Saturday, May 2, 2026

সিএনএন ‘নির্বোধ’, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক’—চটে গিয়ে বললেন ট্রাম্প

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে প্রভাবশালী দুই মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ট্রাম্প সিএনএনকে ‘নির্বোধ’ ও নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক’ বলে আখ্যায়িত করেন। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এসব কথা বলেন। কর্মীদের অবসরকালীন সঞ্চয় সুবিধা বৃদ্ধির এক নির্বাহী আদেশে সই করতে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।

অনুষ্ঠানে নিজের যুদ্ধংদেহী মনোভাব বজায় রেখে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি ইরানকে সামরিকভাবে ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন পড়ি, তারা (ইরান) সামরিকভাবে কত ভালো করছে। আসলে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, তারা শেষ। অথচ আমি নিউইয়র্ক টাইমসে এসব পড়ি আর নির্বোধ সিএনএনে দেখি। আমি সিএনএন দেখি কারণ, শত্রুর গতিবিধি বুঝতে কিছুটা দেখতে হয়।’

ট্রাম্পের অভিযোগ, সংবাদমাধ্যম দুটি এমনভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে যাতে মনে হয় ইরান এ যুদ্ধে ‘জিতছে’। তিনি বলেন, ‘নিউইয়র্ক টাইমস যা করছে তা আমার মতে রাষ্ট্রদ্রোহিতা। আপনারা কলামিস্টদের লেখা পড়লে দেখবেন, এসব ওপরমহল থেকেই শুরু হয়। এটা খুবই ভয়ংকর বিষয়।’

ইরানের সামরিক অবস্থা তুলে ধরে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি এসবে পরোয়া করি না, কারণ সবাই সত্য জানে। আমরা দেশটিকে (ইরান) ধ্বংস করে দিচ্ছি।’

এর আগে নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ড এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছিল যে ইরান যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ‘শক্তি’ হারাচ্ছে। সেখানে যুক্তি দেওয়া হয়, ছোটখাটো কিছু সাফল্য বড় কোনো জয়ে রূপ নিতে পারছে না, বরং এটি ওয়াশিংটনের অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।

তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি

সিএনএন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের লোগো ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প
সিএনএন, দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের লোগো ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ছবি: কোলাজ

ইরানি বন্দর অবরোধে মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ কাজ করছে: ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন নৌবাহিনী ‘জলদস্যুদের মতো’ কাজ করেছেন। ইরানের বন্দরগুলোতে পাল্টা অবরোধ চলাকালে একটি জাহাজ জব্দ করতে চালানো সামরিক অভিযানের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

গতকাল শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা... এটার (জাহাজ) ওপর নামলাম এবং জাহাজটি নিজেদের দখলে নিলাম। আমরা জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি, তেল জব্দ করেছি। এটি অত্যন্ত লাভজনক একটি ব্যবসা।’

উপস্থিত জনতার হর্ষধ্বনির মধ্যে ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা জলদস্যুদের মতো। আমরা অনেকটা জলদস্যুদের মতোই কাজ করছি, তবে আমরা হেলাফেলা করার মতো কিছু করছি না।’

মার্কিন নৌবাহিনীর তৎপরতাকে ট্রাম্প যখন জলদস্যুবৃত্তির সঙ্গে তুলনা করছেন, ঠিক তখনই আইন বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধ এবং সেখান দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর ফি ধার্য করার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হওয়ার পর তেহরান কার্যত এই সমুদ্রপথটি বন্ধ করে দেয়। তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রুট।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা

হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৭ মার্চ ২০২৬
হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৭ মার্চ ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

আড়াই হাজার বছর আগে দক্ষিণ ভারতের বাসিন্দারা দেখতে কেমন ছিলেন

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে গবেষকেরা ছোট্ট একটি ড্রিল মেশিন দিয়ে আড়াই হাজার বছরের পুরোনো একটি দাঁতের এনামেলের অংশ সরানোর কাজ করছেন।

তামিলনাড়ুর মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বলেন, এই দাঁত তাঁদের কাছে থাকা দুটি মানুষের খুলির মধ্যে একটি খুলির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁরা এই খুলি ডিজিটাল–পদ্ধতিতে একটি মুখমণ্ডল পুনর্গঠনে ব্যবহার করেছেন। এ থেকে তাঁরা বোঝার চেষ্টা করছেন, ওই অঞ্চলে হাজার হাজার বছর আগের বাসিন্দাদের চেহারা কেমন ছিল।

