Showing posts with label শোক. Show all posts
Showing posts with label শোক. Show all posts

Tuesday, September 1, 2026

গানের কথাই যেন জীবনের পরিণতি, চাদরে মোড়ানো জেনস সুমনের শেষযাত্রা by মনজুর কাদের

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫ঃ ‘একটা চাদর হবে চাদর, যে চাদরে লুকিয়ে থাকবে মানবপ্রেমের আদর’—নিজের গাওয়া সেই গানের মতোই চাদরে লুকিয়েই শেষযাত্রায় বেরিয়ে পড়লেন আলোচিত সংগীতশিল্পী জেনস সুমন। তবে এ যাত্রায় তিনি নিজে সেই চাদর পরেননি, তাঁকে পরিয়ে দেওয়া হয়েছে সেই চাদর, যা পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে তাঁর নিথর দেহ।

অ্যাম্বুলেন্সে শুয়ে তিনি চিরঘুমে; চারদিকে গাড়ি, রিকশা, মানুষের ব্যস্ত চলাচল। কতটাই না নিষ্ঠুর জীবন—অ্যাম্বুলেন্সের মাত্র কয়েক হাত দূরেই পাশের চায়ের দোকানে কয়েকজন তরুণ চা খাচ্ছিলেন। তাঁদের একজন গুনগুন করে গাইছিলেন, ‘একটা চাদর হবে চাদর…।’ হয়তো জানতেও পারেননি, যাঁর গান তিনি গাইছিলেন, সেই শিল্পী পাশের অ্যাম্বুলেন্সেই শুয়ে আছেন নিথর। এ-ই হয়তো শিল্পীর সত্যিকারের সার্থকতা। চলে যাওয়ার পরও গান বেঁচে থাকে।

শেষযাত্রার শুরু
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার একটু বেশি। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে মিরপুর রোড ধরে সুমনের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স এসে থামে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের আল মারকাজুলে। মোটরসাইকেলে পেছনে ছিলেন সংগীতশিল্পী ও সংগীতায়োজক ঈশা খান। সঙ্গে যন্ত্রসংগীতশিল্পী ফয়েজ পুলক এবং সুমনের এক মামাও। সেখানে মরদেহ ধোয়া ও কাফন পরানোর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। সেখান পৌঁছান যন্ত্রসংগীতশিল্পী আজমীর বাবু, গায়ক নমন। ফোনে বারবার খবর নিচ্ছিলেন শিল্পী ইথুন বাবু, যিনি প্রথম সুমনকে শ্রোতাদের কাছে পরিচয় করিয়ে দেন। কাজ শেষে মরদেহ আবার নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে।

হাসপাতালে আহাজারি, সিদ্ধান্তহীনতা
হাসপাতালে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন সুমনের মা সুফিয়া খাতুন, স্ত্রী বীথি মেহেদী, দুই সন্তান, ছোট ভাই শরিফ মেহেদী ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন। একমাত্র ছোট বোন খুলনা থেকে তখন ঢাকার পথে। রাত আটটা। তখনো ঠিক হয়নি কোথায় দাফন হবে। এদিকে হাসপাতালের এক কোণে একটু পরপর ভেঙে পড়ছেন মা সুফিয়া খাতুন। ১৮ বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর এবার বড় ছেলেকে হারানো—এই ব্যথা কোনো ভাষায় ধরা যায় না। অবশেষে তাঁকে বাসায় পাঠানো হয়। কাঁদতে কাঁদতেই গাড়িতে ওঠেন তিনি। এ সময় হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে নিথর সুমন অপেক্ষা করে আছেন… যেন নীরব দর্শক।

দাফনের জায়গা-সময় নিয়ে মতবিরোধ
পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রথমে সুমনের মরদেহ ফরিদপুরে দাফনের কথা ওঠে। পরে সিদ্ধান্ত হয়, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের কবরস্থানে সমাহিত করা হবে। কিন্তু সমাহিত করার সময় নিয়ে বড় জটিলতা দেখা দেয়। সুমনের ভাই ও মামারা চান, ছোট বোন ঢাকায় পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করা হোক, যাতে বড় ভাইকে শেষবার দেখতে পারেন। কিন্তু সুমনের স্ত্রীর ইচ্ছা ছিল রাত ১০টার মধ্যেই দাফন করা হোক। পরিবার দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়ে। আর সাদা কাফনে মোড়ানো সুমন অ্যাম্বুলেন্সে।

ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স ঘিরে জটিলতা
হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুলেন্সে সাদা কাফনে মোড়ানো সুমন চিরঘুমে। এদিকে তাঁর মরদেহ কখন দাফন হবে এ নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এসব কথাবার্তার মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স বদলের একটা সিদ্ধান্ত আসে। একমাত্র বোনের আসা এবং সকাল পর্যন্ত মরদেহ রাখতে হলে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স লাগবে। হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের সামনে থাকা অ্যাম্বুলেন্সের চালকদের সঙ্গে কথা বলেন সুমনের অধ্যাপক মামা দেলোয়ার হোসেন (তিতুমীর কলেজ, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ)। মৃত ব্যক্তির পরিবারের অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে দেরি করলেন না অ্যাম্বুলেন্সের চালক। দ্বিগুণ ভাড়া চেয়ে বসলেন। পরে আল মারকাজুলে যোগাযোগ করলে তারা ২০ থেকে ৩০ মিনিটে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর কথা জানায়। তখনই প্রথম চালক এসে বলেন, ‘ঠিক আছে, যা দিবেন ওদের, আমাকেও দিলেই হবে। মরা মানুষটারে আর কষ্ট দিই না।’ সুমনের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আমরা ওখানে কথা দিয়েছি, ওরাই নিয়ে যাক। কথাবার্তার একপর্যায়ে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স এসে পৌঁছায়। সুমনকে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে তোলা হয়। এর মধ্যে শেষ হয় হাসপাতালের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা। রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলে উত্তরার খানটেক এলাকায় সুমনের বাসার উদ্দেশে।

খানটেকের বাড়িতে শেষ রাত
ফ্রিজিং গাড়িতে পাশে ছিলেন ছোট ভাই শরিফ ও যন্ত্রসংগীতশিল্পী পুলক। বাড়িতে আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন ইথুন বাবু, তিনি সুমনের স্ত্রীকে বুঝিয়ে বলেন সকালে দাফন করাই ভালো। এভাবেই ঠিক হয় জানাজার সময়। আজ শনিবার সকাল ১০টায় উত্তরার খানটেক জামে মসজিদে প্রথম জানাজা হয়। পরে ৪ নম্বর সেক্টর জামে মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা শেষে একই সেক্টরের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। সেই কবরেই ২০০৭ সালে সমাহিত করা হয়েছিল সুমনের বাবা ফারুক মেহেদীকে। এবার তাঁর কবরেই সমাহিত করা হলো সুমনকে।

একনজরে সুমন
সুমনের পুরো নাম গালিব আহসান মেহেদী। বিনোদন অঙ্গনে ও তাঁর ভক্ত–শ্রোতাদের কাছে তিনি জেনস সুমন নামেই পরিচিত। জন্ম ১৯৭৯ সালে শরিয়তপুরে নানাবাড়িতে হলেও ছোটবেলা কেটেছে ধানমন্ডি ১৫ নম্বর এলাকায়। এরপর বেড়ে ওঠার সময়টায় ছিলেন ঢাকার মণিপুরিপাড়ায়। বাবা উত্তরার খানটেক এলাকায় বাড়ি বানানোর পর সুমনরা সেখানে বসবাস শুরু করেন।

কয়েক বছর ধরে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যাত্রাবাড়িতে বসবাস শুরু করেন। গত ২৮ নভেম্বর ২০২৫ শুক্রবার সকালে যাত্রাবাড়ির বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর দ্রুত তাঁকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর পরীক্ষা–নিরীক্ষা শেষে জানতে পারেন তাঁর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। পরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। এরপর বেলা সাড়ে তিনটায় তিনি মারা যান। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৫। সুমন স্ত্রী, দুই সন্তান, মা, এক ভাই, এক বোনসহ আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবাবন্ধব ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের রেখে গেছেন।

‘একটা চাদর হবে’—এই একটি গানই তাঁকে দেশের ঘরে ঘরে পরিচিত করে তোলে। ১৯৯৭ সালে তাঁর প্রথম একক অ্যালবাম ‘আশীর্বাদ’ প্রকাশের পর একের পর এক শ্রোতাপ্রিয় অ্যালবাম উপহার দেন তিনি ‘আকাশ কেঁদেছে’, ‘অতিথি’, ‘আশাবাদী’, ‘একটা চাদর হবে’, ‘আয় তোরা আয়’, ‘চেরি’সহ আরও অনেক গান। ২০০২ সালে বিটিভির একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে প্রচারের পর সাড়া ফেলে ‘একটা চাদর হবে’ গানটি। রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন গানটির গায়ক জেনস সুমন। তারপর আরও কিছু গান করেছেন। এরপর দীর্ঘ বিরতি।

২০০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সবশেষ অ্যালবাম ‘মন চলো রূপের নগরে’। এরপর কিছুটা অনিয়মিত হয়ে পড়লেও শ্রোতাদের মনে জায়গা ছিল অটুট। ১৬ বছরের বিরতি ভেঙে ২০২৪ সালে প্রকাশ পায় তাঁর গান ‘আসমান জমিন’। জি-সিরিজের ইউটিউব চ্যানেলে গানটি মুক্তি পায়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-29%2F21uat6u5%2F5450171108081720118950122717428912645130051n.jpg?rect=0%2C0%2C1728%2C1152&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সংগীতশিল্পী জেনস সুমন। ছবি: ফেসবুক

Thursday, July 9, 2026

খামেনির দাফন আজ, জনসমুদ্র মাশহাদে

ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত পর্ব আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) তার নিজ শহর মাশহাদে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

বিবিসির লাইভ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে হাজার হাজার মানুষ মাশহাদের রাস্তায় নেমেছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ মাশহাদে জড়ো হচ্ছেন।

এদিন অনেককেই ইরানের জাতীয় পতাকা হাতে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া কয়েকজনের হাতে এমন প্ল্যাকার্ডও ছিল, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানানো স্লোগান লেখা রয়েছে।
খামেনির জানাজার দায়িত্ব তদারক করা দপ্তর জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত খামেনি ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মরদেহ বহনকারী বিমানটি ইরাক থেকে মাশহাদের হাশেমিনেজাদ বিমানবন্দরে পৌঁছেছে।

গত শুক্রবার থেকে ইরানজুড়ে আলি খামেনির শেষ বিদায় উপলক্ষে কার্যক্রম শুরু হয়। ইরান ও ইরাকের একাধিক শহরে এসব আনুষ্ঠানিকতা হয়। তার প্রতিটি জানাজায় ছিল লাখ লাখ মানুষের সমাগম।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রথম দিনেই আলি খামেনি তার নিজ বাসভবনে নিহত হন। চার মাসের বেশি সময় পর অবশেষে খামেনির আজ দাফনকার্য সম্পন্ন হতে যাচ্ছে।
এদিকে গত দুই দিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র আবার পাল্টাপাল্টি হামলা চালাচ্ছে।

খামেনির দাফন আজ, জনসমুদ্র মাশহাদে

Monday, July 6, 2026

খামেনির জানাজায় শত্রুদের প্রতিরোধ আর ট্রাম্পকে হত্যার ডাক

দ্য গার্ডিয়ানঃ ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার ডাক দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার তেহরানের একটি জনাকীর্ণ প্রার্থনা অনুষ্ঠানে খামেনির কফিনের পাশে দাঁড়িয়ে এই স্লোগান তোলা হয়।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি ও তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন। যুদ্ধের কারণে এত দিন খামেনির দাফনপ্রক্রিয়া স্থগিত ছিল। এখন ইরানজুড়ে তাঁর সপ্তাহব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক ও জানাজার আনুষ্ঠানিকতা চলছে।

তেহরানের বৃহত্তম মসজিদ গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সাবেক এই সর্বোচ্চ নেতার জানাজাকে কেন্দ্র করে এক রাজনৈতিক আবহের সৃষ্টি হয়েছে। সেখানে শোকের পাশাপাশি প্রতিশোধের দাবিও জোরালো হয়ে উঠেছে। বহু মানুষ আগের রাতেই গ্র্যান্ড মোসাল্লায় অবস্থান নেন।

অনেকেই সকাল আটটায় জানাজা শুরুর বেশ আগে থেকেই সেখানে জড়ো হতে থাকেন। তাঁদের হাতে ইরানের জাতীয় পতাকা, খামেনির ছবি এবং প্রতিশোধের প্রতীক হিসেবে লাল পতাকা ছিল।

গত শনিবারের তুলনায় গতকাল মানুষের উপস্থিতি ছিল অনেক বেশি। উপস্থিত জনতা ছিলেন বেশ আক্রমণাত্মক। ইরান যে এখনো অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী এবং নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ—বিশ্বদরবারে তা প্রমাণ করতেই এই বিশাল জানাজার আয়োজন করা হয়েছে।

জানাজা শুরুর ঠিক আগে কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে কবি মোহাম্মদ রাসুলি বলেন, ‘এখন থেকে কাফনের কাপড়ই আমাদের পোশাক। আপনার রক্তের কসম, ট্রাম্পকে হত্যা করা এখন আমাদের দায়িত্ব।’

মোহাম্মদ রাসুলি আরও বলেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিতর্কিত মানুষটি এখনো কেন বেঁচে আছেন? ট্রাম্পের জন্য পৃথিবী আর নিরাপদ জায়গা নয়। যে ব্যক্তি আমাদের ইমামকে হত্যা করেছেন, আমরা কেন তাঁকে হত্যা করব না? তা না করা আমাদের জন্য কলঙ্কের।’ তাঁর এই পরিকল্পিত ও সরকার অনুমোদিত বক্তব্যের পর উপস্থিত জনতার মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে অধিকাংশ মানুষই তুমুল করতালির মাধ্যমে তাঁর বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান।

আর্মেনিয়ায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত খলিল শিরঘোলামি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘আপনি মানুষকে হত্যা করতে পারবেন, কিন্তু তাঁর আদর্শকে নয়। আপনারা আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যা করেছেন সত্যি, তবে প্রকৃতপক্ষে আপনারা একটি সুগন্ধির বোতল ভেঙেছেন, যার সুবাস এখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।’

খলিল শিরঘোলামি আরও বলেন, ‘আপনাদের কোনো সভ্যতা নেই, ইতিহাস নেই, কোনো সম্মান নেই। তাই আপনারা কখনোই এটি উপলব্ধি করতে পারবেন না।’

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলকাদর বলেন, ‘জনগণ তাঁদের নেতাকে বিদায় জানাতে দুটি স্লোগান দিচ্ছেন—শত্রুদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ইরানের শহীদ নেতার রক্তের প্রতিশোধ।’

মূল জানাজা পড়ান কোম শহরের ৯৭ বছর বয়সী প্রবীণ আলেম আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। এই অনুষ্ঠানে শুধু খামেনি নন, তাঁর পরিবারের আরও তিন সদস্যেরও জানাজা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর পুত্রবধূ জাহরা হাদ্দাদ আদেল এবং ১৪ মাস বয়সী নাতনি জাহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানি। ছোট্ট নাতনির কফিনটি ছিল পুরো অনুষ্ঠানের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী দৃশ্যগুলোর একটি।

বাবার মৃত্যুর পর থেকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে না আসাটা গতকাল আরও বেশি নজরে পড়েছে। জানাজায় অন্য তিন ভাই উপস্থিত থাকলেও মোজতবা খামেনিকে দেখা যায়নি।

বাবার মৃত্যুর ১০ দিন পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হন মোজতবা। তবে তিন মাস ধরে তিনি জনসমক্ষে আসেননি, কোনো অডিও বার্তাও দেননি। এমনকি গত বৃহস্পতিবার নিজের স্ত্রীর জানাজায়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তাঁর অন্য তিন ভাই মুস্তফা, মাসুদ ও মেসাম বাবার কফিনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

জানাজায় ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ইরানি কর্মকর্তারা হয়তো যুদ্ধবিরতির কারণে আশ্বস্ত ছিলেন, এই অনুষ্ঠানে কোনো হামলা হবে না।

