Sunday, December 13, 2015

ইসলামী ব্যাংক বৈধ ব্যবসা করে, টাকা নিয়ে অন্যায় করিনি : পরিকল্পনামন্ত্রী

ইসলামী ব্যাংক দেশে বৈধ ব্যবসা করে তাই তাদের টাকা নিয়ে কোনো অন্যায় করিনি বলে মন্তব্য করলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি বলেন, যেহেতু তারা বাংলাদেশে বৈধভাবে ব্যবসা করে। সুতরাং তাদের টাকা নিতে সমস্যা কোথায়? তিনি বলেন, আমি মনে করি, এই টাকা নিয়ে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজন করে দেশকে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত করেছি।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক এক সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনা মন্ত্রী এসব কথা বলেন। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টার (আইজিসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এই সেমিনারের আয়োজন করে।
শনিবার এক অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেন, আমি মনে করি ইসলামী ব্যাংককে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের স্পনসর করে সরকার ভুল করেছে। এর মাধ্যমে সরাসরি ইসলামী ব্যাংককে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে এটা ঠেকাতে আমি তখন সরকারকে চিঠি দিয়েছিলাম। কিন্তু আজকের পরিকল্পনামন্ত্রী লোটাস কামালের (পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল) কারণে সেটা ঠেকানো যায়নি।
আবুল বারকাতের ওই মন্তব্যের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পরিকল্পনামন্ত্রী মুস্তফা কামাল বলেন, যারা জীবনে কিছু করে নাই, তারাই এসব মন্তব্য করতে পারে। ইসলামী ব্যাংক যদি মৌলবাদে অর্থায়ন করে বা কোনো অন্যায় কাজ করে, সেটা দেখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক রয়েছে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকে পাঁচ-ছয়জন স্বাধীন পরিচালক নিয়োগও দিতে পারে।

‘তাহলেই আইএসকে পরাজিত করা সম্ভব'

সিরিয়ায় রুশ হস্তক্ষেপ ওই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। খুব সহজেই ইরাক ও সিরিয়ায় সক্রিয়, সুন্নিপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়াকে (আইএসআইএস) পরাজিত সম্ভব হবে না। বিষয়টি বেশ কঠিন এবং এ সঙ্ঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করাও অসম্ভব। কেন? রাশিয়া ডিরেক্টের সাথে এক সাক্ষাৎকারে এ সব প্রশ্নেরই খোলামেলা জবাব দিয়েছেন জর্জি মিরস্কাই
মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমেই বেড়ে চলা উত্তেজনার মধ্যেই সিরিয়ায় রাশিয়ার হস্তক্ষেপ নিয়ে কথা বলতে রাশিয়া ডিরেক্ট বসেছিল ভালদাই ক্লাবের এক সদস্য, অধ্যাপক এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড ইকোনমি অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনার রিলেশনস’র প্রধান গবেষক মিরস্কাই-এর সঙ্গে। এ সাক্ষাৎকারে রাশিয়া কী করে এ অঞ্চলে ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করল, আইএসআইএসকে পরাজিত করা কেন প্রায় অসম্ভব এবং সিরিয়ার রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের ইতি টানতে কী কী প্রতিবন্ধকতা আসতে পারে, তিনি তা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
রাশিয়া ডিরেক্ট : সিরিয়ায় রাশিয়ার এই ভয়ঙ্কর ও ধারণাতীত হস্তক্ষেপের কারণ কী?
জর্জি মিরস্কাই : ধারণাতীত বলছেন কেন? একটি পর্যায় পর্যন্ত সবই অনুমান করা সম্ভব। তবে একটি বিষয়ে আমাদের ভুল হচ্ছে; আমরা ভাবছি আমাদের বিমান হামলার কারণে সিরিয়ার সেনাবাহিনী লাগাতার আক্রমণ করতে শুরু করবে (বিরোধী এবং আইএসআইএসের বিরুদ্ধে)। প্রেসিডেন্ট পুতিন ঘোষণা দিয়েছেন, সিরিয়ার সেনাবাহিনীর আক্রমণে যেতে যত দিন প্রয়োজন তত দিন আমাদের বিমান হামলা চলবে।
তবে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাশিয়া বিমান হামলা শুরু করার পরও এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়েছে সিরীয় সেনাবাহিনী। অদ্ভুত এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কত দিন পর্যন্ত ওখানে বোমা হামলা চালানো সম্ভব? এখন সিরিয়ায় বোমা হামলা চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন। সব কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু সিরীয় সেনাবাহিনী (রুশ সেনাবাহিনীর সমর্থন এবং বিরোধীদের ওপর বিমান হামলা সত্ত্বেও) পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। কেন? এর মানে কি, আমরা বোমা হামলা বন্ধ করব? সিরিয়া অভিযানের ফলাফল কী হতে পারে তার হিসাব করার ক্ষেত্রে রাশিয়া ব্যর্থ হয়েছিল বলেই মনে হচ্ছে।
এখানে অস্বস্তিকরভাবে আরেকটি প্রশ্নও চলে আসে। রাশিয়ার এই অভিযান শুরু করার কারণ কী? বলা হচ্ছে, মিসরে আমাদের যাত্রীবাহী বিমানের করুণ পরিণতি এবং তুরস্কের রুশ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার জবাব দিতেই এই হামলা শুরু করা হয়েছে। কাজেই এখন ক্রেমলিনের পক্ষে সিরিয়ায় বিমান হামলা বন্ধ করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ সিরিয়া অভিযানের পরিণতি অনুমানে ব্যর্থ হয়েছে রাশিয়া। এর অর্থ কি এই যে, এ হামলা চলতেই থাকবে? কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেটাই বা কতটুকু সম্ভব?
আকাশ থেকে বোমা ফেলা খুব সহজ, তবে ভূমিতে পা ফেলার কথা কেউ কি ভাবছে? এ বিষয়টি নিয়ে কারো আগ্রহ নেই। রুশ নেতৃত্ব বহুবার বলেছে, সিরিয়ায় স্থলসেনা মোতায়েন করা হবে না। কাজেই সিরিয়ার সেনাবাহিনী পরাস্ত হচ্ছে এবং এ নিয়ে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। না সৌদি আরব, না জর্ডান, না আর কারো।
আইএসকে সামরিকভাবে পরাজিত করা যেতে পারে। যদি ওবামা ইরাকে দুই লাখ সেনা পাঠান আর পুতিন দুই লাখ সেনা পাঠান সিরিয়ায়, তাহলেই আইএসআইএসকে পরাজিত করা সম্ভব। কারণ এরা অদৃশ্য কোনো সেনাবাহিনী নয়। কিন্তু কোনো দেশই স্থলসেনা পাঠাবে না। কাজেই সব দরজা এখানে এসে বন্ধ হয়ে যায়।
রাশিয়া ডিরেক্ট : অনেকেই বিশ্বাস করেন, ভিয়েনা আলোচনার মাধ্যমে সিরিয়ায় রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছা সম্ভব। আপনার দৃষ্টিতে এই সংঘর্ষের কূটনৈতিক সমাধানের পথে প্রতিবন্ধকতা কী কী?
জর্জি মিরস্কাই : এমন কোনো সুযোগই নেই। একটি বিষয় স্পষ্ট, রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ‘প্রথম শক্তি’ (সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সেনাবাহিনী) এবং তৃতীয় শক্তিকে (বিরোধী এবং ফ্রি সিরিয়ান আর্মি) সমঝোতায় আসতে হবে। তাদের ‘দ্বিতীয় শক্তি’কে (আইএস এবং জাবহাত আল-নুসরা) হারানোর জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শুধু সে ক্ষেত্রেই রুশ বিমান হামলার সহযোগিতা নিয়ে তারা আইএসকে পরাজিত করতে পারবে। কিন্তু কখনোই তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না। এ কারণেই এই সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধান সম্ভব- এমন বিশ্বাসের কোনো কারণ নেই।
রাশিয়া ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে, আসাদের প্রতি তারা কখনোই সমর্থন প্রত্যাহার করবে না। আমরা ফ্রান্সকেও এ ক্ষেত্রে রাজি করাতে পারি (ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ রাজি হওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছেন), যুক্তরাষ্ট্রও হয়তো সমঝোতা করতে গররাজি হবে না। তবে তুরস্ক, সৌদি আরব ও কাতারকে রাজি করানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।
একেবারে অবাস্তবভাবে আপনি যদি ভাবতে চেষ্টাও করেন যে, তারা শেষ পর্যন্ত রাজি হয়েছে, তাহলেও তাদের কী করে সামলাবেন যারা গত চার বছর ধরে লড়াই করে রক্ত ঝরাচ্ছে? প্রতিনিয়তই এরা বন্ধু আর স্বজনদের কবরস্থ করে যাচ্ছে। তারা কখনোই আসাদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হবে না। কখনোই না।
রাশিয়া ডিরেক্ট : অনেকেই মনে করেন, সিরিয়ায় রাশিয়ার সরাসরি হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। হস্তক্ষেপের আগেই পুরো বিষয়টি প্রচণ্ড অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছিল। আপনি কি এর সঙ্গে একমত?
জর্জি মিরস্কাই : পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে গেছে। কারণ দীর্ঘ দিন থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, শিগগিরই বা দেরিতে হলেও সিরীয় সেনাবাহিনী পরাজিত হবে। এখন অবধারিতভাবেই তেমন কিছু আর ঘটবে না। আসাদকে রক্ষা করা পুতিনের মান রক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরেকটি বিষয়ও আছে; বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে আইএসআইএসকে পরাজিত করতে চায়। তবে আজকের পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্ট যে, তেমন কিছু আর সম্ভব নয়।
অন্য দিকে আইএসআইএসকে দেখুন। সবাই একে ঘৃণা করে আবার ভয়ও পায়। বাস্তবে কেউ তাদের সঙ্গে লড়াই করছে না। লড়াইয়ের ভান করছে মাত্র। এদের মধ্যে ইরান, সৌদি আরব এবং অন্যরাও রয়েছে। আসাদও সেই একই ভান ধরে আছেন, যেন তিনি আইএসআইএসের সঙ্গে লড়ছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি ‘তৃতীয় শক্তি’ অর্থাৎ ফ্রি সিরিয়ান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। ইরাকের অবস্থাও অনুরূপ। তাদের দাবি, আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়ছে তারা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরাকিরা নিজেদের এবং বাগদাদকে রক্ষা করে চলেছে; ঠিক যেমনটি কুর্দিরা নিজ ভূখণ্ড রক্ষা করার জন্য লড়ে যাচ্ছে।
পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র আইএসআইএসের বিরুদ্ধে লড়ে চলেছে বলে জানিয়ে আসছে বহু দিন থেকেই। কিন্তু সত্যিটা হলো, খুব বেছে বেছে বোমা ফেলছে তারা যাতে করে হতাহতের সংখ্যা বেশি না হয়। সিরীয়দের মৃত্যুর জন্য ওবামাই দায়ী- এমন একটি অভিযোগ থেকে প্রেসিডেন্টকে বাঁচাতে চাইছে তারা। দেখুন, এখানে সবাই কিন্তু দাবিই করছে। কারণ সবারই নিজ নিজ দ্বিগুণ, তিন গুণ কর্মসূচি আছে, স্বার্থ আছে।
রাশিয়া ডিরেক্ট : এমন অভিযোগও রয়েছে যে, আমরা আইএসআইএসের সম্ভাবনাকে অতিরঞ্জিত করছি। কারো কারো যুক্তি হলো, এটি একটি প্রকল্প মাত্র, একটি রাষ্ট্র সৃষ্টির চেষ্টা- যার কোনো দীর্ঘমেয়াদি দর্শন নেই।
জর্জি মিরস্কাই : এটি আসলেই একটি রাষ্ট্র। প্রয়োজনীয় সব মন্ত্রণালয়, সব সংস্থা, প্রশাসন ও প্রচারণা- সবই তাদের আছে। এর সশস্ত্র বাহিনী আছে। তবে যুদ্ধবিমান ও ট্যাংকের ঘাটতি রয়েছে। তার পরও একটি রাষ্ট্রের যা যা প্রয়োজন তার প্রায় সবই তাদের আছে।
রাশিয়া ডিরেক্ট : আইএসআইএসবিরোধী জোটকে কি হিটলারবিরোধী জোটের সঙ্গে তুলনা করা যায়? গেলে কতটা?
জর্জি মিরস্কাই : হিটলার সত্যিকার অর্থেই পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি ছিলেন। সবাই বিষয়টি বুঝত। সবাই বুঝত যে, শুধু ঐক্যবদ্ধ শক্তিই তাকে ধরাশায়ী করতে পারবে। অন্যথায় পুরো বিষয়টিই একটি দুঃস্বপ্নে পরিণত হতো। সভ্যতা ধ্বংস হতো। আইএসআইএসের ক্ষেত্রে এটা স্পষ্ট যে, তারা ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র বা চীনকেও মোকাবেলা করতে পারবে না। এর ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। হিটলারবিরোধী শক্তির সাথে আইএসআইএসবিরোধী জোটের তুলনা করার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছি না।
রাশিয়া ডিরেক্ট : তা হলে এই তুলনা আপনার কাছে বাগাড়ম্বর মনে হচ্ছে?
জর্জি মিরস্কাই : না। তা হবে কেন? বিষয়টি হলো, তুলনা করা মানুষের স্বভাব। মানুষ সাদৃশ্যও খোঁজে। কারণ এগুলো মানুষকে বুঝতে সহায়তা করে। সাদৃশ্য পেলেই বিষয়টি তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।
রাশিয়া ডিরেক্ট : আমরা সাদৃশ্যগুলোই খুঁজে ফিরি। যখন রাশিয়া সিরিয়ায় বোমা ফেলতে শুরু করল, তখন এর সাথে তুলনা শুরু হলো ১৯৭৯ সালে রাশিয়ার আফগানিস্তান অভিযানের। গণমাধ্যম এ নিয়ে প্রচুর কথা বলেছে।
জর্জি মিরস্কাই : আমি সাদৃশ্যের ভক্ত নই। কারণ আনাড়ি লোকেরা এসব খুঁজে ফেরে। গভীরভাবে বোধ তৈরি হওয়া কিংবা ইতিহাস, সমাজ, ধর্ম বোঝার আগেই পুরো বিষয়টিকে তারা খুব সহজ করে ফেলে। তাদের বিশ্বাস, সাদৃশ্য খুঁজে পেলেই সবকিছু খুব সহজেই ব্যাখ্যা করে ফেলবে তারা।
রাশিয়া ডিরেক্ট : আপনি কি মনে করেন ১৩ নভেম্বর প্যারিস হামলা এবং মিসরে রুশ বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা রাশিয়ার সাথে পশ্চিমাদের ঐক্যবদ্ধ করতে ভূমিকা রাখতে পারে?
জর্জি মিরস্কাই : কোনোভাবেই না। পশ্চিমারা খুব ভালো করেই বোঝে, পুতিন সিরিয়ায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে যাননি। বরং আসাদকে রক্ষা করতে গিয়েছেন। আর পশ্চিমারা আসাদকে উৎখাত করতে চায়। কাজেই এ ধরনের একটি পরিস্থিতিতে জোট হওয়ার প্রশ্ন অবান্তর।
রাশিয়া ডিরেক্ট : তাহলে কূটনীতিক ও রাজনীতিকদের জন্য কোন সমাধানের পথ বা উপদেশ দিতে চান আপনি?
জর্জি মিরস্কাই: সমাধানের কোনো পথ নেই, কোনো উপদেশও নেই। এ বিষয়ে কথা বলাই অর্থহীন। কারণ বিবেচনাবোধ আছে এমন লোকদেরই আপনি উপদেশ দিতে পারেন। যারা নিজের নাকের ডগার চেয়েও সামনে দেখতে পারেন, যারা নিজ দেশ, দল, কংগ্রেস, নিজের মেয়াদ, শ্রোতা- সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেন বিশ্ব মানবতার মূল্যবোধ ও স্বার্থকে- শুধু এ ধরনের লোকই আপনার উপদেশ শুনবে। কিন্তু (রাজনীতির) বিশ্বে এমন কোনো মানুষ নেই। কাজেই (রাজনীতিবিদদের) কোনো বিষয় নিয়েই কোনো উপদেশ দেয়ার কোনো মানে হয় না।
১.ভালদাই ক্লাব : ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এ ক্লাব বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য রাশিয়া এবং পুরো বিশ্বে পরিচিত ও প্রশংসিত। বিশ্বের ৬২টি দেশের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের নয় শতাধিক শিক্ষাবিদ ও গবেষক এই সংগঠনের সদস্য।
অনুবাদ : তানজিলা কাওকাব