গবেষকদের হাতে যে দুটি খুলি আছে, দুটিই পুরুষের। কোন্ডাগাই নামে একটি প্রাচীন সমাধিস্থলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের সময় সেগুলো পাওয়া যায়। কিলাডি থেকে ওই সমাধিস্থল প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। কিলাডি ভারতের একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। সম্প্রতি কিলাডিকে কেন্দ্র করে ওই অঞ্চলে প্রাচীন মানবসভ্যতার নিদর্শন খুঁজে পাওয়া নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনাও শুরু হয়েছে।

তামিলনাড়ু রাজ্যের প্রত্নতত্ত্ববিদেরা বলেন, কিলাডিতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮০ সালের নগরসভ্যতার চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা ভারতীয় উপমহাদেশে মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে সিন্ধু উপত্যকা ঘিরে যে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, সেটিকে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বড় ধরনের সভ্যতা বলা হয়। বর্তমান ভারতের উত্তর ও মধ্যাঞ্চল ঘিরে সিন্ধু সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। এখন পর্যন্ত ভারতে নগর সংস্কৃতি ও নগরায়ণের বয়ান মূলত দেশটির উত্তরাঞ্চল ঘিরে সীমাবদ্ধ।

তবে তামিলনাড়ুর প্রত্নতত্ত্ববিদেরা বলছেন, কিলাডিতে পাওয়া নিদর্শনগুলো প্রথমবারের মতো ইঙ্গিত করছে, দক্ষিণ ভারতেও একটি স্বতন্ত্র প্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল।

প্রত্নতত্ত্ববিদেরা আরও বলেন, কিলাডির মানুষ শিক্ষিত ও উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন ছিলেন। তাঁরা উপমহাদেশের পাশাপাশি বিদেশেও ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন। তাঁরা ইটের তৈরি ঘরে বসবাস করতেন এবং মৃতদেহ কোন্ডাগাইতে সমাহিত করতেন। তাঁরা বিশাল আকারের মাটির পাত্রে মৃতদেহ ভরে ওই পাত্র মাটির নিচে সমাহিত করতেন। মৃতদেহের সঙ্গে মাটির ওই পাত্রে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যেমন খাদ্যশস্য, তৈজসপত্রসহ অনেক কিছু দেওয়া হতো।

এ পর্যন্ত প্রত্নতত্ত্ববিদেরা কোন্ডাগাই খনন করে সেখান থেকে প্রায় ৫০টি এমন মাটির তৈরি শবাধারের সন্ধান পেয়েছেন। সেগুলোতে মানুষের দেহাবশেষসহ আরও কিছু জিনিসপত্র পাওয়া গেছে।

মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা এখন এসব শবাধারে পাওয়া মানব হাড় ও অন্য জিনিসপত্র থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করছেন, যাতে তাঁরা কিলাডির বাসিন্দা কারা ছিলেন এবং তাঁদের জীবনধারা কেমন ছিল, তা নিয়ে আরও ভালোভাবে জানতে পারেন। এ নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান চলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিকস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জি কুমারেসান বলেন, ‘আমরা আমাদের বংশ ও পূর্বপুরুষদের অভিবাসনের পথ বোঝার চেষ্টা করতে চাইছি। আমরা কে, আমরা কোথা থেকে কীভাবে এখানে উপস্থিত হয়েছি, সেই বৃহত্তর প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথে এটি একটি যাত্রা।’

আড়াই হাজার বছরের পুরোনো খুলি থেকে মুখমণ্ডল পুনর্গঠনের কাজটি এমন কিছু সূত্র উন্মোচন করেছে, যা অন্তত এই প্রশ্নের একটি অংশের উত্তর দিতে পারবে বলে মনে করেন এ গবেষক।

অধ্যাপক কুমারেসান আরও বলেন, মুখমণ্ডলগুলোর বৈশিষ্ট্য প্রধানত প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় পূর্বপুরুষদের সঙ্গে মেলে, যাঁরা ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বাসিন্দা ছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। মুখমণ্ডলের বৈশিষ্ট্যগুলোতে ‘মিডল–ইস্ট ইউরেশিয়ান’ এবং ‘অস্ট্রো-এশিয়াটিক’ বংশের ছাপও দেখা যায়, যা প্রাচীনকালের জনগোষ্ঠীর বিশ্বব্যাপী অভিবাসন এবং মিশ্রণের ইঙ্গিত দেয়।

