Thursday, June 4, 2015

মৈত্রী আলোচনা ও মোদির সফর by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ভারতের সংসদে সীমান্ত বিল পাস করানোর সময় বলেছিলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ১৯৭১ সালে যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল, সেই উচ্চতায় আবার পৌঁছে যাবে। কথাটা বলার সময় তাঁর স্বরে আবেগের ছোঁয়া ছিল। সেই আবেগ ছুঁয়ে যায় সভায় উপস্থিত সবাইকে। মনে পড়ছে, রাজ্যসভায় প্রথম দিন বিল পাস হওয়ার সময় এক অবাঙালি সদস্য মুক্তিযুদ্ধের সময় বিখ্যাত হওয়া ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠে লক্ষ মুজিবরের ধ্বনি’ গানটি গাইতে গাইতে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন। আবেগ, আবেগ আর আবেগে ভেসেছিল লোকসভাও, পরের দিন। সৃষ্টি হয় ইতিহাস। সংসদীয় ভারতের ইতিহাসে আর কখনো কোনো সংবিধান সংশোধন বিল এত ভালোবাসা, এত আবেগ ও এত স্মৃতিমেদুরতায় আচ্ছন্ন হয়ে সর্বসম্মতভাবে পাস হয়নি। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেন অবিচ্ছেদ্য, তা বুঝতে দেরি হয় না।
সীমান্ত বিল পাস করিয়ে জুন মাসেই যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর প্রথম বাংলাদেশ সফরে যাওয়ার জন্য জেদ ধরেছিলেন, সেই হাঁড়ি হাটে ভেঙে দেন আবার মোদিরই অতি কাছের রাম মাধব। মোদির মতোই রাম মাধব রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘে দীক্ষিত। টিম-মোদির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সদস্য তিনি। তার ওপর বিজেপির সর্বভারতীয় সম্পাদক এবং ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনের পরিচালক। দিল্লিতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারত-বাংলাদেশ ষষ্ঠ মৈত্রী আলোচনার তিন উদ্যোক্তার একজন ছিল রাম মাধবের ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশন। আলোচনার শেষ দিন মোদির ইচ্ছা ও জেদের কথাটা বলে দিয়ে রাম মাধব বলেছিলেন, ‘সীমান্ত বিল নিয়ে এক বছর আগেও অন্য অনেকের মতো আমিও সংশয়ী ছিলাম। আপত্তি ছিল। কিন্তু এই বিল পাসের প্রয়োজনীয়তা কতটা, মোদি তা বুঝেছিলেন এবং আমাদের বোঝাতে পেরেছিলেন।’ এটাই মোদির নেতৃত্বের মূল কথা। তিনি একজন শক্তিশালী নেতা। তিনি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। এটা তিনি স্পষ্ট বুঝেছেন, দেশের পশ্চিম প্রান্তের মতো অশান্ত যদি পূর্ব প্রান্তও থাকে, ভারতের বিকাশ তাহলে কিছুতেই সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের বিস্তীর্ণ উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বেশ কয়েক বছর ধরে স্বস্তিতে রেখেছেন। তাঁর দেশে তাঁর নেতৃত্বও শক্তিশালী ও প্রশ্নাতীত। দুই শক্তিশালী নেতা-নেত্রী হাতে হাত মিলিয়ে দুই দেশের ভাগ্যই যে শুধু গড়তে পারবেন তা নয়, সন্ত্রাস ও মৌলবাদীদের মোকাবিলাও করা যাবে কঠোর হাতে।
মনোভাবের এই পরিবর্তনের পেছনে যাদের কৃতিত্ব, মৈত্রী আলোচনার উদ্যোক্তারা তাদের অন্যতম। ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ, যারা এই মৈত্রী আলোচনার প্রধান উদ্যোক্তা, তারা কয়েক বছর ধরেই দুই দেশের সহযোগিতা ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রটাকে বিস্তৃত করতে সচেষ্ট। কূটনীতির পরিভাষায় এটাই ‘ট্র্যাক টু ডিপ্লোমেসি’। কলকাতা, ঢাকা, আগরতলা ও দিল্লিতে বছরে অন্তত দুবার করে আলোচনা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে এই সংস্থা দুই দেশের সরকারকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ‘থিংক ট্যাংক’ বলে যাঁরা পরিচিত, দুই দেশের সেই প্রভাবশালীদের সঙ্গে পারস্পরিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য সরকারের কাছে পেশ করার সেই চেষ্টা যে অনেকটাই সফল, এবারের মৈত্রী আলোচনা তার প্রমাণ। সম্ভাবনা কতখানি, বিপদও কতটা ভয়ংকর এবারের দুই দিনের আলোচনায় সেই বিষয়গুলো প্রকটভাবে উঠে এসেছে। ভারতের পররাষ্ট্রসচিব এস জয়শঙ্কর এই আলোচনায় অংশ নিয়ে সম্ভাবনা ও আশঙ্কার ব্যাখ্যা করে তাই বলেছেন, ‘আমাদের দুই দেশের সামনেই দুটি পথ খোলা। একদিকে পারস্পরিক সহযোগিতার অপার সম্ভাবনা, যা দুই দেশকেই এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাজনিত অশান্তি, সন্দেহ ও সংশয়ের আবহ, যা কাউকেই জিততে দেবে না। কোন রাস্তায় আমরা হাঁটব, তা আমাদেরই ঠিক করতে হবে।’ জয়শঙ্করের এই কথারই জবাব দেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী তাঁর ভাষণে। বলেন, ‘রাস্তা আমরা বেছেই নিয়েছি। সেই রাস্তা বন্ধুতার, বিশ্বাসের, উন্নয়নের, প্রগতির ও সহযোগিতার।’
কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই এক দিনে গড়ে ওঠে না। সম্পর্কেরও একটা ইতিহাস থাকে। ধারাবাহিকতা থাকে। সম্পর্ক লালন করতে হয়। রক্ষা করতে হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ওঠানামাও হয়েছে রাজনৈতিক কারণে। কিন্তু তা হলেও ভারতের পূর্বাঞ্চলের ভাষাগত ও চরিত্রগত মিলের জন্য হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের মিলমিশে কখনো ঘাটতি দেখা যায়নি। বাংলাদেশকে তিন দিক দিয়ে ঘিরে থাকা ভারতীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে তাদের সম্পর্কে তাই ভাটাও পড়েনি কখনো। ইউপিএর সময় থেকে যে বিশ্বাস ও সহযোগিতার বাতাবরণের সৃষ্টি, ভারতে পালাবদলের পর তাতে ছেদ পড়বে বলে যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তা ক্ষণিকের মধ্যেই উবে গেছে নরেন্দ্র মোদির বিচক্ষণতায়। জুন মাসে তাঁর সফর সম্পর্কের এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে আশা করি।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে বেশ কয়েকটি বিষয় চিহ্নিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলোয় সহযোগিতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। সীমান্ত বিল পাস হয়ে যাওয়ায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত বরাবর শান্তি বজায় রাখা একটা বড় ব্যাপার। ইতিকর্তব্যগুলোর অন্যতম এটি। সীমান্তে গুলি ও হত্যা বাংলাদেশের কাছে এক অতীব স্পর্শকাতর বিষয়। প্রতিবারের আলোচনায় এই বিষয়টি বড় হয়ে ওঠে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বোঝাপড়া গত কয়েক বছরে চমৎকার বেড়েছে। দুই দেশই সীমান্তে ‘জিরো কিলিং’-এর পক্ষে। তবু সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামছে না কেন? এই প্রশ্নের উত্তর এবারের আলোচনায় খোলাখুলি দিয়েছেন কলকাতার মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর শ্রীরাধা দত্ত। তিনি বলেন, সীমান্তের এপার-ওপারের দশ-পনেরো কিলোমিটার অঞ্চল অপরাধমুক্ত করা না গেলে এই হত্যাও থামবে না। প্রতিটি হত্যার পেছনে অর্থনৈতিক কারণ যে থাকে, তা অস্বীকার করা মূর্খামি। সেই কারণ, যা চোরাকারবারিদের সক্রিয় রেখেছে, তার মীমাংসা হওয়া বেশ জরুরি।
দ্বিতীয় বিষয় নদী-সম্পদের ব্যবস্থাপনা ও জলের নিরাপত্তা। তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হতে হয়তো আরও কিছুদিন লাগবে। কিন্তু শুধু তিস্তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দুই দেশের অভিন্ন নদীগুলোর ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। সম্পর্কের খিলান মজবুত করার লক্ষ্যে এটা অন্যতম। বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও দুই দেশ সহযোগিতার একটা বড় উদাহরণ রাখতে পারে। বাংলাদেশ আজ যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ভারত থেকে কিনছে, তা আগামী দিনে অনেক বেড়ে যাবে। শুধু তা-ই নয়, ভারত-নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশ একযোগে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে অংশীদারত্ব নেওয়ার মতো জায়গায় এসে পৌঁছেছে। এটা তৃতীয় বিষয়। চতুর্থ বিষয় যোগাযোগ। বিভিন্ন ধরনের যোগাযোগব্যবস্থা, যা একদা অভিন্ন এই দেশে ছিল, পারস্পরিক সহযোগিতায় তা নতুনভাবে চালু হয়ে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটাতে পারে। স্থলপথ, নদীপথ ও সমুদ্রপথের মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটলে ভারত-নেপাল-ভুটান-বাংলাদেশ সার্কের মধ্যে এক নতুন অক্ষ হিসেবে পরিচিত হবে। পঞ্চম বিষয় এটারই বিস্তারের দিক। আন্তদেশীয় হাইওয়ে, রেলব্যবস্থা, সমুদ্রবন্দর, উপকূলবর্তী জাহাজ চলাচল আঞ্চলিক উন্নয়নে এক অন্য মাত্রা এনে দেবে। ষষ্ঠ বিষয় উৎপাদন ও পরিষেবা ক্ষেত্রে লগ্নি। ভারতকে এ জন্য একটি পৃথক বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশ দেবে। এই সফরেই তা ঘোষণা হতে পারে। সপ্তম বিষয়ে রয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সহযোগিতা যা অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অসুখ ও অজ্ঞান দূর করবে। অষ্টম ও নবম ক্ষেত্রে রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ে স্থায়ী অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের জন্য প্রকৃত নেতৃত্ব গড়ে তোলা।
মৈত্রী আলোচনার মতো দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক মতবিনিময় সীমান্ত বিল পাস করাতে যেমন সাহায্য করেছে, তেমনই নদী-সম্পদের সুসম বণ্টনও অদূর ভবিষ্যতে করে ফেলবে। এই ধারাবাহিক মতবিনিময়ের ফলে দুই দেশের সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় সরিয়ে ভরসা ও বিশ্বাসের একটা জায়গা সৃষ্টি হয়েছে। মোদির সফর সেই বন্ধন আরও দৃঢ় করবে। কারণ, তাঁর পররাষ্ট্রনীতির মূল কথাই হলো প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা। তাঁর কথায়, ‘প্রতিবেশী অশান্তিতে থাকলে আমিও শান্তিতে থাকতে পারব না।’
হাতে হাত মিলিয়ে সামনের দিকে এগোনো যদি মোদি-হাসিনার চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকে, তাহলে তাঁদের চ্যালেঞ্জাররাও কিন্তু বসে নেই। দিন দিন আরও সক্রিয় হবে তারাও। হচ্ছেও। উপমহাদেশকে নিরাপদ রাখতে সব ধরনের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নিশ্ছিদ্র করা জরুরি। গণতন্ত্রী, প্রগতিশীল ও উন্নয়নকামী নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনা তা বিলক্ষণ বোঝেন। নিরন্তর মৈত্রী আলোচনা সেই বোধোদয়ের কাঠবিড়ালি।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

‘উন্নয়ন’-এর জন্য গণতন্ত্রে ছাড়! by এ কে এম জাকারিয়া

তিন দফা দেশ শাসনের পর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের চতুর্থ দফা শাসনে আমরা জানলাম যে দলটি ‘বেশি’ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। সরকারের দায়িত্ববান একজন মন্ত্রী যখন বলেছেন ‘বেশি গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না’, তখন এটাকে আমরা দলের অবস্থান বলেই ধরে নিতে পারি। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের এই বক্তব্যের পর দল থেকে কোনো ভিন্নমতের কথাও আমরা শুনিনি। কৌতূহল হয়, এটা কি দলটির নতুন অবস্থান, নাকি সব সময়ই এই বিশ্বাস মেনে চলেছে!
১৯৯৬ বা ২০০৮ সালে নির্বাচিত হয়ে আওয়ামী লীগ যখন সরকার চালিয়েছে, তখন অবশ্য দলটির কোনো নেতার কাছ থেকে এ ধরনের কথা শোনা যায়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচন ও এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার পর সম্ভবত দলটি বুঝতে পেরেছে যে ‘গণতন্ত্র’ নিয়ে মাতামাতি করার অবস্থা তাদের আর নেই। এর বিকল্প কিছু লাগবে। গণতন্ত্রের জায়গা দখল করে নিল ‘উন্নয়ন’। জনগণকে এখন গণতন্ত্র বাদ দিয়ে উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাতে হবে। সরকারের নেতাদের ভাষণ-বক্তব্যে জায়গা করে নেয় এই ‘উন্নয়ন’। আলোচনা এবং তর্ক-বিতর্কেও উঠে আসতে শুরু করে উন্নয়ন না গণতন্ত্র, কোনটি আমাদের জন্য বেশি জরুরি।
এসব নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম, ‘আগে উন্নয়ন, পরে গণতন্ত্র?’ শিরোনামে (প্রথম আলো, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৪)। আলোচনা বা তর্ক-বিতর্কটি এ রকম যে উন্নয়ন চাইলে গণতন্ত্রে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। অথবা উন্নয়নের বিষয়টি আগে, গণতন্ত্রের কী হবে, তা পরে দেখা যাবে। তুলনামূলক রাজনীতি ও উন্নয়ন পাঠে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা ও তর্ক–বিতর্ক বহু পুরোনো। এর পক্ষে-বিপক্ষে মতের অভাব নেই, বাস্তব ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈপরীত্য। সামাজিক বিজ্ঞানে সম্পদ (উচ্চমাত্রার) ও গণতন্ত্রের (প্রতিষ্ঠিত) মধ্যে সম্পর্কটি স্বীকৃত। তবে গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও নেই, এমন দেশেও উন্নয়ন ও সম্পদ সৃষ্টি হয়েছে। আবার প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র আশা অনুযায়ী উন্নয়ন দিতে পারেনি, এমন উদাহরণও রয়েছে।
‘বেশি গণতন্ত্রে আমরা বিশ্বাস করি না’—এই বক্তব্যের ইঙ্গিতটি পরিষ্কার। মানে সরকার ‘বেশি’ গণতন্ত্র দিয়ে ফেলেছিল এবং এখন এর ‘মাত্রা’ কমানো হবে। এবং এর সঙ্গে যে উন্নয়নের সম্পর্ক রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরের বক্তব্যে। বলেছেন, ‘মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ যে পথে এগিয়ে গেছেন, বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সে পথে এগিয়ে যাচ্ছেন।’
মালয়েশিয়ার ‘উন্নয়ন’ নিশ্চয়ই একটি আলোচিত বিষয়, কিন্তু ‘গণতন্ত্র’ বা ‘গণতান্ত্রিক’ দেশের আলোচনায় মালয়েশিয়ার জায়গা খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যদি মাহাথিরের ‘পথে এগিয়ে’ যেতে শুরু করেন, তবে গণতন্ত্রকে যে ছাঁটতে হবে, সেটা পরিষ্কার। জনগণকে গণতন্ত্রের অনেক ছাড় মেনে নিতে হবে। আমাদের এখন জানা দরকার, এই ছাড়গুলো কী বা কতটুকু। এর বিনিময়ে কী পাবে বাংলাদেশ, উন্নয়ন? আমাদের আরও জানা দরকার যে উন্নয়ন বলতে আমরা আসলে কী বুঝব। অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন?
‘উন্নয়নের’ স্বার্থে গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে ছাড়টি দিতে হবে, সেটা সম্ভবত নির্বাচন। গত বছরের ৫ জানুয়ারির সংসদ বা এ বছরের সিটি নির্বাচনগুলো যেভাবে হয়েছে, সামনেও মনে হয় সরকার সে ধরনের নির্বাচনের পথেই হাঁটার কথা ভাবছে। সরকার জনগণকে যে ‘উন্নয়ন’ দিতে চাইছে, সেটা পেতে হলে এ ধরনের নির্বাচনকেই মেনে নিতে হবে। আর সরকারি দল যেহেতু ‘বেশি’ গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, ফলে নাগরিক বা মানবাধিকার, আইনের শাসন, বাক্স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা বা জবাবদিহির মতো বিষয়গুলো স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণকে যে ‘উন্নয়নের’ আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, তার বিনিময়ে গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে এ ছাড়গুলো তারা মেনে নিতে রাজি আছে কি না।
গণতন্ত্র ও উন্নয়নের মধ্যে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ‘উন্নয়নের’ সংজ্ঞা ঠিক করা। যুক্তরাজ্যের স্বাধীন থিংকট্যাংক ওভারসিস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের রাজনীতি ও শাসনবিষয়ক রিসার্চ ফেলো আলিনা রোচা মেনোকাল গণতন্ত্র ও উন্নয়নবিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে পাঠ করা প্রবন্ধে বলেছেন, উন্নয়নের এই সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি আমরা অমর্ত্য সেনকে বিবেচনায় নিই, তবে তা বেশ ব্যাপক। তাঁর কাছে উন্নয়নের সংজ্ঞা হচ্ছে ‘মুক্তি’। কারণ তিনি শুধু অর্থনৈতিক সূচককেই উন্নয়নের সংজ্ঞায় যুক্ত করেননি। রাজনৈতিক ও মানবিক মুক্তি, সামাজিক সুযোগ, স্বচ্ছতার নিশ্চয়তা, সুরক্ষামূলক নিশ্চয়তার বিষয়গুলোকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাহাথির মোহাম্মদের পথে এগোতে থাকলে ‘উন্নয়নের’ গতি কতটুকু বাড়বে, সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু এই ধারার উন্নয়ন চেষ্টায় আর যাই হোক, অমর্ত্য সেনের উন্নয়ন সংজ্ঞা অনুযায়ী দেশের জনগণের রাজনৈতিক ও মানবিক মুক্তি মিলবে না। স্বচ্ছতার নিশ্চয়তাও পাওয়া যাবে না। উন্নয়নের বড় শত্রু দুর্নীতি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিহীন পরিস্থিতি বরং উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কার্যকর গণতন্ত্র উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করে—এই ধারণার পেছনের সবচেয়ে বড় যুক্তি হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কিছু বৈশিষ্ট্য। এই ব্যবস্থা জবাবদিহি ও ভারসাম্য নিশ্চিত করে, নির্বাচন ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট সময় পর পর তা কার্যকর করা যায়।
এর বিরুদ্ধ মতও রয়েছে। আগের লেখাটিতে উল্লেখ করেছিলাম, নতুন পাঠকদের জন্য আবার উল্লেখ করছি। ‘গণতন্ত্রে জনগণের যে দাবিদাওয়াকে বিবেচনায় নেওয়া হয়, তা সব সময় উন্নয়ন–সহায়ক নয়। ...গণতন্ত্র অনেক সময় জনপ্রিয় দাবির প্রতি সংবেদনশীল...বা কখনো এমন সুনির্দিষ্ট দাবির প্রতি গণতন্ত্রকে মাথা নোয়াতে হয়, যা আসলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি ও বড় আকারের প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’ ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: এ কমপ্লেক্স রিলেশনশিপ বইয়ে এই মন্তব্য ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক প্রণব কুমার বর্ধনের।
গণতন্ত্র ও উন্নয়নের সম্পর্ক নিয়ে এসব তাত্ত্বিক বিতর্ক থাক। আমরা আপাতত শেখ হাসিনার মাহাথিরের পথে চলার সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, তা খুঁজে দেখার চেষ্টা করি। মালয়েশিয়ার ‘উন্নয়ন’, এর মাথাপিছু আয়—এসব সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা রয়েছে। এবং সেটা বেশ উঁচু বলেই আমাদের দেশের অনেকেরই স্বপ্ন মালয়েশিয়াকে ‘সেকেন্ড হোম’ বানানো। কিন্তু এই স্বপ্নের দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র—এসবেরও তো খোঁজখবর জানা দরকার।
লিম কিট সিয়াং মালয়েশিয়ার বিরোধী ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন পার্টির নেতা। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাঁর উপস্থাপিত প্রবন্ধ থেকে সেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যেতে পারে। লিম রাজনৈতিক কারণে বেশ কয়েক দফা বিনা বিচারে আটক ছিলেন এবং কোনোটির মেয়াদ ছিল দুই বছরেরও বেশি। এসব আটক কার্যকর করা হয়েছে ‘ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট’–এর আওতায়। একবার বিচারে তাঁর শাস্তিও হয়েছে, ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’-এর আওতায়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, মালয়েশিয়া সরকার ও একটি সুইস কোম্পানির গোপন চুক্তির অনিয়ম প্রকাশ করা। মালয়েশিয়া বা মাহাথিরের আমলের শাসনের দশা অন্তত কিছুটা হলেও টের পাওয়া যায় এক লিম কিটের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দিয়ে।
‘ডেমোক্রেসি ইন মালয়েশিয়া, নিদার ফ্রি নর ফেয়ার’ শিরোনামের উপস্থাপনায় লিম অনেক কিছু বলেছেন। মালয়েশিয়ার গণতন্ত্র ও নির্বাচন নিয়ে তাঁর বক্তব্যের কিছু কথা তুলে ধরছি। কথাগুলো সাধারণভাবে এ রকম, নির্বাচন মানেই গণতন্ত্র নয়, কার্যকর গণতন্ত্রে অনেক কিছুর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হয়। এর সঙ্গে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের সম্পর্ক রয়েছে। সম্পর্ক রয়েছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সভা-সমাবেশ করার স্বাধীনতার। গণতন্ত্রে সংসদীয় নজরদারি বা নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির মতো যথাযথ চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স নিশ্চিত করতে হয়। সিভিল সার্ভিসের ভূমিকা হতে হয় স্বাধীন। থাকতে হয় নির্বাচন কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়, দুর্নীতি দমন সংস্থা ও স্বাধীন বিচার বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠান। মালয়েশিয়ার ক্ষমতাসীন সরকার গণতন্ত্রের এই গুরুত্বপূর্ণ সব দিকই উপেক্ষা করে চলেছে। নির্বাচনের মাঠ সমতল নয় এবং অগণতান্ত্রিকভাবে সরকারি দল বারিসান নাসিওনালের (বিএন) পক্ষে নানা সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এভাবেই বর্তমান ক্ষমতাসীনেরা ৫৬ বছর ধরে তাদের শাসনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
আমরা বেশি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি না’ বা ‘মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ যে পথে এগিয়ে গেছেন, বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা সে পথে এগিয়ে যাচ্ছেন’—এসব মন্তব্য থেকে তবে আমরা কী সিদ্ধান্তে আসতে পারি? মালয়েশিয়ার এসব লক্ষণ কী এখানে পরিষ্কার হয়ে উঠছে না? উন্নয়নের আশায় কি তবে আমাদের গণতন্ত্রে ছাড় দিতে হবে!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

পুলিশের সম্ভাষণ, অতঃপর গুলিবর্ষণ! by শেখ হাফিজুর রহমান

জনগণ দেখতে চায়, বিশ্বজিৎ, অভিজিৎ এবং নিরীহ কলেজছাত্ররা যেন পুলিশের চোখের সামনে আর খুন না হন। আমরা চাই, পুলিশ যেন শিক্ষকদের ওপর পেপার স্প্রে নিক্ষেপ না করে, নিরীহ মানুষকে হেনস্তা না করে, ঝাঁপিয়ে না পড়ে অসহায় নারীদের ওপর অনেক দিন আগে পুলিশ সম্পর্কে একটি গল্প শুনেছিলাম। গল্পটি এ রকম, পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হল তল্লাশি করতে গেছে। তল্লাশির সময় কয়েকজন পুলিশ সন্দেহভাজন একজন ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি কী পড়ো? ছাত্র উত্তর দিল, ‘আমি এমবিএ পড়ি।’ পুলিশ তখন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে ছাত্রের কলার ধরে বললেন, ‘ফাজলামো করো আমাদের সাথে! এমএ আর বিএ তুমি একসঙ্গে পড়ো? মনে করো আমরা কিছুই বুঝি না!’ গল্পটিকে আমি নিছক গল্পই মনে করেছিলাম। কিন্তু আমি এখন বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে ওটি আসলে বাস্তব ঘটনা ছিল। সেদিন (১৭ মে ২০১৫) প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় বক্স করা একটি প্রতিবেদন দেখে আমার বিশ্বাস আরও বদ্ধমূল হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র নয়ন বাছারকে (বাছার তাঁর বংশের উপাধি) ‘বাশার’ বানিয়ে পুলিশ তাঁকে হিন্দু থেকে মুসলমানে রূপান্তরিত করেছে। অতঃপর তাঁকে শিবির বানিয়ে পায়ে শটগান ঠেকিয়ে গুলি করেছে দু-দুবার। নয়ন বাছার তিন মাস ধরে পঙ্গু হাসপাতালে পুলিশি প্রহরায় চিকিৎসাধীন আছেন। স্বস্তির খবর হচ্ছে, এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরদিনই ঢাকার দায়রা আদালত নয়নের জামিনের আদেশ দেন।
নয়ন বাছারের ঘটনাটি পড়ে সঙ্গে মনে পড়ল বিশ্বজিতের ঘটনা, যাকে ওই পুরান ঢাকায় সন্ত্রাসীরা শত শত লোক ও পুলিশের সামনে পিটিয়ে ও চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। কাকতালীয়ভাবে বিশ্বজিৎ ও নয়ন দুজনেই হিন্দু সম্প্রদায়ের। আরও মনে পড়ল লিমনের কথা, ডাকাত সন্দেহে র্যাব যার পায়ে গুলি করেছিল।
অস্বীকার করার উপায় নেই যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য, ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। এ কাজ করতে গিয়ে কিছু ভুলভ্রান্তি বা ত্রুটিবিচ্যুতি হতেই পারে। যদি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হতো, তাহলে মনকে সান্ত্বনা দিতে পারতাম। কিন্তু ঘটনা তো একটি নয়, শত শত, যেটিকে নির্দ্বিধায় ‘সিস্টেমেটিক ভায়োলেশন অব হিউম্যান রাইটস বাই পুলিশ’ বলতে পারি। আর শত বছর ধরে চলা এই পুলিশ ‘অ্যাটোরসিটি’ থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন। ওই আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের নির্যাতনে কারও  ক্ষতি হলে তার জন্য দায়ী সদস্যের পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ওই একই আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে কারও মৃত্যু হলে দায়ী সদস্যের জন্য রয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান।
শুধু আইন করে পুলিশ ও র্যাবের নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না, বা থামানো যাবে না। এ জন্য সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা প্রয়োজন। পুলিশের মধ্যে এমন কিছু মৌলিক পরিবর্তন ও যুগোপযোগী সংস্কার দরকার, যাতে এ বাহিনী দীর্ঘদিনের ইমেজ সংকট কাটিয়ে জনবান্ধব হয়ে উঠতে পারে। প্রথম নজর দেওয়া দরকার মাঠপর্যায়ের ওসি থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত। কেননা, চোর-ডাকাত ধরা থেকে শুরু করে নাগরিক ও সড়কের নিরাপত্তা বিধান ও মিছিল-সমাবেশের শান্তি রক্ষার দায়িত্ব এই নিম্নস্তরের পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত।
পুলিশকে জনবান্ধব করার প্রথম পদক্ষেপ হচ্ছে শিকড় পর্যায়ের পুলিশের নিয়োগকে পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত করা এবং ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও মনিটরিংয়ের মধ্য দিয়ে তাদের কাছ থেকে জনগণের সেবা পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা। পত্রপত্রিকা এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার রিপোর্টের দিকে নজর দিলে যে কেউই সহজে বুঝতে পারবেন যে, পুলিশের দ্বারা যে নির্যাতনের ঘটনাগুলো ঘটে এবং হেফাজতে যে মৃত্যু হয়, তার অধিকাংশের জন্য দায়ী এই মাঠপর্যায়ের পুলিশ।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের ২০০৯-১৩ মেয়াদের সরকারের সময় একবার ওসিদের জায়গায় এএসপিদের (বিসিএস উত্তীর্ণ পুলিশ কর্মকর্তা) প্রতিস্থাপনের চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু পরাক্রমশালী ওসিদের কারণে নাকি সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। অথবা তার কারণ হয়তো আরও গভীরে। ওসিদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মন্ত্রী ও এমপিদের কায়েমি স্বার্থই শেষ অবধি ওই উদ্যোগকে সফল হতে দেয়নি। আমার এক সাবেক ছাত্র, যে কিনা এখন এএসপি হিসেবে কর্মরত, সে একবার দুঃখ করে বলছিল, ‘স্যার জানেন, ওসিরা আমাদের কথা শোনে না। কারণ, ওদের সঙ্গে মন্ত্রী ও এমপিদের সরাসরি সম্পর্ক।’
দ্বিতীয়ত, যে বিষয়ে পুলিশের নজর দেওয়া দরকার সেটি হচ্ছে শিকড় পর্যায়ের পুলিশের মোটিভেশন ও প্রশিক্ষণ। গত কয়েক বছরে যে বিষয়ে আমাদের খটকা লেগেছে, সেটি হচ্ছে, যে সময়ে পুলিশের সক্রিয় হওয়ার কথা, অপরাধ প্রতিরোধে তৎপর হওয়ার কথা, তখনই পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা নির্লিপ্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। আর যখন তাদের নিষ্ক্রিয় থাকার কথা, একটু সহিষ্ণু ও কৌশলী হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার কথা, তখনই তারা প্রবল পরাক্রম নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন নিরীহ মানুষের ওপর। আমরা নিশ্চয়ই ভুলে যাইনি ন্যায্য দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য আন্দোলনরত নিরীহ শিক্ষকদের ওপর পুলিশের পেপার স্প্রে নিক্ষেপের কথা। আর দিন কয়েক আগে নারী লাঞ্ছনার প্রতিবাদে সমবেত ছাত্রীদের ওপর পুরুষ পুলিশের বীরত্ব তো (!) আমরা দেখলাম। কিন্তু অভিজিৎকে যখন ঘাতকেরা কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে, পুলিশ তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে, তাদের প্রাণরক্ষারও চেষ্টা করে না, অথবা ঘাতকদের ধরার জন্যও তৎপর হয় না। পাঠক নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, আমিনবাজারে পুলিশের চোখের সামনে গ্রামবাসী ডাকাত সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল ছয়-ছয়জন কলেজছাত্রকে।
২০১৩ সালে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি যখন পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ শুরু করে, তখন আমরা পুলিশকে পড়ে পড়ে মার খেতে দেখেছি। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রান্ত পুলিশের শরীর থেকে রক্ত ঝরেছে। টেলিভিশনের পর্দায় ওই দৃশ্য দেখে আমরা সমব্যথী হয়েছি। আমরা বেদনার্ত ও আতঙ্কিত হয়েছি যখন দেখেছি, পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য আক্রান্ত হলে তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য সদস্যরা তাঁর সাহায্যে এগিয়ে আসছেন না।
রাজশাহীতে একজন আক্রান্ত পুলিশকে উদ্ধার করেছিলেন অসম সাহসী এক নারী। এ বছরের ৫ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া পেট্রলবোমা হামলার সময়ও পুলিশকে যথেষ্ট সক্রিয় ও তৎপর দেখা যায়নি, অথচ কথায় তাঁরা উড়িয়ে দিয়েছেন রাজা-উজির-নাজির—সব! আমরা পুলিশ প্রশিক্ষণের এই মারাত্মক ঘাটতির অবসান চাই। আমরা চাই, পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের এমন প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক, যাতে করে তারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সশস্ত্র আক্রমণ মোকাবিলা করতে পারে, কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে পারে পেট্রলবোমা সন্ত্রাসীদের।
জনগণ দেখতে চায়, বিশ্বজিৎ, অভিজিৎ এবং নিরীহ কলেজছাত্ররা যেন পুলিশের চোখের সামনে আর খুন না হন। আমরা চাই, পুলিশ যেন শিক্ষকদের ওপর পেপার স্প্রে নিক্ষেপ না করে, নিরীহ মানুষকে হেনস্তা না করে, বিপুল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে না পড়ে অসহায় নারীদের ওপর। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি, সেই রাষ্ট্রের জনগণের মানবাধিকার রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। সে কথাটি সম্যকভাবে বুঝতে হবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। আর ওই উপলব্ধির আলোকেই আমল করতে হবে।
শেখ হাফিজুর রহমান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক, মানবাধিকার ও অপরাধবিজ্ঞান গবেষক।

আত্মীয়তার বন্ধনে রাজনীতি-১০ by কাফি কামাল

মরমী কবি ও বিখ্যাত জমিদার দেওয়ান হাছন রাজা। বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজোড়া তার গান ও দর্শনের জনপ্রিয়তা। গানের মতোই সিলেট অঞ্চলের রাজনীতিতে রয়েছে তার উত্তরপুরুষ ও আত্মীয়-স্বজনদের প্রভাব। বৃহত্তর সিলেটের বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধির সঙ্গেই রয়েছে দেওয়ান হাছন রাজার পরিবারের নিকট ও দুরসম্পর্কীয় আত্মীয়তা। হাছন রাজার জামাতা দেওয়ান মোহাম্মদ আসফ চৌধুরী ছিলেন জাতীয় কংগ্রেসের সিলেট শাখার সহ-সভাপতি। হাছন রাজার নাতি হলেন প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। হাছন রাজার নাতিদের মধ্যে- বিশ্বনাথের দেওয়ান তৈমুর রেজা চৌধুরী জিয়া সরকারের যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তৈমুরের ছেলে দেওয়ান শমসের রাজা চৌধুরী বিশ্বনাথের উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। হাছন রাজার প্রোপৌত্র প্রয়াত দেওয়ান মমিনুল মউজদিন ছিলেন সুনামগঞ্জের একাধিকবারের পৌর চেয়ারম্যান। যিনি জ্যোৎস্না উপভোগের জন্য পূর্ণিমার দিন পৌরসভার বাতি বন্ধ রাখতেন।
হাছন রাজার ছেলে দেওয়ান একলিমুর রাজা চৌধুরীর নাতিন জামাই হলেন বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য প্রয়াত দেওয়ান ফরিদ গাজী। মুক্তিযুদ্ধে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রণাঙ্গনের বেসামরিক উপদেষ্টা, বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর পিতা দেওয়ান মোহাম্মদ হামিদ গাজী ছিলেন দিনারপুর পরগণার জমিদার। ফরিদ গাজী হযরত শাহ্‌জালাল মুজাররদ-ই-ইয়েমেনীর (রঃ) সফরসঙ্গী হযরত তাজউদ্দিন কোরেশীর (রঃ) ১৬তম বংশধর।
হাছন রাজার আরেক নাতি সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত দেওয়ান আনোয়ার রাজা চৌধুরী। তার জামাতা হলেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও সাবেক এমপি সুলতান মুহাম্মদ মনসুর আহমেদ। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি সুলতান মনসুরের স্ত্রীর আপন বড়ভাই হলেন সুনামগঞ্জ মহকুমা ইউপিপির সাবেক সভাপতি ও বিএনপিদলীয় সাবেক এমপি  দেওয়ান শামসুল আবেদিন চৌধুরী এবং সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, উপজেলা ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরিন। সুলতান মনসুরের চাচাশ্বশুর হলেন জিয়াউর রহমান সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি দেওয়ান তৈমুর রাজা চৌধুরী ও আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক এমপি দেওয়ান ওবায়দুর রাজা চৌধুরী। হাছন রাজার নাতি দেওয়ান তৈমুর রাজা চৌধুরী আসাম ও পূর্ব-পাকিস্তানের এমএলএ ও আসাম প্রাদেশিক মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি এবং সিলেট জেলা মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। সুলতান মনসুর আবার আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরীর ফুফা শ্বশুর। আবার সুলতান মনসুরের সম্পর্কে নানা হলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউর গনি ওসমানী, সম্পর্কে মামা হলেন সাবেক এমপি ও মৌলভীবাজার আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি, ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত মোহাম্মদ ইলিয়াস, সম্পর্কে দুলাভাই হলেন সিলেট অঞ্চল আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী। এছাড়া সুলতান মনসুরের নিকটাত্মীয়দের মধ্যে আছেন- মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি জেনারেল এমএ রব, সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, সাবেক অর্থমন্ত্রী এম. সাইফুর রহমান, বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, ফারুক এ চৌধুরী পরিবার, সমাজকল্যাণমন্ত্রী সৈয়দ মহসীন আলী, প্রয়াত কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী সিরাজুল হোসেন খান, প্রয়াত ব্যারিস্টার মুনতাকিম চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ কায়সার, সাবেক এমপি নাজিম কামরান চৌধুরী, সাবেক উপদেষ্টা সিএম সফি শামী, রাশেদা কে. চৌধুরীসহ অনেকেই। দেওয়ান হাছন রাজার আত্মীয়দের মধ্যে আরও আছেন- আসামের সাবেক শিল্পমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরী, পাকিস্তানের সাবেক শিক্ষামন্ত্রী দেওয়ান আবদুল মজিদ, সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের পিতা আসাম সরকারের এমএলএ ও হুইপ মকবুল হোসেন চৌধুরী ও সিলেটের সাবেক এমপি শফি আহমেদ চৌধুরী প্রমুখ।
আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্পিকার প্রয়াত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর মায়ের দিকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হলেন হাছন রাজা। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরীর মা বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ছিলেন মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে সিলেট অঞ্চল থেকে প্রথম মহিলা এমপি। আবার সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, বর্তমান সমাজকল্যাণ মন্ত্রী সৈয়দ মহসিন আলী ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীরা পরস্পরের সম্পর্কে খালাতো ভাই। তাদের তিনজনের মা হলেন পরস্পরের কাজিন। আবার দেওয়ান শামসুল আবেদিন চৌধুরী ও দেওয়ান তৈমুর রেজা চৌধুরীরা হলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীর শ্বশুরপক্ষীয় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আবার ইনাম চৌধুরী হলেন দেওয়ান জাকেরিনের মায়ের দিকের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারের রাজস্ব মন্ত্রী তোফাজ্জল আলীর (টি আলী) ছেলে হলেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি রেজা আলী। টি আলীর শাশুড়ি হলেন আসাম সরকারের এমপি জোবেদা খাতুন চৌধুরী। জোবেদা খাতুন চৌধুরীর ভাগ্নে হলেন ইনাম আহমেদ চৌধুরী। সে সূত্রে টি আলী হলেন ইনাম আহমেদের দুলাভাই ও রেজা আলী হলেন ভাগ্নে। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানের মা হলেন জিয়াউর রহমান সরকারের মন্ত্রী আমিনা রহমান। রিয়াজ রহমানের বোন জামাই হলেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক সচিব ফারুক এ চৌধুরী। সে সূত্রে রিয়াজ রহমান ও ইনাম আহমেদ চৌধুরী পরস্পরের বেয়াই। আবার ইনাম আহমেদ চৌধুরীর আপন মামাতো ভাই হলেন বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি নাজিম কামরান চৌধুরী যার স্ত্রী গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী ছিলেন সাবেক উপদেষ্টা। এছাড়া ইনাম আহমেদ চৌধুরীর ভাগ্নে হলেন সাবেক উপদেষ্টা আবদুল মুয়িদ চৌধুরী। ইনাম আহমেদের সম্পর্কে নানা (মামার শ্বশুর) হলেন যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী নোয়াখালীর রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী।
ভাষাসৈনিক, যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম জনমত সংগঠক ও বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের পিতা এডভোকেট আবু আহমদ আবদুল হাফিজ ছিলেন তৎকালীন সিলেট জেলা মুসলিম লীগের কর্ণধার। আর মাতা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী ছিলেন সিলেট মহিলা মুসলিম লীগের সভানেত্রী। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আবুল মাল আবদুল মুহিত এককালে এরশাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তার ছোটভাই একেএম আবদুল মোমেন হলেন জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি। আবার মুহিত ও ইনাম চৌধুরী সম্পর্কে তালুই-পুতরা। ইনামের ভাগ্নের (মামাতো বোনের ছেলে) সঙ্গে বিয়ে হয়েছে মুহিতের ছোট বোনের। মুহিতের আরেক ছোট বোনের ভাসুর হলেন হবিগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সল।
পাকিস্তান আমলের শিল্পমন্ত্রী দেওয়ান আবদুল বাসিতের সঙ্গে একাধিক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ সিলেটের বিখ্যাত (ফারুক-ইনাম) চৌধুরী পরিবার। ফখরুদ্দীন সরকারের আরেক উপদেষ্টা সিএম শফি সামী ইনাম চৌধুরীদের দ্বিমাত্রিক আত্মীয়। একদিকে কাজিন অন্যদিকে কাজিনের হাজব্যান্ড। শফি সামীর শ্বশুর ড. এসটি চৌধুরী হলেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা প্রয়াত মে. জে. (অব.) মঈনুল হোসেন চৌধুরী বীরবিক্রম, বর্তমান সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী বীরবিক্রম, ফখরুদ্দীন সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী ও লন্ডনে বাঙালি কমিউনিটি আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ তাসাদ্দুক আহমেদ চৌধুরী, শমসের মবিন চৌধুরী ও ইনাম চৌধুরী পরস্পরের কাজিন। আবার মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি খালেদা রাব্বানীর বেয়াই হলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব ইঞ্জিনিয়ার আনহ আক্তার হোসেন। খালেদা রাব্বানীর আরেক বেয়াই হলেন নজরুল ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক কবি মাহফুজউল্লাহ।
আবহমান কাল ধরেই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ বৃহত্তর সিলেটের রাজনৈতিক নেতারা। এ অঞ্চলে রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে সবসময় সামাজিক বন্ধনই পেয়েছে বেশি গুরুত্ব। এর নেপথ্যে রয়েছে সিলেটের ৩৬০ আউলিয়ার বংশধরদের ঘনিষ্ঠ আত্মিক বন্ধন। সিলেটের দেওয়ান, চৌধুরী ও সৈয়দ পদবীর পরিবারগুলোর সঙ্গে রয়েছে গভীর আত্মীয়তা। এছাড়া বাংলাদেশের ক্ষমতার প্রতীক খ্যাত সিলেট সদর আসনের একটি রেকর্ড রয়েছে। এ আসনে যে দল জয়লাভ করে তারাই সরকার গঠন করে। বৃহত্তর সিলেটের বেশির ভাগ আসনেই লড়াই হয় আত্মীয়তার।