Sunday, March 16, 2014

বিশেষ সাক্ষাত্কার : অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ- ‘লিটল পিপল’রাই রাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি by এ কে এম জাকারিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদের জন্ম বরিশালে, ১৯৫৮ সালে। ঢাকার রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল ও ঢাকা কলেজ হয়ে তিনি উচ্চশিক্ষা নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরে অটোয়ার কার্লটন বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। ২০০০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বৈরুতের সাজেস বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন ইস্যুতে লেখা ইমতিয়াজ আহমেদের বেশ কিছু বই প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে অজস্র লেখা ও গবেষণাপত্র।

হলফনামা- কেন এই স্ববিরোধিতা? by বদিউল আলম মজুমদার

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সম্প্রতি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের হলফনামা দেওয়ার বিধানের সমালোচনা করে বলেন, ‘এই হলফনামা এখন রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনননামায় পরিণত হয়েছে।’ নির্বাচন কমিশনে হলফনামা জমা দেওয়ার আইন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার কথাও তিনি বক্তব্যে উল্লেখ করেন। (প্রথম আলো, ৪ মার্চ ২০১৪)। জনাব ইসলামের বক্তব্য পড়ে আমরা হতবাক হয়েছি, কারণ এ ধরনের বক্তব্য দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির কাছে আত্মসমর্পণেরই সমতুল্য।

মমতার জয়ের অভিলাষ! by অমর সাহা

ভারতের লোকসভা নির্বাচন ঘিরে এখন নতুন স্বপ্নে বিভোর মমতা। মমতা মানে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বেসর্বা এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর আশা, এবার হয়তো ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের জবাব দিতে পারবেন। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তাঁর দল পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে পায় মাত্র একটি। সেবার তিনি নির্বাচনী জোট করেছিলেন বিজেপির সঙ্গে।

চৌদ্দগ্রামে মন্ত্রীর পিএ- সাংবাদিক মারলে কি হয়? by নিয়াজ মাহমুদ

এক মিনিট কেন্দ্রে থাকলেই তোদের লাশ পড়বে, সাংবাদিক মারলে কি হয়? এই মুহূর্তে কুমিল্লা ছাড়বি। তা না হলে  তোদের সবগুলোকে পুলিশে দেবো। এভাবে ঢাকা থেকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে উপজেলা নির্বাচন কাভার করতে আসা বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও টেলিভিশনের সাংবাদিকদের হুমকি দেন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের পিএ মোশাররফ হোসেন। পাশাপাশি সকাল থেকেই এ উপজেলার  ১০৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ৭৩টি কেন্দ্র দখলে নেয় মন্ত্রীর লোকজন।  মন্ত্রীর নিজ কেন্দ্র শ্রীপুরের নাটচরে ১৯ দল সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট সোহেলকে লাথি দিয়ে বের করে দেয় মন্ত্রীর লোকজন।  এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘটনাকে ভোট ডাকাতির উৎসব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন ১৯ দলীয় জোটের নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমেদ। আর ১৯ দল সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী উপজেলা নির্বাচন স্থগিত চেয়ে আজ অর্ধদিবস হরতাল  দিয়েছেন চৌদ্দগ্রামে।

ছুটছে খেলনা গাড়ি, পিছন পিছন পুলিশ

দু’বছরের মেয়েকে একটা সাদা খেলনা গাড়ি কিনে দিয়েছিলেন বাবা-মা। তবে তা দেখতে শুনতে একেবারে আসলের মতো। দু’আসনের সেই হুড খোলা গাড়িটা প্যাডেল করে সাঁই সাঁই বেগে চালাচ্ছিল জাডারিয়া মিশো। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে এ দিক-সে দিক। কখন যে আবাসনের বাইরে বড় রাস্তায় চলে এসেছে, খেয়াল নেই। হঠাৎই সাইরেনের আওয়াজ!

