Sunday, December 8, 2019

মানুষের জন্য উৎসর্গিত যে নারীর জীবন by মাহমুদুর রহমান

চিকিৎসা, মানুষের একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য সে অধিকার বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে সে কাজটি অনেক ক্ষেত্রেই বেশি সম্পন্ন হয়েছে। এবং এর পেছনে কাজ করছে কিছু মানুষের মানবিক অবদান। তেমনই একজন হলেন জহিরন।

জহিরন বেওয়া নামের এই নারীর বয়স বার্ধক্যে পৌঁছেছে বহুদিন আগে। তবুও একটি সাইকেল নিয়ে তিনি ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামে। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামে চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা এখনও নেই। বেশীরভাগ চিকিৎসক এবং চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট মানুষেরা শহরেই বাস করেন। তাই মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ যেখানে বাস করে, সেই গ্রামগুলোয় চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেন জহিরনের মতো মানুষেরা।

গত ৪৬ বছর ধরে মানুষের ঘরের দরজায় চিকিৎসা নিয়ে যাচ্ছেন জহিরন। ১৯৭৩ সালে নার্সিং এর ট্রেনিং নিয়ে তিনি তাঁর কাজ শুরু করেন। নারী হিসেবে স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর কাজ ছিল নারী, শিশু, প্রসূতি সম্পর্কিত। নারীরা অনেকাংশেই অবহেলিত। সেক্ষেত্রে তাদের ঘোরে গিয়ে প্রসূতি পরিচর্যা, শিশুরোগ সম্পর্কে ভালোমন্দ বলা ছিল জহিরনের কাজ। চিকিৎসার প্রাথমিক প্রয়োজন, সহজ কিছু ঔষধ সঙ্গে নিয়ে ছিল তাঁর প্রতিদিনের পথ চলা।

জহিরনের সে পথ চলা চলছে আজও। এখন তিনি বৃদ্ধা। আগের মতো পায়ে হাঁটা তাঁর পক্ষে সম্ভব না। এবং অদ্ভুত হলো, যে দেশে শহরের মেয়েরা স্কুটি চালালে এখনও ‘লোকে কি ভাববে?’ বলে চিন্তায় ভোগে, জহিরন সে দেশের গ্রামে সাইকেল চেপে বেড়ান। একটি সাইকেল নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের যাত্রা। প্রতিদিন তিন চারটি গ্রামে গিয়ে রোগী দেখেন তিনি। জহিরন বলেন, ‘পায়ে হেঁটে চার পাঁচটা গ্রামে ঘোরা পরিশ্রমের, সময়ও বেশি লাগে। তাই ’৯২ সালে ১২০০ টাকায় একটা সাইকেল কিনেছিলাম। সে সাইকেল আজও আমার সঙ্গী”।

জহিরন তাঁর সাইকেল নিয়ে এই বয়সেও ১৫ থেকে বিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেন। সকাল থেকে তাঁর এই যাত্রা শুরু হয়। তিনি সাধারণ ঠাণ্ডা, জ্বর, উদরাময়ের ওষুধ দিয়ে থাকেন। প্রতিদিন প্রায় ১৫/২০ জন রোগী দেখেন। বহুদিনের কাজে তিনি সব গ্রামের সকলের কাছেই পরিচিত। পথে তাঁকে দেখলে সবাই কুশল প্রশ্ন করে। সাইকেল চেপে সেবা দেওয়া নারী জহিরনের নাম হয়েছে ‘বাংলা নানী’। সকলের ভালোবাসার নানী সে।

এই হলো আমার বাংলাদেশ। এখানে অনেক সোনার মানুষ পাওয়া যায়, একটু খুঁজলেই দেখা মেলে তাদের। জহিরন কোন বড় ডিগ্রিধারী ডাক্তার নন, কিন্তু তাঁর ওইটুকু সেবা অনেকের জন্য অনেক বড় অবদান। মানসিক বল সৃষ্টি করে। মানুষের মাঝে সচেতনতা আর শক্তি জাগিয়ে তুলছেন জহিরন। কাজ করে চলেছেন অক্লান্তভাবে। বয়সের ভারে এখন ক্লান্ত হলেও তিনি কাজ করে চলেছেন। জহিরন বলেন, “আমার ছেলে, ছেলে-বউ আমাকে ঘোরে বিশ্রাম নিতে বলে। কিন্তু আমি জানি আমি সুস্থ আছি আমার কাজের মধ্য দিয়ে। আমি মানুষের সেবা করি, আরও করতে চাই। আমি ওদের ‘নানী’ হয়ে থাকতে চাই”।
>>>নতুন বার্তা ডট কম

নাৎসি যুগে বন্দীদের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে রচিত এনাটমি বই এখনো চলছে

অপারেশন করতে গিয়ে জরুরি মুহূর্তে বিংশ শতকের একটি এনাটমি গ্রন্থের সহায়তা নেন নার্ভ সার্জন ড. সুজান মেককিনন।
গ্রন্থটির সহায়তা তিনি প্রায়শই নিয়ে থাকেন। হাতে আঁকা জটিল সব চিত্র সম্বলিত এই গ্রন্থে রয়েছে মানব দেহের বিস্তারিত খুঁটিনাটি। রয়েছে পরতের পর পরতে আঁকা মানব শরীরের সচিত্র উপস্থাপন।
'পার্নকপ্ফ টোপোগ্রাফিক এনাটমি অফ ম্যান' বা পার্নকপ্ফ প্রণীত মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সচিত্র বিবরণ সম্বলিত এই গ্রন্থটিই দুনিয়ার সেরা সচিত্র এনাটমি পুস্তক হিসেবে বিবেচিত।
মানবদেহের চামড়া, পেশী, শিরা-উপশিরা, স্নায়ু, দেহের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ ও হাড় চিত্রের সাহায্যে বিস্তারিত ভাবে এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
কিন্তু পার্নকপ্ফের বইটি এখন আর বাজারে নেই। তাই, কয়েক খণ্ডে প্রকাশিত এই গ্রন্থের পুরনো একটি সেট নিজের সংগ্রহে রাখতে এমনকি কয়েক হাজার পাউন্ড খরচ করতেও দ্বিধা করেন না আগ্রহীরা।
চড়া মূল্যের এই গ্রন্থ কেউ কেউ ক্লিনিকে, গ্রন্থাগারে বা বাড়িতে সাজিয়ে রেখে প্রদর্শন করে।
এই বইয়ের আছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস। নাৎসিদের হাতে নিহত ব্যক্তিদের দেহ ব্যবচ্ছেদ করে গবেষণালব্ধ ফল সন্নিবেশিত হয়েছে এই গ্রন্থের হাজার-হাজার পৃষ্ঠা জুড়ে।
সমালোচকেরা মনে করেন, গ্রন্থটির যেহেতু কালো ও মর্মান্তিক এক ইতিহাস রয়েছে তাই এটি ব্যবহারের প্রসঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত।
ড. মেককিনন বলছিলেন, বইটির ইতিহাস তাকে অস্বস্তি দেয়। কিন্তু এই বইয়ের সহায়তা ছাড়া অনেক সময় সে নির্ভুলভাবে কাজই করতে পারে না।
মানবদেহের চামড়া, পেশী, শিরা-উপশিরা, স্নায়ু, দেহের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ ও হাড় চিত্রের সাহায্যে বিস্তারিত ভাবে এতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় গণহত্যা থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি রাব্বি জোসেফ পোলক। হেলথ ল বিষয়ের এই অধ্যাপক পার্নকপ্ফের এই গ্রন্থটিকে একটি 'মোরাল এনিগমা' বা 'নৈতিক ধাঁধা' হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অধ্যাপক পোলকের মতে, গ্রন্থটিকে নৈতিক প্রহেলিকা বা ধাঁধা হিসেবে বর্ণনা করার কারণ হচ্ছে, বইটির একদিকে রয়েছে এক জঘন্য ইতিহাস, অন্যদিকে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে মানুষের কল্যাণে।
নাৎসিবাদী খ্যাতিমান ডাক্তার এডুয়ার্ড পার্নকপ্ফের ২০ বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প ছিল এই এনাটমি গ্রন্থ।
সহকর্মীদের ভাষ্যানুযায়ী, পার্নকপ্ফ ছিলেন নাৎসিবাদের উগ্র সমর্থক। এমনকি কর্মস্থলেও তিনি রোজ নাৎসি ইউনিফর্ম বা উর্দি পরে যেতেন।
তাকে যখন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল স্কুলের ডিন পদে নিয়োগ দেয়া হয় তখন তিনি সকল ইহুদি সহকর্মীদের বরখাস্ত করে দেন। বরখাস্তদের মধ্যে এমনকি তিনজন নোবেল বিজয়ীও ছিলেন।
১৯৩৯ সালে নতুন একটি আইন প্রণয়ন করে বলা হয়, বন্দীদেরকে হত্যা করার পরপরই গবেষণা ও শিক্ষা কাজের জন্য তাদের দেহগুলোকে নিকটস্থ এনাটমি বিভাগে জমা দিতে হবে।
সেই সময় ড. পার্নকপ্ফ দিনে ১৮ ঘণ্টা করে কাজ করতেন। মৃতদেহগুলো একের পর এক ব্যবচ্ছেদ করতেন। আর তার সাথেই থাকতো একদল আঁকিয়ে। তারা সেগুলোর ছবি আঁকতো।
মৃতদেহ দিয়ে এনাটমি বিভাগগুলো কখনো-কখনো উপচে উঠতো। বিভাগগুলোতে আর মৃতদেহের স্থান সংকুলান হবে না দেখে এমনকি কখনো কখনো বন্দী-শিবিরগুলোতে হত্যাকাণ্ড সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. সেবিন হিল্ডাব্র্যান্ডট বলছিলেন, পার্নকপ্ফের গ্রন্থে যে ৮০০ চিত্র রয়েছে তার মধ্যে অন্তত অর্ধেকই এসেছে রাজনৈতিক বন্দীদের থেকে।
ব্রিটিশ লাইব্রেরীতে বইটির কয়েক খণ্ড আছে
এইসব বন্দীদের তালিকায় সমকামী নারী-পুরুষ, জিপসি, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ব্যক্তি ও ইহুদিরা ছিলেন।
এই এটলাসের প্রথম খণ্ডটি প্রকাশ হয় ১৯৩৭ সালে। বইটিতে ইলাস্ট্রেটর হিসেবে এরিখ লেপিয়ের ও কার্ল এন্ডট্রেসের স্বাক্ষর এবং স্বস্তিকা চিহ্ন রয়েছে।
এমনকি ১৯৬৪ সালে ইংরেজি ভাষায় দুই খণ্ডে গ্রন্থটির যে সংস্করণ বের হয় সেখানেও আদি স্বাক্ষর ও নাৎসি চিহ্ন ছিল। পরবর্তীতে নাৎসি চিহ্ন ঢেকে দেয়া হয়।
এই এনাটমি এটলাসের হাজার হাজার কপি দুনিয়া জুড়ে বিক্রি হয়েছিল এবং অনূদিত হয়েছিল পাঁচটি ভাষায়। বইটির মুখবন্ধে এটিকে 'দুর্দান্ত অঙ্কন সম্বলিত সচিত্র একটি অসাধারণ শিল্প' হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু একটি বারের জন্যেও উল্লেখ করা হয়নি এর পেছনের রক্তাক্ত অতীত।
১৯৯০ দশকের দিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা প্রথম প্রশ্ন করতে শুরু করে যে, এই গ্রন্থে যাদের ছবি অঙ্কন করা হয়েছে তারা কারা?
অতঃপর গ্রন্থটির কালো ইতিহাস প্রকাশ পাবার পর ১৯৯৪ সালের দিক থেকে বইটি আর বাজারে পাওয়া যায় না।
রয়্যাল কলেজ অফ সার্জন্স বলেছে, গ্রন্থাগার বা ইতিহাসের প্রয়োজন ছাড়া ইংল্যান্ডে গ্রন্থটি ব্যবহার করা হয় না।
তবে, নিউরোসার্জারি করেন এমন নার্ভ সার্জনদের মধ্যে করা সাম্প্রতিক এক জরিপে ফলে দেখা যাচ্ছে, ৫৯% ডাক্তারই বইটির অতীত সম্পর্কে জানে। আর জেনেও ১৩% ডাক্তারেরা বইটি ব্যবহার করছে।
জরিপে অংশ নেয়া সার্জনদের মধ্যে ৬৯% বলেছেন, বইটির ইতিহাস জানার পরো তাদের সেটি ব্যবহার করতে অস্বস্তি হয় না।
কিন্তু ইতিহাস জানার পর গ্রন্থটি ব্যবহারে ১৫% সার্জনের অস্বস্তি বোধ হয় বলে জানা গেছে। আর এই গ্রন্থের ব্যবহার নিয়ে বাকি ১৭% সার্জনের অনুভূতি অস্পষ্ট অর্থাৎ নিজেদের মত নিয়ে তারা রয়েছেন সিদ্ধান্তহীনতায়।
নাৎসিবাদী খ্যাতিমান ডাক্তার এডুয়ার্ড পার্নকপ্ফের ২০ বছর মেয়াদী একটি প্রকল্প ছিল এই এনাটমি গ্রন্থ
ড. মেককিনন বলছিলেন, জটিল অপারেশনের ক্ষেত্রে ছোটো ছোটো নার্ভ খুঁজে পেতে বইটি দারুণ সহায়ক। তবে, এই বইয়ের সহায়তা নিলে তিনি গ্রন্থটির অন্ধকার অতীত সম্পর্কে সকলকে জানিয়ে নেন বলে উল্লেখ করেন।
বইটির ব্যবহার নিয়ে গত বছর এক ধরণের মতৈক্যে পৌঁছান রাব্বি পোলক এবং চিকিৎসা ইতিহাসবিদ ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মাইকেল গ্র্রোডিন।
তারা বলেন, মানুষের জীবন বাঁচানোর স্বার্থে গ্রন্থটির ব্যবহার হতে পারে। তবে, এই এটলাসের অন্ধকার ইতিহাস সম্পর্কে অবশ্যই অপারেশনের আগে সকলকে জানাতে হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পার্নকপ্ফকে গ্রেফতার করা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বরখাস্ত করা হয়। যুদ্ধবন্দী হিসেবে তিন বছর তিনি হাজতবাসও করেন। কিন্তু পরে তার বিরুদ্ধে আর কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি।
পরে তিনি মুক্তি পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে এসে পুনরায় এনাটমি গ্রন্থের কাজে মনোনিবেশ করেন এবং ১৯৫২ সালে তৃতীয় খণ্ড প্রকাশ করেন।
১৯৫৫ সালে গ্রন্থটির চতুর্থ খণ্ড প্রকাশের ঠিক আগে-আগে তিনি মারা যান।
এনাটমি এটলাস প্রকাশের পর কেটে গেছে ৬০ বছরের অধিক কাল। অথচ মানব শরীরের অঙ্গ ব্যাবচ্ছেদ বিষয়ে এখনো এটিই সেরা সচিত্র গ্রন্থ বলে মনে করেন এনাটমির শিক্ষক ড. হিল্ডেব্র্যান্ডট।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োএথিস্ট ড. জোনাথন আইভিস বলছিলেন, এই গ্রন্থে রয়েছে বিস্ময়কর বিশদ চিত্রাবলী। কিন্তু এই বইয়ে লেগে আছে এক ভয়ানক ইতিহাস।
তাই, এই গ্রন্থ ব্যবহার করে উপকার বা সুবিধা নিলে সেই অন্যায়কেই কোনো না কোনোভাবে সমর্থন করা হয় বলে তিনি মনে করেন।
তবে, ব্যবহার না করলে গ্রন্থটি যে হারিয়ে যাবে সে বিষয়ে তিনি উল্লেখ না করে পারেন না।
আর ড. মেককিননের মতে, চিকিৎসা ও শিক্ষার সুবিধার জন্য যে উপকরণই পাওয়া যায় তিনি সেটির সহায়তা নেওয়ার পক্ষে।
তাছাড়া তিনি মনে করেন, এই এনাটমি এটলাস যদি কালের গর্ভে হারিয়ে যায় তাহলে নার্ভ বা স্নায়ুর অপারেশনের সুবিধাদি যেনো বহুযুগ পিছিয়ে পড়বে।
ড: সুশান ম্যাককিনন

আমি রঘু রাই নই, আমি আমার মতো কাজ করব: অবনী রাই by দুর্গানন্দ বাল সাভার

অবনী রাইয়ের চলচ্চিত্র ‘রঘু রাই: অ্যান আনফ্রেমড প্রোর্টেট’-এ তার বাবার অভিজ্ঞতাই তুলে ধরা হয়েছে। অন্যতম এই শ্রদ্ধাভাজন ফটোগ্রাফার গত ৫ দশক ধরে ভারতের ইতিহাস ধরে রেখেছেন। চেন্নাই ফটো বাইএনিয়ালের অংশ হিসেবে চলতি বছরের প্রথম দিকে গোটে-ইনস্টিটিউট/ম্যাক্স মুলার ভবনে একটি প্রদর্শনীর জন্য বাবা আর মেয়ে ছিলেন চেন্নাই।
কারো বাবাকে নিয়ে তৈরী চলচ্চিত্র দ্ব্যর্থবোধক হতে পারে, কারণ এতে নির্দিষ্ট নির্লিপ্ততার প্রয়োজন পড়ে। আইডিয়াটি কিভাবে সামনে এলো?
আমি আসলে আমার বাবাকে নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরী করার কোনো পরিকল্পনা করিনি। বাসায় কয়েকটি ক্যামেরা ছিল, আমি সেগুলো দিয়ে চলচ্চিত্র বানাতে শুরু করি। আমি নিজের জন্যই ছবি তুলছিলাম, চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো আইডিয়া ছিল না। তার ছবি তোলার সময় তিনি আমাকে হয় সংশোধন করে দিচ্ছিলেন, কিংবা বলছিলেন যে এটা আমার সময়ের অপচয় মাত্র। আমি তখন মুম্বাইয়ে সাংবাদিকতার কোর্স করছিলাম। চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো ভাবনা আমার মনে ছিল না কখনোই। কয়েক বছর পর আইডিয়াটি মাথায় এলো। আমি যদি নিজের মতো করে করি, ততক্ষণ আমাকে সমর্থন দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন অনুরাগ কশ্যপ। এক ফিনিশ প্রডিউসার, এক ডাচ এডিটর ও এক অস্ট্রিয়ান ডিস্ট্রিবিউটরকে পাওয়ার পরই রঘু রাই গুরুত্ব দিয়ে সামনে স্থান পেল।
রাইয়ের ফটোগ্রাফিক পর্বটি ৫ দশকের বেশি সময় স্থায়ী। এর সাথে জড়িয়ে আছে ভারতের অকথিত ইতিহাস। এটি ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা ও দালাই লামার স্মৃতিকথাও।
ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তার খুবই ভিন্ন সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে একদিকে যেমন ছিল ঘনিষ্ঠতা, আবার ছিল দূরত্বও। তিনি সবসময় মনে করতেন, একটি ছবিকে অবশ্যই সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আমি যখন আজকের দৃশ্যপটে ওই পর্যায়টির দিকে তাকাই, তখন … আমার কাছে রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানে যে প্রটোকল আর সিকিউরিটি আছে, তাতে করে মনে হয় না, আমি একই কাজ করার চেষ্টা করতে পারব।
আমাদের সময় মনে হচ্ছে, আমরা পেছনে হটছি। সাংবাদিকতার প্রয়োজন শ্রদ্ধাভাজন হওয়া, অনেক বেশি উদ্দেশ্যপূর্ণ হওয়া, দায়িত্বশীল হওয়া। আমরা এখন প্রচারণা, অতিরঞ্জন, ভুয়া প্রপাগান্ডা, বায়োপিক, আর বলিউড-ধরনের সংবাদের যুগে বাস করছি। ১৯৭০-এর দশকে, তখনো আমার জন্ম হয়নি, অবস্থা ছিল ভিন্ন। ওই সময়কার মিডিয়া আজকের চাকচিক্যে আচ্ছন্ন ছিল না।
এই চলচ্চিত্রটি আমার চোখে দেখা বিষয়। তবে মনে রাখতে হবে, গত ৫ দশকে তিনি যেভাবে ভারতকে দেখেছেন, আমি সেভাবে দেখিনি। তবে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এটি হবে ব্যক্তিগত চলচ্চিত্র। এটা কেবল রঘু রাইকে নিয়ে নয়, বরং আমি তাকে কিভাবে দেখেছি, সেটাও এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এতে আমি যেভাবে তাকে, ভারতকে দেখি, তা প্রকাশ পেয়েছে। এতে অনেক ঘটনার স্তর আছে- ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, দালাই লামারদের জীবন এসেছে। কাশ্মিরকে প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। আর তাই আমার মনে হয়েছে, আমার দায়িত্ব ক্যামেরার মাধ্যমে বাস্তবতা তুলে ধরা।
মাদার তেরেসা ও দালাই লামার সাথে রাইয়ের খুবই আলাদা সম্পর্ক ছিল।
দালাই লামা ও মাদার তেরেসার সাথে তার সাক্ষাত না হলে আমি মনে করি, তাকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে দেখা হতো। আমরা যেভাবে দেখি, জীবনকে বুঝি, তার রাস্তা বদলে দিয়েছে তা।
ফটোগ্রাফারের নথিতে যখন যুদ্ধ, নাগরিক আন্দোলন, বা বিপর্যয় সামনে আসে, তখন একটা দ্ব্যর্থবোধকতা চলে আসে। রাই অনেক সময় নিজেকে রাস্তার ফটোগ্রাফার বলতেন। একজন ফটোগ্রাফারের আকাঙ্ক্ষা থাকে কাছে যাওয়ার, আবার তাকে সঙ্ঘাতের ইতিহাসও দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরতে হয়।
এসব জটিল পরিস্থিতিতে তিনি তার ভূমিকাকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার চেষ্টা করেছেন। তিনি প্রায়ই লোকজনকে সহায়তা করতেন। আবার সত্যকে তুলে ধরার দায়িত্বেও বিশ্বাস করতেন। অনেক সময় তিনি এমন স্থানে চলে যেতেন, তখন আশপাশে থাকত চিকিৎসকেরা। তখন তিনি চিকিৎসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন। আবার কাশ্মিরে তার আশপাশে কেউ থাকত না, তিনি সঙ্ঘাতের মুহূর্তে লোকজনের কাছে চলে যেতেন।
পরিস্থিতির প্রতি স্পর্শকাতর থাকার সময় তোমাকে একটি বিকল্প বেছে নিতে হবে। একজন ফটোগ্রাফারকে বিশ্বের অবশিষ্ট অংশের চোখ হওয়ার দায়িত্বশীল হতে হবে।
অনুরাগ কশ্যপ বলেন, ১৮ বছর বয়সে তুমি আসলে তোমার বাবাকে বুঝতে পারো না। আর চলচ্চিত্র নির্মাণ করার প্রক্রিয়ায় তুমি রাইকে ভিন্নভাবে দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছ।
আমার বাবা নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছেছেন এবং তিনি নিজেকে নিয়ে নিশ্চিত। আর আমি যখন এই চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করছি, তখন আমার বয়স ১৮ বছর। আমার জীবনে অনেক কিছু ঘটছে। ক্যামেরা চালানোর সময় ভিউফাইন্ডার দেখতে হবে, অন্য কোনো বিকল্প থাকবে না। তুমি যখন তোমার বাবাকে ভিউফাইন্ডার দিয়ে দেখবে, তখন স্বাভাবিক চোখে ধরা পড়ে না, এমন অনেক কিছু সহজাতভাবেই দেখা হয়ে যাবে।
আমি মনে করি, ব্যক্তিগতভাবে ও পেশাগতভাবে- উভয় দিক দিয়েই পরিবর্তন হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে যখন কিশোর থেকে প্রাপ্তবয়সে পরিবর্তনের সময় আবেগের কারণে এমনটা ঘটা স্বাভাবিক। কিন্তু পেশাগতভাবে এমন একটি বিদ্রোহ ছিল, যেখানে আমার বাবা আমাকে জোর দিয়ে কিছু বলতেন, অথচ আমি সেভাবে কাজ করতে চাইতাম না। আমি রঘু রাই নই, আমি আমার মতো করে কাজ করব। এ কারণে আমাকে পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। আমি কী চাই, সেটা আমাকে বের করে নিতে হয়েছে। আমাদের মধ্যে মিল কোথায় আছে, কোথায় কোথায় অমিল আছে, এবং আমাদের জীবন সম্পর্কে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিও চূড়ান্ত করতে হয়েছে।
ভবিষ্যত কোথায়?
চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার সময় আমার নিজের মধ্যেই কিছু করার অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল। আমি নতুন করে শুরু করতে পারতাম। আমার বাবা সম্পর্কে আমার যা কিছু বলার ছিল, সবই বলেছি। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আমি ঘনিষ্ঠভাবে তাকে দেখিছি। হয়তো অনেকে তার সম্পর্কে আরো গবেষণাপূর্ণ ডকুমেন্টারি নির্মাণ করবে। তবে তা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমার একটি ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। ফলে আমার জন্য এটি আমার মনের একটি পরিষ্কার স্লেট নতুন করে শুরু করার জন্য। এরপর কী করতে হবে, এবং তা আমি কিভাবে করতে পারি, সে ব্যাপারে আমি স্বাধীন।