তবে কিলাডির বাসিন্দাদের পূর্বপুরুষ কারা ছিলেন, তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক কুমারেসান।

ফেস ল্যাব

মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা খুলির মুখমণ্ডল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন খুলিগুলোর থ্রি–ডি স্ক্যান তৈরি করার মাধ্যমে। সেই ডিজিটাল স্ক্যানগুলো পরে যুক্তরাজ্যের লিভারপুলের জন মুরস বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ফেস ল্যাবে’ পাঠানো হয়। এই ফেস ল্যাব ফরেনসিক, কাঠামোগত ও বৈজ্ঞানিক নীতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুলির ডিজিটাল মুখমণ্ডল পুনর্গঠনে সিদ্ধহস্ত।

ফেস ল্যাবের বিশেষজ্ঞরা খুলির স্ক্যানে পেশি, মাংস ও ত্বক যুক্ত করতে কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যবহার করেছেন, যাতে মুখমণ্ডলের অবয়ব স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

এরপর বড় চ্যালেঞ্জ হলো ছবিগুলোতে রং যোগ করা। এ ক্ষেত্রে যেমন পুরুষদের গায়ের রং কেমন হবে, তাঁদের চোখের রং কেমন হবে এবং চুল দেখতে কেমন হবে, এ ধরনের কিছু প্রশ্ন সামনে আসে।

আর্য-দ্রাবিড় বিতর্ক

অধ্যাপক কুমারেসান বলেন, বর্তমানে তামিলনাড়ুর মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রেখে রং ব্যবহারের প্রথাগত নিয়ম মেনে চলা হয়েছে। তবে ডিজিটাল প্রতিকৃতি সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে সরব আলোচনা তৈরি হয়েছে।

প্রতিকৃতিগুলো বর্ণ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ঘিরে ভারতীয় সমাজে দীর্ঘদিন ধরে থাকা বিভাজনগুলো সামনে এনেছে।

ঐতিহাসিক বয়ানে আর্যদের (সাধারণত ভারতের উত্তরাঞ্চলে বসবাসকারীদের বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়) ভারতের ‘মূল নাগরিক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাই দ্রাবিড়দের (প্রধানত ভারতের দক্ষিণ রাজ্যগুলোতে বসবাসকারীদের বোঝাতে শব্দটি ব্যবহৃত হয়) এই খেতাব দেওয়া ওই বয়ানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ভারতে উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে বিভাজন দীর্ঘদিনের। অনেকে বিশ্বাস করেন, ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মসহ ভারতীয় সভ্যতা–সম্পর্কিত সবকিছুর উদ্ভব হয়েছে উত্তর ভারত থেকে। পরে দেশের অন্য অংশে তা ছড়িয়েছে।

কিলাডিতে পাওয়া খুলির মুখমণ্ডলের পুনর্গঠন এমন একটি বার্তা দিচ্ছে, যা আরও জটিল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বলে মনে করেন অধ্যাপক কুমারেসান। তিনি বলেন, ‘এখান থেকে আমরা সবাই যে বার্তাটি নিতে পারি, তা হলো আমরা যতটা ভাবি, আমাদের সভ্যতা আসলে তার চেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় এবং এর প্রমাণ আমাদের ডিএনএতে নিহিত।’

ভারতের গবেষকেরা প্রাচীন খুলি থেকে মুখমণ্ডলের অবয়ব দেওয়ার চেষ্টা করেছেন—এমন ঘটনা এটাই প্রথম নয়।

এর আগে ২০১৯ সালে বিজ্ঞানীরা ভারতের রাখিগড়ি সমাধিস্থল থেকে পাওয়া দুটি খুলিতে মুখমণ্ডলের অবয়ব দিয়েছিলেন। তবে সেই স্কেচগুলোতে রং ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনুপস্থিত ছিল। রাখিগড়ি সিন্ধুসভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনসমৃদ্ধ জায়গা।

কিলাডির খুলিগুলো নিয়ে ফেস ল্যাবে যে দলটি কাজ করেছে, তার নেতৃত্বে ছিলেন ক্যারোলিন উইলকিনসন। তিনি বলেন, ‘মানুষ হিসেবে আমাদের চেহারার প্রতি একধরনের মুগ্ধতা রয়েছে। একে অপরের চেহারা চেনা এবং তা ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা একটি সামাজিক প্রজাতি হিসেবে আমাদের সাফল্যেরই অংশ।’ এই গবেষক আরও বলেন, ‘চেহারার এই চিত্রায়ণগুলো দর্শকদের প্রাচীন ধ্বংসাবশেষকে নিছক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে না দেখে মানুষ হিসেবে বুঝতে উৎসাহিত করে।’

