Tuesday, August 23, 2016

বিশ্বঐতিহ্য ধ্বংসের দায় নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা

আহমেদ আল-ফকিহ আল-মাহদি
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির জঙ্গিনেতা আহমেদ আল-ফকিহ আল-মাহদি দেশটির প্রাচীন শহর টিমবাকটুর ঐতিহাসিক নিদর্শন ধ্বংসের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে গতকাল সোমবার এ ক্ষমা চান তিনি। বিশ্বে এই প্রথমবারের মতো ঐতিহাসিক কোনো স্থাপনা ধ্বংসের দায়ে আইসিসিতে বিচারকাজ শুরু হয়েছে। মাহদি ইসলামি জঙ্গি সংগঠন আনসার দ্বীনের নেতা। জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ইন দ্য ইসলামিক মাগরিবের সঙ্গে এই সংগঠনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ২০১২ সালে জঙ্গিরা টিমবাকটু দখল করে নেয়। সে সময় তারা দ্বাদশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা টিমবাকটু শহরের একটি মসজিদ ও নয়টি সমাধি ধ্বংস করে ফেলে। টিমবাকটু জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনা।
মাহদির বিচার শুরুর মাধ্যমে এই প্রথম কোনো ইসলামি জঙ্গিনেতা আইসিসিতে বিচারের মুখোমুখি হলেন। সেই সঙ্গে এই প্রথমবারের মতো সন্দেহভাজন কোনো জঙ্গিনেতা দোষ স্বীকার করে নিয়েছেন। টিমবুকটুর অমূল্য স্থাপনা ধ্বংসের জন্য মাহদি দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলেন, ‘আমি দেশের মানুষের কাছে ক্ষমা চাই। আমি তাদের কাছে অনুরোধ করি, আমাকে তারা যেন তাদের বিপথে যাওয়া কোনো এক সন্তান হিসেবে দেখেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। আমার জন্য যেসব ধ্বংস হয়েছে, তার জন্য আমি দুঃখিত।’ ২০১২ সালের ৩০ জুন থেকে ১১ জুলাইয়ের মধ্যে টিমবাকটুর ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে ফেলা হয়। বিশ্বজুড়ে এর বিরুদ্ধে নিন্দার ঝড় ওঠে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা মনে করেন, এই বিচারের ফলে অপরাধীদের কাছে একটি শক্ত বার্তা যাবে। এরপর আর কেউই ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস করে পার পাবে না। মাহদি টিমবাকটু শহরের মানুষের কাছেও ক্ষমা চেয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে একটি প্রতিজ্ঞা করতে চাই। আর তা হলো, এই প্রথম এবং শেষবারের মতো আমি অপরাধ করেছি। এমন অপরাধ আর কখনোই করব না।’ আইসিসি মাহদির বিরুদ্ধে হুলিয়া জারির পর নাইজারের সরকার তাঁকে ধরিয়ে দেয়। ইউনেসকো ১৯৮৮ সালে টিমবাকটুকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে। শহরটিতে জঙ্গিদের ধ্বংসযজ্ঞের পর ইউনেসকো বলেছিল, ‘এটি আমাদের জন্য একটি ভয়াবহ খবর।’ বিচারে রাষ্ট্রপক্ষ বলেছে, তারা মাহদির ৯ থেকে ১১ বছরের কারাদণ্ড চাইবে। মাহদি বলেন, এই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করবেন না। তবে আদালতের বিচারকেরা বলেন, মাহদির অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আহমেদ আল-ফকিহ আল-মাহদি আদালতে ইসলামি জঙ্গিদের ‘শয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বের সব মুসলিমকে একটি ছোট উপদেশ দিতে চাই। আমি যে কাজ করেছি, এমন কাজ কেউ করবেন না। কারণ মানবতার জন্য শুভকর নয় এসব কাজ।’

ট্রাম্পের সম্পদ কত?

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, বিশ্বজুড়ে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির মোট মূল্যমান ১০ বিলিয়ন ডলার হবে। কিন্তু এই পরিমাণ সঠিক কি না, সেটা জানার একমাত্র উপায় ট্রাম্পের সর্বশেষ আয়কর হিসাব। সাম্প্রতিক সময়ে সব প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী তাঁদের আয়করের হিসাব নির্বাচনের আগেই দিয়েছেন, কিন্তু ট্রাম্প তাতে গররাজি। তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন, তাঁর আয়করের হিসাব এখন রাজস্ব বিভাগ ‘অডিট’ করছে। এই নিরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি সেই হিসাব জনসমক্ষে প্রকাশ করবেন না। ট্রাম্পের প্রচারাভিযানের নতুন ব্যবস্থাপক কেলিঅ্যান কনওয়ে গত রোববার একই কথা বললেন। পাঁচ মাস আগে যখন তিনি সিনেটর টেড ক্রুজের হয়ে কাজ করছিলেন, তখন ট্রাম্পকে তাঁর আয়করের ব্যাপারে ‘স্বচ্ছ’ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন নতুন চাকরিতে এসে সুর বদলেছেন কনওয়ে। এবিসি টিভির সঙ্গে আলাপকালে যুক্তি দেখিয়েছেন, অডিট ব্যাপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই হিসাব প্রকাশ করা ঠিক হবে না। তা ছাড়া সে খবর জেনে সাধারণ মানুষের কী লাভ? তারা জানতে চায় হিলারি বা ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে তাঁদের আয়করের হার কী দাঁড়াবে।
২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় আয়কর হিসাব দিতে ইতস্তত করেছিলেন রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনি। তখন ট্রাম্প পরিহাস করে বলেছিলেন, আয়কর দাখিলে ব্যর্থতার জন্যই ওবামার কাছে হেরে যান রমনি। রাজস্ব বিভাগ বলেছে, অডিট চলাকালে আয়করের হিসাব প্রকাশে কোনো বাধা নেই। হিলারি ক্লিনটন ইতিমধ্যেই তাঁর সর্বশেষ আয়করের হিসাব প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের রানিংমেট মাইক পেন্স পর্যন্ত বলেছেন, তিনি নির্বাচনের আগেই তাঁর আয়করের হিসাব প্রকাশ করবেন। অথচ ট্রাম্প মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন, কিন্তু কেন? এর একটি জবাব মিলেছে, চলতি সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমস-এর উদ্যোগে এক অনুসন্ধানী সমীক্ষায়। নির্ভরযোগ্য একটি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাহায্যে ও উন্মুক্ত বিভিন্ন নথি ব্যবহার করে ওই সমীক্ষায় দেখা যায়, ট্রাম্পের মোট সম্পদের পরিমাণ সম্ভবত তিনি যতটা দাবি করেছেন, তার চেয়ে অনেক কম। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর মালিকানাধীন সম্পত্তি যেমন ট্রাম্প টাওয়ার বা ট্রাম্প গলফ কোর্স—কোনো না কোনো বিনিয়োগকারীর সঙ্গে যুক্ত। এসব বিনিয়োগকারীর অনেকেই চীনের। তা ছাড়া এর প্রায় প্রতিটির মাথায় রয়েছে বড় অঙ্কের ঋণ। আয়করের হিসাব না দিলেও নির্বাচন কমিশনের কাছে ট্রাম্প একটি দীর্ঘ ঘোষণা (ফিন্যান্সিয়াল ডিসক্লোজার স্টেটমেন্ট) দিয়েছেন। সেখানে তাঁর সম্পদের পরিমাণ দেড় বিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছে।
এই ঘোষণা অনুযায়ী ট্রাম্পের মোট ঋণের পরিমাণ মাত্র ৩১ কোটি ৫০ লাখ ডলার। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমস-এর সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, এ পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। যেমন ম্যানহাটনে ট্রাম্পের নাম বহনকারীর একটি ভবন, যার তিনি শুধু আংশিক মালিক, সেখানে তাঁর ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০০ কোটি ডলার। ট্রাম্পের সম্পদের প্রকৃত মূল্য নিয়ে অবশ্য নানা জল্পনা-কল্পনাও রয়েছে। ফোর্বস ও ফরচুন সাময়িকী বলছে, এই পরিমাণ বড়জোর ৫০০ কোটি ডলার। ট্রাম্পের জীবনীকার টিমথি ও’ব্রায়ানের হিসাবে অনুসারে, ২০০৫ সালে ট্রাম্পের সম্পত্তির মূল্য ২৫ কোটি ডলারের বেশি ছিল না। ভ্যানিটি ফেয়ার পত্রিকা বিভিন্ন সূত্র অনুসরণ করে তাঁর বর্তমান সম্পদের পরিমাণ আনুমানিক ১০০ কোটি ডলারেরও কম বলে জানিয়েছে। ট্রাম্প ঠিক কী পরিমাণ সম্পদের মালিক, তা জানা জরুরি এই কারণে যে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তাঁর একমাত্র যোগ্যতা—তিনি সফল ব্যবসায়ী। তা ছাড়া আয়করের হিসাব থেকে বোঝা যাবে, তিনি ঠিক কী হারে আয়কর দিয়ে থাকেন। নিন্দুকেরা বলছেন, ট্রাম্পের মোট সম্পদ তাঁর দাবির চেয়ে অনেক কম। মোটেই তেমন সফল কোনো ব্যবসায়ী তিনি নন, সে কথা ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়েই নিজের আয়করের হিসাব প্রকাশে এমন আপত্তি করছেন ট্রাম্প। অবশ্য উইকিলিকস জানিয়েছে, ট্রাম্পের আয়করের হিসাব তারা ফাঁস করার তালে আছে।

