Monday, June 12, 2017

রাতের ঢাকায় বেপরোয়া গতি by আল-আমিন

গতির নেশা। ভয়ঙ্কর গতির নেশা। রাতের ফাঁকা সড়কে মোটরবাইক ও কার নিয়ে কিছু তরুণ এই গতির নেশার প্রতিযোগিতায় নামে। এই নেশায় যারা মত্ত তারা অধিকাংশই ধনীর দুলাল। কোনো কিছুতেই তোয়াক্কা নেই তাদের। গতি উঠাতেই হবে। বিপদের ঝুঁকি থাকলেও গতির প্রতি দুরন্ত ভালোবাসা তাদের। এটা তাদের কাছে নিছক একটা বিনোদন। কিন্তু এই গতির নেশায় প্রায়ই ঘটে নানা দুর্ঘটনা। প্রাণ যায় সাধারণ মানুষের।
প্রচণ্ড গতিতে মোটরবাইক ও কার চালানোর সময় তাদের মনে ভয় তো দূরের কথা, ওই সময় তারা উচ্চস্বরে হাসে, চিৎকার করে, বাঁশি বাজায়, ইংরেজি বা হিন্দি গান গায়। শুধু তা-ই নয়, গতির প্রতিযোগিতায় একে অপরকে ছাড়িয়ে যাবার জন্য কিছু তরুণ ফেসবুকে নিজস্ব পেজ খুলেছে। গতির ভিডিও চিত্রগুলো তাদের ফেসবুকে আপলোডও করছে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘ছোট থেকে যেসব তরুণ একটু আডভেঞ্চারপ্রিয় হয়, তারা বিকল্প কিছু করে আনন্দ লাভ করার চেষ্টা করে। তবে এটা কোনো মানসিক সমস্যা নয়। এসব তরুণকে মারধর না করে পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মাধ্যমে শান্তভাবে কাউন্সিলিং করে বুঝাতে হবে যে, জীবন রক্ষা, জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য অনেক রোমাঞ্চকর বিষয় বিসর্জন দিতে হয়।’ শুধু তরুণরা যে গতির নেশায় মাতে তা নয়। ঢাকার রাস্তায় রাতে বেশির ভাগ পরিবহনের গতিই থাকে বেপরোয়া। খালি রাস্তা পেয়ে চালকরা গাড়ি চালান যাচ্ছেতাই।
ঢাকা মহানগর উত্তরের ট্রাফিক পুলিশের ডিসি প্রবীর কুমার রায় মানবজমিনকে জানান, রাত ১টার পর ট্রাফিক পুলিশ থাকে না। রাতে সাজেন্টের সংখ্যাও কম থাকে। এ কারণে কিছু তরুণ রাস্তায় বাইক ও কার নিয়ে গতির নেশায় মেতে ওঠে। পুলিশের টহল বাড়ায় এই বিকৃত প্রতিযোগিতা অনেকটা কমে গেছে। এই গতির নেশা বন্ধ করার জন্য আরো টহল বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরজমিন গত তিনদিন রাতে ঢাকার বনানী থেকে উত্তরা, বিজয় সরণি থেকে মিরপুর গোলচত্বর ও হাতিরঝিল এলাকায় ঘুরে প্রতিযোগিতার এ দৃশ্য লক্ষ করা গেছে। বিজয় সরণির উড়োজাহাজ ক্রসিং থেকে মিরপুর গোলচত্বর পর্যন্ত এই গতির নেশা কম দেখা গেলেও বনানী থেকে উত্তরা এবং হাতিরঝিল এলাকায় প্রকটভাবে দেখা গেছে। এ সময় ট্রাফিক পুলিশ, সাজেন্ট এবং থানা পুলিশের তেমন টহল ছিল না। এতে কিছু তরুণ সড়ক ফাঁকা পেয়ে ইচ্ছামতো কার ও বাইক রেসিং করেছে। সড়কের বিভিন্ন ক্রসিংগুলোতেও তারা গাড়ির গতি না কমিয়ে একই গতিতে গাড়ি চালায়। সাধারণ গাড়িচালক, যাত্রী ও রাস্তা পার হওয়া মানুষ তাদের এ কাণ্ডে বিরক্ত ও উষ্মা প্রকাশ করেন। তবে কারও কিছু করার থাকে না। উচ্চগতিতে তারা শাঁ শাঁ করে এলাকা পার হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার  রাত ১টায় খিলক্ষেত রেলক্রসিংয়ে একটি প্রাইভেট কার ও কয়েকটি মোটরবাইককে উচ্চগতিতে আসা যাওয়া করতে দেখা যায়। ওই কার ও মোটরবাইকগুলো চালাচ্ছিল কয়েকজন তরুণ। উচ্চগতিতে তারা গাড়ি চালানোর সময় চিৎকার ও গান গাইছিল। উচ্চগতিতে প্রায় ১ ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে তারা খিলক্ষেত ক্রসিংয়ের একপাশে গাড়িতে বসে ধূমপান করে। তাদের সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। এক তরুণ নিজেকে রুম্মান মাহমুদ বলে পরিচয় দেন। তিনি থাকেন বনানী ৫ নম্বর রোড এলাকায় পরিবারের সঙ্গে। তার বাবা ডায়মন্ডের ব্যবসা করেন। তার অন্য বন্ধুদের বাসা গুলশান ও বনানী এলাকায়। রুম্মান একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। রুম্মান জানান, প্রত্যেক সপ্তাহে একদিন তারা কার রেসিংয়ে যোগ দেন। এ এলাকায় তাদের কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে। তাদের গ্রুপের নাম স্টার রেসিং। তাদের দলে ৬ জন আছেন। এটি গুলশান ও বনানী এলাকাকেন্দ্রিক। অন্য গ্রুপের নাম হলো বিডি রেসিং, ফ্লাশ ওয়াটার রেসিং, ওয়ানডারফুল রেসিং, অলবিডি রেসিং, ঢাকা-১০০ রেসিং ও হারকিউলিস রেসিং। তারা নিজস্ব ফেসবুকে একটি করে ফ্যানপেইজ খুলেছে। গাড়িতে উচ্চগতি কেন তোলা হয় প্রশ্ন করা হলে রুম্মান জানান, এটা আমাদের কাছে আনন্দের বিষয়। মনে ফুর্তি আসে। বিনোদনও বটে। এটার মাধ্যমে অন্যকেও আনন্দ দেয়া হয়।
উত্তরা এলাকায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সার্জেন্ট জানান, যারা বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান তাদের পিছু নেয়া হয়। উচ্চগতিতে গাড়ি চালালে ট্রান্সপোর্ট আইনে  মামলা করা হয়। কিন্তু কোনো লাভ হয় না। কিন্তু পরের দিনই আবার তারা রাস্তায় নেমে পড়ে গাড়ি নিয়ে। সাধারণ গাড়ি স্পোর্টস কারে রূপান্তর করে তারা গতির প্রতিযোগিতা শুরু করে।
গত শুক্রবার রাতে হাতিরঝিলের গুলশান লিংক ব্রিজের কাছে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন তরুণ মোটরসাইকেল নিয়ে উচ্চগতিতে যাতায়াত করছে। তবে ওই মোটরসাইকেলের পেছনে দুজনকে বসে থাকতে দেখা গেছে। পেছনের জন চালককে আরো গতি তোলার ব্যাপারে উৎসাহ দিচ্ছিল। একক মোটরবাইকধারীদের শারীরিক কসরৎ করতে দেখা গেছে। কেউ মোটরবাইককে উঁচুতে তুলে ধরেছে। প্রায় ৩০ মিনিট পর তারা গুলশান ব্রিজের পাশে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। একজনের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। শাহরিয়ার হাসান চঞ্চল নামে ওই চালক জানান, তারা সপ্তাহে এক থেকে দুদিন এই বাইক নিয়ে উচ্চগতি ও কসরৎ করে। তাদের কাছে এটা একটা বিনোদন এবং শরীরচর্চার বিষয়। তারা এতে মানসিক শান্তি পায়। তাদের দুর্ঘটনার ভয় হয় কিনা প্রশ্ন করা হলে ওই তরুণ জানান, গতি তোলা ও কসরৎ করা তাদের কাছে রোমাঞ্চকর।
তরুণদের উচ্চগতিতে গাড়ি চালানোর বিষয়টি জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান আব্দুল্লাহ আল মামুন মানবজমিনকে জানান, তরুণরা রোমাঞ্চকর কিছু করতে চায়। কিছু তরুণ বাড়তি আনন্দ পেতে এই গতির নেশা তোলে। কিন্তু অধিক আনন্দ পেতে গিয়ে তাদের মৃত্যুও হতে পারে- এটা তারা ভুলে যান। তিনি আরো জানান, এটা কোনো মানসিক সমস্যা নয়। শুধু আনন্দ পেতে গিয়ে তারা এই কাজ করেন। তাদের জীবনের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন করতে পরিবার ও প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ বিষয়ে ‘নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন মানবজমিনকে জানান, ঢাকার যারা রেসিং করে থাকে অধিকাংশই ধনীর দুলাল। যারা উন্মাদের মতো গাড়ি চালান তারা একেবারও ভাবেন না পাশের গাড়িগুলো এবং পথচারীরা তাদের গাড়ির গতি দেখে ভয় পান। অনেকেই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ওঠেন। এদের বিরুদ্ধে পুলিশকে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি।

জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করতে না পারলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার কোন যুক্তিকতা নেই

চট্টগ্রাম-১৫ (লোহাগাড়া-সাতকানিয়া) আসনের সাংসদ প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী বলেন, জনগণের ভাগ্য উন্নয়নে এবং এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে না পারলে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া কোন যুক্তিকতা থাকতে পারে না। তিনি বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী অবহেলিত সাতকানিয়া লোহাগাড়ায় উল্লেখযোগ্য কোন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুদৃষ্টি এবং তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সাতকানিয়া লোহাগাড়াবাসীর ভাগ্য পরিবর্তন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ইতিমধ্যে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া নদীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ, জনগুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ব্রীজ, কালভার্ট এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মানে আরো কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ১৩৭ বছর পূর্বে ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত কালের স্বাক্ষী ঐতিহ্যবাহী সাতকানিয়া আদালত প্রতিষ্ঠিত হলেও এর অবকাঠামোগত উন্নয়নে কোন কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি সাতকানিয়া আদালত ভবনের আধুনিকায়ন, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে আইন মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন বলে আশ্বাস প্রদান করেন।
সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে আজ ১১ জুন, রবিবার দুপুর ২ টায় সাতকানিয়া আদালত ভবন সম্প্রসারণ-নির্মাণ কাজের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন ও সুধী সমাবেশে ড. আবু রেজা নদভী এমপি উপরোক্ত কথাগুলো বলেন। সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট আব্দুর রকিব চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন কচিরের সঞ্চালনায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাতকানিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাস্টার ফরিদুল আলম, সাতকানিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড. সুনিল বড়–য়া, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক, এডভোকেট তাজুল ইসলাম চৌধুরী, এডভোকেট মাহমুদুর রহমান, এডভোকেট হাফিজুল ইসলাম মানিক, এডভোকেট আশীষ কুমার দত্ত, এডভোকেট মোহাম্মদ শাহেদ, এডভোকেট রাজিয়া সুলতানা, এডভোকেট রাশেদুল ইসলাম, চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের সদস্য জসিম উদ্দিন, মাদার্শা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আ ন ম সেলিম চৌধুরী, আমিলাইশ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এইচ এম হানিফ, সাতকানিয়া পৌরসভার প্যানেল মেয়র এ.কে.এম. মোরশেদ, উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাহাবুদ্দীন প্রমুখ।