কেমন ছিল জীবনযাপন

মাদুরাই কামরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা কিলাডিকে সিন্ধুসভ্যতার মতোই সম্পূর্ণভাবে অধ্যয়ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

অধ্যাপক কুমারেসান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা জানতে পেরেছি, কিলাডির মানুষেরা কৃষি, বাণিজ্য ও পশু পালন করতেন। তাঁরা হরিণ, ছাগল ও বুনো শূকর পালন করতেন এবং প্রচুর পরিমাণে চাল ও ছোট দানাজাতীয় শস্য খেতেন।’

এই গবেষক আরও বলেন, ‘আশ্চর্যজনকভাবে, আমরা এমন প্রমাণও পেয়েছি যে তাঁরা খেজুর খেতেন। যদিও বর্তমান তামিলনাড়ুতে খেজুরগাছ সচরাচর দেখা যায় না।’

কিন্তু অধ্যাপক কুমারেসানের দলের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ হলো কোন্ডাগাইতে পাওয়া মানবকঙ্কাল থেকে পর্যাপ্ত ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা, যেন একটি জিন লাইব্রেরি তৈরি করা যায়।

সেখান থেকে পাওয়া কঙ্কালগুলো অনেকটাই জীর্ণ হয়ে গেছে। সামান্য যে ডিএনএ নমুনা সেখান থেকে পাওয়া গেছে, তার মানও বেশ খারাপ। তবে অধ্যাপক কুমারেসান আশাবাদী, এই প্রচেষ্টা থেকে কিছু ভালো ফল আসবে।

অধ্যাপক কুমারেসান বলেন, ‘প্রাচীন ডিএনএ লাইব্রেরি অতীতকে জানার দ্বার উন্মুক্ত করার মতো। এগুলো অতীতের জীবন কেমন ছিল এবং জীবনকে আমরা কীভাবে দেখছি ও এটি কেমন হতে পারে, সে বিষয়ে চমকপ্রদ উপলব্ধি তুলে ধরতে পারে।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-24%2Fc05pnc6x%2Fold-skulls-found-in-India-1.webp?rect=54%2C0%2C675%2C450&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
তামিলনাড়ুর কিলাডির কোন্ডাগাইয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে পাওয়া একটি খুলির ডিজিটাল প্রতিকৃতি। ছবি: ফেস ল্যাব/লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি

‘ট্রাম্প একজন নির্বোধ’, জ্বালানি তেলের দামে ফুঁসছে ক্যালিফোর্নিয়াবাসী

লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি গ্যাস স্টেশনে নিজের পিকআপ ট্রাকে তেল ভরছিলেন ২৮ বছর বয়সী রাইডার থমাস। চোখেমুখে তাঁর চাপা উত্তেজনা আর ক্ষোভ। পুরো ট্যাংক পূর্ণ করতে তাঁর খরচ হয়েছে ১৩০ ডলার, যা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আগের তুলনায় ৩০ ডলার বেশি।

ক্ষুব্ধ থমাস এএফপিকে বলেন, ‘তেলের দামে আমি যেমন ক্ষিপ্ত, কেন এ দাম বাড়ছে তা নিয়ে তার চেয়েও বেশি রাগান্বিত। ট্রাম্প একজন নির্বোধ, এছাড়া আর কিছুই নয়।’

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে দেশ দুটির হামলা শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে হু হু করে বাড়ছে অপরিশোধিত তেলের দাম।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কাছে ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে। জনমত জরিপ বলছে, অধিকাংশ মার্কিনই এ যুদ্ধকে সমর্থন করছেন না।

থমাসের মতে, ‘এ যুদ্ধের কোনো দরকারই ছিল না। এটি ঠিক ইরাক আক্রমণের মতো, যেখানে শেষ পর্যন্ত কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র পাওয়া যায়নি।’

ট্রাম্প দাবি করে আসছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে এ হামলা জরুরি ছিল এবং এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তবে মার্কিন চাপের মুখেও ইরান বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ করে দিয়েছে।

বিশ্বের মোট তেল–গ্যাসের এক–পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়েই সরবরাহ করা হয়। সরবরাহ কমায় ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি গ্যালন তেলের দাম ৬ ডলার (লিটারপ্রতি ১ দশমিক ৫৯ ডলার) ছাড়িয়েছে, যা যুদ্ধের আগে ছিল সাড়ে ৪ ডলার।

জ্বালানির এ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে খাদ্য ও পোশাকসহ নিত্যপণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সাধারণ মানুষ। গ্যাস স্টেশনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা ডেভিড চাভেজ নামের এক ক্যামেরাপারসন অবশ্য পরিস্থিতির জন্য সরাসরি কাউকে দায়ী করতে নারাজ। সাবেক ডেমোক্র্যাট সমর্থক চাভেজ অভিবাসন ও অর্থনীতি ইস্যুতে জো বাইডেনের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে গত নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছেন।

চাভেজ মনে করেন, তেল কোম্পানিগুলো কৃত্রিমভাবে দাম বাড়াচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনিও ট্রাম্পের ওপর কিছুটা হতাশ।

জ্বালানি তেলের এ লাগামহীন দামের প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায়। তেলের দাম দিতে গিয়ে অনেককে এখন টান দিতে হচ্ছে খাবারের বাজেটে। ৭৩ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত নারী ফ্লো জানান, চড়া দামের কারণে এখন তাঁকে গাড়ি চালানো কমাতে হয়েছে। পেনশনের সামান্য টাকা দিয়ে ঘরভাড়া দেওয়ার পর হাতখরচ চালানোও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফ্লো বলেন, ‘জীবন আগে থেকেই কঠিন ছিল, এখন তা আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।’

তথ্যসূত্র: এএফপি

কাতারের কাছে ৪০০ কোটি ডলারের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে উপসাগরীয় মিত্র কাতারের কাছে ৪ বিলিয়ন (৪০০ কোটি) মার্কিন ডলারের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে ইসরায়েলের কাছে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারের নির্ভুল লক্ষ্যভেদী অস্ত্রব্যবস্থা বা প্রিসিশন ওয়েপন সিস্টেম বিক্রিরও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। গতকাল শুক্রবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কংগ্রেসকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়।

দেখুন, আমরা কতটা ভয়ংকর পৃথিবীতে বাস করছি by শওকত হোসেন

নিউক্লিয়ারবিজ্ঞানী আর্নেস্ট জে মনিজ ওবামার সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সেক্রেটারি ছিলেন। তিনি নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের সহসভাপতি ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। এটি একটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্থা, যার লক্ষ্য মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক পারমাণবিক, জৈবিক ও প্রযুক্তিগত হুমকি কমানো।

ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনে আর্নেস্ট জে মনিজ লিখেছেন, ‘“আ হাউস অব ডিনামাইট” নামের সিনেমাটি এমন এক সময়ে মুক্তি পেয়েছে, যখন পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে এক নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। এর সূত্রপাত ক্রিস্টোফার নোলানের ওপেনহাইমার দিয়ে, আর সামনে আসছে জেমস ক্যামেরনের “ঘোস্টস অব হিরোশিমা”। এসব সিনেমা ও সিরিজ এমন সময়ে আসছে, যখন ৪০ বছরের মধ্যে প্রথমবার বিশ্বের পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা আবার বাড়ছে। এগুলো মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে প্রায় ১২ হাজার পারমাণবিক অস্ত্র আছে এবং যেকোনো সময় একটি ভুল সিদ্ধান্ত বিশ্বব্যাপী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।’

সিনেমায় যা আছে
‘আ হাউস অব ডিনামাইট’ সিনেমাটি দেখে ঠিক এই অনুভূতিই হবে। অস্কার বিজয়ী পরিচালক ক্যাথরিন বিগেলোর নতুন সিনেমা এককথায় ভয়ংকর এক সিনেমা। মাত্র ১৮ মিনিট সময়ের গল্প। প্রশান্ত মহাসাগরের উত্তর-পশ্চিম দিক দিয়ে একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ছুটে আসছে। কেউ জানে না, কে এই ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল। হাতে সময় মাত্র ১৮ মিনিট। এ সময়ের মধ্যে কি ক্ষেপণাস্ত্রটি ধ্বংস করা যাবে? সিনেমায় ঠিক এই ১৮ মিনিটকেই তিনটি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো হয়েছে। যাঁরা ‘রশোমান’ সিনেমাটি দেখেছেন, তাঁদের এভাবে গল্প উপস্থাপনার ভঙ্গিটি জানা। সিনেমাটি মূলত দেখায়, এই ক্ষেপণাস্ত্র কে পাঠিয়েছে, আর এখন কী করা উচিত তা সেনাবাহিনী, হোয়াইট হাউস ও প্রেসিডেন্ট কীভাবে বোঝার চেষ্টা করছে।

