Sunday, May 17, 2015

কথা ভুলে যাচ্ছেন সালাহ উদ্দিন -সাক্ষাৎ শেষে বিএনপি নেতার দাবি by রাহীদ এজাজ

ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং সিভিল হাসপাতালের
এনেক্স ভবনে বিচারাধীন মামলার আসামিদের ওয়ার্ডে
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে
রাখা হয়েছে। পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে অনুপ্রবেশের
অভিযোগে তাঁকে আদালতে তোলা হবে। ছবি: প্রথম আলো
শিলং সিভিল হাসপাতাল ভবন এটি। এই হাসপাতালেই
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদ
চিকিৎ​সাধীন আছেন। ছবি: প্রথম আলো
ভারতের শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির নেতা সালাহ উদ্দিন আহমদের মানসিক বিপর্যয় এখনো কাটেনি। তিনি ভীতি, উত্কণ্ঠা ও আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। কোনো কথা মনে রাখতে পারছেন না।
আজ রোববার দুপুরে ওই হাসপাতালে সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করার পর গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে এসব দাবি করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ।
গত সোমবার ভোরে শিলংয়ের গলফ-লিংক এলাকায় উদ্‌ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরির সময় সালাহ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে সেখানকার পুলিশ। পরদিন থেকে পুলিশি পাহারায় শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনি। তাঁকে হাসপাতালের অ্যানেক্স ভবনে বিচারাধীন মামলার আসামিদের ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। পাসপোর্ট ছাড়া ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে তাঁকে আদালতে তোলা হবে।
আজ দুপুরে সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তাঁর (সালাহ উদ্দিন) শারীরিক অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে। তিনি মানসিকভাবে এতটাই বিপর্যস্ত যে কোনো কথা মনে রাখতে পারছেন না। একটা কথা বলে কিছুক্ষণ পরেই তা ভুলে যাচ্ছেন। এটা কেন হচ্ছে, সেটি নিয়ে তাঁর (লতিফ) মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সালাহ উদ্দিন এখনো ভীতি, উত্কণ্ঠা ও আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন বলে দাবি করেন আবদুল লতিফ। তাঁর মতে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিবের মানসিক বিপর্যয়ের রেশ এখনো রয়ে গেছে। তাই তাঁর বলা কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছে। স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদকের ভাষ্য, সালাহ উদ্দিন বারবার শুধু জানতে চাইছেন, তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদ কখন শিলং আসবেন। তিনি (হাসিনা আহমদ) ভারতে আসার ভিসা পেলে খবরটা তাঁকে জানাতে বলেছেন। স্ত্রী কখন তাঁর সামনে আসবেন, সে জন্য অধীর অপেক্ষায় আছেন তিনি। সালাহ উদ্দিনের কিডনির অবস্থা খুবই খারাপ বলে দাবি করেন আবদুল লতিফ। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গত তিন দিনে তাঁর কিডনির অনেকগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। আজ স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন পেলে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
আবদুল লতিফ বলেন, সালাহ উদ্দিনের অন্য শারীরিক সমস্যা নিয়ে একটি চিকিৎসা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। নিয়মিতভাবেই তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছে। চিকিত্সকেরা সবগুলো পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন।
সালাহ উদ্দিনকে উদ্ধৃত করে আবদুল লতিফ বলেন, শিলংয়ের সিভিল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তিনি সিঙ্গাপুরে যে চিকিৎসা নেন, সে ধরনের যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো-সুবিধা এই হাসপাতালে নেই। তাই এ হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে সন্দিহান তিনি। বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদকের ভাষ্যমতে, হাসপাতাল থেকে কোথাও নেওয়ার মতো সুস্থ নন সালাহ উদ্দিন। হাসপাতালে সালাহ উদ্দিনের চিকিৎসক ও হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ জি কে গোস্বামী প্রথম আলোকে বলেন, কিডনিসহ নানা বিষয়ে বেশ কয়েকটি শারীরিক পরীক্ষা করানো হয়েছে। কাল সোমবার সেগুলো পর্যালোচনার পর সালাহ উদ্দিনের সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে। এরপর বোঝা যাবে তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া যাবে কি না। চিকিত্সক গোস্বামীর বক্তব্যের আভাস অনুযায়ী, সালাহ উদ্দিনকে কাল হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার সম্ভাবনা কম।
এদিকে বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিবের আইনগত বিষয় সম্পর্কে দলের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল লতিফ বলেন, এ নিয়ে স্থানীয় আইনজীবীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কথা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে পাওয়া এবং সালাহ উদ্দিনের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার আগে এ বিষয়ে তাঁরা কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। তিনি জানান, সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী শিলং আসার পর আইনজীবীরা তাঁর সঙ্গে কথা বলবেন। এরপর তাঁর (সালাহ উদ্দিন) বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়ে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেবেন।

ভাসমান কফিন-ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড ঠেলাধাক্কা

সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে ‘ভাসমান কফিন’। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সমুদ্রে এখনও আটকা পড়ে আছে মিয়ানমারের কয়েক হাজার রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী অভিবাসী। তাদের উদ্ধার না করলে তারা পরিণত হবেন ভাসমান কফিনে। এমন হুঁশিয়ারি দিয়েছে জাতিসংঘ। তাদের নিয়ে পুশব্যাক-পুশব্যাক চলছে তিন দেশ- থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মধ্যে। নৌযানে করে বিপন্ন এসব মানুষকে প্রতিটি দেশ ঠেলে দিচ্ছে তার জলসীমার বাইরে। এতে অভিবাসীদের অনেকের মৃত্যু অনিবার্য। এ অবস্থায় বেঁচে থাকা এসব মানুষকে ‘ভাসমান কফিন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ওই অঞ্চলের সরকারগুলোকে দ্রুতগতিতে এসব মানুষের জীবন রক্ষার আহ্বান জানালেও তাতে কোন সাড়া মিলছে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়াবিষয়ক পরিচালক ফিল রিচার্ডসন বলেছেন বিপন্ন এসব মানুষকে নিয়ে ত্রিমুখী খেলা বন্ধ করতে হবে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াকে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এখনও সমুদ্রে ভয়াবহ অবস্থায় ভাসছে কয়েক হাজার মানুষ, যাদের বেশির ভাগই মৃত্যুর মুখে পতিত, তাদের খাবার নেই, পানি নেই এমন কি তারা জানে না যে, তারা এখন কোথায় আছে। এ কথা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে। তবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক গতকাল বলেছেন, এ সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলের পাশাপাশি আসিয়ানভুক্ত সব সদস্য দেশকে একযোগে অবশ্যই কাজ করতে হবে। অভিবাসীতে ঠাঁসা একটি নৌযান দু’বার থাইল্যান্ড উপকূলে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের সে সুযোগ দেয়া হয়নি। এ নৌযানকে থাই সমুদ্রসীমা থেকে সে দেশের নৌবাহিনী পুশব্যাক করে পাঠিয়ে দেয় গভীর সমুদ্রে। গতকাল মালয়েশিয়া ওই নৌযানকে দেখতে পায়। ওই বোটটি গতকাল সকালের দিকে ফের থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমায় দেখা যায় বলে খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এর আগে বোটটি ইন্দোনেশিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। থাইল্যান্ড দাবি করেছে, তারা ওই বোটের মানুষদের খাদ্য, পানীয় ও তাদের নৌযান মেরামত করে দিয়েছে। থাই লেফটেন্যান্ট বিরাপং নাকপ্রাসিত এমন কথা বলেছেন। তিনি বলেন, অভিবাসীরা মালয়েশিয়া যেতে চাওয়ায় তারা তাদের মালয়েশিয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছেন। এতে সুস্পষ্ট যে, সমুদ্রে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে আটকে থাকা ওইসব মানুষকে তিনটি দেশের কেউই আশ্রয় দিতে রাজি নয়। ফলে তারা বারবারই তাদের ঠেলে দিচ্ছে সমুদ্রে। রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ সমন্বিত  উদ্ধার অভিযান চালানোর আহ্বান জানানো সত্ত্বেও তা অবজ্ঞা করছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশগুলো। এতে সঙ্কট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। এ পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার পশ্চিম উপকূলে ও মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবতরণ করতে পেরেছে প্রায় ২৫০০ অভিবাসী। তবে শুক্রবার থাইল্যান্ডের ফাং নগা প্রদেশের একটি দ্বীপে যে ১০৬ অভিবাসীর সন্ধান পেয়েছে থাই কর্তৃপক্ষ তারা সেখানে গেলেন কিভাবে তা অস্পষ্ট।
অবর্ণনীয় দুর্ভোগ বোটে: আটকে পড়া বোটগুলোতে অভিবাসীরা বেঁচে আছেন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে। তাদের দেহ হাড্ডিসার। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন সমুদ্রের উত্তাল জলরাশির দিকে। রোগে ভুগে, ক্ষুধায় কাতর এসব মানুষ। তাদের পান করার মতো পানি নেই। এমন বর্ণনা দিলেন মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা মানু আবদুল সালাম (১৯)। তিনি বললেন, আমি যদি জানতাম নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দেয়া এতটাই কঠিন তাহলে প্রয়োজনে দেশের মাটিতেই মারা যেতাম। শুক্রবার যেসব মানুষ ইন্দোনেশিয়ার তীরে উঠতে পেরেছেন তাদের একজন তিনি। বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ যখন সমুদ্রে মানব পাচার বন্ধে পদক্ষেপ জোরালো করে তখন তাদের বহনকারী নৌযানটি সমুদ্রের মাঝে। তারপর কেটে গেছে দুই সপ্তাহ। মানবাধিকার বিষয়ক বিভিন্ন গ্রুপ সতর্কতা উচ্চারণ করেছে আগেই। তারা বলেছে, এ অভিযান জোরালো হওয়ার ফলে পাচারকারী চক্রের ক্যাপ্টেন, যে নৌযান চালাচ্ছিল, সে নৌযান ফেলে, এতগুলো মানুষকে বিপদের মুখে ফেলে পালাতে পারে। হয়েছেও তাই। মানু আবদুল সালাম বলেন, বেশ কয়েক দিন আগে একটি ফোন আসে। সেই ফোন পেয়ে একটি স্পিডবোট নিয়ে পালিয়ে যায় মানু। তার আগে সে তাদের নৌযানের ইঞ্জিন বিকল করে দিয়ে যায়। তারপর থেকে তারা ভাসছিল গভীর সমুদ্রে।
রোহিঙ্গা-বাংলাদেশী মারামারি: একপর্যায়ে ওই নৌযানের খাবার ফুরিয়ে যায়। পানি শেষ হয়ে যায়। অধৈর্য্য হয়ে পড়েন সবাই। ফলে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশী অভিবাসীদের মধ্যে শুরু হয় মারামারি। এতে কমপক্ষে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন। মানু আবদুল বলেন, বাংলাদেশীরা মনে করেছিল ক্যাপ্টেনের বাড়ি ছিল মিয়ানমারে। তাই বাংলাদেশীরা আমাদের ওপর লাঠি ও ছুরি নিয়ে আক্রমণ চালায়। তবে এই ঘটনায় বেঁচে আছেন ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশী সাইদুল ইসলাম। তিনি বললেন, ওই মারামারি পর অনাহারে ও আঘাতের ক্ষত নিয়ে তাদের নৌযানের কয়েক ডজন মানুষ মারা গেছে। তিন মাস ধরে তারা সমুদ্রে ভাসছেন। এক ব্যক্তি তার গ্রামে গিয়ে লোভ দেখিয়েছিল জাহাজে করে মালয়েশিয়া নিয়ে ভাল চাকরি দেয়ার। তার কথায় সায় দিয়ে তিনি যখন সমুদ্রে গেছেন তখনই ক্যাপ্টেন তার কাছে কয়েক শত ডলার দাবি করে বসে। শুধু সাইদুলের বেলায় নয়, সবার বেলায়ই এটা ঘটেছে। এসব মানুষের পরিবারের সদস্যদের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছে।
মিয়ানমারের না: ওদিকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার দাবি অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। গত দু’সপ্তাহ ধরে যখন রোহিঙ্গাদের এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগের কথা বলা হচ্ছে, তারপর এই প্রথম এ বিষয়ে মুখ খুললো মিয়ানমার। সরকারের মুখপাত্র ইয়ে হুট বলেছেন, আমরা নিশ্চিত হয়ে বলতে পারছি না যে, ওইসব অভিবাসী মিয়ানমারের নাগরিক। এর আগে তাদেরকে শনাক্ত করতে হবে। পাচার হওয়া মানুষের বেশির ভাগেরই দাবি যে, তারা মিয়ানমারের নাগরিক। এমনটা দাবি করা খুব সহজ এবং অন্যকে তারা সহজেই এ বিষয়টি বোঝাতে পারে। মিয়ানমারের অন্য এক সরকারি কর্মকর্তা মেজর জাও হে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করার জন্য যে আঞ্চলিক বৈঠক আহ্বান করা হয়েছে তাতে যোগ দেবে না মিয়ানমার।
ভাসমান কফিন: শুক্রবার জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের মুখপাত্র ফারহান হক বলেছেন, উদ্ভূত সমস্যা নিয়ে আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন মহাসচিব বান কি মুন। তিনি এ সময় সব নেতার প্রতি সবার আগে জীবন রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্য কথায়, আমরা তাদের ভাসমান কফিন হতে দিতে পারি না।
জন কেরির ফোন: যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বৃহস্পতিবার রাতেই ফোন করেছেন থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে। এ সময় তিনি এসব মানুষকে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেন। তবে জবাবে থাইল্যান্ড কি বলেছে তা প্রকাশ করেন নি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেফ রাথকে।
অবৈধ অভিবাসীভর্তি বহু নৌকা এখনও ভাসছে: ওদিকে গতরাতে বিবিসি খবর দিয়েছে যে- থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কাছাকাছি উপকূল ও সাগরে এখনও নৌকায় ভাসছে পাচার হওয়া বহু মানুষ। বলা হচ্ছে, এরা মূলত বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গা। ইউএনএইচসিআরের একজন কর্মকর্তা জেফরি স্যাভেজ বার্তা সংস্থা  রয়টারকে বলেছেন, সমন্বিত উদ্ধার তৎপরতার কোন লক্ষণই তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। শুক্রবার ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে প্রায় ৮০০ অভিবাসী তীরে নেমেছে। এ নিয়ে উত্তরপূর্ব মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় আড়াই হাজারেরও বেশি অভিবাসী তীরে নামতে পেরেছেন। তবে আরও বহু অভিবাসী এখনও সাগরে ভাসমান নৌকায় রয়েছেন। রয়টার্স খবর দিয়েছে, মালয়েশিয়ার নৌযানগুলো শনিবারও একটি অভিবাসী-ভর্তি নৌকা তাদের জলসীমা থেকে ফিরিয়ে দিয়েছে। মালয়েশিয়ান একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এই নৌকাটি প্রথম থাইল্যান্ড যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে থাই নৌবাহিনী দুইবার তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়। তবে তারা নৌকার ইঞ্জিনটি মেরামত করে দেয় এবং আরোহীদের খাদ্য, পানি, জ্বালানি তেল ইত্যাদি দিয়ে মালয়েশিয়ার পথ দেখিয়ে সাগরে ছেড়ে দেয়। থাইল্যান্ড-এর ফ্যাং এনগা প্রদেশে একটি দ্বীপে শুক্রবার আরও ১০৬ জন অভিবাসীকে পাওয়া গেছে। সাগরে ভেসে থাকা অনেককে হেলিকপ্টার থেকে খাবার দিলেও তাদের তীরে ভিড়তে দিচ্ছে না ওই অঞ্চলের দেশগুলো। মালয়েশিয়ার সরকার এ সপ্তাহে বলেছে, তারা এসব অভিবাসীকে গ্রহণ করবে না। এর আগে থাইল্যান্ডের মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী জঙ্গলে অবৈধ অভিবাসীদের গণকবর পাওয়া যায়। জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের টেকনাফ উপকূল দিয়ে পাচার হচ্ছে এসব মানুষ।
কোস্টগার্ডের সীমিত পাহারা: মানব পাচার ঠেকানো যাচ্ছে না
টেকনাফ কোস্ট গার্ডের স্টেশন কমান্ডার মোহাম্মদ শাহীদ হোসেন চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, সমুদ্রে তীরবর্তী একেকটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল পাহারা দেয়ার জন্য যে পরিমাণ নৌযান দরকার, তার অভাব আছে। তাদের কিছু হাইস্পিড বোট থাকলেও গভীর সমুদ্রে পাহারা দেয়ার মতো নৌযান এখনও নেই। তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্য ছাড়া তাদের পক্ষে সাগরে ভাসমান সব নৌযান তল্লাশি করাও সম্ভব হয় না। কমান্ডার চৌধুরী জানান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়াতে যেসব নৌকায় অভিবাসী নারী ও শিশুদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদের অধিকাংশই মিয়ানমার থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা বলে তারা ধারণা করেন। অথচ বাংলাদেশের উপকূলে প্রহরায় কাজ করছে নৌ বাহিনী, বর্ডার গার্ড ও কোস্ট গার্ড। এসব বাহিনীর চোখ এড়িয়ে কিভাবে ঘটছে মানব পাচারের ঘটনা, এ প্রশ্নও অনেকে তুলেছেন। কিন্তু এর সঙ্গে কোস্টাগার্ডের কোন সদস্যের যোগসাজশের সম্ভাবনার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন কমান্ডার শাহীদ হোসেন চৌধুরী।

