Tuesday, January 14, 2025
সাংবাদিকতা আমার নেশা, পেশা by মতিউর রহমান চৌধুরী
যাইহোক, কিছুদিন পর পূর্বদেশের তৎকালীন সম্পাদক এহতেশাম হায়দার চৌধুরী আমাকে চাকরি দেন। সেটাও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। চারটি পত্রিকা রেখে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। আমাকে গেজেটেড সরকারি চাকরিরও অফার করা হয়। কিন্তু সে চাকরিতে আমি যোগ দেইনি। সুইডেন চলে যাব এমনটাই স্থির হয়েছিল। এর মধ্যে পরিবর্তন আসে দেশে। ১৫ই আগস্ট নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। সংবাদমাধ্যমের নতুন যাত্রা শুরু হয়। ফেরদৌস আহমেদ কোরেশীর সম্পাদনায় আত্মপ্রকাশ ঘটে দৈনিক দেশবাংলার। সেখানে যোগ দেই। কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে চিফ রিপোর্টারের দায়িত্ব দেয়া হয়। অল্পদিনের মধ্যেই দৈনিক সংবাদে চাকরি হয়ে যায়। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় জিয়াউর রহমান। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় মন্ত্রীরা ঘুষ খাবেন না, তথ্য পাচার করবেন না। কোরআন শরীফ ছুঁয়ে তারা শপথ নেন। এই খবরটা আমার কাছে এসেছিল বিভিন্ন সূত্র থেকে। ইত্তেফাকের সহকর্মী আলমগীর হোসেনের সহায়তায় খবরটির চূড়ান্ত সত্যতা যাচাই করার পর লিখে দেই। ব্যানার হেডিং হয়ে যায়। পরদিন হুলস্থূল। জিয়াউর রহমানের প্রেস উপদেষ্টা দাউদ খান মজলিস ডেকে পাঠান বঙ্গভবনে। খবরের সূত্র জানতে চান। এটা বলি কী করে! একমাত্র সম্পাদক ছাড়া আর কারও কাছে সূত্র বলার সুযোগ নেই। এটাই সাংবাদিকতার শপথ। উত্তেজিত দাউদ খান মজলিস ফোন করলেন সংবাদের সম্পাদক আহমেদুল কবিরের কাছে। বললেন, তোমার রিপোর্টার তো আমার সর্বনাশ করে দিয়েছে। ফিরে এলাম প্রেস ক্লাবে। এরপর সচিবালয়ে ঢুকতেই নিরাপত্তারক্ষী বাধা দিলেন। বললেন, আপনার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড বাতিল হয়ে গেছে। দুপুরের পর অফিসে যেতেই বলা হলো, কবির সাহেব রেগেমেগে অস্থির, দেখা করতে বলেছেন। সম্পাদক আহমেদুল কবির তখন কথা বলছিলেন বার্তা বিভাগের দায়িত্বরত প্রয়াত বজলুর রহমানের সঙ্গে। তিনিই আমার রিপোর্টটি খুব যত্ন সহকারে ছেপেছিলেন। তার বিশ্বাস ছিল আমি আর যাই করি ভুল রিপোর্ট দেবো না। কবির সাহেব সূত্র জানতে চাইলেন না। বললেন, ওরা তো খবরের সত্যতা অস্বীকার করছে না। তারা শুধু জানতে চাচ্ছে কে খবরটা লিক করেছে। বজলু ভাই তখন আমাকে সমর্থন করলেন। বললেন, ওর দোষ কোথায়। ও তো ঠিকই লিখেছে। কোরআন শরীফ ছুঁয়ে যদি কেউ শপথ ভঙ্গ করে তাহলে এই সমস্যা আমাদের নয়। বিষয়টির নিষ্পত্তি এখানেই হলো না। তিন দফা এসবি অফিসে যেতে হয়েছিল। সংবাদে থাকাকালে বাংলাদেশ চীন থেকে অস্ত্র কিনছে এই রিপোর্ট প্রকাশের পর সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ কয়েকঘণ্টার জন্য আটক রাখে আমাকে। বাতিল হয় অ্যাক্রিডিটেশন। জেনারেল আমসা আমিন ছিলেন দায়িত্বে। বারবার একই প্রশ্ন। কে দিয়েছে আপনাকে এই খবর। বলা চলে, এই সব রিপোর্টই আমার জন্য ইত্তেফাকের দরজা খুলে দেয়।
ইত্তেফাকের তখন স্বর্ণযুগ। এক দুপুরে ডাক পেলাম সেখান থেকে। ইত্তেফাক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু দেখা করতে বলেছেন। এক সাক্ষাতেই চাকরি হয়ে গেল। কূটনৈতিক রিপোর্টারের দায়িত্ব পেয়ে গেলাম। সে দিনগুলো ছিল আমার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। বহুবার ডিজিএফআই আর এসবি অফিসে যেতে হয়েছে। পৃথিবীর বড় বড় ইভেন্ট কাভার করার সুযোগ হয়েছে। বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিক হিসেবে অংশ নেয়ার বিরল সুযোগও আসে। এমনকি বিশ্বকাপ ক্রিকেটেও প্রথম বাংলাদেশি সাংবাদিক ছিলাম। আর এসবের জন্য আজও কৃতজ্ঞতা জানাই সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর কাছে। বিদেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে ইত্তেফাককে আরও সমৃদ্ধ করেন। পরে যোগ দেন রাজনীতিতে। মন্ত্রীও হন। সে নিয়ে অবশ্য তখনই লিখিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলাম। বলেছিলাম, একজন সম্পাদক যেখানে মন্ত্রী, এমপি বানান তার কেন মন্ত্রী হতে হবে! যাইহোক, এটা অন্য বিতর্ক। ইত্তেফাকে থাকাকালে নিয়মিতভাবে কলাম লিখতাম সাপ্তাহিক খবরের কাগজে। তখন উপসাগরীয় যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধ কাভার করার জন্য সৌদি আরব যাওয়ার প্রস্তুতিপর্বে দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য শিরোনামে একটি কলাম লিখেছিলাম। তখন এরশাদের জমানা। লেখাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। আমার গাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে নিয়ে গিয়ে ব্রিজের ওপর থেকে ফেলে দেয়া হয়। মামলা গড়ায় আদালতে।
তৃতীয়মাত্রা-খ্যাত সাংবাদিক জিল্লুর রহমানের বিরামহীন তাগিদের প্রেক্ষিতে লেখাটা জমা দিয়ে প্লেনে চড়েছিলাম। তারপর তো অনেক কিছু ঘটে যায় দেশে। সাপ্তাহিক খবরের কাগজ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। হুলিয়া জারি করা হয় আমার বিরুদ্ধে। আবারো বাতিল করা হয় আমার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। প্রধান বিচারপতি তখন সাহাবুদ্দীন আহমদ। তার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ থেকেই ঐতিহাসিক রায় আসে। সাপ্তাহিক খবরের কাগজের প্রকাশনা ফের চালু হয়। আজ সংবাদমাধ্যম যেটুকু স্বাধীনতা ভোগ করছে মূলত বিচারপতি সাহাবুদ্দীনেরই অবদান। অথচ, তার কথা আমরা কেউই স্মরণ করি না। এখানে বলে রাখা ভালো, দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসের নৃত্য লেখার কারণে আমাকে ১৭ ঘণ্টা আটক রাখা হয়েছিল। ইত্তেফাক ছাড়লাম। যোগ দিলাম আজকের কাগজে। অল্পদিন পরেই ছাড়তে হলো মালিকপক্ষের সঙ্গে বিরোধের কারণে। পরের ইতিহাস নিজের পায়ে দাঁড়ানো। পারিবারিক সঞ্চয় আর স্ত্রীর বাপের বাড়ি থেকে পাওয়া অর্থ খুইয়ে বাংলাবাজার পত্রিকা ছেড়ে দিতে হলো। বাংলাবাজারে থাকা অবস্থায় জেলে যেতে হলো। রয়টার্সের সাবেক ব্যুরো প্রধান সিরাজুল ইসলাম কাদিরের একটি রিপোর্ট প্রকাশের কারণেই খালেদা জিয়ার প্রশাসন আমাকে অফিস থেকে গ্রেপ্তার করে। নতুন যাত্রা শুরু হলো মানবজমিন-এ। যত ঝামেলা এখানেই। একটি ক্যাসেট কেলেঙ্কারির রিপোর্ট প্রকাশের জন্য মামলা হলো আদালতে। তখন সাহাবুদ্দীন আহমদ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করছেন। শেখ হাসিনা তখন প্রধানমন্ত্রী। আদালত অবমাননার মামলায় প্রমাণ চেয়ে নির্দেশনা এলো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। এক্ষেত্রে মানবজমিনই ব্যতিক্রম। হাজির করলাম ক্যাসেট। যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদ বিচারপতি লতিফুর রহমান কথা বলছিলেন টেলিফোনে একটি নির্দিষ্ট মামলা নিয়ে। প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ ও ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ আমার পথে দাঁড়ালেন। যেটা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা ছিল। বিচারপতি পদত্যাগ করলেন। মামলায় আমার এক মাস জেল হলো। সম্পাদক মাহবুবা চৌধুরীর একদিন। আর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছয় মাস। মামলাটি এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। মাঝখানে বিরতি। আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় শেখ হাসিনা। মানবজমিন-এ তার বিরক্তি ছিল প্রচণ্ড। বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিলেন। দেশ ছাড়তে বাধ্য হলাম। টানা আট মাস বিদেশে থাকতে হলো। দীর্ঘ সময় অ্যাক্রিডিটেশন পেলাম না। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে যাওয়া বন্ধ। ভয়েস অফ আমেরিকা থেকে সরানোর জন্য লবিং করলো হাসিনার প্রশাসন। ২৮ বছর পর ছাড়তে হলো ভয়েস অফ আমেরিকা। কূটনৈতিক পার্টিগুলোতেও এজেন্সির লোকেরা নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতো। হাসিনার পতনের তিনদিন আগে ২রা আগস্ট আবার দেশ ছাড়তে হলো আমাকে।
