Saturday, July 4, 2015

বাবার বয়সী স্বামীর সাথে ৬ বছরের বালিকার বিয়ে!

ছয় বছরের শিশু। এ বয়সে ভালো করে কলমই ধরতে পারে না- বড় একটি সংসারের হাল ধরবে কীভাবে? বাল্যবিবাহ আর কুসংস্কারের জাঁতাকলে ওই বয়সের এক শিশুর গলায় উঠল বিয়ের মাল্য, হাতে পড়ল ভারী চাবির গোছা। আশ্চর্যের বিষয়, বরের বয়স তার বাবার সমান, ৩৫ বছর। অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ভারতের রাজস্থানের। গত ২৩ জুন চিতোরগড়ের গাংরা গ্রামের এক মন্দিরে গোপনে রতন লাল জাঠের (৩৫) সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় শিশুটিকে। রতন লাল গাংরা গ্রাম কাউন্সিলের নির্বাচিত একজন সদস্য। এক বিবাহিত নারীর সঙ্গে রতন লালের সম্পর্ক ছিল।
তাই বিয়েতে ‘নাটা প্রথা’ (একজন পুরুষ বিবাহিত কোনো নারীর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে পারবেন যত দিন তিনি তার ভরণপোষণ দেন) সম্পন্ন করা হয়।
অবিবাহিত রতন লাল গোপনে সব রীতি-নীতি মেনে বিবাহের পিঁড়িতে বসেন। তিনিও কনের পরিবারের কাছ থেকে বিরাট অঙ্কের যৌতুক নিয়েছেন বলে খবরে বলা হয়েছে। যদিও শিশুটির পরিবারের যৌতুকের অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
তবে শেষরক্ষা হয়নি। পুলিশ ঠিকই খবর পেয়ে আটক করে রতন লালকে। সেই সঙ্গে নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন। সদর মহকুমা শাসকের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে দ্রুত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কমিটিকে।
গাংরার পুলিশ পরিদর্শক জ্ঞানেন্দ্র সিং বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে বিয়ের ছবি ছড়িয়ে পড়লে ঘটনা তদন্তে একটি দল পাঠানো হয়। পরে সত্যতা নিশ্চিত হলে রতন লালকে ‘বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন-২০০৬’ এর অধীনে আটক করা হয়।
তিনি আরো জানান, বয়স বেড়ে যাওয়ায় পাত্রী খুঁজে পাচ্ছিলেন না রতন লাল। তাই নিজের সম্প্রদায়ের মধ্যেই ওই মেয়েটিকে বিয়ে করেছেন বলে জেরার মুখে তিনি স্বীকার করেন।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের খবরে জানানো হয়, রাজস্থানের এই সম্প্রদায়ের মধ্যে এ ধরনের বিয়ের রেওয়াজ আছে। তাই প্রতিবেশীরাও বিয়ে বন্ধের চেষ্টা করেনি।
রাজস্থানের পুলিশ জানায়, বিয়েতে দালালি করেন ৫১ বছরের জামুনি ভাই। এ জন্য তিনি প্রায় তিন হাজার টাকা ঘুষ নেন। তাকে খুঁজছে পুলিশ। শুধু এ বিয়েই নয়, গাংরায় এমন আরো বাল্যবিবাহের ঘটকালিও তিনি করে থাকেন।
তথ্যসূত্র : মিরর

ভ্রান্ত ভাবনা, ভুল পথ, সর্বনাশা পরিণতি by আবুল মোমেন

বাঙালি ও মুসলমান—এ দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর এ দুটি প্রধান পরিচয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য সাধনের সচেতন চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়। কিন্তু এ নিয়ে সমাজে বিতর্ক, বিভ্রান্তি, বিভক্তি ও সংঘাতের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো যাচ্ছে না। এখনো নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসলাম তুরুপের তাস হিসেবে গণ্য হয়। মানুষের যাপিত জীবনে নিজ নিজ ধর্ম ও ধর্মসংস্কৃতির ভূমিকা ব্যাপক। সব মানুষই নিজ নিজ মাতৃভাষা ও জন্মভূমির দানে সমৃদ্ধ হয়। ফলে কোনো সমাজে ভাষাভিত্তিক অঙ্গীকার ও সংস্কৃতি এবং ধর্মভিত্তিক বিশ্বাস ও সংস্কৃতি যদি পরস্পরকে খারিজ করে দেওয়ার প্রবণতায় ভোগে, তবে সেটা অকারণ বিভ্রান্তি ও বিতর্ক জিইয়ে রেখে শেষ পর্যন্ত সামাজিক বিকাশ ও জাতীয় উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণ, আলোকিত শিক্ষিত সমাজ গঠন, জাতীয় উন্নয়নে অভীষ্ট গতিসঞ্চার—সবই মন্থর ও স্থবির হয়ে পড়ছে।
একসময় বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা ভাষায় অমুসলিম লেখকদের প্রাধান্যের কারণে ইসলামি চেতনার অগ্রাধিকারের দোহাই দিয়ে এসব সম্পর্কে বিরূপ প্রচারণা চলেছে। ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী দুই দশকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এ দেশের সাধারণ মানুষ গ্রহণ করায় ইসলামি রক্ষণশীলদের ভাষাসংক্রান্ত সাংস্কৃতিক কট্টরপন্থা কালে কালে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কিন্তু এ নিয়ে কখনো তাত্ত্বিক আলোচনা হয়নি। ভাষাসংস্কৃতির অগ্রগামিতা সহজ ও নিশ্চিত হয়েছে মূলত পাকিস্তানি শাসকদের বাঙালির প্রতি (যার সিংহভাগ ধর্মে মুসলমান) সুস্পষ্ট বৈষম্য ও লাগাতার নিপীড়ন-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও ক্রমবর্ধমান সংগ্রামের কারণে। এই সংগ্রামে বিজয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের অনুষঙ্গ হিসেবেই বাঙালি সংস্কৃতির বিজয়ও ছিল স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এতে কট্টরপন্থীদের মনের খুঁতখুঁতানি কাটেনি। বাঙালি হতে বা বাঙালি মুসলমান পরিচয়ে তাদের কুণ্ঠা থেকে যায়।
বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে আমমানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির একটি সহজ কারণ হলো এর সঙ্গে সংস্কৃত (ও প্রাকৃত) ভাষার যোগ, যে ভাষায় হিন্দুধর্মীয় শাস্ত্রগুলো রচিত; এ ভাষার প্রথম ও প্রধান শিল্পীরা প্রায় সবাই ধর্মত হিন্দু, যা মূলত ঐতিহাসিক কারণে ঘটেছে, ধর্মীয় কারণে নয়। আমরা লক্ষ করব, বাংলার মধ্যযুগ (এবং ভারতবর্ষেরও) ইউরোপের মতো অন্ধকার নয়। এ সময় মুসলিম সুলতানেরাই বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে আনুকূল্য জুগিয়েছেন।
প্রথম যুগের মুসলিম আরব যোদ্ধারা বিজিত দেশে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের ভাষা হিসেবে আরবি প্রচলন করতে চেয়েছেন। দেখা গেছে, ধর্মান্তরকরণ যত সহজ, ভাষান্তরিত করা তত সহজ নয়। ফারসি ভাষা আরব যোদ্ধাদের সব জবরদস্তি উপেক্ষা করে টিকে গেছে। এর কারণ, এ ভাষায় উন্নত জনপ্রিয় সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল, যা ব্যাপক মানুষের নৈমিত্তিক চর্চার অংশ হয়ে পড়েছিল। আজও দেখা যাবে, বৃহত্তর পারসিক সাংস্কৃতিক ভূমিতে—সে বাকু থেকে কাবুল, বোখারা থেকে ইস্তাম্বুল, ইস্পাহান থেকে ফ্রুঞ্জে সর্বত্র—অভিজাত-নিম্নবর্ণ পণ্ডিত-মূর্খ সবাই শ্রেষ্ঠ কবিদের দু-চার পঙ্ক্তি আওড়াতে পারেন। সেই সব সাহিত্য সব সময় তৌহিদি পন্থার শর্ত শতভাগ হয়তো পূরণ করে না।
বাংলা ভাষায় প্রচুর ভাবের গান, আধ্যাত্মিক গান রয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের খেটে খাওয়া মানুষকে যুগ যুগ ধরে ভাবুকতার খোরাক দিয়ে এসেছে। আবার পরবর্তীকালে দেশবন্দনার কাব্য ও গানও রচিত হয়েছে দেদার। ফলে বহুকালে বাঙালির এমন এক ভাবুক আধ্যাত্মিক শাশ্বত মন তৈরি হয়েছে, যা তাকে সহজাতভাবে ভাব আর সুরের রসিক করে তুলেছে। কাব্য ও গানের সূত্রে বাঙালির ভাবের ঘরে একান্ত দেশজ আদল বেশ শক্ত স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। এখানেও নিতান্ত ঐতিহাসিক কারণেই এই ভাব-সুরসম্ভারে হিন্দুদের অবদানই প্রথম এসেছে, হয়তো আজও বেশিই আছে। কিন্তু কালের নিয়মে কি সাহিত্য কি সংগীত, সবতাতেই ইসলামের প্রভাব পড়েছে, আরবি-ফারসি ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে, আর মুসলমান কবি ও সুরশিল্পীর আবির্ভাবও ঘটেছে স্বাভাবিকভাবে। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য বা বাঙালি সংস্কৃতিকে আর কোনোভাবেই নিরঙ্কুশভাবে হিন্দুর বলে ভাবা যাবে না, এটা হিন্দু-মুসলিমের যৌথ সৃষ্টি।
ভাষা ও সাহিত্যের বিষয়ে কিছুটা হাল ছাড়লেও সংগীতের ব্যাপারে কিছু কট্টরপন্থী বলতে চান, ইসলামে সংগীত বেদাত। সংগীতের মূল ভিত্তি হলো সুর। আর যখন সুললিত কণ্ঠে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত বা আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে কান খাড়া করে তা শুনতে হয়। কারণ, সুরের আবেদন সর্বজনীন। পবিত্র কোরআন বা আজানের বক্তব্য কেবল মুসলমানের কাছেই গ্রাহ্য হলেও সুর এমন এক বিমূর্ত ভাষা, যা সব মানুষের, এমনকি প্রাণীদেরও প্রভাবিত করতে সক্ষম।
মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, সব সৃষ্টির মালিক আল্লাহ। তাহলে মানবজীবনে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী, মানবমনকে শান্ত, সুস্থ, সমাহিত করার গুণসম্পন্ন এমন সৃষ্টিকে কেন তাঁরা উপেক্ষা করবেন? হ্যাঁ, বান্দার জন্য পরীক্ষা হলো, এই মহৎ সৃষ্টিকে তার সুমহান রূপেই সে ব্যবহার করবে, নাকি এর অপব্যবহার, অপচয় করবে। এটা ব্যক্তির এবং সেই সঙ্গে সমাজের রুচি, দক্ষতা ও ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে কে কীভাবে সম্পদকে ব্যবহার করবে। এ ধরনের হীনতাকে অপসংস্কৃতি আখ্যা দিয়ে সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশে কাজ করাই হলো সঠিক পথ।
তাই মুসলমানদের বিপরীতমুখী অবস্থানে দাঁড় করানোর প্রয়াসগুলো বস্তুত যুক্তিযুক্ত নয়। আরেকটা কথাও মনে রাখা ভালো, আরব ভূমি মূলত শুষ্ক মরু অঞ্চল, প্রচণ্ড উত্তাপ ও ভয়াবহ লু হাওয়া আর ধূলিঝড় বয়ে যায়। তাপ, লু, ধূলি আর বাতাসের শুষ্কতা থেকে আত্মরক্ষার জন্য সে দেশে নারী-পুরুষ সবাইকে জোব্বাজাতীয় পোশাক পরতে দেখা যায়। সেখানকার মুসলমান যেমন, তেমনি খ্রিষ্টান, ইহুদি সবাই এই পোশাকই পরে। (বর্তমান উন্নতির যুগে ব্যাপক ধনাগমেনর ফলে সর্বত্র ব্যাপকভাবে এসি এসেছে এবং পোশাকেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।) আমাদের এই উষ্ণমণ্ডলীয় দেশের বাতাসে আর্দ্রতা বেশি এবং বৃষ্টির প্রাচুর্যও বেশ। আর সর্বত্র নদীনালা ছড়ানো। এ ধরনের ভ্াপসা গরমে গায়ে বাতাস পেলে আরাম হয়। তাই আমাদের দেশে নিজস্ব যে পোশাকগুলো উদ্ভাবিত প্রচলিত হয়েছে, যেমন: লুঙ্গি, ধুতি, শাড়ি, চাদর, গামছা—সবগুলোই খোলামেলা, যাতে গায়ে বাতাস খেলতে পারে। কোনোটাই আঁটসাঁট নয়, নদীনালা জলা-কাদা ভেঙে পথ চলতে ওঠানো-নামানোর জন্য বেশ উপযোগী।
সংসারে মানুষকে একদিকে যেমন ঔচিত্যবোধ থেকে কাজ করতে হয়, তেমনি অন্যদিকে উপযোগিতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়। কী উচিত, তার সঙ্গে কী উপযোগী, তাকেও মেলাতে হয়।
স্বর্গচ্যুত মানুষের বসত মর্ত্যে, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভাষাসংস্কৃতির বৈচিত্র্যও ব্যাপক। জলবায়ু ও প্রকৃতির ওপর বস্তুত মানুষের হাত নেই। দেখা যাচ্ছে, এদের ওপর বেশি খোদকারি করলে আখেরে বিপর্যয় হয়, যা ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে সামলানো কঠিন। পৃথিবীকে জলবায়ু ও প্রকৃতির দিক থেকে একাকার করা যাবে না—এটা বান্দার কর্ম নয়। এটাও বোঝা গেছে, মানবজাতির ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও ঘুচবে না। মানুষের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এই বিবিধ বৈচিত্র্য নিয়ে পরস্পর শান্তিতে সহাবস্থান করা।
যুদ্ধবিগ্রহ চালিয়ে অপরকে পদানত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের দিন বহুকাল আগে শেষ হয়ে গেছে। এখন কোনো যুদ্ধই নিষ্পত্তি হয় না, চলমান থাকে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সমাপ্ত হলে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, যুদ্ধকে জয় করা গেছে, শান্তিকে নয়।
সংঘাত ও যুদ্ধের কারণগুলো জিইয়ে রাখলে কখনো শান্তি আসবে না, সমৃদ্ধিও নয়। সেটাই ধর্মসম্মত কাজ, যা বিদ্বেষ ও আক্রোশের চর্চাকে নিরুৎসাহিত করবে, বরং বোঝাপড়া ও স্থিতিশীলতার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলায় ইংরেজ শাসন শুরু হওয়ার পর ঊনবিংশ শতকে এখানে একটি কালান্তরের সূচনা হয়েছিল। মুসলমান নেতৃত্ব সেদিন তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ধরতে পারেনি, তাদের ব্যর্থতার চড়া খেসারত গুনতে হয়েছে এ দেশের সাধারণ মুসলমানকে। এর জের আজও শেষ হয়নি। আজ পৃথিবী ও মানবসমাজ আরেক কালান্তরের সামনে। এবার ভূমণ্ডল ও মানবসমাজ ব্যাপক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। অর্থনীতি খোলামেলাভাবে আগ্রাসী হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের ধরন পাল্টে দিচ্ছে, ভূরাজনীতিতে নতুন শক্তিকেন্দ্র ও ভিন্ন টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভূমি ও পানির লড়াইকে আড়াল করতে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের বুলি ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পুরোনো চিন্তা ও রাজনীতির খোলস ভাঙতে না পেরে আরব ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোয় একদিকে শাসকেরা সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ হয়ে এজেন্টের কাজ করছে, আর নানান কট্টর দল ওদেরই পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আত্মঘাতী হানাহানিতে নেমেছে। এই হলো নির্বোধের ক্রোধকে পুঁজি করে তার ওপর প্রভুত্ব দীর্ঘায়িত করার পুঁজিবাদী কৌশল।
দ্রুত পরিস্থিতি অনুধাবন করা দরকার। পরিবর্তনগুলো এবং এদের প্রভাব কত গভীর ও ব্যাপ্ত হতে পারে, তা বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। বিরোধ ও বিবাদের চর্চায় লিপ্ত না হয়ে সংহতি ও সম্প্রীতির সুযোগগুলো এখনই কাজে লাগাতে হবে। বাঙালি ও মুসলমানে বিরোধ হওয়ার কারণ নেই। আরবি শুধু সুন্নি মুসলমানের ভাষা নয়, আরবিভাষী শিয়াদের বাস আছে বাহরাইন, ইরাক, সিরিয়া এবং সব আরব দেশে। নানা মত-পথের খ্রিষ্টানও আছে আরবিভাষী, ইহুদিও রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, চীন, শ্রীলঙ্কা, বসনিয়াসহ কত দেশেই অনারব মুসলমান রয়েছে, যাদের মাতৃভাষা ভিন্ন ভিন্ন।
ইসলামের নবীর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে প্রথম যে বাণীটি আসে, তা একটিমাত্র শব্দ—ইকরা (পড়ো)। পঠন হলো জ্ঞানের চাবি। জ্ঞানের নির্যাস বলা হয় পবিত্র কোরআনকে। তার গভীরতা ও ব্যাপ্তির সঠিক এবং কালোপযোগী ব্যাখ্যার সামর্থ্য যদি কোনো জনগোষ্ঠী হারিয়ে ফেলে একে কেবল একটি মুখস্থ করে আওড়ানোর গ্রন্থ মনে করে, তবে এ গ্রন্থ থেকে সমকালীন জীবনকে চালিত ও সমৃদ্ধ করার রসদ তারা খুঁজে পাবে না। তাদের জ্ঞানরাজ্য হবে মৃত এবং তারা হয়ে পড়বে তামাদি। তারা পিছিয়ে যেতে থাকবে। এ পরিস্থিতিতে স্বভাবতই পরাজিতের মনের ক্রোধ ও প্রতিহিংসায় নিজেরা জ্বলতে থাকবে এবং শত্রু তৈরি করে ঝাল ঝাড়বে। এভাবে সাম্রাজ্যবাদের তেমন ক্ষতি তারা করতে পারবে না, ভ্রাতৃঘাতী হানাহানিই সার হবে। এটা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি।
আমরা কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য এ রকম পরিণতি কামনা করি না।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।

বিশ্বের একটি বাস-অযোগ্য শহর থেকে বলছি... by আনিসুল হক

আজকাল এমন হয়েছে, হরতাল বা অবরোধের মধ্যেও যানজট হয়, আর কোনো একটা দিন যদি রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে স্বাভাবিক দিন পাওয়া যায়, তাহলে সেই দিনে রাস্তাঘাটের হাল হয়ে ওঠে ভয়াবহ। ঢাকা শহরে ভীষণ যানজট লেগে যায়। ঢাকার বাইরেও অনেক শহরে যানজট এখন বড় সমস্যা। আর মহাসড়কগুলোতেও লেগে যায় মাইলের পর মাইল যানজট। কয়েক দিন পরেই ঈদ উপলক্ষে লোকে ছুটবে যার যার বাড়িতে, মহাসড়কগুলোয় তাদের আট ঘণ্টার পথে আটকে থাকতে হতে পারে দেড় দিন পর্যন্ত।
এখন ঢাকার যা অবস্থা, এটা একেবারে গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়, স্বাভাবিক দিনে যানজট হবে অস্বাভাবিক রকম। একটা কারণ সবাই জানি, আমাদের রাস্তার পরিমাণ ৮ ভাগ, এটা হওয়া উচিত ২৫ ভাগ। কিন্তু উন্নত দেশে, যেখানে রাস্তার পরিমাণ বেশি, সেখানে কি যানজট বাধে না? নিউইয়র্কে খুব যানজট হয়!
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের সহপাঠী ছিলেন সুকমল মোদক। সিভিল ডিপার্টমেন্টে আমাদের ক্লাসে তিনি ছিলেন ফার্স্টবয়। এখন সান ফ্রান্সিসকো এলাকায় থাকেন। বছর কয়েক আগে আমি সান ফ্রান্সিসকো গেলে তিনি আমাকে তাঁর বাসায় নিয়ে যাবেন। আমাকে বললেন, তুমি কি ট্রেনে করে অমুক স্টেশন পর্যন্ত আসতে পারবে? আমি তা-ই করলাম। তারপর তাঁর গাড়িতে উঠে তাঁর বাড়িতে গেলাম। ড. মোদক (http://www.bdiusa.org/sukomal-modak-ph-d) বললেন, এই যে তুমি ট্রেনে এলে, এর বদলে ধরো তুমি একটা গাড়িতেই তোমার হোটেল থেকে রওনা হলে, তাহলে তোমার অন্তত এক-দেড় ঘণ্টা বেশি সময় লাগত, কারণ এই সময়টায় ভীষণ যানজট হয়! এরপর সুকমল মোদক আমাকে যে কথাটা বলেছেন, অত্যন্ত মেধাবী ও উচ্চশিক্ষিত এই প্র্যাকটিসিং ইঞ্জিনিয়ারের কথাকে আমি মূল্যবান বলে মনে করি—রাস্তার পরিমাণ তুমি যতই বাড়াও না কেন, গাড়ির পরিমাণ তার চেয়ে বেশি হবে। কাজেই সড়কপথে যানজট হবেই।
আসলেই তো। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত উন্নততর হচ্ছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হতে চায়। এই অবস্থায় কয়েক লাখ টাকা হলেই আমরা যা করি, একটা গাড়ি কিনে ফেলি। না কিনে উপায়ও নেই, কারণ আমাদের দেশে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বলতে প্রায় কিছুই নেই। আমাদের নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত ক্যাটাগরিতে ওঠার প্রতীক হলো একটা গাড়ি থাকা। রাস্তা নেই। কিন্তু গাড়ি আছে। ঢাকার রাস্তায় আছে শুধু গাড়ি আর গাড়ি। গাড়ি আছে, কিন্তু নেই কোনো পরিকল্পনা, নেই পরিকল্পনার সমন্বয়। আপনি কারওয়ান বাজারের ভেতরের রাস্তাগুলো দেখুন, প্রশস্ত পথ, কিন্তু দুই পাশে তার অর্ধেকটা দখল করে রেখেছে নানা ধরনের দোকান, তার পরের অংশটা ব্যবহার করা হচ্ছে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য, ৮০ ফুট রাস্তার ৬০ ফুট বেদখল, আর কুড়ি ফুটে কোনোরকমে দুটো গাড়ি চলাচলের চেষ্টা করছে, তার মধ্যে দুটো দাঁড়িয়ে পড়েছে পার্কিং না পেয়ে, কাজেই বসে থাকতে হচ্ছে। রাস্তা অচল হয়ে পড়ে থাকছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আগে ঢাকার কোনো কোনো রাস্তায় রিকশা চলাচল নিষেধ ছিল, অবরোধের পর ওই নিষেধাজ্ঞা আর কেউ মানে না। একই রাস্তায় নানা গতির যান। হাঁটারও জায়গা নেই, কারণ সবগুলো ফুটপাত বেদখল। আর আছে সমন্বয়হীনতা। একটা মাস্টারপ্ল্যান আছে, ঢাকা মহানগরের যোগাযোগ নিয়ে, কিন্তু যখন কোনো প্রকল্প করা হয়, সেই মাস্টারপ্ল্যান মাথায় রাখা হয় না, ইচ্ছেমতো ফুটওভার ব্রিজ, ইচ্ছেমতো ফ্লাইওভার করা হচ্ছে। র্যাংগস ভবন ভেঙে বানানো নতুন রাস্তাটা বিজয় সরণির মোড়ে যানজট বাড়িয়েছে। খেয়ালখুশিমতো নতুন রাস্তা বা ফ্লাইওভার বানালেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটা সামগ্রিক পরিকল্পনা ধরে এগোতে হবে, যে কাজটা বিদেশি তহবিল খরচ করে সুন্দর করে তৈরি করা আছে। আবার সেটা নিয়ে বসলে বিশেষজ্ঞরা ঢাকার যানজট সমস্যা সমাধানের একটা সামগ্রিক পরিকল্পনা হালনাগাদ করে দিতেও পারবেন।
ঢাকার একটা বড় সমস্যা—অতিরিক্ত জনসংখ্যা। সবকিছু এখন ঢাকামুখী। ঢাকার বাইরে থাকলে নাকি ছেলেপুলেদের লেখাপড়া হয় না। বলি, আমরা ঢাকার বাইরে পড়াশোনা করিনি? আমরা কি মানুষ হইনি? উপজেলা শহর, জেলা শহর আর বিভাগীয় শহরগুলোকে স্বাবলম্বী করারও একটা মহাপরিকল্পনা নিয়ে এগোনো দরকার, দরকার ঢাকামুখী জনস্রোত বন্ধ করার। দিনাজপুরের আশপাশে দেখলাম অনেকগুলো বোর্ডিং স্কুল হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগেই। আমাদের রাজশাহী কিংবা রংপুর হোক না শিক্ষার শহর, সিরাজগঞ্জ কিংবা ময়মনসিংহ বিখ্যাত হোক না চিকিৎসার জন্য!
আর যা-ই করি না কেন, বাংলাদেশের যোগাযোগব্যবস্থা হতে হবে নৌপথ ও রেলপথনির্ভর। আমাদের আরেক বন্ধু স্থপতি ইকবাল হাবিব অবশ্য খুব জোর দেন ঢাকার রাস্তায় হাঁটার সুবিধা করে দেওয়ার ওপরে। তিনি বলেন, ভূগর্ভস্থ রেলও এই শহরের যোগাযোগ স্বাভাবিক ও সুন্দর করতে পারবে না, কারণ এখনো বেশির ভাগ মানুষ হেঁটে চলাচল করে এবং তাদের ভূগর্ভস্থ রেলের টিকিট কেনার সামর্থ্য থাকবে না। আর আমার দুটো চিন্তা আছে, ঢাকা শহরে প্রায় চার লাখ রিকশা চলে, আর গত বছর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এক খবরে সংখ্যাটা বলা হচ্ছে আড়াই লাখ, যার বেশি ভাগ অনুমোদনহীন। মানুষ রিকশা টানে, এটাকে আমার অমানবিক বলে মনে হয়, কাজেই আমাদের একটা গবেষণা হওয়া উচিত বিদ্যুৎ–চালিত ছোট যানবাহন প্রবর্তনের, যার গতি থাকবে ভালো, যা হবে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী। এটা প্রবর্তন করে রিকশা ঢাকা শহর থেকে তুলে দিতে হবে, আজ হোক, কাল হোক। ঢাকা শহরে চার লাখ রিকশা চালান আট লাখ রিকশাওয়ালা। দ্বিতীয় চিন্তা হলো ঢাকা শহরের তৈরি পোশাকের কারখানাগুলোকে একটা মেয়াদের পরে সরিয়ে দেওয়া। আমাদের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক আসে বিদেশ থেকে, তৈরি হয়ে পোশাক যায় বিদেশে, কিন্তু কারখানাগুলো কেন ঢাকায়, তার উত্তর আমার জানা নেই। চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের কাছাকাছি বড় গার্মেন্টস জোন করে দেওয়া যায় নাকি? এই দুটো জিনিস করা গেলে ঢাকা শহর থেকে মানুষের চাপও কমবে অনেকটাই।
আমাদের রাস্তা বাড়াতে হবে, ফুটপাত বাড়াতে হবে, ফ্লাইওভার বানাতে হবে, কিন্তু আমরা যত রাস্তাই বানাই না কেন, গাড়ির সংখ্যা রাস্তার ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি হবেই, কাজেই আমাদের যোগাযোগব্যবস্থাটা নৌপথ ও রেলপথভিত্তিক করতেই হবে। আর তা নিয়ে মাস্টারপ্ল্যান ধরে নতুন করে এগোনোর সময় এখনই।
আমার গত সপ্তাহের গদ্যকার্টুনে ঢাকার যানজট আর জলজট নিয়ে খানিকটা কাব্যিপনা করেছিলাম। যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টন থেকে শ্রদ্ধেয় প্রকৌশলী ও সংবাদপাঠক সিরাজুল মজিদ মামুন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমি আপনার লেখার সাহিত্যগুণ নিয়ে কথা বলব না। আমি হিউস্টনে এসেছি ফুসফুসের চিকিৎসা নিতে আর এসে আটকে পড়েছি। দুই সপ্তাহ আগে চার ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, যানবাহন জলমগ্ন হয়ে পড়ে, চার ঘণ্টা লেগেছিল সেই পানি নেমে যেতে।
‘তারও দুই সপ্তাহ আগে নুরুল আলম চৌধুরী নামের একজন প্রবাসী বাংলাদেশি কাজ থেকে ফিরছিলেন গাড়ি নিয়ে। হঠাৎ আসা বৃষ্টির ঢলে তার গাড়ি ভেসে যায় এবং তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
ঢাকা ও চট্টগ্রামের নিষ্কাশনব্যবস্থা খারাপ। তবে হিউস্টনের মতো খারাপ নয়।’
একটুখানি বৃষ্টি হলেই ঢাকা বা চট্টগ্রামের রাস্তা যে জলমগ্ন হয়, তার অনেক কারণ আছে। আমরা সব নিচু জায়গা ভরাট করেছি। মিরপুরের রূপনগরে প্রশিকা ভবনের পেছন দিকে একটা বিল ছিল চার বছর আগেও, জল টলমল করত, এখন সেটার পুরোটাই দখল করে বাঁশের ঘরবাড়ি বানানো হয়েছে, তারপর বড় রাস্তা থেকে দেয়াল তুলে সেসব জায়গায় হচ্ছে বহুতল ভবন, এটা আমি নিজের চোখে দেখছি, অথচ আমাদের আইন আছে জলাধার ভরাট করা যাবে না। নগরে জলাবদ্ধতার আরেকটা কারণ আমরা বড় বেশি রাস্তায় ময়লা ফেলি এবং পলিথিন ও প্লাস্টিকের ব্যবহার। এসব না হলে সাধারণ বৃষ্টিতে রাস্তায় পানি জমার কথা নয়, বেশি বৃষ্টি হলে আধঘণ্টা-এক ঘণ্টার মধ্যেই পানি নেমে যাওয়ার কথা, অনেক জায়গায় যায়ও।
আমাদের সহপাঠী সুকমল মোদকের আরেকটা পর্যবেক্ষণ ও উদ্বেগের কথা আপনাদের জানিয়ে রাখি। বাংলাদেশের মানুষ নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত হচ্ছে, হলেই তারা তাদের টিনের ঘরটাকে ইটের ঘর বানাতে চাইবে, খুব স্বাভাবিক। মধ্য আয়ের দেশের মানুষের সবার বাড়ি যদি ইটের হয়, তাহলে বাংলাদেশের সব মাটি পুড়িয়ে ইট বানাতে হবে, দেশের পরিবেশের তাহলে বারোটা বেজে যাবেই। ড. মোদক তাই গবেষণা করছেন, ইটের বিকল্প গৃহনির্মাণসামগ্রী কী হতে পারে।
অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অনেকগুলো সমস্যা আসবে, নদীদূষণ, বন ধ্বংস, কৃষিজমি ধ্বংস, জলাভূমি ভরাট—যে দেশ চলে লুণ্ঠনতন্ত্র দিয়ে, সে দেশে এগুলো অনেক বড় সমস্যাই বাধাবে। এমনিতেই ঢাকা পৃথিবীর বসবাস-অযোগ্য শহরের তালিকায় এক–দুই নম্বরে ওঠানামা করছে কয়েক বছর ধরে। সেখান থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আর একমুহূর্ত দেরি না করে সমন্বিত সমাধানের পথ তৈরি করতে হবে, প্রতিটা সমস্যারই কারিগরি সমাধান আছে, দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দূরদর্শিতা। ঢাকা পৃথিবীর সবচেয়ে বাস-অযোগ্য শহর হতে পারে, কিন্তু এত সুন্দর দেশ, এত ভালো মানুষের দেশ আমরা আর কোথায় পাব? এই দেশে জন্মেছি, এই দেশেই মরতে চাই, মরার আগে এই দেশটাকে সুন্দর দেখতে চাই, সুন্দর করে গড়ে তুলতে অবদান রাখতে চাই, আমরা সবাই।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

স্নোডেন কি সত্যিই ‘বিশ্বাসঘাতক’? by মশিউল আলম

স্নোডেন–সমর্থকদের সমাবেশ
রুপার্ট মারডকের মালিকানাধীন ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য সানডে টাইমস গত রোববার প্রথম পাতায় একটা বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করে পশ্চিমা সংবাদজগতে বেশ হইচই ফেলে দিয়েছে। ‘ব্রিটিশ স্পাইজ বিট্রেইয়েড টু রাশানস অ্যান্ড চায়নিজ’ শিরোনামের প্রতিবেদনটির মূল বক্তব্য হলো, রুশ ও চীনা কর্তৃপক্ষ আমেরিকান জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার (এনএসএ) হুইসেল ব্লোয়ার এডওয়ার্ড স্নোডেনের চুরি করা ‘টপ সিক্রেট’ শ্রেণির বিপুল তথ্যভান্ডার হস্তগত করেছে। সেসব তথ্য থেকে তারা জেনে গেছে ব্রিটিশ ও আমেরিকান গোয়েন্দাদের নামধাম, অবস্থান এবং তাঁরা কী পদ্ধতিতে কাজ করেন। ফলে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্স তাদের গুপ্তচরদের প্রাণের নিরাপত্তার স্বার্থে শত্রু মনোভাবাপন্ন দেশে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা মিশন থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে এবং সংস্থাটির গোয়েন্দা কার্যক্রমে বিরাট সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
এই প্রতিবেদনের তথ্যগুলো সত্য হলে তার তাৎপর্য বিরাট। প্রথমত, এর মাধ্যমে প্রমাণিত হবে যে স্নোডেন তাঁর স্বদেশের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার বিপুল পরিমাণ টপ সিক্রেট তথ্য চুরি করে শত্রুপক্ষের হাতে তুলে দিয়েছেন, অথবা তথ্যগুলো শত্রুপক্ষের হস্তগত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ ‘বিশ্বাসঘাতক’, ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ ইত্যাদি যেসব অভিযোগপূর্ণ অভিধায় তাঁকে আমেরিকার কর্তাব্যক্তিরা অভিহিত করে আসছেন, স্নোডেন তা-ই প্রমাণিত হবেন। ফলে স্বদেশে স্নোডেন তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা হারাবেন। যাঁরা তাঁকে নাগরিক স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার পক্ষের এক লড়াকু সৈনিক ও জাতীয় বীর বলে মনে করেন, তাঁরা তাঁকে ঘৃণা করবেন। আর সবচেয়ে গুরুতর কথা হলো, তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত গুপ্তচরবৃত্তি-সংক্রান্ত আইনের অধীনে যে মামলা করা হয়েছে, তাতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হবেন, সর্বোচ্চ দণ্ডে দণ্ডিত হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হবে।
এটা হচ্ছে একটা দিক, যা শুধু ব্যক্তি স্নোডেনের পরিণতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্য দিকটা এর থেকে অনেক বড়। সেটা হলো, স্নোডেনের ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ সত্য বলে প্রমাণিত হলে আমেরিকা ও ব্রিটেনের সরকার ও রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেক সুবিধা হবে। স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের পর থেকে উভয় দেশে প্রবল জনমতের চাপে গোয়েন্দা কর্মসূচি সংস্কার করার যেসব উদ্যোগ শুরু হয়েছে, সেগুলো ঠেকিয়ে দেওয়ার পক্ষে অনেকে যুক্তি খুঁজে পাবেন। তাঁরা বলতে পারবেন, সংস্কারের প্রয়োজন নেই, বরং স্নোডেনের মতো ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ যেন আর কেউ করতে না পারে, সে লক্ষ্যে গোয়েন্দা কার্যক্রম আরও প্রবল ও প্রসারিত করা দরকার।
স্নোডেন–সমর্থকদের সমাবেশ
কিন্তু সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদনটিতে এমন কোনো সাক্ষ্য–প্রমাণ নেই, যার দ্বারা প্রমাণিত হতে পারে যে স্নোডেন সত্যিই বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে হইচই হচ্ছে প্রধানত সে কারণেই। প্রথমত, সানডে টাইমস প্রতিবেদনটিতে যেসব তথ্যসূত্র উল্লেখ করেছে, তাঁরা সবাই ‘নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক’ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা: কেউ ডাউনিং স্ট্রিট অর্থাৎ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের, কেউ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের, কেউ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর। সূত্রদের কেউ বলেছেন, রুশ ও চীনারা স্নোডেনের তথ্যভান্ডারের গোপন কোড ভেঙে (হ্যাক করে) সেগুলো হস্তগত করেছে এবং পড়েছে। কেউ মন্তব্য করেছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন বিনা প্রতিদানে স্নোডেনকে রাশিয়ায় আশ্রয় দেননি। অর্থাৎ, এই সূত্র বলতে চেয়েছে, স্নোডেন নিজেই গোপন তথ্যভান্ডারটি রুশদের হাতে তুলে দিয়েছেন এবং সে কারণেই রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন। স্নোডেন যে আগাগোড়াই দাবি করে আসছেন তিনি তথ্যগুলো সংবাদমাধ্যমকে ছাড়া আর কাউকে দেননি এবং সংবাদমাধ্যমকে দেওয়ার পর তিনি নিজের কাছে কোনো কপিও রাখেননি—সানডে টাইমস এ কথা উল্লেখ করেনি।
সানডে টাইমস ওই প্রতিবেদনে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের বক্তব্যই তুলে ধরেছে, তাঁদের কাছে কোনো সাক্ষ্য–প্রমাণ দাবি করেনি, তাঁদের বক্তব্যগুলোর যথার্থতা যাচাই করেনি। যে কর্মকর্তা বলেছেন, রুশ ও চীনারা হ্যাক করে স্নোডেনের তথ্যভান্ডার নিজেদের ব্যবহারযোগ্য করেছে, সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদকেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা করেননি তিনি এটা কীভাবে জানতে পেরেছেন। সানডে টাইমস দাবি করেছে, স্নোডেন মোট ১৭ লাখ গোপনীয় তথ্য চুরি করে ডাউনলোড করেছেন, কিন্তু এই দাবির পক্ষেও কোনো সাক্ষ্য–প্রমাণ দেয়নি। বরং এনএসএর পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে, তারা নিজেরাই জানে না স্নোডেন কী পরিমাণ গোপনীয় তথ্য নিজের ল্যাপটপে ডাউনলোড করে থাকতে পারেন। আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, স্নোডেনের হাতে রক্তের দাগ লেগে আছে, অর্থাৎ স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের ফলে ব্রিটিশ বা মার্কিন কোনো গোয়েন্দা শারীরিকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। কিন্তু আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, কেউ আক্রান্ত হয়েছেন এমন তথ্য তাঁরা পাননি।
গার্ডিয়ান-এর সাবেক মার্কিন প্রতিবেদক গ্লেন গ্রিনওয়াল্ড, যিনি স্নোডেনের দেওয়া গোপন তথ্যভান্ডারের ওপর ভিত্তি করে ২০১৩ সালে ওই পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন লিখেছিলেন, তিনি সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদনটিকে নিকৃষ্ট ধরনের সাংবাদিকতার দৃষ্টান্ত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি দ্য ইন্টারসেপ্ট নামের এক অনলাইন পত্রিকায় লিখেছেন, সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদনটি মিথ্যায় ভরপুর, এটা স্নোডেনের মুখে কালিমা লেপনের উদ্দেশ্যে মিথ্যা প্রচারণা। তিনি তাঁর দীর্ঘ লেখাটিতে সানডে টাইমস-এর ওই প্রতিবেদনের অন্তঃসারশূন্যতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। গার্ডিয়ানও সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদনটি সম্পর্কে বেশ কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যা থেকে মনে হয়, রুপার্ট মারডকের এই পত্রিকাটি ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ করে স্নোডেনকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টা করেছে। প্রতিবেদনটির শিরোনামের মধ্য দিয়ে সানডে টাইমস স্নোডেনকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছে, কিন্তু এর পক্ষে জোরালো সাক্ষ্য–প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট বা গার্ডিয়ান-এর মতো কোনো সংবাদপত্র স্পষ্টতই এমন আচরণ করত না। বরং এই পত্রিকাগুলো স্নোডেনের তথ্য ফাঁসের পেছনে নাগরিক অধিকার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার তাগিদের কথাই তুলে ধরে আসছে, এবং বলার চেষ্টা করছে যে স্নোডেনের তথ্য ফাঁস একটা বড় ‘পাবলিক সার্ভিস’।
সানডে টাইমস ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব প্রোপাগান্ডা মেশিনের ভূমিকা নিয়ে এডওয়ার্ড স্নোডেনের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার যে অপচেষ্টা করেছে, তা সফল হওয়ার নয় সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদনটি যে দুরভিসন্ধিমূলক, এটি প্রকাশের সময়টা লক্ষ করলেও তা মনে হয়। স্নোডেন তাঁর চুরি করা তথ্যভান্ডার মস্কো পৌঁছার পরেই রুশদের হাতে তুলে দিয়েছেন এমন অভিযোগ উঠেছিল আজ থেকে অন্তত ১৮ মাস আগেই। তখন স্নোডেন এ অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন, সাংবাদিকদের হাতে তথ্যভান্ডারটি তুলে দেওয়ার পর তাঁর কাছে আর এমন কিছু নেই, যা তিনি রুশদের দিতে পারেন। দেড় বছর পর সানডে টাইমস আবার সেই পুরোনো অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ব্রিটেনের সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদন ফেঁদে বসল কেন?
ব্রিটেনে যাঁরা নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার পক্ষে আন্দোলন করছেন, তাঁরাও এই প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ, ব্রিটেনে এখন গোয়েন্দা নজরদারিব্যবস্থার সংস্কারের দাবি উঠেছে; কিছুদিন আগেই ডেভিড অ্যান্ডারসন কিউসি নামে এক স্বাধীন পর্যালোচক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের নির্দেশে ব্রিটেনে প্রচলিত সন্ত্রাসবাদ দমনসংক্রান্ত আইনগুলো পর্যালোচনা করে প্রায় পৌনে ৪০০ পৃষ্ঠার এক প্রতিবেদন পেশ করেছেন, যেখানে তিনি বিদ্যমান আইনগুলোকে অগ্রহণযোগ্য ও অগণতান্ত্রিক বলে মন্তব্য করে বেশ কিছু সংস্কারের সুপারিশ করেছেন। এতে ব্রিটিশ সরকার অসুবিধায় পড়েছে, কারণ তারা আইনগুলো সংস্কার করতে চায় না। গোয়েন্দা নজরদারি বিষয়ে একটা বিল আসছে শরতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উঠবে, তখন সংস্কারের দাবিতে প্রবল বিতর্ক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সানডে টাইমস-এর ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পেছনে দুরভিসন্ধি খুঁজে পাচ্ছেন অনেকেই।
ব্রিটেনের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সানডে টাইমস স্নোডেনের বিরুদ্ধে যে পুরোনো অভিযোগগুলো নতুন করে উত্থাপন করেছে, সেগুলো আমেরিকায় উঠলে একটু কম অবাক হতাম। কারণ, স্নোডেনের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা আমেরিকায় হওয়াই বেশি যুক্তিযুক্ত। তিনি ওই দেশের নাগরিক, বিশ্বাসঘাতকতা করে থাকলে ওই দেশের সরকারের সঙ্গে করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা আছে আমেরিকাতেই এবং সুযোগ পেলে তাঁকে শূলে চড়াবে আমেরিকাই। কিন্তু সানডে টাইমস-এর এই প্রতিবেদনের তথ্যগুলোর ব্যাপারে হোয়াইট হাউস এখন পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করেনি, দেশটির মূলধারার সংবাদমাধ্যমেও এটা নিয়ে তেমন হইচই নেই। সম্ভবত আমেরিকায় বেশির ভাগ মানুষ ধরে নিয়েছে, সানডে টাইমস কোনো ট্যাবলয়েড পত্রিকার মতো একটা চাঞ্চল্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, যার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করার দরকার নেই।
সানডে টাইমস ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব প্রোপাগান্ডা মেশিনের ভূমিকা নিয়ে এডওয়ার্ড স্নোডেনের ভাবমূর্তি কালিমালিপ্ত করার যে অপচেষ্টা করেছে, তা সফল হওয়ার নয়। স্নোডেন যখন হংকংয়ে অবস্থান করছিলেন, তখন নিন্দুকেরা বলেছিলেন তিনি চীনাদের গুপ্তচর, তথ্যভান্ডারটি তিনি চীনাদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তারপর তিনি যখন মস্কো ও কিউবা হয়ে একুয়েডরে যাওয়ার পথে তাঁর দেশ তাঁর পাসপোর্ট বাতিল ঘোষণা করার পরে তিনি মস্কো বিমানবন্দরে আটকে গিয়ে রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় চাইলেন, তখন বলা হলো, তিনি রুশদের গুপ্তচর, ওই তথ্যভান্ডার রুশদের হাতে তুলে দেওয়ার বিনিময়ে রাশিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় চাইতে প্রেসিডেন্ট পুতিনের কাছে গেছেন। সুতরাং সানডে টাইমস নতুন কোনো গল্পই আর বানাতে পারেনি; সে শুধু নিজের এবং সেই সঙ্গে কিছুটা ব্রিটিশ সাংবাদিকতারও ভাবমূর্তির ক্ষতি করেছে।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

ইসরায়েলে রকেট হামলা আইএসের

মিসরের সঙ্গে সীমান্তে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ইসরায়েলি সেনারা
ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে জড়িত একটি গোষ্ঠী মিসরের সিনাই উপত্যকা থেকে গতকাল শুক্রবার ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে রকেট হামলা চালিয়েছে। এতে কেউ হতাহত হয়নি। আজ শনিবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
‘সিনাই প্রভিনস’ নামের জঙ্গিগোষ্ঠীটি টুইটারে এক বিবৃতিতে দাবি করে, দখলকৃত ফিলিস্তিনের ইহুদি অবস্থানে তারা তিনটি রকেট ছুড়েছে। আইএস অধিভুক্ত জঙ্গিগোষ্ঠীটির ভাষ্য, সিনাইয়ের উত্তরাঞ্চলে সামরিক তল্লাশিচৌকিতে হামলার পর মিসরের সেনাবাহিনীকে সমর্থন দেওয়ায় ইসরায়েলে রকেট ছোড়া হয়েছে।
ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্রের ভাষ্য, সিনাই থেকে ছোড়া দুটি রকেট ইসরায়েলি ভূখণ্ডের ভেতরে বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে এতে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
গত বুধবার সিনাইয়ে কয়েকটি তল্লাশিচৌকি ও একটি থানায় জঙ্গিরা হামলা চালায়। এরপর তাদের সঙ্গে মিসরের নিরাপত্তা বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ হয়। এতে কমবেশি ৭০ সেনা ও শতাধিক জঙ্গি নিহত হয়েছে।
জঙ্গিদের অবস্থানে বোমা ফেলে ওই হামলার জবাব দিচ্ছে মিসরীয় বিমানবাহিনী। সিনাই জঙ্গিমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুই ছাত্র কলেজে ভর্তি হতে পারবে না? by প্রণব বল

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী দুই ছাত্রের কলেজে ভর্তি হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য এবার প্রতিবন্ধী কোটা না থাকায় আবেদন করার সময়ই তারা বিভ্রান্তিতে পড়ে। পরে শিক্ষা কোটায় আবেদন করে। দুজনের একজন চট্টগ্রাম কলেজে, অন্যজন হাজেরা তুজ ডিগ্রি কলেজ শিক্ষা কোটায় ভর্তির জন্য বিবেচিত হয়। কিন্তু কোটার শর্ত পূরণ না করায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের ভর্তি করাচ্ছে না।
দুই ছাত্রের মধ্যে একজন বিশ্বজিৎ বসাক বান্দরবান সুয়ালেক উচ্চবিদ্যালয় আর আল আমিন চট্টগ্রাম নগরের রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছে। দুজনই মানবিক বিভাগের ছাত্র। বিশ্বজিতের জিপিএ ৪.২৮ আর আল আমিনের ৩.৮৯।
ভর্তি-প্রক্রিয়ায় এবার জেলা কোটা, শিক্ষা কোটা ও মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকলেও প্রতিবন্ধী কোটা ছিল না। কোন কোটায় আবেদন করবে, তা বুঝতে না পেরে শিক্ষা কোটায় আবেদন করে দুজন।
ভর্তির এই অনিশ্চয়তা নিয়ে দুই ছাত্রের অভিভাবকেরাও উদ্বিগ্ন। বিশ্বজিতের মা সীমা বসাক বলেন, ‘কষ্ট করে ছেলে পড়ালেখা করল। এত সীমাবদ্ধতা নিয়ে ছেলে এসএসসি পাস করার পর অনেক খুশি হয়েছিলাম। কিন্তু এখন ভর্তি হতে পারছে না। আমার ছেলের শিক্ষাজীবন কি এখানে থেমে যাবে?’
শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষা কোটাটি কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সন্তানদের জন্য। এই দুই ছাত্রের কেউ ওই কোটায় পড়ে না।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কলেজের মানবিক বিভাগের ভর্তি কমিটির আহ্বায়ক সহযোগী অধ্যাপক ফরিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘সে (বিশ্বজিৎ) আবেদনের সময় ভুল করেছে। তারা শিক্ষা কোটায় ভর্তির জন্য আবেদন করেছে। প্রতিবন্ধী কোটা নেই। এখন তাদের বিষয়ে আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেব? আমাদের এ ক্ষেত্রে কিছু করার নেই।’
এ বিষয়ে বিশ্বজিৎ বসাক জানায়, প্রতিবার প্রতিবন্ধী কোটা থাকলেও এবার ভর্তিতে কোটা ছিল না। তাই সে শিক্ষা কোটায় আবেদন করে। এই কোটায় তার নাম এলেও ভর্তি হতে দিচ্ছে না কলেজ।
নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচটি পছন্দের কলেজের নাম দিয়ে আবেদন করে হাজেরা তুজ ডিগ্রি কলেজে ভর্তির জন্য বিবেচিত হয় আল আমিন। কিন্তু ১ জুলাই ভর্তি হতে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কেন সে সাধারণ (জেনারেল) কোটায় আবেদন করেনি, তা জানতে চাওয়া হয়।
আল আমিন বলে, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই পাস করতে হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের। এখন সে কী করবে বুঝতে পারছে না।
এ বিষয়ে হাজেরা তুজ ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ কুতুব উদ্দিন বলেন, শিক্ষা কোটায় আবেদন করায় কলেজ কর্তৃপক্ষ তাকে ভর্তি করাতে পারছে না। তবে বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় তাকে চট্টগ্রাম বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন তাঁরা।
ভুক্তভোগী দুই ছাত্র জানায়, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে এবার চার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে। তারাও শিক্ষা কোটায় আবেদন করেছিল।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কলেজ উপপরিদর্শক মো. হালিম প্রথম আলোকে বলেন, ভর্তির নীতিমালায় প্রতিবন্ধীদের জন্য এবার কোনো কোটা রাখা হয়নি। তবে সব কলেজকে তাদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করতে বলা হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সাধারণ কোটায় আবেদন করতে হবে। তবে কলেজ কর্তৃপক্ষ চাইলে তাদের ভর্তি করাতে পারে। এতে বোর্ডের কোনো আপত্তি থাকবে না। এ ছাড়া এই দুজনকে খালি আসনে আবেদনের মাধ্যমে ভর্তির চেষ্টা করতে পারবে।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এই শিক্ষার্থীরা শ্রুতলেখকের মাধ্যমে পরীক্ষা দেয়। তারা মুখে বলবে আর শ্রুতলেখক তা লিখবে। চট্টগ্রাম সরকারি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের সুযোগ রয়েছে। এরপর শিক্ষার্থীরা অন্য বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুস সামাদ বলেন, ‘প্রতিবন্ধী কোটা না থাকায় ভর্তির আবেদনে হয়তো ভুল হয়েছে। কিন্তু সিটি কলেজ আমাদের চারজনকে ভর্তি করিয়েছে। চট্টগ্রাম কলেজ ও হাজেরা তুজ ডিগ্রি কলেজ ভর্তি করাচ্ছে না। এখন কি তাহলে তাদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে?’

‘স্টার জলসার’ জাদু by ইমরান আহম্মেদ

প্রতিদিন এভাবেই ভারতীয় চ্যানেল স্টার জলসায় সিরিয়াল
দেখেন সালমা বেগম (ছদ্মনাম)। ছোট ছেলে শিহাবও
(ছদ্মনাম) সিরিয়ালের ভক্ত। ছবি: ইমরান আহম্মেদ
‘আমার স্টার জলসা দে, “জল নূপুর” শুরু হইয়া গেছে।’
রাজীবকে (ছদ্মনাম) এভাবে আদেশ করেন তার মা সালমা বেগম (ছদ্মনাম)।
রাজীব আপত্তি জানিয়ে বলেন, ‘আমি খবর দেখছি, মা।’
‘পরে দেখিস, পড়তে যা।’
বলেই টেলিভিশনের দূরনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র হাতে নেন সালমা বেগম। বোতাম টিপে চালু করেন স্টার জলসা চ্যানেল।
সালমা বেগম প্রতিদিন ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল স্টার জলসায় গোটা দশেক সিরিয়াল দেখেন। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত এই চ্যানেলে তাঁর চোখ দুটো ঘোরাফেরা করে। গড়ে একটানা পাঁচ ঘণ্টা সিরিয়াল দেখেন। রাত সাড়ে ১১টায়ও তাঁর পছন্দের একটি সিরিয়াল আছে, কিন্তু সকালে উঠতে হয় বলে এটি বাদ দেন। সুযোগ থাকলে অবশ্য দেখা হয়ে যায়। এভাবে প্রতিদিন সিরিয়ালের চক্রে চক্কর দিচ্ছেন তিনি।
সালমা বেগমের তিন সন্তান। সজীব (ছদ্মনাম), রাজীব আর শিহাব (ছদ্মনাম)। একটি বড় কক্ষে ছেলেদের পড়ার টেবিল আর টেলিভিশন। সেখানে বসে পাঁচ ধরে একটার পর একটা সিরিয়াল দেখে চলেছেন সালমা বেগম।
সালমা বেগমের সিরিয়াল দেখার বিষয়ে তাঁর বড় ছেলে অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সজীবের দেওয়া তথ্যমতে, প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনি টিভি সিরিয়াল দেখা শুরু করেন। রাত সাড়ে ১১টায় শেষ করেন। প্রতিটি সিরিয়ালই পাঁচ মিনিট দেখানোর পর বিরতি দেয়। এই ফাঁকে বাসার কাজ সেরে নেন। ব্যাপারটা এমন—সিরিয়াল দেখার ফাঁকে ফাঁকে কাজ।
স্টার জলসায় সিরিয়াল চলাকালে অন্য কোনো চ্যানেল বা অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ নেই বলে জানান সজীব। তিনি বলেন, ‘আমি বাংলাদেশি একটি চ্যানেলে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেখি। তা দেখতে অন্তত তিন দিন আগে মাকে বিষয়টি জানাতে হয়। তখন ওই সময় অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ মেলে। অবশ্য সে সময় তিনি পাশের বাসায় গিয়ে আন্টির সঙ্গে সিরিয়ালের ওই পর্বটা দেখে আসেন।’
অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব বলেন, ‘আমাদের একটা রুম হওয়ায় পরীক্ষার সময় তিনি পাশের বাসায় গিয়ে সিরিয়াল দেখেন। সিরিয়ালের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে বকাঝকা শুরু করেন। সরকার থেকে শুরু করে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন—কেউ বাদ যান না।’
রাজীবের ভাষ্য, মা সিরিয়াল দেখেন বলে টিভির অন্য কোনো অনুষ্ঠান তাঁদের দেখা হয় না। অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ খেলাও দেখা হয় না। তিনি বলেন, ‘আগে “ইত্যাদি” দেখতাম, ঈদের সময় নাটক ও ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখতাম। বিভিন্ন সময় ক্রিকেট-ফুটবল খেলা হয়। এখন এসবের কিছুই দেখার সুযোগ হয় না। সারা বছরই শুধু স্টার জলসা।’
বাড়ির ছোট ছেলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র শিহাব। তৃতীয় শ্রেণি থেকে মায়ের সঙ্গে সিরিয়াল দেখার অভ্যাস করে ফেলেছে। স্টার জলসায় কী কী সিরিয়াল দেখায়, তা শিহাবের মুখস্থ।
সিরিয়ালগুলোর নাম জানতে চাইলে শিহার জানাল, সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় ‘বধূবরণ’, সাতটায় ‘ইষ্টিকুটুম’, সাড়ে সাতটায় ‘তুমি আসবে বলে’ আর রাত আটটায় ‘চোখের তারা তুই’। রাত সাড়ে আটটায় ‘কিরণমালা’, নয়টায় ‘বোঝে না সে বোঝে না’, সাড়ে নয়টায় ‘ঠিক যেন লাভ স্টোরি’, ১০টায় ‘জল নূপুর’, সাড়ে ১০টায় ‘তোমায় আমায় মিলে’, ১১টায় ‘মন নিয়ে কাছাকাছি’, আর সাড়ে ১১টায় ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’। তাঁর বাংলা পাঠ্যবইয়ের কবিতাগুলোর নাম জানতে চাইলে, মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলল, ‘এখন মনে নেই।’
সিরিয়ালে তুমি কী দেখো—জানতে চাইলে শিহাব বলল, ‘প্রেম করে পালাইয়া যায়, আবার ফিররা আসে। ঘরের মধ্যে কুটনামি কইরা প্যাঁচ লাগায়, পূজা-অনুষ্ঠান-গান, বউ থাকতে গোপনে আরেকটা বিয়া—এমন অনেক কিছু।’
সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সিরিয়াল চলে। পরদিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত আগের দিন প্রচার করা সিরিয়ালগুলোর পুনঃপ্রচার চলে। এতেও যোগ দেন মা ও ছেলে।
আগে সপ্তাহে ছয় দিন সিরিয়াল দেখাত, রোববার বন্ধ থাকত, এখন সপ্তাহে সাত দিনই প্রচার করা হয় সিরিয়াল। এতে শুধু আমাদের দেশের নারীরাই নন, শিশুরাও মায়েদের সঙ্গে অনুচিত ও অনুপযোগী জিনিস দেখছে ও শিখছে বলে দাবি করেন রাজীব। এতে শৈশবেই কচিমনে পড়ছে বিরূপ প্রভাব।
সালমা বেগমের ভাষ্য, ‘সন্ধ্যা থেকে সিরিয়াল দেখি বলে আগেই ঘরের কাজকর্ম সেরে রাখি। বিদ্যুৎ বা অন্য কোনো কারণে কোনো সিরিয়ালের কোনো পর্ব মিস হলে দিনের বেলা দেখে পুষিয়ে নিই।’
সালমা বেগমের দেখা ১০টি সিরিয়ালের প্রতিটির নায়ক-নায়িকার নাম তাঁর মুখস্থ। অথচ নিজের মুঠোফোনের নম্বরটা মনে থাকে না। আর বাংলাদেশের নাটক সর্বশেষ কবে দেখেছেন, তা মনে করতে গলদঘর্ম হতে হলো তাঁকে। বাংলাদেশের টিভি নাটকে অভিনয় করা কুশীলব যে কয়জনের নাম তিনি মনে করতে পারলেন, তাঁদের অনেকে এখন অবসর নিয়েছেন।
একসঙ্গে এত সিরিয়াল দেখার পর বিষয়গুলো মনে থাকে কি না—জানতে চাইলে সালমা বলেন, ‘আমার এগুলো মনে থাকে না। আসলে আগের পর্বে কী হইছে আর পরের পর্বে কী হবে, এটা মিলিয়ে ছয়-সাত মিনিট যায়। দৈনিক প্রত্যেকটার ১০-১২টা করে দেখায়। দেখি, আবার ভুলে যাই।’
সিরিয়াল দেখাটা এখনো সে রকম নেশায় পরিণত হয়নি—এমনটা দাবি করে সালমা বেগম বললেন, ‘না দেখাইলে, না দেইখ্যা থাকতে পারমু, তয় দেখাইলে না দেইখ্যা থাকতে পারমু না।’
সালমা বলেন, পাঁচ বছর ধরে সিরিয়াল দেখার অভ্যাস হয়েছে। এর আগে অবসরে হয়তো হাতের কাজ করতেন বা ছোট ছেলেকে পড়াতেন। এখন চোখের সমস্যা হওয়ায় আর হাতের কাজ করেন না। কবে থেকে চোখে সমস্যা—জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিয়মিত সিরিয়াল দেখা শুরু করার দু-এক বছর পরই।
এসব সিরিয়াল দেখার প্রভাবের বিষয়ে সালমার ভাষ্য, এটা শুধু নাটক হলেও অনেকে বাস্তবের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেন। সিরিয়ালের বিভিন্ন ধরনের পোশাক, গয়না, রান্নাবান্না দেখানো হয়। তাঁর প্রতিবেশীদের অনেকে এসব পোশাক-শাড়ি স্বজনদের কাছে দাবি করেন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেক ঝগড়া হয়েছে বলেও তিনি দেখেছেন। এমন করা ঠিক নয় বলে মনে করেন তিনি।
ওই বাসা থেকে ফেরার সময় ডাকলেন সজীব। বললেন, ‘ভাই, একটু ভালো করে লেখেন। সব কিছুরই একটা সীমা থাকে। স্টার জলসা-জি বাংলার মতো চ্যানেলগুলো এখন সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এগুলো এখনো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যৎ আরও খারাপ হবে।’

ফিলিপিন্সে ফেরিডুবিতে ৩৮ আরোহীর মৃত্যু

ফিলিপিন্সে একটি যাত্রীবাহী ফেরিডুবিতে অন্তত ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় লেইতে উপকূলীয় এলাকায় সাগরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কিম নির্ভানা নামের ফেরিটিতে ১৭৩ যাত্রী ও ১৬ ক্রুসহ মোট ১৮৯ আরোহী ছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বিবিসি জানায়, ফেরিটি অরমোক বন্দর থেকে কামোটেস দ্বীপপুঞ্জের সেবুর উদ্দেশে যাচ্ছিল। কিন্তু এক কিলোমিটার দূরে ওরমোক বন্দরের কাছে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যে প্রবল ঢেউয়ের কবলে পড়ে এমবিসিএ কিম-নার্ভানা ফেরিটি উল্টে যায়। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে পুলিশ ও কোস্টগার্ড জানিয়েছে, ফেরিটির ১১৮ জন আরোহী রক্ষা পেয়েছেন। তবে তারা কীভাবে রক্ষা পেয়েছেন,
সাঁতরে তীরে এসেছেন নাকি তাদের উদ্ধার করা হয়েছে তা পরিষ্কার হওয়া যায়নি। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন ১৯ জন। ডুবে যাওয়া ওই ফেরিটির ৫০ থেকে ৭০ জন যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ফিলিপাইন রেডক্রসের চেয়ারম্যান রিচার্ড গর্ডন জানিয়েছেন। তীর থেকে উল্টে যাওয়া ফেরিটি দেখা যাচ্ছে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি। বিবিসিকে তিনি বলেছেন, ‘৫০ থেকে ৭০ জন মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের খাবার, পানি ও কম্বল দেয়া হয়েছে। তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তা করার জন্য ঘটনাস্থলে একটি অ্যাম্বুলেন্স ও ডুবুরি পাঠিয়েছি আমরা।’ ওরমোক বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, উল্টে যাওয়া ফেরিটির ভেতরে তল্লাশি চালাচ্ছেন ডুবুরিরা।

ওবামাকে বিয়ে করতে চান মুগাবে!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে বিয়ে করতে চেয়েছেন জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের আদালত সমকামী বিয়ের বৈধতা দেয়ায় ওবামার প্রতি এমন শ্লেষের তীর ছুড়েছেন তিনি। সমকামিতার কট্টরবিরোধী মুগাবে মার্কিন মুলুকের ‘কাণ্ডজ্ঞানে’ বিরক্ত হয়ে ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘ওয়াশিংটনে গিয়ে এক হাঁটু গেড়ে ওবামার ‘পাণি প্রার্থনা’ করার ইচ্ছা রয়েছে।’ শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় বেতারে দেয়া সাপ্তাহিক সাক্ষাৎকারে মুগাবে বিদ্রুপ করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ওবামা যখন সমকামী বিয়ের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন,
সমকামীদের পক্ষ নিয়েছেন এবং অস্বস্তিকর পরিস্থিতি উপভোগ করছেন, তখনই আমি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীকে ডিভোর্স দিতে চাই এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে বিয়ে করতে চাই।’ মার্কিন আদালতের রায়কে ‘উদ্ভট’ আখ্যা দিয়ে মুগাবে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি না, মানুষ কীভাবে খ্রিস্টের স্পষ্ট নির্দেশ অমান্য করার সাহস পায়, যেখানে প্রভু এটা (সমকাম) নিষিদ্ধ করেছেন।’ তিনি বলেন, ‘বিকৃতরুচির শয়তানের সমর্থকরা’ এখন যুক্তরাষ্ট্র শাসন করছেন। ২৬ জুন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্টের এক রায়ে দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যে সমলিঙ্গ বিয়ে বৈধতা পায়। রায়ের পরপরই বিভিন্ন স্থানে সমকামীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন, অনেকে বিয়েও করেন। রায়ের পর পরই ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটগুলোতে পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কের ঝড় ওঠে।

সেদিন অনেক ভয় পেয়েছি

*এখন কী নিয়ে ব্যস্ত আছেন?
**ঈদের নাটকের কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। কয়েকদিন আগে শফিকুর রহমান শান্তুনুর রচনা ও কমল চৌধুরীর পরিচালনায় ‘সুপার স্ক্রু ড্রাইভার’ নামের সাত পর্বের নাটকে অভিনয় করেছি। এটি গত বছরের ‘স্ক্রু ড্রাইভার’ নাটকের সিকুয়াল। এবারই প্রথম কোনো সিকুয়াল নাটকে কাজ করলাম। খুবই উপভোগ করেছি। আশা করছি সবার ভালো লাগবে। এ নাটক ছাড়া ঈদের জন্য আরও কয়েকটি নাটকে অভিনয় করব।
*ধারাবাহিকের ব্যস্ততা কী আছে?
**এই মুহূর্তে জুয়াড়ি, জীবন থেকে নেয়া এ শহরের গল্প ও বিন্দু বিসর্গ নামে তিনটি নাটক বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার চলছে। এগুলোর শুটিংয়ে নিয়মিত সময় দিতে হচ্ছে। তবে ঈদের জন্য ধারাবাহিকে সময় একটু কম দিচ্ছি।
*‘শূন্য থেকে শুরু’ নাটকেও অভিনয়ের কথা শোনা গেছে...
**হ্যাঁ, আলভী আহমেদের পরিচালনায় নাটকের কাজ শুরু করেছিলাম কিছুদিন আগে। তবে এখনও প্রচারে আসেনি। এ নাটকে অনেক চমক থাকবে দর্শকের জন্য।
*উপস্থাপনার খবর কী?
**বাংলাভিশনে রূপচর্চা বিষয়ক একটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করছি। উপস্থাপনায় বেশ আনন্দ পাই। আগেও উপস্থাপনার কাজ করেছি। এটি ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা।
*সম্প্রতি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছেন। এখন সব ঠিক আছে তো?
**সেদিন আল্লার রহমতে বেঁচে গেছি। অনেক ভয় পেয়েছি। আমার স্বামী রায়হান খান আহত হয়েছে। আর গাড়ির ড্রাইভার মারা গেছেন। জীবনে এত বড় দুর্ঘটনার মুখে এবারই প্রথম পড়লাম। রায়হান এখন আগের চেয়ে ভালো আছে। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
সাদিয়া ন্যান্সি

সরকারি কর্মচারী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী না হলে বরখাস্ত -সংসদীয় কমিটির সুপারিশ by কাজী সোহাগ

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য আসছে নতুন শর্ত। ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ নামে শর্তটি পূরণ না হলে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে। তার আগে চেতনায় ঘাটতি আছে কি নেই বা চেতনায় বিশ্বাসী নন তা নিয়ে তদন্ত করবে সংশ্লিষ্টরা। সরকারি কর্মচারী আইন-২০১৫ এর খসড়ায় এ সুপারিশ যোগ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সুপারিশ শেষে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে। ২৪শে জুন সংসদীয় কমিটির নবম বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী-চাকরিতে প্রবেশ ও অবস্থানের জন্য রাখতে হবে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ বিষয়ে ‘অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস’। এতে আইনটির জন্য প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সুপারিশে কিছু সংশোধনী এনেছে সংসদীয় কমিটি। পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি বিষয় যুক্ত ও বাদ দেয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। স্থায়ী কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, “যদি কোন সরকারি কর্মচারীর আচার, আচরণ ও কার্যাবলীতে প্রতীয়মান হয় যে, উক্ত সরকারি কর্মচারী বাংলাদেশের আদর্শিক ভিত্তি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী নহেন অথবা তাহার মধ্যে এই ভিত্তি ও চেতনার ঘাটতি রহিয়াছে অথবা তিনি এই ভিত্তি ও চেতনার বিপক্ষে কাজ করিতেছেন, তাহা হইলে তদন্ত সাপেক্ষে তিনি চাকরি হইতে বরখাস্ত হইবেন এবং এই বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৩৫ অনুচ্ছেদ ও ইহার ১, ২, ২ (ই) ও ৩ উপ-অনুচ্ছেদের আলোকে ক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ অথবা ক্ষেত্রবিশেষে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানেন না কমিটির সদস্য মুন্সীগঞ্জ থেকে নির্বাচিত এমপি সুকুমার রঞ্জন ঘোষ। গতকাল মানবজমিনকে তিনি বলেন, ওই দিনের বৈঠকে এ নিয়ে তেমন কোন আলোচনা হয়নি। সভাপতি সাহেব সুপারিশ আকারে তা পাঠিয়ে দিয়েছেন। কমিটির অপর সদস্য সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি খোরশেদ আরা হক দাবি করেন, ওই শর্তটি আসলে তার মতামতের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এ নিয়ে কমিটির সদস্যরা তকে অকুণ্ঠ চিত্তে সমর্থন করেন। তিনি বলেন, সত্যিকার অনেক মুক্তিযোদ্ধা সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। জামায়াত-শিবিরের অনেকে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি নিয়ে বসে আছেন। এটা অন্যায়। এ কারণে আমি বলেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না এমন কাউকে সরকারি চাকরিতে রাখা যাবে না। চেতনা বা বিশ্বাস কিভাবে তদন্তের আওতায় আনা যাবে এ প্রশ্নে তিনি বলেন, তদন্তকারীরা বিষয়টি উদঘাটন করতে পারবেন। এ নিয়ে তাদের নিজস্ব পদ্ধতি রয়েছে। এছাড়া সংসদীয় কমিটি আইনে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি অনুচ্ছেদ যুক্ত করার সুপারিশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, “যেহেতু ধারাবাহিক সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়া জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ ধারণ করিয়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশে অভ্যুদয়; সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এবং চাকরিতে অবস্থানের আবশ্যকীয় শর্ত হিসেবে উপরি-উক্ত বিষয়ে অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস আবশ্যক এবং তদ্বারা সব সরকারি কর্মকাণ্ড ও কার্যাবলী পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। সেহেতু রাষ্ট্রের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ লাভ নিশ্চিত হইতে পারে”। এইচ এন আশিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, র.আ.ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, সুকুমার রঞ্জন ঘোষ, মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, আমিনা আহমেদ ও খোরশেদ আরা হক। এছাড়া, বিশেষ আমন্ত্রণে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী  ইসমাত আরা সাদেক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

‘আমি মুজাহিদ বিয়ে করবো’ by ওয়েছ খছরু

একুশে পা দেয়া তরুণী রাজিয়াকে তার ভাবী প্রশ্ন করলেন- ‘বিয়ে করছো না কেন? পছন্দের কেউ আছে নাকি।’ কথা শুনে অনেকটা রেগে ওঠে রাজিয়া। বলে, ‘আমি মুজাহিদ বিয়ে করবো। আর কাউকে নয়।’ কথা শুনে চমকে ওঠেন পাশে থাকা পরিবারের সদস্যরা। এ কেমন উত্তর রাজিয়ার, টেনশনে পড়েন সবাই। এমন সময় চাচা আবদুল লতিফ বসা ছিলেন পাশের ঘরে। রাজিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘দেশের কোন গরিব মেধাবী ছেলেকে বিয়ে করে লন্ডনে নিয়ে যাও। তাহলে দোয়া পাবে। সওয়াবও হবে। ওসব কথা আর বইলো না।’ কিন্তু রাজিয়ার টার্গেট একটাই। সে আইএসের সামরিক ময়দানে যাবে। সেখানেই সে লড়াই করবে। জেদ ধরেছিল এক বছর আগেই। আর এই জেদ থেকেই পরিবারের আরও ১১ সদস্যকে নিয়ে উধাও রাজিয়া। তাদের সর্বশেষ অবস্থান তুরস্ক বলে জানা গিয়েছিল। ওই সময় আবদুল মান্নানের স্ত্রী মিনারা খাতুন দেশে থাকা স্বজনদের ফোনে জানান, তারা ভাল আছেন, সুস্থ আছেন। তবে, তারা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছেন। এ সময় দেশে থাকা স্বজনরা তাদের বারবার ফিরে আসার অনুরোধ জানান। তারা বলেন, ‘বৃটেনে যেতে না পারলে সমস্যা নেই, তোমরা দেশে ফিরে আসো। তবুও ওদিকে যেও না। ছোট্ট বাচ্চা, বৃদ্ধ মানুষটিকে নিয়ে নিরাপদে আস।’ কিন্তু তাদের আকুতি কারও কানে যায়নি। পরিবারের সদস্যরা জানান, ১২ সদস্যদের পরিবারের মধ্যে আইএসের প্রতি সবচেয়ে দুর্বল ছিল একুশে পা দেয়া রাজিয়া খানম। সহকর্মী, সহপাঠীদের দ্বারা সেই আইএসে যোগ দেয়ার প্রেরণা পায়। শুরুটা দুই বছর আগে। বেশ ধার্মিক পরিবার আবদুল মান্নানের। বৃটেনের লুটন শহরে বসবাস করলেও তারা ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। পর্দা মতো চলাচল করেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু রাজিয়া বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের পরিবারের গতিরও পরিবর্তন হয়ে যায়। গত দেড় বছর এ নিয়ে রাজিয়ার সঙ্গে দফায় দফায় দ্বন্দ্ব চলেছে পরিবারের। রাজিয়াকে ফেরাতে চেষ্টার কমতি ছিল না। কিন্তু ফিরলো না রাজিয়া। শেষ মুহূর্তে রাজিয়ার ফাঁদে পা দিয়েই তিন শিশুসহ নিখোঁজ হয়ে গেলেন পরিবারের সদস্যরা। বছর খানেক আগে রাজিয়ার আচরণ ও গতিবিধি সন্দেহের চোখে দেখে বৃটিশ পুলিশ। সেই থেকে রাজিয়ার ওপর নজরদারি শুরু হয়। ওই সময় বৃটেন পুলিশ একবার রাজিয়াদের লুটন শহরের বেডফোর্ডশায়ারের বাসায় তল্লাশি চালায়। সেই সময় থেকে রাজিয়ার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে শুরু করেন পরিবারের সদস্যরা। এ কারণে গত এক বছর ধরে তারা রাজিয়াকে ফেরাতে ব্যর্থ হন। তাকে ভালভাবে সঠিক পথের দায়িত্ব নিয়েছিলেন মা মিনারা খাতুন ও ভাই জায়েদ হুসাইন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারাও পরাজিত হন রাজিয়ার কাছে। এ কারণে ৯ই এপ্রিল যখন দেশের আসার জন্য বৃটেনের বিমানবন্দরে যান আবদুল মান্নানসহ পরিবারের সদস্যরা তখনই বৃটেন পুলিশ তাদের সন্দেহ করে। এ সময় তারা ১২ জনকেই আটক করে একটি হোটেলে নিয়ে যায়। আর ওই সময় বাসায় চালায় তল্লাশি অভিযান। প্রায় তিন দিন হোটেলে রাখার পর পুলিশ তাদের তুর্কি হয়ে দেশে আসার সুযোগ দেয়। বৃটেন পুলিশ থেকে ছাড়া পেয়ে দেশেই এসেছিলেন রাজিয়া ও পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু ১৪ই মে তারা বৃটেনের হিথ্রোতে গিয়ে পৌঁছার কথা ছিল। ১১ই মে ঢাকা থেকে উড়াল দেয়ার পর তাদের আর কোন খোঁজ মিলেনি। বিষয়টি লন্ডন পুলিশকে জানানোর পর পুলিশ তদন্ত শুরু করে। আবদুল মান্নানের ভাই সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে অবস্থানকারী আবদুল লতিফ গতকাল সকালে মানবজমিকে জানিয়েছেন, ভাতিজি রাজিয়ার কারণে এমন হয়েছে। রাজিয়াকে ফেরাতে বারবার চেষ্টা করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর কেউ কেউ নিজে নিজেও তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারেন। তিনি বলেন, ১২ জন সদস্যর কোন ফোন নেই আজ প্রায় ২০ দিন। তারা কেমন আছে, কিভাবে আছে সেটি জানে না কেউ। তিনি আরও বলেন, রাজিয়ার বয়স এখন ২১ বছর। এবার দেশে আসার পর তার বিয়ের জন্য চাপাচাপি শুরু করি। এ সময় তার চাচাত ভাইয়ের স্ত্রী বিয়ে বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে বলতো, সে মুজাহিদ বিয়ে করবে। তাকে আমরা বারবার বুঝানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু বুঝেনি। নিখোঁজ আবদুল মান্নানের ছোট্ট ভাই লাভলু মিয়া জানিয়েছেন, দেশে আসার পর রাজিয়া খুব পর্দানশীন থাকত। ঘরের ভেতরেও রাজিয়া ও তার মা বোরকা পড়ে থাকতো। সব সময় তারা হাত ও পায়ে মোজা ব্যবহার করতো। এছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যরা স্বাভাবিক ছিলেন বলে জানান। আবদুল লফিত ও লাভলু মিয়া জানান, তাদের ভাই আবদুল মান্নান ১৯৬২ সালের দিকে বৃটেনে যান। এরপর থেকে তিনি লন্ডন প্রবাসী। দুই-তিন বছর পরপর দেশে আসেন। স্বজনদের সঙ্গে এক মাস সময় কাটিয়ে ফের চলে যান। এবারও তিনি একইভাবে দেশে এসেছিলেন।

দেখিয়ে দিতে পারবো বাংলাদেশ রোল মডেল: স্যার আবেদ

ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ সম্মানে ভূষিত স্যার ফজলে হাসান আবেদ বলেছেন, তার কর্মীদের জন্য স্বীকৃতি এ পুরস্কার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিসহ নানা ক্ষেত্রে ব্র্যাকের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ উন্নয়নের যে উদাহরণ গড়ছে; একদিন তা সারাবিশ্বে রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পাবে। নিজের এবং ব্র্যাকের এ স্বীকৃতির দিন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান এবং বূর্মা পদকে ভূষিত কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ
শাইখ সিরাজ: দেশের জন্য এমন গৌরব বয়ে আনার জন্য এবং ১৫ কোটি মানুষের হাতে খাবার পৌঁছে দেয়ার কাজের এমন স্বীকৃতির জন্য আপনাকে অনেক অভিনন্দন। পুরস্কারটি কবে নাগাদ আপনার হাতে তুলে দেয়া হবে?
স্যার ফজলে হাসান আবেদ: অসংখ্য ধন্যবাদ। এ পুরস্কারটি অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব খাদ্য দিবসে দেয়া হয়। এবারও সে সময়েই দেয়া হবে। কাজের এ স্বীকৃতি আমাদের কর্মীদের কাজ করতে অনেক বেশি উদ্বুদ্ধ  করবে, সেটাই সবচেয়ে বেশি ভাল লাগার কারণ।
শাইখ সিরাজ: ব্র্যাক এখন একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। আপনি জানেন, গতকালই নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশ। সেখানে বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকাও অনেক। দেশের সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোতে ব্র্যাকের আর কী কী কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে?
স্যার ফজলে হাসান আবেদ: আমরা শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। পুষ্টিহীনতা নিয়েও কাজ করছি আমরা। প্রসূতি মায়েরা ২ বছর কী করে ব্রেস্ট ফিড করাবে সেটা নিয়েও কাজ করছি। আমাদের দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ খাটো থাকে। সেই পুষ্টিহীনতা দূর করতেও কাজ করছি আমরা।
বিকাশের মাধ্যমে কেবল যে টাকা পাঠানো যাবে তা-ই না। বরং বিকাশ দিয়ে ব্যাংক লোন বা সেভিংসও করা যাবে, এমন ব্যবস্থা আমরা করছি। আপনি জানেন, স্বাস্থ্যের ব্যাপারে এ দেশে এখনও অনেক কাজ করার আছে। দেশে কৃমিরোগীর সংখ্যা কম নয়। সেটা নিয়েও কাজ করে যাচ্ছি আমরা। পানি ও স্যানিটেশন নিয়েও কাজ করছি। সবাই যেন স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও স্বাস্থ্যকর পানি পায় সে চেষ্টাই করে চলেছি। এসবের পাশাপাশি অনেক কাজ আছে আমাদের হাতে। যেমন কিছু প্রশিক্ষণ জনগণকে দেয়া যেন অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা একসঙ্গে কাজ করে দেশকে উন্নতির দিকে নিতে পারি। তা ছাড়া কৃষিতেও অনেক ভাল সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের। খাদ্য উৎপাদনশীলতা আরও বাড়াতে কাজ করে চলেছি।
শাইখ সিরাজ: বর্গাচাষি ঋণ আপনাদের একটি বড় কার্যক্রম, সেটা নিয়ে আপনাদের বর্তমান অবস্থান বলুন।
স্যার ফজলে হাসান আবেদ: সেটা চলছেই। প্রতি বছরই বাড়ছে ঋণের পরিমাণ। এখন ৭০০ কোটি টাকার ওপরে গেছে। আশা করি পরিমাণটা শিগগিরই এক হাজার কোটিতে গিয়ে দাঁড়াবে। হয়তো আরও বাড়বে।
শাইখ সিরাজ: এত গেল দেশের প্রেক্ষাপটে কর্মপরিকল্পনা। দেশের শিক্ষা, স্যানিটেশন ও সামাজিক উন্নয়ন নিয়ে কথা হলো, দেশের বাইরেও তো আপনারা অনেক কাজ করছেন? আফগানিস্তানে, উগান্ডাতেও আপনাদের কাজ চলছে?
স্যার ফজলে হাসান আবেদ: সেটাও চলছে। ওসব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ একযোগে কাজ করছে। আমরা হয়তো একটা সময় গিয়ে দেখিয়ে দিতে পারবো বাংলাদেশ যে উন্নয়নের মডেল তৈরি করেছে সেসব অন্য দেশেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
শাইখ সিরাজ: দেশের বায়োটেকনোলজি আবিষ্কারগুলোও তো এখন দেশের বাইরে পাঠানো হচ্ছে?
ফজলে হাসান আবেদ: উগান্ডাতে আমরা একটা বায়োটেকনোলজি প্লান্ট তৈরি করেছি। সেটা শিগগিরই উৎপাদন শুরু হবে। আমরা এখানে যা শিখেছি তা ওখানে নিয়ে যাবো আবার অন্য দেশের শিক্ষা আমাদের দেশে নিয়ে আসবো। ভাল যেসব শিক্ষা সেসব আমরা অদল-বদল করতে চাই।
শাইখ সিরাজ: এ দেশের দারিদ্র্যবিমোচনে সরকারের পাশাপাশি এনজিওগুলোর অনেক বড় ভূমিকা রয়েছে। আপনার কি মনে হয় কবে নাগাদ দেশ থেকে দারিদ্র্য নির্মূল হতে পারবে?
স্যার ফজলে হাসান আবেদ: আশা করি ২০৩০ সালের মধ্যে। সেপ্টেম্বর মাসের দিকে জাতিসংঘ ঘোষণা করবে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। ২০৩০-এর মধ্যে যেসব লক্ষ্য অর্জন করতে হবে, সেটার মধ্যে প্রথমেই থাকবে দারিদ্র্যবিমোচন। এটাই যদি আমাদের প্রথম লক্ষ্য হয় তাহলে সবগুলো দেশই আরও জোরেশোরে কাজ করবে। এখনও তো প্রায় এক-চতুর্থাংশ লোক দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়ে গেছে। তাদের উঠিয়ে আনার জন্যও কাজ শুরু করতে হবে।

অভিবাসী ইস্যুতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশকে অ্যামনেস্টির সুপারিশ

অবৈধ অভিবাসী ইস্যুতে বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সরকারের প্রতি বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এতে বলা হয়েছে, অভিবাসী বহনকারী যেসব নৌকা পৌঁছাবে আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তাদেরকে ফেরত পাঠাতে পারে না এসব দেশ। তাদেরকে নিরাপদে অবতরণ করতে দিতে বাধ্য এসব সরকার। এরপরও সরকারগুলোকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা পূরণ করে আবার কাউকে এমন কোন দেশে জোর করে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এসব মানুষ আন্তর্জাতিক সুরক্ষার দাবি রাখে। অ্যামনেস্টি লিখেছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী ও শরণার্থী সংকট নিয়ে ব্যাংককে আলোচনার জন্য ১৭টি দেশ বৈঠকে মিলিত হওয়ার পর ১ মাস পার হয়ে গেছে। আমরা আপনাদের কাছে বর্তমান সংকট মোকাবিলা ও সংকটের পেছনে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান মূল কারণগুলো বিবেচনায় নিতে শক্ত ও আঞ্চলিক-সমন্বয়কৃত পদক্ষেপ গ্রহণের অব্যাহত অনুপস্থিতির দরুণ আমাদের গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করছি। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ভারতীয় মহাসাগরে অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক, ৭ সহস্রাধিক অভিবাসীর মানবিক সহায়তা ও সাময়িক আশ্রয়দানের বিষয়ে ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার ঘোষণা বর্তমান সংকট মোকাবিলায় ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু জীবন বাঁচানোর মানবিক নীতির প্রতি সাড়া, অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের মানবাধিকার সুরক্ষা ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে আরও বেশি আঞ্চলিকভাবে সমন্বিত দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা নেয়াটাও জরুরি। মর্মপীড়িত মানুষের জীবন রক্ষায় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান জোরালো করতে আরও আঞ্চলিকভাবে মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণে আমরা আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাই। বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশসমূহের প্রতি এভাবেই খোলা চিঠি লিখেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এতে আরও লেখা হয়েছে, যেসব নৌকা আপনাদের অঞ্চলে পৌঁছছে, সেখানকার আরোহীরা মূলত মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা, যারা শরণার্থী ও রাষ্ট্রহীন মানুষ হিসেবে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার দাবিদার। আমরা আপনাদের কাছে ওই মানুষগুলোর যথাযথ শরণার্থী মর্যাদা নিশ্চিতের আহ্বান জানাই। যেসব মানুষের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন নেই ও যারা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফেরত যেতে চান, তাদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে দেশত্যাগে সহযোগিতা করতে একযোগে বিভিন্ন সরকারের কাজ করা উচিত। একই সঙ্গে, অভিবাসী বা শরণার্থীদের গণহারে আটক না করতে আমরা আহ্বান জানাই।
মানবপাচার মোকাবিলা করা ও এ অপরাধে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি ও তদন্ত করতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এরপরও মানুষ শোষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থেকে যাবে, যদি নিজ দেশে দুঃসহ পরিস্থিতি বিরাজ করে। এ সংকটের মূল কারণ অনুসন্ধান ও টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে আপনাদের অবশ্যই যৌথভাবে কাজ করতে হবে। ব্যাংকক সম্মেলন মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান পদ্ধতিগত বৈষম্য ও নির্যাতনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। যখন মানুষের জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়, তখন সে জীবন বাঁচানো রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। যখন মানুষ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে রয়েছে, তখন তাদের সুরক্ষা করতে রাষ্ট্র বাধ্য। তাই আমরা বিশ্বব্যাপী ১৬টি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিভাগের পরিচালকগণ সহ আমাদের পিটিশনে স্বাক্ষরকারী ৬০ হাজার মানুষ আপনাদের কাছে জরুরিভিত্তিতে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণের আহ্বান জানাই।
নিশ্চিত করুন যে নৌকা অনুসন্ধান ও সহযোগিতা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। শরণার্থী ও অভিবাসী বোঝাই সকল নৌকাকে নিকটবর্তী নিরাপদ দেশে অবতরণে সহায়তা করুন, তাদের ফেরত পাঠাবেন না। হুমকি বা কোন ধরনের ভয় দেখাবেন না। খাদ্য, পানি, আশ্রয় ও স্বাস্থ্য সেবা সহ শরণার্থী ও অভিবাসীদের মৌলিক মানবিক প্রয়োজন মিটান। নিশ্চিত করুন যে, আশ্রয়প্রার্থীরা পরিপূর্ণ শরণার্থী মর্যাদা পেতে সক্ষম। নিশ্চিত করুন যে, মানুষের অন্য দেশে স্থানান্তরিত করা হবে না, তাদের নিজ দেশেও নয়- যেখানে তারা মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকবেন। একটি দেশে প্রবেশে বিশেষ কোন উপায় অবলম্বনের জন্য কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন, আটক বা শাস্তি প্রদান না করার বিষয়টি নিশ্চিত করুন। যেসব দেশ এখনও করেনি, তারা জাতিসংঘের শরণার্থী মর্যাদাবিষয়ক সম্মেলন, ১৯৬৭ সালের প্রটোকল, রাষ্ট্রহীন মানুষ সমপর্কিত সম্মেলন অনুমোদন করুন। সেখানে উল্লিখিত আইন, নীতি ও চর্চা বাস্তবায়ন করুন। জরুরিভিত্তিতে মিয়ানমারের সরকারের প্রতি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের আইনি, নীতিগত ও চর্চাগত বৈষম্য বন্ধে আহ্বান জানান। প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত রোহিঙ্গাদের সম নাগরিকত্ব পাবার অধিকার বাস্তবায়ন।

ইসির প্রকল্প থেকে সরে গেল জাতিসংঘ

মেয়াদ শেষ হওয়ার আট মাস আগেই ‘নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে, দাতারা অর্থের জোগান বন্ধ করে দেয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া  হয়েছে। ২০১২ সালের এপ্রিল থেকে এ প্রকল্পে তহবিল জোগান দিয়ে আসছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন। সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো নিয়ে এসব দেশ ও জোট অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে ৩ সিটি নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত না হওয়াকে ‘লজ্জাজনক’ বলে মন্তব্য করেন। এ ছাড়া ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আসছে। গত বৃহস্পতিবারও ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাট বলেছেন, ওই নির্বাচন প্রশ্নে তাদের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। কেবল বহুল আলোচিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনই নয়, পরে নতুন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচন এবং স্থানীয় নির্বাচনগুলোও বিতর্কমুক্ত হয়নি। এ অবস্থায় সব দলের অংশগ্রহণে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানে এখনই সংলাপ শুরুর তাগিদ দিয়ে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দাতা দেশ সংস্থাগুলো। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বিভিন্ন সময়ে সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। একইভাবে বিরোধী দলগুলোকেও সংলাপে উৎসাহ দিয়ে চলেছেন। তিনি দুই নেত্রীকে সংলাপের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। সংলাপে উৎসাহিত করতে অতীতে বাংলাদেশে দূতিয়ালি করে যাওয়া জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দায়িত্ব দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। ইউরোপের ২৮ রাষ্ট্রের জোট ইউরোপীয় ইউনিয়নও সরকার ও বিরোধী দলকে সংলাপে উৎসাহ জোগাচ্ছে। সমপ্রতি এক অনুষ্ঠানে ঢাকাস্থ ইইউ ডেলিগেশনপ্রধান রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়েদুন এক অনুষ্ঠানে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে খানিক স্বস্তি ফিরে আসায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও এটি ‘ভঙ্গুর’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি চলমান সংকটের স্থায়ী এবং দীর্ঘদেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। উল্লেখ্য, বিরোধী দলের বর্জনের মুখে অনুষ্ঠিত গত সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ থেকে আগে ঘোষণা দিয়ে বিরত ছিল ইইউ।
প্রকল্প বন্ধের ঘোষণা এলেও বিজ্ঞপ্তিতে তহবিল প্রত্যাহারের কারণ উল্লেখ নেই: প্রকল্প বন্ধের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে জাতিসংঘের ঢাকাস্থ আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয় থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পাঠানো হয়েছে। ‘ক্লোজ অব প্রজেক্ট: স্টেংদেনিং ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাতাদের তহবিল প্রত্যাহারের কোন কারণ উল্লেখ করা হয়নি। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১২ সালের এপ্রিলে শুরু হওয়া ওই প্রকল্প আগামী বছরের মার্চে চলার কথা থাকলেও দাতারা তহবিল প্রত্যাহার করে নেয়ায় চলতি মাসেই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। জাতিসংঘ জানায়, ১৯৯৫ সাল থেকে বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় শক্তিশালীকরণে সংস্থাটি সহায়তা দিয়ে আসছে। সেই ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আওতায় ‘বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্প নেয়া হয়েছিল। ভোটার নিবন্ধনপ্রক্রিয়াসহ নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ ও আধুনিক নির্বাচনী চর্চাগুলো প্রবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী করতে ওই প্রকল্প ভূমিকা রেখেছে। চলতি জুলাইয়ে ওই প্রকল্প শেষ করে দিলেও ইউএনডিপি এ দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা শক্তিশালীকরণে তাদের অন্যান্য কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে জানিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশে ইউএনডিপির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের’ লক্ষ্য গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জোরদার করা। এ প্রকল্পে অংশীদাররা হলো- বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন, নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ (এনআইডি), ইউরোপীয় কমিশন, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক দপ্তর ডিএফআইডি ও যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএসএআইডি। প্রকল্পে অর্থায়নবিষয়ক তথ্যে বলা হয়েছে, ওই প্রকল্পের আওতায় প্রতি বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক কোটি ৩৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৩০ ডলার, ডিএফআইডি ২৫ লাখ ডলার, ইউএনডিপি টিআরএসি (টার্গেট ফর রিসোর্স অ্যাসাইনমেন্ট ফ্রম দ্য কোর ফান্ডিং) ২০ লাখ ১৪ হাজার ৪২৩ ডলার এবং ইউএসএআইডি ১৪ লাখ ডলার দিয়ে আসছিল। ২০১১ সালে ওই প্রকল্পে ছয় লাখ ৪৯ হাজার ৬৬০ দশমিক ৫৭ ডলার এবং ২০১২ সালে ৭১ লাখ ৭৫ হাজার ৯৪৫ দশমিক ৮৫ ডলার দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে ইউএনডিপির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব পালনে এবং শাসনব্যবস্থার একটি স্থায়ী, পেশাদার, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হতে সহায়তা করতে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন, এর সচিবালয় ও স্থানীয় দপ্তরগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ প্রকল্প’ নেয়া হয়েছিল। ২০০৮ সালে নির্বাচনী সংস্কারপ্রক্রিয়া শুরুর প্রেক্ষাপটে এটি করা হয়েছিল। প্রকল্পের আওতায় ২০১২ সালে ৭০ লাখ নতুন ভোটারকে নিবন্ধন করা হয়। প্রকল্পটি অংশগ্রহণমূলক ও নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়নে ভূমিকা রাখে।

ফেলানী হত্যা- ফের নির্দোষ অমিয়

ভারতের কোচবিহারে বিএসএফের বিশেষ আদালতে ফেলানী হত্যা মামলার পুনর্বিচারের রায়ে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন আদালত। গত ৩০শে জুন ৩ মাস ৫ দিন পর বিচারকাজ শুরু হয়। ৩ কার্যদিবস চলার পর বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আদালতে এ রায় ঘোষণা করা হয়। বিএসএফের বিশেষ আদালতের সোনারী ছাউনিতে বিএসএফের আধিকারিক সিপি ত্রিবেদীর নেতৃত্বে ৫ সদস্যের বিচারিক প্যানেল বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য এই বিচার কাজ পরিচালিত হয়। বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর আদালত তাদের রায় ঘোষণা করেন। এতে আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়া হয়। রায়ের বিস্তারিত এখনও জানা যায়নি।
এদিকে অপ্রত্যাশিত এই রায়ে হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফেলানীর পিতামাতা। তারা মেয়ে ফেলানী হত্যার ন্যায়বিচার না পাওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেন। ফেলানীর পিতা নুর ইসলাম নুরু জানান, দুই দফা সাক্ষ্য দেয়ার পরও তার মেয়ের হত্যার ন্যায্য বিচার পাননি তিনি। তিনি এ রায় প্রত্যাখ্যান করেন। তার মতে অমিয় ঘোষের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। তা না করে ভারত সরকার বিচারের নামে তামাশা করেছে আমাদের সঙ্গে। আমি ন্যায়বিচারের জন্য আবারও আবেদন করবো।
কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘এই রায় ভারতীয় বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এর ফলে সীমান্ত হত্যার ক্ষেত্রে বিএসএফ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। যা সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সংকট তৈরি করবে। এ রায় মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি’। তিনি জানান, ভারতীয় সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারেন। পাশাপাশি ফেলানীর পিতা এই রায়ের বিরুদ্ধে ভারতের উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সহায়তা প্রয়োজন।
২০১১ সালের ৭ই জানুয়ারি ভোরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে ফেরার সময় ভারতের চৌধুরীহাট বিএসএফ ক্যাম্পের অমিয় ঘোষ ১৫ বছরের কিশোরী ফেলানীকে গুলি করে হত্যা করে।
এ ঘটনার দুবছর পর ২০১৩ সালের ১৩ই আগস্ট কোচবিহার জেলার সোনারী এলাকায় ১৮১ বিএসএফ ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্স কোর্টে ফেলানি হত্যার বিচার শুরু হয়। ওই বিচারে বিএসএফ সদস্যকে নির্দোষ ঘোষণা করে রায় দেয়া হয়। এই রায় প্রত্যাখ্যান করে ফেলানী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশনারের কাছে আবেদন করেন ফেলানীর পিতা নুরুল ইসলাম নুরু।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে মামলাটি পুনর্বিচারের সিদ্ধান্ত নেয় বিএসএফ কর্তৃপক্ষ। পিতা নুরুল ইসলাম গত বছরের ১৭ই নভেম্বর দ্বিতীয় বারের মতো সাক্ষ্য দেন ভারতের ওই বিশেষ আদালতে। কয়েক দিন আদালত চলার পর গত ২০শে নভেম্বর আদালত মুলতবি হয়ে যায়। ২৫শে মার্চ পুনরায় বিচার কার্যক্রম শুরুর নির্দেশ দেয় আদালত। ২৬শে মার্চ আইজীবীর অসুস্থতার কারণে আদালত আবারও ২৯শে জুন পর্যন্ত মুলতবি হয়ে যায়। পরে ৩০শে জুন আদালত শুরু হয়ে ৩ দিন চলে। এরপরই মধ্যরাতে এ রায় ঘোষণা করা হয়।
‘গরিব বলে কি বিচার পাবো না?’
বাংলাদেশী কিশোরি ফেলানি খাতুন হত্যা মামলায় বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষ আবার নির্দোষ সাব্যস্ত হয়েছেন। এ রায়ে মর্মাহত ফেলানি খাতুনের বাবা নুরুল ইসলাম। রায়কে তামাশা আখ্যা দিয়েছেন তিনি। আকুতি প্রকাশ করে প্রশ্ন রেখেছেন ‘গরিব বলে কি বিচার পাবো না?’ ফেলানির পিতা বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘সকাল সাতটার দিকে আমি খবর পাই, আমার মেয়ের হত্যাকারীকে খালাস দিয়েছে। কিন্তু আমি এ বিচার মানি না। পাঁচ বছর ধরে আমি আশায় ছিলাম, কিন্তু বিচারটা আমি পাইনি। আমার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু সবার কাছে আমি আবারও বলছি আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। আমি গরিব বলে কি এর বিচার পাবো না?’
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) নিজেরাই নিজেদের সদস্যের বিচার করে। ফেলানি হত্যার এ রায়ে ক্ষুব্ধ ভারতের মানবাধিকার সংগঠন ‘মাসুম’। বিএসএফ-এর বিচারকে লোক দেখানো ও সংবিধান পরিপন্থি বলে আখ্যা দিয়েছে সংগঠনটি। মাসুম প্রধান কিরিটি রায় রায়ের প্রতিক্রিয়ায় বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বিএসএফের আদালতে আগেই স্থির করা ছিল যে কি রায় দেয়া হবে। এটা লোক দেখানো বিচার হলো।
কিরিটি রায়ের প্রশ্ন, এটা কে ঠিক করল যে, শুধুমাত্র অমিয় ঘোষই অভিযুক্ত? যেখানে ফেলানি মারা যায়, সেখান দিয়ে ওর আগে আরও ৪০ জন বেড়া পেরিয়েছে, বিএসএফ ও বিজিবি টাকা নিয়েছে সবার কাছ থেকে। এটা ওয়েল রেকর্ডেড। তাই যারা সেই বেআইনি কাজের অনুমতি দিল, অর্থাৎ অমীয় ঘোষের সহকর্মী বা সিনিয়র অফিসাররা- তারা কেন দোষী হবেন না? কিরিটি রায় আরও জানান, ভারতের সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেকের জীবনের অধিকার রয়েছে। শুধু ভারতের নাগরিক নয়, দেশের মাটিতে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির। এ ক্ষেত্রে সেটাও লঙ্ঘিত হয়েছে।

একাদশে ভর্তি: ৫০,০০০ অভিযোগ by নূর মোহাম্মদ

ভোগান্তি, বিড়ম্বনা আর একের পর এক নাটকীয়তায় চলছে একাদশ শ্রেণীতে প্রথম পর্যায়ের ভর্তি প্রক্রিয়া। প্রথম বারের মতো ‘স্মার্ট’ পদ্ধতিতে ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ভোগান্তি চরম পর্যায়ে পৌঁছে। ভর্তির আবেদন থেকে শুরু করে প্রথম ধাপের ভর্তি পর্যন্ত  আন্তঃবোর্ড সমন্বয় কমিটির কাছে অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক অভিযোগ এসেছে। লিখিত, ইমেইল ও মৌখিকভাবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা বোর্ডে এ অভিযোগ করলেও অনেক ক্ষেত্রে বোর্ড কর্তৃপক্ষ কোন জবাব দিতে পারেনি। এমন অবস্থায় ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠান বোর্ডের ভুল সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হচ্ছে। ৪ দফা পিছানোর পর গত ২৮শে জুন রোববার রাতে এরকমই ভুলে ভরা ফল প্রকাশ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর নানা নটকীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে তারা। আন্তঃ বোর্ড সমন্বয় সাব কমিটি জানায়, বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৫০,০০০  অভিযোগ পড়েছে তাদের হাতে। তবে গতকালও এমন আরও অনেক অভিযোগ আসে। ভোগান্তির কথা বিবেচনা করে গতকাল রাতে বোর্ড জানিয়েছে প্রথম ধাপের ভর্তি প্রক্রিয়া আরও দুই দিন চালানো যাবে। শুক্র ও শনিবার শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে বলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বোর্ড কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক কোন সিদ্ধান্ত জানাতে না পারলেও সমস্যার সমাধান না হলে দ্বিতীয় মেধা তালিকা প্রকাশের পর আবারো নতুন করে আবেদনের সুযোগ দেয়ার কথা উল্লেখ করে একটি নোটিশ টাঙানো হয়েছে ঢাকা বোর্ডে। প্রয়োজনে ৩য় ও ৪র্থ তালিকা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন আন্তঃ বোর্ড সমন্বয় সাব কমিটি আহ্বায়ক ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু বক্কর সিদ্দিক। তবে এই তালিকার বিষয়টি মানতে রাজি নয় ভর্তিচ্ছুকরা। তাদের দাবি, ১ম মেধা তালিকায় সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরা বোর্ডের ভুলের কারণে ২য় তালিকায় কেন যাবে? আর ২য় তালিকায় প্রকাশের পর ভাল কলেজে কোন আসন ফাঁকা থাকবে না। বিষয়টি নিয়ে আদালতে শরণাপন্ন হওয়ার চিন্তা ভাবনা করছেন অনেকেই। এদিকে একাদশ শ্রেণীতে ভর্তির ফলাফলে অসংখ্য ভুল থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে শুরু করা যায়নি শিক্ষা কার্যক্রম। গতকাল পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী ১লা জুলাই থেকে ক্লাস শুরু অঙ্গীকার রক্ষা করতে পারেনি। কিছু প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্টশন ক্লাস করেছে সীমিত আকারে। আর বাণিজ্যিক কলেজেগুলো ভর্তির কার্যত্রুমে ধস নেমেছে। এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বুধবার কলেজ শাখার এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, প্রত্যেক কলেজ ১ম মেধা তালিকায় কতজন শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়েছেন, কতটি আসন ফাঁকা আছে পুরো তথ্য স্ব স্ব বোর্ডকে জানাতে হবে।
গতকাল ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১ম ভর্তির শেষ দিনও ঢাকা বোর্ডে ছিল ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। ভর্তিচ্ছুক, অভিভাবকদের লম্বা লাইন। তদের ভিড় সামালাতে হিমশিম খেতে হয় নিরাপত্তা রক্ষীদের। গতকাল আনসারের পাশাপাশি পুলিশের উপস্থিতি ছিল বোর্ড কার্যালয়ে। বুধবার ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা কলেজ উপ-পরিদর্শককে দুই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার পর গতকাল বোর্ডের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এর আগে ভর্তিচ্ছুকদের তোপের মুখে হঠাৎ বুকের ব্যথা অনুভব করে একটি বেসরকারি হাসপতালে ভর্তি হন কলেজ পরিদর্শক ড. আসফাকুস সালেহীন। তবে গতকাল অভিযোগ প্রদানকারীদের প্রবেশে ছিল কড়াকড়ি। বোর্ডে চেয়ারম্যান, কলেজ পরিদর্শনসহ যে কারও সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে আনসারদের বাধার মুখে পড়তে হয়। চেয়ারম্যানের দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, নানা ভোগান্তি নিয়ে আসা ভর্তিচ্ছুক ও অভিভাবকদের লম্বা লাইন। চেয়ারম্যানের দপ্তরের সামনে কয়েকজন আনসার সদস্য অভিযোগ ধরন বুঝে সাক্ষাতের সুযোগ দিচ্ছেন। এ বিষয়ে চেয়ারম্যান প্রফেসর আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমি গত তিন দিন ধরে অভিযোগ শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। বুধবার পর্যন্ত সারা দেশ থেকে প্রায় অর্ধলাখ অভিযোগ এসেছে। গতকাল কত জমা হয়েছে তা আল্লাহ জানেন। তিনি বলেন, অধিকাংশ অভিযোগই কাঙ্ক্ষিত প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া সংক্রান্ত। তবে তাদের আমরা বলে দিয়েছি, চান্স পাওয়া প্রতিষ্ঠানে আপাতত ভর্তি হন, পরে রিলিজ স্লিপে বদল করে নিবেন। আর যাদের আবেদনে ভুল ছিল তাদেরকেও নানা ধরনের পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছি। এ ছাড়া আমাদের আর কী বা করার আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথমবার চালু হওয়ার অনলাইন ভর্তিতে ভোগান্তি পিছু ছাড়েনি ভর্তিচ্ছুকদের। ভর্তি আবেদন থেকে শুরু করে কলেজ ভর্তি হতে গিয়ে প্রায় ১২ ধরনের ভোগান্তির শিকার হন তারা। ভর্তিচ্ছুকরা যেসব অভিযোগ নিয়ে বোর্ডে আসছে তার মধ্যে অন্যতম কাঙ্ক্ষিত কলেজে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া এবং একজনের আবেদন অন্য আরেকজন বা প্রতিষ্ঠান করে ফেলা। এরপর আবেদন করেও ভর্তির ফলে নাম না আসা, আবেদন না করা প্রতিষ্ঠানে মনোনয়ন, নিজ জেলার বাইরে কলেজ মনোনয়ন, ট্রান্সত্রিুপ্ট না পাওয়া, বাণিজ্য বিভাগ নেই এমন কলেজে পাঠানো হয়েছে ওই বিভাগের শিক্ষার্থীদের। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বিজ্ঞান বিভাগে, আবেদন করেনি এমন কলেজেও পাঠানো হয়েছে শিক্ষার্থী, মেয়ে হয়েও ছেলেদের কলেজে অথবা ছেলে হয়েও মেয়েদের কলেজে ভর্তির সুযোগ করে আবেদন, কোটা পছন্দ না করার পরও কোটায়যুক্ত, নামের সঙ্গে প্রকাশিত ফলাফলের আইডি নম্বরে মিল না থাকা, আবেদনের আইডিতে পিতা-মাতার তথ্য গরমিল থাকা, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান না হয়েও মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত করা, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তি না করানো, বিভিন্ন কলেজে বিভাগের তালিকায় না পৌঁছানো, শিক্ষা বোর্ডের বাতিল করা কলেজেও দেয়া হয়েছে ভর্তির মনোনয়ন।
বোর্ড কর্মকর্তা বলছেন, সারা দেশের ১০টি বোর্ডের সমন্বয় করে  আন্তঃ সমন্বয় বোর্ড। ঢাকা বোর্ড পদাধিকার বলে এটি দেখভাল করে। আর বোর্ড চেয়ারম্যান হন আহ্বায়ক। অভিযোগ এলেও এক্ষেত্রে বোর্ড কর্তৃপক্ষের করণীয় বলতে খুব একটা নেই। বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, কারিগরি দিকটি বুয়েট দেখায় এক্ষেত্রে তারা কিছু করতে পারছেন না। এদিকে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী ১লা জুলাই একাদশ শ্রেণীর ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এবার ভর্তি জটিলতায় কারণে দেশের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ক্লাস শুরু করতে পারেনি। রাজধানীর কয়েকটি কলেজ গতকাল ওরিয়েন্টশন প্রোগ্রাম করে ঈদের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

বৃটেনে নিখোঁজ সিলেটের ১২ সদস্যের পরিবার, সন্দেহ আইএসের দিকে by তানজির আহমেদ রাসেল ও হাসান চৌধুরী

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ১২ সদস্যের একটি পরিবার নিখোঁজ হওয়া নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য। গত ১৭ই মে তারা ছুটি কাটিয়ে যুক্তরাজ্যে ফেরার পথে নিখোঁজ হন। যুক্তরাজ্যে পরিবারটির বসবাস ছিল লুটনে। পরিবারটির প্রধান আবদুল মান্নানের আগের স্ত্রীর দুই ছেলে নিখোঁজ হওয়ার খবর জানান পুলিশকে। কোন বিমান দুর্ঘটনা ঘটেনি, পথে কোন দুর্ঘটনার শিকার হয়নি পরিবারটি। তাহলে তাদের অবস্থান কি, কোথায় আছেন তারা? এমন প্রশ্নে যুক্তরাজ্যজুড়ে তোলপাড় চলছে, উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে তার গ্রামের বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জে। পুলিশ ধারণা করছে, পুরো পরিবারটি সিরিয়ায় গিয়ে থাকতে পারে। যোগ দিতে পারে সিরিয়ার ইসলামিক স্টেট (আইএসে)। ওই পরিবারে রয়েছেন বৃদ্ধ, মাঝ বয়সী, শিশু, নারী ও যুবক। বাংলাদেশে তাদের বাড়ি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও এলাকায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে তাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে। পরিবারের প্রধান আবদুল মান্নান। তার বয়স ৭৫ বছর। গত ১০ই এপ্রিল পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছুটি কাটাতে আসেন বাংলাদেশে। ১১ই মে যুক্তরাজ্যে ফেরার জন্য তারা ইস্তাম্বুলে পৌঁছান, ১৪ই মে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছার কথা থাকলেও তারা সেখানে পৌঁছেন নি। তাই পুলিশের ধারণা পরিবারটি হয়তো তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় পাড়ি জমিয়েছে। লন্ডনের বেডফোর্ডশায়ার পুলিশ জানায়, পরিবারটি কখন সীমান্ত অতিক্রম করেছে, সে বিষয়ে তারা  নিশ্চিত নয়। তবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। পরিবারটির সদস্যরা হলেন- আবদুল মোহাম্মদ আবদুল মান্নান (৭৫), তার দ্বিতীয় স্ত্রী মিনারা খাতুন (৫৩), তাদের মেয়ে রাজিয়া খানম (২১), ছেলে মো. জায়েদ হুসাইন (২৫), মোহাম্মদ তৌফিক হুসাইন (১৯), ভাতিজা ও মেয়ের জামাই মো. আবুল কাশেম সাকের (৩১) এবং তার স্ত্রী সাইদা খানম (২৭), মোহাম্মদ সালেহ হুসাইন (২৬), তার স্ত্রী রোশনারা বেগম (২৪) এবং তাদের ৩ সন্তান, যাদের বয়স ১ থেকে ১১ বছর। লুটনের স্থানীয় কমিউনিটি নেতা আসুক আহমেদ বলেন, আবদুল মান্নানের সঙ্গে তিনি নিয়মিত মসজিদে যেতেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর থেকে তিনি ওই পরিবারটিকে চেনেন। তারা যে বাংলাদেশে ছুটি কাটাতে গিয়েছিল সেটা নিশ্চিত করে আসুক আহমেদ বলেন, অনেকে তুরস্ক হয়ে বাংলাদেশে যাওয়া-আসা করেন। কিন্তু তারা যে কেন লন্ডনে ফিরল না সেটাই বোধগম্য নয়। সিরিয়ার ইসলামী জঙ্গি গোষ্ঠীর সঙ্গে এই পরিবারের কোন সদস্য যোগ দিয়েছে কিনা সে বিষয়েও কেউ কিছু জানে না। এ ঘটনায় বাঙালি কমিউনিটির সবাই উদ্বিগ্ন বলে জানান তিনি। ওদিকে পুলিশ জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে থাকা স্বজনদের সঙ্গে পরিবারটি যোগাযোগ করেছে বলে তারা জানতে পেরেছে। তবে তারা কোথায় আছে, তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেন নি। পরিবারের এক মহিলা সদস্যের কারণে গোটা পরিবার তুরস্ক হয়ে সিরিয়ার ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এ যোগ দিয়েছে বলে লন্ডন পুলিশের  ধারণা।  নিখোঁজ হওয়া পরিবারের অপর  এক সদস্য বর্তমানে লন্ডন অবস্থান করছেন। তার নাম আব্দুস সালাম। তিনি টেলিফোনে দৈনিক মানবজমিনকে জানান- তার পিতা, মা, ভাইবোনসহ ১২ সদস্যের পরিবারবর্গ ১৪ই মে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর পৌঁছার কথা। কিন্তু যথাসময়ে না ফেরায় তারা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ খবর নেন। একপর্যায়ে চরম উদ্বিগ্ন হয়ে লন্ডন পুলিশের কাছে বিষয়টি জানান। লুটনে ওই পরিবারের এক প্রতিবেশী জানান, পরিবারটি এভাবে গায়েব হয়ে যাওয়ার পর ওখানকার পুলিশ বেশ কয়েকবার তাদের বাসায় গেছে এবং খোঁজখবর করেছে। তিনি বলেন, আমি শুনেছি তারা সিরিয়া চলে গেছে। পরিবারটিতে প্রবীণ দু’ব্যক্তি হয়তো এসবের কিছুই জানেন না। নিখোঁজ হওয়া পরিবারটির স্বজনদের একটি সূত্র জানায়, ১১ই মে তুর্িক এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে বাংলাদেশ ছাড়ার পূর্বে ১২ সদস্যের অন্তর্ভুক্ত সালেহ হুসাইন জানান, তারা তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবতরণ করে সিরিয়ায় ২ দিন অবস্থান করবেন। ওই সূত্রটি আরও জানায়, সিরিয়া থেকে গত ১০/১২ দিন পূর্বে এক মহিলা সদস্য ফোনে জানিয়েছেন, তারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে আছেন। তারা এখন পর্যন্ত ভাল আছেন। এরপর থেকে আর তাদের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সূত্র বলেছে, পরিবারটি খুব ধার্মিক ছিল। ওই পরিবারের নারী সদস্যরা বোরকার পাশাপাশি হাত ও পায়ে মোজা পরেন। লন্ডন থেকে বাংলাদেশে আসার দিন গত ৯ই এপ্রিল পরিবারের সকল সদস্যকে হিথ্রো এয়ারপোর্টে সেখানকার পুলিশ ব্যাপক তল্লাশি করে এবং একদিন আটকে রাখে। ফলে নির্ধারিত বিমানে না এসে তারা পরবর্তী ফ্লাইটে  বাংলাদেশে আসেন। গতকাল দুপুরে নিখোঁজ হওয়া ওই পরিবারের গ্রামের বাড়ি ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁওয়ে গেলে সেখানে আত্মীয়স্বজনদের চরম উদ্বিগ্ন অবস্থায় দেখা যায়। আবদুল মান্নানের ছোটভাই মোহাম্মদ আবদুল লতিফ বলেন, ১২ সদস্যের ওই দলে তার ছেলে আবুল কাশেমও রয়েছে। যাবার সময় তারা লন্ডন ফিরে যাচ্ছে বলেই জানিয়েছে। এভাবে নিখোঁজের ঘটনায় তারা চরম উদ্বিগ্ন। ওদিকে বিবিসি জানায়, পরিবারটির কোন সদস্যের নাম সন্ত্রাসীদের তালিকায় ছিল কিনা তার কিছুই বিস্তারিত জানায় নি লন্ডন পুলিশ। কমিউনিটি নেতা আশুক আহমেদ বলেছেন, ওই পরিবারের কয়েকজন নারী উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন বলে ধারণা করছেন স্থানীয়রা। তারা সন্দেহ করছেন, গ্রেপ্তার এড়াতে তারাই পুরো পরিবারটিকে নিয়ে যুক্তরাজ্য ছেড়েছেন।