তিস্তায় পানি প্রত্যাহার

চৈত্রের শুরুতেই তিস্তা নদী থেকে ভারতের আরও পানি প্রত্যাহারের সংবাদ। ২০১১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তির প্রতিশ্রুতি তো পালিত হয়ইনি, এখন সমস্যা আরও তীব্র হয়েছে। শুক্রবারের প্রথম আলো জানিয়েছে, বাংলাদেশের লালমনিরহাটের ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি ব্যাপক হারে কমেছে। এই প্রাপ্তির পরিমাণ ১৯৭৩-১৯৮৫ সালের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার আরও বেশি কৃষিজমি ভারত-বাংলাদেশের যৌথ নদী তিস্তার পানি দিয়ে সেচের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সেচমন্ত্রী টাইমস অব ইন্ডিয়াকে বলেছেন, ‘নিজেদের চাহিদা না মিটিয়ে বাংলাদেশকে পানি দেব কীভাবে?’ সেচমন্ত্রী সম্ভবত আন্তর্জাতিক আইন এবং অভিন্ন নদীবিষয়ক জাতিসংঘের নির্দেশনা ভুলে গেছেন। যৌথ নদীর ওপর কোনো দেশই একক কর্তৃত্ব দাবি করতে পারে না। তাঁর এ অবস্থানের সঙ্গে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান অভিন্ন হলে সেটি বাংলাদেশের বড় দুশ্চিন্তার কারণ বৈকি।
বাংলাদেশ সরকার বারবার ভারতকে ‘ন্যায়সংগত’ পরিমাণ পানি ছাড়ার জন্য অনুরোধ করে আসছে। তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি সম্পাদনের জন্য তাগাদারও শেষ নেই। কিন্তু ভারত সরকার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে জরুরি চুক্তি সম্পাদন থেকে বিরত রয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমারে বিমসটেক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ‘তিস্তা চুক্তি কঠিন বিষয়’ বলে মন্তব্য করেছেন। কূটনৈতিক ভাষায় করা তাঁর মন্তব্যের সারমর্ম হলো এখন তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা এত দিন বলতেন, চুক্তি না হলেও বাংলাদেশ পানি তো পাচ্ছে। এখন কী বলবেন তাঁরা? তিস্তা নদীনির্ভর সেচ প্রকল্পের ওপর উত্তরবঙ্গের তিস্তা অববাহিকার ৬৩ শতাংশ আবাদি জমি নির্ভরশীল। এ বছর কৃষকেরা বোরো রোপণ করে যেখানে পানির জন্য হাহাকার করছেন, সেখানে ভারতে এই পানি প্রত্যাহার নির্দয় আচরণ ছাড়া কিছু নয়।
আন্তর্জাতিক পানিপ্রবাহবিষয়ক জাতিসংঘের কনভেনশনে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য বণ্টনের কথা বলা হলেও ভারত তা মান্য করছে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে নদীবিশেষজ্ঞ ও আইনবিশারদদের নিয়ে সমীক্ষা করে ভারতের কাছে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে হবে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র দপ্তর কি এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রস্তুত? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সর্বতোভাবেই ভারতের প্রতি বন্ধুত্বমূলক আচরণ করেছে এবং সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রসারিত করেছে। সন্ত্রাস দমন থেকে শুরু করে ট্রানজিটের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বাংলাদেশ যেখানে উদার মনোভাব দেখাচ্ছে, সেখানে ভারতের দিক থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়। জাতীয় স্বার্থে, উত্তরবঙ্গের মরুকরণ ঠেকানোর স্বার্থে এবং কৃষি অর্থনীতি টিকিয়ে রাখার খাতিরে বাংলাদেশ সরকারকে কূটনৈতিক পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে।

