Friday, May 29, 2015

‘গণতন্ত্রের সূর্য ডুবেছে প্রেস ক্লাবে’, প্রেস ক্লাবে নতুন সংকট- বিনা ভোটে কমিটি ঘোষণা, প্রত্যাখ্যান

আইল্যান্ড অব ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রের দ্বীপ বলা হয় জাতীয় প্রেস ক্লাবকে। সেই জাতির বিবেকখ্যাত জাতীয় প্রেস ক্লাবেই আজ গণতন্ত্রের সূর্য ডুবেছে। যারা সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সাহস রাখেন না, তারাই আজ সমঝোতা করে বিনাভোটে ক্লাবের নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবে কমিটি ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পীর হাবিবুর রহমান এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এসব কথা লিখেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, প্রথম আওয়ামী লীগ-জামায়াতের সমঝোতা কমিটি হয়েছিল। প্রতিক্রিয়া তীব্র হওয়ায় লজ্জা পেয়ে দম নেন। পরে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মোড়লরা কমিটি নির্বাচিত করে স্বঘোষিত নেতা নির্বাচিত হয়েছেন। গণতন্ত্রের এমন করুণ মৃত্যু যারা ঘটিয়েছেন, তারাই গণমাধ্যমের আলোচিত মুখ হয়ে মধ্যরাতের টক শোতে নীতিবাক্য বলেন। এ লজ্জা রাখার জায়গা নেই, তারা ঢাকবেন কিভাবে। আমরা অনেকেই প্রেস ক্লাবের সদস্য, আমাদের ডাকা হলো না, জানানো হলো না, ভোট হলো না, আমাদের না জানিয়ে শয়তানের প্ররোচনায় নেতৃত্ব হাইজ্যাক করলো দুটি দলের অন্ধরা। একটি পেশাদার ক্লাবের কর্তৃত্ব তারা দখল করে নিলো! কেউ প্রতিবাদও করলো না! এই অবৈধ নেতৃত্বে যারা তাদের সমাজে না বলুন। যেখানেই দেখবেন সালাম না দিয়ে মনে মনে বলবেন শেম। এদের আমন্ত্রণে কোন অনুষ্ঠানে আমি যাবো না। এরা জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইমেজ নষ্ট করেছে অতীতে দলবাজিতে। এবার ক্ষমতাবাজি আর সুবিধাবাদিতায় গণতন্ত্রের কবর দিয়েছে। এরা আমার নেতা নয়। ক্লাবের বিনাভোটের কমিটি বানানোর ক্ষমতা দুই ফোরাম বা দুই ইউনিয়নকে কে দিয়েছে? এদের নাম ক্লাব ইতিহাসে কালো হরফে লেখা থাকবেই। এই দিন দিন নয়। জবাব একদিন দিতেই হবে।
প্রেস ক্লাবে নতুন সংকট- বিনা ভোটে কমিটি ঘোষণা, প্রত্যাখ্যান
বিনা ভোটে জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল আকস্মিকভাবে ডাকা এক সাধারণ সভা থেকে সদস্যদের একাংশ এ কমিটি ঘোষণা করে। সভায় কমিটির প্রায় এক হাজার সদস্যের মধ্যে একশ’ জনও উপস্থিত ছিলেন না। সভায় গঠিত কমিটিতে সভাপতি করা হয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মুহাম্মদ শফিকুর রহমানকে, সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে বিএনপি সমর্থিত কামরুল ইসলাম চৌধুরীকে। ১৭ সদস্যের কমিটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের প্রাধান্য রয়েছে। তবে সৈয়দ আবদাল আহমেদ ও কামাল উদ্দিন সবুজের নেতৃত্বাধীন কমিটি নতুন ঘোষিত কমিটিকে অবৈধ হিসেবে
আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত প্রেস ক্লাবের নির্বাচন নিয়ে গত ছয় মাস ধরেই জটিলতা চলছিল। নির্বাচন না করে সমঝোতার ভিত্তিতে কমিটি গঠনের পক্ষে শুরু থেকেই অবস্থান ছিল সরকার সমর্থকদের। একপর্যায়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক গোলাম সারওয়ারকে সভাপতি ও রুহুল আমিন গাজীকে সাধারণ সম্পাদক করে এক ধরনের সমঝোতার প্রচেষ্টা নেয়া হয়। পরে এ সমঝোতা উদ্যোগ ভেস্তে যায়। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যরাও পদত্যাগ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে পরবর্তী নির্বাচনের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে প্রেস ক্লাবের কার্য নির্বাহী কমিটি আগামী ২৭শে জুন অতিরিক্ত সাধারণ সভা আহ্বান করে। এদিকে এক পক্ষের কমিটি ঘোষণা এবং বর্তমান কমিটির তা প্রত্যাখ্যান করাকে কেন্দ্র করে প্রেস ক্লাবে নতুন সঙ্কট তৈরি হলো। এ সঙ্কট শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়াতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
কমিটিতে যারা আছেন
জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে গতকালের দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রেস ক্লাবের প্রবীণ সদস্য শাহজাহান মিয়া। সভায় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আমানুল্লাহ কবীর, গোলাম সারওয়ার, হাসান শাহরিয়ার, খন্দকার মনিরুল আলম, আবুল কালাম আজাদ, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল, আলতাফ মাহমুদ, কাজী সিরাজ, এলাহী নেওয়াজ খান সাজু, আবদুল জলিল ভুঁইয়া, কুদ্দুস আফ্রাদ প্রমুখ। বিএনপি সমর্থিত ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এলাহী নেওয়াজ খান সাজু নতুন কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষণা করেন। ঘোষিত কমিটিতে অন্যান্যের মধ্যে আছেন সিনিয়র সহসভাপতি- মনজুরুল আহসান বুলবুল, সহসভাপতি আমিরুল ইসলাম কাগজী, যুগ্ম সম্পাদক আশরাফ আলী, ইলিয়াস খান, কোষাধ্যক্ষ কার্তিক চ্যাটার্জি। সদস্য করা হয়েছে আমানুল্লাহ কবীর, খন্দকার মনিরুল আলম, আজিজুল ইসলাম ভূঁইয়া, সাইফুল আলম, শ্যামল দত্ত , শামসুদ্দিন আহমেদ চারু, মোল্লা জালাল উদ্দিন, সরদার ফরিদ আহমেদ, হাসান আরেফিন, শামসুল হক দুররানীকে। সভায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য সংখ্যা আরও ৫০০ বাড়িয়ে ১৫০০ করার সিদ্ধান্ত হয়। সকাল সাড়ে ১১টায় শুরু হওয়া এই সাধারণ সভার কথা জানতেন না বলে অনেক সদস্য অভিযোগ করেছেন।
কমিটি প্রত্যাখ্যান ব্যবস্থাপনা কমিটির
বিনা ভোটে ঘোষিত কমিটি প্রত্যাখ্যান করেছে প্রেস ক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটি। কমিটির পক্ষে সভাপতি কামাল উদ্দিন সবুজ ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমদ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে ঘোষিত কমিটিকে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এতে বলা হয়, দীর্ঘ ৬০ বছরের ঐতিহ্যলালিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রেস ক্লাব নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বর্তমান ব্যবস্থাপনা কমিটি নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঐকান্তিক আগ্রহ, আন্তরিকতা এবং অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভবপর হয়নি। ক্লাবের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেবলমাত্র নির্বাচনের মাধ্যমেই এক কমিটির কাছ থেকে আরেক কমিটিকে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রথা রয়েছে। এর কোন রূপ ব্যত্যয় এবং লঙ্ঘন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্যবৃন্দ এবং দেশের সাংবাদিক সমাজ কোন ভাবেই মেনে নেবে না।
প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটির গত ২৫ ও ২৬শে মে ২০১৫ অনুষ্ঠিত সভায় আগামী ২৭শে জুন ২০১৫ অতিরিক্ত সাধারণ সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভার আলোচ্য বিষয় দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা ও নির্বাচন। ক্লাবের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ক্লাবের স্বত্বাধিকারী বা মালিক যেহেতু স্থায়ী সদস্যবৃন্দ, সুতরাং তাদের সম্মিলিত প্রজ্ঞা, দায়িত্বশীলতা এবং সংকট নিরসনের আন্তরিক প্রয়াসের উপর ব্যবস্থাপনা কমিটি সব সময়ই আস্থাশীল। আগামী ২৭শে জুন অনুষ্ঠেয় অতিরিক্ত সাধারণ সভাতেই সংকট নিরসনের পন্থা বের করা এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে অন্য কারো পক্ষে দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা করার নৈতিক ও আইনগত কোন এখতিয়ার বা বৈধতা নেই।
জাতীয় প্রেস ক্লাব ব্যবস্থাপনা কমিটি সুস্পষ্ট ভাবে জানাচ্ছে যে, ২৮শে মে ২০১৫ তারিখে কোন দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা নির্ধারিত ছিল না। ইতিপূর্বে আহূত সভাটি ব্যবস্থাপনা কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে বাতিল করা হয়েছে এবং সাধারণ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তা সদস্যদের এর মধ্যেই অবহিত করা হয়েছে। কাজেই দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভার নামে যারা তথাকথিত একটি সভা করেছেন তা গঠনতন্ত্রের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং ক্লাবের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পরিপন্থি। একই সঙ্গে তা জাতীয় গণতন্ত্র এবং প্রেস ক্লাবের স্বার্থ ও ঐক্যবিরোধী। এটা ক্লাবের অখণ্ডতা এবং সাংবাদিক সমাজের বৃহত্তর ঐক্য বিনষ্ট করবে এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। ক্লাব পরিচালনা করে ক্লাবের বৈধ কমিটি। ২৭শে জুন ২০১৫ এর অতিরিক্ত সাধারণ সভাই ক্লাবের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করবে। তাই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সকল স্থায়ী সদস্যের প্রতি আমাদের আবেদন- ক্লাবের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ও অখণ্ডতা রক্ষার ব্যাপারে আপনারা যার যার অবস্থান থেকে বলিষ্ঠ ও দৃঢ় ভূমিকা পালন করুন।
আপনারা অবৈধ, আপনারা আর ক্ষমতায় নেই
ওদিকে, প্রেস ক্লাব মিলনায়তে সাধারণ সভায় সরকার সমর্থক সাংবাদিক নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, কয়েক বছর ধরে জাতীয় প্রেস ক্লাব একটি গোষ্ঠি ও রাজনৈতিক দলের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, এভাবে ক্লাব চলতে পারে না। আমি স্পষ্টভাষায় বলতে চাই, আমরা দেশে স্বেচ্ছাচারিতা মানি নাই, জাতীয় প্রেস ক্লাবেও আর কোন স্বেচ্ছাচারিতা মেনে নেয়া হবে না। বর্তমান কমিটিকে অবৈধ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ৩১শে মার্চের পর থেকে এই কমিটির ক্লাব পরিচালনার কোন আইনগত ভিত্তি নেই। অতিরিক্ত সাধারণ সভায় তাদের এ সময়ের মধ্যে সাধারণ সভা ও নির্বাচনের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছিল। তারপরও তারা চেয়ার আঁকড়ে রেখেছেন। আমরা সাধারণ সদস্যরা এর জবাবে বলতে চাই, আপনারা অবৈধ, আপনারা আর ক্ষমতায় নেই। এরপরও যদি আপনারা ক্লাবের চেয়ার আঁকড়ে থাকেন, তাহলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব। সাধারণ সদস্যরা আপনাদের মোকাবিলা করবে। আমানুল্লাহ কবীর বলেন, প্রেস ক্লাবকে ইউনিয়নের মতো বিভক্ত করে এর অখণ্ড ঐতিহ্যকে বিনষ্ট করায় আজকের এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। যদি এক ব্যক্তি এই ক্লাবের দেখভাল না করত, এই সংকট সৃষ্টি হতো না বলে আমি মনে করি। আমরা সেজন্য সমঝোতার একটি প্যানেলের মাধ্যমে এই সংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে চাই। খন্দকার মনিরুল আলম বলেন, ২০০২ সালে যে কমিটি বিজয়ী হয়ে আসে, তারাই একচেটিয়াভাবে সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে দুই ফোরামের ভোট ভারসাম্যহীন করে ফেলে। ফলে সৃষ্টি হয় সংকটের। আমরা এই ভারসাম্যহীনতার অবসান চাই। সভাপতির বক্তব্যে শাহজাহান মিয়া বলেন, আজকের এই সভা ঐতিহাসিক একটি সভা। এটা জাতীয় প্রেস ক্লাবের ইতিহাস মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
প্রেস ক্লাব দখলের অপচেষ্টার নিন্দা
এদিকে, জাতীয় প্রেস ক্লাব দখলের অপচেষ্টার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএফইউজে ও ডিইউজের একাংশের নেতারা। বিএফইউজের একাংশের সভাপতি শওকত মাহমুদ, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মো. মোদাব্বের হোসেন, ডিইউজে’র একাংশের সভাপতি আবদুল হাই শিকদার ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রধান এক যৌথ বিবৃতিতে জাতীয় প্রেস ক্লাব নিয়ে নোংরা খেলা থেকে ষড়যন্ত্রকারীদের বিরত থাকার আহ্বান জানান। বিবৃতিতে তারা বলেন, নির্বাচনকে এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিবেকবান সদস্যদের মূল্যবান মতামতকে যারা আস্থায় নিতে ভয় পান, তারাই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে এটির পদ-পদবি কুক্ষিগত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। ক্লাবের নীতিবান সদস্যরা যা কখনো মেনে নেবেন না। ক্লাবের পদ-পদবি দখলের এ অশুভ কর্মকাণ্ড সাধারণ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে মোকাবিলা করা হবে বলে তারা বিবৃতিতে উল্লেখ করেন।

ড. ইউনূসের তিন শূন্য তত্ত্ব

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে পৃথিবী। বাড়ছে জনসংখ্যা, অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণে বদলে যাচ্ছে জলবায়ু ও বায়ুমণ্ডল। ফলে ক্রমেই বসবাসের অযোগ্য হচ্ছে পৃথিবী। এ অবস্থায় বর্তমান বিশ্বকে নিরাপদ করতে হলে ‘তিন শূন্য তত্ত্ব’ বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলো হলো- দ্রারিদ্র্য ও বেকারত্বকে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসা আসতে হবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নামিয়ে আনতে হবে শূন্যে। এসব চ্যালেঞ্জ অর্জনে ৪টি মহাশক্তি সহায়তা করতে পারে। সেগুলো হলো- যুব বা তারুণ্য শক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, সামাজিক ব্যবসা এবং সার্বজনীন সুশাসন প্রতিষ্ঠা। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘সামাজিক ব্যবসা দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত সেমিনারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন, চীনের রাষ্ট্রদূত এইচ ই মা  মিংকিয়াং, ঢাকায় সফরকারী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সিনিয়র কনসালটেন্ট শারিফাহ হাপসাহ শাহাবুদ্দিনসহ ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। দিবসটি উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন একটি ভিডিও বার্তা পাঠান। ইউনূস সেন্টারের আয়োজনে ৬ষ্ঠ ‘বার্ষিক সামাজিক ব্যবসা দিবস’ এটি। এবারের দিবসের বিষয়বস্তু হচ্ছে ‘আমরা চাকরি প্রত্যাশী নই, চাকরি দাতা-বেকারকে উদ্যোক্তায় রূপান্তর’।
প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের আমন্ত্রণে এ অনুষ্ঠানে ১,৬০০ ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে ৩০টি দেশ থেকে ২৫০ জনেরও বেশি বিদেশী প্রতিনিধি অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন গ্রামীণ আমেরিকার প্রধান নির্বাহী অ্যান্ড্রিয়া জাং, গ্রামীণ ক্রিয়েটিভ ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হ্যানস রিটজ, গ্রামীণ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্স কাউন্টস, গ্রামীণ অস্ট্রেলিয়ার চেয়ারম্যান পিটার হান্ট, ইউগ্লেনা জাপানের প্রধান নির্বাহী মিতসুরো ইজুমো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেকার কলেজের প্রেসিডেন্ট রবার্ট জনসন, নেপালের চৌধুরী ফাউন্ডেশন ও নেপাল সামাজিক ব্যবসার প্রধান নির্বাহী নির্ভানা চৌধুরী প্রমুখ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, পৃথিবীকে নিরাপদ করতে হলে আমাদের দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে হবে। এ তিনটি বিষয় বাস্তবায়ন করা গেলে পৃথিবীকে নিরাপদ করা যাবে। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, পৃথিবীতে মোট সম্পদের ৫০ ভাগ মাত্র ৮৫ জন লোকের হাতে রয়েছে। অবশিষ্ট ৫০ ভাগ সম্পদের মালিক বাকি জনগণ। তাই সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে হলে বেশি বেশি উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। এ জন্য বিশ্বব্যাপী সামাজিক ব্যবসার যে ধারণা সেটি ছড়িয়ে দিতে হবে।
ড. ইউনূস বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই বেকারত্ব রয়েছে। কিন্তু আমাদের চ্যালেঞ্জ হলো একজন মানুষও বেকার থাকবে না। আর এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করছে সামাজিক ব্যবসা। তিনি বলেন, আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই ভুল। এখানে উদ্যোক্তা তৈরির উপায় নেই। মানুষকে দাস করে রাখা হয়। আমরা চাকরিপ্রার্থী হিসেবে শিক্ষার্থীদের তৈরি করছি, যা মানবিক গুণাবলীর অধিকারী হিসেবে এটি লজ্জার। ফলে আমাদের স্লোগান চাকরি প্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা।
তিনি বলেন, আমরা এখানে তরুণ বেকারত্বকে ফোকাস করছি। কারণ কোন মানুষ অন্যের চাকরি করার জন্য জন্ম নেয়নি। নিজের অন্তর্নিহিত সৃজনশীল শক্তি দিয়ে পৃথিবী গঠনে সবাই অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এ ধারণা বাদ দিয়ে মানুষকে ভুল পথে চালানো হচ্ছে। সুযোগ পেলে সব মানুষের উদ্যোক্তা হওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে আমরা দেখছি ওপর শ্রেণীর কিছু মানুষের কাছে সম্পদের পাহাড়। আর নিম্ন শ্রেণীর মানুষ সম্পদ শূন্য। ফলে সম্পদশালীদের একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। আর বৈষম্য থাকলে টেকসই সমাজ হতে পারে না।
তিনি বলেন, চলতি বছরে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী ধাপ হল টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি)। এর অর্থ হলো সমস্ত বৈষম্য কমিয়ে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করতে হবে।
ড. ইউনূস বলেন, পৃথিবী সৃষ্টির পর মানুষের সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছাতে ৩০ হাজার বছর লেগেছে। এর পরবর্তী ২০ হাজার বছর পর ১৮০৪ সালে লোকসংখ্যা ১০০ কোটিতে উন্নীত হয়। বর্তমানে বিশ্বের লোকসংখ্যা ৭২৫ কোটি। তিনি মনে করেন, বর্তমানে প্রতি ১২ বছরে ১০০ কোটি লোক বাড়ছে। আর তাদের খাদ্য, পানি এবং বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় উপকরণ আমাদের কাছে জমা নেই। তার মতে, পৃথিবীর সবকিছু দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে পুরনো ধ্যান-ধারণা দিয়ে আর চলা যাবে না। এতে দারিদ্র্য আরও বাড়বে।
অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, সামাজিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটি বিপ্লব হলো গ্রামীণ ব্যাংক। এ প্রক্রিয়ায় বিশ্বের ২০ কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে উপকৃত হয়েছে। এদের বেশিরভাগই নারী। তিনি বলেন, যদিও আমাদের দেশের অর্থনীতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ। নাগরিকদের জীবন ব্যবস্থার মানদণ্ডের গড়ও সর্বোচ্চ। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, এখনও অনেক আমেরিকান দরিদ্রতার সঙ্গে জীবনযাপন করে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ পরিবারের প্রধান নারী। কিন্তু তারা দারিদ্র-সীমার নিচে বসবাস করে। ফলে এ অবস্থা উত্তরণে সামাজিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সামাজিক বাণিজ্য হচ্ছে এমন ধরনের ব্যবসা, যেখানে উদ্যোক্তারা সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য বিনিয়োগ করবেন। ব্যক্তিগত লাভ থাকবে না। সামাজিক ব্যবসাকে নিজের আয়েই নিজের যাবতীয় ব্যয় মিটাতে হবে। এ ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবসার মুনাফাও পুনঃবিনিয়োগ করা হয়।
অনুষ্ঠানে বলা হয়, এ ব্যবসার পুঁজি অমর। এটাই সামাজিক ব্যবসার শক্তি। এ ব্যবসায় বিনিয়োগকারীরা শুধু টাকাই নয়, তাদের সৃষ্টিশীলতা, যোগাযোগের দক্ষতা, প্রযুক্তিগত মেধা, জীবনের অভিজ্ঞতাসহ অনেক কিছুই বিনিয়োগ করে পৃথিবীটাকে পাল্টে দিতে পারে। সামাজিক ব্যবসার ৭টি মূলনীতি। এর মধ্যে রয়েছে- দারিদ্র্য বিমোচনসহ ব্যক্তিগত মুনাফাহীন কল্যাণকর ব্যবসা এটি, সবার অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন, বিনিয়োগকারীরা শুধু তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থই ফেরত পাবে, এর বাইরে কোন প্রকার লভ্যাংশ নিতে পারবে না, বিনিয়োগকৃত অর্থ ফেরত নেয়ার পর পরবর্তী মুনাফা কোম্পানির সম্প্রসারণে ব্যবহৃত হবে, এ ব্যবসা হবে পরিবেশবান্ধব, এখানে চাকরিজীবীরা ভাল পরিবেশ ও চলমান বাজার অনুযায়ী বেতন-ভাতা পাবেন এবং এটি হবে আনন্দের সঙ্গে ব্যবসা।
মূল অনুষ্ঠানে পাশে একটি ‘মার্কেটপ্লেস’ ছিল যেখানে বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসার পণ্য ও কর্মসূচির প্রদর্শনী করা হয়। মার্কেটপ্লেসে একটি বিশেষ মেলায় নবীন উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন পণ্য সামগ্রীর প্রদর্শনীরও আয়োজন ছিল।
অনুষ্ঠানে তিনটি প্লেনারি সেশন ছিল নবীন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, বিশ্বব্যাপী সামাজিক ব্যবসার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আগামী দিনের রোড ম্যাপ। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঞ্চালনায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বক্তারা এসব সেশনে তাদের ধারণা ও কর্মসূচি সম্পর্কে আলোকপাত করেন।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ১২টি প্যানেল সেশন একই সময়ে সংগঠিত হয়। এগুলো হচ্ছে: সামাজিক ব্যবসা ও অ্যাকাডেমিয়া, নবীন উদ্যেক্তা রীতি-পদ্ধতি, সামাজিক ব্যবসা হিসেবে ক্ষুদ্র ঋণ, সামাজিক ব্যবসা ও প্রযুক্তি, সামাজিক ব্যবসায়ে অর্থায়নের উৎস, নবীন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সামাজিক ব্যবসায়ের ওপর প্রশ্নোত্তর। বৃহত্তর চীনে সামাজিক ব্যবসার ওপর একটি বিশেষ প্যানেল ছিল। এ প্যানেল সেশনগুলোয় পৃথিবীব্যাপী সামাজিক ব্যবসার ধারণা, শ্রেষ্ঠ কর্মসূচিসমূহ, বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয় এবং বক্তাদের মধ্যে মূল্যবান অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়।
এ বছরের সামাজিক ব্যবসা দিবসে কিছু নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেয়া হয়। এগুলো হচ্ছে: জাপান অটোমেকানিক ট্রেনিং স্কুল, গ্রামীণ ইনটেল সোশ্যাল বিজনেস লি., গ্রামীণ ইউগ্লেনা লি., গ্রামীণ ক্যালেডোনিয়ান নার্সিং কলেজ, ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস হেলথ হাব, ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস (অস্ট্রেলিয়া), আরএমআইটি অস্ট্রেলিয়ায় ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে সামাজিক ব্যবসা শর্ট কোর্স, সৌদি আরবের সেন্টেনিয়াল ফান্ড (সেন্টেনিয়াল ফান্ড থেকে উদ্যোক্তাদের জন্য প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন আবদুল্লাহ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডের পূর্বশর্ত)। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বেকার কলেজে ইউনূস সোশ্যাল বিজনেস সেন্টার প্রতিষ্ঠাকল্পে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সামাজিক ব্যবসা দিবস প্রতি বছর ২৮শে জুন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ বছর রমজানের কারণে অনুষ্ঠানটি এগিয়ে ২৮শে মে আনা হয়। একই কারণে আগামী বছরও সামাজিক ব্যবসা দিবস ২৮শে মে তারিখে অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম সামাজিক ব্যবসা দিবস ২০১০ সালের ২৮শে জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

রোহিঙ্গা নিয়ে কিছু একটা করুন

বর্তমান সময়ের অভিবাসী সংকটে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা মুসলিমদের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখার জন্য দেশটির নোবেল বিজয়ী বিরোধী নেত্রী অং সান সু চির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দালাইলামা। আগামী সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া সফরে যাচ্ছেন তিব্বতের স্বাধীনতাকামী এ ধর্মীয় নেতা। এর আগে তিনি বৃহস্পতিবার অস্ট্রেলীয় একটি পত্রিকায় দেয়া সাক্ষাৎকারে এ আহ্বান জানিয়েছেন। খবর এএফপির। দালাই লামা বলেন, ‘এটি খুবই দুঃখজনক।
মিয়ানমারের এ ইস্যুতে (রোহিঙ্গা) নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির কিছু একটা করা উচিত।’ দারিদ্র্য এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ চরমপন্থী বৌদ্ধদের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচতে মিয়ানমার থেকে অবৈধ পথে নৌকায় করে অন্য দেশের উদ্দেশে পাড়ি জমায় রোহিঙ্গা মুসলিমরা। দক্ষিণ-পূর্ব সাগরে ভাসমান অবস্থায় তাদের একটি বড়সংখ্যক সম্প্রতি উদ্ধার হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত গণতন্ত্রীপন্থী বিরোধী নেত্রী অং সান সু চি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। রোহিঙ্গা নিয়ে তার এ অবস্থানে সারা বিশ্বে সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

ভারতে মৃতের সংখ্যা ১৫০০ ছাড়িয়েছে

ভারতে স্মরণকালের ভয়াবহ দাবদাহে অসুস্থ মানুষে হাসপাতালগুলোতে উপচেপড়া ভিড় লেগেছে। এত সংখ্যক মানুষকে চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এদিকে তীব্র গরমে গত এক সপ্তাহে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। কেবল অন্ধ্র প্রদেশ ও তেলেঙ্গানা রাজ্যে বুুধবার থেকে ২৪ ঘণ্টায় ২১৮ জনেরও বেশি মারা গেছে। এ নিয়ে এ দুটি রাজ্যে দাবদাহে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ১ হাজার ৩৪৫ জনে।
দাবদাহে যারা মারা গেছে তাদের অধিকাংশই বয়স্ক কিংবা শ্রমিক। হিটস্ট্রোক কিংবা পানিশূন্যতায় তাদের মৃত্যু ঘটছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী জেলা কর্মকর্তারা জনগণকে দিনের বেলায় বাইরে না যাওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দিচ্ছে এবং পানীয় জাতীয় খাবার খাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। পথচারীদের খাবার পানি সরবরাহ করতে অন্ধ্রপ্রদেশে পুলিশ বিভাগ প্রতিটি পুলিশ স্টেশনে পানি সরবরাহ কেন্দ্র খুলেছে। অন্ধ্র প্রদেশ সরকার প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির জন্য ১ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছে।

চীনের বিরুদ্ধে প্রতিবেশীদের উসকানি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ভবিষ্যৎ অর্থনীতির অন্যতম বৃহৎ উৎস দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণে ভাগ বসাতে অস্থির হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিতর্কিত ওই সমুদ্রসীমায় চীনের অব্যাহত তৎপরতা ও সামরিক স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে আর চুপ থাকতে চায় না ওয়াশিংটন। তবে বেইজিংয়ের সঙ্গে সরাসরি বিরোধে যেতেও পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে চীনের বিরুদ্ধে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে একজোট করার ‘উসকানি’ কৌশল নিয়েছে পেন্টাগন। আশিয়ান রাষ্ট্রগুলোকে সংগঠিত করে বেইজিংকে প্রতিহত করাকেই এখনকার কার্যকর উপায় হতে পারে। এতে সাপও মরবে, আবার লাঠিও ভাঙবে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণে বৃহস্পতিবার এসব কথা জানানো হয়েছে। প্রতিবেশীদের একজোট করতে চীনের কার্যক্রম প্রকাশ করার কৌশল নেয়। গত সপ্তাহে সিএনএনের এক সাংবাদিককে নিয়ে মার্কিন নজরদারি বিমান পি-৮এ ঘুরে আসে স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জে। এ সময় ওই অঞ্চলে বেইজিংয়ের সামরিক স্থাপনাগুলোর ভিডিও করে গোয়েন্দা বিমান। চীনা নৌবাহিনী ওই মার্কিন বিমানকে আটবার সতর্ক করে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের এই আচরণকে ‘দায়িত্বহীন ও ভীষণ বিপজ্জনক’ বলে অভিহিত করে। পরদিন ভিডিওটি প্রকাশ করার মাধ্যমে পেন্টাগন বুঝিয়ে দিল দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর অবস্থানে। ভিডিও অনুযায়ী, চীন চলতি বছরেই বিতর্কিত স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জে ১৫০০ একর জায়গা নিয়ে কৃত্রিম দ্বীপ তৈরি করছে। এতে রয়েছে পাঁচটি আউটপোস্ট। বসানো হয়েছে রাডার ও এয়ারস্ট্রিপ। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, ডজনখানিক ড্রিল নৌযান নিয়ে সাগর খোঁড়া হচ্ছে। অথচ এ এলাকার মালিকানার দাবি করছে ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, ব্রুনেই, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়া। বিতর্কিত এলাকায় চীনের গায়ের জোর ফলানো সামনে এনে এশিয়ান মিত্রদের উসকে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
আজ সিঙ্গাপুরে এশিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক সম্মেলন সাংগ্রিলা ‘ডায়লগ’-এ এই ইস্যুই হতে যাচ্ছে প্রধান আলোচ্য বিষয়। এতে উপস্থিত থাকছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাস্টন কার্টার। নাম না প্রকাশ করার শর্তে মার্কিন এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘এই দেশগুলোকে ইস্যুটা (দক্ষিণ চীন সাগর) নিজেদের মনে করা দরকার। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এ বিষয়ে চীনকে চ্যালেঞ্জ করতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, আশিয়ানের ১০ রাষ্ট্রকে এখনই ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে। চার বছর অপেক্ষা করলে দেখা যাবে সবকিছুই সম্পন্ন হয়ে গেছে। মার্কিন মিত্র ফিলিপিন্স এ ব্যাপারে উৎসাহী হলেও চীনের ওপর হস্তক্ষেপ প্রশ্নে আশিয়ান দ্বিধাবিভক্ত রয়েছে। যদিও গত মাসে এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, সমুদ্রসীমানায় চীনা কার্যক্রমে পারস্পরিক আস্থা নষ্ট হবে ও আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্ট হবে। সিঙ্গাপুরের ইন্সটিটিউট অন সাউথইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের গবেষক ইয়ান স্টোরির মতে, নিকট ভবিষ্যতে দক্ষিণ চীন সাগরে আশিয়ান লেভেলের কোনো ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের সম্ভাবনা নেই। তিনি বলেন, ‘এটা একেবারেই ফ্যান্টাসি।’ এদিকে চীন ভীত হয়ে তার কার্যক্রম থেকে পিছিয়ে যাবে- এমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। দক্ষিণ চীন সাগরের ৯০ শতাংশই নিজেদের বলে দাবি করছে বেইজিং। মনে করা হচ্ছে ওই অঞ্চলে ব্যাপক পরিমাণে তেল-গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে। মঙ্গলবারই তারা সেখানে দুটো বাতিঘরের উদ্বোধন করেছে এবং বার্ষিক সামরিক শ্বেতপত্র প্রকাশ করে জানিয়েছে, চীনা নৌবাহিনী সীমানার বাইরে আরও তৎপর হবে। সাগরের মুক্ত এলাকাতেও তারা নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

সিদ্দিকুরকে ছাপিয়ে দুলাল

দেশসেরা গলফার সিদ্দিকুর কিংবা জামাল হোসেন নয়, এশিয়ান ট্যুরের দ্বিতীয় দিনে লিডার বোর্ডের ওপরের দিকে উঠে এলেন দুলাল হোসেন। এশিয়ান ট্যুর হচ্ছে দেশে। বসুন্ধরা বাংলাদেশ ওপেন। স্বাভাবিকভাবেই সিদ্দিকুর রহমান ও জামাল হোসেনদের প্রতি প্রত্যাশার মাত্রা বেশি ছিল। কিন্তু প্রথম দুই রাউন্ডের খেলায় সে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি দেশসেরা এই দু’গলফার। ফলে স্বাগতিক বাংলাদেশের ৩১ জন গলফার এই টুর্নামেন্টে অংশ নিলেও দ্বিতীয় রাউন্ড শেষে মাত্র সাতজন এই প্রতিযোগিতায় টিকে রয়েছেন। অন্যরা ধুকতে থাকলেও শিরোপা স্বপ্ন বাঁচিয়ে রেখেছেন কেবলমাত্র দুলাল হোসেন। প্রথম রাউন্ডে না পারলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে অবিস্মরণীয় নৈপুণ্য দেখান দুলাল। ফলে ৫০তম স্থান থেকে এক লাফে ৪৬ ধাপ উঠে আসেন তিনি। দুই রাউন্ড মিলিয়ে পারের চেয়ে ছয় শট কম (১৩৬ শট) নিয়ে চতুর্থ স্থানে জায়গা করে নেন। দুলালের আন্ডার পার এইট পারফরম্যান্সই দ্বিতীয় রাউন্ডের সেরা পারফরম্যান্স। আর এই পারফরম্যান্সকে যে কোনো রাউন্ডে নিজের ক্যারিয়ারসেরা পারফরম্যান্স বলে জানান ২০১২ সালে পেশাদার গলফে নাম লিখানো দুলাল। তার কথায়, ‘পারের চেয়ে সাত শট কমই ছিল যে কোনো প্রতিযোগিতায় আমার আগের সেরা সাফল্য। আন্ডার পার এইট আমার ক্যারিয়ারসেরা।’ তবে দ্বিতীয় রাউন্ডে সাফল্যের পেছনে দারুণ কষ্টের অভিজ্ঞতা শোনালেন ২০১০ সালে এসএ গেমসে স্বর্ণপদক জয়ী এই গলফার। দুলাল বলেন, ‘আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। কারণ আগের দিন বৃষ্টির কারণে প্রথম রাউন্ডের ১৮ হোলের মধ্যে ৬ হোলের খেলাই বাকি ছিল আমার। যেটা শেষ করতে আমাকে ভোর সাড়ে ৫টায় কুর্মিটোলা গলফ কোর্সে আসতে হয়েছে। আগের ছয় হোলের খেলা শেষ করে ৮টা ৪০ মিনিট থেকে আবার দ্বিতীয় রাউন্ডের খেলায় নামতে হয়েছে।’ দ্বিতীয় রাউন্ডে আটটি বার্ডি একটি ঈগল ও এক বগির দুর্দান্ত পারফরম্যান্স হলেও দিনের প্রথম ছয় হোল খেলতে পারের চেয়ে দুই শট বেশি নেন ২৫ বছর বয়সী এ গলফার। শিরোপায় চোখ রাখা দুলাল আরও বলেন, ‘ভালো করার আত্মবিশ্বাস ছিল আমার। তবে সিদ্দিকুর, জামাল, সজিবসহ যারা এখানে খেলছেন, তারাও যে কোনো সময়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সামর্থ্য রাখেন। আমি আজ সেটা করে দেখাতে পেরেছি। তবে আরও দুই রাউন্ড আছে সেখানে ভালো করতে হবে।’ দ্বিতীয় রাউন্ডে পারের চেয়ে এক শট বেশি নিয়েছেন সিদ্দিকুর রহমান। দুই রাউন্ডে পারের চেয়ে দুই শট বেশি নিয়ে যৌথভাবে ৪৪তম স্থানে রয়েছেন দেশসেরা এই গলফার। উদীয়মান গলফার সজিব আলী দুই রাউন্ডে পারের চেয়ে এক শট বেশি নিয়ে যৌথভাবে ৩৪তম স্থানে থাকলেও দুই রাউন্ডে পারের চেয়ে চার শট বেশি নিয়ে প্রতিযোগিতা থেকে ঝরে পড়েন জামাল হোসেন। তিন লাখ ডলার প্রাইজমানির এ আসরে পারের চেয়ে ৯ শট কম নিয়ে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন সিঙ্গাপুরের মরদান মামাত। তার চেয়ে এক শট কম নিয়ে লিডার বোর্ডে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছেন স্পেনের কার্লোস পিজেম।

জিয়া হত্যার পরে সেনাবাহিনীতে কী ঘটেছিল -মার্কিন নথি: জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড by মিজানুর রহমান খান

৩০ মে জিয়া হত্যাকাণ্ডের ৩৪ বছর পূর্তি হবে। দীর্ঘ সময় পরে মার্কিন গোপন দলিলে উদ্ঘাটিত হলো জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কাহিনি। এ বিষয়ে প্রথম আলোর বিশেষ ধারাবাহিক আয়োজনের প্রথম কিস্তি ছাপা হলো।
ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড টি স্নাইডার পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছিলেন। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বার্তা পাঠিয়েছিলেন ওয়াশিংটনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরেও এভাবে মার্কিন দূতাবাস সক্রিয় হয়েছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর ভেতরকার খবর জিয়া হত্যাকাণ্ডের পরে তারা বেশি নির্দিষ্টভাবে জানতে পেরেছিল। দূতাবাসের মূল্যায়নে প্রতীয়মান হয় যে পরিস্থিতি অনুকূল না থাকার কারণে সামরিক বাহিনী জিয়া হত্যার পরপরই ক্ষমতা দখলে বিরত ছিল।
১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রদূত স্নাইডার বেলছিলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে যেসব খবরাখবর আমরা পেয়েছি, তাতে আমাদের কাছে এ রকম আর কোনো তথ্য নেই যে জেনারেল মঞ্জুরের সমর্থনে অন্য কোনো সামরিক ইউনিট ওই বিদ্রোহে অংশ নিচ্ছে বা তেমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনীর ফরেন লিয়াজোঁ অফিসার ডিএটিটিকে (ঢাকায় মার্কিন প্রতিরক্ষা অ্যাটাশে) বলেছেন, কুমিল্লার ৩৩ ডিভিশন ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। তারা ঢাকা কমান্ডের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, স্নাইডার এই বার্তায় উল্লেখ করেছিলেন যে চীনা দূতাবাস কর্মকর্তাও আমাদের বলেছেন, একটি বিশ্বস্ত সূত্রমতে তাঁরাও জানতে পেরেছেন, ৩৩ ডিভিশন মঞ্জুরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে যাচ্ছে। চীনাদের মতে, বর্তমান লড়াইয়ের মুখ্য ফ্যাক্টর হচ্ছে ৩৩ ডিভিশন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা, যাঁর সঙ্গে সামরিক বাহিনীর ভালো যোগাযোগ আছে, তিনি আমাদের জানিয়েছেন, তিনি বিশ্বাস করছেন যে বগুড়া কিংবা রংপুর ও ঢাকার বাইরে থাকা নবম ডিভিশনের সৈন্যদের আনুগত্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তাঁদের অধিকাংশই অনুগত। তবে জেনারেল মীর শওকত আলীর নেতৃত্বাধীন ডিভিশনের মনোভাব সম্পর্কে তিনি কম নিশ্চিত।
মীর শওকত আলীকে কয়েক মাস আগে ঢাকায় স্থানান্তর করা হলেও তাঁর যথেষ্ট প্রভাব রয়ে গেছে। তাঁর মতে, নৌবাহিনী পুরোপুরি অনুগত। কিন্তু বিমানবাহিনী বিভ্রান্ত। কারণ, বর্তমান বিমানবাহিনীর প্রধানের নেতৃত্ব দুর্বল। এ ছাড়া ১৯৭৭ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সমস্যাও কিছুটা রয়ে গেছে। এই একই কর্মকর্তা উল্লেখ করেন যে চট্টগ্রামে সামরিক বাহিনীর ভেতরকার সরকার অনুগত ও জেনারেল মঞ্জুরের অনুগত ব্যক্তিদের মধ্যে ‘জটিলতা’ রয়ে গেছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত আরও উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আক্রমণ চালানো হলেও বিএনপির মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরী অক্ষত ছিলেন। যদিও কথিতমতে, আক্রমণকারীরা সংখ্যায় ছিল প্রায় ২০০ এবং তাঁরা গৃহভৃত্যসহ প্রত্যেককে হত্যা করেছেন। এ ঘটনার বাইরে একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় আমাদের নজরে এসেছে। আমরা অবগত হয়েছি, জিয়াকে এই সময়ে চট্টগ্রাম সফর থেকে বিরত থাকতে সামরিক গোয়েন্দারা উপদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের সতর্কতা তিনি অগ্রাহ্য করেন।
১৯৮১ সালের ৩১ মে মার্কিন দূতাবাসের ৭ নম্বর পরিস্থিতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল এরশাদ মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ সব ‘দুর্বৃত্ত এবং তাঁদের কমান্ডিং অফিসারদের’ আজ দুপুরের মধ্যে আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথায় সশস্ত্র বাহিনী চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। স্নাইডার উল্লেখ করেন যে সরকারের প্রতি কুমিল্লার গুরুত্বপূর্ণ ৩৩ ডিভিশনের আনুগত্য সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হয়েছি। বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর, বর্তমানে বিজিবি) প্রধান এবং মন্ত্রিসভার সচিব মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করেন যে ৩৩ ডিভিশন সরকারের সঙ্গেই রয়েছে। বিডিআর প্রধানের মতে, ৩৩ ডিভিশন দেশের অবশিষ্ট অংশ থেকে ফেনী নদীর (চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী জেলার সীমান্ত) কাছে চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আমাদের কাছে এ খবরও এসেছে যে কুমিল্লা থেকে সড়ক ও রেলপথে উল্লেখযোগ্য সৈন্য রওনা দিয়েছে। রাষ্ট্রদূত এরপর লিখেছেন, আমাদের জানামতে, চট্টগ্রামে মঞ্জুরের সঙ্গে বিরোধে লিপ্ত হতে সৈন্য প্রেরণে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। আমরা অনুমান করছি যে এই সৈন্যদের গন্তব্য হচ্ছে ফেনী নদী পর্যন্ত। রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, আমরা আরও ইঙ্গিত পেয়েছি যে চট্টগ্রামের কতিপয় সামরিক ইউনিট সরকারের প্রতি অনুগত। মন্ত্রিসভার সচিব দাবি করেছেন যে সৈন্যরা ব্যাপক সংখ্যায় সরকারের কাছে ছুটে আসছে এবং বিডিআরের প্রধান চট্টগ্রামের অনুগত সৈন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এরপর সূত্র অবমুক্ত না করা এক প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়েছে, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী ইউনিট চট্টগ্রামে সরকারের প্রতি অনুগত রয়েছে। এরপরের কিছুটা জায়গা অবমুক্ত করা হয়নি।
রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেন যে জেনারেল এরশাদ যদিও ফাইনাল অ্যাকশন গ্রহণের হুমকি দিয়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও সরকারের ভেতরে কৌশল গ্রহণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কেউ অবিলম্বে আক্রমণ করতে চাইছেন আর অন্যরা একটি কৌশল গ্রহণের কথা ভাবছেন। কারণ, তাঁরা একটা জাতীয় ঐক্য দেখাতে চাইছেন। তাই মঞ্জুরকে পরিত্যাগ করে সরকারের প্রতি সমর্থনকারী সেনাসংখ্যা যাতে আরও বাড়ে, সে জন্য তাঁরা অপেক্ষা করতে চাইছেন। যাঁরা একটি শক্তিক্ষয়ের (এট্রিশন) কৌশল অবলম্বনের পক্ষে, তাঁদের যুক্তি—দেশের বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে মঞ্জুর সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে এবং তাঁরা যখন ওই অভিযানে নামবেন, তখন সরকার অনুগত সৈন্যদের দিক থেকেও স্বপক্ষ ত্যাগের বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আর সে কারণেই অধিকতর সতর্ক কৌশল অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর প্রতি এরশাদের সমর্থন রয়েছে আর সেটাই প্রাধান্য পাচ্ছে।
২০ দিন পরে: ১৯৮১ সালের ২০ জুন এক সিক্রেট তারবার্তায় জিয়া ও মঞ্জুর হত্যার পরপরই কেন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেনি, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সৈন্যদের আনুগত্য নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকাটাই উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের সংযত করতে পারে। মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও অসন্তোষ রয়েছে কিন্তু আমাদের কাছে এমন রিপোর্ট নেই যে এই গ্রুপ এই সময়ে নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। চূড়ান্তভাবে, সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক তৎপরতা সম্পর্কে জনগণের মনোভাব অনুকূল নয়। আর সেটাই হয়তো তাদের সংযত করতে পারে। যদিও সম্ভাব্য একাধিক ঘটনার পরে আমাদের এই অনুমান বদলে যেতে পারে।
ঢাকায় ব্যাপক সংশয় রয়েছে যে সামরিক বাহিনী কোনো না কোনোভাবে চলতি সাংবিধানিক ক্রান্তিকালকে নস্যাৎ করতে পারে। আশঙ্কা দুটি। প্রথমত, বর্তমান সামরিক নেতৃত্ব সরকারকে সামরিক আইন জারি করতে বাধ্য করবে কিংবা অন্য উপায়ে ক্ষমতা নিয়ে নেবে। কিংবা দ্বিতীয়ত, সামরিক বাহিনীর মধ্যকার একটি অসন্তুষ্ট গ্রুপ বর্তমান সামরিক নেতৃত্বকে উৎখাত করতে পারে। এবং সম্ভবত সরকারকেও। পরের ভয়টি অনেক বেশি অনড়, যদিও তা অস্পষ্ট। এর মূল কথা হচ্ছে, সামরিক বাহিনীর ‘পরিস্থিতি ভালো নয়’। এই আশঙ্কাটা জীবন্ত থাকছে পৌনঃপুনিক গুজবের কারণে। আর সেটা হলো সামরিক বাহিনীর মধ্যে ‘হট্টগোল’ রয়েছে। এক গুজবে বলা হয়েছে, ৮ কিংবা ৯ জুন রাতে ঢাকা সেনানিবাসে একধরনের হইচই ঘটেছে। তবে এই গুজব ও আতঙ্ক সত্ত্বেও গত দুই সপ্তাহে সামরিক বাহিনীর ভেতরকার অবস্থার লক্ষণীয় উন্নতি ঘটেছে। এবং জিয়ার হত্যাকাণ্ডের পরপরই যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, এখন আর ততটা করা হচ্ছে না।
জাসদের ষড়যন্ত্র: ১৯৭৫ সালের পরে ১৯৮১ সালে আবারও জাসদ প্রসঙ্গ আসে। ওই একই বার্তায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত উল্লেখ করেন যে যদিও একাধিক সূত্র সন্দেহ প্রকাশ করেছে, এ মুহূর্তে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ একটি মারাত্মক হুমকি। অনুকূল পরিবেশে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) সৈন্যদের মধ্যকার রেডিক্যাল অংশের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু ১৯৮০ সালের ১৭ জুনের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছে যে জাসদের অবলম্বন করা কৌশল শৌখিন। তদুপরি সাধারণ সৈনিকদের মধ্যে আনুগত্যের অনিশ্চয়তা, আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে অনিশ্চয়তার একটি উপকরণ হিসেবেই রয়ে গেছে।
অন্য একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও লক্ষ করা যায় যে এনসিও (নন-কমিশনড অফিসার) এবং সৈনিকদের মধ্যকার শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনতে পারে। যেমনটা একজন বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ মন্তব্য করেছেন যে সরকারের সৌভাগ্য যে উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তারা তাঁদের সৈন্যদের আনুগত্য লাভ সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন না। জেনারেল মঞ্জুরের বিদ্রোহ সমর্থনে সাধারণ সৈনিকদের অস্বীকৃতি, সেনাবাহিনীতে জিয়ার জনপ্রিয়তা এবং কর্মকর্তাদের প্রতি সৈন্যদের অন্ধভাবে অনুসরণ না করার মনোভাব—এই ক্রান্তিকালে (ক্ষমতা দখলে) উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তাদের সংযত করেছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

ভারতে প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের অধ্যক্ষ

লৈঙ্গিক অসমতার আর্গল ভেঙে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজ। তৃতীয় লিঙ্গের একজনকে প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। নতুন প্রিন্সিপালের নাম মানবী বন্দোপাধ্যায়। জুন মাস থেকেই কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন তিনি। কৃষ্ণনগর উইমেন্স কলেজে তার যোগদানের বিষয়টি রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগতভাবেই এক বিরাট মাইলফলক। কারণ ভারতে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ বরাবরই সমাজে অবহেলিত। তারা সব সময়ই নানা হয়রানির শিকার হয়ে থাকে।
তাই একটি কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে নিয়োগ পাওয়া তাদের গোত্রের মানুষের জন্য এক বড় অর্জন। আর এ অর্জনে স্বাভাবিকভাবেই বেশ উচ্ছ্বসিত মানবী। তিনি বলেন, ‘অবশ্যই আমি আনন্দিত। তবে মিডিয়ার আগ্রহ আমাকে বেশ উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। আমার কাছে অসংখ্য ফোন আসছে। আমি জানি আমার এ অর্জন তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের এক বড় মাইলফলক। তবে এ দায়িত্ব গ্রহণের পর আমার শিক্ষার্থীরাই আমার মূল আগ্রহ।’মানবীর পূর্ব নাম ছিল সোমনাথ। এরপর ২০০৩ সালে তিনি লিঙ্গ পরিবর্তনের জন্য অস্ত্রোপচার করেন। আর অস্ত্রোপচারের পর থেকেই তার জীবনে নানারকম দুর্দশা নেমে আসতে শুরু করে।
বুধবার ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি তার জীবনের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তার অপারেশনের পর তাকে নানা বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি তাকে ওয়াশরুমে যাওয়া নিয়েও নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। পুরুষ কিংবা নারী কেউই তাদের ওয়াশরুমে মানবীকে ঢুকতে দিতে চাইত না। তবে গত কয়েক বছরে অবস্থা অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মানবী জানান, ‘আমি আসলে কখনোই এ প্রিন্সিপালের পোস্টের পেছনে ছুটিনি। কিন্তু আমি এটা বুঝতে পেরেছি যে আপনি যদি আপনার কাজে সৎ এবং দক্ষ হন, তাহলে মানুষ আপনাকে অবশ্যই সম্মান করবে।’

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো হুমকিতে

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং নরেন্দ্র মোদিকে একহাত নিয়েছেন। মোদি সরকারের এক বছর পর কঠোর সমালোচনায় আবির্ভূত হয়েছেন তিনি। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের আমলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো হুমকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। এ সময় কংগ্রেস মনমোহনের বিরুদ্ধে আনা বিজেপির দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়ার। হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়া টুডের।
বুধবার ন্যাশনাল স্টুডেন্টস’ ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়ার জাতীয় সম্মেলনে বক্তব্য দেন মনমোহন সিং। কংগ্রেস পার্টির ছাত্র সংগঠনের এ সম্মেলনে মনমোহন সিং বলেন, জনগণের সামনে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সরানোর জন্য দুর্নীতির বাদ্য বাজাচ্ছে ক্ষমতাসীনরা। এ সরকারের অধীনে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো হুমকির মুখে পড়েছে। আমরা ক্ষমতায় থাকার সময় উন্নয়নের জন্য অনেক কর্মসূচি ও প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল। নরেন্দ্র মোদির সরকার সেগুলো পুনরায় প্যাকেটজাত করে জনগণের কাছে বিক্রি করছে। তিনি বলেন, আমাদের যেসব ইস্যুতে বিজেপি সমালোচনা করত, এখন তো সেগুলোই করছে তারা। মোদি ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বক্তব্য নিয়ে এতদিন সে অর্থে কোনো প্রতিবাদ জাননি মনমোহন সিং। এবার তিনি সরব হলেন। টুজি স্পেকট্রাম ও কয়লা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি অফিসকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করিনি।
আমার পরিবার বা বন্ধুদের উপকারে সরকারি সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগাইনি। মোদি সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী মোদি কংগ্রেসের ব্যর্থতা টেনে এবং এক বছরে তার সরকারের সফলতা তুলে ধরে জনগণের উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়েছেন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ ১-২) জোট সরকারের সময় দুর্নীতির মহোৎসব হয়েছে বলে মোদি দাবি করেছেন। এ ছাড়া সম্প্রতি মোদি সরকারের মন্ত্রীরা অভিযোগ করেছেন, অর্থনৈতিক নীতিতে মনমোহন সরকার ছিল পক্ষাঘাতগ্রস্ত। মনমোহন এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, পক্ষাঘাতগ্রস্ত নীতির অভিযোগ সত্য নয়। ‘আমরা যখন ক্ষমতা ছেড়েছি, তখন বিশ্বের দ্বিতীয় বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ ছিল ভারত।’ কিন্তু বিজেপি সরকারের আমলে দেশের উন্নয়ন আরও দুর্বল হচ্ছে। বিজেপিকে নিশানা করা ছাড়াও কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে জানান, দেশের যুবকরাই ভবিষ্যৎ কংগ্রেসের ভিত। কোনো আপস ছাড়াই আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়ব। এর আগে বিজেপির নেতা নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে মনমোহন সিং বলেন, যারা বিভক্তির রাজনীতি করে তাদের গুজরাট থেকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। মনমোহন সিং বলেন, যে কোনো সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে সমাজের দুর্বল শ্রেণী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু গুজরাটের রাজ্য সরকার সেদিকে খুব একটা নজর দিচ্ছে না।

মানুষ, জঙ্গল ও বন্দিশিবির by সৈয়দ আবুল মকসুদ

উত্তর আচহের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে বাংলাদেশ ও
মিয়ানমারের উদ্ধার হওয়া নারী ও শিশুরা
কত লাখ বছর আগে মানুষ বনজঙ্গলে বাস করত, সে সম্পর্কে আমাদের পরিষ্কার ধারণা নেই। তবে কোনো একসময় জঙ্গলে বাস করতে মানুষ অভ্যস্ত ছিল। সেই জঙ্গলেই আদি প্রত্নপ্রস্তরযুগে মানুষ বাস করত যেখানকার আবহাওয়া অপেক্ষাকৃত অনুকূল। শিকারযোগ্য জীবজন্তু অঢেল। মানুষ জীবনধারণের জন্য পশু শিকার করত। কোনো কোনো জঙ্গলে খাওয়ার উপযোগী ফলের গাছ, লতাপাতা ছিল প্রচুর।
এখন আর জঙ্গলে মানুষ থাকতে পারে না, কারণ জঙ্গলে মুদি দোকান নেই। চাল-ডাল-নুন প্রভৃতি পাওয়া যায় না। জঙ্গলে কাঁচাবাজার নেই। মাছ-তরিতরকারিও নেই। এমনকি দেশলাইটাও পাওয়া যায় না। ফলে আগুন জ্বালানোর উপায় নেই। সুতরাং রান্না বন্ধ। তাই একালে যারা জঙ্গলে থাকবে, তাদের অনাহারে মারা যাওয়াই নিয়তি, যদি বাঘ-ভালুক-অজগর মানুষকে গিলে না-ও খায়। অবশ্য বাঘ-ভালুক-অজগরের বিচার-বিবেচনা ও করুণা আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের চেয়ে বহু গুণ বেশি। বনের পশুও মানুষের চেয়ে কম নিষ্ঠুর।
কোরবানির হাটে ব্যাপারীরা গরু-খাসি নিয়ে আসে। দরদাম করে ক্রেতারা পশু কেনে। মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার গহন জঙ্গলে বহুদিন থেকে বসেছে মানুষের হাট। খুব তাড়াতাড়ি যে মানুষগুলো দাস হিসেবে বিক্রি হয়, তারা ভাগ্যবান। যাদের দাম ওঠে না, তারা হতভাগ্য। দানা-পানি না পাওয়ার ফলে মৃত্যু তাদের অনিবার্য।
দাসপ্রথা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার তা পুনঃপ্রচলন হচ্ছে। এবং দাস হিসেবে নাম লেখাচ্ছে সেই ভূখণ্ডের মানুষ, প্রায়-মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে গেছে বলে উচ্ছ্বসিত যে দেশের নেতারা, অর্থনীতিবিদ, উপসম্পাদকীয় লেখক এবং ব্যবসায়ী নেতারা। প্রায়-মধ্যম আয়ের দেশ আমরা কাকে বলব? যেখানে তৃণমূল পর্যায়ের ক্যাডারদের আছে নতুন মোটরসাইকেল, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতার আছে শেষ মডেলের জাপানি গাড়ি, উপজেলা পর্যায়ের নেতার মিৎসুবিশি পাজেরো। যে প্রায়-মধ্যম আয়ের দেশের ছাত্রনেতাদের আছে অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, আধুনিক বিপণিবিতানে দোকান এবং অমূল্য মোটরগাড়ি। যে দেশে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে এক হালি ইলিশের ক্রেতার অভাব নেই। যে দেশের অভিজাত এলাকার রেস্তোরাঁগুলোতে বাতি নেভে না রাত তিনটাতেও, বসার জায়গা না পেয়ে প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের অনেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন।
সেই প্রায়-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে কেন আর একশ্রেণির যুবক-যুবতী অজানার পথে যাত্রা শুরু করবে সত্যিকারের কোনো মধ্যম-আয়ের দেশে পাড়ি জমানোর আশা নিয়ে। বয়স হয়েছে কারও ১৭, কারও ১৯, কারও ২১, কারও বা ২৬। কাজকাম কিছু নেই। বাড়িতে দুবেলা ভাত জোটে না। বাপ-মায়ে রাগারাগি করে, ছোট বোনগুলো ঠিকমতো কথা বলে না। একদিন বাজারে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এক লোক কোত্থেকে এসে কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘কি রে, বিদেশে যাবি?’
যুবক এই সুযোগ ছাড়তে নারাজ। বলে, ‘যামু।’
লোকটি বলে, ‘চল্, তাইলে তোরে আমার ওস্তাদের কাছে নিয়া যাই।’
ওস্তাদ খুব বেশি দূরে থাকেন না। তার সঙ্গে দেখা করতেই তিনি সব পথ বাতলে দেন। অমুক তারিখে রাত একটায় অমুক ঘাটে নাও থাকব। তুই খালি তাতে উইঠা বসবি গিয়া। তারপর সোজা মালয়েশিয়া। ওইখানে গিয়া দেখবি দুনিয়ার সবচাইয়া উঁচা দালান। উপরের তালায় চাইলে তোর মাথায় চক্কর দিব।
ছেলেটি ভেবে দ্যাখে, এ তো আল্লাহর খাস রহমত। এমন সুযোগ তো বাংলাদেশে আর কেউ তাকে দেবে না। সে কোনোরকমে কিছু হাতখরচ জোগাড় করে। এক ঘোর অমাবস্যার রাতে মা-বাপ-ভাইবোনদের কিছু না জানিয়ে ঘর থেকে বের হয়। রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালে প্রতিবেশীর নেড়ি কুত্তাটা ঘেউ ঘেউ করে অনেকক্ষণ। সে দাঁড়ায়। পেছনে তাকিয়ে দেখে অন্ধকার ঘরে মা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে আর দাঁড়িয়ে না থেকে লম্বা পা চালায়। নৌকায় গিয়ে দেখে তার মতো আরও ৩৫ জন। ইঞ্জিনচালিত নৌকা ছাড়ে। ফটফট আওয়াজ হয়। অজানার পথে শুরু হয় যাত্রা। সামনে তাকিয়ে দেখে কোথাও কোনো আলোর বিন্দু পর্যন্ত নেই। একদিন নৌকা গিয়ে এক ঘাটে থামে। তখনো মধ্যরাত। সেখান থেকে একজন তাদের নিয়ে যায় কোথায় তা তারা জানে না। যখন ভোর হয়, তখন দেখে কোথাও সেই মালয়েশিয়ার উঁচু দালান তো দূরের কথা, সেমিপাকা একতলা দালান বা টিনের ঘর পর্যন্ত নেই, চারদিকে নিস্তব্ধ জঙ্গল।
যুবকটি বাড়ি ছাড়ার পর দিন দশেক পার হয়। একদিন খেতে বসে ওর পিঠাপিঠি বোনটি মাকে বলে, মা, ভাই যে আসতেছে না? মা বলেন, আইব, বন্দরে গেছে। শয়তান ছ্যামরা একটা মোবাইল তো করব। ভাই আর আসে না। আর একদিন খেতে বসে জরিনার ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। গলায় ভাত আটকায়। জরিনার চোখ দিয়ে টপ করে দুফোঁটা পানি পড়ে ভাতের থালায়। মাকে কিছুই বলে না। মুরগিগুলোকে খাওয়াতে গিয়ে মা যে কতবার আঁচলে চোখ মুছেছে, সে কথাও জরিনা জানে না। এর মধ্যে হঠাৎ একদিন একজন এসে জানায়, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে অনেকগুলো গণকবরের খোঁজ পেয়েছেন সাংবাদিকেরা।
মানব পাচার চিরকালই অনেক অঞ্চলে হয়। গরিব দেশ থেকে ভাগ্যান্বেষণে সমৃদ্ধ দেশে মানুষ যায় জীবিকার সন্ধানে। সমুদ্রপথে পাড়ি জমাতে গিয়ে কত মানুষ যে মারা গেছে, তার হিসাব জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দপ্তরেও নেই। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবরের সন্ধান পাওয়ায় এবং সেখানে বন্দিশিবিরে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের উদ্ধার করার সংবাদ প্রচারমাধ্যমে আসায় বিষয়টির প্রতি আমাদের দৃষ্টি পড়েছে। কয়েক দিন যাবৎ প্রতিদিনই বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে মানব পাচারের সংবাদ প্রচার করছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া। ১০ মে জাকার্তা থেকে সংবাদ সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, আগের দিনই দক্ষিণ-পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ার উপকূল থেকে ৪৬৯ জন বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের হতভাগ্যকে নৌকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে ৮৩ যুবতী এবং ৪১ জন শিশু।
প্রচারমাধ্যমে গণকবর, জঙ্গলে বন্দিশিবির এবং মানব পাচারকারীদের বিচিত্র সংবাদ প্রকাশ পাওয়ার পর আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও কিঞ্চিৎ তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই মর্মান্তিক তথ্য যদি প্রচারিত না হতো, তা হলে কী হতো। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিরোধী দলের কর্মসূচি ঘোষণার পরদিনই ঘোষণা করে অমুক তারিখে অতটার সময় নাশকতা হবে। অপ্রধান দৈনিকের কোনো কোনোটিতে সে খবর খুব বড় করে প্রকাশিত হয়। আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলে দিতে পারেন ২০১৮-র ডিসেম্বরে অথবা ’১৯-এর জানুয়ারিতে যে নির্বাচন হবে, সেদিন তাতে কোন কোন কেন্দ্রে কারা বোমা মারবে, সে কথাও। কিন্তু এই যে হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ জীবিকার সন্ধানে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা অন্য কোথাও যাচ্ছে, সে সম্পর্কে গোয়েন্দাদের কিছুমাত্র ধারণা নেই। রোববার এক মানব পাচারকারীকে উখিয়ায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যা করায় প্রশাসন জনগণকে জানিয়ে দিল, তারা মানব পাচারকারীদের শায়েস্তা করায় প্রচণ্ড আন্তরিক। তাদের তালিকা নাকি হালনাগাদ করা হচ্ছে।
রোগ আর উপসর্গ এক জিনিস নয়। গণকবর ও বন্দিশিবিরের সন্ধান পাওয়া, সেখানে বাংলাদেশিদের কয়েকজনকে উদ্ধার করা, তাদের দু-চারজনকে দেশে ফিরিয়ে আনা—এসব উপসর্গ, রোগ অন্য জিনিস। কেন এই মানুষগুলো নৌকায় উত্তাল সাগরে ভেসে অন্য দেশে যাচ্ছে, কেন তারা নৌকা থেকে সাঁতরে গিয়ে পাড়িতে উঠছে—সেসব বিষয়ের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা সরকার দেবে না। সরকার বহু উন্নয়নমূলক কাজে ব্যস্ত থাকায় এসব প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য নয়। দোষ সরকারের নয়, রাষ্ট্রের।
থাইল্যান্ডের জঙ্গলে বাঙালির গলিত লাশ উদ্ধার হওয়ার সংবাদ শুনে আমার একাত্তরের স্মৃতি মনে পড়ল। ষোলোই ডিসেম্বরের এক হপ্তা পরে ঢাকায় এসে আমরা কয়েকজন গিয়েছিলাম রায়েরবাজার। সেখানে ছিল গণকবর অথবা গলিত লাশ এবং শিয়াল-শকুনে খাওয়া মানুষের হাড়গোড়। একাত্তরে অগণিত বাঙালি গণকবরে গিয়ে শেষ আশ্রয় নিয়েছিল। চুয়াল্লিশ বছর পর বাঙালিকে আবার থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গিয়ে গণকবরে শেষ আশ্রয় নিতে হচ্ছে। সেদিন বাঙালি চেয়েছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, আজও একটি বিরাট শ্রেণি অর্থনৈতিক মুক্তির আশায় সাগরে গিয়ে ঝাঁপ দিচ্ছে এবং অনেকে প্রিয়জনহীন পরবাসে মৃত্যুবরণ করছে। খবরে দেখলাম, বন্দিশিবিরগুলোতে নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন। নারী শিশু ও কিশোরীদের প্রলোভন দিয়ে নেওয়া হচ্ছে যৌনদাসী হিসেবে নিয়োগের জন্য। বন্দিদশা থেকে যাদের উদ্ধার করা হয়েছে, তারা জানিয়েছে, মুক্তিপণ আদায় করতে না পারায় অনেককে হত্যা করা হয়েছে। অনেকে অনাহারে ও রোগে মারা গেছে।
যেসব দালাল ফুসলিয়ে দরিদ্র মানুষদের পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়, তারা পায় রাষ্ট্রের মৌন অথচ পূর্ণ সহযোগিতা। পাঁচ বছর আগে যে পাচারকারীর বাড়িতে ছিল দোচালা টিনের ঘর, তাতে পাটখড়ির বেড়া, এখন সেখানে দোতলা দালান। আগে ছিল তার এক চিলতে জমি, এখন ক্রয়সূত্রে কয়েক একর এবং সরকারি খাসজমি দখল সাত একর। ব্যাংকে ঢের টাকা। আগামী কোনো নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থী হলে তার বিজয় ঠেকায় কে?
দেশ যে উন্নতির হিমালয় স্পর্শ করছে, তা প্রতিদিন মানুষ শুনছে। বিভিন্ন প্রজন্মের সন্তানেরা প্রতিদিন ১০ হাজার টাকা দিয়ে হল ভাড়া করে গোলটেবিল করছেন। বইঠা সমর্থকগোষ্ঠীও গোলটেবিল ও মানববন্ধন করছেন। তাতে বড় নেতারা গিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন। রাস্তার কোনো লোক তাদের কাছে গিয়ে জানতে সাহস পাচ্ছে না, হুজুর, বলেন, লাখ লাখ যুবক-যুবতী বিদেশে পাড়ি জমাতে যাচ্ছে কেন? মেধাবী শিক্ষিত বেকারদের চাকরি দিতে পারেন না, নিয়তির কারণে যারা শিক্ষাবঞ্চিত, প্রশিক্ষণের অভাবে যারা অদক্ষ, তাদেরও বাঁচার মতো জীবিকার ব্যবস্থাটা করে দিতে পারেন না। যে দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ পাচার হয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সে দেশের ভাবমূর্তি বলে কিছু থাকে না।
অব্যবস্থার সুবিধাভোগী একশ্রেণির মধ্যবিত্ত বিদ্বান যতই বগল বাজান, ষোলো কোটি সাধারণ মানুষের অবস্থা আজ থাই জঙ্গলে বন্দিশিবিরের মানুষগুলোর মতোই। এমন এক নৌকার তারা যাত্রী, যে নৌকা যাচ্ছে এক অজানা গন্তব্যের দিকে।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

অভিবাসী ইস্যুতে আজ ব্যাংককে সম্মেলন

সাগরে ভাসমান বাংলাদেশী ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে আজ থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক এক সম্মেলন। এ সম্মেলনে ওই অঞ্চলে অভিবাসী সংকট নিয়ে ১০ দফা প্রস্তাব দেবে আন্তর্জাতিক তিনটি সংস্থা। এ কথা বলেছে শরণার্থী বিষয়ক জাতিসংঘের হাইকমিশন। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে আইএনএইচসিআর, ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম) ও জাতিসংঘের ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম। তারা এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোর সঙ্গে তাদের ১০ দফা শেয়ার করেছে। এ ক্ষেত্রে তারা ওই অঞ্চলে ভাসমান নৌযানে যেসব মানুষের জীবন বিপন্ন তাদের সহায়তার জন্য সুদৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ইউএনএইচসিআর আশা করছে, আজকের সম্মেলনে যোগ দেয়া দেশগুলো মানবিক সংকট মোকাবিলায় যৌথ কর্মপন্থা নিয়ে একমত হবে। তারা এ সমস্যার মূল চিহ্নিত করতে পারবেন বলে আশা করা হয়। এ মাসের শুরুর দিকে থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে অভিবাসীদের গণকবর আবিষ্কার হওয়ার পর এ ইস্যুতে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। সাগরে আটকা পড়া বিপন্ন মানুষের কান্না পৌঁছে গেছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। তাই বিশ্ব সম্প্রদায় তাদের বাঁচানোর কর্মপন্থা নির্ধারণে আজ এ বৈঠকে বসেছে। থাইল্যান্ড এই সম্মেলন আহ্বান করেছে। এতে যোগ দেবেন ১৭টি দেশের সরকারি পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ, ইউএনএইচসিআর, আইওএম ও জাতিসংঘের ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম। ওদিকে, মালয়েশিয়াতে যে ১৩৯টি গণকবরের সন্ধান পাওয়া গেছে সেখানে পাচার করে নেয়া মানুষকে সমাহিত করা হয়েছে। মারা যাওয়া এসব অভিবাসীকে মুসলিমরীতি অনুযায়ী সাদা কাফনে সমাহিত করা হয়েছে। সীমান্তবর্তী ওয়াং কেলিয়াং শহরে উপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ান জুনাইদি তুয়ানকু জাফর বলেছেন, কবরগুলোর সাইজ দেখে আমাদের পরিষ্কার ধারণা জন্মেছে যে, এসব গণকবরের একটি কবরে একজন করে ব্যক্তির লাশ দাফন করা হয়েছে। তবে ওই গণকবরে কি ১৩৯টি লাশই দাফন করা হয়েছে? বার্তা সংস্থা এএফপির এমন প্রশ্নের জবাবে ওয়ান জুনাইদি বলেছেন, হ্যাঁ। তিনি বলেন, অভিবাসী নিয়ে এই সমস্যা শুধু মালয়েশিয়ার জন্য নয়। এটা একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। কারণ, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসছে এসব মানুষ। তাই এ সমস্যা এখন আসিয়ানের।
নিউজিল্যান্ড আশ্রয় দেবে: ওদিকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জন কি বলেছেন, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় তার দেশ কিছু সংখ্যক রোহিঙ্গাকে নিতে পারে। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের পরিকল্পনার  অধীনে প্রতি বছর তার দেশে ৭৫০ জন শরণার্থীকে নেয়ার কোটা আছে। তিনি বলেন, এ কর্মসূচির আওতায় আমরা কিছু শরণার্থীকে নিতে পারি।
মিয়ানমারই পারে সমস্যার সমাধান করতে: রোহিঙ্গা ইস্যুতে যে সমস্যার সৃষ্টি তা সমাধান করতে পারে মিয়ানমারই। সেলাঙ্গারে অবস্থিত নলেজ গার্ডেন লার্নিংয়ের প্রিন্সিপাল সৈয়দ মোহাম্মদ বলেন, আমরা যদি মিয়ানমারের সমস্যা সমাধান করতে পারি তাহলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। আমরা মানব পাচার বন্ধ করতে পারবো।
মিয়ানমারে বিক্ষোভ: মিয়ানমারের কয়েক শত নাগরিক রোহিঙ্গা বিরোধী বিক্ষোভ করেছে। এতে অংশ নেন বৌদ্ধ ভিক্ষুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিক। তারা এ সময় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। বলেন, আমাদের দেশের অবমাননা করবেন না। মিয়ানমারে কোন রোহিঙ্গা নেই। এটা জাতিসংঘের সৃষ্টি।

মোদি সরকারের এক বছর by শশী থারুর

এ মাসে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টির সরকারের এক বছর পূর্ণ হবে। তাদের সামগ্রিক কার্যক্রম মূল্যায়নের এটা উপযুক্ত সময় নয়। কিন্তু সারা ভারতেই সরকারের প্রথম বছর নিয়ে ব্যাপক হতাশা রয়েছে।
অগণিত প্রত্যাশার ভেলায় ভর করে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছিল, তার আগে ১০ বছর তারা মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে ইউপিএ সরকারের জমানায় বিরোধী দল ছিল (আমি নিজেও ইউপিএ সরকারের সদস্য ছিলাম)। বিজেপির এত বিপুল মানুষের সমর্থন ছিল যে তারা ৩০ বছরের মধ্যে প্রথম দল হিসেবে লোকসভায় (ভারতীয় সংসদের নিম্নসভা) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়।
বিজেপি সরকারের ব্যাপারে মানুষের উচ্ছ্বাসের কারণ ছিল আগের সরকারের সঙ্গে তার পার্থক্যের দিকগুলো, যদিও এই ব্যাপারটা ছিল অনুমিত, অর্থাৎ ধারণা। যাক, অবশেষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রাপ্ত একটি দল ক্ষমতায় এসেছে, যার নেতৃত্বে আছেন একজন ‘কাজের মানুষ’। ভঙ্গুর এক জোটের সরকারের চেয়ে তো ভালো, যে সরকারের নেতৃত্বে ছিলেন অশীতিপর স্বল্পভাষী মানুষ। যাঁকে আবার কখনো কখনো অন্যায্যভাবে ব্যঙ্গ করে বলা হতো, তিনি একজন দোদুল্যমান ও অনিশ্চিত মানুষ।
চাতুরীপূর্ণ প্রচারণার মধ্য দিয়ে মোদিকে ভোটারদের কাছে বাজারজাত করা হয়েছে। প্রচারণায় বলা হয়েছে, তিনি একজন ব্যবসাবান্ধব মানুষ, যিনি গুজরাটকে উন্নয়নের ধ্রুবতারায় পরিণত করেছেন। আর নির্বাচিত হলে সারা দেশকেই তিনি একইভাবে উন্নত করে ফেলবেন। তিনি তরুণদের ভোট আকৃষ্ট করেছেন চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে, বয়স্কদের ভোট টেনেছেন সংস্কার ও প্রবৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি দিয়ে। আর তিনি যেভাবে নির্বাচিত হন, তাতে দেশের জনমত যাচাইকারীরাও বোকা বনে যান। আর কংগ্রেসও ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করে।
নির্বাচনের পর মোদি বিশ্বদরবারে বুক ফুলিয়ে হেঁটেছেন, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগান দিয়ে তিনি বিনিয়োগকারীদের ভারতে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করেছেন। যদিও তাঁর বিদেশ সফর থেকে খুব সামান্যই লাভ হয়েছে। বড়জোর এতে তাঁর ভাবমূর্তি উন্নত হয়েছে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় ২০০২ সালে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় কয়েক হাজার মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনায় তিনি উদাসীন ছিলেন, এই অভিযোগে তাঁর ভাবমূর্তি ফুটো হয়ে গিয়েছিল।
ঘরের মধ্যে আবার মোদির পারফরম্যান্স তেমন একটা ছাপ ফেলতে পারেনি। যদিও তাঁর হিন্দি বক্তৃতার ভক্তরা তাঁর বাগ্মিতায় মুগ্ধ হয়েই চলেছে, বাগাড়ম্বর ও বাস্তবতার মধ্যকার ফাঁক দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।
আবার সহিষ্ণুতা ও সহনশীলতা নিয়ে অনেক কথা বললেও মোদির দলের মন্ত্রী ও সাংসদেরা যে ঘৃণা ছড়িয়ে চলেছেন, সে ব্যাপার তিনি নিশ্চুপ। এঁদের এসব বক্তৃতাবাজি ভারতের অহিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে একঘরে করে ফেলছে। বিজেপি ধর্ম প্রচারের মতো উন্নয়নের ফেরি করে বেড়াচ্ছে, কিন্তু আদতে দলটি অন্ধত্ব ছড়াচ্ছে। যে শক্তিগুলোর তাঁকে নির্বাচনে জিততে সহায়তা করেছে, তাদের ত্যাজ্য করে তিনি এ বৈপরীত্যের সমাধান করতে পারেন।
অন্যদিকে মোদি যে ‘ন্যূনতম সরকার, সর্বোচ্চ সুশাসনের’ কথা দিয়েছিলেন, সেটাও তিনি রাখতে পারেননি। বরং তিনি খুবই এককেন্দ্রিক, ওপর-নিচ, আমলাতন্ত্র পরিচালিত, ব্যক্তিপূজাভিত্তিক কেন্দ্রীয় সরকারব্যবস্থা চালু করেছেন, ১৯৭০-এর দশকের ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার পর এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি। যাঁরা মোদির গণতান্ত্রিক, আলোচনাশীল ও মতৈক্যপ্রত্যাশী পূর্বসূরিদের ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণে পক্ষাঘাতের’ সমালোচনা করেছিলেন, তাঁরা এখন নতুন পক্ষাঘাতের সম্মুখীন হয়েছেন। কারণ, মোদির কার্যালয়ে ফাইলের স্তূপ সৃষ্টি হচ্ছে, আর সিদ্ধান্তও শুধু সেই এক জায়গাতেই হয়।
সরকারের ঊর্ধ্বতন পদ খালি পড়ে আছে। এমনকি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের অপরিহার্য তিনটি পদের মধ্যেও দুটি পদ খালি। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকঠাক কাজ করতে পারছে না। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে অনেক কথা বললেও মোদি কেন্দ্রীয় তথ্য কমিশনার, ভিজিলেন্স কমিশনার ও লোকপাল (ন্যায়পাল, যিনি সাংসদ ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তাসহ সবার দুর্নীতির তদন্ত করতে পারেন) নিয়োগ করতে পারেননি।
মোদি এতই ব্যস্ত যে এসব ঘাঁটাঘাঁটি করার সময় তাঁর নেই। আর তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সরকারের পালে হাওয়া লাগাতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে সরকার খোলাখুলিভাবে বৈপরীত্যমূলক মনোভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে।
অর্থনৈতিক নীতির কথাই ভাবুন। যদিও মোদি ঘোষণা করেছেন, ‘ব্যবসা–বাণিজ্য সরকারের কাজ নয়’, এয়ারলাইন ও হোটেলে সরকারি মালিকানার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এর সদুত্তর দিতে পারেননি। যদিও রাষ্ট্রায়ত্ত মহিরুহ প্রতিষ্ঠানগুলোর বেসরকারীকরণের কথা এখন আর বলাই হয় না।
তদুপরি, একসময় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে শ্রমবাজারের উদারীকরণ অপরিহার্য মনে করা হতো, সে বিষয়টিও এখন আর আলোচনায় নেই। সংস্কার নিয়ে যে আশাবাদী কথাবার্তা হতো, তার জায়গায় এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ক্রমিক উন্নতির’ কথা বলা হচ্ছে।
একইভাবে অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি একসময় ‘কর সন্ত্রাস’ নিয়ে উপহাস করলেও কর সংগ্রাহকদের নতুন করদাতাদের ওপর লেলিয়ে দিয়েছেন। এমনকি এর মধ্যে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বাদ নেই, মোদি যাঁদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। ফলে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের বেলুন যে ফুটো হয়ে যাচ্ছে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। যদিও মোদির প্রচারণার সময় তা অনেকাংশে বেড়ে গিয়েছিল।
মোদির সরকার মহিরুহ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও তাতে অর্থায়ন করতে না পারার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আরও খারাপ ব্যাপার হচ্ছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, স্যানিটেশন, নারীর নিরাপত্তা—এসবই বাদ দেওয়া হয়েছে, যদিও মোদির নির্বাচনী প্রচারণায় এসব বলা হয়েছিল।
এগুলোর কোনো কিছুই মানুষের অজানা নয়। যেমন, ভারতের কৃষকেরা গর্জে উঠেছেন। কারণ, আগের সরকার যে ভূমি অধিগ্রহণ আইন পাস করেছিল, তা ফিয়াটের চাপানো নানা সংশোধনীর মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়েছে (যদিও এগুলো এখন আইনি প্রতিরোধের মুখে পড়তে যাচ্ছে)।
আরও সাধারণভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় মোদি যে চা-ওয়ালা হিসেবে নিজের পরিচিতি দিয়েছিলেন, সেখান থেকে তাঁর এই পরিবর্তন মানুষের মাঝে ছাপ ফেলেনি। মোদি জাতিকে সেবা করার ঘরোয়া আশীর্বাদ বিসর্জন দিয়ে জমকালো পোশাক পরে সেলিব্রিটির মতো অন্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সামাজিকতা করে বেড়াচ্ছেন। গত জানুয়ারিতে তিনি এর অধোবিন্দুতে পৌঁছে যান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে তিনি ‘আমার বন্ধু ওবামা’ বলে ডেকেছেন। সেদিন তিনি প্রিন্স স্ট্রাইপ স্যুট পরেছিলেন, এর প্রতিটি স্ট্রাইপে তাঁর নাম সোনা দিয়ে খচিত করা ছিল। এই প্রদর্শনীতে মানুষ যারপরনাই বিরক্ত হয়ে দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপিকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। অথচ গত বছর বিজেপি দিল্লিতে প্রায় জিতেই গিয়েছিল।
এক অর্থে এটা মোদির সৌভাগ্য যে সরকারের ব্যর্থতা তাঁর জামানার শুরুর দিকেই ধরা পড়েছে, ফলে তিনি সেগুলো শুধরে নিতে পারেন। তিনি সেই প্রিন্স স্ট্রাইপ স্যুট নিলামে বিক্রি করে দেখিয়েছেন, তিনি সঠিক শিক্ষা নিতে পারেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, তাঁর অন্য ভুলগুলো এত সহজে শোধরানো যাবে না।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন ; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শশী থারুর: ভারতের রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের সাংসদ ও লেখক।

সাংসদদের ‘জ্ঞানের’ আকাঙ্ক্ষা by এ কে এম জাকারিয়া

প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া মানেই কোনো বিষয়ে কিছু ‘জ্ঞান-বুদ্ধি’ অর্জন করা। পদ্মা সেতু একটি বড় ব্যাপার। এত বড় প্রকল্প এর আগে বাংলাদেশে হয়নি। এ জন্য নানা পর্যায়ে জ্ঞান-বুদ্ধি অর্জন জরুরি বৈকি। পদ্মা সেতু প্রকল্পের বাজেটে সে কারণেই একটি প্রশিক্ষণ খাত রয়েছে। ভাগ্যিস এমন একটি খাত ছিল, তা না হলে আমরা কী করে টের পেতাম যে বড় সেতু প্রকল্প বিষয়ে জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা আমাদের ছয় সাংসদের মধ্যে এতটা প্রবল!
জ্ঞানলাভের আকাঙ্ক্ষা ও তা অর্জন সব সময়ই মহৎ কাজ। আর এ জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশে যাওয়ার কথা তো ধর্মীয়ভাবেই বলা আছে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়–সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমাদের ছয় সাংসদ এরই মধ্যে চীন চলে গেছেন। চারজন আবার স্ত্রীকেও নিয়ে গেছেন। শুধু নিজের ‘জ্ঞান অর্জন’ নিয়ে তাঁরা নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট থাকতে চাননি! নিজের গাঁটের পয়সা খরচ (স্ত্রীদের খরচ নিজেদেরই বহন করতে হবে) করে তাঁরা স্ত্রীদের বিষয়টিও নিশ্চিত করেছেন। সাংসদেরা যখন যাবেন তখন তাঁদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বা তাঁদের দেখভালের জন্য সরকারের কর্মকর্তারাও যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। হয়েছেও তা-ই। ছয় সাংসদের চীন সফরের পুরো দলটি হচ্ছে ১৩ জনের। পদ্মা সেতুর ‘প্রশিক্ষণ খাত’ থেকে এ জন্য ‘আনুষ্ঠানিক’ খরচ ৪১ লাখ টাকা মাত্র। ‘অনানুষ্ঠানিক’ খরচ বলেও তবে নিশ্চয়ই কিছু আছে!
পদ্মা সেতুর কাজ পেয়েছে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। চীনে তৈরি করা নানা অবকাঠামো তাদের রয়েছে। সাংসদদের এ সফরের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এ ধরনের বিভিন্ন অবকাঠামো পরিদর্শন করা। সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, ‘সাংসদেরা সেখানে চীনের বিভিন্ন শহরে ঘুরছেন। থাকছেন দামি হোটেলে। যাতায়াতের জন্য গাড়ি ও গাইড সরবরাহ করা হয়েছে।...সরকারিভাবে যে ব্যয় ধরা হয়েছে, তা দিয়ে সফর সম্পন্ন করা যাবে না। বাড়তি ব্যয় প্রয়োজন হতে পারে এবং তা ঠিকাদারের কাছ থেকে নেওয়া হবে।’ (প্রথম আলো, ২৭ মে)। সফরটির ধরন সম্পর্কে প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকে আমরা একটি ধারণা পেলাম। বুঝলাম, ‘অনানুষ্ঠানিক’ খরচ বিষয়টি কী এবং কোথা থেকে তা আসবে।
এ যুগে কোনো কিছুই ফ্রি নয়, ‘জ্ঞান’ অর্জনও নয়। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক নানা পথে খরচ করেও যদি তা অর্জন করা যায়, তাতেই নাহয় সই। কিন্তু কৌতূহলী মনে নানা প্রশ্ন জাগে। বড় বড় সেতু দেখার এসব ‘অবকাঠামো পরিদর্শনকে’ আমাদের ‘প্রশিক্ষণ’ হিসেবে ধরে নিতে হবে? আর এসব দেখে তাঁরা যে ‘জ্ঞান অর্জন’ করবেন, তা পদ্মা সেতুর কী কাজে লাগবে? সেতু বানানো, এর কাঠামো—এগুলো সবই কারিগরি বিষয়। সিভিল কনস্ট্রাকশন বিষয়ে যাঁর ধারণা নেই, তিনি সেতু দেখে কী বুঝবেন? অথবা এই সাংসদেরা এর খরচ সম্পর্কেই বা কী ধারণা করবেন?
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথায় অবশ্য বোঝা গেছে যে এটা আসলে প্রশিক্ষণ নয়, ভ্রমণ। ‘সব মন্ত্রণালয়েই সংসদীয় কমিটির সদস্যদের ভ্রমণের রেওয়াজ আছে।’ আমরা বুঝলাম সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এই ‘রেওয়াজ’ তামিল করেছে পদ্মা সেতুর ‘প্রশিক্ষণ খাতের’ টাকায়। তবে তঁার মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্যদের এমন একটি ‘ভ্রমণ’-এর ব্যাপারে তিনি নাকি রাজিও ছিলেন না। সাংসদদের ‘পীড়াপীড়িতে’ তঁাকে রাজি হতে হয়েছে। যে সাংসদেরা মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রীকে জবাবদিহির মধ্যে রাখবেন, তাঁরা মন্ত্রীর কাছে ‘পীড়াপীড়ি’ করেন বিদেশ ভ্রমণের জন্য! সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী আর কীই বা করবেন, এঁদের হাতে না রাখলেও যে তাঁর বিপদ। এই মন্ত্রণালয় আর এর মন্ত্রীকে এখন সংসদীয় কমিটি আগলে রাখবে বলেই তো মনে হয়।
সাংসদদের এ সফরের বাড়তি কোনো খরচ ঠিকাদারের কাছ থেকে নেওয়া হবে না বলে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী দাবি করেছেন। কিন্তু দামি দামি হোটেলে থাকা, গাড়ি ও গাইড—এসব যে ‘আনুষ্ঠানিক’ খরচে সামলানো যাবে না, তা অনুমান করা যায়। বাড়তি খরচ তবে কোথা থেকে আসবে? এই ধোঁয়াশা যে কোনোভাবেই কাটছে না। জানতে ইচ্ছা হয়, চীনে চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির কাজ দেখতে গিয়ে তাদের আতিথ্য নেওয়া থেকে কি শতভাগ দূরে থাকতে পারবেন আমাদের সংসদীয় কমিটির সদস্যরা? অথবা অন্য কোনো সুযোগ–সুবিধা নেওয়া থেকে? ভরসা করা খুব কঠিন। ভবিষ্যতে পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজের দায়িত্ব পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটিকে কোনো কারণে যদি জবাবদিহির আওতায় আনতে হয়, তখন সংসদীয় কমিটি তা করার জোর নৈতিকভাবে কতটা পাবে?
পদ্মা সেতু বানাতে খরচের যে হিসাব করা হয়েছে, তা দফায় দফায় বেড়েছে। অনেক সময় যৌক্তিক কারণেই তা বাড়ে। তবে বাংলাদেশে কাজ করতে গিয়ে চীনা কোম্পানিগুলো মাঝপথে কাজ বন্ধ করে ব্যয় বাড়াতে চাপ দিয়েছে বা ব্যয় বাড়িয়ে নিয়েছে এমন নজির আছে। পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে এমন ঘটবে না তা কি হলফ করে বলা যায়? চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি ভবিষ্যতে কোনো কারণে পদ্মা সেতুর খরচ বাড়াতে চাইলে তখন অনেকের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে না তো!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

লাশ কাটা ঘরেও বেআব্রু নারী by শিপন হাবীব

পোস্টমর্টেম করে পুরুষ ডাক্তার ও সহকারীরা * স্বজনরা ভোগেন মর্মপীড়ায় * মহিলারা এগিয়ে আসছেন না এ দায়িত্ব পালনে
দেশে খুন, আত্মহত্যাসহ নানাভাবে প্রতিনিয়তই অপমৃত্যু ঘটছে বহু নারী ও মেয়ে শিশুর। নিয়ম অনুযায়ী তাদের মরদেহ পোস্টমর্টেমও করা হচ্ছে। কিন্তু লাশ কাটা ঘরে নারীদেহ কাটা-ছেঁড়ার স্পর্শকাতর এই কাজটা করে যাচ্ছেন পুরুষ ডাক্তার ও পুরুষ মর্গের সহকারীরা। ডাক্তার বা মর্গ সহকারী হিসেবে মহিলাদের এ দায়িত্বে আসতে দেখা যাচ্ছে না। দেশের ২৯টি মেডিকেল কলেজ ও ৬৪ জেলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে শুধু পুরুষ ডাক্তার ও পুরুষ মর্গ সহকারীরাই দিনের পর দিন নারী ও মেয়ে শিশুদের মৃতদেহের পোস্টমর্টেম করে যাচ্ছেন।
ভুক্তভোগী অনেক পরিবারেরই আক্ষেপ, পারিবারিক সহিংসতা বা দুর্ঘটনায় মৃত্যু ছাড়াও নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় অনেক নারী ও মেয়ে শিশু। মৃত্যুর পর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ময়নাতদন্তের টেবিলে। যেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সবটুকুই সম্পন্ন করেন পুরুষ ডাক্তার ও পুরুষ মর্গ সহকারীরা। সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রেই এটি অনৈতিক ও সম্মানহানিকর। ভয়ানক মর্মপীড়ায় আক্রান্ত এসব পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত মহিলা ডাক্তার ও মর্গ সহকারী নিয়োগ দেয়ার দাবি তোলা হলেও নানা কারণে তার বাস্তবায়ন ঘটছে না।
অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ হাতেগোনা কয়েকটি হাসপাতাল বাদ দিয়ে অধিকাংশ মেডিকেল কলেজ ও সরকারি হাসপাতালের মর্গ সহকারীরা মদ্যপ অবস্থায় নারী ও মেয়ে শিশুদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কাটা- ছেঁড়ার কাজটি করে থাকে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আমাদের সমাজে তো বটেই, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই মৃত মানুষের যথাযথ সম্মান ও অধিকার রক্ষার বিষয়ে বিশেষভাবে দৃষ্টি দেয়া হয়। তিনি বলেন, দেশে প্রায়ই নারী ও মেয়ে শিশুদের নানা নির্যাতন ও ধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। মেয়েদের নানা কৌশলে যৌন হয়রানি করা হচ্ছে। এসব সহ্য করতে না পেরে অনেক মেয়েই আত্মহত্যা করছে। তাদের পোস্টমর্টেমের নামে যে ধরনের কর্মকাণ্ড হয় তা কিছুতেই মেনে নেয়া যায় না। একজন জীবিত মানুষের যে ধরনের সম্মান, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবাধিকার রয়েছে তার চেয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত মানুষের সম্মান ও গোপনীয়তা আরও বেশি পাওয়ার অধিকার রয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব সরকার এ বিষয়ে মহিলা ডাক্তার ও মহিলা মর্গ সহকারী নিয়োগের ব্যবস্থা করবে, এমনটাই সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।
অ্যাডভোকেট সালমা আলী আরও বলেন, ধর্ষণের শিকার নারী ও মেয়ে শিশুদেরও এক সময় পুরুষ ডাক্তাররাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতেন। পরে সচেতন মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদ ও দাবির মুখে আদালতের নির্দেশে এখন মহিলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দিয়ে ‘রেপ ভিকটিম’ নারী ও মেয়ে শিশুদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হচ্ছে। এমনটা পোস্টমর্টেমের ক্ষেত্রেও হওয়া জরুরি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল মাহমুদ যুগান্তরকে জানান, মর্গ সহকারী পদের নিয়োগে নারী-পুরুষ বলে কিছু নেই। পুরুষ, মহিলা উভয়ই নিয়োগে অংশ গ্রহণ করতে পারেন। মহিলারা এ পেশায় আসতে চান না কেন- এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ৩০০ ফরেনসিক মেডিসিন ডাক্তার প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে আছেন মাত্র ২৫/৩০ জন। সারা দেশে শুধু একজন ফরেনসিক মেডিসিন প্রফেসর রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, নারী ও মেয়ে শিশুদের পোস্টমর্টেম পুরুষ ডাক্তার ও পুরুষ মর্গ সহকারীরাই করছেন। ঢাকা মেডিকেল ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ১ জন করে মোট দু’জন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ মহিলা ডাক্তার থাকলেও তারা শুধু রেপ ভিকটিমদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। পোস্টমর্টেম করছেন শুধুই পুরুষ ডাক্তার ও মর্গ সহকারীরা।
নারী ও মেয়ে শিশুদের পোস্টমর্টেম পুরুষরা করছেন, এমনটা সত্যিই ভালো দেখায় না জানিয়ে ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, বাধ্য হয়েই এমনটা করতে হচ্ছে। মহিলা ডাক্তার ও মর্গ সহকারী না থাকাই এ অবস্থার কারণ। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার থাকলেও জেলা হাসপাতালগুলোতে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। এ পেশায় মহিলা ডাক্তার কিংবা মহিলা মর্গ সহকারী আসছেন না কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ পেশায় পুরুষ ডাক্তাররাই যে থাকছেন এটাই ভাগ্যের বিষয়। একজন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে সপ্তাহে প্রায় ৩/৪ দিন কোর্টে গিয়ে সাক্ষ্য দিতে হয়। এর জন্য তাদেরকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রিপোর্ট কারও না কারও বিপক্ষে যেতেই পারে, আর তখনই হুমকি-ধমকি আসতে শুরু করে। তার ওপর রাজনৈতিক, সামাজিক চাপ তো রয়েছেই।
এদিকে ঢাকা মেডিকেল, মিটফোর্ড ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে সরেজমিন ঘুরে ও সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তার ও মর্গ সহকারীদের সব সময় ভয়ভীতি আর আতংকের মধ্যে থাকতে হয়। বিশেষ করে খুন-খারাপি, নির্যাতনের ঘনটনায় যেসব নারী ও মেয়ে শিশুর লাশ আসে তাদের পোস্টমর্টেম করতে গিয়ে যথাযথ রিপোর্ট প্রদান করার ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়। যথাযথ রিপোর্ট দিতে গিয়ে কোনো না কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে সেই রিপোর্ট চলে যায়। তখনই নানা হুমকি আসতে শুরু করে। এমন চাপের কারণেই মূলত এ বিভাগে মহিলা ডাক্তার ও মহিলা মর্গ সহকারী আসতে চাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন ডাক্তার জানান, সমাজে যে কোনো বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের বেশ কদর থাকলেও ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তারদের তেমন কদর নেই। তাদের ‘মরা ডাক্তার’ হিসেবে পরিবার তথা সমাজ মনে করে। তাদেরকে মরা মানুষের ডাক্তার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তাছাড়া অন্যসব ডাক্তারের মতো ফরেনসিক ডাক্তাররা প্রাইভেট চিকিৎসাও করতে পারেন না। এসব সমস্যার কারণে ফরেনসিক বিভাগে বিশেষ করে মহিলা ডাক্তাররা আসতে চান না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ফরেনসিক বিভাগে মহিলা ডাক্তারদের না আসাটা সম্পূর্ণ দায়িত্বহীন আচরণ। দেশে সার্জারির অনেক ডাক্তার রয়েছেন। জীবিত নারী ও মেয়ে শিশুদের সার্জারি করার চেয়ে মৃতদেহে পোস্টমর্টেম করা বরং অনেক সহজ। শুধু বাইরে চেম্বার বসিয়ে এক্সট্রা ইনকাম করতে পারবে না বলেই মহিলারা ফরেনসিক বিভাগে আসতে চান না। একই অবস্থা পুরুষদের বেলায়ও। ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যেই ফরেনসি বিভাগে মহিলা ডাক্তার ও মহিলা মর্গ সহকারী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। তাতে মৃত নারী ও মেয়ে শিশুর সম্মান এবং অধিকার রক্ষা হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বুধবার সন্ধ্যায় যুগান্তরকে জানান, বছরের পর বছর এ ধরনের ন্যক্কারজনক কাজ চলে আসছে। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে মহিলা ডাক্তার ও মহিলা মর্গ সহকারী না থাকাটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দফতরের উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতাও বটে। মহিলা ডাক্তার যারা হচ্ছেন তারা তো কাটা-ছেঁড়া দেখে দেখেই ডাক্তারের সার্টিফিকেট অর্জন করছেন। তাহলে মহিলারা কেন ফরেনসিক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে চাচ্ছেন না, সরকারই বা কেন এ নিয়ে উদাসীন? তিনি আরও বলেন, এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অধিক বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ফরেনসিক বিভাগে মহিলা ডাক্তার ও মহিলা মর্গ সহকারী নিয়োগ দেয়ার ব্যবস্থা করতে পারে সরকার।
এদিকে দেশের কোনো জেলা সরকারি হাসপাতালেরই ফরেনসিক বিভাগে মহিলা ডাক্তার, মহিলা মর্গ সহকারী না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) অধ্যাপক ডা. শামি-উল-ইসলাম যুগান্তরকে জানান, অনেকবার উদ্যোগ নেয়ার পরও ফরেনসিক বিভাগের এ কাজে মহিলা ডাক্তার ও মহিলা মর্গ সহকারী পদে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়নি। তবে তিনি জানান, এ বিভাগে মহিলাদের নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা চালানো হবে।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ সচিব মো. মঞ্জুরুল ইসলাম এ বিষয়ে বুধবার যুগান্তরকে জানান, নারী ও মেয়ে শিশুদের পোস্টমর্টেম মহিলা ডাক্তার ও মহিলা মর্গ সহকারী করবে- এটা অনেকেরই দাবি। ফরেনসিক বিভাগে মহিলা ডাক্তার ও মহিলা মর্গ সহকারী নিয়োগে কোনো রকম বাধা নেই জানিয়ে তিনি এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

বিলিয়ন ডলার বাজারে আমাদের ভাগ by এস এম আশ্রাফ আবির

একটা সময় ছিল খুব জিনিয়াস না হলে তথ্যপ্রযুক্তিকে পেশা হিসেবে নেবে, এমন মানুষ খুঁজেই পাওয়া যেত না আর বেশি মেধাবী মানেই বিদেশ চলে যাওয়া। কিন্তু আজকের ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ সমৃদ্ধ হচ্ছে প্রযুক্তিজ্ঞানে সমৃদ্ধ মানুষ দিয়ে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন অ্যাসোসিয়েশন বেসিসের নিবন্ধিত আইটি বা আইটিইএস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯০০-রও বেশি। প্রায় আড়াই লাখ ডেভেলপারের কর্মসংস্থান হয়েছে, এর বাইরে প্রায় ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। বাংলাদেশ খুব শিগগির সারা বিশ্বে প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব দেবে। ২০১৮ সালের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে এক বিলিয়ন ডলার আয় করা আমাদের লক্ষ্য। কিন্তু শুধু লক্ষ্য থাকলেই হবে না, তার জন্য প্রযুক্তি বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ প্রয়োজন।
তথ্যপ্রযুক্তির বিলিয়ন ডলারের বাজারে ঢোকার আগে আমাদের অনেক কাজ বাকি। এর মধ্যে প্রথম হলো দেশের অভ্যন্তরীণ তথ্যপ্রযুক্তির বাজার আরও বড় করা। কমপক্ষে কয়েক বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ বাজার তৈরি করা। এই বাজার কীভাবে হবে? দেশে সরকারি-বেসরকারি যত তথ্যপ্রযুক্তির ক্রয় হয়, নিশ্চিত করতে হবে তার অন্তত ৫০ শতাংশ বা তার বেশি আমাদের দেশি আইটি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারকারী এবং ইন্টারনেটকে জনপ্রিয় করতে হবে, ইন্টারনেটকে নিয়ে যেতে হবে প্রান্তিক মানুষের কাছাকাছি এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে। ইন্টারনেটের ওপর সম্পূর্ণ ভ্যাট তুলে নিয়ে ইন্টারনেটের দাম এখনই কিছুটা কমিয়ে ফেলা সম্ভব। প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য সরকারিভাবে ভর্তুকি দিয়ে হলেও আরও কম মূল্যে ইন্টারনেট সেবার প্রসার ঘটাতে হবে। এতে রাজস্ব আয় কিছুটা কমার আশঙ্কা থাকলেও সরকারকে মনে করতে হবে এই ভর্তুকি একধরনের বিনিয়োগ। এর রিটার্ন আমরা পাব অল্প কিছুদিনের মধ্যেই। দেশের সাড়ে ১২ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর মধ্যে অন্তত ১০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলে তার পরোক্ষ প্রভাব অর্থনীতিতে কত গুণ বেশি পড়বে, সেই হিসাব করে এই সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।
কম্পিউটার থেকে দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে মোবাইল ফোন। মোবাইল চালানোর জন্য আলাদা কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না। আর এ জন্যই মোবাইলের প্রসার আমাদের খুব দ্রুত হচ্ছে, এর পাশাপাশি স্থানীয় উপযোগী কনটেন্ট ও সেবা মোবাইল উপযোগী করে তুলতে পারলেই ১৬ কোটি মানুষের দেশে অভ্যন্তরীণ একটা বিশাল নতুন বাজার তৈরি হবে। এই সব দিক বিবেচনা করেই মোবাইল হ্যান্ডসেটের ওপর কর সম্ভব হলে রেহাই দিতে হবে। যত ব্যবহারকারী বাড়বে, প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা নিয়ে কাজ করার উৎসাহ পাবে আমাদের আইটি কোম্পানিগুলো, তারা নতুন ধরনের সেবা নিয়ে আসবে। যারা নতুন আইটিভিত্তিক বিভিন্ন উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রণোদনা দিতে হবে, শুধু ট্যাক্স মওকুফ করে দিলেই হবে না, সেই সঙ্গে তার জন্য আর্থিক উৎস তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারি পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে বিনিয়োগ করতে হবে।
নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করার জন্য প্রযুক্তি উদ্ভাবনী স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনই সহজ শর্তে হাইটেক পার্কে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক পণ্যের মূল্যায়ন করার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নির্দেশ দিতে হবে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কাজ করে বা তাদের অফিস আবাসিক এলাকায়। অথচ সরকারিভাবে বাণিজ্যিক এলাকা ছাড়া বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি নেই। তার মানে দেশের এই ৯০ শতাংশ আইটি কোম্পানিগুলো ভুয়া ঠিকানা দিতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, তাদের বাণিজ্যিক এলাকায় অফিস করার মতো সামর্থ্য নেই, আর এর জন্য ট্যাক্স বা ভ্যাট নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। অবাণিজ্যিক এলাকায় আইটি প্রতিষ্ঠান করা যাবে, সরকারি দিক থেকে তা নিশ্চিত করতে হবে। আইটি প্রতিষ্ঠানের বাড়িভাড়া বাবদ যে ৯ শতাংশ মূসক রয়েছে, তা পুরোপুরি তুলে দিতে হবে।
সারা দেশে কয়েক বছর ধরে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ছোট-বড় নানা বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক একটি ভবিষ্যৎ জাতি প্রস্তুতের জন্য কলেজ, ইউনিভার্সিটির বাইরে বিশেষায়িত হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। শুধু প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে ধীরে ধীরে সংযোগ ঘটাতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারের আগে স্থানীয় অনলাইন বাজার গড়ে তুলতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে এই প্রশিক্ষিত তরুণেরা স্থানীয় বাজারে কাজ করে দক্ষ হবে, তারপর নিজে থেকেই বিদেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। ইংরেজিতে কথা বলা ও লেখা যেহেতু একটা বড় সমস্যা, এর জন্য আমাদের গার্মেন্টসের বার্মিংহাম কনসেপ্টের মতো ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গড়ে উঠতে পারে, যাদের কাজ হবে বায়ার ও দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীর মধ্যে সংযোগ ঘটিয়ে দেওয়া। সহজ শর্তে কম্পিউটার-ল্যাপটপ এমনকি স্মার্টফোন দেওয়ার কথাও সরকারকে ভাবতে হবে। শুরু থেকেই বলতে হবে আপনার সন্তানকে তথ্যপ্রযুক্তিতে শিক্ষিত করে তুলুন।
বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি এখনো সার্ভিসপ্রধান। এ দেশের ছোট বা মাঝারি কোম্পানিগুলো এখন অন্যের জন্য সফটওয়্যার বা বিভিন্ন প্রযুক্তিভিত্তিক সেবা দিয়ে নিজেদের মেধা খরচ করছে। বিলিয়ন ডলার বাজারে ভাগ বসানোর প্রধান শর্ত হচ্ছে প্রোডাক্ট-নির্ভর কোম্পানি গড়ে তুলতে হবে শুরু থেকেই। হতে পারে আইডিয়াগুলো বাস্তবায়ন হবে দেশে, কিন্তু ভবিষ্যতে স্কেলআপ করা যাবে সারা বিশ্বে। ছোট, বড়, মাঝারি, মিনি, মাইক্রো, মেগা যেকোনো আইডিয়া মোবাইল অ্যাপ, ই-কমার্স সফটওয়্যার প্রোডাক্ট, বিনিয়োগের আশা না করেই শুরু করে দেওয়া উচিত। নিজের উদ্ভাবনী শক্তিতে বিশ্বাস থাকলে নিজের জমানো টাকা বা ঋণ নিয়ে, জায়গাজমি বিক্রি করে নেমে পড়তে হবে এবং লেগে থাকতে হবে। সামনে যাঁরা বিনিয়োগ করবেন, তাঁরাই খুঁজে নেবেন আপনাকে। প্রোডাক্ট উদ্ভাবন নিয়ে সরকারি–বেসরকারি সব জায়গায় এখন জোর দেওয়ার সময় হয়েছে। আওয়াজ তুলুন মেইড ইন বাংলাদেশ।
এস এম আশ্রাফ আবির: পরিচালক, বেসিস এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এমসিসি লি.।
abir@mcc.com.bd

স্বাধীনতার জন্য মুজিব নিজেকে ও জনগণকে প্রস্তুত করেন by প্রণব মুখার্জি

সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির বই ‘দি ড্রামেটিক ডিকেড দি ইন্দিরা গান্ধী ইয়ার্স প্রকাশ করেছে দিল্লির রুপা পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের একটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: দি মেকিং অব বাংলাদেশ’-এর অবিকল তরজমা...
(চতুর্থ কিস্তি)
১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির নির্বাচন ঘোষণা করা হলো। বাংলার তিন বিশিষ্ট নেতা সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক ও মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হলো যুক্তফ্রন্ট। আওয়ামী লীগ, ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টি  (কেপিপি), নিজাম -ই-ইসলাম এবং আরও অল্প কয়েকটি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হল।  যুক্তফ্রন্ট এই নির্বাচনে ব্যাপক সাফল্য লাভ করলো। ৩০৯ আসনের মধ্যে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পেলো কেবল ৯টি আসন। এবং পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমীনসহ মুসলিম লীগের  সকল বিশিষ্ট নেতা পরাজিত হলেন। মুসলিম লীগের এই ফলাফল ছিল ১৯৪৬ সালের নির্বাচনী ফলাফলের চরম বিপরীত। কারণ ওই নির্বাচনে মুসলিম লীগ সহজেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল যে ফজলুল হক সরকার গঠন করবেন, যা তিনি প্রথমে করেছিলেন চার সদস্য নিয়ে। পরে তিনি মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ ঘটিয়ে আওয়ামী লীগ ও অন্য কয়েকটি দলকে আন্তর্ভুক্ত করেন। আওয়ামী লীগ থেকে তার মন্ত্রিসভায় এলেন আতাউর রহমান খান, আবুল মনসুর আহমেদ, আবদুস সালাম খান, হাশিমউদ্দিন আহমেদ ও মুজিবুর রহমান।
মুজিবুর রহমান তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, নিজেদের চিন্তা ও অনুভূতি পরীক্ষা এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরিবর্তে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ তাদের সংশ্লিষ্ট এলাকা ত্যাগ করলেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মাটিতে তারা তৎপর হলেন। তাদের লক্ষ্য হলো, কি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটানো যায়।
পশ্চিম পাকিস্তানে উন্নয়ন কাজ পুরোদমে চলল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশ থেকে আসা ব্যাপকভিত্তিক সাহায্যের ভিত্তিতে সেখানে শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কৃষি উন্নয়নে প্রভূত উন্নতি সাধন ঘটল। এর বিপরীতে পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সামান্যই মনোযোগ দেয়া হল। তারা পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য কাঁচামাল সরবরাহকারী এবং পশ্চিম পাকিস্তানের উৎপাদিত পণ্যের বাজারে পরিণত হল। মার্কিন কূটনীতিক অর্চার কে. ব্লাড তার ক্রয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ বইয়ে লিখেছেন,
‘স্বাধীনতা থেকেই পাকিস্তানের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সামরিক বাহিনী, বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চ পর্যায় এবং গুটি কয়েক ধনাঢ্য শিল্পপতির হাতে চলে গেল। এই তিনটি গোষ্ঠীই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের। পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাভিত্তিক শ্রেষ্ঠত্ব অকার্যকর হল কারণ সংসদীয় গণতন্ত্র ভারতের মতো শেকড় গাড়তে ব্যর্থ হল। পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার কাঠামোর মধ্যে বিদেশী সহায়তা ও অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন তহবিলের উল্লেখযোগ্য অংশ পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে নিয়েছে।’ (অর্চার কে ব্লাড, দি ক্রয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ ( বাংলাদেশ, ২০১৩)
উন্নয়নের ঘাটতি, অগণতান্ত্রিক অনুশীলন এবং সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতির যথেষ্ট অপব্যবহারের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিদ্রোহ করে বসল। মুজিবুর রহমান এই বিপ্লবের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন। কেউ যদি তার (মুজিবের) এই সময়ের ঘটনাবহুল জীবন অধ্যায়ন করেন , তাহলে তিনি বুঝতে পারবেন যে, বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম হিসেবে রূপ দিতে তিনি নিজকে এবং তার জনগণকে কিভাবে পর্যায়ক্রমে প্রস্তুত করেছিলেন।
১৯৫৫ সালের ৫ই জুন তিনি পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন। এর কিছু দিন পরেই ১৭ই জুনে ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় একটি স্বায়ত্তশাসিত পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ২১ দফা ঘোষণা করা হল। ২৩শে জুন আওয়ামী লীগের নির্বাহী কাউন্সিল সিদ্ধান্ত নিলো যে, যদি স্বায়ত্তশাসনের দাবি বিবেচনা না করা হয় তাহলে আওয়ামী লীগের সকল সদস্য গণপরিষদ থেকে পদত্যাগ করবেন। ২৫ আগস্ট গণপরিষদে দেয়া এক বক্তৃতায় মুজিবুর রহমান বলেন:
‘স্যার, আপনি লক্ষ্য করবেন যে, তারা ‘পূর্ব বাংলার’ পরিবর্তে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটি প্রতিস্থাপন করেছে। অথচ আমরা বহুবার দাবি জানিয়েছি যে, পাকিস্তান শব্দের পরিবর্তে যাতে বেঙ্গল ব্যবহার করা হয়। বেঙ্গল শব্দের একটি ইতিহাস ও নিজস্ব ঐতিহ্য আছে। আপনি এটা জনগণের সঙ্গে আলোচনা করার পরে পরিবর্তন আনতে পারেন। আপনারা যদি এটা পরিবর্তন করতে চান, তাহলে আমাকে বাংলায় ফিরে যেতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে জেনে নেব যে, তারা এই পরিবর্তনকে গ্রহণ করবেন কিনা। এক ইউনিটের বিষয়ে বলতে পারি, এটা সংবিধানে আসতে পারে। আপনারা কেন এখন এই বিষয়টি তুলতে চাইছেন? রাষ্ট্র ভাষা বাংলার কি হবে? যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর কি হবে? স্বায়ত্তশাসনের কি হবে? পূর্ববঙ্গের মানুষ এসব বিষয়সহ এক ইউনিট বিবেচনায় নিতে প্রস্তুত থাকবে। সুতরাং  [বেঞ্চের] অপর পাশের বন্ধুদের প্রতি আমি আবেদন জানাই যে, গণভোট বা অন্য কোন উপায়ে যাতে জনগণকে রায় দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়।’
রাষ্ট্র ভাষা থেকে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চে স্বাধীনতার ঘোষণা পর্যন্ত এই ছিল বাংলার মানুষের মূল দাবি।
১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবরে গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা প্রধানমন্ত্রী মালিক স্যার ফিরোজ খান নুনের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারকে ভেঙে দিলেন। ঘোষিত হল সামরিক আইন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করা হল। এর অল্প পরেই জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মির্জাকে পদত্যাগে এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করলেন। ১৯৫৮ সালের ২৭শে অক্টোবর সমগ্র পাকিস্তানের উপর তিনি নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলেন। তার অধীনেই সামরিক শাসন ১৯৬২ সালের জুন পর্যন্ত চললো, যখন তিনি তার প্রবর্তিত ‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ মাধ্যমে একটি বেসামরিক শাসনের সূচনা করলেন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে মুজিবুর রহমানসহ বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে দূরে রাখলেন। (১৯৫৮ সালের ১১ই অক্টাবরে ফিরোজ খান নুন দ্বারা সামরিক আইন ঘোষণার চার দিনের মধ্যে মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হল এবং ১৯৬২ সালের ১৮ই জুন পর্যন্ত তাকে একাধিকবার কারাগার থেকে মুক্তি ও পুনর্বার গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটল)
‘মৌলিক গণতন্ত্রের’ নীতিসমূহের ভিত্তিতে জেনারেল আইয়ুব খান ফাতেমা জিন্নাহ  (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন) কে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে পকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন।
১৯৬৪ সালের ২৪শে জানুয়ারি আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত (সামরিক আইনের অধীনে দলটি নিষিদ্ধ ছিল)  হল এবং তারা অবিলম্বে সার্বজনীন প্রাপ্ত বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনতিবিলম্বে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা দাবি করলো। মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও মুজিবুর রহমান যথাক্রমে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। জাতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে মুজিবুর রহমানকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হল কিন্তু তিনি ছাড়া পেয়েই পুনরায় আন্দোলনে ব্রতী হলেন। ১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের এক জাতীয়  সম্মেলনে মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ঐতিহাসিক ছয় দফা উপস্থাপন করেন। ১৯৬৬ সালের ১লা  মার্চ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। এবং ছয় দফার পক্ষে জনমত গঠনে তিনি ব্যাপকভিত্তিক প্রচারণায় সামিল হন। ১৯৬৮ সালের ৩রা জানুয়ারি পাকিস্তানি সরকার কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা শুরু করলেন। ভারতীয় এজেন্টদের সঙ্গে আঁতাত করে পাকিস্তানকে ধ্বংস করার চেষ্টার দায়ে মুজিবুর রহমান ও ৩৪ জন বাঙালি বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তাকে অভিযুক্ত করা হল। অভিযোগ আনা হল যে, তাদের লক্ষ্য হল পাকিস্তানকে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে তারা পূর্ব পাকিস্তানকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হল। এবং এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে, তার মুক্তি এবং ওই মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ একটি প্রবল গণআন্দোলন গড়ে তোলে। এবং জনমতের চাপে ১৯৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের সরকার মামলা প্রত্যাহার এবং মুজিবুর রহমানসহ গ্রেপ্তারকৃতদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হলো।
২৩শে ফেব্রুয়ারি মুজিবুর রহমানকে রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষ দিলেন এক ব্যাপক গণসংবর্ধনা এবং তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হলো। ১০ই মার্চে তিনি রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান আয়োজিত সর্বদলীয় গোল টেবিল বৈঠকে অংশ নেন এবং সেখানে তিনি তার দাবি মেনে নিতে চাপ দেন।  তিনি ঘোষণা করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের দাবি অবিলম্বে মেনে নেয়া না হলে বিক্ষোভ ও জনরোষ প্রতিহত করা যাবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে তার দাবি-দাওয়া প্রত্যাখ্যানের মুখে তিনি ১৪ই মার্চে ঢাকায় ফিরে এলেন।
 গোল টেবিল সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পর আইয়ুব খান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন। ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ পাকিস্তান আবারও সামরিক শাসনে ফিরে গেল।
ইয়াহিয়া খান যদিও জনমতকে দমন করতে সচেষ্ট হলেন, কিন্তু তার সামনে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবন ও নির্বাচন দেয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প ছিল না। এ রকম একটি দৃশ্যপটে রাজনৈতিকভাবে গোলযোগপূর্ণ পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বরে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
(সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির বই ‘দি ড্রামেটিক ডিকেড দি ইন্দিরা গান্ধী ইয়ার্স প্রকাশ করেছে দিল্লির রুপা পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের একটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: দি মেকিং অব বাংলাদেশ’ এর অবিকল তরজমা)

বাংলাদেশের সূচনায় ছিল মুসলিম লীগের অন্তর্দ্বন্দ্ব by প্রণব মুখার্জি

সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির বই ‘দি ড্রামেটিক ডিকেড দি ইন্দিরা গান্ধী ইয়ার্স প্রকাশ করেছে দিল্লির রুপা পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের একটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: দি মেকিং অব বাংলাদেশ’-এর অবিকল তরজমা...
(তৃতীয় কিস্তি)
বাস্তবতাও আসলে অবিভক্ত বাংলার প্রবক্তাদের কাজ দুরূহ করে দিয়েছিল। কলকাতা ও নোয়াখালীর দাঙ্গার পরে হিন্দুরা একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশে বাস করার ব্যাপারে চিন্তিত ও দ্বিধান্বিত হলো, আর অবিভক্ত বাংলার ক্ষেত্রেও তাদের ভাবনা দাঁড়ালো তাই। নিখিল ভারত হিন্দু মহাসভার সভাপতি ও বাংলার একজন বিশিষ্ট নেতা ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি একটি বিভক্ত বাংলার শক্তিশালী সমর্থক ছিলেন এবং তিনি জনমতকে বহুলাংশে তাঁর মতের অনুকূলে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই মুহূর্তে তিনি বাঙালি হিন্দুদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এই প্রেক্ষাপটে গভর্নর জেনারেল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ঐকমত্য ছাড়া কোন নতুন স্কিম বিবেচনা করতে অস্বীকৃতি জানান।
এদিকে সোহরাওয়ার্দীর জনপ্রিয়তা দ্রুত হ্রাস পেল। কারণ তখন একটি অবিভক্ত বাংলার প্রতি তার সমর্থন ও শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষকতার কারণে প্রায় নিয়মিতভাবে বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতে থাকলো। আর অজুহাত খাড়া করা হলো যে, তিনি এমন একটি এলাকা থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, সেটা এখন পশ্চিমবঙ্গে পড়েছে। আর তাই পূর্ববঙ্গ অ্যাসেম্বলিতে ঢাকার নওয়াব খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে তিনি মুসলিম লীগ নেতার আসন হারিয়েছেন, খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা দিয়েছেন যে ঢাকা হবে পূর্ববঙ্গের রাজধানী। মুজিবুর রহমান তাঁর স্মৃতিকথায় দাবি করেছেন যে, এটা করার ফলে খাজা নাজিমুদ্দিন কলকাতাকে পাকিস্তানের রাজধানী ঘোষণার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেন। তাঁর মতে কলকাতা যদি পূর্ববঙ্গের অংশে পরিণত হতো, তাহলে এটা অবশ্যই পাকিস্তানের রাজধানী হতো। তিনি আরও দাবি করেছেন যে, বাংলার মুসলিম জনগণের মধ্যে সোহরাওয়ার্দীর সার্বিক জনপ্রিয়তা হয়তো তাঁকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আসনে নিয়ে গেছে।  
বাংলাদেশের প্রারম্ভিক-বিন্দু মুসলিম লীগের মধ্যেকার অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং এইচ. এস. সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক ও আবুল হাশিমের মতো অনেক বিশিষ্ট নেতাকে কোণঠাসা করার বিরোধের মধ্যে নিহিত থেকেছে। দেশভাগের পরে পূর্ববাংলায় মুসলিম লীগ প্রধানত জমিদার ও ভূস্বামী অভিজাতদের কর্তৃত্বে থেকেছে। মুজিবুর রহমান তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের অন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া পূর্ব বাংলায় নেতৃত্ব নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দীর পরাজিত হওয়ার অন্যতম কারণ। কারণ লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির একটি বড় অংশ জমিদার ছিলেন। এমনকি মুজিবুর রহমান যখন সিলেটের নবনির্বাচিত সদস্যদের ওপর সোহরাওয়ার্দীর সমর্থনে প্রভাব বিস্তার করতে চাইলেন, তখন তিনি ব্যর্থ হলেন। বলা হয়ে থাকে যে, তারা (জমিদার-রাজনীতিক) যখন নেতৃত্ব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেন, তখন তারা সোহরাওয়ার্দীর কাছে মন্ত্রিসভায় তিনটি পদ এবং সেই সঙ্গে জমিদারি প্রথা বিলোপ না করার ব্যাপারে তাঁর কাছে প্রতিশ্রুতি দাবি করলেন।  সোহরাওয়ার্দী কোন অঙ্গীকার করতে অস্বীকৃতি জানালেন এবং তারা তাঁর বিরুদ্ধে ভোট দিলেন।
জাতীয় রাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটলো। এরফলে পূর্ববাংলার রাজনীতিকরা আরও বেশি প্রান্তিক অবস্থায় পৌঁছে গেলেন। ১৯৪৯ সালে জিন্নাহ মারা গেলেন এবং ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী খানের হত্যাকাণ্ডের পরে খাজা নাজিম উদ্দিন প্রথমে পাকিস্তানের  গভর্নর জেনারেল ও পরে প্রধানমন্ত্রী হলেন। নাজিম উদ্দিন প্রধানমন্ত্রী (যদিও কয়েক বছর পরে তাঁর জায়গায় বগুড়ার মোহাম্মদ আলী এসেছিলেন) হওয়ার কারণে গোলাম মোহাম্মদ, যিনি একজন পাবলিক সার্ভেন্ট, তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন। গোলাম মোহাম্মদের নিয়োগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি রাজনীতিতে আমলাতন্ত্রের অভিষেক ঘটেছিল। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানের প্রকৃত শাসক ছিলেন সিভিল সার্ভেন্ট, সামরিক বাহিনী এবং ভূস্বামী অভিজাতরা। তাদের সঙ্গে শিল্পপতিদের একটি গোষ্ঠী ছিল, তারা সবাই মিলে বিরাট একটা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। আর মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ নাজিমুদ্দিন ও মোহাম্মদ আলী বগুড়ার মতো কতিপয় পূর্ব পাকিস্তানি নেতাদেরকে সামনের সারিতে রেখেছিলেন। এর লক্ষ্য ছিল তাদেরকে শোকেস হিসেবে ব্যবহার করা। যাতে এটা দেখানো যায়, পূর্ব পাকিস্তানি নেতৃবৃন্দ সামগ্রিক পাকিস্তানি এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে অংশগ্রহণকারী হিসেবে রয়েছেন। কিন্তু তাঁরা প্রকৃত শাসকদের পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন।
পূর্ববঙ্গে সরকার গঠনের পরে পূর্ববঙ্গের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসী হয়ে যান। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গের থেকে গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ পূর্ববঙ্গে চলে যান। আর সরকারের মতো মুসলিম লীগের নেতৃত্বেও একই ঘটনা ঘটলো। মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী,  ১৯৩০-এর দশকে যাদের উত্থান ঘটেছিল, তারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত হলেন। আর এর ফল হিসেবে ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে মুসলিম লীগ তার চড়া মূল্য দিলো।
ইতিমধ্যে রাষ্ট্রভাষা অন্দোলন বেগবান হলো। জিন্নাহসহ মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ একরোখা হলেন যে, উর্দুকেই তারা পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করবেন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানের গণপরিষদে বিষয়টি আলোচিত হয়। গণপরিষদ কংগ্রেস দলীয় অন্যতম সংসদ সদস্য বাবু ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত দাবি তুললেন যে, বাংলাকে অনুত্যম জাতীয় ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তিনি যুক্তি দিলেন যে, বাংলা হলো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ভাষা। তাঁর এই দাবি মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ দ্বারা বিপুলভাবে সমালোচিত হলো। এবং প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য ভারতীয় চর হিসেবে কাজ করার জন্য দত্তকে অভিযুক্ত করলেন। কিন্তু এই সমালোচনা সত্ত্বেও বাংলায় এর প্রতিক্রিয়া হলো দ্ব্যর্থহীন। পূর্ববঙ্গ মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ এবং তমুদ্দিন মজলিশ (একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন) উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার প্রতিবাদে সোচ্চার হলো এবং তারা দত্তের দাবি পুনর্ব্যক্ত করলো। কামারুদ্দিন আহমেদ, শামসুল হকের মতো  জ্যেষ্ঠ মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ এবং মুজিবুর রহমান তাঁরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করলেন এবং ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চে বাংলাভাষা দিবস পালন করলেন।
একটি পুলিশ ও প্রশাসনিক ক্রাকডাউনের বিরুদ্ধে  ব্যাপকভিত্তিক ছাত্র সমর্থন এবং সমাবেশ গড়ে উঠলো। প্রতিবাদকারী ছাত্রনেতা কর্মীদের নির্দয়ভাবে প্রহার করা হলো। অনেকে গ্রেপ্তার হলেন। তখন পূর্ববঙ্গের অ্যাসেম্বলি অধিবেশনরত ছিল, সেখানে ফজলুল হক, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, তফাজ্জল আলী, খয়রাত হোসেন এবং অনোয়ারা খাতুন সহ অনেকেই মুসলিম লীগ ও সরকারের কঠোর নিন্দা করলেন। সরকারি নিপীড়নের ফলে ঘটনার ওপর ব্যাপকভিত্তিক জনসমর্থনের ভিত্তি গড়ে উঠলো এবং সরকার প্রতিবাদরত ছাত্রদের সঙ্গে একটি সংলাপে বসতে রাজি হলো। কিন্তু এর অল্প পরেই পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহকে ঢাকায় স্বাগত জানাতে আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত করা হলো।
২৪শে মার্চ জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় ভাষণ দিলেন এবং সেখানে তিনি ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা’ পুনর্ব্যক্ত করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে একই কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। আর উভয় ক্ষেত্রে ছাত্ররা উচ্চস্বরে ও পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিলো- ‘না, আমরা তা মানি না।’
জিন্নাহর ঢাকা ঘোষণা কেবল প্রতিবাদকেই শক্তিশালী করেছিল। এবং ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটি দাঙ্গার মতো মারাত্মক ঘটনায় মোড় নিলো। বিপুল সংখ্যক ছাত্রকে প্রহার বা কারাগারে প্রেরণ করা হলো, এমনকি অনেককে হত্যা করা হলো। ভাষা আন্দোলনের প্রভাব এবং মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দ্বারা সেই আন্দোলন অদক্ষভাবে মোকাবিলা করায় সক্রিয় বাঙালি উপ- জাতীয়তাবাদের জাগরণ ঘটলো।
ভাষা আন্দোলন যখন পর্যায়ক্রমে  বেগবান হলো, তখন মুসলিম লীগের মধ্যে গণ্ডগোল ছড়িয়ে পড়লো। ১৯৪৭ সালে নাজিমউদ্দিন তার মন্ত্রিসভায় সোহরাওয়ার্দীর কোন লোককেই ঠাঁই দেননি। এবং এর ফলে সোহরাওয়ার্দীর সমর্থকরা ঐক্যবদ্ধ হলেন এবং মোহাম্মদ আলী বগুড়া, ড. আবদুল মালেক, তোফাজ্জল আলী এবং মুসলিম লীগের একটি বড় অংশ মিলে গঠন করলো একটি প্রেশার  গ্রুপ। এবং যখন ওই অসন্তোষ দানা বাঁধতে শুরু করলো, তখন মাওলানা আকরাম খান কতিপয় পুরনো মুসলিম লীগ কাউন্সিল সদস্যদের দল থেকে বহিষ্কার করলেন। এভাবে যারা একতরফা বহিষ্কারের শিকার  হলেন তারা নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতির কাছে নালিশ দিলেন এবং সভাপতি হিসেবে চৌধুরী খলিকুজ্জমান পরিষ্কার ভাষায় তাদের জানিয়ে দিলেন যে, তাদেরকে অবশ্যই খাজা নাজিম উদ্দিনের অধীনে কাজ করতে হবে এবং আকরাম খানই সিদ্ধান্ত নেবেন, কে দলে থাকবে বা কাদের থাকা উচিত।
এইসব ঘটনার প্রেক্ষাপটেই গঠিত হয়েছিল নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৪৯ সালে মূলত সোহরাওয়ার্দীর অনুসারীরাই এই দল গঠনের নিয়ামক শক্তি ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট মুসলিম লীগ নেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী হলেন প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট এবং ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনিই এই দায়িত্বে ছিলেন, এরপর তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করলেন। মুজিবুর রহমান গোড়া থেকেই এই দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এবং দলটি প্রতিষ্ঠায় কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন এবং পূর্ব বাংলায় দলটির প্রভাব তিনি ছড়িয়ে দিলেন। মুসলিম লীগ থেকে বিশিষ্ট এবং জনপ্রিয় নেতাদের দলে দলে বেরিয়ে আসার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ল। পরের বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী হিসেবে বেড়ে উঠতে লাগল এবং মুজিবুর রহমান সময়ের ধারায় এই সংগঠনের মুকুটহীন নেতা হিসেবে আবির্ভূত হলেন।
(সম্প্রতি ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবে পরিচিত কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা প্রণব মুখার্জির বই ‘দি ড্রামেটিক ডিকেড দি ইন্দিরা গান্ধী ইয়ার্স প্রকাশ করেছে দিল্লির রুপা পাবলিকেশন্স। এ বইয়ের একটি অধ্যায় ‘মুক্তিযুদ্ধ: দি মেকিং অব বাংলাদেশ’-এর অবিকল তরজমা)