Monday, March 19, 2018

ভারতে বিরোধীদের ফেডারেল ফ্রন্ট গঠনের তোড়জোড় শুরু

একের পর এক উপনির্বাচনে বিজেপির ম্যাজিক দ্রুত বিলীন হওয়ায় ভারতের বিরোধী রাজনীতিকরা আগামী ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে উজ্জিবীত হয়ে উঠেছে। আর তাই বিরোধী জোট গড়ার লক্ষ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগেই গুজরাটের প্যাটেল নেতা হার্দিক প্যাটেল এসে কলকাতায় তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করে গিয়েছেন। আর সোমবার কলকাতায় এসে জোট গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়েছেন তেলেঙ্গান মুখ্যমন্ত্রী ও তেলেঙ্গানা রাষ্ট্র সমিতির নেতা কে চন্দ্রশেখর রাও। এদিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠকের শেষে রাও বলেছেন, আগামী সাধারণ নির্বাচনের আগে ফেডারেল ফ্রন্ট গঠনের ভাল সূচনা হয়েছে। গত ৪ঠা মার্চ রাও প্রথম বিজেপির উত্থান ঠেকাতে আঞ্চলিক দলগুলিকে নিয়ে জোট গড়ার ডাক দিয়েছিলেন।  তিনি বলেছেন, অ-কংগ্রেসি এবং অ-বিজেপি ফ্রন্ট গঠনে সকলের এগিয়ে আসা উচিত । তিনি আরও জানিয়েছেন, সমস্ত ক্ষমতা রাজ্য সরকারগুলির হাতে তুলে দেওয়া উচিত। কেন্দ্রের হাতে সীমিত ক্ষমতাই শুধু থাকবে। আর একমাত্র তখনই দেশ এগিয়ে যেতে পারবে । তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতাও অনেক দিন ধরে বিজেপি বিরোধী জোট গঠনের প্রযোজনীয়তার কথা বলে আসছেন। বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের নেতাদের সঙ্গে তিনি এ ব্যাপারে নিয়মিত কথাও বলছেন। তবে রাওয়ের ঘোষণার পরই মমতা তাকে সমর্থন জানিয়েছেন। এক সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারেও মমতা রাওকে আশ্বাস দিয়েছেন। এদিন রাওয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর মমতা বলেছেন, রাজনীতিতে কখনো কখনো পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে সকলকে এগিয়ে এসে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। রাও বলেছেন, দেশের এখন পরিবর্তন প্রযোজন। আমাদের এজেন্ডাই হল দেশের উন্নয়ন। এসব নিয়েই মমতার সঙ্গে কথা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এদিকে রাও কলকাতায় মমতার সঙ্গে বৈঠক করার আগেই অন্দ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও তেলেগু দেশ পার্টির নেতা চন্দ্রবাবু নাইডুও মমতাকে ফোন করে তার সঙ্গে আলোচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আসলে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী নোট বাতিল থেকে শুরু করে সমস্ত বিষয়ে বিজেপির বিরোধীতায় সরব হয়েছেন। তিনি ধারাবাহিক ভাবে বলে আসছেন যে, এবার আমাদের লক্ষ্য দিল্লির লালকেল্লøা। তার নেতৃত্বে শক্তিশালী বিরোধী জোট গড়ে তোলার ব্যাপারে অনেকেই তৎপরতা শুরু করে দিয়েছেন। বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিজেপির সাবেক নেতা রাম জেঠ মালিনী তো ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রধান নায়িকা বলে মমতাকে অভিহিত করেছেন। তিনি বিজেপিকে উৎখাত করতে মমতার নেতৃত্বে তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের পক্ষে মত প্রকাশ করেছেন। এমনকি মমতাই ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে তিনি মত প্রকাশ করেছেন। শিবসেনাও মমতাকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স¤ভাব্য প্রার্থী বলে জানিয়েছে। বিজেপির জোটের শরিক হওয়া সত্ত্বেও শিবসেনা প্রধান রাজ ঠাকরে ইতিমধ্যেই বিজেপি মুক্ত ভারতের ডাক দিয়েচেন। তেলেগু দেশ পার্টি ইতিমধ্যেই বিজেপির নেতৃত্বাধীর এনডিএ জোট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছেন। লোক জনশক্তি পার্টির নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রামবিলাস পাশোয়ান বিজেপি জোটে স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করছেন না সেটা মাঝে মাঝেই বলেছেন। এমনকি বিজেপিতে ধর্মনিরপেক্ষ নেতা রয়েছে কিনা সেই প্রশ্নও তুলেছেন। অন্যদিকে কংগ্রেস বাস্তব পরিস্থিতে যে কোনও জোটকে সমর্থন জানানোর মত অবস্থান নিতে দ্বিধা করবে না বলে দলের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে সভাপতি রাহুল গান্ধী ইঙ্গিত দিয়েচেন। স্বাভাবিক ভাবেই বিরোধী জোটের পালে হাওয়া যত বাড়বে ততই বিজেপি অন্দরে আশঙ্কা পল্লবিত হবে।

বৃটেনে আতঙ্কে মুসলিম শিক্ষার্থীরা

বৃটেনে আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছেন মুসলিম শিক্ষার্থীরা। কলেজ বা ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া এসব শিক্ষার্থী নানারকম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ক্যাম্পাসেই প্রতি তিনজন মুসলিম শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন এমন নির্যাতন বা হামলার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব যুবতী মুসলিমদের প্রথা অনুযায়ী হিজাব বা বোরকা পরেন তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে বেশি শঙ্কিত। মুসলিম একজন যুবতী তো কান্নায় ভেঙেই পড়েছেন। তিনি এখন নিজেকে অনিরাপদ মনে করেন। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকে টার্গেট করা হয়েছিল। দ্য ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস (এনইউএস)-এর চালানো এক জরিপে এসব তথ্য ফুটে উঠেছে। তারা ওই জরিপ শেয়ার করেছে লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের সঙ্গে। এতে বলা হয়েছে, অর্ধেকের বেশি মুসলিম শিক্ষার্থী হয়রানি অথবা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অনলাইনে। এক তৃতীয়াংশ বলেছেন, তারা তাদের কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েই অপরাধ বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শতকরা ৭৯ ভাগ শিক্ষার্র্থী মনে করেন তারা শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে তাদেরকে টার্গেট করা হয়। তারা বলেছেন ধর্মীয় বিশ্বাসকে আঘাত করার জন্যই এমনটা করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে ঘৃণ্য কথাবার্তা বলা হয়। ঘৃণ্য সংকেত দেয়া হয়। ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতির জন্য এমন আচরণ করা হয় বলে মনে করেন তারা। বিশেষ করে যেসব নারী হিজাব, নিকাব বা বোরকা পরেন তারা বেশি উদ্বিগ্ন। সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন ফাতিমা দিরিয়ি। তিনি দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে বলেছেন, দু’জন ছাত্র আমার ছবি তুলেছে। তারা আমার বোরকার ওপর একটি ছবি আঁকে। সেই ছবিটি যৌনতা সংক্রান্ত। তারা প্রথমে আমার একটি ছবি আঁকে। কারণ আমি বোরকা পরি। তারপর তারা আমার আঙ্গুল ব্যবহার করে আপত্তিকর একটি মন্তব্য লেখে। এতে আমি অনিরাপদ মনে করছি। বাস্তবেই হতাশ হয়ে পড়েছি। তাদের এমন আচরণ দেখে আমি কেঁদেছি। অন্য একটি ঘটনা উল্লেখ করেন ফাতিমা। তিনি বলেন ছাত্রদের ইউনিয়নের কর্মকা-ের এক অনুষ্ঠানে আমাকে আমার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার জন্য ডাকা হলো। সেখানে হঠাৎ একজন আমাকে বললেন, তুমি একজন মুসলিম নারী। তুমি কেন এখানে কথা বলতে এসেছো? তুমি কি এমনিতেই যথেষ্ট নির্যাতিত মনে কর না?
২২ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী বলেন, বৃটেনে সন্ত্রাসী হামলার পর তিনি নিজেই চলাফেরা, আচার আচরণ নেকটা পরিবর্তন করে ফেলেছেন। কারণ, ইসলামভীতি থেকে হামলার আশঙ্কা কমিয়ে আনা। নতুন ওই জরিপে আরো দেখা গেছে বৃটেনজুড়ে মুসলিমরা ক্রমবর্ধমান হারে হেট ক্রাইম বা জাতিবিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। গত বছরে প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বৃটেনজুড়ে মসজিদকে টার্গেট করে হেট ক্রাইম দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফেইথ ম্যাটারস নামের সংগঠনের পরিচালক ফাইয়াজ মুঘল এনইউএস-এর নতুন জরিপ রিপোর্টকে উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনিও মনে করেন ইসলামভীতি থেকে এমন অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার ভাষায়, ২০১২ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে মুসলিমবিরোধী কথাবার্তা, অবমাননা ও নির্যাতন অধিক হারে দেখা যাচ্ছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে যুবক বা যুবতীদের মধ্যে আতঙ্ক আগের চেয়ে বেড়েছে। তারা এখন আর তাদেরকে নিরাপদ মনে করেন না। রিপোর্টে বলা হয়েছে, বৃটেনে শতকরা ৪৩ ভাগ মুসলিম শিক্ষার্থী মনে করেন, তাদের ক্লাসে সন্ত্রাস নিয়ে আলোচনা করা আর স্বস্তির বিষয় নেই। যেসব কারণে তারা নির্যাতিত হচ্ছেন তা নিয়ে আলোচনা করার মতো কোনো স্থান নেই ক্লাসে বা ক্যাম্পাসে।

বিশ্বের চতুর্থ দূষিত নগরী ঢাকা

বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর মধ্যে ঢাকা অন্যতম। বাতাসের গুণমত মাণের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত সূচকে এ কথা বলা হয়েছে। ওই সূচকটি প্রস্তত করেছে ইউএস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সি। ওই তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা হলো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর মধ্যে চতুর্থ। সূচক মূল্যায়ন যার ১৯৫। আর সবচেয়ে বেশি দূষিত নগরী হলো নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। এর মূল্যায়ন ২০৮। রোববার এ সূচক প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের ওই এজেন্সি। সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বায়ু দূষণ ঘন্টায় ঘন্টায় এমনকি দিন ভিত্তিতেও পরিবর্তন হয়। উল্লেখ্য, এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে একই সূচকে ঢাকা ছিল সবচেয়ে দূষিত শহর। তখন বাংলাদেশের মূল্যায়ন ছিল ৩৩৯। আর এখানকার বাতাসকে বলা হয়েছিল ‘ভেরি আনহেলদি’ বা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর। জনস্বাস্থ্যে ঝুঁকি বাড়ানো বুঝাতে ছয়টি ক্যাটেগরিতে এ সূচক প্রণয়ন করা হয়েছে। কোনো শহর যদি এই সূচকে ৩০০ অতিক্রম করে তাহলে সেখানকার বাতাসের গুণগত মানুকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে সূচকে কোনো শহর ৫০ এর নিচে স্কোর করলে তাকে দেখা হয় স্বাস্থ্য উপযোগী শহর অথবা সেখানকার বাতাস স্বাস্থ্যকর। ‘আনহেলদি’ বা অস্বাস্থ্যকর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে ১৫১ থেকে ২০০ পর্যন্ত স্কোরকে। সূচকে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাতাসের গুণগত যে মান বিরাজ করছে তাতে প্রত্যেকটি মানুষ বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। বিশেষ করে যেসব মানুষ বায়ু দূষণে স্পর্শকাতর তারা পড়তে পারেন ভয়াবহ দুর্ভোগে। স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশজ ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্ট দেখাচ্ছে যে, বাতাসের গুণগত মানের সূচক ঢাকায় গত ১১ই মার্চ ছিল ৫০১ স্কোরে। একই দিনে এই স্কোর গাজীপুরে ছিল ৩৩৮ এবং নারায়ণগঞ্জে ছিল ৩০৮। দেশে সব শহরের মধ্যে মার্চে সবচেয়ে বেশি বায়ু দূষণ রেকর্ড করা হয় নারায়ণগঞ্জে। সেই স্কোর ছিল ৫৩৮। চিকিৎসা বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক মৌসুমে বাতাসে সাধারণত ধুলোবালির পরিমাণ অন্য সময়ের তুলনায় ৫ গুন বৃদ্ধি পায়। নির্মাণ প্রতিষ্ঠান থেকে ছড়িয়ে পড়া ধুলোবালি, ময়লায় এই পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করে তোলে। শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে এসব ধুলোবালি শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। দেখা দিতে পারে ফুসফুসের নানা রকম রোগ। দেখা দিতে পারে ভাইরাল ও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ। স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশজ ডিপার্টমেন্ট অব এনভায়রনমেন্টের মতে, বর্ষা মৌসুমে বায়ু দূষণটা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে। উল্লেখ্য, গুণগত মানের দিক থেকে ০-৫০ পর্যন্ত স্কোরকে ভাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ৫১ থেকে ১০০ পর্যন্ত স্কোরকে মডারেট বা মাঝারি মানের ধরা হয়। ১০১ থেকে ১৫০ পর্যন্ত স্কোরকে সতর্কতামুলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৫১-২০০ পর্যন্ত স্কোরকে অস্বাস্থ্যকর বা আনহেলদি ধরা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ পর্যন্ত স্কোরকে অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর হিসেবে ধরা হয়। আর ৩০১ থেকে ৫০০ পর্যন্ত স্কোরকে ধরা হয় চরমভাবাপন্ন অস্বাস্থ্যকর হিসেবে।

প্রমোদ ভ্রমণে ইউএনও, তোলপাড়

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮ তম জন্ম দিবস ও জাতীয় শিশু দিবসে শনিবারের কর্মসূচি ফেলে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী সংগঠনের আমন্ত্রণে প্রমোদ ভ্রমণে কক্সবাজারে গিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস। তিনি সহ গুরুত্বপূর্ণ একাধিক কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে অব্যবস্থাপনায় দিবসের কর্মসূচি হ-য-ব-র-ল হয়ে যায়। আজ সোমবার পর্যন্ত ওই কর্মকর্তারা কক্সবাজারে অবস্থান করায় মধুপুরে তোলপাড় চলছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) অনুপস্থিতিতে রোববার ও সোমবার অফিসপাড়ায় ছিল ছুটির আমেজ। অনেকে সেবা নিতে এসে ঘুরে গেছেন। এ ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
সংবাদকর্মীরা গত তিনদিন অফিসপাড়ায় সরেজমিনে ঘুরে এর সত্যতা পেয়েছেন। ইউএনও না থাকায় সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস রোববারে ৭টি দপ্তরের প্রধান কর্মকর্তাও ছিলেন অনুপস্থিত। ঢিলেঢালাভাবে অফিস করেছেন কয়েকজন কর্মকর্তা। ঐদিন সকাল ১০ টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা সানজিতা নাসরীন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এম.এ রশিদ, উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তা বিদ্যুৎ কুমার দাস, উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. নুরুল ইসলাম, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা সাইদুর রহমান, উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা রথীন্দ্র নাথ চক্রবর্তী ছিলেন,অনুপস্থিত। তাদের অনেকের অফিসে ঝুলেছে তালা। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছা.আমিনা আক্তার অফিসে এসেছেন দুপুরের পর। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অফিসের দুইজন পিয়নও ছিলেন অনুপস্থিত। সোহেল রানা নামের এক পিয়ন অফিসে আসেন ১২ টা ২৫ মিনিটে। আজও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মোছা.আমিনা আক্তারসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা অনুপস্থিত ছিলেন।
উপজেলা প্রকৌশলী কর্মকর্তার অফিস সহায়ক মো. রফিকুল ইসলাম দুপুর ৩টার সময় জানান, সকাল থেকে স্যারের অপেক্ষায় বসে আছি, স্যার কখন আসবেন জানি না।
জানা যায়, শনিবারের শিশু দিবস পালনের প্রস্তুতি সভায় স্থান নির্ধারিত হয়েছিল জেলা পরিষদের মধুপুর অডিটরিয়ামে। পৌর এলাকার অন্তত ৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আনন্দ র‌্যালি শেষে গতবারের মতো অডিটরিয়ামে আলোচনায় যোগ দেয়ার কথা। কিন্তু র‌্যালি শেষে আলোচনা সভার স্থান নিয়ে বিপাকে পড়ে ওইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক শিক্ষার্থীগণ। খোঁজ খবর নিয়ে জানেন,আলোচনা সভা হচ্ছে মধুপুর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে । জেনে অনেকে র‌্যালি শেষ করে ফিরে যান। মাত্র শহীদ স্মৃতি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মধুপুর কলেজের অল্প শিক্ষার্থী হল রুমে বসার সুযোগ পান। সাউন্ড সিস্টেম প্রস্তুত না থাকায় বিপত্তি ঘটে অনুষ্ঠান শুরু নিয়ে। আধ ঘণ্টা পরে শুরু হলেও সেখানে অনুপস্থিত মধুপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস। খোঁজ নিয়ে জানা গেল তিনি মধুপুর ট্রাক মালিক সমিতির আহবানে তাদের কক্সবাজেরের প্রমোদ ভ্রমণে যোগ দিয়েছেন। ঢাকা থেকে বিমানে তিনি গন্তব্যে রওনা দিয়েছেন। ইউএনওর প্রমোদ ভ্রমণে সঙ্গী হয়েছেন,উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সরোয়ার আলম খান আবু। প্রমোদ ভ্রমণে অংশগ্রহণকারী এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি বাপ্পু সিদ্দিকী জানান, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠান ফেলে তিনদিন ব্যাপী ইউএনও’র প্রমোদ ভ্রমণ সত্যিই লজ্জাজনক ব্যাপার। তিনি আরও জানান,শনিবারের শিশু দিবসের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। উপজেলা চেয়ারম্যানের পরিবর্তে ছিলে ভাইস চেয়ারম্যান। পরে জানতে পারলাম তারা ট্রাক মালিক সমিতির আমন্ত্রণে কক্সবাজারে প্রমোদ ভ্রমণে গিয়েছেন।
এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো.মাহবুবুল হক সাংবাদিকদের মোবাইলে জানান, ইউএনও স্যার ছুটিতে আছেন। রোববার যে ৭ জন কর্মকর্তা অনুপস্থিত ছিলেন,তা আমার জানা নেই। আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।
উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা রমেন্দ্র নাথ বিশ্বাস প্রমোদ ভ্রমণের কথা স্বীকার করে মুঠোফোনে সাংবাদিকদের জানান,আমার ছেলে অসুস্থ ছিল বলে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠান শুরু করে দিয়ে এসেছি। পরে ঢাকায় এসে সুযোগ পেয়েছি তাই স্বপরিবারে বিমানে কক্সবাজার এসেছি।

কাটা চুলে কোটি টাকার ব্যবসা

বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের মাথার চুল বিশেষ করে মেয়েদের ঝরে পড়া চুল সংগ্রহ করার ঘটনা নতুন নয়। তার ওপর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিউটি পার্লারগুলোতে কিংবা সেলুনে প্রতিনিয়ত কাটা হচ্ছে বহু মানুষের চুল। আর এসব ফেলনা চুল দিয়েই আসছে টাকা।
শুধু দেশের বাজাই এ দিয়ে ব্যবসা হচ্ছে তা নয়, আসছে শত-কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসেবে গত অর্থবছরে বিভিন্ন দেশে এই চুল রপ্তানি করে আয় হয়েছে এক কোটি ৯০ লাখ ডলার অর্থাৎ ১৫০ কোটি টাকারও বেশি।
ঢাকার ধানমন্ডীর একটি পুরনো পার্লার লি। সেখানে বেলা এগারোটার পর গিয়ে দেখা যায় যে ক'জন নারী সার্ভিস নিতে এলেন তারা বেশিরভাগই আসেন চুল কাটাতে।
ক্লায়েন্টদের চুল কাটছেন কর্মীরা আর কিছুক্ষণ পরপর মেঝেতে জমা হওয়া কাটা চুল ঝাড়ু দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পরিচ্ছন্ন-কর্মীরা।
কিন্তু এসব চুল যায় কোথায়?
লি বিউটি পার্লারের হিসাব বিভাগের পরিচালক বাদল শিমশাং জানান, "কাটা চুল কিছুদিন আগ পর্যন্ত বস্তায় ভরে কিনে নিয়ে যেত একদল লোক। তবে এখন আর ছোট চুলের চাহিদা নেই। বড় চুল কেউ কাটলে পার্লারের মেয়েরা সেগুলো সংরক্ষণ করেন এবং বিক্রি করেন।"
আগে গ্রামের দিকে বাড়িতে বাড়িতে চুল সংগ্রহ করা হতো তবে এখন শহরের অলিতে-গলিতেও চুল খুঁজতে আসেন ফেরিওয়ালারা।
কলাবাগান এলাকার একজন নারী বলেন, মেয়েদের ঝড়ে পড়া চুল নিয়ে যায় ফেরিওয়ালারা, তার বিনিময়ে মেলে অন্যকিছু।"ফেরিওয়ালা আইসা চুল চায়। তারপর ক্লিপ, সেফটিপিন, স্টিলের বাটি, চামচ এগুলা দেয়।" তার সাথে কথা বলেই বেরিয়ে একজন ফেরিওয়ালাকে পাওয়া গেল, যে পুরনো কাগজ ও চুলের খোঁজ করছিল। কি ধরনের চুল নিতে চায় জানতে চাইলে সে বলে, মহিলাদের মাথার চুল।
বাদ নেই ছেলেদের সেলুনও। যদিও সেখানে খুব একটা বড় চুল পাওয়া যায়না তারপরও সেখান থেকেও চুল সংগ্রহ করার জন্য ঘোরাফেরা করে ফেরিওয়ালারা, জানান বেশ কয়েকটি সেলুনের নরসুন্দর বা নাপিত।
তবে বাংলাদেশে মূলত এ ধরনের চুলের বেশিরভাগ সংগ্রহ করা হয় পার্লার থেকে এবং বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে। ঢাকার খিলগাঁওয়ের রেলগেট সংলগ্ন একটি বাড়িতে হেয়ারি নামে উইগ তৈরির কারখানা।
এর উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউর রহমান ২২ বছর আগে শুরু করেছিলেন কাজটি। তখন দোকানে দোকানে গিয়ে তিনি ফ্যাশন ডলের মাথায় উইগ বসানোর জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করতেন। আর এখন তার কাছে প্রতিদিনই কেউ না কেউ আসছেন উইগের খোঁজে।
মতিউর রহমান বলেন, "এখন বিভিন্ন বয়সের মানুষেরা আসছেন নিজেদের মাথার উইগ বা পরচুলা তৈরির জন্য। কেউ চাকরির ইন্টারভিউ দেবেন বা বিয়ের পাত্রী দেখতে যাবেন, আবার কেউ টেলিভিশনে খবর পরবেন এমন অনেকে নিচ্ছেন উইগ। এছাড়া দেশের বাইরে থেকে তাদের কাছে অর্ডার আসছে।"
কাটা চুল কেজি প্রতি তিন-চার কিংবা ৫০০০ টাকাতেও বেচা-কেনা চলছে। তবে চুলের আকার হতে হবে আট ইঞ্চি লম্বা। বর্তমানে কোনও কোনও কোম্পানি এই চুল আইল্যাশ বা চোখের পাপড়ি তৈরিতে ব্যবহার করছে। আর বিভিন্ন বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা চুল প্রক্রিয়াজাত করা ছাড়াও চলে যাচ্ছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে। শত-কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসছে ফেলনা এসব এসব চুল রপ্তানি করে। ব্যবসায়ীরা জানান, দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি এ ধরনের চুল যাচ্ছে ভারতে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তালিকায় উইগ এবং হিউম্যান হেয়ারকে অপ্রচলিত পণ্য হিসেবে বলা হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানায় গত অর্থবছরে এই পণ্য রপ্তানি করে যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল অর্জিত হয়েছিল তার চেয়েও বেশি।
ইপিবির পরিচালক আব্দুর রউফ বিবিসি বাংলাকে বলেন, রাজশাহী নওগাঁ, চুয়াডাঙ্গাসহ উত্তরাঞ্চলের অনেক জায়গাতে ফেলে দেয়া চুল হয়ে উঠেছে অনেকের রোজগারের উৎস। মূলত স্বাধীনতার পর থেকেই এই ব্যবসাটি চলে আসছিল। তবে তা সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়তে থাকে ১৯৯৯-২০০০ সালের পর থেকে। আর রপ্তানি করে সবচেয়ে বেশি মুদ্রা এসেছে ২০১৫ -১৬ অর্থবছরে এক কোটি ১৪ লাখ মার্কিন ডলার। বর্তমানে চীনসহ কিছু দেশ বাংলাদেশে এসে এই খাতে বিনিয়োগও করছে। ফলে ছোট একটি খাত হলেও সেটি ধীরে ধীরে তা সম্ভাবনা জাগাচ্ছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি

অসুস্থতার দোহাই দিয়ে সুচি'র প্রকাশ্য ভাষণ বাতিল

অস্ট্রেলিয়ায় সফররত মিয়ানমারের বিতর্কিত নেত্রী অং সান সুচি'র প্রকাশ্য বক্তৃতা বাতিল করা হয়েছে। এ খবর দিয়েছে সিএনএন অনলাইন। শারীরিক অসুস্থতার দোহাই দিয়ে বক্তৃতা প্রদানে অপারগতা প্রকাশ করেছেন তিনি। অবশ্য অসুস্থতার বিস্তারিত ধরণ উল্লেখ করা হয় নি। এ ব্যাপারে মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র জাও হিতায় সিএনএন'কে বলেন, বিমানযাত্রাজনিত ক্লান্তিতে দুর্বল হয়ে পড়েছেন সুচি। উল্লেখ্য, অস্ট্রেলিয়ায় প্রথমবারের মত অনুষ্ঠেয় আসিয়ান সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্যে দেশটিতে সফর করছেন সুচি। মঙ্গলবার সিডনিতে একটি অনুষ্ঠানে মূল ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল তার। সেখানে ভাষণ শেষে শ্রোতাদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বের ব্যবস্থাও ছিল। কিন্তু সোমবার তা বাতিল করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, শনিবার অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে এখনও জনসম্মুখে কোনও কথা বলেননি তিনি। তবে মঙ্গলবারে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে। উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫ আগস্ট রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন এবং নিধনযজ্ঞ শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং উগ্রপন্থী বৌদ্ধরা। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে । আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পালিয়ে আসা এসব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের মধ্যে। কিন্তু তা কার্যকরের বিষয়টি এখনও প্রক্রিয়াধীন। প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গাদের জন্য ট্রানজিট ক্যা¤প নির্মাণসহ নানা উদ্যোগ গ্রহন করার কথা বলছে মিয়ানমার। তবে এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসিত হন নি। অন্যদিকে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের মধ্যে মিয়ানমারে ফিরে যাবার আবেদন করেছেন মাত্র ৮ হাজার রোহিঙ্গা। এবং আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এই পর্যন্ত মিয়ানমার সরকার মাত্র কয়েক শত রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে! এর মধ্যেই নতুন করে মিয়ানমারে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার আলামত মিলছে। এমন অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ার লোয়ে ইনস্টিটিউটে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সু চি’র একমাত্র প্রকাশ্য ভাষণ নিয়ে আগ্রহ ছিল অনেকেরই। কারণ, অনুষ্ঠানটিতে ভাষণের পাশপাশি দর্শকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়ার কথা ছিল সুচি'র। এমনিতেই বর্তমান সফরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বেশ বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলের কাছে একটি বিবৃতিপত্র পাঠিয়েছেন। অনুরোধ করেছেন সুচি'র সঙ্গে রাখাইনে সংগঠিত মানবতা বিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা করতে। এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ান বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের মুখপাত্র হাবিবুর রহমান সিএনএন'কে বলেন, 'আমরা চাই অস্ট্রেলিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হিসেবে মিয়ানামারের রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত অত্যাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করুক। আমরা চাই অস্ট্রেলিয়া সরকার মিয়ানমারকে বাণিজ্য ও সামরিকসহ অন্যান্য সহায়তা দেয়া বন্ধ রাখুক।' এমতাবস্থায় ধারণা করা হয়েছিলো, বিরল ওই প্রকাশ্য ভাষণে উপস্থিত শ্রোতাদের কাছ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারেন সুচি। ভাষণ অনুষ্ঠানটি বাতিল ঘোষণা করার পর- তা অন্য কোন দিন পুনঃনির্ধারণ করা যায় কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মিয়ানমারের এক মুখমাত্র দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, সময় সংকটের কারনে এবারের সফরে তা আর করা সম্ভব নয়।

কিশোর কিশোরীদের মধ্যে বাড়ছে ধূমপান আসক্তি

দেশের প্রায় ১২ শতাংশ কিশোর কিশোরী নিয়মিত ধূমপানে আসক্ত। এর মধ্যে ৯ শতাংশ ছেলে এবং ৩ শতাংশ মেয়ে। সম্প্রতি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ব্যাপারে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছে। সমীক্ষার নাম ‘গ্লোবাল ইয়ুথ টোবাকো জরিপ’। এ প্রসঙ্গে বৃটেনের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য গার্ডিয়ান একটি প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে। ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সি বালক-বালিকাদের মধ্যে পরিচালিত ওই জরিপে বাংলাদেশ, ভারত, এবং ইন্দোনেশিয়ার কিশোর-কিশোরীদের ধুমপান প্রবণতাসহ বিভিন্ন পন্থায় তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। সমীক্ষায় দেখা গেছে, এই তিন দেশের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় ধূমপান আসক্ত কিশোর-কিশোরীর হার সবচেয়ে বেশি। বলা হয়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক টোবাকো কোম্পানিগুলো সিগারেটের বিক্রি ও প্রচারণার কাজে ব্যবহার করছে স্কুল শিক্ষার্থীদের। এটি বেশি করা হচ্ছে করে মধ্য ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোতে। হাজার হাজার স্কুল শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে কো¤পানিগুলো নিজ নিজ ব্র্যান্ডের প্রচারণা চালাচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শিশু-কিশোরদের তামাকমুক্ত করতে বিশ্বব্যাপী নতুন প্রচারণা শুরু হয়েছে। ২২ টি দেশে এই তামাক বিরোধী প্রচারণার কাজ চলছে। ধূমপান বিরোধী এই নতুন প্রচারণায় তামাকবিরোধী সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থাগুলো সচেতন নাগরিকদের তামাকবিরোধী প্রচারনায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানানোর পাশপাশি ধূমপান প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হয়েছে।

ভেতরে মজুরি বোর্ডের বৈঠক, বাইরে অবস্থান

তৈরি পোশাক শ্রমিকদের জন্য গঠিত নিম্নতম মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক শুরু হয়েছে। আজ সোমবার দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ে এই বৈঠক শুরু হয়। এদিকে মজুরি বোর্ডের কার্যালয়ের নিচে কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ষোলো হাজার টাকা নিম্নতম মজুরির দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে বোর্ডের আলোচনায় মালিক প্রতিনিধি সিদ্দিকুর রহমান, শ্রমিক প্রতিনিধি বেগম শামছুন্নাহার ভূঁইয়া, স্থায়ী শ্রমিক প্রতিনিধি ফজলুল হক মন্টু, স্থায়ী মালিক প্রতিনিধি কাজী সাইফুদ্দিন এবং নিরপেক্ষ প্রতিনিধি কামাল উদ্দীন অংশ নেন। আরও উপস্থিত আছেন মজুরি বোর্ডের সচিব মো. শহীদুল্লাহ। বৈঠক শুরুর মিনিট দশ পরে গার্মেন্টস শ্রমিক অধিকার আন্দোলনের নেতারা পোশাক শ্রমিকদের জন্য নিম্নতম মজুরি ১৬ হাজার টাকার দাবিতে বোর্ডের চেয়ারম্যান এর কাছে স্মারকলিপি দেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শ্রমিক নেতা মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, মোশরেফা মিশু, তাসলিমা আখতার প্রমুখ। পরে গার্মেন্টস কর্মচারী ঐক্য পরিষদ ১৮ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যানকে স্মারকলিপি দেন। বর্তমানে পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ৫ হাজার ৩০০ টাকা।

এলডিসি থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ

এটা আনন্দের সংবাদ যে বাংলাদেশ অচিরেই স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্ত হতে চলেছে। জাতিসংঘের সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) তিন দিন আগে এই খবর জানিয়েছে। এই উত্তরণ যে ঘটতে চলেছে, তা অবশ্য আমাদের অজানা ছিল না। এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা আরও আগেই শুরু হয়েছে। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের শর্ত হলো মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিনটি সূচকের যেকোনো দুটিতে সিডিপির নির্ধারিত মান অর্জন করতে হবে। সিডিপি জানিয়েছে, বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মান অর্জন করেছে। তবে এখনই বাংলাদেশের ‘স্বল্পোন্নত’ পরিচয় ঘুচছে না, অর্জিত অগ্রগতির ধারা আরও ছয় বছর বজায় থাকলে ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের প্রবেশ ঘটবে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায়। তাই সামনের এই ছয় বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিবেশ-পরিস্থিতি অর্থনৈতিক অগ্রগতির অনুকূল নয়। অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের ভাষায়, এই ‘বৈরী’ পরিবেশের মধ্য দিয়েই আমাদের আগামী ছয় বছর অগ্রগতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে।এলডিসি থেকে উত্তরণের পর কতকগুলো চ্যালেঞ্জ আসবে, সেগুলো মোকাবিলার প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করা প্রয়োজন। ১০ মার্চ ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) আয়োজিত ‘এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ’ শীর্ষক এক সংলাপে কতকগুলো সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। যেমন, বাংলাদেশ এখন এলডিসি হিসেবে যেসব বাণিজ্যসুবিধা পায়, উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হওয়ার পর সেগুলো পাবে না। এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ এখন রেয়াতি সুদের ঋণ পায়। এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আর তা পাওয়া যাবে না। ফলে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্কসুবিধা, মেধাস্বত্ব সুবিধা ইত্যাদি কমে যাবে, কিংবা উঠে যাবে। ফলে বিশ্ববাজারে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে।
দেখা গেছে, এ ধরনের নানা কারণে অনেক দেশ এলডিসির তালিকা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর সমস্যায় পড়েছে। তাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমেছে; রপ্তানি, বিদেশি সহায়তা, রেমিট্যান্সও কমেছে। বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক সমন্বয়কারী মিয়া সেপ্পোর ভাষ্য অনুযায়ী, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশি পণ্যের ওপর গড়ে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ শুল্ক বাড়বে। এর ফলে বাংলাদেশকে বছরে ২৭০ কোটি ডলার রাজস্ব দিতে হবে। বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলে রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের আঘাত পড়বে। আমাদের সামনে আরও কিছু বড় সমস্যা আছে। যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব। সামনের দিনগুলোতে এই সমস্যা আরও প্রকট হবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের স্থানচ্যুতি ও জীবিকার সংকট সৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া গত বছর প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব শুধু অর্থনীতি নয়, সামাজিক ক্ষেত্রেও পড়বে। এসব সমস্যা মোকাবিলা করে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এখনই প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, সে জন্য জ্বালানি ও অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করতে হবে। রপ্তানি খাতে তৈরি পোশাকের ওপর অধিক নির্ভরতা নয়, রপ্তানিপণ্যের বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা দিতে হবে। মানবসম্পদের গুণগত মান উন্নয়নের মাধ্যমে সুদক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার ব্যাপক ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে বেশি মনোযোগী হতে হবে। সর্বোপরি সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে নজর দিতে হবে।

