Thursday, December 31, 2015

মাওলানা সাঈদীকে খালাস দিলেন বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা by মেহেদী হাসান

মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দিলেন বিচারপতি মো : আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। আপিল আবেদনের লিখিত রায়ে বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা বলেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত কোনো অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। আসামি পক্ষ সফলভাবে প্রমাণ করতে পেরেছে তিনি রাজাকার বাহিনী এবং শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন না ও কোনো অপরাধ করেননি। আসামি পক্ষ আরো প্রমাণ করতে পেরেছে যে, ঘটনার সময় তিনি পিরোজপুর ছিলেন না, যশোর ছিলেন।
বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা রায়ে লিখেছেন ১৯৭১ সালে তিনি রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন এবং এ হিসেবে তিনি বিভিন্ন অপরাধ করেছেন মর্মে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা প্রমাণের দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্রপক্ষের। কিন্তু তারা তা প্রমাণ করতে পারেনি।
রায়ে তিনি আসামি পক্ষের আপিল আবেদন গ্রহণ করে মাওলানা সাঈদীকে সব অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিয়ে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। অপর দিকে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন তিনি। বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা মাওলানা সাঈদীকে খালাসের পক্ষে দীর্ঘ রায়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্য, অন্যান্য তথ্য প্রমাণ বিশ্লেষণ করে যুক্তি তুলে ধরেছেন।
১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। এর মধ্যে দুইটি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। সে সময়কার প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে এ রায় দেন।
বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। ৬১৪ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় মূলত লিখেছেন বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (বর্তমানে প্রধান বিচারপতি) এবং বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। বেঞ্চের অপর সদস্য তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো : মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি এ এইচ এম শাসসুদ্দীন চৌধুরী (বর্তমানে অবসরে) এবং বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিক বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার রায়ের সাথে একমত পোষণ করেছেন রায়ে।
অপর দিকে মাওলানা সাঈদীকে তিনটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড, একটি অভিযোগে ১২ বছর এবং আরেকটি অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড দিয়ে বেঞ্চের চারজন বিচারপতি যে রায় দিয়েছেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত রায় দিয়েছেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা। তিনি তার ২৪৪ পৃষ্ঠার রায়ে মাওলানা সাঈদীকে সবগুলো অভিযোগ থেকে খালাস দিয়ে তাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন।
বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী রায়ে ২৩৮ পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মামলার উদাহরণের সাহায্যে।
রাষ্ট্রপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে মোট ২০টি অভিযোগ আনে ট্রাইব্যুনালে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-১ মাওলানা সাঈদীকে ইব্রাহীম কুট্টি ও বিশাবালী হত্যাকাণ্ডের দু’টি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেন। অপর ছয়টি অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও সাজা উল্লেখ করা হয়নি।
ট্রাইব্যুনালে যে আটটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সেগুলো হলো ৬, ৭, ৮ (ইব্রাহীম কুট্টি হত্যা), ১০ (বিশাবালী হত্যা), ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯।
রাষ্ট্রপক্ষ ছয়টি অভিযোগে সাজা উল্লেখের দাবি জানিয়ে আপিল আবেদন করে। অপর দিকে আসামিপক্ষ মাওলানা সাঈদীর বেকসুর খালাস করে আপিল আবেদন করে।
২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মাওলানা সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন আপিল বিভাগ। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটি পৃথক অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড অপর দু’টি অভিযোগের একটিতে ১২ বছর এবং আরেকটিতে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। অপর তিনটি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়।
আলোচিত ইব্রাহীম কুট্টি হত্যাকাণ্ডে ১২ বছর জেল এবং বিশাবালী হত্যাকাণ্ডে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। বিশাবালী হত্যার অভিযোগসহ আরো দু’টি অভিযোগে মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে আপিলের রায়ে।
রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন গ্রহণ করে যে তিনটি অভিযোগে সাজা উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো ৭, ১৬ ও ১৯ নং অভিযোগ।
১৬ নম্বর হলো গৌরাঙ্গ সাহার তিন বোন মহামায়া, আনু ও কমলাকে অপহরণ করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেয়ার অভিযোগ। এ অভিযোগে আপিল বিভাগের রায়ে মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্য কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। অপর দিকে ১৯ নম্বর অভিযোগ হলো মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১০০ থেকে ১৫০ জন হিন্দুকে জোর করে ধর্মান্তরকরণ। এ অভিযোগেও মাওলানা সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
সাত নম্বর অভিযোগ ছিল শহিদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে আগুন দেয়া। এ অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
৭, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে ট্রাইবু্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করলেও কোনো সাজা উল্লেখ করেননি। আপিল বিভাগের রায়ে এ তিন অভিযোগের বিপরীতে সাজা উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া আরো তিনটি অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল মাওলানা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করলেও সে তিনটি অভিযোগে আপিলের রায়ে খালাস দেয়া হয়েছে। এ অভিযোগ তিনটি হলো (৬) পাড়েরহাটবাজারে দোকানেপাটে লুটপাটে নেতৃত্ব প্রদান এবং অংশ নেয়া, (১১) মাহবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে লুট এবং তার ভাইকে নির্যাতন এবং (১৪) ১৯৭১ সালে হোগলাবুনিয়া এলাকায় হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ এবং শেফালী ঘরামী নামে একজন মহিলাকে রাজাকার কর্তৃক ধর্ষণে সহায়তা এবং সেখানে উপস্থিত থাকা।
বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা ইব্রাহীম কুট্টি, বিশাবালী হত্যাসহ মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত সবগুলো অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছেন।
মাওলানা সাঈদী ১৯৭১ সালে পিরোজপুরে সংঘটিত অপরাধ স্থলে ছিলেন না। তিনি ১৯৭১ সালের আগে থেকেই যশোর নিউ টাউনে ভাড়া থাকতেন। এপ্রিলে তিনি ধানঘাটা হয়ে মহিরনের সদরুদ্দীন পীর সাহেবের বাড়িতে যান। এরপর সেখান থেকে পীরের শিষ্য দোহাখোলা রওশন আলী মাওলানা সাঈদীকে তার বাড়িতে নিয়ে রাখেন সপরিবারে। আসামিপক্ষের দাবি পিরোজপুরে সংঘটিত অপরাধের সাথে পাকিস্তান আর্মি, রাজাকার এবং শান্তি কমিটির সদস্যরা জড়িত ছিল, মাওলানা সাঈদী নন। বিচারপতি ওয়াহ্হাব মিঞা তার রায়ে এ তথ্য তুলে ধরে বলেন, আসামিপক্ষ তাদের দাবি প্রমাণে সক্ষম হয়েছে।

মোদি থেকেও বড় সরকারি বাংলোয় থাকেন সোনিয়া

ভারতেন প্রধানমন্ত্রীর থেকেও বড় বাড়িতে থাকেন সোনিয়া গান্ধি। তার বাসভবন ১০ জনপথ রোড প্রধানমন্ত্রীর সরকারি আবাস ৭ রেসকোর্সের থেকেও আয়তনে বড়। সম্প্রতি তথ্য জানার অধিকার আইনে এই কথা সামনে এসেছে। দেশের রাজনীতিকদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারি বাসভবন যে তিন জনের, তার মধ্যেই পড়ছেন কংগ্রেস সভানেত্রী। একমাত্র রাষ্ট্রপতি ও উপ-রাষ্ট্রপতির সরকারি আবাস সোনিয়া গান্ধির বাসভবনের থেকে বড়। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধির বাসভবন ১০ জনপথ ১৫,১৮১ বর্গ মিটার এলাকা জুড়ে নির্মিত। প্রধানমন্ত্রীর ৭ রেসকোর্স রোডের আয়তন ১৪,১০১ বর্গ মিটার। গোটা বিশ্বের নিরিখেই রাষ্ট্রনেতাদের বৃহত্তম সরকারি আবাসগুলির মধ্যে পড়ে ৩২০ একর জায়গা জুড়ে নির্মিত ভারতের রাষ্ট্রপতি। উপ-রাষ্ট্রপতির সরকারি আবাস ৬ মৌলানা আজাদ রোডের আয়তন ২৬,৩৩৩,৪৯ বর্গ মিটার। তবে রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সঙ্গে সোনিয়ার ১০ জনপথের পার্থক্য রয়েছে। রাষ্ট্রপতি, উপ-রাষ্ট্রপতি ও প্রধামন্ত্রীর সরকারি বাসভবন নির্দিষ্ট পদের জন্য চিহ্নিত। সেখানে সোনিয়া গান্ধির বাড়ি সরকারের তরফে তাকে বিশেষ ভাবে দেওয়া হয়েছে। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট সাংসদ থাকুন, বা না থাকুন ১০ জনপথের আবাসটি তার জন্যই নির্দিষ্ট। দেবাশিষ ভট্টাচার্য নামে এক ব্যক্তি সম্প্রতি তথ্য জানার অধিকার আইনে আবেদন করে এ বিষয়ে জানতে চান। ১২ তুঘলক লেনের রাহুল গান্ধির সরকারি বাসভবনের আয়তন ৫,০২২.৫৮ বর্গ মিটার। প্রিয়াঙ্কা গান্ধি ভডরা লুইটেন দিল্লির ৩৫ লোধি এস্টেটের বাসভবনের আয়তন ২,৭৬৫ বর্গ মিটার। তবে প্রিয়াঙ্কা গান্ধির সম্পত্তি ও জমি কেনা-বেচা নিয়ে আরটিআই আবেদনে কোনো তথ্য প্রকাশে রাজি হয়নি হিমাচল প্রদেশ সরকার। স্পেশাল প্রোটেকশন গার্ডের সুরক্ষা পান প্রিয়াঙ্কা। তার সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ্যে আনলে নারাপত্তাজনিত সমস্যা হতে পারে বলে জানিয়েছে হিমাচল সরকার। প্রিয়াঙ্কা নিজেও তার সম্পত্তির বিষয়ে তথ্য প্রকাশের বিরোধিতা করেছেন। - সংবাদমাধ্যম

জঙ্গি দমনে সামর্থ্য বৃদ্ধি

জঙ্গি দমনে সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তি দেখিয়ে দেশে আরও একটি বিশেষ বাহিনী গঠনের আগে মুক্ত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সাতপাঁচ ভেবে নেওয়াই উত্তম। প্রস্তাবিত ‘কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম’ গঠনের আগেই তার আইনি কাঠামো ও জবাবদিহির ব্যবস্থা কী থাকবে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে সেসব বিষয় স্পষ্ট করা। এ রকম একটি সংস্থার যদি এতই দরকার থাকবে, তাহলে প্রায় ছয় বছর আগেকার প্রস্তাবিত পুলিশ ব্যুরো অব কাউন্টার টেররিজম (পিবিসিটি) ঝুলিয়ে রাখা সমীচীন হয়নি। এটা যুক্তির কথা যে যাঁরা জঙ্গি দমনের কাজে নিয়োজিত, তাঁদের পুলিশের সাধারণ সার্ভিস থেকে আলাদা করা দরকার। বিদেশ থেকে জঙ্গি দমনের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়ে আসার পরে যেনতেন পদে বদলি কাঙ্ক্ষিত নয়। এটাও সত্য যে সাধারণ অপরাধ দমনে যে ধরনের লোকবল, প্রস্তুতি ও সরঞ্জাম দরকার, তার থেকে জঙ্গি দমন বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় নিজেদের সামর্থ্য বাড়ানোর প্রকৃতি ও ধরন ভিন্ন। প্রধানত এ রকম যুক্তির জাল বিস্তার করেই এলিট ফোর্স হিসেবে র্যাব গঠন করা হয়েছিল, 
এবং জঙ্গি গ্রেপ্তারে অতীতে তারা উল্লেখযোগ্য সাফল্যও অর্জন করেছে। আবার সাম্প্রতিক কালে জঙ্গিবাদ যে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল, তা প্রমাণ করল যে বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করাই শেষ কথা নয়। কেউ যুক্তি দিতে পারেন যে পুলিশ ও ডিবিতে যাঁরা বিশেষজ্ঞ জ্ঞান অর্জন করেছেন বা করবেন, তাঁদের র্যাবে একীভূত করে নিলে যত্রতত্র বদলির সম্ভাবনা থাকে না। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য পুলিশের এমন সংস্থা আছে বলে আমাদেরও থাকতে হবে, সেটা দুর্বল যুক্তি। সমালোচকদের অনেকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে পুলিশ যখন কোনো বিষয় মোকাবিলায় ব্যর্থতার পরিচয় দেয়, তখন তারা এ ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যহীনতার বিষয় সামনে এনে থাকে। তবে নীতিগতভাবে আমরা একমত যে ছোট পরিসরে পুলিশের নিজস্ব একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকা স্বাভাবিক, যারা জঙ্গি নিয়েই লেগে থাকবে, প্রতিনিয়ত নজরদারি ও গবেষণা করবে।

সুড়ঙ্গ শেষে আলোর রেখা

বাংলাদেশে শিক্ষার ক্রমাবনতি নাকি ক্রমোন্নতি হচ্ছে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। অনেকে মনে করেন, অবনতি হয়েছে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে, অতীতের তুলনায় বর্তমান বা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে এই ২০১৫ সালে বাংলাদেশের শিক্ষা অগ্রসর হয়েছে। বলা যাবে না যে অন্ধকার দূর হয়েছে, তবে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্তের আলো এখন আগের চেয়ে উজ্জ্বল। এ আলোচনা আমরা মূলত চার ভাগে করার চেষ্টা করব। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংগঠন ইউনেসকোর মতে, যে বিষয়গুলো আলোচনা করলে একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা বোঝা যায়, সেই তিনটির (শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক এবং শিক্ষক) সঙ্গে ‘শিক্ষা প্রশাসন’ জুড়ে দিয়ে ২০১৫ সালের শেষে এসে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কোথায় এসে দাঁড়াল, তা খতিয়ে দেখার চেষ্টা করব। প্রথমে শিক্ষা প্রশাসন। সারা দেশে বিনামূল্যে বই বিতরণের বিশাল কর্মযজ্ঞ ছাড়াও এবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অন্তত চারটি উল্লেখযোগ্য অর্জন আছে। এক. শিক্ষাবিদদের পরামর্শে, শিক্ষা বোর্ডগুলো ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ। দুই. আইটি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একাদশ শ্রেণিতে অনলাইনে ভর্তি প্রক্রিয়া চালু। তিন. শিক্ষক নিয়োগে নতুন নিয়ম প্রবর্তনের উদ্যোগ। চার. চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এইচএসসি ও এসএসসি পরীক্ষা নেওয়া এবং সঠিক সময়ে ফল প্রকাশ করা।
২০১৪ সালে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীরা এতই বেপরোয়া ছিলেন যে মনে হচ্ছিল তাঁরা অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু আমাদের প্রশাসন দেখিয়ে দিয়েছে যে দুষ্কৃতকারীরা যতই শক্তিশালী হোক, কৌশল, দক্ষতা ও ঐকান্তিকতার কাছে তারা হার মানতে বাধ্য। এ বছর এইচএসসি, এসএসসি, জেএসসি ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর কোনো পরীক্ষাতেই প্রশ্ন ফাঁস হয়নি। তবে মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি কলঙ্ক তিলক, তাতে সন্দেহ নেই। ভর্তি-নৈরাজ্য রোধে এবার একাদশ শ্রেণিতে অনলাইনে ভর্তির প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। যদিও স্বল্প সময়, অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও কারিগরি দক্ষতার অভাবে ১১ লাখ ৫৬ হাজার ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের অনেকে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন, এই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। মানসম্পন্ন শিক্ষক পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা ছিল শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও একচ্ছত্র ক্ষমতা। সম্প্রতি এই ক্ষমতাকে খর্ব করে নিয়োগের একটি নতুন নিয়ম করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদেরা একে স্বাগত জানিয়েছেন। এ বছর শিক্ষা প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তারা প্রয়োজনে সময়সূচি পরিবর্তন করে, ছুটির দিনে কাজ করে হলেও পরীক্ষা নিয়েছেন এবং সময়মতো ফল প্রকাশ করেছেন। কিন্তু শিক্ষকদের জন্য ২০১৫ সাল খুব ভালো নয়—ভালো-মন্দে মেশানো। ভালো এই অর্থে যে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। আর খারাপ এ কারণে যে সরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা মনে করছেন অষ্টম পে-স্কেলে তাঁদের মর্যাদাহানি হয়েছে। বর্ধিত বেতনে তাঁদের ক্ষোভ প্রশমিত হচ্ছে না। তাঁরা এখনো আন্দোলনে আছেন। এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা আন্দোলন করছেন অবসর ও কল্যাণ ভাতা পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করার জন্য। এর বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় আট হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক লাখের মতো শিক্ষক- কর্মচারী এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য আন্দোলন করছেন। ইউনেসকোর মতে, মানসম্পন্ন শিক্ষার অন্যতম শর্ত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। লেখাপড়ার জন্য ছেলেমেয়েদের একটি কক্ষে ঢুকিয়ে দিলেই হবে না, কক্ষটিকে হতে হবে সত্যিকারের শ্রেণিকক্ষ।
আগের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে কক্ষকে শ্রেণিকক্ষে রূপান্তরের প্রক্রিয়া প্রশংসাযোগ্য। যেমন ২০১১ সালে যেখানে বাংলাদেশের কোনো মাধ্যমিক স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ছিল না, সেখানে ২০১৫ সালে ৮০ শতাংশ স্কুল মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করছে এবং সমসংখ্যক স্কুল বিদ্যুতের সংযোগ পেয়েছে। ১০ শতাংশ স্কুল পেয়েছে সৌরবিদ্যুৎ, ৮৫ দশমিক ০৫ শতাংশ স্কুল কম্পিউটার ব্যবহার করার সুবিধা এবং ৩৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ স্কুল ইন্টারনেটের সংযোগ পেয়েছে। ৯১ শতাংশ স্কুলে নিরাপদ পানীয় জলের এবং ৯৯ শতাংশ স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা হয়েছে। যদিও শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত এখনো একটু বেশি, তবু শিক্ষার পরিবেশের ক্রমোন্নতি লক্ষণীয়। ২০১৫ সালে আরও কিছু বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। যেমন, প্রায় সব স্কুলে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা চালু, প্রায় সব ছেলেমেয়েকে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করা (৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ) এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যায় সমতা আনা। এখন ছাত্রের তুলনায় ছাত্রীসংখ্যা বরং বেশি। প্রাথমিক পর্যায়ে এখন ছাত্রীর সংখ্যা ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ, মাধ্যমিক পর্যায়ে ৫৩ দশমিক ২২ শতাংশ। কয়েক বছর ধরে শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তককে বাস্তবসম্মত ও বোধগম্য করার চেষ্টা চলছে। চেষ্টা করা হয়েছে শিক্ষার্থীকে সাম্য, মৈত্রী, সহনশীলতা, মানবাধিকার, লিঙ্গসমতা, সবুজ অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজ, স্বাস্থ্য, নৈতিক শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন ও সক্রিয় করে তোলার। ২০১৫ সালেও এই ধারাতেই ২৯টি প্রান্তিক যোগ্যতা নির্ধারণ করে সেই ভিত্তিতে প্রাথমিক স্তরের ২৪টি পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে। আগে শুরু হওয়া মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের ৭৪টি বই ২০১৫ সালে শেষ হয়েছে। শুধু নতুন বই নয়, ইংরেজি ভার্সনের পুরোনো বইগুলোও এখন পরিমার্জিত হচ্ছে। এ ছাড়া যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য তৈরি হচ্ছে ১৬টি ইন্টারেকটিভ ডিজিটাল টেক্সট। ২০১৫ সালে প্রকাশিত অন্তত দুটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণাপত্রে বাংলাদেশে উচ্চ ও প্রাথমিক শিক্ষার শুধু প্রসার নয়, মানেরও ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। একটি ইউনেসকো, অপরটি গণসাক্ষরতা অভিযান। ইউনেসকোর বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার খুব সফল দেশগুলোর একটি। মানও উন্নত হয়েছে। অপ্রতুল বরাদ্দ সত্ত্বেও আগের চেয়ে বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। শুধু তা–ই নয়, তাদের প্রয়োগও বাড়ছে—বিশেষ করে কৃষিতে। কৃষিতে ২০০ ফলিত গবেষণায় অর্থায়ন করা হচ্ছে, বৃত্তি পাচ্ছেন ১০৮ জন নারী ও পুরুষ বিজ্ঞানী। কৃষি গবেষণার সুফল এখন বেশ দৃশ্যমান। গণসাক্ষরতা অভিযান তার গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, প্রাথমিক শিক্ষায় ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে এবং এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৯ সালের মধ্যে সব শিশুকে স্কুলে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। গণিত, বিজ্ঞান, ইংরেজি,
বাংলা, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়—এই প্রত্যেকটি বিষয়ে ছাত্রছাত্রীরা আগের চেয়ে ভালো করেছে। তবে গবেষণাপত্রটির পরামর্শ হচ্ছে, ৫০ শতাংশ শিক্ষক বাড়িয়ে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত আরও কমিয়ে ১: ৩০-এ নামিয়ে আনা এবং এখনো যে ৩০ লাখ শিশু স্কুলের বাইরে রয়ে গেছে, তাদের দ্রুত স্কুলে নিয়ে আসা। সন্দেহ নেই, উপর্যুক্ত বিষয়গুলোর বেশির ভাগই আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে দিকনির্দেশ করে। এ জন্য আমাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। জাতিসংঘ এমডিজি লক্ষ্যপূরণে সফল হওয়ার জন্য আমাদের প্রশংসা করেছে, শিক্ষামন্ত্রী পেয়েছেন ইউনেসকোর সহসভাপতির পদ। কিন্তু সুড়ঙ্গ শেষের আলো উজ্জ্বলতর হওয়ায় নিকষ অন্ধকার ফিকে হয়ে এলেও আঁধার এখনো আছে। যেমন, ২০১৫ সালে সরকার প্রচুর শিক্ষক-প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলেও চমৎকার সৃজনশীল পদ্ধতির ক্লাস নেওয়া বা প্রশ্ন করার মতো পর্যাপ্ত শিক্ষক খুঁজে পাওয়া যায় না। অন্যদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে শিক্ষামন্ত্রী কঠোর হলেও অনিয়ম দূর হয়নি। যাই হোক, এখন যেভাবে চলছে, তাতে অনেক বিষয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি এবং এগিয়ে যাব। কিন্তু কিছু বিষয় আছে, যেমন ‘মানসম্পন্ন শিক্ষক’, যা বর্তমান ধারায় এগোলে আমরা কখনোই পাব না। আমরা তো জানি ‘মানসম্পন্ন শিক্ষক’ না থাকলে ‘মানসম্পন্ন শিক্ষা’ আশা করা বৃথা। আর এর জন্য চাই আরও বেশি বিনিয়োগ, যেমনটি বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাজেটের ২০ শতাংশ বা জিডিপির ৬ শতাংশ। কিন্তু আমাদের দেশে হচ্ছে উল্টোটা। অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনায় শিক্ষা-বিনিয়োগ ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল বাজেটের ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ, সেখান থেকে পরের বছর কমে হলো ১৩ দশমিক ৬১ শতাংশ, তারপর ক্রমান্বয়ে ১৩ দশমিক ১৩ শতাংশ, ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ, ১১ দশমিক ৫৮ শতাংশ, ১১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং সর্বশেষ এ বছর তা কমে দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৭ শতাংশে। আমাদের মতো দেশে শিক্ষা-বিনিয়োগ যে সবচেয়ে লাভজনক, সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা তা নিশ্চয়ই জানেন। সচেতন নাগরিক মাত্রই আশা করেন ২০১৬ সালের বাজেটে শিক্ষা আশানুরূপ বরাদ্দ পাবে। ‘শিক্ষা পরিবারের’ সদস্যরা তার যথাযথ ব্যবহার করবেন এবং এমন একদিন আসবে, যখন আমরা বাইরে বেরিয়ে এসে সরাসরি সূর্যালোকে উদ্ভাসিত হব, সুড়ঙ্গ শেষের আলোর জন্য আর হাপিত্যেশ করতে হবে না।
গোলাম ফারুক: ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ, গবেষক, অধ্যাপক।
faruk.golam@yahoo.com

বাঙালির আত্মপরিচয়!

প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা জুলিয়াস সিজারের একটি উক্তি ইতিহাসখ্যাত, ‘আমি এলাম, আমি দেখলাম, আমি জয় করলাম’ (Veni, Vidi, Vici); তিনি কথাটা বলেছিলেন এশিয়ায় একটি যুদ্ধজয়ের পর। আর ইংরেজ কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার জুলিয়াস সিজার শীর্ষক বিয়োগান্ত নাটকে একটি কালোত্তীর্ণ উক্তি বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছে —ব্রুটাস, তুমিও! (Thou too, Brutus)। জ্যোতিষীর ভবিষ্যদ্বাণী উপেক্ষা করে সিজার খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ সালের ১৫ মার্চ যখন সিনেট অধিবেশনে উপস্থিত হলেন, তখন সিনেটররা একে একে তাঁকে ছুরিকাঘাত করতে লাগলেন; সবশেষে তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধু ব্রুটাসকে ছুরিকাহস্তে এগিয়ে আসতে দেখে জুলিয়াস আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে উঠেছিলেন, ‘ব্রুটাস, তুমিও!’ সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়ছিলাম। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো আমরা মুসলমান আর একটা হলো আমরা বাঙালি। পরশ্রীকাতরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষাতেই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, পরশ্রীকাতরতা। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে পরশ্রীকাতর বলে। ঈর্ষা, দ্বেষ সব ভাষাতেই পাবেন, সব জাতির মধ্যেই কিছু কিছু আছে, কিন্তু বাঙালিদের মধ্যে আছে পরশ্রীকাতরতা। ভাই ভাইয়ের উন্নতি দেখলে খুশি হয় না। এই জন্যই বাঙালি জাতির সব রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।’ এই কথাগুলো পড়তে গিয়েই আমার মনে পড়ে গিয়েছিল শেক্সপিয়ারের জুলিয়াস সিজার নাটকে সিজারের শেষ বচনটি এবং বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল ‘বঙ্গবন্ধু, আপনিও!’ পরক্ষণেই ভাবলাম, বঙ্গবন্ধু তো যথার্থই বলেছেন, আর তা ছাড়া স্বাধীনতাসংগ্রামকালে নয় মাস পর পাকিস্তানের জেল থেকে বেরিয়ে এসে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু এটাও তো বলেছেন, ‘কবিগুরু, আপনি মিথ্যে প্রমাণিত হয়ে গেছেন।’
অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছিলেন, কবিগুরু যে লিখেছেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী/ রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করোনি’, এটা সত্যি নয়; তা নইলে বাঙালি এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে পারত না। তবে হ্যাঁ, ‘নদী-শিকস্ত ও নদী-পয়স্ত’ অঞ্চলের অধিবাসী বলেই বোধ করি বাঙালি চরিত্রে যুগপৎ এই বৈপরীত্য প্রায়ই পরিলক্ষিত হয়। এ কারণে কবিগুরু অন্যত্র বলেছেন, ‘আমরা (বাঙালিরা) আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না; ভূরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; ...পরের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিকস এবং নিজের বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য।’ কিন্তু এ কথাটা তিনি বলেছেন কোথায় দাঁড়িয়ে? দাঁড়িয়ে নয়, বসে লিখেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের প্রশ্বস্তি গাইতে গিয়ে; আর বিদ্যাসাগর ছিলেন একজন বাঙালিই। অধুনা নীরদ চৌধুরীর আত্মঘাতী বাঙালি শীর্ষক বইটিও পুনর্বার পড়ছিলাম। বইটির এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ‘বাঙালির বাঙালি বলিয়া যত দিনের ইতিহাস আছে তাহার সবটুকু জুড়িয়া ভালো বাঙালি শুধু আপনভোলা বাঙালির মধ্যেই দেখা দিয়াছে। বাকি যাহারা ধন, মান, ঐহিক ক্ষমতা বা প্রতিষ্ঠা চাহিয়াছে, তাহাদের বাসনা যখন শক্তির অল্পতা বা সমাজের ভয়ের দ্বারা সংযত থাকে নাই তখন তাহারা নামে চোর-ডাকাত না হইলেও চরিত্র ধর্মে তাহাই হইয়াছে।’ অবশ্য বাঙালিদের সম্পর্কে সবচেয়ে অপবাদসূচক কথাটি বলেছেন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ প্রশাসনের ইস্পাত-কাঠামোর স্থপতি লর্ড মেকলে, ‘বাঘের কাছে থাবা যা, মৌমাছির কাছে হুল যা, মহিষের কাছে শিং যা, মহিলাদের কাছে সৌন্দর্য যা, একজন বাঙালির কাছে প্রতারণাও তা।’ তাহলে কি বাঙালির কোনো গুণ নেই? ঈশ্বরগুপ্তর ভাষায়, ‘কোন গুণ নাই তার, কপালে আগুন?’ আছে, আছে; অবশ্যই আছে। এটা বিজয়ের মাস, বিজয়ের মাসে অবশ্যই বলতে হয়, মাত্র নয় মাস স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করে (প্রতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্রের সহযোগিতায়) দখলদার বাহিনী থেকে দেশকে মুক্ত করতে কেবল বাঙালিই পারে। আর সামনে আসছে ফেব্রুয়ারি, ভাষা আন্দোলনের মাস; মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করতেও কেবল বাঙালিরাই পারে। তা ছাড়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মতো পণ্ডিত, রবীন্দ্রনাথ,
নজরুল ও জীবনানন্দ দাশের মতো কবি, নেতাজি, শেরেবাংলা ও বঙ্গবন্ধুর মতো দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, হাজী মুহম্মদ মুহসীন ও আর পি সাহার মতো দানবীর—এঁরা এবং আরও অনেক বাঙালিকে নিয়ে আমরা গর্ব করে থাকি। বাঙালির রসবোধও অত্যন্ত প্রখর। পাশ্চাত্যে ওরা হাসে ভরাপেটে, যে কারণে ওদের ‘আফটার-ডিনার স্পিচ’গুলো থাকে হাস্যরসে ভরপুর। বাঙালি হাসে খালি পেটেও, যে কারণে বলা হয় যে বাঙালি মরলেও নাকি তার দাঁত বের করা হাসি ফুরোয় না। সর্বোপরি বাঙালি অন্যের লেগ-পুলিংয়ে ওস্তাদ—সে ঢাকার আদিবাসীদের বলে ‘কুট্টি’, বিহারের লোকদের বলে ‘খোট্টা’, পশ্চিমবঙ্গের লোকদের বলে ‘ঘটি’, আসামের লোকদের ‘আসামি’ আর একপর্যায়ে গান্ধীজিকে পছন্দ করত না বলে নাকি একটি পোকার নাম দিয়েছে ‘গান্ধী পোকা’। চাকরির ইন্টারভিউকালে ‘আপনি কাঁপছেন কেন’ প্রশ্নের উত্তরে সে যে বলেছে ‘এইডা কী কাঁপন দেখছেন, স্যার, প্রশ্ন শুরু করেন, তারপর আসল কাঁপন দেখতে পাবেন’—এই গল্প পুরোনো ও বহুলকথিত। এ স্থলে হাল আমলের একটি উপাখ্যান উপস্থাপন করা যাক: এক বাঙালি গিয়েছে বাজারে তরকারি কিনতে। সে দেখে যে তরকারিওয়ালা সমানে তরকারিতে পানি ছিটাচ্ছে। পানি ছিটানোর উদ্দেশ্য কিন্তু শুধু তরকারিকে সতেজ দেখানোই নয়, ওজনেও ভারী করা। তো একপর্যায়ে তরকারিওয়ালা ‘ভাইজানের কী চাই’ বলতেই সে উত্তর দিল, ‘আপনার পটোলের হুঁশ ফিরলে পর আমাকে এক কেজি দিয়েন।’ বলা বাহুল্য, কেউ বেহুঁশ হয়ে গেলে হুঁশ ফেরানোর জন্য সাধারণত পানির ঝাপটা দেওয়া হয়ে থাকে। পরিশেষে বলি, আপন মাংস যেমন হরিণের বৈরী, তেমনি বাঙালিই বাঙালির প্রতিদ্বন্দ্বী। সে সাবানের মধ্যে যেটি নিকৃষ্টতম সেটির নাম দিয়েছে ‘বাংলা সাবান’, মদের মধ্যে যেটি নিকৃষ্টতম সেটির নাম দিয়েছে ‘বাংলা মদ’, অতএব দুর্মুখেরা বলাবলি করবেই, ‘এই নিরিখে জাতির মধ্যে সবচেয়ে মন্দ যে জাতি, সেটা হচ্ছে বাঙালি জাতি।’ দুর্মুখদের এটা বলার সুযোগ করে দেওয়া সঠিক হয়নি। যাহোক, জয় হোক বাঙালি জাতির সর্বত্র।
আতাউর রহমান: রম্যলেখক৷ ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক৷

মুসলমান এবং ইউরোপের প্রধান সমস্যা by রবার্ট স্কিডেলস্কি; অনুবাদ : মোহাম্মদ হাসান শরীফ

মুসলমানদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের (মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী) আহ্বান জানানোর প্রেক্ষাপটে দুই তরুণ বন্ধুর সাথে আমার কথোপকথনটি হয়েছিল এমন : আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এটা কি মুসলিম অভিবাসন এবং উদার নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষার মধ্যে বেছে নেয়া! তোমাদের মত কী?’ তাদের দু’জনই প্রশ্নটির প্রথম প্রস্তাবনা অস্বীকার করল। তাদের অভিমত ছিল, অভিবাসীদের নিজেদের হয়তো প্রতিক্রিয়াশীল নৈতিক মূল্যবোধ রয়েছে। কিন্তু বর্তমান ব্রিটেন, আমেরিকা বা কন্টিনেন্টাল ইউরোপে জন্ম নেয়া তাদের সন্তানেরা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এটা কি সত্য?
আমার প্রশ্নটি ইসলামি সন্ত্রাসবাদকে (ট্রাম্পের বিষোদগারের আপাতযুক্তি) লক্ষ্য করে ছিল না; বরং ছিল ব্যাপক মুসলিম অভিবাসনের কারণে নৈতিক বিধিমালায় হুমকি নিয়ে, যা ইউরোপের বেশির ভাগ শিক্ষিত লোকের মতো আমার এই দুই তরুণ বন্ধুও এখন বিনা প্রশ্নে গ্রহণ করে নিয়েছেন। ইসলাম যদি ব্রিটেনের আইন ও রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার করার মতো অবস্থায় আসে তবে তাতে, সন্ত্রাসবাদ বাদ দিলেও, কি তারা উদ্বিগ্ন হবে না?
এটা স্রেফ সম্ভাব্য সম্ভাবনা নয়। ২০১০ সালে ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৪৪.১ শতাংশ, তথা মোট জনসংখ্যার ৬ শতাংশ। ২০০১ সালের ১৬ লাখ মুসলমান থেকে বেড়ে ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যে মুসলমান দাঁড়ায় ২৭ লাখ (মোট জনসংখ্যার ৪.৮ শতাংশ)। সাম্প্রতিক অভিবাসনপ্রবণতা এবং আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মুসলমানদের সাধারণ গড়ের চেয়ে বেশি হারে জন্মদানের (ব্রিটেনে গড় হার ১.৮ হলেও মুসলিম পরিবারগুলোতে পরিবারে সন্তান থাকে তিনটি) বিষয়টি বিবেচনায় নিলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যায় মুসলিম অংশ ব্যাপকভাবে বাড়তে বাধ্য।
ইউরোপের বেশির ভাগ এলাকাতেই জনসংখ্যার এ চিত্রই দেখা যাচ্ছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, জনসংখ্যা নিখুঁত বিজ্ঞান নয়। বয়স, জীবনযাত্রার মান, বৈষম্য ইত্যাদি অনেক কিছুর ওপর এটা নির্ভর করে। তাই আগে হোক আর পরে হোক, মুসলমানদের জন্মহার জাতীয় গড়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণই হয়ে যাবে। তবে তত দিনে মুসলিমরা যুক্তরাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১০-২০ ভাগে উন্নীত হয়ে যাবে। এর পরিণাম কী হবে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
উদারমনাদের জাতিগত জনমিতি নিয়ে উদ্বেগ নেই। কারণ ব্যক্তিরা শেষ পর্যন্ত যে সমাজে তারা বাস করে, সেখানকার রীতিপ্রথা অনুসরণ করবে বলে তাদের অনুমান। আদর্শ যুক্তি অনুযায়ী, অসহনীয় যেকোনো পরিস্থিতিতে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হওয়া অভিবাসীরা স্বাগতিক দেশের সমৃদ্ধি সাধন করে। বিশেষভাবে তাদের রাজনৈতিক আচরণ সাধারণ মানুষের ধারাকেই অনুসরণ করে।
এটা যদি সত্য হয়, তবে জনসংখ্যার জাতিগত উপাদানে পরিবর্তনের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব হবে নিরপেক্ষ, এমনকি কল্যাণকরও হতে পারে। আলজেরিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা তুরস্ক থেকে আসা অভিবাসীরা এক বা দুই প্রজন্ম পর দৃষ্টিভঙ্গি ও রাজনীতিতে ইউরোপিয়ানে পরিণত হবে। তাদের ধর্ম তাদের কাছে বর্তমানের বেশির ভাগ ইউরোপিয়ানের মতো ব্যক্তিগত বিষয়ে পরিণত হবে এবং সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা স্থানীয়দের সাথে মিশে যাবে।
তবে ওই ঐতিহাসিক চিত্র, আমার দৃষ্টিতে, অনেকাংশেই নির্ভর করে অভিবাসী জনগোষ্ঠীর ছোট আকার এবং দেশের জনসংখ্যার সাথে তাদের সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতার ওপর। (এবং সে ক্ষেত্রেও একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়াটি স্বাভাবিকতা থেকে অনেক দূরে।) ইউরোপে যুদ্ধ-পরবর্তী অভিবাসন, বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব থেকে, বিপুলসংখ্যক এবং অনেক ব্যবধানযুক্ত সংস্কৃতির সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিণাম সম্পর্কে ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা সামান্যই নির্দেশনা দেয়।
সমস্যাটির মূল হলো সমসাময়িক ইউরোপিয়ান সভ্যতা হলো সেকুলার, আর মুসলিম সভ্যতা হলো ধর্মীয়। ইউরোপে আইন, বিধানিক, শিক্ষা, নৈতিকতা এবং ব্যবসায়িক জীবনের কাছে ধর্ম তার কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে। ইসলামি বিশ্ব এ ধরনের কোনো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়নি। ধর্ম ও রাষ্ট্রের মধ্যে কোনো পদ্ধতিগত বিভাজন হয়নি, ব্যক্তি নয়, পরিবার এখনো মৌলিক সামাজিক ইউনিট হিসেবে রয়ে গেছে। আধুনিক ইউরোপের রাজনৈতিক জীবনের মৌলিক উপাদানগুলোর (যেমন ব্যক্তি অধিকার ও কর্তব্য, সরকারের পরিচালনাগত জবাবদিহিতা) বিশেষ করে আরব মধ্যপ্রাচ্যে অভাব রয়েছে।সেকুলারকরণের প্রয়াস সত্ত্বেও মুসলিম ও পাশ্চাত্যের দৃষ্টিভঙ্গিগত, যদি থাকে, ব্যবধান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরো বেড়েছে, বেশির ভাগ মুসলিম দেশে ধর্ম আবার প্রাধান্যমূলক অবস্থানে উঠছে। চরম আকারে শরিয়াহ ধর্মীয় আইন (ব্যভিচার, সমকামিতা ইত্যাদি বিষয়ে পাশ্চাত্য আইন করে অবৈধ ঘোষণার পথ ছেড়ে দিলেও এসব দেশে সেগুলো মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ গণ্য হচ্ছে) তাদের আইনি বিধানকে প্রভাবান্বিত করছে। অধিকন্তু, অনেক দেশেই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান বলছে, শরিয়াহ হওয়া উচিত দেশের আইন।
ইউরোপে ইসলাম হলো দ্রুততম বর্ধিষ্ণু ধর্ম, এবং শরিয়াহ ইউরোপিয়ান আইনি ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। বিবাহবিচ্ছেদ এবং অন্যান্য পারিবারিক জটিলতা নিরসনে ব্রিটেনে ১০০ শরিয়াহ আদালত রয়েছে। এ কারণে শরিয়াহ আদালত ‘ব্রিটিশ মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা নির্ধারণ’ করার পর্যালোচনা করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেরেসা মে’কে প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে।
সেকুলারকরণ অনিবার্য নয়। রাজনৈতিক দার্শনিক ল্যারি সাইডেটপ বলেছেন, ‘সেকুলারকরণ হলো বিশ্বকে দেয়া খ্রিষ্টান ধর্মের উপহার।’ তার মতে, খ্রিষ্টান ধর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো উদার ব্যক্তিবাদের দিকে পরিচালিত করে এবং অন্য সব প্রধান ধর্মে সেগুলো অনুপস্থিত।
অন্য দিকে, সেকুলারবাদের মহান উপহার হলো সহিষ্ণুতা। বিশ শতকে ইউরোপে ভয়াবহ পশ্চাৎগামিতার পঙ্কিলতা থাকলেও সেকুলারবাদ গোঁড়ামিকে তীব্র হতে দেয় না। কারণ ধর্মীয় নির্দেশনার বিপরীতে সেকুলার যুক্তিবাদ কখনো শেষ হওয়ার নয়।
অর্থনীতিবিদেরা মনে করেন, অভিবাসন হলো অপেক্ষাকৃত ভালো জীবনের সন্ধানে ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা। তারা প্রবীণ জনসংখ্যাজনিত বিরূপতা হ্রাস করা কিংবা ‘নোংরা চাকরি’ করার শ্রমিক জোগানোর জন্য আরো অভিবাসনের আহ্বান জানান। কিন্তু ‘অর্থনৈতিক মানুষকে’ এভাবে ডেকে আনায় অভিবাসনের একটি প্রধান মাত্রাকে মিস করা হয় : রাজনৈতিক সীমান্ত পাড়ি দেয়ার সময় লোকজন তাদের সংস্কৃতিকেও সাথে নিয়ে আসে। আমরা ধরে নিতে পারি না যে, অর্থনৈতিক সাফল্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংস্কৃতিক একীভূত হওয়ার পথে চালিত করে।
এটাই আমাদের ট্রাম্পকে সমর্থনের দিকে নিয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে যা-ই ঘটুক না কেন, ইউরোপে মুসলিম অভিবাসন অব্যাহত থাকবে এবং আগামী কয়েক বছরে এমনকি বাড়বেও। এক সিরিয়া বিপর্যয়ই এটা নিশ্চিত করে ফেলবে। অভিবাসী ও স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর মধ্যকার ব্যবধান কমিয়ে আনার জন্য সংলাপ ও শিক্ষাসহ সব কিছুই করতে হবে। কিন্তু তবুও তা ধর্মীয় রাজনীতি এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির আনা সঙ্ঘাত সম্ভবত প্রতিরোধ করতে পারবে না। আমরা যদি অত্যন্ত গোলযোগপূর্ণ ভবিষ্যতের দিকে অচেতনভাবে চলতে থাকা এড়াতে চাই, তবে আমাদের অবশ্যই স্বীকার করতে হবে- সন্ত্রাসবাদ নয়, বরং ব্যর্থ একীভূতকরণ আমাদের সামনে থাকা প্রধান সমস্যা।
রবার্ট স্কিডেলস্কি : ওয়ারউইকশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল ইকোনমির প্রফেসর ইমেরিটাস এবং ইতিহাস ও অর্থনীতিবিষয়ক ব্রিটিশ অ্যাকাডেমির ফেলো, ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের সদস্য। তিনি তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন লেবার পার্টির সদস্য হিসেবে।

