Thursday, January 1, 2015

আজকের লাইগা বিরোধী দল, এমনিতে সরকার by একরামুল হুদা ও মাহবুবুল হক ভুঁইয়া

(প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সারা দেশ থেকে এই গাড়িতে করেই এসেছেন নেতা-কর্মীরা। ছবি: মনিরুল আলম) নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে জাতীয় পার্টির মহাসমাবেশে এসেছেন শুক্কুর মিয়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সামনে রাখা একটি বাসে বসে ছিলেন তিনি।
সমাবেশে না গিয়ে বাসে বসে আছেন?
‘আমি তো জাতীয় পার্টি করি না। আওয়ামী লীগ করি। তাই বসে আছি।’
তাহলে এসেছেন কেন?
‘আমরা তো একই, তাই আসছি। বন্ধুবান্ধব অনেকেই আসছে তো, তাদের সঙ্গে আসছি। তবে এখন ভেতরে যেতে ইচ্ছে করছে না।’
তাঁর মতো আরও কেউ এসেছে কি না, জানতে চাইলে শুক্কুর মিয়া বললেন, ‘আমাদের গাড়িতে আট-দশজন এসেছে। অন্যান্য গাড়িতেও এসেছে।’ এরপর থেমে বললেন, ‘কম না, আওয়ামী লীগের লোক ভালোই আসছে।’
ঢাকার উত্তরা থেকে জাতীয় পার্টির সমাবেশে এসেছেন পেশায় রাজমিস্ত্রি মো. মহসিন। তিনি এসেছেন দলের প্রতি ‘ভালবাসা’ থেকে। জাতীয় পার্টির বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘এখনো বিরোধী দল হয় নাই, হইব।’
জাতীয় পার্টির ২৯তম জন্মদিন উপলক্ষে আজ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করেছে দলটি। এতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মহসিনের মতো দলের প্রতি ‘ভালোবাসা’ থেকে এসেছেন এমন শতাধিক লোকের সঙ্গে কথা হয়। দলকে ‘ভালোবেসে’ সমাবেশে এলেও তাঁদের অনেকেই জানেন না জাতীয় পার্টি সরকারি দলে, না বিরোধী দলে আছেন।
শ্যামপুরের একটি বেভারেজ কোম্পানিতে কাজ করেন একজন শ্রমিক হেমায়েত মোল্লা। তিনি এসেছেন ঢাকা-৪ আসনের সাংসদ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার এলাকা থেকে। বলেন, ‘পার্টি সরকারি দলে। রওশন এরশাদ সরকারের সঙ্গে মিশছে। বাবলাও সরকারের সঙ্গে মিশে এমপি হইছে।’
কেরানীগঞ্জ থেকে আসা মো. আমিনও মনে করেন জাতীয় পার্টি সরকারি দলে আছে। বলেন, ‘শেখ হাসিনার সঙ্গে আছে না!’ নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পরিবহন শ্রমিক মো. শহীদ, সুজন, রাহুল, মোক্তার হোসেন, রিয়াজসহ আরও অনেকেই মনে করেন, জাতীয় পার্টি সরকারেই আছে। সুজন বলেন, ‘আজকের লাইগা বিরোধী দল, এমনিতে সরকার।’
তবে ময়মনসিংহ থেকে আসা মোজাম্মেল হক, হুমায়ুন কবীর, ঢাকার জুরাইন থেকে আসা ফজলে রাব্বী, জিয়াদ হাসান, শরীফ, অভিসহ এমন অনেকেই ছিলেন যাঁরা জানেনই না জাতীয় পার্টি সরকার না বিরোধী দলে। সায়েদাবাদ থেকে আসা লিপি আক্তার যেমন বললেন, ‘রাজনীতির যে মারপ্যাঁচ তা আমার বুঝে আসে না, জাতীয় পার্টি সরকার দলে, না বিরোধী দলে আছে।’
উত্তরার নির্মাণশ্রমিক মো. হিরু সমাবেশে আসেন এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে। জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, ‘রাজনীতির মধ্যে নাই, তাই এমন কিছু বুঝিও না।’ আজকে দলের প্রতি ‘ভালোবাসা’ থেকে এলেও তিনি জানান এর আগে অন্য এক বড় ভাইয়ের সঙ্গে এসেছিলেন আওয়ামী লীগের সমাবেশে।
জাতীয় পার্টি বিরোধী দলে আছে, এমনটা বলেছেন এ রকম মানুষও পাওয়া গেছে। রংপুরের গঙ্গচড়া উপজেলার লক্ষীটারি ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, যুব সংহতির সহসভাপতি জাহিদুর রহমান এবং সাহিত্য-পাঠাগার সম্পাদক কফিল উদ্দিনের মতো যাঁরা দলের কোনো না কোনো পদে আছেন, তাঁদের মতে জাতীয় পার্টি বিরোধী দলেই আছে।
সোহরাওয়ার্দীর আশেপাশেই ২০০ যানবাহন
এসব সাধারণ লোকজন দলের ভাড়া করা গাড়িতে এসেছেন। কথা হচ্ছিল ঢাকা-গাজীপুর পথের বলাকা বাসের চালক ওমর ফারুকের সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘ভাড়া পাব কি না, জানি না। সকালে যাত্রী নিয়ে টঙ্গী যাচ্ছিলাম। পার্টির লোকেরা গাড়ি আটকে নিয়ে এসেছে।’ তিনি জানালেন, এভাবে অনেক বাসই টঙ্গী থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
তবে সবার অবস্থা এমন নয়। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টির মহাসমাবেশে আসা প্রায় সব যানবাহনই এসেছিল ভাড়ায়। তবে দূরপাল্লার যানবাহন তুলনামূলক কম ছিল, রাজধানীর আশপাশের নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ থেকে আসা যানবাহনের সংখ্যাই ছিল বেশি ।
মৎস্য ভবন থেকে শিল্পকলা একাডেমী পর্যন্ত রাস্তায় ৫০ থেকে ৬০টি, হাইকোর্ট মোড় থেকে শাহবাগ পর্যন্ত প্রায় দেড় শটি, বাংলা একাডেমির সামনের রাস্তায় ২০টি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খেলার মাঠের সামনের রাস্তায় ১৫টির মতো সমাবেশে আসা গাড়ি দেখা গেছে। তবে এসব এলাকা ছাড়াও রাজধানীর প্রবেশমুখে বিভিন্ন জায়গায় সমাবেশে আসা গাড়ি রাখা হয়েছে বলে বাসচালকেরা জানিয়েছেন।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকেই প্রায় ২০০ বাস নিয়ে আসা হয়েছে বলে একাধিক বাসচালক জানিয়েছেন। তাঁরা জানান, বাসপ্রতি ভাড়া দেওয়া হয়েছে তিন থেকে চার হাজার টাকা।
গাজীপুর থেকে আসা একাধিক বাসচালক জানান, ওই জেলা থেকে ৭০-৮০টি বাস এসেছে। গাজীপুর থানা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কমিটির সভাপতি বাবুল মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকায় এসব গাড়ি ভাড়া করা হয়েছে। ঢাকা-৪ আসনের সাংসদ সৈয়দ আবু হোসেন বাবলার নির্বাচনী এলাকা শ্যামপুর থেকে বাস-ট্রাক মিলিয়ে প্রায় ২০টির মতো যানবাহন নিয়ে আসা হয় মহাসমাবেশে।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া থেকে আলম-এশিয়া পরিবহনের সাতটি বাস নিয়ে আসা হয়েছে। এর একটির সহকারী সুমন জানালেন, প্রতিটি বাস ১৪ হাজার টাকায় ঠিক করা হয়েছে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে রংপুর থেকে আসা চারটি বাস রাখা ছিল। এর দুটি আল ইমরান পরিবহনের, অন্যটি এমকে এন্টারপ্রাইজের। আল ইমরানের একটি বাসের চালক কালাম মিয়া জানালেন, প্রতিটি ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে এসব বাস নিয়ে আসা হয়েছে।
সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি: মহাসমাবেশে আসা গাড়িগুলো রাজধানীর হাইকোর্ট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত একপাশের রাস্তায় সারিবদ্ধ রাখা হয়। ফলে হরতালের মধ্যে বন্ধ করে দিতে হয় একপাশের রাস্তা। এতে প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শাহবাগ পর্যন্ত রাস্তায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়, ভোগান্তিতে পড়ে সাধারণ যাত্রীরা।
রাস্তাজুড়ে উচ্ছিষ্ট: মহাসমাবেশে আসা লোকজনকে দুপুরের খাবার হিসেবে বিরিয়ানি দেওয়া হয়। সোহরাওয়ার্দীর উদ্যানের আশপাশে রাখা যানবাহনেই এসব খাবার দেওয়া হয়। খাবার শেষে উচ্ছিষ্ট ও বিরিয়ানির প্যাকেট ফেলা হয় রাস্তায়ই। এর ফলে উদ্যানের আশেপাশের প্রায় সব রাস্তায়ই এসব পড়ে থাকতে দেখা যায়।

‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আসুন সবাই বসি’

সব দলের প্রতি আলোচনার আহবান জানিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, আসুন সবাই এক সঙ্গে বসি, কীভাবে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করা যায়, সে ব্যাপারে আলোচনা করি। আজ বিকালে জাতীয় পার্টির ২৯ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত মহাসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে বেলা ৩ টার দিকে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করে প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর উদ্বোধন করেন এরশাদ। তিনি বলেন, আমরা শ্রম বাজার চালু করেছিলাম, এখন শ্রম বাজার বন্ধ, আমরা আবার ক্ষমতায় আসলে শ্রম বাজার চালু করবো। তিনি বলেন, আমরা ছিলাম সংবিধান স্বীকৃত বৈধ সরকার। আমি দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা শুরু করেছি। দেশের মানুষ এখন যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কথা বলতে পারছে তার ভিত আমিই তৈরি করে দিয়েছি। এলজিইডি সৃষ্টি করে সকল কাঁচা রাস্তা পাকা করার ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছি। এখন দেশে কোন কাঁচা রাস্তা নেই। এদিকে সমাবেশ মাঠে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাংসদ কাজী ফিরোজ রশীদ এর সঙ্গে অপর প্রেসিডিয়াম সদস্য ফয়সাল চিশতীর তর্কাতর্কির ঘটনা ঘটেছে। ফিরোজ রশীদের সাংসদীয় এলাকা থেকে তার অনুসারীরা দুটি হাতি নিয়ে সমাবেশ স্থলে প্রবেশ করলে ফয়সাল চিশতীর সঙ্গে তার এ তর্কাতর্কি হয়। পরে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাদের শান্ত করেন। বক্তব্য রাখেন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, জিএম কাদের, মশিউর রহমান রাঙা, মুজিবুল হক চুন্নু, ঢাকা দক্ষিণ জাতীয় পার্টির সভাপতি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, প্রেসিডিয়াম সদস্য এম এ হান্নান, কাজী ফিরোজ রশীদ, জাপার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, সালমা ইসলাম, এসএম ফয়সল চিশতী, মীর আব্দুস সবুর আসুদ, সুনীল শুভরায় প্রমুখ। সভায় সভাপতিত্ব করেন মহাসমাবেশ প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু।
‘চেয়ারম্যানের নির্দেশে নির্বাচনে গিয়েছিলাম’ -রওশন এরশাদ
বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ বলেছেন, তার দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশে গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহন করেছিলেন তিনি। বিকালে দলের ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অশংগ্রহন করলে ভাল হত। হয়ত তারাও ক্ষমতায় যেত। দলে বিভক্তি চাই না উল্লেখ করে তিনি বলেন, একক শক্তি নিয়ে সামনে এগুতে চাই। যারা দল থেকে চলে গেছেন তাদের ফিরে আসার আহ্বান জানান রওশন এরশাদ। ২৪ বছর ধরে জাতীয় পার্টি কেন ক্ষমতার বাইরে এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, দলের ভেতরে ভুল কোথায়? ভুল খুঁজে বের করতে হবে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কাজ জুনে শেষ হবে -প্রধানমন্ত্রী

ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ আগামী জুনের মধ্যেই শেষ হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, অবকাঠামো নিয়ে কিছু সমস্যা আছে। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। রেল, সড়ক ও নৌপথকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সারা দেশকে একটি নেটওয়ার্কের মধ্যে আনার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ২০তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। বক্তব্যের শুরুতেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সবাইকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। একসময় গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা থাকলেও এখন ১৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আমরা অর্জন করেছি। দেশের ৬৮ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) বাণিজ্য উদারীকরণের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এসব পদক্ষেপ একদিকে যেমন আমাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তেমনি ব্যবসা বাণিজ্য আগের চেয়ে চ্যালেঞ্জিং হয়ে যাচ্ছে। আমাদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রস্তুতি নিতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে।’ বিএনপি-জামায়াতের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘হরতালের নামে বাসে-সিএনজিতে আগুন দেওয়া হচ্ছে। মানুষ পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। এর নাম আন্দোলন না। এটা খুন। বাংলাদেশের মানুষ আর খুনের রাজনীতি দেখতে চায় না।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি তাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাণিজ্যসচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান শুভাশীষ বসু ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে  ফিতা কেটে মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তিনি অন্য অতিথিদের সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি স্টলও ঘুরে দেখেন। এবারের বাণিজ্য মেলায় সব মিলিয়ে আছে ৫০০ স্টল, প্যাভিলিয়ন ও মিনি প্যাভিলিয়ন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ৩০ ও শিশুদের জন্য ২০ টাকা প্রবেশমূল্য। ৩১ জানুয়ারি মেলা শেষ হবে।

সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা হলেও লক্ষ্যগুলো অর্জিত হয়নি : ড. আকবর আলি খান by মোকাম্মেল হোসেন

যুগান্তর : ৫ জানুয়ারি ২০১৪ থেকে ৫ জানুয়ারি ২০১৫। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এ দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচন যাদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে, তারা তাদের ক্ষমতার মেয়াদ এক বছর পূর্ণ করতে চলেছে। ২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি সামনে রেখে আপনার মূল্যায়ন কী?
ড. আকবর আলি খান : ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য করা হয়েছে। যদি ৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হতো, কিংবা সুপ্রিমকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে অন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না যেত, তাহলে দেশে সাংবিধানিক শূন্যতা দেখা দিত। সেদিক থেকে এ নির্বাচন জরুরি ছিল। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা দেশ শাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংবিধানের আরও অন্যান্য লক্ষ্য রয়েছে। সংবিধানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। সংবিধানে বলা হয়েছে, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা দেশ শাসন করা হবে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এ লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। এ অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে সেটা স্বাভাবিক হতো। তা করা হলে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষা ছাড়াও অন্য যেসব লক্ষ্য আছে, সেগুলো অর্জন করা যেত। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। তারা বলছে, এ ধরনের কোনো আলোচনায় তারা আগ্রহী নয়। আমরা মনে করি, সরকার বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনা ও সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে যদি দ্রুত আরেকটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে, তাহলে সংবিধানের লক্ষ্যসমূহ অর্জিত হবে। অন্যথায় সংবিধানের আইন প্রতিপালিত হলেও সংবিধানের লক্ষ্যসমূহ প্রতিপালিত হবে না।
যুগান্তর : আপনি নতুন আরেকটি নির্বাচনের কথা বললেন। সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য হয় এ রকম একটি নির্বাচন পরিচালনায় বর্তমান নির্বাচন কমিশন কি সক্ষম?
আ. আ. খান : না। সেজন্যই আমার বক্তব্য হল, সবার সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে আলাপ-আলোচনা করে করা উচিত। সবাই অনড় অবস্থানে থাকলে সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে না। সমাধান খুঁজে বের করতে হলে সব দলের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হতে হবে। সরকার এটা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে করতে পারে। দুঃখজনক হল, এ ধরনের কোনো উদ্যোগ আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
যুগান্তর : সংবিধানের লক্ষ্যসমূহ অর্জিত হোক বা না হোক, শাসক দল এক বছর ধরে দেশ চালাচ্ছে- এটাই বাস্তবতা। এক বছরের শাসনকাল সামনে রেখে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের সাফল্য দাবি করছে বা করবে। যুগান্তরের পাঠক যদি আপনার চোখে সরকারের সাফল্যগুলো দেখতে চায়?
আ. আ. খান : বাংলাদেশে প্রতিটি সরকারের অনেক সাফল্য রয়েছে। অনেক ব্যর্থতাও রয়েছে। সরকারে থাকলে সব সময় সাফল্য দাবি করা হবে- এটাই স্বাভাবিক। ব্যর্থতার যে প্রশ্ন, সেটা তারা মানবে না। বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হয়েছে। এটা পৃথিবীর অনেক অনুন্নয়নশীল দেশের তুলনায় খুব ভালো। অন্যদিক থেকে দেখলে সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সে লক্ষ্যমাত্রা থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে খুব একটা সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক যতটুকু ছিল- ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। এর প্রমাণ হল- দেশে হরতাল, ধর্মঘট যাই হোক, প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হচ্ছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা আমাদের অর্থনীতির ভয়ংকর রকম ক্ষতি করলে এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতো না। বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে, একদিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। এর কারণ বাংলাদেশে যে উন্নয়ন চলছে, তাতে সরকারের ভূমিকা আছে ঠিকই, তবে তার চেয়েও অনেক বেশি ভূমিকা হল সাধারণ মানুষের। বাংলাদেশে কারা প্রবৃদ্ধি করছে? বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির বড় নায়ক হল প্রবাসে যে বাংলাদেশীরা রয়েছেন, তারা। প্রবাসী বাংলাদেশীরা বছরে প্রায় ১৬-১৭ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠাচ্ছেন।
যুগান্তর : রেমিটেন্সের এ অংক তো আনুষ্ঠানিক। অনানুষ্ঠানিক খাত যোগ করলে নিশ্চয়ই আরও বেশি হবে?
আ. আ. খান : হ্যাঁ। বিদেশ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা অর্থ যোগ করলে এ অংক আরও বেশি হবে। বৈদেশিক সাহায্যের সঙ্গে তুলনা করলে এর ব্যাপকতা বোঝা যাবে। আমরা বৈদেশিক সাহায্য পাই বড়জোর দুই বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ আগের ঋণ শোধ করতেই চলে যায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, সাকুল্যে প্রতিবছর আমরা যে ৭শ’ থেকে ৮শ’ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য পাই- সে তুলনায় প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থ অন্তত ২০ গুণ বেশি। আমাদের পোশাক খাত বিশ্বে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। পোশাক খাতে মূলত অবদান হল দেশের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত নারীদের। এর সঙ্গে গার্মেন্ট উদ্যোক্তারাও কিছুটা কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন। বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্রে সাফল্য অর্জিত হচ্ছে এবং এটা শুধু এ সরকারের আমলেই অর্জিত হয়েছে, তা নয়। ধারাবাহিকভাবে তিন বছরের বেশি সময় ধরে অর্জিত হচ্ছে। এ সাফল্যের নায়কও বাংলাদেশের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত কৃষক। এছাড়া ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে নারী সমাজের উদ্যোগ ও অবদান বেশি। তার মানে এ দেশের মানুষ অতি সৃজনশীল। বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। এজন্যই মূলত অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব তেমন একটা পড়েনি। এটা যে চিরদিনই বজায় থাকবে তা কিন্তু নয়। আমরা যখন অর্থনৈতিক দিক দিয়ে একটা পর্যায়ে উপনীত হব, তখন সুশাসনের অভাবে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি ব্যাহত হবে।
যুগান্তর : বর্তমান সরকারের ব্যর্থতা পরিমাপ করতে বললে আপনি কোন কোন ক্ষেত্র চিহ্নিত করবেন?
আ. আ. খান : সরকারের অর্থনৈতিক যে ব্যর্থতা, সেগুলোর ওপর আমি খুব বেশি গুরুত্ব আরোপ করি না। কারণ কোনো সরকারই অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জন করতে পারে না। সরকার মোটা দাগে বিদ্যুৎ খাতে কিছুটা সফল হলেও জ্বালানি খাতে ব্যর্থ হয়েছে। জ্বালানি খাতে নিদারুণ অপ্রতুলতার কারণে বিদ্যুৎ খাতেও তার প্রভাব পড়ছে। অন্যান্য অবকাঠামো খাতেও যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়নি। অবকাঠামোর দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক পেছনে পড়ে রয়েছে। তবে সরকার কাজ করছে। সরকারকে আমি একেবারেই কৃতিত্ব দেব না- সেটা না, কিন্তু যা করছে তা যথেষ্ট নয়।
যুগান্তর : আপনি অনুন্নত অবকাঠামোর কথা বললেন। প্রশ্ন হচ্ছে, সড়ক-বন্দর-বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো অবকাঠামোগুলোর উন্নয়ন করতে না পারলে বিনিয়োগে কাক্সিক্ষত সাফল্য পাওয়া যাবে কি? বিশেষ করে বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে?
আ. আ. খান : বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আপনি যেসব অবকাঠামোর কথা বললেন, সেগুলো অত্যাবশ্যক। এখন পর্যন্ত দেশী বিনিয়োগ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। কিন্তু একটু আগে যেটা বললাম- আমরা যখন অর্থনৈতিক উন্নতির একটা পর্যায়ে উপনীত হব, তখন এ অভাবগুলো আরও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেবে। ফলে আমাদের যে অগ্রগতি, সেটা ১০ বছর পর থেমে যাবে। কাজেই অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আমাদের হাতে আছে ১০ বছর সময়। আমাদের সামনে একটি সুযোগের জানালা খোলা আছে। এ সুযোগের জানালা হল- আগামী ১০ বছরের মধ্যে আমাদের অবকাঠামোগত ঘাটতিগুলো পূরণ করা। সরকার যদি এ ঘাটতি পূরণ করতে পারে, তবে অবশ্যই দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ এখানে আকৃষ্ট হবে।
যুগান্তর : অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি সুশাসন এবং আর্থিক খাতে শৃংখলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। এসব শর্ত পূরণ করতে হলে করণীয় কী?
আ. আ. খান : আর্থিক খাতে শৃংখলা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠাও সুশাসনের অঙ্গ। সামগ্রিকভাবে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুশাসন না থাকলেও অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে। যখন কোনো দেশ খুব নিু পর্যায়ে থাকে, তখন সুশাসনের অনুপস্থিতিতেও সেখানে অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব। যেমনটা বাংলাদেশের বেলায় ঘটছে। এর কারণ আমাদের এত সম্ভাবনা রয়েছে যে, তার কিছুটা বাস্তবায়িত হলেও দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়। যখন আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটা পর্যায়ে চলে যাব, তখন সুশাসন আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে পড়বে। তখন দেখা যাবে, আমাদের বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছে এবং অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। এটা ঠিক, এটা কতদিন পরে ঘটবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাবে না। আমার মনে হয়, আগামী ১০-১৫ বছর সুশাসনের অনুপস্থিতিতেও আমরা অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের কাজটি চালিয়ে যেতে পারব। এরপর দেখা যাবে, সুশাসনের অভাবে আর এগোনো যাচ্ছে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সামনে ১০-১৫ বছরের সুযোগের একটা জানালা খোলা আছে। যদি দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এ সময়ের মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে আমাদের অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে। অন্যথায় এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া আমাদের অর্থনীতির ওপর পড়বে।
যুগান্তর : তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি কি যৌক্তিক হারে ঘটছে?
আ. আ. খান : অতীতে সরকার এ সম্পর্কিত রেগুলেটরি কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সম্প্রতি সরকারি যে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়েছে, সেটার সঙ্গে আমি একমত নই। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এত কমে যাওয়ার পরেও বাংলাদেশে দাম বেশি রেখে যদি পেট্রোবাংলা লাভ করে, আবার সরকারও কর আদায় করে- তাহলে এর প্রভাব রফতানি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দেবে। বিদেশে জ্বালানির দামের তুলনায় আমাদের এখানে দাম অনেক বেশি হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য দাম কমানো উচিত। এ ব্যাপারে সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।
যুগান্তর : আমাদের এডিপি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে দাতাগোষ্ঠীর অসন্তোষ রয়েছে। বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রী নিজেও দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তারপরও বিভিন্ন প্রকল্প, বিশেষ করে বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে গতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। গতি আনতে হলে কী কী পদক্ষেপ নেয়া দরকার?
আ. আ. খান : গতি আনতে হলে সরকারের ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। আমাদের প্রকল্প ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। ধরুন, আমরা যখন টেন্ডার আহ্বান করি, টেন্ডারে লেখা থাকে- ৬ সপ্তাহের মধ্যে কার্যাদেশ দেয়া হবে। দু’তিন বছর আগে বিশ্বব্যাংক একটা সমীক্ষা করেছিল- সেখানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ টেন্ডারের কার্যাদেশ দেয়া সম্ভব হয়। বাকি ৮৮ শতাংশ টেন্ডার ফাইনাল করা যায় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব তৃতীয় শ্রেণীর ঠিকাদার ভিড় করে। তারা অধিক লাভের জন্য বিভিন্ন ধরনের অজুহাত তোলে। অহেতুক বিলম্ব করতে থাকে। কাজেই সরকারকে প্রকল্প বাস্তবায়ন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ঢেলে সাজাতে হবে। যারা এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই টেন্ডারের কার্যাদেশ চূড়ান্ত করতে হবে। ৬ মাস বা ৬ বছর লাগালে হবে না।
যুগান্তর : প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি কি একটি বড় বাধা নয়?
আ. আ. খান : শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি একটি বড় বাধা। আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি এত ব্যাপক মাত্রায় প্রসার লাভ করেছে যে, এ সমস্যার আশু সমাধানের উদ্যোগ নেয়া না হলে দেশের অগ্রগতি অবশ্যই ব্যাহত হবে। আশু সমাধানের একমাত্র উপায়- দুর্নীতিবাজদের ধরতে হবে। বিচার করতে হবে।
যুগান্তর : কে ধরবে? কে বিচার করবে? দেখা যাচ্ছে- দুর্নীতি দমন কমিশন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্তির সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছে!
আ. আ. খান : দেখুন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকারি দলের অনেকের বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরু করেছিল। এর ফলে তার ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হয়েছিল। কিন্তু তদন্ত শুরুর পর দেখা যাচ্ছে, সবাইকে দায়মুক্তির প্রত্যয়নপত্র দেয়া হচ্ছে। যদি দায়মুক্তিই তদন্তের উদ্দেশ্য হয়, তাহলে দুদকের ভাবমূর্তি যতখানি উজ্জ্বল হয়েছিল, এটা তো ম্লান হবেই, সাংঘাতিকভাবে অনেক নিচে নেমে যাবে।
যুগান্তর : তাহলে দুদকের ভূমিকা কী হওয়া উচিত? দুদক কীভাবে কাজ করবে?
আ. আ. খান : দুদকের ভূমিকা হবে দুর্নীতিবাজদের ধরা। তাদের বিচারের সম্মুখীন করা। এটাই দুদকের কাজ।
যুগান্তর : পক্ষপাতবিহীনভাবে?
আ. আ. খান : দুদকের পক্ষে তো পক্ষপাত করার প্রশ্নই ওঠে না। যদি পক্ষপাতের ঘটনা ঘটে, তাহলে তার ভাবমূর্তি আরও ক্ষুণ  হবে।
যুগান্তর : এখন যা চলছে, তাতে কি পক্ষপাত মনে হচ্ছে না?
আ. আ. খান : গত বছর বিভিন্ন মামলায় যাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে, তারা সরকারি দলের লোকজন। এদের ধরাটাই ছিল অবাক কাণ্ড। ধরার পর দেখা গেল, সবাইকে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে দুদক আন্তরিকভাবে এসব করেছে, নাকি লোক দেখানোর জন্য করেছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
যুগান্তর : দুদকের প্রত্যয়নপত্র কি দুর্নীতিবাজদের সমাজে বিশিষ্ট সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পুনর্বাসিত করছে না?
আ. আ. খান : হ্যাঁ। এতে জনমনে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়েছে। আরও হবে।
যুগান্তর : এ মুহূর্তে সরকারের করণীয় সম্পর্কে আপনাকে পরামর্শ দিতে বলা হলে আপনার প্রথম তিনটি পরামর্শ কী হবে?
আ. আ. খান : প্রথম পরামর্শ- দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। দ্বিতীয়ত- অবকাঠামো শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত- দেশের প্রশাসন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে।
যুগান্তর : সরকারের অতিরিক্ত ভারতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি দেশের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হয়ে দেখা দেবে কি?
আ. আ. খান : এ প্রশ্নটা কিন্তু মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আপনি ভারতঘেঁষা ইত্যাদি বলছেন। এটা সঠিক মূল্যায়ন নাও হতে পারে। ভারত একটি বৃহৎ দেশ। সে তুলনায় বাংলাদেশ অনেক ছোট। সাধারণত বড় দেশ সম্পর্কে ছোট দেশের অনেক সন্দেহ, অবিশ্বাস থাকে। যদি অতি দ্রুত এ ধারণার অবসান ঘটানো না যায়, যদি এর স্বপক্ষে জনমত সৃষ্টি না হয়, আপনি যে ধরনের মন্তব্য করলেন- সে ধরনের মন্তব্য পাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। কাজেই দেশের মানুষ যেন বুঝতে পারে দু’দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার ফলে আমাদের কী লাভ হচ্ছে। কেবল এভাবেই দু’দেশের মধ্যকার সম্পর্ক টেকসই হবে। নচেৎ নয়।
যুগান্তর : আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন মহল থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে গণভোটের দাবি তোলা হচ্ছে। এ দাবির যৌক্তিকতা সম্পর্কে বলুন।
আ. আ. খান : গণভোট যে কোনো বিষয়ের ওপর করা যায়। মাত্র ক’দিন আগে স্কটল্যান্ড ইংল্যান্ডের সঙ্গে থাকবে, নাকি স্বাধীন হয়ে যাবে, তার ওপর গণভোট হয়েছে। এজন্য সংবিধানের কোনো প্রয়োজন পড়েনি। বিলেতে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা গণভোট করেছে। আমাদের এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে প্রশ্ন- এ প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলো কোনোদিনও ঐকমত্যে পৌঁছতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রয়োজনীয়, নাকি প্রয়োজনীয় নয়- এটা যদি জনগণের ওপর ছেড়ে দেয়া হয় এবং জনগণ যদি বলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাই না, তাহলে সেটা বিএনপির মানতে হবে। আর জনগণ যদি বলে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার চাই, তাহলে সেটা সরকারকে মানতে হবে। সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার, আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকার হয়তো হবে না। সুপ্রিমকোর্টের রায়ের সঙ্গে কী ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার সঙ্গতিপূর্ণ সেটা বের করতে হবে। সুপ্রিমকোর্ট বলেছে, অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক হতে পারবে না। নির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও করা সম্ভব। এটা বিভিন্নভাবে করা সম্ভব। এটা নিয়ে যদি গণভোট করতে হয়, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোকে বসে কী প্রশ্নে গণভোট হবে সেটা নির্ধারণ করতে হবে।
যুগান্তর : শাসক দলের অসহনশীল চরিত্র কি দিন দিন উগ্র হচ্ছে? সম্প্রতি গাজীপুরে বিরোধী দলকে জনসভা করতে না দেয়া কি তারই প্রমাণ?
আ. আ. খান : বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অবক্ষয় দীর্ঘদিন ধরে হচ্ছে। এজন্য দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দায়ী। সম্প্রতি গাজীপুরে যা ঘটেছে, তা দুর্ভাগ্যজনক। যদি সরকার বিরোধী দলকে সভা করতে না দেয়, আর বিরোধী দল সরকারকে সভা করতে না দেয়, তাহলে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপন্ন হবে। যদি ফ্রিডম অব অ্যাসোসিয়েশন ও ফ্রিডম অব স্পিচ সংরক্ষণ করা না যায়, তাহলে আমাদের গণতন্ত্র থেকে আমরা কোনো সুফল পাব না।
যুগান্তর : মূল্যস্ফীতির সঙ্গে জীবনযাত্রার মান সমন্বয় করতে স্থায়ী বেতন ও চাকরি কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশন। এ সম্পর্কে বলুন।
আ. আ. খান : আসল সমস্যার সমাধান না করে শুধু বেতন কমিশন গঠন করলে সুফল পাওয়া যাবে না। আমাদের আসল সমস্যা কী? প্রথম কথা হল- সরকারি কর্মচারীদের এমন বেতন দিতে হবে যা জাতীয় আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আপনি যদি নির্ধারণ করতে পারেন কতজন লোকের মাথাপিছু আয়ের সমান সর্বনিু বেতন হবে, তাহলে তার ভিত্তিতে কমিশন ছাড়াই প্রত্যেক বছর বা দুই বছর অন্তর সেটা বাড়ানো সম্ভব। এখানে সমস্যা হচ্ছে তিনটি। প্রথম সমস্যা- সম্পূর্ণ প্রয়োজন মেটে এমন বেতন দেয়ার সামর্থ্য সরকারের নেই। কাজেই সরকারের আর্থিক যে সমস্যা, সেটার সমাধান করতে হবে। আবার শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভালো আর্থিক সুবিধা দিলেই হবে না। উন্নয়ন প্রকল্প করতে হবে। অবকাঠামো করতে হবে। সরকারের অন্যান্য দায়িত্ব পালন করতে হবে। সুতরাং ওখানে কতটুকু পর্যন্ত বেতন বাড়ানো যাবে, এ সম্পর্কে সরকারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দ্বিতীয় সমস্যা হল- সরকারি কর্মচারীদের শুধু মাসের বেতন দিলেই হবে না; তাদের থাকার জায়গারও বন্দোবস্ত করতে হবে এবং অবসর গ্রহণের পর যাতে বাসস্থান সুবিধা বহাল থাকে, সে রকম ব্যবস্থা থাকতে হবে। বর্তমানে আমাদের যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, ঢাকা শহরের আশপাশে এটা করা সম্ভব নয়। সেজন্য আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে সরকারের কর্মকাণ্ড পরিকল্পিত উপায়ে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। যদি এটা করা না যায়, তাহলে বাড়িভাড়া নিয়ে যে সমস্যা হবে, বেতন বৃদ্ধি করেও সেটার সমাধান করা যাবে না। তৃতীয় হল- পেনশনের যে ব্যয়, সেটাও কিন্তু অনেক বেড়ে যাবে। সুতরাং পেনশন নিয়ে কী করা হবে সে ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এসবের কোনো চটজলদি সমাধান নেই। এগুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে হবে, গবেষণা করতে হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
যুগান্তর : রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব না হলে পে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি?
আ. আ. খান : এটা নির্ভর করে সরকার অন্য জায়গায় খরচ কমাবে, নাকি রাজস্ব বাড়াবে- এর ওপর। অর্থমন্ত্রী মহোদয় বলেছেন, বেতন কাঠামো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। অর্থাৎ এক বছরে করা হবে না। কতদিনে করা হবে- এর ওপর নির্ভর করবে এটার প্রভাব কতটুকু পড়বে।
যুগান্তর : ২০১৪ সাল রাজনৈতিকভাবে অনেকটাই স্থিতিশীল থাকার পরও বিনিয়োগের বন্ধ দরজা খোলা সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সাল রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় হয়ে ওঠার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে অর্থনীতিকে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে?
আ. আ. খান : গত বছর যেসব চ্যালেঞ্জ ছিল, এ বছরও মোটামুটিভাবে সেসব চ্যালেঞ্জই আছে। তবে অর্থনীতির ওপর একটা বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। সরকার অনেক বড় বড় প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছে। সরকার বলছে সাবমেরিন কিনবে, যুদ্ধজাহাজ কিনবে, উড়োজাহাজ কিনছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র করছে, পদ্মা সেতু করছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করছে ইত্যাদি। এত বড় বড় প্রকল্প করতে গেলে, সেখানে অর্থায়ন করতে গেলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতির ওপর চাপ পড়বে। সরকারের ব্যয়ের ওপরও চাপ পড়বে। এখন সেই চাপ কীভাবে সমন্বয় করা হয়- বর্তমান বছরে সেটা আমরা আগ্রহের সঙ্গে লক্ষ্য করছি। পরিকল্পনা যদি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যুগান্তর : সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের বিরোধিতা করছেন পরিবেশবাদীরা। এ প্রকল্পের বাস্তবতা কি এটা সমর্থন করে?
আ. আ. খান : এটা অবশ্যই যৌক্তিক। সুন্দরবনের সংরক্ষণ আমরা সবাই চাই। এ বিষয়ে সরকার যত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, তত দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে আলাপ-আলোচনা ও গবেষণা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সমীচীন।
যুগান্তর : মানবাধিকার কমিশনের কাজকর্ম দেখে একে একটা ফ্রেমবন্দি প্রতিষ্ঠান মনে হয়। এটাকে কার্যকর করতে হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার?
আ. আ. খান : আইনে যা আছে, সেটা বাস্তবায়ন করলেই কার্যকর হবে।
যুগান্তর : কে বাস্তবায়ন করবে? যারা দায়িত্বে আছে, তারা তো কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না!
আ. আ. খান : তারা না পারলে তাদের সরিয়ে দেয়া হোক। যারা পারবে, তাদের বসানো হোক।
যুগান্তর : নতুনরা কি পারবে, যদি সেখানে সরকারি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন থাকে?
আ. আ. খান : নিয়ন্ত্রণ থাকলে সম্ভব নয়। ভারতের মানবাধিকার কমিশন যেভাবে কাজ করছে, আমাদের এখানে সেভাবে করতে পারছে না।
যুগান্তর : কেন পারছে না? সমস্যাটা কোথায়?
আ. আ. খান : বললাম তো, উপযুক্ত লোক দেয়া হচ্ছে না, উপযুক্ত লোক দিলে তিনি কাজ করতে পারবেন।
যুগান্তর : উপযুক্ত লোক বাছাই করবে কে?
আ. আ. খান : সরকারই করবে। সরকারই করে।
যুগান্তর : বাছাইটা যদি সরকার করে, তাহলে তো আগের ধারাবাহিকতাই বজায় থাকবে। লাভ হবে কিছু?
আ. আ. খান : এর উত্তর আমার কাছে নেই। দেশের কারও কাছেই এর উত্তর নেই।
যুগান্তর : একজন সাবেক আমলা হিসেবে কতিপয় আমলার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ সংগ্রহের বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
আ. আ. খান : সাধারণ নাগরিক সবার সঙ্গে আমি একমত- এটা অত্যন্ত জঘন্য কাজ হয়েছে। সরকারি কর্মচারী তো বটেই, কারোরই এ ধরনের কাজ করার অধিকার নেই। যারা করেছে, তাদের আইনানুগ শাস্তি হওয়া উচিত।
যুগান্তর : দেশের আমলাতন্ত্রে গুণগত পরিবর্তন আনতে হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া উচিত?
আ. আ. খান : এ সম্বন্ধে আমার একটা বই ফেব্র“য়ারি মাসে প্রকাশিত হবে। সাড়ে তিনশ’ পৃষ্ঠার বই। যে বিষয়ের ওপর আমাকে সাড়ে তিনশ’ পৃষ্ঠা লিখতে হয়েছে, সে সম্পর্কে ১০ মিনিট, আধঘণ্টায় আমি কী বলব!
যুগান্তর : আপনাকে ধন্যবাদ।
আ. আ. খান : ধন্যবাদ।

সুন্দরবনের ভেতরে নৌ চলাচল স্থায়ী বন্ধের সুপারিশ

(সুন্দরবন প্রসঙ্গে আজ প্রথম আলো কার্যালয়ে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। ছবি: জিয়া ইসলাম)  দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশ থেকে বন হারিয়ে যাচ্ছে। দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক বন হলো সুন্দরবন। এটিকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে বাঁচিয়ে রাখতে বনের ভেতর দিয়ে নৌপথ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞরা সুন্দরবনের ভেতরে নৌপথ বন্ধের বিষয়টিতে গুরুত্ব দেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, বন্দরে যাওয়ার একটিই পথ হচ্ছে সুন্দরবনের ভেতরের শ্যালা নদী। অন্য কোনো পথ আছে কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের আটটি দেশের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত জাতিসংঘের ২৫ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল গত ২২ থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সুন্দরবনে অবস্থান করে। তাঁরা সেখানে শ্যালা নদী ও পশুর নদের বিভিন্ন স্থানে তেল ছড়িয়ে পড়ার প্রভাব নিয়ে জরিপ চালান। কীভাবে তেল অপসারণ করা যায়, সেই পরামর্শ দিতেই সরকারের আমন্ত্রণে দলটি কাজ করেছে। বাংলাদেশের ১২ জন বিশেষজ্ঞ এই দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রথম আলোর আমন্ত্রণে দলের কয়েকজন সদস্য আজ এ মতবিনিময় সভায় যোগ দেন। দলের সদস্যরা বলেন, সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে তেল ট্যাংকার পরিবহন সুন্দরবনের পরিবেশ ও বনজীবীদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলের নেতা ফিনল্যান্ড থেকে আসা এমিলিয়া ওয়ালস্টর্ন, দলটির সমন্বয়কারী পার এনডার্স বার্থলিন, ফ্রান্সের রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের প্রধান (সার্ভিস রিসার্চ) স্টেফান লোফলক, বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিনিধি লোয়িক কেরামব্রুন, হারুকা ইজাকিসহ অন্যরা সুন্দরবনে তাঁদের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার পর সেখানকার স্থানীয় মানুষ, সরকার, বিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম যেভাবে সমন্বিতভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে, তার প্রশংসা করেন তাঁরা। তাঁদের মতে, সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা। সুন্দরবন রক্ষায় আর্ন্তজাতিক মহলের সহমর্মিতার বিষয়টিও তাঁরা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেন। প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, সুন্দরবনকে রক্ষার জন্য গণমাধ্যম হিসেবে প্রথম আলোর পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব, তা করা হবে। এ ছাড়া জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলের সুপারিশে সুন্দরবনের ভেতরে নৌপথ বন্ধের সুপারিশটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি প্রতিনিধিদলের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। সভায় তেলের ট্যাংকারডুবির পর সেখানকার ক্ষতি, প্রভাব নিয়েও আলোচনা করেন দলের সদস্যরা। তাঁরা বলেন, ঘটনার পর যতটা আতঙ্ক ছড়িয়েছিল, আপাতদৃষ্টিতে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে ততটা ক্ষতি হয়নি। তবে তেল ছড়িয়ে পড়ার ফলে তার প্রভাব কতটুকু হলো, তা এই মুহূর্তেই বা কয়েক দিনের জরিপের মাধ্যমে বলাও সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা মাথায় রাখতে হবে। সেই লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন এবং নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে। বিশেষজ্ঞ দলের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক বদরুল ইমাম বলেন, ‘সুন্দরবনে অবস্থানের সময় আমি যেন আমার ছাত্রজীবনে চলে গিয়েছিলাম। আমার জীবনে সুন্দরবনের অভিজ্ঞতা “লার্নিং চ্যাপ্টার” হয়ে থাকবে। ঘটনা ঘটার পর গণমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে ইতিবাচক, নেতিবাচক বিভিন্ন দিক নিয়েই আলোচনা হয়েছে। তবে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ দলটি বস্তুনিষ্ঠভাবে জরিপ চালিয়েছে। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে। এখন বিষয়টিতে নজরদারি বাড়াতে হবে।’ দুবাই সিটি করপোরেশনের উপদেষ্টা বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আলী রেজা খান বলেন, ‘সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাটি সবার কাছেই নতুন। বিষয়টি থেকে সবাইকে শিক্ষা নিতে হবে। সরকারকেও সতর্ক হতে হবে।’ সেন্টার ফর ইনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের উপনির্বাহী পরিচালক মনিমুল হক সরকার বলেন, সুন্দরবন এলাকায় চিংড়ি ঘেরের কারণে নদীর নাব্যতা ও নৌ চলাচলের সমস্যা হচ্ছে। এসব চিংড়ি ঘের সরিয়ে ফেলতে হবে। এ ছাড়া সুন্দরবনের ভেতরের নৌপথ বন্ধ করে দিতে হবে। ইউনাইটেড ন্যাশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের (ইউএনডিপি) এ-দেশীয় সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, জাতিসংঘের সুপারিশে সুন্দরবনের ভেতরে নৌপথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে। আলোচনায় ইউএনডিপির প্রোগ্রাম অ্যানালিস্ট (এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড এনার্জি) আলমগীর হোসেন বলেন, তেলের ট্যাংকারডুবির ঘটনায় কোনো প্রভাব পড়েনি, তা বলা যাবে না। এ বিষয়ে আরও গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে। মতবিনিময় সভায় প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম, আনিসুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

‘৫ই জানুয়ারি অনুমতি না পেলেও সমাবেশ করবে বিএনপি’

অনুমতি না পেলেও ৫ই জানুয়ারি বিএনপি রাজধানীতে সমাবেশ করবে বিএনপি। সন্ধ্যায় নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেক কাটা অনুষ্ঠানে দলটির দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ এ কথা জানান। তিনি বলেন, একব্যক্তির স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ৫ই জানুয়ারি সরকার তামাশার নির্বাচন করে গণতন্ত্রকে কবরস্থ করেছে। এখন তারা বলছে ৫ই জানুয়ারি ওই তামাশার নির্বাচনের বর্ষপূর্তি উদযাপন করবে। রিজভী বলেন, আমরা গণতন্ত্র হত্যার ওইদিনটিতে ঢাকায় জনসভার অনুমতি চেয়ে পুলিশের কাছে ইতিমধ্যেই আবেদন করেছি। আমাদের নেতারা মহানগর পুলিশ দপ্তরে গিয়েছিলেন। পুলিশ বলেছে, জনসভার অনুমতি দেবে না। আমরা স্পষ্টভাষায় বলে দিতে চাই, ৫ই জানুয়ারি আমাদের কর্মসূচি করতেই হবে। এই লক্ষ্য নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। রিজভী আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, সরকার আরব্য উপন্যান্সের দৈত্যর মতো জনগনের ওপর চেপে বসে আছে। গণতন্ত্রকে তারা হত্যা করেছে। ৫ই জানুয়ারি গুম-খুনের সিনিয়ালের নায়ক এই অবৈধ সরকার। এখন তারা গণতন্ত্রের কথা যাতে আমরা না বলতে পারি, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী লেলিয়ে দিয়েছে। দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রীর নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, একমন্ত্রী বলেছেন, বিএনপির অনেকে নাকি আওয়ামী লীগের সঙ্গে তলে তলে যোগাযোগ করছে। জনগনকে বিভ্রান্ত করতে ওই মন্ত্রী ওইরকম মিথ্যাচার করছেন। আমরা জানি, এদেশের হাটে-বন্দর-গ্রামে-গঞ্জের মানুষজন জানে, আওয়ামী লীগের নেতারা বিদেশে পাড়ি জমাতে নাকি বিমানের টিকিট কেটে রেখেছে। ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের পূর্বসূরীদের পথ ধরে গনতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য আত্ম উৎসর্গের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়ার আহবানও জানান তিনি। এরপর রিজভী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটেন। এ সময়ে মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আবদুল কাদের ভুঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি মামুনুর রশীদ মামুনসহ ছাত্র দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

খালেদা ইতিহাসের ফল ভোগ করছেন : এরশাদ, দলে বিভক্তি দেখতে চাই না: রওশন এরশাদ

খালেদা জিয়া ইতিহাসের ফল ভোগ করছেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টির মহাসমাবেশে তিনি এ কথা বলেন। খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘উনি (খালেদা) এ দেশে প্রতিহিংসার রাজনীতি শুরু করেন। আমাকে ছয় বছর তিনি জেলে রেখেছেন। আমার স্ত্রীকে আড়াই বছর জেলে রেখেছেন। আমার ছেলেক ছয় বছর আমার সঙ্গে দেখা করতে দেননি। এখন তিনি প্রতিহিংসার ফল ভোগ করছেন। তিনি এখন দুই ছেলের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না। কবে পারবেন তা-ও জানেন না।’
এরশাদ আরও বলেন, ‘আমার ১৪২টি সামাবেশে তিনি ১৪৪ ধারা জারি করেছিলেন। আজ যে তাঁর এই অবস্থা হবে, তখন তাঁর মনে ছিল না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। এখন তিনি ইতিহাসের ফল ভোগ করছেন।’
খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিএনপি বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চারবার চ্যাম্পিয়ন করেছিল। দুর্নীতিতে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করে আবার ক্ষমতায় আসতে চান, লজ্জা করে না। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের সৃষ্টি করেছেন। কোন মুখে রাজনীতি করেন!’
যুবরাজ তারেক রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাজাকার বলেছে—উল্লেখ করে এরশাদ উপস্থিত সবাইকে ‘শেইম’ ‘শেইম’ ‘শেইম’ বলে চিৎকার করতে বলেন। তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে এরশাদ প্রশ্ন রাখেন, ‘সে কি সুস্থ মানুষ? সুস্থ রাজনীতিক?’
জাতীয় পার্টির ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকঢোল পিটিয়ে এ মহাসমাবেশের আয়োজন করা হয়। তবে সভা-সমাবেশে আশানুরূপ জনসমাগম হয়নি বলে মনে করেন এরশাদ। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি থেকে এখন সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধ উঠে গেছে। আমার মহাসচিব আজকের হরতাল প্রত্যাহারের জন্য জামায়াতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। কারণ আমরা দুই মাস আগে এই সমাবেশের ঘোষণা করেছিলাম। হরতাল প্রত্যাহার করলে আরও ১০ লাখ লোক বেশি হতো। তা-ও ৫ লাখ হয়েছে।’
সমাবেশে দলের মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ বাবলুর সভাপতিত্বে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রওশন এরশাদ, পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, এস এম ফয়সাল চিশতী প্রমুখ বক্তব্য দেন।
দলে বিভক্তি দেখতে চাই না: রওশন এরশাদ
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেছেন, ‘দলের বিভক্তির কারণে অনেক কর্মী বুঝতে পারেন না, কোথায় যাবেন। ফলে লাখ লাখ কর্মী বিভক্ত হয়েছেন। আমরা আর বিভক্তি চাই না। এক পার্টি দেখতে চাই। আমি উদাত্ত আহ্বান জানাব, আসুন আমরা মিলেমিশে কাজ করি।’
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় পার্টির মহাসমাবেশে রওশন এরশাদ দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি এ আহ্বান জানান।
জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য রওশন আরও বলেন, ‘মানুষের ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে, তা শুধরে আমাদের কাজ করতে হবে।’ তিনি বলেন, লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।
দলছুট নেতাদের দলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান যখন কারাগারে ছিলেন, তখন তাঁরা (দলছুট নেতারা) তাঁর (এরশাদ) মুক্তির জন্য অনেক কষ্ট করেছেন। এর মধ্যে অনেকে বেঁচে নেই, আবার অনেকে আছেন কিন্তু দলে নেই। আমি তাঁদের আবার দলে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।’ এ সময় তিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, মওদুদ আহমদসহ বেশ কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখ করেন। এ ছাড়া হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষকে জাতীয় পার্টিতে যোগদানের আহ্বান জানান রওশন।
রওশন এরশাদ বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের ঐক্য ও লক্ষ্য থাকে। জাতীয় পার্টি অনেক ভালো কাজ করেছে। তার পরও ২৪ বছর ক্ষমতার বাইরে। তাই আমাদের কী সমস্যা, সেগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দল ক্ষমতায় যেতে চায়। কিন্তু প্রতিটি নির্বাচনে আমাদের দলে বিভক্তি এসেছে। ৯১-এ জাতীয় নির্বাচনের সময় আমরা জেলে ছিলাম। ৯৬-এ আমাদের পার্টির চেয়ারম্যান জেলে ছিলেন। ২০১৪ সালে চেয়ারম্যানের নির্দেশে আমি নির্বাচন করেছিলাম।’

দুর্নীতি যেখানে নীতি by পলাশ কুমার রায়

দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করে আসছে। কঠোর শাস্তির বিধান এবং যুগোপযোগী আইন করার পরও দেশ থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। বরং দুর্নীতি ভয়াবহ ব্যাধির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ পর্যায় থেকে নিুস্তর পর্যন্ত কতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে তা ভুক্তভোগী ব্যক্তিরাই কেবল জানেন। সরকারি অফিসগুলোয় দুর্নীতি এখন আর কোনো অপরাধ কিংবা নিন্দনীয় বিষয় নয় বরং এটা একটা স্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে। সরকারি অফিসগুলোয় দুর্নীতি কতটা বহুমাত্রিক ও চরম আকার ধারণ করেছে তা দুদক থেকে প্রায় অর্ধকিলোমিটার এলাকার মধ্যে অবস্থিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের সরেজমিন অবস্থা থেকে পাঠকদের অবহিত করার চেষ্টা করব।
দুদক থেকে প্রায় অর্ধকিলোমিটার আর বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে ৫০০ গজ পশ্চিম-উত্তর দিকে তেজগাঁও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়। এ কার্যালয়ে প্রতি কর্মদিবসে প্রায় শতাধিক ভূমি মালিক ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিকল্পে যাতায়াত করেন। আগন্তুক এসব সহজ-সরল মনের ভূমি মালিক এবং তাদের প্রতিনিধিদের নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়। জমির মালিকানা তথা ভূমি নিয়ে উদ্ভূত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভূমি মালিকরা যতটা না কষ্ট সহ্য করেন, তার চেয়েও ঢের বেশি হয়রানি হতে হয় এখানে কর্মরত ব্যক্তিদের দ্বারা। ভূমি বিরোধ সংক্রান্ত পরামর্শ এবং সহযোগিতার নামে দায়িত্বপ্রাপ্তরা ঘাটে ঘাটে ভূমি মালিকদের কাছ থেকে প্রণামি আদায় করে থাকেন।
এ ভূমি অফিসে ভুক্তভোগী এক ব্যক্তির সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, তিনি কীভাবে এখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারা চরমভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন। তিনি জানান, তার সদ্য কেনা একটি ফ্ল্যাটের নামজারি (অনেকে মিউটেশন বা খারিজ বলেন) করার জন্য এ ভূমি অফিসের এক ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেন। সেই ব্যক্তি সঠিকভাবে নামজারি করেছেন কিনা তা যাচাই করার জন্য এ অফিসের রেকর্ড রুমে মূল নথি দেখার চেষ্টা করেন। ওই ব্যক্তি তার নামজারি খতিয়ানের নথিটি দেখার জন্য সহকারী কমিশনার ভূমি, তেজগাঁও কার্যালয়ের রেকর্ড কিপারের শরণাপন্ন হলে তিনি নথিটি দেখিয়ে দেয়ার বিনিময়ে ১ হাজার টাকা দাবি করেন। ফ্ল্যাট মালিক ১ হাজার টাকা দিয়ে মূল নথিটি দেখতে চাইলে রেকর্ড কিপার তাকে পরের দিন সকালে আসতে বলেন। সেই ব্যক্তি পরের দিন সকালে এলে রেকর্ড কিপার তাকে বিকালে আসতে বলেন। সেই ব্যক্তি বিকালে এলে রেকর্ড কিপার তাকে দুদিন পরে আসতে বলেন। এভাবে এক সপ্তাহ ঘুরানোর পর রেকর্ড কিপার ওই ব্যক্তিকে বলেন নথিটি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এত ভিড়ের মধ্য থেকে নথিটি খুঁজতে আরও কয়েকদিন সময় এবং পারিশ্রমিক হিসেবে ২ হাজার টাকা লাগবে। সেই ব্যক্তি তৎক্ষণাত ২ হাজার টাকা দিয়ে তাকে নথিটি দ্রুত খুঁজতে বলেন। বাড়তি এ টাকা পেয়ে রেকর্ড কিপার মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে নথিটি খুঁজে পান। শুধু রেকর্ড কিপার নয়, এ অফিসের প্রতিটি টেবিলে আপনার ন্যায্য ও যৌক্তিক কাজ করে নেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের চাহিদা মোতাবেক টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আপনার কাজটি প্রত্যাশিত সময়ে শেষ হবে না, অথবা হয়রানির শিকার হওয়ার পাশাপাশি আপনার নথিটি হয়তো আর কখনোই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনি না চাইলেও এখানে আপনাকে ঘুষ দিতে হবে। অবশ্য এ ঘুষকে সেলামি, প্রণামি, পারিশ্রমিক, বকশিশ, স্পিডমানি কিংবা অন্য নামেও ডাকা যায়।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের অন্যতম দায়িত্ব হল জমির মালিকের পক্ষে সব ধরনের কাগজপত্র দলিল-দস্তাবেজ পরীক্ষা-নিরীক্ষা অন্তে জমি বা ফ্ল্যাট মালিকের নামে প্রস্তাবিত জমি নামজারি ও জমা ভাগের আদেশ দেয়া। তেজগাঁওয়ের এ ভূমি অফিসে প্রতিদিন অসংখ্য নামজারি সংক্রান্ত ফাইল দেখভাল করতে হয়। প্রত্যেকটি ফাইল নামজারি এবং জমা ভাগে কাজ করার জন্য সরকারি ফিস ২৫০ টাকা হলেও জমি মালিকদের কাছ থেকে ক্ষেত্র বিশেষে ১৫ থেকে ৫০ হাজার, কখনও বা এর চেয়ে বেশি পরিমাণে টাকা নেয়া হয়। এ টাকা দিতে জমি/ফ্ল্যাট মালিকদের বাধ্য করা হয়। জমি মালিকদের কাছ থেকে আদায়কৃত এসব টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের গল্প। ভূমি অফিস সংশ্লিষ্টদের চাহিদা মোতাবেক টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে জমি মালিকের মালিকানার স্বপক্ষে দাখিলকৃত কাগজপত্র যত স্বচ্ছ ও নির্ভুলই হোক না কেন, নামজারি করিয়ে নেয়া অসাধ্য বলা যেতে পারে। এ নিয়ে ভূমি অফিসগুলোতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে প্রায়শই ভূমি মালিকদের বচসা হয়। আপনি জমির মালিক হিসেবে ক্ষমতাশালী, প্রভাবশালী, দাপটশালী হোন না কেন, ভূমি অফিসে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিদের নগদ নারায়ণ না দিয়ে শুধু সরকারি ফিস ২৫০ টাকা দিয়ে নামজারি করিয়ে নেয়া অসাধ্য বটে। তাছাড়া এমন সৌভাগ্যবান ব্যক্তির সংখ্যাও খুবই নগণ্য, যারা মাত্র কয়েক হাজার টাকা খরচাপাতি করেই নামজারি করিয়ে নিয়েছেন। অবশ্য আপনার সঙ্গে যদি ভূমি অফিসের বড়কর্তার সঙ্গে সখ্য থাকে অথবা আপনি যদি দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ব্যক্তি হোন তাহলে ভিন্ন কথা। আর একটা কথা মনে রাখবেন, অল্প টাকায় নামজারি করাতে চাইলে ভূমি অফিসে যাতায়াত করতে করতে আপনাকে কয়েক জোড়া জুতার তলানি ছিঁড়তে হবে।
উপজেলা ভূমি অফিস তথা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয় হিসেবে বহুল পরিচিত এসব অফিসে অনুমোদিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি একশ্রেণীর অসাধু দালাল ও উমেদার জমি মালিকদের নানাভাবে হয়রানি করে থাকে। কখনও কখনও উমেদাররা জমি মালিকদের সঙ্গে এমন আচরণ করেন, যাতে মনে হয় জমি/ফ্ল্যাটের মালিক হওয়া একটা অপরাধের ব্যাপার। ভূমি অফিসের এসব দালাল চক্র এবং উমেদাররা জমি মালিকদের শুধু হয়রানি করেন তাই নয়, কখনও তারা নামজারি ও জমা ভাগের নথিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডপত্রের পাতা ছিঁড়ে কিংবা তথ্য বিকৃতি করে জমি মালিকদের কাছ থেকে বাড়তি প্রণামি আদায় করার ফন্দিফিকিরও করেন। তাছাড়া উপজেলা ভূমি অফিসের প্রধান একজন প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা হওয়ায় প্রশাসনিক নানা ধরনের কাজকর্মে তাকে প্রায়শই ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে জমি মালিকদের ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বেশ বেগ পেতে হয় ভুক্তভোগীদের। জমিজমা সংক্রান্ত শত শত মামলা-মোকদ্দমার বিচারিক কাজ দীর্ঘদিন থেকে ঝুলে থাকার ফলে বিচারপ্রার্থী জমি মালিকদের খরচ যেমনিভাবে বাড়ে, তেমনি বাড়তি উৎকণ্ঠাও সহ্য করতে হয় তাদের। প্রশাসন ক্যাডারের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পক্ষে জমি বিরোধ সংক্রান্ত এসব মামলা-মোকদ্দমা স্বল্প সময়ে নিষ্পত্তি করা আদৌ সম্ভব কি-না, তাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা দরকার।
বাংলাদেশ সচিবালয় এবং দুদকের এত কাছে অবস্থিত এ ভূমি অফিসের অনিয়ম আর দুর্নীতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে ভাবতে শেখায়, বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের ভূমি অফিসগুলোর অবস্থা আরও কতটা শোচনীয়। ভূমি অফিসগুলোর কর্তাব্যক্তিদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম আর দুর্নীতিই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে সরকার কার্যত এখনও পদক্ষেপ নিতে পারেনি। স্বল্প সময়ে, স্বল্প খরচে জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভূমি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন যেমন জরুরি, তেমনি ভূমি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দৌরাত্ম্যপনা প্রতিরোধ করাও সময়ের দাবি। জমি সংক্রান্ত ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তিসহ জমি মালিকরা ফি বছর ভূমি উন্নয়ন কর দেয়ার জন্য নামজারি ও জমা ভাগ করতেই ভূমি অফিসে যাতায়াত করেন বেশি। নামজারি এবং জমা ভাগের খতিয়ান পেতে এবং ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করতেও যদি জমি মালিকদের দফায় দফায় ঘুষ দিতে হয়, তাহলে বলতে হয়, ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের বসে বসে ঘুষের টাকা ভাগবাটোয়ারা করা ছাড়া আর কি কোনো কাজ নেই?
পলাশ কুমার রায় : আইনজীবী; আহ্বায়ক, সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন (সুপ্রা)

বরফ আদৌ গলবে কি? by তারেক শামসুর রেহমান

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কর্তৃক কিউবার ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা এবং দু’দেশের মাঝে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রে এটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর এই বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রেখেছে। এর ফলে কিউবা প্রায় ১.১ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং স্নায়ুযুদ্ধের অবসান ঘটলেও যুক্তরাষ্ট্র কিউবার ওপর থেকে বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়নি। এখন ওবামার এ ঘোষণা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, ওবামার এই সিদ্ধান্ত কি আদৌ কার্যকর হবে? দ্বিতীয়ত, এতে করে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কের আদৌ উন্নতি হবে কি? তৃতীয়ত, সম্পর্কোন্নয়নের উদ্যোগ কি কিউবার রাষ্ট্রব্যবস্থায় আদৌ কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্ক অনেকদিন ধরেই আলোচনার একটি বিষয়। কিউবা কি আদৌ তার সমাজতান্ত্রিক নীতি পরিত্যাগ করবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্র আবারও হাভানায় সরকারের উৎখাতের উদ্যোগ নেবে- এসব প্রশ্ন বারবার মিডিয়া ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের লেখনীতে উঠে এসেছে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ধাঁচের সমাজতন্ত্রের পতনের রেশ ধরে সোভিয়েত ইউনিয়নে যখন সমাজতন্ত্রের পতন ঘটল, তখন বলতে গেলে সারা বিশ্বের দৃষ্টি একরকম নিবদ্ধ ছিল কিউবার দিকে। কারণ কিউবা ছিল সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের অন্যতম সমর্থক এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মিত্র। দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, কিউবার অর্থনীতির অন্যতম উৎস এবং নিরাপত্তার অন্যতম গ্যারান্টার সোভিয়েত ইউনিয়নের অবর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে কিউবা টিকে থাকতে পারবে কি-না? একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসনের’ মুখ থেকে কিউবা তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে কি-না, এ প্রশ্নও ছিল। আরও একটি প্রশ্ন সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে আলোচিত হচ্ছিল- তা হচ্ছে, কিউবা কি আদৌ তার সমাজতান্ত্রিক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনবে? কারণ চীন ও ভিয়েতনামের মতো দেশেও স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর পরিবর্তন এসেছে। এ দুটি দেশ এখন আর ধ্র“পদি মার্কসবাদ অনুসরণ করে না। তাই খুব সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ছিল, কিউবা চীন বা ভিয়েতনামের পথ অনুসরণ করবে কি-না?
কিউবা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় ছিল কিউবার নিরাপত্তাহীনতা। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই কিউবার সমাজতান্ত্রিক সরকারকে স্বীকার করে নেয়নি। বরং বিপ্লবের পর (১৯৫৯) কিউবা সরকার যখন লাতিন আমেরিকাজুড়ে বিপ্লব ছড়িয়ে দিতে চাইল, চে গুয়েভারা যখন ‘বিপ্লব’ সম্পন্ন করার জন্য কিউবা সরকারের মন্ত্রীত্ব ত্যাগ করে বলিভিয়ায় গেলেন (সেখানেই তাকে পরে হত্যা করা হয়), তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের কাছে ভিন্ন একটি বার্তা পৌঁছেছিল। যুক্তরাষ্ট্র কখনোই চায়নি তার ‘প্রভাবাধীন এলাকায়’ অন্য কোনো শক্তি প্রভাব খাটাক। মনরো ডকট্রিনের আদলে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছে এ এলাকায় তথা লাতিন আমেরিকায় তার পূর্ণ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে। কিন্তু কিউবার বিপ্লব যুক্তরাষ্ট্রের এই হিসাব-নিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিউবার বিপ্লবের মাত্র দু’বছরের মাঝে ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ভাড়াটে কিউবানদের দিয়ে কিউবা সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা
চালায়। সিআইএ’র অর্থে পরিচালিত এই অভিযান ‘বে অফ পিগস’-এর অভিযান হিসেবে খ্যাত। বলাই বাহুল্য, ওই অভিযান ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র থেমে থাকেনি। এর পরের বছরই ১৯৬২ সালের অক্টোবরে ‘কিউবার মিসাইল সংকট’ একটি পারমাণবিক যুদ্ধের আশংকার জন্ম দিয়েছিল। ওই সময় যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ
করেছিল, কিউবায় সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়েছে, যা তার নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করেছে, এটা বিবেচনায় নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র একটি নৌ-অবরোধ আরোপ করে, যাতে করে কিউবায় কোনো ধরনের সামরিক মারণাস্ত্র সরবরাহ করা না যায়। এই নৌ-অবরোধ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রকে একটি যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রকে তুরস্ক থেকে তাদের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রত্যাহার করে নিতে হবে। দীর্ঘ ১৩ দিন এই নৌ-অবরোধ বহাল ছিল। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ক থেকে মিসাইল প্রত্যাহার করে নিলে সোভিয়েত ইউনিয়নও কিউবা থেকে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরিয়ে নেয়। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক যুদ্ধের আশংকা কমে গেলেও সংকট থেকে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে এই অর্থনৈতিক অবরোধের বিরুদ্ধে কিউবা লড়াই করে আসছে। স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পরও মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ওবামা সম্পর্কোন্নয়নের ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের কথা বললেও এর বাস্তবায়ন খুব সহজ হবে না। কারণ ওবামাকে এ সংক্রান্ত একটি আইন পাস করাতে হবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে কংগ্রেসে তার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। কংগ্রেসের উভয় কক্ষ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে রিপাবলিকানরা। তারা ওবামার ঘোষণায় খুশি নন। আমি একাধিক কংগ্রেস সদস্য তথা সিনেটরের বক্তব্য দেখেছি, যেখানে তারা ওবামার এ-সংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। সিনেটর জন ম্যাককেইন ও সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার এই সিদ্ধান্ত বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে সংকুচিত করবে। অন্যদিকে সিনেটর রয় ব্লান্ট মনে করেন, এই ঘোষণার বাস্তবায়ন ক্যাস্ট্রোকে ক্ষমতায় রাখতে সাহায্য করবে। ডেমোক্রেট দলীয় সিনেটর রবার্ট মেনডেজ মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত হচ্ছে কিউবার মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা ও স্বৈরশাসনকে স্বীকার করে নেয়া। সিনেটর মেনডেজ নিজে কিউবান আমেরিকান। এতে করে ধারণা করা স্বাভাবিক যে, কিউবার ওপর থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কোনো আইনকে কংগ্রেস অনুমোদন দেবে না। ফলে ওবামার ঘোষণা শেষ পর্যন্ত ‘একটি ঘোষণা’ হিসেবেই থেকে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা কিউবায় আরও বেশি গণতন্ত্রায়ন, আরও বেশি অর্থনৈতিক উদারিকরণ চান। মানবাধিকার পরিস্থিতির আরও উন্নতি চান। একই সঙ্গে চান রাজনৈতিক সংস্কার। এটাই হচ্ছে মোদ্দা কথা। বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের শর্তে কিউবা সবকিছু ‘উন্মুক্ত’ করে দেবে না। সোভিয়েত ইউনিয়নে গরবাচেভের সংস্কার কর্মসূচির ফলাফল তাদের অজানা নয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার আনতে গিয়েই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গিয়েছিল। চীন ও ভিয়েতনামে অর্থনৈতিক সংস্কার এসেছে; কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার আসেনি। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের সংস্কার কর্মসূচি ‘পেরেস্ত্রয়কা’র বাস্তবায়ন হয়েছে; কিন্তু ‘গ্লাসনস্ত’ কার্যকর হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কার আসেনি। কিউবায় কোনোটাই আসেনি। চীন তার সংস্কার কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র চীন থেকে এখন ঋণ গ্রহণ করছে। ভিয়েতনামও কম যায়নি। যে ভিয়েতনাম প্রায় ৪০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে, তারাই আজ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মিত্র। ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাকের যে বিশাল চাহিদা, তার একটা বড় অংশ ভিয়েতনাম সরবরাহ করছে। এখানে রাজনীতি অগ্রাধিকার পায়নি। পেয়েছে বাণিজ্য। এখন কিউবা কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তাও দেখার বিষয়। তবে হুট করে দু’দেশের সম্পর্কে কোনো বড় পরিবর্তন আসবে না। কিউবার প্রেসিডেন্ট রাউল ক্যাস্ট্রো ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, ওবামার এ প্রস্তাবের ভিত্তিতে কিউবার রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো পরিবর্তন আসবে না। কিউবার জনগণ এখনও কিউবার সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তবে এটাও ঠিক, বিশ্বায়নের এই যুগে কিউবা ‘একা’ চলতে পারবে না। দেশটিকে ‘দুয়ার’ উন্মুক্ত করে দিতে হবেই। দেশের অর্থনীতির শতকরা ৮০ ভাগ এখনও সরকার নিয়ন্ত্রিত। কিছু ক্ষুদ্র ব্যবসা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সারা দেশে এ সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। বেসরকারি খাত সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন খাত। এ খাত কিছুটা উন্মুক্ত করা হয়েছে। আরও উন্মুক্ত করা হলে যুক্তরাষ্ট্রের হোটেল চেইন ব্যবসায়ীরা এ খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসবে। কিউবায় সীমিত আকারে ‘ডলার বাণিজ্য’ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কিউবান আমেরিকানদের পাঠানো অর্থ এখন নিয়মিত কিউবায় আসছে। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে একটা সমস্যা রয়েছে। কিউবা প্রতিদিন এক লাখ ব্যারেল তেল অত্যন্ত কম দামে ভেনিজুয়েলা থেকে পেয়ে আসছে। এর বিনিময়ে কিউবা ডাক্তার, নার্স, শিক্ষক দিচ্ছে। এসব ডাক্তার, নার্স আর শিক্ষক এখন ভেনিজুয়েলার হয়ে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে কাজ করছে। পুরো ব্যয়ভার বহন করছে ভেনিজুয়েলা। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ এই পরিকল্পনা শুরু করলেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাদুরো তা কতদিন টিকিয়ে রাখতে পারবেন, সেই প্রশ্ন ইতিমধ্যে উঠেছে। কারণ ভেনিজুয়েলার রমরমা তেল ব্যবসার দিন শেষ! অর্থনীতি আগের মতো আর শক্তিশালী নয়। রাজধানী কারাকাসে বিশাল বিশাল ভবন খালি পড়ে আছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীরা আসছেন না। রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ছে। এরই মাঝে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভেনিজুয়েলার সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। ভেনিজুয়েলার ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যখন ওবামা কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার উদ্যোগ নেন, তার ঠিক একদিন পর ১০ ডিসেম্বর এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘটনাকে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর মেনডেজ ‘ভেনিজুয়েলার জনগণের বিজয়’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গত এপ্রিল থেকেই সেখানে অসন্তোষ চলছে। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বেশ কয়েকজন ভেনিজুয়েলান ভিআইপির ওপর। সম্পদ আটক থেকে শুরু করে ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ভেনিজুয়েলার মানবাধিকার পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। এটা সত্য, হুগো শাভেজের মৃত্যুর পর ভেনিজুয়েলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়; কিন্তু তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি বিরাজ করছে কলম্বিয়া ও মেক্সিকোতে। মেক্সিকোর ৪৩ জন স্কুল শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। কিন্তু সেখানে কোনো বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। ভেনিজুয়েলার বিষয়টি যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক, তা কাউকে বলে দিতে হয় না। এখন খুব সঙ্গত কারণেই ভেনিজুয়েলার ওপর মার্কিন ‘চাপ’ যদি বাড়ে, তাহলে কিউবাকে দেয়া তাদের আর্থিক সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে তা কিউবার অর্থনীতিকে আঘাত করবে।
কিউবার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে খোদ যুক্তরাষ্ট্রও উপকৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাত মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র পর্যাপ্ত ডাক্তার, নার্স কিংবা স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করতে পারছে না। স্বাস্থ্যকর্মীদের একটা বড় অংশ আসছে বাইরে থেকে। এক্ষেত্রে কিউবার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা জগৎ বিখ্যাত। তারা যুক্তরাষ্ট্রের এই চাহিদা পূরণ করতে পারে। ২০০২ সালে ফিদেল ক্যাস্ট্রো এ ধরনের একটি প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা গ্রহণ করেনি। এখন পশ্চিম আফ্রিকায় মারাত্মক ইবোলা রোগ ছড়িয়ে পড়ায় কিউবার স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে গেছেন। কিউবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের উন্নতি হলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাত উপকৃত হতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ওবামার ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি ‘বড় উদ্যোগ’। কিন্তু এই উদ্যোগের পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। কারণ কনজারভেটিভদের একটা বড় অংশ এখন যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করে। এটা সত্য, দীর্ঘ ৫৪ বছরের বৈরিতার অবসান হওয়া প্রয়োজন। স্নায়ুযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এখন আর নেই। ছোট রাষ্ট্র কিউবাকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উন্নয়ন সম্ভব নয়। কিউবাকে সঙ্গে নিয়েই সমস্যার সমাধান করতে হবে। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, কিউবা এ বিশ্বকে অনেক কিছু দিতে পারে। তাই বিকাশমান নয়া বিশ্বব্যবস্থার আলোকে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা সম্পর্কোন্নয়ন অত্যন্ত জরুরি।
ড. তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সমাপনী পরীক্ষায় শিক্ষার মান বাড়ছে কি? by মাছুম বিল্লাহ

দেশের ৪৫ লাখ শিশুশিক্ষার্থী শিক্ষাজীবনের প্রথম দুই পাবলিক পরীক্ষার বৈতরণী পাড়ি দিল। ২০১৪ সালের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ২৬ লাখ ৮৩ হাজার ৭৮১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। উত্তীর্ণ হয়েছে ২৬ লাখ ২৮ হাজার ৮৩ জন। পাসের হার ৯৭.৯২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ৪১১ জন। এবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল ২ লাখ ৬৫ হাজার ৯৭৪ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ লাখ ৫৫ হাজার ২৭৩ জন। পাসের হার ৯৫.৯৮ ভাগ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৬ হাজার ৫৪১ জন। আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত জেএসসিতে অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থী ছিল ১৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৩১ জন। পাস করেছে ১৫ লাখ ৫৪ হাজার ৪২৭ জন। পাসের হার ৮৯.২৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমেছে প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণী দুপর্যায়েই। তবে শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ব্যাপক হারে বেড়েছে, কমেছে শূন্যভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। এসবই ধনাত্মক সূচক।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, শিক্ষার মান বাড়ছে কী কমছে, তা প্রাথমিকের শিশুদের ফলাফল দেখে বলা যাবে না। তবে পিওর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চেয়ে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ভালো করেছে। কারণ তাদের শিখন পদ্ধতি অনেক বেশি মানসম্পন্ন। তাদের শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ পান এবং অধিকতর যোগ্যতাসম্পন্ন। এখানে যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হচ্ছে শিক্ষকদের মান ও প্রশিক্ষণ। যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের মান ভালো এবং শিক্ষকরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, সেসব বিদ্যালয়ের ফলও ভালো। অতএব প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। ২০১০ সালে এই পরীক্ষা চালু হওয়ার পর ২০১৩ সালে জিপিএ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আকাশছোঁয়া সাফল্য এসেছিল। জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ৭২ হাজার ২০৮ জন। এবার প্রথমবারের মতো গণিতে সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়েছে। আর তাই গণিতে অনেক শিক্ষার্থী বিশেষ করে গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ভালো করতে পারেনি। সেই একই চিত্র প্রতিবছর, এতে পরিবর্তন আনার তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। শহর-গ্রাম বিভক্তি, ডিজিটাল সুবিধার দিক থেকে বিভক্তিগুলো মিনিমাইজ হচ্ছে খুব ধীরে। অতএব, সরকার তথা সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।
আরেকটি বিষয় আবারও বেরিয়ে এসেছে- হাওর-বাঁওড়, পার্বত্য এলাকা এবং উপকূলীয় এলাকার বিদ্যালয়গুলোর পারফরম্যান্স সবচেয়ে খারাপ। এটি আমরা সবাই জানি, তারপরও বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। বোঝাই যাচ্ছে, প্রচলিত পদ্ধতি এখানে কাজ করছে না। এসব এলাকার জন্য পৃথক ব্যবস্থা, পৃথক কাঠামো জরুরি। সেখানকার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে অন্যভাবে। শিক্ষার্থীদের স্কুল টাইমিং, ছুটি, পরীক্ষা- সবই দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে একটু আলাদা হতে হবে। তা না হলে এই বিভক্তি সহজে রোধ করা যাবে না। সরকার বিষয়টিতে
গুরুত্ব না দিয়ে দেশব্যাপী বই বিতরণ উৎসব করছে। বিনা মূল্যের বই কি সব শিক্ষার্থীর দরকার? আমাদের তো বেশি দরকার মানসম্পন্ন শিক্ষক, মানসম্পন্ন শিক্ষাদান। এনসিটিবি কর্তৃক প্রণীত বিনা মূল্যের বই তো খুব আকর্ষণীয় ও শিক্ষাবান্ধব হচ্ছে না।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সব সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত হলেও সেরাদের তালিকায় তারা আসতে পারছে না। তবে পিটিআই-সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয় ভালো করেছে। তাদের পাসের হার ৯৯.৬২ শতাংশ। ব্র্যাক পরিচালিত বিদ্যালয়ে ৯৯.৫৬ শতাংশ। ব্র্যাক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মডেল এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশেই অনুসৃত হচ্ছে। এখানে শিক্ষকদের যেমন প্রতিমাসে রিফ্রেশার্স করানো হয়, তেমনি শিক্ষার্থীরা শুধু পাঠ্যবই নিয়েই ব্যস্ত থাকে না, তারা নাচ-গান-ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি-ছবি আঁকা ইত্যাদি সহ-পাঠ্যক্রমিক বিষয় নিয়মিতভাবে অনুশীলন করে থাকে। তাদের হাতের লেখাও শেখানো হয়। দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পাস করা একজন শিক্ষার্থীর এ বিষয়গুলোতে যথেষ্ট ঘাটতি থাকে।
গণিত ও ইংরেজি সবার কাছে কঠিন হলেও গড় পাসের চেয়ে এ দুই বিষয়ে পাসের হার বেশি। বিষয়টি রহস্যজনক মনে হয়। এ দুই বিষয়ে কি তাহলে গড়পড়তা নম্বর প্রদান ও খাতা সঠিকভাবে পরীক্ষণ করা হয় না, নাকি অধিকাংশ পরীক্ষক খাতায় লেখা বিষয়বস্তু না বুঝেও নম্বর প্রদান করে থাকেন? বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন এবং এ বিষয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।
প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (পিসা) হচ্ছে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায়, গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে তা পরিমাপ বা যাচাই করার পদ্ধতি। পিসার জরিপ ও মূল্যায়নে দেখা যায়, ফিনল্যান্ড আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন শিক্ষার নেতা বা লিডার। পিসার সব ধরনের সূচকে ফিনল্যান্ড অনেক এগিয়ে আছে; আর তাই দেশটিকে শিক্ষার নেতৃত্বদানকারী রাষ্ট্র বলে ধরা হয়। গত এক দশক ধরে ফিনল্যান্ডের এ অবস্থা এবং বিদ্যালয়গুলোয় সমতা পরিলক্ষিত হচ্ছে শিক্ষা পরিমাপের সব সূচকে। এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের একটি হল সাত বছরের আগে কোনো শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ে পাঠানো হয় না। তেরো বছরের আগে তাদের কোনো ধরনের পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয় না এবং কোনো ধরনের হোমওয়ার্ক দেয়া হয় না। শিক্ষা শুরু করার ছয় বছরের মধ্যে পরীক্ষা তো দূরের কথা, কোনো মূল্যায়ন করা হয় না। এই তিনটি সূচকের ক্ষেত্রে আমরা যদি বাংলাদেশের কথা ধরি, তাহলে আমরা কোথায় আছি? তিন বা সাড়ে তিন বছর হওয়ার আগেই শিশুদের স্কুলে পাঠানোর জন্য সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং পাঠিয়ে দেই। সেই পাঠানো থেকেই তাকে পড়তে হয় কঠিন পরীক্ষায়। ভালো কোনো কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির জন্য শিশুকে বিসিএস পরীক্ষার মতো প্রিপারেশন নিতে হয়। বিসিএসের মতো প্রশ্ন সেট করা হয় এসব পরীক্ষায় (কোনো দেশের মুদ্রার নাম, রাজধানীর নাম, সরকার পদ্ধতি ইত্যাদি), কোচিংয়ে যেতে হয়, নির্দিষ্ট শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে থাকতে হয়। পরীক্ষা দিতে হয়, ফলাফলের জন্য উদগ্রীব হয়ে বসে থাকতে হয়, চান্স না পেলে তিরস্কার শুনতে হয়। কারণ বাবা-মা যদিও বোঝেন কিন্তু সমাজের কাছে হেয় হয়ে যাওয়ার ভয়ে তারা বকাঝকা করেন শিশুকে চান্স না পাওয়ার জন্য। এ নিয়ে বহু লেখালেখি, আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এই হ-য-ব-র-ল অবস্থা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সরকার শিশুশ্রেণীতে ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে; কিন্তু অবস্থার কি খুব একটা উন্নতি হয়েছে?
একবার যদি শিশু তথাকথিত নামকরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে তো শুরু হয়ে যায় ক্লাসওয়ার্ক, হোমওয়ার্ক, ক্লাসটেস্ট, সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক-সাময়িক-চূড়ান্ত-পাবলিক ইত্যাদি পরীক্ষা। এসব পরীক্ষার বেড়াজালে শিশুদের জীবন থাকে মহাব্যস্ত। জীবন ও জগৎকে তারা দেখতে থাকে অন্যভাবে। যে স্কুল যত বেশি পরীক্ষা নিতে পারে এবং শিশুদের চাপে রাখতে পারে, সেই স্কুলকে তত বেশি ভালো বলে মনে করা হয়। এ এক অদ্ভুত চিন্তা। জাতীয় পর্যায়েও আমরা চালু করেছি নতুন নতুন পরীক্ষা। সারা জীবনই যেন পরীক্ষা, আর সেই পরীক্ষা মানে মজার কিছু নয়, পুরোটাই তেতো; অথচ জ্ঞান আহরণ করা এবং করানো যে কত মজার, সেই তথ্যটিই আমরা ভুলভাবে উপস্থাপন করছি এবং প্র্যাকটিস করছি।
ফিনল্যান্ডের শিক্ষার আরেকটি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে লো পারফরমার এবং উচ্চ পারফরমারদের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে না, যা আমাদের দেশে পরিলক্ষিত হয়। এছাড়াও অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওএসিডি) রিপোর্ট অনুযায়ী ক্লাসটিচার ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা প্রচুর স্বাধীনতা ভোগ করেন বিষয় নির্বাচন ও শিক্ষাদানে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হচ্ছে, ফিনল্যান্ডের শিক্ষা শিক্ষার্থীদের শেখায় তারা নিজেরা কীভাবে নিজেদের মূল্যায়ন করবে। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা জানে না তারা কোন বিষয়ে কেন পড়ছে, পড়ে কতটা জেনেছে বা কতটা জানা দরকার। তারা শুধু জানে, গতবার এ প্রশ্নটি পরীক্ষায় এসেছে, এবার এটি আসবে না অর্থাৎ বেজোড় বছরের প্রশ্নপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করলেই পরীক্ষায় টপ স্কোরিং করা যায়। ওই দেশে শিক্ষকদের ডাক্তার ও আইনজীবীদের মতো সামাজিকভাবে মর্যাদা দেয়া হয়। তাই শিক্ষক হওয়ার জন্য একজন প্রার্থীকে শিক্ষক প্রস্তুতি প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। তারা প্রশিক্ষণ এমনভাব পান যাতে শিক্ষার্থীদের গলদ এবং মূল রোগ নির্ণয় করতে পারেন এবং সে অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাদের প্রশিক্ষণটি হচ্ছে ক্লিনিক্যাল।
আমাদের শিশুশিক্ষার্থীদের জন্য সামেটিভ অ্যাসেসমেন্টের চেয়ে ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্টকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে, শিক্ষকদের সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্টের মাধ্যমে তাদের প্রয়োজনীয় কম্পিটেন্সি ও সামাজিক দক্ষতা নির্ণয় করা যাবে। শিক্ষা যাতে বাস্তব জীবনে কাজে লাগে সে বিষয়টি নিশ্চিত করা যাবে। শিক্ষা ও শ্রেণীকক্ষকে কীভাবে আনন্দময় করা যায় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে, অর্থ ব্যয় করতে হবে, শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সভা-সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় খাতের খরচ কমাতে হবে। মানসম্পন্ন শিক্ষক অবশ্যই নিয়োগ দিতে হবে। আর আমাদের দেশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দুটি- এমনটি অন্য কোথাও সচরাচর দেখা যায় না। আমরা বিষয়টি পুনরায় বিবেচনা করে দেখতে পারি।
মাছুম বিল্লাহ : প্রোগ্রাম ম্যানেজার, ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি, সাবেক ক্যাডেট কলেজ শিক্ষক

হঠাৎ আনন্দ মাটি, পুড়ে গেল মুখ by কমল জোহা খান

(ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন রাবেয়া। ছবি: সাজিদ হোসেন) মামার বিয়েতে আনন্দে মেতে ছিল শিশু রাবেয়া। গতকাল বুধবার রাতে ছিল গায়েহলুদ। হইহল্লা আনন্দে ভরপুর বিয়েবাড়ি। জেনারেটরের বিদ্যুতে চারদিক ঝলমল। হঠাৎ কী হলো, থেমে গেল জেনারেটর, নিভে গেল সব আলো। তারপর রাবেয়ার বুকফাটা চিৎকার—মুখটা পুড়ে যাচ্ছে তার। গতকাল বুধবার রাত ১২টার দিকে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার সরকারকান্দি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তদের ছোড়া দাহ্যপদার্থে মুখমণ্ডল পুড়ে গেছে রাবেয়ার। সে এখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছে আর ছটফট করছে যন্ত্রণায়। হামলার মূল লক্ষ্য রাবেয়ার মামা সেলিম সরকার। তাঁকেই মূলত দাহ্যপদার্থ ছুড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। এ সময় রাবেয়াসহ আরও তিনজন আক্রান্ত হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে বাকি তিনজনকে চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁরা হলেন শাহিনা আক্তার (২২), তোহরা বেগম (১৭) ও চার বছরের শিশু সিয়াম।
আজ দুপুরে যন্ত্রণায় কাতর রাবেয়াকে বার্ন ইউনিটের পাঁচতলার শিশু বিভাগে চিকিৎসাধীন দেখা যায়। তবে শয্যা খালি না থাকায় শিশু বিভাগের মেঝের ওপর শুয়ে ছিল রাবেয়া। মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন মা সরলা বেগম। রাবেয়ার বাঁ চোখ বন্ধ। খানিক পর পর রাবেয়া বলছে, ‘মা, একডা ব্যাডা আমারে পুড়াইয়া দিছে!’ প্রথম আলোকে দেওয়া সরলা বেগমের ভাষ্য, মামাতো ভাইয়ের গায়েহলুদের অনুষ্ঠান তখন শেষ হওয়ার পথে। তাঁদের এলাকায় বিদ্যুৎ-সংযোগ নেই। তাই জেনারেটর দিয়ে চলছিল। রাত ১২টার সময় হঠাৎ জেনারেটর বন্ধ হয়ে যায়। এর পর ঘটনাটি ঘটে। সরলা বেগম বলেন, ‘বরের হাতে মেন্দি (মেহেদি) দেওনের সময় আলো বন্ধ হইয়্যা যায়। তখন আমার মাইয়া চিক্কর (চিৎকার) দেয়—“মা, আমার শরীর পুইড়্যা গেছে!”
প্রত্যন্ত এলাকা হওয়ায় যোগাযোগ জটিল। শীতের রাতে আহত পাঁচজনকে স্পিডবোটে করে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে নেওয়া হয় চাঁদপুর সদর হাসপাতালে। আজ ভোর চারটার দিকে তাঁদের ঢাকা মেডিকেলে নেওয়া হয়। রাবেয়া ও তার মামা সেলিম সরকারের এই পোড়া দাগ সারা জীবনের জন্য থেকে যাবে বলে জানান বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, রাসায়নিক দাহ্যপদার্থে (কেমিক্যাল বার্ন) তাঁরা দগ্ধ হয়েছেন। বর সেলিম সরকারের মুখের একপাশসহ সারা শরীরের ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে। শিশু রাবেয়া আক্তারের মুখসহ শরীরের ৬ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাঁদের অবস্থা গুরুতর। কেমিক্যাল বার্নকে ভয়াবহ হিসেবে মনে করেন তিনি। অগ্নিদগ্ধদের ক্ষতচিহ্ন সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হতে পারে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসা সেলিম সরকারের ভাই ইউনুস সরকার ও ভাগনে আবদুল হকের অভিযোগ, দাহ্যপদার্থ ছুড়েছেন সিফাত নামের এক যুবক। পারিবারিকভাবে সেলিমের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল পাশের সখীপুর গ্রামের এক মেয়ের সঙ্গে। এই মেয়েকে পছন্দ করেন সিফাত। গত বছরের মাঝামাঝি সময় সেলিমের আংটিবদল অনুষ্ঠান হয়। পরে সেলিমের পরিবারকে সিফাত জানান যে ওই কনেকে তিনি পছন্দ করেন। এ সময় সেলিমের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁকে (সিফাত) জানানো হয়, মেয়ে রাজি থাকলে তিনি বিয়ে করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। এর জের ধরেই গতকাল রাতে বরকে লক্ষ্য করে সিফাত দাহ্যপদার্থ ছোড়েন। ঘটনার অনেক আগে থেকেই সিফাতকে বিয়েবাড়ির আশপাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখেছেন বলে দাবি করেন সেলিমের স্বজনেরা। সখীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সমির সরকারের ভাষ্য, খবর পেয়ে ওই গ্রামে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এখনো থানায় অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অপরাধীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

খেরোখাতায় আমাদের শিক্ষাঙ্গন

একটি বছরের হিসাবে শিক্ষার সার্বিক চিত্র স্পষ্ট করা কঠিন। শিক্ষা কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া। এক বছরের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যায় পরের বছর। তবুও ২০১৫-এর প্রথম দিনে দাঁড়িয়ে আমরা যদি সদ্য ছেড়ে আসা খেরোখাতার দিকে চোখ বুলাই তবে দেশের সার্বিক শিক্ষাঙ্গনের একটা ছবি হয়তো খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবে ২০১৪-এর অভিজ্ঞতা যে খুব স্বস্তির ছিল তা বলা যাবে না। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাঙ্গন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নিয়ে বরাবরের মতো আমাদের ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক নেতারা তেমন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেননি। গত বছরের শুরু থেকেই সরকারবিরোধী আন্দোলন কর্মসূচির কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে বারবার। শিক্ষাবিদহীন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থাকলে যে যে ধরনের গোলমেলে অবস্থা তৈরি হতে পারে, সব ক্ষেত্রে তার প্রকাশ স্পষ্ট হয়েছিল।
ইতিবাচক দিক হিসেবে দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে। নারীশিক্ষার অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া বছরের প্রথম দিন স্কুল পর্যায়ে টেক্সট বুক বোর্ডের বই পৌঁছানোর কৃতিত্ব রয়েছে সরকারের। এর বাইরে সরকারি কৃতিত্ব বড় মুখ করে বলার মতো ছিল না। তবে সরকার পক্ষ বড় মুখ করে বলেছে অনেক কিছুই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজরদারি, টেক্সট বুক বোর্ডের কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট লেখকদের ঐকান্তিকতা এবং শ্রমে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীর হাতে বই পৌঁছে দেয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে বইয়ের মানগত দিক এবং প্রকাশনার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে গিয়েছিল বিগত বছরগুলোর মতোই। বই লেখার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্র“টি, লেখক-সম্পাদক নির্বাচনে পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রে গ্রন্থ রচনাকে মানসম্মত রাখতে দেয়নি। আর দুর্নীতি ও বাজেট সংকট বইয়ের উৎপাদন-মানকে দুর্বল করে দিয়েছে।
বছরের শুরুর পূর্বেই আন্দোলনরত স্কুলের নিুবেতনভুক শিক্ষকরা পুলিশের টিয়ার শেল ও লাঠিপেটার শিকার হন। প্রাথমিক ও জুনিয়র পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পিইসি আর জেএসসি নামের পাবলিক পরীক্ষার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার চাপে গত বছরও গলদঘর্ম ছিল। এই প্রতিযোগিতামূলক সমাজে এসব পদ্ধতি অভিভাবকের পকেট কেটেছে আর রমরমা করেছে গাইড ও কোচিং ব্যবসায়ীদের পকেট। এর সঙ্গে নতুন ও ভয়ানক উপদ্রব হিসেবে আবির্ভূত লাগাতার প্রশ্ন ফাঁসের মধ্য দিয়ে কোমলমতি শিশুদের হাতেকলমে অনৈতিকতার প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতায় অথবা পৃষ্ঠপোষকতায়। ‘পৃষ্ঠপোষকতা’ শব্দে সংশ্লিষ্টজনদের মধ্যে আপত্তি থাকতে পারে। কিন্তু এমন ‘আপত্তিকর’ শব্দ ব্যবহার করতে হচ্ছে কার্যকারণ সূত্রেই। প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়টি যখন দেশবাসী ও ভুক্তভোগীদের কাছে স্পষ্ট, তখনও বিষয়টি ক্রমাগত অস্বীকার করে চলেছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এই অস্বীকারের অর্থই হচ্ছে ফাঁসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ার পথ তৈরি করে দেয়া। একই সঙ্গে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শত ভাগ পাস আর উজ্জ্বল ফলাফলের বিস্ফোরণ দেখিয়ে সরকারের কৃতিত্ব জাহির করার প্রবণতা কলুষিত করেছে মেধাচর্চার জায়গাটিকে। সরকার পক্ষ অস্বীকার করলেও দেশের সহস্র সহস্র স্কুল-কলেজের শিক্ষক জানেন কোনো এক অলৌকিক নির্দেশনায় তাদের হাত খুলে নম্বর দিয়ে জিপিএ-৫-এর জোয়ার বইয়ে দিতে হয়েছে। এসব কার্যক্রমই শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে। নিুবেতন কাঠামোয় আটকে রেখে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেধাবী শিক্ষক আকৃষ্ট করার ব্যাপারে গেল বছর কোনো পদক্ষেপ গৃহীত হয়নি। বেসরকারি স্কুল আর কলেজের পরিচালনা পর্ষদ, এমপিসহ নানা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অভিলাষে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনীতি বণিক আর দুর্বল মেধার শিক্ষকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
লাখ লাখ কিশোর-তরুণ কওমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে। অথচ এসব মাদ্রাসার কারিকুলামে তেমন কোনো সংস্কার আনতে পারেনি মাদ্রাসা বোর্ড আর সরকারের
মন্ত্রণালয়। আধুনিকায়নের কোনো পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়নি। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষা অনেকটা ধুঁকে ধুঁকে চলছে।
ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও মূলধারার কারিকুলামে তেমন কোনো সমন্বয় সাধিত হয়নি গেল বছরে। একইভাবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পদ্ধতি এবং পরীক্ষা পদ্ধতিতে সমন্বয়ের চেষ্টা করেনি ইউজিসি থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। ফলে শিক্ষা ও সার্টিফিকেটের মান নিয়ে বরাবরের মতো প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ।
রাজনীতিকরণের কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নাজুক অবস্থা অতিক্রম করেছে বিগত বছরটিতে। ছাত্র সংঘাত আর খুনোখুনিতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অনেক বেশি রক্তাক্ত হয়েছে। সরকারি ছত্রচ্ছায়ায় ছাত্রলীগ অনেক বেশি উন্মত্ততা প্রকাশ করেছে। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রলয় সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বিপথগামী অপরাধী ছাত্ররা সরকারি নেতা-নেত্রীদের প্রশ্রয় বঞ্চিত হয়নি। ফলে তারা দুর্দমনীয় হয়ে উঠেছিল বছরজুড়ে।
দলীয় শিক্ষক রাজনীতির নতজানু ও সুবিধাবাদী দশা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিবেশকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। উপাচার্য নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পাণ্ডিত্য ও মেধার চেয়ে দলীয় আনুগত্যের প্রশ্নটিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শুধু রাজনৈতিক কারণে নয়, নিয়োগ বাণিজ্যের প্রশ্নটিও গত বছর সামনে চলে এসেছিল। কয়েক বছর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগে দু-একটি ক্ষেত্রে অর্থ বাণিজ্যের কথা শোনা যেত। এখন কমবেশি অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগেও অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বছর যত শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে, নিরপেক্ষ তদন্তে সেসব যাচাই-বাছাই করা হলে এ সত্য খুঁজে পেতে খুব কষ্ট হবে না।
এভাবে রাজনীতিকরণের বিষময় প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রমে। কুরাজনীতিকরণ এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, শিক্ষক সমিতি বা সিন্ডিকেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ভিসিপন্থী দল হিসাব করতে থাকে আর কটি ভোট যুক্ত হলে বিজয় নিশ্চিত হবে। সেইমতো শুরু হয়ে যায় বিভিন্ন বিভাগে বিজ্ঞাপিত পদে এবং বিজ্ঞাপনের বাইরেও অতিরিক্ত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া। এসব ভোটার শিক্ষকের প্রধান যোগ্যতা থাকতে হয় দলীয় আনুগত্য। ছাত্র জীবনে কোন আদর্শের রাজনীতি করেছে সে বিবেচনাটি সামনে চলে আসে। এসব নিয়োগের পরও যদি ভোটের ব্যাপারে সন্দিহান থাকে, তখন রাতারাতি নতুন বিভাগ খুলে ফেলা হয়। আর সেই বিভাগের বিপরীতে নিয়োগ দিয়ে ফেলা হয় কয়েকজন শিক্ষক। এসব কাণ্ডে ইউজিসিও কেমন করে যেন ম্যানেজ হয়ে যায়। কিন্তু ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এসব নতুন বিভাগের শিক্ষার্থী ও তাদের শিক্ষা কার্যক্রম। যত দ্রুত শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ করা যায়, তত শিগগির বিভাগের অবকাঠামো তৈরি হয় না। শিক্ষার্থীরা অনেকটা উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের দু-তিন বর্ষ পার হলেও তারা অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ শিক্ষকের দেখা পায় না। লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি তৈরি হয় না। সর্বোপরি বিশেষ নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধ থাকায় শিক্ষা কার্যক্রমে তেমন মনোযোগ দিতে পারেন না। উপাচার্য মহোদয়দের ক্যাম্পাসে জ্ঞানচর্চা ও জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ তৈরিতে মনোযোগ দেয়ার বদলে দলীয় রাজনীতি নিয়ে বেশি ভাবতে হয়। এসবের বিষময় প্রভাব এখন প্রতিফলিত হচ্ছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে।
আমার এক সহকর্মী সেদিন যথার্থ বলেছিলেন, এখন ক্যাম্পাসে শিক্ষক রাজনীতি চলছে নয়-ছয়ের মধ্য দিয়ে। প্রথমে বুঝতে পারিনি। পরে বুঝেছি এর মধ্যে যেমন প্রতীকী বিষয় রয়েছে তেমনি রয়েছে পরাবাস্তবতা। জাতীয় রাজনীতির চেয়ে এদিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতিতে কিছুটা ফারাক আছে। দলীয় রাজনীতির সাইনবোর্ড থাকলেও কখনও গোষ্ঠী রাজনীতির স্বার্থে নয়-ছয়ের খেলায় মেতে ওঠেন অনেকে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে। যেমন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদাহরণ নেয়া যায়। জাতীয় রাজনীতিতে এখন বিএনপি-আওয়ামী লীগ পারস্পরিক শত্র“ সম্পর্ক নিয়ে দুই মেরুতে অবস্থান করছে। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাসীন অংশ ও বিএনপির শিক্ষক গ্র“প গভীর বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। যেহেতু দু’দলের ভোট ব্যাংক একসঙ্গে হলে সরল হিসাবেই একচ্ছত্র শক্তি ধারণ করা যায়, সে কারণেই মিলন সমীকরণে চলছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় শিক্ষকরা। এ কারণেই ন্যায়-নীতি ও যুক্তির বাইরে উভয়ের সন্তুষ্টিতে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া বিগত বছরে অব্যাহতভাবে চলেছে।
নয়-ছয়ের বিষয়টি বেশি প্রচার পেয়েছে একটি বাস্তব অবস্থা থেকে। গেল ডিসেম্বরে ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নির্বাচন। মোট পনেরোটি পদের মধ্যে আওয়ামী লীগপন্থীরা ৯টি এবং বিএনপিপন্থীরা ৬টিতে সম্মিলিত প্যানেল ঘোষণা করে। যেহেতু দলবৃত্তে বন্দি শিক্ষকরা এখন বিবেক আর যুক্তি দিয়ে ভোট দেন না, তাই অন্য পক্ষের শিক্ষকরা মিছিমিছি প্যানেল উপস্থাপন করেননি। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়-ছয়ের প্যানেল নির্বাচিত বলে ঘোষিত হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রতীকী স্থান মাত্র। মোটামুটি একই তাল-লয়ে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই রাজনীতির শিক্ষকরা দলবৃত্তে বন্দি করে ফেলছেন শিক্ষা-পরিবেশকে। তাই শিক্ষা কার্যক্রমের সূচক কেবল নিুমুখী হচ্ছে।
নতুন বছরে আমরা সবসময়ই জরামুক্ত হতে চাই। তেজোদীপ্ত হয়ে সুন্দরের পথে হাঁটতে চাই। এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় যদি গুণগত পরিবর্তন আনতে চাই তবে শিক্ষাকে রাজনৈতিক ভেদবুদ্ধিমুক্ত না করতে পারলে অভীষ্টে পৌঁছা সম্ভব নয়। ২০১৫ সালের প্রথম দিন থেকে আমাদের সব ক্ষেত্রের ক্ষমতাবানরা যদি এই উপলব্ধিতে আসতে পারেন যে, নিজেদের সন্তান দেশে লেখাপড়া না করলেও এ দেশের শিক্ষার্থীরা তাদের সন্তানের মতোই। একটি প্রকৃত শিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছাড়া দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই শিক্ষার পরিবেশ সুস্থ রাখার স্বার্থে সব অশুভ তৎপরতা থেকে সরে আসব। স্বাভাবিক নিয়মে জ্ঞানচর্চার সব পথ কণ্টকমুক্ত করব। তবেই আমাদের শিক্ষাঙ্গন বন্দিত্বমুক্ত হতে পারবে। আমরা চাই একটি সুস্থ ধারার বিকাশ ঘটুক নতুন বছরে।
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

অর্থনীতিতে স্থবিরতা দূর হোক

আজ ২০১৫ ইংরেজি নববর্ষের শুরু। শুরুটা হচ্ছে বৃহস্পতিবার; অতএব নতুন বছর মঙ্গলময় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী দিনের কথা পরে হবে, যে বছরটি ফেলে এলাম সেটি কেমন গেল? রাজনৈতিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবে। এ প্রশ্নের উত্তর একেকজন একেকভাবে দেবেন। আমি ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ দিয়ে শুরু করি। গেল বছরের শেষের দিকের খবর হচ্ছে- ব্যাংকগুলো তাদের খাতা ক্লোজ করছে বেশি বেশি খেলাপি ঋণ দিয়ে (ক্লাসিফাইড লোন)। এর অর্থ কী? ২০১৪ সাল শুরু হয়েছিল প্রায় ৯ শতাংশ খেলাপি ঋণ দিয়ে। শেষ হবে ১১ শতাংশের ওপর পরিমাণ খেলাপি ঋণ দিয়ে। এই হচ্ছে আশংকা। ব্যবসায়ীরা কখন ঋণ খেলাপি হন? কতিপয় ব্যতিক্রম বাদে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলেই তারা ব্যাংকের টাকা চুক্তি মোতাবেক পরিশোধ করতে পারেন না। এটা বাস্তবতা। সাধারণভাবে ব্যবসায় মন্দা আগে, খেলাপি ঋণ পরে। যদি তাই হয় তাহলে বলা যায় ব্যবসায়িক দিক থেকে ২০১৪ সালটি ছিল মন্দার বছর। গত ২৫ ডিসেম্বরের খবর- ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় বন্ধ। এ মুহূর্তে ১২,১৮৫টি ফ্ল্যাট যার মূল্য প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা তা অবিক্রীত আছে বলে রিহ্যাব নেতারা পূর্তমন্ত্রীকে জানিয়েছেন। আবাসন শিল্পটির সঙ্গে প্রায় ২০০টি শিল্প জড়িত, জড়িত লাখ লাখ শ্রমিকের ভাগ্য। এ খাতের মন্দা গলা টিপে ধরছে অনেক শিল্পকে। বলা হচ্ছে আয়কর ও দুদকের ভয়ে ক্রেতারা ফ্ল্যাট ক্রয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছেন না।
দেখা যাচ্ছে ভোক্তাপণ্যের বাজারও মন্দা। কিছু দিন আগে মল ও মীনাবাজার সমিতির নেতারা বলেছেন, তাদের বেচাকেনা কম। এর অর্থ হচ্ছে মধ্যবিত্ত মীনাবাজারে আগের মতো যাচ্ছেন না। মধ্যবিত্তদের ক্রয় ক্ষমতা ২০১৪ সালে মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই সালে ব্যাংক আমানতের ওপর সুদের হার আশংকাজনকহারে কমেছে। যেখানে ১৩-১৪ শতাংশ ছিল সুদের হার, তা এখন মাত্র ৮-৯ শতাংশ। মধ্যবিত্তের ওপর ২০১৪ সালের বাজেট ঘোষণাকালে এক প্রস্থ কর বেড়েছে। এসব কারণে বাজারে, মলে, শপিং সেন্টারে বেচাকেনা কম। ২০১৪ সালে কয়েকটি শিল্পের অবস্থা খারাপ বলে কাগজে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। চীনা প্রোডাক্টের অত্যাচারে গ্লাস শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত। শিপ-ব্রেকিং শিল্পের অবস্থা খারাপ। অনেক শিপ-ব্রেকিং শিল্প বন্ধ হয়েছে। শিপবিল্ডিং শিল্পের অবস্থা খুবই খারাপ। এ শিল্পের পুরোধারা এখন ব্যাংকে ব্যাংকে দৌড়াচ্ছেন খেলাপি না হওয়ার জন্য। সুগার রিফাইনিং শিল্প মার খেয়েছে আগেই। তারা নিজেরাও মরেছে, স্থানীয় চিনি শিল্পকেও মার দিয়েছে। মূল্য পতনের কারণে বাংলাদেশ চিনি শিল্প সংস্থা লোকসানের মুখে। স্টিল মিলসের মধ্যে যারা বড় তারা চলছে, ছোট ও মাঝারিরা ক্ষতিগ্রস্ত। তারা ধীরে ধীরে বাজার থেকে নিষ্ক্রান্ত হচ্ছে। সুতা ও কাপড়ের বাজারে চলছে অনিশ্চয়তা। স্থানীয় বস্ত্র শিল্প হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। এদিকে শিল্পের জন্য গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই- ২০১৪ সালজুড়ে ছিল এ অবস্থা। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা ২০১৪ সালজুড়ে ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার বেশি এ অভিযোগ করেছেন। কিন্তু সমস্যার কোনো সমাধান চোখে পড়েনি।
ব্যবসায়িক নেতিবাচক খবরের পাশাপাশি আরও কিছু নেতিবাচক খবর আছে। যেমন রফতানি প্রবৃদ্ধির হার গেল নভেম্বরে আগের মাসের তুলনায় বাড়লেও ২০১৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে রফতানিতে প্রবৃদ্ধির হার নগণ্য। ২০১৩ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০১৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে রফতানিতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র দশমিক ৯২ শতাংশ। বলা হচ্ছে, পোশাক খাতের প্রবৃদ্ধির হার শ্লথ, অতএব সার্বিকভাবেও তাই। পোশাকের সঙ্গে যোগ হয়েছে হিমায়িত মাছ, চামড়া, কাঁচা পাট এবং আসবাবপত্র। তাহলে আর থাকে কী? বস্তুত রফতানির বাজার আমাদের এক পণ্যের। পোশাক ও বস্ত্র। এদিকে রফতানির বিপরীতে আমদানির প্রবৃদ্ধি বেশি ছিল। ২০১৪ সালের শেষের চার মাসে আমদানি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। ভাগ্য ভালো আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলসহ সব ধরনের জিনিসের দামই বাড়তির দিকে। এরপরও আমদানির প্রবৃদ্ধির হার ১৫ শতাংশ। রফতানি কম আমদানি বেশি- এর ফল যা হওয়ার তাই। আমাদের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ২০১৪ সালের শেষ চার মাসে এ ঘাটতি পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৯২ শতাংশ বেড়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর আদায় পরিস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। ২০১৪ সালের শেষ পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কর আদায় কম হয়েছে ১৪৮৪ কোটি টাকা। খবরে দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে কম আদায় হয়েছে ভ্যাট। আয়কর আদায় মোটামুটি ভালো। ভোগ হ্রাস এবং বিনিয়োগ ঘাটতির ফলে রাজস্ব আদায়েও শ্লথগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। সরকারের রাজস্ব আয়ের পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ের চিত্রও সুখকর নয়। ২০১৪ সালের জুলাই-অক্টোবর সময়ে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে বরাদ্দের মাত্র ১৩ শতাংশ। গেল বছরে এ হার ছিল ১৫ শতাংশ।
যেসব মন্ত্রণালয় সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পায় তার মধ্যে ৬টি মন্ত্রণালয়
তাদের গড় ব্যয়ের তুলনায়ও কম খরচ করেছে। এ কারণে উন্নয়নের গতিতে একটা ছেদ পড়ছে। বিশেষত যেখানে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ খুব বেশি লক্ষণীয় নয়।
এতসব নেতিবাচক খবরের মধ্যেও ২০১৪ সালের ভালো খবর আমার কাছে দুটি : মূল্যস্ফীতি ও চালের দাম। এ সালে মূল্যস্ফীতি গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিু স্তরে নেমে আসে। এখন তা ছয় শতাংশের মতো। এটা বিশাল অর্জন। এ অর্জন দুটি কারণে সম্ভব হয়েছে। প্রথমত বিশ্ববাজারে তেলের দামসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের দাম ২০১৪ সালে হ্রাস পেয়েছে। এর সুবিধা আমরা পেয়েছি। দ্বিতীয়ত বছরজুড়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখে। গত দু-তিন বছর আগে ঋণ সম্প্রসারণ বেশি হওয়ার প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নীতি গ্রহণ করে, বিশেষ করে ১১-১২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে। মূল্যস্ফীতি নিচু স্তরে থাকার ফলে সাধারণ মানুষ বেশ কিছুটা স্বস্তি পায়। বাজারে চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে ছিল। এটা অবশ্য বেশ কিছুদিন ধরেই। চালের সরবরাহ ২০১৪ সালজুড়েই সন্তোষজনক পর্যায়ে ছিল। সরকারের গুদামে চালের স্টক যথেষ্ট ছিল। ২০১৪ সালে সরকার বহুদিন পর শ্রীলংকায় কয়েক হাজার টন চাল রফতানি করে। এতে চালের বাজারে স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়নি। শাকসবজি, মাছ, মাংস, ডিম-দুধ ও ফলমূলের দামেও চলতি বছরে (২০১৪) কোনো অস্বাভাবিক উত্থান-পতন পরিলক্ষিত হয়নি। এমনকি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেছি, রোজার দিনেও ভোগ্যপণ্যের দাম নিয়ে কোনো হুজ্জতি হয়নি। অথচ এটা প্রতিবছর হয়।
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে এ দুটি খবর নিঃসন্দেহে ভালো খবর। ভালো খবর আরও একটি আছে। যেমন শিল্পায়ন। এ কথা সত্যি বিদ্যুতের অভাব আছে, গ্যাসের সমস্যা আছে, ঋণের ওপর সুদের হারের বাড়াবাড়ি আছে। কিন্তু এতদসত্ত্বেও ২০১৪ সালের মাঝামাঝি থেকে শিল্পঋণে একটা ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়। ২০১৪ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে শিল্পঋণের সরবরাহ প্রায় ৪৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র থেকে জানানো হয়েছে যে, এটা সম্ভব হয়েছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ার ফলে। পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি জুলাই-সেপ্টেম্বরে বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ইস্পাত ও প্রকৌশল খাতে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়েছে। লক্ষণীয়, খবরে দেখলাম, শিল্পের প্রচলন পুঁজির (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) সরবরাহও এ সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বৃদ্ধির হার ৬৩ শতাংশ। এসব খবর ও তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শিল্প খাতে প্রাণ সঞ্চার হচ্ছে। এটা ধারণা করা হয়, যদি বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় তাহলে শিল্প বিনিয়োগ গতি পাবে। যদি দেশীয় বেসরকারি খাত এগিয়ে চলে তাহলে বিদেশী বিনিয়োগও বাড়বে। শত হোক দেশীয় ব্যবসায়ীরা এগিয়ে না গেলে বিদেশীরা আসবে কোন কারণে? বিদেশীরা দেশীয়দের মাধ্যমেই আসে। ইদানীং তারা পোর্টফলিও বিনিয়োগে আসছে-যাচ্ছে। আমরা চাই তারা ম্যানুফেকচারিংয়ে আসুক। এর পরিবেশ এখন কিছুটা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০১৪ সালে রেমিটেন্সে বড় রকমের কোনো উত্থান পরিলক্ষিত হয়নি। তবে এ খাতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে, যদিও এ হার আশানুরূপ নয়। রেমিটেন্সের বাজার বিদেশে মন্দাক্রান্ত। এরপরও রেমিটেন্স ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এদিকে আবার ডলারের মূল্য রয়েছে। ২০১৪ সালে ডলারের বিনিময় মূল্য বেশ স্থিতিশীল ছিল। ডলার নিয়ে কোনো সংকট তৈরি হয়নি। বরং টাকার বিপরীতে ডলারের মূল্য নিচের দিকেই স্থিতিশীল ছিল। এতদসত্ত্বেও রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। লক্ষণীয় আমাদের টাকা, ভারতীয় রুপি, পাকিস্তানি রুপির চোয়েও স্থিতিশীল। এটা একটা বড় অর্জনই বটে। আমদানি, রফতানি ও রেমিটেন্সের সঙ্গে জড়িত বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ। এটা খুবই সন্তুষ্টির বিষয় যে, আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ প্রতি মাসেই রেকর্ড ভঙ্গ করছে। বর্তমান বাজারমূল্যে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ আমাদের ৬-৭ মাসের আমদানির প্রয়োজনীয় টাকার সমান, যেখানে সাধারণভাবে তিন মাসের সমপরিমাণ থাকলেই চলে। সাধারণ বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ পড়ে। লক্ষণীয় আমাদের রিজার্ভ প্রতি মাসে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির হার কমছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ধন্যবাদ তাদের ব্যবস্থাপনার জন্য। গভর্নর আতিউর রহমান এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন। সার্বিক আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, অর্থনীতি ধীরে ধীরে তার ভিত্তি শক্ত করছে। এবারও আশাবাদ, ৬ শতাংশের অনেক ওপরেই থাকবে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার। ২০১৪ পেছনে পড়েছে। সামনে ২০১৫ সাল। ইংরেজি নববর্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা, যুগান্তরের পাঠকদের শুভেচ্ছা।
ড. আর এম দেবনাথ : সাবেক প্রফেসর, বিআইবিএম

নতুন বছর মঙ্গল বয়ে আনুক

আজ দেশ-বিদেশে নববর্ষ নিয়ে ঘটবে নানা বর্ণালী অনুষ্ঠান। বস্তুত এগুলোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন থেকেই। একবার থার্টিফার্স্ট নাইটে বড়ই আনন্দের সুযোগ হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে। স্ত্রী, ছেলে, নাতি-নাতনি এবং পরিচিত অনেকেসহ। বেশ অনেক রাতে একটি গাড়িবহর নিয়ে চলে গেলাম সিডনির মূল সিটি এলাকায়। ঐতিহাসিক সেতু পার হয়ে যখন পৌঁছলাম প্রশান্ত মহাসাগর তীরে বিশাল মাঠটিতে তখন অবাক হয়ে দেখলাম রঙবেরঙের অজস্র আতশবাজি অনবরত এদিক-ওদিক-সেদিক থেকে ছোড়া হচ্ছে মহাশূন্যে। সেটা ছিল ২০০৭ সালের ৩১ ডিসেম্বরের থার্টিফার্স্ট নাইট।
থার্টিফার্স্ট নাইট তো একটি বছরের শেষ বিদায়ের রাত। কিন্তু কোনো কিছুর বিদায় তো দুঃখের বলে সাধারণ জ্ঞানে আমরা জানি। তাহলে কেন এমন উৎসবের আয়োজন ওই রাতেই? এর পেছনে কোনো ঐতিহাসিক কারণ আছে কিনা, আমার জানা নেই। তবে নিজে নিজেই নিজের মতো করে বুঝে নিয়েছি তা হল পুরাতনের বিদায়ের মধ্যেই তো নতুনের শুভাগমন। তাই নতুনকে সমারোহ করে স্বাগত জানানো হবে তেমনি আবার পুরাতনকেও তেমনই সমারোহ করে বিদায় জানাতে হবে।
আর একটি বছরের সমাপ্তি তো অনেকাংশেই একটি ইতিহাসের সমাপ্তি। তাই ইতিহাস সমাপ্ত হলে বা ইতিহাসের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে বর্ষশেষকে তো গুরুত্ব¡ দিয়েই উদযাপন করতে বা মনে রাখতে হবে। তাই এ ব্যাপক আয়োজন। অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশাল জনমানবহীন দেশের ওই মাঠটিতে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন উপলক্ষে জমায়েত হয়েছিলেন হাজার নর-নারী, তরুণ-তরুণীর, যুবক-যুবতীর সংখ্যাই যদিও বেশি তবুও তারাই সব নন। অন্যান্য বয়সী, বিশেষ করে বয়সীদের সংখ্যাও তো নেহায়েত কম ছিল না। সবাই মিলে কি উদ্দাম নৃত্য। তরুণীরা একজনের সঙ্গে থাকছে- শেষ হতেই আর একজনের সঙ্গে। ওমা, শেষে দেখি যে আমি বা আমার স্ত্রীও বাদ পড়লেন না। সবাইকে নাচতেই হল জোড়ায় জোড়ায়? ড্রিংক? হ্যাঁ, তাও। বাদ নেই, রেহাইও নেই। কারণ কোনো কিছুতে অস্বীকৃতি জানানো নেহায়েত শিষ্টাচারবহির্ভূত বলেও গণ্য হয়। এভাবে আলোর ঝলকানি নাচ-ড্রিংকস প্রভৃতির মধ্য দিয়ে শেষ হল থার্টিফার্স্ট নাইট। না তাই বলে নারীর সম্ভ্রমহানি নেই, অপহরণ নেই, গুম নেই, নেই অমর্যাদাকর কোনো কিছুই।
অবশেষে ভোর হল। নববর্ষের নতুন প্রভাত। সবাই জমায়েত হলাম এক জায়গায়। সেখানেও ড্রিংকস যেন তাই দিনেই নববর্ষের আবাহন। বাইরে আরও অনেক আয়োজন ছিল, গেলাম না অন্য কোথাও নববর্ষ অনুষ্ঠান দেখব ওই বাসা থেকে সোজা বড় ছেলে প্রবীরের বাড়িতে এসে ঘুম। তবে যেটুকু করা হল, তা মনে রাখার মতো।
আমেরিকায় যাইনি কোনো দিন। তবে নববর্ষ উৎসব সেখানেও পালিত হয় পৃথিবীর সব দেশের মতোই ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে এবং নানারকম উদ্দামতার মধ্য দিয়ে মিডিয়া মারফতে তা জানা যায়। তবে যত যাই হোক নববর্ষ উদযাপনে আমরা বাঙালিরা, আমার বিবেচনায় ও রুচিতে, ফার্স্ট, অদ্বিতীয়, রমনার বটমূলের অপূর্ব অনুষ্ঠানমালা, অপরাপর সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠনের অনুষ্ঠানাদি। নানা মিডিয়ার, বিশেষত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াগুলোর নানাবিধ আয়োজন বস্তুতই বাঙালি সংস্কৃতির এক অনবদ্য পরিবেশনা সেদিন আমরা প্রত্যক্ষ করে থাকি। ইলিশ-পান্তা, মুখ-মিষ্টি করা বা করানো, বৈশাখী মেলা, সবকিছু মিলিয়ে সেদিনটি নেহায়েতই আমাদের বাঙালিদের। একান্তভাবেই নিজস্ব।
কিন্তু বাঙালি জাতি মূলত রাজনীতিপ্রবণ। রাজনীতি করতে, রাজনীতি জানতে ও শুনতে ভালোবাসে। ২০১৪ সালের রাজনীতি জনগণকে উৎসাহিত করতে পারেনি। জানুয়ারির ৫ তারিখে নির্বাচনটি ছিল যেমন অতিমাত্রায় বিতর্কিত ক্ষমতাবহির্ভূত দলগুলোর অংশগ্রহণহীন, তেমনি একতরফা বা একদলীয় সংসদে নেতা-নেত্রীদের পরস্পর পরস্পরকে গালিগালাজ এবং নিন্দা-ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে দেশে উত্তেজনা সৃষ্টির অনুকূল। বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে বিদেশে অবস্থানকারী তারেক রহমানের নানাবিধ আপত্তিকর উক্তির প্রতিবাদে সরকারি দলের এবং ওই উক্তির সমর্থনে বিএনপির প্রতিক্রিয়া যে প্রবল উত্তেজনা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে তাতে নতুন করে মানুষের মনে নানাবিধ ভীতি এবং শংকারও সৃষ্টি হয়েছে। আবারও হরতাল-অবরোধ? অবাক ওই হরতাল-অবরোধ ডাকতে বিএনপিকে যেন সরকারি মহল থেকেই উসকানিও দেয়া হল। মাঝখানে ১৬ কোটি মানুষের অসহায়ত্ব, দুঃখ-কষ্ট, জীবনের নিরাপত্তা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা সবই নতুন করে অনিশ্চয়তার হুমকিতে পড়ে গেল।
কেন এমনটি হল? দুই নেত্রীর এবং তাদের সাগরেদদের পারস্পরিক অশ্রদ্ধাশীল অবমাননাকর বক্তব্য তো সারা বছর ধরে নানা উসকানি দিয়েছে, লন্ডন থেকে জিয়াতনয় তারেকের নানা দম্ভোক্তি অগ্নিতে ঘৃতাহুতিও দিয়েই এসেছে। কিন্তু সর্বশেষ তারেকের জঘন্য ইতিহাসবিরোধী ও নোংরা ভাষায় বঙ্গবন্ধুর মতো মহান নেতাকে যে চরম অশ্রদ্ধাসূচক বক্তব্য দিয়ে দেশটাকে তাতিয়ে তোলা হয়েছে তার প্রতিক্রিয়ায় সরকারি দলও মাত্রাতিরিক্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন দাবি করা হল তারেককে অবিলম্বে বঙ্গবন্ধু সংক্রান্ত বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে নতুবা বাংলাদেশের কোথাও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সভা-সমিতি-সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। বিএনপির ঘোষিত জনসভা ছিল ২৭ ডিসেম্বরে গাজীপুরে। ছাত্রলীগ বলে বসল খালেদা জিয়াকে গাজীপুরে সভা করতে দেয়া হবে না। ছাত্রদল-যুবদল বলল, গাজীপুরে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার জনসভা হবেই, ছাত্রলীগকে তারা মোকাবেলা করবে।
এবারের ছাত্রলীগের দাবির সমর্থনে এগিয়ে এলো প্রশাসন। তারা জারি করে দিলেন ১৪৪ ধারা মোতাবেক নিষেধাজ্ঞা যাতে খালেদা জিয়া জনসভা করতে না পারেন। অপরদিকে বোকার মতো বিএনপি খালেদা জিয়ার গাজীপুর জনসভা বাতিল ঘোষণা করে কাপুরুষের মতো ভূমিকা নেয়ায় দেশব্যাপী বিধৃত হল। সম্ভবত তাই তারা সোমবার দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করেন এবং আগামীতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়ার কথাও হুশিয়ারি দ্বারা দেশবাসীকে জানিয়ে দেন।
এখানেই শংকা, এখানেই ভয়। অর্থাৎ বিগত বছরটি বাগবিতণ্ডার মধ্য দিয়ে চললেও নাগরিক জীবন ছিল মোটামুটি শান্তিপূর্ণ। সেই শান্তিটুকুও উধাও হতে পারে বলে তাবৎ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আবার অবরোধের হুমকিও বিএনপির তরফ থেকে দেয়া হয়েছে। তা নিয়েও উদ্বেগ কম নয়। ছাত্রলীগ-যুবলীগের পক্ষ থেকে তারেক রহমানের ওই বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননাকর উক্তির প্রতিবাদে সারা দেশে নানা আদালতে অসংখ্য মোকদ্দমা করা হয়েছে। অনেক আদালত মোকদ্দমাগুলোর প্রাথমিক শুনানির পর তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। বাকি আদালতগুলো সমন জারি করে বসে আছেন। তারেক গ্রেফতারি পরোয়ানাগুলো দেখে আরও হিংসাত্মক হয়ে ওঠে, আরও বেশি আবোল-তাবোল যে বলতে থাকবেন না তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ তিনি বসে আছেন নিরাপদ দূরত্বে। সেখানে যে বাংলাদেশের পুলিশ গিয়ে তাকে গ্রেফতার করতে পারবেন না, তা তো তিনি খুব ভালোভাবেই জানেন। ভোগান্তি যা হওয়ার তা হবে এবং হচ্ছে বাংলাদেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের।
তাই এ ধরনের রাজনীতির বিরুদ্ধে মানুষ। এর দ্বারা দেশ ও জনগণ লাভবান হয় না, হচ্ছেও না। কিন্তু তারা তো অসহায়। বিকল্প কোনো রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেনি সহসা ঘটবে এমন কোনো সম্ভাবনা এ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মানুষ তার প্রত্যাশী। তারা অন্তত এটুকু বুঝে ফেলেছেন, দেশের প্রধান দুটি দল যে অপরাজনীতিতে শুধু নিজেরা ক্ষমতায় থাকা বা খাওয়ার জন্য মেতে উঠেছেন তার দ্বারা দেশবাসীয় কোনো কল্যাণ সাধিত হবে না। তাই প্রয়োজন একটি বিকল্প বামধারার গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির। যে শক্তি ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও দশের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবেন- শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও দারিদ্র্যমুক্ত একটি সুখী, সুন্দর, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে আপ্রাণ নিয়োজিত থাকবেন। ২০১৫ সালে সেই শক্তির উত্থান ঘটুক- কামনা এমনটাই।
কী করে ভুলে যাওয়া যাবে বকশিবাজারের সাম্প্রতিক ঘটনা? সেখানে খালেদা জিয়ার আদালতে যাওয়া নিয়ে কি মারাত্মক ঘটনাই না ঘটল। খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ছাত্রদল তাদের সাধ্যশক্তি অনুযায়ী বিশাল জমায়েত গড়ে তুলেছিল। ছাত্রলীগ কোত্থেকে আবির্ভূত হল, ততোধিক শক্তি নিয়ে হাজির হয়ে সশস্ত্র অবস্থায় আক্রমণ করল ছাত্রদল-যুবদলের নেতা কর্মীদের। ছাত্রলীগ নেতার পিস্তল তাক করে থাকার ছবি সংবাদপত্রে ছাপা হল। পত্রিকাগুলো সে কথা লিখলে সঙ্গে সঙ্গেই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলে উঠলেন, না ছাত্রলীগ তো ওখানে যায়ইনি। যা করেছে সবই ছাত্রদল-যুবদলের লোকেরা। ব্যাস আর যায় কোথাও পুলিশ ছুটল যারা গুলি খেল তাদের ধরতে, ধরলও বটে। ধরা দূরে থাকুক অপরাধী হিসেবে একটি মামলাও করল না পুলিশ ছাত্রলীগের কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে। যেন ছাত্রলীগ কখনও কোনো অপরাধ করে না। এমন আরও দলবাজি আরও বহু ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে। স্থানাভাবে সে পাঁচালি নিয়ে সবাইকে মনে করিয়ে দেয়া সম্ভব নয় বলেই তা থেকে বিরত থাকতে হল। তাদের জন্য শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কত কিই না দেখতে হচ্ছে।
১৬ কোটি মানুষ ২০১৫ সালে কল্যাণকর বিষয়গুলোকেই দেখতে চায়- চায় একটি গণমুখী ইতিবাচক পরিবর্তন।
২০১৫ রাজনীতির ময়দান হোক কলুষমুক্ত। দুর্নীতিমুক্ত, দলবাজিমুক্ত। প্রতিষ্ঠিত হোক আইনের শাসন। জামায়াতে ইসলামী সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত হোক, মানুষের আয়ের ব্যবধান হ্রাস পাক, বেকারত্ব দূর হোক- এসব আকাক্সক্ষার বাস্তবায়ন দেখতে আন্তরিকভাবে আগ্রহী দেশের মানুষ।
রণেশ মৈত্র : প্রবীণ সাংবাদিক

সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অর্থবহ হয়ে উঠুক নতুন বছর by সৈয়দ আবুল মকসুদ

অনন্ত অসীম মহাকালের এক অণু পরিমাণ অংশ একটি সৌর বছর। মানবজীবনও সীমিত। সে জন্য ৩৬৫ দিনের একটি বছর তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বছর তার কাছে উপস্থিত হয় নতুন প্রত্যাশা নিয়ে। সে চায় বিগত বছরের যদি কোনো গ্লানি থাকে তা মুছে ফেলতে।
বিগত দুটি বছরই ছিল জাতির জীবনে ভিন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। খ্রিস্টীয় ২০১৩ সালটি ছিল সংঘাতময়। রাজনৈতিক হানাহানিতে বহু প্রাণ ঝরেছে। আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনীর হাতে অনেক জীবন গেছে। অন্যদিকে বহু পুলিশ-আনসারও জনতার সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন। বিরোধীদলীয় রাজনীতির মূল দাবি ছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সে দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়। ২০১৪ অব্দের প্রথম হপ্তায় এমন একটি নির্বাচন হয় যার সঙ্গে জনগণ ও গণতন্ত্রের কোনো ধরনের সংজ্ঞার কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে গণতন্ত্র থাক বা না থাক, ২০১৪ অব্দটি মোটের ওপর শান্তিপূর্ণভাবেই গেছে। সন্ত্রাস ও হানাহানি যা হয়েছে তা সরকারি দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত যারা তারাই করেছেন দখলবাজি, টেন্ডার প্রভৃতি নিয়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড প্রধানত তারাই করেছেন। প্রধান বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে থানা-পুলিশ, কোট-কাছারিতে দৌড়াদৌড়ি করেই বছর কাবার করেছেন। সবচেয়ে বেশি ফৌজদারি মামলা-মোকদ্দমার জন্য ২০১৪ সাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সরকারের লোকদের জন্য বছরটি ছিল খুবই আরামদায়ক ও স্বস্তির।
সাধারণ মানুষের অব্যক্ত আশংকা হল একটি সুখী, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র। যাদের মধ্যে আকাক্সক্ষা, উদ্দীপনা ও স্বপ্ন নেই, তাদের কাছে কী পুরনো বছর, কী নতুন বছর- সবই সমান। কিন্তু সমাজ পরিবর্তনে যারা সর্বনিু থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী ও সক্ষম, এমন মানুষের কাছে নববর্ষের তাৎপর্য খুব বেশি। তারা চাইবেন পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে নতুন বছরটি যেন ভালো যায়, পূর্ববর্তী বছরের ভুলভ্রান্তির যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
স্বাধীন বাংলাদেশ তার জীবনের ৪৩ বছর অতিক্রম করেছে। এই সময়ে তার অর্জন যেমন সামান্য নয়, তেমনি সুশাসনের অভাবে জাতীয় জীবনের অনেকটা সময়ের অপচয়ও ঘটেছে। সামাজিক অস্থিরতা আজ অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। সন্ত্রাস, ভাংচুর, দুর্নীতি, অস্থিরতা ও অনৈতিকতার সঙ্গে অধিকাংশ মানুষই যুক্ত নয়; কিন্তু তারা ভুক্তভোগী। তাই নতুন বছরে তাদের প্রত্যাশা- বছরটি হোক শান্তিপূর্ণ।
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া কোনো জাতি এগোতে পারে না। হয় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে, নয়তো পিছিয়ে যায়। আমাদের শিশু-কিশোরদের মেধার ঘাটতি নেই। তাদের মানসম্মত ও যুগের উপযোগী প্রাথমিক শিক্ষা দিতে রাষ্ট্র ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যদিও সংখ্যার দিক থেকে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটেছে।
বেসরকারি কিন্ডারগার্টেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে শিক্ষার নামে নির্মম বাণিজ্য ও শোষণ। যার প্রচুর টাকা নেই তার সন্তানের জন্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। ভ্রাতৃঘাতী হানাহানিতে রক্তপাত পর্যন্ত ঘটছে। ব্যাহত হচ্ছে জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক পরিবেশ। ফলে মেধাবী জাতি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হচ্ছে না।
অল্প শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত যে যুবসমাজকে নিয়ে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব, তার একটি বড় অংশ হয় বিভ্রান্ত, নয়তো বিপথগামী অথবা হতাশ। তারা সৃষ্টিশীল কাজে অবদান রাখতে পারছে না। তাদের মনোবল জাগ্রত করতে উৎসাহ দিতে হবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় সমাজে নারীর নিরাপত্তাহীনতা। কন্যাশিশু থেকে বয়স্কা নারী কেউই নিরাপদ নয়। যৌন হয়রানি, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার অগণিত নারী। নারী জীবনের সব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এমনকি গৃহেও আজ তারা নিরাপদ নয়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি কতটা বাড়ল বা কমল তা নিয়েই সরকার খুব চিন্তিত অথবা গর্বিত। সরকার চায় পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে নতুন বছরে জিডিপি আরেকটু বেশি হোক; যদিও জাতীয় জীবনে উন্নয়নের সেটিই একমাত্র মাপকাঠি নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক উন্নয়ন না ঘটলে সেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সমাজকে স্থিতিশীল করতে পারে না। শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি দিয়ে অপরাধমুক্ত একটি সুন্দর সমাজ হতে পারে না।
প্রাথমিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত যারা, যাদের শারীরিক শ্রম জাতীয় অর্থনীতিতে অসামান্য অবদান রাখছে, সেই শিক্ষাবঞ্চিত যুবশক্তিকে একটি দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। তাদের একটি বড় অংশ দারিদ্র্যসীমার উপরে উঠতে পারছে না। অন্যদিকে তাদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। মাদক থেকে তারা জড়াচ্ছে অপরাধে। অকালে প্রাণশক্তি ক্ষয় করে পৃথিবীকে কিছু না দিয়ে এবং পৃথিবী থেকে কিছু না পেয়ে তারা বিদায় নিচ্ছে। যা শুধু যে ওই ব্যক্তি বা তার পরিবারের জন্য ক্ষতি তাই নয়- জাতির জন্যও ক্ষতি। মাদক ব্যবসায়ীদের কঠোরভাবে দমন করা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার রোধ করা সম্ভব নয়।
আমাদের সমাজ রাজনীতিপ্রবণ। গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটি প্রতিযোগিতার বিষয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মনে করা হয় যেন শত্র“। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতার অভাব। সামাজিক অস্থিরতার সেটিও একটি কারণ। বিগত বছরগুলোতে আমরা রাজনৈতিক শত্র“তার নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত দেখেছি। নতুন বছরে চাই সুস্থধারার রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা।
সমাজ ও জাতি রাতারাতি বদলায় না। সমাজ পরিবর্তন সাধনা সাপেক্ষ একটি অতি ধীর প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই প্রক্রিয়াটি যত দ্রুত শুরু হয়, তত দ্রুত সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। এবারের নববর্ষেও আমাদের প্রত্যাশা, দেশ ও সমাজের সমস্যাগুলো শনাক্ত করে তার সমাধান করতে দেশের নেতারা উদ্যোগী হবেন। শিক্ষা গ্রহণ করবেন অতীতের ভুল থেকে।
সমাজ পরিবর্তন শুধু সরকারের কাজ নয়। দেশের উন্নতি বা অধঃপতনের দায় শুধু সরকারের ঘাড়ে চাপানো সমীচীন নয়। সে দায় সব মানুষের। নতুন বছরটি অর্থবহ হয়ে উঠুক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায়- এই প্রত্যাশা করি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ : লেখক ও গবেষক

বিয়ের অনুষ্ঠানে ‘লক্ষ্যভ্রষ্ট’ রকেট: নিহত ২৬, আহত ৪৫

আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের সাঙ্গিন জেলায় সেনবাহিনী ও তালেবান জঙ্গিদের মধ্যে লড়াইয়ের সময় কাছাকাছি অবস্থিত একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠানে তালেবানের ছোঁড়া একটি রকেট আঘাত হানলে কমপক্ষে ২৬ জন প্রাণ হারান। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৪৫ জন। পুলিশের এক মুখপাত্র ফরিদ আহমেদ ওবাইদ এ তথ্য জানান। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। তালেবানরা রকেটটি সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ছুঁড়লেও, সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে আঘাত হানে। এদিকে নিহতের সংখ্যা ৩০ ও আহতের সংখ্যা ৬০ জন হতে পারে। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ওই অঞ্চলে গত ৬ মাস ধরে তালেবানের সঙ্গে সেনাবাহিনীর লড়াই অব্যাহত রয়েছে। কনের চাচাতো ভাই আবদুল হালিম তার ৯ সন্তানের কোন হদিস এখনও পাননি। বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহের মধ্যে তার ৯ সন্তান রয়েছে কিনা, সে সম্পর্কে এখনও নিশ্চিত নন তিনি। বিয়ের অনুষ্ঠানের আনন্দ মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এখন চলছে শোকের মাতম।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ৭,০০০ ভূসম্পত্তি তলিয়ে যাবে সমুদ্রগর্ভে

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের প্রায় ৭ হাজার বাড়িঘর ও ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা। ৩,৪৫৩টি বাড়িঘর এবং ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানসহ ৩,২১৬টি অনাবাসিক ভূসম্পত্তি সমুদ্রের পাতিতে তলিয়ে যেতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। প্রধানত, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যে হারে বাড়ছে, তাতে এ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এনভায়রনমেন্ট এজেন্সি’র বিশেষজ্ঞরা। এর কারণ বিশালাকায় ঢেউ ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের উপকূলরেখা মুছে গিয়ে দ্রুতই আরও কাছে এগিয়ে আসছে। এভাবে চলতে থাকলে, ৮০০ ভূসম্পত্তি আগামী ২০ বছরের মধ্যে সমুদ্রে তলিয়ে যাবে। এমনটাই আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। একই সঙ্গে ঝড়ের আশঙ্কাও বাড়তে থাকবে। যদি এ ভূসম্পত্তিগুলোকে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে হয়, সেক্ষেত্রে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হবে। পরিবেশ সংস্থার মতে, প্রাকৃতিক এ দুর্যোগে ১০০ কোটি পাউন্ডেরও বেশি ভূসম্পত্তি পানিতে তলিয়ে যাবে। আগামী ১০০ বছরে স্থানীয় ৬টি অঞ্চল- গ্রেট ইয়ারমাউথ, সাউদ্যাম্পটন, কর্নওয়াল, নর্থ নরফোক, ইস্ট রাইডিং ও স্কারবরোর প্রতিটি থেকে ২ শতাধিক বাড়িঘর সমুদ্রগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে বাড়ি থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয়া হলে, তার ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সংগঠনগুলো। সম্প্রতি আগামী ৬ বছরের জন্য ২৩০ কোটি পাউন্ড অর্থ বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে সরকার, যার মূল অংশ ব্যয় হবে প্রাকৃতি দুর্যোগ ও সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায়। ১৫,০০০ ভূসম্পত্তিকে সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে এ ৬ বছরে।

মিশরে আল-জাজিরার ৩ সাংবাদিকের পুনর্বিচারের রায়

মিশরের সর্বোচ্চ আদালত এক রায়ে আল-জাজিরার তিন সাংবাদিকের পুনর্বিচার শুরুর নির্দেশ দিয়েছে। এক মাসের মধ্যে নতুন করে বিচার প্রকিয়া শুরু হবে। মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে মিশরে নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামপন্থী দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে সহযোগিতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারা। ওই তিন সাংবাদিক- অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক পিটার গ্রেস্ট, মিশর ও কানাডার যৌথ-নাগরিক মোহাম্মদ ফাহমি ও মিশরের নাগরিক বাহের মোহাম্মদের করা আপিল আবেদনের শুনানির প্রেক্ষিতে রাজধানী কায়রোর আদালত এ নির্দেশ দিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে সাধারণভাবেই প্রতিবেদনটি পরিবেশন করেছিলেন বলে স্বীকারোক্তিতে উল্লেখ করেছেন তারা। তবে বিচারকদের সিদ্ধান্তে এ সময় জেলেই কাটাতে হবে আল-জাজিরার ৩ সাংবাদিককে। এরই মধ্যে ১ বছর জেল খেটেছেন তারা। ২০১৩ সালে এক সেনা অভ্যুত্থানে প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুসলিম ব্রাদারহুডকে সহযোগিতা করার অভিযোগ এনে ওই সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার করা হয়।