আমরা করব জয়, কিন্তু কবে? by জোসেফ ই. স্টিগলিৎস

১৯৬৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে শহরে শহরে দাঙ্গা বেধে গিয়েছিল। লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়াটস শহরে আকস্মিক সহিংসতার পর টানা দুই বছর নিউ জার্সির নিয়ার্ক থেকে মধ্য পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ডেট্রয়েট ও মিনেপোলিস পর্যন্ত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি. জনসন ইলিনয়ের গভর্নর ওটো কারনারের নেতৃত্বে একটি কমিশন নিয়োগ করেছিলেন। দাঙ্গার কারণ তদন্ত করে দেখা এবং করণী য় ঠিক করার দায়িত্ব দেওয়া হয় সেই কমিশনকে।  আজ থেকে ৫০ বছর আগে ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিশন অন সিভিল ডিসঅর্ডারস (যেটি ‘কারনার কমিশন’ নামে ব্যাপকভাবে পরিচিত) যে প্রতিবেদন দাখিল করে তাতে আমেরিকার তৎকালীন আর্থসামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরা হয়, যা ওই বিশৃঙ্খলাকে উসকে দিয়েছিল। কারনার কমিশনের বর্ণনায় এমন এক আমেরিকার চিত্র উঠে এসেছিল, যেখানে আফ্রিকান-আমেরিকান নাগরিকেরা পরিকল্পিত বৈষম্যের শিকার হচ্ছিল; পর্যাপ্ত আবাসন ও শিক্ষাসুবিধা পাচ্ছিল না এবং আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। তাদের সামনে ‘আমেরিকান ড্রিম’ বলে কিছু ছ িল না। ওই কমিশনের মতে, দাঙ্গার মূল কারণ ছিল ‘কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের প্রতি শ্বেতাঙ্গদের বর্ণবাদী আচরণ’। কমিশন বলেছিল, ‘বর্ণ প্রথা আমাদের ইতিহাসের কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছে এবং এখন এটি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ এরপরের অর্ধশতাব্দীতে কতখানি অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে তা নির্ণয় করার জন্য এইজেনআওয়ার ফাউন্ডেশন-এর হয়ে যাঁরা কাজ করেছেন, আমি সেই দলের একজন ছিলাম। কারনার কমিশনের রিপোর্টের একটি বিখ্যাত লাইন ছিল, ‘আমাদের দেশ বিভক্ত ও সমতাহীন দুটি সমাজের দিকে যাচ্ছে, একটি সাদা অপরটি কালো’। দুঃখের বিষয়, আমাদের অনুসন্ধানে দেখা গেছে কারনার কমিশনের এই কথার সত্যতা এখনো বর্তমান আছে।আমাদের চেষ্টার ফল হিসেবে ফ্রেড হ্যারিস ও অ্যালান কার্টিসের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে হিলিং আওয়ার ডিভাইডেড সোসাইটি: ইনভেস্টিং ইন আমেরিকা ফিফটি ইয়ার্স আফটার দ্য কারনার রিপোর্ট শীর্ষক একটি বই, যা পড়ে পাঠকের মন খারাপ হবে।
আমার অধ্যায়ে লিখেছি, ‘কারনার রিপোর্টে শনাক্ত করা সমস্যাসংকুল কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে (যেমন সরকারে কালো আমেরিকানদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়া একটি বড় উদাহরণ।) ; কিছু ক্ষেত্র আগের মতোই রয়ে গেছে (শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্য) ; কিছু ক্ষেত্রে আগের চেয়ে অবনতি হয়েছে (সম্পদ ও আয়বৈষম্য)।’ গত অর্ধশতাব্দীতে নাগরিক অধিকার আন্দোলন একটা পরিবর্তন এনেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মোটা দাগে চোখে ধরা পড়ে এমন বেশ কিছু বৈষম্য বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। সমাজবদ্ধ জীবনযাত্রার মানদণ্ড পরিবর্তিত হয়েছে। কিন্তু গভীরভাবে গেড়ে বসা এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া বর্ণবাদের শিকড় উৎপাটন কঠিন প্রমাণিত হয়েছে। নতুন প্রতিবেদনের মূল বার্তায় নাগরিক অধিকারের মহান নেতা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের সেই বাণী প্রতিফলিত হয়েছে: আফ্রিকান-আমেরিকানদের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার অর্জনকে সমস্ত আমেরিকানের অর্থনৈতিক সুযোগ থেকে আলাদা করে দেখা যাবে না।লুথার কিংয়ের সেই সময় থেকে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক বৈষম্য আরও বেড়েছে। যাদের কলেজ পর্যায়ের ডিগ্রি নেই, তারা এই বৈষম্যের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। আর আমেরিকায় বসবাসকারী আফ্রিকান-আমেরিকানদের তিন-চতুর্থাংশই এই শ্রেণিভুক্ত। আমেরিকার আর্থিক খাত আফ্রিকান-আমেরিকানদের ব্যবহার করার টার্গেট করে আসছে। বিশেষ করে আর্থিক সংকটগুলো শুরু হওয়ার আগের বছরগুলোতে দেখা গেছে তাদের সহজে ঋণ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জিনিসপত্র কিংবা সম্পত্তি চড়া দামে বিক্রি করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তারা সেই ঋণ শোধ করতে পারেনি। এভাবে হাজার হাজার আফ্রিকান-আমেরিকান তাদের বাড়িঘর হারিয়েছে এবং সমাজের বিদ্যমান বৈষম্য আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। তবে এটাও ঠিক যে আমাদের সামনে বেশ কিছু আশার দিক আছে। যেমন, বৈষম্য সম্পর্কে আমাদের ভাবনাচিন্তার অনেক অগ্রগতি হয়েছে। আরেকটি বিষয় হলো, এখন আমরা স্বীকার করতে শুরু করেছি, বৈষম্যের কারণে, বিশেষ করে বর্ণবৈষম্যের কারণে আমেরিকাকে চড়া মূল্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, মার্কিন জনগণের একটা অংশের, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে আন্দোলন শুরু হচ্ছে। তারা বুঝতে পারছে, আমেরিকাকে তার মূল্যবোধের পথে আসতে হবে। আমি আমার অধ্যায়ের উপসংহার টেনেছি এই বলে: ‘বিকল্প এক পৃথিবী গড়া সম্ভব, কিন্তু ৫০ বছরের সংগ্রাম আমাদের দেখিয়েছে সেই বিকল্প রূপকল্পে পৌঁছানো কত কঠিন।’
ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জোসেফ ই. স্টিগলিৎস নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ও লেখক

যশোরের এসপির জমিপ্রীতি

সরকারি কর্মকর্তা হোন আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হোন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন না। সবাইকে আইন মেনে চলতে হয়। কিন্তু যশোরের বর্তমান পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমান নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবেন এবং তাঁর অধীন পুলিশ সদস্যদেরও যেভাবে ব্যবহার করছেন, তাতে মনে হচ্ছে না তিনি আইনের ধার ধারেন। গত শনিবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত সচিত্র খবরে দেখা যায়, এসপির বাংলোর সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের নামে প্রতিবেশী অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা লুৎফুন্নেসার জমি দখল করা হয়েছে। সেখানে লুৎফুন্নেসার ২৭ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি থাকলেও তিনি সেখানে বসবাস করেন না। অসুস্থ স্বামী ও কলেজপড়ুয়া সন্তানকে নিয়ে তিনি শহরের অন্য এলাকায় বসবাস করেন। তবে ওই জমিতে তাঁর বাবা-মায়ের কবর আছে। এসপি সাহেব নিজের বাংলোর সীমানাপ্রাচীর তুলতে গিয়ে সেই কবর দখল করে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে লুৎফুন্নেসা কোনো প্রতিকার না পেয়ে জেলা প্রশাসকের শরণাপন্ন হন। জেলা প্রশাসক বলেছেন, সরকারি সম্পদ দখলের বিষয় হলে তাঁরা তদন্ত করে থাকেন। এটি যেহেতু ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি, তাই পুলিশ প্রশাসনের কাছেই তারা অভিযোগটি পাঠিয়ে দিয়েছে, যা শিয়ালের কাছে মুরগি জমা রাখার মতো।
যেই পুলিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ, সেই পুলিশ প্রশাসনের কাছে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করি না। যশোরের এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জমিসংক্রান্ত অভিযোগের এখানেই শেষ নয়। জমির প্রতি এই পুলিশ সুপারের বিশেষ প্রীতি আছে বলেই মনে হয়। পুলিশ লাইনসের সামনে ১০টি দোকান ও ৩১টি পরিবার উচ্ছেদ করে যে জমি নিজেদের দখলে নিয়েছে, সেই জমির মালিক জেলা পরিষদ। পুলিশ সুপারের নির্দেশে সেখানে দোকান তৈরি করে লিজ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছিল। জেলা পরিষদের আপত্তির মুখে নির্মাণকাজ বন্ধ থাকলেও সেখান থেকে উচ্ছেদ হওয়া মানুষগুলো বিপদে রয়েছেন। উচ্ছেদ হওয়া একটি দোকানের মালিক ও মানবাধিকারকর্মী বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক পুলিশ সুপারের জবরদস্তির বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করলে তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে মামলা দেয় ও তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বিনয় কৃষ্ণ দ্বিতীয়বার সংবাদ সম্মেলন করলে পুলিশ তাঁর বিরুদ্ধেও মামলা দেয়। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে এভাবে নিরীহ মানুষকে হয়রানি করে চলেছে যশোরের পুলিশ। উল্লেখ্য, যে এসপির নির্দেশে পুলিশ লুৎফুন্নেসার বাবা-মায়ের কবরসহ জমি দখল করেছে, তিনি ছিলেন তাঁর প্রাক্তন ছাত্র। একজন শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থীর এ কেমন আচরণ? জমি দখল ও মামলা দিয়ে হয়রানির যে অভিযোগ যশোরের এসপির বিরুদ্ধে উঠেছে, তা গুরুতর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন। আমাদের দাবি, নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষ দিয়ে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক। আপাতত এমন পুলিশ কর্মকর্তার হাত থেকে যশোরের মানুষকে মুক্তি দেওয়া হোক।

বিচারের রাজনীতি ও রাজনীতির বিচার by তোফায়েল আহমেদ

বিচার একটি রাজনীতি নিরপেক্ষ বিষয়। বিচারালয় তাই চোখ বন্ধ রেখে ন্যায়দণ্ড ধারণের অঙ্গীকারে আবদ্ধ একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। নিরপেক্ষতার শপথ নিয়ে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারকাজ নিষ্পন্ন করেন বিচারকেরা। কিন্তু বিচারকেরা যে আইনের ভিত্তিতে বিচার করেন, সে আইন তৈরি করেন রাজনীতির মানুষেরাই এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাউকে অভিযুক্ত করে মামলা দায়েরও পুরোপুরি বস্তুনিষ্ঠ ও রাজনীতি নিরপেক্ষ, তা হলফ করে বলা যায় না। আবার বিচারকেরা রক্ত-মাংসের মানুষ, তাঁদের চোখ-কান সব সময় খোলা থাকে, বাইরের প্রবহমান আলো-বাতাস ও চাপ-তাপ তাঁদেরও প্রভাবিত করতে পারে। কারণ তাঁদেরও আবেগ, অনুরাগ, রাগ-বিরাগ, নানা মানবিক দুর্বলতা থাকা স্বাভাবিক। তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ বিচারকদের ন্যায়পরায়ণতা, বিচারবোধ, সততা, সৎসাহস এবং সুগভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ওপর নিঃশর্ত বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে। বিশ্বব্যাপী এটিই স্বীকৃত নিয়ম ও রীতি। ইতিহাসে ন্যায়ালয় ন্যায়দণ্ড ধারণের অঙ্গীকার সব সময় সঠিকভাবে পালন করতে সক্ষম হয়েছে তা দেখা যায় না, কখনো কখনো এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। এই ব্যতিক্রম ঘটেছে রাজনীতির কারণে, আবার পরে রাজনীতিই তা শুধরে নিয়েছে এবং ইতিহাসের নির্মম রায়ে সুবিচার পাওয়া গেলেও যে ব্যক্তি সুবিচার সময়মতো পেল না, সে ব্যক্তিগতভাবে প্রতিকারবঞ্চিত থেকেই গেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে ৫০০ জুরির সংখ্যাগরিষ্ঠ ২২০-এর বিপরীতে ২৮০ জনের ভোটে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ইতিহাসের রায় সক্রেটিসের পক্ষে থাকলেও ৭০ বছর বয়সে তিনি হেমলক পান করে অন্যায় দণ্ডাদেশ মাথা পেতে নিয়ে জীবন দিয়ে যান। সক্রেটিসের এই বিচার নিঃসন্দেহে একটি রাজনৈতিক বিচার। ভারতীয় উপমহাদেশ নানা রাজনৈতিক বিচারের উর্বর ক্ষেত্রভূমি। প্রখ্যাত ভারতীয় লেখক A. G. Noorani Indian Political Trials: 1757-1947 (2005) শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করেছেন।
এ বইতে বারোটি (১২) রাজনৈতিক মামলার ওপর বিশ্লেষণ হাজির করেছেন জনাব নূরানি। এই বারোটি রাজনৈতিক মামলার প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা হচ্ছেন যথাক্রমে মহারাজ নন্দকুমার (১৭৭৫), সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর (১৮৫৮), বালগঙ্গাধর তিলক (১৮৯৭,১৯০৮ ও ১৯১৬), শ্রী অরবিন্দ ঘোষ (১৯০৮), মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (১৯২১), মাওলানা মোহাম্মদ আলী-মাওলানা শওকত আলী (১৯২১), মহাত্মা গান্ধী (১৯২২) প্রমুখ। উপমহাদেশ তথা বিশ্বের ইতিহাসে এই ব্যক্তিরা আজ অমর। তাঁদের বিরুদ্ধে করা মামলার দুরভিসন্ধি ও রাজনৈতিক হীন চক্রান্ত ইতিহাস স্বীকৃত। উপমহাদেশের তিনটি দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর নামে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলার বিরাম নেই। বাংলাদেশে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের তিনজন প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তি অনেক মামলায় অভিযুক্ত হন। জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ অনেকগুলো মামলায় অভিযুক্ত এবং ছয় বছরের মতো জেলও খেটেছেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও দুবারের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বর্তমানে ৩৭টি মামলায় অভিযুক্ত এবং একটি মামলায় সাজা ভোগ করছেন। তিনবারের অন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও ১১টি মামলা দায়ের করা হয় (২০০৭-২০০৮), যা অবশ্য আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের এই তিন রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর নামে মামলা দায়ের, মামলা সচল রাখা, অচল করা, দ্রুততর, মন্থর কিংবা প্রত্যাহার করা সবকিছুতে রাজনীতির সংস্রব রয়েছে বলে অনেকের ধারণা। বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রসমূহকে তিনটি প্রধান বিভাজনে দেখা হয়। যেমন কার্যকর রাষ্ট্র (Effective state), দুর্বল, ভঙ্গুর বা অকার্যকর রাষ্ট্র (Weak/fragile state) এবং ব্যর্থ রাষ্ট্র (Failed state)। অকার্যকর বা দুর্বল রাষ্ট্র, যারা ব্যর্থতার দিকে অগ্রসরমাণ, তাদের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে যা উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে আইনের শাসনের অনুপস্থিতি, রাজনীতি ও দুর্নীতির সীমানা অচিহ্নিত হয়ে পড়া, বিচারালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকা উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সূচকে যথেষ্ট অগ্রগতি সত্ত্বেও আইনের শাসন, গণতন্ত্র, দুর্নীতি, মানবাধিকার প্রভৃতি সূচকে ক্রমাবনতি মধ্যম আয়ের দেশের পথে অগ্রসরমাণ একটি জাতি-রাষ্ট্রের ভঙ্গুরতাকে বাড়িয়ে দিতে পারে। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছে, ২০১৮ সালে তা পুনরুদ্ধার সম্ভব না হলে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অপরাধ দমনে ভারতের একটি উদ্যোগ আমাদের চোখ খুলে দিতে পারে। ভারতের রাজনীতিতে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধিতে নাগরিক উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় রাষ্ট্র ও সরকার অনেকগুলো বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। ২০১৪ সালের এপ্রিলের ৭ থেকে ১২ মে পর্যস্ত সময়ে যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ৮১ কোটি মানুষ অংশগ্রহণ করে, যা ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতাদের দুর্নীতি ও অপরাধ ভারতীয় গণতন্ত্রের উজ্জ্বলতাকে কিছুটা ম্লান করে দিয়েছে বৈকি। লোকসভার ৫৪৫ সদস্যের ৩০ শতাংশ ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত। লোকসভা ছাড়াও বিধানসভা, রাজ্যসভার অনেকে একই অভিযোগে অভিযুক্ত। ২০১৪ সালের লোকসভা ও আটটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের পরপর এসব বিষয় নিয়ে ১ হাজার ৫৮১টি মামলা হয়।
এই মামলাগুলো ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে রুজু করা হয়। এসব নির্বাচিত প্রতিনিধির কেউ এসব মামলায় দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য সাজাপ্রাপ্ত হলে আইনসভার সদস্যপদ হারাবেন এবং পরবর্তী ছয় বছর আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। সম্প্রতি সরকারের এক সিদ্ধান্তে অর্থ মন্ত্রণালয় রাজনীতিবিদদের এই বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত (আগামী জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে) নিষ্পত্তির জন্য ১৫টি বিশেষ আদালত গঠনের জন্য ৮ কোটি রুপির একটি বিশেষ বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে। এই অর্থে নবগঠিত দুটি আদালত ১৮৪ জন লোকসভা সদস্যের মামলার শুনানি করবেন। বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, তেলেঙ্গানায় একটি করে বিশেষ কোর্ট যথাক্রমে বিধানসভা সদস্যদের ১৪১,১০৭, ৮৭ এবং ৬৭টি মামলার শুনানি করবে। তা ছাড়া অন্ধ্র প্রদেশ, কর্ণাটক, মধ্যপ্রদেশ এবং তামিলনাড়ুতেও একটি করে আদালত গঠিত হবে। অন্য ২১ রাজ্যে বিশেষ আদালত হবে না, তারা স্বাভাবিক আদালতে শুনানি শেষ করবে। কারণ, ৬৫ টির কম মামলা থাকলে কোনো রাজ্য বিশেষ আদালত পাবে না। এর মধ্যে গুজরাটে ৫৪, ঝাড়খন্ডে ৫২ এবং ওডিশায় ৫২টি মামলা রয়েছে, যা সাধারণ আদালতে নিষ্পত্তি হবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধের বহুবিধ অভিযোগের কথা শোনা গেলেও মামলা হয় না। ভারতে মামলার একটি বড় উৎস নির্বাচনকালীন হলফনামায় প্রদত্ত তথ্যাবলি। অসত্য তথ্য, প্রদত্ত তথ্যের সঙ্গে আয়-ব্যয়ের গরমিল এবং সম্পদের তথ্য মামলার একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের দেশে তথ্য নেওয়া হলেও নির্বাচন কমিশন এসব তথ্যের সত্য-মিথ্যা যাচাই করে না। এনবিআর কিংবা দুদকও এ ব্যাপারে নীরব থাকছে। রাজনীতি, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নির্বাচন-এ তিনটি বিষয়কে স্বচ্ছ করতে হলে রাজনীতির অপরাধগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং তা হতে হবে দলনিরপেক্ষভাবে। রাজনীতির গোলকধাঁধা থেকে বের হতে না পারলে আদালত এবং রাজনীতি দুটিই কলুষিত হতে থাকবে।
ড. তোফায়েল আহমেদ: রাজনীতি ও লোকপ্রশাসনের অধ্যাপক, স্থানীয় সরকার ও শাসন বিশেষজ্ঞ
tofail101@gmail.com

ইতালিতে ডানপন্থীদের জয়ে হুমকিতে ইইউ ও অভিবাসীরা by সরাফ আহমেদ

ইতালির নির্বাচনেও দক্ষিণপন্থীদের পতাকা উড়ল। ইউরোপের রাজনীতিতে সর্বত্র এখন দক্ষিণপন্থীদের জয়জয়কার। ৪ মার্চ ইতালির নির্বাচনেও তার বদল ঘটল না। ইতালিতে রক্ষণশীল ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বিরোধী জোটের বিজয় নিঃসন্দেহে ইইউ জোটকেও সংশয়ে ফেলবে। এই প্রথম ইইউ জোটভুক্ত কোনো দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ ভোটার জোটবিরোধীদের নির্বাচিত করলেন। নির্বাচনে কেউ না কেউ জয়লাভ করেই। রক্ষণশীল জোটের দ্বিতীয় শক্তি লেগা নর্ডের নেতা মাত্তো সালভানি বাণিজ্যিক শহর মাইল্যান্ডে হুংকার ছাড়লেন। বললেন, তিনি লোকরঞ্ছনবাদী রাজনীতিক এবং তা–ই থাকতে চান। লাখ মানুষ তাঁদের ভোট দিয়েছেন ইতালিকে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিরতা থেকে মুক্ত করতে। ইতালি নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত বা অর্থনৈতিক বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্রাসেলস, বার্লিন বা প্যারিস নয়, তারা নিজেরাই তার সমাধান করতে চান। অর্ধেক ভোটারই ইতালির ঐতিহ্যবাহী দলগুলোকে ছেড়ে রক্ষণশীল দলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ফাইভ স্টার প্রোটেস্ট মুভমেন্ট নামক দলটি নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৩২ শতাংশ, ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক পার্টি ১৮ শতাংশ, রক্ষণশীল লেগা নর্ড ১৭ শতাংশ এবং ফোর্বস ইতালিয়া পেয়েছে ১৪ শতাংশ ভোট। কিন্তু কেন ইতালির ভোটাররা তাঁদের পুরোনো প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে রক্ষণশীলদের দিকে ঝুঁকে পড়লেন! একটি পরিসংখানে দেখা যাচ্ছে, অব্যাহত বেকারত্বের শিকার হয়ে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে ২০১৫ সালে ১ লাখ ২ হাজার, ২০১৬ সালে ১ লাখ ১৪ হাজার এবং ২০১৭ সালে ১৫ লাখ কাজের খোঁজে ইতালি ছেড়েছেন। বলা বাহুল্য, এঁদের অধিকাংশ যুব সম্প্রদায়ভুক্ত তরুণ-তরুণী। ইতালির শিক্ষিত যুব সম্প্রদায়দের অধিকাংশই উত্তর ও পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী এ ধরনের দেশত্যাগের বিষয়টি ইউরোপে প্রথম ও আলোচিত বিষয়। এ থেকেই বোঝা যায় দেশটির প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনীতির অবস্থা। একসময় অর্থনৈতিকভাবে সবল ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের শুরু থেকে থাকা এবং ইইউ জোটের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক শক্তির এই দেশটির লাগামহীন রাজনৈতিক অরাজকতা, রাজনীতিকদের সীমাহীন অনৈতিকতা ও দুর্নীতি দেশটির ভোটারদের রক্ষণশীল দলগুলোকে ভোট দিতে প্ররোচিত করেছে। ক্ষমতাসীন মধ্যবাম রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রতি অনাস্থা ছাড়াও অন্য এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, দেশটির সরকারি কর্মচারীদের প্রতি ইতালির জনগণের মাত্র ৪০ শতাংশের আস্থা বোধ রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ইতালির নির্বাচন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর জোটের বড় দুই সদস্য জার্মানি আর ফ্রান্সের জন্য একটি বড় রকমের সতর্ক বার্তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইতালিতে আর্থিক খাত ও শরণার্থীদের নিয়ে সমস্যা ক্রমেই বাড়ছিল। এ ক্ষেত্রে তারা ইইউ জোট বা কোনো সংস্থা থেকে কোনো সহযোগিতা পাচ্ছিল না। শরণার্থী ও অভিবাসীসংক্রান্ত বিষয়ও নির্বাচনে অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া বেকার সমস্যা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্রমাবনতিতে হতাশ হয়ে ভোটাররা পুরোনো প্রতিষ্ঠিত সামাজিক গণতন্ত্রী ও বাম দলগুলোকে ছেড়ে দক্ষিণপন্থীদের দিকে মোড় নিয়েছেন। ক্ষমতাসীন মধ্যবাম জোটের দল সামাজিক গণতন্ত্রী ও বাম দলগুলোও ইতালির নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেনি। ভূবৈচিত্র্যগত অবস্থানের কারণে ভূমধ্যসাগর দিয়ে অভিবাসীদের প্রবেশ নতুন নয়। তবে ইদানীং এই পথ ধরে অভিবাসীদের আগমন আরও বেড়েছে। বিষয়টি শুধু ইতালির জন্য সমস্যা নয়, সমস্যাটি ইউরোপের মহাদেশীয় সমস্যা। তাই শরণার্থী ও অভিবাসীদের অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোয় পাঠাতে পারলে হয়তো ইতালির জন্য চাপ কমত।
এ ছাড়া ইতালির বাম দলগুলোর নিজেদের মধ্য তিক্ততা ও বিভক্তি তাদের জনসমর্থন হারাতে ভূমিকা রেখেছে। ইতালিতে যে রক্ষণশীল দলগুলো অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলছে, তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা ছাড়া নিজেরা কতটা সংস্কার করতে পারবে, তা বিস্ময়ের কথা। এই অর্থনৈতিক সংস্কারের কথা বলেই ইতালির রাজনীতির খলনায়ক এবং নির্বাচনে নিষিদ্ধ ফোর্বস ইতালিয়া দলের নেতা সিলভিও বের্লোসকনি দেশটিতে চারবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তবে ২০১১ সালে সর্বশেষ ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার আগে দেশটির অর্থনীতিকে তিনি রসাতলে নিয়ে ছেড়েছেন। ইতালির নির্বাচনে বড় বিজয়ী দল পাঁচ তারা প্রতিবাদ আন্দোলন ৩২ শতাংশ ভোট পেয়েছে। দলটির নেতা বেপ গ্রিলো, একজন ক্যাবার শিল্পী, সারা দেশে দেশটির রাজনৈতিক অবস্থা ও রাজনীতিকদের নিয়ে সমালোচনামূলক কৌতুক করে যথেষ্ট জনপ্রিয়, তা ছাড়া নামকরা ব্লগার। তিনি যখন তার পাঁচ তারা আন্দোলন নাম দিয়ে রাজনীতি শুরু করেন, তখন অনেকের কাছে বোধগম্য হয়নি তিনি কী করতে চাইছেন। তবে তিনি তাঁর শিল্পীসত্তা দিয়ে জনপ্রিয় হতে ও সমর্থন পেতে সক্ষম হয়েছেন, যা অন্য দলগুলো পারেনি। পাঁচ তারা আন্দোলনের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ৩১ বছরের তরুণ আইনজীবী লুইজি দে মায়োকে এখন প্রায় সমমনা দক্ষিণপন্থী লেগা নর্ড বা ফোর্বস ইতালিয়া অথবা নির্বাচনে দ্বিতীয় শক্তি ক্ষমতাসীন সামাজিক গণতন্ত্রী দলের সদ্য পদত্যাগকারী নেতা মাত্তো রেনিজির সমর্থনে নতুন সরকার গঠনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখাতে হবে। সদ্যসমাপ্ত ইতালির নির্বাচনে কোনো দলই সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ার কারণে জোট-সঙ্গী খুঁজতে হবে। সরকার গঠন করতে দেশটির সংসদের উচ্চকক্ষে ৬৩০ আসনের মধ্য ৩১৬ জন এবং নিম্নকক্ষে ৩১৫ আসনের মধ্য ১৫৮ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন পেতে হয়। ২৩ মার্চ নতুন পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার পরই সরকার গঠনকল্পে জোটবিষয়ক আলোচনা শুরু করা যাবে। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিয়ে জোট গঠিত না হলে পুনরায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ইতালির রাজধানী রোমে ১৯৫৭ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) গোড়াপত্তন হয়েছিল, যা রোম চুক্তি নামে পরিচিত। এ বিষয়টি নিয়ে সেই দেশটির জনগণও গৌরব বোধ করেন। তারা শিগগির কতটা ইইউবিরোধী হয়ে উঠবে বা রক্ষণশীলদের হাতকে আরও কতটা শক্তিশালী করবে, তা জানতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।
সরাফ আহমেদ: প্রথম আলোর হ্যানোভার, জার্মানি প্রতিনিধি।
Sharaf.ahmed@gmx.net

দক্ষিণ এশিয়ায় চীন কি এগিয়ে? by মারুফ মল্লিক

১৯৪৭ সালে উপনিবেশবাদের পতন থেকেই ভারত দক্ষিণ এশিয়া রাজনীতিতে প্রভাবশালী শক্তি। আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও এখন আত্মপ্রকাশ করছে। কিন্তু একই সঙ্গে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বন্ধুহীনও হয়ে পড়ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতার ইতিহাস শুরু থেকেই। কিন্তু অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ যারা ভারতের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ছিল, তারা নতুন এক বলয়ের দিকে ঝুঁকছে। এই অঞ্চলে চীনকেন্দ্রিক নতুন বলয় ক্রমে দৃশ্যমানও হচ্ছে। মূলত বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে চীন দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বলয়ের পুনর্গঠন করছে। অন্যান্য প্রতিবেশীর সঙ্গে ভারতের পারস্পরিক বিশ্বাসের মাত্রা এমন তলানিতে গিয়ে পৌঁছেছে যে এখন বাংলাদেশকে রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে বলতে হয়, চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধুই বাণিজ্যিক। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ-চীনের মধ্যকার সম্পর্ককে নেহাতই বাণিজ্যিক বলে উল্লেখ করেছেন। মূলত, বাংলাদেশ তার বৃহৎ প্রতিবেশীর সঙ্গে যেমন সুসম্পর্ক বজায় রেখেই চলবে, আবার বিশ্ব অর্থনীতির নতুন শক্তি চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রেখে সুবিধাও আদায় করে নিতে চাইবে। এটিই স্বাভাবিক। তবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও সামরিক যোগাযোগ বাড়ছে। এটি ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ভারতের এই উদ্বেগ তাদের বিভিন্ন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বক্তব্যে অনেকটাই প্রকাশ হয়ে পড়ছে। ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াত সম্প্রতি অভিযোগ করেছেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশিরা অভিবাসী হিসেবে ঢুকে যাচ্ছে। পাকিস্তান পরিকল্পিতভাবে এই অভিবাসনপ্রক্রিয়া পরিচালনা করছে। আর পেছন থেকে এতে মদদ দিচ্ছে চীন। এসবই হচ্ছে এক ছায়াযুদ্ধের আড়ালে। চীনের প্রভাব কীভবে বৃদ্ধি পাচ্ছে বা ভারত কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে? চীন দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে এগোচ্ছে। ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো।
পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অনেক পুরোনো। বরং নতুন নতুন দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক বৃদ্ধি পাচ্ছে। চীন নেপালকে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ দ্বার হিসেবে বিবেচনা করছে। ২০১৭ সালে চীন নেপালে আট বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো বিনিয়োগ করেছে। সড়কপথ, রেলপথ, ফাইবার কেব্‌লের সংযোগসহ বিভিন্ন অবকাঠামো খাতে চীন আরও ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কাতেও বিনিয়োগের নামে চীনের উপস্থিতি ও প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মালদ্বীপের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েনে চীনের প্রভাব বেশ ভালোভাবেই পরিলক্ষিত হয়েছে। সব শেষে চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে ভারতীয় কোম্পানিকে হটিয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনের শেয়ার কেনায় এগিয়ে আছে। বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে দেওয়ার প্রস্তাবসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করছে চীনারা। বাংলাদেশ চীন থেকে সাবমেরিন কিনে নিজের নৌশক্তি সমৃদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, ভারত দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পরোক্ষ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে স্বার্থ আদায়ের চেষ্টা করছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত বিভিন্নভাবে হস্তক্ষেপ করা চেষ্টা করছে। গঙ্গার পানি বণ্টর চুক্তি করলেও পানি প্রাপ্তি নিয়ে বাংলাদেশিদের মধ্যে সংশয় আছে। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে এখনো কোনো চুক্তি হয়নি। বাংলাদেশ সীমান্তে হত্যা নিয়মিত ঘটনা। রোহিঙ্গা বিষয়েও ভারতের অবস্থান কোনোভাবেই বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না। বাংলাদেশ ছাড়াও নেপালের নতুন সংবিধান প্রণয়ন, নির্বাচন নিয়ে ভারত বিভিন্ন সময় মন্তব্য করে অবস্থান পরিষ্কার করেছে। মালদ্বীপেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটেও ভারত একই আচরণ করেছে। শ্রীলঙ্কাতেও বন্দর নির্মাণ ও বন্দরের নিরাপত্তার নামে চীনাদের জমি দেওয়ার বিষয়টি ভারত ভালোভাবে নেয়নি। সব মিলিয়ে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভারত নিজের নিরাপত্তার স্বার্থেই চীনের এই বলয় ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইবে। কিন্তু ভারতের প্রভাব যে সংকুচিত হচ্ছে, সেটি পরিষ্কার। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ভারত বন্ধু হারাচ্ছে। বাংলাদেশই এখন ভারতের নির্ভরতার স্থান। নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা অনেক আগে থেকেই ভারতের বলয় থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে। এ ক্ষেত্রে এই তিনটি দেশ পাশে পাচ্ছে চীনকে। ভারত কখনই চাইবে না বাংলাদেশও চীনা বলয়ে যোগ দিক। কারণ, অন্য তিনটি রাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশে ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ওপর যদি ভারত নিয়ন্ত্রণ হারায় বা চীনের নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, তবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়বে। এ কথা স্বীকার করতে হবে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ এখন অনেক উষ্ণ। ভারত কখনই এই বাংলাদেশকে হাতছাড়া করতে চাইবে না। বাংলাদেশকে কবজায় রাখতে ভারত মরিয়া হয়ে চেষ্টা করবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ জন্য ভারত বরাবরই চাইবে বাংলাদেশে বন্ধু সরকার ক্ষমতায় থাকুক। নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার নির্বাচন থেকে ভারত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। সেই অভিজ্ঞার নিরিখেই বাংলাদেশবিষয়ক নীতি নির্ধারণ করবে ভারত। তাই চীন-ভারতের ছায়াযুদ্ধের আরেকটি একটি ক্ষেত্র হতে পারে বাংলাদেশ। বোঝাই যাচ্ছে, বাংলাদেশকে দুই পক্ষ থেকেই চাপ মোকাবিলা করতে হবে। তবে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে কীভাবে ভারসাম্য আনে, সেটিও দেখার বিষয়। ভারত চীনের প্রভাবকে খর্ব করতে চাইলে দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। ভারতকে সবার আগে প্রতিবেশী দেশে হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। শুধু সরকার নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর জনসাধারণের মতামতকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বন্ধু সরকারকে হয়তো কিছুদিন ক্ষমতায় রেখে কিছু কিছু স্বার্থ নিশ্চিত করা যাবে। কিন্তু এতে দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমাধান আসবে না। দীর্ঘ মেয়াদের সমাধান না এলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের একাকিত্ব বাড়তেই থাকবে।
ড. মারুফ মল্লিক, রিসার্চ ফেলো, সেন্টার ফর কনটেমপোরারি কনসার্নস, জার্মানি

‘সংসদ টিভি’কে কাজে লাগান by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘শিল্পকলা টিভি’ নামে একটি টিভি চ্যানেল চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। দেশের শিল্প-সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম সারা দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতেই এই উদ্যোগ। এই চ্যানেলে সংগীত, নৃত্য, নাটক, চিত্রকলাসহ শিল্পের সব মাধ্যমের নানা অনুষ্ঠান দেখা যাবে। অনেকের কাছে এই উদ্যোগ প্রশংসিত হবে। কিন্তু আমাদের মনে হয়, এটি গঠনমূলক চিন্তার ফল নয়। সংবাদপত্র থেকে জানা গেছে, মূল উদ্যোগটি ছিল শিল্পকলা একাডেমি কর্তৃপক্ষের। কতটা একপেশে ধারণা দ্বারা পরিচালিত হলে এ রকম চিন্তা হতে পারে, তা এই প্রস্তাব থেকে বোঝা যায়। এই প্রস্তাব যদি গৃহীত হতো, তাহলে কৃষিবিষয়ক, শিক্ষাবিষয়ক, মহিলা ও শিশুবিষয়ক নানা প্রতিষ্ঠান একটি করে টিভি চ্যানেল দাবি করে বসত। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, তিনি এই প্রস্তাব অনুমোদন করে অব্যবহৃত ‘সংসদ টিভি’ চ্যানেলকে শিল্প-সংস্কৃতির জন্য কাজে লাগাতে বলেছেন। অবশ্য এটিও খুব সুচিন্তিত মত নয়। কেন নয়, তা পরে বিস্তারিত লিখছি। কয়েকটি ‘নিউজ চ্যানেল’ ছাড়া প্রায় ৩০টি টিভি চ্যানেল প্রতিদিন প্রায় কুড়ি ঘণ্টা সংগীত, নাটক, নৃত্য ইত্যাদি পরিবেশন করে থাকে। চিত্রকলা অবশ্য এখনো কোনো টিভি চ্যানেলের মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। চিত্রকলা সম্পর্কে প্রচুর টিভি অনুষ্ঠান করার সুযোগও কম। তবে যতটুকু সুযোগ রয়েছে, তা-ও কোনো টিভি চ্যানেল ব্যবহার করেনি। কিসের অভাব থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ‘শিল্পকলা টিভি’ প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। সংগীত, নৃত্য ও নাটক আর কত দেখবে দর্শক? অবশ্য টিভিতে নাচের অনুষ্ঠান তুলনামূলকভাবে খুবই কম। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ বলতে পারে, আমরা উন্নতমানের মডেল অনুষ্ঠান দর্শকদের উপহার দেব। তাই প্রয়োজন ‘শিল্পকলা টিভি’। এটা একটা ভালো কারণ হতে পারে। এখানে একটা কথা বলা দরকার, এই টিভির কার্যক্রম মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করবে না, করবে শিল্পকলা একাডেমি। আমরা মনে করি, এটা শিল্পকলা একাডেমির কাজ নয়। একাডেমি তার অ্যাজেন্ডামতো কাজ করবে।
আমাদের আশঙ্কা, এই টিভি চালু হলে শিল্পকলা একাডেমির চলমান কাজের ক্ষতি হতে পারে। বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমি প্রচুর কাজ করছে। এত কাজ কোনো সরকারের আমলে হয়নি। এ জন্য মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী সবার প্রশংসা দাবি করতে পারেন। যদিও কিছু কিছু কাজ নিয়ে সমালোচনার সুযোগ রয়েছে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় যদি মনে করে বর্তমানে ৩০টি টিভি চ্যানেলে গান, নাটক বা নৃত্য নিয়ে উন্নতমানের অনুষ্ঠান হচ্ছে না, তাহলে তারা তথ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিতে পারে। এ প্রসঙ্গে আমাদের প্রস্তাব: বিটিভি (সরকারি প্রতিষ্ঠান) যদি প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে (সরকারের অংশ) ব্যবহার করতে দেয়, তাহলে শিল্পকলা একাডেমি বিটিভির স্টুডিও, কারিগরি সহায়তা, কারিগরি লোকবল, রিহার্সাল রুম সবই প্রায় বিনা পয়সায় পাবে। কারণ, বিটিভি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান নয়। দুটিই সরকারের অংশ। এই তিন-চার ঘণ্টা সময় কীভাবে ব্যবহার করবে, তা শিল্পকলা একাডেমি চিন্তা করবে। আমাদের মনে হয়, এভাবে শুরু করলে আমরা একটা ইতিবাচক ফল পেতে পারি। অথবা এমনও হতে পারে, এই তিন-চার ঘণ্টার অনুষ্ঠান দেখে দর্শক বলতে পারেন, ‘ওমা, এ রকম অনুষ্ঠান তো বিটিভিতেই দেখি। অন্যান্য চ্যানেলেও দেখি। শিল্পকলা একাডেমি নতুন কী করল?’ দর্শক কী বলবেন, অনুষ্ঠান প্রচারের আগে তা কেউ বলতে পারেন না। তবে তথ্য মন্ত্রণালয় যদি এই প্রস্তাবে রাজি হয়, তাহলে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে পৃথক একটি টিভি চ্যানেলের দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। সরকারের টাকায়, সরকারের নীতিতে, সরকারের ব্যবস্থাপনায় একটি টিভি চ্যানেল (বিটিভি) কীভাবে পরিচালিত হয়, কী ধরনের অনুষ্ঠান হয়, তা তো আমরা প্রতিদিন দেখছি। আবার নতুন করে দেখার কী আছে? সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বা শিল্পকলা একাডেমি তো অন্য কোনো সরকারকে প্রতিনিধিত্ব করে না। একই দলের সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছে। খুব পৃথক বা ব্যতিক্রমী হওয়ার সুযোগ আছে কি?প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ, তিনি নতুন কোনো সরকারি চ্যানেল তৈরি না করে বর্তমানে অব্যবহৃত ‘সংসদ চ্যানেল’কে কাজে লাগানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সেখানেও একটা সমস্যা রয়েছে। প্রায় ১০ বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ‘এটুআই’ প্রকল্পের উদ্যোগে মিডিয়া ও শিক্ষা বিষয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংসদ চ্যানেলকে কীভাবে ‘শিক্ষা চ্যানেলে’ রূপ দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে সেমিনারে অনেকে প্রস্তাব করেছিলেন। কীভাবে যেন আমিও সেই আলোচনায় আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। সভায় অন্যান্য শিক্ষা ও গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞসহ আমরা অনেকেই সংসদ চ্যানেলকে শিক্ষা চ্যানেলে পরিবর্তন করার জন্য প্রস্তাব করেছিলাম। (সংসদ অধিবেশনের সময়টুকু ছাড়া) তখন আমাদের মনে হয়েছিল, সরকারও এ রকমই চায়। কিন্তু সেমিনার শেষ হওয়ার পর অনেক দিন কেটে গেছে, এ ব্যাপারে কোনো কথা আর শোনা যায়নি। অনুমান করি, সরকারের ঘনিষ্ঠ কোনো শক্তিশালী মহল এই প্রস্তাব পছন্দ করেনি। হয়তো এ রকম হলে তাদের আর্থিক ক্ষতি হবে। প্রস্তাবটি আর এগোয়নি। আজ এত বছর পর সংসদ টিভির কথাটি যখন উঠেছে, তখন আমরা আবার দাবি তুলতে চাই, অব্যবহৃত সংসদ চ্যানেলকে ‘শিক্ষা চ্যানেলে’ রূপ দেওয়া হোক। শিক্ষাবিষয়ক পরিকল্পিত নিয়মিত কোনো অনুষ্ঠান অন্যান্য টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয় না বললেই চলে। অথচ শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাজধানী ঢাকাসহ বড় বড় শহরে কর্মরত অভিজ্ঞ, সফল ও জনপ্রিয় শিক্ষকদের রেকর্ডকৃত ক্লাস (স্কুল পর্যায়ে) ভিন্ন ভিন্ন সময়ে টিভির মাধ্যমে প্রচার করলে সারা দেশের ছাত্রছাত্রীরা উপকৃত হবে। এভাবে নিয়মিত পরীক্ষার সিলেবাস অনুসরণ করে দেশব্যাপী স্কুল পর্যায়ে উন্নতমানের মেধাবী ক্লাস পরিচালনা করা যায়। এভাবে প্রায় প্রতিটি পাঠ্যবই টিভি অনুষ্ঠানের মতো করে সারা দেশের ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব। বছরের ৩৬৫ দিন টিভির মাধ্যমে যদি উন্নতমানের পাঠদান করা হয়, তাহলে দেশের স্কুলশিক্ষার্থীদের মান বাড়তে পারে। তাদের কোচিং-নির্ভরতা কমে যেতে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রবণতা ও নির্ভরশীলতাও কমে যেতে পারে। শুধু সিলেবাস-নির্ভর ক্লাস নয়, টিভির মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের জন্য নানা রকম বিশেষ ক্লাস, বিশেষজ্ঞ বক্তৃতা, শিক্ষামূলক প্রামাণ্যচিত্র, প্রশ্ন ও উত্তর অনুষ্ঠান, ছাত্রছাত্রীদের অংশগ্রহণে বিভিন্ন রকম বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, বার্ষিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতাসহ টিভির মাধ্যমে আরও কত কিছু করা যায়। অনেকে এসব জানেন। শুধু জানে না শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কারণ তাদের কর্মকর্তাদের মুখে কখনো এই দাবির কথা শুনিনি। বর্তমানের বিভিন্ন প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে শিক্ষা একেবারেই উপেক্ষিত। শিক্ষার মানোন্নয়নে এখনো আমরা টিভি মাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারিনি। আমাদের সরকার, শিক্ষানীতি প্রণেতাগণ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষাসচিব-কেউ বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো কথা বলেননি। অথচ তাঁরা শিক্ষা বিষয়ে প্রতি সপ্তাহে কয়েকটি বক্তৃতা দেন। ‘শিল্পকলা টিভি’র প্রস্তাবক, সমর্থক ও আগ্রহী ব্যক্তিরা আমাদের এই প্রস্তাবে যে অসন্তুষ্ট হবেন, তা আমরা জানি। আপনাদের জন্য আমাদের দুটি প্রস্তাব। ১) আপনারা বিটিভিকে উন্নত মানের শিল্প-সংস্কৃতির কাজে লাগানোর উদ্যোগ নিন। বিটিভি জনগণের টিভি। এটা কোনো সরকার বা দলীয় চ্যানেল নয়। এটা রাষ্ট্রের টিভি। বিভিন্ন সময়ের তথ্যমন্ত্রীরা বিটিভিকে ‘সরকারি টিভি’ বানিয়েছেন। এই ভুল ভাঙতে হবে। এ জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। পৃথক টিভি চ্যানেলের ঝামেলায় না গিয়ে বিটিভি থেকে সময় চেয়ে নিন। ২) বাকি ৩০টি চ্যানেলের গান, নাটক, আবৃত্তি ও নৃত্যের অনুষ্ঠান মানোন্নয়নে শিল্পকলা একাডেমির বিশেষজ্ঞরা সহায়তা করতে পারেন। কারণ ৩০টি চ্যানেলে গান, নাটক ও নৃত্যের অনেক অনুষ্ঠান প্রত্যাশিত মানের নয়। শিল্পকলা একাডেমি তাদের প্রস্তাবিত টিভি চ্যানেলে যা করতে চেয়েছে, সেই সব আইডিয়া অন্য ৩০টি চ্যানেলকে দিন। তারাও সেই সব অনুষ্ঠান করতে পারে। অন্য টিভি চ্যানেল তো রাত-দিন গান আর নাটক নিয়েই আছে।সরকারের কাছে আবেদন, ‘সংসদ টিভি’কে অন্য কাজে ব্যবহার না করে শিক্ষার মানোন্নয়নে (প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা) কাজে লাগান। এতে দেশ ও জাতি অনেক বেশি উপকৃত হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর গণমাধ্যমকর্মী ও উন্নয়নকর্মী

‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ একটি ভুল শব্দ

প্রথম আলো: র‍্যাবের বর্তমান মুখ্য চ্যালেঞ্জগুলো কী, সেগুলো তার প্রতিষ্ঠাকালীন সনদের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কি না?
বেনজীর আহমেদ: রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক শৃঙ্খলার যে চ্যালেঞ্জ, তা গতিশীল এবং পরিবর্তনশীল। ১৪ বছর আগে একটা তাড়াহুড়োর মধ্যে যে ম্যান্ডেট নিয়ে র‍্যাব গঠিত হয়েছিল, সেখানে আজ অনেক পরিবর্তন এসেছে। র‍্যাবের কাজ ও পরিবেশেও পরিবর্তন এসেছে।
প্রথম আলো: অপারেশন ক্লিন হার্ট র‍্যাবের আওতায় না হলেও তার কাজের ধারাবাহিকতা র‍্যাব বজায় রেখেছে।
বেনজীর আহমেদ: আমি এর পেছনে এভাবে যোগসূত্র খুঁজছি না। অপারেশন ক্লিন হার্ট ও র‍্যাবের বৈশিষ্ট্য এক নয়। এখানে আটটি বাহিনীর লোক আছে, কমান্ড-কাঠামো ভিন্ন। আমি মনে করি না র‍্যাব অপারেশন ক্লিন হার্টের সরাসরি কোনো লিগেসি। ওই সময়ে জেএমবি ও বাংলা ভাইয়ের আকস্মিক উত্থান এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন সরকারের এ রকম একটি বাহিনীর দরকার ছিল। র‍্যাব দুই ফ্রন্টে কাজ করেছিল। বাংলা ভাই দমনের পাশাপাশি সন্ত্রাস দমন তার লক্ষ্য ছিল।
প্রথম আলো: তার মানে র‍্যাব তৎকালীন বিএনপি সরকারের একটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ছিল?
বেনজীর আহমেদ: সেই সময়ে এর প্রয়োজন ছিল এবং তার ধারাবাহিকতা এখনো আছে। তবে আমি সতর্কতার সঙ্গে যা এড়াতে চাই সেটা হলো, সরকারের পক্ষে আমি কোনো কথা বলতে চাই না।
প্রথম আলো: আপনি সরকারের অংশ?
বেনজীর আহমেদ: আমি সরকারের মুখপাত্র। তবে রাজনৈতিক বা নীতিনির্ধারণী বিষয়ে বলবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো কেউ।
প্রথম আলো: দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী এবং অকার্যকর ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার দোহাই দিয়ে ক্লিন হার্টে প্রায় ৫৮ জনকে হত্যা করা হয়েছিল। আজও ওই যুক্তিতেই হত্যাকাণ্ড ঘটছে, কীভাবে প্রমাণ করবেন সেটা বদলেছে? আপনি তখনো বড় পদে ছিলেন? ওই ৫৮ হত্যার তদন্ত চান না?
বেনজীর আহমেদ: ক্লিন হার্টের পক্ষে-বিপক্ষে কথা বলব না। আমি ওই সময়ে তার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। আমি যদি বলি তদন্ত হওয়া উচিত বা উচিত নয়, তাহলে কি তা থেমে থাকবে? এটা বুঝতে হবে, আমরা একটি গণতন্ত্রে বাস করছি। আদালত সচল রয়েছেন, এই যে আপনি আমাকে প্রশ্ন করছেন, এর মানে হলো, গণমাধ্যম অসীম স্বাধীনতা ভোগ করছে। এসবই একটি গতিশীল গণতন্ত্রের লক্ষণ। যা তদন্তযোগ্য, সেটা না হলে কেউ আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন।
প্রথম আলো: ক্লিন হার্টের ৫৮ হত্যার দায়মুক্তি আইনটিও হাইকোর্ট বাতিল করেছেন। সুতরাং সরকারি সংস্থাগুলোর তা তদন্তে বাধা নেই।
বেনজীর আহমেদ: আমার কোনো মন্তব্য নেই। আপনি বললেন, বাতিল হয়েছে, জাস্ট ফাইন।
প্রথম আলো: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টিসহ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা ও গণমাধ্যম বলছে, বিচারবহির্ভূত হত্যা চলছে। সুইডিশ রেডিওর রিপোর্ট মতে, র‍্যাবের কর্মকর্তা জবানবন্দি দিয়েছেন যে র‍্যাব মানুষ মারছে।
বেনজীর আহমেদ: আমরা সুইডিশ সরকারকে অনুরোধ করেছি, এটা সত্যি হলে সেই অফিসার এবং যাঁরা এটা রেকর্ড করেছেন, তাঁদের নাম অবিলম্বে আমাদের জানাতে। র‍্যাবের কোনো কর্মকর্তা যদি তিনি আদৌ হন, তাহলে তিনি খুনি হিসেবে চিহ্নিত হবেন। আমরা আইনি ব্যবস্থায় যাব।
প্রথম আলো: আপনি কি বলছেন যে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে না?
বেনজীর আহমেদ: আমি তো এই টার্মের সঙ্গে একমত নই। তাহলে বিচারে অন্তর্ভুক্ত হত্যাকাণ্ড কোনটি?
প্রথম আলো: এটা কথার পিঠে কথা হলো, আইনের বাইরে হত্যাকাণ্ড ঘটছে। নাম যা-ই দিন, আমরা লাশ পাচ্ছি। র‍্যাবের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ আছে।
বেনজীর আহমেদ: বহির্ভূত হলে অন্তর্ভুক্ত হত্যা আছে। অন্তর্ভুক্ত হত্যা কোনটি?
প্রথম আলো: রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড বোঝাতে এটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত পরিভাষা, বাংলাদেশি মিডিয়া এটা বের করেনি।
বেনজীর আহমেদ: এটা একটা রং কয়েনেজ (ভুল শব্দ উদ্ভাবন)। আমেরিকায় যখন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে লোকজন মারা যায়, তখন তো মার্কিন মিডিয়া এটা বলে না। আপনারাও হইচই করে বলেন না। পশ্চিমা অনেক কিছু নিয়ে...
প্রথম আলো: টিভি টক শোতেও দেখেছি, আপনি একটি আলোচনায় বলেছিলেন, বোস্টন কিলিং নিয়ে সিএনএন কথা বলল না। তো আপনি এটা দেখবেন না যে বোস্টন পুলিশ সাধারণভাবে কেমন আচরণ করে? আমাদের বাহিনীগুলো নিয়মিতভাবে যা সব করে থাকে, সেগুলো বিবেচনায় না নিয়ে আপনি আমেরিকার সঙ্গে কীভাবে মেলান?
বেনজীর আহমেদ: আমি কোথায় মেলালাম। আমি বোস্টনের কথা বলেছি। আমি আমার বাহিনীর সঙ্গে মেলাইনি। এটা আপনি মেলাচ্ছেন এখন। যা আপনার কথা, তাকে আমার বলে চালিয়ে দিতে চাইছেন (হাসি)। এটা কিন্তু নৈতিকভাবে ঠিক নয়।
প্রথম আলো: ২২ ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার এক টুইটে ১৯ জন বিএনপি কর্মীসহ ৭৫০ জন নিখোঁজ বা গুমের তথ্য দেওয়ার বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি?
বেনজীর আহমেদ: পত্রিকায় পড়েছি। তদন্ত কীভাবে করব? নাম-ঠিকানা-পরিচয় লাগবে। শুধু তথ্যের ওপর তদন্ত হয় না।
প্রথম আলো: বিএনপি আপনাকে সুনির্দিষ্ট তালিকা দিলে তদন্ত করবেন?
বেনজীর আহমেদ: আমার কাছে আসার কথা নয়, যাদের কাছে আসবে, তারা দেখবে। সরকার চাইলে র‍্যাব করবে।
প্রথম আলো: আমাদের দেশের অবস্থা ভালো বোঝাতে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০০৯ সালে ব্রিটেনে নিখোঁজ হওয়া পৌনে ৩ লাখের মধ্যে ২০ হাজার ফিরে আসেনি। আমেরিকার অবস্থা আরও খারাপ। আপনার মন্তব্য?
বেনজীর আহমেদ: কোনো মন্তব্য নেই। রাষ্ট্রের কর্মচারী হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের ওপর মন্তব্য করতে পারি না।
প্রথম আলো: আমরা খতিয়ে দেখেছি যে বাংলাদেশের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের সঙ্গে ওই মিসিং হওয়া ব্যক্তিদের কোনো মিল নেই।
বেনজীর আহমেদ: আমরা অবশ্য এটা জানি যে, কোনো কোনো দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ান পুলিশের রেকর্ডেও এমনটা পাবেন।
প্রথম আলো: তার সঙ্গে আমাদের হত্যা-গুমের মিল খুঁজে পান?
বেনজীর আহমেদ: আমি মিসিং মানুষের কথা বলছি। দুনিয়াজুড়েই এটা হচ্ছে, অনেকে ফিরে আসেন, কেউ কখনোই ফিরে আসেন না। আমাদের দেশেও লোকজন মিসিং হয়, ফিরে আসে, ফিরে আসে না। এই মুহূর্তে আমাদের কাছে ১১ জনের নিখোঁজ তালিকা আছে। অভিযোগ ছিল তাঁরা গুম হয়েছেন, আমরা দেখলাম তাঁরা বাড়িতে কাজকর্ম করছেন। কিছুদিন আগে একজন গুরুত্বপূর্ণ লোক সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণে স্বেচ্ছায় মিসিং হয়ে স্বেচ্ছায় আবির্ভূত হলেন। আপনারা এ নিয়ে পত্রিকায় অনেক লেখালেখি করেছেন। আমি নামটা বলতে চাই না। কেউ পাওনাদারের কারণে মিসিং হচ্ছেন।
প্রথম আলো: র‍্যাবের হেফাজতে সাম্প্রতিক মৃত্যু, হয়রানির তথ্য? এ বিষয়ে আপনাদের অভ্যন্তরীণ তদন্তের কী ফল?
বেনজীর আহমেদ: এসব তথ্য তো আপনাদের ভালো জানার কথা। আমাদের হাতে নজির নেই। আমাদের ১৪টি ব্যাটালিয়নকেই আমরা ওয়াচ করি। (হেসে) অবশ্য ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক জর্জ অরওয়েলের বিগ ব্রাদারের মতো করে ওয়াচ নয়। এ জন্য একটি কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ইউনিট আছে। দোষীরা শাস্তি পান।
প্রথম আলো: কতজন কী কারণে শাস্তি পান, সেটা কি প্রকাশযোগ্য?
বেনজীর আহমেদ: প্রকাশযোগ্য। কিন্তু আমাদের দেশে তো এটাও এক সমস্যা, একবার পুলিশ সদর দপ্তর এ রকম তথ্য প্রকাশ করে বিপদে পড়েছিল। ওটাই মূল শিরোনাম হয়ে গেল। আপনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে প্রকাশ করলেন, সেটাই ঘায়েলের জন্য ব্যবহৃত হবে। আমরা শাস্তি যে দিই, সেটা আপনাকে দেখাব, কিন্তু প্রকাশের জন্য নয়।
প্রথম আলো: সোয়াট বা সিটিইউর মতো বিশেষায়িত সংস্থাগুলোর জন্মের পরও র‍্যাব কেন বিলুপ্ত হবে না?
বেনজীর আহমেদ: অন্য সংস্থা এসেছে, কিন্তু র‍্যাব বিলুপ্ত হবে কেন? আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত র‍্যাবের সামর্থ্য অনেক উত্তম। পুলিশ পারলে র‍্যাব সৃষ্টি হতো না। আর র‍্যাবের বেঁধে দেওয়া মানটাই আজ অন্যান্য সংস্থা অনুসরণ করছে। র‍্যাব জাতীয় সামর্থ্য বৃদ্ধি করছে। অনেক দেশেই একই বিষয়ে একাধিক সংস্থা কাজ করে। হোলি আর্টিজেন বেকারির পরে এ পর্যন্ত র‍্যাব ও পুলিশ যথাক্রমে ৪৯২ ও ২০০ সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার করেছে। র‍্যাব না থাকলে চিত্রটি হতো উল্টো।
প্রথম আলো: এভাবে সামরিক বাহিনীকে যুক্ত করে বিশ্বের কোথাও এ রকম বাহিনী আছে কি?
বেনজীর আহমেদ: না, এ ধরনের বাহিনী অনন্য।
প্রথম আলো: ৮০০ কোটি টাকার বাজেটের একটি বাহিনী, একটি সাধারণ বিধির অধীনে চলা কি ঠিক? পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় আইন নয় কেন?
বেনজীর আহমেদ: আমরা একটি সম্পূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ আইনের খসড়া তৈরি করেছি। অংশীজনদের মতামত নিচ্ছি। সরকার ও সংসদ আইন করবে।
প্রথম আলো: খসড়া আইনে নতুন কী অন্তর্ভুক্ত হতে পারে? নিয়োগনীতি?
বেনজীর আহমেদ: অনেক প্রশাসনিক সমস্যা মোকাবিলা করেছি। যেমন সরকার অনুমোদন করলেই তবে আমরা তদন্ত করতে পারি। আবার আদালতের নির্দেশদানের এখতিয়ার আছে। সুতরাং আদেশ আমরা তামিল না করে পারি না, কিন্তু তা-ও অনুমোদনের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হয়। প্রশাসনিক, অপারেশনাল ও অনুসন্ধানগত জটিলতা দূর করার চেষ্টা আমাদের রয়েছে। এটা শতভাগ প্রেষণনির্ভর বাহিনী, তাই ঘন ঘন বদলির কারণে আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবার ও সব তথ্য সংরক্ষণ করতে পারছি না। ফলে কিছু নিজস্ব টেকনিক্যাল স্টাফ প্রয়োজন।
প্রথম আলো: একজন সাবেক সেনাপ্রধান র‍্যাবে অফিসার দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন বলে শুনেছি। আইন দ্বারা এর সমাধান কীভাবে হবে? ৪০ শতাংশের সেনা কোটা পূর্ণ থাকে কি?
বেনজীর আহমেদ: ওটা তো নিশ্চয় তাঁর সরকারি ভাষ্য ছিল না। তাই এর ওপর মন্তব্য করা ঠিক মনে করি না। কোটায় কখনো নানা কারণে ওঠানামা থাকতে পারে, তবে তা সাময়িক।
প্রথম আলো: র‍্যাবের ওপর মানুষের আস্থার বিষয়ে আপনি বলেছেন, দেশ-বিদেশে সমীক্ষা হয়েছে। কারা বলল, ৮৩ ভাগের আস্থা আছে?
বেনজীর আহমেদ: যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট।
প্রথম আলো: আপনি বলেছেন, ১০ বছরে র‍্যাব দেড় লাখ লোক গ্রেপ্তার ও ১ হাজার ২০০ জঙ্গি গ্রেপ্তার করেছে। ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার একটিমাত্র অংশ আপনি, গ্রেপ্তারের পরের স্তরগুলোর ফলাফল জানতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা আছে কি না?
বেনজীর আহমেদ: দেখুন, গ্রেপ্তারের ওই সংখ্যা এটাও নির্দেশ করছে যে, তথাকথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডই যদি আমরা বেশি করতাম, তাহলে এরাই বেশি মারা যেত। আবার দেখবেন, ঢাকায় বিভিন্ন বাহিনী ছিল, যাদের সঙ্গে র‍্যাবের ‘এনগেজমেন্ট’ বা গোলাগুলি হয়েছে, তাদের সংখ্যা কমেছে। শাহাদাৎ বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী কোথায়? যখন এ রকম বাহিনী অনেক ছিল, তখন রেট অব এনগেজমেন্ট বেশি ছিল।
প্রথম আলো: কিন্তু বছরে ৮০ থেকে ১০০ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে, এটা বেশি মনে হয় না?
বেনজীর আহমেদ: আপনি বলুন, কোন সংখ্যাকে আপনি স্ট্যান্ডার্ড মনে করেন? কত জন আমাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হলে আপনি খুশি হবেন?
প্রথম আলো: পাল্টা প্রশ্ন আপনাকেও করা চলে। আর কত সংখ্যা হলে আপনি তাকে ন্যূনতম বলবেন?
বেনজীর আহমেদ: আমার কাছে কোনো সংখ্যা নির্ধারিত নেই। এক বছরে কেউ যদি এনগেজমেন্টে না আসে, একটাও হবে না। আসলে যে কয়টা আসবে, সেই কয়টা হবে।
প্রথম আলো: আপনি ‘এনগেজমেন্ট’ বলছেন। তাহলে বলুন পেশাদার খুনির মানবাধিকারে আপনি বিশ্বাস করেন কি? এটা মানতে আপনি সাংবিধানিকভাবে বাধ্য।
বেনজীর আহমেদ: কেন করব না? এটা আমরা মানি তো। না মানলে গ্রেপ্তার করা দেড় লাখ লোক ও ১ হাজার ২০০ জঙ্গি সবাই তো নিহত হতো।
প্রথম আলো: গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মনিটরিং কীভাবে চলে?
বেনজীর আহমেদ: অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা করি না, ধরেই পুলিশকে দিই। তারা বাকি কাজ করে। আমরা এই প্রথম একটি ডেটাবেইস করেছি। জেলে ঢোকা ও বেরোনো আমরা প্রতিমুহূর্তে মনিটর করছি। কোন সন্ত্রাসী কখন ঢুকল, কখন বেরোল, তা বলতে পারব। ৫০ ভাগের বেশি জেলে এটা করেছি। আমরা যেসব মামলার তদন্ত করি, এর জন্য একটি কেস ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার করেছি। তদন্তের প্রতিটি ধাপে কী ঘটছে, তার ডেটা সংরক্ষণ চলছে। আর সংঘাতে আমাদের কতজন আহত হয়েছে, অঙ্গহানি ঘটেছে, তা আমরা প্রকাশ করি না। কারণ সন্ত্রাসীদের উৎসাহ দিতে চাই না।
প্রথম আলো: ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, এনকাউন্টার চলছিল, হঠাৎ এসব বন্ধ হয়ে গুম এল? কীভাবে দেখেন আপনি?
বেনজীর আহমেদ: এখন তো কোনো অভিযোগই পাই না। তথাকথিত গুমের অভিযোগও পাই না। সুন্দরবনে গত সপ্তাহে দুজন লোক মারা গেছে। এখন বলবেন, তারা মারা পড়ল কেন? তারা সশস্ত্র, আমরা বেশি প্রশিক্ষিত। ১৭টি বাহিনীর ১৯২ জন লোক ১৬ হাজার রাউন্ডের মতো গুলি নিয়ে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেছে, এসব খুব বড় করে আসে না। বেসরকারি ব্যাংক, প্রধানমন্ত্রীর তহবিল ও র‍্যাবের তহবিলের টাকায় তাদের পুনর্বাসন হয়েছে। জেলেরা সন্ধ্যা হলে আগে বাতি নেভাতেন, এখন তাঁরা গ্যাসের চুলা জ্বালান, টিভি দেখেন।
প্রথম আলো: বলুন তো, র‍্যাবের কালো পোশাক সঙ্গে গোখরো সাপের ফণার প্রতীক, এটা দেখে শিশুরা র‍্যাব হতে চাইবে? ভয় পাবে না? এটা কি বদলানোর কথা ভাববেন? অন্য দেশে?
বেনজীর আহমেদ: এটা যাঁরা তৈরি করেছিলেন, তাঁরা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন। হয়তো আপনি যেভাবে ভাবছেন, সেটা তাঁরা চিন্তা করেননি। তাঁরা ভেবেছেন, সন্ত্রাসীদের জন্য এটা একটা বার্তা। অনেক দেশে বাঘ আছে, শ্বাপদের চিহ্ন অনেক স্পেশাল ফোর্সের আছে। হোলি আর্টিজানের পরে গঠিত স্পেশাল কমান্ডো গ্রুপের প্রতীক হলো অর্ধেক মানব, অর্ধেক নেকড়ে। নিরীহর কাছে তারা মানুষ, সন্ত্রাসীর কাছে তারাই নেকড়ে।
প্রথম আলো: সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড রহস্য হয়েই থাকবে? আপনি ডিজি হয়ে আসার পরে কি অগ্রগতি করেছেন?
বেনজীর আহমেদ: র‍্যাবের মহাপরিচালক হিসেবে আমি যদি আমার কর্মকালের মধ্যে ভুক্তভোগী পরিবারের প্রত্যাশা অনুযায়ী এর একটা সুষ্ঠু পরিণতি দেখতে পারি, তাহলে আমার থেকে বেশি খুশি হয়তো কেউ হবেন না।
প্রথম আলো: আপনি আরেকটু নির্দিষ্ট করে বলবেন, কবে আমরা এটা আশা করতে পারি?
বেনজীর আহমেদ: আপনি আমাকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফাঁদে ফেলতে চাইছেন কি? পেশাদার হিসেবে আমি সেই ফাঁদে পা দেব না (হাসি)।
প্রথম আলো: নারায়ণগঞ্জের ত্বকী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র র‍্যাব সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেওয়ার পরেও কিন্তু হয়নি। নথিটি আপনি দেখেছেন কি?
বেনজীর আহমেদ: নথিটি চলমান, ক্লোজ করা হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে সাগর-রুনির নথিটি পর্যালোচনার সময় এটিও দেখেছি।
প্রথম আলো: নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়?
বেনজীর আহমেদ: না। অনেক দেশে কোনো মামলার যখন নিষ্পত্তি হয় না, তখন তাকে ডেথ কেস ফাইল বলে। আবার ৪০ বছর পরে কোনো ক্লু থেকে কিছু পাওয়া গেলে সেটা আবার খোলা হয়। পশ্চিমা দেশগুলোর ওয়েবসাইটে এটা থাকে।
প্রথম আলো: বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর ফাইল খোলা?
বেনজীর আহমেদ: আমরা এর তদন্ত করছি না।
প্রথম আলো: র‍্যাবের রাজনৈতিক ব্যবহারের অভিযোগ কীভাবে দেখেন?
বেনজীর আহমেদ: নমস্য রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের রাজনৈতিক বক্তব্যের পাল্টা বক্তব্য দেওয়া আমার কাজ নয়। আমি পেশাদার। সে হিসেবেই আমার কাজটি করতে চাই।
প্রথম আলো: র‍্যাবের অভ্যন্তরীণ অভিযোগের তদন্ত নির্বাহী কর্মকর্তা বাদ দিয়ে বিচারিক হাকিম দিয়ে করালে অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা পেত বলে মনে করেন কি?
বেনজীর আহমেদ: কেন তাদের দিয়ে করাতে হবে, এটা আমি জানি না।
প্রথম আলো: কারণ বিচারকেরা স্বাধীন।
বেনজীর আহমেদ: আমরা এটাও শুনি তাঁরা স্বাধীন নন। (হাসি) আপনার পত্রিকাতেই ছাপা হবে, না, তাঁরা স্বাধীন নন। যেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, সেটা হলো আমাদের সঙ্গে এনগেজমেন্টের কারণে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছে, তখন আমরা তদন্ত করছি। যদি আমরা যথার্থ দেখি, আর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট না বলেন, তাহলে সেটাই টিকবে। এটাই ভারসাম্য। আর আমি বলব, আমরা কঠোর শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।
প্রথম আলো: মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক? সরকারি কমিশনকে কিন্তু আপনাদের প্রতি সন্তুষ্ট মনে হয় না।
বেনজীর আহমেদ: তাদের কোনো অনুরোধ আমাদের কাছে এই মুহূর্তে পেন্ডিং নেই।
প্রথম আলো: আসক, অধিকার কিছু আপনাদের জানায়?
বেনজীর আহমেদ: না।
প্রথম আলো: আপনার নিজ এলাকা গোপালগঞ্জের কোনো আসন থেকে কখনো নির্বাচনে দাঁড়াবেন না?
বেনজীর আহমেদ: আমি এসব নিয়ে ভাবি না।
প্রথম আলো: তার মানে আপনি রাজনীতিতে নামার সম্ভাবনা নাকচ করছেন না।
বেনজীর আহমেদ: কেন আমি এসব নিয়ে ভাবতে যাব, আমি তো কর্মরত আছি।
বেনজীর আহমেদ: র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান

কোটা-বৈষম্যের প্রতিবাদ ও ঝাড়ু কর্মসূচি

১৯৩১ সালের আদমশুমারিতে দেখা গেছে, ১০ শতাংশ উচ্চবর্ণই প্রায় শতভাগ সুবিধার মালিক। আর জনসংখ্যার বাকি অংশ জন্মের পাপ নিয়ে বঞ্চিত। সেটাও ছিল একধরনের কোটা। সে সময় পূর্বপুরুষের জমিজমা ও শিক্ষার সুযোগ এবং নিম্নবর্ণ ও নিম্নশ্রেণির কৃষকদের পিছিয়ে পড়ার কারণে চাকরি-বাকরির বেশির ভাগই শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও জমিদারশ্রেণির কুক্ষিগত হয়ে ছিল। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও কোটাব্যবস্থার নামে সে রকমই এক অগ্রাধিকারের ব্যবস্থা চালু আছে। কোটার সেই ফাঁক আর দূর হলো না। এই রাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্ম-লিঙ্গ-জাতি-আঞ্চলিক ও কৃষক-শ্রমিকের বঞ্চনার কথা স্বীকার করা হয়েছে। সে কারণে বর্তমান কোটাব্যবস্থায় নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, আদিবাসী ৫ শতাংশ ও প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ—এই মোট ২৬ শতাংশ কোটা নিয়ে কেউ কথা তোলেনি। এর বাইরে আছে পোষ্য কোটার ২০ শতাংশ, যার কথা কোথাও উল্লেখ করা নেই। যার মা-বাবা সরকারের যে বিভাগে চাকরি করেছেন, সেখানটা যেন তাঁর সন্তানদের তালুক। স্বাধীনতার পরপরই ওপরের কোটাগুলোর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা কোটা চালু করা হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও নাতিদের সুবিধাদানের ব্যবস্থা করা হয়। আর এই সুবিধা পেতে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সৃষ্টি হচ্ছে দেদার। নয়া সরকার মানেই নয়া মুক্তিযোদ্ধা তালিকা। ব্রিটিশরা যেভাবে অনুগত জমিদারগোষ্ঠী সৃষ্টি করেছে, কোটার মুলা ঝুলিয়ে এখানেও অনেকটা তা-ই করা হয়েছে। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। আমাদের পিতারা এই দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন, অতএব...। এ রকমটা কেউ কেউ ভাবতে পারেন। কিন্তু আমার মতো মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কাছে কোটাসুবিধা নেওয়া অপমানজনক, পিতাদের কাছেও। আমরা প্রশ্ন করতে চাই, দেশটা কি তবে ভাগ-বাঁটোয়ারার জিনিস? আর এই ভাগের বখরা বিলাতে গিয়ে জন্ম দেওয়া হয়েছে আরও আরও বৈষম্যের। আমরা সব ধরনের কোটার বিপক্ষে নই। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৪৭ বছর পর মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরাও যখন আর সরকারি চাকরিপ্রার্থীর বয়সে নেই, তখন তাঁদের নাতিপুতি ও পোষ্যদের সুযোগ দিতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক বেকারকে বঞ্চিত করার বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠবেই। প্রশ্ন উঠেছে এবং তরুণেরা কোটা সংস্কারের আন্দোলন চালাচ্ছেন। এর সঙ্গে সংহতি জানানো ব্যক্তিগতভাবে কর্তব্য মনে করি।
২. আন্দোলনের লক্ষ্য যেমন গণতান্ত্রিক হতে হয়, তেমনি তার কর্মসূচিকেও হতে হয় মানবিক। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বৈষম্যের শিকারকে উপহাস করতে পারে না। কথাটা বলার প্রসঙ্গ এল আন্দোলনের একটা কর্মসূচির কারণে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনকারীরা প্রতিবাদ হিসেবে সম্প্রতি রাস্তা ঝাড়ু দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছেন। কিছুদিন আগে ভারতেও কোটার বিরোধিতা করতে গিয়ে আন্দোলনকারীরা জুতা পালিশের কর্মসূচি নিয়েছিলেন। কিন্তু এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজকে আমরা কোন বার্তা দিচ্ছি? ঝাড়ু দেওয়া কি নীচু কাজ? সমাজের বঞ্চিত যে শ্রেণিটি ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করে, এর মাধ্যমে তাদের কি হেয় করছি না? শিক্ষার গর্বে কম শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত ঝাড়ুদারদের তুচ্ছ করাটা কি গ্রহণযোগ্য হয়? এর দ্বারা সমাজের সামনে আমরা কোন আদর্শ স্থাপন করতে চাইছি? আমাদের অনেকে উচ্চশিক্ষিত, কিন্তু বিদেশে গিয়ে ঝাড়ু দেওয়ার কাজ করে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠন। আমরা কোটার সংস্কার চাইতে গিয়ে যেন আমাদের পূর্বপুরুষদের অপমান না করে বসি। কোটার সংস্কার তো চাই সংবিধানবর্ণিত সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্যই।
৩. ব্রাহ্মসমাজের সদস্য ও শিবনাথ শাস্ত্রীর শিষ্য আনন্দচন্দ্র মিত্র নামের একজন শিক্ষক, যিনি ময়মনসিংহে শিক্ষকতা করতেন। তিনি ১৮৭৬ সালে রাষ্ট্রনীতিবিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। সেটির নাম ছিল ‘ব্যবহার দর্শন’, যার শিরোনামের নিচে ইংরেজিতে লেখা ‘অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য সায়েন্স অব পলিটিকস’। আনন্দচন্দ্র মিত্র সায়েন্স অব পলিটিকস বলতে ব্যবহার দর্শন বুঝতেন। সেখানে বলেছেন, ‘যে সমাজে রাজশক্তি ও প্রজাশক্তি সম্মিলিত হইয়া কার্য্য করে, তাহাকে রাজ্য বলে। সমুদয় প্রজাশক্তি সম্মিলিত হইয়াই রাজশক্তির সৃষ্টি করে, এবং সেই রাজশক্তির বশীভূত হইতে আপনা হইতেই বাধ্য হয়। রাজশক্তিও আবার প্রজাশক্তির এমন আয়ত্ত থাকে, যে কোন ক্রমেই প্রজাশক্তিকে উপেক্ষা করিয়া কোন কার্য্য করিতে পারে না। যে সমাজে এই রূপে কার্য্য চলে তাহাই প্রকৃত রাজ্য।’ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে তো আমরা এমন রাষ্ট্রই সৃষ্টি করতে চেয়েছিলাম। যেখানে নাগরিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া মেনে নেওয়া হবে। সরকার যদি কোনো সমস্যা বুঝতে না পারে, তখন আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের বোঝানোর সুযোগটা খোলা রাখতে হবে। কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সরকারের হুঁশ ফিরুক। আমরা সরকারকে মনে করাতে চাই যে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের ঘোষিত নীতিই তো ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। ‘নীতি’ শব্দটি ‘নী’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার মানে হচ্ছে টেনে নিয়ে যাওয়া। অর্থাৎ যে বিদ্যার সাহায্যে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়, তাই নীতি। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পূর্বপুরুষদের এই বৈষম্যবিরোধী নীতিই টেনে নিয়ে গেছে। সাতই মার্চের ভাষণের কথা ধার করে বলি, কী পেলাম আমরা? আমাদেরও কি দাবায়ে রাখা হবে?
নাহিদ হাসান: প্রধান সমন্বয়ক, রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি, কুড়িগ্রাম।
nahidknowledge@gmail.com

‘বাঙালিপ্রেমী’ জাফর মাসুদ by সোহরাব হাসান

একাত্তরের মার্চে ইয়াহিয়া খানের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর ভাইস অ্যাডমিরাল আহসান ও পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা ইয়াকুব খানের পদত্যাগের কথা আমরা জানি। এই দুই শীর্ষস্থানীয় পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তা রাজনৈতিক সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের তাগিদ দিয়েছিলেন। তাঁরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে সামরিক অভিযানের পরিণতি পাকিস্তানের ভাঙন এবং অগণিত নিরীহ মানুষের মৃত্যু। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অনেক গবেষক এবং সেই সময়ের ঘটনাবলির প্রত্যক্ষদর্শীদের লেখায় এই দুই বাঙালিপ্রেমী পাকিস্তানি কর্মকর্তার কথা উঠে এসেছে। কিন্তু পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান এয়ার মার্শাল জামাল খান ও গবেষক নাসিম ইউসুফের লেখায় বাঙালিপ্রেমী তৃতীয় যে শীর্ষস্থানীয় সামরিক কর্মকর্তার নাম পাওয়া যায়, তিনি হলেন এয়ার কমোডর জাফর মাসুদ, যিনি মিট্টি মাসুদ নামে বেশি পরিচিত ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান। ১৯৭০ সালের এপ্রিলে যখন জাফর মাসুদ এই দায়িত্ব নিয়ে ঢাকায় আসেন, তখন রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল উত্তপ্ত। পাকিস্তানজুড়ে জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল। ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ ৩১৩ আসনের জাতীয় পরিষদে ১৬৭টি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপিপি পায় ৮১টি আসন। কিন্তু নির্বাচনের এই ফল সামরিক চক্র ও পিপিপি নেতা ভুট্টো মানতে পারছিলেন না। ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ আহুত অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে পূর্ববঙ্গের মানুষ ক্ষুব্ধ প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া জানায়। বঙ্গবন্ধু ধর্মঘটের ডাক দেন। গভর্নর আহসানের শেষ অনুরোধ ছিল যদি একান্তই অধিবেশন স্থগিত করতে হয়, তাহলে যেন নতুন তারিখ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ইয়াহিয়া সেটি করলেন না। আহসান ওই দিনই পদত্যাগ করেন। ইয়াহিয়া খান পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক প্রশাসক ইয়াকুব খানকে গভর্নরের দায়িত্ব দেন। কিন্তু ৪ মার্চ ইয়াকুবও পূর্বাঞ্চলীয় প্রশাসকের পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
এ অবস্থায় সামরিক হাইকমান্ড বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা জাফর মাসুদকে পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের দায়িত্ব দেয় এবং বেলুচিস্তানের কসাই নামে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খানকে নতুন গভর্নর করে পাঠায়। নাসিম ইউসুফ লিখেছেন, ইয়াহিয়া খান যে পথে রাজনৈতিক অস্থিরতা মোকাবিলা করছিলেন, তাতে মাসুদ অসন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর উপলব্ধি ছিল, পূর্ব বাংলার যে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তা দমন-পীড়ন বা সহিংসতা দিয়ে থামানো যাবে না। এ অবস্থায় তিনি ও তাঁর সহযোগীরা ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খানকে ঢাকায় আসতে রাজি করান। শেষমেশ ইয়াহিয়া ঢাকায় আসেন এবং প্রেসিডেন্ট হাউসে মাসুদ ও জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে জাফর মাসুদ প্রেসিডেন্টের কাছে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি খুবই জটিল এবং শান্তিপূর্ণভাবেই রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে। অন্যথায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুর প্রাণহানি ঘটবে। ইয়াহিয়া জবাব দেন, ‘মিট্টি আমি তা জানি, আমি তা জানি।’ এয়ার কমোডর মাসুদ এক ঘণ্টা ধরে সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক এবং পূর্ব বাংলার সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান করা যাবে না। ২০০৩ সালের ৭ অক্টোবর জাফর মাসুদ মারা যাওয়ার পর পাকিস্তানের সাবেক বিমানবাহিনী প্রধান মার্শাল জামাল খান লিখেছেন, মিট্টি মাসুদ ছিলেন বিমানবাহিনীর এক সাহসী কর্মকর্তা। কিন্তু তিনি তাঁর কমান্ডকে নিরীহ মানুষ হত্যার কাজে ব্যবহার করতে দেননি। (ডন, ১৩ অক্টোবর ২০০৬) ঢাকায় অবস্থানকালে ইয়াহিয়া নির্বাচনে বিজয়ী নেতা শেখ মুজিবের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেন। একপর্যায়ে তিনি ভুট্টোকেও ঢাকায় আসতে বলেন। কিন্তু তাঁদের আলোচনা সফল হয়নি। ইয়াহিয়া খান রাজনৈতিক সমাধানের পথে না গিয়ে ২৫ মার্চ ঢাকা ত্যাগের আগে বাঙালিদের ওপর সামরিক অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়ে যান। জাফর মাসুদ শেষে চেষ্টা হিসেবে বিমানবন্দরে বিদায় জানানোর সময়ও তাঁকে এর পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দেন। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। এই ক্রান্তিলগ্নে টিক্কা খান মাসুদকে সামরিক অভিযানে বিমানবাহিনীর সহায়তার জন্য অনুরোধ জানান। কিন্তু মাসুদ দেখতে পাচ্ছিলেন, নিরীহ বাঙালিদের ওপর নির্দয় ও বর্বরোচিত বিমান হামলা বা ধ্বংসযজ্ঞ পূর্ব পাকিস্তানকে পৃথক করে দেবে। তিনি পাকিস্তানের স্বার্থরক্ষা এবং বাঙালিদের ওপর গণহত্যা এড়ানোর জন্য টিক্কার আহ্বানে সাড়া না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ২৬ মার্চ মাসুদ এয়ার কমোডর ইনামুল হককে (পরবর্তীকালে এয়ার মার্শাল) বিমানবাহিনীর কমান্ডের দায়িত্ব দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান চলে যান। সেখানে তাঁকে নতুন পদে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও মাসুদ তা গ্রহণ করেননি এবং বিমানবাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে গণমাধ্যম জাফর মাসুদের প্রতিক্রিয়া নেওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁকে সেটি করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টেও মাসুদের কোনো বিবৃতি নেই। টিক্কা খান ২৫ মার্চ সর্বাত্মক অভিযান চালিয়েও যখন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছিলেন না, তখন ইয়াহিয়া খান তাঁর চেয়েও গণহত্যায় ‘সিদ্ধহস্ত’ জেনারেল এ এ কে নিয়াজিকে ঢাকায় পাঠান। এবং তার সমাপ্তি ঘটে ১৬ ডিসেম্বর নিয়াজির নেতৃত্বে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনার নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে। নাসিম ইউসুফের শেষ মন্তব্য ‘মাসুদের বীরত্বপূর্ণ ও নীতিগত অবস্থান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি তাঁর সম্ভাবনাময় পেশা ত্যাগ করেছেন জনগণের অধিকার এবং দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য।’
সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan 55 @gmail. com

‘কৃষ্ণবিবর পুরোপুরি কৃষ্ণ নয়’ by ড. সাজিদ হক

তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান অধিকাংশ সময় লোকচক্ষুর অন্তরালে বাস করে। এ বিষয় নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা ঠিক সেভাবে পরিচিতি পান না। অল্প দু-একজন গবেষক বা বিজ্ঞানী এই ব্যাপারে সফলতা পান। প্রায় ১০০ বছর আগে আইনস্টাইন পেয়েছিলেন সাধারণ মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা। আর সাম্প্রতিক কালে পেয়েছেন বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। আজ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর জনপ্রিয়তার মাত্রা সারা বিশ্ব দেখতে পেল। একই মানের সমসাময়িক অন্য তাত্ত্বিক পদার্থবিদেরা মানুষের এত কাছে পৌঁছাতে পারেননি। তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আমি পৃথিবীর বহু দেশে অনেক সম্মেলন ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে কোথাও দেখা হয়নি। আমার গবেষণা সহকর্মী ও বন্ধু ড. তীব্র আলীর কাছে বেশ কিছু গল্প শুনেছি, কিন্তু নিজে কখনো কথা বলতে পারিনি। সে জন্য এই বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানীকে নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কোনো গল্প নেই। আজ তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর গবেষণার মূল বিষয়টি নিয়ে মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে মোটামুটি ধারণা পেয়েছে। সেদিক থেকে এ বিষয়েও নতুন তেমন কিছু যোগ করার নেই। কাকতালীয়ভাবে আমার সর্বশেষ গবেষণাপত্র, যেটি মাত্র গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে, স্টিফেন হকিংয়ের একটি বিখ্যাত কাজ ‘সিঙ্গুলারিটি থিওরেম’-এর (Singularity Theorem) সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আমরা এই ‘সিঙ্গুলারিটি থিওরেম’কে এখনকার সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্ব ‘স্ট্রিং থিওরি’ (String Theory) থেকে পর্যালোচনা করেছি। পদার্থবিজ্ঞানে প্ল্যাঙ্ক স্কেল বা একক বলে একটা ব্যাপার আছে। খুব বেশি শক্তি বা খুব ছোট দৈর্ঘ্যের জন্য এই এককটি ব্যবহার করা হয়। যেমন: এক প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য হচ্ছে ১ সেন্টিমিটার/১০...০ সমান (৩৩টি শূন্য)। মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রকৃতি সব সময় এই প্রচণ্ড শক্তির স্কেলে কী হচ্ছে, সেটা আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতে চায়। এই স্কেলের খুব সহজ উপস্থিতি দেখা যায় দুটো ক্ষেত্রে—
১. কৃষ্ণবিবরের ইভেন্ট হরাইজনের (Event Horizon) ভেতর।
২. বৃহৎ বিস্ফোরণ (BIG Bang) সিঙ্গুলারিটিতে (বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড ও সৃষ্টির শুরু অবস্থা)।
কৃষ্ণবিবরের ইভেন্ট হরাইজনের ভেতর কী হচ্ছে, প্রকৃতি তা আমাদের জানতে দেয় না। একইভাবে মনে হয় যেন, এই মহাবিশ্বের শুরুতে কী হয়েছে, প্রকৃতি সেটা গোপন করার জন্য সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে মহাবিশ্বকে অবিশ্বাস্য গতিতে সম্প্রসারণ করেছে। এই ব্যাপারকে আমরা পদার্থবিজ্ঞানে ইনফ্লেশন বলি। এই জটিল বিষয়গুলো নিয়েই স্টিফেন হকিং তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্রগুলো লিখেছেন। আর একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, কৃষ্ণবিবরের ভেতরের রহস্য ভেদ করতে গিয়ে স্টিফেন হকিং আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে যে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যেটি পৃথিবীর তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীদের একটা চিন্তা কৃষ্ণবিবরের ভেতর ফেলে রেখেছে ৫০ বছর ধরে। তাঁর ‘কৃষ্ণবিবর পুরোপুরি কৃষ্ণও না’—এই আবিষ্কার জন্ম দিয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের সম্ভবত সবচেয়ে আলোচিত ‘ইনফরমেশন প্যারাডক্স’-এর (information Paradox ) (ড. তীব্র আলী যেটাকে কূটাভাস বলেছেন)। ভবিষ্যতের মানুষ ও পদার্থবিজ্ঞান স্টিফেন হকিংকে ঠিক কোন আসনে রাখবে, সেটা বলা মুশকিল। তাঁর অসাধারণ গবেষণা জটিল পদার্থবিজ্ঞানকে মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়া এবং সর্বোপরি তাঁর শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করার গল্প তাঁকে যে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় করে রাখবে, তাতে সন্দেহ নেই।
>>>ড. সাজিদ হক, শিক্ষক, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান, ইউনিভার্সিটি অব উইন্ডসর, কানাডা।

মেনেই নিচ্ছি নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু? by আসিফ নজরুল

গত কয়েক দিনে বড় ধরনের কিছু ঘটনা ঘটেছে আমাদের জন্য। এর মধ্যে নেপালে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনা সবাইকে দুঃখ ভারাক্রান্ত করেছে। খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে বিলম্ব কিংবা জাফর ইকবালের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অনেকের নজর কেড়েছে। ৭ মার্চের জনসভাগামী কিছু মিছিল থেকে প্রকাশ্য রাজপথে নারী নির্যাতনের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাও ঘটেছে। এত কিছুর ভিড়ে অনেকের মনে থাকার কথা নয় গত কয়েক দিনে পুলিশি নির্যাতনের ঘটনাকে। এ সময়ে অন্তত তিনটি বড় ধরনের ঘটনা ঘটেছে। প্রথম ঘটনায় প্রেসক্লাবে পিস্তল হাতে ত্রাস ছড়িয়ে সাদাপোশাকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দ্বিতীয় ঘটনায় সমাবেশ থেকে ছিনিয়ে চ্যাংদোলা করে একজন তরুণকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সর্বশেষ ঘটনাটি সবচেয়ে মর্মান্তিক। এতে রিমান্ডে নেওয়ার পর কারা হেফাজতে একজন যুবকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সারা ফেসবুক তাঁর শরীরে নির্যাতনের চিহ্নের ছবিতে ছেয়ে গেলেও ময়নাতদন্তকারী ডাক্তার নাকি এমন কোনো লক্ষণ খুঁজে পাননি! এই তিনটি ঘটনার শিকার ব্যক্তিরা হলেন বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী। তিনটি ঘটনারই সূচনা বিএনপির শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালনকালে। তিনটি ঘটনাই বাংলাদেশের সংবিধান, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা এবং দেশের প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন। নানা ঘটনা-দুর্ঘটনার ভিড়ে এই ধারাবাহিক পুলিশি বর্বরতা অনেকের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের এ বিষয়গুলো নজরে রাখা বা এর প্রতিকার করা কারও কারও আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। তাঁরা যখন তা করেন না, তখন তা আতঙ্কজনক হয়ে দাঁড়ায়। আলী রীয়াজের ১৪ মার্চের লেখায় তা সঠিকভাবে ফুটে উঠেছে। আমি মনে করি এ নিয়ে সমাজে আরও আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রয়োজন রয়েছে মানবাধিকার ধারণার প্রাথমিক পাঠ আবারও স্মরণ করার।
২. মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে (ধর্ম, বংশ, জন্মস্থান, রাজনৈতিক পরিচয়-নির্বিশেষে) এই অধিকার প্রত্যেক মানুষের। যেমন বৈষম্যহীনতা একটি মানবাধিকার। গোপালগঞ্জে বা ফেনীর মানুষ বলে তাই কারও আমলভেদে বৈষম্যের শিকার হওয়ার বা বাড়তি সুযোগ পাওয়ার অধিকার নেই। আওয়ামী লীগ, বিএনপি বা জামায়াতের রাজনীতি করলে আমলভেদে কারও অধিকার কেড়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কোনো বিশেষ ছাত্রসংগঠনের কর্মী এই অভিযোগে পিটিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করার যেসব সংবাদ আমরা পত্রিকায় দেখি, তাও মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আমাদের সংবিধানে মানবাধিকার সীমিত করা হয়েছে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য। যেমন পুলিশ বা সেনাবাহিনীর বাক্স্বাধীনতা বা মিছিল করার অধিকার নেই। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের ক্ষেত্রে বেশ কিছু মানবাধিকার প্রযোজ্য নয় বলা হয়েছে সংবিধানে। তবে কিছু অধিকার, যেমন নির্যাতন, অবমাননাকর ও লাঞ্ছনাকর দণ্ড বা ব্যবহার থেকে মুক্ত থাকার অধিকার, প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃত। জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারের মতো নির্যাতন থেকে রেহাই পাওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। শুধু এ বিষয়টি নিয়ে নির্যাতনবিরোধী যে কনভেনশনটি রয়েছে, তার পক্ষরাষ্ট্র বাংলাদেশও। নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক ও সাংবিধানিক বিধানের পাশাপাশি ২০১৩ সালে প্রণীত একটি আইন বাংলাদেশে রয়েছে। এই আইনে হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগ পুলিশ না নিলে সরাসরি আদালতে মামলা করার, হেফাজতের দায়িত্বে থাকা দোষী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদানের, অভিযোগকারী ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধানের ও তাঁর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আইনে কোনো সমস্যা নেই আমাদের। কিন্তু তারপরও দেশে অব্যাহতভাবে নির্যাতন বা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। ঘটছে মূলত এসবের বাস্তবায়ন নেই বলে।
৩. মানবাধিকার রক্ষিত হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য দেশে নানা ধরনের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যেমন সংসদ, উচ্চ আদালত ও মানবাধিকার কমিশন। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি মানবাধিকার প্রতিষ্ঠান রয়েছে, মানবাধিকার বিষয়ে নজরদারির জন্য এরা বিদেশ থেকে উচ্চ অঙ্কের আর্থিক সহযোগিতাও পেয়ে থাকে। মানবাধিকার নজরদারির জন্য গণমাধ্যমও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ ও সংসদীয় কমিটিগুলো অকার্যকর থাকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। ২০১৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ নির্বাচন বর্জনকারী দলগুলোর সদস্যদের মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলবে না, এটি অভাবনীয় নয়। কিন্তু এ বিষয়ে বাদবাকি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকার জন্য বাংলাদেশে জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি মানবাধিকার কমিশন রয়েছে। এই কমিশনের মৌলিকতম দায়িত্ব হচ্ছে যে কারও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হলে সে বিষয়ে তদন্ত করা, অন্তত তার উদ্বেগ ও আপত্তি প্রকাশ করা। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা করা হয় না। সংসদের বাইরে থাকা বিরোধী দল (যেমন বিএনপি, সিপিবি) ও সংগঠনগুলোর (যেমন তেল-গ্যাসসংক্রান্ত জাতীয় কমিটিসহ) সভা-সমাবেশের ওপর পুলিশি আক্রমণের বহু ঘটনা ঘটলেও আমরা মানবাধিকার কমিশনকে এ বিষয়ে কিছু বলতে দেখি না। হেফাজতে ছাত্রদল নেতা জাকিরের মৃত্যুর সাম্প্রতিক ঘটনাসহ এ ধরনের বহু ঘটনায় কমিশনকে সোচ্চার হতে দেখি না। অতীতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কিছু ঘটনায় কমিশনকে সরকারের ভূমিকার প্রতি সমর্থন প্রদান পর্যন্ত করতে দেখা গেছে। মানবাধিকার রক্ষার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা পালনের অবকাশ রয়েছে উচ্চ আদালতের। নিকট অতীতে উচ্চ আদালত গ্রেপ্তার ও রিমান্ডসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্তমূলক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। এরপর এসব নির্দেশ লঙ্ঘিত হওয়ার সংবাদ ফলাও করে পত্রিকায় বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে উচ্চ আদালত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে আদালত অবমাননার অভিযোগ এনে সরকারের যেকোনো বাহিনীর কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সরকারি বাহিনীর নির্যাতনের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ে আমরা উচ্চ আদালতকে তা করতে দেখি না। নিম্ন আদালতের হাত-পা আরও বাঁধা। চার বছর আগে নিম্ন আদালতের একজন বিচারক ২০১৩ সালের আইন অনুসারে র‍্যাবের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি মামলা (নির্যাতন ও হত্যাসংক্রান্ত) গ্রহণ করেছিলেন। এরপর প্রথমে তাঁর মামলা আমলে নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়, পরে তাঁকে অন্য জায়গায় বদলি করে দেওয়া হয়। নিম্ন আদালতের স্বাধীনতা ও মর্যাদার ওপর এই জাজ্বল্যমান হস্তক্ষেপের ঘটনায় প্রতিবাদ পর্যন্ত করেনি গণমাধ্যম ছাড়া অন্য কেউ। বাকি থাকে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলো। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো এরা লিপিবদ্ধ করে জানিয়ে দেওয়ার কাজটি করে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে নিরন্তর সোচ্চার থাকার দায়িত্ব অনেক ক্ষেত্রে পালন করে না। রাজনৈতিকভাবে যারা সরকারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ, তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ বা ছাত্রলীগের নির্যাতন হলে বহু মানবাধিকার সংগঠন তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। আমল, রাজনৈতিক বিশ্বাস, ধর্মীয় পরিচয়, নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ভেদে তাদের উৎসাহের মাত্রা দৃষ্টিকটু রকমের হেরফের হয়। জাকিরের মৃত্যুর ঘটনাও তাদের অনেকে হয়তো এ কারণে এড়িয়ে গেছে। অথচ মানবাধিকারের মূল দর্শনের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধাবোধ থাকলে এটি করার কথা নয়।
৪. মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানগুলো পালন না করলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বাড়তে থাকবে। নির্বাচনের বছরে এসে তা বাড়ার কারণও আছে। এমনিতেই গণমামলা আর যথেচ্ছ সংখ্যায় অজ্ঞাতনামা আসামি করার প্রচলন দেশে রয়েছে। এই সুযোগে বিরোধী পক্ষের যে কাউকে গ্রেপ্তার করার সুযোগ সরকারের রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর থাকে নির্যাতিত হওয়ার এমনকি মারা যাওয়ার আশঙ্কা। এর কোনো প্রতিকার না হলে দেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার বলে কিছু থাকবে না। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন তখন আরও বিপর্যস্ত হবে।
আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

সুখের সূচক নাকি অসুখের? by কামাল আহমেদ

অনেক দিন ধরে ‘ভালোই তো আছি’ ধরনের একটি বোধ অনেকের মধ্যে জেঁকে বসে আছে। এমন একটি আবহ দেশে বজায় থাকুক, সেটা সব সরকারের মতোই আমাদের সরকারও চায়। আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা চ্যানেলগুলোতেও এ রকম একটি ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টাও বেশ লক্ষণীয়। বিশ্বে কোন দেশের নাগরিক কতটা ভালো আছেন, নিজেদের কতটা সুখী ভাবেন, তার ওপর বছর কয়েক ধরে একটি বার্ষিক সমীক্ষা প্রকাশ করছে জাতিসংঘ। এবারের সমীক্ষা প্রকাশিত হয়েছে ১৪ মার্চ বুধবার।
এতে দেখা যাচ্ছে, ১৫৫টি দেশের মধ্যে ফিনল্যান্ড হচ্ছে সবচেয়ে সুখী আর সবচেয়ে কম সুখীর দেশ হচ্ছে বুরুন্ডি। বাংলাদেশ আগেও যে খুব একটা ভালো অবস্থায় ছিল, তা নয়। কিন্তু এ বছরে তার আরও অবনতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ১১৫-তে। বাংলা কাগজগুলোর অনেকেই খবরটি অবশ্য প্রকাশযোগ্য মনে করেনি। ইংরেজি একটি পত্রিকার শিরোনামের অনুবাদ দাঁড়ায়, ‘বাংলাদেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে সুখী’। শিরোনামটি থেকে ধারণা করা অন্যায় হবে না, আমরা সবকিছু ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতেই পছন্দ করি। খবরটিতে আমাদের দক্ষিণ এশীয় প্রতিবেশীরা কারা এগিয়ে আছে, সেগুলোর দিকে নজর না দিয়ে আমরা গুরুত্ব দিয়েছি যারা আমাদের থেকে পিছিয়ে আছে, তাদের দিকে। অথচ অপ্রিয় বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিলে শিরোনামটি হতে পারত বাংলাদেশ ভুটান, নেপাল ও পাকিস্তানের চেয়ে অসুখী। নেপালের অবস্থান আমাদের চেয়ে ১৪ ধাপ ওপরে, ভুটান ১৮ ধাপ আর পাকিস্তান ৪০ ধাপ। আগের বছরে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১১০ তম, এবার ১১৫। যে ছয়টি উপাদানের ভিত্তিতে একটি দেশ বা জাতির ‘সুখ’-এর মাত্রা পরিমাপ করা হয়েছে, সেগুলো হলো: মাথাপিছু আয়, সামাজিক নিরাপত্তা, জনগণের সুস্থ জীবনের প্রত্যাশা, সামাজিক স্বাধীনতা, ঘুষ ও দুর্নীতির হার। ২০০৯-১০ সালের তুলনায় এসব উপাদানের গড়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে প্রায় শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ। জাতিসংঘের এই সমীক্ষার যথার্থতা নিয়ে বাংলাদেশে কেউ কোনো প্রশ্ন তুলেছেন বলে এখনো আমার চোখে পড়েনি। সরকারের মন্ত্রীরা কি তাহলে এর কোনো ব্যাখ্যা দেবেন? ক্ষমতায় আসার শুরুতে আমরা যতটা সুখী ছিলাম এখন ততটা নই, এমন কথা নিশ্চয়ই উন্নয়নের রাজনীতিবিরোধী ষড়যন্ত্র! আমরা জানি, আমাদের মাথাপ্রতি আয় বেড়েছে, নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ ঘটেছে। জাতীয় উৎপাদনে প্রবৃদ্ধির হার বছরওয়ারি বেড়ে এখন ৭ শতাংশের ঘরে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত নতুন রেকর্ড ছুঁয়েছিল। মাছ উৎপাদন, সবজির ফলন-এই সবকিছুতে আমরা বিশ্বের চতুর্থ নয়তো শীর্ষ দশের মধ্যে। তবে আমরা এমন হিসাবও দেখি, যাতে প্রমাণিত হয় আমাদের রাস্তা নির্মাণের ব্যয়, রেলপথ সংস্কার কিংবা সেতু নির্মাণের খরচ বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ব্যাংকের ঋণখেলাপিতেও আমরা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক প্রতিবেশীর চেয়ে এগিয়ে। এগুলো নিশ্চয়ই অনেকের (সংখ্যায়, শতাংশে নয়) ভালো থাকার রসদ। অর্থনীতিবিদেরা এর ব্যাখ্যা জানলেও সব সময় বলেন না। তবে সম্প্রতি বণিক বার্তায় অধ্যাপক এম এ তসলিম তাঁর এক নিবন্ধে ওই যৌক্তিক ব্যাখ্যাটি তুলে ধরেছেন। নিবন্ধটিতে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠান পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যানের কিছু ফাঁকফোকরের কথা স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন (অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফলগুলো কোথায় হারাল? বণিক বার্তা, ৬ মার্চ, ২০১৮)। তিনি বিবিএসের করা হাউসহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভের (এইচআইইএস ২০১৬) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রাথমিক রিপোর্টের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে মানুষের প্রকৃত আয় আসলে কমেছে। অধ্যাপক তসলিম লিখেছেন, মাথাপিছু আয় ও ভোগে পরিবর্তনের যে তথ্য জাতীয় হিসাবের ডেটা থেকে পাওয়া যায়, তা এইচআইইএস ২০১৬ সালের দেওয়া তথ্যের বিপরীত। এইচআইইএস ও জাতীয় হিসাবের মধ্যে পার্থক্য এত বেশি যে, এটিকে সাধারণ পরিসংখ্যানগত ভুল বা হিসাবের ভিন্ন পদ্ধতির তারতম্য হিসেবে গণ্য করা বেশ কঠিন। তাঁর বিশ্লেষণে ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পারিবারিক প্রকৃত আয় আদতে কমেছে ১১ শতাংশ। একই সময়ে প্রকৃত ভোগও কমেছে প্রায় একই হারে। কিন্তু বিবিএসের জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের প্রকৃত জাতীয় আয় ২০০৯-১০ থেকে ২০১৫-১৬ সালের মধ্যে বেড়েছে ৪২ শতাংশেরও বেশি, যে সময় প্রকৃত মাথাপিছু আয় বেড়েছে ৩১ শতাংশ। অন্যভাবে বললে, জাতীয় পর্যায়ে গড়ে মোট জনসংখ্যার প্রত্যেক সদস্য এই ছয় বছরে প্রকৃত আয় ৩১ শতাংশ বাড়াতে অবদান রেখেছেন। আয়ের এ বৃদ্ধির সঙ্গে একই হারে বেড়েছে প্রকৃত মাথাপিছু ভোগ। কিন্তু এইচআইইএস ২০১৬ অনুযায়ী, পারিবারিক পর্যায়ে প্রত্যেক ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে আয় করেছেন (পারিবারিক আয় পারিবারিক আকার দিয়ে ভাগ করে পাওয়া) ২০১০ সালের আয়ের তুলনায় ২ শতাংশ কম এবং ভোগের জন্য প্রত্যেকের প্রকৃত ব্যয় কমেছে প্রায় ১ শতাংশ। চলতি বছরের শুরু থেকেই আমার মাথায় একটি প্রশ্ন ঘুরছে। প্রশ্নটির পটভূমিটা ব্যাখ্যা করে নেওয়া ভালো। ব্রিটেনে বছরের শুরুতে প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা গেল, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর এই প্রথমবারের মতো দেশটির গড় মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদেরা বললেন যে জিনিসপত্রের দাম যে হারে বেড়েছে, অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির হার এখনো মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি। তাঁদের কথায় এই ফারাক, যাকে তাঁরা মিজারি গ্যাপ বলে অভিহিত করেন (দুর্ভোগের ব্যবধান), দূর হওয়া না পর্যন্ত জীবনযাত্রায় আগের স্বাচ্ছন্দ্য ফিরেছে-এমন কথা বলা যাবে না।
প্রশ্নটি হলো অর্থনীতিবিদেরা কেন একটি মিজারি ইনডেক্স বা কষ্টের সূচক প্রকাশ করেন না? অধ্যাপক তসলিম এইচআইইএস তথ্য উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন, দেশে জনপ্রতি পুষ্টি গ্রহণের হার ২০০৫ সালের তুলনায় ২০১০-এ কমেছিল ৫ শতাংশ আর ২০১৬-তে কমেছে আরও ৯ শতাংশ। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশ যে অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, সেই খাতে মজুরি কমেছে সাড়ে ৭ শতাংশ। দেশে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এখন সর্বোচ্চ। আরও কিছু সর্বসাম্প্রতিক বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল হতাশাজনক। যার মধ্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডব্লিউজেপি)-এর আইনের শাসন সূচক-২০১৭। বিশ্বের মোট ১১৩টি দেশের মধ্যে আইনের শাসনের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০২ নম্বরে। এখানেও দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশীদের মধ্যে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও ভারত আমাদের থেকে এগিয়ে। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট কোনো দেশে আইনের শাসন কেমন, তার মান নির্ধারণে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয় তার মধ্যে আছে মৌলিক অধিকার, দুর্নীতি, সরকারের স্বচ্ছতা, বিচারব্যবস্থার মতো বিষয়গুলো। আবার মৌলিক অধিকারের মধ্যে আছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, জীবনের নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো। সুখী দেশের তালিকা এবং আইনের শাসন সূচকের অবস্থান এই দুটির ক্ষেত্রেই মৌলিক অধিকার এবং দুর্নীতি যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সন্দেহ নেই। এগুলোর ক্ষেত্রে আমরা যে কতটা ভালো আছি, সে কথা জানার জন্য অবশ্য বিদেশি কোনো সূচক দেখার প্রয়োজন পড়ে না। বৈশ্বিক সুখ প্রতিবেদন তৈরির জন্য জনমত জরিপকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ যে সমীক্ষা চালায়, তাতে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব চিহ্নিত করতে তারা যেসব প্রশ্ন করেছে, সেগুলো উল্লেখ করেই শেষ করব। তারা জানতে চেয়েছিল, গতকাল আপনার দিনটিতে কি প্রচুর ভালো লাগা ছিল? অনেক হেসেছেন? অনেক আনন্দ করেছেন? অনেক বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন? দিনটা কি অনেক বিষাদময় ছিল? অনেক রাগ হয়েছিল? নিজেকে এসব প্রশ্ন করার পর কার মনে হবে, ‘আহ্ ভালোই তো আছি?’
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক