Thursday, July 23, 2009

কলকাতায় লাখো মানুষের জনসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কথায় কথায় আর বন্ধ্ নয়

পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, এই রাজ্য থেকে সিপিএমকে হটাতে না পারলে কোনো উন্নতি হবে না। শান্তি আসবে না। তাই ভবিষ্যতে সিপিএমকে হটানোর লড়াইয়ে অংশ নেওয়ার জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
গতকাল মঙ্গলবার শহীদ দিবস উপলক্ষে কলকাতার ধর্মতলা এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেস আয়োজিত লাখো মানুষের এক জনসভায় মমতা এ কথা বলেন। ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই যুব কংগ্রেসের ডাকে মহাকরণ অভিযান করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে ১৩ জন কংগ্রেস কর্মী নিহত হন। সেই ১৩ শহীদের স্মরণে প্রতিবছর তৃণমূল কংগ্রেস পালন করে শহীদ দিবস।
এবার লোকসভা ও পৌরসভা নির্বাচনে ব্যাপক জয়ের পর তৃণমূলের এই জনসভায় লাখো মানুষ জমায়েত হয়। এতে করে গতকাল গোটা কলকাতা অচল হয়ে পড়ে। এ দিন জনসভা শুরুর সময় বৃষ্টি শুরু হলেও তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা বৃষ্টি উপেক্ষা করেই জনসভায় উপস্থিত হন।
মমতা তাঁর ভাষণে বলেন, ‘এই রাজ্য থেকে উত্খাত করতে হবে সিপিএমের দুঃশাসনকে। আনতে হবে রাজনৈতিক পরিবর্তন। ৩৩ বছরে সিপিএম এ রাজ্যে কিছুই করতে পারেনি। এবার সময় এসেছে আমাদের কিছু করার। তাই আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের জন্য।’
মমতা বলেন, ‘রাজ্যজুড়ে সিপিএমের সন্ত্রাস বন্ধ করতে হবে। সিপিএমের কাছে থাকা বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে। আমরা অস্ত্রের বন্যা চাই না। আমরা চাই উন্নয়নের বন্যা।’
মমতা বলেন, ‘কথায় কথায় আর রাস্তা অবরোধ নয়, বন্ধ্ নয়। এটা করতে হলে দলের উচ্চমহলের অনুমতি নিতে হবে। আমরা চাই না মানুষ এই অবস্থান ধর্মঘটে আর ভোগান্তির শিকার হোক।’ তিনি এই রাজ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সর্বত্র আন্দোলন গড়ে তোলারও আহ্বান জানান দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি।
এদিন মমতার জনসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী, চিত্রকর শুভাপ্রসন্ন, সাংসদ কবির সুমন, তাপস পাল, শতাব্দী রায়, সংগীতশিল্পী নচিকেতা, কংগ্রেসের নেতা কেশব রাওসহ তৃণমূলের ছয়জন মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কেরা। এই সভায় মহাশ্বেতা দেবী বলেন, আগামী ২০১১ সালের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিপিএমের ৩২ বছরের অপশাসনের হাত থেকে রাজ্যকে মুক্ত করতে হলে মমতার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। সভায় কবির সুমন বলেন, সিপিএম ধ্বংস হয়ে গেছে। আগামী ২০১১ সালে সিপিএম সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। তিনিও ঘোষণা দেন, ভবিষ্যতে এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বিমানবন্দরে সাবেক রাষ্ট্রপতি কালামের দেহ তল্লাশি!

ব্যাপারটি দেখা হচ্ছে শিষ্টাচারবিধির পরিষ্কার লঙ্ঘন হিসেবে। ঘটনাটি ঘটেছিল গত ২৪ এপ্রিল ভারতের নয়াদিল্লিতে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। মার্কিন বিমান সংস্থা কন্টিনেন্টাল এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট সিও০৮৩তে করে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম। সাধারণ নাগরিকের মতো তাঁর দেহ তল্লাশি করেন ওই এয়ারলাইন্সের কর্মচারীরা। বিমান সংস্থাটি মার্কিন কর্মকর্তার প্ররোচনায় এই তল্লাশি চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ড. কালামকে জোর করে বিমানবন্দরের এরোব্রিজে অপেক্ষা করতে বাধ্য করা হয়। তাঁকে নিরাপত্তা স্ক্যানারের ভেতর দিয়ে নেওয়া হবে কি হবে না, সেটা নিয়ে বিমান কোম্পানির নিরাপত্তাকর্মীদের নিজেদের মধ্যে বিতর্কও হয়েছে। দেহ তল্লাশির জন্য কালামকে নিরাপত্তাকর্মীদের কাছে যেতে বলা হয়েছিল। এমনকি নিরাপত্তা তল্লাশির সময় তাঁর জুতাও খুলে ফেলা হয়।
এই ঘটনায় আত্মপক্ষ সমর্থন করে কনটিনেন্টাল এয়ারলাইন্স বলেছে, নিয়মিত নিরাপত্তা তল্লাশির অংশ হিসেবে সবার দেহ তল্লাশি করা কোম্পানির নীতি। কোম্পানিটি আরও জানায়, ভিআইপি অথবা ভিভিআইপিদের জন্য তাদের আলাদা কোনো আইন নেই।
ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচলমন্ত্রী প্রফুল প্যাটেল বলেছেন, এই ঘটনায় বিমান কোম্পানিটি ভুল করেছে বলে প্রমাণিত হলে তাদের দুঃখ প্রকাশ করতে বলা হবে।
গতকাল এই বিষয়টি ভারতের রাজ্যসভায় আলোচিত হয়। সব দলের সাংসদরা সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রতি এ ধরনের আচরণের তীব্র নিন্দা এবং দোষীদের শাস্তি দাবি করেন।

২০ কোটি টাকার সম্পত্তি পরিত্যক্ত দেখিয়ে ইজারার পাঁয়তারা! by মো. ইব্রাহিম খলিল

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার নোয়াগাঁও এলাকায় স্থাপিত বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) সরবরাহ কার্যালয় ও রেস্টহাউসসহ ব্যবহার উপযোগী প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পত্তি পরিত্যক্ত দেখিয়ে ইজারা দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে। বিউবোর অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ঠিকাদার জাহাঙ্গীর সাত্তার ওরফে টিংকু এসব সম্পত্তি ইজারা নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিউবো চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর সূত্র জানায়, ১৯৫৬ সালে তত্কালীন সরকার নোয়াগাঁও এলাকায় ৫ দশমিক ৬৫ একর জমির ওপর বিদ্যুত্ সরবরাহ কার্যালয়, একটি রেস্টহাউস ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দুটি আবাসিক ভবন নির্মাণ করে। জমিসহ স্থানীয়ভাবে এসব সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকারও বেশি।
বিউবো চট্টগ্রামের উপপরিচালক সুনীল কান্তি নাথ জানান, রাঙ্গুনিয়ায় বিদ্যুত্ সরবরাহ কার্যালয় ও রেস্টহাউসটি দুই দশক ধরে অব্যবহূত পড়ে আছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবন দুটিও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য বিউবো চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলী এসব সম্পত্তি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেন। এ লক্ষ্যে গত ৬ জুলাই তিন সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, রাঙ্গুনিয়ায় নির্মিত বিদ্যুত্ সরবরাহ কার্যালয়, রেস্টহাউস এখনো ব্যবহার উপযোগী। আবাসিক ভবন দুটি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে বরাদ্দ নিলেও ভাড়ায় থাকছে স্থানীয় কয়েকটি পরিবার। এ ছাড়া ৫ দশমিক ৬৫ একর জমির ওপর সেগুন, গামারি, গর্জনসহ নানা জাতের প্রায় দুই কোটি টাকা দামের শতাধিক গাছ রয়েছে। এসব জমির পাশে রয়েছে ঠিকাদার জাহাঙ্গীর সাত্তারের ৫০ শতক জমি। তিনি জমিসহ এসব সম্পত্তি ইজারা নেওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। গত ৬ জুলাই বিউবো (বিতরণ দক্ষিণাঞ্চল) চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে এসব সম্পত্তি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে ইজারা দেওয়ার আদেশ জারি করা হয়।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুত্ সমিতি-২ রাঙ্গুনিয়া কার্যালয় সূত্র জানায়, বিদ্যুত্ সরবরাহ কেন্দ্রটি থেকে কর্ণফুলী পাটকল, কর্ণফুলী ফুরাত কার্পেট কারখানাসহ পোমরা ও বেতাগী ইউনিয়নে বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হয়।
ইজারা কমিটির আহ্বায়ক আবদুল মোত্তালিব জানান, বিউবো (বিতরণ দক্ষিণাঞ্চল) চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের আদেশে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য থেকে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র সংগ্রহ করে সর্বোচ্চ দরদাতার অনুকূলে ইজারার আদেশ জারির ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে সুপারিশ পেশ করার জন্য কমিটির প্রতি নির্দেশ রয়েছে। সেই থেকে গত ১৮ জুলাই পর্যন্ত ১২ কর্মদিবস অতিবাহিত হলেও ঠিকাদার জাহাঙ্গীর সাত্তারের ইজারা আবেদন ছাড়া আর কোনো আবেদন জমা পড়েনি।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি খলিলুর রহমান চৌধুরী অভিযোগ করেন, বিউবো কর্তৃপক্ষ ঠিকাদার টিংকুকে এসব সম্পত্তি গোপনে ইজারা দেওয়ার জন্য পত্রিকা বা স্থানীয়ভাবে কোনো বিজ্ঞপ্তি দেয়নি। ফলে জমি ইজারার ব্যাপারে স্থানীয় লোকজন অবগত নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, টিংকু রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি নিয়ে ২০ কোটি টাকা মূল্যের জমি ইজারার নামে হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তাঁকে এ কাজে সহায়তা করছেন বিএনপিদলীয় সাংসদ সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী।
ঠিকাদার জাহাঙ্গীর সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিউবোর এসব স্থাপনার পাশে আমার জমি রয়েছে। সে হিসেবে ইজারার আবেদন করেছি।’ জমি ইজারা নেওয়ার বিষয়ে বিউবোর কর্মকর্তাদের ইন্ধনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বিউবো (বিতরণ দক্ষিণাঞ্চল) চট্টগ্রামের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) আবদুল কাইয়ুম পাঠান জানান, স্থানীয় দরপত্র সংগ্রহের মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে এসব সম্পত্তি ইজারা দেওয়া হবে। একতরফাভাবে কারও নামে ইজারা দেওয়ার সুযোগ নেই।

দেশের আর একজনও যেন মাদকাসক্ত না হয়

অনেক রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের এই দেশ। এ দেশে যেন আর একজনও মাদকাসক্ত না হয়। মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’ গতকাল মঙ্গলবার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) মিলনায়তনে বাংলালিংক-প্রথম আলো মাদকবিরোধী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রফিকুল ইসলাম এ কথা বলেন।
বিকেল সাড়ে তিনটায় শুরু হয় আলোচনা সভা। এতে প্রথম আলোর উপসম্পাদক আনিসুল হক বলেন, ‘সবাই মিলে চেষ্টা করলে আমরা দেশকে মাদকমুক্ত করতে পারব। ২০ বছর পর বাংলাদেশ হবে একটি আলোকিত দেশ।’
প্রথম আলো বন্ধুসভার পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামান রওশন বলেন, ‘প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে মাদকমুক্ত করতে চাই। এ লক্ষ্যেই আমাদের এই কার্যক্রম।’
মনোচিকিত্সক ও লেখক মোহিত কামাল বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।’ এরপর তিনি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান মোহিতুল আলম বলেন, মাদককে ‘না’ বলার মনোবল বাড়াতে হবে। শিক্ষার একটা বড় ভূমিকা মাদক নিরাময় করা।
শিল্পী মাহমুদুজ্জামান বাবু বলেন, ‘শাসকেরা চান তরুণসমাজ মাদক সেবন করুক। তাহলে তারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করবে না। আমাদের এই দাসত্বের জীবন থেকে মুক্তি লাভ করতে হবে। রুখে দাঁড়াতে হবে মাদকের বিরুদ্ধে।’ শুরুতে বন্ধুসভার আহ্বায়ক আবদুল্লাহ আল মুজাহিদ বক্তব্য দেন।
আলোচনা শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি, নাচ, গান পরিবেশিত হয়। এতে অংশ নেন ক্লোজ আপ শিল্পী আবিদ শাহরিয়ার, পুলব, রণক, শোভন, চার্লস ডি কস্তা, শুভ্রা, জান্নাতি কাশফা, অন্তু, ঈশিতা, তুহিন, মুনিরাসহ অনেকে। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন ফারহানা শাহরিন ও সাইদুজ্জামান রওশন।

প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্যবিশ্বের সামনে সুন্দরবন by পল্লব মোহাইমেন

মানুষের ভালোবাসার ভোট শুধু নয়, এবারে বিচারকদের রায়ও পেল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। ভোটের জোরে আগে শীর্ষ ৭৭-এর তালিকায় ছিলই, এবার বিশেষজ্ঞদের বিচারে এগিয়ে গিয়ে বিশ্বের প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে উত্তীর্ণ হলো সুন্দরবন।
গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাতটা সাত মিনিটে এ নির্বাচনের আয়োজক নিউ সেভেন ওয়ান্ডার্স ফাউন্ডেশন সুইজারল্যান্ডে চূড়ান্ত পর্বে উত্তীর্ণ ২৮টি স্থানের নাম ঘোষণা করে। ফাউন্ডেশনের যোগাযোগ বিভাগের প্রধান টিয়া বি ভিয়েরিং স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সুন্দরবনকে ‘অফিশিয়াল ফাইনালিস্ট ক্যান্ডিডেট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সুন্দরবন প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে। ভোটে এগিয়ে থাকা ৭৭টি স্থানের মধ্যে নানান দিক থেকে বিচার করে ২৮ স্থানকে চূড়ান্ত পর্বের জন্য বেছে নিয়েছেন সাত সদস্যের বিচারকমণ্ডলী।
চূড়ান্ত পর্বে সুন্দরবন থাকলেও বাংলাদেশের অপর মনোনয়ন কক্সবাজার চূড়ান্ত পর্বের জন্য নির্বাচিত হয়নি। তবে সংরক্ষিত তালিকায় আছে। চূড়ান্ত পর্বে থাকা ২৮টি স্থানের নাম ঘোষণার পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ উত্সব শুরু হয়ে যায়। খুলনায় তাত্ক্ষণিকভাবে আনন্দ মিছিল বের করে রূপান্তর, সুন্দরবন একাডেমিসহ বিভিন্ন সংগঠন। রূপান্তরের নির্বাহী পরিচালক রফিকুল ইসলাম জানান, ‘এইবার গোটা বিশ্বের কাছে সুন্দরবনকে তুলে ধরা সম্ভব হবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ওয়ান্ডার্স প্রমোশন অ্যাসোসিয়েশন ও সাইবার ক্যাফে ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন আনন্দ মিছিল করে। এ সংগঠন দুটি আজ বুধবার দুপুর ১২টায় ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) থেকে আনন্দ মিছিল বের করবে। তবে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার চূড়ান্ত পর্বে স্থান না পাওয়ায় অনেকেই ব্যথিত হয়েছে।
সুন্দরবনের জন্য আনুষ্ঠানিক সমর্থক কমিটি (ওএসসি) বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন চেয়ারম্যান হেমায়েত উদ্দিন তালুকদার বলেন, ‘চূড়ান্ত পর্বে যখন ওঠা গেছে, বাকিটাও আমরা পারব বলে আশাবাদী। ১৬ কোটি মানুষের দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ভোট সুন্দরবনের জন্য যাবে। এ জন্য সবার সহযোগিতা ও সচেতনতা প্রয়োজন।’
বিশ্ববাসীর ভোটে ও বিশেষজ্ঞদের রায়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য নির্বাচনের যে প্রক্রিয়া, তার চূড়ান্ত পর্ব শুরু হলো ফাইনালিস্টদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই। আগামী দুই বছর ধরে আবার চলবে ভোটাভুটি। দুই বছরে প্রাপ্ত ভোট ও বিচারকদের নম্বরের ভিত্তিতে এই সেরা ২৮-এর মধ্য থেকে ২০১১ সালে নির্বাচিত হবে সাতটি স্থান বা প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য। গতকাল থেকেই ইন্টারনেটে ভোট শুরু হয়েছে। www.new7wonders.com ঠিকানার ওয়েবসাইটে গিয়ে ভোট দেওয়া যাবে সুন্দরবনকে। সাইটটির প্রথম পৃষ্ঠাতেই ২৮টি স্থানের সচিত্র তালিকা আছে। সেখান থেকে সাতটি স্থানকে ভোট দেওয়া যাবে।
চূড়ান্ত পর্বের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়া থেকে সুন্দরবন ও মালদ্বীপ স্থান পেয়েছে। এ তালিকায় আমাজন, গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, ভিসুভিয়াস, টেবিল মাউন্টেন, মাউন্ট কিলিমানজারোর মতো বিশ্বখ্যাত প্রাকৃতিক জায়গা স্থান পেয়েছে। এই তালিকায় এশিয়া থেকে ১১টি, ইউরোপ থেকে পাঁচটি, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে চারটি, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা থেকে তিনটি, ওশেনিয়া থেকে তিনটি এবং আফ্রিকা থেকে দুটি স্থান আছে চূড়ান্ত তালিকায়।
চূড়ান্ত পর্বে উত্তীর্ণ ২৮টি প্রাকৃতিক স্থান: সুন্দরবন (বাংলাদেশ ও ভারত), মাসুরিয়ান লেক ডিস্ট্রিক্ট (পোল্যান্ড), বু তিনাহ শোয়ালস (সংযুক্ত আরব আমিরাত), গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জ (ইকুয়েডর), জেজু দ্বীপ (দক্ষিণ কোরিয়া), মালদ্বীপ (মালদ্বীপ), গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন (যুক্তরাষ্ট্র), ম্যাটারহর্ন/সারভিনো (ইতালি ও সুইজারল্যান্ড), মাউন্ট কিলিমানজারো (তাঞ্জানিয়া), মাড ভলকানোস (আজারবাইজান), টেবিল মাউন্টেন (দক্ষিণ আফ্রিকা), ভিসুভিয়াস (ইতালি), উ শান (চীনা তাইপে), জিটা গ্রোটো (লেবানন), উলুরু (অস্ট্রেলিয়া), আমাজন (বলিভিয়া, ব্রাজিল, কলাম্বিয়া, ইকুয়েডর, ফরাসি গায়ানা, গায়ানা, পেরু, সুরিনাম ও ভেনেজুয়েলা), ব্ল্যাক ফরেস্ট (জার্মানি), এল ইয়াঙ্কে (পুয়ের্তো রিকো), কোমোদো জাতীয় উদ্যান (ইন্দোনেশিয়া), পুয়ের্তো প্রিন্সেসা জাতীয় উদ্যান (ফিলিপাইন), অ্যাঞ্জেল ফলস (ভেনেজুয়েলা), ডেড সি লেক (ইসরায়েল, জর্ডান, ফিলিস্তিন), ইগুয়াজু ফলস (আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল), ফান্ডি উপসাগর (কানাডা), মোহর গিরিখাদ (আয়ারল্যান্ড), গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ (অস্ট্রেলিয়া, পাপুয়া নিউ গিনি), হা লং বে (ভিয়েতনাম) এবং মিলফোর্ড সাউন্ড (নিউজিল্যান্ড)।

একটি পার্টনারশিপের গল্প by উত্পল শুভ্র

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের এর চেয়ে বড় পার্টনারশিপও আছে। কিন্তু পরিস্থিতি-তাত্পর্য-প্রভাব বিবেচনায় গ্রেনেডার দ্বিতীয় ইনিংসে রকিবুল হাসান ও সাকিব আল হাসানের ১০৬ রানের পার্টনারশিপটির কাছে সেসবও পিছিয়ে। পরশু রাতে গ্রেনেডা গ্র্যান্ড বিচ রিসোর্টের সুইমিং পুলের পাশে বসে টেস্ট ও সিরিজ জেতানো পার্টনারশিপের দুই অংশীদার ফিরে তাকালেন হিরণ্ময় সেই স্মৃতির দিকে—

পর পর দুই ওভারে দুই ওপেনারের বিদায়ে বাংলাদেশ যখন ২৯/২, তখন নামলেন রকিবুল হাসান। এই টেস্ট ম্যাচের ভাগ্য তখন দোদুল্যমান। রকিবুল নেমেই অমন পাল্টা আক্রমণ করে চমকে দিলেন সবাইকে।
রকিবুল: মানসিকভাবে পজিটিভ ছিলাম। ঠিক করেছিলাম, পরিস্থিতি যা-ই থাক, পজিটিভ ক্রিকেট খেলব। কোচ বলেছিলেন, ‘অবস্থা যা-ই হোক, পজিটিভ খেলবে। মারার বল মারবে।’ আমি তা-ই করেছি। আউট হয়ে যাব বা হেরে যাব—এসব চিন্তা মাথায় ঢুকতেই দিইনি। সাকিব আসার পর কাজটা একটু সহজ হয়ে গেল।
সাকিব: ওই পরিস্থিতিতে অমন পজিটিভ খেলা সহজ নয়। রকিবুল খুব ভালো ব্যাটিং করেছে। প্রথম ইনিংসের পর কোচ ওকে বলেছে, টেস্ট ক্রিকেটে ওকে সবচেয়ে ভালো ব্যাটিং করতে দেখেছেন আজ। এটা ওকে অনেক কনফিডেন্স দিয়েছে।
সাকিব নামার সময় স্কোর ৪ উইকেটে ৬৭। আর একটা উইকেট পড়লেই বাংলাদেশের স্বপ্ন ধূসর হয়ে যায়। উইকেটে গিয়ে সাকিব কী বললেন রকিবুলকে, রকিবুলই বা সাকিবকে কী?
রকিবুল: সাকিবের সঙ্গে আমি অনেক আগে থেকেই ব্যাটিং করি। ওর সঙ্গে বেশ কয়টা ভালো পার্টনারশিপ আছে। ওর সঙ্গে ব্যাটিং করতে খুব ভালো লাগে। রানিং বিটুইন দ্য উইকেট খুব ভালো হয়। আর ও পজিটিভ খেলে বলে কাজটা সহজ হয়।
সাকিব: আমি ব্যাটিংয়ের সময় বেশি কথা বলি না। নামার পর ও-ই আমাকে যা বলার বলেছে। বলেছে, বোলিং এমন কিছু হচ্ছে না, সোজা-সোজা খেললেই চলবে।
ড্যারেন স্যামি আর টিনো বেস্ট বোলিং করছেন তখন। তিন উইকেট নিয়ে স্যামি তখন উজ্জীবিত। বোলারদের নিয়ে কী পরিকল্পনা ঠিক করেছিলেন তাঁরা দুজন?
সাকিব: আমরা এমন কোনো প্ল্যান করি নাই যে, ও এভাবে বল করছে তুই এভাবে খেল। যে যার মতো খেলি, যার যেভাবে ভালো মনে হয়। এটা কখনো প্ল্যানিং করি না যে, নির্দিষ্ট কোনোভাবে খেলতে হবে।
রকিবুল: পর পর কয়টা উইকেট পড়ে যাওয়াতে ওরা তখন খুব অ্যাগ্রেসিভ বোলিং করছিল। তবে উইকেটটা ভালো ছিল। এ কারণে ওদের খেলতে পারব না এমন মনে হয়নি।
প্রথম ইনিংসে খেমার রোচের গতির তোড়ে উড়ে গেছে বাংলাদেশ। রকিবুল-সাকিব দুজনকেই আউট করেছেন। রকিবুলের হাতে বাউন্সার মেরে টালমাটাল করে দিয়েছেন তাঁকে। সেই রোচ বোলিংয়ে আসার পর সেটি হয়ে গেল ম্যাচের নির্ধারক মুহূর্ত
সাকিব: আমার মনে হয়েছে, ওকে যদি একটু সাবধানে খেলি তাহলেই হবে। কারণ ও বেশিক্ষণ বোলিং করতে পারবে না। সেই তিন দিনের ম্যাচ থেকে অনেক বল করায় ও অনেক ক্লান্ত। বেশি জোরেও করতে পারবে না। আর উইকেট না পেলে তো আরও না। মনে হয়েছে, ওকে যদি পার করে দিতে পারি, তাহলে বাকি বোলারদেরও আরামসে খেলতে পারব।
রকিবুল: প্রথম ইনিংসে যেটা হয়েছে, ক্রিকেটে এমন হয়ই। বোলার আর ব্যাটসম্যানের মধ্যে একটা লড়াই হয়, বোলার গায়ে-টায়ে মারে, ব্যাটসম্যান আউট হয়ে যায়। তবে আমি সেটা মনে রেখে ব্যাটিং করি নাই। আমি আমার মতো খেলে গেছি।
৪৮ রানে গিয়ে সাকিব রোচের পর পর তিন বলে তিনটা চার মারলেন। ম্যাচটা কাদের হাতে, সেটাও যেন পরিষ্কার হয়ে গেল এতে। পরিকল্পনা করেই কি রোচের ওপর চড়াও হয়েছিলেন সাকিব?
সাকিব: না না, অমন কোনো প্ল্যান ছিল না। চার মারার বল ছিল, মেরেছি। একটা ছিল স্কয়ার কাটের বল, স্কয়ার কাট মেরেছি। একটা ছিল ড্রাইভের বল, ড্রাইভ মেরেছি। একটা পুলের বল ছিল, পুল মেরেছি। ওই সময় ও কী করবে, আমি অনুমান করতে পারছিলাম। স্কয়ার কাটটা করার পর বুঝেছি, ও ওপরে করবে। ওপরে করেছে, চার মেরেছি। পরের বলটা আমি জানতাম একটু শর্ট লেংথ করবে। করেছে, চার মেরেছি।
রকিবুল: ওর ওই তিনটা চার দেখে খুব মজা পেয়েছি।
রকিবুল-সাকিবের পার্টনারশিপে ৫০ হলো, একসময় এক শও। লড়াইয়ে নিমগ্ন ওরা দুজন কি মাইলফলকগুলো খেয়াল করেছিলেন?
সাকিব: ফিফটি পার্টনারশিপটা খেয়াল করি নাই, হান্ড্রেড পার্টনারশিপটা করেছি। আমাদের পার্টনারশিপে যখন ৮৯ হলো, তখন ওকে বলেছি আর ১১ লাগে রে!
রকিবুল: পার্টনারশিপটা ৫০-৬০-৭০ হয়ে যাওয়ার পর আমরা আলাপ করছিলাম, কাজটা অর্ধেক হয়েছে। আর ৩০-৪০টা রান যদি যোগ করতে পারি, তা হলে কাজটা আরও সহজ হয়ে যাবে।
একসময় স্কোরবোর্ডে ভেসে উঠল—হান্ড্রেড পার্টনারশিপ। কোন শটে তা হলো মনে আছে ওদের?
সাকিব: রোচকে যে তিনটা চার মারলাম, তখনই তো হলো। তবে আমি সেটা খেয়াল করি নাই। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে, হয়েছে? ও বলল, হ্যাঁ, হয়েছে। আমি বললাম, তুমি দেখেছ? ও বলল, হ্যাঁ, আমি স্কোরবোর্ডে দেখেছি।
ভালো একটা পার্টনারশিপে দুই ব্যাটসম্যানের একে অন্যকে সাহায্য করার ব্যাপার থাকে। কোনো বোলার হয়তো নির্দিষ্ট কিছু করার চেষ্টা করছে, সেটি খেয়াল করে পার্টনারকে বলা। অথবা ফিল্ডিংয়ে কোনো পরিবর্তন।
সাকিব: না, সে রকম কিছু বলেছি বলে মনে পড়ে না। আমরা নরমাল কথাবার্তাই বলেছি।
রকিবুল: ড্যারেন স্যামি যখন বল করছিল, ও মিড উইকেটটা পুরো ফাঁকা রেখেছিল। ওর প্ল্যানটা ছিল, সাকিব যেন অ্যাক্রস দ্য লাইন খেলে। ওই ফিল্ডিংটা খেয়াল করে আমি সাকিবকে বলেছি, ও কিন্তু এই প্ল্যান করেছে। তুই তোর প্ল্যান অনুযায়ী খেল, ওর ফাঁদে পা দিবি না।
রকিবুল যখন স্যামির বলে কট অ্যান্ড বোল্ড হয়ে ফিরলেন, জয়ের জন্য তখনো চাই ৪২ রান। ম্যাচটার কি আবার একটা নাটকীয়তায় ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা তখন!
সাকিব: ও আউট হওয়ার আগেই আমি ওকে বলছিলাম, আরও ১৫-২০টা রান হলে তার পর যা-ই হোক হবে, কোনো সমস্যা হবে না। আউট হওয়ার পর তো খারাপ লেগেছে। তবে তার পরও কনফিডেন্ট ছিলাম, মুশফিক ভাই আসছে। মুশফিক ভাই সব ইনিংসেই ৩০-৪০ করে করেছে। মুশফিক ভাই আউট হয়ে যাওয়ার পর একটু চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। যদিও তখন ২০ রান দরকার ছিল (আসলে ১৪), তার পরও অনেক রান!
রকিবুল: আমি শেষ পর্যন্ত থাকতে চেয়েছিলাম। একটু আগে খেলে ফেলায় ক্যাচ উঠে গেছে।
১০৬ রানের এই পার্টনারশিপটিই টেস্ট ও সিরিজ জেতাল বাংলাদেশকে। সাকিব ও রকিবুলের কাছে এটি তাই স্মরণীয় হয়ে থাকারই কথা।
সাকিব: উইনিং পার্টনারশিপ। আসল কথা হলো, খুব প্রয়োজনের সময় হয়েছে পার্টনারশিপটা। রকি আর অ্যাশ যখন ব্যাটিং করছিল, আমি আর মুশফিক ভাই আলাপ করছিলাম, এখনই একটা পার্টনারশিপ খুব জরুরি। আমি বললাম, এটা না হলে পরেরটাতে বড় একটা পার্টনারশিপ হতেই হবে। নইলে আমরা পারব না।
রকিবুল: সাকিবের এটা প্রথম ক্যাপ্টেন্সি। অধিনায়ক হিসেবে ওর প্রথম ম্যাচেই ওর সঙ্গে এমন একটা পার্টনারশিপ করতে পারলাম। এটা ওর কাছে যেমন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তেমনি আমার কাছেও।

‘চাঁদের দেশে’ বাংলাদেশ উত্পল শুভ্র, গ্রেনেডা থেকে

নিল আর্মস্ট্রং আর সাকিব আল হাসান তাহলে মিলেই গেলেন!
কিসের সঙ্গে কী! এক নভোচারী আর এক ক্রিকেটার কীভাবে মেলেন এক বিন্দুতে! আহ্হা, এত অধৈর্য হচ্ছেন কেন! একটু খেয়াল করে দেখুন না, ইতিহাস যে তাঁদের মিলিয়েই দিল।
চল্লিশ বছর আগে যে দিনে চাঁদে প্রথম পা রেখে আর্মস্ট্রং বলেছিলেন, ‘একজন মানুষের ছোট্ট একটা পদক্ষেপ আর মানবজাতির জন্য বিরাট এক লাফ’, চল্লিশ বছর পর সেই দিনেই সাকিবের একটা স্ট্রেট ড্রাইভ কি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য বিরাট এক উল্লম্ফন নয়?
রোচের বলে সাকিবের ওই ছক্কায় নতুন একটা ইতিহাস লেখা হয়ে গেল বাংলাদেশের ক্রিকেটে। এই প্রথম পর পর দুটি টেস্ট জয়, এই প্রথম দেশের বাইরে টেস্ট সিরিজ জয়—গ্রেনেডার ছায়া-ছায়া বিকেল আর সাত সমুদ্র তেরো নদী ওপারের সাকিবের দেশের ভোরে তো চাঁদেই পা রাখল বাংলাদেশের ক্রিকেট!
দেশের বাইরে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের দিনটা যে মানুষের চাঁদে পা রাখার চল্লিশতম বার্ষিকীর সঙ্গে মিলে গেছে, রফিকুল আলম তা জানতেন না। বাংলাদেশের ক্রিকেটের নির্বাচকমণ্ডলীর চেয়ারম্যান তার পরও কাকতালীয়ভাবে চাঁদকেই টেনে আনলেন! ‘এত দূর যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আসার পর মনে হলো যেন চাঁদে এলাম। আর বাংলাদেশের এই জয়কে মনে হচ্ছে চাঁদে পা রাখার মতো।’
বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মধ্যে অত ভাবালুতা নেই। চাঁদ-টাঁদের মতো অনেক দূরের বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে তাঁদের মধ্যে গুঞ্জরিত একটাই শব্দ। হোয়াইটওয়াশ! হোয়াইটওয়াশ! সারা জীবন বাংলাদেশ যা হয়ে এসেছে, এই প্রথম তা অন্যকে করল।
কলিন ক্রফটের টেস্ট ক্যারিয়ারে পরাজয়ের সঙ্গে তেমন দেখাই হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুর্দশা দেখেন আর কষ্ট পান অধুনা ফ্রি-ল্যান্স সাংবাদিক। বিবিসির হয়ে সিরিজ কভার করছেন। হাতে রেকর্ডার, কানে হেডফোন—কলিন ক্রফট হো হো করে হাসছেন! ‘ওহ্ গড! বাংলাদেশের কাছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হোয়াইটওয়াশ! আমি আজ সারা দিন হাসব।’
তোর ইচ্ছা হয়েছে, হাসতে থাক, কে মানা করেছে? বাংলাদেশও আজ হাসছে। আনন্দে হাসছে। গর্বে হাসছে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ডের কাছে পরাজয়ের লজ্জা ভুলে গিয়ে হাসছে।
সবচেয়ে বেশি হাসছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। হাসতে হাসতেই আবার কালো হয়ে যাচ্ছে তাঁদের মুখ। মনে পড়ে যাচ্ছে, কদিন আগে কী অপদস্থই না হতে হয়েছে তাঁদের! টি-টোয়েন্টি বিপর্যয়ের পর এমন সব কথা শুনতে হয়েছে যে, এমন অবিস্মরণীয় সাফল্যের আনন্দও তা ভুলিয়ে দিতে অসমর্থ। ‘খু-উ-ব খুশি’ দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেই তাই অনিবার্যভাবে পরের কথাটা হচ্ছে, ‘সবচেয়ে বেশি খুশি, কারণ...’।
গ্রেনেডায় পরশু সকাল থেকেই বৃষ্টি। এমনই অঝোর ধারায় যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটের মাহেন্দ্রক্ষণটি আর খেলোয়াড়দের হাতে থাকছে বলে মনে হলো না। বৃষ্টিতে সেটি ভেসে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রবল হয়ে উঠল একসময়। ক্যারিবিয়ানের ধর্ম অনুযায়ী সেই বৃষ্টি থামতেই ঝকঝকে রোদ।
কিন্তু একসময় যে সেই রোদেও মেঘলা দেখাচ্ছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটাকাশ। ৬৭ রানে ৪ উইকেট নেই! ২১৫ করলেই ইতিহাস—কিন্তু এত সব অর্জনের হাতছানির চাপ আছে, সঙ্গে আছে চতুর্থ ইনিংসে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নামার অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। আলোয় সাজিয়ে রাখা উত্সবের মঞ্চে হঠাত্ই আঁধার নেমে আসবে না তো!
দুই হাসান তা হতে দিলেন না। রকিবুল হাসান নেমেই এমন ব্যাটিং করতে শুরু করলেন যে, মনে হলো এই ছোট্ট টার্গেটটা ছুঁতে এত ঝামেলা তাঁর একদমই পছন্দ হচ্ছে না! আর সাকিব আল হাসান তো বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল বিজ্ঞাপন।
বাংলাদেশের চতুর্থ উইকেটটি পড়ে যাওয়ার পর মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের উত্সব দেখতে দেখতে নেমেছেন। রকিবুলের সঙ্গে তাঁর ১০৬ রানের জুটির প্রতিটি রান জল ঢেলে দিয়েছে সেই উত্সবে। শেষে ওই ছক্কা!
শুধুই একটা ছক্কা! বাংলাদেশের ক্রিকেটে নতুন এক ইতিহাস যে লেখা হলো ওই ছক্কায়! সাকিব আল হাসানকে এখন থেকে নিল আর্মস্ট্রং নামেই ডাকুন না!

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ আজ নিস্তরঙ্গ পঞ্চগড়ে উত্সবের আমেজ by আশীষ-উর-রহমান ও শহীদুল ইসলাম

দারুণ সাড়া পড়ে গেছে দেশের উত্তর সীমান্তের নিস্তরঙ্গ ছিমছাম শহরটিতে। পঞ্চগড়ে ঢুকতেই চোখে পড়ল দেয়ালে দেয়ালে সাঁটা পোস্টার। গতকাল মঙ্গলবার সকালেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গাড়ি ভর্তি করে লোকজন আসতে শুরু করেছে। এই তালিকায় আছেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী, আছে স্কুলের শিক্ষার্থী থেকে বিজ্ঞানমনস্ক সাধারণ মানুষ। আসছেন বিদেশিরাও। শহরের আবাসিক হোটেলগুলোতেও প্রচণ্ড ভিড়। প্রশাসনের তরফ থেকে নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। আর এসবে কৌতূহলী হয়ে উঠেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। সব মিলিয়ে জমজমাট উত্সবের আমেজ পঞ্চগড়জুড়ে।
যেনতেন উপলক্ষ তো নয়, একেবারে মহাজাগতিক ঘটনা! কাজেই মহা-আয়োজন না হলে মানানসই হবে কী করে। বাংলাদেশ থেকে দৃশ্যমান শতাব্দীর শেষ পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। ১০০ বছরে এমন সুযোগ আর মিলবে না; অপেক্ষা করতে হবে ২১১৪ সাল পর্যন্ত। অতএব, এবারের পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি আগ্রহী ব্যক্তিরা।
পঞ্চগড়ে আজ বুধবার সকাল সাতটা ১৪ সেকেন্ড থেকে গ্রহণ শুরু হবে; চলবে নয়টা পর্যন্ত। এর মধ্যে সূর্য একেবারে ঢেকে যাবে আটটায়। ঢাকা থাকবে পুরো তিন মিনিট ৫৮ সেকেন্ড। চরাচরে নেমে আসবে আলো-আঁধারি পরিবেশ। পাখপাখালি দিবাবসান ভেবে ভুল করে ফিরতে থাকবে নিড়ে। তবে এর সবকিছুই নির্ভর করবে আবহাওয়ার ওপর, যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে।
পঞ্চগড়ে অতিথিদের স্বাগত জানাতে তোরণ সাজানো হয়েছে সার্কিট হাউসে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে স্থানীয় সিরাজুল ইসলাম স্টেডিয়ামে তৈরি করা হয়েছে বিশাল মঞ্চ। নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গতকাল সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক বনমালী ভৌমিক ও পুলিশ সুপার হারুন-উর-রশিদ জানান, অতিথিদের থাকার জন্য হোটেল এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থার রেস্টহাউসগুলো বন্দোবস্ত করা হয়েছে। সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণ ছাড়াও আগ্রহী অতিথিদের জন্য বাংলাবান্ধা সীমান্ত, সমতলভূমির চা-বাগান, পাথর জাদুঘর, পঞ্চগড় মহারাজার দিঘির মতো দর্শনীয় স্থানগুলো পরিদর্শনের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাঁদের সহায়তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া কাব, স্কাউট, গার্ল গাইডস ও রোভাররা অতিথিদের সহায়তা করবেন। শহরকে যানজটমুক্ত রাখার ব্যবস্থা নিয়েছে পুলিশ।
সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে পঞ্চগড়ের সাধারণ মানুষের কৌতূহল প্রবল। মৌচাক হোটেলের মালিক আনোয়ার হোসেন বললেন, ‘সূর্যগ্রহণ দেখতে অসংখ্য মানুষ শহরে এসেছেন। হোটেলে সব সময় ভিড় লেগেই আছে। আমরা খাবার দিতে হিমশিম খাচ্ছি।’ মাদ্রাসার গ্রন্থাগারিক আবুল হোসেন শহরের হার্ডওয়্যারের দোকানে ঝালাইকাজে ব্যবহূত কালো চশমা কিনতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘১০৫ বছরের মধ্যে এমন দৃশ্য আর দেখা যাবে না; তাই নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।’ পঞ্চগড় এমআর সরকারি কলেজের সম্মানের ছাত্রী মেহেরুন বেগম বলেন, ‘১০৫ বছরের মধ্যে আর দেখা যাবে না; তাই সকালেই স্টেডিয়ামে যাব গ্রহণ দেখতে। তা ছাড়া আমাদের শহরে এমন একটা আয়োজন হচ্ছে, এটা আমাদের জন্য গর্বেরও ব্যাপার।’ রিকশাচালক বাবুল বললেন, ‘শহরত অনেক নয়া মানুষ আইসচে। ভাড়া ভালয় পাছি। মুই গ্রহণ দেখিবা চাহেচু, কিন্তু কেংকো দেখিম। খালি চোখে তো দেখা যাবা নহায়।’ কলেজছাত্র আবদুল আলীম বলেন, ‘খুবই টেনশনে আছি, এখনো চশমা পাইনি।’ তরুণ ফটোস্ট্যাট ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সুযোগটা নষ্ট করতে চাই না।’ সূর্যগ্রহণ নিয়ে এভাবেই কৌতূহলী হয়ে উঠেছে পঞ্চগড়বাসী।
গ্রহণ সম্পর্কে কৌতূহল মেটাতে গতকাল বিকেল তিনটায় বিপি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে ‘সূর্য এবং গ্রহণ’ নামের আলোচনার আয়োজন করে জাতীয় বিজ্ঞান জাদুঘর। এর কিউরেটর সুকল্যাণ বাছাড় শ্রোতাদের সহজ করে বুঝিয়ে বলেন, ‘সূর্যগ্রহণের সঙ্গে কুসংস্কারের কিছু নেই; কোনো অকল্যাণ বা ভয়ভীতির বিষয় নেই। চাঁদের ছায়া পড়বে সূর্যের ওপর, সূর্য তখন ঢেকে যাবে—এই হলো গ্রহণের মূল বিষয়।’
পঞ্চগড় শহর ছাড়াও সদর উপজেলার হাঁড়িভাসা ইউনিয়নের মধুপাড়া গ্রামে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ ক্যাম্প করা হবে অনুসন্ধুিত্স চক্রের আয়োজনে। চক্রের সভাপতি আজহারুল ইসলাম জানালেন, তাঁদের দুটি বাসে প্রায় ৮০ জন পর্যবেক্ষক এসেছেন পঞ্চগড়ে। দলে আছেন অধ্যাপক এ আর খান, অধ্যাপক দেবদর্শী ভট্টাচার্য, ব্রিটিশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির ফেলো কলিন হ্যান্স। বিজ্ঞানীদের জন্যই মধুপাড়ার ক্যাম্পটি করা হয়েছে; কারণ এখানে পূর্ণ গ্রহণকাল কিছুটা বেশি সময় ধরে থাকবে। পঞ্চগড় ছাড়াও চক্রের আয়োজনে ঠাকুরগাঁও ও ঢাকায় পর্যবেক্ষণ ক্যাম্প হচ্ছে। পঞ্চগড়ে পর্যবেক্ষণ শুরু হবে সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে।
গতকাল বিকেলে ঠাকুরগাঁওয়ে জেলা প্রশাসন ও চক্রের আয়োজনে শোভাযাত্রা বের করা হয়। সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের জন্য তারা ইলেকট্রিক ওয়েল্ডিং কাচের প্রায় ১০ হাজার চশমা তৈরি করে বিতরণ করে। পঞ্চগড়েও সকালে চশমা দেওয়া হবে। থাকবে টেলিস্কোপে গ্রহণ পর্যবেক্ষণের বিশেষ ব্যবস্থা।
বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ৭০ জনের মতো উত্সাহী পর্ববেক্ষক নিয়ে ক্যাম্প করেছে তেঁতুলিয়ার ময়নাগুঁড়ি চা-বাগানে। অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মশহুরুল আমীন জানালেন, তাঁরা তেঁতুলিয়াসহ দেশের ২৪টি এলাকা থেকে সূর্যগ্রহণ পর্যবেক্ষণের আয়োজন করেছেন।
তেঁতুলিয়া মাঝিপাড়ায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ৪৩৩ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে জিরো পয়েন্টে বিএসএফ ও বিডিআরের বিশেষ অনুমতি নিয়ে গতকাল দুই বাংলার জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা মিলিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাতটা ১৫ মিনিটে বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটিরি সভাপতি এফ আর সরকারের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি দল মাঝিপাড়ায় আসে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসে স্কাই ওয়াচার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেবাশীষ সরকারের নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের শৌখিন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর দল। উভয় দলের সদস্যরা পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি করেন; মিষ্টিও বিতরণ করা হয়।
সব মিলিয়ে পঞ্চগড় ও এর আশপাশের এলাকায় এখন জমজমাট উত্সবের পরিবেশ। উত্সবের প্রস্তুতিও সম্পন্ন। এখন সকালের প্রতীক্ষা, আর পরিষ্কার আকাশের প্রার্থনা।

আরেক ভারতীয় জঙ্গি মনসুর ঢাকায় গ্রেপ্তার

ভারতীয় জঙ্গি সংগঠন আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্স এবং লস্কর-ই-তাইয়েবার আরেক সংগঠক মাওলানা মনসুর আলী ওরফে হাবিবুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বাগদা থানার পদ্মপুকুর গ্রামে।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, মনসুর আলী এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া ভারতীয় জঙ্গি শেখ ওবায়দুল্লাহর ‘গুরু’। মনসুর এ দেশে বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিক্ষকতার আড়ালে লস্কর-ই-তাইয়েবার পক্ষে তত্পরতায় যুক্ত ছিলেন।
এই ভারতীয় জঙ্গিকে কয়েক দিন আগে রাজধানীর উত্তরাসংলগ্ন দক্ষিণখান এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সরদারবাড়ির সামনে মাদ্রাসাতুর রহমানের শিক্ষক। ডিবি পুলিশ গতকাল মঙ্গলবার সকালে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে গ্রেপ্তারের কথা প্রকাশ করে। ডিবি সোমবার রাত সাড়ে আটটায় মনসুরকে গ্রেপ্তারের দাবি করেছে। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আটকের পর মনসুর প্রথমে নিজের নাম মাওলানা হাবিবুল্লাহ ও বাড়ি যশোরের ঝিকরগাছার শ্রীরামপুর বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে। এ জন্য তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হতে সময় লেগেছে।
কে এই মনসুর আলী: সংবাদ সম্মেলনে ডিবি কর্মকর্তারা বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে জঙ্গি মনসুর আলীর দেওয়া তথ্যানুযায়ী তিনি উত্তর চব্বিশ পরগনার বাগদাহ থানার মামা-ভাগিনা উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৭৫ সালে হেলেঞ্চা বাজার স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৭৭ সালে বনশাঁ কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। এরপর তিনি কিছু দিন রেল বিভাগে চাকরি করেন। এর মধ্যে তিনি স্থানীয় এক আলেমের মাধ্যমে ধর্মীয় বিষয়ে উদ্বুদ্ধ হন এবং চাকরি ছেড়ে উত্তর প্রদেশের দেওবন্দ মাদ্রাসায় চলে যান। সেখানে আরবির প্রাথমিক পাঠ নেন। তারপর ১৯৮৪ সালে পাকিস্তানে যান।
জঙ্গি তত্পরতা: গতকাল ডিবি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনসুর বলেন, তিনি আরবি শিক্ষার জন্য পাকিস্তানে যান। সেখানে ইসলামাবাদের দারুল উলুম তাকওয়া মাদ্রাসায় দাওরা হাদিস পড়েন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ওই মাদ্রাসায় পড়াকালে তিনি কয়েক দফা আফগানিস্তানে গিয়ে তত্কালীন সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি ওই সময় কালাশনিকভ রাইফেল, মেশিনগান, রকেট লাঞ্চার ও বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র চালানোয় পারদর্শী ছিলেন।
মনসুর আলী জানান, আফগানিস্তান সোভিয়েত দখলমুক্ত হওয়ার পর তিনি ১৯৯৩ সালে ভারতে ফিরে যান এবং আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্সের প্রতিষ্ঠাতা আসিফ রেজা খান, মাওলানা জালাল ও লস্কর-ই-তাইয়েবার খুররম ওরফে আবদুল্লাহসহ ভারতে জঙ্গি তত্পরতায় যুক্ত হন। তাঁরা ‘জিহাদি ভাই’ তৈরি করে প্রথম দিকে লস্কর-ই-তাইয়েবার হয়ে কাশ্মীরে এবং পরে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পাঠাতে শুরু করেন। গুজরাটে সংগঠনের কয়েকজন ধরা পড়ার পর মনসুর আলীর পরিচয় প্রকাশ হয়ে পড়ে। ভারতীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে আসিফ রেজা কমান্ডো ফোর্সের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর তিনি পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন। এর আগে ভারতে জঙ্গি তত্পরতায় যুক্ত তাঁর এক ভাই বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত অতিক্রমকালে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন।
বাংলাদেশে প্রবেশ ও তত্পরতা: ডিবির উপকমিশনার মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯৫ সালে মনসুর আলী ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে (বিএসএফ) ঘুষ দিয়ে অবৈধভাবে এ দেশে ঢুকেছেন। মনসুর আলীর ভাষায়, সীমান্ত পার হতে চাইলে বিএসএফের এক সদস্য বলেন, ‘পঁচাশ রুপিয়া দিয়েগা তো এক চোখ বন্ধ্ করে গা, আওর এক ছ রুপিয়া দিয়েগা তো দো চোখ বন্ধ্ করে গা।’
ডিবি সূত্র জানায়, মনসুর আলী এ দেশে এসে প্রথমে যশোরের মোড়লী মোড়ের নূরানি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার চাকরি নেন। তারপর যথাক্রমে যশোরের বাঘারপাড়ার ইন্দ্রাগ্রামের মক্তব, হবিগঞ্জের পোড়াসুন্দা গ্রামের মক্তব, ঢাকার নবাবগঞ্জের টিকরপুর মাদ্রাসা এবং সর্বশেষ ঢাকার দক্ষিণখানের মাদ্রাসাতুর রহমানে শিক্ষকতার চাকরি করেন। মাদ্রাসার পাশেই একটি বাড়িতে সপরিবারে বসবাস করতেন তিনি। তিনি সাতক্ষীরায় বিয়ে করেছেন বলে জানান।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মনসুর আলী স্বীকার করেন, বাংলাদেশে অবস্থানকালে তাঁর সঙ্গে হরকাতুল জিহাদের নেতা মুফতি আবদুর রউফ (বর্তমানে তাআমির উদ-দ্বীনের শীর্ষ নেতা ও কারাবন্দী), মাওলানা আলী আহম্মদ, মুফতি হান্নান, মুফতি বখতিয়ারসহ অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তাঁর সঙ্গে পাকিস্তানে অবস্থানকারী লস্কর-ই-তাইয়েবার নেতা খুররম ওরফে আব্দুল্লাহর টেলিফোনে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তাঁর দাবি, তিনি এ দেশে কোনো জঙ্গি তত্পরতা বা নাশকতায় যুক্ত ছিলেন না। তাঁদের জিহাদ হচ্ছে ভারতীয় হিন্দুদের বিরুদ্ধে।
যেভাবে সন্ধান মেলে: ডিবি কর্মকর্তারা জানান, দুবাইভিত্তিক ভারতীয় মাফিয়া নেতা দাউদ ইব্রাহিম চক্রের এ দেশীয় নেটওয়ার্কের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ভারতীয় এ জঙ্গি গোষ্ঠীর সন্ধান মেলে। ডিবি গত ২৬ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আটক দাউদ ইব্রাহিম চক্রের সদস্য দুই ভারতীয় নাগরিক আবদুল রউফ দাউদ মার্চেন্ট ও জাহিদ শেখকে (২৮) গ্রেপ্তার করে। জাহিদ দাউদ ইব্রাহিমের মাফিয়াচক্রের বাংলাদেশের এজেন্ট। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তাঁর টেলিফোন যোগাযোগের সূত্র ধরে অনুসন্ধান করতে গিয়ে ডিবি মাদারীপুরের মাদ্রাসার শিক্ষক ভারতীয় জঙ্গি ওবায়দুল্লাহ ও ঢাকায় মনসুর আলীর সন্ধান পান। ওবায়দুল্লাহকে ১৭ জুলাই ডিবি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে।

প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করল ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়েও সহযোগিতা বাড়বে by দীপাঞ্জন রায় চৌধুরী

ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলোচিত এন্ড-ইউজার ভেরিফিকেশন (ইইউভি) বা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ-বিষয়ক চুক্তি সই হয়েছে। এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং মহাকাশ বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আরও দুটি চুক্তি করেছে দুই দেশ। দীর্ঘ আলোচনা শেষে গত সোমবার ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণ ও ভারত সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন নিজ নিজ দেশের পক্ষে এসব চুক্তিতে সই করেন। এ ছাড়া নিজেদের মধ্যে কৌশলগত পাঁচ দফা সহযোগিতা-বিষয়ক আলোচনা শুরুর ব্যাপারেও রাজি হয়েছে দুই দেশ। ওই আলোচনায় দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা যৌথভাবে সভাপতিত্ব করবেন। পাশাপাশি ভারতে দুটি মার্কিন পরমাণু চুল্লি বসানোর জায়গারও অনুমোদন দিয়েছে ভারত সরকার। গত সোমবার এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, আলোচনা শেষে বর্তমান সময়ের সংকটগুলো মোকাবিলায় ভারত-মার্কিন সহযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা।
গত শুক্রবার পাঁচ দিনের সফরে ভারত পৌঁছান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর এই সফরের মূল আলোচ্যসূচি ছিল ইইউভি চুক্তি। এই প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র নির্মাতা কোম্পানি লকহিড ও বোয়িং যথেষ্ট লাভবান হবে। কারণ, ভারত সরকার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আধুনিকায়নের মার্কিন জঙ্গি বিমানসহ আধুনিক অস্ত্র কিনতে আগ্রহী। ভারতীয় বিমানবাহিনীর জন্য ১২৬টি জঙ্গি বিমান ক্রয়ে ভারত যে দরপত্র আহ্বান করেছে, সেখানে অন্যান্য দেশের কোম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ওই দুটো মার্কিন কোম্পানি। ভারত এর আগে ১৯৯৬ সালের ‘ইউএস আর্মস কন্ট্রোল অ্যাক্ট’-এর অধীনে অস্ত্র কেনার ব্যাপারে অসম্মতি জানায়। ওই চুক্তি অনুযায়ী ক্রেতা দেশগুলোকে বিক্রি করা অস্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেই বিষয়ে পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে। তবে ভারতের সঙ্গে স্বাক্ষরিত ইইউভি চুক্তি ১৯৯৬ সালের ওই চুক্তি থেকে ভিন্ন বলে ভারতীয় সূত্রে জানা গেছে। তিনটি চুক্তি সইয়ের আগে দিল্লির ঐতিহাসিক হায়দরাবাদ হাউসে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
ইইউভি চুক্তির পাশাপাশি মহাকাশ বিজ্ঞানবিষয়ক চুক্তি ‘টেকনোলজি সেফগার্ড অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর মাধ্যমে এখন থেকে নিজস্ব উেক্ষপণ-ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত বেসামরিক ও অবাণিজ্যিক কাজে ব্যবহারের কৃত্রিম উপগ্রহগুলো উেক্ষপণ করতে পারবে ভারত। অবশ্য মার্কিন বাণিজ্যিক কৃত্রিম উপগ্রহগুলোও নিজেদের উেক্ষপণ-ব্যবস্থার মাধ্যমে মহাকাশে পাঠাতে আগ্রহী নয়াদিল্লি। তারা এ ব্যাপারেও একটি চুক্তি করতে চায়। এটা করতে পারলে মহাকাশ ব্যবসার বাজারে বড় ধরনের সুযোগ তৈরি হবে ভারতের জন্য।
এ ছাড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে এবং এ ব্যাপারে দুই দেশের সমান অংশীদারের ভিত্তিতে একটি তহবিল গড়ে তোলার জন্য ‘সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এনডওমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামের আরেকটি চুক্তি সই করেছে দুই দেশ। এই চুক্তির মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণার ক্ষেত্রে দুই দেশের প্রযুক্তি ও লোকবল আদান-প্রদান সম্ভব হবে। এই তিনটি চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে অবশেষে হিলারি ক্লিনটন তাঁর এই ভারত সফরের লক্ষ্য পূরণ করলেন।