Tuesday, August 20, 2024

ব্রিটেনে বিএনপির নেতাকর্মীদের এসাইলাম আবেদন অনিশ্চিত, আওয়ামী লীগ কর্মীদের আবেদনের হিড়িক by আরিফ মাহফুজ

গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যুক্তরাজ্যে হঠাৎ করে আওয়ামী লীগের সদস্য হয়ে হোম অফিসে এসাইলাম আবেদন করা অতিমাত্রায় বেড়ে গেছে।  চলতি সময়ে বাংলাদেশি 'ল' ফার্মগুলোতে এর প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা গেছে।

প্রতিটি ফার্মেই বেড়েছে ক্লায়েন্টের সংখ্যা।  ধারণা করা হচ্ছে গত দুই সপ্তাহে হোম অফিসে  প্রায় দুই হাজারের মত নতুন ক্লেইম হয়েছে যারা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক দাবি করেছেন। আবেদন কারীরা বলছেন আওয়ামী লীগ করার কারণে বাংলাদেশে তাদের জীবন হুমকির মুখে। তবে অনেক বাংলাদেশি আইনজীবী বলছেন এখন যারা আওয়ামী লীগের হয়ে এসাইলাম আশ্রয়ের জন্য দরখাস্ত করছেন তাদের কেউই ৫ই আগস্টের পর আসেনি। সবাই এসেছেন পূর্বের বিভিন্ন মেয়াদে,  এদের মধ্যে বেশিরভাগই স্টুডেন্ট ও কেয়ার ওয়ার্কার হিসেবে। স্টুডেন্ট ও কেয়ার ওয়ার্কার হিসেবে আসা বড় একটি অংশ ৫ই আগস্টের পূর্বে এসাইলাম ক্লেইম করেছেন এদের প্রায় সবাই বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থক হয়ে এসাইলাম ক্লেইম  করেছেন।

বিএনপির হয়ে ক্লেইম করা শতকরা ৮০% বাংলাদেশে কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না বলে বলে হোম অফিসের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রমাণিত হয়েছে।  আবেদনকারীর বেশিরভাগই হোম অফিস কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন , তাদেরকে হোম অফিস বিশ্বাস করেনি তবে এদের কেউ কেউ ইমিগ্রেশন আদালতে আপিল করে কৃতকার্য হয়েছেন যার সংখ্যা খুবই কম। বর্তমানে আওয়ামী লীগের হয়ে ক্লেইম করা অধিকাংশই বাংলাদেশে রাজনীতির সাথে সপৃক্ত ছিলেন না বলে 'ল' ফার্ম সূত্রগুলো বলছে।

ডিপলক সলিসিটর্সের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুবুর রহমান জানান , বর্তমানে এসাইলাম আবেদন করতে আসা বেশিরভাগ আবেদনকারী তাঁদের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থক হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন , এরকম অন্যান্য ফার্মগুলোতেও একই খবর পাওয়া যাচ্ছে , তবে গত দুই সপ্তাহে আওয়ামী লীগের হয়ে কতজন বাংলাদেশি এসাইলাম আবেদন করেছেন এর প্রকৃত হিসাব হোম অফিসে তথ্য অনুসারে জানা যাবে।  হোম অফিসে থেকে এ বিষয়ে মোট হিসাবের তথ্য পেতে আরো তিন মাস সময় লাগতে পারে।
গত দুই তিন বছর ধরে বিএনপির হয়ে আবেদন করা অমীমাংসিত এসাইলাম আবেদনগুলোর কি হবে? এ বিষয়ে মাহবুবুর রহমান বলেন, যেহেতু বিএনপির হয়ে এসাইলাম করা ব্যক্তিদের মূল ভয় বা শত্রু ছিল আওয়ামী লীগ সরকার সেহেতু আওয়ামী লীগ এখন সরকারে নেই তাই অমীমাংসিত বা পেন্ডিং এপ্লিকেশনগুলোর সিদ্ধান্ত পজেটিভ আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

এ ক্ষেত্রে বিএনপির হয়ে করা এসাইলাম দরখাস্তকারীদের বাংলদেশে আর কারো দ্বারা জীবননাশের আশঙ্কা , ভয় বা অন্য কোন শত্রু আছে কিনা খুঁজতে হবে , এরকম কারণ ও প্রমাণ বের করতে পারলে পেন্ডিং এপ্লিকেশন গুলোতে পজেটিভ রেজাল্ট আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

সারা দেশে দেড় হাজার ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুর

প্রথম আলো: ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় দেড় হাজার ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। এসব ভাস্কর্য ও ম্যুরালের বেশির ভাগই ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, স্বাধীনতাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক। ধ্বংস করা হয়েছে ময়মনসিংহের শশীলজের ভেনাসের মূর্তি, সুপ্রিম কোর্টের থেমিস ও শিশু একাডেমির দুরন্ত ভাস্কর্যটিও।

প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে ৫ থেকে ১৪ আগস্টের মধ্যে ৫৯টি জেলায় ১ হাজার ৪৯৪টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য (সিরামিক বা টেরাকোটা দিয়ে দেয়ালে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা অবয়ব), ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলার তথ্য পেয়েছেন। বেশির ভাগ ভাঙচুর ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট।

ঢাকা মহানগর এলাকার ১৫টি স্থানে ১২২টির বেশি ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও রিলিফ ভাস্কর্য ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও উপড়ে ফেলা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমানের পরিপূর্ণ অবয়ব কাঠামোর ভাস্কর্য ধ্বংস করা হয়েছে ৭টি। ঢাকা বিভাগে ২৭৩টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২০৪, রাজশাহীতে ১৬৬, খুলনায় ৪৭৯, বরিশালে ১০০, রংপুরে ১২৯, সিলেটে ৪৯ ও ময়মনসিংহ বিভাগে ৯২টিসহ মোট ১ হাজার ৪৯২টি ভাস্কর্য, রিলিফ ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে, উপড়ে ফেলে এবং আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভাস্কর্য, ম্যুরাল ভাঙচুর প্রসঙ্গে দেশের প্রথিতযশা ভাস্কর্যশিল্পী হামিদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি খুবই দুঃখিত, ভারাক্রান্ত। এমন না হওয়াই উচিত ছিল। আর যেন এমন ঘটনা না ঘটে। প্রত্যাশা করি দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু হবে।’

ঢাকার যত ভাস্কর্য

ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা–ভাঙ্চুরের সময় ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে দুটি বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল। রাজধানীতে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত পাঁচটি ভাস্কর্যের স্থান ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও হাতুড়ি-শাবল দিয়ে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে, কোথাও উপড়ে ফেলা হয়েছে, কোনো কোনো ভাস্কর্য পোড়ানো হয়েছে আগুনে।

মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী শামীম শিকদারের ‘স্বাধীনতাসংগ্রাম’ ভাস্কর্যটি রাজধানীর পলাশীর মোড়ে অবস্থিত। সেখানে ছোট-বড় শতাধিক পৃথক ভাস্কর্য রয়েছে। এর মধ্যে অক্ষত আছে মাত্র পাঁচটি। বাকিগুলো উপড়ে ফেলা হয়েছে। ১১ আগস্ট দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, মাটিতে লুটাচ্ছে দেশ-বিদেশের কবি, সাহিত্যিক, বিপ্লবী, রাজনীতিবিদ, বিজ্ঞানীদের আবক্ষ ভাস্কর্য। এর মধ্যে আছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর থেকে ইয়াসির আরাফাত, জগদীশচন্দ্র বসু থেকে লালন।

শিশু একাডেমি চত্বরের ‘দুরন্ত’ পুড়ে যাওয়ার খবর জানা গেছে ৮ আগস্ট। সেদিন বিকেলে শিশু একাডেমিতে গিয়ে দেখা যায়, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পড়ে আছে দুরন্তর অঙ্গার শরীর। অক্ষত ছিল শুধু শিশু মুখটুকু। কাঠি দিয়ে চাকা নিয়ে ছুটে চলা কিশোরের দুরন্ত ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। পাশে থাকা শেখ রাসেলের ম্যুরালটিও পুড়ে ছাই।

বিজয় সরণিতে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘মৃত্যুঞ্জয়’ ভাস্কর্য স্থাপিত হয় সাম্প্রতিক সময়ে। গত বছরের ১০ নভেম্বর ‘মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণ’ উদ্বোধন করা হয়। ৫ আগস্ট বিকেলে দেখা যায়, বিজয় সরণিতে বিশাল অবয়বের ভাস্কর্যটি ভাঙার চেষ্টা চলছে। দড়ি বেঁধে টেনে, আগুন দিয়ে, শাবল চালিয়ে একপর্যায়ে ধ্বংস করা হয় মৃত্যুঞ্জয়।

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বর্ধিত ভবনের সামনে স্থাপিত থেমিসের ভাস্কর্যটি উপড়ে ফেলা হয়েছে দুই পর্বে। এই ভাস্কর্য নিয়ে ২০১৬ সাল থেকেই ছিল নানা মতবিরোধ। গ্রিক দেবী থেমিসের আদলে ন্যায়বিচারের প্রতীক হিসেবে গড়ে তোলা এই ভাস্কর্যের হাতে ছিল ন্যায়দণ্ডের প্রতীক। ৭ আগস্ট উপড়ে ফেলা হয় এটি।

জেলায় জেলায় ক্ষতি

মেহেরপুরের ‘মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্স’কে একক ভাস্কর্য হিসেবে ধরা হলেও সেখানে পাঁচ শতাধিক পৃথক ভাস্কর্য ছিল। কমপ্লেক্সের অন্তত ৩০৩টি ছোট–বড় ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়েছে। সবার আগে ভাঙা হয় বঙ্গবন্ধুর বিশাল ভাস্কর্যটি। ৫ আগস্ট বিকেল পাঁচটার দিকে শতাধিক যুবক রড, বাঁশ ও হাতুড়ি নিয়ে স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটির মাথা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। একই সময় এলোপাতাড়িভাবে আঘাত করে ‘১৭ এপ্রিলের গার্ড অব অনার’ ভাস্কর্যটিতে।

ময়মনসিংহের শশীলজে থাকা ভেনাসের ভাস্কর্যটি ভাঙা হয়েছে, চুরি হয়েছে মাথাটি। শশীলজের জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘শত শত লোক দলবেঁধে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। ভাস্কর্যের মাথার অংশ পাওয়া যায়নি। এটি অমূল্য সম্পদ ছিল।’ এ শহরে জয়নুল সংগ্রহশালার সামনে থাকা শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আবক্ষ মূর্তিটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অবশ্য স্থানীয় শিল্পীরা মিলে পরে সেটি সংস্কার করেছেন।

খুলনায় শেখ মুজিবুর রহমানের দুটি ভাস্কর্য পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে। জেলা শহর মাদারীপুরে নির্মাণাধীন মুক্তিযুদ্ধের একটি স্মৃতিকেন্দ্রের নাম ছিল ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’। শহরের প্রাণকেন্দ্র শকুনির লেকপাড়ে অবস্থিত এই স্মারকের ভেতরের সবকিছু নষ্ট করা হয়েছে ৭ আগস্ট বিকেলে।

৫ আগস্টের পর গাজীপুরে তিনটি স্থানে ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাত বীরশ্রেষ্ঠের রিলিফ ভাস্কর্য। এটি ছিল জয়দেবপুরের ভেতরের দিকে। সিলেটে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থাকা ১২টির বেশি ম্যুরাল ভাঙা হয়েছে। এর সব কটিই শেখ মুজিবুর রহমানের। নরসংদীতে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘তর্জনী’ নামে পরিচিত ভাস্কর্যটি। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ভাষণের একটি আঙুল তুলে রাখা সেই দৃশ্যের অনুকরণে তর্জনী বানানো হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের চেয়ারম্যান নাসিমুল খবির প্রথম আলোকে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভাস্কর্যের তালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে সংস্কারের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে যাওয়া ভাস্কর্য নির্বাচনে। কোনটি কোন প্রক্রিয়ায় সংস্কার হবে তা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। তবে সবগুলোই সংস্কার করা সম্ভব নয়।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা]

চেঙ্গিস খানদের সঙ্গে যুক্ত হলো হাসিনার নাম by মোদাসসের হোসেন খান বীরপ্রতীক

‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের লালন’ বহুল উচ্চারিত এই নীতিবাক্য ছিল পলাতক হাসিনার দুঃশাসনের আমলে পদদলিত। সাধারণ জনগণের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয়েছিল মৌলিক অধিকারগুলোর মাঝে সর্বাধিক অন্বেষিত ন্যায়বিচার। আমার দীর্ঘ জীবনে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসলব্ধ তথ্য থেকে আমি নির্দ্বিধায়, সুস্থ মস্তিষ্কে ও অভ্রান্তচিত্তে ঘোষণা করতে পারি, শেখ হাসিনার ন্যায় অত্যাচারী শাসক ও শোষক মানব ইতিহাসে বিরল। তাই সমগ্র পৃথিবীর মানচিত্রে আবির্ভূত নিম্নোল্লিখিত দশজন স্বৈরাচারের সঙ্গে এখন থেকে যুক্ত হলো শেখ হাসিনার নাম।

১) শেখ হাসিনা, ২) চেঙ্গিস খান (মঙ্গোলিয়া), ৩) ইভান, দি টেরিবল (রাশিয়া), ৪) ভ্‌লাদ, দি ইমপেলার (রুমানিয়া), ৫) দ্বিতীয় লিওপল্ড (বেলজিয়াম), ৬) মাও সেতুং (চায়না), ৭) জোশেফ স্ট্যালিন (সোভিয়েত ইউনিয়ন), ৮) এডলফ হিটলার (জার্মানি), ৯) পলপট (কম্বোডিয়া), ১০) সাদ্দাম হুসেইন (ইরাক) ও ১১) ইদি আমিন (উগান্ডা)।
তালিকাভুক্ত কুখ্যাত সকল দানব-দানবীর মাঝে শেখ হাসিনার অবস্থানই সবার শীর্ষে। লক্ষণীয় বিষয়টি হচ্ছে দুর্নীতি, অত্যাচার, নির্যাতন, গুম, হত্যা নানাবিধ পাশবিক প্রবৃত্তিগুলো সকল স্বৈরাচারের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলেও হাসিনার হৃদয়ে লালিত ছিল আরেকটি নজিরবিহীন ও অবিশ্বাস্য মনোবৃত্তি। ঘৃণ্য আকাঙ্ক্ষা-তার পিতা ও পরিবারের সদস্যদের হত্যার প্রতিশোধের জন্য বাংলাদেশ ও এদেশের সকল মানুষের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার এক অদম্য বাসনা। তাই এই আকাঙ্ক্ষা রূপায়ণে স্বদেশের মানুষগুলোর বিরুদ্ধে সে কেবল ক্ষমতার নিষ্ঠুর অপব্যবহারই করেনি, একে একে দেশের সকল সম্পদ ও সার্বভৌমত্ব প্রতিবেশী রাষ্ট্রের হাতে নিঃশর্তে তুলে দেয়ার কাজটিও প্রায় সম্পূর্ণ করে ফেলেছিলেন। এহেন জঘন্য ও রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের সকল দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে এবং সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে পরিতোষ বিতরণ, নিয়মবহির্ভূতভাবে পদ/পদবি প্রদান এবং অবাধ দুর্নীতির প্রসারে উৎসাহ দানের স্থাপিত হয়েছিল এক অশ্রুত দৃষ্টান্ত। তার নির্দেশ ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছিল মুষ্টিমেয় ধনাঢ্য পরিবার (ওলিগার্ক), যারা লুণ্ঠিত ও কুক্ষিগত করেছে দেশের ৭০ থেকে ৮০% অর্থ ও সম্পদ। অন্যদিকে অনাদিকাল যাবৎ ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছিল সরকারের সাহায্য ও সহযোগিতায় গুপ্ত ও প্রকাশ্য সন্ত্রাসী বাহিনী।

এ সত্য সহজেই অনুমেয়, ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট ও পদলেহনকারী এবং বিবেকবর্জিত এক ক্ষুদ্র শ্রেণি সরকারের সীমাহীন আনুকূল্য লাভ করলেও দীর্ঘ ১৫ বছর স্বৈরাচারের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে একসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হলেও, দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত বৃহত্তর জনগোষ্ঠী ক্রমাগত অত্যাচার ও নির্যাতনে হয়ে উঠে আতঙ্কিত।

অজস্র পরিবারের প্রিয়জন নির্বিচারে গুম ও হত্যার শিকার হওয়ায়, সঙ্গত কারণেই তাদের প্রতিবাদ করার সাহস ও শক্তি ক্রমশ লোপ পেতে থাকে। তাই বিতাড়িত স্বৈরাচারের দুর্নীতি, কুকর্ম ও স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে স্বপ্রণোদিত হয়ে জড়িত হওয়া দুর্বৃত্তদের সংখ্যা অগণিত হলেও, দেশের সরকারি ও বেসরকারি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত জনসংখ্যার এক বৃহৎ অংশ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেবল বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের দুর্বৃত্তায়নে নীরব সমর্থন দিয়ে এসেছে। তাই পতিত সরকারের সকল অপকর্মের বিরুদ্ধাচরণ না করার অপরাধে অভিযুক্ত করে তাদের সবাইকে সাজা প্রদান করা বা লাঞ্ছিত করা অনুচিত হবে। তবে দেশীয় সম্পদ লুণ্ঠন, অত্যাচার, অনাচার, নিপীড়ন ও হত্যাসহ সকল প্রকার অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ও ইন্ধনদাতাদের অতি দ্রুত বিচারের সম্মুখীন করে কঠিনতম শাস্তি প্রদান এই মুহূর্তে দেশপ্রেমিক সকল মানুষের প্রাণের দাবি। সরকারের উপর অর্পিত সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্ব সুষ্ঠু ও দ্রুততম সময়ে সম্পাদন করার লক্ষ্যে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করার জন্য

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিকট বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি:
১) হাসিনার অবৈধ দলীয় সরকার কর্তৃক রাজনৈতিক বিবেচনায় নিম্ন এবং উচ্চ আদালতে নিয়োগপ্রাপ্ত সকল অযোগ্য, অদক্ষ ও পক্ষপাতদুষ্ট সকল বিচারকদের অপসারণ করে প্রশ্নাতীতভাবে সৎ, অভিজ্ঞ ও নিরপেক্ষ বিচারকদের নিয়োগ দেয়া।
২) ঘুণে ধরা বিচার ব্যবস্থা এবং বিচারের হৃদয়বিদারক দীর্ঘসূত্রতার কারণে একাধিক দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে স্বৈরাচার ও তার দোসরদের বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ ও দীর্ঘদিনের স্তূপীকৃত সকল মামলা যত শিগগির সম্ভব নিষ্পত্তি করা।
৩) দেশের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা ও বিদেশে পলাতক সকল চিহ্নিত অপরাধীকে ইন্টারপোলসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাহায্যে দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুততম সময়ে তাদের বিচারের বন্দোবস্ত করা।
৪) গ্রেপ্তারকৃত সকল অপরাধীর শাস্তি প্রদানের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সরকারি সংস্থা অথবা জনরোষের শিকার হতে নিরাপদ রাখার ব্যবস্থা করা।
৫) কেবলমাত্র কুখ্যাত রাজনীতিবিদ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য নয়, অবৈধ এবং ঘাতক হাসিনা সরকারের দস্যুবৃত্তিতে মদতদাতা সকল সংস্থা ও দপ্তরের সুবিধাভোগী ব্যক্তি এবং দুর্নীতির মাধ্যমে রাতারাতি সীমাহীন অর্থসম্পদের অধিকারী হয়ে যাওয়া লুটেরাদেরও বিচারের সম্মুখীন করে লুণ্ঠিত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার বন্দোবস্ত করা।
ন্যায়বিচার বিলম্বিত হওয়াই ন্যায়বিচার অস্বীকার করার শামিল। তবে জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে বিভাজন নয়, সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে সকল ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন উন্নতি নিশ্চিত করা আমাদের প্রত্যাশা। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি দেশে এবং সমগ্র বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. ইউনূস এবং তার নেতৃত্বাধীন অন্যান্য উপদেষ্টাগণের দেশপ্রেম, বিচক্ষণতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, দীর্ঘকাল যাবৎ শৃঙ্খলিত এবং পুনরায় মুক্তিপ্রাপ্ত জাতির সামনে তার আকাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক অধিকার এবং উন্নতির নয়া দিগন্ত উন্মোচন করবে। শত সহস্র প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা সমুন্নত রেখে বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে এক সম্মানজনক, আদর্শ ও অনুকরণীয় দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথিকৃত হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

তাকসিম চক্রের পেটে ৫০০০ কোটি টাকা দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা by মরিয়ম চম্পা

ঢাকা ওয়াসা ভবনে তাকে বলা হয় সম্রাট। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামকে বলা হতো তার পকেট মন্ত্রী। ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খানের ভয়ে তটস্থ থাকতেন মন্ত্রী থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। সম্রাট তাকসিমের বিদায় হলেও তার উজির নাজির পাইক পেয়াদা হিসেবে রয়েছেন র‌্যামস ও বাঁছুর গ্রুপ। তাদের দিয়েই গত ১৫ বছরে ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও রাজস্ব লোপাটের ঘটনা ঘটেছে। হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি দুর্নীতি। এদিকে পদত্যাগের পর তাকসিম এ খানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সোমবার সংস্থাটি থেকে এ সংক্রান্ত একটি চিঠি পুলিশের বিশেষ শাখায় পাঠানো হয়। দুদকের ঊর্ধ্বতন একটি সূত্র দৈনিক মানবজমিনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এক কর্মকর্তা বলেন, তাকসিম এ খানের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রকল্পে দুর্নীতিসহ বেশ কিছু অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে।

সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তার বিদেশযাত্রা নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ইমিগ্রেশনে চিঠি দেয়া হয়েছে। এর আগে গত বছর ২৩শে মে ওয়াসায় অবৈধ নিয়োগের অভিযোগ অনুসন্ধান শেষে মামলার অনুমোদনের জন্য সুপারিশ চেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন দুদকের উপ-পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম। এতে বলা হয়েছে, অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় পরিচালক (উন্নয়ন) ও পরিচালক (কারিগর) এই দুটি পদ ওয়াসার অর্গানোগ্রামে না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটির এমডি প্রভাব খাটিয়ে দুজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। আর চার বছরের বেশি সময় ধরে তাদের বেতন বাবদ ১ কোটি ৯৮ লাখ ৬৫ হাজার ৯৮০ টাকা দেয়া হয়েছে।

নিয়মবহির্ভূতভাবে নিয়োগ হওয়ায় এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। দুদক সূত্র মতে, ২০০৯ সালে ঢাকা ওয়াসার এমডি হিসেবে নিয়োগ পান প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। এরপর একাধিকবার সময় বাড়িয়ে ওই পদে আছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে বারবার নিয়োগবিধি অমান্য করার অভিযোগ উঠে। এ ছাড়া ওয়াসার এমডিসহ অন্যদের বিরুদ্ধে সংস্থাটির পদ্মা-জশলদিয়া প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা, গন্ধর্বপুর পানি শোধনাগার প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা, গুলশান-বারিধারা লেক দূষণ প্রকল্পে ৫০ কোটি টাকার অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে। দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম এই অনুসন্ধান করছেন।

এদিকে তাকসিমের বিদায় হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছে তার দুর্নীতির সিন্ডিকেট র‌্যামস ও বাছুর গ্রুপ। তারা ইতিমধ্যে তাকসিমের দুর্নীতি সংক্রান্ত ফাইল গায়েব করা, তাকসিমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি ওয়াসার এমডি’র পদ থেকে পদত্যাগ করার পর ঢাকা ওয়াসার সাধারণ শ্রমিক-কর্মচারীরা তাকসিমপন্থি কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষিপ্ত হন। তাদের মারধর ও হেনস্তা করতে গেলে বিএনপিপন্থি কর্মকর্তারা এসে তাদের বাঁচিয়ে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করার আগের দিন অর্থাৎ সর্বশেষ গত ৪ঠা আগস্ট পর্যন্ত অফিস করেন তাকসিম এ খান। এরপর থেকে তাকে আর অফিসে দেখা যায়নি। জনরোষে পড়ার ভয়ে নিজ বাসায় না থেকে এ সময় তিনি রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে ভিন্ন নামে রুম বুক করে ওয়াসার দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিটিং করতেন। বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিতেন। সেখান থেকে অনলাইনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশ দিচ্ছেন। পরবর্তীতে তিনি রাজধানীর বসুন্ধরার একটি ফ্ল্যাটে আত্মগোপনে চলে যান। সেখান থেকে তিনি তার অনুসারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ ফাইল গায়েব করান। কিছু ফাইল তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান। তাকসিমের ডান হাত হিসেবে পরিচিত ওয়াসায় কর্মরত বদরুল আলমই মূলত এসব ফাইল সরানোর কাজ করছেন।

এদিকে ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিলেন প্রতিষ্ঠানটিকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার আমলে প্রভাব খাটিয়ে তিনি সেখানে দুর্নীতির সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন। ওয়াসা সূত্র জানায়, তাকসিমের দুর্নীতিতে সক্রিয় ছিল তার স্টাফ অফিসার বদরুল আলম। তরুণ নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমানকে তিনি ৬ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্পের পিডি বানিয়েছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী জয়নাল আবেদিন গত ৬ বছরে ওয়াসার যত টেন্ডারবাজি ও লুটপাটসহ সকল প্রকার দুর্নীতি করেছেন। এই তিনজনই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছেন। এবং প্রত্যেকেই বড় বড় প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। ওয়াসাতে তাদেরকে বাঁছুর গ্রুপ নামে ডাকা হয়। তাদের আগে গত ৮ থেকে ৯ বছর যারা তাকসিমের দুর্নীতির নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদেরকে বলা হতো র‌্যামস গ্রুপ। এই গ্রুপের সদস্য রফিকুল ইসলাম পদ্মা প্রকল্পের ডিজি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে কয়েক শ’ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এই গ্রুপের আরেক সদস্য অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান। তিনি বর্তমানে অবসরে গেছেন। তিনিও একটি প্রকল্পের পিডি ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ রয়েছে। রফিক এবং আক্তারকে দুদকে ডাকা হলেও তাকসিন তার ক্ষমতার প্রভাব বিস্তার করে চাপা দিয়ে রেখেছেন। আরেকজন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মহসেন আলী মিয়া দাসেরকান্দি প্রকল্পের পিডি ছিলেন। তিনিও বর্তমানে অবসরে গেছেন। তার বিরুদ্ধে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান এসি তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুর সাত্তার সবুজ। তার বিরুদ্ধে টানা ৯ বছর সংগ্রহ বিভাগে (কেনাকাটায়) কয়েকশ’ কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়াসার সাবেক বোর্ড চেয়ারম্যান ড. গোলাম মোস্তফা মানবজমিনকে বলেন, ওয়াসা তো দুর্নীতির চারণভূমি। এটা সকলেই জানে। তাকসিমকে দুর্নীতির পুরো বিষয়টি নিয়ে আমি বিব্রত। এবং অনুতপ্ত। তাকে আমি নিজ দায়িত্বে চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেও পরবর্তীতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়তার সুযোগের অপব্যবহার করেন। এ বিষয়ে আমি তখন মন্ত্রণালয়কে তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেয়ার ৪ দিনের মাথায় আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
ঢাকা ওয়াসার বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌ. এ.কে.এম সহিদ উদ্দিন বলেন, ওয়াসার সাবেক এমডিসহ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে পাঁচ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এটার আমি প্রমাণ চাই। অনুমানভিত্তিক কথা বললে হবে না। যথাযথ প্রমাণ দিতে পারলে আমি দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবো। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আমরা দীর্ঘদিন গবেষণা করে এ বিষয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ তুলে ধরলে তৎকালীন সরকার এটার গুরুত্ব দেয়নি। তার ক্ষমতার বলয় এত বেশি উচ্চ পর্যায়ে ছিল যে, কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রেখে অবারিতভাবে দুর্নীতি করেছেন। দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা অবারিতভাবে করে গেছেন তিনি। এখন প্রথম কথা হচ্ছে সাবেক এমডি তাকসিম পদত্যাগ করলেই তো হবে না। তিনি পৃথিবীর যে প্রান্তে থাকুন না কেন আমাদের আইন এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী জবাবদিহিতার আওতায় আনা সম্ভব এবং অবশ্যই প্রয়োজনীয় বলে মনে করি। এর মাধ্যমে জনস্বার্থে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা দরকার। অনিয়ম-দুর্নীতি তিনি এককভাবে করেছেন এটার কোনো সুযোগ নেই। তার সঙ্গে একটি চক্র ছিল এই প্রতিষ্ঠানের। যারা বহাল তবিয়তে থাকলে নিজেদের এবং তাকসিমের দুর্নীতিকে সুরক্ষিত করার চেষ্টা করবে। এক্ষেত্রে বর্তমান চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এটা প্রতিরোধ করার সুযোগ আছে। এবং যারা এই দুর্নীতি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে তাদেরকেও চিহ্নিত করার মাধ্যমে বিচার সুনিশ্চিত ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। 

সেই তরুণের বেঁচে ফেরার গল্প by ফাহিমা আক্তার সুমি

হোটেলকর্মী আমির হোসেন। নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরে বিছানায় পড়ে আছেন। গত ১৯শে জুলাই তিনি জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরছিলেন। সেসময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে পড়ে যান তিনি। দৌড়ে রামপুরা এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবনের চারতলায় আশ্রয় নেন। রড ধরে ঝুলে থাকা অবস্থায় পুলিশ গুলি করে তাকে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় চারতলা থেকে লাফিয়ে তিনতলায় পড়ে যান। আমিরের দুই পায়ে ছয়টি গুলি করে পুলিশ। দীর্ঘ তিন ঘণ্টা ধরে সেখানে যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। এক শিক্ষার্থী আমিরের চিৎকার শুনে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যান।

পরে সেখান থেকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। তিন দিন চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফেরেন। আমির ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থানার দুলারামপুর গ্রামের বিল্লাল মিয়ার সন্তান। তার বাবা পেশায় অটোরিকশা চালক। চার ভাইবোনের মধ্যে আমির তৃতীয়। কিডনি জটিলতায় পাঁচ বছর আগে মা ইয়াসমিন মারা যান। মাকে হারিয়ে তিন ভাইবোন আসেন ঢাকায়। আমির রাজধানীর রামপুরা থানার মেরাদিয়া এলাকায় বড় ভাই নয়নের সঙ্গে বসবাস করেন।

আমির মানবজমিনকে বলেন, ১৯শে জুলাই জুমার নামাজের পর বাসায় ফেরার সময় মেরাদিয়া মেইন রাস্তায় মাত্র এসেছি। তখন দুই পাশ দিয়ে বিজিবি’র গাড়ি ও পুলিশ আসছিল। এসময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। আমি ভয়ে আশ্রয় নিতে দৌড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের চারতলার ছাদে উঠি। আমার পেছনে  পেছনে পুলিশও দৌড়ে আসে। পুলিশ আমাকে নিচে লাফ দেয়ার জন্য বারবার বলে। আমি লাফ না দিয়ে জানালার বাইরে রড ধরে ঝুলে ছিলাম। তখন তারা উপর থেকে আমার আশপাশে গুলি করে আবার লাফ দিতে বলে। বারবার গুলি করে আমাকে ভয় দেখায় আমি যেন নিচে ঝাঁপ দিয়ে পড়ি। সেসময় একটা গুলি না লাগলেও আরেকজন পুলিশ দৌড়ে তিনতলায় নেমে গুলি করলে তখন আমার পায়ে ছয়টা গুলি লাগে। এক একটা পায়ে তিনটা করে গুলি লাগে। কোমরের নিচ থেকে পা পর্যন্ত গুলির আঘাত রয়েছে। প্রতিটি গুলি এক পাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়।

তিনি বলেন, গুলি করার সময় আমার মাথা নিচু করে রাখি। গুলি করে পুলিশ চলে যাওয়ার পর আমি চারতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে তিনতলায় পড়ি। সেখানে পড়া অবস্থায় তিন ঘণ্টা যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম। গুলিবিদ্ধ জায়গা থেকে অনেক রক্তপাত হচ্ছিলো। আশপাশে তেমন কেউ ছিল না, তিন ঘণ্টা পরে আমার চিৎকার শুনে এক শিক্ষার্থী কয়েকজনকে ডেকে আনে। তারা আমাকে পাশে থাকা ফেমাস স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাত বারোটায় আমাকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠায়। সেখান থেকে তিন দিন পরে আমাকে ছেড়ে দেয়। বর্তমানে বাসায় আছি। ফরাজি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। এখন গুলিবিদ্ধ জায়গায় কিছুটা শুকালেও ডান পায়ে একদম শক্তি নেই। আমার ডান পা নড়ে না; অবশ হয়ে আছে। পুলিশ যে অ্যাকশনে দাঁড়িয়ে আমাকে গুলি করছিল তখন মনে হয়েছিল আমি আর বাঁচবো না। ওই ভবনের তিনতলায় ঝাঁপ দিয়ে যখন আমি ব্যথায় ছটফট করছিলাম তখনো মনে হয়েছিল আর মনে হয় দশ মিনিট বাঁচবো। ওই বিল্ডিংয়ের সঙ্গেই রামপুরা থানা। আমার এই অবস্থা যারা করেছে আমি তাদের বিচার চাই। আমি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই। আমার ছোট একটা বোন আছে। অনেক আগে মা মারা যায়। চিকিৎসক বলেছেন- তিন মাস বিশ্রামে থাকতে। পায়ে আগের মতো আর শক্তি ফিরে পাবো না। আমরা তিন ভাই ও এক বোন। সব ছোট ভাই আমি। এক ভাই গ্রামে থাকে আরেক ভাই ঢাকায় গার্মেন্টে চাকরি করেন। পাঁচ-ছয় বছর আগে মা মারা যান। বাবা আগে কৃষিকাজ করতেন সেখানে তাকে সাহায্য করতাম। অভাবের কারণে পড়াশোনা বেশিদূর করতে পারিনি।

তিনি বলেন, ঘুমের মধ্যে এখনো লাফিয়ে উঠি। গুলির শব্দ আমার কানে বাজে। হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার দুই-তিনদিন পর এক পরিচিত লোক আমাকে ভিডিওটি দেখায়। পুলিশ চাইছিল আমি যেন লাফ দিয়ে নিচে পড়ি। রোববার মেরাদিয়ার নয়াপাড়ায় আমিরের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, পাশে থাকা তার ফুফুর বাসার বিছানায় দুই পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে শুয়ে আছেন। চোখে-মুখে এখনো ভয়-আতঙ্ক ভর করছে তার। পাশে বসে সেবা করছেন ফুফু নাসিমা ও একমাত্র বোন হাসনা।

আমিরের ফুফু নাসিমা বেগম বলেন, একটি ভিডিওতে দেখেছি আমিরকে কি ভয়ানক ভাবে পুলিশ গুলি ছুড়েছে। খুবই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে ও বেঁচে ফিরেছে। সেদিন এই ঘটনা শুনে ফেমাস হাসপাতালে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি আমিরের পায়ে অনেক গুলির ক্ষত। ওর মা মারা যাবার পরে বাবা আরেকটি বিয়ে করে। পরে তিন ভাইবোন ঢাকা চলে আসে। দুই ভাই কাজ করে। মোটামুটি খেয়ে-পরে ভালোই চলতো। ওর এখন যে অবস্থা তাতে দ্রুত কোনো কাজ করতে পারবে না। ডান পায়ে কোনো শক্তি পাচ্ছে না। ভিডিওতে দেখা গেছে ওকে যেভাবে গুলি করেছে তাতে ওর ফিরে আসার কথা ছিল না, আল্লাহ ওকে বাঁচিয়ে রেখেছে। ঘটনার দিন মেরাদিয়ায় অনেক ভয়াবহ অবস্থা ছিল। অনেক মানুষ মারা গেছে। আমিরকে ঢাকা মেডিকেলে নেয়ার জন্য কোনো এম্বুলেন্স পাচ্ছিলাম না। পরে ফেমাস হাসপাতালের একটি এম্বুলেন্সে করে পাঠানো হয়।

অবৈধ অস্ত্র গেল কোথায়? by শরিফ রুবেল

৪ঠা আগস্ট রোববার। দুপুর ১টা ৩০ মিনিট। ফেনীর মহিপালে জনসমুদ্র। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে আসেন। মাত্র ৫ মিনিটে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক দখলে নেয় শিক্ষার্থীরা। অল্প সময়ে অবস্থা বেগতিক হয়ে যায়। অস্ত্রহাতে মাঠে নেমে পড়েন নিজাম হাজারী। সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগের শত নেতাকর্মী। সবাই সশস্ত্র। প্রত্যেকের হাতে দেশি-বিদেশি নানা ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র। প্রথমেই সশস্ত্র ছাত্রলীগ যুবলীগ নেতারা শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করেন। আগ্নেয়াস্ত্র থেকে গুলি ছোড়েন। গুলির শব্দে আশপাশ প্রকম্পিত হয়। গুলিতে শত শত আন্দোলনকারী মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘণ্টা ধরে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। ঘটনাস্থলেই ১০ জন নিহত হন। গুলিবিদ্ধ শত মানুষের সারি। এক নজিরবিহীন ঘটনার সাক্ষী হয় ফেনীবাসী। এমন দিন তারা আগে কখনো দেখেনি। সেদিনের ঘটনার বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ এসেছে মানবজমিনের হাতে। ভিডিওতে দেখা গেছে ১০০ থেকে ১৫০ জন ব্যক্তির সবার হাতে প্রাণঘাতী মারণাস্ত্র। এই অস্ত্র দিয়ে তারা দৌড়ে সামনে আগাচ্ছে আর ছাত্রদের উপর গুলি ছুড়ছে। এদের অনেকে মাথায় হেলমেট পরিহিত ছিল। তবে প্রকাশ্যে গুলি চালানো কয়েকজনকে চেনা গেছে। তারা হলেন ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি জিয়া উদ্দিন বাবলু, কাজীরবাগ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফ, জেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লুৎফর রহমান খোকন হাজারী। শুধু ফেনীতেই নয় ৪ঠা আগস্ট আওয়ামী লীগের ডাকা ‘এক দফা কবর দে’ কর্মসূচিতে দেশ জুড়ে অবৈধ অস্ত্রের পাহাড় দেখা গেছে। গত ১৬ই জুলাই থেকে ৫আ আগস্ট পর্যন্ত বিপুলসংখ্যক অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখেছে দেশের মানুষ। শহর, জেলা, উপজেলা, পাড়া, মহল্লায় আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের লাখ লাখ নেতাকর্মীকে পুলিশের সঙ্গে দেশি-বিদেশি মরণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মাঠে নামতে দেখা যায়। এই অস্ত্র দিয়েই তারা ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে শত মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ৫ই আগস্ট দুপুরে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। তখন থেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। পালিয়ে বেড়াচ্ছেন অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও। তবে ৩৬ দিন ধরে ছাত্র-জনতার ওপর তাদের ব্যবহার করা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো হদিস মিলছে না। কোথায় গেল এসব অবৈধ অস্ত্র এ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। এদিকে বিপুলসংখ্যক এই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা না গেলে জনজীবন ঝুঁকিতে পড়ার সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ।

প্রকাশ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেন যারা:
গত ১৯শে জুলাই চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষে অস্ত্রধারী মহানগর যুবলীগ নেতা ‘ডাকাত ফিরোজ’ ছাত্র-জনতার ওপর বারবার গুলি ছোড়েন। এতে বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হোন। অস্ত্রহাতে আরও শতাধিক নেতাকর্মীকে মাঠে দেখা যায়। এ ছাড়া গত ৪ঠা আগস্ট সাভার বাসস্ট্যান্ড ও রেডিও কলোনি এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর মেশিনগান দিয়ে কয়েক রাউন্ড গুলি ছোড়েন সাভার উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক। একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, আতিক তার হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের ট্রিগার টানছেন আর সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। ১৯শে জুলাই সাভার থানা স্ট্যান্ডে সংঘর্ষেও তার হাতে পিস্তল দেখা যায়। সেদিনও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালান এই আতিক। ৪ঠা আগস্টের আরেকটি ভিডিওতে সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য রাজু আহমেদকে বিদেশি অস্ত্র দিয়ে গুলি চালাতে দেখা যায়। এদিন ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মেহেদি হাসান তুষার, সাইদুর রহমান সুজন, দেওয়ান মাসুম, সাভার উপজেলা চেয়ারম্যানের শ্যালক মাজহারুল ইসলাম রুবেল। এ ছাড়া ১৯শে জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি গেট এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়েন নারায়ণগঞ্জ সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও তার ছেলে আয়ান ওসমান। এমন একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায় প্রায় ঘণ্টা ধরে তারা ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালাতে থাকেন। এ সময় তাদের সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২ জন সশস্ত্র যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন। প্রত্যেকের হাতে দেশি-বিদেশি প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। গত ৪ঠা আগস্ট মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়েন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাঈনুল হোসেন খান নিখিল ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি। ওই সময়
ঢাকা উত্তরের প্রায় দেড় শতাধিক নেতাকর্মীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। তারা বার বার ছাত্রদের ধাওয়া করে গুলি ছোড়েন। এতে শত শত শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। এদিন মিরপুর ১০ নম্বরে গুলিতে ৫ শিক্ষার্থী মারা যান। ৪ঠা আগস্ট ঢাকার মোহম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার কালভার্ট ফুট ওভারব্রিজের নিচে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সংঘর্ষ হয়। শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়। মোহাম্মপুর ৩৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ, সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজিব ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস মাসুদুর রহমান বিপ্লবের হাতে শটগান, একে-৪৭ ও চাইনিজ রাইফেল দেখা যায়। সেদিন তাদের সঙ্গে থাকা শতাধিক নেতাকর্মীর সবার হাতেই বিভিন্ন প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। ৪ ঘণ্টা ধরে চলা সংঘর্ষে গুলিতে এক শিশুসহ ৩ জন নিহত হয়। গুলিবিদ্ধ হয় অন্তত ১৪৭ জন। তাদের সিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। ৪ঠা আগস্ট বিকালে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালান ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগের সভাপতি রাজিবুল ইসলাম বাপ্পি। তখন তার সঙ্গে আরও ১০ থেকে ১২ জনকে ছাত্রদের ধাওয়া করে গুলি চালাতে দেখা গেছে। ২রা আগস্ট উত্তরা ১১নং সেক্টরে শিক্ষার্থীদের মিছিলে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় শটগান হাতে গুলি ছুড়তে দেখা যায় তুরাগ থানা যুবলীগ নেতা নাজমুল হাসানকে। ওই সময় যুবলীগ নেতাদের প্রত্যেকের হাতেই আগ্নেয়াস্ত্র দেখা গেছে। সেদিন গুলিতে ৬ শিক্ষার্থী আহত হয়। ৪ঠা আগস্ট মানিকগঞ্জ সদরের খালপাড়ে ছাত্রদের ওপর গুলিবর্ষণ করেন জেলা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় এসএমজি হাতে কার্লেস শুভ, শটগান হাতে সানি আহমেদ, পিস্তল হাতে যুবলীগ নেতা বাশারকে দেখা যায়। এ ছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র হাতে আরও ছিলেন অভিজিৎ সরকার, রুবেল হোসেন ও রেয়াদ খান। তারা দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করে গুলি চালান। গুলিতে ১ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। গুলিবিদ্ধ হয় আরও শতাধিক। ৪ঠা আগস্ট আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা শত শত আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মাঠে নামে। এদিন স্থানীয় এমপি সাইফুল ইসলামকে নিজের ব্যবহৃত অস্ত্র দিয়ে ছাত্রদের ওপর গুলি চালাতে দেখা গেছে। এ ছাড়া ইয়ারপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুমন ভূঁইয়া দুই হাতে দু’টি পিস্তল নিয়ে দফায় দফায় শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ করেন। সেদিন অবৈধ অস্ত্র দিয়ে গুলি চালান যুবলীগ নেতা রুবেল আহমেদ, ছাত্রলীগ নেতা নাদিম হোসেন, জুয়েল ও আরও অনেকে। গত ৩রা আগস্ট কুমিল্লা সদরের কান্দিরপাড়, টমছম ব্রিজে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে ভিক্টোরিয়া কলেজ শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ হয়। এ সময় টমছম ব্রিজ এলাকায় জেলা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক আব্দুল আজিজ সিহানুক শটগান হাতে গুলি ছুড়তে ছুড়তে ছাত্রদের ধাওয়া করেন। ওই ৬০ জনের বেশি নেতাকর্মীর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। তারা শিক্ষার্থীদের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়েন। এতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশ লাইন মোড় ও আলেখাচর এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছাত্রদের ওপর গুলি চালাতে দেখা গেছে মহানগর যুবলীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ সহিদ, আমিনুল ইসলাম টুটুল, জহিরুল ইসলাম রিন্টু, আহমেদ নেওয়াজ পাভেল, হাবিব আল আমিন সাদি, সরকার মাহমুদ জাবেদ। এরা সবাই স্থানীয় এমপি বাহাউদ্দিন বাহারের অনুসারী।

জানতে চাওয়া হলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ মানবজমিনকে বলেন, সারা দেশে অবৈধ অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে এটা উদ্বেগজনক। পুলিশের প্রথমেই এই অস্ত্র হেফাজতে নিতে হবে। না হলে বড় বিপদ হতে পারে। এসব অস্ত্র বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসীদের কাছে চলে গেলে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। অস্ত্র উদ্ধারে জোরদার অভিযান চালানো উচিত। বর্তমানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার চেয়ে অস্ত্র অস্ত্র খেলার চর্চা বেশি হয়। সারা দেশে হাজার হাজার মানুষের হাতে অস্ত্র দেখা গেছে। এসব অস্ত্র কোথা থেকে এলো। রাজনীতির কারণে জনগণের ওপর অস্ত্র ব্যবহার করা সমীচীন নয়।

যশোরে মুসলিম পরিচয়ে বিয়ে, ধর্ষণ অর্থ আত্মসাৎ, ক্লিনিক মালিক গ্রেপ্তার

সনাতন ধর্মাবলম্বী উজ্জ্বল কুমার বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তি নিজেকে মুসলিম পরিচয় দিয়ে জোসনা খাতুন নামের এক মুসলিম নারীকে বিয়ে করে। ঘটনাটি ফাঁস হয়ে পড়ায় প্রতারণা, ধর্ষণ এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে উজ্জ্বলকে গ্রেপ্তার করেছে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। তিনি মেডিল্যাব নামক একটি ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কোতোয়ালি থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক।

জানা গেছে, যশোর শহরের পুরাতন কসবা কাজীপাড়া এলাকার আজিজ সিটি সংলগ্ন শওকত ওসমানের বাসায় ভাড়া থাকেন জোসনা খাতুন (৩৪)। তিনি যশোর সদর উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের মো. নুর আলীর কন্যা। তিনি শহরের ঘোপ সেন্ট্রাল রোডের মেডিল্যাব নামে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে প্রশাসনিক বিভাগে চাকরি শুরু করেন। ওই ক্লিনিকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন বেজপাড়ার উজ্জ্বল কুমার বিশ্বাস (৪৭) নামের সনাতন ধর্মের এক ব্যক্তি।
সূত্র বলছে, উজ্জ্বল নানা রকম লোভ লালসার ফাঁদে ফেলে জোসনার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। একপর্যায়ে জোসনা বিয়ের জন্য চাপ দিলে উজ্জ্বল নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তাকে বিয়ে করবে বলে জোসনাকে শান্ত করেন। জোসনা ও উজ্জ্বল কুমারের মধ্যে চলতে থাকে খোলামেলা শারিরিক সম্পর্ক। এই সম্পর্কের জেরে ও জোসনার চাপাচাপিতে ২০২১ সালের ২০শে জুন ভুয়া এফিডেভিটের মাধ্যমে হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করে উজ্জ্বল।

এরপর দেড় লাখ টাকা দেনমোহরে উজ্জ্বল ও জোসনার ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিবাহ হয়। বিয়ের পর তাদের একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। কন্যা রুহি খাতুনের বর্তমান বয়স ৮ মাস। বিয়ের সময় উজ্জ্বল তার পূর্বের স্ত্রী এবং দুটি পুত্র সন্তান আছে সে তথ্য সম্পূর্ণ গোপন করেছিল। এরই মধ্যে ব্যবসার কথা বলে জোসনার কাছ থেকে নানা ছলে কৌশলে ১১ লাখ টাকা নেয় উজ্জ্বল।
গত ৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে উজ্জ্বল কুমার বিশ্বাস জোসনার সঙ্গে সব রকম যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন পর জোসনার ঠিকানায় ডাকযোগে তালাকনামা পাঠায়। এ ঘটনার পর জোসনা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন যে, উজ্জ্বল কুমার বিবাহিত এবং তার পূর্বের স্ত্রী এবং দু’টি সন্তান নিয়ে বেজপাড়ায় সংসার করছে। একপর্যায়ে জোসনা বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করলে এবং আদালতে মামলা করার হুমকি দিলে উজ্জ্বল কুমার জোসনার কাছে ফিরে আসে এবং তার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী রূপে সংসার করতে থাকে। কিন্তু মাঝে মধ্যে উজ্জ্বল ৪-৫ দিনের জন্য হাওয়া হয়ে যেতেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে জোসনা নিয়মিত সংসার করার দাবি করলে উজ্জ্বল অস্বীকৃতি জানায় এবং তাকে ও তার সন্তানের ভোরণপোষণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। উজ্জ্বল জোসনাকে জানায় সে একজন হিন্দু ধর্মের লোক। তার পক্ষে একজন মুসলিম নারীর সঙ্গে আর সংসার করা সম্ভব নয়। সে হিন্দু হয়ে পূর্বের স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গেই সংসার করছে বলে পরিষ্কার ভাষায় জোসনাকে জানিয়ে দেয়।
এ ঘটনায় জোসনা গত সপ্তাহে বাদী হয়ে যশোর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন। আদালত বাদীর অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য যশোর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জকে নির্দেশ দেন। ওই নির্দেশ মোতাবেক যশোর কোতোয়ালি থানা পুলিশ জোসনার আবেদনটি নিয়মিত মামলা হিসেবে রেকর্ড করে এবং কোতোয়ালি পুলিশ উজ্জ্বল কুমারকে রোববার দিনগত রাতে গ্রেপ্তার করে।

‘বন্ধুরা যখন ক্লাসে, তখন শরীরে বুলেট নিয়ে কাতরাচ্ছি’ by নাজমুল হক শামীম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ফেনীতে আওয়ামী লীগ কর্মীদের চালানো গুলিতে চোখ হারিয়েছেন ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. নাহিদুর রহমান (২০)। গুলিবিদ্ধ হয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন ফেনী সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. রিদোয়ান হোসেন (১৭)।

চোখ হারানো নাহিদের বাবা মো. বাহার মিয়া বলেন, ৪ঠা আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এ সময় নাহিদ ফেনীর মহিপালে সার্কিট হাউজ রোডে ৪ জনকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। নাহিদ সেসময় আহত অসংখ্য ছাত্রকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরদিন দুপুরে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে গেছে শুনে বিজয় মিছিল নিয়ে শহরের দিকে যায় নাহিদ। এখানে সবার আগেই গুলিবিদ্ধ হন নাহিদ।

আহত নাহিদ বলেন, আমি মিছিলের সামনে ছিলাম। আমার হাতে একটি পতাকা ছিল। হঠাৎ করে হেলমেট পরা ৩০-৩৫ জন সন্ত্রাসী গুলি চালানো শুরু করে। প্রথম গুলিটা আমার চোখে লাগে। আমি কিছু দেখছিলাম না। আমি চোখে হাত দিয়ে বসে পড়ি। তখন তারা আমার সারা গায়ে গুলি করে। আমরা আন্দোলন শুরু করেছি। আমরা এই বাংলাদেশে বৈষম্য চাই না। এই স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। আমার অন্তরে সুখ আছে। কিন্তু আমার চোখ দিয়ে আমি আমার সুন্দর দেশটাকে দেখতে পাচ্ছি না। আমার ভেতরের অনেক কষ্ট থেকে বলছি যে, ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। যেদিন আমি সুখ করবো, আনন্দ করবো ওইদিন আমাকে এম্বুলেন্স নিয়ে দৌঁড়াতে হয়েছে চট্টগ্রামে।

নাহিদ বলেন, আমি পরিবারের বড় ছেলে। আমার ওপর অনেক দায়িত্ব। আমার স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকরি করবো। কিন্তু আমি এক চোখ দিয়ে কিছু করতে পারবো কিনা জানি না। এমন স্বৈরাচার সরকার আর কখনো চাই না। বেসরকারি চাকরিজীবী বাবা ছেলের চিকিৎসার ব্যায় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ অবস্থায় চরমভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন নাহিদের বাবা মো. বাহার মিয়া। যেকোনো মূল্যে নাহিদ তার চোখ ফিরে পাবে এটাই পরিবারের চাওয়া।
এদিকে আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিতে আহত হয়ে কাতরাচ্ছে একাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. রিদোয়ান হোসেন। সে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের হাসান হুজুর বাড়ির দিনমজুর মো. ইব্রাহিমের ছেলে। ইব্রাহিম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য গত ৪ঠা আগস্ট বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল এলাকায় অবস্থান নেয় রিদোয়ান। মহিপাল সিক্সলেন ফ্লাইওভারের পশ্চিম অংশে হীরা কনফেকশনারির সামনে সকাল থেকে অবস্থান নিয়ে দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে জোহরের নামাজ পড়ে। নামাজ পড়া শেষ হতে না হতেই গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। পরে সহপাঠীরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসি।

তিনি বলেন, আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে আজ রিদোয়ান বিছানায় কষ্টে দিন পার করছে। আমার একমাত্র ছেলেকে যারা গুলি করেছে সরকারের কাছে তাদের বিচার দাবি করছি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ফেনীর সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম জানান, গত ৪ঠা আগস্ট ছাত্র-জনতার অবস্থান কর্মসূচিতে ফেনীতে আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালালে ঘটনাস্থলে ৮ জন ও চিকিৎসাধীন অবস্থয় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত শতাধিক ছাত্র-জনতা ও সাংবাদিক। পরদিন ৫ই আগস্ট বিকালে বিজয় মিছিলে ফের গুলি চালালে সেখানেও বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা গুলিবিদ্ধ হয়। ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ দীন মোহাম্মদ বলেন, ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিতে হত্যার ঘটনায় রোববার পর্যন্ত থানায় ৫টি মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় ৭শ’ এজাহার নামীয় আসামিসহ ১ হাজার ৬২৩ জন আসামি হয়েছে। এদের মধ্যে সংসদ সদস্যের পিএস পরিচয় দেয়া মানিক নামে একজন গ্রেপ্তার হয়েছে।

রেমিট্যান্সে সুবাতাস

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে বৈধপথে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ হু হু করে বেড়ে গেছে। গত ৫ই আগস্টের আগে রেমিট্যান্স আসা থমকে গেলেও পরে তা বেড়েছে বহুগুণ। কারণ নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আস্থা বাড়ছে প্রবাসীদের। নতুন সরকারকে শক্তিশালী করতে তারা আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, চলতি মাসের প্রথম ১৭ দিনে দেশে বৈধপথে ১১৪ কোটি ৪২ লাখ ২০ হাজার ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ১৩ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকার বেশি। এরমধ্যে আগস্টের প্রথম ৩ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৯ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। এ ছাড়া শুধু ৪ থেকে ১০ই আগস্ট পর্যন্ত এসেছে ৩৮ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার ডলার। আর ১১ থেকে ১৭ই আগস্ট পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৫ কোটি ১৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের অর্থনীতি যখন সংকটে, তখন রেমিট্যান্স বেশি পরিমাণে আসার সংবাদ নিঃসন্দেহে নতুন করে আশা জাগাচ্ছে। সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে প্রবাসীরা চাঙা করতে চান দেশের অর্থনীতি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে ও একদিন পর পর্যন্ত (১-৬ই আগস্টের মধ্যে) দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল মাত্র ৯ কোটি ৫৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার। আর পতনের পর ৭-১০ই আগস্ট ৩ দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৮ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১২ কোটি ডলারের বেশি। এদিকে আগস্টের প্রথম ১০ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৪৮ কোটি ২৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার। প্রতিদিন গড়ে রেমিট্যান্স এসেছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৭০ হাজার ডলার। সেখানে শেষ সাতদিনে প্রবাসী আয় প্রতিদিন গড়ে এসেছে ৯ কোটি ৩০ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
তারা আরও বলেন, জুলাই মাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন, ইন্টারনেট ও সংঘাতের কারণে প্রবাসীরা রেমিট্যান্স শাটডাউন ঘোষণা দেন। এর প্রভাবে ওই মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে। যার ধারাবাহিকতা ছিল চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেও। সরকার পতনের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে।

জানা গেছে, ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনের চেষ্টা করায় শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করে বৈধ্যপথে না পাঠিয়ে হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রবাসীরা। এতে হঠাৎ করে দেশে রেমিট্যান্স আসার প্রবাহ নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ফলে টানা ৩ মাস রেমিট্যান্স দুই বিলিয়নের বেশি এলেও জুলাই মাসে হঠাৎ দুই বিলিয়ন ডলারের নিচে চলে আসে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে আস্থা বাড়ছে প্রবাসীদের। নতুন সরকারকে শক্তিশালী করতে তারা আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। গত ৪ঠা আগস্টের পর থেকে ১৭ই আগস্ট পর্যন্ত ১৩ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১০৩ কোটি ৮৫ লাখ ৭০ হাজার ডলার। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮ কোটি ডলার। আগে যেটা গড়ে ছিল প্রায় ৫/৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ বৈধপথে রেমিট্যান্স আসার পরিমাণও বাড়ছে।

সৌদি আরবে অবস্থানরত জসিম বলেন, পরিবারের স্বাচ্ছন্দে জীবনযাপন করতে সবাইকে ছেড়ে প্রবাসে অবস্থান করছি। কিন্তু গত জুলাই মাসে দেশে ইন্টারনেট বন্ধসহ অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতে পারিনি। কারণ টাকা পাঠানোর সব মাধ্যমই বন্ধ ছিল। এমনকি পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি নাই। তখন অনেকেই বিকল্প উপায়ে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠিয়েছেন। এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ায় আমাদের প্রবাসীদের আস্থা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফলে আমরা চেষ্টা করবো আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে। প্রবাসীদের সবার মধ্যেই এমন মনোভাব তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্কের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, এটি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এজন্য আরও কিছুটা সময় দেখতে হবে। কারণ প্রবাসীরা যদি বৈধপথে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান, তাহলে আমাদের রিজার্ভ বাড়বে, সেইসঙ্গে আমাদের অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।

বিভিন্ন দেশের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোতে প্রবাসীদের ভিড়
রেমিট্যান্স পাঠাতে মালয়েশিয়া, কুয়েত ও ইতালিসহ বিভিন্ন দেশের এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোতে বেড়েছে বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভিড়। কিছুদিন আগে বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর হার কমে গিয়েছিল। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ইতালি থেকে বেড়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। গেল বছর সর্বোচ্চ ১ হাজার ১৬৬ মিলিয়ন ইউরো পাঠালেও এবার সেই রেকর্ড ভাঙতে চলেছে। ইতালিতে গেল সপ্তাহের তুলনায় চলতি সপ্তাহে রেমিট্যান্স পাঠানোর হার দ্বিগুণেরও বেশি। মানি এক্সচেঞ্জগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি সপ্তাহে আগের সপ্তাহের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছে ইতালির প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

দখলমুক্ত হয়নি আনন্দমোহন বসু’র বাড়ি

ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা উপমহাদেশের প্রথম ‘র‌্যাংলার’ আনন্দমোহন বসুর জন্মভিটার এখন বেহালদশা। বাঙালি রেনেসাঁর অন্যতম স্থপতি বিখ্যাত এই সমাজ সংস্কারকের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি বেদখল হয়ে আছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পৃষ্ঠপোষকতা আর ভূমি বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় লিজের নামে বাড়িটি দখলে রেখেছেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তির পরিবার। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি গ্রামে আনন্দমোহন বসুর এই জন্মভিটাটি সংরক্ষণের জন্য এলাকাবাসী ও সুধীজনদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় এটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২রা জানুয়ারি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। পরদিন ৩রা জানুয়ারি মন্ত্রণালয় থেকে কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসককে আনন্দমোহন বসুর বাড়ি থেকে অবৈধ দখলকারীদের উচ্ছেদের বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়। এরপর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে গত ৬ই ফেব্রুয়ারি ইটনা উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা ও সরজমিন তদন্ত করে উচ্ছেদের বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন প্রেরণের কথা বলা হয়। কিন্তু অদ্যাবধি বাড়িটি অবৈধ দখলমুক্ত হয়নি।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতার নির্দেশে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল সোমবার দুপুরে বাড়িটিতে গিয়ে সেখানে সংরক্ষিত প্রত্নসম্পদের সাইনবোর্ড ও নোটিশ ঝুলিয়েছেন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী কাস্টোডিয়ান সাইফুল ইসলাম এ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। এসময় স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার রায় এবং স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

সরজমিন দেখা গেছে, আনন্দমোহন বসুর অরক্ষিত জন্মভিটায় অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে বসতবাড়িটি। ৩.১১ একর আয়তনের বাড়িটিতে রয়েছে কয়েকটি বিশাল ভবন, খোলা মাঠ ও একাধিক পুকুর। বিশাল বসতবাড়িটি পরিণত হয়েছে পরগাছা উদ্ভিদের বাসস্থানে। চারদিকে নির্মিত প্রতিরক্ষা দেয়ালের অনেক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। দেয়ালের অনেক জায়গার ইট-পাথর দুর্বৃত্তরা লুট করে নিয়ে গেছে। আনন্দমোহন বসুর আতুড়ঘরটিকে বানানো হয়েছে গোবরের গর্ত। এ অবস্থায় ঐতিহ্যের নিদর্শন এসব স্থাপনা বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও উপমহাদেশে ছাত্ররাজনীতির গোড়াপত্তনকারী আনন্দমোহন বসুর জন্মস্থান ও বসতবাড়ি দেখার জন্য দেশের নানা প্রান্ত থেকে প্রায়ই দর্শণার্থীরা আসেন। কিন্তু বসতবাড়িটি বেদখল হয়ে থাকায় বাড়িটিতে দর্শনার্থীদের প্রবেশাধিকারও সংরক্ষিত পর্যায়ে চলে গেছে। অথচ সপ্তদশ শতাব্দীর স্থাপত্যশৈলীর অনুপম নিদর্শন এ বাড়িটি। বলাকুট নদীর তীরে অবস্থিত বাড়িটির ভবনগুলো আয়তাকার ভূমি নকশায় নির্মিত, যাতে ইটের গাঁথুনিতে চুন-সুরকির ব্যবহার করা হয়েছে। মূল ভবনটি ইংরেজি বর্ণ ‘ইউ’ আকৃতির একতলা বিশিষ্ট স্থাপনা। কক্ষগুলোর সম্মুখ বারান্দার ছাদ হিসেবে ঢেউটিন ব্যবহার করা হয়েছে। প্রত্যেকটি বারান্দার সামনে একটি করে সিঁড়ি রয়েছে। উত্তর পাশের সিঁড়িতে হাতির মাথা সদৃশ নকশা করা। তিনটি কক্ষের প্রবেশ দরজায় ফুল, লতাপাতা, প্রাণি ও জ্যামিতিক নকশা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি কক্ষে ভোল্টেড ছাদ এবং ফুল ও লতাপাতার নকশা এবং একটি কক্ষের ছাদে লোহার ভিম ও কাঠের কড়িবর্গা রয়েছে। এ বাড়িতেই ১৮৬৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন ভারতীয় উপমহাদেশে অটোক্রোম লুমিয়ের স্লাইড ব্যবহার করে রঙিন ছবির পথিকৃৎ আলোকচিত্রী হেমেন্দ্রমোহন বসু। দীর্ঘ ৫৩ বছর ধরে বাড়িটি বন্দোবস্ত মোকদ্দমামূলে স্থানীয় প্রভাবশালী হাজী আমির উদ্দিনের পরিবারের দখলে রয়েছে। বাড়িটি দখল করার সময় বাড়িটির বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জিনিসপত্র তখন তারা নিজেদের অধিকারে নিয়ে যান। বর্তমানে তার ছেলে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. আবদুল হাই বাড়িটি দখলে রেখেছেন।

কর্নাটকের গভর্নরকে শেখ হাসিনার মতো পরিণতির হুঁশিয়ারি কংগ্রেস নেতার

ভারতে অনিয়ম, দুর্নীতির পরিণতি হিসেবে এখন বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদাহরণ টানা হচ্ছে। শেখ হাসিনা ৫ই আগস্ট পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে অজ্ঞাত স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশে বিক্ষিপ্তভাবে সহিংসতা ও আগুন দেয়ার ঘটনায় ভারতীয় মিডিয়ায় নানা অপপ্রচার চলছে। অতি ডানপন্থিরা, বিশেষত ভারতের মিডিয়াগুলো প্রচারণা চালাচ্ছে যে, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব রিপোর্ট যে মিথ্যা তা বিবিসি এরই মধ্যে প্রামাণ্য হিসেবে উপস্থাপন করেছে। ঘটনা যখন এমন তখন ভারতের রাজনীতিকদের মুখেই শেখ হাসিনার অনিয়মের কথা শোনা যাচ্ছে। তারা নিজেদের দেশে অনিয়ম, দুর্নীতির কথা বলতে গিয়ে অকপটে শেখ হাসিনার উদাহরণ টানছেন। কর্নাটকের কংগ্রেস নেতা ইভান ডি’সুজা এমন উদাহরণ টেনেছেন। কারণ, মহিসুর আরবান ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (এমইউডিএ) দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে গভর্নর থাওয়ার চাদ গেহলটকে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়ার স্ত্রীকে অনিয়ম করে জমি দেয়া হয়েছে।

অনলাইন এনডিটিভি বলছে, এ নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছেন গভর্নর। এজন্য তাকে কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাহার করে না নিলে তার পরিণতি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো হবে বলে সতর্ক করেছেন ডি’সুজা। ইভান ডি’সুজা ম্যাঙ্গালোরে এক বিবৃতিতে বলেছেন, যদি এমইউডিএ যদি গভর্নরকে কেন্দ্রীয় সরকার প্রত্যাহার করে না নেয়, তাহলে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) মতো একই পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে তাকেও। গভর্নরকে পালিয়ে যেতে হতে পারে। উল্লেখ্য, কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়ার বিরুদ্ধে বিচার অনুমোদন করেছেন গভর্নর থাওয়ার চাঁদ গেহলট। এর প্রেক্ষিতে তাকে করুণ পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কংগ্রেসের এই নেতা। তাতে তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিণতির সঙ্গে গভর্নরের পরিণতিকে এক সমান্তরালে নিয়ে এসেছেন। গভর্নরের এই উদ্যোগকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে আপিল করেছেন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া। তিনি একে বেআইনি এবং কর্তৃত্বের বাইরে বলে দাবি করেছেন। সিদ্ধারামাইয়া আরও দাবি করেছেন এই বিচার এই মুহূর্তে তার সুনামের অপূরণীয় ক্ষতি করবে। উপরন্তু তাতে সরকারে বিঘ্ন ঘটবে। রাজনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। আদালত তাকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। আগামী ২৯শে আগস্ট তার বিরুদ্ধে শুনানির আগে কোনো ব্যবস্থা না নিতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

অভিযোগে বলা হয়েছে এমইউডিএ জমি বরাদ্দ দিতে গিয়ে অনিয়ম করেছে। তাতে আরও বলা হয়েছে, ক্ষতিপূরণ হিসেবে সিদ্ধারামাইয়ার স্ত্রী বিএম পার্বতীকে জমি দেয়া হয়েছে। এটা ঘটেছে সিদ্ধারামাইয়া যখন এর আগের মেয়াদে মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। অধিকারকর্মীরা বলছেন, মহিসুরের ১৪টি প্রিমিয়াম সাইটের জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সিদ্ধারামাইয়ার স্ত্রীকে। এটা বেআইনি। এতে রাজ্যের ৪৫ কোটি রুপি ক্ষতি হয়েছে।

ডেমোক্রেট কনভেনশনকে ঘিরে শিকাগো সরগরম

ডেমোক্রেট ন্যাশনাল কনভেনশনকে ঘিরে শিকাগোর ইউনাইটেড সেন্টার অ্যারিনা সরগরম। গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে এই কনভেনশন। চলবে ২২শে আগস্ট বৃহস্পতিবার পর্যন্ত।  প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর মাত্র আড়াই মাসের মতো বাকি। এ সময়ে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন দেয়ার জন্য এই সম্মেলন। ১৮৩০-এর দশক থেকে শুরু হয়েছে এই ধারা। ওই সময়ে প্রেসিডেন্ট অ্যানড্রু জ্যাকসনকে ডেমোক্রেট দলের একদল ডেলিগেট বাল্টিমোরে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচনে মনোনয়ন দিতে সমবেত হয়েছিলেন। সেই থেকে এই ধারা প্রচলিত। তবে এ বছর ডেমোক্রেটদের জন্য এই সম্মেলন কিছুটা ভিন্ন। কার্যত ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস দলের মনোনয়ন পেয়ে গেছেন।

কারণ, মনোনীত হতে তার যতগুলো ডেলিগেট প্রয়োজন, তা তিনি আগেই পেয়ে গেছেন। ফলে ডেমোক্রেটদের এই সম্মেলনকে বিবিসি শুধু রোল কল হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তবু কিছুটা বাকি থেকে যায়। এতে উপস্থিত হওয়ার কথা সেলিব্রেটিদের। দলীয় নেতারা গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন। তা তাদেরকে চলার পথে শক্তি যোগাবে। অনলাইন বিবিসি বলছে, প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী কমালা হ্যারিস তার রানিংমেট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে টম ওয়ালজকে বেছে নিয়েছেন। তারা দু’জনেই মনোনীত হয়েছেন এরই মধ্যে। ফলে এ বছরের সম্মেলনে  ডেমোক্রেট প্রথম সারির নেতাদের মুখে বাণীর দিকে দৃষ্টি থাকবে সবার। তারা দলীয় এই প্ল্যাটফরমকে ব্যবহার করে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কী বার্তা দেন সেদিকে তাকিয়ে আছেন সবাই।  সেখানে কি কি বলা হবে তার একটি খসড়া আগেই প্রকাশ করা হয়েছে। এতে আছে বিভিন্ন ইস্যু।

এর মধ্যে আছে মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনা, জলবায়ু পরিবর্তনকে নিয়ন্ত্রণ করা, অস্ত্র দিয়ে সহিংসতা মোকাবিলা ইত্যাদি। শিকাগোর এই মঞ্চে উঠার কথা রয়েছে ডেমোক্রেট দলের কয়েক ডজন প্রথম সারির নেতা ও সেলিব্রেটিদের।  সোমবার রাতে এতে বক্তব্য রাখার কথা প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের। তিনি এবারের নির্বাচন থেকে এক মাস আগে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে কমালা হ্যারিসকে সমর্থন দেন। তার সঙ্গে উপস্থিত থাকবেন ফার্স্টলেডি জিল বাইডেন। তার বক্তব্য শোনার জন্য উদগ্রীব হয়ে ছিলেন উপস্থিতরা। এ ছাড়া এ রাতে বক্তব্য রাখার কথা শিকাগোর মেয়র ব্রান্ডন জনসন এবং ডেমোক্রেট অন্য নেতাদের। মঙ্গলবার বক্তব্য রাখবেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। একই দিন বক্তব্য রাখবেন ইলিনয়ের গভর্নর জেবি প্রিটজকার, কমালা হ্যারিসের স্বামী ডগ এমহোফ। বুধবার বক্তব্য রাখার কথা সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, প্রতিনিধি পরিষদের সাবেক স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ও অন্যদের। মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর বুধবার রাতে মূল বক্তব্য রাখবেন কমালা হ্যারিসের রানিংমেট মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজ। এই সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাত হলো বৃহস্পতিবার রাত। এদিন মঞ্চে উঠবেন কমালা হ্যারিস। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন গ্রহণ করবেন এবং ‘ফর দ্য ফিউচার’ থিমকে সামনে রেখে এ রাতে চূড়ান্ত বক্তব্য রাখবেন। সম্মেলন চলাকালে যেকোনো সময় মঞ্চে উঠতে পারেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ফার্স্টলেডি হিলারি ক্লিনটন, সাবেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামা, সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমার, প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিস। এ বছরের সম্মেলনে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সমাবেশ ঘটবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যে আছেন ডেমোক্রেট দলের হাজার হাজার ডেলিগেট, সুপারি ডেলিগেট, নির্বাচিত সদস্য, ডেমোক্রেট দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা, ডেমোক্রেট ন্যাশনাল কমিটির সদস্যরা। এর পাশাপাশি উপস্থিত থাকবেন মিডিয়ার হাজারো সদস্য। এবারের সম্মেলন বেশ কিছু তারকার উপস্থিতিতে আলোকিত হবে। এর মধ্যে থাকতে পারেন মেগা তারকা বেয়ন্সে, টেইলর সুইফট প্রমুখ।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণজাগরণ থেকে শিক্ষা! -ব্যাংকক পোস্টের প্রতিবেদন

একটি গণজাগরণ যার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এই আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। যদিও যে সহিংসতা সৃষ্টি হয়েছিল তা ক্রমাগত দমনের শাসন দ্বারা উসকে দেয়া হয়েছিল। ভিন্নমত দমনে জনগণের অসন্তোষের অন্তর্নিহিত কারণ উপেক্ষা করা হয়েছিল। সমাজের সর্বস্তরে নানা বৈষম্য জনগণকে আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ করেছে। জনরোষে এক সময় দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে স্বৈরশাসক। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ব্যাংকক পোস্ট।

এতে বলা হয়, জুলাইয়ের শুরুতে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরীর জন্য বরাদ্দকৃত কোটার সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ২০১৮ সালেও একই দাবিতে আন্দোলন করেন তারা। সেসময় শেখ হাসিনা সমস্ত কোটা বিলুপ্ত করেছিলেন। তবে এ বছরের জুনে হাইকোর্ট কোটাকে পুনর্বহাল করে।

মূলত এ থেকেই আন্দোলনের ডাক দেন শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনের তোপে এক মাস পরে মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরিদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রেখে ৯৩ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। তবে এই রায়ের আগেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কেননা শেখ হাসিনা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ করে বিতর্কিত একটি মন্তব্য করেন। এছাড়া কোটা সংস্কারের দাবিতে নামা শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি চালায় নিরাপত্তা বাহিনী। যারফলে শিক্ষার্থীরা তখন হাসিনার পতনের দাবি করে। এরপর থেকেই গোটা দেশ উত্তপ্ত হয়ে যায় এবং পরিস্থিতির অবনমন হতে থাকে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন রূপ নেয় গণ-আন্দোলনে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঠেকাতে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ওপর প্রয়োজনের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করে। এতে তিন শতাধিক মানুষ নিহত হন। যাদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষার্থী। শেষ পর্যন্ত আন্দোলন আরও প্রকট হতে থাকলে দেশ থেকে পালিয়ে গত ৫ই আগস্ট ভারতে আশ্রয় নেন হাসিনা।

শেখ হাসিনাকে লৌহমানবী বলা হয়। বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা তিনি। একসময় তিনি দেশের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে রাজনীতির ময়দানে বেশ সক্রিয় হয়েছিলেন। তার আমলে বাংলাদেশ বেশ কিছুটা অর্থনৈতিক সাফল্যও পেয়েছে। তৈরি পোশাক খাত তার আমলে খানিকটা উন্নতির পথ দেখেছে। গত দুই দশকে দেশের দারিদ্রতা কমিয়ে ২০১৯ সালে জিডিপি-তে ভারতকেও পিছনে ফেলে দিয়েছিল বাংলাদেশ। দেশের অর্থনীতিতে আগের নেতাদের তুলনায় এত ভালো করার পরও কেন এমন লজ্জাজনক পতনের সম্মুখীন হলেন শেখ হাসিনা। এর উত্তর কঠিন নয়। তিনি ছিলেন একজন স্বৈরশাসক। তিনি ভিন্নমত দমনে অতিরিক্ত বল প্রয়োগে বিশ্বাসী ছিলেন। তার হাত থেকে আইনজীবী, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী কেউই রক্ষা পায়নি। এদের যারাই তার সমালোচনা করেছেন তাদেরকেই হয়ত গুম নয়তো খুন করা হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তার এই উদ্ধত আচরণের মাত্রা আরও প্রকটাকার ধারণ করেছিল। শেখ হাসিনার এমন করুণ পরিণতিতে বিশ্বের শিক্ষা হচ্ছে শত উন্নয়ন করেও জনগণের স্বাধীনতাকে হরণ করলে তার পতন নিশ্চিত।