Saturday, February 28, 2015

হিসাব-নিকাশ কষছে সরকার by জাকির হোসেন লিটন

বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা-না-করা নিয়ে ব্যাপক হিসাব-নিকাশ কষছে সরকার। গ্রেফতার করা হলে বিএনপি নেতাকর্মীসহ সাধারণ জনগণের মধ্যে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে সেই ব্যাপারে আগাম ধারণা নেয়া হচ্ছে। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে আন্দোলনের গতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে, দেশ-বিদেশে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া হতে পারে এবং উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার প্রস্তুত কি না তা ব্যাপকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। অবরোধকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে বারবার খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের কথা বলে বেড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও সরকারের বিভিন্ন সিনিয়র নেতা-মন্ত্রী। তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত। তবে আদালতের নির্দেশ এখনো থানায় পৌঁছেনি এই অজুহাত দেখিয়ে তাকে গ্রেফতারের উদ্যোগ থেকে বিরত রয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে আসলে আওয়ামী লীগ ও সরকারের নীতিনির্ধারকেরা সার্বিক পরিস্থিতি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, দল ও সরকারের মধ্যে থাকা বাম, ‘হাইব্রিড’ ও কট্টরপন্থী বলে পরিচিত কিছু নেতা ও মন্ত্রী খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের পক্ষে রয়েছেন। তাদের মতে, বিএনপি জোটের সরকারবিরোধী আন্দোলন ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় খালেদাকে গ্রেফতার করা হলে তাদের আন্দোলনের চূড়ান্ত কবর রচনা হয়ে যাবে। এতে সরকারও নিশ্চিন্তেই নির্দিষ্ট মেয়াদ পার করতে পারবে।
অন্য দিকে মূলধারার এবং মধ্যপন্থী নেতারা মনে করছেন, সাবেক একজন প্রধানমন্ত্রী ও সরকারবিরোধী জোটের শীর্ষ নেত্রীকে গ্রেফতার করার বিষয়টি এত সহজভাবে নেয়া ঠিক হবে না। স্বাধীনতার পর একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে এভাবে গ্রেফতারের নজিরও নেই। তাকে গ্রেফতার করা হলে সারা দেশে যে বিস্ফোরণ ঘটবে তা সামাল দেয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। আর র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সাময়িকভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে আর সম্ভব হবে না। এতে সরকারের পক্ষে নিরবচ্ছিন্নভাবে মেয়াদ পার করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এ ছাড়া খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও খুব সজাগ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির সাথে সাথেই জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বান কি মুন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিশ্ব। তাই খালেদাকে গ্রেফতার করা ঠিক হবে না।
সূত্র মতে, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হবে কি না তা নিয়ে গতকাল শনিবার পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি সরকার। মূলত সে কারণেই গ্রেফতারের েেত্র ধীরগতি অনুসরণ করা হচ্ছে। অন্য দিকে খালেদা জিয়া গ্রেফতার হতে চান এমন একটি ধারণাও রয়েছে আওয়ামী লীগের ভেতরে। সেটিও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। তবে মামলার শুনানির দিন অনুপস্থিতির কারণে আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা সরকারকে অনেকখানি আশ্বস্ত করে তুলেছে।
খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং গ্রেফতার প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সিনিয়র একাধিক নেতার সাথে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। আলাপকালে তারা জানান, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে চলমান পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে যেতে পারে, চলমান আন্দোলনের গতি বাড়বে কি না এবং বাড়লে তা নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। আবার গ্রেফতার করে বেগম জিয়াকে কি সরকার সসম্মানে বেরিয়ে আসার পথ তৈরি করে দিচ্ছে কি না সেটাও ভাবছেন নীতিনির্ধারকেরা।
কারণ, সরকারের ভেতরে ধারণা রয়েছে, হরতাল-অবরোধে সৃষ্ট চলমান পরিস্থিতি থেকে বিএনপি বেরিয়ে আসতে চাইলেও রাজনৈতিক পরাজয়ের আশঙ্কায় বেরিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছে না। সে জন্য খালেদা জিয়া কারাবরণ করে এ পরিস্থিতির অবসান চান। তাই তাকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়ার েেত্র সতর্ক অবস্থান নিয়েছে সরকার।
দলের সিনিয়র এক নেতা জানান, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের ব্যাপারে সরকার একাধিকবার উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনায় বারবার সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। সর্বশেষ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা কাজে লাগিয়ে তাকে গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু জাতিসঙ্ঘ মহ্সাচিবের উদ্বেগ প্রকাশসহ নানা দিক চিন্তা করে আর গ্রেফতার করা হয়নি। তবে খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করার ব্যাপারে অনেকটাই নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ গত ৬ ফেব্রুয়ারি কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘খালেদাকে দুই কম্বলে থাকতেই হবে।’ তাই প্রধানমন্ত্রীর এমন মনোভাব অবশ্যই বাস্তবায়ন হবে।
এ দিকে সরকারের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার গ্রেফতার নিয়ে সরকার রাজনৈতিকভাবে দায় নিতে চাচ্ছে না। এ কাজে আদালতকেই ব্যবহার করতে চান নীতিনির্ধারকেরা। সে জন্য খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে তড়িঘড়ি করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও এখনই তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। সরকার মূলত ৪ মার্চকে সামনে রেখে এগোচ্ছে। ওই দিন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান ‘দুর্নীতি’ মামলার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। খালেদা জিয়া যদি ৪ তারিখের মধ্যে আগাম জামিনের জন্য সশরীরে উচ্চ আদালতে উপস্থিত না হন তবে ওই দিন তাকে গুলশান অফিস থেকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে নিয়ে যাওয়া হবে। আর আদালত জামিন দিলে তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া হবে। অন্য দিকে জামিন না হলে তাকে কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হতে পারে। ওই কারাগারে ইতোমধ্যেই মহিলা ভিআইপির সেল ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে বলে খবর বেরিয়েছে। তবে কাশিমপুর কারাগারে না নিয়ে খালেদা জিয়াকে নিজ বাসায় গৃহবন্দী করে রাখা হতে পারে বলেও জানা গেছে।
তবে অন্য একটি সূত্র জানায়, বিএনপি জোটের চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের গতি কমাতে ইতোমধ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ শীর্ষ অনেক নেতাকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন বিরোধী জোটের অনেক নেতাকর্মী। গ্রেফতার এড়াতে অনেকেই আবার গা ঢাকা দিয়ে আছেন। রাজনৈতিক কার্যালয়ে এখনো ‘অবরুদ্ধ’ হয়ে আছেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তবুও থামছে না আন্দোলন। দেশব্যাপী ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান ও প্রশাসনের সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও একের পর এক প্রাণহানি, জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর ও বোমাবাজিসহ সহিংস ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বিদেশী দূতাবাস, সরকারের মন্ত্রী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও আদালতপাড়া, ম্যাজিট্রেটের গাড়িসহ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। এ অবস্থায় খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা হলে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে তা নিয়ে সরকারে যথেষ্ট শঙ্কা রয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতারের বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। তাই এ ব্যাপারে প্রশাসনই ব্যবস্থা নেবে। এখানে সরকারের কিছু করণীয় নেই।
দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি বলেন, খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার এখন আর সরকার বা দলের চাওয়া-না-চাওয়ার ওপর নির্ভর করে না। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এটি আদালতের এখতিয়ার।

ব্যারিস্টার মঈনুল ও ইকবাল সোবহানের বাকযুদ্ধ

প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসার স্মরণসভায় এসে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। স্মরণসভায় রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি হয়। এ সময় দু’জনই তর্কে জড়িয়ে পড়লে উপস্থিত সদস্যদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে ইকবাল সোবহান অনুষ্ঠানস্থলে বসলেও ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যান। জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স রুমে শনিবার দুপুরে বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবিএম মূসার স্মরণ সভায় এ ঘটনা ঘটে। স্মরণ সভা ও মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে এবিএম মূসার পরিবার।
ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের আগে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তার বক্তব্যে উপস্থিত আমন্ত্রিত অতিথিদের উদ্দেশে বলেন, এবিএম মূসার এই স্মরণ সভায় আমরা বর্তমান বিষয়কে এনে তাকে যেন বিতর্কিত ও বিভক্তির মধ্যে না ফেলি। তাকে আমরা বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখি।
তার এই বক্তব্যের আগে অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বর্তমান রাজনৈতিক বিষয়ে নিয়ে রাজনীতিক ও সাংবাদিকসহ সুশীল সমাজের কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য দেন। এর জবাবে ইকবাল সোবহান এই বক্তব্য রাখেন। পরে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে তার বক্তব্য তুলে ধরেন। বর্তমান সংকটের সমাধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে ও দেশে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয় নিয়ে বক্তব্য দিতে থাকেন।
এ সময় অনুষ্ঠানের উপস্থাপক রোবায়েত ফেরদৌস বক্তব্য সংক্ষেপ করতে বললে তিনি উপস্থাপককে বলেন, আমি কোনো বাজে লোক না। আমাকে কথা বলতে দেন। কথা বলতে দেবেন না তাহলে ডেকেছেন কেন। বক্তব্য শেষ করে তিনি আবারও উপস্থাপককে তার অবস্থান সর্ম্পকে বলে, সামনের আসনে এসে বসেন।
এরপরই ইকবাল সোবহান মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলেন, এখানে আমরা রাজনীতি করার জন্য আসিনি। এ কথা বলার সঙ্গে ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন প্রতিবাদ জানান। এ সময় ইকবাল সোবহান ব্যারিস্টার মঈনুলকে প্লিজ প্লিজ বলে থামতে বললে ব্যারিস্টার মঈনুল টেবিলে চাপড়ে বলেন, আমাকে আমার কথা বলতে দেন। থামতে বলছেন কেন? আমাকে কেন কথা বলতে দেবেন না। কেন কথা বলতে গেলে আমাকে আটকানো হবে।
ইকবাল সোবহান তাকে উদ্দেশ করে বলেন ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন সাহেব আপনারা সংবিধান স্থগিত করে দিয়ে, সেন্সরশিপ করে দেশ চালিয়েছেন। আর এখন আপনারা আমাদেরকে বড় বড় কথা বলে চলে যাবেন এটা তো হয় না। এ কথা শেষ না হতেই অনুষ্ঠানের মধ্যে হট্টগোল সৃষ্টি হয়।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে বিশিষ্ট কলামিস্ট ও সাংবাদিক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, অনুষ্ঠানে কিছুটা সমস্যা হয়েছে এ জন্য আমরা দুঃখিত।

হাজারী অভ্যর্ত্থনায় অর্ধশত তোরণ : নেই বঙ্গবন্ধু বা প্রধানমন্ত্রীর ছবি

ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীকে অভ্যর্ত্থনা জানাতে দুই কিলোমিটার সড়কে অর্ধশতাধিক তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে। রোববার শহরের মহিপালে সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সমাবেশে তিনি প্রধান অতিথি থাকবেন। ‘হরতাল-অবরোধের নামে দেশব্যাপী নাশকতার প্রতিবাদে’ মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ এই সমাবেশের আয়োজন করছে। সমাবেশে বিশেষ অতিথি থাকবেন ফেনী পৌরসভার মেয়র, স্টার লাইন গ্র“পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব হাজী আলাউদ্দিন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, ওই সমাবেশে অংশ নিতে সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ইতিমধ্যে চাপ দেয়া হয়েছে। এছাড়া শহরের এসএসকে সড়কে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে তোরণ নির্মাণে বাধ্য করা হয়েছে। শনিবার বিকাল পর্যন্ত উক্ত সড়কে ৪৭টি তোরণ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে বলে আয়োজক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এসব তোরণের একপাশে বড় আকারে নিজাম হাজারী অন্য পাশে হাজী আলাউদ্দিনের ছবি টানানো হয়েছে। তবে কোনোটিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অথবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি স্থান পায়নি।
সমাবেশের প্রধান সমন্বয়ক জেলা যুবলীগের যুগ্ম-আহবায়ক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী জানান, পাঠানবাড়ী রোডের মাথা থেকে মহিপাল পর্যন্ত সড়কে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীকে অভ্যর্থনা জানানো হবে। সমাবেশ উপল্েয তোরণ নির্মাণে কাউকে চাপ দেয়া হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এমপি নিজাম হাজারী ও মেয়র আলাউদ্দিনকে স্বাগত জানাতে তোরণ নির্মাণ করেছে।

‘সঙ্কটের সমাধান প্রধানমন্ত্রীর হাতে’ -ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন বলেছেন, চলমান সঙ্কটের উৎস নির্বাচন। এই সঙ্কটের সমাধান তো প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনি নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বলেছিলন, সবার সঙ্গে আলোচনা করে আবার পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন দেয়া হবে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন তার মতেই ছিল অপূর্ণাঙ্গ। সূতরাং প্রধানমন্ত্রীকে সেই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিতে আমাদের লজ্জা কেন? তিনি বলেন, এখন কথা বলতে গেলে ভয় পাই। মূসা ভাই নীরব থাকা সমর্থন করেননি। এজন্য বলছি, নির্বাচন দিলে সন্ত্রাসী তৎপরতা বন্ধ হতে বাধ্য। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা নির্বাচন বাদ দিয়ে পুলিশি কায়দায় সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ করছেন। এই অবস্থায় সুযোগ নিচ্ছে, সুবিধাবাদীরা। শনিবার দুপুরে প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসার স্মরণ সভায় এসব কথা বলেন। ব্যারিস্টার মঈনুল বলেন, আজকে আমরা সাংবাদিক-আইনজীবীরা নিজেদের শক্তি হারিয়ে দলীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছি। এতে কেবল নিজেরাই শক্তিহীন হইনি, পুরো জাতিকে শক্তিহীন করছি। গণতন্ত্র মাঠে মারা যাচ্ছে। গণতন্ত্র রক্ষার শক্তি রাজনীতিবিদরা নন। সাংবাদিক ও আইনজীবীদের এ কাজ করতে হবে। এ জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বঙ্গবন্ধুর মতো দলের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি।
এবিএম মূসা ও সেতারা মূসা ফাউন্ডেশন  আয়োজিত সভায় ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন, চলমান সঙ্কট ভয়াবহ রূপ নেয়ার আগেই সতর্ক করে গেছেন প্রয়াত সাংবাদিক এবিএম মূসা। তিনি এই সঙ্কটের রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেছিলেন। অস্ত্রের ভাষা যে রাজনীতির ভাষা হতে পারে না, এ কথাও জোর দিয়ে বলে গেছেন। তিনি বলেন, অস্ত্রে ভাষা যদি রাজনীতির ভাষা হয়, তাহলে তার মোকবিলার ভাষা কি হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
সৈয়দ আবুল মকসুদের সভাপতিত্বে ও রোবায়েত ফেরদৌসের পরিচালনায় মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন- প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, নিউজ টুডের সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ, মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, প্রবীণ সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর, বৈশাখী টিভির সিইও মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ নজরুল, জাতীয় প্রেসক্লাবের সহ-সভাপতি কাজী রওনক হোসেন, সাংবাদিক আব্দুর রহীম, গোলাম মর্তুজা প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, সাহসী ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা করেছেন মূসা ভাই। তিনি সত্যকে সত্য বলেছেন। বিরোধিতা করলে, সেটাও ছিল তথ্যনির্ভর। আমরা এখানে বিতর্ক সৃষ্টি করতে আসিনি। তাই, তার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে আলোচনা করছি না। আমানুল্লাহ কবীর বলেন, সাংবাদিকদের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে রাজনীতি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কারণ, রাজনীতির ঘটনা প্রবাহের মধ্য দিয়েই সাংবাদিকের কাজ। এখন তো সাংবাদিক নেই; সব দলীয় কর্মী। চলমান সঙ্কট সমাধানে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, একদল অপর দলকে অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা করছে। পার্থক্য একটাই, কারও অস্ত্রের লাইসেন্স আছে, কারও নেই। অস্ত্র দিয়ে অস্ত্রের মোকাবিলা করতে গেলে রক্তক্ষরণ হবে। তিনি বলেন, এই সঙ্কটের সমাধান করতে হবে টেবিলেই। টেবিলের বাইরে সমাধান করতে গেলে যে পরিণতি হবে, সেটা আমাদের সামনেই দেখতেই পাচ্ছি। অভিজিৎ রায় হত্যা উদাহরণ হতে পারে।

