Saturday, March 14, 2015

মধ্যবর্তী নির্বাচনই সংকট থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারে : ড. এমাজউদ্দিন আহমদ

মধ্যবর্তী নির্বাচন না হলে দেশে গৃহযুদ্ধ হতে পারে
সরকারকে তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অবিলম্বে সব দলের অংশগ্রহনে নির্বাচন দেয়ার আহবান জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমাজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, একমাত্র মধ্যবর্তী নির্বাচনই বর্তমান সংকট থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে পারে। আর এটি হতে হবে এখনই। কোন দেরি নয়। না হলে দেশে গৃহযুদ্ধ হতে পারে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন। শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (অ্যাব) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এমাজ উদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ওয়াদা করেছিলেন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় সাময়িকভাবে একটি নির্বাচন করবেন। এরপর সব দলকে সাথে নিয়ে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন করবেন। এখন তার বক্তব্য কার্যকর হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়। তাঁর নিজের করা ভুল সংশোধন করলেই সংকট থাকেনা।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রহসন মন্তব্য করে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে ৪০ ভাগ ভোট পড়েছে। তাহলে বাকি ৬০ ভাগের প্রতিনিধি কোথায়?
এমাজ উদ্দিন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে দেয়া বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, তিনি সঠিক কথায় বলেছেন। তার কোন কথা অগ্রহণযোগ্য ও ভুল নয়।
সরকারের শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়ার আশা প্রকাশ করে এমাজ উদ্দিন বলেন, গনতন্ত্র হত্যা করে কোন দেশ উন্নতি করতে পারেনা।
অ্যাব সভাপতি আনোয়ারুল মজুমদার বাবলার সভাপতিত্বে সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক রুহুল আমিন গাজী, অ্যাব মহাসচিব হাসান জাফির তুহিন প্রমুখ।

রাতের ঢাকায় দুর্বৃত্তরা তৎপর by জিলানী মিলটন

রাজধানীতে পুলিশের তৎপরতার মধ্যেও থেমে নেই দুর্বৃত্তরা। চেকপোস্ট, তল্লাশি আর টহল উপেক্ষা করে দুর্বৃত্তরা রাতে রাজধানী চষে বেড়াচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দুর্বৃত্তরা মাইক্রো কিংবা বাস নিয়ে নেমে পড়ছে ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপরাধে। যাত্রীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। একই সাথে দুর্বৃত্তদের হাতে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। পিন নম্বরের জন্য হাতুড়িপেটা : রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে ৮ মার্চ রাতে চলন্ত বাসে যাত্রীদের সর্বস্ব লুটে নিয়ে তাদের হাত-পা বেঁধে চার ঘণ্টা ধরে নির্যাতন করেছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় যাত্রীরা সব কিছু দেয়ার পরও ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের পিন নম্বর না পেয়ে হাতুড়িপেটা করে। দুর্বৃত্তদের হামলায় আহতদের মধ্যে একজন অনলাইন পত্রিকা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সাংবাদিক হাসান বিপুল। তিনি ওই বাসে করে উত্তরা থেকে মহাখালী যাচ্ছিলেন। রাত ১০টা থেকে পৌনে ২টা পর্যন্ত যাত্রীদের বেঁধে মেঝেতে ফেলে রেখে বাস নিয়ে বিমানবন্দর থেকে কাকলী মোড় হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত সড়কে ঘুরে বেড়ায় দুর্বৃত্তরা। পিটুনিতে আহত পাঁচ যাত্রীকে শেষ পর্যন্ত সাভার-কালিয়াকৈর সড়কে রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে চলে যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তারা ঢাকায় ফেরেন। দুর্বৃত্তরা যাত্রীদের আটকিয়ে দীর্ঘক্ষণ একটি বাস নিয়ে রাস্তায় ছোটাছুটি করলেও রাজধানীজুড়ে পুলিশের চেকপোস্ট আর তল্লাশির মধ্যে ধরা পড়েনি তারা।
ভুক্তভোগী হাসান বিপুল জানান, ওই বাসের চালক তার সহকারীসহ অন্যরা এ ডাকাতির সাথে সরাসরি যুক্ত। রাত পৌনে ১০টার দিকে তিনি যখন উত্তরার আজমপুর থেকে মহাখালীগামী বাসটিতে ওঠেন, তখনো ২০ থেকে ২৫ আরোহী ছিলেন ওই বাসে। বাসটি বিমানবন্দর পার হওয়ার পর তাদের মধ্যে ১৫-২০ জন মিলে পাঁচ যাত্রীকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে আটকায়। তখনই বুঝতে পারেন তিনি ডাকাতের কবলে পড়েছেন। ডাকাতরা তাদের চোখ আর হাত পিছমোড়া করে বেঁধে মাথা নিচু করে রাখে। কাকলী বা চেয়ারম্যান বাড়ি এলাকায় বাসটি ইউ টার্ন নিয়ে ফের বিমানবন্দরের দিকে যেতে থাকে। এর মধ্যে দুর্বৃত্তরা যাত্রীদের সাথে থাকা জিনিসপত্র, টাকা-পয়সা আর এটিএম কার্ড নিয়ে নেয়। এরপর যাত্রীদের কাছ থেকে পাওয়া এটিএম কার্ডগুলো নিয়ে দুর্বৃত্তদের কয়েকজন নেমে যায় এবং রাস্তার পাশের বুথগুলোতে গিয়ে টাকা তোলার চেষ্টা করে। বাসে থাকা দলের অন্যদের মাধ্যমে তারা সংশ্লিষ্ট যাত্রীর কাছে পিন নম্বর জানতে চায়। যাত্রীরা পিন নম্বর না বলায় শুরু হয় নির্যাতন। কিল-ঘুসির পাশাপাশি হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয় শরীরের বিভিন্ন স্থানে। এমনকি মেরে ফেলারও হুমকি দেয়া হয় বলে জানান বিপুল। তিনি জানান, তার কাছে তিনটি ব্যাংকের কার্ড ছিল। এর মধ্যে দুইটি কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। তিনি ওই দুইটি কার্ডের পিন তাদের বলেন। সেগুলো কাজ না করায় দুর্বৃত্তরা তাকে বেদম মারধর করে।
যাত্রীদের অপহরণ করে মুক্তিপণ পাওয়া যাবে কি না- এমন বিষয়েও দুর্বৃত্তরা আলোচনা করে বলে জানান বিপুল। একপর্যায়ে আটকে রাখা যাত্রীদের মেঝেতে শুইয়ে রেখে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে থাকে দুর্বৃত্তরা। রাত পৌনে ২টার দিকে তাদের সাভার-কালিয়াকৈর সড়কের পূর্ণিমা সিনেমা হলের কাছে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়া হয়। তখনো তাদের হাত-চোখ বাঁধা। দুর্বৃত্তরা বাস নিয়ে চলে যাওয়ার পর ফেলে যাওয়া যাত্রীদের চিৎকারে পাশের একটি ট্রাকের গ্যারেজ থেকে কয়েকজন এগিয়ে আসেন। তারাই পাঁচজনকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে স্থানীয় একটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে একটি প্রাইভেটকারের সহায়তায় রাতে মহাখালী ফিরে আসেন বিপুল ও অন্যরা। এভাবে প্রায় দিনই রাতে রাজধানীতে ঘটছে এ ঘটনা। দুর্বৃত্তদের শিকার একাধিক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত সন্ধ্যার পর থেকেই রাজধানীতে দুর্বৃত্তদের তৎপরতা শুরু হয়। গুলিস্তান, পল্টন, কাকরাইল, ফার্মগেইট, সংসদ ভবন এলাকা, মিরপুর, তেজগাঁও, সাত রাস্তা, নাবিস্কো, মহাখালী, কাকলী, রামপুরা, বাড্ডা, গুলশান, খিলক্ষেত, বিমানবন্দর সড়ক, উত্তরা, আবদুল্লাহপুরসহ বিভিন্ন রাস্তায় দুর্বৃত্তরা যাত্রীবেশে মাইক্রো অথবা মিনিবাস নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। সন্ধ্যার পরে ঘরেফেরা মানুষ যানবাহনের অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকেন। আর এ সুযোগে আগে থেকে যানবাহনে বসে থাকা দুর্বৃত্তরা হাঁকডাক করে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীদের তুলে নেয়। এরপর কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগে দুর্বৃত্তরা ঝাঁপিয়ে পড়ে যাত্রীদের ওপর। সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার পরে তাদের রড, হাতুড়িসহ বিভিন্ন অস্ত্র দিয়ে নির্যাতন চালানো হয়। অস্ত্রের মুখে আটকিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিভিন্ন সড়কে ঘুরে বেড়ায়। পরে সুবিধা মতো নির্জন স্থানে নিয়ে গাড়ি থেকে ফেলে দেয়। ক্ষতিগ্রস্তরা অভিযোগ করেন, দুর্বৃত্তরা তাদের নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর সময় একাধিকবার পুলিশের চেকপোস্ট পার হতে দেখেছেন। কিন্তু কখনোই পুলিশের তল্লাশির মুখে পড়তে হয়নি।
রাজধানীতে রাতে প্রতিনিয়ত এই ঘটনা ঘটলেও দুর্বৃত্তরা পুলিশের হাতে আটক বা ধরা পড়ছে না। ঘটনার শিকার একাধিক ব্যক্তির অভিযোগ তারা এ ব্যাপারে থানায় জিডি অথবা মামলা করলেও পুলিশ কখনো তাদের সাথে যোগাযোগ করেনি। তাদের মালামাল উদ্ধার দূরে থাক; আজ পর্যন্ত দুর্বৃত্তদের কেউ ধরাও পড়েনি। আবার ভুক্তভোগী অনেকে কোনো প্রতিকার পাবেন না ধারণা করে পুলিশের শরণাপন্ন হননি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়মুক্তি সবচেয়ে বড় সমস্যা -বাংলাদেশ নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকার

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্য সরকার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ১২ মার্চ, বৃহস্পতিবার দেশটির সরকারি একটি ওয়েবসাইটে (https://www.gov.uk/government/case-studies/bangladesh-political-violence) প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সহিংসতা, হুমকি, হরতাল ও যানবাহন অবরোধে গত ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনের অর্জন ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলসহ (বিএনপি) ১৮-দলীয় জোট সাংবিধানিকভাবে বৈধ নির্বাচনে আপত্তি জানায়, এবং নির্বাচন অবাধ ও নিরপে হবে না, এই আশঙ্কায় তারা এতে অংশগ্রহণ করেনি। অর্ধেক সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি, এবং আওয়ামী লীগ টানা দু’বারের মতো সংসদীয় নির্বাচনে জয় লাভ করে। নির্বাচনের দিনটি সহিংসতার জন্য চিহ্নিত হয়ে আছে : ২১ জন নিহত হয়, এবং শতাধিক ভোটকেন্দ্র পুড়িয়ে দেয়া হয়।
আমরা বারবার সব ধরনের সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছি, রাজনৈতিক দলগুলোকে একসাথে কাজ করার জন্য উৎসাহ দিয়েছি। ৬ জানুয়ারি মানবাধিকারবিষয়ক তৎকালীন ফরেন ও কমনওয়েলথ মন্ত্রী ব্যারোনেস ওয়ার্সি দলগুলোর হুমকি-ধমকি ও সহিংসতার জন্য নিন্দা জানান এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সব রাজনৈতিক দলকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান। আমরা একান্তভাবেও সরকার ও বিরোধী দলগুলোকে আমাদের উদ্বেগ জানাই। বাংলাদেশ সফরে গিয়ে দেশটির মন্ত্রীদের কাছেও ব্যারোনেস ওয়ার্সি, আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক সাবেক সহকারী মন্ত্রী অ্যালান ডানকান, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সাবেক সহকারী মন্ত্রী লিন ফেদারস্টোন উদ্বেগ জানান। গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তিন মন্ত্রীই বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের প্রতি আহ্বান জানান। তারা ভবিষ্যতের নির্বাচন নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টির জন্যও বলেন।
নির্বাচনের পর বিএনপি শান্তিপূর্ণ বিােভের অঙ্গীকার করে, যদিও বছর শেষে রাজনৈতিক উত্তেজনায় বিস্তৃত আকারে রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ২০১৪ সালে তুলনামূলক হরতাল, যানবাহন অবরোধ (কর্মসূচি) কম ছিল, বছরটি শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়। তবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ; দেশের সবচেয়ে বৃহৎ দু’টি দলের মধ্যে কোনো সংলাপ হয়নি। বেসরকারি সংস্থাগুলো জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর দায়মুক্তি সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্বাচনের পর এনজিওগুলো বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের নিন্দা জানায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এগুলোতে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় রথ্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের জড়িত থাকার বিষয়টি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে। গত মে মাসে বাংলাদেশ হাইকমিশনে গিয়ে ব্যারোনেস ওয়ার্সি দ্রুত, স্বচ্ছ ও নিরপে তদন্তের আহ্বান জানান।
সরকার ফরেন ডোনেশন অ্যাক্ট (বৈদেশিক সহায়তা আইন, পার্লামেন্টে অনুমোদনের অপোয়) সংশোধন ও একটি নতুন সম্প্রচার নীতিমালা প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে, এর মধ্যে ডিজিটাল মিডিয়ায় সরকারের সমালোচনাকারী কয়েকজনকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনে আটক করা হয়েছে। এর ফলে সুশীলসমাজ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সমালোচনা বা ভিন্নমতকে দমিয়ে রাখার সরকারি মতা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিচারকদের অভিশংসন করতেও সরকার মতা পুনরুদ্ধার করেছে, এটা নির্ভর করছে কিভাবে এর প্রয়োগ হয় তার ওপর, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সাথে সমঝোতাতে হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ২২ জুলাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাাৎ করেছেন। তিনি (ক্যামেরন) আমাদের অসন্তোষের কথা জানান। উভয়পই উন্মুক্ত সমাজ ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপারে একমত হন, যাতে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

জনগণ জাগলেই সমাধান আসবে -অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ

সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ বলেছেন, দেশে যে সঙ্কট চলছে তা সমাধানে জনগণকেই আগে জাগ্রত করতে হবে। মানুষ জাগ্রত হলে রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান আসবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সমঝোতা ও সংলাপের দাবিতে যে আন্দোলন চলছে তা অব্যাহত রেখে খুব বেশি অর্জন হবে না। কারণ, যে আন্দোলনে জনগণের সরাসরি স্বার্থ নেই তা বেশি গ্রহণযোগ্যতা পায় না। যারা আন্দোলন করছেন তাদেরকে আরও বেশি জনসম্পৃক্ত কর্মসূচির কথা ভাবতে হবে। মানবজমিনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক পক্ষগুলো একই ধারায় রাজনীতি করছে। একই ধরনের কথা বলছে। তারা একই বক্তব্য বারবার দিচ্ছে। এতে করে রাজনীতি এবং দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে না। সর্বশেষ বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য দিয়েছেন তাতে সমাধানের তেমন কিছু নেই। সমাধানের জন্য তাদের পক্ষ থেকে পদ্ধতিগত ও সাংবিধানিকভাবে নতুন ধরনের কর্মসূচি আসতে হবে। তিনি বলেন সংকট সমাধানের মূল জায়গায় আছে দেশের জনগণ। জনগণ সম্পৃক্ত হয় এমন কর্মসূচিতে যেমন ফল আসতে পারে তেমনি জনগণ নিজে থেকে উদ্যোগী হলেও সংকটের সমাধান আসতে পারে। তাই যারা সংকটের সমাধান চাইছেন তাদের উচিত জনগণ জাগরিত কর্মসূচি দেয়া।
সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, সত্যিকার অর্থেই মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে এমন রাজনীতি ছাড়া রাজনীতিকেও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া যাবে না। আমরা এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তাতে রাজনীতির প্রতি মানুষের অনীহা বাড়ছে। এই অনীহা ও অনাস্থা কাটাতে রাজনীতিবিদদেরই উদ্যোগী হতে হবে।

দায়িত্ব বর্তালো সরকারের ওপরই -খালেদার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে বক্তব্য রেখেছেন তাতে সংলাপ এবং সমঝোতার ইঙ্গিত রয়েছে উল্লেখ করে বিশিষ্টজনরা বলেছেন, এখন সঙ্কটের সমাধান নির্ভর করছে সরকারের উদ্যোগের ওপর। একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের যে দাবি রয়েছে এ বিষয়ে সরকারকে উদার হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, খালেদা জিয়ার বক্তব্যে মনে হচ্ছে তিনি তত্ত্বাবধায়কের দাবি থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজনের অধীনে নির্বাচন চেয়েছেন। পরিস্থিতি সরকারের উদ্যোগের ওপর নির্ভর করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় সেটাই দেখার বিষয়। খালেদা জিয়ার বক্তব্য শুনে মনে হলো তিনি আলোচনা শুরু করতে বলেছেন। সরকার সাড়া দেবে কি-না সেটা দেখতে হবে। তিনি আরও বলেন, খালেদা জিয়া আগেও এমন কথাই বলেছেন। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের বিষয়টা সরকারকে সমাধান করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আমেনা মহসিন বলেন, খালেদা জিয়ার বক্তব্যে মনে হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। উনি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলেছেন। কিন্তু উনি এটা কি ফরম্যাটে হবে সে কথা বলেননি। এখানে সরকারের জন্য জায়গা রেখেছেন। সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিকে ইতিবাচক মনে করছেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খালেদা জিয়া দোষারোপ না করে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে বিচার চেয়েছেন। তিনি শক্তভাবে এই দাবি করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসাবে। তিনি আরও বলেন, খালেদার বক্তব্যে মনে হয়েছে তিনি সরকারের পদত্যাগ চাননি। বরং তিনি তাদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে বলেছেন। যার দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যাললের আইন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল বলেন, খালেদা জিয়ার বক্তব্যে  তত্ত্বাবধায়কের দাবি থেকে সরে আসা ছাড়া নতুন কিছু নেই। আমরা সরকারের কাছে নতুন কিছু যেমন শুনতে পাই না, তেমনি তার বক্তব্যেও শোনা যায়নি। খালেদা জিয়ার বক্তব্যে খুবই আশাবাদী হওয়ার মতো প্রস্তাব নেই। যার মাধ্যমে সঙ্কটের সুরাহা সম্ভব। তিনি বলেন, সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসে, অনড় না থেকে গ্রহণযোগ্য সরকারের অধীনে নির্বাচনের কথা বলেছেন। এটা জাতীয় সরকার কিংবা প্রেসিডেন্টের অধীনে কিছু একটা হতে পারে। সরকারকে এ বিষয়ে আগ্রহ দেখাতে হবে। এটা প্রকাশ্যে হতে পারে। কিংবা পর্দার অন্তরালে কোন তৎপরতা হতে পারে। তিনি বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা যেভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, বিএনপির নেতাকর্মীরা যে ক্রসফায়ারে মারা যাচ্ছেন সেটা অসত্য না। এখানে তিনি যে বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা বলেছেন তা নিয়ে সরকারকে গভীরভাবে ভাবা উচিত। তিনি বলেন, এখন একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকারের উদার হওয়ার সুযোগ এসেছে। সরকারের উচিত এমন ব্যবস্থা নেয়া যেন সমাধান হয়।
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. মেজবাহ কামাল বলেন, বেগম জিয়া অনেকদিন পর সরাসরি মিডিয়ার সামনে এলেন। প্রত্যাশা করেছিলাম তিনি বাস্তবতা অনুভব করবেন। তিনি ও তার দল-জোট জনগণের থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন সেটা বুঝবেন। কিন্তু তিনি তার দাবি অব্যাহত রাখলেন এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। খালেদা জিয়ার কর্মসূচি ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ঘোষিত কর্মসূচি পালিত হচ্ছে না। হরতাল ভেঙে পড়েছে। অবরোধও ভেঙে পড়ার পথে। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া সরকারের পদত্যাগের যে দাবি করছেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির কোন ভিত্তি দেখছি না। এসব দাবি পূরণ করতে হলে বিএনপিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে সংসদে আসতে হবে। আইন পরিবর্তন করতে হবে। নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে খালেদা জিয়ার অবস্থান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মধ্যে যে সঙ্কট তৈরি করেছে তা আরও বাড়াবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গ্রেফতার হলেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা by আবু সালেহ আকন

একমাত্র ছেলেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ছেলের অপরাধ কী জানেন না এই মা।
গতকাল আদালত এলাকায় এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি : নয়া দিগন্ত
গ্রেফতার হলেই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। কথিত বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে জীবন যাবে, না গুলি খেয়ে পঙ্গু হবে এ আশঙ্কায় থাকেন স্বজনরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ আশঙ্কা সঠিক প্রমাণিত না হলেও কারো কারো আশঙ্কা ঠিকই ফলে যায়। গত সোমবার রাতে রাজশাহীর মতিহার থানার শ্যামপুর থেকে আটক হওয়া সবুজ আলী এর একটি উদাহরণ। সবুজ আলী মঙ্গলবার রাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তার সাথে আটক হওয়া অপর যুবক তানজিদুর রহমানের খোঁজ মেলেনি গত বুধবার পর্যন্ত। এ দিকে ঢাকায় আটক হওয়া তিন ছাত্রকে দুই দিন পরে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। দেশে গড়ে প্রতিদিন ২০ দলীয় জোটের অন্তত ৩০০ নেতাকর্মী গ্রেফতার হচ্ছেন। গতকালও দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক গ্রেফতার অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। গত বুধবার ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ দিন ভোর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় পুলিশ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ২১ জনকে গ্রেফতার করে। এর মধ্যে বিএনপির আটজন এবং জামায়াত-শিবিরের ১৩ জন নেতাকর্মী রয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, তারা নাশকতায় জড়িত।
খুলনার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিএনপি-জামায়াতের ৫২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত জেলার আটটি থানায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মহানগর যুবদলের সহসভাপতি ইকরামুল কবির মিল্টনও রয়েছেন। এ ছাড়াও ৬ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নাসিম ও সোনাডাঙ্গা থানা যুবদলের প্রকাশনা সম্পাদক হারুনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এ দিকে খুলনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের বলেছেন, ভোরে নগরীর গগন বাবু রোড এলাকায় একটি ট্রাকে আগুন দিয়েছে কে বা কারা।
পাবনায় নাশকতার আশঙ্কায় জামায়াত-বিএনপিসহ ৬৪ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এর মধ্যে পৌর জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুল লতিফ জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর পুলিশ তাকে জেলগেট থেকে ফের গ্রেফতার করে।
রংপুরের বিভিন্ন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিএনপি-জামায়াতের আট কর্মীসহ ৪৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতায় জড়িত সন্দেহে বিএনপি-জামায়াতের ১৩ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
নাশকতার অভিযোগে মানিকগঞ্জে বিএনপি-জামায়াতের পাঁচ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। মেহেরপুরে ১৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য স্থানে চলছে অভিযান।
সূত্র জানায়, যখন কোথাও কেউ গ্রেফতার হয় তখন তাদের স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
গত সোমবার তিন ছাত্র আটক হওয়ার পরে তাদের স্বজনেরা চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান করেন। গত ৯ মার্চ বিকেল সাড়ে ৫টায় রাজধানীর কদমতলী এলাকা থেকে ড. মাহবুবর রহমান মোল্লা কলেজের ছাত্র সাইদুল ইসলাম, তা’মীরুল মিল্লাত মাদরাসার ছাত্র হাসান রাব্বি এবং সিটি কলেজের ছাত্র নাকিবুল আরেফিনকে বাসার সামনে থেকে আটক করে পুলিশ। আটককৃত ছাত্রদের বাবা আনোয়ার হোসেন, হানিফ শিকদার ও মাওলানা ফয়সাল আহমেদ এক যৌথ বিবৃতিতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গতকাল ওই তিন ছাত্রকে আদালতে হাজির করা হয়।
সোমবার রাতে রাজশাহীর মতিহার থেকে আটক করা হয় দুই ছাত্রকে। প্রথমে পুলিশ আটকের বিষয়টি স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করে। আটককৃত তানজিদুর রহমানের বাবা নূর ইসলাম এবং সবুজ আলীর বাবা সাদেক আলী এক বিবৃততে বলেছেন, সোমবার রাত ১টায় আমাদের দুই সন্তান, ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র তানজিদুর রহমান রিপন এবং একই প্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্র সবুজ আলীকে ঘুমন্ত অবস্থায় সবার সামনে বাসা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে সকালে আমরা আমাদের সন্তানদের সাথে মতিহার থানায় দেখা করি এবং খাবারও দিই। কিন্তু দুপুরে হঠাৎ করে পুলিশ তাদের গ্রেফতারের কথা অস্বীকার করে। মঙ্গলবার রাত দেড়টায় সবুজ আলীকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাওয়া যায়। সবুজ আলীর বাবা অভিযোগ করেছেন, মঙ্গলবার রাত দেড়টায় এক পুলিশ কর্মকর্তা তাকে ফোন করে বলেন তোমার ছেলেকে দেখতে চাইলে এই মুহূর্তে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসতে হবে। তিনি গিয়ে হাসপাতালে পুলিশি হেফাজতে সবুজকে চিকিৎসাধীন দেখতে পান। গতকাল সকালে মতিহার থানার ওসি আব্দুর রউফ সাংবাদিকদের বলেন, সবুজকে নিয়ে বিনোদপুর মতিমহলের আশপাশে অভিযান চালালে সে পালানোর চেষ্টা করে এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করে। এ অবস্থায় পুলিশ গুলি চালালে সে আহত হয়। এ দিকে সবুজকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেলেও রিপনের খোঁজ গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

আলোচনায় বসলে সমাধান আসতে পারে -খালেদার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া

সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেছেন, যে কোন সমস্যার সমাধান আলোচনা করেই করতে হয়। চলমান সঙ্কট নিয়ে আলোচনা করলে সমাধান আসতে পারে। খালেদা জিয়া যে প্রস্তাব দিয়েছেন সেটি আমলে  নিয়েও আলোচনা হতে পারে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি)-এর সভাপতি আসম আবদুর রব বলেন, চলমান সঙ্কট উত্তরণে বর্তমান সরকারের পদত্যাগ ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। আমরা অনেক আগে থেকেই এ দাবি জানিয়ে আসছি। কারণ ভোট ছাড়াই এই সরকার জোর করে ক্ষমতায় এসেছে। তাদের আইন পাস করার কোন অধিকার নেই। সরকার পদত্যাগ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ব্যবস্থা করলেই সঙ্কটের সমাধান হবে। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বলেন, যে কোন সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়। চলমান সঙ্কট নিরসনে সরকারকে অবিলম্বে  আলোচনায় বসার আহ্বান জানাচ্ছি। খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলনে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, জনগণের স্বার্থে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী করা হয়নি। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্যই এই সংশোধনী করেছে। এখন তাদেরকে এই সংশোধনী বাতিল করে সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। তবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এই সংশোধনী বাতিল করলেই হবে না নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করতে হবে।  বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে তিনি যে দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন সেটাই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তার বক্তব্যে নতুন কিছু নেই। ওদিকে সরকারও তাদের আগের অবস্থানে রয়েছে। এমন অবস্থায় আলোচনায় বসলে সমাধানের একটা পথ বেরিয়ে আসতে পারে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-এর সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগ বিএনপির নির্ভর করে দেশকে শান্তিপূর্ণ ধারায় এগিয়ে নেয়া যাবে না। আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছেন। এখনও এই দু’দলকে বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ধারায় একটি বিকল্প শক্তি গঠন করতে হবে। তাহলেই দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।

মিশেলকে প্লানেট অব দি অ্যাপস চরিত্রের সঙ্গে তুলনা

মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাকে জনপ্রিয় মুভি ‘প্লানেট অব দি অ্যাপস’র একটি চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করায় যুক্তরাষ্ট্রে স্প্যানিশ ভাষার টেলিভিশন ইউনিভিশনের এক নামি উপস্থাপককে বরখাস্ত করা হয়েছে। ইউনিভিশন বৃহস্পতিবার জানায়, বুধবার সন্ধ্যায় টেলিভিশনে ‘এল গর্দো ওয়াই লা ফ্লাকা’ অনুষ্ঠান চলাকালে ভেনিজুয়েলার উপস্থাপক রডনার ফিগুয়েরোয়া মার্কিন ফার্স্ট লেডি সম্পর্কে এ মন্তব্য করেন। সঞ্চালকরা যখন একজন মেকআপ শিল্পী যিনি নিজেকে মিশেল ওবামাসহ বিভিন্ন নারী সেলিব্রেটির রূপদান করেছিলেন তাকে নিয়ে আলোচনার সময় ওই টিভি উপস্থাপক এ মন্তব্য করেন। ফিগুয়েরোয়া স্প্যানিশ ভাষায় ‘মিশেল ওবামাকে প্লানেট অব দি অ্যাপস’র একটি চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করেন। এর পরপরই ইউনিভিশন ফিগুয়েরোয়াকে বরখাস্ত করে। ইউনিভিশন এক বিবৃতিতে জানায়, গতকাল বিনোদনমূলক ‘এল গর্দো ওয়াই লা ফ্লাকা’ অনুষ্ঠান চলাকালে রডনার ফিগুয়েরোয়া মার্কিন ফার্স্ট লেডি সম্পর্কে যে মন্তব্য করেন তা পুরোপুরি নিন্দনীয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘ফিগুয়েরোয়াকে বরখাস্ত করা হয়েছে।’ এএফপি

অ্যাসাঞ্জকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তাব সুইডেনের

সুইডেনের প্রসিকিউটররা শুক্রবার লন্ডনে গিয়ে জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে (৪৩) জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তাব দিয়েছেন। উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতার বিরুদ্ধে সুইডেনে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেফতার এড়াতে তিনি লন্ডনের ইকুইডোর দূতাবাসে আশ্রয় নিয়েছেন।
২০১০ সালে সুইডেনে দুই নারী অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের অভিযোগ করেন। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু স্টকহোম তাকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করবে এই আশংকায় অ্যাসাঞ্জ সুইডেনে গিয়ে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ খণ্ডন করতে অস্বীকৃতি জানান। উল্লেখ্য, উইকিলিকস যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক, সামরিক ও গোয়েন্দা গোপনীয় তথ্য প্রমাণ প্রকাশ করে। এএফপি

পাকিস্তানে লাখভির জামিন ভারতে ক্ষোভ

লাখভির আটকাদেশ অবৈধ। বেআইনিভাবে আটক রাখা হয়েছে। তাই অবিলম্বে মুম্বাই হামলার প্রধান অভিযুক্ত লস্কর নেতা জাকিউর রহমান লখভিকে মুক্তি দিতে পাক প্রশাসনকে নির্দেশ দিলেন ইসলামাবাদ হাইকোর্ট। শুক্রবার লস্কর-ই-তৈবা নেতা লাখভিকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি নুরুল হক। তার বক্তব্য, সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে জঙ্গি নেতাকে হাজতে আটক রাখা হয়েছে। ৫ মার্চ প্রশাসনের তরফে ভারতের মুম্বাই হামলায় (২০০৪) জঙ্গি নেতার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ এবং এক আফগান নাগরিককে অপহরণের অভিযোগ সংক্রান্ত যাবতীয় নথি আদালতে জমা দেয়া হয়। সেই সঙ্গে জমা দেয়া হয় জঙ্গি নেতাকে আটক রাখা সম্পর্কে পাক সুপ্রিমকোর্টের রায়ের প্রতিলিপি। শুনানিতে লাখভির আইনজীবী রাজা রিজওয়ান আব্বাসি অভিযোগ করেন, মুম্বাই হামলা মামলায় জামিন পাওয়ার পর যেভাবে তার মক্কেলকে জেলে আটকে রাখার পরিকল্পনা হয়,
সেভাবেই ফের তার বিরুদ্ধে অন্য একটি মামলা সাজানোর তোড়জোড় চালাচ্ছে পাকিস্তান সরকার। এদিকে লাখভিকে পাকিস্তানের একটি আদালত জামিন দেয়ায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে ভারত। লাখভির জামিনের বিরোধিতা করে এ ঘটনায় ভারতে নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তলব করা হয়েছে। লাখভির জামিনের খবরে ভারতের রাজ্যসভা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সদস্যরা বলেন, মুম্বাই হামলায় অভিযুক্তদের শাস্তি দিতে পাকিস্তান তার প্রতিশ্র“তি পূরণ করছে না। ভারতের সংসদবিষয়ক মন্ত্রী বেঙ্কইয়া নাইডু বলেছেন, ‘পাকিস্তান লাখভিকে ভারতের হাতে তুলে দিক।’ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরণ রিজিজু বলেছেন, ‘পাকিস্তান সরকারকে দায়িত্বের সঙ্গে আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে উপায় বের করতে হবে যাতে লাখভি জেল থেকে বেরোতে না পারে।’ লাকভি যাতে জেল থেকে মুক্তি না পায় সেজন্য সরকারকে দৃঢ়ভাবে তার পদক্ষেপ নিতে হবে বলেও জানান কিরণ রিজিজু। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা এসব কথা বললেও বিজেপি নেতা সুব্রমনিয়াম স্বামী বলেছেন, ‘আমার মনে হচ্ছে, পাকিস্তানের সঙ্গে আলাপ-আলোচনায় কোনো ফায়দা হবে না। এবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করার প্রয়োজন, তাহলে কিছু সমাধান হতে পারে।’

ভারতের সংস্পর্শে শ্রীলংকার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দিনের সফরে শুক্রবার শ্রীলংকা পৌঁছেছেন। গত তিন দশকের মধ্যে ভারতের কোনো প্রধানমন্ত্রীর এটাই প্রথম শ্রীলংকা সফর। মরিশাসের পোর্ট লুই থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার বিশেষ বিমানে শুক্রবার ভোর ৫টার দিকে কলম্বো পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। রাজধানীতে মোদিকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা জানানো হয়। পরে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাই থ্রিপালা সিরিসেনার সঙ্গে বৈঠক করেন মোদি। দু’জনার একান্ত বৈঠক শেষে শ্রীলংকার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের চীনাবান্ধব সরকারের সময় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করার অঙ্গীকার করেছেন সিরিসেনা। বৈঠকে দু’দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর আলোচনা ফলপ্রসু এবং গঠনমূলক বলে বিবৃতি দিয়েছেন মোদি। বৈঠক শেষে দেয়া সংবাদ সম্মেলনে মোদি আরও বলেন, সিরিসেনা খুবই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা। তার প্রতি আমার আস্থা আরও বেড়ে গেছে। এসময় মোদি তার শ্রীলংকা সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, শ্রীলংকাকে চীন থেকে দূরে রাখাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। পরে শ্রীলংকার পার্লামেন্টে ভাষণ দেন মোদি।
বক্তৃতা দিতে উঠেই সবার আগে শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট মাই থ্রিপালা সিরিসেনাকে ধন্যবাদ জানান তিনি। মোদি বলেন, শ্রীলংকায় পদার্পণের সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য। শ্রীলংকার চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও বন্ধুত্বের সুবাস। পার্লামেন্টে বক্তৃতা দেয়ার সুযোগ দিয়ে আমাকে সম্মানিত করা হয়েছে। আমি ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্ন দেখি, শ্রীলংকার ভবিষ্যৎও যেন তেমন হয়। এটাই আমার শুভেচ্ছা। আজ ভারত ও শ্রীলংকা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মোদি আরও বলেন, আমাদের দুই দেশের ধমনীতে একই সংস্কৃতির ধারা বহমান। আমাদের ইতিহাসও পরস্পরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আজ আমরা উভয় দেশই স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি। শ্রীলংকার সাফল্য আমাদের কাছেও গর্বের বিষয়। আমাদের সহযোগিতা, সমর্থন ও শুভেচ্ছা সব সময়ই শ্রীলংকার সঙ্গে থাকবে। ভারতের সঙ্গে ঐক্য, স্বচ্ছতা, শান্তি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনেই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে শ্রীলংকার ভবিষ্যৎ। এদিকে, দুই দিনের এ সফরের প্রথম দিনেই দুই দেশের মধ্যে চারটি চুক্তি হয়েছে। শনিবার (আজ) তামিল অধ্যুষিত জাফনা দ্বীপে সফর করবেন মোদি। ১৯৮৭ সালের পর প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মোদি এ সফর করছেন।

নর-নারীর সমান অধিকার by এবনে গোলাম সামাদ

বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির -কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর
মানুষ স্তন্যপায়ী প্রাণী। নারী তার গর্ভে সন্তান ধারণ করে। পুরুষ করে না। মাতৃদুদ্ধ পান করে বাঁচে মানবশিশু। মায়ের ওপর তারা নির্ভর করে খাদ্যের জন্য। কেবল খাদ্যের জন্যই নয়, মানসিক পুষ্টির জন্যও। মায়ের অনুপস্থিতিতে কেঁদে ওঠে সন্তান। কিন্তু বাবার অনুপস্থিতিতে এতটা কান্নাকাটি করে না। সন্তানের ভালোবাসাতেই মা আটকা পড়ে গৃহকর্মে। যদিও এখন বলা হচ্ছে, পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়েরা বাধ্য হয় গৃহকর্মে লিপ্ত থাকতে। নারী-পুরুষের মধ্যে আরো অনেক বিষয়ে পার্থক্য আছে। যেমনÑ গড়পড়তা পুরুষ যতটা ভার উত্তোলন করতে পারে, মেয়েরা তা পারে না। পেশিশক্তিতে ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি মতাসম্পন্ন। এই পার্থক্য নারী-পুরুষের মধ্যে এনে দিয়েছে শ্রমবিভাজন। যাতে বেশি কায়িক শক্তি প্রয়োজন হয়, সেসব কাজ করেছে ছেলেরা, মেয়েরা তা করেনি। যেসব সমাজ এখনো পড়ে আছে আদিম জীবনধারায়, সেখানে মেয়েদের দেখা যায় গৃহকর্মে নিযুক্ত থাকতে। কিন্তু ছেলেরা যায় বনেজঙ্গলে শিকার করতে। যেসব সমাজে মানুষ প্রধানত মৎস্যজীবী, সেখানে নৌকা করে ছেলেদের দেখা যায় দূর সমুদ্রে মাছ ধরতে। কিন্তু মেয়েরা থাকে ঘরে, যায় না দূর সমুদ্রে মাছ ধরতে। নর-নারীর শ্রমবিভাজনকে তাই বলা যায় না পুরুষ ষড়যন্ত্রের ফল। এর আছে একটি বাস্তব দৈহিক ভিত্তি। যেটাকে বিবেচনায় না নিলে ভুল করা হয়।
মানসিক দিক থেকেও নর-নারীর মধ্যে পার্থক্য পরিলতি হয়। যেমন গড়পড়তা মেয়েদের সৌন্দর্যচেতনা ছেলেদের চেয়ে বেশি। তাই তারা ঘরদোর অনেক সুন্দর করে গুছিয়ে রাখতে পারে। ছেলেরা যা পারে না। সব দেশেই গড়পড়তা মেয়েরা ফুলদানিতে ছেলেদের তুলনায় সুন্দর করে ফুল সাজাতে পারে। মেয়েদের বর্ণসমাবেশের প্রবণতা ছেলেদের তুলনায় হতে দেখা যায় উন্নত। তাই তারা সেলাইয়ের কাজে নানা রঙের সুতা দিয়ে অনেক সহজে সেলাই করতে পারে, নানা রঙের ফুলের নকশা। এ ছাড়া ছেলে-মেয়ের মধ্যে আরো অনেক জন্মগত পার্থক্য আছে। যেমনÑ মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় কথা বলতে শেখে অনেক তাড়াতাড়ি। গড়পড়তা মেয়েরা তাদের জীবনে ছেলেদের চেয়ে বেশি কথা বলে থাকে। ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে কম দিন বাঁচে। কিন্তু মেয়েদের জীবনে বার্ধক্য আসে তাড়াতাড়ি। পৃথিবীতে তাই বৃদ্ধের তুলনায় বৃদ্ধার সংখ্যা হতে দেখা যায় বেশি।
এসব পার্থক্য পরিবেশগত কারণে ঘটে না। এসব পার্থক্য হলো জন্মগত।
মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় কম খেয়ে বাঁচে, কেননা তাদের শরীর থেকে তাপ ছড়ায় কম। কিন্তু ছেলেরা মেয়েদের মতো অত কম খেয়ে বাঁচতে পারে না। কারণ তাদের দেহ থেকে তাপ ছড়ায় বেশি। তাদের দেহে তাপ ধরে রাখবার মতো চর্বির স্তর থাকে না। মেয়েরা যত কম খেয়ে যত কাজ করতে পারে, পুরুষেরা তাই তা পারে না। এসব পার্থক্যকে ভুলে গিয়ে নর-নারীর সমান অধিকারের কথা ভাবতে গেলে ভুল করা হয়। এসব কথা আমার মনে হচ্ছিল ক’দিন আগে নারী দিবস উপলে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার ক্রোড়পত্র পড়ে। যাতে আলোচিত হয়েছিল মেয়েদের অধিকার নিয়ে অনেক কথা। আর বলা হয়েছিল পুরুষ শাসিত সমাজে মেয়েদের অধিকারবঞ্চনার কথা। কিন্তু মেয়েরা কি পুরুষের মতো সব কাজ করতে সম? না পুরুষেরাই মেয়েদের মতো সব কাজে দেখাতে পারেন একই রকম পারদর্শিতা। সব দেশেই দেখা যায় মেয়েরা ছোট ছেলেমেয়েকে যেভাবে লেখাপড়া শেখাতে পারছেন, ছেলেরা সেটা পারছেন না। অনেক দেশে তাই প্রাথমিক শিার ব্যাপারে মেয়ে শিককে পুরুষ শিকের চেয়ে দেয়া হচ্ছে অগ্রাধিকার। এই বৈষম্য করা হচ্ছে নারী-পুরুষের পার্থক্যকে নির্ভর করে। প্রাথমিক শিায় অর্থাৎ লিখতে, পড়তে ও গুনতে শেখার েেত্র প্রয়োজন হয় যথেষ্ট ধৈর্যের। যেটা মেয়েরা পারেন অনেক সহজে ধারণ করতে। ছেলেরা নয়।
আমাদের দেশে মেয়েরা এখন রাজনীতি নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি করছেন। যেটা আগে ছিল না। এ প্রসঙ্গে ভারতের এককালের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কিছু উক্তি উদ্ধৃত করা যেতে পারে। ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, ‘এই কাজের (প্রধানমন্ত্রিত্বের) ব্যাপারে আমি নিজেকে নারী হিসেবে চিন্তা করি না। কোনো নারীর যদি যেকোনো পেশার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকে, তবে তাকে সেই পেশায় কাজ করার সুযোগ দেয়া উচিত।... আমি নারীবাদী নই, আমি একজন মানবসন্তান। যখন আমি নিজের কাজ করি, তখন নিজেকে নারী হিসেবে চিন্তা করি না।...’ কিন্তু আমাদের দেশে মেয়েরা দাবি করছেন এমপি হওয়ার জন্য সংরতি আসন। যেটা নর-নারীর সমান অধিকারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করা যায় না। জার্মানিতে অ্যাঞ্জেলা মার্কেল চ্যান্সেলর হয়েছেন পুরুষদের সাথে ভোটে প্রতিযোগিতায় জিতেই। আর তিনি তার কাজে পরিচয় দিতে পারছেন যথেষ্ট দতার।
অনেকের ধারণা, মেয়েরা গৃহকাজে আটকা থাকে বলে অন্য কাজে রাখতে পারে না দতার স্বার। কিন্তু এ ধারণাকেও আমি যথেষ্ট সঙ্গত বলে মনে করি না। অনেক নারী গৃহকর্ম করেও হতে পেরেছে যথেষ্ট খ্যাতিমান। এ েেত্র আমার মনে পড়ে, মারি স্লোভদয়াস্কা কুরির (১৮৬৭-১৯৩৪) কথা। মারি কুরি ছিলেন পোল্যান্ডের মেয়ে। তিনি ফ্রান্সে আসেন লেখাপড়া শিখতে। বিয়ে করেন পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পিয়ের কুরিকে। তারা দু’জন রেডিয়াম ধাতু আবিষ্কার করেন। রেডিয়াম নিয়ে গবেষণা করে লাভ করেন বিশ্বখ্যাতি। পিয়ের কুরি ও মারি কুরি নবেল প্রাইজ লাভ করেন ১৯০৩ সালে। পিয়ের কুরি হঠাৎ মারা যান পারিতে রাস্তায় গাড়িচাপা পড়ে। রেখে যান দুই শিশুকন্যাকে। মারি কুরি এদের রান্না করে খাইয়ে ঢুকতেন ল্যাবরেটরিতে গবেষণার কাজে। রেডিয়াম নিয়ে গবেষণা করে পরে তিনি রসায়ন শাস্ত্রে একা লাভ করেন নবেল প্রাইজ, ১৯১১ সালে। এ ছিল তার বিরাট কৃতিত্ব। তিনি দেখাতে সম হন যে, তেজস্ক্রিয় রেডিয়াম পরমাণুরা বিশেষ হারে ভেঙে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় সিসার পরমাণুতে। ঘর সামলেও এ রকম গবেষণা করার নজির খুব কমই আছে। তবে এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, শিশুসন্তানদের রান্না করে খাইয়েও খুব উন্নত মানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা সম্ভব। এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, তার দুই কন্যার মধ্যে এক কন্যা, আইরিন জোলিয় কুরি তার স্বামী জোলিয় কুরির সাথে পদার্থবিজ্ঞানে গবেষণা করে নবেল প্রাইজ লাভ করেন ১৯৩৫ সালে। আইরিন জোলিয় কুরিও সাংসারিক কাজে অবহেলা করেননি। তিনিও ছিলেন তার মায়ের মতো গৃহকর্মে নিষ্ঠাবান। এ রকম দৃষ্টান্ত অবশ্য খুবই বিরল, কিন্তু আছে। ইউরোপ ও আমেরিকায় নারীরা লেখাপড়া জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় অনেক এগিয়ে গেছেন। তথাপি যে ছেলেদের সমক হতে পেরেছেন, তা নয়। প্রতি বছর মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় খুব কম েেত্রই নবেল প্রাইজ লাভ করে থাকেন। নবেল প্রাইজ অবশ্য জ্ঞানবিজ্ঞানের মাপকাঠি নয়। তবুও এর দ্বারা সাধারণভাবেই নারী-পুরুষের অর্জনের কিছুটা মূল্যায়ন করা চলে। মেয়েরা ছেলেদের মতো নবেল প্রাইজ পাচ্ছেন না বলেই যে তারা ছেলেদের চেয়ে গড়পড়তা বুদ্ধিতে কম, এ রকম সিদ্ধান্তে আসা যায় না। তবু পার্থক্যটা ল করবার মতো। এ পর্যন্ত সাহিত্যে মহিলারা তেরোজনের বেশি নবেল প্রাইজ পেয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই। এটাকে নিশ্চয় পুরুষ শাসিত সমাজের একটি ষড়যন্ত্রের ফল বলে চিহ্নিত করা চলে না। খোলাধুলার েেত্রও দেখা যাচ্ছে নর-নারীর পার্থক্য। অলিম্পিকে ছেলেমেয়েদের প্রতিযোগিতা হচ্ছে এখনো আলাদা করে; একত্রে নয়। এটাকেও বলা চলে না পুরুষ ষড়যন্ত্রের ফল। নর-নারীর সমান অধিকারের প্রশ্নকে তাই বিচার করতে হবে এসব পার্থক্যের কথা বিবেচনা করেই।
ইসলামে মেয়েদের ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার দেয়া হয়েছে (আল কুরআন, সূরা ৪: ৩২)। বলা হয়নি তারা ব্যবসা-বাণিজ্য করার যোগ্যতা রাখেন না। রাজনীতি করার েেত্র সরাসরি কিছু না বলা হলেও আল কুরআনে সাবার রানী বিলকিসের খুব প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন শাসক হিসেবে যোগ্যতাসম্পন্না এবং দেশ শাসন করতেন দেশবাসীর সাথে পরামর্শ করে, স্বেচ্ছাচারিতা করে নয় (সূরা ১৭ : ৩২)। বিলকিসের মতো রানী ইতিহাসে খুব বেশি নেই। কিন্তু কুরআনে বলা হয়নি মেয়েরা দেশ শাসনে যোগ্যতা রাখেন না। তবে মেয়েদের মধ্যে যোগ্য শাসক সচরাচর পাওয়া যায় না। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু এ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোনো মহিলা প্রেসিডেন্টের পদ অলঙ্কৃত করতে পারেননি। এখনো বিশ্বে সাধারণভাবে মনে করা হয়, মেয়েদের পে রাজনীতি সামাল দেয়া হলো যথেষ্ট কঠিন কাজ।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

প্রথা ভেঙে হোলি উৎসবে ভারতীয় বিধবারা

ভারতে এবার প্রথা ভেঙে হোলি উৎসবে যোগ দিলেন বিধবা নারীরা। কয়েক শতাব্দীর পুরনো ওই প্রথা অনুযায়ী হোলি উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারেন না বিধবা নারীরা। কিন্তু এবার ভারতের বৃন্দাবনের অনেক বিধবা নারী অংশ নিলেন হোলি উৎসবে, গায়ে রঙ ছড়ালেন একে অপরের। এ খবর দিয়েছে আল জাজিরা। ওই বিধবা নারীদের একজন ৯০ বছর বয়সী টুকনি দেবী। তিনি গত ৬৬ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম হোলি উৎসবে অংশ নিলেন। মাত্র ২৫ বছর বয়সে বিধবা হন টুকনি দেবী। এরপরই নিজের পরিবারের কাছ থেকে বিতাড়িত হয়ে ভারতের বারানসির বৃন্দাবনে একটি আশ্রমে বসবাস করতে শুরু করেন। তিনি বলেন, আমাদের সমাজে বিধবা নারীদের পশুর চেয়েও খারাপ চোখে দেখা হয়। আমার পরিবারের কাছ থেকে আমি বিতাড়িত। সমাজ মনে করে, আমরা তাদের সঙ্গে বসবাস করার উপযুক্ত নই, কেননা আমরা আমাদের স্বামীকে হারিয়েছি। তার মৃত্যুর পর আমি কোন উৎসবই উদযাপন করিনি। পুরো ভারতে উদযাপিত হয় হোলি উৎসব। রঙের উৎসব বলেও এটি পরিচিত। তবে রক্ষণশীল প্রথা অনুযায়ী, বিধবা নারীরা এ উৎসবে অংশ নিতে পারবেন না। বিভিন্ন রঙের গুড়া ছিটিয়ে একে অপরের মুখে লাগিয়ে দেয়া হয় এ উৎসবে। এ থেকেও বঞ্চিত থাকেন বিধবা নারীরা। এদের পরিস্থিতি মূল সমাজের সামনে উপস্থাপন করা ও তাদেরকে সামাজিক কলঙ্কের হাত থেকে রক্ষা করতে, সুলভ ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি এনজিও বারানসি ও বৃন্দাবনে বসবাসরত বিধবাদের জন্য তিনদিনের হোলি উৎসবের আয়োজন করে। ভারতের উত্তর প্রদেশে এ দুই পবিত্র শহর অবস্থিত। প্রায়ই এ দু’ শহরকে বিধবাদের শহর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। যেসব নারীর স্বামী মারা যাওয়ায় সমাজ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন তাদের অনেকের ঠাঁই হয় এখানকার বিভিন্ন আশ্রমে। সুলভ ইন্টারন্যাশনালের ভাইস প্রেসিডেন্ট বিনীতা বর্মা বলেন, ২০১১ সালে বৃন্দাবন ও বারানসিতে যেসব বিধবা বসবাস করেন, তাদের দুরাবস্থা সমপর্কে সুপ্রিম কোর্টের একটি চিঠি পাই আমরা। তারা ক্ষুধায় খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন, এমনকি দিনে একবারের খাবার জোগাড় করতেও তাদের জন্য কঠিন হয়ে যেত। তাদের পরিস্থিতি প্রাণীদের চেয়েও কঠিন ছিল। আমরা তাদের জন্য দিনে দুই বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা শুরু করি। এছাড়া আর্থিক সহায়তাও প্রদান করি। তাদের জন্য হোলি উৎসব আয়োজনের মতো কর্মকাণ্ড তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য করা হয়েছে। আমরা সমাজের বহু রক্ষণশীল ব্যক্তির কাছ থেকে বাধার সম্মুখীন হয়েছি। তবে আমরা হাল ছেড়ে দেব না। ঐতিহ্যগতভাবে তারা কেবল সাদা শাড়ি পরার অনুমতি পান। তারা সৌন্দর্য চর্চাও করতে পারেন না। কিন্তু এ উৎসবে তারা রঙ নিয়ে উৎসবে মেতেছেন, রঙবেরঙের পোশাক পরেছেন। তাদের অনেকে সৌন্দর্য চর্চাও করেছেন। বৃন্দাবনের পাগলবাবা বিধবা আশ্রমে অনুষ্ঠিত ওই বিশেষ হোলি উৎসবে অংশ নিয়েছিলেন হাজারেরও অধিক বিধবা। সুলভ ইন্টারন্যাশনাল আয়োজিত ওই উৎসবে ১৪০০ কেজিরও বেশি ফুলের পাপড়ি ও ১০০০ কেজি রঙের গুড়া ব্যবহৃত হয়েছে। ৩৮ বছর বয়সী এক বিধবা অন্নপূর্না শর্মা জানান, আশ্রমে জীবন অনেক কঠিন। আমি আমার আশ্রমে সবচেয়ে কনিষ্ঠ। তিন বছর আগে স্বামীকে হারিয়েছি। এখন সব ধরনের পার্থিব ইচ্ছা বিসর্জন ও মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার কথা আমাদের। আমি এক আশাহীন জীবনযাপন করছি বহুদিন ধরে, কেননা আমার বহুদিন বাঁচতে হতে পারে। তবে এ উৎসব আমাকে আশা জুগিয়েছে। আমি এতটা খুশিী কখনও হইনি। ওই উৎসবে ৩৭ বছর বয়সী আরেক বিধবা অংশ নিয়েছিলেন। তার বক্তব্যেও ছিল উচ্ছ্বাস ও আনন্দের প্রতিচ্ছবি। তিনি জানান, আমার ইচ্ছা, পৃথিবীতে যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিন এ উৎসবে অংশ নিতে পারবো আমি।

ডিবি পরিচয়ে অপহরণের পর নিখোঁজ ব্যবসায়ী by সিরাজুস সালেকিন

গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে অপহরণের পর খোঁজ মিলছে না বগুড়ার ব্যবসায়ী শিহাবউজ্জামান পাভেলের (২৬)। গত ৯ই জানুয়ারি রাজধানীর বিজয়নগর থেকে তাকে অপহরণ করে দুর্বৃত্তরা। ঘটনার প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এ মামলার কোন অগ্রগতি জানাতে পারেনি পুলিশ। অপহৃতের পরিবারের অভিযোগ, পাভেলের মামলা নিয়ে পুলিশের আচরণ রহস্যজনক। পাভেলের ছোট বোন জেনি জামান সিক্তা জানান, পাভেল কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত নন। তিনি গার্মেন্টের ব্যবসা করতেন। গত ৯ই জানুয়ারি রাজধানীর বিজয়নগর থেকে ডিবি পুলিশ পরিচয়ে ৪-৫ জন লোক তার ভাইকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনার পর ১৩ই জানুয়ারি নিজে বাদী হয়ে পল্টন থানায় মামলা করেন। মামলা নং-১৮। মামলার এজাহারে বলা হয়, রুকসানা আলী হীরা, মো. বাবর আলী ও বেলি বেগম নামে তিনজনের সঙ্গে ব্যবসার বকেয়া টাকা নিয়ে পাভেলের কথা কাটাকাটি হয়। টাকা পরিশোধের কথা বলে তারা ৭ই জানুয়ারি পাভেল ও তার সৎ ভাই জাকির হোসেন মুক্তাকে বগুড়া থেকে ঢাকায় ডেকে নিয়ে আসে। সেই রাতে পাভেল ও তার ভাই হোটেলে অবস্থান করেন। ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত তারা পাওনা টাকা ফেরত পাননি। শুধু মোবাইল ফোনে ওই তিনজনের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। একই দিন বিকাল ৪টায়ক পাভেল ও মুক্তা বাড়ি থেকে বিকাশের মাধ্যমে আসা টাকা তুলতে বিজয়নগরে যান। মাহতাব সেন্টারের সামনে তারা প্রাইভেট কার পার্ক করেন। মুক্তা একটি দোকানে টাকা তুলতে ঢোকেন। এ সময় পাভেল গাড়ির ভেতরে বসা অবস্থায় ছিলেন। গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি থেকে নেমে বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটের কিছু সময় পর সিলভার কালারের হায়েস মাইক্রোবাসযোগে ২৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪-৫ অজ্ঞাতনামা লোক পাভেলের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে দুজন পাভেলের শার্টের কলার ধরে প্রাইভেট কার থেকে নামিয়ে মাইক্রোবাসে তোলার চেষ্টা করে। ড্রাইভার ও আশপাশের লোকজন দৌড়ে এলে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা নিজেদের ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে বলে, পাভেলের নামে মামলা আছে। ঘটনার পর থেকে পাভেলের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। ড্রাইভার পাভেলের পরিবারকে বিষয়টি জানালে পল্টন থানায় ও ডিবি অফিসে খোঁজ করা হয়। কিন্তু এসব জায়গায় তার বিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এরপর ১৩ই জানুয়ারি পল্টন থানায় মামলা করেন পাভেলের বোন সিক্তা। মামলাটি তদন্তের জন্য পল্টন থানা ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। একই দিন র‌্যাবের কাছেও লিখিত অভিযোগ করেন সিক্তা। গতকাল সিক্তা মানবজমিনকে বলেন, আমার ভাইকে ফেরত পাওয়ার আশা ছেড়ে দিয়েছি। এ মামলায় দুজনকে আটক করে রিমান্ডে নিয়েছিল ডিবি পুলিশ। সে সময় পুলিশের ব্যবহার ভাল ছিল। আসামিদের একদিন রিমান্ডে রাখার পর পুলিশের আচরণ রহস্যজনকভাবে বদলে যায়। মামলার তদন্তকাজে পুলিশ আগ্রহ কমিয়ে দেয়। মামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের কথা বললে ডিবি অপরাগতা প্রকাশ করে বলে তারা রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এখন কোন অভিযান চালাতে পারবেন না। তারা পরে যোগাযোগ করতে বলেন। অপহরণের সঙ্গে তাদের পরিবারের একজন সদস্য জড়িত আছে বলে জানান সিক্তা। এ ছাড়া মামলার আসামিদের সঙ্গে সরকারের প্রভাবশালী একজন প্রতিমন্ত্রী জড়িত আছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই উজ্জ্বলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটিতে আছেন বলে জানান। এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার জুয়েল রানা বলেন, মামলার উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি নেই।

শোকের শহর মংলা by রাশিদুল ইসলাম ও একে আজাদ

প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর মংলায় সেনাকল্যাণ সংস্থার ধসে পড়া ভবনের উদ্ধারকাজ সমাপ্ত ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল দুপুরে সেনাকল্যাণ সংস্থার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল  মো.  সেলিম আনুষ্ঠানিকভাবে এর সমাপ্তি ঘোষণা করেন। এ দুর্ঘটনায় কতজন শ্রমিক নিখোঁজ এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিল তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি উদ্ধারকর্মীরা। তবে এখনও ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে দাবি করেছেন উদ্ধার হওয়া শ্রমিকরা। নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের ৫ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মংলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ আলী প্রিন্স। এছাড়া নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ১ লাখ টাকা করে প্রদানের কথা জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। এদিকে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার ফারুক হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিকে আগামী ৭ দিনের মধ্যে তদন্ত  রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ‘সেনাকল্যাণ সংস্থার পরিচালিত এলিফ্যান্ট ব্র্র্যান্ড’ সিমেন্ট কারখানার নির্মাণাধীন ওই মিলিং হাউজের ছাদ ধসে পড়ে এবং রাতেই ধ্বংসস্তূপ থেকে ৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়। যাদের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে তারা হলেন, বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার গৌরম্ভা গ্রামের আমীর আকুঞ্জী, একই উপজেলার রাজনগর গ্রামের আবদুল লতিফ শেখের ছেলে ফারুখ শেখ, একই গ্রামের মারুফ হাওলাদার, একই উপজেলার ঝনঝনিয়া গ্রামের নূর মোহাম্মদ, খুলনা মহানগরীর নিরালা বাগমারা হাজীপাড়ার বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেনের ছেলে আল আমিন, সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার লাঙ্গলধারা গ্রামের বাসিন্দা শামসুর রহমানের ছেলে বাকীবিল্লাহ ও সিরাজুল ইসলাম। ঘটনার পর থেকে মংলা পরিণত হয়েছে শোকের শহরে।
টানা ২৪ ঘণ্টার উদ্ধার তৎপরতা শেষে শুক্রবার দুপুর ১ টায় উদ্ধার কাজ সমাপ্ত ঘোষণা করেছে সেনাকল্যাণ সংস্থা। সংস্থার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সেলিম এক প্রেসব্রিফিংয়ে বলেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হয়েছে যে ভেতরে কোন মরদেহ নেই।
নির্মাণ শ্রমিক মিজান মল্লিক বলেন, ২০ থেকে ২৫ জন শ্রমিক এখনও নিখোঁজ রয়েছে। তার দাবির সঙ্গে আংশিক একমত হয়ে ফায়ার সার্ভিসের খুলনা ও বরিশাল জোনের উপ-পরিচালক মো. শেখ মিজানুর রহমান গতকাল সকালে বলেন, খুলনা, বাগেরহাট, মংলাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ৭টি ইউনিট উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও দু’-একটি লাশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিন সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন স্থানীয় এমপি তালুকদার আবদুল খালেক। উদ্ধার কাজের তদারকি শেষে তিনি এ দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। একই সঙ্গে হতাহতদের পরিবারের পাশে থাকার কথাও জানান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সেনাকল্যাণ সংস্থার মালিকানায় ১৯৯৪ সালে পশুর নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত মংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলিফ্যান্ট ব্র্যান্ড নামে সিমেন্ট বাজারজাত শুরু করে। কারখানাটি গুদাম নির্মাণে ১৪২ কোটি টাকায় চীনের সিএনবিএম ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডকে কার্যাদেশ দেয়। ২০১৪ সালের ১০ই নভেম্বর ভবনটির কাজ শুরু হয়। চলতি বছরের ১০ই নভেম্বর ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরবর্তীকালে চীনা কোম্পানির কাছ থেকে বাংলাদেশ আইটিসিএল নামক অপর একটি  কোম্পানি এ কাজের সাব-ঠিকাদার হিসেবে কাজ শুরু করে। বৃহস্পতিবার সকালে মোট ১৮০ জন শ্রমিক নিয়ে ১৪ দশমিক ৫ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট এ ভবনের ছাদ ঢালাইয়ের কাজ শুরু করে। এদের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ জন শ্রমিক ছাদে ছিল এবং অন্যরা ভবনের নিচে কাজ করছিল। দীর্ঘ ২৩ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ৭ জনের মৃতদেহ ও ৪৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।
নিহত স্বজনদের আর্তনাদ: ভবন ধসে নিহত ও আহতদের স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। একে একে যখন নিহতদের স্বজনরা তাদের প্রিয়জনের লাশ শনাক্ত করতে আসেন তখন সবার চোখেমুখে ছিল স্বজন হারানোর বেদনার ছাপ। আহত শ্রমিক শহীদ শেখের স্ত্রী ফাতেমা বেগম বলেন, আমার স্বামীকে বাঁচিয়ে রাখায় আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া আদায় করি। আমাদের স্কুলপড়ুয়া ছেলে- মেয়ে আছে। এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এদিকে বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার রাজনগর গ্রামের বাসিন্দা নিহত শ্রমিক মাহারুফের বৃদ্ধা মা রহিমা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ২৫ দিন আগে এখানে কাজে আসেন মাহারুফ। কাজ শেষে পারিশ্রমিকের টাকা নিয়ে বাড়ি  ফেরার কথা ছিল তার। কিন্তু তার সন্তান আর বাড়ি ফিরতে পারলো না। নিহতের স্ত্রী খাদিজা বাকরুদ্ধ সন্তানদের জড়িয়ে কান্নারত অবস্থায় বললেন, কে ওদের দেখবে। বাড়ির সামান্য জায়গাটুকু ছাড়া  কোন অর্থসম্পদ নেই। কিভাবে কাটবে তাদের দিন। এদিকে বাবাকে হারিয়ে বিলাপ করছে মেয়ে খাদিজা (১৫) ও যমজ দুই ছেলে একরামুল ও হাকিম (৯)। তারা বলছিল, আব্বা তুমি আমাদের এভাবে রেখে চলে গেলে। ঢালাইয়ের কাজ শেষে টাকা নিয়ে বাড়ি আসবে, বাজার নিয়ে আসবে। কিন্তু আজ তুমি আমাদের এভাবে এতিম করে চলে গেলে।
সহায়তা দান: নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে এক লাখ টাকা করে সহায়তা দেয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন ফ্যাক্টরির উপ-মহাপরিচালক ক্যাপ্টেন    সৈয়দ হেলাল হোসেন। গতকাল সকাল ১০টার দিকে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে তিনি একথা বলেন। শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে মংলা বন্দর হাসপাতালে আহতদের খোঁজ নিতে এসে বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য তালুকদার আবদুল খালেক সাংবাদিকদের জানান, এ দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ  থেকে প্রাথমিকভাবে ২০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে। পাশাপাশি আহতদের প্রত্যেক পরিবারকে প্রাথামিকভাবে ১০ হাজার টাকা করে দেয়া হবে।

নলিতে by উম্মে মুসলিমা

মানিক মুণ্ডা বিকেলে চুলে টেরি কেটে ইস্ত্রিরি করা হাফশার্ট গায়ে সাইকেলের হ্যান্ডেলে তার প্রিয় ফিলিপস রেডিও ঝুলিয়ে অকারণে মেইন রোড এপার-ওপার করত। আমরাও তখন আমাদের বাসাসংলগ্ন বাবার অফিসের সামনে মেতে উঠতাম কুমির কুমির খেলায়। দারোগার দুই মহাপাজি বিচ্ছু ছেলে টুকুল আর মুকুল মানিককে বাবুগিরি করতে দেখে খ্যাপাত ‘মানিক মেথর, মানিক মেথর’ বলে। পোস্টমাস্টারের মেয়ে বিনুও তাল মেলাত ওদের সঙ্গে। কেবল আমি আর আমার ছোট বোন মিলু খুব লজ্জা পেতাম। কারণ, মানিক মুণ্ডা প্রতি সপ্তাহে আমাদের সবার বাসার পায়খানা পরিষ্কার করত। প্রথমে একদিন স্যান্ডো গেঞ্জি ও হাফপ্যান্ট পরে বালতি আর ঝাঁটা হাতে আমাদের বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল মানিক। একটু কাঁচুমাচু। আমি জানালা দিয়ে তাকাতেই সে বলল, ‘বড়বাবু আছেন? আজ মাল ফেলব বটে।’ ‘বাবা, বাবা, মানিক মেথর এসেছে, পায়খানা সাফ করবে।’ ছুটে গিয়ে জোরে জোরে আমি বললাম বাবাকে। বাবা ক্ষুণ্ন হলো। নিজের ঠোঁটে তর্জনী ছুঁয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ছি! মা, কোনো কাজই ছোট না। ওর নাম মানিক মুণ্ডা। ওকে মানিকদা বলে ডাকবে। ললিতাকে দিদি বলো না? তেমনি।’ তাই টুকুল-মুকুল বিকেলে যখন ফিটফাট ফুলবাবু মানিককে ‘মানিক মেথর’ বলে খ্যাপাত, সত্যিই খেপে গিয়ে মানিক তখন তেড়ে আসত সাইকেল নিয়ে। মাল তোলার সময় সে মেথর, সে সময় সবাই তা বলতেই পারে। কিন্তু নিজের কাজ সেরে খোলা জায়গায় বসানো মেথরপল্লির একমাত্র টিউবওয়েলের ইটের ওপর বসে সুগন্ধি সাবান মেখে স্নান করে সে। ঘরে ফিরে দেয়ালে ঝোলানো আয়নার সামনে অনেকক্ষণ ধরে ঘন কালো কোঁকড়া চুলে চিরুনি দেয় আর কথা বলে নিজে নিজে, ‘আমার মতো কয়টা মরদ তু এ মেথরপাড়ায় পাবি নলিতে? তুর কিসের এত অংকার?’
ললিতা হয়েই আবার জবাব দেয় মানিক, ‘কিসের আবার? রূপের বটে।’
‘আমার চেহারাটা কি থাড় কেলাছ? এমুন চোখ, এমুন বুকের ছাতি, এমুন বনদেওতার মতন চুল...’—কথা বলতে বলতে সাবানে ঘষা ঝাঁকড়া চুলে চিরুনি চালিয়ে চালিয়ে চুলগুলো আরও ফুলিয়ে তোলে মানিক।
‘খালি চুল থাকলেই হবেক লাইরে মানিক, ট্যাকা আছে? ছোনা আছে? মালা শাড়ি দিতি পারবিক?’
‘ক্যানে, আমার ফিলিপস রেডিও আছে, একখান ঘর আছে। লগদও আছে বটে।’
‘তা-ও তো তু মানিক মেথর।’
‘তু তো আর রাজকইন্যে লোস।’
‘আমাকে রাজরানি করতি চায় কোতো বাবু।’
‘নলিতে! এই মানিক তুর মরদ। তু লিশ্চয় আমার।’
বাবুদের অফিসঘর ধোয়ামোছা করে ললিতা। বাবুরা অফিসে ঢোকার আগেই বগলে ঝাড়ু, কোমরে ঝাড়ন গুঁজে সেখানে আসে মেয়েটি। টানটান করে বাঁধা পাকা তালের মতো হাতখোঁপায় কোনো দিন রজনীগন্ধা, কখনো গাঁদা, কোনো দিন আবার সাদা হাঁসের পালক। প্রায় হাঁটু অবধি তোলা শাড়ির নিচে দুটো সুঢৌল পা, যেন বেড়ে ওঠা সুপুষ্ট দুটো মেহগনিগাছ। ও যখন সেই পায়ে ভর দিয়ে পেছন ফিরে অফিসের আলমারির ওপরের তাক মোছে, ওর নিতম্ব আর সরু কোমরকে তখন যেন মনে হয় ভরা কলস। যারা তার সৌন্দর্যমুগ্ধ, এ সময় তারা অফিস-সময়ের আগে অফিসে এসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানে আর আড়চোখে উপভোগ করে ললিতার দেহবল্ল­রির শোভা। সে যখন ঘর মোছে, আমার বাবার অফিসের কেরানি বেলাল চাচা তখন ওর সামনে দাঁড়িয়ে নির্দেশ দেয়, ‘টেবিলের নিচে আর একবার হাত ঘুরিয়ে আন ললিতে, দেখছিস না এখনো ধুলো রয়েছে।’
‘আর কত ঘইষব গো কেরানিবাবু, কয়লা ধুলে ময়লা যাবেক?’
কী উদ্দেশ্যে এ কথা বলে ললিতা, তা নিয়ে কেরানিবাবুর মাথাব্যথা নেই। সে শুধু বলে, ‘আর একটু।’ নিচু হয়ে মেঝে মোছার সময় ললিতার সমর্থ স্তনের উদ্ভিন্ন ওঠানামা দেখার আরও একটু লোভ সামলানো বেলাল কেরানির পক্ষে খুব কঠিন যে!
রোজ কাজ সেরে যাওয়ার পথে ললিতা আবুল দোকানির টঙে চা খায়। সঙ্গে একটা টোস্ট। দোকানের সামনের বেঞ্চিতে না বসে বেঞ্চির পাশে যেখানে দুটো ইট পেতে রাখা আছে, দুই হাঁটু উঁচু করে বসে সেখানেই। মানিক বা অন্য মুণ্ডারা এলেও চা খায় ওখানে বসেই। কাচের ছোট ছোট ঝকঝকে গ্লাস কাঠের ট্রের ওপর সাজানো। কিন্তু আবুল দোকানি মুণ্ডা জাতের জন্য রাখে মাটির ভাঁড়। ওরা চা খেয়ে দোকানের পেছনে ছুড়ে ফেলে। দোকানি কোনো দিন ললিতার সঙ্গে মশকরা করে, ‘কোঁচড়ে করে বাড়ি নিয়ে যা। কাল আবার নিয়ে আসিস। ভাঁড় কিনতে পয়সা লাগে না?’
‘আমরা মাঙনা খাই বটে? কুনু দিন ভাঁড়ডা তো ভরেও দাও না দোকানি।’
‘তোর ভাঁড় তো এমনিই ভরা। বাবুরা তোকে কত খাতির করে।’
‘তুমিও করো না কেনে?’
‘হুঁ, মানিক আমার দোকানে গু ছিটিয়ে দিক আরকি।’
‘মানিককে খুব ডরাও যে!’
কথা বলে খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ে ললিতা। ওর খোঁপার ফুল খসে পড়ে। মুখে হাত দিয়ে হাসি আটকানোর সময় বেজে ওঠে ওর গোছা গোছা রেশমি চুড়ি। কোনটা চুড়ির শব্দ আর কোনটা হাসির, ঠাওর করতে পারে না দোকানি। দুলে ওঠে ললিত লবঙ্গলতিকা। পুরুষের শরীরে জাগে শিহরণ।
একদিন বিকেলে হলুদ-লালে একটা নতুন ছাপা শাড়ি পরে, খোঁপায় গাঁদা গুঁজে ঘরের দুয়ারে শিকল তুলে বের হচ্ছিল ললিতা। ধোয়া-কাচা একমাত্র হাফশার্ট পরে মানিক সাইকেল দাঁড় করাল ওর ঘরের পাশে।
‘ই বেলা কুথাকে যাছ নলিতে?’
‘তু কি আমার ঘরের মরদ, তুকে বুলব কেনে?’
‘ছিনিমার টিকিট আনছি দুটো। সেকেন শোতে যাই চল।’
‘কেরানিবাবু এই শাড়ি দিছে। বাবুর সঙ্গে ছিনিমা দেখতি যাচ্ছি।’—কথাটি বলার পর মানিকের অসহায় মুখের দিকে তাকিয়ে বিজয়িনীর হাসি হাসে ললিতা। কোথায় কেরানিবাবু আর কোথায় মানিক মেথর! ললিতা এগিয়ে যায় দপ দপ করে পা ফেলে। শাড়িটা কেরানিবাবু দিলেও দিতে পারে, কিন্তু ললিতা কেরানিবাবুর সঙ্গে সিনেমা দেখতে যাচ্ছে—এটা কখনোই বিশ্বাস করে না মানিক। তার বুকে ঈর্ষার আগুন জ্বালাতেই ললিতার এই আচরণ—মানিক তা বোঝে বা বুঝতে চায়। সাইকেল টেনে নিয়ে ললিতার পাশে হাটঁতে হাঁটতে বলে, ‘ওই বাবুর বাচ্চাগুলানকে বিছছাস যাস না নলিতে। ওরা আমাদের ঘিন্না করে।’
‘তুকে করে। তু মাল ঘাঁটিস।’
পরিষ্কার কাপড় পরে গলায় পাউডারের ছিটে দিয়ে বিকেলে বেড়াতে বেরোনো মানিককে মেথর ডাকলে চাঁদি তেতে ওঠে তার। খপ করে লোহার মতো হাতে সে চেপে ধরে ললিতার হাত, ‘এ-এ-এ আমি মানিক মুণ্ডা, এই মানিক মুণ্ডা তুকে ভালোবাছে। তুকে একদিন ই কথা মানতেই হবেক নলিতে!’
‘উ কথা লিয়েই স্বপ্পন দেখ। আমি যাই।’
সাইকেলে জোর প্যাডেল ঘুরিয়ে ললিতার আগেই সেদিন সিনেমা হলের অদূরে এক ঘুপচি দোকানে গিয়ে বসে থাকে মানিক। সন্ধ্যার শো শুরু হয়ে শেষ হলো, সেকেন্ড শোও শেষ হলো রাত ১২টায়। ললিতা বা কেরানিবাবু কাউকেই ঢুকতে-বেরোতে দেখল না মানিক। নিশ্চিন্তে সাইকেলে উঠল সে। এ নিশ্চয় ললিতার ছল। তাকে রাগাতেই ভালোবাসে ললিতা।
সুনসান রাস্তায় কেবল মানিকের সাইকেলের চাকা আর বাতাসের ধাক্কার শাঁই শাঁই ধ্বনি। বুকপকেট থেকে টিকিট দুটো তুলে নিয়ে উড়িয়ে দেয় বাতাসে। ললিতাকে ছাড়া সে একা একা কোনো দিন সিনেমা দেখবে না। সোনার নাকফুল আর মালা শাড়ি কিনতে বড়জোর লাগবে আর ছয় মাস। বাজারে নতুন ধরনের প্লাস্টিকের স্যান্ডেল এসেছে। পরে বিকেলে খেলা করে বাবুদের মেয়েরা। দেখে ভারি সুন্দর লাগে। ওটাও একজোড়া কিনবে ললিতার জন্য। খালি পায়ে বউ ঘরে তুলবে না সে। ওর বুকে এসে লাগে সুখের বাতাস। মুখে ফোটে গান, ‘হামে তুমছে পেয়ার কিতনা/ এ হাম নাহি জানতে/ মাগার জি নাহি সাকতে তুমহারা বিনা...।’

২.
সেদিন সকালে মা আমাকে বলল, ললিতা অফিস পরিষ্কার করতে এলে আমি যেন তাকে বাসায় ডেকে আনি। বাসা একটু ধোয়ামোছা করা লাগবে। বেলাল চাচা বিয়ে করেছে কদিন হলো। নতুন বউকে দাওয়াত করা হয়েছে। মা রান্নাবান্না করছে। নতুন বউ আসবে শুনে আমি তো মহাখুশি। এক ছুটে বাবার অফিসে গিয়ে দেখি ললিতা বালতি আর ঝাড়ু পাশে রেখে বারান্দায় দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে আছে। পিয়ন এসে অফিসের দরজা খোলেনি তখনো। ওর চুল উস্কো। খোঁপায় কোনো ফুল নেই। পায়ের গোড়ালি ঘিরে নেই আলতার রেখা। মুখের মধ্যে পান, কিন্তু ঠোঁট সাদা। মলিন। রোজকার মতো দেখা হতেই সালাম না দিয়ে কেমন উদ্ভ্রান্তের মতো তাকিয়ে আছে আমার মুখের দিকে।
‘ললিতাদি, মা তোমাকে ডেকেছে।’
‘কেনে গো দিদিমনি?’
‘বেলাল চাচা আজ নতুন বউ নিয়ে আমাদের বাসায় আসবে। বাসাটা একটু ধুয়েমুছে দিতে বলেছে মা।’
খানিক ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে ‘থুহ’ করে বারান্দার নিচে মুখের পান ছুড়ে দিল ললিতা। যেন থুতু ছিটাল কারও গায়ে। কড়া গলায় বলল, ‘আপিসের কাম সেরে যাবখন বোলেন গিয়ে মাকে।’
আমার বন্ধুদের ডেকে নিয়ে এলাম নতুন বউ দেখাতে। ফরসা, ছোটখাটো, স্বাস্থ্যবতী বউ বেলাল চাচার। আমাদের সঙ্গে বসে লুডু খেলল। মা সবার সঙ্গে আমার বন্ধুদেরও খাওয়াল। ললিতাকেও বলেছিল খেয়ে যেতে। কিন্তু শরীর খারাপের কথা বলে বাসা ঝাড়পোঁছ করেই চলে গেল সে। যাওয়ার সময় মা তাকে বলেছে, ‘মানিকের সঙ্গে দেখা হলে বিকেলে ওকে একটু আসতে বলিস ললিতা। ছেলেটাকে একটু খাইয়ে দেব।’
‘আজ্ঞে’—এটুকু বলে শরীরে হিল্লোল না তুলে কাঠের মতো সোজা হেঁটে বেরিয়ে গিয়েছিল ললিতা।
বেলাল চাচা বিকেলের নাশতা সেরে বউ নিয়ে চলে যাবে। বাবা একটা ঝকমকে শাড়ি কিনে এনেছে বউয়ের জন্য। বিকেল গড়িয়ে গেলে মানিক এল ফুলবাবু হয়ে। আজ যেন সে আরও পরিপাটি। বেলাল কেরানির বিয়ে হয়েছে দেখে খুশিতে ডগমগ। এবার ললিতা তাকে ছাড়া আর কোথায় যায়, দেখবে সে। মা খেতে বললে অতি বিনয় তার কণ্ঠে, ‘খেমা কইরবেন মা। আমি রেতের বেলা ভাত খাইনাকো।’ মা জানত, মুণ্ডারা নিজেদের জাত ছাড়া অন্য কারও বাড়িতে খেতে চায় না। তবু ছেলেটাকে বড় ভালো লাগে। তাই বলল, ‘বেশ তো একটু মিষ্টি খাও।’
‘আজ্ঞে মা’—বলে পকেট থেকে রুমাল বের করে দুই হাতে মেলে ধরল মানিক। বাটিতে শুকনো মিষ্টি নিয়ে এল মা। বাটিটি যতই রুমালের কাছাকছি আসে, মানিক ততই নিচে নামায় রুমাল। যেন তাদের ছোঁয়ায় বাবুরা অসম্মানিত না হয়।
আমাদের বাসার প্রায়ান্ধকার গলি দিয়ে মানিক বেরিয়ে যাওয়ার পরই বউ নিয়ে বেরিয়ে গেল বেলাল চাচা। বউকে রিকশায় বসিয়ে খানিক দূরের সেই আবছা আলোছায়ায় মানিকের হাতে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে ফিসফিস স্বরে বলল, ‘মানিক, তোদের জন্য আমার সামান্য উপহার। তুই দু-চার দিনের মধ্যেই ললিতাকে বিয়ে করিস। ও খুব ভালো মেয়ে। তোরা সুখী হবি।’
বেলাল চাচা রিকশায় উঠলে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুতই অন্তর্হিত হলো যানটি। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানিক এক হাতে রুমালে বাধা মিষ্টির পুঁটলি আরেক হাতে উপহারের প্যাকেট নিয়ে সরে এল তার সাইকেলের কাছে। ও কীভাবে সাইকেল চালাবে? ওর যে সারা শরীর কাঁপছে।
সাত দিন পর বিকেলে নিজের সাইকেলে নতুন বউকে সামনে বসিয়ে মানিক এল আমাদের বাসায়। সেদিনও বাসার বাইরে কুমির কুমির খেলছিলাম আমরা। ওদের দেখেই এক ছুটে আমি আর মিলু এলাম বাসার মধ্যে। উত্তেজিত কণ্ঠে হাঁপাতে হাঁপাতে মাকে মিলু বলল, ‘মা, মা, মানিকদা আর ললিতাদি এসেছে। ওদের বিয়ে হয়ে গেছে। ললিতাদিকে কী সুন্দর লাগছে!’
বলতে বলতেই বাসায় ঢুকে মাটিতে গড় হয়ে মাকে প্রণাম করল ওরা। ললিতা উঠে দাঁড়াতেই মা দেখল ওর নাকে চিকচিক করছে সোনার নাকফুল। পায়ে প্লাস্টিকের গোলাপি স্যান্ডেল। আর পায়ের গোছা থেকে অনেকখানি উঁচু করে পরা নতুন লাল ঝলমলে মালা শাড়ি। বিস্মিত চোখে মা দেখল, বেলালের বউয়ের জন্য বাবার কেনা অবিকল সেই শাড়ি পরে লজ্জায় নতমুখী হয়ে আছে ললিতা।

সংবিধানের আলোকেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব by মোস্তফা হোসেন

বর্তমানে দেশে কী পরিস্থিতি বিরাজ করছে তার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কারণ, সামগ্রিক অবস্থাটি সবারই জানা। তবুও সংক্ষেপে বলতে হয়, দুই প্রধান দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যার যার কঠোর অবস্থানে অনড় আছে। আওয়ামী লীগের বক্তব্য হচ্ছে, সংবিধান মোতাবেক জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকার পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকবে। অতএব, পাঁচ বছর মেয়াদ শেষে অর্থাৎ ২০১৯ সালে জাতীয় সংসদের পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তার একদিন আগেও নয় এবং ওই নির্বাচনও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের অধীনেই হবে। দেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো প্রশ্নই আসে না। বিএনপি ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে যে ভুল করেছে, তার খেসারত তাদেরই দিতে হবে। বিএনপিকে আগামী ২০১৯ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
পক্ষান্তরে বিএনপির বক্তব্য হচ্ছে, জনমত উপেক্ষা করে ১৫তম সংশোধনী এনে সংবিধানকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে নিজেরা ক্ষমতায় থেকে ৫ জানুয়ারি ২০১৪ ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে ক্ষমতায় থাকার পাঁয়তারা করছে আওয়ামী লীগ। এ অবস্থা মেনে নেয়া যায় না। অতএব, দেশে অবিলম্বে দলনিরপেক্ষ একটি সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে হবে।
২০১৪ সালব্যাপী চুপচাপ থাকার পর এ বছরের অর্থাৎ ২০১৫ সালের শুরু থেকেই বিএনপি উপরোক্ত দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আন্দোলন শুরু করেছে। বলা বাহুল্য, বিএনপি জোটের এ আন্দোলন বর্তমানে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ, হরতাল ইত্যাদির মারফত জ্বালাও-পোড়াও ও ধ্বংসাত্মক রূপ পরিগ্রহ করেছে। অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি এবং সম্পদের সীমাহীন ধ্বংসসাধন, জাতীয় অর্থনীতিতে ধস নামাসহ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা জীবন বিপর্যস্ত হওয়া, গার্মেন্ট সেক্টরে অচলাবস্থা সৃষ্টিসহ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ রাজনৈতিক/সাংবিধানিক সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশের জনগণ উৎকণ্ঠিত ও শংকাগ্রস্ত।
পর্যবেক্ষক মহল গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলেছে, যদি বিদ্যমান সমস্যা সমাধানকল্পে দুই প্রধান দলের মধ্যে কোনো সমঝোতা-মীমাংসা না হয় তবে আগামীতে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে; তখন তৃতীয় শক্তির আগমনের আশংকাও ব্যক্ত করেছেন কেউ কেউ। আবার কেউ কেউ পুনরায় ০১/১১-এর আবির্ভাবের কথাও বলেছেন।
এছাড়া, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের কথা বলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা, রাশিয়া ও চীনসহ বিভিন্ন দেশ এবং জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইত্যাদি আন্তর্জাতিক সংস্থা উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সব দলের অংশগ্রহণের দ্বারা একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলে আসছে বারবার। কিন্তু এতদসত্ত্বেও দুই প্রধান দল ও জোটের মধ্যে মতপার্থক্য দূর তো হচ্ছেই না বরং সার্বিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি ঘটছে যা উভয় দলের নেতা-নেত্রীদের প্রায় প্রতিদিনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এছাড়া আমাদের জন্য যে নবতম ভয়াবহ বার্তা তৈরি হয়েছে সম্প্রতি, তা হচ্ছে বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের উত্থান এবং এর ক্রম বিস্তার লাভ। ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৪ প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় আল কায়দার বর্তমান প্রধান আল-জাওয়াহিরি ভারতীয় উপমহাদেশে আল কায়দার নতুন শাখা খোলার কথা ঘোষণা করেছেন এবং এতদাঞ্চলে তাদের সংগঠনের কার্যক্রম শুরুর কথা জানিয়েছেন। যার কিছু কিছু আলামত ইতিমধ্যে লক্ষ্য করা গেছে। এছাড়া সিরিয়া এবং ইরাকে আরেক জঙ্গি সংগঠন আইএস কী রকম ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তা প্রায় প্রতিদিনই প্রচার মাধ্যমের দ্বারা জানা যাচ্ছে। বাংলাদেশে এসব জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করার কিছু কিছু আলামতের কথাও আমরা জানতে পারছি আমাদের প্রচার মাধ্যমে। কয়েকদিন আগে আইএস জঙ্গিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ৪ ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে দেশে। আল কায়দা জঙ্গিগোষ্ঠী উপমহাদেশের বর্তমান সীমানা মুছে দিয়ে বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিম বাংলা, অখণ্ড আসামের অঞ্চল এবং মিয়ানমারের পশ্চিমাংশ অর্থাৎ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত আরাকান অঞ্চল ইত্যাদি এলাকার সমন্বয়ে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে এবং সেই মর্মে কাজ করার সংকল্প ব্যক্ত করেছে। এছাড়া ঢাকাস্থ পাকিস্তানি দূতাবাসের এক কর্মকর্তা অনেকদিন ধরে আমাদের দেশের জঙ্গিগোষ্ঠীকে আর্থিক ও অন্যান্য রকমের সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে আসছে বলে গোয়েন্দারা তথ্য দিয়েছেন। এ অবস্থায় শুধু পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও আনসার ইত্যাদি দিয়ে দেশে সক্রিয় ও ক্রমবিস্তার লাভকারী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমন করা যাবে না। এ সন্ত্রাসবাদ দমন করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হলে যা দরকার, তা হচ্ছে দেশে বিরাজমান সংঘাতময় পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা, যা একমাত্র জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই সম্ভব।
উপরোক্ত সার্বিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক/সাংবিধানিক সংকট নিরসনকল্পে উভয় দল ও জোটের মধ্যে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সরকারের একটি রূপরেখা সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশে তুলে ধরতে চাই। আমি মনে করি সংকট উত্তরণের জন্য সংলাপ কিংবা পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের প্রয়োজন নেই। বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সংসদে বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদকে নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান করলেই সেই সরকারের গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা পাবে বলে মনে করি।
মোস্তফা হোসেন : আইনজীবী

হ্যামিলটনে অন্যরকম বাংলাদেশ by তালহা বিন নজরুল

উইলিয়ামসনকে আউট করে নিজের দ্বিতীয় উইকেটটি পেলেন সাকিব। অভিনন্দন
জানাতে ছুটলেন সতীর্থরা। কাল হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে l প্রথম আলো
শাবাশ! বাংলাদেশ, শাবাশ! জয় আসেনি, তাতে কি! ওদের বুক তো কেঁপেছে। হ্যামিলটনে অন্য বাংলাদেশকে দেখা গেল। ব্যাটে-বলে দারুণ লড়াই করেও জিততে পারেনি বাংলাদেশ। প্রায় হাতের মধ্যে থাকা খেলাটি নিউজিল্যান্ড জিতে নিয়েছে। এ হারে হতাশা ছিল না, ছিল না আফসোস। জিতলে আনন্দের সীমা থাকতো না এই যা। বাংলাদেশের ৭ উইকেটে করা ২৮৮ রান টপকাতে নিউজিল্যান্ডকে ৭ উইকেটই হারাতে হয়। হাতে ছিল তাদের ৮ বল। এ হারে বাংলাদেশ গ্রুপ এ’তে চতুর্থস্থানেই থাকছে তা প্রায় নিরানব্বই ভাগ নিশ্চিত। বাকি এক ভাগ থাকছে যদি আজ স্কটল্যান্ডের কাছে বড় ব্যবধানে অস্ট্রেলিয়া হেরে যায়। আর অর্থ হলো কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ হচ্ছে ভারত। বাংলাদেশকে এখন নিউজিল্যান্ডেই থাকতে হচ্ছে। কারণ চতুর্থ কোয়ার্টার ফাইনালটি হবে ওয়েলিংটনে, ২১শে মার্চ। দক্ষতা আর অভিজ্ঞতায় তো নিউজিল্যান্ডই এগিয়ে ছিল। সঙ্গে ছিল চিরচেনা মাঠ আর হাজারও সমর্থকের সরব সমর্থন।  খেলায় নয়, কৌশলে মার খেয়েছে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের দল। অভিজ্ঞতার অভাবও বলতে পারেন। যদিও বাংলাদেশের লাখো সমর্থক কাল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাকিবের কৌশল আর পরিকল্পনার জন্য। তাদের অভিযোগ- সাকিবের কারণেই হাতছাড়া হয়ে গেল এক অসাধারণ জয়। শেষদিকে বোলার নির্বাচন নিয়েই তাদের আপত্তি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রুবেল হোসেন, তাসকিন বা সৌম্য সরকারের পেস বোলারের সহায়তা না নিয়ে কেন পার্টটাইম স্পিনার নাসির হোসেন আর মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের হাতে বল দেয়া হলো। এই মাহমুদুল্লাহকে মাশরাফি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে বলই করতে দেননি। নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের শুরুতেই সবাইকে চমকে দেন সাকিব নিজে বল হাতে নিয়ে। তার পরের ওভারে আরও বড় চমক দেখান তিনি প্রথম খেলতে নামা তাইজুলের হাতে বল তুলে দিয়ে। নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক মার্টিন ক্রো ২৩ বছর আগে ১৯৯২ বিশ্বকাপে নতুন বলে এক প্রান্ত দিয়ে স্পিন আক্রমণের নজির স্থাপন করেন। দিপক প্যাটেলের সেই স্পিনে বেশ কাজও হয় এবং নিউজিল্যান্ড সেবারও অপ্রতিরোধ্য গতিতে সেমিফাইনালে উঠেছিল। এবার দুইপ্রান্ত থেকে স্পিন আক্রমণ চালিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিলেন সাকিব। ক্রিকেট ইতিহাসের যে কোন ফরম্যাটেই দুই প্রান্ত থেকে স্পিন আক্রমণ খুবই বিরল। তবে এ সিদ্ধান্ত সাকিবের একার না দলের নীতি-নির্ধারকদের তা জানা যায়নি। সাধারণত রাতের বেলায় স্পিনারদের বল গ্রিপ করতে কষ্ট হয় যদি শিশির থাকে। আর নিউজিল্যান্ডের পেসাররাই তো বাংলাদেশের ইনিংসে প্রথম আঘাত হেনেছিল। তাই বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত অবাক করার মতোই। বাংলাদেশ অধিনায়ক অবশ্য তার ম্যাচ পরিকল্পনা সঠিক ছিল বলেই দাবি করেছেন। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে, আজ স্পিনারদের কিছুটা বেশি সহায়তা ছিল। প্রথমদিকে স্পিনাররা  বেশি সহায়তা  পেয়েছে। আমরা যদি প্রথমে বোলিং করতাম, তাহলে হয়তো আমাদের স্পিনাররা আরও ভাল করতে পারতো। ম্যাচ হেরেছি, এটা নেতিবাচক। তবে ইতিবাচক অনেক কিছু নেয়ার আছে। ইতিবাচক দিকগুলো মাথায় রাখলে কোয়ার্টার ফাইনালে আমরা দারুণ কিছু করতে পারবো। আর বলতে হয় আমরা আজ ভাল  খেলেছি। তারা কষ্ট করে জিতেছে। গাপটিল ভাল খেলেছে। টেইলরও উইকেটে পড়ে থেকেছে।  শেষদিকে মনে হয়েছে- আমরা কিছু রান কম করেছি।’
এই সমলোচনাটুকু বাদ দিলে বাংলাদেশ দল কাল হেরেও মন জয় করে সবার। শুধু বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমেই নয়, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের সংবাদ মাধ্যমেও বাংলাদেশের প্রশংসা করা হয়। নিউজিল্যান্ডের জয় যে সহজ ছিল না এবং তারা যে হারতেও পারতো তা স্বীকার করে নিয়েছে তারা। বাংলাদেশ আর এক জায়গায় হেরেছে আর তা হলো ভাগ্য। নিউজিল্যান্ডের যে ব্যাটসম্যানটি আম্পায়ারের কল্যাণে জীবন পেয়েছিলেন সেই মার্টিন গাপটিলই শতরান করে বাংলাদেশের পরাজয় তরান্বিত করেন। ইংল্যান্ডের মতো নিউজিল্যান্ডও টসে জিতে বাংলাদেশকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান কিউই অধিনায়ক। তার এ সিদ্ধান্ত সঠিক প্রমাণ করেন ট্রেন্ট বোল্ট। ৩৪ বল খেলা বাংলাদেশ যখন প্রথম উইকেট হারায় তখন দলের সংগ্রহ মাত্র ৪। দশম ওভারের চতুর্থ বলে তামিম যখন আউট হন তখন দলের সংগ্রহ ২৭। দুই ওপেনারই বোল্টের শিকার। এরপর আগের খেলার মতো যথারীতি মাহমুদুল্লাহ আর সৌম্য সরকার বিপর্যয় সামাল দেন। ক্রম উন্নতির ধারা বজায় রেখে সৌম্য তার প্রথম ফিফটি তুলে নেন। আর মাহমুদুল্লাহও তার ধারা ঠিক রেখে তুলে নেন টানা দ্বিতীয় শতক। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ও দ্বিতীয় শতকের মালিক এখন তিনিই। তবে কাল মুশফিক বেশিক্ষণ থাকতে পারেননি। সাব্বির অসাধারণ ব্যাটিং করে ৪০ রান যোগ করে গেছেন। সাকিব আরও বড় ইনিংস খেলতে পারতেন। কিন্তু অহেতুক বলের লাইনে না গিয়েই উপর্যুপরি হাঁকাতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেন উইকেটের পেছনে। এমনটি না হলে স্কোর ৩০০ পেরোতে পারতো। আর তা হলে কিউইরাও আরেকটু বেশি চাপে থাকতো। তবুও ২৮৮ রান কম মনে হচ্ছিল না। কিন্তু গাপটিল-রস টেইলরের সংযমী আর কোরি অ্যান্ডারসন-গ্র্যান্ট ইলিয়টের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে নিউজিল্যান্ড আট বল হাতে রেখেই জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। এই প্রথম তারা গ্রুপ পর্বের সব খেলাতেই জয় পেলো। তবে এবার এ খেলাতেই প্রথম তারা প্রতিপক্ষের সব ব্যাটসম্যানকে আউট করতে পারেনি। আর তাই সাকিবের কথায় হারলেও এ ম্যাচে বাংলাদেশ অনেক কিছুই পেয়েছে। তার কথায়, ‘এই ম্যাচে আত্মবিশ্বাসী হওয়ার মতো বেশকিছু বিষয় আমরা পেয়েছি। আশা করছি তা আমাদের কোয়ার্টার ফাইনালে কাজে লাগবে। আমরা  সেদিকেই তাকিয়ে আছি। এই ম্যাচে খুব কাছে গিয়েও আমরা হেরে গেছি। নিঃসন্দেহে এটি খুবই হতাশাজনক। তবে ম্যাচটি দুর্দান্ত ছিল। শেষে ভাল  খেলা দলই জিতেছে।’

এ দেশের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সর্বনাশ করল কে? by মুহম্মদ জাফর ইকবাল

আমি জানি এ মুহূর্তে দেশের মানুষ এই প্রশ্নের উত্তরে খালেদা জিয়ার নাম বলবে। দেশের মানুষকে দোষ দেয়া যাবে না, কারণ টানা হরতালের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের। যারা কট্টর বিএনপি কিংবা জামায়াতপন্থী তারা অবশ্যই গলার রগ ফুলিয়ে বলবে, সব দোষ এই সরকারের। এ সরকার যদি গোয়ার্তুমি না করত তাহলেই তো পেট্রলবোমা ফাটাতে হতো না, হরতাল ডাকতে হতো না। রাজনীতির মাঠের ব্যাপারগুলো আমি মোটেও বুঝি না। মান্না-খোকার টেলিফোন আলাপটি প্রকাশ হওয়ার পর বলা যেতে পারে আমি প্রথমবার মাঠের রাজনীতি খানিকটা বুঝতে পেরেছি। মাঠের রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের কী হচ্ছে সেটা নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না এবং আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে যেটাকে খুবই খারাপ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বলে মনে হয়, মাঠের রাজনীতিতে সেটা আসলে হয়তো খুবই ভালো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত! এই যে আমরা ভাবছি, দিনের পর দিন হরতাল ডেকে দেশের যাবতীয় সর্বনাশ করার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার বারোটা বাজিয়ে দিয়ে বিএনপি ধীরে ধীরে সবার মন বিষিয়ে দিচ্ছে, জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, সেটা হয়তো শুধু আমাদের ধারণা। বিএনপির নেতানেত্রীরা হয়তো মনে করছেন, এটা আসলে প্রায় ঊনসত্তরের গণআন্দোলনের মতো বিশাল মহান একটি সফল আন্দোলন। কাজেই এসব ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই, দর্শক হিসেবে পুরো ব্যাপারটা দেখা ছাড়া আর কোনো কিছু করারও নেই। কোনো কিছু বলার ও করার না থাকলেও কিছু কিছু বিষয় মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এসএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল না দেয়ার জন্য মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী অনেক অনুনয়-বিনয় করেছেন, বলা যেতে পারে আক্ষরিক অর্থে শুধু পা ধরতে বাকি রেখেছেন; কিন্তু বিএনপির (এবং তাদের সঙ্গে থাকা অন্য দলগুলোর) মন গলেনি। দিনের পর দিন হরতাল ডাকা হয়েছে এবং একটার পর একটা পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছে, পিছিয়ে দিতে হয়েছে। প্রায় ১৫ লাখ কিশোর-কিশোরী তাদের ৩০ লাখ বাবা-মা এবং কোটিখানেক আপনজন গত দুই মাস নিয়মিতভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেদের ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়েছে।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, প্রায় একই সময়ে ও-লেভেল পরীক্ষার তারিখ পড়েছিল এবং তখন কিন্তু তাদের পরীক্ষার জন্য অবরোধে ছাড় দেয়া হয়েছিল! (২১ জানুয়ারি ২০১৫, বিডিনিউজ২৪.কম) আমার প্রশ্নটি খুবই সহজ, যারা ও-লেভেল (কিংবা এ-লেভেল) পরীক্ষা দিচ্ছে তারাও বাংলাদেশের ছেলেমেয়ে, বিএনপি তাদের জন্য যদি ছাড় দিতে পারে তাহলে বাংলাদেশের অন্য ছেলেমেয়েদের জন্য কেন ছাড় দেয়া হবে না? বরং বলা যেতে পারে, যারা এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে সংখ্যায় তারা অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, তাদের মাঝে আছে এ দেশের মধ্যবিত্ত-নিুমধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েরা, মফস্বল আর গ্রামের ছেলেমেয়েরা। আমি ব্যাপারটা নিয়ে একটু চিন্তা করে হাল ছেড়ে দিয়েছি, বিষয়টি হয়তো বোঝার জন্য খুবই সহজ; কিন্তু গ্রহণ করার জন্য খুবই কঠিন। এই দেশ যারা চালায় এবং অচল করে রাখে, দুই দলের কর্তাব্যক্তিরাই আসলে উচ্চবিত্তের মানুষ। তাদের ছেলেমেয়েরা সম্ভবত এসএসসি পরীক্ষা দেয় না, তারা সম্ভবত ইংরেজি মিডিয়ামে ও-লেভেল, এ-লেভেলে পড়ে। কাজেই দেশ যদিও বা গোল্লায় যায়, অন্তত নিজেদের ছেলেমেয়েদের পরীক্ষাটা যেন ঠিকমতো দেয়া যায় সেজন্য এই ব্যবস্থা। কিন্তু আমি যেটুকু জানি তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি, ইংরেজি মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরাও প্রায় সমানভাবে ভুগছে।
যাই হোক, এটুকু ছিল আমার ভূমিকা, এবারে আসল বক্তব্যে আসি।
২.
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যেভাবে দেশের লেখাপড়াকে আক্ষরিত অর্থে পঙ্গু করার সংগ্রামে নেমেছেন, সেটাকে তাদের দলের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র পেট্রলবোমার আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করা যায় (যারা বিএনপির রাজনীতি সমর্থন করেন, তারা সম্ভবত আমি এককভাবে একজনের নাম উল্লেখ করায় একটু বিরক্ত হচ্ছেন, কারণ কাগজে কলমে এটি ২০টি ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত, একজনকে দায়ী করা ঠিক নয়। কিন্তু আমরা সবাই জানি, যদিও পুরো আন্দোলনটি করা হচ্ছে গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য, কিন্তু এই দলগুলোতে গণতন্ত্রের ‘গ’কেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবকিছুই একজনের সিদ্ধান্ত, সেজন্য আমিও একজনের নাম লিখছি)। পেট্রলবোমা যে রকম খুব দ্রুত একজনকে ধরাশায়ী করে ভয়ংকর যন্ত্রণা দিতে পারে, ঠিকভাবে পোড়াতে পারলে আক্রান্ত মানুষটি খুব কষ্ট পেয়ে মারা যায় এবং যদি কোনোভাবে বেঁচে যায় তাহলে যে রকম সারাজীবনের জন্য একটা ক্ষতচিহ্ন বহন করতে হয়, হরতাল-অবরোধ দিয়ে লেখাপড়াকে আক্রমণ করাটাও অনেকটা সে রকম। সপ্তাহের পাঁচ দিন স্কুল-কলেজে না গিয়ে মাত্র দু’দিনে ক্লাস পরীক্ষা নেয়ার চেষ্টা করলে খুব দ্রুত সেই একই রকম ক্ষতি হয়। যদি বা শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিয়ে ছেলেমেয়েরা পাস করেও ফেলে, এই দীর্ঘ দুই মাসের ক্ষতিটুকু কিন্তু তাদের সারাজীবন বহন করতে হবে।
তবে আমি আজকে লেখাপড়ার ওপর এই নিষ্ঠুর আক্রমণের কথা বলার জন্য কাগজ কলম নিয়ে বসিনি, আমি সবার অগোচরে লেখাপড়ার ওপর যে ‘স্লো পয়জনিং’ হচ্ছে তার কথা বলতে বসেছি। তবে মূল বক্তব্যের আগে আমাকে একটু পুরনো ইতিহাস বলতে হবে।
সেই যখন থেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়ে শিক্ষক হয়েছি, তখন থেকে আমি জানি একজন ছেলে বা মেয়ে কী শিখেছে তার থেকে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তার শেখার আগ্রহ আছে কি-না, শেখার ক্ষমতা আছে কি-না সেই বিষয়টি। এ দেশের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া নিয়ে আমার দুঃখের সীমা ছিল না। লেখাপড়ার নামে তাদের কিছু জিনিস মুখস্থ করানো হতো, পরীক্ষার হলে গিয়ে সেটা তাদের উগলে দিতে হতো। পড়াশোনার পুরো বিষয়টা ছিল খুব কষ্টের, কারণ মানুষের মস্তিষ্ক মোটেও কোনো কিছু মুখস্থ করার জন্য তৈরি হয়নি। মানুষের মস্তিষ্ক তৈরি হয়েছে বোঝার জন্য, জানার জন্য কিংবা বিশ্লেষণ করার জন্য। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, মনে রাখার বিষয়টা মানুষের থেকে ভালো পারে শিম্পাঞ্জিরা!
তাই প্রথম যখন সৃজনশীল পদ্ধতির পরীক্ষার বিষয়টি সামনে এসেছিল, আমার আনন্দের সীমা ছিল না (তখন অবশ্য সেটাকে বলা হতো কাঠামোবদ্ধ প্রশ্ন পদ্ধতি; কিন্তু কাঠামোবদ্ধ নামটাকে কেমন যেন কটমটে মনে হয়েছিল বলে এর নামটাকে পাল্টে সৃজনশীল করে দেয়া হয়েছিল)। যাই হোক, সৃজনশীল প্রশ্নের মূল বিষয়টা ছিল খুবই সহজ। এ প্রশ্নের উত্তর দেয়ার জন্য আর কখনও ছাত্রছাত্রীদের কিছু মুখস্থ করতে হবে না। তারা যদি পুরো বইটা মন দিয়ে পড়ে তাহলেই হবে, প্রশ্নগুলোর উত্তর তারা ভেবে ভেবে দিতে পারবে। নতুন কিছু শুরু করা খুবই কঠিন, এখানেও সেটা দেখা গেল। সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি শুরু করা মাত্রই অভিভাবকরা এর পেছনে লেগে গেলেন। স্বার্থপর অভিভাবকদের একটা মাত্র কথা- ‘স্বীকার করি এটা খুবই ভালো পদ্ধতি, কিন্তু আমার ছেলে কিংবা মেয়ে আগের পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে যাক, তারপর এই পদ্ধতি প্রবর্তন করা হোক।’ তারা সৃজনশীল পদ্ধতির বিরুদ্ধে রীতিমতো আন্দোলন শুরু করেছিলেন। আমার মনে আছে, আমরা যারা ছাত্রছাত্রীদের মুখস্থ করার যন্ত্রণা থেকে উদ্ধার করার এই সুযোগটা পেয়ে লুফে নিয়েছিলাম, তারা সবাই মিলে সেটাকে রক্ষা করার জন্য উঠেপড়ে লেগে গিয়েছিলাম। রীতিমতো যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত সারা পৃথিবীর ছেলেমেয়েরা যে পদ্ধতিতে (Bloom's Taxonomy) লেখাপড়া করে, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরাও সেই পদ্ধতিতে লেখাপড়া করার এবং পরীক্ষা দেয়ার একটা সুযোগ পেল। অন্যদের কথা জানি না, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন এই ছেলেমেয়েগুলোকে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিজের ছাত্রছাত্রী হিসেবে পাব। কারণ এই ছাত্রগুলোর মস্তিষ্ক থাকবে সতেজ, তীক্ষ্ণ ও সৃজনশীল, মুখস্থ করিয়ে করিয়ে সেগুলোকে ভোঁতা করিয়ে দেয়া হবে না।
কিছুদিনের ভেতরে আমি প্রথম দুঃসংবাদটি পেলাম, সেটি হচ্ছে সৃজনশীল প্রশ্নের গাইডবই বের হয়ে গেছে। খবরটি ছিল আমার কাছে অবিশ্বাস্য, কারণ সৃজনশীল প্রশ্নটাই করা হয়েছে যেন ছাত্রছাত্রীদের আর প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে না হয় সেজন্য। তার থেকেও আরও ভয়াবহ ব্যাপার ঘটতে থাকল, শুধু যে বাজারে গাইডবই বের হতে থাকল তা নয়, আমাদের দেশের বড় বড় পত্রিকাগুলোও ‘শিক্ষাপাতা’ বা এ ধরনের নাম দিয়ে তাদের পত্রিকায় গাইডবই ছাপাতে শুরু করল! এগুলো হচ্ছে সেই পত্রিকা যারা এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। দেশের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রীতিমতো সংগ্রাম করে, পত্রিকার মূল কাজ সংবাদ ছাপানোর পাশাপাশি তারা জ্ঞান-বিজ্ঞান আর্ট-কালচার নিয়ে ঠেলাঠেলি করে দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য জান কোরবান করে দেয়। আমার খুব ইচ্ছে এসব পত্রিকার ‘মহান’ সম্পাদকদের সঙ্গে কোনোদিন মুখোমুখি বসে জিজ্ঞেস করি, তারা কেমন করে এ দেশের ছেলেমেয়েদের নিয়ে এত বড় প্রতারণা করেন? (আমার মনে আছে, আমি কোনো একটি লেখায় এ ধরনের একটা পত্রিকার গাইডবইয়ের উদাহরণটি তুলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যদি গাইডবই ছাপানো বেআইনি হয় তাহলে পত্রিকায় গাইডবই ছাপানো কেন বেআইনি হবে না? আমরা কেন এই পত্রিকাগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারব না?)।
যাই হোক, বাজারে এবং দৈনিক পত্রিকায় গাইডবই বের হওয়ার পর থেকে অনেক শিক্ষকই স্কুলের পরীক্ষায় এই গাইডবই থেকে প্রশ্ন তুলে নিতে শুরু করলেন। সেসব শিক্ষকের ছাত্রছাত্রীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল- একসময় শুধু পাঠ্যবইয়ের প্রশ্নগুলোর উত্তর ‘মুখস্থ’ করলেই চলত, এখন এর সঙ্গে সঙ্গে তাদের পুরো গাইডবইয়ের প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করা শুরু করতে হল। আমি পড়লাম মহাবিপদে, এ দেশের ছেলেমেয়েদের অনেকেই জানে আমি এই সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি যেন শুরু হতে পারে তার জন্য অনেক চেঁচামেচি করেছি। তারা সরাসরি আমাকে অভিযোগ করতে শুরু করল। আমি তখন তাদের বুঝিয়ে বলতাম, যদি দুই নম্বরী শিক্ষক হয় তাহলে সৃজনশীল গাইডবই পড়ে হয়তো স্কুলের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়া সম্ভব হতে পারে, কিন্তু পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি কিংবা এইচএসসি’র প্রশ্নগুলো কখনোই কোনো গাইডবই থেকে আসবে না। পরীক্ষার আগে এ প্রশ্নগুলো প্রথমবার তৈরি করা হবে। কাজেই যারা গাইডবই মুখস্থ করবে, সত্যিকারের পরীক্ষায় তাদের কোনোই লাভ হবে না। বরং উল্টো ব্যাপার ঘটবে, মুখস্থ করে করে পরীক্ষা দেয়ার কারণে তারা আসল পরীক্ষাগুলোতে নিজে নিজে ভাবনাচিন্তা করে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যাবে।
এতদিন আমি ছাত্রছাত্রীদের এভাবে বুঝিয়ে এসেছি এবং তারাও আমার যুক্তি মেনে নিয়েছে। এ বছর হঠাৎ করে আমি প্রথমবার সত্যিকারের বিপদে পড়েছি। আমার কাছে একজন এসএসসি’র বাংলা প্রশ্নপত্র পাঠিয়েছে, সেই প্রশ্নে গাইডবই থেকে হুবহু প্রশ্ন তুলে দেয়া আছে। প্রমাণ হিসেবে সে গাইড বইয়ের পৃষ্ঠাগুলোও ফটোকপি করে দিয়েছে। ২০১৪ সালে যখন এইচএসসি’র প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে শুরু করল, তখন কিছুতেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় স্বীকার করতে রাজি হয়নি যে ব্যাপারটি আসলেই ঘটেছে। আমি এবারে এসএসসি’র প্রশ্ন এবং গাইডবইয়ের প্রশ্ন পাশাপাশি দিয়ে দিচ্ছি, পাঠকরা নিজের চোখেই দেখতে পাবেন। শুধু এই দুটি নয় আরও অনেক প্রশ্ন আছে, লেখার শেষে আমি লিংক দিয়ে দিচ্ছি, যার ইচ্ছে ডাউনলোড করে সেগুলো নিজের চোখে দেখে নিতে পারবেন।
এর চেয়ে ভয়ংকর কোনো ব্যাপার কি কেউ কল্পনা করতে পারবে? যারা গাইডবই ছাপায়, আনন্দে তাদের বগল বাজানোর শব্দ কি সবাই শুনতে পাচ্ছেন? সেই শব্দ কি শিক্ষা বোর্ড বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যন্ত পৌঁছাবে? এই গাইডবই বিক্রেতারা কি এখন খবরের কাগজ, রেডিও-টেলিভিশনে বড় বড় করে বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না? সেখানে তারা ঘোষণা করবে, ‘আমাদের গাইডবই বাজারের সেরা, এখান থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রশ্ন বেছে নেয়া হয়!’
যত স্বপ্ন ও আশা নিয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি শুরু করা হয়েছিল, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার (নাকি দুর্নীতি?) কারণে এখন কি পুরো বিষয়টা অর্থহীন হয়ে দাঁড়াচ্ছে না? শিক্ষা বোর্ডের কাছে নিশ্চয়ই রেকর্ড আছে, তারা খুব ভালোভাবে জানেন কারা এই প্রশ্ন করেছে। আমরা কি আশা করতে পারি না, যেসব প্রশ্নকর্তা এ দেশের লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর লেখাপড়ার পুরোপুরি সর্বনাশ করে দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধে একটা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে ভবিষ্যতে যেন আর কখনোই এ রকম ঘটনা না ঘটে তার একটা গ্যারান্টি দেবেন? যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে, তাদের কখনও ধরা যায়নি; কিন্তু যারা গাইডবই থেকে প্রশ্ন নিয়ে এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন প্রণয়ন করেন, তাদের ধরতে তো কোনো সমস্যা নেই। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী যেভাবে জোড়হাত করে খালেদা জিয়ার কাছে অনুরোধ করেছিলেন এসএসসি পরীক্ষার সময় হরতাল না দিতে, আমি ঠিক একইভাবে জোড়হাত করে শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করব এসএসসি পরীক্ষায় গাইডবই থেকে প্রশ্ন তুলে না দিতে।
৩.
গাইডবই থেকে তুলে দেয়া প্রশ্ন দিয়ে তৈরি করা এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নের পাশাপাশি ভিন্ন আরও একটি প্রশ্নপত্র আমার হাতে এসেছে। এই প্রশ্নটি জাতীয় কারিকুলামে ইংরেজি মাধ্যমের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র। প্রশ্নপত্রটির খানিকটা অংশ আমি এ লেখার সঙ্গে যুক্ত করে দেয়ার চেষ্টা করেছি জানি না সেটা পত্রিকায় দেখানো সম্ভব হবে কি-না। লেখার শেষে আমি এটারও লিংক দিয়ে দিচ্ছি- যে কেউ সেটা ডাউনলোড করে পুরোটা দেখে নিতে পারবেন।
এসএসসি পরীক্ষায় গাইডবই থেকে নেয়া প্রশ্ন দেখে আমি ক্ষুব্ধ হয়েছি; কিন্তু ইংরেজিতে লেখা পদার্থ বিজ্ঞানের এ প্রশ্নটি দেখে লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেছে। একটা এত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় ইংরেজি ভাষার এই নমুনা দেখেও আমার বিশ্বাস হতে চায় না, কেমন করে শিক্ষা বোর্ড ছাত্রছাত্রীদের হাতে এ প্রশ্ন তুলে দিল? প্রতিটি প্রশ্ন ভুল ইংরেজিতে লেখা। ছোটখাটো ভুল নয়, উৎকট ভুল। যেমন- Who is invented air pump? How many power of an electric fan? Which mirror use of solar oven? ইত্যাদি ইত্যাদি।
প্রশ্নটি দেখেই বোঝা যায় এটি আসলে চরম হেলাফেলার একটা উদাহরণ। ইংরেজি কারিকুলামে প্রশ্ন করার জন্য শুদ্ধ ইংরেজি লিখতে পারে এ রকম একজন শিক্ষকও এ দেশে নেই, তা হতে পারে না। এর অর্থ, যারা এর দায়িত্বে আছেন তাদের লজ্জাশরম বলে কিছু নেই! আমরা যারা এটা দেখি তারা লজ্জায় মুখ দেখাতে পারি না, আর যারা এ কাজটি করেন তারা একটুও লজ্জা পান না, বরং বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ান!
লেখার শুরুতে বলেছিলাম, খালেদা জিয়া তার দলবল নিয়ে এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার যে ক্ষতি করেছেন সেটা পুষিয়ে নেয়া যাবে কি-না আমরা জানি না।
সেই সঙ্গে আমি সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, খালেদা জিয়ার মতো রাতারাতি সর্বনাশ না করলেও খুব ধীরে ধীরে এ দেশের শিক্ষার সর্বনাশ করার কাজটি কিন্তু করে যাচ্ছে যাদের ওপর আমরা এ দেশের ছেলেমেয়েদের শিক্ষার দায়িত্ব দিয়েছি, তারাই!
আবার হাতজোড় করে বলছি, বাঁচান! আমাদের ছেলেমেয়েদের সর্বনাশ থেকে বাঁচান।
মুহম্মদ জাফর ইকবাল : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; লেখক

হরিয়ানায় গরু জবাই করলে মৃত্যুদণ্ড - গরুর গোশত নিষিদ্ধ যৌন হেনস্তার চেয়ে গুরুতর

মহারাষ্ট্রের পর এবার হরিয়ানা। গরুর গোশত নিষিদ্ধ করা নিয়ে মহারাষ্ট্র সরকারের সিদ্ধান্তে ইতোমধ্যেই ভারতজুড়ে তুমুল বিতর্কে বিজেপি। যাবতীয় বিতর্ক, সমালোচনাকে উড়িয়ে হরিয়ানা-র বিজেপি সরকারও রাজ্যে নিষিদ্ধ করতে চলেছে গরুর গোশত। হরিয়ানার রাজ্য বাজেট অধিবেশনেই গরুর গোশত নিষিদ্ধ করার কড়া আইন আনতে চলেছে সে রাজ্যের সরকার। সেই আইনে বলা হয়েছে, হরিয়ানায় গরু জবাই করা হলে বা গরুর গোশত বিক্রি করলে তা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার আওতায় পড়বে। অর্থাত্‍ খুনের শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই পদক্ষেপকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির স্বপ্ন আখ্যা দিয়ে হরিয়ানা সরকারের রামবিলাস শর্মার বক্তব্য, গরুর সুরক্ষা সুনিশ্চিত করা উচিত। এবং গরুর দেখভালের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা আবশ্যিক। তাঁর কথায়, 'গরু আমাদের ধর্ম ও সমাজের একটি পবিত্র প্রাণী। তাই গোহত্যার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী খুবই দুঃখ পান।' গত ৩ মার্চ গরুর মাংস নিষিদ্ধ করেছে মহারাষ্ট্র সরকার।
গরুর গোশত নিষিদ্ধ যৌন হেনস্তার চেয়ে গুরুতর
মহারাষ্ট্রে গোরুর মাংস নিষিদ্ধ হওয়া নিয়ে তীব্র নিন্দায় সরব হয়েছে ভারতের তৃণমূল কংগ্রেস। মহারাষ্ট্র সরকারের সিদ্ধান্তে রাজ্যসভায় উদ্বেগ প্রকাশ করে গরুর গোশত নিষিদ্ধকে যৌন হেনস্থার থেকেও গুরুতর অপরাধ বলে দাবি করেন তৃণমূল এমপি ডেরেক ও'ব্রায়েন।
বুধবার রাজ্যসভার জিরো আওয়ারে বক্তব্য পেশের সময় গরুর গোশত নিষিদ্ধ প্রসঙ্গে ডেরেক বলেন, 'এই নিষেধাজ্ঞা শুধু অর্থনীতিতেই প্রভাব ফেলবে না, গরুর গোশত নিষিদ্ধ করা যৌন হেনস্থার থেকেও গুরুতর অত্যাচার।' এই ইস্যুকে শুধুমাত্র ধর্মীয় দিক থেকে দেখা উচিত নয়। কারণ সংখ্যালঘু ছাড়াও বহু দলিত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাসিন্দারা গরুর গোশত খান। গরুর মাংসকে 'গরিব মানুষের প্রোটিন' বলেও মত প্রকাশ করেন তৃণমূল এমপি ডেরেক।
এদিন রাজ্যসভায় গোমাংস নিষিদ্ধ ইস্যুতে ডেরেক আরও বলেন, 'এই নিষেধাজ্ঞার জেরে মুরগি ও মাছের দাম বাড়বে। একই সঙ্গে বেশ একটা বড় অংশের ব্যবসায়ী রোজগারে প্রভাব পড়বে।'
তৃণমূল এমপি ডেরেক ও'ব্রায়েনের বক্তব্য প্রসঙ্গে রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান পি জে কুরিয়েন জানান, সাধারণ মানুষের স্বার্থের সঙ্গে জড়িত যেকোনো বিষয় নিয়েই রাজ্যসভার সদস্যরা মত ব্যক্ত করতে পারেন। যদিও ডেপুটি চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বিরোধিতা করে কেন্দ্রীয় পার্লামেন্টবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মুখতার আব্বাস নকভির বক্তব্য, এই ইস্যু নিয়ে কোনো আলোচনা করাই উচিত নয়।

মানবযুগের সূচনা ১৬১০ সালে

১৬১০ সালে মানবযুগের (অ্যানথ্রোপোকিনি) সূচনা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন এ গবেষণা অনুযায়ী ওই সময়েই পৃথিবীতে প্রকৃতপক্ষে মানুষের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাচার’-এ ব্রিটিশ নৃতাত্ত্বিকদের গবেষণা প্রবন্ধের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার বিবিসি এ খবর দিয়েছে। মানুষের কার্যকলাপ, জলবায়ু ও পরিবেশের প্রভাব বিচার করে ভূতাত্ত্বিক যুগ নির্ধারণে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো বিজ্ঞানী পারমাণবিক বোমার উদ্বোধন কিংবা শিল্প বিপ্লবের সময়কে মানব সভ্যতার সূচনা বলে স্বীকৃতি দেন। তবে নতুন এই গবেষণা বলছে, আমেরিকায় ইউরোপীয়দের আগমন থেকেই পৃথিবীতে নজিরবিহীন পরিবর্তন এসেছে। ওই সময়টাই মানবযুগের প্রাক্কাল। পৃথিবীর ইতিহাস নির্ধারণে গ্রহের ক্রিয়াশীল পরিবর্তনকে পরীক্ষা করেন। জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে গ্রহাণু সংঘর্ষ কিংবা মহাদেশীয় আলোড়নকে প্রধান কারণ হিসেবে মনে করেন। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের বিজ্ঞানী অধ্যাপক মার্ক মাসলিন বলেন, আমরা এখন হলোসিনি যুগে বাস করছি, যা সাড়ে ১১ হাজার বছর আগে বরফ যুগের পর শুরু হয়েছিল। তবে ভূতাত্ত্বিক কাল নির্ধারণে প্রাপ্ত উপাদানগুলোর আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে, ১৬১০ সালে গোল্ডেন স্প্রাইকের মাধ্যমে মূলত মানবযুগের সূচনা হয়েছে। বিবিসি।