এ রকম এক পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেন মূলত একজনই—মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তিনিই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। অথচ কে এই হামলা চালিয়েছে, কেউ জানেন না। প্রেসিডেন্টের সামনে দুটি বিকল্প সিদ্ধান্ত। যেমন ক্ষেপণাস্ত্রটিকে শিকাগোতে পড়তে দেওয়া, যেখানে লাখ লাখ মানুষ মারা যাবে। অথবা নিশ্চিত না হয়েও কোনো এক শত্রু দেশের ওপর পাল্টা পারমাণবিক আক্রমণ চালানো। এর অর্থ আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুরাষ্ট্র মানেই রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়া।

‘আ হাউস অব ডিনামাইট’ সিনেমার নামটিই আসলে একটি প্রতীক। পরিচালক দেখালেন যে আমাদের পৃথিবীটা এক বিশাল বারুদের ঘর, যেখানে হাজারো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে রাখা আছে। আর একটিমাত্র ভুল বোতামে চাপ দিতেই পুরো এই ঘর ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। আমরা সেই ডিনামাইট ভরা ঘরেই বাস করি। তবু প্রতিদিনের জীবনের মতো হাসি, কথা বলি, কাজ করি, যেন কিছুই ঘটছে না।
সিনেমায় দেখা যায়, ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও কীভাবে সংকটের সময় দ্বিধায় পড়ে যান। প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত জানেন না কী করবেন, তিনি স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে পরামর্শ চাইছেন। অন্যদিকে সেনাবাহিনী ও কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত। কেউ বলছেন আঘাত করতে, কেউ বলছেন অপেক্ষা করতে। এই বিশৃঙ্খলা সবাইকে দেখিয়ে দিল, সত্যিকারের সংকটের সময় মানুষ কেমন ভীত ও অসহায় হয়ে পড়ে।
আর মৃত্যু যখন আসন্ন, তখন আসলে মানুষ কী করে। তখন নিজের প্রিয়জনদের কথাই ভাবে। যেমন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মেয়ে শিকাগোতে আছে, যেখানে ক্ষেপণাস্ত্র পড়তে পারে। ফোনে মেয়ে জানায়, সে একা নয়, এক বন্ধুর সঙ্গে আছে। এ কথায় বাবা কিছুটা শান্ত হন। কারণ, অন্তত জানেন মেয়েটি একা একাই হয়তো মরবে না।

ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে, আসছে শহর ধ্বংস করতে—এ রকম এক সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট কীভাবে নেন, সেই প্রক্রিয়াও সিনেমায় বিস্তারিত দেখানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ একটি স্কুলের অনুষ্ঠানে থাকতে ৯/১১ হামলার খবর পেয়েছিলেন। সেভাবেই এ সিনেমাতেও প্রেসিডেন্ট ছিলেন স্টেডিয়ামে শিশুদের সঙ্গে। তাঁকে দ্রুত সেখান থেকে হেলিকপ্টারে তোলা হয়। সেখানে বসে প্রেসিডেন্ট তাঁর সামরিক সহকারীকে জিজ্ঞেস করেন, কী করা যায়? সহকারী তাঁকে ‘নিউক্লিয়ার ফুটবল’, অর্থাৎ পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নিয়ে তৈরি একটি বই দেখান। প্রেসিডেন্ট বইটি দেখে বলেন, এটি যেন রেস্তোরাঁর মেনু পড়ার মতো। সহকারী তখন বলেন, এখানে ‘রেয়ার, মিডিয়াম, ওয়েল-ডান’, অর্থাৎ আক্রমণের তীব্রতার বিকল্পগুলো বলা আছে। আর যদি আঘাত করেন, তাহলে সবচেয়ে শক্ত আঘাত দিন, যেন সব একবারেই শেষ হয়। প্রেসিডেন্ট কি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটা জানতেই সিনেমাটি দেখতে হবে।

আলোচনা, সমালোচনা ও পেন্টাগনের অসন্তোষ
সিনেমার চিত্রনাট্যকার নোয়াহ ওপেনহেইম একজন সাবেক সাংবাদিক, এনবিসি নিউজের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নির্মাতারা পেন্টাগন, সিআইএ এবং হোয়াইট হাউসের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। তাঁরা পারমাণবিক সংকটের সময়ে সরকার আসলে কী পদ্ধতি অনুসরণ করে, তা জানার চেষ্টা করেছিলেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ড্যান কার্বলার, যিনি স্পেস অ্যান্ড মিসাইল ডিফেন্স কমান্ডের কমান্ডার ছিলেন, ছবিটির প্রযুক্তিগত পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছেন।

নেটফ্লিক্সে মুক্তি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সিনেমাটি নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা। মুক্তির পর ছবিটি প্রথম তিন দিনেই নেটফ্লিক্সে ২ কোটি ২১ লাখ বার দেখা হয়েছে। অর্থাৎ নেটফ্লিক্সে টানা প্রথম স্থানে। তবে পেন্টাগন আপত্তি তুলেছে সিনেমার কিছু অংশ নিয়ে। পেন্টাগনের জারি করা একটি অভ্যন্তরীণ মেমোর কথা জানিয়েছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

ছবিতে দেখানো হয় যে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়। প্রতিরক্ষা সচিব চরিত্রটি তখন বলেন, এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সফলতার হার প্রায় ৫০ শতাংশ। এই দৃশ্যের সঠিকতা নিয়েই পেন্টাগন আপত্তি জানিয়েছে। পেন্টাগনের অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, ‘ছবিতে কাল্পনিক ক্ষেপণাস্ত্র বাধাদান ব্যবস্থা লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয়। আমরা বুঝি এটি মূলত দর্শকদের জন্য নাটকীয়তা বাড়ানোর উপায় হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব জগতে পরীক্ষার ফল একেবারেই ভিন্ন।’ তাদের দাবি, মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এক দশকের বেশি সময় ধরে ১০০ শতাংশ সফলতার হার দেখিয়েছে।
তবে চিত্রনাট্যকার নোয়াহ ওপেনহেইম বলেছেন, তাঁরা এ বিষয়ে সম্মানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন। কেননা ছবিতে যা দেখানো হয়েছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দ্য হলিউড রিপোর্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নোয়াহ ওপেনহেইম বলেছেন, ‘আমি নিজে আগে সাংবাদিক ছিলাম। আমার মনে হয়, যাঁরা সরকারে বর্তমানে কর্মরত নন, তাঁরা অনেক বেশি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন এবং কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ ছাড়াই বাস্তবতা তুলে ধরতে পারেন। তাই আমরা এমন ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করেছি, যাঁরা সম্প্রতি পেন্টাগন, গোয়েন্দা সংস্থা বা হোয়াইট হাউসে কাজ করেছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্য ও বিশ্লেষণের ওপর আমাদের যথেষ্ট আস্থা আছে। সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, যাঁরা এই ক্ষেত্রে বহু বছর ধরে কাজ করছেন, তাঁরা বলেছেন, আমরা বিষয়টিকে সঠিকভাবে ধরতে পেরেছি। তাঁরা মনে করছেন, আমরা সেই বাস্তব জগৎটাই তুলে ধরেছি, যা তাঁরা সারা জীবন অধ্যয়ন করেছেন।’

নোয়াহ ওপেনহেইম আরও বলেছেন, ‘আমি অনেক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছি। আমাদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অনেকখানি অসম্পূর্ণ। ছবিতে যা দেখানো হয়েছে, তা বাস্তবতার কাছাকাছি।’

ক্যাথরিন বিগেলো সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমাদের পারমাণবিক প্রতিরক্ষাকাঠামো নিখুঁত নয়। এ ব্যবস্থায় এমন অনেক নারী-পুরুষ আছেন, যাঁরা গোপনে নিরলসভাবে কাজ করেন এবং তাঁদের দক্ষতার কারণেই আমরা নিশ্চিন্তে বসে কথা বলতে পারছি। কিন্তু দক্ষতা মানে এই নয় যে তাঁরা ভুল করবেন না।’

সিনেমার শেষটা নিয়ে অবশ্য আলোচনা-সমালোচনা আছে। অনেকেই শেষটা পছন্দ করেননি। আবার নির্মাতারাও সুপার হিরো ধরনের কিছু করতে চাননি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সিনেমাটির সূত্র ধরে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এটাই ‘আ হাউস অব ডিনামাইট’-এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। বিশেষ করে ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তি নিয়ে আবার আলোচনার প্রেক্ষাপটে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিউ স্টার্ট হলো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি। চুক্তিটি ২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কার্যকর হয়, যার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। নতুন করে এ চুক্তি করার কথা বলা হচ্ছে। এ চুক্তির অধীন সর্বোচ্চ কতটি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র একটি দেশ রাখতে পারবে, কতগুলো উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যবস্থা থাকতে পারে ইত্যাদি ঠিক করা হয়। এসব কারণে সিনেমাটি যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

কেবল বিনোদন নয়, সতর্কবার্তা
ডেমোক্র্যাট এডওয়ার্ড জে মার্কি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি কংগ্রেসের দ্বিপক্ষীয় (সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ উভয়ের) পারমাণবিক অস্ত্র ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণকর্ম–বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের সহসভাপতি। এমএসএনবিসিতে তিনি ২৮ অক্টোবর নিজ নামে একটি লেখা লিখেছেন। শিরোনাম হচ্ছে, ‘আমি একজন মার্কিন সিনেটর, হাউস অব ডিনামাইট আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি করেছে।’

এডওয়ার্ড জে মার্কি লিখেছেন, ‘সিনেমার গল্প আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি করে যে দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। পারমাণবিক বিপর্যয় থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো বিশ্বজুড়ে অস্ত্রভান্ডার কমানো। ছবির শুরু থেকেই বিগেলো এই ভুল ধারণা ভেঙে দেন যে প্রযুক্তি আমাদের সব সময় রক্ষা করবে।’

সিনেমায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রাউন্ড–বেজড ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রগুলো (যা প্রতিরক্ষাব্যবস্থার অংশ) লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয়। তখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী (অভিনয়ে জ্যারেড হ্যারিস) রাগে বলে ওঠেন, ‘মানে, এটা তো একেবারে কয়েন ছোড়ার মতো ব্যাপার! এই ৫০ বিলিয়ন ডলার খরচে এটাই পেলাম!’
আর উত্তরও আসলে সেটাই সত্য। বাস্তবে পরীক্ষাগারে করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা পরীক্ষায় সাফল্যের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ, তা–ও তখন, যখন লক্ষ্য আগেই জানা থাকে, কোনো বিভ্রান্তি বা ভুয়া টার্গেট থাকে না, আর সময় পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু বাস্তব যুদ্ধের সময় এসব শর্ত কখনোই মেলে না। সেখানে প্রতারণা, বিভ্রান্তি, একসঙ্গে বহু ক্ষেপণাস্ত্র, আর মানবিক ভুলও থাকে। অর্থাৎ সিস্টেমটি ভঙ্গুর ও অস্থির।

সিনেটর এডওয়ার্ড জে মার্কি সবশেষে লিখেছেন, ‘বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যকর নয়, বরং তা পারমাণবিক অস্ত্র হ্রাসের পথে বাধা। যুক্তরাষ্ট্র শত শত বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে এসব ব্যবস্থায়, কিন্তু এখনো তা নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করে না। বড় বড় চুক্তি চলছে, লবিস্টরা লাভবান হচ্ছে, জনগণ মিথ্যা আশায় বেঁচে আছে। কিন্তু মূল ধারণাটিই ভুল। প্রতিরক্ষা যত বাড়বে, প্রতিপক্ষ ততই নতুন অস্ত্র তৈরি করবে। সেই অর্থে এই প্রতিরক্ষা প্রচেষ্টাই বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ায়। তাই এই সিনেমাকে শুধু বিনোদন ভেবে চলবে না।’
এটি এক সতর্কবার্তা। সিনেমাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অস্ত্র বাড়ালে নিরাপত্তা বাড়ে না। বাস্তব সমাধান হলো আরও প্রযুক্তি নয়, বরং কম অস্ত্র।

তথ্যসূত্র: ভ্যারাইটি, দ্য গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য হলিউড রিপোর্টার, পিপল, এমএসএনবিসি, ইনডিপেনডেন্ট

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-10-30%2Fu0yym7y4%2FMV5BNTdmZWQyZmYtZjZjNS00NThlLWJkOWYtNGQwNTIxMzJhYjliXkEyXkFqcGc.V1.jpg?rect=473%2C0%2C3269%2C2179&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
আ হাউস অব ডিনামাইট'-এর দৃশ্য। আইএমডিবি