Sunday, February 23, 2014

বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে কিয়েভ

ইউক্রেনের পার্লামেন্টের বাইরে প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচের
দল পার্টি অব রিজিওনসের উপপ্রধান ভিতালি গ্রুশেভস্কিকে
গতকাল মারধর করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ এখন বিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে। গতকাল শনিবার সরকারবিরোধীরা প্রেসিডেন্টের কার্যালয় ও বাসভবনে ঢুকে পড়েছে। দুই ভবন থেকেই পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ভিক্তর ইয়ানুকোভিচকে গতকাল প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। তাঁর অবস্থান নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। তবে তিনি শিগগিরই পদত্যাগ করবেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে। স্পিকার ভোলোদিমার রাইবাক পদত্যাগ করার পর পার্লামেন্টের সদস্যরা কারাবন্দী বিরোধীদলীয় নেতা ইউলিয়া তিমোশেঙ্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্র ওলেকসান্দার তারচিনভকে স্পিকার নির্বাচিত করেছেন। সরকারবিরোধীপন্থী হিসেবে পরিচিত একজনকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পার্লামেন্ট সদস্যরা সাবেক প্রধানমন্ত্রী তিমোশেঙ্কোকে মুক্তি দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তিনি ২০১১ সাল থেকে কারাগারে ছিলেন। একজন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, ইয়ানুকোভিচ এখনো ইউক্রেনে রয়েছেন। তবে তিনি কিয়েভে নাকি বাইরে কোথাও আছেন, সে ব্যাপারে তিনি বলতে পারেননি। তবে একটি সূত্র জানায়, রাশিয়াপন্থী হিসেবে পরিচিত একটি শহরে রয়েছেন। ইউনুকোভিচের মিত্ররাই এখনো দেশ চালাচ্ছেন উল্লেখ করে সূত্রটি জানায়, নতুন প্রশাসনের কাছে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে তাঁরা কাজ করছেন। এর আগে গতকাল পার্লামেন্টে জরুরি অধিবেশনে বসে। সেখানে বিরোধী দল ইউডিএআর নেতা ভিতালি ক্লিৎচকো পার্লামেন্টে বলেন, ইয়ানুকোভিচ রাজধানী কিয়েভ ছেড়েছেন। এখন তিনি কোথায় আছেন, তা নিশ্চিত নয়।
ইয়ানুকোভিচের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল রাজধানী কিয়েভের ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারে গতকালও হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেন। আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বিক্ষোভকারীরা বলছেন, আগাম নির্বাচনের পথ পরিষ্কার করতেই ইয়ানুকোভিচের পদত্যাগ জরুরি। বিরোধী দলের নেতা ভিতালি ক্লিৎচকো গতকাল ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলেন, ইয়ানুকোভিচকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে সংসদীয় প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। প্রস্তাব পাস করতে আইনপ্রণেতাদের সহায়তা কামনা করেন তিনি। হর্ষধ্বনি দিয়ে তাঁর বক্তব্যকে স্বাগত জানান বিক্ষোভকারীরা। তাঁরা ‘দস্যু নিপাত যাক’ বলে স্লোগান দেন। ইনডিপেনডেন্স স্কয়ারে কয়েক দিন ধরে অবস্থান করে বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন ৫৮ বছর বয়সী ভেসিল লুবারেট। তিনি বলেন, ইয়ানুকোভিচ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এই স্কয়ার ছেড়ে যাবেন না। তাঁর বিশ্বাস, আজই (শনিবার) পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে ও প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করবেন। ভিতালির দলের মুখপাত্র ওকসানা জিনোভিয়েভা বলেন, ‘প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে শিগগিরই সংসদীয় প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। তাঁর পদত্যাগের মাধ্যমে আগামী নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পথ সুগম হবে। টেলিফোনে ওবামা-পুতিন আলাপ: ইউক্রেনে চলমান সহিংসতা বন্ধে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সমঝোতার বাস্তবায়ন জরুরি বলে একমত হয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। মার্কিন কর্মকর্তা এ কথা জানান। রয়টার্স, এএফপি।

ভারতে বিজেপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কী হবে?

নরেন্দ্র মোদি
জনমত জরিপ বলছে, মধ্য ডানপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) প্রায় নিশ্চিতভাবেই ভারতের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। অবশ্য দলটি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে একটি টেকসই জোট সরকার গড়তে পারবে—এমন সম্ভাবনাও কম। আর ভারতের ছোট দলগুলো এখন সেই রকম পরিস্থিতির জন্যই অপেক্ষা করছে। বড় কোনো রাজনৈতিক দল আগামী মে মাসে অনুষ্ঠেয় লোকসভা নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ছোট দলগুলোর নেতারাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন। তাঁরা নির্বাচন-পরবর্তী জোট সরকার গঠনের জন্য দর-কষাকষির পথে যাবেন। আর সম্ভাবনা যাই হোক না কেন, বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা মোদি গত সোমবার বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই সরকারের আসন্ন বাজেটের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে এবারের বাজেট হচ্ছে ‘দশকব্যাপী অবক্ষয় ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত সরকারি নীতির চূড়ান্ত প্রকাশ’। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটিকে কয়েক মাসের মধ্যেই সঠিক পথে নেতৃত্ব দিতে পারবেন—এ রকম আত্মবিশ্বাস একাধিক বক্তব্যের মাধ্যমে দেখিয়েছেন মোদি। কিন্তু বিচ্ছিন্ন ছোট দলগুলোর সমন্বয়ে বিজেপির একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িয়ে যেতে পারে। ওই দলগুলোর কয়েকটি সম্প্রতি নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছে রাজধানী নয়াদিল্লি এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতায়। মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে ব্যর্থ হলে পদটি কার দখলে যাবে, সেটিই ছিল তাদের আলোচনার বিষয়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বড় দুই দল কংগ্রেস ও বিজেপির বাইরে সম্ভাব্য ‘তৃতীয় ফ্রন্ট’ সরকার গঠন করলেও তা ভঙ্গুর প্রকৃতির হবে। আর তাতে দেশে কোনো কাঠামোগত সংস্কার বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে। ভারতের শীর্ষস্থানীয় জনমত জরিপ বিশেষজ্ঞ রাজীবা করনদিকার বলেন, মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না বলেই ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন। কিন্তু এ ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। মোদির সাফল্যের যথেষ্ট সম্ভাবনা এখনো রয়েছে। বর্তমানে তাঁর সম্ভাবনা ২০ শতাংশ হলেও এটি বৃদ্ধি পেয়ে ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। তবে ভারতের রাজনীতির গতিধারা নিয়ত পরিবর্তনশীল। তাই আগামী কয়েক মাসে যেকোনো কিছু ঘটে যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী পদে বিকল্প হিসেবে সামনে চলে আসতে পারে দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার নাম। স্থানীয় ছোট রাজনৈতিক দলগুলো এমনটাই মনে করছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে সে অনুযায়ী কিছু প্রচার কার্যক্রমও দেখা যাচ্ছে। বর্তমান জোট সরকারের প্রধান দল কংগ্রেসের রয়েছে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ভারতের ক্ষমতায় থাকার অভিজ্ঞতা। তবে দেশটির রাজনীতিতে দলটির প্রভাব ক্রমশ কমে আসছে—এ কথা স্বীকার করার পক্ষে যথেষ্ট কারণ ও যুক্তি রয়েছে। অবশ্য বিকল্প সরকারগুলো একাধিকবার ক্ষমতায় এলেও দীর্ঘ সময় টিকে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেনি।

রেনজির নেতৃত্বে ইতালিতে নতুন সরকারের শপথ

মাত্তিও রেনজি
ইতালির মধ্য বামপন্থী রাজনীতিবিদ মাত্তিও রেনজির নেতৃত্বাধীন সরকার গতকাল শনিবার শপথ নিয়েছে। এর মাধ্যমে ডেমোক্রেটিক পার্টির এই নেতা ইতালির সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হলেন। গত শুক্রবার রেনজি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। পরে তিনি সরকার গঠনের লক্ষ্যে মন্ত্রিসভাও ঘোষণা করেন। তবে ইতালির মতো দেশের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাঁর রাজনৈতিক পরিপক্বতা নিয়ে সংশয় রয়েছে দেশের মানুষের। গতকাল স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে রোমে শপথ নিতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যান ফ্লোরেন্সের সাবেক মেয়র রেনজি। ইউরোজোনের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ইতালি সরকারের দায়িত্ব নেওয়া মধ্য বামপন্থী এই ১৬ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেন। তাঁর মন্ত্রিসভার অর্ধেক সদস্য নারী এবং তাঁদের গড় বয়স ৪৭ বছর আট মাস।
রেনজির পাশাপাশি বয়সের দিক থেকে ইতালির ইতিহাসে এই সরকারের সদস্যদের গড় বয়স অনেক কম। রেনজির আগে ইতালির সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন বেনিতো মুসোলিনি। তিনি ১৯২২ সালে যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন, তখন তাঁর বয়স ছিল বর্তমান রেনজির চেয়ে দুই মাস বেশি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মারিও ক্যালাব্রেসি বলেন, নতুন মুখ ও তারুণ্যনির্ভর মন্ত্রিসভা করে রেনজি বড় ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছেন। তবে সরকারের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য নিয়ে অবশ্য সংশয় থাকবে। চলতি মাসের শুরুতে ডেমোক্রেটিক দলেরই নেতা ও আগের প্রধানমন্ত্রী এনরিকো লেত্তা পদত্যাগ করেন। লেত্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রতিশ্রুতিমতো সংস্কারকাজ করতে পারেননি। লেত্তাকে সরানোর ক্ষেত্রে পেছন থেকে এই রেনজি কলকাঠি নাড়েন বলে শোনা যাচ্ছে। রেনজি আশা করেন, তাঁর নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সংকটে পতিত দেশ নতুন আশার আলো খুঁজে পাবে। দেশবাসীকে তিনি আশ্বাস দেন, শুল্ক ও শিক্ষাক্ষেত্রে চার মাসের মধ্যেই সংস্কার আসবে। বিবিসি।

মুগাবের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে গুজব

মুগাবের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে গুজব
জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট ও আফ্রিকার প্রবীণতম নেতা রবার্ট মুগাবে গত শুক্রবার তাঁর ৯০তম জন্মদিন উদ্যাপন করেছেন। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ১৯৮০ সালে জিম্বাবুয়ে স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মুগাবে। তবে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জন্মদিন পালন করায় জিম্বাবুয়ের এই নেতার স্বাস্থ্যের অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে বলে গুজব দানা বেঁধে উঠেছে। জন্মদিনে দেশে মুগাবের অনুপস্থিতির কারণে এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়লেও তাঁর সহকারীরা বলছেন, তিনি সুস্থ হয়ে ওঠার লড়াই চালাচ্ছেন। আজ রোববার বড় পরিসরে জিম্বাবুয়ের স্টেডিয়ামে মুগাবের জন্মদিনের অনুষ্ঠান উদ্যাপিত হওয়ার কথা। দারিদ্র্যপীড়িত দেশটিতে তাঁর এ জন্মদিনের অনুষ্ঠান বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ডলার। জন্মদিন উপলক্ষে জিম্বাবুয়ের কয়েক ডজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রী এবং সমর্থকেরা শুক্রবার মুগাবের প্রশংসা জ্ঞাপনসূচক বাণী দিয়েছেন। এএফপি।

চীন-ভারতের মধ্যে সেতুবন্ধ হতে পারে বাংলাদেশ

এম হুমায়ুন কবির।
এম হুমায়ুন কবির। কূটনীতিক। তাঁর জন্ম ১৯৫১ সালের ৭ ডিসেম্বর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরে স্কুল-কলেজের পড়াশোনা শেষে তিনি উচ্চশিক্ষা নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর হুমায়ুন কবির এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। তিন দশকেরও বেশি সময় কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ফিজি ও নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও কলকাতায় উপহাইকমিশনারসহ বিভিন্ন উচ্চতর পদে আসীন ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা এই কূটনীতিক বর্তমানে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান
প্রথম আলো  ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বহির্বিশ্বে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কূটনীতির দৃষ্টিতে বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
হুমায়ুন কবির  গত ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে, তা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে একধরনের অস্বস্তি রয়েছে। পররাষ্ট্রনীতিতে এর প্রভাব পড়বে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য জানতে হবে বহির্বিশ্ব কী দৃষ্টিতে দেখছে, বাংলাদেশের কাছে তাদের প্রত্যাশা কী? প্রথম প্রত্যাশা হলো, তারা বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায়। কিন্তু কোনো নির্বাচন যদি গ্রহণযোগ্যতা না পায় স্বভাবতই দেশের ভাবমূর্তির ওপর তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দ্বিতীয় হলো, বাংলাদেশকে তারা দেখে একটি নৈতিক মানদণ্ডে, যেমন—সারা বিশ্বে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে যে শান্তিরক্ষীরা কাজ করছেন, সেখানে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। একই সঙ্গে গণতন্ত্রচর্চা, নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে মানুষকে স্বাবলম্বী করার কারণেও তাদের কাছে বাংলাদেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটি নির্বাচনের মাধ্যমে যখন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তখন এ নিয়ে বহির্বিশ্বে আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
প্রথম আলো  পশ্চিমা দেশসহ অনেকেই চেয়েছিল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হোক, কিন্তু প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান ভিন্ন ছিল। তারা ‘একতরফা’ নির্বাচনকে সমর্থন জুগিয়েছে।
হুমায়ুন কবির  এখানে যে যুক্তিটি কাজ করেছে তা হলো, লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যে পথই অনুসরণ করা হোক না কেন, লক্ষ্যটাই আসল। ভারত মনে করেছে যে দল বা গোষ্ঠী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে, তাদের সমর্থন দেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। সে কারণে তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে। অন্যান্য দেশ পদ্ধতি ও লক্ষ্য দুটির মধ্যে সমন্বয় আনতে চেয়েছিল, কিন্তু ভারত লক্ষ্যটাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। লক্ষ্য অবশ্যই থাকবে—শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক ও অগ্রসরমাণ বাংলাদেশ। একই সঙ্গে দেশটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সেটি নির্ধারণের দায়িত্বও জনগণকে দিতে হবে।
প্রথম আলো  আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র মিসরের ক্ষেত্রে যে অবস্থান নিয়েছে, বাংলাদেশের বেলায় ভারত তা-ই করেছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন।
হুমায়ুন কবির  কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি সব ক্ষেত্রে একরকম হয় না। সমাজ, মানুষ, ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনা করেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নির্ধারিত হয়। মিসরে মুরসির সরকার গণতন্ত্রের মধ্য দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিল, কিন্তু তারা লক্ষ্যে স্থির থাকতে পারেনি। বাংলাদেশে আমরা পথ হারাইনি। এখনকার নাগরিক সমাজ হলো প্রাণ। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে বিবেচিত। গণতন্ত্র মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে একটি প্রধান অস্ত্রও বটে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব মনে করছে, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া যত সংহত হবে, এর আর্থসামাজিক উন্নয়ন তত ত্বরান্বিত হবে এবং উদারনৈতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।
প্রথম আলো  চীন ও ভারত আমাদের দুই বৃহৎ প্রতিবেশী। এ ক্ষেত্রে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি কি যথেষ্ট ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে পারছে?
হুমায়ুন কবির  ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী, এর সঙ্গে চার হাজার কিলোমিটার সীমান্ত আছে। আমাদের আমদানির দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। আর চীন প্রথম। দুটি দেশই এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতির শক্তি। এর সুবিধা পাওয়ার জন্য দুই দেশের সঙ্গেই আমাদের সুসম্পর্ক রাখতে হবে। ভারত ও চীনকে আপাতদৃষ্টিতে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হলেও সহযোগিতার ক্ষেত্রও প্রসারিত। বর্তমানে ভারতে চীনের বার্ষিক বাণিজ্য ৮০ বিলিয়ন ডলারের, আগামী ১০ বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
গত বছর চীনের প্রধানমন্ত্রী ভারতে গিয়ে বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমার নিয়ে একটি অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাব দিলে ভারত সানন্দে সমর্থন জানায়। এই প্রস্তাবের পেছনে বাংলাদেশেরও সক্রিয়া ভূমিকা আছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, এর সঙ্গে চীন ও মিয়ানমারকে যুক্ত করতে পারলে দুই বৃহৎ অর্থনীতির দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করতে পারবে। এবং তাতে আমরাই বেশি লাভবান হব। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই চীনের সঙ্গে নতুন যোগাযোগের আগ্রহ দেখাচ্ছে। বেশ কিছু বৃহৎ প্রকল্প নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে। এটি ইতিবাচক বলেই মনে করি।
প্রথম আলো  নির্বাচনের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন লক্ষ করা যাচ্ছে। তারা জিএসপি সুবধা স্থগিত করেছে। এর পেছনে মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সরকারের বৈরিতার বিষয়টি যুক্ত বলে অনেকের ধারণা।
হুমায়ুন কবির  জিএসপি সুবিধা স্থগিত করা পুরোপুরি কারিগরি বিষয়। এর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নেই। এ ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্যভাবে আমাদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারিনি। তবে আশার কথা, সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা অ্যাকশন প্ল্যান দিয়েছিল, এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল হতে পারে। দ্বিতীয়ত, ড. ইউনূসের বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনেক প্রশ্ন আছে, সেটি কেবল সরকার নয়, কংগ্রেস, মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটি, এমনকি সাধারণ মানুষের মধ্যেও নেতিবাচক ধারণা আছে।
আর বাংলাদেশের বিষয়ে যে তাদের আপত্তি, সেটি হলো নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি। হিলারি ক্লিনটন ঢাকা সফরকালেও সে কথা বলে গিয়েছিলেন। দুই দেশের সম্পর্ক একই সঙ্গে বহুমাত্রিক ও জটিল। চ্যালেঞ্জ হিসেবে যেমন আসছে জিএসপি সুবিধা স্থগিতকরণ, তেমনি সম্ভাবনা হিসেবে আসছে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি।
প্রথম আলো  যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টিকফা চুক্তি নিয়ে বেশ সমালোচনা হচ্ছে।
হুমায়ুন কবির  এটি হলো একটি আলোচনার ফোরাম। কী বিষয়ে আলোচনা করব, সহযোগিতা করব, তার ক্ষেত্র। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের মতো দেশের সঙ্গে আলোচনা করতে হলে আমাদের যে সক্ষমতা বাড়ানো দরকার, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে যে সমন্বয় থাকা দরকার, সেটি আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছি, তার ওপরই জাতীয় স্বার্থ রক্ষার বিষয়টি নির্ভর করে।
প্রথম আলো  গত সরকারের দাপুটে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনির বিদায়কে কীভাবে দেখছেন?
হুমায়ুন কবির  আমি বলব, তিনি চেষ্টা করেছেন। অনেকটা উচ্ছ্বাসের সঙ্গেই করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে হননি। স্বীকার করতে হবে যে, গত সরকার যে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, তাতে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমাদের আরও ভালো করার কথা ছিল। এর সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করার প্রয়োজন ছিল। সেই কাজটি তেমন হয়নি।
প্রথম আলো  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ইউনূসের ব্যাপারটি ক্লোজড। এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?
হুমায়ুন কবির  ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ আছে, সেখানে তাঁর অনুগত গোষ্ঠী আছে। কিন্তু তাঁকে কেন্দ্র করেই বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক আবর্তিত হচ্ছে, সেটি ঠিক নয়। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমাদের নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের সঙ্গে সরকারের আচরণ, শ্র্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিষয়টিই বেশি সম্পর্কিত বলে মনে হয়।
প্রথম আলো  দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান কী?
