Monday, January 13, 2020

তোমরা একেকটা নেকড়ে: ওয়ামব্যাক

অ্যাবি ওয়ামব্যাক
অ্যাবি ওয়ামব্যাক যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাবেক ফুটবলার ও কোচ। দুইবার অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জিতেছেন, তাঁর দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে নারীদের ফুটবল বিশ্বকাপে। এ ছাড়া ছয়বার যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষসেরা নারী ফুটবলারের স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। টাইম সাময়িকী অ্যামিকে ২০১৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ মানুষের তালিকায় স্থান দিয়েছে। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের বার্নার্ড কলেজের সমাবর্তনে বক্তা ছিলেন তিনি।
এমন কখনো হয়েছে? তুমি জীবন মাত্র গোছাতে শুরু করেছ আর অমনি তোমাকে আবার নতুন করে সব শুরু করতে হচ্ছে? বুজুর্গদের মতে, এটা হলো জীবনের রূপান্তরের সময়। তবে আমি বলব—ভীতিকর সময়! সম্প্রতি এ রকম একটা ভীতিকর রূপান্তরের ভেতর দিয়ে গিয়েছি, ফুটবল থেকে অবসর নেবার পর। রূপান্তরের বিহ্বলতা কাটিয়ে তুলতেই আয়োজন করা হয় নানা জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান। ঠিক তেমনি একটা অনুষ্ঠানে তোমরা এখন বসে আছ। আমার বেলায় এটা ছিল একটা পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। উপলক্ষ: আমার অবসরপ্রাপ্তি।
ইএসপিএন আয়োজিত সে অনুষ্ঠানে আমার পাশাপাশি পুরস্কৃত করা হয় আরও দুজনকে। কোবি ব্রায়ান্ট ও পেইটন ম্যানিং। নামকরা খেলোয়াড়। আর আমাকে দেওয়া হয় একজন আইকনের মর্যাদা। সামনে ভক্তদের উচ্ছ্বাস। আমাদের ঘিরে শত শত ক্যামেরা। আমি একেবারে ঘোরে চলে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি পেরেছি!
হাততালির পর্ব শেষে মঞ্চ ছাড়ার পালা। একে একে নেমে পড়লেন কোবি ও পেইটন। ঠিক তখনই আমার মনে জেঁকে বসল এক নতুন ভাবনা। আমরা তিনজন খেলোয়াড়। তিনজনই সমপরিমাণ পরিশ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও তেজ নিয়ে মাঠে নেমেছি। খেলেছি বছরের পর বছর। দেশের হয়ে। নিজের সমস্তটা উজাড় করে দিয়ে। তবু অবসরপ্রাপ্তির পর যখন ভবিষ্যতের দিকে তাকাই, দেখি আমার ভবিষ্যৎ ঠিক ওদের মতো নয়। এত দিনে কোবি ও পেইটনের ব্যাংকে জমা পড়েছে শত কোটি টাকা। আর তাই ওদের আছে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা, কাজের চাপ থেকে মুক্তি। ওদের আর টাকার পেছনে দৌড়ানোর প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার লড়াইয়ের কেবল শুরু।
এর পেছনে দায়ী আসলে কী? চাকরির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বৈষম্য। আমাদের অসম বেতনব্যবস্থা বা ‘পে গ্যাপ’।
‘পে গ্যাপের’ কারণে একজন নারী-পুরুষের তুলনায় ব্যবসায়ে তেমন একটা বিনিয়োগ করতে পারেন না। সঞ্চয় করতে পারেন যৎসামান্য। তাই কাজ করে যেতে হয় দীর্ঘদিন ধরে।
যখন পেছনে ফিরে তাকাই, দেখি সমস্ত ক্যারিয়ারজুড়ে আমি কেবল কৃতজ্ঞই ছিলাম। যেমনটা ছিলাম ইএসপিএনের সংবর্ধনার দিন। আমি কৃতজ্ঞ ছিলাম গুটিকয় নারীর ভেতর একজন হতে পেরে। পুরুষের সঙ্গে এক কাতারে দাঁড়াতে পেরে। আসলে কৃতজ্ঞতায় এতটাই মশগুল ছিলাম যে বহুবার নিজেদের অধিকারের আদায়ের সুযোগ পেয়েও হাতছাড়া করেছি!
আজ তোমরা ৬১৯ জন নারী এসে আমার সামনে দাঁড়িয়েছ। সবাই বার্নার্ড কলেজের গ্র্যাজুয়েট। আমি তোমাদের জোর গলায় বলছি, পরিবর্তন এসে গেছে! নারী হিসেবে আমরা যা পাই, তা নিয়েই কৃতজ্ঞ হতে শিখেছি। তবে সময় এলে আমরাও নিজ অধিকারের জন্য লড়তে পারি! ছেলেবেলায় আর পাঁচটা মেয়ের মতো আমাকে শেখানো হয়েছিল অল্পতে তুষ্ট হতে। শেখানো হয়েছিল মাথা নুইয়ে, একাগ্র চিত্তে নিজ পথ ধরে এগিয়ে যেতে। আমি ছিলাম রূপকথার সেই ছোট্ট মিষ্টি লাল টুকটুকে মেয়ে!
সেই গল্প তোমাদের সবার জানা। পৃথিবীজুড়ে সতর্কবাণীস্বরূপ মেয়েদের এই গল্প শোনানো হয়। বনের ভেতর দিয়ে চলেছে মিষ্টি লাল টুকটুকে মেয়ে। তাকে কঠোরভাবে শেখানো হয়েছে কারও সঙ্গে কথা না বলতে। পথ বিচ্যুত না হতে। আর মুখ লুকিয়ে রাখতে ঘোমটার নিচে। এ যেন ঠিক ‘হ্যান্ডমেইডস টেলের’ সেই কাহিনি!
মেয়েটি কিছু পথ নির্দেশনা মোতাবেক চলতে থাকে। কিন্তু যেই না সে কৌতূহলবশত অন্য পথে ঢুঁ মারল, ব্যস! পড়ে গেল নেকড়ের কবলে! এ গল্পের মূল বক্তব্য: মেয়েদের জানার আগ্রহ থাকা চলবে না। বেশি কথা বলা যাবে না। তাহলেই বিপত্তি বাধবে। বিপদ হবে। আমি জীবনে কখনো পথচ্যুত হইনি। তবে তা নেকড়ের ভয়ে নয়। দলচ্যুত হওয়ার ভয়ে। পদোন্নতির সুযোগ না পাওয়ার ভয়ে। বেতন হারানোর দুশ্চিন্তায়।
আজ যদি অতীত ফেরত পেতাম, তাহলে নিজেকে বলতাম, ‘অ্যাবি, তুমি কিন্তু সেই মিষ্টি লাল টুকটুকে মেয়ে নও, তুমি আসলে নেকড়ে!’ এই সমাবর্তন সভায় দাঁড়িয়ে আমি তোমাদেরও বলছি, ‘তোমরাও একেকজন একেকটা নেকড়ে!’
১৯৯৫ সাল। ইয়েলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে হঠাৎ হরিণের সংখ্যা বেড়ে গেলে সেখানে নতুন করে নেকড়ের জোগান দেওয়া হলো। গত ৭০ বছর ধরে সে এলাকায় ছিল হরিণের আধিপত্য। ওরা সব বনাঞ্চল খেয়ে একেবারে নদীভাঙন বাধিয়ে দিয়েছিল। নেকড়ের পাল এলে হরিণের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চলে এল। হরিণেরাও জান বাঁচাতে সবুজ উপত্যকা এড়িয়ে চলতে লাগল, সে অঞ্চলে জন্মাতে লাগল নতুন গাছপালা। পাখিরা গাছে বাসা বাঁধল। বিভার নামক এক প্রাণী লেগে পড়ল নদীর মধ্যে প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরিতে। এতে জুটে গেল হাঁস ও ভোঁদড়ের দল। অর্থাৎ, নেকড়ের উপস্থিতিতে বদলে গেল পরিবেশ। এত দিন যে নেকড়েকে আমরা ক্ষতিকারক ধরে বসেছিলাম, সেই নেকড়েই যেন নিয়ে এল মুক্তির বাণী!
তাহলে কী বুঝলে? নারীরা আমাদের সমাজে সেই নেকড়ের মতো। সমাজ আমাদের হুমকি হিসেবে দেখলেও ভবিষ্যতে আমরাই হব শান্তির বাহক! আমাদের নারীদের একতাবদ্ধ হতে হবে। প্রিয় নেকড়ের দল, আমি তোমাদের সফলতার পথ দেখাব। এর জন্য আমি চারটি উপায় বের করেছি।
প্রথমেই ব্যর্থতাকে সফলতার জ্বালানি হিসেবে দেখতে হবে। একজন সাধারণ লোক তার ব্যর্থতাকে লুকিয়ে রাখে। সে তা ভুলে যেতে চায়। কিন্তু একজন ক্রীড়াবিদ জানে ব্যর্থতার উপকারিতা। একসময় আমি জাতীয় যুব দলে খেলতাম। সে সময় স্বপ্ন ছিল, একদিন মিয়া হ্যামের সঙ্গে মাঠে নামব। হঠাৎ একদিন তাদের লকার ঘুরে দেখার সুযোগ পেয়ে গেলাম। সেদিনের সেই লকারে একটি জিনিস আমার নজর কেড়েছিল। তা হলো একটা ছবি। দরজায় টেপ দিয়ে সাঁটা। এমন এক জায়গায় লাগানো, যাতে মাঠে নামার আগে প্রত্যেক খেলোয়াড় তা দেখে যেতে বাধ্য হয়।
তোমরা হয়তো ভাবছ এটা কোনো একটা বিজয়ের ছবি। আসলে ঘটনা কিন্তু উল্টো! ছবিটি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীর! নরওয়ের নারী ফুটবল টিমের বিজয়ের ছবি। ১৯৯৫ সালে ওরা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বকাপে হারিয়েছিল। সেদিন সেই লকার রুমে দাঁড়িয়ে আমি শিখেছিলাম, জীবনে সফল হতে হলে ব্যর্থতাকে কাজে লাগাতে হবে। ব্যর্থতাকে সফলতার জ্বালানি হিসেবে ধরে নিয়ে এগোতে হবে।
আমার দ্বিতীয় উপদেশ, নিজ নিজ অবস্থান থেকে নেতৃত্ব দিতে শেখো।
ধরো, তুমি পৃথিবীর যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি গোল দিয়েছ। এক যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্র দলের হয়ে সহ-অধিনায়কত্ব করেছ। এরপরও কোচ সিদ্ধান্ত নিলেন, জীবনের শেষ বিশ্বকাপে তুমি শুরুতেই মাঠে নামতে পারবে না। তোমার জায়গায় সুযোগ পাবে অন্য কেউ। কেমন লাগবে তখন? মনে হতেই পারে তোমাকে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। হয়তো তোমার পদোন্নতি নিয়ে গেছে অন্য কেউ। তুমি বাদ পড়ে গেছ দল থেকে। হয়তো ব্রিফকেসের জায়গায় তোমার কোলে এখন সন্তান। চোখের সামনে তোমার সহকর্মীরা এগিয়ে যাচ্ছে। তবে জেনে রেখো, জীবন যদি তোমায় মাঠ থেকে সরিয়ে দর্শকের সারিতে বসিয়ে দেয়, তো সেখানে বসেই তুমি নেতৃত্ব দেবে। যদি মাঠের বাইরে থেকে নেতৃত্ব দিতে না-ই পারলে, তো মাঠে থেকেও পারবে না। আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে বড় নেতা হলেন একজন মা। একজন অভিভাবক হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়। এটা হয়তো জীবনের কঠিনতম ম্যাচ।
তৃতীয় উপদেশ, সবাইকে নিয়ে এগোতে হবে। ফুটবলে প্রতিটা খেলোয়াড় তার নিজ নিজ দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করলে তবেই একজন খেলোয়াড় গোল দিতে পারে। তখন সবাই ছুটে যায় গোল যে করল, তার দিকে। হয়ে ওঠে আনন্দে আত্মহারা। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, তারা শুধু একজনের সাফল্যকেই উদ্​যাপন করছে। আসলে কিন্তু তারা প্রতিটা খেলোয়াড়ের অবদান, কোচের নির্দেশনা, ব্যর্থতা, সবকিছুকেই উদ্​যাপন করে থাকে। সব সময় যে একজনই গোল দেবে তা কিন্তু নয়। তাই যখন তুমি গোল দিতে পারছ না, কিন্তু আরেকজন দিয়েছে, তখন তাকে বাহবা দেওয়া উচিত। নারীদের বলব, তোমরাও একে অন্যের সাফল্যে অভিবাদন জানাও। নিজেদের অবস্থান থেকে আওয়াজ তোলো।
সবশেষে বলব, জগতে নিজের জায়গা নিজেকেই করে নিতে হবে। একবার আমি মিশেল একারসের সঙ্গে খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। তিনি একজন দারুণ খেলোয়াড়। ম্যাচের শুরুতে তিনি খেলাচ্ছলে আমাদের ফুটবলের কিছু নিয়ম শেখাচ্ছিলেন। এভাবে তিন রাউন্ড চলে গেল। চতুর্থ রাউন্ডে তিনি লক্ষ করলেন, তাঁর সামান্য ঢিলেমির জন্য দল প্রায় হারতে বসেছে। তিনি তখন গোলরক্ষকের কাছে ছুটে গেলেন। আর চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘আমাকে বল দাও।’ গোলকিপার তাঁকে বল দিল, আর তিনি নিজেই তিনবার গোল দিয়ে জিতিয়ে দিলেন দলকে। মিশেল বোঝালেন, দলকে জেতাতে তার সমস্ত মনোযোগ দিতে হবে খেলায়। মনে রাখবে, চতুর্থ রাউন্ডের আগে তাঁর দায়িত্ব ছিল দলকে সাহায্য করা ও খেলা শেখানো। কিন্তু শেষের দিকে, তিনি নেতৃত্বের গুণেই বল দাবি করেছিলেন। সময়ের প্রয়োজনে।
আমার নেকড়ের দল, তোমরা জেনে রেখো সময় হয়েছে নিজের বল নিজেই চেয়ে নেওয়ার।
তোমাদের চেয়ে নিতে হবে চাকরি করার সুযোগ। পদোন্নতির আবেদন। মাইক্রোফোন। অফিসের বড় পদ। মর্যাদা। নিজের জন্য, সব নারীর জন্য।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: শাহরোজা নাহরিন, সূত্র: টাইমস ডট কম

সিলেটে নদীপথ ঘুরে ঘুরে... by মতিউর রহমান

কয়েকশ’ মাইল দূরে পাহাড়ের মাথায় ঝকঝকে সাদা কিছু একটা দেখে মনে হচ্ছিল, সেখানে বুঝি কোনও বিরাট সোলার প্যানেল বসানো হয়েছে! যতই কাছাকাছি যাচ্ছি ততই এর আকৃতি বাড়ছিল। পরে বুঝলাম ওটা আদতে একটা জলপ্রপাত। ভারতের সীমান্তবর্তী পাহাড়ের মাথা থেকে জলধারা নেমে এসেছে আমাদের সীমানায়। কাঁটাতারের কারণে ওই ঝরনায় অবগাহনের সুযোগ নেই আমাদের।
সিলেট আমার পছন্দের জায়গা। ছোটবেলা থেকেই পাহাড়-টিলা ভালো লাগে। চা বাগান নিয়ে নানান গল্প পড়ার সুবাদে তা পোক্ত হয়েছে আরও।
এবার যাচ্ছি সিলেটের ভোলাগঞ্জ। দু’পাশে টিলা আর চা বাগান, মাঝ দিয়ে চলে গেছে সড়ক– গল্প-উপন্যাসে এমনটাই পড়েছি। সিলেটে দর্শনীয় জায়গা অনেক। আমরা নিরিবিলি একটা স্পট খুঁজছিলাম, যেখানে মানুষ কম যায়। উৎমা-ছড়া তেমনই। তার আগে ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর দেখার ইচ্ছে হলো।
ভোলাগঞ্জে পৌঁছে নৌকা নিলাম সাদাপাথর পর্যন্ত। সাত মিনিটের পথ। এরপর হেঁটে কিছুদূর যেতেই মিলে গেলো পাহাড় থেকে নেমে আসা কাঙ্ক্ষিত জলধারা। সেই পানিতে দাপাদাপি করছে হাজারও মানুষ। স্রোতধারা যেখানে বেশি সেখানে অবশ্য লোকজন কম। আমরা সেই বেশি স্রোতধারায় নেমে পড়লাম। প্রচণ্ড রোদে গা পুড়ে যাওয়ার মতো অস্বস্তি ছিল। সাদাপাথরের জলে নেমে শরীর জুড়িয়ে গেলো। পানিতে আধঘণ্টা গা ভেজানোর পর রওনা দিলাম উৎমা-ছড়ার উদ্দেশে।
নদীপথ নৌকায় পার হয়ে সিএনজি নিলাম। দু’পাশে সবুজের সমারোহ। বিকেলের নরম আলোয় চোখ ভরে যাচ্ছে। গন্তব্যে পৌঁছে সিএনজি থেকে নেমে ১৫ মিনিটের মতো হেঁটে উৎমা-ছড়া যেতে হয়। সাদাপাথরের মতোই এখানেও পাথুরে নদী। দূর পাহাড় থেকে নেমে এসেছে জলধারা। সেখানে হুটোপুটি করছে ছোট্ট সোনামণিরা। আমরা আগেই গোসল সেরে নেওয়ায় এবার আর পানিতে নামলাম না। শুধু পা ভিজিয়ে চোখ মেলে দেখলাম।
আফসোসের ব্যাপার এই যে, সাদাপাথর ও উৎমা-ছড়া দুটি জায়গাই সীমান্ত এলাকায়। এ কারণে সৌন্দর্যের বেশি গভীরে যাওয়ার সুযোগ নেই। বারবার মনে হচ্ছিল, কেউ বুঝি অপরূপ প্রকৃতিকে সীমানা প্রাচীর দিয়ে বেঁধে রেখেছে। দূর থেকে দেখা ছাড়া সেসব ছোঁয়ার সুযোগ নেই।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বাসে অথবা ট্রেনে সিলেট যাওয়া যায়। নন-এসি বাস ভাড়া ৪৭০ টাকা। ট্রেনের টিকিট ২৮৫ টাকা থেকে শুরু। সিলেট থেকে ভোলাগঞ্জ বাজারে যেতে হবে রিজার্ভ গাড়িতে। কম মানুষ হলে সিএনজি নেওয়া ভালো। দল বড় থাকলে লেগুনা বেছে নেন অনেকে। ১০ জন বসা যায় এমন লেগুনার ভাড়া ২৩০০ টাকা।
ভোলাগঞ্জ বাজার থেকে সাদাপাথর যাওয়ার নদীপথের দূরত্ব মাত্র ৭ মিনিটের। আটজন চড়া যায় এমন নৌকার ভাড়া পড়বে ৮০০ টাকা। আর ভোলাগঞ্জ থেকে উৎমা-ছড়া যাওয়ার পথে নদী পার হতে হবে। নৌকার ভাড়া পড়বে ৫০০ টাকার মতো, সময় লাগবে পাঁচ মিনিট। নদী পেরোলেই দয়ার বাজার। সেখান থেকে উৎমা-ছড়ার সিএনজি ভাড়া একেকজনের পড়বে ৩০ টাকা।
যা যা দেখবেন
সিলেটে দেখার আছে অনেক কিছু। ভোলাগঞ্জে সাদাপাথরের সৌন্দর্য উপভোগের পর উৎমা-ছড়া দেখার পর আরও গভীরে তুরুংছড়া যাওয়া যায়। হাতে বেশি সময় নিয়ে গেলে জাফলং, রাতারগুল, পান্থুমাই, বিছানাকান্দি ইত্যাদি স্থানে বেড়িয়ে আসুন।

>>ছবি: লেখক

ঠাকুরগাঁওয়ে আম গাছ দেখতে ২০ টাকার টিকিট by নাকিবুল আহসান নিশাদ

সূর্যপুরী জাতের আম গাছ
একটি বৃক্ষ কত বড় হতে পারে? আর যাই হোক, তিন বিঘা জমি জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গাছের কথা ক’জনই ভাববে! তাও আবার আম গাছ। বিশাল এই আম গাছ আছে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াড়াঙ্গী উপজেলার হরিণমারী (নয়াপাড়া) গ্রামে। এর বিশালাকৃতি যেন কল্পনাকেও হার মানায়!
দূর থেকে দেখলে মনে হবে এটি বিশাল একটি বট বা ঝাউ গাছ। কিন্তু কাছে গেলে ধারণা বদলে যাবে। উচ্চতা আনুমানিক ৮০-৯০ ফুট। আর পরিধি ৩৫ ফুটের কম নয়। প্রকৃতির আপন খেয়ালে বেড়ে উঠে এটি ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে শোনা যায়, গাছটির বয়স প্রায় ২০০ বছরেরও বেশি। এর বর্তমান মালিক দুই ভাই সাইদুর রহমান ও নূর ইসলাম। তারা বলতে পারেন না ঠিক কবে গাছটির চারা রোপণ করা হয়েছিল।
ধারণা করা হয়, উপমহাদেশ জুড়ে সূর্যপুরী জাতের এত বড় আম গাছ আর নেই। ফলে এটি দেখতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় করেন। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে তাদের উপস্থিতি থাকে বেশি। বিদেশি অনেকেও এতে আকৃষ্ট হন।
জনপ্রতি ২০ টাকা করে টিকিট কেটে আম গাছ দেখতে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। টিকিটের টাকা থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে দুই ভাইয়ের পরিবার চলে ও গাছটির পরিচর্যা করা হয়। আগামীতে দর্শনার্থীদের জন্য পিকনিক স্পট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
২০০ বছরের বেশি বয়স হলেও গাছটিতে আমের বাম্পার ফলন হয়। প্রতি বছর প্রায় ৮০ মণের বেশি আম পাওয়া যায়। এগুলোর মূল্য বাজারের অন্যান্য আমের চেয়ে দ্বিগুণ। আমের মৌসুমে গাছের পাশেই তা বিক্রি করা হয়। তখন এখানে বিভিন্ন ধরনের দোকান বসে। সুস্বাদু, সুগন্ধি, রসালো আর ছোট আটি সূর্যপুরী আমের বৈশিষ্ট্য।
সবচেয়ে অদ্ভুত দিক হলো গাছটির ডাল। এগুলো মূলকাণ্ড থেকে বেরিয়ে একটু উপরে উঠে আবারও তা মাঠিতে নেমে গেছে। তারপর আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়ে উপরে উঠেছে। দেখতে অনেকটা নদীর ঢেউয়ের মতো উঁচু-নিচু। মূলকাণ্ড থেকে বেরিয়েছে ২০টি শাখা। মূলকাণ্ড থেকে বের হওয়া ডালগুলো একেকটি মাঝারি সাইজের আম গাছের আকৃতির মতো।
উত্তরের শান্ত জনপদের সাক্ষী গাছটির শাখাগুলোর দৈর্ঘ্য আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ ফুট। গাছের প্রতিটি ডালে চাইলে অনায়াসে হাঁটাচলা ও বসা যাবে। কিন্তু গাছের সামনে নোটিশে লেখা, ‘গাছে ওঠা বা পাতা ছেড়া নিষেধ।’
যেভাবে যাবেন
সড়কপথে ঢাকা থেকে বালিয়াডাঙ্গীর দূরত্ব প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার। বাসে চড়ে সরাসরি সেখানে যাওয়া যায়। আকাশপথে কিংবা ট্রেনে গেলে সৈয়দপুরে নেমে সড়কপথে দিনাজপুর গিয়ে তারপর বালিয়াডাঙ্গী যেতে হবে। সেখান থেকে ভ্যান, বাস বা মিশুক নিয়ে হরিণমারি বাজার হয়ে ঐতিহ্যবাহী সূর্যপুরী আম গাছের কাছে যাওয়া যাবে। তবে মাথায় রাখতে হবে, জায়গাটি শহর থেকে ভেতরে হওয়ায় ও জনপদ কম থাকায় সহজে গাড়ি পাওয়া যায় না। তাই যাওয়ার সময় গাড়ি রিজার্ভ করে নিলে ভালো।
সূর্যপুরী জাতের আম গাছ

বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট, বাংলাদেশের শুরু যেখানে by নাকিবুল আহসান নিশাদ

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া আর থানচি থেকে শিবগঞ্জসহ দেশের প্রতিটি প্রান্তর ঘুরে দেখার ইচ্ছে আছে। এবার ঘুরে এলাম উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগ। এর মধ্যে হিমালয় কন্যা পঞ্চগড় জেলার কথা বলি। সেখানে দর্শনীয় স্থান হিসেবে প্রথমেই সামনে আসে হিমালয়ের পাদদেশে তেঁতুলিয়া। এর বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন দেশের সর্ব উত্তরে অবস্থিত।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে রোজ ভ্রমণপিপাসুদের উপস্থিতি থাকে। বাংলাবান্ধা থেকে ভারতের শিলিগুড়ি শহর সাত কিলোমিটার আর দার্জিলিং ৫৮ কিলোমিটার দূরে। এছাড়া বাংলাবান্ধা থেকে ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে নেপালের কাকরভিটা সীমান্ত। নেপাল, ভুটান, গ্যাংটক, ডুয়ার্স ভ্রমণকারীরাও এই পথে যাওয়া-আসা করে থাকেন।
মহানন্দা নদীর তীর ও ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন তেঁতুলিয়া উপজেলার ১ নং বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে রয়েছে বাংলাদেশের একমাত্র স্থলবন্দর। এর মাধ্যমে চার দেশের (বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান) পণ্য আদান-প্রদানের সুবিধা রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন প্রায় ১০ একর জায়গার ওপর এটি অবস্থিত।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টে লেখক
১৯৯৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর প্রথম খুলে দেওয়া হয়। দেশের অর্থনীতিতে এটি শুরু থেকে বিশেষ ভূমিকা রেখে আসছে। নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বাণিজ্য চুক্তির আওতায় পণ্য আমদানি-রফতানির মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হয়। ২০১১ সালে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় পণ্য আমদানি-রফতানি শুরু করে বাংলাদেশ। বাংলাবান্ধা দিয়ে ভারত থেকে প্রতিদিন গড়ে একহাজার মেট্রিক টন পাথর ও নেপাল থেকে গড়ে প্রতিদিন ১০০ মেট্রিক টন ডাল আমদানি করা হয়।
ভারত থেকে প্রতিদিন যে পাথর আসে তা জিরো পয়েন্টের খুব কাছেই রাস্তার পাশে মজুত করে রাখা হয়। মেশিনের সহায়তায় ভাঙার পর দেশের বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে যায় সেগুলো। জিরো পয়েন্ট পৌঁছানোর রাস্তার দু’পাশে পাথরের বিশাল বিশাল পাহাড়। এখানে স্থানীয় নারী-পুরুষ তাল মিলিয়ে কাজ করে।
বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট যেতে হলে পঞ্চগড় বাস টার্মিনাল থেকে তেঁতুলিয়াগামী বাসে বাংলাবান্ধা বাজারে নামতে হবে। তেঁতুলিয়া বাজার থেকে ব্যাটারিচালিত অটো বাইকে জিরো পয়েন্টে যাওয়ার সময় রাস্তার দু’পাশে চোখে পড়ে পাহাড় সারি। পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মহানন্দা নদী। এর ওপারে ভারতের সীমান্ত।
জিরো পয়েন্টে যাওয়ার সময় চোখে পড়ে পাথরের মেলা
জিরো পয়েন্টের কাছে গেলে দেখা যায় বিশাল আকারের একটি জিরো। এখান থেকেই বাংলাদেশের শুরু। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কিছুক্ষণ গাছের নিচে বসে আরাম করা যায় সেখানে। সবুজে ঘেরা নিরিবিলি পরিবেশে এর চেয়ে ভালো আর কোনও জায়গা হয় না!
ভারত, নেপাল বা ভুটানগামী মানুষ এখানে পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার হয়। তবে পাসপোর্ট ও ভিসা থাকা চাই। দেশের বাইরে থেকে আসা প্রিয়জনের জন্য এখানে অনেকে অপেক্ষা করেন। তাদের জন্য বসার ব্যবস্থা আছে।
জিরো পয়েন্ট ফটকের কাছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ও ভারতের জাতীয় পতাকা টানানো। অনুমতি ছাড়া এর ভেতরে প্রবেশ করা যায় না। ভারত, নেপাল বা ভুটান থেকে আসা বিভিন্ন মালবাহী সারি সারি ট্রাক দেশের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে।
পঞ্চগড় ফেরার পথে তেঁতুলিয়া ডাকবাংলো ঘুরে আসা যায়। মহানন্দা নদীর কূলে অবস্থিত এই বাংলো শহরের কোলাহল ভুলিয়ে দেয়। দর্শনাথীর ভিড় না থাকায় নিরিবিলি সময় কাটানো যায়। জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে প্রাচীনকালের এই ডাকবাংলোয় থাকা যাবে।
তেঁতুলিয়ায় কোনও আবাসিক হোটেল নেই। পঞ্চগড় শহরে বিভিন্ন মানের বেশকিছু আবাসিক হোটেল আছে। এগুলোতে কক্ষভেদে প্রতি রাতের ভাড়া পড়বে ১৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা।
বাংলাবান্ধা

শক্তি জোগাবে চিকেন কর্নস্যুপ

চারদিকে ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ। এ সময় আক্রান্ত সবাইকে চিকিৎসকরা পানি জাতীয় খাবার বেশি খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। শুধু পানি খেতে কতটুকুই বা ভালো লাগে, তাই এ সময় স্যালাইন, ডাবের পানি, যেকোনও জ্যুস অথবা স্যুপ খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। বাইরে থেকে স্যুপ না কিনে ঘরেই বানিয়ে ফেলতে পারেন চিকেন কর্ন স্যুপ, যা আপনাকে শক্তি দেবে, তরলের চাহিদাও পূরণ করবে। রোগীর সেবা করতে করতে যে ব্যক্তি নিজে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছেন তিনিও দিব্যি এই স্যুপ খেয়ে নিতে পারেন শক্তি সঞ্চয় করার জন্য।
উপকরণ:

মুরগির বুকের মাংস- ১০০ গ্রাম

সুইট কর্ন বা সিদ্ধ ভুট্টাদানা- ২ কাপ

কাঁচামরিচ কুচি- ১ চা চামচ

কর্ন ফ্লাওয়ার- ১ টেবিল চামচ

টমেটো- ১টি

ধনেপাতা- কয়েকটি

তেল ও লবণ- স্বাদ অনুযায়ী

প্রস্তুত প্রণালী:

চুলায় প্যান বসিয়ে পানি দিন। মুরগির মাংস টুকরা করে ফুটন্ত পানিতে দিয়ে দিন। চাইলে এক চিমটি হলুদ গুঁড়া দিতে পারেন পানিতে। ১০ মিনিট পর পানি ফেলে মুরগির সিদ্ধ টুকরাগুলো তুলে রাখুন। আরেকটি প্যানে তেল গরম করে সুইট কর্ন দিয়ে দিন। প্যানে পানি দিয়ে দিন। মরিচ কুচি ও সিদ্ধ মুরগির মাংস দিয়ে দিন। একটি ছোট পাত্রে পানি ও কর্ন ফ্লাওয়ার একসঙ্গে মেশান। মিশ্রণ যেন দলা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন। মিশ্রণটি প্যানে দিয়ে নাড়তে থাকুন। স্বাদ মতো লবণ দিন। ১০ থেকে ১৫ মিনিট চুলায় রেখে নামিয়ে টমেটোর টুকরা ও ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে পরিবেশন করুন গরম গরম চিকেন সুইট কর্নস্যুপ।