মোদির বিরুদ্ধে অসন্তোষ জমছে by জয়ন্ত ঘোষাল

২০১৫ বিদায় নিচ্ছে। নরেন্দ্র মোদি সরকারের এই একটি বছর কেমন কাটল? শাহি দিল্লির সমাচার হলো, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই সরকার সম্পর্কে মানুষের যতটা মোহভঙ্গ হয়েছে, ঠিক ততটা প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কিন্তু কেন এমন হলো? আমার মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী হয়ে নরেন্দ্র মোদি এই দেশের জন্য কোনো কাজ করতে চাননি, শুধুই বিদেশ ঘুরেছেন এবং ‘প্রমোদে ঢালিয়া দিনু মন’ বলে কাজকর্ম শিকেয় তুলেছেন, এমন অভিযোগ করাটা রাজনীতির বিশ্লেষণের অতি সরলীকরণ। কিন্তু এটাও সত্য, গোটা দেশ জুড়ে আপামর মানুষের অসন্তোষ ক্রমবর্ধমান। মনমোহন সিংহ সরকারের দশ বছরে যাঁরা তিতিবিরক্ত হয়ে নরেন্দ্র মোদিকে ক্ষমতায় এনেছেন, তারাই মাত্র দেড় বছরের মাথায় কেন অসন্তুষ্ট, সেটি বোঝার প্রয়োজনীয়তাটা প্রতিপক্ষের চেয়েও বেশি শাসক দলের। রাজনৈতিক বিশ্লেষণের একটি অসুবিধা হচ্ছে, আমি যদি বলি নরেন্দ্র মোদি কিছু ভাল কাজ করেছেন, তা হলে অনেকেই রে-রে করে উঠবেন। এবং বলবেন, আমি বিজেপির সমর্থক। আবার যদি বলি, নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা গত দেড় বছরে অনেক, তা হলেই সঙ্গে সঙ্গে আর এক পক্ষ রে-রে করে বলে উঠবেন, তার মানে আমি মোদি-বিরোধী তথা বিজেপি-বিরোধী। এর মাঝামাঝি একটা জায়গায় থেকেও তো একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ সম্ভব! প্রথমত, নরেন্দ্র মোদি কোনো কাজ করতে চান না বা ভারতের উন্নয়নের জন্য তার ভাবনা বা কর্মসূচি নেই, এ কথা যাঁরা বলেন আমি তাদের দলে নই। দ্বিতীয়ত, লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় বিজেপি নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখে এতটাই গগনচুম্বী প্রত্যাশা গড়ে তুলেছিল আমজনতার হতাশ মনে, তাতে সাধারণ মানুষের চাহিদাটাও ছিল চরম। এখনই কেন জিনিসপত্রের দাম কমে যাচ্ছে না? কেন গরিব মানুষ এখনও গরিব থাকছেন? কেন গঙ্গা দূষণমুক্ত হয়ে যাচ্ছে না? মানুষ ভাবতে শুরু করেছিলেন, নরেন্দ্র মোদি এক জন সুপার হিরো। অনেকটা জেমস বন্ড বা অরণ্যদেবের মতো। তিনি এসেই এই ঘুণ ধরা সমাজব্যবস্থার চালচিত্রটাই রাতারাতি আমূল বদলে দেবেন। আসলে একটা দেশ ও সমাজের সংস্কার যে সব সময় দীর্ঘমেয়াদি, সেটি সাধারণ মানুষ সবসময় বুঝতেও চান না। তা ছাড়া একটি অভিযোগ হলো, বিজেপিই তো প্রচারের সময় এই ‘হাইপ’ তৈরি করেছে। সুতরাং মোহভঙ্গের কারণ যদি সেটি হয়, তা হলে তার জন্যও দায়ী বিজেপি। সে দিন যদি প্রচারের মাধ্যমে সেটি মানুষকে বোঝাতে পারেন মোদি যে অচ্ছে দিন নিয়ে আসবেন, তা হলে দেড় বছরের মাথায় তারা ব্যর্থ হচ্ছেন কেন? আসলে সমস্যাটি রয়েছে একটি পারসেপশন বা ধারণার উপর। ভারতীয় রাজনীতিতে আজকার পারসেপশন একটি বড় শব্দ। নাবালক বিচার আইন সংসদে পাশ হয়ে যাওয়ার পরেও অধিকাংশ সাংসদ বলেছেন, আর একটু ধৈর্য ধরে বিলটিকে সিলেক্ট কমিটিতে পাঠিয়ে আলোচনা করলে বোধহয় ভাল হত। কিন্তু যখন ধর্ষিতার বাবা-মা সংসদের গ্যালারিতে উপবিষ্ট এবং গোটা দেশজুড়ে সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে একটি আবেগ উত্তাল হয়ে উঠেছে, তখন সংসদকেও সেই সার্বভৌম আবেগের কাছে নতিস্বীকার করতে হয়েছে। বিলটিকে তড়িঘড়ি পাশ করতে হয়েছে। এই ঘটনাটা দেখিয়ে দেয়, বাস্তবতার চেয়েও আজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কী ভাবে সেই রাজনৈতিক দলটি জনমানসের কাছে প্রতিভাত হচ্ছে। বারাণসীতে সংস্কার সাধনের জন্য স্টেশনের রূপান্তর পর্ব চলছে। রাস্তায় ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু তাতে সাময়িক সমস্যাটি আরও বেড়ে গিয়েছে। নির্মাণ কাজের জন্য ট্রাফিক বেড়েছে, জঞ্জাল বেড়েছে, ট্রেন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এখন আমাদের মতো জনবহুল দেশে সংস্কার সাধন করতে গেলেও তাতে স্বল্পমেয়াদি সমস্যা আরও বেড়ে যায়। তখন মনে হয়, যদি কোনো কাজই মানুষ না করে, সামাজিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখা হয় এবং প্রচারের ঢক্কানিনাদটা থাকলেই হয়, তাতে কিন্তু অনেক সময় মানুষের অসন্তোষ কম হয়। কালো টাকা বন্ধ করতে গিয়ে দিল্লিতে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই সমান্তরাল কালো টাকার অর্থনীতি যদি এখনও হই হই করে চলত, তাতে কিন্তু শেয়ার বাজার তেজি করা যেত বলে মনে করছে নির্মাণকারী সংস্থাগুলি। নরেন্দ্র মোদি সরকারের রথী-মহারথীরা বলছেন, কাজ অনেক হচ্ছে। ২০১৪ সাল প্রথম বছর। তাই সাময়িক সমস্যাগুলি অনেক বেশি বড় হয়ে উঠেছে। আস্তে আস্তে পরিস্থিতি বদলাবে এবং ২০১৬ থেকে এই ধ্যানধারণার পরিবর্তন হবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? কোথাও একটা সরকার এবং নাগরিক সমাজের মধ্যে যোগাযোগের ত্রুটি আছে। সে কথাও কিন্তু স্বীকার করতে হবে মোদি সরকারকে। তা না হলে যে নীতিপঙ্গুতার জন্য কংগ্রেস সরকারকে ক’দিন আগেও মানুষ গাল পেড়েছে, বিহারে নীতীশ লালুর জোটসঙ্গী হওয়ায় তাদের আসন বৃদ্ধি হয় কী করে? বিভিন্ন উপনির্বাচন, বিভিন্ন রাজ্যের গ্রামীণ পঞ্চায়েত নির্বাচন, এমনকী প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দত্তক নেওয়া গ্রামে বিপর্যয়, গুজরাতে গ্রামীণ ভোট হারানো- এ সবই কি অশনিসঙ্কেত নয়? সাধারণ মানুষের মনে একটি বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে, এই সরকার আর্থিক সংস্কার ও বৃদ্ধির পথেও হাঁটছে না। আবার এই সরকার গরিব মানুষেরও সরকার নয়। দু’দিক থেকেই বিপদে পড়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। ২০১৬ সালে নরেন্দ্র মোদি মানুষের এই অসন্তোষ দূর করতে সক্রিয় হবেন। আর বিরোধী পক্ষ এই অসন্তোষকে মূলধন করে এগোতে সক্রিয় হবে। এটাই দেখার, কে জেতে আর কে হারে! জয়ন্ত ঘোষাল: নয়া দিল্লি ব্যুরো চিফ, আনন্দবাজার পত্রিকা

‘সুন্দরী টোপে’ ভারতকে ফাঁদে ফেলছে পাকিস্তান

নিজেদের কর্মকৌশল পাল্টাচ্ছে পাক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। ভারতের তথ্য জোগাড় করতে তারা সুন্দরী মহিলাদের ‘টোপ’ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ দাবি করছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি এর আগেও এই পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হয়েছে। তবে সোমবার বিমান বাহিনীর এক অফিসারকে গ্রেফতারের পর জানা গেছে, ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপের মতো সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট এবং অ্যাপসে যৌন-প্রেমের ফাঁদ পেতে আইএসআই কব্জা করতে চাইছে গোপন তথ্য। বুধবার এ খবর নিশ্চিত করেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।
ভারতীয় বিমান বাহিনীর ওই অফিসারের নাম রঞ্জিত কে কে। তিনি প্রধান এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার (লিড এয়ারক্রাফট ম্যান) পদে কাজ করেন। অর্থাৎ তার তত্ত্বাবধানে এয়ারক্রাফট রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আইএসআইয়ের কাছে পাচার করার অভিযোগে সোমবার তাকে দিল্লিতে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল, তিনি টাকার লোভেই ওই তথ্য বিক্রি করেছেন। কিন্তু, তদন্তে নেমে গোয়েন্দারা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, মোবাইলের বেশ কিছু ভিডিও এবং অডিও ফাইল পরীক্ষা করে জানিয়েছেন ঘটনাটা ঠিক তেমন নয়, যেমনটা প্রথমে মনে করা হয়েছিল। গোয়েন্দা সূত্রে খবর, ওই অফিসার আসলে আইএসআইয়ের পাতা প্রেমের ফাঁদে পা দিয়ে বড়সড় চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। বছর তিনেক আগে ফেসবুকে এক তরুণীর কাছ থেকে বন্ধুত্বের রিকোয়েস্ট পেয়েছিলেন রঞ্জিত। ম্যাকনট দামিনি নামের ওই ব্রিটিশ সুন্দরীর সেই আবেদনে সাড়া দেন তিনি। এর পর বন্ধুত্বের গভীরতা বাড়তে থাকে। ভারতীয় গোয়েন্দাদের কাছে রঞ্জিত জানিয়েছেন, প্রতি দিন রাতেই কথা হতো। রাতের পর রাত জেগে ম্যাকের সঙ্গে রসালাপ করতেন। ধীরে ধীরে সম্পর্কের স্তর পাল্টাতে থাকে। ফেসবুক চ্যাট থেকে হোয়াটসঅ্যাপে নতুনভাবে আলাপচারিতা শুরু হয়। টেক্সট থেকে এ বার তারা অডিও এবং ভিডিও চ্যাট করা শুরু করেন। একান্ত গোপন ছবি,
সেল?ফির আদানপ্রদান শুরু হয়। এক দিন আসল প্রস্তাবটা পেড়ে ফলেন ম্যাক। ব্রিটিশ একটি ম্যাগাজিনে কাজ করা ম্যাক তার বন্ধুর কাছে ভারতীয় বিমানবাহিনী সম্পর্কে জানতে চায়। এই বিষয় নিয়ে সে লিখবে বলে জানায়। ম্যাককে ‘না’ বলায় এ বার যেন মিসাইল ছোড়া হয় তার দিকে। হুমকি দেয়া হয়, তথ্য না দিলে আগে পাঠানো ভিডিও, অডিও, টেক্সট সব ফাঁস করে দেয়া হবে। ঘাবড়ে যান রঞ্জিত। ম্যাক কি বলছে! কী করবেন ভেবে পান না ওই ইঞ্জিনিয়ার। ততক্ষণে তিনি বুঝতে পেরেছেন, তিনি আইএসআইয়ের পাতা হানিট্র্যাপের শিকার। রঞ্জিতের দাবি, তথ্য ফাঁস না করে তার আর কোনো উপায় ছিল না। গোয়েন্দাদের দাবি, বেলগাঁও থেকে তিন বার, ছয় বার চেন্নাই ও দিল্লি থেকে রঞ্জিত বিমানবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ফাঁস করেছেন। সেনা গোয়েন্দা এবং দিল্লি পুলিশ যৌথভাবে রঞ্জিতকে গ্রেফতার করে। এর পরেই তাকে বিমানবাহিনীর চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। দিল্লি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আপাতত ইলেকট্রনিক সারভেলিয়্যান্স পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। সেই কারণে রঞ্জিতকে ফের দিল্লি নিয়ে আসা হয়েছে। এই শহরেই ম্যাকের সঙ্গে তার বর্ষবরণের রাত কাটানোর পরিকল্পনা ছিল। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

ভারত ডিঙিয়ে চীন সফরে প্রস্তুত নেপালের প্রধানমন্ত্রী

উত্তরসূরিদের দেখানো পথে না হেঁটে এই প্রথমবারের মতো দেশের কূটনৈতিক শৃংখলায় রদবদল আনছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। ইন্দো-নেপাল সম্পর্ক প্রচলিত রীতি উপেক্ষা করে প্রথমবারের মতো চীন সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। বুধবার এমন ঘোষণা দিয়ে নেপালের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী কামাল থাপা বলেন, ২০১৬ নতুন বছরে চীন সফরে যাবেন শর্মা। খবর টাইমস অব ইন্ডিয়া ও পিটিআই। নেপালের নতুন প্রধানমন্ত্রীর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হল রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে প্রথমেই ভারত সফর করা। শর্মার চীন সফর বাস্তবায়িত হলে ইন্দো-নেপাল সম্পর্কের ওই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বদলে যাবে। এর আগে ২০০৮ সালে ভারতকে মাড়িয়ে চীনে প্রথম বিদেশ সফর করেন নেপালের সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কামাল দাহাল। সেখানে তিনি বেইজিং অলিম্পিক উপভোগ করেন।
সম্প্রতি ৫ দিনের চীন সফর থেকে ফিরে থাপা বলেন, মাধেশি সংকট ইস্যু নিয়ে শর্মার চীন সফরের সম্ভাব্য সময়সূচি চূড়ান্ত হয়েছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে আসছে বছরের ফেব্র“য়ারির মাঝামাঝি ও মার্চের শুরুর দিকে শর্মার এ সফর হতে পারে বলে জানান থাপা। ওই সফরে ট্যাক্স, পরিবহন, ও দীর্ঘমেয়াদি ফুয়েল বাণিজ্য বাস্তবায়নে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে বলে জানান তিনি। ইতিমধ্যে ১ হাজার কোটি ইউয়ান সমমূল্যের ১০৪ কোটি লিটার ফুয়েল সরবরাহে সম্মত হয়েছে চীন। এদিকে নেপালের নতুন সংবিধান প্রণয়নের জেরে ক্ষুব্ধ ভারত। ওই ক্ষুব্ধতায় নেপালের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ভারত। কেপি শর্মার চীন সফরকে তাই ভারতের প্রতি নেপালের ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

বন্ধুতার শুরু, নাকি স্রেফ চমক? by অ্যালেন ব্যারি ও সালমান মাসুদ

ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল শুক্রবার সকালে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ফোনের মধ্য দিয়ে। তিনি পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে ফোন করে বললেন, শুভ জন্মদিন।
আর তার চার ঘণ্টা পরে দেখা গেল, নরেন্দ্র মোদি এক আকস্মিক সফরে পাকিস্তানের লাহোর শহরে পদার্পণ করলেন। ব্যাপারটা এত স্বল্প সময়ে ঘটেছে যে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ইসলামাবাদ থেকে লাহোরে আসতেই পারেননি।
গত ১২ বছরে এটাই কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রথম পাকিস্তান সফর। ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্র। তাদের মধ্যকার উত্তেজনা মার্কিন নীতিপ্রণেতাদের মাথায় চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে বহুদিন আগেই। তাঁদের মনের ভয় হচ্ছে, দেশ দুটির মধ্যকার প্রক্সি যুদ্ধ যেকোনো সময়েই প্রকৃত যুদ্ধে পরিণত হতে পারে। ওদিকে মোদি আফগানিস্তানে ভারতের ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন, যার মধ্যে সামরিক সহায়তার ব্যাপারটিও আছে। এ কারণে আবার পাকিস্তানি নেতারা ক্ষুব্ধও হতে পারেন।
এই সফরের মধ্য দিয়ে মোদি এক বার্তা দিলেন, সেটা হলো তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে দ্ব্যর্থক অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটাতে পরিবর্তন এসেছে। অর্থাৎ এখন তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মিলনাত্মক অবস্থান নিয়েছেন, বিরোধাত্মক অবস্থান ত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহ ধরে মোদির প্রশাসন এই বার্তা দিয়ে যাচ্ছে। তারা সন্ত্রাসবাদ ও বাণিজ্য নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে আলোচনার জন্য রোডম্যাপ তৈরি করার কথা বলছে।
মোদি পাকিস্তানের ব্যাপারে মিশ্র বার্তা দিয়েছেন। তিনি গত বছর সবাইকে চমকে দিয়ে নিজের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে নওয়াজকে আমন্ত্রণ জানান, কিন্তু এর তিন মাস পর পাকিস্তানি কূটনীতিকের কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতার সঙ্গে বৈঠকের সূত্র ধরে তিনি দেশ দুটির উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা আচমকাই বাতিল করে দেন।
ভারতীয় এক সংবাদভিত্তিক ওয়েবসাইট দ্য ওয়্যারের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক সিদ্ধার্থ বারদারাজন বলেছেন, ‘মোদি একভাবে জানিয়ে দিলেন, ভবিষ্যতে তাঁর আর উল্টো মোড় নেওয়ার আশঙ্কা নেই। তিনি এবার নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ঢংয়ে কাজ শুরু করেছেন, ফলে সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া তাঁর জন্য আর সহজ হবে না।’
মোদির ওই দিনটা শুরু হয়েছিল আফগানিস্তানের নতুন সংসদ ভবন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে, যেটা বানাতে ভারত নয় কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে। এ ছাড়া তিনি আফগানিস্তানের কাছে তিনটি এমআই-২৫ হামলাকারী হেলিকপ্টার হস্তান্তর করেছেন, আর ‘আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর শহীদ পরিবারের সন্তানদের মধ্যে’ ৫০০ জনকে বৃত্তি দিয়েছেন। ফলে পাকিস্তান আফগানিস্তানে ভারতের উপস্থিতির ব্যাপারে শঙ্কিত হতেই পারে। মোদি সেখানে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের বারতা নিয়ে গিয়েছিলেন।
মোদির এই সফরের কথা বাইরের লোক প্রথম জানতে পারে তাঁর টুইটার–বার্তা থেকে। তিনি একরকম রীতি-বিবর্জিতভাবে টুইটার বার্তায় লেখেন, ‘আজ দুপুরে লাহোরে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সঙ্গে দেখা করার জন্য মুখিয়ে আছি, দিল্লি যাওয়ার পথে আমি লাহোরে নামব।’
এরপর মোদি লাহোরের উপকণ্ঠে নওয়াজের ব্যক্তিগত বাসভবনে যান, ওখানে তখন নওয়াজের নাতনির বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। সেখানে দুই নেতা প্রায় এক ঘণ্টা আলোচনা করেন, তঁাদের মধ্যে তখন বেশ হৃদ্যতা লক্ষ করা গেছে। তঁারা দেশ দুটির মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরু করার অঙ্গীকারও করেন। নয়াদিল্লি-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিক বলেছেন, মোদির এই আচমকা পাকিস্তান সফরের কারণ হচ্ছে পাকিস্তান নতুন একজনকে নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। মালিক আরও বলেন, মোদি হয়তো সংবাদপত্রে আরও ‘ইতিবাচক শিরোনাম’ হওয়ার সুযোগ নিয়েছেন।
মালিক বলেন, পশ্চিম ও সৌদি আরবের চাপের কারণে মোদি বুঝতে পেরেছেন, তাঁকে এমন ভাব দেখাতে হবে, যাতে মনে হয় তিনি আলোচনা শুরুর ব্যাপারে আগ্রহী। ওদিকে পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত টি সি এ রাঘবন ইসলামাবাদ ত্যাগের আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন এমন পর্যায়ে আছে, যেখান থেকে আরও বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটার সুযোগ আছে।
এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ নিজেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে আগ্রহী, তিনি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়াতে চান। কিন্তু পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক চক্র নওয়াজের আগ্রহের ব্যাপারে সন্দিহান। কারণ, তারা মনে করে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভারত মদদ দিচ্ছে। আর তারা কাশ্মীর-বিষয়ক দীর্ঘদিনের বিবাদও মিটিয়ে ফেলতে চায়।
পাকিস্তানের অধিকাংশ বিরোধী নেতাই মোদির এই আকস্মিক সফরকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা আশা করেছেন, এর ফলে দেশদুটির মধ্যকার সম্পর্ক বেশ দ্রুতই উন্নত হবে। আবার অনেকেই বলেছেন, পাকিস্তানের আরও সতর্ক হওয়া উচিত। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রেডরিখ এস পারদি স্কুল অব গ্লোবাল স্টাডিজের ডিন আদিল নাজাম বলেছেন, এই সফরকে অতিমূল্যায়ন করলে বিপদ হতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, এটা খুবই ভালো পদক্ষেপ, তবে ক্ষুদ্র পদক্ষেপ। আর মিছে আশায় বুক বাঁধলে মানুষকে হতাশ হতে হয়।’
এর আগে শেষবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অটল বিহারি বাজপেয়ি একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নিতে ২০০৪ সালে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন, সেবার তিনি তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। আবার ১৯৯৯ সালে বাজপেয়ি এক ঐতিহাসিক দ্বিপক্ষীয় সফরে পাকিস্তান গিয়েছিলেন, দুই দেশের মধ্যে বাস চলাচল শুরু হলে উদ্বোধনী বাসযাত্রায় তিনি পাকিস্তানে গিয়েছিলেন। তখন ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের এক নেতা এই সফরকে ‘অঘোষিত, অভূতপূর্ব ও অরাষ্ট্রনায়কোচিত’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
আর এবারও কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা আনন্দ শর্মা বলেছেন, ‘গত ৬৭ বছরে কোনো প্রধানমন্ত্রী এভাবে অন্য কোনো দেশে যাননি। তো মোদি কি পাকিস্তান-ভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ভেঙে দিতে পারবেন বা ২০০৮ সালের মুম্বাই হামলায় অংশগ্রহণকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবেন?’ তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী কী আশ্বাস নিয়ে আসছেন। এই প্রক্রিয়া কি পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা চক্র— আইএসআই ও পাকিস্তান সেনাবাহিনী অনুমোদন করেছে? পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, তারা কাশ্মীরে ভারতের বিরুদ্ধে লড়াইরত জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে মদদ দিচ্ছে।
ইসলামাবাদের এক টক শো উপস্থাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মঈন পীরজাদা বলেছেন, ‘পুতিনের সঙ্গে সাত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি এবং আফগান গোয়েন্দা সংস্থাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে মোদি পাকিস্তান সফর করে নিজের কঠোর ভাবমূর্তিকে একটু নরম করার চেষ্টা করলেন মাত্র।’ সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের অস্ত্র চুক্তি ও আফগানিস্তানে মোদির মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ কথা বলেছেন।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
অ্যালেন ব্যারি: মার্কিন সাংবাদিক।
সালমান মাসুদ: পাকিস্তানি সাংবাদিক।

গণতন্ত্রের অমসৃণ পথ by সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

গণতন্ত্র সম্পর্কে এত যে কথা বলা হয় তাতে ধারণা করা মোটেই অসংগত নয় যে গণতন্ত্র জিনিসটা কী সে বিষয়ে সবাই একমত। সেটা অবশ্য ঠিক নয়। গণতন্ত্র বলতে নানা মত আছে, কেউ ভাবেন গণতন্ত্র হচ্ছে নির্বাচিত সরকার, অন্য পক্ষ বলে মোটেই না, গণতন্ত্র অনেক বড় ব্যাপার। এ হচ্ছে একটা পরিপূর্ণ সংস্কৃতি। সংজ্ঞা নিয়ে মতবিরোধ যতই থাকুক, গণতন্ত্র যে পরিচিত শাসনব্যবস্থাগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম, এ নিয়ে তেমন একটা দ্বিমত নেই।
সর্বোত্তম কেন তা-ও আমরা জানি। কারণটা হচ্ছে এই যে গণতন্ত্র ব্যক্তিকে মর্যাদা দেয়। কেবল মর্যাদা দেয় না, ব্যক্তির অধিকার, তার স্বার্থ, বিকাশ এসবকে বিবেচনার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখে। অন্য শাসনব্যবস্থায় এমনটা ঘটে না। সেখানে একনায়কত্ব, স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ ইত্যাদি জিনিস নানা নামে কার্যকর থাকে। কয়েকজন শুধু স্বাধীনতা পায়, অন্য সবার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়, ক্ষমতা নাগরিকদের হাতে থাকে না, চলে যায় শাসকদের হাতে। ব্যক্তি ছোট ও কাবু হয়ে যায়।
ওদিকে আবার ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির সম্পর্ক নিয়েও সমস্যা আছে। যেখানে রাষ্ট্র থাকে, সেখানেই এই প্রশ্নটা থাকে। সমস্যাটা সমাজেও আছে এবং থাকে। আসলে সমাজ যেখানে রাষ্ট্রও তো সেখানেই। আর সমাজ আছে সবখানেই, মানুষ অরণ্য, দ্বীপ বা পাহাড়চূড়া, যেখানেই যাক না কেন সমাজের প্রয়োজনটা তার সঙ্গেই থাকে। সঙ্গ ছাড়ে না। সমাজ ছাড়া মানুষ বাঁচে না, সম্পর্কটা মাছ ও পানির মতো না হলেও কাছাকাছি বটে।
ব্যক্তির সঙ্গে সমষ্টির দ্বন্দ্বটাও খুবই স্বাভাবিক। আর এখানেই গণতন্ত্রের বিশেষ উপযোগিতা রয়েছে। গণতন্ত্র সবার স্বার্থ দেখতে চায় এবং ব্যক্তির স্বার্থকে মেলাতে চায় সমষ্টির স্বার্থের সঙ্গে। অর্থাৎ এমন একটা ব্যবস্থা চায় যেখানে ক্ষমতা বিশেষ কোনো কেন্দ্রে কুক্ষিগত থাকবে না, ছড়িয়ে থাকবে সমাজের সর্বত্র এবং রাষ্ট্র শাসন করবেন জনপ্রতিনিধিরা। এখানেই নির্বাচনের ব্যাপারটা আসে। জনপ্রতিনিধিরা নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে অনেকে ধারণা করেন যেখানে নির্বাচিত সরকার আছে, সেখানেই গণতন্ত্র রয়েছে।
কিন্তু সেটা যে সত্য নয় তা তো আমরা আমাদের দেশের নিজেদের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই জেনেছি। এখানে নির্বাচন হয় এবং সামরিক বাহিনীর সাহায্যে ক্ষমতা দখলও চলে। তবে জবরদখল স্থায়ী হয় না। নির্বাচন আসে এবং মনে করা হয় যে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরিণামে যা পাওয়া যায় তা মোটেই গণতন্ত্র নয়, সেটা হচ্ছে নির্বাচিত স্বৈরাচার। আর সাধারণ অভিজ্ঞতা এটাই যে স্বৈরাচার যদি নির্বাচিত হয় অর্থাৎ নিজেকে বৈধ করে নেয়, তবে তা অবৈধ স্বৈরাচারের চেয়েও ভয়ংকর হতে পারে। কেননা বৈধ স্বৈরাচার নিজেকে বৈধ মনে করে, তবে সে জনগণের রায় নিয়ে এসেছে, তাই যা ইচ্ছা তা করতে পারবে, যতটা সম্ভব আইন চালাবে, পাঁচ বছর পরে দেখা যাবে জনগণ তাদের কাজ পছন্দ করেছে কি করেনি। বলা বাহুল্য, এ রকম শাসনকে গণতন্ত্র বলে না। গণতন্ত্রের জন্য জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা আবশ্যক। কিন্তু তা-ও যথেষ্ট নয়, জবাবদিহি কার কাছে, স্বচ্ছতাই বা কতটা? আর ভোট? ভোটের তো কেনাবেচা চলে। আরও বড় সমস্যা যেটা সেটা হলো নাগরিকদের সামনে আসলেই কোনো পছন্দ থাকে না, তারা দুই দল থেকে একটিকে বেছে নেয়। যাদের উভয়েই হচ্ছে অত্যাচারী। জনগণ কার হাতে অত্যাচারিত হবে, এর নাকি ওর (ভোটের মধ্য দিয়ে এর বাইরে কোনো কিছুর মীমাংসা ঘটে না। এমন ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলার কোনো মানেই হয় না।)
গণতন্ত্রকে চিনতে হয় কয়েকটি উপাদান দিয়ে। উপাদানগুলো আমাদের খুবই পরিচিত; কিন্তু বারবার স্মরণ করা আবশ্যক। এদের মধ্যে প্রথম যেটি সেটি হলো অধিকার ও সুযোগের সাম্য। তারপর আসে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। এবং অবশ্যই দরকার হবে সব স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শাসন। এসবই পন্থা, উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তির স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও বিকাশকে নিশ্চিত করা। যথার্থ গণতন্ত্রের সঙ্গে তাই সমাজতন্ত্রের বিরোধ নেই; বলা যায় আসল পার্থক্যটা নামেরই, অন্য কিছুর নয়।
গণতন্ত্রে পৌঁছানোর পথটা যে মসৃণ নয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কেন যে মসৃণ নয় তা-ও বোঝা যায়। মূল কারণ কায়েমি স্বার্থ। যারা ক্ষমতা পেয়ে গেছে তারা সেটা জনগণের কাছে চলে যাক এটা কখনোই চায় না। চাওয়ার কথাও নয়, ক্ষমতা তাই শাসকশ্রেণির হাতেই থাকে, এক হাত থেকে অন্য হাতে যায়, কিন্তু বৃত্তের বাইরে যায় না। কায়েমি স্বার্থের বিশ্বব্যাপ্ত একটি রূপ রয়েছে, তার নাম পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ পুঁজির স্বার্থ দেখে, শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থকে পদদলিত করা ছাড়া তার স্বৈরাচার কায়েমি হতে পারে না।
পুঁজিবাদের তৎপরতার ভেতরে একটা বক্রাঘাত রয়েছে। ব্যক্তির জন্য স্বাতন্ত্র্যের বোধ তৈরিতে পুঁজিবাদের ভূমিকা আছে। ইহজাগতিকতার চেতনা, মানববাদিতা, মানুষের ভেতর বিশ্বজয়ের আকাঙ্ক্ষা এসব পুঁজিবাদের অবদান বইকি; কিন্তু সেই পুঁজিবাদই আবার মানুষকে বন্দী করে ফেলেছে তার নিজের শাসনে। যারা উৎপাদন করে তারা বঞ্চিত হয়। অথচ পুঁজি আসে শ্রমজীবী মানুষের তৈরি উদ্বৃত্ত মূল্য থেকেই।
গণতন্ত্রের কথা পুঁজিবাদ গলা ফাটিয়ে বলে। বলতেই থাকে, থামে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য এ দেশে ও দেশে গিয়ে সে হানা দেয়। মানুষ মারে। কিন্তু যার প্রতিষ্ঠা ঘটায় তা হলো পুঁজির স্বেচ্ছাচার। পুঁজিবাদীরা ঋণ দেয়। তাদের আছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ বিভিন্ন সংস্থা। পুঁজিবাদীদের অধীন এনজিওগুলোও ঋণ দিয়ে থাকে। বিশ্ব পুঁজিবাদ রাষ্ট্রকে আটকায় ঋণের জালে, ক্ষুদ্র ঋণদাতারা গরিব মানুষকে বেঁধে ফেলে বিভিন্ন ধরনের দড়িতে। মূল পুঁজিটা আসে কোথা থেকে? আসে লুণ্ঠন ও জবরদখল থেকে। যে উৎপাদনকারীদের কাছ থেকে টাকা আসে তাদেরই ঋণ দেওয়া হয়, নতুনভাবে শোষণের ইচ্ছায়। মাছের তেলে মাছ ভাজা হয়, ভক্ষণের স্বার্থে। এনজিওর আসল কাজ দারিদ্র্য বিমোচন নয়, আসল কাজ হচ্ছে একদিকে সেবক ও ক্রেতা সৃষ্টি করা, অন্যদিকে মানুষকে পুঁজিবাদী আদর্শে দীক্ষিত অবস্থায় রাখা।
আর আছে বাণিজ্য। মুনাফা লাভের যত বৈধ উপায় আছে তার মধ্যে বাণিজ্য হচ্ছে নিকৃষ্টতম। এ হচ্ছে ছদ্মবেশী লুণ্ঠন। ছদ্মবেশী বলেই বিশেষভাবে গর্হিত। পুঁজিবাদ বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য চালাচ্ছে, বলছে বাণিজ্য হবে উন্মুক্ত। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে যা দেখা যাচ্ছে তা হচ্ছে ধনী দেশের পণ্য গরিব দেশে বিক্রি করা। এর জন্য পুঁজিবাদীরা তাদের নিজেদের উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভর্তুকি দেয়, বৃহৎ পরিমাণ উৎপাদনের সুযোগ নিয়ে উৎপাদন ব্যয় কমায়, গরিব দেশের শ্রম ভাড়ায় খাটায় এবং বিজ্ঞাপনের বিশাল আয়োজন করে। পাশাপাশি গরিব দেশের পণ্য যাতে ধনী দেশে ঢুকতে না পারে, তার জন্য নানা রকম বিধি বন্দোবস্ত ও অজুহাত খাড়া করে রাখে।
পুঁজিবাদীরা অবাধে জ্বালানি পোড়ায়। পরিবেশ নষ্ট করে। যে সমুদ্র মানুষের বন্ধু হওয়ার কথা তাকে শত্রুতে পরিণত করে। সমুদ্রের পানি উঁচু হয়, সেখান থেকে ঝড় আসে, বন্যার পানি সহজে নামে না, অন্যদিকে ভূমিতে দেখা দেয় পানির অভাব। আর সমাজ পরিণত হয় জঙ্গলে, যেখানে নিপীড়ন, সংঘর্ষ, ধর্ষণ চলতে থাকে। সব মিলিয়ে মানুষের বিপদ ঘটে। তার মুক্তি আসে না। প্রকৃত অর্থে উন্নতিও ঘটে না। তার বিপদ বাড়ে। প্রকট হয় বিচ্ছিন্নতা ও ভোগবাদিতা। এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনাই গণতন্ত্রের লক্ষ্য। কিন্তু পুঁজিবাদ কিছুতেই চাইবে না গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। কেননা গণতন্ত্র এলে ক্ষমতা পুঁজির হাত থেকে চলে যাবে জনগণের হাতে।
কিন্তু তাকে ভান করতে হয় গণতন্ত্র কায়েম করার। লোকে যাতে মনে করে যে তারা ক্ষমতাহীন নয়, কেননা তারাই ঠিক করে দেয় রাষ্ট্রের কর্তা কারা হবে। তাই সে নির্বাচনের ব্যবস্থা করে বলে এটাই গণতন্ত্র। আসল অভিপ্রায়টা মনুষ্যত্ববিরোধী ব্যাপারটাকে বৈধতা দেওয়া এবং টিকিয়ে রাখা। ওদিকে কি শিল্প, কি গণমাধ্যম সবকিছুতেই প্রচার চলতে থাকে পুঁজিবাদী আত্মস্বার্থসর্বস্ব ও ভোগবাদিতার। মানুষের সঙ্গে মানুষের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, তাতে পুঁজিবাদের খুব সুবিধা, কারণ তাতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সম্ভাবনা হ্রাস পায়। এই ব্যবস্থায় গণমাধ্যম খুবই কার্যকর থাকে, সে মনে করে যে সে স্বাধীন; কিন্তু তার গলায় থাকে দড়ি, বিপথগামী হতে চাইলেই টান পড়ে গলায়, গণমাধ্যম তখন সামলে নেয়, পুঁজিবাদের সেবায় নিজেকে ব্যস্ত রাখে।
গণতন্ত্রের পথ তৈরি করার উপায় একটাই। সে হচ্ছে আন্দোলন। জনগণের আন্দোলন, মুক্তির লক্ষ্যে। সে আন্দোলনকে একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হতে হবে এবং তার সামনে থাকা চাই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইউরোপের কান্ডারি মেরকেল by তপতী বর্মন

জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। ছবি: এএফপি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপীয়রা ধরেই নিয়েছিল, ইউরোপ ও এর আশপাশের নিরাপত্তায় নেতৃত্ব দেবে যুক্তরাষ্ট্র। এখন সে ভাবনায় পরিবর্তন আসছে। এই পরিবর্তনে সহায়তা করছে জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব।
নানা প্রতিকূলতায় ইউরোপকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে এ বছর আলোচনায় ছিলেন অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। গ্রিসের ঋণ-সংকট, জঙ্গি সংগঠন আইএসবিরোধী অবস্থান, ইউক্রেনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ বন্ধ ও শরণার্থী সমস্যা মোকাবিলায় তাঁর নেতৃত্ব ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০১৫ সালে তিনিই শক্ত হাতে গোটা ইউরোপের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বছরের শেষ দিকে এসে পেয়েছেন তার স্বীকৃতিও, হয়েছেন টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব। আর ফোর্বস ম্যাগাজিনের জরিপে তিনি বিশ্বের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি (প্রথম স্থানে ভ্লাদিমির পুতিন)।
ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়া নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে গত বছর দেশটির যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে আগ্রাসনের দায়ে অভিযুক্ত করে। যদিও ১৭৮৩ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার অংশ থাকা ক্রিমিয়াকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট নিকিতা খ্রুশচভ ইউক্রেনের কাছে ছেড়ে দিয়েছিলেন ‘উপহার’ হিসেবে। ইউক্রেনের রুশপন্থী প্রেসিডেন্ট ইয়ানুকোভিচ ক্ষমতা ছেড়ে রাশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার কিছুদিন পরই ক্রিমিয়া দখলে নেন রুশ সেনারা। গণভোটে ক্রিমিয়াবাসী ইউক্রেন নয়, রাশিয়ার সঙ্গে থাকার পক্ষে রায় দেন। জয়ী হয় পুতিনের কৌশল। কিন্তু এ জয়কে মেনে নিতে পারেনি পশ্চিমা বিশ্ব। ফলে ইউক্রেন ইস্যুতে সংকট থেকেই যায়।
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মেরকেল ও পুতিনকে নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ। তখন ইউক্রেন নিয়ে একটি শান্তি প্রস্তাবের খসড়া তৈরি হয়। এটি নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা চলে। এখন অবশ্য পরিস্থিতি অনেকটাই শান্ত। বলা হয়ে থাকে, এ ব্যাপারে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা মেরকেলের। ইউক্রেনের সমর্থনে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে আর রাশিয়া আরেক দিকে অবস্থান নিয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকে সমঝোতায় আনতে যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা প্রয়োজন ছিল, মেরকেলই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তা করেছেন।
বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে উন্নত বিশ্বের প্রথম কোনো দেশ হিসেবে ঋণখেলাপি হয়ে যায় গ্রিস। দেশটি জুলাই মাসের নির্ধারিত সময়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৬০ কোটি ইউরো পরিশোধে ব্যর্থ হয়। শেষ সময়ে এসে গ্রিস সরকার আর্থিক পুনরুদ্ধারে (বেলআউট) নতুন চুক্তির অনুরোধ জানায়, যাতে দেশটি নতুন করে দুই বছরের জন্য প্রায় তিন হাজার কোটি ইউরো পেতে পারে। তবে ইউরোজোনের অর্থমন্ত্রীরা গ্রিসের প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন। এরপর গ্রিস ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। গণভোট ডাকেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলেক্সিস সিপ্রাস। গণভোটে দেশবাসী জানিয়ে দেন, তাঁরা ইইউতে থাকতে চান; তবে এ জন্য দাতাদের দেওয়া কোনো শর্ত মেনে নিতে চান না। এ সংকট কাটাতেও এগিয়ে আসেন মেরকেল। দফায় দফায় ইইউর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে ইইউ থেকে গ্রিসের বেরিয়ে যাওয়া ঠেকান তিনি।
সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট শরণার্থী-সংকটে আবার ত্রাতার ভূমিকায় হাজির হন মেরকেল। দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুদ্ধরত বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আর বাশারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া। এই দ্বন্দ্বে বাস্তুচ্যুত হয়ে লাখ লাখ মানুষকে শরণার্থীর জীবন বেছে নিতে হচ্ছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রতিদিন তুরস্ক-গ্রিস পার হয়ে ইউরোপের দেশগুলোতে ঠাঁই পাওয়ার অপেক্ষায় থাকে হাজার হাজার মানুষ। এভাবে শরণার্থী হিসেবে ইউরোপে যাওয়ার পথে সাগরে ডুবে মারা যায় শিশু আয়লান কুর্দি। সৈকতে পড়ে থাকা আয়লানের নিথর দেহ বিশ্ব বিবেকে নাড়া দেয় প্রচণ্ডভাবে। ইউরোপের অনেক দেশ শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়। আবার শরণার্থীদের ঠাঁই না দেওয়ার পক্ষেও অনেকে অবস্থান নেয়। মেরকেল এই মানবিক সংকটে তাঁর দেশে শরণার্থীদের স্বাগত জানান। পাশে দাঁড়ান বিপন্ন মানুষগুলোর, যারা যুদ্ধের কারণে সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব ও রিক্ত। সিরিয়া ইস্যুতে সবাই যখন কড়া অবস্থানে, তখন মেরকেল বলেন, সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের অবসানে যেকোনো শান্তি আলোচনায় দেশটির প্রেসিডেন্ট বাশারেরও অংশগ্রহণ করা উচিত। শুধু যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া নয়; আঞ্চলিক সহযোগী যেমন ইরান, সৌদি আরব সবাইকে এই আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বছরের শেষ দিকে নভেম্বরে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় শতাধিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনায় গোটা বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে পড়ে। আইএস এই হামলার দায় স্বীকার করলে ফ্রান্সের পাশে থাকার কথা জানায় ইইউভুক্ত দেশগুলো। পরম বন্ধুর মতো ফ্রান্সের পাশে এসে দাঁড়ান মেরকেল। ঘোষণা দেন, আইএস দমনে ফ্রান্সের পাশে থাকবে জার্মানি।
এ কারণেই হয়তো অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে বর্ষসেরা ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের সম্পাদক ন্যান্সি গিবস লিখেছেন, বেশির ভাগ রাজনীতিবিদ দেশের জন্য যে কাজগুলো করতে সাহস করেন না; তিনি তা করেছেন। জুলুমবাজ ও সুবিধাবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দৃঢ় নৈতিক নেতৃত্ব দেখিয়েছেন। এ গুণগুলো বর্তমান বিশ্বে বিরল। প্রতিটি গভীর সংকটে তিনি সাহসী ভূমিকা দেখিয়েছেন।
মেরকেলের এমন নেতৃত্ব গুণাবলির পেছনে তাঁর ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের কয়েকটি প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছিল টাইম ম্যাগাজিন। ভিন্ন মতাবলম্বী এক যাজকের সন্তান তিনি। জন্মের পর বাবা তাঁকে নিয়ে পশ্চিম জার্মানি থেকে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সোভিয়েতপন্থী পূর্ব জার্মানিতে চলে আসেন। সেখানেই বেড়ে ওঠেন তিনি। ইস্ট জার্মান একাডেমি অব সায়েন্সেসের তিনিই একমাত্র নারী বিজ্ঞানী, যিনি তত্ত্বীয় রসায়ন নিয়ে কাজ করেন। যদিও তাঁর পড়াশোনা ছিল পদার্থবিজ্ঞানে, আর পিএইচডি ডিগ্রিটা অর্জন করেছেন কোয়ান্টাম রসায়নে। এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী এই নারী ক্ষমতায় থাকার দশক পার করেছেন। ৬১ বছর বয়সী মেরকেল সমর্থকদের কাছে পরিচিত ‘মা’ হিসেবে।

