Sunday, September 28, 2025
ছোট দলের বড় ভুল ও প্রক্সি রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন by মনোজ দে
সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ দেয়, বাংলাদেশ গণ–অভ্যুত্থানের দেশ। প্রতিটি অভ্যুত্থানই এখানে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু উদ্দীপনা ও উচ্ছ্বাস মিইয়ে যেতেও খুব বেশি দেরি হয় না। দেখা যায়, জনগণের ঘাড়ে সিন্দাবাদের ভূতের মতো গেড়ে বসা প্রবল কোনো প্রতিপক্ষকে সরাতে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অনন্য ঐক্য তৈরি হয়। কিন্তু যে মুহূর্তে সেই প্রবল প্রতিপক্ষের পতন হয়, সে মুহূর্তেই রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজ নিজ দলীয় স্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতিতে বড় দলগুলোই নির্ধারক শক্তি। গণ–আন্দোলন, গণ–অভ্যুত্থানের ক্ষেত্রে ছোট অনেক দল ও তাদের নেতারা সামনের সারির মুখ হয়ে ওঠেন। কারও কারও ক্ষেত্রে বিকাশের প্রবল সম্ভাবনাও তৈরি হয়। কিন্তু সে সম্ভাবনাও অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারে, তার বড় একটা দৃষ্টান্ত জাসদ।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের সমাজে পরিবর্তনের যে প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে এসেছিল, তা থেকেই জন্ম হয়েছিল জাসদের। কিন্তু নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচিকে পরিষ্কারভাবে সামনে আনার পরিবর্তে না জাতীয়তাবাদী, না সমাজতন্ত্রী—অস্পষ্ট একটা রাজনৈতিক অবস্থান নেয় জাসদ। বামপন্থী জোয়ারের সে সময়ে পরিবর্তনপ্রত্যাশী তরুণদের বড় একটি অংশকে ভিন্ন পথে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল জাসদ। মাতৃসংগঠন আওয়ামী লীগকেও দুর্বল করে দিয়ে শেখ মুজিবের শাসনের পতন ত্বরান্বিত করে দিয়েছিল তারা।
জাসদের এ ভূমিকা নেওয়ার কারণ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিব বাহিনীর জন্মের ইতিহাসের দিকে ফিরে যেতে হবে। একটি বহুল প্রচলিত মত হচ্ছে, একাত্তরে জনযুদ্ধের সময় এ ভূমিতে সশস্ত্র বামপন্থার উত্থান যাতে না হয় সেটা ঠেকাতে মুক্তিবাহিনীর সমান্তরাল বাহিনী হিসেবে মুজিব বাহিনী গড়ে তুলেছিল ভারত ও ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’। মুজিব বাহিনীর নেতৃত্বের বড় অংশটাই পরবর্তী সময়ে জাসদ গড়ে তোলে। জাসদের নেতা–কর্মীদের আত্মত্যাগ ও প্রতিশ্রুতি নিয়ে ন্যূনতম প্রশ্নের অবকাশ নেই। কিন্তু জাসদের তৎপরতা শেষ বিচারে রাজনীতিতে সামরিক স্বৈরতন্ত্র ও ইসলামপন্থী শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করেছিল।
নব্বই পরবর্তী বাংলাদেশের মূলধারার রাজনীতি মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—এই দুই ধারায় বিভক্ত। এর বাইরে মধ্যম মানের শক্তি জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি মূলত রংপুরকেন্দ্রিক দলে পরিণত হয়েছে। গৃহপালিত বিরোধী দল কিংবা মিত্রের ভূমিকায় আওয়ামী লীগের শাসনের বৈধতা দেওয়ায় দলটির গ্রহণযোগ্যতাও কমেছে। দেবর-ভাবির গৃহবিবাদে দলটির সাংগঠনিক শক্তিও দুর্বল হয়ে গেছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি যেভাবে দমন ও তোষণ করা হয়েছে, তাতে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য ইসলামপন্থীদের ভোট ও সমর্থন কতটা বেড়েছে, তার পরিষ্কার কোনো চিত্র নেই। ডাকসু, জাকসু নির্বাচনে বড় বিজয়ই পরিষ্কার একটা বার্তা দিচ্ছে যে উঠতি মধ্যবিত্তের মধ্যে তাদের সমর্থন অনেকটা বেড়েছে। সব মিলিয়ে এটা ধারণা করা যায়, জনসমর্থন যা–ই থাক, সাংগঠনিক শক্তির বিচারে ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।
বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির দাবা খেলায় ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা অনেকটা বোড়ের মতো। অনেক সময় তারা এমন সব কর্মসূচি নেয়, যাতে প্রশ্ন জাগে—তারা কি বড় কোনো শক্তির দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে কি না।
বাংলাদেশের ভোটের মাঠের যে বাস্তবতা, সেখানে ছোট দলের পক্ষে নির্বাচনে ভালো ফল করাটা কঠিন। ফলে মাঠের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও ভোটের বৈতরণি পার হতে গেলে তাদের বড় দলের শরণাপন্ন হতে হয়। এ বাস্তবতা বড় দল ও ছোট দলের মধ্যে প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্ক তৈরি করে। তাৎক্ষণিক লাভের বিচারে বড় দলের ছেড়ে দেওয়া একটি–দুটি আসন পেলেও এতে দীর্ঘ মেয়াদে ছোট দলগুলোর রাজনীতিই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একপর্যায়ে বিকাশের সম্ভাবনাটা শেষ হয়ে যায়।
নতুন দল বিকাশের বাস্তবতা ও জনচাহিদা থাকার পরও দুই ধারার বিপরীতে তৃতীয় বড় ধারা সৃষ্টি না হওয়ার পেছনে এটি বড় কারণ। এ দায় যেমন ছোট দলের, নতুন দলের, আবার বড় দলেরও। বড় দল সব সময়ই চায় প্রথাগত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত যেন জারি থাকে। ফলে তাদের রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে, এমন রাজনৈতিক শক্তিকে তারা কৌশলেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়। অভিজ্ঞতাহীন নতুন দল নগদ পাওনার স্বার্থে বড় দলের কৌশলের কাছে তাদের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাকে বিক্রি করে দেয়। শুধু বড় রাজনৈতিক দল নয়, পুরোনো ব্যবস্থার সঙ্গে স্বার্থের সম্পর্ক আছে, এমন গোষ্ঠীগুলোও চাইবে না নতুন রাজনীতি নিয়ে কেউ তাদের চ্যালেঞ্জ জানাক।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছেন। পরপর তিনটি পাতানো নির্বাচনের কারণে বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোট দিতে না পারায় খুব স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক দলগুলোর ভোটের প্রস্তুতি নেওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা দেখছি, জুলাই সনদ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে মতভেদ, তা নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আবার এ মুহূর্তের ইস্যু নয়, এমন কিছু বিষয় নিয়ে যখন মাঠে হঠাৎই যে সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে, সেটা উদ্বেগজনকই। যেমন হঠাৎই জাতীয় পার্টি রাজনীতির ইস্যু হয়ে উঠল। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরের গণ অধিকার পরিষদ জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবি নিয়ে হাজির হলো। সেই দাবি ঘিরে কর্মসূচি একসময় সংঘাতেও রূপ নিল। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর লাঠিপেটায় মারাত্মকভাবে আহত হলেন নুর। সবারই প্রত্যাশা ছিল, গণ–অভ্যুত্থান নাগরিকের ওপর বাহিনীগুলোর বাড়াবাড়ি রকম বলপ্রয়োগের অবসান ঘটাবে। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলনসহ কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ ও বাহিনীগুলোকে আচরণের ক্ষেত্রে আগের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দেখছি।
নুরকে আহত করার পর স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম হলো। তাঁরা জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। এ কর্মসূচিতে গণ অধিকার পরিষদের রাজনৈতিক অর্জন কতটা, সেটা একটা বড় প্রশ্নই থেকে যায়।
মে মাসে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সময়ও হঠাৎই এ রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি হতে আমরা দেখেছিলাম। চিকিৎসার জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সিঙ্গাপুরে যাওয়ার ঘটনা ঘিরে এর সূত্রপাত। গাজীপুরে এনসিপির একজন নেতা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি ওঠে। শাহবাগ ও যমুনা ঘেরাওয়ের কর্মসূচি আসে। শেষে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে সংঘটিত অপরাধের বিচার না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।
দুটি ঘটনার সঙ্গে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সমীকরণ যে আছে, সেটা বোঝা যায়। গণ–অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের নতুন রাজনৈতিক দল এনসিপির সম্মেলন ঘিরে গোপালগঞ্জে যে সহিংস ঘটনা ঘটেছিল, সেটা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এনসিপির জুলাই পদযাত্রা ঘিরে সারা দেশেই আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু গোপালগঞ্জের কর্মসূচির নাম হয়ে যায় ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’।
সংগঠনটির দু-একজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎই উসকানিমূলক পোস্ট দেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে আইনশৃঙ্খলার কাজে নিয়োজিত বাহিনীগুলোর গুলিতে অন্তত পাঁচজন নিহত হন। এনসিপির নেতাদের সামরিক বাহিনীর গাড়িতে গোপালগঞ্জ ছাড়তে হয়। এ ঘটনার পর এনসিপির জুলাই পদযাত্রা কর্মসূচি স্বতঃস্ফূর্ততা হারায়। জুলাইযাত্রা গোপালগঞ্জে গিয়ে মার্চ ফর গোপালগঞ্জ হয়ে যাওয়ায় এনসিপি কী অর্জন করতে পেরেছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক প্রশ্ন।
১৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যাচ্ছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, পিআর পদ্ধতির নির্বাচনসহ আট দফা দাবিতে জামায়াতে ইসলামীসহ ছয়টি ইসলামি দল ও গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গে যুগপৎ কর্মসূচিতে যাচ্ছে এনসিপি। যদিও দলটির একজন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ফেসবুক স্ট্যাটাসে জানিয়েছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টি এখনো কোনো জোট বা যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেনি। এনসিপি যদি সত্যি সত্যি ইসলামপন্থীদের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে নামে, তাহলে মধ্যপন্থা হিসেবে দলটির যে নিজস্ব ভাবমূর্তি, সেটা অনেকখানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
রাজনৈতিক দলের মূল পরিচয় তার ঘোষণা ও কর্মসূচিই। নাগরিকদের সঙ্গে কোনো একটি দলের সংযোগ তৈরি করে দেয় কর্মসূচি। রাজনীতির দীর্ঘ রেসে টিকে থাকতে হলে নতুন, পুরোনো যেকোনো দলকেই নিজস্ব কর্মসূচি নিয়েই এগোতে হয়। রাজনীতির নগদ কারবারের চেয়ে বাকির লোভটা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট দল, নতুন দল সেই ভুল করলে বড় দলের ছায়া বা প্রক্সি শক্তি হওয়ার নিয়তিই তাকে বরণ করতে হয়।
* মনোজ দে, প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
| সম্প্রতি জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত এইচএম এরশাদের ম্যুরাল ভাংচুর করা হয়। ছবি : প্রথম আলো |
Monday, September 8, 2025
আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ভোটাররা কী করবেন by সোহরাব হাসান
কিন্তু একজন সাবেক দক্ষ আমলা হিসেবে তাঁর জানার কথা কোনো নির্বাচনে ৩০০ আসনে সন্ত্রাস হয় না। যেসব আসনে মারদাঙ্গা প্রার্থী থাকেন, আর যেসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা কম থাকে, সেখানে সন্ত্রাস হয়। নির্বাচন কমিশনকে তাই ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র বাছাই করলেই হবে না, ঝুঁকিপূর্ণ আসনও বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফ ১৯৯১ সালে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি একটি উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের সন্ত্রাসের কাছে হার মেনেছিলেন এবং সেই নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতির গতি–প্রকৃতি বদলে দিয়েছিল।
একইভাবে যে আওয়ামী লীগ আন্দোলনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারাই আবার পরবর্তী সময়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেই ব্যবস্থা বাতিল করে নিজেদের পায়ে কুড়াল মেরেছিল। তত্ত্বাবধায়ক–ব্যবস্থা বাতিলের পর যে তিনটি নির্বাচন হয়েছিল, তাতে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।
সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে নাসির উদ্দীন কমিশন এর আগে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৭২ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধনের প্রস্তাব। এতে সশস্ত্র বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে পুরো আসনের নির্বাচন বাতিল করার কথা বলা হয়েছে, প্রার্থীর বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব প্রস্তাব প্রার্থীর জবাবদিহির আওতায় আনা ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করি।
তবে নির্বাচন কমিশন একক প্রার্থীর ক্ষেত্রে ‘না’ ভোটের বিধান রাখার যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি সুষ্ঠু নির্বাচনের স্থলে কারসাজির সুযোগ বাড়িয়ে দিতে পারে। উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির ৪৯ জন এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছিলেন। এসব আসনে ‘না’ ভোটের ব্যবস্থা থাকলে নির্বাচনের গুণগত কোনো ফারাক হতো কি? বরং জয়ী দল এ কথা বলার সুযোগ পেত যে তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত নয়। অতএব কোনো বিধান চালুর আগে এর পরিণামের কথাও কমিশনকে ভাবতে হবে। নির্বাচন কমিশন যদি ‘না’ ভোট চালু করতে চায়, সব আসনের জন্যই সেটি করতে হবে। এখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ব্যক্তিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।
নির্বাচন কমিশন জোটবদ্ধ নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলীয় প্রতীক বহাল রাখার কথা বলেছে। এটা গণতান্ত্রিক রীতির সঙ্গে কতটা যায়, সেই প্রশ্নও উঠবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটে প্রতীকের বিষয়টি উন্মুক্ত ছিল। কেউ জোটের প্রতীকে, কেউ দলের প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। ২০১৮ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাও ধানের শীষ প্রতীকে ভোট করেছেন (যেহেতু জামায়াতের নিবন্ধন স্থগিত ছিল)। দলীয় প্রতীক রাখা নিয়ে ছোট দলগুলো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এতে বড় দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা বাড়বে এবং ছোট দলের প্রার্থীদের বাড়তি ঝামেলায় পড়তে হবে।
নির্বাচন কমিশনের যে প্রস্তাব সবচেয়ে বেশি আলোচিত, সেটি হলো পলাতক আসামিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা। আদালত কোনো ব্যক্তিকে পলাতক ঘোষণা করলে তাঁর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ থাকার কথা নয়। পলাতক আসামিকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার প্রস্তাবটি ছিল মূলত নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের। সে সময়ে নির্বাচন কমিশন এই প্রস্তাবের সঙ্গে দ্বিমত করেছিল।
গত মার্চ মাসে তারা জাতীয় ঐকমত্য কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছিল, এমন বিধান অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে। এরপর কেন নির্বাচন কমিশন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিল, সেই প্রশ্নের জবাবে কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে উভয় পক্ষের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে এটা করা হয়েছে। প্রশ্নটা সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টির নয়, আইনের। সংবিধানবিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক পলাতক আসামিদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব সমর্থন করে ন্যায্য প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথা বলেছেন। রাজনৈতিক দলের নেতারা আইনের অপব্যবহার না হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন আরও যেসব সংশোধনী প্রস্তাব এনেছে, সেগুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। যেমন লাভজনক প্রতিষ্ঠানে থাকা ব্যক্তিকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে না দেওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কমিটি থেকে পদত্যাগ করা, মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দেশে ও বিদেশে থাকা সম্পদের হিসাব দাখিল করা। কমিশন প্রস্তাব করেছে, রাজনৈতিক দল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনুদান নিতে পারবে; কিন্তু ৫০ হাজার টাকার বেশি হলে সেটি চেকের মাধ্যমে নিতে হবে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থীর পাশাপাশি অনুদানদাতার আয়–ব্যয়েও স্বচ্ছতা আসবে ধারণা করি।
নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নির্বাচনে ভোটারদের ‘প্রথম চোখ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সাড়ে ১২ কোটি ভোটারের কতজনকে তাঁরা হাজির করতে পারেন, তার ওপরই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করছে। সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে, ভোটারদের বাছাই করার সুযোগ ছিল না বলে বিগত তিনটি নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়েছিল। এবার সেই বাছাইয়ের সুযোগ কতটা থাকবে?
অনেকে বলেছেন, নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে সব দলের অংশগ্রহণের প্রয়োজন নেই। ভোটাররা অংশ নিলেই হবে মানলাম; কিন্তু ভোটাররা যদি দেখেন প্রার্থী বাছাইয়ে সুযোগ সীমিত, তাহলে তাঁরা ভোটকেন্দ্রে যেতে বা ভোট দিতে উৎসাহী হবেন না।
সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। অন্যদিকে একটি মহল স্বৈরাচারের সহযোগী হিসেবে জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ করার দাবি জানাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা আমরা জানি না। যদি আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায়, তাহলে তাদের সমর্থক ভোটাররা কী করবেন?
নির্বাচন কমিশন আরপিওতে যত সংশোধনীই আনুক না কেন, গরিষ্ঠসংখ্যক ভোটারকে কেন্দ্রে আনাই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
● সোহরাব হাসান, কবি ও সাংবাদিক
- sohrabhassan55@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
Sunday, August 10, 2025
ফের ভাঙলো জাতীয় পার্টি
১৯৮৬ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে দলটি। নির্বাচন কমিশনে যুক্ত নামের সঙ্গে সবথেকে বেশি নাম জাতীয় পার্টি। এর সঙ্গে ব্রাকেটবন্দি রয়েছে নেতাদের নাম। এরশাদের জীবদ্দশায় পাঁচবার এবং তার মৃত্যুর পর তিনবার এভাবে ভাগ হয় জাতীয় পার্টি।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আলাদা হয়ে যান। তিনি জাতীয় পার্টি (জেপি) গঠন করেন। দলটির মহাসচিবের দায়িত্বে রয়েছেন শেখ শহীদুল ইসলাম, প্রতীক বাইসাইকেল। ২০০১ সালের নির্বাচনে আগে নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামে দল গঠন করে। এই অংশটির নেতৃত্বে এখন রয়েছেন আন্দালিব রহমান পার্থ, মহাসচিব আব্দুল মতিন সাউদ। প্রতীক গরুর গাড়ি। আবার এই বিজেপি দুই ভাগ হয়ে যায়। ব্রাকেটবন্দি হয় ডা. এম এ মতিনের নামে। প্রতীক কাঁঠাল। ২০১৩ সালে এরশাদের পুরোনো রাজনৈতিক সহকর্মী কাজী জাফর আহমেদ দল ভেঙে আলাদা হন। দলটির চেয়ারম্যান ও মহাসচিব বর্তমানে ফজলে রাব্বি চৌধুরী ও মোস্তফা জামাল হায়দার, প্রতীক মোটরগাড়ি।
কাজী জাফরের দল ভেঙে জাতীয় পার্টি পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছিলেন এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক। যদিও তা আলোর মুখ দেখেনি। ২৪-এর নির্বাচনে এরশাদপত্নী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলটিতে ভাঙন হয়। রওশনের নেতৃত্বে আয়োজিত কাউন্সিলে তিনি চেয়ারম্যান ও কাজী মামুনুর রশীদ মাহসচিবের দায়িত্ব পান। এ ছাড়াও রয়েছে তৃণমূল জাতীয় পার্টি। পার্টির চেয়ারম্যান ড. আব্দুল্লাহ আল নাসের ও মহাসচিব শামীম ইশতিয়াক চৌধুরী। এদিকে, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন এরশাদের ভাই জিএম কাদের ও মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী। প্রতীক লাঙ্গল।
গতকাল রাজধানীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে জিএম কাদের বিরোধীদের ‘দশম জাতীয় কাউন্সিল’ অনুষ্ঠিত হয়। কাউন্সিলে কাজী ফিরোজ রশিদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও মুজিবুল হক চুন্নু নির্বাহী চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এতে ৩ সদস্যের একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। আহ্বায়ক মো. জহিরুল ইসলাম, অন্য দুই সদস্য আল মাহমুদ, মো. আরিফুর রহমান খান। এ সময় কণ্ঠভোটে গঠনতন্ত্রের ২০ (১) ক ধারা বাতিল করা হয়। যে ক্ষমতাবলে চেয়ারম্যান যেকোনো নেতাকর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই বহিষ্কার করতে পারতেন। নির্বাচিত কমিটি ১৫ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। সকালে জাতীয় ও দলীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্যদিয়ে কাউন্সিলের উদ্বোধন করা হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন জাতীয় পার্টির ‘ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান’ ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করেন মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু।
প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার। সাংগঠনিক রিপোর্ট পেশ করেন মুজিবুল হক চুন্নু। প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে এই দেশ সৃষ্টি হয়েছে। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমাদের দেশকে একটা অবস্থানে নিয়ে এসেছিলাম। আজকে সবাই সব কথা বলে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতার কথা কেউ বলে না। এখন সরকার বলছে, সংস্কার করতে হবে। সংস্কার কি আমরা করিনি। শিক্ষানীতি, ঔষধনীতি, উপজেলা পদ্ধতি এসবই সংস্কারের অংশ ছিল। এখন সংস্কারের জন্য বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করে আনতে হয়। তারা কীভাবে সংস্কার করবেন? তারা সংস্কারের প্রস্তাবনা দিতে পারে। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করতে হলে নির্বাচিত সংসদ লাগবে।
নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, আদৌ নির্বাচন হবে কিনা জানি না। তাছাড়া দেশে এখন যে পরিবেশ বিরাজ করছে তাতে নির্বাচনের কি দরকার? বড় দুই দলের মধ্যে আসন ভাগাভাগি করে নিলে নির্বাচনের খরচবাবদ দুই হাজার কোটি টাকা বেঁচে যায়। সারা দেশে দখলবাজি চলছে, বাড়ি দখল-দোকান দখল, হাট-বাজার দখল, সব জায়গায় দখলবাজি হচ্ছে। কোনো কিছুতেই নিয়ম কানুনের বালাই নেই। এই সব বন্ধ করতে সরকারের দৃশ্যমান উদ্যোগও চোখে পড়ছে না।
সভাপতির বক্তব্যে ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, জিএম কাদের কাউন্সিল করলেন না, কারণ পদ হারানোর ভয়। ৪০ বছর রাজনীতি করার পর আমার সদস্যপদ বাতিল করা হলো। এক ব্যক্তির বিজনেস, আমরা দলকে হতে দেবো না। আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা কোনো অন্যায় করি নাই। সরকারকে প্রতিহত করতেও হলে সংসদে যেতে হয়। এরপরও বলবো যদি জনগণ মনে করে অন্যায় হয়েছে আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চাই।
বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা আওয়ামী লীগ আমলে হওয়া নির্বাচনকে বৈধতা দিতে আন্দোলন করেছেন। চট্টগ্রামে বৈধতা দিয়েও দিয়েছেন। স্ববিরোধী অবস্থান ত্যাগ করার আহ্বান জানান তিনি। স্বাগত বক্তব্যে রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, জাতীয় পার্টিকে আমরা নিয়ে যাবো সাধারণ মানুষের কাছে। ফিরিয়ে দিবো তৃণমূলের মর্যাদা। পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের গড়া জাতীয় পার্টি কারও একক সম্পত্তি নয়, এই পার্টি জনগণের আশা ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনে রাজপথে থাকবে। আজ থেকে জাতীয় পার্টি কোনো একক নেতৃত্বে চলবে না।
আওয়ামী লীগের আমলে নির্বাচনে অংশ নেয়ায় দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি বলেন, আমরা দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে কোনো বেআইনি কাজ করিনি। যদি নৈতিকভাবে কোনো ভুল হয়ে থাকে, কোনো ভ্রান্তি হয়ে থাকে তাহলে এই কাউন্সিলে দাঁড়িয়ে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে আমরা নিঃশর্ত ক্ষমা চাই।
কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, ২৪ সালে নির্বাচনের আগে জিএম কাদেরকে বললাম, নির্বাচনে যাবেন না, গেলে জাতীয় বেইমান হবেন। তিনি বললেন, আমি যাবো না। পরে দেখি উনি গেলেন। আমরা ক্ষমা চাই। ছাত্ররা বিপ্লব করেছে। তারা বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। এই আন্দোলন সবাই করেছে সব দল। এখন নির্বাচন হলে দিনের ভোট দিনেই হবে। কিন্তু ভোট সব এক বাক্সে যাবে। তারেক রহমানকে বলতে চাই, আওয়ামী লীগের ভুলগুলো করবেন না। মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারছে না। আগামীতে প্রধানমন্ত্রী হবেন কিন্তু আপনার কথা দলের নেতারা শোনেন না। শুধু বহিষ্কার করলে হবে না। দলকে আপনার কমান্ডের মধ্যে আনতে হবে।
আরও বক্তব্য রাখেন কো-চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহিদুর রহমান টেপা, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, এটিইউ তাজ রহমান, সোলায়মান আলম শেঠ, নাসরিন জাহান রতনা, নাজমা আকতার, লিয়াকত হোসেন খোকা, মোস্তফা আল মাহমুদ, মাসরুর মওলা, জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া, আরিফুর রহমান, নুরুল ইসলাম মিলন, জিয়াউল হক মৃধা, খান ইসরাফিল খোকনসহ বিভিন্ন জেলা কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা। কাউন্সিলে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন- জাতীয় পার্টি (জেপি) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর) প্রেসিডিয়াম সদস্য দিদারুল আলম দিদার, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (মতিন) মহাসচিব জাফর আহমেদ জয় প্রমুখ।
অন্যদিকে, শনিবার এক অনুষ্ঠানে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ইতিহাস বলে, মূল স্রোতের বাইরে গিয়ে যারা জাতীয় পার্টিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চেয়েছে, তারাই নিশ্চিহ্ন হয়েছেন। জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দেবে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও জিএম কাদেরের অনুসারীরা। কোনো ষড়যন্ত্রে বিভ্রান্ত না হয়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বানও জানান তিনি।
Monday, October 14, 2024
ব্যাকফুটে চুন্নু, গ্রেপ্তার নাকি পুনর্বাসন! by আশরাফুল ইসলাম
মহাজোট প্রার্থী হিসেবে চুন্নু ‘লাঙ্গল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন। সে নির্বাচনে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভরার স্বীকারোক্তি তিনি নিজেই দিয়েছেন। ২০২২ সালের ৩১শে জুলাই নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে জাতীয় পার্টির সংলাপে তিনি বলেছিলেন, ‘রাতে কিন্তু কাজটা (ভোট দেয়া) হয়। হয় মানে কী, আমরাই করাইছি। কী বলবো এটা হয়। এটা হয় না, ঠিক না।’ এর আগে ২০২১ সালের ৯ই অক্টোবর জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান থেকে মুজিবুল হক চুন্নুকে মহাসচিব করা হয়। তাকে মহাসচিব করার ব্যাপারেও সরকারি দল আওয়ামী লীগ এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে তদবির ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে। জাতীয় পার্টির একাধিক সূত্র বলছে, সর্বশেষ গত ৭ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে মহাসচিব হিসেবে প্রায় একক সিদ্ধান্তে চুন্নু জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে নিয়ে যান। এমনকি গত ৭ই জানুয়ারির নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৩ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসন থেকে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় মুজিবুল হক চুন্নু তার নির্বাচনী পোস্টারে নিজেকে ‘জাতীয় পার্টি মনোনীত ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত’ প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেন। সে সময় বিষয়টি বেশ সমালোচিত হয়। এদিকে গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর শুরুর দিকে বেশ স্বস্তিতেই ছিলেন মুজিবুল হক চুন্নু। ৫ই আগস্ট সেনাপ্রধানের সঙ্গে জাতীয় পার্টির বৈঠক এবং ৩১শে আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জাতীয় পার্টির প্রতিনিধি দলে ছিলেন মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের বিরোধিতার মুখে পরবর্তীতে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে ডাক পায়নি জাতীয় পার্টি। এতে জাতীয় পার্টির পাশাপাশি দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বিপাকে পড়েন। এ রকম পরিস্থিতির মধ্যেই গত ৬ই অক্টোবর রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলায় মুজিবুল হক চুন্নুকে আসামি করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচিকে ঘিরে গত ৫ই আগস্ট রাজধানীর আজমপুর এলাকায় গুলিতে নিহত আলমগীর হোসেন (৩৪) এর মা মোসা. আলেয়া বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে করা এ মামলায় ৬নং আসামি করা হয়েছে মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে। ৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে এটি মুজিবুল হক চুন্নুর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া প্রথম ও একমাত্র মামলা। এরপর থেকেই অনেকটা ব্যাকফুটে রয়েছেন মুজিবুল হক চুন্নু। তার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়টি তার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে জানাজানি হওয়ার পর সেখানে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার নিজ এলাকার মানুষ মুজিবুল হক চুন্নুকে এ মামলায় অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। এ পরিস্থিতি চুন্নু কীভাবে সামাল দিবেন, সেটিই এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শনিবার (১২ই অক্টোবর) জাতীয় পার্টি আয়োজিত ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সকল থানা নেতৃবৃন্দের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বরাবরই আমাদের অনৈতিকভাবে বিভিন্ন চাপে রেখে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করেছে। তাদের কাছে অনেক সময় আমরা জিম্মিও ছিলাম।
এখন কোনো চাপ নেই তাই আমরা স্বাধীনভাবে আমাদের রাজনৈতিক কর্মকৌশল প্রণয়ন করে জনগণকে প্রকৃত সেবা দেয়ার লক্ষ্যে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হবো। জনগণ আমাদেরকেই সমর্থন করবে। এজন্য ধৈর্য্য ধারণ করে কারও কোনো উস্কানিতে বিভ্রান্ত না হয়ে পার্টির সকল সাংগঠনিক কার্যক্রমে একাগ্রতার সহিত অংশগ্রহণ করতে হবে এবং জনগণকেও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলীয় ফোরামে চুন্নু যাই বলেন না কেন, আওয়ামী লীগকে সর্বগ্রাসী হয়ে উঠতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল জাতীয় পার্টি এবং এক্ষেত্রে প্রভাবকের ভূমিকায় ছিলেন মুজিবুল হক চুন্নু। তাই বর্তমান পরিস্থিতি জাতীয় পার্টি কিংবা চুন্নু কারওরই অনুকূলে নয়।
বিশেষ করে চুন্নুর বিরুদ্ধে বেশি সরব আলোচনা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হবেন কি-না, সেটি নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। এ পরিস্থিতি সামাল দিয়ে তিনি পুনর্বাসিত হন কি-না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনকে বৈধতা দেয়ার অজুহাত সঠিক নয়: জিএম কাদের
জিএম কাদের বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে আমরা ২৭০ জন সংসদ সদস্য প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলাম। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিলে তাকে সরকার সিএমএইচে নিয়ে যায় এবং মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধা দেয়। ওই সময় জাতীয় পার্টির ক্ষুদ্র একটি অংশ নির্বাচনে ছিল। সেই সময় রংপুরে নির্বাচন বর্জনের আন্দোলনও হয়েছিল। ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি’র স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এসেছিল। তাই সেই নির্বাচনকে তারাও বৈধতা দিয়েছিল বলেই পরবর্তীতে নির্বাচন করেছে।
২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই বিএনপিসহ সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনে এসে সেই নির্বাচনকে বৈধতা দিয়েছে। বিএনপি’র কয়েকজন সংসদ সদস্য প্রায় ৪ বছর সংসদেও ছিল। ২০২৪ সালে আমরা নির্বাচনের না যাওয়ার ঘোষণা দিলে আওয়ামী লীগ আমাদের দলকে দু’ভাগে বিভক্ত করে রওশন এরশাদকে দলের প্রতীক, নাম ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার প্রক্রিয়া করেছিল। আমরা নির্বাচন বর্জন করলে রওশন এরশাদকে জাতীয় পার্টির প্রতীক দিয়ে নির্বাচন করানো হতো। এরপরেও আমি নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলে আমার অফিস র্যাব, পুলিশ, এসবি, বিজিবি দিয়ে ঘিরে রেখেছিল, যা দেশবাসী জানে। পরবর্তীতে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার গ্যারান্টি দিলে আমরা নির্বাচনে আসি। তাই আমাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হচ্ছে তা সঠিক নয়।
তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি একমাত্র দল যারা সন্ত্রাসবাদ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হাট দখল, জমি দখল, অবৈধ ব্যবসা, লুটপাটের সঙ্গে কখনো জড়িত ছিল না। বিএনপি’র আমলে আমরা হামলা-মামলার শিকার হয়েছি, আর আওয়ামী লীগের আমলে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি।
দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দেশের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বি। মুদ্রাস্ফীতি বাড়ছে, বেকারত্ব বাড়ছে। মানুষ মিল-কারখানা চালাতে পারছে না, উপার্জন কমে যাচ্ছে। সরকারের সামনে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো- মানুষের নিরাপত্তা দেয়া, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা ও বেকারত্ব দূর করা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়ে তিনি বলেন, সরকার এখন পর্যন্ত মানুষের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। তবে তাদের দোষারোপ করা যাবে না। তারা ভগ্নস্তূপের মাঝে দায়িত্ব নিয়েছে। প্রশাসন নড়বড়ে, অর্থনীতি নাজুক, আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। এর ওপর মানুষের পাহাড় সমান প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন- জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য এইচএম ইয়াসির আহমেদ, ভাইস চেয়ারম্যান আজমল হোসেন লেবু, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক, মহানগর জাতীয় পার্টির সিনিয়র সহ-সভাপতি লোকমান হোসেন প্রমুখ।

Friday, August 2, 2024
যারা রক্ষা করবে তারাই জনগণের ওপর বন্দুক চালাচ্ছে: জিএম কাদের
জিএম কাদের বলেন, সরকার যাদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করেছে তাদের কাউকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ পায়নি। আমার প্রশ্ন হলো তাহলে কেন নির্বিচারে এমন গণহত্যা করা হলো। হেলিকপ্টার থেকে, বাড়ির ছাদ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কীভাবে বুঝলো কে সন্ত্রাসী, কে ভালো, কে শিশু। সরকারের এমন কর্মকাণ্ডে আজ দেশের অর্থনীতি চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন্ন হয়েছে। দেশে অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দিলে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়বে।
আবারো জনগণ মাঠে নামবে, মানুষ মারা যাবে। একসময় বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে সন্ত্রাসী জাতি হিসেবে চিহ্নিত হবে। আমি মনে করি এ থেকে উত্তরণে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। আমরা গণতান্ত্রিক পরিবেশ চেয়েছিলাম। কিন্তু দেশে একনায়কতন্ত্র ও চরমভাবে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়েছে। নাশকতার দায় বিএনপি-জামায়াতের ঘাড়ে চাপানো নিয়ে জিএম কাদের বলেন, সংঘর্ষের শুরু থেকে বিএনপি-জামায়াত বলে বলে যতবার সরকার যেভাবে প্রচার করুক না কেন, আমি ঢাকায় দেখেছি, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। জনগণ সরকারের একথা গ্রহণ করেনি। এটি জনগণের সংগ্রাম। বিএনপি-জামায়াত-জাতীয় পার্টির কেউ থাকলে তারা ব্যক্তিগতভাবে আন্দোলনে গিয়েছিল। আন্দোলন নিয়ে বিএনপি-জামায়াত এজেন্ডা দিয়েছিল সরকার এটিকেও প্রমাণ করতে পারেনি। মানুষও গ্রহণযোগ্যভাবে এটিকে গ্রহণ করেনি।
জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি বন্ধ নিয়ে জিএম কাদের বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। কোনো রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক অর্ডারে বন্ধ করা ঠিক নয়। জনগণ তাদের জন্য কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষতিকারক মনে করলে তারা বয়কট করবে। এক সময় সেই রাজনৈতিক দল বিলীন হয়ে যাবে। সরকার এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে কেন জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করলো, তাদের কি উদ্দেশ্য রয়েছে এসব প্রশ্ন আমাদের মনে। সেই সঙ্গে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগে সরকার বড় ধরনের নির্যাতনে যাবে কিনা এটি নিয়েও আমাদের সংশয় রয়েছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান, সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এসএম ইয়াসিরসহ জেলা ও মহানগর জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা।
Saturday, February 1, 2020
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ: তাঁর সফলতা এবং বিতর্কের নানা দিক by আকবর হোসেন

উপজেলা পদ্ধতি চালু
হাইকোর্টের বেঞ্চ বিকেন্দ্রীকরণ
ঔষধ নীতি প্রণয়ন
![]() |
| ক্ষমতায় থাকার সময় বিদেশী গণমাধ্যমের নজরে ছিলেন জেনারেল এরশাদ। |
রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম
সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার
দুর্নীতির বিস্তার
নির্বাচনে কখনো হারেননি এরশাদ
![]() |
| ১৯৮৩ সালে হোয়াইট হাউজে জেনালের এরশাদ |
Tuesday, January 14, 2020
এরশাদকে ছেড়ে গেছেন ঘনিষ্ঠরা

তবে ’৯১ সালে দেশে আবারও সংসদীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হওয়ার পর রাজনীতিতে গুরুত্ব বাড়তে থাকে তার। বৃহৎ দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের রাজনৈতিক সমীকরণে জড়িয়ে যান তিনি। অবশ্য এই জোট-রাজনীতিতে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি হারিয়েছেন দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাকে, নিজের একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের। যাদের মন্ত্রী বানিয়েছিলেন, তাদের অনেকেই ‘সুযোগ-সুবিধা’র প্রশ্নে পক্ষ ত্যাগ করেছেন।
জাতীয় পার্টির নেতাদের দল পরিবর্তনের প্রসঙ্গে এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, কেএম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অনেকেই এরশাদ সাহেবকে ত্যাগ করে অন্য দলে ভিড়েছেন।’
প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, ‘তবে যারা দল ত্যাগ করেছেন, তাদের বেশিরভাগই বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। অনেকে জিয়াউর রহমানের হাত ধরে বিএনপিতে ছিলেন, পরে ক্ষমতা পরিবর্তনের কারণে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন।’
দল পরিবর্তন ঘটে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য মন্তব্য করে মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘আমাকে এরশাদ সাহেব অনেকবার বলেছেন, কিন্তু আমি যাইনি।’ তার দাবি, সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য তিনি রাজনীতি করেন না।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয়ও দেখভাল করেছেন। এখন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য তিনি। ২০০১ সালে জোট সরকারে আইনমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব প্রফেসর এমএ মতিন বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। এরশাদ সরকারের উপপ্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ পরে নতুন জাতীয় পার্টি গঠন করেন। তবে তিনি অন্য কোনও দলে যোগ দেননি।
’৮৮ সালে এরশাদ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান।
জেপি’র আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ছিলেন এরশাদ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী। বর্তমানে তিনি মহাজোটে আছেন। গত আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় মেয়াদে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ছিলেন।
১৯৮৬ সালে নবগঠিত জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। মহাসচিব নিযুক্ত হন অধ্যাপক এমএ মতিন। ৬০১ সদস্যের জাতীয় কমিটি গঠিত হয়। ৫৭ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সচিব হন সাংবাদিক আনোয়ার জাহিদ। পরে তিনি ১৯৯৯ সালে ৪ দলীয় জোট গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং বিএনপিতে সক্রিয় হন।
এরশাদ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। আওয়ামী লীগ ’৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তাকে স্পিকার নির্বাচিত করে।
জাপার দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠাকালে ফ্রন্টের শরিক দল জনদল, ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি, বিএনপি (শাহ) এবং মুসলিম লীগ (সা) নিজেদের অস্তিত্ব বিলুপ্ত ঘোষণা করে জাতীয় পার্টিতে একীভূত হয়। পরে ১৯৮৫ সালের ১৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি এরশাদের নীতি ও আদর্শ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়ে জাতীয় ফ্রন্ট গঠিত হয়। রাজনৈতিক দলের বাইরেও অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ও নেতা এই ফ্রন্টে যোগ দিয়েছিলেন। পার্টি গঠনের ঘোষণার দিনে তারাও জাতীয় পার্টিতে যোগ করেন।
জাতীয় পার্টি গঠনের দিন ২১ সদস্যের প্রেসিডিয়াম, ৫৭ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটিসহ ৬০১ সদস্যের জাতীয় নির্বাহী কমিটির ঘোষণা দেওয়া হয়। ২১ সদস্যের প্রেসিডিয়ামের মধ্যে ১৮ জনের নাম ঘোষণা করা হয়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিজানুর রহমান চৌধুরী (আসেন আওয়ামী লীগ থেকে), মওদুদ আহমদ (আসেন বিএনপি থেকে, পরে আবার জাপা ছেড়ে বিএনপি), কাজী জাফর আহমেদ (পৃথক দল), সিরাজুল হোসেন খান, রিয়াজউদ্দিন আহমেদ ভোলা মিয়া, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী (বিএনপিতে যোগ দেন), আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
এরশাদ সরকারের ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ছিলেন মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাছ। বর্তমানে তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (একাংশ) চেয়ারম্যান। দল পরিবর্তনের বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘অন্যরা কেন দল ত্যাগ করেছে সেই বিষয়ে তো আমি সঠিক বলতে পারবো না। ১৯৮৬ থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত আমি এরশাদের সঙ্গে ছিলাম। আমি স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয়ী হওয়ার পরে জাতীয় পার্টিতে যোগদান করি। কিন্তু আমার মূল দল ছিল জমিয়তে ইসলাম। পরে আমি আবার সেই দলে ফিরে আসি। এরশাদ সাহেব আমাকে যথেষ্ট ভালো জানতেন।’
জাতীয় পার্টিতে যোগদান করার দিনে এরশাদ তাকে ২ লাখ টাকা দিতে চেয়েছিলেন বলে দাবি করেন মুফতি ওয়াক্কাছ। তিনি বলেন, ‘কিন্তু আমি বলেছি টাকা নেবো না। আমরা এলাকার উন্নয়ন দরকার। ফলে যোগদানের দিন আমি ২ লাখ টাকা নিইনি।’ ব্যক্তিগতভাবে এরশাদের অনেক কিছু থাকলেও বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে তার অনেক অবদান আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
Saturday, November 2, 2019
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ: ভাসানী ও শেরে বাংলার দলের মতো জাতীয় পার্টিও বিলুপ্ত হতে পারে - বিশ্লেষক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ
![]() |
| হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ |
Thursday, October 10, 2019
এরশাদ: কবিখ্যাতি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল এক সেনাশাসক, নিষিদ্ধ কবিতা এবং একটি সংবাদ সম্মেলন by মোয়াজ্জেম হোসেন

১৯৮৩ সালের অক্টোবর মাস। জেনারেল এরশাদ তখন বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। মাত্র তিনি যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরেছেন।
সংসদ ভবনে তখন প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দফতর (সিএমএলএ)। সেখানে রীতি অনুযায়ী এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে। জেনারেল এরশাদ কথা বলবেন তার যুক্তরাষ্ট্র সফর নিয়ে।
জাহাঙ্গীর হোসেন তখন সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস এর কূটনৈতিক সংবাদদাতা। এখন তিনি ঢাকায় অবসর জীবনযাপন করছেন। বিবিসি বাংলার সঙ্গে টেলিফোনে তিনি বর্ণনা করছিলেন ৩৬ বছর আগের সেই সংবাদ সম্মেলনটির কথা।
"সংবাদ সম্মেলনটি হচ্ছিল পার্লামেন্ট ভবনের দোতলায় এক নম্বর কমিটি রুমে। জেনারেল এরশাদকে প্রচুর রাজনৈতিক প্রশ্ন করা হচ্ছিল, কারণ তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে ডেকেছিলেন। কিন্তু কোন দল তার ডাকে সাড়া দিচ্ছিল না। কেউ তার সঙ্গে কথা বলতে আসছিল না। বিরক্ত হয়ে জেনারেল এরশাদ বলেছিলেন, আমি কি রেড লাইট এলাকায় থাকি যে আমার সঙ্গে কেউ কথা বলবে না?"
সংবাদ সম্মেলনের এই পর্যায়ে জাহাঙ্গীর হোসেন উঠে দাঁড়িয়ে জেনারেল এরশাদকে বললেন, "মে আই আস্ক ইউ এ নন-পলিটিক্যাল কোয়েশ্চেন"- অর্থাৎ আমি কি আপনাকে একটি অরাজনৈতিক প্রশ্ন করতে পারি?
![]() |
| ঢাকায় বিদেশি সাংবাদিক পরিবেষ্টিত জেনারেল এরশাদ |
ইংরেজীতে তিনি যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন তার বাংলা তর্জমা এরকম:
"আপনি ক্ষমতায় আসার আগে কেউ জানতো না আপনি একজন কবি। এখন সব পত্রিকার প্রথম পাতায় আপনার কবিতা ছাপা হয়। পত্রিকার প্রথম পাতা তো খবরের জন্য, কবিতার জন্য নয়। বাংলাদেশের প্রধানতম কবি শামসুর রাহমানেরও তো এই ভাগ্য হয়নি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে আপনার কবিতা প্রথম পাতায় ছাপানোর জন্য কী কোন নির্দেশ জারি করা হয়েছে?"
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সবাই হতচকিত। জেনারেল এরশাদের পাশে বসা তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ আর এস দোহা বললেন, 'শামসুর রাহমান ইজ নট দ্য সিএমএলএ (শামসুর রাহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নন)।
জেনারেল এরশাদ অবশ্য তার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন। তিনি প্রশ্নকারী সাংবাদিককে বললেন, আমি দেশের জন্য এত করি, এটুকু কি আপনি দেবেন না আমাকে?
"তখন আমি বললাম, ওয়েল জেনারেল, আস্কিং কোয়েশ্চেন ইজ মাই প্রিরোগেটিভ, আনসারিং ইজ ইয়োর্স। ইউ হ্যাভ নট আনসার্ড মাই কোয়েশ্চেন। মাই কোয়েশ্চেন ইজ....(প্রশ্ন করার অধিকার আমার, উত্তর দেয়ার অধিকার আপনার। কিন্তু আপনি আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি। আমার প্রশ্নটি হচ্ছে..)
জাহাঙ্গীর হোসেন এরপর তার প্রশ্নটি আবার করলেন।
এবার জেনারেল এরশাদ বললেন, "আপনি যদি চান, আর ছাপা হবে না।"
এরপর পত্রিকার প্রথম পাতায় জেনারেল এরশাদের কবিতা ছাপা অনেকটাই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার কবিতা প্রথম পাতা থেকে চলে গিয়েছিল ভেতরের পাতায়। তবে এর পরিণাম ভোগ করতে হয়েছিল জাহাঙ্গীর হোসেনকে।
"এ ঘটনার পর আমাকে বদলি করে দেয়া হয় চট্টগ্রামে। আমি যেতে চাইনি। আমার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু আমাকে ব্যুরো এডিটর করে পাঠিয়ে দেয়া হলো। আমি দুবছর ছিলাম। দুবছর পর আমি পদত্যাগ করে সেখান থেকে চলে আসি।"
সামরিক শাসক যখন কবি
এটি ছিল এমন এক সময়, যখন কবিতাকে ঘিরেই চলছিল বাংলাদেশে রাজনীতির লড়াই।একদিকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সেনাশাসক জেনারেল এরশাদ, যিনি কবিখ্যাতি পাওয়ার জন্য আকুল। অন্যদিকে বিদ্রোহী একদল তরুণ কবি, যারা কবিতাকে পরিণত করেছেন তাদের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের প্রধান অস্ত্রে।
প্রতিটি পত্রিকার প্রথম পাতায় তখন হঠাৎ হঠাৎ ছাপা হচ্ছে জেনারেল এরশাদের কবিতা। ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যে বেরিয়ে গেছে তার প্রথম কবিতাগ্রন্থ, 'কনক প্রদীপ জ্বালো।' বঙ্গভবনে নিয়মিত বসছে কবিতার আসর। ঢাকার সেসময়কার প্রথম সারির নামকরা কিছু কবি তাকে ঘিরে থাকেন এসব অনুষ্ঠানে।
কবি এবং অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা মোফাজ্জল করিম তখন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। ক্ষমতা গ্রহণের আগে পর্যন্ত এরশাদের কবিতানুরাগের কথা তিনি শোনেননি, স্বীকার করলেন তিনি।
মোফাজ্জল করিম ছিলেন এরশাদকে ঘিরে থাকা কবিগোষ্ঠীর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ। এর কিছুটা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে, কিছুটা তার কবিতা চর্চার সুবাদে। একারণে এরশাদের বঙ্গভবনের কবিসভায় তিনিও আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন।
"কবিতার প্রতি তার অনুরাগের কথা আমরা প্রথম জানতে পারি ক্ষমতা নেয়ার মাসখানেক পরে এক অনুষ্ঠানে", স্মৃতি হাতড়ে জানালেন তিনি।
"সেই অনুষ্ঠানে তিনি এসেছিলেন সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে বক্তৃতা দিতে। শিল্পকলা একাডেমীর মিলনায়তনে এটা হয়েছিল। উনি বক্তৃতা করলেন। আমরা সবাই সামনে বসে শুনছি। তারপর বক্তৃতার শেষে তিনি হঠাৎ করে বললেন, কাল রাতে আমি একটি কবিতা লিখেছি।"
"এরপর কবিতাটি তিনি পড়ে শোনালেন। সেই প্রথম আমরা তার কবিতা শুনলাম।"
সরকারি ট্রাস্ট থেকে তখন প্রকাশিত হতো দৈনিক বাংলা এবং সাপ্তাহিক বিচিত্রা। দৈনিক বাংলার সম্পাদক তখন শামসুর রাহমান। দুটি কাগজেই নিয়মিত ছাপা হতে লাগলো জেনারেল এরশাদের কবিতা।
বঙ্গভবনে তখন যে কবিতার আসর বসতো তাতে একদিন যোগ দিলেন মোফাজ্জল করিম।
"আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল আমার এক কবিবন্ধু এবং সহকর্মী মনজুরে মাওলা। আমি অনেক অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করে সেখানে গিয়েছিলাম। প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণ বা অনুরোধ, এখানে না গেলে আবার কি না কি হয়, তাই গেলাম, কবিতাও পাঠ করেছিলাম। তো সেখানে আমি লক্ষ্য করেছিলাম, অনেক খ্যাতনামা কবি সেখানে ছিলেন।"
সেই কবিকুলের মধ্যে প্রধান দুই ব্যক্তি ছিলেন কবি ফজল শাহাবুদ্দীন এবং কবি ইমরান নুর, (এটি তার ছদ্মনাম, তার আসল নাম মনজুরুল করিম, সরকারের ডাকসাইটে আমলা ছিলেন)।
মোফাজ্জল করিম মনে করতে পারেন এরা দুজন বিভিন্নভাবে এরশাদ সাহেবের নৈকট্য লাভ করেছিলেন।
তখন কবিদের দুটি সংগঠন ছিল। একটির নাম কবিকন্ঠ। এর নেতৃত্বে ছিলেন ফজল শাহাবুদ্দীন। তার সঙ্গে ছিলেন আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসানের মতো কবিরা। এরশাদ ছিলেন এই সংগঠনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। কবিকন্ঠ বেশ সক্রিয় ছিল। তারা জেনারেল এরশাদকে বলে ধানমন্ডিতে একটি পরিত্যক্ত বাড়ি এই সংগঠনের নামে বরাদ্দ নেন। সেখানে প্রতি মাসে কবিতার আসর বসতো। সেখানে এরশাদ থাকতেন প্রধান অতিথি। তিনি নিজে কবিতাও পড়তেন।
শামসুর রাহমান এবং আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ মিলে কবিদের আরেকটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেটার নাম ছিল পদাবলী। তাদের ঘিরে জড়ো হন আরেকদল কবি।
বাংলাদেশের কবিদের জন্য এটি ছিল এক অভূতপূর্ব সময়। দেশের রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ ব্যক্তি কবিতার অনুরাগী, কবিযশপ্রার্থী। কাজেই কবিদের মধ্যে শুরু হলো একধরণের প্রতিযোগিতা, কিভাবে কবিতার মাধ্যমে তার নৈকট্য এবং আশীর্বাদ পাওয়া যায়।
দেশে সংবাদপত্রগুলোর ওপর তখন জারি রয়েছে কঠোর সেন্সরশীপ। কিন্তু তার মধ্যে নানা কথা, নানা গুজব ভেসে বেড়ায়।
একটি গুজব ছিল, জেনারেল এরশাদের নামে ছাপা হওয়া এসব কবিতা আসলে লিখে দেন নামকরা কজন কবি।
মোফাজ্জল করিম স্বীকার করলেন, এরকম কথা তাদের কানেও এসেছিল তখন। তখন বাংলাদেশের বেশ নামকরা কজন কবির নামই তারা শুনেছিলেন, যারা একাজ করতেন।
"আমরা শুনতাম, কিন্তু এর বেশি আমরা জানতাম না আর কিছু। তবে আমি এটা বিচার করতে যাইনি। এসব কবিতা এরশাদ সাহেবের নামে ছাপা হচ্ছে, আমি সেভাবেই দেখেছি। কে লিখে দিচ্ছে, কেন লিখে দিচ্ছে, সেটা নিয়ে আমি মাথা ঘামাইনি।"
নিষিদ্ধ কবিতা
পত্রিকার প্রথম পাতায় সামরিক শাসকের কবিতা নিয়ে যখন এত আলোচনা, তখন বাংলাদেশে গোপনে হটকেকের মতো বিক্রি হচ্ছে এক নিষিদ্ধ কবিতা।"খোলা কবিতা" নামে সেই কবিতা কেউ প্রকাশ করতে সাহসই করছিল না। কবির নাম মোহাম্মদ রফিক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী সাহিত্যের শিক্ষক।
নিষিদ্ধ কবিতাটির কয়েকটি পংক্তি এরকম:
"সব শালা কবি হবে, পিপীলিকা গোঁ ধরেছে উড়বেই, দাঁতাল শুয়োর এসে রাজাসনে বসবেই।"
পুরো কবিতাটি ছিল অনেক দীর্ঘ, প্রায় ১৬ পৃষ্ঠা। এটি গোপনে ছাপানো হয় এক ছাপাখানায়। নিউজপ্রিন্টে এক ফর্মায় ছাপানো সেই কবিতা গোপনে বিলি করেন মোহাম্মদ রফিকের ছাত্র-ছাত্রীরা। হাতে হাতে সেই কবিতা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে।
কিভাবে রচিত হয়েছিল সেই কবিতা, সেই কাহিনী শোনালেন মোহাম্মদ রফিক, যিনি এখন ঢাকায় অবসর জীবনযাপন করছেন।
"কবিতাটি আমি লিখেছিলাম জুন মাসের এক রাতে, এক বসাতেই। আমার মনে একটা প্রচন্ড ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, মনে হচ্ছিল একজন ভুঁইফোড় জেনারেল এসে আমাদের কবিতার অপমান করছে।"
তার মানে তার এই কবিতার লক্ষ্য তাহলে ছিলেন জেনারেল এরশাদই?
"এটা শুধু এরশাদকে নিয়ে লেখা কবিতা নয়। এরশাদের মার্শাল ল জারি আমার কাছে একটা ঘটনা। কিন্তু একজন লোক, যে কোনদিন লেখালেখির মধ্যে ছিল না, ভূঁইফোড় - সে আজ সামরিক শাসন জারির বদৌলতে কবিখ্যাতি অর্জন করবে, এটা তো মেনে নেয়া যায় না।"
মোহাম্মদ রফিক ছিলেন ষাটের দশকে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। এজন্যে জেলও খেটেছেন। জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের মধ্যে তিনি পাকিস্তানি আমলের সামরিক শাসনের ছায়া দেখতে পেয়েছিলেন। তার কবিতায় তিনি এর প্রতিবাদ জানালেন।
নিষিদ্ধ খোলা কবিতা তখন নানা ভাবে কপি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সারাদেশে। টনক নড়লো নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর। একদিন মোহাম্মদ রফিকের ডাক পড়লো সাভারে সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের দফতরে।
"সেখানে তিনজন সেনা কর্মকর্তার মুখোমুখি আমি। তাদের প্রথম প্রশ্ন, এটা কি আপনার লেখা। আমি বললাম হ্যাঁ, আমার লেখা। আমি তাদের বললাম, আমি আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেব, কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দেব না। সেটা হচ্ছে, এটি কে ছেপে দিয়েছে। কারণ আমি তাকে বিপদে ফেলতে চাই না।"
এর কিছুদিন পর মোহাম্মদ রফিকের নামে হুলিয়া জারি হয়। তাকে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকতে হয়।
কবিদের বিদ্রোহ
এরশাদ বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তখন চলছে নানা জোয়ার-ভাটা। আন্দোলন কখনো তীব্র রূপ নিচ্ছে, আবার কখনো ঝিমিয়ে পড়ছে।১৯৮৭ সাল। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বড় দলগুলোর মধ্যে যখন চলছে নানা টানাপোড়েন, তখন তরুণ কবিরা এক বিরাট কাণ্ড করে ফেললেন। ঢাকায় তারা এক বিরাট কবিতা উৎসবের আয়োজন করলেন, যার নাম দেয়া হলো 'জাতীয় কবিতা উৎসব।'
এই বিদ্রোহী কবিদের নেতৃত্বে আছেন শামসুর রাহমান। তিনি জাতীয় কবিতা পরিষদের সভাপতি। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে মূল সংগঠকের দায়িত্বে সেই রাগী বিদ্রোহী কবি মোহাম্মদ রফিক।
কিভাবে এই কবিতা উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল, সেটি বলতে গিয়ে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়লেন তিনি।
"তখন অনেক তরুণ কবির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। বিশেষ করে রুদ্র, কামাল, এরা অনেকে আমার কাছাকাছি ছিল। আমরা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বা আশে-পাশে আড্ডা দেই। আমাদের মধ্যে তখন আলাপ চলছিল, এরকম কিছু করা যায় কীনা। সেখান থেকেই এর শুরু। তরুণ কবিরাই এর উদ্যোগ নেন। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার নাম প্রস্তাব করেন রফিক আজাদ।"
১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারী ১ এবং ২ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় টিএসসির মোড়ে প্রথম জাতীয় কবিতা উৎসব শুরু হলো। সারা বাংলাদেশের কবিরা জড়ো হলেন সেখানে।
এই উৎসব কার্যত পরিণত হলো এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের এক বিরাট মঞ্চে। প্রথম উৎসবের শ্লোগানটাই ছিল, "শৃঙ্খল মুক্তির জন্য কবিতা।" উৎসবে যত কবিতা পড়া হতো, তাতে রাজনৈতিক কবিতার সংখ্যাই বেশি।
একদিকে সরকার বিরোধী কবিরা যখন রাজপথ গরম করছেন, তখন বঙ্গভবন-কেন্দ্রিক কবিরাও এশিয় কবিতা উৎসব নামে আরেকটি উৎসব করছেন সরকারী আনুকুল্যে। এরশাদ তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। তাতে বিভিন্ন দেশের নামকরা কবিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হলো। ১৯৮৯ সালে তাদের একটি উৎসবে যোগ দিতে এসেছিলেন ইংল্যান্ডের সেসময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান কবি টেড হিউজ।
কিন্তু বিদ্রোহী কবিরা যেভাবে সরকার বিরোধী আন্দোলনে উত্তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছিলেন, তা জেনারেল এরশাদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ালো।
১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় বারের মতো ঢাকায় জাতীয় কবিতা উৎসবে ঘটলো এক অভাবিত ঘটনা। সেবারের উৎসবের শ্লোগান 'স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কবিতা।" উৎসব মঞ্চে অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশের একজন নামকরা শিল্পী, কামরুল হাসান। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি সেখানেই ঢলে পড়েছিলেন। তবে মৃত্যুর আগের মুহূর্তে তিনি এঁকেছিলেন একটি স্কেচ, যার নীচে তিনি লিখেছিলেন, 'দেশ আজ বিশ্ববেহায়ার খপ্পরে।'
উৎসবের কর্মীরা রাতারাতি সেই স্কেচ দিয়ে পোস্টার ছাপিয়ে ফেলেন, কিন্তু বিলি করার আগেই পুলিশ হানা দিয়ে জব্দ করে অনেক পোস্টার। একজন শিল্পীর আঁকা একটি স্কেচ যেন একজন সেনাশাসকের ক্ষমতার জন্য এক বিরাট হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
একটি গণঅভ্যুত্থান
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এক ব্যাপক ছাত্র-গণ অভ্যুত্থানের মুখে পতন ঘটে এরশাদের। পদত্যাগে বাধ্য হন তিনি।কিন্তু তারপর যেভাবে একদিন ধুমকেতুর মতো বাংলাদেশের কাব্যজগতে তার আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল, সেভাবেই হঠাৎ করে তার কবিতা যেন হারিয়ে যায়। ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির কারণে তাকে কারাবাসে যেতে হয়। তবে সেখানে অখন্ড অবসর সত্ত্বেও তিনি কবিতার চর্চা করেছেন এমন খবর পাওয়া যায়নি। আর পত্রিকার প্রথম পাতা শুধু নয়, ভেতরের পাতাতেও তার কোন কবিতা আর ছাপা হতে দেখা যায়নি।
কিন্তু যেসব কবিতা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নামে প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে তার কাব্য প্রতিভা সম্পর্কে কী ধারণা পাওয়া যায়?
মোফাজ্জল করিম বলছেন, এরশাদের মধ্যে একটা কবি মন ছিল বলেই তাঁর মনে হয়েছে।
"আমার একটা জিনিস মনে হয়, তার একটা কাব্যপ্রীতি ছিল। কবিতা তিনি ভালোবাসতেন, কবিদের সাহচর্য পছন্দ করতেন। এ কারণেই তিনি কবিতা পাঠের আসর করতেন, কবিদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। কবিদের জন্য তার একটা সফট কর্ণার ছিল। কেউ কেউ তার কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধেও নিয়েছেন এটাকে কাজে লাগিয়ে, শোনা যায়।"
মোহাম্মদ রফিক অবশ্য জেনারেল এরশাদকে এখনো কবি স্বীকৃতি দিতে রাজী নন।
"সে তো কবি নয়। বাঙ্গালির সবচেয়ে বড় গর্বের জায়গা হচ্ছে কবিতা। কারণ কবিতা চিরকাল বাঙ্গালিকে উদ্বুদ্ধ করেছে। কিন্তু এই কবিতাকে আসলে এরশাদ ধ্বংস করতে চেয়েছে।"
"আমার দেশের একটা চরিত্র আছে। যখন সে জাগে, তখন সে গান শোনে আর কবিতা পড়ে। আর যখন তার অবক্ষয় শুরু হয়, তখন সে কবিতা থেকেও দূরে সরে যায়।"
মোহাম্মদ রফিক মনে করেন, প্রবল পরাক্রমশালী সেনাশাসক জেনারেল এরশাদকে যে শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল, তার পেছনে কবিতা এক বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
![]() |
| মোহাম্মদ রফিকের সেই আলোচিত ও কবিতা মোহাম্মদ রফিক |
Wednesday, September 11, 2019
জানা হল না এরশাদের সেই না বলা কথা

এরশাদ মারা গেলেন গত ১৪ জুলাই রবিবার বাংলাদেশি সময় সকাল পৌনে ৮টায়। ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হল। গত ২৭ জুন সকালে অসুস্থবোধ করলে তাঁকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। তিনি হিমোগ্লোবিনের স্বল্পতা, ফুসফুসে সংক্রমণ ও কিডনির জটিলতায় ভুগছিলেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর, আগের সেনাশাসকের মতো এরশাদও রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন। এরশাদের সেই রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে দেওয়া জীবনবৃত্তান্তে বলা হয়েছে, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রংপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। আবার বাংলাদেশের কিছু সংবাদমাধ্যমের তথ্য, এরশাদের জন্ম বর্তমান ভারতের কোচবিহার জেলার দিনহাটায়। এরশাদ আবার নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, তাঁর জন্ম কুড়িগ্রামে মামা বাড়িতে। রংপুরে কলেজের পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। পাকিস্তান আমলে চট্টগ্রাম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে অ্যাডজুট্যান্ট, পশ্চিম পাকিস্তানের ৫৪তম ব্রিগেডের মেজর, তৃতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে অধিনায়ক এবং সপ্তম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এ সেক্টর কমান্ডার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পশ্চিম পাকিস্তানেই ছিলেন এরশাদ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ঘুরে যাওয়ার তত্য তুলে ধরে অনেকে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাকিস্তান থেকে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে ফেরেন। তার পর অন্য অনেকের মত তাঁকেও সেনাবাহিনীর চাকরিতে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হন তিনি। তখন তাঁর পদমর্যাদা ছিল কর্নেল। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর, জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হলে, এরশাদকে উপপ্রধান করেন। মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্তারা সে সময় এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনা অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলে, জিয়ার পরিবার থেকে এরাশাদকেই দায়ী করা হয়েছিল। তবে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী খালেদা জিয়া একাধিকবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন, এ হত্যায় এরশাদকে অভিযুক্ত করে কোনও আইনি প্রক্রিয়াতেই যাননি। এ ছাড়া জিয়া হত্যার ঘটনার পর, নিহত মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল মহম্মদ আবুল মঞ্জুরকে হত্যার দায়েও অভিযুক্ত ছিলেন এরশাদ। সে মামলার রায় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। অনেকের ধারনা, জিয়া হত্যায় নিজের জড়িত থাকার বিষয়টি ধামাচাপা দিতেই মঞ্জুরকে হত্যা করান এরশাদ।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। নিজেকে সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে সামরিক শাসন জারি করে সংবিধান স্থগিত করেন। প্রথমে বিচারপতি এএফএম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়েছিলেন। কিন্তু সব ক্ষমতা ছিল এরশাদেরই হাতে। এক বছর পর আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন এরশাদ, যদিও এই ক্ষমতা দখল অবৈধ বলে পরে রায় দেয় আদালত। ক্ষমতা দখল করে এরশাদ গড়ে তোলেন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় পার্টি’। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগে উপজেলা গঠন, তাতে নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনের পর রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন দিয়ে নিজের ক্ষমতা দখলকে পোক্ত করেন এরশাদ। এর পর ১৯৮৬ সালে সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ব্যাপক প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও, অন্যান্য দল ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে। ১৯৮৮ সালে এরশাদ সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী এনে ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম করেন, যা বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বদলে দেয়। এ ছাড়া গণমাধ্যম ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা সীমিত করা-সহ নানা পদক্ষেপে বিতর্কিত ছিল এরশাদের ক্ষমতার যুগ।
এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে ছাত্র আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে। ১৯৮৩ সালে সালে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে গুলিতে প্রাণ হারান জাফর, জয়নাল, দীপালী সাহা-সহ বেশ কয়েকজন। সে সময় শিক্ষার্থীদের মরদেহও গুম করে ফেলে পুলিশ। তার পরের বছরই ছাত্রদের মিছিলে পুলিশ ট্রাক তুলে দিয়ে হত্যা করে সেলিম-দেলোয়ারকে। একের পর এক আন্দোলন আছড়ে পড়তে থাকে এরশাদের মসনদে। শ্রমিক নুর হোসেন, বিএমএ নেতা শামসুল আলম মিলন ও ছাত্রনেতা নাজির উদ্দিন জেহাদকে হত্যা করা হয় এ সব আন্দোলনের নানা পর্যায়ে। ১৯৮ সালের ২৮ নভেম্বর এরশাদ বাংলাদেশে জারি করেন জরুরি অবস্থা। এর পর তুমুল আন্দোলনের মুখে, ১৯৯০ সালের ৪ ডিসেম্বর ঘোষণা করে, তার দু’দিনের মাথায় ৬ ডিসেম্বর এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
১৯৯০-এর গণ আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত এরশাদকে বন্দি করে তার বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু তার মধ্যেই চমক দেখিয়ে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে রংপুরের ৫টি আসনে বিজয়ী হন এরশাদ। গণ আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেও, পরের তিন দশক বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভাল মতোই টিকে থাকেন এরশাদ। বরং বলা যায়, আওয়ামি লিগ ও বিএনপির পাল্টাপাল্টিতে এরশাদ নিজের জায়গা ঠিক পেয়ে গিয়েছিলেন। কখনও আওয়ামি লিগের দিকে ঝুঁকে, কখনও বা বিএনপির দিকে ঝুঁকে নিজের পথ করতে দেখা গিয়েছে তাঁকে।
৪৩টি মামলা হয়েছিল এরশাদের বিরুদ্ধে। যার মধ্যে একটিতে খালাস পান। দুই মামলায় তিনি সাজা খাটেন। বাকি মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হলেও মঞ্জুর হত্যা মামলাটি ঝুলে ছিল তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত।
রাষ্ট্রপতি থাকাকালে পাওয়া উপহার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা না দেওয়ার মামলায় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত এরশাদকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেয়। তবে দুই যুগ পর হাইকোর্ট সেই সাজা বাতিল করে। জাপানি নৌযান কেনায় অনিয়মের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ড হয়। জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় এরশাদকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ কোটি ৪৮ লাখ ৭০ হাজার ৮০০ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া সোনা চোরাচালান, টেলিকম দুর্নীতি, পোল্ট্রি ফার্ম দুর্নীতি মামলা, আয়কর ফাঁকি, জাহাজ কেনায় দুর্নীতি, রাজউকের প্লট বরাদ্দে অনিয়ম, হরিপুরে তেল অনুসন্ধানে দুর্নীতি এবং রাডার কেনায় দুর্নীতি-সহ বিভিন্ন অভিযোগে আরও ১৯টি মামলা ছিল এরশাদের বিরুদ্ধে।
১৯৯৭ সালের ৯ জানুয়ারি জামিনে মুক্তি পান এরশাদ। এর পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহৃত হন তিনি। ২০১৪ সালে আওয়ামি লিগের নেতৃত্বে মহাজোট গঠিত হলে তাতে যোগ দেয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। নির্বাচনে মহাজোট জয়ী হলে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হন এরশাদ।
বাংলাদেশে প্রতি বারই নির্বাচন এলে উঠে আসতেন আলোচনায়, বড় দলগুলোর কাছে কদর বাড়ত তাঁর। ভোটের সময় সিদ্ধান্তহীনতা ভোগা তার নিয়মিত বিষয় ছিল। এই বিষয়টি ‘রাজনীতির বিনোদন’ হিসেবেই দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশের মানুষ। এরশাদ নিজেও বলতেন, মনে অনেক কষ্ট নিয়েই তাঁকে সিদ্ধান্ত বারবার বদলানোর কাজটি করতে হয়। বলতেন, সময় হলে সব বলবেন তিনি। কিন্তু সেই সময় এল না আর। এসে গেল তার চলে যাওয়ার সময়। তাই জানা হল না তাঁর সেই না বলা কথা।
Monday, September 9, 2019
সংসদে শোক প্রস্তাবের আলোচনা: এরশাদকে নিয়ে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে রোববার সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন প্রয়াত বিরোধী দলের নেতা এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে আনা শোক প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, দোষে গুণে মানুষ। আমাদেরও অনেক কিছুই বলার আছে। কারণ আমরাই সব চেয়ে বেশি ভূক্তভোগী। তারপরও দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, জনগণের উন্নয়নের স্বার্থে অনেক কিছু হজম করে যাচ্ছি। তিনি প্রয়াত বিরোধী দলের নেতা এইচ এম এরশাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলের নেতা যিনি ছিলেন, সেই জেনারেল এরশাদ এক সময় যখন পাকিস্তান থেকে ফিরে আসেন, তখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তাঁকে সেনাবাহিনীতে যোগদান করান। একসময় তিনি সেনাবাহিনীর প্রধান হন। তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল, সেই নির্বাচনে বিএনপি’র প্রার্থী ছিলেন বিচারপতি সাত্তার। তাকে কিন্তু সেনাপ্রধান হিসেবে সাত্তারকে প্রার্থী করেছিলেন জেনারেল এরশাদ। একটি বিদেশী পত্রিকায় তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন বিচারপতি সাত্তার সাহেব তার প্রার্থী! সেখানেই আমরা আপত্তি তুলেছিলাম। বিচারপতি সাত্তার সাহেবকে বলেছিলাম, এ ধরণের প্রার্থী হওয়া উচিত না। বরং নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে হতে দেন, গণতান্ত্রিক ধারা যেন বজায় থাকে। কিন্তু তারা তা করেনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরফলে ফলাফল এটাই হয়েছিল যে তখন বেগম খালেদা জিয়া কিন্তু রাজনীতিতে আসেনি। কিন্ত পরবর্তিতে রাজনীতিতে না আসলেও হঠাৎ করে বিচারপতি ছাত্তার সাহেবের বিরুদ্ধে একটা স্টেটমেন্ট দেন। বিচারপতি ছাত্তার সাহেব ছিল তখন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তখন খালেদা জিয়া তাকে চেয়ারম্যান পদ থেকে বিদায় দেয়ার জন্য স্টেটমেন্ট দেয়। তিনি বলেন, ১৯৮২ সালে এরশাদ সাহেব যে ক্ষমতা দখল করেছিল, সেই ক্ষমতা দখলের সুযোগটা কিন্তু খালেদা জিয়াই করে দিয়েছিলেন। করে দিয়েছিল হয়তো একারনেই যে, জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়াকে শুধু দুটি বাড়িই নয়, নগদ ১০ লাখ টাকাসহ অনেক সুযোগ সুবিধা জেনারেল এরশাদ দিয়েছিলেন। যে কারণে জিয়া হত্যার ব্যাপারে যে মামলা হয়েছিল চট্টগ্রামে, সে মামলা কিন্তু বিএনপি কখনো চালায়নি। তিনি বলেন, বহুবছর পরে ১৯৯৪ সালের দিকে এক সময়ে বা বহু বছরপর এসে জেনারেল এরশাদকে তাঁর স্বামী হত্যার জন্য দায়ী করেছেন খালেদা জিয়া। এরপূর্বে কখনো দায়ী করেননি। এগুলো ইতিহাসের একটা অংশ যে, ক্ষমতাটাকে তুলে দেয়া বা সুযোগ করে দেয়া। তবে এর বিরুদ্ধে আমরাই প্রতিবাদ করেছি। কারন আমরা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল প্রতিবাদ করেছিলাম এই জন্যই যে, আমরা চেয়েছিলাম গণতন্ত্র গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। অর্থাৎ এক সামরিক শাসকের ক্ষমতা থেকে আরেক সামরিক শাসকের ক্ষমতা আসুক, এটা কখনো আমাদের জন্য কাম্য ছিল না। সংসদ নেতা বলেন, অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে আসার পর অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে আমাকে চলতে হয়েছে। আমি দেশে ফিরে আসার পরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের আমাদের বাড়িতে জেনারেল জিয়াকে আমাকে ঢুকতেই দেয়নি। এটাও বাস্তবতা। তিনি বলেন, প্রথমে মার্শাল ল জারি করে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করে। এরপর নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে ক্ষমতা দখল করে নেয়। এই ক্ষমতা দখল প্রথমে জিয়াউর রহমান করে। জাতির পিতাকে হত্যার পর ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। এরপর জেনারেল এরশাদও নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ আদালত জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের এই ক্ষমতা দখলটাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। উচ্চ আদালত অবৈধ যখন ঘোষণা করেছে, তখন আর এই দুইজনের কেউ আর সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে কিন্তু থাকে না। তাদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লে¬খ করাও হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী বৈধ নয়, বরং সেটা করা যায় না। কারণ একটা রায়ের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্রের ধারাটা অব্যাহত রাখার সুযোগ হয়েছে। জেনারেল এরশাদ সাহেব অমায়িক ছিলেন এবং মানুষের প্রতি তাঁর দরদ ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার পর জাতির পিতা সাভার স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তিতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসে। জেনারেল জিয়া কিন্তু নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দিলেও কখনো মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়নি। যেটা করেছেন জেনারেল এরশাদ সাহেব। তিনি আসার পর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অসমাপ্ত কাজ বা সাভার স্মৃতিসৌধের অসমাপ্ত কাজ বা মুজিব নগরের স্মৃতিসৌধ সেগুলো তৈরি করেছেনে- এতে কোন সন্দেহ নাই। তিনি বলেন, কেউ যদি ভাল কাজ করে নিশ্চয়ই আমরা তা বলব। তাছাড়া আর একটি কাজ এরশাদ সাহেব করেছিলেন। নির্বাচনে যাওয়া নিয়ে যখন জেনারেল এরশাদের সঙ্গে সংলাপ করি আমাদের ১৪ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে জিয়ার আমলে জারিকৃত মৃত্যুর পরোয়ানা প্রত্যাহারের জন্য এবং তাদের মুক্তি দেয়ার জন্য। তাছাড়া অনেকেই তখন গ্রেপ্তার হয়ে বন্দী ছিলেন। এরশাদ সাহেব সকলকে মুক্তি দিয়েছিলেন। এই মুক্তি দেয়ার মধ্য থেকে তিনি এক একটা পরিবারকে রক্ষা করেছিলেন। অতীতের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওই সময় (এরশাদের শাসনামল) অনেকবার আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়, কারাবরণ করি। আমাদের একেক সময় গ্রেপ্তার কখনো সাব জেলে রাখা হয়, আবার কখনো গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি লালদীঘির ময়দানে আমাদের সভা করতে বাধা দেয়া হয়। সরাসরি গুলি ছোঁড়া হয়, সেখানে প্রায় ৩০ জনের মতো মানুষ মারা যায়। এগুলো কিন্তু এরশাদের শাসনামলেই হয়েছিল। সংসদ নেতা বলেন, আমরা সব সময় গণতন্ত্র চেয়েছি, যেন গণতন্ত্র অব্যহত থাক। যে কারণে অনেক প্রতিকুল অবস্থায়ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলাম ১৯৮৬ সালে, যদি সেই নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে হতো, তাহলো হয়তো তাকে (এরশাদ) এই ধরনের বিতর্কিত হতে হতো না। একটি গণতান্ত্রিক ধারা প্রতিষ্ঠিত হতো। যদিও নির্বাচনের পর কারফিউ প্রত্যাহার করা হয়। কারণ জেনারেল জিয়ার আমলে প্রতি রাতে কারফিউ ছিল। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালের নির্বাচন যেটা হয় সেটাও বলতে গেলে কোন দল অংশগ্রহণ করেনি। এরপর আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন করেছিলেন খালেদা জিয়া, তখনও কিন্তু কোন দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নাই। আন্দোলনের মুখে খালেদা জিয়া মাত্র দেড়মাসের মধ্যে ক্ষমতা থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন। সেটাও জনগণের রুদ্ররোষে। অর্থাৎ জনসমর্থন না থাকলে নির্বাচন নিয়ে যে যত বিতর্কিত হোক, যে কথাই বলুক না কেন, যদি জনসমর্থন না থাকে তবে সে নির্বাচেন যদি সত্যিকার ভোট দিয়ে না থাকে তাহলে সেই নির্বাচনে কেউ টিকে থাকতে পারে না। তার প্রমান খালেদা জিয়ার ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন। একাদশ জাতীয় নির্বাচনেও জনগণ ভোট দিয়েছে বলেই বিএনপির আন্দোলনের ডাকে দেশের জনগণ সাড়া দেয়নি। যদি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিত, তবে তারা আন্দোলন করে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারতো। তাই অনেক চরাই উৎরাই পার হয়েই আমরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। দেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে।
Saturday, September 7, 2019
জাপার গন্তব্য কোথায়?

ভোটের পর বলা হলো, জাপা বিরোধী দলে থাকবে। ব্যাস, বিরোধী দল নির্বাচিত হয় দলটি। যদিও দলের কোনো কোনো এমপি বা নেতার খায়েস ছিল সরকারেই থাকার। সুযোগ-সুবিধা পাওয়া বলে কথা। এর আগে পাঁচ বছর এরশাদ বেশ চেষ্টা করেছিলেন তার দলের মন্ত্রীদের সরকার থেকে বের করে নিয়ে আসার। কিন্তু তার সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণ যে এরশাদের হাতে নেই তখন তা অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে যায়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবদ্দশাতেই জাতীয় পার্টিতে কয়েক দফা ভাঙন দেখা দিয়েছিল। ব্র্যাকেটবন্দি একাধিক জাতীয় পার্টি মাঠে দেখা যায়। কিন্তু এরশাদের জাপাই ছিল প্রধান জাপা এবং এ দলের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল শতভাগ। সম্ভবত, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের আগেই সর্বপ্রথম দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান তিনি। দৃশ্যপটে আসেন তার স্ত্রী রওশন এরশাদ। সেই যে এরশাদ দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান তা আর কখনো পুরোমাত্রায় ফিরে পাননি। ভেতরে অবশ্য অনেক খেলা ছিল।
সে যাই হোক এরশাদের মৃত্যুর পর জাপার ‘মালিকানা’ নিয়ে যে সংঘাত তৈরি হতে পারে এটা তিনি বেঁচে থাকতেই আঁচ করেছিলেন। যে কারণে রীতিমতো উইল করে ঘোষণা দিয়ে যান, তার অবর্তমানে জিএম কাদের জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। এরশাদের মৃত্যুর পর তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। শুরুতে এ নিয়ে চুপচাপ থাকলেও কয়দিন পরই রওশনপন্থি নেতারা বিবৃতি দিয়ে জানান, জিএম কাদেরের চেয়ারম্যান হওয়া দলের গঠনতন্ত্র পরিপন্থি। তবে সবচেয়ে বড় সংকটটি তৈরি হয়েছে বিরোধী দলীয় নেতার পদ নিয়ে। বিগত সংসদে রওশন এরশাদ বিরোধী দলীয় নেতার দায়িত্ব পালন করেন। আর বর্তমান সংসদে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এরশাদ। রওশন উপনেতার দায়িত্বে আছেন। জিএম কাদের তাকে বিরোধী নেতা করতে স্পিকারকে চিঠি দেয়ার পরই রওশনপন্থিরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। অগ্রণী ভূমিকায় দেখা যায় আনিসুল ইসলাম মাহমুদকে। তড়িঘড়ি করে রওশনকে বিরোধী দলের নেতা করতে স্পিকারকে পাল্টা চিঠি দেয়া হয়। রওশন এরশাদকে একইসঙ্গে দলের চেয়ারম্যানও ঘোষণা করা হয়। স্পষ্টত জাতীয় পার্টি এখন দুই ভাগ হওয়ার পথে। জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে রংপুর সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে। রংপুর তথা উত্তরাঞ্চলের নেতাদের বেশিরভাগের সমর্থন জিএম কাদেরের প্রতি। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং এমপিদের বড় অংশের সমর্থনও তার প্রতি। যদিও অনেকে অপেক্ষায় আছেন ইশারার। ইশারা যেদিকে থাকবে তারা সেদিকে যাবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে এখন এক অনিশ্চিত যাত্রা শুরু হলো। বিরোধী দলের নেতা কে হন সেদিকে দৃষ্টি এখন অনেকের। বিরোধী দলের নেতার নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক কিছু খোলাসা হয়ে যেতে পারে। যদিও কেউ কেউ বলছেন, বিরোধী দলের নেতার নাম এতো দ্রুত ঘোষণা নাও হতে পারে। নানা রকম কৌশল থাকতে পারে। যে কৌশলের রাজনীতিরই জয়জয়কার এখন বাংলাদেশে। কিন্তু বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হচ্ছে, জাতীয় পার্টি কি টিকে থাকবে? রাজনৈতিক দলের বিলীন হয়ে যাওয়াও এ দেশে নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় পার্টিকে বাংলাদেশের তৃতীয় জনসমর্থনপুষ্ট দল মনে করা হয়। বিশেষত উত্তরাঞ্চলে এখনো এ দলের জনপ্রিয়তা রয়েছে। ভাঙনের খেলায় দলটি কি বিলুপ্ত হয়ে যাবে- সে প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠছে।
Friday, September 6, 2019
কার পাল্লা ভারী? by সালমান তারেক শাকিল
![]() |
| রওশন, এরশাদ, কাদের |
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ ও ছোট ভাই জিএম কাদেরের মধ্যকার চলমান দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন জাপার এমপিরা। ইতোমধ্যে কয়েকজন দৃশ্যত দুজনের পাশে অবস্থান নিয়েছেন। কেউ কেউ বজায় রাখছেন নিরাপদ দূরত্ব। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য স্বয়ং মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। বৃহস্পতিবার সারাদিনে তিনি দৃশ্যপটে নেই অথচ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সড়কের একটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
জাপার উভয় অংশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলের সংগঠন ও এমপিদের মধ্যে জনপ্রিয় জিএম কাদের। বিরোধীদলীয় নেতা ও রংপুর-৩ আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়নে বেশিরভাগ এমপির সমর্থন চেয়ারম্যানের দিকে। তারা হলেন, কাজী ফিরোজ রশীদ, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, নাজমা আকতার, শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ, মেজর (অব.) রানা মোহাম্মদ সোহেল, আহসান আদেলুর রহমান, মসিউর রহমান রাঙ্গা, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, মাসুদা রশিদ চৌধুরী, লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী, নুরুল ইসলাম তালুকদার, সালমা ইসলাম, পনির উদ্দিন আহমেদ। বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে জিএম কাদেরের পাশে ছিলেন, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, গোলাম কিবরিয়া টিপু এমপি, অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি, সুনীল শুভরায়, লে. জে. মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী এমপি, মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, এস এম ফখর-উজ-জামান জাহাঙ্গীর, কাজী মামুনুর রশিদ, আলমগীর সিকদার লোটন, এমরান হোসেন মিয়া, নাজমা আক্তার এমপি, উপদেষ্টা মেজর (অব.) আশরাফউদ দৌলা, মাহমুদুর রহমান মাহমুদ, ভাইস চেয়ারম্যান সরদার শাহজাহান, আহসান আদেলুর রহমান এমপি, মোস্তাকুর রহমান, মস্তফা আল মাহমুদ, নুরুল ইসলাম তালুকদার এমপি, যুগ্ম-মহাসচিব হাসিবুল ইসলাম জয় প্রমুখ।
আগের সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন রওশন এরশাদের সঙ্গে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ছাড়াও জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম কিবরিয়া টিপু, মজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা, এসএম ফয়সল চিশতী, মীর আবদুস সবুর আসুদ, খালেদ আখতার, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, ভাইস চেয়ারম্যান লিয়াকত হোসেন খোকা ও নাসিম ওসমান প্রমুখ। এছাড়া, রওশনপন্থী এমপিদের মধ্যে ছিলেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, ফখরুল ইমাম, মুজিবুল হক চুন্নু, নাসিম ওসমান প্রমুখ।
জিএম কাদেরপন্থী কাজী ফিরোজ রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এরশাদের জাপার পক্ষে। জিএম কাদেরকে তিনি জীবদ্দশায় চেয়ারম্যান মনোনীত করেছেন। তিনি এমপিদের অভিমত নিয়েই বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন। খোদ এরশাদ আমাকে অসিয়ত করেছেন জিএম কাদেরের সঙ্গে থাকতে। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ তৃতীয় একটি গোষ্ঠীর ইঙ্গিতে জাপাকে নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। এটা শত্রুদের কাজ। জাপার সারাদেশের নেতাকর্মীরা জিএম কাদেরের সঙ্গে আছেন।’
পাল্টা মন্তব্য রওশনপন্থী এমপি ফখরুল ইমামের। তার ভাষ্য, ‘গঠনতন্ত্র মোতাবেক তো জিএম কাদের কো-চেয়ারম্যান। পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন এরশাদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি প্রেসিডিয়ামের সঙ্গে কোনও বৈঠক না করে, আলোচনা না করে বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে চিঠি দিয়েছেন, এটা অন্যায় হয়েছে।’
উভয় অংশের বাইরে আছেন, জাপার এমন নেতারা বলছেন, রওশন এরশাদের সঙ্গে জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব ৯০-এর দশকের শুরুতেই। এটা এরশাদের জীবদ্দশাতেই একাধিকবার দৃশ্যমান হয়েছে। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেও রওশন ও জিএম কাদেরের দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে ছিল। এরপর ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি রংপুরে জাতীয় পার্টির কর্মী-সম্মেলনে এরশাদ তার ছোট ভাই জিএম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিলে ফের রওশন বিরোধিতা করেন। পরে রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করেন এরশাদ। কিন্তু গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা হিসেবে কাদেরকে বেছে নেন। এই বছরের জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে গুরুতর অসুস্থ হয়ে সিঙ্গাপুর যাওয়ার আগে ছোট ভাই জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন এরশাদ। কিন্তু গত ২২ মার্চ পার্টির কো-চেয়ারম্যান পদ থেকে জিএম কাদেরকে সরিয়ে দেন। পার্টির গঠনতন্ত্রের ২০/১/ক ধারা অনুযায়ী ওই সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে চূড়ান্তভাবে গত ৪ মে প্রায় মধ্যরাতে সাংবাদিকদের ডেকে এরশাদ জানান, তার ভাই জিএম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এরপর ১৪ জুলাই এরশাদ মারা যান। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে রওশনপন্থীরা কোনও বিরোধিতা না করলেও আজই প্রথম জিএম কাদেরের বিরুদ্ধে গেলেন রওশন।
একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জাপা রংপুরকেন্দ্রিক রাজনীতিতেই এখন পর্যন্ত সক্রিয়। সারাদেশে তেমন সাংগঠনিক শক্তি না থাকলেও রংপুর বিভাগে এরশাদের জনপ্রিয়তা সর্বজনবিদিত। এক্ষেত্রে রংপুর থেকেই দলের নেতৃত্ব পরিচালিত হবে। নেতাকর্মীদের কাছেও তা গ্রহণযোগ্য হবে। আর এ কারণে জিএম কাদের স্বভাবত এগিয়ে থাকলেও সমস্যায় পড়েছেন বেশি তিনিই। রাজনৈতিকভাবে রওশন এরশাদ বা আনিসুল ইসলাম মাহমুদরা এগিয়ে থাকলেও সাংগঠনিক রাজনীতিতে তাদের অবস্থান অনেকটাই কম। যদিও সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে রওশনপন্থীদের দিকে পাল্লা ঝুঁকে থাকার কথা আলোচনায় থাকলেও তা কতটা বাস্তব, আরও পরে স্পষ্ট হবে। তবে, রংপুর-৩ আসনের প্রার্থী নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন জাপার একাধিক নেতা।
জাপার প্রেসিডিয়ামের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা দাবি করেন, জিএম কাদের ও রওশন এরশাদ দুই অংশের চেয়ারম্যান হিসেবে এখন পর্যন্ত থাকলেও চেয়ারম্যান হতে আগ্রহীদের মধ্যে আছেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ (রওশনপন্থী), মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী (জিএম কাদেরপন্থী)। মহাসচিব হিসেবে মসিউর রহমান রাঙ্গা থাকলেও সরকারের সমর্থন আসলে কোন দিকে যায়, সেটিও নজরে আছে তার। মহাসচিব হওয়ার দৌড়েও রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু আছেন। এই নেতার দাবি, সরকারের একটি প্রভাবশালী সংস্থা জাপা-সংকটের পেছনে আছে। ফলে, কে প্রভাবশালী বা কে সামনে এগুবে, তা নির্ভর করবে ওই সংস্থার ওপর। এছাড়া দলের মিডিয়া উইং, কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও চেয়ারম্যান কার্যালয় জিএম কাদের অনুসারীদের দখলে। এ কারণে দৃশ্যত জিএম কাদের এগিয়ে আছেন।
জাপার একাধিক নেতা জানান, জাপার উভয় অংশই এখন সরকারের দিকে ঝুঁকে আছে। জিএম কাদেরও চান সরকারের সম্মতিতে বিরোধী পক্ষ গড়ে তুলতে। সম্প্রতি ছোট ছোট কয়েকটি দলের নেতা সাক্ষাৎ করেছেন তার নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট করতে। যদিও এসব আলোচনা প্রাথমিক পর্যায়ে আছে।
আর জিএম কাদের মনে করছেন, সংসদীয় রাজনীতিতে সরকারের সম্মতির বাইরে কার্যকর বিরোধী দল হওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেছিলেন, ‘মূলত দুটো রাজনৈতিক কারণে বিকল্প বিরোধী জোট করার পক্ষে তার কাছে মত আসছে। একটি হচ্ছে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১৪ দলীয় জোট আছে। জোটের শরিক দলগুলো আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই রাজনীতি করতে আগ্রহী। ফলে, যেকোনও দল চাইলেও সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, বিএনপির নেতৃত্বে বিরোধী জোট থাকলেও দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই শঙ্কিত। এ কারণেই ছোট ছোট দলগুলো জাতীয় পার্টিতে ভিড়তে চায়।’
রওশন এরশাদ দশম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার আসনে ছিলেন। একটি সূত্র বলছে, একাদশ সংসদেও তাকে দেখতে চাইছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি পক্ষ। তবে রওশনপন্থীরা অবশ্য এখনও এ নিয়ে কিছু বলতে নারাজ। ইতোমধ্যে একজন নেতা জানান, খুব সম্ভবত সরকারের পক্ষ থেকে উভয়পক্ষকেই সমাধানে যেতে বলা হবে। অন্যথায় চলতি অবস্থাতেই কিছুদিন কার্যক্রম চলবে।
চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক এমপি মুহাম্মদ নোমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রওশন এরশাদ আমাদের স্যারের স্ত্রী, দলে তার অবদান অনস্বীকার্য। আবার ভদ্রলোক হিসেবে ইতোমধ্যে জিএম কাদের সমাদৃত। তার অবদানও অনেক। আমরা চাইছি ঐকমত্যের ভিত্তিতে জাতীয় পার্টিতে সমাধান আসতে। একটি কার্যকর বিরোধী দল গড়ে তুলতে ঐক্যের কোনও বিকল্প নেই।’
এদিকে, ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি গঠনের পর দফায় দফায় ভাঙনের মুখে পড়েছে জাপা। এরশাদের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোগীরা দল ছেড়ে যোগ দিয়েছেন বিএনপিতে। আবার কোনও কোনও নেতা জাতীয় পার্টি নামেই করেছেন দল। এই নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজী জাফর আহমেদ, নাজিউর রহমান মঞ্জু ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। সর্বশেষ রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান করে জাপায় আবার বিভক্তি শুরু করলেন দলের প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তাকে সঙ্গ দিচ্ছেন মজিবুল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, এস এম ফয়সল চিশতী ও সেলিম ওসমান প্রমুখ।
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে পাঁচটি জাতীয় পার্টি রয়েছে। মূল দল জাতীয় পার্টি (নিবন্ধন নম্বর ০১২)। এর নেতৃত্বে আছেন জিএম কাদের। মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা। তবে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে নতুন চেয়ারম্যানের স্থলে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নাম রয়েছে। নেই মহাসচিব হিসেবে কারও নাম। জাপা ছাড়া কয়েকটি দলের মহাসচিব পরিবর্তন হলেও সেখানে আপডেট নেই।
নিবন্ধিত জাপার মধ্যে বাকি তিনটি হচ্ছে—আন্দালিভ রহমান পার্থের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি (নিবন্ধন নম্বর ০১৮) ও প্রফেসর ডা. এম. এ. মুকিত (চেয়ারম্যান), এ এন এম সিরাজুল ইসলামের (ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব) নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (নিবন্ধন নম্বর ২৮) ও জাতীয় পার্টি-জেপি (নিবন্ধন নম্বর ০০২)। দলটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটে আছে। দলটির মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। অনিবন্ধিত অবস্থায় আছে জাতীয় পার্টি (মোস্তফা জামাল হায়দার)। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক এই দলটি।
বিভক্তির মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির কার্যকারিতা এখন আর কতটুকু বাকি রইলো, এমন প্রশ্ন ছিল এরশাদের সাবেক রাজনৈতিক সহযোগী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের প্রতি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘আমি এরশাদের সঙ্গে রাজনীতি করেছি।’ বিষয়টি নিয়ে তিনি আর কোনও কথা বলতে চান না বলেও জানান।
![]() |
| একই মঞ্চে এইচএম এরশাদ, রওশন এরশাদ ও জিএম কাদের |
জাতীয় পার্টির দ্বন্দ্বকে যেভাবে দেখছে সরকার by মাহবুব হাসান

আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুতে জাতীয় পার্টি এমনিতেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার অবর্তমানে দলে নতুন করে ভাঙন হলে বিরোধী দল হিসেবে অবস্থানও দুর্বল হয়ে যাবে। কেননা ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পার্টি সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করছিল। কিন্তু দুটি অংশ হয়ে গেলে দুই অংশেই সিনিয়র নেতা ও সংসদ সদস্যরা অবস্থান নেবেন। ফলে দলটির ঐক্য নষ্ট হবে।
প্রসঙ্গত, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন তার ভাই ও দলের কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের। কিন্তু তার পদের ব্যাপারে বিরোধিতা করে আসছিলেন অন্য কো-চেয়ারম্যান এবং এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ। সংকট আরও ঘনীভূত হয় জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার আসন নিয়ে। বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) দলের ১৫ জন সংসদ সদস্যের স্বাক্ষর নিয়ে নিজেকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য স্পিকারকে চিঠি দেন জি এম কাদের। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় পার্টির আরেকটি অংশের কয়েকজন নেতা বুধবারই রওশন এরশাদের বাসায় বৈঠক করেন। বৃহস্পতিবার একইস্থানে বৈঠক শেষে রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। পাশাপাশি রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান দাবি করে নির্বাচন কমিশনেও একটি চিঠি পাঠানো হয়।
আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জাতীয় পার্টির এই ভাঙন নিয়ে নীরব থাকবেন তারা। এটা জাপার অভ্যন্তরীণ বিষয়। কোনও অংশেরই পক্ষ না নিয়ে তারা এর সমাধান আশা করছেন। সংসদে ঐক্যবদ্ধ জাতীয় পার্টিকে আশা করছেন তারা।
সূত্রের দাবি, শেষ পর্যন্ত দুই অংশ মিলে যাবে। দুটি অংশেই সংসদ সদস্যরা রয়েছেন। দলটির সিনিয়র নেতারাও দুই ভাগে ভাগ হয়ে পড়েছেন। তারা দলকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবেন। কেননা এখন নিজেরা ঐক্যবদ্ধ না থাকলে অস্তিত্ব সংকটে পড়বে দলটি।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘জাতীয় পার্টি সংসদে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করেছে। তাদের নিজেদের মধ্যে ঝামেলা না করে ঐক্যবদ্ধ থাকাটাই সমীচীন হবে। তাহলে সংসদে একটি দল হিসেবে যেমন ভূমিকা পালন করতে পারবে, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় একটি সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জাতীয় পার্টিতে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে সেটাকে এখনও ভাঙন বলা যায় না। এর আগে দলটিতে রওশন এরশাদকে বিরোধী দলীয় নেতা এবং জি এম কাদেরকে দলের চেয়ারম্যান করে একটি সমাধানের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। এখনও সেভাবেই দলটি উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করতে পারে।
আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় পার্টি আবার ভেঙে যাক সেটা তারা চান না। সরকার দেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার যে পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সে যাত্রায় জাতীয় পার্টির সমর্থন চায়। সংসদে বিরোধী দল হিসেবে আগামীতেও জাতীয় পার্টিকেই প্রত্যাশা করেন তারা। সে কারণে জাতীয় পার্টির দুই অংশের মধ্যে সমাঝোতা চায় সরকার।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে। তারা দল ভাঙা-গড়া চায় না। জাতীয় পার্টির ঐক্য চায়। দলটির নেতাদের মধ্যে যে ভিন্নমত তৈরি হয়েছে সেটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘দলটিতে চেয়ারম্যন ও বিরোধী দলীয় নেতার পদ নিয়ে যে অনৈক্য সৃষ্টি হয়েছে, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে দুই পক্ষের শীর্ষ ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে সমাঝোতা হবে বলে আমার বিশ্বাস।’
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
-
▼
2026
(1756)
-
▼
August
(303)
-
▼
Aug 27
(10)
- দৈনন্দিন খাবারে সিসার ঝুঁকি থেকে কীভাবে মুক্ত হবেন...
- ফিলিস্তিনে কার্যক্রম চালিয়ে যাবে ইউএনআরডব্লিউএ
- ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় ‘বোর্ড অব পিস’ ব্যর্থ ...
- ইয়েমেনের আল-মাখা বন্দরে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
- মার্কিন শক্তি প্রদর্শনের মিশনে ব্যর্থ রণতরী আব্রাহ...
- ফিলিস্তিনি শরণার্থী ইস্যু ‘মুছে ফেলতে’ চায় ইসরাইল ...
- ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসান ছাড়া শান্তি আসবে না: জা...
- ভারতে হিজাব পরায় বাধা, ক্ষুব্ধ ওয়াইসি বললেন ‘এটি ই...
- ব্রিটেনে ইসলামি প্রজাতন্ত্র গড়ছেন না মুসলিমরা—এটি ...
- পুরুষের সমস্যা ভেরিকোসিল কেন হয়, চিকিৎসা কী? by অধ...
-
▼
Aug 27
(10)
-
▼
August
(303)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...






