Showing posts with label আনোয়ার হোসেন. Show all posts
Showing posts with label আনোয়ার হোসেন. Show all posts

Tuesday, January 28, 2025

রেলওয়ে কর্মীরা কী চান, কর্তৃপক্ষ কী ভাবছে by আনোয়ার হোসেন

ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত কর্মচারীরা বাড়তি সময় কাজ করেন। তাই তাঁদের এক মাসের দায়িত্ব দুই মাস কিংবা এর চেয়ে বেশি সময় কাজ করেছেন ধরে বেতন হিসাব করার রীতি ব্রিটিশ আমল থেকেই। এসব কর্মচারী অবসরের পর পেতেন বাড়তি সুবিধা। বিশেষ এই সুবিধা পুরোপুরি দেওয়া না-দেওয়া নিয়ে অচল হয়ে পড়েছে সরকারের গণপরিবহন রেলওয়ে।

গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকে ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত কর্মচারীরা কর্মবিরতি শুরু করেছেন। রেলের ভাষায়, এসব কর্মচারী রানিং স্টাফ । ফলে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই জটিলতার শুরু ২০২২ সালে। তখন অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়ে দেয় যে, রেলের রানিং স্টাফরা যে বাড়তি সুবিধা পান তা আর দেওয়া হবে না। অবশ্য পরে রানিং স্টাফ, রেল কর্তৃপক্ষ ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দর-কষাকষির মাধ্যমে কিছু সুবিধা ফিরে পান রানিং স্টাফরা। কিন্তু এখন ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা সুবিধা পুরোপুরি পুনর্বহাল চান রানিং স্টাফরা। এ দাবিতেই কর্মবিরতি চলছে। রেল কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সুরাহা করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত কোনো সুরাহা আসেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রানিং স্টাফরা ট্রেন পরিচালনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে চালকেরা কাজ না করলে ট্রেন চালানোর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে রেল কর্তৃপক্ষ রানিং স্টাফদের বিষয়ে কঠোর হতে পারছে না। বরং তাঁদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল রেল কর্তৃপক্ষ, এমনকি রেলপথ মন্ত্রণালয়ও।

কিন্তু রানিং স্টাফদের অভিযোগ, অর্থ মন্ত্রণালয়কে রাজি করিয়ে দাবি বাস্তবায়নে যথেষ্ট ভূমিকা রাখছে না রেলপথ মন্ত্রণালয়। রেল কর্তৃপক্ষের এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে চাইছেন রানিং স্টাফরা।  

রানিং স্টাফদের দাবি কী

রানিং স্টাফরা হলেন, ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত পরিচালক (গার্ড), ট্রেনচালক (লোকোমাস্টার), সহকারী চালক ও টিকিট পরিদর্শক (টিটিই)। এরা ট্রেন চালানোর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এ ধরনের কর্মী রয়েছেন প্রায় দুই হাজার। তাঁরা সাধারণত দীর্ঘসময় ট্রেনে দায়িত্বপালন করে থাকেন। ট্রেন চালক ও সহকারী চালকের সংখ্যা এক হাজারের কিছু বেশি। পরিচালক ও টিটিই মিলিয়ে রানিং স্টাফের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯০০ জনের মতো।

দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বেসিকের (মূল বেতন) হিসেবে বাড়তি অর্থ পেতেন তাঁরা। যাকে রেলওয়ের ভাষায় বলা হয় মাইলেজ। মাইলেজ রানিং স্টাফদের বেতনেরই অংশ মনে করা হয়। প্রতি ১০০ কিলোমিটার ট্রেন চালালে রানিং স্টাফরা মূল বেতনের এক দিনের বেসিকের সমপরিমাণ টাকা অতিরিক্ত পেতেন। ৮ ঘণ্টায় এক দিনের কর্মদিবস ধরলে রানিং স্টাফদের প্রতি মাসে কাজ দাঁড়ায় আড়াই বা তিন মাসের সমপরিমাণ।

এ ছাড়া অবসরের পর বেসিকের সঙ্গে এর ৭৫ শতাংশ অর্থ যোগ করে অবসরকালীন অর্থের হিসাব হতো। তবে ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর এই সুবিধা সীমিত করে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই সময়ের পর নতুন করে নিয়োগ পাওয়া কর্মীরা পুরোনোদের চেয়ে আরও কম সুবিধা পাবেন বলেও সরকার সিদ্ধান্ত নেয়।

২০২২ সালের পর নিয়োগপত্রে দুটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া কর্মীরা চলন্ত ট্রেনে দায়িত্বপালনের জন্য রানিং অ্যালাউন্স ছাড়া অন্য কোনো ভাতা পাবেন না এবং মাসিক রানিং অ্যালাউন্সের পরিমাণ মূল বেতনের চেয়ে বেশি হবে না। এ ছাড়া অবসরে যাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বশেষ আহরিত মূল বেতনের ভিত্তিতে পেনশন ও আনুতোষিক পাবেন।

শুরুতে পুরোনো রানিং স্টাফরা সুযোগ-সুবিধা আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। একপর্যায়ে নতুন নিয়োগ পাওয়া রানিং স্টাফদেরও আন্দোলনে ভিড়িয়ে নেয় পুরোনোরা। প্রথমে বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ও শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের মাধ্যমে আন্দোলন করে। পরে বাংলাদেশ রেলওয়ে রানিং স্টাফ ঐক্য পরিষদের নামে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন করছেন তারা।

গত ২২ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে মাইলেজের ভিত্তিতে পেনশন ও আনুতোষিক প্রদান এবং নিয়োগপত্রের দুই শর্ত প্রত্যাহারসহ বিভিন্ন দাবি জানান রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। তা না হলে ২৮ জানুয়ারি থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধের হুঁশিয়ারি দেন। এর ধারাবাহিকতায় গত সোমবার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম রানিং স্টাফদের বৈঠকে ডাকেন। কিন্তু তাঁরা শর্ত দেয় যে, আগে দাবি মানতে হবে। নতুবা বৈঠকে বসবেন না। পরে বিকেল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রানিং স্টাফদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। কিন্তু কর্মবিরতির বিষয়ে অনড় থাকেন রানিং স্টাফের নেতারা।

এর আগে ২০২২ সালে ১৩ এপ্রিল কর্মবিরতি পালন করলে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়েছিল। পরে রেল কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল। এরপর কয়েক দফা দাবি উপস্থাপন করেছেন রানিং স্টাফরা। রেল কর্তৃপক্ষও অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে এবং বৈঠক করেছে। কিন্তু কোনো সুরাহা সম্ভব হয়নি।

রানিং স্টাফ ঐক্য পরিষদের ঢাকা বিভাগের আহ্বায়ক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব মিলে যদি সিদ্ধান্ত জানায় যে, আগামী সাত দিনের মধ্যে বিষয়টির সুরাহা করা হবে তাহলেই তারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করবেন। তিনি জানান, দাবি-দাওয়া নিয়ে তারা রেলপথ মন্ত্রণালয়কে বিভিন্ন সময় ৯৪টি চিঠি দিয়েছেন। ১৭ বার বৈঠক করেছেন। কিন্তু সংকট নিরসনে আন্তরিক নয় তারা। প্রতিবারই কর্মবিরতি ডাকার পর শেষ মুহূর্তে বৈঠক ডাকা হয়।

রেল কর্তৃপক্ষের অবস্থান

রেলওয়ে সূত্র জানায়, প্রথমে অর্থ মন্ত্রণালয় রানিং স্টাফদের বিশেষ সুবিধার পুরোটাই বাতিল করে দিয়েছিল। তাদের বক্তব্য হচ্ছে—সরকারের আর অন্য কোনো কর্মচারীরা এই সুবিধা পায় না। সুতরাং রেলের জন্য বিশেষ সুবিধা বহাল রাখা যাবে না।

কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানায় যে, রেল ২৪ ঘণ্টা সেবা দেয়। রানিং স্টাফদের কাজও ২৪ ঘণ্টা। তাদের সাপ্তাহিক ছুটিও বাতিল করা হয়। এ ছাড়া সামরিক বাহিনীসহ অন্য কিছু বিশেষায়িত দপ্তরের কর্মচারীরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকে। তাই বহাল রাখা হোক। এরপর অর্থ মন্ত্রণালয় প্রথমে মাইলেজ সুবিধা পুনর্বহাল করে। কিন্তু পেনশনের পর বাড়তি সুবিধা বাতিল এবং নতুনদের জন্য সুবিধা কিছুটা কমানোর সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

রেলওয়ে সূত্র বলছে, রানিং স্টাফদের দাবির বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষ আন্তরিক। রেলপথ মন্ত্রণালয়কে তারা বিষয়টি নানাভাবে বুঝিয়েছে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়কে রাজি করানো যাচ্ছে না।

আগামী শুক্রবার টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা শুরু হচ্ছে। প্রতিবার বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে বাড়তি ট্রেন পরিচালনা করে থাকে রেলওয়ে। এবার ঠিক ইজতেমার আগে কর্মবিরতিতে গিয়ে সরকারের গণপরিবহন সেবাকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

রেলওয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও রানিং স্টাফদের সূত্র বলছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ দিয়ে অনেকেই দাবি আদায় করছে। রেলের রানিং স্টাফদের কর্মবিরতির পেছনে এই চিন্তা থাকতে পারে। এটাও সত্য যে, অর্থ মন্ত্রণালয় দীর্ঘদিন ধরেই বিষয়টি ঝুলিয়ে রেখেছে। ফলে ইজতেমাকে সামনে রেখে রানিং স্টাফেরা কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। এবার আলোচনার জন্য বৈঠকে ডাকা হলেও এড়িয়ে যাচ্ছেন রানিং স্টাফ আন্দোলনের নেতারা। এ অবস্থায় জটিলতা আরও বাড়ছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আজ সকালে কমলাপুর রেল স্টেশনে পরিদর্শনে যান। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দাবি-দাওয়া পূরণ রেল বিভাগের হাতে নেই। এটা অর্থ বিভাগের হাতে। আমরা অর্থ বিভাগের কাছে এটা তুলেছি। অর্থ বিভাগ এটা অনেকাংশে এটা পূরণ করে দিয়েছে। দরকার হলে আমরা বাকিটা নিয়েও তাদের সঙ্গে আলোচনা করব। তিনি কর্মবিরতি প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে বলেন, এটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে কিন্তু রেল বন্ধ করতে পারে না। এতে সাধারণ মানুষ কষ্ট পাচ্ছে।

দাবি পূরণে কর্মবিরতিতে রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। ফলে গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ। কমলাপুর স্টেশন, ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি
দাবি পূরণে কর্মবিরতিতে রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। ফলে গতকাল সোমবার মধ্যরাত থেকে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ। কমলাপুর স্টেশন, ঢাকা, ২৮ জানুয়ারি ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

Saturday, January 2, 2016

পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এমন ফলই চেয়েছিল by আনোয়ার হোসেন

বিএনপিসহ অন্যদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে অর্জিত ফলকে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় মনে করছে আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি অধ্যুষিত বলে পরিচিত কিছু এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধানকে কিছুটা বিব্রতকর মনে করছেন কোনো কোনো নেতা। এখন আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য, নির্বাচন নিয়ে যাতে বিতর্ক তৈরি না হয় তা দেখা।
নির্বাচন তদারক-সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতার সঙ্গে কথা বলে এই মনোভাব জানা গেছে। নিজস্ব জরিপ পর্যালোচনা করে ভোটের আগেই আওয়ামী লীগ বলেছিল যে দুই শতাধিক পৌরসভায় তাদের প্রার্থীরা এগিয়ে।
নির্বাচনের আগে পুলিশের এক গোপন জরিপে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ১২৮ এবং বিএনপির প্রার্থীরা ৪৯টি পৌরসভায় এগিয়ে আছেন। বিএনপি যে ২২টি পৌরসভায় জিতেছে তার অধিকাংশই এই জরিপে এসেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন করে দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বিএনপিকে পৌর নির্বাচনের ফল মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ফল প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দিয়ে বিএনপি প্রকারান্তরে জনগণের রায়কে অপমান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা অনুরোধ করব, এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন, ফল মেনে নেন।’ তিনি আরও বলেন, এই নির্বাচনে জনগণ এমন বার্তা দিয়েছে যে তারা বাংলাদেশে পাকিস্তানি প্রেতাত্মার কোনো রাজনৈতিক দলকে দেখতে চায় না। বিএনপিকে জনগণের এই মনোভাব ভালোভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভোট গণনা পর্যন্ত বিএনপিকে নির্বাচনে রাখতে চেয়েছিল সরকার। নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনও ছিল অগ্রাধিকার। এর দুটিই অর্জিত হওয়ায় ফুরফুরে আওয়ামী লীগ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে বিদেশিদের কাছে বিএনপির একমাত্র বক্তব্য ছিল, তারা মানুষের কাছে খুব জনপ্রিয়। এ জন্যই পৌরসভা নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করে বিএনপির এ বক্তব্যের ফয়সালা চেয়েছিল সরকার।
পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অর্জন কী? ভোট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মাহবুব উল আলম হানিফকে এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে প্রমাণ করেছে যে বর্তমান সরকার বৈধ। এই রাজনৈতিক দলটি (বিএনপি) সরকারকে মানে না। নির্বাচন কমিশনকে মানে না। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে পৌরসভা নির্বাচন করতে বাধ্য হয়েছে তারা। এই নির্বাচনে এটাই আওয়ামী লীগের বড় অর্জন।’
ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগের বিষয়ে হানিফ বলেন, ‘বিএনপি যদি নির্বাচনকে সত্যিকার অর্থে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিত, তাহলে তাদের সব পর্যায়ের নেতারা প্রচারে অংশ নিত। তাদের এই সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা সেটা কাজে লাগায়নি। খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদের সংখ্যা নিয়ে যে কটাক্ষ করেছেন, তাতে দেশের জনগণ তাদের ওপর চড়াও হতে পারে, এই ভয়ে কেউ এজেন্ট না হলে এর দায়ভার তো আওয়ামী লীগের না।’
বিএনপির ভবিষ্যৎ আন্দোলন পরিকল্পনা সম্পর্কে হানিফ বলেন, গত ৫ জানুয়ারির আন্দোলনের সহিংসতা ও জনগণের শিক্ষা তাদের মনে থাকলে তারা সন্ত্রাস করার জন্য মাঠে নামবে না। আর নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করার সাংগঠনিক শক্তিও দলটির নেই। বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বিএনপি একটি মাজাভাঙা রাজনৈতিক দল, মেরুদণ্ড ভাঙা দল, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার মতো সাংগঠনিক শক্তিও নেই।’
বিপুল বিজয়ে ফুরফুরে ভাব থাকলেও কিছু কিছু পৌরসভায় জয়-পরাজয়ের ব্যবধান অনেক বড় হওয়ায় কিছুটা বিব্রত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা। নির্বাচন তদারকের দায়িত্বে নিয়োজিত একাধিক নেতা বলেন, ঢাকা বিভাগ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, রংপুর বিভাগ, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের বেশির ভাগ পৌরসভায় ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া ভালো ছিল। কিন্তু চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের বেশির ভাগ ও অন্য কিছু পৌরসভায় অতি উৎসাহী হয়ে ব্যাপক জোর-জবরদস্তি করেছে। ফলে বিএনপির ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকাগুলোতেও দলটির মেয়র প্রার্থীরা ১০ শতাংশের কম ভোট পেয়েছেন, যা অনেকের মনে প্রশ্নের জন্ম দেবে।
বিদ্রোহীদের ভালো ফল: নানা চাপ প্রয়োগের পরও ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগের ১৭ জন বিদ্রোহী মেয়র পদে নির্বাচিত হয়েছেন। দলটির নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় মন্ত্রী-সাংসদের মদদের কারণেই অধিকাংশ বিদ্রোহী জয়ী হয়েছেন। তবে এবার বিদ্রোহীদের ফুলের মালা দিয়ে দলে ভিড়িয়ে নেওয়া হবে না। কারণ এবার ছাড় দেওয়া হলে আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রচুর বিদ্রোহী দাঁড়িয়ে যাবেন। এতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।
বিদ্রোহীদের বিষয়ে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মাহবুব উল আলম হানিফের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, বিদ্রোহীদের জনগণ রায় দিয়েছে, মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তবে তাঁরা দলে ফিরে আসার রায় পাননি। তাঁদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা বহাল থাকবে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সময়ের স্বল্পতার কারণে ১০ শতাংশ পৌরসভায় প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল হয়ে থাকতে পারে।

Tuesday, August 25, 2015

মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশার ভাড়া বাড়ানোর প্রস্তাব by আনোয়ার হোসেন

ঢাকায় চলাচলরত প্রায় ১২ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা মেয়াদোত্তীর্ণ। মিটার ব্যবহারের শর্ত অমান্য করে এসব অটোরিকশার চালকেরা যাত্রীদের গলা কাটছেন। চলছেন নিজেদের ইচ্ছায়। এমন পরিস্থিতিতে অটোরিকশার ভাড়া সরকারিভাবে আবারও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ব্যয় বিশ্লেষণে এসব অটোরিকশার দাম গতবারের চেয়ে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা বেশি এবং অন্য কয়েকটি খরচ দেখিয়ে যাত্রী ভাড়া ও মালিকের জমা বাড়ানোর এই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে। আট সদস্যের যে কমিটি এই প্রস্তাব করেছে, তাতে কোনো যাত্রী প্রতিনিধি নেই।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সূত্র বলেছে, নতুন করে প্রথম দুই কিলোমিটারের জন্য ভাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে ৪০ টাকা। বর্তমানে তা ২৫ টাকা। পরবর্তী প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে ১২ টাকা। বর্তমানে প্রতি কিলোমিটারের সরকার-নির্ধারিত ভাড়া ৭ টাকা ৬৪ পয়সা। এ ছাড়া প্রতি মিনিট ওয়েটিংয়ের (যাত্রাবিরতি, সিগন্যাল ও যানজট) জন্য ৬০ পয়সা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে অটোরিকশার দৈনিক জমা (মালিকের আয়) কাগজে-কলমে ৬০০ টাকা। তবে মালিকেরা দুই পালায় ভাড়া দিয়ে জমা বাবদ আয় করছেন গড়ে ১ হাজার ২০০ টাকা। নতুন প্রস্তাবে জমা বৃদ্ধি করে ৮০০ টাকা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই ভাড়ার হার নির্ধারণ করেছে বিআরটিএর গঠিত একটি কমিটি। প্রস্তাবটি সম্প্রতি অনুমোদনের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বিআরটিএর সূত্র বলেছে, ভাড়া বৃদ্ধির আগে প্রতিবারই ব্যয় বিশ্লেষণের নামে আনুষ্ঠানিকতা রক্ষা করা হয়। এতে মালিক-শ্রমিক নেতাদের দাবিই মুখ্য হয়ে ওঠে। এবারের আট সদস্যবিশিষ্ট ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটির প্রধান বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। কমিটিতে অটোরিকশার মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা আছেন চারজন। বাকি তিন সদস্যের একজন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপসচিব এবং আরেকজন ঢাকা মহানগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের প্রতিনিধি। কমিটির সদস্যসচিব হচ্ছেন বিআরটিএর পরিচালক (প্রকৌশল)। কিন্তু কমিটিতে যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি নেই। অভিযোগ উঠেছে, মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের চাহিদা মেনে ব্যয় বিশ্লেষণে অযৌক্তিক ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কারণে অটোরিকশার প্রস্তাবিত ভাড়া ও মালিকের দৈনিক জমার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।
২০০২ সাল থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালুর পর এর আগে অন্তত ছয়বার এভাবে ব্যয় বিশ্লেষণ করে মালিকের জমা ও যাত্রী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু মালিক-শ্রমিকেরা কখনোই তা মানেননি।
ভুক্তভোগী ও বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, নতুন করে সরকার ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দিলে বর্তমানে নেওয়া বাড়তি ভাড়ার সঙ্গে নতুন করে আরও কিছু যোগ করে যাত্রীদের অতিরিক্ত গলা কাটা শুরু করবেন চালকেরা। মালিকেরাও তাঁদের মনগড়া জমা বাড়াবেন। অতীতেও চালক-মালিকেরা বিআরটিএর সঙ্গে যোগসাজশ করে নিজেরা ভাড়া ও জমার হার ঠিক করে পরে ইচ্ছামতো বাড়িয়েছেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, আগে মিটার ঠিক করে বর্তমান ভাড়া বাস্তবায়ন করতে হবে। এরপর গণশুনানি করে নতুন ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। ওই কমিটিতে অবশ্যই যাত্রীদের প্রতিনিধি রাখতে হবে। তিনি বলেন, কমিটি যে ব্যয় বিশ্লেষণ করেছে, তার অনেক সূচকই ভুল। কারণ, মেয়াদোত্তীর্ণ কোনো যানবাহনের মূল্য বাড়তে পারে না। এ ছাড়া হুট করে অটোরিকশার ভাড়া বাড়ালে তা অন্য যানবাহনের ভাড়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলবে।
বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, শৃঙ্খলা আনার লক্ষ্যেই ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। এখন তো চালক-মালিকেরা সরকারি সিদ্ধান্ত মানছেন না। মালিক-শ্রমিক নেতারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জমা ও ভাড়া বৃদ্ধি পেলে তাঁরা মানবেন।
অবশ্য অতীতের প্রতিটি ব্যয় বিশ্লেষণ এবং সেই অনুযায়ী ভাড়া বৃদ্ধির আগে মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিরা একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
ব্যয় বিশ্লেষণ কমিটিতে মালিক-শ্রমিকদের আধিক্য ও যাত্রী প্রতিনিধি না থাকার বিষয়ে বিআরটিএর চেয়ারম্যান বলেন, কমিটি মন্ত্রণালয় করে দেয়। আর মালিক-শ্রমিকদের সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা ঠিক না।
দেখা গেছে, অটোরিকশার চালকেরা এখন নির্ধারিত হারের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে চার গুণ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। এমনকি চুক্তিতে গেলেও চালকেরা যান তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী গন্তব্যে। উল্টো যাত্রীদের কাছে চালকের আবদার, ‘পুলিশ ধরলে বইলেন মিটারে যাচ্ছি।’
বিশ্লেষণে গোঁজামিল : সর্বশেষ অটোরিকশার ভাড়া বৃদ্ধি করা হয় ২০১১ সালে। সে সময় একটি অটোরিকশার স্যালভেজ ভ্যালু বা মেয়াদ শেষে এর মূল্য ধরা হয়েছিল ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু এবার অটোরিকশার মূল্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশার মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এভাবে অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে অটোরিকশার ভাড়া ও জমা দুটিই বেড়ে যাচ্ছে।
সূত্র বলেছে, অটোরিকশার মূল্যের সঙ্গে সুদ যোগ করা হয়েছে ৪৬ হাজার টাকা। যেখানে মালিকের বিনিয়োগ নেই, সেখানে কীভাবে ব্যাংক ঋণের সুদ যুক্ত হয়, তা ব্যাখ্যা করা হয়নি। নিবন্ধন, রুট পারমিট, রোড ট্যাক্স ও ইনস্যুরেন্স বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ১৩ হাজার টাকা। কিন্তু পুরোনো অটোরিকশার কীভাবে নিবন্ধন খরচ হয়, তা নিয়ে সমালোচনা আছে বিআরটিএতেই। দুর্ঘটনা ও আপৎকালীন কারণে আকস্মিক খরচ হিসেবে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪০ হাজার টাকা, যা রাজধানী ঢাকার মতো শহরে বেমানান।
এসব অসংগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বলেন, বাস্তবতা মেনেই ব্যয় বিশ্লেষণ করতে হয়। আগের ব্যয় বিশ্লেষণ সম্পর্কে তাঁর ধারণা নেই।
পুরোনো অটোরিকশা মেয়াদোত্তীর্ণ: অটোরিকশা নামানোর সময় এর বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ বছর। তা শেষ হওয়ার পর আরও দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়। অর্থাৎ ঢাকায় চলাচলরত প্রায় ১২ হাজার অটোরিকশার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে গত বছরের ডিসেম্বরে।
মালিকদের দাবির মুখে গত বছর অটোরিকশার মেয়াদ তিন বছর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। তবে উচ্চ আদালতে মামলা হলে এই সিদ্ধান্ত আটকে যায়। ফলে এখন যেসব অটোরিকশা চলছে, এর বেশির ভাগই অবৈধ। সাম্প্রতিক সময়ে মিশুকের পরিবর্তে প্রায় ৫০০ অটোরিকশা নামানো হয়েছে।

Saturday, January 31, 2015

প্রায় অচল সড়কপথ, ট্রেন ধুঁকছে সময়সূচি নিয়ে by আনোয়ার হোসেন

চলমান অবরোধ ও হরতালের কারণে মহাসড়কে দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস চলাচল স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অন্তত ৬০ শতাংশ কমে গেছে। নাশকতা এড়াতে গতি কমানোয় ট্রেনের সময়সূচি ভেঙে পড়েছে এবং যাত্রী ও আয় কমে গেছে। এখন পর্যন্ত কেবল লঞ্চ চলাচলই স্বাভাবিক আছে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দূরপাল্লার যে ৪০ শতাংশ যানবাহন চলছে, সেগুলো কেবল কাছাকাছি দূরত্বে। আর নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ পাহারায় ৪০-৪৫ শতাংশ পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় সচল থাকা রেলওয়ের সময়সূচিও ভেঙে পড়েছে। আগে ৮০ ভাগ আন্তনগর ট্রেন সময় মেনে চললেও এখন মাত্র ৪০ শতাংশ সময় মেনে চলতে পারছে। রেলওয়ের হিসাবে, জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনের তুলনায় পরবর্তী ১০ দিনে শুধু রেলের ঢাকা বিভাগীয় এলাকার ২১টি স্টেশনে যাত্রী কমে যায় ১ লাখ ৪০ হাজার। আর আয় কমেছে ৪২ লাখ টাকা। সময়সূচি বিপর্যয়ের কারণে অন্তত ২৫টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে হয়েছে। সাধারণত কোনো ট্রেনের যাত্রা ২৪ ঘণ্টা বিলম্ব হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলে যাত্রা বাতিল করা হয়। অবরোধে একমাত্র লঞ্চ চলাচলই স্বাভাবিক আছে। কিন্তু লঞ্চের কেবিনে যাত্রী সেজে উঠে আগুন দেওয়ার চারটি ঘটনার পর সেখানেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এখন কেবিনের যাত্রীদের দেহ তল্লাশি করা হয়। যাত্রীদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। লঞ্চমালিকেরা জানিয়েছেন, চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও লঞ্চে যাত্রী কমে যাচ্ছে। আতঙ্কের পাশাপাশি অবরোধ-হরতালের কারণে বিভিন্ন গন্তব্যে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ সারতে না পারা এর একটা কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। আবার সড়কপথের অনেক যাত্রীও যেখানে সম্ভব নৌপথ ব্যবহার করছেন।
সড়ক যোগাযোগ ৪০ ভাগ সচল: উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগের প্রধান পথ বঙ্গবন্ধু সেতু। সেখানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন গড়ে যানবাহন চলাচল কমে গেছে ৫ হাজার ২১০টি। আয় কমেছে গড়ে ৪১ লাখ ২০ হাজার টাকা। র্যাব ঢাকা-চট্টগ্রামসহ চারটি মহাসড়কের ২১৬টি স্থানকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর হাইওয়ে পুলিশ সারা দেশের ৯৯৩টি স্থানকে চিহ্নিত করেছে স্পর্শকাতর হিসেবে। গত বৃহস্পতিবার আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এই ৯৯৩টি স্থানে প্রায় ১২ হাজার আনসার মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রথমে ২১৬টি স্থানে আনসার মোতায়েন করা হবে। টানা অবরোধে ঢাকা ও এর আশপাশের যোগাযোগ অনেকটাই স্বাভাবিক আছে। কিন্তু দূরপাল্লার যোগাযোগ প্রায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগে স্থবিরতা নেমে আসছে। ৬ জানুয়ারি থেকে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের টানা অবরোধ শুরু হলেও আগের দিন ৫ জানুয়ারিই সড়কপথে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল সরকার। ৫ থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু সেতু দিয়ে যান চলাচল করেছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭১৯টি। এ সময় দৈনিক গড়ে যান চলেছে ৭ হাজার ৩৯৬টি। অথচ ১ থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত গড়ে প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করেছে ১২ হাজার ৬০৬টি।
সেতু বিভাগের হিসাবে, ৫ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী ২২ দিনে টোল আদায় হয়েছে ১২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। দৈনিক গড়ে আয় ৫৮ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। আর ১ থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত টোল আদায় হয়েছে প্রায় ৪ কোটি ১২ লাখ টাকা। গড়ে প্রতিদিন ১ কোটি ৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ অবরোধের কারণে টোল আদায় ও যানবাহনের পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। সূত্র জানায়, অবরোধের সময় যেসব যানবাহন চলেছে, এর বেশির ভাগই মালবাহী ট্রাক ও ব্যক্তিগত কার। যাত্রীবাহী বাসের সংখ্যা খুব কম। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে মেঘনা-গোমতী টোল প্লাজাটি কম্পিউটারনিয়ন্ত্রিত না হওয়ায় সেখানকার যানবাহন চলাচল ও আয়ের সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, উত্তরবঙ্গের পথে বিভিন্ন কোম্পানির দূরপাল্লার বাস প্রায় বন্ধ। কিছু লোকাল বাস চলাচল করে ঝুঁকি নিয়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম পথের চৌদ্দগ্রাম থেকে ফেনী পর্যন্ত এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানেও একই অবস্থা।
ধুঁকছে রেল: রেলের দৈনন্দিন সময়সূচি অনুসারে, ৬ থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত আন্তনগর ট্রেনের মাত্র ৪৪ শতাংশ সময় মেনে চলতে পেরেছে। বাকি ট্রেনের বেশির ভাগই ৩ থেকে ২৩ ঘণ্টা পর্যন্ত দেরিতে চলেছে। গত ১ ডিসেম্বর থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৮০ দশমিক ৪৭ শতাংশ ট্রেন সময় মেনে চলেছিল। ওই সময় কোনো ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে হয়নি। ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিটি আন্তনগর ট্রেনের সপ্তাহে এক দিন যাত্রাবিরতি আছে। মূলত যাত্রাবিরতির পরদিনই ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময় মেনে চলতে পারছে। রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাতিল হওয়া ২৫টি ট্রেনের যাত্রীদের বেশির ভাগই টিকিট ফেরত দিয়ে টাকা নিয়ে গেছেন। কেউ কেউ পরের দিনের সময়সূচি অনুসারে যে ট্রেনটি চলেছে, সেটিতে চড়েছেন। ২৭ জানুয়ারি দিনাজপুরগামী দ্রুতযান ট্রেনটি কমলাপুর স্টেশন থেকে নির্ধারিত সময়ের ১৬ ঘণ্টা পর ছেড়ে যায়। লালমনিরহাট এক্সপ্রেস ট্রেনটি বুধবার ছেড়ে যায় ১৪ ঘণ্টা দেরিতে। রংপুর এক্সপ্রেস ৪ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট ও চট্টগ্রামের পথের মহানগর প্রভাতী ট্রেনটি চলেছে নির্ধারিত সময়ের সোয়া তিন ঘণ্টা দেরি করে। রেলের কর্মকর্তারা জানান, জানুয়ারি মাসে বরাবরই যাত্রী বেশি হয়। এবারও জানুয়ারির প্রথম ১০ দিন যাত্রী এবং আয় ভালো ছিল। কিন্তু সময়সূচি বিপর্যয়ের কারণে পরবর্তী ১০ দিন যাত্রী কমতে থাকে। যাত্রী কমা ও আয় হ্রাসের ধারা এখনো অব্যাহত আছে। রেলের প্রতিটি বিভাগীয় বাণিজ্যিক কার্যালয় থেকে প্রধান কার্যালয়ে ১০ দিন অন্তর যাত্রী ও আয়ের হিসাব পাঠানো হয়। এ থেকে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের অধীন কমলাপুর, বিমানবন্দর, জয়দেবপুর, সিলেটসহ গুরুত্বপূর্ণ ২১ স্টেশনের যাত্রী ও আয়ের হিসাব পাওয়া গেছে। তাতে দেখা গেছে, ১১ থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত ওই ২১ স্টেশন থেকে যাত্রী পরিবহন হয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯৩৫ জন। এ সময় আয় হয় প্রায় ছয় কোটি টাকা। অন্যদিকে ১ থেকে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত ২১ স্টেশন থেকে যাত্রী পরিবহন করেছিল ৫ লাখ ২৬ হাজার ৩৪৮ জন। এ সময় আয় হয় ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। অর্থাৎ জানুয়ারির প্রথম ১০ দিনের তুলনায় পরের ১০ দিনে যাত্রী কমে যায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার। আর আয় কমে প্রায় ৪২ লাখ টাকা। রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চার দফা নাশকতা ও অবরোধে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের কারণে রেলের সময়সূচি বিপর্যয় হয়েছে। নাশকতার আশঙ্কায় সব ট্রেনের গতিসীমা ঘণ্টায় ৪০ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে ব্রডগেজ ট্রেনের সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারিত আছে ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার। আর মিটারগেজে সর্বোচ্চ ৭২ কিলোমিটার। এ ছাড়া রাতের ট্রেনগুলো চালানোর আগে নিরাপত্তা বাহিনী নিয়ে এক ইঞ্জিন ও এক বগির (পাইলট ট্রেন) একটি ট্রেন নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। এরপরই যাত্রীবাহী ট্রেন চালানো হয়। এতে ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে বাড়তি সময় অপেক্ষায় রাখতে হয়। রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তাকেই তাঁরা সর্বাধিক প্রাধান্য দিচ্ছেন। এ জন্য সময়সূচিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। যেকোনো মূল্যে ট্রেন চালু রাখাই মূল চিন্তা।

Tuesday, January 27, 2015

সম্প্রীতি- এক জলেই সব হয় গো শুচি by আনোয়ার হোসেন

(চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার বরেন্দ্রা গ্রামে শুতিহার নামের দিঘি l ছবি: প্রথম আলো) চার দশক ধরে একটি গ্রামের হিন্দু-মুসলিম ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে একসূত্রে বেঁধে রেখেছে ‘শুতিহার’ দিঘি। দিঘিটিকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও উন্নয়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন গ্রামবাসী। দিঘির আয় থেকে নির্মাণ হয়েছে বিদ্যালয়, মন্দির, মসজিদ, ঈদগাহ, শ্মশান, কবরস্থান এবং রাস্তাঘাট। পাশাপাশি দিঘির আয়ের অর্থ ব্যয় হয়েছে মানুষের আপদ-বিপদে। সরকারি ওই খাস দিঘিটি গ্রামবাসীর হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার অপচেষ্টাও হয়েছে প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে। গ্রামবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এ জন্য জীবনও দিতে হয়েছে গ্রামের একজনকে। কিংবদন্তি বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্রের ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলের নেজামপুর ইউনিয়নের বরেন্দ্রা গ্রামে ‘শুতিহার’ দিঘির অবস্থান। হিন্দু-মুসলিম ও আদিবাসী মিলিয়ে গ্রামটিতে দেড় হাজার লোক বাস করেন।
শুরুর কথা: দিঘিটিতে একসময় হাঁটুপানি থাকত। কচুরিপানায় ভর্তি থাকা দিঘিটি তখন ব্যবহারের অনুপযোগী ছিল। ১৯৭৫ সালে গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সোবহান, দিদার বক্স, আবদুল মালেক, যোগেন সর্দার, ভজহরি সর্দার, সুরেশ কর্মকার, মগোচন্দ্র ওঁরাও, আতাউর রহমান, আবদুল কাদের এবং ঝড়ু চন্দ্র পাহান মিলে মানুষের উপকারে দিঘিটিকে ব্যবহার উপযোগী করার পরিকল্পনা করেন। এ লক্ষ্যে গঠন করা হয় বরেন্দ্র স্বনির্ভর পল্লি সমিতি নামের একটি সংগঠন। বর্তমানে ওই উদ্যোক্তাদের মধ্যে জীবিত রয়েছেন আতাউর রহমান, আবদুল কাদের এবং ঝড়ু চন্দ্র পাহান। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংগঠনটি প্রথমে গ্রামের মানুষকে নিয়ে কচুরিপানা পরিষ্কারের কাজ শুরু করে। একপর্যায়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) কর্মসূচির সহায়তায় দিঘিটি খনন করে মাছ চাষের উপযোগী করা হয়। প্রথম দিকে দিঘিটি থেকে গ্রামবাসীর মাছের চাহিদা পূরণ হলেও পুঁজির অভাবে খুব একটা লাভের মুখ দেখা যায়নি। তবে আয় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ১৯৮৬ সালে দিঘির আয় থেকে ৭৪ হাজার টাকা খরচ করে গ্রামে গড়ে তোলা হয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় (বর্তমানে সরকারি)। এরপর ১৫ বছর ধরে দিঘিটি থেকে মোটামুটি আয় হতে থাকে।
দিঘি রক্ষায় আন্দোলন: ২০০২ সালে দিঘিটি দখলের পাঁয়তারা করে তৎকালীন ক্ষমতাসীনেরা। প্রশাসনের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তারা দিঘিটির বন্দোবস্ত নেয়। তখন প্রতিবাদী হয়ে ওঠে গ্রামবাসী। ওই সময়ে আন্দোলনের প্রথম সারিতে থাকা ফকির মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি খুন হন। এরপর গ্রামবাসী ফুঁসে ওঠেন। তাঁরা এক হয়ে দিঘিটিকে ভিত্তি করে গ্রামের সার্বিক উন্নয়ন ও সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির একটি আদর্শ গ্রাম গড়ে তোলার শপথ নেন। মামলা-মোকদ্দমায় লড়ার পর দিঘিটি পুনরায় গ্রামবাসীর আয়ত্তে আসে। এরপর দিঘির আয় বাড়ার পাশাপাশি গ্রামের উন্নয়নের গতি বেড়ে যায়। দিঘিটিকে পাকাপোক্তভাবে গ্রামবাসীর আয়ত্তে রাখতে ২০১২ সালে গঠন করা হয় বরেন্দ্রা সার্বিক গ্রাম উন্নয়ন সমবায় সমিতি লিমিটেড। সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাবুল ইসলাম বলেন, দিঘির আয়ের ৪০-৪২ লাখ টাকা খরচ করে এরই মধ্যে গ্রামের নানা উন্নয়ন করা হয়েছে। প্রায় ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে মসজিদ, ১০-১২ লাখ টাকা ব্যয়ে মন্দির, আট লাখ টাকা ব্যয়ে ঈদগাহ, শ্মশানের জন্য দুই লাখ টাকা দিয়ে কেনা হয়েছে জমি, প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ করে তৈরি হয়েছে রাস্তা এবং ৪০ হাজার টাকা দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে পানির ট্যাংক। ওই পানির ট্যাংক থেকে প্রতিটি বাড়িতে পাইপের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়ে এবং অসুখ-বিসুখসহ নানা বিপদে-আপদে ব্যয় করা হয়েছে ওই দিঘির আয়ের অর্থ। ভবিষ্যতে হাতে নেওয়া হবে মসজিদ সম্প্রসারণের কাজ, শ্মশানের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ, বাজার নির্মাণ এবং আরও একটি কবরস্থানের জন্য জমি ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ। এ জন্য ব্যয় হবে আরও ৩০-৪০ লাখ টাকা।
গ্রামবাসী জানান, দিঘিটির কারণেই গ্রামের প্রতিটি বাসিন্দা মাছ খাওয়ার সুযোগ পান। ঝড়ু চন্দ্র পাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘দিঘিটা হামরাকে এক করে র্যাখ্যাছে। তাই হামরা সবাই মিলে ভালো আছি। হামারঘে একতা কেহু ভাঙতে পারবে না।’

Saturday, January 3, 2015

মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশা- পকেট কাটা হচ্ছে যাত্রীদের by আনোয়ার হোসেন

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলরত প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশাই এখন কার্যত অবৈধ। কারণ, গত ৩১ ডিসেম্বর এগুলোর বর্ধিত মেয়াদও শেষ হয়ে গেছে। এ অবৈধ অটোরিকশার সংখ্যা দুই মহানগরে চলাচলকারী মোট অটোরিকশার ৭৪ শতাংশ। অটোরিকশার ভাড়া ও মালিকের জমা নির্ধারণ করা হয় এর বয়সসীমার ওপর। শুরুতে অটোরিকশার বয়সসীমা নির্ধারিত ছিল নয় বছর। সেই অনুসারেই এর ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছিল। ঢাকা জেলা অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির চাপে ২০১০ সালে মেয়াদ বৃদ্ধি করে ১১ বছর করে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ আবার চার বছরের জন্য মেয়াদ বাড়ালে হাইকোর্ট তা স্থগিত করেন। এসব অটোরিকশার নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল ২০০১ ও ২০০২ সালে। নিয়মানুযায়ী, অটোরিকশার মেয়াদ শেষ হলে তার চলাচল নিষিদ্ধ থাকবে। তবে সরকার এর মেয়াদ বৃদ্ধি করলে ভাড়া ও জমা কমানো হবে। কিন্তু দুই মহানগরের কোথাও ভাড়া কমানো হয়নি। সেই সুবিধা ভোগ করে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এই বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা আগের মতোই যাত্রীদের পকেট কাটছে। এখন মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশার বয়স বৃদ্ধি করা হবে, নাকি এর স্থলে নতুন অটোরিকশা বরাদ্দ দেওয়া হবে—এই নিয়ে দর-কষাকষি চলছে।
২০০১ সালে চালুর পর থেকেই অটোরিকশার চালক-মালিকেরা সরকারের নির্ধারণ করে দেওয়া ভাড়া মানেননি। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ও এটা মানানোর কোনো চেষ্টা করেনি। ফলে বছরের পর বছর ধরে দেশের প্রধান দুই শহরের যাত্রীরা অটোরিকশার চালকদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। রাস্তায় বের হয়ে যানবাহনসংকটে নাকাল যাত্রীরা মিটারের বদলে কয়েক গুণ বেশি ভাড়ায় চুক্তিতে যেতে বাধ্য হচ্ছে। মালিক ও আমদানিকারকদের সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে একটি নতুন অটোরিকশার দাম চার লাখ টাকা। কিন্তু ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকায় কেনা মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশার মালিকানা হাতবদল হচ্ছে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকায়। এর মূল কারণ, ২০০৩ সাল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে অটোরিকশার নতুন নিবন্ধন বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। ফলে যে অটোরিকশাগুলো রাস্তায় আছে, সেগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করছে। আর এ গাড়িগুলো পুরোনো হলেও বিক্রি হচ্ছে অনেক বেশি দামে। অটোরিকশার খাতের রমরমা মুনাফার একটা হিসাব দিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি নামে একটি সংগঠন। তাদের হিসাবে, ২০০১ সালে ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকায় কেনা একটি অটোরিকশা দিয়ে ১১ বছরে চালক-মালিকেরা ৯২ লাখ টাকা আয় করেছেন। একাধিক অটোরিকশার মালিক এ প্রতিবেদককে জানান, ঢাকায় কারও দুটি অটোরিকশা থাকলে তাঁর অন্য কোনো কাজ করার দরকার হয় না। তবে ঢাকা অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি বরকত উল্লাহ বলেন, ‘শুধু আয় দেখলে হবে না, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও অনেক।’
অটোরিকশা খাতে নৈরাজ্যের বিষয়ে বরকত উল্লাহ বলেন, ‘এটা সত্য, আমরা সেবা দিতে পারিনি। আমাকেই রাজধানীর কমলাপুর থেকে এলেনবাড়ি যেতে ২০০ টাকা গুনতে হয়। এই পথে মিটারে গেলে ভাড়া আসে ৭০ থেকে ৮০ টাকা। অটোরিকশার স্বল্পতা ও চালকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণেই এমন হয়েছে।’ অবশ্য ঢাকা জেলা অটোরিকশা চালক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন দাবি করেন, মালিকেরা বাড়তি জমা চাপিয়ে দেন বলেই যাত্রীদের কাছ থেকে তা তুলতে হচ্ছে চালকদের। তিনি বলেন, অটোরিকশার তুলনায় চালক বেশি বলে মালিকেরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়েছেন। বিআরটিএর হিসাবে, ঢাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে ১২ হাজার ৭১৫টি। চট্টগ্রামেও প্রায় ১৩ হাজার। ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকায় সাড়ে ১১ হাজার এবং চট্টগ্রামে আট হাজার অটোরিকশার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। মেরামত নাকি প্রতিস্থাপন: বিআরটিএ সূত্র জানায়, ২০১০ সালে মালিক সমিতির চাপে সরকার নতি স্বীকার করার ফলে আবার মেয়াদ বৃদ্ধির আন্দোলন শুরু করে তারা। একাধিক বৈঠক করার পর গত ৪ জুন ছয় শর্তে মেয়াদোত্তীর্ণ অটোরিকশার মেয়াদ আরও চার বছর বাড়িয়ে ১৫ বছর করার সিদ্ধান্ত দেয় সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। ছয় শর্তের মধ্যে রয়েছে ইঞ্জিন ওভারহলিং করা, হুড-বডি পরিবর্তন করে নতুন রং করা, সিএনজি সিলিন্ডার পরীক্ষা করা এবং অন্যান্য মেরামত করা। এসব করে বুয়েট ও চুয়েট থেকে ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মালিকদের অনেকে এই প্রক্রিয়ায় যেতে আগ্রহ দেখাননি। কারণ, এই শর্ত পূরণ করতে হলে প্রতিটি অটোরিকশার পেছনে প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে। এ ছাড়া যথাযথভাবে শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা দেখে ছাড়পত্র দেওয়ার যে সক্ষমতা বুয়েটের রয়েছে, তাতে এক বছরে বড়জোর তিন হাজার অটোরিকশা ছাড় পাবে। এ অবস্থায় ১৭৫ জন সাধারণ মালিক ঝক্কিতে না গিয়ে পুরোনো অটোরিকশা ঢাকার বাইরে বিক্রি করে দিয়ে এর স্থলে নতুন অটোরিকশা নামানোর অনুমতি চেয়ে বিআরটিএতে আবেদন করেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য বিআরটিএর সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটিও হয়েছে। কমিটি পরীক্ষা করে ৪৫টি অটোরিকশা প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করে। কিন্তু চূড়ান্ত অনুমোদন আর দেয়নি সংস্থাটি। এরপর ১৭ জন মালিক বিআরটিএর চেয়ারম্যানসহ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের উকিল নোটিশও দিয়েছেন।
এ অবস্থায় সাধারণ মালিকদের একটা অংশ মেয়াদ বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে নীতিমালাবহির্ভূত দাবি করে হাইকোর্টে রিট করে। আদালত গত মাসে মেয়াদ বৃদ্ধির কার্যক্রমের ওপর তিন মাসের স্থগিতাদেশ দেন। জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এ এন সিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, আদালতের রায়, মালিকদের দাবি আর অটোরিকশার স্বল্পতা—সব মিলিয়ে জটিল অবস্থা চলছে। তবে খুব শিগগির সমাধান হয়ে যাবে। সরকার শুধু চালক-মালিকদের স্বার্থ নিয়েই ব্যস্ত—এমন অভিযোগের বিষয়ে সচিব বলেন, ‘এটা ঠিক নয়। ভাড়া ও জমা অমান্য করার দায়ে অনেককে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Sunday, December 28, 2014

