Friday, August 2, 2013

উত্তরাধিকারের রাজনীতি কতটা সফল হবে? by ফকির ইলিয়াস

একটি সরকারের বিদায়ক্ষণ যত ঘনিয়ে আসে, ততই ওই সরকারের পোষ্য আইন-শৃংখলা বাহিনী গা ছেড়ে দেয়। হ্যাঁ, আমি বাংলাদেশের কথাই বলছি। খবর বেরিয়েছে, চলতি মাসেই খুন হয়েছেন ২৪ জন। এর মধ্যে ২৯ জুলাই রাতে পৃথক ঘটনায় খুন হয়েছেন এক যুবলীগ ও এক বিএনপি নেতা এবং এক বাড়ির কেয়ারটেকার। উদ্ধার হয়েছে অজ্ঞাতনামা ১০ জনের মরদেহ। চাঁদাবাজদের হুমকির কারণে চলতি মাসে ঢাকার ৪৮ থানায় জিডি হয়েছে দুই শতাধিক। ছিনতাই যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
কেন এই পরিণতি? এর কোনো জবাব সরকারের শীর্ষজনদের কাছে নেই। বরং তারা ব্যস্ত কথার ফুলঝুরি ওড়াতে। অন্যদিকে খবর আসছে, রাজনৈতিক ও টেন্ডার নিয়ে বিরোধের জের ধরেই যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান ওরফে মিল্কীকে খুন করা হয়েছে। তাকে খুন করার অভিযোগে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছে তিনি ঢাকা যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এইচএম জাহিদ সিদ্দিকী তারেক। আমরা যারা ওই সিসিক্যামেরাটি টিভিতে দেখেছি, তারা ভয় পেয়েছি ভীষণভাবে। এ কোন দেশ? সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরা লোকটি কীভাবে গুলি করছে অবলীলায় এই পবিত্র রমজান মাসে! তাকেও মেরে ফেলা ফেলা হয়েছে ক্রসফায়ারে। বাংলাদেশের বর্তমান মন্ত্রীরা বড় বড় কথা বলেই চলেছেন। দেশের চলমান রাজনীতি নিয়ে এফবিসিসিআই উদ্বেগ প্রকাশের পর এক প্রতিক্রিয়ায় রাজনীতি ব্যবসায়ীদের কাজ নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। প্রশ্ন আসে, দেশটি আসলে তাহলে কার? দেশের ব্যবসায়ীরা তো এই দেশেরই একটি শক্তি। তারা সম্পূরক ধারা। দেশের অর্থনীতি সচল ও চাঙ্গা না থাকলে রাজনীতি অর্থহীন হয়ে পড়তে বাধ্য হয়। এটা নামকরা রাজনীতিকরাও জানেন, বোঝেন। তারপরও তারা এমন বেকুবের মতো কথা বলছেন কেন?
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, আওয়ামী লীগ আগেরবার জয়ী হয়েছে, এবারও জয়ী হবে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হবেন। সম্প্রতি চাঁদপুর সার্কিট হাউসে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন। ভিন্ন চিত্রও আমরা দেখছি। রাজনীতিতে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনে ঢাকাস্থ জাতীয়তাবাদী ঐক্য ফোরাম আয়োজিত ইফতার ও দোয়া মাহফিলে এ কথা বলেন তিনি।
সব মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তারেক রহমান এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশে উত্তরাধিকারের রাজনীতি যে মাথাচাড়া দিয়ে উঁকি দিচ্ছে, তা দেখছে দেশের সাধারণ মানুষ। কিন্তু এই উত্তরাধিকার দেশের উত্তর-প্রজন্মর জন্য কতটা শান্তির হাতছানি দেখাচ্ছে?
আমরা জানি, বাংলাদেশের রাজনীতি একটি জরাজীর্ণ বলয়ে সীমাবদ্ধ। অনেকেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা মুখে বললেও বাস্তবে তারা তা ভয় পান। কারণ একটি জাতি যদি সুশিক্ষিত হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে আর তাদের তাঁবেদার করে রাখা যায় না। তাদের অধিকার কেড়ে নেয়া যায় না। এ কথাটি মনে রেখেই কতিপয় রাজনীতিক এদেশের মানুষকে খাঁচাবন্দি করতে বারবার উদ্যত হচ্ছেন। সময় এসেছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতাকে উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করার।
বলা হচ্ছে, রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা দেড় কোটিরও বেশি। এই চাপ আর কত সইবে রাজধানী ঢাকা? মিরপুর থেকে নয়াপল্টন যেতে যানজটে আটকে থাকতে হয় তিন ঘণ্টা! এটা কোনো মানুষের বসবাসযোগ্য শহর হল! তারপরও বহাল তবিয়তে আছেন ঢাকাবাসী। সাড়ে সাত কোটি মানুষ নিয়ে স্বাধীন হয়েছিল বাংলাদেশ। এই জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি বলা হচ্ছে। সেই প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে দেশে প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা চালু এখন ক্রমেই জনদাবিতে পরিণত হচ্ছে। হ্যাঁ, আমি সাবেক সেনাশাসক এরশাদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে বাধ্য হচ্ছি- বাংলাদেশকে কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করে এই জনচাপ কমানো হোক। মানুষের উন্নয়নকে দোরগোড়ায় পৌঁছ দেয়া হোক।
আমরা ইতিমধ্যে জেনে গেছি, বিএনপি নতুন ইশতেহারের রাজনীতি নিয়ে মাঠে নামবে ঈদের পরই। এই ইশতেহার দু’ভাগে বিভক্ত। এক. সরকারকে তত্ত্বাবধায়ক প্রথায় বাধ্য করা। আর অন্যটি ‘নতুন ধারা’র রাজনীতির কথা বলে মানুষকে কাছে টানা। এই নতুন ধারার কথা বলেই কিন্তু বাংলাদেশে ‘হাওয়া ভবন’ তৈরি হয়েছিল। এই ভবনের নেপথ্যে কারা ছিল তা দেশবাসী ভুলে যাননি। অন্যদিকে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ভিশন-২০২১’-এর বাণী শুনিয়েই বর্তমান সরকার ব্র“ট মেজরিটি পেয়েছিল।
এই ডিজিটাল স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করেছে পদ্মা সেতু কেলেংকারি, হলমার্ক, ডেসটিনি, শেয়ারবাজার, রেলের কালোবিড়াল, সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড, ইলিয়াস আলী গুম- এমন আরও কত ঘটনা! কেন পারলেন না বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা এসব সামাল দিতে? কেন পারলেন না যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করতে?
এটা নিশ্চিত, কতিপয় মৌলবাদীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে বিএনপি বড়জোর ক্ষমতায় যেতে পারবে। আবারও রাজাকাররা রাষ্ট্রীয় গাড়িতে পতাকা ওড়াতে পারবে। কিন্তু প্রজন্মকে আলোর পথ দেখাতে পারবে না। মুখে যাই বলা হোক না কেন- নারী গার্মেন্ট শ্রমিকের কাজ বন্ধ করে কি চালানো যাবে বাংলাদেশ? না, যাবে না। তাহলে যারা ‘তেঁতুল তত্ত্ব’ বিতরণ করছে, তাদের ঘাড়ে বড় দলগুলো সওয়ার হওয়ার এই প্রতিযোগিতা কেন করছে?
বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। তাই বাংলাদেশের প্প্রজন্মর বসে থাকার সুযোগ নেই। শিক্ষিত প্রজন্মকে লেজুড়বৃত্তি বাদ দিয়ে আলোর সন্ধানে এগিয়ে যেতে হবে। উপড়ে ফেলতে হবে সব অপশক্তির ভিত। এই দেশ গণমানুষের। যারা উত্তরাধিকারসূত্রে মসনদ পাওয়ার খায়েশ দেখাচ্ছেন- তাদের বলে দিতে হবে, আপনারা রাজনীতি করুন দেশের কল্যাণ চিন্তা করে। দখলদার কিংবা ভোগবাদীদের দুর্বৃত্তপনার জন্য ৩০ লাখ শহীদ তাদের প্রাণ উৎসর্গ করেননি। পাঁচ সিটি নির্বাচনে গণমানুষ তাদের ভোটাধিকারের ক্ষমতা দেখিয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তারা তা দেখাবে। তারা কার গলায় জয়মাল্য দেবে তা সময়ই বলবে।
ফকির ইলিয়াস : যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসী কবি, সাংবাদিক

গাড়ির চতুর্থ চাকা by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমার প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা,
আজকের দিনটি তোমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি- একই সঙ্গে এটি সবচেয়ে আনন্দেরও একটি দিন। আমার অনেক বড় সৌভাগ্য যে তোমাদের এই আনন্দের দিনটিতে আমি তোমাদের সঙ্গে কিছু সময় কাটাতে পারছি। আমাকে এ সুযোগটি দেয়ার জন্য তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নেই। তোমরা যে রকম তোমাদের জীবনের প্রথম সমাবর্তনে এসেছ, আমিও ঠিক সে রকম আমার জীবনের প্রথম সমাবর্তন বক্তা হিসেবে এসেছি। সমাবর্তন নিয়ে তোমাদের মনের ভেতর যে রকম আগ্রহ ও উদ্দীপনা, তোমাদের সামনে কয়েকটি কথা বলার জন্য আমার ভেতরেও ঠিক একই আগ্রহ ও উদ্দীপনা। তোমাদের আমি কোনো উপদেশ দেব না, তোমাদের কোনো নীতিকথাও শোনাব না, আমি তোমাদের হয়তো কয়েকটি কথা স্মরণ করিয়ে দেব। তার পাশাপাশি আমি আমার এই দীর্ঘজীবনে যে কয়টি সত্য উপলব্ধি করেছি, তোমাদের সেই কথাগুলো বলার চেষ্টা করব। কয়েক যুগ পর তোমরা হয়তো নিজেরাই এই সত্যগুলো উপলব্ধি করতে, আমি মাঝখানের সেই দীর্ঘ সময়টুকু শর্ট সার্কিট করে দিচ্ছি মাত্র- তার বেশি কিছু নয়। তোমরা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে জীবনের পরের ধাপে পা দিতে যাচ্ছ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় চলে আসার কারণে দেশের সবাই এখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়ায় কত খরচ হয় তার একটা ধারণা পেয়ে গেছে। সেই তুলনাটি থেকে তোমাদের ধারণা হতে পারে তোমরা বুঝি খুব অল্প খরচে একটা ডিগ্রি পেয়েছ- সেটি কিন্তু সত্যি নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটকে তোমাদের সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে তোমাদের লেখাপড়ার খরচটুকু বের হয়ে আসবে এবং আমি বাজি ধরে বলতে পারি সেই পরিমাণটুকু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ থেকে কোনো অংশে কম নয়- বরং বেশি হলে আমি অবাক হব না। তোমাদের পেছনে এই খরচটুকু করেছে সরকার। সরকার এই অর্থটুকু কার কাছ থেকে পেয়েছে? পেয়েছে এই দেশের চাষীদের কাছ থেকে, শ্রমিকদের কাছ থেকে, খেটে খাওয়া মানুষদের কাছ থেকে। আমি তোমাদের শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই, এ দেশের অনেক দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ হয়তো তার নিজের সন্তানকে স্কুল-কলেজ শেষ করিয়ে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত পাঠাতে পারেনি, কিন্তু তার হাড়ভাঙা খাটুনির অর্থ দিয়ে তোমাদের লেখাপড়া করিয়েছে। এখন তোমরাই ঠিক কর তোমাদের এই শিক্ষাটুকু দিয়ে তোমরা কার জন্য কী করবে!
কিছুদিন আগে খবরের কাগজের একটি প্রতিবেদন চোখে আঙুল দিয়ে আমাকে একটি সত্য নতুন করে জানিয়ে দিয়েছে। সত্যটি হল আমাদের দেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে গেছে আর এই এগিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে দেশের তিন ধরনের মানুষ। প্রথমত গার্মেন্ট শ্রমিক- যাদের সহস্রাধিককে আমরা সাভারে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছি। দ্বিতীয়ত প্রবাসী শ্রমিক- যারা নিজের আপনজনকে দেশে ফেলে নির্বান্ধব পরিবেশে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে এবং তৃতীয়ত এই দেশের কৃষক- যাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার জন্য আমরা আমাদের ভাষায় ‘চাষা’ নামক একটা শব্দ তৈরি করে রেখেছি। আমি রীতিমতো ধাক্কা খেয়েছি যখন আবিষ্কার করেছি- যারা এ দেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে আমি তাদের কেউ নই, তাদের কারও সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই- আমি তাদের জন্য কখনও কিছু করিনি। আমার মনে হয়েছে আমি বুঝি এই দেশের বোঝা। এ দেশের গার্মেন্টের মেয়েরা, প্রবাসী শ্রমিকরা আর মাঠ-ঘাটের চাষীরা আমাকে সুন্দর একটা জীবন উপহার দিয়েছে- প্রতিদানে আমি তাদের কিছু দিইনি।
আমি তখন নিজেকে বুঝিয়েছি, দেশের অর্থনীতিকে এখন গার্মেন্টের মেয়েরা, প্রবাসী শ্রমিক ও চাষীরা সচল রেখেছে, তারা একটি গাড়ির তিনটি চাকার মতো- গাড়িটি সত্যিকারভাবে ছুটতে পারবে, যখন তার সঙ্গে চতুর্থ চাকাটি জুড়ে দেয়া হবে। সেই চতুর্থ চাকা কোনটি? তোমরা হচ্ছ সেই চতুর্থ চাকা, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বলীয়ান আমাদের নতুন প্রজন্ম। আমি বুভুক্ষের মতো অপেক্ষা করে আছি তোমাদের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা নিয়ে কখন তোমরা এ দেশের শ্রমজীবী মানুষের পাশে এসে দাঁড়াবে। কখন মানুষের শরীরের ঘাম অপসারিত হবে মস্তিষ্কের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে। তোমরা কি জানো, এটি তোমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়? তোমরা কি জানো, তোমাদের চোখে রয়েছে রঙিন চশমা, আমাদের চোখে যেটি একেবারেই সাদামাটা তোমাদের চোখে সেটিই বিচিত্র বর্ণে উজ্জ্বল? তোমরা কি জানো, এখন তোমাদের জীবনকে উপভোগ করার সময়?
তোমরা কি জানো, জীবনকে কিভাবে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করা যায়? তোমাদের সবারই নিশ্চয়ই এ বিষয়ে নিজের একটা ভাবনা আছে- আমি তোমাদের সঙ্গে আমার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া আমার ভাবনাটুকু বিনিময় করি। নিজের জন্য যখন কিছু একটা করি, তখন অবশ্যই আমাদের এক ধরনের আনন্দ হয়। কিন্তু তার থেকে শতগুণ বেশি আনন্দ হয় যখন আমরা অন্যের জন্য কিছু করি। তোমাদের ভেতর যারা বন্যাপীড়িত মানুষের কাছে গিয়ে তাদের হাতে একটুখানি ত্রাণ তুলে দিয়েছ, তখন তাদের মুখে যে হাসিটুকু দেখেছ আমি জানি সেটি তুমি কখনও ভুলবে না। তুমি যখন রক্ত দিয়েছ, সেই রক্তের ব্যাগ থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত গিয়ে যখন একজন মুমূর্ষু বিবর্ণ রোগীর মুখে জীবনের স্পন্দন দিয়ে এসেছে, আমি জানি তুমি সেই আনন্দের কথা কখনও ভুলতে পারবে না। তুমি যখন তোমার ক্যাম্পাসের পথে-ঘাটে পাতা কুড়ানো হতদরিদ্র শিশুটিকে বারান্দায় বসিয়ে বর্ণ পরিচয় করিয়েছ, তুমি নিশ্চয়ই সেই আনন্দটির কথাও কখনও ভুলতে পারনি। যখন গণিত অলিম্পিয়াডে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের সাহায্য করেছ, তখন তাদের উজ্জ্বল চোখের দৃষ্টিটি নিশ্চয়ই তুমি ভুলতে পারনি। যারা এখনও সেই তীব্র আনন্দের স্বাদ উপভোগ করনি, তাদের আমি মনে করিয়ে দিতে চাই- জীবনটিকে একেবারে কানায় কানায় উপভোগ করার এখনই সময়। অন্যের জন্য কিছু করে জীবন উপভোগ করার এই পথটুকুর সন্ধান পেতে আমার অনেক সময় পার হয়ে গিয়েছিল- আমি কিন্তু তোমাদের অনেক আগেই বলে দিয়েছি!
আমার এই দীর্ঘজীবনে আমি অনেক মানুষকে দেখেছি, অনেকের সঙ্গে আমার কাজ করার সুযোগ হয়েছে, সবাইকে নিয়ে আমি অনেক কিছু করেছি। আমার এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে আমি খুব সোজাসাপ্টা একটা বিষয় আবিষ্কার করেছি; সেটি হচ্ছে পৃথিবীর মানুষ দুই রকম। এক ধরনের মানুষের সবকিছুতে উৎসাহ, সব সময়ই তারা নতুন কিছু করার জন্য ব্যস্ত। সব সময়ই তারা কিছু না কিছু করছে, একশটা জিনিস করতে গিয়ে তারা অনেক সময়ই ঘোট পাকিয়ে ফেলছে, সমস্যায় পড়ে যাচ্ছে- তারপরও তাদের উৎসাহে কোনো অভাব নেই। অন্য ধরনের মানুষের কোনো কিছুতে উৎসাহ নেই, তারা নিষ্পৃহ, তাদের তাপ-উত্তাপ নেই। তারা নতুন কিছু করে না, তাই তাদের জীবনে ভুলও হয় না। তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে উত্তেজনা নেই, উচ্ছ্বাস নেই।
আমি তোমাদের আরও একটি সত্যের সন্ধান দিয়ে যাই- এই পৃথিবী, দেশ কিংবা সমাজটাকে চালায় প্রথম গোষ্ঠী, যাদের সবকিছুতে উৎসাহ! পৃথিবীর যত বড় কাজ, সব করেছে এই উৎসাহী প্রজন্ম। তোমাদের ভেতর যারা এই উৎসাহীদের দলে, আমি জানি তোমাদের অতি উৎসাহের কারণে অনেক সময় তোমার ক্ষতি হয়েছে, অনেক গুরুজন তোমাকে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে নিষেধ করেছেন, ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে তোমরা অনেকবার বিপদে পড়েছ। আমি তোমাদের আশ্বস্ত করতে চাই, দেখবে তোমরাই কিন্তু সব কিছুতে নেতৃত্ব দেবে, তোমার অঙ্গুলি হেলনে সবাই তোমার পেছনে এসে দাঁড়াবে। তোমাদের ভেতর যারা উৎসাহকে রাশ টেনে নামিয়ে সতর্কভাবে পা ফেলেছে, উৎসাহী বন্ধুদের একশ’ রকম কাজ দেখে বিরক্ত হচ্ছে, সমালোচনা করেছে- তাদের বলে রাখি, এই উৎসাহটুকুই কিন্তু সফল আর অসফল মানুষের মাঝখানে বিভাজন। তোমরা ঠিক কর মাপা উৎসাহ নিয়ে বিভাজনের নিচে দাঁড়াবে নাকি তীব্র উৎসাহের বান ডাকিয়ে বিভাজনের উপরে গিয়ে দাঁড়াবে।
আজ তোমাদের ছাত্রজীবনের একটি অংশের সমাপ্তি হয়েছে। নিজের মূল্যায়ন করতে গিয়ে তোমাদের অসংখ্যবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে। সেই পরীক্ষায় তুমি তোমার সহপাঠীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নেমেছ। সেই প্রতিযোগিতায় তোমরা কেউ কেউ তোমাদের সহপাঠীদের পেছনে ফেলে এগিয়ে গিয়েছ। আমি তোমাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, সত্যিকারের জীবন কিন্তু প্রতিযোগিতার জীবন নয়। সত্যিকারের জীবন হচ্ছে সহযোগিতার। সত্যিকার জীবনে তোমরা যখন সত্যিকারের কাজ করবে, তখন তোমরা একে অন্যের সঙ্গে পাশাপাশি থেকে সাহায্য করবে। সেখানে কোনো প্রতিযোগিতা নেই। প্রতিযোগিতা শুধু একটি জায়গায় থাকে- সেটি হচ্ছে নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। তুমি এখন যা, দেখি তুমি এক বছর পর সেখান থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পার কি-না। তোমরা এই দেশের নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাচ্ছ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মশালটি এখন তোমাদের হাতে। তোমরা কর্মজীবনে কী কর তার ওপর নির্ভর করবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম। তাই তোমাদের আকাশছোঁয়া স্বপ্ন দেখতে হবে। বড় স্বপ্ন না দেখলে বড় কিছু অর্জন করা যায় না। এ দেশটি তরুণদের দেশ। বায়ান্ন সালে তরুণরা এই দেশে মাতৃভাষার জন্য আন্দোলন করেছে, রক্ত দিয়েছে। একাত্তরে সেই তরুণরাই মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধ করেছে, অকাতরে রক্ত দিয়েছে। আমাদের দেশটি এখন যখন পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে যাচ্ছে, আবার সেই তরুণরাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে। তোমরা সেই তরুণদের প্রতিনিধি- তোমাদের দেখে আমি অনুপ্রাণিত হই, আমি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি।
তোমাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা- ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার জন্য আমাকে নতুন একটা সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল : লেখক; অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

লুনার কাছে চিঠি by সাগুফতা শারমীন তানিয়া

সারাটা দুপুর নিঃশব্দে জাম ঝরবার সময়। সারা দুপুর শরশর শব্দে পেকে হলদে হয়ে যাওয়া পাতা ঝরে জানালার শার্সিতে। এই গাছগুলোর নাম প্লেইন ট্রি, আমি বাংলা করেছিলাম সরলগাছ, দ্বিজেন (শর্মা) কাকা বলেছিলেন এগুলো সরল গাছ না। এসব তাহলে জটিল গাছ। কাণ্ডে অনেক রং। হুইসলারের কালার প্যালেটের রং। লুনা, এসব দিনে বাসায় থাকতে থাকতে হঠাৎ কোনো বেলি-ড্যান্সারের পেটের ওপর শুয়ে থাকতে ইচ্ছা করে। তুলতুলে কোমল মেদ মাখানো সমুদ্র-সফেন পেটে। কোনো অচেনা মহিলার পিছু পিছু চলে যেতে ইচ্ছা করে, যার গায়ে স্টেইন্ড গ্লাসের মতন চকচকে রঙিন সব লজেন্সের গন্ধ। আমাকে শেখানো হয়েছে শব্দটা লজেন্স নয়, শব্দটা লসেঞ্জ। কিন্তু আমার যার পিছু নিতে ইচ্ছা করে তার গায়ে লজেন্সের গন্ধ। লুনা, তোর জন্য আমি একটা সাবানের বাক্স কিনেছিলাম। বাক্সটার গায়ে অনেকগুলো বেগনি প্রজাপতি আর রুপালি জোনাকি আর অস্পষ্ট ইংরেজিতে কী সব লেখার ভান করা। বাক্সটায় সুরের চাবি আছে, চাবি ঘুরালেই চাইকভস্কির ‘সোয়ান লেক’ বাজতে থাকে। একদিন রাতে ‘সামার ইন্টারলুড’ দেখে আমি কেঁদেছিলাম, আমার বুকে বরফের ছুরি ঢুকে গেছিল। সেই রাত্রি আমি কতকাল আগে ফেলে এসেছি। সে রাতে শোনা সোয়ান লেক।
এখন একলা টয়লেটের ছায়াময় অন্ধকারে আমি চাবি দিয়ে সাবানের বাক্সটা বাজাই, রাজহাঁস-প্রজাপতি আর জোনাকি একাকার হয়ে যায়, উড়তে থাকে, ঘুরতে থাকে। সামার ইন্টারলুডের চেয়ে আমার সে বয়সে অনেক ভালো লেগেছিল ‘ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজ’, আমার ভেতরটা খুশিতে চমকে উঠেছিল যখন আইজ্যাকের প্রায়-যান্ত্রিক ডাক্তার ছেলেটা সরল স্বীকারোক্তিতে তার ভালোবাসা জানিয়েছিল। লুনা, কবেকার হুমায়ুন ফরীদির একটা চিৎকার মনে পড়ে আমার, ‘বেলায়েত! এটাই হয়তো সুস্থ অবস্থায় তোকে লেখা আমার শেষ চিঠি’... বা এই জাতীয় কিছু। কার লেখা নাটক মনে নেই, সুবর্ণা ছিল, স্যানাটোরিয়াম থেকে পালিয়ে আসা তরুণী, যে বিশ্বাস করত সে হুমায়ুন ফরীদির স্ত্রী। মনে হয় রাবেয়া খাতুনের লেখা গল্প। এ রকম একটা মুভি দেখেছিলাম পরে, অতল জলের আহ্বান। আমাদের এখানে দলবেঁধে ধূসর মেঘ চলেছে উত্তরে। ধোঁয়ার মতন রং তাদের। উত্তরের বাতাস আছড়ে পড়ছে ক্রমাগত জটিল গাছগুলোর গায়ে, পাতা খসানোর সময় শুরু হয়ে গেছে। বিছুটি গাছে ভরে গেছে বাগান। আর গোলাপ মরতে শুরু করেছে। রান্নাঘরের জানালা দিয়ে পাতাঝরা দেখতে দেখতে আমারও মাঝেমধ্যে চিৎকার দিতে ইচ্ছা করে, ‘বেলায়েত!’ নাই-বা তাহার অর্থ হোক/ নাই-বা বুঝুক বেবাক লোক...
২. আমার ছেলে কুশান আমার ২৩ বছর বয়সের ছবি বুকে নিয়ে সারা বাড়ি ঘুরছে, এটা নাকি তার মায়ের ফটো। আমি ছবির ফ্রেমটা কেড়ে নিই, ২৩ বছরের আমি আম্মার লালপেড়ে শাড়ি পরে রোদে দাঁড়িয়ে আছি, ওই মেয়েটা কিছুতেই কুশানের মা নয়, তার শয়নে-স্বপনে-জাগরণে কুশানাকার কিছুই ছিল না। ‘ইচ্ছে হয়ে ছিলি’ এসব ফালতু কথা। কে বোঝাবে! মাথা দুলিয়ে কুশান আবার বলে, ‘ইটস মেমে’ (মেমে মানে মা)। একটা হরর স্টোরিতে পড়েছিলাম এক যুবকের কথা, অল্প বয়সে বাপ-মা হারিয়ে বড় হয়ে এক আধা শহরে কাজে যায়, কাজ শেষে মফস্বলি এক সিনেমা হলে ঢোকে। একসময় আবিষ্কার করে তার পাশে এসে বসেছে এক তরুণ। বিস্ময়করভাবে তার মুখ চেনা (বাবার মুখ)। তরুণটির সঙ্গে সে অদ্ভুত আকর্ষণবশে তার বাড়ি যায়, অবশ্যম্ভাবীভাবে আবিষ্কার করে তার তরুণী মাকে। খুব সহজ যত্নে তারা যুবকটিকে খেতে দেয় গরমকালের তরমুজ। সে ভেবে পায় না এই যুবক সন্তানকে এরা এত সহজে নিচ্ছে কী করে, এরা তো একে দেখেইনি কখনো। অথচ কত মমতায় হাত-মুখ ধুয়ে আসতে বলল, কী আত্মীয়তার সুরে তার সঙ্গে চিরপরিচিতের মতন করে কথা বলল। পরবাস ওই রকম, দূরে চলে যাওয়া কাছের মানুষকে আরেক রকম করে দেখা, চিরপরিচয়ের সুর বাজে, কিন্তু সে সুর সুদূর মেঘের ধ্বনির মতন। সংগীতহীন। স্বরলিপিহীন।
৩. নিজের ভেতরে সুতোকাটুনি, ভাবনাদের অনর্গল নির্গত রূপ কাটা-সুতোর মতনই। প্রলাপের মতন। একরকমের একরৈখিক মনোলগ, যার গন্তব্য নিয়ে রেখা স্বয়ং ভাবিত নয়, প্রবৃত্তিতাড়িত হয়ে ছুটে চলাই তার কাজ। লুনা, উদ্দেশ্য বিধেয়বিহীন, উৎসববিহীন, আনন্দবিহীন, পরিকল্পনাবিহীন একটি দোলকের মতন শূন্যে দোলায়মান জীবন চাই আমার, যেখানে কোনো দিন মনে পড়বে না ‘খেতে আসো’ ডাক, কোনো দিন মনে পড়বে না মহামাতৃকুলের হালুয়া বানানোর রাত্র -প্রিয়জনের কাছে ক্ষমা চাওয়া, কোনো দিন মনে পড়বে না আরেকটা অনাগত সুন্দর বছরের প্রতীক্ষা।
৪. ঘুমন্ত মাথায় ছলাৎ ছলাৎ করে এসে লাগে ছোট ছোট জাগৃতির ঢেউ, ওয়াটার কালারে করা ছবির শুকিয়ে আসার মতন দুনিয়াটা পষ্ট হতে থাকে, আর্থার মিলার সেই রকম সময়ে সকালবেলা চোখ না খুলেই হাত বাড়িয়ে দেখতেন পাশে স্ত্রী আছেন কি না। ৮০ বছর বয়সে তিনি বলেছিলেন, ‘ঈশ্বরের জন্য আমার মাথায় একটু ফাঁকা স্থান ছেড়ে দেওয়া আছে। আমি তাঁকে বিশ্বাস করতাম, যদি তিনিও আমাকে...’ মায়া সভ্যতার বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী দিন গড়ায় আমার। সকাল শেষ হয় না। দুপুর প্রায় শালগ্রামশিলার মতো স্থাণু। আর সন্ধ্যার আলো থাকে গভীর রাত অব্দি (অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থায়ী জোনাকি নীল)। আমি আমার কররেখার মতন করে শুধু একটা দিনকে জানি। যেদিন আমি আত্মহত্যা করব।সেদিন কী দিয়ে সকালের নাশতা খাব। কেমন অবলীলায় কর্নারশপে মৃতপ্রায় শাকসবজি—আর পুরোনো মাশরুমের কোঁচকানো স্তনবৃন্ত পার হয়ে যাব। রেলগাড়ির জানালা দিয়ে ধূসর আকাশে দেখব ধূসর ডানার চিল (হায় চিল)। ঈশ্বর আমাকে পরিত্যাগ করার সুযোগ পাবেন না সেদিন,
তার আগে আমি পরিত্যাগ করব তাঁকে। শুধু জানি না লুনা, শেষবারের মতন আমার কার মুখ দেখতে ইচ্ছা হবে। আমার প্রিয়তম মুখগুলোর তো কোনো মুখই ছিল না। মুখচ্ছবি দিয়ে আমি তাদের চিনি নাই, শুধু আমার জন্য তারা তাদের ভ্রুকুটি ফেলে গেছে। আমি কি গুনগুন করব? কারও জন্য খুব দুঃখ হবে আমার? আচ্ছা আমার কি তাহলে কবর হবে, লুনা? সাইপ্রাসের ফিসফিস, ছায়াচ্ছন্ন কবর। চাপচাপ অন্ধকারে পোকামাকড়েরা আমার হূদয়—আমার হূদয়ে ফেলে যাওয়া ভ্রুকুটি, আলোর ঝালর সব খেয়ে ফেলতে থাকবে? না না, তার চেয়ে দাহ করা হোক আমাকে। আমার ছাই ফেলে দিয়ে আসবি তুই, প্রিয় কোনো বাগানে। কিন্তু আমার প্রিয় বাগানও যে অসংখ্য—সব ভস্মে চিহ্নিত করে দিয়ে যেতে চাই। আচ্ছা, এত কিছু ‘আমার’ ভেবে নিয়ে মরে যাওয়া কি ঠিক হবে? প্রতারণা হবে না? লুনা? (তার চেয়ে এই ভালো—ফেসবুক খুলে দেখি তুই লিখে রেখেছিস—‘ওই আমারে তোর সুইসাইড নোট দেখা। একা একা লিখতে পারি না, তোরটা দেইখা দেইখা লিখমু!’)
৫. বাইরে অনেক কিছু হবে লুনা। ঘাস বড় হতে হতে শিষ ধরবে। গোলাপের দিন ফিরবে। ধুলার দিন। আমি আবার আগের মতন কাঁথার ভেতরে—সিলিং ফ্যানের শব্দের ভেতরে—মাথার ভেতরে নিমজ্জমান হতে হতে ‘হামারি বহু অলকা’ দেখব, তারপর চিত্রনায়িকা রেখার দুই বেণীর নাচন দেখব—‘আউঙ্গি এক দিন আজ যাউ’... আর আমি সব চিন্তাকে কাঁথার মতন ভাঁজ করে, সিলিং ফ্যানের মতন ডিসম্যান্টেল করে তলিয়ে যেতে থাকব। ‘যেখানে আনন্দ অধীন নয়, বিষাদেও অধিকার নাই...’
৬. আমাদের বাড়ির রাস্তার নাম জেন অস্টেনের এক বিখ্যাত নায়িকার নামে—একটা কানাগলিতে। কানাগলি গোল হয়ে ঘুরে এলে তার নাম হয় কাল-ডে-স্যাক। কিন্তু কানাগলি যদি চলতে চলতে অবশেষে নাকের ডগায় গুঁতো খায় একটা অনতি উচ্চ দেয়ালে, যেখানে উঁকি দিচ্ছে বিছুটির ফুল আর দোল খাচ্ছে চোরকাঁটার মাথা—তাহলে? গলির মুখটা কি তখন বোকা বোকা হবে? গলি তখন বিচলিত চোখে ইতিউতি তাকাবে? বিয়েবাড়িতে ছোটবেলায় আমাদের মুখ যেমন হতো, তেমন? এসব ভাবনা শেষ করে ফেসবুকে কাউকে পাস্তা কারবোনারা বানানো শিখাই, নিজে মানকচুর জিলাপির ছবিতে লাইক দিই। তোকে অনলাইনে খুঁজি লুনা। তুই কবে আসবি, কবে ছুটি। রৌদ্রের দিনে আবার বাগানে আসি, আমি আর কুশান খুঁজে পাই করোটি আকারের কালো পাথর আর বৃক্কের দৈর্ঘ্যচ্ছেদের মতন দেখতে নুড়ি। পাখি আসে আমাদের বাগানে। ইংরেজিতে একটা উপমা আছে, ‘নেকেড অ্যাজ আ জে-বার্ড।’ জে-বার্ডরা নগ্ন শুধু, আর সব পাখির পরনে কাপড়? ম্যাগপাইদের দেখলে অবশ্য মনে হয় আঁটসাঁট কর্সেট পরে আছে। আমার ছেলে আমাকে পাথর উপহার দেয় কেবল, গোলালো, পলিশ করা, ছোট ছোট নানা রঙের পাথর, তার বিস্ময়ের আকার হলো পাথরের মতন।
আর তার উপহার হলো ফুল—এমনি ফুল না। ঘাসে গজিয়ে ওঠা ডেইজি।  সাদা পাপড়ি। হলদে পরাগমণ্ডলী। (শিউলি ফুলকে মনে পড়িয়ে দেয় কেন জানি না। কোথায় পড়েছিলাম শিউলির নাম ফ্লাওয়ার অব স্যাডনেস।দেখলেই সে উবু হয়ে তুলতে লেগে যায়, ঘোষণা দেয় মায়ের জন্য তুলছি। মায়ের জন্য তোলে বটে, কিন্তু মায়ের হাতে দিতে ভুলে যায় মাঝে মাঝে। পকেটে রেখে দেয়, আমি তার জ্যাকেট ঝাড়তে গিয়ে আবিষ্কার করি পকেটে কবেকার দলিত শুষ্ক ডেইজি। দিকনির্দেশহীন ভালোবাসা হলো মসৃণ কালো পাথর। আর শুকনো ডেইজি। ঘাসের শিষের নুয়ে পড়া দেখে কবেকার সর্ষেবালার নুইয়ে পড়া মনে করেছি, চৌকাঠে বসে। নীল নোয়ানো আকাশ দিয়ে এখানে উড়োজাহাজ যায়, হাওয়াই জাহাজ। (মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের নানা বাড়িতে মেয়েদের শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন, ‘হামারা বাপ হাওয়াই গাড্ডিমে কাম করতা হ্যায়’) ভয়। বিভীষিকা। ক্ষুধা। এসব থেকে আমি এখন দূরে। (বিদায় দে গো শচীরানী আমি সন্ন্যাসেতে যাই) আসলেই কি দূরে?
৭. ‘তেপান্তরে নাচে একা আলেয়া’...কী সুন্দর যে লাগত লাইনগুলো, লুনা। তখন কার্তিক মাসে আসলেই কয়েক দিন ধরে আচ্ছামতো বৃষ্টি হতো এবং ঘরে ঘরে আজি রুদ্ধ দুয়ারই হতো। পরে শিখেছিলাম, এর নাম আইতান-কাইতান বৃষ্টি। আহা বৃষ্টির ভেতর হাত অর্ধবৃত্তাকারে মেলে ঘুরছেন ববিতা (অসহ্য দাঁতে নখ খোঁটার সলজ্জভাব, নির্ঘাৎ ববিতার সারা বছর কৃমি লেগেই থাকত, এই হারে নখ খেলে তো হবেই!) এখন কি শীত শুরুর আগ দিয়ে এ রকম বৃষ্টি হয়, জানতে ইচ্ছা করে। কালবৈশাখী দেখতে ইচ্ছা করে, দেখে দৌড় দিয়ে কাঠের জানালা বন্ধ করতে ইচ্ছা করে আর রৌদ্রে দেওয়া আচার তুলে আনতে ইচ্ছা করে। শিল কুড়িয়ে চুষতে ইচ্ছা করে। ঘর অন্ধকার করে শুকাতে দেওয়া ভেজা কাপড়ের ঘ্রাণ পেতে ইচ্ছা করে। সব ইচ্ছা এ রকম নিরুপায় দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে তুলে রাখতে ভালো লাগে না... বুড়ো আর্থার মিলারের মতন আমিও আধা জাগন্ত হাত বাড়িয়ে অন্ধকার হাতড়িয়ে খুঁজি—বাংলাদেশ, তুমি কই। আমার অভয়দাত্রী মা-গন্ধী শরীরের বাংলাদেশ? বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ, তোমাকে যোজন যোজন দূর থেকে ভালোবাসা কত্ত সহজ।
তোমার ঝাঁ ঝাঁ রৌদ্রে পুড়তে থাকা নিউমার্কেটের চাতাল, কাটা কাপড়ের দোকানের গন্ধ আর সেঁকরার সবুজ রং করা দেয়ালের দোকান। তোমার প্রথম বৃষ্টিতে উন্মাতাল আমের মুকুলের ঘ্রাণ। তোমার টিনের চালে ঝমঝম শব্দ আর ঘরের ভেতরে অশ্রুকাজল অন্ধকার। কিন্তু কাছে এলেই আর সবকিছু ছাপিয়ে তোমার ব্যক্তির বিকাশবিদ্বেষী ব্যক্তিত্ববিনাশী ব্যক্তিস্বাধীনতাগ্রাসী ব্যক্তিবিরোধী সমাজ কেন এত চোখে পড়ে, এত গায়ে ফোটে? তুমি কবে মানুষের প্রতি মানবিক হবে? তুমি কবে ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি ভাবতে শিখবে? আচ্ছা লুনা, লোহার টুকরো বুকে বেঁধে বঙ্গোপসাগরের গহিন থেকে সূর্য সেন আর তারকেশ্বর দস্তিদার কেমন করে এই বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আছেন? সব দাঁত ভাঙা সব নখ উপড়ানো সারা জীবন ব্রহ্মচর্য পালন করা সূর্য সেন তাঁর যে সোনালি স্বপ্নের চিকচিকে ডিমটা শেষ চিঠিতে তুলে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটার দশা দেখে তাঁর মন কেমন করে? কোথায় তাঁর কনডেমড সেলে বসে বসে দেখা নবারুণ? এই বাংলাদেশকে, এই ভারতবর্ষকে দেখে সূর্য সেন নিদন্ত বিকৃত মুখে রুষ্ট হূদয় ঢাকতে ঢাকতে তারকেশ্বরের দিকে তাকিয়ে বলেন, লে হালুয়া (খাস চট্টগ্রামের ভাষায়)?
৮. লুনা রে, আজকে আমি আর কুশান স্ট্রবেরি খেতে গিয়ে স্ট্রবেরি তুললাম, উজ্জ্বল লাল রশ্মির মতন পাকা ফল, শুঁয়াভরা ধারালো পাতা। আলগুলোতে খড় আর ধুলিরঙা মাটি। খেতের সামনে এসে গন্ধে পাগল হয়ে গেলাম। প্রায় এক ঘণ্টা ফল তোলার পরে আমার লেননের ‘স্ট্রবেরি ফিল্ডস ফরেভার’ মনে পড়ল। প্রথম যা মনে পড়েছে, সেটা যতীন্দ্র বাবুর ‘অন্ধ বধূ’র লাইন, ‘তাই তো বলি বসে দোরের পাশে/রাত্তিরে কাল মধুমদির বাসে/আকাশপাতাল কতই মনে হয়’, সত্যি এ মধুমদির বাস—আখখেতের ওপরের বাতাস যেমন চিনির গন্ধে—সর্ষেখেতের ওপরের বাতাস যেমন মধুর গন্ধে মাদক হয়ে থাকে, সে রকম আশ্চর্য পুষ্ট ফলের গন্ধে উপচে পড়ছে খেতের বাতাস। যেন নাক ঘষেছি স্তনের পাশে। সেই রঙিন কাচের মতন লজেন্সগন্ধী শরীরের সঙ্গে। একরকমের প্রসন্নতায়—বীজসহ ফেটে পড়ার মতন অসহ্য সুখে ভরে উঠতে থাকে আমার মন।
৯. ড্যানডেলায়নের বুড়ির চুল ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে কুশান বলে, ‘আই উইশ।’ আমিও বলি, ‘আই উইশ...’ ওর ওপর অনেক রেগে অনেক ফেরি করেছি ওকে—‘ছেলে রাখবেন ছেলে’...আর বলেছি, ‘রেলস্টেশনে রেখে আসব!’ ঠিক যা আমার মা বলত। সে ভ্যাক করে কেঁদে ফেলত, মান-অপমানের তিক্ত কান্না। কিন্তু এখন সে বন্ধু। এখন সে আমার মিথজীবী। এখন সে ক্লোরোফিল। তার সঙ্গে কার্টুন দেখতে দেখতে শিখি ‘সিরানো’ নয় ‘সোয়ান লেক’-এর গল্প। একবার ভাবি ‘মারি সেলেস্ট’ জাহাজের গল্প বলব তাকে, আটলান্টিকে ভাসন্ত শূন্য জাহাজ, চলেছে জিব্রাল্টারের দিকে, ছয় মাসের খাদ্য মজুত, পিপে ভরা পানীয়। কিন্তু আশ্চর্য কারণে জাহাজখানা শূন্য। মনে মনে কান পাতি, ক্যাঁচকোঁচ শব্দ হচ্ছে জাহাজের কাঠে নয় পালে, নির্জনতার শব্দ। ভাবি, আঙুল তুলে দেখিয়ে বলব, ওই জাহাজটা আমি আর লুনা। আসা-যাওয়ার চিহ্ন আছে শুধু। কোথায় গেল লোকগুলো, তা কেউ জানে না। কেউ বলে ভূত। কেউ বলে দানো। আড়াই শ বছর ধরে ভেবে কেউ কূল পায় না। তারপর ভাবি স্নেহ-মায়া-করুণা-সহিষ্ণুতা-ক্ষমা চাষ করতে পারা যায় এমন কী গল্প আমি জানি,
যেটা কুশানকে শোনানো যায়? ডারউইনের পোকার নমুনা মুখে পুরে রাখার বিশ্রী গল্পটা ছাড়া আর কোনো গল্পই এই মুহূর্তে মনে আসছে না। আমার দুই বিড়াল কাশ্মীর আর সাটিন মিলে জানালা দিয়ে ঢুকে যাওয়া আলোর পোকা মারার চেষ্টা করছে—এই পর্ব শেষ হলে যাবে বেসিনের কল থেকে পানি খাওয়া মকশো করতে (লুনা তুই কই?), কাল আরেকটা দিন— জেলখানায় কাজ করতে ঢুকব। উইং থেকে ইন্টারভিউয়ের জন্য আসা কোনো কয়েদি উদ্ভ্রান্ত মুখে এসে জিজ্ঞেস করবে, ‘মিস, ও মিস, তোমার কাছে সাদা-কালো কাগজ আছে? জোড়া দিয়ে দিয়ে দাবার ছক বানাব। জেলে বোরিং লাগে গো মিস!’ ও যেখানে দাঁড়িয়ে সেখানে ১০০ বছর আগে আরও এক কয়েদি দাঁড়াত, যার কাজ ছিল নিষ্ফল সিসিফিয়ান টাস্ক, সারা দিন ঢেঁকি ভানবার মতন পা তোলা আর নামানো, অর্থনীতিতে যা কিছু যোগ দেয় না, বিয়োগ করে না; কথা বলা মানা ছিল তাদের একে অন্যের সঙ্গে, মৌনব্রত ভাঙলেই বেত। তখন এই জেলখানায় সবজিখেত আর পাতকুয়া ছিল, ফুলের বাগান ছিল না, ময়ূর ছিল না।

কফিচুমু by আনিসুল হক

কান্তা, তোমাকে খুব মনে পড়ছে আজ। সেই রাতের মতো আজ রাতেও কি আমার ঘুম হবে না? বাইরে বৃষ্টি পড়ছে, পাশে নার্গিস ঘুমুচ্ছে নিশ্চিন্তে, পাশের ঘরে দুই ভাই পরশ আর পাভেলও নিশ্চয়ই ঘুমে কাদা হয়ে আছে। আমার ঘুম আসে না। আমার তোমার কথা মনে পড়ে। আমি বিছানা ছাড়ি, ডাইনিংয়ে গিয়ে গেলাসে পানি ঢেলে খাই, একবার বারান্দার দিকে তাকাই, বারান্দার মানিপ্লান্ট আর অ্যালামান্ডা গাছের সবুজ পাতা হলুদ ফুল বৃষ্টি ধোয়া, কালো পটভূমিতে মৃদু বাতাসে দুলছে। বৃষ্টির ফোঁটার গায়ে ফিলিপস বাতির বিন্দু। তোমার ওপরের পাটির বাম দিকে একটা দাঁত ছিল আরেকটা দাঁতের ওপরে তোলা। আমরা বলতাম, ম্যারা দাঁত। ওই রকম দাঁতকে কী বলে—জানতে চাইলে বিটলা শাহিন ডিকশনারি দেখে বলেছিল, গজদন্ত।
হাসলে তোমার গালে টোল পড়ত যে। আমাদের ক্লাসে একজন কবি ছিল, আমাদের ক্লাসে ৩৮ জন ছাত্র আর ১১ জন ছাত্রীর মধ্যে সেই ওমর খৈয়ামই কেবল থার্ড ক্লাস পেয়েছিল, সে বলেছিল, তোমার গালের টোল আর বিউটি টুথের জন্য সে সমরখন্দ বিলিয়ে দিতে পারে। এই নিয়ে কবিতা লিখেছিল। তোমার গালে টোল ছিল, আমার হূদয় দুলছিল। ওমর ও-কার দিয়ে কথা বলতে পারত না, ‘মুলা খেতে চুর ঢুকেছে’ ধরনের উচ্চারণ ছিল তার, সে তার নিজের লেখা কবিতাটা পড়ত এইভাবে: তোমার গালে টুল ছিল, আমার হূদয় দুলছিল। কান্তা, তোমাকে নিয়ে আমিও মনে মনে একটা কবিতা বানিয়েছিলাম।
কান্তা, কান্তা,
তুমি আমার মনের মানুষ,
 সেই কথা কি জানতা? কিন্তু ঘুণাক্ষরেও এই কথাটা আমি তোমাকে বুঝতে দিইনি। আমি যে মফস্বল থেকে গিয়েছিলাম। রাজবাড়ী তো তেমন কোনো শহর নয়, আমাদের ঘোড়াশালে ঘোড়া নেই, আছে সার কারখানা, আমাদের মানিকগঞ্জে মানিক নেই, আমাদের রাজবাড়ীতেও মোটেও রাজপুত্ররা ঘোরাফেরা করত না। লিচুবাগানে গ্রীষ্মকালে টিন বাঁধা হতো, সারা রাত ঢনঢন করে কেরোসিনের টিনগুলো বাজত, সন্ধ্যা হলেই একঝাঁক বাদুড় উড়ে যেত মাথার ওপর দিয়ে। আমাদের টিনে ছাওয়া টিনের বেড়ার ঘর থেকে টিউবওয়েলের পাড়টা ছিল ঢের দূরে, শেয়াল-ডাকা রাতে উঠোন পেরিয়ে টিউবওয়েলের পাড়ে যাওয়ার সময় ঢোলকলমির দামের ওপরে জোনাকিপুঞ্জের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, দূরে বিলের মধ্যে আলেয়া দেখে ভূতের আগুন বলে ভয় পেলে মা আমার বুকে থুতু দিয়ে দিতেন। মেঘলা বিকেলে চোরকাঁটাভরা খোলায় বসত ফড়িঙের হাট। আমি প্রাইমারি স্কুলে যেতাম খালি পায়ে, এক দৌড়ে। টিফিনের সময় দৌড়ে এসে খড়ে ছাওয়া পাকঘরের কাঁচা মেঝেয় পিঁড়ি পেতে বসলে মা কাঁসার বাটিতে দিতেন দুধ, তাতে গুড় মাখলে রং হতো লাল। হাইস্কুলে গেছি দুই ক্রোশ দূরে, লুঙ্গি পরে যেতাম, তাতে খাল পার হওয়াটা সহজ ছিল। সেখান থেকে আমি যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হলাম, সে তো আমাদের হামেদ চাচার কল্যাণে, তিনি সেকালের বিএ, রোজ বিকেলে বাড়িতে এসে ট্রানস্লেশন ধরতেন, বল তো ফখরুল, ডাক্তার আসিবার পূর্বে রোগী মারা গেল—এর ইংরেজি কী? মুহসীন হলে জায়গা পেয়েছিলাম, এলাকার বড় ভাইয়ের সঙ্গে এক বিছানায় ডাবলিং করতাম। বিকেল হলেই চলে যেতাম টিউশনিতে। ক্লাসে প্রথম দিন গিয়ে গোটা দশেক মেয়ে দেখে চোখ তুলে চাইতে পারিনি। খুব লাজুক ছিলাম যে। কিন্তু ক্রিকেটটা কী করে যেন ভালো খেলতে শিখেছিলাম, ওই অজপাড়াগাঁর স্কুলেই। কারণ, আমাদের ড্রিল স্যার। তিনি নাকি ওয়ারীতে ফার্স্ট ডিভিশনে খেলেছেন। আবদুল বারী নামের ওই শিক্ষক আমাদের বড়দরিয়া বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে ক্রিকেটের সেট এনেছিলেন।
আমি আর সব ছেলেপুলের সঙ্গে অনেকটা সময়ই কাটিয়েছি স্কুলের মাঠে, ক্রিকেট খেলে খেলে। এমন ভালো খেলি না যে কোনো ক্লাবে চান্স পাব। আবার এমন খারাপ খেলি না যে ইন্টার ডিপার্টমেন্ট ক্রিকেট টুর্নামেন্টে ১১ জনে জায়গা হবে না। কান্তা, তিনটি বছর আমরা পার করলাম এক ক্লাসে। কোনোদিন দুজনের মধ্যে কোনো বাক্যবিনিময়ও তো হয়নি। আমি শরীয়তপুরের ছেলে, গায়ের রং কালো, বেঢপ লম্বা, কোনো দিন ব্রিটিশ কাউন্সিলে গিয়ে জার্নাল পড়িনি, সিনেমার ক্যাসেট তুলিনি, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে গিয়ে ছবি দেখিনি, আমি তোমার দিকে পূর্ণ চোখে তাকাব কী করে? সাহস ছিল না, কান্তা। কিন্তু ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনালে আমি ব্যাটিং করতে নেমে একটা ছক্কা মেরেছিলাম, আর আনবিটেন সেভেন্টি ফোর, আমি ম্যান অব দ্য ম্যাচ, সেটা কিন্তু আমি তোমাকেই উৎসর্গ করেছিলাম, তুমি হলুদ রঙের কামিজে, কালো সানগ্লাসে, সাদা ক্যাপে অপ্সরীর মতো হাততালি দিচ্ছিলে, তুমি জানতে না, কান্তা, আমার পক্ষে ভালো ব্যাটিং করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যাচ্ছেন অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তিনি যাচ্ছেন এক বছরের জন্য, ইংল্যান্ড। ক্লাসে তিনি বললেন, ‘আজই তোমাদের সঙ্গে আমার শেষ ক্লাস। আমি যখন ফিরব, তখন তোমরা তো সব বেরিয়ে যাবে। তোমাদের সঙ্গে আর দেখা হবে না।’ শুনে সবচেয়ে বেশি যে কাঁদল, সে তুমি। তোমার দু-চোখ বেয়ে জল ঝরছে, গমের মতো তোমার গায়ের রং, তার ওপর জল, মনে হচ্ছে দু-ফোঁটা সোনা, আমার মনে হলো, আহা, আমি যদি মুছে দিতে পারতাম। স্যার চলে গেলেন, তুমি দাঁড়িয়ে গেলে টেবিলের পাশে, আমাদের দিকে ফিরে বললে, ‘এই এসো, আমরা এসএমআই স্যারকে ফেয়ারওয়েল দিই। সবাই ২০ টাকা করে চাঁদা দাও। এই আবেদিন, তুমি সবার কাছ থেকে চাঁদা নাও তো।’ আমাকে কেন তুমি এই দায়িত্ব দিয়েছিলে, আমি জানি না। আমি অপরাজিত ৭৪ করেছিলাম বলে!
সবচেয়ে লম্বা ছেলে ক্লাসে, গায়ের রং কালো, আমার একটা ডাক নাম আছে—কাজল। ক্লাসে এই নামে একটা মেয়ে থাকায় আমি সেটা কোনোদিন প্রকাশ করিনি। চাঁদা তোলা, মানপত্র লেখা, সেটা কম্পোজ করতে নীলক্ষেতে যাওয়া—উফ, আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো তুমি আমাকে উপহার দিয়েছিলে, কান্তা। আমি কি কোনো দিনও ভাবতে পেরেছিলাম, আমি আর তুমি এক রিকশায় উঠব, কোনো দিনও। তুমিই আমাকে ডেকে নিলে, ‘এই আবেদিন (আমার ভালো নাম ফখরুল আবেদিন, আমি চাই না আমাকে কেউ ফখরুল নামে ডাকুক, কারণ, ইংরেজি বিভাগের স্মার্ট ছেলেমেয়েরা জাকারিয়াকে ডাকত জ্যাক, আমার আশঙ্কা ছিল ফখরুল থেকে ফাখরুল, শেষ পর্যন্ত সেটাকে তারা বানিয়ে ছাড়বে ফা...), চলো তো, একটু নীলক্ষেত যেতে হবে।’ কবি ওমর খৈয়ামই মানপত্রটা লিখেছিল, ইংরেজিতে। তখন সদ্য লেকচারার হিসেবে যোগ দিয়েছেন আবদুস সালাম স্যার, তিনি লেখাটা এডিট করে দিলেন। আমি চাঁদা তুলছি, মোট ৪১ জন টাকা দিল, বাকিরা দিল না। ৮২০ টাকা তখন অনেক টাকা। তুমি, মিনারা আর আমি, আমরা তিনজন খাটাখাটনি করছি। নিউমার্কেটে গিয়ে কলম কেনা হলো, মগবাজার আড়ংয়ে গিয়ে পাঞ্জাবি। আর ক্লাসের ফাঁকে তোমাদের আড্ডায় আমার জায়গা হতে লাগল। আমি এখন তোমাদের সঙ্গে মলের ঘাসে বসতে পারি, বাদাম ছিলে খেতে পারি, তুমি আহ্লাদী ছিলে, বলতে, ‘এই আবেদিন, আমার বাদামের খোসা ছাড়িয়ে দাও।’ আমি বাদামের দানা বের করে ফুঁ দিয়ে তার খয়েরি আবরণটা উড়িয়ে তারপর তোমার হাতে দিতাম। তোমার আঙুলগুলো সত্যি সত্যি কাঁঠাল-চাঁপার কলির মতো ছিল।
তুমি কী একটা পারফিউম দিতে, সেটা ছিল বাতাবি ফুলের গন্ধের মতো, কিন্তু বিকেল হতে হতে তোমার কামিজ ঘামে ভিজে যেত, তোমার শরীর থেকে একটা বুনো গন্ধ এসে আমার নাকে লাগত, আমি পাগল পাগল হয়ে যেতাম। তারপর এল সেই বিকেলটা। আমরা কাঁটাবনের মোড়ের দোকান থেকে মানপত্রটা বাঁধাই করে নিয়ে চললাম এলিফ্যান্ট রোডে, কফিশপে। আমরা দুজন। এক রিকশায়। তুমি বললে, ‘কী খাবা?’ আমি তো জানি না কফিশপে কী খেতে হয়। দোতলায় কাচের জানালার পাশে বসে আছি। নিচে সন্ধ্যা নামছে এলিফ্যান্ট রোডে। গাড়ির হেড লাইট জ্বলছে। তুমি কাটলেটের অর্ডার দিলে। বললে, দু কাপ কফি। আমি বললাম, কান্তা, আমি কফি খাই না। তাহলে সেভেন আপ? আমি বললাম, হ্যাঁ। সেভেন আপটা আগে এল। তারপর কাটলেট। সবার শেষে তোমার কফি। লাল কাপে তোমার ঠোঁট। তুমি ধীরে ধীরে কফি খাচ্ছ। তোমার শরীরে ঘামের বুনো গন্ধ। কফিশপটায় ভিড় নেই। বিশাল ঘরে আমরা দুজন। ও পাশে অনেক দূরে একজন ম্যানেজার। তোমার কোল থেকে তোমার ছোট্ট ব্যাগটা পড়ে গেল মেঝেতে। দুজনে একসঙ্গে উবু হলাম সেটা তোলার জন্য। তোমার গাল আর আমার গাল পরস্পরকে ছুঁয়ে গেল। তখন তুমি হাত বাড়িয়ে আমার ঘাড়ের পেছনটা ধরে আমার মুখে নিজের ঠোঁট চেপে ধরলে। কফির স্বাদে আমার মুখ ভরে গেল। তুমি বিড়বিড় করে বললে, ‘সুইট হেলেন, মেক মি ইমমরটাল উইথ আ কিস।’ আমি এর আগে কোনো দিন কফি খাইনি। এই প্রথম আমি কফি খেলাম। তোমার ঠোঁটের পেয়ালায় ঠোঁট রেখে। আমি তোমার হাত আমার মুঠোয় নিলাম। তোমার আঙুল নিয়ে খেললাম। তোমার বাম হাতে অনামিকায় একটা আংটি। এটা আমি আগে দেখিনি। আমি সেটা নিয়ে আমার আঙুলে খেলতে লাগলাম। তুমি বললে, ‘এটা আমার এনগেজমেন্ট রিং।’ গতকাল তোমার বাগদান হয়ে গেছে। ছেলে থাকে অস্ট্রেলিয়ায়। মেলবোর্নে। তুমি অনার্স শেষ করেই চলে যাবে। কফিতে ক্যাফেইন থাকে। ক্যাফেইন ঘুম তাড়ায়। মুহসীন হলের শেওলা ধরা ছাদের নিচে শুয়ে সারা রাত আমার ঘুম এল না। বহুদিন পরে, কান্তা, আজ রাতেও আমার ঘুম আসছে না। আজ দুপুরবেলা, হঠাৎই আমার বুকটা ধড়াক ধড়াক করতে লাগল। ভয় পেয়ে চলে গেলাম কাইয়ুম ভাইয়ের কাছে। হার্টের ডাক্তার। ল্যাবএইডে বসেন। ইসিজি করালেন। বললেন, ‘ভয় পাবার কিছু নাই। ড্রপ বিট। ব্লাড প্রেশার তো ভালো আছে। আপনি কি কফি খান?’
: হ্যাঁ। খাই। আজ ২৪ বছর ধরে রোজ দু কাপ কফি খাই। এই একটাই আমার নেশা। কান্তা, তোমার বিয়েতে আমি একটা কফিসেট উপহার দিয়েছিলাম। দুটো ছোট্ট কাপ আর একটা কেটলি। দোকানি ওটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, বিয়েতে এর চেয়ে ভালো উপহার আর হয় না। বর-বউ কফি নিয়ে পাশাপাশি বসবে বারান্দায়। আকাশ দেখবে। সূর্যের ডুবে যাওয়া দেখবে। গান শুনবে। আর কফি খাবে। তুমি চলে গেলে। আর কোনো যোগাযোগ রইল না তোমার সঙ্গে। আমি তোমাকে ভুলে গেলাম। বিশ্বাস করো কান্তা, আজ দুপুরে ডাক্তার কাইয়ুম যখন বললেন, ‘আপনার হার্টের বিট ড্রপ হচ্ছে কফির কারণে, কফি খাওয়া বাদ দেন,’ তার আগে পর্যন্ত তোমার কথা আমার মনেই ছিল না। ডাক্তারকে বলতে পারিনি, কফি খাওয়া আমি ছাড়তে পারব না। ব্যাংক থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা। অভ্যাসবশত টিভির সামনে বসেছি, নার্গিস হিন্দি সিরিয়াল দেখছে, আমি সকালের বাসি পত্রিকা ওল্টাই, ওই ঘরে পরশ কম্পিউটারে, পাভেল প্লেস্টেশনে, কাজের মেয়ে কফি দিয়ে গেল। কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে, কান্তা, তোমার কথা মনে পড়ে গেল। কান্তা, তুমি এখন কোথায় আছ, কেমন আছ? তোমার ক ছেলেমেয়ে? আমি কফিটা খেলাম না। খাব না বলে প্রতিজ্ঞা করে খাইনি—তা নয়। আমার মনটা এত উদাস হয়ে গেল যে মন দিয়ে হিন্দি সিরিয়াল দেখতে লাগলাম। গত ২৪ বছরে এই প্রথম বোধ হয় একটা সন্ধ্যা আমার কফিবিহীন কাটল। ২৪ বছর আগে একটা রাত আমার ঘুম আসেনি, কারণ আমি তোমার মুখের পেয়ালা থেকে কফি পান করেছিলাম। nআজ রাতে আমার ঘুম আসছে না, কারণ আমি আজ সন্ধ্যায় কফি খাইনি।