রকিব কমিশনের রেকর্ড

কলঙ্কিত নির্বাচন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের জন্য নতুন কিছু নয়। তাদের মেরুদণ্ড নেই সে সমালোচনাও হয়েছে বারবার। এক নির্বাচন কমিশনার দাঁড়িয়ে থেকে একবার দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন তার মেরুদণ্ড রয়েছে। কিন্তু কমিশনের মেরুদণ্ড কি অবস্থায় রয়েছে তা আরও একবার দেখা গেলো গতকাল।
২৩৪টি পৌরসভার এ নির্বাচনের আগের রাতেও যথারীতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ ঘোষণা দিয়েছিলেন, নির্বাচন হবে অবাধ ও নিরপেক্ষ। ভোটারদের ভোটদানের জন্যও আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি। এরআগে মোবাইল বার্তা দিয়ে জনগণকে নির্বাচন কমিশন মনে করিয়ে দিয়েছিল- ‘ভোট আপনার অধিকার’। সে নিয়ে অবশ্য অনেকের মনেই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে হাস্য কৌতুক করে লিখেছিলেন- কি আশ্চর্য কথা। ভোট এ দেশে এখনও অধিকার। আর কাল নির্বাচনের আগে একজন একটি বিজ্ঞাপনের অনুকরণে লিখেন, ‘ভাতিজা, চাচাকে জিজ্ঞেস করে আমি যা দেখি তুমি কি তা দেখো। চাচা বলেন, তুমি কি দেখো? ভাতিজা বলেন, আমি দেখি একপক্ষ সমানে সিল মারছে, আরেক পক্ষ অভিযোগের পাহাড় গড়ছে। আচ্ছা আঙ্কেল তুমি কি দেখো? আমি তো দেখি অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট, সবাই আইন মেনে যতো খুশি ভোট দিচ্ছে।’ কৌতুক তো কৌতুকই। বাস্তবের অবস্থা কি? নিশ্চিতভাবেই নির্বাচন কমিশন গতকালের ভোটে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া তেমন কোন ত্রুটি পায়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের মনের অবস্থা কি তা অবশ্য বলা দুরূহ। এদিন তিনি আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি হননি।
অনেক পর্যবেক্ষক অবশ্য বলছেন, নির্বাচন কমিশন অসহায়। তাদের আসলে কিছু করারও ছিল না। একজন নির্বাচন কমিশনার সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চেয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশও করেছিলেন। সে নিয়ে তার সমালোচনা হলেও তিনি আসলে হয়তো সত্য কথাই বলেছেন। পুরো পৌরসভা নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে শোকজ করলেও সে শোকজে কোন কাজ হয়নি। পুরো নির্বাচনটিই একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই পরিচালনা করেছে। বিজিবি মোতায়েন করলেও পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন হয়নি। এইসব বাহিনীর ওপর নির্বাচন কমিশনের আসলে কতটুকু নিয়ন্ত্রণ ছিল সে প্রশ্ন রয়েই গেছে। ভোটের দিনে নির্বাচন কমিশনের নির্লিপ্ত ভূমিকার দিকেই সমালোচকরা বেশি দৃষ্টিপাত করছেন। ভোটের আগেই ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা ঘটেছে। কেন্দ্র দখল আর জাল ভোটের উৎসবের খবর মিডিয়ায় দিনভর প্রকাশিত হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকেও নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে কমিশন ভোটের দিনে এসব ক্ষেত্রে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি। তারা হয়তো, বসে বসে এসব দৃশ্য দেখেছে।
স্বাধীন নির্বাচন কমিশন নিয়ে বাংলাদেশে বহু আলোচনা হয়েছে। অনেক তাত্ত্বিকই বলে আসছিলেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করলেই অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন ছিল একতরফা। সে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কিছু করারও প্রয়োজন ছিল না। যদিও ইতিহাসের দায়ভার এড়ানোর সুযোগ কমিশনের নেই। এরপর দীর্ঘ ছুটিতে গিয়েছিলেন কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ। সে সময় তার বিবেকতাড়িত হওয়ার নানা গুঞ্জনও শোনা গিয়েছিল। পরে অবশ্য জানা যায়, তা সত্য নয়। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা কতদূর তা ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়ই অনেকটা খোলাসা হয়ে গিয়েছিল। যতটুকু বুঝার বাকি ছিল তা গতকাল বুঝা হয়ে গেছে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এখনও দূর আকাশের তারা।

নতুন কিসিমের ভোট @মানবজমিন

রূপসী মডেল হাইস্কুলে চলছে জালভোটের উৎসব -ছবি: শাহীন কাওসার
মানবজমিন থেকে কপি পেষ্টঃ গণতান্ত্রিক সিলসিলায় ভোট পবিত্র আমানত। পৌর নির্বাচনের আগে রকিব কমিশন মোবাইল বার্তায় মনে করিয়ে দিয়েছিল- ‘ভোট আপনার অধিকার’। সে অধিকার কোন পর্যায়ে রয়েছে ভোটাররা গতকাল তা আরও একবার নতুন করে অনুভব করেছেন। নতুন কিসিমের এই ভোটের চিত্র স্পষ্ট হয় যশোর সদর পৌরসভার কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট শেষ হওয়ার আগেই গণনা শুরুর দৃশ্য দেখে। বেলা ৩টার দিকে, যশোর সরকারি এমএম কলেজ কেন্দ্রে ভোট গণনা শুরু হয়। প্রিজাইডিং অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, যেহেতু নির্ধারিত সময়ের আগেই শতভাগ ভোট কাস্ট হয়ে গেছে এ কারণে ভোট গণনা শুরু হচ্ছে। পরে অবশ্য এ কেন্দ্রের ভোট বাতিল হয়।
সিল উৎসব শুরু হয়েছিল আগের রাতেই। সকালে প্রথম খবর আসে মাদারীপুরের কালকিনি থেকে। নৌকায় সিলমারা ১১ শ’ ব্যালট পাওয়া যায় সেখানে। বেশি অপেক্ষার প্রয়োজন হয় না। এরপরই খবর পাওয়া যায় কুমিল্লার বরুড়া থেকে। সেখানেও পাওয়া যায় সিলমারা ১২শ’ ব্যালট। অভিযোগ রয়েছে, অনেক কেন্দ্রেই রাতেই এমন সিলমারা হয়েছে। ভোট শুরু হয় সকাল ৮টায়। প্রথম ঘণ্টাতেই সারা দেশে ভোটের চিত্র স্পষ্ট হয়ে যায়। আগের রাতের তীব্র অভিযানে বিরোধী এজেন্টরা পালিয়ে যান অনেকে। বাদ বাকি যারা কেন্দ্র্রে যান তাদের বেশিরভাগই টিকতে পারেন নি। মানবজমিনের রিপোর্টাররা সারা দেশে এক হাজারেরও বেশি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন। এর বেশিরভাগ কেন্দ্রতেই ধানের শীষের এজেন্ট পাওয়া যায়নি। কম বেশি সংঘাত সহিংসতা ঘটেছে সব এলাকাতেই। সাতকানিয়ায় গুলিতে নিহত হয়েছেন এক জন। দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এ নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন দুই শতাধিক। কমপক্ষে ৩০ মেয়র প্রার্থী ভোট বর্জন করেছেন। নরসিংদীর মাধবদীতে ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়েছে। সারা দেশে বিভিন্ন এলাকায় গোলযোগের কারণে স্থগিত করা হয়েছে ৩৬ কেন্দ্রের ভোট। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ভোটের নামে প্রহসন হয়েছে। ২০০ পৌরসভায় কেন্দ্র দখল হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অতীতের যে কোন স্থানীয় নির্বাচনের তুলনায় এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।
আমাদের রিপোর্টারদের পাঠানো প্রতিবেদনে বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের রাত থেকেই বেশিরভাগ এলাকা সরকার সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সংখ্যাগরিষ্ঠ কেন্দ্রে যেমন বিএনপির এজেন্ট ছিল না। তেমনি কেন্দ্রের বাইরেও বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা ভিড় করতে পারেননি। আমাদের সিনিয়র রিপোর্টার কাফি কামাল বগুড়া থেকে জানাচ্ছেন, বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এলাকাতেও ভোট কেন্দ্রের বাইরে বিএনপির কর্মী সমর্থকরা ভিড় করতে পারেননি। তারা অনেকটাই নীরব ছিলেন। পুলিশি হয়রানির ভয়েই এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে বিএনপি প্রার্থীরা জানান। যেসব এলাকায় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে তার বেশিরভাগই হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের। এ ধরনের সবচেয়ে বড় সংঘর্ষটি হয়েছে বরগুনায়। সেখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থীই আহত হন এবং নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। কাউন্সিলর প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তবে অনেক এলাকাতে ভোট কারচুপি হয়েছে বাধাহীনভাবে। কেন্দ্র দখল করে প্রকাশ্যে সিলমারার দৃশ্য দেখা গেছে। এক্ষেত্রে মেয়র পদের প্রার্থীদের প্রতীকেই সিলমারার ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোথাও বাধা দিতে দেখা যায়নি। টিভি ক্যামেরায়ও ধরা পড়েছে অবাধে সিলমারার দৃশ্য। এমনকি কোথাও কোথাও খোদ পুলিশের বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে ব্যালটে সিল মারার। কোন কোন জায়গায় সিল মেরেছেন প্রিজাইডিং অফিসার। জালভোট ছিল মোটামুটি স্বাভাবিক দৃশ্য। এমনও একজন ভোটার পাওয়া গেছে, যিনি লাইনে দাঁড়ালেও নিজের বাবার নাম বলতে পারছিলেন না। তিনি বলেন, তার বাবার নাম কাগজে লেখা আছে। মানিকগঞ্জের একটি কেন্দ্রে ভোট শুরুর নির্ধারিত সময়ের আধা ঘণ্টা আগেই জাল ভোট দেয়া শুরু হয়। ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে বেশ কয়েকটি জায়গায়। মাঠে পড়ে থাকতে দেখা গেছে ব্যালট পেপার। নোয়াখালী থেকে আমাদের রিপোর্টার আহমেদ জামাল জানান, সেখানে তিনি দেখেছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পোলিং এজেন্টরা ভোটারদের নির্দেশ দিয়েছেন তারা যেন নৌকা প্রতীকে প্রকাশ্যেই ভোট দেন। চট্টগ্রামের কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে মহিউদ্দিন জুয়েল জানান, তিনিও প্রকাশ্যে সিল মারার দৃশ্য দেখেছেন। কোথাও ধানের শীষের কোন এজেন্ট পাননি। কয়েকটি কেন্দ্রে প্রবেশ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের কাছ থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের খবর তেমন কোন এলাকা থেকে আমরা পাইনি।
বাংলাদেশের কলঙ্কিত ভোটের ইতিহাস নতুন কিছু নয়। গতকালের নির্বাচন সে ইতিহাসে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করলো। যদিও এটি একটি নতুন কিসিমের গায়েবি ভোট।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়েছে :সিইসি
কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ। বুধবার রাতে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে ভোট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন তিনি। সিইসি বলেন, সারা দেশে আমরা পৌরসভার নির্বাচন সমাপ্ত করলাম। এ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন প্রথম থেকেই যথেষ্ট সতর্ক ছিল, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়। নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রার্থী ও সাংবাদিকদের সহায়তায় কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, সারা দেশে ২৩৪টি পৌরসভায় ৩ হাজার ৫৫৫টি কেন্দ্রের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ায় ৫০টি ভোটকেন্দ্রে ভোট স্থগিত করা হয়েছে এবং নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার ভোট স্থগিত করা হয়েছে। ২০০ পৌরসভায় অনিয়মের বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৬০টি কেন্দ্রে অনিয়মের কথা শুনেছি। বেশির ভাগ অভিযোগ বিএনপির কাছ থেকেই এসেছে। নির্বাচন কর্মকর্তার কাছ থেকেও শুনেছি। যাচাই বাছাই করে আমলে নিয়ে বেশ কিছু কেন্দ্রের ভোট বাতিল করেছি, সেখানে আবার ভোট নেয়া হবে। জালভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জালভোটের ঘটনা দেখেছি, আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে এটা মোকাবিলা করেছি। এজন্য কয়েকজনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আপনারা অসহায় এবং আপনাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না বিএনপির এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে রকিবউদ্দীন বলেন, এটাতো আপনারা প্রথম থেকেই বলে আসছেন,  যখন আমরা রাজনৈতিক দলের কাছে সহায়তা চাইলাম, তখন আপনারা বললেন আমরা অসহায় ফিল করছি। অসহায়ত্বের কিছু নাই। সকলের সহায়তা নিয়েই একটা মহাযজ্ঞ অনুষ্ঠিত হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলাফল এটা। নির্বাচনে হেরে গেলে নিয়মানুযায়ী আপিল করার সুযোগ আছে বলেও জানান তিনি। নির্বাচন নিয়ে আপনি সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে সিইসি বলেন, আমাদের কাজ আমরা করে যাচ্ছি, এখানে সন্তোষ্ট-অসন্তোষ্টের কিছু নাই, ইটস মাই জব, উই আর ডুইং।
নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে: আওয়ামী লীগ
অতীতের যেকোন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চাইতে এবারের পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন নিয়ে বিএনপি কাল্পনিক ও ঢালাও অভিযোগ করছে বলেও মনে করে দলটি। গতকাল বিকালে পৌর নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবার দলীয় প্রতীকে গতকাল অনুষ্ঠিত পৌর নির্বাচন বিষয়ে কথা বলেন দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। উৎসবমুখর পরিবেশে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পৌরসভা নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান তিনি। পৌর নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত থাকার জন্য বিএনপিকেও ধন্যবাদ জানান আওয়ামী লীগের এই নেতা।
হানিফ বলেন, অতীতে যে কোন স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের তুলনায় আজকের (গতকাল) পৌরসভা নির্বাচন অনেক কম সংঘাতপূর্ণ হয়েছে। অতীতে নির্বাচনে ব্যাপক হতাহতের ঘটনা ঘটলেও এবারের নির্বাচন কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল। এই নির্বাচন অনেক শান্তিপূর্ণ হয়েছে। সাতকানিয়ায় যিনি নিহত হয়েছেন, এটা নির্বাচন সংক্রান্ত কোন ঘটনা নয়। কেন্দ্রের বাইরে অনেক দূরে সামাজিক একটি দ্বন্দ্বের জেরে এ ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বিএনপি এ ঘটনা নিয়ে নিয়ে যে মিথ্যাচার করছে আমরা তার নিন্দা জানাই। পৌর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অভিযোগ প্রসঙ্গে হানিফ বলেন, তারা প্রথমে বলেছে ৬০টি পৌরসভায় অনিয়ম হয়েছে। এরপর বলেছে ১৫৭টি। তাদের কোন বক্তব্য সঠিক তা নির্বাচন কমিশন দেখবে। তিনি বলেন, কোন জায়গায় অনিয়ম আর বিশৃঙ্খলা হলে সেই ভোট নির্বাচন কমিশন বাতিল করতে পারে। সেই এখতিয়ার তাদের আছে। আমরা চাই নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করুক।
‘পরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বীরা বিজয়ীদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ করে’-এমন মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, বিএনপি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করবে নাতো কার বিরুদ্ধে করবে? কারণ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করছে। সাধারণত দেখা যায় পরাজিত প্রার্থীদের যখন পরাজয়ের শঙ্কা জাগে তখন তারা বিজয়ী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে এবং এটাই স্বাভাবিক।
বিভিন্ন পৌরসভায় সংঘাত সংঘর্ষের ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন এবং বিএনপির উস্কানিতে এসব ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে হানিফ বলেন, দু’একটি জায়গায় যেসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে প্রত্যেকটি ঘটনায় বিএনপির পক্ষ থেকে উস্কানি দিয়ে গোলযোগ করার চেষ্টা করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য আমরা আমাদের কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিলাম। তারা সহায়তা করেছে। সংযত আচরণ করেছে। বিএনপির অভিযোগ কতটুকু সত্য তা নির্বাচন কমিশন দেখবে। তিনি বলেন, বিচ্ছিন্ন দু’একটি ঘটনা ছাড়া এ ধরনের ঢালাও অভিযোগ করার কোন সুযোগ নেই। ৩ হাজারের বেশি কেন্দ্রের মধ্যে এ সংখ্যা বেশি নয়। এটা ৩ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। আর বিএনপির অভিযোগ যদি সত্যও হয় তাহলেও বলা যেতে পারে এই সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।
পৌর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির গভীর ষড়যন্ত্র ছিল এবং তা এখনও আছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, পৌর নির্বাচন নিয়ে বিএনপির যে দীর্ঘ গভীর ষড়যন্ত্র ছিল এই ধরনের মিথ্যাচার এর একটি অংশ হতে পারে। আমরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পেরেছি যেসব জায়গায় তারা পরাজিত হবে সেখানে ফলাফল শিটে বিএনপির পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর না করার জন্য বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় নির্বাচনকে বিতর্কিত করে আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের জন্য তারা পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
সকল রাজনৈতিক দলকে ফলাফল মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়ে হানিফ বলেন, এই নির্বাচনে সরকারের পরিবর্তন হবে না। নির্বাচন হবে ২০১৯ সালে। আমরা চাই সকল রাজনৈতিক দল নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপদানের লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই নির্বাচনের ফলাফলেই প্রমাণ হবে দেশবাসী উন্নয়নের অগ্রযাত্রা চায়, শান্তি চায়, না-কি সন্ত্রাস, নাশকতা, জঙ্গিবাদ চায় সেটার কিছুটা বার্তা হয়তো পাওয়া যেতে পারে। পৌর নির্বাচনকে ইস্যু করে বিএনপির আন্দোলনের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে হানিফ বলেন, অতীতে বিএনপির আন্দোলন দেশবাসী দেখেছে। সহিংস আন্দোলনের নামে তারা বেশি কিছু করতে পারেনি। ভবিষ্যতে বিএনপি যদি তথাকথিত আন্দোলন করে তাহলে অতীতের মতো দেশবাসী তার সমুচিত জবাব দেবে।
সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, বিএম মোজাম্মেল হক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, সাবেক মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক ফরিদুন্নাহার লাইলি, উপ-প্রচার সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, কেন্দ্রীয় সদস্য এসএম কামাল হোসেন, এনামুল হক শামীম, সুজিত রায় নন্দী প্রমুখ।             
২০০ পৌরসভায় কেন্দ্র দখল হয়েছে: বিএনপি
সরকারের নীল-নকশা অনুযায়ী প্রহসনের সাজানো নির্বাচন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এতদিন প্রহসনের নির্বাচনের যে আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছিল বিএনপি সেটাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া, অন্তত ২শ’ পৌরসভায় কেন্দ্র দখল হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে দলটি। যেসব কেন্দ্রে অনিয়মের লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়েছে সেসব কেন্দ্রে পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি করা হয়েছে। গতকাল বিকালে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে ভোটগ্রহণ শেষে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এসব কথা বলেন। এর আগে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিনদফা সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্র দখল, তাণ্ডবের চিত্র তুলে ধরেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। দেশব্যাপী নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক মির্জা আলমগীর বলেন, সকাল থেকে দিনভর নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশ তো দূরের কথা, ভোটারদের মেরে বের করে দেয়া, কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, প্রকাশ্য সিলমারা, সংঘাত-সহিংসতা ইত্যাদিতে নির্বাচন একটি ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। বিকাল চারটা পর্যন্ত যতটুকু খবর পেয়েছি, তাতে ১৫৭টি পৌরসভায় ধানের শীষের এজেন্টদের মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে। এই সংখ্যা শেষ পর্যন্ত ২শ’র কম হবে না। বিএনপির অনেক এজেন্টকে কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি। ভোটারদেরও অনেক জায়গায় মেরে বের করে দেয়া হয়েছে। অধিকাংশ ভোটকেন্দ্র দখল করা হয়েছে। সাতকানিয়ায় যুবদল নেতা নুরুল আমীনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ভোটারদের লাইন থেকে বিএনপির ভোটারদের বের করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে মির্জা আলমগীর বলেন, প্রথম বারের মতো একাত্তর টিভির এক নারী সাংবাদিকের ওপর হামলা চালিয়েছে সরকার সমর্থকরা। ভোটকেন্দ্রে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করার পরও রাজশাহীতে এটিএন নিউজ ও সমকালের তিনজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, এবারই প্রথম কেন্দ্রের ভেতরে যেতে শর্ত আরোপ করা হয়েছে। গণমাধ্যম যাতে নির্বাচনের সত্য চিত্র প্রকাশ করতে না পারে সেজন্য তাদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। ভোট চলাকালীন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া, অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভোটের  যে চিত্র দেখেছি, তাতে গণতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের অত্যন্ত ঘৃণিত ও সন্ত্রস্ত্র করে তুলেছে। আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রের  চেহারা যদি এই হয়ে থাকে, তাহলে সেই গণতন্ত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। ভোটারবিহীন এই সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না মন্তব্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, যতদিন এই সরকার এভাবে জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায়, ততদিন তারা সুষ্ঠু নির্বাচন হতে দেবে না। তাদের অধীনে কখনও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। কারণ তারা জানে- সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের পরাজয় হবে। প্রহসনের এই নির্বাচনে সরকার সব রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে অভিযোগ করে মির্জা আলমগীর বলেন, সরকারের জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কিন্তু প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে তারা দেখাতে চায়- তাদের জনপ্রিয়তা রয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, যেসব কেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে সেসব কেন্দ্রের অভিযোগ লিখিতভাবে আমরা নির্বাচন কমিশনকে দফায় দফায় জানিয়েছি। স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে যেসব পৌরসভার কেন্দ্র দখল, ভোট কারচুপির অভিযোগ করা হয়েছে সেসব কেন্দ্রে পুনঃনির্বাচন দিতে হবে। এই নির্বাচন আবারও প্রমাণ করেছে, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন সম্ভব নয়। প্রহসনের এই নির্বাচনে কমিশন তাদের অযোগ্যতা আবারও প্রমাণ করেছে। ২০ দলের শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক সাঈদ আহমেদকে তারাব থেকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ করেন মির্জা আলমগীর। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুকসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে পৌর নির্বাচন নিয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে গত রাতে দলের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
দিনভর বিএনপির যত অভিযোগ
এদিকে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সকাল থেকে তিন দফা সংবাদ সম্মেলন করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমেদ। ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে রিজভী আহমেদ বলেন, সারা দেশে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমরা যে আশঙ্কা করছিলাম তার কিছু বৈশিষ্ট্য সকালে ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর থেকেই ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন কেন্দ্রে বিরোধী দলের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে  দেয়া হয়নি। কেন্দ্র দখল করে ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরা, নাটোর, বরগুনার বেতাগী, ঝালকাঠির নলছিটি, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ, নোয়াখালীর বসুরহাট, কুমিল্লার বরুড়া ও লাকসাম, মাদারীপুরের কালকিনি, জামালপুরের সরিষাবাড়ি, বরিশালের মুলাদী, ফেনীর দাগনভূঞা, বগুড়া, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, যশোরের মনিরামপুর, মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড, নরসিংদীর মনোহরদি পৌরসভায় বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়া হয়েছে; নির্বাচনী এজেন্ট এবং  ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয়া হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। দুপুরে তৃতীয়দফা সংবাদ সম্মেলনে রিজভী আহমেদ অভিযোগ করেন, সারা দেশে নিজেদের পক্ষে কৃত্রিম বিজয় দেখানোর জন্য ক্ষমতাসীনরা তাণ্ডব চালায়। আমরা এ পর্যন্ত যেসব তথ্য পেয়েছি, তাতে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা প্রশাসনের সহায়তা বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র দখল করে এবং বিরোধী দলের এজেন্টদের বের করে দিয়ে এ তাণ্ডব চালায়। তিনি বলেন, মনে হচ্ছে, তাদের যে আক্রমণ, ভোটকেন্দ্র দখল এবং পোলিং এজেন্ট ও  ভোটারদের ঢুকতে না দেয়া- এটা যেন তারা উৎসব হিসেবে নিয়েছে পুলিশ, প্রশাসন ও যৌথবাহিনীর পাহারায়। আমরা এই তাণ্ডবের নিন্দা করছি। তিনি অভিযোগ করেন, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, মিরসরাই, রাঙ্গুনিয়া, জয়পুরহাটের কালাই,  গোপালগঞ্জ সদর, বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ, বগুড়া, কুমিল্লার লাকসাম, দাউদকান্দি, চান্দিনা, যশোর, ফরিদপুরের নগরকান্দা, ময়মনসিংহের গফরগাঁও, ভালুকা, নারায়ণগঞ্জের  সোনারগাঁ, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর, নরসিংদী, পাবনার ঈশ্বরদী, সাঁথিয়া, জামালপুরের ইসলামপুর, নাটোর সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, লক্ষ্মীপুরের রায়পুরা, ভোলার  বোরহানউদ্দিন, দৌলতখান, ঢাকার সাভার, ধামরাই, খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ড,  মৌলভীবাজার সদর ও মাগুরা সদর পৌরসভার বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়া, বিএনপির দলীয় এজেন্টদের বের করে দেয়া, নেতাকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধা  দেয়া হয়।
নির্বাচন কমিশনে তিনদফা অভিযোগ
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. ওসমান ফারুক ও খন্দকার মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে দুটি প্রতিনিধি দল দু’দফায় নির্বাচন কমিশনে দলের লিখিত অভিযোগ করেন। এছাড়া রাতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সকালে নির্বাচন কমিশনে যান। নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অভিযোগ করেন ওসমান ফারুকের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি।

ভারতে ওষুধ, খাদ্য ও প্রসাধনে গোমূত্র

ভারতের তামিলনাড়ুর একটি মুসলিম সংগঠন হিন্দু যোগ গুরু রামদেবের তৈরি 'পতঞ্জলি' পণ্য কিনতে মুসলিমদের নিষেধ করেছে।
তামিল নাড়ু তৌহিদ জামাত (টিএনটিজে) নামে ঐ সংগঠন এক ফতোয়ায় বলেছে, পতঞ্জলি নামে বিক্রি ভেষজ ওষুধ, খাদ্য এবং প্রসাধনীতে গোমূত্র ব্যবহার করা হয় যা মুসলিমদের জন্য হারাম।
লিখিত এক বিবৃতিতে টিএনটিজে বলেছেন, "মুসলমানদের ধর্মে গোমূত্র খাওয়া হারাম। সুতরাং পতঞ্জলি পণ্য হারাম।"
মুসলিম ঐ সংগঠনটি তাদের বিবৃতিতে বলেছে, পতঞ্জলি পণ্যগুলোর ভেতরে কী কী উপাদান রয়েছে তা না জেনে মুসলিমরা যাতে ব্যবহার না করে, সে জন্য তারা এই আদেশ জারি করেছে।
রামদেব প্রধানত যোগ-গুরু হিসাবে পরিচিত হলেও, তার প্রতিষ্ঠানের তৈরি পণ্য ভারতে জনপ্রিয়।
রামদেবের পণ্যের বিরুদ্ধে এই ফতোয় নিয়ে টুইটার সহ ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।
ফতোয়া নিয়ে রামদেবের ভক্তরা যেমন টিএনটিজেকে যেমন এক হাত নিচ্ছেন, তেমনি এই সুযোগে রামদেবকে নিয়ে টীকা টিপ্পনীও কাটছেন অনেকে।
শিরিষ কুন্দের নামে একজন তার টুইটার একাউন্টে লিখেছেন, "প্লিজ রামদেবের দেশি ঘি যেন নিষিদ্ধ না হয়। ভক্তরাই তার পতঞ্জলি কেনেন। তারা ফাংগাস খাওয়ারই যোগ্য।"
জিএম পুরোহিত নামে আরেকজন টুইটারে লিখেছেন, "শারিয়া মোতাবেক পতঞ্জলি পণ্যে গোমূত্রের বদলে ছাগলের মূত্র ব্যবহার করা উচিৎ।"
রামদেবের পক্ষ থেকে এই ফতোয়া নিয়ে এখনও কিছু শোনা যায়নি।
সূত্র : বিবিসি

বিমানে করে ভিক্ষা করে এই দম্পতি

ভিক্ষার খোঁজে ভিন্‌দেশে পাড়ি। তাও আবার বিমানে চড়ে!
লন্ডনে এখন উৎসবের মরসুম। তাই ভাল রোজগারের আশায় বিমানে চড়ে এই শহরে ভিক্ষে করতে এসেছেন রোমানিয়ার এক জিপসি দম্পতি! ‘লাভ’ও বেশ ভালই হচ্ছে। শনি এবং রবিবারই ভিক্ষা থেকে তাঁরা আয় করেন প্রায় ৮০০ পাউন্ড। ফলে বিমানভাড়ার ৩৮ পাউন্ড (প্রায় ৫ হাজার টাকা) আর গায়ে লাগছে না অ্যানকুটা (২৫) ও পেতরু (২৯) নিয়াগু-র।
সন্তানদের জন্যই লন্ডনে ভিক্ষা করতে এসেছেন রোমানিয়ার লাসি শহরের এই দম্পতি। লন্ডনের প্রাণকেন্দ্র অক্সফোর্ড স্ট্রিটের দোকানগুলির সামনে ভিক্ষা করেন এই দম্পতি। সোমবার তারা এই ভিক্ষার টাকা পাঠান লাসি শহরে তাদের সন্তানদের কাছে।
এই জিপসি দম্পতির চার সন্তান থাকে লাসি শহরে অ্যানকুটার মায়ের কাছে। শিগগিরই আর এক সন্তানের জন্ম দিতে চলেছেন অ্যানকুটা। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের মতো জিপসিদের জন্য লাসিতে কোনো কাজ নেই। তাই নিজের সন্তানদের খাওয়াতে লন্ডনে ভিক্ষা করতে এসেছি।’’ অ্যানকুটা জানান, লাসিতে অনেক কষ্ট করে তারা মাসে ১৭৬ পাউন্ড রোজগার করেন। তার বদলে লন্ডনে ভিক্ষের রোজগারটা অনেক আকর্ষণীয়। চলতি বছরের বর্ষশেষের অনুষ্ঠান শেষ হলেই রোমানিয়ায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।
সকােল ভিক্ষে সেরে দুপুরের খাওয়াটা লন্ডনের হাইড পার্কেই সারেন পেতরু এবং অ্যানকুটা। মাঝমধ্যে একসঙ্গে হাঁটতেও বেরোন এই দম্পতি। কিন্তু রাতে কোথায় থাকেন? জিপসি দম্পতি জানালেন, তাদের থাকার নির্দিষ্ট জায়গা নেই। যেখানে পারেন, সেখানেই রাত কাটান তারা। কখনো ঘুমিয়ে পড়েন ফুটপাথে।

ভারতে চার লক্ষ ভিক্ষুকের মধ্যে ৭৫ হাজার উচ্চ মাধ্যমিক

১১০ কোটির দেশ ভারত৷ ভাবলে অবাক লাগে এর মধ্যে ৩.৭২ লক্ষ মানুষই ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনযাপন করেন৷ ২০১১ সালের আদমসুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে মোট ভিক্ষুকের ২১ শতাংশই শিক্ষিত৷ কেউ উচ্চ মাধ্যমিক, কেউ স্নাতক আবার কেউ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েও শেষ পর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন! এই পরিসংখ্যান থেকে আরও একটি তথ্য উঠে এলো৷ নিজের পছন্দেই সকলে ভিক্ষাবৃত্তি করেন না, বাধ্য হয়েই এই বৃত্তি বেছে নেন৷ শিক্ষিত ভিক্ষুকদের অনেকেই জানিয়েছেন, তাদের ডিগ্রি ও শিক্ষাগত যোগ্যতার উপযুক্ত কোনও চাকরি না মেলায় তারা ভিক্ষাবৃত্তিকে বেছে নিয়েছেন৷ ২০১১ সালের আদমসুমারির রিপোর্ট অনুসারে পৌনে চার লক্ষ ভিক্ষুকের প্রায় ৭৫ হাজার জন দ্বাদশ শ্রেণি পাশ৷ তিন হাজারেরও বেশি ভিক্ষুকের কারিগরি শিক্ষায় ডিপ্লোমা বা স্নাতকোত্তর, স্নাতক ডিগ্রি রয়েছে৷স্নাতক হওয়ার পরও যে দেশের লোককে ভিক্ষা করতে হয়, সে দেশে বেকারত্বের সমস্যা কতটা ভয়ানক, তা এই আদমসুমারির রিপোর্ট থেকে স্পষ্ট৷-সংবাদমাধ্যম

ভোট নিয়ে তাণ্ডব- গুলি, সংঘর্ষ, কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে নিউ মডেল কলেজ কেন্দ্রে
প্রকাশ্যে সিল মারার মহোৎসব : নয়া দিগন্ত
নয়া দিগন্ত থেকে কপি পেষ্টঃ  কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, সংঘর্ষ, গুলি আর জাল ভোটের মহোৎসবের মধ্য দিয়ে গতকাল দেশব্যাপী ২৩৪টি পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় সংঘর্ষে একজন নিহত হয়েছেন। সারা দেশে দুই শতাধিক কেন্দ্রে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ৫০টি কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার সব কেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে।
অনিয়মের অভিযোগে বিএনপির পক্ষ থেকে ১৫৭টি পৌরসভার এক হাজারের বেশি কেন্দ্রে আবার ভোট গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। অপর দিকে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে ১৭৬টি কেন্দ্র থেকে শাসক দলের লোকজন তাদের প্রার্থীর পক্ষের পোলিং এজেন্ট বের করে দিয়েছে।
সারা দেশের ভোটকেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দুপুর ১২টার মধ্যেই ভোটারশূন্য হয়ে যায় অনেক ভোটকেন্দ্র। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় শাসক দলের প্রার্থীদের কর্মী বাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এসব ভোটকেন্দ্র। সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্র দখল করে তারা শুরু করে ব্যালট পেপারে ইচ্ছামতো সিল মারা উৎসব। এর মধ্যে বেশ কিছু কেন্দ্র আগের রাতেই দখলে নেয় শাসকদলের প্রার্থীদের লোকজন। রাত ১০টার পরপরই শুরু করে ব্যালটে সিল মারার কাজ।
অনেক কেন্দ্রের মাঠে প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে ব্যালট পেপারে জাল ভোটের উৎসব করা হয়েছে। টিভি ক্যামেরার সামনেও ঘটেছে কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মারার ঘটনা। এমনকি ক্যামেরার সামনে ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে সিল মারা ব্যালট পেপারের বই। অনেক কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টরাও যোগ দেয় শাসক দলের প্রার্থীর পক্ষে গণহারে সিল মারার কাজে। সকালে অনেক কেন্দ্রে উৎসুক ভোটাররা ভোট দিতে এলেও তাদের আর ভোট দেয়ার কোনো প্রয়োজন হয়নি। এমনকি অনেক এলাকায় বিরোধী প্রার্থীরাও ভোট দিতে পারেননি। এভাবে দুপুর ১২টার মধ্যে সারা দেশের অনেক ভোটকেন্দ্র একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শাসক দলের লোকজন নিজেদের প্রার্থীদের পক্ষে সিল মেরে ভর্তি করে ব্যালট বাক্স।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও বিভাগীয় নির্বাচন মনিটরিং সেলের আহ্বায়ক মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেছেন, চট্টগ্রামের ১০ পৌরসভায় সকাল ৯টার মধ্যেই সরকারদলীয় প্রার্থীরা ভোটকেন্দ্র দখল করে ভোট ছিনতাই করেছে। ফলে ভোটের আগেই জিতে গেছে আওয়ামী লীগ। বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ অভিযোগ করেন তিনি।
কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, জাল ভোটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় শাসক দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকদের মধ্যে ঘটে সংঘর্ষের ঘটনা। সাতকানিয়ায় সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন একজন। এ ছাড়া আরো অনেক কেন্দ্রে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অনেকে। ব্যালট পেপার ছিনতাই, কেন্দ্র দখল ও ভাঙচুর এবং সঙ্ঘাতের কারণে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে বেশ কিছু কেন্দ্রের। নির্বাচন বর্জন করেছেন বিএনপির অনেক প্রার্থী।
সারা দেশের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী অল্পসংখ্যক কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীদের পক্ষে পোলিং এজেন্ট পাওয়া গেছে। ঝুঁকি নিয়ে কেউ কেউ এলেও তাদের জানে মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে তাদের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও তারা সেখানে ছিল অসহায় অবস্থায়।
সারা দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রে সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেয়া হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং শাসক দলের লোকজনের পক্ষ থেকে। কোথাও কোথাও সাংবাদিকদের মারধর এবং ক্যামেরা ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে।
ভোট জালিয়াতির উৎসবে গতকাল রচিত হয়েছে নতুন নতুন অনেক নজির। যেমন যশোর এমএম কলেজের কেন্দ্রে দুপুরের মধ্যেই শেষ হয় শতভাগ ব্যালটে সিল মারার কাজ এবং ৪টায় ভোট দেয়ার সময় শেষ হওয়ার আগেই শেষ করা হয়েছে গণনার কাজ।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড পৌরসভায় নিজের ভোট দিতে পারেননি বিএনপির মেয়রপ্রার্থী আবুল মনছুর। বিপরীত দিকে অনেক কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীদের সামনেই তার কর্মী-সমর্থকেরা মেতে ওঠেন জাল ভোটের সিল মারার উৎসবে।
আবুল মনছুর জানান, বুধবার সকাল ৯টার দিকে সীতাকুণ্ড ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে গেলে তাকে সরকারদলীয় লোকজন কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা দেয়। পরে তিনি ভোট না দিয়েই ফিরে যান।
আবুল মনছুর অভিযোগ করে বলেন, শুধু আমি না, আমার পরিবারের কেউই ভোট দিতে পারেননি। যেখানে একজন মেয়রপ্রার্থীই ভোট দিতে পারেন না, সেখানে সুষ্ঠু ভোট কিভাবে হয়?
পৌরসভা নির্বাচন আরেকটি সিটি নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। নির্বাচনের মাঠে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের মতে বাস্তবে গতকাল সেটিই ঘটেছে। গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সকাল ৮টা বাজার সাথে সাথেই শাসক দলের লোকজন দখলে নেয় প্রায় সব ভোটকেন্দ্র। এরপর বিরোধী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট বের করে দিয়ে সাধারণ ভোটাররাও যাতে কেন্দ্রে আসতে না পারেন সে ব্যবস্থা করা হয়। সেবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ভোট জালিয়াতি আর তামাশার নির্বাচনের নজির রচিত হয় দেশে।
গাজীপুর সংবাদদাতা জানান, প্রায় সাত বছর পর এ পৌরসভার ভোটারেরা বুধবার ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আনন্দঘন পরিবেশে ভোট দিয়েছেন। কয়েকটি বিশৃঙ্খল ঘটনা ছাড়া এ পৌরসভার ২২টি কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়। প্রায় প্রত্যেক কেন্দ্রেই ভোটারের উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। বুধবার সকালে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আনিছুর রহমান তুলা গবেষণা স্কুল কেন্দ্রে ভোট দেন এবং বিএনপি প্রার্থী শহীদুল্লাহ শহীদ মাওনা চৌরাস্তা মাদরাসা কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন।
এ দিকে শ্রীপুরে পৌর নির্বাচনে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলামকে (ব্রিজ-প্রতীক) লাঞ্ছিত করেছে প্রতিপক্ষ কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকেরা। এ ব্যাপারে প্রার্থী নজরুল ইসলাম জানান, দুপুরে জালভোট দেয়ার সংবাদে কেন্দ্রের ভেতর প্রবেশ করতে চাইলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর লোকজন তাকে মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়।
সাভার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, সাভার পৌর নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম আর বিএনপি এবং এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্ট বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অনেক ভোটার ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দিতে না পারায় হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে যায়। সেই সাথে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে জালভোট দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল পৌর এলাকায় বিভিন্ন স্থানে অপরিচিত বহিরাগতদের উপস্থিতি লক্ষণীয়।
সাভার পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন, সাধারণ কউন্সিলর পদে ৫৫ জন ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ১৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। পৌর এলাকায় মোট ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৬৯ হাজার ৮৫৪ জন, সেই তুলনায় ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডে মোট ৮০টি কেন্দ্রে একযোগে ভোট গ্রহণ করা হয়। নির্বাচনী মাঠে ছিল ২৭ জন নির্বাহী ম্যাজেস্ট্রেট ও দুই প্লাটুন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, র‌্যাব, আনসার সদস্যরা। পাশাপাশি সাদা পোশাকে ছিল গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা।
জালভোট : এখানকার বেশ কয়েটি কেন্দ্রে জালভোট দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পৌরসভা রাজাশনের ৮নং ওয়ার্ডসহ বেশির ভাগ ওয়ার্ডের কেন্দ্রগুলোতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর পক্ষে জালভোট দেয়ার অভিযোগ করেছে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হাজী বদিউজ্জামানের (ভিপি বদি) স্ত্রী শিরিন আক্তার মিতু। আর রাজাশনের আল-হেরা কলেজকেন্দ্র থেকে এক যুবককে আটক করা হয়। এ সময় তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে না দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আল-হেরা কলেজের প্রিজাইডিং অফিসার মোস্তফা জামান জানান, ভোটকেন্দ্রে কয়েকজন জালভোট দিতে এলে আমরা তার নাম ঠিকানা জিজ্ঞাসা করে মিল না পেলে লাইন থেকে বের করে দিই।
এজেন্টদের মারধর : বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্টদের ভয়ভীতি দিয়ে বের করে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে। হাতেগোনা কয়েকটি কেন্দ্রে এক-দুইজন এজেন্ট থাকলেও বেশির ভাগ কেন্দ্রে বিএনপির কোনো এজেন্টই ছিল না। আবার প্রিজাইডিং অফিসারের কাছে বিএনপি ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীদের এজেন্টদের আবেদনের কপি থাকলেও রাজাশনসহ বেশির ভাগ কেন্দ্রে তাদের বের করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। মধ্য রাজাশন এলাকার আল-আমিন পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র থেকে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর পক্ষের এজেন্ট ডা: আব্দুল মালেককে মারধর করে বের করে দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ভোট দিতে পারেননি : সাভার পৌর নির্বাচনের বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হাজী বদিউজ্জামান (ভিপি বদি) মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর থেকে গ্রেফতার এড়াতে পলাতক রয়েছে। হামলা ও গ্রেফতারের ভয়ে গতকাল তিনি নিজের ভোট দিতে পারেননি। তার স্ত্রী শিরিন আক্তার মিতু জানান, তিনি তার বাসার কাছে ড্যাফোডিল স্কুল কেন্দ্রে সকালে ভোট দিয়েছেন।
সদর দক্ষিণ (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার ৬ পৌরসভা নির্বাচনে গতকাল জালভোট ও ব্যালট ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, হোমনা ও দাউদকান্দি পৌরসভার বেশির ভাগ কেন্দ্র দখল করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বরুড়া পৌরসভায় ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের দায়ে একটি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। গতকাল সকালে রিটার্নিং অফিসার লুৎফুন্নাহার নাজিম বরুড়ার লতিফপুর কেন্দ্রটি স্থগিত করেন।
কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার হারুনুর রশিদ জানান, রাত আড়াইটার দিকে ১০-১২ জনের একটি দল এসে নৌকা প্রতীকের ১২০০ ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেন। তারা রাত ৪টা পর্যন্ত সিল মেরে ব্যালটগুলো বাক্সে ভরেন। বরুড়ার ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থী জসিম উদ্দিন পাটোয়ারীর অভিযোগে রিটার্নিং অফিসার লুৎফুন্নাহার নাজিম ভোটগুলো বাতিল করে লতিফপুর কেন্দ্রটির ভোট গ্রহণ স্থগিত করেন।
কুমিল্লার লাকসামে ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের সময় দেশীয় অস্ত্রসহ আটজনকে আটক করা হয়েছে। তারা হচ্ছেন উপজেলার উত্তরদা ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রাব্বানী মজুমদার, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা জাহাঙ্গীর হোসেনসহ আটজন। তাদের মধ্যে লাকসাম রেলওয়ে স্কুল ভোটকেন্দ্র থেকে পাঁচজন ও ধামৈচা কেন্দ্র থেকে অপর তিনজনকে র‌্যাব-১১ এর একটি ভ্রাম্যমাণ দল আটক করে।
লাকসামের পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকা প্রতীক ও ডালিম প্রতীক ছাড়া অন্যদের এজেন্ট বের করে দেয়া হয়েছে।
লাকসামের আল-আমিন ইনস্টিটিউট কেন্দ্রের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। লাকসামের বিএনপির মেয়র প্রার্থী শাহনাজ আক্তার সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকেরা কয়েকটি কেন্দ্রে জালভোট দিয়েছে। তারা কেন্দ্র থেকে মারধর করে ধানের শীষের এজেন্ট বের করে দিয়েছে।
ধানের শীষ প্রতীকের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট মজির আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, রেলওয়ে স্কুল, নশরতপুর, বড়তুপা, শ্রীপুর, গাজীমুড়া, পূর্ব লাকসাম, উত্তরকুল এলাকায় বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর দফায় দফায় হামলা করা হয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, দুপুর ১২টায় কোমারডোগা, গোপালপুর ও রেলওয়ে হাইস্কুলকেন্দ্র থেকে ভোটারদের বের করে আওয়ামী লীগ কর্মীরা এককভাবে দখল করে নেয়।
চান্দিনা পৌরসভার বেলাশ্বর কেন্দ্রে তিন কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ১৫ রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে।
এ দিকে চান্দিনা পৌরসভার ১৩ কেন্দ্রের মধ্যে ১১টি কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র শাহ্ মো: আলমগীর খান। শাহ মো: আলমগীর খান তার লিখিত অভিযোগে বলেন, ভোটকক্ষ থেকে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীর এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া হয়। ভোটারদের হাত থেকে ব্যালট পেপার কেড়ে নেয়া, প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকে সিল মারা ও প্রার্থীকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধাসহ নানা অভিযোগ করেন।
হোমনা পৌরসভার আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এসআই ইমরান ও তিনজন কনস্টেবলসহ ১০ জন আহত হয়েছেন।
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, ময়মনসিংহের ত্রিশাল পৌরসভা নির্বাচনে কেন্দ্র দখলের চেষ্টায় আওযামী লীগ দলীয় প্রার্থী জাহিদুল ইসলাম জুয়েল সরকারের সমর্থকেরা দফায় দফায় ফাঁকা গুলি ও ককটেল ছুড়ে গোটা পৌরসভা এলাকা প্রকম্পিত করে তোলে। এ সময় আহত হয় স্থানীয় বিএনপি নেতা সুরুজ আলী, আ: কাদের ও মনির হোসেন।
জানা যায়, গতকাল দুপুর নাগাদ ত্রিশালের উপজেলা পরিষদের সামনে দফায় দফায় অস্ত্রের মহড়া দেয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর লোকজন। এ সময় তারা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে কমপক্ষে ২০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় বেশ কয়েকটি ককটেলেরও বিস্ফোরণ ঘটায় তারা। স্থানীয় বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনার একপর্যায়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনতা তাদের ধাওয়া করে।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আল ইমরান রহুল ইসলাম বলেন, সাময়িকভাবে একটু গণ্ডগোল হয়েছিল। পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে যায়।
নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শেষ হওয়ার মাত্র আধঘণ্টা আগে পৌরসভার ৮নং ওয়ার্ডের আলী আকবর ভূঁইয়া উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোট দেয়ার কথা বলে কেন্দ্রে প্রবেশ করে ব্যালটের মুড়িবই (কাস্টিং ভোটের হিসাব-নিকাশ) ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
এর আগে দুপুরে প্রশাসন কর্তৃক ময়মনসিংহের ত্রিশালের পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জাহিদুল ইসলাম জুয়েল সরকারকে লাঞ্ছিত করার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করে নৌকার সমর্থকেরা। এ সময় তারা দুই দফায় প্রায় আধা ঘণ্টা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করে।
পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, সশস্ত্র মহড়া দিয়ে ভোট কেন্দ্র দখল করে ভোট ছিনতাইয়ের অভিযোগে ১০টি ভোটকেন্দ্রের ফলাফল বাতিল করে আবার ভোটগ্রহণের দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করলেন এলডিপি সভাপতি ড. কর্নেল (অব:) অলি আহমদ বীর বিক্রম। গতকাল দুপুরে চন্দনাইশ সদরের নিজ বাস ভবনে এ সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ভোর ৫টা থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে অবৈধভাবে নৌকার পক্ষের লোকজন ভোট ডাকাতি করা কেন্দ্র থেকে নিজেদের এজেন্ট বের করে দেয়া ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্ব করাসহ একাধিক কারণে তিনি ১৬টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০টি কেন্দ্রে ফলাফল বর্জন করে নতুনভাবে ভোট গ্রহণের দাবি জানান। এ সময় তিনি বলেন, ১৬টি ভোটকেন্দ্রের চারটি প্রশাসন বন্ধ করে দিয়েছে। অপর তিনটি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্বাভাবিক হলেও ১০টি কেন্দ্রে ফলাফল বাতিল করে তিনি বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত নজিরবিহীন ভোট ডাকাতির ঘটনা এ দেশের মানুষ কখনো দেখেনি।
বেলাবো (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানান, নরসিংদী জেলার তিনটি পৌরসভা নির্বাচনে জালভোট ও কেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে ভোট গ্রহণ চলছে। সকালেই কেন্দ্র দখলে নিয়ে গেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর লোকজন। কোনো কেন্দ্রেই বিএনপি প্রার্থীর কোনো এজেন্ট পাওয়া যায়নি। সকাল ৯টার আগেই বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়ার অভিযোগ করছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এরপর কেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা। তিনটি পৌর নির্বাচনেই বহিরাগতদের ভোটকেন্দ্রে আসা যাওয়া এবং ভোট দিতে দেখা গেছে। বহিরাগত লোকজন কেন্দ্রের ভেতরে আসা-যাওয়া এবং জালভোট দিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো প্রকার তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি। এজেন্টদের বের করে জালভোট দেয়ার অভিযোগ এনে বেলা ১১টায় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন মনোহরদী পৌরসভা বিএনপির মেয়র প্রার্থী মো: মাহমুদুল হক। বারবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার না পেয়ে তিনি বাধ্য হয়ে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। তা ছাড়া নরসিংদী সদর পৌরসভায় তিনটি এবং মাধবদী পৌরসভায় একটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়।
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর নির্বাচনে ৫নং ওয়ার্ডের দড়ি চরিয়াকোনা কেন্দ্রে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষে ১০ জন আহত ও ৩০টি মোটরসাইকেল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ দুইজনকে আটক করে।
জানা যায়, ভোট গ্রহণের শুরুতেই কাউন্সিলর প্রার্থী সোহরাব উদ্দিন ও নজরুল ইসলাম সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়। পুলিশ মাসুদ নামে এক বিএনপি কর্মীকে আটক করে। বিকেলে আবার কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম ও সোহরাব উদ্দিন সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় কিছু ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালট পেপারগুলো বাতিল করে দেন। এ সময় পাকুন্দিয়া থেকে আগত নেতাকর্মীদের দড়ি চরিয়াকোনা কওমি মাদরাসায় রাখা ৩০টি মোটরসাইকেল নজরুল সমর্থকেরা ভাঙচুর করে। মোবাইলে সংঘর্ষের ছবি ধারণ করার কারণে নূর মিয়া নামে এক ব্যক্তিকে আটক করে।
জামালপুর ও সরিষাবাড়ী সংবাদদাতা জানান, জামালপুর সদর, সরিষাবাড়ী, দেওয়ানগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির মেয়র এবং কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ, গুলি, টিয়ার শেল ও ভোটকেন্দ্র দখলের মধ্য দিয়ে পৌরসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। জামালপুর শহর ও সরিষাবাড়ী উপজেলায় বিএনপি-আওয়ামী লীগের সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছেন। পুলিশ ফাঁকা গুলিবর্ষণ ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করেছে। দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভায় বিভিন্ন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী দলের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী এবং কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে ২০ জন আহত হয়েছেন। মেলান্দহ পৌরসভায় শাহজাদপুর এলাকায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির সংঘর্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন।
এ দিকে কেন্দ্র দখল ও ভোট কারচুপির অভিযোগে জামালপুর পৌরসভায় জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী খন্দকার হাফিজুর রহমান বাদশা ও দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভায় আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী শেখ মো: নুরুন্নবী অপু নির্বাচন বর্জন করেছেন। একই অভিযোগে জামালপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী তরুণ হাসান কাজল ও ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুর রহমান নির্বাচন থেকে সড়ে দাঁড়িয়েছেন। সরিষাবাড়ী পৌরসভায় পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন বিএনপির ফয়েজুল কবির তালুকদার শাহিন।
মানিকগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, জালভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে সকাল সাড়ে ৮টায় মানিকগঞ্জ পৌর এলাকায় শহীদ তিতুমীর একাডেমি কেন্দ্রে তিন মেয়র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হয়েছেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী গাজী কামরুল হুদা সেলিম অভিযোগ করেন, ওই কেন্দ্রে আমাদের পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে কয়েক শ’ ছাত্রলীগ কর্মী জালভোট দিতে থাকে। আমরা কয়েকজন ভুয়া ভোটরকে আটক করে পুলিশে দিলেও পুলিশ তাদের ছেড়ে দেয়।
ময়মনসিংহ অফিস জানায়, ময়মনসিংহের গফরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির মেয়র পদপ্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন নিজের ভোট দেননি। তিনি বলেন, মেয়র পদে কেউ ভোট দিতে পারছেন না বলে আমি ভোট দিতে কেন্দ্রে যাইনি। তিনি অভিযোগ করেন, নৌকার সমর্থকরা সকাল থেকেই সব ক’টি ভোটকেন্দ্রের দখল নিয়ে বিএনপির এজেন্টদের বের করে দেয়। এরপর ভোটারদের হাত থেকে মেয়র পদের ব্যালট পেপার নিয়ে তাদের সামনেই নৌকা মার্কায় সিল মারে। তবে কাউন্সিলর প্রার্থীর ব্যালট পেপার ভোটারকে সিল মারতে দেয়া হয় এবং কাউন্সিলর ভোট সুষ্ঠু হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভোটাররা জানান, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ২০ থেকে ৩০ জন যুবক কেন্দ্রের ভেতর অবস্থান নেয়। পোলিং এজেন্টদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার নেয়ার সাথে সাথেই তারা ভোটারদের নৌকা মার্কায় সিল মারতে বলে। না মারলেই তারা মেয়র প্রার্থীর ব্যালট নিয়ে যায় এবং নৌকায় সিল মেরে বাক্সে ফেলে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে কেউ মেয়র পদে নিজের ভোট দিতে পারেননি বলে তারা জানান।
ভোলা সংবাদদাতা জানান, ভোলা জেলার ভোলা, বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান পৌরসভার ৩৬টি কেন্দ্রের বেশির ভাগেরই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় সব কেন্দ্রেই আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিল মারতে ভোটারদের বাধ্য করা হয়। বোরহানউদ্দিন ও দৌলতখান পৌরসভার চিত্র একই।
ঝিনাইদহ সংবাদদাতা জানান, ভোটকেন্দ্র দখলের চেষ্টাসহ বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে ঝিনাইদহ জেলার চার পৌরসভার নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। কোটচাঁদপুরে দু’টি ভোটকেন্দ্রে ব্যালট ছিনিয়ে কাটার চেষ্টা ও শৈলকুপায় দুই প্রার্থীর সমর্থকদের সংর্ঘষে দুইজন আহত হয়েছে। নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী জিন্নাতুল হক ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। বুধবার বিকেল সাড়ে ৩টায় তিনি এ ঘোষণা দেন।
এ ছাড়া জেলার শৈলকুপার ললিত মোহন ভূঁইয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে এক সংঘর্ষে দুইজন আহত হয়েছে। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু পৌরসভার বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী জিন্নাতুল হক ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
নড়াইল সংবাদদাতা জানান, অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নড়াইলের কালিয়া পৌরসভায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী এস এম ওয়াহিদুজ্জামান, আওয়ামী লীগ প্রার্থী ওয়াহিদুজ্জামান হীরা এবং নড়াইল পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী অ্যাডভোকেট সোহরাব হোসেন বিশ্বাস নির্বাচন বর্জন করেছেন। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার থেকে দুপুরের মধ্যে প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করেন।
এ দিকে, ভোটগ্রহণে অনিয়মের অভিযোগে পূর্বকালিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কালিয়া রিটার্নিং কর্মকর্তা শেখ আনোয়ার হোসেন। এ ছাড়া অনিয়মের অভিযোগে কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ সাময়িক স্থগিত ছিল। এ দিকে, কয়েকটি কেন্দ্রে নানা অনিয়মের অভিযোগে কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
ঈশ্বরদী (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, ঈশ্বরদী পৌরসভা নির্বাচনে ভোট ছিনতাইয়ের অভিযোগ, জালভোট প্রদান, পোলিং এজেন্টদের মারধর, ভোটকেন্দ্র দখল, ধানের শীষের এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ করে নির্বাচন স্থগিত চেয়েছেন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মকলেছুর রহমান বাবলু। গতকাল দুপুরে পৌর বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয় ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন স্থগিতের দাবি তোলেন তিনি।
পিরোজপুর সংবাদদাতা জানান, সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্র দখল, কেন্দ্র থেকে বিএনপির সমর্থকদের মারধর করে বের করে দেয়া ও নৌকার এজেন্ট ও সমর্থকদের ব্যালট পেপারে সিল মারাসহ আওয়ামী লীগ প্রার্থী গোলাম কবিরের পক্ষে নানা অনিয়মের অভিযোগ করেছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী শফিকুল ইসলাম ফরিদ। তিনি পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন।
লাকসাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, লাকসামে পৌর নির্বাচন শুরু হওয়ার পরপরই ভোটারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের সময় দেশীয় অস্ত্রসহ উপজেলার উত্তরদা ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম রাব্বানী মজুমদার, সদর দক্ষিণ উপজেলার বাগমারা ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি আয়াত উল্লাহ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা জাহাঙ্গীর হোসেনসহ আটজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে লাকসাম রেলওয়ে স্কুল ভোটকেন্দ্র থেকে পাঁচজন ধামৈচা কেন্দ্র অপর তিনজনকে র‌্যাব-১১-এর একটি ভ্রাম্যমাণ দল আটক করে।
কিশোরগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের সাত পৌরসভার দু’টিতে দুই মেয়র প্রার্থী কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন বর্জন করেছেন। এক মেয়র প্রার্থী পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন। বাজিতপুর পৌরসভার বিএনপির মেয়র প্রার্থী এহসান কুফিয়া সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্র দখল করে ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে পুনর্নির্বাচন দাবি করেছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা মো: শওকত আকবর কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন। এ দিকে করিমগঞ্জ পৌরসভার পাইলট হাইস্কুল কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে কিছুক্ষণ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়।
চাঁদপুর সংবাদদাতা জানান, সংঘর্ষ ও ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়ার ঘটনায় জেলার ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ ও কচুয়া পৌরসভায় সংঘর্ষে অর্ধশত লোক আহত হয়েছেন। পুলিশ ৩৫ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করলে একজন গুলিবিদ্ধ হন। মতলব পৌরসভার দক্ষিণ বাইশপুর ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার ছিনতাইকালে পুলিশ ১৫ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। এতে একজন গুলিবিদ্ধসহ ১০ জন আহত হন।
চাঁদপুরের চারটি পৌরসভার বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন তাদের সমর্থিতদের ভোট প্রদানে বাধা দেয়া হচ্ছে। ভোটকেন্দ্র থেকে সরকার সমর্থিতরা তাদের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়ে ব্যালট পেপারে সিল দিচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা জানান, জেলার আখাউড়া পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট কারচুপি ও কেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেয়াসহ অনিয়মের অভিযোগ এনে তিন মেয়র প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। তারা হলেন বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী হাজী মো: মন্তাজ মিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী মশিউর রহমান বাবুল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট সোহেল ভূঁইয়া। তারা সাংবাদিকদের জানান, নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ব্যাপক কারচুপির বিষয়টি রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানালেও তিনি না শোনার ভান করেন। তাই বাধ্য হয়ে নির্বাচন থেকে সরে এসেছি।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, জেলার রাউজান পৌরসভায় অন্যরকম নির্বাচন দেখেছে পৌরবাসী। সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেবাশীস পালিতের সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়। অধিকাংশ কেন্দ্রে সরকারি দলের লোকজন প্রবেশ করে ব্যালেট পেপার ছিনতাই করে জালভোট দেয়। বিভিন্ন কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্ট এবং সমর্থকদের মারধর করা হয়। পুলিশের সামনে এসব ঘটনা ঘটলেও তারা নীরব ছিল। পরে রাউজান পৌরসভা বিএনপি প্রার্থী কাজী আবদুল্লাহ আল হাছান নির্বাচন বর্জন করেন।
খুলনা ব্যুরো জানায়, জেলার চালনা ও পাইকগাছা পৌরসভায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটাররা সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন। শীতের কারণে সকালের দিকে ভোটারদের উপস্থিতি কিছুটা কম থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে। পাইকগাছায় প্রায় ৭৭ শতাংশ এবং চালনায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়ে। ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পর গণনা শুরু হয়।
নোয়াখালী সংবাদদাতা জানান, জেলার চৌমুহনী পৌরসভায় ব্যাপক গোলযোগ, গুলিবর্ষণ, ককটেল বিস্ফোরণ, ব্যালটবাক্স ভাঙচুর, ব্যালট ছিনতাই, ব্যাপক কারচুপি, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার, মহিলা এজেন্ট ও ভোটার আহত হওয়াসহ এ পৌরসভায় ২০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১০টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করেন জেলা রিটার্নিং অফিসার। হাতিয়া পৌরসভায় বিরোধী দলের নেতাকর্মী ও তাদের সমর্থক ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা প্রদান এবং কেন্দ্র দখল ও ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
টাঙ্গাইল সংবাদদাতা জানান, বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনার মধ্য দিয়ে টাঙ্গাইলে পৌর নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। জেলার মধুপুর ও গোপালপুর পৌরসভা নির্বাচন বর্জন করেন বিএনপি প্রার্থীরা। গোপালপুরে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীও কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ভূঞাপুরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নেতাকর্মীদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। পরে আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালায় বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজন। এ ছাড়া দলীয় প্রতিপক্ষের হামলায় আহত হয়েছেন এক আওয়ামী লীগ নেতা। অন্য দিকে সখীপুরে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে ছয়টি কেন্দ্রে ভোট বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের জেলার সৈয়দপুর পৌরসভায় সংঘর্ষ ও কেন্দ্র দখলের চেষ্টায় চারটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, দুপুরের পর নয়াটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও কেন্দ্র দখলের চেষ্টা করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থীর লোকজন। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ২৪ রাউন্ড ফাঁকা শর্টগানের গুলিবর্ষণ করে। এতে ফজলুর রহমান (৬৫) নামের একজন গুলিবিদ্ধসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়। এ সময় পুলিশ রাজু আহমেদ ও সবুজ নামের দুই যুবককে আটক করেছে।
কুড়িগ্রাম সংবাদদাতা জানান, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও সংঘর্ষের কারণে জেলার উলিপুর পৌরসভায় ১৮টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে মদিনাতুল উলুম মাদরাসা কেন্দ্র ও নারকেলবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র স্থগিত করেছেন প্রিজাইডিং অফিসার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে পুলিশ। এ সময় পাঁচজন আহত হয়। এ ছাড়া কুড়িগ্রাম পৌরসভার কুড়িগ্রাম সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় ও কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে জোর করে ভোট দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জয়পুরহাট সংবাদদাতা জানান, জয়পুরহাট পৌরসভার চারটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে ককটেল বিস্ফোরণের পর এসব কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। ১ ঘণ্টা পর আবার ভোট গ্রহণ শুরু হয়। এ দিকে জেলার কালাই পৌরসভা নির্বাচনে দু’টি ভোটকেন্দ্র দখল করে জালভোট দেয়া এবং ভোটারদের ভোট প্রদানে বাধা দেয়ায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাজ্জাদুর রহমান তালুকদার, বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী আনিসুর রহমান তালুকদার ও জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী প্রভাষক আমিনুল ইসলাম ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন।
হবিগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, হবিগঞ্জে ৭১ টিভির স্টাফ রিপোর্টার ফারহানা রহমানকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। শহরের জেলা পরিষদ কেন্দ্র দখলের দৃশ্য লাইভ টেলিকাস্ট করার সময় শারীরিকভাবে নির্যাতন করে সরকার সমর্থক যুবকরা। সাংবাদিক নির্যাতনের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করার সময় স্থানীয় সাংবাদিক মীর আব্দুল কাদিরের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেয় তারা। এ দিকে পিটিআই কেন্দ্রে জালভোট দেয়ার অভিযোগে ইমতিয়াজ আহমেদ শাওন নামে এক ছাত্রলীগ কর্মীকে ছয় মাসের সাজা দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক নিশাত সুলতানা। শহরের বিকেজিসি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রও দখলের চেষ্টা করা হয়।
বান্দরবান সংবাদদাতা জানান, দুপুরের পর জেলা শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কালেক্টরেট স্কুলকেন্দ্রে জালভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ৩টার পর ওই কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ কর্মীরা বিএনপি ও জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থীর ভোটার পরিচয়পত্র বিতরণকারীর অফিসঘর ভাঙচুর করে। এ সময় সেখানে বিজিবি র‌্যাব ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পুলিশ কেন্দ্র থেকে এক যুবককে অটক করে।
ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা জানান, ঠাকুরগাঁও পৌর নির্বাচনে ২১টি কেন্দ্রের মধ্যে তিনটি কেন্দ্রÑ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সরকারি গোবিন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মহিলা কলেজ ভোটকেন্দ্রে হামলা চালায় আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী। এ ঘটনায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট কেন্দ্রের সামনে দুইজন সাংবাদিককে মারধরসহ প্রায় ছয়টি ব্যালট বই এবং বাক্স ভাঙচুর ও ছিনতাই করা হয়। কাউন্সিলর প্রার্থীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার সময় এ হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ আরিফুর রহমান ও রেজাউল করিম নামে দুই সন্ত্রাসীকে আটক করেছে। আটক দু’জনের বাড়ি সদর উপজেলার নারগুন বান্দিগড় গ্রামে।
ঝালকাঠি সংবাদদাতা জানান, ঝালকাঠির নলছিটি পৌরসভায় বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে ভোট গ্রহণ। দু’টি ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। এজেন্ট-সমর্থকদের বের করে দেয়া ও ছয় সমর্থককে কুপিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে। আহত আবু সাঈদ মোস্তাফা কামাল, সেলিম হাওলাদার ও এনায়েত হোসেনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
আখাউড়া (ব্রাক্ষণবাড়িয়া) সংবাদদাতা জানান, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখল ও কারচুপিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে বিএনপির প্রার্থীসহ তিন মেয়র প্রার্থী আখাউড়া পৌর নির্বাচন বর্জন করেছেন। দুপুর ১২টায় উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ধানের শীষ প্রতীকের বিএনপির প্রার্থী হাজী মন্তাজ মিয়া নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, দেবগ্রাম পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্র বাদে বাকি ১০টি কেন্দ্রে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি।
মাদারীপুর সংবাদদাতা জানান, জেলার কালকিনি পৌর নির্বাচনে ভোট শুরুর আগেই ব্যালটে সিল দেয়া ব্যালট পেপার ছিনতাইসহ নানা অভিযোগে কাষ্টগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দক্ষিণ জোনারদন্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন।
এ ব্যাপারে জেলা নির্বাচন ও রিটার্নিং অফিসার মো: আলাউদ্দিন বলেন, ‘নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই দুই কেন্দ্রে ১১০০ ভোটের ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটায় ওই কেন্দ্র দুটিতে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।
শরীয়তপুর সংবাদদাতা জানান, শরীয়তপুর সদর পৌর নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় সুষ্ঠু ভোট গ্রহণের জন্য একটি লিখিত আবেদন করেছেন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী। প্রকাশ্যে সিল মারার ছবি তুলতে গেলে একজন সাংবাদিককে মারধর করে তার ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়া হয়। এ দিকে জাজিরা পৌরসভার কবিরাজকান্দি কেন্দ্রে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ব্যালট পেপার ছিনতাই করা হয়েছে।
জাজিরা থানার ওসি মো: নজরুল ইসলাম বলেন, কবিরাজকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ছিনতাই করার সময় পুলিশ একজনকে আটক করে। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে। ভেদরগঞ্জ থানার ওসি মো: কবিরুজ্জামান বলেন, কয়েকজন লোক ভোটকেন্দ্রে ব্যালট ছিনতাই করতে গেলে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে এবং তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে।
কুষ্টিয়া সংবাদদাতা জানান, জেলার পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে কুমারখালী ও খোকসা পৌরসভার বিএনপির মেয়র প্রার্থীরা পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও জাতীয় পার্টির প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন। ভোটকেন্দ্রে ভোটার আসতে বাধা প্রদান, নির্বাচনে কারচুপি ও প্রশাসনের অসহযোগিতার অভিযোগ করেছেন অনেক প্রার্থী। অনেক কেন্দ্রে ব্যালেট পেপারের সঙ্কটে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রিজাইডিং অফিসাররা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। কুমারখালী আদর্শ মহিলা কলেজ কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের দুই কমিশনার প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে কয়েক দফা সংঘর্ষে কয়েকজন আহত হয়েছে। এ কেন্দ্রের অব্যবহৃত একটি ব্যালেট পেপার বই পাশের পুকুর থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে।
সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, সীতাকুণ্ড পৌরসভা নির্বাচনে বেলা ১১টার মধ্যেই ৯টি ওয়ার্ডের ১৩টি কেন্দ্রের সব ক’টি যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডাররা দখল করে ধানের শীষ ও কাউন্সিলর ও পোলিং এজেন্টদের পিটিয়ে বের করে দিয়ে নৌকা ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলরদের ব্যালট পেপারে সিল মেরে ভোটবাক্স ভরতে থাকে। এ সময় প্রশাসনের লোকজন নীরব ছিল। সকাল সাড়ে ৯টার সময় ধানের শীষের প্রার্থী আবুল মুনছুর পন্থিছিলা কেন্দ্রে গেলে যুবলীগ সন্ত্রাসীরা তার গাড়িতে হামলা করে এবং পিটিয়ে পা ভেঙে দেয়।
দৌলতখান (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, দৌলতখান পৌরসভা নির্বাচনে হামলা, ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা, এজেন্টদের পিটিয়ে বের করে জালভোট ও সীল মারার মাধ্যমে ১২টার আগেই ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের আসতে বাধা দিয়েছে। পুলিশের সামনেই ভোটার ও এজেন্টদের নির্যাতন করা হয়েছে। প্রশাসনের কোনো সহায়তা না পেয়ে প্রতিপক্ষরা কেন্দ্র ছেড়ে চলে যান। সংবাদকর্মীরাও ভয়ে ছবি তুলতে পারেননি।
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, কলাপাড়া পৌরসভা নির্বাচনে সকাল সাড়ে ৯টার মধ্যে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের খেপুপাড়া নেছারুদ্দীন ফাজিল মাদরাসা, ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মঙ্গলসুখ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মোজাহার উদ্দিন বিশ্বাস ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রের প্রত্যেকটি বুথ থেকে ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টকে বের করে দেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মো: জাহাঙ্গীর হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আমরা এই তিনটি ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রের অনিয়ম সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছি।
হাতিয়া (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, হাতিয়া পৌরসভা নির্বাচন সকাল থেকে ১৩ কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে চললেও দুপুরের দিকে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে।
দুপুরের পর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্র চৌমুহনী উচ্চবিদ্যালয়ে ব্যালট পেপার ছিনতাই ও জালভোট দেয়া নিয়ে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত ৯ জন আহত হন। আহতরা হলেনÑ দুলাল, খোকন, দিদার, ফয়সাল, আলাউদ্দিন, রহিম, আজাদ, জসিম ও নিজাম।
চান্দিনা (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার চান্দিনা পৌরসভার ১১টি কেন্দ্রে আবার নির্বাচনের দাবি জানিয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র শাহ মো: আলমগীর খান।
গতকাল দুপুরে উপজেলা রিটার্নিং অফিসার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরীর কাছে এ আবেদন করেন।
শাহ মো: আলমগীর খান তার লিখিত অভিযোগে বলেন, ভোট কক্ষ থেকে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীর এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া, ভোটারদের হাত থেকে ব্যালট পেপার কেড়ে প্রকাশ্যে নৌকা প্রতীকে সিল মারা ও তাকে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) সংবাদদাতা জানান, লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভা নির্বাচনে অনিয়ম ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী এ বি এম জিলানী। সকাল ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে পৌর শহরে তার বাসভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন তিনি।
এ বি এম জিলানী বলেন, গত দুই দিন ধরে তিনি বাসভবনে অবরুদ্ধ। তাকে ভোটকেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি। ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দিয়ে নৌকার লোকজন কেন্দ্রগুলো দখল করে নেয়।
বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা জানান, রাজবাড়ীর পাংশা পৌরসভার বিএনপি প্রার্থী চাঁদ আলী খান ভোট কারচুপির অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেছেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে জানান, গতকাল সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় ভোট কারচুপি। পৌরসভার ৩, ৮, ও ৬ নম্বর ওয়ার্ড থেকে তার নির্বাচনী এজেন্টদের ভোট কক্ষ থেকে মারধর করে বের করে দেয়া হয়।
পরে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী পাংশা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে নির্বাচন বর্জনের একটি লিখিত অভিযোগ করেন।
গাইবান্ধা সংবাদদাতা জানান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ওয়ার্কার্স পার্টির মেয়র প্রার্থীর ওপর হামলা এবং জাপা মেয়র প্রার্থীর নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। শামীম অ্যান্ড শাকিল কারিগরি কলেজ কেন্দ্রে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত দুই কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুল ইসলাম (পাঞ্জাবি) ও মাসুদ রানা বাপ্পীর (উট) সমর্থদের মধ্যে জালভোট দেয়া নিয়ে সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হন। আহতেরা হলেন- নজরুল ইসলাম, পারভেজ মিয়া, সাদ্দাম হোসেন, আব্দুল করিম ও মানিক মিয়া। পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। কিছু সময় বন্ধ থাকার পর আবার ভোট গ্রহণ শুরু হয়। এ সময় পুলিশ দুই রাউণ্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে।
অপর দিকে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য আমিনুল ইসলাম গোলাপ অভিযোগ করেছেন আব্দুল মতিন মোল্লাকে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থীর সমর্থকেরা লাঞ্ছিত করে জোরপূর্বক মহিলা কলেজ কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়।
এ দিকে গাইবান্ধা পৌর নির্বাচনে উত্তরপাড়া ১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পেপার ও ভোট বাক্স ছিনতাই করার চেষ্টা করা হলে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ ভোট গ্রহণ বেলা পৌনে ২টা থেকে সোয়া ২টা পর্যন্ত আধা ঘণ্টা বন্ধ রাখে। এ ছাড়া গাইবান্ধা পৌরসভার জুবলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ব্রিজ রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে জাল ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ বাধলে কিছু সময়ের জন্য ভোট গ্রহণ স্থগিত রাখা হয়।
কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতা জানান, কেশবপুরে সঙ্ঘাতকালে বিভিন্ন কেন্দ্রে আহত হয়েছেন প্রায় ৩০ জন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন ধানের শীষ কর্মী মেয়র প্রার্থী আব্দুস সামাদ বিশ্বাসের ভাতিজা সুইট, ছাত্রলীগের উপজেলা আহ্বায়ক আজহারুল ইসলাম মানিক ও যুবলীগের সাবেক উপজেলা সভাপতি শাহাদৎ হোসেন।
সকাল সাড়ে ৯টায় হাবাসপোল কওমি মাদরাসা কেন্দ্র থেকে প্রথমে এ তাণ্ডব শুরু হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে সকাল ১০টার মধ্যে ৭ নম্বর ওয়ার্ড মধ্যকূল মহিলা মাদরাসা ওয়ার্ড সাবদিয়া স্বতন্ত্র এবতেদায়ী মাদরাসা কেন্দ্র, বাজিতপুর ফ্রি ব্যাপ্টিস্ট চার্চ স্কুল কেন্দ্রে, কেশবপুর পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে, ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে কেশবপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোগতী নরেন্দ্রপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে, ১১টা ৪৫ মিনিটের দিকে কেশবপুর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কেশবপুর সাইক্লোন সেন্টার কেন্দ্রে ও কেশবপুর পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ভোট গ্রহণ বন্ধ করে দেয়া হয়।
খাগড়াছড়ি সংবাদদাতা জানান, জেলার মাটিরাঙ্গা পৌরসভা নির্বাচনে মাটিরাঙ্গা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে সরকারদলীয় কর্মীরা ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও বিএনপি প্রার্থীর ওপর হামলা করেছে।
বিএনপি প্রার্থী বাদশা মিয়া অভিযোগ করে বলেন, নৌকা প্রতীকে জোরপূর্বক সিল মারা হয়েছে। আমি দ্রুত ৫নং বুথে ঢুকতে গেলে যুবলীগ এবং ছাত্রলীগের কর্মীরা আমাকে বাধা দেয়, এলোপাতাড়ি কিল ঘুষি মারতে থাকে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পুলিশ ও পোলিং অফিসারের সামনেই ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টকে বের করে দিয়ে নৌকার প্রতীকে সিল মারে এবং ব্যালট ছিনিয়ে নেয় তারা। এ ছাড়া মেয়র প্রার্থীর ৯টি ব্যালট ও কাউন্সিলর প্রার্থীর ৪৯টি ব্যালট বাতিল করা হয়েছে বলে উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
মিরসরাই (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও বারইয়ারহাট পৌরসভায় ১৮টি ভোটকেন্দ্র দখল ও জালভোট দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে দুই পৌরসভার সব ক’টি কেন্দ্র দখলে নেয় সরকারদলীয় লোকজন। সারা রাত ককটেল বিস্ফোরণে পুরো এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মিরসরাই উপজেলার দুইটি পৌরসভায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচন স্থগিতের দাবি জানান। সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হলে দুই পৌরসভার ১৮টি কেন্দ্রে বিএনপির এজেন্টদের প্রথমে কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা এবং পরে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ ওঠে। বেলা সাড়ে ১১টায় কেন্দ্র দখলসহ কয়েকটি অভিযোগ তুলে বারইয়ারহাট পৌরসভার বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী মঈন উদ্দিন লিটন নির্বাচন স্থগিতের দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন। পরে মিরসরাই পৌরসভায় বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী এ জেড এম রফিকুল ইসলাম পারভেজও নির্বাচন স্থগিত করার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেন। দুই প্রার্থী উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বলেও জানান।
এ দিকে বারইয়ারহাট পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ সমর্থিত একাধিক প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও হামলার ঘটনা ঘটে।
অপর দিকে মিরসরাই পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী কামরুল হাসান লিটনের এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়ার অভিযোগ করেন তিনি। পৌরসভার সংরক্ষিত ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী বিবি রহিমা রুমা অভিযোগ করেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শাহানা আক্তারের লোকজন তার এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়। সংরক্ষিত ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী সুলতানের নেছা চৌধুরী অভিযোগ করেন ৩ ওয়ার্ডের তিনটি ভোটকেন্দ্র থেকে তার পোলিং এজেন্টদের বের করে দেয়।
দাগনভূঞা (ফেনী) সংবাদদাতা জানান, ফেনীর দাগনভূঞা পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী কাজী সাইফুর রহমান স্বপনের ওপর হামলা, অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগে ভোট বাতিল ও পুনঃতফসিলের দাবিতে বিএনপি প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন করেন। দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলি হয়।
ফেনীর দাগনভূঞা পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী কাজী সাইফুর রহমান স্বপনের ওপর হামলা করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সমর্থকেরা।
প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় সূত্র জানায়, অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ পেলে ভোটগ্রহণের কিছুক্ষণ পর ওই কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থী কাজী সাইফুর রহমান স্বপন প্রবেশ করতে চাইলে তাকে বাধা দেয়া হয়। এ সময় উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আবুল ফোরকান বুলবুলের ছোট ভাই মুন্না ও কাউন্সিলর সাইফুলের বড় ভাই যুবলীগ নেতা রাসেলের নেতৃত্বে উচ্ছৃখল যুবকেরা হামলা করে।
ফরিদগঞ্জ (চাঁদপুর) সংবাদদাতা জানান, ফরিদগঞ্জে ভোট কেন্দ্রে হাঙ্গামা, গুলিবর্ষণ, ককটেল বিস্ফোরণ, ব্যালট পেপার ছিনতাই, জাল ভোট প্রদান ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়েছে। সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। ব্যালট পেপার ছিনতাইকালে বহিরাগতদের ৫টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। ব্যালট পেপার ছিনতাইকালে বহিরাগত তিনজনকে মোবাইল কোর্ট তিন মাসের সাজা প্রদান করেছে। নিজ কেন্দ্রে পুলিশের লাঠিচার্জের শিকার হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোতাহার হোসেন পাটওয়ারী। বিধিবহির্ভূতভাবে পৌর এলাকার বাসিন্দা ভোটকেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মৌলভীবাজার সংবাদদাতা জানান, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, ব্যালট পেপার ছিঁড়ে ফেলা, গোলাগুলি, গণমাধ্যম কর্মীদের লাঞ্ছিত করা ও ক্যামেরা ভাঙচুরের মধ্য দিয়ে মৌলভীবাজার সদর ও বড়লেখা, কুলাউড়া ও কমলগঞ্জ পৌরসভার ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। এসব ঘটনায় বিএনপির দুই কর্মীসহ তিনজন আহত হয়েছেন। এ দিকে সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় প্রেস ক্লাবের পক্ষ থেকে নিন্দা ও ক্ষোভ জানানো হয়েছে। জেলার কুলাউড়া পৌরসভা নির্বাচন চলাকালে পৌরসভার কুলাউড়া ইয়াকুব তাজুল মহিল কলেজ সেন্টারে একজন কাউন্সিলর প্রার্থীর এজেন্ট জাকির হোসেন গিয়াস (৪২) দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় বুধবার বেলা সোয়া ১২টায় মারা গেছেন।
ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা জানান, পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ডের বাহাদিপুর কেন্দ্রে (আ.লীগ বিদ্রোহী) মেয়র প্রার্থী তারিকুল ইসলাম চঞ্চলের ওপর নৌকা প্রতীকের সমর্থকদের হামলায় গুরুত্বর আহত হন। তাকে টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ভূঞাপুর মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সাহিনুল ইসলাম তরফদার বাদল, কাউন্সিলর প্রার্থী আরিফ হোসেন তরফদার রুবেলসহ পাঁচজন আহত হন। ভূঞাপুর মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে নৌকা প্রতীকের লোকজন ৪৪টি ব্যালট পেপার ছিনতাই করে। জাল ভোট ও ছিনতাই ঠেকাতে পুলিশ ৫ রাউন্ড গুলি ছোড়ে।
রাঙ্গামাটি সংবাদদাতা জানান, রাঙ্গামাটিতে তিনটি ভোটকেন্দ্রে সংঘর্ষে ও হামলায় বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম চৌধুরী ও একজন পুলিশসহ ১৪ জন আহত হয়েছেন। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন তিনজন। আহতদের সবাই রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে একজনকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বিএনপি প্রার্থী শহরের ১০টি ভোটকেন্দ্র দখলের অভিযোগ এনে কেন্দ্র সেগুলোতে পুনরায় ভোট গ্রহণের জন্য রিটানিং কর্মকর্তার কাছে আবেদন জানিয়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা: গঙ্গা মানিক চাকমার পক্ষেও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি পুনঃনির্বাচনের দাবি জানিয়েছে।
সোনারগাঁও (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সোনারগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে একটি ভোটকেন্দ্র দখল করাকে কেন্দ্র করে আ’লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে সোনারগাঁও থানার ওসিসহ ১০ জন আহত হয়েছেন। ওই সময় বেশ কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। পুলিশ গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পৌরসভার সোনারগাঁও জি আর ইন্সটিটিউশন উচ্চবিদ্যালয় এ-ই কলেজ কেন্দ্রকে দখলের চেষ্টা করলে ওই ঘটনা ঘটে।
লাকসাম (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, লাকসামে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, প্রকাশ্য ব্যালেটে সিল প্রদান, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া একটি কেন্দ্র থেকে র‌্যাব ১০টি পেট্রল বোমা, বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের মধ্য দিয়ে পৌর নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে আ’লীগের কর্মী-সমর্থকেরা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্র দখলের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এ সময় অধিকাংশ কেন্দ্র থেকে ধানের শীষের এজেন্টদের বের করে কেন্দ্র দখল করে নেয়।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, ভোট কারচুপি, প্রভাব বিস্তার, এজেন্টদের মারধর ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, নৌকা প্রতীকে ভোট দেয়ায় বাধ্য করাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে শাহজাদপুর পৌরসভার মেয়র পদে আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুর রহিম নির্বাচন বর্জন এবং বিএনপি প্রার্থী ও বর্তমান মেয়র নজরুল ইসলাম একই অভিযোগে বিকেল সোয়া ৩টায় নির্বাচন প্রত্যাখ্যান এবং পুনরায় নির্বাচনের দাবি জানান। এ ছাড়া জালভোট দেয়া নিয়ে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে আটজন আহত হয়েছেন। এ সময় দু’টি বাড়ি ও একটি তাঁত কারখানা ভাঙচুর করা হয়।
গুরুদাসপুর (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, গুরুদাসপুর পৌর নির্বাচনে ১২টি কেন্দ্রের মধ্যে চাঁচকৈড় গারিষাপাড়া জামিয়াতুল ইসলামিয়া মাদ্রাসা কেন্দ্রের সামনে ভোট শুরু হওয়ার এক ঘণ্টা পরেই স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী আমজাদ হোসেনের নারিকেল গাছ প্রতীকের পোলিং এজেন্ট শাহিন (৪৮) ও জিয়ারুল (২৮) কে মারধর করে কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছে আ’লীগ মেয়র প্রার্থীর সমর্থকেরা। খবর পেয়ে টহলরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহত শাহিনকে গুরুদাসপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নেয়া হয়েছে।
ফুলপুর (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, ফুলপুর পৌরসভা নির্বাচনে ব্যালট পেপার ছিনতাই ও প্রতিপক্ষের হামলায় এক কাউন্সিলর প্রার্থী আহত হয়েছেন। ফুলপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে মেয়র প্রার্থীর ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। অপর দিকে ফুলপুর পাইলট উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে হামলায় ৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. রফিকুল ইসলামসহ পাঁচজন আহত হয়েছেন।
হোমনা (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, হোমনায় দু’জন মেয়র প্রার্থী এবং দুই কমিশনার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে চার পুলিশসহ ১০ জন আহত হয়েছেন।
চান্দিনা (কুমিল্লা) সংবাদদাতা জানান, কুমিল্লার চান্দিনায় জালভোট দেয়ার অভিযোগে আব্দুল মবিন (৫২) নামে এক ব্যক্তিকে ৬ মাসের কারাদণ্ড ও নাজমুল হাসান (১৭) নামে এক তরুণকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।