মানব পাচার বন্ধে যৌথ কমিশন গঠন করুন -সাক্ষাৎকারে : ড. তাসনীম সিদ্দিকী by ফারুক ওয়াসিফ ও সুজয় মহাজন

ড. তাসনীম সিদ্দিকী
ড. তাসনীম সিদ্দিকীর জন্ম ১৯৫৯ সালে, ঢাকায়। ঢাকার হলিক্রস উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক সমাপ্ত করে প্রবেশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৮৪ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে সে বছরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দেন। এরপর অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি অর্জন করেন। ফুলব্রাইট পান যুক্তরাষ্ট্রের কার্বনডেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। বর্তমানে অধ্যাপনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে। এ ছাড়া তিনি রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্ট রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফারুক ওয়াসিফসুজয় মহাজন
প্রথম আলো : বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসন আইন, ২০১৩ অনুযায়ী, অবৈধ অভিবাসন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ রকম সুনির্দিষ্ট আইন থাকার পরও কেন তা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না?
তাসনীম সিদ্দিকী : এ আইনটিতে অনেক দুর্বলতা রয়েছে। আইনে অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তির কথা বলা হলেও ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে। আমরা আইনটি যেভাবে দেখতে বা পেতে চেয়েছিলাম শেষ পর্যন্ত তেমনটি হয়নি। আইনে অবৈধ পথে ও প্রক্রিয়ায় কর্মী প্রেরণকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধানও আছে। কিন্তু দুর্বলতা রয়েছে এটির বিচার–প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে। আইনে মোবাইল আদালতেও এ ধরনের অপরাধের বিচারের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মোবাইল আদালতের শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা খুবই সীমিত। সে ক্ষেত্রে অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত দালাল বা অপরাধীরা পার পেয়ে যাবে। আইনটিতে এমন কয়েকটি বিচারিক আদালতে এ ধরনের অপরাধের বিচারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাঁদের আসলে এক বছরের বেশি শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা নেই।
প্রথম আলো : এ আইনের অধীনে এখন পর্যন্ত কতজন অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে?
তাসনীম সিদ্দিকী : নতুন আইনে এখন পর্যন্ত দেশে কোনো মামলা হয়নি। তাই এ–সংক্রান্ত বিষয়ে আইনি প্রতিকার চেয়ে আমরা উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছি এবং তাতে রুলও পেয়েছি। হাইকোর্ট এই আইনের অধীনে দালালদের বিরুদ্ধে কেন মামলা দায়ের করা হচ্ছে না, তার কারণ দর্শানোর আদেশ জারি করেছেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী বাহিনীর প্রতি। কিন্তু চার সপ্তাহের ভেতর উত্তর দিতে বলা হলেও এক মাস পরও কেউ কোনো কারণ দর্শায়নি বলে আমরা পত্রিকা মারফত জানতে পেরেছি।
প্রথম আলো : এ আইনের দুর্বলতার দিক আর কী কী?
তাসনীম সিদ্দিকী : যদি কোনো ব্যক্তি অবৈধ অভিবাসনের শিকার হন, তাহলে ওই ব্যক্তিরও শাস্তির বিধান রয়েছে এ আইনে। বিশ্বের কোনো দেশের আইনে এ ধরনের বিধান নেই। যত দ্রুত সম্ভব আইনের এ ধারাটি বাদ দেওয়া দরকার। এ ছাড়া আইনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির বাইরে রাখা হয়েছে।
প্রথম আলো : অবৈধ পথে বিদেশ গিয়ে যেসব বাংলাদেশি মৃত্যুবরণ করেন, তাঁদের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনার আইনি বন্দোবস্ত কী?
তাসনীম সিদ্দিকী : আইনে সুস্পষ্ট করে কিছু বলা নেই। তবে বৈধ অভিবাসীদের বেলায় অন্যায়ের কারণে চাকরিচ্যুত হন তাহলে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা আইনে বলা আছে। বৈধ অভিবাসী বিদেশে মৃত্যুবরণ করলেও লাশ দেশে আনার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এ জন্য বিদেশে বাংলাদেশি মিশনগুলোকে বছরে যে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকের লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে স্থানীয় বাংলাদেশিদের চাঁদাই ভরসা।
প্রথম আলো : অবৈধ পথে অভিবাসন বন্ধে আন্তর্জাতিক কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে বলে আপনি মনে করেন কি?
তাসনীম সিদ্দিকী : অবৈধ পথে অভিবাসন এখন শুধু বাংলাদেশের সমস্যা না। এটির সঙ্গে বেশ কটি দেশ জড়িত। তাই এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে আন্তরাষ্ট্রীয় যৌথ কমিশন গঠন করতে হবে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক, বিশেষ করে জাতিসংঘ এবং সার্ক ও আসিয়ানের মতো আঞ্চলিক সহযোগিতার ফোরামের ভেতর জোরালোভাবে আলোচনা করতে হবে।
প্রথম আলো : মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের সুবিধার্থে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) চুক্তি হয়েছে। তবু কেন অবৈধ পথে মালয়েশিয়াগামী লোকের সংখ্যা বাড়ছে?
তাসনীম সিদ্দিকী : বাস্তবতা বিবেচনায় বলতে গেলে এ উদ্যোগটি একপ্রকার ব্যর্থ হয়েছে। এ চুক্তির আওতায় গত চার বছরে সাড়ে সাত হাজার কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন। অথচ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের চাহিদার বিবেচনায় এ সময়ের মধ্যে অন্তত পাঁচ লাখ কর্মী ওই দেশে যাওয়ার কথা। এ চুক্তিটি ব্যর্থ হওয়ায় অবৈধ পথে মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়। দুভাবে এ অবৈধ অভিবাসনটি হচ্ছে। একটি হলো, যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য আছে তাঁরা ভ্রমণ বা বেড়ানোর নামে ভিসা নিয়ে বিমানে ওই দেশে গিয়ে থেকে যাচ্ছেন। আর যাঁদের ওই সামর্থ্য নেই, তাঁরা দালালদের প্রলোভনে পড়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে মালয়েশিয়ার যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
প্রথম আলো : জীবনের ঝুঁকি জেনেও কেন ও কারা যাচ্ছেন?
তাসনীম সিদ্দিকী : বিভিন্নভাবে আমরা গবেষণা করে দেখেছি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অতি দরিদ্র মানুষগুলো দালালদের প্রলোভনে পড়ে পাচারের শিকার হচ্ছেন। যাঁরা একসময় জীবনের তাগিদে দেশের মধ্যে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় স্থানান্তরের কথা চিন্তাও করতেন না, তাঁরাই এখন সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। কারণ, তাঁদের সামনে শ্রেণি উত্তরণের আর কোনো পথ নেই।
প্রথম আলো : আপনি বলছেন, সরকারিভাবে মালয়েশিয়ায় কর্মী প্রেরণের উদ্যোগটি ব্যর্থ হয়েছে। এ রকম একটি ভালো উদ্যোগ কেন ব্যর্থ হলো বলে মনে করছেন?
তাসনীম সিদ্দিকী : সরকারিভাবে কর্মী প্রেরণের উদ্যোগ গ্রহণের দাবিটি দুই দেশের বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা তুলেছিল। আমরাও এ দাবি করেছিলাম। কারণ, বেসরকারিভাবে কর্মী পাঠানোর ফলে বেশির ভাগ সময়ই কর্মীরা হয়রানির শিকার হতেন। তাই চুক্তিটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো উদ্যোগ ছিল। কিন্তু এটির সুফল পেতে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণের দরকার ছিল, সরকারের দিক থেকে তা করা হয়নি। যদি সরকারের উচিত ছিল ওই দেশে প্রশিক্ষিত মার্কেটিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া, যাতে করে তারা নিয়োগদাতাদের কাছে ঘুরে ঘুরে ওয়ার্ক পারমিট জোগাড় করে আনা। শুধু অনলাইনে দিয়ে রাখলেই হবে না। সরকারের চিন্তাচেতনা ও কার্যক্রম বেসরকারি খাতে যেভাবে দক্ষতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হয় হয়, সে রকম হতো, তাহলে এ রকম একটি উদ্যোগ কখনোই ব্যর্থ হতো না বলে অন্তত আমার ধারণা।
প্রথম আলো : অবৈধ অভিবাসন বা অবৈধ পথে লোক পাচার বন্ধ করতে হলে কী করা দরকার বলে আপনি মনে করেন?
তাসনীম সিদ্দিকী : এটির উৎসে নজর দিতে হবে। যাঁরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাঁদের প্রচলিত জীবনযাত্রা হারিয়েছেন, তাঁদেরই একাংশ যাচ্ছেন। দারিদ্র্যের কারণে তাঁরা নিয়মতান্ত্রিক পথে অভিবাসনের সুবিধা নিতে পারছে না। জলবায়ু-দুর্গত ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলোতে সরকারকে সর্বোচ্চ নজর দিতে হবে। আমাদের মাইগ্রেশন প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে যেতে হবে তাদের কাছে। জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলা তহবিলের অর্থ হাঁস-মুরগি পালন, দড়ি বা মোমবাতি বানানো বা সবজি চাষের প্রশিক্ষণ দান এবং দুর্যোগসহ জাতের ধানবীজ রোপণ করে আয় খুম কম। বরং ড্রাইভিং, কারিগরি শিক্ষাসহ যেসব দক্ষতা চাকরিদাতা দেশগুলোতে প্রয়োজন, সেসব বিষয়ে উঁচুমানের প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়তে হবে। এসব কাজের সুফল দেশেও তারা পাবে, আবার বাইরের সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগে চাকরিও পাবে। সরকারের উচিত বিএমইটি (Bureau of Manpower, Employment and Training)-এর কার্যালয় ওসব এলাকায় নিয়ে যাওয়া। আমাদের আরবান গ্রোথ সেন্টার সৃষ্টি করতে হবে সারা দেশে, যাতে সবাইকে ঢাকায় আসতে না হয়। বাংলাদেশকে অভিবাসন নিয়ে বড় আকারে চিন্তা করতে হবে। আমাদের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বতন্ত্র অধ্যায় না রেখে প্রতিটি অধ্যায়ে অভিবাসনকে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকতে হবে।
প্রথম আলো : সম্প্রতি কয়েকজন অবৈধ পাচারকারী নিহত হওয়ার খবর আসছে, আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
তাসনীম সিদ্দিকী : এখন দেখতে পাচ্ছি, যখন দেশে-বিদেশে জোর সমালোচনা করা হচ্ছে, তখন সরকারের ওপর একধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এই চাপের মুখে কিছু করা সরকারের জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমরা হতাশ হচ্ছি এটা দেখে যে, এদের ধরে এনে বিচার করার বদলে তাদের কেউ কেউ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাচ্ছে। এতে করে সমস্যার গোড়ায় আর হাত দেওয়া যাচ্ছে না। মানব পাচার সমস্যাকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনায় সরকার সত্যিই আন্তরিক কি না, এসব দেখে সেই সন্দেহ বেড়ে যাচ্ছে।
প্রথম আলো : যাদের থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় উদ্ধার করা হচ্ছে, তাদের বিষয়ে এখন কী করণীয়?
তাসনীম সিদ্দিকী : যেখানে যে অবস্থায় তাঁদের পাওয়া যাচ্ছে সেখান থেকে তাদের দ্রুত সুব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা। যারা ফিরে আসছেন তাঁরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আছেন। এদের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন মানসিক পরিচর্যা (কাউন্সেলিং)। তারপর প্রয়োজন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন। সে ক্ষেত্রে সরকারের এখন যে প্রবাসীকল্যাণ তহবিল আছে, সেখান থেকে সেবার সুযোগ এঁরা পাবেন না। আইন অনুযায়ী শুধু বৈধ অভিবাসীরাই তা পেতে পারেন। তাই সরকারের উচিত দ্রুত একটা তহবিল গঠন করা, উন্নয়ন বা রাজস্ব বাজেট থেকে টাকা এনে এদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করা। লিবিয়া-ফেরত কর্মীদের যেভাবে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এককালীন সহযোগিতা করা হয়েছিল, সে রকম করে নয়, বরং তাদের পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের দীর্ঘমেয়াদি বন্দোবস্ত করতে হবে। এটুকু টাকা বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ করার দরকার নেই, এটুকু টাকা রাষ্ট্রেরই খরচ করা উচিত।
প্রথম আলো : বাংলাদেশিদের পাচারের সঙ্গে তো রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাও জড়িত, ওই বিষয়েও তো সমাধান লাগবে।
তাসনীম সিদ্দিকী : যেহেতু রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে এই অবৈধ পথে অভিবাসনের যোগসূত্র রয়েছে, সেহেতু আমরা দাবি করছি, পূর্বের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যে সরকারি নীতি, তা থেকে সরকার বেরিয়ে আসবে। বরং আন্তর্জাতিক পরিসরে এই সমস্যার সমাধানের আওয়াজ তুলতে হবে। প্রতিবেশী হিসেবে একদিকে আমরা তাদের অবর্ণনীয় কষ্ট দেখছি, অন্যদিকে আমরাও আক্রান্ত হচ্ছি।
প্রথম আলো : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
তাসনীম সিদ্দিকী : ধন্যবাদ।