হুমায়ুন কবির  বিভিন্ন সভা-সেমিনার উপলক্ষে বিভিন্ন দেশে যাই। অনেকে প্রশ্ন করেন। সম্প্রতি নেপালের একটি প্রতিনিধি সেমিনারেও এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। তাঁরা জানতে চাইছেন, এই সরকার কতটা স্থিতিশীল? আরেকটি নির্বাচন হবে কি না? বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের প্রশ্ন কাম্য ছিল না। যদি তাঁরা প্রশ্ন করতেন, এখানে কত বিনিয়োগ আসছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কেমন হচ্ছে, মধ্যম আয়ের দেশ হচ্ছে কি না, খুশি হতাম।
প্রথম আলো  মার্কিন কংগ্রেস কমিটি, ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয় বলে প্রস্তাব নিয়েছে। আবার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বর্তমান সরকারের সঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। এটি কি স্ববিরোধী?
হুমায়ুন কবির  না, স্ববিরোধী নয়। তারা তো বিভিন্ন বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশের মানুুষের কষ্ট হয় এমন পদক্ষেপ তারা নেবে না। বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণ হোক, এগিয়ে যাক—এটাই তাদের প্রত্যাশা। সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ কারণেই তারা আরেকটি নির্বাচনের তাগিদ দিয়েছে। সরকার প্রতিদিনের কাজ করে। আমাদের দেশে সরকার ও সংসদের যে সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র বা ব্রিটেনে তা নয়। সেখানে ক্ষমতার বিভাজন আছে। সংসদ অনুমোদন না করলে সরকার কাজ করতে পারবে না। তাই দেখবেন মার্কিন প্রশাসন ও কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য আছে। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা নেই, কমিশনে আছে। তাই নৈতিক চাপটি উপেক্ষা করা যায় না। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রশাসন জনমতকে উপেক্ষা করতে পারে না, আর সেই জনমতের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো পার্লামেন্ট। এটাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
হুমায়ুন কবির  ধন্যবাদ।

প্রতিপক্ষ যখন আওয়ামী লীগ

ছয় কিস্তির উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম দফায় ৯৭টি উপজেলায় নির্বাচন হলো গত বুধবার। যে বিএনপি-জামায়াত জোট বিদেশি লবিস্ট, কিছু অদূরদর্শী দলীয় নেতার প্ররোচনায় গত ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, সেই জোটও এই উপজেলা নির্বাচনে শুধু অংশগ্রহণই করেনি, ৯৭টি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদের মধ্যে যৌথভাবে ৫৩টিতে জয়ীও হয়েছে। নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনের দিন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা বলেছেন, এটি একটি পাতানো নির্বাচন, যেখানে একতরফাভাবে সরকারি দল তাদের বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছে। আওয়ামী লীগ মাত্র ৩৪টি চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছে। ভাইস চেয়ারম্যান পদেও বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থীরা আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালো করেছেন। কারচুপির অভিযোগ এনে একাধিক নির্বাচনী এলাকায় বিএনপি নির্বাচন বর্জন করেছে। তার প্রতিবাদে আটটি উপজেলায় আবার তারা হরতালও করেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যেসব এলাকায় তারা এই অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেছে, তার মধ্যে একাধিক উপজেলায় আবার তাদের প্রার্থীরাই বিজয় লাভ করেছেন। এখন রুহুল কবির রিজভী কী বলবেন জানি না। হয়তো বলবেন, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে মানুষ সব আসনে বিএনপি-জামায়াত জোটকে বিজয়ী করত। ইতিমধ্যে দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হান্নান শাহ বলেই ফেলেছেন, প্রশাসন হস্তক্ষেপ না করলে তাঁরা আরও অনেক বেশি চেয়ারম্যান পদে জয়ী হতেন। বিজয়ী প্রার্থী, নির্বাচন কমিশন আর সরকারকে প্রথম দফার উপজেলার নির্বাচনটি মোটামুটি নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য অভিনন্দন।
কোনো কোনো জায়গায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশে নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে তা অপ্রত্যাশিত ছিল না। নির্বাচন কমিশন আরও একটু সতর্ক হলে এই সহিংসতা কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল। ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে জামায়াত-শিবির আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিএনপি যে মাত্রায় সহিংসতা সৃষ্টি করেছিল, তার তুলনায় উপজেলা নির্বাচনে সৃষ্ট সহিংসতা নস্যি। প্রথম ধাপের পর দ্বিতীয় ধাপে ১১৭টি উপজেলায় ২৭ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপে ৮৩টি উপজেলায় ১৫ মার্চ, চতুর্থ ধাপে ৯২টি উপজেলায় ২৩ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, পঞ্চম ধাপে ৭৪টি উপজেলায় নির্বাচন হবে ৩১ মার্চ। আর ১২টি হবে ষষ্ঠ ধাপে। সব নির্বাচন শেষে এই নির্বাচন নিয়ে সার্বিক বিশ্লেষণ করা সম্ভব। প্রথম ধাপের নির্বাচন সম্পর্কে শুধু একটি কথা বলা যায়, এই ধাপে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন। যদিও এটি একটি স্থানীয় সরকারব্যবস্থার নির্বাচন এবং তা নির্দলীয়ভাবেই হয়, কিন্তু বাস্তবে তা দলীয় রূপই নিয়েছিল। কারণ, প্রায় সব প্রার্থীর পেছনে দলীয় ছাপ ছিল আর নির্বাচনের দিন দলগতভাবে বিএনপি তো নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়ে তাদের কথিত কারচুপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এসেছে। ভোটের দিন বিকেলে বিএনপি আর আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যথাক্রমে রুহুল কবির রিজভী আর এইচ টি ইমাম নির্বাচন বিষয়ে তাঁদের দলীয় অবস্থান প্রকাশ করেছেন। সব কিস্তির নির্বাচন শেষে যদি বর্তমান ধারাবাহিকতায় বিএনপি-জামায়াত জোট ভালো করে, তাহলে নিশ্চিতভাবে তারা তাদের আগের দাবির পুনরাবৃত্তি করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিটার পুনরুল্লেখ করবে। এই নির্বাচনের আরও একটি তাৎপর্য আছে।
নির্বাচনের দিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা রাজশাহী জেলার কয়েকটি কেন্দ্রে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাঁদের দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি দল নির্বাচন চলাকালীন চট্টগ্রামে গিয়ে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে।উল্লেখ্য, বুধবারের নির্বাচনে হেফাজতের সদর দপ্তর এলাকা হাটহাজারীতেও তাদের একজন প্রার্থী ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের আগে এক অজ্ঞাত কারণে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধিদল নেজামে ইসলামের একাংশের প্রধান চট্টগ্রামের মুফতি ইজাহারুল ইসলাম চৌধুরীর লালখান বাজারের মাদ্রাসায় তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল। কিছুদিন পর সেই মাদ্রাসায় বোমা বানানোর সময় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণে তিনজন মাদ্রাসাছাত্র নিহত হয় এবং ওই মাদ্রাসার একটি অংশ উড়ে যায়। এযাবৎ পুলিশ মুফতি ইজাহারকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ড্যান মজীনার স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় নির্বাচনী কেন্দ্র পরিদর্শন করা, একই সময় তাঁর দূতাবাসের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদলের হেফাজতের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে একেবারে তাঁদের সদর দপ্তরে গিয়ে সাক্ষাৎ করা অথবা এর আগে অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধিদলের মুফতি ইজাহারের সঙ্গে দেখা করা—এসব বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। মুফতি ইজাহার যখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৯-দলীয় জোটের অন্তর্ভুক্ত একটি দলের প্রধান, তখন বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। প্রথম দফা উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনেকটা বিপর্যয়কর ফলাফল কী অপ্রত্যাশিত ছিল? দলকানা না হলে বলতে হয়, না, অপ্রত্যাশিত ছিল না। কারণ, বেশির ভাগ নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগই ছিল;
