Thursday, August 13, 2015

উদ্বিগ্ন নাগরিকদের একহাত নিলেন প্রধানমন্ত্রী

রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের
তথ্য ভবনের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বুধবার
বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: ফোকাস বাংলা
যাঁরা ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সংবিধান সংশোধন করার কথা বলছেন তাঁদের একহাত নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাঁর মতে, যাঁরা এখন এ কথা বলছেন তাঁরা সামরিক শাসকদের উপদেষ্টা ছিলেন কিংবা তাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তখন তাঁদের চেতনা কোথায় ছিল সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
আজ বুধবার রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে তথ্য ভবনের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী। খবর বাসস ও ইউএনবির।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘আলোচনায় অনেকে দেশে কোনো গণতন্ত্র দেখেন না, সংবিধান সংশোধনের জন্য কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন, অনেক কিছু বলেন...আমি যখন এই মুখগুলো দেখি...তাদের কেউ একসময় সামরিক শাসকদের উপদেষ্টা ছিলেন, কেউ কেউ তাদের সঙ্গে কাজ করেছেন, কেউ তাদের পদলেহন করেছেন ও একটু করুণার জন্য ধরনা দিয়েছেন। তখন তাদের চেতনার দুয়ার বন্ধ ছিল? ’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার দুয়ার খুলে দেওয়ায় সুশীল সমাজের ওই সব সদস্যের গণতান্ত্রিক চেতনা ও প্রস্তাব-আকাঙ্ক্ষা বেড়েই চলছে। তাঁরা যত গণতন্ত্র ভোগ করছেন, তাঁরা তা আরও পেতে চান। এটা প্রশংসনীয়। তবে এই দাবির বিপরীত দিকটাও তাদের ভেবে দেখা দরকার। এর সঙ্গে তিনি যোগ করেন, ‘আমি আশা করি তারা অন্তত এ কথাটুকু মনে রাখবেন যে আওয়ামী লীগ তাদের মতামত প্রকাশের জন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দিয়েছে এবং দেশে গণতন্ত্রের পথযাত্রা পুনরুজ্জীবিত করেছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র বারবার কশাঘাতের শিকার হয়েছে। অবৈধ দখলদাররা গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগকারীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছে। দেশ কেবল স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির নেতৃত্বে উন্নত হতে পারে। কিন্তু ২১ বছর বাংলাদেশ শাসন করেছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। তারা দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ধ্বংস করেছে। একটি শিশু বিকৃত ইতিহাস থেকে কিছুই শিখতে পারে না। কিন্তু এ দেশে এটাই হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সরকারের সাফল্য জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে অধিকতর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে গণযোগাযোগ খাতের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, গণমাধ্যমের দায়িত্ব হচ্ছে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও গুজবের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করা। তিনি বলেন, ‘আমরা জঙ্গিবাদ দমন এবং সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের দুষ্টচক্র নির্মূল করার লক্ষ্যে কাজ করছি। কিন্তু জনসচেতনতা ছাড়া এ প্রয়াস সফল হবে না।’ তিনি আবারও বলেন, বাংলাদেশ ধর্মীয় উগ্রবাদীদের চারণ ক্ষেত্র নয়। এ দেশে সব ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের মানুষ পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিবেশে বসবাস করবে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের গঠনমূলক সমালোচনার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ‘সরকার সমালোচনায় ভীত নয়। গঠনমূলক সমালোচনা শুধরাতে সহায়তা করে। তবে মিডিয়ার এমন কিছু করা উচিত নয়, যা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন এবং অপশক্তির হাতকে শক্তিশালী করে।’
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন তথ্যসচিব মর্তুজা আহমেদ।
১৬-তলা এই তথ্য ভবনে থাকবে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর (ডিএফপি), গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ও ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের প্রধান কার্যালয়। এ ছাড়া এ ভবনে আধুনিক গ্রন্থাগার, গবেষণা কেন্দ্র, চলচ্চিত্র প্রদর্শন হল, মিলনায়তন ও ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্রও থাকবে।
প্রসঙ্গত উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের গতকাল মঙ্গলবারের গোলটেবিল বৈঠক নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়:
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে ‘পূর্ণ গণতন্ত্রের জন্য ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য’ শীর্ষক উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা বলেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে সংবিধান সংশোধন হওয়া জরুরি। এ লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা উচিত। ৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ নির্বাচনের বছরপূর্তি উপলক্ষে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের সহিংস আন্দোলন কর্মসূচি চলাকালে সরকার ও বিরোধীপক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরুর আকাঙ্ক্ষা থেকে ১৩ নাগরিক মিলে এই সংগঠন গড়ে তোলেন। গতকালের গোলটেবিলে ছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক রওনক জাহান, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী, আইনজীবী শাহদীন মালিক, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর প্রমুখ।

কভি খুশি কভি গম by মাহবুব তালুকদার

বাসায় বসে একটি হিন্দি চলচ্চিত্র দেখছিলাম টেলিভিশনে। চাচা টেলিফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন, কী করছো?
একটা মুভি দেখছি। আমি বললাম, ‘কভি খুশি কভি গম’।
তোমরা  গম নিয়ে আর কত রাজনীতি করবে?
বুঝলাম চাচা আমার কথা বুঝতে পারেননি। বললাম, এই গম সেই গম নয়। এটা হিন্দি গম-এর অর্থ বেদনা। আপনি সম্ভবত গম কেলেঙ্কারির কথা বলতে চাচ্ছেন।
তুমি কত সহজে কেলেঙ্কারি শব্দটা জুড়ে দিলে। অথচ গম নিয়ে কোন কেলেঙ্কারিই হয়নি। খাদ্য অধিদপ্তর হাইকোর্টের নির্দেশে যে প্রতিবেদন দাখিল করেছে, তাতে বলা হয়েছে ব্রাজিল থেকে আনা গম খাওয়ার উপযোগী।
এটা স্বস্তিকর কথা। তবে হাইকোর্ট এ বিষয়ে কী নির্দেশ দেন, এখন তা-ই দেখার বিষয়।
গম নিয়ে তো কম তোলপাড় হলো না। মিডিয়ায় ব্রাজিলের গমের যে ছবি ছাপা হয়েছে, তাতে গমগুলো নষ্ট মনে হয়েছে। সেদিন কুমারখালীর সংসদ সদস্য নিজে গম পরীক্ষা করে তার এলাকার সরকারি খাদ্য গুদামে ওই গম তুলতে দেননি। খুলনার আটাকল মালিকরা বলেছেন, ব্রাজিলের গম দুর্গন্ধযুক্ত এবং এতে আটা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করলে লোকসান হবে।
বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই গমে কুঁচকানো ও ভাঙা দানার পরিমাণ সরকার নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি। পুলিশও এই গম নিতে চাইছে না। এরকম আরও কতো কী? এখন দেখা যাক, হাইকোর্টের নির্দেশ শেষপর্যন্ত কী দাঁড়ায়?
চাচার আমন্ত্রণে বিকালে তার বাসায় গেলাম। দেখি চাচাও তখন টেলিভিশন দেখায় ব্যস্ত। এরকম দৃশ্য কমই দেখা যায়। কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থাকলে চাচা টিভিতে মেতে থাকেন। আমাকে দেখে বললেন, দেশে কত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল। বাংলাদেশকে এখন বিশ্ববাসী সমীহের চোখে দেখছে। এটা কত বড় অর্জন, কল্পনা করতে পারো?
বললাম, বাংলাদেশের অর্জন দিকে দিকে। ক্রিকেট খেলায় অর্জন, সীমানা বিজয়ে অর্জন, সমুদ্র বিজয়ে অর্জন, আপনি কোন অর্জনের কথা বলছেন?
চাচা আর ভণিতা করলেন না। জানালেন, বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত হয়েছে। এটা আমরা দাবি করছি না, বিশ্বব্যাংক ঘোষণা দিয়েছে।
চাচা! নিঃসন্দেহে খবরটা আনন্দের। আমিও খবরটা আগেই জেনেছি। তবে এই খবরে রবীন্দ্রনাথের ‘পুরসকার’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে গেল। কবি রাজসভা থেকে রাজার গলার পুষ্পমালা উপহার নিয়ে বাসায় ফিরছেন। কবির স্ত্রী দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হলেও শেষে রাজমাল্যটিকে গলায় পরে নেন। এটা ছিল রাজার কাছে আর স্ত্রীর কাছে কবির স্বীকৃতি।
তোমার এসব কথার কোন অর্থই বুঝলাম না।
আমি বলতে চাইছি, নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হলাম, রাজার কাছ থেকে পুরস্কারও পেলাম। এর ফলাফল কী?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যাবো। বুঝতেই পারছো, আমাদের অর্থনীতির এখন শনৈঃ শনৈঃ উন্নতি হচ্ছে।
আমার সেই হিন্দি ছবিটার নাম আবার মনে হচ্ছে: ‘কভি খুশি কভি গম’। অর্থ হচ্ছে: কখনো খুশি কখনো বেদনা। আমাদের অর্থনীতির খুশির চেয়ে বেদনার দিকটি বেশি ভারি।
অর্থনীতি নিয়ে নৈরাশ্য যাতনায় কেন ভুগছো?
সংসদে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য শুনে মনের বেদনা বেড়েছে। অবশ্য অর্থমন্ত্রী যে সত্য কথাটি প্রকাশ করেছেন এবং যেহেতু তা প্রকাশ করতে পেরেছেন, সে জন্য তিনি সবার ধন্যবাদার্হ।
মুহিত স্যারের কোন কথা?
সংসদে তিনি বলেছেন, ‘নিজের দলীয় লোকদের সমর্থনের কারণে সোনালী ব্যাংক ও বেসিক ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িত সবার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না।’ তিনি এ কথাও বলেছেন, ‘এটা নিয়ে আমি খুব ক্ষুব্ধ।’
তাহলে তো হয়েই গেল। মুহিত স্যার ঠিক কথাই বলেছেন।
বললাম, অর্থমন্ত্রীর ‘আমি খুব ক্ষুব্ধ’ বললেই কথাটা শেষ হয়ে যায় না। বিএনপি বলেছে, ‘রাষ্ট্রীয় ব্যাংক লুটপাটকারীদের নাম প্রকাশ করুন’।
এদিকে সোনালী ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকসহ অন্যান্য সরকারি ব্যাংকগুলোতে ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ লোপাটের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে অনুমিত হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। কিন্তু এর আর পর নেই। প্রত্যেকের ক্ষুব্ধ হওয়ার মধ্যে দুঃখ ও বেদনা আছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার কোন পদক্ষেপ নেই। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারির তদন্ত সম্পর্কে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর ঐতিহাসিক বক্তব্যটি মনে পড়ে যায়- শেয়ারের ব্যাপারে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয়, কারণ তারা খুবই প্রভাবশালী। প্রভাবশালীরাই এদেশের মালিক ও এদেশের রাজা, আমরা আমজনতা শুধু তাদের প্রজা।
আমি অর্থনীতিবিদ নই বা ব্যাংকারও নই। কিন্তু ব্যাংকিং খাতে যেসব অনাচার ও ভ্রষ্টাচার চলছে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রথম আমি বুঝতে অক্ষম রাজনৈতিক কারণে কাউকে ব্যাংক উপহার দেয়া হয় কেন? কাউকে যদি দয়াদাক্ষিণ্য দেখাতে হয় তাহলে তাকে রাজনৈতিক পদে অধিষ্ঠিত করা যেতে পারে। আর্থিক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কেন? দ্বিতীয়ত, লোন দেয়ার কথা ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টের, বোর্ড কেন লোন দেবে? লোন দেয়ার সময় প্রকল্পের বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেয়া হয় না। বোর্ডের তদবিরে লোন দেয়া হয়। মনে হয় বোর্ডের কাজ কেবল লুটপাটে সহযোগী হওয়া। তৃতীয়ত. বোর্ডে আত্মীয় থাকার কথা নয়, কিন্তু যেখানে তা মানা হয় না, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কি কিছু করণীয় নেই। চতুর্থত. বাংলাদেশ ব্যাংক অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে কখনও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয় না। যাদের ধরা হয়, তাদের শাস্তির দীর্ঘসূত্রতায় অপকর্ম উৎসাহিত হয়।
আরও মজার ব্যাপার আছে। বড় বড় ঋণ খেলাপিদের সুদ মাফ করার প্রবণতা দেখে বিস্মিত হতে হয়। সম্প্রতি ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে রি-সিডিউল করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কী মহৎ উদ্যোগ। এরপর এখন থেকে ৫০০ কোটি টাকার খেলাপির সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকরা জানেন ব্যাংকে যেহেতু জনগণের টাকা আমানত থাকে, সেহেতু ঋণ খেলাপি হলে কোন অসুবিধা নেই। সর্বোচ্চ কতবার রি-সিডিউল করা যাবে, তার কোন নীতিমালা আছে কি? বড় ঋণগ্রহীতারা জানেন, তারা ‘টু পাওয়ার ফুল টু কন্ট্রোল’। ফলে সরকার যেন তাদের কাছে বাঁধা।
এসব কথা চাচাকে বলবো কিনা ভাবছিলাম। চাচা বললেন, দেশের আর্থিক অবস্থা এখন কত ভালো, তার দিকে তোমার কোন দৃষ্টি নেই।
আর্থিক অবস্থা ভালো মানে?
গত অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো আয় বা রেমিট্যান্স দেড় হাজার কোটি ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। ভাবতে পারো, এটা কত বড় অর্জন?
চাচা! এটা অবশ্যই অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট সুখবর। কিন্তু এর পাশাপাশি বাংলাদেশীদের কত হাজার কোটি টাকা সুইস ব্যাংকে পাচার করা হয়েছে, সেই খবরটি এ ধরনের অর্জনকে ম্লান করে দেয়। সেজন্যই আমি বলছিলাম, অর্থনীতিতে আমাদের অবস্থা ‘কভি খুশি, কভি গম’।
তোমার মতো নেতিবাচক চিন্তা আমার নেই। চাচা বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করবেন। অর্থনীতির ফাঁক-ফোকরগুলো নিশ্চয়ই তিনি সামলে নেবেন। তার ওপর আস্থা আছে আমার।
আস্থা আমারও আছে। সেদিন তিনি সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদী ও চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের আরও সোচ্চার হতে বলেছেন। আমি মনে করি, একই সঙ্গে অর্থ লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বললে ভালো হতো।
সেটা কী সম্ভব?
কেন সম্ভব নয়?
সন্ত্রাসী জঙ্গিবাদী চোরাকারবারিরা সরকারের বাইরে থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অপকর্ম করে। কিন্তু যাদের তুমি অর্থ লুটপাটকারী বলছো, তারা কাজ করে সরকারের ভেতরে বসে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে আইন অনুযায়ী হতে হবে।
সব বিষয়েই আইন অনুযায়ী চলতে হবে। আমি জানালাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছেন, আইন অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে, তা সে যে দলেরই হোক।
প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন।
তাহলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ব্যবস্থা নিতে পারছেন না কেন? প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের সঙ্গে তার বক্তব্য খাপ খায় না। দু’জনের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।
চাচা সহসা কথার মোড় পরিবর্তন করে বললেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা বলে একটা কথা আছে।
সেটাই বলুন। রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে নৈতিক বাস্তবতা মার খেয়ে যাচ্ছে।
আমার কণ্ঠস্বর উচ্চগ্রামে ওঠায় চাচা তার কণ্ঠস্বর নামিয়ে আনলেন। শান্তকণ্ঠে বললেন, তোমার উদ্বেগ কিছুটা বুঝতে পারছি। তবে চিন্তা করো না। খুব শিগগিরই আর্থিক খাতের সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
আর্থিক খাত তো একটা বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু আর্থিক খাত ধরে অগ্রসর হলে হবে না। দেশে সামগ্রিকভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
ঠিক আছে। তোমার কথাই মেনে নিলাম। চাচা বললেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কী করতে হবে?
দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বেশ। তারপর? রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অবাধ নিরপেক্ষ সর্বজনগ্রহণযোগ্য নির্বাচন দরকার।
সর্বজনগ্রহণযোগ্য বলে কোন কথা নেই। অধিকাংশ লোক যা মেনে নেয়, তাই-ই সর্বজনগ্রহণযোগ্য। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন সবাই মেনে না নিলেও অধিকাংশ মানুষ তা মেনে নিয়েছে। দু’একটি দেশ ছাড়া বিদেশীরাও আর কোন কথা বলছে না।
আপনার তথ্য ঠিক নয়।
তোমার তথ্যটা কি?
চাচা: ক’দিন আগে জাতিসংঘ এক চিঠি দিয়ে ‘নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ বন্ধ করে দিয়েছে।
ভারি অন্যায়! জাতিসংঘের এটা করা উচিত হয়নি। কি কারণে তারা এটা করলো?
তারা কোন কারণ দর্শায়নি। তবে যেসব দেশ এই প্রকল্পের অর্থ যোগানদাতা ছিল, তারা হাত গুটিয়ে নিয়েছে। তারা অর্থ দিতে আর আগ্রহী নয়।
চাচা সবিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন, এসব দেশ কি চায় না বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা শক্তিশালী হোক?
তারা মুখ না খুললেও বোঝা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তারা খুব হতাশ। এ জন্যই তারা প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
যাকগে। আমরা এখন আর বিদেশীদের দিকে তাকিয়ে নেই। আমরা এখন আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছি। দেখলে না নিজেদের অর্থায়নে আমরা পদ্মা সেতু পর্যন্ত তৈরি করতে পারছি। আগামী কয়েক বছরের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে যাবো আমরা। তারপর উচ্চ আয়ের দেশ।
এসব কথা শুনতে বেশ ভালো লাগে। আমিও আশাবাদী হতে চাই। আমি বললাম, কিন্তু আমাদের অবস্থা সেই হিন্দি গানের মতো: ‘কভি খুশি কভি গম’।

আদালত অবমাননায় জনকণ্ঠের দুই সাংবাদিক দণ্ডিত

দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোহাম্মদ
আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়কে
আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছেন
দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ছবি :প্রথম আলো
দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মোহাম্মদ আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়কে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
আদালতের আজকের কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই দুজনকে এজলাসে বন্দী করে রাখার দণ্ড এবং প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে সাত দিনের কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
আজ বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের ছয় সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও স্বদেশ রায়ের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে দেওয়া রুলের ওপর রায় দেওয়ার ধার্য দিন ছিল আজ। নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পর সকাল ১০টায় আদালত বসেন। এরপর রায় দেন আদালত। সোয়া ১০টায় রায় পড়া শেষ হয়।
রায়ে আদালত অবমাননা-সংক্রান্ত কিছু পর্যবেক্ষণ দেন আপিল বিভাগ। এর মধ্যে আদালত অবমাননা আইন সংস্কার এবং গণমাধ্যমের জন্য কিছু নির্দেশনারও কথা রয়েছে।
বেলা সোয়া একটায় আপিল বিভাগের কার্যক্রম শেষ হলে আতিকউল্লাহ খান মাসুদ ও স্বদেশ রায় এজলাস ত্যাগ করেন।
গত ১৬ জুলাই জনকণ্ঠ-এর ষষ্ঠ পৃষ্ঠায় ‘সাকার পরিবারের তৎপরতা: পালাবার পথ কমে গেছে’ শিরোনামে একটি নিবন্ধের জন্য ২৯ জুলাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আদালত অবমাননার রুল দেন আপিল বিভাগ। নিবন্ধটির লেখক স্বদেশ রায়।
৯ আগস্ট প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চে এ রুলের ওপর আংশিক শুনানি হয়। পরে ১০ আগস্ট আপিল বিভাগের ছয় সদস্যের বৃহত্তর বেঞ্চে এ রুলের ওপর শুনানি শেষ হয়। ওই দিন আদেশের জন্য আজকের তারিখ ধার্য করেন সর্বোচ্চ আদালত।

ছাত্রলীগ কর্মী আলী খুনের মামলায় পুরজিৎ দাস রিমান্ডে

আবদুল আলী তালুকদার
সিলেটের মদন মোহন কলেজে ছাত্রলীগের কর্মী আবদুল আলী তালুকদার (১৯) হত্যা মামলায় একই সংগঠনের কর্মী পুরজিৎ দাস ওরফে প্রণজিতকে দুই দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। আঙ্গুর মিয়া নামে মামলার আরেক আসামিকে আজ বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনিও ছাত্রলীগের কর্মী। মহানগরের কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, গতকাল বুধবার বিকেলে দক্ষিণ সুরমা থেকে আটক পুরজিৎকে আজ গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে নেওয়া হয়। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ রিমান্ড চাইলে মহানগর হাকিম আদালত-১ এর বিচারক সাহেদুল করিম দুদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল আহমদ বলেন, নিহত আবদুল আলীর বাবা আলকাস আলী বাদী হয়ে আজ কোতোয়ালি থানায় ছাত্রলীগ কর্মী পুরজিৎ, আঙ্গুর, রাজীব, মাকসুদ ও তানভিরসহ নয়জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। ছাত্রলীগের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গতকাল দুপুরে কলেজ ক্যাম্পাসে পরিকল্পিতভাবে আলীকে হত্যা করা হয়েছে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলার আরেক আসামি আঙ্গুর মিয়াকে আজ ভোররাতে সুনামগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ বলেছে, পুরজিৎ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আবদুল আলীকে ছুরিকাঘাতের কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আঙ্গুর মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারেও পুলিশের অভিযান চলছে।

নিষ্পাপ নিধনের কাল by ফারুক ওয়াসিফ

সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে পিছপা হন না কোনো মা-বাবা। নিজের সন্তানের লাশ থানা থেকে নিজেই চিনে নিয়েছিলেন রাজনের মা। হয়তো হত্যার ভিডিওটিও না দেখে উপায় নেই তাঁর। সন্তানের অন্তিম মুহূর্তের মরণ আর্তনাদ তিনি মনে রাখবেন, কোনো দিন ভুলবেন না। কিন্তু আমরা পারি না। আমরা ভুলে যেতে চাই। আমরা না পারি সইতে, না পারি কইতে। নিষ্পাপের মৃত্যুর উন্মত্ত মহড়া তবু আমাদের দেখে যেতেই হয়। পেছনে আবহসংগীত হিসেবে বাজে মধ্যম আয়ের মধুর বাঁশি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে...অধিকতর উন্নয়ন আর তুমুল অমানবিকতার দিকে।
বীর আর কসাইয়ের মধ্যে পার্থক্য কী? গুলি বা চাপাতি, জবাই, কাটা, ফাঁস, পেটানো, টুকরা টুকরা করা, পেট্রলে পোড়া, সামনে বা পেছনে কোপ, গুম, ক্রসফায়ার, লিচুতে বিষ, খাবারে ফরমালিনসহ হত্যার কত কত পদ্ধতি। হত্যার এই সব পদ্ধতি যুদ্ধে প্রয়োগ করলে বলে বীর। প্রায়ই যে ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়, তাদের পিঠ চাপড়ে দেওয়ার লোক অনেক। পিটিয়ে সাপ বা শিয়াল মারার মধ্যেও হিংস্রতা থাকে। সেই হিংস্রতা কখনো যখন মানুষ হত্যার খাতে বয়ে যায়, তখন আমরা চমকে উঠি। কিন্তু দাপটের উচ্চসিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ঘরের লোক, কাজের লোক, রিকশাওয়ালা-শ্রমিকসহ নিচের লোককে আমরা কি আহত করি না? আমি যখন মাস্টার, তখন বেতের ব্যবহার করি না কি শিশুর গায়ে? কাজের বুয়ার গায়ে আগুনের ছেঁকা দিই না কি, আমি যখন গৃহকর্ত্রী?
আমরা চোর বলে শিশু বা ভবঘুরেকে পিটিয়ে অভ্যস্ত, কিন্তু ব্যাংকচোর, গমচোর, ভোটচোরদের জন্য রয়েছে লালগালিচা, সোনার পুত্তলিকা। আমাদের অদৃশ্য লেজটি তাদের সামনে ভক্তিতে হাতপাখার মতো দোলে। যাদের অবহেলায় ওয়াসার সুড়ঙ্গে পড়ে জিহাদ নামক শিশুটি মরে গিয়েছিল, তাদের কি যথাযথ শাস্তি হয়েছে? শাস্তি দাবির বেলায়ও আমরা এখন আগে দেখে নিই অপরাধী কোন দলের!
কাউকে রিমান্ডে নিয়ে বা গুম করে জেরার নামে নির্যাতন করা হলে কি বিচার হয়? জেরার নামে অত্যাচারের যেসব গল্প শুনি, তারাও তো নারায়ণগঞ্জের ত্বকীর খুনিদের মতো, রাজনের ঘাতকদের মতো। তারাও তো শরীরের নাজুক জায়গায় হাঁটুতে কষ্ট দিয়ে দিয়ে হত্যার বীভৎস আনন্দে হাসে। হত্যার আগে ত্বকীর অণ্ডকোষ থ্যাঁতলানো হয়েছিল! বিগত বছরগুলোতে মেঘনায়, গাজীপুরে, মুন্সিগঞ্জে যখন অহরহ অপঘাতের লাশ মিলত; সেসবের হত্যাকারীদের কে খুঁজেছে? আমাদের নেতা-নেত্রীরা জনসভায়, টেলিভিশনে, লিখিতভাবে প্রতিপক্ষকে বিনাশের হুমকি যখন দেন, তখন যে মুহুর্মুহু স্লোগান ও জয়ধ্বনি ওঠে, সেগুলো কারা দেয়? আমাদেরই কেউ কেউ নয় কি? ক্রমিক খুনি রসু খাঁরা আমাদের মধ্যেই বাস করে। ত্বকী থেকে বিশ্বজিৎ, অভিজিৎ থেকে রাজন পর্যন্ত কেবলই নিরপরাধের মৃত্যু।
কোথায় আমরা দাঁড়িয়ে তা তো দেখবই, কিন্তু আমরাই বা কেমন, সেটা ভুলে থাকলে চলবে কী করে? প্রতি তিনজন শিশুর দুজনই মা-বাবার মারধরের শিকার (প্রথম আলো, ৬ জুলাই)। ভুললে চলবে কী করে দেশে (দশ বছর আগের জরিপে) কর্মজীবী শিশুর সংখ্যা ৭৪ লাখ, আর সরাসরি শিশুশ্রমিকের সংখ্যা ৩৪ লাখ (সূত্র: ইউনিসেফ ও আইএলও)। এবং আমার-আপনার শিশুরা যখন কোমল শৈশব পার করছে, তখন এরা পড়ে থাকছে নির্যাতন-মৃত্যু আর যৌন সন্ত্রাসের হুমকির মুখে।
মানুষ অমৃতের সন্তান নয়। সেমেটিক ধর্মমতে ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের খুনই আদিতম হত্যাকাণ্ড। হিংস্রতা, জিঘাংসা, অসূয়া আমাদের সহজাত। তা সামলাতে আমরা আইন বানিয়েছি, রাষ্ট্র বানিয়েছি, সংস্কৃতির সাধনা করে আসছি, ধর্ম দিয়ে অধর্ম ঠেকাতে গিয়েছি। ভেবেছি, এগুলোই আমাদের ভেতরের শয়তানকে সামলাবে। সহজাত হিংস্রতাকে নীতি ও শাসনের শিকলে আটকে রাখবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে কেবলই বিষ। আজ আমাদের সৃষ্টিই কি আমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নেই?
শিশু রাজনের হত্যার দুই দিন পরের সংবাদ: হিজড়াকে পিটিয়ে হত্যা, ডাকাত সন্দেহে তিনজনকে পিটিয়ে হত্যা, ঘুমন্ত বস্তিতে আগুনে দুই শিশু অঙ্গার, চরে যুবকের মাথাকাটা লাশ উদ্ধার ইত্যাদি। রাজনীতি থেকে শুরু করে পরিবার পর্যন্ত হিংস্রতার বান। আমরা মধ্যম আয়ের দেশ চাই, ক্রিকেটে বিশ্বসেরা হওয়ার সাধ আমাদের, চেতনায় চেতে উঠে চিৎকার করি আমরা, কিন্তু মধ্যম মানের মানবিকতা অর্জনে কত দেউলিয়া, সেই হুঁশ নেই! এ এমন এক দেশ, যেখানে ঘটনা ঘটে চলে, কিন্তু প্রতিক্রিয়া হয় বেছে বেছে। ভিডিও–বাস্তবতায় আমরাও হয়েছি এমন আসক্ত, সচিত্র না দেখলে আমরা নড়েচড়ে বসি না।
ইমানুয়েল লেভিনাস ফরাসি দার্শনিক। তিনি বোঝাচ্ছেন: কেউ কাছে এলে মানুষ মুখের দিকেই তাকায়। অচেনা সেই মুখ প্রথমেই তার মধ্যে জাগিয়ে তোলে আদিম ভীতি: ও কি আমার শত্রু, ঘাতক? কিন্তু ভালো করে তাকালে সে দেখে, প্রতিটি আনমনা মুখই কত নির্বিরোধী, কত সহজ। পাশবিকতাকে ঘুম পাড়াতে পারলে প্রতিটি মানুষই ঘুমন্ত মুখের মতো সরল ও সহজ। এই অনুভূতি থেকে তখন আমরা আবার মুখের দিকে দেখি, মায়া জাগে। আমাদের সভ্যতায় এই মায়া আজ গরহাজির।
নিষ্পাপের মৃত্যুর উন্মত্ত মহড়া তবু আমাদের দেখে যেতেই হয়। পেছনে আবহসংগীত হিসেবে বাজে মধ্যম আয়ের মধুর বাঁশি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে...অধিকতর উন্নয়ন আর তুমুল অমানবিকতার দিকে সবেরই কারণ আছে। মানুষের ভেতরের বীভৎস বীরের ছায়াটা যে বেরিয়ে আসছে বেশি করে, কারণ আইন-শাসন-নজরদারি-জবাবদিহি মারাত্মক শিথিল। অনেক ক্ষেত্রে রক্ষকেরাই ভক্ষণের পৈশাচিকতা চালায়। কেন এমনটা হচ্ছে, তার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়াউর রহমান। বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এটা সামাজিকভাবে দীর্ঘদিন ধরেই আছে—পোস্ট কলোনিয়াল (সদ্যস্বাধীন) সোসাইটিতে আগ্রাসী বা ধ্বংস করার মনোবৃত্তি থেকে মানুষের মধ্যে এ আচরণ দেখা যায়...জনগণের ভেতর যে হতাশা বা উন্মাদনা থাকে, তার প্রভাবে এই আগ্রাসী আচরণ বেরিয়ে আসে।...শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এমনটা ঘটে। কিন্তু যে রাষ্ট্রে এসব আচরণ নিরুৎসাহিত করার কোনো প্রবণতা বা সিস্টেম থাকে না, সেখানে এসব আচরণ বেশি প্রকাশ পায়।’ বাংলাদেশের ঘটনাগুলো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন গ্লোবালাইজেশনের একটা ট্রানজিশনাল পিরিয়ড পার করছে। সুতরাং এখানকার অনেক মানুষ এসব আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।’ অন্যদিক থেকে একে বলা যায় ট্রানফার্ড অ্যাগ্রেশন বা স্থানান্তরিত ক্রোধ। এক জায়গার হতাশা আমরা আরেক জায়গায় প্রকাশ করি।
শুধু নৈতিকতার মাইক বাজিয়ে এই বিকার ঠেকানো যাবে না। বাজার অর্থনীতির তুমুল হাওয়ায় পাতলা মেঘের মতো ছিঁড়ে-ফুড়ে উড়ে যাচ্ছে আমাদের সমাজ। মানুষ এতই আত্মকেন্দ্রিক যে কেউ কাউকে মানেও না, ডাকেও না। আয়ের চাইতেও বেশি বাড়ছে জীবনযন্ত্রণা-অনিশ্চয়তা-ভয়। এসবে অস্থির মানুষ বোধবুদ্ধি হারিয়ে বিকারগ্রস্ত হয়। ঠিক যে, আইনের কঠোর প্রয়োগ লাগবে, বিচারে আস্থা আনতে হবে, পাশাপাশি সমাজের সংহতি ও বন্ধনও জাগাতে হবে। আমাদের আনন্দের জায়গা নিয়েছে বিনোদন। আর বিনোদন মানেই যৌনকাতর হিংসাত্মক সিনেমা, খেলা, ভিডিও ও টেলিবাস্তবতা। এসব না বদলিয়ে মানুষ বদলাবে কী করে?
একদিন সমাজের সামনে যে আদর্শ ও ব্যক্তিত্ব ছিল, আজ সেগুলো সুবিধাবাদ ও স্বার্থপরতায় ভূলুণ্ঠিত অথবা অকেজো। ভালো মানুষ সব ক্ষেত্রে পরাজিত ও ভীত। দুর্বৃত্ত ও অপরাধীরা রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে। নতুন আদর্শ ও নতুন অনুসরণীয় মানুষকে সামনে আনতে না পারলে, রাষ্ট্রটাকে অসুরবিনাশী করতে না পারলে আমাদের আশা নেই।
চরম পৈশাচিকতার মুখে আমরা বিহ্বল হয়ে পড়ি, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। কিন্তু এই মুহূর্তেই প্রশ্ন করতে হবে, ঠিক এই সময়ে পরিকল্পিতভাবে শিশুকে হত্যা করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য কাজ করেছিল কি না। কেন পুলিশপ্রধান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ সত্ত্বেও রাজনের মূল ঘাতককে সময় থাকতে পুলিশ আটক করতে পারল না? রাজনের মায়ের দাবি, পুলিশ ও ইমিগ্রেশন এড়িয়ে সে এখন দেশের বাইের।
এদিকে উন্মত্ত ক্রোধে অনেকে খুনিদের ফাঁসি চাইছেন, ক্রসফায়ার দাবি করছেন, পিটিয়ে মারতেও চাইছেন। তা-ই যদি হবে, তাহলে বিচার হবে কার? বিচার মানে দোষীকে শুধু ঝুলিয়ে দেওয়া না। আদালতের সওয়াল-জবাবের মধ্যে, উকিল ও বিশেষজ্ঞদের অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে শুধু অপরাধই প্রমাণিত হয় না, অপরাধের কার্যকারণ ও মন-মানসিকতারও হদিস করা হয়। তা থেকেই প্রতিকারের পথেরও সন্ধান মিলতে পারে। তাই হত্যার জবাবে হত্যা নয়, হত্যার বিচারের মাধ্যমে সম্ভাব্য শিকার ও সম্ভাব্য হত্যাকারী উভয়কেই নিহত ও খুনি হওয়া থেকে বাঁচাতে হবে। এবং এসবকে দলীয় রংচশমায় রাঙানো যাবে না।
ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আমরা এখন আমাদেরই মারছি ও মরছি। গভীর গভীরতর অসুখ এখন বাংলাদেশের। আমার মানুষ মরছে আগুনে, ভবন ধসে, ক্রসফায়ারে, গুম হচ্ছে, সাগরে ডুবছে, পায়ের তলায় থ্যাঁতলা হচ্ছে—দেশে-বিদেশে। মানুষই এখন মারছে মানুষকে। প্রতিটি অপঘাতের ক্ষত থেকে উঠে আসছে ডুবন্ত জাহাজের নাবিকের শেষ বার্তা: সেভ আওয়ার সোউলস (এসওএস); আমাদের প্রাণ বাঁচাও! বাংলাদেশ এখন চিৎকার করে বলতে চাইছে, ‘আমি মরি যাইয়ার, আমারে কেউ বাঁচাও রে বা!’

ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

নিজস্ব ক্যাম্পাসঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আবারও ছাড় দেওয়ার ইঙ্গিত

যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন মেনে এখনো নিজস্ব ক্যাম্পাস করতে পারেনি, তাদের আবার সময় দেওয়ার ইঙ্গিত দিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এখনো শর্ত মেনে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি, তাদের ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে অবস্থা জানিয়ে একটি প্রতিবেদন দিতে হবে। এরপর এই প্রতিবেদন দেখে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বিবেচনা করা হবে।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা সভায় মন্ত্রী এ কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকারের ঘোষিত সময় অনুসারে আগামী ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে ক্যাম্পাস করে কার্যক্রম চালানোর কথা ছিল। এখন পর্যন্ত পুরোনো ৫২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৭ টির নিজস্ব ক্যাম্পাস করেছে। অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সাতটি আংশিক শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে। নয়টির ভবন নির্মাণাধীন ও ১৭ টির জমি কেনার ব্যাপারটি প্রক্রিয়াধীন। অন্য তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় জমি কেনেনি।
তৃতীয় দফায় সরকারের দেওয়া সময় অনুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ক্যাম্পাস করার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা। এ ব্যাপারে আরও সময় দেওয়া হলে চতুর্থ দফা হবে।
আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয় সরকার ও ইউজিসি মনোনীত সদস্যদের সিন্ডিকেট সভায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে না। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনহীন ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। কয়েকটিতে বোর্ড অব ট্রাস্টিদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছে। বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সুস্পষ্ট বেতনকাঠামো নেই। এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অনেকে শিক্ষক বা কর্মচারীদের ছাঁটাই করছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অনেকের মানসম্মত ল্যাবরেটরি ও গবেষণাগার নেই। ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয় নামমাত্র গবেষণা করছে। কিন্তু ইউজিসির ক্ষমতা সীমিত থাকায় তাঁরা কিছু করতে পারছে না। এ বিষয়ে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার মন্ত্রণালয় নেবে।
সভায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মালিকদের সংগঠন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির সভাপতি শেখ কবির হোসেন তাঁদের ওপর আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করবেন।

দূর হোক সব ছিটমহলবাসীর দীর্ঘশ্বাস by তুহিন ওয়াদুদ

স্থলসীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পর ছিটমহলবাসীর আনন্দমিছিল
গত ৬ মে ভারতের লোকসভায় স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের পর থেকে খুব দ্রুতই চলছে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি বাস্তবায়নের কাজ। ৩১ জুলাই মধ্য রাতে ছিটমহল বিনিময় কার্যকর হবে। সেই লক্ষ্যে ৬ জুলাই থেকে ছিটমহলবাসী কারা কোন দেশে থাকতে চায়, তার জরিপ শুরু হয়েছে, চলবে ১৬ জুলাই পর্যন্ত। যারা ছিটমহল ছেড়ে নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যেতে চায়, উভয় রাষ্ট্র তাদের জন্য ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ট্রাভেল পাস ইস্যু করবে। চিলাহাটি-হলদিবাড়ী, বুড়িমারি-চেংরাবান্ধা, সাহেবগঞ্জ-বাগবন্দর চেক পয়েন্ট দিয়ে তারা যাওয়া-আসা করতে পারবে।
চলমান জরিপের আগেই কিছু কিছু বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা জরুরি ছিল। ছিটমহলগুলোতে জমি নিবন্ধনের ব্যবস্থা না থাকার কারণে অনেক সময় সাদা কাগজে লিখে জমি বিক্রি হয়েছে। অনেকের জমি আছে কিন্তু দলিল নেই। সরকারিভাবে এই মালিকানার মূল্য নেই। এ রকম জমির মালিক ভারতের মূল ভূখণ্ডে গেলে তাঁর জমি ব্যবস্থাপনা কী হবে, তা তাঁরা জানতে চান।
২২ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত জমি বিক্রি বন্ধ। ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এই নির্দিষ্ট সময়ে যাঁরা নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যাবেন, তাঁরা নিজ নিজ স্থানীয় ডিসি/ডিএমের অনুমতি নিয়ে ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত জমি বিক্রি করতে পারবেন। ভালো হতো, যদি নিজ জন্ম ভূখণ্ড ছেড়ে যাওয়া লোকজনের জমি ওই দেশের সরকার কিনে নিত।
যাঁরা ভারতে যাবেন কিংবা বাংলাদেশে আসবেন, তাঁরা সরকারিভাবে কী কী সুবিধা পাবেন, সেটা তাঁরা জানেন না। বর্তমানে চলতে থাকা জরিপের আগেই যদি এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা যেত, তাহলে অনেকেই স্বাচ্ছন্দ্যে কে কোন দেশে থাকবেন তা নির্ধারণ করতে পারতেন।
ইংরেজিতে ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট ফিল্ড ক্যাম্প’ লেখা ব্যানার ঝুলিয়ে বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে চলছে জরিপের কাজ। এ রকম একটি ক্যাম্পে দাসিয়ার ছড়া ছিটমহলে ৮ জুলাই ভারতের একজন অবজারভার বিধানচন্দ্র সাধুখারকে আমি কয়েকটি প্রশ্ন করেছিলাম, ‘যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা ভারতে গিয়ে কী পাবেন? যাঁরা জমি রেখে যাবেন, তাঁদের জমি ব্যবস্থাপনা কী হবে?  যাঁরা ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়েছেন, তাঁদের কী হবে? এই জরিপের আগে কি এসব জানানো জরুরি ছিল না?’ উত্তরে তিনি আমাকে বলেন, ‘এসব আপনার ভ্যালিড কোশ্চেন। আমি ওপরে জানাব।’
চলতি জরিপে মানুষ গণনা হচ্ছে না। ২০১১ সালে যখন ছিটমহল বিনিময় হওয়ার কথা ছিল, তখন বাংলাদেশ-ভারত উভয় সরকারের উদ্যোগে ছিটমহলে জনসংখ্যা জরিপ চালানো হয়েছিল। সেই তালিকা ধরেই চলছে বর্তমান জরিপের কাজ। সেই জরিপে অনেকেই বাদ পড়েছিলেন। তাঁরা এখন ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন। বাদ পড়াদের মধ্যে যাঁরা ভারতে যেতে চান, ২০১১ সালের জরিপে নাম না থাকলে তাঁরা ভারতে যেতে পারবেন না, আবার বাংলাদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবেন না। একই পরিবারের কারও নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আবার কারও হয়নি। দুঃখ করে কবিচন্দ্র নামের একজন বলছিলেন, ‘আমরা ছয় ভাই। দুই ভাইয়ের নাম নাই। একজন ভারতে যাই-যাই করছিল, তার নামই নাই। আমি রংপুরে অসুস্থ হয়া ছিলাম। আমারও নাম নাই।’ কমলিনী রায় বলছিলেন, ‘ডকুমেন্ট হিসেবে জমির কাগজ আছে, তা–ও নাম নাই। এখন আমাদের কী হবে?’ যাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন না, তাঁরা জমির মালিকানা পাবেন কী করে? যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা না গেলে তাঁরা আমৃত্যু ভাসমান হয়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। বৈবাহিক সূত্রে যে মেয়েরা ছিটমহলের বাসিন্দা হয়েছেন এবং ২০১১ সালের পর যারা জন্মগ্রহণ করেছে, তারা ছাড়া আর কেউ নতুন জরিপে আসছে না। যঁারা ২০১১ সালের জরিপে বাদ পড়েছেন, তাঁদেরও অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
অনেকেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কাজের সন্ধানে গেছেন। ১১১টি ছিটমহলের অনেকেই বৈধ পাস না থাকার কারণে আসতে পারছেন না। ছিটমহলের মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগের কারণে ভারতে যাওয়ার বৈধ পাস না থাকলেও তারা জীবন ধারণের তাগিদে সেখানে গেছেন। সীমান্তে তাঁদের জন্য বিশেষ পাস থাকলে তাঁরা হয়তো সবাই নাগরিকত্ব পেতেন। আর তা সম্ভব না হলে ভারতে রেখেও তাঁদের এ জরিপে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। ২০১১ সালের জরিপে এঁদের অনেকের নাম আছে, অনেকের নাম নেই। যাঁরা বাংলাদেশে থাকতে চান, তাঁদের কেউ কেউ ভারত থেকে চলে এসেছেন। আবার যাঁরা ভারতে থাকতে চান, তাঁদেরও কেউ কেউ জরিপে নাম লেখানোর জন্য এসেছেন। এ রকম দুজন আলমগীর ও জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা হলো কুড়িগ্রামের দাসিয়ার ছড়ায়। তাঁরা পাঁচ ভাই দিল্লিতে ইটভাটায় কাজ করেন। আলমগীর বলছিলেন, ‘আমি ৩০ বছর ধরে দিল্লিতে ইটভাটায় কাজ করি। ছিটমহলে না খায়া আছনোং। একটা ছেঁড়া লুঙ্গি পরি দিল্লি গেছি। আমরা ভারতে থাকব। ছিটমহলে যে টিনের বাড়ি দেখেন, এগুলা দিল্লিতে কাজ করার টাকায় হইচে।’
যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা অনেকেই ভীতি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। ৮ তারিখ পর্যন্ত কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ার ছড়ায় একজনও ভারতে যাওয়ার জন্য নাম লেখেননি। তাঁদের আশঙ্কা, অনেকেই তাঁদের ওপর আক্রমণ করবেন। ৮ জুলাই বিকেলে ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির দাসিয়ার ছড়া ইউনিটের সভাপতি আলতাব হোসেনের উঠানে বাংলাদেশ-ভারতের অনেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে আমিও উপস্থিত ছিলাম। তাঁদের কাছে ভারতে যেতে আগ্রহীরা নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ করছিলেন। সেখানেই গজেন চন্দ্র বর্মণ অভিযোগ করেন, একজন তাঁর পা কেটে ফেলার হুমকি দিয়েছেন।
বাংলাদেশ-ভারত উভয় অংশের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেয়ে ভারতে যেতে ইচ্ছুকগণ ৯ তারিখ থেকে জরিপে নাম লেখাবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন। উপস্থিত সবার মধ্যে আফতাব হোসেন ভারতে যেতে ইচ্ছুক ছিটমহলবাসীর অভিযোগের বিরোধিতা করেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সবাইকে আশ্বস্ত করেন এবং নিশ্চয়তা দেন, তাঁদের কোনো অসুবিধা হবে না। ফুলবাড়ীর ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাও কেউ কোনো হুমকি দিলে অথবা অসুবিধা সৃষ্টি করলে লিখিত অভিযোগ করার কথা বলেন। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ অংশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা আমাকে বলেন, ‘আমরা কাউকে বাধা দিতে চাই না। যাঁরা ভারতে যেতে চান তাঁদেরও আমরা সহযোগিতা করতে চাই। যাঁরা ভারতে যেতে চান, তাঁরা যেন কারও প্ররোচনায় কান না দেন এবং তাঁরা যেন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ প্রশাসনের কাছে পরামর্শ নেন।’
কৃষ্ণকান্ত বর্মণ নামের একজন বলছিলেন, ‘বাংলাদেশ-ভারত উভয় সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, ভারতে যাওয়া পর্যন্ত দুই সরকার যেন আমাদের নিরাপত্তা দেয়।’ এই আকুতি ভারতে যেতে চাওয়া দাসিয়ার ছড়ার প্রায় সব ছিটমহলবাসীর।
বাংলাদেশ-ভারত উভয় রাষ্ট্রের উচিত, যাঁরা নিজেদের মূল ভূখণ্ডে যেতে চান, তাঁদের নির্বিঘ্ন যাত্রা নিশ্চিত করা। ছিটমহলে যাঁরা থাকবেন এবং যাঁরা ছিটমহল ছেড়ে মূল ভূখণ্ডে যাবেন, তাঁদের সবার জীবনই হোক আনন্দপূর্ণ।
তুহিন ওয়াদুদ: শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
wadudtuhin@gmail.com

ইন্টারনেটের জন্য কালো আইন নয় by মশিউল আলম

বাংলাদেশে ২০০৬ সাল থেকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি আইন) নামে একটি বেশ কঠোর আইন বলবৎ আছে। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করে আরও কঠোর করা হয়েছে। তার পরেও সরকার মনে করছে, সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সাইবার অপরাধ দমন ও সংঘটিত সাইবার অপরাধের বিচার করার উদ্দেশ্যে আরও একটি আইন প্রয়োজন। তাই সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০১৫ নামে নতুন একটি আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ বিভাগের ওয়েবসাইটে আইনটির খসড়া প্রকাশ করে এর ওপর সবার মতামত আহ্বান করা হয়েছে। সন্দেহ নেই যে নাগরিকদের মতামত আহ্বান করা একটা সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত: কোনো আইনের খসড়া প্রণয়ন-প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার রীতি গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রচলিত আছে। এর মধ্য দিয়ে প্রজাতন্ত্রের যেকোনো আইনে জনসাধারণের মতামত প্রতিফলনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এর আগে তথ্য অধিকার আইনের খসড়া প্রণয়ন ও চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং বিপুলসংখ্যক নাগরিকের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটা ভালো তথ্য অধিকার আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায়ও যদি সচেতন নাগরিকেরা নিজেদের মতামত প্রদান করেন এবং সুচিন্তিত ও যুক্তিসংগত মতামতগুলো গ্রহণ করা হয়, তাহলে একটা ভালো আইনের খসড়া প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। এ জন্য নাগরিকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয়।
তবে তার আগে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, সাইবার অপরাধ দমনের জন্য বিদ্যমান আইসিটি আইন যথেষ্ট কি না। এ আইন থাকা সত্ত্বেও সরকার যখন আরেকটি নতুন আইনের খসড়া প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিতে হয়, আইসিটি আইনকে সরকার যথেষ্ট বলে মনে করছে না। কিন্তু কেন সেটি যথেষ্ট নয়, কী ধরনের অপরাধের বিচার এ আইনের দ্বারা করা সম্ভব হচ্ছে না, এবং সেগুলোর বিচারের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটা আইন করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়ার শুরুতে বলা হয়েছে, ‘যেহেতু জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এবং সাইবার অপরাধসমূহের প্রতিকার, প্রতিরোধ, দমন, শনাক্তকরণ, তদন্ত এবং বিচারের উদ্দেশ্যে আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এতদ্দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল—’।
এখন আমরা যদি আইসিটি আইনের দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব, সাইবার নিরাপত্তাসহ উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতিকার আইসিটি আইনের দ্বারাই করা সম্ভব। আইসিটি আইন একটা বিশদ আইন, যার দ্বারা ইন্টারনেট-সংক্রান্ত প্রায় সব ধরনের অপরাধের প্রতিকার করা সম্ভব। সাইবার নিরাপত্তার কথা আইসিটি আইনের শুরুতেই উল্লেখিত আছে: ‘যেহেতু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির আইনগত বৈধতা ও নিরাপত্তা প্রদান এবং আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়; সেহেতু এতদ্দ্বারা নিম্নরূপ আইন করা হইল—’। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির নিরাপত্তাই সাইবার নিরাপত্তা, যাকে ইন্টারনেট নিরাপত্তাও বলা হয়ে থাকে। ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত কম্পিউটারের নিরাপত্তাই সাইবার সিকিউরিটি।
যেকোনো আইন প্রণয়নের লক্ষ্য যেন হয় সর্বসাধারণের অধিকার সুরক্ষা করা, ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের হাতে দমনমূলক হাতিয়ার তুলে দেওয়া নয় সাইবার নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয়, এর সুরক্ষার জন্য অবশ্যই আইন থাকা প্রয়োজন। শুধু রাষ্ট্রীয় বা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কম্পিউটার সিস্টেমের নিরাপত্তা নয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কম্পিউটার সিস্টেমের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। ব্যাংক-বিমাসহ সব ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে এমনকি ব্যক্তিগত ওয়েবসাইটেরও নিরাপত্তা সুরক্ষা নাগরিকদের গৃহের সুরক্ষার মতোই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্য এবং নিরাপত্তা ভঙ্গ হলে যে অপরাধ সংঘটিত হয়, তার প্রতিকারের জন্য একটি আইন ইতিমধ্যে বলবৎ থাকা সত্ত্বেও আরেকটি আইনের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করেছি। আমার সহকর্মী মিজানুর রহমান খান, যিনি আইন বিষয়ে লেখালেখি করেন এবং আইসিটি আইন ও প্রক্রিয়াধীন সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়াটি সম্পর্কে বেশ ভালোভাবে অবগত, তিনি মনে করেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন নামে নতুন আরেকটি আইনের প্রয়োজন নেই, আইসিটি আইনই এ–সংক্রান্ত সব ধরনের অপরাধের বিচার করার জন্য যথেষ্ট। তিনি মনে করেন, একই ধরনের অপরাধের বিচার করার জন্য একাধিক আইন তৈরি করা, একাধিক কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি করা সাধারণভাবে ভালো নয়। যদি সাইবার-সংক্রান্ত কোনো ধরনের অপরাধ আইসিটি আইনের আওতায় না পড়ে এবং প্রযুক্তির প্রসারের ফলে সে ধরনের অপরাধের সংখ্যা যদি বেড়ে গিয়ে থাকে, তাহলে সেসব অপরাধের বিচার করার উপযোগী করে আইসিটি আইনটির হালনাগাদ করাই সমীচীন হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জুলফিকার আহম্মদ, যিনি সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে দায়িত্ব পেয়ে সাইবার নিরাপত্তা আইনটির খসড়া প্রণয়ন করেছেন, তাঁকে টেলিফোনে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আইসিটি আইন থাকার পরেও আরেকটি নতুন আইনের প্রয়োজন আছে কি না। তিনি বলেন, আইসিটি আইন সংশোধন ও হালনাগাদ করা হলে সাইবার নিরাপত্তার জন্য নতুন আরেকটি আইনের প্রয়োজন হতো না।
হাইকোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম, যিনি ২০০৬ সালের আইসিটি আইনের খসড়া প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন, তাঁকেও টেলিফোনে একই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আমি আইসিটি আইন ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলাম। তা যদি করা হয়, তাহলে ওই আইনের আওতায়ই সব রকমের সাইবার অপরাধের বিচার করা সম্ভব হবে, নতুন আইনের প্রয়োজন হবে না।’
আমরা দেখেছি, বিদ্যমান আইসিটি আইন একটা ‘কালাকানুন’ হিসেবে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। কারণ, ওই আইনে সাইবার-সম্পর্কিত অপরাধগুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি, কিন্তু দণ্ডের মেয়াদ অতি উচ্চ (সর্বোচ্চ ১৪ বছর কারাদণ্ড বা এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড)। আর একটি বড় আপত্তির বিষয়, আইসিটি আইনে সর্বনিম্ন সাজার মেয়াদ সাত বছর কারাদণ্ড বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে ওই আইনে অত্যন্ত লঘু অপরাধেও গুরুদণ্ড পাওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে। তা ছাড়া, ওই আইনের আওতায় বিচারযোগ্য অভিযোগকে আমলযোগ্য ও জামিনের অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে। এগুলো আসলে ভালো আইনের বৈশিষ্ট্য নয়, সে জন্য আইসিটি আইনের সংশোধনের দাবি উঠেছিল এবং সে দাবি এখনো যৌক্তিক রয়ে গেছে।
এবার সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০১৫ নামে যে নতুন আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে, সেখানে সাইবার অপরাধের সর্বোচ্চ সাজার মেয়াদ ২০ বছর কারাদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। তা ছাড়া, সন্দেহজনক কোনো কম্পিউটার জব্দ করতে প্রয়োজনে দরজা-জানালা ভেঙে প্রবেশ করাসহ যেকোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সাইবার প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধবৃত্তি দমনের লক্ষ্যে আইন প্রণয়নের বিকল্প নেই। কিন্তু আইন যদি এত কঠোর হয় যে তাকে কালাকানুন বলতে হয়, তাহলে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা, নাগরিকদের গোপনীয়তা সুরক্ষার অধিকারসহ গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো খর্ব হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়। কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। সাইবার অপরাধ দমনের আইনি হাতিয়ার তৈরি করতে গিয়ে সরকার যেসব কালাকানুন তৈরি করছে, তার ফলে বিরাট ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার। প্রাতিষ্ঠানিক গোপনীয়তার সুরক্ষা ব্যবস্থাও ভেঙে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয়, যদি সরকার কোনো প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশের ঘটনার তদন্ত ও বিচার করতে গিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানের গোপনীয় তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকারের বিধান করে। এই যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে সাইবার সিকিউরিটি ইনফরমেশন শেয়ারিং অ্যাক্ট নামে একটি প্রস্তাবিত আইন সিনেটে পাস হয়নি।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে নতুন নতুন আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা এক বাক্যে উড়িয়ে না দিয়েও বলা যায়, যেকোনো আইন প্রণয়নের লক্ষ্য যেন হয় সর্বসাধারণের অধিকার সুরক্ষা করা, ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের হাতে দমনমূলক হাতিয়ার তুলে দেওয়া নয়।
মশিউল আলম: সাংবাদিক
mashiul.alam@gmail.com

বাল্যবিবাহ দিতে নির্যাতন: স্কুলে যেতে চায় তানজিলা

বাল্যবিয়েতে রাজি না হওয়ায় নির্যাতনের শিকার বরগুনা সদর উপজেলার ছোট গৌরীচন্ন গ্রামের তানজিলা আক্তার বিদ্যালয়ে যেতে চায়। বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তানজিলার নিরাপত্তা ও তার পড়াশোনা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে নারী অধিকার-বিষয়ক স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা ‘জাগো নারী’।
বাল্যবিয়ে থেকে রক্ষা পেতে গত পবিত্র রমজান মাসে চাচা পান্না খানের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল তানজিলা। এ কারণে পান্নাসহ চারজনের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগে মামলা করেন তানজিলার মা হেলেনা বেগম। গত মঙ্গলবার দুপুরে বরগুনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আদালতে করা মামলায় তানজিলাকে প্রধান সাক্ষী করা হয়েছে।
এদিকে নির্যাতনের দায়ে তানজিলার দায়ের করা মামলায় তাঁর মা-বাবা গত মঙ্গলবার দুপুরে বরগুনার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিমের আদালতে হাজির হন। আদালত সূত্র জানায়, বিচারক নোমান মাইনুদ্দিন তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেছেন। তবে এ মামলায় গ্রেপ্তার তানজিলার বোন জেসমিন ও ভগ্নিপতি মিলনের জামিন নামঞ্জুর করা হয়। মামলার অন্য আসামি গ্রাম্য ওঝা সালমা বেগম পলাতক আছেন।
মামলার আরজিতে হেলেনা বলেন, তাঁর মেয়ে তানজিলা গত রোববার সকালে বাড়ি থেকে প্রাইভেট পড়তে বের হয়। সে সময় তাঁর (হেলেনা) চাচাশ্বশুর এনায়েত খান (৫০), ভাশুর আলমগীর খান (৪৫), জব্বার খান (৫৫), দেবর পান্না খান (৪০) মেয়েকে অপহরণ করেন। মামলাটি আদালত গ্রহণ করে আদেশের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন।
তানজিলা গৌরীচন্ন নওয়াব সলিমুল্লাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী। পড়াশোনার নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে মা-বাবাসহ সবার সহযোগিতা চেয়েছে সে। জাগো নারীসহ কয়েকটি সংগঠনের নেতারা মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালে তানজিলার সঙ্গে দেখা করতে যান। সে সময় সে তাঁর ইচ্ছার কথা জানায়।
গতকাল বুধবার দুপুরে তানজিলা প্রথম আলোকে বলে, ‘আমার বাবা-মা, বোন-ভগ্নিপতি মিলে বাড়ির পাশের এক রিকশাচালকের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়ার আয়োজন করলে আমি চাচার বাড়িতে আশ্রয় নিই। আমার তিন চাচা ও দাদা আমার পাশে দাঁড়ানোয় প্রতিহিংসাবশত তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।’
তানজিলার চাচা পান্না মিয়া বলেন, ‘গত রমজান মাসে তানজিলাকে বাড়ির পাশের এক রিকশাচালকের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে সে আমার বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয়। আমার ভাইয়ের এসব অন্যায় সিদ্ধান্তে একমত হতে না পারায় এখন মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে আমাদের বিরুদ্ধে।’
তানজিলার বাবা জাহাঙ্গীর খান বলেন, ‘আমি মেয়েকে বিয়ে দিতে চাইনি। একজনের সঙ্গে ওর সম্পর্ক আছে শুনে বাড়ির পাশের দিনমজুর এক ছেলের সঙ্গে বিয়ের আলোচনা করেছিলাম।’
গৌরীচন্ন নওয়াব সলিমুল্লাহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমুল ফারুক বলেন, ‘তানজিলার বাবা মেয়েকে বিয়েতে রাজি করাতে কিছুদিন আগে আমার শরণাপন্ন হয়েছিলেন। আমি তাঁকে বলে দিয়েছি, এটা আইনবিরুদ্ধ। ওর ছোট বোন তামান্নাও আমার বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। মাস দুয়েক আগে তাকেও বিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বয়সের কারণে ওর পরিবার সেটা গোপন রেখেছে।’
জাগো নারীর প্রধান নির্বাহী হোসনে আরা বলেন, হাসপাতালে তানজিলার নিরাপত্তা দেওয়া দরকার। সে যাতে আবার বিদ্যালয়ে ফিরে যেতে পারে সে জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসনকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।
বরগুনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রিয়াজ হোসেন বলেন, তানজিলার নিরাপত্তার জন্য হাসপাতালে পুলিশের নজরদারির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

দ্রুত বিচার দাবির মুখেও তদন্ত গড়াচ্ছে ৫ মাসে by উজ্জ্বল মেহেদী

শিশু সাঈদ হত্যা
সিলেটে স্কুলছাত্র আবু সাঈদকে অপহরণ করে পরিবারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল। মুক্তিপণের টাকা জোগাড়ও করেছিলেন পরিবারের সদস্যরা। এরই মধ্যে সাঈদ অপহরণকারী ব্যক্তিদের চিনে ফেলায় শেষে টাকা না নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন পুলিশের একজন সদস্য। আলোচিত এ হত্যার ঘটনায় সিলেট নগরের খুদে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে দ্রুত বিচারের দাবি ওঠে।
ঘটনার পরপরই খুনিরা ধরা পড়ায় ও আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় বিচার দ্রুত হবে—এমন আশাই ছিল সবার। তবে ঘটনার পাঁচ মাস কেটে গেলেও পুলিশ এখনো অভিযোগপত্রই (চার্জশিট) দাখিল করতে পারেনি। দ্রুত বিচার দাবির মুখেও তদন্ত গড়াচ্ছে পাঁচ মাসে। গতকাল মঙ্গলবার এ ঘটনার পাঁচ মাস পূর্ণ হয়েছে।
সিলেট নগরের রায়নগরের বাসিন্দা মতিন মিয়ার ছেলে আবু সাঈদ (৯) গত ১১ মার্চ অপহৃত হয়েছিল। রায়নগরের হাজি শাহমীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র সাঈদকে অপহরণ করে অপহরণকারীরা ওই দিনই পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। দুদিন পর ১৪ মার্চ রায়নগরের পাশের এলাকা কুমারপাড়ার ঝরনারপাড় মহল্লায় পুলিশের কনস্টেবল এবাদুর রহমানের বাসা থেকে শিশু সাঈদের বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার হয়। অপহরণের পর চিনে ফেলায় সাঈদকে হত্যা করে লাশ গুম করতেই বস্তায় ভরা হয়েছিল। এ ঘটনায় মতিন মিয়া বাদী হয়ে পরদিন কোতোয়ালি থানায় ধরা পড়া তিনজন ও অজ্ঞাত আরও দুজনকে আসামি করে মামলা করেন।
ঘটনার সঙ্গে পুলিশ জড়িত থাকায় নগরজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সিলেটের ‘হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার ফোরাম’ সংগঠক লক্ষ্মীকান্ত সিংহ বলেন, শিশু সাঈদ হত্যাকাণ্ডে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্য ও তাদের ‘সোর্স’ জড়িত থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভের মাত্রা ছিল বেশি। প্রতিটি প্রতিবাদ-বিক্ষোভ কর্মসূচি থেকে একটিই দাবি উচ্চারিত হয়েছিল—শিশু সাঈদ হত্যার দ্রুত বিচার। কিন্তু পাঁচ মাসেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় দ্রুত বিচারের দাবিটি পূরণের আশা এখন দুরাশায় পরিণত হয়েছে।
সাঈদের বাবা মতিন মিয়ার বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার খাসিলা গ্রামে। গৃহস্থ পরিবার, ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার জন্য নগরের রায়নগর দরজিবন্দ এলাকায় থাকতেন। সাঈদের মামাসহ নিকটাত্মীয়রা প্রবাসী। সবার আদরের সাঈদহীন পরিবারে এখনো চলছে শোকের মাতম।
দুই ভাই, এক বোনের পরিবারে সাঈদ ছিল মেজো। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সাঈদের একজন নিকটাত্মীয় প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে এক পুলিশ সদস্য জড়িত থাকায় শুরুতে আমরা এ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম। কিন্তু পরে পুলিশের ভূমিকা আমাদের কাছে সন্তোষজনকই মনে হয়েছিল। এখন পাঁচ মাসেও তদন্ত শেষ না হওয়ায় হতাশা ভর করছে।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অপহরণ ও হত্যায় জড়িত পুলিশ কনস্টেবল এবাদুরের বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে। তিনি ২০১০ সাল থেকে মহানগর পুলিশে কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ মহানগর পুলিশের বিমানবন্দর থানায় কর্মরত অবস্থায় এ ঘটনা ঘটে। সাঈদের পরিবারের সঙ্গে এবাদুর পূর্বপরিচিত ছিলেন। লাশ উদ্ধারের পরপরই পুলিশের কাছে এবাদুরের দেওয়া স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে ওই রাতেই সিলেট জেলা ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক এন ইসলাম তালুকদার ওরফে রাকীব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কথিত সোর্স হিসেবে পরিচিত গেদা মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওলামা লীগ নেতা রাকীবের বাড়ি সিলেটের ওসমানীনগর। সোর্স গেদা কুমারপাড়ার বাসিন্দা।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৫ মার্চ এবাদুর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ১৬ মার্চ রাকীবও জবানবন্দি দেন। গেদাকে দুই দফা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর ২২ মার্চ আদালতে জবানবন্দি দেন। আদালতের কাছে তিনজনই অপহরণ ও খুনের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন। টাকার জন্য অপহরণ ও পরে সাঈদ তাঁদের চিনে ফেলায় এই হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে তিনজনই স্বীকার করেন।
যোগাযোগ করলে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. রহমত উল্লাহ গতকালও বলেন, ‘তদন্ত চলছে।’ পাঁচ মাসেও তদন্ত শেষ না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ঘটনাটি স্পর্শকাতর। এক পুলিশও জড়িত। গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করায় একটু দেরি হচ্ছে। এখানে হতাশার কিছু নেই, শিগগির অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।’

তালার পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার: জলাবদ্ধতা দূর করতে ডুবিয়ে মারার ফাঁদ! by কল্যাণ ব্যানার্জি

জোয়ারাধারের সঙ্গে কপোতাক্ষ নদের সংযোগ
খালের মুখের বাঁধ গতকাল ভেঙে যায়। প্রবল
স্রোতে পানি ঢোকে লোকালয়ে -জাহিদুল করিম
কপোতাক্ষ নদ সচল করা ও এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য সাতক্ষীরার তালা উপজেলার পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার (টিআরএম-টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) চালু করা হয়। স্থানীয় লোকজনেরও অভিযোগ, নকশা অনুযায়ী বাঁধ না করেই জোয়ারাধার চালু করার ফলে সেটি এখন ডুবিয়ে মারার ফাঁদে পরিণত হয়েছে।
জোয়ারাধারের সঙ্গে কপোতাক্ষ নদের সংযোগ খালের মুখে স্থানীয় লোকজন ১২ দিন চেষ্টা করে বাঁধ দেওয়ার তিন দিন পর গতকাল মঙ্গলবার তা ভেঙে গেছে। সংযোগ খালে দুই পাশের বাঁধ দ্রুত ধসে যাচ্ছে। ফলে ৩০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দী হওয়ার আশঙ্কা করছে। ওই বাঁধ ভাঙার আগেই বিভিন্ন স্থানে বাঁধের ছিদ্র দিয়ে পানি ঢুকে ছয়টি গ্রাম প্লাবিত হয়।
জোয়ারাধারের সংযোগ খালের ধসে যাওয়া বাঁধ এলাকায় কথা হয় দোহার গ্রামের ইমাদুল হক শেখ, শ্রীমন্তকাটি গ্রামের আফিলউদ্দীন ও শুভকরকাটি গ্রামের আবদুল মালেকের সঙ্গে। তাঁদের অভিযোগ, নকশা অনুযায়ী বাঁধ না করেই জোয়ারাধার চালু করা হয়েছে। ফলে জলাবদ্ধতা থেকে বাঁচানোর জন্য করা জোয়ারাধার এখন ডুবিয়ে মারার ফাঁদ হয়েছে। তাঁরা অভিযোগ করেন, এলাকাবাসীর মতামত উপেক্ষা করে বর্ষার মধ্যেই গত ১১ জুলাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা জোয়ারাধার চালু করার জন্য সংযোগ খালের মুখ কেটে দেন। তাঁরা জানান, এক মাস ধরে বৃষ্টি হওয়ায় ও জোয়ারাধারের বেসিনে জমা পানিতে কয়েকটি এলাকা ডুবে গেছে। ১২ দিন চেষ্টা করে স্থানীয় প্রচেষ্টায় সংযোগ খালের ওই মুখে বাঁধ দেওয়া হয়। গতকাল ভোরে তা ধসে যাওয়ায় আটুলিয়া, দোহার, বালিয়া, সাতপাকিয়া, গৌতমকাটিসহ অন্তত ৩০টি গ্রামে পানি উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সংযোগ খালের পাশে গালে হাত দিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বসে ছিলেন সাতপাখিয়া গ্রামের নার্গিস বেগম। তিনি জানালেন, জলাবদ্ধতার কারণে তাঁরা দেড় মাস বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র ছিলেন। কয়েক দিন আগে সংযোগ খালের মুখ বাঁধ দেওয়ায় পানি ঢোকা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বাড়ি ফিরে এসেছেন সোমবার। গতকাল বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় তিনি আবারও চিন্তায় পড়েছেন।
স্থানীয় খেসরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী বলেন, ‘বর্তমানে ভাটা চলছে, তাতেই যেভাবে পানি লোকালয়ে ঢুকছে, জোয়ারের সময় কী হয় কে জানে!’ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দূরদর্শিতার অভাবে এ ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, কপোতাক্ষ নদ সচল করতে ২৬২ কোটি টাকার চার বছর মেয়াদি প্রকল্পের ২০১১ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়। এ প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ২০১২-১৩ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে পাখিমারা বিলে জোয়ারাধার চালু করার কথা। এ জন্য জমির ক্ষতিপূরণ ও বাঁধ নির্মাণ বাবদ ব্যয় ধরা হয় ১৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। ১ হাজার ৫৬১ দশমিক ৯৬ একর একর জমির ওপর জোয়ারাধার বাস্তবায়ন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জোয়ারাধার চালু করার জন্য বাঁধ নির্মাণ করতে হবে ১২ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার। বাঁধের তলদেশ হবে ৪০ থেকে ৫০ মিটার, উচ্চতা হবে ৩ থেকে ৪ মিটার ও উপরিভাগ হবে ৩ মিটার।
গতকাল সরেজমিন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জোয়ারাধারের জন্য নির্মিত বাঁধ প্রাক্কলন অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়নি অনেক স্থানে। প্রায় ১৩ কিলোমিটার লম্বা এ বাঁধের ২০ থেকে ২৫টি স্থানে ত্রুটি চোখে পড়বে যে কারও। বাঁধের উচ্চতা দুই থেকে আড়াই মিটারের বেশি হবে না। তলদেশও কম রয়েছে অধিকাংশ স্থানে। বিশেষ করে মাধবখালি, দোহার, গৌতমকাটি, সাতপাখিয়া, তেঘরিয়া, বিটেরচক এলাকায় বাঁধের অবস্থা নাজুক। এসব স্থানের বাঁধ মেরামত না করে তড়িঘড়ি করে গত ১১ জুলাই জোয়ারাধার চালু করা হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে। মেরামত না করে জোয়ারাধার চালু করায় ওই সব এলাকা দিয়ে ছিদ্র হয়ে লোকালয়ে পানি ঢুকে ছয়টি গ্রামে জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী জানান, বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাওয়ায় তাঁরা কয়েক দিন ধরে পানিতে পচনশীল নয় এমন বস্তায় বালু ভরে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কিন্তু এলাকার মানুষ তাঁদের কাজ করতে দিচ্ছে না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অত বড় বেসিনের জন্য যত বড় সংযোগ খাল কাটা দরকার ছিল, তা কাটতে পারেননি। ফলে জোয়ারের সময় ওঠা পানি নামার আগেই আবার জোয়ার এসে যায়। তিনি দাবি করেন, এক বছর এমন হতে পারে। পরে ঠিক হয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন, এলাকার মানুষ কাজ করতে দিলে তাঁরা সংযোগ খালের ধসের স্থানসহ জোয়ারাধারের বাঁধ মেরামতের কাজ করবেন।
তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুর রহমান জানান, পরিকল্পিত ও নকশা অনুযায়ী কাজ না করার বিষয়টি তিনি পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান হিসেবে একাধিকবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টদের অবহিত করেছেন। কিন্তু তারা গুরুত্বসহকারে পরামর্শ নেয়নি। তারপর কপোতাক্ষ নদ খনন না করেই জোয়ারাধার চালু করার পাশাপাশি বর্ষাকালে এটি চালু করায় সমস্যা বেড়েছে। তিনি বলেন, গতকাল সকালে তিনি সংযোগ খাল এলাকা পরিদর্শন করে দেখেছেন, আসলে পাশের বাঁধ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

ভুয়া পরোয়ানায় ৭ দিন কারাবাস

ঢাকার একটি আদালতের নাম, সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে পাঠানো ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেপ্তার হয়ে সাত দিন কারাবাস করেছেন সুনামগঞ্জের এক ব্যক্তি। গতকাল বুধবার তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
ধীরেন্দ্র কুমার দাস (৩৩) নামের ওই ব্যক্তির বাড়ি জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার শিমুলবাক ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামে। পুলিশ ৫ আগস্ট গভীর রাতে তাঁকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঢাকার মতিঝিল থানায় দায়ের করা একটি চেক প্রত্যাখ্যানের মামলায় মহানগর হাকিমের আদালত থেকে ধীরেন্দ্র কুমার দাসের বিরুদ্ধে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আসে। এরপর দক্ষিণ সুনামগঞ্জ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম তাঁকে গ্রেপ্তার করেন।
ধীরেন্দ্র কুমার দাস জানান, গ্রেপ্তারের সময় পুলিশকে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর নামে কোনো মামলা নেই। কিন্তু পুলিশ তা না শুনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেয়। তিনি বলেন, ‘আমার নামে ব্যাংকে কোনো হিসাব নম্বর নেই। আমি কীভাবে অন্যকে চেক দেব। আমার মনে হয়, পুলিশ কারও দ্বারা প্ররোচিত হয়ে আমাকে গ্রেপ্তার করেছে।’
ধীরেন্দ্র কুমারের ভগ্নিপতি অবনি কান্ত দাস জানান, ঢাকার সংশ্লিষ্ট আদালতে খোঁজ করে ধীরেন্দ্র কুমার দাসের বিরুদ্ধে কোনো মামলার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এরপর গত মঙ্গলবার ওই আদালতে ভুয়া পরোয়ানার বিষয়টি জানিয়ে তাঁর মুক্তির আবেদন করলে আদালত মুক্তির আদেশ দেন।
এসআই শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় আসার পর আমি তাঁকে গ্রেপ্তার করেছি। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।’

‘২০-দলীয় জোট নিয়ে সংশয় নেই’

২০-দলীয় জোটের আজকের বৈঠকে নেতারা
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট আগে যেমন ছিল, তেমনি আছে। জোট নিয়ে কোনো সংশয় নেই। আজ বুধবার ২০-দলীয় জোটের সভায় শীর্ষ নেতাদের সভায় এ বিষয়গুলো আলোচনা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে জোটের শীর্ষ নেতাদের এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া ২০-দলীয় জোট নির্দলীয় সরকার ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে যাবে না বলেও সভায় আলোচনা হয়।
আগামীকাল সকালে জোটের মহাসচিব পর্যায়ের নেতাদের বৈঠক শেষে সভার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
আজকের সভায় উপস্থিত একটি দলের শীর্ষ নেতা প্রথম আলোকে বলেন, আজকের বৈঠকে মূলত ২০-দলীয় জোট নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে জোটে ভাঙন, জামায়াতের জোট ছাড়াসহ ইত্যাদি বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। এমনকি বিএনপি নেতাদের কেউ কেউও এ নিয়ে কথা বলেছেন। এ পরিস্থিতিতে বৈঠকে ২০-দলীয় জোট ঠিক থাকছে কি না, বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তিনি বলেন, আলোচনা শেষে এ বিভ্রান্তি কেটে গেছে। সবাই জোটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটের অপর শীর্ষ নেতা বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা অবদান রেখেছিলেন, তাদের যেভাবে সম্মানিত করা হয়েছে; বিএনপির সাম্প্রতিক আন্দোলনে যারা অবদান রেখেছেন তাদেরও সেভাবে সম্মানিত করা হবে বলে সভায় একমত হন জোটের নেতারা। পাশাপাশি যারা আন্দোলনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যাপারেও একমত হন তাঁরা। তবে এ বিষয় এখনই কোনো ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে না। খালেদা জিয়া পরবর্তীতে এ ঘোষণা দিতে পারেন।
ওই নেতা আরও বলেন, খালেদা জিয়া অনেক দিন পর দেশের বাইরে যাচ্ছেন, তাই বৈঠকটি মূলত সৌজন্য বৈঠকের মতো হয়। গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় বৈঠকে আলোচিত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জায়গায় শিশু নির্যাতন, ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সভায় আলোচনা হয়।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সভায় সভাপতিত্ব করেন। এ ছাড়া সভায় উপস্থিত ছিলেন, এলডিপির সভাপতি অলি আহমদ, জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান কাজী জাফর আহমদ, জাগপার সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ নেজামী ও জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য আবদুল হালিমসহ জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা।

আইন ভেঙেই চলছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বলছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিকাংশই আইন মানছে না। আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেরাই উপাচার্য বরখাস্ত করছে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে না গিয়ে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনো ভাড়া বাড়িতেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় আইনানুযায়ী ৬ শতাংশ গরিব শিক্ষার্থীকে বিনা বেতনে পড়ায় না। মনোনীত সদস্যদের সিন্ডিকেট সভায় আমন্ত্রণ জানায় না।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে দেওয়া প্রতিবেদনে ইউজিসি এসব কথা বলেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমস্যা নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার উপাচার্য ও ট্রাস্ট্রি বোর্ডের চেয়ারম্যানদের বৈঠকে ডেকেছে ইউজিসি।
জানতে চাইলে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সার্বিক সমস্যা নিয়েই আজ আলোচনা হবে।’
ইউজিসির একটি সূত্র জানায়, এই সভা থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষকে বিভিন্ন ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হবে।
ইউজিসির প্রতিবেদন বলা হয়েছে, পুরোনো ৫২টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ১৭টি নির্ধারিত পরিমাণ জমিতে নিজস্ব ক্যাম্পাস করেছে। গত ডিসেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আচার্য হিসেবে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্ট্রি বোর্ড রাষ্ট্রপতির নিয়োগ করা ব্যক্তিদের বেআইনিভাবে তাঁদের পদ থেকে বরখাস্ত করছে। এটি আচার্যের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল।
ইউজিসি বলছে, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষদের দ্বন্দ্ব হচ্ছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যালয়ে স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট পরিচালনার বিধিমালা অনুসরণ করছে না। সরকার ও ইউজিসির মনোনীত সদস্যদের সভায় আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে না। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সংরক্ষিত তহবিলের টাকা তুলে নিচ্ছে। কেউ এই টাকার বিপরীতে ঋণ নিচ্ছে। অনেকের মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি ও লাইব্রেরি নেই। গবেষণাতে আগ্রহ কম। বেশ কয়েকটিতে নিয়মিত উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যও নেই।
ইউজিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আটটি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনহীন ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। এর মধ্যে আছে দারুল ইহসান, সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি, আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়।
আর অতীশ দীপঙ্কর ইউনিভার্সিটির অনুমোদনহীন ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করা হয়েছে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি দুটি ক্যাম্পাস বন্ধের কথা জানালেও ইউজিসি বলছে, পরিদর্শন করে মতামত দেওয়া হবে।
ইউজিসির একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আজকের সভা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

আগে প্রশ্ন করা শিখতে হবে -রাজশাহীতে আঞ্চলিক বিজ্ঞান জয়োৎসবে বক্তারা

নিজের ভেতর উদ্ভাবনী শক্তি জাগাতে হলে আগে প্রশ্ন করা শিখতে হবে। প্রশ্ন করা শিখলে শিক্ষার্থীরা স্বপ্ন দেখা শিখবে। তারা স্বপ্ন পূরণের জন্য কাজ করবে। রাজশাহীতে শনিবার আঞ্চলিক বিজ্ঞান জয়োৎসবে বক্তারা এ কথা বলেন। সিটি ব্যাংক-প্রথম আলোর উদ্যোগে আয়োজিত জমজমাট ওই উৎসবে তিনটি বিভাগে ৫২৬ জন প্রতিযোগী বিজ্ঞান কুইজে এবং ৪১টি বিজ্ঞান প্রকল্পে প্রায় ১২৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এর মধ্যে বিজ্ঞান কুইজে ৩০ জন ও ১১টি বিজ্ঞান প্রকল্পে অংশ নিয়ে ৩০ জন বিজয়ী হয়। বিজয়ীরা ঢাকায় জাতীয় জয়োৎসবে অংশ নেবে।
উৎসবে বক্তারা বলেন, শিক্ষকদের প্রশ্ন শিখিয়ে দেওয়া উচিত নয়, একইভাবে অহেতুক নম্বর দেওয়াও উচিত নয়। শুধু শুধু নম্বর পেলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ছেড়ে দেবে। অভিভাবকদেরও নম্বরের পেছনে ছোটা উচিত নয়।
বেলুন উড়িয়ে আঞ্চলিক বিজ্ঞান জয়োৎসবের উদ্বোধন করা হয়। সিটি ব্যাংক-প্রথম আলোর উদ্যোগে রাজশাহী ​শিল্পকলা একাডেমীতে এ উৎ​সবের আয়োজন করা হয়। ছবি: শহীদুল ইসলাম
বক্তারা বলেন, বিজ্ঞান চর্চা শুধু গবেষণাগারের কাজ নয়, আমাদের চার পার্শ্বের জগতে বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে সেটা দেখতে হবে। এই কাজটা নিজের বাড়িতেই সাধারণ জিনিসপত্র নিয়েই করা যায়। আর প্রতিদিন নতুন জিনিস আবিষ্কার করতে হবে-এটাও বিজ্ঞানের কাজ নয়। এমন একটি জিনিস তৈরি করতে হবে, সারা জীবন যেন সেটার উপযোগিতা পাওয়া যায়।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তারা আরও বলেন, দেশকে ভালোবাসতে হবে, মাকে ভালোবাসতে হবে। এ জন্য বাড়তি কিছু করার দরকার নেই। নিজের কাজটা ভালো করে করলেই দেশ উপকৃত হবে। মা খুশি হবেন। বক্তারা কুশিক্ষা থেকে শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, কুশিক্ষা অশিক্ষার চেয়ে ভয়ংকর। কুশিক্ষা মানুষকে আদর্শহীন ও লোভী হতে শেখায়। অজ্ঞানতা থেকেই এগুলো আসে। এ জন্য অজ্ঞানতা থেকে বেরিয়ে এসে জ্ঞানকে বুঝতে হবে।
বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রকল্প ঘুরে দেখেন বিচারকেরা। ৪১টি বিজ্ঞান প্রকল্পে প্রায় ১২৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ছবি: শহীদুল ইসলাম
বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রকল্প ঘুরে দেখেন বিচারকেরা। ৪১টি বিজ্ঞান প্রকল্পে প্রায় ১২৬ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়। ছবি: শহীদুল ইসলাম
রাজশাহী অঞ্চলের এ উৎসবে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর জেলার ৪৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। পুরো উৎসবে সহযোগিতা করেন রাজশাহী বন্ধুসভা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যায় ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ বন্ধুসভার বন্ধুরা।
সকাল নয়টায় রাজশাহী শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনের সামনে উৎসবের বেলুন ওড়ানো হয়। এরপর মিলনায়তনে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে উদ্বোধনী পর্ব শুরু হয়। উদ্বোধন করেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক মেজবাহ্‌ উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘২০২১ সালে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। তারপর আমরা বসে থাকব না। ২০৪১ সালের আরেকটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য আমরা কাজ করে যাব। তখন আমরা থাকব না। তোমরাই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। তোমরা একটি বিজ্ঞানমনস্ক জাতি হিসেবে গড়ে উঠবে।’
বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রকল্প ঘুরে দেখেন বিচারকেরা। ছবি: শহীদুল ইসলাম
বিভিন্ন বিজ্ঞান প্রকল্প ঘুরে দেখেন বিচারকেরা। ছবি: শহীদুল ইসলাম
উদ্বোধনী পর্বের পর তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক, নিম্নমাধ্যমিক ও মাধ্যমিক—এ তিনটি বিভাগে ৪০০ জন শিক্ষার্থী ৩০ মিনিটের কুইজ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এরপর খুদে শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞানের ‘আনন্দ’ পর্বে অংশ নেয়। এতে মজার মজার কুইজের উত্তর দিয়ে শিক্ষার্থীরা পুরস্কার জিতে নেয়।
প্রকল্পগুলো মূল্যায়নের জন্য বিচারকের দায়িত্বে ছিলেন রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ আব্দুস সামাদ মণ্ডল, রাজশাহী কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আ ন ম আল মামুন চৌধুরী, রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ব্রজেন্দ্রনাথ সরকার, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ের শিক্ষক আব্দুস সালাম, রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ফারাহ্‌ নাজ আহমেদ ও ইউসেপ-রাজশাহী বিদ্যালয়ের শিক্ষক মাসুদ রানা।
প্রশ্নোত্তর পর্বে উত্তর দিচ্ছে এক শিক্ষার্থী। ছবি: শহীদুল ইসলাম
প্রশ্নোত্তর পর্বে উত্তর দিচ্ছে এক শিক্ষার্থী। ছবি: শহীদুল ইসলাম
বেলা দেড়টায় সমাপনী পর্ব শুরুর আগে সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক পর্বে ‘আলোকের এই ঝরনাধারায়’, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’ ও ‘আমরা সবাই রাজা’-গান তিনটি পরিবেশন করেন বন্ধুসভার বন্ধু দৃষ্টি, নন্দিতা মল্লিক ও রেজাউল করিম।
সমাপনী পর্বে বিচারকদের সঙ্গে মঞ্চে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক অরুন কুমার বসাক ও সিটি ব্যাংকের সহকারী ব্যবস্থাপক আবু সায়েদ ও প্রথম আলোর যুব কর্মসূচির সমন্বয়কারী ও বিজ্ঞান জয়োৎসবের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী মুনির হাসান। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন রাজশাহী বন্ধুসভার বন্ধু ফারুক হোসেন ও প্রথম আলোর রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন মুনির হাসান। প্রতিযোগিতায় প্রাথমিকে ১০ জন, নিম্নমাধ্যমিকে ১০ জন ও মাধ্যমিকে ১০ জন করে মোট ৩০ জন প্রতিযোগী কুইজ বিজয়ীকে পদক ও সনদ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিজ্ঞান প্রকল্পে ১১টি প্রকল্প পুরস্কৃত হয়েছে।
অতিথিদের সঙ্গে বিজয়ী ​শিক্ষার্থীরা। এ উৎসবে তিনটি বিভাগে বিজ্ঞান কুইজে ৩০ জন ও ১১টি বিজ্ঞান প্রকল্পে অংশ নিয়ে ৩০ জন বিজয়ী হয়। বিজয়ীরা ঢাকায় জাতীয় জয়োৎসবে অংশ নেবে। ছবি: শহীদুল ইসলাম

১১ বছরে ৬২ হাতি মেরেছে মানুষ by ইফতেখার মাহমুদ

হাতির বিচরণ। টেকনাফের সংরক্ষিত বন
থেকে গত মাসে তোলা ছবি lসুলতান আহমেদ
হাতির সঙ্গে কিন্তু মানুষের বেশ কিছু মিল রয়েছে। মানুষকে বলা হয় সমাজবদ্ধ প্রাণী, হাতিও তাই। হাতি বাঁচে মানুষের মতোই, ৬০ থেকে ৭০ বছর। হস্তিনী মানুষের মতোই সন্তান জন্ম দেওয়া শুরু করে ১৫ থেকে ২০ বছর বয়সে।
মানুষের সঙ্গে এত সব মিল থাকা সত্ত্বেও হাতির সবচেয়ে বড় শত্রু কিন্তু মানুষই। গত ১১ বছরে শুধু বাংলাদেশেই মানুষের হাতে ৬২টি হাতি মারা পড়েছে। এই হিসাব বন বিভাগের। এর আগের হিসাব বন বিভাগের কাছে নেই। তিন বছর ধরে মানুষের হাতে হাতির মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। অন্যদিকে হাতির আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা কমছে।
বন বিভাগের হিসাবে, ২০১০ সালে দেশে মানুষের হাতে মারা পড়েছে চারটি হাতি। ২০১১, ২০১২ ও ২০১৩ সালে পাঁচটি করে ও ২০১৪ সালে হাতি মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে সাতটিতে দাঁড়িয়েছে। আর গত সাত মাসে তিনটি হাতিকে মেরে ফেলেছে গ্রামবাসী।
এ ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান প্রথম আলোকে বলেন, হাতির বসতি ও চলার পথ দখল করে মানুষ অবকাঠামো গড়ে তুলছে। আর হাতি ওই পথ ধরে এগোলেই বলা হচ্ছে মানুষের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। এতে মানুষও মারা যাচ্ছে, হাতিও মরছে। দেশের বৃহত্তম এই প্রাণীটিকে রক্ষা করতে হলে এর চলার পথ বা করিডর ও বসতি রক্ষা করা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
হাতি রক্ষায় বিশ্বজুড়ে আন্দোলনের অংশ হিসেবে আগামীকাল বিশ্ব হাতি দিবস পালিত হবে। এবারের হাতি দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ‘হাতি করলে সংরক্ষণ, রক্ষা পাবে সবুজ বন’। তবে কয়েক বছর ধরে দেশে মানুষের হাতে হাতি মৃত্যুর যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তা কিন্তু ওই স্লোগানের উল্টো চিত্রই মনে করিয়ে দেয়।
বন বিভাগ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণবিষয়ক বৈশ্বিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) চলমান হাতি জরিপের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী দেশে বড়জোর ২০০ হাতি রয়েছে। অথচ ২০০৪ সালে আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী দেশে হাতি ছিল ২৭৯ থেকে ৩২৭টি। এর মধ্যে ১৯৬ থেকে ২২৭টি হাতি বাংলাদেশে আবাসিক বা স্থায়ীভাবে বাস করে। আর বাকিগুলো ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারজুড়ে বিচরণ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ায় হাতির বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুস আলী প্রথম আলোকে বলেন, অভিবাসী হাতিদের কাঁটাতারের বেড়ার কারণে যাতে বিচরণে সমস্যা না হয়, সে জন্য ভারতের বন বিভাগের সঙ্গে আলোচনা চলছে। আর হাতির করিডর বা বিচরণ পথগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চলাফেরায় হাতি মানুষের চেয়ে স্বাধীন। এরা রাষ্ট্রের সীমানা মানে না। এরা বোঝে কোন বনে তাদের খাবার আছে, চলাফেরার ভালো পরিবেশ আছে। সেই পথ ধরেই এরা চলে, বসবাস করে। স্বভাবের এই প্রাকৃতিক নিয়মও হাতির জন্য কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। নির্দিষ্ট পথে চলার এই স্বভাবের কারণে মানুষ এদের সহজে আক্রমণ করতে পারে। অনেকে উন্নয়নের নামে তাদের যাওয়ার পথ বা করিডরে টাঙিয়ে রাখে বিদ্যুতের তার ও ফাঁদ। বিদ্যুতের তারে আটকে গত জুনেই কাপ্তাই এলাকায় তিনটি হাতির মৃত্যু হয়েছে।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা জানান, হাতিকে কেউ আক্রমণ করলে আত্মরক্ষায় প্রথমে বিশাল শুঁড় উঁচিয়ে চিৎকার করে শত্রুকে বিরত হতে বলে। তারপরেও শত্রু না থামলে কিছুটা সামনে এগিয়ে ভয় দেখায়। তাতেও কাজ না হলে এরা শত্রুকে আক্রমণ করে।
পৃথিবীতে দুই প্রজাতির হাতি দেখতে পাওয়া যায়, একটি এশীয় হাতি, অপরটি আফ্রিকান। এশীয় হাতির বৈজ্ঞানিক নাম Elephas maximus।
বাংলাদেশের মধুপুরগড় থেকে শুরু করে গারো পাহাড়, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপক এলাকার পত্রঝড়া ও চিরসবুজ বনে এক শতাব্দী আগে হাতি বিচরণ করত। এখন এরা শুধু চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার চিরহরিৎ বনাঞ্চলে বিচরণ করে। এদের স্থায়ী বাসিন্দা হিসাবে পাওয়া যায় চুনতি, টেকনাফ, ফাঁসিয়াখালী ও পাবলাখালী অভয়ারণ্য এবং কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, বাঁকখালী, রেজু, ফুলছড়ি, ঈদগড় ও মরিসা এলাকার চিরসবুজ বনাঞ্চলে।
অস্থায়ীভাবে কিছু হাতি মিয়ানমার, ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় রাজ্য থেকে জামালপুরের ঝিনাইগাতী, ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, দুর্গাপুর, সিলেটের কুলাউড়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু কিছু এলাকায় নেমে আসে। এরা মাসাধিক কাল বাংলাদেশে থাকে। তবে সাম্প্রতিক কালে শেরপুর ও জামালপুর জেলার সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে ২০-২৫টি হাতি প্রায় সারা বছর বিচরণ করছে।

সংস্কারে উদাসীনতা, আতঙ্কে যাত্রীরা by সুমনকুমার দাশ

ঢাকা–​সিলেট মহাসড়কের বালাগঞ্জ উপজেলার কাগজপুর
সেতুর ভেঙে যাওয়া স্থানগুলো স্টিলের পাত দিয়ে ঢেকে
দেওয়া হয়েছে। কিছুদিন পরপর এগুলো দেবে গেলে যান
চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ছবি -প্রথম আলো
সেতুর ওপর অন্তত আটটি স্থান ভেঙে গেছে। এসব ভাঙা জায়গা স্টিলের পাত ও ঢালাই দিয়ে ঢেকে (জোড়াতালি) রাখা। কিছুদিন পরপরই এসব স্থানের স্টিলের পাত দেবে গিয়ে ছোট-বড় যান আটকা পড়ে। এ সময় যান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সে স্থানে আবার একইভাবে স্টিলের পাত বসানো হয়। এভাবে জোড়াতালি দিয়ে সংস্কার করে এর ওপর দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।
এ অবস্থা ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বালাগঞ্জ উপজেলার ওসমানীনগর এলাকার কাগজপুর সেতুর। সারা দেশ থেকে সিলেট আসতে হলে এই সেতু পার হতে হয়। অথচ তিন বছর ধরে এটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এটি সংস্কারের উদ্যোগ নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। ফলে ওই সেতু দিয়ে চলাচলের সময় যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা আতঙ্কে থাকেন।
ট্রাকচালক রইসউদ্দিন বলেন, ‘এই সেতু দিয়ে প্রতিদিনই মালবাহী অসংখ্য ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে। গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সেতুটি নির্মাণে কর্তৃপক্ষ উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছেন।’
কাগজপুর সেতু: দেশের যেকোনো স্থান থেকে সিলেট আসতে হলে এই সেতু পার হতে হয়। সেতুর ওপর আটটি ভাঙা স্থান স্টিলের পাত দিয়ে ঢেকে রাখা। গাড়ি উঠলে এটি দুলতে থাকে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, কাগজপুর সেতুটি বুড়িগাঙ নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। সওজ ইতিমধ্যে এ সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে সেতুটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য সেই সময় এখানে একটি বিকল্প বেইলি সেতু নির্মাণ করেছিল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু দুই পাশের সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করায় বেইলি সেতুটি আর ব্যবহার করা হয়নি। ফলে মূল কাগজপুর সেতুটিও আর সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সওজ সিলেট কার্যালয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সেতুটি সংস্কারের জন্য মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দের জন্য আবেদন পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলে বিকল্প বেইলি সেতুটি চালু করে কাগজপুর সেতুটি যথাযথভাবে সংস্কার করা সম্ভব হবে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, এ সেতুর ওপর দিয়ে প্রতিদিন এক হাজার যাত্রীবাহী বাস এবং তিন হাজার মালবাহী ট্রাক চলাচল করে। এ ছাড়া এর ওপর দিয়ে প্রাইভেট কার, অটোরিকশা ও অন্যান্য যানও চলাচল করে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুটির অধিকাংশ স্থানে ঢালাই খসে পড়েছে। এক পাশের পাকা রেলিং ভেঙে লোহার রড বেরিয়ে এসেছে। সেতুর তিন স্থানে ঢালাই খসে পড়ে গর্ত দেখা দিয়েছে। দ্রুতগতিসম্পন্ন যাত্রীবাহী বাস ও ট্রাক চলাচলের সময় পুরো সেতু দুলে ওঠে।
কাগজপুর গ্রামের বাসিন্দা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় তিন বছর ধরে সেতুটি এ অবস্থায় রয়েছে। প্রায়ই কোনো না কোনো দুর্ঘটনা ঘটছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ সেটি স্থায়ীভাবে মেরামতের উদ্যোগ নিচ্ছে না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এলাকাবাসীকেই সেটি সামাল দিতে হয়।’
সেতুর আশপাশের বাসিন্দা ও কয়েকজন গাড়ি চালক জানান, সেতুটি চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। প্রায়ই সেতুর লোহার পাত দেবে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। একবার দুর্ঘটনা ঘটলে সেই যানবাহনটি না সরানো পর্যন্ত সেতুর উভয় পাশে যানজট লেগে থাকে। সর্বশেষ গত সোমবার রাতে সেতুতে একটি ট্রাক দেবে গিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।

তরুণদের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে -প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

প্রথম আলোর উদ্যোগ ও ইউএনএফপিএ’র সহযোগিতায়
আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা। ছবিটি  মঙ্গলবার
সকালে প্রথম আলো কার্যালয় থেকে তোলা। -প্রথম আলো
প্রথম আলোর গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেছেন, তরুণেরাই দেশের প্রাণশক্তি, তারাই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিচ্ছে। এই তরুণেরাই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলবে। তাই তরুণদের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দক্ষতা ও কর্মমুখী শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে হবে। মঙ্গলবার প্রথম আলোর উদ্যোগ ও ইউএনএফপিএ এর সহযোগিতায় এ গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলোর কার্যালয়ে ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস: আমরা রচি সমৃদ্ধ আগামী’ শীর্ষক এই গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে সরকারের নীতিনির্ধারক, শিক্ষক, খেলোয়াড়, যুব সমাজের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম।
গোলটেবিল বৈঠকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, দেশের উন্নয়নে যুবসমাজের ভূমিকা অনেক বেশি। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে এ দেশের যা কিছু অর্জন, তাতে তরুণদের অবদান অনেক বেশি। বর্তমানে ৫ কোটিরও বেশি কর্মক্ষম তরুণ রয়েছেন। এ মুহূর্তে যুব সমাজের ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থানের প্রধান মাধ্যম হতে পারে তথ্য-প্রযুক্তি।
যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় বলেন, সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য তরুণেরাই মূল ভূমিকা রাখছেন। তাই তাদের আরও উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পারিবারিক শিক্ষা আরও উন্নত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিকে ইতিবাচক উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তরুণদের জায়গা করে দিতে হবে। তরুণদের জন্য আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। এখানে কৃপণ হলে চলবে না।
ক্রিকেটে নারীদের এগিয়ে আসার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলের সহ অধিনায়ক জাহানারা আলম। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করতে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে। জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মতু‌র্জা বলেন, তরুণেরা না থাকলে একটি দেশ ওপরের দিতে যেতে পারে না। মেয়েদের এখনো নানাভাবে পিছিয়ে রাখার মানসিকতা আছে কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনো ছেলে-মেয়েদের মধ্যে বিভেদ করে রাখা হচ্ছে। কিন্তু মেয়েদের গুরুত্ব দিতে হবে।
জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের জাতীয় কর্মসূচি কর্মকর্তা মুনির হোসেন বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে পাঁচ কোটির বেশি যুবক রয়েছেন। এই যুবকদের জন্য বিনিয়োগ করতে হবে। যুব উন্নয়নে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার বিসেফ প্রকল্পের কর্মসূচি কর্মকর্তা হরিপদ দাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক সোনম শাহ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার অ্যান্ড এসআরএইচআর বিশেষজ্ঞ শুচি করিম, ইনোভেশন ফর প্রোভার্টি অ্যাকশনের গবেষক শাহানা নাজনীন, জাতিসংঘের যুব উপদেষ্টা প্যানেলের ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ আল রেজওয়ান, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের যুব ইউনিটির জ্যেষ্ঠ কর্মসূচি কর্মকর্তা সামিউদ্দিন আহমেদ, জাতিসংঘের যুব উপদেষ্টা প্যানেলের সদস্য রওনক আল জাওয়াদ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ইখতিয়ার উদ্দিন খন্দকার ও ইউএনওয়াইএসএবির সভাপতি মোহাম্মদ মামুন মিয়া।