‘পানি নামছে, কষ্ট নামে নাই’ by তুহিন ওয়াদুদ

‘যামার (যার) বাড়ি-জমি সোগ (সব) নদীত ভাঙি গেইচে, কিন্তু লজ্জা করি ত্রাণ নিবার পায় না, তার কষ্ট হামার চেয়েও বেশি।’ কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ডাটিয়ার চরের নওশাদ আলী অষ্টমীর চরে ত্রাণ নিতে এসে এ কথাগুলো বলছিলেন। তর্জনী সোজা করে সম্মুখে অনেক দূর দেখিয়ে তিনি আরও বলছিলেন, ‘এখানে অনেকগুলো বাড়ি ছিল, সব এবারের বন্যায় ভাঙি গেইচে। অনেক গেরস্থ ফকির হইচে। কিন্তু লজ্জায় ত্রাণ চাইতে পারে না। এলা (এখন) পানি নামছে, কষ্ট নামে নাই।’ যশোরের এক শিল্পপতি ডিভাইন গ্রুপের চেয়ারম্যান হাসানুজ্জামান রাহিম কুড়িগ্রামে বন্যার্ত মানুষের জন্য প্রায় ২০ লাখ টাকা দিয়েছেন। বন্যার্ত এসব মানুষের জন্য সেই ত্রাণ দেওয়ার কাজে দুবার গিয়েছিলাম ব্রহ্মপুত্রের চরে। দুবারই সাধারণ সমতলের বন্যার্ত মানুষের একই অভিযোগ, ‘যত ত্রাণ সব চরে যায়, কাইমের (সাধারণ সমতল) লোককে কেউ ত্রাণ দেয় না।’ অনেক সময় সারা দিন অপেক্ষা করার পর জোটে খুবই সামান্য ত্রাণ। রমনা ঘাটে গরিবুল্লাহ হোটেলের নুরুল হক জানালেন, একদিন মাত্র তিনি ত্রাণ পেয়েছেন। সেই ত্রাণের পরিমাণ আধা কেজি চিড়া, ১০০ গ্রাম গুড়। অনেকেই সরকারিভাবে একবার ১০ কেজি করে চাল পেয়েছেন। সব সময় ত্রাণের পরিমাণ কম থাকে না। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হলো, ত্রাণ দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। নয়ারহাট, কড়াই বরিশাল, অষ্টমীর চর, জোড়গাছ, রমনাসহ বিভিন্ন এলাকার অনেকের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, বন্যায় যা ক্ষতি হয়েছে, তা অপূরণীয়। মাঠের পর মাঠ ছিল পাটখেত। সেগুলোর সবটাই পানিতে ডুবে নষ্ট হয়েছে।
ধানখেতও তলিয়ে গেছে। অনেকের কলার চাষ নষ্ট হয়েছে। যাঁরা মাছের চাষ করতেন, তাঁদের পুকুরে আর মাছ নেই। নতুন করে ধান চাষের উপায় নেই। বন্যার্ত মানুষের মধ্যে সোলেমান নামের একজন বলছিলেন, ‘গত তিন বছর থাকি এই মৌসুমে একবারও ফসল পাই না। ডুবি যায়।’ সরকারিভাবে যদি ভাসমান বীজতলা তৈরি করে এখানকার কৃষকদের সহায়তা দেওয়া যেত তাহলেও বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো ধান চাষ করা সম্ভব হতো। চরের মানুষের জীবন এমনিতেই কঠিন। তার ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের আরও নাজুক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। চরগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বল্পতাহেতু সেখানে বাল্যবিবাহের প্রকোপ এখনো আছে। যেখানে যতটুকু পড়ার সুযোগ আছে, সেখানকার ছেলেমেয়েরা ততটুকুই পড়ে। তারপর মেয়েদের বিয়ে হয়। অবস্থাপন্ন ছেলেদের কেউ কেউ হয়তো কিছুটা লেখাপড়া করে। কিন্তু শ্রমজীবী মজুর পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ার যবনিকাপাত ঘটে। যেমন অষ্টমীর চরে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বাস। সেখানে মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপড়ার সুযোগ আছে। কলেজে পড়ার জন্য যেতে হবে কমপক্ষে সাত কিলোমিটার দূরের পার্শ্ববর্তী চিলমারী-রৌমারী-রাজীবপুর। ফলে শ্রমজীবী দিনমজুরদের সন্তানদের পক্ষে লেখাপড়া করা সম্ভব হয় না। কুড়িগ্রাম জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে চরের সংখ্যা চার শতাধিক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এসব এলাকায় এনজিওগুলো হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছিল। কিন্তু তারা এমন কোনো প্রকল্প গ্রহণ করেনি যাতে চরজীবনের কষ্টের স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়।
ব্রহ্মপুত্রের বজরাদি চরে গোড়ারকুঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাশারাতুল্লাহ চরগুলোতে কলেজ পর্যন্ত শিক্ষাদানের ব্যবস্থা দাবি করে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে চরের মানুষের আগ্রহ থাকলেও পড়ার সুযোগ পায় না।’ এ বছর কুড়িগ্রামে যে বন্যা হয়েছে তা কোনো কোনো স্থানে ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে, কোথাও কোথাও ১৯৮৮ সালের বন্যার কাছাকাছি। এ বছর বন্যার শুরুতেই ত্রাণ ও দুর্যোগমন্ত্রী কুড়িগ্রামে এসে বড় বন্যার আশঙ্কার কথা বলেও গিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও ত্রাণ কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলার আগাম প্রস্তুতি ছিল না। বাংলাদেশের কয়েকটি জেলায় যেহেতু প্রতিবছরই বন্যা হয়, তাই ওই জেলাগুলোতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আগে থেকেই রাখা প্রয়োজন। কুড়িগ্রামে ভয়াবহ বন্যারও অনেক পরে সামান্য ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। গাইবান্ধার অবস্থাও একই। চরাঞ্চলের মানুষের বিপদের অনেক বড় বন্ধু তাঁদের গৃহপালিত গবাদিপশু। বন্যা হলে এই গরু বিক্রি করে অনেকেই তাঁদের সংকটের সময় পার করেন। যাঁদের গরু নেই, তাঁরা এনজিও থেকে উচ্চহারের সুদে ঋণ নেন অথবা মহাজনের দ্বারস্থ হন। আর সারা বছর ধরে সেই ঋণের ঘানি টানতে থাকেন। কড়াই বরিশাল চরের সফিয়াল বলছিলেন, ‘ভাই, খুব কষ্টে আছি। সারা দিন যায় কোনো কাজ-কাম নাই। সারাটা দিন বসি থাকি।’ বন্যাদুর্গত এসব মানুষকে প্রশিক্ষণ দিয়ে হস্তশিল্পে দক্ষ করে বেকারদের সময়কে শ্রমে পরিণত করা সম্ভব।  চরাঞ্চলগুলোতে আর কিছুদিন পরেই শুরু হবে বাদাম, সরিষা ও মসুরের চাষ। সরকারিভাবে মসুর, সরিষা কিংবা বাদামের বীজ দিয়ে কৃষকদের সহযোগিতা করা যেতে পারে। যখন বন্যায় ঘরবাড়ি-পথ-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-প্রার্থনালয় সবকিছুই ডুবে যায়, তখন গণমাধ্যমগুলোতে বন্যা প্রসঙ্গ প্রচারণার শীর্ষে থাকে। তখন সামান্য কিছু ত্রাণ আসে। কষ্ট-সমুদ্রে কারও কারও কাছে সেই ত্রাণ জীবন বাঁচানোর নিয়ামক হয়ে দেখা দেয়। যখন বন্যার পানি নেমে যায়, কোথাও কোনো প্রচারণা থাকে না, তখনো নিভৃতে নেমে আসে দীর্ঘ কষ্টের ধারা। এই বন্যাচক্রে আবর্তিত বন্যার্ত এসব মানুষের জীবন। সরকার কি বন্যার্ত মানুষের পুনর্বাসনে মনোযোগ দেবে?
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

বিপদের নাম গ্যাস সিলিন্ডার

গ্যাস সিলিন্ডার ত্রুটিপূর্ণ মানেই ঝুঁকিপূর্ণ। এ রকম ত্রুটিপূর্ণ দুটি গ্যাস সিলিন্ডারের ঘষা থেকে বিস্ফোরণ ঘটেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) বগুড়ার গুদামে। সৌভাগ্যজনকভাবে দুর্ঘটনায় জীবন ক্ষয় না হলেও ৩০০ সিলিন্ডার বিস্ফোরিত ও তিনটি ট্রাক পুড়ে গেছে। এ ঘটনাকে গাড়িতে ও বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের ঝুঁকি বিষয়ে হুঁশিয়ার হওয়ার সতর্কসংকেত হিসেবে নিতে হবে। প্রথম আলোর সোমবারের আরেকটি প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বিপিসির নিয়ন্ত্রণাধীন পদ্মা ও মেঘনা কোম্পানির সরবরাহ করা ৮০ শতাংশ সিলিন্ডারই ব্যবহারের অনুপযোগী। বিপিসি জেনেশুনে এমন মৃত্যুফাঁদ কী চিন্তায় সরবরাহ করছে? তা ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডারগুলোর মেয়াদ ও ত্রুটির ব্যাপারে সচেতনতারও অভাব আছে। প্রায়ই গাড়িতে বা বাসায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে মানুষ হতাহতও হচ্ছে। শনিবারের বগুড়ার ঘটনায় দেখা যায়, খোদ সিলেটেই গ্যাস সিলিন্ডারজাত হওয়ার সময় ত্রুটি ছিল। তাই বগুড়ার ডিপোতে ট্রাকে করে আসা ওই সিলিন্ডারগুলোর কোনো কোনোটি থেকে গ্যাস নির্গত হচ্ছিল।
এ রকম দুটি সিলিন্ডারের ঘষা থেকে তৈরি হওয়া আগুনের ফুলকি সৃষ্টি করে প্রথম বিস্ফোরণের। এরপর একে একে শত শত সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। এ রকম বিপজ্জনক সিলিন্ডার থেকে বিস্ফোরণ কি দুর্ঘটনা, নাকি সচেতন অবহেলার ফল? ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডার গাড়িতে রাখলে তা চলন্ত বোমার মতো, বাড়িতে থাকলে নিজেই তা গণবিধ্বংসী অস্ত্র। ফলে সিলিন্ডারের মেয়াদ পর্যবেক্ষণ, মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বদল ও ত্রুটিযুক্ত সিলিন্ডার বাতিলের পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব করার সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে একটি শক্ত আইনি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। সরকার যখন রান্নার কাজে এলপিজি গ্যাসের বিস্তার বাড়াতে চাইছে, তখন এটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। আমরা মনে করি জরুরিভাবে সারা দেশে ত্রুটিপূর্ণ ও মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডারগুলো চিহ্নিত করা দরকার। এ জন্য ভোক্তাদের যেমন সচেতন করতে হবে, তেমনি সরকারিভাবে সিলিন্ডার টেস্ট ও বদলে নেওয়ার সেবা চালু করতে হবে।  

