Friday, April 29, 2016

ওবামার পররাষ্ট্রনীতি উদ্ভট উদ্দেশ্যহীন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পররাষ্ট্রনীতিকে ‘উদ্ভট, উদ্দেশ্যহীন ও বিপর্যয়কর’ বলে সমালোচনা করেছেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের ফ্রন্টরানার ডোনাল্ড ট্রাম্প। নির্বাচিত হলে আমেরিকার স্বার্থকেই সবার আগে গুরুত্ব দেবেন বলে প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন ট্রাম্প। বুধবার ওয়াশিংটনের এক হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নিজের পরিকল্পিত পররাষ্ট্রনীতির বিস্তারিত তুলে ধরেন ট্রাম্প। তিনি জানান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা করবেন। ট্রাম্প বলেন, যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা সহায়তা দিয়ে থাকে সেসব দেশকে অবশ্যই মূল্য পরিশোধ করতে হবে। যদি তারা মূল্য পরিশোধ না করে তবে যুক্তরাষ্ট্রের তাদের প্রতিরক্ষা সহায়তা দেয়ার দরকার নেই। প্রাথমিকভাবে জয় পাওয়ার পর ট্রাম্প নিজেকে রিপাবলিকান পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মঙ্গলবার ভাষণ দেন। বক্তব্য শুরুর আগে ট্রাম্প বলেন, এটা শুধু তার নিজের মতবাদ নয়।
নির্বাচিত হলে এই নীতিতে কিছুটা নমনীয়তা আনবেন বলেও জানান তিনি। পুরো ভাষণজুড়েই ছিল ওবামা প্রশাসনের দুর্বলতা, বিভ্রান্তি এবং ভুলগুলো উপস্থাপন করা। ট্রাম্প আশা করেন, তিনি এগুলো উতরে যাবেন। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে একটা ঝাঁকি দেয়ার কথা বলে বক্তব্য শুরু করেন ট্রাম্প। এর আগে ইসলামিক স্টেট (আইএস) সম্পর্কে ওবামা বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় গেলে তাদের তেল ও পানির সরবরাহ বন্ধ করে দেবেন। এছাড়া তাদের কঠিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মঙ্গলবার বক্তব্যেও এ কথা পুনরাবৃত্তি দেখা গেল। ট্রাম্প বলেন, ক্রমবিস্তারমান ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো শুধু মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি নয়, পুরো বিশ্বেরই নীতি হওয়া উচিত। ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ রুখতে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সঙ্গে নিয়ে লড়াই করবেন বলেও জানান ট্রাম্প। ক্ষমতায় গেলে ন্যাটোকে ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনাও রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। এছাড়া ইসলামী মৌলবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বিষয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সাধারণ আলোচনাও চান তিনি। ট্রাম্প বলেন, কেউ কেউ বলেন যে রাশিয়া যুক্তসঙ্গত কথা বোঝে না। এর কারণটাও আমি খুঁজে দেখতে চাই। আমি চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কও ঠিক করতে চাই। তবে চীনের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাবেন তা জানাননি তিনি। নির্বাচনী প্রচারণায় নামার পর থেকেই বিভিন্ন বিষয়ে আগ্রাসী মন্তব্য করে সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ জন্য নিজের দলের ভেতরেও তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। তবে, সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, পররাষ্ট্রবিষয়ক সম্পর্ক নিয়ে নিজের প্রথম এই বক্তৃতায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আগের চেয়ে কৌশলী ও সংযত মনে হয়েছে। লিখিত ভাষ্যের বাইরে কোনো কথা বলেননি তিনি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে নতুন করে সমীহ আদায় করার সময় এসে গেছে বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
ভাষণে মিত্র রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষার খরচ যুক্তরাষ্ট্র আর মিটিয়ে দেবে না বলেও জানিয়ে দেন তিনি। সেই সঙ্গে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীকে পরাজিত করার জন্য যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়ারও আশ্বাস দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে অবশ্য ‘অভিবাসীরা ধর্ষক’ মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনা জন্ম দেন ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মনোনয়ন পদ্ধতি কারচুপিপূর্ণ : যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি নাগরিক মনে করে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মনোনয়নের পদ্ধতি কারচুপিপূর্ণ এবং সেখানে প্রতারণার আশ্রয় নেয়া হয়। দুই-তৃতীয়াংশ আমেরিকান মনে করেন, এই প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা উচিত। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক জরিপে এ তথ্য পাওয়া গেছে। বুধবার বার্তা সংস্থাটি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ডেমোক্রেট প্রার্থী বার্নি স্যান্ডার্স অনেক সময় এ ধরনের অভিযোগ করেছেন। ২১ থেকে ২৬ এপ্রিল অনলাইনে এ জরিপ চালানো হয়। এতে সমানসংখ্যক ডেমোক্রেট এবং রিপাবলিকান সমর্থকদের নেয়া হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, ৫১ শতাংশ ভোটার মনে করেন, কিছু প্রার্থীর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি প্রতারণামূলক। ৭১ শতাংশ ভোটারের মতে, তারা চান প্রত্যক্ষ ভোটে দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়ন করা উচিত। ২৭ শতাংশ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এই প্রাইমারি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বোঝেন না। আর ৪৪ শতাংশ মনে করেন, এই নির্বাচনে কেন ডেলিগেটদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রায় অর্ধেক মনে করেন, প্রাইমারি নির্বাচন একদিনে হওয়া উচিত।

প্যাকেজ ভ্যাট বাতিল হলে আন্দোলনের হুমকি

নতুন ভ্যাট আইনে ১ জুলাই থেকে সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট কার্যকরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলেছেন, এর ফলে সেবা ছাড়াও পণ্যমূল্য অনেক বেড়ে যাবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নতুন আইন সংশোধন করে ট্রেড ভ্যাট, সংকুচিত ভিত্তি মূল্য এবং প্যাকেজ ভ্যাট বহাল রাখার দাবি জানিয়ে তারা বলেছেন, অন্যথায় আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবেন দেশের ব্যবসায়ীরা।
বৃহস্পতিবার সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পরামর্শক কমিটির ৩৭তম সভায় ব্যবসায়ী নেতারা এসব দাবি জানান। এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান। যৌথভাবে সভার আয়োজন করে এফবিসিসিআই ও এনবিআর। মুক্ত আলোচনায় ৩০ জন ব্যবসায়ী অংশ নিয়ে আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার কথা জানায়। যার বেশির ভাগ ছিল নতুন ভ্যাট আইন সংক্রান্ত। মুক্ত আলোচনায় এফবিসিসিআই পরিচালক আবু মোতালেব বলেন, ১ জুলাই থেকে সর্বত্র কার্যকর হচ্ছে ১৫ শতাংশ ভ্যাট। এতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্যাকেজ ভ্যাট বাতিল করলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা নতুন ভ্যাট আইনকে স্বাগত জানাবে না। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং প্যাকেজ ভ্যাট বাতিল করা হলে প্রয়োজনে মাঠে নেমে আন্দোলন করা হবে। এ সময় টেবিল চাপড়ে উপস্থিত ব্যবসায়ীরা তার বক্তব্যকে সমর্থন জানান। তিনি আরও বলেন, মুখে এনবিআর পার্টনারশিপের কথা বললেও বাস্তবে তা ভিন্ন। এনবিআরের কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের খাতাপত্র জব্দ করছে। মাঠে-ময়দানে বিভিন্ন জায়গায় অহেতুক হয়রানি করছে। বারবার অভিযোগে জানিয়েও ফল পাওয়া যায়নি। অটো রি-রোলিং মিল অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, নতুন ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ীরা শংকিত। ২০০৩ সাল থেকে স্টিল শিল্প ট্যারিফের আওতায় ছিল। নতুন আইনে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। এতে রডের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে।
জুয়েলারি সমিতির সভাপতি কাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, স্বর্ণালংকার বিক্রির ওপর ভ্যাট আরোপ করায় বিক্রি কমেছে। ১০ লাখ টাকা স্বর্ণের ওপর ৫০ হাজার টাকা ভ্যাট দিতে হয়। ভারতে লাগে ১০ হাজার টাকা। তাই ভারত থেকে স্বর্ণালংকার আসছে। এতে টাকা পাচার বাড়ছে। ভ্যাটহার ২ শতাংশ করলে ভ্যাট আদায় বাড়বে ও ব্যবসায়ীরাও উপকৃত হবে। সংসদ সদস্য গাজী গোলাম দস্তগীর বলেন, ১৯৯১ সালে ভ্যাট চালুর পর দুই অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান ও শাহ এমএস কিবরিয়া বলেছিলেন পরে ভ্যাট কমিয়ে দেয়া হবে। সেটি এখনও হয়নি। ট্রেড ভ্যাট বহাল রাখার দাবি জানান তিনি। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির মহাসচিব সুব্রত সরকার বলেন, ২৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ মুনাফা ধরে কম্পিউটার পণ্য আমদানির সময় ৪ শতাংশ অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট (এটিভি) দিয়ে হয়। অথচ বর্তমানে কম্পিউটার পণ্য বিক্রি করে এ পরিমাণ লাভ হয় না। এছাড়া খুচরা পর্যায়ে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। যা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অন্তরায়। এসব ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি। চট্টগ্রাম ওমেন চেম্বারের পরিচালক রেখা আলম চৌধুরী মহিলা উদ্যোক্তাদের জন্য স্থাপনা ভাড়ার ওপর ৯ শতাংশ ভ্যাট বাতিলের দাবি জানান। ইন্সুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন পাভেল বলেন, অথচ জীবন বীমা পলিসির বোনাসের ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কাটা হয়। বিশ্বের কোথাও এ বিধান নেই। গার্মেন্টস শিল্পের পর সবচেয়ে শ্রমঘন খাত বীমা শিল্প। এছাড়া এজেন্ট কমিশনের ওপর এআইটিসহ ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এর আগে এক উপস্থাপনায় ভ্যাট আইন নিয়ে এফবিসিসিআই ও এনবিআরের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত যৌথ কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ভ্যাটের একাধিক হার রয়েছে। সব সরবরাহের ক্ষেত্রে টার্নওভার ৩৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করে উৎপাদন পর্যায়ে ৩ শতাংশ, ব্যবসা পর্যায়ে ২ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে। স্বাগত বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, একদিকে জ্বালানি তেলের দাম কমিয়ে অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে তা ব্যবসায়িক খরচ কমাতে সহায়ক হবে না। গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত ও বিদ্যুৎ ইউনিট প্রতি ৫ থেকে ৬ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার ফলে পণ্যের মূল্য কমে এসেছে। কিন্তু চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন কাস্টমস হাউস লোড দিয়ে শুল্কায়ন করার ফলে ব্যবসায়ীরা আর্থিকভাবে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন। তাই এসআরও ৫৭ অনুযায়ী শুল্কমূল্য নির্ধারণ করে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। লিখিত বক্তব্যে এফবিসিসিআই সভাপতি উৎপাদনশীল খাতে ঋণের সর্বোচ্চ সুদ হার তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের (কস্ট অব ফান্ড) সঙ্গে ৩ শতাংশ যোগ করে সীমাবদ্ধ রাখা, আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রাপ্ত ঋণের সুদ হার ৩ শতাংশ নির্ধারণ ও প্রত্যেক ব্যাংককে এসএমই ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেয়ার দাবি জানান।

জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন শাহাদাত

গৃহপরিচারিকা নির্যাতনের মামলায় জামিনে মুক্ত পেসার শাহাদাত হোসেন এবার জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন। এই ঘটনাকে ‘অনাকাক্সিক্ষত’ উল্লেখ করে বৃহস্পতিবার মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে তিনি দেশ ও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। ভুল স্বীকার করে ক্রিকেটে ফেরার অনুমতি প্রার্থনা করেছেন। শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের মামলায় জেলে যেতে হয়েছে শাহাদাত ও তার স্ত্রী জেসমিন নাহার নিত্যকে। দুই মাস আট দিন জেল খেটে ১২ ডিসেম্বর থেকে দু’জন জামিনে আছেন। এদিন মিরপুর স্টেডিয়ামে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লীগে ব্রাদার্স ইউনিয়ন ও কলাবাগান ক্রিকেট একাডেমির ম্যাচ চলাকালীন গ্র্যান্ডস্টান্ডে লিখিত বক্তব্যে শাহাদাত বলেন, ‘আমি আমার একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্য অনুতপ্ত। পুরো দেশ ও জাতির কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রেসিডেন্টসহ বোর্ডের সব কর্মকর্তা ও আমার সহখেলোয়াড়দের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। মানুষমাত্রই ভুল করে, আমিও ভুল করেছি।’
জামিনে মুক্তি পেয়ে কিছুদিন ধরে নিয়মিত অনুশীলন করছেন শাহাদাত। তার দাবি, জীবিকার প্রয়োজনে নিজের পেশায় আবার যুক্ত হওয়ার অনুমতি তাকে দিয়েছেন আদালত। বিসিবি অবশ্য বহাল রেখেছে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে নারাজ বোর্ড। তাই চলতি ঢাকা প্রিমিয়ার লীগে খেলতে পারছেন না এই পেসার। নিলামের আগে খেলোয়াড়দের তালিকা প্রকাশের সময় ক্রিকেট কমিটি অব ঢাকা মেট্রোপলিস বলেছিল, বিসিবি তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েই শুধু তাকে ঢাকা লীগে খেলার অনুমতি দেয়া হবে। মানবিক দিক বিবেচনা করে ক্রিকেটে তাকে ফিরতে দেয়ার আর্জি জানিয়ে শাহাদাত বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, দেশকে ও দেশের ক্রিকেটকে আরও অনেক কিছু দেয়ার আছে আমার। ক্রিকেটের স্বার্থে, জীবিকানির্বাহের স্বার্থে দ্রুত ক্রিকেটে ফিরতে চাই। চলতি ঢাকা লীগ দিয়েই ফিরতে চাই মাঠে। দেশবাসী, ক্রিকেট বোর্ডসহ সবার কাছে মিনতি করছি, অতীতের ভুল শুধরে আগের শাহাদাত হয়ে ফেরার সুযোগ দেয়া হোক আমাকে।’