ঠিক যেমনটি দেখা গিয়েছিল ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কমপক্ষে ৮০টি আসনে পরাজিত হয়েছিল নিজেদের দলীয় কোন্দলের কারণে নিজেদের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে। সদ্য বিজয়ী উপজেলা চেয়ারম্যান বা অন্যদের বিজয়কে খাটো করে না দেখেও বলা যায়, এই নির্বাচনে আগের ধারাবাহিকতায় অনেক আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হেরেছেন স্রেফ দলীয় কোন্দলের কারণে। কোন্দল এখন আওয়ামী লীগের জন্য একটি দলীয় ট্রেডমার্ক হয়ে পড়েছে। এই কোন্দল যদি না থাকত, তাহলে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে এখনো একটি অপ্রতিরোধ্য দল হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে পারত। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের আগে দলীয় সভানেত্রী থেকে শুরু করে একাধিক শীর্ষ পর্যায়ের নেতা প্রতিটি উপজেলার স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন, তাঁরা যেন প্রতিটি উপজেলায় একজন করে প্রার্থী দেন এবং তাঁর বিজয়ের জন্য কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের সেই আহ্বান শুধু যে অরণ্যে রোদন ছিল, তা-ই নয়, অনেক উপজেলায় এই কোন্দলকে আরও উৎসাহভরে বাতাস দিয়েছেন হয় ওই এলাকা থেকে মনোনীত কোনো এক মন্ত্রী অথবা সাংসদ। স্থানীয়ভাবে হয়তো ঠিক করা হলো, দলীয় প্রার্থী হবেন একজন কিন্তু তাঁকে নাকচ করে দিয়ে মন্ত্রী বা সাংসদ নিজেদের এক বা একাধিক প্রার্থী দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিপর্যয় নিশ্চিত করেছেন। চট্টগ্রামের দুটি নির্বাচনী এলাকার কথা বলি। একটিতে বিদায়ী চেয়ারম্যান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। এলাকায় তিনি বেশ জনপ্রিয় বলে জানা গেছে। কিন্তু একজন মন্ত্রী তাঁকে বোধগম্য কারণ ছাড়া নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন। সেই প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলেন একজন প্রার্থী এবং বললেন, এই প্রার্থীই হচ্ছে দলীয় প্রার্থী। যথারীতি বিএনপি প্রার্থীর কাছে উভয় প্রার্থীর হার।
অথচ এই প্রার্থীদ্বয়ের প্রাপ্ত ভোট যোগ করলে বিএনপি প্রার্থী ধারে-কাছেও নেই। আরেকজন বিদায়ী চেয়ারম্যান, যাঁর সততা কিংবদন্তিতুল্য। বছর দুই আগে তিনি গুরুতর অসুস্থ হলে এলাকার মানুষ চাঁদা তুলে তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল। এবার দলীয় প্রার্থী। কিন্তু এলাকার আওয়ামী লীগের কর্মীদের অন্য চিন্তা। বিএনপি প্রার্থীর টাকাপয়সা খরচ করার যোগ্যতা অনেক বেশি। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নৌকা ভিড়ল তাঁর বন্দরে। ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হলো। এমন অবস্থা খুঁজলে আরও অনেক উপজেলায় মিলবে। সামনের নির্বাচনগুলোতেও এমন হবে না, তা কেউই হলফ করে বলতে পারবে না। এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতার একটি সামান্য চিত্র এবং সাম্প্রতিক কালে যখনই দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অথবা তাদের ভাবধারার কোনো পেশাজীবী সংগঠন কোনো নির্বাচনে অংশ নেয়, তখন এমন কোন্দল বারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং যথারীতি একটি বিপর্যয় ঘটে আর আওয়ামী লীগ সেই বিপর্যয় থেকে কোনো শিক্ষা নেয় না। পাঁচ বছর অথবা দুই বছর পর হোক, আগামী কোনো একসময় একাদশ সংসদ নির্বাচন হবে। এখনো যদি আওয়ামী লীগ দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনে কোন্দল নিরসনে সমর্থ না হয়, তাহলে ভবিষ্যতেও যে এমন সব বিপর্যয় ঘটবে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে? ইতিমধ্যে যেসব এলাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নিজে দলের মন্ত্রী আর সাংসদদের কারণে হেরেছেন, তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, সামনের নির্বাচনে তাঁরা তা সুদে-আসলে পরিশোধ করে দেবেন। এমন অবস্থায় তাঁদের বিপর্যয় রোখে কার সাধ্য? দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ তার নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করে আসছে। এখন সময় এসেছে, সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এটি কে করবেন, তা কোটি টাকার প্রশ্ন।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে শিক্ষক, ইউল্যাব।