Showing posts with label চীন. Show all posts
Showing posts with label চীন. Show all posts

Friday, October 23, 2026

থেমেছে কি ভাগ্যবিড়ম্বিত উইঘুরদের কান্না, বদলেছে কি জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক যোগাযোগ, প্রাচীন সিল্ক রোডের বাণিজ্যপথ এবং তুর্কি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর বসবাসের কারণে অঞ্চলটির রয়েছে স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়। এখানকার প্রধান জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উইঘুর, কাজাখ, কিরগিজ ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তাদের অনেকেই মুসলমান। বিশেষ করে উইঘুররা প্রধানত সুন্নি মুসলিম এবং তাদের ভাষা, সাহিত্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও জীবনযাপন চীনের সংখ্যাগরিষ্ঠ হান জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি থেকে স্বতন্ত্র।

কিন্তু গত এক দশকে জিনজিয়াং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ব্যাপক আটক, দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, নজরদারি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ, জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ এবং পরিবার বিচ্ছিন্নতার মতো বিষয় নিয়ে চীনা সরকারের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। চীনা সরকার এসব অভিযোগের বড় অংশ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ দমন, সামাজিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য এসব নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

তাহলে জিনজিয়াংয়ের মুসলমানরা এখন কেমন আছেন? পরিস্থিতি কি আগের চেয়ে স্বাভাবিক হয়েছে, নাকি বন্দিশিবিরের বিতর্কের বাইরে অন্য ধরনের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে চীনা সরকারের বক্তব্য, জাতিসংঘের মূল্যায়ন, স্বাধীন গবেষণা, মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদন এবং জনসংখ্যার সরকারি পরিসংখ্যান পাশাপাশি বিচার করতে হবে।

নিরাপত্তানীতির পটভূমি: কীভাবে সংকটের বিস্তার?

জিনজিয়াংয়ে সহিংসতা, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযান চীনা সরকারের নিরাপত্তানীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০১৪ সালে চীন ‘সহিংস সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান’ শুরু করে। পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে ২০১৬ সালের পর অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা ও নজরদারিব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার হয়। ২০১৭ সাল থেকে উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিমদের বিপুলসংখ্যক মানুষকে তথাকথিত ‘রাজনৈতিক শিক্ষা’ বা ‘বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রে’ আটক রাখার খবর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

চীনা সরকারের বক্তব্য, এসব কেন্দ্রের উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় উগ্রবাদ প্রতিরোধ, ভাষা ও পেশাগত দক্ষতা শেখানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। সরকার দাবি করে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা চরমপন্থা থেকে দূরে সরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। বেইজিং আরও বলেছে, জিনজিয়াংয়ে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন বেড়েছে।

কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, এসব কেন্দ্রের অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ ছাড়াই আটক রাখা হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বচ্ছ বিবরণ, বিচারপ্রক্রিয়া, আইনজীবীর সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। অর্থাৎ বিতর্কটি শুধু সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়; বরং নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্র কতটা ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে এবং সেই ক্ষমতার ওপর কার্যকর আইনি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কি না, তা নিয়েও।

২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিমদের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থা এখনো গুরুতর উদ্বেগের কারণ। সংস্থাটি নির্বিচার আটক, অন্যায্য কারাদণ্ড, ব্যাপক নজরদারি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে বসবাসকারী উইঘুরদের ওপর চাপের কথা উল্লেখ করেছে। এসব সংস্থার মূল্যায়নকে চূড়ান্ত আদালতের রায় হিসেবে নয়, বরং নথি, সাক্ষ্য ও উপলব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে করা মানবাধিকার মূল্যায়ন হিসেবে দেখা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের মূল্যায়ন: মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা

জিনজিয়াং নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিলগুলোর একটি হলো জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ২০২২ সালের প্রতিবেদন। ৩১ আগস্ট প্রকাশিত এই মূল্যায়নে বলা হয়, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনের নামে চীনা সরকারের নীতি ও ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছে। প্রতিবেদনের উপসংহারে উল্লেখ করা হয়, এসব লঙ্ঘনের কিছু আন্তর্জাতিক অপরাধ—বিশেষ করে মানবতাবিরোধী অপরাধ—হিসেবে গণ্য হতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে নির্বিচার ও বৈষম্যমূলক আটক, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ, যৌন ও প্রজনন অধিকার, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, চলাচলের স্বাধীনতা এবং পরিবার বিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হয়। জাতিসংঘের দপ্তর চীনা সরকারের আইন, নীতিমালা, প্রকাশিত তথ্য ও বক্তব্যও বিবেচনায় নিয়েছিল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়; এটি মানবাধিকার পরিস্থিতির একটি অনুসন্ধানমূলক মূল্যায়ন। ফলে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের আশঙ্কা’ এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। কিন্তু জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়নে এ ধরনের গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশিত হওয়া আন্তর্জাতিক জবাবদিহির প্রশ্নকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

চীনা সরকার জাতিসংঘের মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করেছে। বেইজিংয়ের বক্তব্য, প্রতিবেদনটি ভুল তথ্যের ওপর নির্ভরশীল এবং সন্ত্রাসবাদবিরোধী বৈধ পদক্ষেপকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের দপ্তর ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বলছে, নিরাপত্তার প্রয়োজন থাকলেও তা মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অজুহাত হতে পারে না।

বন্দিশিবিরের পর: কারাগার ও আটকব্যবস্থার বর্তমান চিত্র

জিনজিয়াং নিয়ে বহুল আলোচিত প্রশ্ন হলো, তথাকথিত প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলো বন্ধ হওয়ার পর আটক মানুষদের কী হয়েছে। চীনা সরকার জানিয়েছে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন হয়েছে এবং অংশগ্রহণকারীরা কর্মসংস্থান ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন। কিন্তু মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বক্তব্য, কিছু কেন্দ্র বন্ধ হয়ে থাকলেও বহু উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিম দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপলব্ধ সরকারি পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে কয়েক লাখ উইঘুর ও অন্যান্য তুর্কি মুসলিম এখনো কারাগারে থাকতে পারেন। সংস্থাটি ইলহাম তোহতি, রাহিলে দাওত, গুলশান আব্বাস, ইয়ালকুন রোজি ও একপার আসাতের মতো পরিচিত ব্যক্তিদের কারাবন্দিত্বের বিষয়ও উল্লেখ করেছে। তবে বর্তমান সময়ে আটক থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তালিকা প্রকাশ্যে নেই। ফলে সুনির্দিষ্ট মোট সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন।

বন্দিশিবির ও কারাগারকে এক করে দেখাও ঠিক নয়। কোনো ব্যক্তি প্রশাসনিকভাবে আটক ছিলেন, কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে, আবার কেউ দীর্ঘমেয়াদি সাজা পেয়েছেন—এসব আলাদা পরিস্থিতি। একইভাবে অতীতে আটক মানুষের সংখ্যা থেকে বর্তমান বন্দির সংখ্যা সরাসরি নির্ধারণ করা যায় না।

তবে বর্তমান চিত্রের একটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের স্বচ্ছতার অভাব। আটক ব্যক্তিদের নাম, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিচারসংক্রান্ত নথি, আইনজীবীর সহায়তা এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য তথ্য না থাকলে পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন কঠিন হয়। মানবাধিকারের প্রশ্নে তাই শুধু কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; মানুষ সত্যিকার অর্থে মুক্তি পেয়েছেন কি না, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা কীভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং মুক্তির পর তাঁরা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারছেন কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ধর্মীয় স্বাধীনতা: মসজিদ আছে, কিন্তু স্বাধীনতা কতটা?

উইঘুর মুসলমানদের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় ধর্মীয় স্বাধীনতা একটি কেন্দ্রীয় বিষয়। মসজিদে নামাজ, ধর্মীয় শিক্ষা, রোজা, ইসলামি পোশাক, দাড়ি, ধর্মীয় বই এবং ধর্মীয় নেতাদের কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিধিনিষেধের অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলেছে, ‘ধর্মীয় উগ্রবাদ’ দমনের বিস্তৃত সংজ্ঞার কারণে কিছু বৈধ ধর্মীয় আচরণও সন্দেহের আওতায় পড়েছে।

চীনা সরকার অবশ্য বলছে, দেশটির সংবিধান ধর্মবিশ্বাসের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে এবং জিনজিয়াংয়ে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আইন অনুযায়ী ধর্ম পালন করতে পারেন। ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চীনা সরকারের একটি শ্বেতপত্রে বলা হয়, অঞ্চলটিতে ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষিত হচ্ছে এবং ধর্মীয় বিষয়গুলো আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকার ধর্মীয় কার্যক্রমকে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখার কথা বলেছে।

কিন্তু ধর্মীয় স্বাধীনতা শুধু মসজিদের অস্তিত্ব দিয়ে বিচার করা যায় না। মানুষ বাধাহীনভাবে নামাজ পড়তে পারছেন কি না, রমজানে রোজা রাখতে পারছেন কি না, ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ ও প্রদান করতে পারছেন কি না, নিজের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশের কারণে হয়রানির আশঙ্কা রয়েছে কি না এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ২০২৫ সালের জুলাইয়ের দেশভিত্তিক মূল্যায়ন, যা ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা হয়েছে, বলেছে যে জিনজিয়াংয়ের মুসলমানেরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নিপীড়ন বা গুরুতর ক্ষতির বাস্তব ঝুঁকিতে থাকতে পারেন। ওই মূল্যায়নে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, নজরদারি, আটক, সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনার পরিবর্তনসংক্রান্ত বিভিন্ন সূত্রের তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। এটি যুক্তরাজ্যের আশ্রয়-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ব্যবহৃত একটি দেশভিত্তিক মূল্যায়ন; চীনের প্রতিটি নাগরিকের অভিজ্ঞতার পূর্ণাঙ্গ জরিপ নয়।

মসজিদ ভাঙা বা বন্ধ করার সব ঘটনাকে একই কারণের ফল হিসেবে দেখাও যথার্থ নয়। কোনো স্থাপনা নগর উন্নয়ন, পুনর্নির্মাণ বা অন্য কারণে পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস, ধর্মীয় কার্যক্রম সীমিত করা কিংবা উপাসনালয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ থাকলে প্রতিটি ঘটনা ও নীতির স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।

ভাষা, শিক্ষা ও পরিচয়ের ভবিষ্যৎ

উইঘুর ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এর সঙ্গে তাদের সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্মীয় জ্ঞান, পারিবারিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক স্মৃতি যুক্ত। তাই শিক্ষাব্যবস্থায় মাতৃভাষার অবস্থান জিনজিয়াংয়ের মানবাধিকার আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, জিনজিয়াংয়ে রাষ্ট্রীয় আবাসিক বিদ্যালয়ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ফলে উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু মুসলিম শিশুদের পরিবার ও সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের কাছে আসা তথ্য অনুযায়ী, এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষাদানের প্রধান ভাষা ম্যান্ডারিন; উইঘুর ভাষার ব্যবহার সীমিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, এভাবে শিশুদের মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হতে পারে।

চীনা সরকারের বক্তব্য, ম্যান্ডারিন ভাষায় দক্ষতা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং বৃহত্তর চীনা সমাজে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ায়। ভাষা শেখার সুযোগ তৈরি করা নিজে কোনো অধিকার লঙ্ঘন নয়। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় মাতৃভাষার শিক্ষা, পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিচয় দুর্বল হয়ে পড়লে প্রশ্ন দেখা দেয়—শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের নিজস্ব পরিচয় রক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যকে প্রতিটি বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ জরিপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে শিশুদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ কমে যাওয়া এবং একক সাংস্কৃতিক কাঠামোর দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, যাতে স্বাধীন তদন্ত ও স্বচ্ছ তথ্যপ্রাপ্তি প্রয়োজন।

নজরদারি প্রযুক্তি: ব্যক্তিগত জীবন কতটা স্বাধীন?

জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি শুধু বন্দিশিবির বা কারাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের দৈনন্দিন চলাচল, ফোন ব্যবহার, যোগাযোগ, সামাজিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের ওপর নজরদারিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদন ও গবেষণায় ব্যাপক সিসিটিভি ক্যামেরা, মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, মোবাইল ফোন পরীক্ষা এবং ডিজিটাল তথ্য সংগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ব্যবস্থা উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর বিশেষভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের দেশভিত্তিক মূল্যায়নেও জিনজিয়াংয়ে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, চলাচলের বিধিনিষেধ এবং পরিবারের ভেতর পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ পৌঁছানোর অভিযোগ পর্যালোচনা করা হয়েছে।

রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যদি নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়, কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন ও চলাচলের স্বাধীনতাকে অযৌক্তিকভাবে সীমিত করে, তাহলে তা মানবাধিকারের প্রশ্ন তৈরি করে।

এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন: কী ধরনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, কত দিন তা সংরক্ষণ করা হচ্ছে, কারা ব্যবহার করছে, ভুল শনাক্তকরণের বিরুদ্ধে প্রতিকার আছে কি না এবং নাগরিকেরা স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানাতে পারেন কি না। প্রযুক্তির ব্যবহারকে শুধু আধুনিকায়নের মাপকাঠিতে বিচার করলে এর সম্ভাব্য মানবিক ক্ষতি আড়ালে থেকে যেতে পারে।

জনসংখ্যার পরিসংখ্যান: পরিবর্তন কী বোঝায়?

চীনের ২০২০ সালের জাতীয় জনশুমারি অনুযায়ী, জিনজিয়াংয়ের মোট জনসংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৮ লাখ ৫২ হাজার ৩৪৫। এর মধ্যে উইঘুর জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ২৪ হাজার ২৫৭, যা মোট জনসংখ্যার ৪৪.৯৬ শতাংশ। হান জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ২০ হাজার ৯৮, অর্থাৎ ৪২.২৪ শতাংশ। অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী মিলিয়ে ছিল ১২.৮০ শতাংশ। একই সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে উইঘুর জনসংখ্যা ১৬.২ শতাংশ বেড়েছিল।

এই উপাত্ত থেকে বোঝা যায়, জিনজিয়াং বহু জাতিগোষ্ঠীর আবাসভূমি এবং উইঘুররা অঞ্চলটির বৃহত্তম একক জাতিগোষ্ঠী। তবে জনসংখ্যার অনুপাত বা পরিবর্তনের তথ্য একা দিয়ে জোরপূর্বক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন, পরিকল্পিত জাতিগত প্রতিস্থাপন কিংবা কোনো নির্দিষ্ট নীতির উদ্দেশ্য প্রমাণ করা যায় না। এসব দাবি যাচাই করতে জন্মহার, অভিবাসন, অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যা, পরিবার পরিকল্পনা নীতি এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনের তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন।

অন্যদিকে, জনসংখ্যা বেড়েছে বলেই কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগ অমূলক হয়ে যায় না। জনসংখ্যার সংখ্যা এবং ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা, ভাষার অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা—দুটি আলাদা প্রশ্ন। তাই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি নীতির বাস্তব প্রয়োগ এবং মানুষের অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ: জিনজিয়াং থেকে বিশ্ববাজার

জিনজিয়াংয়ের মানবাধিকার পরিস্থিতি চীনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গেও যুক্ত। তুলা ও বস্ত্র, কৃষিপণ্য, সৌরশক্তি শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন উৎপাদন খাতে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। ফলে শ্রমিকের অধিকার লঙ্ঘিত হলে তার প্রভাব আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থাতেও পড়তে পারে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, উইঘুর ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষকে এমন শ্রম কর্মসূচিতে যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে কাজ বেছে নেওয়া, প্রত্যাখ্যান করা বা কর্মস্থল পরিবর্তনের স্বাধীনতা বাস্তবে সীমিত হতে পারে। চীনা সরকার এসব কর্মসূচিকে দারিদ্র্য হ্রাস, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করে।

কোনো সরকারি কর্মসূচির আওতায় কাজ করলেই তা জোরপূর্বক শ্রম হয়ে যায় না। মূল প্রশ্ন হলো, শ্রমিক স্বাধীনভাবে কাজ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করতে পারছেন কি না, কাজ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ আছে কি না, জবরদস্তি বা শাস্তির ভয় রয়েছে কি না এবং মজুরি ও কর্মপরিবেশের বিষয়ে স্বচ্ছতা আছে কি না।

এই প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ২০২১ সালের উইঘুর ফোর্সড লেবার প্রিভেনশন অ্যাক্ট বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আইনটি জিনজিয়াংয়ে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে উৎপাদিত পণ্যের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার একটি আইনগত অনুমান প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রযোজ্য শর্তে সেসব পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করে। এর ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরবরাহব্যবস্থার উৎস ও শ্রমিকের অধিকার যাচাই করার চাপ বেড়েছে।

তবে জিনজিয়াংয়ের প্রতিটি পণ্য বা প্রতিটি শ্রমিককে জোরপূর্বক শ্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে ঘোষণা করা সঠিক নয়। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পণ্য ও সরবরাহব্যবস্থার ক্ষেত্রে নথি, শ্রমিকের স্বাধীন সাক্ষ্য এবং স্বাধীন পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন।

পরিবার বিচ্ছিন্নতা ও প্রবাসী উইঘুরদের উদ্বেগ

জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতির একটি গভীর মানবিক দিক হলো পরিবার বিচ্ছিন্নতা। কোনো ব্যক্তি আটক থাকলে তাঁর সন্তান, স্ত্রী, স্বামী, বাবা-মা ও আত্মীয়দের জীবনেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়ে। অনেক উইঘুর বিদেশে বসবাস করেন; তাঁদের অভিযোগ, চীনে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করা কঠিন, কখনো কখনো দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। কিছু প্রবাসী আরও অভিযোগ করেছেন, বিদেশে থাকা অধিকারকর্মী বা সমালোচকদের সম্পর্কে তথ্য দিতে তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে দক্ষিণ জিনজিয়াংয়ে এক লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিশু বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল বলে জিনজিয়াং ভিকটিমস ডেটাবেস নামের একটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বিশ্লেষণে অনুমান করা হয়েছে। এই সংখ্যা ওই উদ্যোগের হিসাব; জাতিসংঘের যাচাইকৃত সরকারি গণনা নয়। এসব শিশুর বর্তমান অবস্থা সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন তথ্য নেই।

পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অনিশ্চয়তা নিজেই গভীর মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে প্রতিটি বিচ্ছিন্নতার কারণ এক নয়—কেউ কারাবন্দি, কেউ বিদেশে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রশাসনিক বিধিনিষেধ বা যোগাযোগের অন্য বাধা থাকতে পারে। তাই প্রতিটি পরিবারের পরিস্থিতি আলাদাভাবে যাচাই করা জরুরি।

মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া: সংহতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের টানাপোড়েন

জিনজিয়াংয়ের উইঘুরদের বিষয়ে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া একরকম ছিল না। কিছু দেশ মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, আবার কিছু দেশ চীনের নিরাপত্তানীতি বা উন্নয়নমূলক কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে কিংবা প্রকাশ্য সমালোচনা এড়িয়ে গেছে। ২০১৯ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে চীনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত উদ্বেগের বিপরীতে চীন-সমর্থিত একটি চিঠিতে এক ডজনেরও বেশি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার সদস্যরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ চীনের নীতির প্রতি সমর্থন জানায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই সময় মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছিল।

এই অবস্থানের পেছনে কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্বার্থ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সব দেশের নীতিকে একই বলে ধরে নেওয়া যাবে না; রাষ্ট্রভেদে অবস্থান এবং সময়ের সঙ্গে নীতিও পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো দেশ চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখলেই সে জিনজিয়াংয়ের প্রতিটি নীতিকে সমর্থন করে—এমন সিদ্ধান্তও স্বয়ংক্রিয়ভাবে টানা যায় না।

এখানে মুসলিম বিশ্বের সামনে একটি নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে: ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা কিংবা অন্য কোনো অঞ্চলে মুসলমানদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় যে মানবিক নীতি অনুসরণ করা হয়, তা কি জিনজিয়াংয়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রয়োগ করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং একই মানবাধিকার মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগের ভিত্তিতে খোঁজা উচিত।

আন্তর্জাতিক জবাবদিহি: প্রতিবেদন আছে, অগ্রগতি কতটা?

জিনজিয়াং নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, গুরুতর অভিযোগ নথিবদ্ধ হলেও পরবর্তী তদন্ত, প্রতিকার এবং জবাবদিহির অগ্রগতি সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত। জাতিসংঘের ২০২২ সালের মূল্যায়ন সুপারিশ করেছিল, যাদের স্বাধীনতা অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের মুক্তি দেওয়া হোক এবং লঙ্ঘনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকার নিশ্চিত করা হোক।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০২৬ সালের আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আগের সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতির অভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। সংস্থাটি আরো বলেছে, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২২ সালের পর জিনজিয়াং বিষয়ে উল্লেখযোগ্য নতুন প্রকাশ্য মূল্যায়ন দেয়নি।

জবাবদিহির অর্থ কেবল কোনো রাষ্ট্রকে দোষী ঘোষণা করা নয়। এর অর্থ হলো আটক ব্যক্তিদের পরিচয় ও অবস্থান সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা, নির্যাতন ও বৈষম্যের অভিযোগ তদন্ত করা, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার দেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের লঙ্ঘন ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া। এ জন্য জাতিসংঘের স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিরাপদে ও গোপনীয়ভাবে কথা বলার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টির গুরুত্ব

বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য, উন্নয়ন সহযোগিতা ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার সদস্য। তাই জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম, গবেষক ও নাগরিক সমাজের আগ্রহ স্বাভাবিক।

তবে এ বিষয়ে আলোচনার ভিত্তি হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য তথ্য, মানবাধিকারের সার্বজনীন নীতি এবং সব পক্ষের বক্তব্য যাচাই করার আগ্রহ। কোনো একটি রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বক্তব্যকে একমাত্র সত্য ধরে নেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি শক্তিশালী রাষ্ট্রের সরকারি বক্তব্যকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করাও যুক্তিসংগত নয়।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম ও গবেষকদের জন্য কয়েকটি প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ: জিনজিয়াংয়ে আটক ব্যক্তিদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কতটা স্বাধীন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে? ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মাতৃভাষায় শিক্ষার বাস্তব পরিস্থিতি কী? শ্রমিকদের স্বাধীনভাবে কাজ বেছে নেওয়ার অধিকার কতটা নিশ্চিত? বিদেশে থাকা উইঘুরদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কতটা?

উন্নয়ন ও নিরাপত্তা, কিন্তু অধিকারও

জিনজিয়াংয়ের মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—রাষ্ট্র কীভাবে নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করবে, অথচ কোনো জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতা, ভাষা, সাংস্কৃতিক পরিচয়, পারিবারিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে না?

চীনা সরকার সন্ত্রাসবাদ দমন, স্থিতিশীলতা, দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থানের অগ্রগতির কথা বলছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ও বিভিন্ন অধিকার সংস্থা গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ নথিবদ্ধ করেছে এবং আরও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি জানিয়েছে। এসব অবস্থানের মধ্যে সত্য যাচাইয়ের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ হলো স্বাধীন তদন্ত, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি, আটক ব্যক্তিদের ন্যায্য বিচার, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের নিশ্চয়তা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার বাস্তব প্রমাণ।

উইঘুর ও অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা মানে চীনের জনগণ বা চীনা সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। এটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও নাগরিকের অধিকারের সম্পর্ক নিয়ে একটি মানবিক প্রশ্ন। কোনো দেশের উন্নয়ন যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, তার সাফল্য মূল্যায়নের সময় মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও পরিচয় রক্ষার বিষয়টি বাদ দেওয়া যায় না।

জিনজিয়াংয়ের বর্তমান পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্বাধীনভাবে যাচাই করার জন্য আরও তথ্য প্রয়োজন। সেই তথ্য পাওয়ার পথ খুলে দেওয়া, নিরপেক্ষ অনুসন্ধানকে অনুমতি দেওয়া এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করাই দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও অনিশ্চয়তা কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে। শেষ পর্যন্ত জিনজিয়াংয়ের মানুষের অবস্থার প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর করবে শুধু সরকারি ঘোষণার ওপর নয়, বরং তাঁরা কতটা স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে পারেন, নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি ধরে রাখতে পারেন, পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারেন এবং ভয় বা বৈষম্য ছাড়াই জীবনযাপন করতে পারেন—তার ওপর।

সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইউকে হোম অফিস ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর)

থেমেছে কি ভাগ্যবিড়ম্বিত উইঘুরদের কান্না, বদলেছে কি জিনজিয়াংয়ের পরিস্থিতি

Tuesday, October 20, 2026

দক্ষিণ চীন সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, প্রতিক্রিয়া জানাল চীন

দক্ষিণ চীন সাগরের স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের সাবিনা শোলের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতিকে সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে চীন। অনুমতি ছাড়াই চীনের জলসীমায় অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মার্কিন জাহাজটির বিরুদ্ধে এ বক্তব্য দেয় দেশটির নৌবাহিনী। খবর রয়টার্সের।

চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ডের নৌবাহিনী জানায়, তারা মার্কিন উপকূলীয় যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস চার্লস্টনকে অনুসরণ ও নজরদারিতে রাখতে বাহিনী পাঠিয়েছে। বেইজিংয়ের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপ চীনের সার্বভৌম অধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্যও ক্ষতিকর।

গত মাসে, একই জায়গার কাছে জ্বালানি ভরার অভিযানে থাকা একটি ফিলিপিনো নৌকাকে চীনের উপকূলরক্ষী বাহিনীর একটি জাহাজ ধাক্কা দেয় ।

সাবিনা শোল ও পুরো স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব নিয়ে চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ফিলিপাইনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও আছে।

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সূত্র : রয়টার্স

দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত ফিলিপাইন-অধিকৃত থিতু দ্বীপ। ছবি: রয়টার্স
দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত স্প্র্যাটলি দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত ফিলিপাইন-অধিকৃত থিতু দ্বীপ। ছবি: রয়টার্স

Sunday, October 18, 2026

ফিলিস্তিন সংকট চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবিচার: চীন

অধিকৃত পশ্চিম তীরে জোরপূর্বক বসতি স্থাপন বন্ধ এবং ইতোমধ্যে গড়ে তোলা বসতি প্রত্যাহার করতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) প্রকাশিত চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। খবর টাইমস অব ইসরায়েলের।

বিবৃতিতে বলা হয়, আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগের সঙ্গে বৈঠকে ওয়াং ই এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ফিলিস্তিন সংকটকে চীন চলতি শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবিচার হিসেবে দেখে।

ওয়াং ই বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠা চীনের নীতির অন্যতম ভিত্তি। বেইজিং মনে করে, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের পাশাপাশি দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংকটের সমাধানই সঠিক পথ। একই সঙ্গে গাজায় অবিলম্বে ও পূর্ণাঙ্গভাবে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি, যাতে মানবিক বিপর্যয় আরও ছড়িয়ে না পড়ে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সব পক্ষকে যত দ্রুত সম্ভব সংলাপ ও আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত বেইজিং।

হেরজগের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাকুতে এশিয়ায় পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আয়োজিত সম্মেলনের (সিআইসিএ) ফাঁকে দুই নেতার বৈঠক হয়। এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বিশেষ করে অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। তবে পশ্চিম তীর ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে তাদের আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে হেরজগের কার্যালয় মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।

এ ছাড়া ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন আগাবেকিয়ান শাহিনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি জানান, ফিলিস্তিনের অধিকার ও দাবির পক্ষে কথা বলা অব্যাহত রাখবে বেইজিং।

ওয়াং ই বলেন, ফিলিস্তিন ইস্যুকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে শান্তিপ্রিয় সব দেশকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

সূত্র : টাইমস অব ইসরায়েল

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। ছবি: হেরজগের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগ ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। ছবি: হেরজগের এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত

Monday, October 5, 2026

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বানাতে প্রতিযোগিতায় ৩ দেশ

ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন ও মহাকাশে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতিতে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। দেশগুলোর ধারণা, চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ, প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান এবং দূরবর্তী মহাকাশ অভিযানে পারমাণবিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আগস্টে নাসার ঠিকাদারদের এমন একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে, যা মহাকাশযাত্রা সহ্য করতে পারবে এবং চাঁদের দক্ষিণ মেরুর কাছে কোনো ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই কাজ করতে পারবে। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চুল্লিটি উৎক্ষেপণের উপযোগী করার লক্ষ্য নিয়েছে সংস্থাটি।

অন্যদিকে চীনের সঙ্গে গোপনীয় অংশীদারত্বের আওতায় ২০৩৬ সালের মধ্যে ‘সেলেনা’ নামে একটি চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে রাশিয়া। চীনের নেতৃত্বে পরিচালিত চন্দ্রঘাঁটিগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি কেন?

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন করতে হলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। দিনের বেলায় সৌর প্যানেল বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারলেও চাঁদের রাত পৃথিবীর হিসাবে দুই সপ্তাহেরও বেশি স্থায়ী হয়। ফলে শুধু সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করা কঠিন।

পারমাণবিক চুল্লি সূর্যের আলো ছাড়াই কাজ করতে পারে এবং মানুষের সীমিত হস্তক্ষেপে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহের সক্ষমতা রাখে। প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন সৌরশক্তি এবং রেডিওআইসোটোপ ব্যবস্থা ব্যবহার করে যন্ত্রপাতি উষ্ণ রাখা ও চন্দ্রযানের ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে বড় আকারের চন্দ্রঘাঁটি গড়ে তুলতে আরও বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাসার প্রস্তাবিত ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ নামের এই চুল্লি ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই পাঁচ বছর কাজ করার জন্য নকশা করা হচ্ছে। রাশিয়ার ‘সেলেনা’ চুল্লির উৎপাদনক্ষমতা ১০ কিলোওয়াট পর্যন্ত হবে এবং এটি এক দশক স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলতে পারবে বলে পরিকল্পনা করা হয়েছে।

মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি নিয়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ

তবে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের এই প্রতিযোগিতা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। দ্রুত চুল্লি নির্মাণ ও উৎক্ষেপণের উদ্যোগ নিলে গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে। উৎক্ষেপণের সময় রকেট ব্যর্থ হলে পারমাণবিক চুল্লি দুর্ঘটনার শিকার হতে পারে এবং তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেছেন, চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ করা অত্যন্ত কঠিন হবে। পৃথিবীর পারমাণবিক চুল্লির মতো সেখানে বড় ধরনের সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করাও সহজ নয়। তাই নভোচারী ও যন্ত্রপাতিকে বিকিরণঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে চুল্লির আশপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রিত বা সীমিত করা প্রয়োজন হতে পারে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া; দুই দেশই তাদের পারমাণবিক চুল্লি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এতে পরিবহনের সময় কিছু ঝুঁকি কমবে। তবে নিরাপত্তা যাচাইয়ের পরও দুর্ঘটনার সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

চাঁদের মালিক কে?

চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতা চাঁদের বিভিন্ন অঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

১৯৬৭ সালের ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’ অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করতে পারে না। তবে কোনো দেশ চাঁদে ঘাঁটি স্থাপনের পর তার আশপাশের এলাকায় অন্যদের প্রবেশ সীমিত করতে পারবে কি না এবং সেখান থেকে উত্তোলন করা সম্পদের মালিকানা কার হবে; তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে নির্মিত কোনো পারমাণবিক চুল্লির চারপাশে নিরাপত্তার কারণে সীমিত প্রবেশাধিকার এলাকা তৈরি করতে পারে; এমন আশঙ্কায় নাসা তাদের পরিকল্পনা দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মহাকাশ আইন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন, নিরাপত্তার কারণে এমন কোনো এলাকা তৈরি করা হলেও তা ‘আউটার স্পেস ট্রিটি’-তে থাকা মহাকাশে অবাধ প্রবেশাধিকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে কি না।

তবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া কোনো দেশই এখন পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি যে, তাদের প্রস্তাবিত পারমাণবিক চুল্লি সফলভাবে চাঁদে স্থাপন ও পরিচালনা করা সম্ভব। প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের কারণে নির্ধারিত সময়সূচিও পরিবর্তিত হতে পারে।

সূত্র : দ্য নিউইয়র্ক টাইমস

চন্দ্রাভিযানের সময় নাসার ওরিয়ন মহাকাশযান চাঁদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছে। ছবি : নাসা
চন্দ্রাভিযানের সময় নাসার ওরিয়ন মহাকাশযান চাঁদের কাছ দিয়ে অতিক্রম করছে। ছবি : নাসা

Sunday, October 4, 2026

চাঁদের বুকে পরমাণু চুল্লি বসাতে মরিয়া তিন পরাশক্তি

চাঁদের বুকে পরমাণু চুল্লি স্থাপনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে বিশ্বের তিন পরাশক্তি—যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে মহাকাশযাত্রা সহ্য করতে সক্ষম এবং দীর্ঘ সময় মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই চলতে পারবে—এমন একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির জন্য ঠিকাদারদের প্রস্তুতি নিতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সেটি উৎক্ষেপণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই তৎপরতার পেছনে রয়েছে মহাকাশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। রাশিয়া চীনের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ২০৩৬ সালের মধ্যে চাঁদে একটি পারমাণবিক চুল্লি চালু করার পরিকল্পনা করছে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের আগে এগিয়ে থাকতে নিজেদের পরিকল্পনাও দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে নাসা।

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি স্থাপন, বরফ হিসেবে জমে থাকা পানি ও অন্যান্য সম্পদের সন্ধান এবং সেখান থেকে সৌরজগতের আরো গভীরে অভিযান পরিচালনা করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। চাঁদের সম্পদ ও সেখানে প্রবেশের সুযোগ নিয়ন্ত্রণকে এই পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর দুই দেশই মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদি চন্দ্রঘাঁটির জন্য পারমাণবিক চুল্লিই হতে পারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তির উৎস।

তবে এই প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার একাধিক রকেট উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হয়েছে। রাশিয়ার একটি চন্দ্রযানও চাঁদের পৃষ্ঠে বিধ্বস্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক প্রযুক্তিকে মহাকাশ প্রতিযোগিতায় যুক্ত করা ঝুঁকি আরো বাড়াতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিজ্ঞানীরা।

ইউনিয়ন অব কনসার্নড সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক এডউইন লাইম্যান বলেন, মহাকাশে সবসময়ই প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে এর সঙ্গে পারমাণবিক শক্তি যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

কেন চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি?

চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি গড়ে তুলতে হলে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রয়োজন। সৌরশক্তির বিপরীতে পারমাণবিক চুল্লি সূর্যের আলো ছাড়াই কাজ করতে পারে এবং তুলনামূলকভাবে কম জায়গায় স্থাপন করা সম্ভব। সঠিক নকশা হলে এগুলোতে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপও খুব কম প্রয়োজন হবে।

চাঁদের প্রাথমিক পর্যায়ের ঘাঁটিতে যন্ত্রপাতি সচল রাখা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং রোভার বা যানবাহনে শক্তি সরবরাহের জন্য সৌরশক্তি ও রেডিওআইসোটোপ শক্তি ব্যবস্থা ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন ইতোমধ্যেই মহাকাশে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।

কিন্তু বড় আকারের চন্দ্রঘাঁটি গড়ে উঠলে আরো বেশি বিদ্যুৎ প্রয়োজন হবে। চাঁদের রাত পৃথিবীর হিসাবে প্রায় দুই সপ্তাহ স্থায়ী হয়, ফলে ওই সময় সৌর প্যানেল কার্যকর থাকবে না। আবার দক্ষিণ মেরু এলাকায় তাপমাত্রা প্রায় ১৩০ থেকে মাইনাস ৩৩৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ওঠানামা করতে পারে। এমন পরিবেশে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক চুল্লি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাশিয়া-চীনের পরিকল্পনা

রাশিয়া ২০৩৬ সালের মধ্যে ‘সেলেনা’ নামে একটি চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে। চীনের নেতৃত্বাধীন চন্দ্র স্টেশনগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এটি ব্যবহার করা হবে। চুল্লিটি সর্বোচ্চ ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং কোনো ধরনের মানব হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রায় এক দশক কাজ করার লক্ষ্য রয়েছে।

চন্দ্র প্রকল্পে পারমাণবিক শক্তির বিষয়টি মূলত রাশিয়ার ওপর ন্যস্ত করেছে চীন। মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে রাশিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। শীতল যুদ্ধের সময় দেশটি ৩০টির বেশি পারমাণবিক চুল্লি কক্ষপথে পাঠিয়েছিল। পাশাপাশি বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনেও দেশটির বড় অভিজ্ঞতা রয়েছে।

কুরচাটভ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট মিখাইল কোভালচুক বলেছেন, মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ক্ষেত্রে রাশিয়ার কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। এই প্রতিষ্ঠানই চন্দ্র চুল্লির নকশায় কাজ করছে।

অন্যদিকে, নাসা ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ নামে একটি চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে। এটি ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে, যা প্রায় ১৬টি মার্কিন বাড়ির বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমান। কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ ছাড়াই পাঁচ বছর চালানোর লক্ষ্য রয়েছে এর।

নাসা ২০২৮ সালের ডিসেম্বরেই পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করে একটি মহাকাশযানকে মঙ্গলগ্রহের দিকে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এমন প্রযুক্তির ব্যবহার আগে কখনো করা হয়নি। পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও কক্ষপথ ও চাঁদে ব্যবহারের জন্য নিজস্ব মহাকাশ পারমাণবিক চুল্লি তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

উৎক্ষেপণেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি

তবে পরিকল্পনার সময়সীমা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা খুব একটা আশাবাদী নন। কারণ এখনো এমন কোনো প্রমাণিত অবতরণযান নেই, যা ভারী ও সম্ভাব্য তেজস্ক্রিয় উপাদান নিরাপদে চাঁদের অসমতল পৃষ্ঠে নামাতে পারে। কম মাধ্যাকর্ষণ পরিবেশে কেউ এখনো পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া জানিয়েছে, তাদের চুল্লিগুলো চাঁদে পৌঁছানোর আগে সক্রিয় করা হবে না। অর্থাৎ উৎক্ষেপণের সময় জ্বালানি ‘ঠান্ডা’ বা অপরিবর্তিত অবস্থায় থাকবে। এতে দুর্ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তবে উৎক্ষেপণের সময় রকেট বিস্ফোরিত হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে। জাতিসংঘের মহাকাশে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের বিষয়ক একটি কর্মদলের প্রধান লিওপোল্ড সামারার বলেন, উৎক্ষেপণের সময়ই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। অতীতে অসংখ্য উৎক্ষেপণ ব্যর্থ হওয়ার কারণে কী কী সমস্যা হতে পারে, তার অনেক উদাহরণও রয়েছে।

সমুদ্রের ওপর কোনো পারমাণবিক চুল্লি পড়ে গেলেও বিপদ তৈরি হতে পারে। পানির উপস্থিতিতে নিউট্রন ধীর হয়ে গেলে পরমাণু বিভাজনের শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ২০১৯ সালে রাশিয়ার একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যর্থ হয়ে হোয়াইট সিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় এমন একটি পারমাণবিক বিক্রিয়া ঘটেছিল বলে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। ওই ঘটনায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। তবে রাশিয়া এ দাবি অস্বীকার করে বলেছিল, ক্ষেপণাস্ত্রটি পারমাণবিক চুল্লিচালিত ছিল না।

চাঁদে দুর্ঘটনা হলে কী হবে?

মহাকাশে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের আরেকটি বড় ঝুঁকি হলো দুর্ঘটনার পর তেজস্ক্রিয় পদার্থ পৃথিবীতে ফিরে আসা। ১৯৭৮ সালে রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তিচালিত ‘কসমস ৯৫৪’ উপগ্রহ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কানাডার উত্তরাঞ্চলে আছড়ে পড়ে। এতে প্রায় ৪৮ হাজার বর্গমাইল এলাকায় তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ে। এক বছর ধরে পরিষ্কার অভিযান চালানোর পরও উপগ্রহটির শক্তির উৎসের মাত্র ০.১ শতাংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

চাঁদে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো ভিন্ন হতে পারে। পৃথিবীতে পারমাণবিক চুল্লিগুলোকে সুরক্ষা কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু চাঁদে এমন অবকাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন। নাসা জানিয়েছে, তাদের চুল্লিতে সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে। তবে সেটি কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চন্দ্র চুল্লিগুলোর চারপাশে মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ এলাকা তৈরি করতে হতে পারে। কারণ চাঁদে বাতাস না থাকলেও কম মাধ্যাকর্ষণের কারণে বিস্ফোরণের পর ধ্বংসাবশেষ অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আর পৃথিবীর মতো চাঁদে কোনো চুল্লির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা সরিয়ে ফেলা বা নিষ্ক্রিয় করার জটিল প্রক্রিয়া চালানোর পরিকল্পনাও নেই। নাসা ও রাশিয়ার সংস্থাগুলো জানিয়েছে, মেয়াদ শেষ হলে তেজস্ক্রিয় উপাদান চাঁদেই রেখে দেওয়া হবে।

জ্বালানি নিয়েও জটিলতা

চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লির জন্য কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। নাসার নথিতে বলা হয়েছে, তারা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ নয় এমন জ্বালানি ব্যবহার করতে চায়। এর মধ্যে ‘হাই-অ্যাসে লো-এনরিচড ইউরেনিয়াম’ বা হেলু (এইচএএলইউ) অন্যতম।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে এই জ্বালানির সরবরাহ সীমিত। রাশিয়া এ ধরনের জ্বালানির সবচেয়ে বড় উৎপাদক হলেও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২৪ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি নিষিদ্ধ করেছে।

এর আগে নাসার ২০১৮ সালের পরীক্ষামূলক মহাকাশ চুল্লিতে উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ব্যবহার করা হয়েছিল। এই জ্বালানি তুলনামূলক হালকা ও উৎক্ষেপণ খরচ কমাতে সহায়ক হলেও এর অপব্যবহার করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এ ধরনের জ্বালানি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

রাশিয়া-চীন যৌথ প্রকল্পে কোন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে, তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি। রাশিয়ার পুরোনো মহাকাশ চুল্লিগুলোতে অবশ্য উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ জ্বালানি ব্যবহার করা হয়েছিল।

মার্কিন আইনপ্রণেতা ও পদার্থবিদ বিল ফস্টার সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের জ্বালানি সামান্য কিছু প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও বিস্ফোরক ব্যবহার করেই বিপজ্জনক অস্ত্রে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রতিযোগিতার চেয়ে সহযোগিতার আহ্বান

মহাকাশে ব্যবহারের জন্য ক্ষুদ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির প্রতিযোগিতায় বেশ কয়েকটি মার্কিন কোম্পানিও যুক্ত হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘অ্যান্টারেস’ নামের একটি কোম্পানিকে মহাকাশে ব্যবহারের উপযোগী ক্ষুদ্র চুল্লি তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি নাসা ও পেন্টাগনের চন্দ্র চুল্লি প্রকল্পেও অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাকাশে ব্যবহারের জন্য কোনো ক্ষুদ্র পারমাণবিক চুল্লিই এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত ও প্রস্তুত নয়। কীভাবে তাপ অপসারণ করা হবে, কীভাবে তেজস্ক্রিয়তা থেকে সুরক্ষা দেওয়া হবে এবং কীভাবে চুল্লির কাঠামোগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হবে—এসব মৌলিক প্রশ্নের পুরোপুরি সমাধান এখনো হয়নি।

উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ক্যাটি হাফ মনে করেন, চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন করা প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। তবে যত বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন হবে, চুল্লি তৈরি তত কঠিন হবে।

তার মতে, মহাকাশে প্রতিযোগিতার বদলে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে আরো বেশি অগ্রগতি সম্ভব। মহাকাশ গবেষণায় সহযোগিতামূলক বৈজ্ঞানিক উদ্যোগকে রাজনৈতিক বিরোধের ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।

সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস

চাঁদের বুকে পরমাণু চুল্লি বসাতে মরিয়া তিন পরাশক্তি
ছবি: সংগৃহীত

ছায়াযুদ্ধ: ইরান সংঘাতে ‘চীন ফ্যাক্টর’

দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত মরুভূমিতে কেবল যুক্তরাষ্ট্র আর ইরানের বারুদ ঝরছে; কিন্তু ধোঁয়াশার কিছুটা গভীরে তাকালে দেখা যায়, সেখানে খেলা চলছে অন্য এক বড় দাবার চালের। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মুখোমুখি লড়াইয়ের আড়ালে নিঃশব্দে গড়ে উঠেছে দুই পরাশক্তির ক্ষমতার দ্বিতীয় এক যুদ্ধক্ষেত্র, যার নাম ‘চীন ফ্যাক্টর’।

চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে না। তবে ইরানের পেছনে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত এবং কূটনৈতিক ছায়া ওয়াশিংটনের যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ বেশ জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে না নেমেও চীনের এই উপস্থিতি এক বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে: ইরান সংঘাত কি তবে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন প্রক্সি বা পরোক্ষ ময়দান?

এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হিসাবটা এখনো সরাসরি যুদ্ধের নয়। সম্প্রতি ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-জি জিনপিং জমকালো সম্মেলনে দুই পরাশক্তির শীর্ষ নেতাই একে অপরের প্রতি করমর্দন করেছিলেন। কিন্তু ভৌগোলিক বাস্তবতায় এই ইরান যুদ্ধই আবার তাদের ঠেলে দিয়েছে জ্বালানি, নিষেধাজ্ঞা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা আর মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণের এক কঠিন প্রতিযোগিতায়।

আমেরিকান কঠোর নিষেধাজ্ঞার তোপ সামলেও তেহরান যে আজও টিকে আছে, তার পেছনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সচ্ছলতার উৎস বেইজিং। যুদ্ধের আগে চীনের মোট তেল আমদানির অন্তত ১৩-১৪ শতাংশ যোগাত ইরান। মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা চীনা স্বাধীন তেল শোধনাগারগুলো তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। জবাবে ওয়াশিংটন চীনা কোম্পানি ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে ব্যাকফুটে ঠেলার চেষ্টা করছে। তবে এটি হোয়াইট হাউসকে কঠিন দুশ্চিন্তায় ফেলেছে, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সহজ, কিন্তু চীনের শীর্ষ ব্যাংকগুলোকে কোণঠাসা করতে গেলে জল গড়াবে দুটি পরাশক্তির সরাসরি অর্থনৈতিক যুদ্ধে।

কেবল অর্থই নয়, রণক্ষেত্রে প্রযুক্তির খেলাতেও চীনের নাম উঠে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, ড্রোন ও সামরিক প্রযুক্তিতে ব্যবহারযোগ্য চীনা দ্বিমুখী ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রাংশ পৌঁছচ্ছে তেহরানে। জর্ডানে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ইরানি হামলার পেছনে চীনা স্যাটেলাইট ছবির ভূমিকা ছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে মার্কিন গোয়েন্দারা। বেইজিং অভিযোগ উড়িয়ে দিলেও এবং ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিষয়টি এড়াতে চাইলেও সত্যটা স্পষ্ট, আধুনিক যুদ্ধে জিততে সরাসরি সেনা পাঠানোর দরকার হয় না; প্রযুক্তি ও নেভিগেশন সুবিধা দিয়েও অন্য দেশের সামরিক শক্তিকে অপরাজেয় করে তোলা যায়।

তবে চীনের ভালোবাসাও নিখাদ বা সীমাহীন নয়। মধ্যপ্রাচ্যের তেলের প্রবাহ বিঘ্নিত হলে বা হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়বে খোদ বেইজিংয়ের অর্থনীতি। এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের স্বার্থের এক অদ্ভুত সমীকরণ তৈরি হয়েছে। চীন চায় না, ইরান ধসে পড়ুক, আবার তারা এমন দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধও চায় না। যা পুরো পারস্য উপসাগরকে অস্থিতিশীল করে তোলে। তাছাড়া সৌদি আরব ও আমিরাতের মতো ধনী দেশগুলোর সঙ্গেও চীনের বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তেহরানকে বাঁচানোর তাগিদ থাকলেও তাদের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে নামার মতো বোকামি বেইজিং করবে না।

মূলত ইরান এখন এমন এক প্রক্সি ময়দান, যেখানে আমেরিকা তার নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক শক্তির পুরনো মহড়া দেখাচ্ছে, আর চীন দেখাচ্ছে কীভাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সাপ্লাই চেইন হাত করে সেই মার্কিন শক্তিকে অকার্যকর করে দেওয়া যায়। আমেরিকান প্রতিটি নিষেধাজ্ঞাকে কাঁচকলা দেখিয়ে কেনা ইরানি তেলের ব্যারেল প্রমাণ করছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে।

তাই আসল প্রশ্ন এটি নয় যে চীন সরাসরি ইরানের হয়ে যুদ্ধে নামবে কি না। আসল প্রশ্ন হলো, এই ইরান সংঘাত কি ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের বিদ্যমান বাণিজ্যযুদ্ধকে ছাপিয়ে একুশ শতকের বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের আসল মহড়ায় পরিণত হতে যাচ্ছে? আর সেটিই হতে চলেছে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় কৌশলগত মোড়।

সূত্র: এশিয়া টাইমস

ছবি: এশিয়া টাইমস
ছবি: এশিয়া টাইমস

Sunday, September 27, 2026

ট্রাম্পের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা দেখল বিশ্ব

রয়টার্সঃ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে আলোচিত ভাষণ থেকে শুরু করে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে হোয়াইট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। এসব কিছুর মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে নিজের অবস্থান আবারও জানান দিতে চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

কিন্তু অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এক সপ্তাহে ট্রাম্পের একের পর এক কূটনৈতিক তৎপরতা দেশ–বিদেশে তাঁর সামনে থাকা সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠতে খুব একটা কাজে আসেনি।

ট্রাম্প যেসব সমস্যার মধ্যে আছেন, তার মধ্যে বিস্তৃত হতে থাকা ইরান যুদ্ধ অন্যতম। এর প্রভাবে প্রায় সারা বিশ্বের মতো যুক্তরাষ্ট্রেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। কমেছে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা। কোনো কোনো মিত্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। একই সময়ে চীনের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে প্রতিযোগিতাও আরও তীব্র হচ্ছে।

নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়ে যাওয়ার পর, মধ্যপ্রাচ্য সংকট থেকে শুরু করে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ পর্যন্ত নানা বিষয়ে ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের বাধার মুখে পড়েছেন। ফলে তাঁর পররাষ্ট্রনীতি থমকে গেছে বলে ধারণা তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। ট্রাম্পের নীতির কারণে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির এই নির্বাচনে হেরে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক পরিসর আরও সংকুচিত করতে পারে।

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ট্রাম্পের ভাষণ ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর কীভাবে তিনি খোদ যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে তোলা নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁর ভাষণে সেই চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সংস্থাটির মঞ্চে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প ইরানকে নতুন করে হুমকি দেন। তিনি বলেন, ইরান হয় চুক্তিতে রাজি হবে, না হয় দেশটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হবে।

তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেকের সদস্য ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে নিজের কঠোর অবস্থানও তুলে ধরেন ট্রাম্প। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিজয়ীরাই লুটের মালের অধিকার পায়।’

আন্তর্জাতিক লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ব্যবহারের পথ থেকেও ট্রাম্প সরে আসেননি। বরং ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ পথে তাঁর আরও পদক্ষেপ থাকতে পারে।

এরপর গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মুখোমুখি হন। চীনের নেতাকে যেখানে তুলনামূলকভাবে শক্ত অবস্থানে দেখা গেছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছে। অন্যদিকে ইরান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

সি–ট্রাম্প বৈঠকে সীমিত ফলাফল

চীনের প্রেসিডেন্টের যুক্তরাষ্ট্র সফরে জাঁকজমক ও আনুষ্ঠানিকতার কমতি ছিল না হোয়াইট হাউসের। কিন্তু এত আয়োজনের বাস্তব ফলাফল ছিল সীমিত। দুই নেতার বৈঠকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, তাইওয়ান ও ইরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা হলেও তেমন অগ্রগতি হয়নি।

তবে সবচেয়ে স্পষ্ট ফলাফল ছিল বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে এই বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে দুই দেশের মতপার্থক্য নিয়ে কথা বলতে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি। তবে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে সি তাঁকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত এ দ্বীপটিকে চীন নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্কে তাইওয়ান সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ বিষয়।

তাইওয়ান ইস্যুতে ট্রাম্পের এই আপাত সংঘাত এড়িয়ে চলার অবস্থান তাঁর আগের কড়া অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আগে তিনি শুল্ককে হাতিয়ার করে চীনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে বিরল খনিজের ওপর বেইজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ থাকায় ট্রাম্পের সেই হাতিয়ার বুমেরাং হয়েছে। প্রযুক্তি ও গাড়ি উৎপাদনে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। প্রতিশোধ হিসেবে এগুলোর সরবরাহ বন্ধ রাখার সক্ষমতা দেখিয়েছে চীন।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং বর্তমানে কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল সিচুয়েশন রুমের প্রধান ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ‘ট্রাম্প এমন এক বিশ্বে আমাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন, যেখানে “জোর যার অধিকার তার” মূলনীতি। কিন্তু সি চিন পিং ও ক্রমবর্ধমান চীনা শক্তির প্রসঙ্গ এলেই তিনি কতটা নরম হয়ে যান, সেটি লক্ষ করার মতো।’

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি কোনো বাধার মুখে পড়েছে, এমন ধারণা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘে ট্রাম্পের বক্তব্যে ‘বিশ্বজুড়ে মার্কিন স্বার্থ এগিয়ে নিতে তাঁর বিভিন্ন সাফল্য’ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখার বিষয়টিও রয়েছে।

যদিও ইরান সব সময়ই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য। তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায় না।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে অচলাবস্থা

ট্রাম্পের ব্যস্ত কূটনৈতিক সপ্তাহজুড়ে ছায়ার মতো ছিল ইরান যুদ্ধ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন।

প্রায় সাত মাস ধরে চলমান এ যুদ্ধ বন্ধের সুস্পষ্ট কোনো লক্ষণ নেই। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশে দেশে।

ইরান অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও পিছু হটেনি। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতিতে ইরানের এই অনড় অবস্থানই সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানে হামলার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। তিনি ঘোষণা করেন, ‘আমেরিকা ইজ ব্যাক’ (আমেরিকা ফিরে এসেছে)। যুক্তরাষ্ট্র এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে গাজায় যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু কার্যত সেখানে ফিলিস্তিনি হত্যা বন্ধ হয়নি। মূলত ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের রেকর্ড ক্রমেই নানা অচলাবস্থায় ভরে যাচ্ছে।

বিশ্বের নেতারা এমন একটি সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে, যখন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রভাব কমতে শুরু করতে পারে। তবে তখনো ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হতে আড়াই বছরের কম সময় বাকি থাকবে।

ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক মিত্রই এরই মধ্যে ইরান সংঘাতে সহায়তা দেওয়ার জন্য ট্রাম্পের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। এই যুদ্ধ শুরু করার আগে ট্রাম্প তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেননি।

জাতিসংঘের চলতি অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মিত্র ট্রাম্পের সমালোচনাও করেছেন। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা ট্রাম্পের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি। তাঁদের একজন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি বিশ্বে ‘জঙ্গলের আইন’ ফিরে আসার বিষয়ে সতর্ক করেন। মাখোঁ বলেন, দেশগুলো এখন এমন এক বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে হয়তো শক্তি ও জবরদস্তিই নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি হবে। অথবা একটি ‘সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজ’ গড়ে উঠবে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা পরোক্ষভাবে ট্রাম্পের সমালোচনা করেন। তিনি তাঁর দেশের অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের নিন্দা জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের জলসীমায় টহল দেওয়ার জন্য বিমানবাহী রণতরি প্রয়োজন নেই। অপরাধে অর্থ ও অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধ করতে আমাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্প ‘দেখানোর জন্য কিছু করার বিষয়ে চিন্তিত নন, তিনি ফলাফল নিয়ে চিন্তিত’। তিনি আরও বলেন, কিছু নেতা প্রকাশ্যে যা বলেছেন, তাঁরাই আবার ব্যক্তিগতভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যা বলেছেন, তা মেলে না।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ

ট্রাম্পের প্রভাব কমে যাওয়ার আরেকটি লক্ষণ দেখা গেছে ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে। তিনি ইউক্রেন ও রাশিয়াকে অন্তত সীমিত পরিসরে জ্বালানি অবকাঠামোয় যুদ্ধবিরতিতে রাজি করানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এ প্রচেষ্টা খুব একটা এগোয়নি।

ট্রাম্প ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে একটি চুক্তির কথা তুলে ধরেছেন। এর আওতায় বিশাল এই আর্কটিক দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে এটি তাঁর প্রথম দিকের চাওয়ার তুলনায় অনেক কম। শুরুতে তিনি গ্রিনল্যান্ডের ‘মালিক’ হতে চেয়েছিলেন। প্রয়োজনে ন্যাটোরই আরেক সদস্যের কাছ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে ভূখণ্ডটি দখলের হুমকিও দিয়েছিলেন।

ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার এক্সে লিখেছেন, ‘এক বছর আগে খুব কম দেশই ট্রাম্পের বিরোধিতা করার সাহস পেত। এখন কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান, রাশিয়াসহ অন্যরা আরও বেশি করে “না” বলতে প্রস্তুত।’

একপর্যায়ে ট্রাম্প নিজেও হয়তো ভাবতে শুরু করেছিলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আসলে তাঁর প্রভাব কতটা। জাতিসংঘে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ হিসেবে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘দেখা যাক আমার আদৌ কোনো ক্ষমতা আছে কি না। হয়তো আছে, আবার হয়তো নেই। খুব জলদিই আমরা তা জানতে পারব।’

সামরিক মহড়া দেখছেন (বাঁ থেকে) চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিইউয়ান, দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের বারান্দায়, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সামরিক মহড়া দেখছেন (বাঁ থেকে) চীনের ফার্স্ট লেডি পেং লিইউয়ান, দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের বারান্দায়, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Saturday, September 26, 2026

লোকদেখানো হলেও নিজের সিদ্ধান্তেই ঠিকমতো দেখানো হলো না ট্রাম্পের by হাসান ফেরদৌস

বিশ্লেষণঃ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাঁকজমক পছন্দ করেন। এ বছরের মে মাসে বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তাঁকে চোখধাঁধানো অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। এবার পালা ছিল ট্রাম্পের। বুধবার বিমানবন্দরে নিজে গিয়ে অতিথিকে স্বাগত জানালেন তিনি। পরদিন হোয়াইট হাউসে সির সম্মানে হাজির করা হলো প্রায় পাঁচ শ সামরিক সদস্যকে। ছিল কুচকাওয়াজ, সামরিক বিমানের মহড়া আর সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় ভোজ।

পুরো আয়োজন যেন ক্যামেরার জন্যই সাজানো। অথচ প্রধান মার্কিন টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলোর যৌথ ভিডিও ক্যামেরা ছিল না সেখানে। কয়েক দিন আগে ট্রাম্প ‘ভুয়া সংবাদ’ পরিবেশনের অভিযোগে সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোর সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন। প্রতিবাদে প্রধান নেটওয়ার্কগুলো প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানের জন্য যৌথ ভিডিও সরবরাহ বন্ধ রাখে। আদালতের নির্দেশে তিন প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার ফিরলেও সিকে দেওয়া অভ্যর্থনার সময় সেই অচলাবস্থা কাটেনি। অন্য সংবাদমাধ্যম অনুষ্ঠানটি ধারণ করেছে; তবু ট্রাম্প যে টেলিভিশন-দৃশ্য তৈরি করতে চেয়েছিলেন, তার প্রচারই বাধাগ্রস্ত হলো।

লোকদেখানো অনুষ্ঠান, অথচ নিজের সিদ্ধান্তের কারণেই লোককে ঠিকমতো দেখানো গেল না।

অতিথি আপ্যায়নের পাশাপাশি ট্রাম্প সির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতাও তুলে ধরতে চেয়েছেন। তাঁদের বন্ধুত্বের কথা বলেছেন বারবার; রাষ্ট্রীয় ভোজে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তা বয়ে আনে, এমন সম্পর্ক গড়ার আশা প্রকাশ করেছেন। সির সুর ছিল অপেক্ষাকৃত সংযত। প্রতিযোগিতা থাকবেই, কিন্তু তাকে এমন মল্লযুদ্ধে পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে একজনের জয় মানেই অন্যজনের পরাজয়।

সৌজন্যের আড়ালে বিরোধগুলো অবশ্য অটুট। বাণিজ্যযুদ্ধ আপাতত সাময়িক বিরতিতে রয়েছে, স্থায়ী মীমাংসা হয়নি। বিরল খনিজের সরবরাহ এবং উন্নত প্রযুক্তির ওপর বিধিনিষেধ নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তাইওয়ান প্রশ্নে সি চান ওয়াশিংটন স্বাধীনতার বিরোধিতা করুক; যুক্তরাষ্ট্র এত দিন বলেছে তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে না। এই দুই অবস্থানের ফারাক ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু কূটনীতিতে তার গুরুত্ব অনেক।

ইরান নিয়েও অস্বস্তি আছে। চীন ইরানের তেলের বড় ক্রেতা; নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য চালু রাখার ব্যবস্থার খবরও প্রকাশিত হয়েছে। সামরিক সরঞ্জাম–সংক্রান্ত কিছু অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা অবশ্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ট্রাম্প চান ইরান যুদ্ধ অবসানে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে বেইজিং সহায়তা করুক। ইরান যুদ্ধ বন্ধে আলোচনায় ফেরার পক্ষে সি কথা বলেছেন, কিন্তু ইরানকে মার্কিন শর্ত মানাতে চাপ দেওয়ার কোনো প্রকাশ্য অঙ্গীকার করেননি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে চায় দুই দেশই। একই সঙ্গে বিপজ্জনক কোনো এআই-সংকট দেখা দিলে দ্রুত যোগাযোগের প্রয়োজনও তারা স্বীকার করছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সে ধরনের ঘটনার বিষয়ে পরস্পরকে সতর্ক করার একটি ব্যবস্থার প্রস্তাব করেছেন। প্রেসিডেন্ট সি এআই মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার এবং সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু সতর্কবার্তা আদান-প্রদানের কোনো চুক্তি হয়েছে, এমন ঘোষণা এখনো আসেনি। চীন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পক্ষে হলেও নিজের এআই উন্নয়নের ওপর মার্কিন বাধা কিংবা দেশের ভেতরে প্রযুক্তির রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে রাজি—এমন লক্ষণ নেই।

ওয়াশিংটনে তাই আপাতত সবচেয়ে দৃশ্যমান অর্জনটি রাজনৈতিক নয়, আনুষ্ঠানিক। কুচকাওয়াজ, খানাপিনা, পারস্পরিক পিঠ চুলকানো। কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো মেলেনি। যত দিন সেই উত্তর নেই, তত দিন এই শীর্ষ বৈঠকের ছবি অনেক; ফলাফল অল্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ছবি: এএফপি

Friday, September 25, 2026

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে হতাশ ট্রাম্প

জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দুই নেতার শীর্ষ বৈঠকে সৌজন্য ও আনুষ্ঠানিকতার কমতি ছিল না। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বাণিজ্য, তাইওয়ান কিংবা ইরান ইস্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল বিষয়গুলোতে বড় কোনো অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকের পর দুই নেতা ও তাদের স্ত্রীদের সম্মানে হোয়াইট হাউসে আয়োজন করা হয় রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের। কালো টাইয়ের আনুষ্ঠানিক পোশাকে আয়োজিত ওই নৈশভোজে তিলের আবরণে পরিবেশিত শি-বাসসহ বিভিন্ন পদ রাখা হয়। অতিথিদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের অনেক শীর্ষ নির্বাহী।

হোয়াইট হাউসের বাইরে অবশ্য ছিল ভিন্ন দৃশ্য। একদল বিক্ষোভকারী চীনবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। লালগালিচা পাতা সিঁড়িতে দুই নেতা ছবি তোলার সময়ও তাদের স্লোগান শোনা যাচ্ছিল।

নৈশভোজে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্যের কথা উল্লেখ করলেও শি জিনপিংয়ের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, দুই নেতা ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করলেও দুই দেশের জনগণের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে এবং তাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কও আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো।

এরপর অতিথিদের নির্মাণাধীন নতুন বলরুম ঘুরিয়ে দেখান ট্রাম্প। এর কয়েক ঘণ্টা আগেও তিনি শিকে হোয়াইট হাউস কমপ্লেক্সে তৈরি করা একটি নতুন হেলিপ্যাড দেখিয়েছিলেন। ওয়াশিংটনের অবকাঠামো ও স্থাপনা পুনর্গঠনে ট্রাম্পের আগ্রহের বিষয়টি এসব আয়োজনেও প্রতিফলিত হয়।

অন্যদিকে শি জিনপিং বলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি বিষয়ে দুই পক্ষ অভিন্ন বোঝাপড়ায় পৌঁছেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আলোচনা চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে নতুন কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিয়েছে। তবে কোন কোন বিষয়ে কী ধরনের সমঝোতা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাননি।

শি বলেন, বিশ্বের বড় দেশ হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক পরিচালনায় নতুন ধরনের পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজন রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

আলোচনায় তাইওয়ান ইস্যু

বৃহস্পতিবার বিকেলে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে তাইওয়ান ইস্যু উত্থাপন করেন শি জিনপিং। চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তিনি ওয়াশিংটনকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানান। তবে বৈঠক নিয়ে হোয়াইট হাউসের নিজস্ব বিস্তারিত বিবরণ তখনও প্রকাশ করা হয়নি।

ধারণা করা হচ্ছিল, শি জিনপিং ট্রাম্পের কাছে তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধের বিষয়টি তুলতে পারেন। এর আগে মে মাসে চীন সফরের পর ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তাইওয়ানের জন্য প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন না দিয়ে তিনি তা স্থগিত রেখেছেন। সে সময় তিনি এটিকে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

ট্রাম্পের ওই অবস্থান নিয়ে এশিয়ার কয়েকটি মার্কিন মিত্রদেশের পাশাপাশি তার নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির কিছু সদস্যও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাদের আশঙ্কা ছিল, অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন কমিয়ে দিতে পারে।

তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন। দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও বেইজিং নাকচ করেনি।

বাণিজ্যযুদ্ধ ও বদলে যাওয়া সুর

ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক এমন এক সময়ে হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি কাটেনি। তবে বৃহস্পতিবার ট্রাম্পের বক্তব্যে আগের কঠোর অবস্থানের বদলে ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও দুই দেশের বাণিজ্যিক অগ্রগতির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পায়।

ওয়াশিংটনে পৌঁছানোর পর শিকে স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প তার সঙ্গে ‘দারুণ বন্ধুত্বের’ কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, মে মাসে তার চীন সফরের পর দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।

শি অবশ্য ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে দুই দেশের জাতীয় স্বার্থের পারস্পরিক নির্ভরতার ওপর বেশি জোর দেন। তার মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা স্বাস্থ্যকর হওয়া উচিত। মার্কিন কোম্পানিগুলোকে চীনে স্বাগত জানিয়ে তিনি আশা প্রকাশ করেন, যুক্তরাষ্ট্রেও চীনা কোম্পানিগুলো ন্যায্য আচরণ পাবে।

দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন শি। তার মতে, এ ধরনের যোগাযোগ সংকট তৈরি হলে তা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

পূর্ব এশিয়া বিষয়ে হোয়াইট হাউসের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এডগার্ড কাগান মনে করেন, দুই নেতার বক্তব্যে তাদের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য স্পষ্ট হয়েছে। বর্তমানে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে (সিএসআইএস) কর্মরত কাগানের মতে, ট্রাম্প বিষয়টিকে মূলত শির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক হিসেবে উপস্থাপন করছেন। বিপরীতে শি বেশি সতর্ক এবং জাতীয় পর্যায়ের সম্পর্কের দিকটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।

ইরান ও এআই নিয়েও মতপার্থক্য

বৈঠকের সময় ইরান ইস্যুও আলোচনায় আসে। এর আগে জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন এবং দেশটিকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করার হুমকিও দিয়েছিলেন। তবে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় তার বক্তব্য ছিল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন সুরের।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, শি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার যুদ্ধবিরতির পথে ফিরতে এবং শেষ পর্যন্ত শান্তিচুক্তির জন্য আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিতে রাজি করানোর বিষয়ে চীনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েও দুই নেতা কথা বলেন। শি বলেন, এআইয়ের বিকাশ এমনভাবে পরিচালিত করতে হবে, যাতে এর নিয়ন্ত্রণ সবসময় মানুষের হাতে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। ফলে এ বিষয়ে প্রতীকী কিছু সমঝোতার বাইরে বড় ধরনের চুক্তিতে পৌঁছানো সহজ নয়। বিশেষ করে মার্কিন প্রযুক্তিপণ্যের ওপর আরোপিত রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ থাকলেও ওয়াশিংটন সেগুলো কঠোরভাবে বজায় রাখার পরিকল্পনা করছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

এক দশকের বেশি সময় পর ওয়াশিংটনে সি

বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশের নেতাদের মধ্যে এ বছর এটি দ্বিতীয় বৈঠক। এক দশকেরও বেশি সময় পর শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফর হওয়ায় বৈঠকটি কূটনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

আনুষ্ঠানিকতা ও ক্ষমতাধর নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া ট্রাম্পের কাছে শির এই সফর কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি জাতীয় মর্যাদার বিষয় হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

তবে বৈঠকের সরাসরি সম্প্রচার নিয়েও তৈরি হয় বিতর্ক। হোয়াইট হাউস সিএনএন, এমএস নাও ও পলিটিকোকে নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদে ওই নেটওয়ার্কগুলো ট্রাম্প ও শির বক্তব্য সরাসরি সম্প্রচার করেনি।

রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। অতিথি তালিকায় ছিলেন অ্যাপলের টিম কুক, অ্যামাজনের জেফ বেজোস, অ্যালফাবেটের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, টেসলার ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং।

তবে প্রযুক্তি খাতের এত বড় প্রতিনিধিদল উপস্থিত থাকলেও এআই ও প্রযুক্তি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলোতে তাৎক্ষণিক বড় কোনো সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ফলে আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন ও উষ্ণ কূটনৈতিক বার্তার বিপরীতে ট্রাম্প–শি বৈঠক থেকে বড় ধরনের বাস্তব সমঝোতা কতটা বেরিয়ে এসেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।

সূত্র: রয়টার্স 

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে হতাশ ট্রাম্প

Tuesday, September 15, 2026

ওয়াশিংটন–বেইজিং উত্তেজনা: যুক্তরাষ্ট্রকে মহাকাশযুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করতে বলল চীন

এএফপিঃ মহাকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে চীন। আজ মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুয়ো জিয়াকুন এ আহ্বান জানান। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র কক্ষপথে প্রথমবারের মতো অস্ত্র মোতায়েনের কথা নিশ্চিত করেছে।

এক সংবাদ সম্মেলনে মুখপাত্র জিয়াকুন বলেন, ‘মহাকাশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা ও যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া বন্ধ করা উচিত।’ তিনি মহাকাশে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরুর বিষয়েও সতর্ক করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক গতকাল সোমবার মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে এয়ার অ্যান্ড স্পেস ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি প্রকাশ করেন।

মেইঙ্ক বলেন, ‘শুধু আকাশেই নয়, মহাকাশেও আমরা আমাদের আধিপত্য বজায় রাখি, এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

তবে প্রশ্নোত্তর পর্বে মেইঙ্ক অস্ত্রগুলোর ধরন বা সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তিনি শুধু বলেন, তাঁর বক্তব্যের শব্দচয়ন ‘খুব ভেবেচিন্তে করা হয়েছে’।

ওয়াশিংটন পোস্টকে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, মেইঙ্ক যে প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে এমন সক্ষমতাও থাকতে পারে, যার মাধ্যমে কোনো শত্রুপক্ষের স্যাটেলাইট ধ্বংস করা সম্ভব।

মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনে আন্তর্জাতিকভাবে সরাসরি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী, সেখানে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন করা নিষিদ্ধ।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে ২০১৯ সালে স্পেস ফোর্স প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় তিনি মহাকাশকে বিশ্বের নবীনতম যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

গত বছর ট্রাম্প ‘গোল্ডেন ডোম’ নামে একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পুরো ভূখণ্ড সুরক্ষিত রাখার জন্য প্রস্তাবিত এ বহুস্তরীয় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থার মধ্যে মহাকাশভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ব্যবস্থাও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন। ছবি: রয়টার্স

Thursday, September 10, 2026

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে যেভাবে ইরানে ঢুকছে বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য

রয়টার্স এক্সক্লুসিভঃ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চীনের কাছে তেল বিক্রি করে এর বিনিময়ে বিভিন্ন পণ্য ও সেবা কিনতে বিনিময়ভিত্তিক এক গোপন বাণিজ্যব্যবস্থা ব্যবহার করছে ইরান। এর মাধ্যমে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন থেকে ওষুধ, যানবাহন, যোগাযোগ সরঞ্জামসহ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে দেশটি। এমনকি গত এক বছরে কয়েক মিলিয়ন ডলারের বিমান প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের চুক্তিতেও এই ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

ইরানের দুটি জ্যেষ্ঠ সূত্র এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও তিন ব্যক্তি রয়টার্সকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, এই ব্যবস্থায় ইরানি তেলের অর্থ সরাসরি আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে চীনা রপ্তানিকারকদের কাছে পাঠানো হয় না। বরং তেল বিক্রির অর্থ চীনা পণ্য আমদানির জন্য ক্রেডিট হিসেবে জমা রাখা হয়।

সূত্রগুলোর মতে, এ ব্যবস্থা ইরানের জন্য মার্কিন অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক পথ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে চীনও এতে সুবিধা পাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশটি ছাড়মূল্যে ইরানি তেল পাওয়ার সুযোগ ধরে রাখতে পারছে, পাশাপাশি ইরানে পণ্য রপ্তানিকারক চীনা ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানগুলোও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থেকে নিজেদের আড়াল রাখতে পারছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল কেনা বা পরিবহনে সহায়তা করা কিছু ছোট চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে—এমন কঠোর পদক্ষেপ থেকে এখনো বিরত রয়েছে ওয়াশিংটন।

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রচেষ্টা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে দেশটির ওপর চাপ আরো বাড়িয়েছে। গত আগস্টে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেন, দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে, নইলে তারা ডলারভিত্তিক আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

তবে এই গোপন বাণিজ্যব্যবস্থায় মার্কিন নৌ অবরোধের কী প্রভাব পড়েছে, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। গত ১৪ জুলাই অবরোধ পুনর্বহালের পর থেকে ইরানের কোনো অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে চীনে পৌঁছাতে পারেনি বলে গত সপ্তাহে জানিয়েছিল সংস্থাটি।

কীভাবে চলছে এই বাণিজ্য

রয়টার্সের তথ্যমতে, এই ব্যবস্থার অন্যতম অংশ হলো চীনে অবস্থিত ‘চুশিন’ নামে একটি অস্পষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পশ্চিমা একটি সূত্র এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আরও দুজনের ভাষ্য অনুযায়ী, চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ঝুহাই ঝেনরংয়ের হয়ে কাজ করা একটি ক্রেতা চলতি বছর পর্যন্ত প্রতি মাসে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার চুশিনে জমা দিত।

এই অর্থ ব্যবহার করা হতো ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির (এনআইওসি) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হংকং-নিবন্ধিত একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা আমদানি চুক্তির অর্থ পরিশোধে। এরপর চুশিন চীনা রপ্তানিকারক ও ইরানে অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে অর্থ পাঠাত—সম্ভবত চীনের অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।

সূত্রগুলোর হিসাবে, চুশিনের মাধ্যমে পরিচালিত ইরানি তেল বিক্রির অর্থের প্রায় ৭০ শতাংশ অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। বাকি অর্থ রাখা হয় একটি বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রতিষ্ঠানের (এসপিভি) হিসাবে। এই অর্থ ইরানে পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিল পরিশোধে ব্যবহার করা হয়।

ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র রয়টার্সকে এসপিভিটির অস্তিত্ব নিশ্চিত করেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, এসপিভিতে থাকা অর্থ দুটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে—একটি চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হয়ে কাজ করে এবং অন্যটি ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো আমদানিকারককে এসপিভির অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন দিলে ইরান-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি চীনা প্রতিষ্ঠানে তা জানায়। এরপর সংশ্লিষ্ট চীনা সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হয়।

তবে রয়টার্স চীনের কোনো কোম্পানি নিবন্ধন নথিতে ‘চুশিন’ নামে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হয়ে কাজ করে বলে দাবি করা প্রতিষ্ঠানগুলোরও কোনো নির্ভরযোগ্য সরকারি রেকর্ড পাওয়া যায়নি। একটি সূত্র এমনকি বলেছে, চুশিন হয়তো শুধু একটি স্প্রেডশিটে থাকা নাম।

নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি এড়ানোর কৌশল

এই ব্যবস্থাটি অন্তত ২০২১ সাল থেকে চালু রয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। শুরুতে ইরানে ওষুধ ও কোভিড-১৯ টিকা সরবরাহের জন্য এটি ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ বাড়ালে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

সূত্রগুলোর হিসাবে, গত এক বছরে এই এসপিভির মাধ্যমে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলার লেনদেন হয়েছে।

ইরানের তেল রপ্তানির ওপর চীনের নির্ভরতা এই ব্যবস্থার গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। পণ্যবাজারবিষয়ক তথ্য ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের সমুদ্রপথে পাঠানো তেলের ৮০ শতাংশের বেশি চীন কিনেছে, যার পরিমাণ ছিল গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল।

ইরান ও চীন ২০২১ সালে জ্বালানি ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি করে। তবে সেই চুক্তির বিস্তারিত এখনো খুব বেশি প্রকাশ্যে আসেনি।

যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রভাষক আন্দ্রেয়া ঘিসেল্লির মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা ব্যবহার করে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চাপ মোকাবিলা করছে এবং দেখাচ্ছে যে দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে দেশটিকে সহজে বাধ্য করা যাবে না।

রাজনৈতিকসংবাদ

তবে তার মতে, চীনের নেতৃত্ব একই সঙ্গে নিজেদের ব্যাংক ও কোম্পানিগুলোকে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকেও দূরে রাখতে চায়। তাঁর ভাষায়, এ ক্ষেত্রে চীনের লক্ষ্য হলো ‘দায় অস্বীকার করার মতো পর্যাপ্ত সুযোগ’ রাখা।

চীন রয়টার্সকে জানিয়েছে, তারা প্রতিবেদনে বর্ণিত পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত নয়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন নেই—এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে চীন।

ইরানের জাতিসংঘ মিশন এবং দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। একইভাবে ঝুহাই ঝেনরং ও ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানিও তাদের কথিত ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য করেনি। মার্কিন প্রশাসনও এই নির্দিষ্ট বাণিজ্য ব্যবস্থা নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে যেভাবে ইরানে ঢুকছে বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য
ছবি: সংগৃহীত।

Friday, September 4, 2026

মহাকাশে ছায়াযুদ্ধ: যেভাবে সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন

পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে এবার মহাকাশের কক্ষপথে দানা বাঁধছে এক নতুন লড়াই। একে অপরের স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ শনাক্ত করা, অনুসরণ করা, এমনকি অচল বা ধ্বংস করার সক্ষমতা অর্জনে মরিয়া হয়ে উঠেছে বিশ্বের দুই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মহাকাশ যুদ্ধের এই নেপথ্য প্রস্তুতির চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মহাকাশে বেইজিংয়ের তৎপরতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক। গত জুনে চীন একটি গোপন চালকবিহীন মহাকাশযান থেকে কক্ষপথে একটি ছোট স্যাটেলাইট অবমুক্ত করে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘লিওল্যাবস’ জানায়, ওই ছোট স্যাটেলাইটটি অন্য একটি চীনা স্যাটেলাইটকে প্রদক্ষিণ করে পুনরায় মূল যানে ফিরে আসে।

গবেষকরা বলছেন, চীন এমন ‘হান্টার’ বা শিকারি স্যাটেলাইট তৈরি করছে যা প্রতিপক্ষের মহাকাশযানকে অনুসরণ করতে এবং প্রয়োজনে সেটিকে ধরে ফেলতে বা জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের প্রধান জেনারেল চান্স সাল্টজম্যান সতর্ক করে বলেছেন, চীনের এই স্থল ও মহাকাশভিত্তিক অস্ত্র তৈরির গতি অত্যন্ত দ্রুত এবং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি ‘ব্যাপক হুমকি’।

পরাশক্তিদের গোপন প্রযুক্তির লড়াই

পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রও। চীনের মতো ওয়াশিংটনেরও রয়েছে ছোট শাটল আকৃতির গোপন চালকবিহীন মহাকাশযান। আধুনিক যুদ্ধে স্যাটেলাইট এখন স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। ইউক্রেন কিংবা মধ্যপ্রাচ্য সব যুদ্ধেই যোগাযোগ, গোয়েন্দা তথ্য এবং নেভিগেশনের জন্য স্যাটেলাইট অপরিহার্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন কেবল তথ্য সংগ্রহ নয়, স্যাটেলাইটগুলোকে সক্রিয় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছে। লেজার দিয়ে সেন্সর অচল করা, জ্যামিং প্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা কিংবা সরাসরি অন্য স্যাটেলাইট দখল করে নেওয়া, সবই এখন ভবিষ্যতের মহাকাশ যুদ্ধের অংশ। মার্কিন বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এভারেট ডলম্যানের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সক্ষমতা কোনোভাবে ব্যাহত হলে পৃথিবীতে দেশটির বিশাল সামরিক শক্তি পঙ্গু হয়ে পড়বে।

একাট্টা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা

মহাকাশে চীনের আধিপত্য রুখতে মিত্রদের নিয়ে জোট বাঁধছে ওয়াশিংটন। গত বছর সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য মহাকাশে তাদের প্রথম যৌথ সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। কলোরাডোর একটি ঘাঁটি থেকে পরিচালিত এই অভিযানে একটি মার্কিন স্যাটেলাইটকে অত্যন্ত সুকৌশলে একটি ব্রিটিশ স্যাটেলাইটের খুব কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।

মজার বিষয় হলো, সেই সময় তাদের নিচ দিয়েই অতিক্রম করছিল চীনের ‘শিয়ান-১২-০১’ স্যাটেলাইট। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ছিল বেইজিংয়ের প্রতি একটি ‘কৌশলগত বার্তা’। এর মাধ্যমে মিত্রদেশগুলো তাদের সক্ষমতা ও ঐক্যের জানান দিয়েছে, যাতে চীন তাদের মহাকাশ সম্পদে হস্তক্ষেপ করার সাহস না পায়।

ব্যস্ত কক্ষপথ ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

বর্তমানে পৃথিবীর কক্ষপথ ক্রমেই জনাকীর্ণ হয়ে উঠছে। একদিকে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স-এর ১১ হাজার স্টারলিংক স্যাটেলাইট, অন্যদিকে চীনের নিজস্ব স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তৈরির পরিকল্পনা, সব মিলিয়ে মহাকাশ এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কর্মসূচিতেও মহাকাশভিত্তিক ইন্টারসেপ্টর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিজ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত মহাকাশ এখন ভূ-রাজনীতির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নতুন ময়দান। যেখানে গোপন অভিযান আর অত্যাধুনিক প্রযুক্তির পাল্টাপাল্টি প্রদর্শনীতে ভবিষ্যতের ‘স্টার ওয়ার্স’ বা মহাকাশ যুদ্ধের সলতে পাকানো হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স

মহাকাশ নজরদারিতে মার্কিন বাহিনী। ছবি: রয়টার্স
মহাকাশ নজরদারিতে মার্কিন বাহিনী। ছবি: রয়টার্স

Thursday, September 3, 2026

মধ্যপ্রাচ্যকে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যানের আহ্বান শি জিনপিংয়ের

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয়টি বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

বুধবার (০২ সেপ্টেম্বর) মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে বৈঠকে এ আহ্বান জানান শি জিনপিং। এক দশক পর প্রথমবারের মতো কায়রো সফরে গিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করলেন। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছে বেইজিং।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, আল-সিসির সঙ্গে বৈঠকে শি বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই এই নীতি মেনে চলতে হবে যে মধ্যপ্রাচ্যের জনগণই তাদের নিজেদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক। বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে হবে এবং শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে সংলাপ জোরদারে আঞ্চলিক দেশগুলোকে সমর্থন করতে হবে।’

মিসরের রাজধানী কায়রোর ইত্তিহাদিয়া প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে শি জিনপিংকে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। এ সময় শিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ২১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হয়।

এরপর দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে বৈঠকে বসেন।

চার বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্য সফরে গেলেন শি। কয়েক মাস ধরে চলা সংঘাতে বাণিজ্য ব্যাহত, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর অঞ্চলটির মার্কিন মিত্ররা নিজেদের কৌশলগত সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়ন করছে।

মিসর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা অংশীদার। দেশটি ওয়াশিংটনের কাছ থেকে বছরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা পায়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে কায়রো।

শি আরও বলেন, আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে মিলে নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করতে প্রস্তুত চীন। হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে সংঘাতের কারণে নৌ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সিনহুয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই নেতা নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী সমন্বয় আরও জোরদারে সম্মত হয়েছেন। যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ ডেটা সেন্টার, সেমিকন্ডাক্টর ও গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর সরবরাহ শৃঙ্খলে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগে পরস্পরের মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়েও একমত হয়েছে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা মিসরের আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব বহুমুখী করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। শির সফরের আগে প্রকাশিত এক নিবন্ধে প্রেসিডেন্ট সিসি বলেন, বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ার সময়ে মিসর ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ নীতি অনুসরণ করছে।

সাবেক মিসরীয় কূটনীতিক আয়মান জেইনেলদিন রয়টার্সকে বলেন, ‘চীনসহ বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে চায় মিসর। ফলে দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গি এক জায়গায় এসে মিলছে।’

অন্যদিকে চীনের জন্য মিসরের আঞ্চলিক প্রভাব ও কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে অর্থনৈতিক ভূমিকা বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমানোর প্রচেষ্টায় কায়রোকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখছে বেইজিং।

রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক এইচ এ হেলিয়ার বলেন, ‘বেইজিংয়ের কাছে মিসরের গুরুত্ব অনেক। দেশটির বড় অভ্যন্তরীণ বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিন ইস্যুসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক বিষয়ে মিসরের যথেষ্ট কূটনৈতিক প্রভাব রয়েছে। আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দেশটি গুরুত্বপূর্ণ।’

গত মাসে চীন ও মিসরের যৌথ সামরিক মহড়ায় দুই দেশের বাড়তে থাকা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ‘ঈগলস অব সিভিলাইজেশন’ নামের ওই মহড়ায় চীনের তৈরি জে-১৬ যুদ্ধবিমান এবং ফ্রান্সের তৈরি রাফাল যুদ্ধবিমানের মধ্যে বিরল বিমানযুদ্ধের মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়।

শির সফর ঘিরে কয়েক দিন ধরেই মিসরের রাজধানী কায়রোতে ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা যায়। শহরের বিভিন্ন সড়ক চীনের পতাকা এবং মিসরের স্ফিংস ও চীনের গ্রেট ওয়ালের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার ছবি দিয়ে সাজানো হয়।

সুয়েজ খাল ও ১১ কোটির বেশি জনসংখ্যার মিসর চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বাজার। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্য আমদানি করেছে দেশটি।

২০১৪ সালে প্রেসিডেন্ট সিসির চীন সফর এবং দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে মিসরে চীনের বিনিয়োগ দ্রুত বেড়েছে। চীনা কোম্পানিগুলো কনটেইনার বন্দর, সবুজ হাইড্রোজেন প্রকল্প এবং লোহার পাইপ, গাড়ির টায়ার ও স্যাটেলাইট তৈরির কারখানায় কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।

মিসরের মন্ত্রিসভা জানিয়েছে, সুয়েজ খাল অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

বুধবার মিসরীয় কর্তৃপক্ষ ওই অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনের উন্নয়ন করা একটি শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। একই দিনে চীনের জেডসি রাবার গ্রুপ ৫০ কোটি ডলারের একটি টায়ার উৎপাদন কমপ্লেক্স নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি প্রাথমিক চুক্তি সই করেছে।

সূত্র : রয়টার্স

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। ছবি: রয়টার্স
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি। ছবি: রয়টার্স

Monday, August 31, 2026

হিমালয়ের উজান-ভাটির রাজনীতি

নেপালের হড়পা বানঃ হিমালয় পর্বতমালা কেবল এশিয়ার জলবায়ু ও প্রধান নদীগুলোর উৎস নয়, এটি আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অন্যতম স্পর্শকাতর ভৌগোলিক সীমান্ত। সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া প্রলয়ংকরী হড়পা বান ও হিমবাহ ধস কেবল প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা হিমালয় অঞ্চলের তিনটি প্রধান অংশীদার—চীন (উজান), নেপাল (মধ্যবর্তী) ও ভারতের (ভাটি) মধ্যকার জটিল পানি-কূটনীতি ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

পানির প্রবাহ, স্যাটেলাইট তথ্য আদান-প্রদান এবং বাঁধ নির্মাণের মেগা প্রজেক্টকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের ভূরাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। হিমালয় অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক কৌশলে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে উজান বা আপস্ট্রিম দেশ চীন। তিব্বত মালভূমি থেকে উৎপন্ন আন্তর্জাতিক নদীগুলো (যেমন—ত্রিশূলি, কোশি, সিন্ধু ও ব্রহ্মপুত্র) নেপাল ও ভারতের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী আন্তঃসীমান্ত নদীতে নদীর পানির স্তর, হিমবাহের অবস্থা ও বন্যার আগাম সতর্কবার্তা ভাটির দেশকে জানানো জরুরি। কিন্তু কাঠমান্ডু ও দিল্লির দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ, বেইজিং সময়মতো হাইড্রোলজিক্যাল বা স্যাটেলাইট ডাটা শেয়ার করে না।

এ ছাড়া চীন তাদের তিব্বত সীমান্তে কঠোর তথ্য সেন্সরশিপ বজায় রাখে। এই তথ্যের অপ্রতুলতা নেপালের জন্য আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা তৈরি করা অসম্ভব করে তোলে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত ও নদী-সংক্রান্ত তথ্য গোপন বা নিয়ন্ত্রণ করা চীনের একটি কৌশলগত হাইড্রো-লিভারেজ বা পানি-কূটনীতির অস্ত্র, যা দিয়ে ভাটির দেশগুলোকে চাপে রাখা যায়।

নেপালের প্রাকৃতিক জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৃহৎ অর্থনীতি—ভারত ও চীন—তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে চীন নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোয় বিশাল জলবিদ্যুৎ ও টানেল প্রকল্প গড়ে তুলছে।

এদিকে ভারত নেপালের শত শত মেগাওয়াটের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং নীতি গ্রহণ করেছে যে, যেসব প্রকল্পে চীনা ঠিকাদার বা অর্থায়ন থাকবে, সেই বিদ্যুৎ ভারত ক্রয় করবে না।

দুই পরাশক্তির এই অবকাঠামোগত ও ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ফলে নেপালের সংবেদনশীল হিমালয় অঞ্চলে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনা না করেই একের পর এক বাঁধ ও টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এই অতি-অবকাঠামো নির্মাণই পাহাড়ি অঞ্চলকে আরও বেশি ধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে ফেলছে।

যে কোনো বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর ত্রাণ ও উদ্ধার অভিযান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের একটি দৃশ্যমান মাধ্যমে পরিণত হয়। ভারত সাধারণত নেপালের দুর্যোগে প্রথম সাড়া দানকারী দেশ হিসেবে কাজ করে। বিমান, উদ্ধারকারী দল ও কারিগরি বিশেষজ্ঞ পাঠিয়ে দিল্লি নেপালি জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদের সফট পাওয়ার জোরদার করতে চায়।

এদিকে চীন তাদের প্রকল্প ও অবকাঠামো রক্ষার অজুহাতে উদ্ধারকারী ও কারিগরি টিম পাঠায়। বেইজিং মূলত কাঠমান্ডুর সরকারি ও কৌশলগত পরিকাঠামোতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার দিকে মনোযোগ দেয়।

নেপালে সংঘটিত যে কোনো বন্যা বা হিমবাহ ধস ভারতের জন্যও একটি জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা। নেপালের কোশি ও গণ্ডক অববাহিকার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা অতিরিক্ত পানি একযোগে নামলে ভারতের সীমান্ত ঘেঁষা রাজ্যগুলোয় ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া নেপাল থেকে ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহের যে আঞ্চলিক গ্রিড গড়ে উঠছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ট্রানজিট নীতি হুমকির মুখে পড়ে।

হিমালয় অঞ্চলে নেপালের মতো ছোট রাষ্ট্রগুলো ভারত ও চীনের পানি-কূটনীতি এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে স্যান্ডউইচ বা বাফার স্টেট হিসেবে আটকা পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বরফ ধস ও বন্যার মাত্রা বাড়ছে, তখন ডাটা গোপনীয়তা ও মেগা প্রকল্পের প্রতিযোগিতা পুরো অঞ্চলের জন্যই একটি ভূরাজনৈতিক টাইমবোমে পরিণত হচ্ছে।

হিমালয়ের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে এবং মানবিক ট্র্যাজেডি এড়াতে ভারত, চীন ও নেপালের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় ‘হিমালয় নদী কমিশন’ বা যৌথ পানি-ব্যবস্থাপনা চুক্তি এখন সময়ের দাবি।

হিমালয়ের উজান-ভাটির রাজনীতি
হিমালয়ের উজান-ভাটির রাজনীতি

Wednesday, August 26, 2026

ইরানের ওপর নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় মুখ খুলল চীন ও কাতার

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে চীন ও কাতার। দুই দেশই বলেছে, একতরফা নিষেধাজ্ঞা সংকটের সমাধান নয়; বরং কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখা প্রয়োজন। ইরাকি সংবাদমাধ্যম শাফাক নিউজ এ খবর প্রকাশ করেছে।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক আইন বা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া কোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞা চীন সমর্থন করে না। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে এবং বেইজিং নিজের বৈধ স্বার্থ রক্ষা করবে।

চীন বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে বড় তেল ক্রেতা। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার প্রথম দফায় বড় কোনো চীনা ব্যাংককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।

একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের সমালোচনা করে কাতারও। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, কাতার এখনো ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, উত্তেজনা আরও বাড়লে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, পুরো বিশ্বেই পড়বে।

গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক অভিযান শুরু করে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, এই অভিযানের লক্ষ্য ইরান এবং দেশটির অর্থনীতিকে সহায়তা করা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বাড়ানো।

এই পদক্ষেপের আওতায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ, তেল খাত ও অন্যান্য নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৬০ জন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল সম্পদ, প্রযুক্তি, স্বর্ণ, বিমান পরিবহন ও নৌপরিবহন খাতেও সম্ভাব্য গৌণ নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে বলেন, যেসব দেশ বা কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবে, ভবিষ্যতে তারা মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারাতে পারে। তবে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলার জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হবে।

এদিকে ইরানের অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় তেহরান পুরোপুরি প্রস্তুত। তিনি দাবি করেন, চীন, রাশিয়াসহ ইরানের মিত্র দেশগুলো ওয়াশিংটনের এই চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে।

অন্যদিকে পাকিস্তানও সমান্তরালভাবে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরানে পাকিস্তান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বৈঠকের পর দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উত্তেজনা কমানো এবং হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

আইআরজিসির পাহাড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে। ছবি : এএফপি
আইআরজিসির পাহাড়ায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল করছে। ছবি : এএফপি > হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলে সতর্ক করেছে তেহরান। এসব জাহাজকে জরিমানা, আটক এমনকি জব্দও করা হতে পারে। খবর রয়টার্সের। সোমবার (২৪ আগস্ট) পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে এ সতর্কবার্তা দিয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থা না মানা জাহাজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। ফলে ইরানের এ হুঁশিয়ারিতে এই জলপথ ব্যবহারকারী জাহাজের মালিক ও ভাড়াকারীদের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। প্রণালিটি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে ইরান সম্প্রতি পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষ নামে নতুন একটি সংস্থা গঠন করেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরসংক্রান্ত যাত্রার ক্ষেত্রে নিয়ম না মানা হিসেবে চিহ্নিত জাহাজগুলোর হালনাগাদ তালিকা অনুসরণ করতে হবে পণ্য মালিকদের।

Monday, August 24, 2026

রোবট মানুষের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারছে; কিন্তু সূক্ষ্ম কাজে কতটা দক্ষ

রয়টার্সঃ চীনের হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবটগুলো যে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির অ্যাথলেটের চেয়েও দ্রুত দৌড়াতে পারে, তা তারা দেখিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু কোনো কিছু প্যাকেটজাতকরণ ও গুদামের কাজের পাশাপাশি বিদ্যুতের তার–সংযোগের মতো সূক্ষ্ম কাজ রোবট মানুষের মতো নিখুঁতভাবে করতে পারবে কি না, সেটিই এখন তাদের সামনে আসল পরীক্ষা।

 শনিবার (২২ আগস্ট) থেকে বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। এখানে মানুষের খেলাধুলার আদলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা রয়েছে। পাশাপাশি সিমুলেটেড কারখানা, রেস্তোরাঁ, অফিস ও জরুরি পরিস্থিতিতে রোবটের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্যও বিভিন্ন আয়োজন রাখা হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত এই আয়োজনে মোট ৫১টি ইভেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং ২১টি বিভিন্ন পরিস্থিতিভিত্তিক প্রতিযোগিতা। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব ইভেন্টের ৪০ শতাংশের বেশি রোবটকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।

শনিবার ১০০ মিটার দৌড়ে দুটি রোবট অ্যাথলেটদের ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এই রেকর্ডের মালিক বিশ্বের দ্রুততম অ্যাথলেট উসাইন বোল্ট। রোবটের ক্ষেত্রে এটা ২০২৫ সালের তুলনায় বড় অগ্রগতি। গত বছর ১০০ মিটার দৌড়ে বিজয়ী রোবটটি ২০ সেকেন্ডের বেশি সময় নিয়েছিল।

তবে রোবটগুলো দৌড় শেষে থামতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে। ফিনিশিং লাইনের কয়েক মিটার পর আয়োজকেরা যে মোটা ম্যাট (মাদুর) রেখেছিলেন, তারা সেগুলোতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা খায়।

হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের এবারের আসরে ১০০ মিটার দৌড়ের বিজয়ী রোবটটির একই মডেলের আরেকটি রোবট ৪০০ মিটার দৌড়ে ৩৯ দশমিক ৭ সেকেন্ডে প্রতিযোগিতা শেষ করে। এতে আরেকটি নতুন রেকর্ড হয়। ভেঙে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েড ভ্যান নিকের্কের ৪৩ দশমিক ০৩ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ড।

দর্শক ও রোবোটিকস খাতে বিনিয়োগকারী শু ছিয়াওশেং বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার প্রতিযোগিতার তীব্রতা বেশি। এর ফলে রোবটের ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও তাপনিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ছে।’

ছিয়াওশেং মনে করেন, ‘চীনের শিল্প খাতের উন্নয়নে এর (রোবটের) বিশাল গুরুত্ব রয়েছে।’

এবারের গেমসে কিছু রোবট দড়ি টানাটানি ও ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতাতেও অংশ নিয়েছে। তাই চি ও ‘পিচ-পট’-এর মতো ঐতিহ্যবাহী চীনা খেলাতেও দেখা যাবে রোবটের অংশগ্রহণ। পিচ-পটে সরু মুখের পাত্রে তিরের মতো কাঠি ছুড়ে ফেলতে হয়।

ছোটখাটো ভুলেই আসল পরীক্ষা

দৃষ্টিনন্দন এসব প্রদর্শনীর বাইরে রোবটগুলো বাস্তব জগতের ছোটখাটো সমস্যা কতটা সামলাতে পারে, সেটিই হবে আরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ছোটখাটো সমস্যার উদাহরণ হিসেবে কোনো বিদ্যুতের তার ভুল কোণে থাকা, কোনো কিছু হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া, প্যাকেটের অবস্থান বদলে যাওয়া কিংবা কাজের কোনো ধাপে ভুল করার কথা বলা যায়।

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে রোবট কোনো বস্তু ঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারে কি না, নির্ভুলভাবে হাত ও শরীরের অবস্থান ঠিক করতে পারে কি না, নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে কি না এবং মানুষের সাহায্য ছাড়া ভুল শুধরাতে পারে কি না, তা বোঝা যাবে।

রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লুমোস রোবোটিকসের প্রধান নির্বাহী ইউ চাও বলেন, এই প্রতিযোগিতা রোবটের হার্ডওয়্যার উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে শিল্পটির সক্ষমতাও তুলে ধরা সম্ভব। তবে রোবটগুলো বাস্তব জীবনের সমস্যা কতটা ভালোভাবে সমাধান করতে পারে, তার ওপরই দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রতিযোগিতার গুরুত্ব নির্ভর করবে।

ইউ চাও আরও বলেন, ‘বাস্তব (জগতের) কাজের শেষ ধাপগুলোতে রোবট কাজ করতে পারলেই এর প্রকৃত মূল্য তৈরি হবে। শুধু দৌড়ানো আর লাফানো দক্ষতা বাড়ায় না।’

মানুষের খেলাধুলার আদলে তৈরি পরিচিত ইভেন্টগুলোর পাশাপাশি রোবটগুলো বৈদ্যুতিক গাড়িতে চার্জ দেওয়া, রেস্তোরাঁয় কাজ করা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। শিল্পকারখানায় যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানো ও মালামাল তোলার ইভেন্টও রয়েছে। বিদ্যুতের তার সংযোগের একটি প্রতিযোগিতায় রোবটের দৃষ্টিশক্তি, যান্ত্রিকভাবে সঠিক সংযোগ স্থাপন এবং শক্তিনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা যাচাই করা হবে।

বেইজিংভিত্তিক রোবট নির্মাতা স্টার্টআপ গ্যালবট জানিয়েছে, তারা স্বয়ংক্রিয় হিউম্যানয়েড রোবটের টেনিস ম্যাচ আয়োজন করবে। এতে একক ও দ্বৈত দুই ধরনের ম্যাচেই রোবট অংশ নেবে। বলের গতিপথ অনুসরণ, সার্ভ করা ও প্রতিপক্ষের শট ফেরানোর মতো কাজ করতে হবে তাদের।

রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জিরোথের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা হুয়া রং বলেন, প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরই আসল পরীক্ষা শুরু হবে। তাঁর ভাষ্যমতে, পণ্যটি (রোবট) বিক্রি হওয়ার পর সেটি সত্যিই ব্যবহারকারীদের সমস্যার সমাধান করতে পারে কি না, (মূল) প্রতিযোগিতাটা হবে সেখানে। 

দড়িতে দৌড়াচ্ছে একটি হিউম্যানয়েড রোবট। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ২২ আগস্ট ২০২৬
দড়িতে দৌড়াচ্ছে একটি হিউম্যানয়েড রোবট। চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। ২২ আগস্ট ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Sunday, August 23, 2026

উসাইন বোল্টের ১০০ মিটারের রেকর্ড ভাঙল রোবট

রয়টার্সঃ চীনের স্মার্টফোন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান অনারের তৈরি একটি মানবাকৃতির রোবট ১০০ মিটার দৌড় শেষ করেছে মাত্র ৯ দশমিক ৩২ সেকেন্ডে। আজ শনিবার চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। এর মাধ্যমে রোবটটি জ্যামাইকান স্প্রিন্ট কিংবদন্তি উসাইন বোল্টের গড়া বিশ্ব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।

লাইটনিং নামের রোবটটি আজ বেইজিংয়ে শুরু হওয়া দ্বিতীয় ‘ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের’ প্রস্তুতিমূলক একটি পরীক্ষামূলক প্রতিযোগিতায় প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ১৪ দশমিক ৫ মিটার গতিতে দৌড়ায়।

এই পারফরম্যান্স ২০০৯ সালে বার্লিনে বিশ্ব অ্যাথলেটিকস চ্যাম্পিয়নশিপে বোল্টের ৯ দশমিক ৫৮ সেকেন্ডের ১০০ মিটার স্প্রিন্টের বিশ্ব রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেল।

চীন মানবাকৃতির রোবটশিল্পকে একটি কৌশলগত উদীয়মান খাত হিসেবে জোর দিচ্ছে। দেশটির নীতিনির্ধারক ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর আশা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও হার্ডওয়্যারের উৎপাদন অগ্রগতি, লজিস্টিকস এবং ভোক্তা ব্যবহারে এই প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ঘটাবে।

গত এপ্রিলে ২১ কিলোমিটার বেইজিং হাফ ম্যারাথনেও জয় পেয়েছিল লাইটনিং। রোবটটি দৌড় শেষ করতে সময় নিয়েছিল ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ড, যা পুরুষ অ্যাথলেটদের বিশ্ব রেকর্ডের গতির চেয়ে বেশি।

হাফ ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার সময় রোবটটির উচ্চতা ছিল ১৬৯ সেন্টিমিটার এবং পায়ের দৈর্ঘ্য ছিল ৯৫ সেন্টিমিটার। চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি) জানিয়েছে, ওয়ার্ল্ড হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের আগে গবেষকেরা এর পায়ের দৈর্ঘ্য ১০ সেন্টিমিটার বাড়িয়ে ১ দশমিক শূন্য ৫ মিটার করেছেন।

চীনের বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বেইজিং ই-টাউন হাফ ম্যারাথন ও হিউম্যানয়েড রোবট হাফ ম্যারাথনে ফিনিশিং লাইন পার হচ্ছে অনারের তৈরি লাইটনিং হিউম্যানয়েড রোবট। ১৯ এপ্রিল ২০২৬
চীনের বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বেইজিং ই-টাউন হাফ ম্যারাথন ও হিউম্যানয়েড রোবট হাফ ম্যারাথনে ফিনিশিং লাইন পার হচ্ছে অনারের তৈরি লাইটনিং হিউম্যানয়েড রোবট। ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ছবি: রয়টার্স

Friday, August 21, 2026

ইরানকে কোনঠাসা করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা আটকে দিতে পারে চীন ও রাশিয়া

ইরানকে আর্থিক সুবিধা বা সহযোগিতা দিলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। দেশটিকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তেহরানের বিরুদ্ধে একটি অর্থনৈতিক অভিযানের ডাক দিয়ে তিনি এই কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্প নিজের বৈদেশিক নীতি বাস্তবায়নে মার্কিন অর্থনৈতিক শক্তিকে ব্যবহারের এই নতুন চেষ্টা শুরু করেছেন। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার চীন ও রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। রাশিয়া ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকেই তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। অন্যদিকে চীন বারবার প্রমাণ করেছে যে, নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তারা মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ জানান, ট্রাম্পের পক্ষে এই চাপ প্রয়োগের অভিযান কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। তিনি বলেন, ট্রাম্প এককভাবে এমন একটি সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছেন, যার জন্য ঐতিহাসিকভাবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যসহ চীন ও রাশিয়ার যৌথ বহুপাক্ষিক সমন্বয়ের প্রয়োজন হয়।
ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার এই অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হবে যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত ইতিহাসের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অভিযান।

তিনি জানান, তেল চোরাচালান, মুদ্রা বিনিময়, নগদ অর্থ স্থানান্তর, মুদ্রা রুপান্তর, ভুয়া কোম্পানি ও জাহাজের নিবন্ধনের মাধ্যমে যেসব দেশ ইরানকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করবে, তাদের ভয়াবহ অর্থনৈতিক পরিণতি ভোগ করতে হবে। এর আগে একই দিনে তেহরানের ওপর অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ব্রান্ডেইস ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য অর্থনীতি বিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাবিবি জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দিতে যুক্তরাষ্ট্র জোরালোভাবে প্ররোচিত করেছে এবং ওয়াশিংটন এখন ইরানের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার চীনের ওপরও একই ধরনের চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে।

তবে চীন ও ইরানের বাণিজ্য সম্পর্কে বিঘ্ন ঘটানোর মার্কিন পরিকল্পনা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে পারে। ২০২৫ সালে ইরানের রপ্তানি করা তেলের ৮০ শতাংশই কিনেছে চীন। এই তেল প্রক্রিয়াকরণ করা চীনের বেশিরভাগ শোধনাগার স্বাধীন এবং মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তারা নির্ভরশীল নয়। এছাড়া ইরানি লেনদেন নিষ্পত্তির অভিযোগে চীনের প্রধান ব্যাংকগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে বড় ধাক্কা দিতে পারে। চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইউ জিয়ে জানান, ট্রাম্পের এই হুমকি ইরানের সাথে চীনের বর্তমান বাণিজ্যিক সম্পর্কে কোনো পরিবর্তন আনবে না। তিনি উল্লেখ করেন, বেইজিং যেমন ওয়াশিংটনের সাথে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়, ট্রাম্পও চীনের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে আগ্রহী। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান জানান, নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ কোনো সমস্যার সমাধান করবে না। কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পথেই এই সংকট সমাধানের আহ্বান জানান তিনি। আগামী মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য ওয়াশিংটন সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্রও বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের অবনতি চাইছে না।

অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে ইরানের সমান্তরাল কৌশলগত সম্পর্ক ওয়াশিংটনের জন্য ভিন্ন একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। মস্কো ও তেহরান বহু বছর ধরেই পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক বন্ধন গড়ে তুলেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে দুই দেশ একটি ২০ বছর মেয়াদী অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার ফলে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই তাদের বাণিজ্য বেড়ে ৪৮০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এমনকি কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে রাশিয়া ইরানকে ড্রোনের যন্ত্রাংশ, গোলাবারুদ ও টিএনটি সরবরাহ করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন নিষেধাজ্ঞার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি একে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যর্থ নীতির ধারাবাহিকতা বলে অভিহিত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি লেখেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। এদিকে ব্রিকস জোটের সদস্য হিসেবে ইরান বিকল্প অর্থনৈতিক পথের সন্ধান করছে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেম্মতি জানিয়েছেন, পশ্চিমা বাজারের বাইরে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে ইরান ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে যোগ দেয়ার পরিকল্পনা করছে এবং জোটের দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক লেনদেন বৃদ্ধির উদ্যোগ নিচ্ছে।

ইরানকে কোনঠাসা করার ট্রাম্পের পরিকল্পনা আটকে দিতে পারে চীন ও রাশিয়া