আল-কুদস ফোর্সের কমান্ডার ইসমাইল কানি এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার আহমদ ওয়াহিদিও সবার সামনে উপস্থিত ছিলেন। এই দৃশ্য যুদ্ধের শুরুর দিনগুলোয় কল্পনাও করা যেত না।

তবে কিছু মার্কিন ব্যক্তিত্বের মানসিকতার দিকে লক্ষ করলে মোজতবা খামেনিকে যেকোনো মূল্যে রক্ষার এই কঠোর সিদ্ধান্তকে যৌক্তিক মনে হতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগী লরা লুমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই জানাজাকে একটি সহজ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে মার্কিন রক্ষণশীল ভাষ্যকার মার্ক লেভিন মন্তব্য করেছেন, এই জানাজাটি ছিল হাতছাড়া হওয়া একটি সুযোগ।

গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদের চারপাশের রাস্তাগুলো মোজতবা খামেনি এবং তাঁর বাবার ছবি দিয়ে সাজানো হয়েছিল। পাশাপাশি আলেমরা বিভিন্ন স্টল বসিয়ে মোজতবার দেওয়া বক্তব্যের সংকলন–সংবলিত বই বিতরণ করছিলেন।

কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মোজতবা আহত হয়েছিলেন। তবে তাঁরা নিশ্চিত করেছেন, ওই হামলায় তাঁর স্থায়ী কোনো অঙ্গহানি ঘটেনি।

কফিনগুলো যে মঞ্চে রাখা ছিল, সেখানে শোকাহত জনতা বিভিন্ন বার্তা লিখে রাখেন। ইংরেজিতে লেখা তেমনই একটি বার্তা ছিল-‘কিল ট্রাম্প’ (ট্রাম্পকে হত্যা করো)।

জানাজায় অংশ নেওয়া বিশাল জনতার অনেকেই ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও লাল পতাকা ওড়াচ্ছিলেন। বিশাল চত্বরটি বারবার একটি স্লোগানে মুখর হয়ে উঠছিল—‘কোনো আপস নয়, কোনো আত্মসমর্পণ নয়, কেবলই প্রতিশোধ।’

প্রায় ৩০ হাজার মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন এই চত্বরটি ভোরের অনেক আগেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। কিছু পুরুষ সাদা কাফনের কাপড় পরে এসেছিলেন, যা মূলত খামেনির জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করার প্রস্তুতির প্রতীক।

৪০ বছর ধরে নির্মাণকাজ চলার পরও গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদটির বেশ কিছু অংশের কাজ এখনো অসমাপ্ত রয়ে গেছে। মসজিদের বড় একটি অংশ ত্রিপল দিয়ে ঢাকা রয়েছে। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে এর নির্মাণকাজ বারবার পিছিয়ে গেছে। ফলে ভবনটি পশ্চিমাদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সংঘাতের এক প্রতীকী স্মারকে পরিণত হয়েছে।

জানাজা ঠিক কত মানুষ এসেছিলেন, তার আনুষ্ঠানিক কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। অনানুষ্ঠানিকভাবে কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রথম দিনেই ২০ লাখের বেশি মানুষ অংশ নিয়েছেন। সাত দিনের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে আজ সোমবার তেহরানে একটি বিশাল শোকমিছিল হবে। এরপর খামেনির মরদেহ পবিত্র নগরী কোমে নেওয়া হবে। সেখান থেকে ইরাকের দুটি পবিত্র শহরে এবং সবশেষে তাঁর জন্মস্থান মাশহাদে দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শোকাহত জনতাকে কাঁদতে দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন, যা ইরানি নেতৃত্বের পক্ষেই গেছে। ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম তারা তাঁকে (খামেনি) ঘৃণা করত।’ তিনি আরও অনুমান করেন, ‘হয়তো এগুলো সাজানো কান্না।’

তবে শোকাহত জনতার এই কান্না ছিল সত্য। ইরানের আধ্যাত্মিক নেতা ও প্রধান অভিভাবককে হারানোর বেদনায় তাঁরা মূহ্যমান। অনেকেই জানিয়েছেন, অত্যন্ত সীমিত আয় থাকা সত্ত্বেও তাঁরা এই শেষবিদায়ে অংশ নিতে দূরদূরান্ত থেকে এসেছেন। তাঁরা তেহরানের বিভিন্ন স্কুল বা তেলশিল্প প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় অথবা ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে তৈরি অস্থায়ী ডরমিটরিতে তিন দিন ধরে মেঝেতে ঘুমাচ্ছেন। বিভিন্ন মসজিদ, সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি উদ্যোগে গভীর রাত পর্যন্ত পথচারীদের তরমুজ, কাবাব এবং ফলের রস বিনা মূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

এমনই একজন লায়লা আহমাদি। তিনি বোয়ের-আহমাদ থেকে এসেছেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনে আমরা লাঠিসোঁটা ও কোদাল দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লড়াই করব।’

মধ্যরাতের পর তেহরানের রাস্তায় হাজার হাজার শোকাহত মানুষ সমবেত হন। তাঁদের হাতে ছিল খামেনির ছবি–সংবলিত পতাকা ও ব্যানার। তেহরানের প্রধান চত্বরগুলোয় প্রতি রাতেই তীব্র আবেগঘন মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

সমাবেশে অংশ নেওয়া ৭০ বছর বয়সী বই অনুবাদক হোসেন দেহঘান বলেন, ‘আমাদের নেতাকে সন্ত্রাসী কায়দায় হত্যার পর মানুষের মনে গভীর ক্ষোভ ও শোক জন্ম নিয়েছে। এই সমাবেশগুলো মূলত পারস্পরিক সংহতি প্রকাশ এবং তথ্য আদান-প্রদানের একটি মাধ্যম।’

হোসেন দেহঘান আরও বলেন, ‘নেতাকে হারিয়ে দেশের মানুষ এক চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি, পশ্চিমা বিশ্ব তাঁকে একনায়ক বলে ডাকত এবং তিনি সব ইরানির কাছে জনপ্রিয় ছিলেন না ঠিকই, তবে এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মনে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল।’

চলমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে হোসেন দেহঘান বলেন, ‘কোনো আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই একটি স্বাধীন দেশের শীর্ষ নেতাকে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আলোচনার মাঝপথে এভাবে যুদ্ধ শুরু করা স্পষ্টতই একধরনের প্রতারণা। এটি প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ইসরায়েলের গুরুত্ব কতটা বেশি। তাদের উদ্দেশ্য হয়তো ইরানকে মার্কিন উপনিবেশে পরিণত করা। কিন্তু এই জাতির দীর্ঘ ইতিহাস আছে। যখন কোনো দেশের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে, তখন আক্রান্ত জাতি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই প্রতিরোধে উদ্বুদ্ধ হয়।’

চলতি বছরের শুরুতে সরকারের বিরুদ্ধে হওয়া যে গণবিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল, সেটির কথা উল্লেখ করে হোসেন দেহঘান বলেন, ‘গত জানুয়ারিতে যেসব তরুণ বিক্ষোভ করেছিল, তাদের অনেকেই এখন বুঝতে পেরেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সরকার পরিবর্তন করতে চাওয়ার অর্থ হলো আসলে তারা এ দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণ চায় না।’

তেহরানের আরেক বাসিন্দা ইব্রাহিম কালিম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘একটি ইসরায়েলি বোমার আঘাত থেকে আমি অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলাম। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আমি আজ জীবিত।’

যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে ইব্রাহিম কালিম বলেন, ‘রাতে মাত্র কয়েক মাইল দূরে ২০টিরও বেশি বোমা পড়ার শব্দ গোনার অভিজ্ঞতা কেমন, তা আপনারা বুঝবেন না। আকাশ দিয়ে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখার অনুভূতি একাধারে ভীতিকর ও অপমানজনক।’

ইব্রাহিম আরও বলেন, ‘এই দেশের অনেকেই হয়তো পরিবর্তন চান, তবে তা আমাদের নিজেদের মতো করে হতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র এই সাধারণ বিষয়টি বোঝে না। নিজের সরকারের সঙ্গে মতবিরোধ থাকা এবং আক্রান্ত হলে নিজের মাতৃভূমিকে রক্ষা করা—দুটিই অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মানবিক বিষয়।’

গতকাল রোববার তেহরানে আয়োজিত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান
গতকাল রোববার তেহরানে আয়োজিত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ছবি: রয়টার্স

Sunday, July 5, 2026

খামেনির জানাজা দেখিয়ে দিল পৃথিবী ভাগ হয়ে গেছে by কুরনিয়াওয়ান আরিফ মাসপুল

কালো কাপড়ে মোড়া একটি কফিন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে তেহরানের রাস্তায়। বিলম্বিত গ্রীষ্মের গরমে লাখো মানুষের ভিড়। তাঁদের নিশ্বাসও যেন একসঙ্গে উঠছে-নামছে; যেন এক ছন্দে শোক আর প্রতিবাদ মিশে গেছে।

জনসমুদ্রের মাঝখানে কালো পোশাকের ঢেউয়ের ওপরে উঠে আসছে লাল মুষ্টিবদ্ধ হাত—এই শেষযাত্রার প্রতীক। এই হাত শুধু শোকের নয়, এটি প্রতিবাদেরও। চারপাশে একটাই স্লোগান—আমাদের দাঁড়াতেই হবে।

এটি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজার দৃশ্য। টানা ৩৬ বছরের শাসন, নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাওয়া একসময়ের অবসান। ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলাতেই নিহত হন তিনি। কিন্তু এই জানাজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়; এটি একধরনের ভূরাজনৈতিক বার্তা, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক অস্তিত্বগত রায়।

সাত দিন ধরে দুই দেশের পাঁচটি শহরজুড়ে চলবে এই শেষযাত্রা। ইরানের হিসাবে, দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ এতে অংশ নেবেন। শতাধিক দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হাঁটছিলেন তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্টের পাশে।

আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ার নেতারাও এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কর্মীরাও হাজির হয়েছেন কোনো সরকারি আমন্ত্রণ ছাড়াই। তাঁদের দাবি, তাঁরা ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়াতে এসেছেন। কফিনটি যাবে কুম শহর থেকে, তারপর ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষ পর্যন্ত মাশহাদে দাফন করা হবে—ইমাম রেজার মাজারের পাশে।

পশ্চিমা বিশ্ব এই দৃশ্য দেখছে বিভ্রান্তি আর অবজ্ঞা নিয়ে। ফক্স নিউজ বলছে, এই জানাজায় পশ্চিমা নেতাদের অনুপস্থিতিই নাকি ইরানের একঘরে হয়ে পড়াকে প্রমাণ করছে। তারা এই বিশাল আয়োজনকে শাসকগোষ্ঠীর প্রচারযন্ত্রের কারসাজি বলছে। এটিকে তারা একটি ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মরিয়া বৈধতা খোঁজার চেষ্টা হিসেবে তুলে ধরছে।

কিন্তু এই ব্যাখ্যা বড় ভুল। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কাছে খামেনির এই শেষযাত্রা অন্য অর্থ বহন করে। এটি এমন এক ইতিহাসের স্মরণ, যা পশ্চিমা বিশ্ব ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলে গেছে। এ ঘটনা ১৯৫৩ সালে অপারেশন অ্যাজ্যাক্স-এর কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন সিআইএ ও এমআই সিক্স মিলে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে পশ্চিমা তেলের নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিল। এটি আশির দশকে সাদ্দাম হোসেনকে অস্ত্র দেওয়া, ২০০৩ সালে ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইরাক আক্রমণ, লিবিয়ার ধ্বংস, সিরিয়ার বিপর্যয়—এসব ঘটনাকে মনে করিয়ে দেয়। কারণ, এসব ঘটনা আলাদা ঘটনা নয়; বরং আধিপত্য বিস্তারের একটানা কাঠামো।

ইরানের সাবেক এক ডেপুটি স্পিকার এই দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করে বলেছেন—খামেনির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বৈশ্বিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং সেই আধিপত্যকে ভেঙে দেওয়ার বাস্তব প্রমাণ। পশ্চিমা বিশ্ব ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখের হামলাকে দেখছে একটি কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে। তারা এটিকে দেখছে শত্রুদেশের নেতার মাথা কেটে ফেলার মতো নিখুঁত আঘাত হিসেবে। তবে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনও স্বীকার করেছে, ইরানের নেতৃত্ব এত বিস্তৃত যে কেবল শীর্ষ ব্যক্তিকে সরিয়ে দেশকে অচল করা যাবে না।

সার্বভৌমত্বের বিষয়টি পশ্চিমা দৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত একটি আনুষ্ঠানিক বিষয়। তাদের কাছে বিচার মানে প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত প্রক্রিয়া। কিন্তু গ্লোবাল সাউথের কাছে সার্বভৌমত্ব হলো বাইরের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা, যা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হয়। এখানে বিচার মানে ঐতিহাসিক ও পুনর্বণ্টনমূলক ন্যায়, যা এখনো অর্জিত হয়নি। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গি একে অন্যের সঙ্গে মেলে না। খামেনির জানাজা সেই বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। এক পক্ষের কাছে এটি ‘প্রচার’, অন্য পক্ষের কাছে এটি সত্য।

এই শেষযাত্রার বিশেষত্ব এখানেই, এখানে শোককে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা হয়। পশ্চিমা হামলা যেখানে নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়, সেখানে এই জনসমুদ্র দেখাচ্ছে, সমাজ নিজেই নতুন নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। দেড় থেকে দুই কোটি মানুষের এই সমাবেশ যেন এক জীবন্ত ঘোষণা—অদম্য ইচ্ছাশক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এটি যেন উল্টো একধরনের জীবরাজনীতি। সাম্রাজ্য হত্যা করে মানুষকে ভীত ও অনুগত রাখতে চায়। আর প্রতিরোধ শোককে শক্তিতে পরিণত করে মানুষকে একত্র করে, প্রতিবাদী করে তোলে। ফলে প্রতিটি শোকাহত মানুষই হয়ে ওঠে প্রতিরোধের অংশ। এই জানাজা তাই একধরনের সংহতির শক্তি।

এখানেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কী অপরাধ, কী অন্যায়—তা নিয়েই যখন সবাই একমত নন, তখন নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা টিকতে পারে না। গ্লোবাল সাউথ মনে করে, এই ‘নিয়মভিত্তিক’ ব্যবস্থা পক্ষপাতদুষ্ট, তাই তাদের আস্থা কমে যায়। অন্যদিকে পশ্চিম সেই অভিজ্ঞতাকে ভুল বা বাড়াবাড়ি বলে উড়িয়ে দেয়। ফলে নিজেদের ভুল ঠিক করার সুযোগও থাকে না। এ কারণে আলাপ–আলোচনার সুযোগ কমে, বিভাজন বাড়ে। প্রত্যেক পক্ষ নিজের মতো করে যুক্তি দাঁড় করায় নিজের মানুষদের বোঝানোর জন্য। খামেনির জানাজা তাই এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। এটি দেখিয়ে দেয়, আমরা একই গ্রহে আছি, তবে আমরা আর একই দৃষ্টিভঙ্গির পৃথিবীতে বাস করছি না।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার যে সামরিক শিল্প জোটের কথা বলেছিলেন, তার মূল লক্ষ্য ছিল সংঘাত চালিয়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্য বহুদিন ধরেই তাদের পরীক্ষার জায়গা ও লাভের ক্ষেত্র। এই জানাজা যেন সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের সুরে বলছে—সাম্রাজ্যবাদীদের শান্তির চেয়ে শত্রু বেশি দরকার। আর খামেনির ইরান সেই প্রয়োজনীয় শত্রুর ভূমিকাই পালন করেছে। তাই এই শোক শুধু একজন মানুষের জন্য নয়। এটি একটি সম্ভাব্য পৃথিবীর জন্য, যেখানে সার্বভৌমত্ব মানে সত্যিকারের স্বাধীনতা।

পাকিস্তানের উপস্থিতি এখানে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি ও জুনের সমঝোতা স্মারক তৈরিতে তারা সাহায্য করেছে। অথচ সেই দেশের প্রধানমন্ত্রীই এখন তেহরানে দাঁড়িয়ে সেই নেতাকে সম্মান জানাচ্ছেন, যাঁকে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করেছে। এটি দ্বিচারিতা নয়; বরং বহুমুখী বিশ্বের বাস্তবতা।

ইরাকের নাজাফ ও কারবালা হয়ে শেষযাত্রার পথও গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় রাজনীতিকদের অনুরোধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুভূতি নয়; বরং একটি বার্তা—প্রতিরোধ কোনো এক জায়গার ওপর নির্ভর করে না। একজন নেতা চলে গেলেও নেতৃত্ব থেমে যায় না।

* কুরনিয়াওয়ান আরিফ মাসপুল, গবেষক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক লেখক
- মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

খামেনির জানাজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি ভূরাজনৈতিক বার্তা
খামেনির জানাজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি ভূরাজনৈতিক বার্তা। ছবি: রয়টার্স

Thursday, March 19, 2026

হাসির আড়ালে কত কিছুই–না লুকিয়ে রাখতে সুমন ভাই...

প্রকাশ ১৮ মার্চ ২০২৬ঃ গতকাল মঙ্গলবার হঠাৎ মৃত্যু হয়েছে অভিনেতা শামস সুমনের। এই অভিনেতার মৃত্যু ঘিরে অভিনয় অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শোকে স্তব্ধ সহকর্মী ও ভক্তরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন সহশিল্পীরা। স্মৃতিচারণা, শ্রদ্ধা আর চির বিদায়ের বেদনায় ভরে উঠেছে টাইমলাইন। প্রিয় সহকর্মীকে স্মরণ করে কে কী লিখেছেন?

এক সপ্তাহ আগে একসঙ্গে ইফতারের একটি ছবি পোস্ট করে অভিনেতা শাহরিয়ার নাজিম জয় লিখেছেন, ‘সপ্তাহ খানিক আগে একসঙ্গে ইফতারিটা করেছিলাম। চ্যানেল আইতে তাঁর সঙ্গে কথা হতো না এমন দিন খুবই কমই আছে। মৃত্যুর আগের দুই মাস অনেক গল্প হয়েছে অনেক কিছু জেনেছি তাঁর কাছে। তাঁর যাপিত জীবন সম্পর্কে। তাঁর জীবন অনেক কাছ থেকে দেখেছি। পবিত্র এই দিনে চলে গেলি ভাই। ইনশা আল্লাহ ইনশা আল্লাহ তুই বেহেস্তি।’

একসঙ্গে অনেক কাজ করেছেন। সেই সহকর্মীকে হারিয়ে অভিনেতা গোলাম ফরিদা ছন্দা লিখেছেন, ‘শামস সুমন ভাই এটা কী করে হলো! কিছুতেই মানতে পারছি না! তুমি এভাবে চলে যেতে পারো।’ শামস সুমনের সঙ্গে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে অভিনেত্রী তাহমিনা সুলতানা মৌ লিখেছেন, ‘২০০২/ ২০০৩ সালের কথা। এমনই এক রোজার মাসে ঈদের নাটকের শুটিং চলছিল জাহাজে। আমার সঙ্গে যে কো-আর্টিস্ট ছিল, সে সেটে এসে আমাকে দেখে হঠাৎ করেই শুটিং ছেড়ে চলে যায়। তখন আপনাকে খবর দেওয়া হলো। আপনি স্পিডবোটে করে এসে লঞ্চে উঠলেন এবং একেবারে নতুন এক মেয়ের সঙ্গে অভিনয় করলেন—সেই মেয়েটিই ছিলাম আমি। নতুন কারও সঙ্গে কাজ করতে আপনার কখনো কোনো দ্বিধা ছিল না। বরং সাহস আর ভরসা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তারপর তো আপনার সঙ্গে আরও কত কাজ, কত স্মৃতি…আজ সেসবই শুধু মনে পড়ছে।’

অভিনেত্রী বিজরী বরকত উল্লাহ লিখেছেন, ‘যে ছিল আমাদের আড্ডার মধ্যমণি। শুটিংয়ের দিনগুলোতে হাসিঠাট্টায় ভরিয়ে রাখত সারাটা দিন। তোমার গল্পে শুটিংয়ের ক্লান্তিদায়ক দিনটি কেটে যেত কত সহজে। কত শত স্মৃতি, কত শত মজার ঘটনা, ঠাট্টা–তামাশা, কত পরিকল্পনা, কত বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা। তোমার সেই প্রাণ খোলা হাসি। হয়তো তার আড়ালে কত কিছুই–না লুকিয়ে রাখতে। আমরা যারা তোমাকে খুব কাছ থেকে চিনতাম তাদের স্মৃতিতে, হৃদয়ে তোমার হাসিমাখা মুখটি থাকবে চিরজীবন। সুমন ভাই, তোমার অনন্তযাত্রা যেন শান্তিময় হোক।’

প্রিয় সহকর্মীদের হারানোর খবরটা অনেকের কাছেই ছিল অবিশ্বাস্য। শাহনাজ খুশি লিখেছেন, ‘কী শুনলাম? সুমন ভাই, আপনি আর ইহজগতে নাই? এটা আমরা কোন সহকর্মী বিশ্বাস করতে পারছি না! কি অনিশ্চিত এ জীবন? আপনার সব সময়ের হাসিমুখ চোখে রয়ে যাবে সুমন ভাই। অনন্তলোকে আপনি ভালো থাকেন।’

অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল শামস সুমনের। তাঁর প্রয়াণের কথা শুনে মিলন লিখেছেন, ‘শামস ভাইও চলে গেলেন। ১৯৯৯ সালে প্রথম সুমন ভাইয়ের সঙ্গে কাজ হয় আমার। সেই থেকে তাঁর জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত এক মানুষই ছিলেন, সেই স্নেহ সেই ভালোবাসা সুন্দর পরামর্শ আর হাসিঠাট্টা দিয়ে তাঁর সরব উপস্থিতি জানান দেওয়া। যেখানেই থাকবেন ভালো থাকবেন সুমন ভাই।’

গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা শামস সুমনের মৃত্যু হয়। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬১ বছর। তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। এই অভিনেতার জানাজা আজ বুধবার সকাল ১১টায় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়।

 শামস সুমন। ছবি: ফেসবুক থেকে
শামস সুমন। ছবি: ফেসবুক থেকে

Tuesday, March 17, 2026

অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন

প্রকাশ ১৭ মার্চ ২০২৬ঃ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। হাসপাতাল থেকে শামস সুমনের মৃত্যুর খবরটি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছে অভিনেতা সুজাত শিমুল। শামস সুমন রেডিও ভূমির স্টেশন প্রধান এবং চ্যানেল আই এর অনুষ্ঠান বিভাগের পরিচালক ছিলেন।

হাসপাতাল থেকে অভিনেতা সুজাত শিমুল জানান, আজ বিকেল পাঁচটা পর এই অভিনেতা হঠাৎই অসুস্থতাবোধ করেন। তিনি পরে অসুস্থতার কথা জানান আরেক অভিনেতা শাহাদৎ হোসেনকে। শাহাদৎ দ্রত তাঁকে ঢাকার গ্রিন রোড এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই তিনি মারা যান।

সুজাত শিমুল বলেন, ‘আমরা চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, মূলত কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে শামস সুমনের মৃত্যু হয়েছে।’

একসময়ের টিভি নাটকের জনপ্রিয় অভিনেতা শামস সুমন। মঞ্চ থেকে শুরু করে ছোট পর্দা ও বড় পর্দা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। কয়েক বছর ধরে টেলিভিশন নাটকে অনিয়মিত ছিলেন তিনি।

শামস সুমন অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হলো ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’, (২০১৬) ‘কক্সবাজারে কাকাতুয়া’, ‘চোখের দেখা’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, ‘আয়না কাহিনি’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘জয়যাত্রা’, ‘নমুনা’, ‘হ্যালো অমিত’।

২০০৮ সালে ‘স্বপ্নপূরণ’ চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছিলেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2026-03-17%2Fh0we1xju%2FWhatsApp-Image-2026-03-17-at-7.37.21-PM-1.jpeg?rect=0%2C0%2C1600%2C1067&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
অভিনেতা শামস সুমন। ফাইল ছবি

Monday, January 26, 2026

মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু, বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি আর নেই

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়ানো বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসির সাংবাদিক মার্ক টালি মারা গেছেন। নয়া দিল্লির এক হাসপাতালে ৯০ বছর বয়সে শেষ নিঃশাস ত্যাগ করেন খ্যাতিমান এই সাংবাদিক। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে বিবিসি রেডিওতে তার কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত দেশের মানুষ। সার্বিকভাবে তার দৃষ্টান্তমূলক সততা, মানবিক সংবাদ পরিবেশন ও গভীর প্রেক্ষাপটের বিশ্লেষণের জন্য সমগ্র অঞ্চলজুড়ে সমাদৃত ছিলেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন টালি।

দ্য কাশ্মির মনিটরের এক খবরে বলা হয়, টালির কর্মজীবন দীর্ঘ সময়ের। বিশেষত তিনি বিবিসির দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান প্রতিবেদক ও ভারতীয় ব্যুরো প্রধান হিসেবে সংবাদমাধ্যমটির সবচেয়ে বিশ্বস্ত কণ্ঠস্বর ছিলেন। তার সংবেদনশীল, নিরপেক্ষ এবং জটিল রাজনীতিকে সহজভাবে উপস্থাপনের ধরণ শ্রোতাদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছিল।

সাংবাদিকতার মান বুঝাতে পারদর্শী ছিলেন টালি। ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পগুলো সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। সাংবাদিক সমাজ, গবেষক ও সরকারের বাইরে থেকে বহু ব্যক্তি তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে বিশ্বস্ত তথ্যের প্রতীক হিসেবে। তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর থেকেই আন্তর্জাতিক ও দক্ষিণ এশীয় গণমাধ্যম ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশাজীবীরা শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করছেন এবং তার কাজকে আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করছেন।

মুক্তিযুদ্ধ ও মার্ক টালি

একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর হামলার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন খ্যাতনামা এই সাংবাদিক। বেশ কয়েক বছর আগে দিল্লি থেকে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেয়া এক সাক্ষাৎকারে টালি জানান, ২৫ মার্চ ঢাকার অবস্থা স্বাভাবিক বুঝাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাকে বেশ কিছু এলাকা ঘুরে দেখায়।

মার্ক টালি বলেন, অনুমোদন পেয়ে ঢাকার শাঁখারীবাজারে যাই। সেখানে ব্যাপক গোলাগুলি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। আমি বেশ কিছু ছবি তুললাম। হঠাৎ এক পাঞ্জাবি পুলিশ এসে আমাকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমার চলাচলসংক্রান্ত ফাইল দেখে আমাকে আটক করায় ওই পুলিশকে ধমক দেন। ওসি সম্ভবত বাঙালি ছিলেন। ওসির সাহস দেখে আমি মুগ্ধ হই। ওই সময় এটি ছিল অনন্যসাধারণ এক কাজ। আমি তার জন্য গর্ববোধ করি।

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে মার্ক টালি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের আশার আলো। রেডিওতে কান পেতে সকাল-সন্ধ্যা বিবিসিতে মার্ক টালির কণ্ঠ শোনার জন্য অপেক্ষায় থাকত পুরো দেশ। তার কণ্ঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ত তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের বুকেও। বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।

১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন টালি। দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা হিসেবে ১৯৬৫ সালে ভারতে চলে আসেন। কর্মজীবনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ এই অঞ্চলের বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার স্বাক্ষ্য হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অপারেশন ব্লু স্টার ও এর ফলশ্রুতিতে সংঘটিত ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, শিখবিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড উল্লেখযোগ্য।

বিবিসিতে এসব ঘটনার সংবাদ অত্যন্ত সহজ ও সাবলিলভাবে তুলে ধরেছেন।

১৯৯৪ সালের জুলাইয়ে মার্ক টালি বিবিসি থেকে পদত্যাগ করেন। জন বার্ট নামের এক সহকর্মীর সঙ্গে বাদানুবাদ হওয়ার ইস্তফা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বার্টকে ‘ভীত হয়ে প্রতিষ্ঠান চালানো’ এবং ‘বিবিসির নিম্নমুখীতা ও সহকর্মীদের নৈতিকভাবে দুর্বল করার দায়ে অভিযুক্ত করেন। এরপর থেকেই তিনি স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা ও নয়া দিল্লিতে উপস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন।

mzamin

Thursday, January 1, 2026

শোকের জনসমুদ্র, খালেদা জিয়ার জানাজা

এ এক মহাকাব্যিক প্রস্থান। একটি কফিনের পাশে পুরো বাংলাদেশ। বিরল রাষ্ট্রীয় সম্মান। কোটি জনতার হৃদয়নিংড়ানো শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় শেষ বিদায়। দেশের আপামর জনতার কান্নাভেজা শ্রদ্ধায় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার শেষ বিদায়ের এই যাত্রায় শরিক হয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সরকারের প্রতিনিধি, ৩২টি দেশের কূটনীতিক।

দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বেগম জিয়ার জানাজা হয়ে ওঠে স্মরণকালের বৃহৎ সমাগম। শুধু দেশ নয়, মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয় এটি। বিশ্বের কোনো নারী রাজনীতিকের প্রতি মানুষের এমন ভালোবাসার ঘটনাও বিরল। যে মানিক মিয়া এভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি লাখ লাখ মানুষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তার জানাজায় অংশ নিয়েছেন সেখানেই ৪৪ বছর আগে তার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি এমন এক শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল। জিয়ার জানাজাও হয়েছিল ঐতিহাসিক সমাগম। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, জিয়ার জানাজার পর খালেদা জিয়ার জানাজাই দেশের ইতিহাসে বৃহৎ জানাজা। বেগম জিয়ার জানাজায় দেশের সব দল-মত ও পথের মানুষ মিলিত হয় মানিক মিয়া এভিনিউর মোহনায়। জানাজার ব্যাপ্তি জাতীয় সংসদের মাঠ, মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে। রাস্তা, অলি-গলিতে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্রোত।  

পুরো রাজধানী পরিণত হয় শোকের নগরীতে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ৪৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম আর ত্যাগের প্রতি মানুষের এই সম্মান রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক নজির তৈরি করেছে। ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় সমাহিত করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে।

এর আগে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিউতে ৩৭ দিন লড়াই করে ৩০শে ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভোর ৬টায় না ফেরার দেশে চলে যান বেগম খালেদা জিয়া। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর খবর আলোর গতিতে ৫৬ হাজার বর্গমাইল ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা প্রকাশ করেন শোক। ফেসবুকের পাতা ভরে শোকের বার্তা। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে পুরো দেশ। রাতে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ এভারকেয়ারের হিমঘরে রাখা হয়। সেখান থেকে সকাল সোয়া ৯টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও কঠোর নিরাপত্তায় লাল-সবুজের পতাকার আদলের এম্বুলেন্সে করে আনা হয় গুলশানের বাসভবনে। স্বজনদের কান্নায় সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। মায়ের কফিনবাহী এম্বুলেন্সের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেন বড় ছেলে তারেক রহমান। পাশে তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং ভ্রাতৃবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথি দোয়া-দরুদ পড়েন।

স্বজনদের দেখার জন্য দীর্ঘ দুই ঘণ্টা খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী এম্বুলেন্স রাখা হয় গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনের সামনে। বেলা ১১টার দিকে চোখে জলে বাসভবন থেকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় দেন পরিবারের সদস্যরা। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনীর কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে খালেদা জিয়ার কফিনবাহী এম্বুলেন্স রওনা হয় মানিক মিয়া এভিনিউমুখী। এম্বুলেন্সের সামনে সিটে বসেন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেএড এম জাহিদ হোসেন। কফিনবাহী এম্বুলেন্সের সঙ্গে বুলেট প্রুফ বিশেষ বাসে করে রওনা হন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খালেদা জিয়ার কফিনবাহী এম্বুলেন্স পৌঁছে সংসদ ভবন এলাকায়। ততক্ষণে লোকারণ্য হয়ে পড়ে সংসদ ভবন, মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে। আশপাশের কয়েক কিলোমিটার মূল সড়কের দুই পাশে মানুষ, ফুটওভার ব্রিজে মানুষ, রাস্তার পাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে মানুষ, অলিগলি, ফুটওভার ব্রিজ, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে জুড়ে শোকাহত মানুষ। কেউ স্লোগান দিচ্ছেন না, কেউ নির্দেশনা দিচ্ছেন না, তবু সবাই একইদিকে যাচ্ছে। এক নীরব শৃঙ্খলা। সুশৃঙ্খলা এসব মানুষের কারও হাতে শোকের কালো পতাকা, কারও বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেন। কফিন পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালীন যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেসব বক্তব্য জানাজাস্থলে প্রচার করা হয়। সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে নারীদের জন্য আলাদা জানাজার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে খালেদা জিয়ার পরিবারের নারী সদস্যরা অংশ নেন। বেলা ২টায় জানাজা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মানুষের ভিড়ের কারণে মরদেহবাহী এম্বুলেন্স সংসদ ভবনের দক্ষিণপ্লাজায় আনতে এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বেলা তিনটার কিছু আগে জানাজার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। জানাজার আগে খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এরপর তার বড় সন্তান ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মায়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান এবং ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বুধবার বিকাল ৩টা ৩ মিনিটে শুরু হয় জানাজা। জানাজার নামাজ পড়ান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বামপাশে দাঁড়ান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ডানপাশে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, এরপর জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান এবং তারপরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান দাঁড়ান। প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি তার সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান, আ ফ ম খালিদ হোসেন, আলী ইমাম মজুমদার, সি আর আবরার, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রমুখ। জানাজা শেষে খালেদা জিয়ার কফিন বহন করে যারা এম্বুলেন্সে তুলেন তাদের মধ্যে মাওলানা মামুনুল হক ও মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারি, শায়খ আহমদুল্লাহকেও দেখা যায়।  

গুলশানের বাসভবন থেকে অশ্রুসিক্ত শেষ বিদায়: রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ নেয়া হয় গুলশানের বাসভবনে। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে লাল-সবুজের পতাকার রংয়ে মোড়ানো এম্বুলেন্সে করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ আনা হয়। এম্বুলেন্স ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন। খালেদা জিয়াকে শেষবারের মতো দেখানোর জন্য স্বজনরা আগে থেকেই গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনে জড়ো হন। লাশবাহী এম্বুলেন্সটি প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। কেউ কেউ দু’হাত তুলে মোনাজাত করেন। আবার কোরআন তেলাওয়াত করেন। স্বজন, আর নেতাকর্মীদের চোখের পানিতে গুলশানের ১৯৬ বাড়ির আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।

সবাই যখন নীরবে চোখের পানি ফেলে দেশের আপসহীন নেত্রীকে বিদায় জানাচ্ছেন, ঠিক তখনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে পড়ে। অশ্রুসিক্ত শেষ বিদায়ের মুহূর্তে মায়ের কফিনের এক পাশে বসে একাগ্রচিত্তে কোরআন তেলাওয়াত করতে থাকেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পুরো সময় জুড়ে তারেক রহমান ছিলেন, ধীর স্থির।  এ সময়  তারেক রহমানের পাশে মেয়ে জাইমা রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে দেখা যায়। তারেক রহমানের এই নীরব প্রার্থনা অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। দলীয় নেতাকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।  বেলা ১১টা ৫ মিনিটে বাসভবন থেকে জানাজার উদ্দেশ্যে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পথে রওনা হয় লাশবাহী গাড়িটি। গাড়ির পেছনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা সম্বলিত বাসে ওঠেন তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। শোক, ভালোবাসা আর স্মৃতির ভার বুকে নিয়ে এগিয়ে চলে শেষ যাত্রা এক অধ্যায়ের সমাপ্তি আর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে।
কফিন বহন করলেন তিন আলেমেদ্বীন: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কফিন বহন করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ, আলোচিত ইসলামী বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। গতকাল রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে বেগম জিয়ার স্বজনদের সঙ্গে এই তিন আলেম তার কফিন বহন করেন।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে।

অংশগ্রহণকারী অন্য সদস্যরা হলেন- দলটির নায়েবে আমীর মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমীর আবদুর রহমান মুসা, দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন প্রমুখ।  

স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজায় পরিণত হয়। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জানাজায় মানুষের সমাগম হবে আগেই ধারণা করা হয়েছিল। জানাজার স্থল থেকে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার সড়ক, অলিগলিতে মানুষের ঢল ছড়িয়ে পড়ে। লোকসমাগম মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে দক্ষিণে ফার্মগেট, কাওরান বাজার পার হয়ে বাংলামোটর, শাহবাগ, ওদিকে ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর, কলাবাগান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। উত্তরে চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র পার হয়ে আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, পশ্চিমে আসাদগেট, লালমাটিয়া পার হয়ে কল্যাণপুর পর্যন্ত লোকারণ্য হয়ে পড়ে। পূর্বদিকে বিজয় সরণি ফ্লাইওভার, জাহাঙ্গীরগেট, তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত অবস্থান নেয় মানুষ। জায়গা না পেয়ে মেট্রোরেল স্টেশন, ফ্লাইওভার, আশপাশের বাসা-বাড়ির ছাদ, বারান্দা, অলিগলি থেকেও জানাজায় অংশ নিতে দেখা যায় অনেককে। কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। সরজমিন দেখা যায়, খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ভোর থেকেই বানের স্রোতের মতো মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউমুখী আসতে থাকে। চারপাশের প্রধান সড়ক ও অলিগলি দিয়ে শোকের মিছিল শুরু হয়। জানাজার জন্য মানিক মিয়া এভিনিউর চারপাশের প্রধান সড়কে যান চলাচল আগে থেকেই বন্ধ করে দেয়ায় দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে মানুষ উপস্থিত হন।  বেলা ১২টার দিকেই মানিক মিয়া এভিনিউ সড়ক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। পরে আশপাশের আসাদগেট, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর, ধানমণ্ডি ৩২, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, লালমাটিয়া,  সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল রোড, শিশুমেলা, আগারগাঁও সড়ক ও শ্যামলী পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়। গণভনের প্রধান ফটক থেকে শিশুমেলা হয়ে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে লাখ লাখ মানুষ বেগম জিয়ার জানাজায় অংশ নেয়। এ ছাড়া আড়ং থেকে মিনাবাজার হয়ে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর বাংলাদেশ চক্ষু হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাজা নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। মানিক মিয়া এভিনিউ সড়কের শেষ মাথায় আড়ংয়ের পেছন পাশে লালমাটিয়ার অলিগলিতে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা আদায় করেন। জানাজায় উপস্থিত শোকাহত লোকজন খালেদা জিয়ার ত্যাগ নিয়ে নানা মন্তব্য করেন। তারা বলেন, দেশের মানুষের অধিকারের জন্য গণতন্ত্রের জন্য জীবনে প্রায় সব রকম মানবিক কষ্টই ভোগ করে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে দুই শিশু সন্তানসহ বন্দি হন,  ১৯৭৫ সালে স্বামীর সঙ্গে গৃহবন্দি হন, ১৯৮১ সালে তরুণী বয়সে হারান স্বামী জিয়াউর রহমানকে,  এরপর দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ৩০  বছর দুই দু’টি স্বৈরাচারের নির্যাতন-নিপীড়ন, শেষ ১৮ বছর পরিবারহীন নিঃসঙ্গতা, গুলশান কার্যালয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় ছোট সন্তানকে হারানোর বেদনা, বড় সন্তানকে পঙ্গু করে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানোর যন্ত্রণা, বিনা অপরাধে পরিত্যক্ত কারাগারে দুই বছর কাটানোর যন্ত্রণা হাসিমুখে সহ্য করেন। সহজ পথ এড়িয়ে তিনি স্বেচ্ছায় এই কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন শুধু দেশবাসীর মুক্তির জন্য।

স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকাল সাড়ে ৪টায় স্বামীর কবরের পূর্বপাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এ সময় তার বড় ছেলে ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্য, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। দাফন শেষে খালেদা জিয়ার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিন বাহিনীর সদস্যরা। এরপর বড় ছেলে তারেক রহমানও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর বুলেটপ্রুফ বাসে করে  তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা গুলশানের বাসভবনে ফিরেন।

বিভিন্ন দেশে ও জেলায় গায়েবানা জানাজা: এদিকে ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় বেগম খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর গায়েবানা জানাজা পড়েন। এদিকে চীনের শেনজেন শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদে বুধবার রাতে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহত্তর চায়না বিএনপি’র আয়োজনে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীসহ দলমত নির্বিশেষে চীন প্রবাসী বাংলাদেশিরা এতে অংশগ্রহণ করে। ওদিকে বুধবার বাদ আসর মালদ্বীপের মালে শহরে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন।

জানাজায় অসুস্থ হয়ে একজনের মৃত্যু:
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেয়া একজন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। বুধবার দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণের পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের নাম মো. নীরব হোসেন (৫৬)। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ডালিমিয়া এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নীরব নামের ওই ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। তিনি মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রচুর ভিড়ে ও মানুষের চাপে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। ওসি বলেন, আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি- গরম ও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

Wednesday, December 31, 2025

লড়াকু এক যোদ্ধার বিদায়

না ফেরার দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের আশার বাতিঘর বেগম খালেদা জিয়া। থেমে গেল দীর্ঘ ৪৩ বছরের আপসহীন, সংগ্রামী, লড়াকু এক রাজনৈতিক জীবন। জাতি হারালো রাজনীতির এক নির্ভরযোগ্য অভিভাবক। মানুষ আর গণতন্ত্রের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের এক বিশ্বস্ত ঠিকানা। হয়ে উঠেছিলেন গণমুখী রাজনীতির উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, গণতন্ত্র ও অধিকার রক্ষায় এক লড়াকু সৈনিক। লাজুক গৃহবধূ থেকে রাজনীতির ময়দানে পা রাখা বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রশ্নে জীবনে একদিনের জন্যও আপস করেননি। ফ্যাসিবাদ, স্বৈরশাসনের সামনে এক মুহূর্তের জন্য হার মানেননি। প্রতিটি গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে তিনি ছিলেন সামনের সারির লড়াকু এক যোদ্ধা। নির্বাচনী লড়াইয়ে যার কোনো পরাজয় নেই। প্রতিপক্ষের হিংসা, নির্যাতন, রাজনৈতিক আঘাতের জবাব তিনি দিয়েছেন শালীন ও রাজনীতির ভাষায়। হিংসার জবাব দিয়েছেন শান্তির বলিষ্ঠ বার্তায়।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন দেশের নারী সমাজের। নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের রোলমডেল এক সরকার প্রধান। ৩০শে ডিসেম্বর শীতের কনকনে ভোরে দেশবাসীকে কাঁদিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে। তার এই মহা প্রয়াণে দেশ হারিয়েছে এক মহীয়সী নক্ষত্র, যার আলোয় আলোকিত ছিল গণতন্ত্রকামী এক প্রজন্ম। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দেশি-বিদেশি চিকিৎসক-কর্মীদের ৩৭ দিনের টানা চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বেগম খালেদা জিয়ার অন্তিম মুহূর্তে তার বড় ছেলে তারেক রহমান, পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার আরেক পুত্রবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমানসহ স্বজনরা এভারকেয়ার হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।

রাজনীতির এই অভিভাবককে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান দেশ। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। আজ বুধবার ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি।

মহিয়সী এই নারীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন। শোক প্রকাশ করে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

বেগম খালেদা জিয়ার দাফন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হবে রাষ্ট্রীয় সম্মানে। বেলা দুইটায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউতে বিএনপি চেয়ারপারসনের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় সম্মানে সংসদ ভবনের উত্তর পাশের জিয়া উদ্যানে প্রয়াত স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত হবেন জাতীয় এই অভিভাবক। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই তার জানাজায় অংশ নিতে সাধারণ মানুষ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসতে শুরু করেন। জানাজা ও শেষ বিদায়ে অংশ নিতে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা আসছেন বলে গতকালই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। দলীয় চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে বিএনপি। দলের গুলশানের কার্যালয়ে খোলা হয়েছে শোক বই। গতকালই শোক বইতে সই করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। শোক বইতে সই করেন ২৮টি দেশের কূটনীতিক। আজ এবং আগামীকালও এই শোক বইতে স্বাক্ষর করা যাবে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল। দরদি এই রাজনীতিকের প্রয়াণে শোকে মুহ্যমান দেশের সব শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণের মানুষ। শোকগ্রস্ত নেতাকর্মীরা প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ছুটে যান এভারকেয়ার হাসপাতালে, দলের গুলশান ও নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

দলের সমর্থক, সাধারণ মানুষের ভিড়ে এই তিনটি স্থান পরিণত হয় শোক, নীরবতা এবং আবেগের এক প্রাঙ্গণে। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছেন, কেউ আবার দুই হাত তুলে দোয়া, মোনাজাত করেছেন আপসহীন নেত্রীর মাগফেরাত কামনায়।

গতকাল সকালে এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সংবাদটি নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে হবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি। আমরা এবারো আশা করছিলাম, ঠিক আগের মতোই আবারো তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত, ইতিমধ্যে আপনারা শুনেছেন মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার ঘোষণা করেন মঙ্গলবার ভোর ৬টায় আমাদের গণতন্ত্রের মা, আমাদের জাতির অভিভাবক আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। এই শোক, এই ক্ষতি- এটা অস্বাভাবিক, অপূরণীয়। এই জাতি কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, যে নেত্রী তার সারাটা জীবন জনগণের অধিকারের জন্য, কল্যাণের জন্য, তার সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। এটা আমরা যারা তার সহকর্মী এবং রাজনৈতিক কর্মী, আমরা এটা ভাবতে পারি না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো। শুধু তাই নয়, গণতান্ত্রিক পৃথিবীর এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো।

এরআগে খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার আনুষ্ঠানিকভাবে খালেদা জিয়া ভোর ৬টায় আইসিইউতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে জানান। ব্রিফিংয়ের সময়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। বৈঠকে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও ১ দিনের সাধারণ ছুটির সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি এই সিদ্ধান্ত জানাতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা। পরে দুপুরে বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠকে বসে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে।

এভারকেয়ার থেকে ফিরোজায় যাবে খালেদা জিয়ার মরদেহ: গত রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালেই ছিল বিএনপি চেয়ারপারসনের মরদেহ। আজ হাসপাতাল থেকে মরদেহ গুলশানের বাসা ফিরোজায় নেয়া হবে। গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা আজ বাদ জোহর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে লাশবাহী গাড়ি এভারকেয়ার হাসপাতাল-৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে-কুড়িল ফ্লাইওভার-নৌ সদর দপ্তর হয়ে বাসভবন ফিরোজা, গুলশান-২-কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ-এয়ারপোর্ট রোড-মহাখালী ফ্লাইওভার-জাহাঙ্গীর গেট-বিজয় সরণি-উড়োজাহাজ ক্রসিং হয়ে বামে মোড় নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের ৬ নম্বর গেট দিয়ে দক্ষিণ প্লাজায় যাবে।

চোখে অশ্রু, হাসপাতালের ফটকে ভিড়: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের চোখেমুখে ছিল গভীর শোকের ছায়া। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছিলেন, কেউ আবার দুই হাত তুলে করছিলেন দোয়া ও মোনাজাত। ভিড়ের মধ্যে কোথাও কান্নার শব্দ, কোথাও দীর্ঘশ্বাস-সব মিলিয়ে এক  শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল চত্বর ও সংলগ্ন সড়কে মানুষের চাপ বাড়তে থাকে। ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়। ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কর্মী স্মৃতি চারণা করছিলেন। কেউ আন্দোলনের দিনের কথা বলছিলেন, কেউ কারাবন্দি অবস্থায় খালেদা জিয়ার দৃঢ় অবস্থানের কথা স্মরণ করছিলেন।

শোকে আচ্ছন্ন বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়: খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন গুলশানে তার কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তার মৃত্যুর সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পরপরই দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয় কার্যালয়ে। সেখানে ভিড় করেন দলের নেতাকর্মীরা। চেয়ারপারসনের মৃত্যুর খবরে কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া বিএনপি’র নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কান্নার রোল নয়াপল্টনে, কোরআন খতম: খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হতে দেখা গেছে নেতাকর্মীদের। প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুতে কান্নার রোল পড়ে তাদের মধ্যে। অনেককে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে। কার্যালয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গেলে কোনো ব্যাগ বা ভারী সামগ্রী সঙ্গে নেয়া যাবে না বলে জানানো হয়েছে। জানাজা ও দাফনের সময়সূচি জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক বার্তায় এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, আজ দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবন মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা হবে। এরপর আনুমানিক বেলা সাড়ে ৩টায় শেরেবাংলা নগরে  জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। জানাজার সময় কোনো ব্যাগ বা ভারী সামগ্রী বহন করা যাবে না। দাফনের কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে হবে বলে সেখানে সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার থাকবে না।

অন্যদিকে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় গুলশানের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এতে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অংশ নেন। দুই ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী কমিটির এ বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে কার্যালয়ে সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার জানাজা বুধবার বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে তার স্বামী সাবেক  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হবে। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার জানাজা পড়াবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব। পুরো জানাজা কার্যক্রমের সঞ্চালনা করবেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। সবাই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে জানাজায় অংশগ্রহণ করবেন। তার দাফনে অংশ নেবেন।

গুলশান কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে:
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শোকবইতে স্বাক্ষর করা হয়।  এ ছাড়া আজ বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা এবং আগামীকাল সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শোকবইতে স্বাক্ষর করা যাবে। শোকবইয়ে প্রথম স্বাক্ষর করেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান, জার্মান, ইরান, ওমান, আলজেরিয়া, কাতার, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন, ব্রুনাই, প্যালেস্টাইন, স্পেন, মরক্কো, ভুটান, ব্রাজিলসহ ২৮টি দেশের কূটনৈতিক শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। এ ছাড়াও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী, জামায়াতের নাযেবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলন প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, মেজর জেনারেল অব. মনিরুজ্জামান, মেজর জেনারেল অব. এ টি এম ওয়াহাব, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

শেষ কয়েকদিন খালেদা জিয়াকে যে চিকিৎসা করা হয়েছে: ছেলে তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরে অনেকটা স্বস্তিবোধ করেছিলেন অসুস্থ খালেদা জিয়া। তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরটি বিএনপি চেয়ারপারসনকে জানান তার পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান ও ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) থেকেই ছেলের দেশের ফেরার খবর পান খালেদা জিয়া। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সময়ে তার শরীরে গুরুতর ইনফেকশনের কারণে উন্নত অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

বিএনপি’র ৭ দিনের শোক কর্মসূচি: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ৭ দিনব্যাপী শোক ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি দেয়া এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে আগামী ১লা জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোকের এই ৩ দিন দেশব্যাপী সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে ৭ দিনব্যাপী কালো পতাকা উত্তোলন এবং দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ। দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা কালোব্যাজ ধারণ করবে। প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার জন্য ৭ দিনব্যাপী কোরআন খতম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে গুলশানস্থ বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ও নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এবং জেলা পর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে।

সোমবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সকাল, বিকাল এবং রাতে হাসপাতালে যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। এ ছাড়াও হাসপাতালে যান খালেদা জিয়ার বড় বোন সেলিনা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, আরাফাত রহমান কোকোর মেয়ে জাহিয়া রহমান এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাত ২টায় হাসপাতাল থেকে বের হন তারেক রহমান। কিছু সময়ের বিরতি দিয়ে তিনি আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাসপাতালে যান। বেগম খালেদা জিয়ার অন্তিম সময়ে তারা হাসপাতালেই ছিলেন। 

mzamin

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই

ফরাসি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি ব্রিজিত বার্দো আর নেই। রবিবার তার প্রতিষ্ঠিত বার্দো ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ৯১ বছর বয়সে মারা গেছেন তিনি। অভিনয়জীবনে বার্দো ৫০টিরও বেশি ছবিতে কাজ করেছেন। এরপর তিনি নিজেকে প্রাণী অধিকার আন্দোলনে উৎসর্গ করেন। জীবনের পরবর্তী দশকগুলোতে তিনি চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী সম্প্রদায়, মুসলিম ও অভিবাসীদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করার কারণে বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে পাঁচবার দোষী সাব্যস্ত হন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ফ্রান্স ২৪।

এতে আরও বলা হয়, যৌবনে বার্দো ছিলেন নিরঙ্কুশ এক যৌন-প্রতীক। তার মোহময়ী শারীরিক আবেদন ও মুক্ত জীবনযাপন তৎকালীন ১৯৫০-এর দশকে প্রবল আলোড়ন তুলেছিল। কিন্তু খুব শিগগিরই পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টির সেই অবিরাম অনুসরণে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং সবকিছু ছেড়ে দেন পশুদের জন্য কাজ করতে। শুরুর দিনে যখন তার বাঁকানো দেহরেখা, কাজল নয়ন আর অভিমানী ঠোঁট ফরাসি চলচ্চিত্রের পোস্টারজুড়ে ছড়িয়ে ছিল, তখন ‘বিবি’ নামে পরিচিত এই অভিনেত্রীকে প্রায়ই তুলনা করা হতো মেরিলিন মনরোর সঙ্গে। কিন্তু ১৯৭৩ সালে, হঠাৎ একদিন তিনি খ্যাতির সেই নীল জগতকে বিদায় জানান। অবহেলিত প্রাণীদের দেখভাল করার জন্য সিদ্ধান্ত নেন। তার ভাষায়, তিনি ‘প্রতিদিন সুন্দর হতে হতে অসুস্থ’ হয়ে পড়েছিলেন। তার অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত অভিনয়জীবনে বার্দো একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করলেও সমালোচকদের কাছ থেকে খুব বেশি প্রশংসা পাননি। তার পঞ্চাশটির বেশি চলচ্চিত্রের বেশির ভাগই ছিল মজাদার। তবে তা বেশি সময় স্থায়ী হয়নি, কেবল কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া। ১৯৫৬ সালে ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’ ছবিতে তিনি ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন। সেই তরুণীর প্রেম জড়িয়ে পড়ে এক ত্রিভুজ প্রেমে। ছবিটি পরিচালনা করেন তার তৎকালীন স্বামী রজার ভাদিম। ভাদিমের ভবিষ্যদ্বাণী ছিল, এই তরুণ নৃত্যশিল্পী হয়ে উঠবেন ‘সমস্ত বিবাহিত পুরুষের নাগালের বাইরে থাকা কল্পনার নারী’ এবং তার সেই কথাই সত্যি হয়। ছবিটির এক বিখ্যাত দৃশ্যে, কোমর পর্যন্ত চেরা স্কার্ট পরে মাম্বো নাচতে থাকা বার্দোর মুক্ত যৌনশক্তির প্রকাশ তাকে দেবীর মর্যাদা দেয়। যদিও তা একই সঙ্গে তা চলচ্চিত্র সেন্সরদের বিরক্তির কারণ হয়। সাত বছর পর জ্যঁ-লুক গদারের ‘কনটেম্পট’-এ এক হতাশ, নির্জীব স্ত্রী চরিত্রে তার অভিনয়ও পরিণত হয় চলচ্চিত্রকিংবদন্তির অংশে। প্রযোজক ও দর্শকদের নগ্নদৃশ্যের প্রত্যাশার সঙ্গে গদার এমনভাবে দৃশ্য নির্মাণ করেন যেখানে বিছানায় শুয়ে থাকা বার্দোর শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কোলাজ তৈরি করা হয়। আর তিনি স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, তার শরীরের কোন অংশটি তার সবচেয়ে প্রিয়।

১৯৫৮ সালে ফরাসি লেখিকা মার্গারিত দ্যুরাস লিখেছিলেন- ‘রানী বার্দো দাঁড়ায় সেখানেই, যেখানে নীতিনৈতিকতার শেষ সীমানা।’ এক বছর পর দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার মন্তব্য করেন, তিনি নিজের ইচ্ছামতো চলেন। আর এটাই মানুষকে বিচলিত করে।
কিন্তু ‘স্বাধীনচেতা নারী’ রূপে নিজের এই জন-ইমেজে আনন্দ খুঁজে পাননি বার্দো; বরং তিনি সংগ্রাম করেছেন বস্তুতান্ত্রিক দৃষ্টির বিরুদ্ধে। ১৯৬০ সালে ২৬তম জন্মদিনে তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। আর ১৯৭৩ সালে চল্লিশে পা দেয়ার আগে তিনি পুরোপুরি সরে দাঁড়ান আলো-ঝলমলে জীবন থেকে। ১৯৭৮ সালে তিনি বলেন, ‘আমি জানতাম আমার ক্যারিয়ার সম্পূর্ণভাবে আমার শরীরের ওপর দাঁড়িয়ে। তাই আমি সিনেমা ছেড়ে দিলাম। যেমন আমি সবসময় পুরুষদের ছেড়ে যাই, আগে।’

১৯৩৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর প্যারিসে জন্ম নেয়া বার্দো বেড়ে উঠেছিলেন সচ্ছল, ঐতিহ্যবাহী ক্যাথলিক পরিবারে। চারবার বিয়ে করা বার্দোর একমাত্র সন্তান নিকোলা। তার পিতা বার্দোর দ্বিতীয় স্বামী অভিনেতা জ্যাক শারিয়ের। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তিনি সেন্ট-ট্রোপেজে প্রায় নির্জন জীবন বেছে নেন এবং এরপর থেকে প্রাণীঅধিকারই হয়ে ওঠে তার জীবনের প্রধান পরিচয়। ১৯৮০-এর দশকে কানাডায় বার্ষিক সীলশাবক হত্যাযজ্ঞ দেখার অভিজ্ঞতা তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। ২০১১ সালে ডব্লিউডব্লিউএফ’কে দেয়া এক চিঠিতে তিনি লিখেছেন, ‘ওই দৃশ্যগুলো আমি কখনো ভুলতে পারি না। যন্ত্রণাভরা সেই আর্তচিৎকার এখনো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কিন্তু সেগুলোই আমাকে শক্তি দিয়েছে নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করার, প্রাণীর জীবনের পক্ষে।’

প্রাণী সুরক্ষার লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন। তিনি শিশু সীল, হাতি, পশুবলি প্রথা ও ঘোড়া জবাইখানা বন্ধের দাবিতে আন্দোলন করেন। পরবর্তী জীবনে বার্দো ক্রমশ চরম ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়েন। সমকামী, মুসলিম ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্যের কারণে তাকে পাঁচবার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয় বর্ণবিদ্বেষ উসকানির অভিযোগে। ২০০৩ সালের বই ‘এ ক্রাই ইন দ্য সাইলেন্স’-এ তিনি সতর্ক করেন ফ্রান্সের গোপন, বিপজ্জনক, নিয়ন্ত্রণহীন অনুপ্রবেশ সম্পর্কে। ২০১২ ও ২০১৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন দেন অতি ডানপন্থী নেতা মারিন ল্য পেনকে । তিনি তাকে বলেন ‘২১শ শতকের জোয়ান অব আর্ক’।

ফ্যাশন ও চলচ্চিত্র জগত থেকে সরে যাওয়ার বহু বছর পরও বার্দো সেই জগতগুলো থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। পশমের পোশাক পরার বিরুদ্ধে ছিলেন সরব এবং গর্বের সঙ্গে এড়িয়ে গিয়েছেন প্লাস্টিক সার্জারি। ২০১৭ সালে হার্ভে  ওয়েনস্টিন কেলেঙ্কারির পর যখন মি-টু আন্দোলন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তখনও তিনি উল্টো স্রোতে হাঁটেন। ২০১৮ সালে প্যারিস ম্যাচ’কে তিনি বলেন, বেশিরভাগই ভণ্ডামি ও হাস্যকর আচরণ করছে। তার মতে, অনেক অভিনেত্রী প্রযোজকদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা করে। আর পরে আলোচনায় আসার জন্য বলে বসে তারা হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘পুরুষরা যখন আমাকে সুন্দর বলত, বা বলত আমার নাকি সুন্দর পশ্চাৎদেশ- আমি সেটাকে আকর্ষণীয়ই মনে করতাম।’

mzamin

Tuesday, December 30, 2025

বিদায় খালেদা জিয়া: সব চেষ্টা ব্যর্থ, চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী

প্রথম আলোঃ বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ আজ মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে প্রথম আলোকে জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে জানিয়েছেন,  ‘আম্মা আর নেই।’

এর আগে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন প্রথম আলোকে জানান, খালেদা জিয়া সকাল সাড়ে ৬টার সময় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাঁর পাশে তারেক রহমান ও পরিবারের অন্য সদস্যরা ছিলেন।  

খালেদা জিয়ার জানাজা আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া  ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন । চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। মামলা–মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ—এসবও তাঁদের জীবনে অভাবনীয় নয়। খালেদা জিয়াও চরম পর্যায়ের এমন নির্যাতন সহ্য করেছেন। সহ্য করেছেন স্বামী–সন্তান হারানোর গভীর শোকসন্তাপ, আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা।

রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব–সংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন খালেদা জিয়া।

শৈশব

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুরে ( তবে এই তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতপার্থক্য রয়েছে)। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামে। মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীতে। তাঁদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘খালেদা খানম’। অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন বলে বাড়ির লোকেরা তাঁকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন। সেটিই তাঁর ডাকনাম হয়ে যায়। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট যোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে (উচ্চমাধ্যমিক) উত্তীর্ণ হন।

ইস্কান্দার মজুমদার ধার্মিক ও উদার মানসিকতাসম্পন্ন ছিলেন। তাঁর বাড়িতে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশও ছিল। বড় মেয়ে খুরশিদ জাহান হক গান এবং খালেদা খানম নৃত্যের চর্চা করতেন। বাড়িতে আরবি শিক্ষকের পাশাপাশি সংগীত-নৃত্যের শিক্ষকও ছিলেন। শৈশবে দিনাজপুরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, এমনকি দিনাজপুরের বাইরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি নৃত্য পরিবেশন করে সমাদৃত হয়েছেন। মা তৈয়বা বেগমের রান্নার হাত ছিল চমৎকার। মেয়েদের তিনি রান্না শিখিয়েছেন। মায়ের কাছ থেকে খালেদা খানমই তিন বোনের মধ্যে রান্নার গুণ ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন।

খালেদা খানমের বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে বলা হয়েছে, শৈশব থেকেই তিনি পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। ফুলের প্রতি নিবিড় অনুরাগ ছিল তাঁর। নিজের ঘর পরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখতেন। পরবর্তী জীবনেও তিনি ফুলের প্রতি এই অনুরাগ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি থাকার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।

বিবাহ

সেনাবাহিনীর তরুণ ও চৌকস কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ার পৈতৃক বাড়িতে খালেদা খানমের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের প্রসঙ্গে তাঁর এক জীবনীকার লিখেছেন (প্রাগুক্ত) ঘটক জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন,  ‘“আপনি যদি তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হন, তাহলে আপনার বাড়িতে বিজলিবাতির দরকার হবে না। পাত্রী এত রূপসী যে তাঁর রূপের ছটায় সব অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।” জিয়া হাসলেন ও বিয়ে করতে সম্মত হলেন।’ বিয়ের পর থেকে তিনি ‘বেগম খালেদা জিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।

জিয়া-খালেদা দম্পতির দুই ছেলে। জ্যেষ্ঠ তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। কনিষ্ঠ আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১ সালের ৩০মার্চ এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে শহীদ হন। মাত্র ২১ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে ৩৬ বৎসর বয়সে খালেদা জিয়া অকালবৈধব্য বরণ করেন।

পরিমিত আহার করতেন বেগম খালেদা জিয়া। ফল খেতে পছন্দ করতেন। বিশেষ করে নিয়মিত পেঁপের রস পান করতেন। প্রিয় খাবার ছিল সাদা ভাত, সবজি, মসুর ডাল ও মাছ। মাংস খেতেন, তবে তেমন পছন্দের ছিল না। শ্রোতা হিসেবে তিনি বেশ ভালো ছিলেন। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। জীবনীকারেরা বলেছেন, ‘প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে বিচক্ষণ হয়ে ওঠেন’ (বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম, মাহফুজ উল্লাহ)।

রাজনৈতিক জীবন

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু। জিয়াউর রহমানের প্রয়াণের পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ১৯৮২ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন।

খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সমুন্নত রাখার পাশাপাশি এইচ এম এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তাঁর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথমেই তিনি দলের শীর্ষপদ পাননি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পর ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিজের ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছর দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এল সাফল্য

স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল ৭–দলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় ‘আপসহীন নেত্রী’  হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি ‘এরশাদ হটাও’ শীর্ষক এক দফা আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের চড়াই-উতরাইয়ের পথ পেরিয়ে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে অনেকেরই পূর্বানুমান ছিল তাঁর বিরোধী পক্ষই বিজয়ী হবে; কিন্তু সেসব অনুমান মিথ্যায় পর্যবসিত করে দীর্ঘ আট বছরের অবিরাম, নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামের পর বিএনপির বিজয় তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নহীন করে তোলে। দেশের প্রথম ও বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করেছেন। কোনোটিতেই তিনি পরাজিত হননি। তাঁর এক জীবনীকার বলেছেন, ‘দেশের সব জায়গায় তিনি গেছেন। তিনি পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ সফর করতে পারঙ্গম ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন।’(প্রাগুক্ত : মাহফুজ উল্লাহ)

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে অনেক সাফল্য থাকলেও কিছু সমালোচনাও রয়েছে। বিশেষত দুর্নীতি দমনে তিনি সফল হননি বলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রবল অভিযোগ তোলা হয়েছে বিরোধী পক্ষ থেকে। কথিত ‘হাওয়া ভবন’ ও দুর্নীতির ধারণা সূচক অনুসারে (২০০১-২০০৫) টানা পাঁচ বছর বিশ্বের সবচেয়ে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তাঁর প্রশাসনের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।

কারাবাস

খালেদা জিয়া জীবনের নানা পর্যায়ে বেশ অনেকটা সময় বন্দিত্বের নির্যাতনের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ জুলাই থেকে যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সেনানিবাসে বন্দী ছিলেন। জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর ১৯৮১ সালে সেনানিবাসের বাড়িতে তাঁকে কিছুদিন গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে আলোচিত কালপর্বে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল সড়কের বাড়িতে গৃহবন্দী করা হয়। পরে সেখান থেকে সংসদ ভবনের একটি বাড়িতে সাবজেল ঘোষণা করে এক বছর সাত দিন তাঁকে বন্দী রাখা হয়।

 পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত পুরোনো কারাগারে বন্দিত্বের কঠিন সময় কেটেছে খালেদা জিয়ার জীবনে। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ‘ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা’ করা হয়। গ্রেপ্তার করে এই নির্জন স্থাপনাটিতে বিশেষ কারাগার ঘোষণা করে তাঁকে বন্দী রাখা হয়। এ মামলায় তাঁকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে স্লো পয়জনিংয়ের অভিযোগ ওঠে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার বিদেশে চিকিৎসার আবেদন করেও অনুমতি পাননি। মানবিক কারণে ২০২০ সালে তাঁকে রাজনীতিতে যুক্ত না থাকার শর্তে কারাগার থেকে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। গত বছর ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাঁর দণ্ড মওকুফ করে মুক্তি দেওয়া হয়।

চিকিৎসা

মুক্তি পাওয়ার পর চলতি বছর ৭ জানুয়ারি লন্ডনে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর স্বাস্থ্যের অনেকটা উন্নতি হয়েছিল। তবে নানা রোগে জটিলতা ও শরীর–মনে ধকল সহ্য করে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বয়সও ছিল প্রতিকূল। প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন। হাসপাতালে ভর্তি করানো হতো। গত ২৩ নভেম্বর এমনই পর্যায়ে তাঁকে শেষবারের মতো রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক মাসের কিছু বেশি সময় তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন। এবার তিনি আর চিকিৎসায় সাড়া দিতে পারলেন না। ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন তাঁর প্রিয় দেশবাসীর কাছ থেকে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

Monday, September 15, 2025

কুষ্টিয়ায় দাফন সম্পন্ন: আমরা আম্মার শেষ ইচ্ছাটাই পূরণ করেছি: ফরিদা পারভীনের ছেলে নাহিল by তৌহিদী হাসান

‘আম্মা যখন অসুস্থ ছিলেন, তখন তাঁর শেষ ইচ্ছাটা ছিল কুষ্টিয়াতে একবার আসতে চান। এবং ওনার (আম্মা) শেষ ইচ্ছাটা ছিল তাঁর মা–বাবার কবরে তাঁকে শায়িত করা হোক। আমরা ওনার শেষ ইচ্ছাটাই পূরণ করছি।’

লালনসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের জানাজার আগে এসব কথা জানালেন তাঁর ছেলে ইমাম নাহিল। জানাজা শেষে রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে মা–বাবার কবরে চিরশায়িত করা হয় ফরিদা পারভীনকে। এ সময় সেখানে তাঁর দুই ছেলে ইমাম নাহিল, ইমাম নিমেরী, এক মেয়ে জিহান ফারিয়াসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

গত শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীন (৭১)। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন। রাত ৮টা ২৩ মিনিটে ফরিদা পারভীনের মরদেহ বহনকারী ফ্রিজিং গাড়ি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্তানে এসে পৌঁছায়।

সেখানে অনুষ্ঠিত জানাজায় লালন একাডেমির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন, চিন্তক ও কবি ফরহাদ মজহার অংশ নেন। ফরিদা পারভীনের জানাজা পড়ান কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মোল্লা মো. রুহুল আমীন।

জানাজার আগে ফরিদা পারভীনের ছেলে ইমাম নাহিল তাঁর মায়ের জন্য দোয়া চেয়ে বলেন, ‘কুষ্টিয়াতেই আমার আম্মার বেড়ে ওঠা। এখানে থেকেই তাঁর জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন। তাঁর কোনো অন্যায় যদি হয়ে থাকে, সন্তান হিসেবে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। কুষ্টিয়ার কথা আম্মা সব সময় বলতেন।’

ফরহাদ মজহার বলেন, ‘কুষ্টিয়া হলো নদীয়া। এই নদীয়ার ভাবের কথা ফকির লালন জানে কি তা। বিশাল ভাবের জগৎ। সেই বিশাল ভাবের জগৎটা একেবারে অন্ধকারের গর্ভে হারিয়ে গিয়েছিল। ফরিদা পারভীনের মাধ্যমে এটা সামনে এসেছে। ফরিদার গানের যে মাধুর্য, তার গলার যে মাধুর্য, তার যে বিশেষভাবে পরিবেশনার ভঙ্গি, সাধু জগতে অত্যন্ত পরিচিত। এখানকার যে ভাবসংগীত, সেটার দীর্ঘ ইতিহাস আছে, সেই দীর্ঘ ইতিহাসের যে সুতাটা ছিঁড়ে গিয়েছিল, সেই সুতাটা ফরিদা পারভীন বেঁধে দিয়েছেন।’

জানাজা শেষে জেলা প্রশাসক আবু হাসনাত মোহাম্মদ আরেফীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য আজকের সংগীতাঙ্গনে একটা শোকের ছায়া। তাঁকে শত শত বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ মনে রাখবে। আমরা শোকাহত। বাংলাদেশে সংগীতাঙ্গনে তাঁর যে অবদান, তা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। তিনি একজন গুনী মানুষ ছিলেন। কুষ্টিয়াবাসীর অন্তরে দীর্ঘদিন থাকবেন।’

১৯৫৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর নাটোরের সিংড়া থানায় জন্ম নেওয়া ফরিদা পারভীন গানে গানে কাটিয়েছেন ৫৫ বছর। বাবার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন জেলায় যেতে হয়েছে তাঁকে। শৈশবে যখন মাগুরায় ছিলেন, তখন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তীর কাছে সংগীতের হাতেখড়ি হয়। ১৯৫৭-৫৮ সালে চার-পাঁচ বছর বয়সে তাঁকে গানে হাতেখড়ি দিয়েছিলেন ওস্তাদ কমল চক্রবর্তী। এরপর যেখানেই থেকেছেন, সেখানেই বিভিন্নজনের কাছে গানের তালিম নিয়েছেন তিনি। স্বরলিপি দিয়ে নজরুলের গান হারমোনিয়ামে ও কণ্ঠে তোলার কাজটি তিনি ওস্তাদ মীর মোজাফফর আলীর কাছেই প্রথম শেখেন। ১৯৬৮ সালে তিনি রাজশাহী বেতারের তালিকাভুক্ত নজরুলসংগীতশিল্পী নির্বাচিত হন।

স্বাধীনতার পর লালন সাঁইজির গানের সঙ্গে ফরিদা পারভীনের যোগাযোগ, তখন তিনি কুষ্টিয়ায় থাকতেন। সেখানে তাঁদের পারিবারিক বন্ধু ছিলেন মোকছেদ আলী সাঁই। ১৯৭৩ সালে ফরিদা পারভীন তাঁর কাছেই ‘সত্য বল সুপথে চল’ গান শেখার মাধ্যমে লালন সাঁইজির গানের তালিম নেন। মোকছেদ আলী সাঁইয়ের মৃত্যুর পর খোদা বক্স সাঁই, ব্রজেন দাস, বেহাল সাঁই, ইয়াছিন সাঁই ও করিম সাঁইয়ের কাছে লালনগীতির তালিম নেন। লালন সাঁইজির গানের বাণী ও সুরকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ফরিদা পারভীনের অবদান সর্বজনস্বীকৃত। শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বদরবারেও তিনি লালন সাঁইয়ের বাণী ও সুরকে প্রচারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

লালনগীতিতে অবদানের জন্য ১৯৮৭ সালে একুশে পদক পান ফরিদা পারভীন। এর বাইরে ১৯৯৩ সালে ‘অন্ধ প্রেম’ চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত ‘নিন্দার কাঁটা’ গানটির জন্য শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী (নারী) হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন। তিনি ২০০৮ সালে জাপানের ফুকুওয়াকা পুরস্কার লাভ করেন।

ফরিদা পারভীনের দাফনের সিদ্ধান্তে স্বামী-সন্তানদের মতবিরোধ,অতঃপর... by মনজুর কাদের

তখন রাত ১১টা পেরিয়েছে। কর্মব্যস্ত হাসপাতালেও তখন সুনসান। আইসিইউ করিডরও নিস্তব্ধ। লিফটে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে যেতেই মানুষের আনাগোনা। আগত মানুষদের কেউ এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করছেন। আছে টেলিভিশনের ক্যামেরা। লালনসংগীতের বরেণ্য শিল্পী ফরিদা পারভীনের মৃত্যুসংবাদ শুনে ছুটে এসেছেন সাংবাদিকেরাও। আছেন শিল্পীর পরিবার, স্বজনেরাও। ততক্ষণে সবাই জেনে গেছেন, গতকাল শনিবার রাত ১০টা ১৫ মিনিটে চিরতরে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন ফরিদা পারভীন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

হাসপাতালের বিছানায় প্রাণহীন ফরিদা পারভীনের নিথর দেহ। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বাইরে তখন পরিবারের সদস্যরা। এক পাশে চেয়ারে বসে কাঁদছিলেন স্বামী বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিম, অন্যপাশে ফরিদা পারভীনের দুই সন্তান—এম আই নাহিল ও জিহান ফারিয়া। স্বামীর চাওয়া, ফরিদা পারভীনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানানো শেষে ঢাকার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা। কিন্তু ছেলে-মেয়ের চাওয়া মাকে নিয়ে যাবেন কুষ্টিয়ার পৌর শহরে, সেখানে বাবা-মায়ের কবরে সমাহিত করা হবে। স্বামী–সন্তানেরা আলাদা করে এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিবৃতিও দেন।

৭১ বছর বয়সী শিল্পী ফরিদা পারভীন জীবনের শেষ কয়েক বছর কিডনি রোগের জটিলতায় ভুগছিলেন। ডায়ালাইসিসের পরও তাঁর শিল্পীসত্তা কখনো ক্লান্ত হয়নি। হাসপাতালের বিছানায় থেকেও তাঁর মনে ছিল গান। অবশেষে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে না–ফেরার দেশে চলে গেলেন। সেই সঙ্গে বাংলার সংগীতের আকাশের উজ্জ্বল এক নক্ষত্র অস্ত গেল। নিভে গেল এক কণ্ঠস্বর, যে কণ্ঠ শুনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লালনকে নতুনভাবে চিনেছে।

চিকিৎসকেরা চেষ্টা করেছিলেন শেষ পর্যন্ত—ডায়ালাইসিস, ভেন্টিলেশনে ফেরানো যায় কি না ফরিদা পারভীনকে। কিন্তু আর ফেরানো যায়নি। এর মধ্য দিয়ে ১৪ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা ফরিদা পারভীনের জীবনাবসন হয়। মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আলোচনায় আসে, কোথায় সমাহিত করা হবে বরেণ্য এই শিল্পীকে? ঢাকায় দাফন হলে শিল্পীজীবনের সহকর্মী, তাঁর অসংখ্য ভক্ত-অনুরাগী সহজে শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন—এমনটাই মত দিয়েছেন গাজী আবদুল হাকিম। আবার কুষ্টিয়া তাঁর শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিভরা জায়গা, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন মা-বাবা, শিল্পীরও চাওয়া তাঁকে যেন মা–বাবার কবরে সমাহিত করা হয়—এমনটাই মত দিয়েছেন নাহিল ও জিহান। হাসপাতালে এ নিয়ে ঘণ্টাখানেক ধরে চলে আলোচনা। অবশেষে সিদ্ধান্ত হয়, ফরিদা পারভীনের শেষ ঠিকানা হবে কুষ্টিয়া।

ফরিদা পারভীনের ছেলে এম আই নাহিল গতকাল রাতে প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, তাঁরা আজ রোববার সকাল সকাল মাকে কুষ্টিয়ায় নিয়ে যেতে চান। ঢাকায় কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা করতে চান না। যত দ্রুত মাকে দাফন করা হবে, ততই মঙ্গল। তবে গাজী আবদুল হাকিমের বক্তব্য ছিল এ রকম, ‘শিল্পী ফরিদা পারভীন রাষ্ট্রের সম্পদ। তাই আমার চাওয়া, তাঁকে যেন সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শহীদ মিনারে নেওয়া হয়। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদে জানাজা শেষে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করা হয়। ফরিদা পারভীনের হাতে গড়া গানের স্কুল “অচিন পাখি”তে শেষবারের মতো ঘুরিয়ে নেওয়া হয়।’

গাজী আবদুল হাকিম ও ফরিদা পারভীনের আগের সংসারের সন্তানদের চাওয়া যখন বিপরীতমুখী, তখন এ নিয়ে অভিভাবক পর্যায়ের কয়েকজন হাসপাতালের ভেতরই আলোচনায় বসেন। একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত হয়, ঢাকায় যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা হবে, কিন্তু চিরনিদ্রায় শায়িত হবে কুষ্টিয়ার পৌর কবরস্থানে, যেখানে শিল্পীর বাবা দেলোয়ার হোসাইন ও মা রওফা বেগমকে সমাহিত করা হয়েছে। ছেলে নাহিল বললেন, ‘আমার মায়ের অসিয়ত ছিল, তাঁকে যেন তাঁর বাবা-মায়ের কবরে দাফন করা হয়। এটা তিনি লিখেও দিয়ে গেছেন।’ ছেলের কথা শুনে একপর্যায়ে মেনে নেন গাজী আবদুল হাকিমও।

সন্তানদের চোখে তখন জল, মুখে একধরনের শান্তি—মায়ের শেষ ইচ্ছা পূরণের তৃপ্তি। আবদুল হাকিমও যেন সন্তানদের চাওয়া পূরণ করতে পেরে স্বস্তি পেলেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি একসময়ের জনপ্রিয় গীতিকার ও সুরকার আবু জাফরের স্ত্রী ছিলেন। তাঁদের সংসারে এক মেয়ে ও তিন ছেলে। আবু জাফরের লেখা-সুর করা অনেক গানই তাঁর কণ্ঠে অমর হয়ে আছে। যেমন ‘এই পদ্মা এই মেঘনা’, ‘তোমরা ভুলে গেছো মল্লিকাদির নাম’, ‘নিন্দার কাঁটা’। তবে দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ ঘটলেও গানই ছিল তাঁর চিরসঙ্গী। এরপর ২০০৫ সালের ১৭ জানুয়ারি বংশীবাদক গাজী আবদুল হাকিমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে জড়ান ফরিদা পারভীন। তাঁদের দুজনের সংসারে কোনো সন্তান ছিল না।

হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফরিদা পারভীনের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর তেজকুনীপাড়ার বাসায়। সকাল সাড়ে ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয় মরদেহ, যাতে সাধারণ মানুষ শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে বেলা একটায় ফরিদা পারভীনের মরদেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা রওনা হয়েছেন কুষ্টিয়ায়। বাদ মাগরিব তাঁকে সেখানে সমাহিত করা হবে।

এক আসরে লালনের গান গাইছেন ফরিদা পারভীন, পাশে বাঁশি বাজাচ্ছেন স্বামী গাজী আবদুল হাকিম
এক আসরে লালনের গান গাইছেন ফরিদা পারভীন, পাশে বাঁশি বাজাচ্ছেন স্বামী গাজী আবদুল হাকিম। ফাইল ছবি

Tuesday, September 9, 2025

বদরুদ্দীন উমর: এক রাজনৈতিক কিংবদন্তির বিদায়

লেখক-গবেষক, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল সকালে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বদরুদ্দীন উমরের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। লেখক শিবির ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত মুহাম্মদ কাইউম জানিয়েছেন, বদরুদ্দীন উমরের মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা হবে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে জাতীয় শহীদ মিনার বা অন্য কোনো স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য স্থানটি এখনো ঠিক করা হয়নি। দুপুরে জানাজার পর জুরাইনে তার বাবা-মায়ের কবরে বদরুদ্দীন উমরের দাফন সম্পন্ন হবে। এদিকে, প্রথিতযথা এই লেখকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস। শোকবার্তায় তিনি বলেছেন, বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশীল মানুষদের জন্য তার লেখা এবং জীবনদর্শন এক অনন্য পথনির্দেশ হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা বদরুদ্দীন উমরের শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শোক জানিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। শোকবার্তায় তিনি বলেন, বদরুদ্দীন উমর বারবার রাজরোষে পড়া সত্ত্বেও তিনি তার আদর্শ বাস্তবায়নে ছিলেন আপসহীনভাবে স্থির। কোনো ভীতি বা হুমকি তার কর্তব্যকর্ম থেকে তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। স্বৈরতন্ত্রকে উপেক্ষা করে তিনি তার স্বাধীন মতামত প্রকাশে কখনোই কুণ্ঠিত হননি। তিনি এদেশে ছিলেন স্বাধীন বিবেকের এক প্রতীক।

তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, বামপন্থি প্রগতিশীল রাজনীতির পথিকৃৎ, লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমরের জীবনাবসানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও আমি গভীরভাবে মর্মাহত। স্বাধীনচেতা, নির্ভীক কণ্ঠস্বরের এই বুদ্ধিজীবীর এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া জনমনে হতাশার সৃষ্টি করেছে। এদিকে, বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে আরও অনেক উপদেষ্টা শোক জানিয়েছেন। এ ছাড়া, বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
উল্লেখ্য, ১৯৩১ সালের ২০শে ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় বদরুদ্দীন উমরের জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান; যেখানে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি (পিপিই) বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। কিন্তু তিনি কেবল একাডেমিক জীবনেই থেমে থাকেননি। ১৯৬৮ সালে গভর্নর মোনায়েম খানের কর্তৃত্ববাদী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি শিক্ষকতা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং পরে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে লেখালেখিতে নিবেদিত করেন। বিশাল কর্মভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও তার বই ও গবেষণা দেশে খুব কম আলোচিত হয়েছে। তবে, কলকাতায় তার লেখালেখি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। কাজী আবদুল ওদুদ, আনন্দশঙ্কর রায়, সমর সেন, অশোক মিত্র প্রমুখ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা তার বিষয়ে লিখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে তিনি থেকে গেছেন প্রায় অবহেলিত। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি সংস্কৃতি পত্রিকা প্রকাশ করে এসেছেন। এর মাধ্যমে এবং তার অসংখ্য বইয়ে তিনি লিখেছেন ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজতন্ত্র, বাঙালি মুসলমানের পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংকট নিয়ে।

তিনি যুক্তি দিয়েছেন, সাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত ভিত্তি ১৯৪৭ সালের বিভাজনের সঙ্গে শেষ হয়, পরবর্তীতে মূলত জাতীয়তাবাদকে ঘিরেই সংগ্রাম চলেছে। তার চিন্তাধারা সব সময় লোকপ্রিয় হয়নি, কিন্তু ছিল মৌলিক এবং চিন্তাজাগানিয়া। তারুণ্যে বদরুদ্দীন উমর সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, কৃষক-শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে জীবনের শেষ দিকে তিনি অনেকটাই শান্ত জীবনযাপন করেছেন, বিশাল লাইব্রেরির বইয়ের সঙ্গেই কাটতো তার সময়। পড়া আর লেখা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করতেন যে, বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন অনুপস্থিত। বলতেন, এখানে সত্য কথা অবাধে বলা যায় না। তবু তিনি কখনো থেমে থাকেননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নির্ভীকভাবে লিখেছেন। তার চিন্তা বুঝতে সহায়ক বিশেষ করে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৬), ‘সংস্কৃতির সংকট’ (১৯৬৭), ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৯) তিনটি বই। এই বই লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি। তিনি শাসকদের অধীনে চাকরি পর্যন্ত করবেন না, এ মনোভাব পোষণ করে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।
বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫)
বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

Friday, August 15, 2025

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেই আগস্টেই লেখা কবিতা

মীর গুল খান নাসির
বেলুচিস্তানের প্রথম সারির কবি মীর গুল খান নাসির (১৯১৪—১৯৮৩)। ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিজ জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার থাকায় পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ডের সময় মীর গুল খান ছিলেন কারাগারে বন্দী। বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৪ দিন পর ১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট কারাগারে বসেই তিনি এই কবিতা লেখেন।

মীর গুল খান নাসির
ভোর কোথায়?
চিৎকার, ক্রন্দন আর শশব্যস্ত আহ্বানের মধ্যে
উল্লাস করছে অন্ধ জনতা।

ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা।
বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে মনে হয় দূরে বৃষ্টি হচ্ছে,
কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই
রক্তের ধারা বইছে প্রবল।
হে নির্বোধের দল, কোথায় উজ্জ্বল প্রভাত?
এখানে এখনো ক্রুদ্ধ রাত
এজিদরূপী সাম্রাজ্যবাদীরা এখনো চূর্ণ করছে
সাহসী দেশপ্রেমিকের হাড়,
জনবহুল, চিত্রময় বাংলাদেশে আবারও রক্তের ঝড়।
সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা আবারও জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রাম-নগর,
মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাঁকে
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে
এজিদের বিরুদ্ধে হোসেনের কাহিনির পুনরাবৃত্তি।
হে সাহসী কমরেডগণ, এজিদ থেকে সতর্ক হও,
তোমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হও, পরাস্ত হবে তারা
তাদের মুখ তাদেরই কিন্তু জবান সাম্রাজ্যবাদীদের।
সেবাদাসেরা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের পকেট স্ফীতকায়
এবং সাহসী দেশপ্রেমিকদের খতম করে দিতে
সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে জোগান আসতেই থাকবে
তারা পাঠাবে ভাড়াটে লোক ও অস্ত্র
এই কাপুরুষদের কোনো দয়া-মায়া নেই,
এদের কারণেই বিশ্বে এখন ঘোর অন্ধকার।
মুক্তির শিখা কোথাও জ্বলে উঠলে এরা তা নিভিয়ে দেয় দ্রুত
বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে
আবারও স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত।
সাম্রাজ্যবাদীরা আবারও ফিরে গেছে তাদের সেই পুরোনো
চক্রান্তে, বিশ্বাসঘাতকতায়
আবারও দ্বন্দ্বের ফয়সালা হচ্ছে বন্দুকের নলে
আবারও সোনার জমিনে জ্বলছে আগুন
হে বন্ধুরা, এভাবেই সময়ের মুখোমুখি আমরা
আমার মাতৃভূমি বেলুচিস্তানও জ্বলছে এখন
ভয় পেয়ো না হে সাহসী যোদ্ধারা, থেমে যেয়ো না,
কণ্টকিত দুর্গম পথ এখনো অনেক বাকি।
মুজিবের রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না,
দেশপ্রেমিকের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা।
বেশিক্ষণ নয়, কুয়াশা ও আঁধার সত্ত্বেও
এই ভয়াল রাত্রি দ্রুত কেটে যাবে
হৃদয় দিয়ে নাসির স্পষ্ট দেখতে পায়
বিজয়-পতাকা উড়ছে।

>>>অনুবাদ: রিজওয়ান উল আলম

Tuesday, July 22, 2025

বিভীষিকা, মর্মান্তিক, মর্মন্তুদ: বিমান বিধ্বস্ত

মর্মান্তিক। মর্মন্তুদ। বিভীষিকাময় এক ঘটনা দেখলো দেশ। স্কুল ভবনে অকস্মাৎ আছড়ে পড়লো প্রশিক্ষণ বিমান। বিস্ফোরণ-আগুনে পুড়ে ঝরে গেল অন্তত ২০টি জীবন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে কাতরাচ্ছে দেড় শতাধিক কচি প্রাণ। পোড়া শরীর নিয়ে শিশুদের বাঁচার আকুতি। আহত সন্তান নিয়ে অভিভাবকদের গগনবিদারী আর্তনাদ। হাসপাতালে হাসপাতালে কান্না আর আহাজারিতে সোমবারের বিকালটা হয়ে উঠেছিল এক বিভীষিকার বিকাল।

গতকাল দুপুরে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান এফটি-৭ বিজিআই রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজের স্কুল ভবনে বিধ্বস্ত হয়। এতে বিমানের পাইলটসহ অন্তত ২০ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের কয়েকজন ছাড়া সবাই স্কুলের ক্ষুদে শিক্ষার্থী। গুরুতর আহতদের জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া উত্তরাসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালেও অনেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিমানটি দুর্ঘটনায় পড়ে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর আইএসপিআর। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিমান বাহিনীর পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় হতাহতের ঘটনায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। তিনদিনের জন্য স্থগিত করা হয়েছে জুলাই অভ্যুত্থান স্মরণে চলমান কর্মসূচি। দেশের ইতিহাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনা এটিই প্রথম। এছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ট্র্যাজেডির ঘটনাও বিরল।
আহতদের চিকিৎসায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে ছুটে যান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা। সেনাবাহিনী প্রধান, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনী প্রধানরাও ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তারা উদ্ধার ও আহতদের চিকিৎসা তৎপরতা তদারকি করেন। স্থানীয় জনসাধারণ ও স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থীরাও উদ্ধার কাজে সহায়তা করেন। হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোক প্রকাশ করা হয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকেও। আহতদের দেখতে ও চিকিৎসার খোঁজ নিতে বিভিন্ন দলের নেতারা তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ছুটে যান। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর জানিয়েছে, বিমান বাহিনীর ‘এফ-৭ বিজিআই’ফাইটার জেটটি সোমবার দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উড্ডয়নের ১২ মিনিটের মাথায় বিধ্বস্ত হয়। মাইলস্টোন স্কুলের উত্তরা ক্যাম্পাসের হায়দার আলী ভবন নামের দুইতলা একাডেমিক যে ভবনে বিমান বিধ্বস্ত হয় সেখানে ইংরেজি মাধ্যমের ক্লাস থ্রি থেকে এইটের শিক্ষার্থীদের কোচিং হতো। এছাড়া প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের ক্লাসও নেয়া হতো এ ভবনে। বেলা একটার পর ক্লাস ছুটি হলেও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ কোচিংয়ে থেকে যায়। এছাড়া অভিভাবকদেরও অনেকে ভবনের সামনে অবস্থান করছিলেন। বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। অনেক দূর থেকেও সেখানে ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। জ্বলন্ত উড়োজাহাজটির আগুন নেভাতে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় ফায়ার সার্ভিসের নয়টি ইউনিট। উড়োহাহাজের আগুন ক্লাসরুমে ছড়িয়ে পড়লে সেখানে আটকা পড়েন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীরা। দুর্ঘটনার পরপরই স্কুলের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও আশপাশের লোকজন উদ্ধারে ছুটে যান। পরে যুক্ত হয় ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য বাহিনী। দুর্ঘটনাস্থল থেকে আহত ও দগ্ধদের রিকশা, ঠেলাগাড়িসহ বিভিন্ন বাহনে করে সরিয়ে নিতে দেখা যায়। প্রাথমিকভাবে ঢাকা সিএমএইচ, উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল, কুর্মিটোলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, লুবনা জেনারেল হাসপাতাল এন্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে নেয়া হয় আহতদের।  সেখান থেকে দগ্ধদের অধিকাংশকে পাঠানো হয় জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ জাহেদ কামাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঘটনাস্থালে সাংবাদিকদের বলেন, তাদের কর্মীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ জনের লাশ উদ্ধার করেছে। আইএসপিআর পরে জানায়, বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামসহ মোট ২০ জন সেখানে মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে ঢাকা সিএমএইচ-এ নিহত ১২ জন, বার্ন ইনস্টিটিউটে ২ জন, কুর্মিটোলা জেনারেল হসপিটালে ২ জন, উত্তরার লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে ২ জন, ঢাকা মেডিকেলে ১ জন, উত্তরা আধুনিক হসপিটালে ১ জনের লাশ ছিল।  সোমবার রাতে এক বিজ্ঞপ্তিতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, রাজধানীর ৮টি হাসপাতালে ১৭১ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। রাতে জাতীয় বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান জানান, হাসপাতালে আহত ৮৮ জন ভর্তি আছে। এর মধ্যে বার্ন ইনস্টিটিউটে ৪৪ জন আছেন। তাদের ২৫ জনের অবস্থা গুরুতর।

বেলা দুইটার পর দেখা যায়, বিমান দুর্ঘটনার পর উত্তরা উত্তর মেট্রো স্টেশন থেকে সারিবদ্ধ হয়ে একের পর এম্বুলেন্স প্রবেশ করছে রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, এপিবিএন সদস্যরা সকলে মিলে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করছে। এক একটি এমু্বলেন্সে স্কুলের ভেতর থেকে আহতদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ মেডিকেল, সিএমএইএচ, জাতীয় বার্র্নসহ বিভিন্ন হাসপাতালে। বিমান বিধ্বস্তের খবর পেয়ে অনেক অভিভাবক স্কুলের সামনে ভিড় করছেন তাদের সন্তানের খোঁজ নিতে। অনেকে ভেতরে ঢুকতে না পেরে স্কুলের গেটের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আরিফুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক বলেন, আমার মেয়ে সুফিয়া কামাল হলের ৭ তলার ৯ নম্বর রুমে ছিল। ওর এখন কী অবস্থা, কোথায় আছে আমরা কিছুই জানি না। বাংলা ভার্সনের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী নিধির খোঁজে আসা তার বড় ভাই বলেন, যেখানে বিমানটা বিধ্বস্ত হয়েছে সেই ভবনেই আমার বোন ক্লাস করছিল। ও বাংলা ভার্সনের ৩য় শ্রেণিতে পরে। ওর রোল ১১১২। নিধি এখনো বাসায় যায়নি। আমরা সবগুলো হাসপাতাল খুঁজে দেখছি কোথাও নেই।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, গেট দিয়ে ঢুকে ভেতরের বাম পাশে বড় মাঠ। মাঠের সামনেই ইংরেজি ভার্সন ও নাইন থেকে ইন্টার মিডিয়েটের শিক্ষার্থীদের জন্য একের পর এক ভবন। সেখানে গতকাল অনেক শিক্ষার্থীরই পরীক্ষা চলছিল। আর মাঠের সামনে হাতের ডান পাশে ‘হায়দার আলী হল’ নামে পুরনো দুই তলা ভবন। যেখানে প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা ভার্সনের শিশুদের ক্লাস নেয়া হয়। ক্লাসের পর সেখানেই হয় কোচিং। বিকট শব্দে বিধ্বস্ত হয়ে ওই বিমানটি ঠিক ওই হায়দার আলী হলের সিঁড়ির নিচে ঢুকে যায়। বিমানের আগুনে মুহূর্তেই ভবনে আগুন লেগে যায়। মো. হুমায়ন কবির নামে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষক বলেন, আমি তখন ক্লাস টেনের রুমে ছিলাম। ওদের একটা পরীক্ষা চলছিল। এর মধ্যেই আমাদের ওই বিল্ডিংয়ের ওপরে বিশাল এক বিস্ফোরণের শব্দ হলো। ওই বিস্ফোরণের বিষয়টি জানতে বাইরে এসে দেখি একটি বিমান বাংলা ভার্সনের প্রাথমিকের ভবনের সিঁড়ির নিচে ঢুকে গেছে। তাতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে। ওই সময় ক্লাসরুমে থাকা ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী স্কুলটির পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র দেব মিত্র বলে, প্লে গ্রুপ থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের সকলের ওই হায়দার আলী ভবনে ক্লাস হয়। অন্যদিনের মতো কালকেও আমরা ক্লাসরুমে ছিলাম। সাড়ে ১২টায় অনেকের ছুটি হয়ে গেলে কেউ কেউ ক্লাসরুমের সামনের দোলনায় ঝুলছিল, বল নিয়ে খেলা করছিল। আর আমরা যারা বৃত্তির কোচিং করবো তারা ক্লাসরুমে বসে টিফিন খাচ্ছিলাম। এরমধ্যে হঠাৎ বিশাল একটা শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখলাম- এটা বিমান যেন সামনের ভবনের ছাদের আঘাত খেয়ে আমাদের দিকে ছুটে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি আগুন আর আগুন। আমি তখন খাবার ও বইয়ের ব্যাগ ফেলে দৌড়ে মাঠের দিকে চলে যাই। তখন শিক্ষকরা পাশের ভাঙা গেট দিয়ে আমাদের বেরিয়ে যেতে বলেন। আমিও তখন তাদের সঙ্গে বাইরে চলে আসি। পরে রাস্তার একজনের ফোন দিয়ে আমার বাবার নম্বরে ফোন করে জানাই। আকবর নামে স্কুলটির একজন সিকিউরিটি গার্ড বলেন, আমরা স্কুলের ভেতরেই ছিলাম। কিছু বাচ্চার ছুটি হয়েছে, যাদের অভিভাবক নিতে এসেছে তাদের বের করছিলাম। এর মধ্যেই এই ঘটনা। তিনি বলেন, বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে এত জোরে শব্দ হয়েছে যে, আশপাশের মানুষ পর্যন্ত চলে এসেছে। তিনি বলেন, এই স্কুলের ওপর দিয়ে বিমানের রুট। হযরত শাহ্‌জালাল বিমান বন্দরে ওঠা-নামা করা সকল বিমানই এই স্কুলের ওপর দিয়ে যায়। তাই বিমান নিয়ে আমরা তেমন কোনো কিছু ভাবি না। কিন্তু বিমান যে এইভাবে স্কুলের ওপর পড়বে তা কখনোই চিন্তা করিনি। হাদি আলমাস নামে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আমরা দেখলাম বিমানটি স্কুলের নতুন বিল্ডিয়ের সঙ্গে মনে হলো ধাক্কা খেলো। এরপরই আগুন ধরে আছড়ে পড়ে। তিনি বলেন, এখানে সব ছোট ছোট বাচ্চা। কতো বাচ্চা ছটফট করে চোখের সামনে চলে গেল কিছুই করতে পারলাম না। দিনভর উদ্ধার কাজ চালানোর পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ফায়ার সার্ভিস ও বিমান বাহিনীর কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত বিমানের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করে ট্রাকে করে নিয়ে যান। বিমানের আগুনে হায়দার আলী ভবনের বেশির ভাগই পুড়ে গেছে। নিচতলা-দুইতলার একাধিক শ্রেণি কক্ষের কিছু অবশিষ্ট নেই। ভবনে প্রবেশের সিঁড়ির নিচে মাটির ভেতর ঢুকে যায় বিমানের মাথা। মাইলস্টোনের মাঠে বসে উদ্ধার তৎপরতা পর্যবেক্ষণ করছিলেন শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার। সবশেষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সন্ধ্যায় তিনি বলেন, আমরা এটুকু নিশ্চিত করতে পারি যে- যারা আহত হয়েছেন, তাদের সুচিকিৎসার জন্য আমরা ভীষণ রকমভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। এ ব্যাপারে কোনো ধরনের গাফিলতি এখানে হবে না। আমরা এটাও মনে করি যে এই দুর্ঘটনার একটা ভালো রকমের তদন্ত হওয়া দরকার, সেটাও করা হবে। শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, আমরা অত্যন্ত শোকাহত যে এই ঘটনা ঘটেছে, অনেকগুলো তরুণ প্রাণ ঝরে গেছে। এই ধরনের একটা ভয়ানক দুর্ঘটনায় আমরা শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করছি। যারা আহত হয়েছেন, তারা যেন দ্রুত সুস্থ হন, তার জন্য আমরা পরম করুণাময়ের কাছে প্রার্থনা করছি।

দুর্ঘটনায় পড়া এফ-৭ বিজিআই মূলত চীনের তৈরি চেংদু জে-৭ সিরিজের একটি মাল্টি-রোল জেট ফাইটার। সোভিয়েত আমলের মিগ ২১ এর উন্নত এই চীনা সংস্করণ তৈরি করেছে চেংদু এয়ারক্র্যাফ্‌ট করপোরেশন। চেংদু জে-৭ সিরিজের সবচেয়ে আধুনিক সংস্করণ এফ-৭ বিজিআই। এক ইঞ্জিনের এ বিমানের সর্বোচ্চ গতি মাক ২.২ (শব্দের গতির ২.২ গুণ)। আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, লেজার গাইডেড বোমা ও জিপিএস গাইডেড বোমা, বাড়তি জ্বালানি ট্যাংকসহ দেড় হাজার কেজি ওজন বইতে পারে এসব জঙ্গি বিমান। এ বিমানের ককপিটে একজন বৈমানিক বসতে পারেন। কেএলজে-৬ এফ রাডার ব্যবহার করা হয় এফ-৭ বিজিআই বিমানে। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর মোট ৩৬টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান রয়েছে। এরমধ্যে বেশির ভাগই এফ-৭ বিজিআই। ২০১১ সালে বাংলাদেশ চীনের কাছ থেকে ১৬টি জেট ফাইটার কেনার চুক্তি করে এবং ২০১৩ সালে সেগুলো বিমান বাহিনীর বহরে যুক্ত হয়। ওই বছরই চেংদু এয়ারক্র্যাফ্‌ট করপোরেশন এই মডেলের উড়োজাহাজের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। এর আগে ২০১৮ সালের নভেম্বরে টাঙ্গাইলের মধুপুরে মহড়ার সময় বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ বিজি প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়। ২০২১ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামের জহুরুল হক ঘাঁটি থেকে উড্ডয়নের পর বঙ্গোপসাগরে বিধ্বস্ত হয় একটি এফ-৭ এমবি। ওই দুই ঘটনায় দু’জন বৈমানিক নিহত হন।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসে বিমান বাহিনীর বিমান বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এক তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট দুর্ঘটনায় নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। প্রধান উপদেষ্টা এক শোকবার্তায় বলেন, এই দুর্ঘটনায় বিমানসেনা ও মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষক-কর্মচারীসহ অন্যান্যদের যে ক্ষতি হয়েছে তা অপূরণীয়। জাতির জন্য এটি একটি গভীর বেদনার ক্ষণ। তিনি বলেন, সরকার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি এবং সবধরনের সহায়তা নিশ্চিত করবে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জানিয়েছে, মাইলস্টোনের ঘটনায় মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক পালন করা হবে। এর অংশ হিসেবে মঙ্গলবার দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। পাশাপাশি সকল সরকারি, বেসরকারি ভবন ও বিদেশে বাংলাদেশি মিশনেও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। হতাহতদের জন্য দেশের সকল ধর্মীয় উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে।

ভিডিও বার্তায় প্রধান উপদেষ্টা
আগুনে পুড়ে যাওয়া শিশুদের মা-বাবাকে আমরা কী জবাব দেবো

উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, এ ঘটনায় পুরো জাতি হতভম্ব, বাকরুদ্ধ। আমরা নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করছি। আগুনে পুড়ে যাওয়া শিশুদের মা-বাবাকে আমরা কী জবাব দেবো? প্রধান উপদেষ্টা বলেন, আমার বলার কোনো ভাষা নেই। কীভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। আমার মতো সারা দেশের লোক আজ হতবাক। এ রকম একটা কাণ্ড হতে পারে আমরা কেউ কল্পনা করিনি, ধারণার মধ্যে ছিল না। কিন্তু এ অবিশ্বাস্য জিনিস আমাদের হঠাৎ করে গ্রহণ করতে হয়েছে। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের যে দুর্ঘটনা প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে শিশুদের ওপর পড়লো, আগুনে পুড়ে মরলো- মা-বাবাদের আমরা কী জবাব দেবো, কী বলবো। অজানা শিশুদের মুখ সবার চোখে ভেসে উঠছে। সারা জাতি হতভম্ব, বাকরুদ্ধ। শোকাহত বললে কম বলা হবে।

তিনি আরও বলেন, এখনো লাশ আসছে হাসপাতালে। এখনো হাসপাতালে মারা যাচ্ছে। মা-বাবা খোঁজ নিচ্ছে আমার সন্তান কোথায়? তাকে আর কোনোদিন চেনা যাবে কিনা। যাদের লাশ দেখছি তার মধ্যে আমার সন্তান আছে কিনা। পৃথক করার তো কোনো উপায় নেই। এরা আমাদের সবার সন্তান। হঠাৎ করে চিরদিনের জন্য চলে গেল। আমরা তদন্ত করবো কিন্তু তদন্তে তো তারা ফিরে আসবে না। আমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করছি। সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ছে। সকল হাসপাতালে মানুষ ছুটে আসছেন। সবার প্রতি আমাদের অনুরোধ হাসপাতালে ভিড় করবেন না। আহতদের জন্য এটি ভালো না। তাদের শরীরে রোগ প্রতিরোধের শক্তি নেই। আমরা ভিড় করে থাকলে আমাদের শরীর থেকে তাদের মধ্যে কী রোগ ছড়িয়ে পড়ে তা বলা মুশকিল। কাজেই দূরে থেকে দোয়া করেন সবাই। আমরা বাবা-মা, আত্মীয়স্বজনদের প্রতি আমাদের সহানুভূতি জানাচ্ছি।

প্রফেসর ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের যত সন্তান আছে সবাই আপনাদের সন্তান। আমরা নিজেদের মনকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আপনাদের সান্ত্বনা দেয়া বিরাট ব্যাপার। আমরা সবাই আপনাদের সঙ্গে আছি। জাতির সবাই আপনাদের সঙ্গে আছে। আমরা তাদের জন্য শোক দিবস ঘোষণা করেছি। সবাই মিলে আমরা তাদের স্মরণ করবো। তাদের আত্মার শান্তি কামনা করবো। আজ থেকে সবাই তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করবো। আল্লাহ আপনাদের শান্তি দিক। আমাদের জাতির সবাইকে যারা এ দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত সবাইকে শান্তি দিক। তাদের জন্য দেশবাসী সবাই দোয়া করছে। আল্লাহ মৃত শিশুদের জান্নাতবাসী করুক।

প্রত্যক্ষদর্শীর জবানিতে: মেট্রোরেলের শেষ স্টেশন ‘উত্তরা উত্তর পেরিয়ে’ গোলচত্বর। গোলচত্বরের শেষ মাথায় মেট্রোরেলের অফিস। অফিস পেরিয়ে পেছনের দিকটায় বিশাল জায়গায়জুড়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ। স্কুলে যেতে ছোট ভাঙা রাস্তা। একটা প্রাইভেটকার ঢুকলে রিকশাও ঠিকমতো যেতে পারে না। যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সরু ভাঙা সড়কের কারণে তাই উদ্ধারকাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। ঠিকমতো যাতায়াত করতে পারছিল না উদ্ধারকারী যানবাহনগুলো। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনামতে, প্রশিক্ষণ বিমানটি পড়ে একটি স্কুল ভবনে। ভবনটি দোতলা। সেখানে নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণির বাংলা মিডিয়ামের ক্লাস হয়। দুপুর একটায় শেষ হয় ক্লাস। এরপরই অভিভাবকরা নিতে আসেন শিক্ষার্থীদের। ইংরেজি মিডিয়ামের একদল শিক্ষার্থী অপেক্ষা করছিল কোচিংয়ের জন্য। তাদের ক্লাস টাইম ছিল দেড়টায়। ভবনটিতে ১৬টি ক্লাসরুম, ৪টি শিক্ষকদের রুম রয়েছে। একটু দূরেই ক্যান্টিন। প্রতিষ্ঠানটির ওপর দিয়ে বিমান যাওয়া-আসার চিত্র নতুন নয়।

ক্যান্টিনের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল শিক্ষার্থী সাদিক ইসলাম, মিলন মৃধা, সজল খানসহ বেশ কয়েকজন। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিক বলে, আমরা ক্যান্টিন ও বিল্ডিংয়ের মাঝখানে ছিলাম। একটা বিমানের শব্দ পাই। মনে হলো, নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেখি বিমানটি নিচের দিকে নামছে। স্কুল মাঠে ল্যান্ড করার চেষ্টা করছে। এরপর বিমানটি দোতলা বিল্ডিংয়ের প্রবেশপথ ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির ক্লাসরুমের দিকে আঘাত করে। প্রথমে কিছুটা অল্প আগুন ছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই বিকট শব্দ হয়। এরমধ্যে একজন বিমান থেকে প্যারাসুট দিয়ে নামে স্কুলের সুইমিং পুলের পাশে।

সাদিক বলে, আঘাত হানার পর মনে হয়েছে বিমানে থাকা কিছু ব্লাস্ট হয়েছে। এরপর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমরা কী করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। দেখি বাচ্চারা দৌড়ে বেরিয়ে আসছে। অনেকের শরীরে রক্ত, পোড়া। কয়েকটা শিশুর শরীরে আগুন জ্বলছিল। এক বাচ্চার একটি হাত উড়ে গেছে। আমরা উদ্ধার করতে এগিয়ে গেলেও আগুনের কারণে ভিতরে যেতে পারিনি।

দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ আহমেদ। সে জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের কিছুটা দূরে আমাদের ক্লাস চলছিল। আমাদের ক্লাসে বিমানের শব্দ নতুন কিছু না। তবে, এবার কিছুটা জোরে শব্দ হয়েছিল। মুহূর্তেই আরও একটি বিকট শব্দ। শব্দে আমাদের বিল্ডিং কাঁপতে থাকে। আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, ধোঁয়া  উড়ছে। কিন্তু ঘটনাস্থল দেখা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা চিৎকার করছে। বেরিয়ে ঘটনাস্থলে আসি ৫ থেকে ৬ মিনিট পর। তখন দেখি, শিক্ষার্থীরা আহতাবস্থায় ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। অনেকের শরীর-কাপড় পোড়া। কয়েকজন নিচে পড়ে ছিল। এরপর এলাকাবাসীও এগিয়ে আসে। তারা শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করে দূরে নিয়ে যায়। ওই সময় সকলেই ভয় করছিল, ফের যদি বিস্ফোরণ হয়।

মাইলস্টোনের গেটের কিছুটা সামনে চা দোকানি লোকমান আলী। তিনি দোকানেই ছিলেন। বলেন, দোকানে টিভি চলছিল। হঠাৎ শব্দ শুনি। প্রথমে ভেবেছি, সিলিন্ডার ব্লাস্ট হয়েছে। শব্দ হওয়ার সঙ্গেই বাইরে আসি। স্কুলের ভেতর আগুন দেখি। ১০-১২ জন সেখানেই পড়ে ছিল। সবাই মিলে দৌড়ে যাই। দেখি বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে। কোথায় যাবে, না যাবে, কিছুই বুঝতে পারছে না। অনেকের শরীর পোড়া। আমরা তখনও জানি না বিমান বিদ্ধস্ত হয়েছে। বাচ্চাগুলোরে উদ্ধার করে একটা ফাঁকা জায়গায় নিই। আহত কিছু বাচ্চাকে নিয়ে ডিসপেনসারিতে যাই। কিন্তু আগুনের ভিতরে যেতে পারিনি।
দুর্ঘটনার সময় স্কুলের মাঠে ছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নদী। সে বলে, আমি আম্মুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ। শব্দের দিকে দৌড়ে চলে যাই। পরে তাকায় দেখি, সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে। অনেকেই চিৎকার করছিল, বাঁচাও বাঁচাও বলে। কিন্তু আগুনের কারণে আমরা কাছে যেতে পারিনি। 

mzamin
মুমূর্ষু এক শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে নেয়া হচ্ছে- ছবি: সংগৃহীত