‘এই যে মেরুদণ্ড, একদম সোজা’ by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

বাংলাদেশে কত যে আজব ঘটনা ঘটে, তার কোনো শেষ নেই। বিনা ভোটে যারা মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন, তাদের দাপটেরও শেষ নেই। অনেক ছোট ছোট মুখ অনেক বড় বড় কথা বলছে। কেউ কেউ বুঝতেও পারছেন না, কী তার ক্ষমতা, কী তার যোগ্যতা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ধরাকে একেবারে সরাজ্ঞান করছেন। কেউ কেউ বিদেশীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিচ্ছেন। সেসব বিদেশী এদের হয়তো বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে চলছেন। লজ্জা যেন অনেকের অভিধান থেকে হারিয়ে গেছে। আর এদের যারা সরকারের ইচ্ছামাফিক ‘নির্বাচিত’ বলে ঘোষণা করেছেন, সেটা হলো নির্বাচন কমিশন। এদের অনেকের ভূমিকা ইতোমধ্যে নাট্যমঞ্চের রসিকতাকে হার মানিয়ে দিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যখন এই নির্বাচন কমিশনকে অনেকেই মেরুদণ্ডহীন বলে অভিহিত করছিল, তখন এই কমিশনের এক কমিশনার সাংবাদিকদের সামনে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে এক পাক ঘুরে কোমর দুলিয়ে বললেন, কই আমি মেরুদণ্ডহীন, এই যে আমার মেরুদণ্ড আছে এবং তা এখনো সোজা। তাহলে মেরুদণ্ডহীন হলাম কোথায়? অর্থাৎ তাদের কাণ্ডজ্ঞানে প্রচুর ঘাটতি আছে বলেই মনে হয়।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রহসনমূলক জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন সাজায় সরকার। এদের কেউ দুগ্ধপোষ্য শিশু নন, প্রত্যেকেরই বয়স হয়েছে। যা এদের কারো কারো ভেতরে তৈরি হয়নি, তা হলো মেরুদণ্ড ও আত্মমর্যাদাবোধ। মানুষের আত্মমর্যাদাবোধের সৃষ্টি হয় উপযুক্ত শিক্ষা থেকে। চরিত্রের দিক থেকে এরা নতজানু হিসেবে তৈরি হয়েছেন। আর সরকারও খুঁজে খুঁজে এমন প্রার্থীদেরই এনে নির্বাচন কমিশনে বসিয়েছে। এরা যে ধরনের লোকই হোন না কেন, যে পদে তাদের বসানো হয়েছে, তা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সেটি উপলব্ধি করার ক্ষমতাও যেন এদের নেই। ফলে ব্যর্থ হয়ে গেল কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আকুতি : ‘তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শকতি’। মেরুদণ্ডহীনদের হাতে পতাকা তুলে দেয়া হলো বটে, কিন্তু সে পতাকার ভার বইবার শক্তি তাদের ছিল না। ফলে তারা কুণ্ডুলি পাকিয়ে গুটিয়ে গেলেন।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী দল ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল। ফলে ভোটকেন্দ্রে আসেনি তেমন কেউ। নির্বাচনকেন্দ্র্রে কুকুরদের নরম রোদ পোহাতে দেখা গেছে। চেয়ার পেতে অলস বসেছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। ঘুমিয়ে ছিলেন পোলিং অফিসাররা। নারী ভলান্টিয়াররা মগ্ন ছিলেন খোশগল্পে। পাঁচ শতাংশও ভোট পড়ল না কেন্দ্রগুলোতে। জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেননি। বিনা ভোটে পছন্দের লোকেরা এমপি হয়ে গেছেন নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায়। প্রায় ৫০ কেন্দ্রে একজন লোকও ভোট দেয়নি। এমনকি সেখানে আওয়ামী লীগসহ তাদের মহাজোটের কয়েক হালি করে কর্মী-সমর্থক উপস্থিত ছিলেন, ছিলেন পোলিং এজেন্টরা। কিন্তু তারা কেউ নিজের ভোট দেয়ার প্রয়োজনও অনুভব করেননি। অর্থাৎ নির্বাচনের নামে যে তামাশা হচ্ছিল সেটা তারাও উপলব্ধি করেছিলেন। কেবল উপলব্ধি করতে পারলেন না নির্বাচন কমিশনার। তারা বেশ কয়েক দিন পর সরকারের ইচ্ছামাফিক গরমিলের হিসাবে বলে দিলেন, নির্বাচনে ৪০ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছে! আত্মমর্যাদাবান তো দূরের কথা, তাদের সুস্থ মানুষ ভাবতেও কষ্ট হয়।
এই নির্বাচন দেখে সারা পৃথিবী বিস্ময়ে হতবাক। গোটা দুনিয়া বলল, এটা কোনো নির্বাচনই হয়নি। বাংলাদেশ যে একটি গণতান্ত্রিক দেশ, এটা প্রমাণ করতে চাইলে সব দলের অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে। সরকার প্রথম দিকে মিনমিন করছিল- এটা নিয়ম রক্ষার, সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। শিগগিরই আরেকটি নির্বাচন দেয়া হবে।’ এই সরকারকে স্বীকৃতি দিলো একমাত্র ভারত। আওয়ামী লীগ সরকারকে জেতানোর জন্য ভারতের কংগ্রেস সরকার করেনি এমন কোনো কাণ্ড নেই। নির্বাচনে না যাওয়ার ব্যাপারে অনড় এরশাদকে নির্বাচনে নিতে মনমোহন সরকার তার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংকে ঢাকায় পাঠিয়ে রীতিমতো থ্রেট করে গেলেন। এরশাদ সে কথা মিডিয়ায় প্রকাশও করে দিলেন। যা হোক, ভারতের সমর্থনে সরকার মনে করল- বিশ্বজয় হয়ে গেছে। তারপর সরকারের লোকেরা একেবারে বজ্রকণ্ঠে বলতে থাকলেন, ২০১৯ সালের আগে আর কোনো সংসদ নির্বাচন নয়। আর সে নির্বাচনও ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতোই শেখ হাসিনার অধীনেই হবে।’
তখন আনাড়ি বিশ্লেষকদের মিনমিনে একটি সমালোচনাও ছিল যে, বিএনপি নির্বাচনে না গিয়ে ভুল করেছে। সরকার বলল, বিএনপি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এরপর একে একেবারেই ধুলায় মিশিয়ে দিতে মামলা-হামলা, গুম-খুন শুরু করল। বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে পোরা হলো। মহাসমারোহে শুরু হলো স্বেচ্ছাচারী শাসনকাল।
এতে বিএনপির জন্য সঙ্কটের সৃষ্টি তো হলোই; তারপর এলো উপজেলা নির্বাচন। এ কথা একটি শিশুও বোঝে যে, দেশে যদি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের পক্ষে জয়ী হওয়া সম্ভব হবে না। ইতোমধ্যে জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন দেশ সরকারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখল সুষ্ঠু নির্বাচন ও একটি নতুন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য। অনেকেই আশা করতে থাকলেন, এত ঘটনার পর বোধ করি উপজেলা নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হবে। অতএব, এই নির্বাচনে বিএনপির যাওয়া উচিত। তিন দফায় সে নির্বাচনের ঘোষণা দিলো নির্বাচন কমিশন। প্রথম দফা নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের তুলনায় সিকি ভোটও পেলেন না আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থীরা। সরকার কিংবা তার পছন্দসই নির্বাচন কমিশন হয়তো ধারণাও করতে পারেনি যে, কী বিপুল ধস নেমেছে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায়। তাই সম্ভবত ভোটডাকাতির চিন্তা তখন এত ব্যাপকভাবে করা হয়নি। ফলে জনগণ তাদের জবাব দিয়ে দিলো।
উপজেলা নির্বাচনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় সরকার ও নির্বাচন কমিশন যুক্তি করে ভোট কারচুপি ও কেন্দ্র দখলে নেমে পড়ল। র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবি এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগ-আওয়ামী লীগসহ নানা কিসিমের লীগ সেই সাথে নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা একত্র হয়ে ভোটডাকাতি ঘটতে থাকে। বিরোধী দলের ভোটারদের যেতে দিলো না বুথের আশপাশেও। ভোটকেন্দ্র দখল করে গণহারে সিল মারল আওয়ামী লীগের ব্যালটে। নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করে প্রতিকার পাওয়া গেল না। তারা পাথরের মূর্তির মতো নিশ্চল নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন। কোনো ব্যবস্থাই নিলেন না। তারা যেসব বিধিবিধান করেছিলেন, সেগুলো রয়ে গেল কিতাবের পাতায়। বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন দেখা গেল না। তাই দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার নির্বাচনে বেশিসংখ্যক আসনে জয়ী ঘোষণা করা হলো আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের। সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে মানুষ দুয়ো দিলো। কিন্তু দু’কান কাটার লজ্জা থাকে না। নির্বাচন কমিশন এবার রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
এখন দেশে ২৩৫টি পৌরসভায় নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন বুঝে গেছে, এ যাত্রায় সুষ্ঠুভাবে ভোট হতে দিলে সরকারের প্রতি জনগণের সমর্থনহীনতা প্রকাশ হয়ে পড়বে। আর সে কারণেই ভোট কারচুপি আর জাল ভোট গণহারে সিল মারা প্রভৃতির সুবিধার্থে ঘোষণা করা হলো, পৌরসভা নির্বাচন হবে দলীয় ভিত্তিতে। অর্থাৎ প্রার্থীরা নিজ নিজ দলের মার্কা নিয়ে নির্বাচন করবেন। সরকার এ নিয়ে তাড়াহুড়া করে একটি ত্রুটিপূর্ণ অধ্যাদেশ জারি করাল। তাতে বলা হলো, পৌর মেয়র ও সব কমিশনার নির্বাচন করবেন দলীয় প্রতীক নিয়ে। পরে দেখা গেল, সেটা একেবারেই অসম্ভব। ফলে সংশোধনী আনা হলো। না, শুধু মেয়ররা নির্বাচন করবেন দলীয় প্রতীকে। বাকিরা দলীয় প্রতীক পাবেন না। বারবার পরিবর্তন করতে হলো সিদ্ধান্ত। সরকারের আনাড়িপনার এটাও এক নগ্ন উদাহরণ। দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কথা বলারও প্রয়োজন অনুভব করেনি। সরকার যা বলেছে, একান্ত বাধ্যগতের মতো তাই করে গেছে নির্দ্বিধায়। আবার সরকারি নির্দেশ মতোই তাদের দু’বার বিধিবিধান সংশোধন করতে হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি এবং সরকারের শরিক এরশাদ ও মেনন প্রস্তুতির জন্য নির্বাচন দুই সপ্তাহ পিছিয়ে দেয়ার দাবি জানালে কমিশন তা বিনা বাক্যব্যয়ে বাতিল করে দেয়। তারা অনুগত সরকারের; বিএনপি, এরশাদ বা মেননের নয়।
নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের জন্য নানা ধরনের নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। তা ছাড়া আগের আইনকানুন তো রয়েছেই। সেসব আইনকানুনের মধ্যে রয়েছে, নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলে কাউকে বাধা দেয়া যাবে না। কোনো ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া যাবে না। কোনো মন্ত্রী-এমপি নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না; ইত্যাদি ইত্যাদি। একজন মাত্র মেয়র প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবেন দলের মনোনীত ব্যক্তি হিসেবে। কিন্তু দেখা গেল আওয়ামী লীগ নেত্রী যাকে মনোনয়ন দিয়েছিলেন, তার মনোনয়ন কোনো কারণে বাতিল হয়ে গেছে। তখন নতুন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিলেন নেত্রী আর নির্বাচন কমিশন সুড়সুড় করে তা মেনে নিলো। বিভিন্ন স্থানে বিএনপির শতাধিক প্রার্থীকে মনোনয়নপত্র জমাই দিতে দেয়া হলো না। সে অভিযোগ আমলে নিলো না নির্বাচন কমিশন। মনে হয় যেন ভাবখানা এ রকম যে, ‘তোমাদের তো জিততে দেয়া হচ্ছে না, তাহলে এত হল্লাচিল্লা করছ কেন। তফাত যাও।’ এমনকি আওয়ামী সরকারের অংশ এরশাদ পর্যন্ত অভিযোগ করেছেন, সরকারি দলের লোকেরা তার দলের প্রার্থীদেরও মনোনয়নপত্র দাখিল করতে দেয়নি। শুধু ফেনীতেই ৩৪টি আসনে কাউকে মনোনয়নপত্র জমা দিতে দেয়নি আওয়ামী লীগ। ফলে এ দলের ৩৪ জনই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েগেছেন।
এ দিকে কমিশন রিটার্নিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে প্রশাসনিক ক্যাডারদের। এক কমিশনার যুক্তি দেখালেন, তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞ কর্মকর্তা না থাকায় তারা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ধার করেছেন। তিনি জানিয়ে দিলেন, ইসি আর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা মিলেমিশে একটি চমৎকার নির্বাচন উপহার দেবেন। কোনো প্রশাসনিক কর্মকর্তার মুরোদ আছে, সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়? তারা ইতোমধ্যেই এমন কাজ করেছেন। তারা বিএনপি প্রার্থীর হলফনামা সরিয়ে ভুল তথ্য দিয়ে বলেছেন, ‘তথ্যে ভুল আছে। অতএব, বিএনপি প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল।’ অথচ এসব নিয়ে ইসি একেবারেই নিশ্চুপ। উপরন্তু এই নির্বাচন কমিশন হাস্যকর রুচিহীনতার পরিচয় দিয়েছে। তা না হলে তারা নারীদের নির্বাচনী প্রতীক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফ্রক, চুড়ি, পুতুল, চুলা প্রভৃতি প্রতীক বরাদ্দের সাহস পেতেন না। নারীর প্রতি এই অবমাননার দায়ে তাদের কমিশন থেকে অব্যাহতি নেয়া উচিত ছিল।
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন দুই মন্ত্রী। এমপিরা তো হামেশাই করছেন। ওই দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হলে দায় এড়িয়ে যান নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা। যেন বিষয়টি দেখার দায়িত্ব তাদের নয়। নিজেদের দায়িত্ব তারা চাপিয়ে দিয়েছেন রিটার্নিং অফিসারদের ওপর। সরকারি কর্মকর্তা রিটার্নিং অফিসার মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, এটা কেউ চিন্তাও করতে পারেন না। আর সেটাই ভাবছে নির্বাচন কমিশন। এই কমিশন আর তাদের একই প্রকৃতির রিটার্নিং অফিসার দিয়ে হবে সুষ্ঠু নির্বাচন? দেশের মানুষ এতটা অবিবেচক হয়নি যে, এই নির্বাচন কমিশনকে তারা বিশ্বাস করে বসবে।
অতএব, পৌর নির্বাচনও সম্ভবত হতে যাচ্ছে এক বিশাল প্রহসন। আর ইতিহাস সাক্ষী, এ রকম ধড়িবাজদের পরিণতি সাধারণত বড়ই করুণ হয়ে থাকে। অতএব, সামনে ঘোর দুঃসময়!
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন

সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ। তাই বলে ভুয়া সনদ দেখিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত কিংবা রাজাকারের তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তি রাষ্ট্র থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা নেবে! বিজয়ের মাসেই এ ধরনের একটি খবর আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার জন্য প্রদত্ত ভাতা নিয়ে এই তস্করবৃত্তি আমাদের কেবল উদ্বিগ্নই করে না, লজ্জিতও করে। গত শুক্রবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ভুয়া সনদধারী প্রায় তিন হাজার ব্যক্তির ভাতা বাতিল ও স্থগিত করেছে সরকার। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৭৫ জনের ভাতা স্থগিত এবং বাকিদের বাতিল করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা তালিকার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন আগেও ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের আমলে নতুন করে গেজেটভুক্তির আহ্বান জানানোর পরই ভুয়া সনদধারীদের তালিকাভুক্তির হিড়িক পড়ে যায়। অনেকে ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নাম অন্তর্ভুক্ত করে যথারীতি ভাতাও হাতিয়ে নিয়েছে। পরবর্তীকালে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, সরকারি দপ্তর ও এলাকাবাসীর সাক্ষ্য–প্রমাণে বেরিয়ে আসে যে তারা মুক্তিযোদ্ধা নয়।
এ পরিপ্রেক্ষিতে মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রণালয় উত্থাপিত অভিযোগগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে উল্লিখিত ব্যক্তিদের ভাতা স্থগিত ও বাতিল করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা সাধুবাদ পেতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো এরা কীভাবে ভুয়া সনদ বাগিয়ে নিতে পারল? প্রশাসনের ভেতরে কারা তাদের এই দুষ্কর্মে সহায়তা করেছে? এর সঙ্গে মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেন থাকাও অস্বাভাবিক নয়। মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে ভাতা ফেরত নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। কেবল ভাতা ফেরত নেওয়াই যথেষ্ট নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে। প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন তালিকা ও নাম অন্তর্ভুক্তির পেছনের রহস্য অজানা নয়। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সনদ বাতিল হয়ে গেছে। এ রকম আরও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রশাসনে ও সমাজে লুকিয়ে আছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি বলে মনে করি।

এক্স-রে যন্ত্র তিন বছর ধরে নষ্ট থাকে কীভাবে?

উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। বিশেষ করে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর নানা সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার খবর পত্রিকার আঞ্চলিক পাতাগুলোতে নিয়মিতই মিলছে। প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঠকদের জন্য প্রকাশিত নিয়মিত আয়োজন ‘আমার চট্টগ্রাম’-এ একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে। সেখানকার এক্স-রে যন্ত্রটি তিন বছর ধরে নষ্ট হয়ে রয়েছে। এটা একটি উপজেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য হলেও এর মধ্য দিয়ে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় পর্যায়ের স্বাস্থ্যচিত্র ও চিকিৎসাসেবা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। উপজেলা পর্যায়ের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সাধারণভাবে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা সরকারি চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভরশীল। এখানে কম অর্থে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার কথা। কিন্তু একটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এক্স-রে যন্ত্রের মতো একটি জরুরি চিকিৎসা-সহায়ক যন্ত্র নষ্ট থাকলে জনগণকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে গিয়ে কাজটি সারতে হয়। একটি এক্স-রে যন্ত্র নষ্ট হতেই পারে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তা তিন বছর ধরে নষ্ট অবস্থায় থাকে কী করে?
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৪ সালে এক্স-রে যন্ত্রটি চালু হওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পর প্রথম বিকল হয়। এরপর দ্বিতীয় দফা নষ্ট হয় ২০১৩ সালে। এরপর বেশ কয়েক দফা চেষ্টা করেও যন্ত্রটিকে আর চালু করা যায়নি। তিন বছর ধরে মেশিনটি কক্ষে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার জবাব হচ্ছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানো হয়েছে কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এক্স-রে যন্ত্রের মতো রোগনির্ণয়ের একটি প্রাথমিক যন্ত্র ছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র চলতে পারে না। সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের যন্ত্রটি হয় মেরামত করতে হবে, অথবা যদি তা মেরামত অযোগ্য বিবেচিত হয়, তবে নতুন এক্স-রে যন্ত্রের ব্যবস্থা করতে হবে। হতাশার ব্যাপার হচ্ছে, তিন বছর ধরে বিষয়টি ঝুলে রয়েছে এবং দুটি পদক্ষেপের একটিও কার্যকর হয়নি। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর ‘ঊর্ধ্বতন’ কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে কি?

বাংলাদেশের জন্য জাপানের সবচেয়ে বড় ঋণ–সহায়তা by মাসাতো ওয়াতানাবে

মাসাতো ওয়াতানাবে
বাংলাদেশকে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দিচ্ছে জাপান। আজ এই ঋণচুক্তি সই হচ্ছে। এ উপলক্ষে প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য লেখাটি পাঠিয়েছেন ঢাকায় জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাবে
প্রিয় ফুল শাপলা ও সাকুরার নামে, কিংবা পতাকার নকশায় সাদৃশ্যের মতো আরও নানা আঙ্গিকে অন্তর্নিহিত আছে জাপান ও বাংলাদেশের বন্ধুত্ব, যা কোনো কার্যকারণ ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্তরিক। আরও গভীরে দেখলে, আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর তেনশিন ওকাকুরার প্রগাঢ় সাংস্কৃতিক বিনিময়ের উত্তরাধিকার, যা মানুষে মানুষে আত্মিক সংযোগ ঘটায় এবং হৃদয়ে এক অতুলনীয় কোমল জায়গা তৈরি করে, যাতে এখন আমরা নিজেদের মাঝে অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাই।
গত বছর বাংলাদেশ ও জাপানের প্রধানমন্ত্রীদের দ্বিপক্ষীয় সফরের সময় শুরু হওয়া ‘সমন্বিত অংশীদারত্ব’ দুই দেশের পরীক্ষিত বন্ধুত্বকে আরও বৃহৎ পরিসরে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে, যাতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ‘বিগ-বি’ বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্টের আওতায় আরও জোরদার দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা।
আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে জাপান সরকার তার ৩৬তম জাপানি ইয়েন ঋণ প্রকল্প ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার আওতায় ছয়টি প্রকল্পের জন্য সর্বমোট বরাদ্দ ১৩ হাজার ৩২৬ দশমিক ৫ কোটি ইয়েন (১১১.১ কোটি মার্কিন ডলার), যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা। নিঃসন্দেহে এযাবৎকালের বাংলাদেশের জন্য জাপানের সবচেয়ে বড় ঋণ-সহায়তা। এ ক্ষেত্রে ঋণের শর্তগুলো অতীব রেয়াতি, যার সুদের হার এবং পরিশোধকাল যথাক্রমে বার্ষিক ০.০১% এবং ৪০ বছর। এই ছয়টি প্রকল্প হলো: ১. প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিকরণ; ২. ঢাকা-চট্টগ্রাম পাওয়ার গ্রিড শক্তিশালীকরণ; ৩. শহুরে ভবনের নিরাপত্তা উন্নয়ন; ৪. সেতু উন্নয়ন; ৫. মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং ৬. স্থানীয় শাসনব্যবস্থা উন্নয়ন।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাওয়ার গ্রিড শক্তিশালীকরণ প্রকল্প মাতারবাড়ী সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রকে পরিপূর্ণ করবে, যা সারা দেশের বৃহত্তম শহরগুলোতে দক্ষ জ্বালানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রেরণে সহায়তা করবে। প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করবে, যা উৎপাদন খাতের বিবর্তন ত্বরান্বিত করবে এবং যা একটি উচ্চ মানসম্পন্ন আঞ্চলিক সরবরাহ কেন্দ্র হবে। সংক্ষিপ্ত আকারে, ৩৬তম ইয়েন ঋণ প্রকল্প, বিগ-বি পদক্ষেপের উন্নয়নের মাধ্যমে সহায়তা করবে, যা আমাদের ব্যাপক অংশীদারত্ব যৌথ পদক্ষেপ হবে বলে আশা করা যাচ্ছে এবং বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে এবং মর্যাদা অর্জনে সহায়তা করবে।
এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ বাংলাদেশের জন্য তার সামাজিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে। স্বাস্থ্য খাতে জাপান মা ও শিশুস্বাস্থ্যের ওপর জোর দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে ‘মা, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প’ এমন একটি পদ্ধতি, যা প্রশাসন ও নাগরিক উভয়কে সচল করবে। ‘উপজেলা সরকার ও উন্নয়ন প্রকল্প’ স্থানীয় সরকারের পক্ষে স্থানীয় অধিবাসীদের আরও ক্ষমতাবান করবে, যা সরকারকে মাঠপর্যায়ে কাজ করার জন্য আরও দ্রুত সাড়া দিতে ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে।
এই প্রকল্পগুলো সামগ্রিকভাবে স্ব স্ব ক্ষেত্রে গুরুত্বের দাবিদার। এবং সুসমন্বিত হলে বিগ-বির সমান্তরালে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করবে, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে নগর ও বেসরকারি খাতে উন্নয়ন উৎসাহিত করতে যোগাযোগ ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি করা।
বাংলাদেশের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়ে চলা দীর্ঘ সফরে সুসময়ে-দুঃসময়ে জাপান সব সময় পাশে থাকবে। আমি নিশ্চিত, ৩৬তম ইয়েন লোন প্যাকেজ বাংলাদেশকে কবিগুরুর দেশপ্রেমে সিক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় আরও একধাপ এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে মেরূকরণ আসন্ন

সব ঠিকঠাক থাকলে উপমহাদেশের রাজনীতিতে মেরূকরণ আসন্ন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তান যাবেন বলে ভারত তার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। তবে কূটনৈতিক সূত্রের মতে বাংলাদেশ এখনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। কারণ পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে এখনও পর্যন্ত আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেনি। যদিও গত ৫ই নভেম্বর পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছিলেন, সার্ক বৈঠক কখন হবে তার দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে সার্ক সচিবালয়ের মাধ্যমে ভারতসহ সকল সদস্য রাষ্ট্রের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আফগানিস্তান ইতিমধ্যে এতে যোগদানের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে ওই বৈঠক হতে পারে বলেও কূটনৈতিক সূত্র আভাস দিয়েছে।
ঢাকার কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে সংঘটিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার বিষয়ে সাম্প্রতিক পাকিস্তানি মিথ্যাচারের পটভূমিতে ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে যখন টানাপড়েন চলছে তখন ইসলামাবাদ থেকে কাকতালীয়ভাবে গত সপ্তাহে ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ঘোষণা দেন যে, মোদি পাকিস্তান সফর করবেন। এটা লক্ষণীয় যে, ভারত এবারে গোড়া থেকেই সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করে চলেছে। গত  জুলাইয়ে রাশিয়ার উফ শহরে অনুষ্ঠিত সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) এর শীর্ষ সম্মেলনকালে মোদি-নওয়াজ বৈঠকে মিলিত হন। ১০ই জুলাই  ভারতের পররাষ্ট্র সচিব এস. জয়শঙ্কর এবং তার পাকিস্তানি প্রতিপক্ষ আজিজ আহমেদ চৌধুরী এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় যে,  সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে নওয়াজের আমন্ত্রণ  মোদি গ্রহণ করেছেন।
গত ৮ই ডিসেম্বর পাকিস্তান সফররত ভারতের  বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ‘‘শুরুটা ভারতের প্রধানমন্ত্রীই করছেন। আগামী বছরেই তিনি যাচ্ছেন পাকিস্তান সফরে ‘সার্ক’ সম্মেলনে যোগ দিতে। ওই সময় আমিও আসবো প্রধানমন্ত্রীজীর সঙ্গে।’’
উল্লেখ্য, সার্ক সনদ অনুযায়ী কোনো একটি দেশের সরকার বা নির্বাহী প্রধান সম্মেলনে যোগ দিতে অস্বীকার করলে সার্ক শীর্ষ বৈঠক করা সম্ভব নয়। ২০০৪ সালে ‘সার্ক’ জোটের সম্মেলনে যোগ দিতেই ইসলামাবাদে গিয়েছিলেন ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী। সেটাই ছিল কোনো ভারতীয় শীর্ষ নেতার শেষ পাকিস্তান সফর।
ভারতের মিডিয়া বলেছে, বন্ধুত্বের হাতটা ভারতই প্রথম বাড়িয়ে দিতে চাইলো এই উপমহাদেশে শান্তির জন্য। দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করে তোলাই এর লক্ষ্য। আগামী বছরেই পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ১৫ বছর পর এই প্রথম কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী যাচ্ছেন পাকিস্তানে। ‘সার্ক’ জোটের সম্মেলনে যোগ দিতে।
বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ইসলামাবাদে গিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি জোর দিয়েছেন ভারতীয় উপমহাদেশ সহ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করার ওপরে। আর সেই লক্ষ্যে আগামী বছরেই পাকিস্তান, চীন, আফগানিস্তান সহ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর বিদেশমন্ত্রীদের ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানালেন বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। ইসলামাবাদে সুষমা টুইট করেছেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদ দিয়ে।
আফগানিস্তানের উন্নয়ন নিয়ে গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে ১৪টি দেশের অংশগ্রহণে ‘হার্ট অফ এশিয়া সম্মেলনে’র পঞ্চম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে ভারতের বিদেশমন্ত্রী আরও বলেন, ‘‘দীর্ঘ সময়ের মধ্য দিয়ে গিয়ে আমরা এখন অনেক পরিণত হয়েছি। আমাদের আত্মবিশ্বাসও অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরাই প্রস্তাব দিচ্ছি, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করে তোলার জন্য যা যা করণীয়, তা করা হোক। সেটা যত দ্রুত করা যায় ততই ভালো। তবে আমাদের কোনো ব্যস্ততা নেই। পাকিস্তান তার জন্য যতটা সময় চায়, আমরা সেই সময় দিতে রাজি আছি। দক্ষিণ এশিয়ায় সবক’টি দেশের মধ্যেই পণ্যের আদান-প্রদান ও ব্যবসা-বাণিজ্য আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তার জন্য যে সব বাধা রয়েছে, সেগুলো সরানোর জন্য এই অঞ্চলের সবক’টি দেশকেই আন্তরিক ভাবে এগিয়ে আসতে হবে।’’ তিনি আন্তঃসার্ক কানেকটিভিটি ও ট্রানজিটের ওপর জোর দিয়েছেন।
পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তান থেকে ভারতে পণ্য আসার ব্যাপারে ইসলামাবাদ যাতে আপত্তি না করে, তার জন্যও এ দিন অনুরোধ জানান ভারতের বিদেশমন্ত্রী।
আফগানিস্তান নিয়ে ‘হার্ট অফ এশিয়া সম্মেলন’-এর পঞ্চম মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিতে গত ৮ই ডিসেম্বর ইসলামাবাদে পৌঁছান ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ। অতিথিদের সম্মানে দেয়া নৈশভোজে গতকাল ভারতের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে একান্তে বেশকিছু ক্ষণ আলোচনা হয় পাক বিদেশমন্ত্রী সরতাজ আজিজের। পরে ওই সম্মেলনে সুষমার পাশের আসনটিতে বসে থাকতে দেখা যায় পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীকে। তিন বছর পর এই প্রথম ভারতের কোনো বিদেশমন্ত্রী গেলেন ইসলামাবাদে।
ওই সম্মেলন চলার সময়ে পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গেও আলাদা ভাবে কথা বলেছেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। সূত্রের খবর, কাশ্মীরের মতো কয়েকটি বিতর্কিত ইস্যু নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। ঢাকার পর্যবেক্ষকরা বলেন, বিজেপি সরকারের আমলে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে এরকম শান্তিপূর্ণ আলোচনা অত্যন্ত বিরল। নব্বইয়ের দশকে একাধিকবার এই কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করেই দুই দেশ মুখ দেখাদেখি বন্ধ রেখেছে। এবার বিরাট ব্যতিক্রম।
উল্লেখ্য যে, ১৯৮৫ সালে প্রথম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন হয়। এই কাশ্মীর প্রশ্নে অন্তত ৫টি সার্ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি। গত ৩১ বছরে সার্ক সামিট হওয়ার কথা ৩১টি। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে ১৮টি। এক ডজন সার্ক সম্মেলন প্রধানত দুই দেশের বৈরিতায় ভেস্তে গেছে।
সুষমা বলেছেন, ‘‘দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ককে আরও জোরদার করা আর সেই প্রয়াসকে আরও দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই আমি ইসলামাবাদে এসেছি।’’
কিছু দিন থমকে থাকার পর মূলত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগেই সম্প্রতি দু’দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ের বৈঠক হয় ব্যাংককে। সেই বৈঠকে জম্মু-কাশ্মীর, সীমান্ত সমস্যা, সন্ত্রাস দমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে ঘণ্টা চারেকের বৈঠক হয় দু’দেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের মধ্যে। পরে তা নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে যৌথ বিবৃতিও দেয়া হয়।
ঢাকার পর্যবেক্ষকরা বলেন, দুই দেশের দুই দক্ষিণপন্থি সরকারের মধ্যকার এরকম দহরম মহরম দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীদের মধ্যে সামনের দিনগুলোতে কি প্রভাব ফেলে সেটা দেখার জন্য অনেকেই আগ্রহী থাকবেন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রশ্নে বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক আপাতত সব থেকে নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে মনে করা হয়। অনেকে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার কথাও বলছেন।

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উন্নয়নে সহযোগিতায় প্রস্তুত ভারত

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের উন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতায় ভারত প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির বিদায়ী হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ। অন্যান্য খাতেও ভারত বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে বলে জানান তিনি। গতকাল বিকালে রাজধানীর গুলশানে সাংবাদিকের সঙ্গে মতবিনিময়কালে হাইকমিশনার এসব কথা বলেন। তার বিদায় উপলক্ষে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন ওই মতবিনিময়ের আয়োজন করে। ঢাকায় তিন বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালনকারী এ কূটনীতিক দেশের বহুল আলোচিত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন। তার মতে, বাংলাদেশে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনটি জরুরি ছিল। ভারতে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর বাংলাদেশের ব্যাপারে দেশটির নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলেও স্পষ্ট করেন হাইকমিশনার। পঙ্কজ শরণ মস্কোতে ভারতের পরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। শিগগির তিনি তার নতুন দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। ঢাকার পরবর্তী ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন থাইল্যান্ডে থাকা দেশটির রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন সিংলা। নতুন বছরের শুরুতেই তিনি তার দায়িত্ব বুঝে নেবেন বলে জানানো হয়েছে।
সরকারের সঙ্গে সব সময় ডিল করে ভারত: মতবিনিময়কালে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাদের সমালোচনা এবং ভারতের বিজেপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির যোগাযোগের চেষ্টার বিষয়ে হাইকমিশনারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সংবাদিকরা। জবাবে তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সব সময় ‘ডিল’ করে ভারত। তার ভাষায়, যখন যে সরকারে থাকে তার সঙ্গেই আমরা ডিল করি। এটাই আমাদের পলিসি, আমরা এই নীতিতে চলি। ভারত সব সময় সরকারগুলোর সঙ্গে ডিল করে। ভারত মনে করে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল, আজকের দিনেও এ অবস্থানে কোনো পরিবর্তন নেই। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বর্তমান ব্যবস্থায় ভারত খুশি কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কিভাবে তার লিডারশিপ নির্বাচন করবে এবং এখানে শাসনব্যবস্থা কিভাবে চালাবে- এ ব্যাপরে ভারত কোনো প্রেসক্রাইব করে না। তিনি বলেন, আমরা একটি গণতান্ত্রিক দেশ। আমরা গণতন্ত্রকে সমর্থন করি। আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। একটি স্বাধীন দেশ কিভাবে চলবে তা তার দেশের জনগণই নির্ধারণ করবেন। নিরাপত্তা বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে শরণ বলেন, আইএস বা আইএসআইএলের হুমকি একটি বৈশ্বিক বিষয়। ভারতও এ থেকে ব্যতিক্রম নয়। এদের মোকাবিলায় যেখানে যা প্রয়োজন ভারত সেই পদক্ষেপ নিচ্ছে। হাইকমিশনার বলেন, আমার ধারণা বাংলাদেশ সরকারও একই কাজ করছে। দৈনন্দিন নিরাপত্তা সহযোগিতার বিষয়ে দুই দেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে বলে জানান তিনি। ২০১৪ সালের বর্ধমান বিস্ফোরণ নিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রশংসা করেন তিনি। বলেন, আমরা একে-অপরকে সহযোগিতা করছি। বাংলাদেশে বিদেশিদের ওপর সাম্প্রতিক হামলার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো জবাব দিতে চাননি। এখানে যা ঘটছে সে বিষয়ে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কারণীয় ঠিক করতে সমর্থ হবে বলে আশা করেন তিনি।
একই নৌকায় বাংলাদেশ-ভারত: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গত কয়েক বছরে ‘নতুন ধরনের আস্থা ও বোঝাপড়া জন্মেছে’ বলে মনে করে পঙ্কজ শরণ। এর ফলে অনেক ঝুলে থাকা সমস্যার সমাধান সহজতর হয়েছে বলেও মনে করেন তিনি। শরণ বলেন, স্থল সীমান্ত চুক্তি (এলবিএ) দেখিয়েছে যে, দুই দেশ সবচেয়ে কঠিন ইস্যুসমূহও সমাধান করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এলবিএ সমস্যা নিষ্পত্তিতে অটল কূটনৈতিক তৎপরতার জন্য কৃতিত্ব দেয়া হয়ে থাকে পঙ্কজ শরণকে। বাংলাদেশে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিসহ বহু উচ্চপর্যায়ের সফর দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করাটা ছিল ‘সত্যিকারের সম্মান’। তিনি বলেন, আমাদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল এটি। আমি সৌভাগ্যবান যে, এমন এক সময় আমি উপস্থিত ছিলাম, যখন সম্পর্ক বিভিন্ন দিক থেকে উন্নতি হয়েছে। কয়েক দশক ধরে আটকে থাকা ইস্যুর বিষয়ে অগ্রগতিও আমরা করতে সক্ষম হয়েছি। এ সময়ে আমাদের দুই দেশের পার্থক্য কমিয়ে আনা ও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছি। আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবে এটি ছিল খুবই সন্তোষজনক সময়। তিনি বলেন, এ সম্পর্ক শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, ভারতের জন্যও ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’।
এ সম্পর্কের ভবিষ্যত সম্পর্কে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের নতুন দিকগুলো বের করতে চাই আমরা। বিভিন্ন নদীর পানিবণ্টনের বিষয়টি দুই দেশের জন্যই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, এ ইস্যু সমাধানে সংলাপই একমাত্র উপায়। আবার তিনি এ-ও বলেন, বাস্তবতাকেও আমাদের মেনে নিতে হবে। আমাদের উভয়ই পানি স্বল্পতায় ভুগছে। রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিজের সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তিনি বলেন, প্রায় প্রত্যেক খাতেই দুই দেশের সম্পর্ক উঁচু পর্যায়ে রূপান্তরের বিষয়টি আমি প্রত্যক্ষ করতে পেরেছি। তার মতে, বাংলাদেশ এখন পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় ‘অনেক বেশি পরিণত ও আত্মবিশ্বাসী’। বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্বে স্বীকৃত। শুধু ভারত নয়, বিশ্বের প্রতিটি শক্তি বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চায়। বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাবের ব্যাপারে তিনি বলেন, ভারত সম্পর্কে মানুষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য রয়েছে। তবে সেসব মোকাবিলা করতে হবে আমাদের। কথা বলতে হবে, নিজেদের বার্তা পৌঁছাতে হবে। তার মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের গন্তব্য অভিন্ন। তার ভাষায়, পছন্দ করি অথবা না করি, আমরা একই নৌকায় চড়েছি। হয় আমরা একসঙ্গে চলবো, নয়তো একসঙ্গে ডুববো।

মানছুরা ধর্ষণের পর সাদা কাগজে সই নেয় মাতবররা

বন্দরে এক স্কুলছাত্রী ধর্ষণের অপমান সইতে না পেরে লজ্জায়, ঘৃণায় আত্মহত্যা করে। নিহত স্কুলছাত্রী মানছুরার পিতা জাকির হোসেন জানিয়েছেন, ধর্ষণের পর স্থানীয় আলী আকবর মাতবরকে ঘটনাটি প্রথমে জানিয়েছেন তিনি। পরে আলী আকবর নিজেই আরও ৩ জন মাতবর নিয়ে তাকে চাপ সৃষ্টি করেন থানা পুলিশসহ কাউকে না জানাতে। বিচার সালিশির মাধ্যমে সমাধান করার আশ্বাস দেয়া হয় তাকে। মেয়েকে ওই ছেলের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়ারও পরামর্শ দেন তারা। তাদের পরামর্শে ঘটনার পরের দিন মঙ্গলবার তিনি তার মেয়েকে স্ত্রী ছালমা খাতুনকে দিয়ে ওই ছেলের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। ওই দিন রাতেই মাতবর মনির হোসেন ও সামছু ধর্ষক হাবিবুর রহমানের বাড়ি থেকে মেয়েকে বাড়িতে ফেরত নিয়ে আসেন। এ সময় তার কাছ থেকে মাতবররা একটি সাদা কাগজে সই নিয়ে শুক্রবার বিকালে সালিশ বৈঠকের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তার পরের দিন বৃহস্পতিবার মানছুরা অসুস্থ শরীর নিয়ে বার্ষিক পরীক্ষা দিতে স্কুলে যায়। স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরে রাতে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে মারা যায় সে। নিহত মানছুরার মা ছালমা খাতুন জানান, সোমবার সন্ধ্যায় একই এলাকার মোতালেব বাক্কুর ছেলে হাবিবুর রহমান গার্মেন্ট শ্রমিক বাড়ির গেটের সামনে থেকে তুলে জঙ্গলে নিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করেছে। এ ঘটনায় প্রথমে মেয়ে আত্মসম্মান কী বুঝত না। পরে স্কুলে পরীক্ষা দিতে গিয়ে বিভিন্ন লোকের কথা শুনে অপমান, অপবাদ বুঝতে পেরেছে। ওই অপবাদ সইতে না পেরে লজ্জায় বৃহস্পতিবার রাতে নিজ ঘরের আড়ার সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। মাতবররা থানা পুলিশ থেকে বিরত রাখার কারণে তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেলে ধর্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ধর্ষণের আলামত না এলেও আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধেই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

‘পৌর নির্বাচন নিয়ে সরকারের ষড়যন্ত্র আমরা বুঝি’

পৌর নির্বাচন নিয়ে সরকারের নীলনকশা রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বলেছেন, পৌরসভায় প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। তড়িঘড়ি করে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার অর্থ কী? আমরা জানি, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করেই প্রমাণ করা হবে বর্তমান শাসকগোষ্ঠী হচ্ছে জনগণের সবচেয়ে প্রিয় রাজনৈতিক দল। আমরা এই নীলনকশা বুঝি। আমরা জানি, এটাই হবে। এখানে নির্বাচন করার জন্য কেউ কোন স্বাধীনতা পাবেন না। পদে পদে বাধা দেয়া হবে, গ্রেপ্তার করা হবে, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করা হতে পারে। তারপরও আমরা এই নির্বাচনে আছি। কারণ আমাদের সামনে তো বিকল্প কোন পথ নেই। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (এ্যাব) আয়োজিত ‘পৌরসভা নির্বাচন ২০১৫ : বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, পৌর নির্বাচনে সরকার তার ভরাডুবি ঠেকাতেই বিরোধী দল দমনের পথ বেঁছে নিয়েছে। আবারও পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে কারাগারগুলো। সরকার খুব ভালো করে জানে বিএনপিকে যদি দমন না করা যায়, এভাবে গ্রেপ্তার করে আটকে রাখা না যায়, ত্রাস দেখিয়ে আটকে রাখা না যায়, তাহলে এই নির্বাচনেও তাদের ভরাডুবি ঘটতে পারে। সে জন্য তারা আজকে দমনমূলক একটা ব্যবস্থা নিয়েছে। সরকারের দমনপীড়নের কথা উল্লেখ করে মির্জা আলমগীর বলেন, আমাদের বহু প্রার্থীকে অস্ত্র দেখিয়ে সরিয়ে দেয়া হয়েছে, তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে। ফেনীতে কোন প্রার্থীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেয়া হয়নি। ওখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আজকেও আমার কাছে খবর এসেছে- ঝিনাইদহে আমাদের নেতাকর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সারা দেশে গণগ্রেপ্তার চলছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত এক হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার কয়েক মাস আগে ৫/৬ হাজার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই নির্বাচন তো আমরা জানি, একটা তামাশার মতো অবস্থায় দাঁড়িয়েছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করে তিনি বলেন, তারপরেও আমরা নির্বাচনে আছি। এ জন্য আছি যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে থেকে আমাদের অবস্থাটা দৃঢ় করতে চাই। জনগণের কাছে যেতে চাই। ন্যূনতম যে অধিকারটুকু আছে, সেই অধিকারটুকু নিতে চাই। মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা একটা অস্বাভাবিক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি অতিক্রম করছি। এই পরিস্থিতি থেকে আমাদের সাহসিকতার সঙ্গে, কৌশলের সঙ্গে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে, ধৈর্যের সঙ্গে, গণতান্ত্রিক উপায়ে বেরিয়ে আসতে হবে। মির্জা আলমগীর বলেন, বিশ্বের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে আমি গণতন্ত্রকে দেখতে চাই। বিশ্বপরিস্থিতিতে গণতন্ত্র ডাবল স্ট্যান্ডার্ন্ড। ইরাক, সিরিয়া, মিয়ানমার আফগানিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এটাকেও একটা ছুঁতো করে আমাদের জঙ্গিবাদী, গণতন্ত্রবিরোধী বলে চিহ্নিত করার জন্য সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। এই কথাটা আমাদের সকলের মধ্যে পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত নির্বাচন ছাড়া আমাদের বিকল্প পথ নেই। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নির্বাচনের বিকল্প নেই। মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা একটি উদারপন্থি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। আমরা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে পরিবর্তনে বিশ্বাস করি এবং আজকে স্থানীয় সরকারে যে পরিবর্তন হবে, সেটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে হতে হবে। মিয়ানমারের সামরিক জান্তার অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, জিও পলিটিক্যাল সিচুয়েশন দেখে, আমাদের কৌশলের সঙ্গে, আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় গণতন্ত্রের দিকে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে আমরা নির্বাচনে গিয়েছি। এই সিদ্ধান্তই সঠিক। কারণ, আমাদের তো সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ঢাকায় আমরা পার্টি অফিসে বসতে পারি, কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে দেয়া হয় না। এলাকায় সমাবেশ করতে দেয়া হয় না। লড়াই, সংগ্রাম করেই গণতন্ত্র অর্জন করেছি। দীর্ঘ সাত বছর ধরে হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে মানুষ। সরকারের উদ্দেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, দেয়ালের লিখনগুলো পডুন। জনগণের মানুষের মুখের ভাষা, চোখের ভাষা দেখুন, বোঝার চেষ্টা করুন। এখনও সময় আছে, সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। আপনারা জনগণের অধিকারগুলো ফিরিয়ে দিয়ে একটি সত্যিকার অর্থে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। তিনি বলেন, একটি সঠিক নির্বাচন দিয়ে জনগণের অধিকারগুলো ফিরিয়ে দিন। অন্যথায় অনেকেই বলেছেন, ভয়াবহ একটা পরিণতির দিকে দেশকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আজকে এখানে উগ্রবাদের কথা বলা হচ্ছে। জঙ্গিবাদের কথা বলা হচ্ছে। পশ্চিমারা বার বার বলছে, এখানে জঙ্গিবাদ আসছে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস তখনই বেড়ে যায় যখন গণতন্ত্র থাকে না। গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো পরাজিত হলে উগ্রবাদের উত্থান ঘটে। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি প্রকৌশলী আনহ আখতার হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অন্যান্যের মধ্যে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর নুরুল আমিন ব্যাপারী, এ্যাব মহাসচিব প্রকৌশলী আলমগীর হাসিন, প্রকৌশলী একেএম জহিরুল ইসলাম, প্রকৌশলী মোতাহার হোসেন, প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান মানিক প্রমুখ বক্তব্য দেন।

বিদেশিদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কতা by আলী ইমাম মজুমদার

বিদেশিদের নিরাপত্তায় গুলশান-বারিধারায়
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)  মোতায়েন
বেশ কয়েকটি উন্নত ও ধনী দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্কসংকেত জারি করেছে। মাত্রার হেরফের আছে বটে। তবে অনেকেরই ভাবসাব যে আমাদের দেশটা জঙ্গিতে ভরে গেছে। যেকোনো সময় তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। এসব আশঙ্কা একেবারে অমূলক, এমনটা বলা যাবে না। সাম্প্রতিক কালে সন্ত্রাসী হামলায় দুজন বিদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। প্রাণনাশী হামলা হচ্ছে কিছু ব্লগারের ওপর। ভিন্নধর্মাবলম্বী ধর্মীয় নেতারাও কেউ কেউ এর শিকার হচ্ছেন। হুমকি এসেছে অনেকের কাছে। এমনকি মুসলমানদের একটি অংশ শিয়া সম্প্রদায়ের ওপরও হামলা হচ্ছে। আরও দুঃখজনক যে এ হামলাগুলো হচ্ছে ইসলামের নামে। এসব ঘটনায় গুটিকয় স্বার্থান্বেষীকে বাদ দিলে গোটা দেশবাসী মর্মাহত। ঘটনার হোতাদের চিহ্নিত করে উপযুক্ত বিচার সবারই কাম্য। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এ বিষয়ে কিছুটা প্রচেষ্টাও নিচ্ছে। তবে সেটা আরও জোরদার ও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি হওয়া বাঞ্ছনীয়। আর এটা অসম্ভবও নয়। কিন্তু এ বিষয়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও এমনটা বলা যাবে না যে দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে সতর্ক করার যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ।
মাত্র কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দল জঙ্গি হামলার আশঙ্কার কথা বলে তাদের নির্ধারিত ও সব প্রস্তুতি নেওয়া সফরসূচি বাতিল করে। আবার এর কিছুকাল পরেই তাদের ফুটবল দল এখানে এসে খেলে যায়। বরাবরই এ ধরনের খেলোয়াড়দের জন্য সরকার বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়। সাম্প্রতিক কালের ঘটনাবলির পরিপ্রেক্ষিতে তা জোরদারও করা হয়েছে। এতে তাদের আশ্বস্ত থাকার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে দেশটি অতিসম্প্রতি তাদের সব স্বেচ্ছাসেবককে বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বলেছে। দূতাবাসকে নির্দেশ দিয়েছে তাদের জনবল ছেঁটে ফেলতে। এতে আমরা শুধু দুঃখিত বললে কম বলা হবে। বরং ক্ষুব্ধও। প্রশ্ন আসে, সব দেশের ক্ষেত্রেই কি তারা এমনটা করে? কয় দিন আগে প্যারিসে যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটল, তা গোটা বিশ্ববাসীর জন্যই বেদনাদায়ক। আমরাও এর অংশীদার। সে নগরে তো আইএস নামক জঙ্গি সংগঠনটি নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে এমনটা করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে হামেশাই খুনখারাবি হয়। এই সেদিনও ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি হলিডে পার্টির ওপর তিনজন বন্দুকধারীর গুলিতে ১৪ জন নিহত হন। সেখানে মাঝেমধ্যে স্কুলে ঢুকেও গুলি করে বাচ্চাদের মেরে ফেলে কেউ কেউ। সংবাদপত্র সূত্র থেকে জানা যায়, সে দেশে শুধু এ বছরই ৩৫৫টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে জোর দাবি থাকলেও অস্ত্র উৎপাদনকারীদের লবিং এটা হতে দিচ্ছে না। বছর কয়েক আগে মুম্বাইয়ের একটি হোটেলসহ নগরের অংশবিশেষ লম্বা সময় মাত্র কয়েকজন দুর্বৃত্তের নিয়ন্ত্রণে ছিল। খুন হয়েছে অনেক। প্যারিস হামলার পরেই সেখানে একটি শীর্ষ সম্মেলন হয়ে গেল। হওয়ারই কথা। যত বেদনাদায়কই হোক, কোনো দুর্ঘটনার জন্য তো সব স্থবির হয়ে যায় না। আর যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে প্রতিদিন হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক যাচ্ছেন। যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, এমনকি রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানেরাও। এটা তো স্বাভাবিক।
হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ফ্রান্সসহ ইউরোপের দেশগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আমাদের তুলনায় অনেক জোরদার। তাদের বিত্ত-সামর্থ্য বিবেচনায় তাই হওয়ার কথা। তবে সে নিরাপত্তাব্যবস্থার মাঝেই তো ঘটনাগুলো ঘটছে। প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের ঘটনা সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে আগাম সবকিছু জানার সুযোগ নেই। এর ফলেই এমনটা ঘটে। এ কথাটা আমাদের জন্যও প্রযোজ্য। তবে তারা দ্রুত অপরাধী শনাক্তকরণ ও বিচারের আওতায় আনতে সক্ষম হয়। আর আমাদের এখানে এর ঘাটতি যথেষ্ট। তা ছাড়া রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এ–জাতীয় ঘটনার তদন্ত ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্নমুখী করা হয়। যেমনটা ঘটেছিল ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা মামলায়। এখনো এমন কিছু ঘটবে না এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় না। আর তা ঘটলে প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থেকে যায়। সুযোগ পায় নতুন করে অপরাধ ঘটানোর। তা ছাড়া প্রকৃত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনতেও সময়ক্ষেপণ হয় কারণে-অকারণে। এসব করেই আমরা অন্য দেশগুলোকে আমাদের বিষয়ে বিরূপ ও অপমানজনক মন্তব্য করা ও ব্যবস্থা নিতে সুযোগ দিচ্ছি। আর তারাও বিবেচনাহীনভাবে বা ভিন্ন কোনো বিবেচনা থেকে আমাদের মতো দেশকে অপদস্থ করার সুযোগ হাতছাড়া করে না। এ দেশে আইএস নামক জঙ্গি সংগঠন আছে কি নেই—এ নিয়ে চলছে পাল্টাপাল্টি যুক্তিতর্ক। সেটা থাকুক বা না থাকুক, আমাদের এখানেও জঙ্গি তৎপরতা চলছে এবং তা দ্রুত দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা না করলে ডালপালা মেলে অধিকতর বিপদ ডেকে আনতে পারে। তবে ইউরোপে আইএস যে সক্রিয় সে প্রমাণ তো আমরা সেদিনই দেখলাম। আর আইএস কাদের সহায়তায় গঠিত এবং এর সুবিধাভোগী কারা এটা নিয়ে তো অনেক খোলামেলা কথাবার্তাই হচ্ছে। অন্তত আমাদের মতো দেশ এ বিপজ্জনক খেলায় নামেনি সেটা নিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রও তার নাগরিকদের আমাদের দেশ ভ্রমণে সতর্ক করেছে। আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে সে দেশের সরকারের ভূমিকা ছিল সম্পূর্ণ নেতিবাচক। তবে তাদের সুশীল সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছিল, এটা ভুলে যাওয়ার নয়। এককেন্দ্রিক বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা অনেক। তা ছাড়া তাদের কিছু কিছু পরামর্শ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার দাবি রাখে। যেমন, গত জাতীয় নির্বাচনটি সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও রাজনৈতিক দিক দিয়ে দুর্বল। একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সে দুর্বলতা কাটানোর একটি পথ। তবে ইউরোপের কিছু দেশ এমনকি জাতিসংঘ আমাদের মানবাধিকার প্রশ্নে প্রায়ই যেসব কথা বলে, তা তর্কাতীতভাবে মেনে নেওয়া যায় না। মানবাধিকার দেশ, কাল ও স্থানভেদে ভিন্ন মাত্রা পায়। ইউরোপ প্রাণদণ্ড রদ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্য তা করেনি। করেনি জাপান, চীন ও ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত অনুরাগী মিসর ও সৌদি আরব শত শত লোককে প্রাণদণ্ড দিয়ে থাকে। মিসরে সামরিক বাহিনী তাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে প্রাণদণ্ড দিয়েছে। অবশ্য দণ্ড কার্যকর হয়নি এখনো। এসব ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র কোনো জোর প্রতিবাদ করেছে এমনটা আমরা জানি না। আমাদের দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অনেক ঘটনাই ঘটে থাকে। এগুলো নিয়ে প্রতিবাদ হয়েছে ও হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য দেশও সে বিষয়ে কথা বললে অযৌক্তিক বলা যাবে না। তবে এসব বলতে নিজেদের অবস্থানটি একটু দেখে নিলে ভালো হয়। গুয়ানতানামো বে কারাগারে আটক যুদ্ধবন্দীদের জেনেভা কনভেনশনে স্বীকৃত সুবিধাদির কিছুই দেওয়া হয়নি। বরং সেখানে বছরের পর বছর চলেছে অমানবিক নির্যাতন। হতে পারে ওসামা বিন লাদেন ছিল সন্ত্রাসী নেতা। আমাদের অনেকের মাঝেই তার জন্য কোনো সহানুভূতি নেই। তবে তারও আইনের আওতায় বিচার পাওয়ার অধিকার ছিল। কিন্তু তা মেনে নেওয়া হয়নি। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অগোচরে সে দেশে সশস্ত্র হামলা করে তার মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়। অবশ্য তারা এগুলো করেছে বলেই আমরাও মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে থাকব, এমন কোনো কথা নয়।
পাশ্চাত্য বিশ্বের কাছে আমরা অনেকভাবে ঋণী। আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়ে তারা সমৃদ্ধ করছে আমাদের জনসম্পদকে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহায়তা ত্বরান্বিত করছে উন্নয়নের গতি। বিপুলসংখ্যক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়েছে তাদের দেশে। তাঁরা পেয়েছেন সমৃদ্ধ জীবনের স্বাদ। এ ছাড়া বিপন্ন মানবতার ডাকে ওই দেশগুলো লক্ষণীয়ভাবে সাড়া দেয়। সম্প্রতি সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের ইউরোপই আশ্রয় দিয়েছে উদারভাবে। অথচ তাদের জনশক্তি আমদানি করতে হয়। আমাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার হিসেবেও ইউরোপ আর আমেরিকা সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ওপর নির্ভর করতে হয় আমাদের। তবে একটি জাতির আত্মসম্মান অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সেটি তাদের ক্ষেত্রে যেমন, তেমনি প্রযোজ্য আমাদের ক্ষেত্রেও। অবশ্যই আমরা তাদের পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেব। আর তাদেরও কারণে-অকারণে আমাদের হেয় করার পথ থেকে দূরে থাকতে হবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

ইসির তথ্যে গোলমাল

উপজেলা ও সিটি নির্বাচনের মতো পৌর নির্বাচনেও দায়সারাভাবে কাজ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের সব উপাদান ইসির হাতে থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার হচ্ছে না। আগামী ৩০শে ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘ ৭ বছর পর নৌকা-ধানের শীষের মধ্যে লড়াই হবে এ নির্বাচনে। এই নির্বাচনকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের অংশ বলে ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। অন্যদিকে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের পরীক্ষা হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই বাছাইয়ের পর যথা সময়ে প্রার্থীর বিষয়ে তথ্য দিতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। কিছু ক্ষেত্রে কমিশন প্রথম যে তথ্য দিয়েছে পরবর্তীকালে তা সংশোধন করতে হয়েছে। আগের নির্বাচনগুলোয় প্রার্থীর বিষয়ে যথা সময়ে তথ্য আসলেও এবার এ প্রক্রিয়ায় গোলমাল হচ্ছে প্রায়শই। কমিশনের দাবি স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অদক্ষতার কারণে এমনটি হচ্ছে। তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে মোটা অঙ্কের বাজেট বরাদ্দ এবং পূর্বপ্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও এমনটি কেন হচ্ছে। এবারের পৌর নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও কোন ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেয়নি ইসি। মন্ত্রী-এমপিদের প্রচারণার লাগাম টেনে ধরতে পারছে না কমিশন। মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার নেয়ার বিষয়টি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের ঘাড়ে চাপাচ্ছে ইসি। কমিশনের নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচনী এলাকাগুলোয় প্রকল্প অনুমোদন দিলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ গতকাল মানবজমিনকে বলেন, পৌরসভা নির্বাচনে যে আচারণবিধি করা হয়েছে তা লঙ্ঘিত হলে যেন ব্যবস্থা নেয়া হয়। এটা করতে পারলে কিছুটা হলেও ইসির নিরপেক্ষতা রক্ষিত হবে। বাকি বিষয়গুলোতো আর নির্বাচন কমিশনের হাতে নেই। যেমন, মামলা দিয়ে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এগুলো তো সরকারই করে থাকে। এ মুহূর্তে সরকারকে এসব কাজ থেকে বিরত রাখতে পারবে কে? সরকারের কাছে নির্বাচন কমিশন তো অসহায়। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একতরফা নির্বাচন হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় পৌরসভা নির্বাচনও একতরফা হওয়ার কথা। কিন্তু এ নির্বাচনে গুণগত পরিবর্তন হয় কি না সেটা আর কিছুদিন পরে বোঝা যাবে।
গত বছরের শুরুতে পাঁচ ধাপে দেশের সাড়ে ৪ শতাধিক উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। সহিংসতা বিএনপি সমর্থিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ নিহত হয় প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী। আহত হয় কয়েক সহস্রাধিক। ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোট প্রদান, প্রতিপক্ষের এজেন্টদের বের করে দেয়াসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটে। ভোটগ্রহণের আগের রাতেই কেন্দ্র দখল করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সভর্তি করে রাখেন। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন ও সহিংসতা রোধে ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়ে ইসি। সংঘাত-সহিংসতার পেছনে কমিশনের উদাসীনতা ও সরকারের প্রতি নতজানু ভূমিকাকেই প্রধানত দায়ী করে নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনে আগের দিন ও ভোটের দিন কেন্দ্রে সেনাবাহিনী, র‌্যাব ও বিজিবির টহলও সহিংসতা রোধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ইসি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে ইসি। নির্বাচনে প্রচুর পরিমাণে আচরণবিধি লঙ্ঘন তথা ব্যালট ছিনতাই, কেন্দ্র দখল ও জালভোটসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটে পুলিশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সামনেই। কোনো কোনো জায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লাঞ্ছিত করে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। যার ছবি ও সংবাদ গণমাধ্যমে আসে। এর পরেও ইসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে গণমাধ্যমে দাবি করে।
গত ২৮শে এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় দেশের বড় তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। নির্বাচনে তিন সিটিতেই ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটদানে বাধা, ভোট কারচুপি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের মারধর ও বের করে দেয় সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা। অনেক কেন্দ্রের প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারও এ অনিয়মে শামিল হন। যদিও ওই নির্বাচনও সুষ্ঠু হয় বলে নির্বাচন কমিশন দাবি করে।