আবারও বিচারকের আসনে নিপুণ

চলচ্চিত্রে একেবারেই যেন ব্যস্ততা নেই অভিনেত্রী নিপুণের। তাই ছোট পর্দায় আজকাল নিয়মিত দেখা যাচ্ছে তাকে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী হিসেবেও নিজেকে পরিচিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি এ অভিনেত্রী একটি কমিডি শো’র বিচারকের আসনে বসার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। স্যাটেলাইট চ্যানেল এনটিভির নিয়মিত কমেডি বেইজড রিয়েলিটি শো ‘হা-শো’ আবারও শুরু হচ্ছে। এবারের সেশনে বিচারক হিসেবে থাকছেন এই জনপ্রিয় নায়িকা।
এ প্রসঙ্গে নিপুণ বলেন, ‘এটি দারুণ একটি হাসির অনুষ্ঠান। দর্শকদের কাছেও অনুষ্ঠানটি জনপ্রিয়। শোটির বিচারের দায়িত্বে সম্পৃক্ত হতে পেরে সত্যিই অনেক ভালো লাগছে। আশা করছি বিচারকার্য পরিচালনার পাশাপাশি প্রতিযোগীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারব।’ নিপুণ ছাড়াও এই অনুষ্ঠানের আরও দুই বিচারক হিসেবে থাকছেন নন্দিত জাদুকর জুয়েল আইচ এবং মাজহারুল ইসলাম। আসছে মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশের ৫টি প্রধান বিভাগীয় শহরে অডিশন শুরু হবে হা-শোর নতুন সিজনের। এখানে অংশ নিতে প্রার্থীদের এসএমএসের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। বরাবরের মতো এবারও এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে থাকছেন ছোট পর্দার কমিডি অভিনেতা সাজু খাদেম।

ওদের কান্নার শেষ নেই by সাখাওয়াত কাওসার

‘ভাই গত ১৭ এপ্রিল দয়াগঞ্জ মোড়ে ইবনেসিনায় ডা. ফেরদৌস কামাল ভূইয়াকে দেখাইছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ কিনতে পারি নাই। দেহেন শরীর ফুইল্যা গেছে। উঠলে বসতে পারি না। বসলে উঠতে পারি না। খুব যন্ত্রণা হয়। মাঝে মাঝেই এক-দুই বেলা না খাইয়া থাকি। কী করুম কন? চার বছর বয়সী মেয়েটার মুখের দিকে তাকাইলে নিজেরে ঠিক রাখতে পারি না।’ শনিবার ফারহানা আক্তারের (২৮) সঙ্গে তার যাত্রাবাড়ীর ভাড়া বাসায় গিয়ে এ প্রতিবেদক কথা বলার সময় একপর্যায়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন তিনি। এত গেল শুধু এক ফারহানার খবর। এরকম অসংখ্য ফারহানা কিছুটা সুখের আশায় বিদেশ গিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে ফিরেছেন। ভয়ঙ্কর রোগ বাসা বেঁধেছে তাদের শরীরে। আবার কেউ কেউ যৌন নির্যাতনের পর গর্ভবতী হয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে সহায় সম্বল হারানো এসব ভুক্তভোগীর কান্নাই এখন নিত্যসঙ্গী। তাদেরই একজন কুড়িগ্রামের কল্পনা বেগম (ছদ্মনাম)। তিন মাসের গর্ভবতী হয়ে তিনি চলতি মাসের শুরুর দিকে সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে দেশে ফিরেছেন। এ ব্যাপারে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি এ প্রতিবেদককে বলেন, ওদের জন্য আমরা ভাবছি। কারও অবস্থা খুবই গুরুতর হলে তাদের আমার কাছে পাঠিয়ে দিন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্যাতিত হয়ে ফেরত আসা অসুস্থ রোগীদের জন্য হাসপাতাল তৈরির ব্যাপারে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভুক্তভোগীরা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে দেশে ফিরে আসেন। সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান বিভাগে। তবে একেকটি অভিযোগ নিয়ে শুনানি হয় দিনের পর দিন। দুর্দশাগ্রস্ত, হতদরিদ্র মানুষজন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসেন শুনানিতে অংশগ্রহণের জন্য। কর্মসংস্থান থেকে শুনানি হয়। রায় আসে। তবে মন্ত্রণালয় নেয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তবে সেখানে অভিযুক্ত এজেন্সিগুলো পুনরায় শুনানির আবেদন জানালে হতদরিদ্র মানুষদের পুনরায় শুনানির জন্য ডাকা হয়। তবে আর্থিক কারণে অনেকেই শুনানিতে অংশ নিতে পারে না। অভিযোগ রয়েছে, এক্ষেত্রে রায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সির পক্ষেই যায়। কান্না এবং হতাশাই সম্বল হয় ভুক্তভোগীদের। অনেক ক্ষেত্রে শুনানির রায়ের বিপক্ষে উচ্চ আদালতে রিট করে তা স্থগিতের রায় নিয়ে আসে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। দীর্ঘদিনের মতো ঝুলে যায় হতভাগাদের ভাগ্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে বলেন, নারী কর্মী পাঠানোর পর থেকেই এ ধরনের অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে। বেশির ভাগ নারী কর্মীই বিদেশে গিয়ে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এসব বিষয় সরকারের নীতিনির্ধারক মহল অবগত রয়েছে। তবে সময় এসেছে, আমাদের সরকারের উচিত বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ওইসব দেশকে জানানো। নইলে নির্যাতনের মাত্রা বাড়বে বৈ কমবে না।
এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত প্রকাশ করেন ‘আইন ও সালিস কেন্দ্র’-আসক পরিচালক নূর খান লিটন। তিনি বলেন, যেখানে আমাদের শ্রমিকদের মানবাধিকার নিশ্চিত হবে না সেখানে শ্রমিক পাঠাতে হবে কেন? সরকারের উচিত হবে এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অফিসিয়ালি অবহিত করা। যারা বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য সরকারকেই যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন। এ জন্য তাদের বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টির জন্য মন্ত্রণালয়ও গঠন করা হয়েছে। এখন যদি ওই মন্ত্রণালয় থেকে প্রবাসীরা নিগ্রহ এবং অবহেলার শিকার হন, আর তা দুর্বৃত্তদের পক্ষে যায় সেটা খুবই লজ্জাজনক। মন্ত্রণালয়ের প্রবাসীকল্যাণ বোর্ডের পরিচালক নূরুজ্জামান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নীতিমালায় আছে দুর্ঘটনা এবং মুমূর্ষু অবস্থায় ফিরে এলে এক লাখ টাকা পর্যন্ত চিকিৎসা সুবিধা দেওয়ার।
যাত্রাবাড়ীর ভুক্তভোগী ফারহানার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মাদকাসক্ত স্বামীর দিনের পর দিন নির্যাতন ও আর্থিক যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে এবং সিকদার ট্রাভেলসের মালিক সিরাজ সিকদারের কথায় বিশ্বাস করে ৪০ হাজার টাকায় লেবাননে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। মাসে ২০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন। আশা করেছিলেন হয়তো এর থেকেই অন্তত দুই বেলা সন্তানদের মুখে খাবার জুটবে। তবে সুখ তার কপালে সয়নি। ২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পাসপোর্টে লেবাননের ভিসা থাকলেও প্রতারক চক্র কৌশলে তাকে পাঠিয়ে দেয় সিরিয়ায়। ঠাঁই হয় একটি ক্যাম্পে। দালালদের কথামতো কাজ করতে রাজি না হওয়ায় সেখানে টানা ছয় মাস চলে তার ওপর স্টিমরোলার। দুই দফা লুকিয়ে নির্যাতন ক্যাম্প থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তবে প্রতিবারই সিরিয়ার পুলিশ তাকে তুলে দেয় দালালদের হাতে। ওই ক্যাম্পে ছিল প্রায় ২৮ জন বাংলাদেশি নারী। দালালদের প্রস্তাবে রাজি না হলেই দেওয়া হতো ইলেকট্রিক শক। নির্যাতনের একপর্যায়ে একদিন তার হাতও ভেঙে দেওয়া হয়। চিত্কার করলেই মুখে গুঁজে দেওয়া হতো কাপড়। কোনো চিকিৎসা ছাড়াই ফেলে রাখা হতো তাকে। যৌন নির্যাতন ও বিভিন্ন মাত্রার শারীরিক নির্যাতনে একপর্যায়ে গুরুতর অসুস্থ ফারহানাকে দিয়ে কোনো কাজ করানো সম্ভব না হওয়ায় গত বছরের জানুয়ারি মাসে দেশে ফেরত পাঠায় দালাল চক্র। এরপর থেকে দফায় দফায় হতদরিদ্র মা ফারহানাকে চিকিৎসা করান। তবে এখন চিকিৎসা করতেও পারছেন না তিনি। পরবর্তীতে ফারহানার মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে র্যাব-৩ এর একটি দল পল্টন এলাকা থেকে দালাল চক্রের দুই হোতা আল হাসিব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক জসীম আহমেদ, শিকদার ট্রাভেলসের মালিক সিরাজ শিকদারসহ ১৩ সদস্যকে গ্রেফতার করে। তবে কিছু দিনের মধ্যেই তারা কারাগার থেকে জামিনে বের হয়ে আসেন। সম্প্রতি সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা কুড়িগ্রামের অন্তঃসত্ত্বা এক নারীর স্বামী ক্ষোভ প্রকাশ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হামরা কোনঠে যামু ভাই? হামার কথা কাহো শুনে না। হামরা তো গরিব!...।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার শান ট্রাভেলসে গেছিনু। হামাক খেদাই দিছে। মন্ত্রণালয়ে গেছিলাম। তারাও কিছু করল না।’
র্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল খন্দকার গোলাম সারোয়ার বলেন, ঘটনার মানবিকতা উপলব্ধি করে এ বিষয়ে বিশেষ তত্পরতা চালানো হয়। তবে রিক্রুটিং এজেন্সির বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ। হতাশার কথা হলো, অনেক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিককে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে কিছু দিনের মধ্যেই তারা জামিনে বের হয়ে এসে পুনরায় বিদেশে শ্রমিক পাঠাচ্ছে। এখন বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অনেক নারী শ্রমিকের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

