Friday, August 15, 2025

১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পর সেনানিবাসে কী ঘটেছিল by হাফিজ উদ্দিন আহমদ

সৈনিক জীবন: গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর বইয়ের লেখক হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আত্মজৈবনিক বইটিতে রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ, শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং সেনাবাহিনীর ভেঙে পড়া চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারের চেষ্টা—এসব ঘটনার বিস্তারিত বয়ান রয়েছে। এ বইয়ের প্রাসঙ্গিক কিছু অংশ প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন। সকাল পৌনে ছয়টা বাজে। দরজার কলবেলের একটানা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।

ড্রয়িংরুমের দরজা খুলে দেখি ২য় ফিল্ডের সিও মেজর রশিদ এবং সেনাসদরের একজন স্টাফ অফিসার মেজর আমীন আহম্মেদ চৌধুরী দাঁড়িয়ে আছেন। আমীন সিভিল ড্রেসে কিছুটা উদ্‌ভ্রান্ত, বিমর্ষ। শান্ত-নিরুত্তাপ গলায় রশিদ বললেন, ‘উই হ্যাভ ডান ইট। শেখ মুজিব হ্যাজ বিন কিলড।’

সদ্য ঘুম থেকে উঠে এ ধরনের ভয়াবহ সংবাদ শুনে বিস্ময়ে বিমূঢ় দৃষ্টিতে আমীনের দিকে তাকালাম। এঁরা দুজন বন্ধু, পিএমের কোর্সমেট এবং আমার সিনিয়র। আমীন নিশ্চুপ রইলেন। বাইরে তাকিয়ে দেখি এক গাড়ি ভর্তি আর্টিলারি সৈনিক রশিদের সঙ্গেই আমার বাসার গেট খুলে প্রবেশ করেছে। ড্রয়িংরুমের বাইরেই তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

রশিদ আদেশের সুরে বললেন, ‘আমি কমান্ডারের (কর্নেল শাফায়াত) কাছে যাচ্ছি। তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে।’  ইতিমধ্যে রাইফেলধারী দুজন সৈনিক আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আমার ড্রয়িংরুমে ঢোকে। রশিদের নির্দেশ পেলেই তারা আমাকে গুলি করবে কিংবা বন্দী করবে, এমনটি মনে হলো। রশিদের কথা শুনে আমি হতভম্ব, বলে কী! প্রেসিডেন্টকে হত্যা করে এমনভাবে বলছে, যেন কিছুই হয়নি। আমি একটু সময় নিয়ে ধাতস্থ হওয়ার জন্য বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি ইউনিফর্ম পরে আসছি।’

দ্রুত ইউনিফর্ম পরে নিলাম। ভাবলাম এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমার প্রথম কাজ ব্রিগেড কমান্ডারকে ঘটনা সম্পর্কে জানানো। সুতরাং তাঁর কাছেই যাব। রশিদের প্রস্তাবে রাজি না হলে এরা যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারে। আমি একেবারেই নিরস্ত্র, বাসায় কোনো গার্ডও নেই। স্ত্রী ঘুমিয়ে আছে। তাকেও জানালাম না।

আমার বাসা সেনানিবাসের মেইন রোডের পাশেই। রাস্তার উল্টো দিকেই ডেপুটি চিফ জেনারেল জিয়ার বাসা। জিয়ার বাসার পেছনের রাস্তার ওপারেই ৫০ গজ দূরে কমান্ডার কর্নেল শাফায়াতের বাসা। রশিদের কথামতো বাসা থেকে বেরিয়ে আমি ও আমীন আহম্মেদ তাঁর জিপে উঠলাম। গাড়িভর্তি সৈনিকেরাও আমাদের ফলো করে।

মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ব্রিগেড কমান্ডারের বাসায় পৌঁছে গেলাম। রাস্তায় কোনো জনপ্রাণী নেই, সবাই তখনো সুখনিদ্রায় বিভোর। কমান্ডারের বাসায়ও ২য় ফিল্ডের সৈনিকেরা গার্ড ডিউটি করছে। আমি কলবেল বাজাতেই ব্যাটম্যান দরজা খুলে দিল। আমরা ড্রয়িংরুমে সোফায় বসলাম। মিনিট দুয়েকের মধ্যে লুঙ্গি-শার্ট পরা কর্নেল শাফায়াত ড্রয়িংরুমে এসে বললেন, ‘কী ব্যাপার?’

‘স্যার, উই হ্যাভ কিলড প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব। আমাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অ্যাকশনে যাবেন না। গেলে গৃহযুদ্ধ শুরু হবে।’ বলেই কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে রশিদ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

শাফায়াতও হতভম্ব। আমাকে ও আমীনকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রশিদ এসব কী বলছে?’এমন সময় তাঁর বেডরুমে রেড ফোন বেজে ওঠে। তিনি ফোন ধরতে গেলেন। মিনিট দুয়েক পর ফিরে এসে আমাকে বললেন, ‘চিফ (জেনারেল সফিউল্লাহ) ফোন করেছেন। তিনি জানতে চাচ্ছেন কিছুক্ষণ আগে ৩২ নম্বরে প্রেসিডেন্টের বাড়িতে কারা হামলা করেছে। প্রেসিডেন্ট তাঁকে ফোর্স পাঠিয়ে উদ্ধার করতে বলেছেন। আমি কমান্ডারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চিফ কোনো নির্দেশ দিয়েছেন?’

‘না, উনি শুধু কাঁদছেন আর বলছেন, প্রেসিডেন্ট তাঁকে বিশ্বাস করলেন না।’ শাফায়াত বললেন।

‘স্যার, ইউনিফর্ম পরে আসুন, তাড়াতাড়ি অফিসে যাওয়া দরকার।’ আমি বললাম।

‘ওকে।’ বললেন শাফায়াত।

কয়েক মিনিট পরই আমি ও কমান্ডার বাসা থেকে বেরিয়ে এলাম। আমীন গেলেন তাঁর অফিসার মেসে। এত ভোরে কারও গাড়ি আসেনি। তাই পায়ে হেঁটে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের উদ্দেশে যাত্রা করলাম। রাস্তার মোড়েই জেনারেল জিয়ার শহীদ মইনুল রোডের বাসার পূর্ব পাশের দেয়াল। শাফায়াত বলে উঠলেন, ‘চলো, জেনারেল জিয়ার বাসায় যাই, ঘটনাটি তাঁকে জানাই।’

আমরা দুজন দ্রুত হেঁটে জিয়ার বাসায় গেলাম। সেখানে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকেরা গার্ড ডিউটি করছে, সবাই আমার পরিচিত। তারা গেট খুলে দিলে আমরা দুজন দ্রুত হেঁটে জিয়ার বাসায় গেলাম। সেখানে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের বাসার ভেতরে ঢুকি।

কলবেল টিপলে জিয়া নিজেই দরজা খুলে দিলেন। তাঁর পরনে সাদা পায়জামা, সাদা হাফহাতা গেঞ্জি। শেভ করছিলেন, মুখে সাদা শেভিং ক্রিম, কাঁধে তোয়ালে। আমাদের দেখে বললেন, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড?’

‘স্যার, প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড। একটু আগে মেজর রশিদ এসে আমাকে জানিয়ে গেল।’ শাফায়াত বললেন।

‘সো হোয়াট? প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিলড, ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার। উই উইল আপহোল্ড দ্য কনস্টিটিউশন। (আমরা সংবিধান মেনে চলব) গো অ্যান্ড গেট ইউর ট্রুপস রেডি।’ জিয়ার মন্তব্য। আমরা গেট দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় জিয়াকে নেওয়ার জন্য একটি জিপ বাসায় ঢুকছিল। আমরা ড্রাইভারকে বললাম আমাদের অফিসে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। ড্রাইভার রাজি হয়ে গাড়ি ঘোরাল আমাদের তুলে নেওয়ার জন্য।

জিপে উঠে আমি কমান্ডারকে পরামর্শ দিলাম অরক্ষিত ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে না গিয়ে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের সৈনিকদের সঙ্গে থাকাই আমাদের জন্য শ্রেয়। আমার বিবেচনায় এই ইউনিট আমাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ স্থান। কমান্ডার রাজি হলেন। আমরা ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের ২০০ গজ দূরে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের অফিস এলাকায় ঢুকে জিয়ার গাড়িটি ছেড়ে দিই। আসার পথে প্রধান সড়কে দেখা হলো আমার স্ত্রীর বড় ভাই মেজর ইকবালের সঙ্গে। তিনি ব্যক্তিগত ভক্সওয়াগন গাড়ি চালিয়ে আমার বাসার দিকে আসছিলেন। তিনিও আমাদের সঙ্গী হলেন। ইকবাল ১ম ইস্ট বেঙ্গলের চার্লি কোম্পানির কমান্ডার।

১ম ইস্ট বেঙ্গলে যাওয়ার জন্য মেইন রোড থেকে বাঁ দিকে মোড় নিয়ে এয়ারফোর্স হ্যাঙ্গারের সামনে আসতেই দেখতে পেলাম একটি ট্যাংক দাঁড়িয়ে রয়েছে। ট্যাংকের টারেটে বসে আছেন মেজর ফারুক রহমান, ১ম ইস্ট বেঙ্গল ল্যান্সারের উপ–অধিনায়ক (টুআইসি)। পরনে কালো ইউনিফর্ম, মাথায় কালো হেড গিয়ার। ট্যাংকের মেইনগানের মুখ প্রধান সড়কের দিকে।

৪৬তম ব্রিগেডের ঢাকায় অবস্থিত ৩টি পদাতিক ব্যাটালিয়নের দুটি ১ম ইস্ট বেঙ্গল ও ৪র্থ ইস্ট বেঙ্গল পাশাপাশি রয়েছে। এদের বিভক্ত করেছে একটি ২০ ফুট প্রশস্ত পাকা সড়ক। ১ম ইস্ট বেঙ্গলে প্রবেশ করার সময় লক্ষ করলাম, এ সড়কের ওপরও একটি ট্যাংক অবস্থান নিয়েছে। আমাদের দুটি ব্যাটালিয়নের মাঝামাঝি ট্যাংকের আক্রমণাত্মক অবস্থান দেখে বিস্মিত হলাম, এদের মতলবটা কী?

মিনিট দশেকের মধ্যে ১ম ইস্ট বেঙ্গলের সব অফিসার সিওর অফিসে সমবেত হলেন। সবার চোখেমুখে উত্তেজনা। একজন বললেন, তিনি সৈনিক ব্যারাকের পাশ দিয়ে হেঁটে আসার সময় রেডিওতে মেজর ডালিমের ঘোষণা শুনেছেন, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে এবং দেশে সামরিক আইন জারি করা হয়েছে। কমান্ডার জিজ্ঞেস করলেন, ‘সৈনিকদের রিঅ্যাকশন কী?’

‘তারা উল্লাসধ্বনি দিচ্ছে, আনন্দ প্রকাশ করছে,’ অফিসারের সংক্ষিপ্ত জবাব।

কমান্ডারের নির্দেশ মোতাবেক আমি ৪৬ ব্রিগেডের সব ইউনিটকে স্ট্যান্ড টু (লোকাল ডিফেন্স এবং বাইরে মুভ করার প্রস্তুতি) অবস্থানে থাকার নির্দেশ জারি করি। অফিসকক্ষে তুমুল উত্তেজনা। মিনিটে মিনিটে টেলিফোন আসছে। কারও বিস্ময়ের ঘোর তখনো কাটেনি। নিস্তরঙ্গ জীবনযাত্রায় এত বড় প্রলয়ংকরী ঘটনা। সিনিয়র অফিসাররা কেউ কিছু জানে না, দেশের প্রেসিডেন্ট নিহত! ব্রিগেড অফিসার মেসে আর্টিলারির কয়েকজন অফিসার বসবাস করে। সবাই বলাবলি করছে, গত রাতে নাইট ট্রেনিং ছিল, ২য় ফিল্ডের অফিসাররা সকাল নাগাদ ফিরে আসেনি।

১ম ইস্ট বেঙ্গলের সিও মেজর মতিউর, কমান্ডার ও আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলছি। হঠাৎ কাচ ভাঙার শব্দ শুনলাম। পেছনে তাকিয়ে দেখি একজন লেফটেন্যান্ট সিওর অফিসের দেয়াল থেকে রাষ্ট্রপতি মুজিবের ছবি নামিয়ে সবার সামনেই আছাড় মেরে সশব্দে ভেঙে ফেলেছে। কাচের টুকরা বারান্দায়ও ছিটকে পড়ে! সবাই তাকিয়ে দেখছে, আশ্চর্য! কেউ তাকে কিছুই বললেন না!

এমন সময় অ্যাডজুট্যান্ট এসে কমান্ডারকে জানাল, সিজিএস ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ টেলিফোন ধরে আছেন, ব্রিগেড কমান্ডারকে চাইছেন। কমান্ডার সিওর অফিসে ঢুকে টেলিফোনে সিজিএসের সঙ্গে কথা বললেন, নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানালেন। বললেন, ‘স্যার, ১ম বেঙ্গলে চলে আসুন।’

মিনিট পনেরো পর সকাল সাড়ে সাতটা নাগাদ সিজিএস খালেদ ১ম বেঙ্গলে এসে সিওর রুমে ঢুকলেন। মুক্তিযুদ্ধে ২ নম্বর সেক্টর এবং কে ফোর্সের কমান্ডার খালেদ, আর্টিলারি শেলের টুকরা তাঁর মাথায় আঘাত হেনেছিল। কপালে ক্ষতচিহ্ন তাঁর লম্বাটে মুখের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দীর্ঘকায়, সুঠামদেহী, সুদর্শন অফিসার। আসামাত্র সবাই তাঁকে ঘিরে ধরে। একই জিজ্ঞাসা, হচ্ছেটা কী? হোয়াট ইজ হ্যাপেনিং? খালেদ জানালেন, ২য় ফিল্ড আর্টিলারি এবং ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের সৈনিকেরা গান ও ট্যাংক নিয়ে শহরে মুভ করেছে গত রাতে এবং সূর্যোদয়ের কিছু আগে ৩২ নম্বরে গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করেছে!

কর্নেল শাফায়াত সিজিএসকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ট্যাংক রেজিমেন্ট তো আপনার অধীন, আমার ইউনিট এলাকায় ট্যাংক পজিশন নিয়েছে কেন?’

‘তারা আমার নির্দেশ ছাড়াই মুভ করেছে, দে আর রেবেলস।’ খালেদ বললেন!

‘এখন আমাদের করণীয় কী?’ শাফায়াত বললেন।

খানিকক্ষণ চিন্তা করে খালেদ বললেন, ‘লেট আস বারগেইন উইথ দেম।’

এমন সময় চিফ মেজর জেনারেল সফিউল্লাহর টেলিফোন এল। খালেদ ধরলেন। চিফ সিজিএসকে সেনাসদরে ডেকে পাঠালেন। উপস্থিত সবার ধারণা, এ ধরনের ক্রাইসিস মুহূর্তে ব্রিগেডিয়ার খালেদই ত্বরিত সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষম। শাফায়াত খালেদকে বললেন, ‘আপনি আমাদের সঙ্গেই থাকুন। আমার ব্রিগেড স্ট্যান্ড টু অবস্থায় রয়েছে। বলুন আমরা কী করব?’

‘আমাকে যেতে দাও। আমি চিফের সঙ্গে কথা বলে আধা ঘণ্টার মধ্যেই এখানে ফিরে আসছি।’ খালেদ বেরিয়ে গেলেন।

সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় আমরা অপেক্ষমাণ সেনাসদরের নির্দেশের। নয়টা বেজে গেল। কোনো নির্দেশ আসেনি ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিলের কাছে।

সকাল নয়টার একটু পরই ১ম বেঙ্গলে একটি বড় গাড়িবহর এসে উপস্থিত হলো। সর্বাগ্রে ফ্ল্যাগ কারে চিফ সফিউল্লাহ, তারপর নেভি চিফ রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খান, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এবং শেষ প্রান্তে একটি এম-৩৮ হুডখোলা জিপে অবসরপ্রাপ্ত মেজর শরিফুল হক ডালিম। ডালিমের পরনে ইস্তিরিবিহীন পুরোনো ইউনিফর্ম, কাঁধে ঝোলানো ভারতে তৈরি নাইনএমএম স্টেন কারবাইন।

চিফ, ডেপুটি চিফ, নেভি চিফ ও এয়ার চিফ, ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত সিওর অফিসে ঢুকে মিনিট দশেক আলাপ করলেন। অন্যান্য অফিসার বাইরে বারান্দায়। চিফ ও অন্যরা বারান্দায় বেরিয়ে এলে সবাই জিজ্ঞেস করলেন, কী হচ্ছে? চিফ সংক্ষেপে জানালেন, ‘রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। মেজর ডালিম সেনাসদরে আমার অফিসে এসেছে কিছুক্ষণ আগে। সে বলছে খন্দকার মোশতাক নাকি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি রেডিও স্টেশনে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন।’ ‘এখন কী করা যায়?’ সবার দিকে তাকিয়ে বললেন সিএএস মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ।

বারান্দায় দণ্ডায়মান তিন-চারজন অফিসার, এমনকি নেভি চিফ বললেন, ‘স্যার, আপনার যাওয়া উচিত। প্লিজ সেভ দ্য সিচুয়েশন। ব্রিং থিংস আন্ডার কন্ট্রোল।’ মেজর ডালিম এগিয়ে এসে তীব্র স্বরে বলে ওঠে, ‘স্যার, তাড়াতাড়ি করুন, প্রেসিডেন্ট ইজ ওয়েটিং।’

এরপর সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর চিফত্রয় গাড়িতে উঠে রেডিও স্টেশনের দিকে যাত্রা করলেন। মেজর জেনারেল জিয়া এতক্ষণ নীরবে এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তাঁর কাছে গিয়ে বললাম, ‘স্যার, আপনি রেডিও স্টেশনে যাচ্ছেন না?’

‘নাহ্, আমি আমার অফিসে যাচ্ছি।’ নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন জিয়া।

আমি ও কমান্ডার শাফায়াত ১ম বেঙ্গলে বসে বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে টেলিফোনে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে আলাপ করছি। সিএএস ১ম বেঙ্গলে থাকার সময়ই শাফায়াত তাঁকে জানালেন, ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের সিও মেজর খালেকুজ্জামান ছুটিতে রয়েছেন। ক্রাইসিস পিরিয়ডে পল্টন পরিচালনা করার জন্য একজন নিয়মিত কমান্ডিং অফিসার প্রয়োজন। চিফ বললেন, ‘কাকে চাও?’ কমান্ডার মেজর আমীন আহম্মেদ চৌধুরীর নাম বললেন। চিফ সিও অফিসের ডেস্ক ক্যালেন্ডারের একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে আমীন আহম্মেদ চৌধুরীকে ১৬ ইস্ট বেঙ্গলের সিওরূপে পোস্টিং দিলেন। আমীন সেটি হাতে নিয়ে জয়দেবপুরের উদ্দেশে রওনা হলেন। ’৭২ সালে তিনি এই ইউনিট কমান্ড করেছিলেন।

আমরা একটি রেডিও আনিয়ে সংবাদ বুলেটিন শুনছিলাম। একটু পরই শুনতে পেলাম খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানেরা নিজ নিজ বাহিনীর পক্ষ থেকে খন্দকার মোশতাকের প্রতি আনুগত্য ও সমর্থন ব্যক্ত করেন। বিডিআর, পুলিশপ্রধান এবং জাতীয় রক্ষীবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মেজর আবুল হাসানও নতুন রাষ্ট্রপতির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। রক্ষীবাহিনীর মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার নুরুজ্জামান এ সময় সরকারি কাজে বিদেশে ছিলেন।

বাহিনীপ্রধানদের আনুগত্য প্রকাশের পর প্রতিটি সেনানিবাসে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে। মেজর ডালিমের রেডিও ঘোষণার কোনো প্রতিক্রিয়া কোনো সেনানিবাসে দেখা যায়নি। একমাত্র চট্টগ্রামে ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার কাজী গোলাম দস্তগীর চট্টগ্রাম রেডিও স্টেশনে ফোন করে ডালিমের ঘোষণা প্রচার না করার নির্দেশ দেন। তবে নানা কারণে সামরিক বাহিনীর অফিসার ও সদস্যরা আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং তাঁরা নির্দ্বিধায় এ পরিবর্তনকে মেনে নিয়েছেন। এত বড় মাপের নেতার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারা দেশে আওয়ামী লীগ কিংবা কোনো রাজনৈতিক-সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ লক্ষ করা যায়নি। রাজধানী ও জেলা শহরের আওয়ামী লীগ নেতারা আতঙ্কিত হয়ে গা ঢাকা দেন।...

* মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী ও রাজনীতিক

চিত্রশিল্পীর অঙ্কনে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড।
চিত্রশিল্পীর অঙ্কনে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড।

শোকাবহ আগস্ট: রাসেল বলল, ‘আমি মার কাছে যাব’

বঙ্গবন্ধুর বুকে শেখ রাসেল
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ঘাতকদের নৃশংসতার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন আবদুর রহমান শেখ ওরফে রমা ও মো. সেলিম ওরফে আবদুল। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আদালতে জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের এই দুই বিশ্বস্ত গৃহকর্মী জবানবন্দি দিয়েছেন। সেই ভয়ংকর অমানিশার মুহূর্ত তাঁদের বয়ানে অবিকল তুলে ধরা হলো।

আবদুর রহমান শেখ (রমা) এর জবানবন্দি

আমি ১৯৬৯ সালে কাজের লোক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আসি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর ৫টায় বঙ্গবন্ধু নিহত হন। তখন আমি বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে থাকতাম। ওই দিন, অর্থাৎ ঘটনার দিন রাত্রে আমি এবং সেলিম দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সামনে বারান্দায় ঘুমিয়েছিলাম। আনুমানিক ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ বেগম মুজিব দরজা খুলে বাইরে আসেন এবং বলেন যে, সেরনিয়াবাতের বাসায় দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে। ওই দিন তিনতলায় শেখ কামাল এবং তাঁর স্ত্রী সুলতানা ঘুমিয়েছিল। ওই দিন শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী এবং ভাই শেখ নাসের দোতলায় ঘুমিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু ও তার স্ত্রী এবং শেখ রাসেল দোতলায় একই রুমে ঘুমিয়েছিল। নিচতলায় পিএ মহিতুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মচারী ছিল।

বেগম মুজিবের কথা শুনে আমি তাড়াতাড়ি লেকের পাড়ে যেয়ে দেখি কিছু আর্মি গুলি করতে করতে আমাদের বাড়ির দিকে আসিতেছে। তখন আমি আবার বাসায় ঢুকি এবং দেখি পিএ/রিসিপশন রুমে বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে কথা বলিতেছে। আমি পিছনের সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় এসে দেখি বেগম মুজিব দোতলায় ছোটাছুটি করছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তিনতলায় যাই এবং আমাদের বাসা আর্মিরা আক্রমণ করেছে বলে কামাল ভাইকে উঠাই। কামাল ভাই তাড়াতাড়ি একটা প্যান্ট ও শার্ট পরে নিচের দিকে যায়। আমি তার স্ত্রী সুলতানাকে নিয়ে দোতলায় আসি। দোতলায় গিয়ে একইভাবে আমাদের বাসা আর্মিরা আক্রমণ করেছে বলে জামাল ভাইকে উঠাই। তিনি তাড়াতাড়ি প্যান্ট, শার্ট পরে তার মার রুমে যান। সঙ্গে তার স্ত্রীও যান। এই সময়ও খুব গোলাগুলি হচ্ছিল।

একপর্যায়ে কামাল ভাইয়ের আর্তচিৎকার শুনতে পাই। একই সময় বঙ্গবন্ধু দোতলায় আসিয়া রুমে ঢোকেন এবং দরজা বন্ধ করে দেন। প্রচণ্ড গোলাগুলি একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তারপর বঙ্গবন্ধু দরজা খুলে আবার বাইরে এলে আর্মিরা তার বেডরুমের সামনে চারপাশে তাহাকে ঘিরে ফেলে। আমি আর্মিদের পিছনে ছিলাম। আর্মিদের লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু বলেন, “তোরা কি চাস? কোথায় নিয়ে যাবি আমাকে?” তারা বঙ্গবন্ধুকে তখন সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। সিঁড়ির ২/৩ ধাপ নামার পর নিচের দিক হতে অনেক আর্মি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। গুলি খেয়ে সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু সিঁড়িতে লুটিয়ে পড়েন।

আমি তখন আর্মিদের পিছনে ছিলাম। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কি কর?’ উত্তরে আমি বলি, ‘কাজ করি।’ তখন তারা আমাকে ভিতরে যেতে বলে। আমি বেগম মুজিবের রুমের বাথরুমে গিয়ে আশ্রয় নিই। সেখানে বেগম মুজিবকে বলি বঙ্গবন্ধুকে গুলি করেছে। ওই বাথরুমে শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা, শেখ জামাল ও তার স্ত্রী রোজী, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব ও বঙ্গবন্ধুর ভাই নাসের এবং আমি আশ্রয় নিই। শেখ নাসের ওই বাথরুমে আসার আগে তার হাতে গুলি লাগে, তার হাত হতে তখন রক্ত ঝরছে। বেগম মুজিব শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে তার রক্ত মুছেন।

এরপর আর্মিরা আবার দোতলায় আসে এবং দরজা পিটাতে থাকলে বেগম মুজিব দরজা খুলিতে যান এবং বলেন, ‘মারলে সবাই একই সাথে মরব।’ এই বলে বেগম মুজিব দরজা খুললে আর্মিরা রুমের ভেতর ঢুকে পড়ে এবং শেখ নাসের, শেখ রাসেল, বেগম মুজিব এবং আমাকে নিচের দিকে নিয়ে আসছিল। তখন সিঁড়িতে বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুর লাশ দেখে বলেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’ এই কথার পর আর্মিরা তাঁকে দোতলায় তাঁর রুমের দিকে নিয়ে যায়। একটু পরেই ওই রুমে গুলির শব্দসহ মেয়েদের আর্তচিৎকার শুনতে পাই।

আর্মিরা নাসের, রাসেল ও আমাকে নিচতলায় এনে লাইনে দাঁড় করায়। সেখানে সাদা পোশাকের একজন পুলিশের লাশ দেখি। নিচে নাসেরকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কে?’ তিনি শেখ নাসের বলে পরিচয় দিলে তাহাকে নিচতলায় বাথরুমে নিয়ে যায়। একটু পরেই গুলির শব্দ ও তার মাগো বলে আর্তচিৎকার শুনতে পাই। শেখ রাসেল ‘মার কাছে যাব’ বলে তখন কান্নাকাটি করছিল এবং পিএ মহিতুল ইসলামকে ধরে বলছিল, ‘ভাই, আমাকে মারবে না তো?’ এমন সময় একজন আর্মি তাহাকে বলল, ‘চলো তোমার মায়ের কাছে নিয়ে যাই।’ এই বলে তাহাকে দোতলায় নিয়ে যায়। একটু পরেই কয়েকটি গুলির শব্দ ও আর্তচিৎকার শুনতে পাই।

লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় সেলিমের হাতে এবং পেটে দুইটি গুলির জখম দেখলাম। এরপর দেখলাম কালো পোশাক পরিহিত আর্মিরা আমাদের বাসার সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। তখন ডিএসপি নূরুল ইসলাম এবং পিএ/রিসিপশনিস্ট মহিতুল ইসলামকে আহত দেখি। এরপরে আমাদের বাসার সামনে একটা ট্যাংক আসে। ট্যাংক থেকে কয়েকজন আর্মি নেমে ভিতরের আর্মিদের লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করে ভিতরে কে আছে, উত্তরে ভিতরের আর্মিরা বলে, ‘All are finished.’ অনুমান বেলা ১২টার দিকে আমাকে ছেড়ে দিবার পর আমি প্রাণভয়ে আমার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া চলে যাই।

স্বাক্ষর—আবদুর রহমান শেখ (রমা)

মো. সেলিমের (আবদুল) জবানবন্দি

আমি বর্তমানে বঙ্গভবনে মশালচি হিসেবে চাকরি করছি। ১৯৭২ সাল হতে এই চাকরি করছি। ১৯৬৭ সালে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ ৬৭৭ নং বাড়িতে কাজ শুরু করি। ১৯৭২ সালে চাকরি হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কাজের লোক হিসেবে কাজ করি। চাকরি হওয়ার পূর্বাপর আমি এবং রহমান (রমা) বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে দোতলায় থাকিতাম। বঙ্গবন্ধুর বাড়ি আড়াইতলা, অর্থাৎ তিনতলায় মাত্র ২টা রুম, সেই জন্য আমরা আড়াইতলা বলে থাকি, দোতলায় ৬টা রুম। নিচতলায় ৭টা রুম। বাড়ির উত্তর দিকে রান্নাঘর, গোয়ালঘর ও গ্যারেজ আছে। বাড়ির চারিদিকে অনুমান ৫ হাত উঁচু ওয়াল আছে। ওয়ালের ওপর তারকাঁটা লাগানো আছে। বাড়ির দক্ষিণ দিকে মাত্র একটা গেট আছে। গেট দিয়ে ভিতরে গেলে সামনে একটা করিডর পড়ে। করিডরের দুই পাশে রুম আছে। বাড়ির মাঝখানে একটা এবং বাড়ির পূর্ব দিক দিয়ে একটা মোট দুইটা সিঁড়ি আছে (আপত্তি সহকারে তা রেকর্ড হলো) মাঝের সিঁড়ি দিয়ে পশ্চিম দিকে এবং পূর্ব দিকের সিঁড়ি দিয়ে পূর্ব দিকে মুখ করে ওপরে উঠিতে হয়।

বঙ্গবন্ধুর পরিবারে তিনি, তাঁর স্ত্রী, তিন পুত্র, দুই কন্যা এবং দুই পুত্রবধূসহ মোট ৯ সদস্য ছিল। ঘটনার দিন ৭ জনকে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকাল ৫টার দিকে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংঘটিত হয়। ঘটনার রাত্রে আমি এবং রমা দোতলায় বঙ্গবন্ধুর বেডরুমের সামনে ঘুমিয়েছিলাম। তখন বঙ্গবন্ধু খুব জোরে দরজা খুললে আমার এবং রমার ঘুম ভেঙে যায়। উঠে দেখি বঙ্গবন্ধু গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গিপরা অবস্থায় নিচের দিকে যাচ্ছেন।

ওই রাত্রে তিনতলায় কামাল ভাই ও তার স্ত্রী, দোতলায় জামাল ভাই ও তার স্ত্রী এবং পুত্র রাসেল এক রুমে ছিল। রেহানার রুমে নাসের কাকা ছিল। তখন হাসিনা এবং রেহানা বিদেশে ছিল।

নিচতলায় ডিএসপি নূরুল ইসলাম, পিএ/রিসিপশনিস্ট মহিতুল ইসলাম, টেলিফোন মিস্ত্রি মতিন ও অন্যান্য লোক ছিল।

বঙ্গবন্ধু নিচে যাবার পর বেগম মুজিব আমাকে তাঁর চশমা এবং পাঞ্জাবি দিলে আমি নিচে বঙ্গবন্ধুকে তা দিই। তিনি চশমা-পাঞ্জাবি পরিয়া নেন। আমি বঙ্গবন্ধুর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকি। তখন তিনি বলছিলেন, ‘আমার এবং আমার বোনের বাসা আক্রমণ করেছে, রাজারবাগ ফোন কর।’ এমন সময় বাইর হতে একঝাঁক গুলি ভেতরে আসে। তখন তিনি এবং আমি বসে পড়লাম। তিনি ক্যান্টনমেন্ট, রাজারবাগসহ কোথাও টেলিফোন লাইন না পেয়ে দোতলার দিকে চলে গেলেন। আমি পিছনে পিছনে চলে গেলাম।

সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় কামাল ভাইকে তিনতলা হতে নিচে নামতে দেখি। এদিকে বঙ্গবন্ধু নিজের বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। তারপর দক্ষিণ দিকে গুলির শব্দ শুনি। আমি দৌড়ে জামাল ভাইয়ের রুমে গিয়ে দরজা দিয়ে দেখি কয়েকজন কালো পোশাক পরিহিত লোক গুলি করতে করতে বাড়ির ভিতরে ঢুকেছে। গুলি লাগিবার ভয়ে আমি জামাল ভাইয়ের বাথরুমে ঢুকে বসে থাকি। তখন জোরে জোরে বলছে ‘যে যেখানে আছ সারেন্ডার কর।’ আমি সিঁড়ির দিকে উঁকি দিয়ে দেখি দুজন কালো পোশাকধারী সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। আমি তখন আবার বাথরুমে ঢুকে পড়ি। তারপর কালো পোশাকধারী দুজন লোক আমার কাছাকাছি এলে আমার কিছু সাহস হয়। এই কারণে যে আর্মি দুষ্কৃতকারীদের খবর পেয়ে এসেছে। এই মনে করে আমি উঠতে গেলে তারা আমাকে গুলি করে। গুলি আমার হাতে-পেটে লাগে (এই পর্যায়ে সাক্ষী তার হাতের ও পেটের জখম দেখায়), তখন আমি সামনের দিকে পড়ে যাই।

পরে আমি সিঁড়ির পাশে হেলান দিয়ে বসে থাকি। বসে থাকা অবস্থায় দেখি যে, ৪-৫ জন আর্মির লোক বঙ্গবন্ধুকে তাঁর রুম থেকে ধরে সিঁড়ির দিকে আনছে। বঙ্গবন্ধু আমাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে বলল, ‘এই ছেলেটা ছোটবেলা হতে আমাদের এখানে থাকে। একে কে গুলি করল?’ এরপর তিনি বলিলেন, ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাবি? কি করছি—বেয়াদপি করছ কেন?’ এর কিছুক্ষণ পরে সিঁড়ির দিকে গুলির শব্দ ও চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই। একটু পরে দেখি আম্মাকে (বেগম মুজিব), রাসেলকে, নাসের কাকাকে ও রমাকে আর্মিরা নিচের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ির কাছে গিয়েই আম্মা চিৎকার করে উঠে, ‘আমি ওই দিকে যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেল।’ তারপর নাসের, রাসেল ও রমাকে নিচের দিকে এবং আম্মাকে (বেগম মুজিব) বেডরুমের দিকে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই বেডরুম থেকে গুলির শব্দ এবং চিৎকারের শব্দ শুনতে পাই।

কিছুক্ষণ পর গুলি বন্ধ হয়ে গেল। আমি বসে থাকা অবস্থায় একজন আর্মি এসে আমাকে বলল, ‘তোমার গুলি লাগছে?’ আমি বলি, ‘হ্যাঁ, লাগছে।’ তারপর আর্মিদের বিভিন্ন রুম খোঁজাখুঁজি করতে দেখি। একটু পরেই আর্মির লোক আমাকে বলল, ‘তুমি হেঁটে নিচে যেতে পারবা?’ আমি বললাম, ‘পারব।’ তখন আমাকে হাত ধরে টেনে উঠিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামাতেই দেখি সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে আছে। ওই লাশের ওপর দিয়ে আমাকে নিচে নিয়ে যায়। নিচে বারান্দা দিয়ে গেটের দিকে নিবার সময় কামাল ভাইয়ের লাশ পড়ে থাকতে দেখি। তারপর আমাকে গেটের ভিতরে লাইনে নিয়ে বসায়। সেখানেও একজন সিকিউরিটির লোকের লাশ পড়ে থাকতে দেখি।

লাইনে ডিএসপি নূরুল ইসলাম, মহিতুল ইসলাম, রমা, রাসেল ভাইকে দেখলাম। রাসেল মহিতুল ইসলামের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তারপর আমাকে লক্ষ্য করে একজন আর্মির লোক অন্য একজন আর্মিকে বলল, ‘এর গায়ে গুলি লেগেছে। একে হাসপাতালে নিয়ে যাও।’ একটু পরেই একটা ট্যাংক এবং একটা জিপ এল। ট্যাংক হতে কয়েকজন অফিসার নেমে অন্য আর্মিদের সঙ্গে ইংরেজি ও বাংলায় কী যেন কথাবার্তা বলল। তখন রাসেলকে দোতলায় নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই দোতলা হতে গুলির শব্দ ও চিৎকার শুনলাম। তারপর ট্যাংকের পিছনে আসা জিপে করে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে যাবার পর শেখ সেলিম ও শেখ মারুফের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তারা আমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির খবর জিজ্ঞাসা করলে আমি জানাই যে, সবাইকে মেরে ফেলেছে।

আমি পড়ালেখা জানি না। তদন্তকারী অফিসারের কাছে আমি জবানবন্দি দিয়েছি।

স্বাক্ষর—মো. সেলিম (আবদুল)

কেন ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা দিবস?

জওহরলাল নেহেরু কংগ্রেস সভাপতি থাকার সময় ২৬ জানুয়ারিকে ভারতের স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার কথা ছিল। ১৯৩০ সাল থেকে এ দিনটিকেই কংগ্রেস স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করতো এবং পরে ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। তবুও লর্ডমাউন্টব্যাটেনকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ক্ষমতা হস্তান্তরের যে আদেশপত্র দিয়েছিল তাতে বলা ছিল ৩০ জুন, ১৯৪৮-এর মধ্যেএই কাজ শেষ করতে হবে। দাঙ্গা ও সংঘাত এড়াতে আগেভাগেই ভারতের স্বাধীনতা বিল ১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সে পেশ করা হয়। দু সপ্তাহের মধ্যেই তা পাস হয়ে যায়। এর ভিত্তিতে ভারত ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়। এর পর থেকে ১৫ আগস্টই পালিত হচ্ছে ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে।
১৯২৯ সালে জওহরলাল নেহরু কংগ্রেস সভাপতি থাকাকালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে পূর্ণ স্বরাজের ডাক দিয়েছিলেন। তার আহ্বানে ২৬ জানুয়ারিকে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণার কথা ছিল। ১৯৩০ সাল থেকে এ দিনটিকেই কংগ্রেস স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করত, যতদিন না ভারত স্বাধীনতা পায় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে ঘোষিত হয়। ২৬ জানুয়ারির ওই দিনটিতেই ভারত সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয়।
তাহলে ১৫ আগস্ট কীভাবে ভারতের স্বাধীনতা দিবস হল? লর্ডমাউন্টব্যাটেনকে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ক্ষমতা হস্তান্তরের যে আদেশপত্র দিয়েছিল তাতে বলা ছিল এই কাজ শেষ করতে হবে ৩০ জুন, ১৯৪৮-এর মধ্যে। এ ব্যাপারে সি রাজাগোপালাচারীর বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, ইংরেজরা যদি ১৯৪৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করত, তাহলে হস্তান্তর করার মত কোনও ক্ষমতাই তাদের হাতে থাকত না। ফলে মাউন্টব্যাটেন সে কাজ এগিয়ে এনেছিলেন ১৯৪৭ সালের অগাস্টে।
সে সময়ে মাউন্টব্যাটেন দাবি করেছিলেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনটি এগিয়ে আনার মধ্যে দিয়ে তিনি দাঙ্গা ও রক্তপাত এড়িয়ে যেতে পেরেছেন। তাঁর দাবি ভুল প্রমাণিত হওয়ার পর আত্মপক্ষ সমর্থনে মাউন্টব্যাটেন লিখেছিলেন, ‘যেখানেই সাম্রাজ্যের শাসনের অন্ত হয়েছে, সেখানেই রক্তপাত হয়েছে। এ দাম দিতেই হবে।‘
মাউন্টব্যাটেনের দেওয়া তথ্যের উপর নির্ভর করে ভারতের স্বাধীনতা বিল ব্রিটিশ হাউস অফ কমন্সে পেশ করা হয় ১৯৪৭ সালের ৪ জুলাই। দু সপ্তাহের মধ্যেই তা পাস হয়ে যায়। এর ভিত্তিতে ভারতে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয় এবং তৈরি হয় ভারত ও পাকিস্তান। এ দুই রাষ্ট্রকেই ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট গ্রন্থে মাউন্টব্যাটেনকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, ‘আমি দিনটা এমনিই বেছেছিলাম। একটা প্রশ্নের উত্তরে আমি এই জবাব দিই। আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম যে আমি দেখাব আমিই গোটা বিষয়টার নিয়ন্ত্রক। ওরা যখন জিজ্ঞাসা করেছিল যে আমি কোনও দিন নির্দিষ্ট করেছি কিনা, আমি বুঝে গিয়েছিলাম দ্রুত ব্যাপারটা সেরে ফেলতে হবে। আমি ও নিয়ে ভাবিনি তখনও- আমি ভাবছিলাম আগস্ট বা সেপ্টেম্বর কিছু একটা, তার পর আমি বলে দিই ১৫ আগস্ট। কেন? কারণ এ দিনটা জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বার্ষিকী।‘
১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট জাপানের সম্রাট হিরোহিতো একটি রেকর্ডের রেডিও ভাষণ দেন যা পরে জুয়েল ভয়েস ব্রডকাস্ট নামে পরিচিত হয়। সেই রেডিও ভাষণে তিনি মিত্রশক্তির কাছে জাপানের আত্মসমর্পণের কথা ঘোষণা করেন। মাউন্টব্যাটেন স্মরণ করতে পেরেছিলেন যে তিনি সে ভাষণ শুনেছিলেন চার্চিলের ঘরে বসে এবং মিত্রশক্তির সুপ্রিম কম্যান্ডার হিসেবে জাপানের আত্মসমর্পণের নথিতে ১৯৪৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর স্বাক্ষরও করেছিলেন।
কিন্তু পাকিস্তান ১৪ আগস্ট স্বাধীন হল কীভাবে? সত্যি কথা বলতে কি, হয়নি। ভারতের স্বাধীনতা বিলে দুই দেশকেই ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দেওয়ার কথা বলা ছিল। পাকিস্তান প্রথমে ১৫ আগস্টকেই স্বাধীনতা দিবস হিসেবে মেনেছিল। পাকিস্তানের প্রথম ভাষণে জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘১৫ আগস্ট স্বাধীন, সার্বভৌম পাকিস্তানের জন্মদিন।‘ তবুও ১৯৪৮ সাল থেকে পাকিস্তান ১৪ আগস্ট থেকে স্বাধীনতা দিবস পালন করতে শুরু করে, তার একটা কারণ হতে পারে করাচিতে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট, এথবা ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ছিল ২৭ তম রমজান যা মুসলিমদার কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি দিন।
কারণ যাই হোক না কেন ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই ৭৩ বছর ধরে তাদের স্বাধীনতা দিবস পালন করে তীব্র দেশপ্রেমের সঙ্গে। দুই দেশেই অবশ্য স্বাধীনতার ফল ব্যাপক সংখ্যার নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নিরিখে এ তারিখের তেমন কোনও তাৎপর্য নেই।
>>>ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

বঙ্গবন্ধুর লেখা চিঠি by সোহরাব হাসান

বঙ্গবন্ধু
রাজনীতিতে সমর্পিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের বড় সময় কেটেছে জেলখানায়। সেখানে থাকতে তিনি যেমন রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, নেতা-কর্মী ও স্বজনদের কাছ থেকে বহু চিঠি পেয়েছেন, তেমনি তিনিও তাঁদের লিখেছেন। কারাগারের বাইরে থাকতে রাজনীতির সুবাদেই তিনি বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, অনেকে তাঁর সান্নিধ্যে এসেছেন। তাঁদের কারও কারও সঙ্গে তাঁর পত্র যোগাযোগ হতো। কারাগারে থাকতে বেশির ভাগ চিঠি পেতেন দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে।

সরকারের গোয়েন্দাদের বাজেয়াপ্ত করা কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর লেখা এবং তাঁকে লেখা চিঠির হদিস সম্প্রতি পাওয়া গেছে সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বইয়ে।
কারাগারে বসেও বঙ্গবন্ধু দেশের কথা ভাবতেন। কারাগারের ভেতরে বা বাইরের যেসব ঘটনা তাঁকে আলোড়িত করত, সে সম্পর্কে তিনি অকপটে তাঁর মতামত প্রকাশ করতেন। বঙ্গবন্ধু দলীয় নেতা-কর্মী ও স্বজনের বাইরে বিদেশি রাষ্ট্রনেতা ও দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীদেরও চিঠি লিখেছেন। তাঁর লেখা থেকে বাছাই করা কিছু চিঠি এখানে পত্রস্থ হলো।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই দুর্নীতির অভিযোগ এনে অনেক রাজনৈতিক নেতাকে জেলে পোরেন। এই প্রেক্ষাপটে বাবা শেখ লুৎফর রহমানকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠিটিতে বেদনা ও ক্ষোভ ছিল। আজীবন নিঃস্বার্থভাবে রাজনীতি করেছেন, তাই তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ মানতে পারেননি। পরে বঙ্গবন্ধু আইনি লড়াই করেই অভিযোগ থেকে মুক্তি পান। চিঠিটি বাজেয়াপ্ত হয়েছিল।
জ্যেষ্ঠ কন্যা ও আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে লেখা বঙ্গবন্ধুর চিঠিটি জেলখানার বাইরে থেকে। শেখ হাসিনা তখন স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়াসহ সুইডেন সফরে। ছোট্ট এই চিঠিতে ব্যক্তিগত কুশলাদির পাশাপাশি দেশের দুই কৃতী সন্তান তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ও অধ্যাপক আবদুল হাইয়ের মৃত্যুর খবর দেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদকে লিখেছিলেন ব্যক্তিগত কুশল জানতে চেয়ে। চিঠিটি রাজনৈতিক ছিল না।
তবু পািকস্তান সরকার এটি বাজেয়াপ্ত করে। বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালে অলি আহাদ ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক। বঙ্গবন্ধু তাঁকে লিখেছিলেন করাচি থেকে। তখন গণপরিষদের অধিবেশন চলছিল।
দৈনিক ইত্তেফাক-এ দুই কিস্তিতে প্রকাশিত লেখক আবুল ফজলের প্রবন্ধ ‘শক্ত কেন্দ্র কেন ও কার জন্য’ প্রকাশের পর বঙ্গবন্ধু তাঁকে দুটি চিঠি লেখেন। প্রথমটি লেখেন ১৯৬৯ সালের ১৭ নভেম্বরে। আবুল ফজল পরে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে শেখ মুজিবের সঙ্গে আমার কখনো সাক্ষাৎ পরিচয়ের সুযোগ ঘটেনি। তবে ১৯৬৯-এর শেষের দিকে তাঁর কাছ থেকে আমি নিজের হাতে লেখা দু’খানা চিঠি পেয়েছিলাম। তখন তিনি বাংলাদেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও সর্বপ্রধান রাজনৈতিক তথা বিরোধী দলের নেতা।’

চিঠি-১: বাবা লুৎফর রহমানকে
ঢাকা জেল
১২.১১.৫৮
আব্বা
আমার ভক্তিপূর্ণ ছালাম গ্রহণ করবেন ও মাকে দিবেন। মা এবার খুব কষ্ট পেয়েছিল, কারণ এবার তাঁর সামনেই আমাকে গ্রেপ্তার করেছিল। দোয়া করবেন মিথ্যা মামলায় আমার কিছুই করতে পারবে না। আমাকে ডাকাতি মামলার আসামীও একবার করেছিল। আল্লা আছে, সত্যের জয় হবেই। আপনি জানেন বাসায় কিছুই নাই। দয়া করে ছেলেমেয়েদের দিকে খেয়াল রাখবেন। বাড়ি যেতে বলে দিতাম। কিন্তু ওদের লেখাপড়া নষ্ট হয়ে যাবে। আমাকে আবার রাজবন্দী করেছে, দরকার ছিল না। কারণ রাজনীতি আর নাই, এবং রাজনীতি আর করবো না। সরকার অনুমতি দিলেও আর করবো না।
যে দেশের মানুষ বিশ্বাস করতে পারে যে আমি ঘুষ খেতে পারি সে দেশে কোনো কাজই করা উচিত না। এ দেশে ত্যাগ ও সাধনার কোন দামই নাই। যদি কোনদিন জেল হতে বের হতে পারি তবে কোন কিছু একটা করে ছেলেমেয়ে ও আপনাদের নিয়ে ভালভাবে সংসার করব। নিজেও কষ্ট করেছি, আপনাদেরও দিয়েছি। বাড়ির সকলকে আমার ছালাম দিবেন। দোয়া করতে বলবেন। আপনার ও মায়ের শরীরের প্রতি যত্ন নিবেন। চিন্তা করে মন খারাপ করবেন না। মাকে কাঁদতে নিষেধ করবেন। আমি ভাল আছি।
আপনার স্নেহের
মুজিব
গোপালগঞ্জের বাসাটা ভাড়া দিয়া দেবেন। বাসার আর দরকার হবে না।—মুজিব।
সূত্র: পূর্ব পাকিস্তান সরকার, হোম পোল, এফ/এন, ৬০৬-৪৮ পিএফ, খণ্ড ৯

চিঠি-২: জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে
১৩.৬.৬৯
হাছু মনি
আমার স্নেহ ও ভালবাসা নিও। ওয়াজেদের চিঠি পেয়েছিলাম, উত্তরও দিয়েছি বোধ হয় পেয়ে থাকবে। জেল হতে বের হয়ে তোমাকে ভাল করে দেখতেও পারি নাই। শুধু তোমার শরীরের দিকে চেয়ে তোমাকে যেতে দিয়েছি। শরীরের প্রতি যত্ন নিও। ওয়াজেদের শরীর কেমন। আমরা সকলেই ভাল আছি। চিন্তা করে শরীর নষ্ট করিও না। বোধ হয় শুনেছ মানিক ভাই পিন্ডিতে হঠাৎ মারা গিয়েছেন। বুঝতেই পার আমার অবস্থা। প্রফেসর হাই সাহেবও মারা গিয়েছেন। বাংলাদেশের দুইজন কৃতী সন্তান আমরা হারালাম। চিন্তা করিও না। সুইডেন খুব সুন্দর দেশ। তোমাদের খুব ভাল লাগবে। চিঠি দিও।
তোমার
আব্বা

সূত্র: জাতির জনক, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ট্রাস্ট, পৃ.২১১

চিঠি-৩: তাজউদ্দীন আহমদকে
ঢাকা জেল
১৯ /৮ / ৬৬ (সিল)
স্নেহের তাজুদ্দিন
আমার স্নেহ ও ভালবাসা নিও। কেমন আছ? খবর জানি না। আমাকে খবর দিও। চিন্তা করিও না। সকলকে ছালাম দিও। শরীরটা বেশী ভাল না তবে কেটে যাচ্ছে। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিও।
ইতি—
তোমার মুজিব ভাই

সূত্র: পূর্ব পাকিস্তান সরকার, হোম পোল, এফ/এন, ৬০৬-৪৮ পিএফ, খণ্ড ২৬

চিঠি-৪: অলি আহাদকে
সমারসেট হাউস
করাচি
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬
প্রিয় অলি আহাদ,
তোমার চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আশা করি, গণপরিষদ হতে আমাদের ওয়াক আউট-এর পর ২ মার্চ ঢাকায় ফিরব। তোমার অসুবিধা সম্পর্কে আমি পুরোপুরি জানি ও অনুভব করি। আমাদের সংগঠনের কিছু টাকা সংগ্রহ করার জন্য আমি আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি।
৩ ও ৪ মার্চের প্রস্তাবিত সভা তুমি বাতিল করেছ জেনে আমি খুশি হয়েছি। কারণ তুমি জানো যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া এমন একটি বিরাট সভা অনুষ্ঠিত করা সম্ভব নয়। অবশ্যই একটি কাউন্সিল সভা করা আমাদের দরকার। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির পরই আমরা সভার তারিখ ঘোষণা করব। তুমি আমাদের সংগঠনের জন্য অত্যন্ত উদ্যমের সঙ্গে ও নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছ জেনে আমি অত্যন্ত সুখী। এখানে আমরা গণপরিষদে আমাদের সংগ্রামের ব্যাপারে ব্যস্ত। কারণ আমরা জানি যে, আসন্ন সংগ্রামের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। শহীদ সাহেব ছাড়া আমাদের পার্টির সব সদস্যই ২ ও ৩ মার্চ অথবা কাছাকাছি সময়ে ঢাকার পৌঁছুবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় খবর তোমাকে দেব।
দয়া করে মাওলানা সাহেবকে জানিও যে আমি তাঁর টাকা নিয়ে আসছি। আমাদের সকল কর্মীর প্রতি রইল আমার প্রীতি ও সালাম।
আশা করি তুমি ভালো আছ।
তোমারই
মুজিব ভাই

চিঠি-৫: আবুল ফজলকে

ফোন: ২৪২৫৬১
৬৭৭ ধানমন্ডি আবাসিক এলাকা
রোড নং ৩২, ঢাকা।
তারিখ: ১৭-১১-৬৯ ইং

জনাব অধ্যাপক সাহেব,
আমার ছালাম গ্রহণ করবেন। আশা করি ছহি-ছলামতে আছেন।
সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত আপনার প্রবন্ধ ‘শক্ত কেন্দ্র কেন ও কার জন্য’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। আপনার সাবলীল লেখনী নিঃসৃত সৃজনশীল এই প্রবন্ধটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে অধিক সংখ্যক মানুষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে হবে বলে আমার স্থির বিশ্বাস। প্রবন্ধটি আমি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করতে মনস্থ করেছি। আপনার অনুমতি পেলে কৃতার্থ হব।
আপনার স্নেহের
শেখ মুজিব

শোকাবহ ১৫ আগস্ট: মুক্তির মন্ত্রদাতা, স্বাধীনতার মন্ত্রণাদাতা by আনিসুজ্জামান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
একটা রাষ্ট্র যিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তিনি যে এমনভাবে ঘাতকের অস্ত্রাঘাতে নিহত হবেন, কেউ কি কখনো তা ভেবেছিল? প্রবল আত্মবিশ্বাস আর দেশবাসীর প্রতি আস্থা হয়েছিল তাঁর কাল। কিন্তু সেই আত্মবিশ্বাস, সেই আস্থা, সেই ভালোবাসাই কি তাঁর গুণ ছিল না? তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যুকে অতিক্রম করে তাঁর গৌরবোজ্জ্বল জীবনের দিকে আজ যখন তাকাই, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত গুণ ও বৈশিষ্ট্য এবং তাঁর রাজনৈতিক লক্ষ্য ও কর্মপন্থা আমাদের অভিভূত করে।

বঙ্গবন্ধুর প্রথম যে গুণ আমরা লক্ষ করি, তা তাঁর অদম্য সাহস। অল্প বয়সে এক মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে ফৌজদারি মামলার আসামি হতে হয়েছিল তাঁকে। মুরব্বিদের কেউ তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন দু-একটা দিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে। তিনি সম্মত হননি। বলেছিলেন, ওরা বলবে আমি পালিয়ে গেছি। ফলে তিনি গ্রেপ্তার হন, নিক্ষিপ্ত হন থানা-হাজতে। এর অনেক দিন পরে, পাকিস্তান সরকার যখন পূর্ব বাংলায় নির্বাচিত মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে কেন্দ্রের শাসন জারি করে, তখন সদ্য মন্ত্রিত্ব-হারানো শেখ মুজিবের বাসভবনে পুলিশ হানা দেয় এবং তাঁকে না পেয়ে চলে যায়। ঘরে ফিরে এসে তিনি সে-খবর পান। তৎক্ষণাৎ ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে ফোন করেন তিনি: আপনার ফোর্স আমার বাসায় এসেছিল বোধহয় আমাকে অ্যারেস্ট করতে। তাদের পাঠিয়ে দেন, আমি এখন বাসায়। আত্মগোপনকারী বাম রাজনীতিবিদদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তিনি আত্মগোপনের রাজনীতি নিজের বলে মনে করেননি। তাই আশ্চর্য নয় যে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়েও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে তিনি রয়ে যান ধানমন্ডির বাড়িতে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সুযোগ দেন তাঁকে গ্রেপ্তার করতে।

এই অসীম সাহসের আরেক পরিচয়স্থল তাঁর ৭ মার্চের ভাষণ। সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করতে প্রস্তুত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মারণাস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলতে অসামান্য সাহসের প্রয়োজন হয়। সে-সাহস তাঁর ছিল। অবশ্য সেই সাহসের অনেকটাই তিনি সংগ্রহ করেছিলেন অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মানুষের তেজোদীপ্ত ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ থেকে।

তাঁর আরেকটি গুণ ছিল একাগ্রচিত্ততা। যখন মুসলিম লীগের রাজনীতি করেছেন, তখন পাকিস্তানের দাবিতে ছিলেন অবিচল। যখন বাঙালির স্বাধিকার-প্রতিষ্ঠাকে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন, তখন মুসলিম লীগ ত্যাগ করতে একটুও ইতস্তত করেননি। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে প্রথম কারাবরণ করেন তিনি। তারপর কতবার যে কারাগারে গেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। কোনো দমন-পীড়ন তাঁকে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারেনি। প্রথম জীবনে নেতা মেনেছিলেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীকে। গুরুর সঙ্গে কখনো কখনো মতানৈক্য ঘটা সত্ত্বেও শেষ অবধি তাঁকেই নেতা বলে মান্য করেছেন। মওলানা ভাসানীর মধ্যে উদারতার অভাব লক্ষ করেও তাঁর নেতৃত্বাধীনে রাজনীতি করেছেন-যত দিন না মওলানা নিজে অন্য রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন।

বাঙালিত্বের গৌরবও তাঁর মধ্যে ছিল অপরিমেয়। রবীন্দ্রনাথের গান ও নজরুলের কবিতা তাঁর কণ্ঠে বারংবার ধ্বনিত হয়েছে, আব্বাসউদ্দীনের গান ছিল তাঁর অতি প্রিয়। বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যেই ছিল তাঁর সংগ্রাম। নিতান্ত প্রতিকূল পরিবেশে ১৯৬৬ সালে তিনি উপস্থাপন করেন ‘আমাদের বাঁচার দাবি-৬ দফা কর্মসূচি’। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বন্দী অবস্থায় সামরিক প্রহরার মধ্যেও দেশের মাটির ধুলো মাথায় নিয়ে বলেছিলেন, এখন তিনি মৃত্যুবরণ করতে প্রস্তুত। ১৯৬৯ সালে পূর্ব বাংলাকে আখ্যায়িত করেছিলেন বাংলাদেশ বলে এবং দেশবাসীর রক্তের সঙ্গে বেইমানি করবেন না বলে ওয়াদা করেছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বেন। এসব কথা তিনি রেখেছিলেন, কোনো আপস করেননি। ক্ষমতার হাতছানি তাঁকে অভিভূত করেনি, মৃত্যুভয় তাঁকে বিচলিত করেনি। ১৯৭১ সালে যখন তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী, তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষিত হয়ে গেছে, তাঁর কারা-প্রকোষ্ঠের সামনেই খনন করা হচ্ছে তাঁর কবর, তখন তিনি একটিমাত্র ইচ্ছাই জ্ঞাপন করেছিলেন, তাঁর লাশ যেন সমাহিত করা হয় তাঁর স্বদেশে।

মনেপ্রাণে যিনি বাঙালি, তিনি যে অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন হবেন, সে-কথা স্বতঃসিদ্ধ। অল্প বয়সে ছুঁতমার্গের লক্ষ্য হওয়ায় তিনি পীড়িত হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু অভিভূত হয়েছেন মাদারীপুরের স্বদেশি নেতা পূর্ণচন্দ্রের আত্মত্যাগে। মুসলিম লীগের কর্মী হয়েও তিনি অনুরাগী হয়েছেন সুভাষ বসুর। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ে কলকাতায় তিনি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ইসলামিয়া কলেজের অধ্যাপক ভবতোষ দত্তকে পাহারা দিয়ে মুসলমান এলাকা পার করে দিয়েছেন, আবার হিন্দু এলাকার সীমান্ত থেকে তাঁকে নিয়ে কলেজে পৌঁছে দিয়েছেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর অধিকাংশ মানুষ যখন ধর্মীয় পরিচয়কে ধরে রেখেছে আত্মপর-নির্ণয়ের মানদণ্ডরূপে, তখন তিনি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রগঠনের আবশ্যকতা সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করেছেন। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে শেখ মুজিব আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি পরিহার করতে চেয়েছিলেন, তবে তাতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় মওলানা ভাসানী পরামর্শ দিয়েছিলেন প্রদেশে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের অনুষ্ঠান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। নির্বাচনের পরে প্রথম সুযোগেই শেখ মুজিবের প্রয়াসে আওয়ামী মুসলিম লীগ রূপান্তরিত হয় আওয়ামী লীগে। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম শাসনতন্ত্র রচনার সময়ে দেশকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র আখ্যা দেওয়ার প্রতিবাদ করেছিলেন শেখ মুজিব এবং পূর্ব বাংলার জন্য যুক্ত নির্বাচনপ্রথা প্রবর্তনের সুপারিশ করতে সফল প্রয়াস নিয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রতিরোধে তাঁকে দেখেছি ট্রাকে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ঢাকা শহর পরিক্রম করতে। সবশেষে ধর্মনিরপেক্ষতাকে তিনি রূপ দিয়েছিলেন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপরিচালনার একটি মূলনীতিরূপে।

এ থেকে চলে আসে সংবিধানে বর্ণিত রাষ্ট্রপরিচালনার আরেকটি মূলনীতি সমাজতন্ত্রের কথা। আমরা জানি, মুসলিম লীগের কর্মী হিসেবে মুজিব ছিলেন সোহ্রাওয়ার্দী-আবুল হাশিম উপদলের অন্তর্ভুক্ত। আবুল হাশিমের চিন্তাধারা হয়তো একটি ন্যায়পরায়ণ সমাজগঠনে তাঁকে প্রেরণা দিয়েছিল। তবে ১৯৫৬ সালের চীন ভ্রমণের পর সমাজতন্ত্রের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহের সৃষ্টি হয়। তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা যতই সমৃদ্ধ হয়েছে, ততই তিনি সমাজতন্ত্রের দিকে ঝুঁকেছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্র থেকে তিনি দূর করতে চেয়েছিলেন সকল প্রকার শোষণ-বঞ্চনা। তবে তা বাস্তবায়নের সময় তিনি পাননি।

দেশের মানুষকে তিনি ভালোবেসেছিলেন এবং বড় বেশি ভালোবেসেছিলেন। দেশের মানুষও তাঁকে ভালোবেসেছিল-আজও ভালোবাসে। তার কারণ, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্থপতি। আরও কারণ, সাধারণ মানুষ তাঁকে নিজেদের একজন মনে করেছে। বঙ্গবন্ধু বহু মানুষকে এবং তাদের পিতা বা পুত্রকে মনে রাখতে পারতেন। এ ক্ষমতা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের ছিল, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ছিল, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রজন্মের আর কারও ছিল না। এই ‘আমাদের লোক’কে মানুষ ভোলেনি, ভুলবে না। দেশদ্রোহী ঘাতকেরা ভেবেছিল, সপরিবারে শেখ মুজিবকে হত্যা করে তাঁকে এবং তাঁর রাজনৈতিক ভাবধারাকে মুছে ফেলা যাবে ইতিহাসের পাতা থেকে। তাদের প্রয়াস ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের কাছে বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছেন জ্যোতির্ময় হয়ে, চিরজীবী হয়ে।

শেখ হাসিনার সেই মুখবন্ধ by পার্থ শঙ্কর সাহা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, তাঁর পরিবার ও জাতীয় চার নেতা হত্যার ঘটনায় ১৯৮০ সালে যুক্তরাজ্যে প্রথম অনুসন্ধান কমিশন গঠিত হয়। ওই অনুসন্ধান কমিশনের প্রতিবেদনটি ‘শেখ মুজিব মার্ডার ইনকোয়ারি: প্রিলিমিনারি রিপোর্ট অব দ্য কমিশন অব ইনকোয়ারি’ শিরোনামে পুস্তিকা হিসেবে লন্ডনের র‍্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশনস থেকে ১৯৮২ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত হয়। এর মুখবন্ধ লিখেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশে আইন করে বিচারের পথ রুদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এ কমিটি গঠিত হয়। ব্রিটিশ এমপি ও আইনবিদ স্যার টমাস উইলিয়ামসের নেতৃত্বে কমিশনে আরও ছিলেন আয়ারল্যান্ড সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী শন ম্যাকব্রাইড, ব্রিটিশ এমপি ও আইনবিদ জেফরি টমাস এবং ব্রিটিশ আইনবিদ ও মানবাধিকারকর্মী অবরি রোজ। পুস্তিকাটিতে শেখ হাসিনার লেখা ভূমিকাটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

‘আমার বাবা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমাদের পরিবারের সদস্যদের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করা হয়। ওই বছরেরই ৩ নভেম্বর হত্যা করা হয় আমার বাবার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ চার রাজনৈতিক সহযোগীকেও। শেখ মুজিব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন। তাঁরা ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ায় ব্রতী ছিলেন। তাঁদের হত্যাকারী ও ষড়যন্ত্রীদের মূল উদ্দেশ্য ছিল এসব মূল্যবোধকে বাতিল করে দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক সমাজ সৃষ্টি করা।

এসব মানুষকে হত্যা করা হয় একটি সামরিক অভ্যুত্থানের অংশ হিসেবে, যার মধ্য দিয়ে শিশু রাষ্ট্রটির গণতান্ত্রিক ধারার অবসান হয় এবং শুরু হয় সামরিক শাসন। এই হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন তৎকালীন সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রের শীর্ষ কিছু লোক। আর তাই বারবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও বাংলাদেশের সরকার একজন হত্যাকারীকেও বিচারের মুখোমুখি করেনি। বস্তুত এসব হত্যাকারী ও তাদের সহযোগী ষড়যন্ত্রকারীরা সরকারের কাছ থেকে সুরক্ষা এবং সহযোগিতা পেয়ে এসেছে। এদের কাউকে কাউকে বিদেশে কূটনৈতিক মিশনে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অন্যরা দেশেই নানা সুবিধাজনক অবস্থানে আছে। এভাবে অপরাধকে পুরস্কৃত করা হয়েছে।

হত্যার শিকার পরিবারের সদস্যরা বাংলাদেশে এর প্রতিকার চেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে তাঁরা ও যুক্তরাজ্যে তাঁদের গণতন্ত্রমনা সমর্থকেরা এ বিশ্বাসে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি থেকে সরা যাবে না। তাই তাঁরা বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবার ও জেলখানার ভেতরে বিনা বিচারে আটক চার জাতীয় নেতার হত্যার বিষয়ে অনুসন্ধান করার জন্য একটি কমিশন গঠন করতে প্রথিতযশা কয়েকজন আইনজ্ঞের কাছে আবেদন জানান। ওই আইনজ্ঞদের সুনাম এবং ভাবমূর্তিই বলে দেয়, তাঁরা বিচারের ক্ষেত্রে যথার্থতার সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করবেন। আমরা আশা করি, এই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও আইনের শাসনের অপব্যবহারের ফলে গত সাত বছর ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ধারা যেভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে; বিচারকদের তদন্তের ফলাফল সে বিষয়ে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করবে।

সারা বিশ্বের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সমর্থন করা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ লালনকারী বিশ্বের সব সরকার ও জনগণের অধিকার এবং সেই সঙ্গে দায়িত্ব। এসব অধিকার লঙ্ঘিত হলে ক্ষোভ প্রকাশের জন্য সম্ভাব্য যেকোনো পন্থা তারা ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশের সামরিক শাসক বিদেশি সরকার ও জনগণের সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক ভাবধারা ফিরিয়ে আনার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্বজনমত এই হত্যাকারীদের বিচারের মুখোমুখি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।’

শেখ হাসিনা
সভাপতি
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
লন্ডন, ৩ নভেম্বর ১৯৮২

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেই আগস্টেই লেখা কবিতা

মীর গুল খান নাসির
বেলুচিস্তানের প্রথম সারির কবি মীর গুল খান নাসির (১৯১৪—১৯৮৩)। ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। নিজ জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার থাকায় পাকিস্তানি শাসকদের নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মর্মন্তুদ হত্যাকাণ্ডের সময় মীর গুল খান ছিলেন কারাগারে বন্দী। বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৪ দিন পর ১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট কারাগারে বসেই তিনি এই কবিতা লেখেন।

মীর গুল খান নাসির
ভোর কোথায়?
চিৎকার, ক্রন্দন আর শশব্যস্ত আহ্বানের মধ্যে
উল্লাস করছে অন্ধ জনতা।

ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা।
বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে মনে হয় দূরে বৃষ্টি হচ্ছে,
কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই
রক্তের ধারা বইছে প্রবল।
হে নির্বোধের দল, কোথায় উজ্জ্বল প্রভাত?
এখানে এখনো ক্রুদ্ধ রাত
এজিদরূপী সাম্রাজ্যবাদীরা এখনো চূর্ণ করছে
সাহসী দেশপ্রেমিকের হাড়,
জনবহুল, চিত্রময় বাংলাদেশে আবারও রক্তের ঝড়।
সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা আবারও জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রাম-নগর,
মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাঁকে
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে
এজিদের বিরুদ্ধে হোসেনের কাহিনির পুনরাবৃত্তি।
হে সাহসী কমরেডগণ, এজিদ থেকে সতর্ক হও,
তোমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হও, পরাস্ত হবে তারা
তাদের মুখ তাদেরই কিন্তু জবান সাম্রাজ্যবাদীদের।
সেবাদাসেরা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের পকেট স্ফীতকায়
এবং সাহসী দেশপ্রেমিকদের খতম করে দিতে
সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে জোগান আসতেই থাকবে
তারা পাঠাবে ভাড়াটে লোক ও অস্ত্র
এই কাপুরুষদের কোনো দয়া-মায়া নেই,
এদের কারণেই বিশ্বে এখন ঘোর অন্ধকার।
মুক্তির শিখা কোথাও জ্বলে উঠলে এরা তা নিভিয়ে দেয় দ্রুত
বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে
আবারও স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত।
সাম্রাজ্যবাদীরা আবারও ফিরে গেছে তাদের সেই পুরোনো
চক্রান্তে, বিশ্বাসঘাতকতায়
আবারও দ্বন্দ্বের ফয়সালা হচ্ছে বন্দুকের নলে
আবারও সোনার জমিনে জ্বলছে আগুন
হে বন্ধুরা, এভাবেই সময়ের মুখোমুখি আমরা
আমার মাতৃভূমি বেলুচিস্তানও জ্বলছে এখন
ভয় পেয়ো না হে সাহসী যোদ্ধারা, থেমে যেয়ো না,
কণ্টকিত দুর্গম পথ এখনো অনেক বাকি।
মুজিবের রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না,
দেশপ্রেমিকের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা।
বেশিক্ষণ নয়, কুয়াশা ও আঁধার সত্ত্বেও
এই ভয়াল রাত্রি দ্রুত কেটে যাবে
হৃদয় দিয়ে নাসির স্পষ্ট দেখতে পায়
বিজয়-পতাকা উড়ছে।

>>>অনুবাদ: রিজওয়ান উল আলম

আগস্টে নিহতদের নিয়ে এক সামরিক কর্মকর্তার প্রতিবেদন by মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ

নৃশংসভাবে নিহত ১৮ জনের লাশ তিনটি বাড়ি ও হাসপাতালের মর্গ থেকে সংগ্রহ করে সেগুলো দাফন করার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়েছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তৎকালীন মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ পিএসসির। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুু নিহত হওয়ার পর ঘটনাস্থল ধানমন্ডির বাড়িসহ আরও দুটি বাড়িতে গিয়েছিলেন তিনি। লাশ দাফনের পর ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন হেডকোয়ার্টারে কর্মরত এই স্টাফ অফিসার একটি প্রতিবেদনও জমা দেন নিজের দপ্তরে।
বাঁ থেকে কামাল, রেহানা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোলে রাসেল, বেগম মুজিব, জামাল ও হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হাসিনা ও রেহানা ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর সবাইকে হত্যা করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

মেজর আলাউদ্দিন পাকিস্তান থেকে ফিরে ১৯৭৪ সালে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। একপর্যায়ে রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে নিষ্কৃতিও পান। ১৯৭৫ সালের পর এক সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগেও গ্রেপ্তার হয়ে বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। ১৯৮১ সালে তাঁকে অবসর দেওয়া হয়। পরে এরশাদ সরকারের আমলে গ্রাম প্রতিরক্ষা দলের পরিচালক পদে নিয়োগ পান এবং ’৮৫ সালে চাকরিচ্যুত হন। ২২ জানুয়ারি ১৯৯৯ তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

ইংরেজিতে মর্মস্পর্শী ভাষায় লেখা তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদনটি সংগ্রহ ও অনুবাদ করেছিল প্রথম আলো।

১৫ আগস্টের ঘটনা সম্পর্কে পরিস্থিতি প্রতিবেদন

১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট রাত তিনটায় ঢাকা সেনানিবাসের স্টেশন কমান্ডারের আদেশে আমি প্রয়াত শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে যাই। স্টেশন কমান্ডার আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন। মেজর বজলুল হুদা ও তাঁর লোকজন পাহারা দিচ্ছিলেন বাড়িটি। হুদা আমাকে প্রথমে বাধা দিলেও পরে ঢোকার অনুমতি  দেন।

১. সড়ক নম্বর ৩২, শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি: সব কটি লাশ সিঁড়ির গোড়ায় আনা হলো। রাখা হলো কাঠের কফিনে। বরফ আনা হয়েছিল। রক্ত, মগজ ও হাড়ের গুঁড়া ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল প্রথম তলার দেয়াল, জানালার কাচ, মেঝে ও ছাদে। বাড়ির সব বাসিন্দাকেই খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুলির আঘাতে দেয়ালগুলোও ঝাঁঝরা হয়ে যায়। খোসাগুলো মেঝেতে পড়ে ছিল। কয়েকটি জানালার কাচ ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল ঘরের জিনিসপত্র, গিফটবক্স ও সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিয়েগুলোর উপহারের প্যাকেট। পবিত্র কোরআন শরিফও মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখলাম।

ক. শেখ মুজিবের বাড়িতে নয়জনকে হত্যা করা হয়েছিল। লাশগুলো (প্রদত্ত রিপোর্ট মতে) যে অবস্থায় পাওয়া যায়:

১. শেখ মুজিব: প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানটায় যে সমতল অংশটি, তার তিন-চার ধাপ ওপরে। চশমার ভাঙা কাচ ও একটি পাইপ সিঁড়িতে পড়ে ছিল।

২. শেখ কামাল: অভ্যর্থনাকক্ষে।

৩. টেলিফোন অপারেটর: অভ্যর্থনাকক্ষে।

৪. শেখ নাসের: নিচতলার সিঁড়িসংলগ্ন বাথরুমে।

৫. বেগম মুজিব: মূল বেডরুমের সামনে।

৬. সুলতানা কামাল: মূল বেডরুমে।

৭. শেখ জামাল: মূল বেডরুমে।

৮. রোজী জামাল: মূল বেডরুমে।

৯. শিশু রাসেল: মূল বেডরুমে, তার দুই ভাবির মাঝখানে।

২. বাড়ির সব বাসিন্দাকেই খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। দেখে মনে হচ্ছিল, তাঁদের সবাই তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারান।

শেখ মুজিব: প্রথম তলার সিঁড়ির মাঝখানে যে সমতল জায়গা, তার তিন-চার ধাপ ওপরে একেবারে কাছ থেকে গুলি করে শেখ মুজিবকে খুন করা হয়। তাঁর তলপেট ও বুক ছিল বুলেটে ঝাঁঝরা। শেখ মুজিব সব সময় চশমা পরতেন এবং তাঁর ধূমপানের অভ্যাস ছিল। তাঁর চশমা ও তামাকের পাইপটা সিঁড়িতে পড়ে ছিল। পরনে চেক লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি। চশমার একটি গ্লাস ভাঙা। রক্তে পাঞ্জাবির রং ছিল গাঢ় লাল। একটি বুলেট তাঁর ডান হাতের তর্জনীতে লাগে এবং আঙুলটি প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

শেখ কামাল: কামালের বুক ও তলপেটে তিন থেকে চারটি বুলেট বিদ্ধ হয়। তাঁর পরনে ছিল ট্রাউজার। নিচতলায় তাঁকে খুন করা হয়।

টেলিফোন অপারেটর: তাঁকে নিচতলায় খুন করা হয়।

শেখ নাসের: শেখ নাসেরকে খুন করা হয় বাথরুমের কাছে। তাঁর হাত উড়ে গিয়েছিল। গুলিতে তাঁর দেহের বেশ কিছু স্থান ছিল ক্ষতবিক্ষত। তাঁর গায়ে কোনো পোশাক ছিল না এবং লাশ বিছানার চাদরে মোড়ানো ছিল।

বেগম মুজিব: বেগম মুজিবকে বুকে ও মুখমণ্ডলে গুলি করা হয়। তাঁর পরনে ছিল সুতির শাড়ি এবং কালো রঙের ব্লাউজ। গলায় মাদুলি বাঁধা একটি সোনার নেকলেস। কনিষ্ঠা আঙুলে ছোট্ট একটি আংটি। তখনো তাঁর পায়ে ছিল একটি বাথরুম স্লিপার!

সুলতানা কামাল: সুলতানা কামালের বুকে ও তলপেটে গুলি লাগে। পরনে ছিল শাড়ি ও ব্লাউজ।

শেখ জামাল: শেখ জামালের মাথা চিবুকের নিচ থেকে উড়ে গিয়েছিল। পরনে ট্রাউজার। ডান হাতের মধ্যমায় ছিল একটি মুক্তার আংটি। সম্ভবত এটি ছিল তাঁর বিয়ের আংটি!

রোজী জামাল: তাঁর মুখটি দেখাচ্ছিল বিবর্ণ, মলিন। মাথার একাংশ উড়ে গিয়েছিল। তাঁর তলপেট, বুক ও মাথায় গুলি করা হয়। পরনে ছিল শাড়ি ও ব্লাউজ।

শিশু রাসেল: সম্ভবত আগুনে তার পা ঝলসে যায়। মাথা উড়ে গিয়েছিল। পরনে ছিল হাফপ্যান্ট। লাশ একটি লুঙ্গিতে মোড়ানো ছিল।

৩. মেঝেতে ছড়ানো-ছিটানো ছিল সম্প্রতি অনুষ্ঠিত জামাল ও কামালের বিয়ের অনেক উপহারসামগ্রী ও গিফট প্যাকেট। কিছু বাক্স ছিল ফাঁকা। কামালের কক্ষে রুপার তৈরি অনেক জিনিসপত্র দেখা যায়। সিঁড়িটি ছিল আল্পনা আঁকা। অভ্যর্থনাকক্ষটি ছিল নোংরা। আমি ওপরতলা থেকে শুনলাম নিচতলায় হুদা চিৎকার করছেন। তিনি এ বাড়ি থেকে কিছু জিনিসপত্র চুরি করায় কয়েকজন সেপাইকে গালাগাল দিচ্ছিলেন।

৪. সড়ক নম্বর ১৩/১, ধানমন্ডি, শেখ মনির বাড়ি: মনি ও তাঁর সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে তাঁদের এই বাড়িতে খুন করা হয়। তাঁদের বাড়ির দিকে ‘সেনাবাহিনীর গাড়ি’ আসতে দেখে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব ছেড়ে সরে যান। বাড়িটি ছিল আংশিক তছনছ করা। মেঝেতে স্পষ্ট রক্তের দাগ। মাঝের টেবিলে একটি অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে কিছু ভেজানো চিড়া।

৫.৩৭ মিন্টো রোড, আবদুর রব সেরনিয়াবাতের বাড়ি: মন্ত্রীর বাড়িটি ছিল ফাঁকা। ড্রয়িংরুমজুড়ে দেখা গেল জমাট বাঁধা রক্ত। বাড়ির নিরাপত্তা পুলিশ আগেই পালিয়ে গিয়েছিল!

৬. সেরনিয়াবাত ও শেখ মনি এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে সংগ্রহ করা হয়। লাশগুলো ছিল বিকৃত। তাপ ও আর্দ্রতা লাশের ক্ষতি করে। লাশ থেকে দুর্গন্ধ বেরোচ্ছিল। বনানী গোরস্থানে দাফনের জন্য আমরা লাশগুলো সেনানিবাসে নিয়ে এলাম। শেখ মুজিবের লাশ ছাড়া ৩২ নম্বর সড়কের অন্য সবার লাশও আরেকটি ট্রাকে করে সেখানে আনা হয়।

দাফন-কাফন সম্পর্কে প্রতিবেদন

১. মৃতদেহ সংগ্রহ: ১৫ আগস্টের ঘটনায় নিহতদের লাশ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গ থেকে সংগ্রহ করা হয়। দুটি ট্রাকে করে ১৮টি লাশ দাফনের জন্য আনা হয়। বনানী গোরস্থানে দাফনের জন্য গুলশান মিউনিসিপ্যালিটি থেকে অনুমতি নেওয়া হয়। এএসসি (আর্মি সার্ভিসেস কোর) সেপাইদের একটি প্লাটুন গোরখোদকের কাজ করে। স্টেশন কমান্ডার আগেই আমাকে বলেছিলেন, ১৬ আগস্টের দিনের প্রথম আলো ফোটার আগেই যাতে দাফনের সব কাজ শেষ হয়ে যায়!

২. দাফন: আগস্ট মাসের তাপ ও আর্দ্রতায় কিছু লাশ বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে কোনো ফ্যান ছিল না। ৩২ নম্বরের লাশগুলোতে বরফ দেওয়া ছিল। ফলে সেগুলোর অবস্থা ছিল অপেক্ষাকৃত ভালো। সেপাইদের কয়েকজন ছিলেন, যাঁরা খুবই গলা চড়িয়ে কথা বলছিলেন। শেখ মুজিববিরোধী মনোভাব প্রকাশ করছিলেন তাঁরা। ফলে আমাকে গোটা পরিস্থিতিকেই সতর্কতার সঙ্গে সামাল দিতে হয়। অবশ্য কোনো লাশেরই যাতে অমর্যাদা না হয়, আমি সেটি নিশ্চিত করেছিলাম। সেপাইদের কয়েকজন কবর খুঁড়তে অনীহা প্রকাশ করেন, লাশের খারাপ অবস্থার কারণে কয়েকজন এমনকি ছুঁতে পর্যন্ত রাজি ছিলেন না। আমি নিজে প্রথম মৃতদেহটি (বেগম মুজিবের) ওঠাই এবং চিরশয্যায় শায়িত করি। শেখ নাসেরের দেহাবশেষ একইভাবে দাফন করি। এরপর আর আমার সমস্যা হয়নি। ৪ নম্বর ছাড়া বাকি প্রায় সব কটি কবর ঠিকভাবে খোঁড়া হয়। কারণ, আমরা সূর্যোদয়ের আগেই সব সেরে ফেলার জন্য তাড়াহুড়া করছিলাম। গোরস্থানমুখী সড়কগুলোতে আমরা আগেই সেপাই মোতায়েন এবং গোরস্থান এলাকায় ‘কারফিউ’ জারি করি। ভোরে ঘুম ভাঙা কিছু লোক ও পথচারী কী ঘটছে, বোঝার চেষ্টা করলে তাদের নিরুৎসাহিত করা হয়।

৩. ৭ নম্বর সারির চারপাশে বেড়া দেওয়া হয় এবং অস্থায়ী চৌকি বসিয়ে ২৪ ঘণ্টা পাহারার ব্যবস্থা করা হয়। অনির্দিষ্টকালের জন্য গোরস্থানটিতে দাফনের কাজ বন্ধ ও দর্শনার্থীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

৪. মৃতদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র: কয়েকটি লাশের সঙ্গে কিছু গয়না পাওয়া যায়। একটি তালিকা তৈরি করে গয়নাগুলো স্টেশন কমান্ডারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

৫. শেখ মুজিবের দাফন: ১৬ আগস্ট ১৯৭৫ বেলা ১১টায় শেখ মুজিবের লাশ সেনাবাহিনীর একটি ট্রাকে করে ক্যান্টনমেন্টে আনা হয়। কাফন কেনা হয় সিএসডি (ক্যানটিন স্টোরস ডিপার্টমেন্ট) থেকে। এটি কেনা হয়েছিল বাকিতে! অর্ডিন্যান্সের জিডিও (গ্যারিসন ডিউটি অফিসার) মেজর মহিউদ্দিন আহমেদকে লাশের সঙ্গে টুঙ্গিপাড়া যাওয়ার খুঁটিনাটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়। একটি বিএএফ (বাংলাদেশ এয়ারফোর্স) হেলিকপ্টারযোগে লাশ দাফনের জন্য টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মৃতদেহের গোসল ও জানাজা দেওয়া হয়। জানাজায় শেখ মুজিবের চাচাসহ ডজনখানেক লোক শরিক হন! একটি অস্থায়ী চৌকি বসিয়ে কবরটি পাহারার জন্য রক্ষী মোতায়েন করা হয়। জিডিও টুঙ্গিপাড়া থেকে ফিরে সদর দপ্তরের মিলিটারি অপারেশনসের ডিরেক্টরের কাছে তাঁর রিপোর্ট পেশ করেন।

৬. নিহত ব্যক্তিদের বাড়িগুলো সিল করা হয়: শেখ মুজিব, শেখ মনি ও সেরনিয়াবাতের বাড়ি তালাবদ্ধ করে সিলগালা করা হয় এবং চাবি স্টেশন সদর দপ্তরে রাখা হয়।

৭. অনেক বাধাবিপত্তি ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ যত্ন ও মর্যাদার সঙ্গে অর্পিত দায়িত্ব পালন করি।

বনানী গোরস্থান: সারি নম্বর ৭–এ যাঁদের কবর দেওয়া হয়

১. বেগম মুজিব, ২. শেখ নাসের, ৩. শেখ কামাল, ৪. সুলতানা কামাল, ৫. শেখ জামাল, ৬. রোজী জামাল, ৭. শিশু রাসেল, ৮. অজ্ঞাতপরিচয় ১০ বছর বয়সী একটি বালক, ৯. ফাঁকা, ১০. অজ্ঞাতপরিচয় ১২ বছর বয়সী একটি বালক, ১১. গৃহপরিচারিকা, বয়স ৪৫, ১২. অজ্ঞাতপরিচয় ১০ বছর বয়সী একটি ফুটফুটে বালিকা, ১৩. শেখ মনি, ১৪. মিসেস মনি, ১৫. অজ্ঞাতপরিচয় ২৫ বছর বয়সী এক যুবক, ১৬. অজ্ঞাতপরিচয় ১২ বছর বয়সী একটি বালক, ১৭. আবদুর রব সেরনিয়াবাত, ১৮. অজ্ঞাতপরিচয় ২৫ বছর বয়সী এক যুবক।

নোট: ৯ নম্বর কবরের নাঈম খানের লাশ লে. আবদুস সবুর খানের (এনওকে) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল।

>>>মেজর আলাউদ্দিন আহমেদ। আর্টিলারি, স্টেশন স্টাফ অফিসার, স্টেশন হেডকোয়ার্টার্স, ঢাকা সেনানিবাস, ঢাকা।
১৮ আগস্ট ১৯৭৫

গাজা দখল করে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়তে চান নেতানিয়াহু by নিমের সুলতানি

নিজের জনগণকে ৬৭০ দিনের বেশি সময় ধরে ধ্বংস হতে দেখার বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এত কষ্ট, এত অপরাধের সাক্ষী হওয়ার পরও গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে আরেক দফা ইসরায়েলি হামলার কথা ভাবা পর্যন্ত কল্পনার বাইরে। অথচ বিশ্বের চোখের সামনেই এটি হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্ব কি শুধু দাঁড়িয়ে দেখে যাবে?

ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভা গাজায় এই নতুন হামলার ঘোষণা দিয়েছে। গাজা উপত্যকাকে ‘সম্পূর্ণ দখল’ করার জন্যই তারা সেখানকার জনবসতিগুলোয় হামলা চালানোর পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এ হামলা শুরু হবে গাজা সিটি থেকেই। এর ফলাফল অনুমান করা কঠিন নয়।

২০২৪ সালের মে মাসে আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) নির্দেশ অমান্য করে ইসরায়েল রাফা এলাকায় হামলা চালায়। আজ রাফার কোনো অস্তিত্ব নেই। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে তারা উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া, বেইত হনুন ও জাবালিয়া শহরে হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করে দেয়।

সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোশে ইয়ালন এ অভিযানকে বলেছেন ‘জাতিগত নিধন’। এরপর ইসরায়েল একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতি ভেঙে ফেলে, ২০ লাখ বেঁচে থাকা মানুষকে অনাহারে রাখে এবং দক্ষিণের খান ইউনিস শহর ধ্বংস করে দেয়। এসব কাজ ২০২৪ সালের জানুয়ারি, মার্চ ও মে মাসে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের দেওয়া তিনটি গণহত্যাবিরোধী রায়ের সরাসরি লঙ্ঘন।

জানুয়ারিতে আদালত গাজায় গণহত্যার ঝুঁকি আছে বলে জানান এবং তা ঠেকাতে কিছু ব্যবস্থা নিতে বলেন। এর মধ্যে ছিল গাজায় মানবিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু দেখা গেল, ইসরায়েল এই নির্দেশ মানছে না। গাজা সিটিতে হামলা হলে তা এই গণহত্যা অভিযানের শেষ ধাপ হবে।

৭ অক্টোবরের পরপরই ইসরায়েলের নেতা, রাজনীতিক, সামরিক কমান্ডার ও সেনারা প্রকাশ্যে বলেছিলেন, তাঁরা গাজাকে ধ্বংস করে দেবেন, পুড়িয়ে দেবেন এবং সমতল করে দেবেন। তাঁরা ঠিক সেটাই করেছেন। তাঁরা গাজার ৯০ শতাংশ এলাকা কার্যত ধ্বংস করে এটিকে জনমানবহীন মরুভূমিতে পরিণত করেছেন। বাকি জনসংখ্যাকে ঠাসা অবস্থায় মাত্র ১২ শতাংশ এলাকায় গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। সেখানে মানুষের বেঁচে থাকার মতো কোনো পরিবেশ নেই। অবরোধ আর বোমাবর্ষণের মাধ্যমে ইসরায়েল গাজায় কোনো নিরাপদ জায়গা রাখেনি। বাইরে যাওয়ারও কোনো পথ রাখেনি।

এখন গাজা সিটি, দেইর আল-বালাহ বা আল-মাওয়াসির বাকি জনবসতিতে হামলার মানে হবে নতুন গণহত্যা, আরও ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি এবং অবশিষ্ট অনাহারগ্রস্ত মানুষকে সরাসরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। এর মানে ইসরায়েল আসলে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ গড়ার মেসিয়ানি কল্পনা ও অপরাধমূলক প্রকল্প চালিয়ে যাচ্ছে—ইসরায়েলের লক্ষ্য ‘সর্বোচ্চ পরিমাণ জমি, সর্বনিম্নসংখ্যক আরব’।

পশ্চিম তীরে চলমান জোরপূর্বক উচ্ছেদ কার্যক্রমে এবং গাজাকে পুনর্বাসনের (অর্থাৎ ইহুদি বসতি স্থাপনের) দাবিতেই ইসরায়েলের এই লক্ষ্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজাকে হামাসের হাত থেকে মুক্ত করতে চান না। তিনি চান গাজাকে ফিলিস্তিনি জনগণশূন্য করে দিতে।

২০২৪ সালের জানুয়ারির শুরুতেই জাতিসংঘ বলেছিল, গাজা এখন আর মানুষের বসবাসের উপযোগী নয়। একই বছরের নভেম্বরের শুরুতে ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গালান্ট (যিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে অভিযুক্ত) বলেছিলেন, গাজায় সেনাবাহিনীর করার মতো আর কিছুই বাকি নেই। যদি সত্যিই তা–ই হয়, তাহলে সেই সময় থেকে ইসরায়েলি সেনারা গাজায় আসলে কী করছেন?

নেতানিয়াহু যখন বলছেন ‘গাজা থেকে কোনো হুমকি থাকবে না’, তখন তার আসল মানে কী, সেটা বুঝতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিসভা এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে গাজায় ফাতাহ-নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কোনো অংশগ্রহণ না থাকে। এটা হামাস নির্মূল বা কোনো সামরিক লক্ষ্য নিয়ে করা হচ্ছে না। আসল কথা হচ্ছে, এটি একটি গণহত্যার মতো অভিযান, যার লক্ষ্য ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা চরমভাবে নাকচ করা এবং গোটা অঞ্চলে ইহুদি আধিপত্য কায়েম করা।

যুক্তরাজ্যের মতো পশ্চিমা দেশগুলো গত দুই বছরে ইসরায়েলের গণ–অত্যাচারের সহযোগিতার দায় থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারবে না। ইসরায়েলকে জবাবদিহি থেকে মুক্তি দিয়ে এবং এই দুষ্ট রাষ্ট্রকে অস্ত্র সরবরাহ করে পশ্চিমারা এই অপরাধগুলোকে সম্ভব করেছে। সম্প্রতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার যে ঘোষণাগুলো এসেছে, তা কেবল প্রচারমূলক চাল ও মনোযোগ সরানোর কৌশল।

এ অবস্থায় ইসরায়েলকে থামাতে সব রাষ্ট্রকে অতি জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে, ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থগিত করে এবং ইসরায়েলি অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতকে সহযোগিতা করে ইসরায়েলকে থামানো যেতে পারে। যদি এসব পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে গাজা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে।

এখন বিশ্বের সামনে প্রশ্ন, তারা কি কোনো পদক্ষেপ নেবে, নাকি চলমান গণহত্যা নীরবে দাঁড়িয়ে দেখে যাবে?

নিমের সুলতানি, লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক ল’র রিডার (শিক্ষক)
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

গাজা ধ্বংস করে এবার দখলের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরায়েল
গাজা ধ্বংস করে এবার দখলের পরিকল্পনা নিয়েছে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্স

মিয়ানমারের বন্দিশিবিরে বৈদ্যুতিক শক, যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো নির্যাতনের প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ

মিয়ানমারের বিভিন্ন বন্দিশিবিরে গত এক বছরে নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার যথেষ্ট প্রমাণ পেয়েছে জাতিসংঘ–সমর্থিত একটি স্বাধীন তদন্ত দল। নির্যাতনের ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক শক, শ্বাসরোধ, দলবদ্ধ ধর্ষণ ও যৌনাঙ্গ পুড়িয়ে দেওয়ার মতো বর্বরতা।

আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক এই স্বাধীন তদন্ত দলের প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানান দলের প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান। প্রতিবেদন গত ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ের তথ্য আছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিয়ানমারের নির্বাচিত অং সান সু চির সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই দেশটিতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের ওপর নৃশংস দমন-পীড়নের পর অনেকে সেনাশাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। দেশটির একটি বড় অংশজুড়ে এখনো সংঘর্ষ চলছে।

জাতিসংঘের এই তদন্ত দলের প্রতিবেদনে বলা হয়, আটক কেন্দ্রগুলোর অভিযান পরিচালনায় জড়িত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে তদন্তে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। পাশাপাশি আটক যোদ্ধা ও তাঁদের সহযোগিতাকারী বেসামরিক মানুষকে যাঁরা বিচারের মুখোমুখি না করে হত্যা করেছে, সেই অপরাধীদেরও শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও তদন্তকাজ এগিয়েছে। এই অপরাধীদের মধ্যে রয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য, সংশ্লিষ্ট মিলিশিয়া এবং বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা।

প্রতিবেদনটিতে মিয়ানমারের বন্দিশিবিরগুলোতে হওয়া নির্যাতনের বিস্তারিত উল্লেখ আছে। এর মধ্যে রয়েছে মারধর, বৈদ্যুতিক শক দেওয়া, শ্বাসরোধ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, যৌন অঙ্গ পুড়িয়ে দেওয়াসহ নানা ধরনেরে যৌন সহিংসতা।

নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, মিয়ানমারে নারকীয় নির্যাতনের ক্রমবর্ধমান ঘটনা ও নির্মমতাকে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন একটি দিনের জন্য কাজ করছি, যখন অপরাধীদের তাঁদের কৃতকর্মের জন্য আদালতে মুখোমুখি হতে হবে।’

নিকোলাস আরও বলেন, তাঁরা তদন্ত করতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পেয়েছেন। এর মধ্য দিয়েই মিয়ানমারের আটক কেন্দ্রগুলোতে যে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা বেরিয়ে আসে।

তদন্তকারী দলটি রাখাইন রাজ্যের সম্প্রদায়গুলোর বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতা নিয়ে নতুন তদন্ত শুরু করেছে। সেখানকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও বিরোধী আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াই চলছে।

২০১৭ সালে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা নিজ দেশে নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। গত বছর রাখাইনে সংঘর্ষের তীব্র আকার ধারণ করলে আরও প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের অধীন ২০১৮ সালে গঠিত মিয়ানমার–সম্পর্কিত দ্য ইনডিপেনডেন্ট ইনভেস্টিগেটিভ মেকানিজম দেশটিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। তদন্তকারী এ সংস্থা রোহিঙ্গা–সংক্রান্ত মামলায় পাওয়া তথ্যপ্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতের কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ করেছে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-12%2Fjxs5b42v%2F00067974DM-1754988870.webp?rect=1%2C0%2C770%2C513&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ইয়াঙ্গুনের রাস্তায় এক পুলিশ সদস্য। ১৯ জুলাই ছবি: এএফপি

ইসরায়েল পুড়ছে রেকর্ড তাপমাত্রায়

অত্যধিক তাপপ্রবাহের ফলে ইসরায়েলের কিছু অংশে তাপমাত্রা রেকর্ড প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

বুধবার (১৩ আগস্ট) এ তথ্য জানিয়েছে দেশটির আবহাওয়া পরিসেবা। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরায়েলের পূর্বাঞ্চলে সবচেয়ে উষ্ণতম পরিস্থিতিতে আরও তীব্র গরম পড়বে।

সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়।

খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার রাতে অস্বাভাবিক গ্রীষ্মকালীন বৃষ্টিপাত হলেও জেরুজালেম ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে তাপমাত্রা। বর্তমানে মৃত সাগরে সর্বোচ্চ রেকর্ডকৃত সর্বনিম্ন দৈনিক তাপমাত্রা ৩৬.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস অনুভূত হচ্ছে।

আবহাওয়া পরিসেবা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, জেরুজালেমে দুপুর নাগাদ তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছেছে। অন্যদিকে উপকূলীয় তেলআবিবে, বিকেল নাগাদ তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস (৮৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট) থাকবে।

তবে, মধ্য ইসরায়েলের কাছাকাছি শহর, যেগুলো সমুদ্র থেকে অনেক দূরে অবস্থিত, যেমন রামাত গান এবং গিভাতাইমে ৩০-৩৫ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দেশটির অভ্যন্তরীণ অংশ এবং পশ্চিম তীরের তাপমাত্রা দিনের সবচেয়ে উষ্ণতম সময়ে বিশেষ করে গ্যালিলি সাগরের আশপাশে ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

উত্তর জর্ডান উপত্যকার বেইত শে’আনে তাপমাত্রা পৌঁছানোর কথা ছিল ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট), গ্যালিলি সাগরের তীরে টাইবেরিয়াস এবং গোলান হাইটসে কাটজরিন, উভয়ই স্থানেই এ তাপমাত্রা পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে (১১১ ডিগ্রি ফারেনহাইট)।

মাউন্ট আরবেলে তাপমাত্রা ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১১৮ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ছাড়িয়ে যাবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। অন্যদিকে পশ্চিম তীরের জর্ডান উপত্যকার কাসর আল-ইহুদ তীর্থস্থান এলাকায় ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস উঠে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

অন্য অঞ্চলগুলোতে প্রায় একই রকম গরম থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে, বিশেষ করে হুলা উপত্যকা থেকে দক্ষিণে আরাভা মরুভূমি পর্যন্ত।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, জেরুজালেমের কাছে বেইত শেমেশ এবং দক্ষিণে ডিমোনায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া জনপ্রিয় রিসোর্ট শহর ইলাতে দুপুরের মাঝামাঝি ৪৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১২০ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকদের বাইরে এবং রোদে বেশি সময় না থাকার ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছে ইসরায়েলের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এছাড়া তাপপ্রবাহ, পানিশূন্যতা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যা এড়াতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতেও আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে, প্রকৃতি ও উদ্যান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার রাত পর্যন্ত খোলা জায়গায় হাইকিং ট্রেইলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ছবি : সংগৃহীত