খাঁচা, ক্যামেরা ও কিছু উদ্যমী তরুণ by আনোয়ার হোসেন

(এই খাঁচার সাহায্যে গতকাল পাইপের ভেতর থেকে শিশু জিহাদের লাশ উদ্ধার করা হয় l ছবি: প্রথম আলো) প্রশিক্ষিত দমকল বাহিনী যখন ব্যর্থ, পাঁচ ফুট উচ্চতার একটা লোহার খাঁচা, কিছু উদ্যমী তরুণ-যুবক আর একটি ক্যামেরাই সৃষ্টি করল ইতিহাস। টানা ২৩ ঘণ্টার চেষ্টার পর উদ্ধার হলো ছোট্ট শিশু জিহাদ। তবে জীবিত নয়, মৃত। ১০-১৫ জন উদ্যমী তরুণ-যুবকের একটি দলই টেনে তুলে আনে জিহাদের দেহ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শফিকুল ইসলাম ফারুক, আবু বকর সিদ্দিক, আনোয়ার হোসেন, কবির মুরাদ, নূর মোহাম্মদ, আবদুল মজিদ, শাহজাহান আলী, ইমরান, রাকিব, মুন ও রাহুল। শাহজাহানপুরের রেলওয়ে কলোনিতে পাইপের ভেতর শিশু আটকে যাওয়ার খবর পাওয়ার পর শুক্রবার রাতেই ঘটনাস্থলে আসেন তাঁরা। নির্ঘুম রাত কাটিয়ে জিহাদকে যখন বেলা তিনটার দিকে বের করে নিয়ে আসেন, তখন তাঁরা রীতিমতো ‘হিরো’। অনেকেই তখন তাঁদের নামে স্লোগান দিচ্ছিল এবং কাউকে কাউকে মাথায় তুলে নাচছিল উপস্থিত জনতা। এই দলের সাতজনের সঙ্গে ঘটনাস্থল ও বাইরে প্রায় দেড় ঘণ্টা কথা হয়। দলের আরেক সদস্য ফারুকের সঙ্গে কথা হয় মুঠোফোনে। এঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ক্যামেরা পাঠিয়ে কূলকিনারা করতে ব্যর্থ হলে আনোয়ার নামের এক যুবক তাঁর নিজের ক্যামেরা কয়েকবার পাইপের ভেতরে পাঠান। এর মধ্যে লোহার খাঁচাও তৈরি করে কয়েকজন তা পাইপের ভেতরে ঢোকান। কিন্তু কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। সব শেষে শফিকুল ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিকসহ কয়েকজন মিলে ভারী বস্তু টেনে তোলার উপযোগী করে খাঁচা তৈরি করেন। ফারুক নিজের পকেট থেকেই টাকা দেন এ কাজে। গতকাল দুপুরের পর ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার অভিযান শেষ করলে মওকা মেলে উদ্যমী তরুণ-যুবকদের। কিছু একটা করতেই হবে—এমন মনোভাব দেখান ফারুকসহ দলের অন্যরা। স্থানীয় মানুষ ও উৎসুক জনতাও তাঁদের উৎসাহ দিতে থাকেন। অবশেষে বেলা তিনটার দিকে খাঁচার সঙ্গে ক্যামেরা যুক্ত করে একটি টর্চ লাইটসহ প্রথম পাইপের ভেতর নামানো হয়। আনোয়ার ও নূর মোহাম্মদ বলেন, প্রায় ৭৮ মিটার যাওয়ার পর মনে হয়, খাঁচাটি কোনো কিছুতে আটকে যাচ্ছে। তখন মনিটরে ভেসে ওঠে শোলাজাতীয় কিছু এবং ইটের টুকরোর সঙ্গে কিছু আবর্জনা। কিন্তু মানবদেহের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। এর পরের গল্প শোনা যাক আনোয়ারের মুখ থেকেই। ‘প্রথমে আমরা খাঁচা পাইপের ভেতরে রেখে এর সঙ্গে বাঁধা দড়ি আস্তে আস্তে ছাড়ছিলাম। কিন্তু বারবারই বাধা পাচ্ছিল। এবার অন্য কৌশল নিলাম। যেখানে আটকে যাচ্ছিল, সেখান থেকে খাঁচাটা কয়েক গজ টেনে তুলে জোরে ছেড়ে দিলাম। এরপর যখন টান দিই, মনে হচ্ছিল কোনো কিছুতে আটকে গেছে। বাইরে থাকা মনিটরে আর ইটের টুকরো, আবর্জনা দেখা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে, সমতল একটা বস্তু পড়ে আছে। এমন সময় দড়ি টানা শুরু করি। তখন মনে হচ্ছিল, খাঁচার ওজনের চেয়ে বেশি কিছু আটকে আছে। ২০-২৫ কেজি বাড়তি ওজন অনুভূত হতে থাকে।’
কিছুক্ষণ দম নেন আনোয়ার। এরপর বলেন, ‘তখনই মনে আশার সঞ্চার হতে থাকে। কিছু দূর টেনে আনার পর আবার মনে হলো, ভারী বস্তুটা কিছুটা নেমে যাচ্ছে। তখন ক্ষণিকের জন্য দড়ি টানা বন্ধ করে দিই। আবার ধীরে ধীরে টানা শুরু করি। একপর্যায়ে খাঁচার পুরোটাই বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, খাঁচার হুকের সঙ্গে নাইলনের জড়ানো-প্যাঁচানো চিকন দড়ি আটকে আছে। আরও তিন-চার ফুট টেনে তোলার পর জিহাদের দেহ বেরিয়ে আসে। দড়ির সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল জিহাদের দেহ।’
কী আছে খাঁচায়: লোহার রড দিয়ে তৈরি খাঁচাটির উচ্চতা পাঁচ ফুটের চেয়ে কিছু কম হবে। তিনটি খাড়া লোহার রডের ওপরের অংশে একটা বৃত্তাকার রড দিয়ে আটকানো হয়। এর সঙ্গে টানা দেওয়া হয় আরও দুটি আড়াআড়ি রড। ঠিক মাঝখানে বাঁধা হয় মোটা রশি। খাঁচাটির একেবারে নিচে রড ঝালাই করে ৪৫ ডিগ্রি কোনাকৃতির আংটা তৈরি করা হয়। এই আংটায় আটকে যায় জিহাদের দেহের সঙ্গে প্যাঁচানো নাইলনের চিকন রশি। পেশায় ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম ফারুক বলেন, খাঁচাটি তৈরি করা হয়েছে এমনভাবে যে এটি পাইপের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় আংটাগুলো কোথাও বাধা পাবে না। কিন্তু ফেরার সময় কোনো বস্তু পেলে তা আটকে দিয়ে টেনে নিয়ে আসবে। আবু বকর সিদ্দিক বলেন, প্রথমে আরেকজন খাঁচা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ওটাতে কাজ হয়নি। পরে ফারুকসহ অন্যদের পরামর্শে আগের খাঁচাটার আদলেই নতুন খাঁচা তৈরি করা হয়। আইকন ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ঝালাইকাজে সহায়তা করেন। মুরাদ নামের এক যুবক বলেন, ‘আমরা ক্যামেরা নামানোর আগে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা নামানো হয়। রাত তিনটার পরে আনোয়ার তাঁর ক্যামেরা নামানোর উদ্যোগ নিলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলে দেওয়া হয়, ক্যামেরা অনেক হয়েছে। এই চ্যাপ্টার ক্লোজড। আর দরকার নেই।’
আনোয়ার জানান, ক্যামেরা নিয়ে শুক্রবার রাত নয়টায় তিনি ঘটনাস্থলে যান। অনেক চেষ্টা করেও নামানোর সুযোগ পাননি। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা দামি দামি ক্যামেরা পাঠিয়ে সফটওয়্যার দিয়ে প্রোগ্রাম সেট করে চেষ্টা করে। আনোয়ার আরও জানান, তাঁর ক্যামেরার তারটি ৩০০ মিটার লম্বা। এই তারের ৭৮ মিটার পর্যন্ত পাইপের ভেতর প্রবেশ করানো হয়। এর অর্থ হচ্ছে, জিহাদের দেহটি পাইপের ভেতর ৭৮ মিটার নিচে অবস্থান করছিল। আলাপ করে জানা গেছে, খিলগাঁও সিপাহীবাগে আনোয়ার হোসেনের সিসিটিভির ব্যবসা রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি স্থাপন করাই এই প্রতিষ্ঠানের কাজ। এই দলের সদস্য আবু বকর সিদ্দিক আগোরা ও স্বপ্ন সুপার শপে মালামাল সরবরাহ করে থাকেন। তিনিই বিভিন্ন সময় খাঁচা নির্মাণ ও উন্নয়নে সহায়তা করেন। তাঁদের সহযোগী আবদুল মজিদ স্থানীয় ইলেকট্রিশিয়ান। কবির মুরাদ আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আর নূর মোহাম্মদ পড়ে মতিঝিল কলোনি উচ্চবিদ্যালয়ে। শাজাহান আলী, রাকিব ও ইমরানও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। ফারুক গাড়ির ব্যবসা করেন। এঁরা সবাই একে অপরের পূর্ব পরিচিত নন, উদ্ধার অভিযানে এসে তাঁদের পরস্পরের পরিচয় হয়।

Monday, December 8, 2014

বাস্তবের পথে পদ্মা সেতু by আনোয়ার হোসেন

পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ১৪ শতাংশ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। এর বেশির ভাগই সংযোগ সড়ক, পুনর্বাসন ও প্রকল্প এলাকার উন্নয়নকাজ। এখন শুরু হয়েছে মূল সেতু নির্মাণের কাজ।  সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, গত অক্টোবর পর্যন্ত প্রকল্পের মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজের অগ্রগতি হয়েছে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ। জাজিরার সংযোগ সড়ক ও অবকাঠামো নির্মাণকাজের অগ্রগতি হয়েছে যথাক্রমে ২০ দশমিক ৫ ও ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ এগিয়ে গেলে অগ্রগতির হার আরও বেড়ে যাবে বলে প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এখন মূল সেতুর জন্য নদীর বিভিন্ন অংশে মাটি পরীক্ষা চলছে। এরপর হবে পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের (ভিত্তি) কাজ। এর বাইরে প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৭০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের জন্য প্লট তৈরি করা হয়েছে দুই হাজার ৫৯২টি। অক্টোবর পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৯০টি প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে।
২০১৮ সালে সেতু দিয়ে যুগপৎভাবে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল করবে—এই পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে সবকিছু। সম্প্রতি প্রকল্পের মাওয়া অংশে গিয়ে দেখা যায়, পদ্মার দুই পাড়ে কর্মযজ্ঞ চলছে। মাওয়ায় বড় বড় বার্জে ক্রেন বসানো হয়েছে নির্মাণসামগ্রী ওঠানো-নামানোর জন্য। বড় বড় যন্ত্রে মাটি কাটা ও সমান করা হচ্ছে। চলছে সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ। পাড়ে গাছ কাটা হচ্ছে। নদীতে চলছে ড্রেজার। মানুষ আসছে চাকরির খোঁজে, ব্যবসার আশায়।
নির্মাণ অঙ্গনে (কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড) শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের থাকার জন্য প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা ঘর বানানো হচ্ছে। কয়েক শ শ্রমিক সেখানে কাজ করছেন। কেউ ইট ভাঙছেন। কেউ ভবন বানাচ্ছেন। নিরাপত্তা হেলমেট পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা নির্দেশনা দিচ্ছেন। (স্বপ্নের খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে পদ্মা সেতু by আনোয়ার হোসেন)
একই রকম কর্মমুখর পরিবেশ শরীয়তপুরের জাজিরা ও শিবচরে। সেখানে সীমানাপ্রাচীর দিয়ে পাথর-বালু-ইট এনে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। একটু পর পর ইট-বালু-সিমেন্ট-পাথর-মাটি নিয়ে বড় বড় ট্রাক প্রবেশ করছে নির্মাণ এলাকায়। বড় বড় যন্ত্র দিয়ে মাটি সমান করার কাজ চলছে।
পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীন সেতু বিভাগ। ওই বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকার পদ্মা সেতু নির্মাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিচ্ছেন।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের সমীক্ষা হয়েছিল জাপানি সংস্থা জাইকার অর্থে। নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে। মূল প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা ও ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দাতারা সরে যাওয়ার ঘোষণা দিলে জটিলতা তৈরি হয়। একপর্যায়ে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ডলার জোগান দেওয়ার নিশ্চয়তা দেয়।
পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সেতু নির্মিত হবে কংক্রিট আর স্টিল দিয়ে। ওপর দিয়ে যানবাহন আর নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন।
সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মূল সেতু ও নদীশাসনের কাজ চার বছরের মধ্যে শেষ করার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারদের। তবে বড় ধরনের কারিগরি সমস্যা কিংবা রাজনৈতিক বিপর্যয় নেমে না এলে নির্ধারিত সময়ের আগেই কাজ শেষ করার আশ্বাস দিয়েছেন ঠিকাদারেরা।
সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণকাজের জন্য সাড়ে তিন বছর সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। কাজ তদারকির জন্য একদল কর্মকর্তা প্রকল্প এলাকায় অবস্থান করছেন। আর বনানীর সেতু ভবনে যাঁরা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছেন, তাঁরাও বন্ধের দিন প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করছেন।
জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, পদ্মা সেতু এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা। বড় বড় চ্যালেঞ্জ পাড়ি দিতে হয়েছে। এখন শুধু কাজ। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হবে। ২০১৮ সালে ট্রেন ও যানবাহন চলবে। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পে দুর্নীতি-অনিয়মের ব্যাপারে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) দেখানো হবে। শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই মূল লক্ষ্য।’
পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ ছয় ভাগে (প্যাকেজ) ভাগ করা হয়েছে। পাঁচটি ভৌত কাজের এবং একটি তদারকি পরামর্শকসংক্রান্ত। ভৌত কাজগুলো হলো মূল সেতু, নদীশাসন, দুই পাড়ে সংযোগ সড়ক নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো। এসব কাজ তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে।
মূল সেতু নির্মাণে গত জুনে চীনের চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে প্রকল্প এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। প্রকল্পের কাজ তদারকির দায়িত্বে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, নির্মাণ পর্যায়ে কারিগরি নানা জটিল বিষয় আসতে পারে। তবে সবকিছুই ঠিকঠাকমতো এগোচ্ছে। কাজ নির্ধারিত সময়েই শেষ হবে বলে আশা করা যায়।
পাঁচটি ভৌত ও দুটি তদারক প্যাকেজ মিলিয়ে এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। নদীর তীর রক্ষা, ফেরিঘাট সরানো ও নিরাপত্তাব্যবস্থা রক্ষার ব্যয় ধরলে তা ২৫ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাবে। সব ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করতে হবে বলে সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ভৌত কাজের ঠিকাদারদের প্রত্যেককে শুরুতেই চুক্তিমূল্যের ১৫ শতাংশ হারে অগ্রিম অর্থ দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ১০ শতাংশ। সব আন্তর্জাতিক দরপত্রেই যন্ত্রপাতি সংগ্রহ ও প্রকল্প এলাকার উন্নয়নের জন্য অগ্রিম অর্থ দেওয়ার নিয়ম আছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রে ঠিকাদারের পাওনার একটি বড় অংশ ডলারে পরিশোধ করতে হয়। এটা চুক্তির সময় উল্লেখও থাকে। পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ পাওনা ডলারে পরিশোধ করতে হবে বলে সেতু বিভাগ সূত্র জানিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ১০ হাজার ১৬২ কোটি টাকায় প্রথম পদ্মা সেতু প্রকল্পটি অনুমোদন করেছিল। ২০১১ সালে প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সরকারিভাবে এখনো ২০১১ সালে ধরা ব্যয়ই বহাল আছে।
সেতু বিভাগ থেকে গত এপ্রিলের শেষের দিকে পরিকল্পনা কমিশনে চিঠি দিয়ে প্রকল্প সংশোধনসংক্রান্ত নির্দেশনা থেকে পদ্মা সেতু প্রকল্পকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনসংক্রান্ত সরকারের পরিপত্র অনুসারে একটি প্রকল্প সর্বোচ্চ দুবার সংশোধন করা যাবে। তৃতীয়বার করা যাবে পরিকল্পনামন্ত্রীর বিশেষ বিবেচনায়।
সরকারের একটি সূত্র জানায়, দুই কারণে সরকার এই প্রকল্পটিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রথমত, এর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকসহ দাতাদের সঙ্গে সরকারের তিক্ততার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এটাকে সরকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। পাশাপাশি এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সামনে বাংলাদেশের সক্ষমতাকেও তুলে ধরতে চায় সরকার। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ২০০৮ সালে। আগামী নির্বাচনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে রাজনৈতিকভাবে সরকার বিশেষ সুবিধা পাবে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে।
এ প্রকল্পের বিষয়ে সরকারের স্পর্শকাতরতার উদাহরণ দিতে গিয়ে সেতু বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, মাওয়া ফেরিঘাট সরানোর জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কয়েকবার তাগিদ দিয়েছে। এরপর গত ২০ নভেম্বরের মধ্যে ঘাট সরানোর সময় বেঁধে দেওয়া হয় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ)। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে তারা ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চায়। এটা জেনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তাৎক্ষণিক ঘাট সরানোর নির্দেশ দেয় এবং ২৭ নভেম্বরই ঘাট সরানো হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এও জানান, প্রধানমন্ত্রী বিদেশে সফরে গেলে এসেই প্রথমে পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে সর্বশেষ তথ্য সংগ্রহ করেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।

স্বপ্নের খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে আসছে পদ্মা সেতু by আনোয়ার হোসেন

সব ঠিকাদার নিয়োগ হয়ে গেছে। তদারকির পরামর্শকও প্রস্তুত। এবার পদ্মায় মূল সেতু নির্মাণের পালা। কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে পদ্মার দুই পারেই। নদীর তিন স্থানে চলছে মাটি পরীক্ষা। শিগগিরই শুরু হবে পরীক্ষামূলক পাইলিংয়ের (ভিত্তি) কাজ। ইতিমধ্যে মূল সেতুর জন্য পদ্মাপারে অনেক ভারী যন্ত্রপাতিও ভিড়েছে। অবশ্য সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং পুনর্বাসনের কাজ অনেক আগেই শুরু হয়েছে। তবে গত ২৬ নভেম্বর প্রকল্প এলাকায় গিয়ে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, মূল সেতু নির্মাণকাজেরই যে এখন অপেক্ষা।
ঢাকা থেকে মাওয়া ফেরিঘাট যাওয়ার পথে চৌরাস্তায়ই চোখে পড়ল সড়কের সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এটি পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজের অংশ। বড় বড় ট্রাকে করে মাটি ফেলা হচ্ছে। সেগুলো সমান করছে এক্সকাভেটর।
চৌরাস্তা থেকে সোজা মাওয়া ফেরিঘাট। কিন্তু সেখানে লঞ্চ-স্পিডবোট-বাসে যাত্রী তোলার হাঁকডাক নেই। ঘাট সরিয়ে নেওয়া হয়েছে আরও পুবে, মাওয়া-মুন্সিগঞ্জ সড়কের পাশে শিমুলিয়ায়। কারণ, মূল সেতুর শুরুটা হবে মাওয়া ফেরিঘাট থেকে। মাওয়া আর আড়াই কিলোমিটার দূরের শিমলিয়া ঘাটের মাঝখানে কুমারভোগ গ্রামে নদীর পারে ডেরা গেড়েছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এটাই পদ্মা সেতুর নির্মাণসামগ্রী রাখার মাঠ (কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড)। তাই এই সড়কটিও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। চায়না মেজর মূল সেতু নির্মাণ করবে।
এখানে বিশাল মাঠ ঘিরে দেয়াল দিয়ে তৈরি হচ্ছে ঠিকাদারের লোকজনের আবাসনসহ অন্য অবকাঠামো। ইট ভাঙার যন্ত্রের গরগর শব্দ, শ্রমিকের দৌড়ঝাঁপ, বড় বড় মিক্সচার মেশিন—এ সবই নির্দেশ করে কাজ শুরু হয়ে গেছে। বিশাল মাঠ পেরিয়ে নদীর পারে ভিড়েছে কয়েকটি বার্জ। এতে রয়েছে বড় বড় কয়েকটি ক্রেন। এগুলো দিয়েই নির্মাণ মাঠ থেকে সেতুর সরঞ্জাম ওঠানো-নামানো হচ্ছে।
মাওয়া ঘাট থেকে নদী পার হওয়ার সময় দেখা গেল, শরীয়তপুরের জাজিরা ও মাদারীপুরের শিবচরেও চলছে নির্মাণকাজের তোড়জোড়। শিবচরের কাওড়াকান্দি ফেরিঘাট থেকে সামনে এগিয়ে সড়কের বাঁ পাশে গড়ে উঠেছে ঠিকাদার, পরামর্শক ও সেতু বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য বাসস্থান। বিশাল এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাথর-বালুর স্তূপ। প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত ভারী যানবাহন-যন্ত্র চলছে দিন-রাত।
২০০১ সালের ৪ জুলাই ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার সুপারিশ মেনে মাওয়া-জাজিরার মধ্যে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্মা সেতুর নকশা প্রণয়নে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত করে। মহাজোট সরকার শপথ নিয়েই তাদের নিয়োগ দেয়।
অনেক চড়াই-উতরাইয়ের পর অর্থায়ন, নকশা প্রণয়ন ও ঠিকাদার নিয়োগ হয়েছে। সামনে আর কী চ্যলেঞ্জ আছে জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, সেতুর পাইলিংয়ের কাজটি খুব চ্যালেঞ্জিং। কারণ, ১১৮ মিটার ব্যাপ্তির পাইল বড় হাতুড়ি দিয়ে মাটির নিচে পাঠানো হবে। অনেক সময় মাটি ফেঁসে যেতে পারে। তখন মাটি বের করে আবার পাইল করতে হবে। এটা বেশ জটিল কাজ। তিনি আরও বলেন, নদীশাসনের ক্ষেত্রে মূল সমস্যা আগামী বর্ষায় নদী এখনকার অবস্থায় থাকবে কি না, সে অনিশ্চয়তা। এ ছাড়া পানির নিচের মাটির ৩০ মিটার পর্যন্ত কেটে ঢাল তৈরি করতে হবে। এটা করার সময় ঢাল ধসে পড়তে পারে। যমুনা সেতু নির্মাণের সময়ও ১৫ মিটার ঢাল করতে গিয়ে ধস হয়েছিল। তখন নকশা পরিবর্তন করতে হয়েছিল।
কাজের অগ্রগতি এবং কারা কোন কাজ পেয়েছে
মূল সেতুর কাজ পেয়েছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। এটির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল ২০১১ সালে। কিন্তু বিশ্বব্যাংকসহ দাতারা অর্থায়ন স্থগিত করলে ঠিকাদার নিয়োগও ঝুলে যায়। সরকার দেশীয় অর্থায়নে সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নিলে প্রাকযোগ্য চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক দরপত্রে অংশ নেয়। তবে চূড়ান্ত অর্থাৎ আর্থিক প্রস্তাব জমা দেয় একমাত্র চীনের মেজর ব্রিজ কোম্পানি।
একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকায় মেজর ব্রিজ কাজটি পায়। গত জুনে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে সেতু বিভাগ। তবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনের কাজেও সম্পৃক্ত মেজর ব্রিজ এবং তাদের বিরুদ্ধে সময়মতো কাজ শেষ না করার অভিযোগ আছে।
নদীশাসনের কাজ পেয়েছে চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন। দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই ও বেলজিয়ামের জান ডি নাল নামে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও আট হাজার ৭০৭ কোটি টাকা দরপ্রস্তাব করে সিনোহাইড্রো কাজটি পায়। তাদের সঙ্গে গত নভেম্বরে পদ্মার দুই প্রান্তে প্রায় ১৩ কিলোমিটার নদীশাসন করার চুক্তি করেছে সেতু বিভাগ।
সিনোহাইড্রো ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করার কাজ করছে। কিন্তু সময়মতো তা শেষ করতে পারেনি। দুই প্রান্তের ১২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক ও টোল প্লাজা নির্মাণ এবং সার্ভিস এলাকা নির্মাণকাজ পেয়েছে আবদুল মোনেম লিমিটেড।
সেতু বিভাগ সূত্র বলছে, মাওয়া সংযোগ সড়কের কাজের অগ্রগতি ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। ১৯৩ কোটি টাকায় মোনেম লি. কাজটি করছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০৯ কোটি টাকায় সার্ভিস এলাকার কাজও করছে। এ পর্যন্ত অগ্রগতি ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ।
এর বাইরে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ মুন্সিগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে এক হাজার ৭০ কোটি টাকা। পুনর্বাসনের জন্য প্লট করার কথা দুই হাজার ৫৯২টি। অক্টোবর পর্যন্ত ৭৯০টি প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে।
পদ্মাপারের চিত্র পাল্টাচ্ছে
মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কুমারভোগ গ্রামটা একদম পদ্মা নদীঘেঁষা। এই গ্রামেরই সন্তান আবুল কালাম আজাদ। সৌদি আরবপ্রবাসী কালাম এসেছেন ছয় মাসের ছুটিতে। পদ্মার পারে যেখানে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ডেরা গেড়েছে, সেখানে দিনে একবার হলেও ঢুঁ মারেন আবুল কালাম। এখানে ভিড়েছে পদ্মা সেতু নির্মাণের বড় বড় ক্রেনবাহী বার্জ। আজাদ সেগুলো ঘুরে দেখেন আর মুঠোফোনে গান শোনেন।
নদীর যেখানটায় বার্জ থেমেছে, ৩৫ বছর আগে আজাদদের বসতভিটা ছিল সেখানেই। নদীর ভাঙনে সরতে সরতে তাঁদের বসতবাড়ি এখন ঠেকেছে মাওয়া-লৌহজং সড়কের পাশে। আবার যখন আজাদ দেশে আসবেন, সেই ভিটেটাও থাকবে না। পদ্মা সেতুর জন্য অধিগ্রহণ হয়ে গেছে তাঁদের বাড়িটি। সরকারিভাবে আজাদ ও তাঁর তিন ভাইয়ের জন্য পাঁচ শতাংশের প্লট বরাদ্দ হয়েছে।
আজাদ জানালেন, ১৯৯৮ সাল থেকে তিনি সৌদিপ্রবাসী। প্রতিবারই এসে দেখেন গ্রামের কিছু না কিছু পরিবর্তন হয়েছে। তবে এবারের পরিবর্তনটা ব্যাপক। নির্মাণযজ্ঞ, বিদেশিদের দৌড়ঝাঁপ, বড় বড় বার্জ আর ক্রেন—দেখতে তাঁর ভালোই লাগে। বললেন, ‘উন্নয়ন হচ্ছে। তবে রাতে যখন বাড়িতে ঘুমোতে যাই, ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। বসতভিটাটা এবার তাঁদের ছাড়তে হবে।’
আবুল কালাম আজাদের মতো মাওয়া ও জাজিরার পদ্মাপারের অনেক বাসিন্দাই সেতুর কাজের যজ্ঞ দেখে আপ্লুত। তবে এর মধ্যে অনেকেই নীরবে চোখও মুছছেন বসতভিটার মায়ায়।
আজাদের বর্তমান বাড়িটা ১৪ শতাংশজুড়ে। পুরোটাই পদ্মা সেতু প্রকল্পে পড়েছে। আজাদ নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলেন, ‘নদী নিয়ে গেলে তো কিছু করার ছিল না। এখন সরকার দেশের কাজে নিয়েছে।’
পদ্মা সেতু প্রকল্পের শুরুতেই পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবসম্পর্কিত সমীক্ষা করে সেতু বিভাগ। সেই অনুযায়ী পুনর্বাসনেরও পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সামাজিক প্রভাবসম্পর্কিত সমীক্ষা অনুসারে প্রকল্পের কারণে ১৫ হাজার ৫০০ পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এসব পরিবারের জনসংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার। এর প্রায় সাড়ে আট হাজার কৃষক পরিবার। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজার পরিবার ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হবে। এর প্রায় দুই হাজার পরিবারকে প্রকল্পের অধীনে সরকারি প্লট দিয়ে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিন হাজার পরিবারের অন্যত্র জমি রয়েছে কিংবা নিজে থেকে দূরে চলে যাবে। বাকি ১০ হাজার পরিবার বসতবাড়ি নয়, কৃষিজমি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।
অবশ্য কুমারভোগ এলাকার মুদি ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক দাবি করেন, তিনিসহ তাঁর আত্মীয়স্বজনের প্রায় ২১ একর জমি অধিগ্রহণ করা হলেও টাকা পাননি। সরকার বলছে, এগুলো খাসজমি। রাজ্জাকেরা মামলা করেছেন।
মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের অনেক মামলা হয়েছে। সেগুলো বিচারাধীন।
পরিবেশগত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের কারণে দুই লাখ ৯৫ হাজার ৭২টি বড় গাছ কাটা পড়বে। এর বাইরে বাঁশ আর কলাগাছ কাটা পড়বে চার লাখ ৮৫ হাজার। তবে পরিবেশের ক্ষতিপূরণের জন্য প্রকল্প এলাকায় চার লাখের বেশি গাছ লাগানোর কথা আছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে সাত লাখ বাঁশ ও কলার চারা বিতরণ করার কথা।
প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কারণে প্রায় সাড়ে ২৪ হাজার টন নানা শস্য উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। ৭৬৭ হেক্টর এলাকাজুড়ে মাছ ধরার ব্যবস্থা বন্ধ হবে। মাছের চাষ হয় এমন ১২ হেক্টর পরিমাণ পুকুর ভরাট করতে হবে। নদী থেকে প্রায় পাঁচ কোটি ঘনমিটার মাটি ড্রেজিং করে তোলা হবে।
জমির দর বাড়ছে
লৌহজং এলাকায় জমি বিক্রি হয় কানি বা শতাংশ হিসেবে। ১৪০ শতাংশে এক কানি। লৌহজংয়ের নদীপারের বাসিন্দারা জানান, এক যুগ আগে এই অঞ্চলে এক কানি জমির দাম ছিল এক লাখ টাকা। এখন প্রতি শতাংশ জমির দাম ঠেকেছে তিন থেকে চার লাখ টাকায়। তাও বিক্রি করার মানুষ নেই।
পদ্মা সেতুর অপর পার পড়েছে শরীয়তপুরের জাজিরায়। এর টোল প্লাজা ও সংযোগ সড়ক গেছে মাদারীপুরের নদীঘেঁষা উপজেলা শিবচর দিয়ে। সেতুর ভায়াডাক্ট, সংযোগ সড়ক, সার্ভিস এলাকা ও সেনাবাহিনীর ক্যাম্প—সব মিলিয়ে নদীপারের প্রায় সব জমিই অধিগ্রহণ হয়ে গেছে। বাকি যেসব জমি আছে, সেগুলো আর কেউ বিক্রি করছে না।
শিবচর ফেরিঘাট থেকে মহাসড়কের পাশঘেঁষে রেললাইন হওয়ার কথা। সেখানকার জমি চিহ্নিত করে খুঁটিও বসিয়েছে রেলের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এরপরই বাড়তে শুরু করেছে সেখানকার জমির দর।
আড়িয়ালখাঁ সেতুর পাশের বাচামারা গ্রামের ওপর দিয়ে ২০০১ সালের দিকে শিবচর-টেকেরহাট মহাসড়ক নির্মাণ হয়। এর আগে সেখানকার বিঘাপ্রতি জমির দাম ছিল ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। রেললাইনের জন্য মাপজোক করার আগে বিঘার দাম ছিল ২০ লাখ টাকা। সে দাম এখন ৫০-৬০ লাখ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।
বাচামারা গ্রামের জমির পরিমাপক (আমিন) আবুল কালাম বলেন, মহাসড়ক নির্মাণের সময় তাঁর নিজের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। তখন বিঘাপ্রতি ৩২ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। এরপরই জমির দর বাড়তে থাকে। এবার রেলের কথা শোনার পর জমির বেচাই বন্ধ হয়ে গেছে।
প্রকল্প ঘিরে ব্যবসা-চাকরির হাতছানি
প্রকল্প এলাকা এবং প্রকল্পের প্রধান কার্যালয় বনানীর সেতু ভবনে প্রতিদিনই ব্যবসায়ী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা নানা তদবির নিয়ে হানা দিচ্ছেন। চাকরি দেওয়ার নাম করে একাধিক প্রতারক চক্রও সক্রিয়।
সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাকা ডিপোজিট করার জন্য লোভনীয় প্রস্তাব নিয়ে একাধিক ব্যাংক চিঠি দিয়েছে। সম্প্রতি দুটি বেসরকারি ব্যাংক এ ধরনের চিঠি দেয়। বাংলাদেশে থাকা দেশি-বিদেশি প্রায় সব সিমেন্ট কোম্পানিই তাদের পণ্যের গুণগত মান তুলে ধরে তা ব্যবহারের জন্য আবেদন জানিয়েছে। রড-লোহার কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রতিদিনই প্রকল্পের পরিচালকসহ অন্য কর্মকর্তাদের কক্ষে ধরনা দিতে দেখা গেছে। আছেন পাথর, বালু ও বিভিন্ন ব্যবহার্য পণ্যের কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরাও।
প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেকে দেখা করতে চান। কিন্তু নির্মাণকাজে কী পণ্য ব্যবহার হবে, তা ঠিক করার ক্ষমতা প্রকল্প কর্মকর্তাদের নেই। এটা ঠিকাদারের এখতিয়ার। আর তা তদারকির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে।
গত ২৮ নভেম্বর লৌহজংয়ে চায়না মেজর ব্রিজ কোম্পানির কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন চাকরির জন্য এসেছেন। তাঁদের একজন শফিকুল ইসলাম জানান, তিনি সার্ভেয়ার হিসেবে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করে মংলা বন্দরে অন্য একটি প্রকল্পে কাজ করছেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর অধীনে সার্ভেয়ার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেখে এখানে এসেছেন। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু প্রকল্পটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। চাকরিও করা যাবে অনেক দিন। থাকার ব্যবস্থা পেলে কম বেতনেও রাজি হয়ে যাবেন।
ক্রেন অপারেটরের চাকরির জন্য এসেছিলেন আবুল কাশেম। তিনি জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করেছেন।
প্রকল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কিত সমীক্ষায় বলা হয়েছে, প্রকল্প চলাকালীন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের অস্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এর বাইরে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এর টোল প্লাজা পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে স্থায়ীভাবে আরও অনেক কর্মসংস্থান হবে। এসব কজে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চাকরির এই সুযোগ তৈরির ফলে প্রতারক চক্রও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। শিকদার ট্রেডিং কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রতারণা শুরু করে। প্রতারক চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার এবং ৯৮ জন শ্রমিককে উদ্ধার করে পুলিশ। তবে এর আগেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কাছ থেকে জামানত বাবদ কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
পিছিয়ে আছে রেললাইন নির্মাণ, পথ নিয়েও ক্ষোভ
মূল সেতুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোচ্ছে না রেলপথ নির্মাণের কাজ। প্রাথমিকভাবে মাওয়া থেকে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এখনো অর্থায়ন নিশ্চিত হয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সময় সে দেশের সরকারের পক্ষ থেকে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাপানি অর্থায়ন ধরে নিয়ে রেলের কর্মকর্তাদের এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে যশোর পর্যন্ত প্রায় ১৬০ কিলোমটার রেলপথ নির্মাণের কথা রয়েছে। একটি অংশ গেন্ডারিয়া থেকে কেরানীগঞ্জ হয়ে ভাঙ্গা পর্যন্ত ৮২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার, বাকিটা যশোর পর্যন্ত ৭৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা-ভাঙ্গা রেললাইন নির্মাণে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি এখনো পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়নি। একাধিক নদী থাকার কারণে ঢাকার গেন্ডারিয়া থেকে মুন্সিগঞ্জ জেলার সীমানা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার উড়ালপথে রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যা তিনটি পদ্মা সেতুর দৈর্ঘ্যের চেয়েও বেশি। জটিল কাজ বলে এই অংশটুকু পরে করা হবে।
দ্বিতীয় ভাগ বা ভাঙ্গা-যশোর অংশের রেললাইন নির্মাণ নির্ভর করবে পরবর্তী অর্থায়ন পাওয়ার ওপর।
সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুর দুই প্রান্তে রেললাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই, নকশা প্রণয়ন ও দরপত্র দলিল তৈরির লক্ষ্যে কানাডাভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যানারেলের নেতৃত্বে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। তাদের ২০১২ সালে প্রায় ২৩৭ কোটি টাকায় নিয়োগ দেয় রেল কর্তৃপক্ষ।
রেলের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা থেকে ভাঙা পর্যন্ত রেললাইন করতে হলে ৩৬৫ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে ২৭৩ হেক্টর ব্যক্তিগত ও ৯২ হেক্টর সরকারি জমি। ইতিমধ্যে কয়েকটি এলাকার মানুষ প্রতিবাদ জানিয়ে নকশা পরিবর্তনের আবেদন করেছেন। সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদ এসেছে মুন্সিগঞ্জের নিমতলা বাজার, শিবচরের বাচামারা গ্রাম ও পুলিয়া বাজারের বাসিন্দাদের কাছ থেকে। কারণ, রেলপথটি এই তিন স্থানের মাঝখান দিয়ে যাবে। প্রায় ৮০টি বাড়ি নিয়ে বাচামারা গ্রামের পুরোটাই সরিয়ে ফেলতে হবে।
সম্প্রতি বাচামারা গ্রামে গেলে বাসিন্দারা বলেন, নদীর পূর্ব পারে যেখানে সীমানা দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকে সোজা রেললাইন গেলে বাড়িঘর ভাঙা পড়ে না। জমির ওপর দিয়ে চলে যায়। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ জমি অধিগ্রহণ কমানোর জন্য মহাসড়কের পাশ দিয়ে, বসতির ওপর দিয়ে সীমানা চিহ্নিত করেছে।
বাচামারা গ্রামের বাসিন্দা আলাউদিন মৃধা ও রাজ্জাক মৃধা বলেন, এপার-ওপার করে সাতবার বসতবাড়ি নদীতে গেছে। রেললাইনের কারণে অষ্টমবার ভাঙতে হবে। কিন্তু এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষের বসতবাড়ির বাইরে আর কোনো জমি নেই। ফলে অনেক দূরে বা অন্য জেলায় চলে যেতে হবে তাঁদের। এর আগে মহাসড়ক নির্মাণের সময় গ্রামের মানুষ একবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গ্রামের নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা রেললাইন চাই। তবে আরও ১০০ গজ দক্ষিণে রেললাইন হলে সোজা পথে হয় এবং আমরাও বেঁচে যাই। রেলপথ বাঁকা করেই আমাদের সর্বনাশ করা হচ্ছে।’
জানতে চাইলে প্রকল্পের পরিচালক সাগর কৃঞ্চ চক্রবর্তী প্রথম আলোকে বলেন, সেতু চালুর দিন থেকেই রেল চালুর লক্ষ্যে কাজ এগোচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে কম মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় সেই বিবেচনা শুরু থেকেই ছিল। এর পরও কিছু করার থাকলে দেখা হবে।
জীবন বদলের স্বপ্নে বিভোর দক্ষিণের মানুষ
গত ২৭ নভেম্বরের কথা। নতুন শিমুলিয়া ঘাট থেকে কাওড়াকান্দি যেতে প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল। ফেরিতে কথা হলো খুলনার বাসিন্দা কাপড় ব্যবসায়ী দুলাল চন্দ্র রায়ের সঙ্গে। ঢাকায় আসেন নিয়মিত। মাওয়া-কাওড়াকান্দি হয়ে খুলনা যেতে দিনের বেলায় লাগে সাত ঘণ্টা আর রাতে হলে সেটা ১০ ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকে। এর মধ্যে পদ্মাপারে নেমে নৌযানে ওঠা, নদী পাড়ি দিয়ে আবার গাড়িতে উঠতেই তাঁর তিন ঘণ্টা লেগে যায়। অথচ পদ্মা সেতু হলে ট্রেন বা বাস যে যানেই হোক নদী পাড়ি দিতে ২০-৩০ মিনিটের বেশি লাগবে না।
আনন্দে হাসি না চেপেই দুলাল বলেন, কবে যে সেতু হবে আর পাড়ি দেব, তর সইছে না। আসলে দক্ষিণের মানুষের যে এখন কী কষ্ট তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বোঝতে পারবে না। পদ্মা সেতু দক্ষিণের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হয়েই দেখা দেবে।
পদ্মা সেতু প্রকল্পের সমীক্ষা বলছে, সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলার মানুষের জীবন পাল্টে যাবে। দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বেড়ে যাবে ১ দশমিক ২ শতাংশ। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জিডিপি বাড়বে ২ দশমিক ৩ শতাংশ। মংলা বন্দর ও বেনাপোল স্থলবন্দরের সঙ্গে রাজধানী এবং বন্দরনগরে চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
এই সেতুকে ঘিরে পদ্মার দুই পার সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই নগরের আদলে শহর গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইতিমধ্যে মাদারীপুরের শিবচরের কুতুবপুরে একটি ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে জমির স্কেচম্যাপ করা হয়েছে। দক্ষিণ পারে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। পদ্মা সেতুর দুই পারে সেনাবাহিনীর একটি কম্পোজিট ব্রিগেড করার জন্য প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ফলে পদ্মা সেতু ঘিরে এ এলাকায় কর্মযজ্ঞ কেবল শুরু বলা যায়।

Saturday, October 25, 2014

কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচের সড়ক ও রেলক্রসিং- দশ মাসে ৩৫ মৃত্যু by আনোয়ার হোসেন

রাজধানীর কুড়িল-বিশ্বরোড রেলক্রসিং ও কুড়িল উড়ালসড়কের নিচের বিমানবন্দর সড়কে গত ১০ মাসে ৩৫ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ২৫ জন রেলক্রসিং পার হতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায়, ১০ জন রেলক্রসিং পার হয়ে বিমানবন্দর সড়ক অতিক্রম করতে গিয়ে অথবা বিমানবন্দর সড়ক পার হয়ে রেলক্রসিংয়ের দিকে আসার সময় গাড়িচাপায় প্রাণ হারান। রেলওয়ে পুলিশ সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে। রেলওয়ে পুলিশের কমলাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদ জানান, কুড়িলে ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ হারানো ২৫ জনের মধ্যে একজন ছিনতাই করে পালাতে গিয়ে কাটা পড়েন। বাকি ২৪ জনই ছিলেন পথচারী।

>>পদচারী সেতু না থাকায় রাজধানীর কুড়িল-বিশ্বরোড রেলক্রসিং যেন মরণফাঁদ l ছবি: প্রথম আলো
রাজধানীর কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার রেলপথ আছে। এই পথের খিলগাঁও, মগবাজার, কারওয়ান বাজার, বনানী ও কুড়িল রেলক্রসিং এর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে রেলওয়ে। রেলওয়ে পুলিশের হিসাবে, এই পথে গত ১০ মাসে ১৪০ জন ট্রেনে কাটা পড়ে কিংবা ট্রেনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মারা গেছেন। বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে রেলক্রসিংগুলোতে।
কুড়িল উড়ালসড়ক হওয়ার আগে প্রগতি সরণি থেকে বিমানবন্দর সড়কে ওঠার এবং বিমানবন্দর সড়ক থেকে প্রগতি সরণিমুখী যানবাহন এই রেলক্রসিং দিয়ে পারাপার হতো। উড়ালসড়ক হওয়ার পর ক্রসিংটির দুই পাশে স্থায়ী লোহার বেড়া দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে পথচারীরা এই বেড়ার ফাঁক গলে ক্রসিং পারাপার হয়। রেলওয়ে সূত্র জানায়, কুড়িল রেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৯০টি ট্রেন চলাচল করে। আর বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে কয়েক হাজার যানবাহন চলাচল করে।
কুড়িলের বাসিন্দা ও এই পথ ধরে প্রতিদিন উত্তরার আজমপুর চলাচলকারী রবিউল আলম বলেন, ‘এ জায়গায় পদচারী সেতু (ফুটওভারব্রিজ) না থাকায় পথচারীদের জন্য তা মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। বিকল্প কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। মানুষ সতর্ক থাকবে, কিন্তু সেটারও তো একটা মাত্রা আছে। এখানে তো সড়ক ও রেললাইন দুটিই বিপজ্জনক।’
স্থানীয়রা জানান, এই পথ ধরে রাজধানীর বাড্ডা, কাজীবাড়ী, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, কালাচাঁদপুর, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ বিমানবন্দর সড়কে আসে। আবার সেনানিবাস, নিকুঞ্জ, খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকার মানুষ রেললাইন পার হয়ে প্রগতি সরণির দিকে যায়। এদের একটা বড় অংশই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। বি এ এফ শাহীন কলেজ, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজ, শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজ, শহীদ আনোয়ার গার্লস কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ঝুঁকি নিয়ে এই পথে পারাপার হয়। এখানে দুটি পদচারী সেতুর কাঠামো তৈরি হয়ে আছে। কিন্তু এখনো পাটাতন বসানো হয়নি। পথচারীরা বলছেন, এটা হলে ঝুঁকি কিছুটা কমত।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক কুড়িল উড়ালসড়কের পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি গতকাল শুক্রবার রাতে প্রথম আলোকে বলেন, কুড়িল উড়ালসড়ক প্রকল্পে পথচারীদের জন্য যেসব সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল, সেগুলো হয়নি। এ জন্যই পথচারীরা মারা পড়ছেন। তিনি জানান, পরিকল্পনায় ওই স্থানে দুটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণের কথা ছিল। পরে তিনটি ফুটওভার ব্রিজ করার সিদ্ধান্তও হয়েছিল। এগুলো এমনভাবে নকশা করা হয়েছিল, যাতে সড়কের মাঝখানে কোনো খুঁটি না পড়ে। পুরোটাই স্টিল ফ্রেমের হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কয়েকটি খুঁটি বসানো হলেও কাজটি শেষ করা হয়নি।
রেলক্রসিংটি কেন ঝুঁকিপূর্ণ: রেলওয়ে সূত্র জানায়, ক্রসিংয়ের কাছে রেললাইনটি ৩ ডিগ্রি বাঁকানো। এই মাত্রার বাঁক রেলের ভাষায় ‘বড় বাঁক’ হিসেবে চিহ্নিত। এই বাঁকে চলন্ত ট্রেনের সামনের বগির যাত্রীরা জানালা দিয়ে মাথা বের করে পেছনে তাকালে একেবারে শেষ বগি পর্যন্ত দেখতে পারেন।

>>ক্রসিংয়ের কাছে রেললাইনটি ৩ ডিগ্রি বাঁকানো। এ কারণে ক্রসিং পার হওয়ার সময় সরাসরি ট্রেন দেখা যায় না । ছবি: প্রথম আলো
সরেজমিনে দেখা গেছে, এই বাঁকের কারণে ক্রসিং দিয়ে পার হওয়া লোকজন সরাসরি ট্রেন দেখতে পান না। ফলে হঠাৎ ট্রেন কাছে এসে পড়ে। বাঁকের পাশাপাশি রেললাইন ঘেঁষে রয়েছে গাছপালা, অবৈধ দোকানপাটও। ফলে পথচারীরা রেললাইনে উঠে মাঝ বরাবর গিয়ে টের পান ট্রেন আসছে। তখন অনেকে আর সামনে বা পেছনে সরে যাওয়ার সুযোগও পান না। পতিত হন দুর্ঘটনায়।
শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মাসুদ রানা এবং বি এ এফ শাহীন কলেজের একই শ্রেণির মাহমুদুন্নী প্রথম আলোকে বলে, সড়ক থেকে রেললাইনে ওঠার সময় ট্রেন আসছে কি না, তা দেখার কোনো জো নেই। যানবাহনের হর্ন ও প্রচণ্ড শব্দের কারণে ট্রেনের হুইসেল বা আওয়াজও শোনা যায় না। ফলে একটু অসতর্ক হলেই জীবনের ঝুঁকি।
ক্রসিংয়েই মুখেই সড়কের ওপর চকি বসিয়ে কাপড় বিক্রি করেন হায়দার আলী খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে চোখের সামনে এক যুবক মারা গেলেন। শেষ মুহূর্তে যুবকটি টের পেয়ে পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ধারণা করেছিলাম, নিরাপদে পিছিয়ে যেতে পেরেছে। কিন্তু ট্রেন চলে যাওয়ার পর রক্তাক্ত দেহটি পড়ে ছিল।’
রেলওয়ে পুলিশের কমলাপুর থানার ওসি আবদুল মজিদ বলেন, পার্বত্য বান্দরবানে রাস্তার বাঁকে যানবাহন যাতে নজরে পড়ে সে জন্য আয়না লাগানো হয়েছিল। কুড়িলেও পথচারীদের জন্য এই ব্যবস্থা করলে ট্রেনে কাটা পড়ার হার কমতে পারে।
>>ক্রসিংটির দুই পাশে লোহার প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে l ছবি: প্রথম আলো
ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার: রেলক্রসিংটি পার হয়ে বিমানবন্দর সড়কে এসে অথবা বিমানবন্দর সড়ক পার হয়ে প্রগতি সরণিতে আসার সময় রাস্তায় দ্রুতগতির গাড়ির চাপায় পড়ে গত ১০ মাসে মারা গেছেন ১০ জন। খিলক্ষেত থানা সূত্র আরও জানায়, কুড়িল ক্রসিংয়ের কাছে এভাবে সড়ক পারাপারের কারণে গত ১০ মাসে ৩০টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় অন্তত ১০ জন মারা যান। আহত হন অনেকে। খিলক্ষেত থানার ওসি নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বেপরোয়া গতির যান ও পথচারীদের অসতর্কতাই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের হিসাবে, রাজধানীর ৫৪টি মোড়ে প্রাণহানির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এসব মোড় ও সড়ক বিভাজকের কাটা অংশ দিয়ে পথচারীরা পারাপার হতে গিয়েই বেপরোয়া ও দ্রুতগতির যানবাহনের নিচে চাপা পড়েছেন। রাজধানীতে ২০১২ সালে ৩৬৭ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এর মধ্যে ২৫৪ জনই পথচারী।
কুড়িল ক্রসিংয়ে ট্রাফিক পুলিশের একটি বক্স আছে। সেখানকার এক সদস্য বলেন, তিনি ঘড়ি ধরে হিসাব করে দেখেছেন, এই সড়ক দিয়ে ব্যস্ত সময় প্রতি মিনিটে গড়ে ১৫০টি যানবাহন চলে। এর মধ্যেই মিনিটে গড়ে ২০-২৫ জন পথচারী হাঁত উঁচিয়ে, গাড়ি থামিয়ে, শরীরের নানা কসরত করে পারাপার হন।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক সামছুল হক জানান, কুড়িল উড়ালসড়ক প্রকল্প-পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, ফুটওভারব্রিজ করার পর যাতে কেউ আর উড়ালসড়কের নিচ দিয়ে বিমানবন্দর সড়ক পার না হতে পারে, সে জন্য বিদ্যমান সড়ক বিভাজকের উচ্চতা সাড়ে তিন ফুট থেকে বাড়ানো হবে। সূত্র জানায়, ৩০৬ কোটি টাকার কুড়িল উড়ালসড়কটি তড়িগড়ি করে গত বছর উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধনের পর ফুটওভারব্রিজ নির্মাণসহ প্রকল্পের ছোটখাটো কিছু কাজ রয়ে গেছে।

Wednesday, October 22, 2014

বেপরোয়া গতি, চালকের জন্যই ৯১% দুর্ঘটনা- ঢাকায় সবচেয়ে বেশি মারা যায় পথচারী by আনোয়ার হোসেন

মহাসড়কে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয় যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষ এবং পথচারীদের চাপা দেওয়ার ঘটনায়। রাজধানী ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারায় পথচারীরা। এসব দুর্ঘটনার ৯১ শতাংশই ঘটে অতিরিক্ত গতিতে বেপরোয়াভাবে যানবাহন চালানোর কারণে। গত সোমবার নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৩৪ জন প্রাণ হারান। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) ১৪ বছরের (১৯৯৮ থেকে ২০১২ সাল) তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চিত্র পাওয়া গেছে। এআরআই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি প্রতিষ্ঠান। দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত পুলিশের সংগ্রহ করা তথ্য নিয়েই প্রতিষ্ঠানটি গবেষণা করে এবং তথ্যভান্ডার তৈরি ও ক্ষেত্রবিশেষে সরেজমিনে প্রতিবেদন তৈরি করে। দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক তথ্য বিবরণী (এফআইআর) কিংবা মামলা হলেই কেবল পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করে। এর বাইরের দুর্ঘটনার তথ্য সরকারি হিসাবে থাকে না।

>>নাটোরের গুরুদাসপুরে বাবা হারানোর শোকে কাতর মাজেদুল ইসলাম। দুই বছর পর সম্প্রতি দেশে ফেরেন তিনি l প্রথম আলো
পুলিশ যে ছকে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে, তাতে ১৮টি ঘর থাকে। এতে ১১ ধরনের দুর্ঘটনার উল্লেখ থাকে। গত ১৪ বছরে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪৯ হাজার ৭৭৭টি। এর মধ্যে পথচারীদের চাপা দেওয়ার ঘটনা ২২ হাজার ৩৫৫টি। আর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে সাত হাজার ৫৪৩ বার। তবে মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণহানির সংখ্যা বেশি। এআরআইয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সব ধরনের দুর্ঘটনাতেই নিহত ব্যক্তিদের কয়েক গুণ আহত হয়েছেন।
ঢাকার রাস্তা পথচারীদের জন্য মৃত্যুফাঁদ: পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ সালে রাজধানী ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৬৭ জন মারা যান। এর মধ্যে ২৫৮ জনই পথচারী। অর্থাৎ দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া ৭০ শতাংশেরও বেশি মানুষ পথচারী। এসব মৃত্যুর ৭২ শতাংশই ঘটেছে মোড়গুলোতে। এটাই পুলিশের করা সর্বশেষ হিসাব।
বুয়েটের এআরআই রাজধানীর ৫৪টি মোড়কে দুর্ঘটনার জন্য বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করেছে। ২০১২ সালে করা এক সমীক্ষায় এসেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ঢাকার এই মোড়গুলোতে দুই হাজার ৪২৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ মোড় হচ্ছে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার মোড়, বিজয় সরণি, তোপখানা থেকে পুরানা পল্টন মোড় ও সায়েদাবাদ মোড়।
অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালকই দায়ী বেশি: এআরআই বিশ্লেষণ অনুসারে, গত ১৪ বছরে সারা দেশে ৪৯ হাজার ৭৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে ৯১ শতাংশই অতিরিক্ত গতি ও চালকের বেপরোয়া চালনার জন্য হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় মারা যায় ৪২ হাজার ৫২৬ জন। অবশ্য বেসরকারি হিসাবে দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানির পরিমাণ অনেক বেশি।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত সংবাদের ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংরক্ষণ করে। তাদের হিসাবে গত জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসেই তিন হাজারের বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। আর এসব ঘটনায় মারা যান তিন হাজার ৭৭০ জন। গাড়ির গতিবেগ মেপে অতিরিক্ত গতির জন্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হাইওয়ে পুলিশকে স্পিডগান সরবরাহ করেছে সরকার। কিন্তু অভিযোগ হচ্ছে, পুলিশ সেটা ব্যবহার করে না।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামে একটি বেসরকারি সংগঠনও। এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন দুর্ঘটনা নিয়ে সমীক্ষা চালিয়েছেন একাধিকবার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া যানবাহন চালানোর পেছনে চারটি বড় কারণ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে চালকের প্রশিক্ষণের অভাব, চালকের স্থায়ী নিয়োগের বদলে যাত্রার ওপর বেতন নির্ধারণ, শাস্তির অপ্রতুলতা এবং হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বে অবহেলা।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালালে যানবাহন মালিকও খুশি হন। কারণ, তাতে ট্রিপ বাড়ে। একই কারণে চালকের আয় বৃদ্ধি পায়। ক্ষেত্র বিশেষে চালক যাত্রীদেরও বাহবা পান। এ জন্যই চালকেরা উৎসাহী হয়ে গাড়ির গতি বাড়ান এবং দুর্ঘটনা ঘটে। এতে চালকের প্রাণহানিও ঘটে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী সরকারকেই দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘মানছি, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব আছে। তাহলে সরকার কেন প্রশিক্ষণ দিচ্ছে না? হাইওয়ে পুলিশের তো যন্ত্র আছে। তারা ব্যবস্থা নেয় না কেন? আসলে চালকেরা মুনাফাবাজির শিকার।’
গতি নিয়ন্ত্রণ হয় না: মোটরযান আইনে যানবাহনের জাতীয় গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। জাতীয় মহাসড়ক এবং শহর ও লোকালয়ের জন্য আলাদা গতিসীমা রয়েছে। মহাসড়কে বাস, কোচ ও পিকআপের সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করা আছে ঘণ্টায় ৫৫ কিলোমিটার। ভারী ট্রাক ও লরির গতিবেগ ৫০ কিলোমিটার। ট্রাক্টর ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ৩০ কিলোমিটার। ব্যক্তিগত গাড়ির সর্বোচ্চ গতি ১১০ কিলোমিটার।
শহর ও লোকালয়ে সব যানবাহনেরই গতিসীমা আরও কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে বাস, কোচ, পিকআপ, ভারী ট্রাক, লরির সর্বোচ্চ গতিসীমা ৪০ কিলোমিটার। ট্রাক্টর ও ভারী যানবাহন ২০ কিলোমিটার। ব্যক্তিগত গাড়ির গতিবেগ ৫০ কিলোমিটার।
অবশ্য সড়ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে নির্দিষ্ট স্থানে মোটরযান আইনের এই গতিসীমা কম-বেশি করতে পারে। কিন্তু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা আইনে উল্লেখ করা গতিসীমা কোনোটাই চালকেরা মেনে চলেন না।
সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, গত কয়েক বছরে তিনি বহুবার যন্ত্র ব্যবহার করে যানবাহনের গতিসীমা মেপেছেন। টের পেয়ে অধিকাংশ চালকই গতি কমিয়ে দেন। তবে এর পরও নির্ধারিত গতির চেয়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি গতিতে যানবাহন চালাতে দেখা গেছে। তিনি আরও বলেন, দুর্ঘটনার মূল কারণের বাইরে আরও অনেক কারণ থাকে। উন্নত বিশ্বে এসব কারণ বের করে সমাধানের জন্য সরকারের আলাদা বিভাগ রয়েছে। বাংলাদেশে পুলিশের সেই ধরনের দক্ষতা নেই। ফলে অনেক কারণ ও সমাধান অজানা থেকে যায়। হাইওয়ে পুলিশের গতি মাপার কিছু যন্ত্র আছে। তবে তা ব্যবহার করে যানবাহন চালককে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসার নজির কম।
জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক এস এম কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, অতিরিক্ত গতি মাপার যন্ত্র হাইওয়ে পুলিশের সব স্থানেই আছে। গতি না মানার দায়ে প্রতিদিনই মামলা দেওয়া হয়। একাধিক চালকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাস ও ট্রাকের প্রায় সব চালকই মাসিক বেতনভুক্ত নন। যাত্রা (ট্রিপ) অনুযায়ী মালিকের কাছ থেকে টাকা পান। এ জন্যই পথে গতি বৃদ্ধি করে পাল্লা দিয়ে যানবাহন চালান তাঁরা। এতেই দুর্ঘটনা ঘটে।
সামছুল হক বলেন, বাণিজ্যিক চালকেরা বাধ্য না হলে গতি কমাবেন না। প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকায় নিজের মৃত্যুঝুঁকি থাকার পরও তাঁরা পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালান। এটা বন্ধ করতে হলে হাইওয়ে পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি ও চালকের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

Monday, October 20, 2014

লতিফ সিদ্দিকীর কলকাতায় অবস্থান- দল ও সরকারে অস্বস্তি by আনোয়ার হোসেন

আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দেশে ফিরুন, তা চায় না আওয়ামী লীগ। তবে তাঁর ভারতের কলকাতায় অবস্থান করা নিয়েও দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে কিছুটা অস্বস্তি আছে বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লতিফ সিদ্দিকী প্রতিবেশী দেশ ভারত ছেড়ে অন্য কোনো দেশে গেলে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা খুশি হবেন। তবে তাঁর সঙ্গে দল কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত কোনো যোগাযোগ করা হবে না। তিনি যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাতেও সাড়া দেওয়া হবে না। বরং এমন পরিবেশ-পরিস্থিতি তৈরি করা হবে, যাতে তিনি নিজে থেকেই দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে করা একটি মামলায় গত বুধবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি এরই অংশ। সরকার ও দলের এ অবস্থানের কথা বিভিন্ন মাধ্যমে লতিফ সিদ্দিকী ইতিমধ্যে জেনেছেনও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতাদের মতে, লতিফ সিদ্দিকী দেশে আসার অর্থই হচ্ছে ধর্মভিত্তিক দল, সংগঠন ও সরকারবিরোধীদের হাতে ইস্যু তুলে দেওয়া। সরকার ও আওয়ামী লীগ এই মুহূর্তে এ ঝুঁকি নেবে না। ২৪ অক্টোবর দলের কার্যনির্বাহী সংসদের পরবর্তী বৈঠকে তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদ বাতিলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল-আলম লেনিন প্রথম আলোকে বলেন, দল যা করার করেছে। বাকিটা করবে ২৪ অক্টোবরের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে। এখন দেশে আসা না-আসা লতিফ সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত ব্যাপার। আর তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলো আইনের নিজস্ব গতিতে চলবে। সরকারের একজন মন্ত্রী বলেন, প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি বিপর্যস্ত থাকায় এই মুহূর্তে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। এ অবস্থায় হজ ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে মন্তব্য সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। বিশেষ করে ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে সরকার উদ্বেগের মধ্যে পড়ে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকা অবস্থায়ই লতিফের মন্ত্রিত্ব বাতিলের সিদ্ধান্তের কথা দ্রুত গণমাধ্যমে প্রচারের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে আরব দেশগুলোর মনোভাব নিয়ে সরকার সব সময় কিছুটা অস্বস্তিতে থাকে। হজ যেহেতু সৌদি আরবের একটা বড় উৎসব, তাই লতিফ সিদ্দিকীর বক্তব্যে সৌদি সরকার যাতে আহত না হয়, সে বিষয়ে সরকার কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিল। তাই ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও গত শুক্রবার বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বিতর্কিত বক্তব্যের কারণে সরকার ও দলের যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। অবশ্য আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের যা করণীয় তা করা হয়ে গেছে। এখন তিনি দেশে আসবেন, নাকি বিদেশে থাকবেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। এখানে দল বা সরকারের কিছু করার নেই। লতিফ সিদ্দিকীর পরিণতির পর আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা এখন রাজনীতি কিংবা অন্য কোনো বিষয় নিয়ে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছেন। একজন মন্ত্রী এই প্রতিবেদককে বলেন, আগামী কিছুদিন বক্তৃতাবাজি বন্ধ। কোন কথা বিপদ ডেকে আনে, বলা তো যায় না।
এদিকে লতিফ সিদ্দিকী বাদ যাওয়ার ফলে দলের সভাপতিমণ্ডলী ও মন্ত্রিসভা—দুই জায়গাতেই পদ খালি হয়েছে। সভাপতিমণ্ডলীর পদ নিয়ে তেমন প্রতিযোগিতা নেই। তবে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাওয়ার আশায় অনেক নেতাই দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। সরকারের গত আমলে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছিলেন এমন অন্তত পাঁচ-ছয়জন নেতা নিয়মিত গণভবনে যাতায়াত করছেন বলেও জানা গেছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্ষদ সভাপতিমণ্ডলী ১৫ সদস্যবিশিষ্ট। এর মধ্যে লতিফ সিদ্দিকী বহিষ্কার ও জোহরা তাজউদ্দীন মারা গেছেন। ফলে সভাপতিমণ্ডলীর দুটি পদ শূন্য আছে। দলীয় একটি সূত্র জানায়, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সভাপতিমণ্ডলীর দুটি শূন্যপদ পূরণের সম্ভাবনা আছে। এরপর দলের জাতীয় কমিটির সভা হবে। দশম সংসদ হওয়ার পর জাতীয় কমিটির বৈঠক হয়নি।

Thursday, September 11, 2014

স্বপ্ন দেখতে মানা! by আনোয়ার হোসেন

ঝিরিনা মুন্ডাকে খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় ধানখেতে। তিনি তখন পরের জমিতে গ্রামের অন্য নারীদের সঙ্গে ধানের চারা রোপণ করছিলেন।

মজুরির বিনিময়ে তাঁর ধান বোনা, ধান কাটা, ধানখেতের আগাছা পরিষ্কার করার কাজ শুরু হয় পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই। ভাত-কাপড় আর লেখাপড়ার খরচের জন্য এ ছাড়া কোনো উপায় ছিল না শিশু ঝিরিনার সামনে। বাবার স্মৃতি মনে নেই। তিনি যখন কেবল হাঁটতে শেখেন, তখনই দিনমজুর বাবা নগেন মুন্ডার মৃত্যু হয়। পরিবারে তিন বোন আর মা। বোনদের মধ্যে তিনি ছোট। এক বোন আবার দুই সন্তান নিয়ে স্বামীর ঘর ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছেন। এ অবস্থায় শিশুকাল থেকেই খেটে খাওয়া ছাড়া আর কি উপায় থাকতে পারে ঝিরিনার সামনে?
খেটে খাওয়া মা আরতি মুন্ডাও মাঝেমধ্যে ভেবেছেন বিয়ে দিয়েই একটা উপায় বের করার কথা। কিন্তু ঝিরিনার প্রবল আপত্তির মুখে মা আর ওমুখো হননি। লেখাপড়ার প্রতি প্রবল আগ্রহ দেখে মা মেয়ের ইচ্ছাকে সম্মান দিতে বাধ্য হয়েছেন। অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে লেখাপড়ায় সম্মানজনক ফলাফলও অর্জন করতে পেরেছেন এই কর্মঠ আদিবাসী মেয়ে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল মহিলা ডিগ্রি কলেজের ছাত্রী ঝিরিনা মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন। গত ১৩ আগস্ট এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়।
সম্প্রতি নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর ইউপির বনগাঁ গ্রামে গিয়ে কথা হয় ঝিরিনা, তাঁর মা আরতি, মেজো বোন মিরিন, পাড়া-প্রতিবেশী ও গ্রামের মোড়ল রায়চরণ মুন্ডার সঙ্গে। আরতি জানান, ঝিরিনার হাঁটতে শেখার সময় স্বামী মারা যান। তার আগে তিনি দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তিন বছর পঙ্গু হয়ে বাড়িতে বসে ছিলেন। তখন থেকে অনাহার-অর্ধাহার আর দুঃখ-কষ্ট ছিল তাঁদের প্রতিদিনের সঙ্গী। প্রথমে বড় মেয়েকে নিয়ে খেতে-খামারে ও পরের বাড়িতে কাজ করে দিন চলত খেয়ে না খেয়ে। বড় মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পর মেজো মেয়ে, তারপর ঝিরিনাকে সঙ্গে নিয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধে নামতে হয়েছে তাঁকে। মেজো মেয়ে মিরিনও কাজ করার পাশাপাশি লেখাপড়া করেছেন। তিনিও এখন নাচোল মহিলা কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে পড়েন। আর ঝিরিনাও অভাব-অনটন দেখতে দেখতেই বড় হচ্ছেন। তবে তিনি এটাও দেখছেন যে, তাঁর মেজো বোনও কাজ করার পাশাপাশি লেখাপড়া করেছেন মনোযোগ দিয়ে। কুপিবাতির আলোতেই পড়েছেন ওঁরা। ভাইদের সহযোগিতায় বছর খানেক আগে বিদ্যুৎ নিয়েছেন। মেজো মেয়ে লেখাপড়ায় খারাপ না হলেও ঝিরিনা তাঁর চেয়ে ভালো। কিন্তু ঝিরিনা তো ভালোভাবে পাস করলেন। এখন তিনি কী করবেন? প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপ হয়ে থাকেন তাঁরা। পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা মা আরতি, মেয়ে ঝিরিনা ও মিরিনা।
ঝিরিনা তুমি কী স্বপ্ন দেখো? এ প্রশ্নেও চুপচাপ। ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। মাথা নিচু করে থাকেন ঝিরিনা। তাঁর চোখের কোণ চিক চিক করে ওঠে।
নীরবতা ভেঙে মা আরতি মুন্ডা এবার বলেন, ‘হামরা গরিব আদিবাসী। বড় বড় স্বপনো কি হামরা দেখতে পারি। ভালো বিহা আসলে দিয়া দিব। আর এক বেটিও তো লিখাপড়া করছে, চাকরি তো পায় না। হামাদের গরিবের ছ্যালা-পিলাকি চাকরি পাইবে? অত লিখাপড়া কইর্যাই কী হোইবে?’
মিরিনা জানান, তাঁর মতো ঝিরিনাকেও শেষ পর্যন্ত নাচোল কলেজে ডিগ্রি পাস কোর্সে ভর্তি হতে হবে। এ ছাড়া তো তাঁদের আর সামর্থ্য নেই। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে পারেননি। এসব শুনে ঝিরিনা স্থান ত্যাগ করেন। চোখের জল গোপন করতেই হয়তোবা। তা ছাড়া তাঁকে তো আবার পরে জমিতে ধান বুনতে যেতে হবে। বাড়ির পাশে ধানখেত থেকে তাঁকে ডেকে নিয়ে আসা হয় কথা বলার জন্য।
প্রতিবেশীরা বলেন, বড়ই লক্ষ্মী আর মেধাবী মেয়ে ঝিরিনা। তিনি যদি সুযোগ পেতেন অনেক দূর যেতে পারতেন।
নাচোল মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ওবায়দুর রহমান বলেন, নাচোল উপজেলায় এই প্রথমবারের মতো একজন আদিবাসী মেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেলেন। অনেক দূর থেকে (১৮ কিমি) এসে ক্লাস করতেন। তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যাওয়াটা হবে খুবই দুঃখজনক।

Tuesday, November 5, 2013

রানা প্লাজা ধস- শরীরে লাশের গন্ধ by আনোয়ার হোসেন

২৪ এপ্রিল আমার অবস্থান ছিল ধসে পড়া রানা প্লাজা থেকে এক কিলোমিটারের কম দূরত্বে। আগের দিন রাতে বেড়াতে গিয়েছিলাম সেখানে।