Sunday, July 20, 2025

দামেস্কে হামলা ইসরায়েলি নীতির মারাত্মক ভুল by সৌমায়া ঘান্নুশি

গত বুধবার যুদ্ধবিমানগুলো সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সামরিক সদর দপ্তর ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের আশপাশের এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালায়। এগুলো কোনো সীমান্তবর্তী ‘ফ্রন্টলাইন’ এলাকা ছিল না, বরং এসব স্থাপনা সিরিয়ার রাজধানীর সার্বভৌম ও প্রতীকী কেন্দ্র।

অজুহাত ছিল দুর্বল—সিরিয়ার দ্রুজ সম্প্রদায়কে রক্ষার নামে এই হামলা। কিন্তু এতে কারও বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়; এ হামলা সুরক্ষার জন্য নয়, বরং শক্তি ও ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের জন্য। এটি দ্রুজদের জন্যও নয়—যারা সিরীয় আরব এবং সিরিয়ার জাতীয় কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ—বরং বহুদিনের ইসরায়েলি আঞ্চলিক বিভাজন নীতি চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস; যা গাজার রক্তাক্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে শুরু করে দামেস্কের বিধ্বস্ত মন্ত্রণালয়, এমনকি অন্যান্য রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত।

গাজায় ইতিমধ্যে ৬০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েল, যাঁদের বেশির ভাগ নারী ও শিশু; আহত করেছে আরও ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে; ধ্বংস করেছে ওই ভূখণ্ডের প্রায় ৮০ শতাংশ স্থাপনা। এমন এক রাষ্ট্র এখন সংখ্যালঘুদের রক্ষাকর্তা সাজতে পারে না।

যে রাষ্ট্র দ্রুত বিশ্বের বৃহত্তম খোলা কারাগারে পরিণত হওয়া এক ভূখণ্ড গড়ে তুলছে, অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে প্রতিদিন জাতিবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং তার মৌলিক আইনে বৈষম্যকে বৈধতা দিচ্ছে, সেটা কোনো নৈতিক উচ্চ অবস্থান দাবি করতে পারে না। তারা আসলে সিরিয়ার দ্রুজ জনগোষ্ঠীর জন্য ভুয়া সহানুভূতি দেখিয়ে নিজেদের ভয়ংকর উদ্দেশ্য আড়াল করতে চায়।

টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অপমানের নাটক

লক্ষ্যবস্তু বাছাই ছিল প্রতীকী, কৌশলগত নয়। উমাইয়া স্কয়ার কেবল একটি সড়ক সংযোগ নয়—এটি দামেস্কের আত্মা। এটি সিরীয় গৌরব ও আরব মর্যাদার স্মারক। এখানে দাঁড়িয়ে আছে দামেস্ক তলোয়ারের ভাস্কর্য, প্রতিধ্বনিত হয় উমাইয়া খিলাফতের উত্তরাধিকার, যার এককালে বিস্তার ছিল পিরেনিজ পর্বতমালা থেকে মধ্য এশিয়ার তৃণভূমি পর্যন্ত।

মাত্র আট মাস আগে এই স্কয়ারেই সিরীয়রা উদ্‌যাপন করেছিল ছয় দশকের একনায়কতন্ত্রের পতন। সেই স্থানেই, কর্মদিবসের মাঝখানে, ইসরায়েল হামলা চালায়। তারা এটা জানে যে স্কয়ারটির চারপাশে আন্তর্জাতিক ও আরব টেলিভিশন চ্যানেলের কার্যালয় রয়েছে এবং এই হামলার ফুটেজ বারবার সম্প্রচারিত হবে স্যাটেলাইট চ্যানেল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এটি শুধু একটি বোমাবর্ষণ ছিল না। এটি ছিল টেলিভিশনে সম্প্রচারিত অপমানের এক প্রদর্শনী। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রীই তা স্পষ্ট করে দেন, যখন তিনি গর্বের সঙ্গে একটি ভিডিও শেয়ার করেন—যেখানে দেখা যায়, এক আতঙ্কিত সিরীয় উপস্থাপক সরাসরি সম্প্রচারের সময় তার আসন ছেড়ে দৌড়ে চলে যাচ্ছেন আর পেছনে জ্বলছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।

এটি ছিল এক পরিকল্পিত নাটক, যার উদ্দেশ্য সিরীয়দের চমকে দেওয়া এবং আরবদের আতঙ্কিত করা। এই হামলাটা শুধু অবৈধ বা অনৈতিক নয়—এটা আসলে এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপ, যার লক্ষ্য হলো একটি খণ্ডিত, দুর্বল, বিভক্ত অঞ্চলের ওপর ইসরায়েলি আধিপত্য চাপিয়ে দেওয়া।

এটি নতুন নয়, প্রতিক্রিয়াশীলও নয়; এটি ইসরায়েলের কৌশলের মূল ভিত্তি, যা দশকের পর দশক ধরে, ভিন্ন সরকার, সীমানা ও যুদ্ধে অনুসৃত হয়ে আসছে। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর থেকে ইসরায়েল সিরিয়ায় যত হামলা চালিয়েছে, তা আগের সব দশক মিলিয়েও বেশি।

