Showing posts with label সালমান রাফি শেখ. Show all posts
Showing posts with label সালমান রাফি শেখ. Show all posts

Sunday, September 22, 2019

ভারতের ইউরেশিয়ায় প্রত্যাবর্তন by সালমান রাফি শেখ

দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জিএসপি সুবিধা বাতিল করায় নয়াদিল্লীর অনেকে এখন মাথা চুলকাচ্ছেন। ঘটনার একটা বড় বাঁক বদল হয়েছে এখানে। ট্রাম্প প্রশাসনের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভারতকে তাদের ‘গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার’ ঘোষণা দিয়েছিলেন। ‘চীনকে দমনের’ মার্কিন কৌশলের অংশ হিসেবে ওই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। ট্রাম্প প্রশাসনের আমলের চতুর্থ বছরে এখন আছি আমরা এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার এখন ইউরেশিয়ার ভূ-অর্থনীতির মধ্যে হাতরানোতে ব্যস্ত এবং চীন ও রাশিয়ার সাথে একটা অর্থনৈতিক ও সামরিক অংশীদারিত্বের পথ খুঁজতে তারা উদগ্রিব।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এসসিও সম্মেলন বিভিন্নভাবে ভারতের ভবিষ্যত পররাষ্ট্রনীতির গতি প্রকৃতির জন্য অনেক দিক থেকেই একটা অর্থপূর্ণ দিক ঠিক করে দিয়েছে। সম্মেলনের পরে যে যৌথ ঘোষণা দেয়া হয়, সেখানে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা হয়েছে – যেটাতে ভারত আগে বিরোধিতা করে এসেছে এবং এটাকে ‘ঋণের ফাঁদ’ হিসেবে বর্ণনা করে এসেছে।
যেখানে বিআরআইয়ের প্রশংসা করা হয়েছে, সেখানে যদিও বিশেষভাবে ভারতকে উল্লেখ করা হয়নি, তবে এই প্রশংসা এসেছে একটা যৌথ বিবৃতিতে এবং সেখানে ভারতের কোন আপত্তি বা সমালোচনার কথা উল্লেখ নেই। এটা নয়াদিল্লীর সম্ভাব্য অবস্থান পরিবর্তনের ব্যাপারে অনেক কিছু জানান দিয়েছে, কারণ সমালোচনার জায়গা থেকে তারা বিরোধিতা না করার অবস্থানে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদির বক্তৃতাতেও এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, কারণ তার বক্তৃতাতে বিআরআইয়ের কোন উল্লেখই ছিল না, যদিও তিনি ‘আঞ্চলিক সংযোগের’ পক্ষে কথা বলার পাশাপাশি “সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান, আঞ্চলিক অখণ্ডতা, সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং আস্থার” উপর জোর দিয়েছেন – যে সব শর্তের অধীনে ভারত আঞ্চলিক ভূ-অর্থনৈতিক প্রচেষ্টার সাথে যুক্ত হতে পারে।
কিন্তু এই ধরনের প্রচেষ্টার অধিকাংশই এখন পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে হচ্ছে। চীনের শি ভারতের মোদির সাথে বৈঠকেও দ্বিপাক্ষিক নীতির উপর জোর দিয়েছেন। শি বলেছেন যে দুই দেশের মধ্যে (দ্বিপাক্ষিক) সহযোগিতা শুধু তাদের উন্নয়নকেই ত্বরান্বিত করবে না, বরং এশিয়া তথা সারা বিশ্বের শান্তি, স্থিতিশীলতা অর্জনে ভূমিকা রাখবে। উহানে গত বছর অনুষ্ঠিত শি-মোদি বৈঠকের দিকে ইঙ্গিত করে শি বলেন যে, ‘উহান স্পিরিট’ চীন-ভারত সম্পর্ককে নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন যে, দুই দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ উন্নয়ন অংশীদারিত্ব গঠনের জন্য ভারতের সাথে যোগ দিতে প্রস্তুত রয়েছে চীন।
শি জোর দিয়ে বলেন, দুই পক্ষের একটা মৌলিক বিশ্বাসের ব্যাপারে অনড় থাকা উচিত যে, চীন ও ভারত উন্নয়নের একটা সুযোগ এবং তারা একে অন্যের জন্য কোন হুমকি নয়। তিনি আরও বলেন, “তাদেরকে পারস্পরিক আস্থা জোরদার করা, সহযোগিতার দিকে মনোযোগ দেয়া এবং মতপার্থক্যের বিষয়গুলো মেনে নেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে, যাতে চীন-ভারত সম্পর্ক আরও ইতিবাচক হিসেবে প্রমাণিত হয় এবং দুই দেশের উন্নয়নের ইতিবাচক শক্তি হিসেবে কাজ করে”।
ভারত ও চীন এখন তাদের সম্পর্কের উন্নয়নের জন্য যে পথে এগুচ্ছে, সেখানে দ্বি-পাক্ষিকতাই মূল বিষয়। চীনের বিআরআইকে চীনের কাছে ছেড়ে দিচ্ছে ভারত এবং নীতিগত বা অন্যভাবে এর বিরোধিতা করছে না। চীন অন্যদিকে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বাড়াতে প্রস্তুত এবং সীমান্ত বিরোধসহ সকল ইস্যুতে আলোচনার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এই সম্পর্কের প্রভাবটা অসামান্য, যেটার প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক উভয় ক্ষেত্রেই যার প্রভাব পড়বে।
সম্পর্কের নতুন গতিপথের দিকে ইঙ্গিত করে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বলেছেন, “তাই আমরা এটাকে (মোদি-শি’র বিশকেক বৈঠক) ভারতে সরকার গঠনের পর একটা প্রক্রিয়ার সূচনা হিসেবে দেখছি এবং একবিংশ শতক এবং এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের বিস্তীর্ণ পরিসরে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা এখন ভারত-চীন সম্পর্কটিকে বিবেচনা করছি”।
রাশিয়ার পুতিনের সাথেও বৈঠক করেছেন ভারতের মোদি এবং ভারতের সম্পর্ককে নতুন দিকে চালিত করেছেন। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ভ্লাদিভস্তকে অনুষ্ঠিতব্য ইস্টার্ন ইকোনমিক ফোরামে প্রধান অতিথি হওয়ার ব্যাপারে পুতিনের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন মোদি। দুই নেতাই আসন্ন জি২০ সম্মেলনে বৈঠক করবেন, এবং পুতিনও এ বছর ভারত সফর করতে পারেন। এগুলো কূটনৈতিক তৎপরতা হিসেবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এটা শুধু এসসিও’র নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক মাত্রাকেই সংহত করবে না, বরং এর সদস্য দেশগুলোকেও এগিয়ে নেবে।
রাশিয়া ও চীনের সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান ‘ব্রোমাঞ্চের’ মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে যে কিভাবে তারা বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থানে ভারসাম্য আনতে চাচ্ছে, যে বিশ্বটা ক্রমেই একটা বহুমেরুর বিশ্বের দিকে চলেছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য যুদ্ধ এবং ৫-জি ইন্টারনেট সিস্টেম প্রথম তৈরির মাধ্যমে চীন বিশ্বে ঝড় তুলে দেয়ার পর, বহু দেশের মধ্যে (ভারতও সম্ভবত তাদের মধ্যে রয়েছে) এই বোধোদয় আরও বেড়েছে যে, চীন অবশ্যম্ভাবীভাবে বৈশ্বিক নেতৃত্বের অবস্থানে চলে যাচ্ছে এবং পারস্পরিক উপকারের বাণিজ্যিক ভূগোলোর জন্য তাদের সাথে যোগাযোগ রাখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সন্দেহ নেই যে, রাশিয়া ও চীনের সাথে ভারতের সম্পর্ক বৃদ্ধির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পড়ে যাবে, কিন্তু এই সম্পর্ক মেরামত করার দায়িত্বটা এখন যুক্তরাষ্ট্রের, ‘বাণিজ্য যুদ্ধের’ মাধ্যমে যেটা চাপিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এটা ঠিক যে পেন্টাগন সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্রশান্ত কৌশল নিয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হলো ভারত এবং ইরানের ব্যাপারে অন্তত যুক্তরাষ্ট্রের পদাঙ্ক অনুসরণও করেছে তারা। তবে, এটাও নিশ্চিত যে, রাশিয়া ও চীনের সাথে আরও শক্তিশালী মিত্রতা তৈরির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান বহুমেরুর বিশ্বে বড় শক্তিগুলোর সাথে জোটের ক্ষেত্রে নিজেদের পরিধিটা আরও বাড়াচ্ছে ভারত।
ইউরেশিয়ার মধ্যে প্রবেশের মাধ্যমে ভারত শুধু এই অঞ্চলের এবং এখানকার সংযোগ কর্মসূচি থেকে বিশাল অর্থনৈতিক সুবিধাই পাবে না, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিজেকে একটা শক্তির জায়গাতেও নিয়ে যেতে পারবে।
এই যে প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো: ইউরেশিয়ায় আরও গভীরভাবে জড়িত হওয়া থেকে ভারতকে সরিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র কি করবে, যদি আদৌ কিছু তারা করে? এখন অন্তত, ভারত একটা ঘোষণায় সাক্ষরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেটার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পরিস্কার ও বহুমুখী বার্তা দেয়া হয়েছে, যেখানে “নিয়ম-ভিত্তিক, স্বচ্ছ, বৈষম্যহীন, উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বহুপাক্ষিক বাণিজ্য সিস্টেমের” আহ্বান জানানো হয়েছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বহুপাক্ষিকতা ও সংরক্ষণবাদের নীতির ভিত্তিতে যেটা গড়ে তোলা হবে।

