Sunday, December 4, 2016

না, ‘ওবামা টিভি’ আসছে না

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সামাজিক যোগাযোগের অনলাইন মাধ্যমের এই যুগে তথ্যের ব্যাপক প্রবাহ নিয়ে প্রায় সময়ই মন্তব্য করে থাকেন। তাই গুঞ্জন শুরু হয়েছে, হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর তিনি হয়তো টেলিভিশন চ্যানেল খুলে গণমাধ্যম ব্যবসায় নতুন পেশাজীবন শুরু করতে পারেন। তবে ওবামার সহযোগীরা এ ধরনের সম্ভাবনা গত শুক্রবার উড়িয়ে দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ শাখার পরিচালক জেন সাকি টুইটারে লিখেছেন, মানুষের তথ্য প্রাপ্তির সুবিধা ভোগ করার ধরনে কীভাবে পরিবর্তন ঘটছে, সেই বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ওবামা আগ্রহী। তবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছাড়ার পর তাঁর গণমাধ্যম ব্যবসায় যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। সাকির ওই বক্তব্য ছিল শুক্রবার মিক নিউজ সাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের প্রতিক্রিয়া। এটি লিখেছিল, বিদায়ী প্রেসিডেন্ট শিগগিরই ‘নিজস্ব মিডিয়া কোম্পানি খুলে’ ডিজিটাল গণমাধ্যমের ব্যবসা শুরুর চিন্তাভাবনা করছেন।
সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার চলাকালে যেভাবে তথ্য প্রচার ও তার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল, তা নিয়ে ওবামা উদ্বেগ জানিয়ে বলেছিলেন, এখনকার গণমাধ্যমের পরিবেশ এমন যে কখনো মনে হয় সবকিছুই সত্যি আবার কখনো মনে হয় কোনো কিছুই সত্যি নয়। হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর কী করবেন—জিজ্ঞেস করলে ওবামা বলেন, তিনি একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়তে চান। সেখানে আগামী দিনের নেতাদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতায়নের দিকনির্দেশনা দিতে চান। হবু প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছেও নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন ওবামা। বলেছেন, ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব হস্তান্তরের পর তিনি কয়েক সপ্তাহ ঘুমাবেন, আর স্ত্রীকে নিয়ে চমৎকার একটা ছুটি কাটাতে যাবেন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে নিজের প্রথম বছর কেমন ছিল, তা জানিয়ে একটা বইও লিখতে চান ওবামা।

পার্ক গিউনের দ্রুত পদত্যাগের দাবি, ব্লু হাউসের কাছে বিক্ষুব্ধ জনস্রোত

বিক্ষোভ : দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হির
পদত্যাগের দাবিতে দেশটির রাজধানী সিউল শহরের
কেন্দ্রস্থলে বিক্ষোভ। লোকজনের হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা: ‘পার্ক
গিউন-হিকে গ্রেপ্তার ক​েরা’। গতকালের ছবি। রয়টার্স
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন হির দ্রুত পদত্যাগের দাবিতে গতকাল শনিবার টানা ষষ্ঠ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সিউলে বিক্ষোভ করেছে লাখো মানুষ। এর আগের দিন বিরোধী তিন দল প্রেসিডেন্ট পার্ককে অভিশংসনের জন্য পার্লামেন্টে বিল উত্থাপন করে। সিউলে গতকাল বিক্ষুব্ধ জনতা প্রেসিডেন্টের বাসভবন ব্লু হাউসের প্রায় ১০০ মিটারের মধ্যে চলে চায়। তারা জনগণের উদ্দেশে প্রেসিডেন্টের দেওয়া তৃতীয় ক্ষমাপ্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করে এবং তাঁর দ্রুত পদত্যাগের দাবি জানায়। কীভাবে ও কখন প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করবেন, তার সময়সীমাও পার্লামেন্টকে বেঁধে দিতে বলে বিক্ষুব্ধ জনতা।
প্রেসিডেন্ট পার্কের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য বন্ধু ছই ছন শেকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার সুযোগ দিয়েছেন। সরকারের কাজে প্রেসিডেন্টের বন্ধুর হস্তক্ষেপের অভিযোগে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পার্লামেন্টে তোলা অভিশংসন বিলে বলা হয়, প্রভাব-সংক্রান্ত কেলেঙ্কারিতে প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন সংবিধান ও দণ্ডবিধির আইন লঙ্ঘন করেছেন। এই বিলে সই করেছেন ৩০০ আসনবিশিষ্ট দক্ষিণ কোরিয়ার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ১৭১ জন আইনপ্রণেতা। প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন দক্ষিণ কোরিয়ায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম কোনো নেতা, যিনি কেলেঙ্কারির ঘটনায় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ক্ষমতাচ্যুত হতে চলেছেন।

গন্তব্যে কাস্ত্রোর দেহভস্ম

প্রিয় নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর
আদলে এক ভক্ত শিশু। ​এএফপি
কিউবার বিপ্লবী নেতা প্রয়াত ফিদেল কাস্ত্রোর দেহভস্মাধার দীর্ঘ যাত্রা শেষে গতকাল শনিবার সান্তিয়াগো দ্য ক্যুবা শহরে পৌঁছেছে। এ শহর থেকেই কাস্ত্রো বিপ্লব শুরু করেছিলেন। নয় দিনের শোক পালন শেষে আজ রোববার কাস্ত্রোর দেহভস্ম আনুষ্ঠানিকভাবে সান্তা ইফিগেনিয়া সমাধিক্ষেত্রে সমাহিত করা হবে। এ সমাধিতেই ১৯ শতকের স্বাধীনতার নায়ক হোসে মার্তিকে সমাহিত করা হয়। রাজধানী হাভানার রেভল্যুশন স্কয়ারে আজই আরেকটি শোকসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন বিদেশি অতিথিরা। গত ২৮ নভেম্বর এই স্কয়ারে এক শোকসভা থেকে কাস্ত্রোর ভস্মাধার কিউবার বিভিন্ন প্রান্তে বয়ে নিয়ে যাওয়া শুরু হয়। ১৯৫৯ সালের বিপ্লবে কাস্ত্রোর গেরিলা বাহিনী যে পথে হাভানা পৌঁছেছিল, তার উল্টো পথ অনুসরণ করে দেহভস্ম। জাতীয় পতাকা মোড়ানো এই ভস্মাধার গত বুধবার হাভানা অতিক্রম করে। সে সময় রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে লোকজন ‘আমি ফিদেল!’ বলে স্লোগান দেন।
গতকাল শেষ গন্তব্যস্থল সান্তিয়াগো দ্য ক্যুবা শহরে পৌঁছানোর আগে ভস্মাধারটি প্রতিদিন কিউবাবাসীর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য বিভিন্ন স্থানে যাত্রাবিরতি করে। গতকাল সন্ধ্যায় সান্তিয়াগো দ্য ক্যুবা শহরে কাস্ত্রোর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক বড় স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে এ সভায় ফিদেলের ভাই ও কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বক্তৃতা করার কথা রয়েছে। ফিদেলের অসুস্থতার পর ২০০৬ সালে তাঁর কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন রাউল।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ভারতে

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক
উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ। এএফপি
দুই দেশের উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা সারতাজ আজিজ শনিবার রাতে ভারতের অমৃতসরে পৌঁছেছেন। হার্ট অব এশিয়া সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে গেলেন তিনি। ওই সম্মেলনের ফাঁকে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা হবে কিনা—এমন জল্পনাকল্পনা রয়েছে। সম্মেলনে যোগ দিতে সারতাজ আজিজের রোববার ভারতে পৌঁছানোর কথা ছিল। কিন্তু এর একদিন আগেই তিনি চলে গেলেন। তবে ওই সম্মেলনের ফাঁকে ভারত-পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবে কিনা—সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অসুস্থ সুষমা স্বরাজকে ফুল পাঠিয়ে তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন সারতাজ আজিজ। কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত সুষমা স্বরাজের চিকিৎসা চলছে।
তিনি হার্ট অব এশিয়া সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ওই সম্মেলনে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকা সারতাজ আজিজ অমৃতসর বিমানবন্দরে পৌঁছালে হাইকমিশনার আবদুল বাসিত তাঁকে স্বাগত জানান। গত বছর ইসলামাবাদে হার্ট অব এশিয়া সম্মেলনে পাকিস্তান ও ভারত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছিল। ওই বৈঠকে অমীমাংসিত ইস্যু নিয়ে ‘পূর্ণাঙ্গ দ্বিপক্ষীয় আলোচনা’ শুরু করার বিষয়ে দুই দেশই একমত হয়। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাঠানকোটে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটলে ওই আলোচনা আর পুনরায় শুরু হয়নি। ওই হামলার পর থেকে কাশ্মীর সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে পাকিস্তানের হাইকমিশনার আবদুল বাসিত বলেছিলেন, ভারত যদি প্রস্তুত থাকে তবে নিঃশর্ত আলোচনা শুরুর জন্য পাকিস্তান প্রস্তুত। তবে ভারত ইতিমধ্যেই এটা পরিষ্কার করেছে যে, সীমান্তে চলমান সন্ত্রাস তারা আর মেনে নেবে না।

ক্যালিফোর্নিয়ায় আগুনে ৯ জনের মৃত্যু

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে সান ফ্রান্সিসকোর অদূরে ওকল্যান্ডে একটি ক্লাবে অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ বিবিসিকে জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে অকল্যান্ডের ওই ক্লাবে আগুন লাগে। ক্লাবটিতে কনসার্ট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল। ওই ইভেন্টের ফেসবুক পেজের তথ্য অনুযায়ী বেশ কয়েকজন লোক নিখোঁজ রয়েছেন।
স্থানীয় সম্প্রচার মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কমপক্ষে ১৩ জন নিখোঁজ রয়েছেন। একটি সম্প্রচার মাধ্যম জানিয়েছে, প্রায় ৫০ জন লোক ভবনের ভেতরে ছিলেন। সামাজিক গণমাধ্যমগুলোতে অগ্নিকাণ্ড নির্বাপণ বিভাগের দেওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, ওই ভবনের ছাদে আগুন জ্বলছে। তিনটি ইউনিট আগুন নেভানোর কাজ করছে।

দর্শককে শ্রদ্ধা না করুন, দয়া করুন, জনাব

টিপু সুলতান ধারাবাহিকের এক​টি দৃশ্য
সংসারের সুখের জন্য দুইখানা জিনিস লাগবেই। পয়লায় চুলা, দোসরায় হলো টেলিভিশন। এক জরিপে দেখা গেছে, টেলিভিশনের কারণে স্বামী-স্ত্রীতে কথা হয় কম; তাই ঝগড়াও হয় কম। কনেপক্ষও আগে সংসারের সুখ কামনায় মেয়ের সঙ্গে একখানা টেলিভিশন দিয়ে দিত। কিন্তু সেটা বিটিভির আমল; যখন দর্শক ছিল একমুখী। সেটা ছিল এক দেশ, এক পরিবার, এক টেলিভিশন—এক ও অভিন্নজাতীয় দর্শক।
সে আমলে টেলিভিশন ছিল পরিবারের প্রধান ‘ব্যক্তি’। তাকে ঘিরে সবাই বসে থাকত। অতিথি এলেও বসানো হতো টিভি রাখার ঘরেই। কিন্তু সে দিন আর নেই। এখন চ্যানেল বহু আর দর্শকও বহুমুখী। ফলে টিভির রিমোটের দখল নিয়ে সংসারে অশান্তিও বেড়েছে। স্ত্রী স্টার জলসা দেখবেন বলে স্বামী খেলা বা টক শো উপভোগ করতে পারছেন না। সন্তানদেরও রয়েছে নিজস্ব পছন্দ। যাঁরা পারেন, প্রত্যেকের জন্য আলাদা টিভিসহ ঘরের ব্যবস্থা করে গৃহযুদ্ধ থামান। কিন্তু যাঁদের সে উপায় নেই, তাঁদের টেলিভিশন আর জীবন এক হয়ে যায়। যখন টিভিতে চলে হিন্দি সিরিয়ালের কূটনামির গৃহদাহ, তখন বঞ্চিত দর্শক বাস্তবেই গৃহদাহ চালু করেন। একসময় সংসার সুখের হতো যে টিভির গুণে, এখন সেটাই অশান্তির কারণ। টিভি দেখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীতে বিবাহবিচ্ছেদ থেকে শুরু করে গ্রামবাসীর মধ্যে মারামারির ঘটনাও শোনা যায়। বিনোদন, অবসর, সংস্কৃতিচর্চা—সবই যখন টিভিকেন্দ্রিক, তখন টিভিতে কী দেখায় বনাম কী দেখতে চাই, তা অবশ্যই বিতর্কের বিষয়। সম্প্রতি এই গৃহদাহ জাতীয় স্তরে উঠে এসেছে।
দেশের টেলিভিশনের শিল্পী ও কলাকুশলীদের বড় অংশটাই হঠাৎ ‘অস্তিত্ব’সচেতন হয়ে উঠলেন এবং জেগে উঠে দেখতে পেলেন সে অস্তিত্বের সামনে বেজায় বিপদ। তাঁরা নাটক করেন ও বানান বটে, কিন্তু দর্শক তাঁদের নিচ্ছে না। দর্শক নিচ্ছে বাংলায় তরজমা করা বিদেশি সিরিয়াল। সুলতান সুলেইমান নামের এক তুর্কি সিরিয়ালের বাংলা ‘ডাবিং’ প্রচার করে একটি চ্যানেল লাভবান হয়ে গেল। দেখাদেখি আরও আরও চ্যানেল সেই পথ ধরল। আসলেই তো সর্বনাশ। সব দেশি চ্যানেলে যদি বিদেশি ধারাবাহিক চলে, তাহলে দেশের কালচার ইন্ডাস্ট্রির তো বেকার হওয়ার জোগাড়! কিন্তু আসলেই কি তাই? রাধা দিনে থাকত ঘরে, সন্ধ্যার পর চলে যেত অভিসারে। তেমনি আমাদের অধিকাংশ দর্শক সন্ধ্যা হলেই পরবাসী হতেন। শরীর ঘরে থাকলেও মন চলে যেত অজস্র হিন্দি চ্যানেলের সিরিয়াল, শো, সিনেমা ইত্যাদিতে। এভাবে আকাশ-সংস্কৃতির যুগে বিনোদনের আকাশপথ আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। যে পথে দর্শক, বিজ্ঞাপনও সে পথেই যাবে। প্রায় এক হাজার কোটি টাকার বিজ্ঞাপন–বাণিজ্যের চার শ কোটিই এখন ওই সব বিদেশি চ্যানেলের খোরাক। এদিকে ঘরে ঘরেও চালু হলো হিন্দি বুলি। অনেকে বললেন, হিন্দি সিরিয়ালগুলোর কুটিল কাহিনি সংসারের বিষ।
রিয়েলিটি শোর খোলামেলা নাচ–গান আর শিশুদের দিয়ে অশিশুসুলভ তরল বিনোদন আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে গরল করে ফেলছে। আজকাল শিশু-কিশোর-যুবাদের আড্ডার ভাষাও দেখা যায় হিন্দি। একজন বিদেশি বাংলাদেশে বসে এসব অনুষ্ঠান দেখে ভেবে বসলেন, এটাই আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি! বিশ্বায়নের যুগে সংস্কৃতি যেমন বাজার, তেমনি রাজনীতিরও ময়দান। পাকিস্তান আমলে বাংলার জান-মান-অধিকারের লড়াইটা সংস্কৃতির জমিনেই শুরু হয়। সংস্কৃতি পণ্যও বটে। টেলিভিশনের রয়েছে পণ্যে আসক্ত করার মারাত্মক ক্ষমতা। বিশ্বে মার্কিন প্রাধান্য জারি রাখায় হলিউড খুব কাজে লাগে। একই ভূমিকা বলিউডেরও। এই হুমকি নিয়ে আজকের সরব শিল্পীসমাজ বরাবরই নীরব। তাঁদের দুশ্চিন্তা নিজেদের পেশাগত অস্তিত্ব নিয়ে। হিন্দি চ্যানেলই তাঁদের দর্শকহারা করলেও সে ব্যাপারে এখনো তাঁদের রা নেই। মন টানে না এমন অযত্নে বানানো জিনিস মানুষ দেখবে কেন? দেশে প্রতিভাবান শিল্পী, অভিনেতা, গায়ক, সুরকার—সবই আছে। তাঁরাই হতে পারতেন উপযুক্ত বিনিয়োগ। বিশ্বায়নের খোলাবাজারের দিলখোলা হাওয়ার মধ্যে প্রতিযোগিতা ছাড়া উপায় কই? কিন্তু একশ্রেণির টিভি কর্তৃপক্ষ, বিজ্ঞাপন এজেন্সি ও শিল্প-সওদাগরের কারণে আমরা সোনা ফেলে রাংতার কারবার করে করে বিনা যুদ্ধেই বিনোদনের আকাশ ছেড়ে দিচ্ছিলাম। তারই ফল বিদেশি কালচার-ইন্ডাস্ট্রির হাতে দেশীয় কালচার ইন্ডাস্ট্রির পরাজয়। সারা ভারত না হয় বাদই দিলাম, ভারতের বাংলাভাষী তিনটি রাজ্যেও কেন আমরা আমাদের চ্যানেল দেখাতে পারি না? যেখানে মাত্র দেড় লাখ টাকা ফি দিয়ে যেকোনো ভারতীয় চ্যানেল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ঢুকতে পারে, সেখানে বাংলাদেশি চ্যানেলের জন্য তারা ফি ধার্য করেছে পাঁচ কোটি টাকা?
আমাদের শাকিব খান, আমাদের সালমা, আমাদের মোশাররফ করিম তো কলকাতায় জনপ্রিয়। আমাদের জেমসসহ আরও আরও শিল্পী বলিউডে গিয়ে গান শোনান। অবরুদ্ধ রাখার পরও সেখানে আমাদের দর্শক-শ্রোতা আছে। ঢাকার নাটকের খুব কদর ছিল কলকাতায়। কিন্তু আমাদের সরকার ভারতে আমাদের বিনোদন-শিল্পের বাজার তৈরিতে কিছু করেনি। আগে এটা নিয়েই তো কথা বলা দরকার ছিল, তাই না? দরকার ছিল হুঁশ ফেরানোর। যেমন খুশি তেমন জিনিস দেব, দর্শক তা গিলবে কেন? রিমোট কন্ট্রোল হাতে চ্যানেল পাল্টানোর ওইটুকু স্বাধীনতা দর্শক ছাড়বে কেন? এরই মধ্যে বাংলায় ডাব করা তুর্কি সিরিয়াল সুলতান সুলেইমান অন্তত দর্শকদের দেশি ভাষা ও দেশি চ্যানেলে টেনে এনেছিল। কিন্তু এটাও সমাধান নয়। একযোগে সব চ্যানেলে ডাব করা বিদেশি চ্যানেল চলতে পারে না। মানের বাছাই লাগবে; সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের বিচার লাগবে। এর জন্য নীতিমালা লাগবে। আমরা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে নই, উদার ও সৃষ্টিশীল নীতিমালার পক্ষে। বিষয়টা গুরুতর। কেননা, বেশির ভাগ মানুষ ভূত-ভবিষ্যৎ দেখে না, টেলিভিশন দেখে। আমরা কি বই অনুবাদের বিপক্ষে? তাহলে চলচ্চিত্র বা নাটক অনুবাদের বিপক্ষে থাকব কেন? আমাদের শিল্পীরাই কি মঞ্চনাটকে বিদেশি নাটকের অনুবাদ সংলাপে অভিনয় করেন না?
আমাদের টেলিভিশনেই কি জনপ্রিয় ম্যাকগাইভার, আলিফ লায়লা, টিপু সুলতান-এর চেয়ে জনপ্রিয় হয়নি হূমায়ুন আহমেদের সমস্ত নাটক? আমরাই কি সৃষ্টি করিনি ‘নতুন কুড়ি’র মতো অসাধারণ রিয়েলিটি শো? দর্শক মাত করা ‘ইত্যাদি’ কিংবা আজকের আয়নাবাজি সিনেমাই প্রমাণ, ভালো কাজের স্বীকৃতি আছে। শিশুদের জন্য ‘মিনা কার্টুন’ কি বাংলায় ডাব করে দেখানো ভালো হয়নি? একসময় সপ্তাহের প্রতিটি দিন একটা না একটা মনকাড়া অনুষ্ঠান ছিলই দেশি টিভিতে। বিদেশি অনুষ্ঠানের সঙ্গে দেশের মেধাবী পরিচালকদের মধ্যে এমন প্রতিযোগিতার দিনগুলোতে দর্শকদের সন্ধ্যার সময়টা সুন্দর কাটত। মূল সমস্যা দেশি চ্যানেলের সঙ্গে বিদেশি চ্যানেলের। মূল সমস্যা নাট্যকার, স্ক্রিপ্ট লেখক ও শিল্পীদের যথাযথ বাজেট দিতে কৃপণতা করার। মূল সমস্যা বিজ্ঞাপনের কাঠি হাতে শিল্পীদের ফরমাশ দেওয়ার মানসিকতার। মূল সমস্যা প্রতিভা, নিষ্ঠা ও গবেষণার অভাব। টিভিগুলো অল্প বিনিয়োগে বেশি ব্যবসা করতে চাইলে তো হবে না। আমাদের বিনোদনজগৎ কি নতুন বাস্তবতায় কী দেখাতে হবে এবং কী কীভাবে দেখানো যায়, তা নিয়ে সত্যিকারভাবে ভেবেছে?
দর্শককে দয়া করুন, দর্শক আপনাদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সমৃদ্ধি—সব দেবে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com