Monday, October 13, 2014

হুদহুদ সাইক্লোনের তাণ্ডবে ভালোবাসার নজির

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ ও উড়িষ্যায় রোববার প্রচণ্ড গতিতে ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ আঘাত হানে। এ সময় জলোচ্ছ্বাসে বিশাল এলাকা তলিয়ে যায়। সবাই যখন নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে। কিন্তু কেউ কেউ আবার বিপদকে মাথায় নিয়ে ভালোবাসার মানুষটিকে উদ্ধারের নেমেছেন। এক ব্যক্তির স্ত্রী বেড়াতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়ে যান। লোকটি কিন্তু বিপদের মুখে ফেলে সরে যাননি। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তার স্ত্রীকে উদ্ধার করেছেন। তবে তাদের পরবর্তী কাহিনী জানা যায়নি। ছবিটি প্রকাশ করেছে হিন্দুস্তান টাইমস।

‘প্রথম সুযোগেই দেশে ঢুকে পড়ব’ -আবদুল লতিফ সিদ্দিকী

নিজ দল আওয়ামী লীগ এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যহতি পাওয়া আবদুল লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, ভারত থেকে ‘প্রথম সুযোগেই’ তিনি বাংলাদেশে ‘ঢুকে পড়তে’ চান। এজন্য তিনি সরকার ও দলের সবুজ সঙ্কেতের অপেক্ষায় আছেন। তবে শেষ পর্যন্ত দেশে ফেরা না হলে তিনি ভারতের আশ্রয়ে থাকতে চান। কলকাতায় অবস্থানরত লতিফ সিদ্দিকী আজ সোমবার সন্ধ্যায় বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে এ কথা বলেন।
সাক্ষাত্কারটির হুবহু তুলে ধরা হলো:
বিবিসি: সরকার এবং দল থেকে বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে কীভাবে নিচ্ছেন?
লতিফ সিদ্দিকী: আমার প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক। কারণ আমি একটা দল করি। দলের একটা নিয়ম শৃঙ্খলা আছে। সেই নিয়ম শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেছি বলে আমার দলনেতা মনে করেছেন। সেইজন্য দলের নেতা ব্যবস্থা নিয়েছেন দলের সর্বোচ্চ ফোরামে বসে। সো, এটা নিয়ে আমার তো বিরুপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা না। এই দলই আমাকে মন্ত্রী বানাইছে। এই দলের নেতাই আমাকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এখন তিনি বা তাঁর সহকর্মী মিলে যদি আমাকে মনে করেন যে আমি সহকর্মী হওয়ার যোগ্যতা রাখি না; সেটা সংখ্যাগরিষ্ঠ গণতন্ত্রে তো এটা কোনো অপরাধ না।
বিবিসি: তাঁরা মনে করেছেন, কিন্তু আপনি কি সেই... তাঁদের যে মনে করা, আপনি তাঁদের সঙ্গে একমত?
লতিফ সিদ্দিকী: আমি একমত, কারণ আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত।
বিবিসি: আপনার কাছে কি মনে হচ্ছে যে আপনার প্রতি অবিচার করা হচ্ছে?
লতিফ সিদ্দিকী: না, না। বরঞ্চ আমি অনুতপ্ত যে আমি আমার দল, আমার দলনেতাকে একটা বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিয়েছি।
বিবিসি: এছাড়া অন্য কোনো অনুশোচনা হচ্ছে? পুরো অবস্থার জন্য কি কোনো অনুশোচনা হচ্ছে?
লতিফ সিদ্দিকী: না আমার কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ নেই। আমার নেতাকে আমি বিব্রত করেছি। তিনি আমার ওপর আস্থা রেখেছিলেন, আমি তাঁকে খুব কষ্ট দিয়েছি।
বিবিসি: কিন্তু আপনি যেটা বলেছিলেন, সেটা নিয়ে কি কোনোভাবে কোনো ধরণের অনুশোচনা হচ্ছে?
লতিফ সিদ্দিকী: আবার বলি, আপনারা কিন্তু আমাকে শোনাতে চেয়েছিলেন, আমি কিন্তু বলি নাই। আমার এই জায়গাটায় একটা আক্ষেপ আছে যে সারা পৃথিবীতে কি একজন সাংবাদিক বা একজন মানুষ নেই যে জিজ্ঞেস করল না উনি একটা আড্ডাতে কথা বলেছেন। কোনো সভায় নয়, কোনো সমিতিতে নয়, মাইকে নয়। তো, সেই আড্ডায় উনি পুরোটা কী কথা বললেন, সেইটা না জেনে একটা খন্ডিত অংশ, বিকৃতও হতে পারে, অপ্রাসঙ্গিক হতে পারে। তো পুরোটা কেউ চাইলেন না আজ পর্যন্ত। এইটা আমার আক্ষেপ আছে। আমি পুরো কথাটার দায়িত্ব নিচ্ছি। দেড় ঘন্টা আমি কথা বলেছি। সেই দেড় ঘন্টার টেপটা আপনারা বাইর করান, সেটার পুরো দায়িত্ব আমার। এর জন্য আমার যদি ফাঁসি দেওয়া হয়, তাও আমি মেনে নেব।
বিবিসি: তো যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এখন আপনার পদক্ষেপ কী হবে? আপনি কী দেশে ফিরছেন?
লতিফ সিদ্দিকী: আমি দেশে ফিরতে আগ্রহী। কারণ এই দেশটার স্বাধীনতার জন্য আমি কাজ করেছি। আমি এই দেশটার উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি। কিন্তু প্রেক্ষাপটটা এমন হয়েছে, যে আমি কী করব আমি বুঝতে পারছি না। কারণ, আমি দেশে গেলে, ঢুকে গেলে, আমার নেতা যদি আরও বিব্রত হয়, সেইজন্যে আমি খুবই মানসিক সঙ্কটে আছি। আমি প্রথম সুযোগেই দেশে ঢুকে পড়ব। গিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করব।
বিবিসি: তার মানে আপনি এখনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
লতিফ সিদ্দিকী: বিষয়টা কিন্তু তা না। নেতা বা আমার দলের কোনো ক্ষতি হবে কি না আমি ঢুকলে। সেইটা নিয়ে আমি চিন্তিত। আমাকে নিয়ে আমি চিন্তিত নই।
বিবিসি: কিন্তু দেশে না ঢোকা পর্যন্ত তো সেটা আপনি বুঝতে পারছেন না।
লতিফ সিদ্দিকী: না, না, বুঝতে পারার কথা না। আমাকে তো কিছুটা জানতে হবে। জানতে আমি পারব।
বিবিসি: আপনি দলের কাছ থেকে কিছু শোনার অপেক্ষায় আছেন? যে দল আপনাকে বলবে, ‘না তুমি এসো না’ বা ‘তুমি থাকো’।
লতিফ সিদ্দিকী: অবশ্যই, অবশ্যই, অবশ্যই।
বিবিসি: দলের নেতার সঙ্গে কি আপনি নিজে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন?
লতিফ সিদ্দিকী: দলের নেতা মানে শেখ হাসিনার সাথে? না আমি চেষ্টা করি নাই।
বিবিসি: দলের কোনো পর্যায়ের সঙ্গে কি যোগাযোগের চেষ্টা করছেন যে আপনার কী করা উচিত? মানে আপনি আসবেন কি না?
লতিফ সিদ্দিকী: না, না, না, না।
বিবিসি: তার মানে আপনি চাইছেন তাঁরাই আপনাকে বলুক? আপনি সেটাই চাইছেন?
লতিফ সিদ্দিকী: না, আমি চাইছি না। তাঁরা কী করবেন তা তাঁরাই সিদ্ধান্ত নেবেন।
বিবিসি: মিস্টার সিদ্দিকী, এর আগে আমরা যেটা দেখেছি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে ধরুণ দুজন লেখক, একজন মহিলা একজন পুরুষ। তসলিমা নাসরিন, দাউদ হায়দার-তাঁরা...তাঁদের সম্পর্কে একই ধরণের অভিযোগ ওঠার পর তাঁরা আর দেশেই ফিরতে পারছেন না। বছরের পর বছর। দশকের পর দশক। আপনার কি সেই ভয়টা হচ্ছে যে আপনারও সেই পরিস্থিতি হতে পারে?
লতিফ সিদ্দিকী: না, না, তাঁরা লেখনীর মাধ্যমে বলেছে। তাঁরা এক কথা বলেছে। আর আমি তো এখনও বলছি যে আমার অবস্থান... আমার কথাগুলোকে বিকৃত করা হয়েছে, খন্ডিত করা হয়েছে। একত্রিত যোগ করলে দেখা যাবে আমি একটা অ্যাকাডেমিক বিশ্লেষণ করেছি।
বিবিসি: কিন্তু মানুষ, মানুষের যে পারসেপশন। মানুষ যেটা মনে করছে যে আপনি তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন। আপনার ভিতরে কি ভয় জাগছে যে আপনারও ... দেশে ফিরতে পারবেন কি না?
লতিফ সিদ্দিকী: সেটা দেখা যাবে। সময়ই বলে দেবে। আমার জীবনে এরকম ঝড় বহুবার এসেছে। পচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলাম। তারপর বিতাড়িত হয়েছিলাম। কয়দিন যুদ্ধও করেছি। তারপর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে আমার দ্বিমত হয়েছে বলে আমি সরে এসেছিলাম। এখনও কাদের সিদ্দিকী ক্ষমা চাচ্ছে। এই ব্যাটাকে কে ক্ষমা চাওয়ার আমার পক্ষ থেকে দিল? আমি তো তাঁকে দায়িত্ব দেই নাই যে আমার পক্ষে ক্ষমতা চাও। সে এক দল করে, আমি আরেক দল করি। সে আমার বিরুদ্ধে ২০০১-য়ে নির্বাচনে দাড়িয়ে আমাকে পরাজিত করেছিল।
বিবিসি: আপনার কাছে আমার শেষ প্রশ্ন মিস্টার সিদ্দিকী-আপনি যদি অদূর ভবিষ্যতে দেশে ফিরতে না পারেন, আপনার দল যদি আপনাকে সে ধরণের কোনো ইঙ্গিত না দেয় যে আপনি ফিরুন, আপনি এখনও এমপি আছেন। আপনি কোথায় থাকবেন, সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আপাতত?
লতিফ সিদ্দিকী: না, না।
বিবিসি: আপনি কি ভারতেই থাকবেন?
লতিফ সিদ্দিকী: আমি ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে পারব না। আমি ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে পারব না বলেই আমি কোলকাতায় এসেছি। আমি একেবারেই মাটির সাথে থাকতে চাই। মাটির সোদা গন্ধে আমার... আমি খুব একটা সাধারণ মানুষ ভাই।
বিবিসি: ভারতে কি আপনি থাকতে পারবেন? কোনো ইঙ্গিত ভারত সরকারের কাছে....
লতিফ সিদ্দিকী: ভারত সেটা না দিলে,... সেটা এখনই.. সে ব্যাপারে এখনই কিছু বলব না। সময় সামনে বলে দেবে। সময়ই সময়ের সিদ্ধান্ত নেবে। এখন কিছু বলব না।

বক্তব্যের জন্য অনুশোচনা নেই! সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য অনুতপ্ত -লতিফ সিদ্দিকী

বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা থেকে অপসারিত এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ থেকে বহিস্কৃত নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি দেশে ফিরে যেতে চান, তবে এ ব্যাপারে দল এবং সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। হজ সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্যের পর বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর রোববার মন্ত্রিপরিষদ থেকে তাকে অপসারণ করা হয়। লতিফ সিদ্দিকি বর্তমানে ভারতের কোলকাতায় অবস্থান করছেন। সোমবার বিবিসিকে দেয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে লতিফ সিদ্দিকী বলেছেন, দল এবং সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য তিনি অনুতপ্ত, কিন্তু যে বক্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশে তাকে নিয়ে এই বিতর্ক শুরু হয়, সেটা নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই। সিদ্দিকী মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘরোয়া আড্ডায় দেয়া তার বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিকভাবে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে প্রচার করা হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, তিনি বাংলাদেশেই ফিরে যেতে চান, কিন্তু দেশে ফিরে গেলে দল এবং সরকারকে আরও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলা হবে কিনা তা নিয়ে তিনি চিন্তিত। লতিফ সিদ্দিকী ইঙ্গিত দিয়েছেন যে দেশে ফিরতে না পারলে তিনি আপাতত ভারতেই থাকতে চান। এর আগে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের পর আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে আওয়ামী লীগ থেকেও বহিস্কার করা হয়েছে। রোববার আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে হজ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের পর বাংলাদেশে তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বহিস্কার এবং তার বিচারের দাবিতে ইসলামপন্থী দলগুলো আন্দোলন শুরু করেছিল। এ নিয়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন যে লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভায় রাখা হবে না। রাষ্ট্রপতি হজ থেকে ফিরলেই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোববার বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারপরই লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণ করে আদেশ জারি করা হয়।

এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার -বিজয়ীদের জন্য শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন

সম্প্রতি বিভিন্ন বিষয়ে নোবেল পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন ফরাসি ভাষার লেখক প্যাত্রিক মোদিয়ানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দখলদার নাৎসি বাহিনীর অধীনে ফ্রান্সের মানুষের বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা এবং নিজের শৈশবের দুঃসহ স্মৃতি তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সেই ইতিহাস আর আপন অনুভূতির মিশেলে তিনি তরুণ বয়স থেকেই লিখে চলেছেন। ফরাসি ভাষায় তার ‘স্মৃতির শিল্প’ বইটির জন্য তিনি এবার সাহিত্যে নোবেল পেলেন। রসায়নে এবার নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনজন : এরিক বেটজিগ, স্টিফেন ডব্লিউ হেল এবং উইলিয়াম ই. মোয়েরনার। সুপার রিজলভড ফোরেসেন্স মাইক্রোস্কপ ডেভেলপমেন্টের জন্য তাদের এই পুরস্কার দেয়া হয়। একইভাবে ২০১৪ সালের পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার যৌথভাবে পেয়েছেন তিন পদার্থবিজ্ঞানী : ইসামু আকাসাকি, হিরোশি আমানো এবং সুজি নাকামুরা। এরা তিনজনই জাপানি। কার্যকর নীল আলো নিঃসরণ ডায়োড আবিষ্কারের জন্য এরা এই পুরস্কার পান। এই ডায়োডে রয়েছে উজ্জ্বল ও জ্বালানি-সাশ্রয়ী সাদা আলোর উৎস। আর এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তানের ১৭ বছরের কিশোরী তালেবানের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া মালালা ইউসুফজাই এবং ভারতের শিশু অধিকার কর্মী কৈলাশ সত্যার্থী।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য এবার নমিনেশন পান ২৭৮ জন। এর মধ্যে অনেক নামীদামি ব্যক্তিত্ব যে ছিলেন তা বলাই বাহুল্য; কিন্তু সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১৭ বছরের পাকিস্তানি কিশোরী মালালা ইউসুফজাইয়ের এবং অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত ও পরিচিত ব্যক্তিত্ব ৬০ বছর বয়সী কৈলাশ সত্যার্থীর ভাগ্যেই জুটল এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার। মালালাকে এখন দেখা হচ্ছে বিশ্বে কিশোর-তরুণদের ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব বান কি মুন মালালা ইউসুফজাইকে ‘জাতিসঙ্ঘ কন্যা’ বলে অভিহিত করেছেন। অপর দিকে অপর নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী তিন দশক ধরে বাচপান বাঁচাও আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতে শিশুশ্রম বন্ধ ও শিশু পাচার রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।
নোবেল পুরস্কার নিয়ে অনেক বিতর্ক অতীতে হয়েছে। এবারো যে হবে না তা নয়। তবে অন্যান্য বিষয়ে নোবেল পুরস্কার নিয়ে যতটা না বিতর্ক হয়, তারচেয়ে শতগুণ বেশি বিতর্ক চলে নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে। হয়তো বলা হবে, ২৭৮ জন নমিনির মধ্যে এমন অনেক ছিলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠায় যাদের ভূমিকা কিশোরী মালালা ও স্বল্পপরিচিত সমাজসেবী কৈলাশ সত্যার্থীর চেয়ে অনেক বেশি বড় মাপের। অথচ নোবেল পুরস্কার পেলেন এরা দু’জনই। মালালা তার নিজ দেশ পাকিস্তানে নারীর অধিকার রক্ষার সংগ্রামে নিজ বিশ্বাসের জন্য তালেবানের বিরুদ্ধে তার বীরোচিত লড়াই করে আজ বিশ্বব্যাপী নন্দিত। তবে নিজ দেশে তিনি অনেকটা অচ্ছুত বটে। দেশটির অনেক মানুষ তাকে সন্দেহের চোখে দেখে। এরা মনে করে বন্ধুহীন মালালা পশ্চিমাদের সৃষ্টি। বিদেশে পাকিস্তানের ভাবমর্যাদা ুণœ করতে তাকে দাঁড় করানো হয়েছে। এ পুরস্কার ঘোষণার পর তালেবানেরা তাকে হত্যার ঘোষণা দিয়েছে। অপর দিকে কানাডা তাকে নাগরিকত্ব দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছে। অতএব, এবারের নোবেল পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক যে চলবে, তা ধরেই নেয়া যায়। তবুও বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজ নিজ অবদানের জন্য নোবেল বিজয়ীদের আমরা স্বাগত জানাব।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, যখন নোবেল শান্তি পুরস্কার যৌথভাবে পেলেন পাকিস্তান ও ভারতের দুই নাগরিক তখন দুই দেশের মধ্যে চলেছে এক অশান্তির পরিবেশ। এ দিকে মালালা তার পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তাদের এই নোবেল পুরস্কার ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে বয়ে আনুক শান্তির নতুন বারতা, এ কামনা আমাদের।

বস্তি উচ্ছেদ হলেও মাদকস্পট থেকে যায় -এর দায় পুলিশকে নিতে হবে

ঢাকায় মাঝে মধ্যেই ঘটা করে রেললাইনের দুই পাশের বস্তি ও দোকানপাট উচ্ছেদ করা হয়। মাত্র কয়েক দিন আগে কারওয়ানবাজারে ট্রেনের চাকায় কাটা পড়ে কয়েকজনের মৃত্যু হওয়ায় কর্তৃপক্ষ আবার বস্তি উচ্ছেদ অভিযানে নেমেছিল। রাজধানীর রেললাইনের পার্শ্ববর্তী বস্তি উচ্ছেদ হলেও রেললাইনের কাছে দেড় শ’ স্পটে মাদক ব্যবসায় চলছে। শুধু অবৈধ ব্যবসায় নয়, কোথাও কোথাও প্রকাশ্যেই মাদক সেবন করতে দেখা যায়। ডিএমপি বলেছে, মাদক ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তৎপর রয়েছে। বাস্তবে অনেক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় মাদকের বেআইনি কারবার চলে।
গতকাল নয়া দিগন্তের এক রিপোর্টে এ প্রসঙ্গে আরো জানানো হয়, মহানগরীর মধ্য দিয়ে যাওয়া রেলপথের পাশেই শুধু নয়, কমলাপুর স্টেশনের ভেতরেও মাদকসেবন চলছে। এমনকি, সেখানে রেলওয়ে পুলিশের থানার পাশেও মাদকদ্রব্য কেনাবেচা হয়। তা ছাড়া, দক্ষিণে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকা শহরে ঢোকার পথে জুরাইন রেললাইন বস্তিতে বহু দিন ধরে মাদক বিক্রি হচ্ছে। দুই ব্যক্তি এখানে মাদক ব্যবসায়ের নিয়ন্ত্রক। একজন মহিলা নিয়ন্ত্রণ করে হেরোইন আর একজন পুরুষ নিয়ন্ত্রণ করছে ফেনসিডিলের কারবার। কাছের ঘুণ্টিঘর এলাকাতেও মাদক ব্যবসায় অব্যাহত রয়েছে। এর অদূরে দয়াগঞ্জ, সায়েদাবাদ ওয়াসা বস্তি, গোলাপবাগ প্রভৃতি পয়েন্টেও মাদক বেচাকেনা চলে। দেশের প্রধান রেলস্টেশন কমলাপুর। এর চার পাশে টিটিপাড়া ও শাহজাহানপুর বস্তি, স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন স্থানে আছে কয়েকটি মাদকস্পট। কমলাপুর স্টেশনের পাশেই আইসিডি-সংলগ্ন রাস্তায় সবার সামনেই মাদক ব্যবসায় চালাতে দেখা যায়। কোনো কোনো স্থানে কাবঘর পর্যন্ত মাদক বেচাকেনার বেআইনি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমনÑ মালিবাগ রেলক্রসিংয়ের কাছে একটি কাবে মাদকাসক্তদের আড্ডা চলে। বিগত দিনে এখানে খুনখারাবি পর্যন্ত ঘটেছিল। মগবাজার বস্তিতে মাদক ব্যবসায়ের বিরাট চক্র গড়ে উঠেছে। রেললাইন ধরে আরো উত্তরে গেলে যথাক্রমে কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী, বিমানবন্দর স্টেশন এলাকায় বস্তি ও রেলপথের ধারে বিভিন্ন স্পটে অবাধে কারবার চলছে মাদকের। কেবল কারওয়ানবাজার ও তেজগাঁও এলাকাতেই ৫০টির মতো মাদকস্পট থাকার কথা জানা গেছে। এগুলোতে মাদক কেনা ও সেবন করা হয়। এ দিকে মহানগর পুলিশ বলেছে, রেললাইনের আশপাশে কী ঘটে, তা দেখা রেলপুলিশের দায়িত্ব। অপর দিকে, জিরআরপি বা রেলওয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের লোকবল ঘাটতি রয়েছে। তবে মাদক দমনে চেষ্টার ত্রুটি নেই।
আমরা দীর্ঘ দিন ধরে দেখে আসছি, মহানগরীতে কিছু দিন পরপর বস্তি ও হকার উচ্ছেদের ব্যাপক অভিযান চলে। পুনর্বাসনের পরিকল্পনা ও উদ্যোগ ছাড়াই এ অভিযান পরিচালিত হয় বলে সুফল মেলে না। বরং অসংখ্য দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের জীবনে দুর্ভোগ আরো বেড়ে যায়। বস্তির বিস্তার নগরজীবনে নানা সমস্যার জন্ম দেয় ঠিকই, তবে মাদকদ্রব্যের ব্যবসায় ও সেবন এরচেয়ে কম মারাত্মক সমস্যা নয়। অবৈধ বস্তি প্রয়োজনে নোটিশ দিয়ে উচ্ছেদ করার সাথে সাথে অবশ্যই বস্তি ও আশপাশের সব মাদকস্পট উৎখাত করা জরুরি। এ ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীর দায় এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মাদক বিক্রি, মজুদ, সরবরাহ, সেবন প্রভৃতি দণ্ডনীয় অপরাধে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। মাদকস্পটগুলো উচ্ছেদের পর আবার গড়ে ওঠা রোধ করতে হবে। বিশেষত রেলপুলিশের জনবল বাড়ানো, পুলিশের নিয়মিত টহল এবং গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো উচিত।

বাংলাদেশে ব্যাংক ডাকাতি by তাহমিমা আনাম

‘আমাদেরও আছে’- বাংলাদেশে আমরা কখনও কখনও এ খেলাটি খেলি। বাড়ির চার দেয়ালের মধ্যে এটা খেলা যায়। এ খেলাতে আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি আমাদের এখন কোন একটি নির্দিষ্ট জিনিস আছে যেটা শুধু এর আগে অন্যান্য দেশে পাওয়া যেতো। নব্বইয়ের দশকে ছিল স্যাটেলাইট টেলিভিশন (আমাদের এমটিভিও আছে!); ২০০০ সাল ও পরবর্তী দশকের দিকে ছিল শপিং মল, উঁচুতল ভবন আর মালটিপ্লেক্স সিনেমা। আর এ বছর ছিল, হলিউড স্টাইলে ব্যাংক ডাকাতি। জানুয়ারিতে সোহেল নামের এক ব্যক্তি ও তার সহযোগী ইদ্রিস রাজধানী ঢাকার ৭০ মাইল উত্তরে কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের একটি শাখা থেকে প্রায় ১৭ কোটি টাকা চুরি করে। পরে সোহেলকে ইউসুফ মুন্সি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সে, তার ভাই ইদ্রিস মুন্সি ও অন্য সহযোগীদের ডাকাতির কয়েক দিনের মধ্যে গ্রেপ্তার করা হলেও এর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ এটাই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ওই ডাকাতির বিস্তারিত সামনে আসে। প্রবল আগ্রহ নিয়ে আমরা ঘটনার ইতিবৃত্ত জানতে পারি। কিভাবে মি. মুন্সি ওই ব্যাংক ডাকাতি করার পরিকল্পনা করেছে দু’বছর ধরে, কিভাবে ব্যাংকের পাশে বাসা ভাড়া নিয়েছে আর ব্যাংকের সিন্দুক পর্যন্ত ৩০ ফুট দীর্ঘ সুড়ঙ্গ কেটেছে। এমনকি এমন প্রতিবেদনও এসেছিল- তার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ব্যাংকের এক কর্মচারীর সঙ্গে সম্পর্ক ফেঁদেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ‘দ্য ব্যাংক জব’-এর মতো নানা হলিউড মুভির সঙ্গে তুলনার ঝড় ওঠে। মনে হচ্ছে মি. মুন্সি একটি ধারার সূত্রপাত করেছে। মার্চ মাসে বগুড়াতে সোনালী ব্যাংকের আদমদীঘি শাখা থেকে ৩০ লাখ টাকা চুরি হয়। নিকটবর্তী একটি আসবাবের দোকান থেকে ব্যাংকের সিন্দুক পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কেটে একই কায়দা ব্যবহার করে চোরেরা। আর গত মাসে জয়পুরহাটের একটি ব্র্যাক ব্যাংক শাখা থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা নিয়ে ভেগে যায় অপরাধীরা। এ দফায় পাশের ভবন থেকে ছিদ্র কেটে সংঘটিত হয় ডাকাতি। ব্যাংকের পাশের ঘর ভাড়া নিতে গিয়ে ডাকাতরা দাবি করেছিল তারা পুওর ডেভেলপমেন্ট নামক একটি অলাভজনজক সংস্থার কাজ শুরু করছে। আর হ্যাঁ, বাংলাদেশে আমাদের বিড়ম্বনাও আছে। আমাদের মনোযোগ যখন সিনেমা স্টাইল ডাকাতির দ্রুত বিস্তারের দিকে তখন সব থেকে বড় বিড়ম্বনা হলো, মি. মুন্সি ও তার নকলবাজ অপরাধীরা সত্যিকারের ব্যাংক ডাকাত নয়। বড় চোরেরা চোখের সামনে লুকিয়ে আছে। আর তাদের অনুমোদন দিয়েছে ওই ব্যাংকগুলোই। তারা হলো ঋণখেলাপি: ব্যক্তি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান যারা ব্যাংকের থেকে অর্থ ঋণ নেয় ফেরত দেয়ার কোন অভিপ্রায় ছাড়াই। সমস্যা মনে হয় বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়াতে। দু’ধরনের ব্যাংক রয়েছে: বেসরকারি ব্যাংক, যেগুলোর তত্ত্বাবধান করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আর রাষ্ট্র পরিচালিত বাণিজ্যিক ব্যাংক যেগুলো সরাসরি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় চলে। বেসরকারি ব্যাংকে তো ঋণখেলাপিরা আছেই (কখনও তারা এসব ব্যাংকের বোর্ডের আসনে আসীন), সরকারি ব্যংকগুলোও যে হারে এমন ঋণের অনুমোদন দিয়েছে তা অভাবনীয়। ঋণখেলাপের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বর্তমানে ২ থেকে ৩ শতাংশ। বাংলাদেশে এটা ১২ শতাংশেরও ওপরে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাষ্ট্র পরিচালিত ব্যাংকগুলোতে বকেয়া ঋণের হার ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বেশি। পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। ২০১৩ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট শীর্ষক বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল কর্পোরেট শাসন ব্যবস্থা, ঋণ মানদণ্ডের শিথিলতার ফলে ঋণ অনুমোদনে অনিয়ম দেখা দিয়েছে। এটা রাষ্ট্র পরিচালিত ব্যাংকগুলোকে তাদের অর্ধ বিলিয়ন ডলারের বেশি পরিমাণ ঋণকে খেলাপি ঋণ তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য করেছে। গত ছয় বছরে রাষ্ট্র পরিচালিত প্রধান ৪টি ব্যাংক ঋণ খেলাপি বৃদ্ধি দেখেছে। ওই চার ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ২.৪৫ বিলিয়ন ডলার। (এর মধ্যে ইতিমধ্যে ক্ষতির তালিকাভুক্ত প্রায় ২ বিলিয়ন অন্তর্ভুক্ত নয়)। এর অর্থ হলো বড় অংকের অর্থ ব্যাংকিং প্রক্রিয়া থেকে নেয়া হয়েছে। আর চড়া সুদের হারের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বাধ্য হতে হয়। বাংলাদেশী ব্যাংকগুলোতে সুদের হার প্রায় ৯ থেকে ১৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে জমা রাখার ক্ষেত্রে আয় ৬ থেকে ১২ শতাংশের মধ্যে। ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বেসিক ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান লজ্জাজনকভাবে শীর্ষ ১০০ ঋণ খেলাপির তালিকায় স্থান পেয়েছেন, যিনি প্রায় ১৫০ কোটি ডলার ঋণ নেয়া এক শীর্ষ অভিযুক্ত। ব্যাংক এ ঋণের কিছুটা উদ্ধার করতে পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মূলত অসফলই হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আইনের আশ্রয় নেয়া গেছে সামান্যই। কেননা বিচার ব্যবস্থা সাংঘাতিকভাবে ভারাক্রান্ত। আদালতে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ৮ লাখেরও বেশি মামলা চলমান রয়েছে। রাষ্টায়ত্ত ব্যাংকে এ ধরনের অবস্থা পরিবর্তন করার একমাত্র উপায় হচ্ছে সরকারের নির্বাহী বিভাগ থেকে সমপূর্ণ পৃথক একক একটি ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণে আসা। যে সব ব্যাংক অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে সরাসরি দায়বদ্ধ রাজনৈতিকভাবে নিয়োগকৃতদের হাতে নিয়ন্ত্রিত এবং যাদের কোন নিরপেক্ষ সংস্থা কতৃক নিরীক্ষার ঝুঁকি নেই সেসব ব্যাংকে সবসময়ই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রক্রিয়া সৃষ্টি হবে। মুন্সি ভাইদের হাতে চুরি হওয়া অর্থ র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন উদ্ধার করার পর প্রায় ২ কোটি টাকা পাওয়া যাচ্ছিল না। ইউসুফ মুন্সি দাবি করেছিলেন, এ অর্থ স্থানীয় এক ধর্মীয় নেতার জন্য এক ট্রাক চাল কিনতে ব্যয় করা হয়েছে। এ টাকা আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। মুন্সির এ ঘটনার পর, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর নিরাপত্তা বৃদ্ধি করার পরামর্শ দেয়। ও হ্যাঁ, এটা অনেকটা এমন শোনাচ্ছিল, তাদের ভল্টগুলোতে আরও কিছুটা সিমেন্ট ব্যবহার করা হবে। যখন আমরা ব্যাংকের শাখাগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যাবস্থা নিতে পারছি, তখন আমাদের উচিত, ব্যাংকের ভেতরে থেকে যারা চুরি করে, সে সকল স্যুট পরা ব্যবসায়ীদের প্রতিহত করার পদক্ষেপ নেয়া, যারা দিন দুপুরে আমাদের ব্যাংকগুলো লুণ্ঠন করে।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত লেখার অনুবাদ

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য এক ইসরাইলির লং ওয়াক by গোলাপ মুনীর

বিডিএস মুভমেন্ট। পুরো কথায় ‘বয়কট, ডাইভেস্ট অ্যান্ড স্যাঙ্কশন মুভমেন্ট’। এটি ইসরাইলি বিরোধী একটি গ্লোবাল ক্যাম্পেইন। একটি নন-ভায়োলেন্ট তথা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। অনেকটা গান্ধীর অহিংস সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মতো। এই আন্দোলনের সারকথা হচ্ছে- যত দিন ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলবে না, লঙ্ঘন করে চলবে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা দেবে না; তত দিন ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিরোধী বর্জন, পরিত্যাগ ও নিষেধাজ্ঞা (বয়কট, ডাইভেস্ট ও স্যাঙ্কশন) জারি রাখতে হবে। এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য, বিডিএস মুভমেন্টের বর্ণিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলের ওপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়ে তোলা। এ আন্দোলনের দাবি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর থেকে দখলের অবসান ঘটাতে হবে, থামাতে হবে ইসরাইলি উপনিবেশ গড়ার প্রক্রিয়া। ইসরাইলের আরব-ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সম-অধিকার কার্যকর করতে হবে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের স্বদেশে ফিরে আসার অধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান দেখাতে হবে।  এই আন্দোলনের সূচনা ২০০৫ সালের ৯ জুলাই। ১৭১টি ফিলিস্তিনি এনজিও ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে বয়কট, ডাইভেস্ট ও স্যাঙ্কশন কার্যকর করার দাবি নিয়ে এ আন্দোলনের সূচনা করে। জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব ও দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী যুগের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের বিষয়টি মাথায় রেখে বিডিএস আন্দোলনকারীরা ইসরাইলের বিরুদ্ধে এই বয়কট আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনের সমালোচনাকারীরা বলে- এই আন্দোলন ইসরাইল রাষ্ট্রকে অবৈধ করতে চায়; কিন্তু বিডিএস সমর্থকেরা বলছে- বর্ণবাদী যুগে দক্ষিণ আফ্রিকা-বিরোধী একই ধরনের বয়কট আন্দোলন চলেছে। দশকের পর দশক ধরে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার মৌল অধিকার অস্বীকার করে চলেছে। সম-অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এখানে ভূলুণ্ঠিত। চলছে জাতিনিধন প্রক্রিয়ায় উপনিবেশ গড়ে তোলার যাবতীয় উদ্যোগ। জাতিগত বৈষম্য, সামরিক আগ্রাসন ও দখলদারি। ইসরাইলি নীতির বারবার নিন্দা এসেছে জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিখ্যাত সব মানবাধিকার সংস্থার পক্ষ থেকে। এর পরও বিশ্বসমাজ ইসরাইলকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারেনি। ইসরাইলকে বাধ্য করতে পারেনি আইনের মৌলনীতিগুলো মেনে চলতে। বরং ইসরাইল যুদ্ধাপরাধের মতো অপকর্ম করে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।
এমন একটি প্রেক্ষাপটে ফিলিস্তিনি সুশীলসমাজ এ ব্যাপারে বিশ্বনাগরিকদের সাড়া কামনা করে। আন্তর্জাতিক আদালতে অধিকৃত ফিলিস্তিনে ইসরাইলের দেয়াল নির্মাণকে অবৈধ ঘোষণা করার এক বছর ২০০৫ সালের ৯ জুলাই ফিলিস্তিনি সুশীলসমাজ আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানায় ইসরাইল বর্জনের। এর মাধ্যমে সূচিত হয় বিডিএস আন্দোলন। বিডিএস মুভমেন্টে ব্যাপকভাবে তিন ধরনের ফিলিস্তিনিরা সংশ্লিষ্ট হন : শরণার্থী, দখল করা পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরাইলি দখলাধীনে থাকা ফিলিস্তিনি এবং ইসরাইলে বসবাসরত ফিলিস্তিনি। বিডিএসের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মূলত তিনটি দাবি তোলা হয় : এক. ১৯৬৭ সালের জুনে দখল করা সব আরব ভূমি থেকে দখল ও উপনিবেশের অবসান ঘটাতে হবে এবং ইসরাইলের তোলা তথাকথিত নিরাপত্তা দেয়াল ভেঙে ফেলতে হবে; দুই. ইসরাইলে বসবাসরত আরব-ফিলিস্তিনি নাগরিকদের পূর্ণ সমানাধিকারের ভিত্তিতে মৌল অধিকারের প্রতি স্বীকৃতি এবং তিন. জাতিসঙ্ঘের ১৯৪ নম্বর প্রস্তাব অনুযায়ী ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের তাদের আবাসভূমিতে ফিরে আসার অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন। বিডিএসের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছে ১৭০টি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দল, সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও আন্দোলন। এ আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকেই এর জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। এর আহ্বান প্রথম জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় ২০০৭ সালের নভেম্বরে রামাল্লায় অনুষ্ঠিত প্রথম ফিলিস্তিন বিডিএস সম্মেলনে। এ সম্মেলনে বিডিএসের আন্দোলন কর্মসূচি সমন্বয় করার জন্য গঠন করা হয় বিডিএস ন্যাশনাল কমিটি (বিএনসি)। বিএনসি বিশ্বব্যাপী বিডিএস কর্মসূচির সমন্বয় করছে। বিএনসির সমন্বয় সূত্রে এ পর্যন্ত পৃথিবীর অসংখ্য দেশে অসংখ্য কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল।
গত ২ অক্টোবর ছিল ইন্টারন্যাশনাল ডে অব নন-ভায়োলেন্স। ওই দিনটিতে গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের আদলে বিডিএস আন্দোলনের ন্যায্যতার প্রতি সমর্থন জানানোর একক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করলেন এক ইসরাইলি। ওই দিনটিতে এই ইসরাইলি শিক্ষাবিদ ও রিফিউসেনিক (ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় ফিলিস্তিন-বিরোধী নীতি মেনে নিতে অস্বীকারকারী) ড. মার্সেলো ইসভিরস্কি পৌঁছলেন তার লক্ষ্যে- অস্ট্রেলীয় পার্লামেন্টে। উদ্দেশ্য, অস্ট্রেলীয়দের স্বাক্ষর করা একটি পিটিশন পার্লামেন্টে পেশ করা। এ পিটিশনে অস্ট্রেলীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে বিডিএসের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে। ড. মার্সেলোর এই বিডিএস মিশনের আওতায় তিনি সিডনি থেকে ক্যানবেরা পর্যন্ত ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন। তার এই লং ওয়াক সম্পন্ন করতে সময় লেগেছে ১০ দিন। তিনি তার এই লং ওয়াক শুরু করেন আইকোনিক সিডনি অপেরা হাউজ থেকে। এরপর চলতে শুরু করেন উপকূল বরাবর দক্ষিণ দিকে, এরপর দেশমধ্যবর্তী এলাকা পার হতে চলেন পশ্চিম দিক বরাবর। তাকে পার হতে হয়েছে অনেক ঝোপঝাড় ও পল্লী এলাকার ভূখণ্ড। কখনো তাপমাত্রা ১ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে, আবার কখনো উঠে গেছে ৩০ ডিগ্রিতে। এ সময়ে ঘটেছে নানামাত্রার বৃষ্টিপাত। কখনো প্রবল ঝড়োবাতাস, আবার কখনো কড়া রোদের প্রতিকূল পরিবেশে তাকে পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
তার এই ৩০০ কিলোমিটারের লং ওয়াকের একমাত্র লক্ষ্য বিডিএস আন্দোলন অধিকতর বেগবান করা। ডন মার্সেলোর ব্যাকপ্যাকে লেখা ছিল : ‘BOYCOTT ISRAEL, BDS Sydney to Canberra’- এ লেখা দেখে এ স্লোগানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন এ পথ দিয়ে যাওয়া মোটর চালকেরা। বিকেলবেলা মফস্বল শহরে চলা স্বাগত সমাবেশে সমবেতরা প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছেন বিডিএসের প্রতি সহায়তা করার ব্যাপারে। এর মধ্যে কয়েক দিনে মার্সেলো সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন সাউদার্ন হাইল্যান্ডস প্যালেস্টিনিয়ান সাপোর্ট গ্রুপের তিন তরুণ ফিলিস্তিনি- তারেক হালাওয়া, ডেইন ডাউনেস ও নোয়েল ফারগুসনকে। এরা তার সাথে ছিলেন এক দিন। এর পর তারেক এবং মেলবোর্নের জন সেলিসবারি তার সাথে ছিলেন শেষ দুই দিন। এরা ক্যানবেরার একদম কিনারায় পৌঁছে সাক্ষাৎ পান অধ্যাপক স্টুয়ার্ট রেস, পল ডুফেল, জন ওয়াকার এবং গাজার ছাত্র শামিক ভদ্রের। এরপর সামনে এগিয়ে যাওয়ার পর দেখা পান আরো অনেকের। মার্সেলো পিটিশনটি সরবরাহ করেন পার্লামেন্টে, যা পার্লামেন্টে উপস্থিত হবে আগামী ২৭ অক্টোবর। মূলত পিটিশনগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল অনলাইনে। লক্ষ্য ছিল এই পিটিশনগুলো পার্লামেন্টে উপস্থাপন করবেন স্বতন্ত্র সিনেটর নিক জেনোফেন এবং গ্রিনস সিনেটর লি রিয়ানন, কিন্তু উভয়েই পিছু হটলেন। কারণ, অস্ট্রেলীয় সরকারে জায়নবাদীদের খুঁটির জোর বেশি।
সাবেক অস্ট্রেলীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বব কার সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন তার পলিটিক্যাল ডায়েরি। এতে তুলে ধরা হয়েছে অস্ট্রেলিয়া সরকারের ওপর ইসরাইলি লবির অতিরিক্ত মাত্রার প্রভাবের নানা বর্ণনা। তিনি উল্লেখ করেছেন, এই প্রভাবকে একটি ‘দুষ্টপর্যায়ে’ নিয়ে দাঁড় করানো হয়েছে পার্টি ডোনেশন এবং এমপি ও সাংবাদিকদের ইসরাইল সফর করানোর কর্মসূচির মাধ্যমে। বব কার ঠিকই বলেছেন, অস্ট্রেলিয়ার কোনো রাজনীতিবিদ পার্লামেন্টে মার্সেলোর পিটিশন উত্থাপনের সাহস দেখাবে না। কার্যত ইসরাইলি লবিই এখন ‘ওয়ানস-বাট-নো-লঙ্গার-ডেমোক্র্যাটিক-সভরেন’ অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্টের মালিক।
মাইকেল ড্যানবি এমপিকে সক্রিয়বাদীরা অভিহিত করে ‘মিনিস্টার ফর ইসরাইল’ অভিধায়। এই ফেডারেল এমপি একটি লেখার মাধ্যমে বিদ্রূপাত্মকভাবে ওলংগং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদ ইসরাইলে জন্ম নেয়া ইহুদি ড. মার্সেলোর এই অকুতোভয় উদ্যোগের সম্পর্কে মিথ্যা তথ্যপূর্ণ জট পাকানো সমালোচনা করেছেন। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেছেন মার্সেলো ইসভিরস্কিকে বিডিএসের দাবি সমর্থন করতে দেখে। সেই সাথে বলেছেন, ‘বিডিএসের প্রকৃত লক্ষ্য ইসরাইল রাষ্ট্রের পতন ঘটানো।’ অথচ ন্যায়নীতির অবস্থান থেকেই মার্সেলো এই বিডিএস সমর্থন অভিযানে নেমেছেন। এর উলঙ্গ সমালোচনা করে এমপি ড্যানবি তার মিথ্যাচার ও সঙ্কীর্ণতাকেই প্রকাশ করলেন। মার্সেলো কোনো উচ্চ অথচ অলীক আদেশের অনুগামী কুইক্সট নন, তাই তিনি উদ্দেশ্যহীনভাবে কোনো রাজনৈতিক উইন্ডমিলের পেছনে ছুটতে পারেন না। তিনি স্বীকার করেন, তিনি কোনো অর্বাচীন, অনভিজ্ঞ কাঁচা লোক নন। তিনি এমনটি প্রত্যাশা করেন না, অস্ট্রেলীয় পার্লামেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে বিডিএসের প্রতি অনুসমর্থন জানাবে। তিনি আশা করেন, তার উদ্যোগের ফলে সেখানে সরকারিপর্যায়ে একটি রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা করবে এবং সূচনা করবে একটি ভবিষ্যৎ প্রক্রিয়ার, যার সূত্র ধরে ফিলিস্তিনি জনগণের রাজনৈতিক ও মানবিক অধিকারের প্রতি অস্ট্রেলিয়া এক সময় সমর্থন ঘোষণা করবে, ইসরাইলকে অন্ধভাবে সমর্থন করার অবস্থান থেকে সরে আসবে। মার্সেলো বলেন : ‘আমার এ কাজটিকে অস্ট্রেলিয়ায় ও বিশ্বব্যাপী বিডিএসের অর্থপূর্ণ কর্মসূচি বা কাজের সমুদ্রের মাঝে ছোট্ট একটি কাজ হিসেবেই আমরা দেখতে পারি। আমাদের কাজের তাগিদটা হচ্ছে আমাদের রাজনীতিবিদদের সহায়তা জোগানো, যাতে করে অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়নীতির পক্ষে অবস্থান নিতে পারে।‘
এ মানুষটি এক অকুতোভয় বীরের মতো ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা ও যাবতীয় অধিকার আদায় আন্দোলনে একজন ইহুদি ফিলিস্তিনি হয়েও অন্যান্য সাধারণ ভূমিকা পালন করছেন, ইসরাইল থেকে এ বিষয়টিকে কিভাবে দেখা যেতে পারে? মার্সেলোর এই লং ওয়াক তার বৈশিষ্ট্যের একটি মেটাফোর বা রূপক। তার বাস্তব শক্তি হচ্ছে তার বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সংহতি। ইসরাইলে কেউ ডিসিডেন্ট বা ভিন্নমতাবলম্বী হতে হলে তার চাই মনের ভেতরের পর্যাপ্ত শক্তি। কারণ সেখানে জন্মের পর থেকে প্রতিটি শিশুকে শেখানো হয় শত্রুকে ঘৃণা করতে- আর এই শত্রুটি হচ্ছে ফিলিস্তিন। ১৯৪৮ সালের পর থেকে ইসরাইলের প্রতিটি শিশুপ্রজন্মকে নিতে হয় সামরিক প্রশিক্ষণ। সামরিক শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ শেষে এদের ৪০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরি করতে হয় সেনাবাহিনীতে। অতএব সংখ্যালঘু হোডিম ইহুদিদের (যারা সেকুলার ইহুদি রাষ্ট্রের বিরোধী) বাদ দিলে ইসরাইল একটি সৈনিক জাতি।
ইসরাইলে ভিন্নমতাবলম্বী (ডিসিডেন্ট) হওয়ার চেয়ে রিফিউসেনিক (সেই সচেতন সৈনিক যিনি মার্সেলোর মতো ফিলিস্তিনিদের অবরোধ ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিষ্ঠুরভাবে দখল করার কাজে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে) হওয়ার জন্য মনের ভেতরের আরো বেশি শক্তির প্রয়োজন। সে ধরনের মনোবল না থাকলে ফিলিস্তিনিদের ও প্রাত্যহিক অমানবিক দুর্ভোগ সৃষ্টির ইসরাইলি অপকর্মের বিরোধিতা করতে পারে না। এ ধরনের ভিন্নমতাবলম্বী হওয়ার ঝুঁকির কথা জানিয়েছেন মহিলা রিফিউসেনিক মোসান সন্তাগ তার ভূমিকায়।
রিফিউসেনিক মার্সেলোকে দিতে হয়েছে সমাজচ্যুতির মূল্য। বিচ্ছিন্ন করে রাখা, মানসিক শাস্তি, শত্রুতামি করা, পারিবারিক অবজ্ঞা, বন্ধুবান্ধব ও জাতির কাছ থেকে অবজ্ঞা ইত্যাদি সবই জুটেছে মার্সেলোর কপালে। কারণ তিনি নিজেকে মানাতে পারেননি ইসরাইলি মনমানসিকতার সাথে। এটি করলে তিনি শ্রদ্ধাশীল হতে পারতেন না ফিলিস্তিনিদের প্রতি, দাঁড়াতে পারতেন না তাদের সুরক্ষার আন্দোলনের পক্ষে। মার্সেলো সেই জন যিনি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তির সার্বজনীনতার প্রতি ও সমগ্র মানবজাতির প্রতি।
ইসরাইলিরা একটি জায়নবাদী মিথ্যাকে চিরস্থায়ী করতে চায়। এরা মিথ্যাচার করে বলে- ফিলিস্তিন ছিল একটি ‘এম্পটি ল্যান্ড’ এবং ফিলিস্তিনিরা হচ্ছে একটি ‘ইনভেনটেড পিপল’। মার্সেলোর নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিকে বদলে দেয়ার মধ্যে সীমিত নয়। তিনি সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন ‘আফটার ইসরায়েল’ নামের একটি বই। তার এই বইয়ে সাধারণ ইসরাইলিদের জন্য শান্তির পথনির্দেশ রয়েছে। এই শান্তির পথ হচ্ছে সামাজিকভাবে জায়নবাদ ও সামরিকবাদের উচ্ছেদ। ‘আফটার ইসরায়েল’ হচ্ছে একটি সেকুলার বই। এতে ধর্মীয় গোঁড়ামি তথা রিলিজিয়াস ডগমা হিসেবে জায়নিজমকে মেনে নিতে অস্বীকার করা হয়েছে। এই চমৎকার বইটির মাধ্যমে মার্সেলো সাহস দেখিয়েছেন জায়নিজম পাঠ করতে ফিলিস্তিনিদের ইতিহাসের অধ্যায় এবং এই ভূখণ্ডে বসবাসরত দুই জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের পাঠ আমলে নিয়ে। বইটি কোনো ঈশ্বরলব্ধ জ্ঞানের প্রকাশ নয়, নয় কোনো প্রফেসি বা ভবিষ্যবচনও। এটি আজকের দিনের ইসরাইলি সরকারের কর্মকাণ্ডের স্বরূপ উন্মোচনের এক সাহসী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিশ্লেষণ।
অতি সম্প্রতি গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর ৫১ দিনের অসভ্য, বর্বর, নির্মম সন্ত্রাসী হামলার বেলায় আমরা যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাতিসঙ্ঘ, চীন, রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশকেই নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখেছি। ফিলিস্তিনি জনগণ কোনো মতেই এমনটি ভরসা করতে পারছে না- বিশ্বশক্তিগুলো ফিলিস্তিনে শান্তি এনে দেবে, স্বাধীনতা এনে দেবে। বরং এখন ভরসা করতে পারে ‘পিপল পাওয়ার’-এর ওপর। বিডিএসের মাধ্যমে বিশ্বজনমতের প্রতিফলন ঘটতে শুরু করেছে রাস্তায়, মার্সেলোর মতো বিবেকী মানুষদের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
সবশেষে বলব ‘BOYCOTT, DIVEST, SANCTION (BDS)’ নামের এই আন্দোলনে যখন বিশ্বব্যাপী জাতিধর্ম নির্বিশেষে বিবেকী মানুষেরা সংহতি প্রকাশ করে পালন করছে নানাধর্মী কর্মসূচি, তখন বাংলাদেশীরা এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে লজ্জাজনকভাবে। এখন সময় সে লজ্জা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসার। সেই সাথে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ও ফিলিস্তিনিদের অধিকার বাস্তবায়নের আন্দোলনকে আরো জোরদার করে তোলার। বিশ্বব্যাপী বিবেকী তরুণেরা আজ বর্জন করছে ইসরাইলি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্বজুড়ে নগরে নগরে মানুষ রাজপথে নেমে আসছে ইসরাইলি বর্বরতার, অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে, স্বাধীন ফিলিস্তিন বাস্তবায়নের দাবি জানাতে। শুরু হয়েছে ইহুদিদের কোম্পানিগুলোর পণ্য বর্জনের হিড়িক। গড়ে উঠছে ইসরাইল-বিরোধী বিশ্বজনমত, সে পথেই আসবে ফিলিস্তিনে স্বাধীনতা, ফিলিস্তিনিদের অধিকার। এ বাস্তবতা সময়ের অপেক্ষা মাত্র।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কোন পথে by মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের মধ্যকার ৩৫ বছরের বিধ্বংসী শত্রুতার অবসান ঘটাতে সাহসী পদক্ষেপ নেবেÑ এমন সম্ভাবনা পাশ্চাত্যের পররাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ক্রমেই দানা বাঁধছে। তারা মনে করছে, এ দুই দেশের সঙ্ঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল অংশজুড়ে যে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাপ্তির জন্য তাদেরই প্রয়োজন একটা বিশাল পদক্ষেপ নেয়া। দু’টি ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুগান্তকারী এই সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে। একটি হলো উভয় পক্ষের অভিন্ন শত্রু হিসেবে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) আবির্ভাব এবং ২৪ নভেম্বরের মধ্যেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি প্রশ্নে চুক্তি স্বাক্ষরের আশাবাদ সৃষ্টি। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগদানকালে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি পারমাণবিক আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী হওয়ার মতো বক্তব্য রেখেছেন। তার মতে, এই অচলাবস্থা নিরসনে আর মাত্র একটা সিঁড়ি বাকি আছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গেই ল্যাভরব এ ব্যাপারে এত আশাবাদী ছিলেন যে তিনি বলে ফেললেন, চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনা প্রায় ৯৫ ভাগ সম্পন্ন হয়েছে। রুহানি অনেকবারই জোর দিয়ে বলেছেন, কেবল পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো যায়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার পরিস্থিতি হয়ে পড়বে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এ ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ নেই। তার মতে, ভবিষ্যতে সহযোগিতার অনেক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। তিনি এই অঞ্চলের বিশৃঙ্খলায় ইরানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি স্পষ্টভাবেই তার কথা বলেছেন, ‘পারমাণবিক ফাইলটার প্রতি একটু ছাড় দিন, সব ধরনের ভালো ভালো বিষয় ঢলের মতো প্রবাহিত হতে থাকবে।’
কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। মাত্র এক বছরে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্কে অনেক উন্নতি ঘটেছে। অনেক বছর ধরে উচ্চপর্যায়ের কোনো বৈঠক না হওয়ার পর সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তার ইরানি প্রতিপক্ষ মোহাম্মদ জাভেদ জরিফের সাথে বৈঠক করছেন। তাদের মধ্যকার বৈঠক নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পাশ্চাত্যের এক কর্মকর্তার কথায়, তাদের মধ্যে বেশ আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে। তবে অত্যন্ত দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সহযোগিতার মাত্রাটি কত দূর এগোয়, তা এখনো বলা যাচ্ছে না।
খুব ঘনিষ্ঠ নয়
পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের সমূহ সম্ভাবনার মধ্যে এখন এ প্রশ্নটি সৃষ্টি হয়েছে, ইরান কি আইএসের বিরুদ্ধে আমেরিকান নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশনে যোগ দেবে, নাকি সংগঠনটির বিরুদ্ধে সে পরোক্ষ যুদ্ধ চালাবে? ইরানের আইএস থেকে দূরে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। ইতোমধ্যেই ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের অস্ত্র দেয়া শুরু করেছে ইরান। তা ছাড়া সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের বাহিনীকেও বিপুলভাবে সহায়তা করছে তেহরান। তবে সহযোগিতা করার মতো আরো অনেক ক্ষেত্র রয়েছে। বাগদাদের ওপর তেহরানের বিরাট প্রভাব রয়েছে (উগ্র শিয়া প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকিকে যখন সরানোর দরকার হয়ে পড়ল, তখন সরিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে)। সুন্নি ও কুর্দিদের ক্ষোভ প্রশমনে হায়দার আল আবাদি সরকারকে রাজি করাতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরান অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ইরান বাশার আল আসাদকে ত্যাগ করবে, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ অবসানে তেহরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তা ছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরাইলের বিরুদ্ধে যেভাবে ইরানের সমর্থন পাচ্ছে, সে ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আসতে পারে। অধিকন্তু আফগানিস্তানেও সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে ইরান। এর ফলে এই সম্ভাবনাই সৃষ্টি হচ্ছে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব হয়তো এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি করবেন, যার ফলে দেশটি আঞ্চলিক পরাশক্তির স্বীকৃতি পেয়ে যাবে। এই অঞ্চলে কর্তৃত্ব ফলাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যে রক্তক্ষরণ ঘটাতে হচ্ছে এবং অর্থ ঢালতে হচ্ছে, সেটা ছাড়াই যদি স্বার্থসিদ্ধি করতে পারে, তবে ক্ষতি কী? অবশ্য এর পরও সন্দেহের কিছু কারণ থাকে। ইরান পি৫+১ (আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জার্মানি)-এর সাথে পারমাণবিক কর্মসূচি প্রশ্নে যে আলোচনা চালাচ্ছে, তাতে এমন কোনো চুক্তি করতে চাইবে না যা আপাতদৃষ্টিতে ভালো মনে হলেও কার্যত খারাপ। আবার ইসরাইলও চাইবে না ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্বাভাবিক হোক। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আমেরিকা সফর করেও সেটা বলে এসেছেন।
দ্বিতীয়ত, পারমাণবিক সমঝোতা প্রশ্নে ব্যাপক আশাবাদ দেখা গেলেও সত্যিকার অর্থে এখন পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য দেখা যায়নি। আর যদি আলোচনা ভেঙে যায়, তবে হয়তো ইরান অল্প সময়ের মধ্যেই পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। আমেরিকা এই দাবিতে এখনো অনড় রয়েছে যে, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সামর্থ্য বর্তমানে ব্যবহৃত ৯৫০০ সেন্ট্রিফিউজের অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। আর এই সামর্থ্য আগামী ২০ বছরে বাড়ানো যাবে না। কিন্তু ইরান জোর দিয়ে বলছে, তাদের ক্রমবর্ধমান শিল্পচাহিদা পূরণ করার জন্য অদূর ভবিষ্যতে অন্তত এক লাখ সেন্ট্রিফিউজের প্রয়োজন পড়বে। লন্ডনভিত্তিক থিঙ্কট্যাঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিস্তার রোধ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মার্ক ফিটজপ্যাট্রিক মনে করেন, ইরানি প্রেসিডেন্ট রুহানি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জরিফ হয়তো কোনো ধরনের সমঝোতায় আসতে চান। কিন্তু দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে রাজি হবেন না।
অস্ত্র নিয়ন্ত্রণবিষয়ক হোয়াইট হাউজের সাবেক উপদেষ্টা (বর্তমানে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলফার সেন্টারে কর্মরত) গ্যারি স্যামোর মনে করেন, নভেম্বরের মধ্যে ব্যাপকভিত্তিক কোনো সমঝোতা সম্ভবত হবে না। তবে দুই পক্ষের মধ্যে অন্তর্বর্তী একটা সমঝোতা হতে পারে, যার সূত্র ধরে আলোচনা অব্যাহত থাকার একটা ব্যবস্থা হতে পারে। ইরানি প্রেসিডেন্ট হয়তো মনে করতে পারেন, আইএসের উত্থানের ফলে তার সামনে আমেরিকার কাছ থেকে ফায়দা হাসিলের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আইএস সৃষ্টি নিয়ে ইরান ও পাশ্চাত্যের মধ্যে পারস্পরিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ রয়েছে। রুহানি প্রায়ই অভিযোগ করছেন, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য পাশ্চাত্যের শক্তিগুলো এবং উপসাগরীয় দেশগুলো যে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে আসছে, তার ফলেই আইএসের উত্থান ঘটেছে। অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করছে, বাশার আল আসাদের নৃশংস শাসন এবং ইরাকের শিয়া প্রাধান্যবিশিষ্ট সরকারের দুর্নীতি এবং সুন্নিদের বিরুদ্ধে নির্যাতন চালানোর পরিণতিতে আইএসের আবির্ভাব ঘটেছে।
অধিকন্তু আইএসকে চূড়ান্তভাবে ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র যে পরিকল্পনা করছে, তাতে মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী মুসলমানদের এই সংগঠনটির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, তারা সুন্নি গোত্র ও কুর্দিদের এটাই বোঝাতে চাইছে, ভবিষ্যতে অসাম্প্রদায়িক কেন্দ্রীয় ইরাক রাষ্ট্রের অধিবাসী হবে তারা। আর সিরিয়ায় ফ্রি সিরিয়ান আর্মি (এফএসএ) অস্ত্র পেয়ে যাবে, যত দিন আইএস এবং আসাদ সরকার উভয়ই বিদায় না নেয়। এ দু’টি বিষয়ে ইরান কিভাবে সাড়া দেয়, সেটাও দেখার বিষয়। আসাদ সরকারকে সরিয়ে দেয়া এবং ইরাকে শিয়া সরকার না থাকা ইরান কতটুকু মেনে নেবে, সেটা এখন দেখার বিষয়।
আমার শত্রুর শত্রু হলো আমারও শত্রু
ইরানি প্রেসিডেন্ট গত সপ্তাহে অভিযোগ করেছেন, আমেরিকা আরেকটি সন্ত্রাসী গ্রুপকে প্রশিক্ষণ দিয়ে সিরিয়ায় পাঠাচ্ছে। আবার আইএসের বিরুদ্ধে হামলার একপর্যায়ে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর হামলার শিকার হতে পারে আসাদের বাহিনী এবং তাদেরই মিত্র এফএসএ। আইএসের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেয়া আরব বিমান বাহিনী ইতোমধ্যেই ইরাকের চেয়ে সিরিয়ায় হামলা চালাতেই বেশি আগ্রহী দেখা গেছে। এত কিছু সামাল দেয়ার পরও রুহানি ও জরিফ যদি পাশ্চাত্যের সাথে কোনো একটা সমঝোতায় পৌঁছতে পারেন, তবেই সব কিছু ভালোয় ভালোয় হবে তা নয়। তখন আবার তাদের খামেনির সামনে পড়তে হবে। তা ছাড়া রয়েছে প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। তারাও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে দেবে না। ফলে খুব সহজ হবে না কোনো ঐকমত্যে পৌঁছানো। তবে সব কিছুর জন্যই আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।
(ইকোনমিস্ট অবলম্বনে)

সেভেন মার্ডার- তারেক সাঈদকে হাজির না করায় কারা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ

নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডার মামলার আসামি তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে হাজির না করানোর কারণে কারা কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছেন ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম শফিকুল ইসলাম ।

আজ সোমবার সকাল পৌনে ১০টায় নারায়ণগঞ্জ আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কেএম মহিউদ্দিনের আদালতে এ নোটিশ দেয়া হয়।
কারা কর্তৃপক্ষকে তারেক সাঈদকে কেন আদালতে হাজির করা হলো না এই মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। সেই সাথে আগামী ১ ডিসেম্বর সাত হত্যা মামলার আসামিদের আদালতে হাজির করতে প্রডাকশন ওয়ারেন্ট(পি ডব্লিউ) জারি করেন। যদি ওই দিন আসামিদের আদালতে হাজির না করা হয় তাহলের তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে।
বাদি পক্ষের আইনজীবী ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এ সব তথ্য নিশ্চিত করেন।
এ দিন সাত হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে র‌্যাব-১১ এর সাবেক সিও তারেক সাঈদ, জেল হাজতে আত্মহত্যার চেষ্টাকারী ল্যান্স নায়ক বিল্লাল হোসেন, ও রিমান্ডে থাকা রুহুল আমিনকে আদালতে হাজির করা হয়নি। তবে গ্রেফতার হওয়ার ১০ জন র‌্যাব সদস্য ও চার্চিল, আলী আহম্মদসহ আরো ১১জনসহ মোট ২১ জনকে আদালতে হাজির করা হয়।
তবে তারেক সাঈদকে আদালতে হাজির না করায় বাদি পক্ষের আইনজীবীরা তারেক সাঈদকে জামাই আদারে রাখা হচ্ছে বলেই অভিযোগ তুলেন।
এদিকে সকালে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান আদালতে আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তাকে অভিযোগপত্র গঠন করতে বিচারকের কাছে দাবি জানান। সেই সাথে তিনি নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পদক্ষেপ ও মামলার অগ্রগতি জানাতে বিচারকের কাছে দাবি করেন।
গত ২৭ এপিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র ও দুই নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ সাতজন অপহৃত হন। ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদীতে ভেসে ওঠা ছয়জনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন ১ মে বাকি একজনের লাশ পাওয়া যায় নদীতে।

কারাগারে কেমন আছেন জয়ললিতা

কয়েদি নম্বর সাত হাজার চারশো দুই। তাকে যতই দেখছেন, ততই অবাক হয়ে যাচ্ছেন জেলের অফিসাররা। জেলের ভিতর তাকে দেখে ঘোর কাটছে না রক্ষীদের। সিংহাসন থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ার পরেও, একজন এতটা শক্ত থাকতে পারে! বলছি তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার কথা। আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিবিহীন সম্পত্তি মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এডিএমকে নেত্রী। চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে বেঙ্গালুরুর বিশেষ আদালত। জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে কর্নাটক হাই কোর্ট।

৬৬ বছরের এ নেত্রী তবু ভেঙে পড়েননি। দুই সপ্তাহ হয়ে গেল জেলে রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর আসন নেই। কাছে নেই আশপাশের পরিচিত মানুষগুলোও। সাধারণত এমন সময়ে অনেক পোড় খাওয়া লোকও মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন। কিন্তু জয়ললিতা এখনও পর্যন্ত ফিট এবং মানসিকভাবে শক্ত রয়েছেন। লাঞ্চে আর ডিনারে কার্ড রাইস। ব্রেকফাস্টে দুধ, পাউরুটি, কলা আর আপেল। নিজের খাবারের ব্যাপারে ভীষণ সচেতন তিনি। দিনে এক থেকে দেড় ঘণ্টা বরাদ্দ খবরের কাগজের জন্য। কঠিন সময়ে একা থাকতেই পছন্দ করছেন জয়ললিতা। এডিএমকে নেতাদের সাথেও দেখা করছেন না তিনি। জানিয়েছেন জেলসুপার জয়সিংহ।

সূত্র : জি নিউজ

আবার জোরদার হচ্ছে হংকংয়ের বিক্ষোভ -সিদ্ধান্ত থেকে নড়তে নারাজ বেইজিং

হংকংয়ের সমালোচিত নেতা লিউং চুন ইং ক্ষমতায় থাকার দৃঢ়সংকল্প ব্যক্ত করে গত শনিবার তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত ছাত্রদের সতর্ক করে বলেছেন, তাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। লিউং বলেন, এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শহরটির অঞ্চলগুলোতে অবরোধ তিন সপ্তাহে পড়েছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য তা আর চলতে পারে না। স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল টিভিবিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সঙ্কট নিরসনে ছাত্রনেতাদের সাথে আলোচনার জন্য তার সরকারের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। তবে তাদের সরিয়ে দেয়ার জন্য ‘ন্যূনতম কোনো শক্তি প্রয়োগের বিষয়ও তিনি নাকচ করে দেন’।

>> হংকংয়ের মংকং এলাকায় গতকাল ব্লুরিবন গ্রুপের সদস্যদের অবস্থান ধর্মঘটবিরোধী স্লোগান দিতে দেখা যায় : এএফপি
গত কয়েক সপ্তাহে এটা প্রমাণিত হয়েছে, গণ-আন্দোলন সূচনা করা কিছুটা সহজ কিন্তু তা বন্ধ করা খুব কঠিন। এ আন্দোলনকে কেউ নির্দেশনা দিতে পারছে না। ফলে এটি একটি অনিয়ন্ত্রিত আন্দোলনে পরিণত হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
লিউং সতর্ক করে বলেন, হংকংয়ের গণতন্ত্র নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বেইজিংয়ে চীনা নেতদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ‘বিন্দুমাত্র’ সম্ভাবনাও নেই।
১৭ বছর আগে চীনরে কাছে ব্রিটেন তার সাবেক উপনিবেশ হংকংকে হস্তান্তর করে। সে সময় ‘এক দেশ দুই ব্যবস্থার’ অধীনে হংকংয়ের গণতন্ত্র সুরক্ষা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।
গত আগস্টে বেইজিং ঘোষণা দেয়, মনোনয়ন কমিটির বাছাইকৃত প্রার্থীরাই কেবল ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে প্রধান নির্বাহী পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন।
তথাকথিত কেন্দ্রস্থল দখল আন্দোলনকে ‘অস্থিরতা সৃষ্টি’ উল্লেখ করে গত শনিবার বেইজিংয়ের সরকারি পত্রিকা পিপলস ডেইলির প্রথম পাতায় একটি সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করা হয়। অনেক বিশ্লেষক এ সম্পাদকীয়কে চীনা নেতাদের মধ্যকার অস্বস্তির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন। এরপরই সরকারের প্রধান দফতরের বাইরে বিক্ষোভকারীরা অবস্থান ধর্মঘট আরো জোরদার করলে লিউং তাদের সম্পর্কে এ মন্তব্য করেন।
হংকংয়ের একটি কিন্ডারগার্টেন শিক্ষক ২৭ বছর বয়সী ম্যাগি চিউং বলেন, জায়গাটিকে একটি সবুজ ভূখণ্ড মনে হচ্ছে। কাজে যোগ দেয়ার জন্য তিনি চলে যাবেন। গ্লোসেস্টার ও হারকোর্টের সড়কগুলোতে বিক্ষোভকারীরা ২০০ তাঁবু টানিয়েছে। এ শহর দু’টি হংকংয়ের অন্যতম অর্থনৈতিক ব্যস্ততম এলাকা।
বিক্ষোভকালে শত শত তরুণ ও বৃদ্ধ এখানে রাতে ঘুমিয়েছেন। আবার কেউ গিটার বাজিয়ে, তাস খেলে বা বই পড়ে রাত পার করেছেন। কিছু শিক্ষার্থী হাইওয়েতে অস্থায়ী শ্রেণীকক্ষ বানিয়ে পড়ালেখা করেছেন। গত শনিবার পরিবার নিয়ে অনেকে এ দৃশ্য দেখতেও এসেছিলেন। পাশের দেয়াল ও ওভারপাসগুলোতে শোভা পাচ্ছে নানা ফেস্টুন, ব্যানার ও সাইন। একটিতে লিউংকে মাফিয়া ডন হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। একটি ব্যানারে এক দেশ দুই ব্যবস্থার আওতায় চীনের সাথে একীভূত হওয়ার ব্যাপারে তাইওয়ানকে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়েছে।
তবে এই উৎসবমুখর পরিবেশে সবাই আনন্দিত নয়। নির্মাণশ্রমিক ও গাড়িচালকদের সংগঠন এ বিক্ষোভ শেষ করতে ছাত্রদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। কারণ ব্যারিকেডগুলো ভেঙে তাদের কাজ করতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্যাক্সিচালক চ্যান ট্যাক কিউন বলেন, গণতন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার সাথে জনগণের জীবন-জীবিকারও গুরুত্ব রয়েছে।

ব্যাংকে ঋণ কেলেঙ্কারি -প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে, হয়রানির শিকার ব্যাংক কর্মকর্তারা by আশরাফুল ইসলাম

 হলমার্ক, বিসমিল্লাহ এবং সর্বশেষ বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারির দায়ে শতাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের কেউ কেউ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) হাজিরা দিচ্ছেন। কেউ বা জেল খাটছেন। আবার কেউ বা গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অথচ এসব ঋণ কেলেঙ্কারির প্রকৃত হোতারা যেন অনেকটা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে গেছেন। হলমার্ক ঋণ কেলেঙ্কারির পেছনে যারা জড়িত তাদের এখনো চিহ্নিত করা যায়নি। এমনকি প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত হলমার্ক ঋণকেলেঙ্কারির প্রায় চার হাজার কোটি টাকার গন্তব্য আজও বের করার উদ্যোগ নেয়নি বাংলাদেশ ব্যাংক। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা চাকরি রক্ষার্থে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। অপরাধী না হয়েও এখন নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
হলমার্ক কেলেঙ্কারিসহ ব্যাংকিং খাতে কয়েকটি বড় ধরনের ঋণকেলেঙ্কারির পর আস্থার সঙ্কট চলছে ব্যাংকিং খাতে। লেনদেনের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করছে ব্যাংকগুলো। ঘটনা উদঘাটনের প্রায় তিন বছর পার হতে চললেও এক ব্যাংক আরেক ব্যাংকের স্বীকৃতি বিল কিনতে অধিকতর যাচাই-বাছাই করছে।
সোনালী ব্যাংকের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হলমার্ক নামক অখ্যাত কোম্পানি চার হাজার কোটি টাকা সোনালী ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা চিহ্নিত হওয়ার পর ব্যাংকিং খাতে বিভিন্ন বিল কেনাবেচায় স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতের ঋণ বিষয়ক চুক্তি সম্পাদনের (বিল কেনাবেচা) েেত্র কর্মকর্তাদের স্বার ও উপস্থাপিত তথ্যের সত্যতা নিয়ে পারস্পারিক অবিশ্বাস ও সন্দেহ প্রকট আকার ধারণ করেছে। আস্থার সঙ্কট প্রকট হওয়ায় এখন কাগজপত্রের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত বিশেষ করে ব্যাংকিং উপকরণ ‘বিল’ বন্ধক রেখে ঋণ বিতরণপ্রক্রিয়া হয়ে পড়েছে স্থবির। এখন এক ব্যাংকের বিল অন্য ব্যাংক কিনছে না, অথবা কিনলেও অধিকতর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। আর সোনালীসহ সরকারি ব্যাংকগুলোর সাথে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বিল কেনাবেচা প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বিল বা চেক বন্ধক রেখে ঋণ দেয়া বিলম্বিত হওয়ায় ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হচ্ছে।
ভুক্তভোগী এক ব্যাংক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালক নিয়োগ দেয়ার পর থেকেই ব্যাংকগুলোতে বিভিন্ন অনিয়ম বাড়তে থাকে। পরিচালকদের হস্তক্ষেপে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ঋণ বিতরণ, লোকবল নিয়োগ, পদোন্নতিসহ নানা অনিয়ম শুরু হয়। এসব কাজে বাধা দিলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি, চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানা হয়রানি নেমে আসত। সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি তার একটি বড় উদাহরণ।
অপর দিকে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংক চলত ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বাচ্চুর নির্দেশে। কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে শত শত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন দেয়া হতো। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারি হয় বেসিক ব্যাংকে। বিষয়টি নিয়ে পত্রপত্রিকায় হইচই পড়ে গেলে তিনি পদত্যাগ করে নির্বিঘেœ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমান। বেসিকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তার ওপর নানা হয়রানি নেমে এসেছিল মূলত একটি অনিয়মে বাধা দেয়ায়।
সোনালী ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যাদের নির্দেশে ও ইন্ধনে ঋণ কেলেঙ্কারি হয়েছে তারাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে। আর হয়রানির শিকার হচ্ছেন অনেক নিরপরাধ কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সোনালী ব্যাংকের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের ইশারা ছাড়া হলমার্ক নামক অখ্যাত কোম্পানিকে চার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়া সম্ভব ছিল না। বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ সবাই বুঝতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। এসব পরিচালক এখনো আড়ালেই রয়ে গেলেন। অথচ ঋণ প্রস্তাবে স্বাক্ষর করায় স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা হিসেবে আইনের আওতায় এসেছেন অনেক নিরপরাধ কর্মকর্তা।
ভুক্তভোগী অপর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনার আগে কোন প্রেক্ষাপটে তারা স্বাক্ষর করেছিলেন তা বিবেচনায় নেয়া উচিত। কেননা বেশির ভাগ কর্মকর্তাই পরিস্থিতির শিকার।

বিয়ের বয়স না কমানোর আহ্বান এইচআরডব্লিউ’র

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) মেয়েদের আইনসিদ্ধ বিয়ের ন্যূনতম বয়স না কমানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। আর তা করা হলে সেটা হবে বাল্যবিয়ের হার কমিয়ে আনার অঙ্গীকারের সাথে সাংঘর্ষিক।
বাংলাদেশ সরকার বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করার কথা বিবেচনা করছে বলে মিডিয়ায় খবর প্রকাশের প্রেক্ষাপটে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি এ আহ্বান জানালো।
এইচআরডব্লিউর নারী অধিকারবিষয়ক পরিচালক লিজেল গেনহলজ সোমবার এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের বয়সের আইনসিদ্ধ সীমা কমিয়ে ১৬ বছর করা হলে তা হবে ভুল দিকে একটি ভয়ঙ্কর পদক্ষেপ।’
এইচআরডব্লিউর বিবৃতিতে ছেলে-মেয়ে সবার ক্ষেত্রেই বিয়ের বয়স ১৮ করার আহ্বান জানিয়ে শিশুদের কল্যাণের বিষয়টি সরকারের সিদ্ধান্তের প্রধান বিবেচ্য হওয়া উচিৎ বলে মত দেয়া হয়েছে। 
তিনি বলেন, বাংলাদেশের উচিত হবে যেসব দেশ বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে সফল হয়েছে, তাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা।
বর্তমান আইনে বাংলাদেশে মেয়েরা বিয়ের যোগ্য হয় ১৮ বছর বয়সে, জাতিসঙ্ঘের শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী ওই বয়সেই শৈশব শেষ হয়।
জাতিসঙ্ঘ শিশু সংস্থা ইউনিসেফের মতে, বাল্যবিবাহের দিক থেকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। নাইজার রয়েছে শীর্ষে। বাংলাদেশে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রায় ৭৪ ভাগ নারী বিবাহিত বা ১৮ বছরের আগেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যান।

প্রবীণদের প্রতি অবহেলা যেন বাড়ছেই by আঞ্জুমান আরা বেগম

বৃদ্ধাশ্রমের ট্র্যাডিশনটা আমাদের দেশে কিন্তু খুব বেশিকাল আগে থেকে শুরু হয়নিÑ বড়জোর বছর দশেক বা তার কম। আমরা যারা আটপৌরে বাঙালি তারা প্রথাটা মেনে নিতে পারিনি। অর্থাৎ টাকা-পয়সা খরচ করে নিজের বাবা-মাকে পাঠিয়ে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। কারণ হিসেবে ওরা বলছে কাজের চাপ, বাবা-মাকে দেখাশোনা করতে গেলে স্ত্রী-সন্তানদের অসুবিধা, নিজের কাজের হ্যাম্পার হয়। তাই প্রপার চিকিৎসা ও সেবাযতেœ যাতে সমস্যা না হয় তাই তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তা না হলে দশ সন্তান থাকলেও বাবা-মাকে দেখাশোনা কে করবে, এ নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হবে। বাবা-মা সন্তানকে যখন পৃথিবীতে জন্ম দেন তখন কিন্তু তারা কোনোভাবেই সন্তানকে বুকের কাছ থেকে আলাদা করতে চান না। খেতে দেন নিজে না খেয়ে। অথচ বৃদ্ধ হলে সন্তান সে কর্তব্যটুকু করা থেকে বিরত থাকে স্বার্থপরের মতো।
ঘটনা-১
মাদারীপুরের বাসিন্দা বৃদ্ধ জমিলা খাতুনের বয়স ৯০ বছর। ছেলের বউ একটি সরকারি কলেজের প্রভাষক। মাত্র ১৫ বছর বয়সে শাশুড়ি জমিলা খাতুন তাকে পুত্রবধূ করে ঘরে এনে পড়াশোনা করান নিজের মেয়ের মতো। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে চাকরি পান। সাথে সাথে ডক্টরেট ডিগ্রিও অর্জন করেন একমাত্র শাশুড়িমায়ের আদরযতœ আর মমতায়। কারণÑ বৃদ্ধ জমিলা নাতি-নাতনীদেরও সমান যতেœ বড় করেন। যার কারণে পুত্রবধূ পড়াশোনা ও চাকরি করার সুযোগ পান। তেমনি পুত্রবধূও বৃদ্ধ জমিলা খাতুনকে খুবই যতœ করেনÑ নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো, গল্প করা, সময়মতো সব রকম  সেবাযতœ নিজ হাতেই করতেন। তাই বৃদ্ধা কখনো তার অন্য ৯ মেয়ের বাসায় বেড়াতে যেতে চাইতেন না। কারণ হিসেবে বলতেন, ‘আমার বউমা আমাকে যে যতœ করতে পারে তা তোমরা পারো না।’ বৃদ্ধার মেয়েরা এতে মনে সাময়িক কষ্ট পেলেও আসলে ছোট ভাইয়ের বউয়ের প্রতি বেশ সন্তুষ্ট ছিলেন। কিছু দিন আগের কথা বৃদ্ধা মৃত্যুশয্যায়, ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনীরা চার পাশ ঘিরে বসে আছে। বৃদ্ধা বারবার পুত্রবধূকে ডাকছিলেন আর বলছিলেন, মারে তোর হাতে পানি খাবোÑ হ্যাঁ পুত্রবধূর হাতের পানি খেয়েই লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলতে বলতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। পুত্রবধূ আজো শাশুড়িমায়ের কথা বলতে বলতে চোখ মুছতে থাকেন আর বলেন, ছেলেবেলায় মাকে হারিয়ে বিয়ের পর শাশুড়িমাকে পেয়ে মায়ের অমন স্নেহমমতা পেয়ে নিজের মায়ের অভাব আমি কখনো টের পাইনি। তাই আমি প্রার্থনা করি বাঙালির প্রতিটি বউয়ের ভাগ্যে যেন এমন শাশুড়িমা জোটে।
ঘটনা-২
শর্মিষ্ঠা দত্ত বয়স ৭০ বছর। অল্প বয়সে স্বামী মারা গেলে ছোট ছোট চার ছেলে ও দুই মেয়েকে তিনি চাকরি করে ও স্বামীর রেখে যাওয়া কিছু ব্যাংক ব্যালান্স দিয়ে মানুষ করেন। এতে চার ছেলেই বিদেশে পাড়ি জমান উচ্চশিক্ষার্থে। কিন্তু তারা পড়াশোনা শেষে বাড়ি বা দেশে ফেরার কথা একদম ভুলে যান। এ দিকে মেয়ে দুটোকে তিনি তার শেষ আশ্রয়টুকু বিক্রি করে বিয়ে দেন। ফলে বৃদ্ধ বয়সে মাথা গোঁজার ঠাঁইও তিনি হারান। মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি থাকেন বিধায় মাকে তাদের কাছে কিছু দিনের জন্য বেড়াতে নিয়ে রাখেন কিন্তু দীর্ঘ সময়ের জন্য আর রাখতে পারেন না। কারণ স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন মন্দ বলতে থাকে। নিরুপায় হয়ে দুই বোন ভাইদের কাছে চিঠি লেখে। ভাইরা বোনদের অনুরোধে দেশে আসে। বহু দিন পর মা তার ছেলেদের দেখে বুকে জড়িয়ে ধরেন। ভীষণ খুশি হন। ভাবেন এই বুঝি জীবনের সব যন্ত্রণার অবসান হতে যাচ্ছে। বৃদ্ধা ছেলেদের কাছাকাছি থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু নাহ! ছেলেরা সব কিছু বিবেচনা করে ঠিক করে মিরপুরে একটা বৃদ্ধাশ্রম আছে মাসিক টাকার বিনিময়ে সেখানে মাকে তারা রেখে আসবে। ছেলেরা মাসে মাসে টাকা পাঠাবে। ছেলেমেয়েদের এই সিদ্ধান্তে মা ভীষণ কষ্ট পানÑ মনে মনে ভাবেন নিজের শরীরের রক্ত পানি করা শ্রম দিয়ে যে ছয়টি ছেলেমেয়েকে তিনি মানুষ করেছেন বিয়ে পর্যন্ত দিয়েছেন মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু দিয়ে। সে সন্তানদের আজ মাকে আশ্রয় দেয়ার সাহস নেই! এ কেমন নিয়তি।
ঘটনা-৩
দুই ছেলে দুই মেয়েকে মানুষ করে ৬৫ বছর বয়সের মিনতি রায়। চার ছেলেমেয়ের বাসায়ই পালাক্রমে ঘুরে বেড়ায় তার যখন যেখানে যেতে মন চায়। স্বামীর ভিটে বলতে একটি ফ্যাটে মিনতির মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে। শক্তসমর্থ বৃদ্ধা সারা জীবন চাকরি করেছেন। কারো কাছে মাথা নত করার মতো মানসিকতা তার নেই। তাই সে একদিন মিটিং বসায় ছেলেমেয়েদের নিয়ে। ঠিক করে মা কার কাছে থাকবেন? চারজন চার রকম কথা বলে। এ বলে ওর বাসায় ও বলে এর বাসায়। শেষমেশ ঠিক হয়Ñ “মা বাবার ভিটেতেই থাকবেন। তার সব খরচপাতি বেয়ার করবে ছেলেমেয়েরা। ছেলেরা নির্দিষ্ট একটি অ্যামাউন্ট দেবে, মেয়েরা দেবে তার অর্ধেক। এতে বৃদ্ধা দুটো চাকর রেখে গাড়ি মেনটেইন করে সুন্দর করে চলতে পারবেন। তবে বৃদ্ধা একটি শর্তারোপ করে বলেন যে, প্রতি সপ্তাহের একটি ছুটির দিন সবাইকে মায়ের সাথে সময় কাটাতে হবে এবং বৃদ্ধাও যখন যার বাসায় মন চায় বেড়াতে যাবেন। যেই কথা সেই কাজ শর্তানুযায়ী সবাই সব কথা মেনে চলে। বৃদ্ধা খুব খুশিতে দিনাতিপাত করতে থাকেন। কারো কোনো অভিযোগ অনুযোগ আর থাকে না।
ঘটনা-৪
ফুলবানু বয়স ৬০ বছর। ফরিদপুর জেলায় তার বসবাস। একমাত্র ছেলে জসিমউদ্দিনকে ভিক্ষে করে কোনোমতে খাইয়েদাইয়ে বড় করে তোলেন। কিন্তু লেখাপড়া করানো বা অন্য কোনোভাবে তাকে ডেভেলপ করা সম্ভব হয়নি। গরিব জসিমউদ্দিন রিকশা চালিয়ে নিজে চারটি ছেলেমেয়ের ভরণপোষণ করতে হিমশিম খেয়ে যায়। তাই মাকে নিয়ে তার যত সমস্যা। জসিমউদ্দিনের বউ শাশুড়িকে একদম সহ্য করতে পারে না। প্রতিদিন বউ-শাশুড়িতে লাগে মহা গ্যাঞ্জাম সব মিলিয়ে গরিবের সংসারেও হয় মহাপ্রলয়। বেচারা জসিমউদ্দিন পড়েছে মহাবিপদে। তাই একদিন রাতে বুড়ি মাকে চাদর দিয়ে পেঁচিয়ে একটি বস্তায় ভরে নদীর ধারে ফেলে রেখে আসে। ভোরে জেলেরা মাছ ধরতে এসে বৃদ্ধাকে তুলে নিয়ে স্থানীয় চেয়ারম্যানের কাছে নিয়ে যায়। কোর্টে সরকারিভাবে মামলা হয়Ñ সন্তানের বিরুদ্ধে সন্তান মাকে ফেলে আসার কথা স্বীকার করে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মা ছেলের কান্না দেখে বলেÑ আমার ছেলেকে আপনারা কিছু বলবেন নাÑ আমি ভিক্ষে করে নিজের পেট চালাব। ছেলের বিরুদ্ধে আমার কোনো অভিযোগ নেই। ওকে আপনারা ছেড়ে দিন। বুড়ি তার মতো করে এ বাড়ি ও বাড়িতে ভিক্ষে করে দিনযাপন করতে থাকেন।

বিশেষজ্ঞ মতামত

ড. সৈয়দা শাহনাজ বেগম
সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা
বর্তমানের এই অত্যাধুনিক যুগে বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ঠেলে দেয়ার ট্র্যাডিশন যেন বেড়েই চলেছে। এর মূল কারণ কী? আর এই মূল্যবোধহীন জীবন থেকে উত্তরণের উপায় কী? এই প্রশ্ন দুটো সামনে রেখে সরকারি তিতুমীর কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সৈয়দা শাহনাজ বেগমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেনÑ জীবনযাত্রার মান আগের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি উন্নত। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থাও ঠিক সেভাবে পরিবর্তিত হয়ে নিজের শিকড় থেকে দূরে চলে গিয়ে জন্মদাতা বাবা-মায়ের ঋণ ভুলে নিজেদের আরাম-আয়েশ ও স্ত্রী-সন্তানের মন রক্ষায় আজ অনেক পুত্রসন্তানই মাকে ঠেলে দিচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। অনেক সময় তারা এ-ও বলছে যে, স্বামী-স্ত্রী দু’জনই যেহেতু চাকরিজীবী সুতরাং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবাযতœ ঠিকমতো করা সম্ভব নয়, তাই বৃদ্ধাশ্রমে সমবয়সী বৃদ্ধদের সাথে তারা ভালোই থাকবেন তাই এ ব্যবস্থা। তা ছাড়া তাদের অনেকেই পাশ্চাত্য বিশ্বের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানকার ব্যাপারগুলো তো কেউ কিছু মনে করে না, আমরা কেন মনে করব। আসলে রাতারাতি এত পরিবর্তন কি আমরা হজম করতে পারব? কারণÑ আদিকাল থেকেই বাংলার আবহমান সংস্কৃতিতে বাবা-মা ও সন্তানদের সম্পর্ক হচ্ছে যুগ-যুগান্তরের, সেখানে বিদেশের উদাহরণ হচ্ছে নিছকই বাতুলতা। তা ছাড়া বিদেশের ট্র্যাডিশন হচ্ছে ১৮ বছর পর থেকে সন্তানরা সাবলম্বী হয়। বৃদ্ধ হলে সে দেশের সরকার তাদের দেখভালের দায়িত্ব নেয় সুতরাং তাদের সাথে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। এ ক্রাইসিস থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি বলেনÑ একেবারে ছোটবেলা থেকেই বাবা-মা সম্পর্কে সন্তানদের মধ্যে এই মূল্যবোধটুকু ঢুকিয়ে দেয়ার ট্র্যাডিশন গ্রো করার চেষ্টা করতে হবে। ছেলেমেয়েদের বোঝাতে হবেÑ আজ তোমার (সন্তান) জন্য তোমার বাবা-মা যা করছেন তার প্রতিদান তোমাকেই দিতে হবে যখন তারা বৃদ্ধ হবেন। কারণ বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত যার ফলে বাবা-মা তার সর্বস্ব দিয়েই সন্তানকে বড় করে তোলেন, নিজেদের জন্য কিছুই রাখে না। দায়িত্ব তার নিতেই হবেÑ এটা অবশ্যই কর্তব্যের মধ্যে পড়ে যায়। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটানোর উপায় নেই। তা ছাড়া সরকার বা কোনো দাতাগোষ্ঠী অসহায় এমন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেন তাহলে তো কোনো কথাই থাকে না। যদি কোনো সন্তান বাবা-মায়ের খোঁজখবর না নেন তখন না হয় তারা বৃদ্ধাশ্রমেই আশ্রয় নিবেন অথবা যাদের সন্তানই নেই তারা বৃদ্ধাশ্রমেই যাবেন।


খালেদা সুলতানা নূর
আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
মোল্লার ‘মোহাম্মাদান ল’ বইয়ের ৩৭১ নম্বর ধারার ১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ প্রত্যেক সচ্ছল-অবস্থাপন্ন ছেলেমেয়ে তাদের বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা প্রদানের মাধ্যমে ভরণ পোষণ করতে বাধ্য থাকিবে। এবং একই ধারার ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ অভাবগ্রস্ত ও গরিব সন্তানও বৃদ্ধ মায়ের দায়িত্ব নেয়ার জন্য বাধ্য করা হয়েছে এবং ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে পিতাকেও গরিব সন্তান তার ভরণ-পোষণ করার জন্য বাধ্য করা হয়েছে। অন্য দিকে মেয়েসন্তানদের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে পিতা-মাতাকে অর্থ দিয়ে না পারুক অন্তত সেবাযতœ দিয়ে হলেও কর্তব্য পালন করার কথা। এসব আইনের মাধ্যমে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের কর্তব্য পালনে বাধ্য করা এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণের ব্যাপারে আদালতে মামলা করার আইন রয়েছে। যদিও আজ পর্যন্ত কোনো বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে ভরণ-পোষণ আইনের বিরুদ্ধে মামলা করেনি। কারণ বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিচার করলে হাজারো যন্ত্রণা বা কষ্টেও কোনো বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে এসব মামলা করেন না। কথা প্রসঙ্গে আইনজীবী সুলতানা নূর জানান, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ এলাকায় এক বৃদ্ধ মাকে তার ছেলেরা বস্তার মধ্যে বন্দী করে দূরে ফেলে এলে স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার বৃদ্ধাকে উদ্ধার করে কোর্টে ছেলের বিরুদ্ধে মাকে মামলা করতে বললে তিনি তাতে রাজি হননি। যখন সরকারি উকিল বাদি হয়ে মামলাটি দায়ের করেনÑ ছেলেকে শাস্তি দিতে বলেন, তখন মা ছেলেকে সব অপরাধ থেকে মুক্ত করে দেন। অতঃপর তাকে কোথায় যাবেন জিজ্ঞেস করলে বলেনÑ আমি আমার চোখের মণি ছেলের কাছেই যাবো।
বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবস্থা অনুযায়ী সাধারণ জনগণের ধারণা শুধু ছেলেরাই বুঝি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেবেÑ আসলে কিন্তু তা নয়। বাবা-মা সন্তান মানুষ করার সময় যেহেতু ছেলেসন্তান বা মেয়েসন্তানকে আলাদাভাবে বিবেচনা করেন না সুতরাং মেয়েসন্তানদেরও সমান দায়িত্ব রয়েছে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়া। যদিও আমাদের সমাজে মেয়েরা টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য না করতে পারলেও খোঁজখবর নেয়া, বাবা-মায়ের সেবাযতেœর বেলায় মেয়েসন্তানেরা কিন্তু অনেকাংশে এগিয়ে আছেÑ এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার পরও যতটুকু সম্ভব ছেলেমেয়ে উভয়ই বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দায়িত্ব নেয়া অবশ্যই কর্তব্যের একটি অংশ হিসেবে গ্রাহ্য করা হয়। আর এসব কর্তব্যের ব্যাপারে প্রত্যেক বাবা-মায়েরই উচিত ছেলেবেলায় সন্তানদের মনের ভেতর মূল্যবোধ সৃষ্টি করার মানসিকতা তৈরি করা, যাতে কোনো অনৈতিক কাজ তারা না করে।
বিশেষজ্ঞ মতামত

বাল্যবিয়ে- কিশোরী নির্যাতনেরই আর এক রূপ by খন্দকার মর্জিনা সাঈদ

বাল্যবিয়ে আমাদের সমাজের অতি পরিচিত একটি ঘটনা, যা ক্রমেই পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে মারাত্মক ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এটি কিশোরী নির্যাতনেরই একটি রূপÑ যার সূত্র ধরে সামাজিক জটিলতাও দিন দিনই বেড়ে চলছে। এবং শহরের তুলনায় গ্রামে এর আনুপাতিক হার বেশি। আর এ বিষয়ে কথা হয় অনেকের সাথে। বরিশালের চরকডিয়া ইউনিয়নের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক আসমা বেগম। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, বাল্যবিয়ের কারণে নারীরা তাদের প্রকৃত মেধা বিকশিত করতে পারেন না। শিক্ষাক্ষেত্রে বাধা পাওয়ায় পারেন না উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্বনির্ভর হতে। পারেন না পরবর্ত সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অর্জনসহ অভিভাবকের সঠিক দায়িত্ব পালন করতে। এর ফলে, অসময়ে লাগামহীনভাবে অধিক হারে মেয়ে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে এবং বিভিন্ন অজুহাতে বাল্যবিয়ের অর্পিত দায়িত্ব এই অসহায় মায়েদের ওপরই চাপিয়ে দেয়া হয়। প্রয়োজনে তাদের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করে মিথ্যা বলানো হয়। তবে এ ব্যাপারে কঠোর আইন হয়েছে। তবু কিছু কিছু অসৎ বিয়ে রেজিস্ট্রিকারী কাজী টাকার লোভে অপ্রাপ্তবয়সী মেয়েদের সঠিক জন্মসনদপত্র না দেখেই বিয়ে পড়াচ্ছেন। বিয়ে রেজিস্ট্রি করছেন জাল জন্মসনদ অনুযায়ী, যেটা আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধ। বিষয়টি পাত্র-পাত্রীর অভিভাবকদের সম্মতিক্রমেই হয় বলে দণ্ডনীয় এ অপরাধটি বরাবরই চাপা পড়ে যায়। তাই জনসচেতনতা বাড়াতে পরিবারের পাশাপাশি সমাজপতিদেরও আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে হবে। এর সাথে অনলাইনভিত্তিক যাবতীয় সনদপত্রের সাথে জন্মসনদপত্র সংযুক্ত থাকলে বাল্যবিয়ে ও কিশোরী নির্যাতন অনেকাংশে কমে আসবে। আইনের ভয়ে হলেও অভিভাবকেরা সচেতন হবেন বলেও জানান স্কুলশিক্ষক আসমা বেগম।
এনজিওকর্মী দিলরুবা জাহান শম্পা। তিনি ঝালকাঠি জেলা শহরে দীর্ঘ দিন ধরে বাল্যবিয়ে রোধের পাশাপাশি কিশোরী নির্যাতন নিয়ে কাজ করে আসছেন। শম্পা বলেন, সম্প্রতি ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় কিশোরী নির্যাতনে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। বিষয়টি অবশ্য অনেক আগে থেকেই গণমাধ্যম, বিভিন্ন নারী সংগঠন এবং সমাজের সংবেদনশীল মানুষেরা বলে আসছিলেন, যা ইউনিসেফের প্রতিবেদন চোখে আঙুল দিয়ে যেন দেখিয়ে গেল। আর বিষয়টি যে একটা বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় তাও সবার জানাÑ নির্যাতিত কিশোরীদের বেশির ভাগই বাল্যবিয়ের শিকার, যারা অসহায় দরিদ্র বাবা-মায়ের বোঝা কমাতেই দাম্পত্যজীবনে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়, যখন তারা মোটেই মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকে না; যে অধ্যায়টি বিয়ে-পরবর্তী সময় তাদের কাছে একধরনের নির্যাতন বলেই চিহ্নিত হয়। পরিসংখ্যানে আরো জানা যায়, দু’জন বিবাহিত কিশোরীর মধ্যে একজন স্বামী বা সঙ্গীর হাতে নির্যাতিত হয়Ñ যা কারোই কাম্য নয়। যে কারণে দেশে বাল্যবিয়ে আইনত নিষিদ্ধ হয়েছে। বাল্যবিয়ে বন্ধের ব্যাপারে সবাইকে সচেতন করা হচ্ছে। তবু সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাটি কার্যকর হচ্ছে না। এর সাথে নিশ্চিতও করা যাচ্ছে না, বাল্যবিয়ের সাথে সম্পৃক্ত কিশোরী নির্যাতন বন্ধের অধ্যায়। যা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র ও সমাজ, বিশেষ করে পরিবার বাল্যবিয়ে ও কিশোরী নির্যাতনের অধ্যায়টিকে চেপে রাখাই সমীচীন মনে করছে। ফলে নির্যাতকেরা আরো সাহসী হয়ে উঠছে এবং আইনিভাবে নির্যাতিত নারীরা তেমন সহানুভূতিও পাচ্ছেন না। যে কারণে বাল্যবিয়ে ও কিশোরী নির্যাতনের অধ্যায়টি এখনো ঘরেবাইরে আতঙ্কিত অধ্যায় হিসেবেই আলোচিত হচ্ছে। এই বাস্তবতা এতটাই কঠিন এবং করুণ আর্তনাদ হিসেবে ফুটে উঠেছে যে ইউনিসেফের প্রতিবেদনে তা শিরোনামে পরিণত হয়েছে। তা হলে আইনকে ছাপিয়ে হলেও আজকের কিশোরী আগামীর দেশ গড়ার এবং সুস্থ, সুন্দর, স্বাভাবিক জীবনের অধিকারী হতে পারবেন। পারবেন নিজ নিজ সমস্যা সমাধান করে প্রয়োজনে আইনলঙ্ঘনকারীদের কঠোর শাস্তি প্রদান করতে বলেও জানান এনজিওকর্মী দিলরুবা জাহান শম্পা।

এ বিষয়ে বলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপিকা সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, বর্তমান আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কমবয়সীদের শিশু বলা হয়। সেই অনুযায়ী ছেলেদের বিয়ের বয়স ২১ ও মেয়েদের ১৮ বছর না হলে এই বিয়ে বাল্যবিয়ে বলেই বিবেচিত হবে। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটের কথা বিবেচনা করে অনেক অভিভাবক ও সমাজপতিরা ছেলেমেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর কথা বলছেন। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে আইনি যাচাইও শুরু হয়ে গেছে। এ ক্ষেত্রে ছেলেদের বয়স হবে ১৮ এবং মেয়েদের ১৬ বছর। এর পাশাপাশি উল্লিখিত বয়সের আগে যদি কারো বিয়ে হয়, তা বাল্যবিয়ের আওতায় পড়বে, যা কঠিনতম অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হবে। অপরাধের সাজা সর্বোচ্চ দুই বছর। জরিমানা বাড়িয়েও ৫০ হাজার টাকা করা হতে পারে। অধ্যায়টি বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন ২০১৪-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন। বর্তমানে বাল্যবিয়ের বহুল প্রচলিত আইনটি ১৯২৯ সালের। যে কারণে এর সাজা ও জরিমানা দুটিই কম। যা সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে এবং সঠিক জন্মনিবন্ধন ছাড়া যদি বাল্যবিয়ের আয়োজন করা হয়, এ ক্ষেত্রে বিয়ে রেজিস্ট্রারের নিবন্ধন বাতিল করা হবে। সেই সাথে এই বিয়েতে জড়িত ব্যক্তিকে সাজা ও জরিমানাও করা হবে। আর এই আইনি কার্যক্রমগুলো সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া গেলে অনেকাংশেই বাল্যবিয়ে ও কিশোরী নির্যাতন কমে আসবে। কুসংস্কারাচ্ছন্ন ব্যক্তিরা আইনের ভয়ে হলেও অধ্যায়টি এড়িয়ে চলবেন। কমবে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের জটিলতা বলে জানান অধ্যাপিকা সাবিনা ইয়াসমিন।

সফলতার আলো জ্বলার ক্ষেত্রে সাহস বড় শক্তি -ফ্রান কাপো by মো: আবদুস সালিম

বেশি কথা বলাদের অনেকেই পছন্দ করেন না। অনেকে তাদেরকে বাচাল বা টকেটিভও বলে। কিন্তু অল্প সময়ে বেশি বা সর্বাধিক পরিমাণে শব্দ বলতে পারাও যে একটা বড় ধরনের কৃতিত্ব বা কোয়ালিটি, যা অনেকেরই জানা নেই। এ নিয়ে প্রতিযোগিতার নিয়ম চালু আছে বিশ্বে। এমনকি অনেকে গড়েন বিশ্ব রেকর্ড। মিনিটে ৪৮৫টি শব্দ উচ্চারণ করে বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দিলেন যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনউইচে জন্ম নেয়া নারী ফ্রান কাপো। একবার দুইবার নয়, বরং তিন-তিনবার বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন সবচেয়ে দ্রুত কথা বলা নারী হিসেবে। এক হিসাবে সংশ্লিষ্টরা জেনেছেন, কপো প্রতি সেকেন্ডে বলতে পারেন ১১টি শব্দ। তিনি অনেক আগেই বলেছিলেন, সবচেয়ে দ্রুত কথা বলা নারী হিসেবে গিনেজ বুকের রেকর্ড ভাঙতে হবে আমাকে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই সিরিয়াস। অনেক সময়ে স্টপওয়াচ ধরেও এর চর্চা করেন। আরো অনেক পদ্ধতিতে তিনি এর প্র্যাকটিস করেন। হয়তো সে কারণেই তিনি আজ এ ব্যাপারে এত দূর এগিয়ে গেছেন। এ নিয়ে তার লাইভ অনুষ্ঠানও হয়েছে। তার পর থেকে এ ব্যাপারে তিনি আরো সিরিয়াস হন। বিশ্বরেকর্ড গড়েন ১৯৮৬ সালের ৫ মার্চ। ফের রেকর্ড গড়তে লাস ভেগাসের এক টিভি দর্শকের সামনে হাজির হন ১৯৯০ সালে। কপোর হাতে দেয়া হলো ব্রিটিশ ইংরেজিতে লেখা একটি বই। এটি সপ্তদশ শতাব্দীর। ৪৮৫টি শব্দ পড়েন মাত্র এক মিনিটে। এতেই ভেঙে গেল রেকর্ড। গিনেজ বুকের এখনকার রেকর্ড বলেছে, ফ্রান কপো ৬০৩ দশমিক ৩২ শব্দ পড়েন ৫৪ দশমিক ২ সেকেন্ডে।

সবচেয়ে দ্রুত কথা বলা মেয়ে হিসেবে কাপোর নাম কেবল গিনেজ বুকেই শুধু নয়, তা উল্লেখ আছে বুক অব অল্টারনেটিভ রেকর্ডস ও রিপলিস বিলিভ ইট অর নটে। এগুলো তাকে নিয়ে ফিচারও করেছে। তবে দ্রুত কথা বলতে পারা সম্বন্ধে তিনি বলেন, এর জন্য ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে নিউ ইয়র্কের। দ্রুত বা তাড়াতাড়ি কথা বলাদের বেশির ভাগই থাকে এখানে। দ্রুত কথা বলতে পারার কারণে অনেক তাকে বলে ‘মোটর মুখের নারী’। অসম্ভব দ্রুত রিপোর্ট পড়েন মাত্র আধা মিনিটে।
ফ্রান কপোর আরো পরিচয় আছে। রেডিওতে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। কৌতুকানুষ্ঠান প্রচার করেন এফএম রেডিও স্টেশনে বা নাটকে কণ্ঠ দেয়ার পাশাপাশি অনুষ্ঠান উপস্থাপনারও ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিছু রিপোর্ট পড়েন বেশ রসাত্মক ভঙ্গিতে। তিনি মনে করেন, এমনভাবে কিছু বিষয় প্রচার করতে পারলে তা হৃদয়গ্রাহ্য একটু বেশিই হয়। গণমাধ্যমে তার সাক্ষাৎকার প্রচারিত হলে ব্যাপক পরিচিতি পেতে থাকে।
দেখা যাচ্ছে অনেকগুলো পেশার সাথেই জড়িত তিনি। টিভি অনুষ্ঠানের সহ-উপস্থাপকের পাশাপাশি তিনি ব্লগ রাইটার, বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র। কাপো বেশ সুনাম অর্জন করেছেন স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান হিসেবে। দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের হাসানো হয় কৌতুকাভিনয়ের মাধ্যমে। তিনি কৌতুক পরিবেশন করেন রেস্টুরেন্টেও। কোথাও এ সংক্রান্ত কোনো অনুষ্ঠান হবে খোঁজ পেলে সেখানে দ্রুত যান। তবে এককাভিনয় তার একটু বেশি পছন্দ।
বক্তা হিসেবেও রয়েছে তার বড় পরিচিতি। এ বিষয়ে তার রয়েছে প্রচুর বই। যখন মনে করেন তখনই লিখতে পারেন। অর্থাৎ এ ব্যাপারে তার নেই নির্দিষ্ট সময় বা ক্ষণ। এমনকি অনেক সময় লেখেন অতি সাধারণ বিষয় নিয়ে। তিনি হাসপাতালে থেকেছেন রোগীর সাথে। লক্ষ্য, এখানকার বিভিন্ন্ অভিজ্ঞতা বা সুবিধা অসুবিধাগুলো বুঝতে পারা। এ নিয়ে তিনি বই লিখেছেন। এটি পড়লে মানুষ জানতে পারবে হাসপাতালে কোন সমস্যা হলে কী করতে হবে।
এরই মধ্যে ফ্রান কাপো করেছেন প্রায় তিনশ টিভি শো। কমেডি বক্তৃতায় নতুন নতুন গল্প জুড়ে দেন। যা অনেকের পক্ষে মোটেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। তিনি বলেন, কৌতুকই কমেডির প্রাণ বা মূল। অবশ্য প্রতিটি গল্পের একটি কারণ থাকবে বক্তৃতায়। শেখার মতো কিছু থাকলে তা হয়ে ওঠে আরো প্রাণবন্ত।
কাপো বিখ্যাত অভিযাত্রী হিসেবেও। অভিযান নিয়ে বের করেছেন প্রচুর বই। একটি বইয়ে স্বাক্ষর করেন কিলিমানজারো পর্বতের চূড়ায়। এটি অদ্ভুত এক বিশ্বরেকর্ড বলা যায়। এটি ২০০৪ সালের কথা। ২০০৫ সালে সাগরের তলদেশে টাইটানিকের ধ্বংসস্তূপের সামনে স্বাক্ষর দেন। তবে বিশ্বরেকর্ড গড়া তার আসল উদ্দেশ্য নয়। নিজের পরিচয় নিতেই বেশি ভালো লাগে। মানুষ যাতে অ্যাডভেনচারে নামে সেটাই তার উদ্দেশ্য। ভিডি ব্লগ চালু করেছেন ইউটিউবে। এটি বিনা পয়সার একটি সেবা। অবাক বিষয় হলো- হাঙরের পাশে সাঁতরেছেন। লাফিয়েছেন যুদ্ধবিমান থেকে। পড়েন ঘূর্ণিঝড়ের কবলে। রেসিং কার চালানোর ব্যাপক অভিজ্ঞতা আছে। অনেকে তাকে বেপরোয়া নারী হিসেবে জানেন। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে অভিযান চালাতে হবে সাগরের হাইড্রোথারমাল ভেন্টগুলোতে। এগুলো রীতিমতো উষ্ণ প্রস্রবণ।
প্রচণ্ড সাহসী কাপোর পড়ালেখা কুইন্স কলেজে। পড়েছেন দর্শন ও হিসাববিজ্ঞানে। তবে স্বামীর সাথে জীবন কাটানোর সৌভাগ্য হয়নি তার। অনেকের ধারণা অনেকগুলো পেশায় জড়িত থাকার কারণে তা সম্ভব হয়নি। প্রায় ১৯ বছর বয়সী একমাত্র সন্তানকে নিয়ে বসবাস পুটন্যাম কাউন্টিতে। কাপো মনে করেন, জীবনে অনেক কিছুই স্থায়ী হয় না। যেমনটি হয়েছে আমার বেলায়ও। তা ছাড়া ছোটবেলা থেকে যারা বিভিন্ন অ্যাডভেনচারে যোগ দেয় তাদের পক্ষে এমন কিছু ঘটা বা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কোনো কিছুকে ভয় না পাওয়াই যেন ফ্রান কাপোর জীবন দর্শন।

সাগরের সাথে রাগ অভিমান চলে না by শাহ মুহাম্মদ মোশাহিদ

কালো হয়ে আসছে আকাশ। আতঙ্কে ছুটাছুটি করছে জেলেরা। মাইকে ঘোষণা আসছে, সবাই যেন সময়মতো আশ্রয় কেন্দ্রে হাজির হয়। মহিলা আর বাচ্চারা কেন্দ্রে আসার জন্য প্রস্তুতি নিলেও এলোমেলো ছুটাছুটি করছে গ্রামের পুরুষরা। নিজেদের জীবন বাঁচানোর জন্য নয়। এরা বাঁচাতে চায় জীবিকার অবলম্বন নৌকাগুলোকে।

>> সাগরই এদের খাবার জোগায়। সাগর রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেও মেনে নিতে হয়। অন্নযোগানো সাগরের সাথে রাগ অভিমান চলে না।
চিত্রটা শনিবারের। আবহাওয়া বিভাগের হিসাব মতে, পরদিন রোববার সকালেই ঘূর্ণিঝড় হুদহুদ আঘাত হানবে চাপালাভুপাড়া গ্রামে। এই জেলেগ্রামটি ভারতের অন্ধ্র প্রদেশের বিশাখাপত্তনম শহর থেকে ২০ কিলোমিটার উত্তরে। এখানে জেলেদের জীবনের চেয়ে নৌকার মূল্যই বেশি। এই জেলে গ্রামে ১৯৮৩ সালে একটি আশ্রয় কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এটি উন্নতও হয়েছে। এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ আশ্রয় কেন্দ্রে খাবার, পানি আর ওষুধেরও ব্যবস্থা আছে। এতে আশ্রয় নিতে পারে ৩০০ লোক। কেন্দ্রটি এই চাপালাভুপাড়া গ্রামের জনসংখ্যার জন্য অপ্রতুল হলেও এ নিয়ে মাথাব্যথা নেই জেলেদের।

এদের যত মাথাব্যথা নৌকা নিয়ে। জীবন বাঁচাতে হলে মাছ ধরতে হবে। মাছ ধরতে হলে নৌকা থাকতে হবে। সুতরাং নৌকা যদি নাই থাকে তবে এ জীবনের কোনো মূল্য নেই। তাই শনিবার সারাদিন সাগরের উপকূলে দেখা গেছে নৌকা নিয়ে টানাটানি করছে জেলেরা। কয়েকজন মিলে নৌকা মাথায় করে টান এলাকায় নিয়ে আসছে। কেউ ঠেলে ঠুলে নিরাপদ কোথাও রাখার চেষ্টা করছে।
পঞ্চাশ বছর বয়সি জেলে থোলাডা আমরুও এদের একজন। তিনি বলেন, মাত্র দুসরা উৎসব শেষ হলো। এখন আমাদের মাছ ধরা আর গঙ্গা মায়ের পূজা করার সময়। কিন্তু এই হুদহুদের খবরে সবই ভেস্তে গেলো। কয়েকদিন ধরে তো একেবারেই সাগরে যেতে পারছি না।
তিনি জানালেন, উত্তাল সাগরে যেতে না পারলে তাদের খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার অন্য কোনো অবলম্বন নেই। সাগরই এদের খাবার জোগায়। সাগর রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেও মেনে নিতে হয়। অন্নযোগানো সাগরের সাথে রাগ অভিমান চলে না। এই সাগরই মাঝে মাঝে আমরুর মতো জেলেদের নৌকা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। আর একেকটি নৌকা ভেসে যাওয়া মানে ছয় লাখ রুপি ভেসে যাওয়া। একবার নৌকা হারালে, নতুন আরেকটি কেনার  সমার্থ আমরুদের মতো জেলের পক্ষে সম্ভব নয়।
আমরু বললেন, আমাদের জীবন গেলে যাক। কিন্তু নৌকা ভেসে গেলে পুরো পরিবারকে না খেয়ে থাকতে হবে। একটি নৌকা ভেসে গেলে আমাদের মতো জেলেদের বেঁচে থাকার অর্থ নেই।
জেলে গ্রামের এক রাজনৈতিক নেতা বললেন, সরকার আমাদের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র করেছে। কিন্তু আমাদের নৌকাগুলোর জন্য কিছুই করেনি। আমরা দাবি করেছিলাম নৌকাগুলো নিরাপদে রাখার জন্য একটি জেটি বানিয়ে দিতে। কিন্তু সেটা হয় নি। তবে যতটুকু ব্যবস্থা হয়েছে, ততটুকু দিয়েই হুদহুদের বিপরীতে দাঁড়াতে হয়েছে তাদের। জেলেরা নিজের দায়িত্বেই নৌকাগুলোকে আগলে রেখেছেন।
অবশেষে রোববার এলো। অন্যান্য এলাকার মতো চাপালাভুপাড়া গ্রামেও আঘাত হানলো হুদহুদ। বাতাস বইলো ঘন্টায় ১৭০ কিলোমিটার বেগে। সাগর ফুলে ফেঁপে ঢেউগুলো বড়ো হলো। দুই থেকে তিন মিটার উঁচু হয়ে আছড়ে পড়লো বিশাখাপত্তনম এলাকায়। এতে মারাও গেলো পাঁচজন। কিন্তু সেই জেলে গ্রাম চাপালাভুপাড়ার নৌকাগুলোর কী হলো? এখনো এ বিষয়ে খারাপ কোনো সংবাদ আসেনি। তাই একরকম ধরেই নেয়া যায় জেলেদের নৌকা জেলেদের কাছেই আছে। আবার ঢেউয়ের ফিরতি টানে দু’একটি নৌকা যে সাগরে ভেসে যায়নি, সেটাও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

ইবোলা চিকিৎসায় সতর্কতার নির্দেশ

যুক্তরাষ্ট্রে সন্দেহভাজন ইবোলা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় স্বাস্থ্য বিভাগকে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সম্প্রতি এক মার্কিন সেবিকা লাইবেরিয়ান একজন ইবোলা রোগীকে সেবা দেয়ার সময় নিজেও এ রোগে আক্রান্ত হন। দেশটির কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করার পরই ওবামা এ নির্দেশনা জারি করেন। পশ্চিম আফ্রিকার বাইরে ইবোলায় আক্রান্ত হওয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি হলেন ওই নারী। তিনি এখন টেক্সাসের একটি হাসপাতালের নির্জন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে মাদ্রিদে একজন স্প্যানিশ সেবিকা ইবোলায় আক্রান্ত হন। ড. টম ফ্রেইডেন নামে যুক্তরাষ্ট্রের এক ঊর্ধ্বতন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেছেন, ঐ মার্কিন নার্সের শরীরে কিভাবে এই রোগের সংক্রমণ হলো তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে, হাসপাতালের কর্মীদের ভুলের কারণেই এটি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডব্লিউএইচও। এর অধিকাংশই মারা গেছে গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরালিওনে।

দয়াময় আল্লাহ ক্ষমা চাইবার শক্তি দিন by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ঈদ মোবারক। আশা করেছিলাম এবার কোরবানির ঈদ বেশ আনন্দে কাটবে। প্রতি বছর দু-এক মাস আগে কোরবানির গরু কিনে লালনপালন করি। মুক্তিযুদ্ধের সহকর্মী আব্দুল্লাহ বীর প্রতীক এবার কোরবানিতে তার পালের গরু আমাকে দিয়েছে। গরুটা আমার বাড়িতেই বড় হয়েছে। বেশ শক্তিশালী হৃষ্টপুষ্ট ছিল। ভীষণ ফোঁস ফোঁস করত। খুব সহজে তার কাছে কেউ ঘেঁষতে পারত না। সেটাই এবার আমরা আল্লাহর নামে বাবা-মা, দীপ-কুঁড়ি-কুশি, ওদের মা এবং আমার পে কোরবানি দিয়েছি। ঈদের আগের রাতে প্রচণ্ড জ্বর এসে শরীর খারাপ করেছিল। তবু মোটামুটি ঈদ পালন করেছি। কোরবানি দিয়েছি, বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করেছি। বহু দিন পর এবার শুক্রবার আকবরি হজ হয়েছে। হজ আর পূজা একেবারে কাছাকাছি ছিল। আমার মনে হয়, পূর্ণিমা, অমাবস্যা, তিথি, নত্র বিচার করলে ঈদ কোনোক্রমেই সোমবারে হয় না। রোববারের পরে যাওয়ার কোনো সুযোগই ছিল না; কিন্তু ডিজিটাল কর্মকাণ্ডে ধর্মকর্মের শুদ্ধতা নেই। যার যখন যা মর্জি, তাই তারা করছে। বিশেষ করে সরকারের মর্জি মানুষের বোঝা অসাধ্য। মানুষ বাড়ি পৌঁছতে পারছিল না, সে কারণে কি সময় দেয়ার জন্য ঈদ এক দিন পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল? বুঝব কী করে? ইসলাম তো কোনো রাজনৈতিক দল নয়, ইসলাম একটি ধর্ম। তার সব অনুশাসন আগে থেকে স্থির করা। কারো মর্জিমাফিক সেসব অদল-বদল হওয়ার সুযোগ কোথায়? যে যা-ই বলুন, ৫ তারিখের স্থলে ৬ অক্টোবর ঈদুল আজহার দিন নির্ধারণ কোনো মতেই যুক্তিযুক্ত মনে করি না। ওটা একটা মারাত্মক অধার্মিক কাজ হয়েছে।
সরকার তারস্বরে চিৎকার করছে, দেশে শান্তির হিমেল হাওয়া বইছে। কিন্তু মানুষের মধ্যে কোনো মনুষ্যত্ব, মানবতা, প্রেমপ্রীতি-ভালোবাসার লেশমাত্র নেই। মানুষ আল্লাহর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। পরম দয়াময় প্রভু আমাদের সাপ, ব্যাঙ, কুকুর, বিড়াল হিসেবেও সৃষ্টি করতে পারতেন; কিন্তু দয়া করে তিনি আমাদের শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ বানিয়েছেন। আজ আমাদের মনুষ্যত্ব কোথায়? পবিত্র ঈদুল আজহার গভীর রাতে টাঙ্গাইলের গোড়াই সোহাগপুরে একটি পাকা ঘরে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে এক নরপশু পাষণ্ড মাসহ তিন মেয়েকে পুড়িয়ে মেরেছে। সব থেকে ছোটটির বয়স ছিল পাঁচ বছর। মুসলমান ঘরের নারী আগুনে পুড়ে অঙ্গারÑ এটাকে আল্লাহর রহমত-বরকত মনে করব, নাকি গজবের আলামত? কুরআন-হাদিসে দেখেছি, আল্লাহ প্রেমের কারণে জগৎ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ পবিত্র প্রেমকে ভালোবাসেন। সেখানে রহমত-বরকত দান করেন। জাহাঙ্গীর নামে এক বখাটে তরুণ ১৩ বছরের একটি মেয়েকে বিয়ে করার জন্য লালায়িত হলে সে এবং তার পরিবার রাজি না হওয়ায় গোষ্ঠীসুদ্ধ পুড়িয়ে মারার মাঝে আমি তো কোনো প্রেম খুঁজে পাই না। শুধু জিঘাংসাই দেখতে পাই। প্রেম করেছেন লাইলী-মজনু, শিরি-ফরহাদ, রজকিনী-চণ্ডিদাসÑ এখানে তার লেশ কোথায়? কাউকে কেউ ভালোবাসলে যার জন্য হৃদয়ের বোঁটা ছিঁড়তে চায়, তাকে পুড়িয়ে মারার কথা কল্পনা করা যায় কি? খবরটি শুনে স্থির থাকতে পারিনি। ছুটে গিয়েছিলাম সোহাগপুর মজিবরের বাড়িতে। পরিবারে সচ্ছলতা আনতে গাধার খাটুনি খাটতে সে মালয়েশিয়া গিয়েছিল। পরিবারের অবস্থাও অনেকটা ফিরিয়েছিল। ছোট্ট সুন্দর পাকা বাড়ি, ঘরে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রÑ সবই ছিল; কিন্তু বুকের ধন কেউ নেই। ও রকম পাকা ঘর না হয়ে কাঁচা ঘর হলে মা-মেয়ে চারজনই হয়তো আগুনে পুড়ে ছারখার হতো না। জানি না দোজখের আগুন কেমন হবে, তবে ৬০ লিটার পেট্রল ঢেলে অমন একটি ১৪-১৫ ফুট আশপাশের ঘরে আগুন দিলে তা যে কেমন হতে পারে, সেটা একমাত্র স্রষ্টাই জানেন।
ধরপাকড় চলছে, দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়। রাজনৈতিক প্রভাব না পড়লে, টানাটানি না হলে হয়তো ঘাতকদের সাজা হবে। সেদিন দেখলাম, প্রধান আসামি জাহাঙ্গীরকে ধরিয়ে দিতে পুলিশ এক লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। অনেকে মনে করেন, আসামির জন্য সরকারি পুরস্কার ঘোষণা একটি কঠিন পদপে; কিন্তু কেন যেন আমার কাছে মনে হয়, কোনো আসামিকে ধরতে না পারায় পুলিশের পুরস্কার ঘোষণা তাদের দুর্বলতারই স্বার। তবু পুলিশ কিছুটা তৎপর বলে তাদের সাধুবাদ জানাই। সত্যিই মনটা ভালো নেই। তুমি হয়তো জানো না, তোমার এক অত্যন্ত প্রিয় কর্মী, আমার বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী ঈদের ক’দিন আগে ওয়াশিংটনে পবিত্র হজসহ কিছু বিষয় সম্পর্কে মারাত্মক আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছেন। আসলে আওয়ামী লীগ নিজেকে ধর্মনিরপে বোঝাতে গিয়ে কী সব যে করে, অনেক কিছু হয়তো তারা নিজেরাই খেয়াল করে না। ধর্মনিরপেতা আর ধর্মহীনতা যে এক নয়, তাও বুঝতে চায় না। সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। তোমার কন্যা বড় দতার সাথে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলে দিয়েছেন, সরকারের এবং আওয়ামী লীগের কোনো বিপদ বা অসুবিধা নয়, যে মন্তব্য করেছে এ অসুবিধা তার। পিতা, এখন তুমিই বলো, আমার বাবা মৌলভী মুহাম্মদ আব্দুল আলী সিদ্দিকীর অনুযোগ-অভিযোগ ছিল, আমরা তার কথা শুনিনি, মানিনি; বরং তোমার কথা শুনেছি।’ জনাব লতিফ সিদ্দিকী বামপন্থী আওয়ামী লীগার নন, আওয়ামী লীগেই তার জন্ম। তারপরও নাকি যে বক্তব্য দিয়েছেন সব দায়দায়িত্ব তার, তার দলের নয়। যে পাঠশালায় তিনি সারা জীবন পড়লেন, শিখলেন, এখন তিকর কিছু বলায় সে পাঠশালার বিদ্যাবুদ্ধি সব লোপ পেয়ে গেলÑ এ কেমন কথা? সারা জীবন যা বললেন সব ছিল আওয়ামী লীগের, আজ যখন বেকায়দা তখন সেটা আওয়ামী লীগের না, সরকারের না! মনে হয়, দেশের মানুষও অনেকটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা মেনে নিয়েছে। ২৮-২৯ সেপ্টেম্বরের ঘটনা, এখনো তিনি সরকারের মন্ত্রী। তারপরও আওয়ামী লীগে তার বিরোধীরা গালাগাল করছে। তুমি তো ভালো করেই জানো, গোলামি করতে পারি না, জি হুজুর বলতে পারি না, বিবেকের সাথে প্রতারণা করতে পারি নাÑ যে কারণে আওয়ামী লীগ করতে পারিনি। আজ ১৬ বছর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নিয়ে পড়ে আছি। ছোট মানুষ ছোট দল, কেউ বাধা দেয়ার নেই, তাই বিবেকের নির্দেশে কথা বলি। আওয়ামী লীগের লোকজনেরা প্রায় সবাই পণ্ডিত। আমি আওয়ামী লীগ করি না, কিন্তু তোমাকে ছাড়তে পারিনি। তুমি আমার অস্তিত্ব, তুমি আমার ঠিকানা। তোমাকে ছেড়ে যাবো কোথায়? এতকাল লতিফ সিদ্দিকী ছিলেন আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ‘মাননীয় মন্ত্রী’। যেই মাত্র অসুবিধায় পড়েছেন, বেজুত কথা বলেছেন, তখনই কাদের সিদ্দিকীর ভাই। তখন আর আওয়ামী লীগের নেতা নন। কী যে এক মারাত্মক জ্বালায় আছি, তোমাকে বোঝাই কী করে?
দল ও পরিবারের অবস্থা স্পষ্ট করতে ১১ অক্টোবর জাতীয় প্রেস কাবে গিয়েছিলাম। বিপুল সাংবাদিকে হল ভরে গিয়েছিল। তারা যে সৌজন্যের পরিচয় দিয়েছেন তার জন্য তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কি, আমার কিছু বলার ছিল না। আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও মাননীয় মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী আমার কেউ না, কিছু না; কিন্তু আল্লাহপ্রদত্ত সম্পর্কে তিনি আমার ভাই, আমরা একই মা-বাবার সন্তান। একই রক্ত আমাদের ধমনিতে প্রবাহিতÑ সে সম্পর্ক অস্বীকার করি কী করে? রক্তের সম্পর্ক তো পুঁটি মাছের মতো বাজার থেকে কেনা যায় না। তাই দয়াময় আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করেছি, হে প্রভু, আপনি আমার ভাইকে মা চাইবার শক্তি দান করুন। সত্যিকার অর্থে আল্লাহ শক্তি না দিলে কারো মা চাইবার সামর্থ্য নেই। মুসলিম জাহান, বিশেষ করে দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগায় পরিবারের প থেকে তাদের কাছে মা প্রার্থনা করেছি। তাকেও আল্লাহর কাছে এবং দেশবাসীর কাছে মা চাইতে বিনীত অনুরোধ করেছি। তিনি চাইবেন কি চাইবেন না, সেটা তার ব্যাপার। মুসলমানের ঘরে জন্মেছি, প্রকৃত মুসলমান হিসেবে মরতে চাইÑ এটাই আমার প্রার্থনা।
আমার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য বেশ গুরুত্বের সাথে প্রায় সব সংবাদমাধ্যমে প্রচার করার জন্য আমি ও আমার দল তাদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছি; কিন্তু তারপরও কিছু কিছু সংবাদপত্র তাদের মনের মাধুরী মিশিয়ে তাদের মতো করেই খবর প্রচারের চেষ্টা করেছে। কেউ কেউ আমার উদ্ধৃতি দিয়ে বলার চেষ্টা করেছেনÑ লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের শিকার। আমি করি কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ। আওয়ামী লীগের কেউ ষড়যন্ত্রের শিকার হলে আমার মাথাব্যথা হবে কেন? সংবাদ সম্মেলনের সব বক্তব্য রেকর্ড করা আছে। আমি একবারো আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের কথা মুখেও আনিনি। শুধু দলীয়ভাবে বলা হয়েছে, যাই বলুন, হজ সম্পর্কে লতিফ সিদ্দিকীর বিতর্কিত বক্তব্য তার একার হতে পারে না। সেটা সম্পূর্ণই আওয়ামী লীগ এবং বর্তমান অনির্বাচিত অবৈধ সরকারের। কোনো কোনো পত্রিকা এমন লেখার চেষ্টা করেছে, লতিফ সিদ্দিকীর ইসলামবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছি। সেদিনের সম্মেলনে ইসলাম শব্দটিও আমরা উচ্চারণ করিনি। হজ, মুসলমানÑ এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছি। কারো কারো রিপোর্ট দেখে মনে হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আমার সাথে কথাবার্তা বলেই যেন তিনি তার রিপোর্ট তৈরি করেছেন, ‘লতিফ সিদ্দিকী আউট, কাদের সিদ্দিকী ইন’। লিখতে কোনো বাধা নেই; কিন্তু এমন লিখতে লিখতে লেখার গুরুত্ব হারিয়ে ফেললে একসময় সংবাদমাধ্যমেরই অসুবিধা হবে। মানুষ তখন সত্যকেও বিশ্বাস করতে চাইবে না। তাই যতটা সম্ভব, সত্যের অন্বেষণ করা উচিত।

কয়েদি নাম্বার ৭৪০২ by মহীউদ্দীন আহমদ

চিকিৎসার জন্য সস্ত্রীক চেন্নাই গিয়েছিলাম। আর তখনই ভারতীয় রাজনীতির এক ঐতিহাসিক ঘটনা অবলোকন করার সুযোগ হলো। দিনটা শনিবার ২৭ অক্টোবর। আমরা চেন্নাই ছাড়ার আগে শহরটা দেখার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলাম। ফেরার পথে বাসটা হঠাৎ থেমে গেল। সামনে লাঠি হাতে একটি মিছিল, দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, জায়গায় জায়গায় মানুষের জটলা। চোখেমুখে বিষণœœতার ছাপ, ব্যস্ত সড়ক দ্রুত পরিবহনশূন্য হতে চলছে। কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। হাসপাতালের গেস্ট হাউজে এসে শুনলাম আদালতের রায়ে ওই প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার জেল হয়েছে। তাই শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। আমাদের সতর্ক করে দেয়া হলো যেন রাস্তায় বের না হই। গেস্ট হাউজের ব্যালকনি থেকে ব্যস্ততম সড়ক স্পষ্ট দেখা যায়। দেখলাম রাস্তায় বিশেষ করে বাস নেই বললেই চলে। অথচ এমআরটি হচ্ছে মূল নাগরিক পরিবহন। টেলিভিশনের পর্দায় জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখলাম। সরকারি সম্পত্তি পোড়ানোর দৃশ্য অনেকটা আমাদের দেশের মতোই। ভাঙচুর, আগুন, গাড়ি পোড়ানো প্রভৃতি ঘটেছে। তবে ব্যতিক্রম আত্মাহুতির ঘটনা।
জয়ললিতা তামিলনাড়ুর জনপ্রিয় এক নেত্রী। ফিল্মের নায়িকা থেকে মুখ্যমন্ত্রী। ভারতীয় রাজনীতিতে নায়ক-নায়িকাদের উত্থান নতুন কিছু নয়, তবে ব্যতিক্রম জয়ললিতার ক্ষেত্রে। বড় দুর্নীতির অভিযোগ কাঁধে নিয়েই তিনি বরাবর জনপ্রিয়তার শীর্ষে অবস্থান করেছেন। লোকসভার বিগত নির্বাচনে যেখানে নরেন্দ্র মোদি বড় চমক দেখিয়েছেন, সেই নির্বাচনেও জয়ললিতা ৩৯টি আসনের মধ্যে ৩৭টি জিতেছেন। অর্থাৎ তার রাজ্যে তিনি অসম্ভব জনপ্রিয় এক নেতা। জনগণ শ্রদ্ধা ও ভক্তিতে ‘আম্মা’ বলে সম্বোধন করে তাকে। এই নেত্রী তার নেতৃত্বে তামিলনাড়–তে সফলভাবে মোদি ঝড় থামিয়েছেন।
১৯৯৬ সালে জয়ললিতার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন বিজেপির এক নেতা। তখন তিনি গ্রেফতার হয়ে কয়েক সপ্তাহ জেলে থেকে জামিনে মুক্তি পান। ২০০১ সালে তার দল ক্ষমতা গ্রহণ করলে তিনি হন মুখ্যমন্ত্রী। মে মাসে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলেও সেপ্টেম্বর মাসেই আদালতের রায়ে মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু এবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আদালতে উপস্থিত হয়ে সরাসরি জেলে যেতে হলো। আদালত থেকেই জেলে গেলেন জয়ললিতা। মুখ্যমন্ত্রী থেকে জেলের কয়েদি। ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা এটাই প্রথম। জয়ললিতার আয়ের সাথে সম্পদের কোনো মিল খঁুঁজে পাননি আদালত। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি যে সম্পদের পাহাড় বানিয়েছেন, তার মূল্য ৬৭ কোটি রুপি। ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির এমন নজির ভারতীয় রাজনীতিতে বিরল। এত অল্প সময়ে এত সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার পেছনে যে দুর্নীতি রয়েছে, তা বোঝা কঠিন নয়। ২০০২ সালে উপনির্বাচনে বিজয়ী হয়ে জয়ললিতা আবার মুখ্যমন্ত্রী হন। বলা হয়, ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাটি প্রভাবিত করার চেষ্টাও করেছেন। এমন প্রেক্ষাপটে ২০০৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে তামিলনাড়– থেকে মামলাটি কর্নাটকের ব্যাঙ্গালুরুর একটি আদালতে সরিয়ে নেয়া হয়। এবার সে আদালতের রায়ে মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার চার বছর কারাদণ্ড ও ১০০ কোটি রুপি জরিমানা হয়েছে। আদালতে হাজিরা দিতে এসে তিনি সেখান থেকে সরাসরি পৌঁছলেন জেলে। সুপ্রিম কোর্টের গত বছরের এক আদেশে বলা হয়েছে- কোনো আইনপ্রণেতা দুই বা ততোধিক সময়ের জন্য দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে তার পদের জন্য অযোগ্য হবেন। জয়ললিতার ক্ষেত্রে উচ্চতর আদালতের রায় কার্যকর হয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই রায় নজির হয়ে থাকবে। তারই পুলিশ আদালতের রায়ের পর ভ্যানে তুলে তাকে নিয়ে গেল জেলে। দুর্নীতির এই মামলা থেকে মুক্তি পেতে জয়ললিতা তার প্রভাব-প্রতিপত্তি ও বিশাল জনপ্রিয়তা সব কিছুকেই কাজে লাগিয়েছেন; কিন্তু অবশেষে আদালতের সামনে তাকে হার মানতে হয়েছে। তিনি এখন জেলের সাধারণ একজন কয়েদি। কয়েদি নাম্বার ৭৪০২। ব্যাঙ্গালুরুর পারাপুন্নি আগ্রাহারা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ কয়েদিদের মতোই তাকে রাখা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য আলাদা কক্ষ নেই সেখানে। জয়ললিতা তাকে কোনো বেসরকারি হাসপাতালে নেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি এখন একজন দণ্ডিত আসামি মাত্র। তাই তাকে কারা বিধি মেনে চলতে হবে। জামিন হয়তো তিনি পাবেন, কিন্তু সেটা বড় কথা নয়, বড় বিষয় হলো মুখ্যমন্ত্রীর প্রচণ্ড প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং জনপ্রিয়তা, ক্ষমতা সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে বিশাল বিজয় অর্জন সত্ত্বেও তাকে অবশেষে দুর্নীতির দায় বহন করে জেলে যেতে হয়েছে। এটাই বাস্তবতা। রাজনীতিবিদেরা যদি মনে করে থাকেন তারা আইনের ঊর্ধ্বে, তাহলে তারা নিশ্চিত ভুল করবেন। আইন নিজস্ব গতিতে চলবে। কোনো-না-কোনো সময় তার প্রয়োগও হবে। এটা মনে রাখতে হবে তাদের। জনকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করা আর নিজের জন্য অর্থসম্পদের পাহাড় গড়ে তোলা এক কথা নয়। সম্পদের বিষয়েও আদালত কোনো ছাড় দেননি। ৬৭ কোটির বিপরীতে জয়ললিতাকে ১০০ কোটি রুপি সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা হয়েছে। আর্থিক দণ্ডও কম নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতির বিষয়টি ভারতীয় রাজনীতিতে বেশ জোরেশোরে উঠে এসেছে। কংগ্রেসের দুর্নীতির ইস্যু মোদি উত্থানের বড় কারণ বললে অত্যুক্তি হবে না। দুর্নীতির রায়ে ভারতীয় ব্যবসায়ী, সাহারা গ্রুপের মালিকও জেলে রয়েছেন। জেলে বসেই তিনি জনগণের অর্থসম্পদ ফেরত দেয়ার কাজ করছেন আদালতের নির্দেশে। দুর্নীতি উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় ইস্যু হলেও আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের বিবেচনায় গুরুত্বহীন হয়ে রয়েছে। তারা বিষয়টিকে কবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করবেন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের মনে এই প্রশ্ন্, এখন তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয়। ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির বিষয় কখনোই বিবেচনায় আনা হয় না। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও লুটপাটের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও তা গুরুত্ব পায় না। ক্ষমতাসীনদের ‘কুছ পরোয়া নেহি’ মনোভাবের অবসান হওয়া উচিত। শক্তিশালী আইনিব্যবস্থা গড়ে উঠলে দেশের জনগণ উপকৃত হতো। রাজনীতিবিদ যখন আদালত ও বিচারের ঊর্ধ্বে নিজেকে ভাবেন, বিশেষ করে ক্ষমতাসীনেরা যখন এমন ভাবনার মধ্যে থাকেন, তখন দুর্নীতি নতুন মাত্রা লাভ করে। শুধু বিরোধী রাজনীতিবিদদের টার্গেট করে কখনোই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বিচারব্যবস্থা হবে নির্ভেজাল, যা সরকারি দল, বিরোধী দল ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। বিচারের স্বচ্ছতা থাকবে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। সর্বোপরি, মানুষের আস্থা থাকতে হবে বিচার বিভাগের ওপর। দুর্নীতির মামলা বা বিচার সর্বপ্রকার প্রভাব-প্রতিপত্তির ঊর্ধ্বে থেকে চলতে থাকলে সামাজিক ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে। ভারতের জনগণের মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে সচেতনতা গড়ে উঠেছে, জয়ললিতার বিরুদ্ধে রায়ের মধ্য দিয়ে তারই হয়তো প্রতিফলন ঘটেছে। ভারতের রাজনীতিবিদদের মধ্যে পরিচিত অনেক মুখ দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন ও জেল খেটেছেন। একই অভিযোগে বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষিত হয়েছেন। মুলায়ম সিং যাদবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা চলছে। মামলা চলছে মায়াবতীর বিরুদ্ধেও। ঝাড়খণ্ডের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মধু কোড়ার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা চলছে। এরা সবাই পরিচিত মুখ। রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে তারা দুর্নীতি করেছেন। এখন আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সহজেই নির্বাচনে জিতে মন্ত্রীও বনে যান। বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। জনগণকে এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। দুর্নীতি ও জনপ্রিয়তা দুটো বিষয় মিলে একাকার হয়ে গেলে হয়তো শেষ পর্যন্ত জনপ্রিয়তা টিকে যায়; কিন্তু কত দিন এই পরিস্থিতি চলতে থাকবে?
জয়ললিতা প্রভাব খাটিয়ে বিচার হয়তো বিলম্বিত করেছেন; বিচারকেরা বিচারিক কাজে হয়তো বা বিব্রতবোধ করেছেন; কিন্তু বিচার থেমে যায়নি। উচ্চতর আদালতের হস্তক্ষেপে বিচারকাজ চলেছে। আমাদের দেশে সব আদালত সঠিকভাবে কাজ করতে সক্ষম হলে পরিস্থিতি ভিন্নতর হতো। জবাবদিহিতা, আইনের শাসন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে করণীয় সব কিছুই করতে হবে নিষ্ঠার সাথে। ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির বিচার এবং রায় শুধু ভারত নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে। শক্তিশালী, জনপ্রিয় এবং ক্ষমতাবান রাজনীতিক রাজ্যের সর্বোচ্চ পদে থেকে আদালতের বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন এবং দণ্ডিত হয়ে সাধারণ কয়েদির মতো কয়েদ খাটা শুরু করেছেন। এতে করে ভারতীয় বিচারব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা বেড়েছে। প্রমাণিত হয়েছেÑ সেখানে বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন ও কার্যকর। এমন বিচার বিভাগের ভূমিকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য কতটা অপরিহার্য, তা সুস্পষ্ট হয়েছে এই রায়ের মধ্য দিয়ে। প্রভাবশালী নেতার এমন পরিণতি থেকে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের শেখার কি কিছুই নেই? রাজনীতিতে পাকাপাকি বন্দোবস্তর চিন্তাভাবনা থেকে সরে এসে নেতা-নেত্রীরা যদি দেশকে পরিচ্ছন্ন করার ‘পরিচ্ছন্ন’ মনোভাব নিয়ে চলার শপথ গ্রহণ করেন, তাহলেই দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে। আমাদের জনগণকে তাই সজাগ হতে হবে।

উচ্চশিক্ষায় বাধা : জালিয়াতি ও ফল বিপর্যয় by মো: তোফাজ্জল বিন আমীন

দেশ ও জাতি গঠনে শিার কোনো বিকল্প নেই। শিা জাতির মেরুদণ্ড। সভ্যতা ও সাংস্কৃতিক ধারাকে মজবুত করা সম্ভব নয় শিার আলো ছাড়া। আগামী প্রজন্মই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেবে এটাই সবার প্রত্যাশা। সুতরাং দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে সুশিায় শিতি হওয়ার সুযোগ দেয়া রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার মানকে ছোট কিংবা খাটো করে দেখানো এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। এ লেখার উদ্দেশ্য হচ্ছে নতুন প্রজন্মের মেধাবীদের ফল বিপর্যয় সম্পর্কে একটি ভাবার সুযোগ সৃষ্টি। প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়েও লিখেছি। এবারের বিষয়টি হচ্ছে প্রশ্নপত্র জালিয়াতি ও ভর্তি পরীার ফল বিপর্যয় নিয়ে। মেধাবীদের তালিকায় থাকতে কার না ইচ্ছে করে; কিন্তু সবার নাম মেধাবীদের তালিকায় ওঠে না। যারা মেধাবী তারাই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। তরুণ প্রজন্মের মেধাবীদের কাছ থেকে প্রথমেই মা চেয়ে নিচ্ছি। কারণ, যারা মেধাহীন তাদের ব্যাপারে আমার কোনো প্রশ্ন নেই; কিন্তু যারা জীবনের দু’টি পাবলিক পরীায় গোল্ডেন জিপিএ ৫ পেয়ে মেধাবীদের তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তাদের বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করার চেষ্টা করব। মেধাবী বন্ধুরা যদি এ লেখা পড়ে কষ্ট পান তাহলে কিছুই করার নেই। কারণ এ লেখা লিখছি বিবেকের তাড়নায়।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় দেখতে পেলাম প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীায় ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হতে ইচ্ছুক যোগ্য শিার্থী মাত্র দু’জন। বিষয়টি শুধু উদ্বেগেরই নয়, লজ্জারও। ঢাবি’র খ ইউনিটের ভর্তি পরীার ফল অনুযায়ী ইংরেজি বিভাগে ভর্তিতে যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে পেরেছেন মাত্র দুইজন ভর্তিচ্ছু শিার্থী। বিভাগের ১৫০ আসনের মধ্যে ১২৫ জন খ ইউনিট থেকে ভর্তির নিয়ম রয়েছে। এ অবস্থায় ভর্তি পরীায় ‘যোগ্যতাসম্পন্ন’ শিার্থী না পাওয়ায় বিকল্প উপায় খুঁজছে কর্তৃপ। লীগ সরকারের এবারের মতায় আসা নিয়ে আছে বৈধতা কিংবা অবৈধতার বিতর্ক। এ সরকারের অতীত শাসনামলেও অভিনবভাবে পাসের হার বেড়েছে; কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়, প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের সন্তানেরা যদি ভালো ফল করে মেধার বিকাশ ঘটায় এর চেয়ে আনন্দের বার্তা আর কী হতে পারে! কিন্তু আসলে কি তা হচ্ছে? দেখা যাচ্ছে জিপিএ ৫ পাওয়া এই ছাত্রছাত্রীরা উচ্চশিার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।  শুধু পাসের হার এবং জিপিএ ৫ এর বিচারেই নয় রাজনৈতিক কৌশলেও গত বছরের তুলনায় এবারের এইচএসসি ও সমমানে পাসের হার বেড়েছে ৪ দশমিক ০৩ ভাগ। আর জিপিএ ৫ বেড়েছে ১২ হাজার ৪০৫। এবারের রেকর্ড পাসের নেপথ্য কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। এর বাইরে পরীার উত্তরপত্র মূল্যায়নের েেত্রও উদারনীতি অবলম্বনের নির্দেশনা। নাম প্রকাশ না করে একাধিক পরীক জানিয়েছে, নম্বর কম দিয়ে খাতা জমা দেয়ার পর প্রধান পরীকের প থেকে পরে খাতায় নম্বর বাড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগে ভর্তির জন্য খ ইউনিটের ভর্তি পরীায় ২০১৪-২০১৫ শিাবর্ষে ৪০ সহস্রাধিক শিার্থী অংশ নিলেও পাসের হার মাত্র ৯ দশমিক ৪৫ ভাগ। এ বছর এইচএসসি পরীায় উত্তীর্ণ শিার্থীদের মধ্যে জিপিএ ৫ পেয়েছে প্রায় ৫৭ হাজার। তাদের মধ্যে আবার ইংরেজি বিষয়ে রেকর্ডসংখ্যক নম্বরধারী শিার্থীর সংখ্যা কয়েক হাজার। পাবলিক পরীার এই অভাবনীয় ফলের পরও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীার েেত্র এই করুণ চিত্র ফুটে উঠায় শিার্থীদের মেধাস্তর নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। শিার মান নয় বরং জিপিএ ৫ পাওয়া ছাত্রদের সংখ্যা কিংবা পাসের হারই যে এ দেশের শিাব্যবস্থায় এখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ এই ফলাফল তারই একটি নিদর্শন মাত্র। গত ২০১২-২০১৩ শিাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা অনুষদের অধীনে খ ইউনিটের ভর্তি পরীায় জিপিএ ৫ পাওয়া শিার্থীদের ৯০ ভাগই ফেল করেছে। এর মধ্যে ইংরেজি ও বাংলায় ৩০ নম্বরের মধ্যে পাস নম্বর ছিল ৮। এই দুই বিষয়ে ফেল করা ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় শতাধিক। ২০১০ ও ২০১১ সালে এই ফেলের হার ছিল যথাক্রমে ৫২ ও ৬২ ভাগ। ঢাবির ভর্তি পরীায় ১২০ নম্বরের মধ্যে পাস নম্বর হলো ৪৮। তাহলে ছাত্রছাত্রীরা এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করছে কিভাবে? তারা কি লেখাপড়া করছে না। তাহলে সে প্রশ্নের উত্তর হবে অবশ্যই করেছে। মন্ত্রী, শিার্থী বা অভিভাবক সবাই যেখানে খুশি পাসের হিড়িক দেখে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীায় ইংরেজিতে ৩ বা ৪ নম্বর পেলে কার বা কী আসে যায়।
প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলছে ভর্তি পরীার ডিজিটাল জালিয়াতি। পরীা শুরু হতে না হতেই প্রশ্নপত্রের সব সেট চলে যায় জালিয়াত চক্রের হাতে। এরা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে মোবাইল ফোন, হেডফোন, ব্লুটুথ ডিভাইস, ঘড়ি সদৃশ ক্যামেরার মাধ্যমে ঘটছে ডিজিটাল প্রশ্নফাঁস। প্রযুক্তির এসব উপকরণের চরম অপব্যবহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছে অপোকৃত কম মেধাবী ও প্রতারকেরা। অপর দিকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রকৃত মেধাবী শিার্থীরা। প্রতিটি পরীায় এ ধরনের ঘটনা ভাবিয়ে তুলছে অভিভাকদের। উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক, শিার্থী ও বিশিষ্টজনেরা। তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে কেনা উত্তর দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন প্রতারণা আশ্রয় নেয়া ভর্তিচ্ছুরা। মেধাবীদের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ে জায়গা করে নিচ্ছে জালিয়াত চক্রের সদস্য ও প্রতারকেরা। তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াতচক্র। যে চক্রে রয়েছেন মতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক, পরীা কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবং বিভিন্ন ভর্তি কোচিং সেন্টার ও তাদের শিক্ষকেরাও।
আমরা চাই, আমাদের শিার্থীরা শতভাগই পাস করুক। সবাই ভালো ফল করুক। তবে শুধু পাস করিয়েই নিশ্চয় দায়িত্ব শেষ হবে না। মানসম্মত শিার মান নিশ্চিত করতে হবে।
tofazzul1982@gmail.com

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন প্রসঙ্গ by জালালউদ্দিন আহাম্মদ চৌধূরী আলমগীর

রাঙ্গামাটিতে পাছা পরিষদ (পিসিপি) রাঙ্গামাটি জিমন্যাসিয়াম চত্বরে ২০ মে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, রজতজয়ন্তী উৎসব ও ১৯তম সম্মেলন তথা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এক গণসমাবেশের আয়োজন করেছিল। প্রধান অতিথি ছিলেন পার্বত্য নানা বিতর্কে বিতর্কিত সন্তু লারমা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসের গডফাদার সরকারের বেতনভাতা ভোগকারী, বাড়ি, গাড়ি ও সব সুবিধাসহ জাতীয় পতাকা ব্যবহারকারী, বিতর্কিত আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারকে বাধ্য করে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদন করেছেন। চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে বাধ্য করা হবে। তার বক্তব্য ছিল সম্পূর্ণ স্ববিরোধী ও দেশের বিরুদ্ধাচরণের বহিঃপ্রকাশ। রুবায়েত ফেরদৌস বলেন, বাঙালির জন্য শান্তিচুক্তি হয়েছে। শান্তিচুক্তি করে বাঙালি সেটেলারের সংখ্যা বেড়েছে। এখানে সেনাবাহিনী তাদের রেশন দেয়, বেতন দেয়, জায়গাজমি দেয়। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে চুক্তি বাস্তবায়ন হবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়ন না হলে চুক্তি বাতিল করিয়ে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন করার জন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নেতাদের তিনি পরামর্শ দেন।
রাঙ্গামাটি ২৯৯ আসনে প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি ও অস্ত্রের মুখে এবং ভোটারদের জিম্মি করে সংসদ নির্বাচনে জয়ী উষাতন তালুকদার বিশেষ অতিথির ভাষণে বলেছেন, আগে প্রাথমিক শিক্ষা ও কলেজের সব সমস্যা সমাধান করুন। সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করে না; সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়। তিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের কার্যক্রম স্থগিত রাখার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি অচিরে এ কার্যক্রম বন্ধ করা না হয় তাহলে পরবর্তী পরিস্থিতি খারাপ হলে সরকারকে দায়ী থাকতে হবে। সরকারকে একধরনের হুমকি দেন।
সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের প্রশ্ন, উষাতন তালুকদার প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের কার্যক্রম স্থগিত রাখার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করার কে? দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য স্কুল হবে, কলেজ হবে, উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় হবে। এতে উষাতনেরা তালুকদারের ছেলেমেয়েকে পড়াতে না চাইলে কেউ তাকে বাধ্য করবে না। জাতীয় স্বার্থে সরকার দেশের যেকোনো স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করবে। তাতে যারা বাধা দেবে তাদের বিরুদ্ধে সরকার যথার্থ ব্যবস্থা নেবে, এটাই সাধারণ নাগরিকের অভিমত। পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল সর্বদলীয় ছাত্রসমাজের ব্যানারে এবং ঐকমত্যে রাঙ্গামাটিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের দাবিতে যে কর্মসূচি পালন করা হয়েছে তার কঠোর সমালোচনাও এরা করেছেন।
সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে টালবাহানা করছে বলে অভিযোগ করে জনসংহতি সমিতির নেতা ও আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য তথা বেতনভাতাভোগী ও সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণকারী কে এস মং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে সমাবেশে বলেছেন, পার্বত্য জনগণের সাথে ‘বেয়াদবি করবে না’। এটা বলার দুঃসাহস তিনি কোত্থেকে পান? এ ধরনের ঔদ্ধত্য জাতিকে বেয়াদব বলার শামিল। সরকারের তথ্যমন্ত্রী এসব তথ্য কি পান না? পাছা পরিষদের (পিসিপি) বর্ষপূর্তি বা রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। কেউ সামরিক বাহিনীর কেউ প্রধানমন্ত্রীর এবং আর কেউ আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করেছেন এবং সরকারকে তুলাধুনা করেছেন। কেউ কেউ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের চরম বিরোধিতা করেছেন।
রাঙ্গামাটিতে ১৯৬৫ সালে যখন কলেজ স্থাপনের প্রক্রিয়া চালু হয় তখন উপজাতির উচ্চ বংশের দাবিদার তদানীন্তন রাজা ত্রিদিব রায়, দেওয়ান বংশের অন্যান্য লোক ও ধনাঢ্য বিশেষ কয়েকজন উপজাতীয় লোক মিলে কলেজ স্থাপনের তুমুল বিরোধিতা করেছিলেন। তখন রাঙ্গামাটির বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সমাজসেবক মরহুম সৈয়দ তফজ্জল হোসাইনের অকান্ত পরিশ্রম ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বেসরকারিভাবে রাঙ্গামাটি কলেজ স্থাপন করা হয়। এ কলেজ আজ সরকারি কলেজ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক, তা যারা চায় না তারা কোনো দিন দেশের উন্নতি চায় না। এরা ভবিষ্যৎ বংশধরকে অন্ধকারে নিমজ্জিত রাখার জন্য প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনে বাধা সৃষ্টি করছে। রাঙ্গামাটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় স্থাপনের সময়েও রাজা ত্রিদিব রায় বাধা দিয়েছিলেন। বাঙালিদের প্রাণপুরুষ সৈয়দ তফজ্জল হোসাইন তার প্রাণপণ চেষ্টায় স্থাপন করেছিলেন বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, যা আজ কোতোয়ালি থানার পাশে সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় হিসেবে সুনামের সাথে পরিচিতি লাভ করেছে। উপজাতির মেয়েরা লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছে এ বিদ্যালয়ে। এ কারণে বিস্মিত হতে হয় যখন ভাবি পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক এটা সন্তু লারমারা চান না।
কয়েক দিন আগে কাপ্তাই পিসিপির নবীনবরণ অনুষ্ঠানে সন্তু লারমা প্রধান অতিথির ভাষণে বলেছেন, রাঙ্গামাটিতে মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ যেকোনো কিছুর বিনিময়ে ঠেকানো হবে (দৈনিক গিরি দর্পণ তারিখ : ১৮-০৯-২০১৪)। স্থানীয় সরকার পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান বলেছেন, সরকার এখানে মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করলে তা জ্বালিয়ে দেয়া হবে। উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হলে জ্বালিয়ে দেবেন। এমন ঔদ্ধত্যের উৎস কী?
এদের এসব রাষ্ট্রদ্রোহী কথাবার্তা সরকারের কানে কি যাচ্ছে না? প্রশাসন নীরব থাকে কিভাবে? সন্তু লারমারা যেভাবে লম্ফঝম্প করছেন তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য পার্বত্য চটগ্রামে বসবাসরত প্রতিটি বাঙালি-উপজাতি, হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ খ্রিষ্টান সবাই সম্মিলিতভাবে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করবে। এরা ঐক্যবদ্ধভাবে দলমত নির্বিশেষে বৈষম্যপূর্ণ চুক্তি বাস্তবায়নের পথে সরকারকে বাধা প্রদান করবে চুক্তির বৈষম্য, কালো এবং সংবিধান ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী ধারা ও উপধারাগুলো বাতিল করতে হবে। সবাইকে মনে রাখতে হবে, এ দেশ স্বাধীন স্বার্বভৌম একটি একককেন্দ্রিক রাষ্ট্র। এখানে অঞ্চলবিশেষকে স্বায়ত্তশাসন দেয়ার কারো ক্ষমতা নেই। অপশক্তি অন্যায়ভাবে সংগ্রাম বা আন্দোলনের নামে কোনো মানুষ হত্যা করলে তার পরিণতি খুবই খারাপ।
লেখক : চেয়ারম্যান,পার্বত্য গণপরিষদ, কেন্দ্রীয় কমিটি