হাত-চোখ বাঁধার পরই ভেবেছিলাম এটি শেষ রাত by দীন ইসলাম

উত্তরার বাসা থেকে অপহরণের পর এক রুমে ৬১ দিন কেটেছে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের। তবে ১০ই মে রাতের খাবারের কিছুক্ষণ পর নতুন করে তার হাত-চোখ বেঁধে ফেললে ওই রাতকেই শেষরাত মনে করেন তিনি। শিলং সিভিল হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন সালাহউদ্দিন আহমেদ তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ঘনিষ্ঠজন এবং গোয়েন্দাদের এ তথ্য জানান। তিনি বলেছেন, রাতের খাবারের পর যখন আমার হাত ও চোখ বাঁধা হয় তখন ভেবেছিলাম মেরে ফেলার জন্য ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। তাই ভয়ে আমার হাত-পা শীতল হয়ে আসে। বারবার স্ত্রী-সন্তান, এলাকাবাসীসহ দেশের মানুষের কথা মনে করতে থাকি। এর বেশি কিছু চিন্তা আমার মাথায় আসেনি। এদিকে, সোমবার আটকের পর মানসিক হাসপাতালে নেয়ার আগে পুলিশ সালাহউদ্দিন আহমেদের দাড়ি শেভ করার ব্যবস্থা করে। তার সঙ্গে দেখা করে এসে বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি এ তথ্য জানান। ৬১ দিন সালাহউদ্দিন আহমেদ কী অবস্থায় ছিলেন জানতে চাইলে জনি মানবজমিনকে বলেন, এসব বিষয়ে কথা বলতে গেলে তার মুখে জড়তা চলে আসে। ক্লিয়ারভাবে কিছু বলতে পারছিলেন না। আর এসব বিষয়ে কথা বলার সময় এখন নয়। আমি মনে করি, সালাহউদ্দিনের বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। এ বিষয়টি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকলে আমাদের জন্য মঙ্গল।
যেভাবে আটকের পর ৬১ দিন এক রুমে: ১০ই মার্চ উত্তরা থেকে আটকের দুই ঘণ্টা পর একটি ঘুপচি রুমে নিয়ে তাকে রাখা হয়। এরপরই চোখের বাঁধন খুলে ফেলা হয়। মেঘালয় রাজ্যের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছেও সালাহউদ্দিন বন্দি থাকা রুমের বর্ণনা দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার এক আত্মীয়। ওই বর্ণনায় বলা হয়েছে, সালাহউদ্দিনকে উত্তরার বন্ধুর বাসা থেকে তুলে নেয়া হয়। চোখ ও হাত বেঁধে নিয়ে যাওয়ার আগে ওই ভবনে বসবাসকারী সালাহউদ্দিনের বন্ধু হাবিব হাসনাতসহ কাজের লোকদেরও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। তুলে নিয়ে যাওয়ার দুই ঘণ্টা পর একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়। ওই কক্ষে টয়লেট, ফ্যান, দরজা ও ভেন্টিলেটর ছাড়া কিছুই ছিল না। নিয়মিত তাকে তিন বেলা খাবার দেয়া হতো। পাশাপাশি দেয়া হতো হার্টের ওষুধ। তিনি যেসব ওষুধ খেতেন তা জানানোর পর নিয়মিত কিনে দেয়া হতো। এভাবেই দিন গুনতে থাকেন তিনি। সালাহউদ্দিন গোয়েন্দা ও ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বলেছেন, প্রতিদিন আল্লাহকে ডেকে সময় পার করতেন। তিনি বলেন, দিনের আলো দেখতে পাইনি। তবে মাঝে মধ্যে প্লেনের বিকট শব্দ শুনেছি। এ শব্দটা খুব জোরে হতো। মারধর করেছে কিনা এমন প্রশ্নে কিছুক্ষণ চুপ থেকে সালাহউদ্দিন জানান, আমার সঙ্গে ওরা খুব ভাল ব্যবহার করেছে। তিন বেলা ঠিকমতো খেতে দিয়েছে। ওষুধ দিয়েছে। কোন ধরনের টর্চার করেনি। কোথায় আটক ছিলেন এমন প্রশ্নে ঘুরেফিরে বলেছেন, আমার চোখ ও হাত বাঁধা ছিল। তাই স্থান নিশ্চিত করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাছাড়া আটকের পর থেকে একটি রুমেই ছিলাম। কোথায় ছিলাম সেটা বলতে পারবো না। এটুকু বলতে পারবো একটি বদ্ধ রুমে আটক ছিলাম। 
নিজের রাজনীতি ও পারিবারিক ইতিহাস: সিভিল সার্ভিসের চাকরি ছেড়ে কিভাবে রাজনীতিতে এলেন, কি মন্ত্রী ছিলেন, কতবার এমপি হয়েছিলেন- গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসায় এসবের জবাব দিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ। নিজের রাজনীতি নিয়ে জবাব দেয়ার পাশাপাশি স্ত্রী হাসিনা আহমেদ ছিলেন সাবেক এমপি- এ কথাটিও বলেছেন তিনি। এছাড়া তার এক ছেলে ও এক মেয়ে বিদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে তাও জানান। এসব বিষয়ে কথা বলার ফাঁকে মাঝে মধ্যে আবেগতাড়িত হয়ে যান। এছাড়া সরকারি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে কেন জড়ালেন ওই বিষয়টিও বলেন সালাহউদ্দিন।
বন্ধু ব্যাংকার হাবিব হাসনাতের কাছে ঋণী: ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের উপ- ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিব হাসনাতের ফ্ল্যাটেই থাকতেন সালাহউদ্দিন। আটক করার আগে হাবিব হাসনাতের চোখ ও হাত বেঁধে ফেলা হয়। ওই ব্যাংকার সম্পর্কে সালাহউদ্দিন বলেছেন, আমি আমার বন্ধু হাসনাতের কাছে ঋণী। তিনি ওই সময় সাহসিকতার সঙ্গে আমাকে রেখেছেন। এখন শুনছি হাবিব হাসনাতই আমার স্ত্রীকে দুবাই থেকে ফোন করে তুলে নিয়ে যাওয়ার খবরটি দিয়েছে। এখন জেনেছি, ও (হাবিব হাসনাত) দেশ ছেড়ে এখন সপরিবারে আমেরিকা থাকছে। ওর জন্য কষ্ট লাগে। আমার জন্য হাবিব হাসনাতকে পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে থাকতে হচ্ছে।
শারীরিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না, সিঙ্গাপুর যেতে চান: মেঘালয়ের সিভিল হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদের শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। গতকাল বেলা ১১টায় বিএনপির সহ-সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে আসেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন মেঘালয় রাজ্যের ডাউকিতে বসবাসকারী স্ট্যালিন ও লাজবন। জনি দুই কেজি আপেল, কয়েকটি লেবু ও ইসবগুলের ভুসি নিয়ে দেখা করতে প্রিজন সেলে যান। বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদকের হাতে আপেল দেখে সালাহউদ্দিন বলে উঠেন, আমার জন্য এত খাবার নিয়ে আসছ কেন? আমি তো খেতে পারছি না। হাসপাতালের খাবার দেখিয়ে বলেন, এই যে দেখো কত খাবার দিয়ে গেছে। এত খাবার কিভাবে খাবো। লতিফ জনি এসব কথা শুনে ইসবগুলের ভুসি নিয়ে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে দৌড় দেন। কিন্তু ডাক্তারের বিধি নিষেধের কারণে ইসবগুলের ভুসি দিতে পারেননি। বাইরে বেরিয়ে আবদুল লতিফ জনি সাংবাদিকদের জানান, সালাহউদ্দিন আহমেদের শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তিনি অসুস্থ বোধ করছেন। সকাল পর্যন্ত তার পায়খানা ক্লিয়ার হয়নি। তার মানসিক অবস্থা আগের মতোই আছে। আমার মনে হয়, তার স্ত্রী ভারতে আসার পর তাকে দেখলে হয়তো মানসিক অবস্থার উন্নতি হতে পারে। তিনি বলেন, সালাহউদ্দিন সাহেব আমাকে বলেছেন তার অসম্ভব ব্যাক পেইন শুরু হয়েছে। ব্যাক পেইনসহ নানা সমস্যার কারণে গতকাল রাতেও তিনি ঠিকভাবে ঘুমাতে পারেননি। আমি মনে করি, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়া উচিত। কোন দেশে নিয়ে তাকে চিকিৎসা করানো যেতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল লতিফ জনি বলেন, সালাহউদ্দিন আহমেদ ইতিপূর্বে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ওই দেশের ডাক্তারদের ট্রিটমেন্টে আছেন। চিকিৎসার বিষয়ে তার স্ত্রী শিলংয়ে আসার পর ভারতীয় যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। আমরা আশা করবো কর্তৃপক্ষ যেটা ভাল মনে করবে সেটাই করবেন। ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলার কাগজ পেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে সহ-দপ্তর সম্পাদক জনি বলেন, মামলার কাগজপত্র উঠানোর জন্য আমি যাইনি। এসব কাগজপত্র উঠানোর কাজটি লিগ্যাল প্রসেস। তার জন্য যে আইনজীবী নিয়োগ করা হবে তিনিই এসব কাগজপত্র উঠানোর কাজটি করবেন। সালাহউদ্দিনের স্ত্রী আসার পর এ বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। সিভিল হাসপাতালের ডাক্তারদের চিকিৎসা নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের ট্রিটমেন্ট স্ট্রাকচার ও এ হাসপাতালের ট্রিটমেন্ট স্ট্রাকচার এক নয়। এখানের ডাক্তাররা চিকিৎসা করছেন। কিন্তু স্পেশালাইজড ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসার যে ব্যবস্থা সেটা হয়তো এখানে তিনি পাচ্ছেন না। এজন্য সিঙ্গাপুর নিয়ে চিকিৎসা করানো দরকার বলে মনে করছেন তিনি। এদিকে গতকালও চিকিৎসকরা সালাহউদ্দিন আহমেদের স্বাস্থ্যের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তাকে দেখে এসে কার্ডিওলজিস্ট ডা. জি. গোস্বামী বলেন, আমরা তার সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। সালাহউদ্দিনের ওজন কমে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, আগে তার ওজন কত ছিল তা আমরা জানি না। তাই এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না।
ভাতিজা করিমকে পেয়ে আপ্লুত: অনেক দিন পর রক্তের সম্পর্কের কাউকে কাছে পান বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন। কাছে পেয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, দুপুর একটায় পুলিশি অনুমতি নিয়ে চাচার সঙ্গে দেখা করতে যান মো. করিম। এ সময় প্রিজন সেলের ভেতরে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। চাচা-ভাতিজা দুজনেই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেন। বাইরে বেরিয়ে মো. করিম মানবজমিনকে বলেন, অনেক দিন পর রক্তের সম্পর্ক কাউকে দেখে আপ্লুত হয়ে যান চাচা। নিজের এলাকায় গরিব-দুখী ও যেসব ছাত্রছাত্রীকে মাসিক সহায়তা দিতেন তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। বাড়ির সবাই কেমন আছে ওই বিষয়টিও জানতে চান। চাচা এলাকাবাসীসহ আত্মীয়স্বজন সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। এদিকে গতকালও কলকাতা থেকে আসা আইয়ুব আলী সালাহউদ্দিনের দেখভালে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি বলেন, ভাবি হয়তো সোমবার চলে আসবে। এরপর নিজের কাজে যাবো। এর আগে যাচ্ছি না।
সালাহউদ্দিনকে পেয়ে খুশি ইউটিপি সেলের ৭ বন্দি : সালাহউদ্দিন আহমেদকে পেয়ে খুশি আন্ডার ট্রায়াল প্রিজনার (ইউটিপি) সেলের অন্য ৭ বন্দি। এর মধ্যে পাঁচজন পুরুষ ও দুইজন মহিলা বন্দি। সালাহউদ্দিনকে দেখভাল করেন এমন নার্সসূত্রে জানা গেছে, নিজের জন্য বাইরে থেকে যেসব খাবার সালাহউদ্দিনের কাছে যাচ্ছে তার বেশির ভাগ নিজের সঙ্গে থাকা বন্দিদের মধ্যে ভাগ করে দিচ্ছেন। সব সময় বলেন, আমরা ভাল খাবার খেতে পারলেও ওরা তো ভাল খাবার খেতে পারে না। তাই ওদেরকে বেশি করে দিতে হবে। সালাহউদ্দিনের নিকট আত্মীয় কলকাতা থেকে আসা আইয়ুব আলী মানবজমিনকে জানালেন, ভাই খুব একটা খাবার খাচ্ছেন না। তবুও ভাইকে ডজনের পর ডজন কলা, আপেল, সবজি, রুটিসহ বিভিন্ন খাবার কিনে দিতে হচ্ছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এসব খাবার সেলে দিয়ে আসার পর পরই ভাই এসব খাবার বন্দিদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে দেন। খাবারের পাশাপাশি প্রিজন সেলের বন্দিদের কাপড়চোপড় দিয়ে সহায়তা করছেন সালাহউদ্দিন। সেলে কর্মরত এক কর্মী জানান, বিএনপি’র সহ-দপ্তর সম্পাদক আব্দুল লতিফ জনি সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার পর তার কাছে কাপড়-চোপড় চেয়েছেন সালাহউদ্দিন। জনি জানতে চান কি কি কাপড়-চোপড় প্রয়োজন? প্রতি উত্তরে সালাহউদ্দিন জনিকে বলেন, ওরাতো গরিব মানুষ। ওদেরকে সহায়তা দিতে হবে। এ কারণে তাদের জন্যই কাপড় চেয়েছি। ইউটিপি রুমের তালিকা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদের নাম ওই তালিকার তিন নম্বরে রয়েছে। এছাড়া পুরুষ চিকিৎসাধীন বন্দিদের মধ্যে রয়েছেন বিশাল গুরাং, গণেশ গৌরাঙ্গ, শুকাদউ রাই, সিলভারমুন সেতু ও আনন্দ রাই। অন্যদিকে মহিলা বন্দিদের মধ্যে রয়েছেন গ্রেস বাইপি ও নাগাইনু বাইপি। এ দুই চিকিৎসাধীন বন্দি আলাদা সেলে বসবাস করছে। তাদের কাছেও সালাহউদ্দিনের কাছ থেকে খাবার পৌঁছে যাচ্ছে। কাপড়-চোপড়ও পৌঁছে যাচ্ছে। এদিকে আত্মীয়স্বজনদের পাশাপাশি ডাউকির কিছু শুভানুধ্যায়ী বিভিন্নভাবে সালাহউদ্দিনকে সহায়তা দিচ্ছেন। তারা এ বিএনপি নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে না পারলেও সালাহউদ্দিনের জন্য যেসব নেতাকর্মী ও আত্মীয়-স্বজনরা এসেছেন তাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা করছেন। ডাউকি’র খাসিয়া সম্প্রদায়ের স্ট্যালিন সিভিল হাসপাতালে মানবজমিনকে জানান, আমাদের দেশে সালাহউদ্দিন বিপদে পড়েছে। তাকে সহায়তা দেয়া আমাদের দায়িত্ব। এ প্রেরণা থেকে তার আত্মীয়স্বজনদের নানাভাবে সহায়তা করছি।

রাষ্ট্রগুলো ‘মানুষ নিয়ে পিংপং’ খেলছে

ভূমধ্যসাগরে অভিবাসী পাচার ইস্যু নিয়ে যে শোরগোল তাতে আড়াল হয়ে গেছে হাজারো বাংলদেশী ও রোহিঙ্গাদের চরম দূদর্শা। পশ্চিমা রাজনীতিক আর গণমাধ্যমের দৃষ্টিও তেমনটা পড়েনি। কিন্তু সম্প্রতি প্রায় ৬০০ মানুষ বহনকারী দুটি নৌকা তীরে ভিড়তে না দিয়ে সাগরে ঠেলে দেয়ার যে উদাসীন পদক্ষেপ মালয়েশিয়া নিয়েছে তাতে হয়তো বিশ্বের অন্যতম বড় এ অভিবাসন সঙ্কটের দিকে সবার মনোযোগ ফিরতে পরে। একইরকম অবিবেকপ্রসূত পদক্ষেপ নিয়েছে থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া। বৃটেনের প্রভাবশালী দৈনিক গার্ডিয়ানের সহকারী সম্পাদক সাইমন টিসডাল এক কলামে এসব কথা লিখেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, মালয়েশিয়ার বন্দরগুলো বন্ধ করে দেয়ার সরকারী সিদ্ধান্তের পর দেশটির কর্মকর্তারা ওই দুই নৌকাকে সাগরে ফিরে যেতে বাধ্য করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পরবর্তীতে থাইল্যান্ডের সমুদ্র সীমায় যে নৌকাগুলোকে ভাসতে দেখা যায় তারমধ্যে সেটিও ছিল বলে ধারণ করা হয়। সে দেশের কর্তৃপক্ষও সাফ জানিয়ে দেয় যে তারা স্বাগত নয়। ওই নৌকার এক রোহিঙ্গা শরণার্থী জানিয়েছেন, তাদের ওই ভয়াল যাত্রায় ১০ জন মারা গেছে। মৃতদেহগুলো তারা সাগরে ফেলে দেয়। দুমাস ধরে তারা সাগরে ভাসছেন বলে জানান। খাবার পানির অভাবে দূর্বল হয়ে পড়া নৌকার যাত্রীর মধ্যে শিশুরাও রয়েছে। সহায়তা সংগঠনগুলোর কর্মীদের অনুমান, সাগরে ভাসছেন ৬হাজারের মতো অভিবাসী। তাদের যাওয়ার কোন জায়গা নেই। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে, তাদেরকে সাহায্য করতে ইচ্ছাকৃত অস্বীকৃতি দ্রুতই বড় ধরণের মানবিক বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যেতে পারে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, নৌকার আরোহীরা ক্ষুধার্থ ও অসুস্থ। একইসঙ্গে তারা পানিশূন্যতায় ভুগছে। তাদের এ অবস্থা শুধুই অবনতির দিকে যাচ্ছে। আর এদিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন আঞ্চলিক সরকারগুলো উদ্ধার অভিযান চালানোর বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। বরং তারা এ সমস্যাটি অন্যের ওপর বর্তানোর চেষ্টা করছেন। নিউইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ফিল রবার্টসন বলেন, থাই, মালয়েশীয় ও ইন্দোনেশীয় নৌ বাহিনীদের মানুষ নিয়ে এ ত্রিমুখি পিংপং খেলা বন্ধ করা উচিত। এর পরিবর্তে দূর্দশাগ্রস্থ এসব নৌকার আরোহীদের উদ্ধারে তাদের একসঙ্গে কাজ করা উচিত। লন্ডন ভিত্তিক অ্যামনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, এটা চিন্তা করাই হৃদয়বিদারত যে শ’ শ’ মানুষ এ মুহুর্তে খাবার পানি ছাড়া মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে সাগরে ভাসছে। তারা কোথায় আছে সেটাও জানেনা এসব অসহায় মানুষ। ইন্দোনেশিয়া জানিয়েছে, তারাও ৪০০ অভিবাসীবাহী একটি নৌকা ফিরিয়ে দিয়েছে। তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানা যায় নি। সাগরে নৌকা ফিরিয়ে দেয়ার সাম্প্রতিক এ সিদ্ধান্তের আগে অবশ্য কয়েক শ মানুষ ইন্দোনেশিয়ায় পৌছায়। ওদিকে মালয়েশিয়ার লঙ্কাওয়িতে পৌছায় আনুমানিক ১০০০। থাইল্যান্ডের মতো মালয়েশিয়াও তাদের রমরমা পর্যটন বানিজ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা অপ্রত্যাশিত এ মানবিত সঙ্কট তাদের উপকূলে হাজির হওয়ায় তা পর্যটনের ওপর নেতীবাচক প্রভাব ফেলবে। মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র বিষয়ক উপপন্ত্রী ওয়ান জুনাইদি টুয়ানকু জাফর বলেন, এ সমস্যার মূল কারণ হলো মিয়ানমার ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থীতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমস্যা। তিনি আরও বলেন, ‘ আমরা কি করবো বলে তারা আমাদের কাছে প্রত্যাশা করেন? যারা আমাদের সীমান্তে এসেছে, তাদের সঙ্গে আমরা ভালো ব্যবহার করেছি। আমরা তাদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করেছি কিন্তু এভাবে তারা দলে দলে আমাদের উপকূলে ভিড়তে পারে না। ধারণা করা হয়, গত তিন বছরে মিয়ানমার থেকে ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেেেত্র তারা মানবপাচারকারীদের হাতে মোটা অঙ্কের অর্থ তুলে দিয়ে নৌকায় উঠেছে। পরে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছে থাইল্যান্ডের ট্রানসিট ক্যাম্পে যেখানে ধর্ষণ, মারধোরসহ নানা শারীরিক নির্যাতন ঘটে অহরহ। থাইল্যান্ড সম্প্রতি এসব ক্যাম্পগুলোর ওপর কঠোর অভিযান শুরু করায় সঙ্কট আরও বড় আকার ধারণ করেছে বলে মনে হচ্ছে। এতে করে পাচারকারীদের নৌকাগুলো থাইল্যান্ডের উপকূলে না ভিড়ে সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে। আর যেখানে পারছে সেখানে শরণার্থীদের নামিয়ে দিচ্ছে।
থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী থানাসাক পাতিমাপ্রাকর্ণ বলেন, তার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো শরণার্থী শিবির স্থাপন করবে না। তবে, স্বল্পমেয়াদে মানবিক সহায়তা দিতে তারা ইচ্ছুক। এদিকে, ২৯শে মে এ অঞ্চলের দেশগুলো মানব পাচার ও চোরাচালান রোধে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে আলোচনার লক্ষ্যে বৈঠকে যোগ দেবে। দেশগুলোর সামনে এখন যে চ্যালেঞ্জ তা একাধারে বিরাট গুরুতর ও জরুরি।

মানব পাচার রোধে ‘ক্রসফায়ার’ থেরাপি! by সোহরাব হাসান

ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের একটি
আশ্রয়কেন্দ্রে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীরা
বিষয়টি কাকতালীয় হতে পারে। যেদিন সরকার চলতি অর্থবছরে মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৩১৪ ডলারে উন্নীত হওয়ার ঘোষণা দিল, সেদিনই টিভিতে দেখলাম থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার কূলে ভিড়তে না দেওয়া সমুদ্রে ভাসমান একটি ট্রলারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কয়েক শ বাংলাদেশি নারী, পুরুষ ও শিশুর আহাজারি। রোহিঙ্গারা তাদের দেশে অবাঞ্ছিত, বিতাড়িত। সে কারণে তারা দেশে দেশে আশ্রয়ের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকেরা এভাবে কেন পাচারের শিকার হবে? স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরও কেন আমরা তাদের ন্যূনতম মানবিক ও নাগরিক সুবিধাটুকু দিতে পারলাম না? ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসির সংবাদদাতা জোনাথন হেডের ভাষ্য, ‘সে এক করুণ দৃশ্য। আরোহীরা চিৎকার করে সাহায্য চাইছিলেন। চাইছিলেন খাবার ও পানি। সেখানে ৫০ জন নারী ও ৮৪টি শিশুও ছিল। পুরোনো নৌযানটি কানায় কানায় ঠাসা ছিল।...আমরা দেখেছি, তাঁদের কেউ কেউ বোতলে রাখা নিজের প্রস্রাব পান করছেন। আমরা তাঁদের দিকে পানির বোতল ছুড়ে দিচ্ছিলাম।’ টিভিতে দেখেছি, একটি পানির বোতল ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে, আর অনেকগুলো মানুষ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন সেই বোতল পাওয়ার জন্য। হয়তো একজন পেয়েছেন, আর দশজন বেজার মুখে তাকিয়ে আছেন। ক্ষুধার্ত শিশুরা কাঁদছে। কেউ তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার নেই।
অাগের বিবরণ শুনুন। ছয় দিন আগে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তের সাগরে চালক ও সহকারীরা নৌযানটি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এর ইঞ্জিনও বিকল। বুধবার রাতে থাই জেলেদের সহায়তায় তাঁরা নৌযানটিকে মালয়েশিয়া উপকূলে নিয়ে যান। সেখান থেকে থাইল্যান্ড উপকূলের দিকে ঠেলে পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকেও ফেরত পাঠানো হয় তাঁদের। দু-এক দিনের মধ্যে কেউ উদ্ধার না করলে কিংবা খাবার ও পানি সরবরাহ না করলে হতভাগ্য মানুষগুলোকে বাঁচানো যাবে না। না খেয়েই মারা যাবেন। তখন হয়তো সিরাজগঞ্জের, টেকনাফের কিংবা নরসিংদীর আরও অনেক ঘরে স্বজনের বুকফাটা কান্না শোনা যাবে।
বাংলাদেশে মানব পাচার হয় এখন ৪১টি জেলা থেকে। সীমান্তবর্তী সব জেলায়ই পাচারকারী চক্র সক্রিয়। কিন্তু ওই নৌযানের আরোহীরা কূলে উঠতে পারলেই বেঁচে যাবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। সেখানে তারা কোনো দালাল চক্রের হাতে বিক্রি হয়ে যাবেন। এরপর সেই দালালেরা তাদের থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ার গহিন জঙ্গলে নিয়ে দেশে স্বজনদের কাছে টেলিফোন করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করবে। সেই মুক্তিপণের পরিমাণ এমন যে ওই গরিব মানুষগুলোর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে গণকবরই তাদের শেষ ঠিকানা। বিদেশের মাটিতে স্বজনদের গণকবর খুঁড়তেই কি আমরা দেশ স্বাধীন করেছিলাম? লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে আর কত মানুষের এই অপমান ও করুণ মৃত্যু দেখতে হবে?
এ তো একটি নৌযানের কাহিনি। এ রকম অনেকগুলো নৌযানে এ যুগের মানব দাসদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। স্থলপথে, বিমানপথেও পাচার হচ্ছে মানুষ। বিদেশি সংবাদ সংস্থার খবরে বলা হয়, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সমুদ্রসীমায় ভাসতে থাকা বিভিন্ন নৌযানের প্রায় আট হাজার অভিবাসী এখন তীব্র খাদ্য ও পানীয় কষ্টে রয়েছে। ক্ষুধায় ও অসুস্থতায় অনেকে মারা গেছে। কিছু নৌযানে জ্বালানি ফুরিয়ে আসছে। এক সপ্তাহ ধরে আন্দামান সাগরে লক্ষ্যহীনভাবে ভাসতে থাকা একটি নৌযানের ১০ জন মারা গেছে। নৌযানটিতে খাদ্য ও পানীয় ফুরিয়ে গিয়েছিল। মাছ ধরার কাজে ব্যবহৃত হওয়া ওই নৌযানে প্রায় ৩৫০ জন অভিবাসী ছিল। নৌযানটি থাইল্যান্ড উপকূলে এলেও দেশটি অভিবাসীদের আশ্রয় দেয়নি।
বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ভয়াবহ মানবিক সংকট বলে অভিহিত করলেও আমাদের নেতা–নেত্রীরা আমলে নিচ্ছেন বলে মনে হয় না। তাঁরা আছেন রাজনৈতিক কৌশলে কে জিতল কে হারল, সেই হিসাব–নিকাশ নিয়ে। তিন সিটি নির্বাচনের পর এখন নবনির্বাচিতদের সংবর্ধনা ও অভিষেকের মহড়া চলছে। কোনো দল ব্যস্ত নেত্রীর সংবর্ধনা নিয়ে; কোনো দল প্রয়াত নেতার মৃত্যুবার্ষিকী পালন নিয়ে। এই সব দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের কথা ভাবার সময় কোথায় তাদের।
আমাদের নেতা–নেত্রীরা হররোজ উন্নয়নের বুলি আওড়াচ্ছেন। মধ্যম আয়ের দেশ করার খোয়াব দেখাচ্ছেন। ঢাকাকে হংকং-সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ার কথা বলছেন। যে দেশে এখনো গরিষ্ঠসংখ্যক মানুষ ন্যূনতম মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, যে শহরের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বস্তি ও ফুটপাতে বাস করতে বাধ্য হচ্ছে, সেই শহরকে তারা কীভাবে সিঙ্গাপুর বানাবেন? ফি বছর বাজেটের আকার বাড়ছে, প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার স্ফীত হচ্ছে। কিন্তু ওই পাচার হওয়া মানুষগুলো এবং তাদের মতো আরও লাখ লাখ মানবসন্তান এই হিসাবের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। সরকার দাবি করছে, দেশে দারিদ্র্য কমেছে, সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত আছে। সবই মানলাম। কিন্তু মানব পাচার থামছে না কেন?
আসলে আমাদের অর্থনৈতিক নীতিতে, রাজনৈতিক দর্শনে মারাত্মক গলদ আছে। এখানে তেলা মাথায় তেল দেওয়া হয়। উন্নয়নের সুফল কতিপয় ব্যক্তি পেলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থাকে বঞ্চিত। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর সে দেশের মানুষ জাহাজে করে হংকং, তাইওয়ান কিংবা জাপানের পথে পাড়ি দিত। তাদের বলা হতো ‘নৌকা মানব’। এখন আর ভিয়েতনামিদের বহন করা জাহাজ সমুদ্রে ভাসতে দেখা যায় না। মাত্র দুই দশকে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উন্নয়নের মডেল হতে পেরেছে। আর আমরা প্রবৃদ্ধির হার ৬ না সাড়ে ৫ নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করছি। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই ছোট্ট ভূখণ্ডে ১৬ কোটি লোক বাস করে। তার পরও আমরা জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করছি। সব বিশেষজ্ঞের মতকে অগ্রাহ্য করে বর্ধিত জনসংখ্যা বোঝা নয়, সম্পদ বলে প্রচারণা চালাচ্ছি। কিন্তু সেই জনসংখ্যাকে কীভাবে সম্পদে পরিণত করতে হয়, সেই চেষ্টা করছি না। আমাদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর পরিকল্পনা নেই। পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের চেষ্টা নেই। ফলে বেকার মানুষগুলো পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। জীবিকার সন্ধানে গিয়ে অনেকে সাগরে, মরুভূমিতে, জঙ্গলে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। গতকাল প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সমুদ্রপথে মানব পাচারের বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষ থেকে সতর্ক করা হলেও যথাসময়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি সরকার। এমনকি এ ব্যাপারে গৃহীত জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় স্থান পায়নি সমুদ্রপথে মানব পাচারের বিষয়টি।
বৃহস্পতিবার রাতে টেলিভিশনের খবরে শুনলাম, প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ‘আমরা শুধু বৈধ শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করি। অবৈধ শ্রমিকদের নিয়ে নয়।’ পাচার রোধ বা পাচার হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ব্যাপারে নাকি তাঁর দায়িত্ব নেই। এটি দেখবে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে মানব পাচার নিয়ে স্বরাষ্ট্র ও কিংবা পররাষ্ট্রমন্ত্রীরও কোনো বিবৃতি বা ব্যাখ্যা আমাদের চোখে পড়েনি। তাঁরা হয়তো এটিকে সমস্যাই মনে করেন না। এর সঙ্গে থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তানাসাকের বক্তব্যটি মিলিয়ে নিন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী অবৈধ অভিবাসী সমস্যার সমাধানে উৎস দেশ, অর্থাৎ যেসব দেশ থেকে তারা পাচার হয়ে এসেছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা ও সহায়তা করতে তাঁর সরকার প্রস্তুত।
কেবল সমুদ্রপথেই মানুষ পাচার হচ্ছে না। কয়েক বছর আগেও ঢাকা বিমানবন্দর ছিল শিশু ও নারী পাচারের নিরাপদ রুট। আর স্থলপথে মানব পাচারের ঘটনা তো হরহামেশাই ঘটছে। কেবল পশ্চিমবঙ্গের কারাগারেই দেড় হাজারের বেশি বাংলাদেশি আটক আছেন। সারা ভারতে সংখ্যাটা কত হবে কিংবা পাকিস্তানে? একজন সাবেক কূটনীতিক জানান, পৃথিবীতে এ রকম দেশ হয়তো পাওয়া যাবে না, যেখানে বাংলাদেশি অভিবাসী আছে, কিন্তু কারাবন্দী নেই।
জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন বলেছে, ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাসে সমুদ্রপথে ২৫ হাজার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা পাচার হয়ে গেছে, যা গত বছরে একই সময়ের চেয়ে দ্বিগুণ। এ সময়ে অনাহারে কিংবা অসুখে মারা গেছে ৩০০ জন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের দাবি, বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ পাচার হয়ে যায়। ইউএনডিপি বলেছে, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৩ লাখ ও তিন দশকে ১০ লাখ। এই পরিসংখ্যান উন্নয়নের বার্তা প্রচারকারী নেতা–নেত্রীরা কীভাবে নেবেন জানি না। লজ্জায় আমাদের মাথা অবনত করে দেয়।
দুই সপ্তাহ ধরে মানব পাচারের বিষয়টি দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও সরকারের পক্ষ থেকে তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। বরং তারা মানব পাচার রোধের অতি সহজ পথ হিসেবে ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধকে বেছে নিয়েছে। ইতিমধ্যে পুলিশ ও র্যাবের হাতে পাঁচজন কথিত মানব পাচারকারী নিহত হয়েছেন। সরকার বলতে পারে, এরা এতটাই দুর্ধর্ষ হয়ে উঠেছিল যে অভিযান চলাকালে কর্তব্যরত পুলিশ ও র্যাব সদস্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাই তারা গুলি করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু পাচারকারীরা পুলিশের ওপর হামলা করার মতো শক্তি পেল কোথায়? সেই দানবদের পাকড়াও করার জন্য তারা এত দিন কোনো পদক্ষেপ নিল না কেন? যেভাবে সরকার বিরোধী দলের আন্দোলন থেকে শুরু করে মানব পাচার রোধ—সব ক্ষেত্রে ক্রসফায়ারকে মোক্ষম দাওয়াই মনে করছে, তাতে ভবিষ্যতে আইন–আদালতের প্রয়োজনই হবে না।
ডেইলি স্টার ধন্যবাদ পেতে পারে বাংলাদেশের এই জ্বলন্ত সমস্যাটি সামনে নিয়ে আসার জন্য। সরকার যদি এটিকে তাদের বিরুদ্ধে নতুন কোনো ‘ষড়যন্ত্র’ মনে না করে, তাহলে তাদের উচিত হবে পাচারের কারণগুলো অনুসন্ধান করে এর প্রতিকারে এখনই কিছু করা। তাদের বুঝতে হবে দেশে কাজ থাকলে কেউ কাঁটাতারের বেড়া ডিঙিয়ে কিংবা সমুদ্রপথে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয় না।
কয়েক দিন আগে দেশে দুই দফায় ভূমিকম্প হয়ে গেল। সেই ভূমিকম্পে তেমন ক্ষতি হয়নি। কিন্তু পাচার নামক মানবসৃষ্ট ভূমিকম্পের ক্ষতি বিশাল ও ভয়াবহ। যেসব বাংলাদেশি নারী পুরুষ ও শিশু পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে এখন সাগরে ভাসছে কিংবা বিদেশে কারাগারে আটক আছেন, তাদের বিষয়ে কি মধ্যম আয়ের দেশের স্বপ্ন দেখা এবং ‘প্রকৃত জাতীয়তাবাদী’ সরকারের কিছুই করার নেই?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