উপকূল সমৃদ্ধ হলে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হবে by অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। ছোট-বড় অসংখ্য নদী রয়েছে এদেশে আর এদেশের দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। তাই এদেশে রয়েছে অনেক উপকূলীয় অঞ্চল বা এলাকা যেগুলোর মাছ, চিংড়ি ও লবণ দেশের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে। এছাড়াও, উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর কৃষি ও বনায়ন কার্যক্রমের উপর এদেশের উন্নতি ও সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভরশীল। এক কথায়, উপকূলীয় অঞ্চল মানেই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসমুহ। এই এলাকাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানপূর্বক সরকার ও জনগণ উভয়েরই উপকূলের সকল সমস্যা সমাধানপূর্বক কাক্সিক্ষত মান অর্জনের মাধ্যমে সার্বিক বিকাশ সাধন করতে আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হওয়া উচিত। এতে করে খুব অল্প সময়েই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং জাতি উত্তরোত্তর বৃহত্তর সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল এতোই ব্যাপক ও বি¯তৃত যে, উপকূল ও উপকূলবাসীকে রক্ষার জন্য যথাযথ ও সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সমৃদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় তিন কোটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেননা, জলবায়ুতে উষ্ণতার কারণে যদি সমুদ্রের উচ্চতা ৪৫ সে. মি. বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যাবে। এমন কি, যদি ২১০০ সাল নাগাদ এক মিটার সমুদ্র সমতলের পরিবর্তন ঘটে, তবে বাংলাদেশের তিন মিলিয়ন হেক্টর জমি প্লাবিত হতে পারে। এই প্লাবনযোগ্য অঞ্চলগুলোর সবগুলোই এদেশের উপকূলীয় অঞ্চল। এছাড়া, উপকূলীয় অঞ্চলের উপযুক্ত সুরক্ষা না হলে এদেশের সাত কোটি লোক বিভিন্নভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আক্রান্ত হবে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের পরিধি এবং গুরুত্ব নিঃসন্দেহে আরো সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।
দুঃখের বিষয়, আমরা উপকূলও বুঝি না, উপকূলের গুরুত্বও বুঝি না। তাই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমির উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বিরাজ করছে। এছাড়াও, অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বসতবাড়ি নির্মাণের মারাত্মক প্রভাব পড়ছে কৃষিজমির উপর। শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অপর্যাপ্ততার কারণে সঠিক ও যুগোপযোগী শিক্ষার অভাবে উপকূলীয় অঞ্চলের লোকেরা বিরাজমান সমস্যাবলির কাক্সিক্ষত সমাধান করতে সক্ষম হচ্ছে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহার ও প্রয়োগের কারণে উন্নত চাষাবাদ কিংবা সুপরিকল্পিত বিজ্ঞানসম্মত বনায়ন-কিছুতেই কাক্সিক্ষত সাফল্য ও অগ্রগতি সাধিত হচ্ছে না। উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর কাক্সিক্ষত মান অর্জন করতে হলে প্রয়োজন যুগ ও বিশ্বের সাথে তাল মেলানো উন্নয়নমুখী গতিশীলতা এবং এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ গতিশীলতার জন্য সরকারের আন্তরিক ও গতিশীল পদক্ষেপ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের উপকূলভাগ অনেক ব্যাপক এবং বি¯তৃত। অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো এই উপকূলভাগেই অবস্থিত। মাছ, চিংড়ি, লবণ, কৃষি ও বনায়ন, পর্যটন ও বিনোদন এলাকা - সব দিক দিয়ে দেশের জাতীয় আয় ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে এগুলো সর্বোচ্চ সহায়ক। অথচ দেশের সবচেয়ে উপেক্ষিত অঞ্চলও এই উপকূলীয় অঞ্চলসমুহ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো - প্রভৃতিতে আক্রান্ত হয়ে জান-মালের ব্যাপক ক্ষতি হওয়া এ অঞ্চলগুলোর নৈমিত্তিক বৈশিষ্ট্য। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই এলাকাসমুহের উন্নয়ন সাধন ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, সর্বোপরি শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে উপকূলবাসীকে সুপ্রতিষ্ঠিতকরণ সময়ের দাবি।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল এদেশের উপকূলীয় অঞ্চলসমুহের উপর বয়ে যাওয়া প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের কথা এদেশের মানুষ ভোলেনি, ভুলে যাওয়ার কথাও নয়। এ প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে দেশের ১৬টি জেলার ৪৭টি উপজেলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ৪ লক্ষাধিক মানুষ ও অসংখ্য গবাদি পশু প্রাণ হারায়। এই অসংখ্য মানুষের মৃত্যু এবং অগুন্ত সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি জনম জনম ধরে এদেশের উপকূলবাসীর জন্য এক মর্মন্তুদ ও করুণ ইতিহাস হয়ে থাকবে। অথচ ২৯ এপ্রিল যে শিক্ষা উপকূলবাসীসহ এদেশের মানুষকে দিয়েছে সে শিক্ষা অনুসারে এখনো পর্যন্ত নেয়া হয়নি কোন কার্যকরী পদক্ষেপ। ১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ের পর বয়ে গেল ১৯৯৭ এর ঘূর্ণিঝড়সহ সাম্প্রতিক প্রলয়ংকরী মর্মান্তিক সিডর যার ভিকটিমেরা এখনো বঞ্চিত ও উপেক্ষিত অবস্থায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। উপকূলীয় মানুষদের জন্য ঘূর্ণিঝড়, সিডর ইত্যাদি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত রক্ষণাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অদূর ভবিষ্যতে আরো অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপকূলবাসী সর্বশান্ত হবে। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস ইত্যাদির আক্রমণে উপকূলীয় অঞ্চলের জান-মাল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯৫৪, ১৯৬৮, ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮  ও  ১৯৯৮ সালের  বন্যা ছিল  নিকট  অতীতের ভয়াবহতম। ১৯৭৪ সালের বন্যার কারণে ফসলহানিতে সংঘটিত ভয়ংকর দুর্ভিক্ষ লক্ষ লক্ষ প্রাণ সংহার করেছে। ১৯৮৮ সালের বন্যা  ছিল সবচেয়ে  ভয়াবহতম। দেশের  ৬৪টি  জেলার  মধ্যে  ৫৩টি এ বন্যায় ডুবে যায়, ৩০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং ৪৫ লাখ হেক্টর জমির ফসল ধ্বংস হয়। ১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল ইতিহাসের দীর্ঘতম। ৩ মাস স্থায়ী এ বন্যায়  দেশের ৫৪টি জেলা জলমগ্ন হয়। ২০০৪ সালের বন্যায় দেশের ৫৬টি জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরকারি প্রাথমিক হিসাব মোতাবেক এ বন্যায় মোট ৪২  হাজার  কোটি টাকার সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃহত্তর সিলেট  অঞ্চল এ বন্যায় সবচেয়ে  ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলোচ্ছ্বাস বাংলাদেশের  উপকূলীয় এলাকার  মানুষের নিকট এক মূর্তিমান আতঙ্ক। গত ১৮৫ বছরে  অন্তত ৫১ বার ভয়ংকর  জলোচ্ছ্বাসের হামলায়  পড়েছে বাংলাদেশ। তবে ১৯৬০, ১৯৭০, ১৯৮৫, ১৯৯১  এবং ১৯৯৭ সালের জলোচ্ছ্বাস ছিল বিভীষিকাময়। ১৯৭০ সালের সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় বিশাল এলাকাকে মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল এবং এতে ৫ লাখের বেশি মানুষের  প্রাণহানি  ঘটেছিল। ১৯৮৫  সালের ঘূর্ণিঝড়ে  উড়িরচর  নামক জনপদ  সম্পূর্ণ জনশূন্য  হয়ে  পড়ে।
এটা সকলেরই নিকট সুবিদিত যে, উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর মাছ, চিংড়ি এবং লবণ এদেশের অর্থনীতির জন্য অতীব অপরিহার্য ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এদেশের মানুষের জীবন, জীবিকা ও অর্থনীতির সাথে এগুলোর সম্পর্ক নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য। অথচ বেশ অবাক লাগে যখন দেখি এই উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের উদাসীনতা বিদ্যমান। পক্ষান্তরে, পার্বত্য অঞ্চলগুলোর পক্ষ থেকে অনুরূপ কোন অবদান না থাকলেও সরকারি সহযোগিতায় ও পৃষ্ঠপোষকতায় দিন দিন এগুলো সমৃদ্ধ হতে সমৃদ্ধতর হয়ে যাচ্ছে। আসলে আমরা যে আমাদের প্রকৃত লাভ-ক্ষতি বুঝি না, এটা আমাদের জাতীয় দোষ। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সবক্ষেত্রেই এটি সন্দেহাতীতভাবে সত্য। এখন সময় এসেছে, অতীতের ব্যর্থতা ভুলে গিয়ে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর যথার্থ মানোন্নয়নের মাধ্যমে দেশ ও জাতির কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জন করা। এ অগ্রগতি অর্জনের বিস্তারিত উপায় সম্পর্কে আমাদেরকে অবশ্যই ভাবতে হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে সরকারি রেস্ট হাউজ নির্মাণপূর্বক যদি সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীকে সেগুলো টেন্ডার দেওয়া হতো, তাহলে একদিকে যেমন উপকূলীয় এলাকার বিকাশের পথ সুগম হতো, অপরদিকে উত্তরোত্তর বিকাশ ও সমৃদ্ধির ফলে জাতীয় আয়ও বৃদ্ধি পেতো। এছাড়াও, উপকূলীয় এলাকাগুলো সরকারের øেহচ্ছায়ায় নিয়ন্ত্রিত হতো বিধায় উপকূলের মানুষ উৎসাহ-উদ্দীপনা লাভের মাধ্যমে সৃষ্টিশীল অভিযাত্রায় পরিকল্পিত উপায়ে এলাকার কাক্সিক্ষত বিকাশ ও মানোন্নয়নে মনোনিবেশ করতো , ফলশ্র“তিতে অতি দ্রুত বদলে যেতো উপকূলীয় মানুষের জীবন। উদাহরণস্বরূপ, মগনামা, কুতুবদিয়া, কক্সবাজার, আনোয়ারা, বাঁশখালী, মহেশখালী ও হাতিয়ায় সরকারি রেস্ট হাউজ স্থাপিত হলে উক্ত এলাকার অনেক অগ্রগতি অর্জিত হতো, সরকারেরও আয় বাড়তো। উপকূলীয় এলাকাগুলোতে যে সমস্ত খাস জমি পড়ে আছে, সেগুলোকে ভূমিহীন, দরিদ্র ও অসহায় মানুষদেরকে বরাদ্দ দিলে ভালো হয়; এক্ষেত্রে কোন এনজিওর মাধ্যমে এটি কার্যকর না করে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে করলেই ভালো হয়। এছাড়াও, খাসজমিগুলোর বরাদ্দসহ যে কোন সরকারি দান-অনুদান বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব ঠেকাতে হলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজনীয় মনে করছি। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ১৯৯১-এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের শুমারি এখনো পর্যন্ত হয়নি। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই অদ্যাবধি চরম দুর্দশায় জীবনযাপন করছেন। অবিলম্বে উক্ত শুমারি সম্পন্ন করে তাঁদের দুঃখ-দুর্দশা দূর করা প্রয়োজন।
উপকূলীয় এলাকাগুলোর বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল সরকার কর্তৃক একটি উপকূলীয় মন্ত্রণালয় এবং একটি উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড গঠিত হওয়া। এদেশে রয়েছে অনেকগুলো উপকূলীয় জেলা এবং দেশের সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস হলো এই উপকূলীয় অঞ্চলগুলো। মাছ, চিংড়ি, লবণ, পর্যটন ও বিনোদন এলাকা - সর্বদিক দিয়ে দেশের জাতীয় আয় ও উৎপাদন অনেকাংশেই এগুলোর উপর নির্ভরশীল। অবাক হই যখন দেখি পার্বত্য এলাকাগুলো থেকে অনুরূপ কোন আয় ও উৎপাদন না পাওয়া সত্ত্বেও সব সময় পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয় যে কোন সরকার কর্তৃক গঠিত হয় অথচ উপকুলের মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোন সরকারের আমলেই কোন মন্ত্রণালয় গঠিত হয় না, এমনকি, কোন উপকূলের উন্নয়ন বোর্ডও গঠন করা হয় না। কিন্তু এটা সুস্পষ্ট যে, এ ধরনের মন্ত্রণালয় ও বোর্ড গঠিত হলে জাতীয় আয়, উৎপাদন ও সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতো।
উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে শিক্ষার উন্নয়ন ঘটাতে হবে, বাড়াতে হবে শিক্ষার হার। আরো অনেক স্কুল ও কলেজ স্থাপন করতে হবে। কক্সবাজারে শিক্ষার প্রসারের জন্য এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়। সুন্দরবন, কুয়াকাটা, নিঝুম দ্বীপ ও সেন্ট মার্টিনসহ দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ ও প্রসারকে ত্বরান্বিত করতে হবে। কক্সবাজার ইনানী বীচকে করতে হবে আরো সমৃদ্ধ ও আকর্ষণীয়। সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপন প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, এতে বৈদেশিক আয় অনেক বেশি বাড়বে। ভারত ও মায়ানমার সংশ্লিষ্ট সমুদ্র সীমার বিজয়টিকে কাজে লাগাতে হবে এবং এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন ও আয় বাড়াতে হবে। উপকূলবাসীকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত ও পুরস্কৃতকরণমূলক বনায়ন কার্যক্রমটিকে আরো জোরদার করতে হবে যাতে উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ সব ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে নিরাপদ থাকতে পারে।
পরিশেষে বলবো, উপকূলীয় অঞ্চল মানেই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসমুহ। বাংলাদেশের প্রকৃত ও কাক্সিক্ষত উন্নয়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলোর উপর নির্ভরশীল। তাই এই এলাকাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদানপূর্বক সরকার ও জনগণ উভয়কেই আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হতে হবে উপকূলের সকল সমস্যা সমাধানপূর্বক কাক্সিক্ষত মান অর্জনের মাধ্যমে সার্বিক বিকাশ সাধন করতে। এতে করে খুব অল্প সময়েই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে এবং জাতি উত্তরোত্তর বৃহত্তর সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাবে।
অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্
অধ্যক্ষ ড. মোহাম্মদ সানাউল্লাহ্
অধ্যক্ষ, মেরন সান কলেজ; চেয়ারম্যান, মেরিট বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন;
সভাপতি, সার্ক কালচারাল ফোরাম বাংলাদেশ;
সহসভাপতি, উপকূলীয় উন্নয়ন ফাউন্ডেশন।