Friday, August 14, 2026
বসতি স্থাপনকারীদের কর্মকাণ্ডকে সন্ত্রাসী বললেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার থেকে নাবলুসের কাছে ফিলিস্তিনিদের বেশ কয়েকটি বাড়ি অবরুদ্ধ করে রেখেছে চরমপন্থি বসতি স্থাপনকারীরা।
অবরুদ্ধ ঘরগুলোর একটির মালিক একজন মার্কিন নাগরিক। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জানিয়েছে, তাদের খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে দেওয়া হচ্ছে না এবং চারপাশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।
মার্কিন নাগরিকদের সুরক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের ‘স্থবিরতা’ নিয়ে ওঠা সমালোচনার জবাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে হাকাবি লেখেন, ‘একটি পরিবারকে ভয় দেখানো ও চরম হয়রানি করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড অত্যন্ত ঘৃণ্য। এ ধরনের গুন্ডামির কোনো অজুহাত হতে পারে না।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে সাড়া দিয়ে এসব ‘ইসরাইলি সন্ত্রাসীদের’ সেখান থেকে সরিয়ে দিতে কাজ করছে দেশটির সরকার।
হাকাবির মতো একজন ব্যক্তির মুখে এমন বক্তব্য পাওয়া বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টান যাজক হাকাবি অতীতে পশ্চিম তীরে বিতর্কিত ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে ছিলেন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। উল্লেখ্য, ১৯৬৭ সাল থেকে পশ্চিম তীর অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে ইসরাইল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও সহিংসতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনির পাশাপাশি ৫ লক্ষাধিক ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি সম্পূর্ণ অবৈধ।
![]() |
| বামে ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। |
Friday, January 2, 2026
একটি জাতিরাষ্ট্র কখন, কেন ব্যর্থ হয় by হাসান ফেরদৌস
২০০৪ সালে প্রকাশিত সেই গ্রন্থে রটবার্গ লিখেছিলেন, জাতিরাষ্ট্র ব্যর্থ হয় তখনই, যখন সে নিজের মৌলিক দায়িত্ব পালন করতে পারে না, অথবা তা পালনে করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে। এই সব মৌলিক দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনগণের জন্য প্রাথমিক রাজনৈতিক অধিকার ও সেবা প্রদান করা।
আজকের বাংলাদেশ দ্রুত একটি ব্যর্থ জাতিরাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে, কারণ তার ওপর যে মৌলিক দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে, তার কোনোটাই সে পূরণে সক্ষম নয়। অথবা আরও স্পষ্ট করে বলি, সে দায়িত্ব পালনে সম্ভবত সে আদৌ ইচ্ছুক নয়। বাংলাদেশ নিয়ে এমন কঠোর ও হৃদয়বিদারক কথা আমি কখনো বলিনি, বলব সে কথাও ভাবিনি। গত কয়েক দিনের ঘটনা আমাকে এই কথা ভাবতে বাধ্য করেছে। কারণ হিসেবে আমি চারটি ঘটনার কথা বলব।
এক.
শরিফ ওসমান হাদির হত্যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এই হত্যার আগাম সংবাদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাছে ছিল না, এমন দাবি তারা করতেই পারে। কিন্তু সে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পনেরো দিন পরও কেন হত্যাকারী ধরা পড়ল না? আমরা ইন্টারনেটে দেশি-বিদেশি সূত্র থেকে সে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তাবৎ ঠিকুজিকুষ্টি জেনে বসে আছি অথচ এখনো দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অন্ধকারে ঘুষি ছুড়ছে।
শোনা যাচ্ছে, প্রধান খুনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। কীভাবে, কার বাহনে, কার প্রহরায়? কেউ কেউ বলছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্মতি ও সমর্থনেই তাঁদের দেশ ছেড়ে পালানো সম্ভব হয়েছে। এ কথা সত্যি হলে আমরা তো অনায়াসেই বলতে পারি, রাষ্ট্র তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে শুধু ব্যর্থ নয়, দায়িত্ব পালনে সে অনাগ্রহীও বটে।
দুই.
ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় অথবা সে হত্যাকাণ্ডকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের দুটি প্রধান সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। কার্যালয় দুটি আগুন দিয়ে আংশিক জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। একাধিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর হয়েছে। এই কাজে যাঁরা নেতৃত্ব দেন; যাঁদের অশুভ চক্র বা উগ্রবাদী নামে বর্ণনা করা হচ্ছে, তাঁরা সংবাদপত্র দুটির ভবন জ্বালিয়ে দেওয়াতেই সন্তুষ্ট ছিলেন না, সম্ভবত তাঁরা এই দুই দপ্তরে কর্মরত সাংবাদিকদের পুড়িয়ে মারতেও চেয়েছিলেন।
আক্রান্ত হওয়ার পর ভবনে আটকে পড়া একজন সাংবাদিক ফেসবুকে জানিয়েছেন, চারদিকে আগুনের ধোঁয়ায় তাঁর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এখন আমরা জানি, একজন দুজন নয়, বিপুলসংখ্যক উন্মত্ত জনতা খুব পরিকল্পিতভাবে এতে অংশ নিয়েছিল।
বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি টিভি চ্যানেলে পুরো ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে, বিদেশে বসে আমরাও তা দেখেছি। সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সরকারি কর্তৃপক্ষ জানতেন না, সেটাও নয়। শুরু থেকেই পত্রিকা দুটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারপরও কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?
এই প্রশ্নের দুটির সম্ভাব্য উত্তর অধ্যাপক রবার্ট রটবার্গ কুড়ি বছর আগেই দিয়ে রেখেছেন: যাদের সে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল, তারা হয় সে দায়িত্ব পালনে সক্ষম নয়, অথবা তা পালনে আগ্রহী নয়।
এমন অভাবিত ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে শুকনা দুঃখ প্রকাশ ছাড়া একজনও তাঁদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেননি, সে জন্য ক্ষমা চাননি। পদত্যাগের তো প্রশ্নই উঠছে না। শাসক মহল যদি দায়িত্ববান হতো, তাহলে এই ব্যর্থতার দায়ভার তাঁদের কেউ না কেউ মাথায় পেতে দায়িত্ব থেকে সরে যেতেন।
ফুটবল খেলার মাঠে উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার জন্য মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস পদত্যাগ করেছেন।
২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলা রোধে ব্যর্থতার জন্য ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরাজ পাতিল পদত্যাগ করেছিলেন। ২০১৯ সালে ইস্টারের রোববার বোমা হামলা রোধে ব্যর্থতার জন্য শ্রীলঙ্কার পুলিশ প্রধান পুজিথ জায়াসুন্দ্রা পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০১৪ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে ভয়াবহ ফেরি দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী চুং হন-ওয়ান শুধু হাঁটু মুড়ে ক্ষমাই চাননি, পদত্যাগ করে দায়িত্ব থেকে সরেও গিয়েছিলেন।
দায়িত্ব পালনে এই ব্যর্থতা অথবা অনাগ্রহের একটা ফল হলো, এতে সব ধরনের সহিংসতা ‘নরমালাইজড’ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ঠিক সে ঘটনাটাই ঘটেছে। মবতন্ত্র এখন আর অভাবিত কোনো ব্যাপার নয়, নিয়মিত ব্যাপার। আর যাঁরা এই সহিংসতাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চান, তাঁরা সরকারের তরফ থেকে এই স্পষ্ট সিগন্যাল পেয়ে যান যে সহিংসতা যত তীব্র হোক না কেন, উদ্বেগের কিছু নেই।
তিন.
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয়জন ডিন একযোগে তাঁদের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন। না, স্বেচ্ছায় নয়; বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদেরএকজন নেতা প্রকাশ্যে এই ছয়জনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি ছয় অধ্যাপকের অফিসে গিয়ে তালা লাগিয়ে আসেন। অধ্যাপকদের ‘অপরাধ’, তাঁরা বিগত সরকারের সমর্থক ছিলেন। ঠিক এই অভিযোগে শিক্ষকদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে, এমন আইন কোথায় লেখা আছে, আর এই সিদ্ধান্ত ছাত্র সংসদের এক ছাত্র তাঁর অনুগত সমর্থকদের জোরে বাস্তবায়িত করবেন, সে নিয়মই–বা কবে থেকে বহাল হলো?
বলাই বাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয় বা সরকারের কেউ এ ব্যাপারে তাঁদের দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসেননি। হয় তাঁরা সে দায়িত্ব পালনে অক্ষম অথবা অনাগ্রহী।
চার.
ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু দাস নামের এক কারখানা শ্রমিককে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সত্যি কোনো অবমাননা হয়েছে বা কী সেই অবমাননা, তার কোনো সদুত্তর নেই। হত্যার পর দীপু দাসের লাশ বিবস্ত্র করে একটি গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এই অবিশ্বাস্য বর্বরোচিত কাজটি চোখের পলকে ঘটে যায় তা নয়, বেশ লম্বা সময় ধরে ঘটেছে। কয়েক শ লোক সেটা প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন, পুলিশ কোথায়, কারখানা কর্তৃপক্ষ কোথায়, স্থানীয় সরকারি প্রশাসনই–বা কোথায়? নেই, হয় তারা দায়িত্ব পালনে অপারগ, অথবা অনাগ্রহী।
রবার্ট রটবার্গ ব্যর্থ রাষ্ট্রের যে তিন লক্ষণ সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করেছেন, ওপরের এই চার উদাহরণ থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশ ক্রমে তেমন একটি রাষ্ট্রের পথে হাঁটছে। উদাহরণ বাড়ানো যায়, কিন্তু তাতে একই কথার পুনরাবৃত্তি হবে।
সত্যি সত্যি রাষ্ট্র ব্যর্থ হলে তার নাগরিকদের কী দুর্দশা হয়, তা বুঝতে দয়া করে আজকের হাইতি, সোমালিয়া বা সুদানের দিকে তাকিয়ে দেখুন। স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পর আমরাও সেই একই মহাদুর্যোগে নিক্ষিপ্ত হব, সে কথা লিখতে আমার হাত কাঁপছে। কিন্তু এ কথা যে মোটেই অতিরঞ্জন নয়, তাতেও বড় কোনো ভুল নেই।
এই ব্যর্থতা আমাদের নিয়তি নয়। দেশটা আমাদের সবার। তা ব্যর্থ হোক, দেশি-বিদেশি চক্র তা চাইতে পারে, কিন্তু আমরা তা চাইব কেন? এই অবনমন ঠেকানোর ক্ষমতা আমাদের রয়েছে, কিন্তু সে জন্য চাই ন্যূনতম কর্মসূচির ভিত্তিতে নাগরিক ঐক্য। ইতিমধ্যে দেখেছি মবতন্ত্রের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐকমত্যের একটি প্রাথমিক উদ্যোগ এসেছে। আপাতত উদ্যোগটি নাগরিক ও সুশীল সমাজ পর্যায়ে প্রতিবাদে সীমিত, এই প্রতিবাদ কার্যকর হতে হলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। শুধু প্রতিবাদ নয়, চাই জবাবদিহি।
অধিকাংশ সভ্য দেশে এ–জাতীয় সংকটের সময় একাধিক ‘প্রেশার পয়েন্ট’ কাজ করে—যেমন আদালত, আইন পরিষদ, মানবাধিকার কমিশন ও সংবাদমাধ্যম। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম ছাড়া আর অন্য কোনো প্রেশার পয়েন্ট কার্যকর নয়। তার আশু সম্ভাবনাও নেই। অতএব সংবাদমাধ্যমকে একই সঙ্গে জাতির বিবেক ও জাতির পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব পালন করতে হবে। আমার বিশ্বাস, সে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা তার রয়েছে।
এক শ বছরের আগে, ১৯০৪ সালে জোসেফ পুলিৎজার মন্তব্য করেছিলেন, কোনো দেশের উত্থান ও পতন সে দেশের সংবাদপত্রের উত্থান-পতনের সঙ্গে জড়িত। সৎ, দক্ষ ও জনস্বার্থে নিবেদিত সংবাদপত্রের পক্ষেই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ভণ্ডামি ও প্রহসন থেকে রক্ষা করা সম্ভব।
আমাদের সংবাদমাধ্যমের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ—দেশকে তারা ভণ্ডামি ও প্রহসনে নিক্ষেপ করবে, না তাকে বাঁচাতে জননৈতিকতাকে আয়নার মতো তুলে ধরবে? এর উত্তর তারাই দেবে, সে আশা করি।
* হাসান ফেরদৌস, সাংবাদিক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Thursday, January 1, 2026
লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা by মহিউদ্দিন আহমদ
তারপরও আমরা অভিজ্ঞতা আর কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে ভবিষ্যতের কথা বলি। কাঙ্ক্ষিত বা অনাকাঙ্ক্ষিত যা-ই আসুক না কেন, তার জন্য আগাম প্রস্তুতি নিই। কিন্তু যেখানে আমি একা নই, আমার চারপাশে আছে হাজারো মানুষ ও প্রতিষ্ঠান, সেখানে আমার ব্যক্তিগত অনুমাননির্ভরতা এবং ভবিষ্যৎকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি কোনো কাজে আসে না, যদি না সেটি সম্মিলিত প্রয়াস হয়। এ রকম ঘটনা ঘটে প্রায়ই।
যা চাই না, যা প্রত্যাশিত নয়, তাকে আমরা বলি অঘটন। এ রকম কিছু ঘটে গেলে আমরা অবাক হই। আমাদের মন ভাঙে। হতাশা জেঁকে বসে।
সম্প্রতি কিছু ঘটে গেছে, যা আমাদের অনেকের কাছে ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। কিন্তু ঘটনা তো আপনা–আপনি ঘটে না। এটি ঘটানো হয়। তার পেছনে থাকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত প্রয়াস। এর জন্য থাকে পরিকল্পনা। অনুঘটকেরা তো আটঘাট বেঁধেই নামেন। তিনিই ভালো পরিকল্পনাকারী, যিনি অন্য পক্ষকে সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে পদক্ষেপ নেন। সামরিক পরিভাষায় এটাকে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ বলা যেতে পারে। এ ধরনের পদক্ষেপের একটা উদ্দেশ্য থাকে—হুঁশিয়ার হয়ে যাও; আমরা আসছি বিপুল বিক্রমে।
আপাতত দেখছি, দুটি জনপ্রিয় দৈনিক আর দুটি সাংস্কৃতিক সংগঠনে হামলা হয়েছে। এটা কি হুট করে হলো? মোটেই না। অনেক দিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার হচ্ছিল। ফেসবুক ও ইউটিউব ঘাঁটলেই জানা যাবে, কে কখন কীভাবে উসকানি দিয়েছে। জানাই ছিল, অনেকেই এসব প্রতিষ্ঠান চালু থাকার ঘোর বিরোধী। কিন্তু এভাবে আক্রমণ, লুটপাট এবং আগুন দেওয়া হবে, তা আন্দাজ করা যায়নি।
এ দেশে একদল লোক যখন-তখন যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাউকে শত্রু বানায়, নিমেষেই তার বিচার করে ফেলে এবং বিচারের রায় বাস্তবায়ন করতে একমুহূর্ত অপেক্ষা করে না। এটাকে ‘মব জাস্টিস’ বলে গৌরবান্বিত করার চেষ্টা হয়। আদতে এটা জাস্টিস, নাকি ভায়োলেন্স। এ ধরনের সংঘবদ্ধ আচরণের পেছনে একটা উদ্দেশ্য থাকে। সেখানে ন্যায়বিচারের প্রশ্ন যেমন আছে, তেমনি আছে বদমতলব থেকে ভিন্নমত ও পথের লোককে শায়েস্তা করার ফন্দি।
একটা সমাজে যখন বিচারব্যবস্থা বলে কিছু থাকে না, কাঠামোগত যে ব্যবস্থা আছে, সেটি খুব সময় নেয় এবং অনেক খরচ হয়। ভুক্তভোগীকে বিচার পেতে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর। আদালত আর উকিলের খরচ জোগাতে তাকে সর্বস্বান্ত হতে হয়। সে জন্য অনেকেই নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। আইনের শাসন নিয়ে আমরা যতই আহাজারি করি না কেন, সহজে, কম খরচে এবং অতি দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে এ রকম মব জাস্টিস বা ভায়োলেন্স বন্ধ করা যাবে না। আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার অবস্থানে যেতে আর কত শতাব্দী লাগবে, কেউ বলতে পারে না।
এ তো গেল বিচার না পাওয়ার কারণে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন হাতে তুলে নেওয়ার ব্যাপার। কিন্তু এর বাইরেও কিছু আছে। আমাদের সমাজটা এখনো পশ্চাৎপদ। পশ্চিমের শিল্পোন্নত সমাজের ভাষায় বলা যেতে পারে, আমরা মধ্যযুগীয় ‘ট্রাইবাল’ কালচারে আছি। এখানে নানান মতের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে গোত্র বা গোষ্ঠী।
প্রতিটি গোত্র বা গোষ্ঠী মনে করে, সে-ই সঠিক। বাকি সবাই ভ্রান্ত এবং সমাজের জন্য ক্ষতিকর। তার চোখে যে খারাপ, তাকে শায়েস্তা করার দায়িত্ব বর্তেছে গোত্রপতির ঘাড়ে। এখানে তিনি নিছক নেতা নন, একজন ‘ত্রাতা’। তাঁর কাজ হলো বাকি সবাইকে নির্দশ দেওয়া। তিনি স্লোগান দেন—জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো। অমনি তাঁর অনুসারীরা আগুন হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো আছে মধ্যযুগে, যেখানে চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, জানের বদলে জান—এই হচ্ছে ন্যায়বিচার। আমাদের স্লোগানগুলোও তেমন—একটা-দুইটা ‘অমুক’ ধর, ধরে ধরে জবাই কর। চাষাভুষা, জেলে-তাঁতি, মুটে-মজুরেরা এসব স্লোগান দেয় না। এসব স্লোগান আমরা শুনি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা রাজনৈতিক দলের মিছিলে-সমাবেশে।
প্রবল পরাক্রান্ত মোগল বাদশাহ জালালুদ্দিন আকবর ‘অপরাধীর’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে একটি বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতেন। একটা হাতিকে মদ খাইয়ে মত্ত করা হতো। তারপর দণ্ডিতকে হাত-পা বেঁধে ওই হাতির পায়ের নিচে ছুড়ে ফেলা হতো। বাদশাহ তাঁর সভাসদদের নিয়ে এটা দেখতেন, আমোদ পেতেন। তাঁর ছেলে নুরউদ্দিন মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরও কম যান না। তিনি দণ্ডিত ব্যক্তিকে জীবিত অবস্থায় গাধার সদ্য ছাড়ানো চামড়ায় মুড়ে সেলাই করিয়ে দিতেন। চামড়া যতই শুকায়, সেটি আঁটসাঁট হয়ে ভেতরের মানুষটির ওপর চেপে বসে। তার হাড়গোড় ভেঙে যায়। একসময় সে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। যন্ত্রণা দিয়ে তিলে তিলে মারা।
প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের স্লোগানগুলো অনেকটা সে রকম। আমরা রাস্তায় নেমে যে কারও বিরুদ্ধে ফাঁসি দাবি করি। আমরা অনেকেই বলি, অমুককে প্রকাশ্যে ফাঁসি বা ফায়ারিং স্কোয়াডে দেওয়া হোক, যাতে আশপাশের লোকেরা এটা দেখে বিনোদন পায়। আমাদের স্লোগানে, বক্তৃতায়, বিবৃতিতে আমরা কল্পিত শত্রুর বিরুদ্ধে এমন সব কথা উচ্চারণ করি, যা হাজার বছর আগের সমাজ-সংস্কৃতিকে মনে করিয়ে দেয়।
আজকাল বক্তৃতায় উত্তেজক কথাবার্তা এবং স্ল্যাং যে যত বেশি ব্যবহার করে, তার জনপ্রিয়তার পারদ ততই ওপরে উঠতে থাকে। হেরে মাইরা ফালামু, তোরে ছিঁড়া ফালামু, ওইডা ভাইঙা ফালামু—এ রকম হুংকার দিলে হাততালি পাওয়া যায়। একশ্রেণির মানুষ তাদের পেছনে ছোটে পঙ্গপালের মতো।
আমি গানবাজনা করি। এতে আমি আনন্দ পাই। আপনার ভালো লাগে না। আপনি গাইবেন না। তাই বলে আপনি আমার ওপর চড়াও হবেন? আপনি রায় দিয়ে দিলেন, এটা ইসলামবিরোধী এবং এর বিরুদ্ধে জিহাদ করা কর্তব্য। আপনি গিয়ে আমার বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে হামলা করলেন, আগুন দিলেন, বাদ্যযন্ত্র লুট করলেন।
এ দেশে পত্রিকার পাঠক হচ্ছে মধ্যবিত্ত। তাদের একটা ভগ্নাংশ পত্রিকা পড়ে। আমার ধারণা, দেশের সব ছাপা পত্রিকার মোট সার্কুলেশন হবে বড়জোর ১০ লাখ। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি মানুষ নগদ টাকা দিয়ে কেনে। বাকিগুলোর তেমন বাজার নেই। আপনি বলছেন, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পত্রিকাটি জনগণের দুশমন, অমুকের দালাল, গাদ্দার। তো জনগণ আপনার পছন্দের পত্রিকা পড়ে না কেন—এটা কখনো ভেবে দেখেছেন? আপনি কোন জনগণের কথা বলছেন?
পাঠকের রায়ে তো আপনার অপছন্দের পত্রিকাটিই বেশি জনপ্রিয়। আর আপনি যাদের মধ্যে জনপ্রিয়, তারা তো পত্রিকাই পড়ে না। অথচ আপনি বা আপনারা দলবল উসকে দিয়ে আপনার অপছন্দের পত্রিকার ওপর হামলা চালালেন। সঙ্গে কাকে পেলেন? সমাজের যত চোর-ছেঁচড়-লুটেরা। তারা কম্পিউটার, চেয়ার-টেবিল, টাকাপয়সা লুট করে নিয়ে গেল। তারপর আগুন দিল।
একশ্রেণির লোক সব সময় তক্কে তক্কে থাকে, কখন কোথায় লুটপাট করতে পারবে। সুযোগ পেলেই তারা অন্যের ওপর চড়াও হয়। ঝাঁপিয়ে পড়ে। এখন তো লুটের মচ্ছব চলছে। তার মধ্যে হাতে গোনা দু-একজন পণ্ডিতকে বলতে শুনি, এদের মব বলা যাবে না। এরা হচ্ছে প্রেশার গ্রুপ। যারা মব বলে, তারা হচ্ছে স্বৈরাচারের দোসর। লুটপাটকে ন্যায্যতা দেওয়ার কী ভয়ংকর চেষ্টা!
* মহিউদ্দিন আহমদ, লেখক ও গবেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Saturday, November 29, 2025
সাড়ে ৩ কেজি সোনা পরেন রাজস্থানের ফল ব্যবসায়ী, এখন চাঁদা দাবি করছে সন্ত্রাসীরা
প্রচুর সোনা পরার প্রতি খাটিকের আগ্রহের কারণে চিতোরগড়ের মানুষের কাছে তিনি ভারতের প্রখ্যাত শিল্পী–সুরকার ‘বাপ্পি লাহিড়ী’ নামে পরিচিত। তিনি বাপ্পী লাহিড়ীকে দেখেই নাকি এভাবে সোনা পরার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, দুই দিন আগে খাটিকের মুঠোফোনে প্রথম একটি মিসড কল আসে। এরপর একই নম্বর থেকে একটি হোয়াটসঅ্যাপ কল আসে। তিনি ফোন ধরেননি। এরপর তাঁর ফোনে একটি অডিও রেকর্ডিং পাঠানো হয়। এতে ভয়েস দেওয়া ব্যক্তি তাঁর কাছ থেকে ৫ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন।
খাটিক পুলিশকে জানিয়েছেন, মুঠোফোনে কল করা ওই ব্যক্তি তাঁকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, দাবি মানা না হলে তিনি ‘সোনা পরার মতো অবস্থায়ও আর থাকবেন না’।
এ ছাড়া খাটিককে চুপচাপ বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
খাটিক কোনো কিছু না বলায় তাঁর মুঠোফোনে আবারও কল আসে। সেখানে অপর প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করে আবার পুরোনো কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়। চিতোরগড়ের কোতোয়ালি থানায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ নথিভুক্ত করা হয়েছে।
৫০ বছর বয়সী খাটিক ফল ব্যবসা শুরু করার আগে একসময় হাতে টানা ভ্যানে সবজি বিক্রি করতেন। আপেলের ব্যবসা শুরু করার পর তার ভাগ্য বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সোনার গয়নার প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকেন।
বর্তমানে খাটিক প্রায় সাড়ে ৩ কেজি সোনার গয়না পরেন। এ জন্য স্থানীয়দের কাছে তিনি বেশ পরিচিত। এ কারণে চিতোরগড়ের মানুষ তাঁকে ‘গোল্ডম্যান’ নামে ডাকে।
‘গ্যাংস্টার’ রোহিত গোদারা কে
বিকানেরের লুনাকারানের বাসিন্দা গোদারা বর্তমানে কানাডায় বসবাস করছেন বলে ধারণা করা হয়। ভারতের বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে ৩২টির বেশি মামলা নথিভুক্ত রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গোদারা রাজস্থানের ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজি করতেন, তাঁর একটি বড় বাহিনী ছিল। গত বছরের ২৯ মে পাঞ্জাবের মানসা জেলায় গুলিতে নিহত হওয়া পাঞ্জাবি র্যাপার সিধু মুস ওয়ালার চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম গোদারা। তিনি সিকারের গ্যাংস্টার রাজু থেহাট হত্যাকাণ্ডেরও প্রধান অভিযুক্ত আসামি।
২০২২ সালের ১৩ জুন গোদারা ‘পবন কুমার’ নামে একটি জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে নয়াদিল্লি থেকে দুবাই পালিয়ে যান। তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করা আছে।
![]() |
| বিপুল পরিমাণ সোনা পরিহিত রাজস্থান রাজ্যের ব্যবসায়ী কানাইয়ালাল খাটিক। ছবি: খাটিকের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া |
Tuesday, November 18, 2025
জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিলে পিএ কর্মকর্তাদের হত্যার হুমকি ইসরাইলি নিরাপত্তা মন্ত্রীর
জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিলে পিএ কর্মকর্তাদের হত্যার হুমকি ইসরাইলি নিরাপত্তা মন্ত্রীর
জেরুজালেম পোস্টকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, বেন গভির পিএ নেতাদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, যদি ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী রাষ্ট্র স্বীকৃতির প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় এবং জাতিসংঘ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে পিএ-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে টার্গেটেড হত্যার নির্দেশ দেওয়া উচিত।
এ মন্তব্যের নিন্দা জানিয়ে পৃথক বিবৃতিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেসিডেন্টের কার্যালয়। এক্সে দেওয়া বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় বেন গভিরের মন্তব্যকে ‘পদ্ধতিগত উসকানি’ বলে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তার জবাবদিহিতা নিশ্চিতের আহ্বান জানায়। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় জানিয়েছে, বেন গভিরের বক্তব্যের জন্য ইসরাইল সরকারই দায়ী।
এদিকে সোমবারের পরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গাজা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থাপিত আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। ওই প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিশ্বস্ত পথনকশা সমর্থনের কথাও বলা হয়েছে।
বেন গভির বলেন, জাতিসংঘের ভোটে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র স্বীকৃতির উদ্যোগ এগোলে পিএ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে গ্রেপ্তার করা উচিত। তার দাবি, ইসরাইলের কেটসিওত কারাগারে আব্বাসের জন্য একক সেল প্রস্তুত আছে।
ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনীর সঙ্গে নিরাপত্তা সমন্বয় চালালেও পিএ-এর নেতৃত্বাধীন একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে ইসরাইলের শীর্ষ নেতারা বরাবরই অটল। জাতিসংঘের গাজা খসড়া প্রস্তাব থেকে ‘ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র’ শব্দবন্ধ বাদ দেওয়ার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তেল আবিব। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার ডানপন্থী জোটের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তিনি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিরোধিতা থেকে সরে আসবেন না।
শনিবার আরও এক ধাপ এগিয়ে বেন গভির মিথ্যা দাবি ফিলিস্তিনি জনগণ বলে কিছু নেই। তার ভাষ্য, ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের ভূমিতে আরব দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের সমষ্টি এবং তারা সন্ত্রাস ও নৃশংসতা ছড়িয়েছে। তিনি তথাকথিত স্বেচ্ছায় অভিবাসন নীতিরও সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। যা সমালোচকদের মতে ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নির্মূলের পরিকল্পনা।
নেতানিয়াহুর জোটের উগ্র ডানপন্থী অংশ থেকে শুরু করে অপেক্ষাকৃত মধ্যপন্থী বিরোধী নেতারাও সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতায় একমত। ইসরাইলি নেতৃত্ব বহুবার জানিয়েছে, গাজার শাসনভার পিএ-এর হাতে হস্তান্তর করতে তারা রাজি নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় পিএ-কে ভূমিকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শর্ত হলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে হবে।
ওয়াশিংটন প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার শাসন তত্ত্বাবধান করবে আন্তর্জাতিক বোর্ড অব পিস। আর মাটিতে কাজ করবে প্রযুক্তিভিত্তিক একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসন ও স্থিতিশীলতা বাহিনী। তবে হামাসসহ গাজার বিভিন্ন প্রতিরোধ গোষ্ঠী প্রস্তাবটি সমালোচনা করে বলেছে, এটি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ খুলে দেবে। তারা জানিয়েছে, মানবিক সহায়তা ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি তারা গাজার নিরস্ত্রীকরণ বা প্রতিরোধের অধিকার হ্রাসের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসরাইলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় নির্ধারণে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে।
![]() |
| ছবি: প্রথম আলো |
ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে জাতিসংঘ সমর্থন দিলে পিএ কর্মকর্তাদের বেছে বেছে হত্যা করা হবে: ইসরায়েলি মন্ত্রীর হুমকি
গতকাল সোমবার ওৎজমা ইয়েহুদিত দলের এক সভায় বক্তৃতাকালে বেন-গভির শীর্ষ পিএ কর্মকর্তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একাধিক ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম এ খবর জানিয়েছে।
বেন-গভিরের হুমকির বরাত দিয়ে জেরুজালেম পোস্টের খবরে বলা হয়, ‘যদি তারা ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে এবং জাতিসংঘ একটি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বেছে বেছে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়াই উচিত হবে। কারণ, সবদিক থেকেই তাঁরা সন্ত্রাসী।’
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে আলাদাভাবে বিবৃতি দিয়ে বেন-গভিরের এ মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের এ ধরনের মন্তব্য পদ্ধতিগত উসকানি।
মন্ত্রণালয় থেকে এ ধরনের মন্তব্যের জন্য বেন-গভিরকে জবাবদিহির আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধও জানানো হয়েছে।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে বলা হয়, বেন-গভিরের এ ধরনের মন্তব্যের দায় ইসরায়েল সরকারকে নিতে হবে।
গাজা যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত পরিকল্পনাকে সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের করা একটি খসড়া প্রস্তাবের পক্ষে গতকাল সোমবার ভোট দিয়েছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ।
এ প্রস্তাবে গাজা উপত্যকার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা বাহিনী গঠনের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সংস্কার কর্মসূচি শেষ করলে এবং গাজা পুনর্গঠনকাজ এগিয়ে গেলে ‘ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রগঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরিতে’ সমর্থন দেবে জাতিসংঘ।
ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ থাকায় এ প্রস্তাব নিয়ে ইসরায়েল ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।
বেন-গভির বলেছেন, জাতিসংঘের ভোটে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণা সামনে এগোলে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে গ্রেপ্তার করা উচিত।
বেন–গভির দম্ভের সঙ্গে আরও বলেন, ‘কেৎজিয়ত কারাগারে তাঁর (মাহমুদ আব্বাস) জন্য একটি একক কারাকক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।’
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিরাপত্তা তদারক করে। তবে ইসরায়েলি নেতারা পিএর নেতৃত্বে কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়ে রেখেছে।
বেন-গভির এর আগেও ফিলিস্তিনিদের নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। এমনকি গত শনিবারই তিনি ফিলিস্তিনি বলে কোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই নেই বলে দাবি করেছেন।
নিজের ওই মিথ্যা দাবিতে বেন-গভির বলেছিলেন, ‘ফিলিস্তিনি জনগণ বলে আসলে কিছু নেই। ফিলিস্তিনিদের বরং ইসরায়েলের ভূমিতে আরব দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের সমষ্টি বলে অভিহিত করা যায়, যারা সব জায়গায় সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড ও হত্যাযজ্ঞের বীজ বপন করে।’
এই উগ্র ইহুদি নেতা ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি ছেড়ে স্বেচ্ছায় অন্য কোথাও চলে যাওয়ার প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
সমালোচকেরা ফিলিস্তিনিদের স্বেচ্ছায় ভূমি ছাড়ার প্রস্তাবকে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের সুপরিকল্পিত জাতিহত্যার অংশ বলে বর্ণনা করেছেন।
বেন-গভির ও নেতানিয়াহু সরকারের জোটে থাকা অতি ডানপন্থী দলগুলো থেকে শুরু করে দেশটির মধ্যপন্থী বিরোধী নেতারা, নিজেদের মধ্যে যত বিরোধই থাকুক, একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করতে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর অর্থমন্ত্রী বেনজালেল স্মোট্রিচ কার্যত অধিকৃত পশ্চিম তীরের গভর্নরের দায়িত্বে আছেন। পশ্চিম তীর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড। কিন্তু ইসরায়েল এখন অধিকৃত পশ্চিম তীরকে নিজেদের ভূখণ্ডের সঙ্গে একত্র করে ফেলতে চাইছে।
এ কাজে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন স্মোট্রিচ। তিনি এটাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখাতে চাইছেন।
ইসরায়েল বারবার জানিয়েছে, তারা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে গাজা উপত্যকায় সরকার পরিচালনার ক্ষমতা দিতে চাইছে না।
তবে গাজা নিয়ে মার্কিন প্রস্তাবনায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ভূমিকার কথা বলা হয়েছে, যদিও এ জন্য তাদের যথেষ্ট ‘সংশোধনমূলক ব্যবস্থা’ নিতে হবে।
![]() |
| নেসেটে উগ্র দক্ষিণপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। জেরুজালেম, ১৩ অক্টোবর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স |
Saturday, October 11, 2025
গ্রামের কিশোর থেকে আন্তর্জাতিক গ্যাং লিডার—জেলে বসেও নিয়ন্ত্রণ করেন অন্ধকার জগৎ
বিষ্ণোইয়ের ‘রাজদণ্ড’ হলো একটি মুঠোফোন ও রাজসিংহাসন হলো কংক্রিটের বাক্স। এই স্মার্টফোনও তাঁর হাতে গেছে গোপনে পাচার হয়ে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, এখান থেকেই ৩২ বছর বয়সী এই গ্যাং লিডার এক বলিউড সুপারস্টারকে হুমকি দিয়েছেন, এক পপ তারকাকে হত্যা করিয়েছেন এবং বিশ্বের অন্য প্রান্তে একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা সাজিয়েছেন।
উজ্জ্বল ত্বক, ঘন গোঁফ ও শান্ত দৃষ্টির বিষ্ণোইয়ের বিরুদ্ধে ভারতের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) বহু বছর ধরে অভিযোগ করছে যে তিনি কারাগারের ভেতর থেকে সাত শতাধিক সদস্যের এক ভয়ংকর গ্যাং (সন্ত্রাসী চক্র) নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনার মতো অনেক অভিযোগ রয়েছে।
গত মাসে বিষ্ণোই কানাডায় একটি চিহ্নিত সন্ত্রাসী সংস্থার মুখচ্ছবি হয়ে ওঠেন। এর আগে দেশটির সরকার অভিযোগ করে, ভারত বিষ্ণোই গ্যাংকে ব্যবহার করে কানাডার মাটিতে শিখ ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত করছে।
কানাডার এ সিদ্ধান্ত বিষ্ণোইকে ভারতের এক সুপরিচিত মাফিয়াপ্রধান থেকে আন্তর্জাতিকভাবে তাড়া করে ফেরা একজন শীর্ষ গ্যাং নেতায় পরিণত করেছে।
কানাডার জননিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রী গ্যারি আনান্দাসাঙ্গারি গত সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বিষ্ণোই গ্যাং নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সন্ত্রাস, সহিংসতা ও ভয় দেখানোর লক্ষ্য করেছে। এ অপরাধী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে তালিকাভুক্ত করার বিষয়টি তাদের অপরাধ মোকাবিলা করা ও থামানোর ক্ষেত্রে আমাদের আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হাতিয়ার এনে দেবে।’
বিষ্ণোই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনেক অভিযোগই অস্বীকার করেন এবং তাঁর আইনজীবী সিএনএনকে বলেছেন যে কানাডার সর্বশেষ অভিযোগগুলো তাঁদের তদন্ত করতে হবে।
সিএনএন পশ্চিম ভারতের গুজরাটে সবরমতী কারাগারে যোগাযোগ করেছে। বিষ্ণোই এখানেই বন্দী, তবে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
কয়েক বছরের তিক্ত সম্পর্কের পর দুই দেশ যখন সম্পর্ক ঠিকঠাক করার চেষ্টা করছে, তখন কানাডার মন্ত্রী ওই বিবৃতি দিলেন। নয়াদিল্লি কানডার এ সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
গ্রামের ছেলে থেকে গ্যাং লিডার
বিষ্ণোইয়ের গল্প গোপন অন্ধকার জগতের বস্তিতে শুরু হয়নি। এটি শুরু হয় ভারতের ‘রুটির ঝুড়ি’ নামে পরিচিত পাঞ্জাব রাজ্যের উর্বর মাঠ থেকে, যেখানে সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও স্থানীয় নানা গর্বের অনুভূতি আছে। তবে রাজ্যটি তরুণদের বেকারত্ব ও ব্যাপক গ্যাং সহিংসতায়ও আক্রান্ত।
এ রাজ্যের ছোট একটি গ্রামের প্রাক্তন এই ছাত্র আন্দোলনকারী নিজেকে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের কথিত পরিকল্পনাকারীর ভূমিকায় রূপান্তর করেন।
বিশ্ব তাঁকে লরেন্স বিষ্ণোই নামে চেনার আগে, তিনি ছিলেস বালকরন ব্রার। তাঁর জগৎ সীমাবদ্ধ ছিল দুতারাওয়ালির ধুলামাখা ছোট গ্রামীণ পথে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, এ গ্রামে মাত্র তিন হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করতেন।
ভারতের রাজধানী থেকে প্রায় সাত ঘণ্টা দূরত্বে এবং পাকিস্তান সীমান্ত থেকে প্রায় এক ঘণ্টা দূরে, এটি এমন একটি স্থান, যেখানে মানুষের জীবন ঘোরে ফসলের চারপাশে। সেখানে বিষ্ণোইকে মধ্যবিত্ত জীবনের জন্য উপযুক্ত বলেই মনে হচ্ছিল। হরিয়ানা পুলিশের একজন কনস্টেবলের ছেলে হিসেবে সাদামাটা এক স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন তিনি। তাঁকে নিয়ে ছিল মায়ের বড় স্বপ্ন।
বিষ্ণোই শিক্ষিত ও ‘খুব ভালো পরিবারের’ সদস্য—বলেছেন সাংবাদিক ও ‘হু কিল্ড মুসেওয়ালা?’ বইয়ের লেখক জুপিন্দারজিৎ সিং। বিষ্ণোই গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ওঠা সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগের একটি—পাঞ্জাবি র্যাপার সিধু মুসেওয়ালার হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে বইটি লেখা হয়েছে।
লরেন্স বিষ্ণোই নামটি একজন হিন্দু ছেলের জন্য ‘অসাধারণ’, উল্লেখ করেছেন জুপিন্দারজিৎ সিং। তিনি বলেন, এটি তাঁর মায়ের দেওয়া নাম। স্যার হেনরি লরেন্সকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ছেলের ওই নাম দিয়েছিলেন তিনি। হেনরি লরেন্স পাঞ্জাবের প্রথম ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসক ছিলেন। বিষ্ণোইও খুব ফর্সা ত্বক নিয়ে জন্মেছিলেন।
তাঁর নিজ গ্রামেই সবচেয়ে বেশি বোঝা যায়, শিশুকালের বিষ্ণোই আর গ্যাং লিডার বিষ্ণোই যেন একেবারে দুই ভিন্ন মানুষ। গ্রামের মানুষ এখনো এ দুই রূপকে মেলাতে পারেন না।
‘সে খুব ভালো ছেলে ছিল এবং স্বভাবও ছিল ভালো’, গত বছর দুতারাওয়ালির এক বাসিন্দা সিএনএন নিউজ ১৮–কে এক সাক্ষাৎকারে বলেন। ‘গ্রামের কারও কাছে গেলে, কেউ তাঁর সম্পর্কে খারাপ কিছু বলবে না…আমি বিশ্বাস করি না যে সে গ্যাংস্টার।’
অন্য একজন সিএনএন নিউজ ১৮-কে বললেন, ‘বিষ্ণোই গ্রামে কখনো কাউকে খারাপ কথা বলেনি। সে সবাইকে সম্মান দেখাত।’
কিন্তু গ্রামের সেই ধুলাবালুর পথ বিষ্ণোইয়ের জন্য যথেষ্ট ছিল না। সমবয়সীদের সঙ্গে সেখানকার মাঠে ভলিবল আর ক্রিকেট খেলে দিন কাটানো বিষ্ণোইয়ের ভেতর তখন আরও বড় কিছু করার ইচ্ছা জন্মে।
২০১০ সালের দিকে বিষ্ণোই গ্রাম ছেড়ে চলে যান চণ্ডীগড়ে—পাঞ্জাব ও হরিয়ানার আধুনিক রাজধানী শহরে। শোনা যায়, আইন পড়ার উদ্দেশ্যে সেখানে যান তিনি। সেখান থেকেই শুরু হয় ছোট গ্রামের ছেলে থেকে তাঁর ভয়ংকর গ্যাং লিডারে রূপান্তর। ২০২৩ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তৈরি দীর্ঘ চার্জশিটে এ তথ্য উল্লেখ আছে। এটি সিএনএন হাতে পেয়েছে।
বিষ্ণোই ভর্তি হন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে। বহু বছর ধরে উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি থেকে রাজনীতিবিদ ও কখনো কখনো ‘কুখ্যাত অপরাধীও’ জন্ম নিয়েছে। ছাত্ররাজনীতির সহিংস পরিবেশ তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে প্রভাব, আধিপত্য ও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘খুব অল্প সময়ের মধ্যে লরেন্স বিষ্ণোই পাঞ্জাব, হরিয়ানা, চণ্ডীগড় ও রাজস্থানে অন্য গ্যাংয়ের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিশাল অপরাধ ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।’
সাংবাদিক জুপিন্দারজিৎ সিং বলেন, বিষ্ণোই নিজেকে ঈশ্বরভক্ত ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ হিসেবে দেখাতে চান। বিষ্ণোই দাবি করেন, তিনি নেশা থেকে দূরে থাকেন ও প্রার্থনায় মনোযোগী।
এই ভাবমূর্তি বজায় রাখতে বিষ্ণোই নিজেকে ‘দেশপ্রেমিক’ ও ‘জাতীয়তাবাদী’ হিসেবেও তুলে ধরেন। ২০২৩ সালে কারাগার থেকে এবিপি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষ্ণোই বলেছিলেন, পাকিস্তান ও খালিস্তান আন্দোলনের বিরোধী তিনি। খালিস্তান আন্দোলন হলো ভারতের অংশবিশেষ নিয়ে স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র গঠনের আন্দোলন।
আইনের সঙ্গে সংঘাত
বিষ্ণোই প্রথমবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ২০১০ সালে, এক হামলা মামলায়। দুই বছরের মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা হয়। প্রতিবারের গ্রেপ্তার ও জেলজীবন তাঁকে আরও শক্ত ও সংগঠিত করে তোলে—বলা হয়েছে অভিযোগপত্রে।
২০১৪ সালে রাজস্থানে পুলিশের এক তল্লাশিচলাকালে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তখন আবারও গ্রেপ্তার হন বিষ্ণোই। স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর, এক আত্মীয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে কয়েক মাস পর নাটকীয়ভাবে তিনি পালিয়ে যান।
২০১৫ সালের মার্চে বিষ্ণোই আবার ধরা পড়েন পাঞ্জাবে। এবার আর পালানোর সুযোগ হয়নি। কিন্তু পুলিশ বুঝতে পারে—তাঁকে বন্দী করে রাখলেই তাঁর অপরাধ থেমে থাকবে না।
অভিযোগপত্রে লেখা হয়, ‘লরেন্স বিষ্ণোই জেল থেকেই পুরো গ্যাং পরিচালনা করেন। তিনি জেলের ভেতর থেকে এত দক্ষভাবে কাজ চালান যে বাইরে থেকেও তাঁকে থামানো যায় না।’
বিষ্ণোই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে তরুণদের প্রলুব্ধ এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ করতেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিষ্ণোই গ্যাং গোপন পরিচয়ে কাজ করে। গ্যাংয়ের প্রত্যেক সদস্য শুধু তাঁর ওপরের জনকে চেনেন। একই অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরাও একে অপরকে চেনেন না, যাতে একজন ধরা পড়লেও অন্যদের নিরাপদে রাখা যায়।
বলিউডের তারকা ও পপ গায়ক হত্যার অভিযোগ
বিষ্ণোইয়ের গ্রেপ্তারের পরও তাঁর গ্যাং আরও সাহসী হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালে তিনি আলোচনায় আসেন বলিউড তারকা সালমান খানকে হত্যার হুমকি দিয়ে। কারণ ছিল, ১৯৯৮ সালে খানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এক মামলার অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, সালমান দুটি কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করেছিলেন, যেগুলো বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে পবিত্র।
বিষ্ণোই সম্প্রদায় উত্তর ভারতের এক হিন্দু গোষ্ঠী। তাদের ‘প্রকৃতির রক্ষক’ বলা হয়। তাদের গুরু জাম্ভেশ্বর দেবের দেওয়া ২৯টি উপদেশের একটি হলো, সব প্রাণীর সুরক্ষা দেওয়া।
জুপিন্দারজিৎ সিংয়ের ভাষায়, ‘তাঁর (বিষ্ণোই) প্রথম উদ্দেশ্য ছিল (২০১৮ সালে), সালমান খানকে ভয় দেখানো এবং কৃষ্ণসার হরিণ হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া।’
এর চার বছর পর, ২০২২ সালে, পুলিশের অভিযোগ—বিষ্ণোইয়ের নির্দেশেই খুন হন পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালা। তিনি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন।
বিষ্ণোই এ হত্যায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে জেল থেকে এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী হত্যার পরিকল্পনা করেছেন। একই সাক্ষাৎকারে তিনি আবার সালমান খানকে হুমকি দেন। বলেন, ‘ওকে শাস্তি দেওয়াই আমার জীবনের লক্ষ্য।’
বিষ্ণোইয়ের আন্তর্জাতিক সংযোগ
প্রায় এক দশক কারাগারে বন্দী থাকা সত্ত্বেও বিষ্ণোইয়ের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানার বাইরে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তাঁর গ্যাং এখন যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও কানাডা পর্যন্ত সক্রিয়।
গত বছর কানাডার কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, বিষ্ণোই কানাডায় শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ওপর হামলার পেছনে যুক্ত। ২০২৩ সালে ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় গুলিতে নিহত হন শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জর। তাঁর হত্যার সূত্রেও বিষ্ণোইয়ের নাম আসে।
নিজ্জরকে ভারত সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষণা করেছিল। ভারতের অভিযোগ ছিল, তিনি একটি নিষিদ্ধ সংগঠন চালাতেন। সংগঠনটি বিশ্বজুড়ে শিখ সম্প্রদায়কে খালিস্তানের পক্ষে উসকে দিত।
খালিস্তান আন্দোলনকে ভারত তার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করে এবং বহুদিন ধরে কানাডাকে দেশটিতে শিখ ‘উগ্রপন্থীদের’ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করে আসছে।
অন্যদিকে কানাডার অভিযোগ, তার মাটিতে শিখ রাজনীতিকদের ওপর সহিংসতা ছড়াচ্ছে ভারত।
গত বছরের অক্টোবরে কানাডার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো পার্লামেন্টারি কমিটিতে বলেন, ভারত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের মতো অপরাধী সংগঠনকে ব্যবহার করছে, যাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারত সরকারের সমালোচক এমন কানাডীয়দের ওপর হামলা চালানো যায়।
তবে ভারত নিজ্জর হত্যায় নিজেদের কোনো ভূমিকা থাকার কথা বারবারই অস্বীকার করেছে। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দ চলতি মাসে সিবিসি নিউজকে বলেছেন, ভারতীয় আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তদন্তে সহযোগিতা করছে।
সিএনএন এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।
কানাডায় বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা
কানাডা সরকার এখন আনুষ্ঠানিকভাবে বিষ্ণোই গ্যাংকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছে। অভিযোগ, তারা প্রবাসী সম্প্রদায়ের ওপর ভয় ও সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছে।
কানাডার জননিরাপত্তা বিভাগ এক বিবৃতিতে বলেছে, বিষ্ণোই গ্যাং খুন, গুলিবর্ষণ ও অগ্নিসংযোগে জড়িত। তারা ভয় দেখিয়ে ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে আতঙ্ক তৈরি করে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিক কর্মী ও সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে এসব কর্মকাণ্ড চালানো হয়।
কানাডার ‘বিশ্ব শিখ সংস্থা’ এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের দাবি, বিষ্ণোই গ্যাং কানাডায় শিখদের বিরুদ্ধে ভারতের দমন অভিযানের বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্যে নিজ্জর হত্যাকাণ্ডও অন্তর্ভুক্ত।
এ ঘোষণার ফলে কানাডা সরকার এখন বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সদস্যদের সম্পদ ও তহবিল জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচার করার ক্ষমতা পেয়েছে।
কারাগারে থেকেও আত্মবিশ্বাসী বিষ্ণোই
এত সব অভিযোগ ও কয়েক ডজন মামলাও বিষ্ণোইকে বিচলিত করতে পারেনি। গত বছর এবিপি নিউজকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমাকে গ্যাংস্টার বলা নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। এটা সেই পরিচয়, যা ঈশ্বর আমাকে দিয়েছেন।’
বিষ্ণোই আরও বলেন, ‘৯ বছর জেলে কাটিয়ে আমি এখন ভালো মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখি না। আমি যেমন আছি, তাতেই ভালো আছি।’
![]() |
| নয়াদিল্লির একটি আদালতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিবেষ্টিত লরেন্স বিষ্ণোই। ১৮ এপ্রিল ২০২৩ ছবি: রয়টার্স |
Tuesday, May 27, 2025
নারীর নেশাতেই পতন: যেভাবে দিনমজুর থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী
নাম শুনতে যেমন ভয়ঙ্কর, কাজ ছিল আরও ভয়ঙ্কর। হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, গুলি ছোড়া, অস্ত্রের ঝনঝনানি, আগুন দিয়ে বাড়ি-দোকান জ্বালিয়ে দেয়া তার কাছে ছিল মামুলি ব্যাপার। প্রায় ১ যুগ আগে সাজ্জাদ আলী খানের হাত ধরে আন্ডারওয়ার্ল্ডে পা রাখলেও ধীর ধীরে এই জগতে আলোচিত হয়ে ওঠে ঢাকাইয়া আকবর। সিএমপিও তাকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। তবে শেষমেশ নারীতেই পতন হলো এই সন্ত্রাসীর। রোববার চমেক হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে শুক্রবার রাত আটটার দিকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করা হয়। তার শরীরে অন্তত ১০-১২টি গুলি লাগে। এসময় গুলিবিদ্ধ হন ৮ বছরের শিশু রাতুলসহ আরও এক দর্শনার্থী। তবে অনেকে মনে করছেন, ঢাকাইয়া আকবরের মৃত্যু আন্ডারওয়ার্ল্ডে আরও অশান্তি সৃষ্টি করবে নতুন করে।
সূত্র মতে, ফেসবুকে বেশ সক্রিয় আকবর। তার আইডিও ভেরিফাইড। প্রায় সময় সে নানারকম ভিডিওর পাশাপাশি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্নাকে কটূক্তি করে ভিডিও পোস্ট করতো। নগরে আন্ডারওয়ার্ল্ডের দুই ডন সরোয়ার বাবলা ও বিদেশে পলাতক সাজ্জাদ আলী খানের সঙ্গে চাঁদাবাজি ও ব্যবসাকে ঘিরে দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঝামেলা চলছিল। সেই বিরোধে জড়িয়ে ছিল তাদের শিষ্যরা। ঢাকাইয়া আকবর একসময় সাজ্জাদ আলী খানের শিষ্য থাকলেও ৩ বছর আগে থেকে তার দল ছাড়ে। পরে যোগ দেয় তারই প্রতিপক্ষ সরোয়ার বাবলার সঙ্গে। গত ১৫ই মার্চ ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হলে এই দু’গ্রপের উত্তেজনা আরও বাড়ে। ২৯শে মার্চ নগরের বাকলিয়ায় ব্যাপক গোলাগুলিতে ডাবল মার্ডার হয়। এরপরই ঘটে ঢাকাইয়া আকবরের ঘটনা। সরোয়ার বাবলার গ্রুপের লোকজন বলছে, এসব ঘটাচ্ছে ছোট সাজ্জাদের বাহিনী। একের পর এক টার্গেট কিলিংয়ের মাধ্যমে তারা হত্যা করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ‘সন্ত্রাসী’ আকবরের পরনারীর প্রতি দুর্বলতা ছিল আগে থেকেই। তাই তাকে ‘হত্যাচেষ্টা মিশনে’ পাতা হয়েছিল তরুণীর ফাঁদ। যার সঙ্গে মাত্র পাঁচদিনের পরিচয়ে ‘ডেটিংয়ে’ গিয়েছিলেন আকবর। এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র বলছে, এই হামলার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন বড় সাজ্জাদ। ২০২৩ সালের দিকে কারাবন্দি অবস্থায় আকবরকে জামিন না করানোয় সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয় গুরু ও শিষ্যের। সেই থেকেই আকবরের ওপর ক্ষোভ থাকলেও সামপ্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তা আরও বেড়ে যায়। পতেঙ্গা সৈকতে গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল সেই দ্বন্দ্ব। প্রত্যক্ষদর্শী এক ব্যবসায়ী বলেন, আকবরের সঙ্গে থাকা চারজন ছেলেসহ তারা ৬-৭ জন সৈকতের ২৮ নম্বর দোকানে বসেছিলেন। মোটরসাইকেলে করে ৪ জন যুবক ঘটনাস্থলে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে থাকে। এরপর আকবরের সঙ্গে থাকা ৪ জন সেখান থেকে দৌড়ে পালায়। আর যে তরুণী ছিলেন তিনি গুলিবর্ষণকারীদের সঙ্গে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। আকবরকে গুলির পরপরই স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হন। তার শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। এরপর তাকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার আগে আকবর কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, এই হামলার পেছনে রায়হান, খোরশেদ, ইমন ও বোরহান দায়ী। তারাই তাকে গুলি করেছে। ওই তরুণীর সঙ্গেও তার প্রথম দেখা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই চারজন ছাড়াও সেগুন এবং মোহাম্মদ নামে আরও দু’জন ঘটনার সময় উপস্থিত ছিলেন। বাকি চারজনসহ এই ছয়জন চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী। গুলিবিদ্ধ আকবরের বিরুদ্ধে নগরের বিভিন্ন থানায় হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। বিভিন্ন সময় এসব মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হলেও জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। ঢাকাইয়া আকবর ২০২৩ সালে গুরু সাজ্জাদ আলী খানের ভাইয়ের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। পরে না পেয়ে সাজ্জাদ আলী খানের বাড়ি গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। তার সঙ্গে থাকতে ঢাকাইয়া আকবর চট্টগ্রামের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে ‘নিয়মিত চাঁদাবাজি’ করতেন। সাজ্জাদের ‘ সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ হিসেবে কাজ করতেন ঢাকাইয়া আকবর। ২০১৭ সালে আকবরকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। সে সময় ছয় রাউন্ড কার্তুজসহ একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয় তার কাছ থেকে। এরপর দীর্ঘদিন কারাগারে ছিলেন আকবর। দু’বছর কারাভোগের পর ২০২২ সালের ৪ঠা সেপ্টেম্বর জামিনে ছাড়া পান তিনি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালের ২৭শে সেপ্টেম্বর লক্ষ্মীপুর সদর থেকে দু’টি অস্ত্রসহ তাকে আবারো গ্রেপ্তার করে বায়েজিদ থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভবন মালিককে ফোন করে চাঁদা দাবির অভিযোগ ছিল সে সময়।
আকবরের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের পর জেলে থাকা অবস্থায় আকবর ভেবেছিলেন ‘গুরু’ সাজ্জাদ আলী খান তার জামিনের ব্যবস্থা করবে। কিন্তু ‘গুরুর’ সেই ‘আশীর্বাদের হাত’ পায়নি সে। তার পরিবারই অনেক কষ্টে জোগাড় করেছে মামলা পরিচালনার ব্যয়। তখন থেকেই গুরুর ওপর ক্ষোভ জন্মে তার। জামিনে বেরিয়ে আকবর গুরুকে টেক্কা দিতে নিজেই গড়ে তোলেন বাহিনী। এরপর থেকেই বড় সাজ্জাদের চাঁদাবাজিসহ নানা কর্মকাণ্ডে বাধা হয়ে দাঁড়ায় সে। পুলিশকে সাজ্জাদের বিভিন্ন তথ্য দিয়েও সাহায্য করতো সে। তাই আকবরের প্রতি সমপ্রতি বেশ ক্ষুব্ধ হয় বড় সাজ্জাদ। আকবরের ফেসবুক আইডি ঘেঁটে দেখা গেছে, কারাবন্দি ছোট সাজ্জাদ ও তার স্ত্রী তামান্না শারমিনকে নিয়ে প্রায়ই ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও পোস্ট করতো সে। এ ছাড়া পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান এবং বিএনপি’র এক শীর্ষ নেতাকে হুমকি দিয়েও ভিডিও পোস্ট করতে দেখা গেছে। সমপ্রতি গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ এই সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুলিশকে তথ্য দিয়েছেন আকবর- এমন গুঞ্জন আছে। হাসপাতালে আকবরের স্বজনদেরও দাবি, এই ঘটনায় কারাগারে বন্দি ‘সন্ত্রাসী’ ছোট সাজ্জাদের অনুসারীরা জড়িত।

Monday, May 26, 2025
সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুন
সূত্র বলছে, সম্প্রতি ঢাকা থেকে আটক হওয়া সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের লোকজন এই হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে। আর ঘটনার কলকাঠি নেড়েছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ। যিনি ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের ‘গুরু’। গুলিবিদ্ধ ঢাকাইয়া আকবরও একসময় বড় সাজ্জাদের শিষ্য ছিল। কিন্তু বছরখানেক আগে কারাবন্দি অবস্থায় আকবরকে জামিন না করানোয় সম্পর্কের টানাপড়েন শুরু হয়। সেই থেকেই আকবরের ওপর ক্ষোভ থাকলেও সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ডে তা আরও বেড়ে যায়। পতেঙ্গা সৈকতে গোলাগুলির নেপথ্যে ছিল সেই দ্বন্দ্ব। ঘটনার শুরু থেকেই আকবরের সঙ্গে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবকের বর্ণনা অনুযায়ী, নুসরাত জাহান নামে ওই তরুণীর সঙ্গে আকবরের ফেসবুকে পরিচয় হয় মাত্র পাঁচদিন আগে। কথাবার্তার একপর্যায়ে দেখা করার প্রস্তাব দেয় আকবর। ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার পতেঙ্গা সৈকতে বেড়াতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। সে অনুযায়ী নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার অক্সিজেন মোড় এলাকায় এক ছোট ভাইকে দিয়ে প্রাইভেটকার পাঠায় আকবর। কিন্তু সেদিন ওই তরুণী আসেনি। পরদিন বিকালে তরুণীকে নিয়ে বেড়াতে যেতে আবারো একইস্থানে গাড়ি পাঠানো হয়। শুক্রবার বিকাল ৩টার পর অক্সিজেন মোড় জামান হোটেলের বিপরীতের প্রাইম ব্যাংকের সামনে দাঁড়ায় প্রাইভেটকারটি। কিছুক্ষণ পর নুসরাত জাহান নামে ওই তরুণী ঘটনাস্থলে যান বোরকা ও মাস্ক পরে। গাড়িতে ওঠার আগে তরুণী জানান, তার এক বান্ধবী ও বয়ফ্রেন্ডও সঙ্গে যাবে। পাঁচ মিনিটের মাথায় ওই তরুণী মুঠোফোনে ওই দু’জনকে সরাসরি পতেঙ্গা সৈকতে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়ে প্রাইভেটকারে চড়ে। তরুণীকে নিয়ে এরপর যাওয়া হয় একই থানাধীন চালতাতলী পূর্ব মসজিদ এলাকায় আকবরের বাড়ির সামনে। সেখান থেকেই আকবর গাড়িতে চড়ে। গাড়ি গিয়ে থামে জিইসি মোড় এলাকায়। একটি কাপড়ের শো-রুম থেকে কয়েকটি শার্ট কেনে আকবর।
এরপর গাড়িটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সরাসরি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের দিকে রওয়ানা হয়। গাড়িতে থাকা অবস্থায় আকবর পতেঙ্গা এলাকার কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে। বিকাল আনুমানিক পাঁচটায় গাড়ি পতেঙ্গায় পৌঁছায়। আকবর তার বন্ধুদের ফোন করলে তারা আসতে দেরি হবে বলে জানায়। তখন ওই তরুণীসহ কর্ণফুলী টানেল হয়ে আনোয়ারা পারকির সমুদ্র সৈকতে যায়। সেখানে প্রায় আধাঘণ্টা তরুণীর সঙ্গে সময় কাটায় আকবর। একপর্যায়ে অচেনা কয়েকজন ছেলে আকবরকে সালাম দিয়ে জানায়, ফেসবুকে আকবরের ভিডিও তারা দেখে। আকবর তাদের চিনতে না পেরে সন্দেহবশত তড়িঘড়ি করে আবারো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে ফেরে। পতেঙ্গা সৈকতে ফেরার পর আকবরের পূর্বপরিচিত পতেঙ্গা এলাকার বন্ধুরা কল দেয় এবং সৈকতে তাদের দেখা হয়। যাদের মধ্যে তিনজন আকবরের সমবয়সী ছিল, বাকি একজন বড় ভাই। এরপর প্রাইভেটকার পার্কিং করে তারা সবাই মিলে সৈকতের ২৮ নম্বর দোকানে গিয়ে বসে। কিছুক্ষণ তারা গল্প করে দোকানিকে ডেকে নাশতা অর্ডার করে। এরই মধ্যে দোকানি পিয়াজু নিয়ে আসেন। আকবর এক প্লেট পিয়াজুসহ ওই তরুণীকে নিয়ে একটু দূরে আরেকটি টেবিলে গিয়ে বসে। প্রায় ১০ মিনিট পর হঠাৎ চার যুবক এসে আকবরকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে। চারদিক ধোঁয়ায় ছেয়ে যায়। তৎক্ষণাৎ আকবর প্রাণ বাঁচাতে সমুদ্রের দিকে দৌড়াতে থাকে এবং একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। আকবরের সঙ্গে থাকা সবাই এ সময় ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালায়।
আকবরকে গুলির পরপরই স্থানীয়রা সেখানে জড়ো হন। তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালে নেয়ার আগে আকবর কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, এই হামলার পেছনে রায়হান, খোরশেদ, ইমন ও বোরহান দায়ী। তারাই আকবরকে গুলি করেছে। ওই তরুণীর সঙ্গেও তার প্রথম দেখা। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ওই চারজন ছাড়াও সেগুন এবং মোহাম্মদ নামে আরও ২ জন ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল। বাকি চারজনসহ এই ছয়জন চট্টগ্রামের আলোচিত এইট মার্ডার মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের অনুসারী।

Wednesday, April 30, 2025
কালীগঞ্জে সাবেক চেয়ারম্যান নজরুলের ত্রাসের রাজত্ব by আমিনুল ইসলাম লিটন
জানা যায়, সামাজিকতার নাম ভাঙিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে তিনি আধিপত্য বিস্তার শুরু করেন। যা সাবেক চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের হোসেন মণ্ডলের নেতৃত্বাধীন নেতারাও মানতে পারেননি। ফলে মূল আওয়ামী লীগের সঙ্গে নজরুল মোল্ল্যার বিরোধ স্পষ্ট রূপ নেয়। তৎকালীন এমপি’র শক্তি কাজে লাগিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের মূলধারার লোকজনের ওপর অপ্রতিরোধ্য নির্যাতন চালানো শুরু করেন। হামলা, মামলা আর সন্ত্রাসী তাণ্ডবে এক সময়ে ত্যাগীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। পরে ২০১৪ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে আনোয়ারুল আজিম আনার এমপি হন। তিনি তখন আরেক ডিগবাজি দিয়ে আনারের সঙ্গে সখ্যতা তৈরি করে রাজনৈতিক মাঠে ফেরা মোদাচ্ছেরের সঙ্গে আপস করেন। এ তরফায় তিনি নির্বাচন না করে বসে পড়েন। কিন্তু আওয়ামী লীগ আমলের শেষ নির্বাচনে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে দলটির মান্নান গ্রুপের প্রার্থী আব্দুর রশিদ খোকনের ট্রাকের পক্ষে ভোটে নামেন। এ নির্বাচনে আনোয়ারুল আজিম আনার এমপি নির্বাচিত হলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে নজরুল। পরে কোলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলার ঘাড়ে ভর করে রক্ষা পান তিনি। সুযোগ বুঝে সখ্যতা গড়ে তুলে আবারো ডিগবাজির মাধ্যমে হয়ে যান এমপি আনার গ্রুপের। একজন ভদ্র ও শান্ত প্রকৃতির নেতা হিসেবে সে সময়ে জনপ্রিয়তায় চেয়ারম্যান হয়ে যান মোদাচ্ছের হোসেন মণ্ডল। এরপর থেকে মোল্ল্যার তাণ্ডব কিছুটা থেমে যায়। আপস করে ফেলেন জামাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোদাচ্ছের মণ্ডল ও কোলা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যান আলাউদ্দীন আলার সঙ্গে। জনবিচ্ছিন্ন অবস্থায় ধীরগতিতে দিন কাটছিল তার। ৫ই আগস্টে আওয়ামী লীগের পতনের পর পুনরায় ডিগবাজি মারে নজরুল। খোলস পাল্টে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে হয়ে যান বিএনপি’র কাতারবন্দি। অথচ বিগত ১৭ বছর কোলা জামালপুর ইউনিয়নের বিএনপি’র নেতাকর্মীরা হামলা মামলার শিকার হলেও তিনি ছিলেন আনার এমপি’র পাওয়ারের গা গরম গডফাদার। আওয়ামী লীগের পতনের পর কালীগঞ্জে বিএনপি’র ৩টি গ্রুপ পৃথকভাবে রাজনীতির মাঠে ময়দানে কাজ করছে।
নতুন করে বিএনপি’র নেতা সাজতে তিনি প্রথমে মাথা গুঁজে দেন সাবেক এমপি শহিদুজ্জামান বেল্টুর স্ত্রী মুরশিদা জামান বেল্টু গ্রুপে। সেখান থেকে আরও বেশি সুবিধা নেয়ার জন্য আবারো ডিগবাজি মেরে চলে যান আরেক গ্রুপ হামিদুল ইসলাম হামিদ গ্রুপে। এরপর এলাকায় শুরু করেন পুরনো বন্ধু আওয়ামী লীগের আলা চেয়ারম্যানের সন্ত্রাসী গ্রুপ দিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার। ডিগবাজির ওস্তাদ এই নেতা তার এই সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে কোলা ইউনিয়নের দীর্ঘ সময়ের দুর্দিনের নেতা ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি গোলাম সরোয়ার হোসেন মোল্যাকে কোলা বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে জখম করেন। এর পরের দিন একই ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শুকুর আলীকেও একইভাবে কুপিয়ে জখম করেন। ওই ইউনিয়নের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহম্মেদ বনির বাড়িতেও ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। তার হয়ে বর্তমানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর মদতদাতা যেন নেতৃত্ব পর্যায়ের বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতারাই। প্রায়ই দুই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের পুরনো বন্ধুদের নিয়ে কোলা বাজারে রামদা, ঢাল, সড়কি ও দেশীয় বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়ে এলাকায় এখন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। অথচ বর্তমানে বিএনপি’র নেতাদের মধ্যে চরম গ্রুপিং থাকায় পার পেয়ে যাচ্ছে নজরুল। এ বিষয়ে নজরুল মোল্লা মানবজমিনকে বলেন, আপনি আমার এলাকায় এসে দেখে যান। আমার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট।

Monday, April 28, 2025
জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদের ভাইকে কোপাল কিশোর গ্যাং সদস্যরা
হামলায় শাহরিয়ার হাসান গুরুতর আহত হয়। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় তাকে উদ্ধার করে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রাত আটটার দিকে আহত শাহরিয়ারকে নিয়ে নোয়াখালী থেকে অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। শাহরিয়ার শহরের হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র।
এ ঘটনার প্রতিবাদে আজ রাত পৌনে দশটার দিকে জেলা শহর মাইজদীতে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। বিক্ষোভ-সমাবেশে শহীদ রিজভীর ভাই শাহরিয়ারের ওপর হামলার ঘটনার জন্য আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের লালিত কিশোর গ্যাংকে দায়ী করা হয় এবং হামলাকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।
শাহরিয়ারের মা ফরিদা ইয়াছমিন বলেন, তাঁর ছেলে শাহরিয়ার স্থানীয় হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র। গত দুই দিন আগে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে বাইরের কয়েকজন তরুণের ঝগড়া হয়। বিষয়টি তাঁকে (মা) এবং স্কুলের শিক্ষকদের জানায় শাহরিয়ার। পরে বিষয়টি সে মীমাংসা করে দেয়। এ জন্য বহিরাগত তরুণেরা তার বন্ধুদের মারতে পারেনি। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয় শাহরিয়ারের ওপর। আজ বিকেলে স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে ওই তরুণেরা শাহরিয়ারের ওপর অতর্কিতে হামলা চালিয়ে তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করে।
শাহরিয়ারের বাবা জামাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, হামলাকারীরা প্রথম দুটি মোটরসাইকেলে করে আসে। এরপর আরও কয়েকজন এসে তাঁর ছেলেকে ঘিরে ধরে ব্যাগের ভেতর থেকে ধারালো অস্ত্র বের করে কোপাতে থাকে। এতে তাঁর ছেলে মারাত্মকভাবে আহত হয়। পরে আশপাশের লোকজন তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনি এই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) রাজীব আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, শাহরিয়ার হাসান নামের এক কিশোরকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিকেল সাড়ে চারটার দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়। তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে ওয়ার্ড থেকে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলে তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা সমন্বয়ক আরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের কিশোর গ্যাং শহীদ রিজভীর ছোট ভাই শাহরিয়ারকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালিয়েছে। তারা তাকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। ঘটনার প্রতিবাদে তাঁরা আজ রাতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। এ ছাড়া হামলাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে আগামীকাল সোমবার সকালে হরিনারায়ণপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করা হবে।
সুধারাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু তাহের প্রথম আলোকে বলেন, শাহরিয়ারের ওপর হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল কাজ করছে। বড় ভাই–ছোট ভাই মধ্যকার বিরোধের জের ধরে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা ওই হামলা চালিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
![]() |
| কিশোরগ্যাং সদস্যদের হামলায় আহত স্কুলছাত্র শাহরিয়ার হাসানকে হাসপাতালে আনা হয়। গতকাল রাতে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে। ছবি: প্রথম আলো। |
Sunday, April 27, 2025
কুমিল্লায় ‘কিশোর গ্যাং’: ‘অবস্থান জানান দিতে’ মহড়া, নাগরিকদের উদ্বেগ by আবদুর রহমান
গতকাল বেলা তিনটা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত নগরের কান্দিরপাড় এলাকার রানীর দিঘির পাড়, তালপুকুরপাড় ও আদালতপাড়া এলাকায় তিনটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা মহড়া দেয়। জানা গেছে, নিজেদের অবস্থান জানান দিতে তারা এভাবে মহড়া দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নগরের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৫ সালের দিকে কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। নগরে ‘রতন’, ‘ঈগল’, ‘র্যাক্স’, ‘এক্স’, ‘এলআরএন’, ‘সিবিক’, ‘মডার্ন’, ‘রকস্টার’, ‘ডিস্কো বয়েজ’, ‘বস’সহ কমপক্ষে ২০টি কিশোর গ্যাং আছে। এসব গ্যাং নিজেদের আধিপত্য দেখাতে প্রকাশ্যে সহিংসতায় জড়াচ্ছে। ২০১৭ সালের পর কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ৮ বছরে অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া মাদক কারবার, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে এসব গ্যাং।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২২ এপ্রিল সকালে নগরের ধর্মসাগর পাড়ের রানীর কুঠি এলাকায় নাফিজ অময় (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে কিশোর গ্যাং রতন গ্রুপের সদস্যরা।
এ ঘটনায় নাফিজ অময় কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। মামলায় নগরের ছোটরা মফিজাবাদ কলোনির রতন, তাঁর প্রধান সহযোগী সাইফুলসহ তিনজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫০ জনকে আসামি করা হয়। আসামিরা সবাই রতন গ্রুপের সদস্য। ঘটনার পর রতন গ্রুপের সদস্যরা গা ঢাকা দেওয়ায় পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
নাফিজের এক বন্ধু নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, রতন গ্রুপ নগরের কিশোর গ্যাংয়ের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং তাদের গ্রুপে সদস্যও বেশি। বিগত সময়ে অন্য গ্রুপগুলো রতন গ্রুপের কারণে সক্রিয় হতে পারেনি। নাফিজ অময়ের মামলায় বর্তমানে রতন ও সাইফুল পলাতক থাকার সুযোগে শুক্রবার নগরের তিন এলাকায় তিনটি গ্রুপ মহড়া দিয়েছে।
নগরের অন্তত ৫টি কিশোর গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে জানাশোনা আছে এমন একজন ব্যক্তি (তিনি আগে একটি কিশোর গ্যাংয়ের নেতা পর্যায়ের ছিলেন, বর্তমানে সরে এসেছেন) নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। তিনি বলেন, রতন গ্রুপের মূল নাম হলো ‘র স্কোয়াড’। শুক্রবার যারা তিন এলাকায় মহড়া দিয়েছে, এদের মধ্যে একটি গ্রুপ হলো ‘সিবিকে’; আরেকটি হলো ‘ঈগল গ্রুপ’। তৃতীয় গ্রুপটির তেমন কোনো নাম নেই। রতন গ্রুপ বর্তমানে চাপে থাকায় বাকি গ্রুপগুলো নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে।
কিশোর গ্যাংগুলোকে কারা পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছে বা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি আরও বলেন, কোনো না কোনো পাওয়ার পার্টির লোক পেছন থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও তাঁদের নাম কখনো সামনে আসে না। আগে আওয়ামী লীগের লোকজন এদের নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এখন বিএনপির কোনো কোনো নেতা এদের পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘কুমিল্লা নগরে কিশোর গ্যাংয়ের নামে বর্তমানে যে সন্ত্রাস দেখা যাচ্ছে, এগুলো আওয়ামী লীগের সৃষ্টি। বর্তমানে কিশোর গ্যাংয়ের নিয়ন্ত্রণে বিএনপির কেউ জড়িত রয়েছেন বলে আমার কাছে তথ্য নেই। তবে যদি এমন কোনো তথ্য–প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে অবশ্যই দলীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩ জানুয়ারি বিকেলে নগরের ভিক্টোরিয়া কলেজ-সংলগ্ন রানীর দিঘির পাড়ে অস্ত্রের মহড়া দেয় কিশোর গ্যাংয়ের অর্ধশতাধিক সদস্য। এ সময় ককটেলের বিস্ফোরণও ঘটানো হয়। ওই ঘটনার পর কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তৎপর হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ৯ জানুয়ারি ভোরে নগরের টাউন হল মাঠে দেশি অস্ত্রসহ কিশোর গ্যাংয়ের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ১৪ জানুয়ারি নগরের ঝাউতলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের একজনকে গ্রেপ্তার করে জেলা ডিবি পুলিশ। এরপর ২৫ জানুয়ারি দিবাগত রাত ১২টা থেকে ২৬ জানুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত কুমিল্লা নগরের বিভিন্ন এলাকায় যৌথ অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের ৪ সদস্যসহ ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, শুক্রবার যারা নগরের বিভিন্ন এলাকায় অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে, তাদের বেশির ভাগই পথশিশু, কিশোর ও তরুণ। যখনই নগরের কিশোর গ্যাং মাথাচাড়া দেওয়ার চেষ্টা করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সেটি বন্ধ হয়েছে। শুক্রবারের ঘটনার পর থেকে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছি। সিসিটিভি ফুটেজ এবং বিভিন্ন মাধ্যমে বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী তৎপরতা নির্মূলে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।’
গতকালের সশস্ত্র মহড়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) কুমিল্লার সভাপতি অধ্যাপক লিখিল চন্দ্র রায়। আজ প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা ভেবেছিলাম, একটি স্বস্তিদায়ক সময় পার করব; কিন্তু সময়টা পার করতে হচ্ছে উদ্বেগের মধ্য দিয়ে। গতকালের ঘটনাটি আমি ফেসবুকে দেখে খুবই উদ্বিগ্ন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিষয়টি ভালোভাবে তদন্ত করা উচিত এবং যাঁরাই এসব কিশোর গ্যাংকে পেছন থেকে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁদের সামনে আনা উচিত। পাশাপাশি কিশোর ও তরুণের প্রতি অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।’
![]() |
| কুমিল্লা নগরে গতকাল শুক্রবার বিকেলে কিশোর গ্যাংয়ের মহড়া। ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত |
Sunday, March 2, 2025
অস্ত্রের ঝনঝনানি বাড়ছেই: সক্রিয় আন্ডারওয়ার্ল্ড by সুদীপ অধিকারী
গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি রাত ১০টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানার সুতি খালপাড় এলাকায় মোহাম্মদ জাহিদ (২৫) নামে এক যুবকের পায়ে গুলি করা হয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাকে ঢামেকে নিয়ে আসা মো. হৃদয় বলেন, পায়ে গুলি লেগে রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল জাহিদ। পরে আমরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে আসি। খুব সম্ভবত ছিনতাইকারীরা তাকে গুলি করে থাকতে পারে। গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৩টার দিকে মিরপুর ১১ নম্বর সেকশনের ই-ব্লকের ১ নম্বর রোডে তর্কাতর্কির একপর্যায়ে মো. জসিম উদ্দিন (৪৪) ও তার বোন শাহিনুর বেগম (৩২)কে গুলি করা হয়। আহত অবস্থায় তাদের দু’জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। আহত জসিম উদ্দিন বলেন, তিনি পরিবার নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় থাকেন। সেখানে তার ফার্নিচারের ব্যবসা আছে। মিরপুরে তার বোন শাহিনুর থাকেন। এক সপ্তাহ আগে গাজীপুর থেকে বোনের বাসায় আসি। সপ্তাহখানেক আগে সোহাগ নামে ওই এলাকার এক ছিনতাইকারীকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে সহায়তা করি। তখন তার সহযোগীরা আমাকে হুমকি দেয়। এরপর শবেবরাতের রাতে মসজিদ থেকে নামাজ পড়ে বোনের বাসার সামনে এলে সোহাগের বিষয় নিয়ে এলাকার শরিফ, তুহিন, শহিদুল, সুজন, রিয়াজের সঙ্গে আমার কথাকাটাকাটি হয়।
একপর্যায়ে শহিদুল আমার পায়ে গুলি করেন। খবর পেয়ে আমার বোন শাহিনুর বাসা থেকে বের হয়ে এলে তাকেও গুলি করা হয। স্থানীয়রা আমাদের প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়। গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি রাত পৌনে ১০টার দিকে রামপুরার বনশ্রীতে ডান পায়ের উরুতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন রামপুরা থানা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জুয়েল সরদার (৪০)। তাকেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহত জুয়েলকে হাসপাতালে নিয়ে আসা বন্ধু মহসিন জানান, তারা বনশ্রী এ- ব্লক কাঁচা বাজারের পাশে কয়েক বন্ধু মিলে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেলযোগে হেলমেট পরিহিত বেশ কয়েকজন এসে হিমেল নামের একজনের খোঁজ করেন। তারা বলেন, আমরা হিমেল নামে কাউকে চিনি না।’ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা জুয়েলের ডান উরুতে গুলি করে চলে যায়। বরিশাল জেলার মুলাদি উপজেলার রামচর গ্রামের হাকিম সরদারের ছেলে জুয়েল বর্তমানে পূর্ব রামপুরা এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। গত ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ভোরে হাতিরঝিলে মো. সুমন (২৫) নামে এক ইন্টারনেট কর্মচারীকে গুলি করা হয়। তাকেও উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তার বোন ইভা বলেন, আমার ভাই ইন্টারনেট কোম্পানিতে লাইনম্যানের কাজ করেন।
মঙ্গলবার রাতে রামপুরা ওয়াপদা রোডের একটি চায়ের দোকানের সামনে ১২-১৫ জন মুখোশধারী মোটরসাইকেলযোগে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে আমার ভাই ডান পায়ের উরুতে গুলিবিদ্ধ হন। প্রথমে তাকে উদ্ধার করে মুগদা হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। আমাদের বাড়ি কুমিল্লা জেলার চান্দিনা থানার কুতুমপুর গ্রামে। বর্তমানে আমরা রামপুরার ওয়াপদা রোডের দুই নম্বর গলি এলাকার একটি বাসায় ভাড়া থাকি। এর দুইদিন আগে ১লা ফেব্রুয়ারি রাত সোয়া ১০টার দিকে হাতিরঝিল থানার উলন পোড়াবাড়ি এলাকায় লানী (৫৫) ও শুভ (১৭) নামে দু’জন গুলিবিদ্ধ হন। তারাও ঢামেকে চিকিৎসা নিয়েছেন। গুলিবিদ্ধ জিলানির ছেলে সাইফুল বলেন, আমার বাবা উলন পোড়াবাড়ি এলাকায় কলা বিক্রি করে। রাত ৯টার দিকে হঠাৎ একটি পক্ষকে আরেক পক্ষের লোকজন গুলি ছুড়তে ছুড়তে ধাওয়া করে। সেই গুলি আমার বাবার গায়ে এসে লাগে। এ সময় শুভ নামে আরও একজন গুলিবিদ্ধ হন। তবে কে বা কারা আমার বাবাকে ও ওই কিশোরকে গুলি করেছে, বিষয়টি বলতে পারছি না। আমাদের বাড়ি বি-বাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার কমলপুর এলাকায়। আর গুলিবিদ্ধ শুভর বাড়ি শরীয়তপুরের ডামুড্যা থানার কাচিকাটা এলাকায়।
গত ২৪শে জানুয়ারি রাত সোয়া ১১টার দিকে কামরাঙ্গীরচরের বেড়িবাঁধ এলাকায় সজল রাজবংশী (৩৭) নামে এক ব্যবসায়িকে গুলি করে প্রায় ৭০ ভরি স্বর্ণ ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। গুলিবিদ্ধ সজলের ভাই জয় রাজবংশী বলেছেন, ‘আমার ভাই কামরাঙ্গীরচরে ‘ইতি জুয়েলার্সের’ মালিক। বৃহস্পতিবার রাত ১১টার দিকে দোকান বন্ধ করে মোটরসাইকেলে করে হাজারীবাগে বাসায় ফিরছিল বড় ভাই। বাসার কাছাকাছি এলেই অজ্ঞাত কয়েকজন দুর্বৃত্ত আমার ভাইয়ের বাম পায়ে গুলি করে তার কাছে থাকা প্রায় ৭০ ভরি স্বর্ণ নিয়ে পালিয়ে যায়। গত ৭ই ডিসেম্বর কদমতলী এলাকায় একটি রড তৈরি কারখানার দুই নিরাপত্তাকর্মী মো. মনির (৪৫) ও মো. আল আমিন (৪০) দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন। কারখানাটির তত্ত্বাবধায়ক মো. সবুজ বলেন, রাত ২টার দিকে বাইরে মানুষের শব্দ পেয়ে দু’জন টর্চলাইট জ্বালিয়ে এগিয়ে যান। তখন এক ব্যক্তি তাদের লক্ষ্য করে গুলি করে পালিয়ে যান। তাদের পায়ে গুলি লাগে। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একই রাতে ৯টার দিকে ঢাকার পশ্চিম মেরুল বাড্ডা এলাকায় সাইফুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন। তার ডান পায়ের উরুতে গুলি লাগে।
সাইফুলের খালাতো ভাই মনির হোসেন বলেন, কী কারণে কারা তার ভাইকে গুলি করেছে, সেটা এখনো জানতে পারেননি। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রথমে সাইফুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একের পর এক এমন গুলির ঘটনায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বলেন, আগে কিছু হলেই ধারালো অস্ত্রের ব্যবহার দেখা যেতো। কিন্তু বর্তমানে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার ব্যাপকহারে দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, জুলাই বিপ্লবের পর একসঙ্গে বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। তাদের লোকজনই এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে এই অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করছে। কেউ কেউ আবার দাবিকৃত চাঁদা না পেয়ে দোকান-বাসা বাড়ির সামনে ও নির্মাণাধীন ভবনের সামনে দল বেঁধে এসে গুলি চালানো হচ্ছে। ইন্টারনেট, ডিশ লাইন ও ময়লার ব্যবসার দখল নিতেও পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গোলাগুলি হচ্ছে। এদিকে থানা লুটের অস্ত্রও এখনো সব উদ্ধার হয়নি। সেসব অস্ত্র নিয়েও কেউ কেউ ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে।
তবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক বলেছেন, নগরবাসীর নিরাপত্তার জন্য যা যা উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন আমরা সব নিয়েছি। চেকপোস্ট, পেট্রোল, ফুট পেট্রোল, ডিবি-পুলিশ-র?্যাব-সেনাবাহিনীর টহলসহ যা যা করণীয় আমরা সবকিছু করে যাচ্ছি। ডিএমপি, গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাই সন্ত্রাসীরা যত শক্তিশালীই হোক, সে যেই হোক পুলিশের হাত থেকে রক্ষা পাবে না।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, আমাদের ডিএমপি’র সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, র্যাব, এপিবিএন, এটিইউ সকল এজেন্সি যৌথভাবে অভিযান পরিচালনা করছে। এর আগে আমরা যৌথভাবে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু করি। চিহ্নিত অপরাধীদের তালিকা করে সেই মোতাবেক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। আমরা চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের যদি আটকাতে পারি, তাহলে দেখবেন ঘটনা কমে গেছে। ডিএমপি কমিশনার বলেন, এখানে একটি ঘটনা ঘটলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হয়ে যায়। অপরাধ যে কখনো ছিল না, তা তো না। কিন্তু তখন যেহেতু মিডিয়া এত অ্যাডভান্স ছিল না, সেজন্য প্রচারটা হতো না। ইভেন আগে যে একটা ঘটনা ঘটলে একজন সামনে এগিয়ে এসে প্রতিরোধের চেষ্টা করতো, এখন সেটা না করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ভিডিওতে ব্যস্ত। তাই এসব থেকে মুক্তি পেতে হলে সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ঢাকা জনবহুল একটা শহর, এখানে সবাইকে অবদান রাখতে হবে। ঢাকাবাসীর সবার কাছে অনুরোধ, আসুন সবাই মিলে সম্মিলিতভাবে আমরা চেষ্টা করি।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, যারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক ও সজাগ রয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত চেকপোস্টগুলোও ফাংশন করছে। যৌথ বাহিনীর অপারেশনও ভালোভাবে চলছে। থানার কার্যক্রম স্বাভাবিক গতিতে চলছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মনিটরিং করার জন্য বাহিনীর পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অফিসারদেরও দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ফোর্স ও টহলের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
Wednesday, February 19, 2025
কুয়েটে ছাত্রদল ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দফায় দফায় সংঘর্ষ
কুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ৫ই আগস্টের পর থেকে কুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অতীতে এই ক্যাম্পাসে রাজনীতির নামে ছাত্রলীগের সীমাহীন অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। এমনকি তাদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনে একজন শিক্ষক পর্যন্ত মারা যান। বিপ্লব উত্তর সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল এখানে আর ছাত্র রাজনীতি ফিরবে না। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে সোমবার ছাত্রদল কুয়েটে সদস্য সংগ্রহ ফরম বিতরণ শুরু করে।
মঙ্গলবার দুপুরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা সাধারণ ছাত্রদের নিয়ে ভিসির কার্যালয়ে যাচ্ছিলেন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে। পথিমধ্যে ছাত্রদলের কর্মীদের সাথে মুখোমুখি হলে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এ সময় কুয়েটের পকেট গেট দিয়ে বহিরাগত সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র, রামদা, চাপাতি, লোহার রড নিয়ে প্রবেশ করে। তারা ছাত্রদলের কর্মীদের সাথে একত্রিত হয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামালা চালায়। মুহূর্তে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোটা ক্যাম্পাস। সাধারণ ছাত্রদের প্রতিরোধের মুখে ছাত্রদল কর্মীরা পালিয়ে গেলেও বহিরাগত সন্ত্রাসীদের সাথে কুয়েটের আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের সাথে নিয়ে পাল্টা হামলা করে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল নিক্ষেপে একের পর শিক্ষার্থী রক্তাক্ত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাদেরকে কুয়েট মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে চিকিৎসা দেয়া হয়।
এদিকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে রয়েছেন প্রীতম বিশ্বাস, শাফি, নাফিস ফুয়াদ, সৌরভ, তাওহিদুল, ইউসুফ খান সিয়াম, দেবজ্যোতি, মাহাদি হাসান, নিলয় ও মমতাহিন।
কুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী রাহাতুল ইসলাম বলেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবিতে দুপুর ১টায় আমরা সমাবেশ ডেকেছিলাম। সেখানে বহিরাগতদের নিয়ে ছাত্রদল হামলা চালিয়েছে। জানা গেছে, কুয়েটের ২০ ব্যাচের শিক্ষার্থী জনৈক ইফাজ ছাত্রদলের হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে। এছাড়া সংঘর্ষের শুরুতে ছাত্রদল কর্মীরা বলেছিল, বিকেল ৫টা পর্যন্ত কোন পুলিশ প্রশাসন ক্যাম্পাসে আসবে না। তোদেরকে রক্ষা করবে কে? এই বলে তারা হামলা শুরু করে। এদিকে সংঘর্ষ শুরুর দীর্ঘ সময় পরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব, সেনা বাহিনীর সদস্য ও এপিবিএন, বিজিবি ও নৌ কন্টিনজেন্ট সদস্যরা কুয়েটে আসেন। এ সময় ছাত্ররা কুয়েটের মেইন গেট আটকে দিয়ে নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকে। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। দুপুর ১টায় সংঘর্ষ শুরুর দীর্ঘ চার ঘণ্টা পর বিকেল ৫টায় কেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাস্থলে এলো এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ কমিশনার মোহাম্মদ নাজমুল হাসান রাজিব বলেন, পরিস্থিতি অতি শিগগিরই নিয়ন্ত্রণে আসবে। আমার কুয়েটের ভিসি সহ সব পক্ষের সাথে কথা বলেছি। স্থানীয়দের সাথেও কথা হয়েছে। এঁটা আর বড় রূপ নিতে না পারে সেই চেষ্টা করছি।
এদিকে কুয়েটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর বহিরাগতদের সাথে নিয়ে ছাত্রদলের হামলার প্রতিবাদে রাত সাড়ে ৮টায় বিক্ষোভ সমাবেশ ডাক দিয়েছে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন।

উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের হামলা: স্বামীকে বাঁচাতে ঢাল হয়ে চিৎকার করছিলেন স্ত্রী
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, কিশোর গ্যাং চক্রটির সদস্যরা উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ভেতরে উচ্চশব্দে মোটরসাইকেলের হর্ন বাজিয়ে দ্রুত গতিতে চালাচ্ছিল। এ সময় তাদের মোটরসাইকেলে একটি শিশুকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করে। পাশ দিয়ে যাওয়া আরেকটি মোটরসাইকেলে ভুক্তভোগী দম্পতি এ ঘটনার প্রতিবাদ করলে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের লোকজন ডেকে রামদা দিয়ে কোপাতে থাকে। এ সময় ভুক্তভোগী নারীর চিৎকারে জড়ো হন লোকজন। একপর্যায়ে স্থানীয়রা কিশোর গ্যাংয়ের দুই সদস্যকে ধরে পিটুনি দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
ভুক্তভোগী নাসরিন আকতার ইপ্তি (২৮) উত্তরা পশ্চিম থানায় করা মামলায় বলেছেন, আমি টঙ্গীতে চাকরি করি তাই উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের ৯/এ রোডের সাত নম্বর বাড়িতে থাকি। সোমবার আমি মার্কেট করার জন্য স্বামীর সঙ্গে তার মোটরসাইকেলে বের হই। মার্কেট শেষে বাসায় ফেরার সময় রাত ৯টার দিকে উত্তরা পশ্চিম থানাধীন ৭ নং সেক্টরের ৯ নং রোডের বাসা নং-১০ এর সামনে রাস্তায় পৌঁছা মাত্র দুটি মোটরসাইকেলে ৩ জন ব্যক্তি আমার মোটরসাইকেলের দুই পাশ দিয়ে এলোমেলো ভাবে বিকট শব্দ করে যায়। টার্নিং ঘোরার সময় এদের মধ্যে একটি মোটরসাইকেল সামনের একটি রিকশাকে ধাক্কা দেয়। তখন রিকশায় ৪ বছরের একটি শিশু তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ছিল। শিশুটির বাবা রিকশা থেকে নেমে এসে ওই মোটরসাইকেল চালকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা শুরু করেন এবং একপর্যায়ে একটি থাপ্পড় মারেন। আমার স্বামী মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে আসামিদের বলে ভাই সরি বললেই তো হয়ে যায় এত ঝামেলা করার দরকার কি। তখন রিকশাসহ রিকশার যাত্রীরা চলে যায়। পরে মোটরসাইকেলে থাকা ৩ জন আসামি আমার স্বামীর সঙ্গে তর্কবিতর্ক শুরু করে। একপর্যায়ে আসামিরা আমার স্বামীকে এলোপাতাড়ি মারপিট করতে থাকে এবং বলে তুই আমাদের চিনিস? আমরা কে? এরকম বলে মোবাইল ফোনে তারা কথা বলতে থাকে। তখন আমরা দুইজন মিলে তিনজনের একজনকে ধরে ফেলি এবং তার মোটরসাইকেল আটকে দেই। আশপাশের কিছু লোক এসে আমাদের সহযোগিতা করেন। তখন আসামিরা দৌড়ে সামনের দিকে যায়। সেখানে ১০ জন রামদা হাতে নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত আশপাশের জনসাধারণের মধ্যে আতঙ্ক ও জনমনে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আমার স্বামী মেহেবুল হাসানকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। ওই সময় আমাদের সঙ্গে থাকা লোকজন ভয়ে দূরে সরে যায়। ওই দৃশ্য দেখে আমি আমার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে গেলে অজ্ঞাতনামা ১ জন আসামি আমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রামদা দিয়ে কোপ মারলে আমি আসামির কোপের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমার বাম হাত এগিয়ে দিলে উক্ত কোপ আমার বাম হাতের কনুইয়ের নিচে লেগে রক্তাক্ত জখম হয়। তখন আসামিরা আমার স্বামীকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ডান হাতে কনুইয়ের নিচে, বাম পাশের বগলের নিচে, ডান পায়ের গোড়ালিতে মারাত্মকভাবে জখম করে আহত অবস্থায় টেনে অপহরণের চেষ্টা করে।
আমার স্বামী তখন রক্তাক্ত অবস্থায় চিৎকার করে সাহায্য চাইলে আশেপাশের লোকজন ও থানা পুলিশের টহল টিম ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় মোবারক হোসেন ও রবি রায়কে গ্রেপ্তার করে। বাকি আসামিরা আজমপুরের দিকে পালিয়ে যায়। পরে আমি ও আমার স্বামীকে উপস্থিত লোকজন গুরুতর আহত অবস্থায় উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক আমার ও আমার স্বামীর অবস্থা গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেন। ঢাকা মেডিকেলে যাওয়ার পথে আরও অসুস্থ হলে আমাদের এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করা হয়। উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাফিজুর রহমান জানান, মোটরসাইকেলে উচ্চ শব্দ করে দ্রুত গতিতে যাওয়ার সময় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা একটি শিশুকে চাপা দেয়ার চেষ্টা করে। পাশ দিয়ে আরেকটি মোটরসাইকেলে যাওয়া দম্পতি প্রতিবাদ করে। এরপর কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের লোকবল ডেকে দম্পতির ওপর রামদা দিয়ে হামলা চালায়। এ ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া গতকাল আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাকিদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।

Friday, January 17, 2025
বেপরোয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘ইমন বাহিনী’ by সুদীপ অধিকারী
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধানমণ্ডি এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, ধানমণ্ডি ৪ নম্বর রোডের ৩৯ নম্বর বাড়ির ডাক্তার মল্লিক আব্দুল্লাহ’র ছেলে শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন।
আলোচিত চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলা এবং সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ ওরফে টিপু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ইমন। ১৯৯৮ সালের ১৮ই ডিসেম্বর বনানীর ১৭ নম্বর রোডের আবেদীন টাওয়ারে ট্রামস ক্লাবের নিচে সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী সেই সময় গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়, হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস আগে চলচ্চিত্র প্রযোজক ও ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর কথাকাটাকাটি হয়। এর প্রতিশোধ নিতে সোহেল চৌধুরীকে হত্যা করা হয়। ঘটনার রাতে সোহেল তার বন্ধুদের নিয়ে ট্রাম্পস ক্লাবে ঢোকার চেষ্টা করেন। তাকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেয়া হয়। রাত আড়াইটার দিকে আবারো তিনি ঢোকার চেষ্টা করেন। তখন সোহেলকে লক্ষ্য করে ইমন, মামুন, লিটন, ফারুক ও আদনান গুলি চালায়। এরপর থেকেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে আলোচিত হয়ে ওঠে ইমন। নিজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী পাং বাবুসহ একাধিক হত্যাকাণ্ডের পর ২০০৪ সালে র?্যাবের ধাওয়া খেয়ে কলকাতায় পালিয়ে যায় ইমন। ঢাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা চাওয়ার পর ফোনের সূত্র ধরে বাংলাদেশের সিআইডি পুলিশ কলকাতা পুলিশকে বিষয়টি জানালে ২০০৭ সালের ৮ই ডিসেম্বর কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি ফ্ল্যাট থেকে কলকাতা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। ২০০৮ সালের ৭ই মার্চ কলকাতা পুলিশ ইমনকে বাংলাদেশ পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। সেই থেকেই মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও থানার আটটি মামলায় কুমিল্লা জেলা কারাগারে বন্দি ছিলেন পুলিশের তালিকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন। সর্বশেষ ২০২২ সালের ১১ই এপ্রিল তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। জেলে থেকেই তিনি পুরো এলাকার সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলেন। তিনি জেলে থাকলেও তার বাহিনীর সদস্যরা সক্রিয় ছিল। কেউ বাড়ি নির্মাণ করলেই বাহিনীর সদস্যরা মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে চাঁদা দাবি করতো। শুধু চাঁদাবাজি নয় জেলে বসেই একাধিক হত্যাকাণ্ডও চালিয়েছে এই ইমন। স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে ২০২৩ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় নিজের একসময়ের বন্ধু শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুনের ওপর নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় ইমন। সেই গুলি লেগে মোটরসাইকেল আরোহী ভুবন চন্দ্র শীলের মৃত্যু হয়। এর আগে ২০১৩ সালে ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি আফজাল হোসেন সাত্তার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও কারাগারে থেকেই ইমনের নাম আসে। দীর্ঘ ১৭ বছর কারাগারে থাকার পর গত জুলাই বিপ্লবের পর ১৫ই আগস্ট দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পায় অপরাধ জগতের ক্যাপ্টেন ইমন।
যেভাবে ময়লার ব্যবসা দখলে নেয় ইমন বাহিনী: পশ্চিম ধানমণ্ডির এক নারী বলেন, আমরা এই এলাকায় ২০ বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের বাসাবাড়ি থেকে ময়লা টানছি। সিটি করপোরেশনের কাগজপত্র সব আছে আমাদের। এরপরও যে দল যখন ক্ষমতাই আসে তখন তাদের ওয়ার্ড নেতাদের মাসোয়ারার একটা ভাগ দিতে হয়। কিন্তু ৫ই আগস্টের পর কয়েকজন লোক এসে নিজেদের ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে আমাদের বলেন- আজ থেকে এই এলাকার ময়লার ব্যবসা ইমন ভাইয়ের। তোমরা এখন থেকে কর্মচারী। মাস গেলে বেতন পাবে। আর টাকা আমরা উঠাবো। ষাটোর্ধ্ব এই নারী বলেন, আমরা ছিলাম মালিক আর এখন আমরা হয়ে গেছি কামলা (কর্মচারী)। সব কাজ আমরা করি আর বাসাবাড়ি থেকে স্লিপ দিয়ে টাকা তোলে ইমনের লোক। বেতন তো ঠিকমতো দেয়ই না। উল্টো দুই মাসে ৩০ হাজার টাকা কেটে নিয়েছে। প্রতিটি এলাকাতেই ইমনের লোক ময়লার ব্যবসা দখলে নিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা গরিব মানুষ। আমাদের ওপর এসব নির্যাতনের কথা যার কাছে বলতে যাই- সেই বলে- চুপ থাকো, এরা ভালো মানুষ না। জানে মেরে ফেলবে। কাজ করে খাচ্ছো- এটাই অনেক। থানা পুলিশও এই ইমন বাহিনীর বিরুদ্ধে কথা বলতে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেও জানান ময়লা ব্যবসায়ী।
ভবন নির্মাণে চাঁদাবাজি: ধানমণ্ডি, জিগাতলা, এলিফ্যান্ট রোড, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, তেজগাঁও ও মোহাম্মদপুর এলাকার অংশবিশেষ এলাকায় নতুন ভবন নির্মাণের সময়ে চাঁদা আদায়ে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় ইমনের নাম। ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হলেই সেখানে গিয়ে ২০/৩০টি মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেয় ইমনের লোকজন। তাদের দাবি করা চাঁদার টাকা না দিয়ে কাজ শুরু করতে পারে না ব্যক্তি বা রিয়েল এস্টেট কোম্পানির লোক। এমনই এক ভুক্তভোগী ধানমণ্ডি-১৯ নম্বর স্টার কাবাবের পেছনের রাস্তার এক ভবন মালিক। পুরাতন ভবন ভেঙে কোম্পানির মাধ্যমে নতুন ভবন নির্মাণ করছেন তিনি। প্রাণ ভয়ে নিজের নাম প্রকাশ না করলেও তিনি বলেন, আমি এখানে গত বছর থেকে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। মাসখানেক আগে সন্ধ্যা বেলা হঠাৎ ৩০/৪০টা মোটরসাইকেল নিয়ে একদল যুবক এসে হাজির। তারা আমার শ্রমিকদের কাজ বন্ধ করতে বলে আমাকে খবর দিতে বলে। আমি অন্য কাজে তখন বাইরে ছিলাম। তারা নিজেদের শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের লোক দাবি করে আমার কাছে সিকিউরিটি মানি হিসেবে চাঁদা দাবি করে। আমি তাদেরকে বলি আমার কাছে কোনো টাকা নেই। আমি চাঁদা দিতে পারবো না। তখন আমাকে বলা হয়- চাঁদা না দেয়া পর্যন্ত একটা ইটও গাঁথা যাবে না। এমন কী আমাকে হত্যার হুমকিও দেয়া হয়। আমি তাই ভয়ে আপাতত কাজ বন্ধ রেখেছি। তিনি বলেন, আমি আশপাশের অনেক ভবন মালিকের সঙ্গে কথা বলেছি- ইমন বাহিনীর সদস্যদের নাকি চাঁদা না দিয়ে কেউ এই এলাকায় কাজ করতে পারে না।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি: ধানমণ্ডি এলাকার ছোট থেকে শুরু করে বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের নামে ওঠে মাসিক চাঁদা। তার লোকজনকে চাঁদা না দিয়ে দোকান খুলতে পারে না কেউ। পশ্চিম ধানমণ্ডির রায়ের বাজারের ফিরোজ নামে এক দোকান মালিক বলেন, গত আগস্ট মাসেই ইমনের লোকজন এসে আমাদের বলে গেছে- সকলকে চাঁদা দিতে হবে। তা না হলে কেউ বাজারে ব্যবসা করতে পারবে না। তিনি বলেন, শুধু এই বাজার নয় আশপাশের সব ব্যবসায়ীকেই ইমন বাহিনীকে চাঁদা দিতে হয়। মার্কেট, শপিংমল থেকে শুরু করে বাজার কমিটি সবই তার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। আর চাঁদার টাকা না দেয়ার জন্যই সব শেষ মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের দুই ব্যবসায়ী এলিফ্যান্ট রোড কম্পিউটার সোসাইটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এহতেশামুল হক ও সভাপতি ওয়াহিদুল হাসান দীপুকে সকলের সামনে রাস্তায় ফেলে এলাপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে ইমনের লোকজন।
এসব বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) রমনা জোনের উপ-কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, সন্ত্রাসী যত ক্ষমতাশালীই হোক না কেন আমরা কাউকে ছাড় দিবো না। অভিযোগ পেলে পুলিশ অবশ্যই ব্যবস্থা নিবে। এলিফ্যান্ট রোডের ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি মাসখানেক আগের মাল্টিপ্ল্যান সেন্টারের কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটি বিরোধ চলছিল। সে কারণে অথবা অন্যকোনো কারণেও দুই ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে আহত করা হতে পারে। তবে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নিউমার্কেট থানায় করা মামলায় দাবি করা হয়েছে- ইমন বাহিনীর দাবিকৃত চাঁদার টাকা না দেয়ায়ই মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রকাশ্যে দুই ব্যবসায়ী নেতাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানো হয়। আমরা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। অভিযুক্তদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। ডিএমপি’র গোয়েন্দা দক্ষিণ বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, আমরা মূলত পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে থাকি। যেখানে যেই গোয়েন্দা তথ্য পাই সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিই। আমাদের সেই গোয়েন্দা তথ্যে আন্ডারওয়ার্ল্ড বা ওপেন যারা আছে তাদের কারোর বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
এ বিষয়ে ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, কেউ অবৈধ কোনো কাজ করলে ইমামুল হাসান ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমনসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী সে যেই হোক তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আসতে হবে। তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, ছিনতাইকারী, চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের ধরতে গোয়েন্দা পুলিশের অভিযান ২৪ ঘণ্টা অব্যাহত রয়েছে। কোনো অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতে ব্যক্তিগতভাবে তিনি রক্তচক্ষুকে ভয় পান না বলেও জানান।

Sunday, December 15, 2024
বিরোধীদের সন্ত্রাসবাদী হিসেবে প্রচার করেছে আওয়ামী লীগ -মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের রিপোর্ট

Friday, December 13, 2024
হেলমেট বাহিনীর যুগের অবসান হয়েছে
সাংবাদিকদের সঙ্গে পুলিশ সদস্যদের খারাপ আচরণ, মারধর ও গুলির বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার বলেন, আমরা তো সেবা করতে চাই। সাংবাদিকদের ওপর হামলা কেন করবো? শুধু সাংবাদিক কেন- কোনো মানুষকেই তো পুলিশ নির্যাতন বা হামলা করতে পারে না। আমার পুলিশ সদস্যরা সব সময় ডিসিপ্লিনে থাকবে, হামলা-মামলা বা কারও সঙ্গে খারাপ আচরণ বা অপেশাদার আচরণ কেন করবে? এরকম কোনো ঘটনা যদি ঘটে তাহলে আমার নজরে আনবেন- আমি তদন্ত করবো, ব্যবস্থা নেবো। ডিএমপি ও ক্র্যাবের পারস্পরিক সহায়তা ছাড়া কেউ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তাই আমরা ক্র্যাবের সহায়তা চাই। গত জুলাই-আগস্টে ধ্বংসযজ্ঞ, নানা ধরনের ক্ষতিকর কার্যাবলীর জন্য ডিএমপি কমিশনার হিসেবে ঢাকাবাসীর কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, আমরা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদস্যবৃন্দ নতুন করে ঢাকাবাসীকে সেবা দেয়ার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছি। জুলাই-আগস্টের ঘটনার পর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অনেকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় ঢাকাবাসীর জীবন ও সম্পদ অনিরাপদ হয়ে যায়। আমি ঢাকাবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই, আমার সহকর্মীদের নিয়ে সবার সহযোগিতায় ঢাকাবাসীর জান-মালের হেফাজত করে যাবো। ইতিমধ্যে আমি আমার সহকর্মীদের মেসেজ দিতে সক্ষম হয়েছি যে, আগের মতো আর ঢাকাবাসী সেবা প্রদানে কার্পণ্য করবে না। তিনি বলেন, আগামী ১৬ই ডিসেম্বর, ২৫শে ডিসেম্বর ও ইংরেজি নববর্ষকে কেন্দ্র করে অনেক জায়গায় বহু মানুষের সমাগম হবে। আমি আশা করি, অনেক আনন্দের সঙ্গে নিরাপদভাবে এ দিনগুলো উদ্যাপন করবেন। এখন পর্যন্ত এসব দিনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি নেই, কোনো আশঙ্কা নেই। আয়োজিত অনুষ্ঠানে ক্র্যাব পরিবারের ছয় সদস্যের সন্তানকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ায় বৃত্তি দেয়া হয়। এ ছাড়া ক্র্যাবের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ১০টি ইভেন্টে ৩২ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। এ সময় ব্যক্তিগত খাত থেকে ৩০ হাজার টাকা ক্র্যাব সদস্যদের সন্তানের বৃত্তির জন্য দেন ডিএমপি কমিশনার। ক্র্যাবের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম মানিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসি’র সিনিয়র নির্বাহী পরিচালক এফএম ইকবাল বিন আনোয়ার ডন, ডিআরইউ সভাপতি আবু সালেহ আকন। আরও উপস্থিত ছিলেন, ক্র্যাব সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম, যুগ্ম সম্পাদক দিপন দেওয়ান প্রমুখ।

Tuesday, August 27, 2024
সচিবালয় পরিস্থিতি জাগ্রত ছাত্রসমাজ মোকাবিলা করেছে
জাগ্রত ছাত্রসমাজ যারা স্বৈরাচরের পতন ঘটিয়েছে, তাদের অপরিসীম ত্যাগের ভূমিকায় পুরো পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে। যেই ছাত্ররা স্বৈরাচরের পতন ঘটিয়েছে যারা আমাদের স্বপ্ন এবং যাদের ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হিসেবে দেখি তাদেরকে রাস্তায় ফেলে কীভাবে নির্মমভাবে মেরেছে। আপনারা তাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখেছেন। তিনি বলেন, আমাদের ছাত্রদের ওপর, সমন্বয়কদের ওপর, বিশেষ করে হাসনাতের ওপর যে বর্বর হামলা হয়েছে তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে খোঁজ নিতে এসেছি। সাধারণ মানুষকেও গুরুতরভাবে আহত করা হয়েছে। দু’জনকে অপারেশন করার প্রয়োজন হবে। হাসনাতের অবস্থা এখন মোটামুটি ভালো আছে। আইন উপদেষ্টা বলেন, আমরা মনে করি কাল আনসার বাহিনীর ছদ্মবেশে যারা এসেছিল কোনো দাবি আদায় তাদের এজেন্ডা ছিল না। দাবি আদায় হয় আলাপ-আলোচনার মধ্যদিয়ে। তারা বারবার আলাপ-আলোচনা করে সম্মত হয়ে ফিরে গেছে এবং বারবার আমাদের ঘিরে ফেলেছে। লাঠি তাদের স্টকে ছিল- আপনারা দেখছেন তারা মারমুখীভাবে ছাত্রদের ওপর নির্যাতন করেছেন। তিনি বলেন, এর আগেও আন্দোলনের সময় যারা আহত হয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ চোখে আঘাত পেয়েছেন। এমনকি একজনের একটি চোখ পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। তাদের সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা আমাদের নেই। এ সময় তিনি জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেলে প্রায় দুই হাজার ব্যক্তি চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে ৮০০ জনকে ভর্তি দেয়া হয়েছিল। বর্তমানে হাসপাতালে ১০০ জন গুলিবিদ্ধ আহতসহ চিকিৎসাধীন রয়েছে। এ ছাড়া নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ৯ জন রয়েছেন। আইসিইউতে যারা রয়েছেন তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। হাসপাতালে যারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন তাদের চিকিৎসা সম্পূর্ণ ফ্রি করা হবে। অনেক ওষুধ সরকারিভাবে সাপ্লাই হয় না। সেগুলোও আমরা তাদের দিয়ে চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থা করেছি। ঢামেক হাসপাতালে আহতরা যেন সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবা পায় সেজন্য তাদের ডেডিকেটেড আলাদা ওয়ার্ড করা হয়েছে।
Monday, August 26, 2024
শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর গুলিবর্ষণের ভিডিও নিয়ে তোলপাড়
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের একপর্যায়ে সরকার পদত্যাগের আন্দোলনে রূপ নেয়। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয় এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। সরকার পতনের পর শামীম ওসমান ও তার সহযোগীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন।
এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় ১৯শে জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জে অনেকগুলো হতাহতের ঘটনা ঘটে। নিহতের ঘটনায় শেখ হাসিনা, স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নামে বেশ কয়েকটি হত্যা মামলা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৯শে জুলাই বিকালে শহরের চাষাঢ়া বঙ্গবন্ধু সড়কে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র অবস্থায় মিছিল বের করে। একটি উঁচু ভবনের উপর থেকে মুঠোফোনে ২৯ সেকেন্ডের ভিডিওটি ধারণ করা।
ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, শামীম ওসমান ও তার কয়েক শতাধিক অনুসারী আগ্নেয়াস্ত্র ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে শহরের চাষাঢ়া এলাকা থেকে বঙ্গবন্ধু সড়কে শহরের ২ নম্বর রেলগেট এলাকার দিকে ধাওয়া দিচ্ছে। সেখানে শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ (টিটু) গুলি ছোড়ে।
দুটি আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছিল টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসি নিউজ ও যুগান্তর পত্রিকার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজু আহমেদ। আরও ছিল, শামীম ওসমানের আত্মীয় (অয়ন ওসমানের শ্বশুর) ফয়েজ উদ্দিন লাভলু, তার ছেলে মিনহাজুল ইসলাম ভিকি ও শীতল পরিবহন বাসের পরিচালক অনুপ কুমার সাহা, ১২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নিয়াজুল ইসলাম, মহানগর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন ভূঁইয়া সাজনু প্রমুখ। মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ও তার ছেলে এমআরকে রিয়েনও গুলি চালিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মহড়ায় শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমান, মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসমাইল রাফেল প্রধান, মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি মেহেদী হাসান সম্রাট, সাধারণ সম্পাদক রাসেল প্রধান উপস্থিত ছিল। তারা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা। দেশ রূপান্তর পত্রিকার জেলা প্রতিনিধি কমল খানকেও অস্ত্রের মহড়ায় দেখা যায়। গুলি করে শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়নের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছাত্রলীগ নেতা কাউসার আহমেদও।
১৯শে জুলাই শামীম ওসমানের নেতৃত্বে গুলি চালানোর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বেশ কয়েকজন সাংবাদিক। তারা জানান, সেদিনের পরিস্থিতি ছিল ভীতিকর। ওই পরিস্থিতিতে ছবি ও ভিডিওধারণের কোনো সুযোগ ছিল না। ভিডিওধারণ করতে গিয়ে একজন সাংবাদিক মারধরেরও শিকার হন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বঙ্গবন্ধু সড়কের চাষাঢ়া থেকে মণ্ডলপাড়া মোড় পর্যন্ত শামীম ওসমান ও তার বাহিনী কয়েক দফায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। এই সময় শতাধিক গাড়ির বহর ব্যবহার করে তারা। তারা গাড়ি নিয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের জালকুড়ি এলাকাতেও আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। এ ছাড়া চাষাঢ়া-আদমজী চিটাগাংরোড সড়ক দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জেও মহড়া দেয়।
ওদিকে ১৯শে জুলাই জুমার নামাজের পর যখন শামীম ওসমান তার বাহিনী নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর মুহুর্মুহু গুলি ছোড়েন তখন বঙ্গবন্ধু সড়কের নয়ামাটি এলাকার চারতলা ভবনের ছাদে খেলছিল ছয় বছর বয়সী রিয়া গোপ। রিয়ার বাবা ব্যবসায়ী দীপক কুমার গোপ সাংবাদিকদের তখন জানিয়েছিলেন, ‘গুলির শব্দ শুনে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে মেয়েকে আনতে ছাদে যান। ছাদ থেকে শিশুকন্যাকে কোলে নেয়ার পরই রিয়ার মাথার পেছনের দিকে একটি গুলি লাগে। রক্তে ভেসে যায় দীপক কুমারের হাত।’ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর ২৪শে জুলাই হাসপাতালে মারা যায় রিয়া।
বঙ্গবন্ধু সড়কে শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর গুলি করার ভিডিওটি নিজের ফেসবুক একাউন্টে শেয়ার করেছেন সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বিও। ভিডিওর ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ১৯শে জুলাই ২০২৪, শুক্রবার বিকালে নারায়ণগঞ্জ শহরে শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর অস্ত্রসন্ত্রাস। যোগাযোগ করা হলে রফিউর রাব্বি জানান, ১৯শে জুলাই শামীম ওসমান ও তার বাহিনীর গুলিতেই শিশু রিয়া গোপ নিহত হয়। তিনি বলেন, ঘটনার দিন ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে ছিল না। তখন শামীম ওসমান তার সন্ত্রাসী বাহিনীকে নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর অসংখ্য গুলি ছুড়েন। প্রশাসনের অনুপস্থিতিতে মুহুর্মুহু গুলি ছোড়ার বিষয়টি থেকে বোঝা যায়, শামীম ওসমানদের গুলিতেই রিয়া গোপ মারা গেছে। এই বিষয়ে প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নারায়ণগঞ্জের সমন্বয়ক ফারহানা মানিক বলেন, ওই দিন (১৯শে জুলাই) ওই এলাকায় কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না। কার গুলিতে রিয়া গোপের মৃত্যু হলো, সেটি প্রশাসনকে খুঁজে বের করতে হবে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান ও তাদের অনুসারী শাহ নিজামের নামে অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আমীর খসরু গণমাধ্যমকে জানান, অস্ত্রের মহড়া দিয়ে গুলি করার ভিডিওটি আমাদের নজরে এসেছে। সেখানে কারা, কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লাইসেন্সকৃত বৈধ অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করে থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। গুলিবিদ্ধ হয়ে শিশু রিয়া গোপের মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেদিন ওই এলাকায় কোনো পুলিশ সদস্য ছিলেন না। কার গুলিতে রিয়া গোপের মৃত্যু হয়েছে, সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
দুই সাংবাদিক বরখাস্ত: ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে শনিবার রাতে দৈনিক যুগান্তর ও ডিবিসি নিউজ কর্তৃপক্ষ নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি রাজু আহমেদকে বরখাস্ত করেন। ডিবিসি নিউজ কর্তৃপক্ষ ও যুগান্তর কর্তৃপক্ষ তাদের অনলাইনে প্রকাশিত সংবাদে বলেন, একটি জাতীয় দৈনিক সংবাদপত্রে প্রচারিত প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হলে পেশাবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই আদেশ ২৪শে আগস্ট থেকে কার্যকর করেছে কর্তৃপক্ষ।
ওদিকে রোববার দুপুরে দেশ রূপান্তরের নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি মো. মোবারক হোসেন খান কমল (কমল খান)কে বরখাস্ত করা হয়। সাংবাদিকসুলভ আচরণের পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে বলে পত্রিকাটি তাদের অনলাইনে প্রকাশ করেন। এই আদেশ ২৫শে আগস্ট ২০২৪ থেকে কার্যকর করেছে কর্তৃপক্ষ।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (1972)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...