তারা পদ্ধতিগতভাবে সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করেছে, শত শত অভিযান চালিয়েছে এবং দক্ষিণ সিরিয়ার কৌশলগত পর্বতমালা দখল করে তাদের দখলদারত্ব গভীরতর করেছে। ইসরায়েলের বিমান হামলা এখন এতটাই নিয়মিত ও সাধারণ হয়ে উঠেছে যে এগুলো স্বাভাবিক করে তোলা, সার্বভৌমত্ব মুছে দেওয়া এবং সিরিয়ার আঞ্চলিক অবস্থান ভেঙে দেওয়াই যেন লক্ষ্য।

কিন্তু এটা শুধু এক হামলা নয়, এটা এক মানসিকতা—যা ইসরায়েলি নেতারা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট করে তুলছেন। আসাদের দেশত্যাগের মাত্র এক দিন পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ‘একক, সার্বভৌম সিরিয়ার ধারণা অবাস্তব।’

ইসরায়েলি সামরিক প্রশিক্ষক রামি সিমানি আরও এগিয়ে বলেন, ‘সিরিয়া একটি কৃত্রিম রাষ্ট্র…ইসরায়েলকে অবশ্যই সিরিয়াকে বিলুপ্ত করতে হবে। তার জায়গায় গড়ে উঠবে পাঁচটি ক্যান্টন।’

উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ‘যুদ্ধ থামবে না যতক্ষণ না লাখ লাখ গাজার বাসিন্দা চলে যায়… এবং সিরিয়া ভাগ হয়ে যায়।’
এগুলো কেবল কথার ফুলঝুরি নয়, বরং এক বাস্তব নীতি এবং সেটিই এখন কার্যকর করা হচ্ছে।

আরব ঐক্য দুর্বল করার কৌশল

এই কৌশলের শিকড় প্রসারিত সাত দশকেরও বেশি পেছনে, তথাকথিত ‘পেরিফেরি নীতি’তে, যা ইসরায়েলের অস্তিত্বের শুরুর বছরগুলোতে ডেভিড বেন-গুরিয়ন ও এলিয়াহু সাসুন প্রণয়ন করেছিলেন। এর যুক্তি ছিল সহজ ও নির্মম: যেহেতু ইসরায়েল আরব বিশ্বে মিশে যেতে পারবে না, তাই তাকে ঘিরে ফেলতে হবে অ-আরব শক্তিগুলোর (তুরস্ক, ইরান, ইথিওপিয়া) সঙ্গে জোট গড়ে তুলে এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের শক্তিশালী করে।

এই নীতির তিনটি লক্ষ্য ছিল—অ-আরব, পশ্চিমাপন্থী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা; ভেতর থেকে বিভাজন উসকে দিয়ে আরব ঐক্যকে দুর্বল করা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরবদের সম্মিলিত বিরোধিতাকে প্রশমিত করা।

এই কৌশল ইসরায়েলকে তার শুরুর বছরগুলোয় টিকে থাকতে এবং উন্নতি করতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু এটি কখনো প্রতিরক্ষামূলক ছিল না, বরং ছিল সম্পূর্ণ সম্প্রসারণবাদী। বেন-গুরিয়ন নিজেই তা স্বীকার করেছিলেন: ‘আমাদের লক্ষ্য লেবানন, ট্রান্স-জর্ডান এবং সিরিয়াকে গুঁড়িয়ে দেওয়া… এরপর আমরা বোমা মারব, এগিয়ে যাব এবং পোর্ট সাইদ, আলেকজান্দ্রিয়া ও সিনাই দখল করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের একটি গতিশীল রাষ্ট্র তৈরি করতে হবে, যা সম্প্রসারণের দিকে অভিমুখী। চূড়ান্ত বন্দোবস্ত বলে কোনো  কিছু নেই…শাসনব্যবস্থা, সীমানা কিংবা আন্তর্জাতিক চুক্তি—কোনো ক্ষেত্রেই নয়।’

অন্যত্র তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন, ‘জায়োনিস্ট বা জায়নবাদী আকাঙ্ক্ষার সীমানা হলো ইহুদি জনগণের উদ্বেগ এবং কোনো বাহ্যিক শক্তি তা সীমিত করতে পারবে না।’
এসব শুধু কল্পনাপ্রসূত চিন্তা ছিল না, এগুলো ছিল নীতির মৌলিক স্তম্ভ এবং আজও এগুলোই ইসরায়েলের নীতিকে চালিত করছে।

আঞ্চলিক গতিশীলতা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ইসরায়েলের লক্ষ্যও বদলেছে। মিসর শান্তি স্থাপন করেছে। ইরানের শাহ ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। তুরস্ক ফিলিস্তিনিদের আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। নীতিকে তাই রূপান্তরিত হতে হয়েছে। কিন্তু মূল লক্ষ্য হিসেবে ‘বিভাজন’ অবিচল থেকেছে।

লেবানন, ইরাক, সুদানে ইসরায়েল এই সূত্র প্রয়োগ করেছে। তবে সিরিয়া এখনো এই কৌশলের মুকুটমণি। কেন?

কারণ, সিরিয়া ফিলিস্তিন সীমান্তবর্তী সবচেয়ে জনবহুল আরব রাষ্ট্র এবং সিরীয়রা ফিলিস্তিনকে বিদেশি ইস্যু নয় বরং তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও আধ্যাত্মিক ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দেখে। তা ছাড়া বিলাদ আল-শাম শুধু ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি একটি যৌথ স্মৃতি এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, ইসরায়েল সিরিয়ার ভূমি দখল করে রেখেছে।

এ কারণেই ইসরায়েল গত দশকে কুর্দি ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, ভবিষ্যতের বিভাজনের হাতিয়ার হিসেবে তাদের ব্যবহারের প্রস্তুতিতে এবং এখন আসাদ চলে যাওয়ার পর, সেই ভবিষ্যৎ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

একটি মারাত্মক ভুল হিসাব

কিন্তু সিরিয়াই ইসরায়েলের শেষ গন্তব্য নয়। এটি শুধু মাঝপথ। ইসরায়েলের আকাঙ্ক্ষা এখন অঞ্চলটির আরও গভীরে প্রসারিত হয়েছে—‘পেরিফেরি’ অঞ্চলের ভেতরে—যেখানে ইরান ও পাকিস্তান তার প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি ‘ঘনিষ্ঠ কণ্ঠস্বর’—বিশেষত জেরুজালেম পোস্ট ও নব্য রক্ষণশীল থিঙ্কট্যাংকগুলো প্রকাশ্যে ইরানের বিভাজনের আহ্বান জানিয়েছে। একটি সম্পাদকীয়তে ট্রাম্পকে আহ্বান জানানো হয়েছিল—‘শাসন পরিবর্তন গ্রহণ করুন… ইরানের বিভাজনের জন্য একটি মধ্যপ্রাচ্য জোট গঠন করুন…বিচ্ছিন্ন হতে আগ্রহী সুন্নি, কুর্দি ও বেলুচি অঞ্চলগুলোকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিন।’

ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস যুক্তি দিয়েছিল যে ইরানের বহুজাতিগত গঠনকে একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করে তা কাজে লাগানো উচিত। এমনকি পাকিস্তানও এখন এই দৃষ্টিভঙ্গির অংশ। ইসরায়েলের পক্ষের কেউ কেউ ‘পাকিস্তান থেকে মরক্কো পর্যন্ত’ অঞ্চলটিকে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নিয়ে বলেছে।

এসব পরিকল্পনা আব্রাহাম চুক্তি বা শান্তিচুক্তি থেকে অনেক দূরে। এগুলো ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে স্বাভাবিক করার হাতিয়ার—ইসরায়েলকে অঞ্চলটির অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ক্রমশ আরও খোলামেলা হয়ে উঠছেন। কেউ কেউ এমন একটি দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন, যেখানে ইসরায়েল একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু, প্রায় একটি ‘সাম্রাজ্য’ এবং স্পষ্ট করেছেন যে আরব রাষ্ট্রগুলোকে ইসরায়েলকে ‘মূল্য পরিশোধ’ করতে হবে, ইরান ও হামাসের মতো হুমকি থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বিনিময়ে।

বার্তাটি স্পষ্ট—ইসরায়েল সহিংসতা সরবরাহ করবে আর প্রতিবেশীরা খাজনা দেবে। এটি কোনো অংশীদারত্ব নয়; এটি কূটনীতির ছদ্মবেশে আধিপত্য। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভেন উইটকফ আরও নরম ভাষায় বলেন, ‘যদি এই দেশগুলো একসঙ্গে কাজ করে, এটি ইউরোপের চেয়েও বড় হতে পারে…।’

কিন্তু এটি একীকরণ নয়, বরং অধিক্রমণ—অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সার্বভৌমত্বের। এটি এমন একটি পরিকল্পনা, যেখানে ইসরায়েলের নেতৃত্বে একটি ব্লক গড়ে তোলা হবে, যা ইউরোপকে পাশ কাটিয়ে বৈশ্বিক শক্তিকেন্দ্রগুলোকে চ্যালেঞ্জ করবে।

তবে এখানেই ইসরায়েলের মারাত্মক ভুল হিসাব: যতই এটি প্রসারিত হয়, ততই এটি শত্রু তৈরি করে। ‘পেরিফেরি’তে মিত্র খোঁজা দিয়ে শুরু করে আর শেষে সেই ‘পেরিফেরি’কেই অস্তিত্বগত শত্রুতে পরিণত করে। ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান—একসময় দূরবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল—এখন ইসরায়েলকে শুধু বিরক্তিকর নয়, সরাসরি হুমকি হিসেবে দেখে।

আরব বিশ্বজুড়ে, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা, দামেস্কে ঘৃণ্য হামলা, বৈরুত, সানা ও তেহরানে হামলা—কোনো সম্মেলন যতটা পারত, তার চেয়ে বেশি হৃদয়কে একত্র করেছে। ইসরায়েল যত বেশি আঞ্চলিক সাম্রাজ্য হিসেবে আচরণ করে, অঞ্চলটি তত বেশি এটিকে ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করে। আর ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য টেকে না।

ইসরায়েল যা বিভাজন হিসেবে দেখে, তা শেষ পর্যন্ত রূপ নিতে পারে ঐক্যে এবং একটি যৌথ উপলব্ধিতে: প্রকৃত হুমকি ইরান, সিরিয়া বা এমনকি রাজনৈতিক ইসলাম নয়, বরং আধিপত্যের নীতি নিজেই। যে নীতিতে ইসরায়েল আজ যে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, তার বিপরীতে অবশ্যই জবাব পাবে।

ইসরায়েল যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছে—যেখানে আধিপত্য আর বশ্যতা থাকবে—এই অঞ্চল তা কখনো মেনে নেবে না। কারণ, এ অঞ্চলের জনগণ এর আগে সব দেখেছে। তারা সাম্রাজ্যের পতন দেখেছে, ক্রুসেডারদের, ঔপনিবেশিকদের এবং স্বৈরশাসকদের কবর দিয়েছে। আর তারা শিখেছে, সত্যিকার নীতি হলো সেই নীতি, যা মানুষকে এক করে, আলাদা করে না।