Monday, September 9, 2019

কাশ্মীর: মোদির ‘চূড়ান্ত সমাধান’ এবং হিন্দুত্ব আধিপত্যের যুগ by সালমান রাফি শেখ

দক্ষিণ এশিয়ায় আত্মপরিচয়ের সংগ্রামের যে প্রাধান্য চলে আসছে, সেটা নিয়ে কখনও কোন সন্দেহ ছিল না। এই নানান সংগ্রামের মধ্যে কাশ্মীরীদের স্বাধিকারের আন্দোলনটি অনন্য হয়ে আছে। গত ৭২ বছরের ইতিহাসে ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে (আইএইচকে) অনেক উত্থান পতন দেখা গেছে কিন্তু বর্তমান ভারত সরকার কাশ্মীরীদের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়ার যে পদক্ষেপ নিল কাশ্মীর ইস্যুর ‘চূড়ান্ত সমাধানের’ জন্য, সেটাই মোদি সরকারের পন্থা। এর মাধ্যমে আগুনে অপ্রত্যাশিক মাত্রায় ঘি ঢালা হলো। মোদি সরকারের এই রাজনৈতিক যুদ্ধ স্বাধীনতা আন্দোলনকে দমন না করে বরং এটাকে আরও উসকে দেবে।

এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ১৯৭২ সালের শিমলা চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে, যেখানে কাশ্মীরের পরিস্থিতিকে একতরফাভাবে বদলের ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও ভারতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের (ইউএনএসসি) প্রস্তাবনা লঙ্ঘন করা হয়েছে যেখানে কাশ্মীরের জনগণের গণভোটের কথা বলা হয়েছে। জেনেভা কনভেনশনও এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে, যেখানে নিজেদের জনগণকে কোন দখলকৃত অঞ্চলে স্থানান্তরের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। সব মিলিয়ে ৩৫-এ থেকে অনেক কিছু বোঝা সম্ভব যে মোদি সরকারের মধ্যে একগুঁয়েমি কোন মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে।

এই সঙ্কটকে ঘিরে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা বাদ দিলেও কাশ্মীর সঙ্কটের কারণ মূলত বিজেপি যে হিন্দুত্ববাদী ধারণা পোষণ করে সেটা, প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের (এবং ভারত) মধ্যে যে বোঝাপড়া হয়েছে, সেটা নয়। এই সঙ্কটের মূল রয়েছে বিজেপি যে ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি লালন করে, তার গভীরে, কাশ্মীরকে ঘিরে চলমান ভূ-রাজনীতির মধ্যে নয়। কারণ কাশ্মীরের সাংবিধানিক স্ট্যাটাস যদি বদলেও যায়, এ অঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব দক্ষিণ এশিয়ায় একই থাকবে। সে কারণে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিজেপির ‘হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প’।

২০১৯ সালের নির্বাচনে যাওয়ার সময় বিজেপির ইশতেহারে এটা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে: “জন সঙ্ঘের সময় থেকে আমরা আমাদের অবস্থানকে স্পষ্ট করে আসছি যে ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হবে”।