উপসাগরীয় অঞ্চলে বিভেদের নতুন রেখা by তামীম রায়হান

কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই আকস্মিকভাবে ৫ জুন ভোর থেকে একে একে কাতারের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দেয় সৌদি আরব, আমিরাত, বাহরাইন ও মিসর। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করে দেওয়া হয় স্থলযোগাযোগ, আকাশ ও সমুদ্রপথের সংযোগ। এমন সংবাদে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে কাতারবাসী। সামরিক লড়াই শুরু হওয়ার আগে শেষ মুহূর্তের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার মতো ঘটনাগুলো ঘটছিল খুব দ্রুত। বেলা গড়ানোর আগে বিভেদরেখা স্পষ্ট হয়ে পড়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের ছয়টি দেশের সম্মিলিত সংগঠন জিসিসিতে। একদিকে সৌদি আরব, বাহরাইন ও আরব আমিরাত, অন্যদিকে কুয়েত ও দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ দেশ ওমান থাকে নিরপেক্ষ অবস্থানে—একা হয়ে পড়ে কাতার।
সৌদি আরব কাতারের বিরুদ্ধে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত ব্যাপক করার লক্ষ্যে সৌদি সামরিক জোটে অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। একই ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় আরব আমিরাত ও বাহরাইন। ফলে কাতারের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা আসে মরিশাস, মালদ্বীপ, ইয়েমেন, লিবিয়া এবং মৌরিতানিয়া ও কমরোস দ্বীপপুঞ্জ থেকেও। আর সম্পর্কের মাত্রা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে জর্ডান ও জিবুতি। সর্বশেষ দোহা থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছে নাইজেরিয়া।
কিন্তু কাতারের এই একাকিত্ব বেশিক্ষণ থাকেনি। দুদিন গড়াতেই বেশ কয়েকটি দেশ কাতারের পক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করে। সামরিক সৈন্য ও নিত্যপণ্য সরবরাহের ঘোষণা দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান অস্থিরতায় মূল কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে তুরস্ক। কাতারের বাজারে সৌদি আরবের দুগ্ধজাত পণ্য তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান ‘আলমারাই’র জায়গা দখল করে নেয় তুরস্কের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। সৌদি আরব তার রপ্তানির অন্যতম বাজার কাতার হারালেও এ সুযোগ কাজে লাগায় তুরস্ক। পণ্য আসতে শুরু করে ইরান, আলজেরিয়াসহ অন্য বেশ কিছু দেশ থেকে। কাতারে তুরস্কের সামরিক ঘাঁটিতে ১৫ হাজার সৈন্য পাঠানোর প্রতিক্রিয়ায় সৌদি বিশ্লেষকেরা দাবি জানাচ্ছেন, সৌদি আরব যেন তুরস্কের বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দিদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে।
কাতারকে কেন্দ্র করে এই পরিস্থিতি এবারই প্রথম নয়। ২০১৪ সালেও এ দেশগুলো নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সেই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে কাতার। এরপর ২০১৬ সালে দুই দফা কাতার সফরে আসেন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান। সর্বশেষ সৌদি আরবে অবস্থিত আরব-আমেরিকান-ইসলামি সম্মেলনেও যোগ দেয় কাতার। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের দমনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটেও সৈন্য পাঠায় কাতার। এমন পরিস্থিতিতে পুরো সম্পর্ক পাল্টে দেয় ২৩ মে দিবাগত রাতে কাতার নিউজ এজেন্সির ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের দুর্ঘটনা।
কাতারের আমির ২৩ মে আলউদাইদ ঘাঁটিতে সামরিক সদস্যদের এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি কোনো বক্তৃতা করেননি। সুযোগসন্ধানীরা বেছে নেয় এ দিনটিকে। ২৩ মে রাতে হ্যাক করার পর প্রচারিত বার্তায় বলা হয়, কাতারের আমির আলউদাইদ ঘাঁটিতে সৈন্যদের অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেছেন।