ঋণভারে জর্জরিত ট্রাম্প

রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ৬৫ কোটি টাকা ঋণ করেছে। অন্যদিকে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে এসে প্রচারণা ব্যয় দ্বিগুণ করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু বিবিসি জানায়, ডেমোক্রেটিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী খরচের তুলনায় এ ব্যয় কিছুই নয়। গত মাসে নির্বাচনী প্রচারণায় নিজের ব্যয় দ্বিগুণ করেও হিলারির অর্ধেকে পড়ে আছেন ট্রাম্প। জুলাই মাসে এ কোটিপতি ব্যবসায়ীর প্রচারণা শিবির থেকে খরচ করা হয় ১ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। যা জুন মাসের ৭৮ লাখ ডলারের নির্বাচনী ব্যয়ের তুলনায় দ্বিগুণ পরিমাণ বেশি। মার্কিন কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচারণা ব্যয় দ্বিগুণের বেশি পরিমাণ বৃদ্ধি করেও সাবেক ফার্স্ট লেডি হিলারির কাছেও ঘেঁষতে পারেননি ট্রাম্প। গত মাসে হিলারির নির্বাচনী প্রচারণায় খরচ হয়েছে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার; যা ট্রাম্পের ব্যয়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, নির্বাচনী প্রচারণায় গত দুই মাসে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের পেছনে ইতিমধ্যে ৬ কোটি ডলার খরচ করেছেন হিলারি। কিন্তু এ মাসেই সর্বপ্রথম টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে ৫০ লাখ ব্যয় করেন তিনি। তবে এ পর্যন্ত নিজের প্রচারণার জন্য শুধুমাত্র হ্যাট বিতরণ করে ট্রাম্প খরচ করেছেন ৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। বিবিসি জানায়, নির্বাচনী ব্যয়ের হিসেবে ২০১২ সালের মার্কিন নির্বাচনে অংশ নেয়া বারাক ওবামা ও মিট রমনির স্বল্প ব্যয়ের রেকর্ডকেও হার মানিয়েছেন ধনকুবের ট্রাম্প।
সব দিকে থেকে হিলারির চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছেন তিনি। শুধু নির্বাচনী ব্যয়ে নয়, হিলারির কর্মী সংখ্যাও ট্রাম্পের তুলনায় ১০ গুণ বেশি। হিলারির ৭০০ জন প্রচারণা কর্মীর বিপরীতে ট্রাম্পের আছে মাত্র ৭০ জন। এদিকে তহবিল সংগ্রহেও পিছিয়ে আছেন সাবেক এ রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী। এ মাসে হিলারির তুলনায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার কম জমা পড়েছে ট্রাম্পের তহবিলে। হিলারির ৫ কোটি ২০ লাখের বিপরীতে ট্রাম্পের ফ্রান্ডে এসেছে মাত্র ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। তবে এখন পর্যন্ত নিজের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যক্তিগত তহবিল থেকে মোট ৫ কোটি ডলার খরচ করেছেন ট্রাম্প। এদিকে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ের হিসাব অনুসারে ইতিমধ্যে মোট ৬৫ কোটি টাকা ঋণ করেছে ট্রাম্পের রিয়েল এস্টেট কোম্পানি। তবে প্রকাশ্যে তিনি এ পরিমাণ অর্থ ঋণের কথা স্বীকার করেননি। তার দেয়া হিসাবের তুলনায় এই ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ বলে জানা যায় প্রতিবেদনে। ডেমোক্রেট নেত্রী ওয়ারেন বাফেট ট্রাম্পকে বারবার সম্পদের বিবরণী প্রকাশ করার আহ্বান জানালেও তাতে পাত্তা দেননি এ রিপাবলিকান প্রার্থী। নিজের কর প্রদানের প্রতিবেদন এবং মোট আয়-ব্যয়ের তথ্য পর্যন্ত প্রকাশ্যে ঘোষণা করেননি ট্রাম্প। প্রতিবেদনে বলা হয়, হোয়াইট হাউসের জন্য নির্বাচনী দৌড় শুরু করার সময় ট্রাম্প তার ঋণ সংক্রান্ত যে তথ্য দিয়েছেন তার সঙ্গে বাস্তবের হেরফের আছে বলে মনে করা হচ্ছে। ১০৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ট্রাম্প জানান, নিজের রিয়েল এস্টেট কোম্পানির নামে ৩১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের ঋণ আছে তার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা যায় সেই ঋণ ৬৫ কোটি ডলারের সমান।

যশোর বোর্ডের চমক ও উচ্চ মাধ্যমিকের ফল

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল হচ্ছে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের গেটওয়ে। যেসব শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং আমরা যারা শিক্ষা নিয়ে কাজ করি, তাদের কাছে প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর যদিও কয়েকটি পাবলিক পরীক্ষা হয়, তারপরও প্রতিটি পরীক্ষাই বেশকিছু নতুন বার্তা নিয়ে হাজির হয়, যা আমাদের চিন্তার যথেষ্ট খোরাক জোগায়। এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলের দিকে তাকালে আমরা বেশ কয়েকটি বিষয় দেখতে পাই- যেমন যশোর বোর্ডের চমক। যশোর বোর্ড আসলেই আমাদের চমকে দিয়েছে। গত বছর এ বোর্ড ছিল সর্বনিম্নে, এবার সবার ওপরে। যশোর বোর্ডে ২০১২ সালে পাসের হার ছিল ৬৭.৮৭ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৬৭.৪৯ শতাংশ, ২০১৪ সালে ছিল ৬০.৫৮ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে তা ছিল ৪৬.৪৫ শতাংশ। এ ফল গতবার গোটা এইচএসসি পরীক্ষার ফলের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। কেন এমনটি হয়েছিল? প্রতি বছর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা ও সংশ্লিষ্টরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ৩২ সেট প্রশ্ন করা হবে। তাদের মধ্যে থেকে লটারির মাধ্যমে একটি সেট বাছাই করে পরীক্ষা গ্রহণ করা হবে। যশোর বোর্ড সেই উপযুক্ত কাজটিই করেছিল। কিন্তু তার ফল হয়েছিল উল্টো। অর্থাৎ পাসের হারে নেমেছিল ধস। ফলে কর্তৃপক্ষসহ অন্যান্য বোর্ড নিশ্চয়ই যশোর বোর্ডের ওপর নাখোশ হয়। হওয়ারই কথা!
কিন্তু আমরা কেউ চিন্তা করছি না, বা বলছি না যে- ওটিই ছিল আসল ফল ও আসল মূল্যায়ন। যশোর বোর্ড চাপে থাকার কারণে এবার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে চমক লাগিয়ে দিয়েছে। এবার তাই পাসের হার ৮৩.৪২ শতাংশ, যা সব সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ওপরে। বোর্ডের ফল ভালো হলে ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়ার নজির আছে; কিন্তু একেবারে দ্বিগুণ হওয়া তো এক ধরনের জাদু। সেই জাদুটিই যশোর বোর্ড এবার প্রদর্শন করেছে। তবে আনন্দের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবনার অবকাশ রয়েছে। গত বছর সব বোর্ড মিলে ইংরেজিতে ফেল করেছিল ১৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। আর যশোর বোর্ডে ৫০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী ইংরেজিতে ফেল করেছিল। এবার যশোর বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৮৯.৮৭ শতাংশ। এখানেও যশোর বোর্ড চমক উপহার দিয়েছে। অর্থাৎ যশোর বোর্ডের ডাবল চমক। ইংরেজিতে ঢাকা বোর্ডে এবার পাসের হার ৮৬.৪৬ শতাংশ, রাজশাহী বোর্ডে ৮৪.০৪ শতাংশ, কুমিল্লায় ৮৩.৫৪ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৮৭.৪২ শতাংশ, সিলেটে ৭৭.৯৫ শতাংশ, দিনাজপুরে ৭৮.২৬ শতাংশ, কারিগরি ৯৪.৩৫ এবং আট বোর্ডে ৮৫.৬১ শতাংশ। এখন ইংরেজিতে পাস কিংবা জিপিএ-৫ পাওয়া কোনো বিষয় নয়। শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই ‘টাচ’ করুক আর নাই করুক, বিষয় সম্পর্কে জানুক আর নাই জানুক, ইংরেজি লিখতে, বলতে, শুনতে, বুঝতে পারুক আর নাই পারুক- পাস করতে ও জিপিএ-৫ পেতে কোনো বাধা নেই। এদিকটায় আমাদের বিশেষ দৃষ্টি দেয়া একান্তই প্রয়োজন।
কিন্তু কবে দেব? এবার উল্লেখ করার মতো পজিটিভ কয়েকটি বিষয় ঘটেছে। ২০১৫ সালে ১২টি বিষয়ে ২৩টি পত্রে সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষা হয়েছিল। এবার ১৯টি বিষয়ে ৩৬টি পত্রে পরীক্ষা হয়েছে। সৃজনশীল প্রশ্নের আওতা বাড়ায় নম্বর বেশি উঠেছে এবং শিক্ষার্থীদের ভীতি কেটেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে। ৮৪৮ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে, গতবার এ সংখ্যা ছিল ১৩৩। ২৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, যে সংখ্যা গতবার ছিল ৩৫। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার ৫.১০ শতাংশ বেশি আর জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে ১৫ হাজার ৩৮২। মোট জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবার ৫৮ হাজার ২৭৬। তাছাড়া প্রথমবারের মতো এবার বাংলা ও ইংরেজিতে দুই পত্র করে চারপত্রে পরীক্ষা দিয়েছে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। ১৯৮৬ সালে আলিম স্তর এইচএসসির মান অর্জনের পর থেকে ইংরেজি ও বাংলায় এক পেপার করে পরীক্ষা দিতে হতো মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের। ফলে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো বিষয়ে ভর্তি থেকে বঞ্চিত ছিল। এ বৈষম্য দূর করতে এবার তাদের পরীক্ষা চার পেপারে নেয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় দিক। সবকিছুর ওপরে যে কথাটি বলতে হয়,তা হল- প্রশ্নপ্রত্র ফাঁসের কথা এবার শোনা যায়নি। গত বছর পরীক্ষার আগের দিন রাতে সাজেশন আকারে এবং পরীক্ষার দিন সকালেও নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন বাইরে বের করে দেয়ার অভিযোগ ছিল। শিক্ষামন্ত্রীর যথাযথ পদক্ষেপের ফলে বিষয়টির অনেক উন্নতি হয়েছে।
গ্রেডিং পদ্ধতি চালুর পর শিক্ষার্থীরা মোট নম্বর জানতে পারত না। এবার জিপিএ’র পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক নম্বর দেয়া হবে। তারা অনলাইনে সৃজনশীল, নৈর্ব্যক্তিক এবং ব্যবহারিকের নম্বর আলাদাভাবে জানতে পারবে। এটিও একটি উল্লেখযোগ্য দিক। কারণ একজন শিক্ষার্থী সব বিষয়ে ৮০ থেকে ৮১ কিংবা ৮২ নম্বর পেয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে। অন্য একজন শিক্ষার্থী পেয়েছে ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ নম্বর। গ্রেডিংয়ে এ দুজন শিক্ষার্থীকে একই মানদণ্ডে মাপা হয়, যা কোনোভাবেই ঠিক নয়। একজন শিক্ষার্থী তত্ত্বীয় পরীক্ষায় ৭৫-এর মধ্যে পেয়েছে ২৪ আর ব্যবহারিক পরীক্ষায় পেয়েছে ২৫-এর মধ্যে ২৪। এ বিষয়টিও প্রদর্শিত হবে। তাই বিভিন্ন মহলের দাবি অনুযায়ী বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এতে গ্রেডিংয়ের ধোঁয়াশা কিছুট হলেও কাটবে। ক্রমেই বাড়তে থাকা মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের ফলাফল এবার নিুগামী। এটিও ভালো দিক। কারণ মাদ্রাসা শিক্ষা এমনিতেই অনেক পিছিয়ে আছে। কিন্তু পাসের হারের ক্ষেত্রে প্রতি বছরই দেখা যায়- তারা এগিয়ে রয়েছে, যা সঠিক চিত্র প্রদর্শন করে না। কারিগরি শিক্ষা এখনও শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়াতে পারেনি অথচ পাবলিক পরীক্ষার ফলে তারা প্রতি বছরই এগিয়ে থাকে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নিশ্চয়ই দৃষ্টিতে এসেছে।
তাই হয়তো বিষয়টি এবার একটু আলাদা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে জটিলতায় পড়তে হয় ভর্তিচ্ছু মেধাবী শিক্ষার্থীদের। দেশের প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন শর্ত ও নিয়ম রয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের বিপাকে পড়তে হয়। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এছাড়া তারিখ নির্ধারণে সমন্বয়হীনতা, কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা গ্রহণ, প্রতিটি পরীক্ষার জন্য আলাদা ফি নির্ধারণ, একই ইউনিটে ভর্তিতে একাধিক শিফটে পরীক্ষা গ্রহণ, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাসের বাইরে থেকে প্রশ্ন সংযোজন ইত্যাদি কারণে একজন শিক্ষার্থীকে এক ডজনেরও বেশি আবেদন করতে হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীদের আর্থিক ক্ষতি ও মানসিক চাপে ভুগতে হয়। বিভিন্ন শিফটের পরীক্ষার মধ্যে প্রশ্নপত্রের মধ্যে সমন্বয় থাকে না। ফলে কোনো শিফটের পরীক্ষা সহজ, কোনোটি কঠিন, আবার কোনোটি পরিচিত, কোনোটি অপরিচিত বিষয় থেকে প্রশ্ন প্রণয়ন করা হয়। এ বিষয়গুলো আমরা যখন আশির দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখনও ছিল। এ নিয়ে অনেক কথাবার্তা ও আলোচনা হয়েছে; কিন্তু সমাধান হয়নি। জাফর ইকবাল স্যার জাতীয় পর্যায়ে দু-একবার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন বিষয়টি সমাধানের জন্য; কিন্তু খুব একটা সাড়া পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের এবারও বিপাকে পড়তে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসি বিষয়গুলোর একটি সহজ সমাধান বের করতে পারে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে। ইউজিসি বলছে, দুটি নির্মাণাধীন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৯, তবে এখনও ৩৭টিই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া এখানে প্রথম বর্ষে আসন সংখ্যা ৪০ হাজার ৭২৭। ফলে স্পষ্টতই ৫৮ হাজার ২৭৬ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে ১৭ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে না। এখানে সব জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীরাই যে ভর্তি হবে তা তো নয়, শুধু ‘এ’ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও তো ভর্তি হবে। তার মানে জিপিএ-৫ পেয়েও ভর্তির টেনশন কাটল না। কৃতকার্য ও অকৃতকার্য সব শিক্ষার্থীকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। যারা জিপিএ-৫ পাওনি, এমনকি যারা অকৃতকার্য হয়েছ, তাদের বলছি- চিন্তার কিছু নেই, দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। আপাতত হয়তো একটু খারাপ লাগবে, তাতে একেবারে ভেঙে পড়ার কিছু নেই। তোমরা নিশ্চয়ই জনপ্রিয় কথাশিল্পী আনিসুল হকের লেখাটি পড়েছ। তিনি যথার্থই বলেছেন, তুমি যদি মেডিকেল কলেজে চান্স না পাও, তাহলে তুমি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মালিক হবে, তুমি যদি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারো, তাহলে তুমি বিরাট বিরাট শিল্প-কারখানার মালিক হবে, যেখানে অনেক ইঞ্জিনিয়ার তুমি নিজেই নিয়োগ দেবে। তুমি যদি পরীক্ষায় ফেল করো, তাহলে মন্ত্রী হবে; আর যদি ভালোভাবে পাস করো, তাহলে টিচার হবে- যা মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই চায় না। তোমরা যারা সাইফুর রহমানের উপন্যাস ‘শুধু একটি প্লটের জন্য’ পড়েছ, তারা নিশ্চয়ই দেখেছ- যে শিক্ষার্থী ক্লাসে ভালো ছিল, সে হয়েছে গ্রামের এক কলেজের শিক্ষক। আর যে শিক্ষার্থী সবচেয়ে পেছনের সারিতে ছিল, সে হয়েছে মন্ত্রী। কাজেই তোমাদের ভয় নেই। মেধা আলাদা জিনিস। মেধার যাচাই সব সময় পাবলিক পরীক্ষার ফল দিয়ে হয় না।
মাছুম বিল্লাহ : ব্র্যাক শিক্ষাকর্মীসূচিতে কর্মরত, সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক
masumbillah65@gmail.com

‘নারী জঙ্গি’ কি নতুন অশনিসংকেত?

হাসিনা আইটবুলাসেনের কথা মনে আছে? হাসিনা ছিল ইউরোপের প্রথম আত্মঘাতী মহিলা জঙ্গি। সুন্দরী, ভদ্র, নম্র ২৬ বছরের এ ফরাসি তরুণী ছিল প্রচণ্ড হাসিখুশি স্বভাবের একটি মেয়ে। পড়াশোনায় ভালো। নাচে ভালো। তার মাঝে ধর্মানুরাগ বা ধর্মভীরুতা কেউ কখনও দেখেনি। এমনকি জীবনে কখনও তাকে কোরআন পড়তেও দেখেনি তার পরিবার। সারাক্ষণ ফোন, ফেসবুক, হোয়াটসআপ- এ নিয়ে ছিল তার ব্যতিব্যস্ততা। উল্টো নিয়মিত মদ্যপান করত। মাথায় হ্যাট পরত। তজ্জন্য এলাকায় উপাধিও জুটেছিল ‘কাউগার্ল’। সেই মেয়ে একদিন আচমকা ভোজবাজির মতো পাল্টে গেল। ধর্মবিরাগী মেয়ে হঠাৎ ধর্মানুরাগী হয়ে উঠল। হ্যাটের জায়গা নিল নিকাব-হিজাব। ফেসবুকের পোস্টে ব্যক্তিগত অনুভূতির জায়গা নিল আইএসের বক্তব্য, ছবি-ভিডিও। জনে জনে দিতে লাগল জিহাদের ডাক। ৮ মাসের মাথায় জঙ্গিদের সঙ্গে ভিড়ে কোমরে বোমা বেঁধে পরিণত হল আত্মঘাতী বোমারুতে। তার এ অস্বাভাবিক পরিবর্তনে সবাই অবাক। কেউ সমীকরণ মেলাতে পারে না। তবে একটা জায়গায় মিলল। হাসিনা ছিল প্যারিসের সন্ত্রাসী হামলার সন্দেহভাজন মূল হোতা আবদেলহামিদ আবাউদের দূর সম্পর্কিত; কিন্তু মানসিকভাবে ঘনিষ্ঠ বোন (বিবিসি)।
জীবদ্দশায় হাসিনা সিরিয়ায় পালাতে চেয়েছিল। পারেনি। পেরেছিল ২০ বছর বয়সী ব্রিটিশ তরুণী আকসা মাহমুদ। কেবল নারীদের নিয়ে আইএসের একটি বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট আছে। নাম ‘আল খানসা ব্রিগেড’। অন্তত ৬০ ব্রিটিশ তরুণী বর্তমানে এ ব্রিগেডে কাজ করছে। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৪। মাসিক বেতন ২৫ হাজার সিরিয়ান পাউন্ড। কাজ ইসলামবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। তারা সবাই ব্রিটেন থেকে সিরিয়ায় পালিয়ে গেছে। পরে তাদের বেশিরভাগ আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে করেছে। আকসা বর্তমানে ওই ব্রিগেডেরই একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা। ২০১৩ সালে ব্রিটেনের গাসগো থেকে পালিয়ে এ বাহিনীতে যোগ দেয়। ২০১৪ সালে ম্যানচেস্টার থেকে পালিয়ে একই বাহিনীতে যোগ দেন জাহরা এবং সালমা হেলেন নামে দুই যমজ বোন। আইএস যোদ্ধাকে বিয়ে করে তারা ওই বছরই আবার বিধবা হন। ওই আকসা মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে তুরস্ক হয়ে পালিয়ে সিরিয়ায় যায় খাদিজা সুলতানা, আমিরা আবাসী ও শামিমা বেগম নামের তিন স্কুলছাত্রী। তিনজনই পূর্ব লন্ডনের বেথনল গ্রিন একাডেমির শিক্ষার্থী ( সূত্র : ডেইলি মেইল, মিরর, টেলিগ্রাফ)।
গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৫ সালের ২৭ জুলাই পর্যন্ত ৭০০ ব্রিটিশ নাগরিক আইএসে যোগ দিতে সিরিয়া গেছে। তন্মধ্যে ১০০ নারী। আইএসের জঙ্গি তৎপরতা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২০০ পশ্চিমা তরুণী ওই ভয়াবহ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে এখনও ‘হাসিনা আইটবুলাসেন’ বা ‘আকসা মাহমুদ’দের পাওয়া যায়নি। তবে যা পাওয়া গেছে, তাতেই আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঘুম হারাম। তাতেই ঘরে ঘরে এখন আতংক- বাসার শান্ত-বিশিষ্ট অবুঝ-সুবোধ তরুণীটি তলে তলে তথাকথিত জিহাদি কার্যক্রমে জড়াচ্ছে না তো? কারও প্ররোচনায় তাদের সহজ-সরল মেয়েটি জঙ্গিবাদের চোরাবালিতে পা দিচ্ছে না তো? এ আতংক এতকাল কেবল ছেলেদের নিয়েই ছিল। সম্প্রতি জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগে চার তরুণী গ্রেফতারের ঘটনায় অভিভাবকরা তাদের তরুণী বা শিক্ষার্থী মেয়েদের নিয়েও ভীষণ চিন্তিত। কারণটাও অবশ্য অসঙ্গত নয়। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত ঢাকা মেডিকেল এবং মানারাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য। দু’জন আবার একেবারে নীতিনির্ধারণী সদস্য। তারা দীর্ঘদিন ধরে ‘দাওয়াত’ দেয়া, সদস্য সংগ্রহ, তহবিল গঠনসহ বাংলাদেশে জেএমবির প্রসারে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে সর্বপ্রকার ‘জিহাদি’ কাজ করে যাচ্ছে। একইসঙ্গে তারা মোবাইল, ল্যাপটপ থেকে বিশেষ অ্যাপস ব্যবহার করে অনলাইনে এ মুহূর্তের বিশ্বত্রাস আইএসের পক্ষে প্রচারণা চালাত।
অনলাইনে বিচিত্র গ্রুপ খুলে নিজেদের মধ্যে আইএসের তত্ত্ব, তথ্য, ছবি, অডিও ও ভিডিও ডাউনলোড এবং নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফেইক আইডির মাধ্যমে আইএস সংক্রান্ত তথ্য-ছবি পোস্ট করত। আবার সেগুলো লাইক-শেয়ার করে মানুষকে আইএসে যোগদানে উৎসাহ দিত। এমনকি তাদের কাছে মিলেছে বিপুল পরিমাণ জিহাদি বই, বিভিন্ন ডকুমেন্ট, প্রচার কাজে ব্যবহৃত অডিও-ভিডিও-সিডি। মিলেছে আল কায়দার অন্যতম শীর্ষ নেতা আনওয়ার আওলাকীর জীবনদর্শনের বিপুল অডিও-ভিডিও, তার অডিও লেকচারের ২২টি অরিজিনাল সিরিজ, ৩০টি বাংলায় ডাবিংকৃত সিরিজ। অর্থাৎ এক কথায় আধুনিক জঙ্গিবাদের ষোলোকলায় (সশস্ত্র প্রশিক্ষণ ও আত্মঘাতী বোমা হামলা ছাড়া) এ কোমলমতি তরুণীদের এখন পাকা হাত। তাদের কতই বা বয়স? এই ২০ থেকে ২৫। এ বয়সে কেউ ডাক্তার হয়ে, কেউ সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের ছাত্রী হয়েও; পড়াশোনা-ক্যারিয়ার বাদ দিয়ে জঙ্গিবাদের মতো রাষ্ট্র-সমাজ-দেশবিরোধী এবং আত্মঘাতী ও সর্বনাশা পথ বেছে নিয়েছে; কী সেলুকাস! সত্যি বলতে কী, জঙ্গিবাদে নারীদের সম্পৃক্ততা এ দেশে আগে খুব বেশি একটা ভাবা হয়নি। বরাবরই তরুণ বা পুরুষেই আটকে ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ। বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নভাবে দু-একজন নারীর প্রতি সন্দেহের তীর ছোড়া হয়েছে বটে। তবে সরাসরি অভিযোগ বা গ্রেফতারের ঘটনা এই প্রথম। তাও আবার প্রত্যক্ষ প্রমাণসহ।
সারা বিশ্বে এমনিতে অপরাধপ্রবণতায় নারীরা বরাবরই পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে। জঙ্গিবাদে তো আরও ব্যাক-বেঞ্চার (back bencher)। কিন্তু বিশ্বব্যাপী উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদের দুর্দণ্ড প্রতাপে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যে এই চিত্রবদল শুরু হয়েছে, চার নারী জঙ্গি গ্রেফতারই তার প্রমাণ। শুধু এ চারজন নয়, গ্রেফতারকৃত ঐশীর ল্যাপটপে আবিষ্কৃত হয়েছে আরও ২৭ নারী জঙ্গির অস্তিত্ব। সামনে নারী জঙ্গির এ তালিকার দৈর্ঘ্য যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা আল্লাহ মালুম। কারণ শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বে জঙ্গিবাদের সঙ্গে নারীর সংযোগ-সংশ্লিষ্টতা বাড়ছে। জঙ্গিবাদে তরুণদের ক্রমবর্ধনশীল সম্পৃক্ততার পেছনে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক-পারিবারিক-বিকৃত ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদি কারণ আবিষ্কৃত হলেও তরুণীদের ক্ষেত্রে এ রহস্য এখনও অনেকটা বারমুডা ট্রায়াঙ্গাল। তবে এ বিষয়ে বিবিসির এক প্রতিবেদন বলছে, ব্রিটিশ তরুণীদের আইএসে যোগদানের অস্বাভাবিক আগ্রহ রীতিমতো আতংক তৈরি করেছে। কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রিটেনে আইএস দম্পতিরাই তরুণীদের উদ্বুদ্ধ করছে। তাদের জিহাদি জীবনের রোমাঞ্চকর স্বপ্ন দেখাচ্ছে। তাছাড়া ২০১৩ সালে আইএস ‘জিহাদ আল নিকা’ বা যৌন জিহাদের ধারণা চালু করে।
তাতে তরুণীদের প্রতি আইএস যোদ্ধাদের যৌন সেবাদানের আহ্বান জানানো হয়। যাতে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে যেসব যোদ্ধা লড়ছেন তারা প্রেরণা পান। আশ্চর্য হলেও সত্য, তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে তখন মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ব্রিটেনসহ পশ্চিমা দেশগুলো থেকে নারীরা মধ্যপ্রাচ্য যান আইএস মিশনে যোগ দিতে। ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আইএসকে নিয়ে প্রতিদিন ১ লাখ টুইট হয়। তার অনেকই পাশ্চাত্য নারীর টুইট (২০ আগস্ট, ২০১৫)। জঙ্গি সম্পৃক্ততায় নারীর পাল্লা পুরুষের চেয়ে এখনও কম ভারি হলেও অভিভাবকদের আতংকের পাল্লায় নারী কিন্তু পুরুষের চেয়ে বহুদূর এগিয়ে। অভিভাবকরা সাধারণত মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। এখন সেখানে যোগ হল জঙ্গিবাদ। শরীরের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়, মনের গতিবিধি বা দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে কীভাবে? শরীর অনিরাপদ হলে তাকে নিরাপদ করা যায়; কিন্তু মন অনিরাপদ বা বিপথগামী হলে তাকে নিরাপদ করার বটিকা কই? বাবা-মা তাদের প্রিয় আত্মকেন্দ্রিক সন্তানটি ফেসবুক-ইন্টারনেটে গোপনে, ছদ্মনামে কী করছে কিংবা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা বলে কোথায় যাচ্ছে, তা জানবে কীভাবে? খেয়াল করলে দেখবেন, গ্রেফতারকৃত জঙ্গিদের জঙ্গি সস্পৃক্ততার খবরে সিংহভাগ ক্ষেত্রে তাদের অভিভাবক-শিক্ষক-বন্ধু-বান্ধব বিস্মিত। তাদের কাছে খবরটি অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য। জঙ্গিবাদে দেশ ধুঁকছে অনেকদিন। এখনও অন্ধকার সুড়ঙ্গে সবাই আলোর মুখ খুঁজছি। সেখানে ঐশীদের মুখ। এটা পুরো দেশের জন্য নিঃসন্দেহে নতুন অশনিসংকেত।
‘নারী’ কবিতায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম নারীকে বলেছেন-
‘জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য-লক্ষ্মী নারী
সুষমা লক্ষ্মী, নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারী? ’
আজকের নারী জঙ্গি ডাক্তার ঐশী বা ব্রিটেনের আকসা মাহমুদ বা প্যারিসের হাসিনা আইটবুলাসেনকে দেখলে নজরুল কি এভাবে নারীর ছবি আঁকতে পারতেন?
আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট
aftabragib@yahoo.com

শেয়ারবাজারে সূচক কমছে

দীর্ঘমেয়াদি সংকটে শেয়ারবাজার। কমছে মূল্যসূচক ও বাজার মূলধন। এছাড়া লেনদেনও ৫শ’ কোটি টাকার ঘরে ওঠানামা করছে। রোববারও দেশের দুই শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে। দিনশেষে ডিএসইর সূচক কমেছে ৬ পয়েন্ট এবং সিএসইর সূচক কমেছে ২২ পয়েন্ট। বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএসইতে রোববার ৩২১টি প্রতিষ্ঠানের ১২ কোটি ৮৪ লাখ শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যার মোট মূল্য ৫১১ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৮৩টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের, কমেছে ১৬৮টি এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৭০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। ডিএসইর ব্রড সূচক আগের দিনের চেয়ে ৬ দশমিক ৫ পয়েন্ট কমে ৪ হাজার ৫৭৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। ডিএসই-৩০ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে দশমিক ৩৩ পয়েন্ট বেড়ে ১ হাজার ৭৬৬ দশমিক ২৫ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক ২ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ১১৯ দশমিক ০২ পয়েন্টে নেমেছে।
ডিএসইর বাজারমূলধন আগের দিনের চেয়ে কমে ৩ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সিএসই : চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে রোববার ২৬০টি প্রতিষ্ঠানের ৭৬ লাখ ৯১ হাজার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যার মোট মূল্য ২৬ কোটি ১০ লাখ টাকা। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৮১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের, কমেছে ১৪১টি এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে ২২ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৮০ পয়েন্টে নেমে এসেছে। সিএসই ৩০ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে পয়েন্ট কমে ১২ হাজার ৮২০ পয়েন্টে নেমে এসেছে। শীর্ষ দশ কোম্পানি : রোববার ডিএসইতে যেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেশি বেড়েছে সেগুলো হল- শাহজিবাজার পাওয়ার, ন্যাশনাল টিউবস, আমান ফিডস, মবিল যমুনা বাংলাদেশ, বিএসআরএম লিমিটেড, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট, আলহাজ টেক্সটাইল, কাশেম ড্রাইসেল, বেক্সিমকো ফার্মা এবং স্কয়ার ফার্মা। ডিএসইতে রোববার যেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেশি বেড়েছে সেগুলো হল- ঢাকা ডাইং, ন্যাশনাল টিউবস, মেঘনা সিমেন্ট, জিকিউ বলপেন, আরামিট সিমেন্ট, এমআই সিমেন্ট, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স, সাইফ পাওয়ার, আইপিডিসি এবং ইউনাইটেড ইন্স্যুরেন্স।

ইতিহাস গড়ে নেতৃত্ব ছাড়লেন নেইমার

লাতিন আমেরিকার মানুষ বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ। মাস দুয়েক আগে কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে হুট করে অবসরের ঘোষণা দিয়ে বসেছিলেন মেসি। পরে অবশ্য অভিমান ভুলে জাতীয় দলে ফিরেছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। মেসি-নাটকের অবসান হওয়ার পর এবার নতুন নাটক জমিয়ে দিলেন নেইমার। অলিম্পিকে ফুটবলে দেশকে প্রথম স্বর্ণ এনে দিয়েই অধিনায়কত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিলেন ব্রাজিলের সোনার ছেলে! অলিম্পিকে ব্রাজিলের অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন নেইমার। আর জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন দু’বছর ধরে। হুটহাট মাথা গরম করে লাল কার্ড দেখায় শুরু থেকেই অধিনায়কত্ব নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে নেইমারকে। অলিম্পিকে সোনা জিতে নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করে দেয়ার পর নিজে থেকেই জানিয়ে দিলেন, কোনো পর্যায়েই আর ব্রাজিলের অধিনায়কত্ব করবেন না তিনি। হয়তো নির্ভার হয়ে খেলতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেইমার। দুঙ্গা বরখাস্ত হওয়ার পর গত মাসে ব্রাজিল জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন তিতে। নতুন কোচকে এবার নতুন অধিনায়ক বেছে নিতে বললেন নেইমার, ‘ব্রাজিল অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন। এটা আমার জীবনের অন্যতম বড় পাওয়া।
দেশকে নেতৃত্ব দেয়া অনেক বড় সম্মানের বিষয় হলেও আজ থেকে আমি আর ব্রাজিলের অধিনায়ক নই। আমি এই বার্তাটা এখনই তিতেকে দিয়ে দিতে চাই। যাতে তিনি জাতীয় দলের জন্য নতুন একজন অধিনায়ক খুঁজে নিতে পারেন।’ অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে নেইমারের সরে দঁাঁড়ানোকে মহতী এক সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন ব্রাজিলের অলিম্পিক দলের কোচ রোজারিও মিকালে, ‘সিদ্ধান্তটা আমরা আগেই জানতাম। ফাইনালের আগে সেটা প্রকাশ করা হয়নি। আমিই তাকে অলিম্পিক দলের অধিনায়ক করতে চেয়েছি। কারণ সে-ই সবচেয়ে যোগ্য। নেইমার আমাকে মুগ্ধ করেছে। দেশের জন্য সে নিবেদিতপ্রাণ। তার নেতৃত্ব ছাড়ার ব্যাপারটিও একটি মহতী সিদ্ধান্ত। তিতেকে অধিনায়কত্বের ব্যাপারে নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ করে দিল নেইমার।’ নেতৃত্ব ছাড়লেও ব্রাজিল দলের প্রাণভোমরা হয়ে থাকবেন নেইমার। অলিম্পিক ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিত করা শটের পাশাপাশি ম্যাচে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটিও নেইমারের। ইতিহাস গড়ার পর সমালোচকদের উদ্দেশে তার বার্তা, ‘এখন নিজেদের কথা গিলতে হবে তাদের।’ এএফপি।

কোরবানির ঈদ অস্ট্রেলিয়াতেই করব

*আগামী ঈদ উপলক্ষে কোনো নাটকে অভিনয় করছে না?
**ঈদ উপলক্ষে কোনো নাটকে অভিনয় করা হয়নি। মনে হচ্ছে হবেও না। বেশ কয়েকদিন ছবির কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় নাটকে সময় দিতে পারিনি। এছাড়াও নাটকের চেয়ে সিনেমার দিকেই এখন মনোযোগ বেশি। তাই নাটকে অভিনয় করা হচ্ছে না।
*বিজ্ঞাপনে তো নিয়মিত দেখা যাচ্ছে?
**হ্যাঁ, ছবির পাশাপাশি এখন বেশকিছু পণ্যের মডেল হচ্ছি। তবে সবকিছু ব্যাটে-বলে মিলে যাওয়াতেই কাজগুলো করছি। ভালো বিজ্ঞাপনে কাজ করতে আমার কোনো আপত্তি নেই। গেল ঈদের আগে যে বিজ্ঞাপনগুলোতে কাজ করেছি তার সবগুলোই দর্শকদের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। এ ধরনের বিজ্ঞাপনের আইডিয়ার প্রতি আমার আগ্রহ রয়েছে।
*‘আমি তোমার হতে চাই’ চলচ্চিত্রটির শুটিং কতদূর?
**সম্প্রতি নেপাল থেকে এ ছবির শুটিং করে ফিরেছি। শুটিং কাজ শেষ। এখন শুধু টেকনিক্যাল কাজগুলো বাকি। এগুলো শেষ হলেই বিশেষ কোনো দিনে মুক্তি দেয়া হবে ছবিটি।
*হাতে আর কী কী ছবি রয়েছে?
**তারেক শিকদার পরিচালিত ‘দাগ’ ছবিতে অভিনয় করছি। এর বাইরেও মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে তানিয়া আহমেদ পরিচালিত ‘আকাশে বাতাসে রটিয়ে দিলাম’ নামের ছবিটি। আরও বেশ কয়েকটি ছবি নিয়ে নির্মাতাদের সঙ্গে কথা চলছে, সেগুলোতেও শিগগিরই অভিনয় করব।
*অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছেন কেন?
**ভ্রমণ আমার অন্যতম শখ। তাই সুযোগ পেলেই পরিবার নিয়ে ঘুরতে বের হই। বাংলাদেশের প্রায় দর্শনীয় জায়গাতেই গিয়েছি আমি। এখন বিশ্বের দর্শনীয় জায়গাগুলোও দেখতে যাচ্ছি। এছাড়া প্রতি বছরই পরিবারের সবাই মিলে আমরা কোনো না কোনো দেশে ঘুরতে যাই। এবার যাচ্ছি অস্ট্রেলিয়া। সবকিছু ঠিকঠাক। হাতের কাজগুলোও গুছিয়ে ফেলছি। প্রায় বিশ দিনের একটা লম্বা ট্যুর এটি। এবারের ঈদ অস্ট্রেলিয়াতে করা হবে।
অনিন্দ্য মামুন