ইসরায়েল মানচিত্র আঁকতে পারে, সংখ্যালঘুদের ব্যবহার করতে পারে, রাজধানীতে বোমা ফেলতে পারে, শিশুদের অনাহারে ফেলতে পারে; কিন্তু স্থায়িত্ব বোমা মেরে আদায় করা যায় না।

ইসরায়েল একটি অঞ্চলকে চিরদিনের জন্য নীরব করতে পারবে না। অন্যদের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারবে না। কারণ, সেই ধ্বংসস্তূপ মনে রাখে। এই ভূমিতে, স্মৃতি কোনো ক্ষত নয়। স্মৃতি এক অস্ত্র।
মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া

* সৌমায়া ঘান্নুশি, একজন ব্রিটিশ তিউনিসীয় লেখক ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির বিশেষজ্ঞ। তাঁর লেখা দ্য গার্ডিয়ান এবং দ্য ইনডিপেনডেন্টে  প্রকাশিত হয়েছে।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: মনজুরুল ইসলাম

দামেস্কে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরের পাশে ইসরায়েলের হামলা
দামেস্কে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তরের পাশে ইসরায়েলের হামলা। ছবি: এএফপি

ইসরায়েল কি আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়ার পথে: আল-জাজিরার এক্সপ্লেইনার

গাজায় যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক জনমত ধীরে ধীরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে। অনেক দেশ এখন সেই জনমতের প্রতিফলন ঘটিয়ে ইসরায়েলের প্রতি নিন্দাও জানাচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহে একাধিক পশ্চিমা দেশ ইসরায়েলের মন্ত্রীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা এক যৌথ বিবৃতিতে গাজায় অসহনীয় মানবিক বিপর্যয়ের নিন্দা জানিয়েছে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে গ্লোবাল সাউথভুক্ত কয়েকটি দেশ (সম্মিলিতভাবে ‘দ্য হেগ গ্রুপ’) অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের হামলা রোধে বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে গাজায় একটি ক্যাথলিক গির্জায় ইসরায়েলি হামলার পর ধর্মীয় নেতারাও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন। বাড়ছে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ।

তাহলে কি ইসরায়েলকে থামাতে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হচ্ছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক, আসলে কী ঘটছে:

দ্য হেগ গ্রুপ

দ্য হেগ গ্রুপের নিজস্ব ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এটি একটি আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রীয় জোট। এ জোট আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের পাশে থাকার লক্ষ্যে ‘সমন্বিত কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ’ নেওয়ার জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ।

এ গ্রুপে আছে আটটি দেশ—দক্ষিণ আফ্রিকা, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, কিউবা, হন্ডুরাস, মালয়েশিয়া, নামিবিয়া ও সেনেগাল। তাদের লক্ষ্য জাতিসংঘ সনদের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক আইন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ সব মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা।

চলতি সপ্তাহেই কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটায় এ গ্রুপ এক বৈঠক আয়োজন করে। বৈঠকে চীন, স্পেন, কাতারসহ প্রায় ৩০টি দেশ অংশ নেয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রানচেসকা আলবানিজ। এ বৈঠককে ‘গত ২০ মাসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অগ্রগতি’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।

গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে প্রতিবেদন দেওয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ দূত আলবানিজের ওপর সম্প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন।

দুই দিনের এ সম্মেলন শেষে ১২টি দেশ ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে ছয়টি পদক্ষেপের ব্যাপারে সম্মত হয়। এর মধ্যে আছে ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, অস্ত্র বহনকারী জাহাজ চলাচলে বাধা প্রদান এবং ইসরায়েলি দখলদারি থেকে উপকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারি চুক্তি পর্যালোচনা করা।

কোন কোন দেশ ব্যবস্থা নিয়েছে

গত বুধবার স্লোভেনিয়া ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও চরমপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচকে তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশে বাধা দেয়। কারণ, বৃহত্তর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ মোকাবিলায় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

এর আগে গত জুন মাসে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও নরওয়ে এ দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ দুই মন্ত্রী গাজায় অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষে ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণে অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।

গত মে মাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা যৌথ বিবৃতিতে ইসরায়েলের গাজা অভিযানের নিন্দা জানিয়ে একে ‘সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে আখ্যায়িত করে এবং ইসরায়েল যদি হামলা বন্ধ না করে তবে তাদের বিরুদ্ধে ‘জোরালো পদক্ষেপ’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।

পরে যুক্তরাজ্য তাদের সতর্কবার্তা অনুসরণ করে কিছু বসতি স্থাপনকারী সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় এবং ইসরায়েলের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য আলোচনায় ‘বিরতি’ ঘোষণা করে।

তুরস্কও মে মাসে জানিয়েছে, গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধ রাখবে।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথম আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা করে। এরপর কলম্বিয়া, চিলি, স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও তুরস্ক দক্ষিণ আফ্রিকাকে সমর্থন জানায়।
গত বছরের জানুয়ারিতে আইসিজে অস্থায়ী রায়ে বলেছেন, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যার সম্ভাব্য ভিত্তি’ আছে। সেই সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাসহ জরুরি পদক্ষেপ নিতে ইসরায়েলকে নির্দেশ দেন আদালত, যা ইসরায়েল চলতি বছরের মার্চ থেকে বন্ধ করে রেখেছে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও যেসব সমালোচনা

