Sunday, October 5, 2025

যেভাবেই হোক গাজাকে নিরস্ত্র করার অঙ্গীকার নেতানিয়াহুর, অস্ত্র সমর্পণ করবে না হামাস

যেভাবেই হোক গাজার যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাসকে নিরস্ত্র করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, গাজাকে সামরিকীকরণমুক্ত করা হবে। এটা করতে সহজ বা কঠিন যেকোনো উপায়ই হোক, সেই ব্যবস্থা নেবেন। পাশাপাশি এও বলেছেন, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই গাজায় হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের মুক্তির ঘোষণা দিতে পারবেন। শনিবার টেলিভিশনে প্রচারিত এক বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। তবে হামাস অস্ত্র সমর্পণে রাজি নয়। তারা জানিয়েছে, ইসরাইল এখনও গাজায় গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

হামাস শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি পরিকল্পনার অধীনে জিম্মিদের মুক্তি দিতে রাজি। তবে সেই প্রস্তাবে নিরস্ত্রীকরণের কথা উল্লেখ করা হয়নি। অন্যান্য শর্ত নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। এমন এক প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহু ওই মন্তব্য করেছেন। শনিবার সকালে গাজায় ইসরাইলি বিমান হামলার পর হামাস জানায়, ইসরাইল গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানায় তারা। এ অবস্থায় শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে দুই পক্ষের পরোক্ষ অস্ত্রবিরতি বিষয়ে আলোচনা সোমবার মিশরে শুরু হওয়ার কথা। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, হামাস যদি চুক্তি সম্পন্ন করতে দেরি করে, তিনি তা মেনে নেবেন না। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছেন, হামাসকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, না হলে সব বাজি শেষ। চলো, দ্রুত শেষ করা যাক!

পরবর্তীতে তিনি জানান, ইসরাইল ‘প্রাথমিক প্রত্যাহারের সীমা’ মেনে নিয়েছে, যা সম্ভবত মার্কিন শান্তি পরিকল্পনার সঙ্গে প্রকাশিত ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের মানচিত্রগুলোর একটির প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। ট্রাম্প ২০ দফা পরিকল্পনায় যুদ্ধের তাৎক্ষণিক অবসান ও হামাসের হাতে থাকা ২০ জীবিত ইসরাইলি জিম্মি, পাশাপাশি মৃতদের দেহাবশেষ, মুক্তির বিনিময়ে শত শত আটক গাজাবাসীকে মুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। ইসরাইলি সেনাবাহিনী এক্সে পোস্ট করে জানিয়েছে, তারা ট্রাম্প পরিকল্পনার প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি বাড়ানোর নির্দেশ জারি করেছে এবং সেনাদের নিরাপত্তা তাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার।

হামাস যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনার কিছু দিক মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা একধরনের ‘হ্যাঁ, তবে...’ এমন জবাব দিয়েছে। অর্থাৎ, তারা বাকি সব জীবিত ও মৃত ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তি দিতে রাজি এবং গাজা হবে নিরপেক্ষ ‘টেকনোক্রেটদের দ্বারা পরিচালিত’ একটি প্রশাসনিক অঞ্চল। তবে, নিরস্ত্রীকরণ প্রসঙ্গে তারা কিছু বলেনি। এটাই ইসরাইলের প্রধান শর্ত। তবুও গাজা ও ইসরাইল- উভয় জায়গাতেই এখন একধরনের সতর্ক আশাবাদ কাজ করছে, হয়তো এবার সত্যিই একটি সমঝোতা হতে পারে। পার্থক্য হচ্ছে, এবার সরাসরি ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত হয়েছেন ট্রাম্প নিজে। তিনি চান ইতিহাসে যুদ্ধের অবসান ঘটানো রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত হতে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আগের ব্যর্থ চুক্তিগুলোর প্রধান বাধাগুলো এখনো রয়ে গেছে।

বিশেষ করে, হামাসের দাবি যে ইসরাইলকে সম্পূর্ণভাবে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং জিম্মিরা মুক্তির পর যুদ্ধ পুনরায় শুরু করা হবে না- এই নিশ্চয়তা দিতে হবে। হামাস জানে, জিম্মিদের মুক্তির পর তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে যাবে, তাই তারা নিঃসন্দেহে শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইবে। ওদিকে, দেশের ভেতর ও বাইরে অনেকেই অভিযোগ করছেন, নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে চুক্তি বিলম্বিত করছেন, যাতে যুদ্ধ চলতে থাকে এবং তিনি রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেন। তাকে সমর্থন দিচ্ছেন কট্টর-ডানপন্থী মন্ত্রীরা। তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, হামাসের ‘সম্পূর্ণ পরাজয়’ ছাড়া যদি যুদ্ধ শেষ হয়, তারা জোট সরকার থেকে সরে যাবেন। এটা হলে সরকার পতনের কারণ হতে পারে। তবে আপাতত নেতানিয়াহু তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে আছেন। দেশের অভ্যন্তরে জনমত জরিপে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ইসরাইলি হামাসের সঙ্গে জিম্মি বিনিময় ও যুদ্ধবিরতির পক্ষে। দেশটি এখন গভীরভাবে বিভক্ত, যুদ্ধ ক্লান্ত এবং আন্তর্জাতিকভাবে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তারা।

জিম্মিদের পরিবারগুলো বিবিসিকে জানিয়েছে যে তারা আশাবাদী, খুব শিগগিরই তাদের প্রিয়জনরা ফিরবেন। ভিকি কোহেনের ছেলে নিমরদ গাজায় আটক ২০ জীবিত জিম্মির একজন। ভিকি বলেন, শনিবার সকালে জেগে ওঠার পর আমার মনে একধরনের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে ভয়ও- যদি কিছু ভুল হয়ে যায়? এটা খুবই নাজুক পরিস্থিতি, আমরা আর হতাশ হতে চাই না। তবু আশা করছি, শিগগিরই নিমরদকে দেখতে পাব, তাকে আবার জড়িয়ে ধরতে পারব।

ওদিকে, গত দুই বছরে গাজার বেশির ভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। সেখানে শান্তি প্রস্তাব নিয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া মিশ্র- কেউ আশাবাদী, কেউ গভীর সন্দেহে ভরা। ইব্রাহিম ফারেস গাজার এক বাসিন্দা। তিনি বলেন, অতিরিক্ত আশাবাদে ভেসে যাবেন না। এখনো অনেক বিস্তারিত আলোচনা বাকি আছে- শয়তান সবসময় থাকে খুঁটিনাটিতেই। ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক মাধ্যমে ইসরাইলকে তাৎক্ষণিকভাবে বোমা হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানালেও শনিবার ভোরে ইসরাইলি বিমানবাহিনী আবারও গাজা সিটিতে তিনটি বিমান হামলা চালায়। তাতে কমপক্ষে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। গাজার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি অভিযানে আরও ৬৬ জন নিহত হয়েছেন। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে কমপক্ষে ৬৭,০৭৪।

https://mzamin.com/uploads/news/main/183215_Abul-2.webp

চীন, রাশিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র— সবার সঙ্গে সম্পর্কের কৌশলে ভারত by শশী থারুর

বিশ্ব কূটনীতির মঞ্চে ভারত বহুদিন ধরেই একধরনের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের অবস্থান নীতিগতভাবে নিরপেক্ষ, কিন্তু বাস্তবে অত্যন্ত বাস্তববাদী। আজ যখন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে, জোটগুলোর চরিত্র বদলাচ্ছে, আর বিশ্বব্যবস্থা বিভিন্ন প্রভাব–বলয়ে ভেঙে পড়ছে; তখন ভারত আবারও নিজের অবস্থান নতুন করে ঠিক করার তীব্র চাপে পড়েছে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনের মধ্যে আছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদের প্রধান নিশানাগুলোর একটি হয়ে উঠেছে ভারত।

ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রে ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক বসিয়েছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সব বাণিজ্য অংশীদারের ওপর আরোপিত শুল্কের চেয়ে বেশি। এর বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে। কারণ, গত বছর ভারতের মোট রপ্তানির ১৮ শতাংশ গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে।

তবে এটি কেবল বাণিজ্য–সম্পর্কিত বিষয় নয়, পঁচিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত কৌশলগত সম্পর্ক গভীর করেছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, ক্রমে শক্তিশালী হওয়া ভারতই ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্যের ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নতুন এই শুল্ক আরোপ বুঝিয়ে দিয়েছে, সবচেয়ে মজবুত সম্পর্কও একজন জনতুষ্টিবাদী নেতার খেয়ালের ওপর নির্ভরশীল হতে পারে। এই শুল্ক কিছুদিনের জন্য অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি দুই দেশের সম্পর্কের ধরনকেও নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারে।

শুধু শুল্ক নয়, অন্যভাবেও ট্রাম্প প্রশাসন ভারতকে আহত করছে। বিশেষ করে, তারা পাকিস্তানের প্রতি বাড়তি উষ্ণতা দেখাচ্ছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের উসকানিমূলক কথাবার্তা বলার দীর্ঘ ইতিহাস থাকার পরও ট্রাম্প তাঁকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছেন। আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্রে দাঁড়িয়েই ভারতে পারমাণবিক হামলার হুমকি দিয়েছেন ও কাশ্মীরকে পাকিস্তানের ‘জীবনরেখা’ বলেছেন। কিন্তু এসব বক্তব্যের পরও যুক্তরাষ্ট্র কোনো সমালোচনা না করে নরম কূটনৈতিক আচরণ দেখিয়েছে। এটা স্পষ্ট করে যে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি পুরোপুরি স্বার্থকেন্দ্রিক।

অবশ্য পাকিস্তানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই আগ্রহ কৌশলগতভাবে ভারতের জন্য অস্বস্তিকর হলেও তা তার অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ আসলে ভারতের সঙ্গেই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

ভারতের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হলো এমনভাবে ভারসাম্য রাখা, যাতে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তানের অস্থায়ী ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তার ক্ষতি না করে। বিশেষ করে কাশ্মীরের অস্থির নিয়ন্ত্রণরেখার (যেখানে গত এপ্রিলে পাকিস্তানি সন্ত্রাসীরা ঢুকে পর্যটকদের ওপর ভয়াবহ হামলা চালায়) নিরাপত্তা ঠিক রাখা ভারতের জন্য সবচেয়ে জরুরি।

পাকিস্তানের প্রতি চীনের সমর্থন ভারতের নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে। এপ্রিলের পাকিস্তানি সন্ত্রাসী হামলার জবাবে ভারতের পাল্টা অভিযান ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ চীন পাকিস্তানকে তাৎক্ষণিক সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারীও চীন। এসব অস্ত্র পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধেই ব্যবহার করেছে।

চীনের বিশাল বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) সবচেয়ে বড় প্রকল্প হলো চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)। এটি পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমের গওয়াদার বন্দরকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে। এই প্রকল্প দেখিয়ে দিচ্ছে, চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক এখন শুধু সাময়িক বা কৌশলগত সহযোগিতা নয়, বরং এটি একটি শক্তিশালী ও স্থায়ী জোটে পরিণত হয়েছে।

তাই ভারতকেও বড় পরিসরে পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল করা, সীমান্তে সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার মতো পদক্ষেপই হবে চীন-পাকিস্তান জোটের মোক্ষম জবাব।

চীন সরাসরি ভারতের বিরুদ্ধে সীমান্ত আগ্রাসনও চালিয়েছে। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের ভয়াবহ গালওয়ান যুদ্ধের ক্ষত আবারও দগদগে হয় ২০২০ সালে। ওই বছর চীনের সেনারা গালওয়ান উপত্যকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) লঙ্ঘন করে এবং এক সংঘর্ষে সেখানে ২০ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। এ ছাড়া চীন অরুনাচল প্রদেশ সীমান্তের পার্বত্য ভূমিতে সেনা মোতায়েন করে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেও রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দৃঢ় রয়েছে। শীতল যুদ্ধকালীন নিরপেক্ষ নীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মূলত দুই দেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

সব বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে মতের মিল না থাকলেও ভারত রাশিয়া থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ করে এবং এ বছর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নয়াদিল্লি সফরও নির্ধারিত রয়েছে। তবে এখানেও ভারতের উদ্বেগের যে কারণ আছে, সেটি হলো রাশিয়া যত বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল হতে থাকবে, ততই ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।

বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় ভারত তার আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলোকে বহুমুখী করছে। ইউরোপ যখন তাদের সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহব্যবস্থা নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে, তখন ভারত যুক্তরাজ্যের সঙ্গে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করার এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা বাণিজ্য আলোচনা নতুন করে শুরু করার সুযোগ দেখেছে।

ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশগুলো চীনের বিকল্প হিসেবে গণতান্ত্রিক ভারতকে গ্রহণ করতে আগ্রহী। ভারত আফ্রিকার সঙ্গেও পুরোনো সম্পর্কগুলোকে নতুন করে জোর দিচ্ছে। আফ্রিকার জনসংখ্যাগত সুবিধা ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ভারতের বৈশ্বিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।  যেখানে চীন দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকায় সম্পদ আহরণমুখী নীতি অনুসরণ করেছে, ভারত সেখানে আফ্রিকার সঙ্গে পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ডিজিটাল অবকাঠামোতে ভারতীয় বিনিয়োগও বাড়ানো হচ্ছে।

উপসাগরীয় অঞ্চলে ভারতের স্বার্থ মানবিক ও কৌশলগত—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ৮০ লাখেরও বেশি ভারতীয় বসবাস ও কাজ করেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশে থাকা পরিবারগুলোর জন্য অর্থনৈতিক ভরসা। তবে গালফ দেশগুলো যখন তেলনির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করতে চাইছে, তখন ভারত তাদের প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক কিছু দিতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ভারতের কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে। এতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, এই সম্পর্কগুলো আর কেবল লেনদেনভিত্তিক নয়, বরং কৌশলগত গভীরতায় পৌঁছাচ্ছে।

এশিয়ার ভেতরে ভারত নিঃসন্দেহে প্রয়াত জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের নেতৃত্বের অভাব অনুভব করে। কারণ, আবে নিরাপত্তা খাতসহ দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আরও গভীর করতে চেয়েছিলেন। ভারতের বর্তমান প্রত্যাশা, জাপান সরকার আবার সেই নীতি অবলম্বন করবে।

ভারতের শক্তি তার কৌশলগত নমনীয়তায়। কঠোর জোটের শিকলে বাঁধা না থেকে ভারত নিজের স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তাই প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, জ্বালানি ও অস্ত্রে রাশিয়ার সঙ্গে, বাণিজ্য ও জলবায়ুতে ইউরোপের সঙ্গে, আর উন্নয়ন ও প্রবাসী ভারতীয়দের নিয়ে আফ্রিকা ও উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে সহযোগিতা করছে। তবে এই হিসাবি ও জটিল কৌশল স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দাবি করে।

ভারতকে সন্ত্রাসবাদ, সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে নিজের সীমারেখা স্পষ্টভাবে টেনে তা কার্যকর করতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি, কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে নিজস্ব সক্ষমতায় বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে ভারতকে এমন একটি বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে থাকতে হবে, যা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নীতিনির্ভর ও গণতান্ত্রিক।

- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

* শশী থারুর, জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল এবং ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বর্তমানে ভারতের কংগ্রেস পার্টির একজন এমপি।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইশিবা শিগেরু। ছবি: রয়টার্স

গাজায় কি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা বন্ধ হচ্ছে

আল–জাজিরাঃ গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন হামাস যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবের বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। তারা সব ইসরায়েলি জিম্মিকে মুক্তি দিতে রাজি হয়েছে। তবে ২০ দফা চুক্তির অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চায় তারা।

ট্রাম্প ইতিমধ্যে ইসরায়েলকে অবিলম্বে গাজায় বোমা হামলা বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। ইসরায়েলের সরকারও সেনাবাহিনীকে গাজায় হামলা বন্ধ করতে বলেছে।

অবশেষে কি গাজায় দুই বছর ধরে চলা ইসরায়েলি যুদ্ধের অবসান হতে যাচ্ছে? নাকি সামনে আরও জটিলতা অপেক্ষা করছে? এমন প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।

হামাস আসলে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে

হামাস বলেছে, তারা গাজায় জিম্মি অবস্থায় থাকা সব ইসরায়েলিকে মুক্তি দেবে। জিম্মিদের মধ্যে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মৃতদেহও হস্তান্তর করা হবে। এর বিনিময়ে তারা চায়, গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ হোক এবং গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনারা সরে যাক।

হামাস আরও বলেছে, তারা একটি স্বাধীন ও অরাজনৈতিক ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (টেকনোক্র্যাট) কাছে গাজার শাসনক্ষমতা হস্তান্তর করবে।

ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনার মধ্যে হামাসের অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টিও আছে। ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিষয়ে হামাস বলেছে, একটি বিস্তৃত ফিলিস্তিনি জাতীয় রূপরেখার মধ্যে থেকে আলোচনা করা উচিত। ওই আলোচনায় হামাসও অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে অংশ নেবে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া কি ইতিবাচক

ট্রাম্প হামাসের প্রতিক্রিয়াকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে এ–সংক্রান্ত পোস্ট দিয়েছেন। সেখানে ট্রাম্প লিখেছেন, তিনি মনে করেন ফিলিস্তিনি সংগঠনটি ‘দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য প্রস্তুত’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও লিখেছেন, ইসরায়েলকে অবশ্যই অবিলম্বে গাজায় বোমা হামলা বন্ধ করতে হবে, যেন বন্দীদের মুক্তি দেওয়া যায়।

ট্রাম্প লিখেছেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে বিস্তারিত বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু করেছি। বিষয়টি শুধু গাজা নিয়ে নয়, এটি মধ্যপ্রাচ্যে বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত শান্তি অর্জনের বিষয়।’

ট্রাম্প পরে একটি ভিডিও বার্তা দেন। সেখানে ট্রাম্প আবারও বলেন, তিনি হামাসের জবাবকে একটি বিজয় হিসেবে দেখছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটি একটি বড় দিন। দেখা যাক সব কীভাবে এগোয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করতে হবে। আমি শুধু বলতে চাই, এটি একটি বিশেষ দিন।’

ইসরায়েলের অবস্থান কী

ট্রাম্প গত সোমবার হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে গাজা শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। নেতানিয়াহু তখন বলেন, তিনি ট্রাম্পের পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন। কারণ, তিনি মনে করেন, এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল তাদের যুদ্ধের লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘এটি আমাদের সব জিম্মিকে ইসরায়েলে ফিরিয়ে আনবে, হামাসের সামরিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক শাসন বাতিল করবে এবং নিশ্চিত করবে যে গাজা আর কখনো ইসরায়েলের জন্য হুমকি হবে না।’

তবে নেতানিয়াহু কিছু সতর্কবার্তাও দিয়েছেন। হোয়াইট হাউসে তিনি বলেছেন, হামাস যদি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে অথবা চুক্তি মানার ভান করে পরে উল্টোটা করার চেষ্টা করে—তাহলে ইসরায়েল ‘নিজেই কাজটি শেষ করে দেবে।’

এর কয়েক ঘণ্টা পর নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের উদ্দেশে হিব্রু ভাষায় বলেন, তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিষয়ে একমত নন। ইসরায়েলি সেনারা গাজার বেশির ভাগ অংশে থাকবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

হামাসের অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টিও সমস্যাপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু বলছেন, হামাসকে অবিলম্বে অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। তবে হামাস শুধু বলেছে, তারা বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চায়।

আল-জাজিরার সাংবাদিক আলী হাশেম বলেন, হামাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজার ভবিষ্যৎ, সামগ্রিক সংগ্রামের ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনিদের সম্মতির ওপর নির্ভর করবে। তারা চায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য বড় পরিসরে ফিলিস্তিনি সম্মতি গড়ে তোলা হোক। সুতরাং এটা পরিষ্কার যে হামাসের কথার মধ্যে যদি—কিন্তু...আছে।

মূল বিরোধের জায়গা কী হবে

হামাস পরিষ্কার বলে দিয়েছে, তারা ট্রাম্পের পরিকল্পনার কয়েকটি দিক মানতে রাজি নয়। যেমন ট্রাম্প ও সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বাধীন অস্থায়ী প্রশাসন গঠনের বিষয়ে তাদের সম্মতি নেই।

হামাসের শীর্ষ কর্মকর্তা মুসা আবু মারজুক আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ফিলিস্তিনি নন এমন কেউ ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণ করুক, তা আমরা কখনো চাই না।’

টনি ব্লেয়ার আগে ইরাকে আগ্রাসনে জড়িত ছিলেন উল্লেখ করে তাঁর নিয়োগকে বিশেষভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করেছেন মুসা।

অস্ত্রবিজ্ঞান বা নিরস্ত্রীকরণও সমস্যা হবে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু বলছেন, হামাসকে অবিলম্বে অস্ত্র ছেড়ে দিতে হবে। কিন্তু হামাস শুধু বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে রাজি আছে।

আল-জাজিরার আলী হাশেম বলেন, হামাসের বক্তব্যে বলা হয়েছে গাজার ভবিষ্যৎ এবং পুরো সংগ্রামের ভবিষ্যৎ—ফিলিস্তিনিদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। তারা চায় ফিলিস্তিনিদের বিস্তৃত সম্মতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হোক। স্পষ্ট হলো, হামাস বলেছে, ‘হ্যাঁ, কিন্তু...।

ইসরায়েল কি আসলেই হামলা থামাবে

এক্সিওসের প্রতিবেদক বারাক রাভিদ মনে করেন, ট্রাম্পের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে ইসরায়েল সরকার সম্ভবত অখুশি হবে। কারণ, হামাস একেবারে সব দাবির বিষয়ে সায় দিয়ে দেয়নি। শোনা যাচ্ছে, ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া শুনে নেতানিয়াহু ‘হতবাক’ হয়েছেন। তিনি হামাসের জবাবকে শান্তি পরিকল্পনা ‘প্রত্যাখ্যান’ হিসেবে দেখছেন।

নেতানিয়াহুর সরকারে উগ্র ডানপন্থীদের আধিপত্য রয়েছে। ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনাটি তাদের পছন্দ হয়নি। তারা ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, নেতানিয়াহু যদি চুক্তিতে সম্মত হন, তাহলে তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে হবে।

অবশ্য ইসরায়েলের বিরোধী দল চুক্তিটি সমর্থন করলেও নেতানিয়াহুর ওপর তাদের অবিশ্বাসের কারণে একসঙ্গে জোট গঠন করা কঠিন হবে।

এখন ট্রাম্প কতটা চাপ দিয়ে নেতানিয়াহুকে চুক্তিতে রাজি করাতে পারবেন, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করছে।

ওয়াশিংটন থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক শিহাব রতনসি বলেন, ‘ধারণা করতে পারেন কি, এখনই ওয়াশিংটন ডিসিতে কতগুলো পক্ষ জড়ো হয়েছে, যারা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে।’

রতনসি আরও বলেন, ‘এখন তিনি (ট্রাম্প) কতটা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং মধ্যস্থতাকারীরা তাঁকে চুক্তির শর্তগুলো বহাল রাখা না রাখার ব্যাপারে কতটা চাপ দিচ্ছে, তার ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। কারণ, অতীতে দেখা গেছে, হামাসকে চুক্তি মানতে বলা হয়েছে। আর ইসরায়েলকে নতুন করে হামলা শুরু করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের আহ্বান সত্ত্বেও ইসরায়েল এখনো গাজায় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আজ ভোর থেকে হামলায় কমপক্ষে ২০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

ট্রাম্পের কাছে নেতানিয়াহু কি আসলেই বোঝা, কী বলছেন ইসরায়েলি বিশ্লেষক

ইসরায়েল এখন শুধু তার ‘প্রচলিত শত্রু ও সমালোচকদের’ জন্যই নয়, বরং ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো ‘মহান বন্ধুদের’ জন্যও বোঝায় পরিণত হয়েছে। ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওরি গোল্ডবার্গ গাজায় ইসরায়েলের নির্বিচার হামলা এবং বিশ্ববাসীর দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ঠিক এভাবে কথাটি বললেন।

তেল আবিব থেকে আল-জাজিরাকে গোল্ডবার্গ বলেন, ‘কেউ এটা প্রকাশ্যে স্বীকার করবেন না। কিন্তু আমি মনে করি, হামাসের জবাবকে শান্তি স্থাপনের আগ্রহ হিসেবে দেখে ট্রাম্প যে আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা এমনি এমনি নয়।’

গোল্ডবার্গ বলেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত এটাই প্রমাণ করে, তিনি যখন নেতানিয়াহু বা ইসরায়েলের দিকে তাকাচ্ছেন, তখন তিনি একে একটি বোঝা হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের বহুল পরিচিত ভাষায় বলতে গেলে, তিনি একজন ‘লুজার’ বা ‘ব্যর্থ ব্যক্তিকে’ দেখছেন।

ইসরায়েলি বিশ্লেষক আরও যোগ করেন, ইসরায়েল এমনটা একেবারেই আশা করেনি। কারণ, দেশটি তার ‘জাতিগত নিধনমূলক কর্মকাণ্ডের অন্তহীন চক্রে’ এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল যে তারা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার বাইরে অন্য কিছু স্বীকার করতে পারছিল না।

গোল্ডবার্গ বলেন, ‘গাজায় যাওয়ার চেষ্টা চালানো প্রথম ফ্লোটিলা ও গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার মধ্যে পার্থক্য দেখুন। আর এই (দ্বিতীয়) ফ্লোটিলার বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পদক্ষেপের পর বিশ্বজুড়ে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছে, তা খেয়াল করুন। কিছুই আগের মতো নেই। আমি মনে করি, গত দুই বছরের মধ্যে ইসরায়েল আজ শনিবার সকালে সবচেয়ে বেশি একাকী হয়ে পড়েছে।’

তবে গোল্ডবার্গ যুক্তি দিয়ে বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা মেনে চলার ক্ষেত্রে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিজস্ব একটি সুবিধা রয়েছে।

এই বিশ্লেষক বলেন, ইসরায়েলে যদি মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচন দেওয়া হয়, তবে নেতানিয়াহুর জন্য এটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক পরিস্থিতি হবে। কারণ, তিনি এমন একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পাবেন, যিনি একটি অনিবার্য কঠিন যুদ্ধ লড়েছেন। একই সঙ্গে তিনি একটি অনিবার্য কঠিন চুক্তিও স্বাক্ষর করতে পেরেছেন।

ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা দক্ষিণের দিকে সরে যাওয়ার পর বিশ্রাম নিচ্ছেন। ৩ অক্টোবর ২০২৫
ইসরায়েলি সামরিক অভিযানকে কেন্দ্র করে উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা দক্ষিণের দিকে সরে যাওয়ার পর বিশ্রাম নিচ্ছেন। ৩ অক্টোবর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলো কি ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে by ডেভিড হার্স্ট

আবদুল-মুততালিব আল-কায়েসি ইসরায়েল ও জর্ডানের প্রধান সীমান্তপথ অ্যালেনবি ব্রিজে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে আত্মঘাতী মিশনে যাওয়ার আগে একটি উইল লিখে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘হে আমার উম্মাহর সন্তানেরা, আমরা কত দিন পর্যন্ত দখলদারদের বিষয়ে নীরব থাকব, যতক্ষণ না তারা আমাদের ভূমিতে প্রবেশ করে আমাদের পবিত্রতাকে লঙ্ঘন করে?’

আল-কায়েসি কিংবা তার আগে এই মাসের শুরুর দিকে একই সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীকে আক্রমণকারী মাহির আল-জাজি—কেউ-ই ফিলিস্তিনি নন। তাঁরা দুজনই পূর্ব তীরের জর্ডানিয়ান। আল-কায়েসির বার্তা ছিল, ‘বিশ্বের সম্মানিত স্বাধীন মানুষদের উদ্দেশে এবং বিশেষভাবে শামের আরব গোত্রভাই জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননের মানুষদের উদ্দেশে।’

আল-কায়েসির বার্তা স্পষ্ট, ‘গাজায় যা ঘটছে, তা অন্য আরব দেশগুলোতেও পুনরাবৃত্তি হবে। আমাদের নীরবতা মানেই সহায়তা। কিছু না করলে “গ্রেটার ইসরায়েল” আমাদের ঘরে এসে দাঁড়াবে। যদি এই বার্তা কেবল আম্মানের প্রান্তে সীমাবদ্ধ না থেকে বৃহত্তর এক মনোভাবকে প্রতিফলিত করে, তবে ইসরায়েল ইতিহাসের ভয়াবহ ভুল করছে।’

ইসরায়েল: অস্তিত্বগত হুমকি

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ বারবার বলছেন, জর্ডান নদীর পশ্চিমে কেবল একটি রাষ্ট্রই থাকবে, আর সেটি হবে ইসরায়েল। এই বার্তা শুধু ফিলিস্তিন নয়, সীমান্তের বাইরেও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ইসরায়েল যে হুমকি তৈরি করছে, তা জোট, রাজনীতি, গোত্রীয় পরিচয় বা ধর্মনির্বিশেষে পুরো অঞ্চলকে ঘিরে ফেলছে।

প্রায় দুই বছরের যুদ্ধে লেবাননের অংশবিশেষ ও গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে, দক্ষিণ সিরিয়া দখল হয়েছে আর ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রী আহমেদ গালেব নাসের আল-রাহাওয়িকে হত্যা করেছে এবং ইরানের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করেছে। এখন ইসরায়েল শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্বের জন্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

আপনি যদি ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় বসেন, তবে তার যুদ্ধবিমান আপনার আলোচক দলকেই টার্গেট করবে। ওমানের আলোচনার আগেই ইরানকে আক্রমণ এবং দোহায় হামাসের আলোচক দলকে বোমা হামলায় টার্গেট করার ঘটনাই তার প্রমাণ। ক্ষমতার নেশায় বা তা আঁকড়ে ধরার মরিয়া চেষ্টায় নেতানিয়াহু মনে করছেন, বল প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি ইসরায়েলের নতুন সীমানা চাপিয়ে দিতে পারবেন।

ইসরায়েল আর কখনো এমন সুবিধাজনক মার্কিন প্রেসিডেন্ট পাবে না, যেমন এখন পেয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। তিনি ইতিমধ্যে দখলকৃত গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্তি স্বীকার করেছেন, জেরুজালেমকে ‘ইহুদি রাষ্ট্রের’ অবিভাজ্য রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং এখন গাজা নগরীকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার অনুমতি দিচ্ছেন। মার্কিন প্রশাসন কখনোই এতটা খ্রিষ্টান মৌলবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না।

দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেমের সিলওয়ান এলাকায় ফিলিস্তিনি বাড়ির নিচে খনন করা এক টানেলে দাঁড়িয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি ঘোষণা করেন, জেরুজালেম হলো ইহুদিদের ‘চিরন্তন, অবিভাজ্য, অবিসংবাদিত রাজধানী’। তিনি বলেন, ‘চার হাজার বছর আগে এখানেই, মরিয়াহ পর্বতে, ঈশ্বর তাঁর জাতিকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি কেবল একটি জাতিকেই বেছে নেননি, একটি স্থানও বেছে নিয়েছিলেন এবং এই জাতির জন্য একটি উদ্দেশ্য নির্ধারণ করেছিলেন। জাতি ছিল ইহুদিরা, স্থান ছিল ইসরায়েল, আর উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর আলোকবর্তিকা হওয়া।’ হাকাবির কাছে এই সংঘাতে কোনো ধূসর এলাকা নেই। এটি শুভ বনাম অশুভর লড়াই।

ধর্মীয় যুদ্ধ শুরুর ইঙ্গিত

উন্মত্ততাটা শুধু কোনো ধর্মানুরাগী মৌলবীদের উৎসে ফেরা নয়, এটি ধর্মীয় যুদ্ধে পরিণত হওয়ার শুরুর বাঁশিও হতে পারে। মুসলিম অঞ্চলের ওপর সম্পূর্ণ বিজয়ের লক্ষ্যে যাঁরা আছেন, নেতানিয়াহু তাঁদের পথেই ভুল করছেন; ইতিহাসে আগের অনেক নেতাই তেমন করেছেন, বিশেষ করে নেপোলিয়ন ও হিটলার, যাঁরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আক্রমণ করে পরাজিত হয়েছিলেন।

নেতানিয়াহু মনে করেন যে ৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন ইহুদি নাগরিকের ইসরায়েল ৪৭৩ মিলিয়ন আরব (মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা), ৯২ মিলিয়ন ইরানি বা বিশ্বব্যাপী ২ বিলিয়ন মুসলিমের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে পারবে।

এটা নেতানিয়াহুর ‘সুপার স্পার্টা’ ভাবনা। ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চালিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকে সরে এসে ক্রমে সব আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী, যেমন ইরান ও তুরস্ককে টার্গেট করেছে। নেতানিয়াহুর সুপার স্পার্টা ধারণা সব আরব রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়। ইসরায়েল যে হুমকি সৃষ্টি করছে, তা জোট, রাজনীতি, গোত্র বা ধর্মনির্বিশেষে পুরো অঞ্চলের জন্য প্রযোজ্য।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) কথাই ধরা যাক। ক্ষমতার রাস্তা কোথায়, তা প্রথম শনাক্তকারী নেতাদের একজন ছিলেন ইউএইর প্রেসিডেন্ট মোহাম্মেদ বিন জায়েদ (এমবিএজেড)। তিনি সৌদি যুবরাজকে গোপনে নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাতের পথ দেখিয়েছিলেন।

রাজনৈতিক দায়বোধ

আব্রাহাম চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রথম দেশ ছিল ইউএই। তাই এটিই হতে পারে শেষ দেশ, যা তা বাতিল করবে। তবে আবুধাবির মেজাজ এখন ইসরায়েলের প্রতি খচখচ করছে। ইউএইর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবদুলখালেক আবদুল্লাহ টুইট করেছেন, ‘প্রথমবারের মতো (ইউএইতে) গুরুতর আলোচনা চলছে যে এখন সময় এসেছে আব্রাহাম চুক্তিগুলো স্থগিত করার। চুক্তি এখন কৌশলগত সম্পদ না হয়ে রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে।’

একজন আমিরাতি শিল্পপতির প্রতিষ্ঠিত থিঙ্কট্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা দোহা আঘাতের পর ইসরায়েলের অর্থনীতিকে কীভাবে আঘাত করা যায়, সে বিষয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। সে প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, যদি আরব রাষ্ট্রগুলো একসঙ্গে আকাশপথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে ইসরায়েলের ২৮ বিলিয়ন থেকে ৩৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

দোহায় হামাসের বিরুদ্ধে আঘাতের এক সপ্তাহ পর জরুরি শীর্ষ সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি ইসরায়েলকে ‘শত্রু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর শাসনকালে (২০১৪ থেকে) এমনটা বলার প্রথম ঘটনা এটা। ইসরায়েলি বাহিনী রাফাহ সীমান্ত এবং ফিলাডেলফি করিডর দখল করে মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেছে।

নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা গাজা থেকে এক মিলিয়নের বেশি ফিলিস্তিনিকে সিনাইভিত্তিক এলাকায় ঠেলে দেওয়া। এটি মিসরের জাতীয় নিরাপত্তার ওপর সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। গাজার জনসংখ্যার অর্ধেক খালি করে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা মিসরের সহযোগিতা ছাড়া সফল হতে পারে না। যতক্ষণ আরও ফিলিস্তিনিকে দক্ষিণে ঠেলে দেওয়া হবে, সিনাই ততই ইসরায়েলের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।

জর্ডানকে হুমকি

ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করা দ্বিতীয় আরব দেশ জর্ডানে এখন ওয়াদি আরাবা চুক্তির বর্তমান মূল্য নিয়ে একই ধরনের বিতর্ক চলছে। জর্ডানের ভাষ্যকার মাহের আবু তাইয়ার লিখেছেন, ‘অসলো চুক্তি প্রমাণ করেছে, এটি কেবল ইসরায়েলের বৈধতা আদায়ের ফাঁদ, সারা বিশ্ব থেকে ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের জড়ো করে তাদের দখলদারের নজরদারির নিচে আনার কৌশল ছাড়া আর কিছুই নয়।’

মাহের আবু তাইয়ার প্রশ্ন তুলেছেন, ‘তাহলে ওয়াদি আরাবা চুক্তির পরিণতি কী? এটি কি জর্ডানের কৌশলগত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা? আর নিশ্চয়তাদাতা কারা? যখন আমরা দেখেছি অসলো চুক্তির নিশ্চয়তাদাতারা চোখের সামনে সেটি ভেঙে যেতে দেখেছে এবং তারাই সম্ভাব্য বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হয়েছে।’

আবু তাইয়ার বলেন, জর্ডান দুইভাবে আক্রমণের শিকার হতে পারে। প্রথমত, আল-আকসা মসজিদের তত্ত্বাবধানের কারণে, যেখানে অভূতপূর্ব মাত্রায় ইসরায়েলি বসতকারীদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম তীর ইস্যুতে। ইসরায়েল সীমান্তে নিরাপত্তা অজুহাত তৈরি করে দক্ষিণ জর্ডান পুনর্দখলের চেষ্টা করতে পারে।

প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রকে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশের স্বীকৃতির সর্বশেষ প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, ইসরায়েল কখনোই জর্ডান নদীর পশ্চিমে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের অনুমতি দেবে না, অর্থাৎ পূর্ব দিকে (জর্ডান ভূখণ্ডে) সে সম্ভাবনা থেকে যেতে পারে।

নতুন জোট

আরব নেতারা নিষ্ক্রিয় বসে নেই। প্রতিরক্ষা জোট নিয়ে এখন গুরুত্বসহকারে ভাবা হচ্ছে, যা গত ১০ বছরে অকল্পনীয় ছিল। ২০১৬ সালে সৌদি গণমাধ্যমকে রাতের শিফটে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে হত্যা করার ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের খবর প্রকাশের জন্য। এরদোয়ান বেঁচে গিয়েছিলেন, তবে অভ্যুত্থান প্রায় সফল হয়েই গিয়েছিল।

দুই বছর পর সৌদি সাংবাদিক ও মিডল ইস্ট আইয়ের লেখক জামাল খাসোগিকে সৌদি কনস্যুলেটে হত্যাকে কেন্দ্র করে দুই আঞ্চলিক শক্তি আবার মুখোমুখি হয়। তুরস্ক বরাবরই দাবি করেছে যে হত্যার নির্দেশ এসেছিল সৌদি যুবরাজের কাছ থেকে। টানা তিন বছর ধরে এই ইস্যুতে পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে ওই যুবরাজ কার্যত অচ্ছুত হয়ে পড়েছিলেন।

কিন্তু এর পর থেকে সম্পর্কের যে উষ্ণতা তৈরি হয়েছে, তা লক্ষণীয়। দুই বছর আগে সৌদি তুর্কি ড্রোন নির্মাতা বায়কারের সঙ্গে আকিনজি যুদ্ধ ড্রোন কেনার চুক্তি করে, যা ছিল তুরস্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা রপ্তানি। এখন রিয়াদ আগ্রহ দেখাচ্ছে আলতাই যুদ্ধ ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্রব্যবস্থা ও কান স্টেলথ ফাইটার জেট প্রকল্পে অংশীদার হওয়ার ব্যাপারেও।

আটলান্টিক কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রিয়াদের কানের প্রতি আগ্রহের মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ জঙ্গি বিমানের জন্য দীর্ঘদিনের ব্যর্থ চেষ্টা। ইসরায়েল এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে ইরানে হামলার জন্য এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধা দিয়েছে যেন তারা এ অঞ্চলের আর কারও কাছে এফ-৩৫ বিক্রি না করে।

একইভাবে তুরস্ক ও মিসর, যারা দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী, কেবল রাজনৈতিক ইসলাম ও মুসলিম ব্রাদারহুডের অবস্থান নিয়েই নয়; বরং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে সমুদ্রসীমা নিয়ে দাবিদাওয়ার ক্ষেত্রেও সম্প্রতি একধরনের উষ্ণতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মিসরও কান যুদ্ধবিমান নির্মাণে সহ–উৎপাদক হিসেবে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তা ছাড়া দুই দেশ ১৩ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো যৌথ নৌ মহড়া আয়োজন করতে যাচ্ছে।

সৌদি আরবও পূর্বমুখী হচ্ছে প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্রেও। চলমান পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সঙ্গে তার পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিকে অবহেলা করা যাবে না। এই চুক্তি কিছুদিন ধরেই আলোচনায় ছিল, এমনকি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ক্ষমতায় আসার আগেও।

তবে দোহায় ইসরায়েলি হামলার মাত্র কয়েক দিন পর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একমাত্র পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে এই চুক্তির ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। পাকিস্তানের পেছনে আছে চীন, এ বিষয়ও ওয়াশিংটনের চোখ এড়িয়ে যায়নি। তারপর আছে তুরস্ক।

প্রকৃতিগতভাবেই সতর্ক আঙ্কারা ইসরায়েলের সঙ্গে মুখোমুখি হচ্ছে—দক্ষিণ সিরিয়ায় ইসরায়েলের দখল, বিশেষ করে বাঁধ নির্মাণকে কেন্দ্র করে। কেবল তা–ই নয়, ইসরায়েল দক্ষিণে দ্রুজ এবং উত্তরে কুর্দিদের অভিভাবকত্ব নিজের হাতে নিয়েছে, যা কোনো এক পর্যায়ে পিকেকের সঙ্গে আঙ্কারার শান্তিপ্রক্রিয়ার সরাসরি বিরোধিতা তৈরি করতে পারে। এখন আবার তারা সাইপ্রাসেও প্রবেশ করছে।

ইসরায়েল ইতিমধ্যে সাইপ্রাসে বারাক এমএক্স আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহ করেছে, যা রাশিয়ার এস-৩০০-এর চেয়েও কার্যকর এবং পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুর্কি আকাশ ও স্থলবাহিনীকে ট্র্যাক করতে সক্ষম। ইসরায়েল অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রিজের (আইএআই) সাবেক বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক সহসভাপতি শাই গাল গত জুলাইয়ে যুক্তি দেন, ইসরায়েলের উচিত সাইপ্রাসের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করা এবং দ্বীপের উত্তরাংশকে তুর্কি বাহিনী থেকে ‘মুক্ত’ করার জন্য সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করা।

এ রকম পটভূমিতে আরব অঞ্চল ইসরায়েলের আধিপত্যবাদী আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিহত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটবে না, আবার একরকমভাবে ঘটবেও না। আরবদের বিভক্তি হলো সেই ভিত্তি, যার ওপর একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্প দাঁড় করানো হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থা চিরস্থায়ী হবে—এমনটা ভাবা বোকামি, যখন ছোট্ট ‘স্পার্টা’ ক্রমেই বড় হতে থাকে।

ইসরায়েল স্পষ্টতই বল প্রয়োগ করে সীমান্ত সম্প্রসারণ করার কাজে নেমেছে। একে থামাতে পারে কেবল পুরো অঞ্চলের সম্মিলিত কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি।

* ডেভিড হার্স্ট, মিডল ইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, অনুবাদ ও সংক্ষিপ্তকরণ: মনজুরুল ইসলাম

 ইসরায়েলি বর্বরতায় একরকম মাটিতে মিশে যাওয়া গাজা উপত্যকা
ইসরায়েলি বর্বরতায় একরকম মাটিতে মিশে যাওয়া গাজা উপত্যকা। ছবি: হারেৎজের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে কি প্রায়শ্চিত্ত করতে চায় ফ্রান্স-যুক্তরাজ্য by মো. সাহাবুল হক

জি-৭ ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ তিন দেশ—কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিতে যাচ্ছে।

এর মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের সংখ্যা ১৫০–এ দাঁড়াবে। প্রশ্ন উঠছে, এ স্বীকৃতির বাস্তবিক অর্থ কী? এতে আসলে ফিলিস্তিনের কতটুকু লাভ হবে? এর আগে ১৪৭টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও তা ৭৭ বছর ধরে ফিলিস্তিন একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।

বহু দেশের স্বীকৃতি সত্ত্বেও ফিলিস্তিন কিংবা গাজা উপত্যকার নিরীহ সাধারণ মানুষের ওপর ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন কখনোই থামেনি। এমনকি বর্তমানে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েল সৃষ্ট চলমান অবরোধ সেখানে দুর্ভিক্ষ রূপ লাভ করেছে। ওষুধ, খাদ্য ও জরুরি সহায়তা সেখানে পৌঁছানো একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আজ পর্যন্ত গাজা উপত্যকায় হাজার শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে গাজায় অন্তত ৩৫ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ নারী ও শিশু। ১৯৪৮ সাল থেকে এ পর্যন্ত এই অঞ্চলে ইসরায়েলের নৃশংসতায় প্রায় দেড় লাখ ফিলিস্তিনি মানুষ নিহত হয়েছেন। হাজার হাজার মানুষকে হতে হয়েছে পঙ্গু আহত ও উদ্বাস্তু। লাখ লাখ ফিলিস্তিনি হয়েছেন শরণার্থী।

বিশ্লেষকের মতে, জি-৭ ভুক্ত উল্লিখিত রাষ্ট্রগুলোর স্বীকৃতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য অবশ্যই কূটনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। তবে সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

অনেক বিশ্লেষক বলেছেন, ফিলিস্তিনির পক্ষে স্বীকৃতি দেওয়া আগের ১৪৭ দেশের মতো এই তিন রাষ্ট্রের স্বীকৃতিও একধরনের প্রতীকী। এ প্রতীকী স্বীকৃতি ফিলিস্তিনিদের প্রকৃত স্বাধীনতা কতটুকু আনতে পারবে, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।

ফিলিস্তিনের পক্ষে স্বীকৃতি দেওয়া রাষ্ট্রের সংখ্যা দিন দিন হয়তো আরও বাড়বে, তবে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যর ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য এ স্বীকৃতি অনেকটা ‘পাপের প্রায়শ্চিত্ত’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের এ সংকটের পেছনে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক নীতি এবং সমর্থনই মূলভাবে দায়ী।

অটোমান সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ও ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের তৎপরতা

ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের (১২৯৯-১৯২২) একটি প্রদেশ। শত শত বছর ধরে খ্রিষ্টান জনগণ ও মুসলমানরা ফিলিস্তিনে পাশাপাশি বসবাস করতেন। সেখানে ছোট একটি ইহুদি গোষ্ঠীও বাস করত।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অটোমান সাম্রাজ্য জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলে মিত্রশক্তির টার্গেটে পরিণত হয়। এ সময়ে অটোমানদের আরব প্রদেশগুলোতে ধীরে ধীরে আরব জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে।

আরবরা অনুভব করে তুর্কিরা তাদের ওপর শাসন করছে এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও ভাষা উপেক্ষা করছে। সুযোগটি ব্রিটিশরা কাজে লাগায় এবং আরব ও তুর্কিদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করে।

ব্রিটিশরা আরবদের স্বপ্ন দেখায়, আরবরা অটোমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে যুদ্ধ শেষে আরবদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে ব্রিটেন সহায়তা করবে {ম্যাকমোহন-হুসেইন চিঠিপত্র (১৯১৫-১৬)}। আরবরা ব্রিটিশদের এই ফাঁদে পা দেয়। ঠিক একই সময়ে ব্রিটেন ফ্রান্সের সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি করে, ইতিহাসে যেটি সাইক্স-পিকো চুক্তি (১৯১৬) হিসেবে পরিচিত।

অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এ চুক্তি সম্পন্ন হয়। এ চুক্তির মাধ্যমে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ঐকমত্যে পৌঁছে যে যুদ্ধোত্তর অটোমান ভূখণ্ডকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে। ব্রিটেন পাবে ইরাক ও ফিলিস্তিন আর ফ্রান্স পাবে সিরিয়া, লেবানন, দক্ষিণ-পূর্ব আনাতোলিয়া (তুরস্ক) ও মসুলের (ইরাক) কিছু অংশ।

এ চুক্তিতে রাশিয়া পরে যুক্ত হয় এবং তারা পায় কনস্টান্টিনেপল (ইস্তাম্বুল), আর্মেনিয়া ও কুর্দিস্তানের কিছু অংশ। সাইক্স-পিকো চুক্তি অনুযায়ী, ফিলিস্তিনকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। যদিও তা পরে ব্রিটেন দখল করে নেয়।

রাশিয়া পরে এ চুক্তির বিষয় ফাঁস করে দিলে বিষয়টি বিশ্ববাসীর নজরে আসে। ওই বছরেই আরবরা ব্রিটিশদের সহায়তায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং আরবরা মক্কা, জেদ্দা, দামেস্ক ও অন্যান্য শহর দখল করে নেয়।

এর পরের বছর ১৯১৭ সালে ব্রিটেনের তৎকালীন পররাষ্ট্রসচিব আর্থার বেলফোর ঘোষণা দেন যে ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ‘ইহুদি জনগণের একটি জাতীয় আবাসভূমি’ প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করে। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম হয়।

এখানে ব্রিটিশরা একসঙ্গে কয়েকটি কাজ করে। তারা আরবদের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়, ইহুদিদের জন্য আবাসভূমির ঘোষণা করে এবং ফ্রান্সের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জমি ভাগাভাগির বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এসব ঘটনা একসঙ্গে ঘটে। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে (আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয় ১৯২২ সালে), সাইক্স-পিকো চুক্তি এবং পরে সেভ্রেস (১৯২০) চুক্তির মাধ্যমে অটোমান সাম্রাজ্যের অবশিষ্ট অংশ বিভক্ত হয়। কিন্তু আরবদের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ব্রিটেন স্বাধীন আরব রাষ্ট্র বানানোর কোনো উদ্যোগ নেয় না, অর্থাৎ ব্রিটেনের কাছ থেকে আরবরা ধোকা খায়। মাঝখান দিয়ে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র বানানোর সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

ব্রিটিশ ম্যান্ডেট ও ইহুদি রাষ্ট্র তৈরির চূড়ান্ত রূপ

১৯২০ সালে লিগ অব ন্যাশনসের মাধ্যমে ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ম্যান্ডেট গ্রহণ করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে শাসন করার বৈধতা পায়। এ ম্যান্ডেটের একমাত্র ভিত্তি ছিল বেলফোর ঘোষণা (১৯১৭)। ব্রিটেন ফিলিস্তিনে ম্যান্ডেট পাওয়ার পর এ সময়ে রাশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইহুদিরা জাহাজে করে দলে দলে ফিলিস্তিনে আসা শুরু করে।

এককথায় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের ঢল নামে। ফিলিস্তিনি আরবরা বুঝতে পারে, তাদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে। বিষয়টা আরব জনগণের মধ্যেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় এবং ক্ষোভ দেখা দেয়। ফলে ফিলিস্তিনি আরবরা বিদ্রোহ (১৯৩৬-১৯৩৯) শুরু করে।
এ সময় পর্যন্ত ব্রিটেন ফিলিস্তিনিদের জাতি হিসেবে ন্যূনতম অধিকারের প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শন করেনি।

ফিলিস্তিনি আরবরা ব্রিটিশ সেনা ও ইহুদি নাগরিকদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। কিন্তু ব্রিটিশ সেনারা ফিলিস্তিনি আরবদের কঠোর হাতে দমন করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৭ সালে পিল কমিশন গঠন করে।

সেখানে ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদি অঞ্চলে দুই ভাগে ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু ফিলিস্তিনি আরব ও ইহুদি উভয়ই এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এরই মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) শুরু হয়। এ যুদ্ধে হিটলারের নাৎসি বাহিনী দ্বারা লাখ লাখ ইহুদি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় ও ইহুদিদের প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি বাড়ে।

যুদ্ধ শেষে দাবি উঠতে থাকে বেঁচে যাওয়া ইহুদিদের নিয়ে আলাদা একটি ইহুদি রাষ্ট্র গঠনের। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান ইহুদিদের রাষ্ট্রের পক্ষে জোরালো দাবি জানান এবং ফিলিস্তিনে তাদের জায়গা দেওয়া পক্ষে মতামত দেন। ব্রিটেন বিষয়টা ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে তোলে।

জাতিসংঘ ফিলিস্তিন বিভক্তকরণ পরিকল্পনা (ইউএন রেজল্যুশন ১৮১) অনুমোদন করে। যেখানে ফিলিস্তিনকে দুটি রাষ্ট্রের ভাগ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, একটি ইহুদি রাষ্ট্র ও অন্যটি ফিলিস্তিনি আরব রাষ্ট্র। জেরুজালেমকে রাখা হয় আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে।

প্রস্তাবে বলা হয়, ফিলিস্তিনের মোট জমির ৫৫ ভাগ জমি ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য। ৪৫ ভাগ জমি ফিলিস্তিনি আরবদের জন্য। অথচ ১৯৪৭ সালে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ।

তাদের মালিকানাধীন জমি ছিল ফিলিস্তিনের মোট জমির ৭ শতাংশ। জাতিসংঘের এ সিদ্ধান্ত আরব রাষ্ট্রগুলো মেনে নেয়নি।

এ সিদ্ধান্তকে ইহুদিরা সাধুবাদ জানায় এবং ফিলিস্তিনিদের ভূখণ্ডে ইহুদিরা বিজয় উল্লাস শুরু করে। জাতিসংঘের একতরফা এ ঘোষণার পর শুরু হয় নতুন অধ্যায়। ইহুদি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসে এবং সেখানকার আরব জনগোষ্ঠীর ওপর শুরু হয় নির্যাতন।

১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ৭ লাখ ফিলিস্তিনি নিজ ভূখণ্ড ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হয় এবং ব্রিটিশরা ওই দিনই ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যায়। পরদিন ইহুদি নেতারা ঘোষণা করেন, সেদিন রাতেই ইহুদি রাষ্ট্রের জন্ম হবে। ইসরায়েল রাষ্ট্র জন্মের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরবরা আক্রমণ শুরু করে।

শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। এরপর বিভিন্ন সময় ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩, ১৯৮২ ও গাজা যুদ্ধগুলো, যা এখনো চলমান। প্রতিটি যুদ্ধে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপরই বয়ে গেছে নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ।

বেলফোর ঘোষণার (১৯১৭) মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন শুরু হলেও ইহুদিরা ১৮৯৭ সাল থেকে চাইছিল, একটি আলাদা রাষ্ট্র গড়তে। সে হিসাবে ৫০ বছর ধরে সময় নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র জোর করে দখল করে নেয় ইসরায়েল।

আর এ পুরো প্রক্রিয়ায় জড়িত ব্রিটেন ও ফ্রান্স। এ রাষ্ট্র দুটি এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে। সেটাও আবার শর্ত সাপেক্ষে। এটি একধরনের পাপের প্রায়শ্চিত্ত বললে বেশি বলা হবে। গত ১০০ বছরে ইসরায়েলের এই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র দখলকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো যুদ্ধ–বিগ্রহ হয়েছে।

হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। লাখ লাখ আরব তাঁদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন। আহত ও পঙ্গু হয়েছেন অগণিত মানুষ। এ ইস্যু নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য বছরের পর বছর উত্তেজনা বিরাজ করে। মধ্যপ্রাচ্যের খুব কম দেশ আছে, যার সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ হয়নি।

এ যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যাও অনেক, শুধু টাকা দিয়ে যেটা গণনা করা সম্ভব নয়। মধ্যপ্রাচ্যের সীমারেখাতেও এসেছে পরিবর্তন। এর সব দায়ভার ব্রিটেন ও ফ্রান্স কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।

রাষ্ট্র দুটি তাদের কৃতকর্মের জন্য পৃথিবীবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে, বিনা শর্তে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিলে যদি পাপের প্রায়শ্চিত্ত কিছুটা লাঘব হয়। তা না হলে প্রতীকী স্বীকৃতি দিয়ে শুধু সংখ্যায় বাড়ানো হবে, ফিলিস্তিনের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কিছুই হবে না।

ফিলিস্তিন সংকট কোনো ধর্মীয় সংকট নয়, এটি একটি দখলদারি ও উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের ইতিহাস। ইহুদি জনগণের জন্য একটি নিরাপদ রাষ্ট্রের প্রয়োজন থাকলেও ফিলিস্তিন জাতিকে তাদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করে ইসরায়েল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হওয়া ইতিহাসের একটি বড় অন্যায়।

একবিংশ শতাব্দীতে এসে আন্তর্জাতিক সমাজের উচিত সেই ভুল শোধরানোর। শুধু প্রতীকী স্বীকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

এগুলো হলো গাজা উপত্যকায় অবরোধ প্রত্যাহার, মানবিক সাহায্য সরবরাহ নিশ্চিত করা, ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং একটি কার্যকর ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা এখন সময়ের দাবি।

* ড. মো. সাহাবুল হক, অধ্যাপক, পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা
ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা। ফাইল ছবি: রয়টার্স