সুশাসনের জন্য জবাবদিহি দরকার by সালেহউদ্দিন আহমেদ

২০০৭ সালে আর্থিক খাতের সংকট থেকে যে বৈশ্বিক মন্দার সৃষ্টি হয়, তার মূল কারণ হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনা। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হরেক রকম ব্যবস্থা নিয়েছে, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রোগ নিরাময়ের লক্ষণ এখনো দৃষ্টির বাইরে। ২০১৫ সালে আমাদের নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। বাংলাদেশের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলো এই বৈশ্বিক অধোগতি ও বড় অর্থনীতির নীতিসমূহের নেতিবাচক প্রভাবের বাইরে নয়। বাংলাদেশকে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা ও শৃঙ্খলার জন্য কর্মোদ্যোগ নিতে হবে, শুধু লক্ষণগুলো (ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি, বিধিবিধান ও তত্ত্বাবধানের অপর্যাপ্ততা) আমলে নিলে চলবে না; তাকে অন্তর্নিহিত কারণগুলো খতিয়ে দেখতে হবে (আলগা নীতি, ব্যবস্থাপনার দূরদর্শী নীতি মান্য না করা, দুর্বল আর্থিক প্রতিবেদন, তারল্যের লাগামহীন বিস্তৃতি, যা বুদ্বুদ সৃষ্টি করে)।
এই নিবন্ধে দেশের ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ আমলে নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক কালের হল-মার্ক ও বিসমিল্লাহ গ্রুপের দুর্নীতি, বেসিক ব্যাংকের নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম থেকে দেখা যায়, এসব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় ফাটল ধরেছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দুর্নীতি হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে। এসব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে ব্যবস্থাপনা ও এমনকি নিচের স্তরের কর্মকর্তা পর্যন্ত কোনো ক্ষেত্রেই সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দেখা যায়নি। আরও উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে, এসব অনিয়ম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ভিন্ন কাঠামো দেখা যায়। কিন্তু তারা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনাগত নীতিমালা অনুসরণ করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত মানদণ্ড যথেষ্ট সুচিন্তিত, তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে। ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্টসের (বিআইএস) আওতায় সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেলের দি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং সেটেলমেন্টস (বিআইএস) তিনটি প্রধান মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে: ব্যাসেল ১, ব্যাসেল ২ ও ব্যাসেল ৩। ব্যাসেলের তিনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বাইরেও ব্যাংকগুলো তাদের নিজেদের দেশের নানা আইন ও বিধিবিধান মেনে চলে।
আমানতকারী ও গ্রাহকের স্বার্থরক্ষায় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আগে যেটা বলেছি, বাংলাদেশে ব্যাংকের আইনি চাহিদা আন্তর্জাতিক মান অনুসারে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক কোম্পানি আইনেও এসব প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশনা দেওয়া হয়, নিরীক্ষা প্রতিবেদনসহ। তার ওপর, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক ও কৃষি ব্যাংকের মতো বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো যে আইনে তৈরি হয়েছে, সেটাও তারা মেনে চলে। আবার রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিরও কোম্পানি আইন ও সোসাইটিজ রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের অধীনে নিবন্ধিত কোম্পানির ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান রয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনেরও আর্থিক প্রতিবেদনবিষয়ক বিধিবিধান রয়েছে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, আমাদের দেশে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান (আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইনে পরিচালিত) ও কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনবিষয়ক মানদণ্ড বেশ সন্তোষজনক। কিন্তু উদ্বেগের ব্যাপার হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলো এসব শর্ত ঠিকঠাকমতো পূরণ করে না। অর্থাৎ এসব আইন বাস্তবায়নই (প্রয়োগ ও মান্য করা) হয় না, এটাই একমাত্র ‘দুর্বলতা’। বলা যায়, কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই—ব্যাপারটা অনেকটা এ রকম। ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড-৩০ (আইএএস-৩০) অনুসারে তৈরি করা হয়। তার জায়গায় এখন ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডস (আইএফআরএস-৭) অনুসরণ করা হয়। প্রয়োজনীয় মানদণ্ড যদি অনুসরণ করা হয়, তাহলে ব্যাংকের আমানতকারী, গ্রাহক ও আমজনতার কোনো ক্ষতি হয় না। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য আইএএস-৩০-এর পাশাপাশি আইএএস-৩২, আইএএস-৩৯ ও আইএফআরএস-৯ অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
এটাও উল্লেখ করা দরকার যে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার। অর্থাৎ ব্যাংকগুলোকে একদম ছেড়ে দেওয়া যাবে না, আবার তাদের অধিক হারে নিয়ন্ত্রণও করা যাবে না। এতে বিপর্যয় সৃষ্টি হতে পারে। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জাঁ তিরোল এই বিষয়টি যথাযথভাবে তুলে ধরেছেন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমানতকারী, বিনিয়োগকারী ও আমজনতাকে রক্ষা করা। মোদ্দা কথা, এর কাজ হচ্ছে সামগ্রিকভাবে প্রকৃত অর্থনীতিকে (প্রকৃত পণ্য ও সেবা) রক্ষা করা। নিয়ন্ত্রণের দ্বিতীয় যুক্তি হচ্ছে, আর্থিক খাতের সুশৃঙ্খল ঝুঁকি রোধ করা, যাতে তা এক জায়গায় শুরু হলে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে না পড়া। এটা অর্থনৈতিক কার্যক্রমের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এর ফলে প্রকৃত উৎপাদন হ্রাস পায়, প্রবৃদ্ধি কমে যায়, বেকারত্ব বাড়ে ও মানবকল্যাণের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়।
ব্যাংকিং খাতে সুশাসন আমাদের দেশের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়, বিশেষ করে এই খাতে বিরাজমান সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে। ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় সরকারি ও বেসরকারি দায়িত্বের পরিপ্রেক্ষিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বর্তমানে আরও বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতিতে টেকসই রাজস্ব খাতের জন্য সরকারি কার্য পরিচালনায় স্বচ্ছতা খুব জরুরি, রাজস্ব খাতের সামগ্রিক শৃঙ্খলার জন্যও এটি প্রয়োজনীয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি পরস্পর সম্পর্কিত, একটি জোরদার হলে আরেকটিও জোরদার হয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলে জবাবদিহি বাড়ে, কারণ তাতে নজরদারি বাড়ে। আবার জবাবদিহি থাকলে স্বচ্ছতা বাড়ে, এটা এজেন্টদের জন্য উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে। তারা নিশ্চিত হয় যে তাদের কাজের লক্ষ্য সম্পর্কে মানুষ সম্যকভাবে অবহিত হয়েছে, আর মানুষ তা বুঝতেও পেরেছে।
সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের ঘটনা হচ্ছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাবের যথার্থ দৃষ্টান্ত, সেখানে ঋণগ্রহীতা ও কর্মকর্তারা গোপন সমঝোতার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। সেই ঘটনায় যাদের ধরা হয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বস্তুত তাদের এক রকম ‘বিকৃত প্রণোদনা’ দেওয়া হয়েছে আর সেই দুটি ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাংকে যেসব সৎ কর্মকর্তা কাজ করছেন, তঁাদের কোনায় ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
আর আর্থিক বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের জন্য বোধগম্য আকারে প্রকাশ করতে হবে, যাতে তারা সহজেই বুঝতে পারে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ও আর্থিক প্রতিবেদনের যথাযথ বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত মানদণ্ড গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায্য উপস্থাপনার ক্ষেত্রে ভুল তথ্য উদ্ঘাটনের চেয়ে ভালো কিছু নেই। বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে তাদের পক্ষে তা যথেষ্ট পরিমাণে উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। আর এখানেই হিসাবরক্ষকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বাজারে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিরা যে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক তথ্য ব্যবহার করেন, সেগুলো সরবরাহ করে থাকে অ্যাকাউন্টিং ইনফরমেশন সিস্টেম। একজন হিসাবরক্ষককে শুধু সংখ্যার ওপর নির্ভর করলে চলবে না, তাঁদের সংখ্যা বিশ্লেষণে যুক্তি ও বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হবে।
ব্যাসেল নীতিমালা ও বাংলাদেশের নানা আইন ছাড়া আরও কিছু ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত মানদণ্ড রয়েছে: ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও পরিচালকদের যোগ্যতা, পরিচালনা পর্ষদ গঠন ও তার কার্যাবলির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ। যদিও আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি, ব্যাংকগুলো এসব ব্যবস্থাপনা মানদণ্ড অনুসরণ করে না। দেশের অনেক বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদেই একই পরিবারের একাধিক সদস্য আছেন, এটা করপোরেট সুশাসনের পরিপন্থী। সে কারণে ব্যাংকিং খাতের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা, যাতে আমানতকারী, ঋণগ্রহীতা, বিনিয়োগকারীসহ সবাই উপকৃত হন। একই সঙ্গে তাকে বাজার সম্প্রসারণ, মালিকানা বিস্তৃত ও অর্থায়নের বিকল্প সুযোগ তৈরি করতে হবে; প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে, কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে ও দেশের দারিদ্র্য হ্রাস করতে হবে।
করপোরেট সুশাসনের লক্ষ্য ও বিধিমালা মান্য করানোর মধ্যে ভারসাম্য আনয়নে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি: ক) শক্তিশালী ও স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যার মনোযোগ নিবদ্ধ থাকবে মৌলিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে। খ) সুচিন্তিত ও সুবিবেচনাপ্রসূত ব্যবস্থাপনা মানদণ্ড, যা সময় সময় বাহ্যিক ও প্রশাসনিক চাপের কারণে পরিবর্তিত হবে না, গ) সংকট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তড়িৎ সংশোধনের ব্যবস্থা, সুনির্দিষ্ট ব্যাংকে বা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সংকটের জন্য দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, বর্তমানে ব্র্যাকের স্কুল অব বিজনেসের অধ্যাপক।

সালাহ উদ্দিনের শারীরিক অবস্থার অবনতি

ভারতের মেঘালয়ের শিলং সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদের শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা অবনতি হয়েছে। তার হার্ট ও কিডনির ব্যথা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। পাশাপাশি প্রস্টেট ও চর্মরোগেও ভুগছেন তিনি। অসুস্থতার কারণে রাতে ঘুমাতে পারছেন না। যথাযথ সুযোগ-সুবিধা না থাকায় শিলংয়ে তার উন্নত চিকিৎসা হচ্ছে না। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যেতে ইচ্ছা পোষণ করেছেন সালাহ উদ্দিন। সিভিল হাসপাতালে পুলিশ হেফাজতে থাকা চিকিৎসাধীন সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে শনিবার দুপুরে সাক্ষাৎ করেছেন বিএনপি নেতা আবদুল লতিফ জনি। বিকালে টেলিফোনে যুগান্তরকে এসব তথ্য জানান তিনি। অসুস্থতার জন্য সালাহ উদ্দিনকে আদালতে হাজির করা সম্ভব হয়নি। অসুস্থতার জন্য তদন্ত স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শিলিংয়ের সিটি এসপি এম খাগক্র্যাং।
এম খাগক্র্যাং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, চিকিৎসকরা না ছাড়লে সালাহ উদ্দিনকে আদালতে হাজির করতে পারছে না পুলিশ। এখন তার শারীরিক অবস্থার ওপর সবকিছু নির্ভর করছে। সুস্থ হওয়ার পরই তাকে আদালতে তোলা হবে এবং এরপর শুরু হবে তদন্ত।
এদিকে প্রথমবারের মতো পরিবারের এক সদস্যের সাক্ষাৎ পেয়েছেন সালাহ উদ্দিন। শনিবার দুপুরে তার ভাইয়ের ছেলে করিম তার সঙ্গে দেখা করেন। ভাতিজা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। জানা গেছে, শিলং পুলিশ তাকে সাতদিনের জন্য দেখা করার অনুমতি দিয়েছে। প্রতিদিন তিনি দশ মিনিট করে দেখা করার সুযোগ পাবেন।
চাচার সঙ্গে দেখা করে বেরিয়ে সেখানে অবস্থানরত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে করিম বলেন, চাচা আমায় দেখে কেঁদে ফেলেন। জড়িয়ে ধরে চাচির (হাসিনা আহমেদ) খবর জানতে চান। দেশের খবর জানতে চান। চাচি কবে আসবেন সেটাও জানতে চান তিনি। চাচার শরীর খুবই খারাপ। তাই বেশি সময় কথা বলতে পারেননি। এ সময় করিম ছাড়াও দূরসম্পর্কের আÍীয় আইয়ুব আলী ও হুমায়ুন রশিদও সালাহ উদ্দিনের সঙ্গে দেখা করেন।
এদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শনিবার যুগান্তরকে বলেছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ভারতের আইন অনুযায়ী সেদেশে সালাহ উদ্দিনের বিচার হতে পারে। আর সালাহ উদ্দিনের স্বজনরা বলছেন, আইনি জটিলতা হতে পারে তা মোকাবেলায় তারাও প্রস্তুতি নিয়েছেন। সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ ভিসা পাওয়ার পর আজ বা কাল শিলংয়ের উদ্দেশে রওনা দেবেন বলে জানা গেছে। হাসিনা আহমেদ শিলংয়ে যাওয়ার পরই সালাহ উদ্দিনের চিকিৎসা ও আইনি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
দেশে ফেরত আনার প্রক্রিয়ার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেহেতু সালাহ উদ্দিন অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তাই সেখানকার প্রচলিত আইনে তার বিচার হবে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, সালাহ উদ্দিন কী ধরনের অপরাধ বা দোষ করেছেন এর মাত্রা অনুযায়ী সে দেশে বিচার হওয়ার কথা।
তিনি বলেন, যেহেতু বাংলাদেশেও তার বিরুদ্ধে নাশকতা, উস্কানি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে মামলা আছে তাই সরকার তার বিচার করতে আইনি প্রক্রিয়া তাকে ফেরত চাইবে। তবে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ করে তিনি যে অপরাধ করেছেন আমরা জানতে পেরেছি সেটার বিচারও করবে সে দেশের সরকার।
শনিবার দুপুরে বিএনপি নেতা জনি দেখা করেছেন সালাহ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সিঙ্গাপুরে হৃদরোগের চিকিৎসা করান সালাহ উদ্দিন আহমেদ। শিলং হাসপাতালে সব আধুনিক ব্যবস্থা নেই। সে কারণে তার যথাযথ চিকিৎসা হচ্ছে না।
এক প্রশ্নের জবাবে জনি জানান, সালাহ উদ্দিন আহমেদকে বাংলাদেশে ডিপোর্টেশনের দাবি জানাবেন বা আবেদন করবেন কিনা এটা সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ভারতে আসার পরে সিদ্ধান্ত নেবেন। মামলা কীভাবে পরিচালনা করা হবে আর কীভাবে ভারত থেকে তাকে মুক্ত করা হবে, সালাহ উদ্দিন আহমেদকে ভারতের বাইরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার জন্য তার পরিবার যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করবেন। এছাড়া অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে তার বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে, আদালতে তা পরিচালনা করতে স্থানীয় কয়েকজন সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গেও তারা যোগাযোগ করছেন। সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ শিলংয়ে আসতে না পারায় আইনি প্রক্রিয়া এবং চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হচ্ছে। তিনি আসার পরই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
সালাহ উদ্দিনের সবশেষ অবস্থা জানতে জনির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সালাহ উদ্দিনের শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা খারাপ। শরীর মারাত্মক দুর্বল হওয়ায় কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল। এমনকি বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। রাতে ঘুমাতে পারছেন না। হার্টের সমস্যার কারণে বুকে ব্যথা ও কিডনি জটিলতার কারণে কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছেন তিনি।
জনি জানান, শনি ও রোববার এখানে ছুটি। তাই ডাক্তারদের সঙ্গে তার কথা বলা সম্ভব হয়নি। সোমবার চিকিৎসকরা সালাহ উদ্দিন আহমেদকে আবারও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবেন বলে জানান তিনি।
এদিকে বুধবার ভারতীয় ভিসার জন্য সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদসহ পরিবারের কয়েকজন আবেদন করলেও এখনও ভিসা হাতে পাননি তারা। আজ রোববার বা আগামীকাল সোমবার ভিসা পেতে পারেন হাসিনা আহমেদ। ভিসা পেলে সড়ক পথে শিলংয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন তিনি। তার সঙ্গে আরও দুই অথবা তিনজন নিকট-আত্মীয় যাবেন।
জনি আরও বলেন, সালাহ উদ্দিনের যে ধরনের চিকিৎসা দরকার, তা শিলং সিভিল হাসপাতালে পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি (সালাহ উদ্দিন) সিঙ্গাপুরে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। তাই হার্ট ও কিডনি সমস্যার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়া প্রয়োজন বলে তাকে জানিয়েছেন তিনি (সালাহ উদ্দিন)। চিকিৎসা ও থাকার ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য শিলং পুলিশ বিশেষ করে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে আবারও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন সালাহ উদ্দিন।

বেশভূষা দেখে তাঁর কথা বিশ্বাস করেনি শিলং পুলিশ by রাহীদ এজাজ

সোমবার ভোর ছয়টার দিকে শিলং পুলিশের ইন্সপেক্টর কে শাবং সাদামাটা পোশাকের এক লোককে নিয়ে পাশের পুলিশ ফাঁড়িতে পৌঁছান। সৌম্য, শান্ত লোকটির হাতে ছিল পলিথিনের পোঁটলা। এতে কয়েকটি জামা ও কয়েক পাতা বাংলাদেশি ওষুধ। পুলিশকে জানালেন, তাঁর নাম সালাহ উদ্দিন আহমদ। তিনি বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপির নেতা।
তবে সালাহ উদ্দিনের এ বক্তব্য বিশ্বাস করেনি পুলিশ। তখন ফাঁড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। শিলংয়ের যে ফাঁড়িতে প্রথম সালাহ উদ্দিনকে নেওয়া হয়েছিল, সেই ফাঁড়ির সদস্যরা গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে এসব কথা বলেন। তাঁরা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, চোখ বাঁধার কথা বলা হলেও তাঁর চোখ কিংবা কপালের আশপাশে কোনো দাগ দেখা যায়নি। পরনে ছিল সাদা শার্ট ও একটি ট্রাউজার। পায়ে জুতা থাকলেও মোজা ছিল না। মুখে হালকা দাড়ি। ওই সময় তিনি পুলিশকে জানিয়েছিলেন, দুই মাস আগে তাঁকে বাংলাদেশ থেকে অপহরণ করা হয়েছিল। এরপর অপহরণকারীরা তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরিয়ে মেঘালয়ে ফেলে যায়।
তাঁকে মানসিক হাসপাতালে নেওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশ বলছে, তিনি যে পরিচয় দিচ্ছিলেন, সেটি তাঁদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তিনি ঠিক বলছেন কি না অথবা মানসিকভাবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ কি না, তা নিশ্চিত হতে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সোমবার ফাঁড়ি থেকে সিভিল হাসপাতাল, শিলং সদর থানা, মানসিক হাসপাতাল হয়ে সিভিল হাসপাতাল নেওয়া পর্যন্ত সালাহ উদ্দিন আহমদের সঙ্গে ছিলেন ইন্সপেক্টর কে শাবাং ও সাব-ইন্সপেক্টর পি লামারে।
সালাহ উদ্দিনের এসব বক্তব্য নিয়ে এখনো ঘোরের মধ্যে আছেন শিলং পুলিশের কর্মকর্তারা। তাঁরা এ নিয়ে কিছুই বলছেন না। কী করে সালাহ উদ্দিন এখানে এলেন, সে ব্যাপারে জানতে চাইলে কেউ কেউ এককথায় সব উড়িয়ে দিচ্ছেন, কেউ রহস্যের হাসি হাসছেন।
ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে পুলিশি পাহারায় শিলংয়ের সিভিল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে সোমবার আদালতে নেওয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। ওই দিনের মামলার তালিকায় তাঁর নাম আছে। তবে পুলিশ বলছে, ‘বিএনপি নেতা সুস্থ’ চিকিৎসকের এমন ছাড়পত্র পাওয়ার পর তাঁকে আদালতে নেওয়া হবে।
গত সোমবার ভোরে শিলংয়ের গলফ-লিংক এলাকায় উদ্ভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরির সময় তাঁকে পুলিশ আটক করে স্থানীয় ফাঁড়িতে নিয়ে যায়। গত শুক্রবার ও গতকাল স্থানীয় লোকজন, পুলিশ ও চিকিৎসকেরা আলাদাভাবে প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য থেকে এটা স্পষ্ট যে সালাহ উদ্দিন নিজে নন, পুলিশই তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাস্তুর পুলিশ ফাঁড়িতে নিয়ে যায়।
যে স্থান থেকে সালাহ উদ্দিনকে আটকের কথা বলা হচ্ছে, সেটি হলো গলফ-লিংক। এর অবস্থানটা শিলংয়ের কেন্দ্রস্থল থেকে চার কিলোমিটার দূরে। গত শুক্রবার বেলা তিনটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত এখানে ঘুরে দেখা গেছে, পাহাড় কেটে তৈরি করা গলফ কোর্সগুলোর মাঝে সড়কটি গলফ লিংক নামে পরিচিত। গলফ কোর্সের আশপাশে সারি সারি গাছে চোখজুড়ানো সবুজ এলাকাটি বেশ নিরিবিলি। এখানে সাধারণত কারও যাওয়ার কথা নয়। কেউ সেখানে যানও না। ঘণ্টা খানেক আশপাশে ঘুরে সালাহ উদ্দিন সম্পর্কে জানতে চাইলে অনেকে তাঁর আটকের কথা শুনেছেন বলে জানান। সোমবার ভোরে এঁদের কেউ সেখানে থাকার কথা স্বীকার করেননি। পুলিশের বক্তব্য, ওই সময় স্থানীয় লোকজনের ফোন পেয়ে বিএনপি নেতাকে আটক করা হয় গলফ-লিংক থেকে।
গতকাল শনিবার সকাল সাতটার পর এ সম্পর্কে জানতে পুনরায় এই প্রতিবেদক গলফ-লিংক এলাকায় যান। কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন দিন, এখানে-সেখানে কয়েক জনকে গলফ খেলতে দেখা গেলেও সড়কে কোনো গাড়ি চোখে পড়ল না। হাতের গলফ-কোর্স সড়কের পাশে দায়িত্ব পালন করছিলেন নিরাপত্তাকর্মী সেস্নাং। বাংলাদেশের নাগরিক পরিচয় দিয়ে সালাহ উদ্দিনের নাম বলতেই বেশ সপ্রতিভভাবে জানালেন, গত সোমবার ভোরে তাঁকে এখান থেকে আটক করা হয়েছে। গণমাধ্যমের পরিচয় দিয়ে সেদিন কী ঘটেছিল জানতে চাইলে, কথা না বলে উল্টো হাঁটতে শুরু করেন এক তরুণী। স্থানীয় দুই তরুণের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁরাও কথা বলতে অসম্মতি জানান। এভাবে ঘণ্টা দেড়েক ওই এলাকায় অবস্থান করেও এ নিয়ে কারও বক্তব্য পাওয়া গেল না।
গলফ-লিংক থেকে এই প্রতিবেদকের পরের গন্তব্য মিমহানস (মেঘালয় ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরোসায়েন্সেস) নামে পরিচিত শিলংয়ের মানসিক হাসপাতাল। সোমবার সকাল থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত এখানেই রাখা হয়েছিল সালাহ উদ্দিন আহমদকে। পুলিশ তাঁকে চিকিৎসার জন্য সেখানে নিয়ে যায়।
গতকাল বেলা ১১টার দিকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে গিয়ে বিএনপি নেতার সম্পর্কে জানতে চাইলে কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, মনোরোগবিশেষজ্ঞ এ কে রায়ের তত্ত্বাবধানে সালাহ উদ্দিন আহমদের চিকিৎসা হয়েছে। এ মুহূর্তে তিনি হাসপাতালে নেই, এ বিষয়ে কথা বললে একমাত্র নার্সদের সমন্বয়কারী কর্মকর্তা কথা বলতে পারেন। নার্সদের সমন্বয়কারীর কাছে গেলে তিনি পাস্তুর পুলিশ ফাঁড়িতে যোগাযোগের অনুরোধ জানান।
সেদিন ঠিক কী হয়েছিল, জানতে গতকাল দুপুরে পাস্তুর পুলিশ ফাঁড়িতে যাই। ফাঁড়ির প্রবেশপথে এক পুলিশ কর্মকর্তার কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে দায়িত্বরত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। কমলেশ প্রসাদ সিং হাত বাড়িয়ে আমাকে কামরায় নিয়ে যান। তিনি বলেন, পুলিশই গত সোমবার ভোরে সালাহ উদ্দিন আহমদকে ফাঁড়িতে নিয়ে এসেছিল। তিনি নিজে আসেননি। এরপর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।
মানসিক হাসপাতালের চিকিৎসক এ কে রায় গতকাল বিকেলে ফোনে প্রথম আলোকে বলেন, হুট করে অজানা পরিবেশে এসে পড়ায় শুরুতে সালাহ উদ্দিন আহমদ বেশ বিক্ষিপ্ত ছিলেন। তাঁর কথাবার্তা ছিল অসংলগ্ন। তা ছাড়া তাঁর পরিচয় নিয়ে পুলিশ ছিল সন্দিহান। সব মিলিয়ে মনে হয়েছে, তাঁকে হাসপাতালে রাখা উচিত। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত তাঁকে এখানে রাখা হয়। এখান থেকেই তিনি স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি মানসিকভাবে সুস্থ—এটি পুলিশকে জানানোর পর হৃদ্রোগসহ অন্যান্য শারীরিক সমস্যার জন্য তাঁকে সিভিল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

অভিবাসীদের বাঁচার আকুতি by টিপু সুলতান

শেখ আমানউল্লাহ (২০)। বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছায়। কেমন আছেন? প্রশ্ন করতেই শার্টের বোতাম খুলে হাড্ডিসার শরীর দেখালেন। তারপর ডুকরে কান্না। একটু পর বললেন, ‘আসার সময় আমার ওজন ছিল ৯০ কেজি, এখন ৬৫।’
এই আমানউল্লাহ থাইল্যান্ডের সঙ্খলা প্রদেশের সবচেয়ে বড় ও পুরোনো শহর হাতজ্জাইয়ে পুলিশ হেফাজতে আছেন পাঁচ সপ্তাহ ধরে। তাঁর সঙ্গে আছেন আরও ১২ বাংলাদেশি। সবার বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। অবৈধভাবে থাইল্যান্ড যাওয়ায় এক বছর সাত মাস জেল খেটেছেন তাঁরা। সাজার মেয়াদ শেষে তাঁদের জায়গা হয়েছে থানায়। তাঁরা সবাই দেশে ফেরার আকুতি জানালেন। এঁদের সঙ্গে থাকা অন্য দুজন কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন।
সম্প্রতি সাগরপথে মানব পাচারের বিষয়টি বেশ আলোচিত হলেও এই তরুণদের কাছেই জানা গেল, দালালেরা শুধু সাগরপথে নয়, আকাশপথেও মানুষ পাচার করছে। যার শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশের নাগরিক ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানেরা। গত নয় দিনেই থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার উপকূল থেকে অন্তত তিন হাজার বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা উদ্ধার হয়েছেন। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বলছে, আরও ছয় থেকে আট হাজার অভিবাসী সাগরে নৌকায় ভাসছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো সাগরে ভাসতে থাকা অভিবাসীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার প্রতি আহ্বান জানালেও দেশগুলো তাঁদের তীরে ভিড়তে দিচ্ছে না। সেখানে খাবার ও পানির অভাবে অভিবাসী মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটছে।
মানব পাচারের এ পরিস্থিতিতে হাতজ্জাই পুলিশ স্টেশনে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় ওই ১২ তরুণের। বাংলাদেশি বন্দীদের ডাকতেই প্রথমে আসেন আমানউল্লাহ। পরে এলেন গোলাম রসুল, মনিরুল ইসলাম, মাসুদ রানা, রেজাউল করিম, ইকবাল, আল-আমিন, শিমুল, রুবেল, তরিকুল, রাসেল ও নজরুল। শেষ দুজন ছাড়া বাকিদের বাড়ি যশোরের মণিরামপুর ও ঝিকরগাছা উপজেলায়। রাসেলের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ ও নজরুলের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরায়। এঁদের সঙ্গে সেলিম ও উজ্জ্বল প্রামাণিক ছিলেন। একজন ৭ ডিসেম্বর, আরেকজন ২৫ ডিসেম্বর কারাগারে অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন।
১৪ বছরের বাংলাদেশি কিশোর আফসারুদ্দিন। গতকাল ফোনে দেশে মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে সে। কয়েক সপ্তাহ ধরে নৌকায় সাগরে ভাসার পর অনেকের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার উপকূল থেকে উদ্ধার হয় ছেলেটি। এখন তার আশ্রয় মিলেছে আচেহ প্রদেশের একটি শিবিরে l ছবি: এএফপি
ঝুঁকি নিয়ে এ পথে কেন পা বাড়ালেন? রাসেল বললেন, ‘আমরা তো জানতাম না থাইল্যান্ড আসব। আমরা তো মালয়েশিয়া যাব স্টুডেন্ট ভিসায়। সেভাবে দালাল বলেছে।’ একই কথা জানালেন অন্যরাও। দালালের খপ্পরে পড়লেন কীভাবে? আমানউল্লাহর উত্তর, ‘আমি এইচএসসি পাস করেছি। বাবলু দালাল বলল, আর লেখাপড়া করে কী হবি? মামা-চাচা না থাকলে তো চাকরি পাবি না। তার চেয়ে মালয়েশিয়া চল স্টুডেন্ট ভিসায়। ইনকাম করবি, ভালো থাকবি, চাইলে লেখাপড়াও করতি পারবি।’ এক কথায়ই রাজি হয়ে গেলেন? ‘না, অনেক ভেবেছি। বাবলু বলল, টাকা-পয়সা আগাম লাগবে না, মালয়েশিয়া পৌঁছার পর ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিতে হবে। বৈধ ভিসা। কোনো ঝুঁকি নাই। তা ছাড়া বাবলুর বাড়ি মণিরামপুরে। বিদেশে লোক পাঠায়। সবাই চেনে।’
আমানউল্লাহ জানালেন, তারপর তাঁকে একদিন ঢাকা বিমানবন্দরে নিয়ে বলা হলো, থাইল্যান্ড হয়ে তার পর মালয়েশিয়া পাঠানো হবে। তিন প্রতিবাদ করেছিলেন, ‘আমি এভাবে যাব না, বিপদ হতে পারে।’ তখন বাবলু দালাল তাঁকে বলে, ‘ইন্ডিয়ার গরু কীভাবে পার হয় জানো? বর্ডার পার হয়ে একবার গরুর গায়ে সিল মেরে দিলে, তাকে কোনো পুলিশ ধরে না। তোমার পাসপোর্টেও একবার সিল পড়লে, তোমারে আর কেউ ধরবে না। আর, বিপদে পড়লে আমি তো আছিই।’
আমানউল্লাহ জানালেন, তাঁদের নয়জনকে নিয়ে দালাল চক্রের এক লোক ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে নিয়ে রওনা হন ঢাকা থেকে। প্রথমে শ্রীলঙ্কা যান, তারপর ব্যাংকক হয়ে কম্বোডিয়া। সেখান থেকে লাওস। তারপর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাসে ব্যাংকক আসেন। সেখান থেকে ট্রেনে আসেন হাতজ্জাই। এখানে হাতবদল, নতুন দালাল তাদের দায়িত্ব নেয়। রওনা হন সাদাও জেলার জঙ্গলে মানবপাচারকারীদের কথিত ক্যাম্পের দিকে। পথে পুলিশের হাতে আটক হন তাঁরা।
একই সপ্তাহে থাইল্যান্ডে আসেন মনিরুলসহ তিনজন। তাঁরা অবশ্য প্রথমে বিমানে ব্যাংকক হয়ে কম্পোডিয়া যান। তারপর লাওস। লাওস থেকে আবার বিমানে ব্যাংককে ট্রানজিট ভিসায় তাঁদের নামায় দালালের লোকেরা। তাঁর মনে হয়েছে, দালালদের সঙ্গে ব্যাংকক বিমানবন্দরে অভিবাসন পুলিশের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। যেমনটা হয়েছে, ঢাকায় হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরে।
এই ১২ জনের সবাই জানালেন, ঢাকা বিমানবন্দরে মহিউদ্দিন নামের একজন ইমিগ্রেশন পুলিশের কর্মকর্তা তাঁদের আলাদাভাবে আনুষ্ঠানিকতা করে পার করে দিয়েছিলেন। ওই কর্মকর্তাকে জনপ্রতি নির্দিষ্ট হারে টাকা দিতে হয়েছে বলে দালালেরা তাঁদের জানিয়েছে।
মনিরুলদের ব্যাংকক থেকে বিমানে আনা হয় হাতজ্জাই। সেখান থেকে গাড়িতে মালয়েশিয়া সীমান্তের ক্যাম্পে নেওয়ার পথে পুলিশ আটক করে। এঁরা আসেন মুকুল নামে মানব পাচারকারী এক দালালের মাধ্যমে। যার বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছায়।
মনিরুল জানালেন, মুকুল ও বাবলু দুজনই ঢাকার শামীম নামের এক আদম ব্যাপারীর দালাল হিসেবে লোক জোগাড় করেন। গ্রাম থেকে লোক এনে কমলাপুর বাজার রোডের গাংচিল হোটেল রাখে। ওই হোটেলে এমন অনেককে দেখেছেন তাঁরা।
দালাল চক্রের প্রলোভনে পড়া বন্দী হওয়া এই তরুণদের সবার কাহিনি প্রায় একই। এঁদের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল, সাইয়াক নামে স্থানীয় একজন ব্যক্তি তখন উপস্থিত হন। যিনি পুলিশের দোভাষী হিসেবে কাজ করেন মিয়ানমারের নাগরিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করার সময়। সাইয়াক জানালেন, আকাশপথে যাদের আনা হয়, তাদেরও রাখা হয় জঙ্গলের বিভিন্ন ক্যাম্পে। তারপর সেখানে নির্যাতন করে বাড়িতে ফোন করানো হয়। টাকা আদায় করা হয়। এ ক্ষেত্রে মুক্তিপণের টাকা বেশি দিতে হয়।
১২ তরুণের বাইরে আরও দুই বাংলাদেশি সম্পর্কে কিছু জানা গেল। তাঁরা হলেন, সাতক্ষীরার রবিউল (এখানকার কাগজে নাম সাজু আজহার) ও বগুড়ার মাসুদ পারভেজ। তাঁদের জাল পাসপোর্টে সিঙ্গাপুর হয়ে ট্রানজিট ভিসায় থাইল্যান্ড আনা হয়। তারপর জঙ্গল ক্যাম্পে নিতে চাইলে তাঁরা মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। এরপর দালালের লোকেরাই তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেয়। তাঁদের তিন বছরের সাজা হয়েছে। এখন হাতজ্জাই কারাগারে আছেন।
হাতজ্জাইয়ের পুলিশ জানায়, ওই ১২ তরুণের বিরুদ্ধে আর কোনো মামলা নেই—আদালত থেকে এমন ছাড়পত্র আসার পর তাঁদের পাঠানো হবে মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী এলাকা পাদাং বেশারে অবস্থিত ইমিগ্রেশন ডিটেনশন ক্যাম্পে। সেখান থেকে পরে দেশে ফেরত পাঠানোর বাকি আনুষ্ঠানিকতা। তবে তদবির না করলে আদালতের ছাড়পত্র কত দিনে আসবে, তার ঠিক নেই বলে জানালেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, দূতাবাস থেকে তদবির না করলে অনেক সময় এক বছরেও কাগজ আসে না। ওই কর্মকর্তা জানালেন, বিভিন্ন ডিটেনশন ক্যাম্পে অসংখ্য বাংলাদেশি আটক আছে।
এ সময় লোহার শিকের ওপার থেকে মনিরুল বলেন, তাঁরা কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে থাইল্যান্ডের বাংলাদেশ দূতাবাসে এ পর্যন্ত ১০টি চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু কেউ তাঁদের খোঁজ করতে আসেনি। তিনি বলেন, ‘জেলখানার দেয়ালে দাগ কেটে কেটে হিসাব রেখেছি এক মাস, দুই মাস, চার মাস, বছর চলে যায়, কেউ আসে না।’
এঁদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী নজরুল (১৮)। এতক্ষণ কোনো কথা বলেননি, নীরবে কাঁদছিলেন। হাত জোড় করে বললেন, ‘ভাই আপনি যাইয়েন না, আমাদের নিয়া যান। এখানে না খেয়ে মরছি।’
জানা গেল, দুপুর দুটোয় ও সন্ধ্যায় ছোট এক বাটি ভাত ও একটা তরকারি দেওয়া হয় তাঁদের। প্রায় শূকরের মাংস থাকে তরকারিতে, তাঁরা তা খান না। খালি ভাত খান। আর টেপের পানি খেয়ে বাঁচছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন মুখপাত্র জানান, সাজা শেষ হলে, এদের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ইমিগ্রেশন ক্যাম্পে পাঠানোর পর থাই কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ দূতাবাসকে জানায়। এরপর সঙ্গে সঙ্গে দূতাবাসের কর্মকর্তারা তাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে নাম-ঠিকানা ঢাকায় পাঠায়। এরা বাংলাদেশের নাগরিক—এ মর্মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ছাড়পত্র আসার পর যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
এই মুখপাত্র জানান, এই ১২ তরুণের ব্যাপারে এখন পর্যন্ত দূতাবাসকে থাই কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দেয়নি। তবে দুজনের মৃত্যু সংবাদ ও তাঁদের হাতজ্জাইতে কবর দেওয়ার খবর পেয়েছেন।
দেশে ফেরার আকুতি: এক ঘণ্টা সময় পাওয়া গেছে কথা বলার জন্য। এর মধ্যে কথার চেয়ে কান্না আর ফেরার আকুতিই ছিল বেশি ১২ তরুণের। ফেরার সময় গরাদের শিকের ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে এ প্রতিবেদকের জামা টেনে ধরলেন আমানউল্লাহ। বললেন, ‘আমরা বাঁচতে চাই। বাংলাদেশ সরকারকে বলেন, আমাদের যাতে নিয়ে যায়। দেশে গিয়ে বলব, আর যেন কেউ এ পথে না আসে।’

যে কারণে মরণযাত্রা by রোকনুজ্জামান পিয়াস

দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। নানা ইস্যুতে বন্ধ হয়ে গেছে প্রধান প্রধান বাজার। বাংলাদেশের কর্মীদের এ শূন্যতা পূরণ করছে ভারতসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলো। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বিকল্প বাজারের কথা বলা হলেও সেসব দেশে কর্মীর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত তেমন কোন অগ্রগতি নেই। কোনও কোনও দেশে বছরে সর্বোচ্চ ২০ জন কর্মী পাঠানো হয়েছে। বৈধপথ সঙ্কুচিত হয়ে যাওয়ায় অবৈধ পথ অবলম্বন করার প্রবণতাও বাড়ছে বিদেশ গমনেচ্ছুদের। দালালের খপ্পরে পড়ে বেছে নিচ্ছেন ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ। এদিকে শ্রমবাজার সঙ্কুচিত হওয়াকে কূটনৈতিক ব্যর্থতা বলে মনে করেন বিশেজ্ঞরা। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমবাজার ধসে সরকার নির্ধারিত ভুলনীতিরও সমালোচনা করেন তারা। তাদের মতে- এখনই সময় মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে জি টু জি পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়নের। এ পদ্ধতিতে মাইগ্রেশন খরচ কমলেও দেশটিতে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ এক প্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। অথচ একই সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী যাচ্ছে সেদেশে। গতবছর শুধু নেপাল থেকে দেশটিতে কর্মী গেছে এক লাখ। যেখানে বাংলাদেশ থেকে গেছে মাত্র তিন হাজারের মতো। বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া। ২০০৮ সাল থেকে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ বন্ধ হয়ে যায়। আর মালয়েশিয়া সরকার ২০০৯-১০ সালে বাংলাদেশী শ্রমশক্তি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মতে এ তিনটি দেশে গত বছর বৈধভাবে গেছেন ৩৮ হাজার ৭৬৩ জন কর্মী। অথচ ২০০৭ সালে দেশ তিনটিতে বৈধ পথে গিয়েছিলেন ৭ লাখ তিন হাজার ৭০৫ জন। ২০০৮ সালে যান ৬ লাখ ৮৩ হাজার ২৪১ জন। যদিও বিএমইটির তথ্যে গোঁজামিলের অভিযোগ রয়েছে। নতুনের পাশাপাশি পুরনো শ্রমিক যারা ছুটিতে দেশে এসে আবার যান তাদের আলাদা কোন পরিসংখ্যান নেই। ২০০৭ সালের পরেই ধস নামে সৌদি আরব ও মালয়েশিয়ার বাজারে। ২০১৩ সালে ধস নামে আরব আমিরাতের বাজারেও। গত সাত বছরে এই তিন দেশে জনশক্তি রফতানি কমেছে ৯৫ শতাংশ। গত বছর মালয়েশিয়ায়  গেছেন মাত্র তিন হাজার ৮৭৪ জন। ২০১৩ সালে সংখ্যাটি ছিল মাত্র তিন হাজার ৮৫৩। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার কুয়েত, আবুধাবীতে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে লিবিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে কর্মী নিয়োগ একপ্রকার বন্ধ।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭৬ সাল থেকে জনশক্তি রপ্তানি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে বিদেশে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মী গেছে ২০০৭ ও ২০০৮ সালে। সরকারি হিসেবে সে সময় কর্মী গেছে ১৭ লাখ ৭ হাজার ৬৬৪ জন। তবে ওই সময় যাওয়া কর্মীদের একটি বড় অংশ বিভিন্নভাবে ভোগান্তিরও স্বীকার হয়েছেন। এরপরের বছর ২০০৯ সালে গেছে প্রায় অর্ধেক। ২০১০ সালে এ সংখ্যা আরও কম, মাত্র ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭০২ জন। পরের বছরগুলোতে কর্মী নিয়োগ বাড়লেও ২০১৩ সাল থেকে আবারও ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছে। ২০১১ সালে কর্মী গেছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬২ জন এবং ২০১২ সালে গেছে ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৯৮ জন। ২০১৩ সালে বিদেশে কর্মী নিয়োগ হয়েছে ৪ লাখ ৯২৫৩ জন। ২০১৪ সালে বহির্গমনের পরিমাণ ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ জন। আর এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত গেছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬১ জন। তবে বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার জনশক্তি রপ্তানি থেমে নেই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার। বাংলাদেশের শ্রমবাজার অনেকাংশেই দখল করেছে তারা। সরকারের তৈরী ১৯ লাখ ৫০ হাজার ডাটাবেজের মধ্য থেকে কর্মী পাঠানোর নিয়ম রয়েছে। তবে ২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে ওই ডাটাবেজ তৈরী হলেও এর মধ্য থেকে কতজন কর্মী বিদেশ গেছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান জানা যায়নি। এদিকে কর্মী পাঠানোর এ ধীরগতির ফলে সুযোগ নিচ্ছে এক ধরনের দালাল শ্রেণী। তাদের প্রলোভনে পড়ে বিদেশ গমনে অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছে সহজ-সরল মানুষ। শ্রমবাজারের বিশাল এ শূন্যতা পূরণ করতে বিকল্প কয়েকটি দেশে বাজার খোঁজা হলেও তা খুবই নগণ্য। রামরুর তথ্যমতে, শুধু নেপাল থেকেই গতবছর মালয়েশিয়ায় গেছে ১ লাখ কর্মী। সেখানে বাংলাদেশ থেকে গেছে ৩ হাজার ৮৭৪ জন। বন্ধ শ্রমবাজার চালু হওয়ার পর দেশটিতে জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের দেশের পক্ষ থেকেই জি টু জি পদ্ধতি চালু করা হয়। অভিযোগ রয়েছে অত্যন্ত ধীরগতির এ পদ্ধতির প্রস্তাব বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই দেয়া হয়েছিল। তাছাড়া ইতিমধ্যে জি টু জি পদ্ধতির নানা ত্রুটিও ধরা পড়েছে। মালয়েশিয়ার একটি মানবাধিকার সংস্থা ‘তেনাগানিতা’ এ পদ্ধতির কিছু ত্রুটি চিহ্নিত করেছে। তারা বলেছে, সেদেশের সরকারী কর্মকর্তারা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছে এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থও নেয়। তারা বলেছে, এর আগে মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারা বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে আগ্রহ দেখাতো। এ ছাড়া জি টু জি পদ্ধতির ফলে সাগর পথে অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করছে। এই পরিস্থিতিতে এ পদ্ধতির পুনর্মূল্যায়নের সময় এসেছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে বারবার বলা হয় প্রবাসী কল্যাণ ও জনশক্তি রপ্তানি বাড়াতে বিকল্প শ্রমবাজার সৃষ্টি করা হয়েছে। বলা হয়, বর্তমান বিশ্বে ১৫৯টি কর্মী পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে ওইসব দেশে কর্মী পাঠানোর হার এখনও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেনি। বিএমইটির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর নির্দিষ্ট ২০টি দেশের বাইরে বাকি অন্যান্য দেশে পাঠানো কর্মীর সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার ৬৯০ জন।
এদিকে বৈধপথে জনশক্তি রপ্তানি কমে যাওয়ায় সম্প্রতিক সময়ে কাজের সন্ধানে অবৈধ উপায়ে দেশের সীমান্ত পাড়ি দেয়ার হার বেড়ে গেছে। আর এ কারণে সমুদ্রপথে মৃত্যুর হারও বেড়েছে। ইউএনএইচসিআর-এর তথ্যমতে, গত বছর জুলাই পর্যন্ত কমপক্ষে ৮৭ হাজার মানুষ সমুদ্রপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া গেছে। যা পূর্ববর্তী ২০১৩ সালের তুলনায় ৬১ ভাগ বেশি। ২০১৪ সালে সমুদ্রপথ পাড়ি দিতে গিয়ে মারা গেছেন ৫৪০ জন।  
এ ব্যাপারে ওয়ারবি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের মহাসচিব ফারুক আহমেদ বলেন, চাহিদা থাকা সত্ত্বেও বৈধ উপায়ে কর্মী যেতে না পারায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষ অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছে। তিনি বলেন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল মালয়েশিয়ায় ৫ লাখ কর্মী যাবে। সেখানে সে চাহিদা রয়েছে। জি টু জি পদ্ধতির মাধ্যমে কম খরচে লোক যাবে। কিন্তু এ পর্যন্ত যে সংখ্যক লোক এ পদ্ধতিতে গেলেও তা খুবই নগন্য। ফলে মানুষ চাহিদা মেটাতে এবং বৈধপথে সুযোগ না পেয়ে দালালের খপ্পরে পড়ছে। তিনি বলেন, মানবপাচার বা সমুদ্রপথে অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে নদীপথ স্বশস্ত্র বাহিনীর অধীনে দেয়ার পরামর্শ দেন। তার মতে অন্যান্য যে কোন বাহিনীর তুলনায় এই বাহিনী বেশি তৎপর। তাদেরকে সকল ধরনের ইকুপমেন্ট দিয়ে দায়িত্ব দিলে মানবপাচার বন্ধ করা সম্ভব হবে। ফারুক আহমেদ বলেন, যারা মানবপাচারের হোতা তাদের মেরে না ফেলে, যদি সম্ভব হয় তাহলে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এর পেছনের রাঘব বোয়ালরা বের হতো। কয়েকদিন ধরে সাগরে ভাসমান মানুষের ব্যাপারে তিনি বলেন আমাদের সরকার আগে থেকেই সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে সহযোগিতা চাইতে পারতো। পরে সেখান থেকে বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতো।
অভিবাসী নিয়ে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান রামরু’র ফেলো মো. আনসার উদ্দিন আনাস বলেন, সমুদ্রপথে মানবপাচারের জন্য রোহিঙ্গা সমস্যা ৮০ ভাগ দায়ী। বর্তমান রুটটি তাদের মাধ্যমেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।  রোহিঙ্গাদের বিষয়টি যদি ভালভাবে পরিচালনা করা যেত তবে আজকে এ অবস্থা হতো না। শুরুতে রোহিঙ্গাদের রিফিউজি স্ট্যাটাস দিয়ে যদি এখানে বাস করার সুযোগ দেয়া হতো তাহলে ওই রুটটিও আবিষ্কার হতো না। তিনি বলেন, বর্তমান যারা সাগরপথে যাচ্ছে তাদের বেশির ভাগেরই উদ্দেশ্য মালয়েশিয়া। তবে থাইল্যান্ডের ফিশিং ট্রলারে কাজ করতেও তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্দিষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া বেসরকারিভাবে ছেড়ে দিলে বৈধভাবে কর্মী পাঠানোর পরিমাণ বাড়তো।
অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা আইওএম’র ন্যাশনাল প্রোগ্রাম অফিসার আসিফ মুনির বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে পাচারকারীদের ভেতরে ভয়ভীতি কাজ করে। তারা গা-ঢাকা দিয়েছে। কিন্তু সমুদ্রপথে অনেকগুলো রুট রয়েছে, সবগুলো রুট বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ রুটগুলো বন্ধ করতে না পারলে কখনও মানবপাচার পুরোপুরি বন্ধ হবে না। তাছাড়া দালালচক্র এদের বলে, টাকা পরে দিতে হবে, ফলে এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে হাতছাড়া করতে চান না প্রতারিত মানুষ। আবার অনেকে মনে করেন এখন যেহেতু ডাটাবেজের বাইরে কেউ যেতে পারবে না তাই সমুদ্রপথই সহজ উপায়। মানুষকে সচেতন করার জন্য এখনও যথেষ্ট প্রচারণা চালানো হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