গত বৃহস্পতিবার গাজা শহরের হলি ফ্যামিলি গির্জায় ইসরায়েলের বোমা হামলায় তিনজন নিহত হন। এ কারণে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও নিন্দা জানিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক ‘ক্ষুব্ধ’ ফোনালাপ করেন। এরপর নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে এ হামলার জন্য ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছে।

ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত গাজায় ৫৮ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলের বিরোধিতা

গাজায় ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে গণবিক্ষোভ চলছে। যুদ্ধে ইসরায়েলের বর্বরতা এবং গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর এর প্রভাব দেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ক্ষোভ ক্রমে বাড়ছে।

পশ্চিম ইউরোপে গত জুনে জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ইউগভের এক জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নজিরবিহীনভাবে কমে গেছে।

চলতি সপ্তাহে মার্কিন সম্প্রচারমাধ্যম সিএনএনে প্রকাশিত একই ধরনের আরেক জরিপে মার্কিনদের মধ্যেও একই রকম ফলাফল পাওয়া গেছে। সেখানে মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ মনে করছেন, গাজায় ইসরায়েলের পদক্ষেপ ‘সম্পূর্ণ ন্যায্য’। এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে ছিল ৫০ শতাংশ।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বিভিন্ন সংগীত উৎসবেও ছড়িয়ে পড়েছে, যেমন জার্মানির ফিউশন ফেস্টিভ্যাল, পোল্যান্ডের ওপেন’আর ফেস্টিভ্যাল এবং যুক্তরাজ্যের গ্লাস্টোনবেরি ফেস্টিভ্যালে শিল্পী ও দর্শকেরা গাজা যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে বিরোধিতা করেছেন।

ইসরায়েলের ভেতর যে পরিবর্তন হচ্ছে

গাজার যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ এখনো ছোট আকারে আছে, কিন্তু বাড়ছে। ‘স্ট্যান্ডিং টুগেদার’ নামের একটি সংগঠন ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের একত্র করে আন্দোলন করছে।

গত এপ্রিলে ইসরায়েলি সাময়িকী +৯৭২ (প্লাস নাইন সেভেন টু)–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এক লাখের বেশি ইসরায়েলি রিজার্ভ সেনা দায়িত্ব পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেনাবাহিনীর ভেতর থেকেও খোলাচিঠির মাধ্যমে যুদ্ধবিরোধী বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

ফলাফল কী হতে পারে

দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অজনপ্রিয় হলেও নেতানিয়াহুর কট্টরপন্থী জোট সরকার গাজায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

সরকারের সর্বশেষ প্রস্তাবে গাজার সব মানুষকে একটি তথাকথিত ‘মানবিক শহরে’ আটকে রাখার পরিকল্পনা করা হয়। অনেকেই এ পরিকল্পনাকে একটি ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইসরায়েল যে আন্তর্জাতিক আইন বা বিশ্ব মতামতের কোনো পরোয়া করে না, এটিকে তার প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করেছেন অনেক সমালোচক।

আন্তর্জাতিকভাবে গাজার একমাত্র ক্যাথলিক গির্জায় বোমা হামলার জন্য সাম্প্রতিক সমালোচনা সত্ত্বেও ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন এখনো দৃঢ়। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন এখনো ইসরায়েলের প্রধান কূটনৈতিক ভরসা। ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য জাতিসংঘে ভেটো দেয়, সামরিক সাহায্য জোগায় ও ইসরায়েলের সমালোচকদের (যেমন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত—আইসিসি) ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

যুক্তরাষ্ট্রের এ সমর্থন ইসরায়েলকে আপাতত রক্ষা করছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যখন আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়বে ইসরায়েল, তখন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা মোকাবিলা করা তার জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ইসরায়েলের উগ্রবাদী দুই মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির (বাঁয়ে) ও বেজালেল স্মোট্রিচকে স্লোভেনিয়ার আইনপ্রণেতারা ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছেন
ইসরায়েলের উগ্রবাদী দুই মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির (বাঁয়ে) ও বেজালেল স্মোট্রিচকে স্লোভেনিয়ার আইনপ্রণেতারা ‘অবাঞ্ছিত ব্যক্তি’ ঘোষণা করেছেন। ছবি: এএফপি

গাজায় দুর্ভিক্ষে শুরু হচ্ছে মৃত্যুর ঢেউ: কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, ইসরাইলের উন্মাদ পরিকল্পনা

গাজা উপত্যকার চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা শুক্রবার জানিয়েছেন, উপত্যকাজুড়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের লক্ষণ মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। শত শত মানুষ চরম অপুষ্টি, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, স্মৃতিভ্রংশ এবং চরম ক্লান্তিতে ভুগছে- যা দীর্ঘস্থায়ী অনাহারের সরাসরি লক্ষণ।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রচণ্ড তাপদাহ এই সংকটকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা। এ খবর দিয়েছে ইসরাইলের প্রভাবশালী পত্রিকা অনলাইন হারেৎজ। গাজার আল-শিফা হাসপাতালে শুক্রবার কর্মকর্তারা জানান, শত শত রোগী মারাত্মক অনাহারের উপসর্গ নিয়ে আসছেন। তার মধ্যে বহু শিশু ও নবজাতকের অবস্থা সংকটাপন্ন। মুয়াসি মানবিক অঞ্চলের ফিল্ড হাসপাতালের পরিচালক ডা. সুহাইব আল-হামস সতর্ক করে বলেন, পুষ্টির অভাবে অঙ্গ বিকল হয়ে শিগগিরই মৃত্যুর ঢেউ শুরু হতে পারে। রাস্তায় পড়ে থাকা বহু মানুষকে আমরা এখানে আনছি, যাদের ওষুধের আগেই খাবারের প্রয়োজন।

হামাস পরিচালিত গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকায় প্রায় ১৭০০০ শিশু ভয়াবহ অপুষ্টিতে ভুগছে। দুর্ভিক্ষে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২০ জনে। এর মধ্যে কমপক্ষে ৬৯টি শিশু। শুক্রবার দেইর আল-বালাহ এলাকায় ১৮ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে সরাসরি পুষ্টি ঘাটতির কারণে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও গাজায় কার্যরত আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে হাসপাতালগুলোতে আর কোনো খালি বেড, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম বা ওষুধ নেই- ক্রমবর্ধমান রোগীর স্রোত সামাল দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে। মানবিক সংস্থার প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, চলমান অবরোধ ও পর্যাপ্ত সাহায্যের অভাবই এই ক্ষুধা সংকটকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। অনেকেই গাজার পরিস্থিতিকে দারফুর ও সোমালিয়ার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

হামাস শুক্রবার এক বিবৃতিতে বলেছে, গাজায় এই দুর্ভিক্ষ ও অবরোধ হলো মানবতার বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপরাধ। তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে যে, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে খাদ্য ও পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সামরিক ব্যর্থতার পর এখন একমাত্র সমাধান হলো একটি চুক্তি। হামাসের গণমাধ্যম শাখা ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও তীব্র সমালোচনা করে বলেছে, তারা গণহত্যার নৈতিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়- ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং আন্তর্জাতিক বিচারের আওতায় আনার জন্য। >> হারেৎজের রিপোর্ট

কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, অবৈধ নির্দেশ ও যুদ্ধাপরাধ: ইসরাইলের উন্মাদ পরিকল্পনা

গাজার দক্ষিণে মিশর সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় প্রায় ৬ লাখ ফিলিস্তিনিকে জোরপূর্বক একটি বিশেষ শিবিরে (যা তারা ‘মানবিক শহর’ বলছে) আটকে রাখার পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজের ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। মানবাধিকারকর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল গণউচ্ছেদ ও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি নয়, বরং যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। কাটজ প্রকাশ্যে জানান, গাজার রাফাহ এলাকায় ৬ লাখ মানুষের জন্য একটি ঘনবসতিপূর্ণ ‘মানবিক শহর’ গড়ে তোলা হবে। সেখানে যেসব মানুষকে পাঠানো হবে, তাদেরকে হয় সেখান থেকে বিদেশে পাঠানো হবে অথবা খাবার ও পানির অভাবে থাকতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীকে এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পরিকল্পনা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন হারেৎজ।

ইসরাইলি সরকার পরিকল্পনাটিকে ‘মানবিক বলে প্রচার করলেও বাস্তবে এটি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের আদলে তৈরি হবে বলে সমালোচকরা মনে করছেন। সেখানে কোনো পর্যাপ্ত পানি, বিদ্যুৎ বা অবকাঠামো থাকবে না। মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবে তাঁবুতে থাকতে হবে এবং এলাকা ছাড়ার অনুমতি থাকবে না। তবে শুধু বিদেশে চলে যাওয়ার শর্তে তাদেরকে সেখান থেকে ছাড়া হবে। ইসরাইলের ১৬ জন শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এক যৌথ চিঠিতে বলেছেন, এটি সুস্পষ্টভাবে অবৈধ আদেশ, যা ইসরাইলি সেনাদের কালো পতাকা নীতি অনুযায়ী অমান্য করার অধিকার আছে। তারা সতর্ক করেছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ‘যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, এমনকি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে গণহত্যার পর্যায়ে’ পড়তে পারে।

সামরিক সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মিখায়েল মিলস্টেইন বলেছেন, রাফাহ থেকে সমুদ্র পর্যন্ত যে ফিলিস্তিনি করিডোর, সেখানে ৬ থেকে ৭ লাখ মানুষকে রাখা একেবারেই অসম্ভব। কোনো ঘরবাড়ি নেই, পানি বা বিদ্যুতের নেটওয়ার্ক নেই- ফলস্বরূপ মানবিক বিপর্যয় আরও তীব্র হবে। এই পরিকল্পনা মিশরের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কায়রো ইতিমধ্যেই জানিয়েছে, সীমান্তে এই ধরনের শিবির মিশরের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি ঝুঁকি তৈরি করছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও খারাপ করছে। ইসরাইলের ভেতরেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্টসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি- একে জাতিগত নিধন এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্প হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। মূলধারার মিডিয়াও ‘জনসংখ্যা পাতলা করা’ বা ‘কনসেন্ট্রেশন’ শব্দ ব্যবহার না করে পরিকল্পনাটি ব্যাখ্যা করতে পারছে না।

এ অবস্থায় প্রশ্ন থেকে যায় ১. এই পরিকল্পনা কি আদৌ বাস্তবায়িত হবে, নাকি সেনাবাহিনীর অনীহার কারণে থেমে যাবে? ২. যদি এগিয়ে যায়, তবে কি এটি গাজায় নতুন করে সামরিক শাসন কায়েমের পথ প্রশস্ত করবে, যেটি ধর্মীয় জায়নিস্ট মন্ত্রীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করছেন? ৩. আন্তর্জাতিক আদালত ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো কি এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেবে, নাকি বিশ্ব আবারও নীরব থাকবে?

mzamin

সুপারম্যান বিতর্ক: ফিলিস্তিনিদের বাঁচাতে পশ্চিমা সুপারহিরোর দরকার নেই by জো জিল

জেমস গানের নতুন ‘সুপারম্যান’ ছবিটি মুক্তির পর থেকেই আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ছবির গল্পে আমেরিকান সুপারহিরো ফর্মুলাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং এতে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যুক্ত হয়েছে।

পরিচালক গান এই ছবিতে আমেরিকা–সর্বস্ব ক্লিশে বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন; যদিও এই প্রথম তিনি সামরিক-প্রযুক্তিগত পুঁজিবাদের বিপদ নিয়ে কাজ করেছেন, এমনটা মোটেও নয়। কিছু দর্শক মনে করছেন, এই ছবিতে ইসরায়েলকে আক্রমণ করা হয়েছে।

ছবিতে দেখা যায়, বোরাভিয়া নামের একটি কল্পিত শ্বেতাঙ্গ ইউরোপীয় রাষ্ট্র (যার নেতা ডেভিড বেন-গুরিয়নের মতো দেখতে) তার দরিদ্র, অ-শ্বেতাঙ্গ প্রতিবেশী জারহানপুরে আক্রমণ করে।

মূল দৃশ্যগুলোতে সশস্ত্র সেনাবাহিনীকে একটি নিরাপত্তা বেড়ার কাছে নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের মুখোমুখি হতে দেখা যায়। এটি স্পষ্টতই গাজায় ইসরায়েলের বিভাজন প্রাচীর এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাদের বারবার আক্রমণের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ডানপন্থী সমালোচকেরা এই ছবিকে অতিমাত্রায় ‘প্রগতিশীল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। গান এই ছবির কাজ ২০২২ সালে শুরু করেছিলেন। তাই ধরে নেওয়া যায়, এটি ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের আক্রমণ এবং ইসরায়েলের গাজায় অভিযানের আগের ঘটনা নিয়ে বানানো।

ছবির প্রধান খলনায়ক লেক্স লুথর ইলন মাস্ক ঘরানার একজন শতকোটিপতি। তিনি বোরাভিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করেন এবং জারহানপুর দখলের পরিকল্পনা করেন। সুপারম্যান এখানে একজন সরলমনা ভালো মানুষ। তিনি তাঁর সুপার-কুকুর ক্রিপ্টোকে ভালোবাসেন এবং দানবদের হাত থেকে শহর বাঁচান।

গান দাবি করেছেন, ছবিটি মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নয়। এটি একটি কল্পিত কাহিনি। এটির পটভূমি ইউরোপে। বোরাভিয়ায় রাশিয়ান ভাষাভাষীদের ও পুতিন ঘরানার একনায়কত্বের ছাপ দেখা যায়। এটি ইহুদি রাষ্ট্রের ধারণাকে ঝাপসা করে দেয়। (যদিও অনেক ইসরায়েলি পূর্ব ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত হওয়ায় ইসরায়েল-ফিলিস্তিন কাহিনির সঙ্গে এর মিল থাকার ইঙ্গিত মেলে)

ছবিতে দেখা যায়, সুপারম্যানের বান্ধবী ও সাংবাদিক লোয়িস লেন ডেইলি প্ল্যানেট নামের একটি সংবাদমাধ্যমের জন্য তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। তিনি জানতে চান, কেন সুপারম্যান জারহানপুরের ওপর বোরাভিয়ার আক্রমণ থামিয়ে দিয়েছেন।

লোয়িস যুক্তি দেন, জারহানপুর তো সাধারণ জনগণের ওপর দমন-পীড়ন চালানো একটি স্বৈরশাসকের দেশ। সুতরাং সেখানে হস্তক্ষেপ বা অভিযান চালানো ন্যায্য হতে পারে।

কিন্তু সুপারম্যান সোজা বলে দেন, একটি দেশের ভেতরে নিপীড়ন বা স্বৈরতন্ত্র থাকলেই অন্য কোনো দেশের পক্ষে সেখানে আক্রমণ চালানোর যৌক্তিকতা হতে পারে না।

এই সংলাপে আসলে বর্তমান বিশ্বের বড় রাজনৈতিক বিতর্কের কথা বলা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপমূলক পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে এখানে ইঙ্গিত আছে। এই সংলাপে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও শাসন পরিবর্তনের যুদ্ধের বিরুদ্ধে সমকালীন রাজনৈতিক বিতর্ক ফুটে উঠেছে।

পরবর্তী সময়ে বোরাভিয়ার জারহানপুর আক্রমণের দৃশ্যে একটি ছোট ছেলেকে জাতীয় পতাকা ওড়াতে দেখা যায়। সেখানে ট্যাংক ও সশস্ত্র সেনারা এগিয়ে আসে এবং নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীরা গুলির মধ্য দিয়ে পালাতে থাকে।

এ দৃশ্যটি ২০১৮-১৯ সালে গাজায় ইসরায়েলের বিভাজন প্রাচীরে ফিলিস্তিনিদের ‘গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন’ বিক্ষোভের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে ইসরায়েলি স্নাইপার গুলিতে ২০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। আহত হন আট হাজারের বেশি।

সুপারম্যানকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আমেরিকান শক্তির প্রতীক হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। সুপারহিরোরা সবাই আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদের প্রতীক না হলেও ‘সুপারপাওয়ার’ ধারণা (যা একজন চরিত্রকে লড়াইয়ের মাধ্যমে শত্রুদের পরাজিত করতে সাহায্য করে) আমেরিকান আদর্শের মূল। সুপারহিরোরা মানুষের রূপধারী এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান।

পরিচালক গানের আগের ‘গার্ডিয়ান্স অব দ্য গ্যালাক্সি’ মুভির হালকা কমেডির তুলনায় এই সুপারম্যান একজন সৎ আমেরিকান হিরো।

এখানে সুপারম্যান একটি গভীর সমস্যার মুখোমুখি হয়। সমস্যাটি হলো, কীভাবে সে বিশ্ব শান্তি বজায় রাখবে, যখন শান্তির শত্রু হলো আমেরিকা এবং তার আক্রমণাত্মক মিত্র?

একটি দরিদ্র গ্লোবাল সাউথ দেশকে আক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্য তার হস্তক্ষেপকে আমেরিকার শত্রুর বিরুদ্ধে অযৌক্তিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।

সুপারম্যানকে বিপজ্জনক এলিয়েন হিসেবে ডেমোনাইজ করা হয় এবং বলা হয়, সে পৃথিবী দখল করতে চায় এবং মানুষকে দাস বানাতে চায়। এটি গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট থিওরির ইঙ্গিতবাহী। এই গল্প প্রকাশিত হওয়ার পর মেট্রোপলিসের মানুষ তার বিরুদ্ধে চলে যায় এবং তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মুভিটি সামরিকশিল্প কমপ্লেক্স এবং ঔপনিবেশিকতার সমালোচনাও করে। লেক্স লুথর বোরাভিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করে জারহানপুরের একটি অংশ দখলের পরিকল্পনা করে, যা কিনা ট্রাম্পের গাজাকে ধ্বংস করে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়ারা’ (প্রমোদ কেন্দ্র) বানানোর স্বপ্নের মতো।

ছবির নায়কেরা হলো সুপারম্যান, করপোরেট-সমর্থিত জাস্টিস গ্যাংয়ের তিন সুপারহিরো এবং ডেইলি প্ল্যানেটের সাহসী সম্পাদকীয় টিম। তবে হলিউডের ভূরাজনৈতিক সমালোচনার একটি সীমা আছে। এখানে সামরিক প্রযুক্তি কমপ্লেক্সকে বৃহত্তর সাম্রাজ্যবাদী-রাজনৈতিক-মিডিয়া কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে দেখানো হয়নি, বরং কিছু খারাপ লোকের কাজ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

গানের স্ক্রিপ্টে একটি দক্ষিণ এশীয় ব্যক্তিকে দেখানো হয়, যে কিনা সুপারম্যানকে সাহায্য করে কিন্তু পরে লুথরের হাতে ধরা পড়ে। তার ভাগ্য হলো সেসব সাধারণ মানুষের, যারা নিষ্ঠুর সাম্রাজ্যবাদী যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রাণ দেয়। এটি মুভির সবচেয়ে বাস্তবতাঘনিষ্ঠ মুহূর্ত।

ইসরায়েল ও তার সমর্থকেরা এই মুভিটি পছন্দ করেনি। ইসরায়েলি প্রোপাগান্ডিস্ট বেন শাপিরো শুধু লিখেছেন, ‘ভালো না।’

যদি ছবিটি শুধু এক্সপ্লোশন, মনস্টার ফাইট এবং আকাশে ঘুষাঘুষির পেছনের থিমগুলোকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরত, তাহলে এটি আরও শক্তিশালী হতো। নিউইয়র্ক টাইমস ঘরানার মিডিয়া বা মেইনস্ট্রিম টিভি চ্যানেল যদি কোনো আমেরিকা-সমর্থিত রাষ্ট্রের আক্রমণ ও ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা উন্মোচন করে, সেটি অবিশ্বাস্য।

বাস্তবে তারা সত্যি গোপন করে ভিকটিমদের সন্ত্রাসী এবং আক্রমণকারীকে ‘আত্মরক্ষাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করে।

মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার মিত্র সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে আদিবাসীদের বাঁচানোর যে ধারণা দেখানো হয়েছে, তা অবাস্তব। তাই এটি নাটকীয়ভাবে দর্শকমনে প্রভাব ফেলতে পারেনি।

বাস্তবতা হলো, ফিলিস্তিনিরা কোনো পশ্চিমা সুপারহিরোর জন্য অপেক্ষা করছে না। তাদের মিত্র হলো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ, যারা তাদের মুক্তি এবং গণহত্যার অবসান চায়। আসল সুপারহিরোরা হলো সেই সাহসী মানুষেরা, যারা সাহায্যের কনভয়ে জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে এবং ফিলিস্তিনি মেডিকেল ও সহায়তাকর্মীরা, যারা ইসরায়েলের অবরোধের মধ্যে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করে।

একদিন হয়তো হলিউডে এই বাস্তব নায়কদের দেখানো হবে। তবে সেই দিন কবে আসবে, তা বলা কঠিন।

* জো গিল, লন্ডন ভেনেজুয়েলা ও ওমানে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস, মর্নিং স্টার ও মিডল ইস্ট আই-এর মতো সংবাদপত্রে কাজ করেছেন
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

সদ্য মুক্তি পাওয়া সুপারম্যান সিনেমার একটি দৃশ্য।
সদ্য মুক্তি পাওয়া সুপারম্যান সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: ডিসি স্টুডিওস