Sunday, April 11, 2010

কেউ কি শুনতে পাচ্ছে তাঁদের কান্না by জাহীদ রেজা নূর

পরিবেশটাই ছিল শোকের। অসহায়ত্বের। কিন্তু এই শোক, এই অসহায়ত্ব থেকে বেরিয়ে আসার প্রতিশ্রুতিও ছিল তাতে।
সেদিন সব কথা হলো শেখরকে নিয়ে। রকীব নেওয়াজ শেখর—ফ্যাশন হাউস চিলেকোঠার অন্যতম কর্ণধার। দেশি কাপড় নিয়ে রকমারি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছিল ছেলেটি। কিন্তু হঠাৎ একদিন, ২০০৯ সালের ১৬ নভেম্বর হারিয়ে গেল ও। মোহাম্মদপুরের নিজের বাড়ি থেকে ও যাচ্ছিল উত্তরায় শ্বশুরবাড়ি। রাত ১১টার দিকে বেরিয়েছিল। এত রাতে ড্রাইভারকে ডাকতে চায়নি বলে গাড়ি নিয়ে বের হয়নি। একটি সিএনজিতে করে মহাখালী, তারপর একটি মাইক্রোবাসে উঠে পড়ে উত্তরার পথে। এর পর থেকে ওকে আর পাওয়া যায়নি।
পরদিন গাজীপুরে পাওয়া যায় ওর লাশ।
এ ঘটনার বিবরণ অনেকেই দেখেছেন পত্রিকায়। তবে গত ২৬ মার্চ কারওয়ান বাজারের পূবালী ভবনে যে শোকসভা হয়ে গেল, তাতে যেমন এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, তেমনি কী করে এ ধরনের অপমৃত্যু রোধ করা যায়, সে সমাধানের পথ খোঁজা নিয়েও হলো আলোচনা।
সেদিন এখানে এসেছিলেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, বিচারপতি গোলাম রাব্বানী, ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আবদুর রেজ্জাক খান, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নজরুল ইসলাম, কণ্ঠশীলনের গোলাম সারোয়ার, সাদা-কালোর আজহারুল হক। আমিও ছিলাম তাঁদের সঙ্গে।
কী নিয়ে কথা হলো? কী বেরিয়ে এল এই শোকসভা থেকে?
এখন যে তথ্য দেওয়া হবে, তাতে ঘাবড়ে যাবেন না। নিহত শেখরের বাড়িতে একদিন এসে হাজির তদন্ত অফিসার। বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন তিনি। বোঝা গেল, মামলাটি নিয়ে ভাবছেন তিনি। কিন্তু পরদিন খবরের কাগজ খুলে শেখরের বোন দীপা অবাক! আরে! ছিনতাইকারী হিসেবে কার ছবি ছাপা হয়েছে কাগজে? এ তো সেই পুলিশ অফিসার, যিনি কাল এসেছিলেন ছিনতাই আর হত্যা নিয়ে কথা বলতে!
দুষ্কৃতকারীরের ছড়ানো জাল কতটা বিস্তৃত, তা আমরা অনেকেই জানি না। কারা এই জালে নিজেদের জড়িয়ে রেখেছে, জানি না সেটাও। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যাদের দায়িত্ব, তাদেরই কেউ কেউ যখন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেয় দৃষ্কৃতকারীদের দিকে, তখন কেমন হয়, যেমন ঘটেছে শেখরের মামলা নিয়ে আসা তদন্ত অফিসারের বেলায়? একজন অসহায় মানুষ যাচ্ছেন পুলিশের কাছে সাহায্য পাবেন বলে, কিন্তু দেখা গেল, যেকোনো কারণেই হোক, ঠিকমতো সাড়া মিলছে না পুলিশের। আবার কখনো কখনো ত্বরিতগতিতে পুলিশ ধরে ফেলছে অপরাধীকে। কেন পুলিশের কাজে এ রকম বৈপরীত্য থাকে, তা নিয়ে ভেবে দেখার কথা বললেন আলোচকদের কেউ কেউ। সাধারণ মানুষকে বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্যই তৈরি করা হয়েছে পুলিশ বাহিনী। পুলিশের ভেতর থেকেও সে কাজটি করার চেষ্টা হচ্ছে অবিরত। কিন্তু কোথায় যেন একটি ফাঁক থেকে যাচ্ছে। সে কারণেই কোনো কোনো কাজে তাদের কাছে গিয়ে আস্থা পায় না মানুষ।
ত্রুটিপূর্ণ তদন্তব্যবস্থার কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপরাধের প্রতিকার হয় না। অপরাধীরা শাস্তি পায় না। বললেন আবদুর রেজ্জাক খান।
বিচারপতি গোলাম রাব্বানী বললেন, ছিনতাই, রাহাজানিসহ যাবতীয় দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা খুবই জরুরি। রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠ স্বতন্ত্র ও সম্মিলিতভাবে সক্রিয় হলে দুর্বৃত্তায়ন দূর করা সম্ভব।
ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম ধরলেন সমস্যার অন্য একটি দিক। বললেন, আইনই যথেষ্ট নয়, এর পেছনে রয়েছে অপসংস্কৃতি। সুস্থ সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে জীবন প্রবাহিত হলে মানববিনাশী সকল আচরণ দূর করা সম্ভব। আমাদের সমাজে সহিষ্ণুতার বড় অভাব।
ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন বলেন, আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র এসব অপরাধের প্রতিকার করতে পারছে না। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই আবর্জনার স্তূপ হবে আমাদের পরিণতি।
এখানে আমরা একটু দাঁড়াই। সত্যিই কি আবর্জনার স্তূপে পরিণত হতে চাই আমরা?
ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছিল শেখর নামের যে ছেলেটি, সে কি এই আলোচনা থেকে কিছু পেল? ওকে যখন খুন করছিল কয়েকটি দুষ্কৃতকারী, তখন কেমন ছিল ওর অনুভূতি? স্রেফ কয়েকটি টাকা আর একটি মোবাইল ফোনসেট হয়ে গেল মানুষের জীবনের চেয়ে দামি? শেখরের বাবা-মা, স্ত্রী, ভাইবোন, সন্তানকে কোথায় এনে দাঁড় করাল এই দুষ্কৃতকারীরা? সবাই জানি, আইনের হাত লম্বা। কিন্তু কত লম্বা? সত্যিই কি সেই হাত ধরে আনতে পারে ছিনতাইকারীকে, দুষ্কৃতকারীকে, হত্যাকারীকে?
শেখরের মোবাইল ফোনসেট যারা কেড়ে নিয়েছিল, যারা বিক্রি করেছিল, তারা ধরা পড়েছে। কিন্তু তাদের কি আদৌ ধরে রাখা যাবে? তাদের কাছ থেকে কি স্বীকারোক্তি আদায় করা যাবে? শেখর তো একা নয়, ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে অনেকেই আহত হচ্ছেন, নিহত হচ্ছেন। কী হবে তাঁদের, তাঁদের স্বজনদের? শোকসভায় কথা বলতে গিয়ে কাঁদছিলেন শেখরের বাবা, ডাকসাঁইটে আইনজীবী গরীব নেওয়াজ। কাঁদছিলেন তাঁর ভাই সেনাবাহিনীর মেজর পল্লব। একজন আইনজীবী, একজন সামরিক কর্মকর্তা, কিন্তু তাঁরাও এখন অসহায় হয়ে কাঁদছেন।
কেউ কি শুনতে পাচ্ছে তাঁদের কান্না?
শুরুতেই বলেছি, পরিবেশ ছিল শোকের, অসহায়ত্বের।
সে রকমই কি থাকবে পরিবেশ, নাকি পাল্টে যাবে ভালোর দিকে? কেউ কি সে গ্যারান্টি দিতে পারবে?

ফাতিমা ভুট্টোর চোখে একাত্তর -কালের পুরাণ by সোহরাব হাসান

এই প্রথম ভুট্টো পরিবারের একজন সদস্য স্বীকার করলেন ১৯৭১ সালে লাখ লাখ নারী দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী দ্বারা ধর্ষিত হয়েছিলেন। তাঁর নাম ফাতিমা ভুট্টো। একাত্তরের ট্র্যাজেডির অন্যতম খলনায়ক পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর নাতনি। ভুট্টো কিংবা তাঁর কন্যা বেনজির ভুট্টো কখনোই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের কথা স্বীকার করেননি। সম্প্রতি পেঙ্গুইন/ভাইকিং থেকে প্রকাশিত হয় ফাতিমা ভুট্টোর আত্মজীবনীমূলক বই Songs of Blood and Sword, বাংলায় ‘রক্ত ও তরবারির গান’।
ফাতিমা ভুট্টো একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচার-নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে সুসান ব্রাউনমিলারের Against Our Will: Men Women and Rape বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এতে লেখা হয়েছে ‘পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যুদ্ধের কৌশল হিসেবে চার লাখ নারীকে ধর্ষণ করেছে। বাঙালি জনগোষ্ঠীকে শায়েস্তা করা ও দুর্দশায় ফেলার অংশ হিসেবেই তারা এ কাজ করেছে।’ ব্রাউন মিলার তাঁর বইয়ে ঢাকার ১৩ বছরের মেয়ে খাদিজার করুণ কাহিনী লিখেছেন, যার উদ্ধৃতি রয়েছে ফাতিমার বইয়েও।
‘খাদিজা যখন অপর চারটি মেয়ের সঙ্গে হেঁটে স্কুলে যাচ্ছিল তখনই একদল পাকিস্তানি সেনা তাদের অপহরণ করে। পাঁচটি মেয়েরই ঠাঁই হয় মোহাম্মদপুরে অবস্থিত একটি সামরিক পতিতালয়ে। যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছয় মাস ধরে তাদের সেখানে আটক রাখা হয়। প্রতিদিন দুই সেনাসদস্য খাদিজার ওপর পাশবিক নির্যাতন চালাত। অন্যদের ওপর দশজন করে সেনা পীড়ন করত। খাদিজা যাতে চিৎকার দিতে না পারে সে জন্য দুর্বৃত্তরা তার মুখ বেঁধে রাখত। সেনাদের চাহিদা না মেটানো পর্যন্ত মেয়েদের প্রতিদিনের খাবারও বন্ধ থাকত।’
এরপর ফাতিমা লিখেছেন, নারীর ওপর এই অত্যাচারের পাশাপাশি পাকিস্তানি সেনারা বুদ্ধিজীবী, গবেষক ও সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দুদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চালিয়েছে। করাচিতে খবর ছড়িয়ে পড়ে, পাকিস্তানি সেনারা ঢাকায় ২০০ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে। সিন্ধুতেও তারা নাকি একই ধরনের গণহত্যা চালানোর পরিকল্পনা এঁটেছিল। পিপিপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো এ খবর জানতে পেরে সিন্ধুর দায়িত্বে নিয়োজিত জেনারেল গুলহাসানকে টেলিফোন করে বলেন, ‘আমি শুনেছি তোমরা পূর্ব পাকিস্তানে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছ। যদি সিন্ধুতেও তোমরা একই কৌশল নাও তাহলে আমিই হব দ্বিতীয় মুজিব এবং তোমাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াব।’
ফাতিমা ভুট্টো আরও লিখেছেন, একাত্তরে সেনাবাহিনীর অপকর্ম উদ্ঘাটনে প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে যে কমিশন গঠন করা হয়েছিল সেনাবাহিনী তার পুরো প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেয়নি। অনেক তথ্য তারা কাটছাঁট করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে একাত্তরে নিহতের সংখ্যা দুই লাখ বলে ধারণা করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, সেনা বাহিনী লাখ লাখ বেসামরিক মানুষকে হতাহত করেছে। যার সংখ্যা ৩০ লাখ ধারণা করা হয়। হামুদুর রহমান কমিশনের উদ্ধৃতি দিয়ে পাকিস্তান কর্মকর্তাদের দাবি নিহতের সংখ্যা ৩০ হাজার। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে দুই লাখের কথা বলা হয়। তবে ফাতিমা ভুট্টো হামদুদুর রহমান কমিশন কিংবা ভারতের গবেষক শর্মিলী বসুর তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মনে করেন। তিনি লিখেছেন, সংখ্যা নিয়ে যত বিতর্কই থাক না কেন বেসামরিক ব্যক্তি, বিশেষ করে নারীদের প্রতি পাকিস্তানি সেনা বাহিনী অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই।
তারা অস্বীকার করলেও সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের যত্রতত্র ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে । স্বাধীন বাংলাদেশেও তারা যথাযথ মর্যাদা পাননি। শেখ মুজিবুর রহমান লাঞ্ছিত নারীদের বীরাঙ্গনা হিসেবে সম্মানিত করতে চাইলেও তাঁরা সমাজ ও পরিবারে লজ্জা ও অপমান নিয়েই বেঁচে ছিলেন।
একাত্তরের রাজনৈতিক সংকটের বিবরণ দিতে গিয়ে ফাতিমা লিখেছেন, ইয়াহিয়া খানের রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণার এক সপ্তাহ পর বাংলাদেশে অস্থায়ী সরকার ঘোষণা করা হয় (এখানে তথ্যগত ভ্রান্তি আছে, তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষনা করেন ২৬ মার্চ ১৯৭১, বাংলাদেশ সরকারের ঘোষণা আসে ১০ এপ্রিল) । ইয়াহিয়া খান সর্বাত্মক যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানান। এই যুদ্ধ বছর শেষে পাকিস্তানের ভাঙন কেবল অনিবার্য করেনি, ভারত ও পাকিস্তান আরেকবার সরাসরি যুদ্ধেও জড়িয়ে পড়ে।
ফাতিমা অন্যান্য পাকিস্তানি লেখকের মতো, তাঁর বইয়ে ভুট্টোকে নায়ক বানানোর পাশাপাশি বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রতিনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেননি। তিনি লিখেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন, রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রতিকারের অংশ হিসেবেই ছয়দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এই কর্মসূচিতে এক মাথা এক ভোটের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্বাচন ও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া বাকি সবকিছু প্রাদেশিক সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকার কথা রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে কেন্দ্রে যাতে পুঁজি স্থানান্তর না হতে পারে সে জন্য পৃথক আর্থিক নীতি ও মুদ্রাব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে এতে। অন্যদিকে কর্মসূচিতে বলা হয়েছে, প্রাদেশিক সরকার বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে পারবে এবং বিদেশি মুদ্রার ওপরও তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব থাকবে। চূড়ান্তভাবে প্রদেশগুলোর নিজস্ব সামরিক ও আধাসামরিক বাহিনী থাকার কথাও বলা হয়েছে। অবশ্যই, ভদ্রভাবে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের অধিক, তাদের নিজস্ব দেশই দাবি করেছিল।
ফাতিমা আরও লিখেছেন, মুজিব চেয়েছিলেন তাঁর দল এককভাবে সংবিধান রচনা করবে এবং তাঁকে সরকার গঠনের সুযোগ দেওয়া হবে। সেনাবাহিনী যদিও ভুট্টোকে আওয়ামী লীগের সমপরিমাণ সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তাতে তিনি (ভুট্টো) আশ্বস্ত হতে পারেননি।
এরপর ফাতিমার বিশ্লেষণ হচ্ছে, সেনাবাহিনী এই দুজনকে একে অপরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে এবং যাতে শান্তিপূর্ণ কোনো সমাধান না হয় তা নিশ্চিত করেছে। তাঁর ভাষায়, এরপর ‘সারা পূর্ব পাকিস্তানে দাঙ্গা ও রক্তের বন্যা বইতে লাগল।’
বইটি মূলত পাকিস্তানের রাজনীতি, ভুট্টো পরিবারের দ্বন্দ্ব-কলহ ও ক্ষমতার লড়াই নিয়ে আবর্তিত। প্রসঙ্গ ক্রমে এসেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কথাও। বাঙালিদের প্রতি অধিকাংশ পাকিস্তানির যে বিদ্বেষভাব রয়েছে, ফাতিমা ভুট্টোর লেখায় তার ছাপ নেই, বরং তাদের প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি লক্ষ্য করা গেছে।
তা হলে কি নতুন প্রজন্মের পাকিস্তানিদের চিন্তা ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে?
>>>সোহরাব হাসান: কবি ও সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

তবুও বৈসাবি হোক পাহাড়ে -দেশহীন মানুষের কথা by সঞ্জীব দ্রং

চারুকলার সামনে দেখা পাহাড়ি মেয়েটি কি আসামের ভূপেন হাজারিকার ওই গানটি শুনেছে, ‘পাহাড় এসে সমতলে বাজায় করতালি/বিহুর সাথে মিশে গেছে কখন ভাটিয়ালী?’ আমি জানি না। আমাদের জন্মভূমিতে এ রকম হয় না। রাষ্ট্রই তার অলিখিত নীতির মাধ্যমে পাহাড়ি-বাঙালি অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব জাগিয়ে রাখে। এখানে পাহাড় ও সমতলের গান বাজে না, বরং মানুষে মানুষে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বেড়ে চলে। এখানে মহাশ্বেতা দেবীর কথা রাষ্ট্রের কানে পৌঁছায় না, ‘বহু বছর ধরে আদিবাসীদের বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে মূল স্রোত। মূল স্রোতের নিদারুণ অবজ্ঞা-উপেক্ষা ও অজ্ঞতার জন্য আদিবাসী সমাজের সঙ্গে মূল স্রোতের মধ্যে এই সমান্তরতার ব্যবধান, যে ব্যবধান ঘোচানোর দায় মূল স্রোতের ছিল। তারা যে সভ্য, উন্নত, শ্রদ্ধেয়, মূল স্রোত সেটা জানার চেষ্টাই করল না। এর দাম আমাদের দিয়ে যেতে হচ্ছে, হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মূল স্রোতকেই তো বিচ্ছিন্নতাবাদী বলতে হয় তাহলে। আসলে এখন নম্র, অনুতপ্ত, চিন্তাশীল, আত্মানুসন্ধানী হবার সময়। ক্রুদ্ধ গর্জন ও কথার কচকচির সময় নয়।’ ভারতের প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরুর সময় যখন ‘রিপোর্ট অব দি শিডিউলড ট্রাইবস কমিশন’ হয়, তখন কমিটির সদস্য ভেরিয়ার এলুইন তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আদিবাসী পলিসির সবটাই একটি শব্দে ব্যক্ত করা যায়—নম্রতা।’ এই রিপোর্টে বলা হয়েছিল, ‘আদিবাসীদের জমি নিঃশর্তে ওদেরই থাকবে। বহিরাগতদের কাছে আদিবাসী জমি হস্তান্তর বন্ধ করতে হবে, ওদের অরণ্যের অধিকার মেনে নিতে হবে আর সারা ভারতে অরণ্য অধিকর্তারা ওদের প্রতি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করবেন (আদিবাসী জগত, ভেরিয়ার এলুইন)।’ কবে আমাদের দেশে এ রকম হবে? সভ্যতায়, শিক্ষায়, ভদ্রতা ও নম্রতায়, উদারতা ও বিশালতায় আমাদের রাষ্ট্র ও মূল স্রোত সমব্যথী ও দুঃখিত হবেন আদিবাসী পাহাড়িদের কষ্ট ও বেদনায়? কাপ্তাই বাঁধের কারণে রাজবাড়িসহ ডুবে গেল পাহাড়িদের বাড়িঘর, ধানক্ষেত, শস্যের সবচেয়ে ভালো জমি। ওরা চোখের জলে উদ্বাস্তু হলো। কিছুদিন আগে আবার তানভীর মোকাম্মেলের কর্ণফুলীর কান্না ছবি দেখলাম। ছবিতে গৌতম দেওয়ান বলছেন, পাহাড়ি না হয়ে এটি যদি মুসলিম অধ্যুষিত হতো, তবে এভাবে আমাদের ডুবিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো না।
আমি জানি না কবে এই ধারণা দূর হবে পাহাড়ে যে রাষ্ট্র ও শাসকগোষ্ঠী শাসন করছে না পাহাড়িদের, ওরা শাসিত মানুষ। বাঘাইছড়ির পাহাড়িরাও প্রজাতন্ত্রের মালিক, তারা শাসিত নয়। পাহাড় ও সমতলের বন্ধন ও ঐক্য কবে প্রতিষ্ঠা পাবে?
চারুকলার সামনে দেখা পাহাড়ি মেয়ের কথা বলছিলাম। আমি তার নাম জিজ্ঞেস করিনি। ওকে দেখে মনে হয়েছে ও সাধারণ পরিবারের মেয়ে, পরনে সাধারণ পোশাক। ও হাসিমুখী না হলেও মুখে অতটা মলিনতা চোখে পড়েনি। ওর বাড়ি হতে পারে বাঘাইছড়ি, সাজেকের বাঘাইহাটের কাছে অথবা দীঘিনালা, ভাইবোনছড়া, লোগাং-মাইনী-চেংগী নদীতীরে কোনো গ্রামে? এই শহরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে, চারুকলায় পথ চললেও ওর মন হয়তো পড়ে থাকে দূর পাহাড়ের দেশে যেখানে ওর বাবা-মা স্বজনেরা ভালো নেই, যেখানে জীবন ভেঙে গেছে। সংসারের সুখ একটু বাড়ানোর জন্য, একটু সচ্ছলতা, একটু উপার্জনের জন্য, শিক্ষা নিয়ে মানুষ হওয়ার জন্য, সমাজে ফিরে গিয়ে চিরবঞ্চিত আদিবাসীদের মধ্যে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে নিশ্চয় এই শহরে এসেছে মেয়েটি। মেয়েটির মুখ এখনো চোখে ভাসে আমার। আমার মন উথালপাথাল করে। কত দুঃখেকষ্টে থাকে পাহাড়ি মানুষ এই শহরেও? পড়াশোনার বাইরে তার অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে কত সংকট? ভবিষ্যৎ কত অনিশ্চিত? মেয়েটি দ্রুত হেঁটে কাগজ বিলি করছিল দর্শকদের জন্য, যারা চারুকলায় বাঘাইছড়িতে পাহাড়িদের ওপর আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞের ওপর নির্মিত ডকুমেন্টারি ফিল্ম দেখতে এসেছেন। ওই কাগজে ওরা বলছে, পাহাড়িরা যেন এবার বৈসুক-সাংগ্রাই-বিজু ৭(বৈসাবি) উৎসব বর্জন করে। এই দুঃখকষ্টের মধ্যে কীভাবে বিজু হয়, উৎসব হয়? আক্রমণ, হত্যা, বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া দেখে, অপমান, প্রশাসনের সাম্প্রদায়িক আচরণ, পাহাড়ি নাগরিকদের মানুষ মনে না করা, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য হুমকি, সরকারের অবহেলা ও ক্ষমতাসীন শক্তিমানদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কীভাবে প্রার্থনা-গান-উৎসব হয়?
আমি এই তরুণ সমাজের ক্ষোভ ও কষ্ট অনুভব করার চেষ্টা করি। এই মেয়ের বাড়ি কি বাঘাইছড়ি? সিজক নদীর তীরে? দুসর বা রাঙাদূরছড়ির গ্রামে? অথবা গঙ্গারামমুখ? অথবা তুলাবান, মগবান, দেবাছড়ি, নলবুনিয়া, উগলছড়ি? আমি তো ওর মতো ভুক্তভোগী নই। ওদের সব কষ্ট কি উপলব্ধি করা সম্ভব? ধ্বংসযজ্ঞের কত ছবি পাঠিয়েছেন পাহাড়িরা দেশেবিদেশে। কত ছবি ছড়িয়ে গেছে, জাপান, ফ্রান্স, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা কত জায়গায়।
মন খুব ভালো নেই। কত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে আদিবাসী জীবনে। অপমান সয়ে বেঁচে আছে আদিবাসী পাহাড়ি মানুষ নিজবাসভূমে। অসহায়ের মতো বাঘাইছড়ির মানুষেরা ফোন করেছিলেন আমাকে যখন তাদের জীবন জ্বলেপুড়ে যাচ্ছিল। কীই বা করতে পারি আমরা? আমাদের রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মর্যাদা, নিরাপত্তা, সম্মান রক্ষা করতে পারে না, তাতে সে লজ্জিতও হয় না। তাই মন খুব খারাপ অনেক দিন ধরে। তবুও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে হয়। জীবনকে সুন্দর করার সংগ্রাম চলমান রাখতে হয়। আমাদের ভবিষ্যৎ শিশুদের কথা ভাবতে হয়। ওদের জন্য এই ভূমি, এই পাহাড়, এই সিজক-মাইনী-চেংগি নদী, ফুরামন পাহাড় নিরাপদ বাসযোগ্য থাকবে তো?
আমার অনুরোধ করতে ইচ্ছে করে, ওই মেয়েটিকেও বলি, আসুন এই দুঃখকষ্টের মধ্যেও বিজু-সাংগ্রাই-বৈসুক-বিহু পালন করি। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসার, সুন্দরের ও স্বপ্নের কথা বলি, আগামী দিনের কথা বলি। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছেন, ‘এ জগতে যা কিছু সম্ভব হয়েছে, সব হয়েছে আশার কারণে।’ আমরাও আশাবাদী হই। আমরা যদি বিজু-বৈসুক-সাংগ্রাই বর্জন করি, তবে তো ওই বিরুদ্ধশক্তিরই লাভ। একদিন আমাদের সন্তানেরা ধীরে ধীরে ওদের পরিচয়, সংস্কৃতি, উৎসব, গেংখুলী ভুলে যাবে। শক্তিমানেরা এই-ই চায়। বরং আমাদের তরুণ সমাজ জেগে উঠুক। শ্যামল মিত্রের একটি গান আছে, ‘কণ্ঠ জড়ায়ে ধরে বলি যেতে দিয়ো না আমায়।’ আমরাই তাই করতে চাই। অন্ধকার, মৃত্যু, অপমান, সাম্প্রদায়িকতা, পাশবিক শক্তি প্রদর্শন, হিংসাকে জয় করতে চাই। আমরা বিজুতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে চাই এমন এক ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নিয়ে যেখানে অতীতের মতো কোনো অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি আর ঘটবে না।
সঞ্জীব দ্রং: কলাম লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী।

সুশাসন কি নির্বাসনে যাবে -রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনা by এ এম এম শওকত আলী

আইনশৃঙ্খলা ও সুশাসনের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্কের ভিত্তি বহুমুখী। এক. জননিরাপত্তার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত এবং সংবিধানে স্বীকৃত একাধিক বাহিনীকে আইন প্রয়োগ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়। দুই. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রচলিত আইনের গণ্ডির মধ্যেই এ দায়িত্ব পালন করলে সুশাসন নিশ্চিত হয়। তিন. প্রচলিত আইনের পরিধি অতিক্রম করলে কী করা হবে সে বিষয়েও আইনি বিধান বিদ্যমান। চার. দেশের সব নাগরিক সংবিধান ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের পক্ষে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সহজ হয়। কিন্তু বাস্তবে এমনটি হয় না। কয়েক দশক ধরে প্রচলিত আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ অব্যাহতভাবে মিডিয়ায় প্রকাশিত হচ্ছে। এ অভিযোগ মূলত দ্বিমুখী। এক. সাধারণ নাগরিক, বিত্তশালী ব্যক্তিসহ অপরাধীরা ক্রমাগত আইন ভঙ্গ করে চলেছেন। দুই. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আইন লঙ্ঘন করছেন। বহুবিধ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে এসব বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দৃশ্যমান তা হলো গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যা। আইনের দৃষ্টিকোণে এ ধরনের নির্যাতন ও হত্যা প্রমাণ সাপেক্ষে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মানবিক দৃষ্টিকোণে এ অপরাধ নিন্দনীয় এবং সুশাসনের পরিপন্থী।
আমাদের সংবিধানসহ বিভিন্ন আইনে এ বিষয়ে অনুশাসন বিদ্যমান। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি উদাহরণ উল্লেখ করা প্রয়োজন। এক. যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হলে তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পাদনের জন্য হাজির করতে হয়। দুই. বিনা অভিযোগে সন্দেহের ওপর ভিত্তি করে কোনো ব্যক্তিকে ফৌজদারি কার্যবিধিমালার ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করলেও একই অনুশাসন অনুসরণযোগ্য অর্থাৎ গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে একই সময়ের মধ্যে নিকটস্থ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করতে হবে। তিন. গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে থাকাকালীন তার ওপর কোনো নির্যাতন করা যাবে না। চার. আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তদন্ত সম্পন্ন করার স্বার্থে তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করা যাবে না। হেফাজতে নেওয়ার আইনি নাম রিমান্ড।
বাস্তব চিত্র ভিন্নতর। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে হাজির হওয়ার বাধ্যবাধকতা-সংক্রান্ত অনুশাসন অনেক সময় অনুসরণ করা হয় না। এ জন্য পত্রিকান্তরে সংবাদ প্রকাশিত হলেও এ ধরনের ঘটনা বিরল নয়। প্রতিকার হিসেবে সংবিধানে রিট মামলা করার নাগরিক অধিকার স্বীকৃত। তবে অর্থের অভাব ও বিচারকার্য সম্পাদনে দীর্ঘসূত্রতার জন্য সংক্ষুব্ধ পরিবারের সদস্যরা এ অধিকার আদায়ে অনীহা প্রকাশ করে। বাস্তব চিত্রের অন্য একটি বিধান উল্লেখ করা প্রয়োজন। বিষয়টি ফৌজদারি কার্যবিধিমালা ৫৪-এর আওতায় গ্রেপ্তার এবং রিমান্ড-সংক্রান্ত। ৫৪ ধারার আওতায় গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ক্ষেত্রবিশেষে নির্যাতন করা হয়। এর অন্য নাম তৃতীয় মাত্রা পদ্ধতি। ইংরেজিতে Third Degree Method। অনেক সময় এ ধরনের নির্যাতনে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করে। এ ঘটনাকে বলা হয় হেফাজতে মৃত্যু। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির হেফাজত দুই ধরনের। একটি হলো পুলিশি হেফাজত এবং অন্যটি জেলের হেফাজত, যা জুডিশিয়াল হেফাজত নামে পরিচিত। যেকোনো ধরনের হেফাজতে মৃত্যু হলে আইন বা বিধিসম্মত প্রক্রিয়ায় তদন্তের বিধান রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের তদন্ত আদৌ হয় কি না বা হয়ে থাকলে তদন্তের ফলাফলের ভিত্তিতে কী কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে তা অজানাই থাকে, যা সুশাসনের পরিপন্থী।
৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের ক্ষমতার অপব্যবহার সর্বজনবিদিত। জানা যায় যে অপব্যবহার রোধে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা রায়ের মাধ্যমে ১০ বা ১২ বছর আগে প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও অপব্যবহারের ঘটনা সময় সময় পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। এর মূল কারণ নির্বাহী বিভাগ কখনো এ বিষয়ে সঠিক নির্দেশনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেয়নি। অথবা দিলেও সংশ্লিষ্ট বাহিনী নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সচেষ্ট হয়নি। উল্লেখ্য যে ১৯২৪ সালে কলকাতা হাইকোর্টও এ ধরনের একটি অনুসরণীয় এক রায়ের মাধ্যমে প্রকাশ করেছিল। সংশ্লিষ্ট নীতিমালা পুলিশ বিধিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু এর পরও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।
জননিরাপত্তা শব্দটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এক. দেশের নাগরিকেরা কখনো নিরাপত্তাহীনতার শিকার হবে না। দুই. নিরাপত্তাহীনতা তখনই হয় যখন নাগরিকেরা নিঃশঙ্কচিত্তে চলাফেরা বা ঘুমাতে পারে না। সমস্ত অপরাধীদের অবাধ কার্যক্রম বিগত কিছু সময় ধরেই জননিরাপত্তা দারুণভাবে বিঘ্নিত করছে। সংবাদপত্র বা টিভি দেখলেই বিষয়টি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যোগ করা যায় সড়ক দুর্ঘটনার অব্যাহত মৃত্যুর ধারা। শেষোক্ত বিষয়টির প্রতিরোধের জন্য সরকার একসময় জনপথ পুলিশ ব্যবস্থাপনার পদক্ষেপ নিয়েছিল। আশা করা হয়েছিল যে এ পদক্ষেপের ফলে নিরাপদ সড়ক অর্জনের পথ সুগম হবে। কিন্তু এখনো তা হয়নি। অর্থাৎ গাড়িচালকসহ সশস্ত্র অপরাধীরা একই মাত্রায় আইনের প্রতি দারুণ অবজ্ঞা প্রকাশ করছে। এ ধরনের পরিবেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতইবা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে সক্ষম?
অনেকেই মত প্রকাশ করে থাকেন যে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করলেই অপরাধ দমন সম্ভব। আদালতে বিভিন্ন পর্যায়ে কত লাখ মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় এবং কত বছর ধরে, তার এক পরিসংখ্যান পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছিল। মূল কারণ বলা হয়েছিল বিচারকদের অপ্রতুলতা। সুপ্রিম কোর্ট পর্যায়ে বিচারকদের সংখ্যা সম্প্রতি বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর সুফল ইতিমধ্যে কতটুকু অর্জন করা হয়েছে তা জনগণের জানা প্রয়োজন। এ কথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে বিচারকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ বিচারব্যবস্থায় আরও অনেক প্রতিষ্ঠান জড়িত। যেমন তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান এবং আইনজীবী সম্প্রদায়। পুলিশকে শক্তিশালীকরণ প্রক্রিয়ায় সংখ্যা বৃদ্ধিসহ যানবাহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছে। তদন্তকারী প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ পুলিশ বা যে নামেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে অভিহিত করা হোক না কেন, যদি দক্ষ না হয় তাহলে ইপ্সিত সুফল পাওয়া সম্ভব নয়। এ জন্য একসময় তদন্তকারী সংস্থাকে সাধারণ পুলিশ বাহিনী থেকে পৃথক্করণের বিষয়টিকেও সরকার বিবেচনা করেছিল। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। অন্যদিকে রাষ্ট্রের পক্ষে যেসব আইনজীবী মামলা পরিচালনা করবেন, এঁদের জন্য পৃথক ক্যাডার সৃষ্টির কথাও বলা হয়েছিল। কার্যত তা হয়নি।
অপেক্ষমাণ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি অধস্তন আদালতের বিচারকদের একটি উপদেশ দিয়েছেন। মামলার শুনানির পরিবর্তনের তারিখ যেন বিচারকেরা উপযুক্ত ও গ্রহণযোগ্য কারণ ব্যতিরেকে প্রত্যাখ্যান করেন। বলা নিষ্প্রয়োজন যে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদেরও একটি সম্পূরক দায়িত্ব রয়েছে। তাঁরা যদি যথাযোগ্য কারণ ব্যতিরেকে আদালতে আবেদন পেশ করা থেকে বিরত থাকেন। অন্যদিকে পুলিশ যদি নির্ধারিত তারিখে সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের সময়মতো আদালতে হাজির করার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয় তাহলেও শুনানির তারিখ পরিবর্তন করতে আদালত বাধ্য হবে।
ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত অধস্তন আদালতের বিচারপ্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যাতে নিষ্পন্ন হয় সে লক্ষ্যে হাইকোর্টের নিবিড় পরিবীক্ষণ ব্যবস্থাপনা চালু ছিল। এ পরিবীক্ষণের ফলাফল হাইকোর্টের বাৎসরিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হতো। বিচারকেরাও এ জন্য সতর্কতার সঙ্গে মামলা নিষ্পত্তির জন্য সচেষ্ট ছিল। এ ব্যবস্থাপনা যদি এখনো চালু থাকে তাহলে বলতে হবে, এটা দুর্বল হয়ে গেছে। এ ব্যবস্থাপনাকে অধিকতর শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একইভাবে প্রয়োজন তদন্তকারী সংস্থাসহ মামলা নিষ্পত্তির দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থাকে শক্তিশালী করা। মিডিয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সুশাসনের বেহাল দৃশ্য প্রকাশে শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। সরকারের কিছু নীতিনির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য ভিন্নতর। এ ব্যবধান আশঙ্কাজনক। নাগরিকেরা প্রকৃত তথ্যই জানতে ইচ্ছুক।
ফেরা যাক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইন লঙ্ঘনের প্রশ্নে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী বিগত ছয় বছরে ৬২২ জন ক্রসফায়ারে মৃত্যুবরণ করেছে। এ ধরনের ঘটনার জন্য সরকারের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ছিল যে এ বিষয়ে শূন্য সহনশীলতার নীতি মেনে চলা হবে। অর্থাৎ আইনি কাঠামোর আওতায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রতিশ্রুত আইনি তদন্তের সংখ্যা ও ফল এ পর্যন্ত জনগণ জানতে সক্ষম হয়নি। অনেকের মতে, এতে সরকার ও নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ব্যবধান ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গলজনক নয়।
সুশাসনের পরিধি ব্যাপক। বিষয়টি সার্বিকভাবে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গই এ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত এবং নাগরিকদের কাছে দায়বদ্ধ। তিনটি অঙ্গের দায়বদ্ধতার বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। প্রধান তিনটি অঙ্গসহ সরকারবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টাই সুশাসনকে সুসংহত করতে সক্ষম। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে এ প্রক্রিয়ায় নির্বাহী অঙ্গের দায়িত্ব অধিকতর। কারণ, সর্বক্ষেত্রে সমভাবে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা নির্বাহী বিভাগের।
এ এম এম শওকত আলী: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা; সাবেক সচিব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্কর্ষকেন্দ্র -গবেষণার সুযোগ-সুবিধাগুলো কাজে লাগানো উচিত

২০০৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ নামে একটি গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিজ্ঞান অনুষদের বিভাগগুলোর শিক্ষক-গবেষকেরা সেখানে গবেষণা করবেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় উত্কর্ষ ঘটবে—এমনই ছিল পরিকল্পনা। পুরো একটি ভবন উৎসর্গ করা হয়েছে এই গবেষণাকেন্দ্রকে, যার প্রতিটি তলার আকার ১০ হাজার বর্গফুট। ১১টি ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুবিধাসংবলিত গবেষণাগার এখানে আছে। একটি তলাজুড়ে রয়েছে ক্যাফেটেরিয়া এবং বিদেশি গবেষকদের আবাসিক সুবিধাসংবলিত অতিথি কক্ষ। আরও আছে চার হাজার বর্গফুটের একটি সম্মেলন কক্ষ।
কিন্তু এত সুযোগ-সুবিধা, এমন আয়োজনের ফল-ফসল কী? গত ছয় বছরে গবেষণাকর্ম সম্পন্ন হয়েছে মাত্র সাতটি। বিদেশি গবেষকদের জন্য পরীক্ষাগার, থাকা-খাওয়ার সব রকম সুবিধা থাকা সত্ত্বেও একজন বিদেশি গবেষকও উল্লিখিত সময়ে কোনো গবেষণা করেননি। বিদেশি অতিথিরা আসেন, সেখানে থাকেন, এখানকার শিক্ষক-গবেষকদের সঙ্গে আলাপ-পরামর্শ করেন, কিন্তু তাঁদের কেউ এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা করেননি।
সেন্টার অব এক্সিলেন্স প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যটি চমৎকার। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থী-শিক্ষক-গবেষকদের জন্য এমন কেন্দ্র অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমনটি আছে এবং সেসব কেন্দ্রে নিয়মিত অনেক গবেষণা হয়। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রগতি ঘটছে এভাবেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে সুখ্যাতি অর্জন করেছিল। এটি দেশের সর্ববৃহত্ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়—এ দেশের জ্ঞান-বিজ্ঞানের জগতে অন্যতম পথপ্রদর্শক হতে পারে এই বিদ্যাপীঠ। সেটা সম্ভব নতুন নতুন গবেষণা ও সৃষ্টিকর্ম সাধনের মধ্য দিয়ে। সে কাজে প্রথমত এগিয়ে আসার কথা শিক্ষকদের; তাঁরাই পথ দেখাবেন। তাঁদেরই তত্ত্বাবধানে তৈরি হবে নতুন নতুন গবেষক, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, গবেষণার ব্যাপারে আগ্রহ-উদ্দীপনার বড়ই অভাব। তারই একটি প্রমাণ দীর্ঘ ছয় বছরে মাত্র সাতটি গবেষণাকর্ম।
শুধু বিজ্ঞান-প্রযুক্তি নয়, সামাজিক বিজ্ঞান ও মানববিদ্যা বিষয়েও গবেষণার চিত্র হতাশাব্যঞ্জক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকেরা যদি রাজনৈতিক দলাদলির পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা-উদ্যোগে লিপ্ত থাকতেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পরিবেশ হতো প্রকৃতই বিদ্যাপীঠের মতো। সেই সুযোগ অবশ্যই রয়েছে; অবকাঠামোরও তেমন অভাব নেই। প্রয়োজন এসবের সদ্ব্যবহার করা।

সন্ত্রাস-খুন-টেন্ডারবাজি -দলকে সন্ত্রাসীমুক্ত করা সরকারের স্বার্থেই প্রয়োজন

‘পঞ্চগড়ে ছাত্রলীগ নেতা খুন’—শুক্রবারের প্রথম আলোর এই শিরোনাম এবং সঙ্গে দিনাজপুরে চকচকে চাপাতি হাতে সাধারণ ঠিকাদারদের ধাওয়ার ছবিটিই সব কথা বলে দিচ্ছে। দরপত্র দাখিল নিয়ে পঞ্চগড়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সংঘাতে ঝরে গেল একটি প্রাণ। এবং সঙ্গে আহত হয়েছেন ১১ জন। রাজনৈতিকভাবে তাঁরা এক পক্ষের হলেও ১০টি সরকারি পুকুর ইজারার দরপত্র দাখিল নিয়ে তাঁরা নেমেছেন রক্তারক্তি প্রতিযোগিতায়। ওই দিনের প্রথম আলোর আরও কিছু সংবাদ এ রকম—দিনাজপুরে ভূমি প্রতিমন্ত্রীর এপিএসের নেতৃত্বে ঠিকাদারদের ওপর হামলা, চট্টগ্রামে ঠিকাদারকে হত্যার সঙ্গে জড়িত ‘যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা’, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রক্টর ও প্রাধ্যক্ষের লাঞ্ছনা। সব দেখেশুনে কেবল এটিই বলার রয়েছে, ‘এখনো গেল না আঁধার’; শেষ হলো না টেন্ডারবাজি-দখলবাজির রক্তারক্তির ধারা।
পঞ্চগড়ের ঘটনায় সারা শহরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, চলেছে উত্তেজনা ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর। প্রশ্ন উঠতে পারে, ঠিকাদারেরা ছাত্রলীগ-যুবলীগ নাকি ছাত্রলীগ-যুবলীগই ঠিকাদার-ব্যবসায়ী? দেশের ঠিকাদারি কাজে তো বটেই, অন্যান্য ব্যবসাক্ষেত্রেও দলীয় আধিপত্য স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। সন্ত্রাসের এই বাণিজ্যিক খেসারতের দিকটিও উপেক্ষণীয় নয়।
বাংলাদেশে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস যেন মানিকজোড়। কোথাও সন্ত্রাস হলে ধরে নিতে হবে, তার কার্যকারণগুলোর মধ্যে দুর্নীতিও রয়েছে। আর তাতে অনিবার্যভাবে আসবে সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নাম। দুঃখজনক যে, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের আমলের এই ধারাবাহিকতা এখনো চলতে পারছে। সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের সোয়া এক বছরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীদের নিজেদের ও প্রতিপক্ষের মধ্যকার সন্ত্রাসে কম রক্ত ঝরেনি, কম প্রাণ অকালে হারিয়ে যায়নি। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং তাদের কঠোর ভাষায় থামতে বলেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ‘সকলই গরল ভেল’। দুর্নীতির রজ্জুটি যেমন ওপর থেকে মধ্যম পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ের ক্যাডার পর্যন্ত নেমে এসেছে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই তেমনি সন্ত্রাস হয়ে উঠছে বেপরোয়া। সরকারপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাকাঠামোর মধ্যে শেকড় গেড়ে বসা সন্ত্রাস ও দুর্নীতির এই পৃষ্ঠপোষকদেরই আগে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কেননা তাদের জন্যই সরকারের অনেক শুভ উদ্যোগও কলঙ্কিত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে ভাবমূর্তি। এ বিষয়ে প্রথম আলো গোড়া থেকেই দায়িত্বশীল সমালোচনার মাধ্যমে প্রতিকারের চাহিদা ব্যক্ত করে আসছে।
এ অবস্থা যতটা অসহনীয় ও লজ্জাকর, প্রতিকারে ততটাই কঠোর ও লক্ষ্যভেদী হওয়া চাই। সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আদালতে বিচারের পাশাপাশি দল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেও বহিষ্কার করতে হবে। এটা করার জন্য প্রশাসনসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পক্ষপাতহীন ও দক্ষ শিক্ষক-প্রশাসকদের দায়িত্ব দিতে হবে। তেমনি পুলিশ প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাও জরুরি। দেখতে হবে যাতে রাজনৈতিক চাপ তাঁদের বিব্রত ও ভীত না করে। সন্ত্রাসের এই কলঙ্কিত উত্তরাধিকার ত্যাগ করতে জাতীয় সঙ্কল্প প্রয়োজন। প্রয়োজন দল ও সরকারকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহারের পথ বন্ধ করা।

সুইডেনের প্রিন্সের নতুন প্রেম

সুইডেনের প্রিন্স কার্ল ফিলিপ আবারও প্রেমে পড়েছেন। এবার তাঁর দহরম-মহরম চলছে মডেলকন্যা সোফিয়া হেলকভিস্টের সঙ্গে। ২৫ বছর বয়সী এই মডেলকন্যা সুইডেনের জনপ্রিয় স্টিল ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে বিকিনি পরে আর বক্ষবন্ধনীর বদলে অজগর সাপ জড়িয়ে পোজ দিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। এর পর থেকেই তিনি বিকিনির মডেলতারকা হিসেবে খ্যাত।
ধারণা করা হয়, গত গ্রীষ্মে সুইডেনের একটি সৈকতে দুজনের প্রথম দৃষ্টিবিনিময় হয়। এরপর তাঁদের প্রণয় বহুদূর গড়িয়েছে। ইতিমধ্যে এই জুটি সুইডেন ও নিউইয়র্কে অন্তরঙ্গ মুহূর্ত কাটিয়েছেন।
সোফিয়ার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও দেখা করেছেন প্রিন্স। এর আগে এক বিজ্ঞাপন-নির্মাতা নির্বাহীর সঙ্গে প্রায় এক দশক প্রেম করেন সুইডেনের সিংহাসনের দ্বিতীয় দাবিদার প্রিন্স। সোফিয়ার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের ব্যাপারে খোদ কার্ল ফিলিপ কিছু বলেননি। এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত কিংবা স্রেফ গুজব বলেও উড়িয়ে দেননি তিনি।

জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নেতারা বাধ্যবাধকতাযুক্ত চুক্তি চান

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করতে একটি বাধ্যবাধকতাযুক্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি করার আহ্বান জানিয়েছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের নেতারা। গতকাল শুক্রবার জোটের ১৬তম বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে এ আহ্বান জানান তাঁরা। পাশাপাশি এই নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের ধনী দেশগুলোর কাছে আর্থিক সহায়তা দেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে আয়োজিত ওই সম্মেলনে এক যৌথ বিবৃতিতে আসিয়ানের নেতারা বলেন, গত ডিসেম্বরে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে গৃহীত কোনো বাধ্যবাধকতাহীন ঘোষণাকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে এবং একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছাতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘ সনদকাঠামোর (ইউএনএফসিসিসি) অধীনে থাকা সব পক্ষের উচিত একটি আইনি বাধ্যবাধকতাযুক্ত চুক্তিতে পৌঁছানো। বিশেষ করে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার জন্য এটা করা দরকার। কোপেনহেগেন সম্মেলনেও এ ধরনের আহ্বান জানানো হয়েছিল।
তবে সমালোচকেরা আসিয়ান নেতাদের এই বিবৃতিকে দুর্বল ও নমনীয় বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁরা বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে ওই লক্ষ্যমাত্রা কীভাবে অর্জিত হবে, সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছেন নেতারা। অথচ এ অঞ্চলে এখন খরা চলছে। তাই নেতাদের কাছ থেকে আরও বেশি কিছু আশা করা হয়েছিল।
সম্মেলনে আসিয়ান সদস্য দেশগুলোর নেতারা এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে যথাযথ কৌশল গ্রহণের ব্যাপারেও একমত হন। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা থেকে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে সহযোগিতামূলক নীতি বজায় রাখার কথা বললেও আর্থিক প্রণোদনা তুলে নেওয়ার ব্যাপারে মতৈক্যে পৌঁছান নেতারা।
গত বৃহস্পতিবার জোটের ১০টি সদস্য দেশের অর্থমন্ত্রীরা জানান, তাঁদের আশা এই অঞ্চলে চলতি বছর ৪ দশমিক ৯ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। গত বছর এই প্রবৃদ্ধির পরিমাণ ছিল দেড় শতাংশ।
তবে এবারের আসিয়ান সম্মেলনের আলোচনায় একটি বড় জায়গাজুড়ে ছিল মিয়ানমার প্রসঙ্গ। পাশাপাশি থাইল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও সম্মেলনে প্রভাব ফেলেছে। দেশের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ায় সম্মেলন শুরুর আগ মুহূর্তে থাই প্রধানমন্ত্রী অভিজিত্ ভেজ্জাজিভা এতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিল করেন।
সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে মিয়ানমারের নির্বাচনী আইন স্থান না পেলেও সদস্য দেশগুলোর নেতারা এ ব্যাপারে তাঁদের উদ্বেগের কথা জানান। মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আসিয়ান কখনোই কোনো উচ্চবাচ্য করেনি। এবারও করছে না। তবে অন্যান্য সদস্য দেশের নেতারা সম্মেলনে যোগ দিতে আসা মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী থেইন সেইনকে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁর দেশ জোটের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
আসিয়ান জোটে রয়েছে প্রকৃত রাজতন্ত্রশাসিত ব্রুনাই, সামরিক জান্তাশাসিত মিয়ানমার, একদলীয় কমিউনিস্ট শাসনাধীন লাওস ও ভিয়েতনাম এবং পুরোপুরি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শাসিত ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মতো দেশও এই জোটের সদস্য। তাই কোনো একটি বিষয়ে মতৈক্যে পৌঁছা জোটের পক্ষে খুব সহজসাধ্য নয়।

এমআরপি তৈরির কাজ ভারতকে দেওয়ায় নেপালে বন্ধ্ ডেকেছে মাওবাদীরা

নেপালের মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) তৈরির কাজ ভারতের একটি কোম্পানিকে দেওয়ার বিরোধিতা করে সে দেশের মাওবাদী দল ইউনাইটেড সিপিএন কাল রোববার বন্ধ্ ডেকেছে। গতকাল শুক্রবার মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দহল প্রচণ্ডর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রচণ্ড বলেন, এমআরপির মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয় প্রতিবেশী দেশ ভারতের একটি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এতে নেপালের বহু অভ্যন্তরীণ তথ্য ভারতের হাতে চলে যাবে। প্রচণ্ড বলেন, সরকার নেপালের প্রচলিত আইনই লঙ্ঘন করেনি, এর মাধ্যমে এ সংক্রান্ত গণজবাবদিহিতা (পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি) অধ্যাদেশও অমান্য করা হয়েছে।

মাওবাদীদের দমনে ভারত সরকারের নতুন কৌশল

মাওবাদীদের দমনে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার নতুন সামরিক কৌশল নিয়েছে। এই কৌশলের মধ্যে রয়েছে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় চালকবিহীন বিমান ও অতিরিক্ত সামরিক হেলিকপ্টার মোতায়েন। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর (সিআরপিএফ) একটি অংশকে বিদ্রোহীদের দমনে বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং সেনাবাহিনীর আদলে সিআরপিএফকে পুনরায় প্রশিক্ষণ দেওয়া। ছত্তিশগড়ে বিদ্রোহীদের হামলায় সিআরপিএফের ৭৫ জন সদস্য নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় সরকার নতুন এ রণকৌশল নিল।
একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে, মাওবাদীদের দমনে অভিযান চলছে এবং এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। মাওবাদীদের বিরুদ্ধে লড়তে ১০টি ব্যাটালিয়নকে ইতিমধ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
মাওবাদীদের মোকাবিলায় চালকবিহীন যে বিশেষ প্রযুক্তির বিমানের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে তার পোশাকি নাম ‘আনম্যানড এরিয়্যাল ভেহিকেল’। এই বিমান মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকার পাঁচ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়তে পারবে। মাওবাদীদের গতিবিধির ওপর নজরদারি করবে এ বিমান। বিমান থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনী মাওবাদীদের বিরুদ্ধে কৌশলগত পদক্ষেপ নেবে।
নতুন কৌশলের অংশ হিসেবে সিআরপিএফের মোট দুই লাখ ৩০ হাজার সদস্যকে দুই ভাগে ভাগ করে একটি অংশকে রাজ্যসরকারগুলোর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে মোতায়েন করা হবে। অপর অংশটি ব্যবহার করা হবে বিদ্রোহীদের দমনে।
এর আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরম ছত্তিশগড়ের দান্তেওয়াড়ায় মাওবাদী হামলার পর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, মাওবাদী দমনে সেনাবাহিনী নামানো হবে না। যদিও মাওবাদীদের সাম্প্রতিককালের নাশকতার পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দাবি উঠেছিল মাওবাদীদের দমনে সেনাবাহিনী নামানো হোক। কিন্তু তাতে অবশ্য সায় দেয়নি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

অন্তর্বর্তী সরকারকে আলোচনার প্রস্তাব প্রেসিডেন্ট বাকিয়েভের

মধ্য এশিয়ার দেশ কিরগিজস্তানের প্রেসিডেন্ট কুরমানবেগ বাকিয়েভ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। বর্তমান সরকারকে ‘সাময়িক সরকার’ বলে অভিহিত করেন তিনি। সেই সঙ্গে নিজে পদত্যাগ করবেন না বলেও জানিয়ে দেন। প্রেসিডেন্ট বাকিয়েভের প্রস্তাবের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতেও রাজধানী বিশকেকে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। তবে এতে হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি।
কিরগিজস্তানের দক্ষিণাঞ্চলের অজ্ঞাত স্থান থেকে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট বাকিয়েভ বলেন, ‘আমিই কিরগিজস্তানের বৈধ প্রেসিডেন্ট। তথাকথিত “সাময়িক সরকার” নিজেরাই নিজেদের নিয়োগ দিয়েছে। তবে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলতে প্রস্তুত আছি। আমি জানতে চাই, তারা আসলে কী চায়।” তিনি অভিযোগ করেন, রাজধানী বিশকেকের পথে পথে সশস্ত্র ব্যক্তিদের দেখা যাচ্ছে। চুরি, লুটপাট চলছে। লোকজনকে হত্যা করা হচ্ছে।
রাশিয়ার ইকো মস্কভে বেতারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট বাকিয়েভ বলেন, কিরগিজস্তান ছেড়ে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। তবে স্বীকার করেন, এই মুহূর্তে তাঁর কোনো ক্ষমতা নেই। এর আগে প্রেসিডেন্ট পদ ছেড়ে না দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন বাকিয়েভ।
বিশকেকে গত বৃহস্পতিবার রাতভর গোলাগুলির শব্দ পাওয়া গেলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদিকালিক ইসমাইলভ বলেন, কিছু লুটপাট ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। তবে নগরের পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান রোজা ওতুনবায়েভা গতকাল সরকারবিরোধী সহিংসতায় আহতদের দেখতে বিশকেকের বিভিন্ন হাসপাতালে যান। সহিংসতায় নিহতদের স্মরণে গতকাল এক দিনের শোক ঘোষণা করা হয়।
এদিকে বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন’-এর জন্য রাশিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন রোজা ওতুনবায়েভা। তিনি এ বিষয়ে আলোচনার জন্য মস্কোতে দূত পাঠাবেন বলেও উল্লেখ করেন।
মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট জানায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে ওতুনবায়েভার সঙ্গে একজন মার্কিন দূত দেখা করেছেন। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিতে সবাইকে শান্ত থাকতে ও গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

অনলাইনে বিক্রি হলো ‘বোতলভূত’!

নিউজিল্যান্ডে একটি নিলামে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে দুটি বোতলে আটকানো ‘ভূত’ বিক্রি হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার বিক্রেতা ওয়েবসাইট ট্রেডমি এমন দাবি করেছে। ট্রেডমির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বোতলে একজন বৃদ্ধ এবং আরেকটি বোতলে একটি বালিকার ভূত আটকানো ছিল। বোতল দুটি দুই হাজার ৮৩০ ডলারে (এক হাজার ৯৭৮ মার্কিন ডলার) বিক্রি হয়েছে।
ওয়েবসাইট কর্তৃপক্ষ জানায়, ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতা একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বোতল দুটি কেনা হয়েছে। অবশ্য এর আগে একজন ভুয়া নিলামকারীকে বাদ দেওয়া হয়। ওই নিলামকারী বোতল দুটির দাম পাঁচ হাজার ডলার পর্যন্ত তুলেছিলেন।
বোতল দুটি নিলামে তোলেন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের বাসিন্দা অ্যাভি উডবারি। উডবারি বলেন, গির্জার একজন আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন যাজক তাঁর বাড়ি থেকে ভূত দুটি মন্ত্রের মাধ্যমে বোতল দুটিতে আটকে ফেলেন। এরপর তিনি স্পিরিটভর্তি বোতল দুটি নিলামে তোলেন। তিনি জানান, ভূত দুটির যন্ত্রণায় তাঁর নাওয়া-খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
উডবারি বলেন, ‘২০০৯ সালের ১৫ জুলাই ভূত দুটিকে বোতলে আটকানোর পর থেকে আমাদের আর ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না।’ তিনি জানান, বোতলে আটকানো বৃদ্ধ লোকটির নাম লেস গ্রাহাম, যিনি ১৯২০ সালে উডের বাড়িতে মারা গেছেন। আর বালিকাটি এসেছিল ‘ওইজা বোর্ড’-এর মাধ্যমে আত্মা নামানোর একটি পরীক্ষা করার সময়।

কান্দাহারে যুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে: রবার্ট গেটস

আফগানিস্তানে তালেবানের মূল ঘাঁটি কান্দাহার প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে মার্কিন সেনারা শিগগিরই চূড়ান্ত পর্যায়ের যুদ্ধে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট গেটস।
মঙ্গলবার দক্ষিণ আফগানিস্তানে অবস্থিত ন্যাটো সেনা ঘাঁটির সেনাদের তিনি বলেন, শিগগিরই তাঁরা চূড়ান্ত লড়াইয়ে অংশ নেবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নতুন আফগানিস্তান কৌশলের অংশ হিসেবে কান্দাহারের দখল নিতে আগামী কয়েক মাসে অতিরিক্ত আরও কয়েক হাজার সেনা পাঠাচ্ছে ন্যাটো।
কান্দাহারে নিয়োজিত প্রায় তিন হাজার কানাডীয় সেনাকে সাহায্য করতে গত বছর কয়েক হাজার মার্কিন সেনা যোগ দেন এবং ব্যাপক প্রাণহানির শিকার হয়। মার্কিন কমান্ডাররা জানান, প্রদেশের বেশির ভাগ অঞ্চল এখনো শক্তিশালী তালেবান জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ওবামা প্রশাসন চায়, কান্দাহারে অভিযান চালিয়ে ওই অঞ্চল থেকে তালেবানদের বিতাড়িত করে আফগান সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুনঃ প্রতিষ্ঠ করা। যাতে আগামী ২০১১ সালের মাঝামাঝি ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়তে পারে।
কান্দাহার শহর থেকে ৪৮ কিলোমিটার উত্তরে ন্যাটো সেনা ঘাঁটির সেনাদের উদ্দেশে গেটস বলেন, ‘আপনাদের প্রত্যেকেই কঠিন সফর পার করছেন। আপনারা এমন একটি অঞ্চলে এসেছেন, যার সম্পূর্ণই তালেবানদের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আপনারা এর জন্য রক্ত দিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা এখন কান্দাহারের যেখানটায় আছেন, সেটি তালেবানবিরোধী অভিযানে চূড়ান্ত পর্যায়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। আবারও বলছি, আপনারাই এ যুদ্ধেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন।’
গত বছর জুলাই মাসে এ অঞ্চলে ন্যাটো বাহিনীর ২২ জন সেনা নিহত হন এবং আহত হন ৬২ জন।

সু চিসহ সব বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান

জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চিকে মুক্তি দিতে দেশটির সামরিক জান্তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জান্তাপ্রধান জেনারেল থান শোয়ের কাছে লেখা এক চিঠিতে সু চি ছাড়াও সব রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। টাইমস অব ইন্ডিয়া।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, সব দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে না। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সু চিসহ সব রাজনৈতিক বন্দীকে মুক্তি দেওয়া উচিত, যাতে তাঁরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের স্বার্থেই তাঁদের মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। ১০ দিন আগে দেশটির জান্তাপ্রধান জেনারেল থান শোয়ে বরাবর ওই চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানান বান কি মুন।
জাতিসংঘের মহাসচিব বলেন, ‘আমি বারবার বলছি, সু চিসহ অন্য রাজনৈতিক বন্দীরা নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলে তা কোনোভাবে বিশ্বাসযোগ্য হবে না। নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বেশ কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও নেওয়া প্রয়োজন।’ থান শোয়ের কাছে পাঠানো চিঠিতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্য পরিবেশ সৃষ্টির ক্ষেত্রে ‘তেমন উন্নতি হচ্ছে না’ বলে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব।
শান্তিতে নোবেল পুরস্কারজয়ী সু চি দেশটির বিরোধী দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতা। ১৯৯০ সালে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল এনএলডি জয়লাভ করলেও ক্ষমতা পায়নি। দুই দশকের মধ্যে বেশির ভাগ সময় সু চি বন্দী গৃহবন্দী আছেন।
নির্বাচনী আইন প্রকাশ শুরু করল মিয়ানমারের জান্তা
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা না করলেও মিয়ানমারের জান্তা এ ব্যাপারে পাস হওয়া আইন প্রকাশ শুরু করেছে। গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশ করা ওই আইনে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন জান্তা একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। জান্তার মনোনীত ব্যক্তিরাই ওই কমিশনের সদস্য হতে পারবেন। ওই ব্যক্তিরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না। গতকাল রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে এ কথা বলা হয়।
দুই দশক পর দেশে অনুষ্ঠেয় ওই নির্বাচন নিয়ে বিশ্লেষকেরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, পুরোপুরি জান্তার নিয়ন্ত্রণমুক্ত না হোক, দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, এটা কম অর্জন নয়। তবে অনেকে বলছেন, জান্তা যতই বলুক নির্বাচনে সবার জন্য সমান ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে, আসলে কিন্তু তা নয়। জান্তার সমর্থক ও তার কাছের লোকদের নির্বাচিত করতেই ওই নির্বাচনের আয়োজন করা হচ্ছে।
সোমবার নির্বাচনী ওই আইন পাস করা হয়। পরদিন গতকাল মঙ্গলবার ওই আইনের বিষয়ে কিছু তথ্য প্রকাশ করা হয়। জান্তার তরফ থেকে বলা হয়, সামনের দিনগুলোতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে নির্বাচনী আইনগুলো বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।
জান্তাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল থান শয়ের স্বাক্ষর করা ‘দ্য ইউনিয়ন ইলেকশন কমিশন ল’ শীর্ষক ওই আইনের অধীনে জান্তা একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। একজন চেয়ারম্যানসহ কমপক্ষে পাঁচ সদস্যের সমন্বয়ে ওই কমিশন গঠন করা হবে। নির্বাচনের ব্যাপারে কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। ওই সদস্যরা কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারবেন না। কমিশনের সদস্যদের দেশের শ্রদ্ধেয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তি হতে হবে। জান্তাই তাঁদের মনোনীত করবে।
জান্তার প্রকাশ করা অন্য চারটি আইন হলো, প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভস), জাতীয়তা পরিষদ (হাউস অব ন্যাশনালিটিজ), সংসদ (হাউস অব পার্লামেন্ট) এবং রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আইন।
৪৪০ আসনের প্রতিনিধি পরিষদের ৩৩০ জন হবেন নির্বাচিত বেসামরিক সদস্য, বাকিরা হবেন সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধি। ২২৪ আসনের জাতীয়তা পরিষদের ১৬৮ জন হবেন নির্বাচিত এবং বাকিরা হবেন সেনাপ্রধান মনোনীত।
২০০৮ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় নার্গিস আঘাত হানার কয়েক দিন পর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা দেশে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেয়। ওই ঘোষণায় বলা হয়, ২০১০ সালের কোনো একসময় ওই নির্বাচন হবে। সংবিধানে ওই সময় এমন একটি অনুচ্ছেদ জুড়ে দিয়ে বলা হয়, কোনো প্রার্থী বিদেশি নাগরিকদের বিয়ে করলে তিনি নির্বাচনে অযোগ্য বিবেচিত হবেন।
অনেকের মতে, নোবেলজয়ী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতেই জান্তা ওই শর্ত জুড়ে দিয়েছে। কারণ গৃহবন্দী ওই নেত্রীর স্বামী মাইকেল অ্যারিস একজন ব্রিটিশ নাগরিক। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মাইকেল ১৯৯৯ সালে মারা যান। সু চি এখনো ওই সংবিধান মেনে নেননি।

পীরগঞ্জে রাকাব-বিএমডিএর ঋণ বিতরণ শুরু

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার সেচসুবিধাভুক্ত কৃষকদের মধ্যে ঋণ বিতরণ শুরু করেছে। উভয় প্রতিষ্ঠানের যৌথ তদারকি ঋণ কর্মসূচির আওতায় এ ঋণ বিতরণ করা হচ্ছে।
রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ম. ফজলুল হক সম্প্রতি ব্যাংকের পীরগঞ্জ উপজেলার ভাবনাগঞ্জ হাট রাকাব শাখা প্রাঙ্গণে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন।
অনুষ্ঠানে রাকাবের ঋণ ও অগ্রিম বিভাগের প্রধান খন্দকার গোলাম মোস্তফা ও পীরগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক শামসুল আলম শাহ, বিএমডিএর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. ফিরোজ হোসেন, কৃষক মো. নূরুজ্জামান প্রমুখ বক্তব্য দেন। এতে সভাপতিত্ব করেন রাকাবের ঠাকুরগাঁওয়ের জোনাল ব্যবস্থাপক খাজা ওয়ালিউল ইসলাম। এ ছাড়া অনুষ্ঠানে দুই শতাধিক কৃষক ও কৃষক প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও গ্রিনডেল্টা ইনস্যুরেন্সের চুক্তি স্বাক্ষর

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও গ্রিনডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির মধ্যে প্রিমিয়াম আদায়ের বিষয়ে সম্প্রতি একটি চুক্তি হয়েছে।
এই চুক্তি অনুযায়ী গ্রিনডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির পক্ষে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিমার কিস্তি নিতে পারবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ও সিকিউরড ল্যান্ডিংয়ের প্রধান তারেক রিয়াজ খান এবং গ্রিনডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা চৌধুরী নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ চুক্তিতে সই করেন।

মুরগির খাদ্য ও বাচ্চার দাম কমানোর দাবি

সম্ভাবনাময় পোলট্রিশিল্পকে বাঁচাতে মুরগির বাচ্চা ও খাদ্যের (পোলট্রি ফিড) দাম খামারিদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন।
রাজশাহীতে গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে সমিতির নেতারা এই দাবি জানান। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মোহাম্মদ মুহসিন এবং সমিতির ঢাকা বিভাগের সমন্বয়কারী কামালউদ্দিন আহমেদ ও বরিশাল বিভাগের সমন্বয়কারী এস এম দোহা।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করে বলা হয়, বড় বড় হ্যাচারির মালিক ও ফিড মিলাররা কোনো ধরনের নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আমদানিকৃত মুরগির বাচ্চা ও মুরগির খাদ্যের দাম বাড়িয়ে চলেছে। এ ছাড়া মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির পাশাপাশি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) অনুমোদনহীন ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ বাজার দখল করে নেওয়ার কারণে প্রান্তিক খামারিরা উপর্যুপরি লোকসানে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। সে জন্য পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অবিলম্বে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছে।
সমিতির নেতারা আরও বলেন, চলতি মাসেই দেশকে যখন এভিয়ান-ফ্লুমুক্ত ঘোষণা করার কথা, ঠিক তখনই মত্স্য ও পশুসম্পদমন্ত্রীর ডিও লেটারের মাধ্যমে একটি স্বার্থান্বেষী মহলকে খুশি করানোর জন্য পাশের এভিয়ান-ফ্লু-আক্রান্ত দেশ থেকে ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে দেশের নতুন নতুন জেলা এভিয়ান-ফ্লু-আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় মত্স্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাতে পোলট্রি খামার রাখা নিরাপদ নয় উল্লেখ করে তাঁরা এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

রূপায়ণ হাউজিং ও ইউনিট্রেন্ডের মধ্যে চুক্তি সই

রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট লিমিটেড এবং বিজ্ঞাপনী সংস্থা ইউনিট্রেন্ড লিমিটেডের মধ্যে সম্প্রতি একটি চুক্তি হয়েছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান, ভাইস চেয়ারম্যান সাদাত হোসেন সেলিম, উপদেষ্টা এ কে ফিরোজ আহমেদ ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মঞ্জুর আহমেদ এবং বিজ্ঞাপনী সংস্থা ইউনিট্রেন্ড লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ক্রিয়েটিভ চিফ মুনির আহমেদ খান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জুলফিকার আহমেদ, সিওও তুষার দাস, সিএফও এ এস এম এনামুল হক এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তি পর্যায়ে ছয় মাসের আমানত নিতে পারবে

অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন থেকে ব্যক্তির ক্ষেত্রে ছয় মাস মেয়াদের আমানত সংগ্রহ করতে পারবে। এত দিন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কাছ থেকে সর্বনিম্ন এক বছর মেয়াদি আমানত নিতে পারত।
বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল মঙ্গলবার এক নির্দেশনায় নতুন এ সুযোগ তৈরি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে গতকাল প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের কাছে এ বিষয়ের সার্কুলার পাঠানো হয়েছে।
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কাছ থেকে ছয় মাস বা এর বেশি যেকোনো মেয়াদে আমানত সংগ্রহ করলে তা ছয় মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর নির্দিষ্ট হারে মুনাফাসহ নগদায়ন করা (ভাঙানো) যাবে। এর আগ পর্যন্ত এক বছরের আগে আমানত নগদায়ন করা যেত না।
সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আতিউর রহমানের সঙ্গে অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ নির্বাহীদের এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে শীর্ষ নির্বাহীরা ব্যক্তির কাছ থেকে এক বছরের জায়গায় ছয় মাস মেয়াদে আমানত এবং প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ছয় মাসের পরিবর্তে তিন মাস মেয়াদে আমানত নেওয়ার সুযোগ তৈরির দাবি করেন।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যক্তি আমানতের ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি করেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, নতুন এই সুযোগের ফলে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান তহবিল সংকট কিছুটা কমে আসবে।
সাধারণত অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের তহবিলের জন্য ব্যাংকের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। ব্যাংক থেকে এসব প্রতিষ্ঠান উচ্চ সুদ দিয়ে অর্থ ধার করে থাকে।
আবার তারা আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকেও উচ্চ সুদে (কলমানি) ঋণ করে থাকে। এতে তাদের তহবিল-ব্যয় অনেক বেড়ে যায়।
এর ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো লিজে যে অর্থ খাটায়, তার সুদের হারেও গিয়ে প্রভাব পড়ে।
এখন জনসাধারণের কাছ থেকে স্বল্প মেয়াদে আমানত নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। উপরন্তু, আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারেও অর্থ বিক্রির সুদের হার কমে আসতে পারে।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং লংকাবাংলা ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মফিজউদ্দিন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এতে ব্যক্তি আমানতকারীরা অধিক হারে তাদের কাছে অর্থ খাটাতে আগ্রহী হবেন। অন্যদিকে তাদের তহবিল-ব্যয় কমবে। যার সামগ্রিক প্রভাব ইতিবাচক।’

তিন বছরে ২৫ কোটি ডলারের মূলধন সংগ্রহ

২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বের ১০০ কোটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেওয়া ও পরিবেশের ক্ষতি প্রতিরোধে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে টেকসই ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ব্যাংকিং অন ভ্যালুজ (জিএবিভি)।
এ লক্ষ্যে আগামী তিন বছরের মধ্যে ২৫ কোটি ডলারের নতুন মূলধন সংগ্রহের অঙ্গীকার ঘোষণা করেছে জোটটি। এই অর্থ জোটের বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব প্রকল্প (গ্রিন প্রজেক্টস) ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভে নেওয়া ২০০ কোটি ডলারের ঋণ বিতরণ কর্মসূচিতে স্থান পাবে।
জিএবিভির দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন শেষে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল মঙ্গলবার এসব অঙ্গীকারের কথা জানানো হয়। এ সময় আরও বলা হয়, সমাজের যে জনগোষ্ঠী অর্থায়ন সুবিধা পায়নি, তাদের সে সুযোগ করে দেওয়ায় এ অঙ্গীকারের মূল লক্ষ্য। যাতে তারা টেকসই আর্থিক উন্নয়নের সুযোগ পায়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন জিএবিভির সহ-প্রতিষ্ঠাতা এবং ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ফজলে হাসান আবেদ, যুক্তরাজ্যের শোরব্যাংক করপোরেশনের প্রতিনিধি লরি জে স্পেঞ্জার, পেরুর মিবাঙ্কোর প্রতিনিধি লুইস ফিলিপ ডারকানো এবং ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এ (রুমী) আলী।
ফজলে হাসান আবেদ বলেন, ‘সত্যিকারভাবে বিশ্বে শতকোটি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে জেএবিভির প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন রোধের ব্যাপারেও এটি একটি ভিন্ন ধরনের উদ্যোগ।’ তিনি বলেন, নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত টেকসই ব্যাংকগুলোর পক্ষে আগামী ১০ বছরে বিশ্বের প্রতি ছয়জন মানুষের মধ্যে অন্তত একজনের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।
এক প্রশ্নের জবাবে ফজলে হাসান আবেদ বলেন, তাঁরা আশা করেন, বিশ্বে সত্যিকার অর্থেই নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—এমন আদর্শের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাংক জিএবিভি জোটের সদস্য হবে। সেই সঙ্গে নতুন নতুন টেকসই ব্যাংকের আবির্ভাব ঘটবে। তাঁর ধারণা, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে জোটে ব্যাংকের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যাবে।
লুইস ফিলিপ বলেন, ‘টেকসই ব্যাংকগুলোর জন্য এখন অধিক পরিমাণে অর্থ সংগ্রহ ও বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। যাতে আমরা ভবিষ্যতে এই অর্থ পরিপূর্ণ সম্ভাবনা ও মাত্রায় কাজে লাগাতে পারি। বিশ্বের জন্য এটি একটি অপরিহার্য প্রতিশ্রুতি।’
লরি জে স্পেঞ্জার বলেন, ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগকারী, বর্তমান একক গ্রাহক, প্রাতিষ্ঠানিক ও নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে এসব অর্থ সংগ্রহ করা হবে, যা ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে জিএবিভির সেবা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যয় করা হবে বলে তিনি জানান।
এক প্রশ্নের জবাবে লরি জে স্পেঞ্জার বলেন, বর্তমানে বিশ্বের ২০টি দেশে এসব ব্যাংকের মোট ৭০ লাখ গ্রাহক রয়েছে। এ ছাড়া জিএবিভির সদস্য ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত স্থিতিপত্রে রয়েছে এক হাজার ৪০০ কোটি ডলারেরও বেশি পরিমাণ অর্থ।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জিএবিভির সদস্য ব্যাংকগুলো অব্যাহতভাবে লাভজনক অবস্থায় রয়েছে। এমনকি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সংকটের পরিস্থিতিতেও এসব ব্যাংকের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে। বিশ্ব ব্যাংকিং খাতে তাদের কার্যক্রম খুবই দৃশ্যমান। কারণ, তারা যে মুনাফা অর্জন করে, তা আর্থিক খাত, জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের স্বার্থে কাজে লাগায়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, জেএবিভির সম্মেলনে একযোগে কাজ করার মাধ্যমে টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণের বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বিশ্বব্যাপী টেকসই ব্যাংকিংয়ের প্রভাব ছড়িয়ে দেওয়া, যৌথ উদ্যোগে মূলধন সংগ্রহ বাড়ানো ও একটি কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। এর ফলে নতুন প্রজন্মের টেকসই ব্যাংকের প্রতিশ্রুতিশীল ব্যাংকাররা জিএবিভির লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারবে। এই জোটের সদস্য ব্যাংকগুলো এমন একটি ব্যবসায়িক মডেলের উন্নয়ন ঘটানোর পরিকল্পনা করছেন, যা বিশ্বের সবচেয়ে জরুরি সামাজিক ও পরিবেশবিষয়ক সমস্যাগুলোর সমাধানের বিষয়কে গুরুত্ব দেবে।
এর আগে গত ৬ মার্চ অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জিএবিভির তিন দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। এতে বিশ্বের ১১টি শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বাংলাদেশে এ সম্মেলনের আয়োজক প্রতিষ্ঠান জোটটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ব্র্যাক ব্যাংক।
জিএবিভি হচ্ছে বিশ্বের কিছু সফল ব্যাংকের সমন্বয়ে গঠিত একটি জোট, যারা পরিবেশ, কম সুবিধা পাওয়া ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী এবং খাতগুলোর জন্য অধিকতর টেকসই ভবিষ্যত্ বিনির্মাণের লক্ষ্যে অর্থায়ন করে থাকে। নেদারল্যান্ডের রাজকুমারী প্রিন্সেস ম্যাক্সিমা ও ইউএনইপির নির্বাহী পরিচালক অ্যাচিম স্টেইনার ২০০৯ সালের মার্চে এই জোটের প্রতিষ্ঠা করেন।

শেয়ারবাজারে বড় দরপতন



দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে কমছে লেনদেনের পরিমাণও। আর এসব পতনের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে তুলনামূলক ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির ওপর।
এভাবে বাজার পড়তে থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। এ সময় তারা এসইসি ও ডিএসইর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকে।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) বিভিন্ন সময় নেওয়া পদক্ষেপের প্রভাবেই বাজার পড়ছে। কিন্তু এ ব্যাপারে এসইসি একেবারেই নির্বিকার। তারা অবিলম্বে সংকট উত্তরণের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
বাজার পরিস্থিতি: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল মঙ্গলবার লেনদেনের পরিমাণ চলতি বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। লেনদেন হয়েছে ৬২৯ কোটি টাকার শেয়ার। অর্থাত্ এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে স্টক এক্সচেঞ্জটির লেনদেন এক হাজার কোটি টাকার বেশি কমেছে।
ডিএসইতে গতকাল সাধারণ মূল্যসূচক ৮৬ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার ৪০০ পয়েন্টে নেমে এসেছে। গত এক মাসে এটিই সর্বনিম্ন সূচক।
এদিন মিউচুয়াল ফান্ড ছাড়া কোনো খাতই তেমনভাবে দাঁড়াতে পারেনি। সব খাতের অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারের দাম কমেছে। ডিএসইতে গতকাল মোট ২৪৩টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এদের মধ্যে দাম বেড়েছে ৪৯টির, কমেছে ১৭৮টির দাম।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) গতকাল ১৬১ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। কমেছে ১১৯টির দাম। চারটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ছিল অপরিবর্তিত। সিএসইতে সার্বিক সূচক ১৬৯ দশমিক ১৪ পয়েন্ট কমে ১৫ হাজার ৭০৭ পয়েন্টে নেমে এসেছে। আর লেনদেন হয়েছে ৬৪ কোটি টাকার।

তিন ইংলিশ, এক পাকিস্তানি

শুক্রবার চট্টগ্রামে টেস্ট অভিষেকটা যদি হয়েই যায়, আজমল শাহজাদের প্রথম ওভারে একটু বেশিই সতর্ক থাকতে হবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি—দুটিতেই অভিষেক ওভারে উইকেট পেয়েছেন। বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজের শেষ ম্যাচটি ছিল তাঁর অভিষেক, প্রথম ওভারেই নিয়েছেন তামিম ইকবালের উইকেট। গত মাসে দুবাইয়ে টি-টোয়েন্টির অভিষেক ওভারে তো উইকেট নিয়েছিলেন দুটি, আউট করেছিলেন পাকিস্তানের দুই ওপেনার ইমরান নাজির ও ইমরাত ফারহাতকে। টি-টোয়েন্টি অভিষেকে প্রথম ওভারেই একটির বেশি উইকেট আছে আর কেবল মনসুর আমজাদের। ২০০৮ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষে করাচিতে এক ওভার বোলিং করেই পাকিস্তানি লেগ স্পিনার ৩ রানে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট! টেস্টে অভিষেক ওভারে দুই উইকেট আছে কেবল দুজনের, দুজনই শাহজাদের স্বদেশি। টেস্ট ক্যারিয়ারের প্রথম বলে চার খেয়েছিলেন গ্রায়েম সোয়ান, কিন্তু তৃতীয় ও ষষ্ঠ বলে আউট করেছিলেন গৌতম গম্ভীর ও রাহুল দ্রাবিড়ের মতো দুই ব্যাটসম্যানকে। ২০০৩ সালে জিম্বাবুয়ের মার্ক ভারমিউলেন ও স্টুয়ার্ট কার্লাইলকে আউট করেছিলেন রিচার্ড জনসন।

শাস্তির মুখে আফ্রিদিরা

ভালো খেললে যেমন বোনাস মেলে, খারাপ খেললে তেমনি জরিমানাও করা উচিত। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) অনেক দিন ধরেই এমনটা ভেবে আসছে। এবার সেই ভাবনা বাস্তবে রূপ নেওয়ার অপেক্ষায়। গত অস্ট্রেলিয়া সফরে দলের ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে গঠিত পিসিবির তদন্ত কমিটির সুপারিশ বোর্ড সভাপতি ইজাজ বাটের হাতে এসে পৌঁছেছে। তাতে নাকি দলের পাঁচ খেলোয়াড় শহীদ আফ্রিদি, শোয়েব মালিক, রানা নাভেদ-উল-হাসান, কামরান ও উমর আকমলের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
ওয়াসিম বারির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের কমিটি গত সপ্তাহে তাদের প্রতিবেদন তৈরি করে বাটের হাতে তুলে দেয়। প্রতিবেদন পড়ার পর পরশু বাট মহসিন খানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচক কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে কমিটির সুপারিশগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। বাট দোষী খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন। এই খেলোয়াড়দের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ১৫ জনের দলে থাকা তাই নিশ্চিত নয়।
টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক আফ্রিদি আগামী মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলবেন কি না, সংশয় দেখা দিয়েছে তা নিয়েও। অবশ্য আফ্রিদি আর আকমল ভাইদের শুধু মোটা অঙ্কের জরিমানাও করা হতে পারে। আফ্রিদির অপরাধ, বল কামড়ে পাকিস্তানের ক্রিকেটের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা; আকমল ভাইদের অপরাধ, টিম ম্যানেজমেন্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। এঁদের ২০-৩০ লাখ রুপি করে জরিমানার প্রস্তাব করেছে ওই কমিটি।
মালিক আর রানা নাভেদের জন্য আরও কঠোর শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। এঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দলে কোন্দল তৈরির। এ বছর পুরো সময়ের জন্যই এই দুজনকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করেছে কমিটি। বাট সব সুপারিশই বাস্তবায়নের পক্ষে। ক্রিকইনফোকে তিনি বলেছেন, ‘আমরা শাস্তি হিসেবে জরিমানা এবং নিষেধাজ্ঞা দুটোই দেওয়ার কথা ভাবছি। যে পদক্ষেপই নেওয়া হোক, সেটি হবে দৃষ্টান্তমূলক।’
সূত্র জানিয়েছে, অলরাউন্ডার আবদুল রাজ্জাক কিংবা মিহবাহ-উল হককে অধিনায়ক করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল গঠন করার কথা ভাবছে পিসিবি।

এক্সট্যাসি স্কুল হকি

এক্সট্যাসি জাতীয় স্কুল হকির চূড়ান্ত পর্বে কাল জিতেছে রাজশাহী কসবা স্কুল ও দিনাজপুর পৌরসভা স্কুল। মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে কসবা ১৪-০ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়েছে বরগুনা জিলা স্কুলকে। দিনের অন্য ম্যাচে দিনাজপুর পৌরসভা হাইস্কুল ২-১ গোলে জিতেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় মাধ্যমিক কলেজের বিপক্ষে।

হাডিনের সেঞ্চুরিতে একপেশে ম্যাচ

হ্যামিল্টনের সেডন পার্ক এত দিন অস্ট্রেলিয়ার কাছে ছিল দুর্বোধ্য এক মাঠের নাম। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এই মাঠে এর আগে টেস্ট-ওয়ানডে কোনোটিতেই জেতা হয়নি তাদের। সেই মাঠে কাল হেসেখেলে ৬ উইকেটের জয় পেল অস্ট্রেলিয়া। ম্যাচটাকে ‘সিরিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ’ বলেছিলেন ড্যানিয়েল ভেট্টোরি। এই ম্যাচে হারলে সিরিজ জিততে শেষ দুটো ম্যাচ জিততেই হবে—এই সমীকরণের কারণে। সেই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটাই হয়ে গেল এখন পর্যন্ত সফরের সবচেয়ে একপেশে ম্যাচ।
বুঝতেই পারছেন, ভেট্টোরির কোনো চাওয়াই এই ম্যাচে পূরণ হয়নি। অন্যদিকে রিকি পন্টিংয়ের চাওয়ার পুরোটাই পূরণ করে দিয়েছে তাঁর সতীর্থরা। ভালো শুরুটাকে পুঁজি করে ব্যাটসম্যানরা বড় ইনিংস খেলতে পারেনি বলে প্রথম দুই ম্যাচ শেষে আক্ষেপ করেছিলেন পন্টিং। ক্যারিয়ার-সেরা ইনিংস খেলে অধিনায়কের আফসোস মেটালেন ব্র্যাড হাডিন।
এক বছর এক মাস পর ওয়ানডেতে সেঞ্চুরি পেলেন, একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। সেঞ্চুরির পথে পন্টিংয়ের সঙ্গে দ্বিতীয় উইকেটে তাঁর ১৫১ রানের জুটি। ২৪৬ রানের মামুলি লক্ষ্যের পেছনে ছোটা অস্ট্রেলিয়া ম্যাচটা শেষ করে দিয়েছে আসলে ওখানেই।
টস জিতে ফিল্ডিং নিয়েছিলেন পন্টিং। ২১১ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়ে ১১০ বার টস জিতেছেন, কিন্তু প্রথমে ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মাত্র ২৪ বার। এই ২৪ বারের ২০ বারই জিতেছে অস্ট্রেলিয়া।
২০তম জয় এল কাল। ৫৫ রানে প্রথম তিন ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে ফেলার ধাক্কা রস টেলর আর নিল ব্রুম মিলে সামলে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। ৭১ রানের জুটির পর ২০ রানের ব্যবধানে দুজনের বিদায় আবারও ঝামেলায় ফেলে দেয় নিউজিল্যান্ডকে। ষষ্ঠ উইকেটে স্টাইরিস-হপকিন্সের ৬৭ রানের জুটি আবারও কক্ষপথে ফেরায় স্বাগতিকদের। ৪০ ওভার শেষে নিউজিল্যান্ডের স্কোর ২০১/৫। কিন্তু আগের দুই ম্যাচের মতো শেষ ১০ ওভারে এবার আর ঝড় তুলতে পারেনি নিউজিল্যান্ড, উল্টো পরের সাত ওভারে ৪৪ রানে শেষ ৫ উইকেট হারিয়ে মাত্র ২৪৫ রানে অলআউট হয়ে যায় তারা। আগের ম্যাচে ঝড় তোলা ভেট্টোরি কাল রানের খাতা খোলার আগেই রানআউট।
নিউজিল্যান্ডও প্রথম উইকেটটা তুলে নিয়েছিল রানআউট করেই। ২৫ রানে শেন ওয়াটসনকে হারানোর পর পন্টিং-হাডিনের ওই জুটি। ১২১ বলে ৭টি চার আর ৫ ছক্কায় ১১০ রান করে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে হাডিন যখন ফেরেন, জয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার দরকার ছিল মাত্র ১৬ রান। নির্বিঘ্নে সেই কাজটা সেরে ফেলেন ভোজেস আর হোয়াইট। ওয়েবসাইট।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
নিউজিল্যান্ড: ৪৬.২ ওভারে ২৪৫ (ম্যাককালাম ২৩, ইনগ্রাম ৫, গাপটিল ২১, টেলর ৬২, ব্রুম ২৪, স্টাইরিস ৪১, হপকিন্স ৪৫, ভেট্টোরি ০, বন্ড ১১, সাউদি ১, ম্যাসন ২*; হ্যারিস ৩/৪৮, বলিঞ্জার ১/৩৯, জনসন ৩/৪১, হরিজ ০/৪০, হোপস ০/৪৯, ওয়াটসন ২/২৬)। অস্ট্রেলিয়া: ৪৭.২ ওভারে ২৪৮/৪ (ওয়াটসন ১৫, হাডিন ১১০, পন্টিং ৬৯, হাসি ৯, হোয়াইট ২৫*, ভোজেস ১৩*; বন্ড ০/৪৩, সাউদি ১/৪৩, ম্যাসন ১/৬৮, ভেট্টোরি ১/৩৬, স্টাইরিস ০/৪৩, গাপটিল ০/১৩)। ফল: অস্ট্রেলিয়া ৬ উইকেটে জয়ী।

হকি বিশ্বকাপের সেমিতে জার্মানি-নেদারল্যান্ড

হকি বিশ্বকাপে এশিয়ার আর কোনো প্রতিনিধি রইল না। নেদারল্যান্ডকে কাল ২-১ গোলে হারিয়েও সেমিফাইনালে যেতে পারল না দক্ষিণ কোরিয়া। সমান ১০ পয়েন্ট হয়েও গোল ব্যবধানে এগিয়ে থেকে পুল ‘এ’র দ্বিতীয় দল হিসেবে সেমিতে জায়গা করে নিল ডাচরা। কাল আগের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৫-২ গোলে হারিয়ে এই গ্রুপ থেকে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে জার্মানি।
পুল ‘বি’ থেকে আগের দিনই সেমিফাইনালে উঠে গিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া আর ইংল্যান্ড। আগামীকাল প্রথম সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড মুখোমুখি হবে জার্মানির। অস্ট্রেলিয়ার প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ড। স্বাগতিক ভারতের জন্য টুর্নামেন্টটা এখন সাত নম্বর হওয়ার লড়াই, পাকিস্তানের জন্য শেষ দল হওয়ার অপমান এড়ানো।

দল না পেয়ে ওদের অবসর

হকির বিশেষ দলবদলের জন্য তাঁরা এসেছিলেন ফেডারেশনে। কিন্তু দলবদল তো দূরের কথা, তাঁদের সঙ্গে দেখা করার জন্য কোনো ক্লাব কর্মকর্তার ছায়াও খুঁজে পাওয়া গেল না ফেডারেশনের বারান্দায়। তখনো তাঁরা অপেক্ষায়, কেউ না কেউ হয়তো আসবেন তাঁদের দলে নিতে। কিন্তু কোনো ক্লাব থেকে সাড়া না পেয়ে জাতীয় দল থেকে অবসরই নিয়ে ফেললেন পুলভুক্ত ছয় হকি খেলোয়াড় মশিউর রহমান (বিপ্লব), জাহিদ বিন তালিব (শুভ), খন্দকার হাসান, আবদুস সাজ্জাদ (জন), মোশারফ হোসেন (কুটি) ও রিমন কুমার ঘোষ।
জাতীয় দলের অধিনায়ক মশিউরের আক্ষেপ, ‘এভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব না। পুলের গ্যাঁড়াকলে পড়ে এখন পর্যন্ত কোনো দল পাইনি। আবাহনীর কাছ থেকে প্রস্তাব পেলেও চুক্তির অঙ্কটা আগের বছরের চেয়ে কম। তা ছাড়া আমি একা গেলে বাকিদের কী হবে? এসব ভেবেই আমরা সবাই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।’ পুলের খেলোয়াড়দের জন্য একটা কিছু ব্যবস্থা করা হবে—এমনই আশ্বাস দিয়েছিলেন ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার জামিলউদ্দিন। কিন্তু তিনি কাল বললেন, ‘আমার কিছুই করার নেই।’ তবে আগামী বছর থেকে এই পুলপ্রথা তুলে দিতে চান তিনি, ‘আমি আগামী কার্যনির্বাহী সভায় প্রস্তাব তুলব ভবিষ্যতে যেন পুল না রাখা হয়। পুলের জটিলতায় পড়ে খেলোয়াড়দের জীবন নষ্ট হোক, সেটা আমি চাই না। ফেডারেশন সভাপতিকে রাজি করিয়েছি। আশা করছি আগামী মৌসুম থেকে পুলপ্রথা থাকবে না।’

রিয়াল-মিলানের পরীক্ষার রাত

চ্যাম্পিয়নস লিগে আজ দুটি লড়াই। বার্নাব্যুতে রিয়াল মাদ্রিদ-অলিম্পিক লিওঁ, ওল্ড ট্রাফোর্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-এসি মিলান। এই চার দলকে এক সুতোয় বাঁধা কঠিন। বার্নাব্যু থেকে ওল্ড ট্রাফোর্ডের দূরত্বও কম নয়। তবে দু জায়গার লড়াই দুটো কিন্তু মিশে গেছে একই সূত্রে। দুটি ম্যাচেই আছে পেছন থেকে উঠে আসার প্রত্যয়। পার্থক্য শুধু বার্নাব্যুতে পেছন থেকে উঠে আসতে লড়বে স্বাগতিকেরা। আর ওল্ড ট্রাফোর্ডে এ কাজটা করবে সফরকারীরা।
এ ম্যাচের আগে রিয়াল ও মিলানের আরও একটি জায়গায় মিলে যাচ্ছে—দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম লেগে দুটি দলই এক গোলে পিছিয়ে। লিওঁর মাঠে ০-১ গোলে হেরে এসেছে রিয়াল, আর মিলান ম্যানইউর কাছে নিজেদের মাঠে হেরেছে ২-৩ গোলে। তবে রিয়াল আর মিলান দু দলেই বিশ্বাস, চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ আটে উঠবে তারাই।
রিয়াল গোলরক্ষক ইকার ক্যাসিয়াসের দৃষ্টিটা শুধু শেষ আটেই আটকে থাকছে না। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল পেরিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপার সোনালি ঝিলিকটাই দেখতে পাচ্ছেন তিনি। ম্যাচ-পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনটা ক্যাসিয়াস শুরুই করলেন এই দৃঢ় ঘোষণায়, ‘রিয়াল মাদ্রিদের লক্ষ্য শিরোপা। এ বছরে আবার আমাদের ইউরোপ শাসন করতে হবে।’
একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপার হাহাকার রিয়ালের অনেক দিনের। সর্বোচ্চ নয়টি ইউরোপ-সেরার মুকুট শোভা পাচ্ছে তাদের ট্রফি-কেসে। কিন্তু সর্বশেষ জেতা ট্রফিটায় ধুলোই জমে গেছে। সেই ২০০১-০২ মৌসুমে নবম শিরোপা জয়ের পর থেকে প্রতিবারই দশম শিরোপার স্বপ্ন নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ শুরু করে রিয়াল। কিন্তু সেই স্বপ্ন তো পূরণ হয়ইনি, গত ছয় বছর পেরোতে পারেনি শেষ ষোলর বাধাই।
এবার ঘটনা অন্য রকম হবে বলেই বিশ্বাস রিয়ালের মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর, ‘সবাই জানে এই ক্লাবটি একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপার জন্য কীভাবে অপেক্ষা করছে। নয়টি শিরোপা আছে, সবাই চায় দশম শিরোপা। এ বছরের ফাইনালটাও এখানে (বার্নাব্যুতে) হচ্ছে। আমি নিশ্চিত, আমরা শেষ ষোলর লড়াইটা পেছন থেকে এসে জিতে নিতে পারব। লিওঁকে বুঝিয়ে দিতে পারব, বার্নাব্যু আমাদের মাঠ।’
এসি মিলানের বিপক্ষে ম্যানইউও নিশ্চয়ই নিজেদের মাঠের এই সুবিধাটা পাবে। এসি মিলান কোচ লিওনার্দো এটা জানেন। তবে এই প্রতিবন্ধকতা জয় করেই শেষ ষোলোর লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসতে চান এই ব্রাজিলিয়ান, ‘ওখানে গিয়ে আমাদের শুধু নিজেদের খেলাটা খেলতে হবে। সুযোগগুলো কাজে লাগাতে হবে। আর ধীরস্থির থাকতে হবে আমাদের।’
লিওনার্দো যা চাইছেন—পেছন থেকে উঠে এসে শেষ ষোলর বৈতরণী পার হওয়া, এটা পেতে হলে তাঁকে তাকিয়ে থাকতে হবে তাঁরই স্বদেশি রোনালদিনহোর দিকে। সম্প্রতি পুরোনো জাদু কিছুটা হলেও ফিরে পেয়েছেন এসি মিলানের প্লে-মেকার। রোনালদিনহো নিজেও তাই আত্মবিশ্বাসী। অ্যাডিডাসের বিজ্ঞাপনের সুরে ঘোষণা করে দিলেন, ‘অসম্ভব বলে কিছু নেই।’
পেছন থেকে উঠে আসার সঙ্গে দুই ম্যাচে আছে দুটি ফেরার গল্প। ২০০৩ সালে ম্যানইউ ছাড়ার পর এই প্রথম ওল্ড ট্রাফোর্ডে ফিরছেন মেজর লিগ সকারের দল এলএ গ্যলাক্সি থেকে ধারে মিলানে খেলতে যাওয়া বেকহাম। আর লিওঁ ছাড়ার পর এই প্রথম পুরোনো দলের মুখোমুখি হচ্ছেন করিম বেনজেমা।

জার্মানি বলে কথা

ফুটবল হচ্ছে এমন একটা খেলা, ৯০ মিনিট ধরে একটা বলের পেছনে ২২ জন খেলোয়াড় ছোটাছুটি করে এবং অবশেষে জার্মানিই জেতে।
১৯৯০ বিশ্বকাপে জার্মানির কাছে সেমিফাইনালে হেরে যাওয়ার পর তিতিবিরক্ত ইংলিশ স্ট্রাইকার গ্যারি লিনেকার করেছিলেন এই অমর উক্তি। সুযোগ পেলেই লিনেকারের কথাটা সত্যি প্রমাণে ব্যস্ত হয়ে ওঠে জার্মানি। খেলায় সৌন্দর্য নেই, যান্ত্রিক ফুটবল, শরীরনির্ভর খেলা—এতসব সমালোচনা জার্মান ফুটবল ঘিরে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিনেকারের কথাই গিয়ে সত্যি প্রমাণ হয়, ‘জার্মানিই জেতে।’
আর তাই, এবার যখন ফেবারিটদের তালিকায় জার্মানির নাম উচ্চারিত হচ্ছে না, তখন সর্বশেষ বিশ্বকাপজয়ী জার্মান অধিনায়ক লোথার ম্যাথাউস মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০০২ বিশ্বকাপেও জার্মানিকে হিসাবের মধ্যে রাখেনি অনেকেই। তার পরও সেই জার্মানিই উঠে গিয়েছিল ফাইনালে।
জার্মানি ফেবারিট নয়—খোদ অধিনায়ক মাইকেল বালাকও বলছেন এই কথা। বাছাইপর্বে অপরাজিত থেকেই বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়ার পরও চেলসি মিডফিল্ডার বলেছেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের ধারাবাহিকতার অভাব আছে। শিরোপার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী দল নেই আমাদের। বিশেষ করে প্রীতি ম্যাচগুলোতে আমরা খুবই খারাপ খেলছি। বিশ্বকাপের ড্রতেও ভাগ্য আমাদের পক্ষে ছিল না। কঠিন একটা গ্রুপ পড়েছে আমাদের জন্য, যেখানে প্রতিপক্ষগুলো অস্বস্তিকর এবং শারীরিকভাবে খুবই শক্তিশালী।’
‘ডি’ গ্রুপে জার্মানির তিন প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ঘানা আর সার্বিয়া। এই তিন দলের বিশ্বকাপ রেকর্ড অবশ্য বালাকের কথাকে সমর্থন করে না। তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে খেলবে অস্ট্রেলিয়া, যাদের সর্বোচ্চ সাফল্য গত আসরে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়া। স্বাধীন একক রাষ্ট্র হিসেবে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলতে যাচ্ছে সার্বিয়া। ঘানার এটি দ্বিতীয় বিশ্বকাপ।
ফেবারিটের তকমা না থাকায় চাপমুক্ত হয়ে খেলার একটা সুবিধা আছে। কে জানে, বালাক সেই পথেই হাঁটছেন কি না। তাঁর চোখে ফেবারিট হলো ইংল্যান্ড, ‘দুর্দান্ত একটা দল ওদের। বেশ কজন খেলোয়াড় আছে অসাধারণ মানের। ফ্যাবিও ক্যাপেলোর মতো কোচও আছেন, দলের স্থিরতা এনেছেন যিনি।’ ফেবারিট হিসেবে ব্রাজিল, ইতালি, এমনকি ফ্রান্সের নামও উচ্চারণ করেছেন। কিন্তু জার্মানিকে ফেবারিট মানতে মোটেও রাজি নন তিনি, কারণ ‘এই মুহূর্তে আমাদের চেয়ে অনেকে ভালো দল আছে।’
জার্মানির মূল সমস্যা, তাদের খেলোয়াড়দের ফর্ম। দুই মূল স্ট্রাইকার লুকাস পোড্লস্কি আর মিরোস্লাভ ক্লোসা ভুগছেন গোল-খরায়। লিগে ২০ ম্যাচে মাত্র দুই গোল করেছেন পোড্লস্কি, ১৮ ম্যাচে এক গোল ক্লোসার। সবচেয়ে বড় সমস্যা গোলপোস্টের নিচের জায়গাটি নিয়ে। অলিভার কান আর জেন্স লেম্যানের পর বিশ্বস্ত কাউকে খুঁজেই পাচ্ছেন না কোচ জোয়াকিম লো। রবার্ট এনকের আত্মহত্যা পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গত ম্যাচে রেনে এডলারের ভুলে গোল খেয়ে বসার পর তাঁকে নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
সমস্যা আছেই। তার পরও জার্মানিকে বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়া হবে মস্ত বড় বোকামি। সবচেয়ে বেশিবার ফাইনাল খেলেছে তারা। সবচেয়ে বেশিবার সেমিফাইনাল কিংবা সেরা চার হওয়া দলও। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০—খেলেছে টানা তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে। লিনেকারের কথাটাই বুঝি সত্যি, ‘... শেষে জার্মানিই জেতে।’

এতেই খুশি অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশকে কিছু করতে হলে স্পিনারদেরই করতে হবে, সিরিজের আগে থেকেই এ নিয়ে জোর আলোচনা। ওয়ানডে সিরিজের পর এই ধারণা প্রতিষ্ঠিতই হয়ে গেছে। টেস্ট সিরিজের ১৪ সদস্যের দলে তাই তিনজন বাঁহাতি স্পিনার, অফ স্পিনারও দুজন। অথচ টেস্ট সিরিজের আগে একমাত্র প্র্রস্তুতি ম্যাচে প্রতিপক্ষ দলে প্রথম সারির কোনো বাঁহাতি স্পিনারকেই পেল না ইংল্যান্ড। প্রস্তুতি ম্যাচ, কিন্তু ইংলিশদের প্রস্তুতিটা হলো তো?
‘প্রস্তুতি ম্যাচ সব সময়ই কাজে লাগে। আমাদের ব্যাটসম্যানরা উইকেটে অনেকটা সময় কাটিয়েছে। ট্রট-বেলরা প্রথম মাঠে নেমেই রান পেয়েছে। চার পেসার খেলানোটাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ, ওদের দেখার সুযোগ পেলাম। প্র্যাকটিস যা হয়েছে, আমি সন্তুষ্টই’—বললেন ইংল্যান্ডের জিম্বাবুইয়ান কোচ অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার।
বাংলাদেশ ‘এ’ দলে কোনো বাঁহাতি স্পিনার তো খেলানো হলোই না, যে একজন পার্ট টাইমার ছিলেন, দ্বিতীয় ইনিংসে তাঁকে বোলিং করানো হয়েছে মাত্র এক ওভার। দ্বিতীয় ইনিংসে ইংল্যান্ডের ব্যাটিং করার জন্য যে পরিমাণ ছলাকলা করা হলো, তা কতটুকু কাজে লাগল, প্রশ্ন থাকতে পারে সেটা নিয়েই।
তবে এসব নিয়ে কিন্তু কোনো অভিযোগ, আফসোস বা আক্ষেপ নেই ইংল্যান্ড কোচের। মাশরাফি-আশরাফুল ছাড়া অনভিজ্ঞ বাংলাদেশ দল বা দলে কজন স্পিনার সেটা নিয়েও আগ্রহ নেই। ঘরের মাঠে বাংলাদেশের স্পিনারদের খেলাটা চ্যালেঞ্জিং হবে এটা মানছেন, কিন্তু এ নিয়ে ভাবছেন বলে মনে হলো না। লাঞ্চের সময় নেটে ৬ ওভার ও চা-বিরতির সময় তিন ওভার বোলিং করেছেন ইনজুরি আক্রান্ত স্টুয়ার্ট ব্রড। দলের মূল পেসারকে প্রথম টেস্টে পাবেন কি না বা অনিয়নসের ইনজুরি সারার লক্ষণ নেই, ফ্লাওয়ার চিন্তিত এসব নিয়েই।
প্রস্তুতি ম্যাচ থেকে অনেক ইতিবাচক দিক খুঁজে পেয়েছে ইংলান্ড, তবে জাতীয় দলের জন্য কী প্রেরণা দিতে পারল বাংলাদেশ ‘এ’ দল, সেটা জানা যায়নি। অধিনায়ক ছিলেন, কিন্তু এই ম্যাচে মোহাম্মদ আশরাফুলের এর চেয়েও বড় পরিচয় তো ছিল ‘পরীক্ষার্থী’! সেটাতে ব্যর্থ হওয়ার পর আর হয়তো কথা বলতে চাননি, পরে পাওয়া যায়নি ফোনেও। তবে মুখে কিছু না বললেও জাতীয় দলকে কিছু একটা কিন্তু দিতে পেরেছেন আশরাফুল। মেহরাবের সঙ্গে তাঁর পার্ট টাইম স্পিনের সাফল্য সাকিব-এনামুলদের জন্য বড় প্রেরণা হতে পারে টেস্ট সিরিজে।

রাজশাহীই পাচ্ছে শিরোপার সুবাস

এক দিন আগেই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছিল, জাতীয় লিগের ফাইনাল ম্যাচটি ড্র হলে আগের দুই রাউন্ডে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষে থাকা দল চ্যাম্পিয়ন হবে। কাল লিগের টেকনিক্যাল কমিটি সেই ভুল সংশোধন করে জানাল, শিরোপা নির্ধারণী সবকিছুই ফাইনাল-নির্ভর। জয়-পরাজয় হলে তো জেতা দলই চ্যাম্পিয়ন, ম্যাচ ড্র হলে শিরোপা পাবে ফাইনালের প্রথম ইনিংসে এগিয়ে থাকা দল।
বিসিবির টুর্নামেন্ট কমিটির ভ্রম সংশোধনের পর বদলে গেছে রাজশাহীর গেমপ্ল্যানও। প্রথম ইনিংসে ৭১ রানের লিড নেওয়া আছে। তাদের ‘জিতেই শিরোপা জয়ের’ লক্ষ্য তাই এখন অনেকটাই নমনীয়। কাল ম্যাচের চতুর্থ দিনশেষে দ্বিতীয় ইনিংসে ২ উইকেটে ১৭৭ রান তোলার পর অধিনায়ক খালেদ মাসুদের নতুন লক্ষ্য, ‘ফাইনালে জয় ছাড়া শিরোপা জিতবে না চট্টগ্রাম। আমরা তাদের সেই সুযোগ দেব না। লাঞ্চের আগে যদি বড় একটা লিড নিতে পারি তাহলেই কেবল ইনিংস ঘোষণা করব। ড্র হলেও তো শিরোপা আমাদেরই থাকবে।’
দুই ইনিংসে ২৪৮ রানের লিড নিয়ে আজ আবার ব্যাটিংয়ে নামবেন রাজশাহীর দুই ব্যাটসম্যান জহুরুল ইসলাম ও ফরহাদ হোসেন। ৪৫ রানে প্রথম উইকেট পড়ার পর দ্বিতীয় উইকেটে ওপেনার মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ১১৬ রানের জুটি গড়া জহুরুল দিনশেষে ৬৭ রানে অপরাজিত থেকে এখন লিগের সর্বোচ্চ স্কোরারও (৯১৫*)। এখনো এক ইনিংস কম খেলা চট্টগ্রামের ফয়সাল হোসেনকে (৮৮০) কালই টপকে গেছেন তিনি। এর আগে চট্টগ্রাম প্রথম ইনিংসে অলআউট হয়েছে ৩০১ রানে। রাজশাহীর সোহরাওয়ার্দী ৭৩ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট।

পার্লামেন্ট by সৈয়দ আবুল মকসুদ

যাঁরা লন্ডনে থাকেন অথবা সেখানে ঘন ঘন যাওয়া-আসা করেন, তাঁরা টেমস নদীর তীরে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভবনের ভেতরের মানুষদের সম্পর্কে ভালো জানেন। বাইরে রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ওই ভবনটি আমার একনজর দেখার সুযোগ হয়েছিল। ভবনটি আলিশান কি না, তার স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য কী, সেটা বড় কথা নয়। ওর ভেতরের অস্থায়ী বাসিন্দারা কেমন, সেটাই বিবেচ্য। কী কী কাজ তাঁরা কীভাবে করেন, কেমন তাঁদের আচার-আচরণ, দলের নেতার সম্পর্কে কণ্ঠে মধু ঢেলে হাত কচলে কী ভঙ্গিতে কথা বলেন এবং নিজেদের সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ওই কণ্ঠই বা কেমন বাঘের মতো গর্জে ওঠে, অথবা কচলানো হাত কীভাবে মহাবীর আলেকজান্ডারের তরবারির মতো শূন্যে উত্থিত হয়, তা দেখার সুযোগ পাইনি। তবে আরও কয়েকটি দেশের পার্লামেন্ট ভবন দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। বাংলার মাটিতেও পার্লামেন্ট ভবন দেখেছি। একটি নয়, দুটি। দূর থেকেও নয়, তার ভেতরে গিয়ে। নাখালপাড়ার নিচু বাড়িটি দেখেছি, শেরেবাংলা নগরে লুই আই কানের সুউচ্চ স্থাপত্যটিও দেখেছি। সবশেষে গিয়েছি বহুদিন পর এবার অর্থমন্ত্রীর বাজেট ঘোষণার দিন—সরকারের আমন্ত্রণে।
‘তিরিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে’ অর্জিত ‘বাংলার মাটি’র পার্লামেন্ট ভবনটি পৃথিবীর কনিষ্ঠ পার্লামেন্ট ভবনের একটি। মালয়েশিয়ার যে পার্লামেন্ট ভবন দেখেছি, তার বয়স লুই কানেরটির চেয়ে কম। জার্মান, ফরাসি ও ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবন দেখলে সমীহ হয়। তাকিয়ে দেখে আমার মনে হয়েছে, ওই সব দেশের সব মানুষের চেতনা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা পুঞ্জীভূত হয়ে আছে ওই ইমারতটির ইট-পাথরের মধ্যে। ইরান ও চীনের পার্লামেন্ট ভবন দেখে আমার অন্য রকম অনুভূতি হয়েছিল, সে কথা অন্য সময় বলব।
পৃথিবীর পার্লামেন্ট ভবনগুলো আমার চেয়ে বহুগুণ বেশি দেখেছেন বাংলার পার্লামেন্টের সদস্য—সংক্ষেপে এমপিরা। এমনকি তাঁদের কেউ ইসরায়েলের পার্লামেন্ট বা নেসেট (Knesset) ভবনটিও দেখেছেন, যদিও আমাদের রাষ্ট্রপতি ওই জঙ্গি রাষ্ট্রটিতে যাওয়ার অনুমতি বাংলাদেশের কোনো নাগরিককেই দেন না আমাদের পাসপোর্টে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী আওয়ামী লীগ এবং মুসলিম উম্মাহর নিশানবরদার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের দুজন বিশিষ্ট এমপি চুপিসারে অন্তত একবার তেল আবিব বেড়িয়ে এসেছেন। কত তারিখে তাঁরা গিয়েছিলেন, তা আমি বলব না। বলপেন গুঁতিয়ে খাই। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আমাদের সাহস না থাকতে পারে, চক্ষুলজ্জা আছে। তা ছাড়া ইসরায়েলের মনোরম নৈসর্গিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাওয়া এমপিদের একজন আজ পরলোকে। মৃত ব্যক্তির রেফারেন্স দিয়ে গালগল্পমূলক উপসম্পাদকীয় রচনা লেখা আমার স্বভাববিরুদ্ধ।
দেশের ভেতরে যখন এক দলের নেতারা আরেক দলের নেতাদের চিবিয়ে খান, ঢাকার রাজপথ উত্তাল, তখন আমাদের দুই এমপি একে অপরের হাত ধরে বাংলার মাটি থেকে গিয়ে ইসরায়েলের মাটিতে ঢুকে পড়েন। ওখানকার প্রকৃতির শোভা দেখে তাজ্জব হয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী হয়তো বলেছিলেন, ‘আহ্, কী সুন্দর দেশ! আমাদের সোনার বাংলাও এই রকম হবে।’ তাঁর মুসলিম জাতীয়তাবাদী সহকর্মীটি হাতে চাপ দিয়ে বলেছিলেন: ‘সোনার বাংলা আর পিতলের বাংলা, যা-ই করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি সংবিধানে যা কিছু বসাইয়া গেছেন তাতে হাত দিয়েন না।’
আজ দেশে দেশে যে পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি দেখছি, তার সূচনা ১৯৭৩ সালে বলে আমাদের বালক-বালিকাদের কেউ মনে করতে পারেন। আসলে তা ঠিক নয়। আধুনিক পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সূচনা বহু আগে। ৭০০ বছর তো হবেই! ব্রিটিশ পার্লামেন্টকে বলা হয় ‘মাদার অব পার্লামেন্টস’। কারণ প্রায় সব দেশের আধুনিক পার্লামেন্ট গঠিত হয়েছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের আদলে। পার্লামেন্টের আরেক নাম ‘লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি’ বা আইনপ্রণয়নকারী পরিষদ। আমাদের পার্লামেন্টের আমরা নাম দিয়েছি ‘জাতীয় সংসদ’।
আধুনিক পার্লামেন্টগুলোর রীতিনীতি ও কার্যক্রম ব্রিটেনের মাদার পার্লামেন্ট থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। স্পিকার মাঝবরাবর উঁচুতে বসা। তাঁর ডান দিকে সামনে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহকর্মীরা এবং বাঁ দিকে সামনে বিরোধীদলীয় নেতা ও তাঁদের দলের সদস্যরা। তবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অনেক অপ্রীতিকর ও বিয়োগাত্মক ব্যাপারই হয়েছে, কিন্তু বাঁ দিকের আসন বণ্টন নিয়ে কোনো দিন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়নি। তা থেকে সংসদ বর্জন তো নয়ই। ‘বর্জন’ শব্দটি ব্রিটিশদের অভিধানে অনেক কাল ছিল না।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টে কোনো সদস্য বক্তব্য দিতে চাইলে তিনি তাঁর হ্যাট খুলে আসন থেকে উঠে দাঁড়াননি এবং গলা ফাটিয়ে চেঁচামেচি না করে স্পিকারের অনুমতির অপেক্ষায় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওপর দিয়ে গত ৭০০ বছরে বহু ঝড় বয়ে গেছে। আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। আবার তা নির্মাণ করা হয়েছে একই জায়গায়।
১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথ মারা যাওয়ার মাস তিনেক আগে হিটলার ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ভবনে বোমা ফেলেন। ভয়াবহভাবে বিধ্বস্ত হয়। রবিবাবু ভয় পেয়ে যান। ভাবলেন, এই বুঝি ব্রিটিশ সভ্যতা শেষ হতে যাচ্ছে। সভ্যতার সংকটের কথা তাঁর মাথায় আসে। কিন্তু কোনো জাতির অদম্য মনোবল থাকলে যেকোনো ক্ষতি সে পুষিয়ে নিতে পারে। যুদ্ধের পরে একই জায়গায় পার্লামেন্ট ভবন পুনর্নির্মাণ করা হয়।
সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার ব্রিটেনেও বহুকাল নারীদের ভোটাধিকার ছিল না। ১৯১৮ সালে নারীরা ভোটাধিকার পান। তবে ৩০ বছরের বেশি বয়স্করাই ভোট দিতে পারতেন। ১৯২৮ থেকে নারী ভোটারদের বয়স কমিয়ে ২১-এ আনা হয়।
আমেরিকার কংগ্রেস বা সেখানকার পার্লামেন্ট সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলার দরকার নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ও প্রতিনিধি সভা সম্পর্কে বাঙালি যা জানে, তা আমেরিকার সাধারণ মানুষও জানে কি না সন্দেহ। আমাদের রাজনীতিকেরা নানা ব্যাপারে নালিশ নিয়ে ওখানকার কংগ্রেস সদস্যদের কাছেই ধরনা দেন।
প্রকৃতপক্ষে, অন্য দেশের পার্লামেন্ট সম্পর্কে কথা বলার অধিকার আমার নেই। যেটুকু জানি তা আমাদের দেশের পার্লামেন্ট সম্পর্কেই। প্রথম পার্লামেন্টের সদস্যরা কীভাবে নির্বাচিত হন, তা আমার খুব ভালোভাবে জানা আছে।
বাংলাদেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে শেষ অধিবেশনটি পর্যন্ত সবগুলোতেই উপস্থিত থাকার সুযোগ আমার হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনের প্রচারাভিযানে বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর অন্যান্য সহকর্মীর সঙ্গে সারা দেশ হেলিকপ্টারে ঘোরার সুযোগও হয়েছিল। ভারতের হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকার তুষার পণ্ডিত, স্টেটসম্যান-এর মানস ঘোষ, যুগান্তর-এর সুখরঞ্জন সেনগুপ্ত ও দিল্লির কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে থাকতেন।
নামমাত্র বিরোধী দল থাকলেও খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল কোনো কোনো আসনে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভাসানী ন্যাপ ও নবগঠিত জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের। এমন অনেকের জন্য বঙ্গবন্ধু সারা দেশ ঘুরেছেন, যাঁরা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনেও জয়ী হতে পারতেন না।
বিচারপতি ইদ্রিস ছিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। কিছু আসনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। তাঁরও বিশেষ কিছু করার ছিল না। বঙ্গবন্ধুর কথা আলাদা। তিনি ছাড়া আর যে দশজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, তা ছিল গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ভারতের পত্রপত্রিকায় তা নিয়ে কঠোর সমালোচনা হয়। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৯৩ আসনে জয়ী হয়। জাসদ পেয়েছিল গোটা তিনেক। ভাসানী ন্যাপ একটি এবং স্বতন্ত্র তিনটি আসন। বাংলাদেশে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের ভাগ্য ৭ মার্চ ১৯৭৩ নির্ধারিত হয়ে যায়।
বাঙালি জাতির ইতিহাসে প্রথম সংসদটির অধিবেশন বসেছিল নাখালপাড়ার বাড়িটিতে। প্রথম অধিবেশন বসে ৭ এপ্রিল। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংসদনেতা ও প্রধানমন্ত্রী। আতাউর রহমান খান বিরোধীদলীয় নেতা। সংসদে বিরোধী দলকে অণুবীক্ষণযন্ত্র দিয়ে দেখতে হতো। বঙ্গবন্ধু নিজের দলের ও বিরোধী দলের সদস্যদের সঙ্গে নানা রকম রসিকতা করতেন।
প্রথম সংসদ ছিল প্রাণহীন। বিরোধী দলের সদস্য জনা কয়েক হওয়ায় তাঁরা লম্বা বক্তব্যের সুযোগ পেতেন। তবে মনে পড়ে, সরকারি দলের কোনো কোনো সদস্য যেমন শাহ মোয়াজ্জেম প্রমুখ, বিশেষ করে সত্তর-একাত্তরের বিখ্যাত চার ছাত্রনেতার একজন যাত্রাদলের অধিকারীর মতো অনর্গল বঙ্গবন্ধুর প্রশংসা করে পার্লামেন্ট ভবন কাঁপিয়ে তুলতেন। স্পিকারের সাধ্য ছিল না তাঁকে থামান। যেদিন বাকশাল গঠিত হয়, সেই বিশেষ দিনে অবজারভার সম্পাদক ওবায়দুল হক, জনপদ সম্পাদক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও আরও কয়েকজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সম্পাদকের সঙ্গে আমিও গ্যালারিতে বসা ছিলাম। সেদিন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর পত্রিকায় এক সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, ‘দেশ এক অবৈধ গ্রাম্যতার দিকে’ যাচ্ছে। বিল পাস হওয়ার পরে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় তা নিয়ে আমাদের সঙ্গে রসিকতা করেন। সেদিন দুজন ছাড়া কোনো সদস্য বাকশাল গঠনের বিরোধিতা করেননি। পদত্যাগ করার তো প্রশ্নই আসে না।
পেটের দায়ে কাগজে নানা রকম রচনা লিখি।
অনেকে যাঁরা দেশ নিয়ে ভাবিত, ফোনে ও সশরীরে যোগাযোগ করেন। বিচিত্র বিষয়ে লেখার জন্য অনুরোধ করেন অথবা পরামর্শ দেন। দেশে বেশুমার সমস্যা, লেখার বিষয় অন্তহীন। সেদিন একজন অনুরোধ করলেন, উচ্চ আদালতের মাননীয় বিচারপতি রায় দিয়েছেন, ব্রিটিশ জেনারেল ক্রসওয়েলের মতো জেনারেল জিয়ারও মরণোত্তর বিচার হওয়া উচিত। মোশতাকেরও বিচার হওয়া দরকার। আপনার কলামে বিষয়টি নিয়ে শক্ত করে লেখেন।
পরামর্শদাতাকে আমি বললাম, খোন্কার সাহেবের বিচার ইতিহাস করেছে। ইতিমধ্যে বিধাতা তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছেন। ডালিম-ফারুকদের বিচার করেছে আওয়ামী লীগ সরকার এবং তাদের কারও কারও ফাঁসি হয়ে গেছে। কিন্তু আমার বিবেচনায় ১৫ আগস্টের বর্বরতার বিচার অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। আরও বেশ কিছু মানুষের বিচারকাজ বাকি আছে।
পরামর্শদাতা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন এবং বললেন, তাঁদের সঙ্গে মরণোত্তর হলেও জিয়ার বিচারও হওয়া দরকার।
আমি বললাম, না, জিয়ার নয়। তাঁর বিচার হবে পরে। তাঁর আগে অতি অল্প কয়েকজন বাদে ওই পার্লামেন্টের সব সদস্যের বিচার করতে হবে। আজ না হোক, একদিন হবে। কেউ না করলে ইতিহাস করবে। ইতিহাস তাঁদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেবে বিশ্বাসঘাতকতা ও বেইমানির জন্য।
তিনি বললেন, তারা কারা?
আমি বললাম, তাঁরা আমাদের প্রথম পার্লামেন্টের মাননীয় সদস্যগণ।
বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিল বলে ’৭৩-এর পার্লামেন্টের সদস্যরা সংসদ ভবনে প্রবেশ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। ফেব্রুয়ারির শীতের মধ্যে রাত-দিন কষ্ট করে বঙ্গবন্ধু তাঁদের জিতিয়ে এনেছিলেন। অধিকাংশ এমপিকে ছোট ভাই ও পুত্রের মতো স্নেহ করতেন। তা করুন বা না করুন, সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথ নিয়ে তাঁরা সংসদে ঢোকেন। বঙ্গবন্ধু যেদিন সপরিবারে নিহত হন, সেদিন তাঁদের সাংবিধানিক কর্তব্যটা কী ছিল? ওই দিন বা ১৬ আগস্ট তাঁরা সংসদ অধিবেশনে বসে সংবিধান রক্ষা করলেন না কেন? কেন তাঁরা ডালিম-ফারুকদের ভৃত্যে পরিণত হলেন? কেন তাঁরা ঢাকা থেকে পালিয়ে গিয়ে কেউ দূর-সম্পর্কের চাচাশ্বশুরের বাড়ির গোয়ালঘরে আশ্রয় নিলেন, কেউ গেলেন বঙ্গভবনে মোশতাকের শীর্ণ পায়ে হাত বোলাতে?
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর ৫৯ ঘণ্টা পর ১৭ আগস্ট বিকেল চারটার দিকে আমি জাওয়াদুল করিমের সঙ্গে বঙ্গভবনে গিয়েছিলাম। আরও সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ছিলেন। সেখানে কাদের দাঁত বের করা হাসি দেখেছি, তা বলা সম্ভব নয়। প্রতিমন্ত্রী হওয়ার জন্য কারা তাহেরউদ্দিন ঠাকুরের পায়ে পড়েন, তা তাঁরা ভুলে গেলেও অনেকেই ভোলেননি। এই হলো প্রথম পার্লামেন্টের সদস্যদের কথা।
দ্বিতীয় পার্লামেন্টেও আমি প্রথম দিন থেকেই ছিলাম। সেখানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ২০৭টি আসন, আওয়ামী লীগ (মালেক উকিল) ৩৯, মুসলিম লীগ ১২, জাসদ আট, ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (ছদ্মবেশী জামায়াত) আট, আওয়ামী লীগ (মিজান চৌধুরী) দুটি আসন পায়। দ্বিতীয় সংসদ জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বেইমানি করেনি, কিন্তু গণতন্ত্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ওই সংসদই বেগম খালেদা জিয়াকে একাধিক বাড়ি ও ১০ লাখ টাকা দেয়। ওই সংসদের সদস্যরাই এরশাদ যেদিন (২৪ মার্চ, ১৯৮২) ক্ষমতা দখল করেন, সেদিন গভীর নীরবতা অবলম্বন করেন। প্রতিবাদ করেননি, বরং সন্ধ্যার দিকে কেউ কেউ এরশাদের আত্মীয়স্বজন ও বান্ধবীদের কাছে গিয়ে ধরনা দিয়েছেন।
অর্থাৎ মেয়াদ পূরণের আগেই আমাদের প্রথম ও দ্বিতীয় সংসদের সদস্যরা স্বৈরশাসকদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। সেই স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করে আমাদের সংবাদপত্র।
খবরের কাগজের রচনা লেখক না হয়ে যদি বড় পুলিশ কর্মকর্তা হতাম, তাহলে আল্লাহকে হাজের নাজের মেনে বলতাম, বাংলার মাটিতে পার্লামেন্টের সদস্যরা মানুষ খুন না করলেও গণতন্ত্র হত্যার সহায়তাকারীর ভূমিকাটা সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছে। কিন্তু ১৯৪৮ সালে ‘উর্দু অ্যান্ড উর্দু শ্যাল বি দ্য...’-এর সময় থেকে আজ পর্যন্ত বাংলার মাটির সংবাদপত্র কোনো স্বৈরশাসককেই ছাড় দেয়নি। সংবাদপত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের সঙ্গে থেকে লড়াই করে বলপেন দিয়ে—পিস্তল, চাপাতি ও রামদা দিয়ে নয়। জনগণের দেওয়া রক্তের ওপর দিয়ে হেঁটে একদল মানুষ লুই আই কানের নকশা করা লাল বাড়িতে গিয়ে ওঠেন। সাংবাদিকেরা শপথ নেন না, তাই শপথ ভঙ্গের প্রশ্ন আসে না; মাননীয় এমপিরা দিব্যি শপথ ভঙ্গ করেন। যাঁদের গণতন্ত্র সংহত করতে ও রক্ষা করতে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করার কথা, তাঁরা গণতন্ত্র হত্যায় সহায়তা করেন।
‘মুক্তিযুদ্ধ’ ও ‘৩০ লাখ’—শব্দগুলো যাঁদের ঠোঁটের আগায় লেগে থাকে সারাক্ষণ, তাঁদের আমি হাতজোড় করে প্রশ্ন করতে চাই, সেই ৩০ লাখের মধ্যে পার্লামেন্টের মেম্বর আছেন কতজন? সাংবাদিক খুব বেশি নেই, তবে জনা পনেরো তো আছেনই। যেমন শহীদ সাবের, সিরাজুদ্দীন হোসেন, নিজামউদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নাজমুল হক, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, এম এ মান্নান, আবুল বাশার—সব থোকা থোকা নাম।
লাল বাড়ির প্রকাণ্ড ঘরে দাঁড়িয়ে যাঁদের হাত বল্লমের মতো ঝলসে ওঠে সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে বিষ উদিগরণ করতে গিয়ে, সেই মাননীয়দের আমি সবিনয়ে জিজ্ঞেস করতে চাই, একাত্তরে কয়জন পার্লামেন্টের মেম্বারের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল? তারা ২৫-২৬ মার্চ গণহত্যা শুরুর প্রথম প্রহরেই দ্য পিপল, সংবাদ ও ইত্তেফাক-এর অফিস-ছাপাখানা পুড়িয়ে দেয়। লেখক-সাংবাদিক শহীদ সাবের পুড়ে কয়লা হন। সেদিন কোনো এমপি কয়লা হয়েছিলেন কি?
ষোলোই ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজী রেসকোর্সের ঘাসের মধ্যে গিয়ে হাঁটু ভেঙে না বসলে আরও অন্তত ১০০ সাংবাদিকের ঠাঁই হতো রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে। সংবাদপত্রের ‘নেতিবাচক’ ভূমিকা নিয়ে পৌনে দুই ঘণ্টা বক্তব্য দেওয়া সবাইকে মানায় না। সংবাদমাধ্যম সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণা নেই, তাদের আরও মানায় না। কোনো সংস্কৃতিমান মানুষ কার্টুনকে ভয় করে না। রাশিয়ায় গিয়ে পোল্যান্ডের যে রাষ্ট্রপতি বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হলেন কিছুদিন আগে, তাঁর সরকারকে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল বড় রকমের অর্থনৈতিক সাহায্য দিতে চেয়েছিলেন। তা নিয়ে জার্মান পত্রিকায় কার্টুন হয়েছিল, পোলিশ নেতাকে কোলে বসিয়ে মেরকেল দুধ দিচ্ছেন। ওই অশ্লীল কার্টুনের জন্য সম্পাদককে জার্মান পার্লামেন্ট ভবনে তলব করার দাবি ওঠেনি। প্রিন্সেস ডায়ানার ছেলে উইলিয়ামের বাবা কে, তা নিয়ে সংবাদপত্র প্রশ্ন তুলেছে। ওই সম্পাদককে ওয়েস্টমিনস্টার হলে তলব করার দাবি করেননি কোনো ব্রিটিশ এমপি।
কোনো সভ্য দেশের পার্লামেন্টে মাননীয়রা ক্ষমতাহীন সাংবাদিকদের নিয়ে যা খুশি তা-ই আলোচনা হয় না। বলা হচ্ছে, কয়েকজন এমপি ও মন্ত্রী সংবাদমাধ্যমকে গালাগাল করেছেন, সকলে নন। কথাটা আমি মেনে নিতে নারাজ। একজনও তো প্রতিবাদ করেননি বা তাঁদের থামিয়ে দেননি। মৌন সম্মতি সকলের রয়েছে, তা বোঝার জন্য বড় মাথার দরকার হয় না।
হিটলারের পার্লামেন্ট প্রথমেই সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত হানে। মুসোলিনির ইতালির অবস্থাও তাই। যেসব সাংবাদিক সভা-সমাবেশ কাভার করেন, তাঁরা জানেন, আমি সব সময় আমাদের সংবাদমাধ্যমের অসংগতি ও ভুলভ্রান্তির সমালোচনা করি। সাংবাদিকেরা দোষত্রুটির ঊর্ধ্বে নন। ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর সংবাদ পত্রিকা করতে পারে। তার জন্য প্রেস কাউন্সিলে নালিশ করা যায়। প্রেস কাউন্সিলই সম্পাদক ও প্রতিবেদককে তলব করবে। পার্লামেন্টের মেম্বাররা তলব করলে তা কেমন জমিদার বা দারোগাগিরি মনে হয়। ৩৬ বছর আমি সংবাদমাধ্যমে ছিলাম। কাগজের সম্পাদকও ছিলাম। তাই সম্পাদকদের যখন কোনো কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে, তখন তা আমার গায়ে এসে বিঁধে।
পার্লামেন্ট রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। প্রতিনিধিস্থানীয় মানুষেরাই সেখানে যান। জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, জনগণের সুখ-দুঃখ-বেদনা, জাতির ভবিষ্যৎ ও দেশের স্বার্থসংক্রান্ত বিষয় সেখানে আলোচিত হবে। ব্যক্তিগত আক্রোশ প্রকাশের জায়গা পার্লামেন্ট নয়। যত কষ্টই পাই, আশা করি, আমাদের সংসদও একদিন একটি আদর্শ পার্লামেন্টে পরিণত হবে।
সৈয়দ আবুল মকসুুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।