এগুলো সংক্ষিপ্ত বয়ান। তবে, এখানে দু’টি রিপোর্টের কথা উল্লেখ করা যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর আত্মগোপন এবং গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি খবর। দীর্ঘ ১১ বছর আত্মগোপনে ছিলেন হারিছ চৌধুরী। করোনায় তার মৃত্যু হয়। দাফন করা হয় সাভারে। কিন্তু খবরটি মামুলি কোনো খবর নয়। ১১ বছর ধরে ঢাকার পান্থপথে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান নামে গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। কিন্তু মানবজমিন-এর অনুসন্ধানে জানা যায়, এই ব্যক্তিই হারিছ চৌধুরী। ২০২২ সনের ৬ই মার্চ আমার এই অনুসন্ধানী রিপোর্টটি প্রকাশের পর চারদিকে হইচই পড়ে যায়। সকল সংবাদমাধ্যম খবরটি লুফে নেয়। জানতে চাওয়া হয় ইন্টারপোল থেকেও। কিন্তু গোয়েন্দারা বরাবরের মতোই অস্বীকার করেন। বলেন, খবরের কোনো সত্যতা নেই, মানবজমিনকে দুঃখ প্রকাশ করতে হবে। শেষ পর্যন্ত মানবজমিন দুঃখ প্রকাশ করেনি। বিষয়টি গড়ায় আদালতে। হারিছ চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার সামিরা তানজীন চৌধুরীর আবেদনের প্রেক্ষিতে ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় মাহমুদুর রহমান নয়, হারিছ চৌধুরী মারা গেছেন।
পরের খবরটি রীতিমতো চাঞ্চল্যকর। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তখন বলা হয় তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন। সেই আলোচিত পদত্যাগপত্রের অনুসন্ধান করতে গিয়েই পাওয়া গেল অবিশ্বাস্য এক খবর। পদত্যাগপত্র নেই কোথাও। এর কারণ কী? তিনি কি পদত্যাগ করেননি? প্রেসিডেন্টসহ সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল দেশ ছাড়ার সময় শেখ হাসিনা পদত্যাগপত্র দিয়ে যাননি। খবরটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় সরকারি মহলে। রাজনৈতিক নেতারাও উষ্মা প্রকাশ করেন। সপ্তাহখানেক ধরে মিডিয়াজুড়েই ছিল এই খবরটি। আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও খবরটি ঘিরে নানা বিশ্লেষণমূলক রিপোর্ট প্রচার হতে থাকে। প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে চাপ দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি থেমে যায় নানা রাজনৈতিক ইকুয়েশনে।
(হবিগঞ্জ প্রেসক্লাব-এর ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত ‘অন্তরালের মুখ’ স্মরণিকা থেকে)

Thursday, December 30, 2010
গণমাধ্যমকে কে রেগুলেট করবে? by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
আমার এই পর্যবেক্ষণ পাঠকের জন্য নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অফিসে, ক্লাবে, পারিবারিক আড্ডায় বা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কথা অনেক বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। আমি সৌজন্যবশত কোনো পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের নাম লিখিনি। কিন্তু আড্ডার আলোচনায় অনেকে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নাম নিয়েই অভিযোগ তোলেন। অনেক পাঠক এসব কথা জানেন।
আদর্শভিত্তিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এ দেশে একদা সংবাদপত্র প্রকাশনা শুরু হয়েছিল। সংবাদপত্রের সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিকেরা ছিলেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র। আর আজ? আজ ঋণখেলাপি, ভূমিদস্যু থেকে শুরু করে গোয়েন্দা বিভাগের এজেন্ট অনেকেই সংবাদপত্রের প্রকাশক বা সম্পাদক। নানা কারণে এখনো সম্পাদক বা প্রকাশকের একটা সরকারি বা সামাজিক স্বীকৃতি ও সম্মান রয়েছে। এই সম্মানের আড়ালে তাঁরা কার কী স্বার্থ উদ্ধার করছেন, তা খুব কম পাঠকেরই জানার সুযোগ হয়। অনেক সরলমনা পাঠক এখনো সংবাদপত্রের সব খবর বা নিবন্ধকে খুব আস্থার সঙ্গে পড়েন। কিন্তু সব সংবাদপত্র যে ‘সাংবাদিকতা’ করার লক্ষ্যে সংবাদপত্র প্রকাশ করে না, তা অনেকেই জানেন না। তবে কিছু সংবাদপত্র নিয়মিত পাঠ করে অনেক পাঠক ইতিমধ্যে বুঝতে পেরেছেন, কয়েকটি সংবাদপত্রের বিশেষ অ্যাজেন্ডা কী? একটা পুরোনো প্রবাদ আছে, কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়। অনেক মানুষকে বেশি সময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না।
সাংবাদিকতার কিছু আন্তর্জাতিক নিয়মরীতি আছে। কিন্তু সংবাদপত্রের প্রকাশক বা সম্পাদক যদি তা মানতে না চান, তাহলে তাঁকে বাধ্য করবে কে? কারণ তাঁর হাতে রয়েছে সংবাদপত্র, রিপোর্ট, ছবি, কলাম ও আরও কত কী। টিভি চ্যানেলের মালিকের রয়েছে ক্যামেরা, ক্যাসেট, এডিটিং টেবিল ও সম্প্রচারের যন্ত্র। আর কী চাই? তিনি যা চান, তা-ই প্রচার করতে পারেন। ইচ্ছেমতো বক্তৃতা কাটতে পারেন। এক কথার সঙ্গে সুবিধামতো আরেক কথা জোড়া দিতে পারেন। বক্তার একটা কথার দুটি শব্দ বাদ দিয়েও প্রচার করতে পারেন। একই কথা দুবার প্রচার করতে পারেন। এক ছবি ১০ বার দেখাতে পারেন। দেখানোর উপযুক্ত হলেও তা না দেখানোর স্বাধীনতাও তাঁর রয়েছে। টিভি চ্যানেলের স্বাধীনতার (পড়ুন স্বেচ্ছাচারিতা) কোনো শেষ নেই। টিভি চ্যানেলও যদি নিয়মরীতি মানতে না চায়, কে তাকে বাধ্য করবে? সমাজে এমন কোনো শক্তি আছে কি, গণমাধ্যমকে রীতিনীতি মানতে বাধ্য করতে পারে? হ্যাঁ, একমাত্র সরকারই পারে। কিন্তু সরকারের প্রশ্রয়ে যদি এ রকম স্বেচ্ছাচারিতা ঘটে, তাহলে কে গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করবে?
আমার মাঝেমধ্যে সন্দেহ হয়, এর পেছনে কি কোনো সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র কাজ করছে? আমাদের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল দূষণ ও দুর্বৃত্তায়নের শিকার। দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান পরিবারতন্ত্রের ওপর দল দুটি নির্ভরশীল। দলের প্রধানের একনায়কত্ব এবং কিছু পেটুয়া নেতার নিয়ন্ত্রণে প্রধান দুটি দলের নীতিনির্ধারণ হয়ে থাকে। দলের সম্মেলন, নানা কমিটি ও নানা সভা অনেকটাই লোক দেখানো। দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অন্যত্র নেওয়া হয়। দল দুটির ঐতিহ্যবাহী ছাত্র শাখাও টেন্ডারবাজি ও দুর্বৃত্তায়নের শৃঙ্খলে আবদ্ধ। সুস্থ ও গণতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে বড় দুটি দলের ছাত্র শাখার কোনো সম্পর্কই নেই। বড় দুটি দল তাদের দলের সরকারের আমলে বিচারব্যবস্থাকে কলুষিত করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক টিআইবি রিপোর্ট তা আরও ভালোভাবে তুলে ধরেছে। গণতন্ত্রচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ‘জাতীয় সংসদ’ পর পর দুই মেয়াদ প্রায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই চলছে। বিরোধী দল ছাড়া ‘জাতীয় সংসদ’ এক প্রকার প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। সেই প্রহসন আমরা প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ করছি।
দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমে দূষিত, অকার্যকর ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। ঠিক সে রকম অবস্থায় সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলের মতো শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সুপরিকল্পিতভাবে কিছু লোক তাদের নানা অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গণমাধ্যমকেও জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ ও হাস্যকর করে তুলছে। ভূমিদস্যু, ঋণখেলাপি বা গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা প্রকাশক ও সম্পাদকের ছদ্মবেশে গণমাধ্যমের ইতিবাচক শক্তিকে ভোঁতা করে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে নেমেছে বলে আমার সন্দেহ হয়। কারণ সংবাদপত্র যদি প্রায়ই ভুল খবর ছাপিয়ে পরদিন ভুল স্বীকার করে, তাহলে পাঠক সংবাদপত্রের ওপর আস্থা রাখবে কীভাবে? গুজবই যদি সংবাদপত্রের শীর্ষ খবর হয় এবং পরদিন তা ভুল বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে পাঠক সেই সংবাদপত্রকে বিশ্বাস করবে কেন? এভাবে চলতে থাকলে সংবাদপত্র, টিভি বা সাংবাদিকতা পেশার প্রতিই মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা, ভুল ও অর্ধসত্য তথ্য দিয়ে যদি প্রতিদিন সংবাদপত্র প্রকাশ করতে হয়, সেই সংবাদপত্রকে পাঠক গুরুত্ব দেবে কেন?
‘রাজনীতি’ ছিল সমাজসেবার এক মহান পেশা। রাজনীতিবিদেরা ছিলেন ত্যাগী মানুষ হিসেবে সমাজে পরিচিত। সেই রাজনীতিকদের এখন কী ভাবমূর্তি দাঁড়িয়েছে, পাঠক তা ভালোভাবে জানেন। একটি ক্ষুদ্র মহল সুপরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকতা পেশাকেও এভাবে কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে আমার সন্দেহ হয়। পেশাদার সংবাদপত্র বা সৎ সাংবাদিকতাকে ছাপিয়ে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ সমাজে বেশি আলোচিত হয়। মানুষ নেতিবাচক খবর নিয়ে গল্প করতে পছন্দ করে। এটা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। এর ব্যাখ্যা মনস্তত্ত্ববিদেরা ভালো দিতে পারবেন।
সমাজ কি সাংবাদিকতা পেশাকে এভাবে কলুষিত হতে দেবে? মতলববাজ রাজনীতিবিদ, ভূমিদস্যু, ঋণখেলাপি ও গোয়েন্দা দপ্তরের এজেন্টদের তথাকথিত ‘মিশন’ থেকে সৎ ও নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে উদ্ধার করার উপায় কী? এখনো উদ্ধার করার সময় আছে। জাতীয় ও ছাত্ররাজনীতির মতো সাংবাদিকতা পেশা এখনো একেবারে কলুষিত হয়নি। এখনো ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ সংখ্যায় কম। কিন্তু ব্যবসা, বিজ্ঞাপন, নানা রাজনৈতিক প্রলোভন বা ব্ল্যাকমেইলিং করে পেশাদার সংবাদপত্র বা টিভি চ্যানেলকে ‘হলুদ’ করে ফেলা অসম্ভব কিছু নয়। সেটা আরও ভয়ের। পুলিশ বিভাগ বা বিচার বিভাগের মতো জাতীয় প্রতিষ্ঠানের স্বরূপ যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তার পেছনে স্বাধীন সংবাদপত্রের অবদান অনেকখানি। সে জন্য স্বাধীন সংবাদপত্র তথা পেশাদারি সাংবাদিকতাকে ধ্বংস করার জন্য আজ অনেকে তৎপর। স্বাধীন সংবাদপত্র দেশে আছে বলেই আজ দূষিত রাজনীতি, দুর্বৃত্তায়ন ও দুর্নীতির অনেক খবর জনসমক্ষে তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে। পাঠককে সংবাদপত্রের এই ভূমিকা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
হলুদ সাংবাদিকতাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারত ‘প্রেস কাউন্সিলের’ মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের তথ্যমন্ত্রীর নির্লিপ্ততার কারণে প্রেস কাউন্সিল আজ একটি প্রায়মৃত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আজ যদি প্রেস কাউন্সিল সত্যিকার অর্থে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হতো, তাহলে হলুদ সাংবাদিকতার অভিযোগ প্রমাণের পর অনেক প্রকাশক বা সম্পাদককে নানা শাস্তি পেতে হতো। প্রেস কাউন্সিলকে আমি তখনই কার্যকর প্রতিষ্ঠান বলব, যখন সংবাদপত্রে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেই সংবাদপত্রের রিপোর্টার, প্রকাশক ও সম্পাদকের অর্থদণ্ড হতো; সম্পাদক ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হতেন। এক বছরে তিনবার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সেই সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বাতিল করে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। প্রেস কাউন্সিল যদি সাংবাদিকতার মান রক্ষার জন্য কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে পারে, তাহলেই সেটা একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানের দাবিদার হতে পারবে। তা সম্ভব না হলে আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী পেশাদারি সাংবাদিকতা একদিন হলুদ সাংবাদিকতার গহ্বরে ঢুকে পড়লে আমি অবাক হব না।
সাংবাদিকেরা সংবাদপত্রে বা টিভিতে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ধরেন। সেটা তাঁদের দায়িত্ব। কখনো ‘মিডিয়া ট্রায়ালের’ মাধ্যমে অনেককে আগাম শাস্তিও দিয়ে থাকেন। কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে তাঁরা যে অপকর্মটি করছেন, সে জন্য তাঁদের শাস্তি দেবে কে?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: উন্নয়নকর্মী ও কলাম লেখক।
Wednesday, May 26, 2010
দূষিত রাজনীতি ও টিভি চ্যানেল by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
বাংলাদেশে গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে বলে সরকার দাবি করে থাকে। এই দাবি যে অযৌক্তিক তা নয়। কিন্তু সরকার নানা কৌশলে তাদের বিরোধী বা সমালোচক টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে কখনো আদালত, কখনো বিটিআরসি, কখনো তথ্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নেওয়া হয়। একজন বালকও বুঝতে পারে, কোনো টিভি চ্যানেলের ওপর সরকার অখুশি বা বিরক্ত হলে সরকার নানা অজুহাতে সেই টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দিচ্ছে। বেকার হচ্ছেন শত শত সাংবাদিক, কলাকুশলী ও কর্মী। একটা বয়সের পর বেকার হয়ে যাওয়া যে কী যাতনার, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই বুঝতে পারবেন। যাঁরা সরকার পরিচালনা করেন, এটা তাঁদের বিবেচনার বিষয় হয় না। তাঁরা বোঝেন শুধু রাজনীতি। সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি।
বিএনপি সরকারের পরোক্ষ ইঙ্গিতে যেদিন একুশে টিভি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, সেদিন থেকে টিভি চ্যানেল বন্ধের এই সংস্কৃতির শুরু। বিএনপি হয়তো সেদিন ভেবেছিল, তারা চিরস্থায়ী সরকার। তাদের গায়ে কেউ আঁচড় দিতে পারবে না। কিন্তু বাস্তব খুব নির্মম। বিএনপি-সমর্থিত সিএসবিও নানা অজুহাতে বন্ধ হয়েছিল। সম্প্রতি বন্ধ হলো চ্যানেল ওয়ান।
একুশে টিভি বন্ধ করে বিএনপি সরকার আরও একটি বড় ভুল করেছিল। তা হলো বেসরকারি খাতে টেরিস্ট্রিয়াল টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স পাওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ এখন হাতছাড়া। ফলে সরকারনিয়ন্ত্রিত বিটিভি এখন মিডিয়া জগতে একচেটিয়া ব্যবসা করছে, নিম্নমানের অনুষ্ঠান দিয়েও। কোন যুক্তিতে সরকার বেসরকারি খাতে টেরিস্ট্রিয়াল টিভির লাইসেন্স দিচ্ছে না, তা স্পষ্ট নয়। এটা আমাদের বড় দুই দলের স্বেচ্ছাচারী ও অগণতান্ত্রিক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আমাদের দুর্বল নাগরিক সমাজ ও নির্বিকার মিডিয়া ভোক্তারা এসব দাবিতে সোচ্চার নয়।
সরকার কর্তৃক দুটি টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়াটা আমি বিচ্ছিন্নভাবে দেখি না। এর জন্য আলাদা করে আমার মনে কোনো দুঃখ বা ক্ষোভও নেই। আমি মনে করি, এগুলো দেশের দূষিত ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির ফল। টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকেরা স্মার্ট ও সক্রিয় বলে নানাভাবে তাঁদের দাবি জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারেন। বড় দল দুটির শাসনামলে দেশে আরও কত অবিচার, অন্যায়, স্বজনপ্রীতি, সন্ত্রাস, খুন, অপহরণ যে ঘটেছে তার ইয়ত্তা নেই। সবই হয়েছে রাজনীতির নামে। রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে। শুধু কয়েকটি উদাহরণ দিই। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ দুই দলের সরকারই গড়ে প্রায় ৩০০ জন (প্রতি আমলে) সরকারি কর্মকর্তাকে পাঁচ বছর কোনো কাজ করতে দেয়নি। অসংখ্য ছাত্র আবাসিক হলে থাকতে পারেননি। ব্যবসা করতে পারেননি অসংখ্য ব্যবসায়ী। কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পেশাদার ঠিকাদার, কন্ট্রাক্টররা কাজ করতে পারেন না। কাজ পেলেও লাভের বড় অংশ দিয়ে দিতে হয় ছাত্রনেতাদের।
সরকার পরিচালিত বিটিভিতে দুই দলের আমলে কত শিল্পী কালো তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তার খবর কজন জানেন? কোনো কোনো শিল্পী তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে বিটিভিতে কোনো অনুষ্ঠান করতে পারেননি। শুধু কি কালো তালিকা? বিটিভিতে কত অশিল্পী, ছাত্র-যুব কর্মী ও দলের শিল্পী ক্যাডার বঙ্গবন্ধু ও জিয়ার নাম ভাঙিয়ে মাসের পর মাস বস্তাপচা অনুষ্ঠান করে যাচ্ছে, তাদের বিচার কে করবে? বিটিভি থেকে অনুষ্ঠানের নামে কত যে লাখ লাখ টাকা তারা আত্মসাৎ করছে, তার হিসাব কে করেছে?
এভাবেই চলছে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। সেই দূষিত রাজনীতিরই শিকার হয়েছে দুটি টিভি চ্যানেল। এটা কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়।
শুধু দুটি টিভি চ্যানেল বা তাদের সাংবাদিক ও কর্মীরাই নন, উল্লিখিত সবাই এই দূষিত ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির শিকার। চ্যানেল ওয়ান, একুশে টিভি বা সিএসবি কি এই দূষিত ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোনো অর্থপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল? তারা কি বড় দুই দলের আমলে শুধু ‘ভিন্নমতের’ কারণে বিভিন্ন সেক্টরে যাঁরা নিগৃহীত হয়েছিলেন, নির্যাতিত হয়েছিলেন তাঁদের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরেছিল? নাকি কোনো একটি দলের সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়েছিল সারাক্ষণ? আজ টিভি চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়ার পর বর্তমান সরকারের সমালোচনা করছেন অনেক টিভি সাংবাদিক। ইটিভি যখন বন্ধ হয়েছিল, তখন অন্য টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকেরা কোথায় ছিলেন? দুই দলের আমলে ‘ভিন্নমতের’ কারণে যাঁরা নিগৃহীত, নির্যাতিত বা বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের কজনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল এসব টিভি চ্যানেল?
আমাদের রাজনীতি যেমন দূষিত, তেমনি কয়েকটি গণমাধ্যমও দূষিত। তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গণমাধ্যমের আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হয় না। তারা একটি দল বা দুর্বৃত্ত ব্যবসায়ীর (মালিক) স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজেদের পরিচালিত করে। ‘গণমাধ্যম’ আলু-পোটল বিক্রির মতো একটি ব্যবসা নয়। যেভাবেই হোক, লাভ করার বাসনা থাকলে গণমাধ্যমের ব্যবসায় আসা উচিত নয়। একটি রাজনৈতিক দলকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়াও কোনো গণমাধ্যমের লক্ষ্য হতে পারে না। গণমাধ্যম সত্যকে তুলে ধরে নির্ভীকভাবে। কারও পক্ষে বা বিপক্ষে গণমাধ্যমের অবস্থান হতে পারে না। তাদের অবস্থান হতে পারে কেবল সত্যের পক্ষে।
যাঁরা এই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে গণমাধ্যম পরিচালনা করবেন, তাঁদের জীবনে অনেক দুর্ভোগ নেমে আসতে পারে। দূষিত রাজনীতির সরকার সেই সুযোগ গ্রহণ করবে। সেটাই স্বাভাবিক। অতীতেও করেছে, এখনো করছে, ভবিষ্যতেও করলে আমি অবাক হব না। দল ও সরকার সার্বিকভাবে গণতান্ত্রিক না হলে এ ধরনের আচরণ অপ্রত্যাশিত নয়। শুধু ভোটে পাস করলেই সেই দল বা সরকারকে ‘গণতান্ত্রিক’ বলা যায় না। বড়জোর ‘ভোটের সরকার’ বলা যেতে পারে। গণতান্ত্রিক সরকার ভিন্নমতকে দমন করে না। ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ দেয়। পরমতের প্রতি সহিষ্ণু হয়।
দুটি টিভি চ্যানেলকে সরকার নানা অজুহাতে বন্ধ করে দিয়েছে—এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। তার চেয়েও দুঃখজনক ও হতাশাজনক হলো, দেশে সত্যিকার অর্থে ‘গণতান্ত্রিক সরকার’ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। বড় দুটি দল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত হচ্ছে না। ব্যক্তিপূজা, পরিবারতন্ত্র, দলীয় নেতৃত্বে একনায়কত্ব, মন্ত্রিসভায় একনায়কত্ব, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নকে প্রশ্রয় দিয়ে বড় দুটি দলের সরকার দেশে কোনো গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে পারছে না। শুধু ‘ভোটের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেই বড় দল দুটি মহা আত্মতৃপ্তিতে ভুগছে। একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ‘দেশে নির্বাচিত সরকার এসেছে’—এই আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন। নির্বাচিত সরকার যে তাদের আচরণে অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী, তা অনেকে দেখেও না দেখার ভান করছেন। তাঁদের ভাবখানা এমন: ‘নির্বাচিত সরকার হলেই তার সাত খুন মাপ।’ সে জন্য বর্তমান সরকারের নানা অনাচারের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ। সুজন ও টিআইবি ছাড়া তেমন সক্রিয় ও প্রতিবাদী নাগরিক ফোরাম দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক নেতারা সরকারি নানা উচ্ছিষ্টের লোভে এখন প্রায় নীরব। বিএনপির বুদ্ধিজীবীরা দলের (সরকারের) অতীতের কর্মকাণ্ড স্মরণ করে প্রতিবাদী হতে পারছেন না।
যত দিন অগণতান্ত্রিক, দূষিত ও দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি সরকার পরিচালনায় প্রাধান্য পাবে, তত দিন টিভি চ্যানেল বন্ধ করার মতো ঘটনা ঘটতেই থাকবে। স্বাধীন গণমাধ্যমের নিশ্চয়তা চাইলে গণমাধ্যমকে আগে সত্যিকার ‘গণমাধ্যম’ হতে হবে। দলের বা ব্যক্তিবিশেষের চোঙা হলে সেটাকে ‘গণমাধ্যম’ বলা যায় না। সে রকম গণমাধ্যম থাকলেই কী আর বন্ধ হলেই বা কী! বন্ধ হলে দল বা ব্যক্তিরই শুধু ক্ষতি।
আজকাল উচ্চবেতনে অনেক টিভি সাংবাদিক ও কলাকুশলী বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে চাকরি পাচ্ছেন। খুব ভালো কথা। ছেলেমেয়েদের উন্নতি দেখলে কার না ভালো লাগে। কিন্তু চাকরি নেওয়ার আগে সবাইকে ভেবে দেখতে বলি: এটা কি ‘গণমাধ্যম’, না কোনো দল বা ব্যক্তির চোঙা? চোঙা হলে তার পরিণাম কী হতে পারে তা না বোঝার কোনো কারণ নেই। এ ছাড়া দেখা দরকার, টিভি চ্যানেলের মালিকের ব্যবসায়িক অতীত, কীভাবে লাইসেন্স পেয়েছেন ইত্যাদি। এগুলো না দেখলে একদিন দেখা যাবে যে চ্যানেলের মালিক অফিসে না এসে জেলে চলে গেছেন। শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় যাঁরা টিভির লাইসেন্স পেয়েছেন, পরবর্তী অন্য দলের সরকার এলে নানা অজুহাতে তাঁদের লাইসেন্স বাতিল করে দিতে পারে। এটাই এখনকার দূষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি। কাজেই টিভি চ্যানেলে (ব্যতিক্রম ছাড়া) যাঁরা এখন চাকরি নেবেন, তাঁরা এটাকে ‘অস্থায়ী চাকরি’ হিসেবে গ্রহণ করলে ভালো হবে। পরে মানসিক কষ্ট কম হবে।
সরকারের যেসব ব্যক্তি সম্প্রতি দুটি টিভির লাইসেন্স বাতিল করেছেন, তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই: এক মাঘে শীত যায় না। দুটির বদলে দশটির লাইসেন্সও বাতিল হতে পারে। দূষিত রাজনীতিতে অজুহাতের অভাব হবে না। এখন বড় দুই দলকে ঠিক করতে হবে টিভি চ্যানেল নিয়ে কীভাবে তারা খেলবে। ‘বন্ধ বন্ধ’ খেলবে? না ‘খোলা খোলা’ খেলবে? মাঘ মাসটা বড়জোর পাঁচ বছর মেয়াদি হবে। কিন্তু আবার মাঘ মাস আসে। তথ্যমন্ত্রী কি তা জানেন?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।
eCoxs Special
BNM Archive
- ▼ 2026 (1419)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...