পালপাড়া পোড়াচ্ছে এক সন্ত্রাসী by আনোয়ার পারভেজ

সন্ত্রাসী হামলার ভয়ে রাত জেগে গ্রাম পাহারা দিচ্ছেন
পালপাড়ার মানুষ। বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার
আড়িয়া পালপাড়া থেকে ছবিটি তোলা l ছবি: প্রথম আলো
দুই বোন পড়ত কলেজে। একদিন ছোট বোনটিকে তুলে নিয়ে আটকে রেখে তার বাবার কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা চাইল এক সন্ত্রাসী। এ ঘটনার পরদিন ওই সন্ত্রাসীর ডেরা থেকে পুলিশের সহযোগিতায় উদ্ধার করা হলো মেয়েটিকে। কিন্তু পুলিশ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করল না। এতে করে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা পরিবারটি একদিন দেশ ছেড়ে সপরিবারে চলে গেল ভারতে। দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ওই গৃহকর্তার ভাইই নিশ্চিত করেছেন এ তথ্য।
এ ঘটনা ২০১২ সালের। ঘটনাস্থল বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কের খুব কাছের লোকালয় পালপাড়া। সংখ্যালঘু শতাধিক পাল পরিবার বসবাস করে এই গ্রামে। প্রায় এক যুগ ধরে সেখানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন সন্ত্রাসী মোরশেদ আলম (৩৫)। তাঁর বাড়ি পালপাড়ার পাশের আড়িয়া রহিমাবাদ গ্রামে। মোরশেদের ভয়ে ভারতে চলে গেছে ওই পাড়ার আরও কয়েকটি পরিবার। পাড়ার পুরুষেরা এখন রাত জেগে দল বেঁধে পাহারা দেন গ্রাম।
হত্যা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা আছে মোরশেদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া মাদক ব্যবসা, জবরদখল, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়া, নারী নির্যাতন, বসতবাড়ি ও মৃৎশিল্পে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুরেরও অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
স্থানীয় ব্যক্তিরা জানান, মূলত ২০০৩ সাল থেকেই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করেন মোরশেদ। এর মধ্যে ২০১০ সালে আড়িয়াবাজারে এক চাল ব্যবসায়ীর একটি ঘর দখল করে সেখানে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী একটি সংগঠনের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন তিনি। সেখানে শুরু করেন মাদক ব্যবসা। এরপর মাদক ব্যবসা ও আধিপত্যের বিস্তার নিয়ে প্রতিপক্ষের লয়া মিয়া নামের একজনকে হত্যার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়।
গত ২৭ এপ্রিল গ্রামের বাসিন্দা উৎপল চন্দ্র পালের বাড়িতে হামলা চালিয়ে মাটির জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন মোরশেদ ও তাঁর লোকজন। উৎপল জানান, মোরশেদ তাঁর কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন। তিনি ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। বাকি ৩০ হাজার না দেওয়ায় মোরশেদ লোকজন নিয়ে তাঁর বাড়িতে হামলা চালান।
পালপাড়ার বাসিন্দা অজয় কুমার পাল জানান, ওই ঘটনার দুই দিন পর ২৯ এপ্রিল রাতে আবার ওই পাড়ায় হানা দেয় মোরশেদের লোকজন। চাঁদা না পাওয়ায় ওই রাতেও হামলা করে পালদের তৈরি মাটির জিনিসপত্র ভাঙচুর করে রেখে যায় সন্ত্রাসীরা।
অজয় কুমার পালের স্ত্রী পার্বতী পাল বলেন, ‘তিনডা ছল লিয়ে অভাবের সংসার। সারা দিন রোদে-ঘামে কষ্ট করে মাটির জিনিস বানাই। সোয়ামি ভারত করে লিয়ে তা বিক্রি করে। হাড়ভাঙা খাটুনির পর সেদিন রাতে ঘুমায়ে পরিচি। হঠাৎ মধ্যরাতে দরজাত টাক টাক শব্দ। কে কে বলে হামি চিৎকার দিয়ে উঠি। কয় “হামি মোরশেদ। দরজা খোল।” হামি কই, এত রাতে দরজা খোলা যাবে না। মোরশেদ কয়, “চাঁদা যখন দিবা না, আঙ্গিনায় সব মাটির জিনিস ভাঙ্গা ফেললাম।”’
পাড়ার বাসিন্দা গোবিন্দ পাল বলেন, পর পর দুই রাতে হামলার পর ভয়ে-আতঙ্কে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে ২৯ এপ্রিল তাঁরা গ্রামের বাসিন্দারা মিলে জেলা সদরে গিয়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) কাছে স্মারকলিপি দেন। এ ছাড়া হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মোরশেদের বিরুদ্ধে ২ মে শাজাহানপুর থানায় তাঁরা মামলাও করেন। কিন্তু আসামি এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
গতকাল শুক্রবার সরেজমিন পালপাড়া গিয়ে দেখা যায়, বগুড়া-ঢাকা মহাসড়কের খুব কাছের গ্রাম হলেও লোকালয়টি প্রায় দুর্গম। করতোয়া নদী, অন্য দুই দিকে ঘন জঙ্গলবেষ্টিত এই গ্রামের যাতায়াতের ভরসা একটি মেঠো পথ। সেই মেঠো পথ ধরে পালপাড়ার প্রবেশমুখে পৌঁছাতেই চোখে পড়ল একটি তালাবদ্ধ বাড়ি। এটিই মোরশেদ বাহিনীর আস্তানা বলে জানালেন স্থানীয় লোকজন। কয়েক কদম এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল পাড়ার উঠানজুড়ে ইটখোলা আর পোড়ামাটির মৃৎশিল্প ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। গ্রামজুড়ে সুনসান পরিবেশ। দেখা মিলল কয়েকজন যুবকের। চোখেমুখে ভীতি-আতঙ্ক। দুর্গামন্দিরের চত্বরে সংখ্যালঘু নারীদের জটলা। সবার চোখেমুখে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। সাংবাদিক এসেছে শুনেই কেঁদে ফেললেন এক গৃহবধূ। বললেন, ‘দাদা, হামাকেরে ইজ্জত বাঁচান, সম্ভ্রম বাঁচান, এতগুলা মানুষের প্রাণ বাঁচান। ওই সন্ত্রাসীটাক পুলিশ ধরছে না। রাতের বেলা থানা থেকে পুলিশ এসে দুয়েক ঘণ্টার লোক দেখানো টহল দিচ্ছে।’
পালপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অমরেশ চন্দ্র পাল বলেন, এ পাড়ায় ১২০টি পরিবারের বসবাস। অধিকাংশই দরিদ্র। মাটির তৈজসপত্র ও প্রতিমা তৈরি করে কোনো রকমে জীবিকা চালান। তিনি বলেন, ২০০৩ সালে এ পাড়ার গরিব কারিগরদের কাছে চাঁদাবাজি শুরু করেন মোরশেদ। চাঁদা না দেওয়ায় ওই সময় তাঁকেও মারধর করেন।
পালাপাড়ার লোকজন জানান, ২০১২ সালে কলেজছাত্রীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পর পাড়াজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর প্রদীপ পাল নামের একজন দুই কন্যা আর স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে চলে যান। সপরিবারে দেশ ছাড়েন শ্যামাপদ পাল ও শ্যামা পাল। গত বছর পাড়ার ডাবলু পালের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন মোরশেদ। সাত দিনের মধ্যে না পেলে তাঁর স্ত্রীকে তুলে নেওয়ার হুমকি দেন। এর চার দিনের মাথায় স্ত্রীকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যান ডাবলু পাল।
পাড়ার বাসিন্দা চায়না পাল বলেন, ‘মরদেরা সারা দিন খাটুনি করে বাড়িত ফিরে। রাতে ঘুম নাই। লাঠি হাতে দল বাঁধে পাহারা দিতে যায়। আর বউ-ঝিগেরে কোনো রকমে দিনটা কেটে যায়, সন্ধ্যা নামলেই বাড়তে থাকে আতঙ্ক।’
পুলিশের তথ্যমতে, মোরশেদ পলাতক। তাঁর বক্তব্য জানার জন্য গতকাল কয়েক দফায় তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
মোরশেদ পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী বলে জানান শাজাহানপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মান্নান। তিনি জানান, মোরশেদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা আছে। এর মধ্যে হত্যা ও মাদকের মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন। সর্বশেষ চাঁদাবাজির মামলায় তিনি পলাতক।
ওসি মান্নান বলেন, ‘পালপাড়ায় আগে কী হয়েছে সেটা বলতে পারব না। তবে চাঁদাবাজির মামলা দায়েরের পর মোরশেদকে গ্রেপ্তারের সব ধরনের চেষ্টা চলছে। পালপাড়ার আতঙ্ক কাটাতে রাতে সেখানে পুলিশের টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
বগুড়ার এসপি মো. মোজাম্মেল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘মোরশেদ ও তাঁর লোকজনকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের একাধিক দল মাঠে নামানো হয়েছে। তাঁদের গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত প্রতি রাতেই পুলিশ পালপাড়ায় টহল দেবে। প্রয়োজনে সেখানে অস্থায়ী ক্যাম্প করা হবে।’
বগুড়ার ডিসি শফিকুর রেজা বিশ্বাস পালপাড়ার বাসিন্দাদের কাছ থেকে স্মারকলিপি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রথম আলোকে বলেন, সেখানকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো পরিস্থিতিতে কিংবা কারও ভয়ে ভীত হয়ে কেউ এলাকাছাড়া হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখতে শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‘মানবিক বিপর্যয় রোধে আসিয়ানের সব সদস্যকে এক হয়ে কাজ করতে হবে’

সমুদ্রপথে মানবিক বিপর্যয়ঃ দিনের পর দিন অর্ধাহারে-অনাহারে
কাটিয়ে, অমানবিক মানসিক-শারীরিক নির্যাতন
সমুদ্রে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার অভিবাসীদের রক্ষা করতে অবশ্যই আসিয়ানভুক্ত সব সদস্য দেশকে কাজ করতে হবে। তা না হলে এ সংকট ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। এমন সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও আসিয়ানের চেয়ারম্যান নাজিব রাজাক। এ ইস্যুতে উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল তাকে ফোন করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুন। জবাবে নাজিব রাজাক তাকে বলেছেন, এটা একটা মানবিক বিপর্যয়। এক্ষেত্রে সব দেশকে অবশ্যই একসঙ্গে গুরুত্ব সহকারে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, এটা শুধু আসিয়ান জোটের জন্য একটি সমস্যা নয়। এটা বৈশ্বিক একটি মানবিক সংকট। বিশেষ করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদেরকে শুধু জাতিগত রোহিঙ্গা বলে তাদের দায় শুধু মালয়েশিয়া নিতে পারে না। এ সমস্যা তার দেশের ভেতর থেকে সৃষ্টি হয় নি। তার ভাষায়, যারা সমুদ্রে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন, তাদের অনেকে মারা গিয়েছেন, তাদের প্রতি রয়েছে তার সহানুভূতি। তাদের অনেককে মালয়েশিয়া তার ভূমিতে অবতরণ ও মানবিক সহায়তা দিয়েছে।  এখনও এই অঞ্চলে কয়েক হাজার এমন অভিবাসী আছেন। তাদের দায় শুধু মালয়েশিয়া নিতে পারে না। এ জন্য তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফাহ আমানকে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি যেন মিয়ানমার সরকারকে এই বার্তা পৌঁছে দেন। এক্ষেত্রে মিয়ানমারের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার প্রত্যাশা করেন নাজিব রাজাক। গতকাল মালয়েশিয়ার দ্য স্টার অনলাইনে এসব কথা বলা হয়েছে। গতকাল মেলানা ইনদাহ ফাসা ১ পিপলস হাউজিং প্রজেক্ট আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর অনুষ্ঠানে নাজিব রাজাক সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, সমুদ্রপথে যাওয়া এসব অভিবাসীর সমস্যা শুধু আসিয়ান নেতাদের উদ্বেগের বিষয় নয়। এটা আঞ্চলিক ও জাতিসংঘ মহাসচিব বান-কি মুন, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবোটের মতো আন্তর্জাতিক নেতাদেরও ভাবিয়ে তুলেছে। তিনি বলেন, আসিয়ানের মূলনীতির প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে আমাদের। সে জন্যই আসিয়ানভুক্ত অন্য কোন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি না। এরপরও যখন সুনির্দিষ্টভাবে এ সমস্যাটির বিস্তার ঘটছে এবং এর প্রভাব পড়ছে অন্য আসিয়ানভুক্ত নেতাদের ওপর ও এর বাইরেও তখন অন্যপক্ষগুলোর সহযোগিতা নিয়ে আসিয়ান ফোরামে এর সমাধান খুঁজতে হবে। গতকাল সকালে তাকে ফোন করেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুন। এ সময় বান-কি মুন তার কাছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের কথা তুলে ধরেন। নাজিব রাজাক সাংবাদিকদের বলেন, যেহেতু এই শরণার্থীবিষয়ক সমস্যাটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ তাই তারা এ ব্যাপারে একটি ইতিবাচক সাড়া দেবে বলে আমি আশাবাদী। তাদের এই অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে আমরা হস্তক্ষেপ করতে পারি না। তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহতায় রূপ নেয়ার আগে আমাদেরকে কিছু একটা করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা আসিয়ান নেটওয়ার্কের আওতায় এ সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। তাতে যে সমাধান বেরিয়ে আসবে আশা করি মিয়ানমার সরকার তাকে তাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখবে না। কারণ, মানবিক ট্র্যাজেডি এড়ানোর জন্য চেষ্টা করছি আমরা। এ সময় সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চান, আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে জরুরি ভিত্তিতে সভা আহ্বান করা প্রয়োজন কিনা। জবাবে নাজিব রাজাক বলেন, বেশ কয়েকটি পন্থা নিয়ে কাজ করছে মালয়েশিয়া। ঠিক এই মুহূর্তে মিয়ানমার সরকারের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে আমরা লিয়াজোঁ করছি। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মিয়ানমারের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাবে। একই সঙ্গে আমি আসিয়ানের অন্য সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। যদি জাতিসংঘ সহায়তার প্রস্তাব দেয় তাহলে তা জাতিসংঘের হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস (এইএনএইচসিআর) এর মাধ্যমেই তা করা হবে। এরই মধ্যে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন মিয়ানমারের এক লাখ ২০ হাজার অবৈধ অভিবাসী। তবে এ অবস্থায়ও মালয়েশিয়া এসব মানুষকে আবাসন সুবিধা ও তাদের মানবিক সমস্যা সমাধান দিচ্ছে না বলে যে কথা বলা হচ্ছে তা সত্য নয়। এক্ষেত্রে মালয়েশিয়া বিরাট ভূমিকা রেখেছে, যদিও দেশটি এ সমস্যার উৎস নয়।