Sunday, September 29, 2013

অনুত্তীর্ণদের জন্য প্রশংসা-বচন by শাহনেওয়াজ বিপ্লব

মাঝে মাঝে ভাবি আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ সত্যিই এক আশ্চর্য দেশ। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংস্কৃতি থেকে একেবারেই আলাদা। সম্ভবত এটাই একমাত্র দেশ, যেখানে পরাজিতের কথা কেউ মনে রাখে না। পাঠান-মুঘল-ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়ে যেসব সৈনিক দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাদের অনেকেরই যথাযথ জায়গা হয়নি বাংলার ইতিহাসে। ওই সব যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যেসব সৈনিক রক্তাক্ত হয়ে ফিরে এসেছেন, সেসব পরাজিত সৈনিকের জন্য কোনো শোকগাথা নেই আমাদের। পরাজিতদের ভুলে যাই আমরা খুব দ্রুত। স্মৃতির কোনো কক্ষে আমরা তুলে রাখি না পরাজিতদের স্মৃতিচিহ্ন। পরাজিতের কবরে আমরা উৎসর্গ করি না কোনো রক্তগোলাপ। আসলে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিটাই এমন যে, ব্যর্থ আর সাফল্যহীনদের মনে রাখি না আমরা। আমরা কেবল মুক্তোর মালা পরিয়ে দিই, যারা সফল তাদের গলায়। কথাটা মনে হল এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সৌভাগ্য দেখে। এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়ে গেছে এখন থেকে দেড় মাস আগে। আর ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই সমাজ বদলের স্লোগানধারী দেশের অন্যতম একটি দৈনিক, নানা প্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক আর টেলিভিশন চ্যানেলগুলো জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংবর্ধিত করে চলেছে আজ অবধি। এর বাইরে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলো উল্লাসরত ছাত্রছাত্রীদের ছবি ছেপেছে। নিয়মিত সংবাদ প্রচার করেছে এসব সফলের স্বপ্ন আর সম্ভাবনা নিয়ে। সব সংবাদ প্রতিবেদনের গৎবাঁধা সুর ছিল একই : শিক্ষার মান বাংলাদেশে বেড়েছে, বাংলাদেশে মেধাবী শিক্ষার্থীর হার আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে, জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে মেয়েদের চেয়ে ছেলেরা এগিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি নানারকম কেচ্ছা-কাহিনী।
বাংলাদেশে এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিল ১০ লাখ ২ হাজার ৪৯৬ জন পরীক্ষার্থী। তার ভেতরে পাস করেছে ৭ লাখ ৪৪ হাজার ৮৯১ জন। সবচেয়ে বেশি ফেল করেছে চট্টগ্রামে। শতকরা ৩৯ জন পাস করতে পারেনি ওই বোর্ডে। পাসের এ রমরমা সময়ে চট্টগ্রামে প্রতি ১০০ জনে ৩৯ জন কেন পাস করতে পারল না, অথবা সারাদেশে সম্মিলিত হিসেবে বাকি ২৫ শতাংশ ছাত্রছাত্রী কেন পাস করতে পারল না? ইউরোপের দেশগুলোতে প্রশ্নটি এভাবেই তোলা হয়। জার্মানি ও অস্ট্রিয়ায় প্রতিবছর পরীক্ষার ফলাফল ঘোষণার পর দৈনিক পত্রিকাগুলো বাংলাদেশের মতোই সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তবে বাংলাদেশের মতো করে নয়। পরীক্ষায় যেসব ছাত্রছাত্রী অকৃতকার্য হয়, সাংবাদিকরা জানতে চায় ওই সব অকৃতকার্য ছাত্রছাত্রীর কাছ থেকে, কী দুঃখ ছিল তাদের মনে, কেন তারা পাস করল না? যারা ফেল করেছে তারা কি পাস করা ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে স্বভাবে ও চারিত্র্যে ব্যতিক্রম? কী অভাব ছিল ফেল করা ছাত্র বা ছাত্রীটির? তার কি বইয়ের অভাব ছিল অথবা খাবারের? ঘরে কি তার মা নেই অথবা বাবাকে হারিয়েছে ছোটবেলায়?
কিন্তু আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত কোনো সাংবাদিক এইচএসসি বা এসএসসিতে যারা ফেল করেছে যারা, তাদের কথা কোনো দিন ভাবেনি। তাদের কোনো সাক্ষাৎকার কোথাও ছাপা হয়নি। পরীক্ষায় ফেল করে যে আত্মহত্যা করেছে, তার কথা হয়তো লিখেছে সংবাদপত্রগুলো। কিন্তু গভীরে গিয়ে জানতে চায়নি কী দুঃখে ওই এইচএসসি ফেল করা ছাত্রী আত্মহত্যা করেছে? কেন ছাত্রছাত্রীরা বেশি ফেল করে আমাদের দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারগুলোতে? সে কথা জানতে চায় না কেউ। না মা-বাবা, না বন্ধু-বান্ধবী, সমাজ-সাংবাদিক- কেউই। যারা ফেল করে, আমাদের সমাজ তাদের জন্য বরাদ্দ রেখেছে শুধু নিন্দা আর মন্দ।
বলা হয়ে থাকে, জন্ম মানুষের ভাগ্যকে অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করে। যে ছাত্র বা ছাত্রীটি আজ চট্টগ্রামে কোনো গরিব মা-বাবার ঘরে জন্ম নিয়ে অভাব-অনটনের সংসারে প্রয়োজনীয় শিক্ষা-সুবিধা না পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে ফেল করেছে, সে যদি আমেরিকায় কোনো ধনী মা-বাবার ঘরে জন্মগ্রহণ করত, তাহলে তার জীবন তো অন্যরকম হতে পারত। এ কথাটি আমরা বুঝতে চাই না। অথচ এমন এক গরিব দেশে জন্ম আমাদের, দারিদ্র্য আর অনটনের শিকার হয়ে বেশির ভাগ গ্রামীণ শিক্ষার্থী এসএসসি বা এইচএসসি পর্যন্ত কোনো রকমে লেখাপড়া চালিয়ে যায়। তাদের অনেকের হয়তো উপার্জনক্ষম কেউ নেই সংসারে। খাবার জোগানোর জন্য হয়তো দিনভর কাজ করতে হয়েছে ওসব ছাত্রছাত্রীকে। তাই যারা এবার এইচএসসিতে ফেল করেছ, তাদের বলছি- তোমরা হতাশ হয়ো না। সামর্থ্যে কুলালে পরের বার আবার চেষ্টা কর তোমরা। পৃথিবীতে বড় মনীষীরাও তো ফেল করেছে। আইনস্টাইন অংকে ফেল করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরীক্ষা-ভীতি ছিল। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেয়া যায়।
পরিশেষে একটি কথা : যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে, তাদের নিয়ে উল্লাস করার সঙ্গে সঙ্গে আমরা যেন আমাদের ফেল করা ছাত্রছাত্রীদের কথা ভুলে না যাই; সেদিকটাও খেয়াল রাখতে হবে। কারণ সমাজ বদলের অধিকার শুধু জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের একচ্ছত্র নয়, বরং যারা ফেল করেছে তাদেরও আছে সমাজ বদলের সমান অধিকার। বিষয়টি সমাজ বদলের স্লোগানদাতারা ভেবে দেখবেন- এই আশা করছি।
শাহনেওয়াজ বিপ্লব : কবি, গল্পকার ও অস্ট্রিয়া প্রবাসী গবেষক

এমন ঘটনা আর কখনও যেন না ঘটে by ড. সুকোমল বড়ুয়া

আজ ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩। এ দিনটি গত বছর ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক ট্রাজেডির ভয়াল সেই রাতের কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। বৌদ্ধ পুরাতত্ত্ব ও ঐতিহ্যের অন্যতম তীর্থভূমি পর্যটন নগরী কক্সবাজারের রামু, যেখানে শত শত বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও নানা ভাস্কর্য-সংস্কৃতি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, সেখানেই ঘটে গিয়েছিল স্মরণাতীতকালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিপর্যয়ের এক কালো থাবা। আমাদের প্রিয় রম্যভূমি রামু সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল জনপদ- যেটি আরাকান সংলগ্ন প্রাচীন ব্রহ্মদেশীয় সব থেরবাদী আদর্শকে ধারণ করে এসেছে। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের তীর্থস্থানের প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ও প্যাগোডাই শুধু নয়; রাস্তার পাশে মন্দির ও বিহারের পার্শ্ববর্তী অনেক স্থাপনা ও বসতবাড়ি সেদিন রাতে সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তের কবলে পড়ে আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। শুধু রামুর কেন্দ্রীয় সীমা বিহার নয়, খুবই নামকরা প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার লালচিং ও সাদাচিং এবং উত্তর মিঠাছড়ির শত ফুট দীর্ঘ সিংহশয্যা শায়িত বুদ্ধমূর্তিই নয়, উখিয়ার দীপাংকুর বিহার, জেতবন বিহার ও আর্যবংশ প্রভৃতি ২২টি বৌদ্ধ বিহার এবং চট্টগ্রামের পটিয়ার লাখেরা ও কোলাগাঁও সর্বজনীন বৌদ্ধ বিহার, টেকনাফের হোয়াইক্যাং ও রামু-উখিয়ার ৪০টিরও বেশি বসতবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। দু’শতাধিক রৌপ্য ও স্বর্ণের মূল্যবান বুদ্ধমূর্তি লুটপাট হয়ে যায়। প্রাচীন পুঁথিপুস্তক, পাণ্ডুলিপি ও ভিক্ষুসংঘের মূল্যবান ব্যবহার্য জিনিসপত্র এবং অনেক ধাতব দ্রব্য জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে যায়। এসব ঐতিহ্য দেশ-বিদেশের গবেষকদের বৌদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুসন্ধানের মূল্যবান উপাদান ছিল। আগামীতে হয়তোবা অনেক নতুন জিনিস পাওয়া যাবে, কিন্তু এসব দুর্লভ গবেষণা ঐতিহ্যের উপাদান আর কোনো দিন পাওয়া যাবে না। বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর এ যেন স্মরণকালের ইতিহাসের এক ভয়ানক বর্বরোচিত হামলা। এ হামলাকে কেউ মেনে নিতে পারেনি, আগামীতেও পারবে না।
সবাই বলছে, এটা এদেশের বৌদ্ধদের ওপর বৌদ্ধ স্থাপনা ও ঐতিহ্যের ওপর চরম আঘাত। অন্তত মুক্তিযুদ্ধ ছাড়া কয়েকশ’ বছরের ইতিহাসে বৌদ্ধদের ওপর এ রকম সাম্প্রদায়িক আঘাত আর কখনো আসেনি। তাই বলতে দ্বিধা নেই যে, সেদিনের সেই ধংধ্বযজ্ঞের ভয়ানক দৃশ্য এ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে এক বিরাট আঘাত হেনেছে। সেদিন আমরা আমাদের হাজার বছরের ধর্ম ও সংস্কৃতির এক অনুপম ঐতিহ্যকে হারিয়েছি। আমাদের মনে হয়েছে, এ যেন বিশ্ব মানবতার এক করুণ বিপর্যয়। তাই আজ দিনটিকে গভীর হৃদয় দিয়ে, আর অন্তরের শোক ও সহানুভূতি দিয়ে স্মরণ করছি। সেদিন এ নৃশংস বর্বরতায় যাদের ঘরবাড়ি পুড়ে গেছে; ধর্মীয় স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে, তাদের প্রতি জানাই গভীর সহানুভূতি। আর যারা গৃহহারা হয়ে বহু কষ্টে বাইরে ছিল, তাদের প্রতি জানাই গভীর মমত্ববোধ ও সমবেদনা।  আমরা বিশ্বের যেখানেই যাই না কেন, সেখানে গর্ব করে বলি ‘বাংলাদেশ একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ’। এ যেন আমাদের শত সহস্র বছরের সম্প্রীতির ঐতিহ্য। এ দেশে জন্মগ্রহণ করে আমরা ধন্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাও ছিল তাই। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রধান এ চারটি ধর্ম ছাড়াও রয়েছে ক্ষুদ্র ক্ষুুদ্র নানা জাতিগোষ্ঠী ও নৃ-সম্প্রদায়ের মানুষ। প্রত্যেকেই তাদের নিজ নিজ ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধ করেছে। আর বৌদ্ধদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পুরাতত্ত্ব তো এ দেশের মাটির গভীরে পরতে পরতে মিশে আছে। এমন একটি সামাজিক বন্ধন, সবার সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানে, আর সাম্যের ভিত্তিতে যে দেশ গড়ার প্রত্যয় সৃষ্টি হয়েছিল, তা যেন সেদিন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সে যেন এক অদৃশ্য শক্তির কারণে।
মহামতি বুদ্ধ কোনো ধর্মের প্রতিপক্ষ নন। তিনি এক মহামানবতার প্রতীক, অহিংস ও সাম্যের প্রতীক। আর বৌদ্ধরাও কোনো ধর্মগোষ্ঠীর কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষ নন। তাহলে কেন সেদিন বৌদ্ধদের ওপর এ আঘাত হানা হয়েছিল? কী দোষ ছিল তাদের? ফেসবুকে সাজানো কোরআন অবমাননাকর একটি মিথ্যা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ রকম আঘাত আসতে পারে না। সবাই জানে, বৌদ্ধরা অতি নিরীহ ও শান্তিপ্রিয় সম্প্রদায়। এদেশে বৌদ্ধদের ওপর এ রকম আঘাত কারও কাম্য ছিল না। দেশ-বিদেশে বৌদ্ধদের অনেক সুনাম ও মর্যাদা আছে বেশ উঁচুতে। সে জন্যই তো সেদিন এ ঘটনায় বিশ্ববিবেক জেগে উঠেছিল। দেশজুড়ে মানবতার ঝড় বয়েছিল। এহেন জঘন্য কাজ যারা করেছে, তাদের ঘৃণা ও নিন্দা জানিয়েছে। সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনকেও নিন্দা জানিয়েছে তারা তাদের দায়িত্ব রক্ষা করতে পারেনি বলে। সে এক সহমর্মিতার অপূর্ব নিদর্শন যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ, সব শ্রেণী-পেশার মানুষ জড়ো হয়ে সভা-মিছিল করেছে, প্রতিবাদ জানিয়েছে। গোটা দেশ বৌদ্ধদের পাশে দাঁড়িয়ে সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। সেদিন আমাদের মনে হয়েছে, আমরা যেন আবার একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই চেতনাকে ফিরে পেয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে যেমন কোনো ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ছিল না, বৈষম্য ছিল না- ঠিক সে রকম মনে হয়েছে আমাদের এই একাত্মতার মধ্যে।
এ সন্ত্রাসী হামলায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন, বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা, ডব্লিউএফবিসহ দেশ-বিদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা, এমনকি অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানও ধিক্কার জানিয়েছেন। দেশের সুশীল সমাজসহ সর্বস্তরের জনগণের ধিক্কার তো ছিলই। সরকারও বিব্রতবোধ ও বেশ চাপে ছিল। সেদিন সরকার বলুন, আর প্রশাসনই বলুন, আমরা কেউ এ সম্প্রীতি বিনষ্টের লজ্জা ঢাকতে পারিনি, পারবও না। কারণ দেশ-বিদেশের কূটনৈতিক মিশনসহ সারাবিশ্বের চোখ ছিল আমাদের প্রতি নিবদ্ধ। সেদিন সবার প্রশ্ন ছিল সরকারের আইন-শৃংখলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। স্থানীয় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও নীরবতা দেখেও জাতি সেদিন স্তম্ভিত হয়েছে। এখনো সে প্রশ্ন বারবার উঠে আসে। ঘটনার খুব কাছাকাছি থেকেও কেন তারা অগ্রসর হয়নি, কেন দেখে ও জেনে-শুনে আইন রক্ষাকারী সংস্থা ও প্রশাসন দায়িত্ব পালন করেনি সেটাই জনগণের প্রশ্ন। অতি নিকটে ছিল রামু থানা, উপজেলা নির্বাহী অফিস, চার-পাঁচশ’ গজ দূরে ছিল সেনা ক্যাম্প, বর্ডার সিকিউরিটি গার্ডসহ সরকারের আইন-শৃংখলা ও স্থানীয় প্রশাসন এবং ৭-৮ কিলোমিটার দূরে ছিল জেলার হেডকোয়ার্টারগুলো। ঘটনার আগে ও পরে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাও ছিল যেন নীরব। এ প্রশ্ন শুধু স্থানীয় বৌদ্ধদের নয়, আন্তর্জাতিক মহলসহ দেশ-বিদেশের সব মহলের, তদন্ত সংস্থারও।
খুবই দুঃখের বিষয় যে, সেদিন জনতার মিছিলে আরও দেখা গেছে সরকারদলীয় স্থানীয় নেতাদের। এ তথ্য বারবার পত্রপত্রিকায় এসেছে। এমনকি থানার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাও তাদের সঙ্গে মিশে উস্কে দিয়ে সে সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন। সবার ধারণা, এটা পূর্বপরিকল্পিত। সেখানকার প্রশাসনের সম্পৃক্ততা ছাড়া এহেন নাশকতামূলক কাজ সম্পাদন করা কারও পক্ষে কখনো সম্ভবপর নয়। এখনো সেই জঘন্য কর্মকাণ্ডের কোনো সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার করা হয়নি। স্থানীয় জনগণ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, নিরীহদের নিয়ে থানায় মামলা হয়েছে, এখনো হয়রানি চলছে। অথচ প্রকৃত দোষীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা প্রতিদিন সরকারদলীয় নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছে, বক্তব্য দিচ্ছে। ৩ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন নতুন করে নির্মিত বিহার উদ্বোধন করেন, সে সময়ও তারা নাকি মঞ্চের আশপাশে ছিল।
সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভস্মীভূত সেই বৌদ্ধ বিহারগুলো দৃষ্টিনন্দন করে পুনঃনির্মাণ করে দেয়ার জন্য। এ জন্য সেনাসদস্যরা রাত-দিন খেটেছেন। আসলে তাদের দায়িত্বেই বিহারগুলো পুনঃনির্মিত হয়েছে। তারা বেশ শ্রম দিয়েছেন। কাজে যতœবানও ছিলেন। তাদেরও জানাই ধন্যবাদ। কিন্তু আজ এ শোকাবহ দিনে একটি প্রশ্ন- ভস্মীভূত প্রাচীন ঐতিহ্যের ওপর সুন্দর ও সৌকর্যমণ্ডিত বৌদ্ধ বিহার তৈরি করা হয়েছে, আগুনে পুড়ে যাওয়া গৃহহীনের ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে, তারপরও কি ‘মধুপূর্ণিমা’ রাতের সেই আগুনের ভয়াল দৃশ্য ও সন্ত্রাসীদের বীভৎস তাণ্ডবতা সেখানকার শিশু-কিশোর, ভিক্ষু-শ্রমণ, যুবক-যুবতী, আবালবৃদ্ধবনিতা কখনো ভুলতে পারবে? আরও প্রশ্ন, সেদিন বৌদ্ধদের হৃদয়ে যে আঘাত ও ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, সেটা কি কখনো ভোলা যাবে, কখনো পুনঃনির্মাণ করা যাবে? তাই এমন ঘটনা আর কখনো যেন না ঘটে সে ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রফেসর ড. সুকোমল বড়ুয়া : সাবেক চেয়ারম্যান, পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সভাপতি, বিশ্ব বৌদ্ধ ফেডারেশন- বাংলাদেশ চ্যাপ্টার

অনেক কিছুই বদলে যাওয়ার কথা ছিল- বদলায়নি by মোকাম্মেল হোসেন

আমি বসেছি বাসের একেবারে পেছনের একটা সিটে। নিয়ম অনুযায়ী এই বাসে সিটের অতিরিক্ত কোনো যাত্রী উঠানোর কথা না। এরা সেই নিয়মটা মানছে না। তাই নিয়ে সামনে বসা যাত্রীরা কন্ডাকটরের সঙ্গে হইচই করছে। ঢাকা শহরের বিভিন্ন রুটে আজকাল সিটিং সার্ভিসের নামে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম হয়েছে। এটাও সে ধরনেরই একটা বাস সার্ভিস। নাম নবকলি পরিবহন প্রাইভেট লিমিটেড। নামের সঙ্গে বাসের চেহারার মিল খুঁজতে গিয়ে আমার হাসি পেল। আমাকে হাসতে দেখে পাশের যাত্রী বললেন-
: ভাই, ডোন্ট মাইন্ড। কী জন্য হাসলেন জানতে পারি?
- হাসলাম দুঃখে।
: স্যরি! আমি আরও ভাবছি মজার কোনো জিনিস দেইখ্যা...
- দুঃখটা মজা থেইক্যাই উৎপন্ন হইছে।
: কীরকম!
- মালিকপক্ষ এই বাসটার নাম রাখছে নবকলি, অথচ বাইরে যেমন-তেমন, এর ভিতরের অবস্থাটা একবার দেখেন। অর্ধেক সিটই ভাঙা। এর মধ্যে কয়েকটা আবার দড়ি দিয়া বাইন্ধা রাখছে। কী তার নাম আর কী তার চেহারা!
: এই ধরনের জিল্লতিরে কী বলে জানেন?
- কী বলে?
: বলে- ছাল নাই কুত্তার বাঘা নাম।
- হাঃ হাঃ হাঃ। হানড্রেড পার্সেন্ট সত্য কথা বলছেন। আইচ্ছা, আমারে একটা কথা বলেন তো, লোকাল সার্ভিস হিসেবেও রাস্তায় চলার যোগ্য না, এইরকম লক্কড়-ঝক্কড় মার্কা একটা বাস সিটিং সার্ভিসের অনুমোদন পাইল কীভাবে?
: এর উত্তর খুবই সোজা। অনুমোদনের ক্ষমতা যাদের হাতে ন্যস্ত, তারা বাসের নাট-বল্টু ঠিক আছে কিনা সেইটা লইয়া মাথা ঘামায় না! তারা শুধু দেখে, প্রতিমাসে তাদের হাতে টাকার যে বান্ডিলটা ধরাইয়া দেওয়া হয়, সেইগুলার মধ্যে ছেঁড়াফাটা কোনো নোট আছে কিনা! আপনে জানেন, কয়েকদিন আগে কী ভয়াবহ ঘটনা ঘটছিল?
- কী?
: এই কোম্পানির একটা বাস মহাখালী রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় হঠাৎ ঘুমাইয়া পড়ছিল। বাসের ড্রাইভার হাজার চেষ্টা কইরাও সেইটারে সজাগ করতে পারে নাই। শেষে একটা ট্রেন আইসা দুই ফাল্টা করার পর বাসটা টের পাইছে- কোনখানে সে বিছানা পাতছিল!
- বলেন কী! এই বাস নিচে গেছিল কী করতে? এইটার তো ফ্লাইওভারের উপর দিয়া চলাচল করার কথা।
: নিচে দিয়া গেছিল যাত্রী টুকাইতে।
- কেউ আহত-নিহত হয় নাই?
- ধুসমুস কইরা নাইম্যা যাওয়ায় কোনো যাত্রী আহত-নিহত হওয়ার চান্স পায় নাই। তবে আশপাশে থাকা জনাছয়েক পথচারী ও দোকানদার আহত হইছে। শুনছি, তাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা গুরুতর...
নবকলির শুধু চেহারাই খারাপ না, চরিত্রও খারাপ। কারও চরিত্রে দোষ থাকলে দশজন দশরকম কথা বলার সুযোগ পায়। এর বেলায়ও তাই ঘটল। কন্ডাকটরের উদ্দেশে একজনকে বলতে শুনলাম-
: অই হারামজাদা, এইটা সিটিং সার্ভিস, না চিটিং সার্ভিস?
লোকটার কথা শুনে কন্ডাকটর সরু চোখে তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল-
: গালি দেন ক্যা!
পাশ থেকে অন্য একজন বলে উঠল-
: গালি তো তর জন্য কম হইয়া যায়। তর পাছায় কইষ্যা একটা লাত্থি দেওন দরকার।
- দেন লাত্থি!
ভদ্রলোক উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন-
: লাত্থি দিলে কী করবি তুই?
- আগে দিয়া দেখেন না!
ভদ্রলোক জামার হাতা গুটিয়ে প্রস্তুতি নিলেন। তারপর উচ্চস্বরে বললেন-
: অই ফকিন্নির পুত! তরে কি আমার শনি-মঙ্গলবার দেইখ্যা তারপর লাত্থি দেওন লাগব ভাবছস?
- আমি ফকিন্নির পুত- ঠিক আছে! কিন্তু আপনে জমিদারের পুত হইয়া বাসে উঠছেন ক্যান? প্রাইভেট কারে চলাফেরা করতে পারেন না!
: আমি কিসে চলাফেরা করব এইটা তুই বলার কে? এমন চড় দিব- বাড়িতে যাওয়ার পর তর বৌ তর মুখে কোনো দাঁত খুঁইজ্যা পাবে না।
- এইটা পারবেন! একবার লাত্থি মারবেন- একবার চড় মারবেন! তবে ওস্তাদের মাইর শেষরাইতে। মাইর-গুতা যাই দেন- আমরা একবার ধরলে কিন্তু আর ছাড়ি না। বৈশাখীর ভুইল্যা গেছেন?
পাশে বসা সেই ভদ্রলোক ফিসফিস করে আমার কাছে জানতে চাইলেন-
: বৈশাখ মাসে কী ঘটছিল?
বৈশাখী পরিবহনের ঘটনাটা আমি জানি। বিষণœকণ্ঠে বললাম-
: বৈশাখ মাস না, ও বলছে সাভার থেইক্যা গুলশান-নতুনবাজার রুটে চলাচলকারী বৈশাখী পরিবহনের কথা। ওই বাসে একদিন এইরকম কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের মারামারি লাইগ্যা যায়। এর জের ধইরা পরিবহন শ্রমিকরা ৭ জন বাসযাত্রীকে পিটাইয়া মাইরা ফেলছিল।
: আরে! এ তো সাংঘাতিক লোক! খুন করার কথা কেমন বুক ফুলাইয়া বলতেছে দেখছেন!
- সাংঘাতিকের দেখছেন কী! এই ব্যাটা তো এখন অন্যদের খুনের গল্প শুনাইতেছে। দুইদিন পরে নিজেই মানুষ খুন করার কারবারে নাইম্যা পড়বে।
: কীভাবে!
- নিজেরে ড্রাইভার ঘোষণা করার মাধ্যমে।
: বলেন কী!
- জ্বি।
ভদ্রলোক আমার দিকে স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর কন্ডাকটরের দিকে ইশারা করে বললেন-
: এই লোক টাকা গুনতে-গুনতে ড্রাইভার হইয়া যাবে! ড্রাইভার হওয়ার জন্য মৌলিক কোনো প্রশিক্ষণের প্রয়োজন পড়বে না?
- না, পড়বে না। রাস্তায় গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়ার আগে তারে শুধু জিজ্ঞাসা করা হবে-
: তুমি গরু চেন?
- জ্বে স্যার, চিনি।
: বল তো, গরুর কয়টা মাথা?
- মাথা তো স্যার আপনের মতো একটাই!
: গুড। কয়টা লেজ?
- লেজও স্যার একটাই।
: ভেরিগুড। তুমি তো দেখতেছি হেভি ট্যালেন্ট। আইচ্ছা, এইবার বল- ছাগলের কয়টা চোখ?
- দুইটা।
: কয়টা ঠ্যাং?
- চাইরটা।
: ওয়েলডান। যাও, সমগ্র বাংলাদেশের যে কোনো রোডে গাড়ি চালাইতে তোমার আর কোনো বাধা নাই...
আমার কথা ও অভিনয় দেখে ভদ্রলোক মজা পেয়ে হো হো করে উঠলেন। হাসতেই হাসতেই বললেন-
: বাস্তবে সত্যি সত্যি এইরকম হয় নাকি?
- হয় না মানে? আপনে পরিসংখ্যানের দিকে তাকান। পরিসংখ্যান বলছে- সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেইক্যা বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান হইল দ্বিতীয়। এর কারণ কী জানেন? এর কারণ হইল এই দেশে এইভাবে ড্রাইভার হওয়া যায় বইল্যা। দেশে এইরকম ড্রাইভারের সংখ্যা কম কইরা হইলেও ৭ লাখ। আমাদের দেশে সড়কপথে প্রতিবছর অন্তত ৫ হাজার দুর্ঘটনা সংঘটিত হইতেছে। এসব দুর্ঘটনায় মারা যায় কমপক্ষে ৪ হাজার মানুষ ও পঙ্গুত্ব বরণ করে এর দ্বিগুণ। যদি আপনে এর আর্থিক ক্ষতি পরিমাপ করেন তাইলে তা টাকার অংকে দাঁড়ায় কমপক্ষে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। তাছাড়া সড়কপথে সংঘটিত প্রতিটি দুর্ঘটনা একটি পরিবারের সারাজীবনের অপূরণীয় বেদনা ও আর্থিক সংকটে নিপতিত হওয়ার কারণ হওয়ায় আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
দাঁড়িয়ে থাকা এক যাত্রী ভাড়া কম দেয়ার সূত্র ধরে বাসের পরিবেশ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠল। এ কথা সে কথা বলার পর কন্ডাকটর তাকে বলল-
: ধুনপুন না কইরা ৩২ টাকা ভাড়া দেন।
- কোন দুঃখে ৩২ টাকা দিব?
: ভাড়া ৩২ টাকা।
- শ্যামলী থেইক্যা শেওড়া পর্যন্ত ৩২ টাকা ভাড়া নেওয়ার পারমিশন তরে কে দিছে?
: এইটা সিটিং সার্ভিস।
- অই চিটার, তর এই বাস সিটিং সার্ভিস হইলে আমি দাঁড়াইয়া রইছি কীজন্য?
: আমি কি আপনেরে জোর কইরা উঠাইছি? আপনে নিজের ইচ্ছায় উঠছেন।
- দরজা খোলা পাইছি, তাই উঠছি। দরজা বন্ধ থাকলে উঠতাম?
: ক্যাচাল কইরেন না তো! ভাড়া দেন।
- ভাড়া তো দিছি।
: আরও দেওন লাগব।
- অসম্ভব। তুই আমার হাতে তেল ধরাইয়া দিয়া বলবি- ঘিয়ের দাম দেন, এইটা তো হইতে পারে না! যেমন দই, তেমন পয়সা।
শেওড়া পৌঁছার পর সেই যাত্রী বাস থেকে নামার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই কন্ডাকটর তাকে আটকাল। যাত্রী ভদ্রলোক ক্ষেপে গিয়ে বললেন-
: তুই আমার হাত ধরছস ক্যান?
- আগে টাকা দেন, তারপর নামেন।
: টাকা না দিলে কী করবি? বাস থেইক্যা নামতে দিবি না? আয়, সাহস থাকলে আটকা।
ভদ্রলোক কন্ডাকটরকে ধাক্কা দিয়ে বাসের দরজার কাছে যেতেই সে চিৎকার করে ড্রাইভারের উদ্দেশে বলল-
: ওস্তাদ, গাড়ি টান দেন। আবদুল্লাহপুরের আগে গাড়ি বেরেক হবে না।
ড্রাইভার গাড়ির গিয়ার বদল করতেই সেই যাত্রী লাফ দিয়ে ড্রাইভারের পাশে দাঁড়াল। তারপর ড্রাইভারের গালে একটা চড় মেরে বলল-
: এই- গাড়ি থামা।
চড় খেয়ে ড্রাইভার কয়েক সেকেন্ড থ মেরে তার দিকে চেয়ে রইল। তারপর ঘড়ির পেন্ডুলামের মতো একবার ডানে একবার বামে বাস ঘোরাতে লাগল। শেওড়ার পরের স্টপেজ বিশ্বরোড। আমার এখানেই নামার কথা। কুড়িল ফ্লাইওভার চালু হওয়ার পর বিশ্বরোডের এ জায়গাটায় এখন যানবাহনের ভিড় অনেকটাই কমে গেছে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে ড্রাইভার বাসের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল-
: সবগুলারে খালে ডুবাইয়া মারমু...
ড্রাইভারের কাণ্ড দেখে বাসের মহিলা ও শিশুরা ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল। বাসটা যখন খিলক্ষেত স্টপেজেও থামল না, তখন যাত্রীদের মধ্যে এক ধরনের আতংক দেখা দিল। আমি অবাক হয়ে ড্রাইভারের কারবার দেখছিলাম আর মাত্র কিছুদিন আগে পাস হওয়া একটা আইনের কথা ভাবছিলাম। সে আইনে বলা হয়েছে- দুর্ঘটনায় যানবাহনের যাত্রী মারা গেলে কোনো ড্রাইভারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা যাবে না। এ মুহূর্তে এ বাসের ড্রাইভার সব যাত্রীকে রাস্তার পাশের খালে ডুবিয়ে মেরে ফেলতে চাচ্ছে। ড্রাইভার যদি সত্যি সত্যি এ কাজ করে, তারপরও তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা যাবে না! কী ভয়াবহ ব্যাপার!
সবাই মিলে অনেক অনুরোধ আর অনুনয় করার পর শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরের সামনে এসে ড্রাইভার বাস দাঁড় করাল। আমাকে এখন রাস্তার ওপাশে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা একটা বাস ধরে বিশ্বরোড যেতে হবে। রাস্তা পার হওয়ার জন্য ফুটওভার ব্রিজে উঠে দাঁড়ালাম। কোথাও শৃঙ্খলা নেই। যতদূর চোখ যায়- এলোমেলো-বিশৃঙ্খল একটা অবস্থা। দৃশ্যপটটা এরকম হওয়ার কথা ছিল না। দিন বদলের প্রতিশ্র“তি দিয়ে যারা ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। শাসক দলের প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী অনেক কিছুই বদলে যাওয়ার কথা ছিল- বদলায়নি। অনেক কিছু পাওয়ার কথা ছিল- পাওয়া যায়নি। আমি ঝাপসা চোখে হিসাবের খাতাটার দিকে তাকালাম। দেখলাম- সেখানে একটা গুবরেপোকা হামাগুড়ি দিচ্ছে...
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

সড়ক দুর্ঘটনার ওপর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ফরমান by বদরুদ্দীন উমর

সম্প্রতি বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিবহন মালিক ও পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে এক বৈঠকে ঘোষণা করেন, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে ৩০২ ধারায় যেসব হত্যা মামলা করা হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা ও প্রত্যাহার করা হবে, কারণ এ দুর্ঘটনাগুলো ইচ্ছাকৃত নয় এবং সেই হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে হত্যা হিসেবে চিহ্নিত ও আখ্যায়িত করাও যাবে না! সব দুর্ঘটনা যে ইচ্ছাকৃত নয় এ কথা কে না জানে? কিন্তু এ কথাও কে না জানে যে, সারা বছর ধরে সড়ক দুর্ঘটনায় যে হাজার হাজার লোকের মৃত্যু হয়, তার অধিকাংশই প্রকৃতপক্ষে দুর্ঘটনা বলতে যা বোঝায় তা নয়। এ তথাকথিত দুর্ঘটনাগুলোর বিপুল অধিকাংশই ঘটে এমন কারণে, যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য। প্রশাসন থেকে নিয়ে পরিবহন মালিক ও ড্রাইভাররাই এর জন্য দায়ী। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা দরকার, বাংলাদেশের সড়কপথে যে লাখ লাখ বাস-ট্রাক চলাচল করে, সেগুলোর ড্রাইভারদের অধিকাংশেরই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নেই। যে সরকারি সংস্থা থেকে এদের ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়া হয়, সেগুলো হল দুর্নীতির আখড়া। কাজেই যাদের নামমাত্র কিছু ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ আছে, এমনকি কোনো প্রশিক্ষণই যারা কোথাও গ্রহণ করেনি এমন লোকদেরও ঘুষ খেয়ে লাইসেন্স দেয়া হয়। এ ধরনের অপ্রশিক্ষিত অথবা সামান্য প্রশিক্ষিত লোকদের মালিকরা অল্প মজুরিতে নিযুক্ত করে। মজুরি অল্প হওয়ার কারণে অনেক সময় ড্রাইভারদের ওভারটাইম বা অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। তাদের যথেষ্ট বিশ্রাম হয় না এবং তার ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনাকে ইচ্ছাকৃত হত্যা না বললেও এটা বোঝার কোনো অসুবিধা নেই যে, দুর্নীতি এবং মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফার লোভের কারণেই এ দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে এবং এর জন্য উপযুক্ত তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী মালিক-শ্রমিক যেই হোক, তাদের উপযুক্ত শাস্তি দরকার।
বাংলাদেশে হাজার হাজার নতুন বাস, ট্রাক, মোটরগাড়ি নিয়মিত রাস্তায় নামছে। এগুলো চালানোর জন্য উপযুক্ত ড্রাইভার প্রয়োজন। উপযুক্ত ড্রাইভার আকাশ থেকে পড়ে না অথবা ঘুষ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেলেই তারা যোগ্যতা অর্জন করে না। তারা যাতে এ যোগ্যতা অর্জন করতে পারে তার জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন সারাদেশে শত শত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যাতে স্থাপিত হয় সেটা দেখা। শুধু তাই নয়, এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে ড্রাইভিংয়ের জন্য উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে কি-না, প্রশিক্ষণের পর তাদের পরীক্ষা ঠিকমতো হচ্ছে কি-না সেটাও দেখা। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনা বড় আকারে কমিয়ে আনার জন্য এ কাজ যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নিজের দায়িত্ব মনে করে না। এ ধরনের কোনো পরিকল্পনার কথাও সরকারি যোগাযোগ ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য শোনা যায় না। এ প্রাথমিক এবং অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হওয়ার কারণেই অল্পশিক্ষিত ড্রাইভাররা দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড বলা না গেলেও এটা যে এক ধরনের হত্যাকাণ্ড তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি ড্রাইভাররা দায়ী হলেও মালিক এবং সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ও এর জন্য দায়ী। সুষ্ঠু পরিকল্পনা এবং তা যথাযথভাবে কার্যকর করা হলে যে এ দুর্ঘটনার অধিকাংশই রোধ করা যায় এ নিয়ে বিতর্কের কিছু নেই। কিন্তু তা সত্ত্বেও সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যত কথাবার্তা হয়, তাতে এ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হতে কোনোভাবেই দেখা যায় না। এটা যে একটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য ব্যাপার এবং এ নিয়ন্ত্রণ যে সরকারের দায়িত্ব, এ বোধ আজ পর্যন্ত কোনো সরকারের ক্ষেত্রেই দেখা যায়নি।
প্রায়ই দেখা যায়, দূরপাল্লার সড়কপথে যেসব বাস, ট্রাক, মিনিবাস চলে, সেগুলোর ড্রাইভাররা একে অপরকে ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার জন্য বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়। এ কাজ করতে গিয়ে গাড়ি উল্টে যাওয়ার ঘটনা তো ঘটেই, কিন্তু তার থেকে বেশি ঘটে উল্টো দিক থেকে আসা গাড়ির সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ। মদ খেয়ে বাস-ট্রাক চলাচলের থেকে ড্রাইভারদের এভাবে বেপরোয়া গাড়ি চালানোই অধিকাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। এ সমস্যা সমাধানের একটা কার্যকর উপায় হচ্ছে দূরপাল্লার রাস্তা বা হাইওয়েগুলোতে ডিভাইডার দিয়ে যাওয়া-আসার পথকে পৃথক করা। এটা করা হলে সামনাসামনি সংঘর্ষে দুর্ঘটনা শতভাগ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। ঢাকা, চট্টগ্রাম ইত্যাদি শহরে রাস্তা পারাপারের ক্ষেত্রে পথচারীদের দায়িত্বহীন আচরণ অনেক সময় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী হয়। তারা ফুটব্রিজ বা জেব্রাক্রসিং ব্যবহারের পরিবর্তে ইচ্ছামতো রাস্তা পারাপার করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। তবে দেশে মোট দুর্ঘটনার তুলনায় এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক কম। সড়ক দুর্ঘটনা এবং তা রোধ করার উপায় বিষয়ে অনেক আলোচনা হতে পারে, যা প্রয়োজন। অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন। কিন্তু সে সবের ধারেকাছে না গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার দায়-দায়িত্ব থেকে ড্রাইভারদের একেবারে মুক্ত ঘোষণা করে যা করেছেন তার থেকে দায়িত্বহীন কাজ কমই হতে পারে। এর সঙ্গে দুর্নীতির সম্পর্ক আছে কিনা সেটাও এক বিচার্য বিষয়।
ড্রাইভিংয়ের প্রশিক্ষণের অর্থ শুধু গাড়ি চালানোর শিক্ষা নয়। গাড়ি চালানোর সঙ্গে যত কিছুর সম্পর্ক আছে, সব বিষয়ের শিক্ষাও এর অন্তর্গত। গাড়ির ড্রাইভাররা যেভাবে বেপরোয়া হয়ে গাড়ি চালায়, যেভাবে সামনের গাড়ি ডিঙিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে- এসব বিষয়ে তাদের কোনো শিক্ষা ও সচেতনতাই দেখা যায় না। এর কারণ এ নিয়ে কোনো শিক্ষার ব্যবস্থাই তাদের নেই। সেটা থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা যে সংখ্যায় হয় সেটা হতো না। এ কারণে যেসব সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে সেগুলোকে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড না বলা হলেও এগুলো হত্যাকাণ্ড অবশ্যই। এ হত্যাকাণ্ড কীভাবে বড় আকারে কমিয়ে আনা সম্ভব সে বিষয়ে যে সংক্ষিপ্ত ও সামান্য আলোচনা ওপরে করা হল তার থেকেই বোঝা যায় যে, এর জন্য ড্রাইভাররা যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী মালিক ও সরকার পক্ষ। মালিক শুধু অদক্ষ ড্রাইভার নিযুক্তির মাধ্যমেই এসব দুর্ঘটনার শর্ত তৈরি করে না, গাড়িগুলোর প্রয়োজনীয় মেরামত এবং সেগুলোকে চলাচলের উপযুক্ত অবস্থায় না রেখে রাস্তায় নামানোর ফলে যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে অনেক সময় দুর্ঘটনা ঘটে। সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কোনো সরকারি ল’ থাকার বিষয়ে আগেই বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কতকগুলো জটিল কারণে ঘটে চললেও সে ব্যাপারে কোনো উচ্চবাচ্য না করে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো চিহ্নিত করার কোনো চেষ্টা না করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ড্রাইভারদের ও সেই সঙ্গে গাড়ির মালিকদেরও যেভাবে দায়মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন, এর থেকে দায়িত্বহীন কাজ সরকারের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর আর কী হতে পারে? তা ছাড়া তিনি যেভাবে দুর্ঘটনার জন্য ড্রাইভারদের দায়মুক্ত করেছেন এবং মামলা থেকে তাদের অব্যাহতি দেয়ার কথা বলেছেন, এটা কোনো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নয়। এ হল আদালতের কাজ। দুর্ঘটনা হলে তার জন্য মামলা হতেই পারে এবং সে মামলা নিষ্পত্তির দায়িত্ব আদালতের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পূর্ণভাবে নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে যেভাবে সড়ক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ড্রাইভারদের দায়মুক্ত করার ফরমান জারি করেছেন, তাতে সড়ক দুর্ঘটনা কমে আসার পরিবর্তে আরও বেড়ে যাবে। ড্রাইভারদের আইনের আওতার বাইরে এভাবে থাকা সড়ক পরিবহনের ক্ষেত্রে এক মহাবিপজ্জনক ব্যাপার। দেশের জনগণের ট্যাক্সের টাকায় সরকারি গদিতে বসে থাকা একজন মন্ত্রীর এহেন কাজ যে নৈতিকতাবিহীন এক বড় অপকর্ম এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ ও বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল