Showing posts with label শিশির মোড়ল. Show all posts
Showing posts with label শিশির মোড়ল. Show all posts

Thursday, August 20, 2026

বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা–বাবার by শিশির মোড়ল

মাথাভর্তি চুল। মুখে কথা লেগে আছে। সারাক্ষণ কিছু না কিছু বলছে। বাবাকেও প্রশ্ন করে চলেছে। গান গাইছে একটার পর একটা। বাবার কোলে থাকা শিশুটি সবই করছে ঠিকঠাক। মনে প্রশ্ন জাগে, ও পারে না কী?

পারে না শুধু দাঁড়াতে, হাঁটতে। সোজা হয়ে বসতে পারে না। বসলে মাথা ঢলে পড়ে। এই বয়সী শিশুর পেশিতে যে শক্তি থাকা দরকার, তা ওর নেই। শিশুটি বংশগত রোগে আক্রান্ত। চিকিৎসাবিজ্ঞানে রোগটির নাম স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফি (এসএমএ)।

শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির একমাত্র সন্তান এই শিশু। নাম অলিভিয়া সঞ্চারী নবনী, বয়স চার বছর দুই মাস। রাজধানীর মগবাজারে তাঁদের বাসা। সন্তানের এসএমএ আছে জানার মুহূর্ত থেকে এই দম্পতির কাছে দুনিয়ার সবকিছু যেন ধূসর হয়ে গেছে। তাঁদের মেয়ে বিরল রোগে ভুগছে। এমন রোগ কম দেখা যায়। এসএমএ একটি বিরল রোগ।

২৩ আগস্ট ওই দম্পতির বাসায় তাঁদের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। বাসা ছাড়ার ঠিক আগমুহূর্তে কথা হয় শিশুটির সঙ্গে। শিশুর মা শাহিন আক্তার বলেন, ২০২১ সালের ২০ জুন নবনীর জন্ম। ঠিক সময়ে জন্ম হয়েছিল, জন্মের সময় ওজন ৩ কিলোগ্রামের বেশি ছিল। হাত–পা নড়াচড়াতেও সমস্যা ছিল না। জন্মের ২৫–২৬ দিন পর প্রথম চোখে পড়ল, মেয়ের পা দুটোর নড়াচড়া কমে গেছে। স্বামী–স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে শিশু স্নায়ুরোগবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মিজানুর রহমানের শরণাপন্ন হন। ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক একটি পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন, যে পরীক্ষার ব্যবস্থা দেশে ছিল না।

শিশুর বাবা শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘তখন করোনা শেষ হয়নি, বিদেশ যাতায়াত কঠিন ছিল। আমরা অক্টোবরে (২০২১) ভারতের চেন্নাই গিয়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে মেয়েকে দেখাই। চেন্নাই থেকে রক্তের নমুনা পাঠানো হয় বেঙ্গালুরুতে। নভেম্বরে আমাদের জানানো হয় মেয়ের এসএমএ।’

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে এসএমএ মানুষের জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। মা ও বাবা উভয়ই এসএমএর বাহক হলে তাঁদের সন্তানদের ২৫ শতাংশ ঝুঁকি থাকে এসএমএ রোগী হওয়ার। এসএমএ থাকলে পেশি নিয়ন্ত্রণের শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবানো ও গিলতে অসুবিধা হয়, মেরুদণ্ড বাকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। এসএমএর রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্মে একটি শিশুর এসএমএ দেখা যায়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসএমএ–কে আমরা বিরল রোগ বলছি। তবে দেশে আরও অনেক ধরনের বিরল রোগ আছে।’

বিরল রোগ সংক্রামক বা অসংক্রমাক হতে পারে। তবে বিরল রোগ কেন্দ্রে কেন্দ্রে রেখে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো ধরনের কাজ নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিরল রোগ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথকভাবে কোনো শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কোনো কাজ নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন সেটার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।’

বিরল রোগ কী

জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে রোগের প্রাদুর্ভাব কম দেখা যায়, তা বিরল রোগ। এ বছর ফেব্রুয়ারির বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি দলিল বলছে, বিরল রোগ হচ্ছে একটি বিশেষ স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, যা প্রতি দুই হাজার মানুষের মধ্যে একজনে বা তার কমে দেখা দেয়। বিশ্বব্যাপী প্রায় সাত হাজার বিরল রোগ আছে, ভুগছে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ। ৭০ শতাংশ বিরল রোগ শিশু বয়সে শুরু হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগ সাধারণত জটিল, একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এতে প্রভাবিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তি সহ–অসুস্থতায় (কো–মরবিডিটি) ভোগে। রোগটি দ্রুত অবনতির দিকে যায়, প্রতিবন্ধিতা সৃষ্টি করে ও অকালমৃত্যুর কারণ হয়।

বিরল রোগ নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। এদের নিয়ে কাজও কম। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে এগিয়ে থাকতে দেখা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দুই লাখ মানুষের মধ্যে একজনের যে রোগটি হয়, তা বিরল রোগ। দেশটিতে প্রায় ছয় হাজার বিরল রোগ আছে। এসব রোগে আড়াই কোটি মানুষ ভুগছে।

দেশে কত বিরল রোগ

এই প্রতিবেদক গত মার্চ থেকে আগস্টের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত তিনটি হাসপাতাল, বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও ৩০ জনের বেশি অভিভাববক ও রোগীর সঙ্গে কথা বলে দেশে বিরল রোগের পরিস্থিতি জানার চেষ্টা করেছেন। এই সময়ে এসএমএ, ডিএমডি, হিমোফিলিয়া, মোয়ামোয়া, সিফা সিনড্রোম, রেটস সিনড্রোম, প্রজেরিয়া, ট্রি ম্যান সিনড্রোম, এক্সপির মতো বিরল রোগের কথা জানা গেছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।

এসএমএ জিনের ত্রুটিজনিত রোগ। এতে পেশির নিয়ন্ত্রণ শক্তি ক্রমাগত কমতে থাকে, খাবার চিবোতে ও গিলতে সমস্যা হয়, মেরুদণ্ড বাঁকা ও কুঁজো হয়, শ্বাসকষ্ট থাকে। রোগীর দাঁড়াতে, হাঁটতে ও সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট হয়। সাধারণত ১০ হাজার শিশু জন্ম নিলে তাদের মধ্যে একজনের এই রোগ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দেশে এই রোগী আছে ২০০ থেকে ৩০০।

জিনের ত্রুটিজনিত আরেকটি রোগ ডুচেনি মাসকুলার ডিস্ট্রোফি (ডিএমডি)। এটি ছেলেদের বেশি হয়। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সে পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়। অনুমান করা হয়, দেশে ডিএমডি রোগী আছে দুই শর কাছাকাছি। ১০ হাজার জীবিত জন্মে একজনের এটি দেখা যায়।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের চিকিৎসকেরা ‘রেটস সিনড্রোম’ নামের একটি বিরল রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন। এটিও জিনের ত্রুটিজনিত স্নায়ুর রোগ। জন্মের দেড়-দুই বছর পর্যন্ত শিশু ভালোই থাকে। তারপর থেকে শিশুর খিঁচুনি হতে দেখা যায়। শিশুর মাথা বড় হয় না। শিশু ভুলে যেতে থাকে। কত মানুষ এতে আক্রান্ত, তা জানা যায় না।

দেশের গণমাধ্যমগুলো ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজনদারকে নিয়ে অনেক প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। আবুল বাজনদারের হাত ও পায়ের আকৃতি ছিল গাছের শিকড়ের মতো। জিনের নির্দিষ্ট ত্রুটি থাকা মানুষ হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রোগটি দেখা দেয়।

আবুল বাজনদার ১৯ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদককে বলেন, তিনি আবার অস্ত্রোপচারের জন্য জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছেন। এ পর্যন্ত তাঁর দুই হাত ও দুই পায়ে ৩০টি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে।

প্রায় একইভাবে গণমাধ্যমের দৃষ্টি পড়েছিল একজন ‘প্রজেরিয়া’ রোগীর ওপর। এতে শিশুর চেহারা প্রবীণের মতো হয়। জিনের রূপান্তরে এটা হয়। মানুষ অল্প সময়ে বুড়িয়ে যায়। হৃদ্‌রোগ ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি থাকে। এক কোটি মানুষের মধ্যে এমন ব্যক্তি একজন দেখা যায়।

রক্তের একটি বিরল রোগ হিমোফিলিয়া। কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ হয় না। এই রোগ সাধারণত পুরুষের হয়, নারী এই রোগের বাহক। ১০ হাজার মানুষের মধ্যে এই রোগে একজনকে আক্রান্ত হতে দেখা যায়।

২০১৬ সালের নভেম্বরে রাজধানীর উত্তরার একটি প্রায় অন্ধকার ঘরে ৮ ও ১২ বছর বয়সী দুই ভাইবোনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। এরা সূর্যের আলো সহ্য করতে পারে না। দুই ভাইবোন জিনের ত্রুটিজনিত জেরোডার্মা পিগমেনটোসামের (এক্সপি) রোগী। এক্সপির রোগী আলোতে থাকলে কয়েক মিনিটের মধ্যে চামড়া শুকিয়ে যায়। তাদের স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা দেখা দেয়, শ্রবণশক্তি কমে যায়। তাদের এখনো চিকিৎসা চলছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের গবেষকেরা জানিয়েছেন, দেশে অন্তত ২০০ জন ‘মোয়ামোয়া’ রোগী আছে। এটি মস্তিষ্কের রক্তনালির রোগ। এতে মস্তিষ্কের ধমনিতে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। রোগীর সাময়িকভাবে তীব্র মাথাব্যথা, শরীরের একাংশে অবশ ভাব, খিঁচুনি, কথায় অস্পষ্টতা, চোখে ঝাপসা দেখা, স্মরণশক্তি কমে যাওয়া—এই রোগের লক্ষণ।  

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া জানান, তিনি ময়মনসিংহের একটি পরিবারে ‘সিফা সিনড্রোম’ (কনজেনিটাল ইনসেনসিভিটি টু পেইন উইথ অ্যানহিড্রোসিস)–এর দুজন রোগী পেয়েছেন। ঘর্মগ্রন্থি (সোয়েট গ্লান্ড) না থাকার কারণে এদের ঘাম হয় না। এদের গরম লাগে বেশি, হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বেশি। এরা ব্যথা অনুভব করে না।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক (শিশু নিউরোলজি বিভাগ) জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘দেশে স্নায়ুর বিরল রোগ আছে অন্তত ১৫টি। অন্য কতটি বিরল রোগের অস্তিত্ব আছে, তা জানা নেই। প্রকৃত সত্য হচ্ছে, খোঁজা হয়নি।’

অবিরাম কষ্টের কাহিনি

রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পারভেজের প্রথম সন্তান মুনতাসিরের জন্ম হয় ২০১৪ সালে। জন্মের পাঁচ বছর পর মুনতাসিরের অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, পা বেঁকে যায়, পায়ের পেশিতে ব্যথার কথা বলতে থাকে। ২০২২ সালে শনাক্ত হয় মুনতাসির ডিএমডির রোগী।

ডিএমডির রোগীর বয়স বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাত–পায়ের পেশি শক্ত হয়ে যায়, আঙুল বেঁকে যায়। আক্রান্ত শিশুর বয়স ১০–১২ হতেই নিজ থেকে আর চলাচল করতে পারে না। বাবা–মায়ের সামর্থ্য থাকলে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে পারে। মুনতাসিরের ক্ষেত্রে ঠিক এমনই হয়েছে।

১৫ এপ্রিল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে মুনতাসিরের বাবা মোহাম্মদ পারভেজের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘কিছুই করতে পারলাম না। আমার চোখের সামনে ছেলেটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে গেল। বয়স মাত্র ১১ বছর। কিছুই করতে পারলাম না।’ চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, এমন শিশুরা বেশি দিন বাঁচে না।

মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের বিরল রোগে আক্রান্ত মানুষ, তাদের বাবা–মা–অভিভাবসহ অন্তত ৩০ জনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের সবাই মোহাম্মদ পারভেজের মতো অসহায়। সন্তানের গল্প বলতে গিয়ে মায়ের চোখ ভেসে যায় জলে। কারও কষ্ট চিকিৎসা করাতে না পারার। কেউ জানেন চিকিৎসা করিয়েও সন্তানকে বাঁচাতে পারবেন না। ‘আমি মারা গেলে আমার সন্তানের কী হবে’, এমন চিন্তায় দিন যায় কোনো কোনো মায়ের।

২০ মার্চ কথা হয় খুলনার লবণচরার নূরজাহান রজনী ও মেহেদি হাসান আমিরের সঙ্গে। নূরজাহান রজনী কৃষি ব্যাংকে চাকরি করেন, মেহেদি হাসান আমির এলাকায় ছোটখাটো ঠিকাদারির কাজ করেন। তাঁদের তৃতীয় সন্তান আমিরা এসএমএর রোগী। আমিরা প্রায়ই তার বাবা–মা ও দুই বোনের উদ্দেশে বলে, ‘রাগ কোরো না। আমি বসতে পারি না, আমি হাঁটতে পারি না, রাগ কোরো না।’ নূরজাহান রজনী প্রথম আলোকে বলেন, ‘এতটুকু মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে বুক ফেটে কান্না আসে।’

এমন সন্তান নিয়ে মা–বাবার জীবন আমূল বদলে যায়। রাজধানীর মগবাজারের শাহিন আক্তার ও শাহাদাৎ হোসেন দম্পতির ক্ষেত্রে তেমনই ঘটেছে। দুজন একসময় একটি বামপন্থী সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিয়মিত ওই দলের অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন, অংশ নিতেন। এখন সব বন্ধ। শাহাদাৎ হোসেন চাকরির প্রয়োজনে কর্মস্থলে যান। আপনার সময় কাটে কীভাবে? এমন প্রশ্নের উত্তরে মা শাহিন আক্তার বলেন, ‘আমার নিজের বলে আর কোনো সময় নেই। সারাটা সময় মেয়ের সঙ্গে। মেয়ে যখন ঘুমায়, তখনই কিছুটা ছুটি।’ ঘরের বাইরে যাওয়া নেই, আত্মীয় বাড়ি যাওয়া নেই। সামাজিক অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ। শাহিন আক্তারের দুনিয়া আটকে গেছে মেয়েতে।

এমন সন্তান দুটো থাকলে সমস্যা কি বেড়ে যায়? দুঃখ কি দ্বিগুণ হয়? ব্যবসায়ী ওমর ফারুকের দুটি ছেলেই বিরল রোগে আক্রান্ত। ২৩–২৪ আগস্ট ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে আয়োজিত একটি ওয়ার্কশপের প্রথম দিনের একটি অধিবেশনে ওমর ফারুক বলেন, ‘আমাদের জীবন বদলে গেছে। আমাদের জীবন থেকে আনন্দ হারিয়ে গেছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অভিভাবক বলেন, এমন বাবা–মাও আছেন, যাঁদের তিনটি সন্তানই বিরল রোগে ভুগছে। ঘরজুড়ে একটি খাট, তার ওপর তিন সন্তানকে নিয়ে স্বামী–স্ত্রী রাত কাটাতেন। ইতিমধ্যে একটি সন্তান মারা গেছে। এখন ওই খাটেই বাবা–মা রাত কাটান বাকি দুই সন্তানকে নিয়ে।

সহজে রোগ শনাক্ত হয় না

পুরান ঢাকার সুজন সাহা ও রমা সাহার একমাত্র মেয়ে স্বস্তিকা সাহা। মেয়ের বয়স যখন ৯ মাস, বাবা–মা খেয়াল করলেন, মেয়ের বসতে ও দাঁড়াতে কষ্ট হয়। সুজন সাহা বলেন, ‘প্রথম মেয়েকে মিটফোর্ড হাসপাতালে দেখাই। পরে পিজি হাসপাতালে দেখাই। তারপর পান্থপথের একটি বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। মেয়ে দিন দিন দুর্বল হতে থাকে। আট মাস আগে ভারতের চেন্নাই গেলাম। পরীক্ষায় ধরা পড়ল মেয়ের এসএমএ। আগের তিনটি হাসপাতালের কোনো চিকিৎসকই রোগ ধরতে পারেননি।’ একাধিক শিশুর মা-বাবার কাছ থেকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা শোনা গেছে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন আফরিন আক্তার। তিনি এসএমএর রোগী। তিনি বলেন, প্রথমে একজন চিকিৎসক মায়োপ্যাথির চিকিৎসা দেন। পরে দেশে-বিদেশে পরীক্ষায় নিশ্চিত হন যে তার এসএমএ। আফরিন আক্তার বলেন, ‘তিন বছরের বেশি সময় আমি ভুল চিকিৎসার মধ্যে ছিলাম।’ তিনি এখন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।

প্রায় সব বিরল রোগের নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. টিটো মিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু সাপোর্টিভ ট্রিটমেন্ট দিই, যেন রোগী স্বস্তি বোধ করে, রোগটি যেন আর না বাড়ে।’

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাওলী সরকার বলেন, ‘রোগনির্ণয় সঠিক না হলে ভুল চিকিৎসা হয়। এক রোগের লক্ষণ কিছু ক্ষেত্রে অন্য রোগের সঙ্গে মিলে যায়, তখন ভুল চিকিৎসার ঝুঁকি তৈরি হয়। কোনো রোগের চিকিৎসাই হয়তো জানা নেই, তখন রোগটি যেন না বাড়ে, সে জন্য কিছু চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভালো রেফারেল পদ্ধতি না থাকার কারণে রোগীরা ভুল প্রতিষ্ঠান বা ভুল ব্যক্তির কাছে চলে যান, এতে সঠিক চিকিৎসা রোগীরা পান না।’

৯৫ শতাংশের চিকিৎসা নেই

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিরল রোগের চিকিৎসা–সম্পর্কিত ওষুধসহ অন্যান্য পণ্যের দাম অনেক বেশি। অনেক দেশে এসব পণ্য ও ওষুধের প্রবেশাধিকার সীমিত। এটি বড় চ্যালেঞ্জ।

যেমন স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রোফির (এসএমএ) কথা বলা যায়। চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, এ রোগের চিকিৎসার ওষুধ তিনটি। প্রথমত জিনথেরাপি। ইনজেকশনের মাধ্যমে জীবনে তা একবারই দিতে হয়। এর দাম প্রায় ২২ কোটি টাকা। আরেকটি  ইনজেকশন আছে, প্রতি দুই মাস অন্তর রোগীর মেরুদণ্ডে দিতে হয়। একটি ইনজেকশনের দাম এক কোটি টাকা। আর আছে একটি সিরাপ। এর প্রতি বোতলের দাম ১০ লাখ টাকা। একজন রোগীর মাসে এক বোতল দরকার হয়।

জিনথেরাপি বাংলাদেশে দুটি শিশুকে দেওয়া হয়েছে। মেরুদণ্ডে দেওয়া ইনজেকশন কেউ পেয়েছে বলে জানা যায়নি। একটি বহুজাতিক কোম্পানি দেশের তিনটি শিশুকে বিনা মূল্যে সিরাপ দেওয়া শুরু করে। এখন শুধু মগবাজারের নবনী ওষুধটি বিনা মূল্যে পাচ্ছে।

বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে ওষুধ উদ্ভাবন করে তা সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে বিক্রি করা ওষুধ কোম্পানির জন্য লাভজনক নয়। যে দু–একটি ওষুধ তৈরি হয়, তার দাম বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ওষুধ উদ্ভাবনে সমতাভিত্তিক বিনিয়োগ ও আর্থিক প্রণোদনার অভাবের কারণে সারা বিশ্বের ৯৫ শতাংশ বিরল রোগের এখনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।

রাষ্ট্র কী করছে

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিরল রোগ নিয়ে তাদের কোনো ধরনের কাজ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর বলেন, ‘বিরল রোগ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক শাখা নেই। সামগ্রিকভাবে বিরল রোগ নিয়ে কাজও নেই। বিশেষ কোনো বিরল রোগ নিয়ে আলোচনা উঠলে তখন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’

ব্যতিক্রমী ভূমিকা নিয়েছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল, বিশেষ করে এই প্রতিষ্ঠানের শিশু নিউরো বিভাগ। এই বিভাগ বিরল রোগে আক্রান্ত শিশুদের জন্য প্রতি সপ্তাহে বিশেষ ক্লিনিক চালু করেছে। এ ছাড়া প্রতি মাসের মাঝামাঝি এক দিন বড় করে নিয়মিত সেমিনারের আয়োজন করে।  

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে একটি বিরল রোগের (এসএমএ) চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসার সরঞ্জাম কেনার জন্য ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের অনুকূলে ৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক কাজী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ বলেন, ৫ কোটি টাকার ওষুধ কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাকি টাকা খরচ করার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

আত্মশক্তির সন্ধান

বিরল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহায়তা বা পাশে দাঁড়ানোর জন্য কয়েকটি সংগঠন গড়ে উঠেছে। এসব সংগঠন তথ্য সংগ্রহ করে, দেশে–বিদেশে কোথায় রোগ পরীক্ষা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, তা জানার ও জানানোর চেষ্টা করে।

এমনই একটি সংগঠন কিওর এসএমএ বাংলাদেশ। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক বলেন, ‘এসএমএ রোগী ও তাদের অভিভাবকদের নিয়ে এই সংগঠন তৈরি হয়েছে। রোগটির ব্যাপারে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রোগনির্ণয়ে জেনেটিক পরীক্ষা দেশে চালু করার জন্য আমরা দৌড়ঝাঁপ করছি। ওষুধ কোম্পানি ও চিকিৎসকদের সঙ্গে নিয়ে আমরা চেষ্টা করছি যেন কম দামে ওষুধ পাওয়া যায়।’

একইভাবে ডিএমডি রোগীদের জন্য গড়ে ওঠা সংগঠনের নাম ডিএমডি কেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। হিমোফিলিয়া রোগীদেরও আছে বাংলাদেশ হিমোফিলিয়া সোসাইটি। এই ধরনের সংগঠন বিদেশে আছে।

কী করা যায়

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী একটি সার্বিক ও রোগীকেন্দ্রিক পন্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ব্যক্তির সক্ষমতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া, সামাজিকভাবে তাদের সম্পৃক্ত রাখার পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা কর্মসংস্থানে প্রবেশের বাধা দূর করা জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিরল রোগের জন্য পৃথক শাখা খোলার দাবি করেছেন কেউ, কেউ সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও কেউ কেউ বলেন।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক জুবাইদা পারভীন বলেন, ‘এই ক্ষেত্রে দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে হবে। রোগ শনাক্তে উপযুক্ত ল্যাবরেটরি স্থাপন করা জরুরি।’

[প্রথম আলো রোগী ও রোগীর অভিভাবকদের অনুমতি নিয়ে তাঁদের নাম এই প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে।]

বিরল রোগ: চোখের সামনে সন্তান অচল হয়ে পড়লেও কিছু করার থাকে না মা–বাবার

Sunday, August 16, 2026

৫ কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো যে উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম by শিশির মোড়ল

ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএসকে আমরা খাওয়ার স্যালাইন বা ওরস্যালাইন বলেই জানি। কলেরা বা কলেরার মতো ডায়রিয়াজনিত রোগে পানিশূন্যতা দূর করার জন্যই ওষুধটি উদ্ভাবিত হয়েছিল। যে উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। লিখেছেন শিশির মোড়ল

তরল খাইয়ে রোগীর কলেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, তা নিয়ে ১৯৫২ সালের দিকে কলকাতায় একটি গবেষণা হয়েছিল। ওই গবেষণার ফলাফল নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট–এর ১৯৫৩ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ লেখেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের কলেরা ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হেমেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি।

প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে কলেরায় আক্রান্ত কিছু রোগীর বমি বন্ধ ও পানিশূন্যতা দূর করার জন্য অ্যাভোমিন ট্যাবলেটের সঙ্গে পাথরকুচির পাতার রস খাওয়ানো হয়েছিল। তাতে ফলও পাওয়া গেছে।

গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে বা তারও কিছু আগে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কলেরা নিয়ন্ত্রণে কিছু গবেষণা হয়েছিল। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল। আমাদের এখানে এই গবেষণা করেছিল পাক–সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (আজ যা আইসিডিডিআরবি)।

মাঠপর্যায়ে ওআরএসের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা হয় আইসিডিডিআরবির চাঁদপুরের মতলব ও ঢাকা হাসপাতালে। এ পর্যায়ের গবেষণায় মূল গবেষক ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড ক্যাস। তাঁদের সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম ও মজিদ মোল্লা। অনেকে এই বিজ্ঞানীদের ওআরএসের উদ্ভাবক বলে মনে করেন।

১৯৬৮ সালের আগস্টে ল্যানসেট তাদের গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে। গবেষণা প্রবন্ধের মোদ্দাকথা ছিল, কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানোর পর ভালো ফল পাওয়া যায়।

ওই প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, খাওয়ার দ্রবণের এই উপাদানগুলো সস্তা ও সহজে পাওয়া যায়। এসব উপাদান সংরক্ষণ বা মজুত করা সম্ভব। আর পানি দিয়েই এই দ্রবণ তৈরি করা যায়।

ঢাকা ও কলকাতায় কতটা সমান্তরালভাবে ওআরএস নিয়ে গবেষণা চলেছিল, দুই শহরের বিজ্ঞানীদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল, তার একটি বর্ণনা ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টভিউ প্রেস থেকে প্রকাশিত কলেরা: দ্য আমেরিকান সায়েন্টিফিক এক্সপেরিয়েন্স ১৯৪৭–১৯৮০ বইয়ে পাওয়া যায়। ওই গ্রন্থে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে বিশদ বর্ণনা আছে।

ওই বছরের জুন নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীশিবিরে কলেরা দেখা দেয়। তখন বনগাঁও এলাকার শরণার্থীদের প্রথম ওআরএস খাওয়ানো হয়। এটাই ছিল ওআরএসের প্রথম ব্যাপক ব্যবহার। ভারতে এই কাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিলীপ মহলানবিশ।

তাই একক কোনো প্রতিষ্ঠান, একক কোনো বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী দল খাওয়ার স্যালাইন উদ্ভাবন করেনি। ওআরএসের গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি হওয়ার আগে অনেকে অনেক ধরনের কাজ করেছেন। ম্যানিলায় কিছু কাজ হয়েছে, কিছু হয়েছে ঢাকায়, কিছু কলকাতায়। ওআরএসের চূড়ান্ত রূপটি এসেছে ১৯৬৭ বা ১৯৬৮ সালের দিকে।

পানি–লবণ–গুড়ের ঘুঁটা

স্বাধীনতার পর দেশে ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রকোপ ছিল প্রবল। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও ছিল ডায়রিয়া। তখন মানুষের বাড়ি বাড়ি ওআরএসের প্যাকেট পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। ওই পটভূমিতে ওআরএস বা মুখে খাওয়ার স্যালাইনকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, বিশ্বের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনে তা বিরল।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির পদ্ধতি বা কৌশল শিখিয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা। ১৯৮০ সালে ডায়রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ও বাড়িতে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির প্রকল্প শুরু করে ব্র্যাক। ‘এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি’—এই ফর্মুলা নিয়ে মাঠে নামে ব্র্যাক।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্র্যাকের কর্মীরা শিখিয়েছিলেন: প্রথমে ফুটিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে, একটি পাত্রে আধা সের (আধা লিটারের কিছু বেশি) পানিতে এক চিমটি লবণ ও এক মুঠ গুড় নিয়ে ভালো করে গুলতে বা ঘুঁটতে হবে। সেই দ্রবণ ডায়রিয়ার রোগীকে খাওয়াতে হবে। ব্র্যাকের লক্ষ্য ছিল দেশের প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনকে এই দ্রবণ তৈরি শেখাতে হবে। ব্র্যাকের পাশে ছিল সরকার।

বেঁচেছে পাঁচ কোটির বেশি প্রাণ

ল্যানসেট–এর ১৯৭৮ সালের ৫ আগস্ট সংখ্যার সম্পাদকীয়র বিষয় ছিল ওআরএস। তাতে বলা হয়েছিল, ওআরএসের উদ্ভাবন চিকিৎসাক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার ২৮ বছর পর ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি—এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে টাইম ম্যাগাজিন

এগুলো বিশ্বের মানুষের কাছে ওআরএসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বেড়ে যাওয়ার উদাহরণ। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ওআরএসের ব্যবহার বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনা ও ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে। তার নেতৃত্বে ছিলেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষকেরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে শরীর থেকে দ্রুত পানি বের হয়ে যায়। ওআরএসের মাধ্যমে সেই পানি প্রতিস্থাপন করা হয়। ওআরএস ব্যবহার করে এ পর্যন্ত পাঁচ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছে।

বছরে বিক্রি ১৫০ কোটি প্যাকেট

এখন রক্তচাপ কমে গেলেও খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) খেয়ে নিচ্ছে মানুষ। প্রখর রোদে ক্লান্ত–ঘর্মাক্ত রিকশাচালক রাস্তার পাশের দোকান থেকে আধা লিটার পানির বোতল কিনে তাতে এক প্যাকেট খাওয়ার স্যালাইন গুলে খেয়ে নিচ্ছেন। বহু মানুষের বাড়িতেই ওরস্যালাইন এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

কেউ কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে, বাক্স–পেটরা গোছানোর সময় দেখে নেন, খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট নেওয়া হয়েছে কি না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকান থেকে শুরু করে রাজধানীর অভিজাত হাসপাতালেও পাওয়া যায় ওরস্যালাইন।

দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী, নিরক্ষর, শিক্ষিত—সব শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে এটি। ওআরএস এ দেশের মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের যেসব দেশে ওআরএসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার অন্যতম। ওষুধটি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীদের বড় ভূমিকা ছিল।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে ওআরএস পৌঁছানো এবং বাড়িতে ওআরএস তৈরি করার পদ্ধতি–কৌশলও উদ্ভাবন করেছে এ দেশের মানুষ। সারা দেশে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) ওআরএসের একক আধিপত্য।

এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, ‘সারা বছর এসএমসির প্রায় ১৫০ কোটি প্যাকেট ওরস্যালাইন বিক্রি হয়। বাজারের ৯৫ শতাংশ ওরস্যালাইন এসএমসির।’

এসএমসি ছাড়া আরও কয়েকটি কোম্পানির ওআরএসের প্যাকেট বাজারে বিক্রি হয়। এরা বছরে প্রায় আট কোটি প্যাকেট ওআরএস বিক্রি করে। এ ছাড়া মানুষ নিজেই ঘরে বা বাড়িতে পানির সঙ্গে লবণ ও চিনি বা গুড় গুলিয়ে খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করে। বাড়িতে বানানো এই মিশ্রণও ওআরএস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো উদ্ভাবন মানুষের জীবনের সঙ্গে এমন মিশে যাওয়ার উদাহরণ বিরল।

(বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫–এ প্রকাশিত)

লবণ ও গুড় মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করছেন মতলবের একজন নারী, ১৯৭৯–৮০ সাল
লবণ ও গুড় মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করছেন মতলবের একজন নারী, ১৯৭৯–৮০ সাল। ছবি: আইসিডিডিআরবি

Thursday, February 26, 2026

‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’, এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে নেই by শিশির মোড়ল

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের একটি বক্তব্য অনেকের নজর কেড়েছে। অনেকে মনে করছেন, মন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্য খাতের বাস্তব চিত্র কিছুটা ফুটে উঠেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এতে চিকিৎসকদের কিছুটা হেয় করা হয়েছে।

দায়িত্ব নেওয়ার তিন দিন পর গত শুক্রবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার হাফিজপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘মানুষকে যাতে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে না হয়, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে। সহজলভ্য ও সর্বজনীন করার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’ তবে ‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’—এই পরিস্থিতি দেশে নেই।

চিকিৎসাসেবা পাওয়া বা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন চিকিৎসক। সেবার জন্য নার্সসহ আরও অন্য ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীও প্রয়োজন। কিন্তু ১০ হাজার মানুষের জন্য দেশে চিকিৎসক আছে সাতজন। নার্স আরও কম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। বছরের পর বছর স্থায়ী জনবলসংকটের মধ্যে আছে দেশের স্বাস্থ্য খাত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জনবল কম রেখে মানসম্পন্ন সেবা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে চিকিৎসকসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব দূর করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক রুমানা হক বহু বছর ধরে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বর্তমান মানবসম্পদ তথ্যপদ্ধতিকে হালনাগাদ ও শক্তিশালী করা এবং একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরি করা। জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মী, চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মীর শূন্যপদ পূরণ করা। মনে রাখতে হবে, গ্রামীণ সেবাকে পদোন্নতির মানদণ্ডে যুক্ত করলে প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসক ধরে রাখা সম্ভব হতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করলে অনেক সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করি।’

পরিস্থিতি কী

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত চিকিৎসকের (এমবিবিএস পাস) সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার। এর মধ্যে কত চিকিৎসক মারা গেছেন, কত চিকিৎসক বিদেশ আছেন, কত চিকিৎসক পেশা চর্চা করেন না—এই তথ্য বিএমডিসির কাছে নেই।

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩০ হাজারের মতো চিকিৎসক কর্মরত আছেন।

স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন দলিলে বাংলাদেশের অনুমিত জনসংখ্যা ১৮ কোটি ধরা হচ্ছে। সেই হিসাবে দেশে ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক ৭ দশমিক ২ জন। ভারতে ১০ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক ৯ দশমিক ৯ জন, নেপালে ১০ দশমিক ৯ জন, শ্রীলঙ্কায় ১১ দশমিক ৪ জন, পাকিস্তানে ১২ দশমিক ৮ জন এবং মালদ্বীপে ২৩ জন। বাংলাদেশের চেয়ে পিছিয়ে শুধু আফগানিস্তান (৩ দশমিক ২) ও ভুটান (৫ দশমিক ৫)। একইভাবে দেখা যায়, দেশে নার্সের সংখ্যাও প্রয়োজনের চেয়ে কম।

বাস্তবে দেখা যায়, স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া শুধু একা চিকিৎসকের কাজ নয়। স্বাস্থ্যসেবায় বড় ভূমিকা রাখেন নার্স, মিডওয়াইফ, টোকনোলজিস্টসহ আরও অনেকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসক প্রধান বা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। মানসম্পন্ন সেবার জন্য চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর দক্ষতার মিশ্রণের প্রয়োজন হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত ১: ৩: ৫ হওয়া বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ একজন চিকিৎসক থাকলে নার্স থাকবেন তিনজন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন পাঁচজন।

২০২৫ সালে প্রকাশিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৮ কোটি মানুষের জন্য সরকারি খাতে চিকিৎসক প্রয়োজন ১ লাখ সাড়ে ৩ হাজার। সেই হিসাবে নার্স দরকার ৩ লাখ সাড়ে ১০ হাজার এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী দরকার ৫ লাখ সাড়ে ১৭ হাজার। ওই প্রতিবেদন আরও বলছে, দেশে প্রয়োজনের চেয়ে ১৭ শতাংশ চিকিৎসক কম আছে। অন্যদিকে নার্স ৮২ শতাংশ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ৫৬ শতাংশ কম। সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩২ শতাংশ পদ শূন্য।

চিকিৎসক অনুপস্থিতির ১৮ কারণ

দক্ষিণের জেলা খুলনার সুন্দরবন–সংলগ্ন দাকোপ উপজেলায় সরকারি চিকিৎসকের পদ আছে ৪০টি। রোববার খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে চিকিৎসক আছেন ১২ জন। অর্থাৎ ২৮টি পদে চিকিৎসক নেই বা ৭০ শতাংশ পদ শূন্য। এ রকম উদাহরণ আরও আছে।

নানা কারণে চিকিৎসকেরা কর্মক্ষেত্রে থাকেন না, থাকতে চান না বা থাকতে পারেন না। ২০২৪ সালের মার্চে স্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট–এ প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রবন্ধে দেখা গেছে, ১৮ কারণে চিকিৎসকেরা কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন। এর মধ্যে আছে:

অবকাঠামোগত দুর্বলতা: রোগী দেখার কক্ষগুলো ছোট, এক কক্ষে একাধিক চিকিৎসককে বসতে হয়, রোগী দেখার সময় গোপনীয়তা রক্ষা করা সম্ভব হয় না। হাসপাতালে রোগীর আত্মীয়স্বজনের ভিড় অনেক বেশি থাকে। হাসপাতালে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের সরবরাহ প্রয়োজনমতো থাকে না। ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি থাকে। পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ থাকে না। চিকিৎসকদের সহায়তাদানকারী সব ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীর স্বল্পতা দেখা যায়। হাসপাতালগুলোতে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘটতি থাকায় চিকিৎসকদের নোংরা পরিবেশে কাজ করতে হয়।

প্রভাবশালীদের চাপ, সহিংসতা: হাসপাতালে সরকারি চিকিৎসকেরা সব সময় স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চিকিৎসকদের কাজে বাধা দেন, নানা অনৈতিক চাপ দেন। এসব চাপের কারণে কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। অনেক সময় রোগীর আত্মীয়রা চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অনেক সময় শারীরিক সহিংসতার মুখে পড়েন চিকিৎসকেরা।

আবাসন ও পারিপার্শ্বিক সমস্যা: উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকদের আবাসন সমস্যা বেশি। কর্ম এলাকায় তাঁদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ভালো সুযোগ নেই। তাঁরা যে এলাকায় কাজ করেন, সেই এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ।

নীতি–সম্পর্কিত: সরকারি নীতিই অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের পেশাগত উন্নয়নের বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা চার ধরনের সমস্যার কথা গবেষকদের বলেছেন—চাকরির সুযোগ–সুবিধায় ক্যাডারদের মধ্যে অন্যায্যতা রয়েছে, অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানো যায় না, বদলির ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখা যায় এবং উচ্চশিক্ষা বা বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগের ঘাটতি আছে।

গবেষকদের একজন ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খালেকুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসকদের সমস্যাগুলো পুরোনো, পরিচিত ও বহুল আলোচিত। প্রয়োজন আন্তরিকতার সঙ্গে সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করা।’

‘অটোমেশন’ একটি সমাধান

চিকিৎসকেরা নিজের পছন্দের এলাকায় থাকতে বা পেশা চর্চা করতে চান। এই বাস্তবতা মেনে নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বদলি ও পদায়নে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এতে চিকিৎসকেরা নিজেদের পছন্দের বেশ কিছু বিকল্প স্থানের নাম উল্লেখ করতে পারেন। এর সঙ্গে অভিজ্ঞতা ও অন্যান্য দক্ষতা মেলালে চিকিৎসকদের পদোন্নতি হবে নিরপেক্ষভাবে।

এই পদ্ধতির ব্যবহার শুরু হয়েছে। এই পদ্ধতি ব্যবহার করে ৪৮তম বিসিএসের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসকের পদায়ন হয়েছে। এই পদায়নে এখনো কোনো অনিয়ম বা আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। একই পদ্ধতিতে ৪৪তম বিসিএসের ২১৭ জন চিকিৎসকের পদায়ন হবে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

গত রোববার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি বহাল থাকলে বা সর্বস্তরে চালু হলে নিয়োগ ও বদলিতে স্বচ্ছতা আসবে, অর্থ লেনদেন বন্ধ হবে।

জনবলসংকট সমাধানে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কমিশন প্রতিবেদনের সুপারিশ নতুন সরকারের আমলে নেওয়া উচিত।

বিএনপি কী করবে, মন্ত্রীর ব্যাখ্যা

নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, চিকিৎসকেরা অসমভাবে বণ্টিত। হাসপাতালে চিকিৎসকদের চাপের মধ্যে কাজ করতে হয়। তাঁদের মধ্যে উৎসাহের ঘাটতি আছে।

ইশতেহারে আরও বলা হয়েছে, ‘দেশজুড়ে সকল নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে নতুন করে প্রায় এক লক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করা হবে, যার ৮০ শতাংশ হবে নারী।’

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে একটি সভা হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও সভায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত, স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমানসহ আরও একাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানিয়েছে, সভায় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি আলোচিত হয়।

চিকিৎসকেরা মানুষের পেছনে ঘুরবে, এমন বক্তব্যের কিছু সমালোচনা হতে দেখা গেছে। ওই প্রসঙ্গে গত রোববার স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজ কার্যালয়ে এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে রোগী কোনো চিকিৎসককে পাননি, এমন অভিযোগ শোনা যায়। আমরা এই ধরনের অভিযোগের অবসান ঘটাতে চাই। আমরা কর্মক্ষেত্রে চিকিৎসকদের রাখার উপযুক্ত ব্যবস্থা করতে চাই। চিকিৎসকের উপস্থিতি রোগীর সেবা নিশ্চিত করবে। চিকিৎসকের অনুপস্থিতির কারণে রোগীর চিকিৎসা হয়নি, এমন অভিযোগ আর শোনা যাবে না।’

‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’, 
এমন পরিস্থিতি বাংলাদেশে নেই

Saturday, August 17, 2019

ঢাকা ও মুগদা মেডিকেলে খুব বেশি পরিমাণে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে by শিশির মোড়ল

রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খুব বেশি পরিমাণে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে এডিস মশা রয়েছে। অথচ সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা হচ্ছে এই হাসপাতালে। সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সর্বশেষ মশা জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

কীটতত্ত্ববিদেরা মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৮০ শতাংশ পাত্রে (পরিত্যক্ত কৌটা, বোতল, বালতি, জগ, কার্নিশ ইত্যাদি) এডিস মশার লার্ভা পেয়েছেন। এই হাসপাতালের ভেতরে-বাইরে মশা জন্মানো ও বংশবিস্তারের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে।

হাসপাতালটির পরিচালক আমিন আহমেদ খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখানে মশা বেশি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এই হাসপাতাল একটি ঝিলের ওপর। হাসপাতালের আশপাশে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা হয়।’ তিনি আরও বলেন, হাসপাতাল ভবন ওপরের দিকে বাড়ানো হচ্ছে, বিভিন্ন তলায় পানি জমে থাকছে। এ ছাড়া এসির জমে থাকা পানিও পরিষ্কার করা হচ্ছে না। এই হাসপাতালে এ পর্যন্ত ৩০ জন নার্স ও ১২ জন চিকিৎসক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

৩১ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা ঢাকার ১৪টি এলাকায় এ জরিপ করেছে। তারা বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পরীক্ষা করে দেখেছে। এর মধ্যে ১২টি জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে লার্ভা পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেছেন, একটি এলাকায় ২০ শতাংশের বেশি পাত্রে লার্ভা পাওয়া গেলে পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচনা করা হয়।

৮০ শতাংশের বেশি পাত্রে লার্ভা পাওয়া গেছে পাঁচটি স্থানে। এগুলো হচ্ছে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কমলাপুর বিআরটিসি বাস ডিপো, কমলাপুর রেলওয়ে কলোনি, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও শাহজাহানপুর বস্তি।

গাবতলী বাস টার্মিনাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিরপুর-১২–এর বিআরটিসি বাস ডিপোতে এডিস মশার ঝুঁকি একই পর্যায়ে। জরিপকারীরা দেখেছেন, এই তিন স্থানে ৬০-৮০ শতাংশ পাত্রে এডিসের লার্ভা আছে। মশার বংশবিস্তারের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত পাত্র হচ্ছে পরিত্যক্ত টায়ার।

নির্মাণাধীন ভবন বা অন্য অবকাঠামোর মশা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। কারণ, এসব স্থানে পানি জমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ ভুপেন্দর নাগপাল সম্প্রতি ঢাকা এসে একাধিক সভায় বলেছিলেন, নির্মাণাধীন ভবন বা অবকাঠামোর মশা নিধন করা সম্ভব হলে ঢাকার ডেঙ্গু ৪০ শতাংশ কমে যাবে। মশা নিধন করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের।
  • ঢাকার ১৪টি এলাকায় সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জরিপ।
  • বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পরীক্ষা।
  • পরীক্ষায় ১২টি জায়গায় ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে লার্ভা পাওয়া গেছে।
মেট্রোরেল প্রকল্প, মহাখালী কড়াইল বস্তি, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ২০-৬০ শতাংশ পাত্রে লার্ভা পেয়েছেন জরিপকারীরা। উত্তরা থেকে পল্লবী, মিরপুর, ফার্মগেট হয়ে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেলের কাজ চলছে। রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা মিরপুর-১২তে মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকায় মশা জরিপ করেছে। প্রকল্প এলাকাকে তারা এডিস মশার ঝুঁকিপূর্ণের তালিকায় রেখেছে।

মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকারি প্রতিষ্ঠান ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। মশার লার্ভার ঝুঁকিপূর্ণ তালিকা সম্পর্কে জানতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ এন সিদ্দিকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

 রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্লাস্টিকের বালতি, প্লাস্টিকের ড্রাম, অব্যবহৃত টায়ার ও কর্ক শিট, ধাতব ড্রাম ও নারকেলের খোলায় ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছেন জরিপকারীরা। রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা জরিপের ফলাফল দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা সাংবাদিকদের বলেন, ‘জরিপের ফলাফল আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’

রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা বছরে তিনবার মশা জরিপ করে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে, বর্ষার সময় ও মৌসুম শেষে। এ বছর মার্চে প্রথম জরিপ করে তারা বলেছিল, বর্ষার সময় মশা বাড়বে, সঙ্গে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়বে। এর পরের নিয়মিত জরিপ করে ১৭-২৭ জুলাই। তাতে দেখা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে মশা প্রায় ১৪ গুণ বেড়ে গেছে। এই সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। তখনই রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা এই অতিরিক্ত তড়িৎ জরিপের সিদ্ধান্ত নেয়।

জরিপে দেখা গেছে, কালশী ইসিবি চত্বর ও ভাষানটেক বস্তির ২০ শতাংশের কম পাত্রে লার্ভা পাওয়া গেছে। এই দুটি এলাকাকে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলছে রোগনিয়ন্ত্রণ শাখা।

জরিপের ফলাফল বিষয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাকের চেয়ারপারসন অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, জরিপের তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে সচেতন হওয়া বা করার ব্যাপারটি মুখের কথাই হয়ে আছে। সরকার সবাইকে সচেতন হতে বলছে, কিন্তু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলো কেউ পরিষ্কার করছেন না বা মশামুক্ত করার উদ্যোগ নিচ্ছেন না। সক্রিয়তার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সচেতনতাকে সংজ্ঞায়িত করতে হবে। অন্যকে করতে বলার চেয়ে নিজে করে দেখানোটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Monday, June 24, 2019

ব্যক্তির স্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ছে by শিশির মোড়ল

স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বাড়ছে। এই ব্যয় বৃদ্ধিকে ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা’ অর্জনে বাধা বলে মনে করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা।
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে পাঁচ দফা সংস্কার প্রস্তাব করে একটি ধারণাপত্র তৈরি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ। ব্যবস্থাপনা, জনবল, সেবা, অর্থায়ন ও তথ্য ব্যবস্থাপনা—এই পাঁচটি বিষয়ে ধারণাপত্রকে সামনে রেখে বড় পরিসরে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের মহাপরিচালক শাহদাত হোসেন মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। বিরাজমান ব্যবস্থাতেই সংস্কার এনে তা অর্জন সম্ভব। আমরা বাস্তব কিছু সংস্কার প্রস্তাব করেছি।’
এ বছরের বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য, ছিল ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা: সবার জন্য, সবখানে’। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার (ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ) অর্থ প্রত্যেক মানুষ প্রয়োজনের মুহূর্তে মানসম্পন্ন সেবা পাবে। সেবার জন্য মানুষ সামর্থ্য অনুযায়ী খরচ করবে। অর্থের অভাবে মানুষ সেবাবঞ্চিত থাকবে না, ব্যয় বহন করতে গিয়ে নিঃস্ব হবে না।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে দেশে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়।
পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে
সরকারের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ ২০১২ সালে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের কৌশলপত্র তৈরি করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমাতে উদ্যোগ নেবে সরকার। তখন ব্যক্তির নিজস্ব খরচ ছিল ৬০ শতাংশ। ২০৩২ সালে তা ৩২ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কমেনি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের সরকারি হিসাব বলছে, ব্যক্তির নিজের ব্যয় ৬৭ শতাংশ, আর ২৩ শতাংশ সরকারের। বাকি ১০ শতাংশ দাতা ও অন্যরা ব্যয় করে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি।
২০১২ সালে ওষুধের জন্য মানুষ মোট ব্যয়ের ৬৫ শতাংশ ব্যয় করত। এখন তা বেড়েছে। এ ছাড়া অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বাণিজ্যিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, ‘এসব ক্ষেত্রে সরকারি নজরদারি বাড়লে ব্যক্তির ব্যয় কমে আসবে।’
৫ দফা প্রস্তাব
স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সংস্কার প্রস্তাবের শুরুতে বলা হয়েছে, অবকাঠামো, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবলে বিনিয়োগ থাকলেও মানুষের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। এটা বড় চ্যালেঞ্জ। সংস্কারের অগ্রাধিকার তালিকার শুরুতে আছে ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন।
ধারণাপত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেছেন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে ক্যাডার-নন-ক্যাডার দ্বন্দ্ব এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার দ্বন্দ্ব কয়েক দশকের পুরোনো। এই দ্বন্দ্ব সমন্বয়হীনতার বড় কারণ। এ জন্য সেবার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠানে জনবল নিয়োগ দিতে বলা হয়েছে। ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত তথ্য সরবরাহ কাঠামোর আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে।
সংস্কারের অন্যতম উদ্দেশ্য ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমানো। এ জন্য সরকারের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য বরাদ্দ ব্যবস্থাপনা ও ব্যয়ে দক্ষতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এর ওপর নজরদারি জোরদার করতে হবে। ৯০ শতাংশ মানুষকে সামাজিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার আওতায় আনতে হবে।
দিশারি প্রকল্প
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ২০১২ সালের কৌশলপত্রে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে) নামে একটি দিশারি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছিল। ২০১৩ সালে এই প্রকল্প শুরু করার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি। ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় এসএসকে শুরু করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ঘাটাইল ও মধুপুর উপজেলাকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়। এই তিন উপজেলার ৮০ হাজার পরিবারকে স্বাস্থ্য কার্ড দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে স্বাস্থ্য সহকারীর সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। ৭৮টি রোগের চিকিৎসা বিধি (ট্রিটমেন্ট প্রটোকল) তৈরি করা হয়েছে। বিধিতে প্রতিটি রোগের চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওষুধের তালিকা দেওয়া আছে।
দরিদ্র পরিবারগুলোর পক্ষে সরকার বছরে এক হাজার টাকা প্রিমিয়াম দেয়। বিনিময়ে প্রতিটি পরিবার বছরে ৫০ হাজার টাকার চিকিৎসা সুবিধা পায়। কোনো পরীক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে করা হলে সেই ব্যয়ও প্রকল্প থেকে পরিশোধ করা হয়। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চিকিৎসা, প্রিমিয়ামসহ যাবতীয় ব্যয়ের হিসাব রাখে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের পরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আছে। কিন্তু এ বিষয়ে ধারণাগত অস্পষ্টতাও আছে। সংসদে ও জনপরিসরে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হওয়া দরকার।

Thursday, May 30, 2019

রাস্তায় মারা যান ৫০ জনের বেশি মা by শিশির মোড়ল

সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে বাড়ি থেকে হাসপাতালে বা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে যাওয়ার পথে বছরে রাস্তায় মারা যান ৫০ জনের বেশি মা। এটি দেশে মোট মাতৃমৃত্যুর ১ শতাংশ। এ তথ্য সরকারের মাতৃস্বাস্থ্য জরিপে (২০১৬ সালে) উঠে এসেছে। এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব বলে মনে করেন স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রওশন আরা বেগম বলেন, গর্ভধারণের পরপরই সঠিক পরিকল্পনা নিলে রাস্তায় মাতৃমৃত্যু রোধ করা সম্ভব। কোন হাসপাতালে সন্তান জন্ম দেওয়া হবে, বাসা থেকে সেখানে যাতায়াতের ব্যবস্থা কী হবে, তা আগেই ঠিক করে রাখতে হবে। একই সঙ্গে সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় চিকিৎসার জন্য অর্থ জোগাড় করে রাখা দরকার। এসব বিষয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি থাকলে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। তিনি বলেন, জরুরি সমস্যা নিয়ে কোনো সন্তানসম্ভবা মা হাসপাতালে গেলে তাঁকে অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা যাবে না। ওই মায়ের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম হাসপাতালে যাতে থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে।
বাংলাদেশ মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ ২০১৬–এর তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৩১ শতাংশ মাতৃমৃত্যুর কারণ অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। দ্বিতীয় কারণটি খিঁচুনি। এ কারণে ২৪ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হয়। স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসব হলে মাতৃমৃত্যু কম হয়। ৪৭ শতাংশ নারী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তান জন্ম দেন। সরকারের জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপ বলছে, গড়ে ধনী পরিবারের তিনজন মা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তান জন্ম দেওয়ার সুযোগ পান। গরিব পরিবারের ক্ষেত্রে এই সুযোগ পান একজন। তবে ওই জরিপ বলছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের ক্ষেত্রে ধনী ও দরিদ্রের এই পার্থক্য আগের চেয়ে অনেকটাই কমে আসছে। ২০০৭ সালে ধনী ও দরিদ্রের পার্থক্য ছিল আট গুণ। ২০১১ ও ২০১৪ সালে পার্থক্য কমে হয় যথাক্রমে ছয় ও পাঁচ গুণ।
বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (২০১৭-১৮) খসড়া প্রতিবেদন বলছে, সমাজের সবচেয়ে দরিদ্রশ্রেণির মাত্র ২৬ শতাংশ মা প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের সুযোগ পান। অর্থাৎ তাঁরা হাসপাতাল, ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সন্তান প্রসব করেন। ধনীদের ক্ষেত্রে এই হার ৭৮ শতাংশ।
স্ত্রীরোগ ও ধাত্রীবিদ্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এখনো ৫৩ শতাংশ প্রসব হচ্ছে বাড়িতে। অর্থের অভাব না থাকলেও সচেতনতার অভাবে ধনী পরিবারের সব মা এখনো প্রসবের সময় হাসপাতালে আসেন না। আর দরিদ্র পরিবারের ক্ষেত্রে সমস্যা দুটি। একটি অংশের সচেতনতার অভাব। অন্য অংশের অর্থের অভাব।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে ৩০ লাখ ৮৮ হাজার জীবিত শিশুর জন্ম হয়েছিল। আর বাংলাদেশ সরকারের ২০১৬ সালের মাতৃস্বাস্থ্য জরিপ বলছে, দেশে এক লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৯৬ জন মায়ের মৃত্যু হয়। সরকার অবশ্য দাবি করছে সংখ্যাটি আরও কম হবে।
মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে গত রোববার রাজধানীতে ওজিএসবি আয়োজিত এক সভায় জানানো হয়, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি দুই ঘণ্টার গড়ে অন্তত একজন মায়ের মৃত্যু হচ্ছে। এসব মৃত্যুর ৫৪ শতাংশ হচ্ছে বাড়িতে। ১৪ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হচ্ছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ১৪ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে প্রাইভেট ক্লিনিক ও হাসপাতালে। ৬ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হচ্ছে জেলা সদর হাসপাতালে, ৬ শতাংশ মৃত্যু হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, কমিউনিটি ক্লিনিক, এনজিও ক্লিনিক ও অন্যান্য স্থানে ৫ শতাংশ মায়ের মৃত্যু হয়। হাসপাতাল, ক্লিনিকসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ঘটনা মাতৃমৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক লতিফা শামসুদ্দিন।
আজ মঙ্গলবার দেশে পালিত হচ্ছে ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে ২৮ মে–কে নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস ঘোষণা করেন। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘মর্যাদা ও অধিকার: স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসূতিসেবায় অঙ্গীকার’। এ বছর মানসম্মত গর্ভকালীন সেবা, প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব এবং নারীর স্বাস্থ্য অধিকারের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

Monday, March 25, 2019

নীতিমালা ভেঙে ডাক্তার গড়ার কারবার by শিশির মোড়ল

*অধিকাংশ মেডিকেল কলেজ শর্ত না মেনেও অনুমোদন পাচ্ছে।
*নজরদারি কম, দুর্নীতির অভিযোগ।

দেশের বেসরকারি মেডিকেল কলেজের প্রায় সব কটি চলছে কমবেশি শর্ত অমান্য করে। বেসরকারি মেডিকেল কলেজ পরিদর্শনের কাজে যুক্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তেমনটাই বলছেন।
কলেজগুলোর শর্তমাফিক অবকাঠামো নেই, কারও হয়তো নিজস্ব জমি নেই, অনেকেরই শিক্ষার্থীদের হাতে–কলমে শেখানোর জন্য উপযুক্ত হাসপাতাল বা পর্যাপ্ত রোগী নেই। শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অথচ কলেজের সংখ্যা বেড়ে চলেছে।
আওয়ামী লীগের গত দুই আমলে বছরে গড়ে তিনটি করে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। দেশে এখন বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৬৯। মোট ৩৬টির মালিকানা বা পরিচালনায় আছে সরকারি দলের নেতা অথবা দলসমর্থিত চিকিৎসক বা ব্যবসায়ী। অতীতেও ক্ষমতাসীন দলসমর্থিত উদ্যোগ প্রাধান্য পেয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, শরীয়তপুর, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর জেলার ছয়টি কলেজ ঘুরে দেখেছেন। ১৩টি কলেজের সরকারি পরিদর্শন প্রতিবেদন হাতে এসেছে। অনুসন্ধান আরও বলছে, বেসরকারি মেডিকেল কলেজের ওপর স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নজরদারি কম। তথ্য চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, নেই।
রাজশাহী শহরের খড়খড়ি এলাকায় শাহ মখদুম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ৭ মার্চ দুপুর সাড়ে ১২টা। একটি ঘরে জনা কুড়ি ছাত্রছাত্রী বাদে ক্যাম্পাস মোটামুটি ফাঁকা। হাসপাতালের নির্মাণাধীন বহির্বিভাগটি সুনসান। শয্যাগুলো খালি। কলেজটি চালু হয়েছে পাঁচ বছর আগে, ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে। অধ্যক্ষ নেই, ভারপ্রাপ্ত হয়ে কলেজ চালাচ্ছেন উপাধ্যক্ষ।
ঘণ্টাখানেক পর প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিবেদক বহির্বিভাগে শ্বাসকষ্টে ভোগা একজন রোগীর দেখা পান। তাঁর সঙ্গী বলেন, অনেকক্ষণ এসেছেন, ডাক্তার পাননি।
গত সপ্তাহে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি পরিদর্শক দল এ কলেজ দেখতে গিয়েছিল। ওই দলের একজন সদস্য প্রথম আলোকে বলেন, কলেজটিতে অনুমোদিত শিক্ষার্থী সংখ্যার অনুপাতে হাসপাতালের শয্যা বা রোগী নেই। সেই অনুপাতে শিক্ষকও কম।
এসবই বেসরকারি মেডিকেল কলেজ স্থাপন ও পরিচালনা নীতিমালার বরখেলাপ। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘নীতিমালার চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান শর্ত মানছে না। ইতিমধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছি। ভবিষ্যতে আমরা আরও কঠোর হব।’
সব বেসরকারি কলেজ যে শিক্ষার্থী পায়, এমন না। রাজশাহীর কলেজটির কর্তৃপক্ষ বলছে, এখন তাদের মোট ২০০ শিক্ষার্থী আছেন। এই প্রথম ছয়জন শেষ বর্ষের পরীক্ষা দিয়েছেন। এযাবৎ কোনো বছরই অনুমোদিত ৫০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হননি। এবার ঢুকেছেন মাত্র ১৮ জন। তবে লাভের হাতছানি বড়।
বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর মোট আসন ৬ হাজার ২৩১। এ বছর বিদেশি ভর্তি হয়েছেন প্রায় এক হাজার। সরকার-নির্ধারিত ভর্তি ফি ১৮ লাখ টাকা। বেতন ও অন্যান্য নিয়মিত খরচও নির্ধারিত। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে একজন শিক্ষার্থী কলেজকে দেবেন ২২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। বিদেশি শিক্ষার্থীরা এর জন্য দেবেন ৩৬ লাখ টাকা। এর বাইরে আছে পরীক্ষার ফি ও হোস্টেল খরচ, যা প্রতিষ্ঠান ঠিক করবে।
চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসরকারি কলেজগুলো এই আয়কে গুরুত্ব দেয়, চিকিৎসা শিক্ষাকে নয়।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব। তাঁর কথা, ‘কিছু মেডিকেল কলেজের অবস্থা খুবই খারাপ। সম্প্রতি আমরা সদস্যদের বলেছি, সকলকেই নীতিমালার সব শর্ত মানতে হবে। মান উন্নত করতে হবে। দু-একটি প্রতিষ্ঠানের কারণে পুরো খাতের বদনাম হচ্ছে।’
শর্তের বরখেলাপ
নীতিমালা অনুযায়ী, ৫০ আসনের একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের সঙ্গে অন্তত ২৫০ শয্যার একটি আধুনিক হাসপাতাল থাকতে হবে। শিক্ষার্থী ভর্তির দুই বছর আগে থেকে হাসপাতালটি চালু থাকতে হবে। ৭০ শতাংশ শয্যায় নিয়মিত রোগী ভর্তি থাকবে। হাসপাতাল ও কলেজ হবে একই ক্যাম্পাসে। এগুলোর আয়তনও নির্দিষ্ট করা আছে। কলেজের আসন বরাদ্দ বাড়লে সেই অনুপাতে হাসপাতাল বড় করতে হবে।
রাজশাহীতে দেখা কলেজটির হাসপাতালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক দল ২৫০ শয্যার চেয়ে কম পেয়েছে। ৭ মার্চ দুপুরে প্রথম আলোর রাজশাহী প্রতিবেদক সেখানে শয্যায় কোনো রোগী দেখেননি। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনিরুজ্জামান বলেছিলেন, ভর্তি সাতজন রোগী বিদ্যুৎ না থাকায় বাইরে গেছেন। প্রতিবেদক পরে সন্ধ্যায় গিয়ে চারজন রোগীকে দেখতে পান।
হাসপাতালে রোগী না থাকা আর শিক্ষকস্বল্পতা একটি সাধারণ সমস্যা। পরিদর্শন কর্তৃপক্ষের সূত্র বলছে, অনেক হাসপাতাল আদতে বিশেষজ্ঞ ক্লিনিকের মতো, যেখানে বিকেলে রোগী দেখার ভিড় হয়। আরেক সমস্যা, ভবনের কাঙ্ক্ষিত আয়তনসহ অবকাঠামো এবং কলেজ ও হাসপাতালের অভিন্ন ক্যাম্পাস না থাকা।
২০১২ সালে চালু হওয়া খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এক কিলোমিটার দূরত্বে ছড়িয়ে আছে। ময়লাপোতার মোড়ে ১৮ তলা যে ভবনটি আছে, সেটি হাসপাতাল ভবন। ৫ মার্চ এই ভবনে ঘুরে কোনো শিক্ষার্থী চোখে পড়েনি।
অভ্যর্থনাকারীর কাছে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করতে চাইলে তিনি পাঁচতলায় পাঠান। সেখানে এক কর্মচারী বলেন অপেক্ষা করতে। আধা ঘণ্টা পরে তিনি বলেন, অধ্যক্ষ চলে গেছেন। জানা যায়, কলেজ ভবনটি রয়েল হোটেলের কাছে। পরদিন তাঁর নাগাল পেলে কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক পরিতোষ পাল বলেন, তিনি নতুন এসেছেন, প্রতিষ্ঠানের খুঁটিনাটি তথ্য জানা নেই।
হাসপাতাল দূরে হলে বা সেখানে পর্যাপ্ত রোগী না থাকলে শিক্ষার্থীদের অনুশীলনের সমস্যা হয়। নীতিমালায় বিষয় ও শিক্ষার্থীর মাথা গুনে শিক্ষকের সংখ্যা বেঁধে দেওয়া আছে। শিখন ভালো হওয়ার জন্য ৫০ আসনের একটি কলেজে কমপক্ষে ১৭৭ জন শিক্ষক দরকার।
দেশের প্রথম বেসরকারি মেডিকেল কলেজটি রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায়। নাম বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ। ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজের সুনাম আছে। এর হাসপাতাল নিজস্ব ভবনে। তবে ৩৪ বছর ধরে কলেজ চলছে ভাড়া বাড়িতেই।
অধিদপ্তরের পরিদর্শন কর্মকর্তাদের বিবেচনায়, ৬৯টি কলেজের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজসহ ১৬টি মানসম্পন্ন। ১০টিই ঢাকার বাইরে। এগুলোর হাসপাতালে রোগী থাকে এবং শিক্ষকের সংখ্যাও মোটামুটি ভালো।
তবে ভালো কলেজগুলোরও জমি-ভবনের আয়তন অথবা ভাড়া বাড়ির সমস্যা আছে। অধিদপ্তরের কাছ থেকে যে ১৩টি মেডিকেল কলেজের পরিদর্শন প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, সেগুলোর ১১টিই এমন।
পেছনে প্রভাবশালীরা
গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে পশ্চিমে ইটাহাটায় ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের বাঁ পাশে সিটি মেডিকেল কলেজের ভাড়া করা পাঁচতলা ভবন। আশপাশের দোকানিরা বলছেন, ভবনটি তৈরি হয়েছিল পোশাক কারখানার জন্য।
প্রতি তলায় সরু বারান্দার দুপাশে ছোট ছোট ঘর। এসব ঘরে শিক্ষকেরা বসেন, ভবিষ্যতের চিকিৎসকেরা ক্লাসও করেন। কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) অধ্যাপক মো. ইউনুস আলী মণ্ডল কলেজটি ঘুরিয়ে দেখিয়ে বললেন, প্রতিষ্ঠানটি মানসম্পন্ন।
কলেজের হাসপাতাল বেশ দূরে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল হামিদ বলেন, ওই দিন রোগী ভর্তি ছিল ১৮ জন। নীতিমালার শর্ত মোতাবেক সেখানে কমপক্ষে ১৭৫ জন রোগী থাকার কথা। কিন্তু অত শয্যা ফেলার জায়গা নেই।
প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান সাংসদ মহীউদ্দীন খান আলমগীর। হাসপাতালে তাঁর অফিস ঘরের বাইরে নামফলক ঝুলছে। কলেজটি তিনি কিনে নিয়েছেন। একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, ‘গার্মেন্টস বিক্রি হলে মেডিকেল কলেজ বিক্রি হবে না কেন? দুটোই এখন ব্যবসা।’
সরকারি পরিদর্শন প্রতিবেদন বলছে, ২০১০ সাল থেকে কলেজটি তিনবার ক্যাম্পাস বদলিয়েছে। নিজস্ব জমি নেই। পরিদর্শনের দিন হাসপাতালে মোট ৫১ জন রোগী ছিল, যাদের সেদিনই অথবা তার আগের দিন ভর্তি করা হয়। অধিকাংশ রোগীর সমস্যা ছিল মাথা, কোমর বা পেটে ব্যথা, যার জন্য ভর্তি নিষ্প্রয়োজন। কলেজের আসনসংখ্যা ৮০। মোট শিক্ষক ১০৫, ওই দিন ছিলেন ১৬ জন।
পরিদর্শন প্রতিবেদনে আছে, প্রায় সব শর্ত অমান্য করায় এ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন স্থগিত করা হয়েছিল। ফের পরিদর্শনের জন্য ওপরতলার চাপ আসে। বিশেষ পরিদর্শন কমিটি গঠিত হয়। প্রতিবেদনটি তাদের।
রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে মেডিকেল কলেজের মালিকানা বা পৃষ্ঠপোষক বদলের নজির আছে। ৩৬টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের উদ্যোক্তা ক্ষমতাসীন সরকারপন্থী। তাঁদের মধ্যে একজন মন্ত্রী, দুজন প্রতিমন্ত্রী ও দুজন সাবেক মন্ত্রী আছেন। আছেন একাধিক সাংসদ, চিকিৎসক নেতা ও ব্যবসায়ী।
বিএনপিপন্থী এবং জামায়াতে ইসলামীপন্থী চিকিৎসক বা ব্যবসায়ীরা ছয়টি করে মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। জাতীয় পার্টির নেতারা চালাচ্ছেন দুটি মেডিকেল কলেজ। বাদবাকি ১৯টি মেডিকেল কলেজের পরিচালকেরা সরাসরি কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত না।
নজরদারি ও দুর্নীতি
কলেজগুলো নজরদারির মূল দায়িত্ব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়নবিষয়ক পরিচালকের দপ্তরের। এখানকার একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্ত চলছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানের সূচনায় দপ্তরটির পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক এম এ রশিদ। দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর সম্প্রতি তিনি বদলি হয়েছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেছিলেন, তাঁদের পরিদর্শন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে নতুন কলেজের অনুমোদনসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয় মন্ত্রণালয়ের একটি কমিটি। কমিটির সভাপতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সদস্যদের মধ্যে আছেন চিকিৎসক নেতারা।
কলেজ স্থাপন, আসনসংখ্যা বৃদ্ধি, নবায়ন বা কোর্স অনুমোদন-সংক্রান্ত একাধিক সভার কার্যবিবরণীতে (২০১২-২০১৩) দেখা যায়, মন্ত্রণালয় শর্ত না মানা কলেজগুলোও অনুমোদন দিয়েছিল।
২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদক তথ্য অধিকার আইনে সব কটি কলেজের পরিদর্শন প্রতিবেদন চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ৯০ দিন পর চিঠিতে লেখেন, ‘বেসরকারি মেডিকেল কলেজ–সংক্রান্ত পরিদর্শন প্রতিবেদন অত্র বিভাগে সংরক্ষিত নেই।’
অধ্যাপক রশীদ-ই-মাহবুব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহ-উপাচার্যও ছিলেন। তাঁর সাফ কথা, ‘এভাবে চলতে পারে না, চলতে দেওয়া উচিত না।’ তিনি বলছেন, সরকারকে খারাপ মেডিকেল কলেজগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে সাহায্য করতে হবে। আর বেশি দুরবস্থার কলেজগুলোকে অন্য কলেজের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে হবে।
(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ)

Thursday, November 12, 2015

উচ্চশিক্ষায় ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ -ইউনেসকোর বৈশ্বিক প্রতিবেদন by শিশির মোড়ল

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো বলছে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করেছে বেশ কিছু দেশ। এদের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হতে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এ দেশে শিক্ষার মান বেড়েছে। এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ২০ শতাংশ শিক্ষার্থী স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে পড়েন। স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের এই হার এশিয়ার সর্বোচ্চ দেশের তালিকায় আছে।
ইউনেসকোর বৈশ্বিক বিজ্ঞান প্রতিবেদন ২০১৫-এ এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে দেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির জন্য ১৮ লাখ ৪০ হার শিক্ষার্থী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। ২০০৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৫০ হাজার। এই সময়ে প্রকৌশলে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৮ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইউনেসকো বলছে, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ভর্তির হার বেশি হলেও খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থী পিএইচডি ডিগ্রির (গবেষণা) জন্য ভর্তি হন। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম প্রকৌশলীরা। ২০০৯ সালে ১৭৮ জন প্রকৌশলী পিএইচডি ডিগ্রির জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। ২০১২ সালে ভর্তির সংখ্যা বেড়ে হয় ৫২১। প্রতিবেদেন বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ৭ হাজার ৯০ জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী আছেন। অন্যদিকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ১৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬৫৯ জন।
এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। বাংলাদেশ ২০১২ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার লক্ষ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. কায়কোবাদ ইউনেসকোর প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা জমি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় খুবই কম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা ছাড়া, এই খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
‘ইউনেসকো সায়েন্স রিপোর্ট: টুয়ার্ডস ২০৩০’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক দেশ জাতীয় উন্নয়ন এজেন্ডায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে যুক্ত করেছে। ২০০৮-০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পরও গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। প্রতিবেদনে কিছু বৈশ্বিক প্রবণতার কথা বলা হয়েছে। দেখা গেছে, ফলিতবিজ্ঞানে বিনিয়োগ বেশি হচ্ছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে বিজ্ঞান ও গবেষণা খাতে সরকারি ব্যয় কমে গেছে। এই খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আগের মতো আছে বা বেড়েছে। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে উত্তর-দক্ষিণের ব্যবধান কমেছে। তৃতীয়ত, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন পৃথিবীতে বিজ্ঞানীর সংখ্যা বেশি এবং তাঁরা এক জায়গায় স্থির নন। ২০০৭ সালের চেয়ে ২০১৪ সালে গবেষক ও বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার সংখ্যা ২০ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের শিক্ষার মান বেড়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা, তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে, ২০১০ সালে মাধ্যমিক স্তরে শ্রেণিকক্ষে গড়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৭২। ২০১৩ সালে কমে ৪৪ জনে দাঁড়ায়। প্রাথমিক স্তরে পুনর্ভর্তির হার ১৩ থেকে কমে ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধিবিষয়ক প্রকল্পের (২০০৯-২০১৮) মধ্যবর্তী মূল্যায়নে দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষার মানে সন্তোষজনক অগ্রগতি হচ্ছে।
অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, এ দেশে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম, মোট জাতীয় আয়ের মাত্র ২ শতাংশ। বরাদ্দ বাড়ানো গেলে শিক্ষার পরিস্থিতি আরও ভালো হতো।
ইউনেসকোর ৮২০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে অন্যান্য বেশ কিছু দেশের মতো বাংলাদেশ বিষয়ে পৃথকভাবে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে, কৃষিপ্রযুক্তি বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা ত্বরান্বিত করেছে। ৪৭টি নতুন প্রযুক্তি ১৩ লাখ ১০ হাজার কৃষক ব্যবহার করছেন, ২০০টি ফলিত গবেষণায় অর্থায়ন করা হচ্ছে, কৃষিতে উচ্চতর ডিগ্রির জন্য ১০৮ জন নারী ও পুরুষ বিজ্ঞানীকে বৃত্তি দেওয়া হয়েছে, কৃষকদের জন্য ৭৩২টি তথ্য ও পরামর্শ কেন্দ্র খোলা হয়েছে, শস্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ৩৪টি প্রযুক্তি ১৬ হাজার কৃষক ইতিমধ্যে গ্রহণ করেছেন।
২০০৫ সালে বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা ছিল ২৮৩টি। ২০১৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৯৪-এ। ইউনেসকো বলছে, বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখার সময় বাংলাদেশি বিজ্ঞানী বা গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সহপ্রবন্ধকার হিসেবে সঙ্গে রাখছেন। অন্যদিকে দেশে অবস্থানরত বিজ্ঞানী বা গবেষকদের চেয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা মেধাস্বত্বের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী।
প্রতিবেদনে ইউনেসকোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা বলেছেন, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো টেকসই উন্নয়নের চালক হিসেবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

Tuesday, November 10, 2015

পুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ ‘বাংলাদেশ ধাঁধা’ by শিশির মোড়ল

স্বাস্থ্যের কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই সাফল্যের তথ্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশনায় উদ্ধৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে এটাও বলা হচ্ছে যে স্বাস্থ্যে সাফল্য অর্জন করলেও পুষ্টিতে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে আছে। এই পিছিয়ে থাকাটাও বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। কারণ, আফ্রিকার ক্ষুধাপীড়িত কয়েকটি দেশের চেয়েও বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ। উদাহরণ দিয়ে বলা হচ্ছে, খর্বকায় শিশুর হার আফ্রিকার সাব সাহারা এলাকার চেয়ে বাংলাদেশে বেশি। আবার গর্ভবতী নারীর ওজন আফ্রিকায় গড়ে ১০ কেজি বৃদ্ধি পায়, বাংলাদেশে পাঁচ কেজি। খর্বাকৃতি ও গর্ভবতী নারীর ওজন বৃদ্ধি পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে অথচ পুষ্টিতে পিছিয়ে থাকার এই পরিস্থিতিকে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘বাংলাদেশ এনিগমা’ বা ‘বাংলাদেশ ধাঁধা’। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ ও এখান থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন এক দশকের বেশি সময় ধরে। পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের আরও কিছু দেশে এই ‘ধাঁধা’ আছে। এটা প্রথম ধরা পড়ে ভারতের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সের তৎকালীন পরিচালক ভুলিমিরি রামলিঙ্গস্বামীর গবেষণায় ১৯৯৬ সালে। এরপর থেকে জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলেও কেন সমানতালে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় না। কেন পুষ্টির উন্নতি স্বাস্থ্যের উন্নতির সমান্তরাল হয় না।
পুষ্টিতে পিছিয়ে আছে—এ রকম ৫৭টি দেশ চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ। দেশগুলোর পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি করতে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে একটি আন্দোলন শুরু হয়েছে ২০১০ সালে, নাম ‘সান মুভমেন্ট’ বা ‘স্কেলিং আপ নিউট্রিশন’। বিশ্বের ২৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই আন্দোলনের নেতৃত্বে আছেন। তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের নাম আছে।
২০ থেকে ২২ অক্টোবর ইতালির মিলান শহরে সানের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৫৭টি দেশের সাংসদ, সরকারি, বেসরকারি, একাডেমিক, সাংবাদিক প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। এর বাইরে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত ছিলেন। নিজ নিজ দেশের এবং বিশ্বের পুষ্টি পরিস্থিতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিনিধিরা মিলানে জড়ো হয়েছিলেন। মূল সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সরকারগুলোকে পুষ্টি কর্মসূচিতে নেতৃত্ব জোরদার করার পাশাপাশি জবাবদিহি বাড়াতে হবে, পুষ্টি কর্মকাণ্ডে দাতানির্ভরতা কমাতে হবে এবং পুষ্টির যাবতীয় কর্মকাণ্ডে রাজনীতিক, গণমাধ্যমসহ নাগরিক সমাজের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পুষ্টিকে প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মকাণ্ডে পরিণত করতে হবে।
স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে অথচ পুষ্টিতে পিছিয়ে থাকার এই পরিস্থিতিকে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘বাংলাদেশ এনিগমা’ বা ‘বাংলাদেশ ধাঁধা’। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ ও এখান থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন এক দশকের বেশি সময় ধরে তিন দিনের সম্মেলনে একটি অধিবেশন ছিল পুষ্টি ইস্যুতে গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা নিয়ে। এই অধিবেশনে সাংবাদিকেরা বলেন, পাঠকের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম বলে সংবাদপত্রের মালিক ও ব্যবস্থাপকদের কাছে পুষ্টি তেমন গুরুত্ব পায় না। তা ছাড়া, পুষ্টি নিয়ে নাগরিক সমাজে ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা বিতর্ক কম হয়। রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধ, দুর্নীতি, কূটনীতি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ নিয়ে নির্দিষ্টভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত রিপোর্টার থাকলেও পুষ্টির ক্ষেত্রে থাকে না।
২০১০ সালে শুরু হলেও বাংলাদেশে ‘সান’ আন্দোলন সাড়া ফেলতে পারেনি। এই আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল মূলত এনজিওগুলো। কিন্তু এনজিওগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ে নেতৃত্ব নিয়ে। কেউ কেউ আদর্শিক কারণে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়নি। সম্মেলনে যোগ দেওয়া একাধিক বিদেশি প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপের সময় জানা গেল, বাংলাদেশের এই দ্বন্দ্বের খবরটি তাঁরাও জানেন। সরকারের জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানে যোগ্য লোক না থাকার কারণে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনাগ্রহের কারণে সরকারও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়নি বা হতে পারেনি।
সম্মেলনের মূল সুর ছিল, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে একক কোনো প্রকল্প (প্রজেক্ট), কর্মকাণ্ড (অ্যাকটিভিটি) বা কর্মসূচি (প্রোগ্রাম) পুষ্টির উন্নতি করতে পারে না, কোথাও পারেনি। পুষ্টিকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দিলে ভুল হবে। দায়িত্ব যদি শুধু খাদ্য মন্ত্রণালয় নেয় তাহলেও পুষ্টির উন্নতি হবে না। এ কাজ কৃষি মন্ত্রণালয়ের না হলেও তারও দায়িত্ব আছে। পুষ্টিকে এগিয়ে নিতে বহু খাতভিত্তিক উদ্যোগ (মাল্টি স্টেকহোল্ডার অ্যাপ্রোচ) প্রয়োজন। এর অর্থ এই উদ্যোগের সঙ্গে স্বাস্থ্য, খাদ্য, কৃষি, পানি, শিক্ষা, তথ্য, অর্থ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক সমাজকে সচেতন ও পুষ্টির পক্ষে সক্রিয় করতে হবে। ধারণা, তাহলেই ধাঁধা দূর হবে।
শিশির মোড়ল: সাংবাদিক।

Saturday, August 8, 2015

জরুরি হয়ে পড়েছে এক সন্তান নীতি -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: মোহাম্মদ আলী by শিশির মোড়ল

মোহাম্মদ আলী
সামাজিক বিপণন বা সোশ্যাল মার্কেটিং–এর ধারণা জনপ্রিয় করেছে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি বা এসএমসি। পরিবার পরিকল্পনায় সামাজিক বিপণন প্রকল্প হিসেবে ১৯৭৪ সালে এসএমসির যাত্রা শুরু হয়েছিল। আজ ১১ জুলাই, বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উপলক্ষে এসএমসির ৪১ বছরের পথচলা, সাফল্য, ব্যবসায়িক কৌশল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রথম আলোকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলী। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল
প্রথম আলো: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের সাফল্য কতখানি? এখনকার প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?
মোহাম্মদ আলী: স্বাধীনতার পর দেশে মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট (টিএফআর) ৬-এর বেশি ছিল। টিএফআর কমে এখন ২.২-এ দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারের হারও অনেক বেড়েছে। বর্তমানে ৬৬ শতাংশ দম্পতি কোনো না কোনো পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এগুলো বড় ধরনের সাফল্য।
তবে এখন কয়েকটি বিষয়ে জোর দেওয়ার সময় এসেছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহারের হার এ দেশে খুব কম। ভেসেকটমি বা লাইগেশনের মতো স্থায়ী পদ্ধতির ওপর জোর দিতে হবে। এখন এক সন্তান নীতি গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়া দরকার। পাশাপাশি আচরণ পরিবর্তন এবং যোগাযোগে আরও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
প্রথম আলো: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা পরিবার পরিকল্পনায় দেশের সাফল্যে এসএমসির অবদান কীভাবে বর্ণনা করবেন।
মোহাম্মদ আলী: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও শিশুস্বাস্থ্যে বড় অবদান রেখেছে এসএমসি। সর্বশেষ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপে (২০১৪) দেখা গেছে, জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণকারীদের প্রতি তিনজনের একজন এসএমসির পণ্য ব্যবহার করে। অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, এসএমসির সেবার ফলে ৪১ বছরে ১ কোটি ৬০ লাখ অপরিকল্পিত গর্ভধারণ থেকে সুরক্ষা দিয়েছে। একই সঙ্গে ১২ লাখ শিশুর মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হয়েছে। এগুলো জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য খাতে এসএমসির বড় অবদান।
প্রথম আলো: বাজারে এসএমসির প্রধান পণ্য কী আছে? সাধারণ মানুষের কাছে এসব পণ্য কীভাবে পৌঁছায়?
মোহাম্মদ আলী: বর্তমানে এসএমসির আটটি পণ্যের ২৩টি ব্র্যান্ড বাজারে আছে। এর মধ্যে আছে জন্মনিরোধক বড়ি, কনডম, আইইউডি, ইমপ্লান্টস, ইনজেকটেবলস, ওআরএস, সেফ ডেলিভারি কিট, স্যানিটারি ন্যাপকিন, শিশুর জন্য অণুপুষ্টি-কণাসমৃদ্ধ পাউডার ও জিঙ্ক। এসব পণ্য সাধারণত ওষুধের দোকান, মুদি দোকান ও এনজিওতে বিক্রি হয়। এ ক্ষেত্রে এসএমসির স্যানিটারি ন্যাপকিনের কথা বিশেষভাবে বলা দরকার। এর নাম ‘জয়া’। নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা মাথায় রেখে এর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এর মান বাজারের যেকোনো উচ্চমূল্যের ন্যাপকিনের মানের সমান। অল্পদিন আগে বাজারে ছাড়লেও এর পরিচিতি ও চাহিদা ব্যাপক।
প্রথম আলো: বাজারে অনেক প্রতিষ্ঠানের একই ধরনের পণ্য আছে। কিন্তু মানুষ কেন এসএমসির পণ্যের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী?
মোহাম্মদ আলী: ১৯৭৪ সাল থেকে এসএমসি মানুষকে কম দামে মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করে আসছে। এসএমসির সব পণ্যের দাম কম, দরিদ্র শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। এই দীর্ঘ সময়ে পণ্যের মান ঠিক রাখার ফলে এসএমসি মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। এসএমসির যেকোনো ব্র্যান্ডের প্রতি মানুষের বিশ্বাস আছে যে, তিনি ঠকবেন না। উদাহরণ হিসেবে খাওয়ার স্যালাইন বা ওআরএসের কথা বলা যায়। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ সাধারণ ডায়রিয়া চিকিৎসায় প্রথমেই এসএমসির স্যালাইন খোঁজে। বাজারের ৮০ শতাংশ ওআরএস এসএমসির। এটা আস্থারই পরিচয়।
প্রথম আলো: এত বড় বাজার ধরা ও মানুষের আস্থা অর্জনের পেছনের কারণ কী?
মোহাম্মদ আলী: বেশ কিছু কৌশলের কারণে এসএমসি বর্তমান অবস্থায় আসতে ও মানুষের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে। একটি বড় বিতরণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সহজে মানুষের কাছে মানসম্পন্ন পণ্য পৌঁছায়। আমাদের বাজারজাতকরণ কৌশল হচ্ছে ক্রেতাকেন্দ্রিক। ঘরের কাছের ওষুধের বা মুদি দোকানে আমাদের পণ্য পাওয়া যায়। ক্রেতারা এসএমসি ও এসএমসির পণ্যকে বিশ্বাস করে।
অন্যদিকে এসএমসির কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা দেখতে চান যে এই প্রতিষ্ঠানটি দৃঢ়ভাবে টিকে আছে। কর্মচারীরা দেখতে পান, এই প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কেউ নিয়ে যান না, নিতে পারেন না। মুনাফা প্রতিষ্ঠানেই বিনিয়োগ করা হয়। তাই প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাঁদের কমিটমেন্ট আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডির মতো দাতা প্রতিষ্ঠান আমাদের সহায়তা করে চলেছে এই কারণে যে, আমরা সামাজিক বিপণনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হতে পেরেছি। এটা এখন নিশ্চিত যে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারব। আমাদের ব্যাপারে সরকার ও পেশাজীবীরা উচ্চ ধারণা পোষণ করেন।
প্রথম আলো: ব্যবসার পাশাপাশি মানুষের জন্য আর কী করছে এসএমসি?
মোহাম্মদ আলী: ব্যবসার পাশাপাশি এসএমসির কিছু সামাজিক কাজও আছে। যেমন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের অনেক পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা আছে শহর ও নগরে দরিদ্র মানুষের জন্য ক্লিনিক তৈরি করা। এসব ক্লিনিকে পরিবার পরিকল্পনা সেবা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হবে। এ ছাড়া রাজধানীর বাসস্ট্যান্ডগুলোতে বসার জায়গা, টয়লেট ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা আমাদের আছে।
প্রথম আলো: পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বা সাফল্য আসেনি—এমন কিছু কি উল্লেখ করার মতো আছে?
মোহাম্মদ আলী: ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুদের জন্য তৈরি করা মনি-মিক্সের (অণুপুষ্টি-কণাসমৃদ্ধ গুঁড়া খাবার) ক্ষেত্রে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। যেভাবে মানুষের সাড়া পাব বলে আমরা ভেবেছিলাম সেভাবে সাড়া পাইনি।
প্রথম আলো: এসএমসি ৪১ বছর পার করেছে। ভবিষ্যতের এসএমসির চেহারা আমরা কেমন দেখতে পাব?
মোহাম্মদ আলী: সামাজিক বিপণনের নীতি ও চর্চার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এসএমসি সামাজিক ব্যবসায় বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চায়। মূল উদ্দেশ্য নারী, শিশু ও পরিবারের স্বাস্থ্য ও কল্যাণে অবদান রাখা। ইতিমধ্যে ব্যবসা বৃদ্ধির বড় পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসএমসি এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড করা হয়েছে। এটা লাভজনক প্রতিষ্ঠান। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। একটি মানসম্পন্ন ওষুধ কারখানা করার সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে।
অন্যদিকে এসএমসি হোল্ডিংয়ের মাধ্যমে আগের সেবা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সেবার পরিধি বাড়ানো হবে। এসএমসি এন্টারপ্রাইজের মুনাফা হোল্ডিংয়ে বিনিয়োগ করা হবে। ২০২০ সালের মধ্যে এসএমসির পণ্য উৎপাদনক্ষমতা অনেক বাড়বে, একই সঙ্গে সেবার পরিধিও অনেক বিস্তৃত হবে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ আলী: ধন্যবাদ।

Tuesday, July 14, 2015

আইসিডিডিআরবিতে অসন্তোষ by শিশির মোড়ল

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ চলছে। ব্র্যাকের কাছে বছরে এক টাকা ভাড়ায় মূল ভবনের ৪০,৫০০ বর্গফুট জায়গা ৪৯ বছরের জন্য ইজারা, খাবার ও যাতায়াত থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার, বৈজ্ঞানিক জার্নাল বিক্রি করায় এই অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু অনিয়মের প্রতিবাদে ও একাধিক দাবিতে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আন্দোলন করছেন। কর্মীমঙ্গল সংস্থার নেতৃত্বে তাঁরা ২৭ জুন থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত নিয়মিত কালো ব্যাজ ধারণ, সমাবেশ, প্রতিষ্ঠানের ফটক অবরোধ ও মিছিল করেছেন। রমজান উপলক্ষে আন্দোলন স্থগিত আছে। ঈদের পর আন্দোলনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠী, স্বাস্থ্যসম্পর্কিত দেশি পেশাজীবী ও সংগঠন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে পৃথক তিনটি মতবিনিময় সভা করার ঘোষণা দিয়েছেন। কর্মীমঙ্গল সংস্থা আইসিডিডিআরবির বেতনভুক বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন। এর সদস্য সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার হাজার। আইসিডিডিআরবির একাধিক সাবেক ও বর্তমান বিজ্ঞানী বলেন, প্রতিষ্ঠানে এ রকম পরিস্থিতি আগে কখনো হয়নি।
জানতে চাইলে আইসিডিডিআরবির যোগাযোগ ও উন্নয়ন শাখা থেকে প্রথম আলোকে বলা হয়, আইসিডিডিআরবির অধ্যাদেশ, বিধি-বিধান ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের অনুমোদন অনুযায়ী সবকিছু হয়। কর্মীমঙ্গল সংস্থা তাদের সদস্যদের উদ্বেগের বিষয়গুলো তুলে ধরায় আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষ স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটির সাম্প্রতিক তোলা সব দাবি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
পুষ্টিবিজ্ঞানী এস কে রায় ১৯৭৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত আইসিডিডিআরবিতে কর্মরত ছিলেন। তিনি বলেন, বিজ্ঞানীরা মানসিক কষ্টে থাকবেন, অধিকারের জন্য আন্দোলন করবেন—এ রকম পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া দুঃখজনক। সরকার, ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও দাতাগোষ্ঠীর উচিত সমস্যার সুষ্ঠু সমাধানে মনোযোগী হওয়া।
রাজধানী মহাখালী এলাকায় আইসিডিডিআরবির প্রতিষ্ঠা ১৯৬০ সালে। ডায়রিয়া চিকিৎসায় খাবার স্যালাইন আবিষ্কারের কারণে সারা পৃথিবীতে পরিচিতি পায় এই প্রতিষ্ঠান। ১৯৭৮ সালে অধ্যাদেশ জারি করে সরকার একে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের রূপ দেয়। সরকার এ পর্যন্ত চার একর জমি দিয়েছে আইসিডিডিআরবিকে।
বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে চার হাজার ৪৩৬ জন দেশি এবং ২৪ জন বিদেশি কর্মরত। এখানে বিজ্ঞানীর সংখ্যা ২১২ জন, এঁদের মধ্যে সাতজন বিদেশি। বাংলাদেশ সরকার ও জাতিসংঘের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, দাতা সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়, ফাউন্ডেশন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবিকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
১৭ সদস্যের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ আইসিডিডিআরবির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী সংস্থা। স্বাস্থ্যসচিব, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সচিব এবং সরকারের একজন প্রতিনিধি ছাড়া বোর্ডের বাকি সদস্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নীতিনির্ধারক বলেন, সরকার আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানের কাজে নাক গলাতে চায় না। তবে এই প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হোক সরকার তা দেখাতে চায়।
৪০,৫০০ বর্গফুটের ভাড়া বছরে এক টাকা: আইসিডিডিআরবি মূল ভবনের ষষ্ঠ তলা ৪৯ বছরের জন্য ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের কাছে ইজারা দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ইজারা দলিলে স্বাক্ষর করেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আইনুন নিশাত এবং আইসিডিডিআরবির সাবেক নির্বাহী পরিচালক আলেহান্দ্রো ক্রেভিয়েটো।
ব্র্যাক ও আইসিডিডিআরবির কাজ সম্পর্কে অবহিত এমন একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দেশি পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এই চুক্তি হয়েছিল। সরকারের অনুমতি ছাড়া জায়গা ইজারা দেওয়া আইনের লঙ্ঘন। এতে আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছে ব্র্যাক। আর আইসিডিডিআরবির কিছু বিজ্ঞানী কোনো দিন শিক্ষকতা না করেই অধ্যাপক হয়ে গেছেন।
ইজারা দলিলে দেখা যায়, চুক্তি কার্যকর হয়েছে ২০১০ সালের ১ নভেম্বর থেকে, চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে ২০৫৯ সালের ৩১ অক্টোবর। চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে ব্র্যাকের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূল ভবনের বিভিন্ন এলাকার সাতটি লিফট, ছয়টি জরুরি নির্গমন পথ ও করিডোর ব্যবহার করতে পারবেন।
আইসিডিডিআরবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বরের সভার কার্যবিবরণীতে দেখা যায়, বোর্ডকে না জানিয়ে ব্র্যাককে এই জায়গা দেওয়া হয়েছিল। আইসিডিডিআরবি প্রথম আলোকে জানিয়েছে, আলেহান্দ্রো এই জায়গা ব্র্যাককে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে বোর্ড অব ট্রাস্টিজ তা অনুমোদন করে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্র্যাকের পাবলিক হেলথ স্কুল আইসিডিডিআরবির ভবনে শুরু হওয়ার পর আলেহান্দ্রোসহ প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ওই স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। অন্য ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্তে আলেহান্দ্রোর বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় তিনি ২০১২ সালের জুন মাসে চাকরি ছেড়ে চলে যান।
ইজারা নেওয়ার ব্যাপারে ব্র্যাকের ভাইস চেয়ারপারসন আহমেদ মোশতাক রাজা চৌধুরী দাবি করেন, ব্র্যাক ও আইসিডিডিআরবির যৌথ উদ্যোগে জেমস পি. গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই অবস্থান থেকে আইসিডিডিআরবি জায়গা স্কুলকে দিয়েছে। জায়গা ব্যবহার উপযোগী করার জন্য ব্র্যাক ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। আর আইসিডিডিআরবির বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী অধ্যাপক হয়ে এখানে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন।
কর্মীমঙ্গল সংস্থার ক্ষোভের কারণ—বিজ্ঞানী ও কর্মকর্তাদের জন্য স্থান সংকুলান না হওয়ায় আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষ নিকেতন ও তেজগাঁওয়ে ভবন ভাড়া নিয়েছে। মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বহুতল ভবনের দুটি তলা একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করেছে।
জার্নাল বিক্রি: আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষ ‘জার্নাল অব হেলথ, পপুলেশন অ্যান্ড নিউট্রিশন’ সংক্ষেপে জেএইচপিএন-এর মালিকানাস্বত্ব বিক্রি করে দিয়েছে। জার্মানির প্রতিষ্ঠান বায়োমেড সেন্ট্রাল এটি কিনে নিয়েছে।
কর্মীমঙ্গল সংস্থা অভিযোগ করেছে, প্রথমত, এই জার্নাল বিক্রি করার দরকারই ছিল না। দ্বিতীয়ত আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান ছাড়াই এই জার্নাল বিক্রি করা হয়েছে। কত দামে এই জার্নাল বিক্রি হয়েছে তা এখনো বিজ্ঞানী ও কর্মীদের জানানো হয়নি।
‘প্রাচ্যের ল্যানসেট’ নামে পরিচিত এই জার্নাল বিক্রি হওয়ায় আইসিডিডিআরবির একাধিক গবেষক দুঃখ প্রকাশ করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ গবেষক বলেন, খরচ কমানোর অজুহাতে জার্নালটি বিক্রি করা হয়েছে।
আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিষ্ঠানের মূল গুরুত্ব গবেষণার ওপর। প্রতিষ্ঠানটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ মনে করে জার্নালটি যদি বাইরের প্রকাশক দিয়ে প্রকাশ করা হয় তাহলে বেশি কার্যকর হবে।
জার্নালের নতুন ওয়েবসাইটে দেখা যায়, এর নতুন সম্পাদক অধ্যাপক আবদুল্লাহ বাকি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ব্লুমবার্গ স্কুল অব পাবলিক হেলথের মাতৃ ও নবজাতক কেন্দ্রের পরিচালক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে তিনি আইসিডিডিআরবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের একজন প্রভাবশালী সদস্যের নিকট আত্মীয়।
গত ৩৩ বছর ধরে জেএইচপিএন প্রকাশ করে আসছিল আইসিডিডিআরবি। আগে এর নাম ছিল জার্নাল অব ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ (জেডিডিআর)। প্রভাব বিস্তারকারী মানের (ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর) নিরিখে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ভারতের ইন্ডিয়ান জার্নাল অব মেডিকেল রিসার্চ-এর পরেই ছিল জেএইচপিএন-এর স্থান।
এই জার্নালে লেখা ছাপানোর জন্য কর্তৃপক্ষকে কোনো অর্থ দিতে হতো না। কিন্তু এখন প্রতিটি প্রবন্ধের জন্য বায়োমেড সেন্ট্রালকে দুই হাজার মার্কিন ডলার দিতে হবে বাছাই প্রক্রিয়ার খরচ বাবদ।
ভর্তুকি প্রত্যাহার: আইসিডিডিআরবি কর্তৃপক্ষ ক্যানটিনের খাবারে ও যাতায়াতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে ১৯৭৮ সাল থেকে। এর ফলে অর্ধেক মূল্যে ক্যানটিনে খেতে ও বাসে যাতায়াত করতে পারতেন সব স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারী। কর্তৃপক্ষ গত ফেব্রুয়ারিতে ভর্তুকি বন্ধ করে দেয়। প্রতিবাদে বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বড় অংশ ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ক্যানটিনে খাওয়া ও বাসে যাতায়াত বন্ধ রেখেছেন।
কর্মীমঙ্গল সংস্থার নেতারা বার্ষিক আয়-ব্যয়ের কাগজ প্রথম আলোকে দিয়ে বলেন যে ১৯৮০ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের বাজেট ঘাটতি ছিল। গত তিন বছর বাজেট উদ্বৃত্ত হচ্ছে। শুধু ২০১৪ সালেই উদ্বৃত্ত ছিল চার লাখ মার্কিন ডলার। এখন ভর্তুকি প্রত্যাহার মেনে নেওয়া যায় না।
বৈষম্যের অভিযোগ: প্রতিষ্ঠানের বিধি অনুযায়ী চাকরির বয়সসীমা ৬০ বছর। একাধিক আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনকারী বাংলাদেশি বিজ্ঞানীকে ৬০ বছর বয়সের পর আর চাকরিতে রাখা হয়নি। কিন্তু বিদেশিদের ক্ষেত্রে এই বিধির ব্যতিক্রম ঘটেছে। বর্তমান নির্বাহী পরিচালক জন ডি ক্লেমেন্সের বয়স ৬৬ বছর।
আইসিডিডিআরবির অধ্যাদেশে বলা আছে, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও কর্মকর্তারা জাতিসংঘের বেতন কাঠামো অনুসারে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাবেন। বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা এবং কর্মীমঙ্গল সংস্থা বলেছে, বিদেশিদের ক্ষেত্রে এই নিয়ম অনুসরণ করা হলেও বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে আইসিডিডিআরবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘বেতন ও সুযোগ-সুবিধার পরিকল্পনা অনুমোদন করে আইসিডিডিআরবির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ। বোর্ড সকল কর্মচারীর প্রতিযোগিতামূলক বেতন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
করণীয়: কর্মীমঙ্গল সংস্থা অভিযোগ করেছে, জনবল কাঠামোতে না থাকলেও অনিয়ম করে কিছু পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কেনাকাটায় আর্থিক অনিয়মের কথাও প্রকাশ্য সমাবেশে বলা হচ্ছে। সংস্থার সদস্যরা এসব অনিয়ম দূর করতে আন্তর্জাতিক তদন্তেরও দাবি জানিয়েছেন।
কাগজপত্রে দেখা যায়, বর্তমান মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা ইনগ্রিড রেনডের মাসিক বেতন ১৩ লাখ টাকার বেশি। তিনি বাড়ি ভাড়া পান দুই লাখ টাকা। সঙ্গে সার্বক্ষণিক গাড়ি ও চালক। এ ছাড়া বছরে চারবার পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় বিজনেস ক্লাসে বিমানের টিকিট পাবেন। কোনো বিজ্ঞানী এই বেতন ও সুযোগ পান না।
পুষ্টিবিজ্ঞানী এস কে রায় বলেন, আইসিডিডিআরবি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এখানে প্রশাসকের চেয়ে গবেষক ও বিজ্ঞানীর প্রয়োজন বেশি। বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিকপর্যায়ে প্রতিযোগিতা করে গবেষণার অর্থ সংগ্রহ করেন। এর একটি অংশ প্রশাসনে ব্যয় হয়। সুতরাং অধিকসংখ্যক অদক্ষ জনবল নাকি কমসংখ্যক দক্ষ জনবল লাভজনক—তা প্রশাসনকেই ভাবতে হবে।

Monday, June 22, 2015

চিকিৎসক বাবার চোখে মেয়ের প্রথম ১৮ বছর by শিশির মোড়ল

বাবা অধ্যাপক লুৎফুল কবীরের সঙ্গে চিকিৎসক
ফারহাত লামিসা কবীর l ছবি: প্রথম আলো
‘আমি জানি, প্রত্যেকের কাছেই তার বাবা সাধারণ কোনো ব্যক্তি নন। তারপরও বলব, আমার আব্বু সত্যি অসাধারণ, অতুলনীয়। চিকিৎসক বাবা অনেকেরই আছে। কিন্তু আমার আব্বু আমাকে নিয়ে যা করেছেন, সন্তানের প্রতি গভীর স্নেহের চেয়েও তা বাড়তি কিছু।’
বাবা এ আর এম লুৎফুল কবীর সম্পর্কে গভীর আবেগ আর ভালোবাসার এই কথাগুলো ফারহাত লামিসা কবীরের। এমবিবিএস পাস করে ফারহাত বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ থেকে গত সপ্তাহে ইন্টার্নশিপও শেষ করেছেন। আর বাবা লুৎফুল কবীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের অধ্যাপক।
ফারহাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আব্বু আমার জন্মের পর থেকে আমার বেড়ে ওঠা, বড় হওয়া শুধু দেখেননি, রীতিমতো পর্যবেক্ষণ করেছেন। পর্যবেক্ষণ করেই শেষ করেননি, আমার ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত তা নোট নিয়েছেন এবং একটি শিশুর বেড়ে ওঠা সেই নোটবইয়ে তুলে ধরেছেন। অনন্যতা না থাকলে এই কাজটি তিনি করতেন না।’ এরপর বললেন, ‘বিশ্ব বাবা দিবসে আব্বুর প্রতি রইল গভীর ভালোবাসা।’
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এ আর এম লুৎফুল কবীর পেডিয়াট্রিক প্র্যাকটিস অন প্যারেন্টস প্রেজেন্টেশন নামে একটি বই লিখেছেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘বইটি মূলত শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ সম্পর্কে।’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও পেশাজীবী চিকিৎসকদের জন্য লেখা ৯৩০ পৃষ্ঠার বইয়ের একটি অধ্যায়ে একমাত্র সন্তান ফারহাত লামিসা কবীরের বেড়ে ওঠার তথ্য দিয়েছেন তিনি।
চিকিৎসক বাবা ও মেয়ের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফারহাত লামিসার জন্মের পর থেকে নিয়মিত তাঁর ওজন, উচ্চতা এবং মাথার পরিধি পরিমাপ করতেন লুৎফুল কবীর। ফারহাত বলেন, তাঁর বাবা প্রতি ছয় মাস পরপর সবকিছু পরিমাপ করতেন। এভাবে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত চলে। ১৮ বছরের সেই হিসাব বইয়ে তুলে দিয়েছেন বাবা। ১৯৯০ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত কোন বছর ফারহাতের ওজন, উচ্চতা ও মাথার পরিধি কত ছিল, তা এই বইয়ে বর্ণনা করা আছে। বইটি জার্মানি থেকে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে বলে লেখক জানিয়েছেন।
লুৎফুল কবীর বলেন, ‘সবচেয়ে দ্রুত বাড়ে মানুষের মস্তিষ্ক। পূর্ণবয়স্ক একজন মানুষের মস্তিষ্কের যে আকার, তার দুই-তৃতীয়াংশ তৈরি হয় জীবনের প্রথম দুই বছরে। এ সময় অনেক শিশুর মাথার তাপমাত্রা একটু বেশি থাকে। অনেক বাবা-মা চিন্তিত হন। কিন্তু চিন্তার কিছু নেই।’ এই শিশু বিশেষজ্ঞ বলেন, শিশুর বৃদ্ধি ও বিকাশ অব্যাহত থাকা দরকার। যদি কখনো তা থেমে যায়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যা আছে।
শিশুর জ্বর হলে, বমি বা বমি বমি ভাব হলে, মাথাব্যথা হলে, খিঁচুনি হলে, মুখ বেঁকে গেলে, কানে জ্বালা হলে, মামস হলে, নাক দিয়ে রক্ত পড়লে, মুখে ঘা হলে, ওজন-উচ্চতা কম হলে, দীর্ঘদিন কাশি থাকলে, শ্বাসকষ্ট হলে, পেটে ব্যথা হলে, জন্ডিস দেখা দিলে এবং এ রকম আরও কয়েক ডজন সমস্যা দেখা দিলে সেই নির্দিষ্ট রোগের লক্ষণ ও করণীয় সম্পর্কে বইটিতে বলা আছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা আছে।
ফারহাতের বৃদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করার বিষয়টি কি পরিকল্পিত ছিল—এমন প্রশ্নের উত্তরে লুৎফুল কবীর বলেন, ‘এ কাজটি আমি যে করব, তা ওর জন্মের আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম।’
বইটি সম্পর্কে দেশের কয়েকজন শিশু বিশেষজ্ঞের মতামত বইয়ের শুরুতে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে প্রয়াত অধ্যাপক এম এস আকবরের মন্তব্যে বলা হয়েছে, একজন ফরাসি চিকিৎসক ১৭৫৯ থেকে ১৭৭৭ সাল পর্যন্ত তাঁর পুত্রসন্তান বেড়ে ওঠা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আর বাংলাদেশি কন্যাসন্তানের বেড়ে ওঠার পর্যবেক্ষণ করার ঘটনা এই অঞ্চলের জন্য নতুন। লুৎফুল কবীর বলেন, ‘সন্তানকে পর্যবেক্ষণ করার অনুপ্রেরণা আমি পেয়েছিলাম ফরাসি চিকিৎসক ডি মন্টবিলার্ডসের কাছ থেকে।’

Tuesday, May 26, 2015

প্রশিক্ষণের ২০ কোটি টাকা কর্মকর্তাদের পকেটে by শিশির মোড়ল

স্বাস্থ্য খাতের টাকা লোপাট হচ্ছে প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার নামে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে কাগজে-কলমে প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনারে অংশ নিয়েছেন ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৮১৮ জন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাস্তবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা অনেক কম। কাল্পনিক প্রশিক্ষণ, বানোয়াট প্রশিক্ষণার্থীর তালিকা ও ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে টাকা আত্মসাৎ করেছেন কর্মকর্তারা।
সরকারি নিরীক্ষায় দেখা গেছে, গত অর্থবছরে প্রশিক্ষণ খাত থেকে ২০ কোটির বেশি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কিছু কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য নিরীক্ষা প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানেও দেখা গেছে, প্রশিক্ষণ না দিয়ে স্বাস্থ্য খাতের টাকা লোপাট করছেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। অন্তত তিন বছর ধরে একই পন্থায় দুর্নীতি করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সিংহভাগ কাজ ৩২টি কার্যকর পরিকল্পনা বা অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এতে দাতাদের অর্থসহায়তা আছে। মহাহিসাব নিরীক্ষা অধিদপ্তরের ফরেন এইডেড প্রোজেক্ট অডিট ডাইরেক্টরেট (ফাপাদ) ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১০টি ওপির হিসাব নিরীক্ষা করেছে। তাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি ধরা পড়েছে। নিরীক্ষা-সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেছেন, সবগুলো ওপি নিরীক্ষা করলে প্রশিক্ষণে শতকোটি টাকার অনিয়ম পাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ হচ্ছে না। দুর্নীতি রপ্ত করতেই প্রশিক্ষণ হচ্ছে।’
টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি স্বাস্থ্যসচিব সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। ১১ মে মন্ত্রণালয়ে নিজ কক্ষে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনিয়মের বিষয়ে অবগত আছি। অনিয়ম দূর করার চেষ্টা করছি।’
অনিয়মের ধরন: ফাপাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন কর্মকর্তা একই দিনে দুই জেলায় উপস্থিত থেকে কর্মশালা পরিচালনা করেছেন। এভাবে বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা শতাধিক কর্মশালা থেকে সম্মানী নিয়েছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর নিজস্ব অফিস আছে জেলা পর্যায়ে। সেখানে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা না পাঠিয়ে জেলা সিভিল সার্জন অফিসে নগদ টাকা পাঠানো হয়েছে, যা বড় ধরনের অনিয়ম। তিন দিনের অন্তত ৪০টি কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, প্রশিক্ষণার্থীদের আমন্ত্রণপত্র কিছুই খুঁজে পায়নি নিরীক্ষক দল।
এই অনিয়মের সময় আব্দুল ওয়াহিদ আকন্দ ও নাসির উদ্দিন লাইন ডিরেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন। এঁরা কেউই অনিয়মের কথা অস্বীকার করেননি। তবে একে অন্যের ওপর দোষ চাপিয়েছেন। আব্দুল ওয়াহিদ আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি লাইন ডিরেক্টর থাকাকালে অনিয়ম হয়নি। আমি কিছু দিন ছিলাম না, তখন হয়ে থাকতে পারে।’ আবার তিন মাস লাইন ডিরেক্টরের পদে থাকা নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমি প্রশিক্ষণের কোনো বিল চূড়ান্তভাবে পরিশোধ করিনি। অনিয়ম কিছু হয়ে থাকলে আমার আগে যিনি ছিলেন তাঁর (আকন্দ) সময়ে হয়েছে।’
দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি দেখিয়ে টাকা পকেটে ঢুকিয়েছেন কর্মকর্তারা। ইন-সার্ভিস (পেশায় থাকাকালীন) প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বাস্তবে ২ হাজার ৬৫৬ জন প্রশিক্ষণ পান। অথচ কাগজে-কলমে ৩ হাজার ৯২১ জন দেখানো হয়েছে। ১ হাজার ২৬৫ জনকে প্রশিক্ষণ না দিয়েই তাঁদের নামে খরচ দেখানো হয়েছে।
কাগজপত্রে দেখা গেছে, রাজধানীর পান্থপথের একটি প্রতিষ্ঠানে ৩৬০ জন সরকারি কর্মকর্তাকে ইংরেজি, আরবি ও কম্পিউটারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক হিসেবে তিন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন একই ব্যক্তি। নিরীক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, ওই প্রতিষ্ঠানটির আকার এতই ছোট যে সেখানে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব নয়। আর এক ব্যক্তি কী করে তিনটি বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
এই সময় লাইন ডিরেক্টর ছিলেন সুভাস কুমার সাহা। যোগাযোগ করা হলে অবসরে যাওয়া এই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি চাকরিতে থাকার সময় এসব অভিযোগ শুনিনি।’
সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হয়েছে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ (এনসিডি) কর্মসূচিতে। দরপত্র ছাড়াই কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্রশিক্ষণ সামগ্রী কেনা হয়েছে। সবগুলো ভাউচার ১৪ থেকে ২৫ হাজার টাকার মধ্যে। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ৬২ হাজার ৪২৮ জনকে, কিন্তু খরচ দেখানো হয়েছে ৬৮ হাজার প্রশিক্ষণার্থীর। একই প্রশিক্ষণের বিপরীতে একাধিকবার খরচ দেখানো হয়েছে। সব জেলাতেই হোটেল ভাড়া ১৫ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে কারও বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। কারণ, ওই অর্থবছরে তিনজন লাইন ডিরেক্টরের দায়িত্ব পালন করেছেন। এঁদের দুজনকে ওএসডি করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় অন্যজনকে প্রথমে ওএসডি করে এবং পরে দাতাদের অর্থসহায়তা নেই এমন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক করেছে।
বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে: বিদেশে প্রশিক্ষণের নামেও অনিয়ম হয়েছে। ইন-সার্ভিস প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থেকে মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণে পাঠানো হয় সরকারি কর্মকর্তাদের। মালয়েশিয়ার হাসপাতালে প্রশিক্ষণের টাকা পাঠানো হয়নি। টাকা দেওয়া হয়েছে একটি দালাল প্রতিষ্ঠানকে।
অন্যদিকে একাধিক প্রশিক্ষণে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমন কর্মকর্তারা গেছেন, যাঁদের সঙ্গে স্বাস্থ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। নিরীক্ষা কর্মকর্তারা বলছেন, এ প্রশিক্ষণ গ্রহণের উপযুক্ত না হলেও এঁদের সম্মানী, বিমান ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এঁদের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানে টিউশন ফিও দেওয়া হয়েছে।
দিনে ৪,৭২৮ জনকে প্রশিক্ষণ: গত অর্থবছর শেষে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল স্বাস্থ্য খাত কর্মসূচির মধ্যবর্তী মূল্যায়ন করেছে। মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭ লাখ ২৫ হাজার ৮১৮ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষ প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন। অর্থাৎ দিনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৪ হাজার ৭২৮ জন। সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিন বাদ দিলে দৈনিক ৮ হাজারের বেশি মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মূল্যায়নের সঙ্গে জড়িত একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বলেছেন, বাস্তবে কিছু কর্মকর্তা প্রশিক্ষণকে অবৈধ অর্থ উপার্জনের পন্থা হিসেবে ব্যবহার করছেন।
টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যে বাস্তবে সম্ভব নয়, এটা দাতাদেরও বুঝতে হবে। দাতারা কী করে বাজেট অনুমোদন করে? দুর্নীতির দায় তাদেরও নিতে হবে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধান: ফাপাদের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধূমপান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে চিকিৎসকদের জন্য ১৪৫টি কর্মশালার আয়োজন করে অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ (এনসিডি) কর্তৃপক্ষ। এতে ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৩১ হাজার ৬১৮ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রশিক্ষণ না দিয়েই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যাচাইয়ের জন্য নিরীক্ষকদের সদস্যরা নোয়াখালী সফর করেন। তাঁরা জানতে পারেন, নোয়াখালীতে কোনো প্রশিক্ষণ হয়নি।
সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাট জেলার প্রশিক্ষণ-সম্পর্কিত কাগজপত্র প্রথম আলো সংগ্রহ করেছে। তাতে দেখা যায়, লালমনিরহাটের বড় বাড়ির হাড়াটি কমিউনিটি সেন্টারে ২৪ থেকে ২৬ মে তিন দিনের কর্মশালা হয়। কর্মশালার জন্য শহরের আর এন ইসলাম মার্কেটের মিয়াজী বই ঘর থেকে খাতা, পেনসিল, কলম, প্যাড, ফাইল; আহমেদ অ্যান্ড সন্স থেকে ব্যাগ; হাবিব প্রিন্টার্স থেকে ব্যানার, কেরামত ফটোকপিয়ার থেকে ফটোকপি, হাবিব ডেকোরেটরস থেকে সাউন্ড সিস্টেম, আউয়াল মিষ্টি ঘর থেকে শিঙাড়া, সন্দেশ, লাড্ডু; শাওন কম্পিউটারস থেকে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল এবং তাপস সিডি থেকে সিডি কেনা হয়েছে। আর এন ইসলাম মার্কেট ঘুরে দেখা গেছে, এসব দোকানের অস্তিত্বই নেই। হাড়াটি কমিউনিটি সেন্টার নামে কমিউনিটি সেন্টারও নেই।
লালমনিরহাটের সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, ওই সময় তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে লালমনিরহাটে কোনো প্রশিক্ষণ হয়নি।
কাগজপত্রে দেখা যায়, একই তারিখে প্রশিক্ষণ কর্মশালা হয়েছিল ঠাকুরগাঁওয়ে। শহরের গোড়িয়া সড়কে মানবকল্যাণ সংস্থা নামের একটি এনজিওর মিলনায়তন ব্যবহারের বিল জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওই নামে কোনো প্রতিষ্ঠান ঠাকুরগাঁও শহরে নেই।
শহরের সমবায় মার্কেটের সেলিম স্টেশনারিকে খাতা, কলম, ফাইলের দাম, আরমান লেদার শপকে ব্যাগের দাম, মাসুম ব্যানারকে ব্যানারের দাম, মামুন ফটোস্ট্যাটকে ফটোকপির, নবরূপা সাউন্ড সিস্টেম থেকে শব্দযন্ত্র ভাড়া, মোহনা কনফেকশনারিকে নাশতা, প্রান্তিক এন্টারপ্রাইজ থেকে প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল বাঁধাই এবং প্রিয়া কম্পিউটার্সকে সিডি রাইট করার দাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঠাকুরগাঁও শহরে এসব দোকান খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঠাকুরগাঁওয়ের সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, এই সময় ঠাকুরগাঁওয়ে কোনো প্রশিক্ষণই হয়নি।
প্রশিক্ষণার্থীর তালিকায় সবাই চিকিৎসক। অথচ কোনো চিকিৎসককে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁদের কেউ কেউ ২০ বা ১২ বছর আগে এই দুই জেলায় কাজ করতেন বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে।
২০১২ সাল থেকে প্রথম আলো স্বাস্থ্য খাতে প্রশিক্ষণে অনিয়ম অনুসন্ধান করছে। ওই বছরের ১১ জুন বরিশাল জেলার গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিন দিনের পুষ্টি প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, তিন দিনের কর্মশালা শেষ হয় দুই ঘণ্টায়। ঢাকা থেকে যাওয়া কর্মকর্তা ব্যাগ, খাতা, কলম ও প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল নিয়ে যাননি। এমনকি প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানীও দিয়ে আসেননি। এ নিয়ে প্রথম আলোতে ২ অক্টোবর ২০১২ প্রতিবেদন ছাপা হয়।
২০১১-১২ অর্থবছরে কয়েকটি ওপির হিসাব নিরীক্ষা করেছিল ফাপাদ। সেই নিরীক্ষায় দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ একাধিক পরিচালক ও কর্মসূচি ব্যবস্থাপক প্রশিক্ষণের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ নিয়েও ২০১৩ সালের ৮, ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপা হয়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রশিক্ষণ নিয়ে এই দুর্নীতি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বছরের পর বছর এটা হচ্ছে বেশ কিছু সংখ্যক কর্মকর্তার যোগসাজশে। যাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে, তাঁদের শাস্তি না দিলে এই দুর্নীতি বন্ধ হবে না।