Wednesday, September 17, 2014

তাহলে ৭০ ও ৯৯ অনুচ্ছেদেও সংশোধনী আনুন by মিজানুর রহমান খান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আক্ষেপের মধ্য দিয়ে এটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, সংসদে কারও অপসারণের প্রস্তাব তিনি চাইলে কী পরিণতি হতে পারে। শেখ হাসিনাকে ছাড়া আওয়ামী লীগের সবাইকে কেনা যায়, প্রধানমন্ত্রীর এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশ গণতন্ত্রের মাননির্দেশক। কোনো নির্বাচনের মান ভালো-খারাপ যেমনই হোক, এটাই চূড়ান্ত মনোভাব। তাঁর এই উক্তি নির্দেশ করছে যে, শুধু সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ শুধরে অভিশংসন-প্রথা আমদানি নয়, এ উপলক্ষে ফ্লোর ক্রসিং-সংক্রান্ত ৭০ অনুচ্ছেদ এবং অবসরের পরে বিচারকদের চাকরি গ্রহণসংক্রান্ত ৯৯ অনুচ্ছেদের দিকেও নজর দিতে হবে।

বিচারক অপসারণ-প্রক্রিয়ায় ৭০ অনুচ্ছেদের দলীয়করণের প্রভাবের দিকে চার আইনবিদ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এটাই যথেষ্ট নয়। তাঁদের আরও কতগুলো কথা পরিষ্কার করে বলতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম দুই সংবিধানপ্রণেতার উদ্দেশে অনভিপ্রেত তির্যক মন্তব্য করেছেন। মাহবুবে আলম নিজেই বাহাত্তরে না ফিরতে মত দিয়েছিলেন। বলেছিলেন বিদ্যমান কাউন্সিল সংস্কার করতে। কিন্তু এখন তিনি ড. কামাল ও আমীর-উল ইসলামের কাছে প্রশ্ন তুলেছেন, এখন কেন ডিগবাজি খাচ্ছেন? এটা সম্পূর্ণ অনাবশ্যক এবং অপ্রাসঙ্গিক। মনে হচ্ছে, তিনি আওয়ামী লীগ নেত্রীকে খুশি করতেই এই মন্তব্য করেছেন। সরকারপ্রধানকে খুশি করার গরজটা কত তীব্র, সেটা প্রধানমন্ত্রীর ‘কেনা যায়’ মন্তব্যে স্পষ্ট। শেখ হাসিনাকে কেনা যায় না। আর অ্যাটর্নি জেনারেলকেও কেনা যায় না! তবে অ্যাটর্নির উচিত, তিনি কেন ডিগবাজি খেলেন সেটা ব্যাখ্যা করা।
বাহাত্তরের সংবিধানে ফেরার কথা বলা যে একটি চাতুরী, সেটা বাহাত্তরের সংবিধানপ্রণেতারা যেভাবে বলছেন, তাতে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, সরকারি দল প্রচারণার কাজে গোয়েবলসীয় তত্ত্ব অন্ধের মতো অনুসরণ করার পণ করেছে। বাহাত্তরের সংবিধানপ্রণেতাদের তরফে কিছু সত্য দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ না করার কারণে সরকার একটা সুযোগও পাচ্ছে। যেমন সংবিধানপ্রণেতারা এখন হঠাৎ করে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কথা তুলছেন। তাঁরা বলছেন না যে, ৭০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে অভিশংসনের কী সম্পর্ক তৈরি হতে পারে, সেটা বাহাত্তরে ভাবা হয়নি। এমনকি তাঁরা বাহাত্তরের সংবিধান আজকের প্রেক্ষাপটে কতটা, কোথায় অপ্রাসঙ্গিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ, সে-বিষয়ক সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরছেন না। বিচারক অপসারণ-প্রক্রিয়ার ব্যাপারে চার আইনবিদের একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি তাই যথেষ্ট নয়। তাঁরা সরকারকে আলোচনা করতে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আজ যদি দেশে সত্যিকার গণতন্ত্র থাকত, আর সরকার তাঁদের সংলাপে আমন্ত্রণ জানাত, তাহলে তাঁদের পক্ষে দ্রুত একটি বিকল্প সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া দুরূহ হতো। কারণ, তাঁদের প্রস্তুতিমূলক কাজ নেই। সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামাল মনে করেন, কাউন্সিলকে আরও উন্নত করার সুযোগ আছে। তাকে গ্রেপ্তার করানোর ক্ষমতা দিতে হবে। তার অবমাননার বিধান আনতে হবে। কিন্তু নাগরিক সমাজের দিক থেকে সেই প্রস্তুতি কোথায়?
এটা ভয়ংকর, আজ কাউকে কথা বলতে না দিয়ে ১৬তম সংশোধনী আনা হচ্ছে। সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত নিজেই মতামত নেওয়ার কথা বলেছিলেন। আজ বলা হচ্ছে, আইন নিয়ে বলতে দেওয়া হবে। তার মানে দাঁড়াল ক্ষমতাসীন সরকার অভিশংসন-প্রথা ফেরানোর সঙ্গে সংবিধানের অন্য কোনো অনুচ্ছেদ সংশোধনের যোগসূত্র আছে, সেটাই স্বীকার করে না। কিন্তু সেখানেই আমাদের প্রতিবাদ করতে হবে। নাগরিক সমাজকে বলতে হবে কাউন্সিল রাখার বিকল্প হচ্ছে তার সংস্কার। আর এই হচ্ছে তার রূপরেখা। বলতে হবে, কাউন্সিলের বিকল্প সংসদীয় অপসারণব্যবস্থাও চলতে পারে। কিন্তু সর্বাগ্রে সংসদকে প্রকৃত সংসদ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সার্বভৌম সংসদের নামে ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এখনই জোরেশোরে সংসদকে স্বাধীন করার কথা তুলতে হবে।
চার আইনবিদ ৭০ অনুচ্ছেদবিরোধী যে অবস্থান নিয়েছেন, সেটাই হতে পারে মূলমন্ত্র। তবে সেটা আমরা কেবল তাঁদের মতো করে বিচারক অপসারণ বা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আলোকেই বুঝব না; বুঝব পুরো রাষ্ট্র গঠনের ত্রুটি দূর করার দিক থেকে। আমাদের বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও লাগবে; সংসদের স্বাধীনতাও লাগবে। বাহাত্তরে যে কারণ ও যুক্তিতে ৭০ অনুচ্ছেদ আনা হয়েছিল, তাতে সংকীর্ণ মানসিকতার ছাপ পড়েছিল। ১৯৭২ সালেই এর কোনো দরকার ছিল না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ব্যক্তিত্ব যথেষ্ট উঁচুতে ছিল। বিশ্বের সব লিখিত সংবিধানকে প্রত্যাখ্যান করে এবং কেবল ব্যক্তিকে মহীয়ান করতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত করার এই ভুল প্রকাশ্যে স্বীকার করতে পারলে জাতির বড় উপকার করা হবে। কারণ, সবকিছু ছাপিয়ে বড় সত্য এই যে, ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার কারণে বিদ্যমান কাউন্সিল-ব্যবস্থাও অকার্যকর রয়ে গেছে। আর সে কারণে বিচার বিভাগ এবং অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থার স্বাধীনতা এবং তার গণমুখী হওয়ার সম্ভাবনা অব্যাহতভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।
আগামী কয়েক দিবসের মধ্যে যে বিধান আমরা পাচ্ছি, ভারত সেটা ১৯৫০ সালে লিখেছিল। সেই লেখাটা গৌণ বিষয় ছিল। মুখ্য ছিল আইন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যেটা আমাদের তিন মাসের মধ্যে পরিবেশন করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন, সেটা করতে ভারতের মতো দেশেরও দীর্ঘ সময় লেগেছিল। ১৯৬৪ সালে তারা বিল আনল। কী ধরনের কমিটি করে, কী প্রক্রিয়ায় বিচারক অপসারণ করা হবে, সে জন্য যৌথ কমিটি হলো। দুই বছর পরে তারা প্রতিবেদন দিল। এরও দুই বছর পরে ১৯৬৮ সালে বিল পাস হলো। এখন সেই আইনের একটি সংস্কার-প্রক্রিয়া প্রায় ১০ বছর ধরে চলমান আছে।
আমাদের নাগরিক সমাজ ও আইনবিদদের ভাবতে হবে, গণতন্ত্রের দাবিদার একটি সরকার তাদের কেন এতটা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে পারে। একটি সর্বদলীয় শক্তিশালী বার সম্মেলনের আহ্বানের কোনো প্রভাব সরকারের ওপর কেন নেই? সেটা কেবলই প্রধানমন্ত্রী কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছেন, সেই কারণে? আমি মনে করি, এটা একমাত্র কারণ নয়। জনসম্পৃক্ততা ও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে একটা বিরাট শূন্যতা তাঁদের তরফেও রয়েছে। যেমন আইনবিদেরা প্রবলভাবে যুক্তি দিচ্ছেন যে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। কাউন্সিল বিলোপ হলে এই মৌলিক কাঠামোয় আঘাত পড়বে। তাঁরা বলছেন না যে, নির্বাচন কমিশনসহ অন্য সাংবিধানিক সংস্থাগুলোর স্বাধীনতাকে আমরা কী বলব? এসব সংস্থা সংবিধানের কী কাঠামো? এসব সংস্থার হয়ে বারের মতো কথা বলার কেউ নেই। তাহলে তাদের কথা কে বলবে?
সরকারের শক্তি হলো, নাগরিক সমাজ কখনো উঁচু স্বর তৈরি করতে পারেনি যে, প্রধানমন্ত্রীর হাতে সর্বময় নির্বাহী ক্ষমতা থাকতে পারবে না। বাহাত্তরে এটা করা নিশ্চিত ভুল ছিল। তখন শুদ্ধ হলেও সেই কার্যকারণ আমূল বদলে গেছে। তাদের উচিত প্রতিটি সুযোগে এ কথা অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলা। বিচ্ছিন্নভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো না বলা। কারণ, এটাই বলতে হবে, স্বাধীন সংসদ না থাকলে সংবিধানই মূল্যহীন হয়ে পড়ে। সংসদ সদস্যদের ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা নিয়ে রাজনীতিকেরা আন্দোলনে নামতে অপারগ। কেনা যায়—উক্তির মধ্যে সেটা আবারও পরিষ্কার হলো। আর এই ঘাটতি পূরণের দায় অন্যরাও নিতে চান না। সুপ্রিম কোর্ট বারকে কখনো আমরা ৭০ অনুচ্ছেদবিরোধী আন্দোলনে নামতে দেখিনি। তাদের কখনো বলতেও শুনিনি, কেবল সংসদেরই নয়, প্রধানমন্ত্রীর হাতে সর্বময় ক্ষমতা সত্যিকার অর্থে বিচার বিভাগ ও বিচারকের স্বাধীনতার মারাত্মক অন্তরায়। আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম ইত্তেফাককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে যখন বলেন, সুপ্রিম কাউন্সিল একটি মীমাংসিত বিষয়, তখন তা আমাদের হতবিহ্বল করে। কারণ, বিষয়টি ১৯৭২ সাল থেকেই অমীমাসিংত এবং তা দালিলিকভাবে প্রমাণিত। বাহাত্তরে যদি ওই আইন নিয়ে আলোচনা হতো, তখন তাঁদের মনে পড়ত যে, ৭০ অনুচ্ছেদের প্রভাব সব সাংবিধানিক সংস্থার ওপর কী হতে পারে। মাননীয় সংবিধানপ্রণেতারা স্বীকার করুন, আপনারা ৭২ সালে প্রধানমন্ত্রীকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং ৭০ অনুচ্ছেদ ঢুকিয়ে বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত, মীমাংসিত ও অনুসৃত ‘ক্ষমতার পৃথক্করণ’ নীতিকে ধূলিসাৎ করেছিলেন।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। ৪৮(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কার্য করবেন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেনও, ক্ষমতা তো রাষ্ট্রপতির হাতেই থাকছে। এর মানে কী? সংবিধানে যেখানেই রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার কথা আছে, সেখানেই আসলে ক্ষমতাটা ভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশের ভোটে প্রস্তাব পাস হলে কি আপনাআপনি কেউ অপসারিত হবেন? নাকি সংসদ তখনো প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহ হয়ে থাকবে?
আইনমন্ত্রী বলেছেন, আইন না করা পর্যন্ত নতুন আনা অনুচ্ছেদটি মৃতই থাকবে। তাহলে মৃতকে আনতে এত ব্যাকুল কেন। আইনমন্ত্রী সাবেক বিচারপতিদের দিয়ে তদন্ত কমিটির যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা আরও ক্ষতিকর ফল বয়ে আনতে পারে। এর অর্থ হলো, সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদকে আমরা আর বাহাত্তরের মতো ফেরত পাব না। এটা ফেরত চাই। এই অনুচ্ছেদ অবসরের পরে বিচারকদের চাকরি নিষিদ্ধ করেছিল। আমাদের দুর্ভাগ্য, এই বিষয়ে আইনজীবীরা নীরব। এই নীরবতা ভাঙুন। বিল পাস থেকে সরকার বিরত থাকুন। সেটা কাউন্সিল বহাল রাখতে নয়, সেটা অনেক বেশি জরুরি অভিশংসনবিষয়ক একটি ত্রুটিমুক্ত কার্যকর আইন তৈরি করতেও।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

তারেক রহমানের উক্তি ও সত্য উদঘাটনের সুযোগ by মইনুল ইসলাম

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের নারকীয় হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ক্ষমতা জবরদখলকারী খোন্দকার মোশতাককে ‘কুলাঙ্গার’ হিসেবে গালমন্দ করায় কুপিত হয়ে লন্ডনের প্রবাস থেকে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার মনোনীত উত্তরসূরি তাঁর বড় ছেলে তারেক রহমান আওয়ামী লীগকে ‘দল অব কুলাঙ্গারস’ বলে গালাগালি করেছেন। কুলাঙ্গারের অর্থ জানা থাকলে যে কেউ বুঝতে পারবেন যে খোন্দকার মোশতাককে ওই অভিধায় অভিহিত করে শেখ হাসিনা ভুল করেননি। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থেকে বঙ্গবন্ধুর একেবারে ‘কাছের মানুষ’ সেজে তাঁকে ঝাড়ে-বংশে হত্যা করার প্রধান কুশীলবের ভূমিকা যে পালন করে, তাকে কুলাঙ্গার আখ্যা দিলে অন্যায় কীভাবে হলো, তা বোঝা যাচ্ছে না। আরও বোঝা মুশকিল, গালটা তারেক রহমান নিজের ভাগে নিলেন কেন? মোশতাকের পক্ষ নিয়ে ঝগড়া বাধিয়ে প্রকারান্তরে তারেক রহমান বিএনপির জন্ম এবং রাজনীতির সঙ্গে মোশতাক ও পঁচাত্তরের খুনি চক্রের পরমাত্মীয়তা স্বীকার করে নিলেন কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।
খোন্দকার মোশতাকের বিশ্বাসঘাতকতা ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধকালীন মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার মতোই ভয়ংকর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই খোন্দকার মোশতাক ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় পাকিস্তানকে টিকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিলেন। মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধের কান্ডারি তাজউদ্দীন আহমদ অত্যন্ত শক্তভাবে ওই গাদ্দারদের মোকাবিলা করে মোশতাক চক্রকে পুরোপুরি অকার্যকর করে রেখেছিলেন ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এটুকু ইতিহাস তারেক রহমানেরও নিশ্চয়ই জানা আছে। খোন্দকার মোশতাক ধুয়া তুলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী বঙ্গবন্ধু মুজিবকে জীবিত ফেরত পেতে চাইলে বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতার ব্যাপারে মুজিবনগর সরকারকে ছাড় দিতে হবে। পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের প্রস্তাবে রাজি হতে হবে।’ এর বিপরীতে তাজউদ্দীনের সুস্পষ্ট অবস্থান ছিল, ‘স্বাধীনতাও চাই, মুজিবকেও চাই। স্বাধীনতা পেলেই শুধু মুজিবকেও পাওয়া যাবে, অন্য কোনোভাবে নয়।’ এই ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য খোন্দকার মোশতাক ও মাহবুবুল আলম চাষীকে ওই দুই মাস দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পূর্ণ নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।
কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য হলো: ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার পরপর হয়তো এই ইস্যুতেই শেখ মণির সহায়তায় খোন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধুকে তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে বিরূপ অবস্থানে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবারের অন্য কোনো সদস্যেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা থাকা অস্বাভাবিক নয়। বঙ্গবন্ধুর প্রাণ বাঁচানোকে তাজউদ্দীন গুরুত্ব দেননি, মোশতাক ও শেখ মণির মতো তাজউদ্দীন-বিরোধীদের হাতে এটাই হয়তো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এক সাম্প্রতিক স্মারক বক্তৃতায় জাতিকে জানিয়েছেন যে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার এক দিনের মধ্যেই তাজউদ্দীন বুঝে গিয়েছিলেন যে তিনি বঙ্গবন্ধুর আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। তারপরও তাজউদ্দীন দৃঢ়ভাবে বঙ্গবন্ধুকে নিষেধ করেছিলেন খোন্দকার মোশতাককে মন্ত্রিসভায় না নিতে। কিন্তু তাজউদ্দীনের কথা পাত্তা পায়নি। মোশতাক তখন বনে গেছেন বঙ্গবন্ধুর আপনজন, বনে গেছেন বঙ্গবন্ধুর ভাগনের সার্টিফিকেটে। মন্ত্রিসভার দাপুটে সদস্য হিসেবেই বঙ্গবন্ধুর সরকারে জায়গা করে নিয়েছিলেন খোন্দকার মোশতাক। তাজউদ্দীন ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি হারানো বঙ্গবন্ধুর সে আস্থা জীবদ্দশায় আর ফিরে পাননি। বঙ্গবন্ধু কখনোই তাজউদ্দীনের কাছে জানতে চাননি কীভাবে তাঁর অনুপস্থিতিতে মুজিবনগর সরকার মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিল, কেনই বা তাজউদ্দীন বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করেছিলেন, ২৬৬ দিনের মুক্তিযুদ্ধের সময় কার কী ভূমিকা ছিল, যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার কলকাতা থেকে কীভাবে মুজিবনগর সরকারের গুরুদায়িত্ব পালন করেছিল। হয়তো অন্য কারও কাছ থেকে তিনি এসব ব্যাপারে মিথ্যা বয়ান পেয়ে তাজউদ্দীনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নেতিবাচক উপলব্ধিতে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
জাতির দুর্ভাগ্য, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তাঁর সবচেয়ে আস্থাভাজন আপনজন হিসেবে পরিচিত তাজউদ্দীন কোনো অপরাধ না করে এহেন শাস্তি পাওয়াটা হয়তো মেনে নিতে না পেরে তাঁর নেতার ওপর অভিমান করে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে প্রকৃত সত্য এবং তাঁর নিজস্ব ভাষ্য তুলে ধরেননি, নেতার ভুলও ভাঙাননি। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ যে বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় একবারও তাঁর নামাঙ্কিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকারের ঐতিহাসিক শপথ অনুষ্ঠানস্থল বর্তমান মেহেরপুরের মুজিবনগরে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেননি। এতৎসত্ত্বেও জাতির প্রতি কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাজউদ্দীন সব অপমান হজম করে বঙ্গবন্ধু সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ক্রমেই তাজউদ্দীন মন্ত্রিসভায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। সরকারের নীতিনির্ধারণে তাজউদ্দীনকে অগ্রাহ্য করাটাই যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর মন্ত্রিত্বের দুই বছর নয় মাস সময়কালের শেষের দিকে। তবু বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটের সদস্যদের মধ্যে সততা, যোগ্যতা, দক্ষতা, নিয়মনিষ্ঠতা ও কর্তব্যপরায়ণতার বিচারে তাজউদ্দীনই যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন, তা ইতিহাসেরই রায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে তাজউদ্দীনকে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে অপমানজনকভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার পর বঙ্গবন্ধু হত্যার কুশীলব এই মোশতাক-তাহেরউদ্দিন ঠাকুর চক্রই সুপরিকল্পিতভাবে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে থাকতে চেষ্টা করেছে। এটাও তাৎপর্যপূর্ণ যে ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞ থেকে মোশতাকের পৃষ্ঠপোষকতাকারী শেখ মণিরও নিষ্কৃতি মেলেনি, এটাই ঘাতকদের রক্তলোলুপ ও কৃতঘ্ন চরিত্রের পরিচায়ক!
১৯৭৫ সালের প্রথম দিকে ফারুক-রশীদ গং অভ্যুত্থানের পরিকল্পনায় জিয়াউর রহমানকে নেতৃত্ব প্রদানের অনুরোধ জানিয়েছিল, এটা তো আশির দশকেই কর্নেল রশীদের নিজের বয়ানে বিবৃত হয়েছে। ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার্থে অবস্থানকালে (১৯৮৭-৮৮ সালে) সেখানকার টেলিভিশনের ওই প্রোগ্রামটা আমি নিজের চোখে দেখেছি, নিজের কানে শুনেছি। রশীদের বয়ান মোতাবেক জিয়াউর রহমান ওই প্রস্তাবে সায় দেননি এই বলে, ‘আমাদের সিনিয়রদের পক্ষে এ ব্যাপারে অসুবিধা আছে, তোমরা জুনিয়ররা পারলে কিছু করো।’ এই বক্তব্যটি তখন থেকেই বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করছে। কিন্তু রশীদের এই বক্তব্য আদৌ দেওয়া হয়নি বলা যাবে না এত দিন পর। এটা তো ‘রেকর্ডেড’ বক্তব্য, যা একাধিকবার ‘ব্রডকাস্ট’ হয়েছে। এই বক্তব্যের ভিত্তিতে যেটুকু নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে তা হলো: জিয়াউর রহমান ফারুক-রশীদ-মোশতাক চক্রের অভ্যুত্থান-পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে রক্ষা করার শপথে আবদ্ধ ছিলেন, অথচ অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের খবর জেনেও তা তিনি যথাযথ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে যথাসময়ে জানাননি। এই পরিপ্রেক্ষিতে যদি কেউ অভিযোগ করে যে জিয়াউর রহমানও ১৫ আগস্টের হত্যাযজ্ঞের দায়ভার এড়াতে পারেন না, তাহলে ওই ব্যক্তির উচিত হবে অভিযোগটির আইনি সমাধানের জন্য যথাযোগ্য আদালতে বিচারপ্রার্থী হওয়া। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভা-সমিতি বা মিডিয়ায় এই বিষয়টা নিয়ে বিএনপির নেত্রী খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়াই এ ব্যাপারটার সুরাহা করার যৌক্তিক পন্থা। জিয়াউর রহমানকে তাঁর অনুসারী ও সমর্থকেরা পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড ও সামরিক অভ্যুত্থানের শুধুই ‘সুবিধাভোগী’ বলে প্রচার করে চলেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৭ নভেম্বরের মধ্যবর্তী সময়ের যাবতীয় ঘটনা-দুর্ঘটনার দায়ভার তাঁরা সুচারুভাবে মোশতাক, ফারুক-রশীদ নেতৃত্বাধীন সামরিক জান্তা এবং খালেদ মোশাররফের ওপর পার করে দিয়ে জিয়াউর রহমানের ‘মাসুম’ ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু সত্য ক্রমেই উন্মোচিত হচ্ছে। স্বাধীনতাসংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৭২-১৯৭৫ পর্বের স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে সত্যি সত্যি কী ঘটেছিল, কারা কী ঘটিয়েছিল, কার বা কাদের কী ভূমিকা ছিল, এই প্রতিটি পর্বে কার কী সম্মান প্রাপ্য, প্রকৃত খলনায়ক কে বা কারা ছিল—এগুলো ক্রমেই জাতির সামনে উদ্ভাসিত হতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির অবিশ্রান্ত গালাগালির প্রতিযোগিতা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্রমেই অভব্য ও অসহনীয় পর্যায়ে অবনমিত করা সত্ত্বেও সত্য উদ্ঘাটনের যে স্বর্ণসুযোগ জাতির সামনে হাজির হয়েছে, তা হেলায় হারানো যাবে না।
আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পর্বগুলোর বর্ণনায় সত্যের ইচ্ছাকৃত বিকৃতি ঘটানো হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে দলগুলোর রাজনীতির স্বার্থে। স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসকে বিএনপির মূল নেত্রী থেকে শুরু করে কোনো নেতা-নেত্রীই প্রকাশ্যে স্বীকার করবেন না বলে পণ করেছেন। বিএনপির ইতিহাস-পাঠ শুরুই হয় মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ থেকে। এ ব্যাপারেও বিকৃতি আছে: ঘোষণাটি ২৬ মার্চে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠিত ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র’ থেকে ২৭ মার্চ প্রচারিত হলেও বিএনপির বেশির ভাগ নেতা-নেত্রীই এখনো গলাবাজি করছেন যে ২৬ মার্চ নাকি ওটা প্রচারিত হয়েছে। এর উল্টোপিঠে আওয়ামী লীগের ইতিহাস পাঠে ২৬ মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর এক লাফে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় দিবস এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে চলে যাওয়ার প্রবণতা জোরদার হচ্ছে ক্রমেই। স্বাধীনতা অর্জনের সব কৃতিত্ব যেন শুধুই বঙ্গবন্ধুর, আর কে কী করেছেন, তাঁর যেন স্বীকৃতি দিতেও কার্পণ্য! এতেও যে একধরনের ইতিহাস বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে, তা কি অস্বীকার করা যাবে?
এ জন্যই বলছি, জাতির মহামূল্যবান ও পরম গর্বের স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এহেন গালাগালির প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হলে সত্য ইতিহাসের নায়ক এবং সাক্ষী যাঁরা এখনো জীবিত আছেন, তাঁদেরই এগিয়ে আসতে হবে। নিজের পাতে ঝোল টানার প্রবণতা পরিহার করে শুধুই বিবেকের দ্বারা পরিচালিত হয়ে অবিকৃত সত্যটা জাতিকে জানানোর দায়িত্বটুকু পালন করুন। আপনাদের চাওয়া-পাওয়ার পালা প্রায় শেষ। কোনো দল বা দলনেত্রীর মনোরঞ্জনের আর প্রয়োজন নেই। পরের প্রজন্মের কাছে সত্য উদ্ঘাটনের দায়বদ্ধতা দ্বারা তাড়িত হয়ে এই মহাসুযোগ গ্রহণ করুন।
ড. মইনুল ইসলাম: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিপন্ন চট্টগ্রামের শিল্পকারখানা by সোহরাব হাসান

রেশনিং ব্যবস্থায় এখন চট্টগ্রামের মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে। যখন সার কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ করা হয়, তখন অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ থাকে। আর যখন গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু থাকে, তখন সার কারখানাগুলো বন্ধ রাখা হয়।
এই মুহূর্তে গ্যাসের অভাবে ৫৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন চট্টগ্রামের চারটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকায় শিল্প ও আবাসিক এলাকায় লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাউজান বিদ্যুৎকেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, গ্যাস ছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো চালু করার সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য দৈনিক ১৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন; সরবরাহ করা হয় ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) সূত্রমতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ১৬ হাজার ১৭৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। একই সময়ে সার কারখানার জন্য ১৫ হাজার ৩৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়েছে। মোট উত্তোলিত গ্যাসের ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ চট্টগ্রামে বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ সার কারখানাগুলো পেয়ে থাকে।
পিডিবির দাবি, কেজিডিসিএল তাদের জন্য বরাদ্দ ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস না দেওয়ায়ই সমস্যা বেড়েছে। গত জুলাই থেকে পিডিবির গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ হতে থাকে। সর্বশেষটি বন্ধ হয়েছে ৭ সেপ্টেম্বর। বর্তমানে পিডিবি হাটহাজারী ও দোহাজারীতে স্থাপিত তেলচালিত দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, বেসরকারি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল এবং জাতীয় গ্রিড থেকে চট্টগ্রামের চাহিদা মেটাচ্ছে। গত শনিবার রাত পর্যন্ত সরবরাহ ছিল ৫০২ মেগাওয়াট, চাহিদা ৭০০ মেগাওয়াট। সরকারি হিসাবেই প্রায় ২০০ মেগাওয়াট কম।
এ অবস্থায় শিল্পকারখানাগুলো মারাত্মক সংকটে পড়েছে বলে জানালেন চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিসিসিআই) সভাপতি মাহবুবুল আলম। চট্টগ্রামের শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের হালহকিকত জানতে ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে যখন তাঁর সঙ্গে আলাপ করছিলাম, তখনো লোডশেডিং চলছিল। তিনি বললেন, যেখানে দিনে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, সেখানে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে কীভাবে?
হঠাৎই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, না পুরোনো সমস্যা? মাহবুবুল আলম যোগ করলেন, সমস্যা বেশ পুরোনো, তবে ইদানীং বেড়েছে। গ্যাস সরবরাহের অপ্রতুলতার কারণে ২০০৯ সাল থেকে শিল্পকারখানায় নতুন গ্যাস-সংযোগের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। গত বছর নতুন গ্যাস-সংযোগের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয় এবং ঢাকা ও অন্যান্য অঞ্চলে ৯২টি কারখানায় গ্যাস–সংযোগ দেওয়া হয়। এ সময়ে দেশে গ্যাসের উৎপাদন এক হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে বেড়ে দুই হাজার ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়। কিন্তু চট্টগ্রামের একটি কারখানায়ও নতুন গ্যাস-সংযোগ দেওয়া হয়নি। তা ছাড়া, গ্যাস সঞ্চালনে বাখরাবাদ থেকে ঢাকায় সাত-আটটি লাইন থাকলেও চট্টগ্রামের সঙ্গে আছে মাত্র একটি লাইন। ফলে চাইলেও এখানে সরবরাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় শিল্পোদ্যোক্তারা অর্ধশত কারখানার জন্য তিন হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি এনে বসিয়ে রেখেছেন। গ্যাসের অভাবে তাঁরা উৎপাদনে যেতে পারছেন না, নতুন উদ্যোক্তারাও ভরসা পাচ্ছেন না।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা এটিকে দেখছেন তাঁদের প্রতি সরকারের বিমাতাসুলভ আচরণ হিসেবে। তাঁদের দাবি, এক ঘণ্টার লোডশেডিংয়ে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয় ১০ কোটি টাকার বেশি। তা হলে সপ্তাহে দুই দিন শিল্পকারখানা বন্ধ রাখতে হলে ক্ষতির পরিমাণটি অনুমান করা কঠিন নয়।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছোট, বড় ও মাঝারি আকারের ছয় হাজার শিল্পকারখানা আছে। নাসিরাবাদ-কালুরঘাট, পতেঙ্গা-হালিশহর, কুমিরা-সীতাকুণ্ড এলাকায়ই বেশির ভাগ শিল্পকারখানা। লোডশেডিংয়ের কারণে কী পরিমাণ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে? জবাবে ওই ব্যবসায়ী নেতা বললেন, কমপক্ষে ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ যেখানে ১০০টি পণ্য উৎপাদন হওয়ার কথা, সেখানে হচ্ছে ৭০টি। তা ছাড়া, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে উৎপাদন আরও কমে যায়। বড় কারখানাগুলোতে বেশি শ্রমিক থাকায় তারা পালাবদল করে চলতে পারলেও ছোট ও মাঝারি কারখানায় সেটি সম্ভব নয়। ফলে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা যখন দাবি করেন, তাঁরা বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করেছেন, তখন তা চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কাছে ঠাট্টা বলেই মনে হয়।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই দেনদরবার করে আসছেন গ্যাস-সমস্যা সমাধানের জন্য। তাঁরা প্রধানমন্ত্রী ও বিদ্যুৎ উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সমস্যার কথা বলেছেন। কিন্তু প্রতিকার পাননি। কেবল প্রধানমন্ত্রী সঞ্চালন লাইনে একটি বাড়তি বুশটার বা রেগুলেটর বসানোর আশ্বাস দিয়েছেন। এটি কার্যকর হলে গ্যাসের চাপ কিছুটা বাড়লেও ঘাটতি পূরণ হবে না।
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের দ্বিতীয় যে বড় সমস্যাটিতে পড়তে হয়, তা হলো অপ্রতুল যোগাযোগব্যবস্থা। বিমানবন্দর থেকে শহরে যাওয়ার একটাই পথ, তাও প্রায়ই যানজটের শিকার হয়। কোনো বিদেশি ক্রেতা বা শিল্পোদ্যোক্তা এ অবস্থা দেখলে প্রথমেই হোঁচট খাবেন। তাই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের দাবি, অবিলম্বে বিমানবন্দর থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত বিকল্প সড়ক করা হোক।
আর ঢাকা-চট্টগ্রাম সড়কের উন্নয়ন প্রসঙ্গে চেম্বার সভাপতি বললেন, ‘আমরা এখন আর ফোর লেন নিয়ে ভাবছি না। যেভাবে সড়কের ওপর চাপ পড়ছে, তাতে আট লেন না করে উপায় নেই। আশির দশকে মালয়েশিয়া যখন বিওটি (বিল অপারেট অ্যান্ড ট্রান্সফার) পদ্ধতিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম ফোর লেন করতে চাইল, সরকার তাতে রাজি হলে এত দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হতো না। সরকার আনোয়ারা ও মিরসরাইয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করেছে। সেখানে দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের আনতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহও নিশ্চিত করতে হবে। সরকার কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণের কথা বললেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির নেতা সগির আহমদের দাবি, জলাবদ্ধতার কারণে ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। সড়কব্যবস্থা অপ্রতুল। বাংলাদেশের প্রাণ বলে পরিচিত খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা মোট আমদানি শুল্কের ৩৭ শতাংশ জোগান দেন। প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠকেও ব্যবসায়ী নেতারা খাতুনগঞ্জের হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কথা বললেন। কীভাবে তা সম্ভব। তাঁরা সরকারের কাছে বাড়তি কোনো সুবিধা চান না। চান অবকাঠামো উন্নয়ন, জলাবদ্ধতার অবসান ও ব্যবসানুকূল পরিবেশ।
ব্যবসায়ী নেতারা আরও বললেন, খাতুনগঞ্জের ব্যবসাটি গড়ে উঠেছিল আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে। ১৯৮০ সালে একজন ব্যবসায়ী প্রথম প্রতারণা করে সেই বিশ্বাসের জায়গাটি নষ্ট করেন। এরপর চেক জালিয়াতি ও অন্যান্য উপায়ে শতাধিক প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এর প্রতিকারে চেক জালিয়াতি আইন কঠোর করার পাশাপাশি এর যথাযথ প্রয়োগের ওপরও জোর দেন তাঁরা। কেননা, অপরাধী অপরাধ করে পার পেলেই অন্যরা অপরাধ করতে উৎসাহী হয়।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

বিয়ের বয়স কমতে পারে, বাল্যবিবাহে সাজা বাড়ছে

বিয়ের বিদ্যমান বয়স কমানোর চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এ ক্ষেত্রে ছেলেদের বয়স ১৮ এবং মেয়েদের ১৬ করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহের অপরাধের জন্য সাজা সর্বোচ্চ দুই বছর ও জরিমানা বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা করা হতে পারে। বর্তমানে বাল্যবিবাহের সর্বোচ্চ সাজা তিন মাস এবং জরিমানা এক হাজার টাকা।

সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে গতকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে সাজা ও জরিমানার পরিমাণ বাড়িয়ে ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৪’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। একই সভা থেকে বিয়ের বয়স কমানো যায় কি না, তা পর্যালোচনা করার জন্য আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্দেশ (অনুশাসন) দেওয়া হয়েছে। সভা শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের সভার সিদ্ধান্ত জানান।
আইনানুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সীদের শিশু বোঝায়। মন্ত্রিসভায় উপস্থিত সূত্রগুলো বলছে, যেহেতু এই আইনটি বাল্যবিবাহ নিয়ে, তাই এখানে ছেলেদের বিয়ের বয়স ২১ না রেখে নিম্নে ১৮ বছর করার পক্ষে কেউ কেউ মত দেন। আবার কেউ কেউ মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর কথাও বলেন। বিষয়টি আইনি যাচাইয়ের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত ২১ থেকে ২৩ জুলাই লন্ডনে গার্ল সামিটে অংশ নিয়ে দেশে ফেরার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের বয়স বর্তমানে যা আছে, তা কমানো উচিত। এ ক্ষেত্রে তিনি যুক্তরাজ্যের উদাহরণ টেনে বলেন, সেখানে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৬। আর বাংলাদেশে ১৮, যা একটু বেশি হয়েছে। বর্তমানে মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৮ বছরের কম এবং ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ বছরের কম হলে বাল্যবিবাহ বলা হয়।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, মন্ত্রিসভা সামাজিক বাস্তবতা ও পরিবেশসহ প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিয়ের বয়স কমানো যায় কি না, তা বিবেচনার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখাকে বলেছে।
বাল্যবিবাহের বিদ্যমান আইনটি ১৯২৯ সালের। এতে বাল্যবিবাহের সাজা ও জরিমানা কম। অন্যান্য ক্ষেত্রেও অসম্পূর্ণতা রয়েছে। এ জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তাব করে। যেটি গতকাল নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হলো। এখন আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত শেষে আবার সেটি মন্ত্রিসভায় উঠবে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য। এরপর বিলটি পাসের জন্য জাতীয় সংসদে উঠবে।
নতুন আইন অনুযায়ী, সাজা ও জরিমানা করবেন নির্বাহী হাকিম। তবে বিয়ে বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে পারিবারিক আদালতে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত বিভিন্ন ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত সাজা দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া আছে।
যাঁরা বাল্যবিবাহের পরিচালনা করেন, যাঁরা বাল্যবিবাহের অনুষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বর-কনে এই দণ্ডের আওতায় পড়বেন। তবে অপরাধী নারী হলে শুধু আর্থিক দণ্ড হবে, কারাভোগ করতে হবে না।
আইনানুযায়ী বিয়ের বয়স বিবেচনা করা হবে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট (থাকলে) বা মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষার সনদ দেখে। বয়স প্রমাণের ক্ষেত্রে অ্যাফিডেভিট গ্রহণযোগ্য হবে না। বয়সের ক্ষেত্রে মিথ্যা সনদ প্রমাণিত হলে মিথ্যা সনদ প্রদানকারীরও দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড হবে। বাল্যবিবাহের আয়োজনে সহায়তাকারী বিবাহ রেজিস্ট্রারের নিবন্ধন বাতিল করা করা হবে এবং সেই ব্যক্তিকেও একই রকম সাজা ও জরিমানা করা হবে। বিয়ের তথ্য সংরক্ষণের জন্য আধুনিক তথ্যভান্ডার করা হবে।
প্রস্তাবিত আইনানুযায়ী, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এই কমিটির কার্যাবলি বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও গ্রাম আদালত বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিকল্প বিরোধ পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারবে। এই আইনের অধীন বাতিলকৃত বাল্যবিবাহের ফলে জন্মগ্রহণকারী শিশু বৈধ হবে এবং এই শিশুর নিরাপত্তা, হেফাজত ও ভরণপোষণের দায়িত্ব আদালত নির্ধারণ করবেন। এ ক্ষেত্রে শিশু আইন বিবেচিত হবে। তবে আদালত শিশুর নিরাপত্তা, হেফাজত ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নির্ধারণের সময় শিশুর বাবাকে দায়বদ্ধ করার বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনা করবেন। এ ধরনের শিশুর বাবার আইনগত উত্তরাধিকারী হতে কোনো বাধা নেই।
আইনে বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে শিক্ষার্থী ও সমাজকে সচেতন করার জন্য মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যসূচিতে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া গতকালের মন্ত্রিসভায় কাস্টমস আইন-২০১৪-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আগের আইন হালনাগাদ করে বাংলায় নতুন আইনটি করা হচ্ছে। বিদ্যমান আইনে আমদানি ও রপ্তানিপণ্যের ঘোষণার পদ্ধতিতে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে, যা নতুন আইনে সহজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। আইনটি কার্যকর হবে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে।

‘না’ ভোট দিতে তিন ব্রিটিশ নেতার আহ্বান

রোববার স্কটল্যান্ডে এক অনুষ্ঠানে ডেভিড ক্যামেরন। রয়টার্স
যুক্তরাজ্যের প্রধান তিন দলের নেতা কনজারভেটিভ দলের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন, লেবার নেতা এড মিলিব্যান্ড এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা নিক ক্লেগ ‘না’ ভোট দিতে স্কট্ল্যান্ডবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবারের গণভোটে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিপক্ষে ভোট দিলে স্কটল্যান্ডকে আরও বেশি ক্ষমতা দেওয়ার জন্য তাঁরা একটি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষরও করেছেন। খবর বিবিসির। তিন নেতার স্বাক্ষর করা অঙ্গীকারনামা গতকাল মঙ্গলবার স্কটল্যান্ডের জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড পত্রিকা ডেইলি রেকর্ড-এর প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়। অঙ্গীকারটিতে তিনটি অংশ আছে। এর মধ্যে ‘বারনেট ফর্মুলা’ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
বারনেট ফর্মুলার মাধ্যমেই যুক্তরাজ্যের অর্থ মন্ত্রণালয় উত্তর আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড এবং ওয়েলসে সরকারি ব্যয়বরাদ্দ নির্ধারণ করে। অঙ্গীকারের প্রথম দফায় স্কটল্যান্ডের পার্লামেন্টের জন্য আরও বেশি মাত্রায় নতুন ক্ষমতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আছে। এর জন্য সময়সীমা নির্ধারণেরও অঙ্গীকার করেছেন তিন নেতা। দ্বিতীয় ভাগে সম্পদের সুষম বণ্টন করে সমান সুযোগ ও নিরাপত্তা বিধানের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। তৃতীয় ভাগে জাতীয় স্বাস্থ্য পরিষেবায় (এনএইচএস) আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার পক্ষের সমর্থকেরা বলছেন, কেবল স্বাধীনতাই ক্ষমতাবৃদ্ধির নিশ্চয়তা দিতে পারে। আগামীকালের গণভোটে যদি স্বাধীনতার পক্ষে রায় হয়, তবে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ৩০০ বছরের জোটের ছেদ হবে স্কটল্যান্ডের। যুগোশ্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর ইউরোপে আরেক নতুন দেশের জন্ম হবে। নির্বাচন-পূর্ব কয়েকটি জনমত জরিপের ফলাফল বলছে, নির্বাচন হবে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। প্রথম দিকে পিছিয়ে থাকলেও শেষ দিকের জরিপগুলোতে স্বাধীনতার পক্ষে জনমত বেড়ে যায়। শুক্রবারই নির্বাচনের ফল ঘোষিত হবে।

গুরুত্বপূর্ণ সফরে ভারতে আসছেন শি জিনপিং

শি জিনপিং
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আজ বুধবার ভারত সফরে আসছেন। দুটি অভিনব ঘটনা ঘটছে তাঁর এই সফরে। এক, প্রচলিত রাষ্ট্রাচার ভেঙে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চীনের প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানাবেন। আর এই প্রথম কোনো বিশ্বনেতা দিল্লির বদলে ‘মোদির গুজরাট’ দিয়ে তাঁর সফর শুরু করছেন। গুজরাটের আহমেদাবাদের সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই প্রথম কোনো নেতাকে আজ গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। শি জিনপিংয়ের এই সফর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর সফরে দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়ার কথা। এর একটি গুজরাট সরকারের সঙ্গে দক্ষিণ চীনের গুয়াংডং প্রদেশের মধ্যে, অন্যটি স্বাক্ষরিত হবে আহমেদাবাদ মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের সঙ্গে গুয়াংডংয়ের রাজধানী গুয়াংজুর মধ্যে। দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে ভারতের উদ্বেগও আলোচ্য বিষয় হিসেবে থাকছে। চীন ভারতে শিল্প পার্ক স্থাপনে বিনিয়োগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা সফর করে শি আসছেন ভারতে। ওই সফরে শি নৌপথে চীন থেকে দক্ষিণ এশিয়া হয়ে ইউরোপে যাওয়ার ঐতিহাসিক ‘সামুদ্রিক সিল্ক রোডে’ সংযুক্ত হতে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার কাছে আহ্বান জানান। দৃশ্যত এরই প্রতিক্রিয়ায় ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ভারতও ‘মৌসুম’ নামের একটি সামুদ্রিক পথের প্রস্তাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যেসব অঞ্চলে মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়, ভারত মহাসাগরীয় সেসব দেশের মধ্যে ঐক্যপ্রত্যাশী মোদির এ প্রকল্প। গত মে মাসে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতা নেওয়ার পর ভারত ও চীন উভয়েই শি জিনপিংয়ের এই সফর নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে। তবে শির সফরের প্রাক্কালে ভারত-চীন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমস-এ প্রকাশিত খবরে বলা হয়, গত সপ্তাহে চীনা সেনাবাহিনীর ২০০ সদস্য সীমান্তবর্তী লাদাখের ভারতের দাবিকৃত অংশে ঢুকে পড়ে। তারা সেখানে দুই কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক তৈরির কাজ শুরু করে। ভারতীয় সেনারা এর প্রতিবাদ জানায়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সৈয়দ আকবরউদ্দিন সীমান্তে উত্তেজনা প্রসঙ্গে বলেন, মোদির সঙ্গে শির বৈঠকে সীমান্ত বিরোধ প্রসঙ্গ উঠবে।

বয়স পাঁচ, লম্বা পাঁচ ফুট সাত!

বয়স পাঁচ, লম্বা পাঁচ ফুট সাত!
করণ সিং স্কুলে যাবে, এ নিয়ে তার মা-বাবার চিন্তার শেষ নেই। না, ছেলে প্রথম স্কুলে যাচ্ছে বলে নয়, উদ্বেগের কারণ তাঁর উচ্চতা। সমবয়সীদের তুলনায় বেজায় লম্বা করণ। বয়স ৫ বছরের সামান্য বেশি হলেও সে পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি লম্বা। করণের বাড়ি ভারতের উত্তর প্রদেশের মিরাট জেলায়। বাবা সঞ্জয় সিং বলেন, স্কুলে গেলে প্রথম প্রথম সহপাঠীরা ওকে দেখে দৌড়ে পালাত, এড়িয়ে চলত।
পরে অবশ্য সব ঠিক হয়ে যায়। এখন অনেক বন্ধু ওর। উচ্চতার জন্য গিনেস ওয়ার্ল্ডের রেকর্ড গড়েছে করণ। বিশ্বে ওর বয়সী কোনো শিশু এত লম্বা নয়। করণের মা শ্বেতলানা সিংও সাত ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা। এখনো তাঁর উচ্চতা বেড়ে চলেছে। ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতের সবচেয়ে দীর্ঘাঙ্গি নারী। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

ইমরানের আহবান

ইমরান খান
পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রধান ইমরান খান তাঁর আন্দোলনরত সমর্থকদের ওপর ‘পুলিশি নির্যাতন’ বন্ধ করতে দেশের সুপ্রিম কোর্টের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সময় তিনি এই আহ্বান জানান। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় জনগণের ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ইমরান বলেন, ‘গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা হিসেবে সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করা সুপ্রিম কোর্টের কর্তব্য।’
গত সোমবারও ইমরান প্রধান বিচারপতির প্রতি তাঁর সমর্থকদের ওপর পুলিশি নির্যাতন বন্ধে সুয়োমটো জারির আহ্বান জানিয়েছিলেন। জোর করে গ্রেপ্তার কর্মীদের ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগে পুলিশ রোববার ইমরানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ডন

আওয়ামী লীগে খুনোখুনির নেপথ্যে ভাগ-বাটোয়ারা by নুরুজ্জামান লাবু

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে চলছে খুনোখুনি। ঘটছে একের পর এক খুনের ঘটনা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অভিযোগের আঙুল উঠছে দলীয় কর্মীদের বিরুদ্ধে। এ কারণে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা রয়েছেন চরম আতঙ্কে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই নয়, ঢাকার বাইরে দেশের প্রায় সব জেলা-উপজেলাতেও একই অবস্থা। এ পর্যন্ত সংঘটিত এসব দলীয় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ভাগবাটোয়ারার বিষয় জড়িত বলে তদন্ত সূত্র জানিয়েছে। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসার ভাগবাটোয়ারার বিষয়ও আছে কোন কোন হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে। অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি  বছরের গত আট মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্তত শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী খুন হন। নিজ দলের লোকজনের হাতেই খুন হন তারা। এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, খুনি খুনিই। তাদের কোন দলীয় পরিচয় নেই। খুনিদের কারও ছাড় নেই- সে দলের হোক বা দলের বাইরের কেউ হোক। আইন তার নিজের গতিতে চলবে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা খুনের ঘটনায় এমপিদের নামও এসেছে। আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না।
গত শুক্রবার খোদ ঢাকার আজিমপুরের আওয়ামী লীগের দুই সংসদ সদস্যের অনুসারীদের বিরোধের জের ধরে এক কর্মী খুন হন। একটি কাঁচাবাজারের দখল নিয়ে স্থানীয় এমপি হাজী সেলিমের অনুসারীদের সঙ্গে সাবেক এমপি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের অনুসারীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় প্রতিপক্ষের লোকজন সাহাবুদ্দিন সাবু নামে এক কর্মীকে কুপিয়ে জখম করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর শ্যামপুরে ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম লালুকে সন্ত্রাসীরা গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এ ঘটনায় পুলিশ একই ইউনিয়ন ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরনবী শাওনকে ওরফে হাতকাটা নবীকে গ্রেপ্তার করে। পুলিশ জানিয়েছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে লালুকে হত্যা করা হয়। গত ১০ই আগস্ট আগারগাঁওয়ের ৪১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি পদপ্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনার নেপথ্যেও আধিপত্য বিস্তার বলে পুলিশ জানিয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ গ্রুপের সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ২০শে মে ফেনী শহরে প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা একরামুল হক একরামকে। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের ফেনী সদর আসনের সংসদ সদস্য নিজাম হাজারীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। ঘটনার তদন্ত শেষে পুলিশ যে চার্জশিট দিয়েছে তাতে নিজাম হাজারীর নাম না থাকলেও চার্জশিটভুক্ত বেশির ভাগ আসামিই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। গত ১৫ই জানুয়ারি যশোরের বেলতলা এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলি ও বোমা হামলায় নিহত হন শহর যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম শিপন। এ মামলায় জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ফয়সাল খানসহ ১০ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে।
বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা ও নাসিক প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ সাত খুনের ঘটনার নেপথ্যেও দলীয় নেতাকর্মী। ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নূর হোসেন র‌্যাব সদস্যদের দিয়ে তাদের হত্যা করা হয়। ঘটনার পরপরই নূর হোসেন ভারতে পালিয়ে গেলেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত র‌্যাব সদস্য ও নূর হোসেনের সহযোগীদের গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত চলছে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনেও আধিপত্য বিস্তার প্রধান কারণ বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
গত বছরের ২৯শে জুলাই রাজধানীর গুলশানে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কীকে। এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত একই সংগঠনের নেতা জাহিদ সিদ্দিকী তারেকসহ দু’জন র‌্যাবের ক্রসফায়ারে নিহত হন। তদন্ত শেষে এই ঘটনায় তারেক ছাড়া আরও ১১ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় র‌্যাব। এর মধ্যে বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী। এদের মধ্যে যুবলীগ নেতা সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল বিদেশে পলাতক ও মতিঝিল থানা আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু কারাগারে। অন্যরা অনেকেই জামিনে রয়েছেন। বর্তমানে মামলাটির অধিকতর তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ- সিআইডি।
গত বছরের ১৮ই জানুয়ারি টাঙ্গাইলে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা ফারুককে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে টাঙ্গাইলের খান পরিবারের চার ভাই সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা, পৌরসভার মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি, টাঙ্গাইলের চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি জাহিদুর রহমান খান কাঁকন, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা সানিয়াত খান বাপ্পার হাত রয়েছে। মূলত জেলা সেক্রেটারির পদ নিয়ে বিরোধের জের ধরে ফারুককে হত্যা করা হয়।
গত ২৪শে মে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর পুইছড়িতে আওয়ামী লীগের সুলতান গ্রুপের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে প্রাণ হারান শামসুল আলম। ১৬ই  মার্চ নগরীর দুই নম্বর গেটে খুন হন ছাত্রলীগ কর্মী ফোরকান ও কামরুল। যুবলীগ নেতা আবুল বশর এই জোড়া খুনের নির্দেশদাতা ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত নির্বাচনের পর লক্ষ্মীপুরে নিহত হয়েছেন চরশাহী আওয়ামী লীগ সভাপতি আবদুল মান্নান ভূঁইয়া, রায়পুর পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ, ভাঙ্গাখা ইউনিয়ন যুবলীগ কর্মী রিপন হোসেন, বসিকপুর যুবলীগ নেতা রোমান হোসেন, রামগঞ্জ যুবলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম, চন্দ্রগঞ্জ বসুদহিতা ছাত্রলীগ কর্মী মামুন হোসেন, চন্দ্রগঞ্জে ছাত্রলীগের দুই কর্মী রবিউল ইসলাম শিমূল এবং ফরহাদ হোসেন মামুন। তাদের মধ্যে ফরহাদ হোসেন মামুনকে নৃশংসভাবে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব-বিবাদ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা থেকেই এ সব ঘটনা ঘটেছে। দলীয় কোন্দলের কারণে নোয়াখালীর চাটখিলে ১৬ই মার্চ চাটখিল পৌর ছাত্রলীগ নেতা আল-আমিন প্রথমে অপহরণ ও পরে গুলিতে নিহত হন। ৭ই মে অপহরণের পর খুন হন যুবলীগ নেতা শুভংকর চন্দ্র কুঁড়ি। ২৬শে এপ্রিল যশোরের বেনাপোলে পাল্টাপাল্টি হামলায় খুন হন যুবলীগের দুই কর্মী পুটখালীর ইমান আলী ও উত্তর বারোপোতা এলাকার লালন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফোরকান উদ্দিন মৃধা ওরফে পাহাড়ি সেলিম নিহত হন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে তার মৃত্যু হয়।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে দলীয় নেতাকর্মী খুনের ঘটনায় দলীয় নেতাকর্মী জড়িত থাকায় তদন্ত প্রভাবিত হয়ে থাকে। অনেক সময় জড়িত নেতাকর্মীরা প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও এক ধরনের চাপ তৈরি হয়। এ জন্য তারা ঠিকভাবে কাজ করতে পারেন না। এ কারণে বেশির ভাগ অপরাধী  ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। কিংবা ধরা পড়লেও সহজেই জামিনে ছাড়া পেয়ে যান। দলের ঊর্ধ্বতন নেতারাও দলীয় অবস্থান ধরে রাখার জন্য অভিযুক্তদের পক্ষ নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. জিয়াউর রহমান বলেন, রাজনীতি যখন অর্থ উপার্জনের উৎস হয় তখন এমন খুনোখুনি হয়। এক শ্রেণীর লোক রাজনীতিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। এলাকায় যার আধিপত্য তার হাতেই সব কিছু থাকে নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে আধিপত্য বিস্তারের কারণে নিজ দলের নেতাকর্মীকে খুন করা হয়। তিনি বলেন, আমাদের তৃণমূলে যতদিন না গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়ন না ঘটবে ততদিন এভাবে চলতে থাকবে।

সংবিধান সংশোধন বিল পাস হচ্ছে আজ

বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনতে ‘সংবিধান (ষোড়শ সংশোধন) বিল-২০১৪’ আজ পাস হওয়ার কথা রয়েছে। বিলটি সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত হওয়ায় এটি ‘হ্যাঁ-না’ কণ্ঠভোটে পাস হবে না। সংবিধান অনুযায়ী বিভক্তি ভোট অর্থাৎ গোপন বুথে সরাসরি ব্যালটে স্বাক্ষরের মাধ্যমে সংসদ সদস্যদের ভোট গ্রহণ করা হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বিলের পক্ষে পড়লে তা পাস হবে। সংবিধান সংশোধনী বিলটি পাস উপলক্ষে এরই মধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সংসদ সচিবালয়। বিভক্তি ভোট গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় বুথের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভোট গ্রহণের জন্য কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বুঝে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া আজ সব সংসদ সদস্যকে সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত থাকতে সরকারি ও বিরোধী দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের জোটের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের সময় কোন সদস্য সংসদে অনুপস্থিত থাকতে পারবেন না। অনুপস্থিত থাকলে তার সদস্যপদ শূন্য হবে। তবে স্পিকারের এবং স্ব-স্ব দলের সংসদীয় দলের প্রধানের অনুমতি সাপেক্ষে যে কোন সদস্য ওই দিন অনুপস্থিত থাকতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি বিলটির পক্ষে ভোট দেবে বলে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিরোধী দল বিলের পক্ষে ভোট দেবে জানিয়ে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘আমরা বিলের পক্ষে ভোট দেবো, দলীয়ভাবে এ সিদ্ধান্ত রয়েছে।’ তিনি জানান, একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নেয়ার জন্য বুধবার তার বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল, তবে সংবিধান সংশোধনী বিল পাসের বিষয় থাকায় তিনি সেই সফর বাতিল করেছেন। এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ জানান, সংবিধান সংশোধন বিল পাসের দিন সংসদে যেন সরকারি দলের সব সংসদ সদস্য উপস্থিত থাকেন সে জন্য এরই মধ্যে হুইপিং করা হয়েছে। সবাই উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী সংবিধান সংশোধন বিলটির ওপর কিছু সংশোধনী জমা দিয়েছেন সংসদ সচিবালয়ে। বিলটির ওপর জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাবও করেছেন তিনি। এ ছাড়া কেউ বিলটির ওপর কোন সংশোধনী বা জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দেননি। সংবিধান সংশোধন বিল পাসের নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে বিলটি পাসের প্রস্তাব করবেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক। এরপর স্থায়ী কমিটির সুপারিশকৃত আকারে বিলটির প্রতিটি উপদফা, দফা, প্রস্তাবনা ও শিরোনাম ভোটে দেবেন স্পিকার। পরে জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠান ও সংশোধনী প্রস্তাবগুলোও স্পিকার ভোটে দেবেন। এ দুটি বিষয় নিষ্পত্তি হবে কণ্ঠভোটে। এরপর বিলটি পাসের প্রস্তাবের পক্ষে-বিপক্ষে সংসদ সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে লবিতে গিয়ে গোপন বুথে স্বাক্ষর করবেন। এরপর স্পিকার ভোটের ফলাফল ঘোষণা করবেন। এ বিলটি পাস হলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ’৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপিত হবে। ওই অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টের কোন বিচারককে তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অসদাচরণ বা অসামর্থ্যের কারণে সংসদের মোট সদস্য সংখ্যার অন্যূন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সমর্থিত সংসদের প্রস্তাবক্রমে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে অপসারণের বিধান ছিল। তবে ওই অনুচ্ছেদে বিচারপতিদের চাকরির বয়স বর্তমান বিধান অনুযায়ী ৬৭ বহাল থাকবে।
উল্লেখ্য, গত ৭ই সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সাত দিনের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য ওই দিনই বিলটি আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাই শেষে বিলের ওপর সংসদে প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। সংসদীয় কমিটি গত ৯ ও ১০ই সেপ্টেম্বর মাত্র দু’টি বৈঠকেই এ প্রতিবেদন চূড়ান্ত করে। এর আগে ২০১১ সালের ৩০শে জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়েছিল। বহুল আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে ওই সংশোধনীর মাধ্যমে। সংসদে বিভক্তি ভোটের মাধ্যমে সেদিন বিলটি পাস হয়েছিল। বিলটির পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ২৯১টি, বিপক্ষে ‘না’ ভোট পড়েছিল মাত্র ১টি। নবম সংসদের একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম ওই ‘না’ ভোটটি দিয়েছিলেন।

যে প্রশ্নের জবাব সরকারের নিজেরও জানা নেই by নূরে আলম সিদ্দিকী

৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর হয় নিদারুণ দাম্ভিকতা অথবা মর্মান্তিক অদূরদর্শিতা, মননশীলতার দৈন্যের কারণে সরকার একেকটি নতুন বিতর্কের উপস্থাপন করছে। যে প্রশ্নের জবাব ও যৌক্তিকতা সরকার নিজে অবগত অথবা এর সঠিক জবাব দিতে তারা প্রস্তুত কিনা সেটি রাজনীতির আজ বড় প্রশ্ন। সম্প্রতিকালে এ কে খন্দকারের ‘জয় পাকিস্তান’ নিয়ে যে বিতর্কের ঝড় উঠলো সেখানেও মূল প্রশ্নটি হলো ১৫ই আগস্টের পর এ কে খন্দকার সাহেব খুনি মোশ্‌তাকের প্রতি প্রকাশ্য আনুগত্য প্রকাশ করলেন। বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করার জন্য জেনারেল শফিউল্লাহ, এ কে খন্দকার, মোশাররফ হোসেন খানদের যে নৈতিক এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল সেটি তো করেনইনি বরং বাংলাদেশ বেতারে স্ব-ইচ্ছায় খুনি মোশ্‌তাক সরকারের সমর্থন প্রদান করেছেন। জেনারেল এরশাদের মন্ত্রিসভায়ও তিনি পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন। তাকে ২০০৮-২০১৪ সাল পর্যন্ত কোন যুক্তিতে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য রাখা হলো?  স্বৈরাচারী মানসিকতার এহেন স্বেচ্ছাচারিতা বিরল ও দৃষ্টান্তবিহীন।

দলের পরিচালনা পরিষদ, নীতিনির্ধারণী প্রেসিডিয়াম, সংসদ, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা শুধু অকার্যকরই নয়, কেবল দলীয়করণের আবর্তে অন্তরীণই নয়, প্রধানমন্ত্রীর এতটাই আজ্ঞাবহ যে, শেখ হাসিনার অর্চনা-তোষামোদীর প্রতিযোগিতায় বিবেক বিবর্জিত; অন্ধের মতো যখন ছুটছে, শাসনতন্ত্র তার আঁচলে বাঁধা- এ নির্মম সত্যটি যখন বিশ্ববাসীর কাছে প্রতীয়মান তখন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় দু’টি প্রধান স্তম্ভ গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগ সংশ্লিষ্ট সম্প্রচার নীতিমালা ও বিচারপতিদের অভিশংসন আইন প্রণয়নে এ নির্লজ্জ উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনসহ বিশ্ব জনমতকে তিনি যে বার্তা দিলেন, এক কথায় নিজেকে প্রতিভাত করলেন- তা হলো, তিনি মনে করেন রাষ্ট্রশাসনে জনগণ, বিশেষজ্ঞের মত, সংসদ, প্রশাসন, আইন বিভাগ কোন কিছুরই প্রয়োজন নেই। তার ইচ্ছা, অভিপ্রায় ও অভিলাষই সর্বশেষ এবং একমাত্র বিধান। বাংলাদেশে তিনি কারও কাছে জবাবদিহির আওতায় নেই। বিশ্ববাসীর বিশ্লেষণে তিনি রোমান সম্রাটের চেয়েও শক্তিশালী। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি জানি রোমান সম্রাট জাতীয় সমস্যা অথবা কোন নতুন অভিযান পরিচালনা করলে তার মন্ত্রিপরিষদ, সেনাধ্যক্ষদের সঙ্গে চুলচেরা আলোচনা করে একটি সিদ্ধান্ত নিতেন। গ্রিক সভ্যতার প্রাক্কালেও স্বাধীন ও সার্বভৌম পার্লামেন্ট ছিল এবং সংসদ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সংসদের অভিমতকে এড়িয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া কারও পক্ষে সম্ভব ছিল না।
প্লেটোসহ তৎকালীন দর্শন, বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কালজয়ী ও প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গের শিক্ষক সক্রেটিসের বিচারও সংসদের অভ্যন্তরেই হয়েছিল। যারা এই অভিশংসন আইন, সম্প্রচার আইন নিয়ে নানা আবোল-তাবোল কথা বলছেন, ভাগ্যিস তারা এসব দৃষ্টান্ত দেননি বা দিতে পারেননি। অভিশংসন বিলটি সংসদে পেশ হওয়ার পর এর বিচার-বিশ্লেষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হলে দেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ, শাসনতন্ত্রের প্রণেতাগণসহ বহু বিশ্লেষক, আইনজীবী বিবেকের নিভু নিভু আলোয় এখনও যারা নিজেদের তুলে ধরতে চাইছেন তারা সকলেই প্রস্তাবটি আইনে পরিণত করার আগে গণভোটে পাঠানোর দাবি তুলেছিলেন। আমি এদের মতো প্রজ্ঞার অধিকারী না হলেও এ দাবির সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিলাম। সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যান বিস্তারিত বর্ণনায় না গিয়ে তার বিশেষ বাচন ভঙ্গিমায় সংসদকে জানালেন, ’৭২-এর সংবিধানের সংযোজিত ধারাটি কেবল পুনরুজ্জীবিতই করা হলো না বরং তাদের চাকরির নিশ্চয়তা অধিক নিরাপদ করা হলো যে, ইমপিচমেন্ট কমিটির সদস্যদের সুপারিশ সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য দ্বারা সমর্থিত হওয়া প্রয়োজন, তারপরই রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। নিন্দুক এবং তার সমালোচকরা তার ইন্টেগ্রিটি নিয়ে যত কটাক্ষ, যত সমালোচনাই করেন না কেন আমি এ প্রসঙ্গে কোন বিতর্কে যেতে চাই না। তার বাকচাতুর্যে আমার কোন সন্দেহ নেই। তার একটি অদ্ভুত উপস্থাপন-ভঙ্গি এবং বিরল হাস্যোজ্জ্বল মুখ তার তীব্র বিরোধীকেও সাময়িকভাবে হলেও আকৃষ্ট করে। কিন্তু চমক ভাঙতে সময় লাগে না। শুধু সুরঞ্জিত বাবুই নন, বড়-ছোট, মাঝারি পাতি নেতারাও কৃতার্থ চিত্তে এবং বিগলিত হৃদয়ে প্রায়ই বলেন- নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্রের সকল অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করবে। সেটাই তো স্বাভাবিক। কথাটি সঙ্গত এবং যুক্তিগ্রাহ্য হতো যদি সংসদের নির্বাচনের প্রশ্নে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনটি দেশে এবং বিদেশে অগণতান্ত্রিক ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত না হতো। শুধু ১৫৩ জন সংসদ সদস্যই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত নন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনটি গণতন্ত্রের নামে একটি প্রহসন। এবং স্বয়ং শেখ হাসিনার উক্তি, এটি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার নির্বাচন।
’৭২-এর সংবিধানের স্বীকৃতি ও ম্যান্ডেট নেয়ার জন্য ’৭৩-এর নির্বাচনটি বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী নেতৃত্বে বিকশিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকেই সগৌরবে প্রতিষ্ঠিত করে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশে সিরাজ শিকদার ও গণবাহিনীর অস্ত্র যখন গণতন্ত্র ও মানবতাকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে তুলেছিল সেই অরাজকতা, থানা লুট, খাদ্যগুদামে অগ্নিসংযোগ ইত্যাদি বীভৎস নারকীয় পরিবেশে নির্বাচন না দেয়ার শাসনতান্ত্রিক বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও ’৭৩-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ২৯১টি (৩০০টির মধ্যে) আসনপ্রাপ্তি সংবিধানকে ম্যান্ডেটস্বীকৃত করে; বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে এবং বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও গণতান্ত্রিক চেতনার মননশীলতাকে হিমাচলের গিরিশৃঙ্গমালার উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করে। তখনকার রাজনৈতিক আঙ্গিকে সকলেরই বিশ্বাস ছিল নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব আসবে এবং নতুন নতুন মুখ নির্বাচিত হয়ে প্রদীপ্ত সূর্যের মতো শুধু সংসদে নয়, দেশে গণতন্ত্রের আলো ছড়াবে। শুধু শাসনতন্ত্রে ও লৌকিকতায় নয়, প্রকৃত অর্থে আওয়ামী লীগ কংগ্রেসের মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্রমান্বয়ে রূপান্তরিত হবে এবং সংসদও ভারতীয় সংসদের মতো যে দলই ক্ষমতায় থাক না কেন, কার্যকর অর্থে অনুশীলনে, চর্চায়, মননশীলতায় কোন ব্যক্তি বা দলের নয়, দেশের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে সংসদকে গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক পাদপীঠে রূপান্তরিত করবে। বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন হবে দলীয় সংকীর্ণতার প্রভাব বিবর্জিত একেকটি গণতান্ত্রিক পাদপীঠ এবং স্বমহিমায় উদ্ভাসিত নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। ’৯১-এর নির্বাচন থেকে শুরু করে যতই দিন পেরিয়েছে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতা পাওয়া তো দূরে থাক, ব্যক্তিতান্ত্রিকতায় রূপান্তরিত হয়েছে। দেশ শাসনের প্রশ্নে জনগণ, তাদের মতামত ও স্বার্থ আজ কেবল অপাঙ্‌ক্তেয়ই নয়, নির্মমভাবে উপেক্ষিত। সেখানে বিচারপতির অভিশংসন ও সম্প্রচার আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ’৭২-এর শাসনতন্ত্র থেকে ভারতসহ যে কোন সংসদের উদাহরণ টানা আজকে একটি বিরাট কৌতুক।
১৯৭৫ সালে মস্কোপন্থি বামদের সুপরিকল্পিত ও কৌশলী চক্রান্তে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়েছিল। বর্তমানে মস্কো-পিকিং ও গণবাহিনী প্রবর্তকদের বিরামহীন ইন্ধনে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে অকস্মাৎ তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতি বিলুপ্তির মাধ্যমে একদলীয় নয়, বরং এক ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলেই এ কে খন্দকার, জেনারেল শফিউল্লাহ, এম এইচ খান, জেনারেল খলিল ও এইচ টি ইমামের মতো সুযোগসন্ধানী ব্যক্তিরা খুনি মোশ্‌তাকের সুস্পষ্ট মদতদাতা হওয়ার পরও কোন শাস্তি তো পানইনি, বরং পুরস্কৃত হয়েছেন। অজ্ঞাত পরিচয়, অনভিজ্ঞ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মস্কো-পিকিংপন্থি ভ্রান্ত বাম ও গণবাহিনীর শক্তিশালী নেতারা ক্ষমতায় সদম্ভে অধিষ্ঠিত থাকার কারণে আক্ষেপে আমি লিখেছিলাম- কর্নেল তাহের ও সিরাজ শিকদার জীবিত থাকলে তারাও বোধহয় শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার শোভা বর্ধন করতেন। কথাটি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের উত্তরাধিকার হিসেবে আমার ব্যক্তিগত হলেও নিবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার পর তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে প্রেসিডিয়াম এমনকি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী পর্যায়ের সদস্যদের এত অসংখ্য সমর্থনসূচক টেলিফোন আমি পেয়েছি যা আমাকে শুধু আশ্চর্যান্বিত ও বিস্ময়াভিভূতই করেনি, মনে হয়েছে আমি আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক নেতা ও কর্মীর হৃদয়ের রক্তক্ষরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছি।
একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, পৃথিবীর যেখানেই গণতন্ত্রের লেশমাত্র রয়েছে সেখানেই কোন না কোনভাবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যক্তিতান্ত্রিকতার ভিত্তি যখন ক্রমেই জগদ্দল পাথরে রূপান্তরিত হচ্ছে তখন প্রায়ই নতুন নতুন আইন, অনুশাসন, দম্ভোক্তি মানুষকে ব্যথিত ও স্তম্ভিত করছে এবং দেশকে এক অজানা আশঙ্কার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে সংসদে জাতীয় পার্টির ক্যারিকেচার এবং সংসদের বাইরে কেবলই ক্ষমতালিপ্সু, ভগ্ন মেরুদণ্ড, জনসমর্থনহীন বিএনপির প্রতিবাদ তো দূরের কথা, সামান্য প্রতিরোধ করারও শক্তি নিঃশেষিত হচ্ছে। এটাও মূল্যবোধের অবক্ষয়ের অন্যতম বাস্তব দৃষ্টান্ত। সামগ্রিকভাবে জাতি আজ ঘনঘোর অন্ধকার অমানিশার মধ্যে নিপতিত।
এই চরম হতাশার মুহূর্তেও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখি বলেই নতুন প্রজন্মের প্রতি আমি উদাত্ত আহ্বান জানাবো, তোমরা আত্মপ্রত্যয়ে উজ্জীবিত হয়ে এই ঘনঘোর অমানিশার মধ্যে অকুতোভয়ে এগিয়ে আসো। তোমরাই পারবে আরেকটি ৬৯, ৭০ বা ৭১-এর জন্ম দিতে। আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনের ইতিহাস শিক্ষা দেয়- গণতান্ত্রিক অধিকার ভিক্ষা চেয়ে পাওয়া যায় না, আগ্নেয়গিরির গলিত লাভার মতো প্রজ্জ্বলিত হয়েই তাকে অর্জন করতে হয় এবং সেটি স্বার্থবিবর্জিত নতুন প্রজন্মের পক্ষেই সম্ভব।

ছিনতাই আতঙ্ক by ইকবাল আহমদ সরকার

দিন দুপুরে গুলি করে, ডিবি পুলিশ ও র‌্যাব পরিচয়ে পর পর কয়েকটি স্থানে কোটি টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অপরদিকে বিকাশের টঙ্গী সেনাকল্যাণ শাখার বিক্রয় প্রতিনিধি নিজাম উদ্দিন গত গত ১৪ই সেপ্টেম্বর স্থানীয় এজেন্টদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে অফিসে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। দিন দুপরে তাকে গুলি করে টাকাভর্তি ব্যাগ ও তার মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। ১২ই সেপ্টেম্বর ভোরে গাজীপুর নাগদা ব্রিজ থেকে ঈশ্বরদী ইপিজেডে অবস্থিত ভিনটেজ ডেনিম লিমিটেড নামের কারখানার ৮৫ লাখ টাকা দামের ২৪৩ রোলে ২৭ হাজার ৮৭১ গজ ফেব্রিকসসহ কাভার্ডভ্যান ছিনতাই হয়। র‌্যাব সদস্য পরিচয় দিয়ে এ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। কাপড়সহ কাভার্ডভ্যান ছিনিয়ে নেয়ার ওই ঘটনায় ব্যবস্থাপক (কর্মাশিয়াল ডিপার্টমেন্ট) মো. আছাদুজ্জামান বাদী হয়ে জয়দেপুর থানায় মামলা করেন। গত ১০ই সেপ্টেম্বর বুধবার গাজীপুর মহানগরের জাঝর এলাকার নার সুয়েটার ফ্যাক্টরির শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতনের ৭২ লাখ টাকা নিয়ে কর্মকর্তারা মাইক্রোবাসযোগে উত্তরা থেকে কারখানায় যাচ্ছিলেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় কারখানার কাছে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে মাইক্রোবাস থামিয়ে গাড়িসহ ৭২ লাখ টাকা নিয়ে চলে যায়। গত ১১ই সেপ্টেম্বর কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকা থেকে দিন দুপুরে ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে কয়েকজন যুবক গ্রামীণফোনের কাস্টমার সার্ভিসের ২ জনের কাছ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। কালিয়াকৈরের খাড়াজোড়া নামক স্থানে দু’জনকে সড়কের পাশে ফেলে এরপর তারা চলে যায়। এছাড়াও গাজীপুরের কোনাবাড়ি শিল্প এলাকা ও কালিয়াকৈর এলাকায় দুটি কারখানার গত মাসে বিপুল অংকের টাকা ছিনতাই হয়েছে। গত এক সপ্তাহে গাজীপুরে তিনটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় মোট ৯ জনকে আটক করা হয়। তবে কোন ছিনতাইয়ের টাকা বা মালামাল উদ্ধারের তেমন কোন অগ্রগতি নেই। বিষয়ে এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। দিন দুপুরে প্রকাশ্য গুলি করে, ডিবি পুলিশ ও র‌্যাব পরিচয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনায় লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে গাজীপুরের গ্রামীণফোনের ডিস্ট্রিবিউটর বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মো. মোবারক হোসেন জানান, প্রায় এক বছর আগে টঙ্গীর পাড়ার এলাকায় তার একজন বিপণন কর্মীকে গুলি করে ৬ লাখ টাকা ছিনতাই করেছে। সম্প্রতি গাজীপুরের নানা কায়দায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তিনি রয়েছেন আতঙ্কে। তিনি বলছেন, ফ্ল্যাক্সি লোড, রিচার্জ কার্ড, মোবাইল ফোন সেট ইত্যাদির টাকা সংগ্রহ করতে কর্মীদের সকালে মার্কেটে পাঠিয়ে সন্ধ্যায় অফিসে ফেরা পর্যন্তই থাকতে হয় উৎকণ্ঠায়। বাংলালিংকের টঙ্গী এজেন্ট ভয়েজ মার্কেটিংয়ের মালিক মনিরুল ইসলাম শামীম জানান, কয়েক মাস আগে টঙ্গীর সাতাইশ এলাকা থেকে গুলি করে তাদের বাংলালিংকের কর্মীর কাছ থেকে ছিনতাই হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। আজো উদ্ধার হয়নি সেই টাকা। ঈদ সামনে রেখে ছিনতাইকারী ও অপরাধীচক্র বেশি তৎপর থাকে। তাই পুলিশের নজরদারি ও তৎপরতা বাড়ানো প্রয়োজন। জাঝর এলাকার যে কারখানার ৭২ লাখ টাকা ছিনতাই হয়েছে, সে সোয়েটার কারখানার মালিক মো. মনির উদ্দিন জানিয়েছেন এর পর বেতন বোনাসের জন্য ব্যাংক থেকে টাকা তুলে কারখানায় আনার সময় পুলিশ পাহারায় টাকা নিয়ে আসবেন।

বাঘেরা বাঁচুক সুন্দরবনের জন্য by কাজল ঘোষ

কিছুদিন আগে চিড়িয়াখানা দেখে আসা একদল উৎসাহী তরুণের সঙ্গে কথা হচ্ছিল বাঘ নিয়ে। আমাদের এখানে যে দু’চারটি বাঘ আছে তাদের কোনটিরই প্রাণশক্তি আছে বলে মনে হয় না। অতিকষ্টে তৃতীয় বিশ্বের এই দরিদ্র দেশের প্রতিনিধিত্ব করতেই যেন এদের পথচলা। এদের দেখলেই যে কেউ বুঝবে এদেশে খাবারের অভাব। খাদ্য বণ্টনে সততা নেই। খাদ্য লুটপাটকারীদের নেই বিচার। সর্বোপরি সুশাসনের অভাব। আলোচনা বুঝি ধীরে ধীরে সুশীল সমাজের দিকেই এগোচ্ছে। একবার ভাবুনতো চিড়িয়াখানায় গিয়ে বাঘের হাঁক ক’জন শুনেছেন। যারা শুনেছেন নিঃসন্দেহে তারা সৌভাগ্যবান। যারা বাঘ নিয়ে জরিপ করেন তারা যদি কোনভাবে শহরে বাসরত নাগরিকদের যারা চিত্তের বিনোদনে চিড়িয়াখানায় গেছেন তারা কি বাঘের শব্দ শুনেছেন। এমন ভাগ্যবানদের তালিকা খুব লম্বা হওয়ার কোন কারণ দেখি না। কেন বাঘ আর আওয়াজ করতে পারে না। তা চিড়িয়াখানার হাঁড়ির খবর নিলেই বেরিয়ে আসবে।
একাধিক পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, চিড়িয়াখানার প্রাণীগুলোর খাবার সরবরাহ সঠিকভাবে হয় না। কিউরেটরের এক চিঠি থেকে জানা যায়, জানুয়ারি মাসে ১৬০০ কেজি সবুজ ঘাস সরবরাহের নির্দেশ থাকলেও মাত্র ৮০০ কেজি ঘাস সরবরাহ করা হয়। অথচ খাতায় লেখা হয় ১৬০০ কেজিরই তথ্য। পরে বিষয়টি নিয়ে প্রাণীপুষ্টি অফিসার আবু সাঈদ কামাল বাচ্চুর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনে থমকে যায় জবাব প্রক্রিয়া। সংশ্লিষ্টরা জানান, শুধু ঘাস নয়; প্রাণীগুলোর অন্যতম খাবার মাংস সরবরাহেও অর্ধেক দেয়া হয়। এছাড়া, খাবার হিসেবে ২ দাঁতের অল্পবয়সী গরুর মাংস সরবরাহের নির্দেশনা থাকলেও দেয়া হয় বুড়ো জীর্ণশীর্ণ মৃতপ্রায় গরু-মহিষের মাংস। মানসম্মত পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে এবং নিয়মিত ওষুধসহ সঠিক পরিচর্যার অভাবে চিড়িয়াখানার বেশির ভাগ প্রাণীই ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে এগোচ্ছে। অভিযোগ আছে, নির্ধারিত বরাদ্দের বিপরীতে অর্ধেক পরিমাণ খাবার সরবরাহ নেয়া হয় ঠিকাদার থেকে। আর এর নেপথ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয় মোটা অঙ্কের অর্থ। এর জন্য যদিও একাধিক তদন্ত কমিটি হয়েছে; সংসদীয় তদন্ত কমিটিও কাজ করেছে। ওই পর্যন্তই। বাঘেরাতো খাঁচায় বন্দি। না হলে হয়তো ওদের বরাদ্দের হিসাব পাই পাই করে বুঝে নিতো। আর যাই হোক বাঘেরা দলবলে কম হলেও দুর্বল নয়। নিয়তির পরিহাস চিড়িয়াখানার এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য বেচারা বাঘ মামার দল এক পা কবরে দিয়ে আমাদের বিনোদন দিচ্ছে। এ চিত্র শুধু ঢাকা চিড়িয়াখানার- এমন ভাবার কোন কারণ নেই। কক্সবাজারে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। এটা তো পশু-পাখিদের জন্য অভয়ারণ্য হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেখানকার যে দু’চারটি বাঘ আছে তারাও মর-মর। এসবের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের জবাবদিহি আছে বলে মনে হয় না। কার বরাদ্দ কে পরীক্ষা করে? লুট করে প্রাণীকুলকে পথে বসানোই এদের কাজ। ব্যক্তিগত আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা বলে মূল প্রসঙ্গে ফিরে আসছি। কিভাবে প্রাণীদের খাবার না দিয়ে নিজেরাই লুট করে নেয় তা দেখার সুযোগ হয়েছিল বাগেরহাটে। সেখানকার খানজাহান আলীর মাজারে পরপর দু’বার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। খুলনায় অফিসের কাজে গেলে সেখান থেকেই ষাট গম্বুজ মসজিদসহ মাজার এলাকায় গিয়েছি। ছোট থেকেই খানজাহান আলীর মাজারের কালা পাহাড় আর ধলা পাহাড়ের গল্প শুনেছি। গাঁয়ের বাজারে, রেল স্টেশনের বুকে ওই মাজারের পুকুরঘাটের দু’পাশে দুই কুমিরের ছবিসদৃশ তাবিজ বিক্রেতার ছবিটি চোখে ভাসে। সুযোগ পাওয়ায় কালা পাহাড় আর ধলা পাহাড় দেখার আগ্রহ নিয়েই মাজারে নেমে খোঁজ নিতে শুরু করি। কালা পাহাড় প্রয়াত হয়েছেন অনেক আগেই। এখনও আছেন ধলা পাহাড়। পুকুরের চারপাশে বিভিন্ন বাড়ির পেছনে কখনও কখনও দেখা মেলে নিঃসঙ্গ এই ধলা পাহাড়ের। হঠাৎ সমস্বরে আওয়াজ দেখা মিলেছে অমুক বাড়ির ঘাটে। আমার সঙ্গী-সাথিদের রেখেই আমি ছুটলাম। এ সুযোগ কোনভাবেই মিস করতে চাই না। চারপাশে ভিড় করে আছে মুরিদ নামের এক দঙ্গল মানুষ। যারা কোনভাবেই ধলা পাহাড়ের কাছে যেতে দিচ্ছে না। আগে চাই টাকা অথবা মানতের মুরগি, ছাগল অন্য কিছু। সামনেই দেখলাম দূর থেকে আসা এক পরিবার তাদের পালা দু’টি মুরগি নিয়ে এসেছে মানতের জন্য। ধলা পাহাড় ছুঁয়ে মুরগিগুলো নিয়ে রেখে দিলো ওই লোকেরাই। ঝটপট উত্তর, সরে দাঁড়ান। ওগুলো পরে দেয়া হবে। এটা ধলা পাহাড়ের এখন খাবার সময় না। নির্বিকার মানুষ বোকার মতোই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে প্রস্থান করলো। আমি ভিড় ঠেলে ধলা পাহাড়ের গায়ে হাত দিতেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে উঠলো ভিড় করে থাকা মুরিদের দল। আমার কাছে টাকাও চাইলো। কোনরকম পাত্তা না দিয়েই সরে আসি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি এখানেও আছে এদের মস্ত সিন্ডিকেট। এরা পুকুরের চারপাশে আস্তানা গেড়েছে। ধলা পাহাড় আর কালা পাহাড়ের নামে তারা লুটের কারখানা খুলেছে। আর ধুঁকে ধুঁকে মরছে কুমিরগুলো। পরওয়ারদিগারের কাছেই এদের বিচার প্রার্থনা করে বিদায় নিলাম। বারবার মনে হলো কি দুর্ভাগ্য এই কুমিরগুলোর। ওদের নামেই সব আসে কিন্তু খায় অন্যেরা। আমাদের চিড়িয়াখানাগুলোতে মানুষরূপী দুর্বৃত্তরাই পশুদের জন্য বরাদ্দ খাবার লুটে নিয়ে পশুদের ভাগ্যের বারোটা বাজাচ্ছে। যা হোক ঢাকায় বাঘদের নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন হচ্ছে। প্রথম বাঘ সম্মেলন হয়েছিল ২০১০ সালে রাশিয়ায়। তখনও শেখ হাসিনাই দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানে ঢাকায় দ্বিতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক এই সম্মেলন চলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই এই সম্মেলনের উদ্বোধক ছিলেন। কিভাবে বাঘ সংরক্ষণ করা যায়। বাঘদের নানা নিরাপত্তার দিকও এই সম্মেলনে আলোচনা চলছে। বাঘ সম্মেলনে প্রকাশিত পুস্তিকায় জানা যায়, দুনিয়ায় বাঘ আছে মাত্র ৪,১৪৭টি আর তার মধ্যে বাংলাদেশে আছে ৪৪০টি। ৬০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এদের বাস। সম্মেলনে আলোচনায় উঠে এসেছে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করলে এখানে বাঘেদের বসবাসে কোন ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না। চারদিনের এই সম্মেলনে গবেষকরা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার যে টার্গেট ধরা হয়েছে তাতে বাংলাদেশ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারবে না। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বাঘ বসবাসের যে সমতল ভূমি, মিঠা পানি আর পর্যাপ্ত খাদ্যের সংস্থান থাকা দরকার তা অপ্রতুল। অথচ সারা বিশ্বের অন্য সব দেশ তাদের টার্গেট পূরণে সফল হবে। অথচ এই আমাদের সরকারের লোকজনই বলে বেড়াচ্ছেন রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে কোন প্রভাব ফেলবে না। এটা একেবারেই দ্বৈত অবস্থান। বাঘের জন্য যে দিগন্ত বিস্তৃত অভয়ারণ্য দরকার তা ধীরে ধীরে কমে আসছে। যেভাবে আমাদের এখানে কৃষিজমি কমছে। সেই একই ভাবে আগ্রাসী লোভী মানুষেরা বন কেটে কাঠ পাচার করে বনভূমি ধ্বংস করে জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের উন্মত্ততায় লিপ্ত। ক’বছর আগে ভুটান সফরের সুযোগ হয়েছিল। সেখানে মোট ভূমির ৬৫ ভাগই রিজার্ভ ফরেস্ট। অথচ আমরা রাষ্ট্রীয়ভাবে বনভূমির বারোটা বাজাতে ব্যতিব্যস্ত। না হলে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তড়িঘড়ি করে রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হতো না। ইতি টানছি লেখাটির এই বলে, যে বাঘেদের রক্ষায় এই সম্মেলন তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। যদি বাঘেদের পক্ষে কেউ তাদের যন্ত্রণা মর্মবেদনা তুলে ধরতো তবে হয়তো বিশ্ববাসীর চোখ পড়তো কতটা অসহায় এই জীবকুল।
১৬.০৯.২০১৪