Tuesday, January 15, 2019

দেশে চাকরি প্রার্থী কত? by নূর মোহাম্মদ

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ৪৩ পদে নিয়োগে আবেদন পড়ে ৭৩ হাজার প্রার্থীর। সর্বশেষ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১২ হাজার সহকারী শিক্ষক নিয়োগে আবেদন পড়েছে ১৯ লাখ। ৪০তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য আবেদন করেছেন ৫ লাখের বেশি প্রার্থী। প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর আবেদনের এ তথ্যই অনেকটা বলে দেয় দেশের চাকরির বাজারের হাল  হকিকত কেমন? তবে প্রশ্ন হলো, আসলে দেশে মোট চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা কত? বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও সরকারি তথ্যের মধ্যে রকমফের রয়েছে এ বিষয়ে। তবে সব সংস্থার তথ্যই বলছে, দিনে দিনে দেশে শিক্ষিত বেকার বা চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রতি বছর যে পরিমাণই গ্রাজুয়েটস বের হচ্ছেন তাদের কর্মসংস্থান সে হারে হচ্ছে না। এতে প্রতিবছর শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ চাকরির বাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন। যার ফলে চাকরি প্রার্থী এবং বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছে তরুণদের আকৃষ্ট করতে। রয়েছে অধিক সংখ্যায় চাকরির ব্যবস্থা ও চাকরি প্রার্থীর বয়স বাড়ানোর।
দেশে বর্তমানে কতজন চাকরি প্রার্থী আছে তার সঠিক পরিসংখ্যান সরকারি কোনো সংস্থার কাছে নেই। বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, বাংলাদেশে এখন প্রায় ৪ কোটি ৮২ লাখের বেশি তরুণ বেকার। যাদের যোগ্যতা থাকার পরও প্রাপ্ত চাকরি মিলছে না। এজন্য প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে বাজারের কর্মসংস্থানের সমন্বয়হীনতা, বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থানের ধস, জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের সমন্বয় না থাকা, কারিগরি শিক্ষার প্রসারে সরকারের ভুল নীতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে এসব বেকার তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ না দিলে সমাজে বিশৃঙ্খলাসহ নানা ধরনের অপরাধমূলক কাজ বেড়ে যাবে। এজন্য নতুন সরকার তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা বাস্তবায়নে জোরালো উদ্যোগ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতি বছর ৬ লাখের বেশি গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলেও নতুন কর্মসংস্থান পাচ্ছে সর্বোচ্চ ৪০ হাজারের মতো। এতে শুধু চাকরি প্রার্থীই বাড়ছে না, চাকরি নিতে গিয়ে নানা ধরনের অনৈতিক পন্থায় জড়িয়ে পড়ছে অনেকেই। সামাজিকভাবে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে সমাজের উপর। চাকরি দেয়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর তিনটি বড় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের হিড়িক পড়ে। যা অতীতে সব রেকর্ড ভেঙ্গেছে। সম্প্রতি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৪০ হাজার শূন্য আসনের বিপরীতে প্রায় ৩০ লাখ আবেদন পড়ে। মেধা তালিকায় প্রথম থেকে ১৪তম নিবন্ধনধারীরা প্রায় ৭ লাখ আবেদনকারী গড়ে ৬টি করে আবেদন করেছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১২ হাজার সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিপরীতে সারা দেশে প্রায় ১৯ লাখ প্রার্থীর আবেদন পড়েছে। প্রতি পদে বিপরীতে প্রার্থী ১৫৮ জন। প্রার্থী সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় পরীক্ষা নিতে হিমশিত খাচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। কেন্দ্র ও ভেন্যু খুঁজতে গিয়ে দুই দফা পরীক্ষা তারিখ দিয়েও তা স্থগিত করে। সারা দেশে এত সংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা সম্ভব না মনে করে কয়েক দফা পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এ ব্যাপারে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল মানবজমিনকে বলেন, আমাদের ধারণার বাইরে আবেদন পড়েছে। কেউ কল্পনা করতে পারেনি এত সংখ্যক আবেদন পড়বে। বাধ্য হয়ে কয়েক দফায় পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সর্বশেষ ৪০তম বিসিএসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে প্রায় পৌনে ৫ লাখ প্রার্থী আবেদন করেছে। সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, সরকারি চাকরির প্রতি শিক্ষিত যুবকদের আগ্রহ বেড়েছে এজন্য আবেদনের সংখ্যা বাড়ছে। এ ছাড়াও বিসিএসে উত্তীর্ণ হলে এখন ক্যাডার সার্ভিসে না হলেও নন-ক্যাডারে চাকরি পাওয়া যায়। এসব কারণে আবেদনের সংখ্যা বাড়ছে। তবে চাকরির প্রার্থীর তুলনায় চাকরির সংখ্যা কম এটা বলা যায়। পল্লী বিদ্যুতের একটি চাকরি বিজ্ঞপ্তির সংখ্যা উত্থাপন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক আবুল বারাকাত সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, পল্লী বিদ্যুতের পরীক্ষায় ৪৩ পদের বিপরীতে যখন ৭৩ হাজার প্রার্থী আবেদন করে, তখন বুঝতে হবে চাকরি নেই। চাকরির বাজার তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দেশের মানুষের অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে হবে।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে এ খাতের বিশেষজ্ঞতা বলছেন, বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হওয়া এর মূল কারণ। বেসরকারি খাতে চাকরি সংখ্যা কমে যাওয়ায় সবাই সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। তাদের মতে, বেসরকরি খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ার অন্যতম কারণ জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থানের সমন্বয় না থাকা। অর্থাৎ যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে একই হারে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ফলে এই প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান তৈরিতে তেমন ভূমিকা রাখছে না। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না হওয়া এবং সরকারি বিনিয়োগের কার্যকর ব্যবহার হচ্ছে না। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো তথ্যমতে, ২০১৭ সালের ৩৯টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন পরীক্ষায় পাস করেছেন ৫ লাখ ৩১ হাজার ৯৪৬ জন। এ ছাড়াও আরো শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর পাস করে বের হচ্ছে ৮৫ হাজারের বেশি। আর দেশে প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারি প্রায় ২ লাখ কর্মক্ষম মানুষ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যোগ্যতা থাকার পরও এর বেশি অংশ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। একই সঙ্গে সরকারি শূন্যপদগুলোও নিয়মিতভাবে পূরণ হয় না। আর বেসরকারি খাতে বর্তমানে বিশেষজ্ঞ, কারিগরি ও প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষিতদের চাহিদা বেশি। যে কারণে প্রচলিত ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের বেসরকারি খাতে চাকরি পেতে বেগ পেতে হচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও উন্নয়ন গবেষক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, যারা স্বল্পশিক্ষিত তাদের মধ্যে বেকারত্বের সংখ্যা কম। কিন্তু যখন উচ্চ শিক্ষিতের হার বাড়ে তখন বেকারত্বের হারও বাড়ে। এর ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষিত বেকারত্বের স্বাভাবিক কারণ হচ্ছে, যে পরিমাণ জনগোষ্ঠী প্রতিবছর কর্মবাজারে প্রবেশ করছে, সেই পরিমাণ কর্মসৃজন হচ্ছে না। আর শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত পেশাদারিত্বের যে চাকরি, সেই চাকরি সৃষ্টির সংখ্যা কম। ফলে, বেকারত্বের সংখ্যাটা আরো বড়ভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানী তৌহিদুল হক মানবজমিনকে বলেন, বেকাররা চাকরি না পাওয়ায় যে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তাই নয় সামাজিকভাবে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। একদিকে চাকরি না পাওয়ায় এসব শিক্ষিত জনবলকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে বেকারদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে নানা সামাজিক অপরাধে। আর চাকরি না পাওয়ার আশঙ্কা ও হতাশা থেকে উচ্চ শিক্ষিত মেধাবীদের একটি অংশ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। ফলে, তাদের মেধা ও সেবা দেশের কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
দেশের শিক্ষিত বেকার জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করতে সর্বশেষ নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি দেয় আগামী পাঁচ বছরে ১ কোটি ২৮ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির।

মোদি ‘হটাতে’ তৃণমূলের মহাসমাবেশ

‘মোদি হটানো’র লক্ষ্য নিয়ে ১৯ জানুয়ারি ভারতের কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে মহাসমাবেশের আয়োজন করতে যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস। এতে যোগ দেবেন ভারতের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বিরোধী দলের নেতারা। গত বছরের ২১ জুলাই কলকাতায় শহীদ দিবসে তৃণমূল আয়োজিত এক মহাসমাবেশ থেকে ১৯ জানুয়ারি নরেন্দ্র মোদিকে হটানোর মহাসমাবেশের ঘোষণা দেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
তৃণমূলের দাবি, ১৯৯২ সালে পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা থেকে বামফ্রন্টকে হটানোর লক্ষ্যে ‘মৃত্যুঘণ্টা’ বাজিয়েছিলেন তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের বিরোধীদলীয় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার ১৯ জানুয়ারি কলকাতার ব্রিগেড সমাবেশ থেকে কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপির ‘মৃত্যুঘণ্টা’ বাজানো হবে।
মমতা বলেছেন, বিজেপি ২০১৪ সালের নির্বাচনে ২৮২টি আসন পেলেও এ বছর ১০০ আসনও পাবে না। তামিলনাড়ু, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাটে বিজেপির আসন হবে শূন্য। উত্তর প্রদেশে অখিলেশ যাদব, মায়াবতীরা এক হওয়ায় বিজেপির ধরে রাখা ৭২টি আসনের মধ্যে এক–চতুর্থাংশ আসন পাবে না তারা। বিহারে এবার আসন কেড়ে নেবে রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা লালুপ্রসাদ যাদবের দল। ওডিশায় আসন কাড়বে বিজু জনতা দলের নেতা নবীন পট্টনায়ক। আর পাঞ্জাবে কংগ্রেসের অমরেন্দ্র সিং।
ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের সমাবেশকে সফল করার জন্য মমতা কোমর বেঁধে নেমেছেন। এক মঞ্চে ওঠাচ্ছেন বিজেপিবিরোধী বিভিন্ন দল আর নেতাদের।
তৃণমূল জানিয়েছে, ওই সমাবেশে বিজেপিবিরোধী ২০ নেতাসহ আরও বহু নেতা যোগ দেবেন। তাঁদের মধ্যে থাকবেন কর্ণাটকের জনতা দল (সেক্যুলার) নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী এইচ ডি কুমারস্বামী, এই দলেরই ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া, জম্মু কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও ন্যাশনাল কনফারেন্স দলের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ, উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সমাজবাদী দলের নেতা অখিলেশ যাদব, অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও তেলেগু দেশম দলের নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, বিহারের রাষ্ট্রীয় জনতা দলের অন্যতম নেতা ও লালুপুত্র তেজস্বী যাদব, তামিলনাড়ুর ডিএমকে দলের নেতা এম কে স্টালিন, বিহারের লোকতান্ত্রিক জনতা দলের নেতা শারদ যাদব, ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপির বিদ্রোহী নেতা যশোবন্ত সিনহা ও শত্রুঘ্নœসিনহাসহ বিজেপিবিরোধী দলের নেতারা। সব মিলিয়ে ওই দিন বিজেপিবিরোধী ২২টি দলের নেতাদের যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমন্ত্রণ জানালেও এখন পর্যন্ত কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সমাবেশে কারও যোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়নি। এদিকে বাম দল ঘোষণা দিয়েছে, তারা কেউ থাকবেন না মহাসমাবেশে।
১৯ জানুয়ারির সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেছে তৃণমূল। পশ্চিমবঙ্গজুড়ে মহাসমাবেশের বড় বড় তোরণ, পোস্টার, ব্যানার লাগানো হচ্ছে।
জানা গেছে, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তৈরি করা হচ্ছে পাঁচটি মঞ্চ। একটিতে বসবেন মমতাসহ বিভিন্ন রাজ্যের নেতা ও মন্ত্রীরা। আরেকটিতে বসবেন তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কেরা । তৃতীয় মঞ্চে থাকবেন তৃণমূলের বিভিন্ন জেলার নেতারা। আর দুটি মঞ্চে থাকবেন সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষেরা। ৭০০টি লোহার রড দিয়ে গড়া হচ্ছে এই মঞ্চ। এক হাজার মাইক্রোফোন থাকবে। ওয়াচ টাওয়ার, এলইডি টিভি রাখা হচ্ছে সমাবেশস্থলে।
এ ছাড়া বিভিন্ন রাজ্য ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত নেতা–কর্মীদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য থাকছে ১০০টি ক্যাম্প। তাঁদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে গীতাঞ্জলি স্টেডিয়াম, ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্র, উত্তীর্ণ মিলনায়তন, সল্টলেক পৌরসভার খেলার মাঠ ও বিভিন্ন ধর্মশালায়। দুপুর ১২টায় সমাবেশ শুরু হবে। সমাবেশকে সফল করার জন্য থাকবে তৃণমূলের পাঁচ হাজার স্বেচ্ছাসেবক। তৃণমূল দাবি করেছে, সমাবেশে ৩০ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ যোগ দেবে।
তৃণমূল নেতারা বলছেন, ব্রিগেড সমাবেশের দিন তৃণমূল কর্মীরা মমতাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী করার দাবি জানিয়ে স্লোগান তুলবেন।

যেভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছিলাম

এটা এমনই এক নাটকীয় ঘটনা যার মধ্যদিয়ে সৌদি আরবে নারীদের সমস্যার ওপর নতুন করে বিশ্বের নজর পড়েছে। আঠারো বছর বয়সী রাহাফ মোহাম্মদ আল-কুনুন গত সপ্তাহে ব্যাংকক বিমানবন্দরের হোটেল কক্ষে নিজেকে অবরুদ্ধ করেন এবং আর বাড়ি ফিরে যাবেন না বলে ঘোষণা করে বিশ্বব্যাপী বিতর্কের সূচনা করেন।
তিনি তার জন্মভূমি সৌদি আরব থেকে পালিয়েছেন। তাকে ঘিরে টুইটারে এক তীব্র আন্দোলন শুরু হওয়ার পর কানাডার সরকার রাহাফ মোহাম্মদ আল-কুনুনকে আশ্রয় দিয়েছে। সৌদি আরবে নারীদের অধিকার এবং মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক যখন চলছে তখন রাহাফ আল-কুনুনের মতো আরো একজন নারী এর আগে দেশ থেকে পালিয়ে কানাডায় আশ্রয় নিয়েছেন। তার নাম সালওয়া। চব্বিশ বছর বয়সী এই নারী তার এক বোনকে নিয়ে সৌদির আরব থেকে পালিয়ে কানাডায় চলে যান।
এখানে তার নিজের বর্ণনাতেই পড়ুন তার কাহিনী: ঘর থেকে পালানোর প্রস্তুতি ছয় বছর ধরে, আমরা দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করছিলাম। কিন্তু এটা করতে হলে আমাদের পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হতো। এই কাগজগুলো জোগাড় করতে হলে আমার অভিভাবকের সম্মতি লাগতো।
(সৌদি আরবে নারীদের বহু কিছু পেতে হলে পরিবারের পুরুষ অভিভাবকের সম্মতির প্রয়োজন হয়।) সৌভাগ্যক্রমে আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলাম তখন আমার একটি জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করা হয়েছিল। আমার একটি পাসপোর্টও ছিল। কারণ একটি ইংরেজি ভাষা পরীক্ষার জন্য পাসপোর্টের দরকার হতো। কিন্তু আমার পরিবার এগুলো আমার কাছ থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাই, যেকোনো উপায়ে আমাকে ওই কাগজগুলো জোগাড় করা দরকার হয়ে পড়েছিল। তাই আমি আমার ভাইয়ের বাড়ির চাবি চুরি করি। এরপর চাবি তৈরির দোকানে গিয়ে সেগুলোর নকল তৈরি করি।
আমি লুকিয়ে বাড়ি থেকে বের হই। কাজটা ছিল খুবই বিপজ্জনক। ধরা পড়লে সমূহ বিপদ ছিল। এভাবে নকল চাবি হাতে আসার পর আমার এবং আমার বোনের পাসপোর্ট দুটি আমার হাতে চলে আসে। একদিন আমার বাবা যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন আমি তার মোবাইল ফোনটি ব্যবহার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তার অ্যাকাউন্টে লগ-ইন করি এবং সেখানকার রেজিস্টার্ড ফোন নাম্বারটি বদলে আমার মোবাইল নাম্বার দিয়ে দেই। তার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেই আমি দেশ ত্যাগের জন্য আমার বাবার অনুমতিপত্র জোগাড় করি। যেভাবে ছাড়তে হলো দেশ: একরাতে সবাই যখন ঘুমোচ্ছিল তখন আমরা দুই বোন গোপনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। আমরা গাড়ি চালাতে জানি না। সেজন্য ট্যাক্সি ডাকি। ঘটনাচক্রে সৌদি আরবে বেশির ভাগ ট্যাক্সি ড্রাইভার হলেন বিদেশি। ফলে, দুজন নারী নিজেরাই বিমানবন্দরে যাচ্ছেন, এটা নিয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভারের মনে কোনো প্রশ্নের উদয় হয়নি। আমরা রিয়াদে বাদশাহ খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দিকে রওনা হলাম।
কেউ যদি এটা লক্ষ্য করতো এবং যদি আমরা ধরা পড়তাম, তাহলে নির্ঘাত আমাদের মৃত্যু হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছরটিতে আমি এক হাসপাতালে কাজ করে যে কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। তা দিয়েই আমরা বিমানের টিকিট এবং জার্মানিতে ট্রানজিট ভিসা জোগাড় করি। সৌদি বেকার ভাতার কিছু অর্থও আমি জমিয়ে রেখেছিলাম। যাই হোক, আমার বোনকে সঙ্গে নিয়ে আমি জার্মানিগামী বিমানে উঠে বসি। এটা ছিল আমার প্রথম বিমান ভ্রমণ। সেই অভিজ্ঞতা ছিল অনন্য। একদিকে যেমন খুশি ছিলাম, অন্যদিকে বেশ ভয়ও লাগছিল। বাড়ির সবাই সকালে ঘুম থেকে উঠে যখন দেখলো আমরা দুই বোন বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছি তখন আমার বাবা পুলিশে খবর দেন।
কিন্তু যেহেতু আমি বাবার ফোন নাম্বার বদলে দিয়েছিলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা যখনই বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিল, সেই কলগুলো আমার ফোনে বেজে উঠছিল। জার্মানিতে বিমান নামার পরও আমি তাদের কাছ থেকে টেক্সট মেসেজ পাচ্ছিলাম। যেখানে যাত্রার শেষ; সৌদি আরবে আমাদের যেটা ছিল, তাকে ঠিক জীবন বলা চলে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে আমি বাড়িতে বসে থাকতাম। সারাদিন কিছুই করার ছিল না। এটা আমাকে খুব কষ্ট দিতো। আমাদের শেখানো হয়েছিল পুরুষরা মেয়েদের চেয়ে সব দিকে থেকে ভালো। রমজান মাস এলে আমাকে রোজা রাখার জন্য জোরজবরদস্তি করা হতো। জার্মানিতে পৌঁছানোর পর আমি লিগাল এইড গ্রহণ করলাম এবং একজন আইনজীবী খুঁজে বের করলাম, যিনি আমাকে রাজনৈতিক আশ্রয় পেতে সাহায্য করেছিলেন। তার সাহায্যে আমি কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়ার আবেদনপত্র পূরণ করলাম। কানাডাকে আমি বেছে নিয়েছিলাম, তার কারণ দেশটির মানবাধিকার রক্ষার রেকর্ড খুবই ভালো। সিরিয়ার শরণার্থীদের যেভাবে কানাডা আশ্রয় দিয়েছিল, সেই খবর আমি আগ্রহ নিয়ে পড়েছিলাম। তাই আমি ভাবলাম, কানাডাই হবে আমার থাকার জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা। আমার আবেদনপত্র গৃহীত হওয়ার পর আমি জার্মানি থেকে কানাডার শহর টরন্টোতে চলে আসি। যেদিন টরন্টোতে এসে নামলাম, বিমানবন্দরে কানাডার পতাকা দেখে মনটা ভরে গেল। এখন আমি আমার বোনকে নিয়ে মন্ট্রিয়াল শহরে থাকি। এখানে আমার জীবনে কোনো শঙ্কা নেই। কোনো কিছুর জন্য কেউ আমাকে আর চাপ দেয় না। সৌদি আরবে টাকা-পয়সা হয়তো অনেক বেশি, কিন্তু এখানে রয়েছে ব্যক্তি স্বাধীনতা। আমার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আমি যখন খুশি বাইরে যেতে পারি। কারও অনুমতি লাগে না। এখানকার জীবন নিয়ে আমি সত্যি খুব খুশি। এখনকার প্রকৃতিতে হেমন্তের দৃশ্য আর বরফ পড়া দেখতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি এখন ফরাসি ভাষা শিখছি, সাইকেল চালানো শিখছি, সাঁতার কাটা শিখছি। আইস স্কেটিং শিখছি। আমার মনে হচ্ছে জীবনটাকে নিয়ে সত্যি ভালো কিছু করছি। আমার পরিবারের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। আমার মনে হয় একদিক থেকে সেটা দুপক্ষের জন্যই ভালো হয়েছে। এখন আমার বাড়িঘর এখানেই। এই জীবনই আমার জন্য ভালো।

লাগবে না আর গাড়িভাড়া

লুক্সেমবার্গে আগামী মার্চ থেকে গণপরিবহনে আর ভাড়া লাগবে না। ইউরোপের সবচেয়ে ছোট দেশ লুক্সেমবার্গ। জনসংখ্যা ৬ লাখ ২ হাজার। দেশটিতে যানজট এখনো বড় সমস্যা। অচিরেই এর সমাধান হতে চলেছে। গত মাসে দেশটি ঘোষণা দেয়, ট্রেন, ট্রাম, বাসসহ সব ধরনের গণপরিবহনে বিনা মূল্যে চড়ার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। মার্চ থেকে তা কার্যকর হবে।
আজ মঙ্গলবার সিএনএনের খবরে জানানো হয়, দেশটির গণপূর্ত ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড্যানি ফ্রাঙ্ক বলেন, এই উদ্যোগের ফলে যানজট সমস্যার সমাধান হবে। পরিবেশের জন্যও এটা ভালো হবে।
ইউরোপের অন্যতম ধনী দেশ লুক্সেমবার্গ। ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে লুক্সেমবার্গের মাথাপিছু জিডিপি সবচেয়ে বেশি। তবে দেশটি আয়তনে মাত্র ২ হাজার ৫৮৬ বর্গকিলোমিটার হওয়ায় জায়গার সংকট তীব্র। টেকসই উন্নয়ন ও অবকাঠামো ষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০১৭ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে লুক্সেমবার্গে প্রতি হাজারে ৬৬২ জনের গাড়ি ছিল। ওই বছর এই দেশের গাড়ির চালকেরা গড়ে ৩৩ ঘণ্টা যানজটে আটকা ছিলেন।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গোটা দেশে গণপরিবহন সেবা আছে। প্রতিবছর এর পেছনে সরকারের খরচ ৫৬ কোটি ২০ লাখ ডলার। প্রতিবছর টিকিট বিক্রি করে পাওয়া যায় ৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। গণপূর্ত ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড্যানি ফ্রাঙ্ক বলেন, দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় আছে। বিনা মূল্যে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে জনগণকে উন্নত অর্থনীতির সুফল দিতে চায় রাষ্ট্র।
লুক্সেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভূমি ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা লুক্সেমবার্গ ইনস্টিটিউট অব সোসিও-ইকোনমিক রিসার্চের অধ্যাপক জেফরি কারুসো বলেন, চাকরির জন্য লুক্সেমবার্গ বেশ আকর্ষণীয়। অনেকে উচ্চ বেতনের চাকরি করেন। জীবনমানও তাই অনেক উন্নত। তবে বিনা মূল্যে ভ্রমণের সুযোগ কিছুটা বিড়ম্বনার জন্ম দিতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁর। তিনি বলেন, আগে যাঁরা হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে অল্প দূরত্বের পথ পাড়ি দিতেন, তাঁরা এখন এর বদলে চট করে বাসে উঠে পড়বেন। তবে তিনি মনে করেন, সরকারের এই উদ্যোগের কারণে মানুষ এখন নিজের গাড়ি নিয়ে রাস্তায় কম বের হবেন। এতে যানজট কমবে।

অটিজমদের জন্য বিশ্বের প্রথম উপনগরী তৈরি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে

বিশ্বে প্রথম অটিজমে আক্রান্তদের জন্য কলকাতার অদূরে একটি আলাদা উপনগরী গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগণার উস্তিতে শিরাখেলে ৫২ একর জমির উপরে এই উপনগরীতে অটিজম নিয়ে সুসংহত উন্নয়ন কর্মসুচি রূপায়নের কাজ হবে। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সুরেশ সোমানি ও রতœাবলী গ্রুপের উদ্যোগে গঠিত ইন্ডিয়া অটিজম সেন্টার এই উপনগরী গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে। এই উপনগরীতে অটিজম শিশুদের থাকার ব্যবস্থা যেমন থাকবে তেমনি থাকবে এদের আগামী দিনে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নানা কমসুচি রূপায়নের মত ব্যবস্থাও।
একই ছাতার তলায় থাকবে হাসপাতাল, স্কুল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। এছাড়া অটিজম নিয়ে আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগের কাজও হবে। উল্লেখ্য, সুরেশ সোমানির পুত্রও অটিজম আক্রান্ত। সেখান থেকেই তিনি অটিজম নিয়ে ভাবতে শুরু করেন।
তারই পরিণতিতে গড়ে উঠছে এই উপনগরী। সম্প্রতি অটিজম সংক্রান্ত এক আলোচনা চক্রে সুরেশ সোমানি বলেছেন, এই সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, অটিজমে আক্রান্তদের প্রত্যেককে সুষ্ঠু চিকিৎসা দেওয়া। ভারত সহ গোটা বিশ্বে অটিজম চিহ্নিত শিশুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে প্রতি ৬৮ জন শিশুর মধ্যে একজন অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত।
অথচ, অটিজম নিয়ে সকলের সচেতনতা এবং জ্ঞান খুব কম। শিশুদের মধ্যে অটিজম সময়মত চিহ্নিত করার বিষয়টিও ভারতের মত দেশে খুবই অবহেলিত। অনেকে আবার অটিজমকে মানসিক রোগের সঙ্গে গুলিয়েও ফেলেন। কলকাতায় অটিজম সেন্টার আয়োজিত আন্তর্জাতিক আলোচনা চক্রে প্রায় ২৮ জন বিশেষজ্ঞ এই রোগের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেই আলোচনায় যেমন উঠে এসেছে রোগটি মোকাবেলায নানা চিকিৎসার কথা, তেমনি উঠে এসেছে নানা গবেষণার কথাও। বিহেভিয়ার মনস্তস্তও এই আলোচনাচক্রে গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের উদ্বেগের দিকটি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।

৫০ আসনের ৪৭টিতেই অনিয়ম -টিআইবির নির্বাচন পর্যালোচনা প্রতিবেদন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি। সংস্থাটির নির্বাচন পর্যালোচনা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, যে ৫০ টি আসনে গবেষণা করা হয়েছে এর মধ্যে ৪৭টিতেই কোন না কোন অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪২টি আসনের একাধিক কেন্দ্রে প্রশাসন  ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর ভূমিকা ছিলো নীরব। ৪১ টি আসনে জাল ভোট দেয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগের রাতে সিল মেরে রাখা হয় ৩৩ আসনে। বুথদখল ও জালভোট পড়ে ৩০ আসনে। পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে যেতে বাধা ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয় ২৯ আসনে। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা ও জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয় ২৬ আসনের।
ভোট শেষ হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায় ২২টি আসনের একাধিক কেন্দ্রে । এ সব অনিয়মের ব্যাপারে বিচারবিভাগীয় তদন্তের সুপারিশ করেছেন টিআইবি।
আজ ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা’ শীর্ষক প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, দৈবচয়নের মাধ্যমে ৩০০ টি আসনের মধ্যে ৫০ টি আসনে এই পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে ৪৭ টি আসনেই কোন না কোন অনিয়ম হয়েছে। তিনি বলেন, এটাকে আংশিক অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলা যেতে পারে, কারণ সবদলের  প্রার্থী অংশ নিলেও সবার সমান প্রচারণার সুযোগ ছিলো না। বিশেষ করে ভোটারদেরও তাদের অধিকার অনুযায়ী, পছন্দ অনুযায়ী ভোট দেয়ার সমান সুযোগ ছিলো না। কোন কোন কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের ঢুকতে দেয়া হয়নি।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মারা, অনেক কেন্দ্রে ভোটারকে ভোট দিতে না দেয়া, বুধ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মারা, জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে। অনিয়ম তুলে ধরে বলেন, ভোট শুরুর আগেই কোথাও কোথাও ব্যালট বাক্স্র ভর্তি হয়ে যায়, ভোট শেষ হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা তুলে ধরে টিআইবর নির্বাহী পরিচালক বলেন, তাদের প্রত্যাশিত নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতা দেখা গেছে। বিশেষ করে সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরী করতে নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি। তার যথেষ্ঠ তথ্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করে তিনি। বলেন, প্রতিপক্ষকে দমনে সরকারি দলের সহায়ক অবস্থানে দেখা গেছে কমিশনকে। সবদলের প্রার্থীদের সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি তারা। আচরণবিধি পালনের ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ দেখা গেছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরীতে ব্যাপক ব্যর্থতা দেখা গেছে এবং এ ব্যাপারে কমিশনের ভেতরে মতদ্বৈততা লক্ষ্য করা গেছে- এটা অভূতপূর্ব বিষয়।

মাছ চাই, না বড়শি চাই? by আশির আহমেদ

এটা একটা জনপ্রিয় চাইনিজ ছোট গল্প। ছেলে মাছ খেতে চাইলো। সরাসরি মাছ দিলে, সে একবারই মাছ খাবে। সাময়িকভাবে খুশি হবে। বাবা তাকে সেই সুযোগ দিলেন না। মাছ না দিয়ে ধরিয়ে দিলেন একটা বড়শি। মাছ ধরা শিখিয়ে দিলেন। ছেলের প্রথম কয়েকটা দিন কষ্টে কাটলো। কিন্তু মাছ ধরার কৌশলটা জানার কারণে সে সারা জীবন মাছ খেতে পারলো।
আপনি কী চাইবেন? মাছ? না কী মাছ ধরার কৌশল? 
১. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জরাজীর্ণ অবস্থায় ছিল জাপান। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি কোনো অবকাঠামোই তো অবশিষ্ট ছিল না। ছিল না তেমন কোনো প্রাকৃতিক সম্পদ। দেশটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে বিশ্বব্যাংক থেকে টাকা ধার নিলো। সেই টাকা দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসার অবকাঠামো তৈরি করলো। শিনকানসেন (পৃথিবীর দ্রুততম ট্রেন) টানলো, বড় বড় শহরগুলোকে হাইওয়ে দিয়ে কানেক্ট করলো। শত শত ফ্লাইওভার তৈরি হলো, পাহাড়ের ভেতরে সমুদ্রের নিচে টানেল তৈরি হলো। মজার ব্যাপারটি হলো- বিদেশ থেকে কোনো শ্রমিক আমদানি করলো না।
কোম্পানিগুলোর ম্যানেজার বাইরে থেকে আনলো না। টয়োটা, হোন্ডা, তোসিবা, সনি, হিটাচি এমন শত শত কোম্পানি কাজ করে দিলো নিজেদের লোক দিয়ে। সিইও থেকে শুরু করে ম্যানেজার, শ্রমিক সবই জাপানি। নিজেদের কর্মদক্ষতা বাড়লো, অভিজ্ঞতা বাড়লো। এই কোম্পানিগুলো কোথাও টেন্ডারে অংশগ্রহণ করলে বা কোনো কর্মচারী চাকরিতে আবেদন করলে কেউ বলতে পারবে না- যাহ তোদের অভিজ্ঞতা নেই, আগে অভিজ্ঞতা নিয়ে আয়, তারপর চাকরি।
জিডিপি হু হু করে বাড়তে লাগলো। ধারের টাকা ফেরত দিয়ে ২০ বছরের মাথায় আমেরিকাকে, বিশ্বব্যাংকে উল্টো ঋণী করে ফেললো। শুরু থেকেই জাপান বাইরে থেকে কোনো প্রডাক্ট কেনেনি। টেকনোলজি আমদানি করেছে।
ধরুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যকলাপ ধারণ করার জন্য ক্যামেরা লাগবে। ওনারা তিনজন নয় ছয়জন লোক পাঠাবেন। ক্যামেরা যাচাই বাছাই করার জন্য নয়। ক্যামেরা কিভাবে বানাতে হয় সেই টেকনোলজি শিখে মগজে ভরে আনার জন্য। যেন দেশে এসে শুধু প্রধানমন্ত্রীর জন্যই নয়, সাধারণ জনগণ ও এফোর্ড করতে পারে এমন ক্যামেরা বানাতে পারেন। নিজ দেশে কাজে লাগলে অন্য দেশেও কাজে লাগবে। রপ্তানি করো, আরো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করো। জিডিপি বাড়াও।
মাছ চাইলেই মাছ নয়, মাছ ধরার কৌশলটা শিখিয়ে দাও।
২. মালয়েশিয়ার মাহাতির মুহম্মদ জাপানে পড়াশোনা করেছেন। ক্যাপাসিটি বিল্ড করার জাপানিদের এই কৌশলটি শিখে গেলেন। আশি ও নব্বইয়ের দশকে স্ট্রাটিজিক্যালি দলে দলে মালয় গোষ্ঠীকে বিদেশে পাঠালেন। পড়াশোনার জন্য। স্কিল ডেভেলপমেন্ট এর জন্য। আমেরিকা, ইউরোপ আর জাপান। বিদেশ থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গেই সেই বিদ্যা কাজে লাগানোর মতো জায়গায় সেট করে দিলেন। প্রোডাক্টিভিটি বাড়লো, আয় বাড়লো। ম্যানেজার শ্রেণির লোক তৈরি হলো। বিদেশ থেকে যা আমদানি করলো তা হলো শ্রমিক শ্রেণির লোক। যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসার অবকাঠামো তৈরি হলো। নিজের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেন। এখন আর মালয় ছাত্রদের তেমন বিদেশে যেতে হচ্ছে না। বরং বাইরে থেকে মালয়েশিয়াতে বিদেশি ছাত্র আসা শুরু করেছে। চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে না।
জাপানি কোম্পানিগুলোকে ইনভেস্ট করার উইন উইন সিচুয়েশন তৈরি করে দিলেন। জাপানিরা ইনভেস্ট করলেন। গাড়ি কোম্পানি, হোম ইলেক্ট্রনিক্স কোম্পানি। মাহাতির এর দল স্ট্রাটিজিটা এমনভাবে করলেন যাতে টেকনোলজিটা ট্রান্সফার হয়। স্কিল ডেভেলপমেন্ট হয়। ৫০ বছরে জাপান যা টেকনোলজি ডেভেলপ করেছে তা যেন পাঁচ বছরে ট্রান্সফার হয়। তার ফলাফল দেখেন। ’৮৫-র দিকে মালয়েশিয়ান ব্র্যান্ডের প্রোটন সাগা (মিতসুবিশি জয়েন্ট ভেঞ্চার) গাড়ি বাজারে এলো।
আর আমরা আমাদের মন্ত্রী, এমপিদের জন্য বিনা ট্যাক্সে কিভাবে গাড়ি আমদানি করতে পারি সেই পলিসি বানিয়ে দিলাম। অথচ আমাদের প্রগতি, র‌্যাংগস বা সদ্য ওঠা ওয়ালটন দিয়ে গাড়ির ১০% জিনিস ও তৈরি করে শুরুটা করলে কেমন হতো? ইতিমধ্যে মেইড ইন বাংলাদেশ একটা ব্র্যান্ড বেরিয়ে আসতো না? কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান হতো না? টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট, স্কিল ডেভেলপমেন্ট হতো না? সেই শুরুটা আজো সম্ভব। বেটার লেইট দ্যান নেভার।
ক্যামেরা থেকে শুরু করে হোম-ইলেক্ট্রনিক্সের এমন কোনো জাপানি প্রোডাক্ট নেই যাতে মেইড ইন মালয়েশিয়া লেখা নেই। একবার ম্যানচেস্টার থেকে জাপানি ফ্লাইটে করে জাপান ফিরছি। মুসলিম হালাল ফুড অর্ডার দিয়ে রেখেছিলাম। দেখি বাক্সে হালাল একটা সিল দেয়া। লেখা Certified by MHCTA (Malaysian Halal Consultation and Training Agency)। কত জায়গায় এদের বিচরণ।
৩. ২০১০ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। বাংলাদেশের একজন নামকরা অর্থনিতিবিদ গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। জেমস ওয়াট নামের যে বৈজ্ঞানিক স্টিম ইঞ্জিন আবিষ্কার করেছিলেন, তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন ইন্সট্রুমেন্ট মেকার ছিলেন। গ্লাসগো শহরটা ঘুরিয়ে দেখালেন। শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা, ওয়াটার সাপ্লাই, পার্ক, টাউন হল ইত্যাদি। গ্লাসগো সেন্ট্রাল রেলওয়ে স্টেশনটা তৈরি হয়েছে ১৮৭৯ সালে। অন্যান্য অবকাঠামোগুলোও একই সময়ের তৈরি। বৃটিশ সরকার আমাদের দেশগুলো থেকে ট্যাক্স কালেক্ট করেছেন আর ব্যয় করেছেন জনস্বার্থে। অর্থনিতিবিদ বললেন, আর আমাদের অবস্থা দেখেন- শাহজাহান সাহেব আমাদের অবকাঠামোতে মনোযোগ না দিয়ে বানালেন তাজমহল, নিজের জন্য। জনগণের জন্য নয়। শায়েস্তা খাঁ টাকায় আট মণ চাল খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। যারা কিনলো তাদের উপকার হলো, কিন্তু যে চাল তৈরি করলো সেই কৃষকের বারোটা বাজলো। আট মণ চাল মানে ১৪ মণ ধান। ১৪ মণ ধান বিক্রি করে মাত্র এক টাকা আয় হতো। গরিব কৃষক গরিবই রয়ে গেল।
(৫) ১৯৯৬ সালের কথা। ভারতে আইটি সেক্টরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বেড়েই চলছে। ভারতের সরকার বড় তিনটি কোম্পানির প্রধানদের ডাকলেন। ইনফোসিস, টাটা আর আজিম প্রেমজির উইপ্রোকে। ডেকে বললেন, দেশের উন্নতির জন্য আপনাদের কন্ট্রিবিউশন অনেক। সরকারের কাছে কী আপনাদের কিছু চাওয়ার আছে? তিন কোম্পানিই অবাক হলেন। বললেন, আমাদের একমাস সময় দেন। আমরা একটা লিস্ট দেব। ওনারা এক সপ্তাহ পরেই একটা উইশ লিস্ট দিলেন। তিন কোম্পানির তিন দাবি- (ক) Stay away from us (খ) Stay away from us (গ) Stay away from us।
জাপানের জাইকা আমাদের অনেক সাহায্য করেন। আমরা খুশি। এই খুশিটাকে স্বল্পমেয়াদী না করে দীর্ঘমেয়াদী করা চাই। শুনে থাকবেন বছর দুই আগে জাপানি সরকারের সঙ্গে আমাদের ৬০ বিলিয়ন ইয়েন এর একটা চুক্তি সই হয়েছে। বলেন তো দেখি এই টাকা কী সাহায্য? না কী ধার?  ধার নিচ্ছে কে ফেরত দিচ্ছে কে? আমরা যদি ধারই নিয়ে থাকি, তাহলে এই টাকাটা কন্ট্রোল করছে কে? প্ল্যান করছে কে, ইমপ্লিমেন্ট করছে কে? কতটাকার প্রোডাক্ট কিনছি? কত টাকার টেকনোলজি কিনছি? কতটাকার স্কিল ডেভেলপমেন্ট হচ্ছে? টাকাটা ফেরত দিচ্ছি কবে? 
জাপান আমাদের একটা বন্ধু দেশ। প্রোডাক্ট না চেয়ে টেকনোলজি চাইলে ওনারা ‘না’ করবেন না। আমরা মাছ চাচ্ছি না কি মাছ ধরার টেকনোলজি চাচ্ছি, এই সিদ্ধান্ত দেয়ার দায়িত্ব আমাদের।

বাংলাদেশে বিকল্প খুঁজতে হবে ভারতকে by ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রসঙ্গ এলে গড়পড়তা যেকোনো ভারতীয়ই হয়তো অত পাত্তা দেবেন না। দেশটিকে অনেকে মনে করেন খুবই হতদরিদ্র, যেটি কিনা কেবল ঝাঁকে ঝাঁকে অবৈধ অভিবাসী ও ইসলামিস্ট মৌলবাদী রপ্তানি করে। কিন্তু ভারতের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তাব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গি এ ব্যাপারে একেবারেই ভিন্ন। তাদের কাছে বাংলাদেশ খুব গুরুত্বপূর্ণ এক কৌশলগত আংশীদার ও বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশী। গত সপ্তাহে টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি এই কর্তাব্যক্তিদের অব্যাহত সমর্থন এই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে, তাকে ছাড়া নয়াদিল্লির ঢাকা নীতি টিকবে না।
কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিরোধী শিবির ভীত ও বিদীর্ণ হয়ে গেছে। শেখ হাসিনার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেছে আদালত। তিনি এখন জেলে। যদিও খালেদা জিয়া এক সময় ভারতের নির্দয় শত্রু ছিলেন, নয়াদিল্লি কিন্তু একবার তাকে ও তার ছেলে তারেক জিয়াকে সমর্থন দিতে রাজি হয়েছিল।
কিন্তু তারা ভারতের বিশ্বাসের পিঠে ছুরি বসান। বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে ইচ্ছামতো কাজ করার সুযোগ দেন।
সেই বিশ্বাসঘাতকতা নয়াদিল্লির জন্য হতভম্ভকর ছিল। এরপর থেকে বেগম জিয়াকে আর বিশ্বাস করেনি ভারত। সেই থেকে বাংলাদেশে নয়াদিল্লির কেবল একটিই কার্ড: শেখ হাসিনা। কিন্তু এটি একেবারে আকাক্সিক্ষত কোনো পরিস্থিতি নয়। শেখ হাসিনা ও তার দলের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর চিড় ও হতাশা তৈরি করেছে। এমন পরিস্থিতি যেকোনো একদলীয় শাসন ও কার্যক্ষম বিরোধী দল না থাকারই এক অনিবার্য পরিণতি।
শীর্ষে থাকা দুই নেতা শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার মতো কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা বাংলাদেশ দুর্ভাগ্যজনকভাবে সৃষ্টি করতে পারেনি। এ কারণে নয়াদিল্লির পছন্দ আরও সীমিত হয়ে গেছে।
কিন্তু এরপরও বাংলাদেশিদের অনুভূতি ও আকাক্সক্ষা নিয়ে সংবেদনশীল হতে হবে ভারতকে। বাংলাদেশের ব্যাপকভাবে বর্ধিষ্ণু মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যারা দেশের রাজনীতির উঠাপড়া নির্ধারণ করে; ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে যেখান থেকে আসে, সেই মধ্যবিত্তদের মধ্যে ভারত নিয়ে মিশ্র অনুভূতি রয়েছে। ভারতীয়রা বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে ও নেতিবাচক আচরণ করে- এ নিয়ে এই মধ্যবিত্তদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তারা এ-ও বিশ্বাস করে, দেশে নয়াদিল্লি অতিমাত্রায় প্রভাব বিস্তার করছে। এছাড়া রাজনীতির সকল ক্ষেত্রে ভারত প্রভাবিত করে। তাদের এই ধারণা কিন্তু অমূলক নয়।
নয়াদিল্লি বাংলাদেশে শেখ হাসিনার কোনো বিকল্প দেখে না। তিনি একজন নির্ভরযোগ্য বন্ধু যিনি কিনা ভারতের উদ্বেগ নিয়ে সংবেদনশীল। এই আংশীদারিত্ব অতীতে ফলদায়ক ছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আর কতদিন? একজন রাজনৈতিক নেতা ও দলের সঙ্গে অংশীদারিত্ব কি চিরকাল ধরে চলতে পারে? এই প্রশ্ন খুব শিগগিরই আরও জরুরি হয়ে দেখা দিতে পারে কারণ বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়তে যাচ্ছে। এর প্রথম কারণ হলো অর্থনীতি। এরপর হলো ভূ-রাজনীতি।
বাংলাদেশ একটি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’- এই ধারণা ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। শক্তিশালী রপ্তানিমুখী অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বদৌলতে, দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬ শতাংশ ছিল ২০০৯ থেকে। নয় বছরে চরম দারিদ্র্যে বসবাস করা বাংলাদেশির সংখ্যা ১৯ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশেরও কমে এসে পৌঁছেছে।
উদীয়মান এই অর্থনীতি কয়েক লাখ ভারতীয়কে বাংলাদেশে আকৃষ্ট করেছে যারা দেশটির গার্মেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসাখাতে কাজ করেন। বাংলাদেশের অর্থনীতি যত এগোবে সুযোগ ততই খুলবে। ভারতীয়রা লাভবান হবে যদি এই ভালো সম্পর্ক বজায় থাকে।
নতুবা চীন চলে আসবে। দেশটি ইতিমধ্যেই কৌশলগত ক্ষেত্রে এগিয়েছে। পাকিস্তানের পর চীনা সমরাস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বাংলাদেশ। চীন থেকে ট্যাংক, বিমান ও সাবমেরিন কিনেছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা মনে করেন, এই অঞ্চলে আরো বড় ভূমিকা পালন করবে চীন। তিনি বেশ আগ্রহসহকারে দেশের অবকাঠামোতে চীনা বিনিয়োগ চেয়েছেন।
চীন বাস্তবায়ন করছে এমন বড় ধরনের প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৩৭০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিতব্য ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু ও চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্প। নয়াদিল্লি ও রাজধানীর সংবাদমাধ্যম মূলত পশ্চিমে বিশেষ করে পাকিস্তানে চলমান কৌশলগত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিভোর। কারণ, পাকিস্তানে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করছে চীন। কিন্তু ভারতের পূর্বে চীন আরো বৃহৎ ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
এর মধ্যে বিশেষ উদ্বেগের কারণ হলো মিয়ানমারে চীনের কৌশলগত প্রকল্পসমূহ। দুই মাস আগে মিয়ানমারের ক্যাউকপ্যু শহরে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণে চীন চুক্তি করেছে। চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি সংস্থা ১৩০ কোটি ডলার ব্যয়ে এই বন্দর নির্মাণ করবে। ৭০ শতাংশ অর্থায়ন করবে চীন। বন্দর পরিচালনায়ও থাকবে দেশটি।
বিশ্লেষকরা দেখিয়েছেন, এই গভীর বন্দর বঙ্গোপসাগরের বিপরীতে অবস্থিত। বিশাখাপত্তমের কাছে ভারতের নির্মিতব্য সাবমেরিন ঘাঁটি থেকে এটি বেশি দূরে নয়। ক্যাউকপ্যু নির্মাণ শেষ হলে ভারতের চারপাশে একাধারে কয়েকটি (পাকিস্তানে গাদার ও শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা) বন্দর নির্মাণ শেষ করবে চীন।
পাকিস্তানের ক্রমশই বেড়ে চলা ঋণের বোঝা ও চীনের ওপর সম্পূর্ণ সামরিক নির্ভরতার কারণে দেশটির অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ কার্যত ইসলামাবাদ থেকে বেইজিংয়ে চলে গেছে। ধীরগতিতে হলেও শ্রীলঙ্কায়ও একই ধরনের প্রক্রিয়া চলছে। শ্রীলঙ্কায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শক্তিশালী চীন-পন্থী লবির উত্থান হয়েছে। এই লবির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসে। এটি একেবারেই নির্ভুল, বেইজিংয়ের কৌশলগত লক্ষ্য হচ্ছে ভারতকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে ধরে ভারতকে ঠেকানো। খুব অবাক হওয়ার বিষয় নয়, বেইজিং বাংলাদেশেও কাজ শুরু করে দিয়েছে।
বেশ কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামের দক্ষিণে সোনাদিয়ায় একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করতে চেয়েছিল চীন। নির্মাণের শর্ত বেশ বিপজ্জনক ছিল। নিশ্চিতভাবেই এটি ছিল বেইজিংয়ের ‘ঋণ কূটনীতি’র অংশ। জাপান এগিয়ে না এলে বাংলাদেশ হয়তো ওই টোপ গিলতো। জাপান আরো ভালো ও নিরাপদ প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়। এখন কক্সবাজারের পাশে মাতারবাড়িতে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ করছে জাপান। সেখানে একটি ১২০০ মেগাওয়াটের বিরাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল ও অন্যান্য সুবিধাও থাকবে। বলা হচ্ছে, এই প্রকল্প হলো এই অঞ্চলকে শিল্প করিডরে পরিণত করার বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ। এটি হবে এশিয়া ও বাকি বিশ্বে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ দ্বার। খুবই অনুকূল শর্তে এই প্রকল্পের বেশিরভাগ অর্থায়ন করছে জাপান।
সেবার বাংলাদেশে ভারতের স্বার্থ যেন জাপানই উদ্ধার করে দিয়েছে। কিন্তু ঢাকা এখনও বিভিন্ন বিকল্প খুঁজছে। আর চীন কিন্তু অতীতে নিজেদের স্বার্থ এগিয়ে নিতে বিদেশি রাজনীতিবিদ বা কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে পর্যন্ত পিছপা হয়নি। ভারতের জন্যও সম্ভবত সময় এসেছে বাংলাদেশে নিজের রাজনৈতিক সংযোগ আরও বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় করার।
(ইন্দ্রনীল বন্দ্যোপাধ্যায় একজন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষক। তার নিবন্ধটি ভারতের এশিয়ান এইজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।)

সৌদি অবরোধ সত্ত্বেও কাতারের অর্থনীতি টিকে থাকার রহস্য

কাতারের আমীর তামিম বিন হামাদ আল থানি
২০১৭ সালের জুন মাসে চারটি প্রতিবেশী দেশ যখন কাতারের উপর অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল তখন বিশ্লেষকরা বলেন, দেশটি দুই ধরণের সমস্যার মুখে পড়েছে।
লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইন্সটিটিউট-এর মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষক মাইকেল স্টেফেন্স বলেন, কাতারের চ্যালেঞ্জ ছিল দুটি।
প্রথমত, তাদের প্রমাণ করতে হবে যে ওসামা বিন লাদেনের মতো কোন সন্ত্রাসীকে তারা সমর্থন করছে না। দ্বিতীয়ত; তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তি যে মজবুত সেটি প্রমাণ করা। বিনিয়োগের জন্য কাতার যে একটি ভালো জায়গা সে বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়েছে।
সৌদি আরব, মিশর, বাহরাইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত - এ চারটি দেশ একসাথে কাতারের উপর অবরোধ আরোপ করেছিল।চারটি দেশের অভিযোগ হচ্ছে, কাতার সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করে। যদিও এ ধরণের অভিযোগ কাতার সবসময় অস্বীকার করে আসছে।
এ চারটি দেশ অবরোধ তুলে নেবার বিনিময়ে কাতারকে ১৩টি শর্ত দিয়েছিল।
এগুলোর মধ্যে রয়েছে - ইরানের সাথে কাতারের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করা, আল-জাজিরা টিভি চ্যানেল বন্ধ করা। কিন্তু কাতার কোন শর্ত মানেনি। ফলে ১৯ মাস পরেও অবরোধ এখনো বহাল রয়েছে। কাতার সন্ত্রাসবাদ সমর্থন করে কী না সে প্রশ্ন এখন আর আলোচনার মধ্যে নেই।
অন্যদিকে তুরস্কের আঙ্কারায় সৌদি কনসুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগজিকে হত্যার বিষয়টি নিয়ে সৌদি আরব বেশ বিপাকে পড়েছে।
তবে কাতারকে এখনো প্রমাণ করতে হচ্ছে যে ব্যবসার জন্য তাদের অর্থনীতি উন্মুক্ত।
সুতরাং অবরোধের সাথে দেশটি কতটা খাপ খাওয়াতে পেরেছে?
অবরোধ আরোপের আগে কাতারে আমদানিকৃত পণ্যের ৬০ ভাগ আসতো এ চারটি দেশ থেকে।
এর মধ্যে খাদ্যদ্রব্যই প্রধান। সুতরাং অবরোধ আরোপের পর কাতারকে বিকল্প পথ দেখতে হয়েছে।
সেক্ষেত্রে তুরস্ক এবং ইরানের মাধ্যমে বিকল্প পথে খাদ্য আমদানি শুরু করে।
এছাড়া দেশের ভেতরে উৎপাদন বাড়ানো শুরু করে।
দুধের চাহিদা মেটানোর জন্য হাজার-হাজার গরু আমদানি করছে কাতার। কাতার বিনিয়োগ ফান্ড-এর সিনিয়র ডিরেক্টর আকবর খান বলেন, কাতার বেশ ভালোভাবেই সংকট মোকাবেলা করেছে।
অবরোধ শুরু হবার তিনমাস পর হামাদ সমুদ্র বন্দরে ৭.৪ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প উন্মুক্ত করে।
এর মাধ্যমে গভীর সমুদ্র বন্দরে পণ্যবাহী অনেক জাহাজ ভিড়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কাতার মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে, বিশেষ করে আমেরিকার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করে।
এছাড়া জার্মানির সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য কাতার জোরালো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য কাতার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর মধ্যে রয়েছে শ্রম আইনের সংস্কার, বেসরকারিকরণ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা গঠন।
তবে দেশটি এখনো বড় ধরণের কোন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারেনি। এজন্য কাতারের আমলাতন্ত্রকে দায়ী করা হয়।
কাতারের রয়েছে বিশাল প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত। গ্যাস মজুতের দিক থেকে কাতার বিশ্বে তৃতীয়। ফলে তারা আমদানির বিকল্প পথ বের করতে পেরেছে।
তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিতে কাতার বিশ্বে প্রথম। ২০১৭ সালে দেশটি ৮১ মিলিয়ন টন এলএনজি রপ্তানি করেছে, যেটি বিশ্বের মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের ২৮ শতাংশ।
দেশটি প্রতিদিন ছয় লক্ষ ব্যারেল তেল রপ্তানি করে। তেল এবং গ্যাসের মতো প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ভিত্তি করে অবরোধ সত্ত্বেও কাতারের অর্থনীতি বিস্তৃত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বলেছে ২০১৭ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১.৬ শতাংশ।
ধারণা করা হচ্ছে ২০১৮ সালে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হবে ২.৪ শতাংশ এবং ২০১৯ সালে সেটি হবে ৩.১ শতাংশ।
লন্ডন ক্যাপিটাল ইকনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক জেসন টাভি বলেন, উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর তুলনায় কাতারের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য খুবই দুর্বল।
তিনি বলেন, কাতারের নিজস্ব জনসংখ্যা মাত্র তিন লাখের মতো। সুতরাং সরকার চাইলে তাদের সবাইকে সরকারি চাকরিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, কাতার যদি না চায়, সেক্ষেত্রে ব্যবসা বান্ধব বৈচিত্র্যপূর্ণ অর্থনীতি দেশটির জন্য খুব একটি প্রয়োজনীয় নয়।
শুধু গ্যাসে উত্তোলন বাড়িয়ে দেবার মাধ্যমেই কাতার টিকে থাকতে পারবে।
শুধু গ্যাস বিক্রি করে কাতার যে অর্থ উপার্জন করবে সেটির মাধ্যমে অন্য সবকিছুকে সহায়তা করা যাবে। এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্রঃ বিবিসি

ভুল ফরিদের দুই মাস কারাভোগ অবশেষে মুক্তি by জিয়া চৌধুরী

ইনিই প্রতারক ফরিদ হোসাইন যাকে পুলিশ খুঁজছে
একটি চেক প্রতারণার মামলায় চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ফরিদ হোসাইনের বিরুদ্ধে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন ঢাকার একটি আদালত। ওই মামলায় দুই মাসের সাজা ভোগের পর ঢাকার আরেকটি আদালতের মামলায় আসামি হিসেবে ফরিদ হোসাইনকে হাজির করলে দেখা যায় তিনি মূল প্রতারক ফরিদ হোসাইন নন। কারাভোগ করা ফরিদ হোসাইন ও কারাদণ্ড ঘোষণার পর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার নাটমুড়া গ্রামের ফরিদ হোসাইন আসলে দুজন আলাদা মানুষ। ঢাকার পরিবেশ আদালতের আরেকটি মামলায় কারাভোগ করা ভুল ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করলে বিচারকের নজরে আসে বিষয়টি। ওই আদালতের বিচারক যুগ্ম ও দায়রা জেলা জজ মো. শওকত হোসাইন আসামিকে খালাস দিয়ে দ্রুত মুক্তি দিতে ঢাকার জেল সুপারকে নির্দেশও দিয়েছেন।
এমন নির্দেশের পর গতকাল সিএনজিচালক ফরিদ হোসাইন মুক্তি পেয়েছেন বলে কারা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
আদালত  সূত্রে জানা যায়, ঢাকা মহানগর ৭ম যুগ্ম ও দায়রা জজ আদালতের চেক প্রতারণার ৮৩৯/২০১৭ নম্বর দায়রা মামলায় আসামি ছিলেন ফরিদ হোসাইন। যার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে মামলার এজাহারে চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার নাটমুড়া গ্রামের কথা উল্লেখ আছে।
গত বছরের ২৫শে অক্টোবর মামলার রায়ে আসামি ফরিদকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। ৫ দিন পর ৩১শে অক্টোবর ওই মামলায় আসামির বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পাঠানো হয়। পরোয়ানা পাওয়ার পর নাটমুড়া গ্রামের সিএনজি অটোরিকশা চালক ফরিদ হোসাইনকে গ্রেপ্তার করে বাঁশখালী থানা পুলিশ। গত ৪ঠা নভেম্বর তাকে আদালতে হাজির করলে কারাগারে পাঠায় আদালত। মহানগর দায়রা জজ আদালতে চেক প্রতারণার এই মামলায় দুই মাস কারাভোগের পর সিএনজিচালক ফরিদ হোসাইনকে ২০১৫ সালের আরেকটি চেক প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে ঢাকার পরিবেশ আদালতে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। যার দায়রা মামলা নম্বর ৮৫২৮/২০১৫।
এই মামলায় ২০১৭ সালের ৫ই মে প্রতারক ফরিদ হোসাইনকে ১ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার অর্থদণ্ড দেন আদালত। তবে, এই মামলায় বাঁশখালীর সিএনজিচালক ফরিদকে গ্রেপ্তার দেখাতে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করলে গত ১লা জানুয়ারি তাকে তলব করেন বিচারক মো. শওকত হোসাইন। জিজ্ঞাসাবাদে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন পুলিশের হাতে আটক সিএনজিচালক ফরিদ ও প্রতারক ফরিদ আসলে এক ব্যক্তি নন। মূলত, ভুল করে সিএনজিচালক ফরিদকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিনা অপরাধে তাকে দুই মাসের কারাভোগ করতে হয়। এদিন, আটক থাকা ফরিদ হোসেনকে মামলা থেকে খালাস দেন আদালত। এবং ঘটনার বিষয়ে ব্যাখা চেয়ে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী উপ-পরিদর্শক আবদুল মুনাফকে আদালতে তলব করা হয়। গত ১৩ই জানুয়ারি আদালতে হাজির হয়ে ঘটনার বিষয়ে ব্যাখা দেয় বাঁশখালী থানার দুই পুলিশ কর্মকর্তা। নাম ও পিতার নামে মিল থাকায় এবং আসামি নিজেকে নির্দোষ দাবি না করায় সিএনজিচালক ফরিদ হোসাইনকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে এ সময় জানান তারা। তবে, ঘটনার সুরাহা করতে এবং মূল প্রতারক ফরিদকে ২৩শে জানুয়ারির মধ্যে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করারও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশখালী থানার ওসি মো. কামাল হোসেন মুঠোফোনে মানবজমিনকে বলেন, আসামির নিজের নাম, পিতা ও গ্রামের নামে মিল থাকায় এমনটা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় সিএনজিচালক ফরিদ হোসাইন নিশ্চুপ ছিলেন বলেও দাবি করেন বাঁশখালী থানার ওসি।
এদিকে, মূল প্রতারক ফরিদ হোসাইনের বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে আরো আটটি চেক প্রতারণার মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। ভুল করে আটক করা ফরিদকে এসব মামলাও গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। তবে, ফরিদ হোসাইন কারাগারে থাকার সময় এই আটটি মামলায় তার পক্ষে জামিন নেয়া হয়। মূল প্রতারক ফরিদ হোসাইন নিজেকে আড়ালে রেখে এসব মামলা থেকে নিষ্কৃতি পেতে আইনজীবীর সহায়তায় এসব মামলায় জামিন নিয়ে রেখেছেন বলেও সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে, মূল প্রতারক ফরিদ হোসাইনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করতে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাঁশখালী থানার ওসি। তিনি বলেন, খুব শিগগিরই আসল আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

নির্বাচনের এজেন্ডা থাকলে সংলাপে যাওয়া বিবেচনা করা হবে -সিলেটে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা by ওয়েছ খছরু

নির্বাচন নিয়ে এজেন্ডা থাকলে ঐক্যফ্রন্ট ‘সংলাপ’ বিষয়ে বিবেচনা করবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী কি নিয়ে সংলাপের আহ্বান করেছেন তা আমি জানি না। তবে গতবারের মতো যদি সংলাপ হয় তাহলে সে সংলাপ কখনই অর্থবহ হবে না। এখন আমাদের এজেন্ডা তো একটাই- নির্বাচনকে বাতিল করতে হবে, পুনরায় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তিনি গতকাল দুপুরে সিলেটের ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার জিয়ারত শেষে সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন। মির্জা ফখরুল আরো বলেন, ‘যেখানে দেশের জনগণের অধিকার প্রয়োগ করতে দেয়া হয়নি এবং এতে করে দেশের যে একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেছে- এই বিষয়টি যদি উনারা বুঝেন আর আমাদেরকে জানান- তখনই আমরা বিবেচনা করবো। তবে এটা নির্ভর করবে তখনকার সময়ের উপর।’
গত ৩০শে ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট চলাকালে সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার আজিজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে সংঘর্ষে উপজেলা ছাত্রদল নেতা সায়েম আহমদ সোহেল নিহত হন। তার স্বজনদের সান্ত্বনা জানাতেই গতকাল ঐক্যফ্রন্টের নেতারা সিলেট আসেন।
বেলা সাড়ে ১১টায় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা ঢাকা থেকে সিলেট পৌঁছান। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা হলেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকী, মহাসচিব হাবিবুর রহমান বীর প্রতীক, গণফোরামের কার্যকরী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব।
প্রথমেই তারা ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন। পরে মাজার প্রাঙ্গণেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মাজার জিয়ারতের সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন, সিলেট-৩ আসনের সাবেক এমপি শফি আহমদ চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কাহের শামীম, মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন, জেলার সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ, আজমল বখত সাদেক, রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী, ইমরান আহমদ, বালাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মিয়া সহ সিনিয়র নেতারা।
বিগত নির্বাচনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, দখলদারী সরকার বাংলাদেশের জনগণের অধিকারকে হরণ করে নিয়ে গেছে এবং তারা সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। জনগণের রায়কে তারা ডাকাতের মতো ডাকাতি করে নিয়ে গেছে। সারা দেশেই সকলের চোখে-মুখে একটা শোকের চিত্র ফুটে উঠেছে। এর কারণ জনগণ তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তিনি বলেন, উপজেলা নির্বাচন অথবা স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সরকারের পরিবর্তন ঘটায় না এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব সেটারও কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। তাই এই নির্বাচনগুলো খুব একটা মুখ্য ব্যাপার না।
নির্বাচন কমিশনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে যে নির্বাচন কমিশন আছে সেই কমিশনের অধীনেই জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশসহ গোটা পৃথিবীই দেখেছে যে, কতোটা অযোগ্য এ নির্বাচন কমিশন। যাদের কোনো যোগ্যতাই নেই নির্বাচনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার। এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন কি রকম হবে- এ রকম প্রশ্নেরই এখন আর কোনো প্রয়োজন নেই।’
জাতীয় নির্বাচনকে বাতিল করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বারবার বলছি যে, গত জাতীয় নির্বাচনকে বাতিল করলে এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে জনগণের রায়ের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠিত সরকার গঠন করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে নির্বাচন হতে হবে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য এবং সকল দলের অংশগ্রহণে।’ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের ঐক্যফ্রন্ট অটুট আছে  সামান্যতম কোনো সমস্যা নেই ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে। রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরের কিছুটা অমিল থাকতেই পারে- এটাই স্বাভাবিক।  কিন্তু আমাদের ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে কোনো ঝামেলা নেই।
নিহত সোহেলের বাড়িতে মির্জা ফখরুল: দুপুরে সিলেটে হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার জিয়ারত করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সহ ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। পরে তারা বালাগঞ্জের আজিজপুর গ্রামে নিহত ছাত্রদল নেতা সোহেলের বাড়িতে যান। প্রথমে তারা সোহেলের কবর জিয়ারত এবং মোনাজাত করেন। পরে তার মাসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন মির্জা ফখরুল। তাদের সান্ত্বনা জানানোর পাশাপাশি হাতে তুলে দেন নগদ ১ লাখ টাকা। পরে সোহেলের বাড়িতেই শোকসভায় বক্তব্য রাখেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সহ ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ।
এ সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সোহেলের রক্তের প্রতিবাদ ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য হটাতে হবে এই সরকারকে। সিলেটসহ গোটা দেশের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থেকে সরকারের বিদায়ের পথ সুগম করতে হবে। তবেই সোহেলদের আত্মদান কাজে আসবে। এ সময় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা আ স ম রব, কাদের সিদ্দিকী,  মোস্তফা মহসিন মন্টু, শফি আহমদ চৌধুরী, আব্দুল কাইয়ূম চৌধুরী, আব্দুল আহাদ খান জামান ও নিহত সোহেলের চাচাতো ভাই লুৎফুর রহমান বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ছিলেন বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন, আবুল কাহের শামীম, আলী আহমদসহ সিনিয়র নেতারা।

চাঞ্চল্যকর মামলায় সাক্ষী সংকট by নাজুমল আহসান রাজু

চাঞ্চল্যকর মামলার সাক্ষীরা আদালতে না আসায় বিলম্বিত হচ্ছে মামলার বিচার। নির্ধারিত সময়ে সাক্ষী হাজির না হওয়ায় বছরের পর বছর ঝুলছে মামলার কার্যক্রম। চাঞ্চল্যকর অনেক মামলায় সাক্ষী না আসায় কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে প্রসিকিউশনকে। অনেক ক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে আদালতকে সাক্ষী হাজিরে সমনও জারি করতে হচ্ছে। তারপরও সাক্ষীদের আদালতে আসা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সাক্ষী হাজিরে প্রসিকিউশন ও পুলিশের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ রয়েছে। এতে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ ও হতাশা।
সূত্র জানায়, ঢাকার জেলা ও দায়রা  জজ আদালত এবং মহানগর দায়রা জজ আদালতেই সাক্ষী সংকটে ঝুলছে অন্তত ২৫০ চাঞ্চল্যকর মামলা। সারা দেশে এমন অনেক মামলা রয়েছে যা সাক্ষী না আসায় নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
প্রসিকিউশনের বিরুদ্ধেও সাক্ষী  হাজির না করার নির্লিপ্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ধার্য তারিখে সাক্ষী না আসায় দফায় দফায় পেছানো হয়েছে মামলার শুনানি এবং দিন, মাস বছর পেরিয়ে মামলাগুলো ঝুলছে। ছয় বছর আগের আশুলিয়ার তাজরিন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডের মামলার বিচার এখনো বাকি। ১০৪ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ১০ জনের সাক্ষ্য হয়েছে গত তিন বছরে। মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে  ২০১২ সালের ২৪শে নভেম্বর ১২২ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। আহত হন অর্ধশতাধিক। ২০১৫ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়েছে কিন্তু অগ্রগতি সামান্য।
গুরুত্বপূর্ণ দুই সাক্ষী আদালতে না আসায় থমকে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার বিচার। আদালত থেকে জামিন অযোগ্য সমন জারি করেও হাজির করা যায়নি দুই চিসিক সাক্ষী ডা. শহিদুল ইসলাম ও ডা. মেজর শওকত হাসানকে। একুশের বইমেলা থেকে বের হওয়ার পথে ২০০৪ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে দুর্বৃত্তদের চাপাতির কোপে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ১৫ই আগস্ট মারা যান জার্মানির মিউনিখে। ঢাকার তৃতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন এ হত্যা মামলার বিচার শেষ হয়নি গত ১৫ বছরেও। মাত্র দুইজন সাক্ষীর জন্য বিচার আটকে আছ এ মামলার বিচার কাজ। ২০১২ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ গঠন হয়েছিল।
সাক্ষী দিতে অনীহার কারণে সিলেট বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আদালতে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যার মামলার মাত্র ৪৩ জনের সাক্ষ্য সম্পন্ন হয়েছে। অথচ মোট সাক্ষী ১৭১ জন। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার দিন ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট সকালে খুনিদের ছোড়া কামানের গোলায় মোহাম্মদপুরের শের শাহ সুরী রোডের ১৩ জন নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলা গত দেড়যুগের মতো বিচার ঝুলছে।
বিধি অনুসারে আদালতে সাক্ষী হাজিরের দায়িত্ব পুলিশের। আর সাক্ষী আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করবে প্রসিকিউশন। এক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রসিকিউশনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। পুলিশ সাক্ষীকে হাজির করলে শুনানি হয় না আবার পুলিশ সাক্ষী হাজির করতে না পারায় শুনানি পিছিয়ে যায়। সাক্ষীরাও আদালতে আসেন সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে। দেখা যায় নিজের সময় ও অর্থ খরচ করে সাক্ষী আদালতে হাজির হলেও কোনো কারণে শুনানি না হলে ওই সাক্ষী তার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। গুরুতর অপরাধের মামলায় সাক্ষীদের জীবনের ঝুঁকি থাকে। তা সত্ত্বেও সাক্ষীরা আদালতে এসে সাক্ষী দেয়ার নজির কম নয়। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ ও প্রসিকিউশন সাক্ষীদের তাদের শেখানো সাক্ষী দিতে বাধ্য করেন। এ কারণে সাক্ষীদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব পড়ে।
ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু মানবজমিনকে বলেছেন, সাক্ষীরা আদালতে আসতে চান না। তারা স্বেচ্ছায় আসতে না চাইলে আদালত সমন জারি করেন। তারপরেও অনেকের ঠিকানা বদল হওয়ায় সমন ফিরে আসে। মামলার বিলম্বিত বিচারের অন্যতম কারণ সাক্ষীদের না আসা।
তৈরি পোশাক কারখানা তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকাণ্ডের মামলায় সাক্ষীদের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য পরোয়ানা জারি করেও তাদের আদালতে হাজির করা যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পিপি কাজী শাহানারা  ইয়াসমিন। এ মামলার অধিকাংশ সাক্ষী তাজরিনের শ্রমিক হওয়ায় অনেকে ঠিকানা বদলেছেন যে কারণে তাদের খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না।

থাইল্যান্ডে গণতন্ত্রকামী হাজারো মানুষের বিক্ষোভ

থাইল্যান্ডে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে যে, দেশের জাতীয় নির্বাচনের তারিখ আবারো পেছানো হতে পারে। প্রায় ৫ বছর ধরে স্থগিত থাকা ওই নির্বাচনের তারিখ এ নিয়ে পঞ্চমবারের মতো পেছাতে যাচ্ছে। তবে সামরিক সরকারের এমন পদক্ষেপ ভালোভাবে নিচ্ছে না দেশটির গণতন্ত্রকামী মানুষ। আগামী ২৪শে ফেব্রুয়ারি থাইল্যান্ডে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। পূর্বে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার দফায় দফায় নির্ধারিত তারিখেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে আশ্বস্ত করেছেন। কিন্তু সম্প্রতি ইঙ্গিত দেয়া হয় যে, নির্ধারিত তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত নাও হতে পারে। অর্থাৎ পঞ্চমবারের মতো নির্বাচনের তারিখ পেছাতে চাচ্ছে সরকার। এর প্রতিবাদে রোববার গণতন্ত্রকামী হাজারো মানুষ থাইল্যান্ডের রাজপথে বিক্ষোভ করে।
তারা নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার দাবি জানান। সরকার নির্বাচন পিছিয়ে তাদের কথার বরখেলাপ করতে চাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে এক রক্তপাতহীন ক্যু-এর মাধ্যমে থাইল্যান্ডের ক্ষমতা গ্রহণ করে সেনাবাহিনী। তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে। প্রায় পাঁচ বছর ধরে দফায় দফায় জাতীয় নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর পিস অ্যান্ড অর্ডার, সংক্ষেপে এনসিপিও অব্যাহতভাবে নির্বাচনের তারিখ পরিবর্তন করতে থাকে। তাদের দাবি, নির্বাচনের জন্য দেশ প্রস্তুত না। কিন্তু এনসিপিও’র সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, তারা দেশের নতুন রাজার রাজ্যাভিষেকে অযাচিত হস্তক্ষেপ করতে পারে। এর প্রতিবাদে সপ্তাহজুড়ে রাজধানী ব্যাংককের একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবস্থান নিয়েছে প্রায় ২০০ বিক্ষোভকারী। ঐতিহাসিকভাবে তাদের অবস্থান নেয়া সড়কটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, ২০১০ সালে ঠিক এই সড়কেই সেনাবাহিনী কয়েক ডজন গণতন্ত্রকামী মানুষকে হত্যা করে। এবার বিক্ষোভকারীরা আগামী মাসেই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি সংবলিত ব্যানার নিয়ে র‌্যাচপ্রাসং নামক এ সড়কে অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনের দাবিতে বিচ্ছিন্ন বিক্ষোভ চলছে।
এ বিক্ষোভের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন সেনা প্রধান জেনারেল আপিরাত কংসোম্পং। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভকারীরা ঝামেলা করতে চাইছে। জেনারেল আপিরাত রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা এনসিপিও’র সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বে রয়েছেন। এনসিপিও সরকার আগামী মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সন্দিহান থাকলেও দেশটির নির্বাচন কমিশন এখনো তাদের অবস্থা পরিষ্কার করেনি। গত বছরে কমিশন নির্ধারিত তারিখেই নির্বাচন আয়োজনের অঙ্গীকার করেছিল। ধারণা করা হচ্ছে, কমিশন তাদের পূর্বের কথার ওপরই অবিচল আছে। কেননা, গত ডিসেম্বরে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ৫-এর অধিক ব্যক্তির এক জায়গায় জড়ো হওয়ার ওপর  থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। এগুলো থেকে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

ঢাকায় বাইক রাজত্ব by শাহনেওয়াজ বাবলু

দুই চাকার বাহন মোটরবাইক। গতিপ্রিয় মানুষদের প্রিয় যান। যানজটের ঢাকায় কারও কারও জন্য এটি বড় এক ত্রাতা। অনেকটা যানজট এড়িয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ব্যক্তিগত যাতায়াতে সহজ   এই মাধ্যমটি এখন অনেকটা গণপরিবহনে রূপ পাওয়ার অবস্থা। রাইড শেয়ারিং অ্যাপ চালু হওয়ায় রাজধানীজুড়ে ভাড়ায় চলছে লাখো মোটরবাইক। ব্যক্তিগত বাইকের সঙ্গে ভাড়ায় চলা বাইক যোগ হওয়ায় রাজধানীর সড়ক যেন এখন বাইকের সাম্রাজ্য। এমনিতেই ব্যক্তিগত বাহন হিসেবে দ্রুত হারে বাড়ছে বাইকের সংখ্যা।
আর উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে অনেকে বাইক নিয়ে সড়কে নামায় এই সংখ্যা অনেকটা ধারণাতীত। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকায় রেজিস্ট্রেশন করা যেসব মোটরবাইক আছে এর চেয়ে ঢের বেশি সংখ্যক বাইক রাজধানীতে  নেমেছে আশেপাশের জেলা থেকে আসা।
দেশের বিভিন্ন স্থান থেকেও বাইকাররা ঢাকা আসছেন ভাড়াভিত্তিক অ্যাপে বাইক চালাতে। আর বিপুল সংখ্যার এই বাইক চালকদের অনেকের প্রশিক্ষণ নেই, যথাযথ ট্রাফিক আইন জানেন না। এতে নগরে বাড়ছে দুর্ঘটনা।
সড়কে চলা অন্য যানবাহন ও সাধারণ পথচারীদের অনেক ক্ষেত্রে বিরক্তির কারণ হচ্ছে এই মোটরবাইক। পথচারীদের জন্য নির্ধারিত ফুটপাথে বাইক চলা বন্ধ করতে নানা উদ্যোগের পরও তা থামানো যাচ্ছে না। উচ্চ আদালত থেকেও এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। ২০১৬ সালে ঢাকায় রাইড শেয়ারিং সেবা নিয়ে আসে উবার। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির মাধ্যমে এই সেবার সুযোগ করে দিলেও পরে মোটরসাইকেলও যুক্ত করে। একই সময়ে একে একে আসে পাঠাও, স্যাম, বাহন, সহজ, ওভাই, ওবোনসহ আরো অনেক প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে উবারের গাড়ি ও মোটরসাইকেল মিলিয়ে মোট এক লাখ চালক রয়েছে এবং প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার চালক যুক্ত হচ্ছেন। তবে এরমধ্যে মোটরসাইকেল চালকের সংখ্যা কতো সেটা জানা যায় নি। গত বছরের নভেম্বর থেকে ঢাকায় প্রথমবারের মতো মোটরসাইকেল সেবা চালু করে প্রতিষ্ঠানটি। যার নাম রাখা হয় ‘উবার মোটো’।
ভারতের হায়দরাবাদে উবার প্রথম মোটরসাইকেল রাইড শেয়ার সেবা শুরু করলেও সেটা বাংলাদেশের মতো জনপ্রিয়তা পায়নি।
গত দুই বছরে ঢাকার রাস্তায় মোটরসাইকেল বাড়ার চিত্র পাওয়া যায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যে। প্রতিষ্ঠানটির ঢাকা কার্যালয় থেকে ২০১৬ সালে যেখানে ৫৩ হাজার ৭৩৮টি মোটরসাইকেলের নিবন্ধন দেয়া হয়েছিল, সেখানে ২০১৭ সালে নিবন্ধিত হয় ৭৫ হাজার ২৫১টি। আর ২০১৮ সাল থেকে এই পর্যন্ত মোটরসাইকেলের নিবন্ধন হয়েছে ৮২ হাজার।
এ হিসাবে, ২০১৭ সালে ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ২০৬টি মোটরসাইকেল নিবন্ধন হয়েছে। আর গত বছরের প্রথম আট মাসে প্রতিদিন গড়ে ২২৪টি মোটরসাইকেল নিবন্ধন হয়েছে। এ নিয়ে বিআরটিএ’র মোটরযান পরিদর্শক মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন,  আগে হালকা যান এবং ভারী যানবাহনের নিবন্ধনের হার ছিল বেশি। কিন্তু গত দুই বছরে মোটরসাইকেল নিবন্ধনের হার অনেকটাই বেড়েছে। অতিরিক্ত মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন বাড়ার কারণে কোনো সমস্যা হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে রিয়াজুল ইসলাম বলেন, এতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। আমরা খুব ভালোভাবেই হ্যান্ডেল করছি। আর সব কিছু যাচাই বাছাই করে নিবন্ধন করাচ্ছি।
রাইড শেয়ারিংয়ে যেসব মোটরসাইকেল চলে তার একটা বড় অংশ ঢাকার বাইরের বিভিন্ন জেলার নম্বর প্লেটধারী। বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে মানুষ মোটরসাইকেলে যাতায়াত করছে। এতে ভাড়া কম এবং যাতায়াতও করা যায় কম সময়ে। তাই রাজধানী ঢাকার অনেক মানুষই এখন যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহার করে থাকে। আর এতে হাজার হাজার যুবকের উপার্জনের ব্যবস্থাও হয়েছে। এইসব মোটরসাইকেল চালকের মধ্যে বেকার ছাড়াও বিভিন্ন  পেশার মানুষ রয়েছে।
কেন জনপ্রিয় হলো মোটরসাইকেল: মূলত কম পয়সায় দ্রুত যাতায়াত, তারমধ্যে ডিসকাউন্ট সুবিধার কারণে ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে অ্যাপভিত্তিক মোটরসাইকেল রাইড সেবা। ঔষধ কোম্পানি বায়োফার্মায় চাকরি করেন রেদোয়ান আহমেদ। প্রায়ই তার কাজের প্রয়োজনে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়। এই যাতায়াতের ক্ষেত্রে তিনি পুরোপুরি এই মোটরসাইকেলের ওপর নির্ভর করেন। মানবজমিনকে তিনি জানান, খুব ইমার্জেন্সি কোনো কাজ থাকলে বাইকে করে সবচেয়ে কম সময়ে সেখানে পৌঁছানো যায়। আমি যে অ্যাপগুলো ব্যবহার করি সেগুলোর একটা না একটায় ডিসকাউন্ট থাকেই। তখন সেই ভাড়াটা অনেক কম আসে। তাছাড়া বাইকে করে আপনি এমন সব রাস্তায় যেতে পারবেন যেখানে হয়তো বড় গাড়ি চালানো সম্ভব না।
ট্রাফিক আইনে মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তাছাড়া এই রাইড পরিবহন সেবাগুলো যাত্রীদের নিরাপত্তায় কয়েকটি সেফটি ফিচার যুক্ত করায় মোটরসাইকেল রাইডে আগ্রহী হচ্ছেন নারীরাও। এসব সেফটি ফিচারের মধ্যে রয়েছে চালক ও গাড়ি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যসহ জিপিএস ট্র্যাকিং, টু-ওয়ে ফিডব্যাক ও ট্রিপ ডিটেইলস শেয়ারিং। এ ছাড়া গাড়ি খোঁজা বা ভাড়া নিয়ে দর কষাকষির কোনো ঝামেলা না থাকায় এই মোটরসাইকেল রাইড নেয়ার কথা জানান ঢাকার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ইকবাল হোসেন। মানবজমিনকে তিনি বলেন, অফিস ছুটি হওয়ার পর বাসগুলোয় এত ভিড় থাকে যে, ওঠার উপায় থাকে না। উঠতে পারলেও এত বেশি ধাক্কাধাক্কি হয়। তাই অ্যাপের মাধ্যমে মোটরসাইকেলে যাতায়াত করি। রাইডের মাধ্যমে বাইক ডাকলে বাস ভাড়া থেকে একটু বেশি খরচ পড়লেও গাড়ি থেকে অনেক কম। সবচেয়ে বড় কথা হলো, মোটরসাইকেলের মাধ্যমে দ্রুত যানজট ঠেলে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। আর এটা আমাকে মাঝ রাস্তায় নামিয়ে দেয় না। একদম গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। এটাই সবচেয়ে বড় সুবিধা।
শেয়ারিং অ্যাপ তরুণদের জন্য অর্থ আয়ের সুযোগ: মোটরসাইকেল যানজটের মধ্যে দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনেক তরুণদের জন্য অর্থ আয়েরও ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।  বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় প্রায় প্রতিদিনই অফিসে যাওয়া-আসার পথে এই রাইড সেবা দিয়ে থাকেন মাহফুজুর রহমান। এতে একদিকে যেমন তার বাইক রক্ষণাবেক্ষণ খরচ উঠে আসে তেমনি ছুটির দিনে অবসরে কয়েক ঘণ্টা এই সার্ভিসের মাধ্যমে তার পকেট খরচও এসে পড়ে। মাহফুজ জানান, আমি আগে থেকেই বাইক চালাই, তাই বলতে গেলে এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জনে আমার কোনো কিছুই ইনভেস্ট করতে হয়নি। যা পাচ্ছি তার পুরোটাই লাভ। আমার মতো এখন অনেকেই ফ্রি-ল্যান্সার রাইড সার্ভিস দিচ্ছে। তবে এমন অনেককেই আমি চিনি যারা সকাল-সন্ধ্যা বাইক রাইড দেন। এখন এটাই তাদের পেশা।
দুর্ঘটনাও বাড়ছে: বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট- এআরআই’র হিসাবে ২০১৭ সালে রাজধানীতে ৪৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৫৩ জন নিহত এবং ১৯ জন আহত হন। গত বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) সেই সংখ্যার প্রায় কাছাকাছি দুর্ঘটনা ঘটে। এই সময়ে ঢাকায় ৪২টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৪৭ জনের মৃত্যু এবং ৩৭ জন আহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনায় নিহতদের রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলের চালক অথবা যাত্রীও ছিলেন।
গত ১৭ই সেপ্টেম্বর খিলক্ষেতে দুর্ঘটনায় মারা যান লাফিজুর রহমান নামে এক মোটরসাইকেল আরোহী। ৩রা সেপ্টেম্বর রাতে মতিঝিল এলাকায় রিপন শিকদার এবং জানে আলম গাজী নামে দু’জন নিহত হন। এরও আগে ২০শে আগস্ট মোহাম্মদপুরে ট্রাকের ধাক্কায় সোহেল পারভেজ, ৬ই জুলাই বিমানবন্দর গোলচত্বরের কাছে নাজমুল হাসান এবং ৬ই মার্চ তেজগাঁওয়ের আড়ং চেকপোস্টে কাজী মারুফ হাসান নামে মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন। ট্রাফিক সূত্র বলছে, রাজধানীতে নিয়ম ভাঙার কারণে যানবাহনের বিরুদ্ধে যে মামলা হয় এর বড় অংশই মোটরবাইক।
চালকের অদক্ষতা: মোটরবাইকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বাড়ছে অদক্ষ চালকের সংখ্যাও। এতে বাড়ছে দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার জন্য চালকদের অদক্ষতা এবং নিরাপত্তা জ্ঞানের অভাবকে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর পরিচালক ইলিয়াস কাঞ্চন। মানবজমিনকে তিনি বলেন, রাইড শেয়ারিংয়ের কারণে মোটরসাইকেলের চলাচল বেড়েছে, দুর্ঘটনা বাড়ার এটা একটা কারণ। মোটরসাইকেল চালকরা অনেকেই অপেশাদার চালক। তাদের ক্ষেত্রে ড্রাইভিং শিখে আসার বিষয়টা নেই। চালকদের অনেকেই বেপরোয়া, অনেকে দক্ষ হলেও নিরাপত্তা জ্ঞানের অভাব আছে।
তিনি বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের দ্রুত ট্রিপ শেষ করার একটা ব্যাপার থাকে। এজন্য তারা দ্রুত চালাতে চান। এক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে বাইক চালকদের বক্তব্য অনেক সময় যাত্রীরাও তাড়া দেন। দ্রুত সময়ে তারা গন্তব্যে পৌঁছাতে চান। অনেকে ট্রেন, লঞ্চ বা দূরে যাত্রার বাস ধরতে বাসা থেকে বের হন। তখন নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে তাড়া দেন। এতে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।
দুর্ঘটনার দায় আছে রাইড শেয়ার কোম্পানিগুলোরও: রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার বিষয়টি দেখছে না- এমনটি স্বীকার করেছেন শেয়ার আ মোটরসাইকেল (স্যাম) এর প্রধান নির্বাহী ইমতিয়াজ কাসেম। তিনি বলেন, রাইড শেয়ারিংকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন অনেকে। অনেকে গ্রাম থেকে চলে এসেছেন মোটরসাইকেল চালাতে। রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো শুধু লাইসেন্স থাকলেই চালানোর অনুমতি দিয়ে দিচ্ছে। কোনোমতে কাগজপত্র তৈরি করেই রাস্তায় নেমে যায়। কোনো অভিজ্ঞতা না থাকায় দুর্ঘটনায় পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।
পাঠাওয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুসাইন এম ইলিয়াসও স্বীকার করলেন, দুর্ঘটনার দায় কিছুটা তাদেরও আছে। তিনি বলেন, দায়ভার অবশ্যই কিছুটা আছে। কিন্তু এ খাতে শৃঙ্খলা আনতে হলে সবাইকেই কাজ করতে হবে। আমরা যেহেতু সবাই মিলে কাজ করছি। ফল আসবেই।
শিক্ষানবিশ লাইসেন্স থাকলেই রাইড শেয়ার করার সুযোগ দেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, লাইসেন্স থাকলেই কেউ ভালো ড্রাইভার নাও হতে পারে। যাই হোক, আমরা চিন্তা করছি কীভাবে এ বিষয়টি আরো নিয়মের মধ্যে আনা যায়। এখন আর লার্নার দিয়ে কাউকে রাইড দেয়ার সুযোগ দিচ্ছি না। রাইডারদের জন্য বাড়তি কোনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যায় কিনা সেটাও আমরা ভেবে দেখছি।
মোটরসাইকেলে নিরাপত্তায় করণীয়: ঢাকায় ক্রমেই এই মোটরসাইকেল বেড়ে যাওয়ায় দুর্ঘটনার হারও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। মানবজমিনকে তিনি বলেন, গাড়ির ভেতরে আপনি যেমন চারদিক থেকে একটা নিরাপত্তা বলয় থাকেন, সেক্ষেত্রে মোটরবাইকের চারদিক খোলা। দুই চাকার ওপর ভারসাম্য গাড়ির মতো এত ভালো থাকে না। এ কারণে আরোহীদের পাশাপাশি পথচারীরাও দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে থাকেন।
ট্রাফিক আইনে মোটরসাইকেল চালকের পাশাপাশি যাত্রীর হেলমেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোয় এখন চালকরাই এই হেলমেট সরবরাহ করে থাকে। তবে এই হেলমেটগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনি বলেন, এখন রাস্তাঘাটের বেশিরভাগ মোটরসাইকেলের চালক ও আরোহীদের হেলমেট পরতে দেখা যায়। যেটা বেশ ইতিবাচক। তবে আরোহীরা যে হেলমেটগুলো পরেন, সেগুলোর মান খুবই খারাপ। বাইকের পেছনে বসা যাত্রীরা যে হেলমেট ব্যবহার করেন এগুলো দেখতে প্রায় বিল্ডিংয়ে কাজ করার সময় শ্রমিকরা যেই হেলমেট ব্যবহার করেন ঠিক সেগুলোর মতো। মানসম্পন্ন হেলমেট বলতে ভালো উপাদানের তৈরি এমন হেলমেট হতে হবে যেটা মাথাকে পূর্ণ সুরক্ষা দেয়ার পাশাপাশি কান ও থুঁতনি রক্ষা করবে।
মোটরবাইকের চলাচলে শৃঙ্খলার বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন ট্রাফিক পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মফিজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বেপরোয়া কিংবা ফুটপাতেথ মোটরসাইকেল চালানোর বিরুদ্ধে শহরের বিভিন্ন জায়গায় জরিমানা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আমরা সব সময় মোটরসাইকেলের চালকদের সচেতনভাবে ড্রাইভ করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। কিন্তু আরোহীদের সচেতনতা এবং মানসিকতা না বদলালে এটি পুরোপুরি বন্ধ করা মুশকিল বলে মনে করেন তিনি।

৯৫ হাজার বন্দীর জন্য মাত্র ৮ জন চিকিৎসক by রোজিনা ইসলাম

  • • ৬৮ কারাগারে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১২৯টি
  • • কারাগারে ৩৬ হাজার ৬১৪ জনের থাকার ব্যবস্থা
  • • কিন্তু আসামির সংখ্যা প্রায় ৯৫ হাজার
  • • চিকিৎসক চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বারবার চিঠি
  • • স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না
দেশের ৬৮টি কারাগারে প্রায় ৯৫ হাজার বন্দীর জন্য এখন চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র আটজন। বন্দী ও চিকিৎসকের এই অনুপাতই বলে দিচ্ছে, কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার কী অবস্থা। ছোটখোটো শারীরিক সমস্যার জন্যও বন্দীদের কারা হাসপাতালের বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।
তবে কারা কর্তৃপক্ষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে বন্দী থাকা মানসিক রোগী ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে। এমন বন্দীর সংখ্যা প্রায় এক হাজার। তাঁদের নিয়মিত কাউন্সেলিং (পরামর্শ) ও বিশেষায়িত চিকিৎসা দরকার। কিন্তু সে ব্যবস্থা কারাগারগুলোতে নেই।
কারা হাসপাতালগুলোর জন্য চিকিৎসক চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে গত এক বছরে কয়েক দফা চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কেও বারবার জানানো হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চিঠি–চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ৬৮টি কারাগারে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ১২৯টি। এর মধ্যে ঢাকার কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারাগারে দুজন, চট্টগ্রাম, সিলেট, ব্রাক্ষণবাড়িয়া, কুমিল্লা, বরিশাল ও গাজীপুর জেলা কারা হাসপাতালে একজন করে চিকিৎসক রয়েছেন। দেশের কারাগারগুলোতে ৩৬ হাজার ৬১৪ জনের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু আসামির সংখ্যা প্রায় ৯৫ হাজার।
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক সুভাষ কুমার ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই হাজার কারাবন্দীর জন্যে একজন চিকিৎসকও নেই। আমরা ধার করে সদর হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক নিয়ে আসি। সত্যিকারের যাঁরা রোগী, তাঁদের কোনো চিকিৎসাই দিতে পারছি না।’ কারা হাসপাতালগুলোর জন্য চিকিৎসক চেয়ে গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে শতাধিক চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, সর্বশেষ চলতি বছরের শুরুতেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসক চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ২০০ শয্যার হাসপাতালের জন্য চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৩৩টি। সেখানে মাত্র একজন চিকিৎসক রয়েছেন। বাকি ৩২টি পদই শূন্য।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কারা হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগ দিতে গত ডিসেম্বরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে বেশ কড়া ভাষায় চিঠি লেখা হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। সেখানে বলা হয়, ২০ জন চিকিৎসককে বিভিন্ন কারা হাসপাতালে যোগদান করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তাঁরা কাজে পর্যন্ত যোগ দেননি। যাঁরা যোগ দেননি, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে চিঠিতে বলা হয়। বারবার চিঠি দেওয়ার পরও চিকিৎসক পদায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কারা হাসপাতালে যেতে অনাগ্রহ রয়েছে বেশির ভাগ চিকিৎসকের। বিশেষ করে ঢাকার বাইরের হাসপাতালে তাঁরা যেতে রাজি হন না। তিনি বলেন, ‘দেখি, এবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী করে?’
কেরানীগঞ্জে অবস্থিত ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কারাধ্যক্ষ মাহবুবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কারাগারে ১১ হাজার বন্দীর জন্য ২ জন চিকিৎসক। বন্দীদের কোনো চিকিৎসাই আসলে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিদিন অন্তত দুই শ বন্দী বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা নিয়ে কারা হাসপাতালে আসেন।
হাসপাতালের চিকিৎসক বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, এক্সরে করার মতো কক্ষ নেই। হাসপাতালের কোনো সুবিধাই এত বড় কারাগারে আসলে নেই।
কারা হাসপাতালে চিকিৎসক–সংকটের সুযোগ নিয়ে খুনের আসামিসহ সাজাপ্রাপ্ত বন্দীরা বাইরের হাসপাতালে অবস্থান করার সুযোগ নেন বলে জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, কারা হাসপাতালে চিকিৎসার সুব্যবস্থা থাকলে নানা অজুহাত দেখিয়ে ভিআইপি বন্দীদের বাইরে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করা যেত। দুর্নীতিও কমে আসত।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সাবেক উপ-কারা মহাপরিদর্শক গোলাম হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় এক লাখ কারাবন্দীর জন্য মাত্র আটজন চিকিৎসক থাকার বিষয়টি অস্বাভাবিক। বন্দী হিসেবে কারাগারে থাকলেও তাঁদের মানবাধিকারের বিষয়টি সবার ভাবা দরকার। তিনি বলেন, তাঁর সময়ে অবস্থা একই রকম ছিল। এখন সময় এসেছে অবস্থা পরিবর্তনের।

সংশোধিত মজুরি নিয়ে আপত্তি শ্রমিকদের, অবরোধের চেষ্টা

পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের একটি ছাড়া সব গ্রেডের মজুরি কাঠামো সংশোধন করে বেতন বাড়িয়েছে সরকার। নতুন এই কাঠামোর মধ্যেও আপত্তি আছে বলে মনে করেন শ্রমিকরা। একারণে গতকাল আবারো বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেছেন তারা। আশুলিয়ায় কয়েক হাজার শ্রমিক কাজ ছেড়ে রাস্তায় নেমে সকাল থেকে ঢাকা টাঙ্গাইল-মহাসড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করেন। ওই সময় কিছু কারখানার মালিক ভাঙচুরের আশঙ্কায় নিজেরাই কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।
আশুলিয়ায় কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, সংশোধিত মজুরিতে কয়েকশ’ টাকা বেড়েছে। নতুন কাঠামোর ছয়টি গ্রেডে ১৫ থেকে ৭৪৭ টাকা পর্যন্ত মজুরি বেড়েছে। আর এটা দেয়া হচ্ছে মূলত খাবার ও যাতায়াত ভাতা হিসেবে আলাদা করে।
কিন্তু আমাদের দাবি সেটা মূল বেতনের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হোক।
গত রোববার শ্রম মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে মালিক-শ্রমিক ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি জানান, নতুন কাঠামোতে চিকিৎসা, যাতায়াত, বাড়িভাড়া বাড়ানো ছাড়াও মূল মজুরির সঙ্গে ৫ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট ঘোষণা করা হয়েছে।
পর্যালোচনা কমিটির ঘোষিত কাঠামোতে দেখা গেছে, এক নম্বর গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি ৭৪৭ টাকা, দুই নম্বর গ্রেডে ৭৮৬ টাকা, তিন নম্বর গ্রেডে ২৫৫ টাকা, চার নম্বর গ্রেডে ১০২ টাকা ও পাঁচ নম্বর গ্রেডে মজুরি ২০ টাকা বেড়েছে। ষষ্ঠ গ্রেডে বেড়েছে ১৫ টাকা। আর সপ্তম গ্রেডে আগের মতোই রাখা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সংশোধিত এই কাঠামো ২০১৮ সালের ১লা ডিসেম্বর থেকেই কার্যকর ধরা হবে। বর্ধিত অংশের টাকা ফেব্রুয়ারির বেতনের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে সংশোধিত কাঠামোর গেজেট প্রকাশ করা হবে জানিয়ে শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান জানান বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমি আশা করবো, তারা সবাই শান্তিপূর্ণভাবে কাজে যোগ দেবেন।
সর্বনিম্ন গ্রেডে সবমিলিয়ে বেতন ৮ হাজার টাকা। আর সর্বোচ্চ গ্রেডে ১৮,২৫৭ টাকা। সবমিলিয়ে সর্বশেষ সমন্বিত কাঠামোতেও খুব একটা লাভ হয়নি বলে মনে করছেন শ্রমিকরা।
নতুন মজুরি কাঠামো ব্যাখ্যা করে আশুলিয়ার একটি কারখানার শ্রমিক বলেন, সরকার বেতন বাড়িয়েছে ঠিক। তবে সেটা বেসিক বা মূল বেতনের সঙ্গে নয়। আমরা চাই বেসিকের সঙ্গে সমন্বয় করে দেয়া হোক। কিন্তু তা না করে এটা আলাদা আলাদা করে খাবার ও যাতায়াতের সঙ্গে দেয়া হচ্ছে। যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, বেসিকের পরিমাণ বাড়লে আমাদের ওভারটাইমের হার বাড়ে। আলাদা করে দিলে বাড়বে না। তিনি বলেন, ধরেন আমাদের ওভারটাইমের হার আছে ৪০ বা ৩০ টাকা। বেসিকের সঙ্গে দিলে ওভারটাইমের হার আসবে ঘণ্টায় ৫০ টাকা। সেজন্য আমার দাবি বেতনটা বেসিকের সঙ্গে দেয়া হোক। অন্যদিকে বেসিক বা মূল বেতন বাড়লে ঈদ বোনাস, ছুটি-কালীন টাকা, সার্ভিস বেনিফিটও এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এমনিতেই বাড়তো।
এই শ্রমিকের মতো নতুন ঘোষিত কাঠামোতে খুশি নন বলে জানান অন্য শ্রমিকরা। তাদের মতে, ২০ থেকে আড়াই শ’ টাকায় তাদের জীবনের এমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। এ ছাড়া পোশাক শিল্পের শ্রমিকের বেশিরভাগই ওভারটাইমের বাড়তি আয়ের ওপর নির্ভরশীল। রাত ১০টা পর্যন্ত ওভারটাইম করেও আমি সব মিলাইয়া মাত্র পাই ১০ হাজার। এখন ছেলের পড়াশোনার খরচ দেবো? নাকি ২৮০০ টাকা বাসা ভাড়া দেবো? তাহলে আমরা খাবো কি? দেশে পাঠাবো কি?
আরেকজন শ্রমিক জানান, ইতিমধ্যেই গার্মেন্টে বেতন বাড়ানোর ঘোষণা আসার পরই আমাদের বাসা ভাড়া বেড়ে গেছে। এ ছাড়া অন্য যাবতীয় জিনিসের দামও বেড়ে গেছে। আরেকটি আক্ষেপের কারণ হলো প্রতি বছর সকল প্রাতিষ্ঠানিক পেশার মতোই পোশাক খাতে ৫ শতাংশ হারে মূল বেতন বা বেসিক বেতন বাড়ার কথা, যা সাধারণত ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে বাড়ানো হয়। সেটি এবার দেয়া হচ্ছে না। সেটা যোগ হলে সরকার ঘোষিত কাঠামোর সঙ্গে আরো কিছু টাকা যোগ হতো বলে জানালেন শ্রমিক নেতারা। সার্ভিস বেনিফিট হলো ৫ বছর চাকরি করলে চাকরি ছাড়ার সময় প্রত্যেক শ্রমিককে প্রতি মাসের অর্ধেক বেতন দেয়ার নিয়ম। এ ছাড়া নারীদের মাতৃকালীন চার মাসের বেসিক দেয়ার নিয়ম রয়েছে। সেটিও তারা কম পাবে। পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যাই সিংহভাগ। পোশাক মালিকেরা খুব সূক্ষ্মভাবে এভাবে শ্রমিকদের বঞ্চিত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ।
সম্মিলিত গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি নাজমা আক্তার বলেন, ত্রিপক্ষীয় কমিটি যে মজুরি সমন্বয় করেছে, এর মধ্যে ৫ ও ৬ নম্বর গ্রেডের আরেকটু বৃদ্ধি পেলে ভালো হতো। ৬ নম্বর গ্রেডে ১৫ ও ৫ নম্বর গ্রেডে ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, যা খুবই কম। মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের বলবো, কারখানা পর্যায়ে আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করুন। তিনি বলেন, মূল মজুরি কমে গেলে ওভারটাইম, অবসরকালীন ভাতা, ক্ষতিপূরণ ইত্যাদি কমে যায়। বর্তমানে অন্যান্য সুবিধাদি বাড়লেও মজুরি কিন্তু বাড়ছে না। আমাদের মজুরি বৃদ্ধি দরকার। প্রধানমন্ত্রী যেহেতু সমন্বয়টি করে দিয়েছেন, সে জন্য আমরা মেনে নিয়েছি। স্বাগত জানিয়েছি। প্রত্যাশা থাকবে, প্রধানমন্ত্রী মূল মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টি দেখবেন। শ্রমিকরা আন্দোলন বাদ দিয়ে কাজে ফিরে যাবেন।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি বাবুল আখতার বলেন, ত্রিপক্ষীয় কমিটি মজুরি যেটি সমন্বয় করেছে সেটি সবাই দেখেছে। ৩ নম্বর গ্রেডে যে হারে মজুরি বাড়ানো হয়েছে, সেই হারে ৪, ৫ ও ৬ নম্বর গ্রেডের মজুরি বাড়েনি। ৬ নম্বর গ্রেডে বেড়েছে মাত্র ১৫ টাকা ও ৫ নম্বর গ্রেডে বেড়েছে ২০ টাকা এবং ৪ নম্বর গ্রেডে বেড়েছে ১০২ টাকা। এই বৃদ্ধি শ্রমিকদের কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে জানি না। তবে শ্রমিকদের কাছে আমরা শ্রমিকনেতারা আহ্বান জানাই, তারা আন্দোলন ছেড়ে উৎপাদনে ফিরবেন।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাবেক সেক্রেটারি তৌহিদুর রহমান বলেন, যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। তবে কোনো কোনো জায়গায় হয়তো মজুরি বৃদ্ধির মেসেজটি পৌঁছেনি। তাই আন্দোলন হচ্ছে। দুয়েক দিনের মধ্যেই সব সমাধান হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, মালিকরা তো বলেছিলেন কোনো মজুরি বৃদ্ধি করা হবে না। কিন্তু আন্দোলনের মাধ্যমে সামান্য বৃদ্ধির হলেও তো কিছুটা পরিবর্তন করা গেছে। ধীরে ধীরে আগামীতে আরো পরিবর্তন হবে। এক সঙ্গে সব দাবি আদায় হবে আশা করা ঠিক না।
আরেক শ্রমিক নেত্রী কল্পনা আক্তার বলেন, বন্ধ কারখানাগুলো খুলে দিলে হয়তো আন্দোলন থেমে যাবে। আর মজুরি বৃদ্ধির মেসেজটি সবার কাছে পৌঁছাতে হবে। তাহলে পরিস্থিতি শান্ত হবে বলে মনে করেন তিনি।
মজুরি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে তা দ্রুত সংশোধনের দাবিতে টানা ৮ দিন গতকাল আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার বিভিন্ন কারখানায় বিক্ষোভ করেছে তৈরি পোশাক শ্রমিকরা। বিষয়টি নিরসনে বিকালে পুলিশ স্থানীয় বাড়িওয়ালা, জনপ্রতিনিধি এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছে। এ সময় তৈরি পোশাক শ্রমিকদের কাজে ফেরানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ে উন্মুক্ত আলোচনা করা হয়। মতবিনিময় সভায় কারখানায় কাজ না করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে তাদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করা হবে। এ ছাড়া কোনো মতেই বর্তমান পরিস্থিতি এই এলাকায় বাড়ি ভাড়া বাড়ানো যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, মঙ্গলবার থেকে জামগড়া এলাকায় মাইকিং করতে হবে যারা কার্ড পাঞ্চ করে চলে যাবেন তাদেরকে ‘নো ওয়ার্ক, নো পে’ পদ্ধতিতে কোনো বেতন পাবেন না বলে জানিয়ে দিতে হবে। এজন্য বাড়িওয়ালা ও দলীয় নেতাকর্মীদের বিষয়টি বুঝানোর জন্য অবশ্যই সকাল থেকে মাঠে থাকতে হবে। শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার সানা শামিনুর রহমান বলেছেন, অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের শ্রমিক আন্দোলনে উস্কে দেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অনেক বাড়িওয়ালা ভাড়াটিয়াদের ইন্ধন দিয়ে দিচ্ছেন বেতন বাড়লে বাড়ি ভাড়াও বাড়বে। আমরা এসব অভিযোগ বিচার বিশ্লেষণ এবং তদন্ত করছি। শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে এসব চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. আবু কালাম সিদ্দিক বলেন, গার্মেন্ট সেক্টরে চলমান অসন্তোষ নিরসন সম্ভব না হলে তা অন্য দেশে চলে যাবে। আমাদের অর্থনীতির চাকা অচল হয়ে যাবে। তাই অসন্তোষ নিরসনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুই হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো মূল্যে এ অবস্থার উন্নতি করা হবে। আমরা বিজিএমইএ’র সঙ্গে কথা বলেছি তারা যদি কারখানা বন্ধ করে দেয় তাহলে আপনারা এলাকাবাসীরাও বিপদে পড়বেন। তাই যারা গার্মেন্ট সেক্টর নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে তাদের বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে আমাদের জানাবেন। আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
উল্লেখ্য, গতকাল সকালে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার এনভয় গ্রুপ, উইন্ডি গ্রুপ, হা-মীম গ্রুপ, শারমিন গ্রুপ, পলমলসহ প্রায় ২০টি কারখানার তৈরি পোশাক শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশের পর কার্ড পাঞ্চ করে বের হয়ে যান। এ সময় হাজার হাজার শ্রমিক বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করতে চাইলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাদের ধাওয়া দিয়ে সরিয়ে দেন। এ ছাড়া জিরাবো, কাঠগড়া, সাভার, হেমায়েতপুরসহ অন্যান্য এলাকার কারখানাগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করেছে শ্রমিকরা।

রংপুরে শতকোটি টাকার মধু উৎপাদনের সম্ভাবনা by জাভেদ ইকবাল

রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় সরিষা ক্ষেত এবং লিচু বাগানে পরিকল্পিতভাবে মৌমাছির চাষ করা হলে মধু উৎপাদনের মাধ্যমে বছরে শতকোটি টাকা আয়ের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন হবে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞগণ অভিমত পোষণ করেছেন। এর ফলে একদিকে বিপুলসংখ্যক বেকার পুরুষ ও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি চাষির বাড়তি আয়ের সাথী ফসল হিসেবে নতুন সম্ভাবনাময় পণ্য হিসেবে তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিশাল এক সহায়ক শক্তির সৃষ্টি হবে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, রংপুর অঞ্চলের রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী জেলায় বিপুল পরিমাণ লিচু বাগান এবং বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির চাষ করে প্রতি বছর শতকোটি টাকা মূল্যের মধু উৎপন্ন করার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। ইতিমধ্যে কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের কারিগরি সহযোগিতায় গত কয়েক বছর ধরে এসব জেলায় বিভিন্ন সরিষা ক্ষেত এবং লিচু বাগানে মৌমাছির চাষ করার পাশাপাশি চাষিরা সাথী ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মৌমাছি চাষ সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ জনান, প্রতিটি মৌবক্সে প্রতি মওসুমে ন্যূনতম ৪ থেকে ৫ কেজি করে মধু পাওয়া যায়। এছাড়া মৌচাষের প্রকল্পভুক্ত সরিষা ক্ষেতের ফলনও অন্তত ২০ ভাগ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ওই এলাকায় বিভিন্ন ফলের গাছের মুকুল এবং ফসলের ক্ষেতে মৌমাছির ব্যাপক সমাগমের মাধ্যমে প্রচুর পরাগায়নের সৃষ্টি হয়।
এ কারণে ওইসব ফলের বাগান এবং ক্ষেতের ফলনও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। এই কর্মসূচির আওতায় গত অর্থ বছরে এসব জেলার বিভিন্ন সরিষা ক্ষেতে ৫ হাজারের বেশি মৌ বক্স স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা ধরে এই অঞ্চলে ৩ হাজার ৩১৪টি মৌমাছির বক্স স্থাপন কারা হয়েছে। এর মাধ্যমে চাষিরা সাথী ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করতে পেরে অর্থনৈতিকভাবে প্রচুর লাভবান হয়েছে। এই কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলায় সবচেয়ে বেশি সাফল্য অর্জন হয়েছে বলে জানা গেছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর বিভাগের রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট এবং নীলফামারী এই ৫ জেলায় গত রবি মৌসুমে প্রায় ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়। এসব সরিষা ক্ষেতের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমিতে মধু উৎপন্নের লক্ষ্যমাত্রা  নিয়ে ৫ হাজার  ৫৫টি মৌমাছির বক্স স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে গোটা মওসুম জুরে এসব সরিষা ক্ষেতে ৩ হাজার ৩১৪টি মৌ বক্স স্থাপন করে গত মৌসুমে ৫৫ হাজার ২০০ কেজির বেশি পরিমাণ মধু উৎপন্ন হয়েছে বলে  সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে চাষকৃত সকল সরিষা ক্ষেত মৌচাষ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হলে কেবল এসব সরিষা ক্ষেত থেকেই প্রতি মৌসুমে অন্তত ৪ লাখ কেজির বেশি মধু উৎপন্নের মাধ্যমে প্রায় ২০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হতো। এছাড়া এই অঞ্চলের লিচু বাগানের মধ্যে পরিকল্পিতভাবে মৌমাছির চাষ করে আরও অন্তত ২০ থেকে ২৫ লাখ কেজি মধু উৎপন্ন করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে প্রায় শতকোটি টাকা মূল্যের মধু উৎপন্নের অপার সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব উৎপাদিত মধু দেশের স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। অপর দিকে পশ্চাৎপদ এবং  অবহেলিত এই অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি দক্ষ জনশক্তির এক অপার ভাণ্ডারও তৈরি হবে। প্রাপ্ত সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭-১৮ অর্থ বছরের গত মৌসুমে রংপুর জেলায় সরিষা চাষ করা হয়েছে ৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ১০৬ হেক্টর জমির সরিষা ক্ষেতে ৯৮টি মৌ বক্স স্থাপন করে ২০৫ কেজি এবং জেলার ৪৬৪ হেক্টর জমিতিে চাষকৃত লিচু বাগানের মধ্যে ৪৫ হেক্টরে ৭২৫টি মৌ বক্স স্থাপন করে ৯ হাজার ৭১০ কেজি মধু উৎপন্ন হয়েছে। কুড়িগ্রাম জেলায় ১২ হাজার ৮৫৩ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৪৬৯ হেক্টর সরিষা ক্ষেতে ২ হাজার ৪০১টি মৌ বক্স স্থাপন করে ৫২ হাজার ৭৪০ কেজি। গাইবান্ধা জেলায় ৬ হাজার ৯৯০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৫০ হেক্টর সরিষা ক্ষেতে ৬০৩টি মৌ বক্স স্থাপন করে ২ হাজার ৫০ কেজি। নীলফামারী জেলায় ৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এর মধে ১৩১ হেক্টর সরিষা ক্ষেতে ৩৯টি মৌ বক্স স্থাপন করে ১৫৫ কেজি। লালমনিরহাট জেলায় ১ হাজার ৭৯৫ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫ হেক্টর সরিষা ক্ষেতে ২০৫টি মৌ বক্স স্থাপন করে ৮৫ কেজি মধু উৎপন্ন হয়েছে। মৌমাছি চাষে কৃষকদের সহায়তার জন্য কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করছে। মৌমাছি চাষের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকার চাষিরা সাথী ফসল হিসেবে বাড়তি আয়ের সুযোগ পেয়েছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের। সীমিত পর্যায়ে মৌমাছি চাষে সাফল্য অর্জিত হওয়ায় রংপুর বিভাগের ৫ জেলায় গত রবি মৌসুমে প্রায় পৌনে ৩ কোটির বেশি টাকা মূল্যের ৫৫ হাজার কেজিরও বেশি মধু উৎপন্ন হয়েছে। কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক ডক্টর মোহাম্মদ সরওয়ারুল হক জানান, রংপুর অঞ্চলে লিচু এবং সরিষা ক্ষেতে মৌচাষ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে মৌচাষ ইতিবাচক প্রভাব হিসেবে ব্যাপক সাফল্যের কাজ করছে। ফলে চাষিরাও এতে ক্রমান্বয়ে উৎসাহিত হচ্ছে। বিশেষ করে নদী তীরবর্তী চড় এলাকা সহ বির্স্তীন সরিষার ফসলের মাঠে মৌচাষে চাষিরা উৎসাহিত হয়ে তা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে দক্ষ মৌয়ালের অভাবে অনেকেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে মৌচাষে এগিয়ে আসতে পারছে না বলে তিনি জানান। দেশের উত্তরাঞ্চলের সিরাজগঞ্জ এবং বগুড়ার কিছু এলাকায় দক্ষ মৌয়াল আছে তারাই প্রত্যেক মৌসুমে এসে সীমিত পর্যায়ে এই এলাকায় মৌয়ালের দায়িত্ব পালন করে থাকে। সিরাজগঞ্জের মৌসুমি মৌয়াল চান মিয়া জানান, প্রত্যেক গ্রীষ্ম মৌসুমে তারা এই অঞ্চলে মধু সংগ্রহের জন্য আসেন। সাধারণত এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে মধু সংগ্রহ শুরু হয়। মৌয়ালরা অভিযোগ করে জানান, আমাদের দেশে লিচু বাগানে মৌচাষ বা মধু সংগ্রহের জন্য কোনো নিয়ম শৃঙ্খলা নেই। বাজারজাত করার ব্যাপারেও কোনো পরিকল্পিত উদ্যোগ নেই। এ ব্যাপারে সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হলে কেবল মৌচাষ করেই রংপুর অঞ্চলের চাষিরা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ স্বাবলম্বী হতে পারবে।

এমপিদের শপথের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট

একাদশ জাতীয় সংসদের এমপিদের শপথের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করা হয়েছে হাইকোর্টে। দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই সংসদ সদস্যদের (এমপি) শপথ নেয়া অসাংবিধানিক ও বেআইনি দাবি করে এ রিট করা হয়েছে। গতকাল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিট আবেদনটি দায়ের করেছেন আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন । রিট আবেদনকারী হলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. তাহেরুল ইসলাম (তৌহিদ)।
এর আগে গত ৮ই জানুয়ারি একাদশ সংসদের এমপিদের শপথ গ্রহণের প্রজ্ঞাপন বাতিল বা প্রত্যাহার চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ দেন রিট আবেদনকারী। কিন্তু বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে এমপিদের শপথের প্রজ্ঞাপন বাতিল বা প্রত্যাহার না হওয়ায় রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন। নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছিল, ১৩ই জানুয়ারি সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যে শপথের প্রজ্ঞাপন বাতিল বা প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে উচ্চ আদালতে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে।
তবে তিনি রিট আবেদনের বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি মাহবুব উদ্দিন খোকন।
আজ মঙ্গলবার রিট আবেদনটি শুনানির জন্য হাইকোর্টের কোনো দ্বৈত বেঞ্চে উপস্থাপন করা হতে পারে। 
মাহবুব উদ্দিন খোকন জানিয়েছেন, রিট আবেদনে লিগ্যাল নোটিশের দেয়া আইনি যুক্তিকে আরো বিশদ আকারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
৮ই জানুয়ারি পাঠানো নোটিশে বলা হয়েছিল, গত ৩রা জানুয়ারি এমপিদের শপথ গ্রহণে সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে। কারণ দশম জাতীয় সংসদের পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হবে আগামী ২৮শে জানুয়ারি। সংসদের মেয়াদ অবসানের আগেই তাদের শপথ গ্রহণ অসাংবিধানিক ও বেআইনি।
নোটিশে বলা হয়, দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। প্রজ্ঞাপন জারির পর এমপিরা শপথ নিয়েছিলেন ৯ই জানুয়ারি। মন্ত্রিসভার সদস্যরা শপথ নেন ১২ই জানুয়ারি। ২৯শে জানুয়ারি সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে সংবিধান অনুযায়ী যার পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হবে আগামী ২৮শে জানুয়ারি।
আর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ সংসদীয় আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩০শে ডিসেম্বর। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ অনুসারে ১লা জানুয়ারি নির্বাচিত এমপিদের প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্বাচন কমিশন। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে প্রকাশ শপথ অনুষ্ঠানে আয়োজনে পদক্ষেপ নিতে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপনটি পাঠানো হয় সংসদ সচিবালয়ের সচিবের কাছে। স্পিকারের আমন্ত্রণে গত ৩রা জানুয়ারি একাদশ সংসদের এমপিরা শপথ নিয়েছেন সংবিধানের ৫৬ (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। রাষ্ট্রপতি ওইদিনই শপথ নেয়া এমপিদের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৬ই জানুয়ারি মন্ত্রীদের নাম ও দপ্তর প্রকাশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদে সংসদ ভেঙে দিয়ে পুনরায় সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের দফা (৩)-এ বলা হয়েছে, ‘সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে; এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোন কারণে সংসদ ভাংগিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাংগিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে: তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।]
এ বিধানে মোতাবেক এটা পরিষ্কার যে, ২৮শে জানুয়ারি আগের সংসদের মেয়াদ অবসানের পূর্ব পর্যন্ত একাদশ জাতীয় সংসদের এমপিরা শপথ নিতে পারেন না। কিন্তু  ১২৩ (৩) এর বিধান উপক্ষো করে তারা শপথ নিয়েছেন। যাতে সংবিধান লঙ্ঘিত হয়েছে।
সংবিধানের ১৪৮ (৩) এ বলা হয়েছে-এই সংবিধানের অধীন যে ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির পক্ষে কার্যভার গ্রহণের পূর্বে শপথগ্রহণ আবশ্যক, সেই ক্ষেত্রে শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে। এই অনুচ্ছেদ প্রমাণ করে যারা ৩রা জানুয়ারি এমপি হিসেবে শপথ নিয়েছেন তারা দশম সংসদের মেয়াদ বলবত থাকায় সংবিধানের ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদের শর্ত লঙ্ঘন করেছেন। সংবিধানের ১২৩ (৩) লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে যারা শপথ নিয়েছেন তারা প্রধানমন্ত্রী নিয়োগেও সহায়তা করেছেন। আইনের দৃষ্টিতে এমপিদের কার্যভার গ্রহণ যে কারণে সংবিধান পরিপন্থী এবং প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও সরকার গঠনে সহায়তা করাও একই কারণে সংবিধান পরিপন্থী।
দশম সংসদ এখানো কার্যকর থাকায় এবং ২৮শে জানুয়ারি সংসদের পাঁচ বছর মেয়াদ অবসান না হওয়া পর্যন্ত এমপিদের নতুন করে নেয়া শপথ আইনত অকার্যকর। কারণ তারা এখনো দশম সংসদের এমপি। সংবিধানের ৬৫ (৩) (ক) অনুযায়ী ৩৪৫ জনেরও বেশি এখনো এমপি পদে বহাল রয়েছেন।
ফলে ১২৩ (৩) অনুচ্ছেদ ও ১৪৮ (৩) অনুচ্ছেদের আলোকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত এমপিদের ৩রা জানুয়ারির শপথ, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও সরকার গঠন সংবিধান পরিপন্থি, বেআইনি ও আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত। শপথ এবং এমপি হিসেবে কার্যভার গ্রহণ আইনত অগ্রহণযোগ্য এবং বাতিলযোগ্য। যেহেতু এমপিরদের শপথ বেআইনিভাবে হয়েছে সেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ও সরকার গঠনও বেআইনি, অসাংবিধানিক ও বাতিলযোগ্য।

আহমদ শফীর নতুন নতুন ফরমান বিতর্ক বাড়ছে

একের পর এক ফরমান। বিতর্ক বাড়ছে হেফাজত আমীর আল্লামা শাহ্‌ আহমদ শফীর বক্তব্য নিয়ে। শুরুটা হয়েছিল শুক্রবার। যখন হাটহাজারী মাদ্‌রাসা প্রাঙ্গণে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না। ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়াতে পারবেন। উপস্থিত অনুসারীদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে ওয়াদাও নেন তিনি। এ নিয়ে তৈরি হয় তুমুল বিতর্ক। শিক্ষাবিদ, ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষকরা মত দেন, আল্লামা শফীর এ বক্তব্য ইসলাম ও সংবিধান সম্মত নয়।
বিতর্কের মুখে বিবৃতি দেন হেফাজত প্রধান। বলেন, তার বক্তব্য গণমাধ্যমে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আহমদ শফী কী বলেছিলেন, তা অডিও রেকর্ডে পরিষ্কার শোনা যায়। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই।
ওই বিবৃতিতে নারী শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা হাজির করেন আহমদ শফী। তিনি বলেন, আমি আমার বক্তব্যে বলতে চেয়েছি, শিক্ষাগ্রহণ করতে গিয়ে যেন পর্দার বিধান লঙ্ঘন করা না হয়। কারণ আমাদের দেশের বেশির ভাগ সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে সহশিক্ষা দেয়া হয়, অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে একই সঙ্গে শিক্ষাগ্রহণ  করে। এতে করে পর্দার লঙ্ঘন হয়। শিক্ষাগ্রহণ অবশ্যই জরুরি, তবে সেটা গ্রহণের জন্য আমরা আমাদের কন্যাদের অনিরাপদ পরিবেশে পাঠাতে পারি না। সর্বশেষ আল্লামা শফী আরেক বিবৃতিতে বলেছেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের পড়াতে চাইলে বোরকা পরতে হবে। নারী শিক্ষার্থীদের পড়াতে নারী শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
হেফাজত আমীরের সর্বশেষ এইসব বক্তব্য এরই মধ্যে তুমুল আলোচনা তৈরি করেছে। রাজনীতিবিদ থেকে শুরু বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ এ নিয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেছেন, হেফাজত আমীরের বক্তব্য রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আহমদ শফীর বক্তব্যে হতবাক ও বিস্মিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ নিয়ে বিবৃতি দেন তিনি। ওদিকে, মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পড়ানোর জন্য হেফাজতে ইসলামের আমীর শাহ্‌ আহমদ শফীর নারী শিক্ষা বিরোধী বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে গণফোরাম। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু এ নিন্দা জানান। বিবৃতিতে তারা বলেন, আহমদ শফীর বক্তব্য নারী বিদ্বেষী, স্বাধীনতার চেতনা বিরোধী ও সংবিধান বিরোধী।
এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নিতে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। আহমদ শফী ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মনগড়া ফতোয়া দিয়ে দেশ ও সমাজকে আলো থেকে অন্ধকারে নিতে চান। আহমদ শফীর নারী শিক্ষা বিরোধী ফতোয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান তারা। শিক্ষাবিদ ও ইসলামী চিন্তাবিদরা বলছেন, ইসলামী জ্ঞান অর্জনে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। এখানে নারী এবং পুরুষকে আলাদা করে দেখা হয় না। আল্লামা আহমদ শফী যে বক্তব্য দিয়েছেন তা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি না। তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তা ইসলাম সম্মত না।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশে হেফাজতে ইসলামের আবির্ভাব ছিলো নাটকীয়। শাহবাগের কাউন্টার হিসেবেই প্রথম বিপুল আলোচনায় আসে সংগঠনটি। ধর্মভিত্তিক দাবিতে মাঠে আবির্ভূত হওয়া হেফাজত প্রথম কওমি মাদ্‌রাসা ভিত্তিক সংগঠনগুলোর ব্যাপক সমর্থন পায়। ক্রমে তাদের দাবিও কর্মসূচি নেতিয়ে পড়ে। এতে অনুসারীদের কাছেই অনেকটা গুরুত্ব কমে যায় এই সংগঠনটির। বিশেষ করে চট্টগ্রামের হাটজাহারী মাদ্‌রাসার প্রধান আল্লামা আহমদ শফীর একক নেতৃত্ব, সংগঠনটির কার্যক্রম ওই মাদ্‌রাসাকেন্দ্রিক হওয়ায় সারা দেশের আলেম- ওলামারা হেফাজতের কার্যক্রমে সক্রিয় হচ্ছেন না। এছাড়া বিভিন্ন বিষয়ে সংগঠনটির বিতর্কিত অবস্থান, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে সখ্য ও রাজনৈতিক বক্তব্য সময়ে সময়ে সংগঠনটিকে আলোচনায় আনে।
অরাজনৈতিক তাবলীগ জামায়াতের দুই ভাগ হওয়ার পেছনেও রয়েছে হেফাজতকেন্দ্রিক একটি অংশ। সর্বশেষ কওমি মাদ্‌রাসা সনদকে (দাওরায়ে হাদিস) মাস্টার্সের সমমানের মর্যাদা দেয়াকে কেন্দ্র হেফাজতের কর্মসূচি সারা দেশে আলোচনার জন্ম দেয়। এতে সংগঠনটির অনেক অনুসারী ওই অবস্থানের সমালোচনা করেন।

লেডি বাইকারের বিরুদ্ধে বিয়ে প্রতারণার অভিযোগ

মাধবদীতে সুবর্ণা নাহার সাথী (২৩) নামে এক লেডি বাইকারের বিরুদ্ধে ‘বিয়ে’ প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে এবং একাধিক মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগ করেন তার স্বামীর পরিবার। সোমবার মাধবদী প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন স্বামী শরিফুল ইসলাম সানীর (২৪) পরিবার। তিনি ওই এলাকার পল্লী চিকিৎসক শামসুল হকের ছেলে। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সানীর বড় ভাই ব্যাংক কর্মকর্তা শামিমুল হক সেলিম।
লিখিত বক্তব্যে তিনি অভিযোগ করেন, সুবর্ণা নাহার সাথী প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে শরিফুুল ইসলাম সানীকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে পরিবারের অমতে তাকে বিয়ে করতে বাধ্য করেন। পরবর্তীতে নানা সময়ে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কারের দাবিতে সানির পরিবারের সঙ্গে তার কলহ শুরু হয়। ধীরেধীরে সাথীর আসল উদ্দেশ্য বেরিয়ে আসতে থাকলে সানীর পরিবার সতর্ক হয়ে যায়।
এতে ক্ষিপ্ত হয়ে সানীর পরিবারের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও গণধর্ষণের অভিযোগ এনে মাধবদী থানায় পরপর দুটি মামলা করেন সাথী।
তিনি আরো বলেন, লেডি বাইকার হিসেবে পরিচিত সাথী মূলত একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্য। চক্রটির সহযোগিতায় এর আগে ঢাকার আরেক যুবককে বিয়ে ও পরবর্তীতে ওই যুবকের বিরুদ্ধে মামলা করে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন সুবর্ণা নাহার সাথী। তিনি বলেন, সানির সঙ্গে বিয়ের কাবিনামায় সাথী নিজেকে কুমারী দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেলস্‌ ম্যানেজার মহিবুল ইসলাম শাওন নামে এক যুবকের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলে বিয়ে করে মেটো অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেন সুর্বণা নাহার সাথী। এ ঘটনায় একটি বেসরকারি টেলিভিশনে এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে চলে আসে সাথীর আসল কাহিনী।

মহাজগত থেকে পৃথিবীতে আসছে রহস্যজনক বেতারতরঙ্গ

মহাজগতের বহুদূরের একটি ছায়াপথ থেকে আসা রহস্যজনক সংকেত পাওয়ার বিস্তারিত প্রকাশ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ক্যানাডার একটি টেলিস্কোপে ওই সংকেত ধরা পড়েছে।
তবে সংকেতের অর্থ বা কোথা থেকে সেটি আসছে, তা এখনো বিজ্ঞানীরা বের করতে পারেননি।
এর মধ্যে ১৩টি দ্রুত গতির বিস্ফোরণের মতো বেতার শব্দ রয়েছে, যেটি বারবার ঘুরে ঘুরে আসছে। যেটিকে এফআরবি বলে বিজ্ঞানীরা বর্ণনা করছেন। এই শব্দটি প্রায় দেড় হাজার আলোকবর্ষ দূরের কোন উৎস থেকে আসছে।
এ ধরণের ঘটনা অতীতে আরো একবার ঘটেছে, সেটি আরেকটি টেলিস্কোপের মাধ্যমে জানা গিয়েছিল।
ব্রিটিশ কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইনগ্রিড স্টেয়ারর্স বলছেন, ''এটা জানার পর আরো একবার এই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, মহাবিশ্বের অন্য কোথাও কিছু রয়েছে।''
''এ ধরণের শব্দ আরো পাওয়া গেছে এবং গবেষণার জন্য আরো উৎসের সন্ধান মিললে, আমরা হয়তো এই সৃষ্টি সংক্রান্ত রহস্য বুঝতে শুরু করবো- এটি কোথা থেকে আসছে আর কি কারণে সেটির উৎপন্ন হচ্ছে।''
ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ওকানাগান উপত্যকায় চারটি একশো মিটার লম্বা অ্যান্টেনা নিয়ে শাইমি গবেষণাগারটি অবস্থিত, যেখানে এই সংকেত ধরা পড়েছে। এই গবেষণাগার থেকে প্রতিদিন আকাশে অনুসন্ধান চালানো হয়।
গত বছর এই টেলিস্কোপটি কাজ শুরু করার পর মহাবিশ্বের ১৩টি মহাজাগতিক বিস্ফোরণের শব্দ পেয়েছে, যার মধ্যে একটি কয়েকবার ফিরে ফিরে এসেছে।
সম্প্রতি ন্যাচার পত্রিকায় এই গবেষণার তথ্যটি প্রকাশিত হয়।
''আমরা দ্বিতীয় বারের মতো একটি সংকেতের পুনরাবৃত্তি পেয়েছি, দ্বিতীয় সংকেতটি একেবারে প্রথমটির মতোই ছিল,'' বলছেন ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রীহর্ষ তেন্ডুলকার।
''এটা আমাদের ওই সংকেতের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরো ধারণা দিচ্ছে", তিনি বলছেন।
এফআরবি মানে সংক্ষিপ্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ বেতার তরঙ্গ, যা হয়তো মহাবিশ্বের আরেক প্রান্ত থেকে পৃথিবীতে এসে পৌঁছচ্ছে।
এ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এরকম ৬০টি একক, দ্রুত গতির বিস্ফোরণের বেতার তরঙ্গ সনাক্ত করতে পেরেছেন, যার মধ্যে দুইটির পুনরাবৃত্তি হয়েছে। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, প্রতিদিন আকাশে এরকম সহস্রাধিক বেতার তরঙ্গ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
কি কারণে এরকম বেতার তরঙ্গ তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে অনেক মতবাদ চালু আছে।
এসব ধারণার মধ্যে আছে: শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র নিয়ে কোন নিউট্রন তারকার খুব দ্রুত ঘূর্ণন, দুইটি নিউট্রন তারকার একত্রে মিশে যাওয়া আর অল্প কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, ভিনগ্রহের প্রাণীর মহাকাশযান থেকে আসা তরঙ্গ।