এই স্ট্যাটাস বাতিলের কারণে যেটা হবে, সেটা হলো ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে অ-কাশ্মীরী/অ-স্থানীয় জনগণ এত বিপুল সংখ্যায় কাশ্মীরে অভিবাসী হয়ে আসবে যেটা এখানকার জনসংখ্যার চেহারা বদলে দেবে এবং এখানকার মানুষ নিজেদের মুসলিম সংখ্যাগুরু হিসেবে যে দাবি করে আসছে, সেটা আর তারা করতে পারবে না এবং নিজেদের স্বাধিকারের দাবিও তুলতে পারবে না। হিন্দু জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়ে গেলে জম্মু ও কাশ্মীর আর মুসলিমদের জন্য সুনির্দিষ্ট থাকবে না এবং সেক্ষেত্রে গণভোটের মাধ্যমে তারা আর নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের সুযোগ পাবে না।

এই পরিবর্তনের পর ভারতীয় বসতি স্থাপনকারীরা এখন কাশ্মীরে জমি ও সম্পদ কিনতে পারবে। পশ্চিম তীরে ইসরাইল ঠিক এই কাজটাই করছে। বিজেপি ও সঙ্ঘ পরিবার কাশ্মীরের মুসলিম সংখ্যাগুরু চেহারাটি চিরদিনের জন্য বদলে দিতে চায়। ৩৫এ অনুচ্ছেদ এখন হিন্দু সংখ্যাগুরুদের উপত্যকায় জোর করে প্রবেশ করাবে এবং আগামী বছরগুলোতে সেখানে আরও ব্যাপক মাত্রায় এর শাখা প্রশাখা বিস্তার করা হবে।

অন্যদিকে, কাশ্মীরকে ভারতীয় ইউনিয়নে ‘অন্তর্ভুক্ত’ করার মধ্য দিয়ে মোদি একই সাথে ভারতীয় রাজনীতিতে ঘৃণা ও বিভাজনের রাজনীতির পুনরাবৃত্তি করতে চান, যাতে সেটা তার জনপ্রিয়তাকে আরও শক্তিশালী করে এবং হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠিগুলোর মধ্যে তার সমর্থন আরও পোক্ত হয়। এর গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যদি সেটাকে এই সরকারের ব্যর্থতাগুলোর আলোকে দেখা হয়। তাছাড়া এর আগে জনগণের হৃদয় জয় করতে এবং জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার ধারণা দূর করতেও তারা ব্যর্থ হয়েছে।

যদিও সরকারীভাবে বলা হচ্ছে যে, কাশ্মীরকে ভারতীয় ইউনিয়নের সাথে যুক্ত করার মাধ্যমে সেখানে নয়াদিল্লী আরও ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারবে এবং সেখানকার উন্নয়নের জন্য আরও তহবিল দিতে পারবে, কিন্তু এটা মূলত একটা বিভ্রান্তি এবং সেটা বোঝা যায় ভারতের সবখানে বিভিন্ন স্টাইলে হিন্দুত্ববাদীদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক তৎপরতা দেখে। নতুন সাংবিধানিক স্ট্যাটাসের অধীনে জম্মু ও কাশ্মীরের পরিস্থিতিও এর চেয়ে আলাদা কিছু হবে না।

‘বিশেষ মর্যাদাহীন’ যুগে কি পরিবর্তন আসতে পারে, সেটা বোঝার জন্য আমাদের মোদি সরকারের বিগত পাঁচ বছরের দিকে নজর দিতে হবে। দেখতে হবে যে, এই সময়টাতে ভারতের মূল ভূখণ্ডের জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সাথে কি আচরণ করা হয়েছে।

কোনরকম অতিরঞ্জন ছাড়াই বলা যায় মোটের উপর নিরপরাধ মুসলিমদের উপর বহু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে মুসলিম আর দলিতরা মোদির ‘হিন্দুত্ব প্রকল্পের’ টার্গেটে পরিণত হয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে সংখ্যালঘুদের যে অবনতি হয়েছে, সেটা তাদেরকে আরও অগুরুত্বপূর্ণ করে তুলবে। কারণ. যে বিষয়গুলোর সাথে তাদের জীবন জড়িত সেখানে প্রভাব বিস্তার করার মতো কোন সামর্থ তাদের থাকবে না। এ অবস্থায় হিন্দুত্বের আধিপত্য মেনে নেয়া ছাড়া তাদের আর কোন উপায় থাকবে না।

এই আদর্শ শুধু রাজনৈতিক আধিপত্যের কথাই বলে না, বরং এর মধ্যে একটা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্তরভেদের বিষয়ও রয়েছে, সেখানে হিন্দুরা থাকবে সবার উপরে। জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের মাধ্যমে ঠিক সেই কাজটাই করা হলো। এর মাধ্যমে এই অঞ্চলকে মূলত ভারতীয় উপনিবেশে পরিণত করা হলো। ১৯৫৪ সাল থেকে এই অঞ্চলটি যে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে আসছিল, সেটা মূলত এ অঞ্চলের ব্যাপক মুসলিম সংখ্যাগুরু চারিত্রকে রক্ষা করার জন্যেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে, একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক এটার বিলুপ্তির নিশ্চিত উদ্দেশ্য হলো উপত্যকায় বিজেপি ও তাদের বর্তমান শত্রুসুভল আচরণের অধীনে হিন্দুদের আধিপত্য নিশ্চিত করা।

৩৫এ বাতিল ও প্রয়োগের বাস্তব অর্থ হলো উপত্যকার জনগণের উপর একটা দখলদারিত্বের আইন চাপিয়ে দেয়া, যারা সর্বপ্রকারে নয়াদিল্লীর আধিপত্যবাদী পদক্ষেপের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখবে, যে নয়াদিল্লী এখানে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্যের চেষ্টা করছে।

Friday, August 30, 2019

নিশ্চিত গন্তব্যে এগিয়ে যাচ্ছে আফগান দাবার বোর্ড by সালমান রাফি শেখ

যদিও কিছু মূলধারার পশ্চিমা মিডিয়া এবং কিছু নেতৃস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যকার প্রায় চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে এখনও সন্দেহ পোষণ করে যাচ্ছেন, তবে দোহা-৯ আলোচনা এখনও চলছে এবং এখান থেকে কিছু অসামান্য গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলের আশা করা হচ্ছে, যেটা শুধু মার্কিন সেনা প্রত্যাহার নয়, বরং আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন পক্ষ এরই মধ্যে যুদ্ধ শেষ করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেটা আরও স্পষ্ট হয়েছে আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেটের সাম্প্রতিক হামলার পর। হামলায় কয়েক ডজন মানুষ মারা গেলেও সেটা আলোচনার উপর কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি, যদিও পরে ‘ইসলামিক স্টেট কর্তৃক’ দেশের কর্তৃত্ব নেয়ার বিষয়ে আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে।

