Tuesday, June 16, 2020

খাসা ঘর বানানোর জায়গা নেই বাবুই পাখিদের by রিপন দে

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই, কুঁড়ে ঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই, আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোধ, বৃষ্টির, ঝড়ে। বাবুই হাসিয়া কহে, সন্দেহ কি তাই? কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়। পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা, নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।
কবি রজনীকান্ত সেনের এই কবিতাটি পড়িয়ে ছোটবেলায় আমাদের শিক্ষকরা সততা আর নৈতিকতা শিক্ষা দিতেন। নিজে লড়াই করে স্বাধীনভাবে বাঁচার শিক্ষা দিতেন। নিজের কাজকে ভালোবাসা ও সম্মানের শিক্ষার উদাহরণ হিসেবে বাবুই পাখি আমাদের খুব প্রিয়।
একটা সময় আশপাশে প্রচুর তাল গাছ ছিল। আর সেই গাছে প্রকৃতির নিপুণ শিল্পী বাবুই বাসা বাঁধতো পরম যত্নে। ধৈর্য নিয়ে আপন মনে বুনতো নিজ বাসা। তবে এই পাখিকে আমরা শুধু পরিশ্রমী আর সততার প্রতীক হিসেবেই চিনি। কিন্তু তাদের শিল্পগুণের পেছনে রয়েছে আরেক কাহিনী। আর সেটি তার প্রেমিকাকে খুশি করার অদম্য বাসনা।

বাবুই পাখির যখন প্রজনন মৌসুম আসে তখন পুরুষ বাবুইটি একের পর এক বাসা গড়তে থাকে তার প্রেমিকাকে খুশি করতে। একেকটি পুরুষ বাবুই এক থেকে ২০টি পর্যন্ত বাসা তৈরি করে। বাসা তৈরির কাজ শেষ হলে সুরে সুরে তার প্রেমিকাকে আহ্বান জানায়। তার ডাকে কাছে আসে স্ত্রী বাবুই পাখি। এসেই পরখ করে দেখে কেমন হলো তার বাসা। যদি সে বাসা পছন্দ হয় এবং নিরাপদ মনে করে তবেই সে মিলিত হয় পুরুষ বাবুইর সঙ্গে। তাদের বাসায় ডিম আসে বাচ্চা ফোটে। একই সঙ্গে একটি পুরুষ বাবুই একাধিক সংসার গড়ে তাই এতো বাসা তৈরি করে।
বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য এম এ তাহের জাগো নিউজকে জানান, বাবুই পাখি সাধারণত তিন ধরনের বাসা তৈরি করে। নিচের দিকে অনেক লম্বা সরু একটা রাস্তা থাকে, যে রাস্তা দিয়ে বাসার ভেতরে ঢোকে। এমন বাসা অনাগত ছানার জন্য নিরাপদ। আরেক ধরনের বাসার বেশিরভাগ অংশ খোলা থাক। এমন বাসা বানানোর পেছনের কারণ হচ্ছে, বাবুই পাখিটি এই বাসায় বিশ্রাম করে বা এখানে বসে আশেপাশে সতর্ক পাহারা বসায়। আরেকটি বিশেষ ধরনের বাসা বানায়, যার ভেতরে দুইটি অংশ থাকে। সে বাসায় সংসার ছানাসহ বিশ্রামের আলাদা জায়গা থাকে।
কিন্তু চিরচেনা সেই দৃশ্যের দেখা এখন আর তেমন মেলে না। কারণ উঁচু তাল, নারিকেল ও সুপারি গাছ কমে যাওয়ায় বাসা বুনার উপযুক্ত স্থান হারাচ্ছে ক্রমশ। অতি লোভে দামি গাছ লাগানোর জন্য গাছপালা কেটে ফেলছে। ফলে বিপদে পড়ছে বাবুই পাখিরা।

বাসা তৈরির জন্য বাবুই পাখির প্রথম পছন্দ তাল গাছ। এরপর নারিকেল বা সুপারি গাছ। এই সব গাছের পাতার সাথে অন্য লতাপাতা মিশিয়ে তারা বাসা গড়ে। উপরে বাসা বানানোর কারণে সে নিরাপদে থাকতে পারে। তাল গাছ বা নারিকেল গাছের এতো উপরে থাকে সেখানে সাধারণ অন্য কোনো কিছুর নাগালের বাইরে থাকে।
সেই বাবুই পাখি ২০/২৫ বছরের ব্যবধানে চরম সংকটে পড়েছে। এতোটাই সংকটে যে বাধ্য হয়ে কলা গাছ বা বিভিন্ন ঝোপে বাসা বানাচ্ছে। বাবুই পাখি প্রজননের এই সময়টায় আরও বেশি বিপদে পড়েছে। কলা গাছের মতো নিচু গাছে ঝুকি আছে জেনেও বাসা তৈরি করছে তারা। যেই বাসা থেকে বাচ্চারা ঢিল মেরে তাদের ডিম নষ্ট করে দিচ্ছে, তবুও এই নিচু জায়গা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। মানুষের হিংস্র থাবার কাছে হার মেনেছে বাবুই পাখির জীবনের মায়া। এমন কিছু বাসার ছবি কেরানিগঞ্জে কয়েকটি এলাকায় দেখতে পান বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সদস্য এম এ তাহের।
তিনি জানান, অতি লোভে আমরা তাল গাছ কেটে অন্য গাছ লাগাচ্ছি। তার ওপর কিছু কুসংস্কার আছে। গ্রামের মানুষ মনে করে তাল গাছে ভূতে বাসা বাধে। আর সে ধারণা থেকেই বেশিরভাগ তাল গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। জ্ঞানের অভাবে টাকার লোভে প্রকৃতি ধ্বংস করে চলেছি উন্নয়নের প্রতিযোগী হয়ে। তাদের এই অবস্থা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। কী করছি আমরা তাদের সাথে! নির্লজ্জের মতো মাথা নিচু করে রইলাম। এতটা পাষাণ আমরা কী করে হলাম? একটি গাছ কেটে কয়টি গাছ লাগিয়েছি আমরা তা কি ভেবে দেখেছি কখনো? আমি প্রথম দেখলাম কলা গাছের ডালে এবং কাশবনে বাসা বানাতে আর কেউ দেখেছে কি না, আমার জানা নাই। কতোটা বিপন্নর কাতারে চলে যাচ্ছে বাবুইপাখি। প্রকৃতি না বাঁচলে মানুষ বাঁচবে কীভাবে?

এ বিষয়ে পাখিবিদ এস আই সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, এই পাখির বাংলা নাম : দেশি-বাবুই, ইংরেজি নাম : Baya Weaver, বৈজ্ঞানিক নাম Ploceus philippinus। সাধারণত মে থেকে আগস্টের মধ্যে বাবুই পাখির প্রজনন মৌসুম। একটি পুরুষ পাখির একাধিক বাসা ও পরিবার থাকতে পারে। এরা সাধারণত ২ থেকে ৪টি ডিম দেয়। ডিম ফুটে ছানা বের হতে ১৪ থেকে ১৫ দিন সময় লাগে। মেয়ে পাখি একা ডিমে তা দেয়। একটি ছানা ১৪ থেকে ১৬ দিনে নিজের মতো চলার সক্ষমতা অর্জন করে। বাবুই পাখিদের খাদ্য তালিকায় আছে ঘাস-বীজ, খাদ্যশস্য ও পোকা-মাকড়।
তিনি আরও জানান, বাবুই পাখি তাল, নারকেল, সুপারি, খেজুর ও বাবলা গাছে বাসা করে থাকে। তবে বাসা বাধার জন্য সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে তাল গাছ। কিন্তু প্রকৃতি উজাড় করে তাল গাছ কেটে তাদের আবাসন আমরা ইতোমধ্যে নষ্ট করে ফেলেছি।

আজকের ফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়া, এবং একটি লাথি থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধ! by হাসান মাহবুব

আজ যখন ক্রোয়েশিয়া ফ্রান্সের বিরুদ্ধে খেলতে নামবে, প্রতিটি ক্রোয়েশিয়ানের মনে একবার হলেও একটি ছবি ভেসে উঠবে। ছবিটিতে ক্রোয়েশিয়ার (সাবেক যুগোশ্লোভিয়া) খেলোয়াড় জভনিমির বোবান একজন পুলিশকে লাথি মারছেন।
আপাতদৃষ্টিতে গর্হিত কাজ। তবে এটাই হয়ে আছে ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক। এটা কোনো সাধারণ কিক না। ইতিহাসে এর পরিচয় “The kick that started a war” নামে। যুগোস্লোভিয়া দেশটা বড় গোলমেলে ছিলো। সেখানে সার্ব, ক্রোয়াট, স্লোভানিয়ান, মন্টেনেগ্রিন ইত্যাদি বিভিন্ন রকম জাতিসত্তার মানুষ বাস করতো। মার্শাল টিটোর মৃত্যুর পর ১৯৮০ এর পরে অস্থিতিশীল সময়টায় ক্রোয়াটরা তাদের হতাশা এবং অস্থিরতা ঢাকার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলো ফুটবলকে। তাদের প্রাণপ্রিয় ক্লাব ডায়নামো জাগরেবের খেলার সময় স্টেডিয়ামে গান গেয়ে, শ্লোগান তুলে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পেতো।
এমনই এক সময়ে ১৩ই মে ১৯৯০ সালে ডায়নামো জাগরেব মুখোমুখি হলো সার্বিয়ার রেড স্টার বেলগ্রেডের সাথে। ডায়নামো জাগরেবের সমর্থকরা, যারা ব্যাড ব্লু বয়েজ নামে পরিচিত ছিলো, প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলো সহিংসতা মোকাবেলার। তারা অনেকেই ক্রোয়েশিয়ান মিলিটারির সাথেও যুক্ত ছিল। ওদিকে রেডস্টার বেলগ্রেডের সমর্থকরাও ছিলো কুখ্যাত। খেলা শুরু হলো এক বিস্ফোরন্মুখ পরিস্থিতিতে। মাত্র দশ মিনিট চলেছিলো ম্যাচটি, এরপরই শুরু হয় দাঙ্গা। ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত দাঙ্গাগুলোর একটি।
আর এমন সময়েই জভনিমির বোবান আসেন ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতার বার্তা নিয়ে, তার উড়ন্ত লাথি দিয়ে। পুলিশ একজন ক্রোয়াট সমর্থককে ধরে রেখেছিলো, যেন বেলগ্রেড থেকে আসা গুন্ডাদের কোনো ক্ষতি করতে না পারে। ওদিকে বেলগ্রেডের গুণ্ডারা চালিয়ে যাচ্ছে তাণ্ডব। ছুটে এলেন বোবান। উড়ন্ত লাথি মারলেন পুলিশকে, মুক্ত করলেন তার জাতভাইকে।
এরপর আর পরিস্থিতি সামলে রাখা সম্ভব ছিলো না কারো পক্ষেই। পরবর্তী এক ঘন্টা ধরে স্টেডিয়ামে নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ চলে, যার নমুনা ইতিহাসে নেই।
বোবান পরে বলেন...
  • *“আমি আমার খ্যাতি, যশ, পরিচিতি, কিছুরই তোয়াক্কা করিনি। আমি জীবন বাজী রেখেছিলাম একটি আদর্শের জন্যে, ক্রোয়েশিয়ার জন্যে”।
জভনিমির বোবানের এই লাথি আক্ষরিক অর্থেই ক্রোয়েশিয়ার স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা করে। এসি মিলানে বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার কাটানো বোবান পরে ক্রোয়েশিয়ার পক্ষে বিশ্বকাপেও অংশ নেন ১৯৯৮ সালে। এখন তিনি ফিফার ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল।
আপনারা যারা খেলার সাথে রাজনীতি মেশাতে অনিচ্ছুক, তারা এই ঘটনাটা একটু মনে রাখবেন।
আর একটা কথা, ১৯৯৩ সালে ক্রোয়েশিয়ার ১১৯ তম র‍্যাংকিং নিয়ে কথা হচ্ছে, ব্যাপারটা বোঝা গেছে এখন? ক্রোয়েশিয়া তখন কেবল যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীন হয়েছে। ফিফাতে কেবল রেজিস্টার্ড হয়েছে। সেজন্যেই তাদের র‍্যাংকিং তলানিতে ছিলো। তারা মোটেও দুর্বল দল ছিলো না। অখণ্ড যুগোস্লাভিয়া ভেঙে সেসব দেশ হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবগুলোই বিশ্বকাপ খেলেছে।
ক্রোয়াটরা মুক্তিকামী বীরের জাত, আমরাও। তাদের ছিলেন বোবান, আমাদের ছিলেন শহীদ জুয়েল, মুশতাক। আফসোস একটাই, লুকা মডরিচরা খেলতে নামার সময় এখনও সেই যুদ্ধবিদ্ধস্ত অবস্থা থেকে উঠে আসার স্মৃতি স্মরণ করেন, আর আমাদের নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়েরা পাল্লা দিয়ে বান্ধবী তৈরি করেন।
এভাবেই পার্থক্য তৈরি হয়, এ কারণেই আমরা পিছিয়ে যাই বারেবার।