Monday, June 9, 2025

ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বন্দ্বের মধ্যেই নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ইঙ্গিত দিলেন মাস্ক

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং তার রিপাবলিকান মিত্রদের সঙ্গে ইলন মাস্কের সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে টেসলার সিইও একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের  ইঙ্গিত দিয়েছেন। মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স -এর মাধ্যমে একটি জরিপ পরিচালনা করেছেন মাস্ক। যেখানে তার ২২ কোটি অনুসারীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, 'আমেরিকায় কি এখন এমন একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের সময় এসে গেছে, যা মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা ৮০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করবে?' ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী 'হ্যাঁ' ভোট দিয়েছেন।

জরিপের ফলাফলের প্রতিক্রিয়ায় মাস্ক বলেন, ‘মানুষ তাদের মতামত দিয়েছে। আমেরিকায় মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা ৮০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন! এটাই ভাগ্য।’

মাস্ক সম্ভাব্য একটি নামও প্রস্তাব করেন,  'দ্য আমেরিকা পার্টি'। এই নামটির সঙ্গে  অনেকটাই মিল রয়েছে তার গঠিত সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি (পিএসি)) 'আমেরিকা পিএসি'-এর সঙ্গে। ২০২৪ সালে ট্রাম্পকে হোয়াইট হাউসে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টায় সহায়তার জন্য এই পিএসি গঠন করা হয়। ওই সুপার পিএসি ট্রাম্পের পক্ষে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় দাতা ছিলেন মাস্ক। শনিবার এনবিসি নিউজের সাথে আলাপকালে ট্রাম্প হুঁশিয়ারির সুরে বলেছেন যে, মাস্ক যদি তাদের বিরোধের মাঝে ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের তহবিল দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে তাকে ‘পরিণতি ভোগ করতে হবে’।

তবে  সেই পরিণতি কী হবে তা বলতে চাননি ট্রাম্প। ২০১৬ এবং ২০২০ সালের নির্বাচনে মাস্ক ট্রাম্পের ডেমোক্র্যাটিক প্রতিপক্ষ হিলারি ক্লিনটন এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে  ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় মাস্ক বলেছিলেন যে, তিনি রিপাবলিকানকে ভোট দিতে চান এবং সেইসঙ্গে ট্রাম্পের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সেইসঙ্গে সরকারের দক্ষতা বিভাগের (DOGE) প্রধান হিসাবে মাস্ককে নিযুক্ত করেন ট্রাম্প।

তবে, ট্রাম্প এবং মাস্কের মধ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনসাধারণের নজর কেড়েছে। ট্রাম্পের ‘বিগ, বিউটিফুল বিল’-এর প্রতি মাস্কের অসম্মতির মধ্য দিয়ে এই বিবাদ শুরু হয়। বিলটিকে  তিনি ‘জঘন্য’ বলে উল্লেখ করেন এবং তার সোশ্যাল মিডিয়া অনুসারীদের বলেন, ‘কিল দ্য বিল।’

গত বৃহস্পতিবার, দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে টানাপোড়েন আরও তীব্র হয়। মাস্ক অভিযোগ করেন, প্রয়াত অর্থদাতা এবং যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইন সম্পর্কিত ফাইলগুলোতে ট্রাম্পের নাম রয়েছে।  যদিও তিনি এই সম্পর্কিত কোনও প্রমাণ প্রদান করেননি এবং শনিবার ভোরে নিজের পোস্টটি এক্স থেকে মুছে ফেলেন।

মাস্ক, আরেকটি মুছে ফেলা পোস্টে লেখেন,  ‘ট্রাম্পকে অভিশংসিত করা উচিত এবং ভ্যান্সকে  তার স্থলাভিষিক্ত করা উচিত।’

প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প টেসলার সিইওকে হোয়াইট হাউস ছেড়ে যেতে বলেন। ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি জিমি প্যাট্রোনিস শুক্রবার নিউজন্যাশন-এর ব্লেক বারম্যানকে বলেন, ‘ইলন মাস্ক নতুন কোনো রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছেন না… ট্রাম্প জানেন, কখনো কখনো আপনি যাদের বিশ্বাস করেন, পছন্দ করেন, বন্ধুত্ব করেন—তাদের সঙ্গেও সম্পর্ক খারাপ হতে পারে। এটা আমাদের এখানে ডিসিতে সবসময়ই ঘটে। আমার কথা মনে রাখবেন, এক মাস পর এদের আবার একসঙ্গেই দেখা যাবে।’

সূত্র : টাইম

mzamin

মিশরের নতুন রাজধানী তৈরির কারিগর চীন, যেখানে থাকবে ৬০ লক্ষ লোক

রাজধানী কায়রো থেকে মাত্র ৪৫ কিলোমিটার (২৮ মাইল) পূর্বে মরুভূমির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত মিশরের নতুন প্রশাসনিক রাজধানী ক্রমেই বাস্তবের  রূপ নিচ্ছে। যার নির্মাণ, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে  চীন। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ সংস্থা , চায়না স্টেট কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং কর্পোরেশন ( CSCEC), কেবল নতুন বাণিজ্য শহরের  প্রাথমিক ঠিকাদারই নয়, বরং চীন ও মিশরের মধ্যে একটি চুক্তির মাধ্যমে এটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। ৭০০ বর্গকিলোমিটার (২৭০ বর্গমাইল) আয়তনের এই নতুন শহরটিতে ৬০ লক্ষেরও বেশি লোকের বসবাসের ব্যবস্থা থাকবে। কায়রোর যানজট ও দূষণ নিরসনের জন্য এটি নির্মিত হচ্ছে। এটি নির্মাণের জন্য মোট ব্যয় হবে ( যার মধ্যে প্রেসিডেন্টের  প্রাসাদ, সংসদ, সরকারি ভবন এবং বিদেশী দূতাবাসের জন্য স্থান অন্তর্ভুক্ত থাকবে) আনুমানিক ৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। মিশরীয় ইউনিট সিবিডি প্রকল্পের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি প্রোটোকল স্বাক্ষরের ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে চীনা কোম্পানিগুলোকে  বিশেষ সুযোগ করে দেবে এবং কায়রোকে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের একটি বেল্ট অ্যান্ড রোড গেটওয়ে হিসেবে স্থান দেবে।

CSCEC এক বিবৃতিতে বলেছে- 'চুক্তির অধীনে, CSCEC নতুন প্রশাসনিক রাজধানীতে CBD-এর সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করবে, যা বাসিন্দা, পর্যটক এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মন্বিত নগর পরিষেবা প্রদান করবে। 'রবিবার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত চীনের গৃহায়ন উপমন্ত্রী ডং জিয়াংগুও দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অংশীদারিত্বকে "পারস্পরিক সুবিধার একটি মডেল" হিসেবে দেখেন এবং গৃহায়ন, অবকাঠামো এবং নগর-গ্রামীণ উন্নয়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের জন্য চীনের ভূমিকা  ব্যক্ত করেন।সিবিডিতে আফ্রিকার সর্বোচ্চ আকাশচুম্বী ভবন, ৩৮৫.৮-মিটার (১,২৬৬-ফুট) আইকনিক টাওয়ার, ১০টি অফিস টাওয়ার, পাঁচটি আবাসিক টাওয়ার এবং চারটি হোটেল রয়েছে, যার প্রধান ঠিকাদার হল সিএসসিইসি। ২০২৩ সাল থেকে, ৩০,০০০ এরও বেশি সরকারি কর্মচারী নতুন রাজধানীতে স্থানান্তরিত হয়েছেন, যা প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির তৃতীয় মেয়াদে অভিষেকের পর থেকে মিশরের সরকারী কর্মকান্ডের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে।ব্যাংক সহ বাণিজ্যিক ভাড়াটেরাও সিবিডিতে স্থানান্তরিত হচ্ছে। চীনা কোম্পানিগুলি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলের অধীনে বন্দর, মহাসড়ক এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মতো মেগাপ্রকল্প নির্মাণে ক্রমবর্ধমান অর্থায়ন করছে।

বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট পলিসি সেন্টারের ঋণ ডাটাবেস অনুসারে, ২০২৩ সালের মধ্যে, চায়না এক্সিম ব্যাংক এবং অন্যান্য চীনা ঋণদাতাদের একটি কনসোর্টিয়াম সিবিডি নির্মাণের জন্য ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সরবরাহ করেছিল।  মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের একজন অনাবাসী সিনিয়র ফেলো জন ক্যালাব্রেস বলেন, সিবিডি নির্মাণকারী সংস্থাগুলো  সহ চীনা সংস্থাগুলোকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ব্যবহারিক এবং কৌশলগত উভয় উদ্দেশ্যকেই প্রতিফলিত করে- বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে  অগ্রাধিকার এবং স্মার্ট সিটি হিসেবে  অ্যাক্সেস।  চীন-মিশর সম্পৃক্ততা এমন এক সময় হচ্ছে যখন বেইজিং মিশরে তার বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করছে, বিশেষ করে সুয়েজ খালে। যা ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরকে সংযুক্তকারী একটি প্রধান বৈশ্বিক বাণিজ্য পথ।জেনারেল অথরিটি ফর ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ফ্রি জোনস অনুসারে, উৎপাদন থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে ২,৮০০ টিরও বেশি চীনা কোম্পানি মিশরে কাজ করছে, যার বিনিয়োগ ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।

সূত্র : সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট

mzamin

বিশ্বের প্রথম পানি শূন্য শহর হতে চলেছে কাবুল: সতর্ক করলেন বিজ্ঞানীরা

কাবুল বিশ্বের প্রথম ‘আধুনিক’ শহর হতে চলেছে যেখানে দেখা দেবে সম্পূর্ণ পানিশূন্যতা। আগাম সতর্ক করে দিলেন বিশেষজ্ঞরা। এনজিও মার্সি কর্পসের একটি প্রতিবেদন অনুসারে, দ্রুত নগরায়ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গত দশকে কাবুলের জলাধারের মধ্যে পানির স্তর ৩০ মিটার পর্যন্ত কমে গেছে।ইতিমধ্যে কাবুলের বাসিন্দাদের জন্য খাবারের পানির প্রাথমিক উৎস বোরহোলগুলো প্রায় অর্ধেক শুকিয়ে গেছে। বর্তমানে প্রতি বছর প্রাকৃতিক রিচার্জ হারের চেয়ে ৪৪ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে।

মার্সি কর্পস আফগানিস্তানের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডেইন কারি বলেন, ‘সংকট মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তার প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা থাকা উচিত। পানি না থাকার অর্থ হলো মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাবে, তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি আফগানিস্তানের পানির চাহিদা পূরণ না করে তবে আফগান জনগণের জন্য বাড়বে অভিবাসন এবং তা আরও কষ্টের কারণ হবে।’

প্রতিবেদনে পানি দূষণকে আরেকটি ব্যাপক চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কাবুলের ভূগর্ভস্থ পানির ৮০% পর্যন্ত অনিরাপদ বলে মনে করা হচ্ছে। যেখানে উচ্চমাত্রার পয়ঃনিষ্কাশন, লবণাক্ততা এবং আর্সেনিক রয়েছে। কাবুলের মানুষের জন্য পানির সরবরাহ একটি নিত্যদিনের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। কিছু পরিবার তাদের আয়ের ৩০% পর্যন্ত পানিতে ব্যয় করে এবং দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি পরিবার পানি সম্পর্কিত ঋণের বোঝায় ভোগে। কাবুলের খায়েরখানা পাড়ায় বসবাসকারী একজন শিক্ষিকা নাজিফা। তিনি বলছেন, ‘আফগানিস্তান অনেক সমস্যার মুখোমুখি, কিন্তু এই পানির সংকট সবচেয়ে কঠিন সমস্যার মধ্যে একটি। প্রতিটি পরিবারই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, বিশেষ করে যাদের আয় কম। পর্যাপ্ত, ভালো মানের কূপের অস্তিত্বই নেই।’

কিছু বেসরকারি কোম্পানি এই সংকটকে পুঁজি করে সক্রিয়ভাবে নতুন কূপ খনন করছে এবং বিপুল পরিমাণে সরকারি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করছে। তারপর তা শহরের বাসিন্দাদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করছে।

নাজিফা বলেন, ‘আমরা আগে পানির ট্যাঙ্কার থেকে ক্যান ভরার জন্য প্রতি ১০ দিনে ৫০০ আফগানি (৫.৩০ পাউন্ড) দিতাম। এখন একই পরিমাণ পানির জন্য আমাদের ১,০০০ আফগানি খরচ হয়। গত দুই সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। আমরা আশঙ্কা করছি এটি আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে।’

২০০১ সালে কাবুলের জনসংখ্যা ছিল ১০ লক্ষেরও কম। এখন সেই কাবুল শহরের জনসংখ্যা সাতগুণ বৃদ্ধির ফলে পানির চাহিদা নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কেন্দ্রীভূত শাসন ও নিয়ন্ত্রণের অভাবও কয়েক দশক ধরে এই সমস্যাটিকে স্থায়ী করে তুলেছে। ২০২৫ সালের গোড়ার দিকে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় অফিস ঘোষণা করে যে, আফগানিস্তানে পরিকল্পিত পানি ও স্যানিটেশন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ২৬৪ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে তাদের অংশীদাররা মাত্র ৮.৪ মিলিয়ন ডলার (৬.২ মিলিয়ন পাউন্ড) পেয়েছে।

২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে আন্তর্জাতিক পানি ও স্যানিটেশন তহবিলের আরও ৩ বিলিয়ন ডলার স্থগিত করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউএসএআইডি তহবিলের ৮০% এরও বেশি হ্রাস করার সাম্প্রতিক পদক্ষেপ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কারি বলেন, ‘সবকিছুই সাহায্যের উপর ভীষণভাবে  নির্ভরশীল। আমরা স্বল্পমেয়াদী পানির সমস্যার সমাধানের জন্য লক্ষ লক্ষ ডলার ব্যয় করতে পারি এবং বলতে পারি যে আমরা প্রয়োজনটি পূরণ করেছি, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য আরও ভাল বিনিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এই প্রয়োজন অব্যাহত থাকবে।’

শিক্ষিকা নাজিফা বলেন, ‘পানি আফগানিস্তানের একটি মানবাধিকার এবং প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি কোনও রাজনৈতিক বিষয় নয়। বাগানের শুকিয়ে যাওয়া  ফুল এবং ফলের গাছগুলোর দিকে তাকালে আমার হৃদয় ব্যথিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা কী করতে পারি? আমরা বর্তমানে একটি সামরিক রাষ্ট্রে বাস করছি, তাই আমরা বিষয়টি রিপোর্ট করার জন্য সরকারের কাছেও  যেতে পারি না।’

পাঞ্জশির নদীর পাইপলাইন এমন একটি প্রকল্প যা সম্পন্ন হলে, ভূগর্ভস্থ পানির উপর শহরের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমতে পারে এবং ২০ লক্ষ বাসিন্দাকে খাবার পানি  সরবরাহ করা যেতে পারে। এর নকশা ২০২৪ সালের শেষের দিকে সম্পন্ন হয়েছিল এবং বাজেট অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।  

সরকার ১৭০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিপূরক হিসাবে অতিরিক্ত বিনিয়োগকারী খুঁজছে। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার একজন সিনিয়র গবেষক এবং আফগান পানি ও পরিবেশ নেটওয়ার্কের সদস্য ডঃ নাজিবুল্লাহ সাদিদ জানাচ্ছেন,
‘আমাদের বাজেটের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকার সময় নেই। আমরা এমন এক ঝড়ের কবলে পড়েছি যেখান থেকে অবিলম্বে পদক্ষেপ না নিলে আর কোনও প্রত্যাবর্তন সম্ভব হবে না।’

গবেষকের কথায়, ‘কাবুলের বাসিন্দারা এমন এক পরিস্থিতিতে আছেন যেখানে তাদের খাবার বা পানির মধ্যে একটি বেছে নিতে হচ্ছে। তবুও, আমরা যে স্থানীয়দের সাথে কথা বলেছি তারা এখনও একটি টেকসই সমাধানের জন্য তাদের কাছে যা আছে তা বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক। যে প্রকল্পটি সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলবে তাকে অগ্রাধিকার দিতে তারা প্রস্তুত। আমাদের কেবল কোথাও থেকে শুরু করতে হবে।’

সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান

mzamin

আমেরিকানরা কেন ইসরায়েলিদের চেয়ে বেশি ইসরায়েলি by আহমেদ মুর

১৯৭১ সালে প্রকাশিত ফ্রেডারিক ফর্সাইথের দ্য ডে অব দ্য জ্যাকেল উপন্যাসটি শুরু হয়েছে ফরাসি প্রেসিডেন্ট শার্ল দ্য গলকে হত্যার ষড়যন্ত্রের কাহিনি দিয়ে। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যাঁরা জড়িত ছিলেন, তাঁরা ‘পিয়ে-নোয়া’ (পিয়ে অর্থ কালো, নোয়া অর্থ পা) নামে পরিচিত। আলজেরিয়া যখন ফ্রান্সের উপনিবেশ, তখন দেশটিতে জন্ম নেওয়া ফরাসিদের এই নামে ডাকা হতো।

পিয়ে-নোয়ারা চাইতেন না, শার্ল দ্য গল আলজেরিয়া ছেড়ে যাক। তাঁরা এটিকে বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করতেন। সাবেক উপনিবেশে থাকতে না পেরে তাঁরা হতাশ, হীনবল ও চরম সহিংস হয়ে ফ্রান্সে ফেরত এসেছিলেন। পিয়ে-নোয়ারা নিজেদের ফরাসিদের চেয়ে বেশি ফরাসি বলে ভাবতেন।

এই উপন্যাসের আকর্ষণীয় জায়গা হলো, বাস্তব ইতিহাসের সঙ্গে কাহিনির মিল আছে। ষাটের দশকে দ্য গলকে অন্তত ছয়বার হত্যা চেষ্টা করা হয়েছিল। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন ফরাসি রেভানচিস্টরা (হারানো দেশ ফিরে পেতে আগ্রহী জাতীয়তাবাদী)। ১৯৯৪ সালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনকে হত্যা করেছিলেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ইয়িগাল আমির। বলা হয় যে তিনি উপন্যাসটি পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

সেই উপন্যাসের কথা আবার মনে পড়ল হামাস ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বন্দী বিনিময় চুক্তির খবর পড়ে। এদান আলেক্সান্ডার নামের একজন আমেরিকান-ইসরায়েলি সেনাকে হামাস দেড় বছর ধরে বন্দী করে রেখেছিল। তাঁর মুক্তির জন্য বন্দী বিনিময় চুক্তি। নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যচ্ছে, এদান নিউ জার্সিতে বড় হয়েছিলেন। উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে ইসরায়েলে গিয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

লাইনটি পড়ে আমার মনে প্রশ্ন জাগল—একজন আমেরিকান কিশোর এমন চরম পন্থার দিকে কেন ঝুঁকে পড়ল? কেন একজন আমেরিকান কিশোর নিজের দেশ ছেড়ে এমন একটা দেশের সেনাবাহিনীতে যোগ দিল, যাদের মূল কাজ হলো, দখলদারি ও বর্ণবাদ।

এই প্রশ্ন নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটি আরেকটি বিস্তৃত প্রবণতাকেও তুলে ধরে। সেটি হলো, আলেকজান্ডার এই পথে একেবারেই অনন্য কেউ নন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট–এর এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ‘প্রায় ২৩ হাজার ৩৮০ জন আমেরিকান নাগরিক বর্তমানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে কর্মরত।’

তবে তাঁরা সেই পথটাতেই হাঁটছেন, যেটি আগে থেকেই রক্তস্নাত। ১৯৯৪ সালে বারুচ গোল্ডস্টেইন নামের একজন আমেরিকান জায়নবাদী হেবরনের একটি মসজিদে গুলি চালিয়ে ২৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছিলেন।

প্রতিবেদনে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় মারা যাওয়া আমেরিকান পরিবারগুলো সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। পরিবারগুলো ‘ইহুদিবাদী রাষ্ট্রের প্রতি তীব্র অঙ্গীকার’ ব্যক্ত করেন। তিনটি পরিবারের মধ্যে দুটি পরিবার বসতিতে (পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের তৈরি করা বর্ণবাদী স্থাপনা) বাস করছে অথবা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নিচ্ছে।  

গাজায় গণহত্যামূলক অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত একজন সৈনিকের মা নিজেকে ‘ইসরায়েলিদের চেয়েও বেশি ইসরায়েলি বলে বর্ণনা করেছেন’। একজনের বাবা তাঁর পরিবারের আমেরিকা থেকে ইসরায়েলে যাত্রার কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘আমরা জায়নবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য এসেছিলাম।’

প্রতিবেদনটিতে বিস্তৃতভাবে দেখানো হয়েছে সামাজিক সংস্থার মাধ্যমে কীভাবে আমেরিকান তরুণেরা চরম পন্থার দিকে হাঁটছেন। গাজায় নিহত একজন সেনা প্রতিবছর পেনসিলভানিয়ার জায়নবাদীদের গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে গিয়ে কাজ করতেন।

নিবন্ধটি পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে একটা শক্তিশালী মগজধোলাইয়ের প্রক্রিয়া এখানে আছে। সে কারণেই এসব পরিবার তাদের নিজেদের এবং সন্তানদের সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিক, এমনকি বীরোচিত বলেই মনে করে।

এটা ঠিক যে বিদেশি সেনাবাহিনীতে আমেরিকানদের যোগদানের ঘটনাটি শুধু ইসরায়েলের ক্ষেত্রেই ঘটেনি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেতারমাধ্যম এনপিআর জানাচ্ছে, রাশিয়ার দখলদারির বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয়দের যুদ্ধে শত শত আমেরিকান লড়ছে। তবে ‘শত শত’ আর ‘হাজার হাজার’ এক জিনিস নয়। আর দখলদারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আর দখলদারি প্রতিষ্ঠার জন্য যুদ্ধ করা এক বিষয় নয়।

ফিলিস্তিনে গণহত্যার প্রেক্ষাপটকে বিবেচনায় নিলে, আমরা এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়াই, যেখানে হাজার হাজার আমেরিকান সক্রিয়ভাবে যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত। তাঁরা এমন এক সেনাবাহিনীর অংশ, যেটি গাজায় ২০ হাজারের বেশি শিশুকে হত্যা করেছে। দ্য ইকোনমিস্ট-এর তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে ইসরায়েলি সেনারা গাজায় ৭৭ হাজার থেকে ১ লাখ ৯ হাজারের মতো মানুষকে হত্যা করেছে। এই সংখ্যা গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশ।

ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সম্প্রসারণ হিসাবে দেখার একটা প্রবণতা আমেরিকান গণমাধ্যমে দেখা যায়। সম্প্রতি লেখক ও সংবাদিক তা-নাহিসি কোটসকে ফিলিস্তিন নিয়ে তাঁর লেখালেখির জন্য সিবিএস টেলিভিশনের উপস্থাপক ‘চরমপন্থী’ বলে উল্লেখ করেন। অবশ্য টেলিভিশনটি পরে জানিয়েছে, উপস্থাপকের বক্তব্য ও আচরণের সঙ্গে তারা একমত নয়।

মে মাসের আরেকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা দরকার। এসএসএনবিসিকে দেওয়া এক উত্তেজনাপূর্ণ সাক্ষাৎকারে পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি মোসাব আবু তাহা বলেন যে ইসরায়েলি সেনারা (নারী ও পুরুষ উভয়ই) গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছেন। এ সময় আবু তাহা নিজের পরিবারের নিহত সদস্যদের গল্প বলেন। ইসরায়েলি পাইলটরা তাঁদের হত্যা করে। সেই মানুষগুলোর মরদেহ উদ্ধার করা যায়নি। ৫০০ দিনের বেশি সময় ধরে সেই মরদেহগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির নিচে চাপা পড়ে আছে।

আবু তাহা, ইসরায়েলি সেনাদের বর্বরতার যে সুস্পষ্ট বিবরণ দিয়েছেন, এটি আমাদের সামনে একটি পথের কথাই বলে। আমরা আশা করতেই পারি যে আমেরিকান মা-বাবারা এই সাক্ষাৎকার দেখেছেন। হয়তো এ রকম আরও সাক্ষাৎকার তাঁরা দেখে থাকবেন। নিশ্চয়ই তাঁরা এর পর থেকে বলবেন, ‘না, আমরা চাই না, আমাদের সন্তানেরা চরম পন্থায় দীক্ষিত  হয়ে নৃশংসতায় অংশ নিক।’

* আহমেদ মুর লেখক এবং ফাউন্ডেশন ফর মিডল ইস্ট পিস-এর ফেলো
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনা হয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে। ১৪টি দেশ এর পক্ষে ভোট দিলেও। বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ভেটো দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ৪ জুন
গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনা হয় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে। ১৪টি দেশ এর পক্ষে ভোট দিলেও। বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ভেটো দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ৪ জুন। ছবি: রয়টার্স

লস অ্যাঞ্জেলেসে ট্রাম্পের ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনকে কেন বিপজ্জনক মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের আপত্তি উপেক্ষা করেই লস অ্যাঞ্জেলেসে দুই হাজার ন্যাশনাল গার্ড সদস্য মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন। অভিবাসনসংক্রান্ত বিক্ষোভ ঠেকাতে তিনি এমন পদক্ষেপ ঘোষণা করেন। যদিও এটি একটি বিরল ঘটনা।

বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, কয়েক দশক ধরে প্রেসিডেন্টের বিশেষ এ ক্ষমতার ব্যবহার দেখা যায়নি। এবার সে ক্ষমতা প্রয়োগের কারণে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এটি একদিকে যেমন অঙ্গরাজ্য সরকারের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে, তেমনি অনেক দিন ধরে চলে আসা নিয়মকানুন ও রীতিনীতিও ভেঙে দিচ্ছে।

ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযানের বিপক্ষে লস অ্যাঞ্জেলেস শহর ও আশপাশের এলাকায় গত শুক্রবার থেকে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তখন কেন্দ্রীয় অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা অন্তত ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী অভিযান চলার মধ্যে এসব গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। ওই অভিযানের অংশ হিসেবে দেশজুড়ে বেশ কিছু ধরপাকড় ও বিতাড়নের ঘটনা ঘটছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও ফ্ল্যাশ ব্যাং গ্রেনেড (প্রাণঘাতী নয়) ব্যবহার করেছে।

তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, স্থানীয় কর্মকর্তারা বিক্ষোভ সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। যে কায়দায় দাঙ্গা ও লুটপাটের মতো সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন, সে কায়দাতেই কেন্দ্রীয় সরকার এখন ব্যবস্থা নেবে। নিজস্ব মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা লিখেছেন ট্রাম্প।

লস অ্যাঞ্জেলেসে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের জন্য ‘টাইটেল টেন অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস কোড’-এর আওতায় এক আদেশে স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প। আদেশ অনুসারে, ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা অভিবাসন বিভাগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত থাকা অন্য সরকারি কর্মীদের নিরাপত্তা দেবে। পাশাপাশি তারা ফেডারেল সম্পদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকবে। গত শনিবার অ্যাটর্নি জেনারেল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের মন্ত্রীকে পাঠানো এক চিঠিতে ট্রাম্প এসব কথা বলেছেন।

টাইটেল টেন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চাইলে হামলা ঠেকাতে, বিদ্রোহ দমন করতে বা আইন প্রয়োগের জন্য ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করতে পারেন। এর অর্থ হলো এই পরিস্থিতিতে ন্যাশনাল গার্ড গভর্নরের অধীনে নয়, সরাসরি প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করে এবং প্রেসিডেন্টকেই সবকিছু জানায়।

১৯৯২ সালের পর এবারই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ন্যাশনাল গার্ড সেনাদের ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে রেখে কাজ করানোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। ১৯৯২ সালে রোডনি কিং নামের এক কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিকে মারধর করার মামলায় চার শ্বেতাঙ্গ পুলিশ কর্মকর্তা খালাস পাওয়ার ঘটনায় লস অ্যাঞ্জেলেসে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়লে এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। লস অ্যাঞ্জেলেসে কয়েক দিন ধরে চলা ওই দাঙ্গায় বেশ কয়েকজন নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত ও গ্রেপ্তার হন। এ দাঙ্গায় প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ নষ্ট হয়েছে। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম একটি অস্থিরতার ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা সাধারণত তখনই ন্যাশনাল গার্ডকে ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন, যখন কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর সাহায্য চান। যেমন লস অ্যাঞ্জেলেসে দাঙ্গা বা লুইজিয়ানায় হারিকেন ক্যাটরিনার পরবর্তী সময়ে অঙ্গরাজ্যের গভর্নর যখন নিজস্ব ক্ষমতায় পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছিলেন না, তখন তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা চেয়েছিলেন।

আবার যখন কোনো গভর্নর আদালতের আদেশ উপেক্ষা করেন, তখনো প্রেসিডেন্ট ন্যাশনাল গার্ডকে ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেন। এমনই একটি ঘটনা ঘটেছিল লিটল রক স্কুলসংক্রান্ত এক মামলায়। লিটল রকের স্কুলে বর্ণবৈষম্য দূর করতে আদালতের দেওয়া নির্দেশ বাস্তবায়নে প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার ন্যাশনাল গার্ডকে ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছিলেন।

সিএনএনের জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক এবং মার্কিন সরকারের সাবেক কর্মকর্তা জুলিয়েট কায়েম মনে করেন, বিক্ষোভ দমনের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। হুমকির মাত্রা বিবেচনায় এ ধরনের কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোটা যুক্তিযুক্ত হয়নি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘শহরের বিক্ষোভ সামাল দেওয়ার দায়িত্বটা সরাসরি পুলিশ ও অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষের। কিন্তু গভর্নরের মত উপেক্ষা করে সেখানে হস্তক্ষেপ করলেন প্রেসিডেন্ট। আধুনিককালে এ ধরনের নজির নেই।’

গত শনিবার জুলিয়েট কায়েম শনিবার সিএনএনকে বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক দেশ এ ধরনের বিক্ষোভ সামাল দিতে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করে না।’

গভর্নরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে ট্রাম্প যেভাবে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন, তাতে সহিংসতা ছড়ানোর ঝুঁকি বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন জুলিয়েট কায়েম।

কায়েম বলেন, ‘ফেডারেল নিয়ন্ত্রণে থাকা সেনারা মূলত বলপ্রয়োগের মতো কাজগুলোর জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা কোনো রাজনৈতিক সংকট বা জন–অসন্তোষকে শান্তভাবে মোকাবিলার জন্য প্রশিক্ষণ পায় না।’

ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর নিউসমের মতের বিরুদ্ধে ট্রাম্প যেভাবে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা দুই নেতার মধ্যে চলমান উত্তেজনার সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক দিন ধরেই ডেমোক্র্যাটশাসিত ক্যালিফোর্নিয়াকে নিশানায় রেখেছেন এবং বারবার বিভিন্ন তহবিল বা অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ করার হুমকি দিয়ে অঙ্গরাজ্যটিতে নিজের নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন ক্যালিফোর্নিয়ার জন্য বরাদ্দ ফেডারেল তহবিলের একটা বড় অংশ বাতিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত মাসে এক ক্রীড়া অনুষ্ঠানে এক ট্রান্সজেন্ডার খেলোয়াড়ের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল তহবিল বন্ধ করার হুমকি দিয়েছিলেন।

সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন বন্যা প্রতিরোধ প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ১২ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের তহবিল কাটছাঁট করেছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগেই ট্রাম্প ক্যালিফোর্নিয়ায় ভয়াবহ দাবানল মোকাবিলা নিয়ে অঙ্গরাজ্যটির কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করে আসছিলেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও গভর্নর নিউসমের মধ্যে বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রকাশ্য বিবাদ চলছে।

সিএনএনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাসটেড হার্নডন বলেন, ‘আমি মনে করি, হোয়াইট হাউস ইচ্ছা করেই উত্তেজনা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে। কারণ, তারা এই উত্তেজনাটাই চায়। তারা চাইছে গ্যাভিন নিউসমের সঙ্গে লড়াই হোক, যেন তারা এ লড়াইয়ে ফেডারেল ক্ষমতার বিভিন্ন দিক ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান মজবুত করতে পারে।’

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ন্যাশনাল গার্ড সেনাদের মোতায়েনের এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক’ উল্লেখ করে সমালোচনা করেছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক পল ও’ব্রায়েন মনে করেন, মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা মানুষদের নিশানা করা ও শাস্তি দেওয়ার জন্যই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘কোনোভাবেই জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ভিন্নমত দমন ও মানুষের মনে ভয় ঢোকানোর জন্য এমনটা করা হয়েছে।’

লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়
লস অ্যাঞ্জেলেসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। ছবি: এএফপি ফাইল ছবি

‘কনস্টান্টিনোপল’ যেভাবে ওসমানি সাম্রাজ্যের অধীনে এল by জাফর সৈয়দ

১৪৫৩ সালের ২৯ মে সুলতান মেহমেদের সৈন্যরা কনস্টান্টিনোপল আক্রমণ করে। ৪৭ দিন টানা গোলাবর্ষণের পর এই শহর তুর্কি ওসমানি সাম্রাজ্যের দখলে আসে। তবে ইউরোপীয়রা আজও ভুলতে পারেনি সেই পরাজয়ের গ্লানি। কনস্টান্টিনোপলের পতন নিয়ে লিখেছেন বিবিসি উর্দুর জাফর সৈয়দ। আজ সোমবার লেখাটি বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।

১৪৫৩ সালের ২৯ মে  ঘড়িতে সময় রাত দেড়টা। পৃথিবীর এক অন্যতম প্রাচীন ও শ্রেষ্ঠ শহরের প্রাচীর আর গম্বুজগুলোর ওপর দিয়ে হলুদ চাঁদ পশ্চিমের দিকে হেলে পড়ছে, যেন বড় কোনো বিপদের সংকেত দিচ্ছে।

অস্তমিত চাঁদের ম্লান আলোয় আকাশের তারাগুলো দেখতে পাচ্ছে যে, শহরের প্রাচীরের বাইরে সেনারা ধীরে ধীরে এবং সুশৃঙ্খলভাবে জড়ো হচ্ছে।

ওই সৈন্যরা তাদের হৃদয় দিয়ে যেন অনুভব করছিল, তারা ইতিহাসের মোড় ঘোরানো এক মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

এই শহর হচ্ছে কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) এবং প্রাচীরের বাইরে অটোমান বা ওসমানীয় সেনারা চূড়ান্ত আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

শহরের প্রাচীর লক্ষ্য করে ওসমানীয় কামান ৪৭ দিন ধরে গোলাবর্ষণ করে। সেনাপতিরা বিশেষভাবে তিনটি স্থান লক্ষ্য করে তাদের গোলাবর্ষণ চালিয়ে যায়, যাতে প্রাচীর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২১ বছর বয়সী ওসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ হঠাৎ করেই তাঁর বাহিনীর সামনে সারিতে পৌঁছে যান। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, চূড়ান্ত হামলা হবে ‘মেসুত টিকিওন’ নামক প্রাচীরের মাঝামাঝি অংশে, যেখানে অন্তত নয়টি ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং পরিখার একটি বড় অংশে ফাটল ধরেছে।

মাথায় মোটা পাগড়ি আর সোনালি পোশাক পরে সুলতান তুর্কি ভাষায় তাঁর সৈন্যদের বললেন, ‘আমার বন্ধু ও ছেলেরা, এগিয়ে চলো, নিজেদের প্রমাণ করার সময় এসে গেছে।’

সঙ্গে সঙ্গেই বাঁশি, শিঙা, ঢোল ও বিউগলের শব্দ রাতের নীরবতা ভেদ করে দেয়। কিন্তু এই কানফাটা শব্দেও ওসমানীয় সেনাদের আকাশ ফাটানো চিৎকার পরিষ্কার শোনা যাচ্ছিল। এরপর তারা প্রাচীরের দুর্বল অংশে হামলা চালায়।

এক পাশে স্থলভাগ থেকে আর অন্য পাশে সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজে লাগানো কামানের মুখ থেকে গোলা ছুড়তে শুরু করে সেনারা।

বাইজেন্টাইন সৈন্যরা প্রাচীর রক্ষা করতে প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু দেড় মাস ধরে চলা অবরোধে তাদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা হতাশ ও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

অনেক সাধারণ মানুষও সেনাদের সাহায্য করতে প্রাচীরের কাছে এসে আক্রমণকারীদের লক্ষ্য করে পাথর ছুড়তে থাকে।

অন্যরা কাছের একটি গির্জায় ছুটে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনা করতে শুরু করে। পাদরিরা গির্জার ঘণ্টা জোরে বাজাতে শুরু করেন, যারা ঘুমন্ত ছিল, ঢং ঢং শব্দে তারাও জেগে ওঠে।

খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের সব মানুষ নিজেদের ধর্মীয় বিভেদ ভুলে, একত্র হয়ে শহরের সবচেয়ে বড় ও পবিত্র গির্জা হায়া সোফিয়ায় জড়ো হতে থাকে।

ওসমানীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা থামাতে প্রতিরক্ষা বাহিনী সাহসিকতার সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছিল।

সেদিন ওই শহরে থাকা ইতালীয় চিকিৎসক নিকোলো বারবেরো লিখেছেন, সাদা পাগড়ি পরা বাহিনীর সদস্যরা নির্ভীক সিংহের মতো আক্রমণ চালাচ্ছিল। আর তাদের স্লোগান ও ঢোলের শব্দ এমন ছিল, যেন তারা এই পৃথিবীর না।

ভোরের দিকে তুর্কি সেনারা প্রাচীরের চূড়ায় পৌঁছে যায়। ততক্ষণে অধিকাংশ প্রতিরক্ষা সেনা মারা গেছে এবং তাদের সেনাপতি জিওভান্নি জাস্টিনিয়ানি গুরুতর আহত হন। তাঁকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

পূর্ব দিক থেকে সূর্যের প্রথম আলোতে দেখা গেল, একজন তুর্কি সেনা কিরকোপোটা ফটকের ওপরে থাকা বাইজেন্টাইন পতাকা নামিয়ে ওসমানীয় পতাকা উড়িয়ে দিচ্ছে।

সুলতান মেহমেদ তাঁর মন্ত্রী ও সহযোগীদের সঙ্গে একটি সাদা ঘোড়ায় চড়ে হায়া সোফিয়ায় যান।

প্রধান ফটকের সামনে এসে ঘোড়া থেকে নেমে সড়ক থেকে এক মুঠো ধুলা তুলে তাঁর পাগড়িতে ছিটিয়ে দেন। আর তা দেখে তাঁর সহচরদের চোখ ভিজে ওঠে।

মুসলিমরা ৭০০ বছরের প্রচেষ্টার পর অবশেষে কনস্টান্টিনোপল জয় করেছে। এই জয় শুধু একটি শহরের দখল বা এক রাজা থেকে আরেক রাজার ক্ষমতাবদল ছিল না, এর সঙ্গে সঙ্গে এক ঐতিহাসিক যুগের পতন ও আরেকটি অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।

একদিকে খ্রিষ্টপূর্ব ২৭ অব্দে শুরু হওয়া রোমান সাম্রাজ্য ১৪৮০ বছর ধরে কোনো না কোনো রূপে টিকে থাকার পর অবশেষে পতন ঘটে।

অন্যদিকে ওসমানীয় সাম্রাজ্য তার শীর্ষে পৌঁছায় এবং পরবর্তী ৪০০ বছর ধরে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বহু অংশে রাজত্ব করে।

১৪৫৩ সালকেই মধ্যযুগের সমাপ্তি ও আধুনিক যুগের সূচনা বলে মনে করা হয়। শুধু তা–ই নয়, কনস্টান্টিনোপল বিজয়কে সামরিক ইতিহাসের একটি মাইলফলক হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।

কারণ পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয় যে বারুদ ও বড় বড় কামানের গোলার যুগে শহরকে শুধু প্রাচীর দিয়ে রক্ষা করা যাবে না।

তুর্কিরা শহরটি দখল করার পর হাজার হাজার গ্রিকভাষী নাগরিক এখান থেকে পালিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে ইতালিতে বসতি স্থাপন করে।

সে সময় ইউরোপ ‘অন্ধকার যুগ’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল এবং প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে কনস্টান্টিনোপলে তখনও গ্রিক ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা হতো।

এখানে আগত শরণার্থীদের কাছে হীরা এবং রত্নপাথরের চেয়ে মূল্যবান সম্পদ ছিল অ্যারিস্টটল, প্লেটো, টলেমি, গ্যালেন ও অন্য দার্শনিক, বিজ্ঞানী ও পণ্ডিতদের মূল গ্রিক পাণ্ডুলিপি।

ইউরোপে প্রাচীন গ্রিক বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবনে তাঁদের সবারই বিরাট ভূমিকা ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, এ কারণেই ইউরোপে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের সূচনা হয়; যা পরবর্তী কয়েক শ বছর ইউরোপকে গোটা পৃথিবীর থেকে এগিয়ে দেয়, যে ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।

তরুণ সুলতান মেহমেদ ২৯ মে সকালে যে শহরটি দেখেছিলেন, সেটি তখন আর সেই শহর ছিল না। যার জাঁকজমকের কাহিনি তিনি ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছেন।

দীর্ঘ অবক্ষয়ের পর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য অবলুপ্ত হয়ে পড়ে এবং শত শত বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর ধনবান শহর কনস্টান্টিনোপলেও জনসংখ্যা কমতে কমতে কয়েক হাজারে নেমে আসে।

শহরের অনেকাংশ জনশূন্য হয়ে একে অপর থেকে আলাদা হয়ে বিচ্ছিন্ন গ্রামে পরিণত হয়। বলা হয়ে থাকে, তরুণ সুলতান শহরের এই করুণ অবস্থা দেখে পারস্যের কবি শেখ সাদির লেখা এই কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন—

‘উলু ডাকে আফরাসিয়াবের মিনারে...মাকড়সা জাল বোনে রোমান সম্রাটের প্রাসাদে।’
কনস্টান্টিনোপলের পুরোনো নাম ছিল বাইজেন্টিয়াম। কিন্তু যখন ৩৩০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট কনস্ট্যান্টাইন প্রথম তাঁর রাজধানী রোম থেকে এখানে স্থানান্তর করেন, তখন শহরের নাম বদলে তাঁর নামানুসারে ‘কনস্টান্টিনোপল’ রাখা হয়। আরবরা যাকে ‘কুসতন্তিনিয়া’ বলত।

পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য পতনের পরও এই পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য কনস্টান্টিনোপলে টিকে থাকে এবং চতুর্থ থেকে ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত এই শহর এতটা উন্নতি করে যে তখন দুনিয়ার আর কোনো শহর তার ধারে–কাছে ছিল না।

এ কারণেই মুসলিমরা শুরু থেকেই শহরটি জয় করার স্বপ্ন দেখে আসছিল।

এই লক্ষ্য পূরণে প্রথমদিককার কয়েকটি চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ৬৭৪ সালে একটি বিশাল শক্তিশালী নৌবহর প্রস্তুত করে আরবরা কনস্টান্টিনোপলের দিকে রওনা দেয়।

এই বহর শহরের বাইরে তাঁবু খাটিয়ে ক্যাম্প করে এবং পরবর্তী চার বছর ধরে বারবার প্রাচীর ভেদ করে শহরে ঢোকার চেষ্টা করে।

অবশেষে ৬৭৮ সালের শেষ দিকে বাইজেন্টাইনদের নৌবাহিনী শহর থেকে বেরিয়ে এসে আরবদের ওপর আক্রমণ চালায়। এবার তাদের হাতে ছিল এক ভয়ানক অস্ত্র, যার নাম ছিল ‘আতিশে ইউনানি’, বাংলায় যার অর্থ, ‘গ্রিক আগুন’।

এই গ্রিক আগুন আসলে কী ছিল, তা আজও জানা যায়নি। তবে এটি ছিল এমন এক দাহ্য পদার্থ, যা তীরের সাহায্যে ছুড়ে দেওয়া হতো এবং এটি যুদ্ধ নৌযানের গায়ে আটক থাকত।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, পানি ঢাললে এই আগুন আরও জ্বলে উঠত।

আরবরা এই ভয়ানক অস্ত্রের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো নৌবহর আগুনের সমুদ্রে পরিণত হয়।

সেনারা পানিতে লাফিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করলেও তাতেও রক্ষা হয়নি। কারণ, এই গ্রিক আগুন পানির ওপরে পড়েও জ্বলতে থাকত। মনে হচ্ছিল, পুরো মরমর সাগরে আগুন ধরে গেছে।

আরবদের পিছুহটা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। ফেরার পথে একটি ভয়াবহ সমুদ্রঝড় আরও সর্বনাশ ডেকে আনে এবং শত শত জাহাজের মধ্যে মাত্র অর্ধেক নৌযান ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছিল।

এই অবরোধ চলাকালেই প্রখ্যাত সাহাবি হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) মারা যান। তাঁর কবর আজও শহরের প্রাচীরের বাইরে রয়েছে।

সুলতান মেহমেদ এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যাকে তুর্কিরা পবিত্র স্থান বলে মানে।

এরপর ৭১৭ সালে উমাইয়াদের আমির সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিক আরও ভালো প্রস্তুতি নিয়ে আবার কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করেন। এবারও পরিণতি ভালো হয়নি। প্রায় দুই হাজার নৌযুদ্ধযানের মধ্যে মাত্র পাঁচটি ফিরে আসতে সক্ষম হয়।

সম্ভবত এই কারণেই পরবর্তী ৬০০ বছর ধরে মুসলিমরা আর কনস্টান্টিনোপলে আক্রমণ করেনি। এরপর সুলতান মেহমেদ অবশেষে শহরের ওপর নিজের পতাকা উড়িয়ে পুরোনো সব বদলা পূর্ণ করেন।

শহর দখলের পর সুলতান তাঁর রাজধানী এডিরনে থেকে কনস্টান্টিনোপলে স্থানান্তর করেন এবং নিজের জন্য রোমের সম্রাটের উপাধি ‘কায়সার-ই-রোম’ গ্রহণ করেন।

পরবর্তী দশকে এই শহর আবার এমন উত্থান দেখে, যা অতীতের গৌরবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সুলতান নিজের সাম্রাজ্যজুড়ে এক ফরমান পাঠালেন, ‘কেউ আসতে চাইলে এই শহরে আসতে পারেন, তাঁকে শহরে ঘর ও বাগান দেওয়া হবে।’

শুধু এটুকুই নয়, সুলতান মেহমেদ ইউরোপ থেকেও লোকজনকে কনস্টান্টিনোপলে আসার আমন্ত্রণ জানান, যাতে শহরটি আবার জনবসতিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ ছাড়া সুলতান শহরের ধ্বংসপ্রাপ্ত মৌলিক অবকাঠামো নতুন করে নির্মাণ করেন, পুরোনো খালগুলো মেরামত করেন এবং নিষ্কাশনের ব্যবস্থা চালু করেন।

সুলতান মেহমেদ বড় পরিসরে নতুন নির্মাণকাজ শুরু করেন, যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো তোপকাপি প্রাসাদ এবং গ্র্যান্ড বাজার।

অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন রকম হস্তশিল্পী, কারিগর, ব্যবসায়ী, ক্যালিগ্রাফার, চিত্রশিল্পী, স্বর্ণকার এবং অন্যান্য দক্ষ পেশাজীবী শহরের দিকে আসতে শুরু করেন।

সুলতান মেহমেদ হায়া সোফিয়া নামের গির্জাটি মসজিদে রূপান্তর করেন। তবে তিনি শহরের দ্বিতীয় বড় গির্জা‘ক্লিসায়ে হাওয়ারিয়ান’ বা চার্চ অব দ্য অ্যাপোস্টলসকে গ্রিক অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের কাছেই রেখে দেন। এই সম্প্রদায় আজও একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে টিকে আছে।

সুলতান মেহমেদের ছেলে সেলিমের শাসনামলে ওসমানি সাম্রাজ্য খিলাফতের মর্যাদা লাভ করে এবং কনস্টান্টিনোপল হয় এর রাজধানী। সব সুন্নি মুসলিমের কেন্দ্রীয় শহরে পরিণত হয়।

সুলতান মেহমেদের নাতি সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের শাসনামলে কনস্টান্টিনোপল নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যায়। এই সেই সুলেমান, যাঁকে বিখ্যাত তুর্কি ধারাবাহিক ‘মাই সুলতান’-এ দেখানো হয়েছে।

সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের রানি হুররাম সুলতান বিখ্যাত স্থপতি সিনানকে ভাড়া করেছিলেন, যিনি রানির জন্য একটি বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন।

সিনানের অন্যান্য বিখ্যাত স্থাপনার মধ্যে রয়েছে সুলেমানিয়া মসজিদ, হুররাম সুলতান হামাম, খোসরু পাশা মসজিদ, শাহজাদা মসজিদ ও অন্যান্য স্থাপনা।

কনস্টান্টিনোপলের পতন ইউরোপের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বই, কবিতা লেখা হয়, অনেক চিত্রকর্ম আঁকা হয় এবং এই ঘটনা ইউরোপীয়দের সামষ্টিক চেতনার অংশ হয়ে ওঠে।

এ কারণেই ইউরোপ কখনো কনস্টান্টিনোপলকে ভুলতে পারেনি।

ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুরস্ককে সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়ে আজও গড়িমসি করছে। এর কারণ, শত বছরের পুরোনো সেই ইতিহাস।

গ্রিসে আজও বৃহস্পতিবারকে অশুভ দিন হিসেবে ধরা হয়। কারণ, ১৪৫৩ সালের ২৯ মে ছিল বৃহস্পতিবার।

তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত বাইজেন্টাইন গির্জাকে মসজিদে রূপান্তর করেন তৎকালীন কনস্টান্টিনোপল বিজয়ী সুলতান মেহমেদ, যা এখন হায়া সোফিয়া নামে পরিচিত
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত বাইজেন্টাইন গির্জাকে মসজিদে রূপান্তর করেন তৎকালীন কনস্টান্টিনোপল বিজয়ী সুলতান মেহমেদ, যা এখন হায়া সোফিয়া নামে পরিচিত। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ভারতের নারীদের জন্য ‘অর্ধেক আকাশ’ খুলল মে মাসে by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতীয় নারী জাতির ক্ষমতায়নের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ১৭ জন অসম সাহসী ব্যতিক্রমীর নাম, যাঁরা ২০২৫ সালের ৩০ মে মহারাষ্ট্রের পুনের ন্যাশনাল ডিফেন্স একাডেমি (এনডিএ) থেকে স্নাতক হলেন। ৩১৯ জন পুরুষ সহপাঠীর সঙ্গে ‘পাসিং আউট প্যারেড’, যার পোশাকি নাম ‘অন্তিম পাগ’, তাতে অংশ নিলেন ভারতের তিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর এই ১৭ জন হবু নারী কর্মকর্তা।

এনডিএর ৭৬ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম পুরুষদের সঙ্গে পায়ে পা ও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একই সঙ্গে একই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রতিরক্ষা বাহিনীতে শামিল হতে চলেছেন এই নারীরা। কিছুকাল আগেও যে অধিকার দেশের নারীদের ছিল না, যা ছিল তাঁদের কল্পনার অতীত, ৩০ মে তা ধরা দিল।

নারী ‘অর্ধেক আকাশ’ হলেও ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে পুরুষের মতো তাঁদের সমান অধিকার ছিল না পাঁচ বছর আগেও। ২০২০ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেই অধিকার তাঁদের অর্পণ করেন। তত দিন পর্যন্ত স্নাতক হওয়ার পর নারীরা চেন্নাইয়ের ‘অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমিতে’ এক বছরের ‘কোর্স’ করে সেনাবাহিনীতে কর্মকর্তা হতে পারতেন। কিন্তু স্কুলের গণ্ডি টপকানোর পর এনডিএতে পুরুষদের মতো তিন বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর স্নাতক হয়ে সেনাবাহিনীতে স্থায়ী কমিশন পদে নিযুক্তি পেতেন না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ওই ১৭ জন নারী সেই অধিকার অর্জন করলেন।

কতটা কঠিন সেই প্রশিক্ষণ? একটা ছোট্ট উদাহরণ হলো, পুরুষদের সঙ্গে তাঁদের মতো ১৪ কিলোমিটার দৌড়নোর পর লিখিত পরীক্ষা দিতে বসা। এ দিনটির কথা কল্পনা করেই সম্ভবত ২০২১ সালে ভারতের তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এম এম নরবনে সে বছরের অন্তিম পাগের সমাবর্তনের আসরে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে ৪০ বছর পর হয়তো দেখা যাবে, আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে, কোনো নারী সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে অভিবাদন গ্রহণ করছেন।’

সে বছরেই এনডিএর দরজা প্রথমবারের মতো নারীদের জন্য খোলা হয়েছিল। ৩০ মে সেই নারীরা স্নাতক হওয়ার পর জেনারেল নরবনে সংবাদমাধ্যমে নিজের প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘সেনাবাহিনীতে লিঙ্গের সাম্যতা অর্জনে এটাই প্রথম পদক্ষেপ। এঁরাই একদিন সামনে থেকে বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে আমাদের গর্বিত করবেন।’

পরিবর্তন শুধু সামাজিক ও মানসিক স্তরে নয়, এতকালের বন্ধ দরজা নারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে এনডিএকেও অনেক বদলাতে হয়েছে। এযাবৎ নারীবর্জিত শিক্ষাকেন্দ্রে নারীদের জন্য উপযুক্ত বাসস্থান ও শৌচালয়ের বন্দোবস্ত করতে হয়েছে। বদলাতে হয়েছে নিরাপত্তা প্রটোকল। নতুন নিয়মাবলি ও বিধিমালা তৈরি করতে হয়েছে।

ক্যাডেটদের ঠিকমতো গাইড করতে ১০ জনের মতো নারী কর্মকর্তাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু অপরিবর্তিত থেকে গেছে কঠিন প্রশিক্ষণ সময়সূচি। মেয়েদের জন্য বিন্দুমাত্র কোনো ছাড় নেই। শীত–গ্রীষ্ম–বর্ষায় কাকভোরে পুরুষদের যে সময় ঘুম থেকে উঠতে হয়, নারীদেরও উঠতে হয় তখন। প্রতিদিন পুরুষদের যত কিলোমিটার দৌড়াতে হয়, মেয়েদেরও ঠিক ততটাই।

পরীক্ষার যে সূচি পুরুষদের জন্য, মেয়েদের জন্যও তা এক। এমনকি দৈনন্দিন শরীরচর্চা বা প্রশিক্ষণের সময়সূচিও পুরুষ–নারীতে কোনো তফাত নেই। একমাত্র পার্থক্য ওজন নিয়ে দৌড়ানোর ক্ষেত্রে। পুরুষদের তুলনায় মেয়েদের বহন করতে হয় কিছুটা কম ওজন।

পার্থক্য নেই বলেই সম্ভাষণের ক্ষেত্রে এনডিএতে নারী ক্যাডেটদেরও লিঙ্গ পার্থক্য করা হয় না। পুরুষদের মতো নারীরাও শুধু ‘ক্যাডেট’।

সাহসী এই ১৭ নারী ইতিমধ্যে তাঁদের পছন্দের কর্মস্থল বেছে নিয়েছেন। ৯ জন যাচ্ছেন সেনাবাহিনীতে। উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনের ইন্ডিয়ান মিলিটারি একাডেমি হতে চলেছে তাঁদের পরবর্তী ঠিকানা। পাঁচজন যাবেন হায়দরাবাদের ডুন্ডিগালের এয়ার ফোর্স একাডেমিতে। তিনজন যাচ্ছেন কেরালার এঝিমালায় ইন্ডিয়ান নেভাল একাডেমিতে।

সাবমেরিন বা ফ্রিগেট; রাফাল, সুখোই বা মিগের মতো ফাইটার প্লেন কিংবা ট্যাংক নিয়ে শত্রুদেশে ঢুকে পড়ার দায়িত্ব এঁদের ওপরই পড়তে চলেছে। ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর ইতিহাসে সংযোজিত হলো এক নতুন অধ্যায়।

ভারতের নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান ভাইস অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ মনে করছেন, ভবিষ্যতে এ নারীরাই হতে চলেছেন দেশের সম্পদ। তাঁর মতে, আধুনিক যুদ্ধ ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। সেখানে পুরুষ ও নারীতে কোনো প্রভেদ থাকবে না।

উত্তরাখণ্ডের ইশিতা শর্মা অর্থনীতি নিয়ে পড়তে পড়তে এনডিএর দরজা খোলার খবর পেয়েছিলেন তিন বছর আগে। বিন্দুমাত্র না ভেবে তিনি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ দেখান। সুযোগ পান এবং চলেও আসেন।

গণমাধ্যমকে ইশিতা বলেন, ‘ছিলাম অন্তর্মুখী। এনডিএ আমাকে আমূল বদলে দিয়েছে। বদলে গেছে আমার বক্তিত্ব। মানসিকতা। এখানে একমাত্র সত্য, একটিমাত্র শব্দ, সমতা।’

এটা ছিল এনডিএর ১৪৮তম পাঠ্যক্রম। পরিবর্তনের প্রথম বছর। এই ১৭ সাহসী নারীর মতো পরবর্তী কোর্সগুলোয় অপেক্ষায় রয়েছেন আরও ১২৬ জন।

ভারতের প্রতিরক্ষায় নারীর প্রবেশ ঘটেছিল ব্রিটিশ জমানায়। ১৮৮৮ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় শুরু হয়েছিল ‘দ্য ইন্ডিয়ান মিলিটারি নার্সিং সার্ভিসেস’। দীর্ঘ ১০৪ বছর প্রতিরক্ষা বাহিনীতে অন্য কোনো দরজা নারীদের জন্য খোলা হয়নি। ‘শর্ট সার্ভিস অফিসার’ পদে নারীদের বাহিনীতে নেওয়া শুরু হয় ১৯৯২ সাল থেকে।

এর ১৬ বছর পর ২০০৮ সাল থেকে আইন ও শিক্ষা কোরে নারীদের পার্মানেন্ট কমিশন পদে নেওয়া শুরু হয়। ২০১৫ সালে ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্স প্রথম নারী ফাইটার পাইলট নিয়োগ করে। ২০২০ সালে আসে সেই সন্ধিক্ষণ, যখন তিন বাহিনীতেই পার্মানেন্ট কমিশনের পক্ষে সুপ্রিম কোর্ট ঐতিহাসিক রায় দেন। ২০২১ সালে খুলে যায় নারী ক্যাডেটদের জন্য এনডিএর দরজা। ২০২৫ সালের ৩০ মে গর্বিত ১৭ সাহসী নারীর আত্মপ্রকাশ।

২০২৫ সালের মে মাস ‘অর্ধেক আকাশ’–এর অনন্য আখ্যান।

ভারতের এনডিএতে প্রথম ব্যাচের এক নারী ক্যাডেট–৩০ মে, পুনে
ভারতের এনডিএতে প্রথম ব্যাচের এক নারী ক্যাডেট–৩০ মে, পুনে। ছবি: এএনআই

ঈদের দ্বিতীয় দিন গাজায় ইসরাইলের হামলায় নিহত ৭৫

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকাতে ঈদুল আজহা ছিল ৬ জুন। দখলদার ইসরাইল হামলা চালিয়েছে সেদিনও। পরের দিন ৭ জুন ইসরাইলি বিমান বাহিনীর গোলাবর্ষণে উপত্যকাজুড়ে নিহত হয়েছেন অন্তত ৭৫ জন। এতে আহত হয়েছেন আরও প্রায় শতাধিক। রোববার গাজার সিভিল ডিফেন্স বিভাগসূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

নিহতদের মধ্যে ১৬ জন একই পরিবারের সদস্য। এর মধ্যে ৬ জন শিশুও রয়েছে। এই পরিবারটি বসবাস করত গাজার প্রধান ও মধ্যাঞ্চলীয় শহর গাজা সিটির সাবরা এলাকায়। আল জাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফিলিস্তিনের সিভিল ডিফেন্স বিভাগের মুখপাত্র মাহমুদ বাসেল বলেন, বিমান অভিযানের আগে কোনো সতর্ক সংকেত বা সাইরেন দেয়নি ইসরাইলের বিমান বাহিনী। তিনি আরও জানান, শনিবারের হামলায় অন্তত ৮৫ জন ধ্বংস্তূপের তলায় আটকা পড়েছেন। তাদের উদ্ধার করা এখনও সম্ভব হয়নি।

 mzamin

বিক্ষোভে উত্তাল লস অ্যাঞ্জেলেসে ন্যাশনাল গার্ড বাহিনী, ডেমোক্র্যাটদের ক্ষোভ

অভিবাসীবিরোধী অভিযানের জেরে বিক্ষোভে উত্তাল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছাতে শুরু করেছেন ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা। স্থানীয় সময় রোববার সকাল থেকে ন্যাশনাল গার্ড সদস্যদের লস অ্যাঞ্জেলেসে দেখা গেছে। এর আগে দুই দিন সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়।

রোববার ভোরে লস অ্যাঞ্জেলেসের সিটি হলের কাছে হেলমেট পরা সেনাদের অস্ত্র এবং হাতে ঢাল নিয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়। দুপুরের পর আরও বিক্ষোভ হওয়ার আশঙ্কায় আগে থেকেই সেখানে তাঁদের মোতায়েন করা হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, টানা দুই দিন বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লস অ্যাঞ্জেলেসে ন্যাশনাল গার্ডের দুই হাজার সদস্য মোতায়েনের ঘোষণা দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে এ সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্র্যাট দলীয় গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম।

লস অ্যাঞ্জেলেসে শনিবার দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ হয়। বিশেষ করে লাতিন-অধ্যুষিত একটি ডিস্ট্রিক্টে অভিযানে গেলে স্থানীয় লোকজন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্টের (আইসিই) সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। সেখানকার প্যারামাউন্ট ডিস্ট্রিক্টে বিক্ষুব্ধ মানুষদের সরাতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়া হয়, লাঠিপেটা করা হয়।

আইসিইর অভিযানে এক সপ্তাহে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ১১৮ জন অনিবন্ধিত অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ জন আটক হয়েছেন গত শুক্রবার। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এ অভিযানকে ‘নিষ্ঠুর’ বলে নিন্দা জানান।

এ ঘটনায় হোয়াইট হাউস থেকে একটি বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এসব অভিযান যুক্তরাষ্ট্রে ‘অবৈধ অপরাধীদের’ অনুপ্রবেশ বন্ধ ও তাঁদের প্রতিহত করার জন্য অপরিহার্য। এই সহিংসতার পরিপ্রেক্ষিতে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ব্যর্থ’ ডেমোক্র্যাট নেতারা তাঁদের নাগরিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছেন।

এমন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া অরাজক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দুই হাজার ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের আদেশে সই করেছেন বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

অভিযান চলাকালে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করায় কয়েকজনকে আটকের কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার (এফবিআই) উপপরিচালক ডন বনগিনো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স পোস্টে বিক্ষোভকারীদের সতর্ক করে তিনি লেখেন, ‘আপনি অরাজকতা করলে আমরা আটক করব। আইনশৃঙ্খলা বজায় থাকবে।’

আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ডেভিড হুয়ের্তা রয়েছেন। তাঁকে শুক্রবার আটক করা হয়। হুয়ের্তা সার্ভিস এমপ্লয়িজ ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়নের (এসইআইইউ) ক্যালিফোর্নিয়া শাখার সভাপতি।

ডেমোক্র্যাটদের ক্ষোভ

তবে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের সিদ্ধান্তকে ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উসকানি’ বলে মন্তব্য করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, ট্রাম্প ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের ঘাটতির কারণে নয়, বরং তাঁরা একটি নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি করতে চান। এ সময় বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তাদের (ট্রাম্প প্রশাসনকে) সে সুযোগ দেবেন না। কখনো সহিংস হবেন না। শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করুন।’

ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের বিরোধিতা করেছে আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নও (এসিএলইউ)। মানবাধিকার সংগঠনটি মনে করে, লস অ্যাঞ্জেলেসে ন্যাশনাল গার্ড পাঠানোর ট্রাম্পের নির্দেশ ‘অপ্রয়োজনীয়, উসকানিমূলক ও ক্ষমতার অপব্যবহার’।

এসিএলইউর ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রজেক্টের পরিচালক হিনা শামসি বলেন, ট্রাম্পের এ পদক্ষেপ লস অ্যাঞ্জেলেসের বাসিন্দাদের ‘ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে’।

এদিকে বিক্ষোভ দমনে প্রয়োজনে লস অ্যাঞ্জেলেসে মেরিন সেনা মোতায়েনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি জানান, লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঘটনায় ক্যাম্প পেন্ডলটনে থাকা মেরিন সেনারা মোতায়েনের জন্য ‘উচ্চ সতর্কতায়’ রয়েছেন।

বিক্ষোভ মোকাবিলায় ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের ঘোষণা দিয়ে শনিবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে হেগসেথ বলেন, সহিংসতা অব্যাহত থাকলে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার ওই ঘাঁটির মেরিন সেনাদেরও মোতায়েন করা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় কম্পটন এলাকায় একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। শনিবার ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে
যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সময় কম্পটন এলাকায় একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। শনিবার ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে। ছবি: এএফপি

অবৈধ অভিবাসীদের ধরপাকড় ঘিরে উত্তপ্ত আমেরিকার লস অ্যাঞ্জেলেস

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে অব্যাহত অভিবাসন অভিযান। দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভকারীরা ফেডারেল এজেন্টদের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে। যার ফলে শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তারা তাদের বিচারের আওতায় আনার হুমকি দিয়েছেন। শনিবার দক্ষিণ-পূর্ব লস অ্যাঞ্জেলেসের প্যারামাউন্ট এলাকায় একটি দোকানের বাইরে অভিবাসীদের আটকের খবর সামনে আসার পর নতুন করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বিক্ষোভকারীরা কর্মকর্তাদের ব্যঙ্গ করে এবং ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) এজেন্টদের এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানায়। প্রতিবাদকারীদের মধ্যে একজন জানান, ‘কোনও মানুষ অবৈধ নয়।’

হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের সচিব ক্রিস্টি নয়েম সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘এলএ দাঙ্গাবাজদের’ সম্বোধন করে একটি বার্তা পোস্ট করেছেন, সতর্ক করে দিয়েছেন যে অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না।

তিনি লিখেছেন, ‘আপনি আমাদের থামাবেন না বা আমাদের গতি কমাতে পারবেন না। আইসিই আইন প্রয়োগ করবে এবং যদি আপনি কোনও আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার উপর হাত রাখেন, তাহলে আপনার বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ পরিসরে মামলা করা হবে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সীমান্ত জার, টম হোমান, ফক্স নিউজকে বলেছেন যে, শনিবার সন্ধ্যায় লস অ্যাঞ্জেলেসে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হয়। ইতিমধ্যেই আইসিই এজেন্টরা শহরে আইন প্রয়োগকারী অভিযান পরিচালনা করে অভিবাসন লঙ্ঘনের অভিযোগে কমপক্ষে ৪৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এরপর বিক্ষোভ মাথাচাড়া দেয়।

বিক্ষোভকারীরা লস অ্যাঞ্জেলেসের শহরতলিতে এডওয়ার্ড আর রয়েল ফেডারেল বিল্ডিংয়ের প্রবেশপথ এবং প্রস্থান পথ বন্ধ করে দেয়, যেখানে আটক ব্যক্তিদের রাখা হয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি (ডিএইচএস) এক বিবৃতিতে বলেছে যে, ‘১,০০০ দাঙ্গাবাজ একটি ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী ভবন ঘিরে ফেলে এবং আইসিই আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের উপর হামলা চালায়। ভবন এবং করদাতাদের অর্থায়নে পরিচালিত সম্পত্তি নষ্ট করে।’

অভিবাসন সংক্রান্ত কঠোর ব্যবস্থা ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির অংশ, যেখানে তিনি রেকর্ড সংখ্যক মানুষকে কাগজপত্র ছাড়াই দেশে ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কারণ হোয়াইট হাউস আইসিই-এর জন্য প্রতিদিন কমপক্ষে ৩,০০০ অভিবাসীকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু দেশে বৈধভাবে বসবাসকারী ব্যক্তিরা তারাও ব্যাপক অভিবাসন দমন অভিযানের কবলে পড়েছেন। প্যারামাউন্ট এলাকার কাছে লস অ্যাঞ্জেলেসের কম্পটন থেকে আল জাজিরার রিপোর্টার  রবার্ট রেনল্ডস জানিয়েছেন যে, শনিবার পুলিশ ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস এবং ফ্ল্যাশব্যাং গ্রেনেড ব্যবহার করে।

শনিবারের বিক্ষোভ এবং অভিবাসন তল্লাশির খবরে আইসিই বা ডিএইচএসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। লস অ্যাঞ্জেলেসের ডেমোক্র্যাটিক মেয়র কারেন বাস শুক্রবার এক বিবৃতিতে অভিবাসন তল্লাশির নিন্দা জানিয়েছেন। বাস বলেন, ‘যা ঘটেছে তাতে আমি ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ। এই কৌশলগুলো আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে সন্ত্রাসের বীজ বপন করে এবং আমাদের শহরের নিরাপত্তার মৌলিক নীতিগুলিকে ব্যাহত করে। আমরা এটি মেনে নেব না।’

সূত্র : আলজাজিরা

mzamin

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম টাকা ভারতে ছাপা নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার মুখে পড়েন তাজউদ্দীন

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম টাকা ছাপানো হয় ভারতে। কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় আসার আগে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের মহারাষ্ট্রের নাসিক শহরে অবস্থিত নাসিক সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে ৮০ কোটি এক টাকার নোট ছাপানোর উদ্যোগ নেন। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশে প্রচলিত সব পাকিস্তানি নোট ধাপে ধাপে সরিয়ে নিজস্ব মুদ্রা চালু করা। কারণ, পাকিস্তান সরকার তখন এক টাকা ও উচ্চ মূল্যমানের নোট বাতিলের পরিকল্পনা করছিল। তাই সময়ক্ষেপণ করলে দেশের অর্থনীতিতে হঠাৎ ধস নামার আশঙ্কাও ছিল।

তবে ভারতে নোট ছাপানোর উদ্যোগ নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণার মুখে পড়েন তাজউদ্দীন আহমদ। তাঁর বিরুদ্ধে সদ্য স্বাধীন দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের ষড়যন্ত্রের মিথ্যা অভিযোগ তোলে তাঁর নিজ দল আওয়ামী লীগেরই একটি গোষ্ঠী। তারা গুজব ছড়িয়ে দেয়, ভারতের প্রিন্টিং প্রেসে এক টাকার মুদ্রা ছাপানোর যে সিদ্ধান্ত তাজউদ্দীন নিয়েছেন, তাতে ভারতের জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার দরজা খুলে গেছে।

এ নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম স্ক্রল ডট ইন গত শুক্রবার ‘স্বাধীন বাংলাদেশ যেভাবে প্রথম পাকিস্তানি মুদ্রার অবসানে ভারতে তৈরি টাকার প্রচলন করেছিল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সে দেশেরই স্টেটসমেন পত্রিকার সংবাদদাতা মানস ঘোষের লেখা ‘মুজিব’স ব্লান্ডার্স: দ্য পাওয়ার অ্যান্ড দ্য প্লট বিহাইন্ড হিজ কিলিং’ শিরোনামের বই অবলম্বনে এ প্রতিবেদন করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানি মুদ্রা পরিবর্তনে তাড়াহুড়ার একটি বিষয় ছিল। কারণ, তখন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক টাকার নোটসহ উচ্চ মূল্যমানের অন্যান্য নোট বাতিলের চিন্তা করছিল। তাই তাজউদ্দীন আহমদ সিদ্ধান্ত নেন, পাকিস্তানের মুদ্রা বাতিলের পরিকল্পনা কার্যকর করার আগেই তাঁর সরকার ধাপে ধাপে নিজেদের মুদ্রা বাজারে ছাড়বে; যাতে সদ্য স্বাধীন দেশের ওপর হঠাৎ কোনো অর্থনৈতিক সংকট এসে না পড়ে। এই পরিকল্পনার শুরুটা তিনি করতে চেয়েছিলেন বাজারে এক টাকার নোট ছাড়ার মাধ্যমে।

তাজউদ্দীন আহমদ সিদ্ধান্ত নেন, তাঁর সরকার পরবর্তী দুই মাসের মধ্যে বাজার থেকে পাকিস্তানের সর্বনিম্ন মূল্যমানের নোট তুলে নেবে। এর পরিবর্তে নতুন এক টাকার নোট চালু করবে। এই এক টাকার নোট যে ভারতে ছাপা হয়েছিল, তা প্রবাসী সরকারের অনেকেই জানতেন না।

১৯৭২ সালের মার্চে নতুন এক টাকার নোট বাজারে ছাড়া হয়। এ নোটগুলোতে পাকিস্তানের উর্দু হরফের পরিবর্তে সুন্দর বাংলা ফন্ট স্থান পায়। তখন ব্যবসায়ী মহল ও সাধারণ মানুষ এ উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। ঢাকার কিছু দৈনিক পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে এ বিষয়ে সরকারের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দূরদর্শিতার প্রশংসা করে।

কিন্তু হঠাৎ করেই ঢাকা থেকে প্রকাশিত কিছু দৈনিকে খবর ছাপা হয়, দেশের পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে নকল এক টাকার নোটের বস্তা ঢুকছে। যদিও ‘গুজব’ আকারে প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনে তাজউদ্দীনের নাম সরাসরি বলা হয়নি। তবে স্পষ্ট ইঙ্গিত ছিল, নোট ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের হাতে বাংলাদেশের অর্থনীতি ধ্বংস করার সুযোগ তুলে দিয়েছেন, ভারত যাতে বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাজউদ্দীন স্বেচ্ছায় সেই সুযোগ করে দিয়েছেন এবং ভারতীয় ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন। সংবাদের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে পত্রিকায় একই নম্বরের দুটি ভিন্ন নোটের (জাল নোট হিসেবে) ছবিও ছাপানো হয়।

মূলত তৎকালীন কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউ কেউ টাকার বিষয়টি নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে বিভিন্ন সংবাদ ফাঁস করতেন। যেমন তাঁরা একবার সংবাদকর্মীদের জানান যে ভারত থেকে টাকা ছাপানো নিয়ে যে প্রচারণা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও উদ্বিগ্ন। সেই সূত্র ধরে কিছু সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশ হয় এভাবে, প্রতিদিন ভারত থেকে বাংলাদেশে কোটি কোটি এক টাকার নকল নোট পাচার হচ্ছে। এই খবর শুনে বঙ্গবন্ধু সত্যতা যাচাই করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিজ দপ্তরে তলব করেন। এ ঘটনায় তাজউদ্দীন আহমদ মর্মাহত হন। কারণ, বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডাকার পরিবর্তে তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ডেকে নিয়েছিলেন। অথচ তাঁকে (তাজউদ্দীন) কিছুই জানানো হয়নি।

ওই সময় সাংবাদিক বজলুর রহমান (প্রয়াত) পূর্বদেশের তৎকালীন সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরীকে (তিনি জাল ভারতীয় মুদ্রার ছবি ছাপিয়েছিলেন) জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার কাছে যাঁরা ছবিগুলো দিয়েছেন তাঁরা কি নকল নোট বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছেন? পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছেন?’ এহতেশাম হায়দার এ বিষয়ে জানাতে কোনো আগ্রহ দেখাননি।

দৈনিক সংবাদে কর্মরত বজলুর রহমান তখন এহতেশাম হায়দার চৌধুরীকে বলেন, ‘আপনার কি একবারও মনে হয়নি যে যাঁরা আপনাকে এসব ছবি ও খবর দিয়েছেন তাঁরা অসৎ উদ্দেশ্যে আপনার পত্রিকাকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছেন? আমরা এটি খুব ভালোভাবেই জানতাম যে আওয়ামী লীগের কারা এই নোংরা চক্রান্তে লিপ্ত; তাঁরা কার বিরুদ্ধে এবং কী উদ্দেশ্যে এই কাজ করছেন। তাই আমরা এ খবরটিকে গুরুত্ব দিইনি। সীমান্তবর্তী কোনো জেলা থেকে আমাদের কোনো সংবাদদাতা ভারত থেকে জাল বাংলাদেশি নোটের ব্যাপক চোরাচালানের খবর দেয়নি। ওই সব জেলার পুলিশ কিংবা সীমান্তে নিয়োজিত বাংলাদেশ রাইফেলসও (বর্তমান বিজিবি) জাল নোট জব্দের কোনো তথ্য দেয়নি। পুরো প্রচারণাটিই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—তাজউদ্দীনকে ফাঁসানোর জন্য।’

পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সেসব প্রতিবেদন দেশে একধরনের ভীতিকর ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। গুজব এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে ঢাকার রিকশাওয়ালারা ভারতে ছাপানো এক টাকার নোট নিতে অস্বীকৃতি জানান। বরং তাঁরা পাকিস্তানি নোট ও কয়েনে (ধাতব মুদ্রা) ভাড়া নিতে চাইতেন। আর দোকানিরা বলতেন, এই নোট বৈধ নয়। যদিও কেউ কেউ নতুন নোটের পক্ষে যুক্তি দিতেন। তাঁরা বলতেন, সরকার এখনো এসব নোটকে অবৈধ ঘোষণা করেনি। তবে ব্যবসায়ীরা পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলতেন, দেশের জনগণ এই নোটে আস্থা রাখেন না।

ভারতে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের টাকা ছাপা
ভারতে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের টাকা ছাপা

‘ডেমোক্র্যাটদের সাহায্য করলে পরিণাম ভুগতে হবে’ -ট্রাম্প

'রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য যদি ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীদের তহবিল দেন, তাহলে তার পরিণাম গুরুতর হবে'।  এনবিসি নিউজকে দেয়া এক টেলিফোনিক সাক্ষাৎকারে একদা ঘনিষ্ঠ বন্ধু টেসলা কর্তা  ইলন মাস্ককে এই ভাষাতেই হুঁশিয়ারি দিলেন  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই সপ্তাহের শুরুতে জনসমক্ষে দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে সংঘাতের খবর  ছড়িয়ে পড়ার পর ট্রাম্প আরও বলেছেন যে, মাস্কের সাথে সম্পর্ক মেরামত করার কোনও ইচ্ছা তার নেই।

টেসলা এবং স্পেসএক্সের সিইওর সাথে তার সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে বলে তিনি মনে করেন কিনা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ধরে নিচ্ছি, হ্যাঁ।’

এই সপ্তাহের শুরুতে এক্স এবং ট্রুথ সোশ্যালে একে অপরকে আক্রমণের পর  থেকে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো সবচেয়ে জোরালো ছিল। তিনি আরও বলেন যে,  বিশ্বের সামনে তাদের দুজনের বিচ্ছেদের পর রিপাবলিকান পার্টি আগের চেয়ে আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ। ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন, এখনই মাস্কের সাথে কথা বলার কোনও পরিকল্পনা তার নেই।

প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমি অন্যান্য কাজে খুব ব্যস্ত। এই মুহূর্তে তার সাথে কথা বলার কোনও ইচ্ছা আমার নেই।’

প্রেসিডেন্টের  অফিসকে অসম্মান করার জন্যও  মাস্কের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার মাস্ক এক্স-এ প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে একের পর এক পোস্ট করতে শুরু করেন। যার মধ্যে একটি পোস্ট এখন মুছে ফেলা হয়েছে। সেখানে তিনি ট্রাম্প এবং প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনের মধ্যে একসময়ের যোগসূত্রর কথা তুলে ধরেন।

ট্রাম্প এ প্রসঙ্গে শনিবার বলেন, ‘এটা একটা পুরনো খবর, বছরের পর বছর ধরে এটা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এমনকি এপস্টাইনের আইনজীবীও বলেছেন যে, এর সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই।’

তাদের বিবাদের আগের দিনগুলোতে, মাস্ক জনসমক্ষে হোয়াইট হাউসে পাস হওয়া রিপাবলিকান পার্টির নেতৃত্বাধীন ব্যয় বিলের সমালোচনা করেছিলেন। ওভাল অফিসে, ট্রাম্প মাস্কের সমালোচনার জবাবে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি খুবই হতাশ কারণ ইলন এই বিলের ভেতরের কাজকর্ম সম্পর্কে জানতেন।’

এই মন্তব্যের কিছুক্ষণ পরেই মাস্ক তার পোস্টের ঝড় তোলেন, যার মধ্যে ছিল একটি পোস্টে ট্রাম্পকে অভিশংসনের আহ্বান জানানো।  যদিও পরে সেই পোস্টটি মুছে দেন মাস্ক।

২০২৪ সালে ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট  নির্বাচনের সময় বড় আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছিলেন মাস্ক। গত বছর সুইং স্টেটগুলোতে তাকে শক্তিশালী করতে আড়াই বিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছিলেন। প্রশাসনিক কাজকর্মের প্রথম মাসগুলোতে, ট্রাম্প মাস্ককে সরকারি দক্ষতা বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত করেছিলেন, যেখানে তিনি ফেডারেল কর্মীদের ব্যাপক ছাঁটাই এবং বেশ কয়েকটি সংস্থা বন্ধ বা আংশিক বন্ধ করার তত্ত্বাবধান করেছিলেন।

সূত্র : এনবিসি নিউজ

mzamin