Wednesday, April 15, 2020

ক্রিমিয়ার ইতিহাস : তাতার মুসলিম

ভৌগলিক অবস্থান :
ক্রিমিয়ার তাতার হচ্ছে কৃষ্ণ সাগরের উত্তর উপকূলে অবস্থিত ইউক্রেনের একটি স্বায়িত্বস্বাসিত প্রজাতন্ত্র। বহু উত্তান পতনের নীরব সাক্ষী ক্রিমিয়া। ক্রিমিয়ার এ বিস্তীর্ণ অঞ্চল শত বছর ধরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও শাসকদের দ্বারা শাসিত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। ২৬, ২০০ কিলোমিটারের আয়তন বিশিষ্ট ক্রিমিয়া প্রজাতন্ত্রের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৯, ৭৩, ১৮৫ জন। ক্রিমিয়া হচ্ছে ক্রিমিয়ান তাতারদের জন্মভূমি, যারা নৃতাত্ত্বিকভাবে সংখ্যালঘু। গোটা জনসংখ্যার ১৩ শতাংশ ক্রিমিয় তাতার। ক্রিমিয়ান তাতারদের পূর্বপুরুষ হচ্ছে তুর্কী। ত্রয়োদশ শতাব্দী হতে তারা ক্রিমিয়ান উপদ্বীপে বসবাস করে আসছে।
পূর্বের অবস্থান :
মূল তাতারগণ পঞ্চম শতাব্দীতে গোবী মরুভূমির উত্তর পশ্চিমে বসবাস করত। নবম শতাব্দীতে খিতানগণ তাদের এলাকার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলে তারা দক্ষিণ অভিমূখে যাত্রা করে। চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মোঙ্গল শাসন কায়েম করে। চেঙ্গিস খানের দৌহিত্র বাতু খানের পরিচালনায় তাতারগণ পশ্চিম দিকে রাশিয়ার সমতল অভিমূখে রওনা হয়। যাত্রার সময় তারা তাদের সাথে তুর্কী উরাল বংশোদ্ভুত জনগণকেও সাথে নিয়ে যায়। চেঙ্গিস খানের বংশধর বার্কাই খানের (১২৫৭-১২৬৭) আমলে তাতারদের সাথে ইসলামের পরিচয় ঘটে।
ইসলামে প্রবেশ :
উযবেগের (১৩১৩-১৩৪০) ক্ষমতায় আরোহণের আগ পর্যন্ত এতদঞ্চলে ইসলাম ব্যাপকতা লাভ করেনি। চতুর্দশ শতকের শেষের দিকে ইসলাম ধর্ম ও সংস্কৃতি তাতাদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। চতুর্দশ শতকে পরিভ্রমণকারী পর্যটকগণ এতদঞ্চলে ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার নিদর্শন প্রত্যক্ষ করেন। সময়ের বিবর্তনে ইসলামী অনুশাসন, সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রতি তাতারদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পেতে থাকে।
তাতার রাজ্য :
কিপচাক সাম্রাজ্যের (Golden Hordes) পতনের পর উক্ত অঞ্চলের উপর গড়ে উঠা তাতার রাজ্য সমূহের মধ্যে ক্রিমিয়াই ছিল সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীন রাজশক্তি। ক্রিমিয়ার এই তাতার বংশের রাজত্বকাল ১৪২০ হতে ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় দীর্ঘ সাড়ে তিন শ’ বছর স্থায়ী হয় এবং সিংকোরাপোলকে রাজধানী করে পর্যায়ক্রমে ৬২ জন তাতার খান ক্ষমতায় অধিষ্টিত থেকে রাজনৈতিক প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হন। কাজান বংশের প্রতিষ্ঠাতা উলুঘ মুহাম্মদের জনৈক ভ্রাতা তাশ-তিমুর তোখতামিশের সেনাপতি ছিলেন এবং তিনিই ক্রিমিয়ায় তাতার বংশের প্রতিষ্ঠা করেন।
জার আইভানকে পরাজিত করে মস্কো জয় :
গীরাই খান নামে পরিচিত তাতার শাসকদের সাথে পোলান্ডের ডিউক ও উসমানীয় তুর্কী সুলতানগণ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে ক্রিমিয়া অবস্থিত হওয়ায় এর ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে সবাই সজাগ ছিলেন। বহিঃশত্র“র আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে তাতারগণ দু’লাখ সদস্য বিশিষ্ট দূর্ধর্র্ষ সেনাবাহিনী গঠন করেন যার মাধ্যমে পোলান্ড, রাশিয়া ও কোসাকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান পরিচালিত হয়। এমনকি ১৫৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম দওলত গিরাই এর নেতৃত্বে তাতার বাহিনী রাশিয়ার জার আইভানকে পরাজিত করে মস্কো নগরী বিধ্বস্ত করে দেয় এবং জারকে কর প্রদানে বাধ্য করে। সে সময় ককেসাস, দাগিস্তান ও রুমালিয়ার উপরও তাতারদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
রাশিয়া কর্তৃক ক্রিমিয়া জয় :
১৪৭৫ সালে উসমানীয় সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহর নেতৃত্বে এই দ্বীপ সম্পূর্ণভাবে মুসলিমদের অধীনে চলে আসে যা তিন শতক বলবৎ থাকে। ক্রিমিয়ার মুসলিম তাতার শাসক উসমানীয় খিলাফতের প্রতিনিধি হয়ে শাসন করতে থাকেন।
১৭৮০ এর দশকে রাশিয়ার নিকট উসমানীয়রা পরাজিত হলে খলিফাহ প্রথম আব্দুল হামিদ বাধ্য হন একটি দুঃখজনক চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাতে ক্রিমিয়াকে স্বাধীনতা দেয়া হয়। কিন্তু ক্রিমিয়ার ভৌগলিক অবস্থান রাশিয়ার কাছে হওয়ায় তারা ক্রিমিয়ায় দখলদারিত্ব শুরু করে। ক্রিমিয়ার মুসলিম শাসক ইস্তাম্বুলে আকুল আবেদন জানান, "আমরা স্বাধীনতা চাইনা, আমরা খিলাফতের সরাসরি অধীনে জীবন যাপন করতে চাই। আপনারা আবার সৈন্য নিয়ে এখানে আসেন" কিন্তু ইস্তাম্বুল তখন এতই দুর্বল ছিল যে রাশিয়ার সাথে করা চুক্তি ভাঙ্গার সাহস পায়নি তারা।
অবশেষে ৮ এপ্রিল, ১৭৮৩ সালের এই দিনে রাশিয়া ক্রিমিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।...!!!!
ক্রিমিয়া স্বাধীন রাজ্য :
১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে সম্পাদিত কুচকায়নারজির সন্ধিতে ক্রিমিয়া স্বাধীন রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ১৭৭৪ হতে ১৭৭৬ সাল পর্যন্ত তাতারগন নির্বিঘ্নে ক্রিমিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যবসা বানিজ্য সম্প্রসারন করেন। নিজেদের সন্তানদেরকে তাঁরা উচ্চ শিক্ষার জন্য বুখারার বিখ্যাত মাদ্রাসায় পাঠাতে থাকেন। এমনকি তাতারদের পূর্ব পুরুষগণ যারা খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা আবার ইসলাম ধর্মে ফিরে আসেন। কিন্তু তাতারদের এ স্বাধীনতা প্রাপ্তি বেশী দিন স্থায়ী হয়নি।
সন্ধি ভঙ্গঃ ২য় ক্যাথরিন
পরিশেষে ক্রিমিয়ার খান শাহীন গিরাই এর সাথে তুর্কী সুলতানের মনোমালিন্যের সুযোগে সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করে ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ৯ই এপ্রিল জারিনা দ্বিতীয় ক্যাথারিণ ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভূক্ত করে নেন। উক্ত ঘোষণায় তাতারদের ধর্মীয়, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার অক্ষুন্ন থাকার আশ্বাস দেয়া হলেও তা আদৌ কার্যকর হয়নি।
রুশদের অধীনে ক্রিমিয়া :
বস্তুত রুশদের অধীনে ক্রিমিয়ার তাতার মুসলিম জাতি গোষ্ঠীর পরবর্তী ইতিহাস বড়ই মর্মন্তুদ ও হৃদয়স্পর্শী। জারদের অনিয়ন্ত্রিত বর্বরতায় তাতারগণ সীমাহীন অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়নের শিকার হন এমনকি জোর পূর্বক তাতারদের ধর্ম পরিবর্তনে বাধ্য করা হয়। নিজেদের সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ভিত্তি যখন বিধ্বস্ত হয়ে যায় তখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও দু’লাখ পঞ্চাশ হাজার তাতার মুসলিম নারী-পুরুষ স্বদেশভূমি পরিত্যাগ করে তুরস্ক ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় নেন। শত নিগ্রহ ও নির্যাতন স্বত্ত্বেও যারা পৈত্রিক বাস্তুভিটা পরিত্যাগ করেনি তাদের উপর নেমে আসে পৈশাচিকতার খড়গ কৃপাণ।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধ :
১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হলে এতদঞ্চল সাময়িক ভাবে তুরস্ক ও ইংরেজদের অধীনে চলে যায়। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতি তাতার মুসলমানদের জন্য সৃষ্টি করে নতুন বিপদ। রাশিয়ার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহিতার অপরাধে ক্রিমিয়ার তাতারদের অভিযুক্ত করা হয়। জার সন্ত্রাসীগোষ্ঠী জিঘাংসার উন্মত্ততায় নির্বিচারে ধর্ষণ, অগ্নি সংযোগ ও নিপীড়ন চালিয়ে তাতারদের নির্মূল প্রক্রিয়া শুরু করে দেয়। বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকে এ Ethning cleansing অভিযান।
ইতিহাসবিদ জি, হ্যান্বলী Central Asia শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, ১৭৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ক্রিমিয়ায় যেখানে তাতার মুসলমানদের সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ, নির্মূল অভিযানের ফলে ১৯১৭ সালে সে সংখ্যা এসে দাঁড়ায় মাত্র এক লাখে।
সোভিয়েত সোশ্যালিষ্ট রিপাবলিক ইউনিয়নের (USSR) অন্তর্ভূক্ত
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে বলশেভিকগণ ক্রিমিয়াকে সোভিয়েত সোশ্যালিষ্ট রিপাবলিক ইউনিয়নের (USSR) অন্তর্ভূক্ত করে নেয়। ১৯২০ হতে ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত মোট সাত বছর স্বায়ত্বশাসিত প্রজাতন্ত্র হিসেবে ক্রিমিয়া পর্যাপ্ত স্বাধীনতা ভোগ করে। এমনকি রাশিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টি ও মিল্লি ফিরকা কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। তাতার ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেয়া হয় এবং মুসলমানগণ সরকারী উচ্চপদে নিযুক্তি লাভ করেন। কিন্তু দূর্ভাগ্য ক্রিমিয়ার তাতার মুসলমানদের এ সৌভাগ্য বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে মস্কো সরকার তাতার জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নির্মূল করার জন্য পূর্বাপেক্ষা কঠোরতম পন্থায় আঘাত হানে। তাতার মুসলমানদের স্বাধীনভাবে বাঁচার স্বপ্নসাধ সাময়িকভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লবের পূর্বে পুরো ক্রিমি য়ায় মসজিদের সংখ্যা ছিল ১৭৫০, বলশেভিক বিপ্লবের পর তা হ্রাস পেয়ে দাঁড়ায় মাত্র ১০০ তে।
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ ও ষ্ট্যালিন :
দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় পুরো তাতার জনগোষ্ঠীকে ষ্ট্যালিন নাজী জার্মানীর দালাল হিসেবে অভিযুক্ত করে প্রতিশোধের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৪৪ সালে ষ্ট্যালিন সরকার ক্রিমিয়ান তাতারদের ভাষাকে সিরিলিক (Cyrillic) অক্ষরে পরিবর্র্তিত করে দেয়। রুশ বুদ্ধিজীবিদের মাধ্যমে ক্রিমিয়দের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে মুছে ফেলা হয়। পারিবারিক জীবনে, সামাজিক বন্ধনে ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রচন্ডরূপে ধ্বস নামে। অতঃপর শুরু হয় তাতার মুসলমানদের পুনঃ উৎখাতের পালা। ষ্ট্যালিনের নির্দেশে তাতার মুসলমানদেরকে নিজ মাতৃভূমি ক্রিমিয়া হতে জোর করে বের করে দেয়া হয়। বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ, যুবা-বৃদ্ধ ও শিশু গণহত্যার শিকার হয়ে পড়ে। অধিকাংশ তাতার বাস্তু-ভিটা ও সহায়-সম্পত্তি হারিয়ে সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিশেষত উযবেকিস্তানে উদ্বাস্তু রূপে আশ্রয় নেয়। তাতারগণ সোভিয়েত শাসনের প্রতি ‘অনুগত’ নয় ষ্ট্যালিনের এ যুক্তিই ছিল নির্বাসনের ভিত্তি। তিনি তাতারদের ‘অবিশ্বস্ত নাগরিক’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। এক পরিসংখ্যানে জানা যায় যে, ৫০ হাজার থেকে এক লাখ তাতারকে ষ্ট্যালিন দেশ ত্যাগে বাধ্য করেন। বিপুল সংখ্যক তাতারের জীবন প্রদীপ নিভে যায় কারা অন্তরালে। তখনকার আদমশুমারী অনুযায়ী তাতার মুসলমানদের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩ শতাংশে।
ষষ্টদশ ও বিংশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে জার রাশিয়া ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্রিমিয়ার জনগণের প্রতি দমন মূলক শাসন ও পক্ষপাতদুষ্ট আর্থ-সামাজিক নীতি গ্রহণ করেও ব্যাপকভাবে এ অঞ্চলকে রুশীয়করণ করতে ব্যর্থ হয়। অধিকাংশ জনগণ রুশ আত্নীকরণকে দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন এবং ইসলামী পরিচিতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইসলামী অনুশাসন প্রতিপালনের প্রতি দৃঢ়তার ফলে তাতার জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সামাজিক পরিমন্ডলে বসবাস করেও একটি ভারসাম্যপূর্ণ রীতি বজায় রাখতে সক্ষম হন। প্রবল বিপত্তি সত্ত্বেও মুসলমান পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকাকে তাতারগণ গৌরব মনে করেন।
ইতোমধ্যে আড়াই লাখ তাতার স্বদেশে ফিরে আসলেও বহুবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে তাঁরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাকীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাধাগ্রস্থ হয়। সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে কিন্তু একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে ক্রিমিয়ার তাতারদের স্বাধীনতা তো দূরের কথা নিজ মাতৃভূমিতে তাদের প্রত্যাবাসনের কাজ টুকু পর্যন্ত সম্পন্ন হয়নি।

মৃতের মস্তিষ্ক আংশিক সচল!

প্রাণী মারা গেলে তার মস্তিষ্ক বা ব্রেন দ্রুত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে বলেই ধারণা ছিল। গবেষকেরা এবার মারা যাওয়ার চার ঘণ্টা পর একটি প্রাণীর মস্তিষ্কের আংশিক সক্রিয় করতে পেরেছেন বলে দাবি করেছেন। গবেষকেরা মৃত শূকরের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করেন। এ গবেষণার ফলাফল জীবন ও মৃত্যুর মধ্যে বাধা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। অবশ্য এটি আলঝেইমারের মতো রোগের ক্ষেত্রে নতুন গবেষণার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে। বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
গবেষকেরা বলছেন, মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণার বিষয়টি নৈতিকতার প্রশ্ন তুলছে। অনেকেই বলছেন, মারা যাওয়ার পর মস্তিষ্ক সক্রিয় হলে সে প্রাণীকে ঠিক মৃত বলা যাবে না, আবার তা পুরোপুরি জীবিতও বলা যাবে না।
গবেষকেরা তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, মস্তিষ্কের কোষ মারা যাওয়ার বিষয়টি বন্ধ করা যেতে পারে এবং মস্তিষ্কের মধ্যে কিছু সংযোগ আগের অবস্থায় নেওয়া যায়। তবে ওই মস্তিষ্কের সচেতনতা বা চেতনার কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি।
এ গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হচ্ছে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে কয়েক মিনিটের মধ্যে তা অপরিবর্তনীয় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে প্রচলিত এ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে পেরেছে।
গবেষকেরা কসাইখানা থেকে ৩২টি শূকরের মস্তিষ্ক সংগ্রহ করেন। চার ঘণ্টা পরে তা ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষকেদের তৈরি একটি সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করেন। ওই সিস্টেম বিশেষভাবে তৈরি রক্তের অনুরূপ কৃত্রিম তরল নাড়ির গতির মতো ছন্দে মস্তিষ্কে পাম্প করতে থাকে। ওই তরলে থাকা সিনথেটিক রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্কে অক্সিজেন ও ওষুধ পাঠানো হয়। এতে মস্তিষ্কের কোষ মারা যাওয়ার গতি কমে যায় এবং কোষগুলো জীবিত হতে শুরু করে। মস্তিষ্কে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত ওই বলকারক ককটেল তরল দেওয়া হয়।
গবেষকেরা দেখতে পান, মস্তিষ্কের মধ্যকার যোগাযোগব্যবস্থা সাইন্যাপস কাজ করতে শুরু করেছে।
গবেষণাসংক্রান্ত নিবন্ধ নেচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। তাতে গবেষকেরা বলেছেন, মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে সাইন্যাপস যোগাযোগে ক্ষেত্রে সাড়া দিচ্ছে। স্বাভাবিক মস্তিষ্কের মতোই একই পরিমাণ অক্সিজেন ব্যবহার করছে এবং ওষুধেও সাড়া দিচ্ছে।
শূকরগুলো হত্যার ১০ ঘণ্টা পরেও এ সাড়া পাওয়া যায়। তবে ইসিজি ব্রেন স্ক্যানে ‘ব্রেন-ওয়াইড ইলেকট্রিক অ্যাকটিভির’ কোনো সংকেত পাওয়া যায়নি, যা মস্তিষ্কের চেতনা নির্দেশ করে। অর্থাৎ মৌলিকভাবে এগুলো মৃত মস্তিষ্কের অনুরূপ।
ইয়েল ইউনিভার্সিটির নিউরোসায়েন্সের অধ্যাপক নেনাদ সেসটান বলেছেন, ‘আমরা আগে ভাবতাম, মস্তিষ্কের কোষের মারা যাওয়ার ঘটনা দীর্ঘ সময় ধরে ঘটে থাকে। এখন আমরা দেখেছি, কোষ মারা যাওয়ার ঘটনা ধীরে ধীরে ও ধাপ অনুযায়ী ঘটে। এসব প্রক্রিয়ার কোনো কোনোটা আটকে দেওয়া যায়, তা সংরক্ষণ করে আবার ফিরিয়ে আনা যায়।’
দীর্ঘ মেয়াদে ভবিষ্যতে স্ট্রোক বা জন্মের সময় অক্সিজেনের স্বল্পতার মতো ঘটনার ক্ষেত্রে আরও উন্নত সুরক্ষাব্যবস্থা পাওয়া যাবে বলে আশা করছেন গবেষকেরা।
নৈতিকতার প্রশ্ন
মৃত মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণায় বিষয়ে নৈতিকতার প্রশ্ন উঠছে। গবেষকেরা বলছেন, তাঁরা শূকরের মাংস খাত বা কসাইখানা থেকে মস্তিষ্ক সংগ্রহ করেছেন। প্রাণীগুলো পরীক্ষাগারে বড় করা হয়নি। তবে ইয়েলের গবেষকেরা মস্তিষ্কগুলোর চেতনা ফেরার বিষয়ে এতটাই উদ্বেগে ছিলেন যে তাঁরা মস্তিষ্কের কার্যক্রমতা কমার ওষুধ প্রয়োগ করেছেন। বিশেষজ্ঞরা ওই মস্তিষ্কের কোনো উচ্চ পর্যায়ের সাড়া পাওয়া যায় কি না, সে কার্যকলাপ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করেন। এ রকম কিছু হলে তাঁরা অ্যানেশথিয়াটিক ব্যবহার করতেন এবং পরীক্ষা শেষ করতেন।
বিষয়টি নিয়ে নীতিশাস্ত্রজ্ঞরা নেচার সাময়িকীতে লিখেছেন, এ বিষয়ে নতুন নীতিমালা প্রয়োজন হবে। কারণ, গবেষণাকাজে ব্যবহৃত প্রাণীগুলো শেষ পর্যন্ত এমন একটি পর্যায়ে অবস্থান করবে, যাতে তাদের পুরোপুরি জীবিত বলা যাবে না, আবার পুরোপুরি মৃতও বলা যাবে না।
গবেষকেদের মতে, বিশ্বের মধ্যে প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে সবচেয়ে জটিল কাঠামো বলা হয়। তবে মস্তিষ্কের কিছুটা অংশ ফ্রিজিং পদ্ধতি বা পাত্রের মধ্যে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ জন্মানো মাধ্যমে গবেষকেরা মস্তিষ্কের থ্রিডি ওয়্যারিং করতে পারবেন না।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথের গবেষক অ্যান্ড্রে বেকেল মিচেনার বলেন, এ ধরনের গবেষণা মস্তিষ্কের পোস্টমর্টেমের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন গবেষণার পথ খুলে দিতে পারে।
তবে গবেষকেরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে কোনো আঘাতের পর রোগীর ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে তাঁদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।
গবেষক স্টেফান বলেছেন, ‘স্বাভাবিক মস্তিষ্কের কার্যকলাপ ফেরাতে পারব কি না, সে বিষয়ে কোনো জ্ঞান নেই।’
এ পরিবর্তন কি মৃত্যুর অর্থ বদলে দেবে? এ মুহূর্তে এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে ‘না’। তবে কয়েকজন নীতিশাস্ত্রজ্ঞরা বলছেন, ‘আমাদের এখন কাদের মস্তিষ্ক মারা গেছে, তা নিয়ে বিতর্ক করতে হবে।’
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল এথিকস অ্যান্ড নিওন্যাটোলজিস্টের পরামর্শক ডমিনিক উইলকিনসন বলেন, বর্তমানে যখন কাউকে ব্রেন ডেড হিসেবে ধরা হবে, তখন তাকে ফিরিয়ে আনার কোনা উপায় নেই। যদি কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এটা ঘটে, তবে তাকে চিরবিদায় বলতে হবে। তবে ভবিষ্যতে যদি মৃত্যুর পরে তার মস্তিষ্ককে ফিরিয়ে আনা যায়, তার চেতনা ও ব্যক্তিত্ব ফিরে আসে, তবে তা মৃত্যুর সংজ্ঞায় বড় প্রভাব ফেলবে।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় শূকরের মস্তিষ্কে চেতনা ফেরানো যায়নি। মস্তিষ্ক নীরব ছিল।
তবে এ গবেষণা বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে, কতক্ষণ পর্যন্ত মস্তিষ্ককে টিকিয়ে রাখতে পারতেন গবেষকেরা, চার ঘণ্টা অপেক্ষা না করলে কী হতো? আবার গবেষকেরা মস্তিষ্কের উদ্দীপনা ঠেকাতে ওষুধ ব্যবহার না করলে কি ফলাফল অন্য রকম হতে পারত? এ প্রশ্নও উঠছে।