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড- প্রশ্নের মুখোমুখি পুলিশ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় দুর্বৃত্তদের হামলায় রক্তাক্ত হয়ে ফুটপাতে
পড়ে আছেন লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায়। তাঁকে হাসপাতালে নিতে আশপাশের
মানুষের সহায়তা চাইছেন আহত স্ত্রী রাফিদা আহমেদ। পাশেই পুলিশ দাঁড়ানো।
বৃহস্পতিবার রাতের ছবি l বাংলার চোখ
শাহবাগ থানা থেকে দুরত্ব দুইশ’ গজ। ঘটনাস্থলের কাছেই ছিল পুলিশের নিরাপত্তা টহল দল। গ্রন্থমেলার ফটক ঘিরে আরও কয়েক স্থানে ছিল পুলিশের অবস্থান। সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশের নিয়মিত টহল দলের অবস্থানও ছিল আশপাশের সড়কে। এমন নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেই ব্লগার অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে খুন করে দুর্বৃত্তরা। চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করার পর তারা নির্বিঘ্নে এলাকা ত্যাগ করলেও কোথাও কোন বাধার মুখে পড়েনি। পুলিশ কর্তারা জানিয়েছেন, ওই এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা টহল ছিল। তাহলে কিভাবে খুনিরা নির্বিঘ্নে এমন হত্যাকাণ্ড ঘটালো- এমন প্রশ্নের মুখোমুখি পুলিশ। এ ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত কোন ক্লু উদঘাটনের খবর জানাতে পারেনি পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের দুই ঘণ্টার মধ্যেই আনসার বাংলা-৭ নামের একটি সংগঠন দায় স্বীকার করে বলে পুলিশ দাবি করেছে। তবে এর আগে এই সংগঠনের অস্তিত্বের কথা জানা যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতের স্বজন, ব্লগার ও বিভিন্ন সংঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে, ঘটনাস্থলের ৫০ গজ দূরেই দায়িত্ব পালন করছিল পুলিশ। সেখানে ছিল পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান। হামলার শিকার হয়ে অভিজিৎ ও তার স্ত্রী বন্যা ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে যাননি। ঠাণ্ডা মাথায় দুর্বৃত্তরা অভিজিতের মৃত্যু নিশ্চিত করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।
গতকাল সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, রক্তের দাগ লেগে আছে ফুটপাতে, রাস্তায়। সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অনেকে। ঘটনাস্থলটি রাজু ভাস্কর্য থেকে ২৫ গজ দূরে উত্তর দিকে সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যান সংলগ্ন ফুটপাত। প্রায় ২০০ গজ দূরে শাহবাগ থানা। ঘটনাস্থলের পাশেই গ্রন্থমেলা উপলক্ষে পুলিশের ব্যারিকেড। পুরো ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী সেখানে প্রহরায় ছিল পুলিশ। গ্রন্থমেলামুখী সব লোককে এখানে দেহ তল্লাশি করে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। ঘটনাস্থল দিয়ে প্রতিদিন হাজার-হাজার মানুষ গ্রন্থমেলায় আসা-যাওয়া করেন। টিএসসিতে বসে আড্ডা দেন তরুণ-তরুণীরা। গ্রন্থমেলা ছাড়াও বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই এলাকাটি নিরাপত্তা বলয়ে থাকে। গ্রন্থমেলা উপলক্ষে তা আরও জোরদার করা হয়েছে। এমন নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যেই নির্বিঘ্নে অভিজিৎকে হত্যার ঘটনায় স্তব্ধ খোদ পুলিশ কর্মকর্তারা। এ ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্নের জবাব মিলছে না তাদের কাছে। অভিজিৎ হত্যার পরপরই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। ঘটনার পরপরই আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, হামলাকারীরা পেছন দিক থেকে অভিজিৎকে  কোপাতে থাকে। এ সময় অভিজিৎকে রক্ষা করার জন্য বন্যা এগিয়ে গেলে তার ওপর হামলা চালানো হয়। দুষ্কৃতকারীদের চাপাতির আঘাতে বন্যার একটি আঙ্গুল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ততক্ষণে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অভিজিৎ। রক্তে ভেসে যায় ফুটপাত। তার মাথা থেকে মগজ বের হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সেখানে। অভিজিৎ মাটিয়ে লুটিয়ে পড়ার পর দুষ্কৃতকারীরা পালিয়ে যায়। তখন চিৎকার করে লোকজনের সাহায্য চান বন্যা। আশপাশে কিছু লোক জড়ো হলেও তারা নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমনকি পাশে দায়িত্ব পালনরত পুলিশও প্রথমে বন্যার চিৎকারে সাড়া দেয়নি। এভাবে কয়েক মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পর একজন আলোকচিত্রীসহ কয়েকজন এগিয়ে যান। তাদের সহযোগিতায় অভিজিৎ ও বন্যাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রন্থমেলার তখন টিএসসি ব্যারিকেডের দায়িত্ব পালন করছিলেন পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওয়াহিদুজ্জামান। ওয়াহিদুজ্জামান মানবজমিনকে বলেন, আমরা (পুলিশ সদস্যরা) তখন গ্রন্থমেলার দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমাদের অবস্থান ছিল গ্রন্থমেলার টিএসসি ব্যারিকেডে। প্রথমে আমি বুঝতে পারিনি। একপর্যায়ে চিৎকার শুনে এগিয়ে যাই। ততক্ষণে কয়েক ব্যক্তি আহতদের সহযোগিতা করে সিএনজি অটোরিকশাযোগে হাসপাতালে নিয়ে যান। এসআই ওয়াহিদুজ্জামান জানান, ঘটনা বুঝতে পেরে ওই অটোরিকশার পেছনে- পেছনে হাসপাতালে যান তিনি।
এ বিষয়ে রমনা জোনের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান বলেন, অনেক সময় জনসমাগম এলাকায় টার্গেট ওরিয়েন্টেড কিলিং এ অংশ নেয়াদের হাতেনাতে ধরা কঠিন হয়ে যায়। ঘটনার পরপরই পুলিশ ও ডিবি পুলিশসহ র‌্যাব ও সিআইডি তদন্ত শুরু হয়েছে। বিভিন্নস্থানে অভিযানও চলছে বলে জানান তিনি। নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে মন্তব্য করে শিবলী নোমান বলেন, এটি প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর কাজ।
তদন্তে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা মনে করেন, কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারীরা প্রশিক্ষিত ছিল। যে কারণে জনসমাগম এলাকায় হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে তারা নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। বৃহস্পতিবার গ্রন্থমেলায় যাওয়ার পর থেকেই দুষ্কৃতকারীরা তাকে অনুসরণ করছিল বলে তারা মনে করেন। কিলিং মিশনে অংশ নেয়া একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে তার উপর হামলা চালায়। মূল কিলিংয়ে দুই জন অংশ নিলেও পরোক্ষভাবে আরও কয়েকজন ছিল হত্যা মিশনে। ঘটনাস্থলের আশপাশেই তারা অবস্থান নিয়েছিল। এসব বিষয়কে সামনে রেখেই তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা জঙ্গিরা এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আনসার বাংলা সেভেন নামের একটি গ্রুপ টুইটারে এ হত্যাকাণ্ডকে নিজেদের বিজয় বলে দাবি করেছে। এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। তিনি জানান, প্রত্যক্ষদর্শীরা তেমন কোন তথ্য দিতে পারেনি। তবে সেলিম নামে এক ফুল বিক্রেতা পুলিশকে জানিয়েছেন, কিলিং মিশনে অংশগ্রহণকারী দুজন মধ্যে একজনের পরনে সাদা শার্ট, অন্যজনের পরনে ছিল কোট। তাদের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছর হবে। অত্যন্ত ক্ষীপ্রতার সঙ্গে অভিজিৎকে কুপিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তারা স্থান ত্যাগ করে। প্রত্যক্ষদর্শী সেলিম চিৎকার করেন। এ সময় হামলাকারীরা তার দিকে তেড়ে গেলে তিনি ভয়ে পালিয়ে যান। অভিজিৎকে হত্যার দুই ঘণ্টার মধ্যেই আনসার বাংলা-৭ নামের টুইটার একাউন্ট থেকে অভিজিৎ হত্যার দায় স্বীকার করা হয়েছে। টুইটার বার্তায় লেখা আছে, ‘জয় নোজ নো বাউন্ডস, ভিআইপি টার্গেট ইজ ডাউন ইন ঢাকা।’ এবং ‘আল্লাহু আকবর.. বাংলাদেশে আজ একটি বিশাল সাফল্য। টার্গেট ইজ ডাউন..।’  ‘আনসার বাংলা ৭’ নামের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে ওই টুইট করার পর হত্যার দায় স্বীকার করে আরও বেশকিছু টুইট করা হয়। ওইসব টুইটে অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডকে ‘বিজয়’ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। ‘আনসার বাংলা ৭’ নামের সংগঠনকে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সহযোগী বলে মনে করছে পুলিশ। যদিও এ নামের কোন সংগঠনের অস্থিত্বের বিষয়ে আগে শোনা যায়নি।
অভিজিতের বন্ধু ও তার একাধিক বইয়ের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ টুটুল জানান, প্রগতিশীল এই লেখককে বিভিন্ন সময়ে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে। ঘটনার দিন স্ত্রী বন্যাকে নিয়ে বইমেলায় যান অভিজিৎ। সেখানে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন শেষে বের হলেই এ ঘটনা ঘটে। নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ই ফেব্রুয়ারি বইমেলা উপলক্ষে দেশে ফিরেন অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী বন্যা। তাদের ধারণা, দেশে ফেরার পর থেকেই অভিজিৎকে টার্গেট করছিল দুষ্কৃতকারীরা। ব্লগে ধর্ম, বিশ্বাস, বিজ্ঞান নিয়ে লেখালেখির কারণে তার ওপর একটি মহল ক্ষুব্ধ ছিল। তারা বিভিন্ন সময়ে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। যে কারণে অভিজিৎকে নিয়ে আতঙ্কে ছিলেন তার পরিবারের সদস্যরা। অভিজিৎ দেশে থাকুক, এটা চাইতেন না তার পরিবারের লোকজন। অভিজিতের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, আমি অভিজিৎকে বলেছিলাম- তোমার মতো মানুষের জন্য এই দেশ সুখকর না। আমি যে আশঙ্কা করেছিলাম শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। ওরা আমার ছেলেকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করলো। সরকার চাইলেই খুনিদের গ্রেপ্তার করতে পারে বলে মনে করেন অজয় রায়। তিনি বলেন, খুনি কারা তা সবাই জানে। জঙ্গিগোষ্ঠীরাই অভিজিৎকে হত্যা করেছে। তাদের সব নথিপত্র পুলিশের কাছে রয়েছে। সরকার চাইলেই পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে পারে। এ ঘটনায় অজয় রায় বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক সুব্রত জানান, মামলায় অজ্ঞাতদের আসামি করা হয়েছে। ঘটনার পরপরই ঘটনাস্থল থেকে দুর্বৃত্তদের ফেলে যাওয়া চাপাতি ও একটি ব্যাগ উদ্ধার করেছে পুলিশ। আলমত ও বিভিন্ন সূত্রধরে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। হত্যাকারীরা যে চাপাতি ব্যবহার করেছে তার বাট কাগজ দিয়ে মোড়ানো ছিল।
শুক্রবার অভিজিতের লাশের ময়নাতদন্ত করেছেন ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা। এ বিষয়ে ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ বলেন, অভিজিৎ রায়ের মাথার ডান পাশে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ধারাল অস্ত্রের তিনটি আঘাত রয়েছে। আঘাতের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়। একটি আঘাত থেকে আরেকটি আঘাতের দূরত্ব আধা ইঞ্চি, সবগুলোই সমান্তরাল। একটি আরেকটির ওপর পড়েনি। ওই আঘাত এতই মারাত্মক ছিল যে চামড়া ও হাড় কেটে একেবারে মগজে পৌঁছেছে। এছাড়া পিঠে ও বাঁ চোখের ভ্রূর কাছে জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে হামলার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে রাতে সাড়ে ১০টায় মৃত্যু হয় অভিজিৎ রায়ের। এ ঘটনায় গুরুতর আহত অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী বন্যা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বন্যাকে ঢামেক হাসপাতাল থেকে স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। শুক্রবার সকালে তাকে স্কয়ার হাসপাতালে স্থানান্তরের পর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে বলে তার পরিবারের সদস্যরা জানান। অভিজিতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, শ্রদ্ধা জানানোর পর তার ইচ্ছা অনুযায়ী মরদেহ ঢাকা মেডিক্যালে দান করা হবে শিক্ষার্থীদের গবেষণার জন্য।
গত আট বছর যাবৎ পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছিলেন অভিজিৎ  রায়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ড. অজয় রায়ের পুত্র। দেশে এলে তিনি তার পিতার বাসা বড় মগবাজারের ইস্টার্ন হাউজিংয়ে এবং মামার বাসা ইন্দিরা রোডে থাকতেন। তিনি মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা। সেই সঙ্গে বিজ্ঞান, বিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়ে লেখালেখি করতেন তিনি। সমপ্রতি শূন্য থেকে মহাবিশ্ব ও ভিক্টোরিয়া ওকাম্পে নামে তার দুটি বই প্রকাশ হয়েছে।
এদিকে, শুক্রবার দিনভর লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যা ও ব্লগার রাফিদা বন্যার ওপর হামলার প্রতিবাদে ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভেস্ট, গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সংগঠন শাহবাগে মিছিল ও সমাবেশ করেছে। খুনিদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার করা না হলে এর দায়দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে বলে জানান তারা। একই সঙ্গে এ হামলার জন্য মৌলবাদী শক্তির তৎপরতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্লিপ্ততাকেও দায়ী করা হয়।
ঢাবিতে দিনভর বিক্ষোভ, প্রতিবাদ
বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার জানান, লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের নৃশংস হত্যকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকাল দিনভর প্রতিবাদ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। বিভিন্ন প্রগতিশীল সংগঠন বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশসহ এসব কর্মসূচি পালন করে। সমাবেশে বক্তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সুরক্ষিত এলাকায় এ হত্যাকণ্ডের ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এর দায় সরকারকেও নিতে হবে। একই সঙ্গে ধর্মাশ্রয়ী জঙ্গি সংগঠনের বিরুদ্ধে সারা দেশে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলারও আহ্বান জানানো হয়। সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশ করেন ‘আক্রান্ত মুক্তচিন্তা’- শিরোনামে প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষক-নাগরিকরা। সমাবেশে লেখক অভিজিৎ হত্যা ও ব্লগার রাফিদা বন্যার হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের পরিচালনায় সমাবেশে বিশিষ্টজনরা বক্তৃতা করেন। লেখক ও কলামনিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের সময় যেভাবে দেশের প্রগতিশীল মানুষদের হত্যা করা হয়েছিল, হুমায়ুন আজাদকে হত্যা করেছে তারই ধারাবাহিকতায় অভিজিৎকে হত্যা করা হয়। এর মাধ্যমে দেশে প্রগতিশীল মানুষের প্রতিনিধিকে হত্যা করা হয়েছে। এখন সময় এসেছে শপথ নেয়ার, যাতে প্রতিশীল আন্দোলন হারিয়ে না যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এমএম আকাশ বলেন, মুক্তচিন্তা ধারণাটি সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। হত্যা করে এর অগ্রগতি বন্ধ করা যাবে না। আনসারউল্লাহ বাংলা টিম বাংলাদেশকে কুয়োর ব্যাঙ বানাতে চায় বলে তিনি মন্তব্য করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এজেএম শফিউল আলম ভূঁইয়া বলেন, যারা বাংলাদেশকে বাংলাস্তান বানাতে চায় তারাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির বলেন, যারা অভিজিৎকে হত্যা করেছে তারা লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। একুশে গ্রন্থমেলায় মানুষের ভিড়ে কুপিয়ে মারার সাহস তারা কোথায় পায়? হত্যাকারীরা প্রগতিশীল, মুক্ত এবং জনগণের বাংলাদেশ চায় না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অন্যতম প্রসিকিউটর রাণা দাশ গুপ্ত বলেন, সাঈদীর রায়ের পর ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে সাধারণ মানুষ এবং সংখ্যালঘুদের উপর হামলা চালানো হয়েছে। দেশে গৃহযুদ্ধ বাধানোর জন্য জঙ্গিরা এ হত্যকাণ্ড ঘটিয়েছে। তিনি পুলিশের কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, যেসব পুলিশ সদস্য হত্যাকাণ্ডের অদূরে দায়িত্বে ছিল তারপরও অভিজিৎ ও তার স্ত্রীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ক্ষুদ্রস্বরের প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী বলেন, কার কাছে নিন্দা জানাবো? কার কাছে বিচার চাইবো? তারা কি বিচার করবেন? গ্রন্থমেলায় আমরা প্রকাশকরা প্রবেশের সময় বারবার সার্চ করা হয়। কিন্তু এত নিরাপত্তার মধ্যেও কিভাবে দু’জন ঘাতক অস্ত্রসহ হামলা চালালো বুঝে আসে না। সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, যারা ঘাতক তাদের প্রতি ঘৃণা তো রয়েছেই পাশাপাশি যারা বিচার অসমাপ্ত রেখে তাদের সুযোগ করে দিয়েছেন তাদের প্রতিও ঘৃণা জানাচ্ছি। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন তা সম্পন্ন করতে পারলে হত্যাকারীরা এত সাহস পেতো না।
তিনি বলেন, গ্রন্থমেলা জুড়ে পুলিশের স্তরের পর স্তর নিরাপত্তা রয়েছে। সে স্তরের মধ্যে কিভাবে অস্ত্রসহ ঘাতকরা আসে এবং পুলিশ সে সময় কি করছিল তার জবাব পুলিশের কাছ থেকে আদায় করতে হবে। কামাল লোহানী বলেন, এদেশের মানুষ যেমন মরতে জানে তেমনি মারতেও জানে। তিনি দেশের সকল প্রগতিবাদী মানুষকে এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে হামলাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হাসান তারেক বলেন, অতীতেও এমন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব ঘটনার কোন বিচার হয় না। প্রচার রয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রাজধানীর সবচেয়ে নিরাপদ এলাকা। এখানে সার্বক্ষণিক পুলিশের পাহারা থাকে। পাশাপাশি একটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরাও পাহারা বসায়। এর মাঝেও মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। এ থেকে প্রমাণিত হয় সরকারের সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দেয়ার কথা ফাঁকা বুলি। তিনি বলেন, আন্দোলনের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। যেন সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এটিও হারিয়ে না যায়। তিনি এ ঘটনার জন্য ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়ী করেছেন।
গণসংহতি আন্দোলনের আহ্বায়ক জুনায়েদ সাকী বলেন, বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড হয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য, ক্ষমতায় থাকার জন্য। পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যে এই হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে সরকার জনগণের নিরাপত্তা দিতে পারে না। একমাত্র জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনই নিরাপত্তা দিতে পারে। সমাবেশ শেষে রাত ১০টা পর্যন্ত সেখানে প্রতিবাদী গান পরিবেশ করে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতাকর্মী ও বিক্ষুব্ধরা। সন্ধ্যায় হত্যাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনার জন্য প্রগতিশীল ছাত্রজোট কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- আজ সকাল থেকে কালো ব্যাজ ধারণ, বেলা ১২টায় ক্যাম্পাসে প্রতিবাদী মিছিল ও দুপুর ১টায় মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন। ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ধর্মঘট। দোষীদের আটক ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মশাল মিছিল করেছে ছাত্রলীগ, গণজাগরণ মঞ্চ ও প্রগতিশীল ছাত্রজোট। অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের স্থানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
গণজাগরণ মঞ্চের লাগাতার অবস্থান: এদিকে লেখক ও ব্লগার অভিজিতের হত্যার প্রতিবাদে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার পক্ষ। অভিজিৎ এর হত্যাকারী ও পরিকল্পনাকারীরা গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত এই অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন ডা. ইমরান। গতকাল সকাল ১০টা থেকে এ অবস্থান শুরু হয়। এ সময় ডা. ইমরান বলেন, যারা অভিজিৎ রায়কে হত্যা করেছে তারা আত্মস্বীকৃত মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠী। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত জঙ্গি ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, একই ধরনের ঘটনা বার বার ঘটছে। অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, অধ্যাপক শফিউল, ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর গতকাল অভিজিৎকেও হত্যা করা হলো। অথচ হত্যাকারী জঙ্গিগোষ্ঠীর কোন বিচার হচ্ছে না।