অবমুক্ত থাকুক জাতীয় সংসদ ভবন

সংসদ ভবন
জাতীয় সংসদ ভবন ঘিরে নির্মিত হচ্ছে সাড়ে আট ফুট উঁচু লোহার বেষ্টনী। সংসদ সচিবালয়ের সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন করছে পূর্ত মন্ত্রণালয়। লুই আই কানের মূল নকশার বাইরে গিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের চারদিকে এই বেষ্টনী নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়, এখন পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বাতিল হয়নি। লুই কানের নকশায় সংসদ ভবনের পূর্ব ও পশ্চিম দিকের লন ও দক্ষিণ প্লাজা সাধারণ জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। মূল ভবনের সঙ্গে উন্মুক্ত স্থান রাখার তাৎপর্য এই যে সংসদে যাঁরা বসবেন, তাঁদের সঙ্গে সাধারণ জনগণের নৈকট্য প্রকাশ পাবে স্থাপত্যশৈলীর ভেতর দিয়ে। সাধারণ জনগণের সঙ্গে এই নৈকট্য ও একই তলে অবস্থান গণতন্ত্রের তাৎপর্যকেও ধারণ করে। লুই আই কান এ দেশের মাটি, গাছপালা, আলো-জল-হাওয়ার সঙ্গে একটি সুর বজায় রেখে গোটা স্থাপত্যের নকশাটি করেছিলেন। ফলে এই স্থাপত্যের চারদিকে নকশাবহির্ভূত লোহার বেষ্টনী স্থাপত্য নির্মাণের পেছনে থাকা তাৎপর্যকে নস্যাৎ করবে; মানুষ ও প্রকৃতির সঙ্গে যুক্ততার প্রতীকী যোগাযোগকে ছিন্ন করে এর নান্দনিক দিক ও স্থাপত্যমান বিনষ্ট করবে।
সংসদ ভবনের চারদিকে লোহার শিক দিয়ে বেষ্টনী নির্মাণে সংসদ সচিবালয়ের সিদ্ধান্তে ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’র বিষয়টিই অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। লোহার বেষ্টনী কি সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে? নকশা অমান্য করে লোহার খাঁচা না বানিয়ে অন্য কোনো উপায়ে কি এই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেত না? ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বসিয়ে নজরদারি বাড়ানোসহ উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে কি করা যেত না এই নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান? এটা স্পষ্ট যে সংসদ সচিবালয় নিরাপত্তার দিকটি বিবেচনায় রেখেই সিদ্ধান্তটি নিয়েছে। কিন্তু একটি স্থাপত্য, যা আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে, যা আমাদের গণতন্ত্রের তাৎপর্যকে ধারণ করে, তার স্থাপত্যমানকে দেখভাল করার কি কেউ নেই? দেশে নিরাপত্তাঝুঁকি যদি বেড়ে গিয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে খাঁচাই কি সমাধান? নিরাপত্তার ঝুঁকি বাড়লে সরকারের তো প্রধান দায়িত্ব সেই ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করা। নয়তো মানুষ এবং স্থাপত্য রক্ষায় লাখ লাখ খাঁচাই কেবল বানাতে হবে। লুই কানের নকশা অক্ষুণ্ন রেখে অন্য সব উপায়েই সংসদ ভবন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা বাড়ানো যেত। সেসব উপায়ের ক্ষেত্রে তো কোনো বাধা ছিল না।
বিশ শতকে নির্মিত বিশ্বের শ্রেষ্ঠ স্থাপত্যগুলোর একটি আমাদের জাতীয় সংসদ ভবন। এটিকে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবেই দেখে মানুষ। এই স্থাপত্য যাতে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পায়, সে ব্যাপারে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর নানা উদ্যোগও নিয়েছে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করেছি, সংসদ ভবনের স্থাপত্যমান রক্ষায় কোনো সরকারেরই সুদৃষ্টি নেই। আশির দশকে এরশাদ যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত তখন প্রথমবারের মতো বেষ্টনী নির্মাণের পরিকল্পনা হয়। কিন্তু প্রতিরোধের মুখে বাতিল হয় সেই সিদ্ধান্ত। বিগত সংসদও সংসদ ভবন এলাকার চারপাশে ১০ ফুট উঁচু দেয়াল নির্মাণের চেষ্টা করেছিল। পরিবেশ ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের আপত্তির মুখে বাতিল হয়েছিল সেই পরিকল্পনা। তবে নতুন করে যে এই লোহার বেষ্টনী নির্মিত হচ্ছে, পরিবেশ ও স্থাপত্য অধিদপ্তর তাতে কী করে অনুমতি প্রদান করল? নাকি এবার স্থাপত্য অধিদপ্তরের পরামর্শ ছাড়াই নির্মিত হচ্ছে এই স্থাপনা?
সংসদ ভবনের ভেতর ও বাইরে লুই কানের মূল নকশাবহির্ভূত অনেক স্থাপনাই নির্মাণ করা হয়েছে। আর এসবই এই স্থাপত্যের স্থাপত্যমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। গণপূর্ত বিভাগের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে সংসদ ভবনের ভেতরে কক্ষের সংখ্যা পাঁচ শতাধিক, অথচ লুই কানের নকশা অনুযায়ী মোট কক্ষ ছিল ৪০০। ভবনের ভেতর অনেক কক্ষ বানানো হয়েছে কাচ ও কাঠের বেড়া দিয়ে। লুই কান ভবনের ভেতর আলো-বাতাস প্রবেশের এমন ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে দিনের বেলায় বৈদ্যুতিক আলো ছাড়াই কাজ করা সম্ভব হয়। কিন্তু নতুন নতুন স্থাপনা সেসব আলো-হাওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। নকশা অমান্য করে সংসদ ভবন এলাকায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাড়ি বানানো হয়েছে। এ নিয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছিল এবং স্থাপনা নির্মাণে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ অবধি বাড়ি নির্মাণ হয়েছে। হাইকোর্ট সে সময়ে, ২০০৪ সালে, সংসদ ভবন এলাকায় লুই আই কানের নকশার বাইরে যেকোনো রকম স্থাপনা নির্মাণকেই বে-আইনি ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন। এ সময় হাইকোর্ট জাতীয় সংসদ ভবনকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণারও নির্দেশনা দেন। (সূত্র: প্রথম আলো, ২৩ জুন ২০১৩)
আমরা স্মরণ করতে পারি, সংসদ ভবনের উত্তর ফটক বন্ধ করে যখন একটি টেলিভিশন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয় তখন নকশাবহির্ভূত এই স্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েছিল। তখন সংসদ সচিবালয়ের কমিশনের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, লুই আই কানের নকশাবহির্ভূত কোনো স্থাপনা নির্মিত হয়ে থাকলে তা ভেঙে ফেলা হবে। সে সময়ে, ২ জুন ২০১৩ ওই কমিশনের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘জাতীয় সংসদ ভবন বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য নিদর্শন। এর স্থাপত্যমান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। লুই কানের মূল নকশার বাইরে কোনো ধরনের পরিবর্তন করা যাবে না। (সূত্র: প্রথম আলো, ২৩ জুন ২০১৩) কিন্তু আমরা এখন লুই কানের নকশার বিপরীতে লোহার বেষ্টনী নির্মিত হতে দেখছি।
প্রধানমন্ত্রী গত সংসদে বলেছিলেন, লুই কানের নকশা বদলানো যাবে না। এর স্থাপত্যমান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে। তিনিই বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী। আমরা আশা করছি, অবিলম্বে সংসদ ভবন এলাকার চারপাশে লোহার বেষ্টনী নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিল করে তিনি তাঁর নিজের বক্তব্যের সত্যতা রক্ষা করবেন। একই সঙ্গে সংসদ ভবনের স্থাপত্যমান রক্ষার অনুকূলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপও গ্রহণ করবেন। আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত এই স্থাপত্যের শিল্পমান অক্ষুণ্ন থাকুক।
লেখকেরা: শিক্ষক, শিল্পী ও স্থপতি।

সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়ার খোঁজে

পৃথিবীর সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত ও রাজনৈতিক ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ অঞ্চলের নাম দক্ষিণ এশিয়া। এখানে বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ আছে। আছে মেধাবী ও কর্মক্ষম এক বিশাল তরুণসমাজ। কিন্তু সেই তরুণদের কাজে লাগানোর জন্য যে সুবিন্যস্ত পরিকল্পনা, পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা দরকার, রাষ্ট্রনেতাদের চিন্তা ও কর্মে তার লক্ষণ দেখা যায় না। বরং তাঁরা ঐতিহাসিক ভ্রান্তির বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছেন। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর থেকে জাতিগত ও ধর্মগত অভ্যন্তরীণ বিরোধে এ অঞ্চলের দেশগুলো যেমন ন্যুব্জ ও দুর্বল হয়েছে, তেমনি পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধেও ক্রমাগত শক্তি ক্ষয় করে চলেছে (ব্যতিক্রম ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ)। খাল কেটে কুমির আনার মতো প্রতিবেশী দেশের বিদ্রোহীদের উসকে দিলে তার পরিণতি যে কী ভয়ংকর হতে পারে, বর্তমান পাকিস্তানই তার প্রমাণ।
১৩ মার্চ মিয়ানমারের বন্দরনগর ইয়াঙ্গুনে ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টার আয়োজিত দক্ষিণ এশিয়ার সাতটি দেশের গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সংলাপে এই অঞ্চলের সরকারগুলোর নানা দুর্বলতা ও হঠকারিতার পাশাপাশি গণবিরোধী ভূমিকার কথা উঠে আসে। উঠে আসে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সম্পর্ক, আন্তরাষ্ট্রীয় ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ, পরমাণু অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, আন্তসীমান্ত বিরোধ ও সন্ত্রাসবাদের ভেতর-বাইর। আলোচিত হয় বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে গণমাধ্যমের দ্বন্দ্বময় সম্পর্কের বিষয়টি। আলোচনায় অংশ নেন নাজিবা আইউবি (আফগানিস্তান); সাইফুল্লাহ গুল, ওমর চিমা (পাকিস্তান); কুণ্ডা দীক্ষিত (নেপাল); দিলনাজ বোগা, ত্রিদিবেশ মাইনি, সৈয়দ নাজাকাত, জয়দেব মিশ্র ও রামকৃষ্ণ শ্রীনাথারান (ভারত); আমন্ত পেরেরা (শ্রীলঙ্কা), শ্যামল দত্ত ও সোহরাব হাসান (বাংলাদেশ)। এ ছাড়া ইস্টওয়েস্ট সেন্টারের পক্ষে ছিলেন ড. সাব্বির চিমা ও সুজান ক্রিফেলস।
পৃথিবীর সব অঞ্চলেই রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও আন্তরাষ্ট্রীয় বিরোধ আছে। কিন্তু সেই বিরোধ জিইয়ে রেখে কেউ অমঙ্গলকে আলিঙ্গন করেননি, যেমনটি করেছেন দক্ষিণ এশীয় নেতারা। বিভিন্ন অঞ্চলের দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় বিরোধ মেটাতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ক্ষত কাটিয়ে উঠতে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলো যে পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়; তারই সফল পরিণতি আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তারা একটি কার্যকর অর্থনৈতিক জোটই করেনি, অভিন্ন মুদ্রা ও ভিসাও চালু করেছে। এ ছাড়া কার্যকর আঞ্চলিক জোট গঠিত হয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (আসিয়ান), আফ্রিকায় (আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা), ল্যাটিন আমেরিকায় (ল্যাটিন আমেরিকান ইকোনমিক কো-অপারেশন)। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা সে রকম কার্যকর আঞ্চলিক সংগঠন গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁরা মুখে ঐক্যের কথা বললেও কাজ করেন ঐক্যের বিপক্ষে। তিন দশক আগে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এখন একটি প্রায় ভঙ্গুর ও অকার্যকর জোটে পরিণত হয়েছে। সার্ক কার্যকর না হওয়ার কারণ কী? অনেকে বলেন, ভারত ও পাকিস্তানের বিরোধ। খানিকটা সত্য। আরও সত্য আছে। এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কও সৌহার্দ্যপূর্ণ নয়। যে প্রতিদান তারা প্রতিবেশীর কাছে আশা করে, সেই প্রতিদান দিতে প্রস্তুত নয়।
স্মরণ করতে পারি যে, সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তি না করেই আসিয়ান দেশগুলো চীনের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ সার্বিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে। আমরা পারিনি। এখনো বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে ঘুরেফিরে পুরোনো বিষয়গুলোই স্থান পাচ্ছে। সড়কের গতিবিধি কী হবে, পানিবণ্টন চুক্তি হবে কি না, সীমান্ত বিরোধ মিটবে কবে, ভিসাব্যবস্থা আরও সহজ করা যাবে কি না ইত্যাদি। এসব সমস্যা জিইয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খুব বেশি এগিয়ে নেওয়া যায় না। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ২৬ শতাংশ ব্যবসা-বাণিজ্য হলেও সার্ক দেশগুলোর মধ্যে হচ্ছে মাত্র ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি মৈত্রী নয়, বৈরিতার লক্ষণ।
সম্ভবত দুটি কারণে দক্ষিণ এশিয়ার নেতারা সংকটের সমাধান না করে জিইয়ে রাখেন। প্রথমত, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দেশের জনগণের মধ্যে একধরনের যুদ্ধংদেহী মনোভাব জাগিয়ে রাখা। দ্বিতীয়ত, প্রতিবেশীর কাছ থেকে হুমকি আসতে পারে—এই অজুহাতে জনগণকে মৌলিক ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত করা। তবে অনেক দেশের সেই ক্ষমতাও নেই। ১৯৪৭ সালে এই অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নেতারা সাম্প্রদায়িকতার যে বীজ বপন করেছিলেন, সেটাই এখন বিষবৃক্ষে রূপ নিয়েছে। সমূলে এই বিষবৃক্ষের উৎপাটন ছাড়া এ অঞ্চলে শান্তি, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি আনা যাবে না। তখন আমাদের নেতারা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন যে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করা গেলেও কোনো দেশ থেকে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষকে একেবারে উচ্ছেদ করা যায় না। সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত ও উৎপীড়িত রেখে দেশকেও খুব বেশি এগিয়ে নেওয়া যায় না। পূর্ব ও পশ্চিমের যেসব দেশ এসব সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে সচেষ্ট হয়েছে, তারা কিছুটা হলেও এগিয়ে গেছে। আর যেসব দেশ গায়ের জোরে ভিন্ন মতকে স্তব্ধ করে দিতে চাইছে, সেসব দেশে ঘোষিত-অঘোষিত গৃহযুদ্ধ চলছে।
আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের উদ্দেশ্যই হলো সব নাগরিকের মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণ। দুর্ভাগ্য, দক্ষিণ এশিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্রের অধিপতিরা সেটি বুঝতে চান না। তাঁদের কাছে রাষ্ট্র মানে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ। তাঁদের কাছে রাষ্ট্রীয় বিরোধ জিইয়ে রাখা। তাঁরা প্রতিবেশীকে শত্রুজ্ঞান করে নিজের নীতি ও কৌশল ঠিক করেন। সবকিছু দেখেন সংকীর্ণ জাতীয়তা কিংবা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে। তাঁরা সীমান্তের ওপার দূরে থাক, নিজ দেশের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা-অনিচ্ছাও বুঝতে চান না।
এসব ক্ষেত্রে গণমাধ্যম বা সাংবাদিকদের ভূমিকা কী হবে? তাঁরা কি রাষ্ট্রের চালকদের নীতিকে সমর্থন করবেন? তাঁরা কি অন্য দেশের মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকবেন, আর নিজ দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলি উপেক্ষা করবেন? তাঁরা কি সরকারের ভাষায় কথা বলবেন, নাকি উৎপীড়িত ও দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াবেন? তাঁদের লেখার ও বলার কেন্দ্রে কী থাকবে—সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, না মানুষ? কার কণ্ঠস্বর হবেন তাঁরা—ক্ষমতান্ধ রাজনীতি, নাকি মানুষের কল্যাণে পরিচালিত অর্থনীতি? দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিক প্রতিনিধিরা জোর দিয়ে বললেন, পীড়িত ও বঞ্চিত মানুষই হবে গণমাধ্যমের কেন্দ্র। সীমান্তের এপারের মতো ওপারের সমস্যাটিও তাঁরা দেখবেন নির্মোহ দৃষ্টিতে। কীভাবে? সেটি সম্ভব পরস্পরকে জানা, শোনা ও বোঝার মাধ্যমে। সেটি সম্ভব পেশাগত সততা ও একাগ্রতার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকেরা যেভাবে ভিন্ন রাষ্ট্রকে দেখতে চান, সাংবাদিকেরা নিশ্চয়ই সেভাবে দেখবেন না। তাঁরা দেখবেন তাঁদের নিজেদের সংগৃহীত তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে। তাই দক্ষিণ এশিয়ার সাংবাদিকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে হবে; নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। প্রতিবেশী দেশের খবর সংগ্রহের জন্য যতটা সম্ভব পশ্চিমা তথ্যমাধ্যমের নির্ভরতা কমাতে হবে। দিনভর এই আলোচনায় আফগানিস্তানে তালেবান হানার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা, পাকিস্তানে বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠীর মধ্যকার প্রাণঘাতী লড়াইসহ তালেবানের সঙ্গে সরকারের আলোচনা-প্রক্রিয়া, শ্রীলঙ্কার তামিল বিদ্রোহী দমন থেকে মানবাধিকার হরণ, ভারতে সমরাস্ত্র তৈরির সাফল্য থেকে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদী তৎপরতা ও নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতা গুরুত্ব পায়। ভুটান এই অঞ্চলের সবচেয়ে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত।
সব বিষয়ে যে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা একমত হয়েছেন, তা নয়, বরং তালেবান উত্থান, কাশ্মীর সমস্যা, আফগানিস্তানে মাদক ব্যবসার উৎস ইত্যাদি নিয়ে প্রবল মতভেদ লক্ষ করা গেছে। কিন্তু একটি বিষয়ে প্রায় সব দেশের সাংবাদিক প্রতিনিধিরাই একমত হন যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আন্তরাষ্ট্র ও অভ্যন্তরীণ বিরোধই উন্নয়নের প্রধান বাধা। এই বাধা অবশ্যই দূর করতে হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থে, মানবাধিকারের স্বার্থে এই যুদ্ধাবস্থার অবসান ঘটিয়ে পরস্পরকে মৈত্রীর বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সব দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সমস্যার সমাধান করতে হবে। প্রশ্ন হলো, দক্ষিণ এশীয় নেতারা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবেন? তাঁরা কি সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য কাজ করবেন, নাকি এই অঞ্চলকে চিরতরে গরিব করে রাখবেন? তাঁরা কি এ অঞ্চলের পৌনে দুই শ কোটি মানুষকে নিজেদের ভাগ্য গড়ার সুযোগ দেবেন, নাকি তাঁদের দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহার করবেন?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net