Showing posts with label বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার. Show all posts
Showing posts with label বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার. Show all posts

Friday, December 4, 2009

প্রতিশোধ নয়, প্রতিকার -বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার by মশিউল আলম

রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে যাঁরা হত্যা করতে গিয়েছিলেন, তিনি তাঁদের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘তোরা কী চাস?’ সেই মুহূর্তে তাঁরা এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন আগ্নেয়াস্ত্রের ভাষায়।
পরে সেই উত্তর অনূদিত হয় রাজনৈতিক ভাষায়: বাংলাদেশ এক স্বৈরশাসকের হাত থেকে মুক্তি পেল। ১৫ আগস্ট জাতীয় ‘নাজাত দিবস’। একদলীয় শাসনের অবসান ঘটল, বহুদলীয় গণতন্ত্রের রাস্তা গেল খুলে। বাকশালি স্বৈরশাসন ও তার নেতার হাত থেকে দেশকে মুক্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করার জন্য সেই রক্তাক্ত কালরাত্রি অনিবার্য হয়ে উঠেছিল, ওই রক্তগঙ্গার প্রয়োজন ছিল ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই সে ঘটনা যাঁরা ঘটিয়েছিলেন, তাঁরা সদর্পে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে।’
তারপর অনেকগুলো বছর পেরিয়ে গেছে। বহুবর্ণিল বহুদল হয়েছে, কিন্তু গণতন্ত্রের পথে বেশি দূর অগ্রসর হওয়া যায়নি। এবড়োথেবড়ো পথে বহু কসরত করে সেদিকে এগোনোর চেষ্টা চলছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ‘প্রয়োজনীয়তা’ বা ‘যৌক্তিকতা’র প্রচারণা ধীরে ধীরে কমে এসেছিল। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া যখন চলছে, তখন কিছু সংবাদমাধ্যমে সেই সব পুরোনো প্রচারণা আবার ফিরে এসেছে। সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের বিশেষ বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিলের আবেদন খারিজ করে রায় ঘোষণার পর দৃশ্যত কেউ সে রায়ের বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। বিএনপির পক্ষ থেকে মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন। এমনকি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদও আনুষ্ঠানিকভাবে বলেছেন, তাঁরা এ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু কয়েকটি সংবাদপত্র রায় সম্পর্কে সরাসরি কিছু না বললেও এমন সব প্রচারণা চালাচ্ছে, যা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে তারা এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সেই সব পুরোনো যুক্তিই তুলে ধরতে চাইছে। শেখ মুজিবুর রহমান স্বৈরশাসক ছিলেন, তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খর্ব করতে চারটি ছাড়া দেশের সব সংবাদপত্র বন্ধ করে দিয়েছিলেন, একদলীয় বাকশাল গঠন করেছিলেন, রক্ষীবাহিনীকে সুরক্ষা দিয়েছিলেন দায়মুক্তির আইন করে, দেশ পরিচালনায় তাঁর ব্যর্থতা ছিল সীমাহীন ইত্যাদি। এসব প্রচারণা চালানো হয়েছে ঠিক সেই মুহূর্তে, যখন তাঁর হত্যাকারীদের বিচারের আপিল আবেদনের শুনানি চলেছে। সেই সময়ের বিদেশি পত্রপত্রিকায় ‘মুজিবের পতন’ নিয়ে নেতিবাচক ধরনের এবং খন্দকার মোশতাক আহমদের প্রতি সমর্থনসূচক যেসব সংবাদ, মন্তব্য ইত্যাদি ছাপা হয়েছিল, সেগুলো সংগ্রহ করে ধারাবাহিকভাবে ছেপেছে একটি দৈনিক। এর পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রতি সহানুভূতির প্রকাশ ঘটেছে ওই পত্রিকাগুলোর বিভিন্ন খবরে ও মন্তব্যে।
মুজিববিরোধী এই সব প্রচারণায় নতুন কিছুই নেই। আছে বরং সেই পুরোনো মানসিকতারই পরিচয়। সেটা হলো, মুজিব হত্যাকাণ্ডকে জায়েজ করা এবং যাঁরা ওই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তাঁদের ওপর বীরত্বের গুণ আরোপ করা। এ ধরনের সাংবাদিকতার পেছনে যে রাজনীতি ক্রিয়াশীল রয়েছে, আধুনিক গণতন্ত্রের যুগে তা যে অচল, তা ওই রাজনীতিকেরা উপলব্ধি করেন কি না, ভেবে স্থির করতে পারি না। কিন্তু এটা তো দেখতে পাচ্ছি, কোনো রাজনৈতিক মহলের পক্ষেই আজ আর সেদিনের মতো প্রকাশ্যে বলা সম্ভব নয় ‘পনেরই আগস্টের নায়কেরা’ বাংলাদেশকে মুক্তি দিয়েছেন।
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যাঁরা ইনডেমনিটি আইন করে হত্যাকারীদের বিচারের পথ দীর্ঘকাল বন্ধ রেখেছিলেন, উল্টো লোভনীয় নানা চাকরি ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে পুরস্কৃত করেছিলেন, বিদেশ থেকে ডেকে এনে রাজনৈতিক দল গঠন করিয়ে, এমনকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও প্রার্থী বানিয়েছিলেন—সেই রাজনীতিকেরা মুখে মুখে আদালতের রায়কে স্বাগত জানাচ্ছেন বটে, কিন্তু তাঁদের মনের মধ্যে কী আছে? সেখানে কি কোনো পরিবর্তন এসেছে? কোনো শুভবুদ্ধির উন্মেষ ঘটেছে? তাঁরা কি আজ আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেন যে, বঙ্গবন্ধুর ভুল-ত্রুটি-ব্যর্থতা যত যা-ই থাকুক না কেন, তাঁর হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য ছিল না, হতে পারে না? একই যুক্তিতে আজ তাঁদের এটাও কি উপলব্ধি করা উচিত নয়, খন্দকার মোশতাক আহমদের জারি করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল না করা, স্বঘোষিত হত্যাকারীদের বিদেশি মিশনে চাকরি-পদোন্নতি ইত্যাদির মধ্য দিয়ে পুরস্কৃত করা কোনো নৈতিক বিচারেই সংগত হয়নি? প্রকাশ্যে না হোক, অন্তত আপন মনে তাঁরা যদি উপলব্ধি ও স্বীকার করেন যে, সেসবই ছিল ভুল, অন্যায় করা হয়েছিল, তাহলে কি তাঁরা নৈতিক বা রাজনৈতিক—কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন? নাকি তার ফলে দেশের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বৈরিতা, অনাস্থা, অবিশ্বাস, ষড়যন্ত্রপরায়ণতা লাঘব হতে পারে?
অবিকশিত গণতন্ত্র, আইনের শাসন সম্পর্কে সঠিক ধারণার অভাব ইত্যাদি নানা কারণে অপরাধ, বিচার, দণ্ড ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের সমাজে স্বচ্ছ ধারণার ঘাটতি এখনো বেশ লক্ষণীয়। বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সিরাজুর রহমান দৈনিক নয়া দিগন্তে গত ২৪ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার, রায় ইত্যাদি নিয়ে এক নিবন্ধ লিখেছেন। নানা ঘটনা ও প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মোদ্দা যে বক্তব্যটি তিনি হাজির করেছেন সেটা হলো, শেখ হাসিনা পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিলেন (বা আসামিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছেন)। আদালতের রায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী এখন কী করবেন সে রায় নিয়ে? এ কথা কি তাঁর মনে হচ্ছে যে দয়া, ক্ষমা এবং অনুকম্পাহীন বিচার প্রতিশোধ এবং প্রতিহিংসাপরায়ণতারই নামান্তর? সত্যি কি তিনি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রাজনীতি করেছেন? প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন?’
সিরাজুর রহমান তাঁর ওই লেখার প্রারম্ভিক অংশের কিছু পরের দিকে উল্লেখ করেছেন, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের গোড়ার দিকে বিবিসির এক ইংরেজ সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘তিনি রাজনীতিকে ঘৃণা করেন, কিন্তু পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নিয়েছেন। আমি সেই রেকর্ডিং থামিয়ে দিয়েছিলাম, শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, বিবিসি থেকে সে কথা প্রচার করা তাঁর রাজনীতির জন্য খুবই ক্ষতিকর হবে। বুঝতে পেরেছিলাম, সে পরামর্শের জন্য হাসিনা আমার ওপর বিরক্ত হয়েছিলেন। পরে শুনেছিলাম অন্য কোথাও তিনি বলেছেন, তাঁর পিতার হত্যায় বাংলাদেশের মানুষ কাঁদেনি, সে জন্য তিনি তাঁদের শাস্তি দিতে চান।’
বর্ষীয়ান সাংবাদিক সিরাজুর রহমানের এসব কথার সত্যমিথ্যা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ আমাদের নেই। তবে এটা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, তিনি বলতে চাইছেন, শেখ হাসিনা তাঁর সেই কথিত প্রতিশোধপরায়ণতাই চরিতার্থ করছেন। কিন্তু একটি সত্য সিরাজুর রহমানের দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে: ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা তাঁর পিতার হত্যাকারীদের ধরে ধরে টপাটপ ফাঁসিতে লটকাননি। বিশেষ কোনো ট্রাইব্যুনাল বসাননি, সংক্ষিপ্ত বিচারের উদ্যোগ নেননি। সাধারণ আইনে স্বাভাবিক পন্থায় বিচারের উদ্যোগ নিয়েছেন। সেটা করতে গিয়ে বিচার-প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘায়িত হয়েছে। তারপর ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে বিচার-প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিলম্বিত বিচারের ভাগ্যে যোগ হয়েছে আরও সাত (৫+২) বছরের বিলম্ব। এবার আওয়ামী লীগ আবার দায়িত্ব গ্রহণের পর স্বাভাবিক বিচার-প্রক্রিয়ার পথের বাধাগুলো সরিয়ে নিয়েছে; ২৯ কার্যদিবস শুনানি শেষে আপিল বিভাগের এক বিশেষ বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেছেন। এরপর আসামিদের ক্ষমাপ্রার্থনার সুযোগ রয়েছে—সব আইনি-প্রক্রিয়াই যথাযথভাবে অনুসৃত হচ্ছে। হত্যাকারী যদি আইনানুগ পন্থায় বিচারের মাধ্যমে আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হয়ে দণ্ড পান, তবে সেটাকে প্রতিশোধ বলা যায় না, সেটা কৃত অপরাধের আইনি প্রতিকার। এ ছাড়া অন্যায়-অপরাধের আর কী প্রতিকার থাকতে পারে?
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দণ্ডিত আসামিদের দণ্ড কমিয়ে প্রাণদণ্ড এড়ানোর জন্য। সিরাজুর রহমানও আধুনিক ইউরোপ-আমেরিকার দৃষ্টান্ত টেনে বলতে চেয়েছেন, তাঁদের ফাঁসি দেওয়া ঠিক হবে না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মানবতাবোধের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিরিখে এ ধরনের অনুরোধ জানিয়ে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশ বড় অদ্ভুত দেশ: এই দেশে জেলখানার মধ্যে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা হেফাজতেও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার হত্যাকারীদের বিচার করা যাবে না বলে আইন জারি করা হয়েছে। এখন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা যদি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেন, রাষ্ট্রপতি তাঁদের দণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন, তাহলে কে নিশ্চয়তা দিতে পারে চার বছরের মাথায় অন্য এক সরকার ক্ষমতায় এলে তাঁরা ফুলের মালা গলায় পরে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পাবেন না?
জাতীয় ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা ছাড়া বাংলাদেশ ইতিহাসের ও চলমান সময়ের অশুভ পাকচক্র থেকে বেরতে পারবে না। সে জন্য প্রয়োজন বৈরিতা-বিভেদের অবসান। যাঁরা ভুল, অন্যায়, অপরাধ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অনুশোচনা না জাগলে বৈরিতার অবসান কী করে সম্ভব? আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পর শুধু দণ্ডিত আসামিদের নয়, তাঁদের প্রতি সহানুভূতিশীল বা তাঁদের প্রণোদক রাজনৈতিক শক্তিরও এই উপলব্ধিতে পৌঁছা উচিত।
মশিউল আলম: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

Sunday, November 22, 2009

বঙ্গবন্ধু হত্যার দায় আমাদের সকলের by সৈয়দ বদরুল আহ্সান

১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের কথা আমাদের সকলের মনে থাকবে। সেদিন আমরা কে কোথায় ছিলাম এবং কখন এবং কী অবস্থায় আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের করুণ মৃত্যুর সংবাদটি শুনেছিলাম এইসব চিত্র, এইসব কথা আমাদের মনে গেঁথে আছে এবং যত দিন আমরা যারা আজ ৫০ পেরিয়ে এসেছি, বেচেঁ থাকলে আমাদের স্মরণে থাকবে। বঙ্গবন্ধুকে সব সময়ই আমাদের মনে পড়ে এবং এর প্রধান কারণ তিনি ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। আজ এত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর যে তাঁর হত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন হলো এই বাস্তবতাটি আমাদের মনে নতুন আশার সূচনা করে। এবং সেই আশাটি খুবই সামান্য ও পরিস্কার—এই বাংলাদেশে তথা পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো স্থানে যেন এই রকম নৃশংস হত্যাকাণ্ড না ঘটে এবং কোনো নেতা ও তাঁর পরিবার যেন এইভাবে এই অস্বাভাবিক উপায়ে মৃত্যুবরণ না করেন।
বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় হয়েছে। আমাদের সন্তুষ্টির যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ষড়যন্ত্রকারীরা এবং তারা যে দেশেরই হোক না কেন, কোনো দিন সফল হয় না। হ্যাঁ, তারা বড় মাপের মানুষদের মেরে ফেলতে পারে। রাষ্ট্রকে বিকল করে দিতে পারে কিছু সময়ের জন্য। কিন্তু তারা ইতিহাসে কখনো কোনো শীর্ষস্থান পায় না। জাতির জনকের হত্যাকারীরা আজ ঘৃণিত নামমাত্র। খন্দকার মোশতাকের কথা মানুষ মনে করে একজন হত্যাকারীর রূপে। যারা নভেম্বর ১৯৭৫ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করল তারা ওই খুনি হিসেবেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এই জগতের ইতিহাসে চিহ্নিত থাকবে। এবং যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যার ফায়দাটা লুটেছেন, তাঁরাও ধিকৃত মানুষ বলে গণ্য হবেন।
এই সবই সত্য। সবই বাস্তব। কিন্তু আরও বাস্তবতা রয়েছে। একটি হলো অতি সহজ একটা সত্য। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতি হিসেবে আমরা কি আমাদের দায়িত্ব পালন করেছিলাম? আজ আমরা হরহামেশাই বঙ্গবন্ধুর কথা বলি। এমন ব্যক্তিও আছেন যাঁদের কথা শুনলে মনে হয় তাঁরা কোনো একসময় বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের লোক ছিলেন। কে কত গভীরভাবে বঙ্গবন্ধুকে চিনেছে, কত গভীরভাবে তাঁর রাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে, এই কথা প্রায়ই আমরা শুনে থাকি। বিশেষ করে যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখন বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী মানুষের কোনো ঘাটতি দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ওই সকল সাবেক কূটনীতিকের কথা, যাঁরা বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর বছরের পর বছর দেশের বিভিন্ন বঙ্গবন্ধুবিরোধী সরকারের চাকরি করেছেন এবং কতভাবে নিজেদের উন্নতি সাধন করা যায় তা নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। অথচ তাঁদেরই কয়েকজন সম্বন্ধে আমরা অনেক কিছু শুনেছি। বাংলাদেশের বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনে তাঁদের কেউ কেউ ওই সকল কর্মচারীদের ওপর চড়াও হয়েছেন, যাঁদের কাছে কখনো বঙ্গবন্ধুর কোনো ছবি পাওয়া গেছে। এমন রাষ্ট্রদূতও ছিলেন যাঁরা বিদেশে সফররত দেশি সামরিক শাসককে খুশি করার জন্য সেই শাসকের হোটেলের কক্ষের সম্মুখে সুইমিং পুলে সাঁতার কেটেছেন এবং সেই শাসকের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। আবার কোনো এক প্রধানমন্ত্রীকে খুশি করার উদ্দেশ্যে বিদেশে তাঁর অবস্থানকালে তাঁর হোটেলকক্ষে জুতার দোকান সাজিয়ে বসেছেন। কেননা সেই প্রধানমন্ত্রী একজোড়া বিদেশি জুতা ক্রয় করার খায়েশ ব্যক্ত করেছিলেন।
এই ধরনের অনেক কথা, অনেক গল্প আপনি শুনতে পাবেন। যে সেনাপ্রধান বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে পারেননি, তিনিই আবার পরপর দুই সামরিক শাসকের আমলে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ তিনি বঙ্গবন্ধুর কথা সব সময়ই বলে থাকেন। জেনারেল ওসমানী, যিনি চতুর্থ সংশোধনীর প্রতিবাদ করে জাতীয় সংসদ ত্যাগ করেন এই বলে যে তিনি অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মেনে নিতে পারেন না, সেই জেনারেল ওসমানিই খন্দকার মোশতাকের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা হয়ে প্রায় তিন মাস বঙ্গভবনে কর্মরত ছিলেন। আমাদের কাছে এমন কোনো প্রমাণ নেই যাতে আমরা ধরে নিতে পারি, তিনি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ওপর তাঁর কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পেরেছিলেন। কী কারণ ছিল ওসমানীর ওই খুনিদের সঙ্গে যাওয়ার? যে মোশতাকের আমন্ত্রন সরকারে যোগ দেয়ার জন্য ঘৃণা ভরে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, সেই মোশতাকের সঙ্গে জেনারেল ওসমানী কেন যোগদান করলেন? দেশে তো সেই ১৫ আগস্টের পরও সাহসী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। মুজিবনগর সরকারের চার নেতা খুনিদের সামনে মাথা নত করেননি। তাঁদের কারাগারে নেওয়া হয়। কখনো কি ওসমানী মোশতাকের কাছে দাবি করেছিলেন, তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হোক? ওই চারজন কারাগারে নিহত হলেন। কেউই তাঁদের রক্ষা করতে পারলেন না। সবচেয়ে অনুতাপের বিষয় হলো, এই জেনারেল ওসমানীই পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য অসাম্প্রদায়িক দলের পক্ষে ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারত করেন। মাজার জিয়ারতটি কি ১৫ আগস্টের অব্যবহিত পরপরই করা যেত না?
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছি। যে নেতার কথায় আমরা যুদ্ধে গিয়েছি, যাঁর প্রাণ রক্ষার জন্য আমরা কোটি কোটি বাঙালি ১৯৭১-এ নামাজ পড়েছি, প্রার্থনা করেছি, সেই নেতা যখন নিহত হন, আমরা কেউ প্রতিবাদ করিনি, বাইরে এসে বিক্ষোভ করিনি। আমাদের মাঝে অনেকে আছেন যাঁরা বঙ্গবন্ধুর গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন। অথচ পরবর্তীকালে এই ব্যক্তিরাই বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরোধিতা করেছেন এবং তথাকথিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এই স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের শুনতে হয়েছে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কু-রটনা। তিনি নাকি ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। যারা এই সব কথা বলে বেড়ায় তাদের অতীত পর্যবেক্ষণ করলেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। তারা পাকিস্তানকে ভুলতে পারেনি। যেমন, ওই বিএনপিভুক্ত প্রাগুক্ত সামরিক কর্মকর্তার কথাই ধরা যাক। তিনি নাকি বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক মানতে রাজি নন। তাতে আপনার-আমার কিছু যায়-আসে না। তবে ওই ব্যক্তির মনমানসিকতাটা আমাদের সামনে ফুটে ওঠে। এবং এই শ্রেণীর মানুষই ১৯৭৫-এর পরবর্তী সময়ে এই বাংলাদেশে লাভবান হয়েছেন। যেমন লাভবান হয়েছেন ওই সকল বাঙালি, যাঁরা ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কূটনৈতিক মিশনে চাকরি করেছেন এবং পরে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করে বঙ্গবন্ধু ভক্ত হয়েছেন এবং আরও পরে শেখ হাসিনার কাছে ভিড়েছেন অনায়াসে।
কিন্তু তাঁদেরই বা আমরা দোষারোপ করব কেন? আমি, আপনি, আমরা সবাই তো একই অপরাধে অপরাধী। আমরা সবাই তো বঙ্গবন্ধুকে কাছে থেকে দেখেছি, তাঁর কথা শুনেছি, তাঁকে শ্রদ্ধা করেছি। সেই আমরাই কী করে ওই সব মানুষের পক্ষে কথা বলেছি, যারা বঙ্গবন্ধুর হত্যায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে? জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, খালেদা জিয়া—তাঁদের তো বঙ্গবন্ধুর সৃষ্ট দেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে রাজনীতি করার কথা। সেটা তাঁরা করেননি। তাঁরা জাতির পিতার হত্যাকারীদের সব সময় সর্বোতভাবে রক্ষা করেছেন। আজ যখন মওদুদ আহমদ পুলকিত হয়ে প্রশ্ন করেন যে ১৯৭৫ সালে চতুর্থ সংশোধনীর পরিণতি কী হয়েছিল, তখন তাঁকে কেউ পাল্টা প্রশ্ন করে না কেন যে সেই সংশোধনী তো আপনাদেরই মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষেরা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে উড়িয়ে দিয়েছিল? আর সেই হত্যাযজ্ঞ তো আমাদের গোটা জীবনকে তছনছ করে রেখে দিল।
কথা শেষ হওয়ার নয়। আমরা কি ওই সাংবাদিকদের কথা বলি যারা আজ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখে যান যত্রতত্র? একদা তো ওরাই বাকশালে যোগদান করার জন্য বঙ্গবন্ধুর সামনে ভিড় জমিয়েছিলেন। এমনও সাংবাদিক আছেন যাঁরা গভীর রাতে রাজধানীর বাইরে থেকে মুরগি বোঝাই ট্রাকে চেপে ঢাকায় এসেছেন বঙ্গবন্ধুকে দেখাতে যে তাঁরা তাঁর দ্বিতীয় বিপ্লবের অনুসারী। তাঁরা আমাদের মাঝেই রয়েছেন। আমরা তাঁদের সঙ্গে ওঠা-বসা করি, এক টেবিলে বসে খাই। এই লজ্জা তো আমাদেরই। আর ওই যে সাংবাদিক, যিনি ১৯৭৫-এর নভেম্বরে তাজউদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেছিলেন, তিনি তো পরবর্তীকালে অনেক উন্নতি করেছেন, তাঁকে কি আমরা কখনো প্রশ্ন করেছি তাঁর সেই ভূমিকার বিষয়ে?
আজ আমাদের সকলের জন্য অনুতাপের দিন, প্রায়শ্চিত্ত করার দিন। পিতাকে হত্যা করে কোনো পরিবার প্রশান্তি লাভ করে না, জাতির মুক্তিদাতাকে সপরিবারে নিশ্চিহ্ন করলে জাতির জীবনে আঁধার কেবল ঘনীভূত হতে থাকে, এই সত্য মেনে নেওয়ার দিন আজ। আজ সৃষ্টিকর্তার কাছে করজোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার সময় এসেছে।
সৈয়দ বদরুল আহ্সান: সাংবাদিক

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম

আটলান্টিকের এপারে বিশ্বের তাবত্ বাংলাদেশির মতো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় শোনার জন্য। মেঘ আর সূর্যের লুকোচুরি খেলা চলছিল। আজ ছিল শীত (নিউইয়র্কে তখন ১৮ নভেম্বর, রাত ১১টা)। ঘড়ির কাঁটা যেন এগোতেই চাইছে না। ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বাঙালিদের মনেপ্রাণে উত্তেজনা আর উত্সাহের খবর আসতে লাগল মুঠোফোন মারফত। ‘বিশ্বের রাজধানী’ বলে খ্যাত নিউইয়র্ক শহরের বিভিন্ন স্থানে অন্যান্য শহরের মতোই সমবেত হলো দলমতনির্বিশেষে অসংখ্য বাঙালি। ইতিহাসের কালের সাক্ষী হওয়ার জন্য স্থান-কাল-পাত্রভেদে যার যার সুবিধামতো জড়ো হলো বাঙালি-অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসের গ্র্যান্ড সুইটস রেস্টুরেন্ট ও উডসাইডের ঢাকা ক্লাবে।
আমরা বাংলাদেশ সময় থেকে প্রায় ১২ ঘণ্টা পিছিয়ে থাকায় ১৮ তারিখ সন্ধ্যা থেকেই ভিড় বাড়তে লাগল এসব এলাকায়। সময় কাটিয়ে দেওয়ার জন্য কোনো কোনো স্থানে গান ও কবিতা, আবার কোথাও কেউ কেউ জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে লাগল। সবার মনেই উত্তেজনা। রাত যত বাড়ছে, উত্তেজনা আর উত্সাহ যেন ততই উপচে পড়ছে। একই সঙ্গে ভিড়ও বেড়ে চলল, আর বিভিন্ন স্থান থেকে ফোনে কথা চালাচালি চলছে। যে যা শুনছে, তা-ই তাদের জানা মতে সর্বশেষ খবর হিসেবে অন্য সবাইকে অবহিত করছে। সবার দৃষ্টি টিভির পর্দায়। সময় গড়িয়ে চলছে, রাতও বাড়ছে। কিছুক্ষণ পর রায়ের কথা ভেসে উঠল টিভির পর্দায় (এটিএন বাংলা)। উপস্থিত সবাই ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি দিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল। তারপর মোনাজাত করে শোকরানা আদায় করল। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী সংগঠন সমর্থিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ভাস্বর অগণিত মানুষ দীর্ঘ ৩৪ বছর পর প্রতীক্ষিত রায় শুনে আবেগে আপ্লুত হলো। এই রায়ের ধারাবাহিকতায় দেশে এক এক করে সব হত্যার বিচার হবে—এই আশায় বুক বাঁধল। বিশেষ করে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অতিসত্বর সম্পন্ন করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মধ্যরাতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে যে যার মতো বুকের ভার লাঘব করে ঘরে ফিরল।
ফাহিম রেজা নূর
নিউইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

Friday, November 20, 2009

আইনের জয়কে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করা উচিত -বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি

অবশেষে ৩৪ বছর ঝুলে থাকার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যার বিচারের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে আজ। উচ্চ আদালতে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ পাওয়া পাঁচ আসামির আপিলের চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবেন। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বাকি সাত আসামির একজন মৃত এবং ছয়জন পলাতক থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্ত রাজনৈতিক হত্যার উপযুক্ত বিহিতের মাধ্যমে শোকের ভার ও জাতীয় দায় মিটবে বলে আশা করা যায়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই রায় সব মহলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে এবং একটি কলঙ্কিত অধ্যায়ের অবসান ঘটাবে, এটাই প্রত্যাশিত।
দীর্ঘ ও কণ্টকিত পথ পেরিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারের উপসংহার টানছেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ দিয়ে খুনিদের বিচারের পথ বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই কালো আইনের রাহুগ্রাস থেকে সংবিধান ও দেশ মুক্ত হলেও রাজনৈতিক বাধায় আইনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়েছিল। যত দিন গেছে, হত্যাকারীদের বিচার ও শাস্তির অপরিহার্যতা জাতীয় দাবি হয়ে উঠেছে। হত্যা অপরাধ, রাজনৈতিক হত্যা আরও বড় অপরাধ এবং দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে খুনিচক্র নিঃসন্দেহে চরম বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে। এর বিচার ছাড়া আইনের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা এবং রাজনীতির কলঙ্কমোচন সম্ভব হতো না। এই জাতীয় কর্তব্য পালনের ব্যাপারে কোনো অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এর মূল্যায়নেরও কোনো সুযোগ নেই।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দেবেন, দেশবাসী অবশ্যই তা মেনে নেবে।’ দায়িত্বশীল একটি রাজনৈতিক দলের অবস্থান এটাই হওয়া উচিত। অবশ্য পরে তিনি ভিন্ন ধরনের মন্তব্যও করেছেন। ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের প্রশ্নে রাজনীতির বিষবাষ্প যাতে কাউকে আচ্ছন্ন না করে, সেটাই হবে এই মুহূর্তের প্রত্যাশা। এই বিষয়টি দেশের সব রাজনৈতিক শক্তিকে বিবেচনায় নিতে হবে।
১৯৯৮ সালে নিম্ন আদালতে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রথম রায়ে ২০ আসামির ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হয়। ২০০১ সালে উচ্চ আদালতের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ নিশ্চিতকরণ বেঞ্চ ১২ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট আবার ক্ষমতায় এলে বিচারকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর, গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মামলাটি আবার সচল হয় এবং ২০০৭ সালের ৭ আগস্ট মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত পাঁচ আসামির আপিলের শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে আদালত গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর পাঁচজনেরই লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেন। কিন্তু বিচারকের অভাবে শুনানির প্রক্রিয়া আবার আটকে যায়। এ বছরের ৫ অক্টোবর শুনানির জন্য হাইকোর্টের বেঞ্চ গঠিত হয়। বেঞ্চ টানা ২৯ দিনের শুনানির পর ১২ নভেম্বর রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন ১৯ নভেম্বর।
পঁচাত্তরের ঘাতকচক্র দীর্ঘ তিন দশক যে পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে, তাতে বোঝা যায়, তাদের হাত অনেক দূর প্রসারিত। সংগত কারণেই এ রায় ঘোষণা নিয়ে সরকার সতর্কাবস্থায় রয়েছে। জননিরাপত্তার প্রশ্নটি দায়িত্বের সঙ্গে নজরে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতারা দলীয় নেতা-কর্মীদের সংযত ও দায়িত্বশীল থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আশা করব, আইন জয়ী হবে এবং রাজনৈতিক মহলসহ দেশের সকল মহল এ ঘটনাকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করবে।