এতে কাতারের আমিরের নাম ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশগুলো সম্পর্কে এমন কিছু মন্তব্য প্রকাশিত হয়, যা নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে। ২৪ মে কাতারের সরকারি দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, কাতারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম হ্যাকিংয়ের শিকার হয়েছে এবং এটি নিয়ে তদন্ত চলছে। যেসব বক্তব্য ও বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে, কাতার সেগুলো আগাগোড়া অস্বীকার করে।
এ সুযোগ চরমভাবে লুফে নেয় সৌদি-আমিরাতের গণমাধ্যম। হ্যাকিংয়ের মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে দেশ দুটোর টিভি স্ক্রলে আসতে শুরু করে কাতারের আমিরের ভুয়া বিবৃতি। এরপর মধ্যরাতে লাইভে আসতে শুরু করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা এবং এসব উসকানিমূলক বিবৃতিকে তাঁরা জঘন্য ও কাতারের সীমা লঙ্ঘন বলে জোর প্রচারণা শুরু করেন। হ্যাকিং সম্পর্কে কাতারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অন্যান্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও সৌদি-আমিরাত ও মিসরের গণমাধ্যম সেসব সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলে। এ প্রচারণা ও তথ্যযুদ্ধ চলে ১২ দিন।
এরই মধ্যে ২ জুন সৌদি আরব সফরে যান আরব আমিরাতের যুবরাজ মুহাম্মদ বিন জায়েদ। একই দিন কাতার ঘোষণা করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত সংস্থা এফবিআই কাতারকে হ্যাকিং তদন্তে সহযোগিতা করছে। ৩ জুন হ্যাক করা হয় ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল ওতাইবার বেশ কিছু ই-মেইল। হ্যাকাররা নিজেদের গ্লোবাল লিকস নামে পরিচয় দেয়।
৫৫ পৃষ্ঠার এসব ই-মেইল ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মে মাস পর্যন্ত মার্কিন বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়। এতে আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূতের কাতার সম্পর্কে বেশ কিছু বিরূপ মন্তব্য ছিল। বিশেষ করে আলউদাইদ ঘাঁটি সরিয়ে নিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ ও প্ররোচিত করেন আল ওতাইবা। এক বার্তায় তিনি বলেন, তোমরা কাতারকে জাহান্নামের স্বাদ বুঝিয়ে দাও। এই ই-মেইল ফাঁসের পর কাতার স্তম্ভিত হয়ে পড়ে, ভ্রাতৃপ্রতিম ও প্রতিবেশী দেশ আরব আমিরাতের আচরণে।
আরব আমিরাত এসব ই-মেইলের সত্যতা অস্বীকার করেনি। বরং এসব নিয়ে আল জাজিরা যখন বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু করে এবং পরিস্থিতি ক্রমেই আরব আমিরাতের প্রতিকূলে যেতে থাকে, তখনই আসে চূড়ান্ত পদক্ষেপ। ৫ জুন ভোর থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় কাতারকে। অভিযোগ তোলা হয়, কাতার এ অঞ্চলে জঙ্গিবাদ প্রচার করছে এবং উগ্রপন্থীদের আশ্রয় দিচ্ছে।
পবিত্র রমজানে কাতারকে বয়কট করার এমন আকস্মিক ঘোষণায় অবাক হয়ে পড়ে উপসাগরীয় অঞ্চলবাসী। সৌদি, আমিরাত ও বাহরাইনে অধ্যয়নরত কাতারি শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাবর্ষ অসম্পূর্ণ রেখে কাতারে ফিরে এসেছেন তাঁরা। এক কাতারি স্বামীকে দুবাইয়ে তাঁর আমিরাতি স্ত্রীর কাছে যেতে না দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে দুবাই। আবার ওই স্ত্রীকেও দোহা যেতে বারণ করেছে দুবাই কর্তৃপক্ষ। দোহায় স্বামী ও সন্তান ছেড়ে দুবাইয়ে একা পড়ে আছেন স্ত্রী, এমন অমানবিক আরও বেশ কিছু ঘটনা ঘটছে এই অঞ্চলে। পাশাপাশি যেসব কাতারি নাগরিকের সহায় সম্পত্তি আছে সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও বাহরাইনে, তাঁদেরও প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। এই সম্পর্কচ্ছেদের ফলে কেবল আঞ্চলিক বাণিজ্য বা কূটনীতির ক্ষতি নয়; বরং সাধারণ মানুষের পারিবারিক জীবন, শিক্ষাজীবন, কর্মজীবন এবং ব্যক্তিগত অধিকারের ক্ষেত্রগুলোতেও ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এক কাতারি মা সৌদি আরব থেকে ফিরে আসার সময় তাঁর কাছ থেকে প্রতিবন্ধী শিশুকে কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন, কারণ শিশুটির বাবা সৌদি নাগরিক হওয়ায় শিশুটিও সৌদি জাতীয়তার। ফলে তাকে ছাড়াই মাকে সৌদি আরব ত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। এমন চার শর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ অভিযোগ দায়ের করেছেন কাতারের জাতীয় মানবাধিকার কমিটির কাছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতিমধ্যে এক বিবৃতিতে এ পরিস্থিতির নিন্দা জানিয়েছে।
সর্বশেষ কাতারের সঙ্গে সম্পর্কিত ৫৯ জন ব্যক্তি ও ১২টি সংস্থাকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে তালিকা প্রকাশ করেছে সৌদি জোট। এ নিয়েও রয়েছে নানা কথা। তালিকায় ১৯ নম্বরে থাকা ব্যক্তি আল্লামা ইউসুফ আলকারজাভি আড়াই মাস আগেও সৌদি আরবে সম্মানিত অতিথি হিসেবে মক্কায় এক সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন, সৌদি গ্র্যান্ড মুফতির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহর কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন সৌদি আরবের সর্বোচ্চ পুরস্কার বাদশাহ ফয়সাল পদক। এ ছাড়া আরব আমিরাতের মাকতুম শাসক পরিবারের দেওয়া সম্মাননা এবং এক মিলিয়ন দিরহামের পুরস্কারও পেয়েছেন এই কারজাভি। এই তালিকায় আছেন সাংবাদিক, লেখক, বিশ্লেষক, ধর্মীয় পণ্ডিত ও সমাজকর্মী।
এই পরিস্থিতিতে যেকোনো মূল্যে আল জাজিরার কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করতে চায় সৌদি আরব। কাতারকে দেওয়া শর্তের তালিকায় প্রথমেই আছে এই চ্যানেলের নাম। তালিকায় রয়েছে আলআরাবি টিভি, আলআরাবিআলজাদিদ পত্রিকা, মিডলইস্ট আই এবং আরাবি টোয়েন্টি ওয়ান ওয়েবসাইটও বন্ধ করার শর্ত দেওয়া হয়েছে কাতারকে। আরও আছে হামাস ও ইখওয়ানের (মুসলিম ব্রাদারহুড) নেতাদের কাতার থেকে বহিষ্কার ও তাঁদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করার শর্ত। তেহরানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অভিন্ন পন্থা মেনে চলার দাবিও মেনে নিতে চাপ দেওয়া হচ্ছে কাতারকে। এসবের জবাবে কাতার এখন পর্যন্ত বলে আসছে, পররাষ্ট্রনীতিতে কারও চাপিয়ে দেওয়া উপদেশ তারা মানবে না।
সাড়ে ১১ হাজার বর্গকিলোমিটারের ছোট দেশ কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ। ২০২২ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজক কাতারে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। দিন দিন উদার ও সাহসী হয়ে ওঠা কাতারের পররাষ্ট্রনীতিকে তাই রুখতে চাইছে সৌদি-আমিরাত জোট। ইসরায়েলের দৌরাত্ম্যের চেয়ে এই অঞ্চলের কনিষ্ঠতম আমির এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমকে থামিয়ে দেওয়াই মনে হয় তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিরূপ পরিস্থিতিতেও আরব আমিরাতকে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে কাতার। আবুধাবির বিদ্যুৎ উৎপাদনে অর্ধেক গ্যাসের জোগান দিচ্ছে কাতারের প্রতিষ্ঠান ডলফিন।
একই ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জীবনাচারের দেশগুলোর মধ্যে যে বিভেদরেখা টেনে দিচ্ছে সৌদি আরব, তাতে করে উপসাগরীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক আবহ পাল্টে যাচ্ছে। জিসিসি সংস্থাটির আর কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি কেউ কেউ বলছেন, আরব আমিরাত ও সৌদি আরবকে উসকে দিয়ে সুবিধা হাতিয়ে নিতে চাচ্ছে সুযোগসন্ধানী মিসর। খুশি ইসরায়েলও। সাধারণত আরবদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে কোনো পক্ষাবলম্বন না করার যে নীতি ছিল ইসরায়েলের, তা ভুলে কাতারের বিরুদ্ধে মনোভাব প্রকাশ করেছে দেশটি।
কাতার চেষ্টা করছে, আলোচনার টেবিলে এই সমস্যার সমাধান হোক। কিন্তু কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি-আমিরাত ও বাহরাইনের জঙ্গিবাদের অপবাদ ও তথ্যসন্ত্রাসের আশ্রয় নেওয়া উপসাগরীয় অঞ্চলে কী ধরনের ফলাফল বয়ে আনবে, এর ওপর নির্ভর করছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতির অনেক কিছুই।
তামীম রায়হান, প্রথম আলোর কাতার প্রতিনিধি

ট্রাম্পের বৃটেন সফর বাতিল চান জেরেমি করবিন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বৃটেন সফর বাতিল করার পক্ষে মত দিয়েছেন বিরোধী লেবার দলের নেতা জেরেমি করবিন। তিনি এক টুইটে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাষ্ট্রীয় সফর বাতিল করাকে স্বাগত জানাই। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে অস্বীকৃতি ও লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের সমালোচনা করার কারণে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অবস্থান নিয়েছেন করবিন। তিনি টুইটে আরো বলেছেন, লন্ডনের মেয়র ও প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের কারণে তিনি এমন অবস্থান নিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। বৃটেনের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে বেশ জনপ্রিয় নেতা জেরেমি করবিন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র প্রধানমন্ত্রিত্বকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন। নির্বাচনে তাকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ করে দিয়েছেন। পরক্ষণেই তিনি তেরেসা মে’কে পদত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনিই এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৃটেন সফর সরকারিভাবে বা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয় নি। তবে এ সফর নিয়ে জন অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে এমন আশঙ্কায় তা আপাতত স্থগিত আছে। লন্ডন ব্রিজ হামলার পর মন্তব্যের কারণে করবিন ছাড়াও ট্রাম্পের সফর বাতিল করার পক্ষে মত দিয়েছেন আরো কিছু এমপি। ওই সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প টুইট করে বলেছিলেন, সন্ত্রাসী হামলায় কমপক্ষে ৭ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত হয়েছেন। লন্ডনের মেয়র বলছেন, উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। তার এ টুইটকে ভুল বলে উল্লেখ করেছেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। ট্রাম্পের বৃটেন সফর বাতিল করার দাবি জানান লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান তেরেসা মে। ওই সফরের সময় তিনি ট্রাম্পকে বৃটেন সফরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন ট্রাম্প। তবে এ সফরের সরকারি কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয় নি।

দৃক গ্যালারির কর্মকর্তা খুন: রহস্যের জট খোলেনি এক বছরেও

দৃক গ্যালারির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ১ বছর পেরুলেও রহস্যের জট খোলেনি। তাকে কি কারণে এবং কারা এ হত্যা করেছে তা উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। নিহতের স্বজনরা দাবি করেছেন, পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
২০১৬ সালের ৩রা এপ্রিল ধানমন্ডির ৮ নম্বর সড়কের ডাচ্‌-বাংলা ব্যাংকের শাখা থেকে ৩ লাখ টাকা তুলে বাইরে বের হন। এরপরই তিনি নিখোঁজ হন। একদিন পর ৪ঠা এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি বিলের একপাশের ঝোঁপ থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা, দুর্বৃত্তরা অন্য কোথাও তাকে হত্যা করে লাশ সেখানে ফেলে যায়।
ওই ঘটনায় নিহতের বড় ভাই ইমদাদুল হক বাদী হয়ে ৪ঠা এপ্রিল রাতে কলাবাগান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর-২। মামলা অজ্ঞাতনামাদের আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ইরফানুলকে খুনের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণের ব্যাপারে তারা অবগত নন। পুলিশ মামলাটি প্রথমে ডিবিতে স্থানান্তর করেন। ডিবি পুলিশ পরে সিআইডিতে স্থানান্তর করেন।
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এসআই আসাদ মুন্সি জানান, এ হত্যাকাণ্ডের কোনো ক্লু পাওয়া যায়নি। আমরা চেষ্টা করছি। খুনের ক্লু বের হলেই এ ঘটনার হোতারা চিহ্নিত হবে। এতদিন ধরে খুনের ক্লু না পাওয়ার কারণ কি প্রশ্নে তিনি বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা একাধিকবার ছুটিতে ছিলেন। এছাড়াও এটি একটি জটিল মামলা। এ কারণে সময় লাগছে।
নিহতের বড় ভাই ইমদাদুল হক মানবজমিনকে জানান, পুলিশ খুনের রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয়েছে। সিআইডি পুলিশও এর রহস্য উদঘাটন করতে পারছে না। তাহলে আমরা কার কাছে যাবো? তিনি জানান, আমার ভাইকে কেন এবং কারা খুন করেছে এখন পর্যন্ত কিছুই জানতে পারলাম না।  আমার ভাই ছিল অত্যন্ত ভদ্র ও নম্র। অত্যন্ত শিল্পীমনা মানুষ ছিল সে। আমাদের জানামতে তার কোনো শত্রু ছিল না। আমার ছোট ভাই খুন হওয়ার পর পুরো পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে গেছে। তিনি হত্যাকারীদের শাস্তি দাবি করেন।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, যে ব্যাংক থেকে ইরফানুল টাকা তুলেছিলেন ওই ব্যাংকের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছিল পুলিশ। তার ব্যাংকে প্রবেশ করা এবং টাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে সিসি ক্যামেরায় দেখা গেছে। এরপর তিনি ব্যাংক থেকে বের হয়ে যান। নিহতের লাশ উদ্ধারের সময় চোখে ও মুখে মলমের গন্ধ ছিল। পুলিশের ধারণা, ইরফানুল ইসলামের টাকা লুটে নেয়ার জন্য একটি চক্র ব্যাংক থেকেই তার পিছু নিয়ে থাকতে পারে। পরে তার টাকা লুটে নিয়ে হত্যা করে নারায়ণগঞ্জে ফেলে রেখে যেতে পারে। এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জের কোনো অপরাধীচক্র জড়িত থাকতে পারে কিনা তা পুলিশ খতিয়ে দেখছে।
সিআইডি সূত্রে জানা গেছে, নিহতের গাড়িচালক ওই কর্মকর্তাকে ব্যাংকে ঢুকতে দেখেছেন। পরে চালক গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েন। এরপর গাড়িচালক ব্যাংক থেকে ওই কর্মকর্তাকে আর বের হতে দেখেননি। কোনো ফোনও দেননি। এতে তিনি ব্যাংক থেকে বের হয়ে কোনদিকে গেছেন তা গাড়িচালক পুলিশকে জানাতে পারেননি। এ ঘটনায় নিহতের গাড়িচালক এবং সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। কিন্তু তাদের কাছে খুনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র আরো জানায়, পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের পর পুলিশ তার পারিবারিক ও প্রতিষ্ঠানিক কোনো বিরোধ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে। কিন্তু এ বিষয়ে পুলিশ তেমন কোনো তথ্য পায়নি। পুলিশের ধারণা, ডাকাত বা ছিনতাইকারী কোনো চক্র ইরফানুলকে হত্যা করে থাকতে পারে। ইরফানুল হাজারীবাগ থানাধীন জিগাতলায় ১৫/১ নম্বর রোডের ৫৮ নম্বর বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়ায়।

শিক্ষা যখন চাকরিতে বাধা by এমএম মাসুদ

আসলাম আলম। রাজধানীর পরিবাগের একটি মেসে থাকেন। গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। এখান থেকেই ২০০২ সালে এসএসসি এবং ২০০৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। ২০১৪ সালে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করেন। বাবা-মা নেই। ৫ ভাইয়ের মাঝে সবার ছোট আসলাম। মাস্টার্স পাস করার পর গত তিন বছরের মাঝে একটি এনজিওতে কিছু দিন কাজ করেছেন। এর আগে টিউশনি করে চলেছেন। এখন তিনি কিছুই করছেন না। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে চলছেন। বিসিএস ও অন্যান্য চাকরির জন্য পড়াশোনা করেছেন। ইতিমধ্যেই বিসিএসসহ বেশ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকে চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়েছেন। একই মেসে থাকেন আশিকুর রহমান। তিনি ২০১৩ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে অনার্স-মাস্টার্স পাস করেছেন। বিসিএসসহ বিভিন্ন ব্যাংকে চাকরির জন্য পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু ডাক পাননি। চার বছর ধরে তিনি কর্মহীন। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। বড় ভাইয়ের পাঠানো অর্থেই চলে তার মেসজীবন।
এরকম হাজারো শিক্ষিত কর্মহীন চাকরি পাচ্ছেন না। নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়ায় অনেকে স্বেচ্ছা বেকার জীবন বেছে নিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ নিচু পদে চাকরি নিয়ে টিকতে না পেরে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন। এ ছাড়া কেউ কেউ নিম্ন পদে চাকরি নিয়ে গ্রামে যেতে চান না। তাই তারা রাজধানীতে অবস্থান করে ভালো চাকরির আশায় সময় পার করছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, চাকরির জন্য উপযোগী শিক্ষা না পাওয়ার কারণে উচ্চ শিক্ষিতদের বেকারত্ব বাড়ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রম শক্তি জরিপ ২০১৫-১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২ বছরে দেশে ১৪ লাখ কর্মসংস্থান হয়েছে, যা ৪.২ শতাংশ। তবে ২০১৩ সালের মতো এখন ২৬ লাখ বেকার রয়েছে। অর্থাৎ বেকার সংখ্যা অপরিবর্তিত আছে। উচ্চ শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ৯ শতাংশ।  অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের তথ্যে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধির পরও নতুন কর্মসংস্থান হ্রাস পেয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৭ শতাংশ। সেটা ২০১০-১৫ সময়কালে কমে দাঁড়িয়েছে ১.৮ শতাংশে। তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থান প্রায় স্থবির হয়ে আছে। বিশ্লেষকরা জানান, বাংলাদেশের শিল্প খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও কর্মসংস্থান কমেছে। এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণে জাতীয় সমন্বিত কর্মসংস্থান কর্মকৌশল গ্রহণ, প্রযুক্তি নির্ভর গুণগত শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে। তাদের মতে, আবার এমনিতেই চাকরি কম হচ্ছে। এর মধ্যে যাদের বয়স ৩০-এর বেশি, তাদের চাকরি পেতে তুলনামূলক সমস্যা কম হয়। কিন্তু ১৫ থেকে ২৯ বছরের যারা, তাদের ব্যাপক প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে। ফলে তরুণদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হচ্ছে।
ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেশে বিবিএ ও এমবিএ করা শিক্ষিত শ্রমশক্তি আছে। কিন্তু সেগুলো কাজে লাগছে না। দেশে দক্ষ জনশক্তির বিপুল অভাব রয়েছে। শিল্প-কারখানায় ব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তা দেশে একেবারে তৈরি হচ্ছে না। এজন্য এখন সময় এসেছে বিদ্যমান শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে বাজারমুখী কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করার। এ ছাড়া শিল্প খাতে বিভিন্ন প্রণোদনা, কর অব্যাহতিসহ বিভিন্ন নীতিসহায়তা দিতে হবে।  সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশেষ ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রবৃদ্ধি হচ্ছে উৎপাদনশীলতার মাধ্যমে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। যেহেতু এর সঙ্গে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা জড়িত। অর্থনীতিতে যে ধরনের বৈচিত্র্যায়ণ দরকার, যার মাধ্যমে অধিক সংখ্যক মানুষকে কর্মসংস্থান দেয়া যাবে, সেখানে বড় ধরনের বিচ্যুতি রয়েছে। এজন্য রপ্তানি বৈচিত্র্যায়ণ করে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। দক্ষ শ্রমিক বাড়াতে হবে। রাজস্ব পলিসি, প্রণোদনা পলিসি, রেগুলেটরি পলিসি ও ডুয়িং বিজনেস কস্ট কমাতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হলেও কাঙ্ক্ষিত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান হচ্ছে না বাংলাদেশে। তাছাড়া বিপুলসংখ্যক নারী রয়েছে শ্রমশক্তির বাইরে। মানসম্মত চাকরির অভাব রয়েছে। বিশেষ করে মহিলাদের ক্ষেত্রে। কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ আর কর্মক্ষম পুরুষের ৩৫ শতাংশ কৃষিকাজ করে। বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক মনে করে, কর্মসংস্থান বাড়ানোর ক্ষেত্রে ৫ ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কর্মে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি বাড়ানো, তরুণদের কর্মের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে অধিক প্রতিযোগিতা হ্রাস এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান গুটি কয়েক দেশে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন বাজার তৈরি। এদিকে বিবিএস নতুন শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে ১৪ লাখ নতুন শ্রমশক্তি দেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হয়েছে, কর্মসংস্থানও হয়েছে ১৪ লাখ। বেকারত্বের হার ৪.৩ থেকে কমে ৪.২ শতাংশ হয়েছে। এর পরও দেশে বেকারত্বের সংখ্যা ২৬ লাখ। এর মধ্যে ডিগ্রিধারী প্রতি ১০০ জনে ৯ জন বেকার; যা শতাংশের হিসাবে উচ্চ শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ৯ শতাংশ।
বেকারত্বের এই হিসাব আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) দেয়া মানদণ্ড অনুযায়ী, সপ্তাহে এক ঘণ্টা কাজ না করলে ওই ব্যক্তিকে বেকার হিসেবে ধরা হয়। সে হিসাবে বাংলাদেশে সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কাজ করতে পারেন না এমন বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ।
বিবিএস প্রতিবেদন মতে, কোনো ধরনের শিক্ষার সুযোগ পাননি, এমন মানুষের মধ্যে মাত্র ২.২ শতাংশ বেকার। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী কর্মক্ষম তরুণ-তরুণীর মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি বেকার। জরিপ অনুযায়ী, এখন বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ। নারীদের বেকারত্বের হার ৬.৮ শতাংশ এবং পুরুষদের ৩ শতাংশ। নারী ও পুরুষ উভয়েই ১৩ লাখ করে বেকার।
উচ্চ শিক্ষিতদের মাঝে ১২.১ ভাগ বেকার। তাদের মধ্যে নারীদের হার বেশি, ১৫ শতাংশ। শহর অঞ্চলে বেকারত্বের হার (৪.৪%) গ্রামের তুলনায় (৪.১%) বেশি। দেশের কর্মক্ষম নারীদের ৬.৮ ভাগ বেকার, পুরুষদের মধ্যে ৩ শতাংশ বেকার।
বিবিএসের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কাজ করেন এমন মানুষের সংখ্যা ৫ কোটি ৯৫ লাখ। এর আগের ২০১৩ সালের জরিপে এই সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৮১ লাখ। এক দশকের ব্যবধানে কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সোয়া এক কোটি। ২০০৬ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, তখন দেশে ৪ কোটি ৭৪ লাখ কর্মজীবী মানুষ ছিলেন। ২০১০ সালে এসে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ কোটি ৪১ লাখে। ওই সময়ে বছরে গড়ে ১৩ লাখ ৪০ হাজার বাড়তি কর্মসংস্থান হয়েছে।
দুই বছরের ব্যবধানে নারী ও পুরুষ উভয়ের গড় মজুরি বা আয় বেড়েছে। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, পুরুষদের চেয়ে নারীরা কম আয় করেন। নারীদের গড় আয় ১২ হাজার ১০০ টাকা। ২০১৩ সালে আয় ছিল ১০ হাজার ৮১৭ টাকা। এখন একজন পুরুষ গড়ে ১৩ হাজার ১০০ টাকা আয় করেন, দুই বছর আগে ছিল ১১ হাজার ৭৩৩ টাকা।