Saturday, June 28, 2014

নিষ্ক্রিয় ইসলামপন্থি দল- তর্জন-গর্জন সব নীরব বিবৃতিতেই সীমিত

একেবারে নীরব নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে ইসলামপন্থি দলগুলো। বিবৃতির মাধ্যমে সীমিত রয়েছে তাদের সব তর্জন-গর্জন। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর কোন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেই তারা। এমনকি ঘরোয়া সভা-সমাবেশ, সংবাদ সম্মেলনের মতো কর্মকা-েও তাদের দেখা মিলছে না। নারীনীতি, শিক্ষানীতি, নাস্তিক্যবাদসহ নানা ইস্যুতে আলোচিত ইসলামপন্থি দল এবং সংগঠনগুলোর এ নীরবতা জনমনে বেশ কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে নেতাকর্মী সমর্থকদের। সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিকূলতার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যায় বেশির ভাগ দল এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। ইসলামী কোন ইস্যুতেও এসব দলের মধ্যে নেই কোন সমন্বয়। বরং যে যার সুবিধামতো রাজনীতিতেই ব্যস্ত প্রায় সব দল। ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা ও পদ দখল নিয়ে অনেক ইসলামী দলের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল। অনেকে আবার সরকার ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত। অবশ্য ইসলামী দলগুলোর সমর্থন আদায় ও নিয়ন্ত্রণে বড় দু’টি দল অনেকটা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। যদিও প্রকাশ্যে তেমন সমর্থন দিতে দেখা না গেলেও তলে তলে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে দেখা যায়। অনেক নেতা আবার একাধিক দল ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। এতে ইসলামের নামে সৃষ্ট বহু ইসলামী দলের কার্যক্রম নিয়ে বিব্রত ও বিভ্রান্ত হচ্ছেন ধর্মপ্রাণ মানুষ। তবে সংশ্লিষ্ট নেতাদের দাবি, ইসলামী দলগুলো আগের মতোই আছে। কিন্তু সরকার রাজপথে এসব দলের কোন কর্মকা- চালাতে দিচ্ছে না। নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে। সাম্প্রতিককালে দেশে বেশ আলোচনায় উঠে আসে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। বেশ কিছু ইসলামী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে কওমি মাদরাসা ভিত্তিক অরাজনৈতিক দাবিদার এ সংগঠন ১৩ দফা দাবিতে ঢাকা অবরোধ ও মহাসমাবেশের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে ৫ই মে’র শাপলা ট্র্যাজেডির পর এ সংগঠনের কার্যক্রম গুটিয়ে যায়। ঝিমিয়ে পড়ে এর নেতাকর্মী-সমর্থক-ভক্ত অনুরাগীসহ বৃহৎ জনগোষ্ঠী। প্রথম দিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের অনুগত থাকলেও তেমন কোন সফলতা না পেয়ে পরে অবস্থান পরিবর্তন করে হেফাজত। বর্তমানে সরকারের সঙ্গে আপস এবং সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা মতেই সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা চলছেন বলে শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা মহানগরে হেফাজতের মধ্যে দেখা দিয়েছে বিভক্তি। তবে এসব বিষয় মানতে নারাজ হেফাজতের নেতারা। তারা বলেন, হেফাজতের তৎপরতা নেই এ কথা ঠিক নয়। কওমি মাদরাসাগুলোয় বর্তমানে পরীক্ষা চলছে। সামনে রমজান। তা ছাড়া সরকার আমাদের আগের মতো কোন কাজ করতে দিচ্ছে না। গ্রেপ্তার-হয়রানি করা হচ্ছে। সরকারের সুযোগ-সুবিধা নেয়ার ব্যাপারে মিডিয়া অপপ্রচার চালাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তারা। দেশের বৃহৎ ইসলামী দল জামায়াতে ইসলামীর অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। দলটির শীর্ষ নেতারা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারাধীন। নির্বাচন কমিশনের দেয়া নিবন্ধন বাতিল করেছে হাইকোর্ট। রাজনৈতিকভাবেও নিষিদ্ধের মুখোমুখি দলটি। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন প্রকাশ্য কোন কার্যক্রম নেই জামায়াতের। বেশির ভাগ নেতাই আত্মগোপনে। এতে দলের নেতাকর্মীদের বিরাজ করছে হতাশা। তবে অত্যন্ত গোপনে এ দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত আছে। দল ও নেতাদের রক্ষায় জামায়াত বর্তমান সরকারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে বিভিন্ন মহলে শোনা যাচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্টরা তা অস্বীকার করছেন। মুফতি আমিনীর ইসলামী ঐক্যজোট একসময় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত থাকলেও তার মৃত্যুর পর থেকে দলটির তেমন তৎপরতা নেই। ১৯ দলীয় জোটের শরিক এ দলের অনেক নেতা বর্তমানে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। দলটির কার্যক্রম অনেকটাই লালবাগ মাদরাসাকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এ ব্যাপারে দলের চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী বলেন, এখন তো কোন তৎপরতা দেখানোর সুযোগই নেই। কোন কর্মসূচিই তো সরকার পালন করতে দিচ্ছে না। বিভিন্ন ইসলামী দলের অগোছালো অবস্থা এবং সরকারের সঙ্গে কোন কোন ইসলামী দলের নেতাদের যোগাযোগ রক্ষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব কথা শোনা যায়, তবে বিস্তারিত কিছু জানি না। তা ছাড়া সরকার আমাদের রাজপথে কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দিলেই বোঝা যেতো, আসলে তাদের সঙ্গে কোন আঁতাত আছে কিনা। দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে গত ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ সরকারি মহলের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেয়ার ঘটনায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নেতাদের মধ্যে। একপর্যায়ে দলটির মহাসচিব হুমায়ুন কবিরকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনার রেশ ধরে সম্প্রতি দলের সিনিয়র নায়েবে আমীর আবদুর রব ইউসুফীসহ শীর্ষ বেশ কয়েকজন নেতা পদত্যাগ করে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামে যোগ দেন। এসব ঘটনায় বেশ স্থবির হয়ে পড়েছে এ সংগঠনের কার্যক্রম। ১৯ দলীয় জোটের অপর দুই শরিক খেলাফত মজলিস ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামেরও প্রকাশ্য কার্যক্রম নেই বললেই চলে। জমিয়তের মহাসচিব মুফতি ওয়াক্কাস দীর্ঘদিন কারাভোগের পর সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছেন। এতে দলটি কিছুটা প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তবে দলটির বেশ কয়েকজন নেতা সরকারি দল ও বিএনপি জোট উভয় পক্ষের সঙ্গে সমান তালে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন বলে জোরালো আলোচনা রয়েছে। যদিও এ অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করেন তারা। জোটের আরেক শরিক বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টির কোন তৎপরতা নেই। হাফেজ্জী হুজুর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কার্যক্রম এখন কামরাঙ্গীরচর মাদরাসাকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধ। মাঝেমধ্যে কিছু কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিলেও পুলিশের অনুমতি না থাকার অজুহাতে নেতারা মাদরাসা থেকে বের হন না। প্রায় একই অবস্থা চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের। পুলিশ পাহারায় মাঝেমধ্যে কিছু কর্মসূচি নিয়ে তারা মাঠে নামেন। তবে সে ক্ষেত্রে সরকারের নীরব সমর্থন থাকে বলে গুঞ্জন শোনা যায়। বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন বর্তমান সরকারের শরিক দল। রাজপথে তাদের কোন তৎপরতা নেই। মহাজোটের শরিক বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোটও দীর্ঘদিন ধরে নীরব রয়েছে। এ ছাড়া ইসলামী ঐক্য আন্দোলন, জাকের পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক ফ্রন্ট এবং ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ, মুসলিম লীগ, গণতান্ত্রিক ইসলামী ঐক্যজোট, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত, বাংলাদেশ ইউনাইটেড ইসলামী পার্টিসহ বেশ কিছু ইসলামী দল ও সংগঠনের মঞ্চ ময়দানে কোন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তবে ফ্যাক্স এবং ই-মেইল বার্তায় তাদের সরবতা প্রায় দেখা যায়। সরকারবিরোধী নানা রকম তর্জন-গর্জনও শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় না তার ছিটেফোঁটাও।

লবিতে তখন অন্যরকম দৃশ্য

সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ নির্বাচনের জন্য সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে আসছে বিএনপি। সরকারের তরফে উপেক্ষিত সে আহ্বান। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা ও সরকারের মন্ত্রীরা বলছেন, ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের জন্য যে কোন সময় সংলাপ হতে পারে। সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থান যখন দুই মেরুতে তখন রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ভারতের সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ উঠেছিলেন সোনারগাঁওয়ে। গতকাল সকালে সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সোনারগাঁও হোটেলের লবিতে বসেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী ও মশিউর রহমান। প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা ও মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন তারা। এদিকে সুষমার সঙ্গে খালেদার বৈঠকে অংশ নিতে ১০টায় হোটেলে পৌঁছান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপি নেতারা। লবির একপাশে ড. মশিউর রহমানকে দেখে এগিয়ে যান মির্জা আলমগীর। কুশলাদি জিজ্ঞাসা করে মশিউর বলেন, ‘কি রে তোর শরীর কেমন আছে? আজ তো দেখতে ভালোই লাগছে।’ মির্জা আলমগীর হেসে বলেন, ‘স্যার, যাচ্ছে একরকম।’ বিএনপি সূত্র জানায়, ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনাকালে মশিউর রহমান পেশাগতভাবে জ্যেষ্ঠ হওয়ায় তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করেন মির্জা আলমগীর। কুশল বিনিময় করে দলের অন্য নেতাদের নিয়ে অন্যদিকের চেয়ারে বসতে যাচ্ছিলেন তিনি। এ সময় বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেন ড. গওহর রিজভী। মির্জা আলমগীরকে বলেন, ‘ভাই কেমন আছেন? আমাদের ফেলে যাবেন না।’ উত্তরে মির্জা আলমগীর বলেন, ‘আমরা তো ফেলে যেতে চাই না। আপনারাই তো আমাদের ঠেলে দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন।’ এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা সাবিহউদ্দিন আহমেদকে উদ্দেশ্য করে ড. রিজভী বলেন, ‘আসেন, একত্রে বসি। এই তো আমাদের মধ্যে সংলাপ হচ্ছে। এটাও অনানুষ্ঠানিক সংলাপ। আমরাও সংলাপ সেরে ফেলি।’ এ সময় বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সদস্য ড. আবদুল মঈন খান সেখানে পৌঁছান। এরপর বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা কিছুক্ষণ আড্ডা দেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হোটেলে পৌঁছা পর্যন্ত অন্তত ১০ মিনিট চলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের এ মিনি সংলাপ। এ সময় সেখানে ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার তারেক এ করিমও উপস্থিত ছিলেন।

জনগণের সেবা করতে ক্ষমতায় এসেছি: প্রধানমন্ত্রী

জনগণের সেবা করতে ক্ষমতায় এসেছি বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। শনিবার জাতীয় সংসদে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার ভোগ-বিলাসে লিপ্ত নয় এবং নিজেদের আখের গোছাতে ক্ষমতায় আসেনি। জনগণের সেবা করার জন্য ক্ষমতায় এসেছে। এজন্য দেশের উন্নয়ন হচ্ছে।

 বিরোধী দলের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন দেশের জনগণ, যুব সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দেখতে পাচ্ছে কিভাবে গণতন্ত্র চর্চা করতে হয়। বর্তমান বিরোধী দল বিরোধিতার খাতিরেই বিরোধিতা না করে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করছে। সংসদ কেমন হওয়া উচিত, তা এখন দেশবাসী বুঝতে পারছে।

মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর সারচার্জ আরোপ করে তা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহার করার প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী তার বক্তৃতায় মোবাইল ফোনের আমদানির ওপর শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব কিছুটা বেশি হয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেন। তিনি অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মোবাইল ফোনের আমদানির ওপর শুল্ক কিছুটা হ্রাস করতে পারেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ওই প্রস্তাব গ্রহণ করে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোবাইল ফোন ব্যবহারের ওপর যে সারচার্জ আরোপের কথা বলেছেন তা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হবে।

পুঁজিবাজারের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বাজার এখনকার সমস্যা কাটিয়ে ওঠেছে। একে গতিশীল করতে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিটি যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা অব্যাহত রাখার পরামর্শ দেন। ওই সব পদক্ষেপ যেন পরিবর্তন না করা হয়, সেদিকেও তিনি নজর রাখার নির্দেশ দেন।

প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সকলকে আন্তরিকভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। এগিয়ে যাওয়ার যে গতিধারা শুরু হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে তা অব্যাহত রাখতে সকল প্রতিকূলতার মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

বাংলানিউজের উদ্যোগে তিশমার কন্ঠে শাকিরার গাওয়া ‘লা লা লা’ গানটির বাংলা সংস্করণ

ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবলকে সামনে রেখে বিখ্যাত গায়িকা শাকিরার গাওয়া ‘লা লা লা’ গানটির বাংলা সংস্করণ তৈরি হয়েছে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকমের উদ্যোগে। বাংলায় গানটি গেয়েছেন তিশমা। নতুন সংগীতায়োজনও করেছেন তিনি। পর্তুগিজ ও ইংরেজি ভাষা থেকে ‘লা লা লা’ গানটি বাংলায় লিখেছেন জুয়েল মাজহার।

‘লা লা লা’ বাংলা গানটি নিয়ে বাংলানিউজের উদ্যোগে একটি মিউজিক ভিডিও-ও নির্মাণ করা হয়েছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এই মিউজিক ভিডিওতে মডেল হয়েছেন সংগীতশিল্পী তিশমা। গানটির মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করেছেন জয়ন্ত রোজারিও। গতকাল রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে মিউজিক ভিডিওটি প্রকাশ হয়েছে। এদিন থেকে http://www.banglanews24.com/beta/index.php  এবং ইউটিউবে গানটির ভিডিও দেখা যাচ্ছে।

ব্রাজিল বিশ্বকাপের লড়াইয়ে চার লাতিন দল by পিন্টু আনোয়ার

গ্রুপ পর্বে ব্রাজিল তারকারা দুই ম্যাচে দেখিয়েছেন ৭ গোল। তবে এক ম্যাচে গোলশূন্যও থেকেছেন পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। এবার ভুলের আর সুযোগ নেই। আজ শুরু হচ্ছে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ড। আর নকআউট পর্বের প্রথম দিনই মাঠে নামছে চার লাতিন দেশ। দ্বিতীয় রাউন্ডে প্রথম নকআউট ম্যাচে আজ মহাদেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বী চিলির কাছে ব্রাজিলের পরীক্ষা। বেলো হরিজোন্তের মাঠে ব্রাজিল-চিলি ম্যাচটি শুরু হবে রাত ১০টায়। দ্বিতীয় রাউন্ডের অপর ম্যাচে মোকাবিলা করবে কলম্বিয়া ও দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে। রিও ডি জেনিরোয় ঐতিহাসিক মারাকানা মাঠে কলম্বিয়া-উরুগুয়ে ম্যাচ শুরু রাত ২টায়। এতে আলাদা পরীক্ষা লুইস সুয়ারেজবিহীন উরুগুয়েরও। গ্রুপের শেষ ম্যাচে ইতালি ডিফেন্ডার জর্জিও কিয়েলিনিকে কামড়ের দায়ে শাস্তি নিয়ে ইতিমধ্যে বিশ্বকাপ শেষ সুয়ারেজের। এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম সেরা  নৈপুণ্যের দল চিলি। শুরুর দুই ম্যাচে টানা দুই জয় নিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করে চিলিয়ানরা। এতে তারা অস্ট্রেলিয়াকে হারায় ৩-১ গোলে আর শিরোপাধারী স্পেনের বিপক্ষে চিলির জয়টি ২-০ গোলের স্পষ্ট ব্যবধানে। এতে বিদায় নিশ্চিত হয় চ্যাম্পিয়ন স্পেনের। গ্রুপের শেষ ম্যাচে শক্তিধর দল নেদারল্যান্ডসের কাছে ০-২ গোলে হার মানলেও চিলিয়ানরা গোল দু’টি হজম করে  ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে। চিলির আক্রমণভাগে সেরা ফর্ম দেখাচ্ছেন এফসি বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড অ্যালেক্সিস সানচেস, জুভেন্টাস তারকা আরতুরো ভিদালরাও। দ্বিতীয় রাউন্ডে মাঠে নামার আগে ব্রাজিল কোচ লুইস ফেলিপে স্কলারিও দেখাচ্ছেন চিলিকে সমীহ। বলেন, গ্রুপের ড্র দেখে এক সময় ভেবেছিলাম চিলি নকআউট পর্বের আগেই বাদ পড়বে। আসলে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে চিলিকে মোকাবিলা করতে চাচ্ছিলাম না আমি। আজ চিলির বিপক্ষে শুরুর একাদশে পরিবর্তনের আভাস দিয়েছেন ব্রাজিল কোচ। মাঝমাঠে পাউলিনহোর বদলে একাদশে সুযোগ নিচ্ছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগের ম্যানচেস্টার সিটি তারকা ফার্নানদিনহো। আজ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্রাজিল কোচকে থাকতে হচ্ছে আলাদা সতর্ক। অধিনায়ক থিয়াগো সিলভা ও আক্রমণভাগের মূল ভরসা নেইমারসহ দলের চার খেলোয়াড় ইতিমধ্যে হলুদ কার্ড দেখে রেখেছেন। আজ এদের কারও হলুদ কার্ড মানে কোয়ার্টার ফাইনালে নিষেধাজ্ঞা। চিলি কোচ জর্জ সাম্পাওলির চিন্তাটা দলে ইনজুরি নিয়ে। চোটের কারণে বৃহস্পতিবার দলের অনুশীলনে দেখা যায়নি মিডফিল্ডার আরতুরো ভিদাল ও ডিফেন্স তারকা গ্যারি মেডালকে। কলম্বিয়ার বিপক্ষে উরুগুয়ের পরিসংখ্যানটা দাপুটে নৈপুণ্যের। উরুগুয়ে শেষ আট মোকাবিলায় মহাদেশীয় প্রতিপক্ষ কলম্বিয়াকে হারিয়েছে ৬ বার। এতে কলম্বিয়ার মাত্র এক জয় ও এক ড্র। বিশ্বকাপে দু’দলের মোকাবিলা দেখা গেছে একবারই। এতেও সুখস্মৃতি সেলেস্তে উরুগুইয়ানদের। ১৯৬২’র বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে কলম্বিয়ার বিপক্ষে আগে গোল খেয়েও উরুগুয়ে ম্যাচ জেতে ২-১ গোলে। তবে শীর্ষ স্ট্রাইকার সুয়ারেজের নিষেধাজ্ঞার ধাক্কাটা উরুগুয়ে কোচ অস্কার তাবারেজ কেমনে সামলান আজ এটাও দেখার বিষয়। এক্ষেত্রে ফুরফুরে স্কোয়াড নিয়েই উরুগুয়ের মোকাবিলায় নামছেন কলম্বিয়ার আর্জেন্টাইন কোচ হোসে পেকারম্যান। এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে তিন জয় দেখিয়েছে মোট চার দল। আর্জেন্টিনা, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও কলম্বিয়া। তবে ডেথ গ্রুপ থেকে উরুগুয়ের উত্তরণটাও আলাদা নৈপুণ্যের। প্রথম ম্যাচে কোস্টারিকার কাছে হারলেও পরের দুই খেলায় উরুগুয়ে হারায় দুই সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড ও ইতালিকে। চলতি আসরের প্রথম পর্বে  মেক্সিকোর সঙ্গে গোলশূন্য ড্র তে পয়েন্ট ভাগাভাগি করলেও গ্রুপে বাকি দু্‌ই ম্যাচে ব্রাজিল কুড়ায় দাপুটে জয়। ক্রোয়েশিয়াকে ৩-১ ও ক্যামেরুনকে হারায় তারা ৪-১ গোলে । আর   বিশ্বকাপে চিলির বিপক্ষে ব্রাজিলের পরিসংখ্যানটা সেলেসাও ভক্তদের জন্য অভয়েরই। ফুটবলের মহাযজ্ঞে এ পর্যন্ত তিন মোকাবিলায় প্রতিবারই দাপুটে জয় দেখেছে ব্রাজিল। আর সেলেসাওরা চিলিকে এর প্রতিবারই হারিয়েছে বিশ্বকাপের নকআউট রাউন্ডে। চিলির বিপক্ষে বিশ্বকাপে সাফল্যের স্মৃতিটা ব্রাজিলিয়ানদের টাটকা। দক্ষিণ আফ্রিকায় গত বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে চিলিকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে যায় ব্রাজিল। ১৯৯৮’র দ্বিতীয় রাউন্ডে চিলির বিপক্ষে ব্রাজিল জয় পায় ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে। আর ১৯৬২’র বিশ্বকাপে ব্রাজিলের জয়টি আলাদা তাৎপর্যের। সেবার সেমিফাইনালে ব্রাজিল ৪-২ গোলে হারায় স্বাগতিক চিলিকে। পরে ফাইনালে চেকোস্লাভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিল জিতে নেয় টানা দুইবারের বিশ্বকাপ। এর আগে ১৯৫৮’র আসরে প্রথমবার বিশ্বকাপ শিরোপার স্বাদ পায় ব্রাজিল।  শেষ ৯ মোকাবিলায় চিলির জালে ব্রাজিলিয়ানরা দেখিয়েছে গোলবন্যা। ৯ ম্যাচে ৩.৭ গড়ে ব্রাজিল পেয়েছে ৩২ গোল। আর চিলির বিপক্ষে ব্রাজিল অপরাজিত রয়েছে টানা ১৪ বছর। এ সময় ১২ ম্যাচে ব্রাজিল জয় দেখেছে ১০ বার।  এবার সেরা ফর্ম দেখাচ্ছেন ব্রাজিল সেনসেশন নেইমার ডা সান্তোসও। চলতি বিশ্বকাপে তিন ম্যাচে নেইমারের ৪ গোল। আসরে এ পর্যন্ত চার গোল দেখিয়েছেন শুধু আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি ও জার্মান ফরোয়ার্ড টমাস মুলার। ব্রাজিলের জার্সি গায়ে শেষ ৬ ম্যাচে আট গোলের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন নেইমার। আর গত পাঁচ বিশ্বকাপে দ্বিতীয় রাউন্ডে অদম্য দেখা গেছে ব্রাজিলকে। দ্বিতীয় রাউন্ডের এ পাঁচ ম্যাচে ব্রাজিল প্রতিপক্ষ জালে ঠেলেছে ১৩ গোল। বিপরীতে পাঁচ ম্যাচে ব্রাজিল গোল হজম করেছে মাত্র একবারই। আর ব্রাজিলের মাটিতে দু’দলের পরিসংখ্যানে বিপরীত চিত্র।  নিজ মাটিতে শেষ ৪০ ম্যাচে অপরাজিত ব্রাজিল। এখানে তাদের শেষ হারটি এক যুগ আগের। ২০০২ মওসুমের আগস্টে প্রীতি ম্যাচে ব্রাজিলের ১-০ গোলের হারটি ছিল মহাদেশীয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্যারাগুয়ের বিপক্ষে। আর পরিসংখ্যান বলে,  ব্রাজিলের বিপক্ষে সাফল্য পেতে হলে ভেলকি দেখাতে হবে সানচেস-ভিদাল-বারগাসদের। ব্রাজিলের মাটিতে স্বাগতিক সেলেসাওদের বিপক্ষে কখনই জয় দেখেনি চিলিয়ানরা। এখানে ২৬ ম্যাচের ২০টিতেই হার দেখেছে তারা।

বেপরোয়া ছিনতাই

রাজধানী ও এর বাইরে হঠাৎ করেই ছিনতাই বেড়ে গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল জোরদার না থাকায় রাজধানীতে ছিনতাইকারী চক্রের এখন মহোৎসব চলছে। অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শিথিলতার সুযোগে তারা আরও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ফলে নগরবাসীর মধ্যে ছিনতাই-আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। খুনখারাবি, চুরি, ডাকাতির পাশাপাশি ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। কিন্তু তা ঠেকাতে দৃশ্যত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোন  কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি ছিনতাই আতঙ্কে ভুগছেন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টরা। অহরহই তারা ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ায় এ মাত্রা আরও বেড়ে গেছে। মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে আতঙ্কে বিকাশ-এর এজেন্টরা। বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের আতঙ্ক দূর করা না হলে এজেন্টরা মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এতে সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে সেবাটি। এজেন্টদের কাছ থেকে ছিনতাই ছাড়াও সাধারণ মানুষের অর্থও ছিনতাই হয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে গত পরশু। এদিন দুপুরে প্রকাশ্যে কল্যাণপুর বাসডিপোর সামনে ৩ প্রাইভেটকার আরোহীকে গুলি করে ৩০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন মাল্টিন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের সুপারভাইজার শামসুর রহমান, গাড়িচালক আকতার  হোসেন ও ফ্ল্যাটক্রেতা জাকারিয়া। এদের মধ্যে আহত শামসুর রহমান, আকতার হোসেন ও প্রাইভেটকার আরোহী বিল্লাল হোসেন (আনসার সদস্য)কে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল এবং জাকারিয়াকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। শুধু এ ঘটনায়ই নয়, গত এক মাসে রাজধানীতে ১৫টি বড় ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র। তবে এসব ঘটনায় জড়িত ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ সপ্তাহে আরও একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীতে। গত ২২শে জুন  রোববার উত্তরায় বিকাশের এক এজেন্টকে গুলি করে ১১ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় আহত মো. শাহিন নামে একজনকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এছাড়া, গেল সপ্তাহে খিলগাঁওয়ে ছানাউল্লাহ নামে এক বিকাশ এজেন্টের ৮ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। একই সপ্তাহে রামপুরায় ইরান মুন্সী নামের একজনকে গুলি করে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। ইরান মুন্সী রামপুরা এলাকার স্কাই ইন্টারন্যাশনালের মালিক ও বিকাশ এজেন্ট। রাজধানীর বাইরেও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টরা। গত ২২শে জুন মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলায় আতোয়ার হোসেন ও আবদুল আলিম নামে বিকাশের দুই এজেন্টকে কুপিয়ে ৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ২৭শে এপ্রিল বরিশালের বিকাশ এজেন্ট সাদ এন্টারপ্রাইজের কর্মীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ১২ লাখ টাকা নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। ১১ই মে মাদারীপুরে বিকাশ এজেন্টের ১৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ১০ই জুন ঝালকাঠিতে গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে ছিনতাই করা হয় ২৮ লাখ টাকা। এভাবে প্রায়ই দেশের কোথাও না কোথাও ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টরা। অনেক এজেন্টকেই এতে আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৬ মাসের মধ্যে গত এক মাসেই রাজধানীতে সবচেয়ে বেশি বড় অঙ্কের টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। তাও আবার গুলি করে। ছিনতাইকারীরা অধিকাংশ ঘটনা ঘটাচ্ছে  মোটরসাইকেলযোগে এসে। আবার পালিয়েও যাচ্ছে মোটরসাইকেলে। কিন্তু কোন ঘটনাতেই ছিনতাইয়ে জড়িতরা ধরা পড়েনি। সবচেয়ে বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে রামপুরা থানা ও আশপাশ এলাকায়। রাজধানীতে একের এক ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশের চরম ব্যর্থতার অভিযোগ করছেন ভুক্তভোগীরা। কিন্তু নগর পুলিশের এতে কোন মাথাব্যথা নেই। মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের প্রতিদিন লেনদেনের সীমা বেঁধে দিলেও অনেকেই তা মানছেন না। এ কারণে তাদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ জমা পড়ছে। এ কারণেও অনেক সময় ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন এজেন্টরা। রাজধানীর মিরপুর এলাকার বিকাশ, ডাচ্‌-বাংলা ও ইউক্যাশের এক এজেন্ট জানালেন, তিনটি প্রতিষ্ঠানের সেবা দিয়ে থাকি। জমার পরিমাণটাও তাই বেশি হয়। কিন্তু জমা হওয়া অর্থ নিয়ে সব সময়ই আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। একবার ছিনতাই হয়ে গেলে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ  নেই। এ কারণে অন্য কোন ব্যবসার কথা ভাবছি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত এক কোটি ৫৪ লাখ গ্রাহক এ সেবায় যুক্ত হয়েছে। আর এজেন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন লাখ ২৬ হাজার। ২০১২ ও ২০১৩ সালে যে হারে এ সেবার প্রবৃদ্ধি হয়েছিল, বর্তমানে তা ঋণাত্মক হয়ে গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সচল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা এর আগের মাসের তুলনায় ২ দশমিক ৭৭ শতাংশ কমে ৫৭ লাখ ৬৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান ও গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ- কমিশনার ছানোয়ার হোসেন জানান, সামপ্রতিক সময়ে যেসব গ্রুপ ছিনতাই করছে তাদের অধিকাংশকে গত বছর গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তারা এখন জামিনে এসে ছিনতাইয়ে নেমেছে। তাদেরকে ধরার জন্য শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করা হবে।

প্রেম, গণধোলাই অতপর শ্রীঘরে

প্রেম হয়েছে মোবাইলে। কিন্তু প্রেমিকের পারিবারিক অবস্থা মনমত না হওয়ায় ভাঙ্গে প্রেম। জামালপুরের বকশীগঞ্জে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে এসে গণধোলাই খেয়ে এখন শ্রীঘরে প্রেমিক মতিউর রহমান (২২)। তার বাড়ি বগুড়ার আদমদি উপজেলায় লক্ষণপুর গ্রামে। পিতার নাম আকবর আলী। আজ দুপুরে তাকে জেল হাজতে পাঠায় পুলিশ।
বকশীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাছিনুর রহমান জানান, বকশীগঞ্জ উপজেলার বগারচর ইউনিয়নের ধারারচর গ্রামের অনার্স পড়ুয়া কলেজ ছাত্রী ফারজানার (২০) সঙ্গে মোবাইলের মাধ্যমে সর্ম্পক হয় মতিউরের। প্রেমের একপর্যায় মতিউরকে বিয়ে করতে রাজী হয় ফারজানা এবং এ জন্য মাস দুয়েক আগে মতিউরের বাড়ি যায় ওই ছাত্রী। কিন্তু মতিউর এর পারিবারিক পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে পালিয়ে আসে সে। পরে মতিউর আবার মোবাইলে সর্ম্পক স্থাপন করতে চাইলে তাকে বকশীগঞ্জে আসতে বলে ফারজানা। মতিউর ফারজানার বাড়ীতে আসলে তাকে ধরে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোর্পদ করা হয়। পরে দুপুরে তাকে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।

কনডম নিয়ে বিতর্কে ভারতের স্বাস্থ্য মন্ত্রী

এইডস প্রতিরোধে কনডমের চেয়েও বেশি কার্যকরী হল যৌন সঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ততা – ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধনের এই মন্তব্যকে ঘিরে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

এইডস মোকাবিলায় যুক্ত এনজিও ও বিশেষজ্ঞরা অনেকেই মন্ত্রীর বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করে বলছেন, এভাবে নৈতিকতার পাঠ দিয়ে এইডসের সঙ্গে লড়াই করা সম্ভব নয়।

কিন্তু ভারতের ন্যাশনাল এইডস কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন বা নাকো মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে, এখন থেকে তারা বিবাহবহির্ভূত বা প্রাকবিবাহ যৌনতা বন্ধ করার জন্যও প্রচারে জোর দেবেন।

কনডম নিরাপদ যৌনতা নিশ্চিত করে, আর সেটাই এইডস-কে দূরে রাখার চাবিকাঠি – এতদিন নাকো-র যাবতীয় বিজ্ঞাপন আর প্রচারের মূল কথা ছিল সেটাই।

তবে ভারতের নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন এ সপ্তাহে নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেছেন – কনডম নিরাপদ ঠিকই, কিন্তু আরও অনেক বেশি নিরাপদ হল নিজের স্ত্রী বা যৌনসঙ্গীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা।

তাঁর এই বক্তব্য তোলপাড় ফেলেছে সঙ্গে সঙ্গেই, কিন্তু যৌন সম্পর্ক স্থাপনে নৈতিকতার বাঁধন যে খুব জরুরি এই যুক্তিতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী অবিচল।

মিঃ হর্ষবর্ধনের কথা হল, ‘‘একজন মহিলা ও পুরুষের মধ্যে যে যৌন সম্পর্ক, তার শুদ্ধতা ও সততা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্যও আমাদের চেষ্টা করতে হবে, সে বিষয়টার ওপর প্রচারে জোর দিতে হবে।’’

মন্ত্রীর এই ভাবনা সামনে আসার পর নাকো-ও জানিয়েছে, এইডসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই যৌন নৈতিকতা যে কতটা প্রয়োজন সে বিষয়টা তারা প্রচারে তুলে ধরবেন।

এইডস নিয়ন্ত্রণ দফতরের সচিব ভি কে সুব্বুরাজ বলছেন, মাত্র একজন যৌনসঙ্গী রাখা, বিয়ের আগে যৌনতায় না-জড়ানো এবং বিয়ের পর স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা – এখন থেকে এইগুলোই হবে তাদের ক্যাম্পেনের থিম; কারণ সমাজের নৈতিক বন্ধন শক্ত করাতে দোষের কিছু নেই।

সমস্যা হল, ভারতে দীর্ঘদিন ধরে এইডসে-র বিরুদ্ধে লড়ছেন যে অ্যাক্টিভিস্টরা, তাদের বেশির ভাগই এই যুক্তি মানতে রাজি নন।

ইন্ডিয়া এইচআইভি-এইডস অ্যালায়েন্সের প্রোগ্রাম ম্যানেজার অভিনা আহের যেমন বলছেন, ‘‘এইডসের ক্ষেত্রে যারা চরম ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের আপনি নৈতিকতার জ্ঞান দিতে পারেন না।’’

তাঁর যুক্তি, ‘‘সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাই তাদের সেই পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে – তার ওপর যৌনকর্মীর পেশাও ভারতে বেআইনি। এই চরম ঝুঁকিপূর্ণদের জন্য নিরাপদ যৌনতাই পথ। নৈতিকতার কথাটাই এখানে অবান্তর। এইডসের ক্ষেত্রে যারা চরম ঝুঁকিপূর্ণ, তাদের আপনি নৈতিকতার জ্ঞান দিতে পারেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর নীতি ও স্ট্র্যাটেজি তাই অবশ্যই পাল্টানো দরকার।’’

পাশাপাশি বিশেষজ্ঞরা এই বলেও সতর্ক করে দিচ্ছেন, কনডমের পক্ষে নানা প্রচার এতদিন ভারতকে যে সুফল দিয়েছে, জোরটা নৈতিকতার ওপর সরে গেলে তাতে হিতে বিপরীতও হতে পারে।

বিরোধী দল কংগ্রেসের মুখপাত্র ও দলের মহিলা শাখার প্রেসিডেন্ট শোভা ওঝাও প্রায় একই সুরে বলছেন, ‘‘নাকো কনডমের হয়ে প্রচার করছে মানেই এই নয় যে তারা অবৈধ যৌন সম্পর্ককে উৎসাহিত করছে।’’

মিস ওঝা আরও বলেন, ‘‘যুবকদের মধ্যে কনডমের ব্যবহার, কনডমের ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানো ভারতকে এইডসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অনেক সাহায্য করেছে। এখন হঠাৎ করে মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনা আমদানি করাটা ঠিক নয়।’’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী হর্ষ বর্ধন, যিনি নিজে একজন নামকরা চিকিৎসক, তিনি অবশ্য তাঁর এইডস প্রতিরোধের দর্শনকে মোটেই মধ্যযুগীয় বলে মানতে রাজি নন।

বরং ভারতের পটভূমিতে যৌন নৈতিকতা আর যৌন বিশ্বস্ততাই যে সেরা দাওয়াই – সেটা ধরে নিয়েই তাঁর দফতর এখন এইডস মোকাবিলার নতুন রূপরেখা তৈরি করছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করার আহ্বান

বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ বলেন, ‘আসুন, আমরা প্রতিহিংসার রাজনীতি পরিহার করি। দেশে একটি সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করি। অতীতে কোনো বিরোধী দলই সরকারকে সহযোগিতা করেনি। আমরা সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে প্রকৃত বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চাই।
শনিবার সকালে জাতীয় সংসদে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। বিরোধীদলীয় নেতা তার বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংঘাতের রাজনীতি পরিহার করে সমঝোতার পথে আসার আহ্বান জানান খাদ্যে ভেজালের দাপটে উদ্বেগ প্রকাশ করে রওশন এরশাদ বলেন, খাদ্যে-ওষুধে ভেজাল। এমনকি ধনে পাতায়ও ফরমালিন। আমার ফরমালিন খাচ্ছি।  তিনি বলেন, ফরমালিন বন্ধে শুধু মাত্র কয়েকটা ফল পরীক্ষা করে দেখলেই হবে না। ফরমালিনের অপব্যবহারের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
খাদ্যে ভেজালে যাবজ্জীবন ও ফাঁসির দন্ড রেখে আইন করার আহবান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী প্রজন্ম ফরমালিন খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাবে। 
তিনি বলেন, একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারির পর সাধারণ মানুষের আস্থা থাকছে না ব্যাংকের ওপর। ব্যাংকে টাকা রাখতে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ব্যাংকের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। ওই সকল কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রওশন এরশাদ প্রতিজেলায় একটি করে হাইকোর্টে বেঞ্চ বসানোর ব্যবস্থা করাসহ বিমান, রেল ও টেলিফোনকে প্রাইভেট সেক্টরে দিয়ে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

সুইস ব্যাংকের টাকা ফিরিয়ে আনা হবে- প্রধানমন্ত্রী

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সুইস ব্যাংকে কার কি টাকা আছে তা দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। শুধু তাই নয়, টাকা পাচারে যারা জড়িত তাদেরও বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। গতকাল আওয়ামী লীগের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশকে সুইজারল্যান্ডের মতো গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশকে সুইজারল্যান্ডের মতো করে গড়ে তোলা স্বপ্ন দেখতেন। আওয়ামী লীগ দেশকে সে লক্ষ্যে  পৌঁছানোর জন্য কাজ করে চলেছে। প্রায় ৪০ মিনিট দেয়া বক্তব্যের শুরুতে তিনি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শামসুল ইসলাম, হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য নেতাদের শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করেন। আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি বক্তব্যের জবাবে বলেন, খালেদা জিয়ার ছেলের পাচার করা টাকা দেশে প্রথম আনতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকার। শুধু তারেক, কোকো নয়, সুইস ব্যাংকে কার কি টাকা আছে সেটা আমরা ফিরিয়ে আনব। তার (খালেদা জিয়া) টাকাও আছে। তিনিও ধরা খাবেন। আমি শুনলাম উনি (খালেদা জিয়া) অভিযোগ করেছেন জিয়াকে না-কি আমরা হত্যা করেছি। আমরা কেন তাকে হত্যা করবো? আপনি তখন কোথায় ছিলেন? একটা বাক্স নিয়ে আসলো আপনি বা আপনার ছেলে সেটা খুলেও দেখলেন না। নব্বই সালে গুলিস্তানের এক জনসভায় হঠাৎ স্বীকার করলেন এরশাদ আপনার স্বামীর খুনি। জিয়া মারা যাওয়ার পর এরশাদ ভাবী সাহেবের (খালেদা জিয়া) যত্ন-আত্তি করতে কোন কার্পণ্য করেননি। আমি বলি রহস্যটা কি? বেগম জিয়াকে জিজ্ঞাসা করি আপনি মদত না দিলে এরশাদ কিভাবে ক্ষমতা দখল করে? জিয়া হত্যাকা-ের পর শেখ হাসিনা বোরকা পরে সীমান্তে পালিয়ে ছিলেন- খালেদা জিয়ার এ বক্তব্যের জবাবে তিনি বলেন, আমরা তখন সিলেট গিয়েছি মাজার জিয়ারতের জন্য। বন্যায় রেললাইনে পানি ঊঠলো। তাই ঢাকা আসতে পারছিলাম না। আখাউড়ায় আটকে গেলাম। আমার সঙ্গে তখন ছিলেন সাজেদা চৌধুরী, আমির হোসেন আমু। আমরা ঐদিন উঠলাম ভৈরবে জিল্লুর রহমানের শ্বশুর বাড়ি। জিয়া হত্যার পরে তিনিই (শেখ হাসিনা) একমাত্র প্রথম বিবৃতি দিয়েছিলেন দাবি করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ক্যু ও জিয়া হত্যার পরে আমি একটি বিবৃতি লিখলাম। হত্যার পর এটাই ছিল প্রথম বিবৃতি। তখন আর কেউ বিবৃতি দেয়ার সাহস করেনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৫ই জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি নেত্রী হরতাল-অবরোধ করে গাড়িতে পেট্রোল বোমা মেরে, আগুন দিয়ে নির্মমভাবে মানুষ হত্যা করেছেন। তার নির্মমতা থেকে শিশু পর্যন্ত রক্ষা পায়নি। খালেদা জিয়া হরতাল-অবরোধ করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র প্রমাণের চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। আপনার স্বামী খুনি, আপনি খুনি, আপনার ছেলে খুনি, আপনার পুরো পরিবার খুনি। জনগণ অপানাদের চায় না। জনগণ দেশকে স্থিতিশীল রাখতে আওয়ামী লীগের পাশে থেকেছে। পাশে থাকবে।
 আওয়ামী লীগকে ‘হীরের টুকরো’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগকে যতই ভাঙা ও কাটার চেষ্টা করা হয়েছে ততই আওয়ামী লীগ রশ্মি ছড়িয়েছে। ৯৬ সালে আমরা ক্ষমতায় আসার পর মানুষ প্রথমে উপলব্ধি করে দেশে জনগণের সরকার এসেছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্ব অর্থনীতির রোল মডেল। আমরা আজ পরনির্ভরশীল নই, আত্মনির্ভরশীল।
তিনি বলেন, সবাই বলেছিল পদ্মা সেতু হবে না। আমরা বলেছিলাম হবে। ইনশাআল্লাহ্‌ আমরা কাজ শুরু করেছি। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, খালেদা জিয়া কোনোদিনই চান না দেশের বাচ্চারা পাস করুক। কারণ উনি নিজেই তো অংক আর আরবি ছাড়া আর কোন বিষয়ে এসএসসিতে পাস করতে পারেননি। শিক্ষামন্ত্রীকে বলেছি আমাদের পাসের দেশে ৯৮ শতাংশ পাস করে। আমাদেরও সেটা হওয়া উচিত। স্বাধীনতা ও জাতির ক্রান্তিকালে আওয়ামী লীগ সবচেয়ে ভূমিকা রেখেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পলাশীর আম্রকাননে বাঙালির স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করে সে সূর্যের নবোদয় ঘটিয়েছে। আওয়ামী লীগের জন্ম, প্রতিষ্ঠা, সংগ্রাম ও আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য। স্বাধীন জাতি হিসেবে বাঙালিকে মর্যাদা দেয়ার জন্য। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশ যখন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখনই ১৫ই আগস্ট ঘটিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্য আবার অস্তমিত করার ষড়যন্ত্র করা হয়। পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্যাস্তে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট সেই ষড়যন্ত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটে। পলাশীর আম্রকাননে মোনাফেক বেঈমান ছিল মীর জাফর আর বঙ্গবন্ধু হত্যা ও এই ষড়যন্ত্রে জড়িত আওয়ামী লীগেরই কুলাঙ্গার খোন্দকার মোশ্‌তাক। আর তার সঙ্গে একত্রিত হয়ে গাদ্দারি করেছেন জিয়াউর রহমান। কথায় বলে যে নালে যায় সে নালে আসে। মোশ্‌তাকও টিকতে পারেনি। ষড়যন্ত্রকারী মোশ্‌তাককে সরিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেন, তিনি ১৫ই আগস্টের খুনিদের পুরস্কৃত করেন, যার মাধ্যমে ১৫ই আগস্টের খুনিদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, নির্বাচনে না এসে ভুল করেছেন। এখন বিদেশী প্রভুদের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করছেন, নালিশ করছেন। এসব কান্নাকাটি বন্ধ করুন। বিদেশীরা আপনাকে ক্ষমতায় আনবে না। তাদের কাছে ধরনা দিয়ে কোন লাভ নেই। আওয়ামী লীগ বিদেশী প্রভুদের উপর নয়, দেশের মানুষের শক্তিতে বলিয়ান। আওয়ামী লীগই পারে আওয়ামী লীগই পারবে। তাই দেশের জনগণই আওয়ামী লীগকে বার বার ক্ষমতায় আনে।
সভায় উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, ষড়যন্ত্র আগেও ছিল। এখনও আছে। সকল ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়া বলেছেন আমাদের হাতে রক্ত। আমাদের হাতে রক্ত নেই। রক্ত আপনার হাতে। ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের আগে আপনি মানুষ খুন করেছেন। তিনি বলেন, আপনি জিয়া হত্যার বিষয়ে আমাদের দায়ী করছেন। অথচ স্বামী হত্যার পরে আপনিই ছিলেন সবচেয়ে সুবিধাভোগী। এরশাদ হবেন রাষ্ট্রপতি। আপনি হবেন উপ-রাষ্ট্রপতি এমনই সিদ্ধান্ত ছিল আপনার। তিনি বলেন, যতই দাবি করেন তত্ত্বাবধায়ক আর ফিরে আসবে না। এটা এখন অতীত। শেখ হাসিনার অধীনেই আপনাকে আগামী নির্বাচনে আসতে হবে। উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করেননি। কিন্তু এখন সেজেগুজে সুষমা স্বরাজের সঙ্গে হোটেলে ঠিকই দেখা করতে গেলেন। ভুল হলেও রাজনীতিতে কেউ কাউকে ক্ষমা করে না। এরশাদের কাবিন করা বিবি রওশনও এরশাদকে খাতির করেনি।
প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, আওয়ামী কোন বিশেষ স্থান থেকে জন্ম লাভ করেনি। আওয়ামী লীগ আছে। আওয়ামী লীগ থাকবে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে রোগ, শোক, জরা ব্যাধি উপেক্ষা করে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন- আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট সাহারা খাতুন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনি প্রমুখ।

নারায়ণগঞ্জে যেভাবে দেওয়া হলো জালভোট- ইডব্লিউজির সংবাদ সম্মেলন

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচন। ১১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রে একদল লোক ঢুকে ৮ থেকে ১০টি ব্যালট পেপার ছিনতাই করে। পেপারে সিল মেরে ব্যালটবাক্সে ঢুকিয়ে দেয়।

আলীরটেক এলাকার একটি কেন্দ্রে ৫০ থেকে ৬০ জন লোক ঢুকে দুই ঘণ্টা ধরে ব্যালট বাক্সে সিল মারা ব্যালট পেপার ঢুকিয়ে দেয়। ১৩ নম্বর ওয়ার্ডেও বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে একইভাবে কিছু লোক ঢোকে। হুমকি দেওয়া হয় প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে। তিনি চুপ করে বসে থাকেন।

আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপনির্বাচন পর্যবেক্ষণ শেষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে পড়া প্রাথমিক বিবৃতি প্রতিবেদনে এভাবেই নির্বাচন চলাকালে দেখা কয়েকটি ভোটকেন্দ্রের বর্ণনা দেয় ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ (ইডব্লিউজি)। ইডব্লিউজি নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনে ১৪১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬০টি কেন্দ্রে ৬০ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করে। নির্বাচনে ৬০টি কেন্দ্র পরিদর্শনের পরে ইডব্লিউজি জানায়, ৬০টির মধ্যে ৩০ শতাংশ কেন্দ্রে জালভোট পড়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার প্রাথমিক বিবৃতি প্রতিবেদন পড়ে শোনান নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার পরিচালক আবদুল আলীম। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘একদল লোক’, ‘কিছু লোক’, অবৈধভাবে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন ও জালভোট দেন। কিন্তু তাঁরা কারা, কোন দলের, তা বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।

এসব লোকের পরিচয় জানতে চাইলে আবদুল আলীম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিক বিবৃতিতে এসব বিষয় আনা হয় না। বিস্তারিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য দেওয়া হবে।’
পরে আবদুল আলীম একটু হেসে বলেন, ‘এ ছাড়া আমার মনে হয় এটা আপনারা বুঝতে পারছেন।’

ইডব্লিউজির লিখিত বিবরণীতে বলা হয়, নির্বাচন ছিল অনেকাংশে শান্তিপূর্ণ। সহিংসতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু বিপুলসংখ্যক ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। ভোট গ্রহণ শুরুর সময় ৫৩ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে ১ থেকে ২০ জন এবং ৩ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে ৪০ জনের বেশি ভোটারের লাইন ছিল।

লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, কোনো কোনো কেন্দ্র থেকে পর্যবেক্ষণ সংস্থার পর্যবেক্ষকদেরও বেশ কিছু সময়ের জন্য কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। ১৪ শতাংশ কেন্দ্রে প্রার্থীর এজেন্টদের গণনা প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবাদ বা আপত্তি করতে দেখা গেছে। ভোট গণনার পর ১৪ শতাংশ কেন্দ্রে নিয়ম অনুযায়ী ফলাফল টাঙিয়ে দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া ইডব্লিউজির একজন পর্যবেক্ষককে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে এবং আটজন পর্যবেক্ষককে গণনাকক্ষে ঢুকতে দেওয়া হয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে।

ইডব্লিউজির স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের এ নির্বাচন খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বড় কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের প্রবণতা দূর করতে হবে।

তরুণেরা চাকরিপ্রার্থী নয় চাকরিদাতা: ড. ইউনূস

নতুন ব্যবসা ও পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসার জন্য তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘তরুণেরা চাকরিপ্রার্থী নয়, তাঁরা চাকরিদাতা।’

আজ শনিবার রাজধানীর হোটেল র্যাডিসনে ইউনূস সেন্টারের আয়োজনে পঞ্চম সামাজিক ব্যবসা দিবস উপলক্ষে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস এ কথা বলেন। সকালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি। তরুণদের উদ্দেশে ইউনূস বলেন, পরিকল্পনা নিয়ে আসলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তহবিলের সংকট হবে না।

এই খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘তরুণেরা যখন ব্যবসার উদ্যোগ নিয়ে আসেন, তখন আমরা খুব অনুপ্রাণিত হই। সামাজিক ব্যবসা দিয়ে সামাজিক সমস্যা দূর করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তরুণদের স্বপ্ন ও উদ্যোগ নিয়ে বেকারত্ব দূর করতে হবে।’

ড. ইউনূস বলেন, তিনি মনে করেন পৃথিবীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে, যখন বেকারত্ব বলে কিছু থাকবে না। সুস্থ শরীরের একজন মানুষ বেকার থাকবে—এটা হতে পারে না।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রবার্ট এফ কেনেডি সেন্টার ফর জাস্টিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের প্রেসিডেন্ট ক্যারি কেনেডি। তিনি বলেন, শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ব্যবসা কীভাবে অবদান রাখতে পারে, তা বিবেচনা করা উচিত। ড. ইউনূস ও তাঁর সামাজিক ব্যবসা যে অন্যদের চেয়ে আলাদা, সেটি সর্বস্তরে আলোচিত।

কেনেডি বলেন, লাখ লাখ দরিদ্র মা-বাবা দারিদ্র্যের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন। তাঁদের আমাদের সহায়তা করা উচিত।

অনুষ্ঠানে সোশ্যাল বিজনেস ডিজাইন ল্যাবের আওতায় হাইতি, নেপাল, উগান্ডা ও বাংলাদেশের সামাজিক ব্যবসার অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা হয়। প্রথম কর্ম অধিবেশনে বক্তব্য দেন, গ্রামীণ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেয়া জাং, জার্মানি ইউনূস সোশ্যাল বিজনেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সোফি আইজানম্যান, নেপালের চৌধুরী গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নির্ভানা চৌধুরী, কম্বোডিয়ার ফ্রি, পারফর্মিং সোশ্যাল এন্টারপ্রাইজের প্রধান নির্বাহী হাউট ডারা, চায়না সোশ্যাল বিজনেস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক গোয়া জান, ভারতের নাভার্ড গ্রুপের প্রধান মহাব্যবস্থাপক বি এস সুরান প্রমুখ।

শাবাশ এএসপি বশির!!

মোহাম্মদ বশিরউদ্দীন
১৮ জুন প্রথম আলোয় ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয়। ওই দিনই অফিসে এসে একটি টেলিফোন পেলাম। নিজের পরিচয় দিয়ে টেলিফোনদাতা বললেন, আমি নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ বশিরউদ্দীন। আপনারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি নামে যে সম্পাদকীয়টি লিখেছেন, সে জন্য ধন্যবাদ জানাই। সাত খুনের পর বেশ কয়েকবার নারায়ণগঞ্জ গেলেও তাঁর সঙ্গে আর কথা হয়নি। কথা হয়েছে সাবেক এসপি, ডিসিসহ আরও অনেকের সঙ্গে, যাঁরা নিজেদের নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ দাবি করতেন। কিন্তু এখন খবর বের হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন, পুলিশ ও র‌্যাবের অনেক বড় কর্তাই নূর হোসেনের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেতেন। ১৮ জুন এএসপি বশিরউদ্দীনের কথা শুনে পুলিশ সম্পর্কে আগের ধারণাটিই পাল্টে গেল। তাহলে সব পুলিশ খারাপ নন। সবাই হাতে কাগজ পেয়ে ব্ল্যাকমেলও করেন না। র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সম্পর্কে অনেক বদনাম। ইদানীং সেই বদনামের মাত্রাটি আরও বেড়েছে। কয়েক দিন আগে সাভারে এক পুলিশ কর্মকর্তা একজন রিকশাচালকের কাছে এক হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন। গরিব রিকশাচালক সেই টাকা দিতে না পারায় তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে রাস্তার ওপরই ফেলে রেখে যায় পুলিশ। পুলিশের গ্রেপ্তার-বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। পুলিশের চাঁদাবাজি, ঘুষ যেমন স্বাভাবিক ব্যাপার, তেমনি তাদের হাতে নিরীহ ও সাধারণ মানুষের লাঞ্ছিত হওয়াও গা-সওয়া হয়ে গেছে।
এই অবস্থায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি নেওয়ার মাধ্যমে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেই খবর একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গণমাধ্যমে জানানো বিরল ও ব্যতিক্রম ঘটনাই বটে। চাইলে তিনি ওই কাগজপত্র দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ আদায় করতে পারতেন। এএসপি বশির তা করেননি। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে পুলিশ বিভাগেও অনেক সৎ মানুষ আছেন। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে যা ঘটল, তাতে ওই পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এল। আমাদের সমাজের মাথা বলে পরিচিত ব্যক্তিরা যখন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে আপস ও পলায়নকে জাতীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তখন এই পুলিশ কর্মকর্তা সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে সমাজটি এখনো পচে যায়নি। এখনো সত্য কথা বলার মানুষ আছেন। ভোটের অঙ্কে বিজয়ী সেলিম ওসমান বা পরাজিত এস এম আকরাম নন, সেই সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বশিরউদ্দীনই হলেন নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনের নায়ক। কীভাবে? তিনি নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করছিলেন বন্দর উপজেলার মদনপুর কেওঢালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে। শামীম ও সেলিম ওসমানের অনুসারী (আওয়ামী লীগ করেন না জাতীয় পার্টি করেন, না তিনি দুটোই একসঙ্গে করেন, জানা গেল না) স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুস সালাম দলবল নিয়ে কেন্দ্রটি দখল করতে গেলে তিনি বাধা দেন। তাঁকে ভোটকেন্দ্রের এলাকা ছেড়ে যেতে বলেন।
কিন্তু চেয়ারম্যান পুলিশ কর্মকর্তার কথা গ্রাহ্য না করে তাঁকে এই বলে হুমকি দেন যে তাঁকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া না হলে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ মাথা নিয়ে যেতে পারবে না। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের পরও মাথা নেওয়ার প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার মানুষ নারায়ণগঞ্জে আছে! এ ধরনের লোককে তো রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করা উচিত৷ এ পর্যায়ে এএসপি বশিরউদ্দীন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানালে তাঁরা ওই ইউপি চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন। এর পরই গায়েবি আওয়াজ আসে—তাঁকে ভোটকেন্দ্রটি ছেড়ে যেতে হবে, চেয়ারম্যান সালামকে সদলবলে ভোটকেন্দ্র দখল করতে দিতে হবে। কেননা, সময় বেশি হাতে নেই। ৭০-৮০ ভাগ ভোট কাস্ট করাতে হবে। ওপার থেকে গায়েবি টেলিফোনটি করেছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের ভাই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান। কিন্তু এএসপি বশির তাঁর কথায় রাজি না হলে শামীম ওসমান কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা বলে গাল দেন। তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। তাঁর টেলিফোন সক্রিয় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে টেলিফোন করার কথাও তাঁকে জানিয়ে দেন। এর পরও দমে যাননি সেই পুলিশ কর্মকর্তা। বলেছেন, ‘আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতে দিন। আমি এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। অন্য কারও হুকুম তামিল করার এখতিয়ার নেই।’ যে শামীম ওসমানের কথা ছাড়া নারায়ণগঞ্জে নাকি একটি গাছের পাতাও নড়ে না, সেই শামীম ওসমানকে মুখের ওপর যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তা এভাবে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অবিচল থাকতে পারেন, তাঁকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। শাবাশ জানাই। এখনো পুলিশ বিভাগে, সরকারি প্রশাসনে এ ধরনের দু-চারজন কর্মকর্তা আছেন বলেই দেশটি টিকে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রশাসন বা পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ রকম নিষ্ঠাবান কর্মকর্তার প্রতি কী আচরণ করছেন?
তাঁরা কি তাঁকে সুরক্ষা দেবেন? আমরা হতবাক হলাম জেলা পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন এই ঘটনাকে ‘টুকটাক কথাবার্তা’ বলে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি কোন কথাকে টুকটাক কথা কললেন? শুয়োরের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা গালি, নাকি দেখে নেওয়ার হুমকি? একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্ব তাঁর অধীন ব্যক্তিকে সুরক্ষা ও অভয় দেওয়া। তিনি যাতে নিজের কর্তব্য পালন করতে পারেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের এসপি মহোদয় বিপরীত কাজটিই করলেন। এতে হুমকিদাতা আশকারা পাবেন, আর হুমকিপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। হয়তো এরপর ওই দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাকে বিএনপি-জামায়াতের লোক বানিয়ে সাসপেন্ড বা খাগড়াছড়ির দুর্গম জঙ্গলে শাস্তিমূলক বদলি করা হবে। এ ব্যাপারে আমরা নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য শুনতে চাই। নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এএসপি বশির হুমকির শিকার হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনেরই দায়িত্ব সেই হুমকিদাতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। সেই কাজটি নির্বাচন কমিশন করতে পারলে তাদের অতীত গ্লানি কিছুটা হলেও মুছে যেত। মানুষ বলত, অন্তত কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নির্বাচন কমিশন দেশবাসীকে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে না পারলেও অন্তত একটি অন্যায়ের প্রতিকার করেছে। আর এ ঘটনায় যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ব্যবহার করা হয়েছে, সেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরও স্পষ্ট বক্তব্য চাই। যে কেউ যখন-তখন তাঁদের সমস্ত অপকর্মের ঢাল হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ব্যবহার করতে পারেন? শামীম ওসমান রাজনীতি করবেন কি করবেন না, সেই বার্তা কেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেবেন? শাবাশ এএসপি বশিরউদ্দীন। এ রকম দৃঢ়চেতা ও সৎ পুলিশ কর্মকর্তারাই পারেন সমাজের দুষ্ট ক্ষত ও ক্যানসারগুলো ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

উৎখাত সংস্কৃতি থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে কে?

বাংলাদেশের ৪৩ বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনে দু-দুবার রক্তলোলুপ হত্যাযজ্ঞের আয়োজন প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। দুবারই সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরও দুবার সমরপ্রভুরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছেন—১৯৮২ সালে সরাসরি এবং ২০০৭ সালে আড়াল থেকে, তবে রক্তপাতের প্রয়োজন হয়নি। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন-প্রক্রিয়ায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে একমাত্র নির্ধারক করার প্রয়োজনেই এ দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির প্রচলন করা হয়েছিল। কিন্তু, ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নয় যে ১৯৯৬-২০০৮ পর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা পালনের অবস্থান থেকে ওই পদ্ধতিতেও প্রকৃত বিচারে সামরিক বাহিনীকে হটানো যায়নি; দেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাই প্রতিবার মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলী বাছাইয়ে। ৪৩ বছরের নির্বাচিত-অনির্বাচিত সব সরকারের মধ্যে এ দেশে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগের একমাত্র নজির সৃষ্টি করেছিলেন শেখ হাসিনা, তাঁর সরকার ২০০১ সালে কোনো আন্দোলন ছাড়াই সময়মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করে। অন্যদিকে, ১৯৯০ সালে সামরিক একনায়ককে উৎখাতের জন্য যেমন গণ-অভ্যুত্থানের প্রয়োজন পড়েছিল, তেমনি আবার ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রহসনে একতরফা বিজয়ী বিএনপিকে হটিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রচলনের জন্যও প্রায় গণ-অভ্যুত্থান পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল।
এরই ফলে সংবিধানে তড়িঘড়ি করে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করাতে হয়। ১৯৯৬ সালেই কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মারাত্মক ত্রুটিটি জাতির কাছে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল: ওই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে লাগামহীন ক্ষমতাধর করে ফেলা হয়েছিল বিএনপির ধুরন্ধর নীতিপ্রণেতাদের অভিসন্ধি অনুসারে। ব্যাপারটা ধরা পড়েছিল প্রথমবার বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস যখন প্রধান উপদেষ্টা এবং সেনাবাহিনীর িচফ অব স্টাফের অগোচরে কয়েকজন সেনা কমান্ডারকে চাকিরচ্যুত করার আদেশ জারি করায় সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। আল্লাহকে শুকরিয়া যে তদানীন্তন প্রধান উপদেষ্টা প্রয়াত বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে জাতি ওই বিপদ থেকে পরিত্রাণ পেয়েছিল। তবে, ওই সামরিক সংকটে শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ায় বেশ কয়েকজন মেধাবী সেনা কমান্ডার চাকির হারিয়েছিলেন। এরপর নির্বিঘ্নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে আবারও ব্যবহার করে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার অপপ্রয়াসে প্রায় সফল হয়ে গিয়েছিলেন, এ কথা হয়তো এখন অনেকে ভুলে গেছেন। মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার বিচক্ষণ পদক্ষেপ তাঁদের ওই তৎপরতাকেও ভন্ডুল করে দিয়েছিল। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিএনপি-জামায়াত জোট কীভাবে অপব্যবহার করে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে গো–হারা হারানোর ব্যবস্থা করেছিল,
সেটা এখন মোটামুটি সবার জানা হয়ে গেছে। সবশেষে ২০০৬-২০০৭ পর্বে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে খালেদা জিয়া কতভাবে যে অপব্যবহার করেছেন, সে কাহিনি এত তাড়াতাড়ি জাতি ভুলে যায়নি। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর িচফ অব স্টাফ পদে বেগম জিয়ার পছন্দসই পরিবর্তনকে ভন্ডুল করার উদ্দেশ্যেই ২০০৭ সালের এক-এগারোর ছদ্মবেশী সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, এটাও অনেকে ভুলে গেছেন হয়তোবা। কিন্তু, এসব ত্রুটির কারণে নয়, সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন এর ‘অনির্বাচিত সরকার’ হওয়ার কারণে, যা খুবই যৌক্তিক। কিন্তু, ওই রায়ে সংসদ প্রয়োজন মনে করলে আরও দুবারের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখা যাবে বলে সুপ্রিম কোর্ট মত প্রকাশ করেছিলেন, শুধু বিচার বিভাগকে এর সঙ্গে না জড়াতে অনুরোধ করা হয়েছিল। সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টের ওই মতামতকে উপেক্ষা করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছানুসারে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ািরর একতরফা নির্বাচনটা সফল করার জন্যই যে সুপ্রিম কোর্টের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা হয়েছে, তা না বোঝার কারণ নেই। কিন্তু, এর ফলে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের ইস্যুটা এ দেশে আবারও গণ-অভ্যুত্থান, সামরিক অভ্যুত্থান ও হত্যাযজ্ঞের পুরোনো ‘অসভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে’ প্রত্যাবর্তনের যে প্রবল আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তা কি অস্বীকার করা যাবে?
১৯৯১ সালে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটে সরকার পরিবর্তনের ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতির’ বিকাশের যে সূচনা হয়েছিল, তা থেকে জাতি যে ২০১৪ সালে আবারও ছিটকে পড়ল৷ এটাকে কি মহাবিপদ মনে হচ্ছে না? ছয় মাস ধরে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতা-কর্মীরা যে আবারও আরেকটি ১৫ আগস্টের হুমকি দিতে শুরু করেছেন, তা কি শুধুই কথার কথা? ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া বিএনপি ১৫ আগস্টকে বরাবরই ‘জনগণের মুক্তি’ হিসেবেই অভিহিত করে চলেছে। বিএনপির অনেক নেতা ওই অমানুষিক হত্যাকাণ্ডের ঘাতকদের ‘সূর্যসন্তান’ বলেও অভিহিত করেছেন একাধিকবার এবং এটা মোটেও কাকতালীয় বা তাৎপর্যহীন নয় যে শেখ হাসিনার অনুরোধ সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়া ১৫ আগস্টে তাঁর জন্মদিন ঘটা করে পালন করা থেকে বিরত হবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। এটাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনাকেই হত্যা করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছিল। ওই ধরনের হত্যার পরিকল্পনা অদূর ভবিষ্যতে যে নেওয়া হবে না, তা কি নিশ্চিত করে বলা যায়? সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জামায়াত-শিবিরের খুন-জখম-বোমাবাজির তাণ্ডবে লক্ষণীয় ভাটার টান পরিলক্ষিত হওয়ায় রাজনীতির মাঠে প্রবল সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে যে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের নিষ্ক্রিয় রাখার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে একটা গোপন সমঝোতায় উপনীত হয়েছে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণায় সুপ্রিম কোর্টের রহস্যজনক বিলম্ব এবং অসুস্থতার অজুহাতে নিজামীর রায় ঘোষণা মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ স্থগিত করে দেওয়ায় সমঝোতার ব্যাপারটাকে আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য, এটাকে আমি জামায়াতের ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্কের’ একটা ধুরন্ধর চাল হিসেবেই বিবেচনা করছি। নিজেদের শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য তাদের এই ‘যুদ্ধবিরতির’ প্রয়োজন ছিল ৈবকি! কিন্তু, আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজি নই যে জামায়াত-শিবিরকে তাদের সহিংস রাজনীতি থেকে এ ধরনের সমঝোতা বেশি দিন বিরত রাখতে পারবে। আমি এও বিশ্বাস করি যে এ ধরনের গোপন সমঝোতা আখেরে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার জন্যই বুমেরাং হবে। প্রতিপক্ষকে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদ দখলের সংস্কৃতি মানবসমাজের উপরিকাঠামোতে রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর থেকেই চালু রয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক পর্যায়ের মানবসমাজে রাষ্ট্র ছিল না। এমনকি মানব-বসতি স্থাপনের ইতিহাসে যেসব প্রাচীন সভ্যতার কথা আমরা জানতে পারছি, সেগুলোতেও প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্র চালু ছিল না। সামাজিক বিকাশের ধারায় বিকশিত তুলনামূলক অপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান বলা চলে রাষ্ট্রকে।
রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মান্ধাতার পদ্ধতি রাজতন্ত্রে খুনোখুনিই প্রধান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল বলা চলে। একটা সমাজ কতখানি সভ্য হলো, তার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনে হত্যা ও খুনোখুনির প্রয়োজন মোটেও না থাকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতখানি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা গেল, তার পরীক্ষায় ওই সমাজ উত্তীর্ণ হতে পারল কি না সে ব্যাপারটা। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাষ্ট্র-চরিত্র সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হলে কিন্তু এখনো রাজনৈতিক হত্যা, সামরিক অভ্যুত্থান ও গণ-অভ্যুত্থানের অশনিসংকেতকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়াটা মোটেও সমীচীন হবে না। ভারতে সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি যেভাবে ভোটের জোয়ারে অভিষিক্ত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলো, তা প্রমাণ করে দিয়েছে যে গণতন্ত্রের িশকড় ভারতে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছে। দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারকে জনগণ প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করার পর কংগ্রেস-নেত্রী সোনিয়া গান্ধী যেভাবে দায় নিয়ে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটাও প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই পরিচায়ক। আবার, কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে যেভাবে তিনি এই বিপর্যয় থেকে কংগ্রেসকে উদ্ধারের মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্যটা পুরোপুরি পরিস্ফুট হয়েছে। এর সঙ্গে তুলনা করুন ২০১৩-২০১৪ পর্বের বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ডামাডোলকে। ১৯৯১ সালে ভোটের রাজনীতি চালু হলেও এ দেশে ২৩ বছর ধরে পালাক্রমে নির্বাচিত বিএনপি বা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কোনো সরকারই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটে পর পর দুই মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেনি। কিন্তু, প্রতিবারই সরকারে ক্ষমতাসীন জোট তাদের ক্ষমতার মেয়াদে সুপরিকল্পিতভাবে পরবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য ‘সাজানো বাগান’ গড়ে তোলার প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়েছে।
১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৬ ও ২০০৭–এর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা গেছে, অ্যান্টি–ইনকমব্যান্সি ফ্যাক্টর বাংলাদেশে এতই প্রবল যে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আরও বহুদিন এ দেশে কোনো ক্ষমতাসীন দল বা জোট পর পর দুবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতাসীন হতে পারবে না। দুর্নীতি ও পঁুজি লুণ্ঠনের দুষ্ট চক্র থেকে কোনো সরকাির দল বা জোটই বেরোতে পারছে না বলেই বারবার জনগণের বিপুল প্রত্যাখ্যান সদ্য-বিদায়ী সরকারি দল বা জোটের জন্য নির্বাচনী বিপর্যয় ডেকে আনছে, এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই। ভারতের বিহার রাজ্যে নীতিশকুমার তাঁর পূর্বসূির লালু প্রসাদ যাদবের তুলনায় তুলনামূলক সুশাসন দেওয়ায় তিনি পর পর তিনবার বিহারে নির্বাচনী বিজয় অর্জন করেছিলেন। এবার মোদি জোয়ারে তাঁর দল লোকসভা নির্বাচনে পরাজয় বরণ করায় তিনি পদত্যাগ করেছেন, যদিও বিধান সভায় তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অক্ষুণ্ন ছিল। এটাও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সৌন্দর্যেরই প্রতিফলন। আমাদের দুই নেত্রী যদি নির্বাচনী পরাজয়কে নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার এই গণতান্ত্রিক মানসিকতাটুকু অর্জন করতে পারতেন, তাহলে বাংলাদেশের শিশু গণতন্ত্র এবার যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল, তা এড়ানো যেত। কিন্তু, তাঁদের দুজনই ক্ষমতার লিপ্সায় এতই বঁুদ হয়ে আছেন যে নিজেদের ক্ষমতার মেয়াদকে যেনতেনভাবে দীর্ঘায়িত করাই তাঁদের প্রধান ধ্যানজ্ঞান বলা চলে। দেশ ও জনগণের জীবনের সীমাহীন দুর্ভোগে তাঁদের কিছু যায় আসে না।
মইনুল ইসলাম: প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি৷

উৎখাত সংস্কৃতি থেকে গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে কে? by মইনুল ইসলাম

বাংলাদেশের ৪৩ বছরের ইতিহাসে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনে দু-দুবার রক্তলোলুপ হত্যাযজ্ঞের আয়োজন প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। দুবারই সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়েছে। আরও দুবার সমরপ্রভুরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছেন—১৯৮২ সালে সরাসরি এবং ২০০৭ সালে আড়াল থেকে, তবে রক্তপাতের প্রয়োজন হয়নি। রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন-প্রক্রিয়ায় অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে একমাত্র নির্ধারক করার প্রয়োজনেই এ দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতির প্রচলন করা হয়েছিল। কিন্তু, ওয়াকিবহাল মহলের অজানা নয় যে ১৯৯৬-২০০৮ পর্বের তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে নির্ধারক ভূমিকা পালনের অবস্থান থেকে ওই পদ্ধতিতেও প্রকৃত বিচারে সামরিক বাহিনীকে হটানো যায়নি; দেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থাই প্রতিবার মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলী বাছাইয়ে।

৪৩ বছরের নির্বাচিত-অনির্বাচিত সব সরকারের মধ্যে এ দেশে স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ত্যাগের একমাত্র নজির সৃষ্টি করেছিলেন শেখ হাসিনা, তাঁর সরকার ২০০১ সালে কোনো আন্দোলন ছাড়াই সময়মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা অর্পণ করে। অন্যদিকে, ১৯৯০ সালে সামরিক একনায়ককে উৎখাতের জন্য যেমন গণ-অভ্যুত্থানের প্রয়োজন পড়েছিল, তেমনি আবার ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনী প্রহসনে একতরফা বিজয়ী বিএনপিকে হটিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রচলনের জন্যও প্রায় গণ-অভ্যুত্থান পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। এরই ফলে সংবিধানে তড়িঘড়ি করে ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করাতে হয়। ১৯৯৬ সালেই কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার মারাত্মক ত্রুটিটি জাতির কাছে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছিল: ওই ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতিকে লাগামহীন ক্ষমতাধর করে ফেলা হয়েছিল বিএনপির ধুরন্ধর নীতিপ্রণেতাদের অভিসন্ধি অনুসারে।
ব্যাপারটা ধরা পড়েছিল প্রথমবার বেগম খালেদা জিয়ার পরামর্শে তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস যখন প্রধান উপদেষ্টা এবং সেনাবাহিনীর িচফ অব স্টাফের অগোচরে কয়েকজন সেনা কমান্ডারকে চাকিরচ্যুত করার আদেশ জারি করায় সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছিল। আল্লাহকে শুকরিয়া যে তদানীন্তন প্রধান উপদেষ্টা প্রয়াত বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের সময়োচিত পদক্ষেপের কারণে জাতি ওই বিপদ থেকে পরিত্রাণ পেয়েছিল। তবে, ওই সামরিক সংকটে শাস্তিপ্রাপ্ত হওয়ায় বেশ কয়েকজন মেধাবী সেনা কমান্ডার চাকির হারিয়েছিলেন।
এরপর নির্বিঘ্নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাসকে আবারও ব্যবহার করে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার অপপ্রয়াসে প্রায় সফল হয়ে গিয়েছিলেন, এ কথা হয়তো এখন অনেকে ভুলে গেছেন। মনে করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার বিচক্ষণ পদক্ষেপ তাঁদের ওই তৎপরতাকেও ভন্ডুল করে দিয়েছিল। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে বিএনপি-জামায়াত জোট কীভাবে অপব্যবহার করে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে গো–হারা হারানোর ব্যবস্থা করেছিল, সেটা এখন মোটামুটি সবার জানা হয়ে গেছে। সবশেষে ২০০৬-২০০৭ পর্বে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে খালেদা জিয়া কতভাবে যে অপব্যবহার করেছেন, সে কাহিনি এত তাড়াতাড়ি জাতি ভুলে যায়নি। রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর িচফ অব স্টাফ পদে বেগম জিয়ার পছন্দসই পরিবর্তনকে ভন্ডুল করার উদ্দেশ্যেই ২০০৭ সালের এক-এগারোর ছদ্মবেশী সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল, এটাও অনেকে ভুলে গেছেন হয়তোবা।
কিন্তু, এসব ত্রুটির কারণে নয়, সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারবিষয়ক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছেন এর ‘অনির্বাচিত সরকার’ হওয়ার কারণে, যা খুবই যৌক্তিক। কিন্তু, ওই রায়ে সংসদ প্রয়োজন মনে করলে আরও দুবারের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখা যাবে বলে সুপ্রিম কোর্ট মত প্রকাশ করেছিলেন, শুধু বিচার বিভাগকে এর সঙ্গে না জড়াতে অনুরোধ করা হয়েছিল। সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টের ওই মতামতকে উপেক্ষা করেছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইচ্ছানুসারে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ািরর একতরফা নির্বাচনটা সফল করার জন্যই যে সুপ্রিম কোর্টের মতামতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করা হয়েছে, তা না বোঝার কারণ নেই।
কিন্তু, এর ফলে রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তনের ইস্যুটা এ দেশে আবারও গণ-অভ্যুত্থান, সামরিক অভ্যুত্থান ও হত্যাযজ্ঞের পুরোনো ‘অসভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে’ প্রত্যাবর্তনের যে প্রবল আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে, তা কি অস্বীকার করা যাবে? ১৯৯১ সালে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটে সরকার পরিবর্তনের ‘রাজনৈতিক সংস্কৃতির’ বিকাশের যে সূচনা হয়েছিল, তা থেকে জাতি যে ২০১৪ সালে আবারও ছিটকে পড়ল৷ এটাকে কি মহাবিপদ মনে হচ্ছে না? ছয় মাস ধরে বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতা-কর্মীরা যে আবারও আরেকটি ১৫ আগস্টের হুমকি দিতে শুরু করেছেন, তা কি শুধুই কথার কথা?
ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া বিএনপি ১৫ আগস্টকে বরাবরই ‘জনগণের মুক্তি’ হিসেবেই অভিহিত করে চলেছে। বিএনপির অনেক নেতা ওই অমানুষিক হত্যাকাণ্ডের ঘাতকদের ‘সূর্যসন্তান’ বলেও অভিহিত করেছেন একাধিকবার এবং এটা মোটেও কাকতালীয় বা তাৎপর্যহীন নয় যে শেখ হাসিনার অনুরোধ সত্ত্বেও বেগম খালেদা জিয়া ১৫ আগস্টে তাঁর জন্মদিন ঘটা করে পালন করা থেকে বিরত হবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। এটাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনাকেই হত্যা করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত হয়েছিল। ওই ধরনের হত্যার পরিকল্পনা অদূর ভবিষ্যতে যে নেওয়া হবে না, তা কি নিশ্চিত করে বলা যায়?
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে জামায়াত-শিবিরের খুন-জখম-বোমাবাজির তাণ্ডবে লক্ষণীয় ভাটার টান পরিলক্ষিত হওয়ায় রাজনীতির মাঠে প্রবল সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে যে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের নিষ্ক্রিয় রাখার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে একটা গোপন সমঝোতায় উপনীত হয়েছে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর রায় ঘোষণায় সুপ্রিম কোর্টের রহস্যজনক বিলম্ব এবং অসুস্থতার অজুহাতে নিজামীর রায় ঘোষণা মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ স্থগিত করে দেওয়ায় সমঝোতার ব্যাপারটাকে আর উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য, এটাকে আমি জামায়াতের ‘থিঙ্ক ট্যাঙ্কের’ একটা ধুরন্ধর চাল হিসেবেই বিবেচনা করছি। নিজেদের শক্তি পুনরুদ্ধারের জন্য তাদের এই ‘যুদ্ধবিরতির’ প্রয়োজন ছিল ৈবকি! কিন্তু, আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে রাজি নই যে জামায়াত-শিবিরকে তাদের সহিংস রাজনীতি থেকে এ ধরনের সমঝোতা বেশি দিন বিরত রাখতে পারবে। আমি এও বিশ্বাস করি যে এ ধরনের গোপন সমঝোতা আখেরে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার জন্যই বুমেরাং হবে।
প্রতিপক্ষকে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদ দখলের সংস্কৃতি মানবসমাজের উপরিকাঠামোতে রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর থেকেই চালু রয়েছে। প্রাগৈতিহাসিক পর্যায়ের মানবসমাজে রাষ্ট্র ছিল না। এমনকি মানব-বসতি স্থাপনের ইতিহাসে যেসব প্রাচীন সভ্যতার কথা আমরা জানতে পারছি, সেগুলোতেও প্রাথমিক পর্যায়ে রাষ্ট্র চালু ছিল না। সামাজিক বিকাশের ধারায় বিকশিত তুলনামূলক অপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান বলা চলে রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মান্ধাতার পদ্ধতি রাজতন্ত্রে খুনোখুনিই প্রধান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল বলা চলে। একটা সমাজ কতখানি সভ্য হলো, তার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনে হত্যা ও খুনোখুনির প্রয়োজন মোটেও না থাকার রাজনৈতিক সংস্কৃতি কতখানি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা গেল, তার পরীক্ষায় ওই সমাজ উত্তীর্ণ হতে পারল কি না সে ব্যাপারটা।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাষ্ট্র-চরিত্র সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করা হলে কিন্তু এখনো রাজনৈতিক হত্যা, সামরিক অভ্যুত্থান ও গণ-অভ্যুত্থানের অশনিসংকেতকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়াটা মোটেও সমীচীন হবে না। ভারতে সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি যেভাবে ভোটের জোয়ারে অভিষিক্ত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলো, তা প্রমাণ করে দিয়েছে যে গণতন্ত্রের িশকড় ভারতে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়েছে। দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারকে জনগণ প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করার পর কংগ্রেস-নেত্রী সোনিয়া গান্ধী যেভাবে দায় নিয়ে নেতৃত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেটাও প্রকৃত গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই পরিচায়ক। আবার, কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে যেভাবে তিনি এই বিপর্যয় থেকে কংগ্রেসকে উদ্ধারের মিশনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, তাতেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সৌন্দর্যটা পুরোপুরি পরিস্ফুট হয়েছে।
এর সঙ্গে তুলনা করুন ২০১৩-২০১৪ পর্বের বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ডামাডোলকে। ১৯৯১ সালে ভোটের রাজনীতি চালু হলেও এ দেশে ২৩ বছর ধরে পালাক্রমে নির্বাচিত বিএনপি বা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন কোনো সরকারই জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভোটে পর পর দুই মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেনি। কিন্তু, প্রতিবারই সরকারে ক্ষমতাসীন জোট তাদের ক্ষমতার মেয়াদে সুপরিকল্পিতভাবে পরবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য ‘সাজানো বাগান’ গড়ে তোলার প্রাণপণ প্রয়াস চালিয়েছে। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৬ ও ২০০৭–এর অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা গেছে, অ্যান্টি–ইনকমব্যান্সি ফ্যাক্টর বাংলাদেশে এতই প্রবল যে নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আরও বহুদিন এ দেশে কোনো ক্ষমতাসীন দল বা জোট পর পর দুবার নির্বাচনে জিতে ক্ষমতাসীন হতে পারবে না।
দুর্নীতি ও পঁুজি লুণ্ঠনের দুষ্ট চক্র থেকে কোনো সরকাির দল বা জোটই বেরোতে পারছে না বলেই বারবার জনগণের বিপুল প্রত্যাখ্যান সদ্য-বিদায়ী সরকারি দল বা জোটের জন্য নির্বাচনী বিপর্যয় ডেকে আনছে, এটা না বোঝার কোনো কারণ নেই। ভারতের বিহার রাজ্যে নীতিশকুমার তাঁর পূর্বসূির লালু প্রসাদ যাদবের তুলনায় তুলনামূলক সুশাসন দেওয়ায় তিনি পর পর তিনবার বিহারে নির্বাচনী বিজয় অর্জন করেছিলেন। এবার মোদি জোয়ারে তাঁর দল লোকসভা নির্বাচনে পরাজয় বরণ করায় তিনি পদত্যাগ করেছেন, যদিও বিধান সভায় তাঁর দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অক্ষুণ্ন ছিল। এটাও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সৌন্দর্যেরই প্রতিফলন।
আমাদের দুই নেত্রী যদি নির্বাচনী পরাজয়কে নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়ার এই গণতান্ত্রিক মানসিকতাটুকু অর্জন করতে পারতেন, তাহলে বাংলাদেশের শিশু গণতন্ত্র এবার যেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল, তা এড়ানো যেত। কিন্তু, তাঁদের দুজনই ক্ষমতার লিপ্সায় এতই বঁুদ হয়ে আছেন যে নিজেদের ক্ষমতার মেয়াদকে যেনতেনভাবে দীর্ঘায়িত করাই তাঁদের প্রধান ধ্যানজ্ঞান বলা চলে। দেশ ও জনগণের জীবনের সীমাহীন দুর্ভোগে তাঁদের কিছু যায় আসে না।
মইনুল ইসলাম: প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি৷

দলের দুর্গ বেঁচেছে, ইজ্জত বাঁচেনি by ফারুক ওয়াসিফ

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের পাঁচতলার ঘর। জানালার পাশে বসে আছেন শামীম ওসমান। বিকেলের সোনাঝরা রোদ এসে পড়েছে মুখের এক পাশটায়। একের পর এক সাদা মার্লবোরো সিগারেট ধরাচ্ছেন। বাইরের দিকে তাকিয়ে উদাস কণ্ঠে বলছিলেন, ‘এবার আমার ছুটি। আজ আমার কান্নার দিন। ভাই মারা যাওয়ার পরের ৪৫ দিন কাঁদি নাই।ভাইয়ের কবরের সামনে আজ কাঁদব।’ বললাম, কাঁদবেন কেন? আপনারা কি নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন?
উত্তরটা ঘুরিয়ে দিলেন, ‘আমরা ৮০ ভাগ ভোট পাব। আইভীর বাড়ির এলাকার কেন্দ্রে আমার ভাই জিতেছে। কিন্তু এখন আমি কিছু বলব না। শুধু বলব আলহামদুলিল্লাহ।’ ভোটকেন্দ্র দখলে বাধা দেওয়া পুলিশের সাহসী এএসপি মো. বশিরউদ্দীনকেও তিনি বলেন, ‘চারটার মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ পারসেন্ট ভোট কাস্ট করতে হবে, তুমি কেন্দ্রটা ছেড়ে দাও এবং চলে যাও।’ দুই জায়গায়ই ৮০ শতাংশ ভোটের কথা তিনি বলেছেন৷ আমাদের বলেছেন, ২০ থেকে ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে আমরা জিতব৷ এই ‘আমরা’ দল নয়, ওসমান পরিবার৷ দিন শেষে তাদের জয় ১৬ হাজার ভোটে৷ কেন্দ্র দখলে বাধা না পেলে সম্ভবত শামীম ওসমানের নির্বাচনী অঙ্ক কাঁটায় কাঁটায় মিলত!
লুঙ্গি আর টি–শার্ট পরে তিনি বসেছিলেন চেয়ারে৷ বন্ধ জানালা ভেদ করে বাইরে থেকে আসছে সমর্থকদের বিজয়োল্লাস। পটকা ফুটছে৷ নারায়ণগঞ্জে আজ বিএনপি-আওয়ামী লীগ নেই, সবাই সেলিম ওসমানের জাতীয় পার্টি৷ প্রথম বিজয় মিছিল বের হয় বিকেল পাঁচটায়। ভোট গণনা শেষ না হতেই জয়ধ্বনি কেন? নির্বাচনী কর্মকর্তা ও প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করা?
উত্তেজনা লুকাতে পারছিলেন না তিনি৷ গড়গড় করে অনেক কথা বলছেন৷ দলে দলে কর্মীরা আসছেন। পায়ে হাত দিয়ে নেতাকে সালাম করছেন। ভোটের ঠিকাদারের মতো ভোটের হিসাব দেখাচ্ছেন৷ নেতা তাঁদের বললেন, ‘উল্লাস করবা না, মাথা নত রাখবা৷’ কীভাবে সেটা করতে হবে মাথা ঝুঁকিয়ে তাও দেখিয়ে দিলেন৷

সন্ধ্যার মুখে একটা ফোন এলে চঞ্চল হলেন। ফোন নামিয়ে বললেন, ‘মিডিয়া ক্যু হচ্ছে নাকি? ওরা আনারসের (এস এম আকরােমর প্রতীক) এগিয়ে থাকার কথা বলছে কেন? আর কথা না, তোমরা যাও, পারলে খোঁজ নাও৷ আমি এখন আসরের কাজা নামাজ পড়ব।’
সারা দিন ঘুরে যা দেখেছি, শামীম ওসমানের কথায় তারই স্বীকৃতি৷ ওসমান পরিবার যে ক্ষমতার নিবিড় জাল দিয়ে জেলার প্রশাসন ও রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, সেই জাল দিয়েই ছেঁকে ভোট তুলে আনা হয়েছে৷ তারপরও আশঙ্কা কেন? কারণ, সম্ভবত এএসপি বশিরের পোষ না মানা আচরণ৷ একজন এএসপি যেভাবে এত বড় ক্ষমতাচক্রকে
নািড়য়ে দিলেন, প্রধানমন্ত্রীর খোলামেলা সমর্থন না পেলে ওসমানদের কী পরিণতি হতো, সেটা ভাবার বিষয়৷ বোঝা যায়, ওসমান পরিবারের ক্ষমতার শিকড় মাটিতে নয়, আকাশে৷
নদীর এপার-ওপার মিলিয়ে দুই ধরনের ভোটকেন্দ্র দেখলাম: জনশূন্য ও কর্মীবহুল৷ আমলা পাড়া, কবি নজরুল, দাসেরগাঁও বিদ্যালয়ে ভোটার আসছে টিপটিপ বৃষ্টির মতো একটি-দুটি করে৷ আর বার একাডেমি, মরিয়ম উচ্চবিদ্যালয়, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে ওসমান সমর্থকদের ভিড়৷ প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের সামনে দলবল নিয়ে তারা আছেন৷ স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আকরামের লোকজন বিরল৷ দুজনকে পেলাম শীতলক্ষ্যার খেয়ানৌকায়৷ বয়স্ক এক নারী ইিঙ্গতে বোঝালেন আকরামকেই তাঁর পছন্দ৷ তাঁর যুবক পুত্রও তাই৷ নবীগঞ্জ গুদারাঘাটে পেলাম একদল তরুণকে, লাঙ্গলের লোক। জিজ্ঞাসা কির, ভোট দিতে যাচ্ছেন, নাকি নিতে? একজন হেসে উত্তর দিলেন, ‘দুইডাই।’ অর্থাৎ তাঁরা ভোট দেবেও, নেবেও।
ভোট কীভাবে নেয়, তা দেখলাম সকালে, বার একাডেমি ভোটকেন্দ্রে। পুরুষদের অংশে চারটি বুথ। একটিতেও আনারসের পক্ষের প্রকৃত পোলিং এজেন্ট নেই। একজনের ভোটার তালিকা, নির্বাচন কমিশনের দেওয়া পরিচয়পত্র কিছুই নেই৷ আরেকজনের পরিচয়পত্রে নামই নেই৷ একই প্রার্থীর হয়ে কাজ করলেও কেউ কাউকে চেনেন না৷ এক এজেন্ট নাম বললেন আজিজুল হক অথচ পাশের ঘরে থাকা তাঁরই সহকর্মী বললেন ওই এজেন্টের নাম আসিফুজ্জামান। ১ নম্বর বুথে ভোটার স্লিপ ছাড়াই একজন ঢুকলেন, বললেন হার্টের রোগী; তাই তাড়াতাড়ি ভোট দিয়ে চলে যাবেন। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার যাচাই না করেই ব্যালট পেপার তুলে দিলেন। পোলিং এজেন্টরা নির্বিকার৷ আরেক ঘরে ৩০ বছর বয়সী এক নারী এলেন৷ লাঙ্গলের এজেন্ট তাঁকে দিলেন ৬০ বছর বয়সী আরেক ভোটারের পরিচয় নম্বর। সেখানেই আরেক ভুয়া ভোটার মিলল৷ সাংবাদিক দেখে তাৎক্ষণিকভাবে ভোটারের লাইন সাজিয়ে ফেলা হলো৷ বারান্দায় ঘোরাফেরা করা সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারকে নিয়ে বেঞ্চে বসানো হলো৷ বিবি মরিয়ম উচ্চবিদ্যালয়ে আনারসের পোলিং এজেন্ট আনুষ্ঠানিক পরিচয়পত্র দেখাতে পারলেন না। কেন্দ্রে কেন্দ্রে যে সিস্টেমেটিক কারচুপি, তা অভিনব ও অবাধ৷
লাঙ্গলের লোকেরা আসল আর প্রতিপক্ষ আনারসের বেশির ভাগ এজেন্টই নকল—এমনটা হয় কখন? যখন একই পক্ষ করে সরকারি ও বিরোধী দলের অভিনয়৷ সংসদে জাতীয় পার্টি যেমন সাজানো বিরোধী দল, নারায়ণগঞ্জে তেমনি আনারসের আসল এজেন্টদের তাড়িয়ে বসানো হয়েছে বানোয়াট প্রতিদ্বন্দ্বী। ডান হাত-বাঁ হাত মিলে খেলছে মনমতো খেলা। দেখার কেউ নেই৷
নুলুয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা থেকে আনারসের প্রতিনিধি নিলয় দাসকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করলেন আনারস প্রতীকের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম। ক্ষণে ক্ষণে তাঁর কাছে অভিযোগ আসছিল৷ জানালেন, নিলয় দাসকে দুই ঘণ্টা আটকে মারধর করে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মুছাপুর ইউনিয়নের দাসেরগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গেলাম বেলা আড়াইটার দিকে। সকালে এখানকার আনারসের এজেন্টকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল৷ দুপুরে তাঁকে পাওয়া গেল, তবে পরিচয়পত্রে ছবি নেই, নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তার সই নেই। তিনি তাঁকে বের করে দেওয়ার কথা অস্বীকার করলেন। বললেন, মুঠোফোন নিয়ে ভোটকেন্দ্রে থাকার নিয়ম না থাকায় ফোন বাড়িতে রাখতে গিয়েছিলেন। অথচ সেখানকার অন্য এজেন্টরা দিব্যি তাঁদের মুঠোফোন প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে জমা রেখেছেন। আরেক কক্ষের আনারসের পোলিং এজেন্ট আমেনা বেগম। তাঁকে পাঠিয়েছেন এক ‘ভাই’। বলেছেন ৫০০ টাকা দেবেন। আমেনা বেগমের আশা এক হাজার টাকা। আনারসের আরেক এজেন্ট মনির হোসেন৷ বললাম, আপনি আওয়ামী লীগ করেন? হকচকিত হয়ে বললেন, ‘হ৷’ তাঁকে বসানো হয়েছে আনারসের মনোয়ারা বেগমের বদলি হিসেবে৷ মনোয়ারা বেগম নাকি অসুস্থ হয়ে চলে গেছেন!
এখানে সকালে আওয়ামী লীগের শত শত কর্মী ছিলেন। এখনো আছেন জনা পঞ্চাশেক৷ পথে আর ভোটকেন্দ্রে এ রকম দলবদ্ধ মহড়া দেখে প্রতিপক্ষের সমর্থক ও ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসার সাহস হওয়ার কথা নয়। এঁদেরই একজন ফোনে বলছিলেন, ‘ঘরে ঘরে কইয়া দিছি লাঙ্গলে ভোট দিবি। না দিলে আসার দরকার নেই।’ তিনি এলাকার যুবলীগের আহ্বায়ক আলমগীর আহমেদ। বললেন, ‘অভিযোগ মিথ্যা। আনারসের প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট দিবারই পারেনি৷ দু-চারজন যারা আছে হেরা আমাগেরই লোক।’ বললেন, ‘আপনি তো জানেন কেন এখানে আছি। দলের নির্দেশ, আমরা দল মানি৷’ বললাম, আপনি লোকজনকে আনারসে ভোট দিতে নিষেধ করছিলেন কেন? আমি নিজের কানে শুনেছি বলায় হেসে ফেললেন, ‘আরে, ওইটা ভাবি ছিল, একটু দুষ্টামি করছি।’ ভোটাররা যুবলীগের নেতার ভাবি বা দুলাভাই হলে দুষ্টুমি তো মধুরই হবে!
এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার কাজী কাওসার আহমেদ। ভাত খেয়ে পান চিবুচ্ছিলেন৷ বললেন, কোনো অনিয়ম নেই। অথচ তাঁর ৩০ গজ দূরেই ভোটারদের আসবার চিকন আইলপথে বেঞ্চি পেতে বসা চারজন তরুণ৷ সাংবাদিকেরাই যা একটু পাত্তা পাচ্ছেন। তাই তাঁদের ওপর চোটপাট দেখালেন নারায়ণগঞ্জ নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা। ভোট গ্রহণের একেবারে শেষ মুহূর্তে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব কেন্দ্রে গিয়ে প্রিসাইডিং অফিসারকে ধমকালেন, কেন সাংবাদিকেরা সেখানে আছে। পুলিশ সামলেছেন, প্রশাসন সামলেছেন, বাদ সেধেছে মিডিয়া।
খেয়ানৌকার ওই প্রৌঢ় নারী বলছিলেন, ‘ভোট তো দিছি কিন্তু যেভাবে নামছে, কী যে অইব।’ কী হবে তা বোঝা গেল শামীম ওসমানের কথায়। ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই তিনি বিজয়ের জন্য ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেন। বলছিলেন, নারায়ণগঞ্জকে তিনি পাল্টে দেবেন। বললাম, আপনি তো বললেন ছুটি নেবেন আর সাংসদ থাকবেন না। তাহলে কীভাবে পাল্টাবেন? কপালে হাত দিয়ে বললেন, ‘নেত্রীকে বলব, তিনিই সব করবেন। তবে এখন কিছু বলব না, আগে বাবার সঙ্গে কথা বলব, তারপর সব জানাব।’ তাঁর কথায় মনে হলো, এই ‘বাবা’ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কেউ। তাঁকে দেখার ইচ্ছা মিটল না৷ আফসোস!
শামীম ওসমানের কক্ষ থেকে যখন বেরিয়ে আসি, তখন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বাজে। ফল ঘোষিত হয়নি। তবু মিছিলের পর মিছিলে ভরে গেছে জাতীয় পার্টির দপ্তরের সামনের রাস্তা৷ একটু আগে শামীম বলছিলেন, ‘মিডিয়া ক্যু করে আমাদের হারিয়ে দেবে না তো?’ ক্যু বলি, আর কারচুপি বলি—কিছু একটা হয়েছে। তবে সেটা যে ওসমান পরিবারের পক্ষে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
শহরজুড়ে বৃষ্টি নেমেছে। শামীমের ভাষায়, ‘রহমতের বৃষ্টি’৷ ‘নারায়ণগঞ্জের মোদি’ এখন একা থাকবেন, ‘বাবার’ সঙ্গে কথা বলবেন৷ আমরা বেরিয়ে এলাম। মনে প্রশ্ন, এই বিজয়ে কি ত্বকীর খুনিরা বেঁচে যাবে? সাত খুনে ওসমান পিরবারের জড়িত থাকার অভিযোগ হালকা হবে? প্রতিহিংসা নেমে আসবে না তো বিপক্ষের ওপর?
নারায়ণগঞ্জ শেখাল, কীভাবে ক্ষমতার দাপটে গণরায় লোপাট করা যায়। এটা একটা মডেল৷ সরকার এই ফর্মুলা সারা দেশে কাজে লাগাতে পারে৷ তাহলে আর ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন করতে হবে না। সরকারের একটি দুর্গ রক্ষা পেয়েছে ঠিকই, কিন্তু নির্বাচনের ইজ্জত বাঁচেনি৷ তবে খেলা এখনো বাকি৷ এখন মধ্যাহ্ন বিরতি৷
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

তোষণে ব্যস্ত জাতীয় পার্টি

সরকারের তুষ্টি, অতুষ্টিকে প্রাধান্য দিয়ে সংসদে ভারসাম্য ভূমিকা পালন করছে জাতীয় পার্টি। বিরোধী দল হিসেবে তারা সরকারের বেশ কিছু কর্মকা-ের কঠোর সমালোচনা করছে। আবার সরকারের নেক নজরে থাকতে ভূয়সী প্রশংসা করতেও দেখা গেছে। ক্ষেত্রবিশেষে তারা সরকারি দলের নেতাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সুরে কথা বলেছেন। গত কয়েক দিনে সংসদে জাতীয় পার্টির নেতাদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট আলোচনা ও পয়েন্ট অব অর্ডারে অংশ নিয়ে প্রতিদিনই দলটি ভারসাম্য বজায় রাখতে ব্যস্ত। সংসদ কার্যক্রমের পর্যবেক্ষক হিসেবে পরিচিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গতকাল মানবজমিনকে বলেন, এ ধরনের ভূমিকা পালন করে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টি নিজেদের আরও বিতর্কিত করছে। তারা না পারছে সরকারের পক্ষে থাকতে আবার না পারছে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে। এটা এক রাজনৈতিক রঙ্গ। গত ১৯শে জুন সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মা বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের নামে নির্মিতব্য পদ্মা সেতুর নামকরণের দাবি জানান। তার ওই দাবিতে সমর্থন জানান সংসদ উপ নেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ও স্বতন্ত্র এমপি রুস্তম আলী ফরায়জী। ওই দিন ফিরোজ রশীদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মা মহীয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব সারাজীবন পর্দার আড়ালে থেকে সকল আন্দোলন-সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থেকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। জাতির জনকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন স্বাধীনতার জন্য। কখনও গণমাধ্যমে হেডলাইন হতে আসেননি, ক্ষমতার কাছাকাছিও যাননি। বঙ্গবন্ধু জীবনের বেশির ভাগ সময় জেলে কাটিয়েছেন। তার দীর্ঘ কারাজীবনের সময় শুধু নিজের পরিবার নয়, গোটা আওয়ামী লীগ পরিবারের দেখাশোনা করেছেন। তার নামে ঐতিহাসিক পদ্মা সেতুর নামকরণ হলে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি খুশি হবে। এর আগে তিনি বাজেট আলোচনা ও পয়েন্ট অব অর্ডারে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন। ১৫ই জুন সংসদে দেয়া বাজেট আলোচনায় তিনি বলেন, বাজেট দেখে মনে হবে- দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দুর্বল ও দুর্নীতিগ্রস্ত আর্থিক অবকাঠামো দিয়ে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা সম্পূর্ণ অনুমান ও প্রত্যাশা-নির্ভর। তিনি বিদেশী বিনিয়োগ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রত্যাশা করেছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তার হাতে নয়। আর তিনি জ্যোতিষীও নন। অথচ আমরা দেখছি- সংসদের বাইরে বলা হচ্ছে- এই সংসদ অবৈধ। বাজেট দেয়ার অধিকার নেই। আমরা আজ পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্রের ভিত রচনা করতে পারিনি। গোটা দেশ আজ বিভক্ত। সব শ্রেণী-পেশার মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। এদিকে নির্বাচন প্রশ্নে জাতীয় পার্টির এমপিরা সরকারে সঙ্গে তাল মিলিয়ে বক্তব্য  দেন। তারা বলেন, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে জাতীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। জাতীয় পার্টির কাছ থেকে তাদের শেখা উচিত কিভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে হয়। ওদিকে সরকারি দলের এমপিরা প্রতিদিনই সংসদে বিএনপি, দলের চেয়ারপারসন ও তার পরিবারের কঠোর সমালোচনা করছেন। ৮ই জুন বাজেট আলোচনায় জাতীয় পার্টির অপর এমপি পীর ফজলুর রহমান বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ১১৯৩ কোটি টাকার সম্পূরক বরাদ্দ দাবি করেছে। অথচ এই মন্ত্রণালয় প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে পারে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অতিরিক্ত দাবি করেছে; কিন্তু জেলা সদরে চিকিৎসক নেই। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৪৪০ কোটি টাকা অতিরিক্ত দাবি করেছে। অথচ পুঁজিবাজারে নিঃস্ব হওয়া লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর রক্তক্ষরণ বন্ধ করার ব্যবস্থা নেই। পুঁজিবাজারে লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেই। খালিদ ইব্রাহিমের সুপারিশ বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দলের অপর এমপি আবদুল মতিন চৌধুরী ১১ই জুন বলেন, বাজেট বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ গণতন্ত্রের অর্থ যদি হয় জ্বালাও-পোড়াও তাহলে বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ-বিএনপি দু’দলই নির্বাচন বর্জন করেছে। কিন্তু গণতন্ত্রের স্বার্থে জাতীয় পার্টি সব সময়ই নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সর্বশেষ ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারকে আরও শক্ত অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে একই দিন আলতাফ আলী বলেন, বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে হবে। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা হলে সরকারের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে। ১৫ই জুন প্রশাসনের উদাসীনতায় রাজধানীর মিরপুরের কালশীতে বর্বর হত্যাকা- ঘটেছে বলে দাবি করেন পীর ফজলুর রহমান। এ নিয়ে ক্ষোভ জানানোর পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন তিনি। জাপা এমপি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের আগে দেশের একটি সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতিহিংসার শিকার হয়েছে রাজধানীবাসী। আমরা দেখেছি এই রাজনৈতিক গোষ্ঠী কিভাবে সাধারণ মানুষকে বাসের মধ্যে পুড়িয়ে মেরেছে। পোড়া মানুষের ঝলসানো শরীর এখনও আমাদের চোখে ভেসে ওঠে।

অদিতি রাও হায়দারিকে নিয়ে হৈচৈ

‘ইয়ে সালি জিন্দেগি’ ছবির মাধ্যমে বলিউডে যাত্রা শুরু হয় অদিতি রাও হায়দারির। এরপর আরও বেশ কিছু বলিউড ও তামিল ছবিতে কাজ করলেও তার মাধ্যমে লাইমলাইটে আসতে পারেননি তিনি। তবে পরবর্তীতে মহেশ ভাটের হাত ধরে ‘মার্ডার-৩’ ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেন অদিতি। এ ছবিতে ভাল অভিনয়-পারফরমেন্স দেখিয়ে আলোচনায় আসতে সক্ষম হন তিনি। এরপর অক্ষয় কুমারের সঙ্গে ‘বস’ ছবিতে কাজ করেও প্রশংসিত হন তিনি। তবে সম্প্রতি অদিতি আলোচনায় এসেছেন একটি বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে। ‘গুড্ডা রাঙ্গিলা’ ছবিতে প্রায় ৫০ বার চুমোদৃশ্যে কাজ করতে দেখা যাবে এ অভিনেত্রীকে। শুধু তাই নয়, এখানে অনেক দৃশ্যে বিকিনি পরে ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন তিনি। এখানে ব্যাপক খোলামেলা ও সাহসী হয়ে কাজ করায় ছবিটি মুক্তির আগেই বিষয়টি নিয়ে হৈ চৈ পড়ে গেছে। অদিতি রাও এই নিয়ে তার বক্তব্যে বলেছেন, আমি আসলে শুরু থেকেই স্বাধীনতা প্রিয়। আমাদের দেশের মানুষ অনেক বেশি রক্ষণশীল সেটা মানি। কিন্তু সবারই স্বাধীনতা ভোগের অধিকার রয়েছে। আমি সেটি মেনেই শুরু থেকে কাজ করছি। কাজ করতে গিয়ে ৫০ কেন ৫০০ বার চুমোদৃশ্য করতে হলে সেটাও করবো। বিকিনি কেন, চরিত্রের প্রয়োজনে নগ্ন হতেও আমি প্রস্তুত। শতভাগ স্বাধীনতা নিয়েই যতদিন পারি কাজ করতে চাই। কেউ কিছু মনে করলেও তার ধার আমি ধারি না। সম্প্রতি আদিতি রাওয়ের দেয়া এমন বক্তব্যে সরগরম হয়ে উঠেছে ভারতীয় মিডিয়াগুলো। ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে অদিতির বিতর্কিত এ বক্তব্য। অনেকেই মনে করছেন আলোচনায় থাকার জন্যই এমন মন্তব্য করেছেন তিনি। আবার অনেকে বলছেন অদিতি ভুলে গিয়েছেন বলিউডের মতো বড় জায়গায় নগ্ন হওয়ার চেয়ে অভিনয় জানাটাই বেশি জরুরি। তবে বিষয়টি মিডিয়া-বলিউডপাড়ায় ‘টক অব দ্য টাউন’-এ পরিণত হওয়ার পর অনেকটাই নীরব এখন অদিতি।

আরেফিন শুভ ও মাহিয়া মাহির ‘ওয়ার্নিং’

সময়ের সেরা দুই তারকা আরেফিন শুভ ও মাহিয়া মাহিকে নিয়ে সফল পরিচালক সাফিউদ্দিন সাফি এবার নির্মাণ করছেন ‘ওয়ার্নিং’। আগামী ৩রা আগস্ট থেকে শুরু হবে এ ছবির শুটিং। ইতিমধ্যে শওকত আলী ইমনের ভ্যালুসিটি স্টুডিওতে গান মহরতের মাধ্যমে ছবির কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছেন পরিচালক। গান মহরতে সংগীত পরিচালক শওকত আলী ইমন কনা ও রূপমকে দিয়ে একটি রোমান্টিক গান রেকর্ড করেন। গানের গীতিকার ছিলেন কবির বকুল। পেনল ফিল্মসের প্রযোজনায় নির্মাণাধীন ‘ওয়ার্নিং’ ছবিতে শুভ ও মাহির সঙ্গে থাকছেন মিশা সওদাগরসহ অনেকেই। শুভ-মাহি জুটির প্রথম ছবি ‘অগ্নি’র ব্যাপক সাফল্যের পর এ জুটিকে নিয়ে নির্মাতাদের আশাবাদ অনেক বেড়ে গেছে। ‘ওয়ার্নিং’ ছবিটি দর্শকদের পছন্দকে গুরুত্ব দিয়েই নির্মাণ হবে বলে পরিচালক সাফিউদ্দিন সাফি জানিয়েছেন। পরিচালক সাফি এখন ব্যস্ত ‘হানিমুন’ ছবির শেষ পর্যায়ের কাজ নিয়ে। জাজ মাল্টিমিডিয়ার ব্যানারে নির্মিত বাপ্পি-মাহি জুটির এ ছবিটি আসন্ন ঈদে মুক্তি পাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

গণমাধ্যম, পুলিশ–র‌্যাব শামীমের কাছে সব তুচ্ছ by ইফতেখার মাহমুদ

গণমাধ্যম, পুলিশ-র‌্যাব, নিজ দল আওয়ামী লীগ—তাঁর কাছে সবই যেন তুচ্ছ৷ সাংবাদিকেরা তাঁর কাছে সারমেয়৷ র‌্যাব-পুলিশকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারেন তিনি৷ নিজ দল আওয়ামী লীগের ওপরও তিনি ক্ষুব্ধ৷ কারণ, দলের অনেক নেতা তাঁকে পছন্দ করেন না। এর মধ্যেই ভাই সেলিম ওসমানকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জকে বদলে দিতে চান তিনি৷ তিনি সরকারি দলের আলোচিত সাংসদ শামীম ওসমান৷ গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের দোতলার একটি কক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর খোলামেলা আলাপচারিতার সারমর্ম করলে এই চিত্রই ফুটে ওঠে৷

বৃহস্পতিবার দিনটি ছিল নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে উপনির্বাচনের দিন৷ বিকেলে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে বসে নির্বাচনের খোঁজখবর রাখছিলেন শামীম ওসমান৷ নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার মো. বশিরউদ্দীনকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে তাঁর বক্তব্য নিতে সাংবাদিকেরা সেখানে যান৷ এঁদের মধ্যে ছিলেন দুটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক, ক্যামেরাম্যান, প্রথম আলোর দুই সাংবাদিক৷ তিনি সবাইকে কক্ষে নিয়ে বসান৷ তবে শুরুতে পুলিশ কর্মকর্তার বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি তিনি৷ বললেন, ‘তোমাদের সঙ্গে এমনি কথা বলি৷’ সাংবাদিকেরাও একে একে নানা প্রসঙ্গ তুললেন৷ নিজের আত্মবিশ্বাস, তাচ্ছিল্য, ক্ষমতার প্রকাশ ঘটিয়ে সেসব বিষয়ে কথা বলেন তিনি৷ প্রায় শেষ পর্যায়ে একজন সাংবাদিক এই আলাপচারিতায় উঠে আসা কিছু বিষয় এবং এ-সংশ্লিষ্ট অভিব্যক্তি প্রকাশের বিষয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি ঘাড় নেড়ে সায় দেন৷
আলাপচারিতায় শামীম ওসমান গণমাধ্যম নিয়ে তাঁর মনোভাব অকপটে প্রকাশ করেন৷ তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকরা হচ্ছে কুকুর। আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন পাড়ার অনেকে পয়সা হলে বাড়িতে কুকুর পুষত। ওদের বাড়ির সামনে গেলে কুকুরগুলো মুখ ভেংচাত। এর পর যাদের আরও পয়সা হলো, তারা মিডিয়া পোষা শুরু করল। এগুলো হলো অ্যালসেশিয়ান কুকুর। প্রশিক্ষিত। লাত্থি দিলেও এগুলো কামড়াতে আসে।’
শামীম ওসমান বলে চলেন, ‘যেমন ধরেন, বসুন্ধরার শাহ আলম। ওর আছে চারটা। কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, একটি অনলাইন পত্রিকা আর আরেকটি সান না কী যেন নামের ইংরেজি পত্রিকা। বাবুলের একটা পত্রিকা ছিল, আরেকটা টেলিভিশন নিছে। আজাদ সাহেব, ওনার আগে পত্রিকা ছিল একটা, তাঁর আরেকটা লাগবে। নতুন করে একটি টিভি চ্যানেল নিছে। পত্রিকা আছে একটাই, সেইটা হইলো ইত্তেফাক৷’
দম নিয়ে আবার শুরু করলেন শামীম ওসমান, ‘সালমান—ও তো একটা চোর। বড় চোর। ২৩ হাজার কোটি টাকা ও চুরি করছে। তারও পত্রিকা ছিল, এখন একটা টিভি চ্যানেল নিছে। আমি তো তারে দেখা হইলে বলি—চোর, চোর, চোর।’
প্রসঙ্গত, নুরুল ইসলাম বাবুল যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান৷ এই গ্রুপের মিিডয়া হচ্ছে দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভি৷ এ কে আজাদ হা-মীম গ্রুপের চেয়ারম্যান৷ দৈনিক সমকাল ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোর এই গ্রুপের মিডিয়া৷ সালমান এফ রহমান বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান৷ এই গ্রুপের পত্রিকা ইংরেজি দৈনিক ইনডিপেনডেন্ট ও ইনডিপেনডেন্ট টিভি৷
শামীম ওসমান বললেন, ‘কালকে যদি তোমাদের মালিক বলে, শামীম ওসমানের পক্ষে লিখো। তোমরা তাই করবা।’ এ সময় একজন সাংবাদিক বলেন, ‘মালিক যা বলবে আমরা তা-ই করব, তা সব সময় ঠিক না। আমরা চাকরি ছেড়েও দিতে পারি।’ আরেকজন সাংবাদিক বললেন, ‘কিছু কুকুর যেমন লেজ নাড়ায়, আবার কেউ কেউ ডাকাত আসলে চিৎকার করে৷ অনেক সময় তারা গ্রামও পাহারা দেয়।’
জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘তোমরা যাইবাটা কই। হ্যাঁ, তোমরা চাকরি ছাড়তে পারো। কিন্তু সব মালিক যদি একই কথা বলে। কই যাইবা।’ তিনি বললেন, ‘এরা সবাই আমার বিরুদ্ধে লেখে। আমি কিচ্ছু বলি না। লেখুক। ওরা (মিডিয়ার মালিকেরা) কোত্থেকে উঠে আসছে, তা তো আমি জানি। ওরা অনেক ছোট জায়গা থেকে আজকে বড় জায়গায় আসছে। ওদের সবার সঙ্গে আমার ভালো খাতির আছে।’
ঘড়ির কাঁটার সময় তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। কথা শুরু হয়েছিল নির্বাচন কেমন হলো, ফলাফল কী আশা করছেন—এসব নিয়ে। জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়ানো বড় ভাই সেলিম ওসমানের নিশ্চিত বিজয় হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন শামীম ওসমান।
আলাপের একপর্যায়ে পুলিশ কর্মকর্তাকে ফোনে হুমকি দেওয়ার প্রসঙ্গটি আবার উঠে আসে৷ এবার শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার নাম করে তো অনেকেই অনেককে ফোন করে। ও বাচ্চা ছেলে৷ তার পেটে আমি লাত্থি মারতে চাই না। আমি যদি বলি, ও তিন লাখ টাকা ঘুষ চেয়েছে, তা কি ঠিক হবে? ছেলেটা কয়দিন আগে বিয়ে করেছে, একটা সন্তান আছে (আসলে এখনো সন্তান হয়নি)।’
নিজের দল আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করতেও ছাড়লেন না শামীম ওসমান। বললেন, ‘আমার দলের অনেক নেতাই আমাকে দেখতে পারে না। আমার বিরুদ্ধে বলে। সেই জন্য আমি বলি, আমি সরকারি দলে থেকেও বিরোধী দলের লোক।’
একজন সাংবাদিক বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো আপনার পক্ষে আছেন। সংসদে আপনার পরিবারের পক্ষে থাকার কথা বলেছেন।’ শামীম ওসমান বলেন, ‘আমার একমাত্র সম্বল আমার আপা (শেখ হাসিনা)। তিনি আমাকে স্নেহ করেন।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি যদি বলি, এক ডাকে লাখ লাখ মানুষ হাজির হবে। ১১০০ র্যাব আর ৪০০ পুলিশ নিমেষে উড়ে যাবে। এসব র্যাব-পুলিশ আমার কাছে কিছু না।’
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার প্রসঙ্গ এলে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমিই প্রথম বলেছি, ওই খুনের ঘটনায় র্যাব জড়িত। এ কথা বলার পর র্যাব আমারে মারতে স্নাইপার (গুপ্তঘাতক) এনেছিল। আমি শুরুতেই বলেছিলাম, ওই খুনে র্যাবের তিনজন জড়িত। পরে তাদের জবানবন্দিতেও তা প্রমাণিত হয়েছে।’
নূর হোসেনের প্রসঙ্গ টেনে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমি যদি তাকে শেল্টারই (আশ্রয়) দিতাম, তাহলে সে আমাকে বাপ ডাকত না। সাহায্য চাইত না।’
খুন হওয়া কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের বিষয়ে শামীম ওসমান বললেন, ‘র‌্যাবের ওরা আইসা নজরুলরে বলল, প্রতিদিন তুমি আমাদের দুই লাখ করে টাকা দিবা। বিনিময়ে এলাকায় মাদকের ব্যবসা করবা। নজরুল শোনে নাই। এসব বুঝতে পাইরা আমি নজরুলরে বলছিলাম, তুমি মারা পড়বা। বাঁচবা না।’
এই কথোপকথনের মধ্যে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে তাঁর নেতা-কর্মীরা ওই কক্ষে আসতে শুরু করেন। একে একে তাঁরা শামীম ওসমানের পা ধরে সালাম করতে লাগলেন। তখনো নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়নি৷ কিন্তু কর্মীরা তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন৷ শামীম ওসমান তাঁদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘আমার কর্মীরা আমাকে ভালোবাসে। আমিও তাদের ভালোবাসি।’
বড় ভাই সেলিম ওসমান উপনির্বাচনে জিতলে দুই ভাই মিলে নারায়ণগঞ্জকে বদলে ফেলার কথাও বললেন শামীম ওসমান, ‘নারায়ণগঞ্জের সঙ্গে ঢাকার স্কাই ট্রেন চালু করব। শীতলক্ষ্যার পারে শিল্পাঞ্চল করব। আমার ভাইয়ের সঙ্গে ওয়ালমার্টের মতো বড় বড় প্রতিষ্ঠানের আলাপ হয়েছে। তারা সেখানে বিনিয়োগ করবে৷ একটি ভারতীয় কোম্পানির সঙ্গে আলাপ হয়েছে, তারা একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল করবে। এই সব করে আমি নেত্রীর কাছে তুলে দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসরে যাব। নেত্রীর একজন কর্মী হিসেবে বাকি জীবন কাটাব।’
এই পর্যায়ে শামীম ওসমান ঘড়ি দেখলেন, তারপর মেঘলা হয়ে আসা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আল্লাহর কুদরত, বৃষ্টি নামতাছে। নাইলে আজকা ওই মহিলার (মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী) খবর ছিল। আমার কর্মীদের বুকে তুষের আগুন জ্বলতাছে, ওই আগুন যদি আজকা জ্বইলা উঠত, তাইলে সবকিছু ছারখার হয়ে যেত। বৃষ্টি আইসা ওই আগুন একটু ঠান্ডা করছে।’
আবারও ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আওয়ামী লীগের ওই সাংসদ সাংবাদিকদের বললেন, ‘আপনারা এখন যান। আমার একজন “বাবা” আছে। আমি এখন নামাজ পড়ব। আমার বাবার সঙ্গে কথা বলব।’

শাবাশ এএসপি মোহাম্মদ বশিরউদ্দীন!! by সোহরাব হাসান

১৮ জুন প্রথম আলোয় ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি’ শিরোনামে একটি সম্পাদকীয় ছাপা হয়। ওই দিনই অফিসে এসে একটি টেলিফোন পেলাম। নিজের পরিচয় দিয়ে টেলিফোনদাতা বললেন, আমি নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ বশিরউদ্দীন। আপনারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি নামে যে সম্পাদকীয়টি লিখেছেন, সে জন্য ধন্যবাদ জানাই। সাত খুনের পর বেশ কয়েকবার নারায়ণগঞ্জ গেলেও তাঁর সঙ্গে আর কথা হয়নি। কথা হয়েছে সাবেক এসপি, ডিসিসহ আরও অনেকের সঙ্গে, যাঁরা নিজেদের নিষ্কলুষ ও নিষ্পাপ দাবি করতেন। কিন্তু এখন খবর বের হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন, পুলিশ ও র‌্যাবের অনেক বড় কর্তাই নূর হোসেনের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেতেন। ১৮ জুন এএসপি বশিরউদ্দীনের কথা শুনে পুলিশ সম্পর্কে আগের ধারণাটিই পাল্টে গেল। তাহলে সব পুলিশ খারাপ নন। সবাই হাতে কাগজ পেয়ে ব্ল্যাকমেলও করেন না।

র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সম্পর্কে অনেক বদনাম। ইদানীং সেই বদনামের মাত্রাটি আরও বেড়েছে। কয়েক দিন আগে সাভারে এক পুলিশ কর্মকর্তা একজন রিকশাচালকের কাছে এক হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছিলেন। গরিব রিকশাচালক সেই টাকা দিতে না পারায় তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে রাস্তার ওপরই ফেলে রেখে যায় পুলিশ। পুলিশের গ্রেপ্তার-বাণিজ্য এখন ওপেন সিক্রেট। পুলিশের চাঁদাবাজি, ঘুষ যেমন স্বাভাবিক ব্যাপার, তেমনি তাদের হাতে নিরীহ ও সাধারণ মানুষের লাঞ্ছিত হওয়াও গা-সওয়া হয়ে গেছে।
এই অবস্থায় ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদে চাকরি নেওয়ার মাধ্যমে যে দুর্নীতি হয়েছে, সেই খবর একজন পুলিশ কর্মকর্তার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে গণমাধ্যমে জানানো বিরল ও ব্যতিক্রম ঘটনাই বটে। চাইলে তিনি ওই কাগজপত্র দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ আদায় করতে পারতেন। এএসপি বশির তা করেননি। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে পুলিশ বিভাগেও অনেক সৎ মানুষ আছেন।
কিন্তু গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে যা ঘটল, তাতে ওই পুলিশ কর্মকর্তার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে এল। আমাদের সমাজের মাথা বলে পরিচিত ব্যক্তিরা যখন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে আপস ও পলায়নকে জাতীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তখন এই পুলিশ কর্মকর্তা সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে সমাজটি এখনো পচে যায়নি। এখনো সত্য কথা বলার মানুষ আছেন।
ভোটের অঙ্কে বিজয়ী সেলিম ওসমান বা পরাজিত এস এম আকরাম নন, সেই সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বশিরউদ্দীনই হলেন নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনের নায়ক। কীভাবে? তিনি নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করছিলেন বন্দর উপজেলার মদনপুর কেওঢালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে। শামীম ও সেলিম ওসমানের অনুসারী (আওয়ামী লীগ করেন না জাতীয় পার্টি করেন, না তিনি দুটোই একসঙ্গে করেন, জানা গেল না) স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুস সালাম দলবল নিয়ে কেন্দ্রটি দখল করতে গেলে তিনি বাধা দেন। তাঁকে ভোটকেন্দ্রের এলাকা ছেড়ে যেতে বলেন। কিন্তু চেয়ারম্যান পুলিশ কর্মকর্তার কথা গ্রাহ্য না করে তাঁকে এই বলে হুমকি দেন যে তাঁকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেওয়া না হলে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কেউ মাথা নিয়ে যেতে পারবে না। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের পরও মাথা নেওয়ার প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার মানুষ নারায়ণগঞ্জে আছে! এ ধরনের লোককে তো রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করা উচিত৷
এ পর্যায়ে এএসপি বশিরউদ্দীন বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানালে তাঁরা ওই ইউপি চেয়ারম্যানকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেন। এর পরই গায়েবি আওয়াজ আসে—তাঁকে ভোটকেন্দ্রটি ছেড়ে যেতে হবে, চেয়ারম্যান সালামকে সদলবলে ভোটকেন্দ্র দখল
করতে দিতে হবে। কেননা, সময় বেশি হাতে নেই। ৭০-৮০ ভাগ ভোট কাস্ট করাতে হবে। ওপার থেকে গায়েবি টেলিফোনটি করেছেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সেলিম ওসমানের ভাই আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান।
কিন্তু এএসপি বশির তাঁর কথায় রাজি না হলে শামীম ওসমান কুত্তার বাচ্চা, শুয়োরের বাচ্চা বলে গাল দেন। তাঁকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। তাঁর টেলিফোন সক্রিয় রেখেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে টেলিফোন করার কথাও তাঁকে জানিয়ে দেন। এর পরও দমে যাননি সেই পুলিশ কর্মকর্তা। বলেছেন, ‘আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতে দিন। আমি এখন নির্বাচন কমিশনের অধীনে। অন্য কারও হুকুম তামিল করার এখতিয়ার নেই।’
যে শামীম ওসমানের কথা ছাড়া নারায়ণগঞ্জে নাকি একটি গাছের পাতাও নড়ে না, সেই শামীম ওসমানকে মুখের ওপর যখন একজন পুলিশ কর্মকর্তা এভাবে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অবিচল থাকতে পারেন, তাঁকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। শাবাশ জানাই। এখনো পুলিশ বিভাগে, সরকারি প্রশাসনে এ ধরনের দু-চারজন কর্মকর্তা আছেন বলেই দেশটি টিকে আছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রশাসন বা পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ রকম নিষ্ঠাবান কর্মকর্তার প্রতি কী আচরণ করছেন? তাঁরা কি তাঁকে সুরক্ষা দেবেন? আমরা হতবাক হলাম জেলা পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন এই ঘটনাকে ‘টুকটাক কথাবার্তা’ বলে সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করলেন। তিনি কোন কথাকে টুকটাক কথা কললেন? শুয়োরের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা গালি, নাকি দেখে নেওয়ার হুমকি? একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়িত্ব তাঁর অধীন ব্যক্তিকে সুরক্ষা ও অভয় দেওয়া। তিনি যাতে নিজের কর্তব্য পালন করতে পারেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের এসপি মহোদয় বিপরীত কাজটিই করলেন। এতে হুমকিদাতা আশকারা পাবেন, আর হুমকিপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। হয়তো এরপর ওই দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাকে বিএনপি-জামায়াতের লোক বানিয়ে সাসপেন্ড বা খাগড়াছড়ির দুর্গম জঙ্গলে শাস্তিমূলক বদলি করা হবে।
এ ব্যাপারে আমরা নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য শুনতে চাই। নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এএসপি বশির হুমকির শিকার হয়েছেন। নির্বাচন কমিশনেরই দায়িত্ব সেই হুমকিদাতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া। সেই কাজটি নির্বাচন কমিশন করতে পারলে তাদের অতীত গ্লানি কিছুটা হলেও মুছে যেত। মানুষ বলত, অন্তত কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নির্বাচন কমিশন দেশবাসীকে সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে না পারলেও অন্তত একটি অন্যায়ের প্রতিকার করেছে।
আর এ ঘটনায় যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ব্যবহার করা হয়েছে, সেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েরও স্পষ্ট বক্তব্য চাই। যে কেউ যখন-তখন তাঁদের সমস্ত অপকর্মের ঢাল হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে ব্যবহার করতে পারেন? শামীম ওসমান রাজনীতি করবেন কি করবেন না, সেই বার্তা কেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেবেন?
শাবাশ এএসপি বশিরউদ্দীন। এ রকম দৃঢ়চেতা ও সৎ পুলিশ কর্মকর্তারাই পারেন সমাজের দুষ্ট ক্ষত ও ক্যানসারগুলো ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

খালেদা জিয়া ও সুষমা স্বরাজের একান্তে ১২ মিনিট

খালেদা জিয়া ও সুষমা স্বরাজের একান্তে ১২ মিনিটের বৈঠক নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। শুক্রবার রাজনৈতিক অঙ্গনসহ মিডিয়াকর্মীদের মাঝেও এ নিয়ে ছিল কৌতূহল। একান্তে তারা কি কথা বললেন- এ ব্যাপারে বিএনপির কোনো নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ করে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে খালেদা জিয়ার ঘনিষ্ঠ এবং বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা যুগান্তরকে বলেন, দু’জনের একান্ত বৈঠকে বিএনপি ও ১৯ দলীয় জোটের এ মুহূর্তের অবস্থান এবং জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কৌশলগত সম্পর্কের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি ৫ জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনসহ সরকারের বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কিছু সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া বাংলাদেশে দ্রুত আরেকটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ভারতের নতুন সরকারের সহযোগিতা কীভাবে পাওয়া যায়, সে ব্যাপারে সুষমার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছেন খালেদা। তবে এ বিষয়ে কি আলোচনা হয়েছে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা দিতে রাজি হননি সূত্রটি।

শুক্রবার সকাল দশটা পঁচিশ মিনিটে হোটেল সোনারগাঁয়ে প্রেসিডেন্ট স্যুইট ‘বেঙ্গলি’তে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বৈঠকের এক পর্যায়ে খালেদা জিয়া ও সুষমা স্বরাজ একান্ত ১২ মিনিট কথা বলেন। এদিকে হোটেল থেকে বেরিয়ে খালেদা জিয়া তার গুলশানের বাসায় যান। সেখানে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, উপদেষ্টা রিয়াজ রহমান ও সাবিহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে প্রায় দেড়ঘণ্টা বৈঠক করেন তিনি। সুষমার সঙ্গে বৈঠকের সার্বিক বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। এক পর্যায়ে সুষমার সঙ্গে একান্তে করা আলোচনা নিয়েও কথা বলেন খালেদা জিয়া। সুষমার বৈঠকের পর খালেদা জিয়ার ও দলের নেতাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত আরেকজন নেতা যুগান্তরকে বলেন, সুষমার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বিএনপির সঙ্গে বিজেপির ওয়ান টুন ওয়ান সম্পর্কের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন খালেদা জিয়া। দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের প্রেক্ষাপট, সরকারবিরোধী আন্দোলন, বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের হত্যা, মামলা নির্যাতনসহ ক্ষমতাসীনদের অবস্থানও তার কাছে স্পষ্ট করা হয়। এছাড়া কথা বলেন, জামায়াত প্রসঙ্গেও। খালেদা সুষমাকে বলেছেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে আমাদের নির্বাচনী জোট। আপনাদেরও জোট আছে। জোটের বিষয়টি আপনারাও ভালো জানেন।’ ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে সন্ত্রাস দমনসহ তাদের করণীয় কি হবে তারও ইঙ্গিতও দিয়েছেন খালেদা। তবে খালেদা জিয়া নানা বিষয়ে অবহিত করলেও সুষমা এসব ব্যাপারে ইতিবাচক বা নেতিবাচক কোনো মন্তব্য করেননি।

ডিভোর্সি স্ত্রীর সঙ্গে প্রেম, অতঃপর...

বিয়ের পর বনিবনা না হওয়ায় স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন শাহীন। ডিভোর্সের পর স্ত্রী রত্না বিয়ে করেছিলেন অন্য একজনকে। দ্বিতীয় বিয়ের পর রত্না ফের আগের স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। আর এটিই কাল হয়ে দাঁড়ায় শাহীনের জন্য। রত্নার স্বামীর হাতে খুন হতে হয় শাহীনকে। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে  মোবাইল ফোনে কথা বলতেন শাহীন। তাদের এই যোগাযোগ ধরে ফেলেন রত্নার স্বামী টুটুল। এরপরই টুটুল ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে শাহীনের ওপর। স্ত্রীর সঙ্গে শাহীনের এই সম্পর্ক সহ্য করতে না পেরে ছুরি দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে শাহীনকে। রাজধানীর খিলগাঁও ৭৬ নম্বর মেরাদিয়া হিন্দুপাড়া এলাকায় বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে এই ঘটনা ঘটে। সেদিন টুটুল শাহীনের বাসায় গিয়ে তাকে ডেকে বাইরে নিয়ে আসে। অন্য বাসার ছাদে পরকীয়ার বিষয়টি নিয়ে দুজনের মধ্যে অনেক সময় বাগবিত-া চলে। একপর্যায়ে শাহীন বিষয়টিকে শান্ত করার জন্য টুটুলকে বলে তার রুমে চলে যান। তবে টুটুল শাহীনের রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে তাকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। শাহীন বাঁচার জন্য নিজেই ঘরের দরজা খুলে বের হয়ে এলে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ২টার দিকে মৃত্যু হয় তার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, দীর্ঘদিন যাবৎ মোবাইল ফোনে তাদের পরকীয়া চলছিল। আর এই ঘটনা টুটুল হাতেনাতে ধরে ফেলে। সবার অগোচরে চালিয়ে যাওয়া প্রেম টুটুলের কাছে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় এই হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। নিহত শাহীনের স্ত্রী রুবি জানান, ১১ বছর আগে রত্নার সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে হয়েছিল শাহীনের। বছর যেতে না যেতেই তাদের সংসার ভেঙে যায়। এর কারণ হলো শাহীনের পরিবার ও রত্নার পরিবার তাদের এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। রত্নার পারিবারিক অবস্থা অনেক ভাল ছিল আর শাহীনের তেমন কিছুই ছিল না। বিলবোর্ডের কাজ করে সংসার চালাতো। একদিন কাজ করলে ১০ দিন বসে থাকতো। এসবের কারণে তাদের দুই পরিবারর মধ্যে অনেক ঝগড়া হতো। অনেক বিচারও হয়েছে। এসবের একপর্যায়ে রত্নার পরিবার ডির্ভোস করিয়ে নেয়। এরপর তাদের মধ্যে কোন ধরনের যোগাযোগ হয়নি। তখন আমার সঙ্গে পরিচয় হয় শাহীনের। আমি গার্মেন্টে কাজ করতাম। দুজনের বাসা ছিল পাশাপাশি। এই সুবাদে প্রতিদিন দেখা হতো। এই দেখা থেকেই পরিচয়, প্রেম ও পরিণয়। সেই সময় রত্নারও টুটুলের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। ভালই চলছিল দুজনের সংসার। রত্নাদের বাসাও ছিল আমাদের পাশে। প্রতিদিন দেখা হতো আমাদের দুই পরিবারের। রুবি বলেন, রত্নার স্বামী টুটুলের সঙ্গেও আমার বাবার বাড়ির সবার খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। প্রায় দিনই সেই বাসায় বেড়াতে আসতো। আমিও তার সঙ্গে কথা বলতাম। তবে আমার স্বামী ও রত্নার মধ্যে যে আবার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তা আমি জানতাম না; এমনকি কোনদিন বুঝতেও পারিনি। রুবি বলেন, ওই রত্নাই নিজ থেকে শাহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। সে এলাকার ফ্লেক্সিলোডের দোকান থেকে শাহিনের নাম্বার সংগ্রহ করে। এরপর প্রায়ই অপরিচিত হিসেবে শাহীনকে ফোন দিতো আর বলতো আপনি আমাকে চিনবেন না আমি আপনাকে খুব ভালভাবে চিনি। তাদের প্রেমের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর গত সোমবার এসব কথা আমাকে শাহীন নিজেই বলেছিল। এই কথাগুলো শুনার পর আমি শাহীনের ওপর রাগ করে আমার চাচার বাসা মহাখালীতে চলে যাই। তবে আমার জানা মতে এখানে শাহীনের কোন দোষ ছিল না। রত্না নিজে থেকেই এই ঘটনাগুলো করেছে। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খিলগাঁও থানার এসআই সাব্বির বলেন, পরকীয়ার কারণেই এই হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটেছে। শাহীন ১০ বছর আগে ডির্ভোস দেয়া স্ত্রীর সঙ্গে পুনরায় প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বিষয়টি রত্নার বর্তমান স্বামী জানতে পেরে শাহীনের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যান। যার ফলে গত বুধবার রাতে টুটুল এই হত্যাকা- ঘটনায়। তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় শাহীনের স্ত্রী বাদী হয়ে খিলগাঁও থানায় একটি হত্যামামলা দায়ের করেছেন। আসামিরা এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।

জালিয়াতির মামলায় সোনিয়া ও রাহুলকে আদালতের সমন

সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী
কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, সহসভাপতি রাহুল গান্ধীসহ শীর্ষ ছয় কংগ্রেস নেতাকে জালিয়াতি ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে আগামী ৭ অাগস্ট আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে৷ দিল্লির মহানগর হাকিম গোমতী মানোচা গতকাল বৃহস্পতিবার এই নির্দেশ দেন৷ ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা সুব্রমানিয়ান স্বামী কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে সম্পত্তি হাতানো ও তছরুপের অভিযোগ আনেন৷ সেই অভিযোগের সারবত্তা রয়েছে মন্তব্য করে আদালত এই নির্দেশ দেন৷ কংগ্রেস সূত্রে জানানো হয়েছে, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের কাছে আদালতের নির্দেশ এখনো পৌঁছায়নি৷ মামলা নিয়ে দলীয় নেতৃত্ব চিন্তাভাবনা করছে৷ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷ মামলার মূলে রয়েছে ন্যাশনাল হেরাল্ড সংবাদপত্র গোষ্ঠী৷ ১৯৩৮ সালে জওহরলাল নেহরু এই সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠা করেন৷ ২০০৮ সালে তা বন্ধ হয়ে যায়৷
স্বামীর অভিযোগ, হেরাল্ড গোষ্ঠীর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি রুপি৷ সোনিয়া-রাহুলেরা তা হাতিয়ে নিতে উদ্যোগী৷ এ জন্য রাহুল ইয়ং ইন্ডিয়া নামে একটি সংস্থা তৈরি করেন৷ মাত্র ৫০ লাখ টাকায় তাঁরা হেরাল্ডের সম্পত্তি নিতে চান৷ দিল্লির হেরাল্ড হাউসের একটা বড় অংশ তাঁরা ভারত সরকারের পাসপোর্ট ডিভিশনকে ভাড়া দিয়েছেন, যা কিনা আইনত তাঁরা পারেন না৷ স্বামীর আরও অভিযোগ, হেরাল্ড গোষ্ঠীকে কংগ্রেস ৯০ কোটি রুপির শর্ত ছাড়া ধার দিয়েছিলেন, যা কিনা কোনো রাজনৈতিক দল আইনত করতে পারে না৷ স্বামী এসব অভিযোগ প্রথম করেছিলেন ২০১২ সালে৷ সে সময় রাহুল একটি চিঠিতে অভিযোগগুলো অসত্য, ভিত্তিহীন ও সম্মানহানিকর বলে উল্লেখ করেছিলেন৷ তিনি মামলার হুমকিও দিয়েছিলেন৷ কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, ন্যাশনাল হেরাল্ড পত্রিকা পুনরুজ্জীবনে দল সুদহীন ধার দিয়েছিল৷ তাতে বাণিজ্যিক কোনো স্বার্থ ছিল না৷ এবার স্বামী মামলা করে দেওয়ায় কংগ্রেস নেতৃত্বকে তার জবাব দিতে হবে৷ সোনিয়া ও রাহুল ছাড়াও ৭ অাগস্ট আদালতে হাজির হতে আরও চার কংগ্রেস নেতাকে সমন জানানো হয়েছে৷ তাঁরা হলেন দলের কোষাধ্যক্ষ মোতিলাল ভোরা, অস্কার ফার্নান্দেজ, সুমন দুবে ও শ্যাম পিত্রোদা৷ কংগ্রেস সূত্রের খবর, দল এই সমনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যেতে পারে৷