Tuesday, January 21, 2014

ভারতের রাজনীতি- আম আদমি পার্টির চ্যালেঞ্জ by কুলদীপ নায়ার

পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টরা ৩৫ বছর ধরে শাসন করেও সেখানকার জনজীবনের মান উন্নত করতে পারেননি। অর্থাৎ তাঁদের মার্ক্সবাদ প্রগতির একটা প্রলেপ মাত্র।
তাঁদের চামড়ায় আঁচড় কাটলেই দেখা যাবে তাঁরা বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিকতার অংশ। কয়েক দশকেও তাঁঁরা যা করতে পারেননি, আম আদমি পার্টি সেটা ১২ মাসের মধ্যে করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে। কাজটি হলো গরিব মানুষকে জাগিয়ে তোলা, যাতে তারা নিজেদের বক্তব্য নিজেরাই তুলে ধরতে পারে।

ভারতের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি মন্দিরের মোহন্তদের মতো। তারা কিছুই শেখেনি, কিছুই ভোলেনি। নিজেদের নীতি-কৌশলগুলোর ভুলত্রুটি সংশোধন করার পরিবর্তে তারা আম আদমি পার্টিকে মনে করছে একটা অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম, কিংবা বুদ্বুদ। তারা মনে করছে সামনের এপ্রিলে লোকসভা নির্বাচন আসতে আসতে এই বুদ্বুদ ফেটে মিলিয়ে যাবে। কিন্তু কংগ্রেস ও বিজেপির এ রকম ধারণা ভুল, কারণ, আম আদমি পার্টি জনগণের মনকে স্পর্শ করতে পেরেছে, তাই দলটির প্রভাব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। লাখ লাখ মানুষের আম আদমি পার্টিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়েই তা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
ভারতীয় রাজনৈতিক দৃশ্যপট খাপছাড়া, জোড়াতালিসর্বস্ব হলেও এখন তা একধরনের রূপ পরিগ্রহ করতে চলেছে। বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত আম আদমি পার্টির আবির্ভাবের ফলে রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে গেছে। কংগ্রেস ও বিজেপির একটি বিকল্প হিসেবে তারা আবির্ভূত হয়েছে; এমন একটি বিকল্পের ভীষণ প্রয়োজন ছিল। কারণ, কংগ্রেস ও বিজেপি দুটি ভিন্ন বোতলে একই সুরা।
ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যেসব আঞ্চলিক দলের ভিত্তি রয়েছে, এবারের নির্বাচনে তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ভাষা, এলাকা বা অঞ্চলের নামে তাদের আবেদন ও জনপ্রিয়তা কার্যত অনেক হ্রাস পেয়েছে। দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনে আম আদমি পার্টির সাফল্য বিভিন্ন ধরনের বিভক্তি ও মেরুকরণের রাজনীতিকে আঘাত করেছে। কারণ, এই দলটি জাত-পাত, শ্রেণী-ধর্ম-ভাষা ইত্যাদি ভেদাভেদ অতিক্রম করে গেছে। কংগ্রেস ও বিজেপি—উভয় দলই স্বীকার করেছে যে আম আদমি পার্টি যেভাবে সাফল্য অর্জন করেছে, সেখান থেকে তাদের অনেক কিছু শেখার আছে। যদি তারা এটা আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেই থাকে, তাহলে তাদের নিজেদের রূপান্তর ঘটাতে হবে। এখন পর্যন্ত তারা বিদ্যমান ব্যবস্থার কেন্দ্রই রয়ে গেছে। আম আদমি পার্টির নেতা-কর্মীদের মধ্যে মার্ক্সবাদী ও নকশালপন্থীরা রয়েছেন কি না, সেটা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত দলটি জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার অনুকূলে কাজ করে যাবে। চূড়ান্ত বিচারে, স্বাধীনতার ৬৭ বছর পরও ভারতের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে দারিদ্র্য রয়ে গেছে, আম আদমি পার্টি কত দ্রুত তা দূর করতে পারে, সেটাই তাদের সামনে আসল পরীক্ষা।
এটা নিশ্চিত, বামপন্থীরা নির্মমভাবে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এতে যে ক্ষতি হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এ জন্য কমিউনিস্ট ও সমাজতান্ত্রিক দলগুলো নিজেরাই দায়ী; কারণ, তারা তৃণমূলের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। প্রগতি ও সাম্যের পক্ষে শুধু স্লোগান উচ্চারণ আর সুন্দর সুন্দর কথা বলাই যথেষ্ট নয়। আম আদমি পার্টি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করার এজেন্ডা নিয়ে এসেছে এবং তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনের একটা সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। বিজেপির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেদ্র মোদির জনপ্রিয়তায় যেভাবে ভাটার টান লেগেছে, তাতে আভাস মিলছে যে জনগোষ্ঠীর ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ ছিল, তারা এখন আর সে রকম নেই। অবশ্য সংবাদমাধ্যম এখনো মোদিকে বড় করেই দেখিয়ে চলেছে। মোদির জনপ্রিয়তা দ্রুত কমে যাচ্ছে বলেই তো রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ব্যতিব্যস্ত হয়ে বিজেপিকে বলছে, তোমরা এখন আম আদমি পার্টিকে থামাও, কংগ্রেসকে নয়। অথচ বছরের পর বছর ধরে কংগ্রেসই ছিল তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ।
দিল্লি শাসনের প্রতিটি পদক্ষেপে আম আদমি পার্টি যেভাবে বিভিন্ন নেতার আক্রমণের শিকার হচ্ছে, তাতে এই ধারণাই সঠিক প্রমাণিত হচ্ছে যে কংগ্রেস এখন পড়ে গেছে তৃতীয় অবস্থানে। খবর পাওয়া যাচ্ছে, কংগ্রেস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, মোদিকে ঠেকাতে তাদের উচিত অনানুষ্ঠানিকভাবে আম আদমি পার্টিকে সমর্থন করা। এর আরও একটা অর্থ এই যে কংগ্রেস উপলব্ধি করতে পারছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে না। বস্তুত, কেন্দ্রে সরকার গঠনে আম আদমি পার্টিকে সহযোগিতা করতে কংগ্রেস নিজের সমর্থন তো বটেই, বিভিন্ন রাজ্যের আঞ্চলিক দলগুলোকেও এক কাতারে জড়ো করার চেষ্টা চালাতে পারে। কারণ, মোদিকে ক্ষমতার বাইরে রাখার চেষ্টায় কংগ্রেস হেন কিছু নেই, যা করা বাকি রাখবে।
রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক দিকটি হলো দুর্নীতি। দুর্নীতিবাজ হিসেবে পরিচিত নেতাদের সমর্থন পেতে কংগ্রেস বা বিজেপি কোনো দলেরই কোনো দ্বিধা নেই, বিশেষত বিজেপির। কংগ্রেস হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বীরভদ্র সিংয়ের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এমন একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে অবৈধ সুবিধা দিয়েছেন, যে প্রতিষ্ঠানের বিরাট অংশের শেয়ারের মালিক তাঁর এক আত্মীয়। আর নরেদ্র মোদি জনসমক্ষে ন্যায়নীতির কথা বলেন বটে, কিন্তু তিনি তাঁর মন্ত্রিসভায় এমন এক মন্ত্রীকে রেখে দিয়েছেন, যিনি আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন। বিহারের লালুপ্রসাদ যাদব ও রশিদ মাসুদ আদালতে দণ্ডিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসদ সদস্যপদ হারিয়েছেন। কিন্তু বিজেপি কেন গুজরাটে দণ্ডিত সদস্যদের মোদি সরকারের মধ্যে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছে?
আরেকটি বিরক্তিকর বিষয় হচ্ছে ব্যক্তিপূজা। এই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে যেন রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার মতো হতে চাইছে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী নরেন্দ্র মোদি, কারণ, একজন শক্তিমান ব্যক্তি ও শক্তিশালী সরকারের স্লোগান তুলেছেন তিনিই। ১২ বছর আগে নিজের নাগরিকদের ওপর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনায় যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন, তিনি গোটা দেশের শাসক হয়ে উঠলে সংবিধানে ভিন্নমত প্রকাশের যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তা বিরাট ঝুঁকির মুখে পড়ে যাবে। আহমেদাবাদে পুলিশ মোদির বিরুদ্ধে একটি এফআইআর নিতেও যে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, এটা দুঃখজনক হলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। গোপনে আড়ি পাতার যে কেলেঙ্কারিতে একটি মেয়ের ওপর নজরদারির সঙ্গে মোদির জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে, সেটি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আসলে কী ঘটেছে, তা জানার প্রক্রিয়া শুরু করতে একটি এফআইআর প্রয়োজন। কেন্দ্র সরকারের নিয়োগকৃত একটি কমিশন তদন্ত করে তা বের করতে পারত। কিন্তু মোদির রাজ্যের প্রশাসনযন্ত্র এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে আগ্রহী নয়। স্থানীয় পুলিশের আচরণে সেটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে।
নরেন্দ্র মোদি যে ২০১৪ সালের নির্বাচনকে জাতীয় ইস্যুগুলোর পরিবর্তে ব্যক্তিত্বের সংঘাতভিত্তিক ভোটযুদ্ধে পরিণত করতে চাইছেন, কংগ্রেসের এটা বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু কংগ্রেসও একই দোষে দুষ্ট, তারাও রাহুল গান্ধীকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে, যেন বা লড়াইটা হবে এই দুই ব্যক্তির মধ্যে। রাহুল গান্ধীও খুব ঘন ঘন গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলছেন, সরকারের সিদ্ধান্ত পাল্টে দিচ্ছেন। একটি দৃষ্টান্ত হলো, কোনো আইনপ্রণেতা আদালত কর্তৃক দণ্ডিত হলে সংসদ সদস্যপদ হারাবেন—সুপ্রিম কোর্টের এই রায় থেকে রাজনীতিকদের রক্ষা করার উদ্দেশ্যে জারি করা অধ্যাদেশ। আরও একটি দৃষ্টান্ত মহারাষ্ট্রে গৃহায়ণ কেলেঙ্কারি। ওই রাজ্যের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সরকার আদর্শ হাউজিং প্রতিবেদন খারিজ করে দিয়েছিল, রাহুল গান্ধী সেটি আংশিক পুনরুদ্ধার করেছেন। তার পরও রাজনীতিকেরা পার পেয়ে গেছেন; এখন দায়টা বইতে হবে শুধু আমলাদের।
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের উপলব্ধি করা উচিত আম আদমি পার্টির পক্ষ থেকে তিনি যে সরকারের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, সেটি তাঁর সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খাবে না। অবাক ব্যাপার যে তিনি ১৬টি বিভাগই রেখে দিয়েছেন। গান্ধীবাদী জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জনতা পার্টি গড়ে উঠেছিল, তা বেশি দিন টেকেনি। কিন্তু তারা চেয়েছিল যেন জরুরি অবস্থা না থাকে। সেটা ঘটেছে, গণতন্ত্রের শিকড় গভীরে প্রোথিত হয়েছে। আম আদমি যদি বিদ্যমান ব্যবস্থাটির জঞ্জাল পরিষ্কার করতে সক্ষম হয় এবং নিশ্চিত করতে পারে যে তা সঠিক পথে থাকবে, তাহলে সেটা হবে তার বিরাট অবদান, এমনকি দলটি যদি বেশি দিন না-ও টেকে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতীয় সাংবাদিক।

ভারতের রাজনীতি- আম আদমি পার্টির চ্যালেঞ্জ by কুলদীপ নায়ার

পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্টরা ৩৫ বছর ধরে শাসন করেও সেখানকার জনজীবনের মান উন্নত করতে পারেননি। অর্থাৎ তাঁদের মার্ক্সবাদ প্রগতির একটা প্রলেপ মাত্র।

রাজপথে কম্বলমুড়ি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর রাত যাপন

১২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গায়ে কাপন ধরারই কথা। কাছেই ইনডিয়া গেইট। এরই মধ্যে রাস্তায় ম্যাট্রেস বিছিয়ে রাত পার করে দিলেন ভারতের আলোচিত আম আদমি পার্টির প্রধান ও দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।
দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত না করায় গতকাল সোমবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে তার এই অবস্থান কর্মসূচি। সেখানে তিনি কেবল বিক্ষোভই করেননি, রাস্তায় বসেই রীতিমতো সরকারি কাজ চালিয়েছেন। একের পর এক ফাইল দেখেছেন,  গুরুত্বপূর্ন কিছু ফাইলে স্বাক্ষরও করেছেন। ইতোমধ্যে পুরো দিল্লিবাসীকে ১০ দিনের এই কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ভারতে এই প্রতিবাদ কর্মসূচিকে বলা হচ্ছে ‘ধর্না’। ১০ দিনের ধর্নার দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবারও চলছে একই দশা। মুখ্যমন্ত্রীর নজিরবিহীন এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সোমবার দিল্লির প্রাণকেন্দ্র পার্লামেন্ট, নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লকসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় সৃস্টি হয় প্রচন্ড যানজট। আম আদমি পার্টি প্রধানের এই কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের জড়ো হওয়া ঠেকাতে বন্ধ রাখা হয় আশপাশের বেশ কয়েকটি মেট্রো স্টেশন। ভারতীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, রাজ্য সরকারের প্রধান নিজেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের ভূমিকায় নেমেছেন। এতে ভারতের রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা জট পাকিয়ে গেছে। গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে সাম্প্রতিক বেশকিছু অপরাধমূলক ঘটনায় রাজ্য সরকারের দুই মন্ত্রীর নির্দেশনা সত্ত্বেও পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারে অস্বীকৃতি জানায়। ঘটনার শুরু এভাবেই। অভিযুক্ত পুলিশের সদস্যদের বরখাস্তের দাবি তোলেন কেজরিওয়াল। এজন্য  সোমবার ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে এই কর্মসূচির ডাক  দেন তিনি। দাবি পূরণের জন্য সকাল ১০টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। ওই সময়ের মধ্যে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল কুমার সিন্ধের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করতে রওনা হন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু সচিবালয়ের পথে ইন্ডিয়া গেইটের কাছে পুলিশের ব্যারিকেডে আটকা পড়েন কেজরিওয়াল ও তার মন্ত্রিসভার ছয় সদস্য। তাকে ঠেকাতে সুশীল সিন্ধের কার্যালয়ের সামনে ১৪৪ ধারাও জারি করা হয়। এই পরিস্থিতিতে সেখানেই অবস্থান নিয়ে টানা বিক্ষোভের ঘোষণা দেন কেজরিওয়াল। জানা গেছে গত বুধবার রাতে দিল্লির আইনমন্ত্রী সোমনাথ ভারতী নগরের দক্ষিণাঞ্চলে একটি বাড়িতে মাদক ও নারী পাচারকারী চক্রের সদস্য অভিযোগে উগান্ডার কয়েকজন নাগরিককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন পুলিশকে। কিন্তু পরোয়ানা না থাকায় পুলিশ অভিযান চালাতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর পুলিশের মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন চার নারী। তারা অভিযোগ করেন, তারা মাদক গ্রহণ করেছেন কিনা পরীক্ষা করতে পুলিশ তাদের মূত্রের নমুনাও নিয়েছে। এছাড়া একটি মৃত্যুর ঘটনায় রাজ্যের আরেক মন্ত্রী রাখি বিড়লা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেও পুলিশ তা পালন করেনি বলে অভিযোগ অরবিন্দ কেজরিওয়ালের। সম্প্রতি দিল্লিতে ৫১ বছর বয়সী ডেনমার্কের এক পর্যটককে ধর্ষণের ঘটনাও পুলিশ যথাযথভাবে তদন্ত করছে না বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ যেখানে মুখ্যমন্ত্রীর নীল রঙের গাড়িটি আটকে দিয়েছে, তার পাশেই সোমবার রাত কাটিয়েছেন ৪৫ বছর বয়সী কেজরিওয়াল ও তার দলবল। ১২ ডিগ্রী সেলসিয়াসের কনকনে শীতের মধ্যে রাস্তায় ম্যাট্রেস বিছিয়ে কয়েকটা কম্বলে নিজেকে জড়িয়ে সেখানেই ঘুমিয়েছেন আম আদমির নেতা। মুখ্যমন্ত্রীর পাদুকাজোড়া এ সময় পাশেই পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এনডিটিভি আরো লিখেছে, মুখ্যমন্ত্রীর শরীর বিশেষ ভাল নয়, আগের দিন বেশ কয়েকবার কাশতে শোনা গিয়েছিল তাকে। তারপরও মধ্যরাতের সামান্য আগে শুয়ে ভোর সোয়া ৫টার পর তিনি উঠে পড়েন। ভোরের আলো তখনো ফোটেনি, কেজরিওয়াল রাস্তায় অপেক্ষায় থাকা সাংবাদিকদের সামনে বলেন, “দিল্লিতে যখন এতো অপরাধ, মেয়েরা যেখানে নিরাপদ নয়, সেখানে স্বরাস্ট্রমন্ত্রী সিন্ধে কীভাবে আরাম করে ঘুমান! আমরা তাকে ঘুমাতে দেব না’। কেজরিওয়ালের অভিযোগ, সুশীল সিন্ধে ‘স্বৈরাচারী’ আচরণ করছেন। এই শীতের মধ্যে যারা রাস্তায় জেগে বিক্ষোভ করতে এসেছেন, তাদের নূন্যতম মৌলিক অধিকারগুলোও আমলে নেয়া হচ্ছে না। রাতে ব্যারিকেডের মধ্যে খাবার ও পানি আনতেও বাধা দেয়া হয়েছে। এখানে কোনো টয়লেট নেই। গতকাল আমাকে রেল ভবনের টয়লেট ব্যবহার করতে দিয়েছিল, আজ সেটাও দিচ্ছে না। অবশ্য রাজ্যের মন্ত্রীরা একটি মোবাইল টয়লেট যোগাড় করেছেন বলে জানান তিনি। মঙ্গলবার সকালে রাজ্যসভার ছয় মন্ত্রীর পাশাপাশি শ’ দুয়েক কর্মীকে দেখা যায় আম আদমি নেতার সঙ্গে। কেজরিওয়াল অভিযোগ করেন, আরো অনেকেই তার সঙ্গে যোগ দিতে চাইলেও তাদের বাধা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেছেন আমাদের দাবি অনুযায়ী রোববার প্রজাতন্ত্র দিবসের আগেই যদি কর্তব্যে অবহেলাকারী পাঁচ পুলিশকে বরখাস্ত করা না হয়, তাহলে লাখো মানুষ রাজপথে নামবে’। দিল্লির পুলিশ কমিশনার বিএস বাসি বরখাস্তের দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে তদন্ত চলছে। তবে দাবি আদায়ে সেই তদন্তের ফলাফল পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি নন কেজরিওয়াল।

রাজপথে কম্বলমুড়ি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর রাত যাপন

১২ ডিগ্রী সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গায়ে কাপন ধরারই কথা। কাছেই ইনডিয়া গেইট। এরই মধ্যে রাস্তায় ম্যাট্রেস বিছিয়ে রাত পার করে দিলেন ভারতের আলোচিত আম আদমি পার্টির প্রধান ও দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল।

পরমাণু চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু করেছে ইরান

ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া কমিয়েছে। বিশ্বের ৬টি শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান।
জাতিসংঘের আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ খবর জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত তরলীকরণ করা শুরু করেছে ইরান। ২০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম পারমাণবিক বোমা হিসেবে ব্যবহারযোগ্য। আইএইএ’র সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে পাঠানো ওই প্রতিবেদনে তারা নিশ্চিত করেছে যে, ২০শে জানুয়ারি-২০১৪ থেকে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। নাতাঞ্জ-এ অবস্থিত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্লান্টে এ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন ইরানের আনবিক শক্তি সংস্থার উপ-প্রধান বেহরুজ কামালভান্দি। সরকারি টিভি চ্যানেলে দেয়া বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের আইএইএ পর্যবেক্ষক দল ফোর্দো প্লান্ট পরিদর্শনে যাবেন। ৬ বিশ্বশক্তির (যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, বৃটেন, জার্মানি, চীন ও রাশিয়া) সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ কিছু পয়েন্ট আইএইএ তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এগুলো হলো, ৬ মাস চুক্তিকালীন সময়ের মধ্যে ইরান নতুন করে কোন ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্লান্ট তৈরি করতে পারবে না। ৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে ইউরেনিয়াম পরিশুদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে এবং ২০ শতাংশ সমৃদ্ধকৃত ইউরেনিয়াম নিষ্ক্রিয় করতে হবে। এর পরিবর্তে ইরানের ওপর নতুন করে পরমাণু সংক্রান্ত কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করাসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার কিছু কিছু প্রত্যাহার করে নিতে সম্মত হয়েছে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো।

পরমাণু চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু করেছে ইরান

ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া কমিয়েছে। বিশ্বের ৬টি শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তির অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নিয়েছে ইরান।

আশ্চর্য সব মানুষ by কাজল ঘোষ

রাজধানীর কিছু রাস্তায় যখন হাঁটি বা যানজটে থমকে গিয়ে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ কানে বাজে- কি এক ঘোর আমাকে তাড়া করে ফেরে। যেন নতুন এক স্বপ্নের ভুবন।
কোলাহল আর ভিড় ঠেলে কখনও যদি পাঁচতারা হোটেল সোনারগাঁওয়ের ফুটপাতে সন্ধ্যায় হাঁটাচলার সুযোগ হয় তাহলে খানিকটা থেমে কান পাতুন। শুনতে পাবেন পাখির সুতীব্র চিৎকার। শত হাইড্রোলিক  হর্নের আওয়াজ ভেদ করে আপনাকে যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে পাখিরা। হঠাৎ কোন এক বসন্তের দুপুরে রমনার ফুটপাত দিয়ে হাঁটলে কোকিলের মন্ত্রমুগ্ধ স্বর আপনাকে নিয়ে যাবে অন্য ভুবনে। মৎস্য ভবনের মোড় থেকে ইস্কাটন গার্ডেনের সন্ধ্যার রূপ সত্যিই আমাকে নিয়ে যায় অনেক পেছনে। যেখানে আমি ম্যাচ বক্স নিয়ে সারি সারি গাছের ভিড়ে ঝিঁঝিঁ পোকা খুঁজে ফিরতাম আনমনে। এই স্বপ্নচারিতা শুধু আমাকে আবিষ্ট করে রাখে এক দল বৃক্ষ। যারা এক দল ক্ষমতালোভী মানুষের মতো স্বার্থপর নয়। যারা তাদের ছায়া দিয়ে এক মায়াঘেরা পরিবেশ রচনা করেছে যুগ-যুগান্তরে। অথচ কি বীভৎসতা আর নির্মমতা নিয়ে আমরা করাতে তাদের নির্মূল করেছি গত কিছুদিন। তা-ও গণতন্ত্রের নামে, মৌলিক অধিকারের নামে। অথচ আমরা সবাই জানি, সমাজ আর সভ্যতা বিনির্মাণে কি ভূমিকা এই গাছেদের। আমরা বেঁচে আছি গাছের অবারিত দানে। অট্টালিকা ঘেরা এই শহরে যতটুকু গাছ দেখি তা তো রাস্তার মাঝখানে অসহায়; ক্ষীণকায় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু গাছ। এখানেও কালো থাবা। সেদিন বিজয়নগরের পথ ধরে যেতেই খেয়াল করলাম একটু পর পর কাটা গাছের গুঁড়ি। গত বছরের ৫ই মে জামায়াত-শিবির, হেফাজত আর জাতীয় পার্টির বিপথগামী কর্মীদের রোষানলের শিকার হয় বিজয়নগর থেকে পল্টন মোড় পর্যন্ত কয়েক শ’ গাছ। বিরোধী জোটের টানা অবরোধ আর হরতালে তা বিস্তৃত হয়েছে দেশজুড়ে। সাতক্ষীরা, যশোর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বগুড়া, জয়পুরহাট, রংপুর, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, পাবনা, সীতাকুণ্ড, গাইবান্ধা ও চাঁদপুর জেলার রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে শতবর্ষের হাজার হাজার গাছ রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছে। আগুনে পুড়ে মৃত্যু, পুলিশের গুলিতে মৃত্যু আর দুর্বৃত্তদের চোরাগোপ্তা হামলার শিকার হয়ে মৃত্যু হলেও পক্ষে বা বিপক্ষে বিবৃতি আসে। একে অন্যের দায় এ ওর ঘাড়ে চাপায়। কিন্তু করাতে বলি হওয়া গর্জন, শিরিষ, শিমুল, পলাশ, গামার, জারুল, ইউক্যালিপটাস, মেনজিন, গজারিরা ছটফট করলেও প্রাণ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। প্রকাশিত হিসাবে দেখা গেছে, গত ১০ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার সময় ৫০ হাজারের বেশি গাছ কাটা পড়েছে। বেশির ভাগ গাছই এখনও পরিণত হয়নি। প্রতিটির দাম ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। পরিণত হলে কমপক্ষে এই গাছের প্রতিটির মূল্য হতো ৩০ হাজার টাকা করে। গড়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার গাছ নিধন করা হয়েছে। নিধন হওয়া ৫০ হাজারের মধ্যে অন্তত ৪৫ হাজার গাছেরই মালিক সামাজিক বনায়নের ও ব্যক্তিমালিকানাধীন। এলজিইডির হিসাব অনুযায়ী তাদের ৩,৫১০টি, সওজের ২,৬৪০টি গাছ রাজনৈতিক সহিংসতায় ধ্বংস হয়েছে। অথচ এ ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে কোন পরিবেশকর্মী প্রতিবাদে সোচ্চার হননি। অথচ বিদেশী তহবিলের লোভে জলবায়ু সম্মেলনে দেশ বিভূঁইয়ে ঘুরে বেড়ানো আর নিজেদের বড় পরিবেশবাদী দাবি করার লোকও সংখ্যায় এদেশে অনেক। অনেকে বড় বড় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায়। এদের কেউই রাস্তায় দাঁড়াননি নির্মমভাবে বৃক্ষ নিধনের প্রতিবাদে। করেননি মানববন্ধন, সাদা পতাকা মিছিল। দোহাই আপনাদের, যে যেই দলেরই হোন না কেন এই নিরপরাধ গাছেদের এভাবে নিধন করবেন না। এরা আপনাদেরই জীবনদান করেছেন কালে কালে। শেষ করবো রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ক’টি লাইন দিয়ে- পৃথিবীর এই ক্লান্ত এ অশান্ত কিনারার দেশে, আশ্চর্য সব মানুষ রয়েছে...।

মঞ্চের পালা, বয়াতির লড়াই by শামীমুল হক

ঈমান আলী মইরা গেছে/ সব বেঈমান আলীর দল...। পালাগানে পালাকারদের প্রায়ই এ গানটি গাইতে শোনা যায়। পালায় জিততে তাদের যে কসরত তা তন্ময় হয়ে শোনেন দর্শক।

মঞ্চের পালা, বয়াতির লড়াই by শামীমুল হক

ঈমান আলী মইরা গেছে/ সব বেঈমান আলীর দল...। পালাগানে পালাকারদের প্রায়ই এ গানটি গাইতে শোনা যায়। পালায় জিততে তাদের যে কসরত তা তন্ময় হয়ে শোনেন দর্শক।
গ্রামেগঞ্জে এখনও শীতকাল এলে আয়োজন করা হয় পালাগানের। মঞ্চ বানিয়ে, আলোকসজ্জা করে অন্যভাবে সাজানো হয় মাঠ। মঞ্চের দুই পাশে বসেন দুই বয়াতির দল। দুই বয়াতির গানের লড়াই দেখতে দূর দূরান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন আসরে। সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া এ পালাগান চলে ভোর পর্যন্ত। সারা রাত দর্শক-শ্রোতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বয়াতির লড়াই দেখেন। কখনও হাততালি দেন। কখনও উদ্বেগে সময় কাটান- বিপক্ষ বয়াতির ছুড়ে দেয়া প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে কিনা অপর বয়াতি এ চিন্তায়। না, গানে গানে প্রশ্নের উত্তর তো দিচ্ছেনই পাশাপাশি নিজেও ছুড়ে দিচ্ছেন প্রশ্নের তীর। টান টান উত্তেজনা। এমন লড়াইয়ে লড়াইয়ে ভোর রাতে গিয়ে দুই বয়াতি এক হয়ে এক সুরে গান ধরেন। দর্শকদের জানান দেন, রাতব্যাপী যে গানের যুদ্ধ হয়েছে কিংবা পালাগানে দুই জনে দুই পক্ষে থাকলেও আসলে পৃথিবীতে সবই এক। অর্থাৎ একজন ছাড়া অন্যজন চলতে পারেন না। চলতে গেলে সবকিছুরই প্রয়োজন আছে। কাজেই দ্বন্দ্ব ফ্যাসাদ নয়, সবাই এক হয়েই কাজ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত পালাকাররা তাদের ভূমিকায় এটাই বুঝিয়ে দিয়ে যান। মঞ্চের পালাগানের রাজনীতিতে দুই পক্ষ এক হলেও দেশের রাজনৈতিক মঞ্চে প্রধান দুই দল কখনও এক হতে দেখা যায় না। কারণ, এখানে হচ্ছে স্বার্থের লড়াই। এ লড়াইয়ে দেশ গোল্লায় যাক তাতে কি? নিজের লাভ হলেই হলো। দেশের মানুষ যারা তারা তো রাজনৈতিক এ মঞ্চের দর্শক। কিন্তু এ দর্শকরা সবই  বোঝেন। তারা সব অনুভব করেন। তাদের সামনে সব ফকফকা। কিন্তু তারা যে দর্শক। তাদের তো মঞ্চে ওঠার সুযোগ নেই। কথা বলারও সুযোগ নেই। পালাগানের মঞ্চে যেমন দেখে ও শুনেই সার; তেমনি রাজনৈতিক মঞ্চের সব নাটকও দেখা ও শুনার অধিকার তাদের। মঞ্চে ওঠার সুযোগ নেই। দেশের রাজনীতিতে এসব দর্শকের মূল্যায়ন কবে হবে? এ দর্শকরা কখন মঞ্চে ওঠার সুযোগ পাবেন? তাদের কথার কখন মূল্যায়ন হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর না জানা পর্যন্ত রাজনৈতিক মঞ্চের কুশীলবরা পালাকারদের মতো শেষ মুহূর্তেও এক হবেন না। ততদিন তারা তাদের মতোই চলবেন। তারা একবারও ভাবেন না দর্শক না থাকলে তাদের মূল্যায়ন কোথায়? দর্শক না থাকলে তাদের ভাল কাজে হাততালি দেবে কারা? দর্শক না থাকলে তাদের এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগাবে কারা? অবশ্য যদি ৫ই জানুয়ারির মতো একটি নির্বাচন করতে পারা যায়- তাহলে তো দর্শকের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নেই দর্শকদের তোয়াজ করার। এমন বোবা দর্শক যদি থাকেন তাহলে তাদের জন্য লাভই হয়। যতক্ষণ খুশি মঞ্চ দখল রাখা যায়। যেভাবে খুশি মঞ্চ পরিচালনা করা যায়। কেউ বাধা দেয়ার থাকবে না। কেউ প্রতিবাদ করার থাকবে না। কারও কাছে জবাবদিহি করারও প্রয়োজন নেই। এমন মঞ্চ কি আসলে আখেরে নিজেদের কাছে রাখা যায়। কারণ, দর্শকের মন যোগাতে না পারলে তারা তো অডিয়েন্স ছেড়ে চলে যাবেন। তাদের কাছে ভাল না লাগলে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। তারপর দর্শকবিহীন মঞ্চে কতক্ষণ থাকতে পারবেন পালাকাররা। মঞ্চে যারা থাকেন তারা এসব বিষয় কখনও ভাবেন না। কারণ, তাদের সঙ্গে থাকেন যন্ত্রীরা। আর তারা চোখ বুজে চলেন বলে মনে করেন বাদ্যযন্ত্রের সুরে দর্শক তো থাকবেই। মনে পড়ছে একটি গল্পের কথা- এক গ্রামে করা হয়েছে গানের আয়োজন। রাগ সংগীতের আয়োজন। সারা দিন মাইকিং করে বিখ্যাত গায়কের গানে আমন্ত্রণ জানানো হয় গ্রামবাসীকে। সন্ধ্যায় মাঠভর্তি মানুষ। মঞ্চে উঠলেন গায়ক। তিনি দেখেন, সামনে এক লোক একটি নতুন গামছা নিয়ে বসে আছেন। গায়ক তাকে ডাকলেন। তার কাছ থেকে গামছাটি চেয়ে নিলেন। গায়ক নতুন গামছা বিছিয়ে বসলেন মঞ্চে। তারপর চোখ বুজে টান দিলেন রাগ সংগীতে। দীর্ঘ সময় পর গান শেষ করে দেখলেন মাঠ ফাঁকা। শুধু বসে আছেন একজন। গায়ক খুশি হলেন। যাক একজন অন্তত রাগ সংগীতের মর্ম বুঝলেন। ডাকলেন তাকে। বললেন, গান নিশ্চয়ই তোমার ভাল লেগেছে। সবাই চলে গেলেও তুমি রয়ে গেলে। আমি খুব খুশি হয়েছি। লোকটি বললেন, আমি আপনার গান শোনার জন্য বসে থাকিনি। আমি বসে আছি আমার গামছার জন্য।

কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনীতি by ড. মাহফুজ পারভেজ

বাংলাদেশ এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে প্রধানত রাজনৈতিক কারণে। প্রাকৃতিক বা অর্থনৈতিক বা দুর্নীতিবিষয়ক ইস্যুতে অতীতে বিশ্ব শিরোনাম হলেও এবার বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার মূল-কারণ রাজনীতিক।
১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটুকু গণতন্ত্রসম্মত হয়েছে এবং সে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারের বৈধতার প্রসঙ্গটি এখন দেশ-বিদেশের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এই পরিস্থিতিতে বিগত মাসগুলোর বিপর্যস্ত অবস্থান থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সঠিক, সমন্বিত ও শান্তিপূর্ণভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কিনা, সেটাও উল্লেখিত হচ্ছে। রাজনীতি ঠিক না হলে যে, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, আইন-শৃঙ্খলা ছন্দ ফিরে পাবে না, এমন শঙ্কাও রয়েছে। অতএব, যে সংসদ, সরকার ও বিরোধী দল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, তা রাজনৈতিকভাবে সত্যিই সফল হতে পারে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে কেবল ক্ষমতার ভাগাভাগিজনিত নির্বাচন-পূর্ব সাফল্য নয়; বরং নির্বাচন-পরবর্তী সাফল্যের তুলাদণ্ডেই পরিমাপ করা হবে নতুন সরকারকে। অন্যদিকে বিরোধী দলীয় কার্যক্রমের সাফল্য-ব্যর্থতার বিষয়গুলোকেও পুরোপুরি আড়াল করে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাদেরকেও আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেদের প্রকৃত চেহারা দেখার সময় এসেছে। নেতৃত্ব, সংগঠন, কৌশল ও কর্মসূচির দিক থেকে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে তারা কি করেছেন এবং ভবিষ্যতে কি করবেন, সেটা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করাও কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে উজ্জ্বল করার জন্যই এসব অতি জরুরি চিন্তা-ভাবনা-আত্মসমালোচনা তাদেরকে করতে হবে। বস্তুত, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন সত্যিকার অর্থেই পাড়ি দিচ্ছে সন্ধিক্ষণ। অতীতের দ্বি-দলীয় ব্যবস্থার কাঠামো একটি প্রবল পালাবদলের মুখে। সরকার ও বিরোধী, যে অবস্থানেই থাকুক না কেন, দেশের রাজনৈতিক শক্তিসমূহকে নানা রকমের পট-বদল ও পরীক্ষার বিরূপ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়েই যেতে হচ্ছে। সরকারে আসীন আওয়ামী লীগের পরীক্ষা একরকম আর ক্ষমতার বৃত্ত থেকে সদ্য ছিটকে-পড়া বিএনপির পরীক্ষার ধরন স্বাভাবিক কারণেই আরেক রকমের। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি, যেমন জাতীয় পার্টি ও জামায়াত, এরাও পরীক্ষার বাইরে নেই। অস্তিত্ব রক্ষা ও বিকাশের পথে নানা পরীক্ষার সামনে পড়েছে দল দুটি। সন্দেহ নেই, ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বাপরের ঘটনা-প্রবাহ বাংলাদেশের এ যাবৎকালে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বিন্যাসের মূল ধরে টান দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎও এ টানাটানির কারণে শঙ্কামুক্ত নয়। একটি সুপ্ত ও চাপা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মোটেও আড়াল করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সামনের দিনগুলোর আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক চিত্র সম্পর্কে কেউই আশাবাদী উপসংহার টানতে পারছেন না। কেননা, খোদ রাজনীতিই যদি আক্রান্ত বা বেপথু হয়, তখন সুশাসনসহ সামাজিক, অর্থনৈতিক, আইন-শৃঙ্খলা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও সেটার ঝাপটা এসে লাগবেই। রাজনীতিকে সঠিক পথে আনার জন্য ক্রেডিবল, পার্টিসিপেটরি, ইনক্লুসিভ, ফ্রি-ফেয়ার, ট্রান্সপারেন্ট নির্বাচনের কথা ছাড়া অন্য কোন পন্থার কথা কেউ বলতে পারবেন না। অন্য কথা বা পথ যারা বাতলে দিচ্ছেন, তারা গণতান্ত্রিক রাজনীতির পক্ষে কাজ করছেন বলা যাবে না। অতএব সব কিছুই করতে হবে গণতান্ত্রিক বিধি-ব্যবস্থার শাশ্বত নীতিকে মেনেই। ক্ষমতায় থাকা আর ক্ষমতায় যাওয়ার গতানুগতিক রাজনীতির একমুখী লক্ষ্য থেকে আরও বৃহত্তর পরিসরকে বিবেচনায় না নেয়া হলে, ক্ষমতাসীন বা ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী, কেউই দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি থেকে মানুষকে উদ্ধার করতে পারবেন না। এবং সন্ধিক্ষণের সঙ্কটাবর্তে বিপর্যস্ত রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে যথাযথ স্থানে ও মর্যাদায় তুলে আনতেও পারবেন না।

কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনীতি by ড. মাহফুজ পারভেজ

বাংলাদেশ এবারই প্রথমবারের মতো বিশ্বব্যাপী আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে প্রধানত রাজনৈতিক কারণে। প্রাকৃতিক বা অর্থনৈতিক বা দুর্নীতিবিষয়ক ইস্যুতে অতীতে বিশ্ব শিরোনাম হলেও এবার বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার মূল-কারণ রাজনীতিক।

সমাধান তাহলে হয়েই গেল! by মনির হায়দার

অবশেষে পাশে নেই যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত। অন্যসব শরিক দলের নেতারা যথারীতি খালেদা জিয়ার দুই পাশেই ছিলেন। বক্তৃতাও করেছেন তারা।
পুরনোদের সঙ্গে নতুন যুক্ত হয়েছেন খণ্ড-বিখণ্ড জাতীয় পার্টির সর্বশেষ অংশের নেতা কাজী জাফর আহমদ। অবশ্য এই জোটে তাঁর যুক্ত হওয়ার কোন ঘোষণা কোন পক্ষ থেকেই দেয়া হয়নি। তবে বহুকাল পর তাকে দেখা গেল বিএনপির কোন সমাবেশে বক্তৃতা করতে। এলডিপি’র অলি আহমদ ও বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থসহ অন্য সব শরিক দলের নেতারাও বক্তৃতা করেছেন। সোমবার বিকালে এমনই ছিল সোহরাওয়ার্দী  উদ্যানের দৃশ্যপট। যদিও সমাবেশটি ছিল বিএনপির। তবুও সেখানে ১৮ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর প্রায় সব নেতাই হাজির ছিলেন। দেখা যায়নি কেবল জামায়াত নেতাদের। নিঃসন্দেহে এ এক নতুন দৃশ্য। অন্তত বিগত পাঁচ বছরে এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যায়নি। কাগজে কলমে কখনও চারদলীয়, আবার কখনো ১৮দলীয় জোট বলা হলেও বাস্তবে প্রতিপক্ষ বরাবরই এটাকে ‘বিএনপি-জামায়াত জোট’ হিসেবেই অভিহিত করেছে। অবস্থা এমন হয়েছিল যে, জামায়াতকে ছাড়া বিএনপির পথ চলাই যেন অসম্ভব। আর এটাকেই সবচেয়ে বড় ইস্যু হিসেবে সামনে নিয়ে আসে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা।

সামপ্রতিক বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা বিএনপিকে অভিযুক্ত করেছে মূলত জামায়াতের সঙ্গে মাখামাখির দায়ে। চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের জন্যও তারা বিএনপির জামায়াতপ্রীতিকেই দায়ী করেছে। ‘জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ না করলে বিএনপির সঙ্গে কোন আলোচনা বা সমঝোতা নয়’- কথাটি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে তার দলের নেতারা কত হাজার বার যে বলেছেন, তার কোন হিসাব নেই। এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের, বিশেষত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থনও আদায় করতে পেরেছেন তারা। এই প্রেক্ষাপটেই বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া গত সপ্তাহে বিবিসিকে বলে বসেন যে, জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কটা সাময়িক। বিএনপির ঘাড়ে থাকা জামায়াতি বোঝার ভার অনেকটাই স্পষ্ট হয় খালেদা জিয়ার এই কথায়। সর্বশেষ ইউরোপীয় পার্লামেন্টের গৃহীত প্রস্তাবেও জামায়াত-হেফাজতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক ছেদের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এ অবস্থায় গত ক’দিন ধরে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে নানা গুঞ্জন। নাজুক দশা কাটিয়ে উঠতে বিএনপির নীতিনির্ধারকদের অনেকেই নাকি জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন দলনেত্রীকে। এছাড়া, ঢাকায় দায়িত্বরত বিদেশী কূটনীতিকদের অনেকেই বিএনপিকে একই পরামর্শ দিয়েছেন বলে শোনা যায়। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই জামায়াতকে ‘মডারেট মুসলিম ডেমোক্রেট’ সার্টিফিকেট দিয়ে আসছে। তা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন-সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে জামায়াতের সঙ্গে বন্ধুত্ব ক্রমশ বাধা হিসেবেই স্পষ্ট হতে থাকে। অন্যদিকে জামায়াতের অভ্যন্তরেও রণকৌশল পরিবর্তনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে পত্রিকার খবরে প্রকাশ। এছাড়া, ময়দানের সহিংসতায় অগ্রভাগে থাকা দলটির নেতাদের বড় একটি অংশ বিএনপির ওপর নাখোশ বলেও খবর বেরিয়েছে।
এমন পটভূমিতেই সোমবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হয়ে গেল বিএনপির জনসভা। গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে সৃষ্ট অবরুদ্ধ-লণ্ডভণ্ড দশার পর এটিই ছিল দলটির প্রথম শোডাউন। আর সেখানেই দেখা গেল প্রায় অচেনা এক দৃশ্য। ১৮ দলীয় জোটভুক্ত প্রায় সবগুলো দলের নেতা সেখানে মঞ্চে হাজির ছিলেন। জোটের বাইরের নেতা বর্ষীয়ান রাজনীতিক কাজী জাফর আহমদকেও দেখা যায় খালেদা জিয়ার পাশে। তবে দেখা যায়নি শুধু জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের। মঞ্চের সামনে উপস্থিত জনতার মধ্যেও আগের সমাবেশগুলোর মতো জামায়াত-শিবিরের আধিপত্য দেখা যায়নি। গোটা সমাবেশস্থলের কোথাও ছিল না তাদের কোন ব্যানার-ফেস্টুনও। হঠাৎ এমন দৃশ্য দেখে নিশ্চয়ই আশান্বিত হয়ে উঠেছে হতাশাক্লান্ত  জাতি। রাজনৈতিক সমঝোতার পথে মূল বাধা বুঝি দূর হয়ে গেল! অন্তত ক্ষমতাসীন মহলের কথা অনুযায়ী।
একটানা দীর্ঘদিনের সংঘাত-সহিংসতা ও দমন-পীড়নে গোটা সমাজ আজ বিপর্যস্ত। বেঘোরে মানুষের প্রাণহানিতে ব্যক্তি নিরাপত্তা আজ উধাও। এ অবস্থায় শঙ্কা আর আতঙ্কের ঘোর অমানিশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পথে বিএনপি-জামায়াতের মাখামাখিটাই যদি মূল প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করে থাকে, তাহলে সোমবারের সমাবেশ নিশ্চয়ই সেই বাধা অতিক্রম করার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। সুতরাং এই প্রশ্ন এখন খুবই প্রাসঙ্গিক যে, তাহলে রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান কি হয়েই যাচ্ছে?

সমাধান তাহলে হয়েই গেল! by মনির হায়দার

অবশেষে পাশে নেই যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত। অন্যসব শরিক দলের নেতারা যথারীতি খালেদা জিয়ার দুই পাশেই ছিলেন। বক্তৃতাও করেছেন তারা।

ফেসবুকের এক নারী ইঞ্জিনিয়ারের কথা... by ইমরান আলী

পরীক্ষার ফলাফল থেকে শুরু করে, প্রশাসনিক, বৈমানিক, বিজ্ঞানী, নিরাপত্তায়, রাষ্ট্র পরিচালনা, বলতে গেলে সবদিক দিয়েই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এগিয়ে। থেমে নেই প্রযুক্তিতেও।
ফেসবুকের মতো সারা বিশ্বে জনপ্রিয় এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথম ১০ জন ভাড়াটে এমপ্লয়ির ভেতরেও ছিলেন নারী। বিশ্বের কোটি কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীরা কি জানেন তাদের ফেসবুকে বন্ধুদের নিউজফিডগুলোর ডেভেলপার কে ছিলেন? রুচি সাংভি। আর ইনিই হচ্ছেন ফেসবুকের প্রথম নারী ভাড়াটে ইঞ্জিনিয়ার (ডেভেলপার)। ভারতীয় এই রুচি সাংভিকে বলা হয় বিশ্বে কম্পিউটার প্রযুক্তিতে শক্ত অবদান রাখা ২০ নারীদের মধ্যে একজন। প্রখর এই মেধাবীর ফেসবুকে চাকরিতে যোগদান নিয়ে বেশ মজার তথ্যও রয়েছে।

জুকারবার্গ ও তার বন্ধুরা মিলে যখন দেখলেন তাদের তৈরি করা ফেসবুকের জনপ্রিয়তা ও চাহিদা বেড়েই চলছে তখন সিদ্ধান্ত নিলেন কিছু এক্সপার্টকে ‘হায়ার’ করার। কতকটা চুক্তিভিত্তিক কাজ। ‘রুচি’ নিজেও ছিলেন একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী। তিনি ফেসবুকে আবেদন করলেন চাকরির জন্য। ভাইভার প্রথম দিনেই তিনি অফিসে গিয়ে ভিমরি খেলেন। পুরো অফিস ফাঁকা। খোঁজ নিয়ে জানলেন সব প্রোগ্রামার নাকি সারা রাত জেগে প্রোগ্রামিংয়ের কাজ করেন আর দিনে ঘুমান। ফাঁকা অফিসে তিন ঘণ্টা একা বসেই অপেক্ষা করছিলেন তিনি। তারপর কেউ একজন এসে তার ভাইভা নিয়েছিলেন। সে পরীক্ষায় তিনি টিকেও গেলেন। সেখান থেকে তার ক্যারিয়ারের উন্নয়ন।
ফেসবুকের পুরো ব্যাপারটাই ‘রুচির’ কাছে ছিল আনন্দদায়ক। পাশাপাশি তিনি এটাকে নিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জ হিসেবে।
ভারতের পুনেতে বড় হওয়া রুচির জন্ম ২০শে জানুয়ারি ১৯৮২ সালে। কারনিগ মেলন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইলেক্ট্রিক্যাল কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়া রুচি ফেসবুকে যোগদান করেন ২০০৫ সালে। ২০০৬ সালে ফেসবুকের নিউজ ফিডের (প্রথম ভার্সন) পেছনে রয়েছে তার ব্যাপক অবদান। ২০০৬ সালে তিনি এর বিস্তারিত বর্ণনা লেখেন এক ব্লগে। সে সময় ফেসবুকে নিউজ ফিডের এই ব্যাপারটি ছিল একেবারেই আলোচিত ও সমালোচিত। নিউজ ফিড যা ফেসবুকের অন্য বন্ধুর হোম পেজে প্রদর্শিত হয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ফলে এটা কে নিয়ে অনেকেই সরাসরি তখন রুচিকে আক্রমণ করেছিলেন সমালোচনার ভাষায়। সমালোচনাকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী এই নিউজ ফিড নাকি তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও কথাকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল ইচ্ছার বিরুদ্ধে। সব সমালোচনাকে এড়িয়ে রুচি হয়ে ওঠেন আরও সক্রিয় কর্মী এবং ফেসবুকের একনিষ্ঠ একজন। ২০০৬ সালে তিনি ফেসবুকের প্রডাক্ট লিড হিসেবে কাজ করেন। রুচি মূলত ফেসবুকের নতুন নতুন কি কি সুবিধা আনা যায় সে বিষয়েও গবেষণা করতেন। আজকের দিনে আমরা যে ফেসবুক ব্যবহার করছি তার পেছনে রুচির অবদান অনস্বীকার্য।
সফলভাবে ৫ বছর ফেসবুকে কাজ করে তিনি ২০১০-এ চাকরি ছেড়ে দিয়ে ও তার স্বামী আদিত্য আগারয়ালের সঙ্গে নিজেই  ‘কোভ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। তবে সেই প্রতিষ্ঠান খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি। ২০১২ সালে তিনি ড্রপবক্স((ফটো, ডকুমেন্ট, ভিডিও বা কোন ফাইল শেয়ারিং/ব্যাকআপ সুবিধা)) থেকে চাকরির ডাক পান। ড্রপবক্সের পণ্য বিপণন, প্রচার ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাজ করেন। একপর্যায়ে তিনি ড্রপবক্স অপারেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেন। বর্তমানে প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের কাছে ড্রপবক্সও বেশ আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বে ফেসবুকে কাজ করার সুবাদে রুচি ২০১১ সালে ‘বেস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়ন কাজের জন্য FWD.us-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এই রুচি সাংভি। ফেসবুকের নিউজ ফিডের সাবেক এই প্রথম নারী ডেভেলপারের ব্যক্তিগত যত কথা ও গল্প কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে ঋডউ.ঁং-এর সাইটে।
ফেসবুকের প্রথম নারী ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে রুচির নাম ফেসবুক ইতিহাসে যে লেখা থাকবে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই বললেই চলে।

ফেসবুকের এক নারী ইঞ্জিনিয়ারের কথা... by ইমরান আলী

পরীক্ষার ফলাফল থেকে শুরু করে, প্রশাসনিক, বৈমানিক, বিজ্ঞানী, নিরাপত্তায়, রাষ্ট্র পরিচালনা, বলতে গেলে সবদিক দিয়েই পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও এগিয়ে। থেমে নেই প্রযুক্তিতেও।

এক বছরে ১৫ জনপ্রতিনিধি খুন, বিচার হয়নি একটিরও

সন্ত্রাস আর রাজনৈতিক সহিংসতায় শুধু সাধারণ নাগরিকই নয় প্রাণ যাচ্ছে জনপ্রতিনিধিদেরও। বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় গত এক বছরে অন্তত ১৫ জন জনপ্রতিনিধি প্রাণ হারিয়েছেন।
গত এক বছরেই সারা দেশে খুন হয়েছেন ১২ জন ইউপি চেয়ারম্যান, একজন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ২ জন ইউপি সদস্য। তাদের প্রত্যেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সবচেয়ে বেশি জনপ্রতিনিধি হত্যার ঘটনা ঘটেছে দক্ষিণাঞ্চলে। গত ৩০ বছরে যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনা জেলায় খুন হয়েছেন শতাধিক ইউপি চেয়ারম্যান।  এসব হত্যায় একটিরও সুষ্ঠু বিচার হয়নি। গত বছরের ১০ই মার্চ পাবনার সদর উপজেলার গয়েশপুর ইউপি চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ইবরাহিম আলী মৃধার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার লালন শাহ সেতু সংলগ্ন মহাসড়কে তার লাশ পাওয়া যায়। ২৪শে মার্চ যশোরের বেনাপোলের পোর্ট থানার পটুয়াখালী ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক নিহত হন। শার্শা উপজেলার মাইজডাঙ্গা নামক স্থানে সন্ত্রাসীরা তার ওপর গুলি চালায়।  ২১শে মার্চ হত্যা করা হয় মেহেরপুরের উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা ডা. হামিদুর রহমান হেলালকে। তাকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়। এসময় পিতাকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের বোমায় নিহত হন তার কলেজপড়ুয়া কন্যা সুমি। ১৭ই জুন ঝিনাইদহ উপজেলার নলডাঙ্গা ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী  লীগ নেতা  রুহুল আমীন বিশ্বাসকে কুপিয়ে ও বোমা মেরে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ৮ই আগস্ট হবিগঞ্জ সদরের গোপায়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ইসহাক মিয়া খুন হন। জমিসংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে প্রতিপক্ষের হামলায় তিনি নিহত হন। ১লা সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান ফুরকান উদ্দিন সেলিম মৃধা ওরফে পাহাড়ি সেলিম নিহত হন। ৫ই অক্টোবর প্রকাশ্যে নিহত হন যশোরের চৌগাছা উপজেলার সিংহঝুলি ইউপি চেয়ারম্যান ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জিল্লুর রহমান। দিনে-দুপুরে সন্ত্রাসীরা গুলি করে তাকে হত্যা করে। ৮ই ডিসেম্বর কুষ্টিয়া উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জগন্নাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান মুন্সী রশিদুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ১২ই ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের কোন্ডা ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আতিকুল্লাহ চৌধুরীকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ২০শে ডিসেম্বর টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউপি চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি রফিকুল ইসলাম ফারুককে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। ৩০শে ডিসেম্বর সাতক্ষীরার আগরদাঁড়ি ইউপি চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা আনারুল ইসলাম যৌথবাহিনীর গুলিতে নিহত হন। গত ১৮ই জানুয়ারি নাটোরের সিংড়া উপজেলার কলম ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা ফজলার রহমানকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করেছে। ৩রা জানুয়ারি খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ধামালিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. শহিদুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। টোলনাস্থ নিজ বাড়িতে গুলি করা হয় তাকে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। ২৭শে জানুয়ারি সিলেটের জৈন্তাপুর ইউপি সদস্য শামসুদ্দিন দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। ১২ই এপ্রিল নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বাগডোর ইউপি সদস্য আবদুস সালাম প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হন। ২০১০ সালের ৮ই অক্টোবর প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয় নাটোরের বড়াই গ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা সানাউল্লাহ নূর বাবুকে। এরপর ২০১১ সালের ১লা নভেম্বর নরসিংদী পৌরসভার মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা লোকমান হোসেনকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে।

এক বছরে ১৫ জনপ্রতিনিধি খুন, বিচার হয়নি একটিরও

সন্ত্রাস আর রাজনৈতিক সহিংসতায় শুধু সাধারণ নাগরিকই নয় প্রাণ যাচ্ছে জনপ্রতিনিধিদেরও। বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলায় গত এক বছরে অন্তত ১৫ জন জনপ্রতিনিধি প্রাণ হারিয়েছেন।

সংসারের অন্তরাল থেকে অনন্ত অন্তরালে

মেয়ে, জামাই ও নাতনিদের সঙ্গে সুচিত্রা সেন
আমরা যে সুচিত্রা সেনকে চিনি, তাঁর বয়স ৪৫ থেকে ৪৬। তাঁর জীবনের অবসান ঘটেছে ৩৫ বছর আগে। পঞ্জিকার হিসাবে প্রায় ৮৩ বছর বয়সে ১৭ জানুয়ারি সকালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন অন্য এক সুচিত্রা সেন। প্রায় ৩৫ বছর সংসারের অন্তরাল থেকে অনন্ত অন্তরালে চলে গেলেন। সুচিত্রা সেনের মৃত্যুতে দুই বাংলার মিডিয়া ও সংস্কৃতিকর্মীদের কথা ও লেখায় প্রাধান্য পেল তাঁর রূপ। তাঁর অভিনয়-নৈপুণ্যের কথাও আছে, তবে বিশ্লেষণ কম। বঙ্গীয় সমাজে যাঁর বাজারদর বা জনপ্রিয়তা আছে, তাঁকে নিয়ে প্রথাগতরা অনেক কিছুই করে। প্রথাগত ভাষায় বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক নেতারা তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও শোক বাণী দিয়েছেন। এ ধরনের জনপ্রিয় মানুষকে নিয়ে যে দুই বাংলায় মৃদু রাজনীতি হবে না, অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে তাঁর নাম ব্যবহূত হবে না, তা-ও নয়। অধিকাংশ লেখা ও বক্তব্য থেকে একালের পাঠক ও দর্শক-শ্রোতার মনে হবে, সুচিত্রা সেন ছিলেন কোনো ধু ধু প্রান্তরে এক অপরূপ ফুল। মনে হবে, তিনি একা, তাঁর চারপাশে বিশেষ কেউ নেই। তাঁর মৃত্যুতে অনেকের মতো আমি শোক অনুভব করিনি, কোনো শূন্যতাও নয়।
সকালে নাশতা খাওয়ার সময় টিভিতে তাঁর মৃত্যুর সংবাদটি শোনার পর আমি একধরনের অতীত স্মৃতিবিধুরতায় আক্রান্ত হই। ফিরে যাই আমাদের তরুণ বয়সে। আমাদের সময়ে। পঞ্চাশের শেষ থেকে ষাটের দশকটি ছিল আমাদের সময়। উপনিবেশ-পরবর্তী উপমহাদেশে—ভারত, পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলায়—পঞ্চাশের দশকটি ছিল প্রস্তুতির সময়। বাঙালির সৃষ্টিশীলতার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটেছিল ষাটের দশকে। বাঙালি বলতে আমি দুই বাংলার বাঙালিকেই বোঝাচ্ছি। সাহিত্য ও শিল্পকলায়, সংগীত ও চলচ্চিত্রে এবং জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে ষাটের দশকটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতির ক্ষেত্রেও ষাটের দশকটি ছিল খুবই সৃষ্টিশীল। আমাদের কারও স্বপ্ন ছিল সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, কারও কাছে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই পেয়েছিল প্রাধান্য। ষাটের দশক মানুষ তৈরি করেছিল বলেই আমরা একাত্তর করতে পেরেছিলাম। মধ্য-পঞ্চাশ থেকে মধ্য-সত্তর ছিল বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণকাল। সেই স্বর্ণকালের, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে পারি, ‘অনন্তযৌবনা উর্বশী’ ছিলেন সুচিত্রা সেন। তাঁর সম্পর্কেই শুধু বলা যায়, তিনি ছিলেন ‘যৌবনে-গঠিতা’ এবং ‘নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধূ, সুন্দরী রূপসী’। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ভারত ও পাকিস্তানে সুন্দরী নায়িকার অভাব ছিল না। সত্তর ও আশির দশকেও অভাব নেই। বৈজয়ন্তী মালা, আশা পারেখ, সায়েরা বানু, শ্রীদেবী, ওয়াহিদা রেহমান থেকে মাধুরী দীক্ষিত। তারপর প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, শিল্পা শেঠি, কারিনা কাপুর, ক্যাটরিনা কাইফ হিন্দি ছবির কত সুন্দর মুখ।
লাহোরের নায়িকারাও ছিলেন অসামান্য সুন্দরী। কিছুটা মেদবহুল হলেও নীলো, সাবিহা, নায়ার সুলতানা, মোশাররাত নাজির, নাদিরা, রানী, জেবা, রোজিনা প্রমুখের গ্ল্যামার অল্প ছিল না। আমাদের সেই কালের বিশ্বনন্দিতা এলিজাবেথ টেলর, মেরিলিন মনরো, ব্রিজিত বার্দোত, সোফিয়া লরেন প্রমুখ ছিলেন। কলকাতার টালিউডেই ছিলেন অনেক সুন্দরী। অনুভা গুপ্তা, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, মালা সিনহা, সুপ্রিয়া, মাধবী—কেউই কম সুন্দরী নন। তবু কেন আমাদের মতো যুবকেরা পাগল হয়েছিল সুচিত্রা সেনকে নিয়ে? অন্যদের কথা বলতে পারব না। আমি শুধু আমার নিজেরটাই জানি। তাঁর আগেও মেয়েদের দেখেছি; কিন্তু সুচিত্রা সেনের মধ্যেই প্রথম দেখলাম নারীর রূপ। সুচিত্রা সেনের মধ্যে সমাবেশ ঘটেছিল নানা গুণের। সৌন্দর্যের সঙ্গে তাঁর অভিনয়-নৈপুণ্য। আচরণের মাধুর্য। অসামান্য ব্যক্তিত্ব। চারিত্রিক সংগতি ও দৃঢ়তা। আত্মমর্যাদাবান, তবে কিছুটা জেদি। বঙ্গীয় সমাজে এত গুণের সমাবেশ একজনের মধ্যে বিরল। শুনেছি তিনি নাকি প্রযোজকদের বলতেন, ছবির বিজ্ঞাপনে তাঁর নাম আগে দিতে অর্থাৎ উত্তম-সুচিত্রা নয়, সুচিত্রা-উত্তম অভিনীত। পরবর্তী প্রজন্মের যাঁরা তাঁর রূপ উপভোগ করেননি, যাঁরা তাঁর সৌন্দর্যের সুধা আমাদের মতো আকণ্ঠ পান করেননি রুপালি পর্দায়, তাঁরাও দেখলাম তাঁর রূপের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত। তাঁর রূপের বাইরে তাঁর দার্শনিক ও ধার্মিক সত্তার কথা কেউ বললেন না—না-কলকাতার, না-বাংলাদেশের। রূপসীও ছিলেন বটে!
সুচিত্রা সেনের ঝিনুকের মতো চোখ, কালো ভ্রমরের মতো ভ্রু, কিঞ্চিৎ কোঁকড়া কেশ, সে চুল কখনো খোলা। কখনো আলগা চুল পিঠে ছড়ানো। কখনো এক পাশে সিঁথি। তাঁর চুল বাঁধাটাই অন্য রকম। আলগা খোঁপা ঘাড়ের ওপর। কখনো চুল টেনে পনিটেইল বাঁধা। কখনো মাঝখানে সিঁথি। কত নারীর খোঁপায় ফুল দেখেছি। সুচিত্রা সেনের চুলে গোঁজা ফুল দেখে মনে হয়েছে, ওই ফুলই যেন নতুন জীবন পেল—সুন্দর ফুল হলো সুন্দরতর সুচিত্রার চুলের ছোঁয়া পেয়ে। তাঁর নিখুঁত দাঁতের উজ্জ্বলতা ভোলার নয়। তাঁর সূক্ষ্ম হাসি? সুচিত্রার শাড়ি পরার ঢং, তাঁর ব্লাউজ—সবই অনন্য। থ্রি-কোয়ার্টার ব্লাউজে তাকে যা মানাত, অন্য কোনো নারীকে তেমনটি দেখিনি। উচ্চবিত্ত ঘরের কত যুবতীকে সেকালে দেখেছি তাঁকে অনুকরণ করতে। আমি কোনো সিনেমাপ্রেমিক যুবক ছিলাম না। আমার বাবা সিনেমা খুব দেখতেন। তাঁর সঙ্গে হলে গিয়েই দেখি সম্ভবত সুচিত্রা সেনের প্রথম যে ছবিটি তা হলো অগ্নিপরীক্ষা। ওই ছবিতে তাঁর ঠোঁট মেলানো সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ‘গানে মোর ইন্দ্রধনু’ শুনে কে না মুগ্ধ হয়েছে। হারানো সুর-এর সেই গান, ‘তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার’ যত দিন বাংলা ভাষা আছে তত দিন থাকবে। পথে হলো দেরীতে ‘এ লগনে দুটি পাখি’ সন্ধ্যার কণ্ঠে অপূর্ব। কত যে রোমান্টিক দৃশ্য তাঁর অভিনীত ছবিতে। মনে পড়ে, উত্তমকুমারের কোল ঘেঁষে বসা সুচিত্রা সেন। উত্তমের ঠোঁটে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে: ‘সূর্য ডোবার পালা আসে যদি আসুক—বেশ তো, বেশ তো...’।
বুক ভরে যায়। সপ্তপদীতে উত্তমের মোটরসাইকেলের পেছনে বসে গ্রামের সড়কে যাচ্ছেন সুচিত্রা। পাখি উড়ছে আকাশে। উত্তমের ঘাড়ের মধ্যে সুচিত্রার মুখ। একালে মোটরসাইকেলে মেয়েদের পেছনে চলাচল হচ্ছে, সেকালে তা ছিল বিরল রোমান্টিক ব্যাপার। ব্যতিক্রমী দৃশ্য। হেমন্তের কণ্ঠে উত্তম গাইছেন, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো’। জীবনে মোটরসাইকেলই চালাতে শিখলাম না। পেছনে বসাব কাকে? সেকালে ভাবতাম, এভাবে যদি কাউকে পেছনে বসিয়ে মোটরসাইকেল চালাতাম! শুনেছি, সপ্তপদী শুটিংয়ের সময় নাকি কোনো কারণে উত্তম-সুচিত্রার মান-অভিমানে কথাবার্তা বন্ধ ছিল। কিন্তু অভিনয় দেখে তা বোঝার উপায় আছে? কী অন্তরঙ্গ ও স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ পরস্পরের। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনি সপ্তপদী। উত্তম-সুচিত্রা জুটি। কৃষ্ণেন্দু (উত্তম) হিন্দু। রিনা ব্রাউন (সুচিত্রা) নেটিভ খ্রিষ্টান। উভয়ের সে কী প্রাণবন্ত অভিনয়। কী এক হালকা মুহূর্তে রিনা কৃষ্ণেন্দুকে ঠাট্টা করে বলেছে ‘ব্লাকি’। উত্তরে কৃষ্ণেন্দু বলছে, ‘আমরা মা কালীর সন্তান।’ কৃষ্ণেন্দুর জন্মদাতা বাবা হলেন ছবি বিশ্বাস—বাংলা ছবির আরেক সম্রাট। কিন্তু এ ছবির ছবি বিশ্বাস জলসা ঘর-এর জমিদার বিশ্বম্ভর রায় নন—একজন মধ্যবিত্ত। ছেলে মেডিকেলে পড়ে। তাকে দেখতে গেছেন হোস্টেলে। কৃষ্ণেন্দু গেছে খেলতে। ছবি বিশ্বাসের ছোট্ট সংলাপ: ‘পড়াশোনা 
ছেড়ে দিয়ে খেলে বেড়াচ্ছে বুঝি?’ প্রেমে কৃষ্ণেন্দু-রিনা হাবুডুবু। ‘বাবা মত দেবেন না’—জানায় কৃষ্ণেন্দু। ওই মুহূর্তে ‘জানি না’ বলে বুকে জড়িয়ে ধরেন উত্তমকে সুচিত্রা। ওই আলিঙ্গনে কোনো অশ্লীলতা নেই। এক স্বর্গীয় আবেগের প্রকাশ। রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত গান ‘মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি কোন নব চঞ্চল ছন্দে’ হাজারবার শুনেছি। সব সময়ই ভালো লাগে। কিন্তু শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দত্তা ছবিতে এই গানটি যখন শুনি, তখন অন্য রকম আবেদন সৃষ্টি হয়। এ যেন চিরচেনা রবীন্দ্রসংগীত নয়—অন্য গান। দত্তায় সুচিত্রাকে অত ভালো লাগেনি। কিন্তু এই গানটির কারণে তাঁর অভিনয় হূদয় ছুঁয়ে যায়। ঘরে পায়চারি করতে করতে গানটি গাইছেন একাকী। কখনো বিছানায় শুয়ে পড়ে গাইছেন। তখন তাঁকে লাগে অন্য রকম। গানটিও অন্য রকম মাত্রা পায়। কত ছবিতে কত রকম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুচিত্রা সেন। কখনো উচ্চবিত্ত পরিবারের উচ্ছল তরুণী। কখনো নিম্ন-মধ্য শ্রেণীর নারী। চন্দ্রনাথ-এ কাজের মেয়ের ভূমিকায়। তাঁর আনন্দের মুহূর্তের অভিব্যক্তি এক রকম। অভিমানের দৃশ্য, দুঃখ-বেদনার দৃশ্য, বিস্ময়ের অভিব্যক্তি, শোক ও বিষাদের ছায়া চোখে-মুখে—সবকিছুই যেন অনন্য। হারানো সুর কতবার দেখেছি। তবু মনে হয় আবার দেখি।
ইন্দ্রনীল ছবিতে নায়কের গলায় হেমন্তের গাওয়া ‘নীড় ছোট, ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়’ হূদয় ছুঁয়ে যায়। ওই মুহূর্তে সুচিত্রার প্রশান্ত হাসি। মনে আছে, একবার সবার উপরে হলে বসে দেখছি। সামনে বা পেছনের কোনো মাঝবয়সী নারী ডুকরে কেঁদে উঠলেন। দীপ জ্বেলে যাই প্রথম দেখি হলে। কতবার দেখেছি, তার হিসাব নেই। ম্যাটিনি দেখে আবার রাতের শো দেখেছি। অসামান্য অভিনয় মানসিক হাসপাতালের সুপার পাহাড়ি সান্যালের। নার্স সুচিত্রা (রমা)। নতুন রোগী এসেছে বসন্ত চৌধুরী স্মৃতি হারিয়ে। সুপার বলছে, রমা, এই কেসটা তোমাকে টেক-আপ করতে হবে। কী অভিনয়! যেন বাস্তবের হাসপাতালে রোগী ও নার্স। ওই ছবির গান ‘এই রাত তোমার আমার, এই চাঁদ তোমার আমার’। ভালোবাসার অভিনয় করতে করতে রমা রোগী বসন্ত চৌধুরীকে ভালোই বেসে ফেলে। রোগী ভালো হয়। বাড়ির লোক আসে তাকে নিতে। তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। হাসপাতালের নার্সকে তো বাবা-মা বউ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। বিদায়ের মুহূর্তে সুচিত্রার যে অভিব্যক্তি। প্রথমবার আমি হলের মধ্যেই শব্দ করে কেঁদে দিয়েছিলাম। লজ্জার কথা। কিন্তু আমি একা নই। হলের প্রায় সব নারীই ফোঁস ফোঁস করে কাঁদেন। বহুকাল থেকে এবং মৃত্যুর পরে আরও বেশি শুধু সুচিত্রার রূপের প্রশংসাই করা হচ্ছে। আমরা বলছি না তাঁর অভিনীত ছবিগুলোর কাহিনিকার, পরিচালক, প্রযোজক, সংগীত পরিচালক, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পীদের কথা। চলচ্চিত্রের মতো একটি মাধ্যমে একা কেউ সফল হতে পারেন না।  লচ্চিত্রের মতো একটি শিল্পকর্মে নায়িকার রূপই সব নয়। চলচ্চিত্র একটি যৌথ শিল্পমাধ্যম। সুচিত্রা সেনের মতো সুন্দরী নায়িকাকে আক্কেল আলি বেপারী পরিচালিত ‘তোরে খামু’ জাতীয় ছবিতে অভিনয় করতে দিলে সেটা শিল্পকর্ম হবে না। চাই চমৎকার কাহিনি,
অনবদ্য অভিনয়, মনমাতানো গান, কারিগরি কুশলতা। বাংলা ছায়াছবির সৌভাগ্য, তা পেয়েছিল সুচিত্রা সেনের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অভিনেত্রীকে এবং প্রতিভাবান সব পরিচালক, কাহিনিকার, সংগীত পরিচালক, গীতিকার ও কণ্ঠশিল্পী। সেকালে ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, বিমল ঘোষদের মতো গীতিকার। সুচিত্রা সেনের ঠোঁটে কণ্ঠ দিয়েছেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, আরতী মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর। তাঁর নায়কদের গানে গলা হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মুখোপাধ্যায়ের মতো জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীদের। সুচিত্রা-উত্তমের অভিনীত ছবিগুলোয় বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি সান্যাল, বিকাশ রায়, জহর গাঙ্গুলি, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়—সবাই নমস্য অভিনেতা। সবার সম্মিলিত উপহার সুচিত্রা সেন। সুচিত্রা সেনের অন্তরালে চলে যাওয়া নিয়ে অনেকে হাহাকার করেন। আমার বিবেচনায় তিনি সঠিক কাজটি করেছেন। কোটি কোটি মানুষকে যিনি আনন্দ দিয়েছেন, তাঁর নিজের জীবন কি ছিল পরিপূর্ণ আনন্দময় ও সুখের? তিনি নিজে ছিলেন সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। তাঁর স্বামী দিবানাথ সেন ছিলেন বনেদি বংশের সন্তান। তিনি স্ত্রীর ক্যারিয়ার নির্মাণে অনেক অবদান রেখেছেন। কিন্তু একসময় তাঁদের বিচ্ছেদ ঘটে। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে সুচিত্রা জীবনের বিচিত্র প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে থাকতে পারেন। তার ফলে গড়ে ওঠে তাঁর নিজস্ব জীবনদর্শন। জীবনের শেষ ৩৫ বছর তিনি সমর্পিত ছিলেন ঈশ্বরের সাধনায়। এ কাজটি একজন উঁচু আদর্শবান মানুষ ছাড়া কারও পক্ষে সম্ভব নয়। তাঁর আত্মা শান্তি পাক—এই প্রার্থনা করি।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

সহসাই ফের বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাশীদের উদ্দেশে বলেছেন, সহসাই ফের বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। আপনারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিন।
একই সঙ্গে উপজেলা নির্বাচনেরও প্রস্তুতি নিতে হবে। উপজেলা নির্বাচনে আর কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। গতকাল সংরক্ষিত মহিলা আসনে আগ্রহীদের সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এদিকে গতকাল উপজেলা নির্বাচনে দলগতভাবে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় পার্টি। এক্ষেত্রে পার্টির তহবিলে টাকা জমা দিয়ে ফরম কেনার জন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যদিও স্থানীয় সরকার নির্বাচন হিসেবে উপজেলায় দলীয় প্রার্থী মনোনয়নের সুযোগ নেই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে। সকাল ১১টায়  বনানী কার্যালয়ে তাদের সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা থাকলেও তা নেয়া হয়নি। এ সময় গণমাধ্যম কর্মীদেরও প্রধান ফটকের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। আর এমপি প্রার্থীদের সঙ্গেও আলাদা করে কোন কথা বলেননি পার্টি চেয়ারম্যান এরশাদ। দিয়েছেন কিছু দিকনির্দেশনা। বলেছেন- এটাই শেষ নির্বাচন নয়। আবারও নির্বাচন হবে। যারা মহিলা এমপি হতে পারবেন না তাদেরকে উপজেলা নির্বাচনে চেষ্টা করার পরামর্শ দেন এরশাদ। সাক্ষাৎকার না নিয়ে তাদের বিদায় দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মহিলা পার্টির নেত্রীরা। মহাসচিব এবিএম রুহুল আমীন হাওলাদার বলেছেন, পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ও সংসদীয় দলের নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে সমন্বয় করে দু’একদিনের মধ্যেই নির্বাচন কমিশনে প্রার্থীদের নামের তালিকা পাঠানো হবে। এ প্রসঙ্গে জাপার মহিলা নেত্রীরা জানান, আমাদের সকাল ১০টার মধ্যে বনানী কার্যালয়ে আসতে বলা হয়েছিল। এরশাদ সাহেব ১১টার দিকে এলেও তিনি আমাদের সাক্ষাৎকার নেননি। আমাদের কনফারেন্স রুমে বসিয়ে  জাতীয় ও উপজেলা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে জাতীয় মহিলা পার্টির সিনিয়র সহ-সভাপতি রিতু নূর বলেন, আমাদের এমপি করা হবে না এ জন্য আমাদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়নি। আমরা আশঙ্কা করছি অন্য কোনভাবে বা অন্য কিছুর বিনিময়ে সুসময়ের পাখিদের এমপি করা হচ্ছে। এবার যদি তা করা হয় তাহলে আমরা প্রতিরোধ গড়ে তুলবো। তিনি বলেন, পার্টি চেয়ারম্যানের জন্য ১ বছরের ছেলে নিয়ে জেল খেটেছি। যার জন্য জীবন-যৌবন শেষ করলাম তিনি এখন আর আমাদের চেনেন না।

জাতীয় মহিলা পার্টির রাজশাহী মহানগরীর সভাপতি বেগম সফুরা সরকার বলেন, আমরা মাঠে কাজ করি। টাকাও নেই। এখানে অনেকে এসেছেন তাদের আমরা জীবনেও দেখিনি। তারা মেকআপ পার্টি। মাঠে কাজ করলে এত সাজার সময় থাকে না। মহিলা পার্টির যুগ্ম সম্পাদক শিরীন চৌধুরী রীতা বলেন, জাপায় এখন আর প্রকৃত নেতা-নেত্রীর মূল্যায়ন নেই। তবে স্যার বলেছেন এটাই শেষ নির্বাচন নয়। জাতীয় মহিলা পার্টির গাজীপুর মহানগরীর সম্পাদক রোকসানা পারভীন বলেন, স্যার বলেছেন সহসাই আরেকটি নির্বাচন হবে। নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের দুপুর ১২টার দিকে জাপা মহাসচিব রুহুল আমীন হাওলাদার বলেন, একটি বড় দলে মনোনয়নের সিদ্ধান্ত নিতে গেলে অনেক কথাই আসে। এটাই স্বাভাবিক। প্রার্থীদের টাকার বিনিময়ে এমপি করা হচ্ছে এমন প্রশ্নে রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন,  অনেক কথাই আসবে। তবে তা সঠিক নয়। এবার বিশ্বস্ত ও ত্যাগী নেত্রীদের মূল্যায়ন  করা হবে। এরশাদ ও রওশন এরশাদের মধ্যে মনোনয়ন নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়ে জাপার মহাসচিব বলেন, এসব অভিযোগ সঠিক নয়। জাপা মহাসচিবের বক্তব্য শেষে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এরশাদ বনানীর কার্যালয় ত্যাগ করেন। তবে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোন কথা বলেননি। গত শুক্রবার থেকে জাপার সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু হয়।  রোববার পর্যন্ত ৬টি আসনের বিপরীতে ৯৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
২২ ও ২৩শে জানুয়ারি জাতীয় পার্টির উপজেলা প্রার্থীদের মধ্যে আবেদনপত্র বিতরণ: এদিকে, উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রার্থীদের মধ্যে আগামী ২২ ও ২৩শে  জানুয়ারি  আবেদনপত্র বিতরণ করা হবে। জাতীয় পার্টির ৬৬, কাকরাইলস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে হবে। আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে চেয়ারম্যান প্রার্থীর জন্য পার্টি তহবিলে তিন হাজার টাকা এবং ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীর জন্য দুই হাজার টাকা করে পার্টি তহবিলে জমা দিতে হবে। ২৩শে জানুয়ারি বিকালেই প্রার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জাপার অফিস সূত্র জানিয়েছে।

সহসাই ফের বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সংরক্ষিত মহিলা আসনে মনোনয়নপত্র প্রত্যাশীদের উদ্দেশে বলেছেন, সহসাই ফের বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে। আপনারা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিন।

বিএনপি এখন কী করবে

খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ, তিনি তাঁর আন্দোলনের কৌশল পরিবর্তন করেছেন। আন্দোলনের পাশাপাশি সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন, সেটাও প্রশংসাযোগ্য। দেখা যাক নতুন কৌশল নিয়ে তিনি কত দূর এগোতে পারেন। আশা করি খালেদা জিয়া, বিএনপি বা ১৮-দলীয় জোট এখন উপলব্ধি করতে পারছে যে ৫ জানুয়ারি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করা আরও কঠিন কাজ হবে। নির্বাচন যতই প্রশ্নবিদ্ধ ও প্রহসনের হোক না কেন, বাস্তব সত্য হলো: একটা নির্বাচন হয়েছে। ১৪-দলীয় জোট নতুন সরকার গঠন করেছে। এটা বাস্তব। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই বিএনপিকে নতুন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। বর্তমান সরকারকে অবৈধ বলা যাবে না, জনসমর্থিতও বলা যাবে না। এটা নিয়ম রক্ষার প্রশ্নবিদ্ধ সরকার। বিএনপি বাংলাদেশের একটি বড় দল। তবে গত এক বছরে প্রমাণিত হয়েছে বিএনপি লড়াকু দল নয়। বিএনপির সামনে এখন বড় সংকট। জানি না বিএনপি এই সংকট কীভাবে মোকাবিলা করবে। লেখার শুরুতেই বিএনপির কিছু সাফল্যের কথা তুলে ধরতে চাই। সাম্প্র্রতিককালে টিভি টক শো ও সংবাদপত্রে বিএনপির নানা সমালোচনা হচ্ছে,
যা সব সময় পুরোপুরি ন্যায্য নয়। সমালোচকেরা আংশিক বর্ণনা করেন, যা অনুচিত। যেসব কথা মিডিয়ায় সে রকমভাবে আসেনি। তা হলো—১. ঢাকায় ব্যর্থ হলেও বিভিন্ন জেলা শহরে বিএনপি ও ১৮-দলীয় জোট ভালোভাবেই আন্দোলন করেছে। হরতাল ও অবরোধ প্রায় সব জেলায়ই সফল হয়েছে। ২. আওয়ামী লীগের সরকার নানা চেষ্টা করার পরও ৩০০ আসনের একটিতেও বিএনপির কাউকে দিয়ে নির্বাচন করাতে পারেনি। সারা দেশে বিএনপির নেতা-কর্মীরা দলের সিদ্ধান্তের প্রতি বিশ্বস্ত ছিলেন। এটা একটা দলের জন্য কম কৃতিত্ব নয়। ৩. নির্বাচন কমিশন চক্রান্ত করে ‘বিএনএফ’ নামে একটি ভুয়া দল সৃষ্টি করলেও বিএনপির একজন নেতাও ওই দলে যোগ দেননি। সরকারের ‘বিএনএফ’ পরিকল্পনা ভন্ডুল হয়েছে। ৪. ১৮-দলীয় জোটের আন্দোলনের ফলেই সরকার একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে পারেনি। সরকার যদি আগামী পাঁচ বছরও ক্ষমতায় থাকে, তবু এক দিনের জন্যও এই কলঙ্ক মোচন হবে না। ৫. সরকার প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে এবার ভালোভাবে প্রমাণ করেছে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন বাংলাদেশে সম্ভব নয়। এটাও বিএনপির বিজয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কে আন্দোলনের একটা অধ্যায় বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে যাওয়ার আগে বিএনপির প্রথম কাজ হবে আত্মসমালোচনা করা (যা কেউ করতে চায় না)। আত্মসমালোচনা না করলে বিএনপি তার ভুলগুলো চিহ্নিত করতে পারবে না। বলাবাহুল্য, বিএনপি গত আন্দোলনে প্রচুর ভুল করেছে। প্রথমে ভুলগুলো স্বীকার করতে হবে। ভুল স্বীকার করলেই পরবর্তী পদক্ষেপগুলো মোটামুটি ঠিকভাবে নিতে পারবে। ভুলগুলো প্রচারের জন্য নয়। নিজেদের অবস্থান বোঝার জন্য খুব জরুরি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে আমরা বিএনপির কী কী ভুল দেখেছি? ১. বিএনপি ঢাকা শহরে তার শক্তি সম্পর্কে সচেতন ছিল না। ঢাকায় বিএনপির অন্তত পাঁচ হাজার লড়াকু কর্মী নেই। ২. দলের শীর্ষস্থানীয় ১০ জন নেতা গ্রেপ্তার হওয়ার পর দলটি কাবু হয়ে গেছে। ৩. কারারুদ্ধ সাদেক হোসেন খোকা ছাড়া ঢাকায় আন্দোলন সংগঠিত করার মতো আর যোগ্য নেতা নেই। ৪. কেন্দ্রের বেশির ভাগ নেতাই আন্দোলনমুখী নন, মিডিয়ামুখী। বেশির ভাগই বুদ্ধিজীবী টাইপের নেতা। একটি বড় দলে অন্তত ৫০ জন আন্দোলনমুখী নেতা ও পাঁচ হাজার আন্দোলনমুখী কর্মী থাকতে হয়, যাঁরা জান বাজি রেখে দলের কর্মসূচি রাজপথে বাস্তবায়ন করতে পারেন। গত তিন মাসের আন্দোলনে দেখা গেছে বিএনপিতে সেই রকম নেতা ও কর্মী খুব কম। নয়াপল্টনের জনসভায় যোগ দেওয়া, মিছিল করা, সেমিনার করা আর জান বাজি রেখে রাজপথে আন্দোলন করা এক কথা নয়। ৫. বিএনপি একটি পেটিবুর্জোয়া সনাতন রাজনৈতিক দল। বিপ্লবী দল নয়। কাজেই বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াবেন, তা সমর্থনযোগ্য নয়। দলের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারের হাতে গ্রেপ্তার হবেন, এটাই স্বাভাবিক। গ্রেপ্তার হলে তো বড় নেতা হওয়া যায়। রাজনৈতিক কারণে গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক নেতার একটা শর্ত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তান আমলে বারবার গ্রেপ্তার না হলে এত বড় নেতা হতে পারতেন কি? ৬. নির্বাচন একবার করে ফেলতে পারলে আওয়ামী লীগকে টলানো কঠিন হবে।
নির্বাচন প্রতিহত (বানচাল) করার মতো শক্তি বিএনপির নেই। নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য ঢাকায় ও অন্যত্র আইনানুগভাবে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ থাকবে। তাদের পরাস্ত করে নির্বাচন প্রতিহত করতে হবে। এটা কত বড় লড়াই তা বিএনপির হাইকমান্ড অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে। ৭. গত তিন মাসের আন্দোলনে বিএনপি তার নেতা ও কর্মীর বাইরে (সব নেতা ও কর্মীও রাজপথে ছিলেন না) সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। কোথায় ছিল তাদের যুবদল ও ছাত্রদল? (কয়েকজন অবশ্য গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আগেই) বেশির ভাগ নেতাই স্লোগান, মিছিল ও জনসভার লোক। আন্দোলনের লোক খুব কম। অনেক নেতাই সুবিধাবাদী। সুসময়ের বন্ধু। এটা এবার প্রমাণিত হয়েছে। তবে একটা কথা সবার বুঝতে হবে, আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা এখন খুব সহজ কাজ নয়। ’৬৮-৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ’৭১-এর স্বাধীনতার আন্দোলন বা ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মতো ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা এখন প্রায় অসম্ভব। তবু এখনো কিছুটা সম্ভব হতে পারে মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইস্যু হলে বা ধর্মবিষয়ক কোনো ইস্যু হলে। ৮. ১৮-দলীয় জোটের আন্দোলনে যে ব্যাপক সন্ত্রাস ও সহিংসতা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষ সমর্থন করেননি। এসব হিংসাত্মক ঘটনায় ও সাধারণ মানুষের প্রাণহানিতে অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছেন। এতে লাভ হয়েছে আওয়ামী লীগের। জনগণের ক্ষোভ ও সমালোচনাকে তারা ক্যাশ করেছে। ব্যাপকভাবে প্রচার করেছে। খালেদা জিয়া যতই বলুন, 
সহিংসতা বিএনপি করেনি’, তা বাস্তবতার ধোপে টেকেনি। সন্ত্রাস ও সহিংসতা দিয়ে নির্বাচন প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি, উল্টো বিএনপির বদনাম হয়েছে। আন্দোলনে সন্ত্রাস ও সহিংসতা পুরো আন্দোলন সম্পর্কেই দেশে-বিদেশে একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করবে, তা বিএনপি আগে বুঝতে পারেনি। এগুলো আমাদের প্রধান পর্যবেক্ষণ। এর বাইরে হয়তো আরও অনেক বিষয় থাকতে পারে। বিএনপির নিজস্ব কিছু পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতাও থাকতে পারে। নিঃসন্দেহে তা হবে খুব মূল্যবান। আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বে বিএনপি কী করবে, কী কৌশল নেবে, তা আমরা বিস্তারিত জানি না। তবে সরকার তথা আওয়ামী লীগ এখন অনেক শক্তিশালী। প্রহসনের নির্বাচনের কলঙ্ককে তারা গায়ে মাখছে না। আমাদের ধারণা, সরকার সংলাপের নাটক করবে কিন্তু অর্থবহ সংলাপ করবে না। সংলাপ করলেও আওয়ামী লীগ ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ মানবে না। আওয়ামী লীগ এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না, যার মাধ্যমে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে ও জয়লাভ করার সুযোগ পাবে। নির্বাচন থেকে যেকোনোভাবে বিএনপিকে দূরে রাখাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। আমাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলে আমরা খুশি হব। তবে এই ধারণাগুলো বিএনপিকে মনে রাখতে অনুরোধ জানাই। ২০১৪ সালটা বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই বছরেই যা কিছু করার বিএনপিকে করতে হবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, দেশি-বিদেশি চাপ সৃষ্টি করে সরকারকে নির্বাচন দিতে বাধ্য করা। এই বছরটি যদি সরকার নানা টালবাহানায় পার করে দিতে পারে, আমাদের ধারণা, পরিস্থিতি আর বিএনপির অনুকূলে না-ও থাকতে পারে।
বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার জন্য বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। এমনও শোনা যাচ্ছে, আইনি প্রক্রিয়ায় জামায়াত নিষিদ্ধও হয়ে যেতে পারে। ভোটের কিছু শেয়ার ছাড়া বিএনপির জন্য জামায়াত তেমন প্রয়োজনীয় দল নয়। তা ছাড়া জামায়াতের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার, সন্ত্রাসী দল ইত্যাদি অভিযোগও রয়েছে। এ রকম বিতর্কিত একটি দলকে সঙ্গে না রাখলে বিএনপির কি খুব বড় রকম ক্ষতি হবে? আমাদের ধারণা, না, তেমন বড় কোনো ক্ষতি হবে না। জামায়াতকে ছাড়লেও জামায়াতের ভোট বিএনপিই পাবে। জামায়াতকে বাদ দিলে বিএনপি আরও অন্তত তিন-চারটি দলকে আন্দোলনে পাশে পাবে, যারা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকাও রাখতে পারবে। নতুন কয়েকটি দল ছাড়াও ব্যাপকসংখ্যক প্রগতিশীল মানুষও বিএনপিকে সমর্থন দিতে পারে, এমনকি ভোটের অধিকার ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনে রাজপথেও নামতে পারে। জামায়াতমুক্ত বিএনপি নতুন তিন-চারটি দলের সহায়তায় ‘তত্ত্বাবধায়ক’ ইস্যুতে একটা বড় গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে। বিএনপিকে বুঝতে হবে, জামায়াতের সহায়তায় যে সহিংস আন্দোলন সমপ্রতি হয়েছে, তাতে দলের লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। বরং বিএনপি ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে। জামায়াতের সঙ্গ ছেড়ে জিয়াউর রহমানের বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে পাথেয় করে একটা বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আন্দোলন শুরু করার আগে বিএনপিকে তার মিত্র, জোট, কৌশল, আন্দোলনের চরিত্র, কর্মসূচি ইত্যাদি সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে যদি বিএনপি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে বিএনপির জন্য করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে। বিএনপি ও খালেদা জিয়া নিশ্চয়ই সেটি চান না।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

যেভাবে থেমে গেল নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড by ফখরুজ্জামান চৌধুরী

যে সাম্রাজ্যের গোড়া পত্তন হয়েছিল দ্বীপ-মহাদেশ অস্ট্রেলিয়ায়, কালক্রমে তার বিস্তার ঘটে এশিয়া, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এক জীবনে এতো অর্জন খুব কম লোকের ভাগ্যেই ঘটে থাকে।
তাকে একদা দেশছাড়া করার সংকল্পের কথা ঘোষণা করেছিলেন যে আরেক অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া মুঘল, কিছুকাল পাদপ্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল উপস্থিতির পর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে গেলেন তিনি। স্যার কেরি ফ্রান্সিস বুলমোর প্যাকার বয়সে ছোট ছিলেন কিথ রূপার্ট মারডকের (১১ মার্চ, ১৯৩১-)। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ান প্রথম মিডিয়া মুঘল হিসেবে তার নামই উচ্চারিত হতো সর্বত্র। নানা রকম চমক সৃষ্টিতে তার জুড়ি মেলা ছিল ভার!

স্যার ফ্রাংক প্যাকার ও গ্রেটেল বুলমোর দম্পতির প্রথম সন্তান জীবনাচরণে ছিলেন বেহিসেবি। বিতর্ক জন্ম দিতেই তিনি ভালবাসতেন। অস্ট্রেলিয়ার আয়কর বিভাগের সঙ্গে প্রতিনিয়ত ঝগড়া- বিতর্কে জড়ানো ছিল যেন তার কাছে আনন্দময় খেলা! জনপ্রিয় স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল নাইন (৯)-এর জন্য ক্রিকেট খেলা প্রচারের স্বত্ব দাবি করে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট কর্তৃপক্ষের কাছে নেতিবাচক জবাব পেয়ে এতোটাই রুষ্ট হলেন যে, বিশ শতকের সত্তরের দশকে বিশ্বের নামীদামি ক্রিকেটারদেরকে নিয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ক্রিকেট সংস্থাসমূহের অস্তিত্ব ধরেই টান দিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি চালু করলেন ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেট-যাতে অন্তর্ভুক্ত হতে পেরেছিলেন ভারত ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের সেরা ক্রিকেটাররা। আর খেলোয়াড়দেরকে বিদ্রোহ করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন একদা ইংল্যান্ড ক্রিকেট দলের অধিনায়ক টনি গ্রেগ।
কেরি শুধু চেয়েছিলেন তার চ্যানেল-৯ ক্রিকেট ম্যাচ প্রচার স্বত্ব লাভ করুক। ১৯৭৬ সালের চূড়ান্ত বৈঠক থেকে যখন তাকে না করেছিল অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট কর্তৃপক্ষ, ক্ষুব্ধ কেরি সভায় দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমাদের সবার মধ্যেই রয়েছে বারবনিতার কিঞ্চিৎ সত্তা। ভদ্র মহোদয়গণ, দয়া করে বলবেন কি, এতো দামে বিক্রি হবেন?’
পরবর্তী ঘটনা ইতিহাস, কেরি প্যাকারের ওয়ার্ল্ড সিরিজ ক্রিকেটের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক ক্রিকেট মুখ থুবড়ে পড়ে। পরবর্তীকালে কেরির সঙ্গে সমঝোতা করে এবং খেলোয়াড়দের স্বার্থ রক্ষা করে চুক্তির বলে বর্তমান ক্রিকেট হাল পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশ্বব্যাপী ক্রিকেটাররা কেরিকে স্মরণ করেন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে।
আর দ্বিতীয় অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া মুঘল রূপার্ট মারডকের জন্ম মেলবোর্নে। স্যার কিথ মারডক ও এলিজাবেথ জয়-এর একমাত্র সন্তান বেড়ে উঠেছেন ধনী সংবাদপত্র ব্যবসায়ী পরিবারে। সন্তানকে পারিবারিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠিত করার আগে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করার জন্য ভর্তি করে দেন মারডক দম্পতি।
রূপার্টের যখন ২১ বছর, পিতা মারা গেলেন। যুক্তরাজ্য থেকে ফিরে এসে তরুণ বয়সে পারিবারিক ব্যবসার দায়িত্ব নিতে হলো তাকে। সেটা ১৯৫৩ সালের কথা। এডেলেইডের একটি সংবাদপত্র দিয়ে শুরু হলো তার মিডিয়া সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার আরও দু’ একটি রুগ্‌ণ সংবাদপত্রের মালিকানা কিনে নিলো তার কোম্পানি নিউজ লিমিটেড।
১৯৭২ সালে মারডক সিডনির সকাল বেলার ট্যাবলয়েড দি ডেইলি টেলিগ্রাফ কিনে নিলেন স্যার ফ্রাংক প্যাকারের কাছ থেকে। পরবর্তীকালে স্যার ফ্রাংক এই বিক্রয় কাজের জন্য দুঃখপ্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে এই বেচাকেনাকে মারডক তার প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সূচক হিসেবে বিবেচনা করতেন। তরুণ কেরি প্যাকার এই পত্রিকার মালিকানা বদলকে খুব ভালো চোখে দেখেননি। তিনি নাকি তার অন্তরঙ্গদের এই সময়ে বলেছিলেন, মারডকের জীবনকে তিনি কষ্টকর করে তুলবেন।
১৯৫০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ায় টিভি নেটওয়ার্কে মারডক তার ব্যবসায়িক সংশ্লিষ্টতার সূচনা করেন। চ্যানেল-৭ নামক এই বাণিজ্যিক চ্যানেলটি কেরি প্যাকারের চ্যানেল-৯ এর সঙ্গে প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে থাকে। বিভিন্ন রকম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান, যেমন ‘সেলস অফ সেঞ্চুরি’ প্রচার করেও দর্শক ধরে রাখতে ব্যর্থ হয় তার চ্যানেলটি। পরবর্তীকালে তিনি তার টিভি চ্যানেলটি বিক্রি করে দেন। নিউজ করপ, অস্ট্রেলিয়ার ব্যবসা শুধু সীমাবদ্ধ থাকলো প্রিন্ট মাধ্যমে।
যুক্তরাষ্ট্রে মারডকের প্রথম টেলিভিশন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ হলো ১৯৮৬ সালে যখন ফক্স ব্রডকাস্টিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হলো। ২০০০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লগ্নিকারক হিসেবে শেয়ার বাজারে তার নাম তালিকাভুক্ত হলো। স্যাটেলাইট টেলিভিশন, চলচ্চিত্র ও ইন্টারনেট ব্যবসায় প্রচুর মূলধন বিনিয়োগ করলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রে রূপার্ট মারডকের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগটি ঘটে প্রভাবশালী ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে। চার্লস ডাও, এডওয়ার্ড জোনস ও চার্লস বার্গট্রেসার ১৮৭৪ সালে যে পত্রিকাটির যাত্রা শুরু করেন তৎকালীন সময়ে অত্যন্ত সাদামাটাভাবে, তা যে একদিন সময়ের বিবর্তনে এবং পরিচালনার দক্ষতার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধিক বিক্রীত এবং বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী পত্রিকায় পরিণত হবে, তা অনেকেই ভাবতে পারেননি।
২০০৭ সালের মে মাসে রূপার্ট মারডক ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিটি শেয়ার তার অভিহিত মূল্যের তিন গুণ বেশি দাম দিয়ে কেনার ঘোষণা দিয়ে নিউ ইয়র্কের স্টক মার্কেটে চমক সৃষ্টি করেন। পত্রিকার তৎকালীন মালিক ব্যানক্রফট পরিবার অনেক দেন-দরবারের পর ৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের মালিকানা রূপার্ট মারডকের নিউজ করপ-এর কাছে হস্তান্তর করলেন। বিশ্ব মিডিয়ায় খবরটি প্রচারিত হলো এই শিরোনামে: ‘মারডকের ডাও জোনস-এর মালিকানা অর্জন!’
বিশ্বব্যাপী মিডিয়া জগতে রূপার্ট মারডক তার আধিপত্য বিস্তার করে চললেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে। একটা সময়ে তাকেই একমাত্র তার নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী বিবেচনা করতে শুরু করলেন মিডিয়া সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে যে ট্যাবলয়েড নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড-এর কারণে একদা নন্দিত মিডিয়া মুঘল এখন নিন্দিত এবং ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজের কৃতকর্মের জবাবদিহি করতে গিয়ে সংক্ষুব্ধ এক ব্যক্তির আক্রমণের শিকার হলেন, সেই রবিবাসরীয় সাপ্তাহিকটির মালিকানা তিনি কিনেছিলেন ১৯৬৮ সালে। শোনা যায়, তার মা এই পত্রিকা কিনতে পুত্রকে বার বার নিষেধ করেন এই বলে যে, এই পত্রিকা তোমার জন্য নয়! এই সাপ্তাহিকীর মালিকানা অর্জনের পর তিনি একে একে কিনে নেন ব্রডশিট পত্রিকা দি সান, দি টাইমস, দি সানডে টাইমস।
শুধু পত্রিকার মালিকানাই অর্জন করলেন না মারডক, ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম নিয়ামক হিসেবেও তার আবির্ভাব ঘটলো। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে রূপার্ট মারডক ব্রিটিশ রাজনীতিতে রক্ষণশীল দলের প্রার্থী মার্গারেট থ্যাচারকে নির্বাচনে সমর্থন করলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি টনি ব্লেয়ারের দল লেবার পার্টিকেও সমর্থন করেন। টনি ব্লেয়ারের সঙ্গে তার নিবিড় সখ্য ব্রিটিশ রাজনীতিতে অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
রূপার্ট মারডক বুঝতে পারেন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক এবং মাঝে মাঝে তার সঙ্গে জাতীয় সমস্যা নিয়ে বৈঠকের খবর প্রকাশ হওয়ার ফলে তার ও তার ব্যবসা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য তিনি তার মালিকানাধীন দি সান পত্রিকাকে নিয়োজিত করেন ডেভিড ক্যামেরনের রক্ষণশীল দলকে সমর্থন করতে!
যুক্তরাজ্যের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া এক অদভুত সম্পর্কে সম্পর্কিত। এখনো দেশটি বৃটেনের রানীর প্রতিনিধি গভর্নর জেনারেল দ্বারা শাসিত। অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় পরিচয় কমনওয়েলথ অফ অস্ট্রেলিয়া এবং যুক্তরাজ্যের গর্বিত অধিবাসীদের মনে আছে, একদা তাদের দেশের দাগি অপরাধীদেরকে নির্বাসনে পাঠানো হয় দ্বীপ দেশটিতে। ক্যাপ্টেন জেমস কুক নামক একজন ইংরেজ নৌ-পরিব্রাজক এন্ডেভার নামক জাহাজে চড়ে সাগর পথে অভিযান চালিয়ে ১৭৬৯ সালে অস্ট্রেলিয়া নামক বিশাল দ্বীপ দেশটি আবিষ্কার করেন এবং ইংরেজদের কর্তৃত্বাধীনে দেশটি দীর্ঘ দুই শতাধিক বছর ধরে আছে।
গত শতকের আশির দশকে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালীন দেখেছি, একজন অস্ট্রেলিয়ান হাসতে হাসতে নিজের পরিচয় দেয়, ‘পমিজ বাস্টার্ড’ বলে। পম মানে ইংরেজ আর বাস্টার্ডের বাংলা নাই বা বলা হলো। আর সিডনির হারবার ব্রিজ অতিক্রম করার সময় টোল দিতে গিয়ে মনে মনে এবং কখনো প্রকাশ্যে ইংরেজকে কষে গাল দিতে কতো যে শুনেছি, আজ মনে হলে হাসি পায়। তবু অস্ট্রেলিয়ানরা গণভোটে বর্তমান অবস্থানের পক্ষেই ভোট দেন!
অস্ট্রেলিয়ার একজন মানুষ বৃটেনে গিয়ে মিডিয়া সাম্রাজ্যের মুঘল হবেন, ইংরেজদের পক্ষে বিষয়টি হজম করা সহজ ছিল না। সহ্য তারা করেছেন, দীর্ঘ চল্লিশ বছর ধরে রূপার্ট মারডকের সঙ্গে ইংরেজদের ছিল এক ধরনের ভালবাসা-ঘৃণার সম্পর্ক। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটলো এবার যখন মারডকের মালিকানাধীন নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড ফোনে আড়িপাতার কেলেঙ্কারির দায় মাথায় নিয়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরের নানাবিধ প্রতিক্রিয়ায়।
যুক্তরাজ্য পার্লামেন্টের সংস্কৃতি-মিডিয়া-স্পোর্টস কমিটিতে শুনানিতে উপস্থিত রূপার্ট মারডক ও তার ছেলে জেমস মারডক যখন আড়িপাতার বিষয়ে নিজেদের সংশ্লিষ্টতার কথা অস্বীকার করে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন জোনাথন মে-বওয়েনস নামক এক আত্মস্বীকৃত কৌতুকাভিনেতাকে এক প্লেট কেডিং ক্রিম ছুড়ে মারলেন তা ছিল অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া-মুঘলের প্রতি বৃটিশ জনগণের মনোভাবেরই পরিচায়ক! রূপার্ট মারডক শুধু একটি পত্রিকাই বন্ধ করেননি। তিনি ব্রিটিশ সমাজ, রাজনীতি এক কথায় জাতীয় জীবনে বিশাল কম্পনের সৃষ্টিও করেছেন। নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ডের প্রাক্তন সম্পাদক এন্ডি কৌলসনকে গণসংযোগ প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়ার ফলে ব্র্র্র্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এখন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি। আর ফোনে আড়িপাতায় সহায়তা করার অভিযোগে অভিযুক্ত লন্ডনের পুলিশ বিভাগ, ইতিমধ্যে লন্ডনের পুলিশ কমিশনার ও উপ-পুলিশ প্রধান পদত্যাগও করেছেন। আর সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতাই তো আজ বিরাট সমস্যায় পড়ে গেছে।
যে নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড কেলেঙ্কারির কারণে রূপার্ট মারডকের মিডিয়া সাম্রাজ্যের ভিত্তি আজ টালমাটাল, তা একদিনে অর্জিত হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার এডেলেইডে মাত্র একটি সংবাদপত্র নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন যে রূপার্ট মারডক গত শতকের পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি, তার সব অর্জন বুঝি আজ এই পত্রিকার কারণে ম্লান হয়ে যায়। তার ব্যবসার প্রসার ঘটে আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ায়। এবং তা ঘটে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে।
ইউরোপে তার ব্যবসার শুরু ১৯৬৮ সালে। এবং তা শুরু হয় নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড-এর মালিকানা কেনার মাধ্যমে।
১৯৮৬ সালে তিনি তার সংবাদপত্র শিল্পে ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতির ছাপা প্রক্রিয়া প্রবর্তন করেন যা তখনকার দিনে ছিলো এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এর ফলে অবশ্য তার পত্রিকায় কর্মীর সংখ্যা কমে গেলো। এর কারণে তাকে শ্রমিক-সাংবাদিকদের তুমুল প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে হয়। মারডক লন্ডনের ডকল্যান্ড এলাকার ওয়াপিঙে আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ প্রেস স্থাপন করেন। সেই এলাকায় শ্রমিকরা তুমুল বিক্ষোভ করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীরা অভিযোগ আনেন যে, সরকার রূপার্ট মারডককে সহায়তা করেছেন শ্রমিক আন্দোলন বানচাল করতে।
যুক্তরাষ্ট্রের রূপার্ট মারডকের মিডিয়া সাম্রাজ্য স্থাপনের কাজ শুরু হলো ১৯৭৩ সালে।
এশিয়ায় রূপার্ট মারডকের ব্যবসার শুরু ১৯৯৩ সালে যখন তার প্রতিষ্ঠান হংকংভিত্তিক স্টার টিভি নেটওয়ার্ক-এর স্বত্ব কিনে নেন।
সামপ্রতিককালে ফোন-হ্যাকিংয়ের কারণে ক্রীড়া জগতে হৈচৈ ফেলার মতো ঘটনাটি ঘটায় নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড যখন পাকিস্তান ক্রিকেট টিম ২০১০ সালের ২৭ জুলাই থেকে ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইংল্যান্ড সফর করে।
নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড-এর সাংবাদিক মাযহার মাহমুদ।
মাযহার মজিদ নামে এক আরব শেখ এবং জুয়াড়ির ছদ্মবেশে তিন পাকিস্তানি খেলোয়াড়-অধিনায়ক সালমান বাট, উদীয়মান ও প্রতিশ্রুতিবান দুই ফাস্ট বোলার মোহাম্মদ আসিফ ও মোহাম্মদ আমিরকে অর্থের প্রলোভনে আটকে ফেলেন এবং তাদের সঙ্গে তার পুরো আলাপ-আলোচনার টেপে ধারণকৃত রেকর্ড পত্রিকায় সরবরাহ করেন। নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ডে ওই জুয়াড়ির সঙ্গে খেলোয়াড়দের জড়িত থাকার খবর প্রচার করার ফলে তিনজন খেলোয়াড়েরই খেলোয়াড়ি জীবন আজ ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে অনুরূপভাবে আরেক প্রাক্তন পাকিস্তানি ক্রিকেটার ইয়াসির হামিদকে ফাঁসাতে গিয়ে ২০১০ সালের শেষ দিকে যে কাহিনী ফাঁদে নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড, তাতে পত্রিকা নিজেই ফেঁসে যায়। ২০১১ সালে জুন মাসে ইউ কে প্রেস কাউন্সিলের রায়ে সংবাদটি ভুয়া প্রমাণিত হয় এবং কর্তৃপক্ষ সংবাদটির ভিডিও চিত্র তাদের ওয়েবসাইট থেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।
এই একটি ঘটনায় পত্রিকার বিশ্বাসযোগ্যতা কিছুটা হলেও তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তী ঘটনাগুলো দ্রুত ঘটতে থাকে, যার ফলে ১৬৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী একটি পত্রিকা বন্ধই হয়ে গেল। মানুষের বিশ্বাসে পত্রিকার ব্যাপারে আগেই চিড় ধরেছিল।
যে পত্রিকাটি ১৬৮ বছর ধরে গড়ে উঠেছিল। বন্ধ হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হতে তার মাস দুয়েকের বেশিও সময় লাগলো না!
ফোনে আড়িপাতার প্রথম অভিযোগটি শোনা যায় ২০০৬ সালে। ভাসা ভাসা প্রথমদিকে শোনা গেলেও যখন শোনা গেল রূপার্ট মারডক ব্রিটিশ স্কাই ব্রডকাস্টিং-এর মালিকানা নিতে চেষ্টা করছেন, অভিযোগ আরো তীব্র হলো।
অভিযোগ উঠলো ব্রিটিশ রাজ পরিবারের টেলিফোনে আড়িপাতার। সবচেয়ে বেশি হৈচৈ উঠলো যখন জানা গেল ২০০২ সালে গুম হওয়া তেরো বছরের বালিকা মিলি ডওলারের ফোনেও নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড-এর সাংবাদিক আড়ি পেতেছিলেন। পরবর্তীকালে যখন গুম হওয়া মেয়েটির খুন হওয়ার খবর জানা গেল তখন পত্রিকার বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। ২০০৫ সালে লন্ডনে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত বায়ান্ন জনের অন্যতম বাইশ বছর বয়সী ডেভিডের পিতা গ্রাহাম ফোলকেজের পরিবারের সঙ্গে পত্রিকার সাংবাদিকরা যা করেছেন, তা ভুলতে তারা সহজে পারবেন না। লন্ডন পুলিশের কাছ থেকে মি. গ্রাহাম জানতে পারেন, নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড গ্লেন মুঘলফেয়ার নামক একজন বেসরকারি গোয়েন্দা নিয়োগ করেছে তার ফোনে আড়িপাতার জন্য।
এতসব অভিযোগ মাথায় নিয়ে পত্রিকা চালানো যে সম্ভব হবে না তা বুঝতে দেরি হয়নি রূপার্ট মারডকের। ১০ জুলাই (২০১১) পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠা জুড়ে ‘থ্যাক ইউ এ্যান্ড’, ‘গুডবাই’-ধন্যবাদ এবং বিদায় লিখে বের হলো দেড় শতাধিক বছরের পুরানো একটি পত্রিকা।
প্রতিপক্ষ ব্যঙ্গ করে লিখলো: নিউজ অফ দি ওয়ার্ল্ড তো নয়, এ যেন ‘এন্ড অফ দি ওয়ার্ল্ড’। পৃথিবীরই শেষ!
আরও রসিকতা করে ছবি ছাপলো দু’টি- একটি মারডকের ছেলেদের (উত্তরাধিকারী: এয়ারস) অন্যটি কন্যার স্নেহে বেড়ে ওঠা পত্রিকার শেষ সম্পাদক রেবেকা ব্রুক্‌স্‌-এর মাথাভর্তি তার ঝাঁকড়া চুল। ছবির নিচে লেখা হলো: চুল (হেয়ারস)! ঐবরৎং ও ঐধরৎং-এর উচ্চারণের সমিলতা রসিকতার জন্ম দেয়।
পত্রিকা তো বন্ধ হলো। কিন্তু প্রশ্ন হলো: নিকট ভবিষ্যতে রূপার্ট মারডকের বিশাল অর্থনৈতিক সাম্রাজ্য অক্ষত থাকবে তো? মারডকের নিউজ করপ-এর সম্পদের তালিকায় রয়েছে:
৭.৬ বিলিয়ন ডলার- চলচ্চিত্রে
৭.০ বিলিয়ন ডলার- কেবল টিভিতে
৬.১ বিলিয়ন ডলার- সংবাদপত্রে
৪.২ বিলিয়ন ডলার- ফক্সটিভি নেটওয়ার্কে
১.৩ বিলিয়ন ডলার- পুস্তক প্রকাশনায়
১.২ বিলিয়ন ডলার- মার্কেটিং-এ
১.৫ বিলিয়ন ডলার- অন্যান্য খাতে।
অশীতিপর রূপার্ট মারডক, তার পুত্র জেমস এবং চীনা বংশোদভূত স্ত্রী ওয়েনডি ডেং সম্মিলিত মেধা ও বুদ্ধি দিয়ে কি করে এই সঙ্কট মোকাবিলা করেন তা-ই এখন দেখার বিষয়।

যেভাবে থেমে গেল নিউজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড by ফখরুজ্জামান চৌধুরী

যে সাম্রাজ্যের গোড়া পত্তন হয়েছিল দ্বীপ-মহাদেশ অস্ট্রেলিয়ায়, কালক্রমে তার বিস্তার ঘটে এশিয়া, ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। এক জীবনে এতো অর্জন খুব কম লোকের ভাগ্যেই ঘটে থাকে।

একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা

মুজিবুল হক
এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা স্বল্প পরিচয়েই মনে দাগ কাটেন। এম মুজিবুল হক—বাংলাদেশের সাবেক কেবিনেট সেক্রেটারি, যিনি ১২ জানুয়ারি, ২০১৪ সালে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন—ছিলেন তাঁদের একজন। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ১৯৫২ সালে, যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হল ছাত্র ইউনিয়নের ভিপি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের একজন নামকরা ছাত্র। তিনি হলের ভিপি হয়েছেন, হল নির্বাচনে, পরবর্তীকালের প্রখ্যাত আওয়ামী লীগের নেতা আবদুস সামাদ আজাদকে পরাজিত করে। ১৯৫২ সালেরই কোনো একসময়ে তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় সলিমুল্লাহ্ হলের চায়ের দোকানে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাগত হিসেবে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হলাম এবং আমার এখনো মনে আছে, সুদর্শন এই মানুষটির গভীর গলার আওয়াজ, স্পষ্ট বাচনভঙ্গি আর ব্যবহারের উষ্ণতা আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। পরের বছরগুলোতে, তাঁর সঙ্গে জীবনের চলার পথে, বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা হয়েছে এবং যতই তাঁকে জেনেছি, ততই তিনি মনে গভীরভাবে দাগ কেটেছেন।
১৯৩০ সালে বরিশালের বানারীপাড়ায় জন্ম নেওয়া মুজিবুল হক ছিলেন আমার চেয়ে মাত্র চার বছরের বড়; কিন্তু তবু কিছুদিনের জন্য হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন আমার সরাসরি শিক্ষক। তাঁর প্রয়াণে কি স্কুল কি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সরাসরি আর কোনো শিক্ষক বেঁচে নেই। ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে (সিএসপি) যোগদানের আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। আমার মনে পড়ে, ক্লাসে আমরা ইংরেজিতে কথা বলে যেন ইংরেজি বলার জড়তা কাটিয়ে উঠি, সেটাই ছিল তাঁর প্রচেষ্টা। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক, কারাবাসেও ছিলেন কিছু সময়ের জন্য এবং ভাষা আন্দোলনে তাঁর অবদানের জন্য তাঁকে বহু বছর পরে হলেও সোহ্রাওয়ার্দী পুরস্কারে পুরস্কৃত করে স্বীকৃতি জানানো হয়েছিল। মুজিবুল হক ছিলেন একজন আদর্শ সরকারি কর্মকর্তা, যিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন স্থানে, এসডিও এবং ডিসির পদ অলংকৃত করেছিলেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর এতই সুনাম ছিল যে তখন অনেক কনিষ্ঠ কর্মকর্তাই তাঁর সঙ্গে কাজ করতে চাইতেন। আমার ছোট ভাই ইনাম আহমদ চৌধুরী ছিল তাঁদের একজন, যে ১৯৬১ সালে শিক্ষানবিশ সিএসপি কর্মকর্তা হিসেবে অনেক চেষ্টা করে রাজশাহীতে পোস্টিং নিয়েছিল। কারণ, মুজিবুল হক রাজশাহীর ডিসি ছিলেন। তার চাকরিজীবনের প্রথমেই মুজিবুল হকের সান্নিধ্য ছিল এক প্রীতিদায়ক অভিজ্ঞতা, এই কথাটি ইনাম প্রায়ই বলে থাকে।
আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের সময় মুজিবুল হক ছিলেন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রসচিব। সেই সময়ে তাঁর ভূমিকার জন্য তিনি টিক্কা খানের রোষানলে পড়েন। কথিত যে টিক্কা খান তাঁকে বলেছিলেন, বাঙালি কর্মকর্তাদের ‘শুদ্ধি’ অভিযান কি তিনি স্বরাষ্ট্রসচিব মুজিবুল হককে দিয়েই শুরু করবেন। যা-ই হোক একাত্তরের মার্চ/এপ্রিল মাসেই তাঁকে ইসলামাবাদে বদলি করে দেওয়া হয়। নামকাওয়াস্তে তাঁকে কেন্দ্রীয় সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যুগ্ম সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। যদিও কোনো অর্থপূর্ণ দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়নি। সেই সময়ে পাকিস্তান সরকার দ্য বিট্রেয়েল অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতকতা শীর্ষক একটি প্রোপাগান্ডা ছবি তৈরি করে, যাতে উল্লেখ ছিল, পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে কিছু বাঙালি সামরিক এবং বেসামরিক কর্মকর্তার ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ নজির। এই ছবিটি দেখতে বাঙালি কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করা হতো। ছবিটি দেখতে গিয়েছিলেন মুজিবুল হক। তাঁর সঙ্গে গিয়েছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরই তদানীন্তন উপসচিব নুরুল হোসেন খান। ছবিটি দেখার পর বেরিয়ে এসে মুজিবুল হক একটি বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন, ‘বাপ কা বেটা’! ‘কে তিনি’, তাঁকে প্রশ্ন নুরুল হোসেন খানের। ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’, দৃপ্তকণ্ঠে ছিল মুজিবুল হকের উত্তর। পাকিস্তান থেকে ১৯৭৩ সালে আফগানিস্তান আর দিল্লি হয়ে গোপনে বাংলাদেশে পাড়ি জমালেন মুজিবুল হক। বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাসচিব হিসেবে নিযুক্তি দিলেন। তার পর থেকে একজন আদর্শ এবং দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে মুজিবুল হক অধিষ্ঠিত ছিলেন বিভিন্ন পদে।
১৯৮৯ সালে বাংলাদেশের কেবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। প্রশাসনিক বিষয়াদিতে তাঁর ছিল গভীর অভিজ্ঞতা। যখন বাংলাদেশে মাত্র ১৬টি জেলা ছিল, তখনো তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে নগরায়ণ ত্বরান্বিত করে সেগুলোকে ‘উন্নয়ন কেন্দ্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার ভাবনা পোষণ করতেন। দেশের সব মহকুমাকে জেলা হিসেবে পরিণত করার আদি ভাবনাটি বোধ করি তাতেই নিহিত ছিল। মুজিবুল হকের একটি বিশেষ গুণ ছিল তাঁর স্পষ্টবাদিতা এবং তিনি যা বলতে অথবা বোঝাতে চাইতেন তা অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায়, বাংলা অথবা ইংরেজিতে প্রকাশ করার ক্ষমতা তাঁর ছিল। ১৯৮৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে বসে থাকেননি মুজিবুল হক। স্বাস্থ্য উন্নয়ন ক্ষেত্রে তাঁর ছিল বিপুল আগ্রহ এবং ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ছিলেন। সম্পৃক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সঙ্গে। জনপ্রশাসন ট্রেনিং কেন্দ্র, বাংলাদেশ জাতীয় পে-কমিশন এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে সরকারি কর্মকাণ্ডে সহায়ক ভূমিকা পালনের জন্য তিনি সচেষ্ট ছিলেন। ইউনিসেফের ঢাকা অফিসের বিশেষ উপদেষ্টা হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্বন্ধে তাঁর আগ্রহ আমি প্রত্যক্ষ করেছি, যখন আমি ব্র্যাকের উপদেষ্টা ছিলাম। তিনি ২০০৫ সালে বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা পদক’ লাভ করেন। তাঁর জীবনের শেষ দু-তিনটি বছর তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে নিজেকে সক্রিয় কর্মকাণ্ড থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। সেই সময় তিনি নিঃসঙ্গ জীবন যাপন করেছেন। কিছুটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। তাঁর তিরোধানে বাংলাদেশ একজন মূল্যবান নাগরিককে হারাল আর আমরা যারা তাঁর নৈকট্য লাভে ভাগ্যবান ছিলাম, হারিয়েছি একজন উদার, উষ্ণ হূদয় মানুষকে, যাঁর অনুপস্থিতি আমরা নিবিড়ভাবে অনুভব করি।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব।

টানা ১১ মাসের ভীতি

গাবতলী থানার নিরাপত্তায় প্রহরা
৩ জানুয়ারি রাতে বগুড়া পৌঁঁছার পর হোটেলকক্ষে বসেই কিছুক্ষণ পর পর ককটেলের শব্দ পাচ্ছিলাম। সাংবাদিকতা করতে প্রথমবারের মতো বগুড়া গিয়ে বিষয়টি আমার কাছে একটু ভীতিকর মনে হলো। একেকটি বিস্ফোরণের শব্দ পাই আর আমি মুঠোফোনে স্থানীয় প্রতিনিধি আনোয়ার পারভেজের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কারণ, আমার কাছে এসব ঘটনা ‘সংবাদের বিষয়বস্তু’ বলেই মনে হচ্ছিল। আমার উৎসুক ফোনের জবাবে প্রতিনিধির জবাব ছিল, এসব এখন কোনো বিষয়ই না। মামুলি ঘটনা। দু-একটা দিন থাকেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন। চার দিন পর যখন ওই এলাকা ছেড়ে আসি, তখন কথাটি সত্য বলে মানতে বাধ্য হই। সাংবাদিকতার কল্যাণে এত দিনে জেনে গেছি, একই ঘটনা প্রতিনিয়ত যখন ঘটতে থাকে, তখন সেটির সংবাদমূল্যও কমতে থাকে। সেই অনুযায়ী, বগুড়ার ককটেল বিস্ফোরণ নিতান্তই সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ কারণে তা আলাদাভাবে সংবাদমূল্য হারিয়েছে। সকালের শুরুটা কিংবা মাঝরাতে ককটেলের শব্দে ঘুম ভাঙার মুহূর্তগুলোকে আত্মস্থ করে ফেলেছে বগুড়ার মানুষ।
৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের খবর সংগ্রহে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে প্রতিনিয়ত। তাঁদের কাছ থেকে জানা গেল, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর থেকেই বদলে যায় বগুড়ার চিরচেনা দৃশ্যপট। গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের পর থেকে সহিংসতা শুরু। একের পর এক ঘটনায় জেলাটিতে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে জামায়াত-শিবির ও তাদের সহযোগীরা। তাদের আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য ছিল নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারের বিভিন্ন স্থাপনা। এই অবস্থার কারণে প্রায় এক বছর ধরে রুদ্ধশ্বাস এক পরিবেশের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন বগুড়ার সাধারণ মানুষ। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনযাপন সবই বিপন্ন। এই বিপন্নতা থেকে মুক্তির আকুতি ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের। ফিরে আসার দিন হোটেল ত্যাগের আগে হোটেল কর্মচারীর মুখেও তার প্রমাণ পাওয়া গেল। ‘স্যার, ঢাকা থেকে আসছেন। আপনারা তো দেশের অনেক খবর জানেন। কবে থেকে দেশ আবার স্বাভাবিক হবে? আমরা কবে আবারও শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারব?’ দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল সদ্য শেষ হওয়া দশম সংসদ নির্বাচন। ভোটকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী এলাকা গাবতলীর মডেল থানা আক্রমণ, কেন্দ্রে কেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ, মানুষের মল ছিটিয়ে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করার মতো ঘটনা ঘটেছে। সেই সঙ্গে ভোটের প্রহসন তো ছিলই।
ভোটের সব সরঞ্জাম নষ্ট করে ফেলার পরও গাবতলী উপজেলার বেশ কিছু কেন্দ্রে ভোটের প্রশ্নবিদ্ধ ফল প্রকাশের মতো ঘটনাও ঘটেছে। সংবাদপত্রের পাতায় সেসব খবর ছাপা হয়। বগুড়ায় অবস্থানকালে যে হোটেলে উঠেছিলাম, ‘দীর্ঘদিন বিরতির’ পর আমরাই ছিলাম সেটির প্রথম অতিথি। আমরা বলতে আমি এবং নির্বাচনী খবর সংগ্রহে যাওয়া ঢাকার আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিবেদক ও ক্যামেরাম্যান। হোটেলের মালিক নিজেই জানালেন, অনেক দিন ধরেই অতিথিশূন্য আবাসিক এই হোটেলটি। ফিরে আসার দিনে বগুড়ার বিখ্যাত সবজির বাজার মহাস্থানহাটে গিয়ে জানা গেল সবজিচাষিদের হাহাকারের কথা। বিক্রেতার অভাবে মাঠে সবজি ফেলে দেওয়ার কথা জানালেন অনেকে। এসব মানুষের কষ্টের কাছে অবরোধ ও হরতালের মধ্যে যানবাহনহীন অবস্থায় নানা পন্থায় ভেঙে ভেঙে নির্বাচনের খবর সংগ্রহে বগুড়ায় পৌঁছানোর কষ্ট হয়ে যায় অতিতুচ্ছ। জামায়াত-শিবির ও তাদের সহযোগীদের তাণ্ডবে বগুড়ার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়েছে যে দিনদুপুরে ওই এলাকার মহাসড়কে চলতে গেলেও ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। যে মহাসড়ক ভারী যানবাহনে ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে ছিল যানবাহনের স্বল্পতা। কদাচিৎ কিছু যানবাহনের দেখা মেলে। যার বেশির ভাগ ছিল নছিমন, করিমন, রিকশা, ট্যাক্সি ও মোটরসাইকেল।
কিছু কিছু পণ্যবোঝাই ট্রাক দেখা গেল নিরাপত্তাবেষ্টনীতে চলাচল করতে। ভোটের আগের দিন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলতে জেলার শাজাহানপুর উপজেলার একটি গ্রামে গেলাম আমরা কয়েকজন সাংবাদিক। মূল সড়ক থেকে কিছুটা মেঠোপথ পেরিয়ে ওই গ্রাম। মোটরসাইকেলের শব্দ শুনেই ওই গ্রামের উঠানে দাঁড়ানো পুরুষ-নারীরা তাড়াহুড়ো করে স্থান ত্যাগ করলেন। ভয়ে কাতর মানুষগুলো আশ্রয় নিলেন ঘরের ভেতর। পরে অবশ্য সাংবাদিক পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর কয়েকজন বাইরে বেরিয়ে এলেন। কথা বললেন। কথায় কথায় জানা গেল তাঁদের শঙ্কা, আতঙ্কের কথাও। প্রতিনিয়ত অজানা শঙ্কা তাড়িয়ে বেড়ায় এঁদের। তাই গাড়ির শব্দ, বেশি মানুষের আগমন মানেই তাঁদের কাছে ভয়। ভয়মুক্ত নয় বগুড়ায় কর্মরত সাংবাদিকেরা। একা একা কোথাও সংবাদ সংগ্রহে যাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই ঝুঁকির কারণে ভোটের দিনেও দল বেঁধে যেতে হলো ভোটকেন্দ্রে। সর্বশেষ খবর নিয়ে জানা গেল, ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরছে। গাড়ি চলছে, দোকানপাট খুলছে। ব্যবসা বাণিজ্যও জমতে শুরু করেছে। কিন্তু এরই মধ্যে যে ক্ষতি হয়ে গেছে সেটি পুষিয়ে নেওয়ার কাজটি হয়তো এত দ্রুত সম্ভব নয়। তবু নতুন করে আর যেন ক্ষতির মুখে পড়তে না হয় এই কামনা এখন বগুড়াবাসীর। সেসব মানুষের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে চাই, ভালো থাকুক বগুড়াবাসী, ভালো থাকুক প্রিয় স্বদেশ।
সুজয় মহাজন: সাংবাদিক।

‘নির্বাচন বৈধ হলেও অসম্পূর্ণ’ : ফারুক চৌধুরী by জাকারিয়া পলাশ

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ফারুক চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সময় এসেছে একথা প্রমাণ করার যে, আমরা গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচনই মনে করি না। গণতন্ত্র বলতে আমরা মানুষের মতামতের সার্বিক গুরুত্বকেও বুঝি।

ব্যাংককের বিক্ষোভে আবারও হামলা

থাইল্যান্ডের সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রধান নেতা
সুথেপ থাগসুবান গতকালও ব্যাংককের বিক্ষোভে নেতৃত্ব
দেন। এ সময় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার খরচ জোগাতে
সমর্থকেরা তাঁর হাতে অর্থ তুলে দেন ছবি: রয়টার্স
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে সরকারবিরোধীদের বিক্ষোভের স্থানে গতকাল রোববার আবার বিস্ফোরণ এবং গুলির ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২৮ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে চলতি সংকট থেকে নিজেদের দূরে রাখার ব্যাপারে আবারও ইঙ্গিত দিয়েছে সামরিক বাহিনী। থাই সরকার উৎখাতে ‘ব্যাংকক অচল’ কর্মসূচির দ্বিতীয় সপ্তাহ শুরুর প্রাক্কালে বিরোধীদের ওপর হামলায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। মধ্য ব্যাংককের ভিকট্রি মনুমেন্টে বিক্ষোভকারীদের সমাবেশস্থলের কাছে গতকাল পরপর দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এরপর সেখানে গুলিবর্ষণ করে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা। চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়েছে ভিকট্রি মনুমেন্ট। বিক্ষোভকারীরা গত সোমবার থেকে ওই স্মৃতিসৌধটি নিজেদের দখলে রেখেছেন।
মেডিকেল সার্ভিসেস বিভাগের প্রধান সুফান শ্রিথাম্মা বলেন, ‘আহতদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর... বোমার টুকরার আঘাতে তাঁরা আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’ কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। ৫২ বছর বয়সী থিরাইউথ উতকাইনতানোন্দ বলেন, ‘মঞ্চে ভাষণ চলার সময় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। এরপর সবাই মাটিতে শুয়ে পড়েন। প্রায় দুই মিনিট পরে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে। তখন সবাই আতঙ্কে দৌড়ে পালাতে থাকেন।’ এর আগে গত শুক্রবার বিক্ষোভের নেতা সুথেপ থাগসুবানের নেতৃত্বে একটি মিছিলে বিস্ফোরণের ঘটনায় একজন বিক্ষোভকারী নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছিলেন। ২০০৬ সালে থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রাকে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার কিছুটা আগ থেকেই অস্থিরতা চলছে থাইল্যান্ডে। দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে থাকসিন স্বেচ্ছানির্বাসনে রয়েছেন। তাঁর ছোট বোন ইংলাক সিনাওয়াত্রা এখন দেশটির প্রধানমন্ত্রী। গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে বিক্ষোভের কারণে ইংলাকের সরকার চাপের মধ্যে রয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, ইংলাককে পদত্যাগ করে একটি অনির্বাচিত ‘গণপরিষদে’র কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। বিক্ষোভকারীদের আহ্বান সত্ত্বেও সেনাবাহিনী চলতি সংকটে প্রত্যক্ষ কোনো ভূমিকা রাখবে না বলেই এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে। শনিবারও সশস্ত্র বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার থানাসাক পাতিমাপাকর্ন এ কথাই বলেছেন। সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষে কুচকাওয়াজের সময় স্থানীয় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘দেশের দেখভালের জন্য আমাদের প্রত্যেককে প্রত্যেকের সাহায্য করা দরকার।’ সেনাবাহিনী ও সরকারের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা করা দরকার। আমি নিজে আইন এবং সব পক্ষকেই শ্রদ্ধা করি। একটি সমাধান খুঁজে বের করতে আলোচনায় বসতে সব পক্ষকেই অনুরোধ করছি।’ পৃথক একটি সাক্ষাৎকারে সশস্ত্র বাহিনী প্রধান ব্যাংকক পোস্ট পত্রিকাকে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগ্রহ তাঁর নেই। এমনকি চলতি সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও রাখতে চান না তিনি। এএফপি ও রয়টার্স।

‘নির্বাচন বৈধ হলেও অসম্পূর্ণ’ : ফারুক চৌধুরী by জাকারিয়া পলাশ

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ফারুক চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন সময় এসেছে একথা প্রমাণ করার যে, আমরা গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচনই মনে করি না। গণতন্ত্র বলতে আমরা মানুষের মতামতের সার্বিক গুরুত্বকেও বুঝি।
বাংলাদেশের মনে রাখা উচিত যে, আমরা একটি ক্রমাগত ছোট হয়ে আসা পৃথিবীতে বাস করছি এবং আমরা এই পৃথিবীতে একা দাঁড়িয়ে নেই। আমরা জাতিসংঘের একটি গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র। আমাদের দেশে যাতে এমন কিছু না ঘটে যা বিদেশীদের সমালোচনায় উৎসাহিত করে। তিনি বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও তা অসম্পূর্ণ। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সরকার সাংবিধানিক ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে। কিন্তু, এটা একটা বড় ‘কিন্তু’, বৃহত্তম বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ নেয়নি। অতএব, নির্বাচন বৈধ হলেও ‘অসম্পূর্ণ’ রয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য এটা কাম্য নয়। এ জন্য আমি মনে করি যে, সরকার পক্ষ ও বিরোধী দলের (বিএনপি) সংলাপে বসা উচিত। একটি জাতির ইতিহাসে দুই-চার-পাঁচ বছর বড় কথা নয়। বড় কথা হচ্ছে, দেশে একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করা। নির্বাচন কিন্তু গণতন্ত্রের শেষ নয়, শুরু। গণতন্ত্র হচ্ছে দেশের মানুষের চিন্তাধারায় অবগাহনের নিমন্ত্রণ ও প্রতিফলন। ফারুক চৌধুরী বলেন, আমি খুবই আশাবাদী, দুই দলের মধ্যে সংলাপের সুষ্ঠু একটি পরিবেশ সৃষ্টি হবে। বস্তুনিষ্ঠ আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজন হলে দুই দলকেই ছাড় দিয়ে প্রত্যেকের অংশগ্রহণের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দুই দলের রাজনীতিবিদদেরই এগোতে হবে। হারি জিতি নাহি ভয়- এমন চিন্তা রাখতে হবে। যে দল হেরে গেল সে দল যে সবকিছু হারিয়ে ফেললো তা তো নয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে এক অর্থে বিরোধী দল নেই। যা গণতন্ত্রের জন্য খুবই হানিকর। কারণ বিরোধী দলের যদি লক্ষ্য হয় সরকারে প্রবেশ করা তাহলে তো আর বিরোধী দলে থাকা হলো না। তারা বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হবে। বিরোধী দলের ভূমিকা কি- তা মনে রাখতে হবে। তারা যদি মনে করে, সরকার ভুল পথে রয়েছে তাহলে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া তাদের কাজ। কখনও বা জাতীয় স্বার্থে সরকারকে সহায়তা করবে তারা। যেমন ভারত বা অন্য কোন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে দেশের স্বার্থের প্রশ্ন রয়েছে। সেখানে সরকার ও বিরোধী দল একজোট হয়ে কাজ করবে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিদেশীদের ভূমিকা প্রসঙ্গে বললেন, বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এখানে ১৬ কোটি মানুষের বাস। এর ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে পৃথিবীর বড় রাষ্ট্রগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া, ভারতসহ প্রতিবেশী এবং বিভিন্ন দেশের ব্যাপক ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অতএব এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, অন্যান্য দেশ অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করবে। তারা আমাদের দেশে স্থিতিশীলতা চায়, সন্ত্রাসমুক্ত বাংলাদেশ চায়। কিন্তু আগ্রহ প্রদর্শন আর হস্তক্ষেপ এই দুয়ের মধ্যে ফারাক আছে। আমরা নিশ্চয়ই চাইবো না যে কেউ আমাদের ওপর হস্তক্ষেপ করুন। প্রতিবেশী দেশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আজকে এখানে একটি সরকার আছে। কাল একটি সরকার হবে। আমি আশা করবো, ভারত তার দেশের স্বার্থেই সবার সঙ্গে, রাজনৈতিক সব গোষ্ঠীর সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখবে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা ভারতের স্বার্থ হতে পারে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি দেশে সমঝোতার একটি আবহ সৃষ্টি হয়, তাহলে আমাদের রাজনীতিতে বহির্বিশ্বের কোন প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের কারণ থাকবে না।
তিনি নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা প্রসঙ্গে বলেন, যারা সাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে, তারা বাংলাদেশে বিশ্বাসী না। কারণ, অসাম্প্রদায়িকতা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের একটি স্তম্ভ; গণতন্ত্র যেমন, ন্যায়বিচার যেমন। দেশে এমন একটি অবস্থার সৃষ্টি হওয়া উচিত যাতে রাজনীতির নিরিখে বা অন্য কোন মাপকাঠিতে কোন একটি বিশেষ গোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু বলে বিবেচনা করা হবে না। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সমতা রইবে। কোন একটি গোষ্ঠী নিজেকে সংখ্যাগুরু বলে বিবেচনা করবে না। তা ভাষাভিত্তিক হোক, ধর্মভিত্তিক হোক, সমাজভিত্তিক হোক। কারণ যখনই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিতে আমরা বাংলাদেশকে দেখি তখনই আমরা বাংলাদেশকে দুর্বল করে ফেলি।

কদিন আগেই ঝগড়া হয়েছিল শশী-সুনন্দার

সুনন্দা পুশকার ও শশী থারুর
শশী থারুরের সঙ্গে কদিন আগেই স্ত্রী সুনন্দা পুশকারের ঝগড়া হয়েছিল। অনেক লোকের চোখের সামনে গত বুধবার এ ঘটনা ঘটে বিমানের মধ্যে। কেরালা থেকে নয়াদিল্লি ফিরছিলেন তাঁরা। বিমানযাত্রায় পুরো পথেই ঝগড়া করছিলেন ভারতের কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ প্রতিমন্ত্রী শশী থারুর ও তাঁর স্ত্রী। এমনকি দিল্লি বিমানবন্দরে পৌঁছার পরও তাঁদের ঝগড়া থামেনি।
গত শুক্রবার রাতে দিল্লির একটি হোটেল থেকে সুনন্দার মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। লাশের ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সুনন্দার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তবে তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাঁকে হত্যা করা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো পুলিশ নিশ্চিত হতে পারেনি। সুনন্দার মৃত্যু নিয়ে তদন্ত করতে গিয়েই বিমানে ওই দম্পতির কলহের বিষয়টি জানতে পেরেছে পুলিশ। পুলিশ মনে করছে, বিমানে ঝগড়ার পর থেকে সুনন্দার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সময়টা মোটেই ভালো যায়নি ওই দম্পতির। সম্ভবত ঝগড়াঝাঁটি লেগেই ছিল। একটি সূত্র জানিয়েছে, শশী ও সুনন্দার মধ্যে ছয় মাস ধরেই ঝামেলা লেগে ছিল।
তবে মৃত্যুর আগের তিন-চার দিন সুনন্দা চরম বিষাদগ্রস্ত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন। বিমানের ওই ঝগড়াই শেষ পর্যন্ত সুনন্দাকে মৃত্যুর দুয়ারে ঠেলে নিয়ে গেছে কি না, তা বোঝার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, বিমানে সুনন্দা ও শশীর ঝগড়ার সময় বিষয়টি খেয়াল করেছিলেন সম্প্রচারমন্ত্রী মনিষ তিওয়ারি। তিনি তাঁদের থামতে বলেছিলেন, কিন্তু কোনো হস্তক্ষেপ করেননি। দিল্লি বিমানবন্দরে নামার পর সুনন্দা কাঁদতে কাঁদতে ওয়াশরুমে ঢুকে যান। তাঁদের দুজনের ঝগড়ার দৃশ্য ধরা পড়েছে বিমানবন্দরের ক্লোজসার্কিট ক্যামেরায়। ৫৭ বছর বয়সী শশীর সঙ্গে সুনন্দার বিয়ে হয় ২০১০ সালে। এটি ছিল শশীর তৃতীয় বিয়ে এবং সুনন্দার দ্বিতীয়। সম্প্রতি শশীর সঙ্গে পাকিস্তানি সাংবাদিক মেহর তারারের কথিত সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হয়। টাইমস অব ইন্ডিয়া।