জাপার সামনে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ: এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আগামী নির্বাচনের জন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, দেশের মানুষ এ সরকারকে চায় না। বিএনপিকেও চায় না। এ অবস্থায় জাতীয় পার্টির সামনে ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ এসেছে। আমরা এ সুযোগকে কাজে লাগাতে চাই। যদি নিরপেক্ষ ও সঠিক নির্বাচন হয় তাহলে জাতীয় পার্টি আবার ক্ষমতায় যাবে। শনিবার দুপুরে চট্টগ্রামের মুরাদপুরস্থ মহানগর জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে ইঙ্গিত করে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান বলেন, 'দুই দল ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে গেছে। এক দল ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং আরেক দল ক্ষমতায় যেতে মরিয়া। নিজেদের স্বার্থে মানুষ মারছে তারা।' এরশাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'আমার হাতে রক্তের দাগ নেই। নুর হোসেনকে পেছন থেকে কেউ গুলি করেছে। ডা. মিলনকে কে মেরেছে জানি না। অথচ এ দুই মৃত্যুর জন্য আমাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে। কিন্তু এখন কতো মানুষ মরছে। ক্ষমতার জন্য দেশে এখন যা ঘটছে, তা আগে কখনো ঘটেনি।
সাবেক এ রাষ্ট্রপতি বলেন, 'আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা ক্ষমতায় যাবো। মানুষ খুন, অর্থ পাচার ও দুনীতি নয়; মানুষের কল্যাণ করতেই ক্ষমতায় যাবো। জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় আসলে শান্তির নতুন সূর্য উঠবে। অমবস্যা কেটে যাবে। বর্তমানে যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তা কাজে লাগাতে হবে। শান্তির জন্যই আল্লাহ জাতীয় পার্টিকে পাঠিয়েছেন।'
চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক ও নারী সাংসদ মাহজাবীন মোরশেদের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। সভায় উপস্থিত ছিলেন- দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মোরশেদ মুরাদ ইব্রাহিম, দলের চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আহ্বায়ক শামসুল আলম মাস্টার, উত্তর জেলা আহ্বায়ক শায়েস্তা খান প্রমুখ।

‘অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড- প্রমাণ করে সরকার নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ’ -বিএনপি

পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দাফনের আয়োজন  করছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ। বলেছেন, অবৈধ সরকার অস্ত্রের জোরে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার কেড়ে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে প্রতি মুহূর্তে মুক্তিযুদ্ধের সকল অর্জনকে পদদলিত করে গণতন্ত্রকেই বিলুপ্ত করে দিতে চায়। প্রধানমন্ত্রী তার পিতা বাকশাল গঠনের মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যা করে যেমন আওয়ামী লীগকে অস্তিত্বহীন করে দিয়েছিল; তেমনি তিনিও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফের আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে দাফন করার আয়োজন করে চলেছেন। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ মন্তব্য করেন তিনি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই নিপীড়ক শাসকচক্রের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন সংগ্রাম কেবলই বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোটের ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই নয়। রাষ্ট্রের মালিকানা জনগণের কাছে ফেরত দেয়ার এই আন্দোলনকে সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কর্মকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপনের সীমাহীন অপচেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, দিনাজপুরের চিরিরবন্দরের নিভৃত পল্লীতে গতকাল মিথ্যা মামলায় বিএনপি নেতাকে ধরতে গিয়ে পুত্র রেজওয়ানুলকে হত্যা করে স্ত্রী-কন্যাকে গুলিবিদ্ধ করে পুলিশ গ্রামবাসীর প্রতিরোধে পলায়ন করতে বাধ্য হয়। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আজ দেশের সকল পাড়ায়-মহল্লায় জনগণের নেতৃত্বে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিরোধ-সংগ্রাম কমিটি গড়ে উঠেছে। জনতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধের মুখেই অবৈধ সরকারও পলায়নে বাধ্য হবে শিগগিরই।  তিনি বলেন, রাস্তায় কয়েকটি গাড়ি চলাচল দেখে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুললেও আন্দোলনে তৃণমূলের ব্যাপক অংশগ্রহণ আওয়ামী সরকারকে সমূলে উৎপাটন করতে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না। আমি এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাচ্ছি। সময়ের পরিবর্তনে এ সকল নারকীয় হত্যাকাণ্ডে দায়ী ব্যক্তিদের উপযুক্ত আদালতে বিচার করা হবে। একইসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল সভাপতি জাকির হোসেন, ছাত্রনেতা মৃণাল কান্তিকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে বোমাবাজ সাজানোর পুলিশি নাটকের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তিনি। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ছাত্রদল, যুবদলসহ যেসকল অসংখ্য নেতা-কর্মীকে পুলিশ গ্রেপ্তারের পর অস্বীকার করছে তাদের সকলের তালিকা আমরা সংরক্ষণ করছি। পুলিশ-র‌্যাবের কতিপয় দলকানা সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই- এই সরকারই শেষ সরকার নয়। অবৈধ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা করে আইনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন না। দফায় দফায় রিজভী আহমেদকে রিমান্ডে নেয়ার নিন্দা জানিয়ে বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব বলেন, রিজভী আহমেদকে হত্যার উদ্দেশ্যেই সরকার গ্রেপ্তারের পর থেকে কারাগারে না নিয়ে ২৯ দিন লাগাতার পুলিশি রিমান্ডে নেয়ার নজিরবিহীন ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে। তা যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটে এর দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে।  সালাহউদ্দিন আহেমদ বলেন,  পুলিশ বেষ্টনীর মধ্যেও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে এদেশের কোন নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ। আমরা অভিজিৎ হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি। আন্দোলনের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান অনির্দিষ্টকালের শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচির পাশাপাশি দেশব্যাপী রোববার থেকে ৭২ ঘণ্টার হরতালি পালিত হবে।

অভিজিতের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছে এফবিআই

লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করার ব্যাপারে তাঁর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (এফবিআই)। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পরিবার চাইলে তারা হত্যার বিষয়ে তদ্ন্ত করতে প্রস্তুত।
অভিজিৎ রায় যুক্তরাষ্ট্রেরও নাগরিক ছিলেন। তাঁর বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক অজয় রায় এনটিভি অনলাইনকে বলেন, ‘গতকাল শুক্রবার এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা তদ্ন্ত করতে প্রস্তুত বলে আমাদের জানিয়েছে। আমরা বলেছি, আমরা সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’ তিনি জানান, বাংলাদেশে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের একটি প্রতিনিধিদল তাঁদের রমনার বাসায় আসবে। এ বিষয়ে দূতাবাস থেকে তাঁদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে।
পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সঙ্গেও এফবিআইয়ের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ডিবির জ্যেষ্ঠ কোনো কর্মকর্তাই এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ভেঙে যেতেও পারে by এবনে গোলাম সামাদ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক কিছুর হিসাব মেলানো কঠিন। আমরা কেউ ধারণা করতে পারিনি যে, বাংলাদেশের এক কালের দুই কার্ল মার্কস ভক্ত নেতা, জাসদের হাসানুল হক ইনু আর ওয়ার্কার্স পার্টির নেতা রাশেদ খান মেনন, তাদের পুরনো ধ্যান-ধারণা একেবারে পরিত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সাথে হাত মেলাবেন। হবেন মন্ত্রী। কেউই ভাবতে পারেননি যে, এই দুই নেতা হজ করতে যাবেন এবং হবেন আলহাজ। আলহাজ হওয়া দোষণীয় নয়। কিন্তু মার্কসবাদ বলে ধর্ম হচ্ছে আফিমের নেশার মতো, ধর্ম মানুষকে পরকালবাদী করে তোলে। আর ইহজাগতিক সমস্যা সম্পর্কে করে তুলতে চায় উদাসীন। জানি না, এই দুই নেতা এখন কী ভাবছেন, মার্কসবাদের এই মৌল দর্শন নিয়ে। ধর্ম সম্পর্কে এদের মনোভাব, অনুমান করা চলে, নিশ্চয় আর আগের মতো নেই। হাসানুল হক ইনু এক সময় বিশ্বাস করতেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রে হাসানুল হক ইনুর দল জাসদ অনেক আগেই আস্থাহীন হয়ে পড়েছিল। রাশেদ খান মেনন কিছু দিন আগেও বলেছেন, দুনিয়ার মজদুর এক হও। কিন্তু এখন তিনি আওয়ামী লীগের সাথে হাত মিলিয়েছেন। তার বক্তব্য, তিনি বাংলাদেশকে একটি মুসলিম মৌলবাদী দেশ হিসেবে দেখতে চান না। তিনি হজ করে ফিরেছেন নিজেকে একজন খাঁটি মুসলমান প্রমাণ করার জন্য। তিনি খাঁটি মুসলমান হলেও ইসলামি মৌলবাদে আস্থাবান নন। সমস্ত আওয়ামী লীগ এখন পরিচালিত হতে চাচ্ছে এক কালের দণিপন্থী (মস্কোপন্থী) কম্যুনিস্টদের চিন্তাচেতনার দ্বারা। এ রকমই এখন সাধারণ জনরব। সাবেক আওয়ামী লীগ নেতারা আর আওয়ামী লীগে আগের মতো আদ্রিত নন। আওয়ামী লীগে চলেছে গুরুতর মতবাদিক দ্বন্দ্ব; যা আওয়ামী লীগকে ভেঙে দিতেই পারে।
আওয়ামী লীগ এখন পরিচালিত হচ্ছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। শেখ হাসিনাকে বাদ দিলে আওয়ামী লীগে এমন আর কোনো নেতা নেই, যাকে বলা যেতে পারে প্রকৃত আওয়ামী লীগপন্থী। কিন্তু শেখ হাসিনা একজন মানুষ। যেকোনো মানুষ যেকোনো সময় মৃত্যুবরণ করতে পারেন। শেখ হাসিনার অবর্তমানে আওয়ামী লীগ হয়ে পড়বে নেতাহীন। নেতাহীন আওয়ামী লীগ ভেঙে পড়তেই পারে। এটাও একটা বিশেষ সম্ভাবনা। আওয়ামী লীগে কোনো বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না। এর ফলে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ হয়ে পড়ছে দুর্বল। তোফায়েল ও আমির হোসেন আমু দু’জন খুবই প্রাচীন আওয়ামী লীগ নেতা। কিন্তু এদের প্রভাব আওয়ামী লীগের মধ্যে খুব প্রবল বলে মনে হচ্ছে না। এদের পে সম্ভব হবে না আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব প্রদান করা। কারণ এদের দু’জনের কারোরই নেই শেখ হাসিনার তুল্য ভাবমূর্তি। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় আছেন। কিন্তু জয় কি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন? অনেকে ভেবেছিলেন কংগ্রেসে নেহরু পরিবার চিরদিন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে। কিন্তু রাহুল গান্ধী এখন পড়েছেন চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে। আমরা দেখতে পেলাম রাজধানী দিল্লিতে কংগ্রেসের কোনো পদপ্রার্থী নির্বাচনে জয়ী হতে পারলেন না। নেহরু পরিবারের ঐতিহ্য আর এখন আগের মতো জনপ্রিয় নেই। জয় হলেন দ্বি-নাগরিক। তিনি যেমন বাংলাদেশের নাগরিক, তেমনি আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইন বলে যে, তার দেশের নাগরিক অন্য কোনো দেশে গিয়ে রাজনৈতিক পদ দখল করতে পারবে না। জয়কে বাংলাদেশে রাজনীতি করতে হলে ছাড়তে হবে মার্কিন নাগরিকত্ব। কেননা, মার্কিন আইন এমনটাই বলে।
তোফায়েল আহমেদ একসময় ছিলেন সারা বাংলাদেশের একজন খুবই জনপ্রিয় নেতা। তিনি শেখ মুজিবকে সভা ডেকে প্রদান করেছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের অনুকরণে, ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোপা। যেটা এখন আওয়ামী লীগ ব্যবহার করে চলেছে। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট তোফায়েল আহমেদ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের এক অংশ তুলেছিলেন গুরুতর অভিযোগ। তারা বলেছিলেন, তোফায়েল আহমেদ যদি নিষ্ক্রিয় না থেকে যথা সময়ে রীবাহিনীকে ডাকতেন, তবে শেখ মুজিবের মৃত্যু হতো না। রীবাহিনীর অলিখিত ভার ছিল তোফায়েল আহমেদেরই ওপর। এখনো আওয়ামী লীগে অনেকে আছেন যারা মনে করেন, তোফায়েল আহমেদকে বিশ্বাস করা যায় না। তাই শেখ হাসিনার স্থান তোফায়েল আহমেদ নিতে পারবেন, এমন অনুমান করা যথেষ্ট সঙ্গত নয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অভাবে ও আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে ভেঙে যেতেই পারে। শেখ হাসিনার উচিত আওয়ামী লীগে তার অনুপস্থিতিতে নেতৃত্ব দিতে পারেন এমন নেতা তৈরি করে যাওয়া। কিন্তু তিনি তা করছেন বলে মনে হচ্ছে না। অবশ্য আমরা এ কথা বলছি, বাইরে থেকে দেখে। আওয়ামী লীগের ভেতরের কথা আমরা ঠিক সেভাবে যে জানি, তা নয়। তবে বিশ্বের নানা দেশের ইতিহাসে দেখা যায়, উপযুক্ত নেতার অভাবে একটি রাজনৈতিক দলের বিলুপ্তি ঘটতে পারে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও সেটা ঘটা অসম্ভব নয়।
দেশে এখন বিতর্ক উঠেছে, আওয়ামী লীগ উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে কি করে না, এই প্রশ্ন নিয়ে। কেননা, আওয়ামী লীগ বলছে আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র। যা এক সময় দেশে দেশে কম্যুনিস্টরা বলতেন। রাশিয়ার কম্যুনিস্ট পার্টি এই যুক্তি তুলে মতায় ছিল প্রায় ৭৪ বছর। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। এখন খোদ রাশিয়ার মানুষ চাচ্ছেন তাদের দেশে বহুদলীয় উদার গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা। শেখ মুজিব কেন বাকশাল গড়েছিলেন, আমরা তা জানি না। কারণ তিনি এক সময় দেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করেছিলেন। আর সেই কারণে পেতে পেরেছিলেন বিপুল জনপ্রিয়তা। শেখ মুজিব তার গণতান্ত্রিক দর্শন পরিত্যাগ করে যদি বাকশাল গঠন না করতেন, তবে তার রাজনৈতিক জীবনের ও রকম করুণ বিয়োগাত্মক পরিণতি ঘটতে পারত বলে ভাবা যায় না। হয়তো তিনি নির্বাচনে মতা হারাতেন, কিন্তু আবার নির্বাচনের মাধ্যমেই আসতে পারতেন মতায়। নির্বাচনের মাধ্যমেই কেবল হতে পারে এক দলের হাত থেকে আর এক দলের হাতে রক্তপাতহীনভাবে মতার হস্তান্তর। যতগুলো কারণে দেশে দেশে মানুষ গণতন্ত্র চেয়েছে এবং চাচ্ছে, তার একটা বড় কারণ হলো এটাই। বিলাতের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ চার্চিল নির্বাচনের মাধ্যমে মতা হারিয়েছিলেন। আবার মতায় আসতে পেরেছিলেন নির্বাচনের মাধ্যমে। তিনি বলেছিলেন গণতন্ত্রে গলদ আছে অনেক, কিন্তু মানুষ এর চেয়ে ভালো রাজনৈতিক পদ্ধতি এখনো আবিষ্কার করে উঠতে পারেনি। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে চার্চিলের এই বক্তব্য আমার মনে পড়ছে।
বাংলাদেশে আমার মনে হয় একটা অন্তর্বর্তী নির্বাচন হওয়া হবে যুক্তিযুক্ত। তাতে আসবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের একটা সমাধান। তা না হলে দেশের রাজনৈতিক সমস্যা আরো জটিল হয়েই উঠবে। এমনকি আওয়ামী লীগের মধ্যেও সঙ্কট দেখা দিতে পারে। ভেঙে পড়তে পারে আওয়ামী লীগ।
বিএনপি জোট বেঁধেছে আরো ১৯টি দলের সাথে। কিন্তু এই মোট ২০টি দলের মধ্যে আছে মূল্যবোধের একটি সাধারণ ঐক্য। যাকে বলা হচ্ছে, ইসলামি মূল্যবোধ। কিন্তু ১৪ দলের মধ্যে এ রকম মূল্যবোধের ঐক্য আছে বলে মনে হচ্ছে না। হাসানুল হক ইনু আর রাশেদ খান মেনন হাসিনার সাথে অনেক বিষয়েই পারছেন না ঐকমত্য গড়তে। এ রকমই মনে হচ্ছে আমাদের বাইরে থেকে দেখে। ২০ দলে যে পরিমাণ তাত্ত্বিক আছেন, ১৪ দলের ঐক্যজোটে আছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। নিকট ভবিষ্যতে ১৪ দলের জোটে তাই মতবাদিক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়ার সম্ভাবনা বেশি। অন্তর্বর্তীকালীন নির্বাচন দিলে আওয়ামী লীগ তাই উপকৃত হতে পারবে। এ রকমই আমাদের বিশ্বাস।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

দেশদ্রোহিতার অভিযোগের পরোয়া করি না -ড. কামাল হোসেন

সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, দেশদ্রোহিতার অভিযোগের পরোয়া করি না। এর আগে পাকিস্তান আমলেও আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর এরশাদ ও বিএনপি সরকারের আমলেও আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ছিল। আজ ২০১৫ সালে এসে একথা শুনতে হবে- এটা দুঃখজনক। দেশের জন্য লজ্জাজনক। শুক্রবার সকালে গণফোরাম কার্যালয়ে সংগঠনটির বর্ধিত সভা চলাকালীন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল এসব কথা বলেন। সম্প্রতি নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুুদুর রহমান মান্নার ফোনালাপ প্রচারের পর তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। মান্নার ফোনালাপের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনকে জড়িয়ে বক্তব্য রাখেন সরকারি দলের নেতারা। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ড. কামালের গ্রেপ্তার দাবি করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে গণফোরাম সভাপতি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে প্রতিবাদ জানান।
মান্নার ফোনালাপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মান্না টেলিফোনে যে কথা বলছেন সেসব তদন্ত হচ্ছে। আমি এসব কথা শুনে অবাক হয়েছি। মান্নাকে বলেছি তার অবস্থান পরিষ্কার করতে। আমরা এই রাজনৈতিক চিন্তা করি না। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ এসেছে এসবের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য হচ্ছে জনগণের মন জয় করা। ড. কামালের গ্রেপ্তার দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। তিনি না বুঝে ছেলে মানুষের মতো এসব কথা বলেছেন। বিষয়টা দুর্ভাগ্যজনক।
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা পেট্রলবোমায় দগ্ধদের দেখতে বার্ন ইউনিটে গিয়েছিলাম। অথচ আমাদের বলা হয় আমরা নাকি দগ্ধদের সমবেদনা জানাইনি। তখন ছবি তুলে পত্রিকায় না দেয়াটা আমাদের ভুল হয়ে গেছে। আমরা সকল ধরনের সহিংসতার বিপক্ষে।
ড. কামাল বলেন, আমরা আগেই বলেছিলাম অবস্থা অস্বাভাবিক হচ্ছে। কারণ ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন এটা বাধ্যবাধকতার নির্বাচন। পরে আলাপ-আলোচনা করে আরেকটা নির্বাচন দেয়া হবে। যত দেরি হচ্ছে দেশকে অস্থিতিশীল অবস্থার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ১৪ দল গঠনের মাধ্যমে ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির পাতানো নির্বাচন প্রতিহত করেছিলাম। জাতীয় সঙ্কটের মধ্যে ১৪ দল গঠন হয়েছিল। ১৪ নম্বর দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এসেছিল। যার ফলে ২০০৮ সালে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। তাই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের বিকল্প নেই।
ড. কামাল বলেন, এদেশ কোন দল বা গোষ্ঠীর না। সংবিধানে আছে দেশের মালিক জনগণ। দেশে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মৌলিক বিষয়গুলোতে দেশের মানুষের বিরোধ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সঙ্কট দুই দলের আলাপ- আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে না। এখানে ৯ কোটি ভোটার ও ১৬ কোটি মানুষ রয়েছে। তাদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। তাই আলোচনা হতে হবে সকল দলের অংশগ্রহণে। আলোচনার মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দাবি করে তিনি বলেন, পরিস্থিতি এমন দিকে গড়াচ্ছে যে, দিন দিন সবাই আইনের শাসন উপেক্ষা করছে। সঠিক নির্বাচন হলে গোটা জাতি অস্বাভাবিক অবস্থায় পড়তো না। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পর এসে এসব দেখতে হবে ভাবতে অবাক লাগছে। ব্লগার অভিজিৎ হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে তিনি বলেন, জড়িতদের যথাযথ তদন্ত করে শাস্তি দেয়া হোক। এ ধরনের ঘটনা একটার পর একটা ঘটবে কেন। দেশের সকলক্ষেত্রে দলীয়করণ চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পৃথিবীর খুব কম জায়গায় জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেয়ার নজির রয়েছে। শক্তি প্রয়োগ করে দেশের রাজা হওয়া অসম্ভব। জনগণের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসতে হয়। আমরা দেশের মাটি ধরে রাখবো। আমাদের মেরে ফেলেন। কিন্তু ১৬ কোটি মানুষকে মেরে ফেলতে পারবেন না। দেশে অসুস্থ রাজনীতি চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকা সুস্থ রাজনীতি না। এটা একটা রোগ। এই রোগ দূর করার জন্য আলাপ আলোচনা করতে হবে। বর্তমান সঙ্কট দূর করতে আলোচনার বিকল্প নেই। সভায় সভাপতির লিখিত বক্তব্যে ড. কামাল বলেন, গণফোরাম সবসময় এ ধরনের রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে সংলাপের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। তাই বর্তমান সঙ্কটের মূল কারণসমূহকে চিহ্নিত করে সমাধানের পথে অগ্রসর হতে হবে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বর্তমান সঙ্কট শুরু হলেও অতীতে একই ধরনের সঙ্কট সৃষ্টির প্রয়াস হয়েছিল। ভবিষ্যৎমুখী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থায়ীকরণের স্বার্থে আমাদের বর্তমান সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানের পন্থা ভাবতে হবে। শুধু একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে নয়। বরং সংলাপ হতে হবে রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বস্তরে কার্যকর গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। বর্ধিত সভায় উপস্থিত ছিলেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমেদ প্রমুখ। বর্ধিত সভায় কয়েকটি রাজনৈতিক প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, দেশ এক অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটে পতিত হয়েছে। সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতি ও জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসন উপেক্ষা করে সন্ত্রাস, সংঘর্ষ ও সহিংসতা গোটা জাতিকে অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে আন্দোলনের নামে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ ও সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। বিচার-বহির্ভূত হত্যা বন্ধ করে সরকারকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বতর্মান চলমার সঙ্কট নিরসনে এবং দেশে ভবিষ্যৎ সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে গণফোরাম দেশব্যাপী গণসংযোগ এবং এপ্রিল মাসের মধ্যে ঢাকায় জাতীয় চ্যালেঞ্চ মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বৃহত্তর পরিবেশে একটি জাতীয় কনভেনশন করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

বর্তমান সঙ্কটের দায় কাদের? by হারুন-আর-রশিদ

১৩ ফেব্রুয়ারি বসন্তের প্রথম দিনেই একটি টিভি চ্যানেলে রাত ১০টায় টকশোতে যা দেখলাম তাতে মনে হলো, একটি গ্রাম্য ঝগড়াÑ সুস্থ মস্তিষ্কধারী জ্ঞানী মানুষের কথাবার্তায় এত উগ্রতা কখনো দেখিনি। দেখিনি অনুষ্ঠান সঞ্চালকের এমন দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডÑ নীরবে তিনি সদাহাস্যমুখে তা উপভোগ করছেন। মনে হচ্ছিল, সঞ্চালকারিণী একটি দলের পক্ষে ভূমিকা নিয়ে অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন। পক্ষপাত-আক্রান্ত এসব অনুষ্ঠান জাতির ভাগ্যাকাশে আরো বিপর্যয় ডেকে আনবে। মাননীয় নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান যেভাবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল ওই অনুষ্ঠানে তিনিই একক বক্তা, অন্য বিশিষ্টজনেরা তার ছাত্র। অনুষ্ঠানটির যবনিকাপাত ঘটেছে অনেকটা এভাবেÑ সব দোষ নন্দঘোষের। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত দেশে যা ঘটেছে বা ঘটছে তার সব দোষ বিএনপির। মন্ত্রীর পুরো বক্তব্যই অনুষ্ঠানে প্রাধান্য পেয়েছিল। একপর্যায়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা অব: মেজর জেনারেল ইবরাহিমের সাথে সঞ্চালককে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। ভাষা প্রয়োগে অসুস্থতার পরিচয় দিয়েছেন সঞ্চালক। এভাবে পক্ষপাত রোগে আক্রান্ত প্রচারযন্ত্র থেকে দেশ ও জাতির অপকারই বেশি হবে, যদি এভাবে চলতে থাকে। জাতির দর্পণ হলো গণমাধ্যম, সেখানেও যদি দেশের মানুষ সত্য কথাটি খুঁজে না পায়, তাহলে দেশের জন্য তা বিপর্যয় ডেকে আনবে।
দেশে হরতাল-অবরোধ এবং সহিংতার ব্যাপকতা কেন বাড়েÑ সেই প্রসঙ্গে একটি লেখায় বলেছিলাম। এসবের মূল কারণ অনেকটা প্রকৃতির মতো। মানুষ যখন প্রকৃতির বিরুদ্ধে কাজ করে তখন প্রকৃতি বসে থাকে না, রুদ্রমূর্তি ধারণ করে; এতে দেশ ও জনগণের চরম ক্ষতি হয়। ঝড়, বন্যা, গোর্কি, ভাঙন এবং অতিমাত্রায় তাপদাহ ও ঋতুচক্রের আমূল পরিবর্তনÑ এসবই মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। প্রকৃতির বিরুদ্ধে আচরণের কারণেই এসব দুর্যোগ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। তদ্রƒপ গণতন্ত্রও। কারণ তার আদর্শ আছে, নীতি আছেÑ যখন এর বিরুদ্ধাচরণ করা হবে, তখন গণতন্ত্র তার স্বাভাবিকরূপে আর থাকবে না, বিকৃত উগ্ররূপ ধারণ করবে। বর্তমানে সেটাই ঘটছে। কিন্তু দুঃখজনক যে, রাজনীতিকেরা মূল কথাটি বুঝতে চাইছেন না। ক্ষমতার মসৃণ পথ হলো গণতন্ত্র। সব দলের অংশগ্রহণের নির্বাচনে সেই গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হয়। কিন্তু ৫ জানুয়ারির ২০১৪ জাতীয় নির্বাচনটি সেই আলোকে হয়নি। জোটগতভাবে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টির এক অংশ ছাড়া দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং সংশ্লিষ্ট জোট সেই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এ ছাড়া দেশের আরো ২০ থেকে ২৫টি দল অংশগ্রহণ করেনি। কেন করেনি, সেটা এ দেশের মানুষ যেমন জানে, তেমনি জানেন রাজনীতিকেরাও। নবম সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে আওয়ামী লীগে সংবিধান থেকে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সর্বসম্মত ও পরীক্ষিত বিধানটিকে উৎপাটন করার কারণে আজকের এই সঙ্কট চরম আকার ধারণ করেছে। এটা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক সঙ্কট। এটা কোনোভাবেই আইনশৃৃঙ্খলাজনিত ঘটনা নয়। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার কারণ, গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথকে রুদ্ধ করে দেয়ার ফলে প্রথাগত নিয়মে গণতন্ত্র আর সোজা-সরল থাকেনি। গতিহারা গণতন্ত্র যে অন্য রূপ নেবে রাজনীতিসচেতন মানুষ তা সহজেই বোঝে।
এবার সঙ্কটের অবতারণা ঘটে গুলশানের ৮৬ নম্বর বাড়িতে ট্রাক বোঝাই বালুর বস্তা দ্বারা ৩ জানুয়ারি প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের পথকে অবরুদ্ধ করে দেয়ার দিন থেকে। একইভাবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্রের পথকেই শৃৃঙ্খলিত করে রাখা হয়েছে। মিটিং, মিছিল, মানববন্ধনসহ সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে দেয়া হলো সরকারি নির্দেশে। সেই কঠোর নির্দেশ এখনো বহাল আছে। আফসোসের বিষয়, বিএনপি ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় থেকে তখনকার বিরোধী দলের দাবি মোতাবেক (আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টি) তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি ১২তম সংশোধনী এনে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়ে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে দলটি। সেই মানদণ্ডে আওয়ামী লীগের চেয়ে বিএনপি অনেক বেশি সহনশীল রাজনৈতিক দল। আজ বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলের দাবিÑ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। ন্যক্কারজনক হলো, বৃহত্তর বিরোধী দলের বিরুদ্ধে সরকারি দলের সব রকম মিটিং, মিছিল, কর্মসূচি চলছে অবাধে। গণমাধ্যমে তা পুরোপুরি প্রচার করার সুযোগ পাচ্ছে। গণতন্ত্র শুধু বিশেষ দলের জন্য নয়, সব দলের মতপ্রকাশের অধিকারের নামই গণতন্ত্র। একপেশে কথিত গণতন্ত্রের ব্যবহার সহিংসতার বিকাশ ঘটায়। পেট্রলবোমা থেকে শুরু করে গুম, ক্রসফায়ার, ডাইরেক্ট গুলির হুকুমসহ যত রকম সহিংসতার পথ, সবই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথকে রুদ্ধ করে দেয়ার কারণেই ঘটছে।
১৪ ফেব্রুয়ারি ‘প্রথম আলো’ পত্রিকা লিড নিউজ লিখেছেÑ ২০ দলের আজ বিক্ষোভ। পুলিশ বিএনপিকে রাস্তায় নামতে দেবে না। বাধা দিলে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে সর্বাত্মক হরতাল। মাঠে থাকবে শুধু আওয়ামী লীগ। পুলিশ তাদেরকে সহযোগিতা করবে সহিংসতা দমনে। গণতন্ত্রকে কারা বাধাগ্রস্ত করছে এবং কিভাবে করছে পত্রপত্রিকায় তা প্রতিদিনই প্রকাশ পাচ্ছে। এর নাম কী করে গণতন্ত্র হয়? এ দেশে আইয়ুব শাহীর শাসনামলেও মত প্রকাশে এত বাধা দেয়া হয়নি। আরেকটি দৈনিকে (১৪-২-১৫) এসেছে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, জাতীয় সংলাপের আহ্বানকে অগ্রাহ্য করলে অসাংবিধানিক শক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। ওই পত্রিকায় লিড নিউজ ছিল গুলশানের ৮৬ নম্বর বাড়িতে ভাত ও পানিকষ্টে তারা ৫৬ জন, পঞ্চম দিনের খাবারও নিয়ে গেছে গুলশান পুলিশ। একটি দৈনিকে (১৪-২-১৫) লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী যদি নিজে ঘোষণা দেন, সহিংসতার পথ বন্ধ করলেই আমার দল সংলাপে বসতে রাজি। কিন্তু সে ধরনের কোনো আলামত সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে আসছে না। ফলে গণতন্ত্র আলোর পথ দেখছে না।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০ ফেব্রুয়ারির একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট মানবৃষ্ট দুর্যোগ। মূলত পঞ্চদশ সংশোধনীর পক্ষে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর একক সিদ্ধান্ত মানব সৃষ্ট এ দুর্যোগের কারণ। প্রায় দুই মাস ধরে যে সহিংসতা চলছে তার গোড়ার কারণ ক্ষমতাসীন সরকারের সীমাহীন ক্ষমতার দাপট। তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলের জন্য কথা বলার ন্যূনতম সুযোগ পর্যন্ত রাখেননি। তাদের চরম দমন-পীড়নে বিরোধী দল জনগণের চোখের সামনে থেকে প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে বলা চলে। অনেকেই বলছে, বিএনপি এখন আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি। তাদের বেশির ভাগ নেতাই কারাগারে। বাকিরা গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। প্রশ্নটা হলো, বিএনপি এখন কী করবে। রাস্তায় বের হতে পারছে না। কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারছে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের বাধার কারণে। সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে শুনেছি, মানুষ মারা বন্ধ করতে হলে ভোট দিতে হবে। আরেকটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। যত দিন নির্বাচন না হবে তত দিন অচলাবস্থা হয়তো থাকবে। এই সহজ কথাটি কেন প্রধানমন্ত্রী বুঝতে পারছেন না। ৫ জানুয়ারি একপেশে নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট নয়। তারা সব দলের অংশগ্রহণে আরেকটি নির্বাচন চায়। সব দল-সমর্থিত একটি স্থায়ী ব্যবস্থা নির্বাচনকালে থাকতে হয়। সেরকম একটা আইনি ব্যবস্থা দলিল আকারে সবার সম্মতি নিয়ে করতে হবে। অন্যথায় নির্বাচনের পর স্থূল কারচুপি, সূক্ষ্ম কারচুপি, ভোটারবিহীন নির্বাচন, ভোটকেন্দ্রে দলীয় সন্ত্রাস, এসব কথা প্রতি পাঁচ বছর পর পর শুনতে হবে। জনগণই ক্ষমতার উৎস, সেহেতু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো বিষয়ে দ্বিমত বা বহুমত দেখা দিলে, তখন মতগুলোর ওপর গণভোট নেয়া হলে কলহ-বিবাদ ও সহিংস রাজনীতি থেকে দেশবাসী রেহাই পাবেন। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতার একটি স্থায়ী ব্যবস্থা রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তাবিধানে অতি জরুরি হয়ে পড়েছে।
পেট্রলবোমা ও বালুর ট্রাক দুটোই আমাদের অসুস্থ ও দূষিত রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। বালুর ট্রাক মানুষ না মারলেও পেট্রলবোমার রাজনীতি কার্যত পেপার স্প্রে ও বালুর ট্রাক থেকে সৃষ্ট। দেশের বৃহত্তম দলের প্রধান ব্যক্তির মুখ বন্ধ করে দেয়া গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে মাঠে নামার মতো বিষয় এবং প্রতিবন্ধকতার প্রতীক, যেটা গণতান্ত্রিক বিশ্বে কোথাও নেই। বিএনপি যতই চেষ্টা করুক শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করতে সরকার এখন তা হতে দেবে না। এজেন্টরা আন্দোলনকে সহিংসতার দিকে নিয়ে যাবে আর এভাবে সহিংসতার অভিযোগে নেতাদের পাইকারিভাবে গ্রেফতারের সুযোগ মিলবে। প্রথম থেকে বোমাবাজির বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ বিএনপি করতে পারেনি বলে এ ক্ষেত্রে সরকারের কৌশলের কাছে হেরে গেছে।
ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়Ñ এই ‘থিম’ রাজনীতিকেরা স্লোগান হিসেবে ব্যবহার করেন। কিন্তু দলগতভাবে এই নীতি কেউই অনুসরণ করেন না। দলীয়করণ ছাড়া বড় দুটো দল বিগত ২৪ বছর সরকার পরিচালনা করতে পারেনি। সেহেতু নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতির কথা সুবিবেচনায় এনে সব রাজনৈতিক দলকে (নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত) একটি জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করতে হবে। এ সনদই হবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত। কাজটি করতে হবে যাতে বিজয়ী দল দেশ পরিচালনায় স্বৈরাচার বা পরিবারতন্ত্র বা জমিদারিব্যবস্থা চালু করতে না পারে। সে কথা সনদে উল্লেখ থাকতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে একক ক্ষমতা দিয়ে সম্পূর্ণ নির্দলীয় লোকদের কমিশনার নিয়োগ দিতে হবে। ধর্মগ্রন্থ নিয়ে তাদের শপথ গ্রহণ করতে হবে। দেশকে যারা ভালোবাসেন তাদের এগিয়ে আসতে হবে এসব ব্যাপারে প্রয়োজনীয় মতামত দেয়ার জন্য। উন্নত বিশ্বের সংবিধানে এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত বিধান আছে বিধায় নির্বাচনোত্তরকালে ওই সব দেশে সহিংসতা দেখা দেয় না।
১৫ ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকার সম্পাদকীয় মন্তব্য পড়ে ভাবলাম, বিএনপি আর ঢাকায় মিটিং-মিছিল করতে পারবে না। সে পথ সরকার ২০১৯ পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছে। ১৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির পূর্বঘোষিত প্রতিবাদ মিছিলটি সরকার করতে দেয়নি। বৃহত্তম বিরোধী দল থেকে আভাস দেয়া হয়েছিল যদি সরকার শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে বাধা না দেয়, তাহলে বিএনপি হরতালের কর্মসূচি থেকে বিরত থাকবে। সরকারের আচরণে মনে হলো, সরকারও বুঝি হরতাল চায়। পুলিশ প্রশাসন আগে থেকেই তাদের মিছিল করতে না দেয়ার ঘোষণা দেয়। প্রশাসন ৫ জানুয়ারির আগে থেকেই বিরোধী দলের সভা-সমাবেশের ওপর বিষেধাজ্ঞা দিয়ে আসছিল, এটি এরই ধারাবাহিকতা বলে প্রতীয়মান হয়। মহানগর পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, তারা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করতে চাইলেও অনুমতি দেবো না। কারণ আমাদের আস্থা নেই। স্পষ্টতই এ মনোভাব অযৌক্তিক এবং সঙ্ঘাতের রাজনীতির উসকানি। আইনের রক্ষক হিসেবে পুলিশ সরকারি ও বিরোধী দল নির্বিশেষে সবার প্রতি সমান আচরণ প্রদর্শন করবেÑ এটাই জাতির প্রত্যাশা।
লেখক : গ্রন্থকার, গবেষক
E.mail : harunrashidar@gamil.com

নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতের আহ্বান -অভিজিৎ হত্যায় নিন্দা

ব্লগার অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ। নিয়মিত সংবাদ-সম্মেলনে সংস্থাটির মহাসচিব বান কি-মুনের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক শুক্রবার এ কথা জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন মুখপাত্র। ডুজাররিক বলেছেন, ব্লগারের ওপর হামলা প্রসঙ্গে মানবাধিকার ইস্যুতে কর্মরত সহকর্মীদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা পরিষ্কারভাবেই এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে, দুষ্কৃতকারীদের অবিলম্বে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা হবে। তারা এমনটাও বলেছেন যে, বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের নিয়মিত ব্রিফিং এ বাংলাদেশী এক সাংবাদিকের উপস্থিতি ও প্রশ্ন করা নিয়ে ওঠা আপত্তিও নাচক করে দেন ডুজাররিক। এখানে প্রশ্নোত্তর পর্বের বাংলাদেশ অংশটুকু উপস্থাপন করা হলো।
প্রশ্ন: সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রশ্ন। সেটা বাংলাদেশে এবং এখানে বাংলাদেশের ব্যাপারে। প্রথমত, বাংলাদেশে অভিজিৎ রায় নামে একজন ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে, যা বেশ বড় ঘটনা। আমি জানতে চাই জাতিসংঘ, সিপিজে ও অন্যান্যরা সুস্পষ্ট কারণে এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে কিনা। জাতিসংঘ এ ব্যাপারে কি বলছে? আমাদের সহকর্মী এখানে বাংলাদেশ সম্পর্কে কয়েকটি ব্যাপারে প্রশ্ন করেছেন। গতকাল আমি এমএএলইউ (মিডিয়া অ্যাক্রেডিটেশন অ্যান্ড লিয়াজোঁ ইউনিট)-এর কাছে জানার চেষ্টার করেছিলাম, বাংলাদেশে যেমনটা প্রতিবেদনে এসেছে যে বাংলাদেশ সরকার ও তাদের দূতাবাস জাতিসংঘে ওই সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন থাকার বিষয়ে কিছু অনুসন্ধান করেছে এবং তারা চেষ্টা করছেন যাতে তিনি এখানে কোন প্রশ্ন না করতে পারেন। আমি জানতে চাই, এ ধরনের অনুসন্ধানের ব্যাপারে জাতিসংঘের অবস্থান কি?
মুখপাত্র: এক্ষেত্রে জাতিসংঘের অবস্থান হচ্ছে, কেউ যদি অ্যাক্রেডিটেশনের শর্ত পূরণ করেন, তারা এ কক্ষে সাদরে অভ্যর্থিত এবং আমরা তাদের যে কোন প্রশ্ন করতে স্বাগত জানাই। তাদের প্রশ্নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভূমিকা যদি বেশি দীর্ঘ হয়, সেক্ষেত্রে তা আমি সংক্ষিপ্ত করে দিতে পারি। তবে সেটা শুধু আমার চেয়ারের বিশেষ ক্ষমতা।
প্রশ্ন: সদস্য রাষ্ট্রসমূহের জন্য এটা কি যথাযথ যে, সাংবাদিকরা কি প্রশ্ন করবেন সেটা তারা নির্বাচন করে দেয়ার চেষ্টা চালাতে পারবে?
মুখপাত্র: বিষয়টি হচ্ছে, যখন কেউ এই কক্ষে অবস্থান করবেন, তারা যে কোন প্রশ্ন করতে পারবেন। ঠিক আছে? আর, ব্লগারের ওপর হামলা প্রসঙ্গে মানবাধিকার ইস্যুতে কর্মরত সহকর্মীদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। তারা পরিষ্কারভাবেই এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে, দুষ্কৃতকারীদের অবিলম্বে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিচারের আওতায় আনা হবে। তারা এমনটাও বলেছেন যে, বাংলাদেশে নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

এ সংঘাতে কার লাভ কার ক্ষতি by আনু মুহাম্মদ

এক অনিশ্চিত অদ্ভুত নিষ্ঠুর অবস্থা পার করছি আমরা। পার হতে পারব কতটা, কেউ বলতে পারে না। এমনিতেই আমাদের স্বাভাবিক জীবনের গ্যারান্টি নেই, তার ওপর ক্ষমতার সংঘাতে সবকিছুই ঝুলে গেছে অনিশ্চয়তার চিকন সুতায়। একদিকে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধে পেট্রলবোমা, আগুন ইত্যাদির আতঙ্ক, মৃত আর দগ্ধ মানুষের সারি। অন্য দিকে এই সমস্যার সমাধানের কথা বলে সরকারি সব বাহিনীর অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার প্রয়োগ। পাইকারি গ্রেপ্তার পরিণত হচ্ছে গ্রেপ্তার-বাণিজ্যে। সন্ত্রাসী দমন পরিণত হয়েছে ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা গণপিটুনিতে মৃত বলে দেখানো হচ্ছে। আতঙ্ক, অনিশ্চয়তার অন্ধকার থেকে তাই মানুষের মুক্তি মিলছে না। সরকার বলছে, সন্ত্রাসের প্রতি জিরো টলারেন্স, কিন্তু সরকারি তৎপরতা বলছে গণতন্ত্রের প্রতি জিরো টলারেন্স তাদের।
ক্ষতি হচ্ছে অনেক রকম, অনেকভাবে। যারা প্রভাবশালী, তারা নিজেদের ক্ষতি অনেক বেশি দেখিয়ে তা সরকারের কাছ থেকে আদায় করতে সক্ষম। সে ধরনের নানা তৎপরতা দেখাও যাচ্ছে। কিন্তু পরিবহনের শ্রমিক, খুদে ব্যবসায়ীসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের লাখ লাখ মানুষ, আলু উৎপাদকসহ কৃষকেরা, যাঁরা তাঁদের পণ্যের দাম পাচ্ছেন না, অভিভাবক যাঁদের সন্তানদের শিক্ষার খরচ বেড়ে যাচ্ছে, অনেকের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে অনেকের জীবন বিপর্যস্ত হচ্ছে। এঁদের সংগঠিত শক্তি নেই রাজনীতিকে প্রভাবিত করার, নেই ক্ষতিপূরণের ছোট্ট অংশ আদায় করার শক্তিও। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সমাজে-পরিবারে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায়। এর আর্থিক পরিমাপও করা সম্ভব নয়।
সবার যে অসুবিধা হচ্ছে, তা নয়। চারদিকে অনিশ্চয়তা, সন্ত্রাস, আতঙ্ক, দমন-পীড়ন; এ রকম দমবন্ধ ঘোলা অবস্থার মধ্যেও কিছু গোষ্ঠীর কাজ ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। সংক্ষেপে এখানে কয়েকটি উল্লেখ করি: (১) হল-মার্কের আড়ালে একটি চক্র সোনালী ব্যাংক থেকে চার হাজার কোটি টাকারও বেশি মেরে দিয়েছিল। অর্থমন্ত্রীর ভাষায় যা ছিল ‘কিছুই না’! সেই চার হাজার কোটি টাকা আদায়ের ‘চেষ্টার পর’ সোনালী ব্যাংক আবিষ্কার করেছে, যাদের নামে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে, সে রকম ২৫টি কোম্পানির হদিস পাওয়া সম্ভব নয়। তাদের মতে, ‘যেহেতু এই টাকা উদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা নেই’, সেহেতু তারা এই প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ঋণ ‘অবলোপন’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ এগুলো আর হিসাবে থাকছে না। খাতা পরিষ্কার, লুণ্ঠন সমাপ্ত! (২) যাঁরা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছেন, তাঁদের জন্য ঋণ পুনঃ অর্থায়ন বা রিশিডিউল করার সুযোগ আরও ১২ বছর বাড়ানো হয়েছে। সুদের হারও কমানো হয়েছে। বেক্সিমকোর পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া ঋণ নিয়ে করা আবেদন থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত। অবলোপনের পথেই এগুলোর যাত্রা। (৩) দেশি-বিদেশি সব বিশেষজ্ঞ মত উপেক্ষা করে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে সুন্দরবনধ্বংসী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে। এর নির্মাণকাজের জন্য অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করতে ভারতের এনটিপিসি চাপ দিচ্ছে। কারণ, শর্ত শিথিল না করলে ভারতের নির্ধারিত কোম্পানি এই কাজ পাবে না। (৪) এইচএসবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের অর্থ পাচারের খবর একটু হলেও প্রকাশিত হয়েছে। (৫) সরকার আগামী ছয় মাসে আবুধাবি ও সৌদি আরব থেকে ১৩ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করবে ব্যারেলপ্রতি ১০৪-১১৪ মার্কিন ডলার দামে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারদর হচ্ছে ৬০ মার্কিন ডলার। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এর জন্য মোট খরচ হবে ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা, যা প্রকৃত দামের দ্বিগুণ। মানে জনগণের বাড়তি খরচ হবে চার হাজার কোটি টাকার বেশি। (সূত্র: ডেইলি স্টার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) (৬) বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সভার আগে আগে অনেক বাড়তি সুবিধা দিয়ে নিজেদের পূর্বঘোষণা লঙ্ঘন করে, একসঙ্গে বঙ্গোপসাগরের তিনটি ব্লক কনোকোফিলিপসের নেতৃত্বাধীন গ্রুপের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। (৭) ভূমি দখল, নদী দখল অব্যাহত আছে।
জনগণের সম্মতির চেয়ে ক্ষমতার জন্য যখন দেশি বা বিদেশি শক্তি সন্ধান করতে হয়, তখন এ রকম ঘটনাই ঘটতে থাকে। জনগণকে অন্ধকারে রেখে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি হয়, নীতি হয়, তারই সম্পদ লুণ্ঠন করার জন্য তার গণতান্ত্রিক অধিকারই খর্ব করা হয়। এখানে দুই পক্ষের প্রতিযোগিতা হলো, এই কাজে কে কত দক্ষতা দেখাতে পারে, কে কত ফুলতে পারে, কে কত নিবেদন করতে পারে। বিএনপিসহ ২০-দলীয় জোট জনগণের জন্য কোনো এজেন্ডা দেয়নি, বর্তমান দুর্নীতি, লুণ্ঠন, পাচারকেন্দ্রিক তৎপরতার ভিন্ন কোনো পরিচয় তার পক্ষে দেওয়া সম্ভব না। কেননা, তার রেকর্ডও কলঙ্কিত। সুতরাং পর্দার আড়ালে দেশকে উজাড় করে কে কত দিতে পারে, তার প্রতিযোগিতাই এখন একমাত্র অবলম্বন।
ন্যূনতম গণতান্ত্রিক বিধিমালা নিশ্চিত করতে গেলে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো জমিদারিতন্ত্র, গোষ্ঠীতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্রের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর থেকে যারাই ক্ষমতায় এসেছে, তারাই ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করেছে। যে নৈরাজ্য ও ক্ষমতান্ধতা থেকে অশান্তি ও সহিংসতার বিস্তার ঘটে, তা আসলে গোড়ায় গোছানো সম্পদ কেন্দ্রীভবন প্রক্রিয়ারই ফলাফল। সংবিধানে এক ব্যক্তির হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার ক্ষেত্রে সব সরকারই ভূমিকা পালন করেছে। গণতান্ত্রিক উপায়ে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া গড়ে তোলার চেষ্টা তাই কখনো গুরুত্ব পায়নি, নির্দিষ্টভাবে কোনো ক্ষমতাসীন দলই সে পথে যায়নি। এই অক্ষমতার সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও শ্রেণির বিকাশ ধরন সম্পর্কিত, সম্পর্কিত প্রান্থস্থ পুঁজিবাদী দেশে সম্পদ কেন্দ্রীভবনে আদিম উপায় বা লুণ্ঠন পাচারের কেন্দ্রীয় ভূমিকা, সম্পর্কিত কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার সঙ্গে দেশি-বিদেশি কতিপয় গোষ্ঠী, বহুজাতিক পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের স্বচ্ছন্দ যোগাযোগের সুবিধা। এসব কারণেই এত বছরেও দেশে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া দাঁড়ায়নি।
১৯৯১ থেকে বিভিন্ন শাসনামল সাক্ষী—দুর্নীতি, দখলদারি, দলীয়করণ, জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি, সংখ্যালঘুদের জমি দখল ইত্যাদি কোনো ক্ষেত্রেই দুই দলের মধ্যে তফাত টানা যায় না। শুধু আমল থেকে আমলে বৃদ্ধি দেখা যায়। এই অভিন্নতা নিয়ে কথা বললে আওয়ামী লীগের নেতা-বুদ্ধিজীবীরা ক্ষোভ ও উষ্মা প্রকাশ করেন। তাঁরা যেখানে পার্থক্য টানেন সেটা মুক্তিযুদ্ধ। ঠিক। ক্ষমতা নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগ এই একটি জায়গায় নিজের একটি ভিন্ন পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়েছে। ভর করেছে ১৯৭১ সাল বা মুক্তিযুদ্ধের ওপর। এটাই তার বড় পুঁজি, যা তার শেষ অবলম্বন। ক্ষমতার প্রয়োজনে এই দল নব্য বিকশিত কোটিপতি সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র এবং বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থ বাস্তবায়নকারী একটি শক্তিতে পরিণত হয়েছে। দেশের স্থানে স্থানে সন্ত্রাসী গডফাদার দখলদারেরা তার মিত্র। জনগণের বদলে এরাই তার ভরসা। মুক্তিযুদ্ধে যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ অংশ নিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন, তার কিছুই আর তাঁরা এখন ধারণ করেন না। কিন্তু তাঁর ঢাল ১৯৭১। কলঙ্কিত হয় মুক্তিযুদ্ধ যখন লুটেরা দখলদার খুনিদের রক্ষায় এই ঢাল ব্যবহার করা হয়।
বিএনপির সঙ্গে ঝুলে থাকা জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীরা প্রকৃতই জনগণের বৃহৎ অংশের ঘৃণা, আতঙ্ক ও উদ্বেগের বিষয়। বিএনপি তাদের মন্ত্রী বানিয়েছে। আওয়ামী লীগ আগের বার (১৯৯৫-৯৬) জামায়াতের সঙ্গে আন্দোলন করে ক্ষমতায় যাওয়ার কারণে যুদ্ধাপরাধী বিচারে অগ্রসর হয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় গিয়ে এই বিচার শুরু করে নিজের কলঙ্কমোচনে কিছুটা সফল হয়েছে। উপরন্তু এই বিচারের মুখে জামায়াতের আন্দোলনে সঙ্গী হিসেবে বিএনপি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আওয়ামী লীগের জন্যও তাই ১৯৭১ সালকে ধরে নিজের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার প্রকল্প গ্রহণ সহজ হয়েছে। জামায়াতের প্রতি মানুষের ভয় ও ঘৃণা। অতএব আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের হিসাব হয়তো এ রকম যে এই ভয় যত বাড়ানো যায়, যত দিন টিকিয়ে রাখা যায়, ততই তাঁদের ক্ষমতা নিরাপদ।
এখন পুরো পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। হরতাল-অবরোধ আছে কেবল কাগজেই। বিএনপির কেন্দ্র, শাখা—সকল পর্যায়ে কার্যালয়, এমনকি খালেদা জিয়ার কার্যালয়ও এখন অকার্যকর। তাদের নেতা-নেত্রীদের মধ্যে এখন যোগাযোগ প্রায় অসম্ভব। প্রায় ১৫ হাজার নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার। বাকিরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। মিছিল-সভায় লোকজন নেই। বিএনপির এই হাল দেখে জনগণ কোনো সাড়া দেয়নি, পথে নামেনি। সুতরাং আওয়ামী লীগের কৌশল, প্রচার, নিয়ন্ত্রণ, দমন-পীড়ন—সবই সফল।
কিন্তু সরকারের এই সাফল্য আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কত দিন চলবে বর্তমান দমবন্ধ অনিশ্চয়তাকাল? আওয়ামী লীগ বলছে, তারা কোনো ছাড় দেবে না, নির্বাচন দেবে না, সংলাপে যাবে না, দমন-পীড়ন বন্ধ করবে না। বিএনপি জোট কোণঠাসা হয়ে বিবৃতি দিয়ে হরতাল-অবরোধের অশান্তি জারি রাখবে। সন্ত্রাসী তৎপরতায় মানুষের জীবন বিপন্ন হতেই থাকবে। খুন, আটক-বাণিজ্যে তছনছ হবে বহু পরিবার। এ রকম অস্বচ্ছতা, অগণতান্ত্রিকতায় যাদের লাভ, আখেরে তাদের তৎপরতাই শক্তিশালী হবে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কায়েমি স্বার্থগোষ্ঠীর ক্ষমতা ও প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন, দখল, জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতা ও চুক্তি চলতেই থাকবে। নানামুখী চক্রান্ত বাড়বে। নিপীড়নের নানা বাহু সম্প্রসারণে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের জায়গাগুলোও সংকুচিত হতে থাকবে। পুরো পরিস্থিতির প্রধান শিকার অতএব জনগণ, দেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu

ঘুমের ঘাটে by জাহেদ মোতালেব

ছোট বোন পারুল অদ্ভুত ধরনের। ধানের পাতার মতো সুন্দর। কেবল স্বপ্ন দেখে। কত রকম যে তার স্বপ্ন! কেউ শুনে শেষ করতে পারবে না। বিরক্তি চলে আসতে পারে। বলবে, যা তো, তোর স্বপ্ন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়। একদিন সে সত্যি সত্যি ঘুমিয়ে পড়ে। তার ঘুমের মধ্যে পাথরঘাটা হয়ে যায় ঘুমের ঘাট। ঘুমের ঘাটে একদল দস্যু আসে। তারা পারুলকে নিয়ে যায়। সুলতান কী করবে? ঘুমের ঘাটে একটা জাহাজ তৈরি করার কথা ভাবে। মনে হয় ইতিহাসের ক্ষয়ে যাওয়া ধূসর পৃষ্ঠা দিয়ে তৈরি হবে জাহাজের পাল। পাথরঘাটা কিংবা বন্দরগ্রামের পুরোনো সেই সব বাড়ির কাঠ, যাতে এখনো পর্তুগিজ দস্যু বা আরাকানিদের গন্ধ রয়ে গেছে, তা দিয়ে তৈরি হবে জাহাজ। তারপর সে বেরিয়ে পড়বে। কীভাবে পারুলকে খুঁজবে, ব্রিজঘাটে বসে সম্ভবত তা-ই ভাবছিল। বাবলু এসে তার সামনে মেলে ধরে আসমানতারা, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের উপন্যাস। সে পড়ে: ‘জীবন তো এক। ওই আগুনের মতো। মনে হয় রূপ তার অন্তহীন।’ বাঁ হাতে বইটা সরিয়ে দেয়।
বাবলু বলল, ‘চা খাবি?’
সুলতান দেখে, গাঙচিলগুলো ইচ্ছেমতো উড়ছে। তার মনটাও আজ উড়ুউড়ু। অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে পারুলের সঙ্গে। কথাগুলো যদি ক্যাসেটের ফিতা হয়ে যায়, ফিতা নিয়ে সে ছেলেবেলার মতো দৌড়াবে। পেছনে পারুলকে কান্না করতে দেখলে থামবে। তাকে ফিতা দিয়ে দেবে। তখন হাসি ফুটবে তার মুখে। বাবলু তার কলেজজীবনের বন্ধু। থিসিস নিয়ে কথা বলতে চায়। সে ‘অমানুষের ইতিহাস’ বিষয়ে চিন্তা করে। তাকে ‘মধ্যযুগে সমাজে নারীর ভূমিকা’ নিয়ে থিসিস লিখতে হবে। সে ওই সময়ের সমাজের কথা ভাবে। নিজেকে প্রশ্ন করে, সমাজ কীভাবে চলে? মনে হয়, সমাজ নারীর চোখে বাসা বাঁধে। কিন্তু পুরুষ এসে বাসাটায় ময়লা জমায়, ভেঙে ফেলতে চায়। এমন কথা থিসিসে লিখতে পারব? ভাবে সে। সুলতান ভাবে, সময়টা ঝামেলার মহারাজ। পাখি হয়ে ঠোঁটে পোকা নিয়ে কেবল ওড়ে। দুপুরে মা ডিম মামলেট করেছিল। একটা ডিম তারা চারজনে ভাগ করে খেত। আজ ডিমটা তিন ভাগ হয়েছে। তাই পারুলের কথা বেশি মনে পড়ছে। মামলেট সে খুবই পছন্দ করত। সে কি মামলেট হয়ে ভোগে চলে গেছে? এ কথা ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল। কষ্ট যেন কচুরিপানা, কর্ণফুলীর পানিতে ভাসে। বাবলুর মন বিষণ্ন। মুখটা এখন জোয়ারের পানির মতো থমথমে। সে কি পারুলের কথা ভাবছে? মাঝি যেভাবে বসে বইঠা চালায়, তার ভঙ্গি তেমন। মনে হয়, নৌকা চালিয়ে সে কোথাও চলে যাচ্ছে।
দুই বছর ধরে সুলতান বেকার। আসমানতারার প্রচ্ছদ দেখে। আপনমনে বলে, ‘প্রলেতারিয়েত কী রকম বেঁচে থাকে বুঝতে পারছি।’ নগরের লাইটগুলো মানুষের মুখে রং মাখতে মাখতে ঝাপসা হয়ে গেছে। সুলতান মাথা নিচু করে হাঁটে। বাসায় যাচ্ছে। একটা লোককে তাড়া করেছে রাস্তার মেয়েটা। বলে, ‘আমার টাকা দিয়ে যা।’ লোকটার পিছু পিছু মেয়েটা কর্ণফুলীর পাড়ে পৌঁছে যায়। সুলতানও তাদের পিছে হাঁটে। লবণের কারখানার গন্ধ, পানি আর স্রোতের গন্ধে সে ভুলে যায় কেন এসেছে। তার মনে হয়, সামনে অন্ধকারের মাঠ। এখানে কি কোথাও ঘাট ছিল? সেই ঘাটে অনেক কাল আগে সে একবার হারিয়ে গিয়েছিল! তার ইচ্ছে করে হারানো সেই সময়কে খুঁজে পেতে। তাই বুক ভরে বাতাস নেয়। তার চোখে পারুলের মতো টলটল করে কান্না। হতে পারে কৃষ্ণপক্ষের রাত অথবা রুপালি জোছনার। তাতে কিছু যায়-আসে না। কানফুল হারানো মেয়েটি কর্ণফুলী থেকে কাঁদতে কাঁদতে উঠে এলেও কেউ দেখতে পাবে না। কারণ, রাত এখন বয়স্ক মানুষের মতো থুত্থুড়ে।
অনেক দিন আগে এ রাস্তা দিয়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে যাওয়ার সময় কোনো পর্তুগিজ, ফরাসি কিংবা ইংরেজ পারুলের মতো কাউকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল কি না, কর্ণফুলী আর বঙ্গোপসাগরের পানিতে মিশিয়ে গিলে খেয়েছিল কি না, তা আজ কে বলতে পারে? সেই নারীর চোখের রং পারুলকে নিয়ে যাওয়া দুর্বৃত্তদের চোখে আছে কি না, তারা ওসব দস্যুর বংশধর কি না, তা-ও বা কে জানতে চাইবে? কিন্তু মানুষ যে এখনো পুরোনো মানুষের মতো রয়ে গেছে, তা কি পারুল জানত না?
সুলতান হাঁটছে ধীর পায়ে। এই শরতেও পায়ে পায়ে কুয়াশা। পুরোনো গির্জার ওপর যে ঘণ্টা কিংবা সেন্ট প্লাসিডস স্কুল, সারিবদ্ধ কবর আর ফুল ছুঁয়ে কে যেন এদিকে আসে। এসে তার কানে কানে বলে পাথরঘাটায় পাথরচাপা পড়া কোনো কথা। কিন্তু কথাগুলো কুয়াশা হয়ে যায়। তাই সে বুঝতে পারে না। ভাবে, প্রতিটা দিনের মধ্যেই হয়তো লুকানো থাকে ইতিহাস। এ রকম রাতে কেন একটা পুরুষ কুকুরের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে? কেন খোয়া ওঠা রাস্তার মতো মেয়েটা রাস্তারই সঙ্গী হয়ে থাকে? এসব প্রশ্ন তার কাছে কেবলই কুয়াশা। সেই কুয়াশা নিয়ে সে শীতের বাড়ি বেড়াতে যায়। দুপুরে ভাত খেয়ে পারুলের সঙ্গে রোদ পোহায়। পারুলকে ছায়া দিয়ে দাঁড়ায়। তখন পারুল মোড়া থেকে উঠে তার কানটা টেনে দেয়। সুলতান মায়ের কাছে নালিশ করে। মা হাসে। সেই হাসিতে শীত কেটে উষ্ণতা হাসনাহেনার গন্ধের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পাথরঘাটার সেই পাথরগুলো আজ কোথায়? পারুলের উজ্জ্বল চোখের ঘুম-ঘুম ভাব হয়ে তা কি হারিয়ে গেছে? নাকি এ পাথর সুলতানের দুই চোখে চাপা পড়ে আছে! চাপা পড়া পাথরে ঘুমের হাট বসেছে?
ঘরে গেলে পাগলপ্রায় মা জিজ্ঞেস করে, ‘পারুল কোথায়?’
চুলে হাত বুলিয়ে চুপ করে বসে থাকে সুলতান। মা আবার জানতে চায়। সে হেসে বলে, ‘মা! আজ একটা ঘটনা ঘটছে। দেখলাম, পারুলের মতো একটা মেয়ে...’
এ কথা শুনে মার চোখ দিয়ে পানি গড়ায়। সুলতান ভাবে, পাথরঘাটায়, এ নগরে কিংবা দূর দূর গ্রামে যেসব দস্যু লুটপাট চালিয়েছে, তাদেরই কোনো বংশধর হয়তো নিয়ে গেছে পারুলকে। আজ এক সপ্তাহ হয়ে গেল, পুলিশ কিছুই করতে পারল না। মাঝিরঘাটের নসু মালুমকে দিয়ে এবার সত্যি সত্যি জাহাজটা বানাবে। পারুলকে খুঁজে পেতেই হবে। ভাবতে ভাবতে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। তবে তার মধ্যে বানের পানির মতো রাগ জমে। এই পানিতে কী ভেসে যায় কে জানে!

‘নতুন নির্বাচন বাংলাদেশে পরিবর্তন আনতে পারে’ -(ইইউ) সংসদ সদস্য ইওসেফ ভাইডেনহলৎসার

নতুন একটি নির্বাচন বাংলাদেশে পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সংসদ সদস্য ইওসেফ ভাইডেনহলৎসার। সম্প্রতি বাংলাদেশ ঘুরে এসে ডয়েচে ভেলেকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে গত ১৬ থেকে ২০শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা সফর করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকারবিষয়ক সাব-কমিটি। এ কমিটি শুধু সরকার নয়, বিরোধী দলের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। বাংলাদেশ সফরের সময় ওই সাব-কমিটিতে ছিলেন অস্ট্রিয়ার এমপি ইওসেফ ভাইডেনহলৎসার। ডয়েচে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, বাংলাদেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল নিজেদের মধ্যে সমঝোতা থেকে বহু দূরে রয়েছে। তবে সঠিক পথে যাওয়ার মতো অবস্থায় এখনও রয়েছে দেশটি।
ডিডাব্লিউ: বাংলাদেশ সফর করে সেখানকার পরিস্থিতি কেমন মনে হলো আপনার?
ইওসেফ ভাইডেনহলৎসার: রাজপথে সংঘর্ষের খুব একটা প্রমাণ নেই। কিন্তু আপনি যদি ভিন্ন ভিন্ন মতের মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, সরকারের প্রতিনিধি থেকে সাংবাদিক পর্যন্ত, তখন সংঘাতের গভীরতাটা ঠিকই উপলব্ধি করতে পারবেন। সাধারণ মানুষের মৃত্যুও টলাতে পারছে না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার অবস্থানকে। উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলার পর যে কেউ বুঝতে পারবে, দলগুলোর মধ্যে মতৈক্যের কোন একক রেখা নেই। নেই দুই পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের পথ, কেননা কোন পক্ষই ছাড় দিতে রাজি নয়। সরকার ও বিরোধীপক্ষ উভয়েই আমাদের ভিডিও দেখিয়েছে, যেগুলোতে প্রাণঘাতি হামলার জন্য তারা একে অপরকে দায়ী করেছে। পরিস্থিতি অত্যন্ত নৈরাশ্যজনক বলে মনে হচ্ছে এবং এতে আমি সত্যিই খুব উদ্বিগ্ন।
ডিডাব্লিউ: বর্তমান পরিস্থিতি শিগগিরই ভাল হওয়ার কোন ইঙ্গিত কি দেখা যাচ্ছে?
ইওসেফ ভাইডেনহলৎসার: অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে আমি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেকগুলো ইতিবাচক দিক দেখতে পাই। অর্থনীতি ভালভাবে চলছে। এ ছাড?া সে দেশে সংঘটিত দুর্নীতি এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো নিয়েও দেশটির মানুষের সচেতনতা বাড়ছে। সব মিলিয়ে ইতিবাচক দিকে অগ্রসর হওয়ার মতো বেশ কয়েকটি ভাল দিক দেশটির রয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠিত অভিজাত শ্রেণী এ উন্নয়নের পথে এক ধরনের অন্তরায়। আমার মনে হয়, দেশটির শীর্ষ দুই নেত্রী বর্তমান বিসংগত পরিস্থিতি বা অচলায়তনের জন্য দায়ী।
ডিডাব্লিউ: রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক উদ্যোগ তাহলে কিভাবে নেয়া যেতে পারে?
ইওসেফ ভাইডেনহলৎসার: দেশটির প্রগতির জন্য আসলে একটি ‘কমপ্রিহেনসিভ কনসেপ্ট’ বা ‘সমন্বিত পরিকল্পনা’ প্রয়োজন। এজন্য একটি সমন্বিত, অংশগ্রহণমূলক এবং গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যা জনগণকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দেবে। আর একমাত্র সেটা করা হলেই বাংলাদেশ খুব তাড়াতাড়ি এ চলমান সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের সঙ্গে আলোচনার সময় উভয় পক্ষই ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরের বদলে শুধু অতীতের বিভিন্ন ঘটনা টেনে এনেছে। আমার মনে হয়, গোটা রাজনৈতিক পরিকাঠামো এ দুই বড় নেত্রীর জন্য ভুগছে, যারা কিনা অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং পারিবারিক ইতিহাসের মধ্যেই নিজেদের আটকে রেখেছেন। এজন্য একটা নতুন নির্বাচন বাংলাদেশে অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে তা রাজনীতিতে কিছু নতুন মুখ এবং নতুন মানুষ নিয়ে আসতে পারে। শুধু তখনই পরিস্থিতিতে একটা পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে হয়।
ডিডাব্লিউ: বাংলাদেশের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্ভাব্য সমঝোতাকারী হিসেবে আজকাল ইউরোপের নাম উঠে আসছে। ইইউ কি সেজন্য প্রস্তুত?
ইওসেফ ভাইডেনহলৎসার: বাংলাদেশের কিন্তু মধ্যস্থতাকারীর তেমন একটা দরকার নেই। তবে আমার মনে হয়, দেশটির বিদেশ থেকে চাপ প্রয়োজন। সেটা না হলে কাজ হবে না। আর এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এ অঞ্চল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য সহযোগী। তা ছাড়া সংঘাত পরিহার বা নিরসনে ইউরোপের একটা ঐতিহ্য রয়েছে। সেটা বিবেচনায় নিলে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা-সংলাপে আমরা যথার্থ মধ্যস্থতা করতে পারি। তবে উদ্যোগটি অবশ্যই বাংলাদেশের তরফ থেকে আসতে হবে।

বল এখন সরকারের কোর্টে by কাজী সাইদ

‘টানা অবরোধে বিপর্যস্ত দেশ’ শিরোনামে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ নয়া দিগন্তের সম্পাদকীয় বলছে, ‘প্রায় দেড় মাস ধরে টানা অবরোধে ব্যবসায়ের ক্ষতি এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতির ক্ষতি এক বছরের বাজেটের অর্ধেক ছাড়িয়ে গেছে। পত্রপত্রিকায় প্রতিদিন খবর আসছে দেশের বিভিন্ন খাতের বিপর্যস্ত অবস্থার। বলা হচ্ছে, অবরোধে বিপর্যস্ত দেশের চিংড়ি শিল্প খাত, পোশাক রফতানি খাত, ুদ্র শিল্প খাতসহ এমন আরো অনেক খাত।’ অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘অবরোধে ভয়াবহ ক্ষতি কৃষি খাতের। দেশের ব্যবসায়ী মহলের হাহাকারের শেষ নেই।’ পত্রিকাটি আরো লিখেছে, ‘কিন্তু সরকারপক্ষ স্বীকারই করতে চাচ্ছে না, দেশে কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট আছে। ফলে বিদ্যমান সহিংসতা ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অবসান ঘটার কোনো পথ খুলছে না। অথচ সব মহলের এক কথা, ৫ জানুয়ারির অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এ রাজনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান হচ্ছে সবার অংশগ্রহণে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন।’ ৬ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ২০ দলীয় জোটের অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহারের কোনো আলামত দৃশ্যমান নয়। বার্তা সংস্থা এএফপির সাথে সম্প্রতি এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বিরোধী জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, দেশের বিবেকবোধসম্পন্ন প্রত্যেকে জানেন, বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের একটিই মাত্র পথ আছে। তা হলো সবার অংশগ্রহণমূলক, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও অর্থপূর্ণ নির্বাচন। যত দ্রুত তা আয়োজন করা হবে, ততই তা সবার জন্য মঙ্গলজনক হবে। বিলম্ব করা হলে সঙ্কট আরো জটিল আকার ধারণ করতে পারে। খালেদা জিয়া আরো বলেন, ‘আমরা বলেছি সুষ্ঠু নির্বাচন হতে হবে আলোচনার মাধ্যমে ও সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে। আমরা সেটিই চেয়েছি। সব দলের জন্য যাতে সমান ক্ষেত্র (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) তৈরি হয়; সে জন্য আমাদের নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও নির্বাচনী আইন নিয়ে কিছু সিদ্ধান্তে আসতে হবে। কিছু দিন আগে আমরা সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছি, কিন্তু তাদের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাইনি। সপ্তাহখানেক আগের এ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, বছরের শুরু থেকে সে পর্যন্ত বিরোধী দলের ১৮ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর থেকে ক্রমাগত বিএনপি-জামায়াতের ওপর নানা আঙ্গিকে নির্যাতন-নিপীড়নের যে ধারা অব্যাহত থাকে, তা দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সংবিধান থেকে তিন জোটের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একতরফাভাবে বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনপদ্ধতি চালুর মধ্য দিয়ে আজকের এ রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষবৃক্ষ রোপণ করা হয়। বিরোধী রাজনৈতিক দলকে বিকলাঙ্গ করার পরিণাম কী, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৩তম রাষ্ট্রপতি হ্যারি এস ট্রুম্যানের উদ্ধৃতি থেকে স্পষ্ট। তার বিখ্যাত উক্তি, 'Once a government is Committed to the principle of silencing the voice of opposition, it has only one way to go, and that is down the path of increasingly repressive measures, until it becomes a source of terror to all its citizens and creates a country where everyone lives in fear.' দেশের জনগণ এখন প্রতিটি মুহূর্তে ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত।
বিরোধী দলের ৭ দফা প্রস্তাব
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১৪ সংবাদ সম্মেলনে দেশের চলমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে ৭ দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয় : ০১. একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন এবং সে নির্বাচনে যেন সব রাজনৈতিক দল অংশ নিতে পারে এবং সব পক্ষের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা হয়। ০২. গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ, দক্ষ, যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে, যাতে জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) প্রয়োজনীয় সংশোধন করা যায়। ০৩. নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সাথে সাথে জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত হবে এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর সম্মতিক্রমে গঠিত নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। ০৪. নির্বাচনের উপযোগী শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারা দেশে সশস্ত্রবাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন। ০৫. নির্বাচনী প্রচারাভিযান শুরু হওয়ার আগেই চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনা, ০৬. সব রাজবন্দীকে মুক্তিদান, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার। ০৭. বর্তমান সরকারের আমলে বন্ধ করে দেয়া সব সংবাদপত্র ও স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল খুলে দিতে হবে। মাহমুদুর রহমানসহ আটক সব সাংবাদিককে মুক্তি দিতে হবে। উল্লেখ্য, এ প্রস্তাবনা তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি দল কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়।
প্রহসনের নির্বাচনে এরশাদ
৫ জানুয়ারি ২০১৪ অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাক্কালে বিশেষ দূতিয়ালির জন্য এক সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশে আসেন সদ্য বরখাস্ত হওয়া ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। বাংলাদেশে নির্বাচন নিয়ে তখন তার ভূমিকা এতই বিতর্কিত ছিল যে, কূটনৈতিক মহলে তা সমালোচনার ঝড় বইয়ে দেয়। অনেকেরই ধারণা, তার বিতর্কিত ভূমিকার কারণেই ‘এক তরফা’ সে নির্বাচনের নামে প্রহসন অনুষ্ঠিত হতে পেরেছিল। বিশেষ করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হু. মু. এরশাদের সাথে তার কথোপকথনকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত আচরণ বলে অভিহিত করেন। নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে জাপা চেয়ারম্যান এরশাদের সাথে যে আলোচনা হয়েছিল, পরে এরশাদ সংবাদ সম্মেলন করে তা গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেন। এরশাদের ভাষায় : ‘উনি (সুজাতা সিং) আমাকে বলেছেনÑ আপনারা নির্বাচনে থাকুন।’ জবাবে আমি বলেছি, ‘দেশের এখন যে অবস্থা তাতে নির্বাচন করা সম্ভব হবে না, নির্বাচনের কোনো পরিবেশ নেই। সারা দেশ, গ্রামগঞ্জে সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে। আমরা সবাই নিরাপত্তাহীনতায়, আমার দলের নেতা ও প্রার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায়, কেউ নির্বাচনী এলাকায় যেতে পারছি না।’ সুজাতা সিং আমাকে বলেছেন, ‘কেন, এই সরকার তো ভালো কাজ করেছে, আপনি থাকুন।’ জবাবে আমি তাকে বলেছি, ‘আপনি রাস্তায় গিয়ে একজন মানুষকে জিজ্ঞেস করুন, কেউ এ সরকারের পক্ষে বলবে না, তারা সবাইকে শত্রু বানিয়ে ফেলেছে। তাদের বাক্সে কোনো ভোট পড়বে না। সঠিক নির্বাচন হলে এক শতাংশ ভোটও পাবে না। আমরা সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচনে যাবো না।’ তখন এরশাদকে সুজাতা সিংয়ের পাল্টা প্রশ্ন ছিল, ‘তাহলে তো জামায়াত-শিবির ক্ষমতায় আসবে, আপনি কি চান তারা আসুক?’ এই সুজাতা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাথে আলাপ করে বলেছিলেন, ভারত বাংলাদেশে স্থিতিশীল পরিবেশ দেখতে চায়। অন্য দিকে আওয়ামী লীগকে যেকোনো মূল্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সহিংসতা ও বিরোধী দলকে দমনের জন্য ভারতের পাশে থাকার পূর্ণ নিশ্চয়তা দেন। নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে অটল থাকলেও অনেক নাটকীয়তার পর এরশাদের দল তাতে অংশ নেয়। হ্যারি এস ট্রুম্যানের আরেকটি বিখ্যাত উক্তি এমনÑ 'My choice early in life was either to be a piano player in whorehouse or a politician. And to tell the truth, there's hardly any difference. (শৈশবে ইচ্ছে ছিল হয় বেশ্যালয়ের পিয়ানোবাদক অথবা রাজনীতিবিদ হওয়ার। এখন সত্য বলতে কি, দুটোর মধ্যে কোনো তফাত খুঁজে পাই না)।
সুজাতা সিংয়ের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী নির্বাচনী প্রহসনের মাধ্যমে একটি সংসদ গঠিত হয়েছে। এরশাদবিরোধী দলের নেতা হতে পারেননি, পদটি বাগিয়ে নিয়েছেন তার প্রথমা স্ত্রী। এ সংসদে বর্তমানে সংরক্ষিত মহিলা আসনের ৫০ জনসহ সর্বমোট ৩৫০ জন সদস্যের মধ্যে ২৭৬টি আওয়ামী লীগের, ৪০টি জাতীয় পার্টি এরশাদ), দু’টি জাতীয় পার্টি (মঞ্জু)। এ ছাড়া সাতটি মেননের ওয়ার্কার্স পার্টির, ১৬টি ইনুর জাসদের, দু’টি মাইজভাণ্ডারির তরিকত ফেডারেশনের, একটি বিএনএফের এবং স্বতন্ত্র ১৬টি। ১৮ মার্চ ২০১৪ ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ প্রতিবেদন’ উপস্থাপনকালে টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান দশম সংসদ বিরোধী দলবিহীন সংসদ। আক্ষরিক অর্থে বিরোধী দল থাকলেও কার্যত কোনো বিরোধী দল নেই। এই বিরোধী দলবিহীন সংসদের স্থায়িত্ব কেমন হবে জানা নেই।
দাবি উপস্থাপন, দাবির সমর্থনে মিটিং, মিছিল, হরতাল, অবরোধ, গণকারফিউ, অসহযোগ আন্দোলনÑ এসব এ দেশে নতুন কিছু নয়। সরকারের দমন-পীড়ন, জেল-জুলুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিনা বিচারে আটকÑ এসবের অভিজ্ঞতা দেশবাসীর রয়েছে। বিরোধী দলের মিটিং-মিছিলে বোমা হামলা, যানবাহনে অগ্নিসংযোগে পুড়ে গিয়ে নাগরিকের জীবনহানি, সম্পদহানি, জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা নতুন কছিু নয়। ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচন আগের ’৮৮ ও ’৯৬-এর ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে সরকারি কূটকৌশল ও জালিয়াতির মানদণ্ডে। বর্তমানে দেশে যে সঙ্কট চলছে, তা রাজনৈতিক এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানযোগ্য। এ ঔদার্য সরকারের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের বিবেকের দংশন থেকেই উৎসারিত হওয়া উচিত। বল এখন সরকারের কোর্টে।
মাও সে তুং বলেছেন, ‘অতীতের ভুলগুলো অবশ্যই প্রকাশ করে দিতে হবে। অতীতের খারাপ বস্তুকে বৈজ্ঞানিক মনোভাব দিয়ে বিশ্লেষণ করা ও সমালোচনা করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতের কাজ আরো সতর্কভাবে সম্পন্ন করা যায়। এটাই হচ্ছে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের ভুল এড়ানোর অর্থ। তিনি আরো বলেছেন, ‘কোনো প্রক্রিয়ায় যদি কতকগুলো দ্বন্দ্ব থাকে তবে তাদের মধ্যে অবশ্যই একটা প্রধান দ্বন্দ্ব থাকবে, যা নেত্রীস্থানীয় ও নির্ণায়ক ভূমিকা গ্রহণ করবে। অন্যগুলো গৌণ ও অধীনস্থ স্থান নেবে। তাই দুই বা দুয়ের অধিক দ্বন্দ্ববিশিষ্ট কোনো জটিল প্রক্রিয়ার পর্যালোচনা করতে গেলে আমাদের অবশ্যই তার প্রধান দ্বন্দ্বকে খুঁজে পাওয়ার জন্য সব প্রচেষ্টা চালাতে হবে। এই প্রধান দ্বন্দ্বকে আঁকড়ে ধরলে সব সমস্যারই মীমাংসা করা যায়।’ একতরফা, একগুঁয়েমি ও প্রহসনের নির্বাচনই সব সঙ্কটের কারণÑ এতে তো কারো সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই।
Kazi_Sayed@yahoo.com

অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড- কিলিং মিশনে দুই পেশাদার

‘আমেরিকা থেকে দেশে এলেই খুন করা হবে। মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকেন।’ এ ধরনের হুমকি দিয়ে প্রায়ই বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী অভিজিৎ রায়কে ই-মেইলে হুমকি দেয়া হতো। দেশে আসার পরও ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি ফেসবুক আইডি থেকে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এমনকি শুক্রবার সকালেও অজ্ঞাত স্থান থেকে অভিজিৎ রায়ের বাবা শিক্ষাবিদ অজয় রায়কে মোবাইল ফোনে হুমকি দেয়া হয়েছে। পুলিশ, নিহত অভিজিতের পরিবার ও ব্লগাররা এসব তথ্য জানিয়েছেন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে জানা গেছে, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় দুই কিলার। তারা  ধারালো চাপাতি দিয়ে অভিজিৎ ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে কুপিয়ে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়। তবে ওই দুই কিলার সম্পর্কে এখনও কোনো তথ্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। নিহতের পরিবার সরাসরি অভিযোগ করছে- উগ্রপন্থী জঙ্গিরা অভিজিৎকে নৃশংসভাবে খুন করেছে। কারণ এর আগে অভিজিৎকে হুমকি দিয়ে আসছিল জঙ্গিরা। পুলিশ বলছে, হত্যার ধরন দেখে মনে হয়েছে উগ্রপন্থী জঙ্গিরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ইতিপূর্বে এ ধরনের যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, অভিজিৎ খুনের ধরন একই। তাছাড়া হত্যার দায় স্বীকার করে ‘আনসার বাংলা সেভেন’ নামে একটি সংগঠন টুইটারে একটি পোস্ট করেছে। ময়নাতদন্তসংশ্লিষ্ট চিকিৎসক বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়েছে তারা খুবই দক্ষ ও পেশাদার। কোথায় মারলে মানুষ মারা যায় তা তাদের খুব ভালো করেই জানা আছে।
শুক্রবার দুপুরে গোয়েন্দা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ডিবির উপপুলিশ কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় বলেন, কারা খুন করেছে এখনও নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। তবে উগ্রপন্থী জঙ্গিরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারে। আনসার বাংলা সেভেন নামে যে সংগঠনটি অভিজিৎ হত্যার বিষয়ে টুইটারে একটি পোস্ট দিয়েছে সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রমনা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার শিবলি নোমান বলেন, হুমায়ুন আজাদ ও অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ধরন একই রকম।
অভিজিৎ রায়কে হত্যার জন্য ধর্মীয় উগ্রবাদীদের দায়ী করে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ার ডাক দিয়ে শুক্রবার টিএসসিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন ছাত্র-শিক্ষক, নাগরিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, মানবাধিকার কর্মী ও প্রগতিশীল সংগঠনের নেতাকর্মীরা। বক্তারা বলেন, লেখক হুমায়ুন আজাদ ও ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার ধারাবাহিকতায় জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী বিজ্ঞানমনস্ক ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখক অভিজিৎকে হত্যা করা হয়েছে। তারা এ ঘটনার জন্য পুলিশ ও সরকারকে দায়ী করছেন। অবিলম্বে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের দাবি জানান তারা।
বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৯টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পূর্ব-উত্তর কোণে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফুটপাতে অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। কয়েকজন পথচারী অভিজিৎ ও রাফিদাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় (ঢাকা মেট্রো-থ-১৩-৩৯৫৮) করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। রাত সাড়ে ১০টার দিকে অভিজিতের মৃত্যু হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাফিদাকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় শুক্রবার সকালে নিহতের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায় বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি করে শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেছেন। শুক্রবার বিকালে মামলাটি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এদিকে দুপুরে অভিজিতের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে মর্গের মরচ্যুয়ারিতে (হিমঘর) রাখা হয়েছে। অভিজিতের ছোট ভাই অনুজিৎ রায়ের স্ত্রী কেয়া বর্মণ জানান, অভিজিৎ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রোববার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ২ ঘণ্টা তার মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে রাখা হবে।
মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী প্রকৌশলী অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা- তারা দুজনই মৌলবাদবিরোধী লেখালেখি করতেন। তার হত্যাকাণ্ডের পর উগ্রবাদীদের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ফারাবী সাইফুর রহমানের নাম উঠে আসে। অভিযোগ, এই ফারাবীই অভিজিৎকে হুমকি দিয়ে আসছিল। জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে কয়েক বছর আগে ফারাবীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত বছর সে জামিনে বের হয়। ফারাবীকে খুঁজছে পুলিশ।
কিলার ছিল দু’জন : প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয় দুই কিলার। একজন খাটো ও স্বাস্থ্য মোটা, তার গায়ে ছিল সাদা পোশাক। অপরজনের গায়ে ছিল কোর্ট। তুলনামূলক লম্বা। দুই থেকে তিন মিনিটের মধ্যে কুপিয়ে তারা ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। হত্যার পর কিলাররা দুটি ধারালো চাপাতি ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যায়। শাহবাগ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডে দুই কিলার অংশ নেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। দু’জন সরাসরি অংশ নিলেও আশপাশে তাদের আরও লোকজন ছিল। ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে কুপিয়ে পালিয়ে যায় তারা। ঘটনাস্থল থেকে দুটি চাপাতি ও একটি ঘাড়ের ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ২০ গজ উত্তরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পাশের ফুটপাতে বই বিক্রেতা রুবেল মিয়া বলেন, ‘রাতে (বৃহস্পতিবার) বাঁচাও বাঁচাও করে কে বা কারা চিৎকার করছিল। ভয়ে আমরা কেউ এগিয়ে যাইনি। এরপরই কয়েকজন আমাদের বলে, ‘গ্যাঞ্জাম হয়েছে লাইট বন্ধ করে দেন। এরপরই আমরা লাইট বন্ধ করে দেই।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী বই বিক্রেতা বলেন, ‘আমাদের যখন লাইট বন্ধ করতে বলল, সেটি হামলার পরে কী আগে তা বলতে পারব না।’ বাঁশি বিক্রেতা মো. লাল মিয়া বলেন, ‘শুধু চিৎকার চেঁচামেঁচি শুনেছি।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে ফুটপাতে বইয়ের দোকানের এক কর্মচারী জানান, ঘটনাস্থল থেকে দু’জনকে পালিয়ে যেতে দেখেছেন তিনি।
খুনিরা দক্ষ : শুক্রবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে অভিজিৎ রায়ের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ। তিনি বলেন, নিহতের মাথার পেছনে ডান পাশে তিনটি গভীর আঘাতের চিহ্ন ছিল, ভারি অস্ত্র দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। একটি আঘাত থেকে আরেকটি আঘাতের দূরত্ব প্রায় আধা ইঞ্চি। কোপগুলো এতই জোরাল ছিল যে, মাথার চামড়া ও হাড় কাটার পর মগজও কেটে গেছে। এতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া পিঠে ও বাঁ-চোখের ভ্রুর কাছে জখমের চিহ্ন রয়েছে। ডা. সোহেল বলেন, যেভাবে কোপ মারা হয়েছে এটা খুব দক্ষ হাতের কাজ। হামলাকারীরা জানে, কোথায় আঘাত করলে মানুষ মারা যায়। মাথায় যে তিনটি আঘাত করা হয়েছে তা একটি আরেকটির ওপর পড়েনি। দক্ষ কিলার ছাড়া এভাবে মানুষ হত্যা করা সম্ভব নয়।
সুরতহাল রিপোর্ট : লাশের সুরতহাল তৈরি করেন শাহবাগ থানার এসআই সুব্রত গোলদার। তিনি জানান, নিহত অভিজিতের শরীরে অন্তত সাতটি কাটা জখমের চিহ্ন রয়েছে। মাথার পেছনের আঘাতগুলোর মধ্যে একটি ছয় ইঞ্চি ও আরেকটি তিন ইঞ্চি লম্বা। এর গভীরতা প্রায় দুই ইঞ্চি। এর পাশেই দুটি গভীর কাটা জখম। এ ছাড়া কপালের বাম পাশে একটি জখম, ঘাড়ের পেছনে একটি, পিঠের বাম পাশে একটি কাটা জখম রয়েছে। ডান হাতের কব্জি ও ডান পায়ের পাতায় জখমের চিহ্ন রয়েছে।
এজাহার : অভিজিতের বাবা অজয় রায় বাদী হয়ে শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টায় শাহবাগ থানায় হত্যা মামলা করেছেন। মামলা নম্বর ৫১। শাহবাগ থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম বলেন, মামলায় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। সংখ্যা উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি বিকালে ডিবিতে হস্তান্তর করা হয়েছে বলে জানান তিনি। ওসি বলেন, সকালে থানায় আসার আগে অভিজিতের বাবা অজয় রায়কে অজ্ঞাত স্থান থেকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেয়া হয়েছে। হুমকিদাতারা বলেছে, ছেলের (অভিজিৎ) কী পরিস্থিতি হয়েছে তা দেখেছেন, আপনিও ভালো হয়ে যান। যে মোবাইল নম্বর দিয়ে তাকে হুমকি দেয়া হয়েছে সেটির অবস্থান জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজাহারে বলা হয়েছে, রাত সাড়ে ৮টার দিকে একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বাসায় ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এক বা একাধিক দুর্বৃত্ত অভিজিতের ওপর হামলা করে। এতে অভিজিৎ নিহত হন। হামলার সময় তার সঙ্গে থাকা স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা তাকে বাঁচাতে গিয়ে গুরুতর আহত হন। রাফিদার বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। শরীরের অন্যান্য অংশেও জখমের চিহ্ন রয়েছে।
ক্যাম্পাসেই ‘জঙ্গি আখড়া’ : লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার ঘটনায় জঙ্গিদের জড়িত থাকার সন্দেহ প্রকাশ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শুক্রবার টেলিফোনে যুগান্তরকে বলেন, হত্যাকারীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে আসেনি বলেই তিনি মনে করছেন। লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা, ব্লগার রাজীব ও অভিজিৎ হত্যার ঘটনা ‘একই সূত্রে গাঁথা’ বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিঞা। তিনি বলেন, ‘যারা চাকু-ছুরি নিয়ে হত্যা করতে এসেছিল তারা কেউ বাইরে থেকে আসেনি। এটা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক।’ তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পুলিশের কাছে আছে কিনা তা তিনি স্পষ্ট করেননি। ‘আনসার বাংলা সেভেন’-এর নামে টুইট বার্তার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের তদন্ত ভিন্ন খাতে নেয়ার জন্য এটা তাদের কৌশল হতে পারে। কারা জড়িত তা আমরা খতিয়ে দেখছি।’
৫ এপ্রিল তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ : এদিকে অভিজিতের বাবার মামলার নথি আদালতে যাওয়ার পর ঢাকা মহানগর হাকিম মাসুদ জামান ৫ এপ্রিল পুলিশকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, হত্যা মামলার এজাহার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে পাঠাতে হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক সুব্রত গোলদার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য সময় চাইলে বিচারক তারিখ ঠিক করে দেন বলে আদালত পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা উপ-পরিদর্শক মাহমুদুর রহমান জানান।
জঙ্গিরাই দায়ী : পরিবারের সদস্য ও ব্লগাররা জানিয়েছেন, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখালেখির কারণে অনেক আগে থেকেই অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল জঙ্গিবাদীরা। অভিজিতের বাবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক অজয় রায় বলেন, ‘আমার ছেলেকে হত্যার জন্য উগ্র জঙ্গিবাদীরা দায়ী। তারা আমার ছেলেকে খুন করেছে। জামায়াতের দুর্বৃত্তরা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে।’ অভিজিতের ছোট ভাই অনুজিৎ রায়ের স্ত্রী কেয়া বর্মণ বলেন, অভিজিৎকে প্রায়ই ই-মেইলে হত্যার হুমকি দিত জঙ্গিরা। বলা হতো, দেশে এলেই মেরে ফেলা হবে। তিনি ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমেরিকা থেকে ঢাকায় আসেন। বইমেলায় তার একটি বই বেরিয়েছিল। ওই উদ্দেশ্যেই মূলত তিনি এসেছিলেন। ওই মাসেই চলে যান। এরপর আর আসেননি। সর্বশেষ ১৬ ফেব্র“য়ারি স্ত্রীকে নিয়ে তিনি দেশে আসেন। রমনা থানাধীন ১০২-১০৪ বড় মগবাজারের ২/এফ ইস্টার্ন হাউজিংয়ে তাদের বাসা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা ও বইমেলার উদ্দেশ্যেই তার দেশে আসা। ৩ মার্চ চলে যাওয়ার কথা ছিল। প্রায় ১০ বছর আগে অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রে যান। ২০০৭ সালে রাফিদাকে বিয়ে করেন তিনি। ব্লগার ও লেখক পারভেজ আলম বলেন, ১৯ ফেব্র“য়ারি একটি ফেসবুক আইডি থেকে অভিজিৎ রায়কে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। উগ্রপন্থী জঙ্গিবাদীরাই তাকে খুন করেছে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, আনসার বাংলা সেভেন নামে একটি সংগঠন টুইটারে অভিজিৎ হত্যার বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছে। তাতে ইংরেজিতে লেখা হয়েছে- ‘হি ওয়াজ এ টার্গেট ফর মোর দেন থ্রি/ফোর ইয়ার্স। বাট আলহামদুলিল্লাহ হি জাস্ট কাম টু ঢাকা ফ্রম ইউএসএ লাস্ট উইক অ্যান্ড নাউ হি ইজ গন।’ এদিকে বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে টুইটারে পোস্ট করা বার্তায় সংগঠনটি অভিজিৎকে হত্যার ঘটনায় সন্তোষ প্রকাশ করে। তাকে ‘ইসলামের শত্রু বলে আখ্যা দিয়ে বলা হয়, ‘ইসলামের বিরুদ্ধে অপরাধ করায় অভিজিৎ রায়কে গত ৩-৪ বছর ধরে টার্গেটে রাখা হয়। হ্যাঁ, আমরা পেরেছি’ বলে উল্লাস করে সংগঠনটি। এ ছাড়া ‘আজ মহান দিন’ উল্লেখ করে ‘বাংলাদেশে আজ বিশাল এক সফলতা অর্জিত হয়েছে’ বলেও টুইটারে উল্লেখ করে ‘আনসার বাংলা-৭’ নামের ওই সংগঠনটি। এ ছাড়া রাত ১টার দিকে ‘আনসার বাংলা-৭’ এর পক্ষে পোস্ট করা হয়, ‘টার্গেট ইজ ডাউন, ওয়েট ফর দ্য নেক্সট।’
ওই কর্মকর্তা বলেন, বেশ কয়েকটা কারণ সামনে নিয়ে হত্যার তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে তিনি সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখালেখি করতেন। এ বিষয়টিকে সামনে আনা হয়েছে। মৌলবাদীদের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। এ ছাড়া তার ব্যক্তিগত শত্রু আছে কিনা সে বিষয়টিতেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে একইভাবে চাপাতি দিয়ে লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা হয়েছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দারকেও মিরপুরে তার বাড়ির সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ দুটি হত্যাকাণ্ডে জঙ্গিবাদীদের সম্পৃক্ততা পান তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তীব্র নিন্দা : সন্ত্রাসীদের হাতে লেখক, ব্লগার অভিজিৎ রায়ের খুনের ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির স্টেট ডিপার্টমেন্টের ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও বার্তা পোস্ট করার মাধ্যমে এই নিন্দা জানানো হয়। ডিপার্টমেন্ট অব স্টেটের মুখপাত্র জেন সাকি এই ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ তীব্র ভাষায় অভিজিৎ রায়ের হত্যার নিন্দা জানাচ্ছে। যা শুধু ভয়াবহই নয়, একই সঙ্গে চরম কাপুরুষোচিতও বটে। অভিজিৎ একজন সাংবাদিক, মানবতাবাদী, একজনের স্বামী এবং অনেকের বন্ধু ছিলেন। তার স্বজন ও বন্ধুদের জন্য আমাদের গভীর সমবেদনা। তিনি যে নির্মম ও কাপুরুষোচিত হত্যাকাণ্ডের শিকার তা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণই নয়, মুক্ত মত, বুদ্ধিবৃত্তি এবং ধর্মীয় চর্চার আন্তর্জাতিক নীতির ওপরও আক্রমণ, যে নীতির কথা বাংলাদেশের সংবিধানেও গুরুত্বের সঙ্গে সন্নিবেশিত আছে এবং দেশটির ঐতিহ্যগত জীবনচর্চার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।’
১৫ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি : অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে শুক্রবার বিবৃতি দিয়েছেন দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও আন্দোলনের অন্যতম আহ্বায়ক পদার্থবিজ্ঞানী অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ রায়ের নির্মম হত্যাকাণ্ডে আমরা তীব্র ক্ষোভ ও ঘৃণা জানাচ্ছি। বিবৃতিদানকারীরা হলেন- বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও-এর পক্ষে ড. আনিসুজ্জামান (সভাপতি), অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল (আহ্বায়ক) ও বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট কামাল লোহানী, ডা. সারওয়ার আলী, নাসিমুন আরা হক, সাংবাদিক আবেদ খান, সৈয়দ শামসুল হক, জিয়াউদ্দিন তারিক আলী, রাশেদা কে চৌধুরী, ড. এমএম আকাশ, অ্যাডভোকেট সুপ্রিয় চক্রবর্তী, কাবেরী গায়েন, মোতাহার আখন্দ, লাইসা আহমেদ লিসা ও জিনাত আরা হক ।
মরদেহ দেয়া হবে ঢাকা মেডিকেল কলেজকে : লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায়ের ইচ্ছা অনুযায়ী তার মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার পরিবার। অভিজিতের ফুফাতো ভাই বিষ্ণু রায় শুক্রবার বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর পর নিজের মৃতদেহ মেডিকেলের ছাত্রছাত্রীদের গবেষণার কাজে দান করার ইচ্ছা ছিল অভিজিতের। তার সেই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।’
অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডকে নৃশংস আখ্যায়িত করে শোক জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন। শুক্রবার এক টুইট বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘অভিজিৎ রায়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডে আমি মর্মাহত।’ এদিকে অভিজিত রায় হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক দাতব্য সংস্থা দ্য সেন্টার ফর ইনকোয়ারি।