চুক্তিটা যে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০ আগস্ট হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনে সেটা জানিয়েছেন। ট্রাম্প যেভাবে আত্মবিশ্বাসের সাথে জানিয়েছেন যে আফগানিস্তানে সব কিছু সঠিকভাবেই চলছে, তাতে বোঝা গেছে যে তিনি আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বেশ কিছুকাল ধরেই উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট হলেও, আরও কিছু বিষয় স্পষ্ট করেছেন ট্রাম্প, তাতে একটা ধারণা পাওয়া গেছে যে ভবিষ্যতের চেহারাটা কেমন হতে পারে।

এ সবের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এই ধারণা যে, এতদিন যে ‘আফগান নেতৃত্বাধীন ও আফগান কর্তৃত্বাধীন’ সংলাপের কথা বলা হয়েছে, সে ধারণা এখন মৃত। তালেবানরা অব্যাহতভাবে আফগান সরকারের সাথে আলোচনার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যাদেরকে তারা অবৈধ মনে করে এবং যতটুকু বা বৈধতা ছিল অব্যাহতভাবে নির্বাচন স্থগিত করার কারণে সেটাও তারা হারিয়েছে।

ট্রাম্প বলেছেন, “তালেবানরা আফগান সরকারকে শ্রদ্ধা করে না। আফগান সরকারের জন্য তাদের কোন শ্রদ্ধা নেই। আমি সেটা বুঝি এবং আমি সেটা জানি। এবং তারা দীর্ঘ সময় ধরে ঠিক সেভাবে একসাথে থাকতে পারেনি”।

এমনকি তিনি যদিও তালেবান এবং আফগান সরকারের মধ্যে যোগাযোগ না থাকার কথা বলেছেন, তবে তিনি কোনভাবেই উল্লেখ করেননি যে, তারা বা অন্য কোন দেশ – পাকিস্তান ও কাতার – কোনভাবে তালেবানদের চাপ দিচ্ছে বা চাপ দেয়ার ইচ্ছে রয়েছে যাতে তারা আফগান সরকারের সাথে আলোচনায় অংশ নেয়। এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ‘যথেষ্ট’ সময় পার করেছে এবং তালেবানরা যদি আফগানিস্তানের রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে – যেটা তারা করবে – সে অবস্থাতেই তালেবানদের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তাদের সাথে বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোন সমস্যা নেই।

অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই আত্মবিশ্বাস জন্মেছে যে, তালেবানরা তাদের লড়াই অব্যাহত রাখবে না এবং তারা বরং এটা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে যাতে আফগানিস্তান প্রাক ৯/১১ পরিস্থিতিতে ফিরে না যায়। ট্রাম্প বলেছেন, “আর তালেবানরা যদি সত্যিই সঠিক হয় – যেটা তারা বলছে, তাহলে তারা সেটা ঘটতে দেবে না। কারণ তারা সহজেই সেটা করতে পারবে”।

এটা শুনতে অদ্ভুত শোনালেও এই সম্ভাবনাটা বাড়ছে যে, ইসলামিক স্টেট যাতে নিয়ন্ত্রণ নিতে না পারে, সেটা ঠেকানোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র তালেবানকে সহযোগিতাও করতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদিও সরাসরি সে রকম কোন ইঙ্গিত দেননি, তবে সেনা প্রত্যাহার পরবর্তীকালে আফগানিস্তানে শক্তিশালী গোয়েন্দা উপস্থিতি রাখার কথা তিনি বলেছেন, যারা তালেবানদের উপর নজরদারীর সাথে সাথে ইসলামিক স্টেটের শক্তিবৃদ্ধির উপরও নজর রাখবে। আর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে যে তালেবানরা এই আইএসকে প্রতিহত করতে পারবে।

একটা পর্যায়ে এবং একটা জায়গাতে সে কারণে একটা অভিন্ন শত্রু আইএসের বিরুদ্ধে তাদের লড়াই একটা যৌথ প্রচেষ্টায় রূপ নিতে পারে, যেখানে মার্কিন গোয়েন্দারা তালেবানদের সহযোগিতা করবে, যারা মূলত অধিকাংশ যুদ্ধ পরিচালনা করবে।

অন্যভাবে বললে, তালেবানদের দেয়ার মাধ্যমে এবং ঘানি প্রশাসনকে অবজ্ঞা করার মাধ্যমে একটা চুক্তি তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে, যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে সহায়তা দেয়ার এবং দেশে তাদেরকে নতুন মিত্র বানানোর আশা করছে, যদিও এই মিত্রতার মধ্যে গভীর সমন্বয়ের অভাব থেকেই যাবে।

সেনা প্রত্যাহার-পরবর্তীকালেও যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে একটা সহযোগিতার সম্পর্ক থাকার অর্থ হলো দুই পক্ষের মধ্যে এই সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকাও এখানে সক্রিয় থাকবে, যে দুই পক্ষ দুই দশক ধরে একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এর আরেকটি অর্থ হলো আফগানিস্তান নীতির ক্ষেত্রে পাকিস্তানের উপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতাও জারি থাকবে। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের প্রথম দুই বছরে শীতল সম্পর্কের পর তাদের এ উপলব্ধি হয়েছে যে, পাকিস্তানের ভূমিকা এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

যুক্তরাষ্ট্র যে হঠাৎ করে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উষ্ণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা নিজেরই একটা পরিষ্কার ইঙ্গিত যে, পরবর্তী মার্কিন নির্বাচনের আগে যুদ্ধ শেষ করার ব্যাপারে হোয়াইট হাউজ এবার অনেক সিরিয়াস।

সে কারণেই এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিদ্যমান সকল উপায় ও পন্থা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। এর মধ্যে তালেবানদের সাথে বন্ধুত্ব এবং ঘানি সরকারকে পরিবর্তিত স্বার্থের বেদিতে উৎসর্গ করাটাও রয়েছে, যেমন, দীর্ঘতম যুদ্ধ লড়ার পর এখন সেটা শেষ করার জন্য যাদের সাথে তারা চুক্তি করছে, গতকাল তারা ছিল ‘সন্ত্রাসী, আজ তারা ‘গেরিলা’ আর আগামীকাল তারা ‘মিত্র’ হতে চলেছে।

Thursday, August 8, 2019

আসন্ন আফগান চুক্তি কেন পাকিস্তানের জন্য বিজয় by সালমান রাফি শেখ

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ২০১৬ সালে যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি আফগানিস্তানের জন্য ‘আঞ্চলিক কৌশল’ প্রণয়ন করে সেটা উদযাপন করেছিলেন এবং তাদের দীর্ঘতম যুদ্ধের ইতি টানার জন্য ভারতকে এর প্রধান ভূমিকায় বসিয়েছিলেন। আগামী মাসগুলোতে যেখানে আফগান যুদ্ধের ইতি ঘটার একটা ব্যাপক সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আঞ্চলিক কৌশল’ কাজ করেছে বলে মনে হচ্ছে – অন্তত চীন ও পাকিস্তানকে সফলভাবে পুরো প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে সেটা কাজে লেগেছে, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট শুরুতে যেভাবে ভেবেছিলেন, ঠিক সেভাবে পুরো বিষয়টি কাজ করেনি।

যেমন, ভারত যদি শুরুতে প্রধান ভূমিকা রাখতো, তাহলে শান্তি-চুক্তির ফ্রেমওয়ার্ক গঠন বা এতে প্রভাব বিস্তারের মতো কোন কূটনৈতিক ভূমিকাই তাদের থাকতো না। তবে পাকিস্তান পুরো প্রক্রিয়ার ‘আঞ্চলিকীকরণের’ ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছে – একদিকে তারা তালেবানদের সাথে চীনের যোগাযোগের কূটনৈতিক চ্যানেল খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সাথে তালেবানদের যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তালেবানদের সরাসরি আলোচনার জন্য পাকিস্তান যে ‘সহায়তা’ করেছে এবং তালেবানরা সেখানে যুদ্ধ পুরোপুরি শেষ করার জন্য যে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, সেখানেও পাকিস্তান কার্যত ভারতের তথাকথিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ নীতিকে সফলভাবে পরাস্ত করেছে।

এই কূটনৈতিক বিজয় সত্যিকার অর্থেই পাকিস্তানের কূটনৈতিক জৌলুস বাড়িয়েছে, যার বহিপ্রকাশ ঘটেছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খানকে ওয়াশিংটনে সফরের আমন্ত্রণ জানানোর মধ্য দিয়ে এবং পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে আগের দশকের ‘সন্ত্রাস-বিরোধী যুদ্ধের’ ফ্রেমওয়ার্ক থেকে বের করে এনে আরও সামনে এগিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টার মাধ্যমে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খানের সাথে আলোচনায় বেশ খোলামেলা ছিলেন এবং তিনি স্বীকার করেছেন যে আফগান গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়ার ব্যাপারে পাকিস্তান তাদেরকে সহায়তা করছে।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে যদিও অন্যান্য দিকগুলোর যথাযথ উল্লেখ থাকবে, তবে অন্তত এখনকার মতো যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের ভারতের পূর্ব-পরিকল্পিত ‘কেন্দ্রীয় ভূমিকার’ জায়গা বদলে সেখানে পাকিস্তানকে বসিয়েছে। হোয়াইট হাউজ যেটাকে “সঙ্ঘাতপূর্ণ এই অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের” প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে।

আফগান যুদ্ধের সমাপ্তির মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র তাই যে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করে যেতে চাচ্ছে, সেখানে পাকিস্তানের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সমাপ্তির পর তালেবানদের যখন রাজনৈতিক উত্থান হলো, সেই পরস্থিতির সাথে বর্তমানের একটা সাদৃশ্য রয়েছে। এখানে পার্থক্য শুধু এটা যে, এখানে একটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে এবং বিশেষ করে পাকিস্তান, চীন ও রাশিয়ার মতো আঞ্চলিক পক্ষগুলো এখানে জড়িত রয়েছে, যাতে তারা চুক্তির বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

এটা পাকিস্তানের জন্য একটা বিশাল কূটনৈতিক সাফল্য কারণ নিজেদের প্রধান দাবিগুলোর ব্যাপারে কোন রকম ছাড় না দিয়েই তারা যুদ্ধের সমাপ্তি টানতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধান দাবিগুলো ছিল আফগানিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামোতে তালেবানদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং ‘সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধে’ পাকিস্তানের নিজেদের ভূমিকার স্বীকৃতি আদায়।

পাকিস্তানের এই দাবি পূরণ হতে যাওয়ার অর্থ হলো এখানে ভারতের যে দাবি ছিল যে তালেবানদের রাজনৈতিক কাঠামো থেকে বাদ দিতে হবে, সেটা পুরোপুরি গৌণ হয়ে গেছে।

ভারত সে কারণে শান্তি চুক্তির প্রক্রিয়া থেকে পুরোপুরি বাদ পড়ে গেছে, এমনকি ভারত যদিও দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক মিত্র ছিল এবং যদিও একবিংশ শতকে তাদের মধ্যে একটা দৃঢ় জোট তৈরি হতে যাচ্ছে, এর পরও প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়েছে তারা।

পুরো প্রক্রিয়া থেকে ভারতকে সম্পূর্ণ বাদ রাখার একটা কারণ সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের চলমান শুল্ক বিতর্ক, তবে এতে কোন সন্দেহ নেই যে পাকিস্তানের নিজেদের কূটনৈতিক তৎপরতার কারণেই মূলত যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তির প্রক্রিয়ায় ভারতের জন্য কোন জায়গা রাখতে পারেনি।

আফগানিস্তানে ভারতের যে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান এখানে চীনের ভূমিকাকে উৎসাহিত করার কারণে ভারতের সেই অবস্থানটি গৌণ হয়ে গেছে। তাছাড়া চীন ও তালেবানদের মধ্যে গোপন কূটনৈতিক যোগাযোগ থেকে শুরু করে গত মাসে তালেবান প্রতিনিধিদের চীন সফরের মধ্য দিয়ে চীনের ভূমিকাটি এখানে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠেছে। তালেবানরা দোহাতে মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় বসার এবং খসড়া চুক্তি চূড়ান্ত করার ঠিক আগ দিয়েই ওই চীন সফরে গিয়েছিল তালেবান প্রতিনিধি দল।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে, শান্তি আলোচনায় বেইজিং একটা প্রধান ভূমিকা রেখেছে এবং গত মাসে তালেবান নেতা মোল্লা বারাদারের বেইজিং সফর সম্ভবত দোহা আলোচনায় বাঁক বদলের পেছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। দোহা-৬ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে বরফ জমতে শুরু করেছিলে, সেটা গলানোর ক্ষেত্রে চীন নিশ্চিতভাবে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এমনকি জালমাই খালিলজাদ যেখানে আগে ভারতে গিয়ে নয়াদিল্লীকে প্রক্রিয়ার ব্যাপারে ‘অবহিত’ করেছেন, সেখানে দোহা-৭ আলোচনার পর তিনি চীনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সেখানে খসড়া চুক্তি তৈরির ব্যাপারে সমন্বয় করেন, যেটার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় চীনের ভূমিকাটা প্রকাশিত হয়েছে।

আলোচনা যেখানে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, এ অবস্থায় খুব সামান্যই সন্দেহ রয়েছে যে, ভারতের আফগান নীতি সব ক্ষেত্রেই পরাজিত হয়েছে। আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা থেকে শুরু করে, আফগানিস্তান ও এই পুরো অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদে পাকিস্তানের পৃষ্ঠপোষকতার অপপ্রচার এবং পাকিস্তান বারবার আলোচনার প্রস্তাব দেয়া সত্বেও পাকিস্তানের সাথে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনায় বসতে অস্বীকার করা – ভারতের এই সব নীতিই ব্যর্থ হয়েছে।

আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে তালেবানরা অবশ্যম্ভাবীভাবে একটা প্রধান রাজনৈতিক পক্ষ হতে যাচ্ছে – এই বাস্তবতার অর্থ হলো তালেবানদের প্রকৃত ও দেশীয় রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ভারত যে অস্বীকার করে আসছে, তাদের সে নীতিও এখানে পরাস্ত হলো। সে কারণে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে ভবিষ্যতে ভারতের কোন ভূমিকা দেখছে না এবং একমাত্র চীনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যাপারেই ভারতের গুরুত্ব রয়েছে তাদের কাছে। তবে ইউরেশিয়ান ভূ-অর্থনৈতিক স্বার্থের ব্যাপারে ভারতের ক্রমবর্ধমান আগ্রহের কারণে সেই ভূমিকা রাখার ব্যাপারে ভারত এখন আর অতটা আগ্রহী নয়, কারণ সেখানে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকাটা গুরুত্বপূর্ণ।
মস্কোতে গত ৩০ মে সিনিয়র আফগান রাজনীতিকদের সঙ্গে আলোচনার পর  প্রধান আলোচক মোল্লা আব্দুল ঘানি বারদারের নেতৃত্বে বেরিয়ে আসছেন তালেবান প্রতিনিধি দল

Wednesday, July 24, 2019

পাকিস্তানের আঞ্চলিক অবস্থান যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিশালী by সালমান রাফি শেখ

অগণিত অর্থনৈতিক সমস্যা – স্বল্প বিদেশী মুদ্রার রিজার্ভ, আইএমএফের ঋণ, বিদেশী ঋণ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ভঙ্গুর অবস্থা – এগুলো সত্বেও পাকিস্তানের আঞ্চলিক অবস্থান এখন এমন একটা শক্তিশালী জায়গায় গিয়ে পৌছেছে যেটা গত দুই দশকের মধ্যে ছিল না। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের আনুষ্ঠানিক ‘বিচ্ছিন্নতার’ নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও ইসলামাবাদ তাদের আঞ্চলিক অবস্থানকে ভারতের চেয়েও পোক্ত করেছে, যদিও পাকিস্তানের পূর্বের প্রতিবেশী দেশটিকে সবসময়ই প্রশান্ত মহাসাগর বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলে গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হচ্ছে।

কুলভূষণ যাদবকে পাকিস্তানের হাত থেকে মুক্ত করতে ভারত যে চেষ্টা করেছিল, সেটা ঠেকানোর ব্যাপারে পাকিস্তানের সাফল্য এই পরীক্ষায় উৎরে গেছে। যদিও আইসিজেতে যাওয়ার পরিকল্পনাটা ভারতেরই ছিল। ভারত পাকিস্তানের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসার প্রস্তাব বারবার প্রত্যাখ্যান করে এসেছে এবং এরই ফলশ্রুতিতে আইসিজের দ্বারস্থ হয়েছে। মোদি সরকারের অব্যাহত পাকিস্তান-বিরোধী অপপ্রচার এবং এর পরিণতিতে পাকিস্তানকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার যে নীতি তারা নিয়েছে, সেটার কারণে পাকিস্তানের সাথে আলোচনার প্রস্তাবকে তারা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।

পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ভারতীয় নীতির একটি ভিত্তি হলো তাদের এই অপপ্রচার যে পাকিস্তান এই অঞ্চলে ‘সন্ত্রাসকে সহায়তা দিচ্ছে’। আইসিজেতে যে বিচার হলো, সেখানে তার উল্টো চিত্র উঠে এসেছে এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, ভারতই বরং এ অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ত্রাসবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারটা এখন তাদের নিজেদের ঘাড়ে গিয়ে পড়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোন পরাশক্তিই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের অপপ্রচারকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। তার অতি সাম্প্রতিক বহিপ্রকাশ হলো আফগান শান্তি প্রক্রিয়ার উচ্চ পর্যায়ের টেবিলে পাকিস্তানকে আমন্ত্রণ জানানো। শুধু তাই নয় এই প্রক্রিয়া থেকে ভারত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। তাছাড়া আফগান দৃশ্যপট থেকেও পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ভারত এবং আফগানিস্তানের যুদ্ধ শেষ করার ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর মতো কোন প্রভাবও ভারতের নেই।

সম্প্রতি বেইজিংয়ে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যে চারপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে, সেখান থেকেই বোঝা গেছে যে আফগানিস্তানে ১৭ বছরেরও বেশি মার্কিন যুদ্ধের অবসানের পেছনে চূড়ান্ত বিবেচনায় কারা ভূমিকা রাখছে।

যদিও রাশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আগের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে পাকিস্তান ছিল না, কিন্তু সবশেষ বৈঠকে সেটা ঘটেছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, তিন প্রধান দেশ “পাকিস্তানকে আলোচনায় স্বাগত জানিয়েছে এবং তারা বিশ্বাস করে যে, আফগানিস্তানে শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে”।

পাকিস্তানকে ‘বিচ্ছিন্ন করার’ ভারতীয় নীতির বিপরীতে পাকিস্তানের বর্তমান অবস্থাটা আফগানিস্তান শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের ইতিবাচক ভূমিকার স্বীকৃতি দিয়েছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে যে কথাটা বলে আসছে যে, আফগানিস্তানে কিছু ঘটলে পাকিস্তানের উপরও তার প্রভাব পড়ে, পাকিস্তানের ভূমিকার ব্যাপারে স্বীকৃতি ইসলামাবাদের সেই দাবিকেই সমর্থন করলো। ইসলামাবাদ আরও বিশ্বাস করে যে, বৃহত্তম পশতুভাষী জণগোষ্ঠির দেশ হিসেবে, পাকিস্তানকে অবশ্যই আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হতে হবে এবং প্রধান বিশ্ব শক্তি – বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে না, আফগানিস্তান চুক্তির সময় পাকিস্তানের স্বার্থের বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করা।

পুরো আফগান শান্তি প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিচ্ছে, এই বক্তব্যের মধ্যে কোন অতিরঞ্জন নেই। এর কারণ মূলত আফগান তালেবানদের অব্যাহতভাবে আলোচনার টেবিলে ধরে রাখাতে পাকিস্তানের সাফল্য এবং তালেবানদের সাথে সরাসরি চ্যানেলে আলোচনার জন্য চীন ও রাশিয়াকে সক্ষম করে তোলার ব্যাপারে তাদের ভূমিকা। অন্যভাবে বললে, এই শক্তিগুলো এই স্বীকৃতি দিলো যে আলোচনা এবং যুদ্ধ সমাপ্তির জন্য একটা খসড়া চুক্তির ব্যাপারে সম্মত হওয়া, অন্তত এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে, এটা পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া সম্ভব হতো না।

‘বিচ্ছিন্নতার নীতির’ কারণে ভারতের কাছে পাকিস্তানের এই কেন্দ্রীয় ভূমিকার বিশ্বাসটি মারাত্মক। কারণ এখানে পাকিস্তানের এমন ভূমিকা ও ইমেজ উঠে এসেছে, যারা আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি টানার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে, সন্ত্রাসবাদ উসকে দেয়ার ব্যাপারে নয়।

একজন ভারতীয় বিশ্লেষক যেমনটা বলেছেন: “সন্দেহ নেই যে, ভারত এখানে বড় ধরনের হারের মুখোমুখি হয়েছে। পাকিস্তান আফগান প্রক্সি যুদ্ধে ভারতকে পরাজিত করেছে এবং এই পরাজয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে”।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্কের দ্রুত উন্নতি হচ্ছে, চীনের সাথে তাদের সম্পর্ক একটা অনমনীয় পর্যায়ে চলে গেছে, এবং রাশিয়ার সাথেও তাদের দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। এটাই সম্ভবত প্রথমবারের মতো পাকিস্তান ও রাশিয়া একত্রে আঞ্চলিক একটা ফোরামে মিত্র হিসেবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে সাহায্য করছে।

আঞ্চলিক সংহতি সন্দেহাতীতভাবে আফগান যুদ্ধের সমাপ্তির সাথে জড়িত, এর অর্থ হলো এই দেশগুলো বিশেষ করে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের’ মোড়ক থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং একটা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত মাত্রা এখানে যুক্ত হচ্ছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র আবারও পাকিস্তানের রফতানি পণ্যের শীর্ষ গন্তব্য হতে চলেছে এবং পাকিস্তানের জ্বালানি সঙ্কট মেটানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হয়ে উঠতে যাচ্ছে রাশিয়া। আর এতেও সন্দেহ নেই যে, পাকিস্তান রাশিয়ার অস্ত্র ও প্রতিরক্ষা সিস্টেম কেনার ব্যাপারেও গভীরভাবে আগ্রহী।

ভারতের জন্য এখন এটা উপলব্ধির সময় এসেছে যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তাদের বিচ্ছিন্নতার নীতি কাজ করেনি এবং সেটা কাজ করবে না, বিশেষ করে এমন একটা সময় যখন পৃথিবীর এই অঞ্চলটা বিআরআই থেকে নিয়ে ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়নের মাধ্যমে আঞ্চলিক সংযোগ কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সংযোগ যেখানে নতুন উদীয়মান অগ্রাধিকার, ‘বিচ্ছিন্নতার’ নীতি বাস্তবায়ন সেখানে কিভাবে সম্ভব?

এটা আসলে ভারতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা যে, এই জিনিসটা বুঝতে তারা দীর্ঘ সময় নিয়েছে। পাকিস্তান, অন্যদিকে নিজেদের তরফ থেকে ভারতের সাথে সংলাপের উপর জোর দিয়ে যাচ্ছে, এবং মোদি সরকারও হয়তো নিজেদের জাতীয় ভোট ব্যাংক রক্ষায় এটার বিরোধিতা অব্যাহত রাখবে, যদি না নিজেদের অংশের বরফ গলানোর চেষ্টা করে তারা।
২৪ ডিসেম্বর ২০১৭, পাকিস্তানে আটক ভারতীয় গুপ্তচর কুলভূষণ যাদবের সঙ্গে সাক্ষাত করেন তার আত্মীয়-স্বজন

Tuesday, July 23, 2019

আফগান শান্তি আলোচনার সার কথা by সালমান রাফি শেখ

দোহাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানদের মধ্যে সপ্তম দফা শান্তি আলোচনা চলছে। এ পর্যন্ত যে সব বিষয়ে বিস্তারিত জানা গেছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে যে, একটা খসড়া এখন পুণরায় লেখা হচ্ছে, যেটার ব্যাপারে আগে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছিল এবং খসড়া শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পথে যথেষ্ট ‘অগ্রগতি’ অর্জিত হয়েছে।
আলোচনা যে চলছে, এটাই একটা ইতিবাচক বিষয়। চুক্তির খসড়া লেখা এবং সেটা সংশোধনের যে অব্যাহত প্রক্রিয়া, সেটা থেকে শুধু এটাই বোঝা যাচ্ছে না যে, এটা একটা জটিল প্রক্রিয়া, বরং এটাও বোঝা যাচ্ছে যে, দুই পক্ষের মধ্যে অনেক ভিন্নমতও রয়েছে, যেগুলোর কারণে চুক্তি চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। ষষ্ঠ দফা আলোচনার পর মার্কিন বিশেষ দূত খলিলজাদ বলেছিলেন যে, “বিশদ খসড়ার মধ্যেই যত সমস্যা”। তিনি আরও বলেন যে, “চুক্তির মূল বিষয় নিয়ে” বিতর্ক হচ্ছে।
আলোচনার এই ‘সারবস্তু’ নিয়ে বিশ্লেষণ যখন প্রকাশিত হলো, তখন দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বড় মতবিরোধের বিষয় এবং বিবাদের মূল বিষয়টি এখনও রয়ে গেছে, বিশেষ করে তালেবানদের দিক থেকে। সেটা হলো সেনা প্রত্যাহারের সময় ঘোষণা। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে অবশ্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তালেবানদের প্রতিশ্রুতি পাওয়া যে তারা কোন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সাথে সহায়তা করবে না।
তালেবানদের দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার যুদ্ধে ইতি টানার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে, কয়েক শ সেনা রাখাটা প্রয়োজন যাতে চুক্তি যথাযথাভাবে বাস্তবায়নের বিষয়টি ‘পর্যবেক্ষণ’ করা যায় এবং যাতে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো আবার আঘাত হানতে না পারে।
খসড়া পুনরায় লেখার যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে মার্কিন সেনার উপস্থিতি ও প্রত্যাহারের বিষয়টির সমাধান হয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র হয়তো দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে রাজি হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজি হওয়ার কারণ কি হতে পারে?
এখানে যদি শুধুমাত্র তালেবানদের জোরাজুরির ব্যাপার হতো, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো সেনা প্রত্যাহারে রাজি হতো না, অন্তত এত তাড়াতাড়ি নয়। তবে, বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তালেবানদের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে, আফগানিস্তানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাড়ছে, যেটা সামগ্রিক শান্তি প্রক্রিয়ার মূল বিষয়। এর অর্থ হলো চুক্তিটি শেষ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপর চাপ আসলেই বাড়ছে।
অতি সম্প্রতি তালেবানরা চীনে গিয়েছিল চুক্তির বিষয়ে আলোচনা করতে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লু কাং এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে, “তারা (চীন ও তালেবান) আফগানিস্তানে রাজনৈতিক সমাধান খুঁজতে এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রাখার জন্য পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষার বিষয়ে একমত হয়েছে”।
‘সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের’ উল্লেখ করাটা এখানে গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে তালেবান ও আফগানিস্তানে সক্রিয় ২০টি অন্য সন্ত্রাসী গ্রুপের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের বিষয়টি উঠে এসেছে। চীনাদের যদিও এই দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, তালেবানরা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করবে, কিন্তু ‘প্রতিশ্রুতি’ দেয়ার বিষয়টি অনেক বেশি জটিল, সেটা সাদামাটা দৃষ্টিতে বোঝা যাবে না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আইসিসের বিরুদ্ধে লড়াই করাটা তালেবানদের জন্য কোন সমস্যা হবে না, আল কায়েদার সাথে সম্পর্কটা শত্রুতা বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়। তালেবানরা যদি একমতও হয় যে তারা আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে এই গ্রুপগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে বা পশ্চিমা কোন দেশে হামলা চালাতে দেবে না, কিন্তু এখানে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে যে যুদ্ধের বিষয়ে কোন উত্তর না আসলে এই সব গ্রুপগুলোর হাজার হাজার সদস্যদের কি হবে।
যেহেতু এই যোদ্ধাদের বড় একটা অংশই আফগান, তাই তাদের সমাজে সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রত্যাবাসনের জন্য পরিবেশ তৈরির গুরুত্বটি কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একটা সাধারণ অস্ত্রবিরতি, নিরস্ত্রিকরণ এবং সমাজে পুনর্বাসনের এই বিপুল কর্মযজ্ঞের জন্য তালেবানদের এককভাবে দায়বদ্ধ করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়াসহ আন্তর্জাতিক পক্ষগুলোকে এখানে তাদের ভূমিকা রাখতে হবে। চীন, রাশিয়া ও এমনকি পাকিস্তানের ভূমিকা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যারা চায় না যে, এই ইসলামিক গ্রুপগুলো নিরবে মধ্য এশিয়া বা জিনজিয়াংয়ে ছড়িয়ে পড়ুক এবং এইসব এলাকায় হামলা শুরু করুক।
আন্তর্জাতিক চাপ ও উদ্বেগ থাকলেও, আসলে যুক্তরাষ্ট্রই এখানে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চায় এবং সে কারণেই তারা সম্ভবত দ্রুত (কয়েক মাসের মধ্যে) সেনা প্রত্যাহারের ব্যাপারে রাজি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন এটাকে তাদের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রচারণা চালানোর জন্য সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে চান। যে প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধের ইতি টানতে সক্ষম হয়েছে, দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিশ্চিতভাবে সেটা তাদেরকে একটা শক্ত রাজনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড় করাবে। এটা ভুললে চলবে না যে, এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার একটা প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে যাচ্ছেন, যে প্রতিশ্রুতি তিনি ২০১৬ সালের প্রচারণার সময় দিয়েছিলেন। সেটা হলো যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সমাপ্তি টানা।
সাম্প্রতিক সপ্তম দফা আলোচনায় ‘অসামান্য অগ্রগতি’ হয়েছে বলে তালেবানরা যে বিবৃতি দিয়েছে, সেটাকে যদি বিশ্বাস করা হয়, তাহলে এটা অনুমান করা হয়তো নিরাপদ হবে যে, চুক্তির বিস্তারিত খসড়ার ব্যাপারে দুই পক্ষ একমত হতে পেরেছে এবং এ ব্যাপারে চূড়ান্ত অর্জন প্রায় দ্বারপ্রান্তে।
তবে বিনষ্টকারীরাও সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে কারণ আফগান সরকারকে এই প্রক্রিয়া থেকে প্রায় স্থায়ীভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। তাছাড়া তালেবানদের আধিপত্যের রাজনৈতিক সিস্টেম কেমন হবে, সেটা নিয়েও একটা অস্পষ্টতা রয়ে গেছে। অশুভের একটা বড় অংশ তাই এখনও রয়েই গেছে।