Thursday, October 14, 2010

গল্প- 'গাদি' by ইফফাত আরেফীন তন্বী

বিকাশপর্ব
খেলার নাম জানতাম, গাদি … এর নিশ্চিত শ্রবণপ্রিয় কোনো নাম আছে। নামটা শুনেছিও, কিন্তু মনে করতে পারছি না। এই মনে না-করাটা প্রায়শই ঘটে। আর এই মনে-না-করতে-পারাটা অবধারিতভাবে কথক যে, তাকে সময়বদ্ধতা থেকে মুক্তি দেয়, ’বর্তমান’, ‘অতীত’, সাথে ’আনুমানিক ভবিষ্যৎ’ বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে একটা একটা ঘটনারূপে তৈরি করে, এবং কথক সেইসকল ঘটনাকে সত্যি বলে ধরে নেয়।

ঘটনা এক.
ছোট্টবেলা মল্লিকা নামে প্রতিবেশী বন্ধুটি স্বীয় দাসী মোমেনার পাঁচ টাকা চুরি করে মেরী বিস্কুট কিনে খেয়েছিল।

ঘটনা দুই.
সিঁড়িতে পড়ে থাকা কথকের ত্রিশ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে যায় বুয়া।

ঘটনা তিন.
ঘটনা তিন অবধারিত ভাবে কোনো ’আনুমানিক ভবিষ্যৎ’-এর, কথক এই স্থানে আসার পরে যে ঘটনাটি ঘটে- যার নাম “স্মৃতিভ্রংশ”। স্মৃতিভ্রংশ?

১.
শুরুটা ছিল আসলে গাদি খেলা… ছোটবেলা যখন গাদি খেলতে যেত… কথক ‘দুধভাত’ হত, প্রায়শই ‘দুধভাত’ শব্দটি তার মুখে একটি করে চড় মারত — লজ্জা, অপমান, ঘৃণা সেই ছোট্টবেলাতেই ভর করেছিল তাকে। তবু প্রায় প্রতিদিন বিকালে দলভাগাভাগির সময় কারো সাথে জোড় বেঁধে নাম পাতিয়ে আসতা — দুইজন রাজার সামনে দাঁড়িয়ে বলতো — “রোদ নেবে না বৃষ্টি নেবে?” কোনো রাজাই বৃষ্টি চাইত না, রোদ চাইত শুধু।

১.
শিথানে রোদ্দুর নিয়ে ‘বার্ড অভ হেভেন’ হাঁটে। পার হয়ে যায় লালমাটি… পরনের ডেনিম জিন্সটা ঘষে-যাওয়া কালো। হঠাৎ মনে পড়ে যায় গ্যালারি চিত্রকে একটা ছবি বাঁধাতে দেওয়া, কেরোসিন কাঠের ফ্রেমটাকে কালো রঙে ঘষে দিতে বলেছে। হঠাৎ চিন্তায় পড়ে, ভিতরের বহুবর্ণা কি বাঁধা পড়বে এ-ঘষা-কালোয়… কী জানি!

তার ভাবতে ভালো লাগে এই বহুবর্ণা থেকে ঘটবে বিচ্ছুরণ। আলো আর আলো। সকল আলোর হর্ষশক্তিতে তার নৈর্ঋতে সৃজন হবে আলোকঘূর্ণি, তার ওপারেই তার কাক্সিক্ষত ভবিষ্যৎ অথবা না-পাওয়া অতীত, যেখানে বিস্মৃত তোতুল পাখির সকল পূর্বপ্রমের অভিজ্ঞান। কথক আসলে ‘বার্ড অভ হেভেন’-কে এছাড়া অন্য কিছু ভাবতে পারে না।

২.
গাদি খেলায় তার একটামাত্র চাওয়া ছিল সে যেন দেখাতে পারে নৈপুণ্য। সকলের কাছে হয়ে পড়ে প্রয়োজনীয় খেলোয়াড়।

শীতের শুরুতে পাড়ার সদ্য-প্রেমে-পড়া তরুণেরা ব্যাডমিন্টনের ছঁক কাটে, সন্ধ্যার পর আলো জ্বেলে খেলা। সেই ছঁকে গোধূলিপূর্ব গাদি খেলা, তাদের দলে যে-খেলোয়াড় সবচেয়ে চমকের সাথে প্রতিপক্ষকে ছুঁয়ে দেয়, তার কদরই থাকে বেশি।

একদিন যারা ’আরাধ্য খেলোয়ার’ তাদের ইচ্ছে জাগে স্বাদ বদলের… এ যেন রাজা-মহারাজার শখ করে এক আধদিন ভর্তা খাওয়া, যেন বিল গেটস-এর তেজগাঁ বস্তি ভ্রমণ, শখ করে ওদের পিঁড়িতে বসা; আর তাতেই বর্তে যেত কথক।

সেদিন যে-খেলাটি হত তার নাম ঝুমুর ঝুমুর।

২.
‘বার্ড অভ হেভেন’ রোদ্দুর শিথানে, কত শতমূল অথবা কালমেঘ দলে লাল মাটিতে, ঘষা কালো ডেনিমটি এক নতুন চেহারা নেয়।

নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়, যেন সে ‘চে’, তার সাইকেল নেই, আছে পা। এইভাবে সে যেন কোনো রেভুলেশনের অভিমুখে। ‘চে’ থেকে সে হয়ে যায় ‘অর্জুন’, ‘পার্থ’। যে-অরণ্যে সে, তার স্থপতি একদল বোটানিস্ট। ‘বার্ড অভ হেভেন’ আজ তবে এ-অরণ্যের পার্থ।

জিনে-ধরা চাঁদটি হয়ে যায় তার ভবিষ্যৎ। সে এইখানে অপেক্ষা করে চিত্রাঙ্গদার…
একটি তরুণ দুর্গসদৃশ আবাসে বহুর মধ্যে এক, অনন্যা তোতুল পাখিকে মনে হয় দ্রৌপদী। এ যেন দ্রৌপদীর যুধিষ্ঠির কাল…
পার্থ ঈর্ষায় জ্বলে মাতোয়ারা হয় চিত্রাঙ্গদার সমীপে…
একেশিয়া বৃক্ষের আড়াল হতে কটা চুলের চিত্রঙ্গদা আবির্ভূত হন।

৩.
সেইসব স্বাদবদলের দিনে খেলা চলত ঝুমুর ঝুমুর…
যে চোর সে বলত ‘ঝুমুর ঝুমুর আটষটির পাতা’

কথক দৌড়াত –

ঝুমুর ঝুমুর আটষটির পাতা
ঝুমুর ঝুমুর আটষটির পাতা
ঝুমুর ঝুমুর আটষটির পাতা
ঝুমুর ঝুমুর আটষটির পাতা
ঝুমুর ঝুমুর আটষটির পাতা
ঝুমুর ঝুমুর আটষটির পাতা
ঝুমুর ঝুমুর আটষটির পাতা

বোকা কথক সবাইকে দেবার পর ছোট্ট গাছটি পত্রশূন্য , ওর ঘরে পৌঁছাত পত্রহীন একটি শাখা। আর সেই সাথে ওর জন্য জড়ো হত অভিশাপ।

তারপর আবার — ’ঝুমুর ঝুমুর বিষফল পাতা’

দৌড় দৌড় দৌড় দৌড়

ঝুমুর ঝুমুর বিষফল পাতা
ঝুমুর ঝুমুর বিষফল পাতা
ঝুমুর ঝুমুর বিষফল পাতা
ঝুমুর ঝুমুর বিষফল পাতা
ঝুমুর ঝুমুর বিষফল পাতা
ঝুমুর ঝুমুর বিষফল পাতা

বংশবৃদ্ধির কালে ঝুমুর ঝুমুরের দল গাছটিকে পত্রহীন ফলহীন করে তুলল, পক্ষকাল পরে মৃত্যু হল গাছটির! অভিশাপ জমা হল কথকের থলিতে…
বোকাটা এত বেশি গাছ চিনত!
দূর ভবিষ্যতে বনজ নামক পুস্তকে খুঁজে পায় বিষফলের অস্তিত্ব, অন্য নামে: ’সর্পগন্ধা’।
এতকাল পরে দু’চোখ উজাড় করে কাঁদে সে।

আবার পূর্বের স্বাদে ফিরে যায় গাদি খেলায়।
রাজা যে, সে দাঁড়ায় ভার্টিকাল লাইনে, মন্ত্রী হরাইজন্টাল ওয়ানে, সেনাপতি হরাইজন্টাল টুতে, প্রধান পারিষদ হরাইজেন্টাল থ্রিতে। প্রতিপক্ষ প্রথম কক্ষে বন্দী… ইতিউতি সুযোগ খোঁজে ঘর গলে বের হবার, এইখানে ওইখানে চুক্কি কাটে। কথকদের রাজা মন্ত্রী সেনাপতি আর যে সাধারণ প্রজা, কেউ একজন গলে বেরিয়ে যায়…

সামনে হরাইজেন্টাল টু।
এদিক ওদিক দৌড় দৌড়… এর এক গুপ্তমন্ত্র আছে- এক লাইনে দৌড়ে দৌড়ে ক্লান্ত করে দাও সেনাপতিকে।
এদিক… … ওদিক… … এদিক… … ওদিক… …
এদিক… … ওদিক… … এদিক … … ওদিক… …
কথকদের যে রাজা, সে ঢুকে পড়ে গাদি কক্ষে, আর অমনি হরাইজন্টাল ওয়ান তাকে আটকে ফ্যালে।

৩.
‘বার্ড অভ হেভেন’ যে পার্থ, অপেক্ষা করে চিত্রাঙ্গদার নিবেদনের… আসে না আসে না আসে না… অহং জ্বলে ওঠে মাথার মধ্যে।
যেন ক্রোমায় চলতে থাকে দ্রৌপদীর যুধিষ্ঠির কালের চিত্রাবলী।
কোনো আসরে যুধিষ্টির চুম্বন করেছিল দ্রৌপদীর চাঁপাকলা-সদৃশ আঙুল। আহ!
সবকিছু মিথ্যা মনে হয়… চিত্রাঙ্গদার কোমরে তীব্র লাথি পড়ে, তার ফিফথ অ্যাভিনিউর লালমাটিমাখা ছাপচিত্র কী মনোহর! চিত্রাঙ্গদা পড়ে যায়, আহ্…
আর আমু না গো মামু আমারে ছাইড়া দাও… আর পাতা টোকামু না…
ঘাসের ভিতর মুখ ডুবিয়ে চিত্রাঙ্গদা প্রতিজ্ঞা করে, মুখটি দেখা যায় না…
ওর কটা চুলগুলো হঠাৎ… ওর চুলগুলো যেন হয়ে যায় ভুট্টাখেত, ভেতর থেকে উকুনগুলি উঁকি দেয়। কী বিকট কী বীভৎস! সে স্পষ্ট দেখতে পায় ওরা কটাক্ষ করছে, ম্পষ্ট শুনতে পায় দ্রৌপদী আর ভীমের রতিবর্ণনা
‘বার্ড অভ হেভেন’ কিন্তু চিত্রাঙ্গদাকে মারতে চায়নি, কেবল উকুনগুলোর মুখ বন্ধ করতে ওর ফিফথ অ্যাভিনিউ দিয়ে জোরসে ঘাসের মধ্যে গুঁড়িয়ে দিয়েঝে উকুনের আবাস।

৪.
রাজা মন্ত্রী সেনাপতি সকলে একে একে সকল কক্ষ পার হয়ে আসে।
আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, এইবার এইবার হবে গাদি…
কী তীব্র উত্তেজনা… কথক পাড়ি দিয়ে এসেছে সকল কক্ষ…
যে পারবে দিতে গাদি… আজ এ-যুদ্ধের জয়মাল্য হবে তার…

গাদির ছঁক থেকে তাদের ছাদটা দেখা যায়। মা’কে হাঁটতে দ্যাখে সে, দূর থেকে মা হাসে, বড্ড দূরের মনে হয় তাকে। আজ এই জিনে-ধরা চাঁদের সামনে বসে সে আবিষ্কার করে ঠিক কবে সৃজন হয়েছে এই দুরত্বের… কথক তখন কেজি ক্লাসে… ফুলের বাগান শোভিত এক বাড়ির রঙপেন্সিল-আঁকা ছবি আনে ওর প্রিয় বন্ধু। যেন হাতের মুঠোয় স্বর্গ। শত অনুনয়ের পর অরূপচিত্রের সাথে রাত্রিযাপনের অধিকার পেল সে- শর্ত, ‘ফিরিয়ে দিতে হবে পরেরদিন প্রথম পিরিয়ডে। গৃহে প্রদর্শনীর পর বইয়ের বাকশে রেখে দেয় সযতন অহংকারে।

- পি ইউ টি পুট
- সি ইউ টি কাট
- না মা, সি ইউ টি কুট
- না কাট
- না কুট
- না
- না কেন? কেন?
- এত কথা না, এটাই নিয়ম
- কেন নিয়ম বলতে হবে
- সময় নস্ট কোরো না, পড়ো
- না পড়বো না… না… না… না…

মা সহ্য করেন না এই অবাধ্যতা, গায়ে হাত তুললে… না… না…। মা তখন বক্সের নীচ থেকে ছবিটা বের করে টুকরো টুকরো করে ছেঁড়েন।

হায় জিনে-ধরা চাঁদ! কথক ভাবে, স্বীয় রাজ্য হারিয়ে কোনো রাজা কি এতটা হেঁট হয়েছিল, বন্ধুর কাছে যতটা হয়েছিল ছোট্ট কথক? আজ অবধি আর উঁচু হল না মাথাটা।

৪.
উকুনগুলোকে মাড়ানোর পর ‘বার্ড অভ হেভেন’ -এর মনে হয় সে তো তোতুল পাখির জন্য বাদলদিনের প্রথম কদমফুল খুঁজতে এসেছে…
কদম না… সে পায় অশোক। আগুনধরা সে-ফুল। হাতে আগুন নিয়ে ফেরার পথে বারোমাইসা কদম গাছে একটি ফুল মেলে…
‘বার্ড অফ হেভেন’ ডেনিমে কাদা নিয়ে, হাতে অশোক কদম নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছয় একেশিয়া-তলে, সেখানে গরম চায়ের কাপে চুমু খাচ্ছে তোতুল পাখি।
কী অসম্ভব সুন্দর একটা দিনের শুরু হয়!

অসমপর্ব

বোকা কথকটি হরাইজন্টাল ওয়ানের পাশে বসে ছাদের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল সেই ছিঁড়ে-ফেলা ছবির কথা।
সেনাপতি, রাজা ও অন্যরা সকলে আটকে পড়েছে হরাইজন্টাল টু-থ্রির মাঝে, সেখানে ভার্টিকালও বন্ধ।
কথক ছাদে তাকায়… কী চমৎকার বেগুনি শাড়ি উড়িয়ে মা হাঁটছে! হঠাৎ দেখতে পায়, ওর মায়ের হাতে সেই আকাঁ ছবিটা টুকরো টুকরো ঝরে পড়ছে… ছেঁড়া টুকরোগুলিরর মাঝে মা ডুবে যাচ্ছে… ডুবে যাচ্ছে…

অপর পক্ষীয় মন্ত্রী হরাইজন্টাল ওয়ানের অপর প্রান্ত থেকে বেড়ালের মতো ধীর পায়ে এসে ছুঁয়ে দেয় কথককে। ওরা পরাজিত হয়। কথকের মাথা হেঁট হয় আবার।

সর্বশেষ সংবাদ: কে বা কারা চিত্রা নামের একটি শিশুকে লালমাটিতে মুখ চেপে শ্বাস রোধ করে হত্যা করেছে।
===========================
ইফফাত আরেফীন তন্বী
জন্ম
যশোর ২৬/৪/১৯৭৯
tanwi13@yahoo.com

পেশা
পাণ্ডুলিপি রচনা

মূল আগ্রহ পড়া। লেখালেখির প্রতি আগ্রহের জন্য জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্বকে (পাণ্ডুলিপি রচনা) প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিষয় হিসেবে বেছে নেওয়া। কিন্তু মূল প্রস্তুতি শৈশবে মাতামহের অবেক্ষনে ।

লেখালেখির জন্য সর্বত্র উৎসাহ দিতেন বাংলা নাটকের মহাকবি সেলিম আল দীন ও বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা সেলিম।

এছাড়া আইকনস নামের একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক (জীবনযাত্রা বিষয়ক)।
=============================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম   গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান  গল্প- ‘অপঘাতে মৃত্যু’ ও ‘সাদামাটা’ by লীসা গাজী   গল্প- 'দ্বিতীয় জীবন' by ইরাজ আহমেদ  গল্প- 'পুষ্পের মঞ্জিল' by সাগুফতা শারমীন তানিয়া   গল্প- 'একশ ছেচল্লিশ টাকার গল্প' by কৌশিক আহমেদ  গল্প- 'একে আমরা কাকতালীয় বলতে পারি' by মঈনুল আহসান..   গল্প 'গহ্বর' by জাহিদ হায়দার    গল্প- 'পুরির গল্প' by ইমরুল হাসান  গল্প- 'নওমির এক প্রহর' by সাইমুম পারভেজ  গল্প- 'মরিবার হলো তার সাধ' by আহমাদ মোস্তফা কামাল   গল্প- 'নিষুপ্ত শেকড়' by নিরমিন শিমেল   গল্প- 'লাল ব্যাসার্ধ্ব' by শামীমা বিনতে রহমান  গল্প- 'সেদিন বৃষ্টি ছিল' by মৃদুল আহমেদ   ক. কিছুদিন হয় সেই নগরে কোন বৃষ্টি হচ্ছিল না। কিছুদ.. গল্প- 'তুষার-ধবল' by সায়েমা খাতুন  গল্প- 'কোষা' by পাপড়ি রহমান  গল্প- 'কর্কট' by রাশিদা সুলতানা   গল্প- 'তিতা মিঞার জঙ্গনামা' by অদিতি ফাল্গুনী  গল্প- 'সম্পর্ক' by তারিক আল বান্না  গল্প- 'অনেক দিন আগের দিনেরা' by রনি আহম্মেদ

bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ ইফফাত আরেফীন তন্বী


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

গল্প- 'অনেক দিন আগের দিনেরা' by রনি আহম্মেদ

বলা যায় দানেশ স্মৃতির পথে ভাবছিল… গাছের ডালপালার ধাঁধা দিয়ে রোদের ছটাগুলো ঘষামাজা পেতল তীর, বেরিয়ে আসছিল স্থির… তার শৈশবের ফেলে আসা গ্রামের কথা… তীর গেঁথে যাচ্ছিল সামনের ছোট লনটার ছোট ঘাসের গোড়ায়।… সে জানে এবং সে জানে না গ্রামটা ছিল অন্য কোথাও, যেখানে ছিল তার চেয়েও বেশি কোথাও… কাছেই ধাঁধার ভেতর থেকে দাঁড়কাক উঠেছিল ডেকে… বিদ্ধ রোদের দিকে সে তাকালে আশা করা সম্ভব পানি দিয়ে রোদগুলো ধুয়ে সাফ করে দেয়া সম্ভব।… কাকটা যখন ডাকলো তখন সে দেখতে পেলো এবং দুজন দুজনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো।… রোদগুলো প্রায় ধুয়ে আসছে, সবুজ চোখা ঘাসে পানির সাথে মিশে যাওয়া রোদের মিশ্রণ কাঁপছে সোনালী রং-এ। রোদ কেঁপে কেঁপে ধোঁয়াটে অস্বচ্ছতায় উঠে আসছে সেই অন্য গ্রামটা… হঠাৎ কাকটা গাঙচিলের ভঙ্গিতে উড়ে বসেছিল পাশের বাসার শ্যাওলা ধরা কার্নিশে।… সুতরাং চোখ নিঃশব্দে প্রবেশ করে গ্রামের ভেতর।… কাকটা আবার উড়ে বিদায় নিয়েছিল, যা ছিল এক চিলতে মেঘ/এক খণ্ড গ্রানাইট।… রুপালী দীঘিটা, রোদে ঝিকমিক, আকাশে যখন সাদা গর্ত — থাকবে চাঁদ — দীঘিটা হবে তীক্ষ্ণ আরও।… লনের ঘাসে কাঁচা সবুজ ঘাসফড়িং আসে। ফড়িংটার অবস্থান দুর্ভাগ্যপীড়িত — সেও হয়ে যাচ্ছে ঘাস।… চোখের সামনে, চোখের ভেতরে এবং কোথাও নয়, এক ফোঁটা উলঙ্গ ছেলের উপস্থিতি ধরা পড়ে, জটাধারী এবং মাংসের হৃদয় থেকে উঠে আসা তার গায়ের আন্তরিক রং, ইঁদুর ছানার মত লিঙ্গ তার — সে দাঁড়িয়ে পুকুরপাড়ের প্রকাণ্ড পাথরের উপর। পাথরটা কোনো কিছুর প্রতীক্ষায় অনেক দিনে নিজের ভেতর যে কিছুটা জীবন আনেনি অন্যমনস্ক লোক ছাড়া কেউই তা জোর দাবি করবে না। দৃষ্টির আনন্দ দেহে ছড়িয়ে সেই পাথর থেকে/খাঁ খাঁ পাথর থেকে ঝাঁপ দেয় রুপালী দীঘির দৃষ্টিপথে ফলে বাতাস চিৎকার করে এবং সে দীঘি পিঠে সাঁতরে যায় প্রায় আজীবন।… ফড়িংটাকে শনাক্ত করার মত যন্ত্র আর নেই। সে বিনা কারণে পাশের গোল বেতের টেবিলে পড়ে থাকা ধর্মীয় গ্রন্থটি তুলে নেয়।… একসময় ছেলেটি ক্লান্ত হয় ও দীঘি থেকে উঠে আসলে তার শরীরের এসব ওসব বেয়ে পড়তে থাকা পানির ধারার শব্দও শোনা যায়। ছেলেটি এবার গা ঝাড়া দিয়ে কয়েকটি বলশালী মহীষ হয়ে গ্রামের সবুজ ছায়ায় ধূলো উড়িয়ে মুছে যায় এবং তাদের অনুসরণ কাজ শেষে দেখতে হয় প্রান্তর। প্রান্তর দিগন্তের উপরের মেঘগুলো একশোভাগই কাল্পনিক। সে কারণে তাদের প্রকটতা সামান্যও কম নয়।… গ্রন্থটির পাতার লেখাগুলোর প্রতিটি লাইনই অনবরত অসংখ্য দিগন্ত ছাড়া কিছু নয়। মৃদু বাতাসে হাতে মেলে ধরা গ্রন্থটির পাতা উল্টে যাচ্ছিল। দানেশের বিয়েতে তার এক মুসল্লী বন্ধু লিন্ডাকে এটা উপহার দেবার পর, চিরকালই গ্রন্থটি বুকসেল্ফের কোনায় পড়ে থাকার ফলে সামনের ও পেছনের মলাটে অপরিচিত মাছের মোটা আঁশ গজিয়ে ওঠে। কাল রাতে বেশ কিছুটা পরিশ্রমের পর ছোট চাকুটা দিয়ে আঁশগুলো ছাড়ায় দানেশ। এরপর আঁশগুলো বয়েমে ভরে ডীপ ফ্রীজে রেখে দেয়। আঁশবিহীন ভারমুক্ত বইটা পড়বার ইচ্ছা থাকলে দু তিন পেইজ পড়া হয় মাত্র। পুরো মনোযোগ ইদানিং কিছুতেই দেয়া যায় না এবং ব্লুফিল্মেও। লিন্ডা ও সে যখন কোনো রাতে উত্তেজনায় মাত্রা যোগ লোভে ব্লুফিল্ম দেখে তখন দেখা যায় দানেশের মাথার চুলগুলো প্রবল একঘেয়েমিতে লম্বা হতে শুরু করেছে, লম্বা হতে হতে পুরো ঘরটাই একেবারে ঠেঁসে বোঝাই করে ফেলেছে আর লিন্ডা সেই চুলের ভেতর জট পাকিয়ে আত্মমিথুনরত — ব্লুয়ের গ্রুপ সেক্স তখন একটি বৃষ্টিতে ক্ষয়ে যাওয়া ফটোগ্রাফ, ফিল্ম শেষে দানেশের মোলায়েম চুল স্বাভাবিক মাপে ফিরে আসে এবং আত্মমিথুনে ক্লান্ত লিন্ডার ঘর্মাক্ত শরীর জটমুক্ত, দানেশ তখন পারস্পরিক মিথুনের জন্য ঝাপ দেয় সুতরাং এবার ঠঈজ টা বন্ধ করো! রাত জেগে গ্রন্থটি পড়ার চেষ্টা করার জন্য লিন্ডার সাথে বোধহয় কথা কাটাকাটিও হয় কিছুটা। বাতি জ্বালালে লিন্ডার আবার ঘুম আসতে চায় না — মুশকিল।
 
“তুমি টেবিল ল্যাম্প ব্যবহার করলেই তো পারো। আমার ঘুমের সুবিধা হয়।”

“চোখ বন্ধ করে ঘুমাবে।”

একদম হালকা কণ্ঠে দানেশের তামাশা। কিন্তু লিন্ডা ওভার রিঅ্যাকশনে পিঠ ঘুরিয়ে নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই লিন্ডা চমকে দিয়ে খিল করে হেসে ওঠে।

“কী হলো, হাসছ কেন?”

লিন্ডা নিরব — উত্তর দেয় না। দানেশ তখন, ‘তোমা কর্তৃক কিছু হবে না’ এরকম ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে ডানে বামে — এবং এই মাথা নড়ানোতে তার কোনো হাত ছিল না। হয়তো সে আগে কোথাও কাউকে মাথা নাড়তে দেখেছে আর সেই অনুর্বর মুহূর্তে সেটাই সে করে ফেলে।

তুচ্ছ আচরণের কোনটি দানেশের ভবিষ্যৎ আচরণে প্রভাব ফেলবে সেটা সে যেমন জানে না তেমনি জানে না আর সবাই। আবার হতে পারে সবারই জানা।… কাল্পনিক প্রকট মেঘগুলোর পিঠ ফেঁসে ওঠে মাস্তুল — সে সব মাস্তুলে ফুটে ওঠে সাবলীল নীলচে পাল, আর মহিষেরা ঘাসহীন লালচে প্রান্তর দিগন্তে একটানা স্থির তাকিয়ে তখন। তারা জ্ঞানী হয় যখন বোঝে তারা অনন্ত এবং ক্ষণস্থায়ী। প্রান্তরের এদিক ওদিক আকাশছোঁয়া পাতাহীন বটগাছগুলো অক্টোপাসের মত ডালপালা ছড়িয়ে বহুশতকের শ্রান্তিতে দাঁড়িয়ে আছে কোনোরকম। সেখানেই কোথাও জীর্ন সাইনবোর্ডে লেখা থাকে কয়েকটি নাম — কিন্তু তাদের পাঠোদ্ধার আত্মহত্যা করলেও সম্ভব নয়। হাওয়া বয় আর ফুলে ওঠে নীলচে পাল এবং শেষ পর্যন্ত সরতে থাকে পরিববর্তনশীল গন্তব্যে। আলো মহিষদের জাপটে ধরে পড়ে যায় মাটিতে ছায়া হয়ে — মহিষদের ভাবঘন কষা চোখে স্বপ্ন উঠে আসে, জমে ওঠে। মহিষদের দেহ স্বপ্নের ব্যাপক ভরে দেহের কোনো বিন্দুতে সংকুচিত হয়ে কেন্দ্রীভূত হতে চায় — তারা মুখ উঁচু করে একটি সর্পাকার আর্তনাদ নীলিমায় পাঠিয়ে দিলে ধাতব গুণাগুণ সম্পন্ন আর্তনাদটি সূর্যকে সমস্যায় ফেলে, সূর্যের পরিসীমায় অস্থিরতা আসে — সেখান থেকে হলুদাভ তামাটে গন্ধবিহীন লালা ঝরতে থাকে — সেই লালা শোঁ শোঁ শব্দে কম সময়ে ডুবিয়ে দেয় প্রান্তর।… অনেক রাতে ঘুম ভেঙে গেল। দেখা গেল বাতি না নিভিয়েই গ্রন্থটির উপর ঝুঁকে ঘুমিয়ে গেছে কখন। লিন্ডার মাথার কাছের চুপচাপ বেড সাইড টেবিলটায় চোখ যায় তখন। ঘুমের বড়ির শূন্য স্ট্রাপ পড়ে আছে। পাশে খালি গ্লাস আধখালি ক্রিস্টাল জগ। লিন্ডা খেয়ে ঘুমিয়েছে। সে অভ্যস্ত নয় তবু মাঝে মধ্যে খায়। মাঝখানে কাচ খাওয়ার অভ্যাস হয়েছিল লিন্ডার। কাচের রঙিন চুড়ি, চাইনিজ ফ্লাওয়ার ভাস, কাজ করা গ্লাস প্লেট, ক্রিস্টালের ডেকোরেশন পীস — এ ধরনের দৃষ্টিমনোহর কাচদ্রব্য ভেঙে ছোট টুকরো করে ভাতের সঙ্গে খেতো। ঠোঁটে দেখা দিতো সুন্দর সব ক্ষত। লিন্ডার থুতনী বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তো ভাতের থালায় গলিত গোলাপের মত। দানেশ ফরাসি চুম্বনে হারিয়ে যেত সেই ঠোঁটের ভেতর — সে মুহূর্তে সে সবচেয়ে সরল। হঠাৎই একদিন কাচে অরুচি এসে যায় লিন্ডার।

দানেশ জড়তা নিয়ে বাতি নেভাবে বলে ওঠে। স্যান্ডেলের খস খস শব্দে লিন্ডার ঘুম ভেঙে যায়, ওর পাতলা ঘুম, বড়িতেও কাজ হয় না; ভেঙে যায়। লিন্ডা তবু ঘুমের উপর ভাসতে ভাসতে শুধুমাত্র চেতনার দূরবর্তী ছায়ায় মাখামাখি হয়ে জড়ানো কণ্ঠে বলেছিল, “বাতিটা নিভেয়ে দাও।” দানেশ বাতি নিভিয়ে ফিরে এসেছিল বিছানায়। আঁধারে তার হাত লিন্ডার খোঁজ করে, আর স্পর্শ করে লিন্ডার নীল স্লিপিং গাউনের ঘাড়, তার মিথুনের ইচ্ছা হয় — তার পাঁচটি আঙুলের ডগায় একটি করে পাঁচটি চোখের জন্ম হয়। কালো উষ্ণ দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থেকে নিজেদের ইচ্ছাগুলো গুটিয়ে নেয় কিন্তু হাতটা সে সরায় না, বাঘের নখের মত থাবার ভেতর পঞ্চ চোখ ঢুকে গেলে শৈশব এসে দাঁড়ায়। মা, মায়ের সাথে ঘুমাবার সময় অন্ধকারে যখন তার ভয় করতো সে মায়ের শরীর ছুঁয়ে নিত, নিশ্চিন্ত ভয়হীন হয়ে ঘুমিয়ে যেত আবার আর দানেশ জানে না ছনের উপর দিয়ে বয়ে যেত নদীর বাতাস, সে হাওয়া তাদের ভিটা পেরিয়ে কোনো শষ্যক্ষেতের গায়ে ফুঁ দিয়ে দিত; আন্দোলিত শস্যক্ষেতের মত সেও আন্দোলিত ঘুমে-স্বপ্নে।

“হাত সরাও না।”

ঘুমে ভাসতে ভাসতে লিন্ডা আপত্তি করেছিল। দানেশ চমকে অপ্রস্তুত হয়ে হাতটা সরিয়ে নিলেও স্লিপিং গাউনের ঘাড় মাংসসহ ছিঁড়ে গিয়ে তার হাতে লেগে গিয়েছিল — কিছুক্ষণ পরে লিন্ডা কোথাও খসে পড়ে গেলে আবারও শৈশব ঘরে প্রবেশ করে।

প্রতিদিন গ্রামের শেষ মাথায় স্কুল থেকে হেঁটে ফিরে ক্ষুধার্ত কণ্ঠে ‘মা’ বলে উচুস্বরে ডেকেছে, সে ডাকে মা-এর কী প্রতিক্রিয়া হত সেটা আর মনে নেই। কারণ স্মৃতির ভবিষ্যৎ এরকম অনিশ্চিত একটা সময়ে স্মৃতির অতীত মুছে বা বদলে যেতে পারে সম্পূর্ণই। যতদুর সম্ভব মা ডাক শুনে মা হাসতে থাকতো, কিন্তু সেই হাসিটা অন্য সব হাসির মত ছিল না, হাসিটার সাথে ভবিষ্যতের সম্পর্ক ছিল। তবে সেই অসরল মুহূর্তে সময়ের বাইরে অতীত বর্তমানের ককটেলে সে লিন্ডাকে মা জ্ঞান করে ডেকেছিল ‘মা-আ’ কিন্তু ভাসতে থাকা লিন্ডা অনেকদিন আগে ডুবে যায়।… প্লাবিত প্রান্তর থেকে মহিষদল নিজেদের টেনে হিঁচড়ে গ্রামের দিকে নিয়ে চলে।… গ্রন্থটির লেখা ঝাপসা লাগছে। চোখের কি বারোটা বাজছে? সেদিন লিন্ডাকেও সে চিনতে পারেনি; ভেবেছিল তার শৈশবের কুয়োতলায় কড়ই গাছের ডালে গলায় ফাঁস দেয়া ছোট চাচি। ছোট চাচি মূল বাসস্থান হতে বিচ্ছিন্ন একটা ঘরে জাম গাছটার উত্তর পাশে থাকত। মাথা ছিল পুরোই ছিটাল। নিচু স্বরে মশার মত কাঁদতো আর তর্জনী ঝাঁকিয়ে অদৃশ্য কাউকে নিঃশব্দে শাঁসাত, মারপিট করত। কথা বলত খুব, একা একা নয় নিজের চুল থেকে লালচে কালচে উকুনগুলোর সাথে। বলতে বলতে হঠাৎই আঙুলের ঢেঁকি তৈরি করে টিপে মারত। একমাত্র মাকে সহ্য করতে পারতো সে, কেন করতে পারতো দুজনের একজনকেও জিজ্ঞেস করা হয়নি… গ্রামে শীত আস্‌লে চটকদার লাল কমলা নকশা করা নৌকায় আসতো ইরু বয়াতীর দল। ইরু পাগলা বলতো সবাই, কাযেম মাঝির ভাস্তে ছিল সে। ইরু পাগলার মাথা থেকে কল কল শব্দে কালো ঝর্না পিঠের গিরিখাত হয়ে থেমেছিল কোমরে, কালো মুখটা ছিল লোহার, হাতের আঙুলগুলো রবারের। আণবিক ব্যাঙের ছাতার মত বটগাছ যার তলেই পাগলার আসর চলতো শেষ রাত অবধি। লোহার মুখমণ্ডলে চাঁদের আলো, আঁধারের বিরুদ্ধে ছিল তা মৃদু অভিযোগ আর রবারের আঙুলগুলো একতারাটায় ব্যাস্ত হাটুরের দ্রুততায় হেঁটে যেত। ভাঙে আফিমে চূড় হয়ে যাওয়া গায়ক শ্রোতারা আধ্যাত্মলোকের সন্ধানে এত ভারি হয়ে যেত যে তাদের বাসায় পৌঁছাবার জন্য দড়ি বেঁধে টেনে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করা হত। দেখা যেত ব্যায়ামপুষ্ট কিছু লোক ভোরের হালকা আঁধারে প্রায় অচেতন অস্পষ্ট কিছু লোককে দড়ি বেঁধে টেনে হেঁচড়ে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছে এবং তারা দেহের টানে মাটিতে রেখে যাচ্ছে থেতলে যাওয়া সাপের মত দেহছাপ। গ্রামটার চেহারা ছিল বোকার মত। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘরবাড়ি অতিরিক্ত সরলতায় এদকি ওদিক ছড়ানো ছিটানো আর উপর কৃত্রিম-অকৃত্রিম আকাশ — আষাঢ়ে মূষল নামাত বৃষ্টি। পুরানো আম বাগানটা পেরিয়ে ছিল ভাঙা নামহীন জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। সেই পরিত্যক্ত সবুজাভ দালানটাতে একবার লাশ পাওয়া যায়, ডাকাতদের কাজ। লাশের মুণ্ডু ছিল না। দাফন করা হয় গাজীর বাড়ির বেশ কিছুটা দক্ষিণে — বাবা দানেশকে সে লাশ দেখতে দেয়নি — দানেশ কল্পনা করে নিয়েছিল। পরে যখনই সে প্রগাঢ় নিরবতায় ঝোপঝাড়ে দুর্বোধ্য সবুজাভ দালানটায় গিয়েছে সে লাশটাকে খোঁজার চেষ্টা করেছে। ফলে সে লাশটাকে প্রায়ই দেখতে পেয়েছে, অন্যেরা সে সুযোগ পায়নি।

গ্রামের একদিক দিয়ে ক্ষীণস্রোতা ‘তকশা’ বয়ে যেত। মসজিদের পথে প্রতিদিন বাপের হাত ধরে যেতে যেতে ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলো লক্ষ্য করেছে ও। একটা না একটা গয়না নৌকাকে প্রাধান্য দিয়ে ঘিরে থাকতো কিছু ডিঙ্গি নৌকা। গঞ্জ থেকে ক্ষুদ্র-মাঝারী ব্যবসায়ীরা রবিবারের হাটে জমা হত নদীপথে। বেদেরা আসতো বিবিধ প্রজাতির সাপ নিয়ে।

একবার বেদেদের দল রবিবারের হাটে ফেলে গেল এক বেতের জুড়ি। কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল ঝুড়ির ভেতর থেকে। খুলে দেখা গেল ওটার ভেতর দুমাথাওয়ালা একটি শিশু। শিশুটির হলুদাভ ত্বকে সাপের দেহের মত চক্রাবক্রা নকশা কাটা। এঘটনায় গ্রামে ভীতি ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু গাজীর ছোট মেয়ে শিশুটিকে দত্তক নেয়। ছমাস সব ঠিকই ছিল, ছমাস পর মা ও শিশু কোন জনারণ্যে হারিয়ে যায় কেউই তা বলতে পারে না — সম্ভবত আজ পর্যন্ত।
অবশ্য এত কিছু স্মরণে আসে না। আবার সবকিছুই স্মরণে চলে আসে, কারণ স্মৃতি সরে না মানুষ সরে আসে। তার মনে পড়ে সেই ডিসেম্বর মাসেই বাবার হাপানী তীব্র হয়ে পড়তো। এরকমই কোনো হাঁপানীতে মধ্যশীতে তার বাবার মৃত্যু হল। বাপের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী পুরো কাফনে পবিত্র কুরআনের কিছু মূল্যবান আয়াত লিখে কবর দেয়া হয় মাটির ১২ ফুটি গভীরে। সেই থেকে সে একা চলছে, গ্রাম ছেড়ে কি না ছেড়ে এসে পৌঁছেছে বিদেশি কোম্পানীর মাঝারী চাকরিটায়। এই সেদিনই / এই সেদিনও দানেশ বাথরুমে দাড়ি কামিয়ে সদ্য পরিষ্কার মুখমণ্ডল আয়নায় দেখছিল। বাবার সাথে মিল পাচ্ছিল চেহারায়, যদিও বাবার নূরানী দাড়িটা তার নাই। মাঝে মাঝে বাবাটা যেন চেহারা থেকে বেরিয়ে আসে। নাকটা, কপাল, ভ্রুটা, চোখ, থুতনীটা মিলে গিয়েছিল। মিলে যায়। মিল থাকলেও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সে পায়নি, তার বাবা ছিল ধর্মপ্রাণ একগুয়ে গ্রাম্য ব্যক্তিবিশেষ। অথচ সে মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন আধুনিক মানুষ। ধর্ম অর্থহীন, যদিও ছেলেবেলায় তার শেকড় ধর্মের নির্যাসে বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু সে শেকর আজ মাটি বদলেছে। আচার আচরণে শহুরে গোলমরিচ ছিটানো, ফলে গ্রাম্য সকল কিছুই চাপা পড়ে গেছে কোথায় কে যেন। সে ভালো করেই জানে বাবামার সেই সহজ জীবনের না বুঝে বেঁচে থাকার আরামপ্রদ খেলাটি সে ইচ্ছা করলেও এখন খেলতে পারবে না। ফলে সে বাবা মায়ের ছায়া থেকে অনেক দূরে। তবে এটাও ঠিক কোন জীবনটা গুরুত্বপূর্ণ এটাও বলে দেয়া ঠিক না।

তবু বাবামার ছায়া বা প্রভাব থাকাটা ছিল স্বাভাবিক একটি ঘটনা, কিন্তু থাকেনি, থেকেছে অন্য অনেকের, আধুনিকতার — লিন্ডার। আয়নায় সদ্য কামানো মুখে বাবাকে সে ঠিকই পায়, কিন্তু নিজ চেহারায় পেয়েছিল এক যন্ত্রশীতল যুক্তিবাদী ছাপ, যেটা বাবার মাটির মুখে ছিল না। পল্লীর গৃহস্থ বাই মসজিদের ইমাম ভোতা গোত্রের হবে। তবু, তবু তার একটু খারাপ লেগেছিল — অযথা মনে হয়েছিল মিলটা — সমান সমান হলে ভালো হত, তার যৌক্তিক শীতলতাটা হয়তো দেয়াল, একটি দেয়াল, দুজন মানুষের জন্ম দিয়েছে যা। “কী হল তোমাকে ডেকে আমি হয়রান। তুমি শোনোনি?”
দানেশ বোঝে না কী হয় / কী হয়েছে, একটু সময় মস্তিষ্ক জনশূন্য থেকে লিন্ডাকে চায়ের কাপ হাতে ৯০ ডিগ্রি অবস্থানে টেবিলের সামনে দাঁড়ানো দেখে। চায়ের কাপের জ্যামিতিক নকশাগুলোই প্রধান হয়ে পরিবেশ শক্তিময় করার দায়িত্ব বিনা আপত্তিতে নিয়ে নেয়।

“ও তুমি।”

“তোমার চা। রান্নাঘর থেকে ৩/৪ বার ডেকেছি।”

“কেন? ছেলেটা কোথায়, ওকে দিয়েই পাঠিয়ে দিতে।”

“না, দোকানে ডিম আনতে পাঠিয়েছি। কুমীরের ডিম।” লিন্ডা রস করার চেষ্টা করে, দানেশ হাসতে পারে না, পরপরই লিন্ডার কথায় ফিরে আসা গেল, লিন্ডা একবার রান্নাঘরে ঢুকলে বের হতে চায় না, যতটা পারে কাজের ছেলেটাকে দিয়ে বাইরের কাজগুলো করিয়ে একেবারে রান্নার ঝামেলা শেষ করে বের হয়, এটা তার নিয়ম, শিথিল শক্তের মাঝামাঝি। লিন্ডার তবু কেমন মনে হয়, অন্য কোনো সময় চায়ের জন্যে কাজের ছেলেটার অনুপস্থিতে সে দানেশকে ডাকে না, ডাকাটা ভদ্রতায় বাঁধে। নিজেই চলে আসে চা-টা নিয়ে। আজ ডাকলো কেন? ভুলে গিয়েছিল? নাকি কোনো গোপন বিরক্তি, দানেশের প্রতি, যার ফলে চতুর ক্রোধ তাকে এ কাজ করিয়ে নিয়েছে? কিন্তু আমরা জানি ঘটনাপ্রবাহ মানুষকে দিয়ে অনেক অপ্রয়োজনীয় আচরণে বাধ্য করে, কেননা ঘটনাপ্রবাহ নিজেই তেমন কোনো অর্থ ধারণ করে না — অর্থ টেনে বের করা হয়। সে তার হালকা ভুলটাকে কোথাও পাঠিয়ে দিয়ে নিচের ঠোঁটটাকে সামান্য নামিয়ে দানেশের দিকে চা-এর কাপ এগিয়ে দেয় এবং পাশের চেয়ারে বসে পড়ে।

“তোমার ছুটি কিন্তু শেষ হয়ে আসছে।”

“কীসের ছুটি?” প্রশ্নটাতে লিন্ডার মুখে আবছা উজ্জ্বলতা আসে। উজ্জ্বলতা আসবে, সে এখন দানেশের প্রকৃতি সম্পর্কে কিছু বলতে যাচ্ছে যা বলতে যাচ্ছে তা তাকে বুঝতে হয়েছে, মানুষের স্বভাব যেমন কিছু বুঝলে কমবেশি খুশি হয়ে ওঠা।

“তুমি এত অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড হয়ে যাচ্ছ। কীসের আবার ছুটি, বলো তো কীসের?”

“অফিস, অফিসের।”

দানেশের মনে হলো প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে নিরবে মুখভঙ্গি দিয়ে বুঝিয়ে দিলে ব্যাপারটা ভারসাম্য পেত, উত্তর দেয়ায় সে যেন কিছুটা নির্বোধ সরলতা প্রকাশ করে ফেলেছে।

দাঁড়কাকটা আবার ফিরে আসে। কোথায় গিয়েছিল? গ্রানাইটটা কি লনটার পোষা? তার মায়ের মত লিন্ডাও দাঁড়কাকে সহ্য করতে পারে না। হয়তো অমঙ্গল মনে করে। সামান্য কুসংস্কার দুকালের দুই মানুষকে কী রকম এক ফ্রেমে বেঁধে ফেলল সেকেন্ডের জন্য, তাই না?… তারপর ছেলেটি আবারও নিভাজ রুপালি পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়লে ধারালো শব্দ বাতাসকে চিড়ে ফেলে। ছেলেটি এরকম পানিতে সাঁতরে যাবার চেষ্টা করে ফলে সে সক্ষম না হলে হাতপা নাড়িয়ে ভেসে থাকার সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে দুঃখজনক সত্যতে তলিয়ে যাবার সূচনা করে রুপালি পানির তলপেটে।… লিন্ডা যখন আঁশমুক্ত গ্রন্থটা দানেশের হাত থেকে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে যাবে তখনই দাঁড়কাকটা সবাইকে চমকে দিয়ে গগণ পর্যন্ত ডেকে উঠলে লিন্ডা কাকটা তাড়ানোর জন্য হুস হুস শব্দ করলে দাঁড়কাকটা কী করে? কাকটা গাঙচিলের ভঙ্গিতে উঠে পাশের বাড়ির কার্নিশে বসে আবারও ।… স্বপ্নপুষ্ট দেহ বলেই সে ডুবে যায়, কারণ আপনাদের অনেকেরই জানা আছে স্বপ্নের অসাধারণ প্রাবল্যের কথা… লিন্ডা বইটায় চোখ রাখলে তাকে হাসতে হয়। হাসতে হাসতে বলতে হয়, “আমি তো খেয়ালই করিনি তুমি মকসুদুল মোমেনীন নিয়ে বসেছো। তোমার মত পাপী পাপ ত্যাগ করলো কেন?”

“করেনি। আমার মাকে সবসময় এটা নাড়াচাড়া করতে দেখতাম।”

“মাকে মনে পড়ছে খুব?” কণ্ঠস্বরে সহানুভূতি। কিন্তু দানেশের সন্দেহপ্রবণ অনুভূতি বলে ওঠে, হয়ত এটা ব্যঙ্গ।

“হ্যাঁ। কিন্তু দুতিন পাতা পড়তে পেরেছি।”

“কাল তো অনেক রাত জেগে পড়ছিলে।”  “না। পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম, ঘুম ভেঙে লাইট নেভাই।” লিন্ডা তালু মেলে চোখের হালকা রোদ আড়াল করে। দানেশ লক্ষ্য করে বার্ধক্য লিন্ডাকে বিব্রত করেনি। দানেশকেও দেখলে ৩০/৩১ মনে হয় কিন্তু সে ৪৭/৪৮। লিন্ডা তো রীতিমতো যুবতী, যথেষ্ঠ যৌনআবেদনময়ী, তার দেখা হয়েছে, তার বন্ধুরা লিন্ডার ভৌগলিক কারুকাজ সুযোগ পেলেই চোখে বসিয়ে নেয়। আর যা দানেশের দেখা নাই তা হলো বন্ধুরা চোখে বসানো তীব্র যৌনাবেদনাময়ী লিন্ডাকে নিয়ে নিজ নিজ বাথরুমে বা কামরা বন্ধ করে এবং হস্তমৈথুন পর্ব শুরু করে, লিন্ডার উরু, নিতম্ব, বুক, ঠোঁট, পাতলা শিফন শাড়ির ভেতর দিয়ে দেখা নাভীমূল তাদের হাতের গতি নিয়ন্ত্রণ করে যতক্ষণ না বীর্য উপচে পড়ে নিষ্পাপ দেবদূতের মত। লিন্ডার দৈহিক সৌন্দর্যের তীব্রতার ব্যাপারটা প্রকটভাবে ধরতে পারে গত মাসে টিকাটুলিতে ইয়াকুবের (একুব মেটাল ড্রাম ম্যানুফ্যাকচারিং-এর মালিক) বাসায় আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য পার্টিতে। যাই হোক, এগুলো কোনো বিগ ডিল নয়। সে বুঝেছে লিন্ডা এগুলো উপভোগই করে, সে হলেও করতো। আচ্ছা, তাদের যদি এক বা একাধিক সন্তান থাকতো? তাদের জীবনধারণ অন্য হতো বোধহয়। তারা কি অনেক বুড়িয়ে যেত? জ্বী হ্যা, তাদের সন্তান হয় না। অক্ষমতা কার সেটাও তারা পরীক্ষা করে বের করতে চায় না। দাম্পত্য জীবনে জটিলতা আসতে পারে এই ভয়ে তারা জানতে চায় না তাদের ভেতর কে অক্ষম। অথচ তারা যখন একা নিজেদের চিন্তাভাবনার জগতে থাকে তখন নিজেকেই তারা দোষী মনে করে আলাদা ভাবে আবার কখনও মনে মনে একে অপরের উপর দোষ চাপিয়ে দায়মুক্ত অথবা বিশেষ প্রকারের মুক্তি চায়। বাড়ির কাজের ছেলেটা হয়ত তাদের অনুর্বরতার কারণে সন্তানস্নেহের কিছুটা পেয়ে থাকে। একদিন লিন্ডা কাজের ছেলেটার জন্য পনেরটা ফীডার কিনে এনেছিল, যদিও তার বয়স ১৩ বছর। লিন্ডার নির্দেশে বাধ্য হয়ে প্রতিদিন তাকে চার ফিডার করে দুধ খেতে হত।

দানেশ রেডিওর মত একটি তথ্য প্রচার করে হঠাৎ। “নস্টালজিয়া। বাবামাকে মনে পড়ছে, মনে পড়ছে আমার গ্রামকে।” দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ। তারপর গোলাপী নিরবতা ভেঙে সবার অপত্তি সত্ত্বেও দানেশ বলে ওঠে, “জানো কাল রাতে আমি তোমাকে ‘মা’ ডেকেছিলাম।” কথাটা বলেই দানেশ চমকে যায়।

“কদিন পর তুমি আমাকে নানি দাদি ডাকা শুরু করবে।”

লিন্ডা হাসি চাপলো। এরই মধ্যে ঘাসফড়িংটা উড়ে আসলো টেবিলটায়। দানেশ লিন্ডার মুখোমুখি তাকাতে লজ্জা পেল। সে আলতো করে চোখ বুঁজে ফেললো। চোখের আঁধার দেখতে দেখতে সে বললো — বললো পুরোপুরি আত্মনিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় — “সরি, তোমাকে আর ‘মা’ ডাকবো না।” লিন্ডাকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকতে হয়। বুঝে নিতে হয় দানেশের বলার ভঙ্গিটা।

“তোমার কিছু একটা হয়েছে।”

কিছুক্ষণ রঙশূন্য নিরবতা ভাঙে না।

“আমি চাকরী ছেড়ে দিয়েছি।”

“ছেড়ে দিয়েছো?”

“হু।” লিন্ডা প্রশ্ন করে না, দানেশকে প্রশ্ন আশা করতে হয়, একটা বানোয়াট উত্তর তার আছে। উত্তর থাকবে, দানেশের অবস্থা ভালো নয়, জ্ঞান আসছে তো চলে যাচ্ছে, তবে বেশি চিন্তা করবেন না, আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করছি।”

“শুনবে না কেন?”

“না।”

“কেন?”

“আমি জানি তুমি চাকরি ছাড়ো নি।”

“বেশি বোঝো তুমি।”

আদিকাল থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষ সকল কিছুর দাস — পরিবেশেরও। তাই দানেশ কথাটা অপেক্ষাকৃত উঁচু শব্দে বললে লিন্ডাকে নিরুপায় হয়ে ব্যক্তিত্ব আনার জন্য ভ্রু কোঁচকাতে হয়। “বুঝি। আমি ঠিকই বলেছি।”

দানেশ চুপ। লিন্ডাকে মুখ চোখ ধারালো করার সিন্ধান্ত নিতে হয়। “ঠিক বলিনি?”

“হু।”

“তুমি আমাকে এড়ানোর জন্য এসব বলছো। তোমাকে তো চিনি আমি। বলছো না বলো তো?” লিন্ডা নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। দানেশ ভেবে পায় না লিন্ডা সব বুঝে ঝায় কেন। দু’একটা জিনিস বাদে।… দীঘিপিঠে মহিষ দলের গলে যাওয়া শিথিল হয়ে যাওয়া মৃতদেহ ভাসে — তাদের পূর্ণ আয়ত চোখ মৃত্যুর আকার দেখে ব্যথাতুর তাকিয়ে থাকে। গলিত সে সব দেহ থেকে নিঃশব্দে গল গল ঘন পঙ্গলে স্বপ্ন বেরিয়ে আসে, যেমন ভয়ার্ত মাছ ছুটে যায় নষ্ট কম্পাসকে নকল করে। স্বচ্ছ রুপালী পানি পিঙ্গল হলে এবং আরও পিঙ্গল হলে শেষ অধ্যায় চলে আসতে কি দেরি হয়?

না, সুতরাং আমাদের আপাত প্রতিক্ষিত শেষ অধ্যায় চলেই আসে। শেষ পর্যায়ে তরল পিঙ্গল স্বপ্নের ভেতর মৃত মহিষদল ভাসতে থাকলে একটা সময় আসে যখন চিহ্নিত করবার জন্য আপনি আর দায়িত্ব পান না।

গভীর, অতএব, রোদের ভেতর বাধ্য হয়ে দীঘিটি তার পিঙ্গল চোখ বিস্ফারিত করে তাকিয়ে থাকে শাঁই শাঁই দৌড়ে পালিয়ে যাওয়া আকাশের দিকে… তবে লিন্ডার প্রশ্নটিতে দানেশ উত্তর খোঁজে। ফলাফল হয় সে কয়েকটি বেঁচে থাকা থেকে অনেকটা সরে দাঁড়িয়ে বলে দেয়, “কী জানি হবে হয়তো।” ফড়িংটা উড়ে ঘাসে ফিরে আসে, ফলে চায়ের কাপটা নিঃসঙ্গ হয় এবং সময় হাঁপায় এবং দাঁড়কাকটা একবার ডেকে হয়ে যায় অদৃশ্য এবং লিন্ডাও আবছা হয়ে আসে এবং দানেশের পিঠ ফুড়ে হয়তো দুটো কালো ডানা গজায় এবং কাজের ছেলেটি কোথা থেকে এসে সারা বারান্দা জুড়ে প্রশ্রাব করে নীতিশূন্য হয়ে এবং সবকিছুই হয়ে যায় সম্পূর্ণ ইমমোবাইল।

রচনা: উত্তরা, ঢাকা ১৯৯০-১৯৯৬
অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ
=====================
রনি আহম্মেদ জন্ম: ঢাকা, ১২/১০/১৯৭১
 
রনি আহম্মেদ এর ওয়েব লিংক

=================================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম   গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান  গল্প- ‘অপঘাতে মৃত্যু’ ও ‘সাদামাটা’ by লীসা গাজী   গল্প- 'দ্বিতীয় জীবন' by ইরাজ আহমেদ  গল্প- 'পুষ্পের মঞ্জিল' by সাগুফতা শারমীন তানিয়া   গল্প- 'একশ ছেচল্লিশ টাকার গল্প' by কৌশিক আহমেদ  গল্প- 'একে আমরা কাকতালীয় বলতে পারি' by মঈনুল আহসান..   গল্প 'গহ্বর' by জাহিদ হায়দার    গল্প- 'পুরির গল্প' by ইমরুল হাসান  গল্প- 'নওমির এক প্রহর' by সাইমুম পারভেজ  গল্প- 'মরিবার হলো তার সাধ' by আহমাদ মোস্তফা কামাল   গল্প- 'নিষুপ্ত শেকড়' by নিরমিন শিমেল   গল্প- 'লাল ব্যাসার্ধ্ব' by শামীমা বিনতে রহমান  গল্প- 'সেদিন বৃষ্টি ছিল' by মৃদুল আহমেদ   ক. কিছুদিন হয় সেই নগরে কোন বৃষ্টি হচ্ছিল না। কিছুদ.. গল্প- 'তুষার-ধবল' by সায়েমা খাতুন  গল্প- 'কোষা' by পাপড়ি রহমান  গল্প- 'কর্কট' by রাশিদা সুলতানা   গল্প- 'তিতা মিঞার জঙ্গনামা' by অদিতি ফাল্গুনী  গল্প- 'সম্পর্ক' by তারিক আল বান্না




bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ রনি আহম্মেদ


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

একনেকে ২০৪১ কোটি টাকার নয়টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন

দুই হাজার ৪১ কোটি টাকার নয়টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
এসব প্রকল্পে স্থানীয় মুদ্রায় জোগান দেওয়া হবে এক হাজার ৩৬৯ কোটি টাকা এবং প্রকল্প সাহায্য হিসেবে পাওয়া যাবে ৬৭২ কোটি টাকা।
গতকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে একনেকের সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই নয়টি প্রকল্পের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণটি হলো আখাউড়া স্থলবন্দরকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যে ২৩৩ কোটি টাকার সরাইল-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সুলতানপুর-চিনাইর-আখাউড়া-সেনারবাদী স্থলবন্দর সড়ককে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীতকরণ প্রকল্প।
সভা শেষে প্রকল্পটি সম্পর্কে পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকার সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমান জেলা সড়কটি মহাসড়কে পরিণত হয়ে সিলেট ও চট্টগ্রাম মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। তবে আমদানি-রপ্তানি কাজেই বেশি ব্যবহূত হবে।
মন্ত্রী জানান, ভারতের সঙ্গে ১০০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তির আওতায় এই প্রকল্পের অর্থায়ন হবে।
একনেকের সভায় অনুমোদিত অন্য প্রকল্পগুলো হলো—কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৯৯ কোটি টাকার বৃহত্তম ঢাকা জেলা সেচ এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প (২য় পর্যায়); ৩০০ কোটি টাকার কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে গ্রামীণ যোগাযোগ উন্নয়ন প্রকল্প; পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৬৬ কোটি টাকার সিরাজগঞ্জ হার্ড পয়েন্ট পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্প; মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৭৭ কোটি টাকার বিত্তহীন মহিলা উন্নয়ন কর্মসূচি (সংশোধিত) প্রকল্প; যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১০৪ কোটি টাকার পুরাতন যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্তকরণ প্রকল্প; শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৩৪ কোটি টাকার ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি স্থাপন প্রকল্প; ৬৫৫ কোটি টাকার জেলা সদরে অবস্থিত সরকারি পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজসমূহ বাস্তবায়ন প্রকল্প এবং ৩৭৩ কোটি টাকার উপজেলা আইসিটি প্রকল্প।
একনেকের সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান, যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, আলাউদ্দিন আহমেদ, তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরীসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

আজ এডিবির সঙ্গে ১০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষর

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সংযোগ লাইন নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সরকার এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) কাছ থেকে ১০ কোটি ডলার বা ৭০০ কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে। আজ বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে এ ঋণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
ইতিমধ্যে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এসব লাইন নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বা এক হাজার ১১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০ কোটি ডলার বা ৭০০ কোটি টাকা দেবে এডিবি। আর বাকি পাঁচ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বা ৪১০ কোটি টাকা সরকারকেই জোগান দিতে হবে।
এডিবির কাছ থেকে ৩২ বছর মেয়াদে এই ঋণ নেওয়া হচ্ছে। প্রথম আট বছর আসলের কিস্তি পরিশোধ করতে হবে না। তবে এ সময় বছরে এক শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। পরবর্তী ২৪ বছরে দেড় শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে আসলের কিস্তি পরিশোধসহ।
এই প্রকল্পের অধীনে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনতে ৪০০ কেভি ক্ষমতাসম্পন্ন ৪০ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন লাইন স্থাপন করা হবে। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সাবস্টেশন নির্মিত হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০১৩ সালে।
জানতে চাওয়া হলে এডিবির ঢাকা অফিস থেকে আজকের ১০ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি স্বীকার করা হয়। সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উঠতে পারছে না। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির লাইন স্থাপনের জন্য অর্থ পাওয়ার অনুরোধ জানানো হলে বোর্ড তা অনুমোদন করে।
জানা গেছে, এ বছরের মধ্যে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বাছাই ও কার্যাদেশ দেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় গত ১১ জানুয়ারি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। তারপর দুই দেশের বিদ্যুৎসচিব পর্যায়ের যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির দুটি এবং যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বাধীন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর মাত্র সাড়ে ছয় মাসের মাথায় গত ২৬ জুলাই বিদ্যুৎ আমদানির অবকাঠামো নির্মাণের অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে ৩৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি চুক্তি সই হয়। ওই চুক্তির আওতায় ২০১২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ভেড়ামারা দিয়ে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হবে।

দুর্যোগের ‘প্রত্যয়’ ফিরে দেখা by মাহবুবা নাসরীন

গত কয়েক দিনের পত্রপত্রিকাজুড়ে ছিল তুরাগ নদে যাত্রীসহ একটি বাস নিমজ্জনের এবং তার উদ্ধার তৎপরতার মন্থর গতিসম্পর্কিত খবর। যে বিষয়টি আজ (১৩ অক্টোবর, ২০১০) বিশ্ব দুর্যোগ হ্রাস দিবসে নতুন করে আমাদের দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, আপদ প্রত্যয়গুলো নিয়ে ভাবনায় ফেলছে। নিমজ্জিত বাসটির হতভাগ্য যাত্রীরা আক্ষরিক অর্থে ‘ঝুঁকি’ শব্দটি বিশেষজ্ঞদের মতো সংজ্ঞায়িত না করতে পারলেও পথ চলতে প্রতি মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষ কী পরিমাণ ঝুঁকি নিয়ে চলছে, তা বুঝতে পারে।
পেছনে ফিরে তাকালে আমরা দেখি, বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষিণ এশিয়ায় প্রশংসা কুড়িয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে এ নিয়ে আত্মতৃপ্তি থাকলেও তুরাগের বাস নিমজ্জনের ঘটনা আর তার সঙ্গে উদ্ধারকাজের মন্থর গতি সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে না। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস বিষয়টি ২০০৫ সালের জানুয়ারি মাসে দুর্যোগ হ্রাসবিষয়ক সম্মেলনে একটি কর্মপরিকল্পনা ‘হিউগো ফ্রেমওয়ার্ক অন অ্যাকশন’ নেওয়া হয়। যার আদলে বাংলাদেশ সরকারও ঝুঁকি হ্রাস বিষয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও নীতিমালা নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সংসদে পাস হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইন। নারী উন্নয়ন নীতিমালায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বিষয়টি আগস্ট ২০১০-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এসব পদক্ষেপ আমাদের আশাবাদী করলেও স্বস্তিতে রাখতে পারছে না।
কারণ, আমরা দেখেছি, ২০০৫ সালে একটি নয়তলা ভবন ধসে পড়েছিল—যার উদ্ধারকাজে সময় লেগেছিল এক সপ্তাহের বেশি। ১০ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আমিনবাজার সেতু পার হওয়ার পর সালেহপুর সেতুতে ওঠার আগ মুহূর্তে তুরাগ নদে নিমজ্জিত হওয়া বাসটি শনাক্ত করতে সময় লাগল ২৫ ঘণ্টা, আর হতভাগ্য মৃত যাত্রীদের সবাইকে আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আমরা প্রত্যক্ষ করলাম, দক্ষ ডুবুরি আর একমাত্র স্যোনার (সাউন্ড নেভিগেশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) যন্ত্র আনতে হলো চট্টগ্রাম থেকে। এ থেকে বোঝা যায়, একটি দুর্ঘটনাজনিত উদ্ধারকাজেই আমরা ঝুঁকিকে প্রাধান্য দিইনি। সেখানে ভূমিকম্পপ্রবণ ‘দুর্যোগ’-এর সম্মুখীন হলে বাংলাদেশের হতাহত মানুষদের উদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু আছে, তা সহজেই অনুমেয়।
আমাদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সংগঠন ও জনগণকে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শিক্ষা নিতে হবে তুরাগের দুর্ঘটনা থেকে কীভাবে দুর্যোগের ঝুঁকি কমানো যায়, সে বিষয়েও। যানবাহনের চালক ও যাত্রীদেরও শিক্ষণীয় আছে ব্যাপকভাবে। ইতিমধ্যেই কমিউনিটি ঝুঁকি নিরূপণ নির্দেশনা কার্যকর তথ্য সংগ্রহ করছে ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনার আওতায়। এগুলোর ফলাফল কী, জনগণকে সড়ক ও নৌপথ সম্পর্কে কীভাবে সচেতন করা যায়, তার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
বিশ্ব ঝুঁকি হ্রাস দিবসেই শুধু নয়—বছর ধরেই ঝুঁকি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। ঝুঁকি হ্রাস শুধু দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায়ই নয়, সব ধরনের আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনার সময়ই জরুরিভাবে সাড়া দেওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করবে এই প্রত্যাশা করা বাংলাদেশের প্রতিনিয়ত লঞ্চ, বাস, সড়ক দুর্ঘটনায় পতিত মানুষসহ সবার। কারণ, দুর্যোগের মতো এসব দুর্ঘটনারও মারাত্মক ফল থাকে, সর্বস্ব হারানোর বেদনা থাকে, আহত হওয়ার মতো ঘটনা থাকে, থাকে মৃত্যু। যদিও তা অল্পসংখ্যক মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তবুও তাদের যথাযথ সেবা না পাওয়ায় ঝুঁকি হ্রাস পরিকল্পনায় তাদের অন্তর্ভুক্ত না করাটা মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতোই।
বিশ্ব ঝুঁকি হ্রাস দিবসে বিষয়টি আজ আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেকোনো ঝুঁকিজনিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের কতটা প্রস্তুত থাকতে হবে। এর মধ্যে ঝুঁকিজনিত দুর্ঘটনা প্রশমন ও নিরসন করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা যেকোনো দেশের জরুরি ব্যবস্থাপনার অংশ না হলে কোনো পরিকল্পনা, নীতিমালার বাস্তব প্রতিফলন হয়েছে বলে আমাদের বিশ্বাস হবে না।
সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে এবং সর্বোপরি যেসব কারণে দুর্ঘটনা ঘটে, তা প্রতিরোধে সর্বসাধারণের সচেতনতা বাড়ানো আজ সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিকভাবে ঝুঁকি, দুর্ঘটনা, আপদ ও দুর্যোগের মধ্যে প্রত্যয়গত পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের জন্য এরা সমার্থক। কারণ, একটি মৃত্যু একটি পরিবারকে যে নাজুকতা বা ঝুঁকির মুখোমুখি করে, তা পুষিয়ে নেওয়ার মতো বিকল্প নেই।
মাহবুবা নাসরীন: অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করবেন রানি এলিজাবেথ

যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ আগামী নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করবেন। যুক্তরাজ্যের হাইকমিশন গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ খলিফা বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান ও ওমানের সুলতান কাবুস বিন সায়িদের আমন্ত্রণে যুক্তরাজ্যের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপ নভেম্বরে ওই সফর করবেন। তাঁরা আগামী ২৪ ও ২৫ নভেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ২৫ থেকে ২৮ নভেম্বর ওমান সফর করবেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানে রানি এলিজাবেথ ও প্রিন্স ফিলিপের এটা দ্বিতীয় সফর। সফরের সময় ওমানে সুলতানি শাসনের ৪০ বছরপূর্তি উদ্যাপন করা হবে।

বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধী কিমের বড় ছেলে

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-ইলের বড় ছেলে কিম জং-নাম রাষ্ট্রক্ষমতা বংশানুক্রমিক হস্তান্তরের বিরোধিতা করেছেন। গত শনিবার জাপানের আসাহি টেলিভিশন নেটওয়ার্ককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের এই মতামত ব্যক্ত করেন নাম।
সম্প্রতি ছোট ছেলে কিম জং-উনকে নিজের উত্তরাধিকার হিসেবে ক্ষমতায় বসানোর পরিষ্কার ইঙ্গিত দিয়েছেন কিম জং-ইল। এ সপ্তাহের শুরুতে উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতাসীন দলের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল সামরিক সমাবেশ ও অনুষ্ঠানে প্রথমবার প্রকাশ্যে ছেলেকে পাশে নিয়ে উপস্থিত হন ইল। এর আগে গত মাসের শেষ ভাগে উন জেনারেল হিসেবে এবং ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্থানীয় পদে পদোন্নতি পান।
বেইজিংয়ে দেওয়া শনিবারের সাক্ষাৎকারে কিমের বড় ছেলে নাম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের হাতে বংশানুক্রমিক ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা করি। তবে আমি মনে করি, অভ্যন্তরীণ কোনো বিষয়ও এখানে কাজ করে। আমার দিক থেকে বলতে পারি, ছোট ভাইকে সাহায্য করার ব্যাপারে আমি প্রস্তুত।’
বর্তমান নেতা কিম জং-ইলও ১৯৯৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হন। ছোট ভাই উনকে উত্তরাধিকার করা প্রসঙ্গে বড় ভাই নাম বলেন, ‘আমার ধারণা, বাবাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই। বিষয়টি নিয়ে আমি ভাবছি না।’
একসময় ধারণা করা হতো, কিমের উত্তরাধিকার হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করবেন নাম। কিন্তু ২০০১ সালে জাল পাসপোর্ট নিয়ে জাপানে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ার পর বাবার আস্থা হারান তিনি। বর্তমানে চীন ও ম্যাকাউতেই বেশির ভাগ সময় পার করছেন নাম।

কলম্বিয়ার সাবেক এক সেনা কর্মকর্তার ৪৪ বছরের কারাদণ্ড

কলম্বিয়ার সাবেক এক সেনা কর্মকর্তাকে গত সোমবার ৪৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ২৪৫ জনেরও বেশি বেসামরিক লোককে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে মেজর (অব.) আলিরিও আন্তোনিও ইউরেনাকে এই শাস্তি দেওয়া হয়। নিহত ব্যক্তিদের অনেককেই টুকরো টুকরো করে হত্যা করা হয়েছিল। সে দেশের সরকারি কর্মকর্তারা এ কথা জানান।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় ট্রুজিল্লো শহরের ওই স্থানীয় বাসিন্দাদের পর্যায়ক্রমে হত্যা করা হয়। কৌঁসুলিরা জানান, সে সময় তিনি সে দেশের ভ্যালি ডি কৌকা রাজ্যে সামরিক বাহিনীর একটি ব্রিগেডের কমান্ডার ছিলেন এবং ডানপন্থী আধা সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ট্রুজিল্লোর বাসিন্দাদের হত্যার ব্যাপারে এই আধা সামরিক বাহিনীকে দায়ী করা হয়।
নিহত ব্যক্তিরা বামপন্থী বিদ্রোহীদের সহযোগী ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। কলম্বিয়ার সামরিক বাহিনী কয়েক দশক ধরে এই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।

চিলির খনিশ্রমিকদের তুলে আনা হবে আজ

চিলির খনিতে আটকে পড়া ৩৩ জন শ্রমিককে আজ বুধবার উদ্ধার করার কথা রয়েছে। উদ্ধার কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রায় দুই মাস ধরে আটকে থাকা এসব শ্রমিককে খনি থেকে তুলে আনতে ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। উদ্ধার তৎপরতার খবর সংগ্রহ করতে সেখানে সারা বিশ্ব থেকে প্রায় এক হাজার ৭০০ সংবাদকর্মী জড়ো হয়েছেন।
চিলির প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা এবং বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেসের সেখানে উপস্থিত হয়ে উদ্ধার করা শ্রমিকদের অভিনন্দন জানানোর কথা রয়েছে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য খাড়াভাবে ৬২৫ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়েছে। সেখানে ফিনিক্স নামের ২১ বর্গ ইঞ্চির একটি ক্যাপসুল লিফট বসানো হয়েছে। ইতিমধ্যে উদ্ধারকারীরা লিফটের কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন। ওই লিফটে একজন করে শ্রমিককে তুলে আনা হবে। একজনকে তুলে আনতে সময় লাগবে ১৫ থেকে ২০ মিনিট।
উদ্ধার প্রকল্পের প্রধান প্রকৌশলী অ্যান্দ্রেস সুগারেত বলেছেন, শ্রমিকদের তুলে আনার সময় সম্ভাব্য যেসব সমস্যায় পড়তে হতে পারে, সেসব তাঁরা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন। লিফট ওঠানামা করার সময় সুড়ঙ্গের গা থেকে পাথর খসে লিফটের ওপরে পড়ার ঝুঁকি আছে। এ কারণে তাঁরা লিফটের ছাদটিতে লোহার অতিরিক্ত আস্তরণ লাগিয়ে দিয়েছেন।
এদিকে দীর্ঘদিন খনির নিচে আটকে থাকার পর সম্ভাব্য মুক্তির খবর পেয়ে শ্রমিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অতিরিক্ত মানসিক উত্তেজনায় রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার কারণে কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আবার অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পথে লিফটে চড়ে এই বিশাল পথ পাড়ি দেওয়ার ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে কেউই আগে লিফটে উঠতে চাইছেন না।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শ্রমিকদের তুলে আনার কাজ শুরু করার আগে খনির নিচে দুজন নার্স ও দুজন খনি বিশেষজ্ঞ যাবেন। যেসব শ্রমিক মানসিক ও শারীরিকভাবে শক্তসমর্থ, তাঁদের প্রথম দফায় ওঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আটকে পড়া শ্রমিকদের ৩২ জন চিলির এবং একজন বলিভিয়ার নাগরিক।
উদ্ধারকাজ শেষ করার পর শ্রমিকদের স্বাগত জানানোর জন্য খনির পাশেই বিশেষ তাঁবু ফেলা হয়েছে। সেখানে চিলির প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা এবং বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস উপস্থিত থাকবেন।

শীর্ষ ২০ ধনী নারীর ১১ জনই চীনের!

বিশ্বের শীর্ষ ২০ ধনী নারীর তালিকায় ১১ জনই চীনের নাগরিক। যুক্তরাষ্ট্রের টকশো উপস্থাপিকা অপরাহ উইনফ্রে ও লেখিকা জে কে রাউলিংয়ের সম্পদের চেয়েও তাঁদের গড় সম্পদের পরিমাণ (২৬০ কোটি ডলার) বেশি। গতকাল মঙ্গলবার চীনের একটি পত্রিকায় বিশ্বের শীর্ষ ধনী নারীদের এই তালিকা প্রকাশিত হয়েছে।
সাংহাইভিত্তিক পত্রিকা হুরুন শীর্ষ ধনী নারীদের সম্পদের বিবরণ দিয়ে ওই তালিকা প্রকাশ করেছে। তালিকায় দেখা যায়, শীর্ষ তিনজনই চীনের নাগরিক। কাগজ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের রানী হিসেবে পরিচিত ঝাং ইনের অবস্থান সবার ওপরে। তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ৫৬০ কোটি ডলার। তালিকায় নবম স্থানে থাকা অপরাহ উইনফ্রের সম্পদের পরিমাণ ২৩০ কোটি ডলার। হ্যারি পটার-খ্যাত লেখিকা ১০০ কোটি ডলার সম্পদের অধিকারী জে কে রাউলিংয়ের অবস্থান ২০তম।
হুরুন পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও শীর্ষ ধনীর তালিকা প্রণয়নকারী হুগওয়ার্ফ বলেন, ‘শীর্ষ ধনীর এই তালিকায় বিশ্বের অন্য কোনো দেশের নারী চীনের নারীদের ধারেকাছেই আসতে পারেননি।’
তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন, ব্রিটেনের তিনজন এবং ইতালি, রাশিয়া ও স্পেনের একজন করে নারীর নাম আছে। স্পেনের কাপড় ব্যবসায়ী রোসালিয়া মিরার সম্পদের পরিমাণ সাড়ে ৩০০ কোটি ডলার।
খবরে পুরুষদের সম্পদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়, এক হাজার ২০০ কোটি ডলারের সম্পদ নিয়ে চীনের ধনীদের তালিকায় শীর্ষে আছেন জং কিংহৌ।

ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্রের স্বীকৃতির দাবি ফিলিস্তিনের প্রত্যাখ্যান

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে ইসরায়েলের দেওয়া প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিনিরা। ইসরায়েল বলেছে, ফিলিস্তিন ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তারা স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়াতে রাজি আছে। কিন্তু তাদের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনিরা বলেছে, এই স্বীকৃতির সঙ্গে বসতি স্থাপন বা শান্তি আলোচনার কোনো সম্পর্ক নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত মাসে ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সরাসরি শান্তি আলোচনা টিকিয়ে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি স্থাপন। আলোচনা শুরুর সময় পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল ইসরায়েল। গত ২৬ সেপ্টেম্বর ওই স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ দাবি করে আসছে, ইসরায়েল বসতি স্থাপনের স্থগিতাদেশ না বাড়ালে তারা শান্তি আলোচনা থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু ইসরায়েল তা করতে নারাজ।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে গত সোমবার শীতকালীন অধিবেশন শুরু হয়েছে। অধিবেশনে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘ফিলিস্তিনি নেতারা তাঁদের জনগণকে যদি দ্ব্যর্থহীনভাবে জানান তাঁরা ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন, তাহলে আমি আমার মন্ত্রিপরিষদের কাছে বসতি স্থাপনের ওপর আরেকটি স্থগিতাদেশের প্রস্তাব করতে রাজি আছি।’
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত ওই ভাষণে নেতানিয়াহু আরও বলেন, ‘এ প্রস্তাব আমি আগে অন্যভাবে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, এখন সরাসরি বলছি।’
তবে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিনিরা। তারা বলেছে, ইসরায়েলকে তারা ইতিমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে, কাজেই নতুন করে স্বীকৃতি দেওয়ার কিছু নেই।
শান্তি আলোচনায় ফিলিস্তিনের পক্ষে প্রধান আলোচক সায়েব এরাকাত বলেছেন, মার্কিন মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা নিয়ে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার সঙ্গে ইসরায়েলের এই দাবির কোনো সম্পর্ক নেই।
সায়েব এরাকাত বলেন, ‘আমি আশা করি তিনি (নেতানিয়াহু) এই খেলা বন্ধ করবেন। বসতি স্থাপন বন্ধ করে শান্তি আলোচনা আবার শুরু করবেন।’
১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তির আগে ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তাঁদের ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাইবে না ফিলিস্তিনিরা, কেননা এতে ১৯৮৪ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় শরণার্থী হয়ে পড়া মানুষজনের নিজেদের দেশে ফেরার বিষয়টি কঠিন হয়ে যাবে।
ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি কখনোই মধ্যপ্রাচ্য-সংকট সমাধানের জন্য একান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। কিন্তু গত বছর নেতানিয়াহু ক্ষমতায় আসার পর থেকে ফিলিস্তিনের সঙ্গে যেকোনো শান্তিচুক্তির জন্য এটাকে অন্যতম শর্ত হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তবে এর মানে এই নয় যে আমি শান্তি আলোচনার জন্য এই বিষয়টিকে শর্ত হিসেবে বেঁধে দিচ্ছি। কিন্ত এতে কোনো সন্দেহ নেই যে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের দিক দিয়ে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে শান্তি আলোচনার বিষয়ে ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে। এতে আশা এবং বিশ্বাসের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে।’
তবে ইসরায়েলের এই প্রস্তাবের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা আগের অবস্থানেই আছি, আমরা চাই বসতি স্থাপনের ওপর স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো হোক।’
ইসরায়েলের হারেৎজ পত্রিকা লিখেছে, ‘তিনি (নেতানিয়াহু) যখন দাবি করেন যে আব্বাস ইসরায়েলকে ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিন, তখন তিনি আব্বাসকে রাজনৈতিক আত্মহত্যার প্রস্তাবই দেন।

সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিকানা গ্রহণ করেছে সরকার

হাঙ্গেরিতে বিষাক্ত বর্জ্যদূষণের ঘটনায় গতকাল মঙ্গলবার এমএএল হাঙ্গেরিয়ান অ্যালুমিনিয়াম প্রোডাকশন অ্যান্ড ট্রেড কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ সে দেশের সরকার গ্রহণ করেছে। এর আগে ওই কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়। দেশটির প্রধানমন্ত্রীর এক মুখপাত্র এ তথ্য জানান।
ওই মুখপাত্র জানান, পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে ওই কোম্পানিকে জাতীয়করণ করার পক্ষে সর্বসম্মতভাবে একটি বিল গৃহীত হয়। বিলের পক্ষে ৩৩৬টি ভোট এবং বিপক্ষে মাত্র একটি ভোট পড়ে। পরে বিলটিকে আইনে পরিণত করা হয়। আইন অনুযায়ী, ওই কোম্পানির সব সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে। এ ছাড়া কোম্পানি পরিচালনা করার জন্য রাষ্ট্র একজন প্রতিনিধি কিংবা কমিশনার নিয়োগ দেবে। বর্জ্যদূষণ ঘটনার সমাধানে কমিশনার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। ইতিমধ্যে জাতীয় দুর্যোগ ও ত্রাণ বিভাগের প্রধান গিওরজি বাকোন্দিকে ওই কোম্পানির কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সপ্তাহ খানেক আগে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টের ১০০ মাইল পশ্চিমে আজকা শহরে এমএএলের মালিকানাধীন অ্যালুমিনিয়াম তৈরির কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য সংরক্ষণাগারের বাঁধ ধসে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এএফপি।

ইউক্রেনে বাস-ট্রেন সংঘর্ষে নিহত ৪০

ইউক্রেনের মধ্যাঞ্চলীয় দিনিপ্রোপেত্রোভাস্ক শহরের কাছে গতকাল মঙ্গলবার বাস ও ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৪০ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এ ছাড়া আহত হয়েছে ১২ জন। দেশটির কর্মকর্তারা এ তথ্য জানান।
পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, ট্রাফিক সংকেত অমান্য করে বাসটি রেললাইন অতিক্রম করার চেষ্টাকালে স্থানীয় সময় সকাল আটটা ৩০ মিনিটে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল থেকে ৪০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচ এক বিবৃতিতে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। এ ছাড়া দুর্ঘটনার কারণ উদ্ঘাটনে দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই ক্লুয়েভকে প্রধান করে তিনি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গে ভারত ও যুক্তরাজ্যের সামরিক মহড়া

পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কলাইকুন্ডায় আগামী ২০ অক্টোবর থেকে শুরু হচ্ছে ভারত-ব্রিটেন বিমানবাহিনীর যৌথ সামরিক মহড়া। এই মহড়ার নাম দেওয়া হয়েছে এক্সারসাইজ ইন্দ্রধনু-৩। চলবে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত। এতে ব্রিটেনের ২৬০ জন বৈমানিক যোগ দেবেন।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি রাজধানী নয়াদিল্লিতে বলেছেন, ব্রিটেনের রাজকীয় বিমানবাহিনীর সঙ্গে ভারতীয় বিমানবাহিনীর এই যৌথ মহড়া হবে। এতে যোগ দেবে ভারতের সুখোই-৩০ এম কে আই এবং ব্রিটেনের ইউরো ফাইটার। আরও থাকবে অ্যাওয়াকস। এ ছাড়া থাকবে মাঝ আকাশে জ্বালানি ভরার জন্য আইএল-৭৮ ও ভিসি-১০ বিমান।

আফগানিস্তানে ব্রিটিশ জিম্মির মৃত্যু তদন্তের নির্দেশ

আফগানিস্তানে নিয়োজিত মার্কিন কমান্ডার জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস জিম্মি ব্রিটিশ ত্রাণকর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ব্রিটিশ ত্রাণকর্মী লিন্ডা নোরগ্রোভ গত শুক্রবার নিহত হন। প্রাথমিকভাবে তাঁর মৃত্যুর জন্য জিম্মিকারীদের দায়ী করা হচ্ছে। এর আগে মার্কিন সেনারা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন বলেছেন, লিন্ডা নোরগ্রোভ মার্কিন গ্রেনেড হামলায় দুর্ঘটনাক্রমে নিহত হতে পারেন। তবে লিন্ডাকে উদ্ধারের প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হলো, সে ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন যৌথভাবে তদন্ত করবে। ইউএস স্পেশাল অপারেশন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জোসেফ ভোটেলের নেতৃত্বে এই তদন্ত হবে।
তদন্তকারীরা তাঁদের হেলিকপ্টার ও চালকবিহীন বিমান হামলার ভিডিও ফুটেজগুলো পরীক্ষা করে দেখবেন। তাঁরা অভিযানে অংশ নেওয়া সেনাদের সাক্ষাৎকারও নেবেন।
ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যেই এই তদন্ত শেষ হবে এবং লিন্ডা নোরগ্রোভের পরিবারকে জানানোর পর তা জনসমুখে প্রকাশ করা হবে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানের কুনার প্রদেশ থেকে লিন্ডা অপহূত হন।

লৈঙ্গিক সমতায় এগিয়ে নরডিক দেশগুলো

লৈঙ্গিক সমতার দিক দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে ভালো দেশ আইসল্যান্ড। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
ডব্লিউইএফের ‘গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ’ প্রতিবেদনে লৈঙ্গিক সমতার দিক দিয়ে এ নিয়ে পর পর দুবার শীর্ষ অবস্থানে থাকল আইসল্যান্ড। ১৩৪টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানেও আছে আরও দুই নরডিক দেশ নরওয়ে ও ফিনল্যান্ড। চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে আছে যথাক্রমে সুইডেন ও নিউজিল্যান্ড।
রাজনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্বাস্থ্যের দিক দিয়ে নারী ও পুরুষের তুলনামূলক অবস্থান বিবেচনা করে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
এই তালিকায় যুক্তরাজ্যের অবস্থান ১৫ নম্বরে। গত বছরও তারা একই অবস্থানে ছিল। সবচেয়ে বেশি অবনমন হয়েছে ফ্রান্সের। ২০০৯ সালে তাদের অবস্থান ১৮তম থাকলেও এবার ৪৬-এ নেমে এসেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র আগের বছরের ৩১ নম্বর থেকে এবার ১৯-এ উঠে এসেছে। তাদের ক্ষেত্রে ফ্রান্সের ঠিক উল্টোটা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সরকারে বেশ কয়েকজন নারী স্থান পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের এই অগ্রগতি। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রই এখন এ বিষয়ে সবার ওপরে। এই অবস্থানে আগে ছিল কানাডা।
লৈঙ্গিক বৈষম্যের দিক দিয়ে ১৩৪টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ তিনটি দেশ ইয়েমেন (১৩৪), চাদ (১৩৩) এবং পাকিস্তান (১৩২)। ডব্লিউইএফ জানিয়েছে, তাদের জরিপে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে ব্যবধান সবচেয়ে কম। আর্থিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান সবচেয়ে বেশি।

ভারতসহ চার দেশ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য

টানা ১৯ বছরের বিরতির পর আবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দুই বছরের জন্য (২০১১-১২) অস্থায়ী সদস্যপদ পেয়েছে ভারত। গতকাল মঙ্গলবার সাধারণ পরিষদের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দেওয়া ভোটে জাপানকে পরাজিত করে ভারত এ সদস্যপদ লাভ করে। এ ছাড়া আরও তিনটি দেশ দুই বছরের জন্য নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য পদে নির্বাচিত হয়েছে। দেশ তিনটি হলো জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কলম্বিয়া।
১৯১টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ভারত এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে ১৮৭টি দেশের সমর্থন পেয়েছে। ১৯৯২ সালের পর এই প্রথম ভারত আবার অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। ১৯৯৬ সালে এ নির্বাচনে ভারত জাপানের কাছে প্রায় ১০০ ভোটের ব্যবধানে হেরে যায়। তবে এ বছর জাপানকে হারাতে সক্ষম হয় ভারত।
আফ্রিকা অঞ্চল থেকে উগান্ডার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। ল্যাটিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলো থেকে মেক্সিকোর স্থলাভিষিক্ত হয়েছে কলম্বিয়া। পশ্চিম ইউরোপ এবং অন্যান্য এলাকার প্রতিনিধি হিসেবে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের স্থলাভিষিক্ত হতে কানাডা, জার্মানি ও পর্তুগাল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
আগামী বছর থেকে নবনির্বাচিত দেশগুলো পরবর্তী দুই বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করবে।

সিয়াওবোর নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেন তাঁর স্ত্রী

এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী চীনের কারাবন্দী মানবাধিকারকর্মী লিউ সিয়াওবোর পক্ষে নরওয়েতে গিয়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে পারেন তাঁর স্ত্রী লিউ সিয়া। গতকাল মঙ্গলবার লিউ সিয়ার বরাত দিয়ে হংকংভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ইনফরমেশন সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি এ কথা জানিয়েছে। এদিকে লিউয়ের স্ত্রীকে মুক্তভাবে চলাফেরা করতে দেওয়ার জন্য চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর লিউয়ের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তিয়েনআনমেন স্কয়ারে নিহত ছাত্রদের স্বজনেরা।
মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, স্ত্রীকে নরওয়েতে গিয়ে পুরস্কার গ্রহণ করতে বলেছেন লিউ। গত রোববার চীনের জিনঝু প্রদেশের কারাগারে স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাতের সময় এ ব্যাপারে তাঁদের কথা হয়। এ বছরের ডিসেম্বরে নরওয়ের রাজধানী অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে। চীনে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় লিউকে। রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অপরাধে গত বছর লিউকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
স্ত্রী লিউ সিয়া বলেন, কারাগারে তাঁর স্বামীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়েছে এবং কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, লিউ গ্যাস্ট্রিক ও আলসারে ভুগছেন। তবে তিনি হেপাটাইটিস-বিতে আক্রান্ত কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। গত সোমবার থেকে লিউকে ভালো খাবার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান সিয়া।
স্বামীর সঙ্গে দেখা করে আসার পর থেকে লিউ সিয়াকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে বলে সোমবার দাবি করেছে আরেকটি মানবাধিকার সংস্থা। নিজের টুইটার অ্যাকাউন্টেও গৃহবন্দিত্বের কথা লিখেছেন সিয়া। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সিয়াকে অবাধে চলাফেরা করতে দেওয়ার জন্য গতকাল চীন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ ব্যাপারে এক বিবৃতিতে বেইজিংয়ে মার্কিন দূতাবাসের মুখপাত্র রিচার্ড বুয়ানগান বলেন, ‘একাধিক সংবাদ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, লিউ সিয়া বেইজিংয়ে গৃহবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করতে এবং সব চীনা নাগরিকের মানবাধিকার ও স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান জানাতে আমরা চীনকে আহ্বান জানাচ্ছি।’ গত সোমবার ইউরোপের ১০টি দেশের কূটনীতিকেরা সিয়ার সঙ্গে দেখা করতে চাইলে বাধা দেয় চীনা কর্তৃপক্ষ।
এদিকে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে নিহতদের স্বজনদের সংগঠন ‘তিয়েনআনমেন মাদার্স’-এর পক্ষ থেকে লিউ সিয়াওবোর মুক্তি দাবি করা হয়েছে।

মার্কিন রেস্তোরাঁগুলোতে হামলার আহ্বান আল-কায়েদার

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে জনবহুল রেস্তোরাঁগুলোতে হামলা চালানোর জন্য সে দেশের জিহাদিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আল-কায়েদা। সংগঠনের ইংরেজি ভাষার সাময়িকী ইন্সপায়ার-এর দ্বিতীয় সংখ্যায় এ আহ্বান জানানো হয়েছে।
৭৪ পৃষ্ঠার এই সাময়িকীতে ইয়াহিয়া ইব্রাহিম নামের এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘ওয়াশিংটনের রেস্তোরাঁগুলোতে মধ্যাহ্নভোজের সময় একের পর এক হামলা চালাতে পারলে কিছু সরকারি কর্মকর্তাকে শেষ করা যাবে।’
ইব্রাহিম আরও বলেন, ‘এ ধরনের হামলা চালানোই ভালো। এতে করে গণমাধ্যমে বেশি সাড়া ফেলা যাবে।’ ইসলামের জন্য যারা জীবন বাজি রাখতে প্রস্তুত, তারা পিকআপ ট্রাক থেকে শুরু করে প্রেসার-কুকার বোমা ব্যবহার করে এ ধরনের হামলা চালাতে পারে।
আরও লেখা হয়েছে, ‘ট্রাকের সামনে স্টিলের ব্লেড বেঁধে জনবহুল রাস্তার ওপর দিয়ে চালিয়ে ইসলামের শত্রু আমেরিকানদের কচুকাটা করা যেতে পারে।’
‘আমাদের মার্কিন ভাইদের প্রতি কিছু পরামর্শ’ শিরোনামের লেখায় আরও বলা হয়েছে, ‘এর আগে কখনো হামলার জন্য এ ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি।’
সাময়িকীতে আল-কায়েদার শীর্ষস্থানীয় নেতা আনওয়ার আওলাকির মন্তব্যও আছে। তিনি ‘মার্ডিন ঘোষণার’ নিন্দা করে বলেছেন, এটা ‘অসম্মানজনক’ এবং ‘এতে শুধু কালি-কলমের অপচয়’ হয়েছে।
গত মার্চ মাসে তুরস্কের মার্ডিন শহরে মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের একটি সম্মেলন শেষে মার্ডিন ঘোষণা গৃহীত হয়েছিল। এতে সন্ত্রাসবাদের নিন্দা জানানো হয়।
আল-কায়েদার কাছ থেকে এ ধরনের হুমকির জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ (ডিএইচএস) এর আগে বলেছিল, এ ধরনের একটি সাময়িকী যে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালাতে মার্কিন নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানাবে, তা ডিএইচএস এবং এফবিআই ধারণা করতে পেরেছিল।
ইন্সপায়ার সাময়িকীর প্রথম সংখ্যায় ওসামা বিন লাদেন ও আওলাকির নিবন্ধ ছিল। এতে পশ্চিমাদের ওপর হামলা চালাতে এবং জিহাদে যোগ দিতে পশ্চিমা পাঠকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
দ্বিতীয় সংখ্যায় একটি নিবন্ধ লিখেছেন মার্কিন নাগরিক সামির খান। নর্থ ক্যারোলাইনার বাসিন্দা সামির বলেছেন, আমেরিকার একজন বিশ্বাসঘাতক হতে পেরে তিনি গর্বিত।
২৪ বছর বয়সী সামির লিখেছেন, ‘আমি আমেরিকার একজন বিশ্বাসঘাতক, আমার ধর্ম রক্ষার জন্যই আমাকে তা হতে হয়েছে। আমরা জিহাদ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছি। হয় ইসলামকে সারা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করে যাব, নাহয় ইসলামের পতাকাবাহী হিসেবে মহান আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যাব।

প্রার্থীদের অনেকেই আসামি

ভারতের বিহার রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে যেসব প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন, তাঁদের মধ্যে রাজ্যের ক্ষমতাসীন জোটে বিভিন্ন মামলার আসামি রয়েছেন সবচেয়ে বেশি। ন্যাশনাল ইলেকশন ওয়াচ সমীক্ষা চালিয়ে এ তথ্য দিয়েছে।
বিহারে বিধানসভার ২৪৩টি আসনে নির্বাচন শুরু হবে ২১ অক্টোবর। ছয় দফায় ২০ নভেম্বর পর্যন্ত এই নির্বাচন চলবে। ফলাফল ঘোষণা করা হবে ২৪ নভেম্বর।
সমীক্ষা অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন বিজেপি-জনতা দলের (সংযুক্ত) প্রধান শরিক বিজেপির প্রার্থীদের মধ্যে মামলার আসামি রয়েছেন ৪১ জন। অপর শরিক মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের জনতা দলে (সংযুক্ত) এমন প্রার্থী রয়েছেন ৩১ জন। রাম বিলাশ পাশোয়ানের লোকজনশক্তি পার্টির প্রার্থীদের মধ্যে আসামি ১০ জন। লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দলে এমন প্রার্থী রয়েছেন ২২ জন। এসব প্রার্থীদের বিরুদ্ধে খুন, চাঁদাবাজি, অপহরণ, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।
সমীক্ষার তথ্যমতে, বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও লালুপ্রসাদ যাদবের সহধর্মিণী রাবড়ি দেবীর রয়েছে ৬২টি গরু ও ৪২টি বাছুর, যার মূল্য ১৭ লাখ ৮০ হাজার রুপি। আর লালু-রাবড়ির রয়েছে সর্বমোট চার কোটি ৫৮ লাখ রুপির সম্পত্তি। রাবড়ি দেবী এবার বিহারের রঘোপুর ও শোনপুর কেন্দ্র থেকে লড়ছেন। অন্যদিকে এবার বিহারে তিন বাম দল সিপিআই, সিপিএম ও সিপিআই (এমএল) এবার ঐক্যবদ্ধভাবে জোট গড়ে লড়ছে।

পাকিস্তানে আসছেন দূত মেসি

এই সেদিন চীন পর্যন্ত এসে গেছেন। এবার আপনার বাড়ির আরও কাছে আসছেন বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি। ফক্স স্পোর্টস তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূত মেসিকে সংস্থাটি যুদ্ধ, সন্ত্রাস, দুর্যোগকবলিত পাকিস্তান ও গাজায় পাঠাতে চায়।
ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এই দুই জায়গায় বিপন্ন মানবতার পাশে শান্তির দূত হয়ে দাঁড়াবেন মেসি। যুদ্ধে বিপন্ন শিশুদের নিয়ে কাজ করবেন। ফক্স স্পোর্টসের দাবি অনুসারে, আগামী বছর জুলাইয়ের মাঝামাঝি মেসি এই সফরে বের হবেন। ওই সময় ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলে কোনো ব্যস্ততা থাকবে না, শেষ হয়ে যাবে কোপা আমেরিকাও। ফলে বার্সেলোনা তারকাকে ফাঁকাই পাবে ইউনিসেফ।
ইউনিসেফের সঙ্গে বার্সেলোনার সম্পর্ক অনেক পুরোনো। সেই সুবাদে মেসিও বৈশ্বিক এই সংস্থার নানা কাজের সঙ্গে জড়িত। এ বছরই মার্চ মাসে সম্পর্কটা আরও দৃঢ় হয়েছে। মেসিকে নিজেদের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে ঘোষণা করেছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক এই সংস্থা। মাস কয়েক আগে ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত হাইতিতেও ঘুরে এসেছেন তিনি।

বিসিবির সভাপতি এবার আইসিসিতে

এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের প্রধান হয়েছেন আগেই। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি আ হ ম মোস্তফা কামাল এবার হলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) অডিট কমিটির চেয়ারম্যান।
বিসিবির কোনো প্রতিনিধির আইসিসির কোনো সম্মানজনক পদে যাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম। আইসিসির অর্থনৈতিক প্রতিবেদন প্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, অডিট প্রক্রিয়া ছাড়া আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখাশোনার ভার অডিট কমিটির।

চার দিনের ম্যাচ থামিয়ে ওয়ানডে!

প্রথম পর্বের তিন ম্যাচ শেষেই আবহাওয়ার কাছে আত্মসমর্পণ করল জাতীয় ক্রিকেট লিগ। এ মাসে আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা থাকায় আজ-কালের মধ্যেই স্থগিত ঘোষণা করা হবে চার দিনের ম্যাচ। বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটি চার দিনের ম্যাচ স্থগিত করে ২২-২৩ অক্টোবর থেকে জাতীয় লিগের এক দিনের ম্যাচ শুরু করার প্রস্তাব করবে ক্রিকেট পরিচালনা কমিটির কাছে। ঘরোয়া ক্রিকেটের বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ওয়ানডে টুর্নামেন্ট শুরুর কথা ছিল আগামী ৫ নভেম্বর থেকে।
টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান বিসিবির পরিচালক গাজী আশরাফ হোসেন কাল বলেছেন, ‘আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এ মাসের ১৭-১৮ তারিখ পর্যন্ত বৃষ্টির আশঙ্কা আছে। এমনিতেই এক রাউন্ডের ম্যাচ বৃষ্টির কারণে স্থগিত করতে হয়েছে। পরের ম্যাচগুলোতেও সেটা হলে নির্ধারিত সময়ের আগে চার দিনের ম্যাচ শেষ করা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে ওয়ানডে টুর্নামেন্টও ঠিক সময়ে শুরু করা যাবে না।’ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এবারের জাতীয় লিগে ওয়ানডে ম্যাচের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সামনে প্রিমিয়ার লিগ, এশিয়ান গেমসেও চলে যাবেন অনেক ক্রিকেটার। এসব মাথায় রেখে জাতীয় লিগের ওয়ানডে টুর্নামেন্টটা ঈদুল আজহার ছুটির আগেই শেষ করার ইচ্ছা টুর্নামেন্ট কমিটির। সে ক্ষেত্রে চার দিনের ম্যাচ হবে বিশ্বকাপ চলাকালীন।
এবার প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ শুরু হওয়ার কথা আগামী ১৮ ডিসেম্বর থেকে। জাতীয় লিগের সূচি রদবদলে এই লিগটাও একটা কারণ বলে জানিয়েছেন টুর্নামেন্ট কমিটির প্রধান, ‘বিশ্বকাপের প্রস্তুতির জন্য প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচগুলোর মধ্যে তিন দিন করে বিরতি চেয়েছেন জাতীয় দলের কোচ। প্রিমিয়ার লিগের জন্য এবার তাই একটু বেশি সময় লাগবে। তা ছাড়া সামনে এশিয়ান গেমস আছে। ওয়ানডে পরে হলে সব ক্রিকেটার হয়তো তাতে খেলতে পারবে না।’ ওয়ানডে টুর্নামেন্টের ভেন্যু হিসেবে রাজশাহী, বগুড়া ও বিকেএসপির নাম প্রস্তাব করবে টুর্নামেন্ট কমিটি। ৪ থেকে ৭ অক্টোবর রাজশাহী, বগুড়া ও যশোরে চার দিনের ম্যাচের প্রথম পর্বের তিনটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃষ্টিতে বিঘ্নিত হয়েছে যশোরে হওয়া রাজশাহী-সিলেট ম্যাচটি। আর ১০ অক্টোবর থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে স্থগিতই করে দিতে হয়েছে তা।
চার দিনের ম্যাচ আপাতত হচ্ছে না জেনে কোনো কোনো দল এরই মধ্যে শুরু করে দিয়েছে এক দিনের ম্যাচের প্রস্তুতি। আমাদের রাজশাহী অফিস জানিয়েছে, রাজশাহী বিভাগীয় স্টেডিয়ামে ৯ অক্টোবর থেকেই কোচ শাহনেওয়াজ শহীদ শানুর তত্ত্বাবধানে শুরু হয়ে গেছে রাজশাহী বিভাগীয় দলের অনুশীলন।

তিনে তিন মেনেজেসের

ধীরে ধীরে জাগছে ‘সুন্দর ফুটবল’, যার প্রতিশ্রুতি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই দিয়েছিলেন মানো মেনেজেস। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিপক্ষে ম্যাচ দুটিতে অবশ্য সুন্দর ফুটবল খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু পরশু ইউক্রেনের বিপক্ষে রবিনহো-পাতো-আলভেজরা ২-০ গোলে শুধু জিতলেনই না, জানিয়ে দিলেন, আক্রমণাত্মক সুন্দর ফুটবলের মন্ত্রেই তাঁরা উজ্জীবিত।
এই নিয়ে মেনেজেসের অধীনে তিন ম্যাচের তিনটিতেই জিতল ব্রাজিল। ইরানের বিপক্ষে ৩ গোলের জয়ে একটি করে গোল করেছিলেন দানি আলভেজ ও আলেজান্দ্রে পাতো। পরশু আন্দ্রেই শেভচেঙ্কো-বিহীন ইউক্রেনের বিপক্ষেও এই দুজনের গোলেই জয় পেল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। ম্যাচটি হয়েছে ইংল্যান্ডে।
২৫ মিনিটে রবিনহোর বাড়ানো বল ভলি করে ব্রাজিলকে লিড এনে দেন আলভেজ। ৬৪ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটি করেছেন এসি মিলান তারকা পাতো। দুঙ্গার বিশ্বকাপ দলে সুযোগ না পাওয়া ২১ বছর বয়সী পাতো মেনেজেস যুগে তিন ম্যাচ খেলে গোল করলেন তিনটিতেই। ব্রাজিলের জালেও বল একটা ঢুকেছিল। কিন্তু অফসাইডের কারণে ওলেকসান্ডারের গোল বাতিল করে দেন রেফারি। আলভেজের ফ্রি-কিক, ডেভিড লুইসের শট পোস্টে প্রতিহত না হলে আরও দুটো নিশ্চিত গোল পেতে পারত ব্রাজিলও।
দলের জয়, সঙ্গে উজ্জীবিত পারফরম্যান্সে কোচ মেনেজেসকে এই প্রথম দেখা গেল তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে, ‘ম্যাচ এবং দলের খেলার ধরনে আমি সন্তুষ্ট। আমরা প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য মাত্র তিন দিন সময় পেয়েছিলাম। দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই তরুণ। দলের উন্নতিতে আমি খুশি।’

দুই মেরুতে দুই দল

দূর থেকে দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। সাইটস্ক্রিনের সামনে ম্যাচের মতো করে ব্যাটিং অনুশীলন করছে নিউজিল্যান্ড। বোলিং করছেন একগাদা স্পিনার। কিন্তু ড্যানিয়েল ভেট্টোরি ও নাথান ম্যাককালাম ছাড়া নিউজিল্যান্ড দলে তো স্পিনার বলতে আর কেবল স্পিনিং অলরাউন্ডার কেন উইলিয়ামসন! এত স্পিনার তাহলে এলেন কোত্থেকে? রাতারাতি নিউজিল্যান্ড থেকে ডজনখানেক স্পিনার উড়িয়ে আনা হলো নাকি!
কাছে যেতেই ভুল ভাঙল। স্পিন করা যাঁদের কাজ, তাঁরা তো বটেই, দলের ফিল্ডিং কোচ-ম্যানেজারসহ সাপোর্ট স্টাফের সবাই স্পিন বল করছেন। স্পিন-বিষে কিউইরা যেভাবে নীল হচ্ছে, স্পিনারদের এ রকম মেলা খুব একটা অবাক করল না। অবাক করল না ম্যাচের পরদিন গোটা স্কোয়াডের অনুশীলনে চলে আসাও। সাধারণত ম্যাচের পরদিন থাকে ঐচ্ছিক অনুশীলন, একাদশের বাইরে থাকা তিন-চারজন এসে খানিকটা ঘাম ঝরিয়ে চলে যান। কিন্তু ২-০-তে পিছিয়ে থাকা দলের সেই বিলাসিতার সুযোগ কোথায়? কাল সকাল নয়টায়ই তাই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে হাজির পুরো নিউজিল্যান্ড দল।
আর বাংলাদেশ? প্রায় প্রতি সিরিজেই দেখা যায় ম্যাচের পরদিন হোটেলে বিশ্রাম নেয় প্রতিপক্ষ, আর অনেক অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে অনুশীলনে ঘাম ঝরায় বাংলাদেশ দল। কিন্তু এই সিরিজের বাংলাদেশ কি আর সেই বাংলাদেশ! বেলা একটার দিকে অনুশীলনে এলেন কেবল মুশফিকুর রহিম ও রকিবুল হাসান। বাকি সবাই হোটেলে বিশ্রামে। এই দুজনও নেটে ঘণ্টাখানেক ব্যাটিং করে চলে গেলেন। নেই কোচিং স্টাফের কেউ। কোচ জেমি সিডন্স অবশ্য আগের দিনই বলে দিয়েছিলেন, কেউ ব্যাটিং করতে চাইলে তিনি আসতে প্রস্তুত। কিন্তু মুশফিক-রকিবুলরাই কোচকে আর টানেননি। দলের সবাই দারুণ খোশমেজাজে, রাতে ছিল টিম ডিনার। কী মধুর সময়ই না যাচ্ছে!
তাই বলে ভাববেন না দুই ম্যাচ জিতে আয়েশি হয়ে গেছে বাংলাদেশ দল। দুটো ম্যাচ জিততে শক্তি তো আর কম ক্ষয় হয়নি। আবার পূর্ণোদ্যমে মাঠে নামতে কালকের বিশ্রামটা জরুরি ছিল, জানালেন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। শুধু দলের খেলায়ই নয়, বাংলাদেশের বদলে যাওয়া মানসিকতা ফুটে উঠল সাবেক সহ-অধিনায়কের কণ্ঠেও, ‘আজ (গতকাল) ঐচ্ছিক অনুশীলন বলেই অন্যরা আসেনি, পর্যাপ্ত বিশ্রাম সবার জন্যই জরুরি। অনুশীলনের জন্য কালকের (আজ) দিনটা তো আছেই। সিরিজে হারছি না, তাই বলে সিরিজ ড্র করার মানসিকতা আমাদের নেই। আগে হয়তো একটা-দুটো জয় পেলেই আমরা খুশি হয়ে যেতাম। এখন জিততে চাই সিরিজ।’ নিউজিল্যান্ডের মতো দলের বিপক্ষে টানা দুটো জয়ের পরও উন্নতির জায়গা দেখছে বাংলাদেশ, সেটাও জানালেন মুশফিকুর।
দুটো হার একটু যেন বদলে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড দলকেও। বাংলাদেশ সফরে আসা সবচেয়ে মিশুক বিদেশি দল কি না, সিরিজের শুরু থেকেই এই নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে ছিল এমন আলোচনা। রাতারাতি তাদের ব্যবহার আমূল বদলে যায়নি, তবে পরাজয়ের ছাপ কিছুটা হলেও পড়েছে আচরণে। কাল মাঠে গিয়েই দলের ম্যানেজার মাইকেল শার্প নিরাপত্তাকর্মীদের বলে দেন, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন না তাঁর দলের কেউ। অনেক অনুরোধের পর রাজি হলেন, তবে কোনো ক্রিকেটার নয়, কথা বললেন দলের ফিল্ডিং কোচ ট্রেন্ট উডহিল।
সিরিজের আগে তারা ছিল নিরঙ্কুশ ফেবারিট, আর এখন লড়াই করছে সিরিজ বাঁচাতে। ফিল্ডিং কোচ জানালেন, স্বাভাবিকভাবেই দলের সবাই খুব হতাশ। পরশু ম্যাচে হারার পর ড্রেসিংরুমেই জরুরি টিম মিটিং সেরে নিয়েছে নিউজিল্যান্ড দল। সেখানে কী কথা হয়েছে, বলতে চাইলেন না ম্যানেজার শার্প। তবে খোশগল্প যে হয়নি, এটা অনুমান করতে জ্যোতিষী হওয়ার প্রয়োজন নেই। কাল অনুশীলনের সিরিয়াসনেস, সবার প্রত্যয়ী কথাবার্তাই বলে দিচ্ছে, সিরিজ হারের লজ্জা বাঁচাতে পরের দুটো ম্যাচ কিউইরা নিয়েছে ‘জীবন-মরণ বাজি’ হিসেবে।
সাকিবদের চূড়ান্ত পরীক্ষা হয়তো সামনের ম্যাচ দুটোই।

গল্প- 'সম্পর্ক' by তারিক আল বান্না

দুই বন্ধু রফিক আর সাইফুলের গল্প এটা। গত শতকের শেষ দশকের প্রথমার্ধের এক অদ্ভুত সময় তখন; বয়স্কদের শাসন করছে শিশুরা (গণতন্ত্র)। নতুন সরকারের আগমনের সাথে সাথে নতুন উদ্যমে ঢুকছে ফারাক্কার পর স্বাধীনতা পরবর্তী গত ৩৭ বছরে প্রতিবেশীর দেয়া ২য় শ্রেষ্ঠ প্রীতি উপহার। ১ নম্বরটার উপলক্ষ্য ছিল পেট-খাদ্য-কৃষি, আর ২ নম্বরটা উপলক্ষ্য ছিল আসক্তি—মগজহীন একটা গোটা প্রজন্ম। আরও অনেকের মত রফিক আর সাইফুলও কৈশোর থেকে একত্রে বড় হওয়া—নৌকায় করে বছিলা, রায়েরবাজার পার হয়ে কামরাঙ্গীর চর হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত চলে যাওয়া, মিরপুর ব্রিজ থেকে একত্রে তুরাগে লাফিয়ে পড়ার দুঃসাহসী নির্মল আনন্দ, টার্মিনালের মতিগো লগে লাগলে একত্রে হকিস্টিক-রামদা নিয়ে হিটে যাওয়া, আরও কয়েক বছর পরে, ততদিনে ডাইল চিনে গেছে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় বাগবাড়ী, মুন্সীবাড়ির ঘাট পার হয়ে মাইলের পর মাইল ভিতরের নির্জনতার মধ্যে একান্ত-আসল-নিজস্ব আড্ডা দেয়া প্রজন্মের প্রতিনিধি। অন্যদের মত তারাও এই যুক্তিহীন বয়স্কদের বালখিল্যতায় ভরা এই সময়ের বলি।

গল্প- 'তিতা মিঞার জঙ্গনামা' by অদিতি ফাল্গুনী

১.
শ্রী শ্রী এলাহি ভরসা

মোরসেদের বাহুর তলেনাচার সাজন বলে
ফজল কর আজি জেল গপ ফুল।
নামনি হালদারের গাতিমেসে-সোমপুর বসতি
জমা রাখি পাশ আউসে সোমপুর।
বড় ভাই-এর নাম মাজমছোট পাতলা মেজো সাজন
ছোট ভাই গিয়েছে মরে।
সাজন বড় গোনাগারসাত বছর মেয়াদ তার
কয়েদ হ’ল দিনের লড়াই করে।

গল্প- 'কর্কট' by রাশিদা সুলতানা

রের দরজায় পাটিতে বসে মালার মাথাটা কোলের উপর ধরে নুরজাহান উঁকুন আনছিল। ঘুপচিগলির এই ঘরে কেবল দরজার কাছটায় দিনের আলোয় খানিক আলোকিত হয়। টিনের একচালা ঘরের এই রুমের বাকি অংশটুকু সারাক্ষণ অন্ধকারেই থাকে। উঁকুনের কামড়ে ঘুমের মাঝে মেয়েটা সারারাত মাথা চুলকায়। দিনের বেলা একঘণ্টা ঘুমালেও মাথার চুলকানিতে অস্থির হয়ে থাকে । দুপুরের খাবারের পর মেয়েকে পাঁকড়াও করে বসে উঁকুন-নিধন যজ্ঞে। ঘরের ঘুলঘুলিতে চড়ুইপাখি চিড়িৎ চিড়িৎ ডেকে যাচ্ছে। চৌকাঠের অদূরে ড্রেনের কালো ময়লা পানি বাতাসে তিরতির তরঙ্গে বয়ে যায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে। কালো মাছি উড়ছে ভন ভন করে। উঁকুন মারা মাছ ধরার মতোই নেশার ব্যাপার। শরীরে ব্যথা থাকায় এবং চোখে খানিক কম দেখায় দু’তিনটা ছোট ছোট উঁকুন তার হাতছাড়া হয়ে যায়। মেয়ের মাথার সব চুল উলটপালট করে লিকি, ঢেলা বেশ কয়টা ধরা পড়ে। বামদিকের একটা ঘর থেকে ময়না বের হয়ে এসে ড্রেনের উপর বমি করছে। খানিক আগেই তার ঘর থেকে উচ্চ হাসির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। হলুদ আঠালো পদার্থের সাথে একদলা ভাত বেরিয়ে ড্রেনের কালো পানির স্রোতে মিশে যাচ্ছে। মেলামাইনের গ্লাসে পানি নিয়ে কুলি করে। খানিক পরই ময়নার ঘর থেকে ময়না আর এখানকার দালাল সিরাজের উচ্চ হাসির শব্দ শোনা যায়। ময়নার বমি, কুলি করা, উচ্চ হাসি কোনোকিছুই মাজেদার গভীর অভিনিবেশে উঁকুন আনায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে না।

গল্প- 'কোষা' by পাপড়ি রহমান

আমাদের বাড়িতে অন্ধকার নামতো সূর্য ডোবার ঢের আগে। ছোট-বড়-মাঝারি নানাজাতের গাছপালায় ঘেরা বলে রোদের মুখ দেখা যেতো কি যেত না। মাকড়সার জালের মতো ছড়ানো আলো ঈষৎ ঝিলিক মেরেই দ্রুত লুকিয়ে পড়তো ওই ঘিঞ্জি পাতা-লতার আড়ালে। ফলে প্রতিদিনই সন্ধ্যা নামার আগে-ভাগেই বাড়িটা ঝুপ করে কোনো গভীর কুয়ার ভেতর ঢুকে পড়তো। আর এই রকম হঠাৎ নামা অন্ধকারে আমাদেরও গা ছমছম করে উঠতো। প্রতিদিন সন্ধ্যার আগেই রাত হয়ে যাওয়া, আর এতে আমরা অভ্যস্তই বলা চলে — তবুও ভয় আমাদের জোঁকের মতো কামড়ে থাকতো। এই ভয় তাড়ানোর কোনো উপায়ও আমাদের জানা ছিল না। বাড়ির দক্ষিণ দিকে একেবারে পাতায় পাতাময় গাবগাছ — দিবা নাই নিশি নাই বিশাল ছাতার মতো নিজেকে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাতাস, ঝড় এমনকি ঘূর্ণিঝড়েও কখনো একটা পলকা ডালও তার ভেঙে পড়ে নাই। ওই সবল গাছের দিকে আমরা মনের ভুলেও তাকাতাম না। আমরা জানতাম ওই গাবগাছই হলো ভূত-পেত্নীদের আখড়া। গাবগাছ পেলেই নাকি তেনারা নিরাপদে সংসার যাপন করেন। দক্ষিণ দিকে তেনাদের রাজত্ব — পশ্চিম দিকটা যে আমাদের তাওতো নয়। এইদিকে আছে একটা বড়সড় আষাইঢ়্যা আমের গাছ। উনিও হাত-পা মেলে এতটাই আয়েশ করে আছেন যে, উনার ড্রামের মতো মোটাসোটা ডালগুলো নেমে এসেছে ঠিক ঘরের চালের উপর পর্যন্ত। ফলে অন্ধকার হয়ে এলে পশ্চিমে তাকানোর সাহসও আমাদের ছিল না। দক্ষিণ-পশ্চিমকে নিষিদ্ধ এলাকা চিহ্নিত করে পুবের ফর্সা ফর্সা দিকটাতে আমরা বিচরণ করতে চাইতাম। কিন্তু এটাও আমাদের জন্য সহজ ছিল না। এই পূবদিক অতোটা অন্ধকার না হলেও মস্ত একটা ন্যাংগুইল্যা গাছ একেবারে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে শুয়ে আছে। আর এই পানি হলো আমাদের প্রাচীন পুকুরের পানি। গণ্ডা তিনেক আণ্ডা-বাচ্চাকে অকালে ডুবিয়ে মারার ইতিহাস নিয়ে এই পুকুর জল অথই করে দিব্যি বেচেবর্তে আছে! এই পুরানা পুকুর এখনো এতটাই গভীর যে, উইন্যার দিনেও থই পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। বলা চলে আমাদের চারদিকেই গা ছমছম করা পরিবেশ। এই রকম দিনে-রাতে ভয় ভয় ধরা বাড়িতে হঠাৎ দুইজন ছুতার এলো। এবং কয়খানা কাঁঠালের চওড়া তক্তা নিয়ে কাজেও লেগে গেল। ছুতার দেখে আমরা অবাক হলাম। দাদাজান কি নতুন কোনো পালঙ্ক বানাবে নাকি? কিন্তু আমাদের চক্ষের সামনে তক্তা রানদা করে তারা কিনা পালঙ্ক না-বানিয়ে নৌকার আদল দিল! ছোটমোট একটা কোষা নাওয়ের আদল! বাড়ির সামনের খ্যাংড়াকাঠির মতো শুয়ে থাকা খাল, সারা বৎসর জলহীন-খটখটে! কিন্তু বর্ষা এলেই এমন ভরভরন্ত হয় যে, ওই খ্যাংড়াকাঠি চেহারাটা ভাবাই যায় না। প্রতি বর্ষায় জল এমন বাড়ন্ত হয় যে উঠানের কোণা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

দাদাজানের হঠাৎ কেন কোষা নাও বানানোর মতি হলো আমাদের মাথায় এলো না। তবে অনুমান করলাম বাদলার সময় ওই জলময় খাল পারাপারের জন্যই এই ব্যবস্থা। দাদাজানের এমন বড়দিলের পরিচয় পেয়ে আমরা আনন্দে আটখানা হয়ে উঠলাম। যাক বাবা গাড়ি-ঘোড়া না হোক একটা সত্যি সত্যি কোষা তো দেখতে পাচ্ছি! আমাদের গাড়ি নাই, ঘোড়া নাই — এমনকি একটা আস্তাবলও নাই। থাকার প্রশ্নও আসে না। গাড়িতে চড়ার আনন্দ কী তা আমরা এখনো জানি না। আমাদের গাড়ি বলতে এখনো সুপারির খোল। গাড়িতে চড়া বলতেও সুপারির খোলে। আর হা করে করে আসমানের দিকে তাকিয়ে থাকা। এছাড়া উপায়ই বা কি- সুপারি গাছগুলো তো আসমানমুখীই। ফলে ওই দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আমরা চোখ ঝাপসা করে ফেলি — কখন জোর হাওয়া দিবে? হাওয়ার তোড়ে খোল সমেত একটা প্রায় আধ শুকনা ডাল খসে পড়বে মাটিতে। ওই খসে পড়া খোল নিয়ে আমাদের কাড়াকাড়ির অন্ত নাই। আমি, চন্দন, মিশু, সাথী-দিপু হুলুস্থুল বাঁধিয়ে দেই — কার আগে কে চড়বে ওই খোলের গাড়িতে। এই নিয়ে ঝগড়া-ঝাটিসহ মারপিটও আমরা কম করি না। এইদিকে উপদ্রবের মতো বড়দাদীজান না হয় ছোটদাদীজান জুটে যায়। ওই খোল টেনে নিয়ে তারা রান্নাঘরে চুলার ভেতর গুঁজে দেয়। বড় বা ছোটদাদীজানকে আমরা বাধা দিতে পারি না। তবে ওই সুপারির খোল পুড়তে দেখলে আমাদের মন পুড়ে একেবারে ছাই হয়ে যায়।

আমরা ভেবে পাই না বুড়া-আধবুড়া মানুষেরা কেন এইসব ছাতামাতা নিয়ে টানাটানি করে! এই সুপারির খোল আমাদের কাছে কতোটা আরাধ্য তারা কি তা জানে না? এই খোলের উপর জুত হয়ে বসলেই দিব্যি গাড়ি চড়া যায়। চন্দন না হয় মিশু একজন টেনে নিলেই হলো। আর কেউ পাতাসহ ডান্ডি চেপে ধরে বসে থাকি। ডান্ডি চেপে ধরে ধরে হাতের তালুতে রক্ত জমে যায়। তবুও আমরা ডান্ডি ছাড়ি না। ছাড়লেই বিপদ। গাড়ি তখন খালি খোলসহ ছুটতে থাকবে আর আমরা মাটিতে। এই আনন্দের বাহনে চড়ে আমরা হেসে গড়িয়ে পড়ি। অবশ্য এই খোল-গাড়িতে আরো একটা মজার বিষয় ঘটে — গাড়ি চলার সঙ্গে সঙ্গে উঠানের ধুলা সমান হয়ে মসৃণ-সুন্দর রাস্তা বানিয়ে দেয়। কিন্তু বানানো রাস্তা ধরে আমরা আর ফিরে আসতে পারি না। ফিরতে শুরু করলেই ধুলা সরে ফের তা অমসৃণ হয়ে ওঠে। চন্দন-মিশু বা দিপু পালা করে খোলের গাড়িতে চড়লে আমরা নতুন নতুন রাস্তা বানাতে থাকি। উঠান জুড়ে ওইসব রাস্তা দেখে আমাদের আহলাদের সীমা থাকে না।

তা যানবাহন বলতে ওই সুপারির খোল-ডান্ডি-পাতা। আর তা গড়গড়িয়ে ধুলার উপর টেনে নিয়ে সব ধুলাকার করে দেয়া — এছাড়া অবশ্য আরো একটা চলাও আমাদের আছে — ঘোড়ার সঙ্গে চলা! বারুণীর মেলা থেকে দাদাজান চাক্কাওয়ালা তেজি ঘোড়া কিনে আনে। চার চাক্কার ওপর বসানো মাটির ঘোড়া। দুই চাক্কার মধ্যিখানে দড়ি বেঁধে টানলেই ঘটর ঘটর করে চলতে শুরু করে। দড়ি হাতে নিয়ে আগে আগে আমরা আর পিছু পিছু মাটির নিষ্প্রাণ ঘোড়া। চলতে চলতেই হয়তো দড়ি ছিঁড়ে যায় অথচ আমরা টের-ই পাই না। খানিকটা পথ যাওয়ার পর ঘোড়া চলার শব্দ না পেয়ে পেছনে তাকাই — ঘোড়া ঘোড়ার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে! তার কেশর নড়ে না, চক্ষুর পাতা পড়ে না — তার টগবগ নাই — অথচ লাগাম ছিঁড়ে আমরা চলে এসেছি ম্যালা দূর! তাও যাহোক সুপারির খোল আর মাটির ঘোড়া নিয়ে আমাদের চলা! ওই একঘেয়ে চলার সঙ্গী এখন কোষা! আস্ত একখানা কোষা নাও!

একদিন দাদাজানের তদারকীতে ওই ভূতের গাবগাছ থেকেই গাব পেড়ে আনা হলো। বালতিকে বালতি গাব। সেই গাব ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হলো পাক্কা দুইদিন। তারপর সেই রস মাখা হলো কোষার গতরে। আমরা কেউ-ই কোষার আশপাশ থেকে আর নড়ি না। নড়বো কী? উঠানে জমা বৃষ্টির পানিতে কলার মোচা ভাসানোর চাইতে কোষা ভাসলে যে দারুণ বিষয় হবে আমরা তা বুঝে ফেলেছি।

গাবের রসের প্রলেপ দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে দাদাজান দুই-চাইরবার গলা খাকরি দেয়। বেশ জোরে কেশে-টেশে কাশির দলা থুক করে ছুঁড়ে দেয় সামনে। আর সেই কাশি কিনা পড়ে দুই ছুতারের মাঝখানে! দাদাজানের সেইদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নাই। দাদাজান ফের কেশে গলা সাফ করে বলে, ‘আলকাতরা হইলে জব্বর ভালা হইতো। অবশ্যি আলকাতরার বদলে গাবের রসের পোছ দিলেও পানিতে তলাডা খাইব না হেমন।’

দাদাজানের এই সাবধান বাণী আমাদের কানে ঢোকে কি ঢোকে না। আর তখন উইন্যার সময় — খালে পানির নাম-নিশানাও নাই — অথচ আমাদের মনে হয় পানির ঢল নেমে নদী হয়ে গেছে! আর সেই নদীতে ছোট্ট কোষাটা পানসি নাও হয়ে ভেসে চলেছে। আর এই পানসির গতি একেবারে রাজহাঁসের মতো। আমরা মহাফূর্তিতে বহুবার শোনা শোলোক আওড়াতে থাকি:

পানসি নাও পানসি নাও
পান খায়া যাও
মিশুর শাউড়ির ঢোবলা গুয়া
তুইল্যা নিয়া যাও…

মিশুর পাছাটাই তো এখনো বড়সড় হয়ে ওঠে নাই। কে যে তার শাশুড়ি হবে আমরা তার কিচ্ছু জানি না। তবু সেই অদেখা শাশুড়ির ভারিসারি পাছাটা তুলে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের আকুতির শেষ থাকে না। আরে ধুর! কোথায় ছইওয়ালা পানসি আর কোথায় কার শাশুড়ির পাছা! আমাদের দাদাজানের বেশি টাকা-পয়সা নাই। একটা কোষা বানাতেই তার ছ্যারাব্যারা অবস্থা। চক্ষের সামনে উল্টে রাখা কোষা, তাতে গাবের রসের পোচ দেয়া দেখেও আমরা বলতে পারি না, ‘দাদাজান-ও সুনার দাদাজান — এইডার ওপরে এইবার একটা ঘর বানাইয়া পানসি কইরা দেন। সেই ঘরের মইদ্যে আমরা খাওয়া-দাওয়া সাইরা নিন্দ পাড়বার চাই।’

দাদাজানকে কিচ্ছু বলার সাহস আমাদের হয় না। আসলে আমরা তো ভালো মতো বুঝিই না কোষা আর পানসির তফাৎ কী? ডিঙি আর ছিপ নাওয়ে পার্থক্য কী? আমরা আসলে কিচ্ছু বুঝি না। শুধু এইটুকু বুঝি আমরা চলতে চাই। চলাও ঠিক না ঘুরতে চাই। লাটিমের মতো চক্কর মারতে চাই। ঘোড়ার মতো, গাড়ির মতো, নাওয়ের মতো চলন্ত কিছুর মধ্যে আমরা চড়তে চাই। চড়ে নিজেদের পেটে হাত-পা ঢুকিয়ে বসে থাকতে চাই। অর্থাৎ চলাটাই আমাদের কাছে আনন্দের। তা সুপারির খোলের উপর বসে হোক অথবা নাওয়ের ভিতর থেকে হোক।

বাদলার মরশুম আসার আগে-ভাগেই কোষা নাওয়ের কাজ শেষ হয়ে গেল। দাদাজানের মাথা হিটকুলি বুদ্ধিতে ভরা। দাদাজান নাওয়ের গলুই দিল টিনের টুকরা দিয়ে। এটা এক দেখবার মতো জিনিস হলো বটে। গাবের কালসিটে প্রলেপ কাঁঠাল কাঠের হলুদ রঙ গায়েব করে এক অচেনা রঙ ধরালো। টিনের রুপালি গলুইয়ে রোদ্দুর পড়লেই এক বাহারি দৃশ্য দেখতে পাই আমরা। আমাদের কাছে এই কোষাকেই রুপার নাও মনে হয়। আমাদের আর পায় কে? আমরা একেকজন যেন সত্যি সত্যিই বাদশা-বেগম বনে গেছি! আর নতুন রাজ্য দখলের লোভে খোলা তরবারি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। শত্রু সামনে পড়লে তাকে কচুকাটা করতেও আমাদের দ্বিধা হবে না। কিন্তু এই টগবগ করে ফুটন্ত খুশি আমরা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারি না। আমাদের কোষা খালে ভাসে না। এদিকে বর্ষার পানি উঠান পেরিয়ে পৈঠা ছুঁয়ে ফেলেছে। দাদাজান নানা উছিলা বের করে। শুক্কুরবার বাদ জুম্মা ঠিক করে তো তার বাতাসা কেনার পয়সার টান পড়ে যায়। ফের শুক্কুরবার ঘুরে আসে — দাদাজানের বাতাসার পয়সা যোগাড় হয় না। আমরা অস্থির-বিস্থির করি। দাদাজানকে কাকুতি-মিনতি করে বলি, ‘দাদাজান বাতাসা খাওন নাগব না। আমরা বাতাসা খাইতে চাই না। আমরা খালি কোষাডায় চড়তে চাই। কোষায় চইড়া খাল আর বিলের মইদ্যে ঘুরতে চাই।’

দাদাজান আজব কিসিমের বটে। আমাদের কথা একেবারে পাত্তা দেয় না। এদিকে খালের উপর একবাঁশের পুলটা নড়বড় করে। আমরা ভয়ে তাতে উঠতেই পারি না। এখনো ভালোমতো কেউ সাঁতরাতে পারি না। এক বাঁশের পুলের উপর পা দিলেই গা শিরশির করে। পা ফসকে পড়ে যাবার ভয়ে আমরা নিচে পর্যন্ত তাকাই না।

অথচ উইন্যার সময় এই খালের ভিতর আমরা বউ-ছি, গোল্লাছুট খেলি। কুম্ভির কুম্ভির খেলি। কিন্তু বর্ষা এলে খালের ওই পাড়েও কেউ যেতে পারি না! বিষয়টা আমাদের কাছে দারুণ রহস্যময় লাগে। খালের ওই পাড়ের বকুল গাছটা কালচে সবুজ পাতায় ভরে থাকে। আর গাছের তলাটা ফুল পড়ে একেবারে সাদা হয়ে থাকে। আমাদের মন ছুটে যায় বকুল ফুলের গন্ধে। কিন্তু এক বাঁশের পুল পেরোবার সাহস সঞ্চয় করতে পারি না। এই জলবন্দি অবস্থায় আমাদের দম ফাঁপড় করে। আমরা দল বেঁধে উল্টানো কোষার উপর বসে থাকি। একেক জন হাতে বাঁশের কঞ্চি নিয়ে বৈঠার মতো বাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু আমাদের কোষা একচুলও আগায় না। মরা ঢোড়া সাপের মতো নিস্তেজ পড়ে থাকে। চন্দন বা মিশুর হাফপ্যান্টের ফাঁক দিয়ে দেখা পড়ে থাকা নুনুর মতো লাগে কোষাটাকে। নড়েও না। চড়েও না। আমরা রাগ করে কোষা থেকে নেমে পড়ি। হাতের কঞ্চিবৈঠা দিয়ে বিষকাঁটালির ঝোপের উপর বাড়ি মেরে চলি। শালার এই গাছের জান বেজায় শক্ত। বর্ষার পানিতে ডুবে গেলেও এই গাছ মরে না। কঞ্চির বাড়ি মেরে বিষকাঁটালির ঝোপ উজাড় করেও আমাদের ক্ষোভ মেটে না। শালার দাদাজান। বুইড়া কুনহানকার। আমরা আফনের বাতাসা খাইতে চাই না। খালি কোষাডারে জলদি জলদি খালে ভাসায়া দেন। দাদাজান কীভাবে যেন আমাদের মনের কথা বুঝতে পারে! পরের শুক্কুরবার বাদ জুম্মা মিলাদ দিয়ে ঠোঙা ভরে গুড়ের বাতাসা নিয়ে আসে। বাতাসার গন্ধে বাতাস ম ম করে। আমাদের দুই হাত ভরে ওই বাতাসা গুঁজে দেয়। মিশু-চন্দন-সাথী-দিপু কেউ বাদ যায় না। অন্য পাড়ার দুই চারজনের হাতেও ওই বাতাসা পৌঁছায়। আমরা বাতাসা চাটতে চাটতে ফের কোষা ভাসানোর স্বপ্ন দেখি। সত্যি সত্যিই ওইদিন বিকালে দাদাজান কোষাটা খালে ভাসায়। বৈঠা টানে। কখনো লগি মারে। আমাদের বলে, ‘এতজন একলগে চড়ন যাইব না। ছোট্ট নাও ডুইব্যা গেলে বিপদ হইব।’

আমরা মন খারাপ করে তার কথা শুনি। দুই হাত দিয়ে গোপনে চক্ষের পানি মুছি। তারপর দাদাজানের কথা মতো তিন-চারজন কোষায় উঠে পড়ি। দাদাজান বৈঠা টানলে ছলাৎ ছলাৎ ধ্বনি ওঠে। আমরা কোষার কিনারে বসে পানিতে হাত ডুবালে দাদাজান ধমকে ওঠে, ‘নাওয়ের বগলে বগলে হাপ চলে। আত উঠায়া রাখো।’

আমরা ভেজা হাত কাপড়ে মুছে গুম হয়ে বসে থাকি। দাদাজান খাল পেরিয়ে বিলে কোষা নামায় — শাপলা তুলে দেয়। ঢ্যাপ তুলে দেয়। ডুব দিয়ে কয়েকটা শালুকও তুলে দেয়। আমরা ঢ্যাপ ভেঙে দেখি লাল সরিষার মত মিহিদানায় ভরা। দাদাজান হঠাৎ বলে ওঠে, ‘লাল ঢ্যাপ খাইও না — ওইডায় হাপে বিষ ঢালে।’

দাদাজানের নিষেধ আমরা তোয়াক্কা করি না। ঢ্যাপের লাল লাল দানা আমাদের লোভাতুর করে তোলে। আমরা ওই লাল ঢ্যাপই খেয়ে ফেলি। শাপলা ফুলের বুক চিরে হলদে মখমলের মতো রেণু খেতে খেতে ফের উবু হয়ে হাত ডুবিয়ে দেই পানিতে। সন্ধ্যা ঘনায়মান বলে দাদাজান হয়তো দেখে না। অথবা ইচ্ছা করেই না দেখার ভান করে নাকি বয়সের কারণেই দেখে না — আমরা বুঝতে পারি না। দুই পাক কোষা ঘুরিয়েই দাদাজান বলে, ‘এইবার লও বাড়িতে যাইগা। আন্ধার নাইমা গেছে গা।’

‘দাদাজান আর এট্টু ঘুরানি দেন। দিলেই যামুগা। আর চড়মু না।’

আমরা দূরের একটা আধ ফুটন্ত শাপলার দিকে আঙ্গুল তুলে বলি, ‘এইডা তুইল্যাই যামুগা।’

দাদাজান দুনোমুনো করে। তারপর রাগ করে বলে, ‘ভাল্লুকের হাতে খুন্তা দেওন নাগে না। এইডা নিয়াই যাইবা গা। আন্ধারে পুকামাকড়ে ঝামেলা করবো।’

আমাদের গা কাঁটা দিয়ে ওঠে, আমরা তো ভাল করেই জানি রাত হলে কেউ-ই সাপকে সাপ বলে না। বলে পুকামাকড়। রাতের বেলায় নাকি সাপের নাম নিতে নাই।

পানির উপর ভেসে থাকা শাপলাটা অন্ধকারে অস্পষ্ট দেখায়। আমি হাত বাড়িয়ে তুলতে চাইলে দাদাজান বাধা দিয়ে বলে, ‘খাড়াও আমি তুইল্যা দেই।’

দাদাজানের কথা শেষ করার আগেই চন্দন পানিতে হাত ডুবায়। অস্ফুট স্বরে উহ্ শব্দ করে। তারপর ফুলটা তুলে আনে। দাদাজান এইবার জোরে ধমকে ওঠে, ‘মাতুব্বুরি না করলে অয়না — বজ্জাত পুলাপাইন!’

আমি, মিশু, সাথী — ভীষণ আনন্দ নিয়ে বসে থাকি। চন্দনের মুখটা ভয়ার্ত দেখায়। সামান্য উশখুশ করে সে। আমরা পাত্তা দেই না। এই প্রথম আমরা জলের উপর ভাসতে পারছি। নিজেদের হাঁসের ছানা মনে হয়। এক অর্থে এই কোষাটাই আমাদের প্রথম চলার গাড়ি। পরের দিন ভোর-ভোরই চন্দনদের ঘরে কান্নার শব্দ শুনি। আমরা চোখ কচলাতে কচলাতে দৌড়ে যাই। দাদাজানও দৌড়ায়। বিছানার উপর চন্দন চিৎ হয়ে ঘুমিয়ে আছে। তার মুখ নীলবর্ণ দেখায়। ঠোঁটের পাশে ফেনা জমে শুকিয়ে আছে!

আমরা কিছুই বুঝতে পারি না। অকারণেই বুক ঠেলে কান্না আসে — চন্দনের কী হইলো?

তারপর কতদিন কোষাটা ঘাটে পড়ে থাকে! দাদাজান ঘন ঘন চক্ষু মোছে। দেখে আমরাও চক্ষু মুছি। বৃষ্টি-ঝড়-জল কত কি যে কোষাটার উপর দিয়ে বয়ে যায়। হঠাৎ একদিন বিকাল বিকাল দেখি দাদাজান শুকনা চক্ষে কোষটা খালে ভাসায়। হাতে ফের বৈঠা ধরে। লগি মারে। আমরা চুপ করে দল বেধে দাঁড়িয়ে দেখি। কোষায় চড়ার বায়না ধরি না। পরের দিন দাদাজানই নিজ থেকে আমাদের ডাক দেয়। ডাক দিয়ে বলে, ‘সুনারা আহো-আইজ তুমাগো নাওয়ে ঘুরামু। কিন্তুক ভুলেও পানিত আত চুবাবা না।

আমাদের তক্ষুণি চন্দনকে মনে পড়ে। কিন্তু নাওয়ে চড়ার আনন্দের কথা ভেবে কিছুতেই দাদাজানকে না বলতে পারি না! আমরা ঝটপট উঠে পড়লে দাদাজান কোষা ভাসিয়ে দেয়। তারপর ধীরে ধীরে বৈঠা টানে। পানির উপর ঘুরতে ঘুরতে আমরা ফের শাপলা তুলি। ঢ্যাপ তুলি। জলার্দ্র হাওয়ায় আমাদের ঘুম ধরে যায়। কিন্তু আমরা জোর করে চক্ষের পাতা খুলে রাখি। আমরা জানি এখন ঘুমিয়ে পড়লে কোষায় চড়ার মজাটা এক্কেবারে মাটি হয়ে যাবে…

ঢাকা, জুন ২০০৮
===========================
পাপড়ি রহমান
সম্পাদনা
ধূলিচিত্র

গল্প
লখিন্দরের অদৃষ্ট যাত্রা (খনা প্রকাশন, ২০০০)
হলুদ মেয়ের সীমান্ত (দিব্যপ্রকাশ, ২০০১)
অষ্টরম্ভা (মননপ্রকাশ, ২০০৭)

কিশোর উপন্যাস
মহুয়া পাখির পালক (জোনাকি প্রকাশনী, ২০০৪)

উপন্যাস
পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ (মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৪)
বয়ন (মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৮)
======================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম   গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান  গল্প- ‘অপঘাতে মৃত্যু’ ও ‘সাদামাটা’ by লীসা গাজী   গল্প- 'দ্বিতীয় জীবন' by ইরাজ আহমেদ  গল্প- 'পুষ্পের মঞ্জিল' by সাগুফতা শারমীন তানিয়া   গল্প- 'একশ ছেচল্লিশ টাকার গল্প' by কৌশিক আহমেদ  গল্প- 'একে আমরা কাকতালীয় বলতে পারি' by মঈনুল আহসান..   গল্প 'গহ্বর' by জাহিদ হায়দার    গল্প- 'পুরির গল্প' by ইমরুল হাসান  গল্প- 'নওমির এক প্রহর' by সাইমুম পারভেজ  গল্প- 'মরিবার হলো তার সাধ' by আহমাদ মোস্তফা কামাল   গল্প- 'নিষুপ্ত শেকড়' by নিরমিন শিমেল   গল্প- 'লাল ব্যাসার্ধ্ব' by শামীমা বিনতে রহমান  গল্প- 'সেদিন বৃষ্টি ছিল' by মৃদুল আহমেদ   ক. কিছুদিন হয় সেই নগরে কোন বৃষ্টি হচ্ছিল না। কিছুদ.. গল্প- 'তুষার-ধবল' by সায়েমা খাতুন


bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ পাপড়ি রহমান

এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters

গল্প- 'তুষার-ধবল' by সায়েমা খাতুন

অনেক দিন ফেলে রাখা পেন ড্রাইভটা কম্পিউটারে প্লাগ-ইন করে কিছু দিনের জমে থাকা পারিবারিক ছবিগুলো বাছাই করতে গিয়ে হিমশিম খায় নায়লা। এই নিয়ে সে কয়েকবার বসেছে। লাস ভেগাস, ফ্লোরিডা, ওয়াশিংটন ডিসি ঘুরে এসেছে এক এক ছুটিতে। লেবার হলিডে, থ্যাংকস গিভিং, ক্রিসমাস, নিউ ইয়ার…। সে বেশ কিছু দিন কেটে গেছে। সেসব ছবিগুলো সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা হয়নি এখনও। মাঝে মাঝে ভুলে যায়। কিছু ছবি বাছাই করে উঠে যায়। নিচে লবিতে যাবে লন্ড্রি ব্যাগ নিয়ে। জ্যামাইকার হিল সাইড এভিনিউতে এই অ্যাপার্টমেন্ট ভবনে অল্প কয়েকটি বাংলাদেশী পরিবার আছে। নিউ ইয়র্কের হাজার হাজার বাংলাদেশী ট্যাক্সি চালকদের কয়েকজন। আফ্রিকান-আমেরিকান, স্পেনীয়, আরব, পূর্ব এশীয় পরিবারও রয়েছে। টিভির একটা যান্ত্রিক কোলাহল ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। দেশ থেকে আসবার পর টিভির অনুষ্ঠানগুলো আর তেমন মন দিয়ে দেখে না। বসার ঘরে টিভি চলতে থাকে, ও ঘর-গেরস্থালীর কাজকর্ম করে যায়। বরফ পড়া শুরু হবার আগে রোজ বাংলাদেশী মসজিদের পাশের ছোট পার্কটাতে হাঁটতে যেত। এখন দুই-তিন প্রস্থ গরম কাপড় পরে বেরুতে আলসেমি লাগে। লিকুইড ডিটারজেন্টের বোতলটা নিতে নিতেই ফোন।

‘সাগরে যাবা রাতে?’

‘আমি তো বাটার ফিস ডিফ্রস্ট করেছি।’

‘আজ আর রান্নার ঝামেলা করো না।’

‘হাজীর বিরিয়ানি খেতে ইচ্ছা করতেছে, না?’

‘সপ্তায় একদিন বাইরে খাই?’

‘ফাঁসীর আসামীর মত বউয়ের রান্না খেলে মরতে ইচ্ছা করে নাকি?’

রিপন এইসব হাবিজাবি জোক করে। ওর কথার আগা-মাথা নাই।

‘মাইন্ড করছো না?’

‘আচ্ছা, আমি কাপড় ধুতে গেলাম।’

‘শোন ডিসিতে আমার চাকরীটা হয়ে গেল। পার্মানেন্ট। ভার্জিনিয়া বা ওয়াশিংটনে এবার আমরা বাড়ি কিনে ফেলবো।’

‘কনগ্রাটস্ ! আলহামদুলিল্লা।’

এসকেলেটরে রোকেয়া ভাবি। বাচ্চাকে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরছেন। ‘নায়লা, শরীরটা খারাপ নাকি?’

‘নাতো ভাবি।’

‘তোমার শ্বশুর-শাশুড়ী চলে গেছে?’

‘হুঁ।’

‘আর কত এভাবে দিন কাটাবা? বাচ্চা-কাচ্চা হলে দেখবা অন্য রকম লাগবে।’

‘জ্বী। আমি তো বলি।’

‘আরে তোমার জামাইর কথা রাখ। ভাল চাকরির কি শেষ আছে? বাড়ি না কিনলে কিছু করা যাবে না, এইটা কেমন কথা? আমরা দুইটা বাচ্চা নিয়ে কেমনে চালাই, দেখ না?’

প্রিতম ফেরার আগেই নায়লাকে মাছের দোকান, সব্জি সব কেনা-কাটা শেষ করে ফিরতে হবে। গাড়ির চাবিটা নিয়ে ওভার কোট, দস্তানা, টুপি পরে তৈরি হয়ে নামে। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গরম হতে অপেক্ষা করে। আজ ঢাকায় আম্মার সাথে কথা বলতে হবে। ভাল লাগে না। আম্মার রোজ এক কথা — আমার এত ভাল মেয়েটা সংসার করে আর কিছুই করলো না। প্রথম প্রথম প্রিতমের সাথে এক সঙ্গে গ্রসারী করতো। ড্রাইভিং লাইসেন্সটা হবার পর থেকে হালাল দেশী দোকান থেকে পরোটা, মাছ-গোশত্, মশলা, স্প্যানিশ/আমেরিকান দোকান থেকে দুধ, দই, ফল-ফলাদি, সব্জি, বেগেল সব ও-ই করে ফেলে। তাছাড়া, ওর ঘর থেকে বেরুনোও হয় না। শনিবার প্রিতম ঘর-বাড়ি ভ্যাকুয়াম করে দেয়। বাথরুমও ধুয়ে দেয়। খুব পরিপাটি থাকতে চায়। দেশের ছেলেরা এমনটা কমই হয়।

ভাগ্যগুণে একটা পার্কিং পেয়েছিল। রাস্তায় বরফ জমছে। নিউ ইয়র্কের ভিড় রাস্তায় লোকে গাড়ি আস্তেই চালায়। মাঝে মাঝে নায়লার মনে হয় গুলিস্তান না নিউ ইয়র্ক। আজ তো চলতেই চাইছে না। চাকা পিছলে যাচ্ছে। সিগন্যালে বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ গা গুলাতে থাকে। ভীষণ ক্ষুধা বোধ করে। বোতল বের করে এক ঢোক পানি খেয়ে নেয়। মাছের দোকানের গন্ধটা যেন এখান পর্যন্ত তাড়িয়ে আসছে। বাসায় পৌঁছে বাথটবে গরম পানিতে বসে থাকবার পর আরাম পায়। অনেকক্ষণ ঘষে ঘষে গোসল করে।

রবীন্দ্র সংগীতের এমপি থ্রি অডিও ছেড়ে মেইল চেক করতে বসে। ‘তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই ক্ষণে ক্ষণ, ও মোর ভালবাসার ধন, দেখা দিবে বলে তুমি হও যে অদর্শন…’ ইফফাত আরা বড় মধুর করে গাইছে। ‘ফেসবুক’ থেকে এক অচেনা মেসেজ চেক করতেই চমক লাগে। ওই গানটিই লেখা। হাসিব। নিলর্জ্জতা দেখে অবাক হয়ে যায়।

প্রিতম চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকে। ‘অ্যারিজোনা থেকে রাখী আসছে। ওর ননদের বিয়ে।’

‘ও।’

‘আমি তো ভেবেছি তুমি তৈরি হয়ে থাকবে।’

‘এই তো পাঁচ মিনিট। চা দিব?’

‘টেল ইউ দ্য ট্রুথ, তোমার এই রবীন্দ্রনাথ ব্যাটা ছিল বিরাট উয়্যোম্যানাইজার।’

মাথা নেড়ে টিভির সামনে বসে যায়।

‘রাখীর কাছে শুনলাম, রিয়ার সাথে ঝামেলাটা বেড়ে গেছে হাসিবের। নানা রকম নাটক।’

নায়লা সাইন আউট করে বসার ঘরে আসে। এনটিভিতে ড. আজফার হোসেনের অনুষ্ঠানে ড. সলিমুল্লাহ খান অতিথি। আলোচনার বিষয়, লালনের দর্শন।

‘কে এরা?’

‘ও, তুমি তো আবার কাউকে চেন না।’

বিজ্ঞাপন বিরতিতে প্রিতম সিএনএনে ঢোকে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্ক চলছে। সিনেটর হিলারী ক্লিনটন ও বারাক ওবামার ভাষণ চলছে।

‘কী মনে হয় নায়লা?’

‘এবার ডেমোক্র্যাটরা আসছে।’

‘শাদা কনজাভেটিভদের জোরও কম না?’

হিলারী ইরাক থেকে মার্কিন সেনাদের দ্রুত ও দায়িত্বশীল প্রত্যাহার এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা প্রবর্তন করবার কথা বলছেন। নায়লা চায়ের কাপে চিনি নাড়তে নাড়তে বসে মন দিয়ে শোনে। হিলারীর চেহারায় একটা বয়সের ছাপ পড়েছে। হবে না কেন, এই তো টেবিলে রাখা পত্রিকাতে ষাট পালনের ছবি। তার অর্ধেক বয়েস হতে না হতেই নিজেকে যেন ফুরিয়ে যাওয়া মনে হয়।

‘শুনেছো, ওবামা নাকি মুসলমান, কিন্তু তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কথা বলে না।’

নায়লা দ্রুত তৈরি হয়ে পড়ে। সাগর রেস্তোরাঁতে খেতে পারে না। প্যাকেট করে নিয়ে আসে। বাসায় ফিরে প্রিতম অ্যানসারিং মেশিন চেক করে। নায়লা শুয়ে শুয়ে শোনে।

‘ওল্গা মামী আগামী সপ্তায় দাওয়াত দিয়েছে। ছেলের গ্র্যাজুয়েশন পার্টি।’

‘শনিবার, না রবিবার? রবিবার কিন্তু সামিরার বেবি শাওয়ার।’

‘শনিবার।’

জানালার বাইরে শাদা হয়ে পড়ে আছে শহরটা। রাস্তা-ঘাট, বাড়ি-ঘর সব শাদা আর শাদা। এখন আর কোনো রং নেই এই শহরের। গাছগুলো সব পাতা ঝরিয়ে ফেলেছে সেই কবে। পেঁজা পেঁজা তুলোর মত নেমে আসছে। ধবল চাদরের তলায় ঢাকা পড়ছে দুনিয়া। ক্লাস থ্রিতে হুমায়রা ম্যাডাম গ্রীম ব্রাদার্স থেকে পড়াচ্ছেন, এক শীতের মাঝামাঝিতে রানী জানালার ধারে বসে পালকের মত বরফ ঝরা দেখে ভাবেন কি, আমার যদি এমন শুভ্র এক কন্যা হত! যেই না ভাবা, তার হাতে ছিল সুঁচের নক্সার কাজ, সুঁই ফুটে এক ফোঁটা টক্টকে লাল রক্ত পড়লো ধবল তুষারের পরে। রানী মুগ্ধ হয়ে সেই লাল রঙের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, সে যেন এমন রক্তবর্ণ হয়। তার জানালার গরাদ ছিল কুচকুচে কাল আবলুস কাঠের। তার কিছুদিন পর রানী এক তুষার শুভ্র রক্তলাল কপোল ভ্রমর কালো চুলের এক কন্যা প্রসব করে মারা গেলেন। রানী বললেন, নায়লা, এই মেয়েটাকে তুই নিয়ে যা। ওকে বিষ মাখানো আপেলটা খেতে দিবি না, বুঝলি। কোথা থেকে দড়াম দড়াম করে গুলির শব্দ হল। রানীর চেহারাটা হবহু বেনজীর ভুট্টোর মত দেখালো। কোথা থেকে এক আর্তনাদ শোনা গেল — আলতাফ, ইয়ার ইয়ে কেয়া হো গ্যায়া?

‘নায়লা, আর কত ঘুমাবে? এই দেখ আমি আজ নাশ্তা বানায় ফেলছি।’

‘এত গরম লাগছে কেন?’

‘দেখি তো, হিটিং সিস্টেম আবার ৭৪ করে রাখলো কে?’

নাশতা খেয়ে প্রিতম বরফ পরিষ্কার করতে নেমে যায়। গাড়ি সাফ করে। নায়লা ফোন নিয়ে বসে। ‘আম্মা কী করো?’

‘তোর কথাই বলছিলাম তোর আব্বার কাছে। মেয়েটা অ্যাডমিশন নিয়েও সেমেস্টার বন্ধ করে বসে আছে। এত ভাল করে কেউ বসে থাকে?’

‘আম্মা, এখানে আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে একজন ট্যাক্সি চালায়, বুয়েট থেকে মেকানিক্যাল করে আসছে। আর একজন মেজর ছিল। আর তুমিও তো কিছুই করলে না আম্মা?’

‘আমাদের কথা এক হল? আমাদের ব্যাচে প্রথম মেয়েরা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে আসে। শায়লা আর তুই পর পর হয়ে গেলি। তোদের পাহারাদারি রেখে আমি আর বার হতে সাহস করলাম না। সেই জন্যই আমি চাই তোর একটা ছেলে হোক। একবার একটা দুর্ঘটনা হলে মানুষ থেমে যায় না।

‘মা! মানুষের চাওয়াটাই সব নয়। সব কিছু তোমার-আমার চাওয়া না চাওয়ায় হবে না। হয়েছে?’

‘দিন দিন তুই সিনিকের মত কথা বলছিস।’

‘এ জন্যই তোমাদের ফোন করতে ভাল লাগে না।’

‘বিদেশে গিয়ে তুই পর পর হয়ে গেছিস।’

‘আম্মা, আমেরিকার সিটিজেন হওয়াটাকে তোমরাই তো বিরাট একটা কিছু মনে কর। বাংলাদেশের সিটিজেন তো মানুষই না। এখন রাখি আম্মা, রান্না বসাতে দেরি হয়ে যাবে।’

‘এই করেই তোর দিন যাবে!’

‘গেলে কী করবো মা? ভাল থেকো।’

প্রিতম ফিরে এসে দেখে নায়লা শুয়ে আছে।

‘কি হল তোমার?’

‘ঘুম পাচ্ছে।’

‘রাতে ঘুম হয়নি? শরীর ঠিক আছে তো? সোফাতে কেন, বিছানায় যাও।’

‘না, এখানেই ভাল।’

‘কী হয়েছে তোমার, লক্ষী কাঁদছো কেন?’

তোমাকে না বলেছি এসব কিছু দেখতে না। এটিএন বাংলায় প্রতিবেদনে দেখাচ্ছে, একটা রাস্তায় ফেলে যাওয়া নবজাতককে এক পথচারী মহিলা উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে এসে বাঁচানোর চেষ্টা করছে। এই দেখো, অটাম ইন নিউ ইয়র্ক হচ্ছে। মুভি চ্যানেলে আসে।

‘কালকে যা বেঁচেছে আজকে দুপুরে হয়ে যাবে। তুমি আরাম করো। কয়দিন যে ধকল গেছে! আমি চুল কাটিয়ে আসি, কেমন?’

অনেক বেলা করে ফিরে প্রিতম। নায়লা সোফাতে পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ওকে তুলে দিয়ে গোসলে পাঠায়। খাবার গরম করে এক সঙ্গে খায়। বাইরে কোথাও যেতে চায় না নায়লা। ওকে সারাদিন বিছানায় পড়ে পড়ে ঘুমাতে দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ে। ডাক্তারের কাছেও যেতে চায় না।

‘আমার সাথে ভাল নেই তুমি, নায়লা। আমাকে বিয়ে করে তোমার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। বিশ্বাস করো, তোমাকে চাপ দেয়া ঠিক হয়নি আমার। ব্যাপারটা ভুলে যাও না কেন? কত লোকেই তো প্রথম প্রথম বাচ্চা রাখতে চায় না। আবার পড়াশুনা শুরু করো।’

‘পড়াশুনা করতে আর ভাল লাগে না।’

‘আমার তো মনে হচ্ছে সংসারও তোমার ভাল লাগছে না। তুমি বোরড্ হয়ে যাচ্ছ। এত ভাল করে এসেছো, কমপক্ষে সিটি ইউনিভার্সিটির হান্টার কলেজে ঢুকে পড়, সব ঠিক হয়ে যাবে। নাকি তোমার জন্য একটা বয়ফ্রেন্ড খুঁজে দিব? এই যে ভাই, আমি তো ফেল, দেখেন আমার বউটাকে একটু খুশী রাখতে পারেন নাকি।’

‘বাজে কথা বোলো না।’

‘তাহলে কী করবো?’

প্রিতম তার শরীরের উষ্ণতা দিয়ে ধবল শুভ্র তুষারে রক্তিম উষ্ণতা সঞ্চার করতে চায়। ধবল তুষারের কি কোন রং আছে? উষ্ণতা?

পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙে নায়লার। একা একা এ ঘর ও ঘর করে কফির মগ নিয়ে টিভি খুলে বসে। ‘উয়োম্যানাইজার এর বাংলা কী?’

‘মাগীবাজ।’

‘তোমার বানানো বাংলা! এখানে মেয়েটাকেও গালি দেয়া হচ্ছে।’

‘আগে অনেক জায়গায় মেয়ে বলতে এটা বলতো, এখন গালি হয়ে গেছে।’

‘ওরে বাবা, তুমি এতসব জানলা কেমনে?’

‘আমার নানীর মুখে শুনছি। তুমি কি ডিকশনারি খুলে বসছো নাকি? কী তোমার কবির মানহানির মামলা ঠুকবে?’

‘আমি একটু নিচে হেঁটে আসি।’

‘দেখো আবার বরফে পা পিছলে পড়ো না।’

ঢালু রাস্তা থেকে উপরের দিকে উঠে আসতেই দেখে বরফের উপর রোদ ঠিকরে পড়ছে। ঠাণ্ডায় মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। তখন আচমকা শাদা তুষারের শুভ্রতার ভেতর একটা রঙধনুর মত রক্তিম আভাস মনে হয়।
====================================
সায়েমা খাতুন
জন্ম: ৩০ আগস্ট, ১৯৭৪; পুরানো ঢাকার টিকাটুলীতে এবং বেড়ে ওঠা নতুন ঢাকার উত্তরায়। পড়াশোনা ও মনোযোগ নৃবিজ্ঞান ও সাহিত্যে।

লেখালেখি: গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ এবং অনুবাদ। নৃবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, সহকারী অধ্যাপক। নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হেমন্তকালীন পর্ব পড়ার পর জননী হতে গিয়ে আপাততঃ উচ্চতর পড়া স্থগিত। প্রকাশিত একমাত্র কাব্যগ্রন্থ নিরাশ্রয় নিদ্রায় দূর ক্রেংকার, বেরিয়েছে ২০০৪ এ।

পরিব্রাজন: ত্রিপুরা, হ্যানোফার, বার্লিন, হ্যামলিন,ওল্ডেনবুর্গ, ব্রেমেন, ব্যাংকক, কলকাতা, কাঠমান্ডু, কারাকাস, জোহানেসবার্গ, হংকং, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, ওহাইও এবং নিউ ইয়র্ক ।
==============================
গল্প- আলিমের নিভৃতিচর্চা by রাশিদা সুলতানা   গল্প- প্রত্যাবর্তন: আমার ‘ফেরা’ নিয়ে যে কাহিনী না ..মানষ চৌঃ   গল্প- 'বীচিকলায় ঢেকে যায় মুখ ও শিরোনাম' by আনোয়ার ...  গল্প- 'প্রীত পরায়া' by সিউতি সবুর   গল্প- 'চলিতেছে' by মাহবুব মোর্শেদ   গল্প- 'গোপন কথাটি' by উম্মে মুসলিমা   গল্প- 'রূপকথা' by লুনা রুশদী  সঞ্জীব চৌধুরীর কয়েকটি গল্প   গল্প- 'অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস' by ফাহমিদুল হক   গল্প- 'মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা' by ইমতিয়ার শামীম   গল্প- 'হাজেরার বাপের দাইক দেনা' by জিয়া হাশান  গল্প- ‘অপঘাতে মৃত্যু’ ও ‘সাদামাটা’ by লীসা গাজী   গল্প- 'দ্বিতীয় জীবন' by ইরাজ আহমেদ  গল্প- 'পুষ্পের মঞ্জিল' by সাগুফতা শারমীন তানিয়া   গল্প- 'একশ ছেচল্লিশ টাকার গল্প' by কৌশিক আহমেদ  গল্প- 'একে আমরা কাকতালীয় বলতে পারি' by মঈনুল আহসান..   গল্প 'গহ্বর' by জাহিদ হায়দার    গল্প- 'পুরির গল্প' by ইমরুল হাসান  গল্প- 'নওমির এক প্রহর' by সাইমুম পারভেজ  গল্প- 'মরিবার হলো তার সাধ' by আহমাদ মোস্তফা কামাল   গল্প- 'নিষুপ্ত শেকড়' by নিরমিন শিমেল   গল্প- 'লাল ব্যাসার্ধ্ব' by শামীমা বিনতে রহমান  গল্প- 'সেদিন বৃষ্টি ছিল' by মৃদুল আহমেদ   ক. কিছুদিন হয় সেই নগরে কোন বৃষ্টি হচ্ছিল না। কিছুদ...



bdnews24 এর সৌজন্যে
লেখকঃ সায়েমা খাতুন


এই গল্পটি পড়া হয়েছে...
free counters