চাঁদ দেখা: মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবের তারিখ নির্ধারণে বিজ্ঞানকে কেন ব্যবহার করা যাচ্ছে না

চাঁদ দেখা নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে প্রায়শই ধর্মীয় অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ নিয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে মুসলিমরা।
মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবগুলোর তারিখ নির্ধারিত হয় নতুন চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে। মুসলমানরা যে হিজরি সন ব্যবহার করে, তা চন্দ্রবর্ষপঞ্জী নির্ভর। কিন্তু আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের মাধ্যমে কোন দেশে কখন নতুন চাঁদ দেখা যাবে তা বহু আগে থেকেই হিসেব করে বলে দেয়া সম্ভব।
কিন্তু তারপরও কেন তাহলে মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবের তারিখ নির্ধারণ নিয়ে এত বিতর্ক এবং বিভ্রান্তি? কেন একটি নির্দিষ্ট তারিখে ধর্মীয় উৎসব করার ব্যাপারে মুসলিম ধর্মীয় নেতারা এক হতে পারছেন না?
এ নিয়ে বিবিসি বাংলার শাকিল আনোয়ার কথা বলেছিলেন বাংলাদেশের একজন নামকরা পদার্থবিজ্ঞানী এবং ইসলাম ও বিজ্ঞান বিষয়ক বেশ কয়েকটি বইয়ের লেখক ড: শমসের আলীর সঙ্গে।
ড: আলীর মত হচ্ছে, ধর্মীয় উৎসবের তারিখ নির্ধারণের জন্য ইসলামে যে বিধান আছে, তার সঙ্গে বিজ্ঞানের কোন বিরোধ নেই। কাজেই আধুনিক জ্যোর্তিবিজ্ঞান প্রয়োগ করে খুব সহজেই বলে দেয়া সম্ভব কখন হিজরি সনের নতুন চান্দ্র মাস শুরু হচ্ছে। ফলে সারা বিশ্বের মুসলমানরা চাইলে একই দিনেই পালন করতে পারেন তাদের ধর্মীয় উৎসব, এ নিয়ে এত বিভ্রান্তি বা সংশয় থাকে না।
তারিখ নির্ধারণ নিয়ে কেন এত বিতর্ক?
খালি চোখে চাঁদ দেখা যাওয়ার পরই হিজরি সনের একটি নতুন চান্দ্র মাস শুরু হবে, এটাই ইসলামের বিধান। বহু ধর্মীয় নেতা এখনো পর্যন্ত খালি চোখে চাঁদ দেখা যাওয়ার ওপরই নির্ভর করতে চান।
ডঃ শমসের আলী বলছেন, তারিখ নির্ধারণ নিয়ে এক সময় যে বিতর্ক হতো, তার একটা যুক্তি ছিল। কারণ তখন চাঁদ খালি চোখেই দেখতে হতো। কোন পাহাড়ের এক দিক থেকে চাঁদ দেখা যেত, অন্যদিক থেকে দেখা যেত না। মুসলমানদের যে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগ এত তড়িৎ এবং ঘনিষ্ঠ ছিল না।
"কিন্তু এখন এসব অজুহাত দেয়ার আর সুযোগ নেই", বলছেন তিনি।
"পৃথিবী তো একটাই। চাঁদও একটি। প্রতি মাসেই চাঁদ ওঠে। কোথাও চাঁদ দেখা যাওয়ার মানে হচ্ছে সেই চন্দ্র মাস শুরু হয়ে গেল। পুরো বিশ্ব এখন তাৎক্ষণিক এবং ব্যাপক যোগাযোগের আওতায়। কাজেই এখন কোন একটি জায়গায় চাঁদ দেখা যাওয়ার পর একই দিনে উৎসব না করার বিরুদ্ধে কোন ওজর আপত্তি থাকতে পারে না।"
ডঃ শমসের আলী বলেন, বিশ্বের নামকরা সব ধর্মীয় পন্ডিতরা পরামর্শ করে ঠিক করেছিলেন একটা দেশে চাঁদ দেখা গেলে, অন্যদেশেও সেটা মানা হবে। ওআইসির (অর্গেনাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশন) এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের অনেক দেশই গ্রহণ করেছে, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো শুধু নেয়নি।
বাংলাদেশ কেন পারছে না
ডঃ শমসের আলী জানান, এই বিষয়টি নিয়ে তারা বাংলাদেশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে তিনদিন ধরে বৈঠকও করেছিলেন।
"ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আমরা তিন দিন ব্যাপী একটি আলোচনা করেছিলাম। সব যুক্তি তর্ক তুলে ধরে বললাম, যে এখন যে ধরণের যোগাযোগ সারা বিশ্বে, একটা জায়গায় চাঁদ উঠলে সেটা সবার জন্য বাইন্ডিং হবে। পৃথিবীর অন্য কোথাও চাঁদ দেখা গেল কিনা, সেটা দেখে সিদ্ধান্ত নিন, এটাই আমরা বলেছিলাম। গত বছর আমরা একথা বলি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে বলা হয়েছিল এটা প্রধানমন্ত্রীকে বলার জন্য।"
"আমার অনুমান, প্রধানমন্ত্রী এই সায়েন্টিফিক জিনিসটার ব্যাপারে কনভিন্সড। কিন্তু উনার তো একটা পরামর্শ দরকার। কারও তো বলা উচিৎ। ওআইসির সদস্য হিসেবে, অন্য কোন দেশে চাঁদ দেখা গেলে, সেটিকে আমরা দেখা গেছে বলে গণ্য করবো। এই সিদ্ধান্ত নিলেই কিন্তু আর সমস্যা থাকে না।"
ডঃ শমসের আলী বলেন, ধর্মীয় ক্যালেন্ডারের শুরুটা ধর্মীয়, কিন্ত গণনার পদ্ধতি তো বৈজ্ঞানিক । চাঁদ ওঠা, সূর্য ওঠা, এগুলো তো বৈজ্ঞানিক। বাংলাদেশ এখন কক্ষপথে স্যাটেলাইট ছেড়েছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপারে বাংলাদেশের বেশ আগ্রহ। তাহলে কেন আমরা এটা মেনে নেব না।"
আন্তর্জাতিকভাবে কী সিদ্ধান্ত হয়েছিল
২০১৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলন হয়েছিল তুরস্কের উদ্যোগে। সেখানে তুরস্ক, কাতার, জর্ডান, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মরোক্কো সহ ৫০টি দেশের ধর্মীয় পন্ডিত এবং বিজ্ঞানীরা অংশ নেন। ইন্টারন্যাশনাল হিজরি ক্যালেন্ডার ইউনিয়ন কংগ্রেস নামে পরিচিত এই সম্মেলনে হিজরি ক্যালেন্ডার নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলিমদের মধ্যে যে বিভক্তি সেটা নিরসনে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সম্মেলনে দুটি প্রস্তাব বিবেচনা করা হয়েছিল। প্রথমত সারা বিশ্বের জন্য দ্বৈত বর্ষপঞ্জী চালু করা, পূর্ব গোলার্ধের জন্য একটি, আর পশ্চিম গোলার্ধের জন্য একটি। আর দ্বিতীয় প্রস্তাবটি ছিল, সবাইকে একটি বর্ষপঞ্জীর মধ্যে নিয়ে আসা। শেষ পর্যন্ত বেশিরভাগ প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞ একটি বর্ষপঞ্জীর পক্ষেই মত দেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্সি অব রিলিজিয়াস অ্যাফেয়ার্সের সেসময়ের প্রেসিডেন্ট মেহমেট গোরমেজ তখন একটি তুর্কী সংবাদপত্র ডেইলি সাবাহ'কে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই নতুন বর্ষপঞ্জী মেনে নিতে কিছু দেশ হয়তো অসুবিধায় পড়বে, কিন্তু এটি যাতে বিশ্বজুড়ে গৃহীত হয় সে ব্যাপারে ওআইসি তাদের প্রভাব কাজে লাগাতে পারে।
মিস্টার গোরমেজ আরও বলেন, "বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে ইসলামী দুনিয়ায় এক ধরণের ভুল ধারণা আছে। আজকের যুগে, যখন মানুষ চাঁদে যেতে পারে এবং চাঁদ-সূর্যের প্রতি মূহুর্তের গতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে, তখন পাহাড় বেয়ে উঠে খালি চোখে চাঁদ দেখতে হবে বলে গোঁ ধরে থাকাটা ভুল।"

বড় পর্দায় শঙ্কু by সুহৃদ শংকর চট্টোপধ্যায়

বিজ্ঞানী-উদ্ভাবক প্রোফেসর শঙ্কু ছিলেন সত্যজিৎ রায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফিকশনাল সৃষ্টি। প্রথমবারের মতো সন্দীপ রায়ের নির্দেশনায় তা বড় পর্দায় আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
প্রতিভাধর বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও বহু ভাষাবিদ প্রোফেসর শঙ্কু ছয় দশক ধরে তরুণ বাঙালি পাঠকদের রোমাঞ্চিত করে রেখেছেন। এবার তিনি আত্মপ্রকাশ করছেন একটি ফিচার ফিল্মে। ফেলুদার (সত্যজিতের আরেক সাহিত্য সৃষ্টি) মতো শঙ্কুও অব্যাহতভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, বাঙালি সংস্কৃতিতে কাল্টের মর্যাদা পেয়ে আসছে। সত্যজিতের ছেলে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা সন্দীপ রায়ের নির্দেশনায় নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো অবলম্বে চলচ্চিত্রটি তৈরি করা হবে। ব্রাজিলের আমাজন বনের কেন্দ্রস্থলে প্রোফেসরের খ্যাপাটে বন্ধু নকুড়চন্দ্র বিশ্বাসকে নিয়ে অভিযানের কথা থাকবে ছবিটিতে। শ্রী ভেনকটেশ ফিল্মস তৈরি করবে ছবিটি।
বাঙালি ফিকশনের অনেক জনপ্রিয় চরিত্রই সিনেমায় রূপান্তরিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের ব্যেমকেশ বকশি, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাকা বাবু, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা। কিন্তু প্রোফেসর শঙ্কুকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে যে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের প্রয়োজন তা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এখন ওই প্রযুক্তি স্থানীয়ভাবে পাওয়া যাওয়ায় নির্মাতারা এদিকে নজর দিয়েছেন।
শুরুতে সন্দীপ রায় প্রোফেসর শঙ্কর আরেকটি অ্যাডভেঞ্চার আশ্চর্যজন্তু চিত্রায়নের কথা ভাবা হয়েছিল। এটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের ব্যক্তিগতভাবে প্রিয়। কিন্তু গল্পের প্রয়োজনে যে ধরনের ভিজুয়াল ইফেক্টের প্রয়োজন, তার ব্যবস্থাপনা কঠিন হওয়ায় ওই সিদ্ধান্ত পাল্টানো হয়। নকুড়বাবু ও এল ডোরাডোতে অনেক কম ভিজুয়াল ইফেক্টের প্রয়োজন পড়ে। তিনি বলেন, আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। তরুণ দর্শকেরা এখন অনেক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাথে পরিচিত। আমরা তাদের হতাশ করতে চাই না। এ কারণে আমরা প্রস্তুতিতে অনেক সময় নিচ্ছি। শ্যুটিংয়ের কাজ হবে দুই পর্যায়ে। প্রাথমিক পর্বের কাজ হবে মে মাস থেকে। তা হবে ভারতে। চলবে আগস্ট পর্যন্ত। তারপর ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলে চিত্রায়নের কাজ শুরু হবে।
শঙ্কুকে নিয়ে সত্যজিৎ রায় সম্ভবত কখনো চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবেননি। সন্দেশ ম্যাগাজিনের জন্য ১৯৬১ সালে তিনি যখন শঙ্কুকে নিয়ে প্রথম গল্পটি লিখেন ব্যোমযাত্রীর ডায়রি নামে, তখন এ নিয়ে সিরিজ লেখার কথা তার মাথায় ছিল না। বয়স্ক, দাড়িওয়ালা, টাক মাথার ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু এমন এক চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যা বাঙালি ফিকশনে আগে কখনো দেখা যায়নি।
সত্যজিৎ রায় তার নিজের মানবিক চেতনা, আদর্শ ইত্যাদি ঢেলে দিয়েছিলেন শঙ্কু চরিত্রে। বলা যায় শঙ্কুই ছিলেন সত্যজিৎ রায়। ফেলুদাও অনেক দিক থেকে সত্যজিৎ রায়। শঙ্কুর সততা, ব্যক্তিগত ও শিক্ষাবিদ হিসেবে আন্তরিকতায় তার ছাপই ফুটে ওঠেছে।
সত্যজিৎ রায় ছিলেন সায়েন্স ফিকশনের বিরাট ফ্যান। তার অন্যতম ফিকশনাল চরিত্র ছিল স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের প্রফেসর চ্যালেঞ্জার। শুরুতে চ্যালেঞ্জার থেকেই শঙ্কুর জন্ম হয়েছিল।
সত্যজিতের ইচ্ছা পূরণ
ফেলুদার মতো প্রোফেসর শঙ্কুও ভ্রমণনামা। পাঠককে এই কাহিনী পৃথিবীর নানা জায়গায় নিয়ে যায়। ফেলুদা চরিত্রটিও নানা জায়গায় ভ্রমণ করে। তবে লেখক যেসব জায়গায় গেছেন, ফেলুদা আসলে সেসব স্থানেই বিচরণ করেছেন। আর শঙ্কু এমন সব স্থানে গেছেন, যেখানে লেখক কখনোই যাননি। সন্দীপ রায় এ নিয়ে বলেন, সত্যজিৎ রায় যেসব জায়গায় যেতে চেয়েও যাওয়ার সুযোগ করতে পারেননি, সেখানেই শঙ্কুকে পাঠিয়েছিলেন।
আর এটিই শঙ্কুর কাহিনী রচনা কঠিন করে দিয়েছিল। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান সম্পর্কে তথ্যের জন্য সত্যজিৎকে তার বন্ধুদের ওপর নির্ভর করতে হয়েছিল। নানা বিশ্বকোষ, গ্রন্থ ঘেটে ঘেটেও তিনি তথ্য সংগ্রহ করতেন। তার তথ্য সংগ্রহের একটি প্রিয় স্থান ছিল কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরি।
কলকাতার গভার্নমেন্ট গার্লস কলেজের সহযোগী অধ্যাপক শম্পা সেনের মতে, ফেলুদার চেয়ে প্রোফেসর শঙ্কুর আবেদন বেশি হওয়ার কারণ বিষয়বস্তু ও বক্তব্যের দিক থেকে এটি অনেক বেশি চিন্তা-জাগানিয়া ও পরিণত।
তিনি বলেন, ফেলুদার মতো প্রোফেসর শঙ্কু আপাদমস্তক বাঙালি। তবে শঙ্কু অনেক বেশি বিশ্বজনীন ব্যক্তিত্ব। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিজ্ঞানী। শঙ্কুর অভিযানের মাধ্যমে সত্যজিৎ রায় তরুণ পাঠকদের তথ্যের বিশ্বকোষ ও জ্ঞান উপহার দিয়েছেন। বাঙালি সায়েন্স ফিকশনে ডায়েরির আকার আরেকটি অনন্য বিষয়। সাহিত্যিক মূল্যে ফেলুদার চেয়ে প্রোফেসর শঙ্কু আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফেলুদা সিরিজের সাতটি চলচ্চিত্র নির্মাণকারী সন্দীপ রায়ও মনে করেন, ফেলুদার চেয়ে প্রোফেসর শঙ্কুর আবেদন অনেক বেশি। তিনি বলেন, দ্বিভাষিক বিষয় ও ভিজুয়াল ইফেক্টের কারণে শঙ্কু অনেক বেশি লোকের কাছে পৌঁছাবে। আমি একযোগে সর্বভারতীয় মুক্তির আশা করছি।
নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো লেখা হয়েছিল ১৯৮০ সালে। চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা হয় ২০১৬ সালে। সময়ের এই বিশাল পার্থক্যের কারণে অবশ্যই কিছু পরিবর্তন হবে। তবে শঙ্কুর অভিযানের সাথে প্রয়োজনীয় স্থানেই কেবল পরিবর্তন আনা হবে। বইতে থাকা মূল চরিত্রগুলো অটুট রাখার দিকে খেয়াল থাকবে।
সত্যজিৎ রায় তার প্রায় প্রতিটি গল্পেই ছবি এঁকেছেন। ফলে সন্দীপকে ওই চেহারার সাথে মিল রেখে সঠিক অভিনেতাকে বেছে নিতে হবে। শঙ্কু চরিত্রে অভিনয় করবেন সত্যজিৎ রায়ের অনেক ছবিতে অভিনয়ের জন্য বিখ্যাত ধৃতিমান চ্যাটার্জি। সন্দীপ রায় বলেন, ধৃতি দা আছেন সঠিক বয়সে। তার ইংরেজিও চমৎকার। নকুড় বাবুর চরিত্রে থাকবেন বর্ষীয়ান অভিনেতা সুভাশীষ মুখোপাধ্যায়।
সন্দীপ রায় বলেন, তার বাবা চরিত্রগুলোর ছবি এঁকে পরিচালকের কাজ আরো জটিল করে দিয়েছেন। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে পাঠকের কল্পনাকে জীবন্ত করে তুলে ধরা।

চীনা নিপীড়ন শিবিরে ১০ লাখের বেশি মুসলিম: যুক্তরাষ্ট্র

সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ১০ লাখের বেশি মানুষকে চীন নিপীড়ন শিবিরে আটকে রেখেছে বলে অভিযোগ তুলেছে যুক্তরাষ্ট্র। বেইজিংয়ে উইঘুরসহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের মুসলিমদের গণ–আটকের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে তারা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের এশিয়া নীতির পরিচালক র‍্যান্ডেল শ্রিভারের এই মন্তব্যে বেইজিংয়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান উত্তেজনা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ‘নিপীড়ন শিবির’ কথাটি আন্তর্জাতিক সমালোচনার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল। কারিগরি শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর মাধ্যমে ইসলামি চরমপন্থীদের ঝুঁকি স্তিমিত করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন তিনি।
প্রতিরক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী সচিব শ্রিভার আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় জার্মানির নাৎসি বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য শব্দ ‘নিপীড়ন শিবির’ কথাটি ব্যবহার করেছেন তিনি।
এর আগে বন্দিশিবিরের সাবেক বাসিন্দারা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নির্যাতনের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। শিবিরের প্রতিটি কক্ষে উপচে পড়া মানুষের ভিড়। প্রতিদিনকার পাশবিক নির্যাতনের পাশাপাশি মগজ ধোলাইয়ের কারণে অনেকেই আত্মহত্যায় উদ্বুদ্ধ হয়। কাঁটাতারের বেড়া আর পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে ঘেরা নিপীড়ন শিবিরগুলো বন্দীদের জন্য রীতিমতো বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চীনের সেনাবাহিনীর ব্যাপারে পেন্টাগনে বিস্তারিত এক আলোচনায় শ্রিভার বলেন, ‘চায়নিজ সমাজতান্ত্রিক দলগুলো নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যবহার করে চীনের মুসলমানদের গণহারে গ্রেপ্তার করে বন্দিশিবিরে আটকে রাখছে।’ তাঁর মতে, আটক মুসলিমের সংখ্যা ‘৩০ লাখের কাছাকাছি’ হবে।
ওয়াশিংটনের চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও মুসলমান নাগরিকদের প্রতি চীনের আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন। গত বৃহস্পতিবার শিবিরগুলোকে পুনঃশিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। চায়নিজদের এহেন কর্মকাণ্ড ‘১৯৩০ সালের স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে’ বলে দাবি করেন পম্পেও।
জিনজিয়াংয়ের জ্যেষ্ঠ চায়নিজ কর্মকর্তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন সরকার। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে সীমান্তবর্তী এ বিশাল এলাকায় ঠাঁই মিলেছে উইঘুরসহ অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু মুসলিমদের। মার্কিন যেকোনো অবরোধের বিরুদ্ধে ‘গুনে গুনে প্রতিশোধ’ নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে চীন।
জিনজিয়াং কর্তৃপক্ষ গত মার্চ মাসে ‘নিপীড়ন শিবিরের’ সঙ্গে এলাকাটির তুলনা সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, ‘এটি আর দশটি সাধারণ বোর্ডিং স্কুলের মতোই।’ তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, উইঘুর মা–বাবার ওপর সন্তানের উপাধি পরিবর্তনে বাধ্য করা থেকে শুরু করে তাদের ইসলামি শিক্ষার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে জিনজিয়াং। শুধু নিষেধাজ্ঞাই নয়, তাদের আদেশ অনুযায়ী না চললে শাস্তিও পেতে হচ্ছে চীনা মুসলিমদের।

ভারতে জৈন তরুণ-তরুণীরা কেন দলে দলে সন্ন্যাস বরণ করছে?

"আমি আর কখনই তাকে আলিঙ্গন করতে পারবো না," বিবিসির কাছে তার একমাত্র মেয়ে সম্পর্কে বলতে গিয়ে গলা বুজে আসছিলো ইন্দ্রবদন সিংহির।
আবেগ চেপে রাখার চেষ্টায় অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, "মেয়ের চোখের দিকে আর তাকাতে পারবো না।"
ইন্দ্রবদন সিংহির মেয়ে স্বাভাবিক সাংসারিক জীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাসিনী হওয়ার দীক্ষা নিয়েছে। সেই উপলক্ষে বাড়িতে সেদিন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল । ঘর-সংসার ছেড়ে মেয়ে এখন চলে যাবে আশ্রমে। সন্ন্যাসিনী হয়ে সেখানেই থাকবে।
সংসার জীবনের শেষ কদিনে আত্মীয় স্বজন, বন্ধুরা বাড়িতে এসে দেখা করে যাচ্ছেন মেয়ের সাথে।
২০ বছরের ধ্রুবি আর দশটি মেয়ের মত জীবন যাপন করতো। গান শুনতো। কাছের পার্কে ক্রিকেট খেলতো। বন্ধুদের সাথে রেস্তোরাঁয় খেতে যেত।
ভারতে জৈন ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ৪৫ লাখের মত
কিন্তু সন্ন্যাস বরণের পর, সে আর তার বাবা-মাকে বাবা-মা বলে ডাকতে পারবে না। চুল কেটে ন্যাড়া হতে হবে। খালি পায়ে হাঁটতে হবে। খেতে হবে শুধু ভিক্ষা করে। তাও আবার সব খাবার খাওয়া যাবে না।
আরো কিছু কঠোর বিধিনিষেধ তাকে আজীবন মেনে চলতে হবে - গাড়ি চড়া যাবেনা, গোসল করা যাবে না।, ফ্যানের নিচে শোয়া যাবে না, মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না।
ধ্রুবি সিংহির পরিবার প্রাচীন জৈন ধর্মের অনুসারী। এখনও ভারতের এই ধর্মের ৪৫ লাখ অনুসারী রয়েছে। যারা এই ধর্মের আচার পালন করেন - তাদেরকে ধর্মগুরুর জারি করা কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে জীবন যাপন করতে হয়।
ইন্দ্রবদন সিংহি জানালেন, তাদের একমাত্র সন্তান ধ্রুবি ছোট থেকেই উচ্ছ্বল, বহির্মুখী ছিল। জিনস পরতো। টিভি রিয়েলিটি শোতে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রচণ্ড আগ্রহ ছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছর ধরে সে ধীরে ধীরে ধর্মের দিকে ঝুঁকছিল।
তারপর সম্প্রতি স্বাভাবিক জীবন-যাপন থেকে মুক্ত হয়ে সন্ন্যাসী হওয়ার দীক্ষা নিয়েছে সে।
শুধু ধ্রুবি নয়, তার মতো শত শত জৈন তরুণ-তরুণী পার্থিব জীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাস বরণ করছে। বছরে বছরে তাদের সংখ্যা বাড়ছে, এবং ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এই পথে বেশি যাচ্ছে।
মুম্বাই বিশ্ববিদ্যালয়ে জৈন দর্শন পড়ান ড: বিপিন দোশী। তিনি বলেন, "আগে বছরে বড় জোর ১০ থেকে ১৫ টি দীক্ষা নেওয়ার ঘটনা ঘটতো।" কিন্তু তিনি জানান, গত বছর সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫০। এ বছর সংখ্যা ৪০০ হতে পারে।

কেন এই আকর্ষণ?

জৈন সমাজের নেতারা বলছেন, প্রধানত তিনটি কারণে এটি হচ্ছে: তরুণ বয়সীরা আধুনিক জীবনের চাপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, আধুনিক প্রযুক্তির কারণে ধর্মের শিক্ষা, দর্শন নতুন প্রজন্মের কাছে সহজে পৌঁছুচ্ছে, এবং ধর্মীয় স্থানে সফরের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক তরুণ-তরুণী সন্ন্যাস জীবনের অভিজ্ঞতা নিতে আকৃষ্ট হচ্ছে।

'পিছিয়ে পড়ার ভয়'

ড. বিপিন দোশী বলেন, অতিমাত্রায় যোগাযোগ-নির্ভর যে সমাজ এখন তৈরি হয়েছে, তা অনেক মানুষকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে ফেলছে।
২০ বছরের তরুণী ধ্রুবি (বামে) সন্ন্যাস জীবনে দীক্ষা নিয়েছে
"ইউরোপে কী হচ্ছে, নিউইয়র্কে কী হচ্ছে, সাথে সাথেই আপনি তা দেখতে পারছেন। আগে প্রতিযোগিতা ছিল আপনি যে মহল্লায় বসবাস করেন, তার মধ্যেই সীমিত। এখন প্রতিযোগিতা পুরো বিশ্বের সাথে।"
ফলে, তিনি বলেন, ''পিছিয়ে পড়ার ভয়'' সবসময় মানুষকে তাড়া করছে।
"'আপনি যখন সন্ন্যাস জীবনের জন্য দীক্ষা নিলেন, পার্থিব জীবন বর্জন করলেন, আপনার সামাজিক এবং ধর্মীয় মর্যাদা সাথে সাথে এমন পর্যায়ে উঠে গেল যে ধনী লোকজনও আপনার সামনে এসে মাথা নোয়াচ্ছে।"
ফিজিওথেরাপিস্ট পূজা বিনাখিয়া গত মাসে সন্ন্যাসিনীর দীক্ষা নিয়েছেন। তিনি বললেন, তার জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে।
এর আগে ২৪ ঘণ্টা উদ্বেগের জীবন ছিল পূজার - পরিবারের জন্য উদ্বেগ, বন্ধুদের জন্য উদ্বেগ, নিজের চেহারা নিয়ে উদ্বেগ, পেশা নিয়ে উদ্বেগ। এখন আর তাকে ভাবতে হয়না বন্ধুরা, স্বজনরা তাকে নিয়ে কী ভাবছে, কী চোখে দেখছে।
"এখানে আমরা শুধুই আত্মার পরিশুদ্ধি নিয়ে ভাবি।"

সোশাল মিডিয়া গুরু

দীক্ষা নেওয়ার কয়েকদিন আগে ধ্রুবির কথা ছিল তার গুরুই ''তার কাছে সব''।
"তিনি আমার জগত। তিনি যা বলেন, সেটাই আমার কাছে শেষ কথা।"
নতুন দীক্ষা নেওয়া সব জৈনরাই তাদের গুরুকে নিয়ে, গুরুর কথায় পাগল। ধর্মীয় গুরুরা তাদের শিষ্যদের কাছ শতভাগ আনুগত্য পান।
একটি জৈন আশ্রম
ড. দোশী বলেন, এই প্রবণতা সবসময় এরকম ছিলনা।
"'আগে ধর্মীয় গুরুরা অনেক আত্মকেন্দ্রিক ছিলেন। তাদের নিজেদের আত্মার পরিশুদ্ধি নিয়েই মূলত তারা ভাবতেন। কিন্তু এখন এই ধর্মগুরুরা তরুণ যুবকদের কাছে ধর্মের বানী পৌঁছে দিতে অনেক তৎপর।"
"তারা (গুরুরা) ভালো কথা বলেন, নতুন প্রজন্মের কাছে তারা সহজ সাধারণ একটি জীবনের পথ তুলে ধরেন। তরুণ তরুণীরা তাতে আকৃষ্ট হচ্ছে।"
১০ বছর আগেও জৈনরা তাদের ধর্মীয় বইপত্র পড়তেন শুধু প্রাচীন অর্ধ মগধি এবং সংস্কৃত ভাষায়। কিন্তু এখন অনেক ধর্মীয় বইপত্র ইংরেজিতে অনুবাদ হয়েছে।
"জৈন ধর্মের ইতিহাস নিয়ে শর্ট-ফিল্ম হয়েছে। সোশাল মিডিয়ায় সেগুলো প্রচার করা হচ্ছে। ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।"
মূলত হোয়াটসআ্যাপের মাধ্যমে ছড়ানো এসব শর্ট-ফিল্মে সন্ন্যাস জীবনকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে, ধর্ম গুরুদের 'সুপারহিরো' হিসাবে দেখানো হচ্ছে।
মুনি জিনভটশারিয়া বিজয় মহারাজাসাহেব নামে একজন জৈন ধর্মগুরু নিজে ইউটিউবে বেশ কিছু ভিডিও ছেড়েছেন। ইউটিউবে তার ফলোয়ারের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি।

ধর্মীয় সফর

ধ্রুবি জানায় পাঁচ বছর আগে একটি আশ্রমে গিয়ে কিছুদিন থাকার পর থেকে সে সন্ন্যাস জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হতে শুরু করে।
নতুন সন্ন্যাসিনী ধ্রুবিকে বিদায় দিচ্ছেন তার বাবা
ঐ আশ্রমে গিয়ে কিছুদিন থেকে যে কোনো জৈন, সন্ন্যাস জীবনের অভিজ্ঞতা নিতে পারে। সেখানে খালি পায়ে থাকতে হয়, বিদ্যুৎ নেই, গোসলের ব্যবস্থা নেই। আশ্রমে নির্ভার সহজ এই জীবনযাপনে আকৃষ্ট হচ্ছে অনেকে।
হিতেশ মোতা, যিনি মুম্বাইতে দীক্ষা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, বলেন আশ্রমে গিয়ে থাকাটা প্রশিক্ষণের মত কাজ করে। একেকজনের কয়েকবার করে আশ্রমে গিয়ে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। "ফলে সন্ন্যাস জীবন সম্পর্কে ভীতি, আধুনিক জীবনযাপন ছেড়ে যাওয়ার ভীতি দূর হয়ে যায়।"
গত মাসে মুম্বাইয়ের কাছে নাসিক শহরে এক জৈন আশ্রমে ৬০০ জনের মত তরুণ তরুণী ধর্মীয় সফরে গিয়ে বেশ কিছুদিন ছিল। তাদের কয়েকশ পরে দীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছা জানিয়েছে।
তাদের একজন ১২ বছরের কিশোর হেট দোশী।
ভালো ছাত্র, স্কেটিং চ্যাম্পিয়ন। খেলাধুলো ছেড়ে, কয়েক সপ্তাহ স্কুল বাদ দিয়ে সে আশ্রমে গিয়েছিল। ক'দিনে ১৮ কেজি ওজন কমেছে। কিন্তু ঐ কিশোরের কথা - তার ''হৃদয় আলো দেখেছে''।
"আমার গুরু বলেছেন, এই পার্থিব জগত ভালো নয়। আমি পাপের জীবন থেকে দূরে যেতে চাই। আমি দীক্ষা নিতে চাই। গুরু বলেছেন যত তাড়াতাড়ি করা যাবে, ততই ভালো। আমি ১৫ বছর বয়সের আগেই দীক্ষা নেব।"
হেট দোশীর বাবা-মা তার ছেলের পরিবর্তনে গর্বিত।
কিন্তু অনেক পরিবার শঙ্কিত। যেমন ধ্রুবির বাবা-মা কোনদিনই চাননি তাদের একমাত্র মেয়ে সন্ন্যাসিনী হয়ে যাক।
আনুষ্ঠানিকভাবে পারিবারিক জীবন ত্যাগ করার দিনে ধ্রুবির বাবা মেয়েকে শেষবারের মত আলিঙ্গন করে বলেন, "দু বছর দেখ কেমন যায়। চাইলে তারপর ফিরে এসো।"
শত শত জৈন তরুণ তরুণী পরিবার ছেড়ে সন্ন্যাস জীবন বরণ করছে