Wednesday, February 28, 2018

চলতি পথে যত হয়রানির শিকার নারী by পিয়াস সরকার

কাওরান বাজারে অফিস শেষে প্রতিদিন ফার্মগেটে গিয়ে লেগুনা ধরেন অদিতি রেহেনা। কাওরান বাজার থেকে ফার্মগেট এই রাস্তাটুকু যেতে বাজে মন্তব্য শোনা নিত্যদিনের সঙ্গী তার। তিনি বলেন, প্রতিবাদ করতে করতে বিরক্ত। আর কত প্রতিবাদ করা যায়? এখন এটাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে ধরে নিয়েছি। আবার লক্ষ্য করি আমার সঙ্গে কোনো ছেলে থাকলে এই বাজে মন্তব্য খুব কমই শোনা যায়।
রাজধানীতে একা চলাফেরা করা নারীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কর্মজীবী, শিক্ষার্থী কিংবা গৃহবধূ যারা একা চলাফেরা করেন ঢাকায় তারা প্রতিনিয়ত মোকাবিলা করছেন বিভিন্ন সমস্যা।
শিক্ষার্থী সাগরিকা জাহান বলেন, একদিন ভার্সিটি থেকে বাসার ফেরার সময় বসুন্ধরা মার্কেটের সামনে সাহায্যের আবেদন করেন একজন বিদেশি। তার গন্তব্যে যাবার পথ বলে দিই। কিন্তু তারপর ঘটলো বিপত্তি। সে আমাকে তার হোটেল রুমে নিয়ে যাবার প্রস্তাব করে। কথাটা শুনে আমি এতটাই স্তম্বিত হই যে সেখানে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকি কিছুক্ষণ। আমার হচকিত ভঙ্গি আর হয়তো বিপদের আশঙ্কায় তিনি দ্রুত চলে যান। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বেশ কিছু ছেলে শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চাই, কেন ঘটে এসব ঘটনা? তারা জানান, বিষয়টা মূলত মজা করার জন্য করা। আমি বা আমরা যখন বন্ধুরা একসঙ্গে থাকি তখন মেয়েদের উদ্দেশ্যে দু’একটা কথা বলে থাকি। ব্যাপারটা এমন না যে তাদের হেনস্থা করছি- তারাও মজা পাচ্ছে আমরাও মজা পাচ্ছি।  আড়ংয়ে চাকরি করেন লালমাটিয়া কলেজের শিক্ষার্থী তাসনিম আরেফিন জয়া। চাকরি শেষে মেসে ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা বেজে যায়। তিনি বলেন, আমি রাতে একাই মেসে ফিরি। প্রায় প্রতিদিন রাস্তায় কানে আসে অনেক কথা। কথাগুলো যে আমাকে নিয়ে হচ্ছে তা বুঝতে বাকি থাকে না। আমাকে উদ্দেশ্য করে বলা কথাগুলো যে সব সময় অশ্লীল হয় তা নয়। অনেক সময় তারা পোশাকের, চুলের, চোখের প্রশংসা করে। কিন্তু খুব স্বাভাবিক ভাবেই প্রশংসাটাও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অচেনা-অজানা কয়েকটি ছেলে আমাকে দেখছে এটাই তো একটা হয়রানি। আবার অনেকে জানান যুবক বয়সী ছেলেরা বাজে মন্তব্য করে। কিন্তু তুলনামূলক বয়স্ক ব্যক্তিরা শরীর স্পর্শ করবার চেষ্টা করে বেশি। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মিনতি রায় প্রতিদিন সাভার থেকে ধানমন্ডিতে আসেন। তিনি বলেন, বাসে আমার পাশের সিটে যুবক বয়সী ছেলেরা বসলে একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসে। কিন্তু একটু বয়স্ক ব্যক্তিরা প্রায়শই গা ঘেঁষে বসে।
বাসে যাতায়াত করা নারীদের যেন নীরবে মেনে নিতে হয় অনেক কিছু। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান সমস্যা হেলপারদের শরীরে হাত দেয়া। বাস থেকে নামার সময় এবং বাসে উঠার সময় তারা শরীরে হাত দেয়। তারা ভাব করে বাসে উঠতে কিংবা নামতে সাহায্য করছে। একবার কল্যাণপুরে তানজিল পরিবহন থেকে নামবার সময় শরীরে হাত দেয়ায় প্রতিবাদ করি হেলপারের বিরুদ্ধে। উল্টা আমাকেই সবার সামনে অপমানজনক কথা বলে সে। রাস্তায় জ্যাম হবার কারণে পুলিশ আসে। পুলিশকে বলার পর তিনি এমন একটা ভাব ধরলেন যেন খুব মজার গল্প বলছি তাকে। পুলিশ উল্টো আমাকে বোঝালেন বাসে এমন তো হতেই পারে। জনজটলায় শরীরে অচেনা হাত নিয়েও সচেতন থাকতে হয় নারীদের। ভিড় বাস কিংবা মার্কেট এসব স্থানে এসব ঘটনা ঘটে অধিক পরিমাণে। সিম্রিতি রাত্রি অধ্যয়নরত আছেন প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটিতে, থাকেন ঝিগাতলায়। লেখাপড়ার পাশাপাশি শ্যামলি ও আদাবরে দুটি প্রাইভেট পড়ান। তিনি বলেন, লেগুনার সিটগুলো এমন ভাবে তৈরি বসলে অন্য ব্যক্তির সঙ্গে শরীর লাগবেই। আবার এর মাঝে অনেকে চেষ্টা করেন একটু বেশি ঘেঁষে বসতে। হাত রাখার স্থানে ইচ্ছাকৃত স্পর্শ করতে। বাসে ভিড়ের মধ্যে অনেকে দেন ইচ্ছাকৃত ধাক্কা। সব থেকে বিব্রতকর পরিস্থিতি সম্মুখীন হতে হয় যখন স্পর্শকাতর স্থানে অন্যের শরীরের স্পর্শ অনুভব করি। প্রেস ইনস্টিটিউড অব বাংলাদেশ, পিআইবির সহকারী অধ্যাপক কামরুন নাহার রুমা বলেন, সমাজে তখনই নারী হয়রানি বন্ধ হবে যখন পুরুষরা অনুভব করবে আমি একটা নারীকে যে দৃষ্টিতে দেখছি আমার মা, বোন, স্ত্রী, প্রেমিকাকেও সেই দৃষ্টিতে দেখছে অন্য কোনো পুরুষ। এই অনুভূতি তখনই সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবে যখন সমাজ সুশিক্ষায় শিক্ষিত হবে। নিউ মুক্তি ক্লিনিক কল্যাণপুরের মনোরোগ বিশেষ ডা. শামসুন নাহার বলেন, সামাজিক অবক্ষয়, বন্ধুর প্ররোচনা, মাদকাসক্ত, অপসংস্কৃতি বিভিন্ন কারণে এসব ঘটনা ঘটে। ধর্মীয় শিক্ষা ও আইনের শাসনের অপ্রতুলতার কারণে এটি রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। যে নারীটি হয়রানির শিকার হচ্ছেন তার মানসিকতার যেমন পরিবর্তন আসছে আবার সমাজের মানুষের প্রতি অবিশ্বাসের জায়গা তৈরি হচ্ছে। এরকমভাবে চলতে থাকার কারণে সে তার সন্তানকেও সুশিক্ষা দিতে অক্ষমতার পরিচয় দিতে পারে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। চলতি পথে হয়রানির হিসাব করে যেমন শেষ করা সম্ভব নয়, ঠিক তেমনি অভিযোগের দারস্থ হন না বেশির ভাগ নারী। যারা অভিযোগ করেন তাদের সংখ্যাও নেহায়ত কম নয়। বেসরকারি সংস্থা ব্যাকের তথ্য মতে, ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তথ্যে উঠে আসে ৫ হাজার ৮২৫টি নারী নির্যাতনের শিকার। ২০১৭ সালের অক্টোবরে ৫৮ শতাংশ বেড়ে তা দাঁড়ায় ৯ হাজার ১৯৬টি। রিপোর্টে উঠে আসে শারীরিক নির্যাতনের শিকার ৬২৮ জন, অন্যান্য নির্যাতনের শিকার ৮৮৮ জন। ব্যাক ও ইউএনডিপির দেশের ৪৪টি ইউনিয়নের পরিচালিত মাঠ জরিপে জানা যায়, দেশের নারীর প্রতি সহিংসতার ৬৮ শতাংশই নথিভুক্ত হয় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে মতে বিবাহিত নারীরা ৮৭ শতাংশই কোনো না কোনো ভাবে হয়রানির শিকার হন। ২০১৬ সালে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশ পরিচালিত ‘নিরাপদ নগরী নির্ভয়ে নারী’ শীর্ষক নারীর প্রতি যৌন সহিংসতা ও হয়রানি বিষয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও নারায়ণগঞ্জ শহরের ৮০০ নারী গবেষণাটিতে অংশ নেয়। এদের মধ্যে ৮৮ শতাংশই বলেন, তারা পথচারী, পুরুষ যাত্রী এবং ক্রেতাদের দ্বারা হয়রানির শিকার হন। আবার তারা জানান পুলিশের সাহায্য চাইলে সমস্যা বাড়ে। যৌন সহিংসতা এড়াতে ৬৪ ভাগ নারী রাতে ঘরের বাইরে যান না। নিরাপত্তাহীনতার কারণে ৬০ ভাগ নারী রাতে ঘরের বাইরে বের হবার ক্ষেত্রে দলগতভাবে যাবার চেষ্টা করেন। নগরের ৪৭.৫ ভাগ নারী গণপরিবহন, রাস্তা কিংবা উন্মুক্ত জনবহুল এলাকায় চলাফেরা করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। গবেষণায় অংশ নেয়া ৮১ শতাংশ নারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে সহায়তার জন্য যেতে চান না।

রওশনের লজ্জা! by সাজেদুল হক

(ঢাকার চিঠি-১) সিদ্ধান্তটি আচমকাই নিয়েছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ৫ই জানুয়ারির আগের ইতিহাস। দেশ তখন অগ্নিগর্ভ। অংশগ্রহণমূলক, না একতরফা নির্বাচন? জাতীয় পার্টির নির্বাচনে অংশ নেয়া নিয়ে সংশয় ছিলো সামান্যই। দলটি ইতিমধ্যে মনোনয়নপত্রও দাখিল করেছিলো। কিন্তু হঠাৎই বেঁকে বসেন এরশাদ।
জানালেন, তার দল নির্বাচনে অংশ নেবে না। বলাবলি আছে, ঢাকায় নিযুক্ত এক বিদেশি অতিথি এ ব্যাপারে এরশাদকে প্রভাবিত করেছিলেন।
এ সিদ্ধান্তের পরিণতি অবশ্য শুভ হয়নি এরশাদের জন্য। তার ঠাঁই হয় হাসপাতালে। এরশাদ যখন বাধ্যতামূলক চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, তখন তার দলের এক অংশের নেতারা শরণাপন্ন হন রওশনের। তাকে বুঝান নির্বাচনে থেকে গেলে কী কী লাভ হবে। সব মহলের সঙ্গে তার যোগাযোগও করিয়ে দেন। হঠাৎ স্বামীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন রওশন। নির্বাচনে থেকে যায় জাতীয় পার্টি। এমনকি এরশাদের মনোনয়নপত্রও প্রত্যাহার হয় না। ভাইয়ের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে মূল্য চুকাতে হয় জিএম কাদেরকে।
নির্বাচনের পর অবশ্য এরশাদকে বলা যায়, রক্ষাই করেন রওশন। রওশন হন বিরোধী দলের নেতা। এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। মন্ত্রিসভায়ও জায়গা হয় জাপা নেতাদের। আবার তারা প্রধান বিরোধীদলও। পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন এক সরকার ব্যবস্থা কায়েম হয়। কিন্তু এতদিন পর এসে রওশন এরশাদ খোদ সংসদেই জানালেন তার লজ্জা লাগে। জিএম কাদের বরাবরই এর বিরুদ্ধে বলে গেছেন। এরশাদ কখনো এদিকে, কখনো ওদিকে। কিন্তু মঙ্গলবার রাতে রওশন এরশাদ সংসদে যা বলেছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। ‘আমরা সরকারি দল, না বিরোধী দল কোনটা আমরা? দেশে-বিদেশে নিজেদের পরিচয় দিতে পারি না। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা লাগে। কারণ সবাই জানতে চায়, জাতীয় পার্টি সরকারি দল, না বিরোধী দল। প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, আমাদের মন্ত্রীগুলোকে উইথড্র করে দেন। আমাদের বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে দেন। কিন্তু আমি জানি না, কেন সেটা হয়নি।’
রওশন এরশাদ মঙ্গলবার রাতে যে অনুভূতি প্রকাশ করলেন এমন কথা তিনি অতীতে আর বলেননি। কেন হঠাৎ করে তিনি এটা বলতে গেলেন তা একটা প্রশ্ন। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা আরো একবার বিস্মিত হয়েছেন এটা ভেবে যে, বিরোধীদল বিরোধীদলের ভূমিকা পালন করতে পারবে কি না তা এখন নির্ভর করে সরকারি দলের ওপর। অদ্ভুত! কে না জানে, চলতি বছরের ডিসেম্বরেই আগামী সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনের আগে হয়তো জাতীয় পার্টিকে বিরোধীদলের ভূমিকায় দেখাও যেতে পারে। জাপা মন্ত্রীরা ২-৪ মাসের জন্য সেক্রিফাইস করতেও পারেন। সরকার তাদের সে সুযোগ দিতেও পারে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।

নিষেধাজ্ঞা আরোপে একমত ইইউ

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে দেশটির জেনারেলদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে একমত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রবিষয়ক পরিষদ। এ ছাড়া সেখানে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে মিয়ানমারের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জোরদারের ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউরোপের ২৮ দেশের এই জোট। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে গতকাল সোমবার ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক পরিষদের সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়। গতকালের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ইইউর পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তাবিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ফেদেরিকা মোঘেরিনি। এদিকে, জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক হাইকমিশনার জেইদ রাদ আল হুসেইন মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনের পরিস্থিতিকে ‘সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ মানব কসাইখানার অন্যতম’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় গতকাল জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৩৭তম নিয়মিত অধিবেশন উদ্বোধনের সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। জেইদ রাদ আল হুসেইন বলেন, রাখাইনসহ বিভিন্ন স্থানে ক্রমবর্ধমান ভয়াবহতা বন্ধে শুরুতে এবং সম্মিলিতভাবে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ব্রাসেলসের বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকায় ইইউ রাষ্ট্রদূত রেনসে টেরিংক গতকাল বিকেলে বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পাশে থাকবে। এ জন্য সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে আলোচনার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। রেনসে টেরিংক বলেন, সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ঘুরে যাওয়া ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্যরা আগামী মাসে পার্লামেন্টে প্রতিবেদন জমা দেবেন। এর ভিত্তিতে পার্লামেন্টে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নতুন প্রস্তাব নেওয়ার কথা রয়েছে। ব্রাসেলসে ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক পরিষদের গতকালের সভায় সর্বসম্মতভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।
এতে বলা হয়েছে, কোনো রকম দেরি না করেই রাখাইনে ভয়াবহ ও নিয়মতান্ত্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মিয়ানমারের জেনারেলদের বিরুদ্ধে এর আগে  যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ইইউর কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে মিয়ানমারের কোনো সেনা কর্মকর্তার নাম আসেনি গতকালের বৈঠকে। তবে একাধিক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ইইউর পররাষ্ট্র পরিষদের এই বৈঠকে বলা হয়, রাখাইনে এখনো ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ভয়ের সংস্কৃতি ও নিরাপত্তাহীনতা অব্যাহত থাকাটা নিন্দনীয়। ফলে সংখ্যায় কম হলেও এখনো সেখান থেকে লোকজন বাংলাদেশে চলে যাচ্ছেন। এ ছাড়া জরুরি ত্রাণকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। বৈঠকে বলা হয়, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, তাদের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া ও বৈষম্য দূর করে সেখানকার জীবনমানের এবং মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতির স্বার্থে রাখাইন-বিষয়ক পরামর্শক কমিশনের সুপারিশের পূর্ণ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারের চাহিদা নিরূপণের বিষয়টি মূল্যায়ন করা উচিত। জাতিসংঘের বিশেষ দূতের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে তাঁর ব্যাপারে মিয়ানমারকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনেরও আহ্বান জানিয়েছে ইইউ। মিয়ানমারে জাতিসংঘের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ দূত ইয়াংঘি লির বিরুদ্ধে অং সান সু চির সরকার গত বছরের ডিসেম্বরে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ আনে। এর ফলে তিনি এখন মিয়ানমার যেতে পারছেন না।

সৌদিতে প্রথম নারী উপমন্ত্রী তামাদির

পরিবর্তনের হাওয়া লাগা সৌদি আরবে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে উপমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর নাম তামাদির বিনতে ইউসেফ আল-রাম্মাহ। দেশটির বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ তাঁকে শ্রম ও সামাজিক উন্নয়ন উপমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) গতকাল মঙ্গলবার এ খবর জানিয়ে বলেছে, বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে তামাদির সমাজকল্যাণ ও পরিবার সংস্থারও দেখভাল করবেন। সৌদি আরবে চলমান সংস্কার কার্যক্রমের মধ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে গত সোমবার বড় ধরনের পরিবর্তন আনেন বাদশাহ। একই সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নতুনদের নিয়োগ দেন। অপেক্ষাকৃত তরুণদের সুযোগ করে দিতে অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত মন্ত্রণালয়ে বেশ কিছু উপমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়োগ পাওয়া উপমন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র নারী তামাদির। রক্ষণশীল সৌদি আরবের ইতিহাসে কোনো নারীর এমন পদে আসীন হওয়া বিরল ঘটনা।

ঠাট্টা করে এ কী খাট্টা!

নীল নদ নিয়ে ঠাট্টা করে বেকায়দায় পড়েছেন মিসরের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী শিরিন আবদেল ওহাব। রসের ঠাট্টা শেষে টকোয় খাট্টা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একেবারে ছয় মাসের জেল। আজ বুধবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, নীল নদের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে ঠাট্টা করেছিলেন শিরিন।
মিসরের অন্যতম খ্যাতনামা সংগীতশিল্প শিরিন একটি টিভি অনুষ্ঠানের বিচারকও। শিরিন তাঁর এক ভক্তকে বলেছিলেন, ‘নীল নদের পানি পান করলে জীবাণু হতে পারে। এর চেয়ে বোতলের পানি পান করুন।’ শিরিনের আগে গতকাল মঙ্গলবার দেশটির আরেক সংগীতশিল্পী লায়লা আমিরের দুই বছর কারাদণ্ড হয়। লায়লা অবশ্য শিরিনের মতো পরিচিত নন। একটি মিউজিক ভিডিওর জেরে লায়লাকে দণ্ড পেতে হয়। তাঁর বিরুদ্ধে পাপাচারে প্ররোচনার অভিযোগ আনা হয়। একই ঘটনায় মিউজিক ভিডিওর পরিচালক ও এক অভিনেত্রীর স্বল্পকালীন দণ্ড হয়েছে। সংগীতশিল্পী শিরিন কারাদণ্ড পেয়েছেন মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর দায়ে। কায়রোর একটি আদালত এই দণ্ড দিয়েছেন। মিসরের সংবাদমাধ্যম বলছে, জামিনের জামানত হিসেবে শিরিনকে পাঁচ হাজার মিসরীয় পাউন্ড দিতে বলেছেন আদালত। দণ্ডর বিরুদ্ধে শিরিন আপিল করতে পারবেন। শিরিনের ভাষ্য, এক বছরের বেশি আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি কনসার্টে ঠাট্টাটি করেছিলেন তিনি। পরে তা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। বোকামিপূর্ণ ঠাট্টার জন্য ক্ষমাও চান তিনি।

‘রাজনীতির প্রভু’ ও প্রশাসনের নৈতিকতা by সোহরাব হাসান

রাজনীতিকেরা নিজেদের জনগণের সেবক বলে দাবি করেন। আর সেই সেবকের সেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দেন সরকারি প্রশাসনযন্ত্র, যাকে আমরা আমলাতন্ত্র বলে অভিহিত করি। কিন্তু রাজনীতি ও আমলাতন্ত্র প্রায়ই জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে না। এ ব্যাপারে একে অপরের ওপর দোষ চাপালেও কেউ আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হন না।
আমরা যখন সমাজের কোনো অংশের নীতিনৈতিকতার ঘাটতি তথা অসততার উদাহরণ দিই (সেটি হতে পারে সাংবাদিক, পুলিশ, সরকারি কর্মকর্তা কিংবা অন্য পেশার মানুষ), তখন তার চটজলদি উত্তর দেওয়া হয়, তাঁরা তো সমাজের বাইরের কেউ নন। আর যেহেতু সমাজ অসততা-অনাচারে আছে, সেহেতু ওই নির্দিষ্ট পেশার মানুষেরও দুর্নীতিমুক্ত থাকা সম্ভব নয়। এ ধরনের অপযুক্তি দিয়েই সমাজ ও রাষ্ট্রের সব অন্যায়কে জায়েজ করা হয়। যেমন সরকারের সমালোচনা করলে ক্ষমতাসীনেরা অতীতের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তাদের আমলে আরও বেশি দুর্নীতি হতো (বর্তমানে দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় নিচের দিক থেকে দ্বিতীয়। আমাদের নিচে আছে আফগানিস্তান। ওপরে ভুটান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপ ও পাকিস্তান)। গত রোববার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উদ্যোগে প্রশাসনে নৈতিকতার মানোন্নয়ন নিয়ে যে সংলাপ হলো, সেখানেও আলোচকেরা স্বীকার করেছেন, দেশের উন্নয়নকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যেতে হলে প্রশাসনে সততা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এ ধরনের সংলাপে সাধারণত মন্ত্রী-সাংসদেরা হাজির থাকেন এবং অন্য বক্তারা দল ও ব্যক্তি-বন্দনায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আলোচ্য সংলাপে সে রকম কেউ ছিলেন না বলে সবাই মন খুলে কথা বলেছেন। সংলাপে উপস্থাপিত ধারণাপত্রেও স্বীকার করা হয়, ‘দুর্নীতির ব্যাপকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উন্নয়নের সুফল সব জনগণের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে; অপরাধ দমনের জন্য নিয়োজিত ব্যক্তিদের অপরাধপ্রবণতা অন্যদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। সমাজের বিভিন্ন অংশে অনৈতিক চর্চা বিস্তার লাভ করছে।
অপরাধ ও অনৈতিকতার চর্চা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।’ দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানও স্বীকার করেছেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার ঘাটতি আছে এবং বড় বড় দুর্নীতি ধরা কঠিন কাজ। রাষ্ট্রে সুশাসন আনতে হলে এই কঠিন কাজটাই তাঁকে করতে হবে। প্রশাসনে সুশাসনের ঘাটতির নানা কারণ আছে। যোগ্য লোককে যোগ্য স্থানে না বসানো কিংবা অযোগ্য লোককে যোগ্য স্থানে বসানোর এন্তার মন্দ নজির আছে। আছে ভালো কাজ করে তিরস্কৃত এবং মন্দ কাজ করে পুরস্কৃত হওয়ার উদাহরণও। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি, ভালো পদায়নের কথাও সরকারি কর্মকর্তাদের কথায় উঠে এসেছে। তবে তাঁরা যে কথাটি জোর দিয়ে বলেননি বা বলতে সাহস পাননি, তা হলো প্রশাসনের ওপর রাজনীতির প্রভুদের (পলিটিক্যাল মাস্টার্স) অযাচিত হস্তক্ষেপ। ‘জনগণের সেবক’ রাজনীতিকেরা অনেক সময় সেটি মানতে চান না। জবরদস্তি করেন। যাঁরা মাঠপর্যায়ে কাজ করেন, তাঁরা জানেন এই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কী ও কত প্রকার। বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা তারিক সালমনের ঘটনা নিয়ে শোরগোল উঠেছিল। তিনি সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ যাতে সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়, সে জন্য কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছিলেন। অবৈধ স্থাপনা ভেঙে দিয়েছিলেন। এতে এলাকার রাজনীতির প্রভুরা ক্ষুব্ধ হন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁকে গরাদখানা পর্যন্ত নিয়ে যান। পরে ওপর মহলের হস্তক্ষেপে তারিক সালমনের হয়রানি বন্ধ হয়। কিন্তু তারিক সালমনের মতো যাঁরা রাজনীতির প্রভুদের চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না, তাঁরা মুখ বুজেই সব সহ্য করেন। অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য হন। সুষ্ঠু ও সৎভাবে প্রশাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব আইন ও বিধি প্রয়োজন, তার প্রায় সবটাই আমাদের আছে। নতুন করে আইনের প্রয়োজন নেই। কিন্তু যে সমস্যাটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হলো আইনের প্রয়োগ। প্রশাসনের কর্মকর্তারা যদি দেখেন আইনের প্রয়োগ করতে গেলে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন, তখন তো তাঁরা আইনবহির্ভূত পথেই হাঁটবেন। বেআইনি কাজে উৎসাহিত হবেন। যাঁরা ঢাকার সচিবালয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের হয়তো তেমন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মুখোমুখি হতে হয় না। কিন্তু তারিক সালমনের মতো যাঁরা উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। স্থানীয় সাংসদের কথা শুনলে উপজেলা চেয়ারম্যান ক্ষুব্ধ হন।
উপজেলা চেয়ারম্যানের কথামতো কাজ করলে দলের অন্য নেতারা বিরাগভাজন হন। আবার দলও নানা উপদলে বিভক্ত। এক নেতার কথা মানলে অন্য নেতা বিগড়ে যান। একটি দেশের উন্নয়ন ও সুশাসনের জন্য আমলাতন্ত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সরকার তাদের মাধ্যমেই নীতি-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে থাকে; দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে নয়। কিন্তু সেই কাজটি সব সময় তাঁরা নির্বিঘ্নে করতে পারেন না। আবার অনেক সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগত সুবিধা পেতে রাজনীতির প্রভুদের সঙ্গে আপসের পথ বেছে নেন। বিষয়টা এমন যে ‘তুমিও খাও, আমিও খাই।’ প্রশাসনে ন্যূনতম নীতিনৈতিকতাবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ওই সভায় নাগরিক সমাজের এক প্রতিনিধি ভারতের একটি উদাহরণ তুলে ধরেছিলেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী রাজনৈতিক কর্মসূচিতে একটি জেলা সদরে গেলে জেলা প্রশাসক তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আপনার জন্য সার্কিট হাউসের কক্ষ বরাদ্দ আছে। কিন্তু আপনি যেহেতু রাজনৈতিক কর্মসূচিতে এসেছেন, সেহেতু আমার পক্ষে থাকা সম্ভব হবে না। তবে এখানে আপনার দেখাশোনার লোক থাকবে। এ কথা বলে জেলা প্রশাসক সার্কিট হাউস থেকে বের হয়ে যান। বাংলাদেশে কী কখনো ভাবা যায়, দেশের প্রধানমন্ত্রী বা কোনো মন্ত্রী জেলা শহরে গেছেন আর জেলা প্রশাসক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁর কর্মসূচিতে না থাকার কথাটি তাঁকে জানিয়ে দিয়েছেন। এ রকম হলে পরদিনই তাঁকে বিএনপি-জামায়াতের অনুসারী আখ্যা দিয়ে ওএসডি অথবা খাগড়াছড়ি বদলি করা হতো। বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একজন সরকারি কর্মকর্তা জানান, মন্ত্রীরা জেলা শহরে গেলে তাঁদের সঙ্গে দলের ৫০ থেকে ১০০ লোক যান। আর জেলা প্রশাসককে তাঁদের সবার খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। এত লোকের আপ্যায়ন তিনি করবেন কোত্থেকে? স্থানীয় সম্পদ তহবিল বা এলআর ফান্ড নামে একটি তহবিল করা হয়েছে, যা বেআইনি না হলেও অনৈতিক। এ বিষয়ে আমলাদের ওজর-আপত্তি থাকলেও মন্ত্রী-এমপিরা শোনেন না। প্রশাসনের নীতিনৈতিকতা বিষয়ে আরেকটি চাক্ষুষ উদাহরণ দিই। গত সোমবার বিকেলে কারওয়ান বাজার থেকে আমরা উবারের গাড়িতে করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলায় যাচ্ছিলাম। আন্ডারপাস পার না হতেই একটি বাস এসে আমাদের গাড়িকে ধাক্কা দেয়। পরে পুলিশ বাসটিকে আটক করে। উবারের চালক প্রতিকার চাইলে পুলিশ কর্মকর্তা ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করার পরামর্শ দেন। কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায়, বাসচালকের লাইসেন্সও হালনাগাদ ছিল না। আমরা বললাম, ক্ষতিপূরণ দিলে তো বাসচালক যে অন্যায় করলেন, তার বিচার তো হলো না। তাঁকে তো শাস্তি পেতে হবে। জবাবে ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ঢাকায় যাঁরা গাড়ি চালান, ৯০ শতাংশের লাইসেন্সই জাল বা মেয়াদোত্তীর্ণ। কেন? তাঁর জবাব, একটি ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে ১০-১৫ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়। নবায়ন করতেও ৫ হাজার টাকা দিতে হয়। পুলিশ কর্মকর্তার কথা শুনে মনে হলো আমাদের প্রশাসন নৈতিকতা থেকে এখনো শত মাইল দূরে আছে।
সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে দরকার ‘জিরো টলারেন্স’ by আলী ইমাম মজুমদার

উড়োজাহাজে কোথাও যেতে-আসতে টিকিট লাগে। আর বিদেশে যেতে হলে দরকার হয় পাসপোর্ট, ভিসাসহ নানাবিধ আনুষ্ঠানিকতা। এগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় বিমানবন্দরে। ধাপে ধাপে পার হতে হয় বিভিন্ন স্তর। এসব কারণেই বিমানবন্দরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। আর এর আবশ্যকতাও বাড়ছে দিনের পর দিন। আর তা কার্যকর করতে স্তরে স্তরে রয়েছেন বিভিন্ন সংস্থার কর্মীরা। বিমানবন্দর ভবনে প্রবেশ থেকে বিমানে আরোহণ পর্যন্ত পাঁচ স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তাবলয় রয়েছে বলে লক্ষ করা যায়। আমাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর শীর্ষে অবস্থান ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের। এর বর্তমান অবকাঠামো ক্রমসম্প্রসারমাণ হলেও বাড়তি চাহিদা জোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু নিরাপত্তাব্যবস্থায় যেন ঘাটতি না থাকে, সে বিষয়ে সরকার সচেতন। আরও উল্লেখ্য যে এই ঘাটতির অভিযোগে আমাদের দেশ থেকে পণ্য নিয়ে যাওয়া বিমানের কোনো কোনো দেশে অবতরণে নিষেধাজ্ঞার ঘটনাও ঘটেছে। অতি সম্প্রতি সরকারের দুই বছরের নিরলস প্রচেষ্টায় যুক্তরাজ্য সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করল। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞায় ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্ষতির পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়। শাসনব্যবস্থার সক্ষমতাও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। দেশের প্রধান বিমানবন্দরটির স্তরে স্তরে নিরাপত্তাবলয় সাজানো আছে। এর বিপরীতে রয়েছে জনবল। কোনো সংস্থায় তা ঘাটতি থাকলে মিটিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থাও করা যায়। তাতে তেমন কোনো সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হয় না। তবে এসব নিরাপত্তাব্যবস্থার সঙ্গে যাঁরা সংশ্লিষ্ট আছেন, তাঁদের কেউ কেউ তা প্রায়ই ভঙ্গ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের সহায়তায় অন্যরাও তা হামেশা ভেঙে চলে। এ ধরনের নিয়ম ভঙ্গ হয়তোবা কোনো নাশকতা সাধনের উদ্দেশ্যে নয়। মূলত স্বজনের বিদেশ যাওয়া বা দেশে ফেরাকালে বিদায় কিংবা স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে ঘটে থাকে। তবে কাজগুলো তো বেআইনি ও শাস্তিযোগ্য। আর এই ঢিলেঢালা নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগই তো নিতে পারে কোনো অসাধু চক্র। এমনই দুটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ খবর দেশবাসীকে বিচলিত করার মতো। ফেব্রুয়ারি মাসের ১৯ ও ২২ তারিখে প্রথম আলোয় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয় খবর দুটি। প্রথম খবরটির শিরোনামে ছিল ‘পুলিশকাণ্ডে নিরাপত্তা ছিন্ন’। পুলিশের একজন ইউনিফর্মধারী উপপরিদর্শক পাঁচ স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিন্ন করে তাঁর একজন বিদেশগামী আত্মীয়কে তুলে দিতে সরাসরি থাই এয়ারলাইনসের একটি জাহাজে উঠে পড়েন। এমন সময় জাহাজের দরজা বন্ধ হয়ে গেলে আটকা পড়েন তিনি। ঘটনা টের পেয়ে ক্যাপ্টেন দরজা খুলে তাঁকে নামান। তবে নিরাপত্তার ঝুঁকি রয়েছে বলে অস্বীকার করেন বিমান চালাতে। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে বিমানটি ঢাকা ত্যাগ করে। তবে সেই উপপরিদর্শকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানা যায়নি। তিনি বিমানবন্দরে কর্মরত নন। তখন পুলিশি দায়িত্বও পালন করছিলেন না। ছিলেন পারিবারিক কাজে। তাহলে ইউনিফর্ম তিনি পরেছিলেন এভাবে ঢুকে পড়ার সুবিধার্থে। এমনটা বিশ্লেষণ করলে কি খুব বেশি বলা হবে? আর পুলিশ ছাড়াও বিমানবন্দরে অনেক সংস্থা আছে। কেউ তাঁকে চ্যালেঞ্জ করল না। সংশ্লিষ্ট উপপরিদর্শক বলেছেন, চেকিং থেকে শুরু করে বিমানে আরোহণ পর্যন্ত কেউ তাঁকে কিছু জিজ্ঞেস করেনি। তাহলে কি এ ধরনের পোশাক পরে কোনো নাশকতাকারীর এই স্পর্শকাতর এলাকায় প্রবেশ করার বাসনা চেপে বসতে পারে না? আর সেই উপপরিদর্শককে তাৎক্ষণিক কোনো শাস্তির আওতায় না এনে সংশ্লিষ্ট সংস্থা নীরব রইল। ২২ তারিখে প্রকাশিত খবরটির শিরোনাম ‘এবার নিরাপত্তা ছিন্ন করলেন কাস্টমস কর্মকর্তা’। জানা গেল, অস্ট্রেলিয়াগামী ছেলেকে উড়োজাহাজে তুলে দিতে কাস্টমসের একজন রাজস্ব সহায়ক কর্মকর্তা নিরাপত্তাবেষ্টনীর দুই ধাপ পেরিয়ে বোর্ডিং ব্রিজ এলাকায় ঢুকে পড়েন। এই কর্মকর্তা অবসর প্রস্তুতির ছুটি কাটাচ্ছেন। তবে তাঁর কর্তব্যকালীন পরিচয়পত্র ফেরত নেয়নি কাস্টমস। বিমানবন্দরে কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। শাস্তি হয়েছে তাঁর। হয়তোবা এটা থেকে শিক্ষা নেবেন অন্যরা। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, তাঁর কাছ থেকে ডিউটি পাসটি ফেরত নেওয়ার দায়িত্বে যে কর্মকর্তা রয়েছেন, তাঁর কী হয়েছে? সম্ভবত কিছুই হয়নি। খবরের কাগজের প্রতিবেদন অনুসারে বিমানবন্দরে সংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, আত্মীয়দের বিদায় জানাতে সরকারি চাকরিজীবী, বিভিন্ন বাহিনীর ইউনিফর্মধারী লোকজন, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিকসহ নানা পর্যায়ের লোকজন বিভিন্ন সময়ে বিমানবন্দরের স্পর্শকাতর এলাকায় প্রবেশের অনুরোধ করেন। সেই অনুরোধ কতটা রাখা হয় কিংবা হয় না, তার উল্লেখ নেই সেই বক্তব্যে। তবে অনেকাংশেই যে রাখা হয় বা রাখতে হয়, তা অনুমান করা যায়। এমনিতেই বিমানে আরোহণকালীন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায়ও আমাদের নিরাপত্তা তল্লাশি বেশ কম। তার মধ্যে যদি এভাবে অনুপ্রবেশের সুযোগ থাকে, বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়। আর এ ধরনের অপরাধ করে দায়মুক্তি পেতে থাকলে তো সেই আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হয়। বিমানবন্দরে নিরাপত্তার আরেকটি হুমকির কারণ হতে পারে ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে। এই লাউঞ্জগুলো ব্যবহারকারীদের কতজন ভিআইপি আর কারা নয়, তার অনুসন্ধান করা যেতে পারে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের দিয়ে। কর্মরত পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেট বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নন। একজন ভিআইপি গমনাগমনকালে কতজন সহচর বিদায় ও স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকার কথা, তা-ও নির্দিষ্ট করা আছে। এর ধারেকাছেও মানা হয় না। ঝাঁক বেঁধে ঢুকে পড়ে বিভিন্ন সময়ে। আর ভিআইপি তালিকায় আসেন না এমন অনেকেই বিমানবন্দরে কর্মরত কোনো না কোনো সংস্থার যোগসাজশে তা ব্যবহার করছেন। এই লাউঞ্জগুলোর অপব্যবহার বাড়াচ্ছে নিরাপত্তা হুমকি। কিছু ভিআইপি সহচর বোর্ডিং ব্রিজের গেটে তাঁদের বিদায় ও স্বাগত জানান। এটা অনেকটা দীর্ঘদিনের রেওয়াজ হয়ে গেছে বলে লক্ষ করা যায়। ব্যয়বহুল এই স্থাপনার প্রকৃত ও ন্যায্য ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। অপেক্ষাকৃত ছোট আয়তনের আমাদের দেশটি পৃথিবীর অষ্টম জনবহুল দেশ। ইতিমধ্যে জনসংখ্যা ১৬ কোটি ছাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফলে বাড়ছে জীবনযাত্রার মান। প্রসার ঘটছে শিল্প-ব্যবসাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের। তাই দ্রুত বেড়ে চলেছে বিমানযাত্রীর সংখ্যা। আর সেটা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রে। এই চাহিদার জোগান দিতে আমাদের বিভিন্ন বিমানবন্দরের ক্রমসম্প্রসারণ ঘটছে। তেমনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে আরও একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের। সবকিছুরই প্রয়োজন রয়েছে। তবে সর্বাগ্রে প্রয়োজন আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাবিধান। এই সামর্থ্য আমাদের আছে। এর সদ্ব্যবহার না করে বরং করা হচ্ছে অপব্যবহার। যাঁরা দায়িত্বে থাকছেন, তাঁরা চলছেন ঢিলেঢালে। নচেৎ আলোচ্য দুটি ঘটনা ঘটত না। এ দুটি তো ধরা পড়ায় জনগণ জানল। এই সর্বনাশা পথ থেকে ফেরানো সম্ভব। যে জনবল যেখানে নিয়োজিত, সেখানে তাঁর কাজটি তাঁকে দিয়েই করাতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো বিচ্যুতিকে দেখতে হবে ‘জিরো টলারেন্স’ নিয়ে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
majumderali1950@gmail.com

ঘুরে দাঁড়িয়েছে শেয়ারবাজার

টানা সাত কার্যদিবস দরপতনের পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের শেয়ারবাজার। আজ মঙ্গলবার সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে লেনদেন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বেড়েছে ২৩ পয়েন্ট। সূচক বাড়লেও গতকালের চেয়ে আরও কমেছে লেনদেন। লেনদেন হয়েছে ৩২১ কোটি ৯১ লাখ টাকা। গতকাল লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৩৫০ কোটি টাকা। আজ হাতবদল হওয়া শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে দর বেড়েছে ১৬৮টির, কমেছে ১০৬টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৬০টির। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল যেসব কোম্পানি, সেগুলো হলো অলিম্পিক, গ্রামীণফোন,
স্কয়ার ফার্মা, ইউনিক হোটেল, আল আরাফাহ ব্যাংক, কেয়া কসমেটিকস, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, বেক্সিমকো ফার্মা, ইফাদ অটোজ ও অ্যাপেক্স ফুডস। দর বাড়ার শীর্ষে ছিল যেসব কোম্পানি—ইউনাইটেড ইনস্যুরেন্স, গ্রিন ডেলটা লাইফ ইনস্যুরেন্স, প্রগতি ইনস্যুরেন্স, এসিআই ফরমুলেশন, অ্যাপেক্স ফুডস, সেন্ট্রাল ইনস্যুরেন্স, লিবরা ইনফিউশন, ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, হাওয়া ওয়েল টেক্সটাইল ও মেট্রো স্পিনিং। অপর দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে আজ সার্বিক সূচক বেড়েছে ৯৩ পয়েন্ট। মোট লেনদেন হয়েছে ১৫ কোটি টাকা।

এ এক বিস্ময়কর আবিষ্কার by সুফি মোস্তাফিজুর রহমান

প্রথম আলো: আপনি তো সুন্দরবনের দুটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান দেখলেন। দেখে কী মনে হলো?
সুফি মোস্তাফিজুর রহমান: আমাদের দৃষ্টিতে সুন্দরবন মানুষের কাছে একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। মনে করা হয়, সুন্দরবন এলাকায় মানববসতি সাম্প্রতিক সময়ের। কিন্তু এখানকার ভূমি কতটা প্রাচীন, তা সুনিশ্চিতভাবে এখনো বলা যায়নি। এ নিয়ে নানা মত আছে। এখানে যে প্রাচীন মানববসতি থাকতে পারে, এমন ভাবনা করা হয়নি। এ নিয়ে তেমন কোনো কাজও হয়নি। সম্প্রতি আমরা এসব প্রত্নস্থানের কথা শুনেছি। তা দেখার জন্য আমরা সুন্দরবনের বেশ কয়েকটি স্থানেও গেলাম। যা দেখলাম, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। এ এক বিস্ময়কর আবিষ্কার। খেজুরদানা এলাকায় আমরা ইটের তৈরি বেশ কিছু অবকাঠামো দেখেছি। সেসব ইটের আয়তনও বোঝার চেষ্টা করলাম। ইটের বিস্তৃতি ৭০০ থেকে ৮০০ মিটার। আমরা যেতে পেরেছি মাত্র দুটি স্থানে। এমন আরও কয়েকটি জায়গা আছে বলে শুনেছি। এগুলো সুন্দরবন এলাকায় বড় ধরনের বসতির ইঙ্গিত দেয়। বসতির ধরন এখনই সুনির্দিষ্টভাবে বোঝা না গেলেও এটা পরিষ্কার যে এখানে বড় ধরনের বসতি ছিল। বসতিগুলো অবশ্যই পাল আমলের। এ ধরনের বসতি ওই সময়ে ওই এলাকায় সমৃদ্ধির পরিচয় বহন করছে।
এই মাপের ইট অবশ্যই ১০০০ থেকে ১২০০ বছর আগে ব্যবহৃত হতো। বাংলাদেশে এ ধরনের ইটের ব্যবহার শুরু হয়েছিল ৭০০ থেকে ৮০০ বছর আগে। ১৩ শতকে সর্বশেষ এ ধরনের ইট ব্যবহৃত হয়েছে। গুপ্ত আমল অর্থাৎ ৩২০ থেকে ৫৫০ খ্রিষ্টাব্দেও ওই বসতিটি গড়ে উঠে থাকতে পারে। তবে এ নিয়ে আরও গবেষণা দরকার। আপেক্ষিক তারিখ নির্ণয় পদ্ধতিতে যদি দেখি, তাহলে ওই স্থাপনাগুলো ১০০০-১২০০ বছর আগের। দেড় হাজার বছর আগেরও হতে পারে। এ ধরনের বসতি জোয়ার-ভাটা এলাকায় গড়ে ওঠার কথা নয়। কেননা, ওই এলাকাটি এখন জোয়ারে ডুবে যায়, ভাটায় এর একাংশ ভেসে ওঠে। এ ধরনের প্রাকৃতিক পরিবেশে এ-জাতীয় স্থাপনা গড়ে উঠলেও তার পক্ষে এত দিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। এই স্থাপনাগুলোর গড়ে ওঠা প্রমাণ করছে, সমুদ্র এখান থেকে আরও দূরে ছিল। ১০০০ বছর আগে এখানে জোয়ার-ভাটা ছিল না। বসতির প্রকৃতি ও সমুদ্রের অবস্থান বোঝার জন্য আরও গবেষণা দরকার। তবে এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি, তা বাংলাদেশে বসতির ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন। বাংলাদেশের ইতিহাস যে হাজার বছর আগে কত সমৃদ্ধ ছিল, এর মধ্য দিয়ে তা আমরা জানতে পারলাম। আমরা ময়নামতি, পাহাড়পুর ও মহাস্থানগড় আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে যেমন বাংলাদেশের ইতিহাসের নতুন দিক সম্পর্কে জানতে পেরেছি, সুন্দরবনের আবিষ্কারটিও তেমনি নতুন একটি ধারার সূচনা করল।
এই সভ্যতা সম্পর্কে এর আগে অনেকে নানা ধরনের তথ্য আমাদের দিয়েছিলেন। কিন্তু এভাবে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কেউ কখনো বলেননি। এখানে ইসমে আজম আমাদের সামনে বিজ্ঞানসম্মত কিছু অকাট্য আবিষ্কার তুলে ধরেছেন। এসব আমাদের সুন্দরবন ও বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মানববসতির ইতিহাস নতুন করে লেখার উৎস জোগান দিল।
প্রথম আলো: এখানে আমরা বসতির চিহ্ন পেলাম। এই বসতি কারা গড়ে তুলল? তারা কী করত? কেন তারা হারিয়ে গেল? এসব বিষয়ে কোনো প্রাথমিক ধারণা কি আমরা করতে পারি?
সুফি মোস্তাফিজ: সুন্দরবন অঞ্চল সম্পর্কে জনপ্রিয় ইতিহাসের যেসব বই ও বয়ান আমরা পাই তাতে বলা হয়, সেখানে মোগল আমলে কিছু বসতি ছিল; লবণ চাষ হতো। পর্তুগিজ ব্যবসায়ীরা এখানে আসতেন লবণ আমদানি করতে। যাঁরা লবণ তৈরি করতেন, তাঁরা অবশ্যই স্থানীয় কেউ ছিলেন। কিন্তু এর আগের ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তা আমাদের খুঁজতে হবে। এখানে এসে আমরা যা দেখলাম, তাতে মনে হচ্ছে এখানকার মানুষেরাই সেই লবণ প্রস্তুত করতেন। লবণকেন্দ্রিক বসতি ও বাণিজ্যের সঙ্গে এখানকার মানুষেরা যুক্ত থাকতে পারেন। অনেক স্থাপনা দেখে মনে হয়েছে, অনেকটা বৌদ্ধস্তুপার (বৌদ্ধদের প্রার্থনাস্থল) মতো। তবে এগুলো নিয়ে আরও কাজ করতে হবে।
এখানকার বসতিগুলোর প্রকৃতি কী ছিল, তা জানতে পারলে আমরা বলতে পারব, তারা কত দিন এখানে টিকে ছিল। তার ওপর নির্ভর করে বলা যাবে কেন তা ধ্বংস হয়ে গেল। আমরা দেখেছি, কোথাও নদী বা সমুদ্র থাকলে এবং সেখানে অনুকূল পরিবেশ থাকলে সেখানে সভ্যতা গড়ে ওঠে। ভালো উৎপাদনব্যবস্থা ও প্রশাসন থাকলে সেটি টিকে থাকে। আবার প্রকৃতি বিরূপ হলে তা আবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। নদী দূরে সরে গেলে, মহামারি হলে, নিজেদের কোনো দুর্বলতা দেখা দিলে বা কোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণের মুখে পড়লে জনপদ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
৭৫০ থেকে ১২০০ সালে আমাদের এখানে বৌদ্ধসভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। সুন্দরবনের এই স্থাপনাগুলো বৌদ্ধসভ্যতার নিদর্শন হয়ে থাকলে বৌদ্ধশাসনের অবসানের পর, ১৩০০ সালের পর তা আর টিকে থাকার কথা নয়। কেননা, এরপর তো তা আর শাসকদের সমর্থন পাবে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এটি ধ্বংস হলো, তা জানার জন্য আমাদের আরও গবেষণা করে দেখতে হবে।
প্রথম আলো: বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্র ছিল এখান থেকে বেশ দূরে। এ ছাড়া এলাকাটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণও। অতীতেও পরিবেশের নানা পরিবর্তন ঘটে থাকতে পারে। সেগুলোর কোনো প্রভাবও কি ওই বসতির ওপরে পড়ে থাকতে পারে?
সুফি মোস্তাফিজ: পরিবেশ এখনো মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা থেকে অতীতের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার মতো গবেষণা আমাদের দেশে এখনো তৈরি হয়নি। আমরা উয়ারী-বটেশ্বরে এ বিষয়ে চেষ্টা করছি। সুন্দরবনের এই আবিষ্কার আমাদের এ বিষয়ে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
প্রথম আলো: সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব কী বলে মনে করেন?
সুফি মোস্তাফিজ: সুন্দরবনের ভেতরে যে মানববসতির এত প্রাচীন ইতিহাস লুকিয়ে ছিল, তা আমরা হয়তো কখনো জানতামই না। ইসমে আজম বাঘ গণনা করতে গিয়ে প্রাচীন মানববসতির এই নিদর্শনগুলো আবিষ্কার করেছেন। পরে নিজেই পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতো অনুসন্ধান চালিয়ে গেছেন। আমাদের মতো পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিকের চোখে এত দিন তা ধরা পড়েনি। যদিও এ ধরনের স্থাপনা খুঁজে বের করার দায়িত্ব আমাদেরই। সুন্দরবনের মতো জোয়ার-ভাটা ও কাদামাটির অরণ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুঁজে বের করার বিষয়টি উন্নত দেশগুলোতে মেরিন আর্কিওলজি নামে পরিচিত। এর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দরকার। তাতে জাহাজ লাগে। সামুদ্রিক এলাকায় দীর্ঘদিন থেকে কাজ করতে হয়। পানির নিচে তলিয়ে থাকা ভূমিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা স্থাপনা খুঁজে বের করার প্রয়োজন পড়ে। এর বৈশিষ্ট্য বোঝা খুবই কঠিন। ইসমে আজম একা একা বহু কষ্ট করে এই কাজগুলো করেছেন।
প্রথম আলোর সৌজন্যে আমরা যে সুন্দরবনে গেলাম, তাতেই বুঝতে পেরেছি কাজটি কত কঠিন। সুন্দরবনে যাওয়ার পথে নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেল। ভাটায় আমাদের নৌকা সমুদ্রের দিকে ভেসে যাচ্ছিল। সমুদ্রে ভেসে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা ছিল। আমাদের পুরো দলটি সমুদ্রে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতে পারতাম। কাউকে খবর দেব, তারও সুযোগ ছিল না। সেখানে তো মোবাইল ফোনের সংযোগ বা কোনো নৌযান নেই। এক দিন কাজ করতে গিয়েই আমরা এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম। অন্য প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকার সঙ্গে এর পার্থক্য হচ্ছে এখানে জীবন বাজি রেখে কাজ করতে হয়। ইসমে আজম এই বনে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন খুঁজে বেরিয়েছেন। অনেক কিছুর সন্ধান আমাদের দিয়েছেন। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, সুন্দরবনে হাজার বছরের পুরোনো বসতির নিদর্শন আবিষ্কারের মূল ব্যক্তি হিসেবে ইসমে আজমের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

হায়, কীভাবে বদলে যায় গল্প! by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

একটি বৈদ্যুতিক বাল্বকে কতভাবে কাজে লাগানো যায়, তার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সবাইকে চমকে দিয়েছিল এক কিশোর। চট্টগ্রাম সেন্ট প্লাসিডস স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র তারিক আমিন চৌধুরী বৈদ্যুতিক বাল্বে এমন কিছু সেন্সর লাগিয়েছিল, যার মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে মুঠোফোনের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বাল্বটি যে ঘরে লাগানো হবে, তার ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কী ঘটছে তার তথ্য আহরণ করা সম্ভব। মুঠোফোনের স্ক্রিনে এসব চিত্র যেকোনো জায়গা থেকে দেখা যাবে। বাল্বে স্থাপিত সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে ঘরে চোর-ডাকাত বা অচেনা কেউ ঢুকল কি না, তা যেমন দেখা যাবে, আবার ঘরে আগুন ধরলে বা গ্যাস ছড়ালে তা-ও দেখা যাবে। অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণও করা যাবে। এই সবকিছু সংযোজিত হবে বাল্বের সঙ্গেই।
এই উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে তারিক সহযোগিতা পেয়েছে অগ্রজপ্রতিম শান্তনু ভট্টাচার্যের। শান্তনু চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগের ছাত্র। তারিক আমিনের এই কৃতিত্বের কথা আজ নতুন করে কেন উল্লেখ করার দরকার পড়ল, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে উদ্ভাবনের বিষয়টা আর একটু খোলাসা করি। ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরির প্রতিষ্ঠান বিএমসির ‘স্মার্ট বাল্ব’ নামে একটি বৈদ্যুতিক বাল্ব বাজারে পাওয়া যায়, যেটি বৈদ্যুতিক সংযোগ ছাড়াই তিন ঘণ্টা আলো দিতে পারে। সেই বাল্বকেই আরও উন্নত ও বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার চিন্তা থেকেই মূলত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের কাজটি শুরু করেছিলেন তারিক ও শান্তনু। চট্টগ্রামের দুটি প্রযুক্তি মেলায় বৈদ্যুতিক বাল্বের এই বহুমুখী ব্যবহারের প্রকল্পটি প্রদর্শিত হলে বেশ সাড়া পড়ে। সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয় এই অভিনব ভাবনার কথা। তারিক তখন সাংবাদিকদের বলেছিল, নানা ধরনের সেন্সর ব্যবহারের মাধ্যমে তারা বাল্বটিকে নানা মাত্রায় ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে চেয়েছে। এমকিউ ২ (গ্যাস সেন্সর), এলডিআর (আলোর পরিমাণ নির্ণয়) ও পিআইআরসহ (তাপমাত্রা-আর্দ্রতা নির্ণায়ক) নানা সেন্সর স্থাপন করা হয়েছে বাল্বের মধ্যে। ব্লুটুথ ও ওয়াইফাইয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এই বাল্বকে। এর মধ্যে তারিকের প্রযুক্তিটি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে বিএমসি। তারা তারিকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী এই প্রতিষ্ঠানের আর্থিক আনুকূল্যে বাল্বটিকে আরও উন্নতমানের ও ত্রুটিমুক্ত করতে কাজ করবে তারিকেরা। প্রাথমিকভাবে ১ লাখ বাল্ব বাজারে আনার চুক্তি হয়েছে। এটা ২০১৭ সালের শেষের দিকের ঘটনা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে এটিই তারিকের একমাত্র উদ্যোগ নয়; এর আগে ‘মন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের’ একটি প্রযুক্তি প্রদর্শন করে তারিক পেয়েছিল চট্টগ্রাম বিসিএসআইআর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মেলা ২০১৫-এর প্রথম পুরস্কার। সে সময় জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে তৃতীয় স্থান পেয়েছিল তার উদ্ভাবন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে যে ছেলেটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে ভাবনায় ডুবে থাকে, নতুন আবিষ্কারের নেশা যাকে উদ্দীপ্ত করে রাখে, সেই ছেলেটি পরিণত বয়সে দেশ ও সমাজের বড় সম্পদ হবে, পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করবে-এটাই তো ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু হায়, গল্পটি সেভাবে এগোল না। একদিন সংবাদমাধ্যমে যে কিশোরটির ছবি ছাপা হয়েছিল অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য, সেই তারিক এসএসসি পরীক্ষার হল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মাথা নিচু করে ফিরে গেছে ঘরে। তার অপরাধ কী? অপরাধ, প্রশ্নপত্রের পাশে টিক চিহ্ন দিয়েছিল সে। আমরা যারা এসএসসি, এইচএসসি বা অন্যান্য পরীক্ষা অতিক্রম করে এসেছি, প্রায় সবাই তো বাড়িতে এসে নিশ্চিত হওয়ার জন্য প্রশ্নপত্রে যে উত্তরটি সঠিক বিবেচনা করেছি তাতে টিক চিহ্ন দিতাম। এখনো সেই নিয়মের সঙ্গেই তো অভ্যস্ত ছাত্রছাত্রীরা। প্রশ্নপত্রে কোনো দাগ দেওয়া যাবে না-এমন নিয়ম বা নির্দেশনা কি আদৌ দেওয়া আছে? প্রশ্নপত্রে টিক চিহ্ন দেওয়া মানে কি নকল করা? সন্দেহ করা আর নিশ্চিত হওয়া একই ব্যাপার নয়। সন্দেহের বশে তারিক আমিনসহ তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের আগে ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়ের আরও অন্তত দুবার ভাবা উচিত ছিল।
কেননা, বহিষ্কার সর্বশেষ ধাপ। ক্ষমতা তাঁর আছে, কিন্তু সেটা প্রয়োগ করার আগে ভাবতে হবে একজন শিক্ষার্থীর এই দুর্বিষহ অভিজ্ঞতা তার নিজের জীবনে, মা-বাবা-পরিবার, এমনকি সমাজে কী পরিণতি বয়ে আনতে পারে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় চলছে। প্রায় সব পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় বিস্মিত ও হতাশ দেশের মানুষ। কেউই রোধ করতে পারছে না এই সর্বনাশা প্রবণতা। তাৎক্ষণিক নানা রকম নিয়মনীতি বা পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ইন্টারনেটের গতি কমানো, পরীক্ষা কেন্দ্রের ২০০ মিটারের মধ্যে মুঠোফোন নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বা প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা ইত্যাদি সত্ত্বেও প্রশ্নপত্র ফাঁস অব্যাহত রয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার মতো ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ চাপানোর চেষ্টা চলছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে না পেরে প্রশাসন চড়াও হয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর। প্রশ্নপত্রে টিক চিহ্ন দেওয়ার মতো অপরাধের জন্য শিক্ষার্থী বহিষ্কারের ঘটনা তারই একটি বড় উদাহরণ। এই ঘটনার প্রতিবাদ করায় শিক্ষার্থীদের কয়েকজন অভিভাবককেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে পরীক্ষা কেন্দ্রগামী একটি বাসে অভিযান চালিয়ে পুলিশ বেশ কয়েকজন পরীক্ষার্থীকে আটক করে। তাদের মুঠোফোনে প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে-এই অভিযোগে ২৪ জনকে বহিষ্কার এবং ৯ জনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া ওই দিন সারা দেশে মোট ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যাদের মুঠোফোনে প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে, তারা তো প্রশ্ন ফাঁস করেনি। এই কিশোরেরা হয় কৌতূহল, নয়তো প্রলোভনের শিকার হয়েছে। দেশজুড়ে প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে যে তোলপাড় ঘটছে, তাতে পরীক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত না হওয়ার তো কারণ দেখি না। শিক্ষাব্যবস্থাটাই যেখানে পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও ফলাফলনির্ভর, সেখানে সুযোগ পেলে কম বয়সী ছেলেমেয়েরা এটুকু সুযোগ নেবে না-এটা ভাবা কতটা বাস্তবসম্মত? সংবাদপত্রের পাতায় আটক ছাত্রদের ছবি দেখেছি। ক্যামেরা থেকে মুখ আড়াল করার চেষ্টা করছে তারা। অন্য রকম হতে পারত গল্পটা। এই কিশোর-তরুণদের ছবি তাদের কৃতিত্বের জন্য, প্রতিভা ও সৃজনশীলতার জন্য সংবাদপত্রের পাতায় স্থান করে নিতে পারত। কিন্তু আমরা তারিক আমিনের সাফল্যের ছবিটা যেমন মুছে দিয়েছি, তেমনি এদের সম্ভাবনার পথটাও রুদ্ধ করে দিলাম। আগামী প্রজন্ম কি আমাদের ক্ষমা করবে?
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক, কবি ও লেখক
bishwabd@yahoo.com

অভিজিৎ হত্যা

লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার তিন বছর পার হলেও মূল অপরাধীদের এখনো ধরা যায়নি। এ নিয়ে দেশীয় তদন্তকারী দলের সঙ্গে আমেরিকান তদন্তকারীরাও কাজ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ করা যায়নি। যেহেতু অভিজিৎ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন, সেহেতু সেই দেশের তদন্তকারীরাও এখানে এসেছিলেন তদন্তকাজে সরকারকে সহায়তা করতে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বইমেলা থেকে ফেরার পথে জঙ্গিগোষ্ঠী অভিজিৎকে হত্যা করে। তাদের আক্রমণে তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ গুরুতর আহত হলেও প্রাণে বেঁচে যান। তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এত দিন বলা হয়েছিল যে অভিজিৎ হত্যাকারীদের কেউ কেউ ধরা পড়েছে, অন্যদের শনাক্ত ও পাকড়াও করতে পারলেই আদালতে অভিযোগপত্র দায়ের করা হবে। অভিজিতের বাবা বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক অজয় রায় শুরু থেকে বিচার নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন। গণমাধ্যমে তিনি একাধিকবার তাঁর অসন্তুষ্টির কথাও জানিয়েছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সন্দেহভাজন হিসেবে যাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তাঁরা কেউ অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিলেন না। তাঁদের দাবি, নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসার আল–ইসলামই (পুরোনো আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) অভিজিৎকে খুন করেছে। এর নির্দেশদাতা এবং সংগঠনটির সামরিক শাখার প্রধান চাকরিচ্যুত মেজর সৈয়দ জিয়াউল হকসহ খুনিরা চিহ্নিত হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের অপর নির্দেশদাতা শরিফুল ওরফে মুকুল রানা খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়ায় পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। কিন্তু হত্যার পরিকল্পনাকারী চাকরিচ্যুত মেজর জিয়া এবং আরেক সমন্বয়ক মো. সেলিম ওরফে হাদী-২ সহ সাতজন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। অভিজিৎ হত্যার তদন্ত হচ্ছে অনেকটা অন্ধের হাতি দর্শনের মতো। তদন্তের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা একেক সময় একেক কথা বলছেন। আদালতের কাছ থেকেও তাঁরা বারবার সময় নিচ্ছেন। পরস্পরবিরোধী ও অসম্পূর্ণ তথ্য কখনো সত্য উদ্‌ঘাটনে সহায়ক নয়।
দুজন নির্দেশদাতার মধ্যে যদি একজন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ও অপরজন পলাতক থাকে তাহলে রহস্য উদ্‌ঘাটিত হবে কী করে? এর আগে সরকারের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, মেজর জিয়া নজরদারিতে আছেন। এ রকম দুর্ধর্ষ জঙ্গি নজরদারিতে থাকার পরও গ্রেপ্তার হচ্ছে না কেন? শুরু থেকেই সরকার জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখানোর কথা বলে আসছে। ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী বেশ কিছু সফল অভিযানের খবরও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এসেছে। এগুলোকে সরকারের সাফল্যের দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করলে, হত্যা মামলাগুলোর তদন্ত শেষ না হওয়া ব্যর্থতা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। জঙ্গিদের হাতে অনেক মানুষ মারা গেছেন। কিন্তু রাজীব হায়দার ছাড়া আর কোনো হত্যা মামলার বিচার হয়নি। খুনিরা পলাতক থাকলে এবং তাদের ধরা না গেলে তারা যে নতুন অঘটন ঘটাবে না বা ফের শক্তি সঞ্চয় করে মাঠে নামবে না, তার নিশ্চয়তা কী? অভিজিৎ রায়ের পর জঙ্গিদের হাতে জীবন দিয়েছেন তাঁর বইয়ের প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন। সেই হত্যার তদন্তও ঝুলে আছে। মামলার তদন্তকাজ শেষ না হলে বিচার শুরু হবে কবে? একটি মামলার তদন্তকাজ শেষ হওয়ার পর বিচার পেতে অনেক সময় লাগে। তিন বছরেও অভিজিৎ হত্যার তদন্তকাজ শেষ হয়নি। তদন্তকাজ শেষ ও অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য আর কত অপেক্ষা করতে হবে? অবিলম্বে অভিজিৎ হত্যার তদন্ত শেষ করে যেসব আসামি পলাতক আছেন, তাঁদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হোক। খুনের বিচারই পারে জঙ্গিদের শিকড় নির্মূল করতে।

ইতালির নির্বাচনেও অভিবাসী বিদ্বেষ by সরাফ আহমেদ

ইউরোপে উদারনৈতিক রাজনীতির এখন বেহাল অবস্থা। সর্বত্র তথাকথিত জনতুষ্টিবাদী ও জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীলদের কাছে আত্মসমর্পণ করছে ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর রাজনীতি। ইউরোপের নানা দেশের পর এবার ইতালির নির্বাচনকে ঘিরে তারা মাঠে নেমেছে। পূর্ব ইতালির মাসেরাতা শহরের দুটি অপরাধমূলক ঘটনা এখন ইতালির পার্লামেন্ট নির্বাচনের মূল নিয়ামক হতে চলেছে। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে একজন ইতালীয় নারীকে হত্যার অভিযোগে নাইজেরিয়ার নেশাগ্রস্ত একজন অভিবাসী অভিযুক্ত হন। এর পরপরই চলন্ত গাড়ি থেকে একজন ইতালিয়ান যুবক কিছু আফ্রিকান অভিবাসীর ওপর গুলি চালান। এতে পাঁচজন আফ্রিকান আহত হন। এরপর গলায় ইতালির পতাকা জড়ানো এই যুবক চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘ইতালি, ইতালির নাগরিকের জন্য, পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করুক।’ তাঁকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানায়, ওই ব্যক্তি গত বছর অভিবাসনবিরোধী একটি দল থেকে আঞ্চলিক নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। ইতালির নির্বাচনের প্রাক্কালে মাসেরাতা শহরের এই দুই ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশটির দক্ষিণপন্থী কট্টরবাদী দলগুলো আসন্ন ৪ মার্চের নির্বাচনে এটাকে পুঁজি করতে মরিয়া হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) চতুর্থ বৃহত্তম শক্তিশালী দেশ এবং জোটের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সদস্যদেশটির নির্বাচন নিঃসন্দেহে ইইউ জোট রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলবে। দক্ষিণ ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে অনেকটা উদার প্রকৃতির দেশটিতে ঐতিহাসিকভাবেই নানা জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করছে। ইতালির জনসংখ্যা ৬ কোটি ৬০ লাখ, যার মধ্যে অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৫০ লাখ। এই অভিবাসীরা বৈধভাবে চাকরি করেন এবং রাজস্ব পরিশোধ করে দেশটিতে বসবাস করছেন। তবে ভূমধ্যসাগরের অপর পারের দেশ লিবিয়াতে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই আফ্রিকা ও এশিয়ার যুদ্ধপীড়িত ও দরিদ্র শরণার্থীরা সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে আসছেন। এই মুহূর্তে ইতালিতে এ ধরনের শরণার্থীর সংখ্যা ৬ লাখ। ইউরোপের সংবাদমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে, ইতালিতে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে রাজনীতি করার বিষয়টি একদম নতুন। গত কয়েক বছর ধরে ইতালির অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে কোনোভাবেই অভিবাসী বা শরণার্থীদের দায়ী করা যায় না। অথচ দেশটির রক্ষণশীল দলগুলোও ইউরোপের অন্য দেশগুলোর নির্বাচনে বিদেশি-বিদ্বেষী দলগুলোর সাফল্য দেখে এই হানাহানির রাজনীতিকে কাজে লাগাচ্ছে।
ইতালির রাজনীতিতে মূলত তিনটি জোট ভোটযুদ্ধে সক্রিয়। ২০১৩ সালের নির্বাচনেও মূলত তিনটি জোটের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল। জোটগুলো ছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক ও সমমনা দলগুলো, বেপে গ্রিলোর নেতৃত্বে রক্ষণশীল ফাইভ স্টার মুভমেন্ট এবং সিলভিও বেরলুসকোনির নেতৃত্বে রক্ষণশীল ফরোয়ার্ড ইতালি। এই দলগুলোর বাইরে বামপন্থী ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ মুভমেন্ট, রক্ষণশীল আঞ্চলিক দল নর্দান লিগ, বাম ঘেঁষা সিনাসর্তা ইতালি, লিবারেল পপুলার অ্যালায়েন্স এবং রক্ষণশীল ব্রাদার অব ইতালি দল। ছোট দলগুলোর সব সময় বড় সমমনা দলগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে ক্ষমতায় যাওয়ার রেওয়াজ ইতালিতে রয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বেপে গ্রিলোর নেতৃত্বে রক্ষণশীল ফাইভ স্টার মুভমেন্ট নির্বাচনে ২৮ শতাংশ ভোট পেয়ে শক্তিশালী দল হতে যাচ্ছে। দলটি নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় গেলে, ইউরো মুদ্রা জোট থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা বলেছে। বেরলুসকোনির নেতৃত্বে রক্ষণশীল ফরোয়ার্ড ইতালি দলটির ১৬ শতাংশ ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মাত্তিও সালভানির নেতৃত্বে আরেক রক্ষণশীল দল লিগা নর্ডের ১৪ শতাংশ ও রক্ষণশীল ইউরোবিরোধী ব্রাদার ইতালি দলটির ৫ শতাংশ ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব মিলিয়ে রক্ষণশীল দলগুলোর প্রায় ৫০ শতাংশ বা অধিক ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে উদার সামাজিক গণতান্ত্রিক ধাঁচের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাত্তিও রেনজির ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং সমমনা প্রগতিশীল ও বাম দলগুলো মিলিয়ে ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ১৯৮৯ সালে বার্লিনের প্রাচীর পতনের পর থেকে ইউরোপের দেশে দেশে যে নিও লিবারেলিজম বা উদারনৈতিক রাজনীতির স্রোত বহমান ছিল, আপাতত তাতে ভাটা পড়েছে। জনগণের মৌলিক চাহিদার বাইরে যে আরও কিছু চাওয়া-পাওয়ার বিষয় রয়েছে, সে বিষয়গুলো উদার গণতান্ত্রিক দলগুলো অনুধাবন করতে পারেনি। নিজেদের ভুল সংশোধন না করে কট্টর রক্ষণশীলদের সমালোচনায় তারা বেশি সময় ব্যয় করেছে। উদারবাদীদের ভুল রাজনীতির কারণে এখন ইউরোপের অনেক দেশেই তারা কট্টরবাদীদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে নতুবা কট্টরবাদীদের মতো নতুন সংস্করণের রাজনীতি গ্রহণ করছে। ফ্রান্স, জার্মানি, অস্ট্রিয়ার পর ইতালিতে উদারনৈতিক না কট্টরবাদী-কারা ক্ষমতায় আসছে, তা দেখা যাবে আগামী ৪ মার্চের নির্বাচনে।
সরাফ আহমেদ: প্রথম আলোর হ্যানোভার (জার্মানি) প্রতিনিধি
Sharaf.ahmed@gmx.net

বাবার স্মৃতির খোঁজে ডরোথি by সোহরাব হাসান

১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচারী এরশাদের পুলিশ বাহিনী ট্রাকচাপা দিয়ে খুন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এইচ এম ইব্রাহিম সেলিম ও কাজী দেলোয়ার হোসেনকে। তাঁরা দুজনই ছিলেন ছাত্রলীগের নেতা। সেদিন স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ শান্তিপূর্ণ মিছিল বের করলে পুলিশ বাহিনী সেই মিছিলের ওপর ট্রাক উঠিয়ে দেয়। বাংলাদেশে এ রকম বর্বরোচিত ঘটনা দ্বিতীয়টি ঘটেনি। এরপর ১ মার্চ রাজনৈতিক দল ও শ্রমিকসমাজ দেশব্যাপী ধর্মঘটের ডাক দিলে সরকারের লেলিয়ে দেওয়া গুন্ডারা আদমজী মিলে শ্রমিক-মিছিলে হামলা করে শ্রমিকনেতা তাজুল ইসলামকে হত্যা করে। শহীদ ইব্রাহিম সেলিমকে যখন হত্যা করা হয়, তখন তাঁর কন্যা নূসরাত জাহান ডরোথির বয়স মাত্র ছয় মাস। বাবাকে দেখলেও কোনো স্মৃতি তাঁর মনে থাকার কথা নয়। তারপরও প্রতিবছর ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে তিনি ঢাকায় চলে আসেন বাবার স্মৃতির খোঁজে। বাবার স্মৃতি মানে ইব্রাহিম সেলিম সূর্যসেন হলের যে কক্ষে থাকতেন, সেই কক্ষটি একবার ঘুরে আসা। বাবার স্মৃতি মানে ইব্রাহিম সেলিম যে বিভাগে পড়তেন, সেই বিভাগটি ঘুরে দেখা। বাবার স্মৃতি মানে যেখানে এরশাদের পুলিশ তাঁদের ট্রাকচাপা দিয়ে মেরেছিল, সেই জায়গায় ফুল দেওয়া। বাবার স্মৃতি মানে তাঁর বন্ধুদের খুঁজে বের করা। ডরোথির মা অসুস্থ, তাই একাই তিনি বরিশাল থেকে ঢাকায় এসেছেন। প্রতিবার আসেন। বাবার সহপাঠী ও বন্ধুদের কেউ কেউ ডরোথির প্রতি সহমর্মিতার হাতে বাড়ান, তাঁকে সান্ত্বনা দেন। আবার অনেকে এড়িয়ে চলেন। সেলিম, দেলোয়ার ও তাজুলের আত্মত্যাগের পথ ধরে দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনের মাধ্যমে নব্বইয়ে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন ঘটে। রাজনৈতিক দলগুলো সেদিন তিন জোটের রূপরেখা দিয়ে গণতন্ত্রকে সংহত এবং স্বৈরাচারকে চিরতরে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু যে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে নূর হোসেন, রউফুন বসুনিয়া, ডা. শামসুল আলম মিলনসহ বহু নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ জীবন দিয়েছেন, ক্ষমতার রাজনীতি তাঁদের কথা মনে রাখেনি। শহীদদের স্বপ্ন ও আদর্শ থেকে রাষ্ট্র এখন বহু দূরে। আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি শহীদ সেলিম-দেলোয়ার দিবন। অন্যান্য দিবসের মতো এই দিনটিও হয়তো নীরবে চলে যাবে, চলে যায়। কোনো কোনো পত্রিকায় পাতায় তাঁদের যুগল ছবি ছাপা হয়েছে। হয়তো টেলিভিশনের খবরেও এক ঝলক দেখানো হবে সেই ছবি। কিন্তু তাঁদের স্বজনদের কান্না কে মোছাবে? কে সান্ত্বনা দেবে ইব্রাহিম সেলিমের কন্যাকে? তিনি তো ৩৪ বছর ধরে বাবার অপেক্ষায় আছেন।
তিনি জানেন, এই অপেক্ষার পালা কখনো শেষ হওয়ার নয়। যত দিন বেঁচে থাকবেন, মায়ের কাছে শোনা বাবার গল্প স্মৃতিতে নিয়ে চলবেন। কিন্তু রাষ্ট্র সেলিম-দেলোয়ারের স্মৃতি রক্ষায় কিছু করেনি। অন্তত যেখানে ইব্রাহিম সেলিম ও দেলোয়ার হোসেনকে হত্যা করা হয়েছিল, সেখানে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করে তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখতে পারে। ডরোথির দাবি, সেই সড়কটি সেলিম-দেলোয়ারের নামে করা হোক। জায়গাটি দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে পড়েছে। মেয়র সাঈদ খোকনের কাছে ইব্রাহিম সেলিমের কন্যা ডরোথি একাধিকবার আবেদন করেছেন। কিন্তু কোনো জবাব মেলেনি। সেলিম-দেলোয়ার দিবসে তাঁদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ছাড়া কোনো সংগঠনকে কর্মসূচি নিতে দেখা যায় না। তাঁদের সহযাত্রীদের অনেকে এখন সরকার ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তাঁদের কাছেও কি শহীদ সেলিম-দেলোয়ারের কোনো মূল্য নেই? যে বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা পড়াশোনা করতেন, সেই বিশ্ববিদ্যায়ও তো স্মৃতি রক্ষায় কিছু করতে পারে। তাঁদের নামে কোনো পাঠাগার, মিলনায়তন কিংবা হলেরও নামকরণ হতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে না, কী কারণে তাঁরা জীবন দিয়েছেন, সেই ইতিহাসও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানানো হবে। ডরোথির মা নাসিমা জাহানও ছিলেন অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। সেলিম মারা যাওয়ার পর আর্থিক অনটনের কারণে তাঁর পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যায় এবং মা-বাবার কাছে চলে যান। তিনি পিতৃহারা শিশুসন্তানকে অনেক কষ্টে মানুষ করলেও ঠিকমতো পড়াশোনা করাতে পারেননি। নবম শ্রেণির পর ডরোথির পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে এখন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন। এটুকুই কি একজন শহীদ-কন্যার প্রাপ্য ছিল? মনে হচ্ছে, আমাদের দেশে শহীদেরা এখন আর স্মরণীয় মানুষ নন, ক্ষমতার সিঁড়ি। শহীদ সেলিমের কন্যা ডরোথির আক্ষেপ, সমাজ তাঁর বাবাকে ভুলে গেছে। তিনি চান তরুণ প্রজন্ম জানুক, কেন তাঁর বাবা এবং তাঁর সহযাত্রীরা জীবন দিয়েছেন।

আবারও শ্রমিকের মৃত্যু

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর উপজেলায় অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের সময় গর্ত ধসে ছয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা শুধু দুঃখজনক নয়, অনভিপ্রেতও বটে। এই নিয়ে এ রকম গর্ত ধসে গত ১৩ মাসে ৫০ জন পাথরশ্রমিক নিহত হলেও তা নিয়ে যেন কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। মঙ্গলবার প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, গত রোববার রাতে কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকার হাজিরডেগনায় ফসলি জমিতে গর্ত করে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের সময় ধসে ১০ শ্রমিক চাপা পড়েন। এঁদের মধ্যে ৫ জন মারা যান। সোমবার জৈন্তাপুর উপজেলার শ্রীপুর পাথর কোয়ারিতে গর্ত ধসে আরও এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পাথরশ্রমিকেরা সাধারণত পাথর কোয়ারিতে মাটির তলদেশে বোমা মেশিন নামের পাওয়ার পাম্পযন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলন করে থাকেন। কিন্তু বোমা মেশিন ব্যবহারের ফলে ভূগর্ভস্থ মাটির স্তরের পরিবর্তন হয়। এতে ভূমিধস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ আশঙ্কা থেকেই বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি এটা নিষিদ্ধ করার জন্য উচ্চ আদালতের কাছে আবেদন করে। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় পরিবেশ অধিদপ্তর ২০১০ সালে এই বোমা মেশিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।
কিন্তু এরপরও এ যন্ত্রের ব্যবহার থামেনি। ফলে ঘটে চলেছে গর্ত ধসের ঘটনা। আর এরই মাশুল গুনতে হলো কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুরের ছয় পাথরশ্রমিককে। এ ছাড়া কোম্পানীগঞ্জসহ ছয়টি উপজেলার পাহাড় ও টিলা কাটার ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পাহাড় ও টিলা কাটা চলছেই। টিলা খুঁড়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে যে শুধু মানুষের প্রাণহানি ঘটছে তা নয়, গুরুতর বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রকৃতি এবং পরিবেশও। এভাবে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনের পেছনে রয়েছে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী। এসব ব্যবসায়ী ‘পাথরখেকো’ হিসেবে পরিচিত। বছরের পর বছর ধরে তাঁরা শ্রমিকদের দিয়ে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করালেও তাঁদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাহলে স্থানীয় প্রশাসন কী করছে? আর পরিবেশ অধিদপ্তরই–বা বসে আছে কেন? এসব অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পাথর উত্তোলন এবং গর্ত ধসে এভাবে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটত না। স্থানীয় প্রশাসনেরও কি এতে স্বার্থ রয়েছে? কেননা, তাদের সহযোগিতা ছাড়া বছরের পর বছর ধরে এই অবৈধ কাজ চলে কীভাবে? চিহ্নিত পাথরখেকোদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি যাঁরা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনে মদদ দিচ্ছেন, তাঁদের চিহ্নিত করতে হবে এবং কঠোর শাস্তি দিতে হবে।

পুরুষ কবে ‘মানুষ’ হয়ে উঠবে? by নিশাত সুলতানা

সারা দিনের কর্মক্লান্তি শেষে সন্ধ্যায় সবে বাসায় ফিরেছি। একটু বাদে কলবেলের অস্থির শব্দ। দরজা খুলতেই আমাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন পাশের ফ্ল্যাটের গৃহকর্মে সাহায্যকারী মেয়েটি। বয়সে সবে তরুণী হয়ে উঠলেও নয় ও চার বছর বয়সী দুটি সন্তানের মা তিনি।
মেয়েটি কেন জানি যেকোনো আনন্দে কিংবা দুঃখে আমার কাছেই প্রথমে আসেন। দেখলাম তাঁর সারা শরীরে আঘাতের অসংখ্য চিহ্ন। কপালের পাশে একটি জায়গা থেঁতলানো, পুরো কপাল গেছে ফুলে। কারণ জিজ্ঞেস করতেই কান্নার মাত্রা আরও বেড়ে গেল। কান্না কিছুটা প্রশমিত হলে তাঁর কাছ থেকে যা জানতে পারলাম তা হলো, কয়েকটি বাসায় কাজ করে মেয়েটি যা উপার্জন করেন তার প্রায় সম্পূর্ণটাই তিনি তাঁর স্বামীর হাতে তুলে দেন। বাকি সামান্য অর্থটুকু তিনি তাঁর নিজের ও সন্তানের কথা ভেবে স্বামীর অগোচরে ঘরের কোনো এক কোনায় জমা করেছিলেন। সেই যত্সামান্য গুপ্তধন সেদিন তাঁর স্বামীটি উদ্ধার করে ফেলেন, আর এতেই বেধে যায় তুলকালাম কাণ্ড। অর্থের উৎস হিসেবে প্রথমত মেয়েটির চরিত্র নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করা হয়। সেটি প্রতিষ্ঠিত করতে না পেরে মেয়েটিকে অপরাধী করা হয় কেন তিনি তাঁর স্বামীকে প্রকৃত আয়ের প্রতিবেদন গোপন করে এই অর্থ জমা করেছেন। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে তাঁর সঞ্চিত টাকাপয়সা তো কেড়ে নেওয়া হয়ই, উপরন্তু তাঁকে এমন মার দেওয়া হয় যেন ভবিষ্যতে তিনি এ ধরনের কাজ করার আগে সাতবার ভাবনাচিন্তা করেন।
প্রতিদিন সকালে অফিস সহকারী মেয়েটির মিষ্টি হাসিমুখ দেখে কর্মদিবসের শুভসূচনা হয় আমার। কিন্তু সেদিন মেয়েটির মুখের হাসি কোথায়! হাসির বদলে তাঁর মুখে একরাশ বিষণ্নতা। কারণ জিজ্ঞেস করতেই তিনি অকপটে জানালেন, স্বামী তাঁকে আগের রাতে মারধর করেছেন। মারধরের কারণ সন্তানেরা পরীক্ষায় কম নম্বর পেয়েছে। তাই দোষ তো নিশ্চিতভাবেই সন্তানগুলোর মায়ের! মেয়েটি খুব বেশিদূর পড়ালেখা করতে পারেননি, কোনো রকমে এসএসসি পাস করেছেন। কিন্তু ছেলেমেয়েদের পড়াশোনায় খুব একটা অবদান রাখার সক্ষমতা তাঁর না থাকলেও সন্তানের ব্যাপারে তাঁর মধ্যে কখনো কোনো উদাসীনতা দেখিনি। তাঁকে তাঁর স্বামী নিষ্ঠুরভাবে মেরেছেন আর বলেছেন সামনের পরীক্ষায় ছেলেমেয়েদের ফলাফলের অবনতি হলে তাঁকে বাড়ি থেকে বহিষ্কৃত করা হবে এবং এটাই তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ‘কীভাবে সন্তানদের পড়ালেখার উন্নতি হবে’-এ প্রশ্ন করায় মেয়েটি কয়েকটি অতিরিক্ত পিটুনি খেয়েছেন। মেয়েটির স্বামী সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালান, অনেক ব্যস্ততা তাঁর। এসব ভিত্তিহীন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় কোথায় তাঁর?
সমাজের চোখে অত্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ও খুবই সম্মানজনক এক পেশায় রয়েছেন আমার আরেক পরিচিতা। সন্তানকে স্কুলে রাখার সময় কিংবা স্কুল থেকে নেওয়ার সময় কখনো কখনো দেখা হয় আমাদের। সন্তানের স্কুলসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদানের সূত্র ধরে আমাদের মধ্যে বেশ সখ্য গড়ে ওঠে। ভদ্রমহিলার স্বামীও সমাজের উঁচুতলার মানুষ এবং সবাই তাঁকে বেশ সমীহ করেই চলে। সেই ভদ্রমহিলার কাছ থেকে প্রায়ই শুনি স্বামী কর্তৃক আরেক কদর্য নির্যাতনের কথা। প্রায়ই স্বামী তাঁকে ধর্ষণ করেন। আর এ বিষয়টি তিনি নীরবে সয়ে যান, কাউকেই বলতে পারেন না। কারণ স্বামী কর্তৃক যৌন নির্যাতনকে এ সমাজ ধর্ষণ বলে স্বীকার করে না। তাই বল প্রয়োগের এই বিষয়টিতে যতই কদর্যতা বা পাশবিকতা থাকুক না কেন আমাদের সমাজে এটি স্বীকৃত এবং একে নীরবে মেনে নেওয়ার শিক্ষাই মেয়েদের দেওয়া হয়। ধর্ষণের পাশাপাশি এই ভদ্রমহিলা মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হন। প্রায়ই তিনি বিবাহবিচ্ছেদের কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত সমাজ, সংসার আর সন্তানদের কথা ভেবে পিছিয়ে যান। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশে শতকরা আশি ভাগ নারীই তাঁদের বিবাহিত জীবনে অন্তত একবার হলেও তাঁদের স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই নির্যাতনের মধ্যে রয়েছে যৌন নির্যাতন, শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নির্যাতন। এর মধ্যে শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের মাত্রা সবচেয়ে ভয়ংকর। প্রতিবেদনটিতে পুরুষের কর্তৃত্বমূলক মনোভাবই এই নির্যাতনগুলোর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই যে সমাজের নিম্ন স্তর থেকে উচ্চ স্তরের তিনটি নারীর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরলাম, তাঁদের প্রত্যেককেই পরামর্শ দিয়েছিলাম স্বামীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে। কিন্তু তাঁরা তা করতে অনিচ্ছুক।
এই তিনজন নারীই কিন্তু আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী, স্বামীর ওপর নির্ভরশীল নন। কিন্তু এত নির্যাতনের পরও তাঁরা চান না তাঁদের স্বামীরা শ্রীঘরে যাক, কষ্ট পাক। এই যে এত অত্যাচার আর নির্যাতন সহ্য করার পরও, নারী পুরুষের প্রতি উদার সেটি প্রত্যক্ষ করার পরও পুরুষ নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হননি। বরং তা পুরুষকে নারীর প্রতি আরও বেশি সহিংস করে তুলছে। বিবিএসের জরিপে আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ নির্যাতনের বিপরীতে মাত্র ২.৬ শতাংশ বিবাহিত নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। এই বাস্তবতায় আমরা কী করে আশা করতে পারি যে সামনের দিনগুলোতে পারিবারিক সহিংসতা কমে আসবে? এত অত্যাচার আর নির্যাতন সহ্য করার পরও পুরুষকে বারবার নারী ক্ষমা করেছে মানবিকতার কারণে এবং বৃহত্তর পারিবারিক স্বার্থে। কিন্তু অধিকাংশ পুরুষ তলিয়ে দেখেন না যে পুরুষকে বারবার ক্ষমা করার পেছেনে শুধু উদারতা নয়, বরং পুরুষের প্রতি নারীর করুণাও মিশে আছে। সংবেদনশীল ও প্রকৃত পুরুষেরা নিশ্চিতভাবেই এই বিষয়গুলো উপলব্ধি করেন। নারীকে তাঁরা মানুষ হিসেবে সম্মান করেন। কিন্তু বাকি এবং আমাদের সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ তথাকথিত পুরুষেরা তা বুঝবে কবে? কবে তারা ‘মানুষ’ হয়ে উঠবে?
নিশাত সুলতানা: লেখক ও গবেষক
purba_du@yahoo.com

বদলের হাওয়ায় সৌদি নারীরা

সত্যিই খেল দেখিয়ে চলেছেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি, ফুটবল মাঠে বসে খেলা দেখার অধিকার—এরপর সরাসরি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ! বছর খানেক আগেও সৌদি নারীদের এসব অধিকারের কথা ভাবা ছিল স্বপ্নেরই নামান্তর। সৌদি বাদশাহ সালমান গত জুনে ভাতিজা মোহাম্মদ বিন নায়েফকে সরিয়ে সিংহাসনের উত্তরসূরি করেন ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমানকে। এরপর থেকে বদলের হাওয়া বইতে শুরু করেছে ‘রক্ষণশীল’ দেশ বলে পরিচিত সৌদি আরবে। দেশটি অর্থনৈতিক সংস্কারের নামে তেলভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরতা কমানো, পর্যটন ও শিল্পায়নে গুরুত্ব দেওয়া, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি আর নারীদের অধিকারের বিষয়ে ধাপে ধাপে অনেকটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যার মূল কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে তরুণ ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে। বাবা বাদশাহ সালমান সিংহাসনে থাকলেও কার্যত অনেকে ক্ষেত্রেই মূল ভূমিকা পালন করছেন এই যুবরাজ। ধাপে ধাপে অধিকার পাওয়া সৌদি নারীরা এবার দেশটির সৌদি সেনাবাহিনীতেও যোগ দিতে যাচ্ছেন। এই নিয়োগপ্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নারীরা তাতে আবেদন করছেন। আপাতত মক্কা, মদিনা, রিয়াদ ও আল-কাসিম প্রদেশেই শুধু নারী ‘সৈনিক’ পদে তাঁরা নিয়োগ পাবেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত ১২টি যোগ্যতার মধ্যে রয়েছে আবেদনকারীকে অবশ্যই সৌদি নাগরিক হতে হবে, বয়স হতে হবে ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে, হাইস্কুল ডিপ্লোমাধারী হতে হবে। আর যে প্রদেশে চাকরি করতে চান, সেই প্রদেশে অবশ্যই আবেদনকারী ও তাঁর অভিভাবকের (স্বামী, বাবা, ভাই কিংবা ছেলে) থাকার জায়গা থাকতে হবে। মাত্র বছর তিনেক আগে ভোটাধিকার ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার পান সৌদি নারীরা। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গত সেপ্টেম্বরে গাড়ি চালানোর অধিকার পান নারীরা। চলতি বছরের জুন থেকে তা আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হওয়ার কথা। ওই সেপ্টেম্বরেই নারীদের ফতোয়া জারির অধিকার দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সৌদি ছাত্রীদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়।
আর গত মাসে প্রথমবারের মতো মাঠে বসে ফুটবল খেলা দেখার অধিকার দেওয়া হয় তাঁদের। এসব বিষয় বিবেচনায় সৌদি সেনাবাহিনীতে নারীদের যোগ দেওয়ার অধিকারটা দ্রুতই পাওয়া গেলে বলা যায়। সৌদি নারীদের এই অধিকার পাওয়ার তালিকার চেয়ে আটকে থাকার তালিকাটা কিন্তু এখনো দীর্ঘ। এখনো পাসপোর্ট করা, বিদেশ ভ্রমণ, বিয়ে, ব্যাংক হিসাব খোলা, কোনো ব্যবসা শুরু করা, কোনো ধরনের সার্জারি—এমনকি সাজা শেষ হওয়ার পর কারাগার ছেড়ে যাওয়ার জন্যও সৌদি নারীকে অবশ্যই তাঁর পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি নিতে হয়, যেটা দেশটিতে ‘অভিভাবকত্ব ব্যবস্থা’ বলে পরিচিত। মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই অভিভাবকত্ব ব্যবস্থার কারণে সৌদি নারীরা ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। সরকার এই ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার কথা বললে তা বাস্তবায়ন করছে না। বিষয়টি নিয়ে সৌদি নারী অধিকার কর্মীরা সোচ্চার হয়ে উঠছেন। সৌদি নারীদের গাড়ি চালানোর অধিকার আদায়ের আন্দোলনের অগ্রদূত মানাল আল শরিফ সম্প্রতি চলমান ‘অভিভাবকত্ব ব্যবস্থার’ বিরুদ্ধে টুইট করেছেন। লিখেছেন, ‘এগিয়ে যাওয়ার পথে আমিই আমার অভিভাবক’। তবে ৩২ বছর বয়সী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান এই বিষয়গুলোতেও সংস্কার আনবেন কি না, তা সময় বলে দেবে। প্রায় নয় দশক ধরে সৌদি আরবের ক্ষমতায় থাকা বর্তমান রাজবংশের কেউই এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবেননি। শুধু নারী অধিকারের বিষয়েই নয়, অন্য কোনো বিষয়েও সংস্কারের পথে হাঁটেননি তাঁরা। এর কারণ হয়তো দেশটির ‘রক্ষণশীল সমাজের’ বিরুদ্ধে যেতে চাননি কেউই। সেখানে মোহাম্মদ বিন সালমান অনেকটা নিজের মতো করে বদলের হাওয়া বইয়ে দিচ্ছেন। বলা হয়ে থাকে, তেলভিত্তিক অর্থনীতি আর ধর্মীয় নেতাদের পরামর্শের ওপর ভর করে দেশ পরিচালনা সৌদি আরবের পুরোনো মডেল। তাহলে তো বর্তমান ক্রাউন প্রিন্স তা ভেঙে বেরিয়ে নতুন মডেল প্রবর্তনের চেষ্টা করছেন। যে মডেলের মূলমন্ত্র জাতীয়তাবাদ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন। যা ‘ভিশন ২০৩০’ শিরোনামে একটি মহাপরিকল্পনায় প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে এই মহাপরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করছে নানা হিসাব-নিকাশের ওপর।
মাহফুজার রহমান: সাংবাদিক
manik.mahfuz@gmail.com

ভারতের ‘দক্ষিণ এশিয়া সমস্যা’ by আলী রীয়াজ

মালদ্বীপের রাজনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে ভারতের অস্বস্তি এবং তিন দশক পরে আবারও সেখানে প্রত্যক্ষভাবে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের যে কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে, তাকে ‘ভারতের মালদ্বীপ সমস্যা’ বলে চিহ্নিত না করে ‘ভারতের দক্ষিণ এশিয়া সমস্যা’ বলেই চিহ্নিত করা দরকার। মালদ্বীপের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিচ্ছে যে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত এখন কার্যত বন্ধুহীন। তার চারপাশের দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র বাংলাদেশের সরকারকেই ভারত বন্ধু বলে বিবেচনা করতে পারে। কিন্তু সেই ‘বন্ধুত্বের’ ভিত্তিতেও যে সংশয়-সন্দেহ ঢুকতে শুরু করেছে, তার ইঙ্গিত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই উক্তি, ‘চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক জোরদার হওয়া নিয়ে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।’ প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তি ভারতকে আশ্বস্ত করার বার্তা। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের প্রভাববলয় বিস্তারের তীব্র প্রতিযোগিতা। গত এক দশকে সারা পৃথিবীতে, বিশেষত এশিয়া ও আফ্রিকায়, চীন তার বাণিজ্যিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করেছে, বিনিয়োগ করেছে। চীন আত্মকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে কেবল যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই তার প্রভাব বাড়াচ্ছে তা নয়, বৈশ্বিক রাজনীতিতে সুস্পষ্ট ভূমিকা নিচ্ছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীন তার আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী। এই লক্ষ্যে চীন বা ভারত যে তাদের সামরিক শক্তি প্রদর্শনে কুণ্ঠিত নয়; চীন, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য সিকিমের মধ্যকার দুর্গম দোকলাম মালভূমিতে তিন মাস ধরে অচলাবস্থা তার প্রমাণ। দোকলাম সংকটের আপাতত অবসান হয়েছে বলে মনে হলেও চীনের সরকারি সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস-এর ভাষ্য অনুযায়ী এ বছর আবারও এ দুই দেশের মধ্যে দোকলামের মতো অচলাবস্থার সূচনা হতে পারে।
ভারতীয় সংবাদপত্র আনন্দবাজারকে উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে, চীন ভুটানকে ‘টোপ’ দিয়েছে ওই জায়গার বদলে অন্য দুটি এলাকা দেবে। ভুটান তাতে রাজি হতে পারে এই আশঙ্কা করছেন ভারতের নীতিনির্ধারকেরা, যার অর্থ হবে চীনের সঙ্গে ভুটানের ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের ওপর চীনের চাপ বৃদ্ধি। দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোতে ইতিমধ্যে ভারতের প্রভাব হয় ক্ষীয়মাণ অথবা অনুপস্থিত। মিয়ানমার বা পাকিস্তান বিষয়ে আলোচনার দরকার হয় না। এ দুই দেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং গভীর। চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরে (সিপ্যাক) ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ তাই বিস্ময়ের বিষয় নয়। মিয়ানমারে চীনের বিনিয়োগের পরিমাণ হ্রাস পায়নি; রাখাইন প্রদেশের গভীর নৌবন্দরের ৭০ শতাংশ চীনের মালিকানা তুলে দেওয়া তার উদাহরণ। মিয়ানমারে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরকারের আলোচনায় চীনের সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গাদের বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বাংলাদেশকে রাজি করানো প্রমাণ করে চীনের কতটা প্রভাব। ক্ষীয়মাণ প্রভাবের উদাহরণ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ। নেপালে ক্রমবর্ধমান চীনা উপস্থিতির একটি দৃশ্যমান প্রমাণ হচ্ছে কাঠমান্ডুর নতুন পুলিশ একাডেমি, যা নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার, পুরোটাই উপহার হিসেবে দিয়েছে চীন। নেপালে মোট বিদেশি বিনিয়োগের ৬০ শতাংশ এখন চীনের-৭৯ দশমিক ২৬ মিলিয়ন ডলার। গত নির্বাচনে নেপালে কমিউনিস্টদের বিজয়ের একটা কারণ তাদের ভারতবিরোধী অবস্থান। নেপালের সংবিধানকে কেন্দ্র করে ভারতের আরোপিত অবরোধের সময় চীন নেপালের পক্ষে দাঁড়িয়েছে, সেটা আশু বিষয়; দুই দেশের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অসমতাই যে এই পরিবর্তনের আসল কারণ, সেটা অনস্বীকার্য। শ্রীলঙ্কায় রাজাপক্ষের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানে চীনের প্রভাব হ্রাস পাবে ভারতের এমন আশা পূরণ হয়েছে বলা যাবে না; শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতেই গিয়ে পৌঁছেছে, অর্থনৈতিক বিবেচনায় সেটা শ্রীলঙ্কার জন্য ইতিবাচক কি না, সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। আফগানিস্তানে ভারতের বিনিয়োগ ও প্রভাব দুই-ই ছিল শক্তিশালী। এখনো তা তেমনি আছে এমন দাবি করা যাবে না। আফগানিস্তানে চীনের কেবল বিনিয়োগই বাড়ছে তা নয়, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে সমঝোতা তৈরিতে চীনের উদ্যোগ চীনের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ। মালদ্বীপের সংকট সমাধানে চীন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে, যা জাতিসংঘের প্রস্তাবের বিকল্প। মালদ্বীপের সংকট বিষয়ে ভারতের অবস্থানকে আপাতদৃষ্টিতে গণতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান বলে মনে হতে পারে। কেননা, এই সংকটের সূত্রপাত ১ ফেব্রুয়ারি যখন মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিন দেশের সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া আদেশ উপেক্ষা করে জরুরি অবস্থা জারি করেন, যা এখন আরও এক মাসের জন্য বাড়ানো হয়েছে। আবদুল্লাহ ইয়ামিন ২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যে কর্তৃত্ববাদী আচরণ করছিলেন, এখন তা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। এসব ঘটনায় ভারত ক্ষুব্ধ। কিন্তু ভারতের ক্ষোভের প্রধান কারণ অন্যত্র-তা হলো ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে গত বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে মালদ্বীপের সম্পর্কের ব্যাপক উন্নতি। দেশে প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদের আমলেই ভারতের ওপর মালদ্বীপের নির্ভরতা হ্রাসের চেষ্টা শুরু হয়েছিল। ২০১২ সালে যখন তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, তখন আবদুল্লাহ ইয়ামিন সরকারের পক্ষে ভারতই সবচেয়ে সরব ছিল। ইয়ামিন সরকার উপর্যুপরিভাবে যখন আদালতের ওপর তার কর্তৃত্ব স্থাপন করেছে, মতপ্রকাশের পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছে, তখন ভারত সরকার সেগুলোকে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করেনি। এখন মালদ্বীপের সরকার যখন চীনের ওপর নির্ভর করে ভারতের প্রভাববলয়ের জন্য হুমকি হয়েছে, তখন ভারতের জন্য তা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। চীনকে গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি বলে সনদপত্র দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু মালদ্বীপে গণতন্ত্র রক্ষা ভারতের উদ্দেশ্য বলে মনে করার কারণ দেখি না। ভারতের এবং ভারতের অবস্থানের প্রতি সহানুভূতিশীল অনেক বিশ্লেষক দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের এই প্রভাব বিস্তারের জন্য চীনের অর্থনৈতিক শক্তির দিকেই দৃষ্টি দেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে অর্থের বিবেচনায় চীনের শক্তি প্রবল। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশীরা কেবল সে কারণেই চীনের মুখাপেক্ষী হচ্ছেন তা মনে করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না।
এ জন্য প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের আচরণ এবং ওই সব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। ভারত তার প্রতিবেশীদের সঙ্গে যে আচরণে অভ্যস্ত, তা প্রতিবেশীদের আশ্বস্ত করে না। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, কিন্তু কেবল ইতিহাস দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কের ভিত্তি হয় না। ২০০৮ সালের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠ হয়; প্রতিবেশী হিসেবে এ দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও সহযোগিতা ইতিবাচক বলেই বিবেচিত হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের পারস্পরিক সম্পর্কের সমতা রক্ষিত হয়নি; ভারত তার কাঙ্ক্ষিত সবকিছু আদায় করে নিতে পারলেও এর বিনিময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রিক স্বার্থ রক্ষিত হয়নি, ক্ষমতাসীন দল তা থেকে সুবিধা লাভ করেছে। গত বছরগুলোতে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সফরের সময় প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি এবং দেশের অবকাঠামোগত খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। এ নিয়ে ভারতের যে অস্বস্তি আছে, প্রধানমন্ত্রীর কথাতেই তা স্পষ্ট। বাংলাদেশকে তার অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণ করতে গিয়ে ভারতকে আশ্বস্ত করতে হচ্ছে কেন তা আমাদের ভেবে দেখে দরকার। ২০১৪ সালে একপক্ষীয় নির্বাচনের সময় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতি ভারতের সমর্থন ও সক্রিয়তা এবং এতে করে ক্ষমতাসীন দলের ভারতনির্ভরতার বিষয় স্পষ্ট হয়। কিন্তু এতে করে ভারতের ব্যাপারে বাংলাদেশের নাগরিকদের কী ধারণা হয়, ভারতের নীতিনির্ধারকেরা তা বিবেচনায় নিলে ভালো করবেন। সে ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানের দেওয়া আশ্বাস কি যথেষ্ট? শুধু তা-ই নয়, সম্প্রতি ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের মন্তব্য যে বাংলাদেশ পাকিস্তান ও চীনের হয়ে ভারতকে অস্থিশীল করতে ভারতের আসামে মুসলমানদের অনুপ্রবেশ ঘটাচ্ছে এবং ওই বক্তব্যের প্রতি দেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বিজয় কুমার সিংয়ের সমর্থন বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের যে ধারণা দেয়, তা বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য উদ্বেগজনক। ভারতের এ ধরনের আচরণই যে ‘ভারতের দক্ষিণ এশিয়া সমস্যা’ সৃষ্টি করেছে, সেটা ভারতের নীতিনির্ধারকেরা যত দ্রুত বুঝতে পারবেন, ততই ভালো।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

আজ জাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস

আজ জাতীয় ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবস। ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) ৬২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও দিবসটি পালিত হচ্ছে। ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠা হয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সচেতন করে তুলতেই বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি তার প্রতিষ্ঠা দিবসকে ডায়াবেটিক সচেতনতা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ নেয়। দিবসটি উপলক্ষে আজ বুধবার বাডাসের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী নানা কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। এক জরীপ মতে বিশ্বে প্রতি সাত সেকেন্ডে একজন মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে এই রোগ এখন মহামারী রূপ নিচ্ছে। দেশে বর্তমানে ৮৪ লাখেরও বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ডায়াবেটিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৪২ দশমিক ৫ কোটি। অথচ ১৯৮৫ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ কোটি। এখনই এই রোগ প্রতিরোধ করা না গেলে ২০৩৫ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ৫৯ কোটিতে পৌঁছানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। সমিতির পক্ষ থেকে দিবসটি উপলক্ষে ডায়াবেটিস ঝুঁকি এড়াতে নিয়িমত খাদ্যাভ্যাসসহ নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি হাঁটাচলা ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে আজ আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা ও বিনামূল্যে ডায়াবেটিস পরীক্ষাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রতিবছরই এদিনে সকাল সোয়া ৮টায় রাজধানীর শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে টিএসসি পর্যন্ত শোভাযাত্রা বের করা হয়। বেলা ১১টা পর্যন্ত জাদুঘরের সামনে, ধানমণ্ডির রবীন্দ্র সরোবরে এবং এনএইচএন ও এইচসিডিপির বিভিন্ন কেন্দ্র সংলগ্ন স্থানে বিনামূল্যে ডায়াবেটিস নির্ণয় করা হয়। ডায়াবেটিকস সচেতনতা দিবসে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণদের বক্তব্য, শারীরিক শ্রম, নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট পরিমান খাওয়া এবং ওজন ঠিক রাখাসহ সচেতনা এই রোগ থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।

ব্রিটেনে ২৭ বছরের রেকর্ড ভাঙল শীত

যুক্তরাজ্যে তীব্র শীত ও ঠাণ্ডায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত ২৭ বছরের মধ্যে তীব্র শীত পড়ার রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছে আবহাওয়া বিভাগ। এ জন্য বিশেষ আবহাওয়া সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সোমবার ভোর থেকে তীব্র শীতে ব্রিটেনসহ ইউরোপের দেশগুলোতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। তুষারপাতের কারণে ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রেল ও যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ব্রিটেনে আবহাওয়ার এ অবস্থাকে ‘দ্য বিস্ট ফ্রম দ্য ইস্ট’ নামে অভিহিত করেছেন আবহাওয়াবিদরা। ব্রিটেনে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে যাত্রীদের সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাড়ি ফিরতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বুধবার এক প্রতিবেদনে এ খবর দিয়েছে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট। সাউথ ইস্টার্ন রেলের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা আপাতত যাত্রীদের সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে ভ্রমণ শেষ করার পরামর্শ দিচ্ছি।’ এ পরিস্থিতিতে লন্ডন ওভারগ্রাউন্ড সার্ভিসও সোমবার রাত সাড়ে দশটা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে সেবা বন্ধের ঘোষণা দেয় এবং সাউদার্ন রেল তাদের সার্ভিস সীমিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
লন্ডন সময় সোমবার সকাল থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত ব্রিটেনের বিভিন্ন রেল রুটে একশ’র বেশি ট্রেন দেরিতে ছেড়ে যায়। অনেক ট্রেনের যাত্রাও বাতিল করা হয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার এবং বুধবারও ইউরোপে তুষারপাত ও তীব্র শীত পড়তে পারে। এ ব্যাপারে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। ব্রিটেনের আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, সপ্তাহজুড়ে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে। ১৯৯১ সালের পর গত ২৭ বছরের মধ্যে এ মৌসুমে আবহাওয়ার তাপমাত্রা সর্বনিু পর্যায়ে নেমে আসার আশঙ্কা করা হচ্ছে। মূলত সাইবেরিয়ান বা আর্টিক বায়ুর প্রভাবে ইউরোপে তীব্র শীত পড়ছে। এদিকে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে সোমবার জার্মানির দু’টি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয় এবং ইউরোপজুড়ে অনেক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বিঘ্নিত হয়।

ক্রমেই বাড়ছে বই বিচ্ছিন্নতা by একে এম শাহনাওয়াজ

এবারের মতো বইমেলা সাঙ্গ হওয়ার ঘণ্টা বেজে গেছে। এ বছর বাংলা একাডেমির অভ্যন্তর এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বইমেলার পরিসর বেড়েছে। বেশ খোলামেলা হয়েছে। হেঁটে চলে স্টলে বা প্যাভিলিয়নের বই দেখে অনেক বেশি স্বস্তি ছিল এবার। তবে অধিকাংশ প্রকাশকের মন বিশেষ ভালো নেই। জিজ্ঞেস করলেই বলেন, ‘নাহ! বেচাবিক্রির অবস্থা ভালো না। মেলায় আসা বেশির ভাগ মানুষকে পাঠক বলা যায় না। তারা বেড়ানোর আনন্দ নিয়ে আসেন। মাঝে মাঝে বই স্টলের কাছে দাঁড়ান। নেড়ে চেড়ে দেখেন। বই সামনে রেখে সেলফি তোলেন। তারপর খালি হাতে বা ক্যাটালগ নিয়ে চলে যান। এখন তো আমাদের স্কুল-কলেজপড়ুয়া প্রজন্মকে আর শিক্ষার্থী বলা যায় না। সবাই পরীক্ষার্থী। চলমান শিক্ষাপদ্ধতিতে বর্তমান প্রজন্মকে পরীক্ষার জালে বন্দি করে ফেলেছি। স্কুল, কোচিং আর প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে পড়ার বাইরে ওদের ফেসবুক ছাড়া আর কোনো জীবন নেই। সময় কোথায় যে, আনন্দের জন্য মুক্তভাবে মুক্ত বিষয়ের বই পড়বে! এসব বাস্তবতার প্রভাব তো বইমেলায় পড়বেই। ছেলেবেলায় দেখতাম স্কুলে এবং পরিবারের ভেতরে ক্লাসের পড়াশোনার পাশাপাশি পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার প্রণোদনা থাকত। গ্রামে বা মহল্লায় পাঠাগার গড়ে তোলা হতো। বন্ধুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল এ সপ্তাহে কে ক’টা বই পড়েছি তা নিয়ে। আমাদের হাতে বিজ্ঞানের অনেক আশীর্বাদই এসে তখনও পৌঁছেনি। ফলে সময় কাটাতে স্কুলের বাইরে খেলাধুলা আর বইপড়া বিনোদনের অংশেই পরিণত হতে লাগল। স্বাধীনতা-উত্তরকালে রেডিওর পাশাপাশি বিটিভি কিছুটা বিনোদনের উৎস ছিল। তবে তা বইপড়ার অভ্যাস ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় তেমন বিঘ্ন ঘটায়নি। বরঞ্চ বলা যায়, সাংস্কৃতিক আবহকে কিছুটা প্রণোদনাই দিয়েছে। একুশ শতকের শুরুর দিকে আমরা আকাশ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত হলাম। দিনে দিনে অনেক টিভি চ্যানেল হল। প্রাইভেট অনেক রেডিও সম্প্রচার শুরু করল। চ্যানেলের কল্যাণে হিন্দি সিরিয়াল আর হিন্দি ছবি তরুণ প্রজন্মকে অনেকটাই বন্দি করে ফেলল। তখন এদের একটি বড় অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি ছাড়া বই পাঠ আর নন্দনচর্চায় খুব একটা সময় বের করত পারছিল না। এবার দাবানলের মতো প্রবেশ করল ফেসবুক, টুইটার ধরনের আধুনিক সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। এসবের ইতিবাচক দিকগুলো নিয়ে এখানে আলোচনা করতে চাইছি না। নতুন প্রজন্ম স্কুল-কলেজের দায় কিছুটা মেটাতে পারলেও ফেসবুক গ্রাসে তারা অনেকটাই বিপর্যস্ত। ক্লাসে অমনোযোগিতা বেড়েছে। টের পাই পেছনের দিকে বসা ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই স্মার্ট ফোনের বাটন টিপছে। অনেক বাবা-মাকে দেখি শিশু সন্তানটিকে ট্যাব কিনে দিয়ে ট্যাবাসক্ত করে দিয়েছেন। এদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা নিয়ে আমার শঙ্কা হয়। এ বাস্তবতায় বই পড়ায় মনোযোগী করে তোলা তো হবে সাধনার ব্যাপার। আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীদের আমরা অদ্ভুত পরীক্ষা নিয়ন্ত্রিত জীবন উপহার দিয়েছি। ওদের কারও মুক্তচিন্তা করার মতো জীবন নেই। পাঠক্রমবহির্ভূত পাঁচটি বইয়ের খোঁজ রাখার সময় ওদের নেই। জিপিএ ৫ অর্জন ছাড়া ভবিষ্যতের আর কোনো স্বপ্ন নেই। শহরকেন্দ্রিক হাতেগোনা কয়েকটি কলেজ ছাড়া অধিকাংশ কলেজে শিক্ষকরা মনে করেন না নিয়মমাফিক কলেজে যেতে হয়। আর গেলেও ক্লাস নিতে হয়। অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা মনে করে শিক্ষক নির্দেশিত নোট-গাইড সংগ্রহ করার বাইরে ক্লাসে যাওয়ার খুব একটা আবশ্যকতা নেই। ফলে ক্লাসের বই বলতে যারা গাইড বই বোঝে, তাদের কাছে পাঠবহির্ভূত বইয়ের খোঁজ রাখার আবশ্যকতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়কে কি এ অবস্থা থেকে দূরে রাখা যাবে? আমার মনে হয় না। আকাশ সংস্কৃতি আর ফেসবুক-টুইটার সংস্কৃতির ভেতর অবগাহন করতে গিয়ে অনেকের কাছে বই বিস্ময়ের বস্তুতে পরিণত হয়েছে। এখন তরুণদের অনেকেরই কানে হেডফোন আর হাতের মোবাইল সেটে অনবরত আঙুলের ছন্দময় দোলা। বই পড়ার সময় কোথায় ওদের! ভোরবেলা হাঁটতে গিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে ছাত্রছাত্রীদের ভিড় দেখে নতুনভাবে আশাবাদী হয়েছিলাম। তাহলে নিন্দুকের মুখে ছাই দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা কি আবার লাইব্রেরিমুখো হতে শুরু করেছে? খোঁজ করে জানলাম বিষয়টা তেমন নয়। এখন লাইব্রেরিতে আসন পাওয়া ভার। বিসিএস বা অন্য কোনো চাকরি প্রত্যাশীরা নিজেদের প্রস্তুত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবেলায় এসে লাইব্রেরিতে যাচ্ছে। ভাগ্যিস স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এখন আর তেমন লাইব্রেরিতে যাওয়ার সময় পায় না। নয়তো লাইব্রেরিতে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ার জন্য এতদিনে আন্দোলন শুরু করে দিত। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় দিনব্যাপী ইতিহাস একাডেমির বার্ষিক আন্তর্জাতিক ইতিহাস সম্মেলন হয়ে গেল। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক গবেষক এসেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের এ গবেষক-শিক্ষক বন্ধুরা একই আক্ষেপ করে বললেন, ফেসবুক-সংস্কৃতি জ্ঞানচর্চার জায়গা থেকে তরুণদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এর প্রামাণ্য উদাহরণ পেয়েছিলাম গত বছর কলকাতা বইমেলায় গিয়ে। ২৬ জানুয়ারি ২০১৭-তে কলকাতায় শুরু হয়েছিল বইমেলা। আমি ২৭ জানুয়ারি বিকালে মেলায় গিয়েছি। কলকাতা বইমেলার অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। আগে যখন ময়দানে বইমেলা হতো তখন অনেকবারই সেখানে গিয়েছি। এখনকার তুলনায় ময়দানের বইমেলা অনেক বেশি জাঁকালো ছিল। দীর্ঘ লাইন ধরে টিকিট কেটে মেলায় ঢুকতে হতো। আমি গত শতকের ৯০-এর দশকের কথা বলছি। আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে একটি স্মৃতি কথা অনেক লেখাতে লিখেছি। বলেছি লাখ লাখ বইপ্রেমিক মানুষকে দেখেছি যাদের অধিকাংশই হাতভরা বই কিনে বাড়ি ফিরছে। তখন আফসোস করে বলতাম, আহা, আমাদের একুশের বইমেলায় দর্শকদের অর্ধেকও যদি বই কিনত তাহলে আমাদের প্রকাশনার চেহারাটাই পাল্টে যেত। গত বছর কলকাতা বইমেলায় দেখেছি যেন একই হাওয়া বইছে দুই বাংলায়। কলকাতা বইমেলা চলে গেছে এখন সল্টলেকে। বড় বড় প্যাভিলিয়ন খুব কমই চোখে পড়ল। বাংলাদেশের প্রায় ত্রিশটি প্রকাশনা সংস্থার স্টল ঘিরে একটি আলাদা প্যাভিলিয়ন করা হয়েছিল। কান্তজির মন্দিরের আদলে করা বাংলাদেশের প্যাভিলিয়নটিকেই একমাত্র আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল আমার। কলকাতা বইমেলায় এখন আর টিকিট কাটতে হয় না। তেমন কিউ দিয়েও আমাদের ভেতরে ঢুকতে হল না। বই ছাড়াও সেখানে ছিল নানারকম খাবারের দোকান। তাঁত বস্ত্রের দোকান, আচার, চাটনির দোকান। বইয়ের দোকানের চেয়ে এসব দোকানেই ভিড় তুলনামূলকভাবে বেশি। মেলা থেকে বই কিনে বাড়ি ফেরা মানুষের সংখ্যাও বেশ কমে গেছে। আমার সঙ্গে মেলায় যোগ দিয়েছিলেন বারাসাত কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক ও লেখক রাজকুমার চক্রবর্তী। তিনিও অভিন্ন হতাশা ব্যক্ত করলেন। আসলে ‘অবসরে বই পড়া’ বলে একটি কথা ছিল। এখন তো ফেসবুক, টুইটার আর আকাশ সংস্কৃতি এবং নানা পরীক্ষার চাপে অবসর বলে কোনো কিছু নেই এই প্রজন্মের। তাই অবসরে বই পড়া ক্রমে নতুন প্রজন্মের কাছে অচেনা হয়ে পড়ছে। আমি দেখেছি- অনুভব করেছি কলকাতা বইমেলার চেয়ে একুশের বইমেলার চরিত্র এবং আবেগ আলাদা। একুশের বইমেলা অনেক বেশি গোছাল। বই প্রকাশ নিয়ে প্রকাশকদের পরিমার্জনাও একটু আলাদা। অনেক বছর ধরেই মেলায় আসা মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। জায়গা সঙ্কুলান না হওয়ায় বইমেলার বড় অংশ এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। আকর্ষণীয় স্টল সাজিয়ে বসেছেন প্রকাশকরা। একজন প্রকাশক আক্ষেপ করে বলছিলেন, যত মানুষ প্রতিদিন মেলায় আসেন তাদের দশ ভাগও যদি বই কিনতেন তাহলে মেলার চেহারাটাই পাল্টে যেত। পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে আমাদের দেশের মতো সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে না। মৌলিক শিক্ষার পর ডিপ্লোমা ধরনের নানা শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের পর কর্মক্ষেত্রে চলে যায়। আর গবেষণার ক্ষেত্রে যারা থাকতে চায় তারা বিশেষায়িত বিদ্যায় নিজেদের যুক্ত করে। তাই ওদের কারিকুলামই এমন যে, সেমিস্টারে ঢুকে অনেক কিছুই পড়ে, তবে কোনো কিছুর গভীরে যাওয়া হয় না। আমাদের বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের (অধুনা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগেও) কারিকুলাম ও সিলেবাস এসব আধুনিক দেশের দর্শনেই পরিচালিত হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা পাশ্চাত্য দেশে পাড়ি জমায় অথবা ক্রেডিট ট্রান্সফার করে, তাদের না হয় একটি জীবন তৈরি হয়; কিন্তু দেশে যারা থাকে তাদের অনেকেই জ্ঞানের রাজ্যে না ঘরকা, না ঘাটকা হয়ে থাকে। এ দেশে নানা নীতিনির্ধারণী খেলায় বিভ্রান্ত আমরা আসলে নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করে তুলতে পারছি না। আমি দেশের অন্যতম নামি এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করি। ক্লাসে খোঁজ নিয়ে জেনেছি, কমপক্ষে পাঁচ শতাংশ ছাত্রছাত্রী একুশের বইমেলা সম্পর্কে তেমন পরিষ্কার কিছু জানে না। পাঁচ শতাংশ ছাত্রছাত্রী জানে না কোথায় বসে একুশের বইমেলা। প্রায় ৪০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী কখনও বইমেলায় যায়নি। এখানকার শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি নিয়মের খাঁচায় বন্দি। ক্লাস-পরীক্ষা দিতে দিতে এরা তিন মাসের সেমিস্টারে নোট আর হ্যান্ডআউটের বাইরে যাওয়ার সময় পায় না। যারা সংবাদপত্র পড়ার ধারণা হারিয়ে ফেলছে, তারা পরীক্ষার অক্টোপাস বেষ্টনীর বাইরে গিয়ে কীভাবে বইপড়ার জগতে প্রবেশ করবে! তা ছাড়া যখন জানতে পারে এ বইমেলায় থাকা বেশির ভাগ বই বাংলা ভাষায় লেখা, তখন ওরা আরও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কারণ বাংলা ভাষা চর্চার সঙ্গে ওদের সম্পর্ক খুবই ক্ষীণ। এভাবেই আমাদের নতুন প্রজন্ম জ্ঞানচর্চার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব যারা দেবে, তাদের এমন বইবিমুখ জীবনে সঞ্চয় বেশি থাকার কথা নয়। সুতরাং ভয়ঙ্কর এক ভবিষ্যৎ কি অপেক্ষা করছে না আমাদের জন্য? বিষয়টি নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলের ভাবনা সম্প্রসারিত হলেই মঙ্গল।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnaway7b@gmail.com

প্রতিরোধই বাঁচার উপায় by ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

দেহে বহু ব্যাধির আহ্বায়ক, নীরব ঘাতক স্বভাবের ডায়াবেটিস রোগটির অব্যাহত অভিযাত্রায় শঙ্কিত সবাইকে এটি নিয়ন্ত্রণে যথাসচেতন করে তুলতেই বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি ২৮ ফেব্রুয়ারিকে ডায়াবেটিক সচেতনতা দিবস হিসেবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিগত শতাব্দীর শেষার্ধে সংক্রামক ব্যাধি নিচয়ের নিয়ন্ত্রণে গোটা বিশ্বে সবাই উঠেপড়ে লাগলেও এবং গুটিবসন্ত ও পোলিও নির্মূলে সফল হতে সক্ষম হলেও মানুষের সুন্দর সাবলীল জীবনযাপনের পথে নীরবে তার সর্ব কর্মক্ষমতা হরণকারী অ-সংক্রামক ব্যাধি ডায়াবেটিসের বিস্তার রোধে ও নিয়ন্ত্রণে ব্যক্তি সচেতনতার অনিবার্যতা এবং এর জন্য সুপরিকল্পিত সর্বজনীন উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণের আবশ্যকতা যথা মনোযোগ ও চেতনার চৌহদ্দিতে আসছে না বলে প্রতীয়মান হয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান সমস্যা ও সীমাবদ্ধতাগুলোর প্রতি বিশ্বদৃষ্টি আকর্ষণ এবং সব সরকার ও জনগণের তরফে সংহত ও সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণে ঐকমত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশ ২০০৬ সালে জাতিসংঘকে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধকল্পে প্রস্তাব গ্রহণের আহ্বান জানায়। মূলত বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির উদ্যোগে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবে এবং যৌক্তিকতার প্রচারণা-প্রয়াসে ১৪ নভেম্বরকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস হিসেবে ঘোষণা দিয়ে জাতিসংঘ ২০০৬ সালে ৬১/২২৫ নং প্রস্তাব গ্রহণ করে।সেই থেকে জাতিসংঘের সব সদস্য দেশে, বিশ্ব ডায়াবেটিক ফেডারেশনের দু’শর অধিক সদস্য সংগঠনে, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য সংস্থা, কোম্পানি, পেশাজীবী সংগঠন ও ডায়াবেটিক রোগীদের মাঝে বিশ্ব ডায়াবেটিক দিবস নানা প্রাসঙ্গিক প্রতিপাদ্য বিষয় নিয়ে পালিত হচ্ছে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে বিশ্বব্যাপী তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১৪-২০১৮) মূল প্রতিপাদ্য হল ‘ডায়াবেটিস রোগকে জানা, নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিরোধের মাধ্যমে এর বিস্তার রোধ’। এটি (ক) ডায়াবেটিক রোগীদের শিক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতায়নে (খ) সরকারগুলোকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণে ও প্রতিরোধমূলক উপযুক্ত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা-কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবেলায় (গ) স্বাস্থ্যকর্মী পেশাজীবী সম্প্রদায়কে অধিকতর গবেষণা ও বাস্তব কৌশল উদ্ভাবনের দ্বারা উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োগে যত্নশীল হতে এবং (ঘ) সাধারণ মানুষকে ডায়াবেটিসের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত হয়ে কীভাবে এর থেকে দূরে থাকা বা প্রতিরোধ করা সম্ভব, সে সম্পর্কে সচেতন হওয়ার তাগিদ দেয়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধে ব্যক্তির সজ্ঞান ও আন্তরিক আগ্রহ আবশ্যক বলেই তাকে উদ্বুদ্ধকরণ, সার্বিক সহায়তা প্রদান,
চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি এবং উপায় উপকরণ সরবরাহ তথা পরিবেশ নির্মাণে অবিসংবাদিত ভূমিকা রয়েছে সরকার এবং সমাজের। কেননা সুস্থ জনশক্তি বা নাগরিকের সুস্বাস্থ্য সব সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার অন্যতম অবলম্বন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডায়াবেটিস সচেতনতা দিবসের প্রচার-প্রচারণায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ডায়াবেটিস থেকে রক্ষার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে যাদের ডায়াবেটিস আছে, যাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা আছে আর এ চিকিৎসায় নিবেদিত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী- সবারই শিক্ষার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। এর মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসের বিস্তারকে থামানো, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদারকরণ এবং এর প্রভাব প্রতিক্রিয়াকে সীমিতকরণ। এসব প্রচার-প্রচারণার মূল হল ‘থ্রি-ই’ (Education, Engage and Empower) বা তিনটি প্রতিপাদ্যে প্রতিষ্ঠিত অর্থাৎ সবাইকে এ রোগ সম্পর্কে সচেতন করতে শিক্ষার প্রসার, অধিক সংখ্যক রোগী-সাধারণ মানুষ-চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ, প্রতিরোধ ও সেবায় সম্পৃক্তকরণ এবং ডায়াবেটিস রোগীদের নিজেদের কর্তব্য ও অধিকার সম্পর্কে জানানো। রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হলে ডায়াবেটিস রোগ দেখা দেয়। সাধারণত ডায়াবেটিস বংশগত কারণে ও পরিবেশের প্রভাবে হয়। কখনও কখনও অন্যান্য রোগের ফলেও হয়ে থাকে। এ রোগ সব লোকেরই হতে পারে। ডায়াবেটিস একবার হলে আর সারে না। এটা সবসময়ের এবং আজীবনের রোগ। তবে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা গ্রহণ করে এ রোগকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব হয়। অতিরিক্ত প্রস্রাব, অত্যধিক পিপাসা, বেশি ক্ষুধা, দুর্বল বোধ করা এবং কেটে ছিঁড়ে গেলে ক্ষত তাড়াতাড়ি না শুকানো হচ্ছে এ রোগের সাধারণ লক্ষণ। যাদের বংশে রক্ত-সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়স্বজনের ডায়াবেটিস আছে, যাদের ওজন খুব বেশি, যাদের বয়স ৪০-এর ওপর এবং যারা শরীরচর্চা করেন না- গাড়ি চড়েন এবং বসে থেকে অফিসের কাজকর্মে ব্যস্ত থাকেন, তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। অত্যধিক চিন্তা-ভাবনা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, আঘাত, সংক্রামক রোগ, অস্ত্রোপচার, অসম খাবার, গর্ভাবস্থা এবং ওজন বেশি বেড়ে যাওয়া এ রোগ বাড়াতে সাহায্য করে। এগুলোর প্রতি দৃষ্টি রেখে প্রথম থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ বা বিলম্বিত করা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সমীক্ষামতে নগরায়ন, ‘ওয়েস্টার্ন ফুড’ আর সার্বিক পরিবেশের ভারসাম্যহীনতায় এ রোগের বিস্তারকে করছে বেগবান। বিশ্ব রোগ নিরাময় কেন্দ্রের মতে এই শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পৌঁছার আগেই এটি মানবভাগ্যে মারাত্মক মহামারীরূপে উদ্ভাসিত হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ডায়াবেটিক তথ্য নিকাশ কেন্দ্রের হিসাব মতে, খোদ যুক্তরাষ্ট্রেই এই ঘাতক ব্যাধি বছরে ১৩২ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিসাধন করে সে দেশের জাতীয় অর্থনীতির। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রায় সবক’টি দেশই এক থেকে পাঁচ দশক ধরে স্বাধীনতা ভোগ করে এলেও দেশগুলো আজও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, মূল (স্থূল) জাতীয় উৎপাদনের (Gross National Product) স্বল্পতা, অক্ষরজ্ঞানের নিম্নহার, অনুন্নত কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, অপর্যাপ্ত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা, ব্যাপক অপুষ্টি, উচ্চজন্ম ও শিশুমৃত্যুর হার এবং পৌনঃপুনিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সংগ্রাম করে চলছে। এতসব সমস্যা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি দমনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলের অধিবাসীদের আয়ুষ্কাল ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যথা- ডায়াবেটিস মেলাইটাস, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদির প্রকোপ বেড়েছে। ডায়াবেটিস মেলাইটাস সংক্রামক রোগ না হওয়ার কারণে এখনও পর্যন্ত দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার প্রায় সব দেশের স্বাস্থ্য কার্যক্রমের অগ্রাধিকার তালিকায় সংক্রামক রোগের তুলনায় এর স্থান অনেক নিচে। এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটিকে তাদের আঞ্চলিক অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। সুতরাং ডায়াবেটিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা কর্মসূচি এসব দেশে সন্তোষজনকভাবে গড়ে ওঠেনি।
সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিনামূল্যে চিকিৎসা করা হয় ঠিকই; কিন্তু রোগীকে ইনসুলিন দেয়া হয় কেবল হাসপাতালে ভর্তি হলেই, বহির্বিভাগের রোগীকে কখনই ইনসুলিন দেয়া হয় না। দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ অধিবাসী যে পল্লী অঞ্চলে বাস করে, সেখানে ইনসুলিন পাওয়া যায় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ডায়াবেটিসের মতো আজীবনের রোগের ক্ষেত্রে যে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন, এসব উন্নয়নশীল দেশে সে সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতনতাও নেই। যেসব হাসপাতালে ডায়াবেটিসের চিকিৎসা করা হয় সেখানেও এসব রোগীর কোনো নথি কিংবা তালিকা রক্ষা করা হয় না; এমনকি কোনো কেন্দ্রীয় নিবন্ধনও নেই। বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে জলবায়ুর যে পরিবর্তন সূচিত হচ্ছে তার সঙ্গে ডায়াবেটিস বিস্তারের সংযোগ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাতাসে নিঃসৃত কার্বনের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে পরিবেশগত সমস্যায় জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটার প্রমাণ এখনই মিলছে। ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ ৫২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও ভয়াবহরূপে বাড়িয়ে পৃথিবীকে বাসের অযোগ্য করে তুলতে পারে। ধনী দেশগুলো সবচেয়ে বেশি গ্যাস নিঃসরণ করলেও দরিদ্র দেশগুলো এর প্রতিক্রিয়া ভোগ করে বেশি। এ অবস্থার প্রতিকার না হলে প্রতি তিন বছরে জিডিপির ৫ থেকে ২০ শতাংশ অর্থ ব্যয়িত হবে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায়। এর ফলে পুষ্টিহীনতা, সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধি পাবে। অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলেও জলবায়ুর পরিবর্তন ত্বরান্বিত হচ্ছে। দ্রুত ও দুর্বল নগরায়নের ফলে বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা এখন শহরে বাস করে। এখানে আছে যন্ত্রচালিত পরিবহন ব্যবস্থা, চলছে বস্তির বিস্তার, শরীরচর্চাবিহীন যাপিত জীবনে বাড়ছে বয়োবৃদ্ধ জনসম্পদ, হচ্ছে বনজ প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড়, প্রাণিজ ও সুষম খাদ্যের জায়গা দখল করছে কলকারখানায় প্রক্রিয়াজাত কৃত্রিম অস্বাস্থ্যকর খাবার, পরিবর্তিত হচ্ছে আহার প্রক্রিয়া, বাড়ছে বিশ্বখাদ্য- কৃষির ব্যবসা ও বিপণনে প্রতিযোগিতা। ২০৩০ সালের মধ্যে আট বিলিয়ন বিশ্ব জনসংখ্যার পাঁচ বিলিয়ন বাস করবে শহরে, যাদের মধ্যে দুই বিলিয়নই বাস করবে বস্তিতে। ফলে জীবনযাত্রায় জটিলতা বাড়তেই থাকবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কাছে নতি শিকার করতে বাধ্য হতে থাকবে। ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্ব জনসংখ্যা ৭ থেকে ৯ বিলিয়নে বৃদ্ধি পাবে এবং এশিয়া ও আফ্রিকাতেই ঘটবে এর ব্যাপক বিস্তার। সার্বিকভাবে বিশ্ব জনসংখ্যায় প্রবীণের প্রাধান্য থাকলেও উন্নয়নশীল দেশে নবীনের পাল্লা হবে ভারি। জনমিতিতে এমন অসম পরিবর্তনপ্রবণতায় ইতিমধ্যে সম্পদের অপ্রতুলতায় পরিবেশ দূষণ, নানা রোগের প্রাদুর্ভাব ও বিস্তারকে প্রভাবিত করছে। এ পটভূমিতে বর্তমানে বিশ্বে ৩৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে ভুগছে। ২০৩০ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ৫০ কোটিতে দাঁড়াবে। বছরে ৪৬ লাখ মানুষ এ রোগে মারা যায়। ডায়াবেটিসে সবচেয়ে বড় ক্ষতি কর্মক্ষমতা হারানো। এ রোগের পেছনে বার্ষিক ব্যয় হয় ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার। পাঁচজনের মধ্যে চারজন ডায়াবেটিস রোগী বাস করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। এ রোগ পরিবারকে অসচ্ছল করে, শ্রমশক্তি বিনষ্ট করে এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পর্যুদস্ত করে।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান; চিফ কো-অর্ডিনেটর, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি

সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে উত্তর কোরিয়া

রাসায়নিক অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা যায় সিরিয়ায় এমন যন্ত্রপাতি সরবরাহ করছে উত্তর কোরিয়া বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞাদের বরাতে খবরে বলা হয়েছে, সিরিয়ায় অ্যাসিড প্রতিরোধী টাইলস, ক্ষয়রোধী ভালব ও পাইপ সরবরাহ করা হচ্ছে।
মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, পিয়ংইয়ংয়ের ক্ষেপণাস্ত্র বিশেষজ্ঞদের সিরীয় অস্ত্র নির্মাণ কারখানায় দেখা গেছে। সিরীয় বাহিনী বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত পূর্ব ঘৌটায় ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহার করছে বলে প্রতিবেদন আসার পর নতুন এ অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। এ সম্পর্কিত জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদন এখনও প্রকাশ করা না হলেও তা ফাঁস হয়ে গেছে। অন্যদিকে ক্লোরিন গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে সিরিয়া সরকার। আর নিজেদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে আছে উত্তর কোরিয়া। টাইলসগুলো রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির কারখানা নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বলেছে, ২০১৬ সালের শেষ দিক থেকে ২০১৭ সালের প্রথম দিকে একটি চীনা ট্রেডিং ফার্মের মাধ্যমে পাঁচটি চালান সিরিয়ায় পাঠানো হয়েছে। এগুলো কয়েক বছর ধরে পাঠানো বহু চালানের একটি অংশ বলে অভিযোগ করেছে জার্নালটি।
সিরিয়ার সরকারি সংস্থা দ্য সায়েন্টিফিক স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (এসএসআরসি) কয়েকটি ‘ফ্রন্ট’ কোম্পানির মাধ্যমে এসব চালানের মূল্য পরিশোধ করেছে বলে দাবি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের। ফাঁস হওয়া ওই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে কিনা তা পরিষ্কার করেননি জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক। কিন্তু নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, আমার ধারণায় সাধারণ বার্তাটি হচ্ছে, যেসব নিষেধাজ্ঞা আরোপিত আছে, সব সদস্য দেশের দায়িত্ব তা মেনে চলা। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়া সরকার জাতিসংঘ প্যানেলকে জানিয়েছে উত্তর কোরিয়ার স্পোর্টস কোচ ও ক্রীড়াবিদরাই শুধু সিরিয়ায় আছে।

নিরামিষ বিপ্লব চলছে চীনে

সারা পৃথিবীতে গরু, শূকর আর মুরগির মাংসের সব থেকে বড় ক্রেতা চীন। সেই দেশই এবার নিরামিষ খাবার-দাবারের দিকে ঝুঁকছে। গত কয়েক বছর ধরেই চীনের বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় নিরামিষের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। স্বাস্থ্যমনস্ক বর্তমান প্রজন্মের মাংসসহ হাই ক্যালোরি ডায়েট পছন্দ না। অর্গানিক, নিরামিষ ও মাংসহীন ডায়েটেই ঝোঁক বেশি তাদের। একটু বয়স্ক যারা তারা রক্তচাপ, বেশি ওজন বা হৃদরোগের মতো সমস্যা থেকে বাঁচতেও নিরামিষ খাবার পছন্দ করছেন। শুধু বেইজিং বা হংকং নয় এই স্বাদবদলের হাওয়া দেশের সব শহরেই। চীনের সব থেকে বড় শহর সাংহাইয়ে ২০১২ সালে মাত্র ৪৯টি নিরামিষ রেস্তোরাঁ ছিল। এখন সেই শহরে নিরামিষ রেস্তোরাঁর সংখ্যা শতাধিক। কয়েক বছর আগ পর্যন্ত সিচুয়ান প্রদেশের চেংড়ু শহরের কোনো রেস্তোরাঁয় নিরামিষ খাবার মিলতো না। কিন্তু সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, শহরের অন্তত অর্ধেক রেস্তোরাঁর মেন্যুতে এখন ঢুকে পড়েছে একাধিক নিরামিষ পদ।মাংস বিক্রিতে চীন এখনও বিশ্বে প্রথম। কিন্তু বিক্রির পরিমাণ কমছে।
২০১৪ সালে ৪ কোটি ২৪৯ লাখ টন শূকরের মাংস বিক্রি হয়েছিল চীনে। ২০১৬ সালে সেই পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৪ কোটি ৮৫ লাখ টন। অথচ এই দু’বছরে চীনের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে ১ কোটি ১৫ লাখ। মাংস বিক্রি কমার সঙ্গে সঙ্গেই ফল ও শাকসবজির ফলন, আমদানি ও বিক্রি বেড়েছে। ২০১০ সালে মাত্র ১ দশমিক ৯ টন অ্যাভোকাডো আমদানি করত চীন। ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা ১৩ হাজার গুণ বেড়ে হয়েছে ২৫ হাজার টন। সাংহাইয়ের জিয়াও টং বিশ্ববিদ্যালয় শহরের বিভিন্ন রেস্তোরাঁতে একটি সমীক্ষা চালিয়ে দেখেছে, নিরামিষ পদ অর্ডার দেন যারা তাদের অধিকাংশের বয়স ২০ থেকে ২৯ এর মধ্যে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। তবে ৬৫ বছরের বেশি যাদের বয়স তাদেরও অনেকেই নিরামিষ খেতে শুরু করেছেন বলে জানিয়েছেন কর্মীরা। এই পরিবর্তনের সুফল মিলছে পরিবেশেও। গবেষণায় দেখা গেছে, চীনের মাংস-প্রক্রিয়াকরণ কারখানাগুলো থেকে বছরে ১৫ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হতো।