Saturday, October 6, 2018

বাসায় বাসায় মৃত্যুকূপ by শুভ্র দেব

বাসায় বাসায় তৈরি হচ্ছে মৃত্যুকূপ। বাসায় থাকা বেশির ভাগ রিজার্ভ ও সেপটিক ট্যাংকি গ্যাস বোমায় পরিণত হয়েছে। এতে করে নিহতের সংখ্যাও বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে বদ্ধ অবস্থায় থাকা রিজার্ভ ও সেপটিক ট্যাংকে ধীরে ধীরে গ্যাস তৈরি হয়। পরিষ্কার বা অন্য কোনো কারণে এসব ট্যাংকির ঢাকনা খুলতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়। এছাড়া গ্যাস লাইন লিকেজ থেকেও দুর্ঘটনা ঘটে। সামান্য ইলেকট্রিক স্পার্কিং বা আগুনের স্পর্শ পেয়েই বিস্ফোরিত হয়। এতে করে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটছে।
গত ১০ বছরে এ ধরনের বিস্ফোরণে অন্তত দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। বিলসসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্যমতে গত বছরে সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে ১২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ১২ জনের মৃত্যু হয়। আর ২০১৪ সালে ১৭, ২০১৫ সালে ৩১, ২০১৬ সালে ৩৩ এবং ২০১৭ সালে ৩৫ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছরে সেপটিক ও রিজার্ভ ট্যাংক বিস্ফোরণে অর্ধশতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপরিকল্পিত নির্মাণ কাজ, সচেতনতার অভাব, দীর্ঘদিন একই ভাবে ফেলে রেখে দেয়া ও অব্যবস্থাপনাই দায়ী।
গত ২১শে আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর পল্লবী থানাধীন মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের ই-ব্লকের ৪ নম্বর লেনে মোশারফ হোসেন নামের এক ব্যক্তির ছয়তলা বাড়ির নিচতলায় রিজার্ভ ট্যাংক বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৬ জনসহ মোট নয়জন দগ্ধ হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়। এদের মধ্যে একই পরিবারের ৫ জন নিহত হন। ২৯শে সেপ্টেম্বর মাদারীপুর পৌর শহরের পাকদি এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনের সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে দুজন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন- সিরাজুল মাতব্বর (২৯) ও সুমন মাতব্বর (২২)। পুলিশ জানিয়েছে, সেপটিক ট্যাংক পরিষ্কার করতে গিয়ে প্রথমে সিরাজুল ভেতরে প্রবেশ করেন। অনেক সময় পেরিয়ে গেলে এবং তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন সুমন। পরে দু’জনকেই ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে সেখানেই তাদের মৃত্যু হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে রিজার্ভ ট্যাংক কিংবা আবদ্ধ কোনো ট্যাংকের খালি জায়গায় গ্যাস সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া আশপাশে থাকা গ্যাসলাইন লিকেজ হয়েও ট্যাংকে গ্যাস জমতে পারে। অন্যদিকে সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে জৈব পদার্থ পচে মিথেন ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস সৃষ্টি হতে পারে। জমে থাকা এসব গ্যাস যখন কোনো দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে আসে তখনই বিস্ফোরণ ঘটে। এছাড়া ট্যাংকে তৈরি হতে পারে সালফিউরিক এসিড, যা ওয়াল বা স্লাব ধসের কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন পরিষ্কার করা না হলে ট্যাংক গ্যাস চেম্বার বা গ্যাসবোমায় পরিণত হতে পারে। এর বিষক্রিয়া খুবই তীব্র হয়। বদ্ধ ট্যাংকে যে বিষাক্ত গ্যাস জমা হয়, এ বিষয়ে শ্রমিকসহ অনেকেই অজ্ঞ। সাধারণ কিছু নিয়ম মানলেই দুর্ঘটনা রোধ করা যেতে পারে। যেমন, ট্যাংক খোলার পরপরই ভেতরে না ঢোকা। ফ্যানের বাতাস দিয়ে ভেতরের বিষাক্ত গ্যাসকে সহনীয় করে তোলা। ট্যাংক পরিষ্কারের আগে তা পানি দিয়ে পুরোমাত্রায় ভরে দেয়া। এরপর পানি ফেলে দিয়ে ট্যাংক পরিষ্কার করলে আর গ্যাস বিস্ফোরণের ঝুঁকি থাকে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে নগর ও পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সরওয়ার জাহান মানবজমিনকে বলেন, এটি একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। ঢাকা শহরের লাখ লাখ বাড়িতে সেপটিক ট্যাংক আছে। এগুলো এক একটি মৃত্যুফাঁদ হয়ে আছে। এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় কিন্তু এ নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই। নেই কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। এটি যখন নির্মাণ করা হয় তখন সঠিক নিয়ম মেনে তৈরি করা হচ্ছে না। সময়মতো পরিষ্কার করা হয় না। তিনি বলেন, আবার অনেক সময় সেপটিক ট্যাংকের সঙ্গে অন্যান্য লাইন লিকেজ হয়ে মিশে যাওয়াতে দুর্ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে। তাই বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের আরো গুরুত্ব দেয়া দরকার।

বুকে পাথর চাপার গল্প by ইকবাল আহমদ সরকার

সিরাজুল ইসলাম ছিলেন বিমান বাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার। অন্যদিকে কুমিল্লার জাহানারা বেগমের স্বামীও  ছিলেন বিমানবাহিনীতে কর্মরত। দুজনের জীবনের নানা সুখ-স্মৃতি থাকলেও জীবনের শেষ প্রান্তের গল্প বাধা পড়ে গেছে গিভেন্সি গ্রুপের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সিরাজুল ইসলামকে ভুয়া সনদ বানিয়ে মৃত দেখিয়ে ব্যাংকে গচ্ছিত জীবনের সবটুকু সঞ্চয় তুলে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে তার প্রিয় স্ত্রী। একইসঙ্গে নিজের মাসিক পেনশনের টাকা উত্তোলনের ক্ষমতাও নিয়ে নেন স্ত্রী। বৃদ্ধাশ্রমে বসে সিরাজুল ইসলাম এখন শুধু ডুকরে ডুকরে কাঁদেন আর ভাবেন সোনালি অতীতের কথা। আর চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে রেখে জাহানারা বেগমের স্বামী মারা যাবার পর দিনে দিনে সন্তানরা আলাদা হয়ে যায়। একদিন ছোট ছেলে ও তার স্ত্রী প্রয়োজনের কথা বলে পাঁচ লাখ টাকার চেকে স্বাক্ষর নিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়।
এরপর জাহানারার ঠাঁই মেলে একই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। এমনি শত বৃদ্ধ-বৃদ্ধার বুকে পাথর চাপার গল্প আটকে আছে ওই কেন্দ্রের পড়তে পড়তে। এর মধ্যে প্রবীণ দিবসটি অন্য দিনগুলোর চেয়ে একটু আলাদা-আনন্দে কাটিয়েছেন তারা।
গাজীপুরের বিকে বাড়ি এলাকার বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে গিয়ে জানা গেছে সেখানে থাকা দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের শেষ জীবনের কষ্টের কাহিনী। যাদের অনেকেরই আছে সোনালি অতীত। ছেলে মেয়েরাও প্রতিষ্ঠিত। বিদেশেও আছেন ভালো অবস্থানে। কেউ কেউ স্ত্রী-সন্তানের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়ে কিংবা প্রতারিত হয়ে শুধু পরপারে যাবার অপেক্ষায় দিন পার করছেন এখানে।
পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা ৬৮ বছর বয়সী সিরাজুল ইসলাম জানান, সংসারে স্ত্রী ও চার মেয়ে থাকলেও কোনো ছেলে সন্তান ছিল না। সুখেই কাটছিল বিমান বাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার সিরাজুল ইসলামের চাকরি জীবন। পরে চাকরি নেন ঢাকার বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক অফিসে। কিন্তু চাকরির শেষ দিকে ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে এবং অবসরে যাওয়ার কয়েক বছর পরই দেখা দেয় অশান্তি। স্ত্রী কৌশলে পৈতৃক ভিটা বাড়ি বিক্রি করে দেন। এক সময় স্ত্রী-সন্তানদের রোষানলে পড়তে হয় তাকে। শেষমেশ সিরাজুল ইসলামের ভুয়া মৃত্যু সনদ বানিয়ে ব্যাংকে গচ্ছিত জীবনের সবটুকু আয় তুলে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয় তাকে। একইসঙ্গে নিজের মাসিক পেনশনের টাকা উত্তোলনের ক্ষমতাও নিয়ে নেন স্ত্রী। এর আগে স্ত্রীর পরামর্শে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে গাজীপুর রাজেন্দ্রপুরের আতলরা এলাকায় শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তি কেনেন স্ত্রী ও মেয়েদের নামে। এতে তার নিজের ভাই-বোনদের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি হয়। কিছুদিন যাওয়ার পর ছোটভাইও তার নামে থাকা অবশিষ্ট ১০ কাঠা জমি লিখে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। সেখান থেকে গাজীপুরের কোনাবাড়ির এক আত্মীয়ের বাসায় উঠেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়া হয় এবং সুস্থ হলে গাজীপুরের বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে অফিসে গেলে ঘটনাটি আদালতের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পরামর্শ দেয়া হয়। এখন শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে থেকে আইনি লড়াই করার শক্তি নেই বলেও জানান তিনি।
সিরাজুলের মতো বৃদ্ধাশ্রমে থাকেন কুমিল্লার জাহানারা বেগম (৭৫)। তিনি জানান, তার স্বামী বিমানবাহিনীতে চাকরি করতেন। তার স্বামী চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে রেখে মারা গেছেন। সকলের বিয়ে হওয়ার পর যে যার মতো আলাদা হয়ে গেছে। জাহানারা বলেন, একসময় আমার ছোট ছেলের বাসায় থাকতাম। একদিন ছোট ছেলে ও তার স্ত্রী প্রয়োজনের কথা বলে পাঁচ লাখ টাকার চেকে স্বাক্ষর করে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়। পরে তাকে বকাঝকা শুরু করে এবং বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ওই টাকা অন্যদের না দিয়ে শুধু ছোট ছেলেকে টাকা দেয়ায় অন্য সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত তিনি চলে আসেন এই বৃদ্ধাশ্রমে। এখানে চার বছর ধরে আছেন তিনি। সন্তানরা খোঁজ নেন না তার। প্রথম প্রথম সন্তানদের ছেড়ে এখানে থাকতে খুব খারাপ লাগলেও এখন মানিয়ে নিয়েছেন।
গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ার মনোরঞ্জন (৬৮) ছয় মাস ধরে আছেন এখানে। তিনি ছিলেন একজন সরকারি চাকুরে। অবসরের বয়স সীমার আগেই ইস্তফা দেন চাকরি থেকে। দুই ছেলে ও স্ত্রী নিয়ে ছিল তার সংসার। গ্রামে বিশাল পুকুরে মাছ চাষসহ সহায়-সম্বল সবই ছিল তার। হঠাৎ তার এক ছেলে জুয়ায় আসক্ত হয়ে ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন। ছেলের ঋণ পরিশোধে সমাজপতিদের হুমকিতে নিজের সহায় সম্বল সবই বিক্রি করতে বাধ্য হন। চোখের সামনে সবকিছু শেষের দৃশ্য নিজে মেনে নিতে পারলেন না। স্বজনদের আড়ালেই এসে আশ্রয় নেন এই বৃদ্ধাশ্রমে।
গাজীপুর সদর উপজেলার বিকে বাড়ি বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল জানান, উপার্জনে অক্ষম বৃদ্ধ-বৃদ্ধা যারা দুবেলা দুমুঠো খাবার পান না, যাদের থাকার জায়গা নেই কিংবা যাদের সচ্ছল হওয়া সত্ত্বেও বাবা-মার ভরণ পোষণ দেয় না বা সামর্থ্য নেই কিংবা যাদের কেউ নেই তাদের লালন পালন করা হচ্ছে এই কেন্দ্রে। এখানে যারা আছেন তাদের জন্য কোনো খরচ দিতে হয় না। নিবাসীদের বিনামূল্যে কাপড় ও চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়, যার যার ধর্ম পালনের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানকার নিবাসীদের বিনোদনের জন্য খেলাধুলা ও টেলিভিশন এবং পত্রিকা ও বই পড়ারও ব্যবস্থা রয়েছে। মৃত্যুর পর এখানেই তাদের দাফন ও সৎকারের ব্যবস্থা করা হয়। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক মো. আবু শরিফ জানান, তবে যারা এখানে আসতে চান তাদের চলাফেরায় সক্ষম ও বয়স ৬০ বছর বা বেশি হতে হবে এবং কিছু শর্ত মেনে থাকতে হবে। বর্তমানে এই বয়স্ক ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ২০৭ জন নিবাসী রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৭ জন পুরুষ এবং ১০০ জন নারী।

ঢাবির ৫১তম সমাবর্তন: কালো গাউনে প্রাণের উচ্ছ্বাস by মুনির হোসেন

ওদের দম ফেলার ফুরসত নেই। সময় যে ফুরিয়ে যাচ্ছে। হাতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। স্মৃতিগুলোকে ছবির ফ্রেমে বাঁধতে এখনো বাকি অনেক কিছু। তাইতো তারা অস্থির, কোথাও স্থির নেই। অস্তিত্বের পরিচয় দেয়া কার্জনের লাল দালান, সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্য কিংবা কখনো হার না মানা অপরাজেয় বাংলা। চষে বেড়াচ্ছেন পুরো ক্যাম্পাস। আর রঙিন ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করছেন প্রিয় মুহূর্তগুলো।
এ যেন অন্য রকম দৃশ্য। আবেগ আর ভালোবাসার মিশ্রণে ফুটে উঠছে প্রাণের উচ্ছ্বাস। ভালো লাগার এমন দৃশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসজুড়ে। ৫১তম সমাবর্তন সামনে রেখে নব্য গ্রাজুয়েটদের এ ব্যস্ততা। আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশ সেরা বিদ্যাপীঠের ৫১তম সমাবর্তন। গত ৩রা অক্টোবর কস্টিউম পাওয়ার পর থেকেই এ ব্যস্ততার শুরু। সকাল, দুপুর, বিকাল কখনো সন্ধ্যা ছাড়িয়ে রাত। হল কিংবা হলের বাইরে, সবাই মেতেছে প্রাণের উচ্ছ্বাসে।
এ ব্যস্ততার ভিড়ে কখনো চলছে খুনসুঁটি। মান অভিমানের ফিরিস্তিও। চলার পথের সঙ্গীদের আজও যে জ্বালাতন করতে ভুলছে না কেউ কেউ। তাদের খুনসুঁটি আর একে অপরকে বকাঝকা করার মধ্য দিয়ে নিজেদের মধ্যে বন্ধনটা যেন আরো মজবুত হচ্ছে। কারণ তাদের সঙ্গেইতো মিশে আছে দিনরাতের কত সুখ-দুঃখের স্মৃতি। তাইতো আজও শেষ সময়ে একে অপরের সঙ্গী তারা। দল বেঁধে ছবি তুলতে অপরাজেয় বাংলা থেকে শুরু করে টিএসসি, কার্জন হল, মল চত্বর, সিনেট, লাইব্রেরি, মধুর ক্যান্টিন, শহীদ মিনার থেকে ভিসি চত্বর সব জায়গায় চষে বেড়াচ্ছেন তারা। রঙিন ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করছেন সুখ স্মৃতিগুলো। আকাশের দিকে সমাবর্তন হ্যাট ছুড়ে দিয়ে অজানা উদ্দেশে পাড়ি দেয়ার বৃথা চেষ্টা। আবার সময় করে ছুটে যাচ্ছেন গত পাঁচ বছর যাদের শাসনে নিজেকে কিছুটা ঘুছিয়ে নেয়া গেছে সেই প্রিয় শিক্ষকদের কাছে।
শুধু নিজেরাই নয়, সমাবর্তনের হাওয়া লেগেছে কারো কারো গর্বিত বাবা-মা’র গায়েও। ছেলে গ্রাজুয়েট হিসেবে স্বীকৃতি পাবে বলে গ্রাম থেকে ছুটে এসেছেন। ছেলেও দিয়েছে যোগ্য সম্মান। নিজের সমাবর্তন হ্যাট পরিয়েছেন মাকে আর বাবাকে পরিয়েছেন গাউন। এরপর রিকশায় ছড়িয়ে ছুটে চলার দৃশ্যও ক্যামেরাবন্দি হয়েছে গত কয়েকদিনে। এ ছাড়াও বাবা মাকে নিয়েই অনেকে ক্যাম্পাসের মধুর স্থানগুলোতে শেষ স্মৃতি ধারণ করছেন।
আবার কখনো এসব গ্রাজুয়েটদের কিছু বিশেষ কার্য আবেগতাড়িত করবে যে কাউকে। এ যেমন- রিকশাওয়ালা মামাকে নিজের গাউন ও হ্যাট পরিয়ে দিয়ে স্যালুট জানানো, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বুকে জড়িয়ে ছবি তোলা, কখনোবা আনন্দাশ্রু ফেলা, উন্মাদভাবে ঘুরে বেড়ানো পাগলের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছবি তোলা।
আছে কিছু হাস্যকর দৃশ্যের ধারণও। হতাশ গ্রাজুয়েট, ভুতুড়ের বেশে গ্রাজুয়েট, ভিক্ষা করছেন গ্রাজুয়েট, সমাবর্তন হ্যাটের আড়ালে মুখ লুকাচ্ছেন কতিপয় গ্রাজুয়েট, গ্রাজুয়েট লুঙ্গি পরে তার ওপর গায়ে জড়িয়েছেন গাউন, মাথায় দিয়েছেন হ্যাট- এরপর ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সুপারম্যানের সাজে গ্রাজুয়েট, গ্রাজুয়েট কাপলরা হ্যাটের আড়ালে মুখ লুকিয়ে কী যেন করছেন।
কথা হয় বিজয় একাত্তর হলের ছাত্র রায়হানুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, সমাবর্তন হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। দেশ সেরা বিদ্যাপীঠ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করতে পারা নিশ্চয় ভালো লাগার। এ অনুভূতি প্রকাশ করার মতো নয়। কিন্তু কেমন জানি একটা খারাপ লাগাও কাজ করছে। বিদায় জানাতে হবে স্বপ্নের বিদ্যাপীঠকে। কত সুখ-দুঃখের উত্থান-পতনের স্মৃতি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ধূলিকণার সঙ্গে।
রোকেয়া হলের ছাত্রী রোকসানা আঞ্জুমানের ভাষায় এ স্বীকৃতিতো শুধু স্বীকৃতি নয়। এর মধ্য দিয়ে আমাদের ওপর দায়িত্ব অর্পণ করবেন রাষ্ট্র প্রধান। দেশমাতৃকার জন্য কাজ করার যে দায়িত্ব তিনি তুলে দিবেন, চেষ্টা করবো নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য আজীবন কাজ করে যাওয়ার।
এ বছর রেকর্ড সংখ্যক গ্রাজুয়েটের অংশ গ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সমাবর্তন অনুষ্ঠান। সমাবর্তনে অংশগ্রহণের জন্য ২১ হাজার ১১১জন গ্র্যাজুয়েট রেজিস্ট্রেশন করেছেন। এই সংখ্যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনের ইতিহাসে সর্বাধিক। অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ৯৬টি স্বর্ণপদক, ৮১ জনকে পিএইচ ডি এবং ২৭ জনকে এম ফিল ডিগ্রি প্রদান করা হবে। সমাবর্তনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সভাপতিত্ব করবেন। এবারের সমাবর্তনে সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। অধিভুক্ত সাত কলেজের রেজিস্ট্রেশনকৃত গ্র্যাজুয়েটগণ ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে ঢাকা কলেজ ও ইডেন মহিলা কলেজ ভেন্যু থেকে সরাসরি সমাবর্তন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।

গল্পটা প্রথম নারী মেজর জেনারেল সুসানে গীতির by কাজী সোহাগ

অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক পথ। নিজের মেধা, অধ্যবসায় আর পেশার প্রতি অদম্য আনুগত্যের ওপর ভর করে ক্যারিয়ারে অর্জন করেছেন আরেকটি তিলক। সেটা হলো মেজর জেনারেল। মেডিকেল কলেজের একজন পরিচালকের কর্মকাণ্ড দেখে অনুপ্রাণীত হয়েছেন। আর সবচেয়ে ভালো বেসেছেন সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত জীবন। পরে ওই জীবনকে নিজের জীবনের সঙ্গে করেছেন একাকার। গল্পটা বাংলাদেশের প্রথম নারী মেজর জেনারেল ডা. সুসানে গীতির।
৩০শে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম নারী মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি পান তিনি।
সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. সামছুল হক ওইদিন সেনা সদর দপ্তরে তাকে মেজর জেনারেল পদবির র‌্যাংক ব্যাজ পরিয়ে দেন। তার স্বামী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুল্লাহ মো. হোসেন সাদ (অবসরপ্রাপ্ত) একজন সফল সামরিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন। মেজর জেনারেল সুসানে গীতি ১৯৮৫ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে নারী ডাক্তার হিসেবে ক্যাপ্টেন পদবিতে যোগদান করেন। ১৯৯৬ সালে প্রথম নারী হিসেবে হেমাটোলজ্থিতে এফসিপিএস ডিগ্রী অর্জন করেন। এছাড়াও তিনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন এবং বিভিন্ন সামরিক হাসপাতালে প্যাথলজি বিশেষজ্ঞের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কর্মরত। সম্প্রতি মানবজমিনসহ আরো কয়েকটি গণমাধ্যমের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার ক্যারিয়ারের নানা দিক।
নিজের নামের ব্যাখা দিয়ে বলেন, আমার নাম রেখেছিলেন আমার নানা। এটা একটি ফারসি নাম। উচ্চারণটা আসলে সাউসান-ই-গীতি। গীতি মানে পৃথিবী আর সাউসান হচ্ছে একটি ফুল। এর অর্থ হচ্ছে পৃথিবীর ফুল। বোর্ডের তালিকায় নামটা সুসানে হয়ে যায়। পরে সেটা আর কারেকশন করা হয়নি। রাজশাহীতে বেড়ে ওঠা সুসানে গীতি বলেন, এ পর্যন্ত আসতে আমার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার মা’র। আবার নানীও অনেক অবদান রেখেছেন। ক্যারিয়ারে আরেকটি পদক প্রাপ্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে খুবই ভালো লাগছে। বিশেষ করে যে কোন নতুন কিছু শুরু করার মধ্যে একটা অন্যরকম আনন্দ থাকে। সেক্ষেত্রে আমাকে দিয়ে শুরু হয়েছে। এজন্য আমি সবার কাছে কৃতজ্ঞ। বিশেষ করে মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। নারী ক্ষমতায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ। বাংলাদেশের সমগ্র জনগণের কাছে কৃতজ্ঞ। কাজ করতে গিয়ে আমি নারী না পুরুষ তা নিয়ে বিভেদ আনতে চাই না। কাজের ক্ষেত্রে আমি আমার কাজটাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছি। যেটা আমার কাজ সেটাই করেছি। এ পর্যায় আসতে কি ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে প্রশ্নে তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ তো কিছু থাকেই। আমাদের কার্যক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আসতে হয়। যেমন আমি একজন প্যাথলজি স্পেশালিস্ট। এ কারণে বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিংয়ে যেতে হয়েছে। বড় বড় সিএমএইচ চালাতে হয়েছে। এসব কিছু চ্যালেঞ্জের সঙ্গে নিতে হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের সেনাবাহিনীর সিস্টেম অন্যরকম। আমার ওপর যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয় সেটা পালন করতে আমি বাধ্য।
দায়িত্বটা আমরা সূচারুরূপে পালন করে থাকি। কাজ করতে গিয়ে সামাজিক ও পারিবারিক কোন বাধার মুখে পড়েননি বলে জানান তিনি। নারীর ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলোতে নারীর সংখ্যা বাড়ছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা অবশ্যই একটি বিরাট পজিটিভ দিক। সামগ্রিকভাবে আমরা অনেক পিছিয়ে ছিলাম। সেক্ষেত্রে আমাদের নারীর ক্ষমতায়ন চলছে কিছুদিন ধরেই। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর অবদান অনেক। এসব কারণে আমাদের উন্নয়ন আরো এগিয়ে যাবে বলে আমি মনে করি। দেশ আরো উন্নত হবে। কেননা একজন শিক্ষিত মা শিক্ষিত সমাজ উপহার দেবে। একটা শিক্ষিত সমাজ যখন চলে আসবে তখন দেশের উন্নয়নে এটা আরো কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সেনাবাহিনীতে আসার গল্প প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত জীবন, শৃঙ্খলা, তাদের কর্তব্যবোধ আমাকে অনুপ্রাণীত করেছে। মেডিকেল কলেজের একজন ডাইরেক্টর ছিলেন। উনি আর্মি থেকে এসেছিলেন। স্যার খুব সুন্দরভাবে কলেজ পরিচালনা করতেন। সেগুলো দেখে আমার খুব ভালো লেগেছিলো। তাই ইন্টার্নি পিরিয়ড থেকে সেনাবাহিনীতে আসার আবেদন করি। আমাদের আর্মি মেডিকেল কোরে কিন্তু সেনাবাহিনীতে অনেক আগে থেকেই চিকিৎসক আছেন। এটা পাকিস্তান আমল থেকেই আছে। কর্ণেল রোকেয়া আনিস ম্যাডাম ছিলেন।
উনি প্রথম কর্নেল ছিলেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুরাইয়া রহমান ছিলেন। উনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হাতেই প্রথম ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হয়েছিলেন। বর্তমানে আমাদের দেশের নারীদের অবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে নারীরা অনেক জায়গায় এগিয়ে গেছে। অনেক সাংবাদিক এখন নারী। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা মহিলা। বিভিন্ন সেক্টরে যেমন এডমিন ক্যাডারে মহিলা আছেন। আইন সংস্থাতেও অনেক মহিলা আছেন। সে হিসেবে আমরা কিন্তু অনেক এগিয়ে যাচ্ছি। ভবিষ্যতে আরো এগিয়ে যাবো। সেক্ষেত্রে কি আমরা স্বপ্ন দেখতে পারি যে আগামীতে সেনাপ্রধান হতে যাচ্ছেন একজন নারী-এমন প্রশ্নে অনেকটা অট্টহাসি দিয়ে তিনি বলেন, হতেও পারে। কারণ আমাদের অন্যান্য কোরেও তো আর্মিতে মহিলারা এসেছেন। এরই মধ্যে অনেকের লে. কর্নেল পদে আসার সুযোগ আসছে। সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুযায়ি অবশ্যই তারা প্রমোশন পাবে। মেজর জেনালের হওয়ার পর কি ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন প্রশ্নে তিনি জানান, মানুষ যত উপরে উঠবে তার দায়িত্বও তত বাড়বে। আমার কাছে এখন বড় দায়িত্ব হচ্ছে পেশাগত জ্ঞান দিয়ে সেবার মান আরো উন্নত করা।
জাতিসংঘ মিশনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, মিশনে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সবাই খুব পছন্দ করে। জেন্ডার বেসিসে অনেক মহিলা এখন মিশনে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ মেডিকেল কন্টিনজেন্টে (ব্যানমেড) মেডিকেল কোর থেকে আমরা প্রথম গিয়েছিলাম। অন্যান্য আর্মস কোর থেকেও এখন যাচ্ছেন। তিনি বলেন, সেখানে আমরা ফ্রি ফ্রাইডে ক্লিনিক পরিচালনা করতাম। গ্রামে গ্রামে যেয়ে তাদেরকে চিকিৎসা দিয়ে বেড়াতাম। বাংলাদেশ তাদের কাছে খুবই পছন্দের। প্রতিটি মানুষ কিন্তু বাংলাদেশকে পছন্দ করতো। তারা এত ভালোবাসতো যে আমাদের কাছে এসে তারা বাংলাও শিখতো। তারা অনেক কালচারাল শো করেছে, আপনারা দেখেছেন। বাংলায় তারা গান গেয়েছে। এখন সেখানে যারা আছেন আশা করি আমাদের থেকেও তারা ভালো করবেন। সেনাবাহিনীতে যারা নতুন আসতে চায় তাদের জন্য কি পরামর্শ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বি ডেডিকেটেড টু ইউর সার্ভিস। আমরা যেহেতু মেডিকেল সার্ভিসে আছি সেক্ষেত্রে রোগীদের সেবাটা আরো ভালো করে দেয়ার চেষ্টা করতে হবে। বাংলাদেশ নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাক।
বিশেষ করে আমি একজন শহীদ পরিবারের সন্তান। আমি চাই, আমার বাবার রক্ত যেনো বৃথা না যায়। আমার বাবা শহীদ খলিলুর রহমান রাজশাহীতে পুলিশ অফিসার ছিলেন। তিনি পাকিস্তান আর্মির হাতে মারা যান। আমরা তার ডেডবডিটা পাইনি। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের জন্য আমাদের ফিলিংসটা অন্যরকম। আমরা আরো উন্নতি চাই এদেশের। আমার এই পজিশনে থেকে আমাকে আদর্শ ভেবে আরো অন্যরা যেনো এগিয়ে আসে আমি সেটাই চাই। নিজের পরিবারের অবদান প্রশ্নে তিনি বলেন, আমার স্বামী সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার। একটি ফ্যামিলিতে হাজবেন্ড ও ওয়াইফ দু’জনে দু’জনার ভালো না চাইলে কিন্তু কেউ এগিয়ে আসতে পারে না। বাচ্চাদেরও অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। সবারই অবদান আছে।

কর্তৃত্ববাদের দিকে বাংলাদেশের অবনমনের গতি বাড়ছে -ইকোনমিস্টের রিপোর্ট

এটা চিন্তা করা কঠিন কিভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ আগামী নির্বাচনে হারবেন। প্রধান বিরোধী দলগুলো বিশৃঙ্খল অবস্থায়। এই অবস্থার আংশিক কারণ হলো তাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনা সরকারের বিরামহীন মামলা। তারপরও নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নিপীড়ন আরো নৃশংস হয়ে উঠছে। লন্ডনের প্রভাবশালী সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক নিবন্ধে এসব বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়, সমালোচকদের ওপর সর্বশেষ আক্রমণের নজির হলো অনলাইন ও সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণের একটি বিল, যেটি সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে পার্লামেন্ট অনুমোদন করে। এই আইনের নিপীড়নমূলক বিধানের মধ্যে রয়েছে: ১৯৭১ সালের যেই যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়েছিল সেই যুদ্ধ নিয়ে কেউ ‘অপপ্রচার’ চালালে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড। শেখ হাসিনার পিতা এই স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
আরেকটি অস্পষ্ট ধারায় ‘আক্রমণাত্মক ও ভীতিকর’ বিষয়বস্তু পোস্ট করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলছেন, চরমপন্থা ও পর্নোগ্রাফির প্রচার বন্ধে এই আইন প্রয়োজনীয়। তবে, সাংবাদিকরা আতঙ্কিত।
তবে, এই বিলই সরকারের একমাত্র অস্ত্র নয়। বিরূপ নিবন্ধ প্রকাশ করেন যেসব সংবাদপত্রের সম্পাদক তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির অসংখ্য অভিযোগ আনা হয়েছে। একজনের বিরুদ্ধে একপর্যায়ে ৮০টি মামলা দায়ের করা হয়। রাজধানী ঢাকায় অনিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পক্ষে কথা বলার পর আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে আগস্টে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ‘মিথ্যা তথ্য প্রচারে’র অভিযোগে। এই আন্দোলন যেভাবে সরকার মোকাবিলা করেছে তা নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্টের ব্যাপারে ফেসবুকের কাছেও অভিযোগ দিয়েছে।
এ ছাড়াও আছে স্বাধীনচেতা বিচারকদের ওপর আক্রমণ। ২০১৪ সালে পার্লামেন্ট একটি সংবিধান সংশোধনী পাস করে। এর ফলে সরকারের জন্য আরো সহজে বিচারকদের বরখাস্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। গত বছর সুপ্রিম কোর্ট ওই সংশোধনী বাতিল করে। তখনই সরকার আকস্মিকভাবে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনে। তিনি বিদেশে থাকা অবস্থায়ই পদত্যাগ করেন। সেপ্টেম্বরে তিনি একটি আত্মজীবনী প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, প্রধানমন্ত্রীর দল আওয়ামী লীগ বিচারকদের প্রায়শই ভয়ভীতি দেখায়।
পুলিশও গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে কম। এই বছরের শুরুর দিকে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় ২০০ জনের প্রানহানি হয়েছে। সরকারের মতে, নিহতদের সবাই গ্রেপ্তার এড়াতে বা ক্রসফায়ারে পড়ে মারা গেছে। কিন্তু নিহত একজনের পরিবারের প্রকাশ করা রেকর্ডিং-এ শোনা যায়, ওই ব্যক্তিকে পুলিশের আতঙ্কজাগানিয়া বিশেষ অভিজাত স্কোয়াড র‌্যাবের হেফাজতে হাত বাঁধা ও নিরস্ত্র অবস্থায় গুলি করা হয়েছে। বিরোধী দল দাবি করছে, এই মাদকবিরোধী অভিযানকে ব্যবহার করে সরকার প্রতিপক্ষ রাজনীতিকদের সরিয়ে দিচ্ছে। তবে, এই অভিযোগ সরকার অস্বীকার করে।
কিন্তু হতাহতরা সবাই যদি মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত হতও, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মিনাক্ষী গঙ্গোপ্যাধ্যায়ের মতে, ‘তারা দোষী না কি অপরাধী তা বিচার করার দায়িত্ব পুলিশ বা সরকারের নয়।’
একসময় আওয়ামী লীগ আর প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হতো। সংবিধানে একসময় বিধান ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন পরিচালনা করবে যাতে সুষ্ঠুতা নিশ্চিত হয়। কিন্তু একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ম্যান্ডেট অতিক্রম করে মেয়াদ বৃদ্ধি করায়, শেখ হাসিনা বিএনপির আপত্তি উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধন করে পুরো ব্যবস্থাই বাতিল করেন।
বিএনপি পরবর্তী নির্বাচন (২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত) বয়কট করে। ফলে দলটির এখন পার্লামেন্টে কোনো আসন নেই। এই বছরের শুরুর দিকে দলটির নেত্রী খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির অভিযোগে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়। যখন খালেদা ও হাসিনা পালাবদল করে প্রধানমন্ত্রী হতেন, দু’জনকে বলা হতো দুই বেগম। খালেদার ছেলেও দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত। তিনি বৃটেনে নির্বাসিত থেকে দল পরিচালনা করছেন। বিএনপির মিত্র একটি ইসলামিস্ট দলের কয়েকজন নেতাকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে সংঘটিত অপরাধের দায়ে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। ওই দলটি পাকিস্তানের বিভক্তির বিরোধিতা করেছিল। দলটির অন্য নেতারা কারাগারে। দুই দলের কোনোটিই দৃশ্যত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সমর্থ নয়, যদি তারা এবার নির্বাচনে অংশ নিতে সম্মত হয়ও।
বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক মনে করেন, শেখ হাসিনা যেকোনো মূল্যে ক্ষমতায় থাকতে চান। ফলে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কার্যত একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হওয়াটা নিশ্চিত হবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সরকারের ওপর জনক্ষোভ মিইয়ে যাবে। বরং, এটি ভিন্ন রূপ ধারণ করতে পারে। জামায়াতে ইসলামিকে দুর্বল করার কারণে বেশ কয়েকটি নতুন ইসলামি সংগঠন সৃষ্টি হয়েছে। এদের অনেকগুলোই চরমপন্থি।
বিদেশি, সমকামী ও সরব ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের ওপর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার পর সরকার সহিংস ইসলামি গোষ্ঠীগুলোকে দমন করেছে। এরপর থেকে রক্তারক্তি কমেছে। কিন্তু এ থেকে উৎসারিত চরমপন্থি প্রবণতা কমেনি। গোয়েন্দা সংস্থার প্রাক্তন এক কর্মকর্তার মতে, ‘যদি আদৌ কিছু হয়ে থাকে, এটি বরং বাড়ছে।’

নতুন নতুন ফ্রন্ট খুলছে

কে জানে? রাজনীতি হয়তো এমনই। সেই কৌটিল্যের কাল থেকেই। বছর পাঁচেক আগের কথা। হঠাৎ করেই জামায়াতের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় শাপলা চত্বর। বাধা ছাড়া রাজপথে নামতে পেরে উল্লাস দেখান দলটির নেতাকর্মীরা। কাদের মোল্লাও ট্রাইব্যুনালে ‘ভি’ চিহ্ন দেখান। পরে কী হয়েছে তা সবারই জানা। গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটা একটা চেনা দৃশ্যই।
ক্ষমতাসীনরা বার বার ইস্যু তৈরি করেছে। নতুন নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। দিশেহারা বিরোধী শক্তি এর পেছনে ছুটে চলেছে। তাদের অবশ্য খুব বেশি কিছু করার ছিল কি না তা নিয়ে বিতর্ক আছে।
বাংলাদেশের রাজনীতি একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিক্রম করছে। সংসদ নির্বাচনের তিন মাসও বাকি নেই। মাঠ অবশ্য ক্ষমতাসীনদের একতরফা দখলে। এই অবস্থাতেও বসে নেই নীতিনির্ধারকরা। কোটা সংস্কারের দাবিতে মাঠে নামে ছাত্ররা। গ্রেপ্তার, নির্যাতন থেকে শুরু করে হাতুড়িপেটা। ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। যদিও এখন তারা থিতু হওয়ার চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় সংস্কার নয়, প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে পুরো কোটাই বাতিল করে দেয়া হয়েছে। কেন বাতিল করা হলো কোটা? অনেক বিশ্লেষকই বিশ্বাস করেন, এর পেছনে অন্য খেলা আছে। এরইমধ্যে কোটা বহালের দাবিতে শাহবাগসহ দেশের বিভিন্নস্থানে অবস্থান, বিক্ষোভ হয়েছে। পুলিশ কোথাও বাধা দেয়নি। এইসব জমায়েতে উপস্থিতি কম হলেও ইশারা পেলে উপস্থিতি যে বহুমাত্রায় বেড়ে যাবে তা কে-না জানে।
কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, এর মাধ্যমে এক ঢিলে বহু পাখি মারা হতে পারে। নির্বাচন পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ইস্যুকে রাজপথে রাখা হতে পারে। আর অন্য কোনো উপায়ে কোটাও ফিরিয়ে আনা হতে পারে। এটা অবশ্য ঠিক যে, অনেক যুক্তিবান ব্যক্তিই মনে করেন, ১৫-২০ ভাগ কোটা এখনো প্রয়োজন রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী কোটা উঠিয়ে দেয়া কিছুতেই উচিত নয়।
কোটা ইস্যুতেই কী রাজনীতি আটকে থাকবে। কিছুতেই নয়। আরো একাধিক ফ্রন্ট খোলার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলার রায় ঘোষণা করা হবে ১০ই অক্টোবর। এ মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও আসামি। মামলাটিকে সর্বোচ্চ আলোচনায় আনার চেষ্টা স্পষ্ট। তবে, বিএনপির নীতিনির্ধারকরা চেষ্টা করছেন, নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিটি যেন সামনে থাকে সেটা নিশ্চিত করা। যদিও গায়েবি মামলায় দলটির নেতাকর্মীদের এরই মধ্যে জেরবার। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে সহিংসতা সারা দুনিয়ার মানুষই দেখেছে। এ নিয়ে বিএনপি নেতাদের নিজস্ব ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু কর্মসূচি ঘোষণাকারী দল হিসেবে সে সময় বিএনপিকেই দায় নিতে হয়েছে। দলটির নেতাকর্মীরা হয়েছেন আসামি। আন্তর্জাতিক মহল সহিংসতার জন্য সেসময় অত্যন্ত কড়া ভাষায় বিএনপি-জামায়াতকে অভিযুক্ত করে। তবে, এবারের ঘটনাটা বেশ অদ্ভূত। কোনো বিস্ফোরণ নেই, ভাঙচুর নেই। তবুও মামলা হচ্ছে। এ নিয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কোনো প্রতিক্রিয়া অবশ্য এখনো চোখে পড়েনি।
ওদিকে, বিরোধী শিবিরের বৃহৎ জোট গঠনের প্রক্রিয়া নানা জটিলতায় এখনো চূড়ান্ত রূপ পায়নি। আজ-কালের মধ্যে ড. কামাল হোসেন দেশে ফেরার পর এ প্রক্রিয়া গতি পেতে পারে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। বৃহৎ ঐক্যের নেতারা একমত হলে বিরোধী দলগুলো সম্মিলিতভাবে কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে। তবে, এ নিয়ে নানামত রয়েছে। ওদিকে, এই ঐক্যপ্রক্রিয়ায় একটি মহল বাধা দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওই মহলটি জামায়াত ইস্যু বারবার সামনে এনে ঐক্যপ্রক্রিয়া নস্যাৎ করার চেষ্টা করছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তারা বলছেন, ঐক্যপ্রক্রিয়ায় ৯৯ ভাগ নেতাই এটা মেনে নিয়েছেন যে, জামায়াত বৃহৎ জোটে আসতে পারবে না। তবে, ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকবে কি থাকবে না- সেটা বিএনপির ব্যাপার। কিন্তু দুই একজন ব্যক্তি বিএনপিকে শর্ত দিয়েছেন যে, বৃহৎ জোটে আসতে হলে বিএনপিকে জামায়াত ত্যাগ করে আসতে হবে। এটা জোট যেন না হয় তার তৎপরতা বলে মনে করেন সম্ভাব্য জোটের কোনো কোনো নেতা। ওদিকে, এই পরিস্থিতিতে নীরব জামায়াত। দলটির নেতারা এ ইস্যুতে মুখ না খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এদিকে, হেফাজত ফ্রন্টের দিকেও দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। ক্ষমতাসীন মহল অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হেফাজতকে কাছে টানতে সক্ষম হয়েছেন বলে কোনো কোনো পর্যবেক্ষকের মত। হেফাজতের আমির আল্লামা আহমদ শফী সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশংসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে সংবর্ধনা দেয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি। ইসলামী ঐক্যজোটের একটি অংশও সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। এ অবস্থায় হেফাজতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। নায়েবে আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজতের বর্তমান অবস্থানের সমালোচনা করেছেন।
হেফাজত ভাগ হয়ে যেতে পারে এমন গুঞ্জনও রয়েছে। অতীতে সরকারের হেফাজত সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ সমালোচনামুখর হলেও এবার অবশ্য তারা নীরব রয়েছেন।
কিছু ফ্রন্টের আভাস পাওয়া গেছে। তবে, আগামী ৮০-৮৫ দিনে নতুন নতুন ফ্রন্টের আবির্ভাব ধারণার চেয়েও বেশি মাত্রায় হতে পারে। কারণ এবারের প্রশ্নটি ক্ষমতার।

ইশা আন্দোলনের মহাসমাবেশ: তফসিলের আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে

চরমোনাইর পীর ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম বলেছেন, বর্তমান সংসদ বহাল রেখে এদেশে কোনো নির্বাচন করতে দেয়া হবে না। তফসিল ঘোষণার আগেই এই সংসদ ভেঙে দিয়ে একটি নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। গতকাল জুমার নামাজের পর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জাতীয় মহাসমাবেশ থেকে তিনি এ ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরেও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে রাস্তায় নেমে আসতে হয় সেটা ভাবতেও লজ্জা লাগে। স্বাধীনতার পরে এদেশে এখন পর্যন্ত যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারা দেশকে গলা টিপে ধরে খেয়েছে। তারা খুন-গুমের রাজনীতি কায়েম করেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা একের পর এক এটা করে এসেছে। বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচিত ও অনির্বাচিত দুই ধরনের স্বৈরশাসক দেখেছেন। এখন তারা চায় সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি।
আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দেশে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে ফেলছে। গত দশ বছরে তারা একটা নির্বাচনও সুষ্ঠু করতে পারেনি। তাই দেশের দুষমনদের দূর করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
চরমোনাই পীর বলেন, দেশ ও ইসলামের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র আমরা মেনে নেবো না। ইসলামী রাষ্ট্র নিয়ে মানুষের মনে যে ভুল ধারণা রয়েছে সে সম্পর্কে বলতে চাই, দেশে ইসলাম কায়েম হলে সকল ধর্ম বর্ণের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে। আমরা এ লক্ষ্যেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের ৩০০টি আসনের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছি। তাদের বিজয়ের লক্ষ্যে কাজ করার জন্য দলের কর্মীদের নির্দেশ দেন তিনি।
ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফায়জুল করীম বলেন, এই ময়দানে ৭ই মার্চ শ্রদ্ধাবাজন শেখ সাহেব মানুষের মুক্তির কথা বলেছিলেন। কিন্তু দেশ কি আদৌ কোনো মুক্তি পেয়েছে? মানুষ কি স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে? এদেশ থেকে গত কয়েক বছরে বিভিন্ন খাতে যে পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে তার হিসেবের কোনো শেষ নেই। দেশটা খুন গুমে ভরে গেছে। তিনি কয়েকটি খাতে দুর্নীতির হিসেব তুলে ধরে বলেন, আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোয় নির্মাণ ব্যয় থেকে আমাদের এখানে সড়ক, ব্রিজ, ফ্লাইওভার করতে কয়েকগুণ বেশি ব্যয় হচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করেছিল বৈষম্য দূর করতে। এখন কি বৈষম্য দূর হয়েছে। আমি বলতে চাই যেই আওয়ামী লীগের উত্থান হয়েছিল গণানুষের জন্য। তারা সত্তর সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছিল অথচ আজ তারাই মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি গণমামুষের অধিকার ফিরিয়ে না দেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আরেকটি উত্থান ঘটাবে।
বর্তমান ইসির সমালোচনা করে ফায়জুল করীম বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন হচ্ছে একজন রোবট। তাকে সরকার যেভাবে চালাচ্ছে সেভাবেই তিনি চলছেন। রোবটকে যা সেট করে দেয়া হয় রোবট তাই করে, তিনিও তাই করছেন। এই অযোগ্য নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগ করে একটা কার্যকর ইসি গঠন করতে হবে।
ফায়জুল করীম আরো বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বারবার জোট করে, আপনাদের মানুষ আর ক্ষমতায় নিবে না। বর্তমান আওয়ামী লীগের অবস্থা তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। আপনাদেরকে এদেশের মানুষ আর কখনো ক্ষমতায় বসাবে না। কয়েকদিন আগে ভারতের বিজেপির এক নেতা বাংলাদেশকে দখল করার হুমকি দিয়েছেন কিন্তু এই বিএনপি, আওয়ামী লীগ কেউ তার প্রতিবাদ করেনি। আপনারা ভারতের দালালি করতে পারেন, এদেশের মানুষ তাদের দালালি করেন না। এদেশের মানুষ আপনাদের চেহারা আর দেখতে চায় না।
ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব অধ্যক্ষ হাফেজ মাওলানা ইউনুস আহমাদ বলেন, আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে ন্যায়-শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেশের অর্থে পদ্মা সেতু হবে। কিন্তু তিনি এটা বলতে পারেন না আমাদের দেশে যে জনসম্পদ, মেধাসম্পদ রয়েছে তাতে আর কারো কাছে আমরা হাত পাতবো না।
প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিন্সিপাল সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী বলেন, ইসলামী আন্দোলন মহাসমাবেশের ডাক দিয়েছে যখন গোটা দেশটা খুন, গুম ধর্ষণে ভরে গেছে। আওয়ামী লীগ বলছে দেশ উন্নয়নে করে ভরে ফেলছে। তারা উন্নয়ন মেলা বসিয়ে দেখাচ্ছে। সত্যিকার উন্নয়ন করলে মেলা করে দেখাতে হয় না। এই আওয়ামী লীগ এমন কোনো কাজ নেই, যা তারা করেননি। তারা সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে নিজেদের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতায় যাওয়ার উন্নয়ন করেছে। আপনারা ৫ই জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় আসবেন সেটা আমরা করতে দেবো না। এদেশের মানুষ সেটা হতে দিবে না।
প্রেসিডিয়াম সদস্য নূরুল হুদা ফায়েজী বলেন, আমরা যদি দেশের জন্য ত্যাগ করতে পারি তাহলে আমাদের বিজয় সুনিশ্চিত। তাই আমদেরকে সে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
প্রেডিয়াম সদস্য অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন বলেন, আজকে আমাদের দেশের রাজনীতি দূষিত, কলুষিত হয়ে গেছে। যারা ভোট ডাকাতি করেছেন তাদের কোনো লজ্জা নেই। চারদিকে ভোট ডাকাতির উৎসব চলে। নির্বাচনে জিতে আওয়ামী লীগ আর হারে গণতন্ত্র।
প্রেসিডিয়াম সদস্য এটিএম হেমায়েত উদ্দিন বলেন, যারা এই দেশের মানুষের সঙ্গে গাদ্দারি করেছে তারা আন্দোলনে ভেসে যাবে। মানুষ চায় শান্তিতে বসবাস করতে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা সেটা কায়েম করতে পারছে না।
সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলনের জাতীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা। জুমার নামাজের আগেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলের নেতাকর্মীরা আসতে শুরু করেন। মাঠেই জুমার নামাজ আদায় করেন অনেক নেতাকর্মী। আর নামাজের পরে পুরো উদ্যান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়।

‘আউটসোর্সিং ও ভালোবাসার গল্প’

ফ্রিল্যান্সিংকে পেশা হিসেবে নিয়ে অনেক তরুণই নিজের ভাগ্য বদলেছেন। কিন্তু এ পেশার সামাজিক স্বীকৃতি নেই এখনও। সেরকম এক তরুণের গল্প নিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে রাহিতুল ইসলামের উপন্যাস ‘আউটসোর্সিং ও ভালোবাসার গল্প’।
প্রথাগত চাকরির পেছনে না ছুটে স্বাবলম্বী হওয়ার কাহিনি উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সাংবাদিক হিসেবে লেখক খুব কাছ থেকে এই পেশার চ্যালেঞ্জগুলো দেখেছেন। এই পেশার প্রতিকূলতা, সুযোগ, উদ্যোক্তা হওয়ার গল্পের সঙ্গে মানবিক প্রেমের আখ্যান তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
প্রধাণত এই পেশার সামাজিক স্বীকৃতি নিয়েই আবর্তিত হয়েছে এর গল্প। শূন্য থেকে শুরু করা এক তরুণ কীভাবে এ পেশার আদর্শ হয়ে ওঠে, সেই দৃশ্যই আঁকেন লেখক। গল্পের নায়ক মাহাবুবের জীবন-সংগ্রামের পাশাপাশি তার প্রেমের এক অন্তরঙ্গ বয়ান এ উপন্যাস। সরকারি, বেসরকারি যেকোনো চাকরির চেয়ে আউটসোর্সিং পেশা হিসেবে ভালো।
নিজের অনেকটা স্বাধীনতা রয়েছে। উপন্যাসটি কোনো কাল্পনিক গল্প নয়। এটি মাহাবুব নামের একজন ফ্রিল্যান্সারের জীবন থেকে নেয়া। ভালোবাসার কাজ আর ভালোবাসার মানুষ নিয়ে এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের গল্প।
রাহিতুল ইসলামের উপন্যাসের নায়ক ও নায়িকার শেষ পরিণতি কী হবে? নায়িকার পরিবার কি একজন ফ্রিল্যান্সারের হাতে মেয়েকে তুলে দেবে? নাকি সমাজের চাপে পেশা বদল করতে হবে মাহাবুবকে? অথবা সব ছাপিয়ে জয় হবে প্রেমের, ভালোবাসার?
উপন্যাসটি প্রকাশ করছে সিঁড়ি প্রকাশন। এই মাসের ২০ তারিখ থেকে দেশের বাজারে ও ৩১ তারিখ থেকে কলকাতার বাজারে বইটি পাওয়া যাবে। বাংলাদেশে বইটির মূল্য ২০০ টাকা এবং কলকাতার মূল্য ১৮৫ রুপি। এছাড়া বইটি মিলবে অনলাইন শপ রকমারি ডটকম এ।

নিজের রগরগে বিছানা-জীবন ফাঁস ওয়ার্নের

নিজেই একবার বলেছিলেন, তাঁর উইকেট সংখ্যার থেকে তাঁর শয্যাসঙ্গিনী বেশি। টেস্ট ও ওয়ান ডে মিলিয়ে ওয়ার্নের উইকেট ১০১১টি। তাহলে...
বাইশ গজে ঘূর্ণি আর মাঠের বাইরে নারী সঙ্গ— ওয়ার্নের জীবন বোঝার জন্য জোড়া এই কীর্তিই যথেষ্ট। মাঠের পারফরম্যান্স যেমন মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো, তেমনই ওয়ার্নের রঙিন জীবনও বারেবারে আলোচনায় উঠে এসেছে।
সম্প্রতি ওয়ার্নের আত্মজীবনী ‘নো স্পিন’ প্রকাশ্যে এল। প্রকাশ পাওয়ার পরেই ওয়ার্ন ফের সংবাদ শিরোনামে। কারণ, এই বইয়েই যে ফের ওয়ার্নের বিছানা-জীবন জনসমক্ষে।
কী বলছেন ওয়ার্ন? ওয়ার্ন তখন ৩৬। সদ্য ডিভোর্স হয়েছে। ২০০৬ সাল নাগাদ কাউন্টি ক্রিকেটে হ্যাম্পশায়ারের হয়ে খেলছিলেন স্পিন-কিংবদন্তি।
সেই সময়েই তিনি নিউজিল্যান্ড বংশোদ্ভূত মডেল কোরালি এইজহোৎজ টেক্সট করে জানিয়েছিলেন, ‘‘তোমার পাশে আমার থাকা উচিত।’’
নিজের থ্রিসাম সেক্সের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে আগল খুললেন ওয়ার্নও। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, ‘‘টেক্সট পাঠানোর পরেই কোরালি এক বান্ধবীকে চুম্বন করছে এমন ছবি আমাকে পাঠায়। আমি সাউদাম্পটনে ছিলাম। আর ওরা ছিল লন্ডনে। আমি তৎক্ষণাৎ পালটা জানাই, একঘণ্টার মধ্যেই আসছি।’’
কোরালি এইজহোৎজ ছিলেন তাঁর বান্ধবী এম্মা কিয়ার্নের ফ্ল্যাটে। ওয়ার্ন ভদকা ও শ্যাম্পেন সহযোগে যথারীতি হাজির হয়ে যান ফ্ল্যাটে। ওয়ার্ন নিজের আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘‘আমি পৌঁছনো মাত্র ওরা উত্তেজক নৃত্য করতে শুরু করে দেয়। একে অন্যকে চুমুতে চুমুতে অস্থির করে দিচ্ছিল। আমি বললাম, যেমনটা চলছে তেমনই চলুক। আমি এখানে বসে উপভোগ করি।’’ সোফায় বসেই ওয়ার্নের সামনে দুই বান্ধবী নিজেদের অন্তর্বাস খুলে ফেলেন।
তারপরেই শুরু হয় ‘রাসলীলা’! ওয়ার্ন রগরগে ভঙ্গিতে লিখেছেন, ‘‘গোটা ঘর অট্টহাসিতে ভরে উঠছিল। ওরা একের পর এক পেগ পান করেই চলেছিল। আমি দু’জনকেই ক্রমান্বয়ে চুম্বন করতে শুরু করে। প্রত্যেকে পরস্পরের অবশিষ্ট সুতো খুলতে সাহায্য করি। এর মধ্যেই হঠাৎ ওরা বিছানায় চলে আসে। তারপরেই আমরা ‘সেদিকে’ অগ্রসর হই।’’
উত্তেজক রাতে ওয়ার্ন বান্ধবীর ফ্ল্যাট থেকে বেরোন ২.৩০টা নাগাদ। সোজা ক্রিকেট গ্রাউন্ডে চলে যান। সেখানেই গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে নেন বাকি রাত। রসালো রাতের পরে ওয়ার্ন খেলতে যখন নেমে মাঠ ছেড়েছিলেন যখন তাঁর নামের পাশে ৯৯/৭।
মাঠে চ্যাম্পিয়ন হলেও আঘাত এসেছিল ঠিক তারপরেই। সেদিন রাতেই ব্রিটেনের প্রখ্যাত ট্যাবলয়েড ‘নিউজ অব দি ওয়ার্ল্ড’-এর এডিটর ফোন করে ওয়ার্নকে জানান, তাঁর যৌনক্রিয়ার সমস্ত ছবি তাঁদের কাছে রয়েছে। ওয়ার্ন সরাসরি কোরালি এইজহোৎজ-কে ফোন করে জানতে পারেন, তাঁর বান্ধবী কিয়ার্ন গুপ্ত ক্যামেরায় সমস্ত ফুটেজ ধরে রেখেছিলেন এবং সেই ট্যাবলয়েডকে তা বিক্রিও করে দিয়েছেন।
ওয়ার্ন নিজের আত্মজীবনীতে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে লিখেছেন, ‘‘আমি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এই সমস্ত ট্যাবলয়েডের মুচমুচে গল্পের সঙ্গে লড়াই করেছি। এঁরা কেমন ধরণের মানুষ যাঁরা হিডন ক্যামেরায় সমস্ত কিছু ধরে রেখে তা পরে বিক্রি করে দেয়?’’
সূত্র - এবেলা

সৌদি থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে বাংলাদেশিদের: ১০ দিনে শূন্যহাতে ফিরেছেন ৫০০ by রোকনুজ্জামান পিয়াস

খালি পা। পরনে ময়লা কাপড়। মলিন মুখ। মাথা নিচু করে বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে আসেন শাহ আলম। ২২ বছর বয়সী এই যুবকের বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলায়। ১ বছর ৫ মাস আগে তিনি সৌদি আরব গিয়েছিলেন। দেশটিতে যেতে খরচ হয়েছিল সাড়ে ৬ লাখ টাকা। কিন্তু যাওয়ার পর থেকেই ভোগান্তি পিছু ছাড়েনি।
কখনো বেকার, কখনো দিনভিত্তিক চুক্তিতে কাজ করে কোনোরকম থাকা-খাওয়া চলেছে তার। এরই মধ্যে কোনো কারণ ছাড়াই গত ১৯শে সেপ্টেম্বর সৌদি পুলিশ তাকে আটক করে। কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে সোজা পাঠিয়ে দেয় সফর জেলে। সেখান থেকেই গতকাল পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে দেশে। তার সঙ্গে ফেরত এসেছে আরো ১৪৯ জন বাংলাদেশি। সৌদি এয়ারলাইন্সের এসভি-৮০৬ নম্বর ফ্লাইটে দুপুর ২টা ১০ মিনিটে তারা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এদের কেউ কেউ বিমানবন্দরে নেমেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ফেরত আসা এই কর্মীদের অভিযোগ, তাদের কাছে সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও কোনো কারণ ছাড়াই ধরে ধরে পাঠিয়ে দিচ্ছে দেশে। ফেরত আসা কর্মীদের মধ্যে যেমন রয়েছেন দীর্ঘদিন দেশটিতে অবস্থান করা, তেমনি রয়েছেন অতি সম্প্রতি যাওয়া বাংলাদেশিরাও। জানা গেছে, গত ১০ দিনে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হারে গত ২৬শে সেপ্টেম্বর ৮০ জন, ৩রা আগস্ট ১৪৪ জন, বৃহস্পতিবার ফিরেছেন ১৭০ জন। এছাড়া এর মধ্যেই বিভিন্ন ফ্লাইটে শ’খানেক কর্মী দেশে ফিরেছেন। আগামীকাল আরো ১০০ জনের ফেরত আসার কথা রয়েছে। ফেরত আসা কর্মীরা বলছেন, সামনে তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। ধারদেনা করে বিদেশ যাওয়ায় অনেকে বাড়ি ফেরা নিয়েও দোটানায় রয়েছেন। তবে কি কারণে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে এ ব্যাপারে সরকারের দায়িত্বশীল কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গতকাল শাহজালাল বিমানবন্দরে কথা হয় সৌদি ফেরত এসব কর্মীর সঙ্গে। শাহ আলম জানান, তিনি গত বছরের ১৩ই এপ্রিল আপন ফুফাতো ভাইয়ের মাধ্যমে সৌদি আরব যান। তাকে ইলেক্ট্রিকের কাজ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। বলেছিল, থাকা-খাওয়া খরচ বাদে তার আয়-রোজগার হবে মাসে ৮০-৯০ হাজার টাকা। এই চিন্তা করে তিনি সাড়ে ৬ লাখ টাকা ধারদেনা করে সে দেশে পাড়ি জমান। কিন্তু দেশটিতে যাওয়ার পর প্রথম ৪ মাস কাটে বেকার জীবন। ওই সময় তিনি কোনরকম একবেলা-আধাবেলা খেয়ে দিন পার করেছেন। এরপর তাকে মরুভূমির একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ দেয়া হয়। সেখানে কাজ করেন ৪-৫ মাস। ওই সময় তিনি বাড়িতে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকাও পাঠিয়ে ছিলেন। এরপর আবারো বেকার হয়ে পড়েন। কোম্পানি তাকে দিয়ে কাজ করালেও আর বেতন দেয়নি। এক সময় পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েন। এর মধ্যে পেট চালানো এবং থাকার জন্য মাঝে মাঝে দু’একদিন এদিক-সেদিক কাজ করেন।
কিন্তু তাও নিয়মিত না। এই অবস্থায় গত ১৯শে সেপ্টেম্বর কাজে যাওয়ার সময় সকালে পুলিশ তাকে কোনো কারণ ছাড়াই আটক করে। শাহ আলমের দাবি, তার ভিসার মেয়াদ, বৈধ আকামাসহ সবই ছিল। কিন্তু সেগুলো দেখালেও কোনো কাজ হয়নি বরং কাগজপত্র নিয়ে সফর জেলে পাঠিয়ে দেয়। এরপর সেখানে কাটে ১৬ দিন। ওই জেলেও ছিল কষ্টের জীবন। তিনি বলেন, এই ১৬ দিন এক কাপড়েই ছিলাম। ওই কাপড়েই ফেরত এসেছি। তিনি আরো বলেন, গাদাগাদি করে থাকতে হতো। ফলে পরদিনই অসুস্থ হয়ে পড়ি। তার মতো বেশিরভাগ লোকজনই অসুস্থ হয়ে পড়ে সফর জেলে। কিন্তু কোনো ধরনের চিকিৎসা বা ওষুধপত্র দেয়া হয়নি। শাহ আলম জানান, এখন বাড়ি ফিরবো না। কারণ, পাওনাদাররা তাকে নাজেহাল করবে। তাই আপাতত তিনি ঢাকায় এক বন্ধুর কাছে উঠবেন।
একই ফ্লাইটে আসা বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উত্তরদাত গ্রামের শামীম হোসেন বলেন, তিনি মনজিল ভিসায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন ৬ মাস আগে। খরচ হয়েছিল সাড়ে ৫ লাখ টাকা। কিন্তু যাওয়ার পর কপিল (মালিক) আকামা করে দেয়নি। পরে আকামার জন্য ওই কপিলকে আরো ২৪০০ রিয়াল (৫৩ হাজার টাকা) দেন তিনি। আকামাও পান। কিন্তু বৈধ সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তাকে গত ২২ তারিখে ধরে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, আমি মদিনা এলাকার একটি দোকানে সাবান কিনতে গেলে পুলিশ ধরে। প্রথমে থানায় এরপর সফর জেলে পাঠায়। সেখান থেকে দেশে। তিনি বলেন, সফর জেলের ১৪ দিন তার জীবনের সবচেয়ে পীড়াদায় ছিল। বলেন, ১৫ জনের থাকার জায়গায় তারা ৯০-১০০ জন রাখে। একবেলা ডাল-ভাত, দুই বেলা ১টা করে রুটি দেয়া হয়। তিনি বলেন, এই ৬ মাসে তিনি ২৪০০ রিয়াল আয় করেছেন যার মধ্যে থাকা-খাওয়াতে প্রতি মাসে ৫০০-৬০০ রিয়াল খরচ হয়েছে। তিনি কাজি এয়ার ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরব যান বলে জানান।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার আখানগর গ্রামের বাদল মিয়ারও একই অভিযোগ। তিনি ৬ লাখ টাকা খরচ করে ক্লিনার ভিসা নিয়ে সৌদি গেছেন ৩ মাস আগে। সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র তার কাছে রয়েছে। কিন্তু পুলিশ সেগুলো কেড়ে নিয়ে তাকে সফর জেলে পাঠায়। একই জেলার নাসির উদ্দিন বলেন, কপিলের সঙ্গে তার মতবিরোধ হওয়ায় তাকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। এরপর ২০-২৫ দিন জেলে কেটেছে তার। বলেন, তার কাছেও বৈধ কাগজপত্র ছিল। নাসির অভিযোগ করেন, বাংলাদেশ দূতাবাসের লোকজন সফর জেলে গেলেও তাদের সঙ্গে কোনো কথা বলেনি। বরং তিরস্কার করতেন। তিনি আরো বলেন, তাদের মোবাইল রাখার জন্য ২০ রিয়াল এবং ব্যাগ রাখার জন্য ২৫ রিয়াল পুলিশকে দিতে হয়। অন্যথায় সেগুলো তারা নিজেরাই রেখে দেয়।
চল্লিশোর্ধ নাটোরের জুবায়ের বিমানবন্দরের ২নং টার্মিনালে থেকে বের হয়েই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, দেড় বছর আগে তিনি সৌদি গেছেন। তার আকামার মেয়াদ আছে এখনো ৭ মাস। এই অবস্থায় কোনো কারণ ছাড়াই তাকে আটক করে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। তার দেশে ফেরত আসার কথা এখনো বাড়ির কেউ জানে না। এই অবস্থায় তিনি বাড়ি ফিরতে চান না। তবে কোথায় যাবেন তাও জানেন না।
এদিকে বিমানবন্দর সূত্রে জানা গেছে, নারীকর্মীদের সঙ্গে গণহারে পুরুষকর্মী ফেরত আসা শুরু হয়েছে। শাহজালালের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের সহকারী পরিচালক তানভীর আহমেদ জানান, সৌদি থেকে ফেরত আসাদের মধ্যে ৬ বছর আগে যাওয়া লোকজন যেমন আছেন, তেমনি সম্প্রতি যাওয়া কর্মীরাও আছেন। তিনি বলেন, ফেরত আসা এসব কর্মী অভিযোগ করছেন, বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের আটক করে দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে আসল কারণ দূতাবাস বলতে পারবে। কি কারণে তাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে- এ ব্যাপারে সরকারে দায়িত্বশীল পর্যায়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রশাসনে ক্যাডার বৈষম্য, বাড়ছে ক্ষোভ by শফিকুল ইসলাম

পদোন্নতি ও আচরণ বৈষম্যের অভিযোগে সরকারি কর্মকর্তাদের সাধারণ ২৭ ক্যাডারের মধ্যে ‘প্রশাসন ক্যাডার’ ছাড়া বাকি ২৬ ক্যাডারের প্রায় ৪৬ হাজার কর্মকর্তা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। পেশাগত বৈষম্য দূর করতে প্রশাসন ক্যাডারের প্রায় পাঁচ হাজার কর্মকর্তাকে বাদ দিয়ে অন্য ক্যাডার সদস্যদের সমন্বয়ে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
এ সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ— সরকারের উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে আদালতের রায় লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এছাড়া, এই মুহূর্তে জনপ্রশাসনে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সঠিকভাবে বিধি-বিধান ও রীতিনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, বিসিএস ১৯৮৫ ব্যাচের ক্ষেত্রে পদের অতিরিক্ত পদোন্নতির সুযোগটি এখন সাধারণ রীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ সরকারের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, পদের অতিরিক্ত পদোন্নতি দেওয়ার বিধান নেই।
প্রশাসনের অন্য ক্যাডারগুলোর ক্ষেত্রে এই বিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করা হলেও ‘প্রশাসন ক্যাডার’ এর উপসচিব বা তদূর্ধ্ব পদের ক্ষেত্রে কোনও নিয়মনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে না। এছাড়া, প্রশাসনের শীর্ষ পদে অর্থাৎ সচিব বা সিনিয়র সচিব পদে ‘প্রশাসন ক্যাডার’ ছাড়া অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি পাওয়ার সুযোগ কম। চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সমান মর্যাদার পদে যোগদান করতে হয়। তবে শিক্ষা ক্যাডারের শীর্ষ পদের নাম অধ্যাপক হলেও তার পদমর্যাদা প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্মসচিবের সমান।
শিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মহাপরিচালকের একটি মাত্র পদ দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদায় ছিল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ পদটি সচিবের পদমর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে। একইভাবে তথ্য ক্যাডারের শীর্ষপদ হচ্ছে প্রধান তথ্য কর্মকর্তা। এটিও অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার ছিল। সম্প্রতি এই পদটিকেও সচিব পদে উন্নীত করা হয়েছে। অথচ প্রশাসন ক্যাডারের সব মন্ত্রণালয় ও দফতরের শীর্ষ পদটি সবসময়ই সচিব পদমর্যাদার ছিল।
উল্লেখ্য, সরকারের জনপ্রশাসনে ইকোনমিক ক্যাডারকে প্রশাসন ক্যাডারে একীভূত করার মধ্য দিয়ে বর্তমানে মোট ক্যাডারের সংখ্যা ২৭টি। এই মুহূর্তে জনপ্রশাসনে উপসচিব পদে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১ হাজার ৩২৪টি। যুগ্মসচিব পদে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৩৮৪টি। অতিরিক্ত সচিব পদে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১২০টি। সচিব ও সিনিয়র সচিব পদে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৮৯টি।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই মুহূর্তে (বৃহস্পতিবার, ৪ অক্টোবর) সরকারের প্রশাসনে সচিব পদে ৭৮ জন, অতিরিক্ত সচিব পদে ৬২১ জন, যুগ্ম সচিব পদে ৭৬৪ জন, উপসচিব পদে ১ হাজার ৫৯৯ জন, সিনিয়র সহকারী সচিব পদে ১ হাজার ৪৬৪ জন কর্মকর্তা বিভিন্ন দফতরে দায়িত্ব পালন করছেন।
১৯৭৫ সালে জাতীয় সংসদে অনুমোদিত ‘চাকরি পুনর্গঠন ও শর্তাবলী অ্যাক্ট ১৯৭৫’ অনুযায়ী একই গ্রেডে এবং স্কেলের কর্মকর্তাদের মধ্যে বেতন-ভাতা ও সুবিধার ক্ষেত্রে কোনও বৈষম্য করার সুযোগ নেই। কিন্তু উপসচিব বা তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তাদের সুদমুক্ত গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকার ঋণ ও সেই গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ৫০ হাজার টাকা দেওয়ার আদেশ জারি করে ওই আইনকে লঙ্ঘন করা হয়েছে বলেও অভিযাগ রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোথাও কোনও আইন লঙ্ঘন করা হচ্ছে না। কোনও ক্যাডার বৈষম্য নাই।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘সরকারের সক্ষমতা বেড়েছে, তাই গাড়ির সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এটা নতুন কিছু নয়। পর্যায়ক্রমে অন্যরাও পাবেন।’
তবে ক্যাডার বৈষম্যের বিষয়ে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) বাংলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে বিসিএস ক্যাডারগুলোতে রয়েছে বিবিধ মাত্রার বৈষম্য। কখনও পদোন্নতি বৈষম্য, কখনও কর্তৃত্ব বৈষম্য।’
তিনি বলেন, ‘ক্যাডারভিত্তিক বৈষম্যের নানা ধরন রয়েছে। যেমন ধরা যাক, কোনও এক বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সব ক্যাডারের সব শাখায় কর্মকর্তা নিয়োগ হলো। একই দিনে পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো, আবার একই দিনে তাদের যোগদান হলো। তারা যদি তাদের পদোন্নতির শর্ত পূরণ করেন, তাহলে তাদের একই দিনে পদোন্নতি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তা হচ্ছে না। পদোন্নতির ক্ষেত্রেও রয়েছে নানা জটিলতা। যেমন স্বাস্থ্য ক্যাডারের পদোন্নতির জন্য তাদের অতিরিক্ত ডিগ্রি থাকা চাই। একই যোগ্যতা কিংবা চিকিৎসকদের চেয়ে কম যোগ্যতা নিয়ে পদোন্নতি পেয়ে হয়তো কেউ ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদে আসীন হচ্ছেন, আর চিকিৎসকদের হয়তো প্রবেশপদেই সারাজীবন থাকতে হচ্ছে। শিক্ষা ক্যাডারসহ অনেক ক্যাডারের জন্য শুধু বিভাগীয় পরীক্ষা, বুনিয়াদি কোর্স, সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই পদোন্নতি হয়। প্রশাসন ক্যাডার, পুলিশ ক্যাডারসহ কিছু কিছু ক্যাডারে কিছুদিন বেশি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হয়। সব ক্যাডারের জন্য যদি আর কোনও উচ্চতর ডিগ্রির প্রয়োজন না হয়,তাহলে স্বাস্থ্য ক্যাডারের জন্য কী কারণে অতিরিক্ত ডিগ্রির প্রয়োজন হবে? একইভাবে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তার সমান অথবা বেশি যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসা ক্যাডারদের পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে, যা হওয়া উচিত নয়। ২৭টি ক্যাডারের মধ্যে স্বাস্থ্য ক্যাডার একমাত্র ক্যাডার, যেখানে প্রবেশকালীন যোগ্যতার চেয়ে আরও অনেক বেশি ডিগ্রি প্রয়োজন হয় পদোন্নতিতে। অন্য সব ক্যাডারে প্রবেশকালীন যোগ্যতাই তাকে সর্বোচ্চ পদে আসীন করার জন্য যথেষ্ট।’
অধ্যাপক তুহিন বলেন, ‘ক্যাডারগুলোতে পদ শূন্য সাপেক্ষে পদোন্নতি হয়। শুধু নির্দিষ্ট ক্যাডার ধরে নয়, যখন পদোন্নতি হবে তখন সেই বিসিএসের সব কর্মকর্তার পদোন্নতি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি না হওয়ার কারণে একই ক্যাডারেও চলছে বিশৃঙ্খলা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে উপজেলায় যে প্রকৌশলী, চিকিৎসক, কৃষি কর্মকর্তা থাকেন, তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে থাকেন। প্রশাসন ক্যাডারের একজন তরুণ কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হন। অন্যদিকে সেই নির্বাহী কর্মকর্তার চেয়ে অনেক সিনিয়র এবং তার চেয়ে মেধায় ও যোগ্যতায় অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও একজন চিকিৎসক, কৃষিবিদ, প্রকৌশলী পদোন্নতি না পেয়ে প্রবেশ পদেই হয়তো থাকেন। জেলা পর্যায়েও একই অবস্থা। এতে করে প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করাটা সম্মানজনক হয় না। এ অবস্থার অবসান না হলে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর হবে না।’
তিনি বলেন, ‘সব ক্যাডারের কর্মকর্তাদের চাকরিজনিত যেকোনও সিদ্ধান্তের জন্য যেতে হয় সচিবালয়ে। সেখানে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সব ক্যাডারের সিদ্ধান্ত দেন। এতে সব ক্যাডারের যে প্রধান কর্মকর্তা- মহাপরিচালকেরা রয়েছেন, তাদের ক্ষমতাকে ছোট করা হয়। সব মন্ত্রণালয়ের সচিব হওয়া প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ক্যাডারের কর্মকর্তার। যেমন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব হবেন একজন কৃষিবিদ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হবেন একজন চিকিৎসক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব হবেন একজন শিক্ষাবিদ। এতে সরকারি চাকরির কাজে গতিশীলতা আসবে। একই সঙ্গে স্বাধীনভাবে সব ক্যাডার দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন।’
উল্লেখ্য, বিসিএস ১৩তম ব্যাচের তথ্যসহ অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা যেখানে উপসচিব পদমর্যাদার পদে কাজ করছেন সেখানে একই ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা যুগ্মসচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন তাও এক বছরের বেশি আগে থেকে। অথচ অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির কোনও খবর এই মুহূর্তে নেই।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহম্মদ বলেন, ‘এগুলো নতুন কিছু নয়, দীর্ঘদিন যাবৎ চলে আসছে। তাছাড়া পদোন্নতি পাওয়ার সময় হলে তো তাকে পদোন্নতি দিতে হবে।’

গাজায় ইসরাইলি হামলায় শিশুসহ তিন ফিলিস্তিনি শহীদ আহত ৩৭৮

দখলদার ইহুদিবাদী ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে পূর্ব গাজা সীমান্তে নিহত হয়েছে এক শিশুসহ তিন ফিলিস্তিনি এবং আহত হয়েছে কয়েক শত।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় দখলদার বিরোধী মিছিলে অংশগ্রহণকারী একদল ফিলিস্তিনি টায়ার-পোড়ানো ধোঁয়ার আড়াল থেকে হানাদার ইসরাইলি সেনাদের দিকে পাথর ছুড়লে বর্ণবাদী ইসরাইলি সেনারা ফিলিস্তিনি প্রতিবাদীদের দিকে কাঁদানে গ্যাস ও তাজা বুলেট নিক্ষেপ করে।  ফলে শহীদ হয় ১২ বছরের শিশু ফারিস হাফিজ এবং ২৪ বছর বয়স্ক আকরাম আবু সামান।
গাজার ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলি জবর-দখল ও হত্যাযজ্ঞের কারণে বিতাড়িত ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ফিরে আসার অধিকার বাস্তবায়নের জন্য গত ৩০ মার্চ থেকে প্রতিবাদ-মিছিল করে আসছে। আজ শুক্রবারকে প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছিল ফিলিস্তিনিরা।
ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আজকের ঘটনায়  আহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৩৭৬ এবং তাদের মধ্য থেকে ১৯২ জনকে গাজার নানা ক্লিনিক ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে ১২৬ জন তাজা বুলেটে বিদ্ধ হয় এবং তাদের মধ্যে সাত জনের অবস্থা গুরুতর। 
হানাদার ইসরাইলিরা ত্রাণ বা উদ্ধার-কর্মী এবং অ্যাম্বুলেন্সগুলোর ওপরও হামলা চালায়।
ফিলিস্তিনিরা গাজার ওপর ইসরাইলের অমানবিক অবরোধ তুলে না নেয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিল অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে।