Sunday, August 16, 2026

ইসরাইলি কারাগারে ৪৭৬৯ ফিলিস্তিনি তরুণ-তরুণী বন্দী

ইসরাইলি কারাগারে চার হাজার ৭৬৯ ফিলিস্তিনি তরুণ-তরুণী বন্দী রয়েছেন। বুধবার (১২ আগস্ট) ফিলিস্তিনের বন্দীবিষয়ক কমিশনের প্রধান রায়েদ আবু আল-হুম্মুস এ তথ্য জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক যুব দিবস উপলক্ষে দেয়া এক বক্তব্যে তিনি এই তথ্য প্রকাশ করেন। প্রতি বছর যুবকদের বিভিন্ন সমস্যা এবং সমাজ গঠনে তাদের ভূমিকা তুলে ধরতে ১২ আগস্ট এ দিবসটি পালন করা হয়।

আবু আল-হুম্মুস বলেন, ‘ইসরাইলি কারাগারে ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী পুরুষ বন্দীর সংখ্যা চার হাজার ৭১৩ জন এবং নারী বন্দীর সংখ্যা ৫৬ জন।’

তিনি জানান, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি কারাগারে নিহত ৯১ ফিলিস্তিনি বন্দীর মধ্যে ৪১ জনই ছিলেন তরুণ।

আবু আল-হুম্মুস বলেন, ‘তাদের মধ্যে ৪০ জনের লাশ ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছে রয়েছে এবং এর পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সের আরো কয়েক ডজন বন্দীর লাশও সেখানে আছে।’

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় মার্কিন-সমর্থিত গণহত্যা যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইসরাইল ফিলিস্তিনি বন্দীদের ওপর নির্যাতন বাড়িয়েছে।

আবু আল-হুম্মুস বলেন, ‘ফিলিস্তিনি যুবকরা ফিলিস্তিনি জনগণের সংগ্রামের মেরুদণ্ড এবং দখলদারিত্ব, অবিচার ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির প্রকৃত যোদ্ধা।’

তিনি আরো বলেন, ‘যতক্ষণ না তাদের স্বাধীনতা ও মুক্তির আশা পূরণ হচ্ছে এবং তারা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার মধ্যে একটি স্বাভাবিক জীবন লাভ করছে, ততক্ষণ তারা লড়াই চালিয়ে যাবে।’

ফিলিস্তিনি যুবকদের ওপর চলমান নির্যাতন বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, বিশেষ করে যুববিষয়ক সংগঠনগুলোকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইসরাইলি কারাগারে নয় হাজার ৪০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দী রয়েছে, যাদের মধ্যে ৯২ জন নারী এবং ৩৭০ জনেরও বেশি শিশু। নির্যাতন, অনাহার এবং পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার ফলে সেখানে কয়েক ডজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে।

১৯৪৮ সালে সশস্ত্র জায়নবাদী গোষ্ঠী গণহত্যা চালিয়ে এবং সাত লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। পরবর্তীতে তারা বাকি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডও দখল করে নেয় এবং জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব অনুযায়ী সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার বা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে।

সূত্র: আনাদোলু অ্যাজেন্সি

ইসরাইলি কারাগার
ইসরাইলি কারাগার। সংগৃহীত

ফিলিস্তিনি বন্দিদের একে একে ফাঁসিতে ঝুলানোর হুঁশিয়ারি বেন-গভীরের

ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভীর জানিয়েছেন, ইসরাইলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে তিনি তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন। তিনি আরো আশা প্রকাশ করেন যে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের 'একে একে' ফাঁসিতে ঝুলানো হবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা রোববার (১৬ আগস্ট) জানিয়েছে, সাবেক ইসরাইলি বন্দি রোম ব্রাসলাভস্কির সাথে আলাপকালে এসব কথা বলেন বেন-গভীর। তিনি স্পষ্ট করেন, যে মৃত্যুদণ্ডের আইন কার্যকরের জন্য তিনি জোর প্রচার চালিয়ে আসছেন, তার অধীনে ফাঁসি কার্যকর করাই হবে মৃত্যুদণ্ডের মূল পদ্ধতি।

কথোপকথনে বেন-গভীর বলেন, 'সময় এলে আমি অসম্ভবকেও সম্ভব করব। আপনাকে কথা দিচ্ছি, এটি বাস্তবায়ন করতে আমি আমার সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করব এবং বিশ্বকে ওলটপালট করে দেব।'

ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইসরাইলি কারাগারে তাদের জন্য আগের চেয়ে আরো কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। বেন-গভীর সরাসরি বলেন যে, বন্দিরা এখন আরো বেশি কষ্টে আছেন জেনে তিনি 'আনন্দিত'।

ইসরাইলি আইনসভা সম্প্রতি ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে এ সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ পাস হওয়া এই আইন অনুযায়ী, যেসব ফিলিস্তিনি কোনো ইসরাইলিকে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হবেন, সামরিক আদালত যদি ঘটনাটিকে 'সন্ত্রাসবাদ' কিংবা 'ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকারের' দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে মনে করে, তবে তাদের ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে।

বেন-গভীরের এই মন্তব্য এবং নতুন আইনের কারণে মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি কঠোর অবস্থান ও মৃত্যুর সাজা কার্যকরের জন্য এই ইসরাইলি মন্ত্রীর ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভীর জানিয়েছেন, ইসরাইলি কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করতে তিনি তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করবেন। তিনি আরো আশা প্রকাশ করেন যে, ফিলিস্তিনি বন্দিদের 'একে একে' ফাঁসিতে ঝুলানো হবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা রোববার (১৬ আগস্ট) জানিয়েছে, সাবেক ইসরাইলি বন্দি রোম ব্রাসলাভস্কির সাথে আলাপকালে এসব কথা বলেন বেন-গভীর। তিনি স্পষ্ট করেন, যে মৃত্যুদণ্ডের আইন কার্যকরের জন্য তিনি জোর প্রচার চালিয়ে আসছেন, তার অধীনে ফাঁসি কার্যকর করাই হবে মৃত্যুদণ্ডের মূল পদ্ধতি।

কথোপকথনে বেন-গভীর বলেন, 'সময় এলে আমি অসম্ভবকেও সম্ভব করব। আপনাকে কথা দিচ্ছি, এটি বাস্তবায়ন করতে আমি আমার সবটুকু ক্ষমতা দিয়ে চেষ্টা করব এবং বিশ্বকে ওলটপালট করে দেব।'

ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইসরাইলি কারাগারে তাদের জন্য আগের চেয়ে আরো কঠোর এবং কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। বেন-গভীর সরাসরি বলেন যে, বন্দিরা এখন আরো বেশি কষ্টে আছেন জেনে তিনি 'আনন্দিত'।

ইসরাইলি আইনসভা সম্প্রতি ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে এ সংক্রান্ত একটি বিতর্কিত প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ পাস হওয়া এই আইন অনুযায়ী, যেসব ফিলিস্তিনি কোনো ইসরাইলিকে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হবেন, সামরিক আদালত যদি ঘটনাটিকে 'সন্ত্রাসবাদ' কিংবা 'ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব অস্বীকারের' দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে মনে করে, তবে তাদের ফাঁসি দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে।

বেন-গভীরের এই মন্তব্য এবং নতুন আইনের কারণে মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি কঠোর অবস্থান ও মৃত্যুর সাজা কার্যকরের জন্য এই ইসরাইলি মন্ত্রীর ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাকে আরো বাড়িয়ে তুলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বেন-গভীর সরাসরি বলেন যে, বন্দিরা এখন আরো বেশি কষ্টে আছেন জেনে তিনি 'আনন্দিত'।
বেন-গভীর সরাসরি বলেন যে, বন্দিরা এখন আরো বেশি কষ্টে আছেন জেনে তিনি 'আনন্দিত'। আল জাজিরা

১৫ হাজার কিমি পাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে ইরান : প্রযুক্তি দিচ্ছে কে?

সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার দূরপাল্লার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) তৈরির পরিকল্পনা করছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার এক প্রতিনিধির বক্তব্য থেকে এই তথ্য সামনে এসেছে। বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হলো 'খোররামশহর', যার সর্বোচ্চ পাল্লা ৪ হাজার কিলোমিটার। তবে হুট করে এই পাল্লা বাড়িয়ে ১৫ হাজার কিলোমিটারে উন্নীত করার উদ্দেশ্য মূলত মার্কিন ভূখণ্ডকে সরাসরি নিশানা করা।

ইউক্রেনের কিয়েভভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় স্বাধীন সামরিক মিডিয়া ও কনসালটিং কোম্পানি 'ডিফেন্স এক্সপ্রেস' সম্প্রতি এই খবরের বিস্তারিত সামরিক বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মূলত সামরিক প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প নীতি, অস্ত্রশস্ত্রের বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের বর্তমান অবস্থান থেকে ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে হামলা চালানো সম্ভব।

চলতি মাসের ৭ তারিখে জুম্মার খোতবায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনির প্রতিনিধি, তেহরানের জুম্মার নায়েবে ইমাম আবদুল-নবী মুসাভি ফার্দ প্রথম এই ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির পরিকল্পনার কথা জানান। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ মধ্যম পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে সরাসরি অসীম পাল্লার আইসিবিএম তৈরিতে হঠাৎ এই লাফ দেয়া স্বাভাবিক ও প্রচলিত কৌশলের সাথে ঠিক মেলে না। সাধারণত ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে প্রথম ধাপের আইসিবিএম এবং এরপর মার্কিন ভূখণ্ডের ওয়াশিংটন বা নিউ ইয়র্কে আঘাত হানার জন্য ১০ হাজার থেকে ১৩ হাজার কিলোমিটার পাল্লার প্রযুক্তি তৈরি করা হয়। সেখান থেকে সরাসরি ১৫ হাজার কিলোমিটার পাল্লার কথা ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় যে, তেহরান হয়তো আগের মতোই অন্য কোনো মিত্র দেশের তৈরি প্রযুক্তি হাতে পেতে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি নেয়ার এই ইতিহাস ইরানের জন্য নতুন নয়। উদাহরণস্বরূপ, তাদের 'খোররামশহর' ক্ষেপণাস্ত্রটি মূলত উত্তর কোরিয়ার 'হুয়াসং-১০' (মুসুদান)-এর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এদিকে এ ক্ষেপণাস্ত্র আবার সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের 'আর-২৭' সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের নকশা থেকে নেয়া।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া অন্তত তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে যার পাল্লা ১৫ হাজার কিলোমিটার বা তার বেশি। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ১২ জুলাই উৎক্ষেপণ করা হয় 'হুয়াসং-১৮।' এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ছিল ১৫ হাজার কিলোমিটার। এছাড়া, আরো শক্তিশালী 'হুয়াসং-১৯' ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১৭ হাজার কিলোমিটারের বেশি। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার 'হুয়াসং-১৮' তৈরিতে সরাসরি রাশিয়ার ভূমিকা ছিল পরিষ্কার। রাশিয়ার তিন স্তরের কঠিন জ্বালানিচালিত 'তোপোল-এম' আইসিবিএমের নকশা অনুকরণেই এটি তৈরি, ধারণা করা হয়। পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার তরল জ্বালানিচালিত ১৫ হাজার কিমি পাল্লার 'হুয়াসং-১৭' ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি হয়েছে সোভিয়েত আমলের 'আর-৩৬' ক্ষেপণাস্ত্রের ভিত্তিতে। ন্যাটো এ ক্ষেপণাস্ত্রের নাম দিয়েছিল 'শয়তান।'

উত্তর কোরিয়ায় অত্যন্ত দ্রুত ও সফলভাবে এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিকাশ প্রমাণ করে যে এতে পরীক্ষিত রুশ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারও একই পথ ধরে রাশিয়া থেকে উত্তর কোরিয়া হয়ে সেই ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ইরানের হাতে পৌঁছানোর প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। অথবা আন্তর্জাতিক কোনো চাপ না মেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে তেহরানকে দ্রুত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জনে এবার সরাসরি সহায়তা দিতে পারে মস্কো।

খোররমশাহর ক্ষেপণাস্ত্র
খোররমশাহর ক্ষেপণাস্ত্র। ইরানের প্রেসটিভি

ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছেন, মূল্য দিচ্ছি আমরা—ক্ষুব্ধ উপসাগরীয় মিত্ররা

ইরানের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কূটনৈতিক অবসান ঘটাতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি উপসাগরীয় মিত্রদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। মার্কিন গণমাধ্যমের বরাতে আনাদোলু এ তথ্য জানিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা বলেন, ‘ট্রাম্প এই যুদ্ধ শুরু করেছেন, আর আমরা তার মূল্য দিচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ক্ষোভ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

আরব ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি জানিয়েছে, কয়েকমাসের সংঘাত এবং ইরান ও তার মদদপুষ্ট বাহিনীর অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইন ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান সমালোচক হয়ে উঠেছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, কিছু উপসাগরীয় রাষ্ট্র ইতোমধ্যে দেশগুলোর ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক স্থাপনা রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।

তবে, এই অঞ্চলের একজন পশ্চিমা কূটনীতিক সতর্ক করে বলেছেন যে, এই ঘটনাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মনোভাবের কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নির্দেশ করে না। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের আগেও মার্কিন বাহিনীকে খুব একটা উৎসাহের সঙ্গে স্বাগত জানায়নি দেশগুলো।

কূটনীতিকটি বলেন, ‘এটা ছিল অনেকটা এক প্রয়োজনীয় মন্দ বিষয়। আর এখন এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।’

এই অস্বস্তি এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন ট্রাম্প কূটনৈতিক আলোচনায় অগ্রগতির কথা বলে ইরানের বিরুদ্ধে আরো কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দিয়েও পরে তা থেকে সরে এসেছেন, অথচ ওয়াশিংটন ও তেহরান এখনও এই সংঘাতের অবসানে কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারেনি।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা এই মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ওয়াশিংটন তার আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছে। এর পাশাপাশি ট্রাম্পের সঙ্গে সকল উপসাগরীয় অংশীদারদের সঙ্গে অসাধারণ সম্পর্ক রয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলো এই সংঘাত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে, যার মধ্যে কিছু দেশ প্রাথমিকভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দ্রুত বিজয়ের সম্ভাবনাকে সম্ভাব্য উপকারী হিসেবে দেখেছিল। তবে, কর্মকর্তাদের মতে, কোনো স্পষ্ট সমাধান ছাড়াই যুদ্ধ চলতে থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে।

ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা সত্ত্বেও, উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক সরঞ্জাম, গোলাবারুদ এবং গোয়েন্দা তথ্যসহ নিরাপত্তা সহায়তার জন্য ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল।

গত তিন মাস ধরে ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে নিরাপদ নৌপথ নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে এবং তেহরান বলছে যে, নিরাপত্তার পূর্ণ পুনরুদ্ধার ও স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌচলাচল মার্কিন সামরিক কার্যকলাপ বন্ধের ওপর নির্ভরশীল।

ট্রাম্প যুদ্ধ শুরু করেছেন, মূল্য দিচ্ছি আমরা—ক্ষুব্ধ উপসাগরীয় মিত্ররা
ছবি: সংগৃহীত।

ইরান যুদ্ধে হতাশ, মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকিতে থাকা ৫ হাজার সেনা নিয়ে ফিরে যাচ্ছে সেই মার্কিন রণতরি

গালফ নিউজঃ যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ২৬৬ দিন অভিযানে থাকার পর দেশে ফিরতে যাচ্ছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ দিন এটি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও এ কথা জানিয়েছেন।

দীর্ঘ সময় ধরে রণতরিটির মোতায়েন থাকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর নাবিকদের মধ্যে মনোবল কমে যাওয়া ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সমস্যার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য ও জাহাজটিতে কর্মরত নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা।

হাং কাও বলেন, পরিকল্পিত পালাবদলের অংশ হিসেবে রণতরিটি শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাহাজের নাবিকদের কল্যাণ ও নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার।

হাং কাও বলেন, মিশনের প্রয়োজনেই লিংকনের মোতায়েনের সময় বাড়ানো হয়েছিল। দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন কঠিন। আর যুদ্ধ অভিযান সেটিকে আরও কঠিন করে তোলে।

দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনে উদ্বেগ

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন অভিযানকে সহায়তা করতে আব্রাহাম লিংকনকে পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) পাঠানো হয়। যুদ্ধটি এখন ষষ্ঠ মাসে পড়েছে। রণতরিটি ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে।

গত ২০০ দিনের বেশি সময়ে রণতরিটি কোনো বন্দরে নোঙর করেনি।

হাং কাও বলেন, মোতায়েনের সময় জাহাজের নাবিকদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাজা খাবারের সরবরাহ না থাকায় খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। আবার অভিযান নিয়ে হুমকি বেড়ে গেলে বাড়িতে ফোন করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

নৌ সেক্রেটারি বলেন, মোতায়েনের সময় অল্পসংখ্যক নাবিক মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার জন্য চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

সিএনএন জানিয়েছে, গত মাসে রণতরিটি থেকে এক নাবিক পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তাঁকে উদ্ধার করা হয় এবং চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। ওই নাবিক পরে দায়িত্বে ফিরেছেন, নাকি তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।

হাজারো অভিযান পরিচালনা

আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে সান ডিয়েগোতে অবস্থিত নিজ ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়।

হাং কাও বলেন, মোতায়েনের সময় রণতরিটি ১০ হাজারের বেশি উড্ডয়ন অভিযান পরিচালনা করেছে এবং ১৫ লাখ পাউন্ডের গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলোর মধ্যে এই জাহাজের নাবিকদের মোতায়েন রাখার হার অন্যতম সর্বোচ্চ।

হাং কাও বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আমাদের তরুণ নারী–পুরুষদের সক্ষমতার শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁরা কখনো ভেঙে পড়েননি।’

তবে এই শীর্ষ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধ অভিযান অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের বিঘ্ন তৈরি করে। সামরিক নেতৃত্বকে তাই অভিযানের প্রয়োজন ও সেনাসদস্যদের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।

তবে যুদ্ধজাহাজটির নাবিক ও মেরিন সেনাদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে বর্ণনা করতেও আপত্তি জানান হাং কাও। তিনি বলেন, অভিযানজুড়ে তাঁরা ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন।

হাং কাও বলেন, ‘তাঁদের (মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্য) নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই সব সময় প্রথম অগ্রাধিকার। রণতরিটি দেশে ফেরার পর এর নাবিকদের জন্য “বীরোচিত অভ্যর্থনা”র আয়োজন করা উচিত।’

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস, এনবিসি নিউজসহ বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালন শেষে কবে নাগাদ দেশে ফেরা যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে থাকা যুদ্ধজাহাজটির নাবিক ও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। সেই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা।

এই উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সান ডিয়েগোতে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় হাং কাও ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে পরিবারের সদস্যরা এ ক্ষোভ উগরে দেন। কর্মকর্তারা তাঁদের বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি।

সভায় নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নৌবাহিনী ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তা–ও সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি।

তবে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, রণতরিটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক), বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক বা ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

পরিবারের সদস্য ও নাবিকদের অভিযোগ, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার সেনাসদস্য চরম খাদ্য ও পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিঠি বা ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যেখানে বিশ্রামের সুযোগ মেলাই ভার।

বর্তমানে নাবিক ও ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তাঁরা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চান। এক নাবিকের আকুতি, ‘এ মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’

যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেকে এফ/এ–১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান পরিদর্শন করছেন এক মার্কিন নাবিক। ছবিটি ২৭ জুন ২০২৬–এ তোলা
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের ফ্লাইট ডেকে এফ/এ–১৮ই সুপার হর্নেট যুদ্ধবিমান পরিদর্শন করছেন এক মার্কিন নাবিক। ছবিটি ২৭ জুন ২০২৬–এ তোলা। ছবি: মার্কিন নৌবাহিনী

পাঁচ বছরে তালেবান সরকারের অর্জন ও ব্যর্থতা: কেমন আছে আফগানরা

আল-জাজিরাঃ আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে দেশটিতে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য পেলেও নারী শিক্ষা, মানবাধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থতার মুখে পড়েছে তালেবান সরকার।

২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর প্রত্যাহারের পর তালেবান আবার কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গত পাঁচ বছরে দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আগে যেসব এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, সেখানে এখন তুলনামূলকভাবে নিরাপদে যাতায়াত করা সম্ভব হচ্ছে। আইএস-খোরাসানসহ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকিও অনেকটাই দুর্বল করতে পেরেছে তালেবান।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশকে সচল রাখতে সক্ষম হয়েছে তালেবান সরকার। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার পরও উন্নত কর ও শুল্ক আদায়, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ, প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। কুশ তেপা খাল, তাপি গ্যাস পাইপলাইন এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন প্রকল্পসহ বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে সরকারি অর্থব্যবস্থায় স্বচ্ছতার অভাব ও দুর্নীতির অভিযোগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে তালেবানের সামাজিক নীতিকে। দেশটিতে মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর আনুষ্ঠানিক আধুনিক শিক্ষার সুযোগ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে নারী চিকিৎসক, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীর সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক শিক্ষার পরিবর্তে ধর্মীয় শিক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া সরকারে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক শক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেনি তালেবান। ক্ষমতা ক্রমেই তালেবানের সর্বোচ্চ নেতা হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার নেতৃত্বাধীন একটি সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি তালেবান। কয়েকটি দেশ কাবুলের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখলেও এখনো ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেনি তারা। নারী শিক্ষা ও অধিকার নিয়ে কঠোর বিধিনিষেধ আফগানিস্তানকে আন্তর্জাতিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলছে।

বর্তমানে তালেবানের ক্ষমতার ওপর বড় কোনো সামরিক হুমকি নেই এবং রাজনৈতিক বিরোধীরাও বিভক্ত। তবে দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ও সরকারের প্রতি ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাই তালেবানের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

পাঁচ বছর পর তালেবান আফগানিস্তানের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করতে পারলেও দেশটি কী ধরনের রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলবে, সেই মৌলিক প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর এখনো দিতে পারেনি। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অর্জনের পাশাপাশি জনগণের আস্থা, নারী শিক্ষা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনই এখন তালেবান সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

পাঁচ বছরে তালেবান সরকারের অর্জন ও ব্যর্থতা: কেমন আছে আফগানরা

বাবা ডাববিক্রেতা, মা পরিচারিকা; এই অভিনেতার গল্প সিনেমাকেও হার মানায়

প্রকাশ ২৫ নভেম্বর ২০২৫ঃ বলিউডের কোনো অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবনের গল্প অনেক সময় পর্দার গল্পকেও হার মানায়; বিশাল জেঠওয়া তেমনই একজন। চলতি বছর নীরজ ঘেওনের ‘হোমবাউন্ড’ সিনেমা দিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় থাকা এই অভিনেতার এক বস্তি থেকে অস্কার পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চলতি বছর ভারত থেকে অস্কারে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে ‘হোমবাউন্ড’কে; ওটিটিতে মুক্তির পর থেকে বাংলাদেশি দর্শকেরাও মজেছেন এই সিনেমায়। তবে অনেকেই জানেন না পর্দায় দুর্দান্ত অভিনয় করা বিশালের গল্প।

বস্তির দিনগুলো
১৯৯৪ সালের ৬ জুলাই এক গুজরাটি পরিবারে বিশালের জন্ম হয়। বাবা নরেশ জেঠওয়া ও মা প্রীতি জেঠওয়া। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা বিশাল ছোট থেকে অভাবের মধ্যে বড় হয়েছেন। জীবিকার খোঁজে বিশালের বাবা একসময় মুম্বাই পাড়ি দেন। বাণিজ্য নগরীতে এসে অকূলপাথারে পড়েছিল জেঠওয়া পরিবার। ছোটখাটো কাজকর্ম করে যা আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। তাই পরিবারের অন্ন সংস্থান করার জন্য মুম্বাইয়ের সড়কে ডাব বিক্রি করা শুরু করেন নরেশ। মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল ঘিঞ্জি বস্তিতে। ছোট থেকে অভাব নিত্যসঙ্গী হলেও লেখাপড়ার জন্য ছেলেকে উৎসাহ দিতে নরেশ ও প্রীতি।

ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশাল বলেন, ‘বস্তিতে বেড়ে ওঠা প্রতিটি শিশুর মতো আমিও আকাশে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হতাম। বিদেশে ভ্রমণের স্বপ্ন ছিল আমার। মনে আছে, যখন লন্ডনে থাকা কোনো এক চাচা আমাদের দেখতে আসতেন, আমরা ভাবতাম, “কত বড় মানুষ”।’

টিভি থেকে শুরু
বিশাল ২০১৩ সালে টিভি শো ‘মহারাণা প্রতাপ’ দিয়ে অভিনয়জীবন শুরু করেন। এই শোয়ের সময় প্রথমবার উড়োজাহাজে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন, তবে তিনি সেই ফ্লাইট মিস করেন! এরপর তাঁকে দেখা যায় ‘ভারত কা বীর পুত্র’, ‘ডিয়া অউর বাতি হাম’, ‘পেশওয়া বাজিরাও’ ইত্যাদি সিরিয়ালে। কম মানুষই জানে, তিনি ‘সা রে গা মা পা’ রিয়েলিটি শোতে ব্যাকগ্রাউন্ড ড্যান্সার হিসেবেও ছিলেন।

‘মর্দানি ২’ দিয়ে ভাগ্যবদল
পর্দায় তাঁর দৃষ্টির নিষ্ঠুর শীতলতায় চমকে উঠেছিল সিনেপ্রেমীরা। রানি মুখার্জির সঙ্গে সমানতালে সাবলীলভাবে অভিনয় করে নিজের জাত চিনিয়ে দিয়েছিলেন ছোটপর্দা থেকে উঠে আসা এই অভিনেতা। ‘মর্দানি ২’-এর খলচরিত্র কিশোর অপরাধী ‘সানি’র ভূমিকায় তাঁর হাড় হিম করা উপস্থিতি কাঁপিয়ে দিয়েছিল দর্শকের বুক। আলোচিত এই সিনেমার পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।

অভিনেতা বিশাল জানান, ‘মর্দানি ২’ ছবির সময় প্রযোজক আদিত্য চোপড়ার দেওয়া একটি উপদেশ আজও মেনে চলেন তিনি। ‘তাঁর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে বলেছিলেন নিজেকে পরিচালকের কাছে পুরোপুরি সঁপে দিতে। সেই মন্ত্র আমি এখনো মেনে চলি। “হোমবাউন্ড”-এও নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিয়েছিলাম। এর বাইরে আমার কী করা উচিত, তা আমার জানা ছিল না। ছবিটা করার সময় একটা কথাই আমার মনে হয়েছিল যে নীরজ স্যার এই ছবির জন্য সময়, পরিশ্রম, প্রচেষ্টা—সবকিছু উজাড় করে দিচ্ছেন, আমাকে তার যথাযোগ্য সম্মান দিতে হবে।’

‘হোমবাউন্ড’ দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি
চলতি বছর কানে ‘হোমাবাউন্ড’ সিনেমার প্রিমিয়ারের পরেই আন্তর্জাতিক পরিচিতি পান বিশাল। কান উৎসবে প্রদর্শনের পর ৯ মিনিট ধরে স্ট্যান্ডিং ওবেশন পায় সিনেমাটি। এরপর ভারত সিনেমাটিকে অস্কারে পাঠিয়েছে, অস্কার মনোনয়নের চূড়ান্ত তালিকায় সিনেমাটি জায়গা পাবে কি না, সেটা জানা যাবে সামনের মাসে।

উত্তর প্রদেশের এক গ্রামকে ঘিরে বোনা হয়েছে ‘হোমবাউন্ড’-এর কাহিনি। দুই তরুণের নিখাদ বন্ধুত্ব, পুলিশে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন আর এর ভেতর দিয়ে সমাজের জাতপাত ও ধর্মীয় বৈষম্যের মতো বিষয় উঠে এসেছে। ছবিতে ‘চন্দন কুমার’ চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিশাল। এই সিনেমা বদলে দিয়েছে বিশালের দর্শনও। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজে ইংরেজি বলতে পারলেই কেউ উচ্চশ্রেণির হয়ে যায়। আমি ঝরঝরে ইংরেজি বলতে পারতাম না, তাই হীনম্মন্যতায় ভুগতাম। কিন্তু এই ছবির পর আমি নিজেকে গ্রহণ করতে শিখেছি।’

স্বপ্নপূরণ
শৈশবে বস্তিতে দাঁড়িয়ে যে কিশোর উড়োজাহাজে চড়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনিই আজ ‘হোমবাউন্ড’ সিনেমা নিয়ে ঘুরেছেন পাঁচটি শহর। ‘আমি ১৫ বছর ধরে ইন্ডাস্ট্রিতে আছি, কিন্তু বিদেশে কাজের জন্য যাওয়া হয়নি। (তবে) গত এক বছরে আমি এ ছবির জন্য লন্ডন, সুইজারল্যান্ড, প্যারিস, কান, দুবাই ও টরন্টোতে ঘুরেছি। এই সিনেমা আমার জীবনে অনেক কিছু নিয়ে এসেছে।’

তবে বিশালের জন্য সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল মায়ের সঙ্গে বিদেশভ্রমণ। তিনি বলেন, ‘মায়ের সঙ্গে সফর আমার জন্য অমূল্য স্মৃতি। অন্যদের জন্য এটি সাধারণ হতে পারে, কিন্তু আমার জন্য মায়ের সঙ্গে বিজনেস ক্লাসে যাত্রা এক বিশেষ অভিজ্ঞতা। আমি এই মুহূর্ত নিয়ে গর্বিত।’

হিন্দুস্তান টাইমস অবলম্বনে 

বিশাল জেঠওয়া অভিনীত বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্য। কোলাজ
বিশাল জেঠওয়া অভিনীত বিভিন্ন সিনেমার দৃশ্য। কোলাজ

কি ঘটেছে কাতারে নিখোঁজ ইরানের তিন পাইলটের ভাগ্যে?

চলতি বছরের মার্চে উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত শুরুর পর কাতারের আকাশে ভূপাতিত হয়েছিল ইরানের দুটি সুখোই-২৪ যুদ্ধবিমান। ঘটনার দীর্ঘ ছয় মাস পার হলেও সেই অভিযানে অংশ নেওয়া তিন ইরানি পাইলটের ভাগ্য ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম রহস্য ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন। তেহরানের দাবি-বৈমানিকদের জীবিত বন্দি করে গোপন হেফাজতে রেখেছে কাতার। দোহার দাবি তাদের হাতে কোনো জীবিত পাইলট নেই। এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে নিখোঁজ পাইলটদের পরিবারের। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি ও আল জাজিরা।

ঘটনার সূত্রপাত গত ২ মার্চ, যখন কাতারের আল উদাইদ মার্কিন ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ইরানের দুটি বোমারু বিমান ভূপাতিত করা হয়। চারজন বৈমানিকের মধ্যে মজিদ কাজেমি নামের একজনের মরদেহ উদ্ধার করে আগেই তেহরানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে বাকি তিন পাইলট-জাওয়াদ সালেহি, আব্দুল মজিদ দাশতিয়ান ও ওমরান বেহরুশিয়ানকে নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) প্রধান মির্জানা স্পোলজারিকের কাছে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক চিঠিতে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরজাদেহ অভিযোগ করেছেন, বিমান থেকে নিরাপদে বেরিয়ে আসা (ইজেক্ট) এই তিন সেনাকে কাতার ছয় মাস ধরে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বন্দি করে রেখেছে। পরিবার কিংবা কোনো কূটনৈতিক প্রতিনিধির সাথে তাদের দেখা করতে না দেওয়াকে যুদ্ধবন্দি সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে তেহরান।

তবে ইরানের এই অভিযোগকে স্পষ্ট ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে কাতার। শনিবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ জানান, তাদের ভূখণ্ডে কোনো ইরানি পাইলট বন্দি নেই এবং তেহরানের এই বক্তব্য সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। দোহার পক্ষ থেকে জানানো হয়, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে আকাশসীমা লঙ্ঘনের কারণেই আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিমানগুলোতে আঘাত হানা হয়েছিল। পরবর্তীতে বিশেষ উদ্ধারকারী দল অনুসন্ধান চালিয়ে কেবল একজনের মরদেহই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। কাতার আরও উল্লেখ করে, উদ্ধার অভিযানের বিস্তারিত তথ্য খতিয়ে দেখার জন্য গত এপ্রিলেই ইরানি প্রতিনিধি দলকে দোহা সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যার কোনো উত্তর এখনও তেহরান দেয়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আলোচনা ও যুদ্ধবিরতির কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় যখন কাতার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে, ঠিক সেই সময়ে এই তিন পাইলটের পরিণতি ঘিরে নতুন করে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। একদিকে তেহরানের বন্দি মুক্তির জোরালো দাবি, অন্যদিকে দোহার আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতি দুই দেশের এই বিপরীতমুখী অবস্থানে তিন বৈমানিকের জীবিত থাকা বা মৃত্যুর বিষয়টি আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবেই ঝুলছে।

কি ঘটেছে কাতারে নিখোঁজ ইরানের তিন পাইলটের ভাগ্যে?

ফ্লোরিডায় ফিলিস্তিনি-আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবের সমাবেশ বাতিল

ইসরাইল সরকারের কট্টর সমালোচক এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ সদস্য রাশিদা তালিব। তাকে নিয়ে আয়োজিত একটি নির্বাচনী সমাবেশের ভেন্যু শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে। ইসরাইল নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির অবস্থানকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনার মধ্যেই দলের এক অঙ্গরাজ্য আইনপ্রণেতার অভিযোগের পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ খবর দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলেছে, কংগ্রেসের প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সদস্য তালিবের শুক্রবার দক্ষিণ ফ্লোরিডায় একটি সমাবেশে অংশ নেয়ার কথা ছিল। আসন্ন ফ্লোরিডা ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা তিন প্রার্থীর সমর্থনে ওই সমাবেশ আয়োজন করা হয়। সমাবেশের ভেন্যু হিসেবে নির্ধারিত ছিল দ্য ভেন্যু ফোর্ট লডারডেল। কিন্তু ফ্লোরিডা লেজিসলেটিভ জিউইশ ককাসের চেয়ারম্যান ও অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি মাইকেল গটলিব বৃহস্পতিবার একটি বিবৃতি দিয়ে পরিকল্পিত সমাবেশটিকে ইহুদিবিরোধী সমাবেশ হিসেবে অভিহিত করার পর ভেন্যুটি হঠাৎ অনুষ্ঠান বাতিল করে। তালিব অবশ্য ইহুদিবিদ্বেষের নিন্দা করেছেন। তিনি বলে আসছেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখলদারিত্ব এবং গাজা ও লেবাননে ইসরাইলি হামলার সমালোচনা করা ইহুদিবিদ্বেষ নয়। ভেন্যুটির কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে অনুষ্ঠান বাতিলের কারণ হিসেবে নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেছে। তারা জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ইহুদি মালিকানাধীন এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের মূল্যবোধ ও অঙ্গীকার আমাদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাশিদা তালিব ও নিউইয়র্ক সিটির মেয়র জোহরান মামদানি-সহ ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল নেতারা গাজা ও লেবাননে ইসরাইলি হামলা, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রিপাবলিকানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ইসরাইলের প্রতি ওয়াশিংটনের সমর্থনের বিরোধিতা করেছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরাইলকে সমর্থন করার বিষয়ে ডেমোক্রেটদের মধ্যে সমর্থন ক্রমশ কমছে। তালিব কংগ্রেসে ইসরাইলের নীতি ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি দেশটির আচরণের অন্যতম সোচ্চার সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তার অবস্থান নিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরেও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে।

সমাবেশটির আয়োজক ছিল ফ্লোরিডা ইয়ুথ জাস্টিস কোয়ালিশন, জেন-জি ফর চেঞ্জ এবং ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার স্থানীয় একটি শাখাসহ কয়েকটি সংগঠন। সমাবেশে অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি অ্যানজি নিক্সনকে সমর্থন দেয়ার কথা ছিল। তিনি মার্কিন সিনেটের আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ ছাড়া মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা এলিজাহ ম্যানলি ও অলিভার লারকিনের পক্ষেও সমর্থন চাওয়ার কথা ছিল। দ্য ভেন্যু ফোর্ট লডারডেল অনুষ্ঠান আয়োজন থেকে সরে দাঁড়ানোর পরও সমাবেশটি শুক্রবার রাতে ফোর্ট লডারডেলের একটি ওয়াইন বারে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল বলে আয়োজকদের একজন দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’কে জানিয়েছেন। ফ্লোরিডা ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ ককাস অভিযোগ করেছে, সমাবেশ বাতিলের পেছনে মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব কাজ করেছে।

ফ্লোরিডায় ফিলিস্তিনি-আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিবের সমাবেশ বাতিল

গাজায় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ২১ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হওয়া দুটি বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ২১ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করেছে সিভিল ডিফেন্স দল। শনিবার উদ্ধারকাজের সময় আরও একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির নিচে আটকে থাকা ৪০ জনের মরদেহ উদ্ধারে অভিযান শুরু হয়েছে।

আনাদোলু নিউজ এজেন্সিকে গাজা সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, পূর্ব গাজা সিটির আসকুলা এলাকার কাছে বাতনিজি পরিবারের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ওই স্থানে উদ্ধার অভিযান শেষ করার পর পশ্চিম গাজা সিটির কাতিবা এলাকায় ঘারবিয়া পরিবারের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ থেকে আরও ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করেন উদ্ধারকর্মীরা।

পরে পূর্ব গাজা সিটির জেইতুন এলাকার আল-মাগরিবি পরিবারের বাড়িতে উদ্ধার অভিযান শুরু করেন সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা। সেখানে ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও ৪০ জনের মরদেহ আটকে থাকার খবর পাওয়া গেছে বলে জানান বাসাল।

তিনি বলেন, মরদেহ উদ্ধারে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি, উদ্ধার সরঞ্জাম, জ্বালানি ও অন্যান্য লজিস্টিক উপকরণের তীব্র সংকট। এসব সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মরদেহ ও জীবিতদের কাছে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

গাজায় দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্যে বহু ভবন ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান ও মরদেহ উদ্ধারে সিভিল ডিফেন্স দলগুলো ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। 

গাজার একটি এলাকা। পুরোনো ছবি
গাজার একটি এলাকা। পুরোনো ছবি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন ফিলিস্তিনপন্থি ওকাসিও-কর্টেজ!

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে এখনই শুরু হয়েছে নানা জল্পনা। সেই আলোচনার কেন্দ্রে ক্রমেই উঠে আসছেন নিউইয়র্কের কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ (এওসি)। মাত্র ৩৬ বছর বয়সেই জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা এই প্রগতিশীল নেত্রী প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে তার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড ও জনপ্রিয়তা ঘিরে সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা দিন দিন জোরালো হচ্ছে।

সম্প্রতি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রকফেলার মেমোরিয়াল চ্যাপেলে দেওয়া এক বক্তব্যে ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা কোনো পদ বা আসন দখল করা নয়; বরং ‘দেশকে পরিবর্তন করা’। তার এ বক্তব্য উপস্থিত শ্রোতাদের ব্যাপক করতালির জন্ম দেয়। এরপর থেকেই ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি ওকাসিও-কর্টেজের জন্য অনুকূল হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের একটি অংশ পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বে হতাশ। বিশেষ করে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রবীণ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানো, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা এবং শ্রমজীবী মানুষের অধিকারকে সামনে রেখে প্রগতিশীল প্রার্থীদের সাম্প্রতিক কিছু নির্বাচনি সাফল্যও ওকাসিও-কর্টেজের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।

জুলাইয়ে ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ারের একটি জরিপে সম্ভাব্য ডেমোক্রেটিক প্রার্থীদের মধ্যে ওকাসিও-কর্টেজ এগিয়ে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। শুধু ইনস্টাগ্রামেই তার অনুসারীর সংখ্যা প্রায় এক কোটি। তার সমর্থকদের মধ্যে রয়েছে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা (ডিএসএ)-এর মতো প্রগতিশীল সংগঠন থেকে শুরু করে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসির মতো শীর্ষস্থানীয় নেতাও।

ডিএসএর কো-চেয়ার আশিক সিদ্দিকি বলেন, ওকাসিও-কর্টেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়লে সংগঠনটির সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হবে। তার মতে, ২০২৮ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে শ্রমজীবী মানুষের শক্তিশালী কণ্ঠ থাকা প্রয়োজন।

জাতীয় পরিচিতি তৈরিতে দীর্ঘ প্রস্তুতি

ওকাসিও-কর্টেজ ২০১৬ সালে বার্নি স্যান্ডার্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছিলেন। পরবর্তীতে নিজেই নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে ২০১৮ সালে নিউইয়র্কের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে ১০ মেয়াদের কংগ্রেসম্যান জো ক্রাউলিকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেন। তখন তিনি ছিলেন সাবেক বারটেন্ডার ও ওয়েট্রেস, নির্বাচনি প্রচারের জন্যও তার হাতে ছিল খুব সামান্য অর্থ।

তবে প্রগতিশীল সংগঠনগুলোর সহায়তায় তিনি দ্রুত জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসেন। তার প্রথম নির্বাচনি চক্রেই প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছ থেকেও সাক্ষাতের অনুরোধ আসতে শুরু করে।

ওকাসিও-কর্টেজের সাবেক যোগাযোগ পরিচালক ও জাস্টিস ডেমোক্র্যাটসের সহপ্রতিষ্ঠাতা করবিন ট্রেন্টের ভাষ্য, ২০১৮ সালে ক্রাউলিকে হারানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহল তার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে হিসাব-নিকাশ শুরু করে। কিন্তু তিনি নিজে কখনো প্রেসিডেন্ট, গভর্নর বা সিনেটর হওয়ার কোনো দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করেননি।

ট্রেন্টের মতে, ওকাসিও-কর্টেজের সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বাভাবিকতা ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষমতা। সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগকে তিনি নিজের ভাষায় তুলে ধরতে পারেন বলেই তার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক কৌশলবিদ ক্রিস স্কটও মনে করেন, তার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা—বিশেষ করে বারটেন্ডার হিসেবে কাজ করার অতীত—অনেক ভোটারের সঙ্গে তাকে সহজে সংযুক্ত করে। ক্রমেই মেরুকৃত মার্কিন রাজনীতিতে ভোটাররা এমন প্রার্থীদের দিকে ঝুঁকছেন, যাদের জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজেদের জীবনের মিল খুঁজে পান।

প্রগতিশীলদের সমর্থন, আবার সমালোচনাও

গাজা ইস্যুতেও তার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তিনি ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে কমলা হ্যারিসের গাজা নীতির প্রশংসা করায় বামপন্থী কর্মীদের একাংশ তার সমালোচনা করে।

সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে ২০২০ সালের মহামারি-পরবর্তী সময়ের সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব ও ‘পুলিশের অর্থায়ন বন্ধ’ করার মতো কিছু বামপন্থী দাবির প্রসঙ্গে ওকাসিও-কর্টেজ বলেন, সেই সময়ের ‘ওয়োক’ রাজনীতি ছিল অতিরিক্ত উগ্র। বিশ্লেষকদের মতে, এই মন্তব্য তার রাজনৈতিক অবস্থানকে কিছুটা মধ্যপন্থী করার কৌশলও হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৮ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারি যে কঠিন প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে, তা নিয়ে খুব বেশি সন্দেহ নেই। ওকাসিও-কর্টেজ প্রার্থী হলে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তালিকায় থাকতে পারেন কমলা হ্যারিস, পিট বুটিগিগ, গ্যাভিন নিউজম, জন অসফ এবং প্রগতিশীল কংগ্রেসম্যান রো খান্নার মতো নেতারা।

২০২৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে ওকাসিও-কর্টেজ মার্কিন ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পাবেন—এমনকি থিওডোর রুজভেল্ট ও জন এফ কেনেডির রেকর্ডও ছাড়িয়ে যেতে পারেন।

তবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ডেমোক্রেটিক পার্টির বিভিন্ন অংশের সমর্থন নিশ্চিত করা। বিশেষ করে আফ্রিকান-আমেরিকান ভোটারদের মধ্যে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ধারার প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বার্নি স্যান্ডার্সের ২০২০ সালের নির্বাচনি প্রচারের জাতীয় কো-চেয়ার নিনা টার্নার বলেন, ডিএসএ ও প্রগতিশীলরা কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের কাছে যথেষ্ট কার্যকরভাবে পৌঁছাতে পারেনি। তার মতে, ২০২৮ সালে ওকাসিও-কর্টেজকে জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হতে হলে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ ও সংগ্রামকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে।

দক্ষিণ ক্যারোলিনার ডেমোক্রেটিক কৌশলবিদ অ্যান্টুয়ান সিওরাইটের মতে, ওকাসিও-কর্টেজকে এমন ইস্যুতে মনোযোগ দিতে হবে যা সাধারণ আমেরিকান পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মতো বিষয়কে সহজবোধ্যভাবে তুলে ধরতে পারলে তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন।

রিপাবলিকানদের আক্রমণও হবে বড় বাধা

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হলে রিপাবলিকান ও ডানপন্থী গণমাধ্যমের তীব্র আক্রমণের মুখেও পড়তে পারেন ওকাসিও-কর্টেজ। বহু বছর ধরে তাকে উগ্র বামপন্থী বা ‘কমিউনিস্ট’ হিসেবে চিত্রিত করে আসছে ডানপন্থী মহল।

সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসনাল যোগাযোগ পরিচালক তারা সেটমেয়ার মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে ওকাসিও-কর্টেজের কিছু মন্তব্য তার অবস্থানকে মধ্যপন্থী দেখানোর কৌশল হতে পারে। তবে ইন্টারনেটের যুগে তার পুরোনো বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান সহজে হারিয়ে যাবে না।

সেটমেয়ারের পরামর্শ, সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে না গিয়ে ওকাসিও-কর্টেজের বরং নিউইয়র্কের সিনেট আসনের দিকে নজর দেওয়া উচিত। তার মতে, সিনেটর হিসেবে অভিজ্ঞতা অর্জন করলে ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।

তবে ইতিহাসে এমন অনেক উদাহরণও রয়েছে, যেখানে নেতারা ‘সঠিক সময়ের’ অপেক্ষায় থেকে সুযোগ হারিয়েছেন। আবার বারাক ওবামার মতো নেতারা সঠিক মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে সরাসরি হোয়াইট হাউসে পৌঁছেছেন।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন ফিলিস্তিনপন্থি ওকাসিও-কর্টেজ!
নিউইয়র্কের কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ

মোদিদের শত্রু সেই ‘আজাদি’ স্লোগান আবার ভারতের তরুণদের মুখে

ভারতে শিক্ষা খাতে অনিয়ম ও পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ঘিরে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ‘আজাদি’ স্লোগান। একসময় যে স্লোগানকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে শিক্ষার্থী নেতাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দেওয়া হয়েছিল, সেই একই স্লোগান এখন জেন-জি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

২৬ জুলাই সকালে নয়াদিল্লির জন্তর মন্তরের কাছে দেয়ালে আঁকা আন্দোলনের বিভিন্ন গ্রাফিতি মুছে ফেলতে কর্তৃপক্ষ দ্রুত কর্মীদের পাঠায়। এর একদিন আগে পরীক্ষা কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে আন্দোলনের মুখে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। আন্দোলনের প্রবেশপথে লেখা ছিল— “#২০২৬ জেন-জি বিপ্লব!!!” এই আন্দোলনের প্রধান স্লোগান ছিল আজাদি বা স্বাধীনতা।

আন্দোলনের সময় ২০ বছরের এক তরুণ গাছে উঠে শক্তিশালী লাউডস্পিকারে ‘আজাদি’ গানটি বাজান—‘আজাদি, আমাকে স্বাধীনতা দাও! আজাদি, আমাকে স্বাধীনতা দাও! আজাদি, আমাকে স্বাধীনতা দাও!’ গানটির সঙ্গে জনতাও সুর মেলায় এবং হাত উঁচিয়ে স্বাধীনতার দাবি জানায়। বলিউডের গলি বয় সিনেমার জনপ্রিয় এই গানটি এবার শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগীত হয়ে ওঠে।

নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট স্ট্রিটে পুলিশ সদস্যদের শিক্ষার্থীদের মারধরের ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে প্রায় এক দশক পুরোনো গানটি নতুন করে জনপ্রিয়তা পায়। শুধু দিল্লি নয়, জয়পুর, লখনউ ও মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহরেও ‘আজাদি’ স্লোগান ছড়িয়ে পড়ে।

অথচ এক দশক আগেও দিল্লিতে ‘আজাদি’ ছিল অত্যন্ত বিতর্কিত একটি শব্দ। ২০১৬ সালে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) শিক্ষার্থীদের এই স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়।

গত মাসে মন্ত্রীর পদত্যাগের পর হাজার হাজার বিক্ষোভকারী বাড়ি ফিরে যাওয়ায় যন্তর মন্তরের আলো নিভে গিয়েছিল। কিন্তু রাস্তা জুড়ে তখনও উজ্জ্বল হলুদ রঙের ধাতব পুলিশের ব্যারিকেডের সারি ছিল। সেগুলোর অনেকগুলোই বিক্ষোভকারীরা রং করে দিয়েছিল। যেগুলোর একটিতে লাল রঙে লেখা ছিল: ‘উমর, শারজিল, গুলফিশা তোমাদের আগে এখানে ছিল।’

এই স্লোগানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের নারীবাদী আন্দোলন ও কাশ্মীরের প্রতিরোধ থেকে, যা বর্তমানে ভারতের মূলধারার ছাত্র রাজনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে

জেএনইউ থেকে রাজপথে

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে জেএনইউতে ভারতের মৃত্যুদণ্ড ও কাশ্মীরি নেতা আফজাল গুরুর মৃত্যুদণ্ড নিয়ে একটি আলোচনা সভাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। পরে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো শিক্ষার্থীদের ‘আজাদি’ স্লোগানের ভিডিও প্রচার করে ঘটনাটিকে জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করে।

আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই ঘটনাটি এভাবেই স্মরণ করেছেন উমর খালিদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং অনুষ্ঠানটির অন্যতম আয়োজক বনজ্যোৎস্না লাহিড়ী

মোদী সরকারের প্রতি অনুগত বলে বিবেচিত ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো এই ঘটনাটিকে একটি জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে এবং তৎকালীন জেএনইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমারের নেতৃত্বে ছাত্রদের ‘আজাদি’ স্লোগান দেওয়ার ফুটেজ বারবার সম্প্রচার করে।

মোদিপন্থি গণমাধ্যমগুলো ছাত্রদেরকে ‘সন্ত্রাসীদের সমর্থক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং কিছু চ্যানেল ঘটনাটি সম্পর্কে বিকৃত ক্লিপও সম্প্রচার করেছে। লাহিড়ী বলেন, বিতর্কটি ‘মাত্রাতিরিক্ত বড় আকার ধারণ করায়’ খালিদের মতো ছাত্র এবং জেএনইউ ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠে।

লাহিড়ী স্মরণ করেন, ‘তীব্র গণমাধ্যম ট্রায়াল শুরু হলো। এটি ছিল একটি পরিকল্পিত প্রচারণা: আর বার্তা ছড়ানো হচ্ছিল যে দেশবিরোধী ছাত্ররা করদাতাদের টাকায় জীবনযাপন করে ।’ কয়েক দিনের মধ্যেই রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ ও গ্রেপ্তার শুরু হয় এবং কয়েক সপ্তাহ পরে খালিদ ও অন্যরা জামিনে মুক্তি পায়।

দক্ষিণ ভারতের হায়দ্রাবাদে বর্ণবৈষম্যের অভিযোগ তুলে দলিত ছাত্র রোহিত ভেমুলা আত্মহত্যা করার পর, সেখানকার কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কঠোর দমন অভিযান চালায়।

২০১৬ সালের শুরুর দিকের এই ঘটনাগুলো একটি সরকারি অভিযানের সূচনা করেছিল, যা ধীরে ধীরে ভারতের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিন্নমত ও মত প্রকাশের পরিসরকে সংকুচিত করে দেয়। শিক্ষার্থীরা বলেছেন, বছরের পর বছর ধরে এই পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

এরপর ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের পরিসর সংকুচিত হতে থাকে বলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, আলোচনা সভা ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনের অনুমতি না দেওয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগের অভিযোগও ওঠে।

২০১৯ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় দিল্লির মুসলিম শিক্ষার্থী নেতারা জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান।

শিক্ষার্থীরা বলছেন, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব দাবিতে হওয়া বিক্ষোভ, যা ২০২০ সাল পর্যন্ত চলেছিল, তার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবাদের সুযোগ আরও সংকুচিত হয়েছে।

পুলিশি উপস্থিতি ও তদন্ত জোরদার করা হয়েছিল; শিক্ষার্থীদের অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এবং গবেষণা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

আর এর ছয় বছর পর আজও, পুনরায় গ্রেপ্তার হওয়া খালিদ এবং শারজিল ইমামের মতো ছাত্রনেতারা বিনা বিচারে কারারুদ্ধ রয়েছেন।

‘আজাদি’ থেকে গলি বয়

২০১৬ সালের জেএনইউ আন্দোলনের ‘আজাদি’ স্লোগানই সংগীত প্রযোজক ডাব শর্মাকে অনুপ্রাণিত করে। তিনি শিক্ষার্থীদের স্লোগানের সঙ্গে ইলেকট্রনিক বিট যুক্ত করে গানটি তৈরি করেন।

পরবর্তী সময়ে পরিচালক জোয়া আখতার ২০১৯ সালের গলি বয় সিনেমায় গানটি ব্যবহার করেন। মুম্বাইয়ের র‍্যাপার ডিভাইন এতে অংশ নেন। সিনেমার সংস্করণে ক্ষুধা ও বৈষম্য থেকে মুক্তির বিষয়টি থাকলেও মূল আন্দোলনের জাতপাত, পুঁজিবাদ ও ডানপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে থাকা অনেক বক্তব্য বাদ দেওয়া হয়।

সাত বছর আগে, পুনর্নির্মিত সংস্করণে ডিভাইন আয় বৈষম্য ও রাজনীতিবিদদের সুবিধাভোগী সন্তানদের নিয়ে র‍্যাপ করেছিলেন এবং একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা দখলের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন — এই সবই এখন বিশ্বজুড়ে জেন জি প্রজন্মের প্রতিবাদের মূল বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

মোদীর শাসনামলে ভারত একাধিক গণতান্ত্রিক সূচকে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়েছে। এ বছর, শর্মার নতুন করে সাজানো স্কোরটি ব্যাপকতর শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের প্রতিরোধের স্লোগানে পরিণত হয়।

‘আজাদি’ ধ্বনির সর্বপ্রথম আধুনিক রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত খুঁজে পাওয়া যায় ১৯৮০-এর দশকে জেনারেল জিয়া-উল-হকের সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নারীবাদী প্রতিরোধে। প্রয়াত ভারতীয় নারীবাদী কর্মী কমলা ভাসিন স্মরণ করেছেন যে, তিনি এই ধ্বনির সাবলীলতায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন এবং এটিকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট প্রতিবাদের জন্য আহ্বানগুলোকে উপযোগী করে তুলেছিলেন।

১৯৮০-এর দশকের শেষের দিকে ভারতীয় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে কাশ্মীরি প্রতিরোধও এই স্লোগানটি গ্রহণ করেছিল। নয়াদিল্লির বাম উদারপন্থী আন্দোলনও এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু তাদের স্বাধীনতার আহ্বান ছিল নিজ নিজ প্রেক্ষাপট-নির্ভর।

২০২১ সালে ভাসিনের মৃত্যুর এক বছর আগে, তিনি এক সাক্ষাৎকারে আজাদি স্লোগানকে “একটি জীবন্ত, স্পন্দনশীল স্লোগান” হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

এই স্লোগানটি প্রতিদিন বিকশিত হয়, প্রতিদিন পরিবর্তিত হয়। এর অর্থ অপরিবর্তনীয় নয়।

জেন-জি আন্দোলনে নতুন অর্থ

ভারতের প্রধান বিচারপতি বিতর্কিতভাবে দেশের বেকার যুবকদের তেলাপোকা ও পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করার এক মাস পর, গত জুন মাসে সেই অপমানজনক মন্তব্যটি দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে।

বোস্টন ইউনিভার্সিটির স্নাতক অভিজিৎ দীপকে এক্স-এ একটি পোস্টে সাধারণভাবে ভেবেছিলেন: “যদি সব তেলাপোকা একজোট হয়?”। এরপর তিনি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন শুরু করেন এবং ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়ে যান। এটি ইনস্টাগ্রামে ২২ মিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার অর্জন করে, যা ২০১৪ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ফলোয়ারের সংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি।

লক্ষ লক্ষ ভারতীয় ছাত্রছাত্রীকে প্রভাবিত করা একাধিক পরীক্ষা কেলেঙ্কারির পর, প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষা সংস্কারের আহ্বান জানিয়ে একটি আন্দোলন শুরু করার অঙ্গীকার করে দীপকে ভারতে ফিরে আসেন।

এবারের আন্দোলনে ‘আজাদি’ নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষা ও অধিকার আদায়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির নেতা অভিজিৎ দিপকে পরীক্ষার কেলেঙ্কারি ও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে দিল্লির জন্তর মন্তরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠনও যুক্ত হয়।

অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ) ও স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়াসহ বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলো আন্দোলনকে দীর্ঘস্থায়ী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা পালা করে আন্দোলনস্থলে অবস্থান করেন। আইনজীবী, অধ্যাপক ও কৃষকদেরও আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এ আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এটি প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে থেকেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও, মিম ও ইনস্টাগ্রাম রিলের মাধ্যমে আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। প্রচলিত গণমাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে আন্দোলনকারীরাই নিজেদের বক্তব্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠেন।

এআইএসএর সাবেক জাতীয় সভাপতি এন সাই বালাজির মতে, নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে দক্ষ হওয়ায় তারা নিজেদের আন্দোলনের বয়ান নিজেরাই তৈরি করতে পেরেছে। ফলে তাদের ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টাও আগের তুলনায় কম কার্যকর হয়েছে।

‘আজাদি’ কেন আবার জনপ্রিয়?

আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রতিবাদের জায়গা সংকুচিত হওয়ায় তরুণদের রাজনীতি আবার রাস্তায় ফিরে এসেছে। ২০১৯ সালের নাগরিকত্ববিরোধী আন্দোলন তাদের অনুপ্রাণিত করেছে বলেও অনেকে মনে করেন।

এআইএসএর নেত্রী নেহা বোরা বলেন, ২০১৯ সালের মুসলিম নেতৃত্বাধীন নাগরিকত্ববিরোধী আন্দোলন তার মধ্যে একটি ‘বিপ্লব’ তৈরি করেছিল। তার মতে, সরকার ‘আজাদি’ শব্দটিকে অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলেও পুলিশি নির্যাতনের মুখে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পেরেছে—এই স্লোগান আসলে মৌলিক অধিকারের সবচেয়ে শক্তিশালী দাবি।

সাম্প্রতিক আন্দোলনে ‘আজাদি’ তাই শুধু পুরোনো একটি প্রতিবাদী গান নয়; বরং ভারতের নতুন প্রজন্মের কাছে শিক্ষা, অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

মোদিদের শত্রু সেই ‘আজাদি’ স্লোগান আবার ভারতের তরুণদের মুখে
ছবি: সংগৃহীত।

‘আজান আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ নয়’

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে প্রকাশ্যে আজান প্রচারের বিরোধিতা করেছেন অঙ্গরাজ্যটির লেফটেন্যান্ট গভর্নর মিকাহ বেকউইথ। তার দাবি, গির্জার ঘণ্টাধ্বনি আমেরিকার সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অংশ হলেও ইসলামের আজান আমেরিকান সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অংশ নয়।

বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্যের অলাভজনক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ানা সিটিজেন এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নিজের ‘আস্ক মিকা এনিথিং’ ভিডিও সিরিজে এক দর্শকের প্রশ্নের জবাবে বেকউইথ বলেন, গির্জার ঘণ্টা বাজানো যদি অনুমোদিত হয়, তাহলে ইসলামের আজান কেন নীরব রাখতে হবে—এমন প্রশ্নের পর তিনি আজানের প্রকাশ্য সম্প্রচারের বিরোধিতা করেন।

বেকউইথ কোনো নির্দিষ্ট মসজিদ বা স্থানীয় বিরোধের কথা উল্লেখ করেননি এবং কোনো নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা প্রস্তাব করেননি। সাধারণত প্রকাশ্যে ধর্মীয় শব্দ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে স্থানীয় আইন প্রযোজ্য হতে পারে। তবে আদালতের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে, এসব আইন ধর্মীয় বক্তব্যের ভিত্তিতে বৈষম্যমূলক হতে পারে না।

ইন্ডিয়ানা মুসলিম অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্কের নির্বাহী পরিচালক মালিহা জাফর বলেন, তার জানা মতে ইন্ডিয়ানার কোনো মসজিদই লাউডস্পিকারে বাইরে আজান সম্প্রচার করে না।

জাফর আরো জানান যে যে, মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমানে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশেষত জনসমক্ষে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের কারণে মুসলিমরা নিজেদের অনিরাপদ মনে করছে।

তিনি বলেন, মসজিদগুলোতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে এবং সক্রিয় বন্দুকধারী মোকাবিলার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে মসজিদে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এসে ভাঙচুর ও অন্যান্য ঘটনা ঘটেছে। তিনি আরও বলেন, তিনি প্রতিটি মসজিদের সঙ্গে তার যোগাযোগে নেই এবং তাই এ ধরনের ঘটনার ব্যাপকতার সঠিক হিসাব তিনি দিতে পারবেন না।

জুন মাসে স্টেটহাউসে অনুষ্ঠিত ‘ফেইথ ওভার ফিয়ার’ অনুষ্ঠানে জাফর বলেন, ইন্ডিয়ানা জুড়ে মুসলিম পরিবারগুলো ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষপূর্ণ জনমত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

জাফর বলেন, ‘যখন কুসংস্কার এবং অপতথ্যকে বিনা প্রতিবাদে চলতে দেওয়া হয়, তখন তা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যেখানে মানুষ নিজেদের অবাঞ্ছিত, বিচ্ছিন্ন এবং ভীত বোধ করে।’

বেকউইথ সোমবার যুক্তি দিয়েছেন যে, ইসলামি আযান আমেরিকান সংস্কৃতির জন্য একটি বহিরাগত বিষয়। তিনি একজন দর্শকের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছিলেন, যিনি জানতে চেয়েছিলেন যে গির্জার ঘণ্টা বাজানোর অনুমতি থাকলেও কেন ইসলামিক আজানকে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে।

বেকউইথ পরামর্শ দিয়েছেন যে, যারা ইসলামিক আজান শুনতে চান, তাদের এমন দেশে যাওয়া উচিত যেখানে এই প্রথাটি স্থানীয় ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অংশ। তিনি আরও পরামর্শ দিয়েছেন যে, মসজিদগুলো প্রকাশ্যে আজান সম্প্রচার করার পরিবর্তে নামাজের সময় হলে সদস্যদের কাছে টেক্সট মেসেজ পাঠাতে পারে।

বেকউইথ বলেছেন, ‘ইসরাইল এবং ইন্ডিয়ানার বাকি অংশের সম্প্রদায়গুলোতে উচ্চস্বরে ইসলামিক আজান বাজানোর কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই’।

মে মাস থেকে তীব্রতর হওয়া ইসলামের বিরুদ্ধে তার ব্যাপক সমালোচনা অব্যাহত অংশ হিসেবেই বেকউইথ এই মন্তব্যগুলো করেন।

খ্রিস্টান রাজনৈতিক অনুষ্ঠান ফ্ল্যাশপয়েন্টে দেওয়া এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে বেকউইথ ইসলামের সমালোচনা করেন এবং বলেন যে আমেরিকানদের ‘আবার ঘৃণা করার অনুমতি’ থাকা উচিত। একই মন্তব্যে তিনি ইসলামকে একটি ‘শয়তানের উপাসক গোষ্ঠী’ হিসেবেও বর্ণনা করেন। পরে তিনি দাবি করেন যে এই ধর্মটি ‘নাৎসিবাদের চেয়েও খারাপ’, । পরে তিনি আজান নিষিদ্ধ করার জন্য প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস

তবে বেকউইথের দাবি করা ‘ইসলাম আমেরিকান সংস্কৃতি বা ইতিহাসের অংশ নয়’ এর সঙ্গে দেশটির ইতিহাসের বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখা যায়।

ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব আফ্রিকান আমেরিকান হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার এবং লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয়দের বসতি স্থাপনের প্রাথমিক সময় থেকেই উত্তর আমেরিকায় মুসলমানদের উপস্থিতি ছিল।

১৫০০-এর দশক থেকেই উত্তর আমেরিকায় ইসলামের উপস্থিতি রয়েছে এবং ক্রীতদাস হিসেবে আসা আফ্রিকান মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় চর্চা বজায় রেখেছিলেন

এমনকি আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধেও মুসলমানরা উপনিবেশগুলোর পক্ষে লড়াই করেছিলেন। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা জর্জ ওয়াশিংটন ও থমাস জেফারসন ধর্মীয় স্বাধীনতার বিতর্কের সময় ইসলামকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছিলেন।

থমাস জেফারসন লিখেছিলেন যে ভার্জিনিয়ার ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন ইহুদি, খ্রিস্টান এবং মুসলমানসহ সবার সুরক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছিল।

আমেরিকান সংস্কৃতিতে প্রাথমিক আফ্রিকান মুসলিমদের প্রভাব ব্লুজ সঙ্গীতের সুরের মধ্যেও লক্ষ্য করা যায়।

ফলে ইন্ডিয়ানায় প্রকাশ্যে আজান প্রচার নিয়ে বেকউইথের মন্তব্য নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেছে।

‘আজান আমেরিকান সংস্কৃতির অংশ নয়’
যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লেফটেন্যান্ট গভর্নর মিকা বেকউইথ। ছবি: সংগৃহীত।

ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে কোন কোন খাবারে by মো. ইকবাল হোসেন

বিশেষ কিছু খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়—এমনটাই বলছে গবেষণা। কারসিনোজেন বৈশিষ্ট্য থাকা খাবারগুলোই মূলত ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী। যেসব উপাদান, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ও অণুজীব মানবদেহ বা কোষের ডিএনএর জিনগত পরিবর্তন ঘটায়, সেগুলোকেই কারসিনোজেন বলে।

কারসিনোজেন কিসে থাকে

১. প্রক্রিয়াজাত মাছ-মাংসে ক্যানসার সৃষ্টির অন্যতম উপাদান থাকে। হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন হলো এমন সব রাসায়নিক যৌগ, যা মাছ–মাংস উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার সময় তৈরি হয়। বিশেষ করে মাংস গ্রিল করা, আগুনে ঝলসিয়ে কাবাব বানানো ও ভাজার সময় এগুলো বেশি তৈরি হয়। এই যৌগগুলো কারসিনোজেন হিসেবে বিবেচিত এবং কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

২. কার্বোহাইড্রেট (শর্করা) সমৃদ্ধ অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত করা খাবারে অনেক বেশি কারসিনোজেন যৌগ থাকে। শর্করাকে উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজা বা সেঁকা হলে অ্যাক্রিলামাইড নামক কারসিনোজেন যৌগ তৈরি হয়। এমন খাবারগুলো হলো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ক্র্যাকার, চিপস, তেলেভাজা বিস্কুট, চানাচুর। এমন খাবারগুলো নিয়মিত খেলে পরিপাকতন্ত্রের ক্যানসার ও কোলন ক্যানসারে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

৩. ট্রান্সফ্যাট (ক্ষতিকর চর্বি) সমৃদ্ধ খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। চিপস, চানাচুর, শিঙাড়া, পেঁয়াজু, পিৎজা, বার্গার ইত্যাদি ফাস্ট ফুড ট্রান্সফ্যাট সমৃদ্ধ। ট্রান্সফ্যাট শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি করে, যা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। গবেষণা অনুযায়ী, উচ্চমাত্রায় ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ কলোরেক্টাল, ওভারিয়ান ও প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

৪. প্রিজারভেটিভ সমৃদ্ধ খাবার ক্যানসারের জন্য দায়ী—বিশেষ করে নাইট্রেট ও নাইট্রাইটস সমৃদ্ধ প্রিজারভেটিভ। এগুলো সসেজ, হ্যাম, বেকন, হটডগসহ বিভিন্ন ফাস্ট ফুড এবং প্রক্রিয়াজাত মাংসে ব্যবহার করা হয়। এটি উচ্চ তাপের সংস্পর্শে কারসিনোজেন গঠন করে, যা পাকস্থলীর ক্যানসারে ভূমিকা রাখে।

৫. তামাক বা তামাক জাতীয় পণ্য থেকে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। তামাকের ধোঁয়ায় নাইট্রোসামিন নামক কারসিনোজেন উৎপন্ন হয়। এটি মুখের ও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করে।

৬. বর্তমানে ভেজাল খাবারের পাশাপাশি শাকসবজিতে কীটনাশকের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। কীটনাশকে হেভি মেটাল (ভারী ধাতু) ও অর্গানোফসফেটসহ অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হয়। অর্গানোফসফেট কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করলে তা শাকসবজি ও ফলমূলে কিছুটা অবশিষ্ট থাকতে পারে। এই শাকসবজি নিয়মিত খেলে পাকস্থলী ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৭. অ্যালকোহল পানের ফলে শরীরে অ্যাসিটালডিহাইড তৈরি হয়। এটি ক্যানসার সৃষ্টিকারী জিনকে সক্রিয় করে। তাই নিয়মিত অ্যালকোহল পান করলে পরিপাকতন্ত্রের ও লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি থাকে।

* মো. ইকবাল হোসেন, জ্যেষ্ঠ পুষ্টি কর্মকর্তা, চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতাল

বিশেষ কিছু খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়
বিশেষ কিছু খাবার ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। ছবি: পেক্সেলস

৫ কোটি মানুষের প্রাণ বাঁচানো যে উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম by শিশির মোড়ল

ওরাল রিহাইড্রেশন সলিউশন বা ওআরএসকে আমরা খাওয়ার স্যালাইন বা ওরস্যালাইন বলেই জানি। কলেরা বা কলেরার মতো ডায়রিয়াজনিত রোগে পানিশূন্যতা দূর করার জন্যই ওষুধটি উদ্ভাবিত হয়েছিল। যে উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের নাম। লিখেছেন শিশির মোড়ল

তরল খাইয়ে রোগীর কলেরা নিয়ন্ত্রণ করা যায় কি না, তা নিয়ে ১৯৫২ সালের দিকে কলকাতায় একটি গবেষণা হয়েছিল। ওই গবেষণার ফলাফল নিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সাময়িকী ল্যানসেট–এর ১৯৫৩ সালের ২১ নভেম্বর সংখ্যায় একটি প্রবন্ধ লেখেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালের কলেরা ওয়ার্ডের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক হেমেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জি।

প্রবন্ধে বলা হয়, ১৯৫২ ও ১৯৫৩ সালে কলেরায় আক্রান্ত কিছু রোগীর বমি বন্ধ ও পানিশূন্যতা দূর করার জন্য অ্যাভোমিন ট্যাবলেটের সঙ্গে পাথরকুচির পাতার রস খাওয়ানো হয়েছিল। তাতে ফলও পাওয়া গেছে।

গত শতকের ষাটের দশকের শুরুতে বা তারও কিছু আগে থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কলেরা নিয়ন্ত্রণে কিছু গবেষণা হয়েছিল। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা ছিল। আমাদের এখানে এই গবেষণা করেছিল পাক–সিয়াটো কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (আজ যা আইসিডিডিআরবি)।

মাঠপর্যায়ে ওআরএসের কার্যকারিতা নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা হয় আইসিডিডিআরবির চাঁদপুরের মতলব ও ঢাকা হাসপাতালে। এ পর্যায়ের গবেষণায় মূল গবেষক ছিলেন বিজ্ঞানী ডেভিড আর নেলিন ও রিচার্ড ক্যাস। তাঁদের সঙ্গে রিসার্চ ফেলো হিসেবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী রফিকুল ইসলাম ও মজিদ মোল্লা। অনেকে এই বিজ্ঞানীদের ওআরএসের উদ্ভাবক বলে মনে করেন।

১৯৬৮ সালের আগস্টে ল্যানসেট তাদের গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করে। গবেষণা প্রবন্ধের মোদ্দাকথা ছিল, কলেরা রোগীদের গ্লুকোজ, সোডিয়াম ক্লোরাইড, সোডিয়াম বাইকার্বোনেট ও পটাশিয়াম ক্লোরাইডের দ্রবণ খাওয়ানোর পর ভালো ফল পাওয়া যায়।

ওই প্রবন্ধে বলা হয়েছিল, খাওয়ার দ্রবণের এই উপাদানগুলো সস্তা ও সহজে পাওয়া যায়। এসব উপাদান সংরক্ষণ বা মজুত করা সম্ভব। আর পানি দিয়েই এই দ্রবণ তৈরি করা যায়।

ঢাকা ও কলকাতায় কতটা সমান্তরালভাবে ওআরএস নিয়ে গবেষণা চলেছিল, দুই শহরের বিজ্ঞানীদের মধ্যে পার্থক্য কী ছিল, তার একটি বর্ণনা ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্টভিউ প্রেস থেকে প্রকাশিত কলেরা: দ্য আমেরিকান সায়েন্টিফিক এক্সপেরিয়েন্স ১৯৪৭–১৯৮০ বইয়ে পাওয়া যায়। ওই গ্রন্থে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে বিশদ বর্ণনা আছে।

ওই বছরের জুন নাগাদ পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থীশিবিরে কলেরা দেখা দেয়। তখন বনগাঁও এলাকার শরণার্থীদের প্রথম ওআরএস খাওয়ানো হয়। এটাই ছিল ওআরএসের প্রথম ব্যাপক ব্যবহার। ভারতে এই কাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দিলীপ মহলানবিশ।

তাই একক কোনো প্রতিষ্ঠান, একক কোনো বিজ্ঞানী বা বিজ্ঞানী দল খাওয়ার স্যালাইন উদ্ভাবন করেনি। ওআরএসের গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা তৈরি হওয়ার আগে অনেকে অনেক ধরনের কাজ করেছেন। ম্যানিলায় কিছু কাজ হয়েছে, কিছু হয়েছে ঢাকায়, কিছু কলকাতায়। ওআরএসের চূড়ান্ত রূপটি এসেছে ১৯৬৭ বা ১৯৬৮ সালের দিকে।

পানি–লবণ–গুড়ের ঘুঁটা

স্বাধীনতার পর দেশে ডায়রিয়াজনিত রোগের প্রকোপ ছিল প্রবল। শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও ছিল ডায়রিয়া। তখন মানুষের বাড়ি বাড়ি ওআরএসের প্যাকেট পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। ওই পটভূমিতে ওআরএস বা মুখে খাওয়ার স্যালাইনকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল, বিশ্বের জনস্বাস্থ্য আন্দোলনে তা বিরল।

বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির পদ্ধতি বা কৌশল শিখিয়েছিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের মাঠকর্মীরা। ১৯৮০ সালে ডায়রিয়া সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা ও বাড়িতে খাওয়ার স্যালাইন তৈরির প্রকল্প শুরু করে ব্র্যাক। ‘এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি’—এই ফর্মুলা নিয়ে মাঠে নামে ব্র্যাক।

বাড়ি বাড়ি গিয়ে ব্র্যাকের কর্মীরা শিখিয়েছিলেন: প্রথমে ফুটিয়ে পানি জীবাণুমুক্ত করতে হবে, একটি পাত্রে আধা সের (আধা লিটারের কিছু বেশি) পানিতে এক চিমটি লবণ ও এক মুঠ গুড় নিয়ে ভালো করে গুলতে বা ঘুঁটতে হবে। সেই দ্রবণ ডায়রিয়ার রোগীকে খাওয়াতে হবে। ব্র্যাকের লক্ষ্য ছিল দেশের প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজনকে এই দ্রবণ তৈরি শেখাতে হবে। ব্র্যাকের পাশে ছিল সরকার।

বেঁচেছে পাঁচ কোটির বেশি প্রাণ

ল্যানসেট–এর ১৯৭৮ সালের ৫ আগস্ট সংখ্যার সম্পাদকীয়র বিষয় ছিল ওআরএস। তাতে বলা হয়েছিল, ওআরএসের উদ্ভাবন চিকিৎসাক্ষেত্রে শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তার ২৮ বছর পর ২০০৬ সালের ১৬ অক্টোবর এক চিমটি লবণ, এক মুঠ গুড় ও আধা সের পানি—এই ফর্মুলার সাফল্য নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করে টাইম ম্যাগাজিন

এগুলো বিশ্বের মানুষের কাছে ওআরএসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বেড়ে যাওয়ার উদাহরণ। এরই মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ ওআরএসের ব্যবহার বৃদ্ধির ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ডায়রিয়া ব্যবস্থাপনা ও ওআরএসের ব্যবহার নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতে থাকে। তার নেতৃত্বে ছিলেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষকেরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ডায়রিয়া হলে পায়খানার সঙ্গে শরীর থেকে দ্রুত পানি বের হয়ে যায়। ওআরএসের মাধ্যমে সেই পানি প্রতিস্থাপন করা হয়। ওআরএস ব্যবহার করে এ পর্যন্ত পাঁচ কোটির বেশি মানুষের প্রাণ রক্ষা হয়েছে।

বছরে বিক্রি ১৫০ কোটি প্যাকেট

এখন রক্তচাপ কমে গেলেও খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) খেয়ে নিচ্ছে মানুষ। প্রখর রোদে ক্লান্ত–ঘর্মাক্ত রিকশাচালক রাস্তার পাশের দোকান থেকে আধা লিটার পানির বোতল কিনে তাতে এক প্যাকেট খাওয়ার স্যালাইন গুলে খেয়ে নিচ্ছেন। বহু মানুষের বাড়িতেই ওরস্যালাইন এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

কেউ কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে, বাক্স–পেটরা গোছানোর সময় দেখে নেন, খাওয়ার স্যালাইনের প্যাকেট নেওয়া হয়েছে কি না। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুদিদোকান থেকে শুরু করে রাজধানীর অভিজাত হাসপাতালেও পাওয়া যায় ওরস্যালাইন।

দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী, নিরক্ষর, শিক্ষিত—সব শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন মেটাচ্ছে এটি। ওআরএস এ দেশের মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বিশ্বের যেসব দেশে ওআরএসের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, বাংলাদেশ তার অন্যতম। ওষুধটি উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) বিজ্ঞানীদের বড় ভূমিকা ছিল।

অন্যদিকে সাধারণ মানুষের কাছে ওআরএস পৌঁছানো এবং বাড়িতে ওআরএস তৈরি করার পদ্ধতি–কৌশলও উদ্ভাবন করেছে এ দেশের মানুষ। সারা দেশে সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানির (এসএমসি) ওআরএসের একক আধিপত্য।

এসএমসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তছলিম উদ্দিন খান বলেন, ‘সারা বছর এসএমসির প্রায় ১৫০ কোটি প্যাকেট ওরস্যালাইন বিক্রি হয়। বাজারের ৯৫ শতাংশ ওরস্যালাইন এসএমসির।’

এসএমসি ছাড়া আরও কয়েকটি কোম্পানির ওআরএসের প্যাকেট বাজারে বিক্রি হয়। এরা বছরে প্রায় আট কোটি প্যাকেট ওআরএস বিক্রি করে। এ ছাড়া মানুষ নিজেই ঘরে বা বাড়িতে পানির সঙ্গে লবণ ও চিনি বা গুড় গুলিয়ে খাওয়ার স্যালাইন তৈরি করে। বাড়িতে বানানো এই মিশ্রণও ওআরএস। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো উদ্ভাবন মানুষের জীবনের সঙ্গে এমন মিশে যাওয়ার উদাহরণ বিরল।

(বর্ণিল ভালো থাকুন ২০২৫–এ প্রকাশিত)

লবণ ও গুড় মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করছেন মতলবের একজন নারী, ১৯৭৯–৮০ সাল
লবণ ও গুড় মিশিয়ে স্যালাইন তৈরি করছেন মতলবের একজন নারী, ১৯৭৯–৮০ সাল। ছবি: আইসিডিডিআরবি

ট্রাকে চড়ে, সামরিক বিমানে চড়ে তুরস্ক ত্যাগের আগে কী কী করেছিলেন ট্রাম্প, মানসিক অবস্থাই-বা কেমন ছিল

তুরস্কে গত মাসে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মঞ্চে উঠছিলেন, ততক্ষণে তাঁকে গোপনে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছিল।

ওই দিন (ন্যাটো সম্মেলনের শেষ দিনে, ৮ জুলাই) সকালেই মার্কিন কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে একটি উদ্বেগজনক তথ্য নিয়ে আসেন। ইরানিরা জানত, আঙ্কারার কোন বিলাসবহুল চেইন হোটেলে ট্রাম্প অবস্থান করছিলেন। তুরস্কের রাজধানীতে তাঁর মোটর শোভাযাত্রা কীভাবে চলাচল করছে, সে সম্পর্কেও তারা অবগত ছিল।

মার্কিন কর্মকর্তারা সিএনএনের কাছে দাবি করেছেন, ইরান ট্রাম্পকে হত্যা করার পরিকল্পনায় অনড় ছিল। এমনকি তারা এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানটিকে ভূপাতিত করার জন্য কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার ছক কষছিল।

তুরস্কের রাজধানীতে ট্রাম্পের নিরাপত্তা ও যাতায়াতের খুঁটিনাটি তথ্য ইরান যেভাবে জোগাড় করেছিল, তা তাঁর পুরো দলকে আতঙ্কিত করে তোলে। যদিও কিছু মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, অত্যন্ত সুরক্ষিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্পকে হত্যার ইরানিদের চেষ্টা সফল হওয়াটা অসম্ভব।

একজন কর্মকর্তা জানান, ইসরায়েলি সরকার ইরানের এ সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার গোয়েন্দা তথ্য মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সঙ্গে ভাগাভাগি করেছিল। তবে সিআইএ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ইসরায়েলের এই গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সন্দিহান ছিলেন।

সিআইএর কয়েকজন কর্মকর্তা এ তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ইরান আদৌ এ ধরনের হামলা চালানোর ক্ষমতা রাখে কি না, তা নিয়েও তাঁরা সন্দিহান ছিলেন বলে ওই কর্মকর্তা সিএনএনকে জানান।

তা সত্ত্বেও এ তথ্য পাওয়ার পর মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে সতর্কতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়া মার্কিন কর্মকর্তারা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে ট্রাম্পের ওপর তিনটি পৃথক হত্যাচেষ্টা চালানো হয়েছিল। তার ওপর ইরানের এই ক্রমাগত হুমকির কারণে তাঁর নিরাপত্তা দল সব সময়ই একধরনের অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ছিল।

তাই বিষণ্ন মুখে এবং বাঁ হাতে একটি ফোল্ডার ধরে ট্রাম্প নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দুই ঘণ্টা দেরিতে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন। সেখানে তিনি সম্মেলনটিকে একটি বড় সাফল্য বলে ঘোষণা করেন। তবে আগের দিনের মতোই ট্রাম্পের কথাবার্তায় ইরান তাঁকে হত্যা করার যে চেষ্টা করছে, তা নিয়ে একধরনের দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠছিল।

ট্রাম্পের পাশে এ সময় মন্ত্রিসভার তিনজন সদস্য এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দাঁড়িয়ে ছিলেন। ট্রাম্প বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের জীবন অত্যন্ত বিপজ্জনক। এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি পেশা।’

কয়েক মিনিট পরই ট্রাম্প মঞ্চ ত্যাগ করেন। তাঁর মোটর শোভাযাত্রাটি আঙ্কারা বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হয়। এটি প্রেসিডেন্ট কমপ্লেক্স ত্যাগ করার ঠিক চার মিনিট পর একটি সাদা রঙের ক্যাটারিং ট্রাক এসে এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানের পাশে থামে।

হুমকি মূল্যায়ন ও নতুন কৌশল

প্রেসিডেন্টকে কীভাবে নিরাপদে দেশ থেকে বের করে নেওয়া যায়, তা নিয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি ছোট দল দিনভর ব্যস্ত ছিল। কর্মকর্তারা জানান, তাঁরা সকাল ও বিকেলজুড়ে তুরস্কের বিভিন্ন বিকল্প নিরাপত্তাব্যবস্থা খতিয়ে দেখেন। এ সময় ট্রাম্প বিশ্বনেতাদের সঙ্গে একের পর এক বৈঠক করছিলেন এবং কর্মকর্তারা তাঁকে প্রতিমুহূর্তের খবরাখবর জানাচ্ছিলেন।

দীর্ঘ আলোচনার জন্য কর্মকর্তাদের হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিল না। ৮ জুলাই সন্ধ্যায় ট্রাম্পের তুরস্ক ত্যাগ করার কথা ছিল। এই সুনির্দিষ্ট হুমকির বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই তাঁর রওনা হওয়ার সূচি নির্ধারিত ছিল।

আঙ্কারার কারুকার্যখচিত ও অত্যন্ত সুরক্ষিত বেশতেপে প্রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সের ছোট ছোট কক্ষে বসে এ পরিকল্পনা করা হয়। ট্রাম্পের পৌঁছানোর আগেই তুরস্কে চলে এসেছিলেন মার্কিন জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। তিনি সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে অন্য শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক করেন এবং একটি জরুরি পরিকল্পনা সাজান।

কর্মকর্তারা হুমকির ধরনসহ বেশ কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখছিলেন। ইসরায়েল প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছিল, ইরান তার সহযোগীদের ব্যবহার করে ট্রাম্পকে হত্যার জন্য একটি নতুন পরিকল্পনা করছে। তবে এ তথ্য ছিল বেশ অস্পষ্ট। ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা সে সময় এক সংবেদনশীল পর্যায়ে ছিল। তাই কিছু কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, এটি হয়তো ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার একটি চেষ্টা হতে পারে।

এ বিষয়ে অবগত তিনটি মার্কিন সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্পের এ সফরের আগে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যে ইরানের নতুন কোনো নির্দিষ্ট হত্যা পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। এর পরিবর্তে কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ইরানের বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে ট্রাম্পের মৃত্যুর জন্য ক্রমাগত আহ্বান জানানোর সাধারণ ঘটনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন।

ট্রাম্পকে নিশানা করার এ ইচ্ছা কেবল ইরানের নেতৃত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আগের সপ্তাহে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। কয়েক দিন ধরে চলা সেই জানাজায় অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষের হাতেও ট্রাম্পকে হত্যা করার আহ্বান–সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা গিয়েছিল।

একজন মার্কিন কর্মকর্তার মতে, শীর্ষ সম্মেলন শুরুর পর মার্কিন গোয়েন্দাদের কাছে আরও তথ্য আসতে শুরু করে। এতে বিমানবন্দর এলাকার কাছাকাছি কোনো স্থান থেকে উড্ডয়নের সময় এয়ারফোর্স ওয়ান লক্ষ্য করে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কার কথা বলা হয়।

কিছু কর্মকর্তার কাছে এই আশঙ্কা একটু অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল। ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ এবং তুরস্কের সঙ্গে ইরানের ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের নিরাপত্তা ছিল নজিরবিহীনভাবে কঠোর। বিশ্বনেতাদের অন্যান্য সম্মেলনের চেয়েও এখানে অনেক বেশি নিরাপত্তাব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।

আঙ্কারাজুড়ে হাজার হাজার তুর্কি নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন ছিল। প্রায় প্রতিটি রাস্তার মোড়ে বসানো হয়েছিল অস্থায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা। শীর্ষ সম্মেলনস্থল এবং বিমানবন্দরকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছিল বহুমাত্রিক নিরাপত্তাবলয়। এই বিমানবন্দর দিয়েই ন্যাটোর ৩২টি সদস্যদেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা যাতায়াত করছিলেন।

কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার এ তথ্য ঠিক কোথা থেকে এসেছে, তা স্পষ্ট নয়। মার্কিন এবং আঞ্চলিক কর্মকর্তারা পরে জানান, প্রেসিডেন্টের প্রস্থানের পর কোনো সন্দেহভাজন উগ্রবাদীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণও পাওয়া যায়নি।

তবু সিক্রেট সার্ভিস মনে করেছিল, সময় কম থাকলেও এই সম্ভাব্য ঝুঁকিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। একজন মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘হুমকিটি এতটাই গুরুতর ছিল যে সেদিন আমাদের চরম কিছু পদক্ষেপ নিতে হয়েছিল। পরিস্থিতি তেমন না হলে আমরা কখনোই এ পদক্ষেপগুলো নিতাম না।’

এ বিষয়ে অবগত দুটি সূত্র জানায়, কিছু নিরাপত্তা কর্মকর্তা মনে করেছিলেন, ট্রাম্পকে তুরস্ক থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় ছিল সকালেই গোপনে দেশ ত্যাগ করা, যখন ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি প্রথম শনাক্ত হয়।

তবে সেই প্রস্তাব নাকচ করে দেওয়া হয়। ট্রাম্প তাঁর পূর্বনির্ধারিত সূচি বজায় রাখেন। তিনি সংবাদ সম্মেলন ডাকার আগে ইউক্রেন ও সিরিয়ার নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেন।

তবে এটি স্পষ্ট ছিল, এই জীবননাশের হুমকি তাঁর ওপর একধরনের মানসিক চাপ তৈরি করছিল। ন্যাটোর মহাসচিবের সঙ্গে এক সকালের বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ‘আজ সকালে আমি একটি বিষয় লক্ষ করলাম। আমি তাদের সব তালিকার শীর্ষে রয়েছি। এ পর্যন্ত মনে হচ্ছে, আমি কিছুটা ভাগ্যবান। কিন্তু ভাগ্য হয়তো সব সময় সহায় থাকে না।’

খাবার সরবরাহের ট্রাকের আড়ালে ছদ্মবেশ

যখন সিক্রেট সার্ভিস, হোয়াইট হাউস এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা ট্রাম্পকে গোপনে দেশ থেকে বের করার পরিকল্পনা করছিলেন, তখন ট্রাম্প নিজেও একটি ভিন্ন চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন। তিনি তুরস্কে আসতে যে ৪০ কোটি ডলার মূল্যের জাম্বো জেট বিমানটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটি কেন ফেরতযাত্রায় ব্যবহার করছেন না, তার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা তাঁকে দাঁড় করাতে হতো।

কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭ উড়োজাহাজটি প্রেসিডেন্টের কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয় ছিল। তবে কিছু কর্মকর্তা গোপনে ইরানের প্রতিবেশী দেশে এই বিমানে করে ভ্রমণ করার বিষয়ে আগে থেকেই বেশ শঙ্কিত ছিলেন।

ওয়াশিংটন থেকে ফ্লাইটটি সফলভাবেই তুরস্কে অবতরণ করে। ট্রাম্প নিজের পছন্দের রঙে সাজানো নতুন উড়োজাহাজটি নিয়ে বেশ গর্বিত ছিলেন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি আনন্দের সঙ্গে উড়োজাহাজটি দেখান। ট্রাম্প টারমাকে দাঁড়িয়ে তাঁর সমকক্ষ এরদোয়ানকে বলেছিলেন, তাঁর পুরোনো বিমানটি এখন কেবল একটি ‘ব্যাকআপ’ হিসেবে রয়েছে।

তবে এর এক দিন পরই নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন, ট্রাম্পকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন বিমান বা অতি পরিচিত হালকা নীল ও সাদা রঙের পুরোনো মডেল—কোনোটিই নিরাপদ হবে না। ট্রাম্প দ্রুত বুঝতে পারেন, বিশ্বসেরা বলে দাবি করা তাঁর সাধের বিমানটি কেন ফেরতযাত্রায় ব্যবহার করা হচ্ছে না, তা নিয়ে মানুষ অপ্রীতিকর প্রশ্ন তুলতে পারে।

বেলা ৩টা ৪২ মিনিটে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠকে বসার ঠিক আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, কাতার থেকে পাওয়া নতুন উড়োজাহাজটি যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটিতে পাঠানো হচ্ছে, যাতে সেখানকার সেনারা এটি ঘুরে দেখার সুযোগ পান।

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, ‘সবাই দারুণ উত্তেজিত। আমরা ভাবলাম, প্রথম সুযোগটি সেনারাই পাক।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, তিনি নিজে পুরোনো বিমানটিতে করে ফিরে যাচ্ছেন।

বাস্তবে ট্রাম্প কোনো উড়োজাহাজেই ফিরছিলেন না। তাঁর উপদেষ্টারা এবং সিক্রেট সার্ভিস মিলে এক চতুর ছদ্মবেশের পরিকল্পনা করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সুরক্ষার জন্য কৌশলটি আগে থেকেই তাদের গোপন নীতিমালায় ছিল।

সিক্রেট সার্ভিসের যোগাযোগপ্রধান অ্যান্টনি গুগলিয়েলমি বলেন, ‘মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস যেকোনো জায়গায় আমাদের সুরক্ষামূলক কার্যক্রমের জন্য রিয়েল-টাইমে সব ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্টের ওপর হওয়া হত্যাচেষ্টা এবং উল্লেখযোগ্য হুমকি বৃদ্ধির কারণে আমরা আমাদের মিশন সফল করতে সব সময় অনড় রয়েছি।’

এই চতুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ট্রাম্পকে প্রথমে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান বিমানে চড়তে হয়েছিল। এরপর তাঁকে বিমানের মূল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে দ্রুত হেঁটে অন্য পাশের একটি বিকল্প বহির্গমন পথ দিয়ে বের করে নেওয়া হয়, যেখানে একটি সাদা রঙের খাবার সরবরাহের (ক্যাটারিং) ট্রাক অপেক্ষা করছিল।

তুর্কি এয়ারলাইনসের সুস্বাদু খাবারের বেশ সুনাম রয়েছে। বিমানের কেবিন ক্রুরা শেফের টুপি ও সাদা জ্যাকেট পরে ঐতিহ্যবাহী নানা খাবার পরিবেশন করেন। বিমানের এই খাবারগুলো সাধারণত হাইড্রোলিক ট্রাকের মাধ্যমে উড়োজাহাজে ওঠানো হয়।

তবে এ বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি জানান, এবার নির্দিষ্ট সময়ে ক্যাটারিং ট্রাকটি পুরোপুরি খালি ছিল। মার্কিন কর্মকর্তারা ওই দিন সকালেই ঠিক কী কাজে লাগবে, তা বিস্তারিত না জানিয়েই গোপনে ট্রাকটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিলেন।

আগে থেকেই পরিষ্কার করে রাখা ট্রাকের ভেতরের খালি বাক্সে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন তাঁর সার্বক্ষণিক ব্যক্তিগত সহকারী নাটালি হার্প। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ওভাল অফিসের বর্তমান অপারেশন ডিরেক্টর ও একসময়ের বিশ্বস্ত বডিগার্ড ওয়াল্ট নাউটা এবং হোয়াইট হাউসের পার্সোনেল প্রধান ড্যান স্কাভিনো, যিনি কয়েক দশক ধরে ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের সুরক্ষায় কয়েকজন সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টও সেই ট্রাকের কনটেইনারের ভেতরে ছিলেন।

সবাই ট্রাকে ওঠার পর স্যুট পরা একজন সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট সামনের কেবিনে চালকের পাশের আসনে বসেন। এরপর টারমাক পেরিয়ে মাত্র ১৬২ সেকেন্ড ড্রাইভ করে ট্রাকটি ট্রাম্পকে নিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি সি-৩২এ বিমানের পাশে গিয়ে থামে।

খাবার সরবরাহের এই ট্রাকে কারা কারা চড়বেন, তা ঠিক কীভাবে ঠিক করা হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। পরে যুক্তরাজ্যের মিল্ডেনহল বিমানঘাঁটির উদ্দেশে রওনা হওয়া এই সি-৩২এ সামরিক বিমানে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগ দেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ।

বড় উড়োজাহাজেই রয়ে যান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। তাঁদের সঙ্গে ট্রাম্পের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সহযোগীও ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শীর্ষ নীতি উপদেষ্টা স্টিফেন মিলার, যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চেং, স্টাফ সেক্রেটারি উইল শার্ফ, উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল নিধাম এবং ডেপুটি চিফ অব স্টাফ রিচার্ড ওয়াল্টার্স।

জনসংখ্যা ও অগ্রবর্তী দলের অন্য স্টাফরাও বড় উড়োজাহাজেই অবস্থান করছিলেন। তাঁদের অনেকেই জানতেন না, ট্রাম্প সামনের কেবিনে নেই এবং আসলে তিনি এই উড়োজাহাজের যাত্রীই নন। তাঁদের সবাইকে উড়োজাহাজের পর্দা টেনে রাখতে বলা হয়েছিল।

সাবেক সিক্রেট সার্ভিস এজেন্ট ও সিএনএনের বিশ্লেষক জনাথন ওয়াক্রো বলেন, প্রেসিডেন্টের যাতায়াতের সময় সিক্রেট সার্ভিসের পক্ষে এমন বিভ্রান্তিকর কৌশল নেওয়া নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার জন্য প্রায় সময়ই এমন মেকি বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্ট যখন কোনো হেলিকপ্টারে ওঠেন, তখন একই রকম তিনটি হেলিকপ্টার আকাশে ওড়ে, যাতে সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে চিহ্নিত করা না যায়।’

ট্রাম্প অবশ্য চলতি সপ্তাহে সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, তুরস্ক ছাড়ার সময় আসলে তাঁর প্রধান উড়োজাহাজটিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিল। যদিও সেখানে তাঁর না থাকার কথা কেউ জানতেন না। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা যে দুটি বিমানকেই অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেছিলেন, তার প্রমাণ মেলে আরেকটি পদক্ষেপে। তুরস্কের আকাশসীমা পার না হওয়া পর্যন্ত দুটি বিমানের সুরক্ষার্থে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ। ছবির বাঁয়ে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাবহর দেখা যাচ্ছে
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ওয়েস্ট পাম বিচে কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ। ছবির বাঁয়ে প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তাবহর দেখা যাচ্ছে

কেন জাপানের এই দুটি শহর বিশ্বের অন্যতম বাসযোগ্য

ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ‘গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬’-এ বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় সপ্তম হয়েছে ওসাকা, দশম টোকিও। শীর্ষ ১০-এ দুটি শহর নিয়ে জায়গা করে নেওয়া এশিয়ার একমাত্র দেশ জাপান।

একটি শহরকে সত্যিকার অর্থে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে আকাশচুম্বী ভবন, পর্যটন আকর্ষণ কিংবা আধুনিক প্রযুক্তি নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শহরে ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য আরও জরুরি কিছু সাধারণ বিষয় আছে। গাড়ি ছাড়া কর্মস্থলে যাওয়া যায় কি না, হেঁটে বাজার করা যায় কি না, হুইলচেয়ারে রেলস্টেশন ব্যবহার করা যায় কি না, কিংবা বেবি স্ট্রলার (শিশুর ঠেলাগাড়ি) নিয়ে ফুটপাত দিয়ে নিরাপদে চলা যায় কি না—এসবই শহরের বাসযোগ্যতার বড় মাপকাঠি।

এই সাধারণ বিষয়গুলোতেই এগিয়ে জাপানের শহরগুলো। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ‘গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬’-এ বিশ্বের সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় সপ্তম হয়েছে ওসাকা, দশম টোকিও। শীর্ষ ১০-এ দুটি শহর নিয়ে জায়গা করে নেওয়া এশিয়ার একমাত্র দেশ জাপান।

সূচকে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় পূর্ণ নম্বরের পাশাপাশি শক্তিশালী অবকাঠামো জাপানের শহরগুলোকে এগিয়ে রেখেছে। তবে বাসিন্দা ও নগর–পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞদের মতে, আরও কিছু সুচিন্তিত ব্যবস্থা দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তুলেছে। এর মধ্যে চারটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

১. রোজকার জীবনকে কেন্দ্র করে শহর

জাপানের শহরগুলোতে পাড়ার মধ্যেই দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ রয়েছে। এর বড় উদাহরণ ‘শোতেনগাই’। সরু সড়কের দুই পাশে ছোট ছোট দোকানপাটে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যিক এলাকা। সাধারণত এসব সড়কে ডেলিভারি ভ্যান ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করে না, স্থানীয় মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাবারের দোকানই বেশি থাকে। শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, শোতেনগাই স্থানীয় মানুষের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনস্থলও। পুরোনো শোতেনগাইয়ের অনেকগুলো বড় মন্দির বা উপাসনালয়ের পথে গড়ে উঠেছে, আর আধুনিকগুলো রেলস্টেশন বা জনসমাগমের স্থানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে। জাপানের শহর ও শহরতলিতে ছড়িয়ে থাকা এসব শপিং স্ট্রিট দেশটির স্থানীয় জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির এক অনন্য পরিচয় বহন করে।

১৮ বছর ধরে টোকিওতে বসবাসকারী পাওয়ার হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী জশ গ্রিসডেল বলেন, ছাদঢাকা ব্লকের মধ্যেই সবজির দোকান, পুরোনো কফিশপ, ক্লিনিক, ১০০ ইয়েনের দোকান এবং রাতের খাবারের নানা ব্যবস্থা পাওয়া যায়।

২. সবার জন্য পরিবহন

সময়ানুবর্তিতা, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য জাপানের গণপরিবহন বিশ্বজুড়ে পরিচিত। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী গ্রিসডেলের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। জাপানের প্রায় যেকোনো স্টেশনে আগাম পরিকল্পনা ছাড়াই যাওয়া যায়। লিফট নষ্ট থাকলেও বিকল্প ব্যবস্থা থাকে।

এর পেছনে রয়েছে ২০০৬ সালের ‘ব্যারিয়ার-ফ্রি’ আইন। এরপর দুই দশক ধরে দেশজুড়ে গণপরিবহনব্যবস্থা প্রতিবন্ধীবান্ধব করা হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে ব্যস্ত রেলস্টেশনগুলোর ১০টির মধ্যে ৯টির বেশি এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যাতে সিঁড়ি ব্যবহার না করেও চলাচল করা যায়।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত হলুদ উঁচু রেখাযুক্ত পথের উদ্ভাবনও জাপানে। ১৯৬৭ সালে প্রকৌশলী সেইইচি মিয়াকে দৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকা এক বন্ধুকে সাহায্য করতে এটি তৈরি করেন।

৩. জায়গার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা

আধুনিকতা মানেই পুরোনো সবকিছু সরিয়ে ফেলা নয়—জাপানের শহরগুলোতে এরও উদাহরণ রয়েছে। ওসাকার কাছে কায়াশিমা স্টেশনের ছাদ ভেদ করে বেড়ে ওঠা প্রায় ৭০০ বছরের পুরোনো কর্পূরগাছটি তার একটি উদাহরণ।

শহরের ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকাতেও পুরোনো মন্দির, ছোট রেস্তোরাঁ, গাছপালা ও স্থানীয় জীবনের উপস্থিতি ধরে রাখা হয়েছে। ফলে আধুনিক শহরের মধ্যেও মানুষ নিজের জায়গার সঙ্গে একটি সম্পর্ক অনুভব করতে পারে।

৪. গণপরিসরে শিষ্টাচার

শুধু অবকাঠামো নয়, বাসযোগ্য শহর তৈরিতে বাসিন্দাদের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো, ট্রেনে নীরবতা বজায় রাখা, অগ্রাধিকার আসন ছেড়ে দেওয়া, যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলা কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা—এসব অভ্যাস শহরের জীবনকে শান্ত রাখে।

জাপানের বাসযোগ্য শহরের গল্প তাই শুধু উন্নত রেলব্যবস্থা, লিফট বা সুন্দর রাস্তার গল্প নয়। বরং শহরকে এমনভাবে গড়ে তোলার গল্প, যেখানে দৈনন্দিন জীবন সহজ, চলাচল সবার জন্য উন্মুক্ত, পুরোনো ও নতুনের সহাবস্থান রয়েছে এবং নাগরিকেরাও গণপরিসরের প্রতি দায়িত্বশীল। শহরকে বাসযোগ্য করে তোলার এই চার সহজ নিয়মই হয়তো ওসাকা ও টোকিওকে বিশ্বের সেরা শহরগুলোর কাতারে নিয়ে গেছে।

সূত্র: বিবিসি

জাপানের টোকিও শহর
জাপানের টোকিও শহর। ছবি: পেক্সেলস

টুইট করে হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যাবে না, যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় মেনে নিতে হবে: ইরান

যুক্তরাষ্ট্রকে পরাজয় মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে ‘অত্যন্ত নিকৃষ্ট’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম আরও বাড়বে, এ জন্য তিনি মার্কিনদের প্রস্তুত থাকতেও বলেছেন।

ইরান যুদ্ধ অবসানে শান্তি আলোচনায় অগ্রগতি হলেও এখনো একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলও কার্যত অচলই হয়ে আছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে আজ শনিবার ভোরে এক পোস্টে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি বলেন, ‘এই প্রণালি ইরানের নির্দেশেই খোলা ও বন্ধ হবে। তাই যতক্ষণ না আপনারা পরাজয়ের বাস্তবতা মেনে নিচ্ছেন এবং অলীক কল্পনায় বিভোর থাকা বন্ধ করছেন, ততক্ষণ ইরান অবরোধ বলবৎ রাখবে।’

কাজেম আরও বলেন, ‘একটি টুইট বা বিমানবাহী রণতরী দিয়ে, কোনো আদেশ জারি করে কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতা দিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যায় না।’

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার কোনো সিদ্ধান্ত ইরান নেয়নি।

শনিবার প্রকাশিত ওই সাক্ষাৎকারে ইরানের সংবাদমাধ্যম শাহরারা নিউজকে আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আবার শুরু করতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে কিছু শর্ত মেনে নিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের দাম ২৯ শতাংশ বেড়েছে

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো, যা এখন কার্যত অচল হয়ে গেছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাত চলতে থাকায় মার্কিনদের পেট্রোলের জন্য আরেকটু বেশি দাম দিতে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প।

গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ‘পেট্রোলের জন্য সামান্য একটু বেশি দাম দেওয়া সার্থক, যদি এর বিনিময়ে একটি অত্যন্ত নিকৃষ্ট দেশ পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।’ যেসব দাবির প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে যৌক্তিক প্রমাণ করতে চান, তাঁর অন্যতম এটি।

আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ছিল প্রায় ৪ দশমিক ০৮ ডলার, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি।

নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প পেট্রোলের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এখন বরং পেট্রোলের দাম অনেকটা বেড়ে গেছে। যার ফলে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বেড়েছে এবং সাধারণ ভোক্তাদের ভেতরে হতাশা দেখা দিয়েছে। যার প্রভাব মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপর পড়তে পারে।

আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা নভেম্বরের নির্বাচনে ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

যুদ্ধ নিয়ে ইরান নিজেদের দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখলেও দেশটির অর্থনীতিতে এর ক্ষতির প্রভাব পড়ার লক্ষণ ফুটে উঠেছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং ইরানের তেল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে ডেভিড এস ম্যাক সেন্টার ফর ট্রেনিং অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্সে বক্তব্য দিচ্ছেন। ১৪ আগস্ট ২০২৬

কুষ্টিয়ায় আমির হামজার গাড়িতে হামলা, ভাঙচুর

কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজার গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। আজ শনিবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে শহরে থানাপাড়া জামে মসজিদের সামনে ছয়রাস্তার মোড়ে এ ঘটনা ঘটে।

এ হামলার জন্য গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের অভিযুক্ত করছেন কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের আমির খন্দকার এ কে এম আলী মহসীন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গণ অধিকার পরিষদের লোকজন আক্রমণ করেছে। তাঁদের সঙ্গে বিএনপির ছাত্রদল যোগ দিয়েছে। এমপি সাহেব (আমির হামজা) বাইরে থেকে আসছিলেন, ওরা ইটপাটকেল মেরে গাড়ির পেছনের কাচ ভেঙেছে। আমাদের লোকজন প্রতিহত করতে গেলে মারামারি হয়েছে। আমরা এ ব্যাপারে কেস (মামলা) করব।’

হামলায় আমির হামজা আঘাত পেয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নে জেলা জামায়াতের আমির বলেন, ‘আঘাতপ্রাপ্ত হননি। এমপি সাহেব ওনার বাসায় আছেন। আমাদের লোকজন প্রটেকশন দিচ্ছে।’

পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি গণ অধিকার পরিষদ সম্পর্কে আমির হামজা একটি বক্তব্য দিয়েছেন। সেই বক্তব্যের জেরে গণ অধিকার পরিষদের পক্ষ থেকে আজ বিকেলে কুষ্টিয়া শহরের ছয় রাস্তার মোড়ে থানাপাড়া জামে মসজিদের সামনে প্রতিবাদ সভা করা হয়। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে আমির হামজা নিজ গাড়িতে করে মোড় হয়ে পাশেই তাঁর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। এ সময় সমাবেশ থেকে স্লোগান দিতে থাকেন গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা। তখন আমির হামজার গাড়ির সামনে-পেছনে পুলিশের একাধিক গাড়ি ছিল।

একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ছয় রাস্তার মোড় অতিক্রম করার সময় গণ অধিকার পরিষদ ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের (এমপির গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা) মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়। পাল্টাপাল্টি স্লোগানও চলতে থাকে। একপর্যায়ে জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মীরা আমির হামজাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে হেঁটে বাড়ির দিকে নিয়ে যান। গাড়িটিও তাঁদের পেছন পেছন যেতে থাকে। দুই দলের নেতা-কর্মীদের ধাক্কাধাক্কির এক পর্যায়ে দুই পক্ষই ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। ইটের আঘাতে আমির হামজার গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। গাড়ির আরও কয়েক জায়গায় ইটের আঘাত লাগে।

দুই পক্ষের মুখোমুখি অবস্থানের সময় ছয় রাস্তার মোড় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ ছোটাছুটি করতে থাকে। উভয় পক্ষের মধ্যে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া চলে। ঘটনার সময় পুলিশ ও র‌্যাবের সদস্যরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন।
কুষ্টিয়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কবির হোসেন মাতুব্বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা সাথেই ছিলাম। এরই মধ্যে হঠাৎ করে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এমপি সাহেব বাড়িতে আছেন। পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে আছে।’

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আমির হামজার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর গাড়িটি গ্যারেজে রাখা। তিনি বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন। নেতা-কর্মীদেরও ভিড় ছিল। ওই সময় ৫০-৬০ জন নেতা-কর্মীকে লাঠিসোঁটা বের হতে দেখা যায়।

আমির হামজার মিডিয়া সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত তানভীর হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা একটা অনুষ্ঠান শেষ করে বাসায় ফিরছিলাম। এমপি সাহেবের গাড়ির সামনে ও পেছনে পুলিশ ও র‌্যাবের গাড়ি ছিল। এমপি সাহেব চলে যাওয়ার সময় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা আক্রমণ করে। ইট দিয়ে গাড়িতে আঘাত করে। সদর থানার ওসির উপস্থিতি থাকা সত্বেও হত্যার উদ্দেশে এ আক্রমণ হয়। ইটের আঘাতে আমার পায়ে রক্ত ঝড়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। তবে বিষয়টি নিয়ে গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাসান আল মামুন তাঁর ফেসবুক আইডিতে লিখেছেন, কুষ্টিয়ার এমপি আমির হামজা তাঁর এক বক্তব্যে গণ অধিকার পরিষদকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন, সেই বক্তব্যের প্রতিবাদে কুষ্টিয়ায় গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল করলে সেখানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরা গণ অধিকার পরিষদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে গণ অধিকার পরিষদের ৪০-৫০ জন নেতা-কর্মী গুরুতর আহত হন।

হাসান আল মামুন ফেসবুকে আরও লিখেছেন, ‘প্রিয় জামাত, আপনারা ভুলে গেছেন গণ অধিকার পরিষদের অবদান? সমস্যা নেই, সময় বলে দিবে আপনারা কোন পথে যাবেন! শেখ হাসিনার পথ আপনাদের ডাকছে।’

গণ অধিকার কার্যালয়ে হামলা

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, সন্ধ্যা সাতটার দিকে আমির হামজার সর্মথকেরা লাঠিসোঁটা নিয়ে শহরের হাইস্কুল মার্কেটে গণ অধিকার পরিষদের জেলা কার্যালয়ে অতর্কিত হামলা চালায়। পরে তাঁরা মিছিল নিয়ে শহরের ছয় রাস্তা মোড়ের পাশে হরিপুর সংযোগ সেতুর নিচে যায়। সেতুর নিচে গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেকের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায়। এতে শহরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় সাংবাদিকেরা পেশাগত দায়িত্ব পালনে গেলে তাঁদের ওপর চড়াও হয় ভাঙচুরকারীরা।

এ বিষয়ে গণ অধিকার পরিষদের কুষ্টিয়া জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক তৌকির আহমেদ বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ শেষে ফিরে যাওয়ার সময় আমির হামজার সমর্থকেরা তাঁদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। এতে কয়েকজন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।

কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজন এসেছিলেন। তাঁরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। তাঁদের সামান্য কাটাছেঁড়া দেখা গেছে। ইটের আঘাত হতে পারে।
গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে

আমির হামজার ওপর হামলার বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরকারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তিনি বলেন, ‘ছাত্রদলের ছেলেরা গিয়ে দুই পক্ষকেই সেখান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আমরা কখনোই চাইনি মারামারি হোক।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি আমির হামজা গণ অধিকার ও আমাদের নিয়ে কিছু আপত্তিকর কথা বলেছেন। এ জন্য গণ অধিকার ছয় রাস্তার মোড়ে সমাবেশ করছিল। জামায়াত যে অভিযোগ করছে তা একেবারেই ভিত্তিহীন। গণ অধিকারের বিষয়টা আমাদের ওপর চাপাচ্ছে।’

হামলায় আমির হামজার গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তোলা ছবি
হামলায় আমির হামজার গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে তোলা ছবি। প্রথম আলো

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ নিহত ১১

দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের কয়েক দফা বিমান হামলায় দুই নারী, তিন শিশুসহ অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। শনিবারের এ হামলায় আহত হয়েছেন আরও ১৯ জন।

গত ১৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর এটি লেবাননে অন্যতম প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা।

লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, শনিবার দক্ষিণ লেবাননের আনসার গ্রামে একটি বাড়িতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের হামলায় সাতজন নিহত হন। এ ছাড়া দেইর আল-জাহরানি গ্রামে পৃথক এক হামলায় নিহত হন আরও চারজন।

লেবাননের সরকারি বার্তা সংস্থা এনএনএ জানায়, দক্ষিণ লেবাননজুড়ে আরও বেশ কয়েকটি বিমান হামলা চালানো হয়েছে, যা গত দুই মাসের মধ্যে লেবাননের অভ্যন্তরে সবচেয়ে গভীরে চালানো হামলা।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, তারা আনসারে হিজবুল্লাহর অভিজাত রাদওয়ান বাহিনীর একটি ‘কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরে’ হামলা চালিয়েছে। এতে রাদওয়ান বাহিনীর ব্যাটালিয়ন কমান্ডার আলী সামির আল-হাজ হাসান নিহত হন।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও জানায়, হামলার সময় হাসানের পরিবারও ওই সামরিক সদর দপ্তরের ভেতরে ছিল। তবে তাঁরা লক্ষ্যবস্তু ছিলেন না বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি বাহিনী।

হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে বলেছে, লেবাননের ওপর এই হামলার ‘উপযুক্ত জবাব’ দেওয়া হবে।

এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলের এ হামলা ‘আলোচনা পিছিয়ে দেবে না, বরং তা নতুন করে শুরু করতে এবং আরও ফলপ্রসূ করতে সাহায্য করবে।’

স্পিলম্যান বলেন, ‘আমি মনে করি, এটি কাজে দেবে। আশা করা যায়, এই পদক্ষেপ আলোচনাকে এগিয়ে নেবে। কারণ, এখানে আমাদের শত্রু কে, তা স্পষ্ট; আর সেই শত্রু হলো হিজবুল্লাহ।’

এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম। তিনি বলেন, আনসার গ্রামে ইসরায়েলি হামলায় নিহত ব্যক্তিরা কোনো ‘সামরিক স্থাপনায়’ ছিলেন না এবং সেখানে নিহত নারী ও শিশুরা কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিল না।

লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এই হামলাকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি ‘স্পষ্ট বার্তা’ বলে উল্লেখ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তির শর্ত অনুযায়ী হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে না বলে জানিয়েছে, যা ‘আত্মসমর্পণের শামিল’ আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেছে হিজবুল্লাহ।

উল্লেখ্য, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর দুই দিনের মাথায় গত ২ মার্চ ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। জবাবে লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করে দক্ষিণ লেবাননের একাংশ নিয়ন্ত্রণে নেয় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ইসরায়েলের হামলায় লেবাননে এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকা থেকে তোলা ছবিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পাহাড়ি এলাকায় ইসরায়েলি হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। ১৪ আগস্ট ২০২৬
দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকা থেকে তোলা ছবিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আলি আল-তাহের পাহাড়ি এলাকায় ইসরায়েলি হামলার পর ধোঁয়া উড়তে দেখা যাচ্ছে। ১৪ আগস্ট ২০২৬ ছবি: এএফপি

অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি by মিজানুর রহমান খান

১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনার ইঙ্গিত এবং সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের নানা উপাদান পাওয়া যায় মার্কিন নথিতে। সেই সব নথি বিশ্লেষণ করে ধারাবাহিকভাবে লিখেছিলেন প্রয়াত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান। ১৫ আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থান এবং শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তাঁর একটি লেখা প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য পুনঃপ্রকাশ করা হলো।

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিস ইউজিন বোস্টার ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে মূল্যায়নধর্মী অন্তত সাতটি তারবার্তা পাঠান মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে। ১৬ আগস্ট এ সম্পর্কে প্রাথমিক মন্তব্য শীর্ষক বার্তায় তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৫ আগস্ট স্থানীয় সময় ভোর সোয়া পাঁচটায় অভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল। ২৪ ঘণ্টা পরের ঘটনা এই আশাবাদ সৃষ্টি করেছে যে এ অভ্যুত্থানকে চ্যালেঞ্জ করা হবে না।’

ওই সময় ওয়াশিংটনেও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ঢাকার খবর জানতে উদ্‌গ্রীব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার ১১-১২ ঘণ্টা পর তিনি তাঁর স্টাফ বৈঠকে উল্লেখ করেন, ‘আমি আইএনআর (ব্যুরো অব ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিসার্চ) থেকে এ বিষয়ে ভালো তথ্য পাই।’

এ সময় ব্যুরোর পরিচালক উইলিয়াম জি হিল্যান্ড বলেন, ‘আমি যখন আপনার সঙ্গে কথা বলি, মুজিব তখনো মারা যাননি।’ সিআইএর সাবেক চৌকস কর্মকর্তা হিল্যান্ড ৭৯ বছর বয়সে গত বছরের ২৫ মার্চ মারা যান। ‘তিনি ছিলেন এক ভালো বিশ্লেষক। আমাদের গ্রুপে তিনি ছিলেন অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তাঁর মৃত্যুর পর এ মন্তব্য করেন কিসিঞ্জার (ওয়াশিংটন পোস্ট, ২৮ মার্চ ২০০৮)। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ওয়াশিংটন সময় সকাল আটটার আগে মুজিবের মৃত্যুর বিষয়ে কিসিঞ্জার-হিল্যান্ড কথোপকথনের বিস্তারিত জানা যায়নি।

তবে ১৫ আগস্ট কিসিঞ্জার যখন তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে শুনলেন, বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ছিল সুপরিকল্পিত ও সংগঠিত, তাৎক্ষণিক বললেন, ‘তার মানে কী? মুজিবুর কি জীবিত, না মৃত?’ নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলফ্রেড আথারটন এ সময় বলেন, ‘মুজিবুর নিহত। তাঁর নিকটতম আত্মীয়স্বজন, যাঁদের অধিকাংশই পরিবারের সদস্য, তাঁরা বেঁচে নেই।’

এ-সংক্রান্ত দলিল থেকে জানা যাচ্ছে, হার্ভার্ড স্নাতকোত্তর ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আথারটন এবং ১৯৬৯ পর্যন্ত সিআইএতে থাকা হিল্যান্ড বাংলাদেশের এই অভ্যুত্থানের খুঁটিনাটি জানতেন। ১৯৬২-৬৫ সালে কলকাতায় কর্মরত আথারটন ২০০২ সালের ৩০ অক্টোবর মারা গেছেন।

১৯৭৮-৭৯ সালে তিনি মিসরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সোভিয়েত বিশেষজ্ঞ হিল্যান্ড প্রেসিডেন্ট ফোর্ডের নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে খ্যাতি কুড়ান। তিনি ফরেন অ্যাফেয়ার্স ম্যাগাজিনের সম্পাদকও ছিলেন।

ওই দিন হিল্যান্ডের মুখে ‘মুজিব তখনো মারা যাননি’ শুনে কিসিঞ্জার পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘সত্যিই তাই? তারা তাহলে মুজিবকে কিছু সময় পরে হত্যা করেছিল?’ এর জবাব দেন নিকটপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আথারটন। তিনি বলেন, ‘আমরা যত দূর জানি—আমি বলতে পারি না যে আমরা বিস্তারিত সবকিছু জেনে গেছি। কিন্তু ইঙ্গিত ছিল তাঁকে হত্যা পরিকল্পনা বিষয়েই। এবং তারা তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলে। ভেতরে প্রবেশ করে এবং তাঁকে হত্যা করে।’

লক্ষণীয়, বোস্টারের পাঠানো তারবার্তাগুলোয় বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে যে তিনি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সংবেদনশীল ও সতর্ক ছিলেন। তিনি ১৬ আগস্ট লিখেছেন, ‘জনসাধারণ যদিও মুজিবের পতনে আনন্দ প্রকাশ করেনি কিন্তু গ্রহণসূচক শান্ত অবস্থা বজায় রয়েছে এবং সম্ভবত তাতে স্বস্তির নিশ্বাসও রয়েছে।

শেখ মুজিব ও বাঙালিরা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এর কারণ ছিল তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে তাঁর ব্যর্থতা। এবং দৃশ্যত তাঁর ক্ষমতায় থাকাটা হয়ে পড়েছিল মূলত ব্যক্তিগত ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে। অবশ্য এর সঙ্গে যুক্ত হয় “ডাইন্যাস্টিক রিজনস” অর্থাৎ রাজবংশীয় শাসকদের পরম্পরাসংক্রান্ত কারণ। বাঙালিদের কাছ থেকে মুজিবের বিচ্ছিন্নতা ক্রমশ বাড়ার বড় কারণ ছিল তিনি যথাযথ পরামর্শ গ্রহণ থেকে দূরে সরছিলেন। এমনকি মুজিবের মধ্যে স্বৈরশাসকের চিরায়ত বৈকল্য ফুটে উঠতে শুরু করেছিল।’

বোস্টারের কথায়, ‘জুনের গোড়া থেকে শেখ মুজিব ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে ব্যাকুল হয়ে পড়েছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় তাঁর ভাগনে শেখ মনির ক্রমবর্ধমান প্রভাব। এসবই অভ্যুত্থানকারীদের সন্দেহমুক্ত করে যে পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব করা আর সমীচীন হবে না। তবে অভ্যুত্থানের জন্য ভারতীয় স্বাধীনতা দিবস বেছে নেওয়ার বিষয়টি হয়তো শুধুই কাকতালীয়। এই কাকতালীয় বিষয়টি কিন্তু আমাদের বিবেচনায় লক্ষণীয়।’

বোস্টার এরপর লেখেন, ‘এটা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে। খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকার সামান্যই উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পেরেছে। যদিও শেখ মুজিবের সঙ্গে যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন, তাঁদের অনেকেই হত্যার শিকার কিংবা বাদ পড়েছেন। কিন্তু তারপরও বর্তমান সরকারে সেসব পরিচিত মুখই রয়ে গেছেন, যাঁরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী দুর্বল প্রশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। স্পষ্টতই মন্ত্রিসভায় এখন যাঁরা রয়ে গেছেন, তা থেকে মনে হয়, মোশতাকের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলবে। কিন্তু সেখানে বৃহত্তর মডারেশন থাকবে। ১৫ আগস্ট দেওয়া তাঁর প্রথম বেতার ভাষণে এই দৃষ্টিভঙ্গি সমর্থন করে।

শেখ মুজিবের অভ্যন্তরীণ বিষয়ের নিন্দা করলেও মোশতাক জানিয়ে দিয়েছেন পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা অনেকটাই অব্যাহত থাকবে। ইতিমধ্যে কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে যে নতুন সরকার পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইবে।

মোশতাকের সঙ্গে ভারতের সদ্ভাব না থাকার বিষয়টি প্রকাশ্য বিষয় হলেও এটাও পরিষ্কার যে নতুন সরকার ভারতের মনে বাড়তি কোনো সন্দেহ-সংশয় সৃষ্টি করার দিকে যাবে না। মোশতাকের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভার দিকে তাকালে সেই ইঙ্গিত মেলে। পুরোনো মুখগুলো রেখে দেওয়ার পেছনে নতুন সরকার কার্যত ভারতের কাছে সেই বার্তাই পৌঁছে দিতে চায়।

মোশতাকের ভাষণে যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও বন্ধুত্ব সম্পর্ক বজায় রাখার মধ্যে অধিকতর ভারসাম্যপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত মেলে। এভাবে সরকার সোভিয়েত প্রভাব কিছুটা স্তিমিত করতে চাইছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রভাব সম্পর্কে উল্লেখ করতে গিয়ে বোস্টার লিখেছেন, ‘নতুন সরকারের সঙ্গে আমাদের নিজেদের সম্পর্ক মুজিব সরকারের চেয়ে “এমনকি আরও অন্তরঙ্গ ভিত্তি”র ওপর প্রতিষ্ঠা পাবে। নতুন রাষ্ট্রপতি অতীতে অত্যন্ত লক্ষণীয় ও প্রকাশ্যে “প্রো–আমেরিকান” দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।

বড় কথা হচ্ছে, মুজিব সরকারের মধ্যে শেখ মনি ও সামাদের (আবদুস সামাদ আজাদ) মতো যাঁরা বামপন্থী ও আমেরিকাবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁরা আর নেই। আরও জোরালো সম্ভাবনা হচ্ছে, বাংলাদেশ আমাদের কাছে এখন বেশি পরিমাণে সাহায্য চাইতে পারে। ইতিপূর্বে মোশতাক আমাদের বলেছিলেন, শুধু আমেরিকাই আমাদের সত্যিকারের সাহায্য করতে পারে। সুতরাং আমাদের প্রতি নতুন সরকারের উচ্চাশার বাঁধ নিয়ন্ত্রণই হতে পারে বড় সমস্যা।’

মোশতাক সরকার এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে সম্পর্ক মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইউজিন বোস্টার লক্ষণীয়ভাবে উল্লেখ করেন, ‘এটা আমরা বিচার করতে পারি না।’ তাঁর কথায়, ‘আমরা কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ করি যে প্রত্যেক সরকারি বিবৃতিতে ক্ষমতা গ্রহণের অনুকূলে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লিখিত হচ্ছে। আমাদের বলা হয়েছে, সামরিক বাহিনী বর্তমানে সামরিক আইন আদেশ এমএলও প্রস্তুত করছে এবং এ ক্ষেত্রে যদি পাকিস্তানি ধাঁচ অনুসরণ করা হয়, তবে তা-ই হবে দেশের আইনের ভিত্তি।

এর ফলে সামরিক ও বেসামরিক লোকের মধ্যে উত্তেজনা বাড়াবে কি না, তা আমরা এখন বলতে পারি না। কিন্তু আমরা এটা ভাবতে পারি, মোশতাক বিবৃতিতে ইতিমধ্যে যা বলেছেন, তাতে গত জানুয়ারিতে মুজিব যা চাপিয়ে দিয়েছিলেন, তার চেয়ে একটি নতুন ও অধিকতর উদার সংবিধান পাওয়া যাবে।’

বোস্টার এ পর্যায়ে আরও উল্লেখ করেন, ‘মুজিবকে উৎখাতে সামরিক বাহিনীর সাফল্যের প্রেক্ষাপটে আমাদের এই ধারণা জন্মেছে যে অভ্যুত্থানকারীরা মুজিবকে হত্যার চেয়ে বেশি কিছু ভাবেনি। যাহোক, সামরিক বাহিনী—বিশেষ করে যেসব তরুণ কর্মকর্তা, যাঁরা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁরাই শেখ মুজিবকে উৎখাত করেছেন এবং আমরা সন্দেহ করি এবং যেহেতু তাঁরা রক্তের স্বাদ পেয়েছেন, তখন পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে তাঁরা কিছু ভূমিকা রাখতে চাইবেন।

অভ্যুত্থানের পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে কোনো বাঙালি গাদ্দাফিকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা না করাই ভালো। তার চেয়ে বরং এটা ভাবাই সংগত যে চাকরিমুখো মধ্যবিত্ত শ্রেণির পুরোনো সদস্য—যাঁরা শেখ মুজিব দ্বারা হুমকিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা হয়তো একটি অধিকতর উদারপন্থী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন। পাকিস্তানি জমানায় পূর্ব বাংলায় যেমনটা দেখা গিয়েছিল, তার চেয়ে এটা হতে পারে ভিন্ন।’

বোস্টার লেখেন, ‘এখানে একটি বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা উচিত যে রক্তস্নাত হলেও শেখ মুজিবের উৎখাত যখন সফল হয়েছে, তখন আরও অনেক কিছুই করা বাকি রয়েছে। মোশতাকের ভাষণ প্রধানত সাধারণ বিবরণগত দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ এবং এতে আওয়ামী লীগের ইতিপূর্বেকার বাগাড়ম্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে কিন্তু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ এ পর্যন্ত যা নেওয়া হয়েছে, তা অল্পই।

দেশ পরিচালনায় সীমিত পদক্ষেপ দেখে আমরা বিস্মিত হইনি। তবে যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে নতুন সরকারের কর্তৃত্ব হ্রাস পেতে শুরু করবে। সে ক্ষেত্রে আমরা খুবই অস্থিরতাপূর্ণ একটি ক্ষমতার লড়াই প্রত্যক্ষ করতে পারি। বাঙালির রাজনৈতিক মঞ্চে শেখ মুজিবের মতো আজ আর কোনো কমান্ডিং পারসোনালিটি বা আদেশদানকারী ব্যক্তিত্ব নেই, যা কিনা মুজিবকে দীর্ঘকাল টিকিয়ে রেখেছিল। বেসামরিক সরকারের পদস্খলন ঘটেছে। আমরা এখন সামরিক বাহিনীর দিকে তাকাতে পারি। জাতিকে বাঁচাতে সেটাই আবশ্যিক।’

* মিজানুর রহমান খান, প্রয়াত সাংবাদিক

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা