Thursday, July 23, 2015

তাজউদ্দীন আহমদ: জন্মদিনের অভিবাদন by শারমিন আহমদ

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী
তাজউদ্দীন আহমদ।
বাংলাদেশ একদিন তার নিজস্ব প্রয়োজনেই খুঁজে নেবে তাজউদ্দীনকে
তাজউদ্দীন আহমদের ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে অজস্র শুভেচ্ছা।
লাখো তারার দীপ্তিময় অভিবাদন।
শীতলক্ষ্যার কূলঘেঁষা, শাল-গজারির বনে ঘেরা, লাল মাটিতে পথ আঁকা, নিটোল সবুজ গ্রাম দরদরিয়ায় ১৯২৫ সালের ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার তাজউদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বেঁচে থাকলে আজ নব্বই বছরে পদার্পণ করতেন। কিন্তু মাত্র অর্ধশত বছরের জীবনেই তিনি সম্পন্ন করেছেন শত বছরের যুগান্তকারী কর্ম। বাংলাদেশ নামের এক স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ে ও নবজাত রাষ্ট্র গঠনে তিনি যে অনন্য অবদান রেখেছেন, তা যুগ যুগ ধরেই বিশ্বের স্বাধীনতাকামী জাতির জন্য হতে পারে দিগ্দর্শন ও অপার সম্ভাবনার বাতিঘর। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেরণা ও প্রতীক। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তাজউদ্দীন আহমদ এক নির্মোহ সাধকের অধ্যবসায় নিয়ে সেই প্রেরণাকে এক সাফল্যমণ্ডিত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত করেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে যদি এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করতে হয়, তাহলে বলা যায় যে তিনি ছিলেন এক ন্যায়নিষ্ঠ, নির্ভীক, দূরদর্শী ও স্বাধীনচেতা মানুষ। নিজেকে আড়ালে রেখেও কোনো কৃতিত্ব দাবি না করে বিশাল মাপের কাজগুলো অসাধারণ দক্ষতা, বিচক্ষণতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে যেমন করে সম্পন্ন করতেন, তার জুড়ি মেলা ভার। তাঁর চরিত্রের ওই বিরল গুণাবলিরই সার্থক বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭১ সালের চরম প্রতিকূল সময়ের আবর্তে—মুক্তিযুদ্ধের যজ্ঞপীঠে। তাজউদ্দীন আহমদকে না জানলে তাই বাংলাদেশের জন্মকথা—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানাও হবে অসম্পূর্ণ।
১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ, শ্রান্ত, অনাহারে ক্লিষ্ট তাজউদ্দীন আহমদ ও তাঁর দুর্গম যাত্রাপথের সঙ্গী ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে কুষ্টিয়ার সীমান্ত থেকে ভারতে স্বাগত জানিয়েছিলেন ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান আইজি গোলক মজুমদার। তাজউদ্দীন আহমদ ওই শঙ্কাকুল অবস্থায়ও নিজ দেশের মর্যাদার প্রসঙ্গে ছিলেন সজাগ ও অবিচল। তিনি ও ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম গোলক মজুমদারকে বলেছিলেন, এক স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরূপে তাঁদের যোগ্য মর্যাদায় গ্রহণ করলে পরেই তাঁরা ভারতে আশ্রয় নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। গোলক মজুমদার সেই কথা রেখেছিলেন। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর প্রধান রুস্তমজির মাধ্যমে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা (৪ এপ্রিল, ১৯৭১) করিয়ে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ সরকার গঠনে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করেছিলেন।
তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে গিয়ে তিনি ও তাঁর মতো অনেকেই আবিষ্কার করেছিলেন এক বিশ্বমাপের নেতাকে; প্রথম বাংলাদেশ সরকারের রূপকার ও সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের পরিচালক এবং প্রধানমন্ত্রীর পদবি ও পদের চেয়েও আকাশছোঁয়া মানবিক চেতনা ও আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এক বিনম্র মানুষকে; সাধারণের ভিড়ে এক অসাধারণকে।
তাজউদ্দীন আহমদ গোলক মজুমদারকে বলেছিলেন, ভারত যদি সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়, তিনি রিফিউজি ক্যাম্পে চলে যাবেন এবং সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবেন। ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন, স্বীকৃতি ছাড়া সার্বভৌমত্বের বন্ধুত্ব হয় না। তাঁরা যৌথ চুক্তি করেছিলেন যে স্বীকৃতির পরেই ভারতীয় সহায়ক বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে এবং যেদিন বাংলাদেশ সরকার মনে করবে সহায়ক বাহিনীর দেশে থাকার প্রয়োজন নেই, সেদিনই ভারতীয় বাহিনী প্রত্যাহার হবে। ১৯৭১ সালের ওই চুক্তি অনুসারেই ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করা হয়। ভিন্ন রাষ্ট্রে আশ্রয় ও তার সহযোগিতা গ্রহণের পরেও প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষায় তাজউদ্দীন আহমদের দূরদর্শী পদক্ষেপ ও বিচক্ষণতা বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত নবজাত বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী হিসেবেও তিনি প্রতিনিয়ত লড়েছেন বাংলাদেশকে পরনির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত করে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও বৈষম্যমুক্তরূপে গড়ে তুলতে।
ভিন্ন রাষ্ট্রে আশ্রয় ও তার সহযোগিতা গ্রহণের পরেও প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষায় তাজউদ্দীন আহমদের দূরদর্শী পদক্ষেপ ও বিচক্ষণতা বাংলাদেশের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
তাজউদ্দীন আহমদেরই সমবয়সী গোলক মজুমদার (জন্ম ৮ জুলাই, ১৯২৫), যিনি নিজেও ছিলেন এক অসাধারণ গুণী, বিনম্র, ইতিহাসচিহ্নিত ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশের দুঃসময়ের বন্ধু। এ বছরই তাঁর নব্বইতম জন্মবার্ষিকীর মাত্র দুই দিন আগে, ৬ জুলাই চলে গেলেন অমর্ত্যলোকে। তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায়। সে সময় তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা বইটির জন্য ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তিনি আমাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছিলেন। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি এটি পড়ে তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে তাঁর স্মৃতিচারণা ও অভিব্যক্তি নিজ হাতে লিখে তাঁর মেয়ের মাধ্যমে আমাকে পাঠিয়েছিলেন, যা ছিল ব্যক্তিগত ও ঐতিহাসিক আঙ্গিকে এক পরম পাওয়া। তাঁর লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হলো:
‘তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে আমার পরিচয় একাত্তরের সেই রক্তঝরা মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে। স্থিরচিত্ত ও স্বল্পভাষী এই মানুষটির ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ! তাঁর সত্যনিষ্ঠা ও স্বার্থ ত্যাগ সব রকম ষড়যন্ত্র ও প্রতিকূলতা কাটিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা সম্ভব করেছিল—যার নাম বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আস্থা ও আনুগত্য ছিল অকপট ও অবিচল...। বইটিতে কোনো অত্যুক্তি নেই, নেই কোনো উচ্ছ্বাস। প্রতিটি ছত্রে তাজউদ্দীন সাহেবের উজ্জ্বল উপস্থিতি অনুভব করি।’
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পরদিন ২২ বছরের তরুণ রাজনৈতিক কর্মী ও শিক্ষার্থী শোকাহত তাজউদ্দীন দিনলিপির পাতায় লিখেছিলেন, ‘সূর্য অস্তমিত হলো। এবং অস্তমিত হলো মানবতার পথের দিশারি আলোকবর্তিকা। তাহলে কি অন্ধকার নেমে এল? আলো এবং অন্ধকার। অন্ধকার এবং আলো। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। তারপরে তো সূর্যের কিরণ। ক্ষীণতনু নতুন চন্দ্র। কিন্তু তারপরে তো আনন্দময় পূর্ণচন্দ্রের আবির্ভাব। হতাশার শেষ তো আশাতে।...যে মানুষটির শোকে আজ আমরা মুহ্যমান, সেই মানুষটি তো অন্ধকারের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আলোতে পৌঁছেছিলেন। তাঁকেও তো অন্ধকারে আলোর অন্বেষণে উদ্বিগ্ন হতে হয়েছে। অথচ কী বিস্ময়! তিনি নিজেই তো ছিলেন একটি আলোকবর্তিকা। আলোককে কি তুমি ধ্বংস করতে পারো? আলোর কণিকা আমাদের কাছ থেকে বহু দূরে অবস্থিত হতে পারে। কিন্তু তাতে কী? ধ্রুবতারার দূরত্ব অকল্পনীয়। কিন্তু বিজন মেরুতে অভিযানকারীর সে–ই তো একমাত্র দিকনির্ধারক। যুগ থেকে যুগে।’
দিনলিপিটি লেখার সময় তরুণ তাজউদ্দীন জানতেন না যে একদিন তাঁর কাঁধে ন্যস্ত হবে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব। ঘাতকের গুলিতে প্রাণ দান করে তিনিও অমরত্ব লাভ করবেন। রূপান্তরিত হবেন পথনির্ধারক আলোকবর্তিকায়।
আমার সুগভীর বিশ্বাসের কথাটি আবারও উল্লেখ করি। বাংলাদেশ একদিন তার নিজস্ব প্রয়োজনেই খুঁজে নেবে তাজউদ্দীনকে। তাঁর জ্যোতির্ময় জীবনধারার অনির্বাণ আলোয় শিশুরা খুঁজে পাবে মুক্তির পথ।
তাজউদ্দীন আহমদের ৯০তম জন্মবার্ষিকীতে অজস্র শুভেচ্ছা। লাখো তারার দীপ্তিময় অভিবাদন।
সহায়ক গ্রন্থ
শারমিন আহমদ: তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা

সিমিন হোসেন রিমি সম্পাদিত তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি ১৯৪৭-৪৮। প্রতিভাস প্রকাশনা।
সিমিন হোসেন রিমি সম্পাদিত তাজউদ্দীন আহমদ: ইতিহাসের পাতা থেকে। প্রতিভাস প্রকাশনা।
তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা, লেখক: শারমিন আহমদ। ঐতিহ্য প্রকাশনা।
আদ্দিস আবাবা, ইথিওপিয়া
শারমিন আহমদ: তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা।

তাহলে কি শুধু আমাদের দেশেই হিজড়া সমস্যা?

পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে ঘুরেছি অনেক কিন্তু কোথাও হিজড়া দেখতে পাইনি তাহলে কি শুধু আমাদের দেশেই হিজড়া সমস্যা? তার মানে চিকিৎসার অভাব? নাকি উন্নত দেশগুলোতে ওদের গ্রহণ করার শক্তি আছে বলে ওখানে ওদের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হয় না। একটি শিশু জ্যানেটিকাল ক্রুটি নিয়ে জন্ম নেয়, কিন্তু সময়মত চিকিৎসার অভাবে সারাটি জীবন ধরে এক অবেক্ত অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। তার উপর সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁদেরকে আরও অসহায় করে দেয়। যে পরিবারটিতে জ্যানেটিকাল ত্রুটি নিয়ে একটি শিশু জন্ম নেয় তাঁরা সান্ত্বনা খুঁজে পায় না। লোকলজ্জার ভয়ে শিশুর চিকিৎসাটুকু ভালোভাবে করাতে পারে না। সামাজিক অসচেতনতায় অন্যরাও তাদেরকে সহজ ভাবে গ্রহণ করার পরিবর্তে হাস্য রসে মত্ত হয়। কিন্তু আমরা কখনো ভেবে দেখি না ওরাও মানুষ ওদেরও আমাদের মতো সুখ-দুঃখ আছে, আত্ম মর্যাদা আছে, প্রেম আছে। সব অনুভূতি গুলো পাওয়ার অধিকার ওদেরও আছে। কিছুদিন আগে একটা জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলে নাচের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে বিচারকরা একজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে নিয়ে প্রকাশ্যে হাস্যরসে মত্ত হল। উন্নত দেশ হলে ওই সমস্ত অবিবেচক বিচারকদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো তাঁদের নিচু মানসিকতার জন্য। শুধু আমাদের দেশ বলেই কেউ প্রতিবাদই করলো না। হয়তো আমরা জানিও না এটা অন্যায়। ওরাও মানুষ। ওদেরও প্রাপ্য সম্মানটুকু নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। আমদেরই অবহেলায়, অসচেতনটায়, অযত্নে সকলের অজান্তেই নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য অনেক ক্ষেত্রে ওরা একসময় দানব রূপে আবির্ভূত হতে বাধ্য হয়। তখন আমাদের টনক নড়ে। কিন্তু আমরা ভেবে দেখি না, আজকের ওদের এই পরিণতির জন্য কোন না কোন ভাবে আমরাও দায়ী। দেরীতে হলেও দেশে ওদের নিয়ে কাজ হচ্ছে এটা একটি ভালো পদক্ষেপ। ভবিষ্যতে আমরা ওদেরকে সমস্যা না ভেবে ওদের প্রতি সহানভুতিশীল হবো নিশ্চয়ই। ওরা তৃতীয় লিঙ্গ। প্রথম ও দ্বিতীয় লিঙ্গ কোনটি নারী কোনটি পুরুষ আমার জানা নেই। কিন্তু এই তিন লিঙ্গের মানুষের প্রতিই আমাদের মনুষ্যত্ব সমান থাকবে এই কামনা করি। সুত্র: প্রিয় ডটকম

আগাম নির্বাচনের কী দরকার! by এ কে এম জাকারিয়া

তুরস্কে নির্বাচন হয়েছে ৭ জুন। নির্বাচনে অংশ নিয়েছে ২০টি রাজনৈতিক দল। ফলাফলে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (একেপি) পেয়েছে প্রায় ৪১ শতাংশ ভোট, আসন ২৫৮টি। এরপরই আছে রিপাবলিকান পার্টি (সিএইচপি)। তারা ২৫ শতাংশ ভোট পেয়ে পেয়েছে ১৩২টি আসন। ৫৫০ আসনের পার্লামেন্টে বাকি আসনগুলো পেয়েছে অন্য দলগুলো ভাগাভাগি করে। সরকার গঠন করতে যেহেতু অন্তত ২৭৬টি আসনের দরকার, তাই একা সরকার গঠন করতে পারছে না একেপি। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী ৯ জুন পদত্যাগ করেছেন এবং তা প্রেসিডেন্ট গ্রহণও করেছেন। তবে নতুন সরকার না হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। একই সঙ্গে অবশ্য সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দল হিসেবে তিনি নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণও পেয়েছেন। ৪৫ দিনের মধ্যে কোনো দলের সঙ্গে মিলে সরকার গঠন করতে না পারলে আগামী নভেম্বর মাসে আবার নির্বাচন হতে পারে তুরস্কে।
তুরস্কে যদি নতুন বা আগাম নির্বাচন করতে হয়, তবে সেটা করতে হবে আইনগত বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে। কিন্তু বাংলাদেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর (যে নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পেয়ে ৩০০ আসনের পার্লামেন্টে এককভাবেই ২৪৩টি আসন পেয়েছে আওয়ামী লীগ) এখনই কেন আগাম নির্বাচন নিয়ে অঙ্ক কষা শুরু করল সরকার? (আগাম নির্বাচনের অঙ্ক কষছে সরকার, প্রথম আলো, ২৪ জুন)। বাংলাদেশে এ ধরনের আগাম নির্বাচনের উদ্যোগের পেছনে আইনগত বা সাংবিধানিক কোনো ব্যাপার-স্যাপার নেই। বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। সরকারের ভেতরে যদি সত্যিই এ ধরনের চিন্তাভাবনা শুরু হয়ে থাকে, তবে এর পেছনে কারণটি কী?
বাংলাদেশের ইতিহাসের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর একটি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন। এই নির্বাচনে অর্ধেকেরও বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, যেখানে জনগণকে ভোট দিতে হয়নি। প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত বিএনপি ও তার জোট এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি। এসব কারণে এই নির্বাচন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় এই নির্বাচনের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক খুঁজে পাওয়াও কঠিন। এমন একটি নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ও দলটির নেতারা মুখে যা-ই বলুন, ভেতরের খচখচ থেকে নিশ্চয় মুক্তি পাননি। সেই খচখচ থেকে এত দিনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, তাতে কি আগাম নির্বাচনের মলম লাগাতে চাইছে আওয়ামী লীগ? অথবা মুক্তি চাইছে ভাবমূর্তির পূর্ণগ্রাস থেকে? কিন্তু আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই এটা জানে যে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে একটি আগাম নির্বাচন দেওয়ার মানে দাঁড়াবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যে গ্রহণযোগ্য হয়নি, তা স্বীকার করে নেওয়া। তা-ই যদি হয়, তবে এখন আগাম নির্বাচনের যে অঙ্ক কষা হচ্ছে, সেই কাজটি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরপর করলে কী হতো? পানি এত ঘোলা করে কী লাভ হলো?
জনগণের কাছে এ ধরনের আগাম নির্বাচনের খবর বাড়তি কোনো আশা জাগায় না। খামোখা নির্বাচন করে পয়সা খরচ করার দরকার কী! টাকাটা অন্তত বাঁচুক!
৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ শুরুতে ‘নিয়ম রক্ষার নির্বাচন’ হিসেবে জায়েজ করতে চেয়েছে। এই নির্বাচনের পর বছর খানেক দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত ছিল। আর এই সময়েই আওয়ামী লীগ তার অবস্থান পাল্টে কঠোর থেকে কঠোর হতে শুরু করে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ওপর ভর করেই তারা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার আওয়াজ তুলতে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনের বর্ষপূর্তিতে এক হঠকারী আন্দোলনের সূচনা ঘটনায় বিএনপি। সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত দলটি কৌশল হিসেবে সাধারণ মানুষকে এর শিকারে পরিণত ও তাদের পুড়িয়ে মারার মতো বর্বরতার পথ ধরে। গণ-আন্দোলনের নামে এ ধরনের সন্ত্রাস ও নাশকতার পথ কাজে দেয় না, বিএনপির আন্দোলনও কোনো পরিণতি পায়নি। অনেকটা নাকে খত দিয়েই আন্দোলন থেকে সরে আসতে হয়েছে দলটিকে।
এখন আওয়ামী লীগ যে আগাম নির্বাচনের অঙ্ক কষছে তা কী বিএনপির বীভৎস আন্দোলনের ফসল? নিশ্চয়ই নয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, আওয়ামী লীগ কিছু পরিস্থিতি ও ঘটনার জন্য অপেক্ষা করছে। এর মধ্যে রয়েছে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে চলা অন্তত দুটি মামলার নিষ্পত্তি ও বিএনপিকে ভাগ করা। এসব সারা হলে ২০১৬ সালের শেষে অথবা ২০১৭ সালের শুরুতে নাকি আগাম নির্বাচন দেওয়ার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। এর মানে দাঁড়াচ্ছে বিএনপির চরম বেকায়দা দশা নিশ্চিত করা গেলেই একটি আগাম নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএনপিও এই মধ্যবর্তী বা আগাম একটি নির্বাচনের সম্ভাবনার কথা নিশ্চিত করেছে। দলটির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে সরকার আরও কিছু সময় কাটাতে চাইবে। কিন্তু আমরা মনে করি, সরকার মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য হবে।’ বিএনপি এ ধরনের আশা করতেই পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে সরকারকে ‘বাধ্য’ করার ক্ষমতা আপাতত বিএনপি বা তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের নেই। এবং সরকারও কোনো কারণে ‘বাধ্য’ হয়ে এই নির্বাচন দেবে না। আগেই বলেছি, আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত বাধ্যবাধকতাও নেই। আগাম নির্বাচন নিয়ে সরকারের এই ‘অঙ্ক কষা’ বা হিসাব-নিকাশটি একেবারেই রাজনৈতিক।
আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই আগাম নির্বাচনের চিন্তা–ভাবনা করে থাকে, তার পেছনের কারণটি সরকারের গা থেকে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের বাজে গন্ধ দূর করা। কিন্তু বিএনপিকে ভাগ করে বা ‘নতুন বিএনপি’ তৈরি করে অথবা খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের দণ্ড নিশ্চিত হওয়ার পর যদি আগাম নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা যে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের চেয়ে গ্রহণযোগ্য কিছু হবে, তার নিশ্চয়তা কী? আওয়ামী লীগের হিসাব-নিকাশের মধ্যে যদি রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো বিষয় না থাকে, তবে আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের চেয়ে ভিন্ন কোনো মর্যাদা পাবে বলে মনে হয় না। গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি ঝুলেই থাকবে।
বিএনপির বড় নেতাদের সবাই প্রায় বিভিন্ন মামলায় জেলে অথবা পলাতক। সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত এই দলটি আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবে, এমন কোনো ভয় সরকারের সামনে নেই। সবকিছুর ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও পরিষ্কার। এর ওপর যদি কোনো কোনো মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের দণ্ড নিশ্চিত হয়ে যায়, তাঁরা যদি নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হয়ে যান, তবে তো সব বাধাই দূর হবে। তখন আর নির্বাচনের কী দরকার! ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে তো সরকারের কোনো বাধা নেই।
নির্বাচন মানেই খরচ। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গণতন্ত্রকে নিচে নামিয়েছে। এখন আওয়ামী লীগ আগাম নির্বাচনের যে অঙ্ক কষছে, তা আর যা-ই হোক গণতন্ত্রের মান বাড়াবে বলে মনে হয় না। আমাদের মতো জনগণের কাছে এ ধরনের আগাম নির্বাচনের খবর বাড়তি কোনো আশা জাগায় না। খামোখা নির্বাচন করে পয়সা খরচ করার দরকার কী! টাকাটা অন্তত বাঁচুক!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

শ্রীলঙ্কায় আবার রাজাপক্ষে! by আলী রীয়াজ

মাহিন্দা রাজাপক্ষে
শ্রীলঙ্কায় কি একটি রাজনৈতিক সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে? নাকি স্বৈরতান্ত্রিক শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের ক্ষেত্রে যে বাধা-বিপত্তিগুলো থাকে, সেগুলো এখন সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হচ্ছে? নাকি যেকোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেসব অনিশ্চয়তা তৈরি করে, আমরা তা-ই প্রত্যক্ষ করছি? এসব প্রশ্নের কারণ এই নয় যে দেশের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং আগামী ১৭ আগস্ট নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গত ২৬ জুন দেশের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা অপ্রত্যাশিত ছিল না। কেননা, আগেই বলা হয়েছিল যে সংবিধানের কিছু সংশোধনী পাস করার পর পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচন করা হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পার্লামেন্ট ২৩ এপ্রিল ভেঙে দিয়ে জুন মাসে নির্বাচন করা হবে বলা হয়েছিল; সেই বিচারে পার্লামেন্ট ভাঙা হয়েছে অনেক দেরিতে। ফলে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার কারণে নয়, প্রশ্ন উঠছে এ কারণে যে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেসব ঘটনা ঘটছে এবং নির্বাচনের ফলাফলের সম্ভাব্য যেসব চিত্র উঠে আসছে, তাতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরির এবং রাজনীতির পশ্চাদযাত্রার আশঙ্কা এখন অনেকের মনেই দানা বাঁধছে।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মাইথ্রিপালা সিরিসেনা প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন যে রাজনৈতিক কাঠামোতে তিনি বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাবেন। সেই প্রতিশ্রুতিতে আস্থা রেখেই এ বছরের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন মাহিন্দা রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে সাধারণ ভোটাররা সিরিসেনাকে বিজয়ী করেছিলেন। নির্বাচনের পরপর রাজনীতিতে যতটা আশাবাদ লক্ষ করা গিয়েছিল, গত কয়েক মাসে তাতে যে ভাটার টান লেগেছে, সেটা শ্রীলঙ্কার রাজনীতি বিষয়ে উৎসাহীরা নিঃসন্দেহে অবগত আছেন। এটা ঠিক যে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হ্রাস করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সিরিসেনা ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাতে তিনি সফল। সংবিধানের ঊনবিংশ সংশোধনী প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যের সাংবিধানিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু এটাও ঠিক যে নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য প্রণীত বিংশতিতম সংশোধনী পার্লামেন্ট পাস করেনি। তাঁর প্রতিশ্রুত ১০০ দিনের পরিকল্পনার এক বড় অংশও তিনি বাস্তবায়ন করতে পারেননি। উপরন্তু তাঁর বিরুদ্ধেও আত্মীয়স্বজনকে সরকারি উচ্চপদে আসীনের অভিযোগ উঠেছে, দুর্নীতির প্রশ্নও এসেছে। কিন্তু এসবের চেয়েও বড় সমালোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে তাঁর সরকারের সাফল্য আশাব্যঞ্জক নয়। তামিলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার সময়, বিশেষ করে এই গৃহযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে, যেসব যুদ্ধাপরাধের ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নিতে তিনি উৎসাহ দেখাননি।
কয়েকটি বিষয় এখানে স্মরণে রাখা দরকার, সিরিসেনা দলগতভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষের দল শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টির (এসএলএফপি) সদস্য, তবে তিনি যখন তাঁর দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন, তখন তাঁকে সমর্থন জুগিয়েছিল প্রধান বিরোধী দল ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি (ইউএনপি) এবং তামিল নাগরিক ও দলগুলো। সিরিসেনা যেমন দল ত্যাগ করেননি, তেমনি সাবেক প্রেসিডেন্ট রাজাপক্ষেও দলেই আছেন, যদিও রাজাপক্ষে দলের নেতৃত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। সিরিসেনা যখন নির্বাচনে বিজয়ী হন, তখন পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল এসএলএফপি বা ফ্রিডম পার্টি, কিন্তু তিনি বিরোধী দলকে সরকার গঠনের আহ্বান জানান এবং রানিল বিক্রমা সিংহে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। সংবিধান সংশোধনীর জন্য প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন নিশ্চিত করতে মার্চ মাসে ফ্রিডম পার্টির ২৬ জনকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে ‘জাতীয় সরকার’ গঠন করেন প্রেসিডেন্ট সিরিসেনা। যেহেতু সবাই জানতেন যে এই পার্লামেন্ট ও মন্ত্রিসভা শিগগিরই ক্ষমতা থেকে সরে যাবে, সে কারণে এ নিয়ে কারোরই আপত্তি ছিল না। এই পটভূমিকায় ইউএনপির নেতারা আশা করেছিলেন যে তাড়াতাড়ি নির্বাচন হবে। তাঁদের আশা যে রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভ রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে তাঁরা পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভালো ফলাফল করতে পারবেন। ২২৫ সদস্যের পার্লামেন্টে তাঁদের আসন ছিল ৪০-এর মতো। আন্তর্জাতিক সমাজ, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো, তাড়াতাড়ি নির্বাচনের জন্য সিরিসেনার ওপর চাপ বহাল রেখেছিল।
সিরিসেনার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার সময় থেকেই ফ্রিডম পার্টির ভেতরে দুটি পরস্পরবিরোধী গোষ্ঠী জন্ম নেয়—একদিকে সিরিসেনা, অন্যদিকে রাজাপক্ষে। রাজাপক্ষে এখন এ রকম ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে তিনি দলের হয়ে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রার্থী হতে চান। তাঁর প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে ফ্রিডম পার্টির নেতৃত্বাধীন জোটের সদস্য কয়েকটি দক্ষিণপন্থী দল। তিনি আশা করেন যে সিরিসেনা তাঁকে সমর্থন করবেন। কেননা, দল বিভক্ত থাকলে ফ্রিডম পার্টির বিজয় হওয়ার আশা নেই বললেই চলে। যদি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার আশায় দলের নেতারা একজোট হন, তবে তাতে রাজাপক্ষের গোষ্ঠীই সবচেয়ে লাভবান হবে। যদি ফ্রিডম পার্টি বিজয়ী হয় এবং রাজাপক্ষে প্রধানমন্ত্রী হন, তবে দল ও সরকার কোনোটার ওপরই সিরিসেনার নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। শুধু তা-ই নয়, তামিলদের সঙ্গে রিকনসিলিয়েশন বা বিরোধ মেটানোর বিষয়, যে ক্ষেত্রে গত কয়েক মাসে অগ্রগতি হয়েছে সামান্যই, তা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে বলাই ভালো। প্রাসঙ্গিকভাবে বলা দরকার যে তামিল টাইগাররা যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত হলেও বিশ্বজুড়ে তাদের যে নেটওয়ার্ক, সেটা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। আর নৈতিক বিবেচনায় একটি গণতান্ত্রিক দেশ কোনো অবস্থাতেই তার অতীত অপকর্মের দায় এড়াতে এবং সংখ্যালঘুদের তাদের অধিকারবঞ্চিত করে শাসন অব্যাহত রাখতে পারে না। সবার অংশগ্রহণমূলক ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের পথে শ্রীলঙ্কা গত তিন দশকে অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। আশা করা যায় যে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শ্রীলঙ্কার নাগরিকেরা সেই বার্তা দিতে চাইবেন না যে তাঁরা পেছনের দিকে হাঁটতে চান।
ইউএনপির নেতারা আশা করেন যে ফ্রিডম পার্টি তাদের তালিকায় রাজাপক্ষকে রাখবে এবং তা তাঁদের জন্য শাপে বর হয়ে দেখা দেবে। কিন্তু সেই আশা কতটা বাস্তববাদী, সেটাও প্রশ্নসাপেক্ষ। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইউএনপির সমর্থনপুষ্ট সিরিসেনা যে ৫১ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, তার সবটাই তাঁদের সমর্থকদের ভোট নয়, ফ্রিডম পার্টির একাংশও তাঁদের সঙ্গে ছিল। তা ছাড়া ধর্মভিত্তিক দক্ষিণপন্থী দল জাতিকা হেলা উরুমায়া (জেএইচইউ) সেই সময়ে তাঁদের সঙ্গে থাকলেও এখন দলটি ফ্রিডম পার্টির সঙ্গেই যাবে বলে ধারণা করা যায়। জনতা ভিমুক্তি পেরামুনা (জেভিপি) দুই দলের কারও সঙ্গে না গিয়ে নিজেদের প্রার্থী দেবে। দেশের উত্তর ও পূর্বে যে তামিলরা সিরিসেনাকে সমর্থন করেছিলেন, তাঁরা তামিল দল টিএনএকেই ভোট দেবেন। ফলে ইউএনপির কমপক্ষে ১৫ শতাংশ ভোট কম পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, রাজাপক্ষে যে ৪৭ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, তা তাঁর নিজস্ব এমন বলা যাবে না। যদি ফ্রিডম পার্টি একত্রও থাকে, তবু এর সবটাই তাঁর পক্ষে আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এই নির্বাচনের আরেকটি দিক হচ্ছে সময়ের প্রশ্ন। এই মুহূর্তে নির্বাচনের একটি অন্যতম কারণ হলো জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের আসন্ন রিপোর্ট। শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধের শেষ বছরগুলোয় সরকার ও তামিল যোদ্ধারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছিল কি না, যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কাউন্সিলের রিপোর্ট প্রকাশ করার কথা ছিল এপ্রিলে, কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকারের অনুরোধে তা ছয় মাস পেছানো হয়। এই রিপোর্টে সুনির্দিষ্টভাবে কারা যুক্ত ছিল, তা প্রকাশিত হতে পারে বলে বলা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের ওপরে চাপ তৈরি হবে। এই রিপোর্ট পেছানোর একটি উদ্দেশ্য ছিল দেশের রাজনীতিতে, বিশেষ করে নির্বাচনের ওপরে, তার প্রভাব ঠেকানো। এই রিপোর্ট প্রকাশিত হলে রাজনৈতিকভাবে রাজাপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে অনেকের ধারণা। আবার কেউ কেউ এই মতও দেন যে জাতিসংঘের এই রিপোর্টকে দেশের ওপরে বিদেশিদের হস্তক্ষেপ এভাবে দেখিয়ে, সিনহালা জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা তৈরি করে রাজাপক্ষে আবারও ক্ষমতায় ফিরতে পারেন। এখন দুই সম্ভাবনা থেকেই নির্বাচনকে মুক্ত রাখা যাবে।
যেভাবেই বিবেচনা করা হোক না কেন, ১৭ আগস্টের নির্বাচন পর্যন্ত শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতে উত্তেজনা থাকবে, থাকবে অনিশ্চয়তা। সেই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে নির্বাচন দেশকে কোন পথে নেবে, ভোটাররা শ্রীলঙ্কার জন্য কী ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন?
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

স্ত্রীর চোখ তুলে নিল পাষণ্ড স্বামী: যৌতুকই কারণ by মানসুরা হোসাইন ও অরূপ রায়

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মেয়ে সুখির
শয্যাপাশে মা l ছবি: প্রথম আলো
‘সুখীকে যখন লোকজন হাসপাতালে নিয়া আসে, তখন তাঁর দুই চোখ দিয়া রক্ত গড়াইয়্যা পড়ছিল। সুখীর সঙ্গে থাকা লোকজন কাগজে করে উপড়াইয়্যা ফেলা চোখ আনছিল। সেই চোখ আমরা অনেকেই দেখছি। অনেকে মোবাইলে ছবিও তুলছে।’
রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে কর্মরত আনসার কমান্ডার আবুল কাশেম সুখীকে হাসপাতালে আনার মুহূর্তটি এভাবে বর্ণনা করেন।
ঈদের আগের দিন শুক্রবার গৃহবধূ সুখীর এক চোখ উপড়ে ফেলে স্বামী ও তার স্বজনেরা। সুখীর মা লায়লা বেগম গতকাল সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডাক্তাররা মাইয়্যার উপড়াইয়্যা ফেলা চোখ বোতলে ভইরা রাখছে। তা দেইখ্যা খুবই খারাপ লাগছে।’
ঘটনাটি ঘটে সাভারের জিঞ্জিরা এলাকায়। ভাড়া বাসায় সুখীর স্বামী রবিউল, তার দুই ভাই ও এক বোন মিলে ইলেকট্রিক টেস্টার দিয়ে মেয়েটির এক চোখ উপড়ে ফেলে। আরেক চোখেও প্রচণ্ড আঘাত করা হয়। সুখীর চিৎকারে এলাকাবাসী এগিয়ে এসে তাঁকে উদ্ধার করেন এবং জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পঞ্চম তলায় ফিমেল ওয়ার্ডে ভর্তি করান। সুখী এখন চিকিৎসাধীন। এলাকাবাসী সুখীকে উদ্ধারের পর রবিউলকে তুলে দেন সাভার থানা-পুলিশের হাতে। সুখীর পরিবার বাদী হয়ে মেয়ের স্বামীসহ তিনজনকে আসামি করে মামলা করেছে। রবিউল এখন কারাগারে।
সুখী প্রথম আলোকে ক্ষীণ কণ্ঠে বলেন, ‘টাকা দেওনের লাইগ্যা আগে থেইকাই মারধর করত। রোজার দিন। আমার মেয়েরে দোকানে পাঠাইয়্যা দেয়। প্রথমে আমার হাত বান্ধে। প্রথম ভাবি, আজকেও মারব। কিন্তু ওর দুই ভাই ও এক বইনও যখন আমারে ধরে, তখন বুঝি অন্য কিছু করব। কিন্তু হাত ও মুখ বান্ধা থাকার কারণে কথা কইতে পারি নাই। টেস্টার হাতে নেয়। এক চোখ যখন তুইল্যা ফালাইছে তখন দিগ্বিদিক হইয়া অনেক জোরে চিৎকার দেই। ঘরের এক জানালা ভাঙা ছিল। পাশেই ছিল মসজিদ। জুমার নামাজ পড়তে আসা লোকেরা ও বাড়িওয়ালি আমারে উদ্ধার করছে বইল্যা শুনছি। চোখ তুইল্যা ফালানোর পরই আমি অজ্ঞান হইয়া পড়ি। এখন আরেক চোখের দুই পাতা একটু খুলতে পারি। কিন্তু কিছু দেহি না।’
এক যুগ আগে বিয়ে হয়েছে সুখী আক্তারের (২৪)। এ ঘটনার পর সাভার থানা-পুলিশের এক সদস্য ফোন করে সুখীর মাকে ঘটনার কথা জানান। তারপর থেকে পুরো পরিবারের দিশেহারা অবস্থা। তাদের ঈদ কেটেছে হাসপাতালে। সুখীর সাত বছর বয়সী মেয়েকেও প্রথমে সুখীর শ্বশুরবাড়ির লোকজন আটকে রেখেছিল। পরে তাকে আনা হয়েছে। সুখীর শ্বশুরবাড়ি ঢাকার সিঙ্গাইর থানায়। আর সুখীর বাবার বাড়ি নবাবগঞ্জ উপজেলায়।
সুখীর মা জানালেন, মাত্র মাস খানেক আগে মেয়ের স্বামী বিদেশ থেকে ফিরেছে। সুখীর বাবা-মা একবার তিন লাখ টাকা দেন বিদেশ যাওয়ার সময়। এবার বিদেশ থেকে একেবারে চলে এসেছে বলে জানায় মেয়ের স্বামী। আসার পর আবার স্ত্রীর কাছে দেড় লাখ টাকা দাবি করে। মেয়ে বেশির ভাগ সময় বাবার বাড়িতেই থাকত। এর আগেও মেয়েকে মারধর, ঘরে বন্দী করে রাখা, খাবার না দেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে বিচার-সালিস হয়েছে। সুখীর বাবা-মা অনেকবার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন, মেয়েকে আর শ্বশুরবাড়ি পাঠাবেন না।
সুখীর বাবা নূর মোহাম্মদ বিলাপ করে বললেন, ‘আমার চারটা ম্যায়া। এক পোলা। তাদের আমি কোনো দিন থাপড় দেই নাই। জানে খাইট্যা আমি মানুষ করছি। আর এহন এই ম্যায়ার যে অবস্থা করছে...। আমি এর বিচার চাই।’
এদিকে সাভার থানা-পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় রবিউল প্রথম আলোকে বলে, ‘স্ত্রীর অন্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে চোখ তুলে ফেলেছি। যাতে ও আর কাউকে দেখতে না পারে।’ তবে সুখীর বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা রবিউলের এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক জালাল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, সুখীর ডান চোখ তুলে ফেলা হয়েছে। সুখীকে যাঁরা হাসপাতালে ভর্তি করাতে এসেছিলেন, তাঁরা তুলে ফেলা চোখটি সঙ্গে করে এনেছিলেন। তাঁরা ভেবেছিলেন, চিকিৎসকেরা যদি তা আবার লাগাতে পারেন। আসলে তা করা সম্ভব নয়। সুখীর বাঁ চোখেও প্রচণ্ড আঘাত করা হয়েছে। এ চোখ দিয়ে কিছুটা দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। দেখতে পাবেই—তা বলা যাচ্ছে না।

মিয়ানমার থেকে দেশে ফিরেছেন ১৫৫ বাংলাদেশি

সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় উদ্ধার হওয়া আরও ১৫৫ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। আজ বুধবার বিকেল চারটায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) একটি প্রতিনিধি দল তাঁদের সঙ্গে নিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের ঘুমধুম সীমান্ত দিয়ে দেশে আসেন।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন বিজিবির কক্সবাজার ১৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. রবিউল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে এই ১৫৫ জনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এর আগে এই অভিবাসীদের ফিরিয়ে আনতে সকালে বিজিবির একটি প্রতিনিধি দল মিয়ানমারে যায়। দেশটির মংডু সীমান্তে সেখানকার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে তাঁদের পতাকা বৈঠক হয়। আর ওই বৈঠকেই ১৫৫ বাংলাদেশি অভিবাসীকে হস্তান্তর করা হয়।
বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলটি আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের মৈত্রী সেতু দিয়ে মিয়ানমারে যায় এবং অভিবাসীদের নিয়ে একই পথে তাঁরা ফিরে আসেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তোফায়েল আহমদ বলেন, একাধিক গাড়িতে করে অভিবাসীদের ঘুমধুম সীমান্ত থেকে কক্সবাজার শহরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আনা হচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগামীকাল বৃহস্পতিবার অভিভাবকদের কাছে তাঁদের হস্তান্তর করা হবে।
গত ৮ জুন প্রথম দফায় মিয়ানমার থেকে ১৫০ জন অভিবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। ১৯ জুন দ্বিতীয় দফায় ফিরিয়ে আনা হয় ৩৭ জনকে।
সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় উদ্ধার হওয়া আরও ১৫৫ বাংলাদেশি আজ দেশে ফিরেছেন। মিয়ানমারের মংডু সীমান্তে সেখানকার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন ডিপার্টমেন্টের সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পতাকা বৈঠকে ১৫৫ বাংলাদেশিকে হস্তান্তর করা হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা

মুম্বাইয়ে সিরিজ বোমা হামলাঃ ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি ৩০ জুন!

ইয়াকুব মেমন
১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ পশ্চিম ভারতের
বন্দরনগরী মুম্বাইয়ে সিরিজ বোমা হামলা
চালানো হয়। এতে নিহত হন ২৫৭ জন।
ঘটনার চার দিন পর বোমা বিস্ফোরণে
ক্ষতিগ্রস্ত একটি সড়কের পাশ দিয়ে
যাচ্ছে একটি বাস। ফাইল ছবি: এএফপি
মুম্বাইয়ে সিরিজ বোমা হামলার দায়ে ইয়াকুব মেমনের ফাঁসি কার্যকর করতে আর কোনো বাধা নেই। তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্ট। ফলে আগামী ৩০ জুন তাঁর ফাঁসি কার্যকর হতে পারে বলে ভারতীয় কয়েকটি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। ১৯৯৩ সালে ​মুম্বাইতে ১৩টি সিরিজ বোমা হামলায় ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। ওই ঘটনায় এই প্রথম কারও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে।
মুম্বাইয়ের সন্ত্রাস-বিরোধী একটি আদালত ২০০৭ সালে ৫৩ বছর বয়সী মেমনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ১৩টি সিরিজ বোমা হামলার অর্থের জোগানদাতা ছিলেন মেমন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলেও হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট তা খারিজ করে দিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রাখেন। পরে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিও এ বছরের শুরুর দিকে তাঁর প্রাণভিক্ষার আবেদন নাকচ করেন। একই সঙ্গে মৃত্যুদণ্ডের তারিখ চূড়ান্ত করতে বিষয়টি মহারাষ্ট্রে পাঠান। কিন্তু মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনা করতে মেমন আবারও আবেদন করলে দেশের সর্বোচ্চ আদালত আজ মঙ্গলবার তা খারিজ করে দেন।
বর্তমানে মেমন নাগপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। নাগপুর কারাগারে বা পুনের ইয়েরওয়াদা কারাগারে তাঁর ফাঁসি কার্যকর হতে পারে বলে জানালেন কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক জুগেশ দেশাই।
সরকারের একটি সূত্র জানায়, মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফাদনাভিস এরই মধ্যে মেমনের ফাঁসির তারিখ ও সময় অনুমোদন করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি তাঁর পরিবারকেও জানানো হয়েছে।
মুম্বাই হামলার আরেক আসামি ইব্রাহিম মেমন ইয়াকুব মেমনের ভাই, যিনি টাইগার মেমন নামে পরিচিত। ওই হামলার পর থেকেই তিনি পলাতক।

‘রাজন রাজন আর্তনাদ’ বাইয়ারপাড়ে মানুষের ঢল by ওয়েছ খছরু

ঈদের আগের দিন অর্থমন্ত্রী গেলেন রাজনদের বাড়িতে। বললেন, ‘খুনিরা মানুষ নয়, জানোয়ার।’ আর ঈদের দিন দলে দলে লোকজনও গেলেন পরিবারকে সান্ত্বনা জানাতে। কিন্তু কোন সান্ত্বনাই মা লুবনার শোকাহত মনকে স্বস্তি দিতে পারেনি। আর বাবা আজিজুর রহমানও যেন পাগলপ্রায়। শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন। কোন ভাষা নেই মুখে। বুক ফেটে যে আর্তনাদটি বের হচ্ছে সেটি কেবল- ‘রাজন, রাজন।’ চোখের সামনেই রাজনের কবর। দুয়ার খুললেই চোখে পড়ে কবর। ঈদের দিন সকাল হতেই দুই হাত উপরে তুলে কবরের দিকে তাকিয়ে উঠোনে দাঁড়িয়ে আর্তনাদ শুরু করেন মা লুবনা। তার আর্তনাদে ঘুম ভাঙে বাইয়ারপাড়ের মানুষের। ছেলের কবরের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করতে থাকেন। বুক চাপড়ে বলেন, ‘রাজন উঠে আয়।’ হাতে থাকা জামা কাপড় দেখিয়ে বলেন, ‘ওই কাপড় পরে নামাজে যা। আমি ফিরনি সেমাই রান্না করবো। জামাত থেকে এসে খাবে।’ তার এই আর্তনাদের দৃশ্য দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না গ্রামবাসী। মাকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা যেন হারিয়ে ফেলেছেন সবাই। আর্তনাদ করে করে কাদামাখা উঠোনে শুয়ে পড়লেন মা। আর বাবা আজিজুর রহমান ছেলের কবরের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে পারলেন না। শুয়ে পড়লেন মাটিতে। ঈদের সকালে দুখিনী মা ও বাবার মুখে ছিলো রাজনের জন্য আর্তনাদ, হাহাকার। বলতে লাগলেন, ‘রাজন কবরে শুয়ে আছে। এতো কষ্টে ওর মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যু দেখার আগে কেন আল্লাহ আমাদের দুনিয়া থেকে তুলে নিয়ে গেলেন না।’ মা লুবনা প্রতিবেশীকে বললেন, ‘রাজন ওখানে কেমন আছে। কি করছে। খেতে আসবে না। মা বলে জড়িয়ে ধরবে না।’ রাজনের চাচারা ঈদের দিন দুপুরে মানবজমিনকে জানালেন, ‘ঈদের সকালে সকল শোক নেমে এসেছিলো আমাদের বাড়িতে। আমরাই বুক ধরাতে পারিনি। ওর মা বাবা কিভাবে বুক ধরাবে।’ ঈদের সকালে মাতমে পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়েন মা লুবনা ও পিতা আজিজুর রহমান। এ জন্য গ্রামের লোকজন তাদের দুই জনকে দুই ঘরে রেখে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করেন। এদিকে, সকাল হতেই রাজনদের বাড়িতে ঢল নামে সাধারণ মানুষের। প্রথমে গ্রামে নারী-পুরুষরা দলে দলে গিয়ে হাজির হন রাজনদের বাড়িতে। পুরুষরা দল বেঁধে রাজনের কবর জিয়ারত করেন আর অঝোরে কাঁদেন। দুপুর হতেই সিলেট শহর থেকে দলে দলে মানুষ যান রাজনের বাড়িতে। দুপুরের দিকে শ’ শ’ মানুষের উপস্থিতিতে শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করে রাজনের বাড়িতে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি সহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতারা রাজনদের বাড়িতে গিয়ে তার শোকাহত মা ও বাবাকে সান্ত্বনা জানান। এ কারণে গোটা দিনই রাজনের জন্য হাহাকার চলে রাজনের বাড়িতে। বিএনপি নেতা আব্দুল মোক্তাদির, কয়েস লোদি সহ অন্যরা রাজনের বাড়িতে শোক জানাতে গিয়ে চোখের জল সংবরণ করতে পারেননি। তারা খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। ঈদের আগের দিন রাজনের বাড়িতে যান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। এ সময় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘শিশু রাজনকে  পৈশাচিকভাবে নির্যাতনে যারা হত্যা করেছে তারা মানুষ না, জানোয়ার। তাদের বিচার নিশ্চিত করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘রাজন হত্যার আসামি (কামরুল ইসলাম) সৌদি আরবে পালাতে সহায়তাকারী বদমায়েশদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘ঘটনার দিন এলাকাবাসী সোচ্চার হলে রাজনকে বাঁচানো সম্ভব হতো।’ তিনি এলাকাবাসী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্দেশে খুনিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়ার আহ্বান জানান। অর্থমন্ত্রী রাজনের ভাই সাজনের ভবিষ্যতের জন্য ৫ লাখ টাকার ফান্ড গঠনের ঘোষণা দেন। এ সময় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সিলেট সদর উপজেলা পরিষদ  চেয়ারম্যান আশফাক আহমেদ সহ সিনিয়র নেতারা উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, নিহত রাজনের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজির সময় সিলেট শহর থেকে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নগরীর তালতলাস্থ কে এস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান লটারি বিক্রি করছিল। কিন্তু কোন ধরনের অনুমতি না ছাড়াই লটারি বিক্রি করায় শুক্রবার রাতে দুইজনকে আটক করে পুলিশ। আটককৃতরা হলেন- নগরীর কুয়ারপাড় ৭৭ নং বাসার বাসিন্দা মৃত নেছার আহমদের ছেলে মামুন (২৪) ও মতিয়ার (২৫)। বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এসআই নজরুল ইসলাম জানান, রাতে নগরীর তালতলাস্থ কে এস এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নির্মমভাবে খুন হওয়া রাজনের নাম ভাঙিয়ে ২টি রিকশা দিয়ে লটারি বিক্রি করছিল। প্রতি টিকিটের মূল্য নিচ্ছিল ২০ টাকা করে। লটারি বিজয়ীদের মধ্যে ৫ জনকে পুরস্কৃত করা হবে বলে তারা ঘোষণা দিচ্ছিল। এর মধ্যে প্রথম পুরস্কার রয়েছে ১টি মোটরসাইকেল, ২য় পুরস্কার ১৪ ইঞ্চি একটি টিভি, তৃতীয় পুরস্কার ১টি বাইসাইকেল, ৪র্থ পুরস্কার ১০টি মোবাইল ও পঞ্চম পুরস্কার একটি ফিল্টার। তিনি আরও জানান, রাজনের নামে লটারি বিক্রির  কোন অনুমতি না থাকায় কে এস এন্টারপ্রাইজের পরিচালক মামুন ও  মতিয়ার নামের আরো একজনকে আটক করা হয়েছে। এছাড়াও রিকশা দুটি জব্ধ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন নজরুল। নিহত রাজনের নাম ভাঙ্গিয়ে লটারি বিক্রির কথা জানতে পেয়ে তার বাবা আজিজুর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলের নাম ভাঙ্গিয়ে  যে বা যারা টাকা তুলছে তাদের আমি চিনি না।’ এটা একটি প্রতারণা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের প্রতারকদের আটক করতে হবে। কারণ আমি কোন টাকা চাই না। আমি আমার ছেলে হত্যার বিচার চাই।’ রাজন খুনের নির্মম ঘটনা ভুলতে পারছে না সিলেটবাসী। এলাকার মানুষ একের পর এক খুনিদের ধরে পুলিশে দিয়েছে। আর প্রতিবারই তারা উল্লাস করেছে। ক্ষোভ ঝেড়েছে পুলিশের দিকেও। ওদিকে, খুনিদের গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে হচ্ছে মানববন্ধনও। ঈদের আগের দিন নগরীর তালতলায় ব্যবসায়ীরা বিশাল মানববন্ধন করেছেন। আর গতকাল বিক্ষোভ করেছে স্বপ্ন পূরণ সমাজ কল্যাণ সংঘ ও বৃহত্তর বাগবাড়ী পশ্চিম কাজলশাহবাসী। এ সময় নগরীর নরসিংটিলা এলাকায় বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। হাজী মখন মিয়ার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক রকিব খান এবং মিসবাহ উজ্জামানের যৌথ পরিচালনায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন, ৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আমজাদ হোসেন এবং বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন এলাকার বিশিষ্ট মুরব্বি তৈয়বুর রহমান।

সরল-বিধ্বংসী মুস্তাফিজ by তারেক মাহমুদ

মুস্তাফিজুর রহমানের হাততালি এখন রীতিমতো আলোচনার বিষয়। উইকেট পেলে কখনো শূন্যে লাফিয়ে ওঠেন, কখনো উদ্বাহু হয়ে শরীর ঝাঁকান। তা উদ্যাপন যেভাবেই হোক, শেষটা করেন দুটো হাততালি দিয়ে। সহজ-সরল এই উদ্যাপনে কতজন কত কিছু যে খুঁজে পাচ্ছেন!
কেউ বলেন, ও নতুন। উইকেট পাওয়ার আনন্দ কীভাবে উদ্যাপন করতে হয় এখনো বুঝে ওঠেনি। একটু সময় দিতে হবে।
কেউ খুঁজছেন সারল্য। একটা ছেলে কতটা সহজ-সরল হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসেও উইকেট পাওয়ার উদ্যাপনটাকে আন্তর্জাতিক মানের করতে পারেনি!
আরও কত কিছু! তবে সব ধারণার মধ্যেই ‘কমন’ একটা ব্যাপার থাকছে। মুস্তাফিজের সারল্য। কে কী ভাবছে সেটা না ভেবে মনের আনন্দে উল্লাসে মাতার বেখেয়াল। সতীর্থদের কাছ থেকে জানা যাচ্ছে, ড্রেসিংরুমেও মুস্তাফিজ যথেষ্টই সপ্রতিভ। অথচ সেই মুস্তাফিজ সংবাদ সম্মেলনে কী যে আড়ষ্ট! উল্টো দিকে থাকা টেলিভিশন ক্যামেরাগুলো যেন একেকটা বন্দুকের নল! সাংবাদিকেরা নল তাক করে তাঁর কাছ থেকে কথা আদায়ের চেষ্টা করছেন।
এই চিত্র জাতীয় দলে আসার পর তাঁর প্রথম দুই সংবাদ সম্মেলনের। কালকের সংবাদ সম্মেলন সেসবের সঙ্গে পুরোপুরি মিলল না। অনেক সাংবাদিকের মতে ব্যবধানটা ‘আকাশ-পাতাল।’ এই পরিবর্তনের একটা প্রেক্ষাপট আছে। দিনের খেলা শেষে প্রথমে হলো দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে একমাত্র ফিফটি করা টেম্বা বাভুমার সংবাদ সম্মেলন। ওই সময় মাঠে বসে মুস্তাফিজকে বেশ খানিকক্ষণ পরামর্শ দিলেন বিসিবির মিডিয়া ম্যানেজার রাবীদ ইমাম। কান পেতে যা শোনা গেল, তাতে মূল বার্তা একটাই—অনেক সময় কিছু প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে হয়। তবে আজ (গতকাল) ভালো খেলেছ। এমন দিনে প্রাণ খুলে কথা বলবে।
ওই টোটকাই হয়তো একটু বদলে দিল মুস্তাফিজকে। যেখানে ‘আজ কি একটু বেশি জোরে বল করতে চাইলেন’ প্রশ্নে সাবলীল উত্তর, ‘আরে, শরীর ভালো থাকলে সবই ভালো হয়।’
তবে সংবাদ সম্মেলনে যে তিনি আসলেই ‘আকাশ-পাতাল’ বদলে গেছেন, তা নয়। আগে যে কথা এক লাইনে সেরেছেন, সেটা কাল দুই-তিন বাক্যে বলেছেন, এই আরকি। উদাহরণ দিলে আরও পরিষ্কার হবে—
ওয়ানডে অভিষেক ম্যাচে পাঁচ উইকেট পেয়েছিলেন। টেস্ট অভিষেকে পেলেন চার উইকেট। কোনটাকে এগিয়ে রাখছেন?
মুস্তাফিজ: ওয়ানডে এক রকম, টেস্ট এক রকম। এগিয়ে থাকার দিক দিয়ে টেস্টটাই...। ওয়ানডেতে যা-ই করি না কেন, সবাই রান করার চেষ্টা করে। টেস্টে সহজে উইকেট পাওয়া যায় না।
চার উইকেটের মধ্যে কোনটা পেয়ে বেশি ভালো লেগেছে? হ্যাটট্রিক না পাওয়ায় আফসোস আছে নিশ্চয়ই...
মুস্তাফিজ: হাশিম আমলার প্রথম উইকেটটা। হ্যাটট্রিকের চেষ্টা ছিল। যেভাবে বল করতে চেয়েছিলাম, সেটাই হয়েছে। কিন্তু হ্যাটট্রিক হয়নি।
টেস্ট না ওয়ানডে, কোনটা বেশি চ্যালেঞ্জিং?
মুস্তাফিজ: টেস্টটাই বেশি কষ্ট।
তবে মুস্তাফিজ মাঝে মাঝে কম কথায় আসল বক্তব্যটা দিতে পারছেন, এটাও বড় পরিবর্তন। অভিষেক টেস্টে নতুন বলে অভিজ্ঞ কাউকে সঙ্গী পাননি। ক্যারিয়ারের মাত্র চতুর্থ টেস্ট খেলতে নামা মোহাম্মদ শহীদের সঙ্গে জুটি সম্পর্কে বললেন, ‘পরিকল্পনা ছিল ডট বল বেশি করা। ডট বল বেশি হলে ওরা একটা পর্যায়ে রান নেওয়ার চেষ্টা করবে। তখন উইকেটও আসবে।’
এমন কোনো মহাকাশবিজ্ঞান নয়। তবে প্রথম টেস্টেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাফল্যকে কৃতিত্ব দিতেই হবে। তা ছাড়া ওয়ানডেতে বিস্ময় ছড়ানো অফ কাটার কমিয়ে এনে যেভাবে অন্য অস্ত্রগুলো ব্যবহার করলেন, শুরুতেই অনেক কিছু বুঝে ফেলার প্রমাণ তাতেও। অভিষেক টেস্টের প্রথম স্পেলটা (৫-০-২০-০) অবশ্য মনমতো হয়নি মুস্তাফিজের। ভয়ংকর হয়ে উঠলেন ৪ ওভারের তৃতীয় স্পেলে। ৬ রান দিয়ে দুই মেডেনসহ ৩ উইকেট, সেটাও হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনা জাগিয়ে মাত্র চার বলের মধ্যে! হঠাৎ বিধ্বংসী হয়ে ওঠার রহস্য ফাঁস করলেন নিজেই, ‘লাঞ্চের সময় কোচ আমাকে ডেকে প্রথম স্পেলের বোলিং দেখালেন।’ স্বল্পভাষী মুস্তাফিজ আর কিছু না বললেও সাংবাদিকেরা বুঝে নিলেন, ভুলগুলো শুধরে নিয়েছিলেন তখনই।
কিন্তু এভাবে বুঝে নেওয়া আর কত! সংবাদ সম্মেলন শেষে মাঠ পাড়ি দিয়ে ড্রেসিংরুমে যাওয়ার পথেও তাই মুস্তাফিজের পিছু পিছু সাংবাদিকদের দল। খোলা আকাশের নিচে যদি আরেকটু প্রাণখোলা হন! হলেন এবং তাতে বেরিয়ে এল মাঠের মুস্তাফিজও—
—উইকেটগুলো কি খুব সহজে পেয়ে যাচ্ছেন?
মুস্তাফিজ: ওপরওলা দিচ্ছেন, তাই সহজ হয়ে যাচ্ছে।
—তৃতীয় উইকেটটা পাওয়ার পর কেমন লাগছিল?
মুস্তাফিজ: তা কি আর বলা লাগে...!
কথা শেষ না হতেই হঠাৎ সেই হাততালি। সারল্যের মধ্যেই ফুটে উঠল বিধ্বংসী মুস্তাফিজের চেহারা।
উইকেট পাওয়ার পর সতীর্থদের আনন্দের মধ্যমণি হবেন—মুস্তাফিজুরের জন্য গত কিছুদিনে এটি নিয়মিত অভিজ্ঞতাই। এই ছবিটি ডিআরএসে ডুমিনির আউট নিশ্চিত হওয়ার পর। আগের বলটিতেই হাশিম আমলাকে কটবিহাইন্ড বানিয়ে টেস্টে প্রথম উইকেট পেয়েছেন বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসার l প্রথম আলো

ঈদের আর্তনাদ by আবুল হায়াত

কাল প্রায় সারা রাত ধরে হয়েছে প্রবল বর্ষণ। সকালেও আঁধার চারদিক। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামবে। বারান্দায় এসে দাঁড়ানোর আগে অভ্যাসবশত সদর দরজার গোড়ার দিকে চোখটা গেল। পত্রিকার আশায়। তারপরই মনে পড়ল বন্ধ আজ পত্রিকা।
বারান্দায় দাঁড়িয়েই নিয়মমাফিক চোখ পড়ল সামনের ফাঁকা জায়গাটায়, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল আমার বন্ধু নীপবৃক্ষটি। বর্ষাকালটা দারুণ উপভোগ করতাম তার দিকে চেয়ে চেয়ে। সে যেন কথা বলত আমার সঙ্গে। তাকে কীভাবে নির্মূল করা হয়েছে, সে কাহিনি শুনিয়েছি আপনাদের এই কলামেই। জানি, সে আর ফেরার নয়। তবু মন খারাপ হয়। কষ্ট অনুভব করি।
আজ ঈদ। মন খারাপ করতে নেই। ঈদ শব্দের মানেই তো উৎসব। আজ উপবাস সমাপ্তির উৎসব। বড়ই আনন্দের উৎসব। সারা বিশ্বের মুসলিম আজ মেতে উঠবে আনন্দে। ধনী-দরিদ্র, ছোট-বড়, সুস্থ-অসুস্থ—সবাই আনন্দ করবে, এই তো ঈদ। কিন্তু—। হ্যাঁ, কদিন ধরে একটা ‘কিন্তু’ মনের মধ্যে খচখচ করছে। আজকের দিনটাতে সেটা তো থাকার কথা নয়। তবু ঢাকার আকাশের ভারী বর্ষণ মনটাকে ভারাক্রান্ত করল। কালও তো বিবিসির আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখলাম—বলছে, সপ্তাহ ধরে রোদ-বৃষ্টির খেলা চলবে। তাহলে এই আনন্দের সকালটায় আকাশ কেন গোমড়ামুখ করল। রোদ-ঝলমলে হলে কী হতো? জানি না কী হতো। তবে মন বলছে, আকাশ কাঁদছে, বেশ করছে। মনের যন্ত্রণা যখন মুখে প্রকাশ করার ক্ষমতা হারায়, চোখের পানি নিজে থেকেই উদ্গত হয়।
সেদিন আমি রাজনের খবরটা পড়তে পড়তে কেঁদেছি। অনেকক্ষণ বসে ছিলাম স্তব্ধ হয়ে। এও কী সম্ভব! মানুষ হতে পারে এত নিষ্ঠুর, এত নির্দয়? না, ভিডিও দেখতে পারিনি আমি। দু-চার সেকেন্ড দেখেই চোখ ফিরিয়ে নিয়েছি। না, দেখবও না কখনো।
আজ এখন নীপবনের অভাবটা যেমন মনটাকে মোচড় দিয়ে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে মনটা ছুটে গেল রাজনের বাড়িতে। ভেসে উঠল সিনেমার ট্রেলারের মতো কতগুলো ছবি।
আজ সবার আগে রাজন উঠেছে ঘুম থেকে। ঈদের আনন্দে বিভোর তার মন। কাজ নেই আজ। সবজি বিক্রি করতে যেতে হবে না। বাবাও যাবে না কাজে। গোটা পরিবার একসঙ্গে আনন্দে মেতে থাকবে। উদ্যাপন করবে ঈদ।
ভোরে উঠেই কাছাকাছি কোথাও থেকে ফুল সংগ্রহ করেছে, সাজিয়ে রাখছে পা-ভাঙা টেবিলে, একটা খুব পুরোনো জং ধরা ফুলদানিতে। মা ঘুম থেকে উঠে অবাক আনন্দে আপ্লুত হবে এই আশায় ফুল সাজিয়েই হইহই করে বাড়ির লোকদের ঘুম ভাঙাল সে। এই আনন্দে খেয়ালই করেনি—মা সেই রাত থাকতে উঠেই সেমাই রান্নায় ব্যস্ত। রাজন জর্দা-সেমাই পছন্দ করে তো। বাড়ির তরতাজা মোরগটা বেঁধে ফেলেছেন ভোরেই। রাজন অনেক দিন থেকেই মোরগের রান খেতে চাইছিল। আজ তার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করবেন মা।
বাবা কাল রাতেই ভালো খেপ পেয়েছিলেন, সেই টাকা দিয়ে একটি লাল টুকটুকে পাঞ্জাবি এনে লুকিয়ে রেখেছেন রাজনের জন্য। অবাক হয়ে ভাবেন এতটুকু ছেলে পড়াশোনার ফাঁকে কীভাবে আয়-রোজগার করে সংসারের হালে জোগান দিচ্ছে।
‘ওরে আমার মানিক রে।’ মা বলছেন ছেলের ফুল সাজানো দেখে। দোয়া করলেন মাথায় চুমু দিয়ে, ‘অনেক বড় হবি বাবা, মা-বাবার কষ্ট যে লাঘব করে, তার ভালো নিশ্চয় আল্লাহ করবেন।’
রাজন তো চুপচাপ থাকার ছেলে নয়। বাবার ঘুম ভাঙার আগেই তাঁর জামা-কাপড় এনে গুছিয়ে বাবার বিছানার ওপর রাখল। ছেঁড়া স্যান্ডেল জোড়া সুন্দর করে মুছে সাজাল চৌকির পাশে। কাল সবজি বেচে সামান্য লাভ থেকে আতর এনেছিল, সেটাও রাখল কাপড়ের পাশে। সঙ্গে টুপিটা। ওটাও কদিন আগে দরজিকে দিয়ে বানিয়ে রেখেছিল বাবার জন্য।
মা ছেলের এসব কাণ্ড দেখে মুখ টিপে হেসে চলে যান রান্নার চালায়। মনে মনে বলেন, ‘ছেলে মাশাল্লাহ বড় হয়ে গেছে।’
বাবা গোসল সেরে এসে এতসব আয়োজন দেখে আনন্দে জড়িয়ে ধরেন ছেলেকে বুকের মাঝে। ঝাপসা হয়ে আসে তাঁর চোখ।
‘বাবা রে, তোর ছোট্ট মনটাতে এত কিছু ভাবিস আমাদের জন্য!’ টুপ করে বাবার পা ধরে সালাম করে রাজন।
এবার খুশিতে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন বাবা। ছুটে আসেন মা। এ দৃশ্য তাঁকেও আপ্লুত করে। ছুটে আসে সবাই। খুশিতে মেতে ওঠে প্রত্যেকে। ঈদের খুশিতে। জমে ওঠে ঈদ-আনন্দ।
প্রচণ্ড হর্নের শব্দে ঘোর কাটে আমার। একটা রিকশার চাকা আটকে গেছে সামনের ডোবা রাস্তার লুকানো গর্তে। তাতেই একটি প্রাইভেট কারের চিৎকার। আমার কানে মনে হলো এ তো হর্ন নয়, রাজনের পরিবারের আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ছে যেন আকাশে-বাতাসে। সারা দেশের মানুষের অন্তরাত্মায়।
আমি কাঁদছি এখন। জানি, অনেকেই কাঁদছেন আজ রাজনের জন্য। তার পরিবারের জন্য। প্রকৃতিও কাঁদছে সবার সঙ্গে। চারদিক ঝাপসা হয়ে এল বৃষ্টির দাপটে। ‘রাজন, তুমি আমাদের কখনো ক্ষমা কোরো না। আমরা ক্ষমার অযোগ্য।’ আমার আত্মাটা আর্তনাদ করে বলে উঠল।
১৮ জুলাই, ২০১৫
আবুল হায়াত: নাট্যব্যক্তিত্ব।

দ্বিতীয় দিনেও অচল ভারতের সংসদ, বিজেপির তিন শীর্ষ নেতার ইস্তফার দাবিতে অটল বিরোধীরা by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ললিত মোদি ও সরকারি চাকরিতে নিয়োগ-সংক্রান্ত ‘ব্যপম’ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে ভারতে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির তিন শীর্ষ নেতা-নেত্রীর ইস্তফার দাবিতে অটল বিরোধীকুল। সংসদের দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনও গতকাল বুধবার তারা ভন্ডুল করে দিল। সরকারপক্ষও অনড়। ললিত কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত থাকার কথা জানালেও পদত্যাগের প্রশ্নকে আমল দিতে সরকার রাজি নয়। ফলে অচলাবস্থা অব্যাহত।
বিজেপি দল ও সরকারের দাবি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এমন কোনো গর্হিত কাজ করেননি যে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে। রাজ্যসভার নেতা অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি গতকাল সংসদে বলেন, রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে এবং ব্যপম ঘটনায় অভিযুক্ত মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান সংসদের আলোচ্য হতে পারেন না। রাজ্য সরকারকে সংসদের আলোচনায় টেনে আনা হলে বিজেপিও কংগ্রেস-শাসিত রাজ্যগুলোর দুর্নীতি সংসদে টেনে আনবে।
সরকার ও বিরোধী পক্ষের এই বিবাদের মীমাংসার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত। ফলে সারা দেশে অভিন্ন কর কাঠামো (জিএসটি) সংক্রান্ত বিলসহ আর্থিক সংস্কারে প্রয়োজনীয় বেশ কয়েকটি বিলের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতিতে সুষমার টুইটার অ্যাকাউন্টের এক পরিবর্তন তাঁর ইস্তফার জল্পনাকে উসকে দিয়েছে। এত দিন তাঁর নামের পাশে ‘ভারত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী’ কথাটি লেখা থাকত। গতকাল লেখাটি দেখা যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্রের ব্যাখ্যা, এটি সুষমার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট। সুষমা নিজে কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
সুষমা স্বরাজ গতকাল বিজেপির সংসদীয় দলের বৈঠকে ললিত কেলেঙ্কারিতে তাঁর ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন। কোন পরিস্থিতিতে এবং কেন তিনি আইপিএলের সাবেক কমিশনার দেশত্যাগী ললিত মোদির বিদেশ সফরের জন্য যুক্তরাজ্য সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন তা তুলে ধরেন। অরুণ জেটলির কথায়, সুষমার ব্যাখ্যায় দল ও সরকার সম্পূর্ণভাবে সন্তুষ্ট। তাই তাঁর পদত্যাগের দাবি অযৌক্তিক। রাজ্যসভায় মুলতবি প্রস্তাব মেনে ললিত মোদিকে নিয়ে যেকোনো আলোচনায় তিনি যে প্রস্তুত, জেটলি তা জানিয়েও দেন। কিন্তু কংগ্রেসসহ অন্য বিরোধীরা তাতে সন্তুষ্ট হয় না। তাদের দাবি, আগে ইস্তফা, পরে আলোচনা।
বিরোধীরা গতকাল কালো ব্যাজ পরে হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে সংসদে ঢুকেছিলেন। প্ল্যাকার্ডগুলোতে ছিল সরকারের সমালোচনা করে বিভিন্ন কথা লেখা। প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিরোধীদের সভায় ঘুরতে বারবার বারণ করেন স্পিকার সুমিত্রা মহাজন।
কংগ্রেসের সুরে সুর মিলিয়ে মন্ত্রীদের ইস্তফার দাবি জানান বহুজন সমাজ পার্টির মায়াবতী, সিপিএমের সীতারাম ইয়েচুরি এবং সমাজবাদী পার্টিও। সুষমা একটা টুইটে জানান, রাজস্থান থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত কয়লা কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত সাবেক কংগ্রেসি সন্তোষ বাগড়োডিয়াকে কূটনৈতিক পাসপোর্ট দেওয়ার জন্য এক কংগ্রেস নেতা তাঁকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। দরকার পড়লে সেই কংগ্রেস নেতার নাম তিনি সংসদে প্রকাশ করবেন। কংগ্রেস সুষমার এ বক্তব্যকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
দুই বছর আগে বিজেপি যেভাবে কংগ্রেস-শাসিত সরকারের দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে সংসদ অচল করে রাখত, কংগ্রেস এখন ঠিক সেই ভূমিকাতেই অবতীর্ণ। পার্থক্য একটাই। মনমোহন সিংয়ের সরকার ছিল সংখ্যালঘু, নরেন্দ্র মোদির সরকারের গরিষ্ঠতা প্রশ্নাতীত।
ভারতীয় যুব কংগ্রেসের (আইওয়াইসি) কর্মীরা পুলিশি বাধার সামনে দাঁড়িয়ে সরকারবিরোধী স্লোগান দিচ্ছেন। দুর্নীতির অভিযোগে ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কয়েকজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত এবং তাঁদের পদত্যাগের দাবিতে নয়াদিল্লিতে পার্লামেন্ট ভবনের কাছে গতকাল ওই বিক্ষোভ হয় l ছবি: এএফপি

সিডনিতে ঈদ by হ্যাপি রহমান

প্রতি বছরের মতো ঘুরে ফিরে এবারও মুসলিম উম্মার জন্য আনন্দ ও খুশির বার্তা নিয়ে এল পবিত্র ঈদ উল ফিতর। চাঁদ দেখার ভিত্তিতে যথাযোগ্য মর্যাদা, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। অস্ট্রেলিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের মুসলমানেরা উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদ উদ্‌যাপন করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার বেশ কিছু জায়গায় ১৬ জুলাই শুক্রবার ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ১৭ জুলাই শনিবারও ইন্দোনেশিয়া, আফ্রিকা, সিঙ্গাপুর, ভারত ও বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের মুসলমানদের সবাইকে দেখা গেছে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে। স্থানীয় সময় ১৬ ও ১৭ জুলাই অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড, ক্যানবেরা, মেলবোর্ন ও পার্থসহ বিভিন্ন প্রদেশে বসবাসরত মুসলমানরা সপরিবারে নিকটস্থ মসজিদ ও খোলা মাঠে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করেন।
মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদকে ঘিরে সরকারি-বেসরকারিভাবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ছুটি থাকে না অস্ট্রেলিয়ায়। অমুসলিম প্রধান এই দেশে ঈদের জন্য আলাদা ছুটি না থাকলেও অধিকাংশ মুসলমানেরা প্রতি বছর দুই ঈদে ছুটি নেন। কেউ কেউ কর্মব্যস্ততার জন্য ছুটি নিতে পারেন না। তাদের আবার ঈদের নামাজ আদায় করেই ছুটে যেতে হয় কর্মস্থলে। অবশ্য এ বছর শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঈদ হওয়ায় কর্মদিবসের চেয়ে অনেক বেশি মুসলমানের সমাগম হয়েছে ঈদের জামাতগুলোতে। সিডনিতে বেশ কয়েক জায়গায় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। লাকেম্বার বড় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত। এ ছাড়াও সিডনি অলিম্পিক পার্ক, প্যারামাটা মসজিদ, লিভারপুল, ব্ল্যাক টাউন সাবাবের কুইকার হিলস জামে মসজিদের মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ঈদের জামাত। পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক নামাজের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
নামাজ শেষে চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রবাসে ঈদের অনুভূতি জানতে চাইলে আসাদ, মতি, মাজু, সঞ্জু, কবির, তুষার, শামিম, সালাউদ্দিন, মুনমুন ও তামান্না পৃথকভাবে জানালেন, যদিও এখানে পরিবার নিয়ে থাকি কিন্তু দেশের ঈদের আবেগটা অন্যরকম। দেশে প্রিয়জনদের খুব বেশি মিস করি। আত্মীয়স্বজন ছাড়া ঈদ করলেও পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ্য বিনিময়ও এই আনন্দ উৎ​সব প্রবাসীদের জীবনযাত্রায় এক পশলা বৃষ্টির মতোই সুখকর। পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে দেশটির প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট একটি ভিডিও বার্তায় অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত সকল মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানান।
(প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবি তুলেছেন ডা. আসাদ জামান)

পাহাড়ধসে আরও মৃত্যু- কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে কবে?

টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঘটনা হয়তো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনায় প্রতিবছর চট্টগ্রামে কিছু প্রাণহানিকে ‘স্বাভাবিক’ বিষয় বলেই মেনে নেওয়া হচ্ছে। তা না হলে বছরের পর বছর ধরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে কেন? টানা বৃষ্টির বিপদ ও ঝুঁকির বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষ বিবেচনায় নিলে শনিবার ঈদের রাতে পাহাড় ও দেয়াল ধসে পাঁচ শিশুসহ ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু এড়ানো যেত।
চট্টগ্রামে পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে অনেক ঘরবাড়ি গড়ে উঠেছে। মূলত নিম্ন আয়ের লোকজনই এখানে বসবাস করে। টানা বর্ষণের সময় এই ঝুঁকি চরমে পৌঁছায়। ২০০৭ সালে পাহাড় ধসে ১২৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বোঝা যায় সে ঘটনাও আমাদের টনক নাড়াতে পারেনি। পরের বছর (২০০৮) মারা গেছেন ১৪ জন। এরপর থেকে ২০০৯ সাল বাদ দিয়ে প্রতিবছরই পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ২০১১ সালে মারা গেছেন ১৭ জন আর ২০১২ সালে ২৮ জন। এ বছর ৬ জনের মৃত্যুর পর আবার পাহাড়ের পাদদেশ থেকে, ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর থেকে লোকজনকে সরানো ও উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়েছে। আমাদের প্রশ্ন, ঘটনার আগেই কেন এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলো না?
২০০৭ সালের পাহাড়ধসের ঘটনার পর একটি পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত সেই কমিটি এখনো কার্যকর রয়েছে। তখন পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাড়িঘর না রাখার সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো কার্যকর না হওয়া দুঃখজনক।
বছর বছর পাহাড় ধসে মৃত্যু এড়াতে দুর্ঘটনার পর বা মাঝেমধ্যে উচ্ছেদ অভিযান যে কাজ দেবে না, সেটা পরিষ্কার। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাড়িঘর নির্মাণ স্থায়ীভাবে বন্ধ করার বিকল্প নেই। একটি কার্যকর পরিকল্পনার আওতায় সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে যত সময় নেওয়া হবে, এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা ততই বাড়তে থাকবে।

রক্ষা করি পরিবেশ... by দ্বিজেন শর্মা

বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সম্প্রতি প্রথম আলোর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘রক্ষা করি পরিবেশ/গড়ি সোনার বাংলাদেশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে পরিবেশবিদ, বন কর্মকর্তা ও সুধীজনের প্রদত্ত ভাষণের নির্যাস নিম্নরূপ
ক. সরকার পরিবেশ সুরক্ষায় আন্তরিক। কিন্তু প্রভাবশালী কতিপয় পরিবেশনাশী ব্যক্তির দৌরাত্ম্যে সবকিছু ভন্ডুল হতে চলেছে। খ. পরিবেশবান্ধব অর্থনীতি ও জীবনমান উন্নয়ন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সমবেত উদ্যোগ। গ. টেকসই উন্নয়ন ধারণার বিকাশ ঘটান। ঘ. বন বিভাগের ওপর অত্যধিক কর্মচাপ এবং ফলত নানা ব্যর্থতা। ঙ. পরিবেশ ধ্বংস ও মনুষ্যবিলুপ্তির আশঙ্কা এক সমাবদ্ধ বাস্তবতা। এই বিজ্ঞ আলোচকদের নিয়েই এই পর্যালোচনা।
খ. কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তির দাপটে সরকারের পরিবেশ রক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়া অবিশ্বাস্য মনে হলেও এটাই আমাদের বাস্তবতা। এই ব্যক্তিবর্গ দেশের শিল্পপতি, যাঁরা প্রভূত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে সরকারকে স্বস্তিতে রেখেছেন। তাদের উৎপন্ন বর্জ্যের ব্যাপারে সরকারের পক্ষে কোনো কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া সংগত কারণেই যথেষ্ট কঠিন। কিছুদিন আগে এক দৈনিকে প্রকাশিত মিল্ক ভিটা কোম্পানির জনৈক কর্মকর্তার একটি লেখা পড়েছিলাম। তিনি একদা পরিবেশ অধিদপ্তরে কর্মরত ছিলেন এবং ‘অত্যুৎসাহবশত’ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বর্জ্য শোধনে গাফিলতির দায়ে বড় অঙ্কের অর্থ জরিমানা করেছিলেন। ফল হয়েছিল হিতে বিপরীত। অতঃপর নির্বাসন বহু দূরের মিল্ক ভিটা কোম্পানিতে, যার সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার কোনো সম্পর্ক নেই। এই হলো সরকারের পরিবেশ রক্ষা কর্মকাণ্ডের চালচিত্র।
আমরা এই বাস্তবতা ভুলে যাই যে প্রাথমিক পুঁজি সঞ্চয়কালে প্রকৃতিকে ছাড় দেওয়া একটি অবান্তর প্রশ্ন। এতে পুঁজিপতি ও সরকার উভয়েরই ক্ষতি। কবে এই পুঁজি সঞ্চয়ের কাল শেষ হবে এবং সরকার পরিবেশ রক্ষায় কঠোর হবে বোঝা দুষ্কর।
ঢাকার আশপাশের নদীগুলো ইতিমধ্যে বর্জ্যাগার হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে সারা দেশে এই ধারার শিল্পায়ন বাস্তবায়িত হলে দেশের পরিবেশের হাল কেমন হবে, তা সহজেই অনুমেয়। দেশ তখন মনুষ্য বসবাসযোগ্য থাকবে তো? আরেকটি সমস্যাও দৃশ্যমান। শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও আবাসন নির্মাণে আমরা প্রতিবছর ১ শতাংশ বা ততোধিক কৃষিজমি হারাচ্ছি। এই হার অব্যাহত থাকলে বা বৃদ্ধি পেলে শেষ পর্যন্ত কৃষি ও কৃষকের দুর্দশা কোথায় ঠেকবে, তা কেবল সরকারই জানে। অতি জনঘন দেশের নাজুক প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর সাবেকি উন্নয়নের চাপ কী ফল ফলাবে, বোঝা খুব কঠিন নয়। কিন্তু কীই–বা করার আছে? বিশ্বায়নের যুগে বিকল্প উন্নয়নধারা উদ্ভাবনের কোনো সুযোগ আমাদের নেই। খ. পরিবেশবান্ধব অর্থনীতিও তার দ্বারা জীবনমান উন্নয়ন আমাদের পরিস্থিতিতে একটি অলীক স্বপ্ন। পৃথিবীতে এমন দৃষ্টান্ত থাকলে আমার তা জানা নেই। সবুজ অর্থনীতি, সবুজ ব্যাংকিং ইত্যাকার প্রচারকে কেউ কেউ বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য ধোঁয়াশা ছড়ানোর কৌশল মনে করেন। তারা যে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, সে কথা নির্দ্ধিধায় বলা যাবে না।
আজকের উন্নত বিশ্ব উন্নত প্রযুক্তির দৌলতে এবং অনুন্নত দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটিয়েছে সত্যি, কিন্তু এই উন্নয়নের খেসারত দিতে দিতে গোটা জীবমণ্ডল এখন বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ওজোনস্তর ক্ষয়, বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি, সমুদ্রস্ফীতি ও জলবায়ু পরিবর্তন—এমন কয়েকটি বিপত্তির কথাই শুধু আমরা জানি, কিন্তু এগুলোর পরিসর ও অভিঘাতের যথার্থ স্বরূপ আমাদের অজানা। অতঃপর উন্নয়নশীল দেশের করণীয় কী? একজন বক্তা তো বলেই দিয়েছেন পশ্চিমা মডেলের উন্নয়নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগাল ধরতে উন্নয়নশীল দেশের জন্য আরও পাঁচটি পৃথিবীর সম্পদ প্রয়োজন হবে।
মানুষের দম্ভ যতটা আকাশচুম্বীই হোক সে কোনো প্রজাতি উৎপাদন করতে পারে না, অথচ নিয়তই অজস্র প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটিয়ে চলেছে। প্রকৃতি পারে দুটিই। মানবজাতি ধ্বংস হলে সেটা হবে তার কৃতকর্মের ফল, প্রকৃতি তার পুনর্জনন ঘটাবে না।
আরেকটি প্রশাসনিক প্রশ্নও জিজ্ঞাস্য: গোটা বিশ্ব সমপর্যায়ে শিল্পোন্নত হলে বাতাসে মানুষের জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেন থাকবে তো? উল্লেখ্য, উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বাসিন্দাদের অনুপাত ৩০:৭০।
গ. প্রকৃতির সঙ্গে সমঝোতামূলক টেকসই পরিপোষক উন্নয়নের ধারণাটি অন্তর্গতভাবে বিরোধপূর্ণ। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের লড়াই চলছে সভ্যতার সূচনা থেকে এবং তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ প্রকৃতিকে যদৃচ্ছা লুণ্ঠন করে তার জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটিয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি থেকে প্রত্যাঘাত আসার কোনো আশঙ্কা আমাদের ভাবনায় ছিল না। কিন্তু তাই ঘটেছে এবং প্রবল আকারে। এ থেকেই টেকসই বা পরিপোষক উন্নয়ন ভাবনার জন্ম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রকৃতির সঙ্গে সমঝোতার বাতাবরণ সৃষ্টিতে আমরা কতটা স্বাধীন? ক্যাপিটাল বা পুঁজি এ ক্ষেত্রে প্রধান স্টেকহোল্ডার, যা পুরোপুরি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। পুঁজি প্রকৃতির প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী এবং শিল্পসভ্যতার চালিকাশক্তি। পঁুজিহীন আধুনিক সমাজব্যবস্থা অকল্পনীয়। তাই পঁুজিকে মান্য করে টেকসই বা পরিপোষক উন্নয়ন আদৌ সম্ভব কি না, তা বলা কঠিন।
ঘ. বন বিভাগের আহরণমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ইদানীং প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব (অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল, জাতীয় বোটানিক গার্ডেন ইত্যাদি) ন্যস্ত হওয়ায় তাদের কর্মচাপ অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। বনাঞ্চলের মতো ব্যাপক পরিসরে আহরণ ও সংরক্ষণের মতো দুটি বিপরীতধর্মী কাজের সমন্বয় বিধান সত্যিই কঠিন। এমতাবস্থায় প্রকৃতিপ্রেমী তরুণদের নিয়ে একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা অবশ্যই ভাবা যেতে পারে। এসব সংস্কার সম্পন্ন হলে বন বিভাগের কর্মকাণ্ড বিরোধমুক্ত, স্বচ্ছন্দ ও অধিকতর ফলপ্রসূ হতে পারে।
ঙ. সশরীরে স্বর্গযাত্রায় ইচ্ছুক জ্যেষ্ঠ পাণ্ডব যুধিষ্ঠিরকে বকরূপী যমরাজ প্রশ্ন করেছিলেন, ‘জগতে সবচেয়ে আশ্চর্য কী?’ উত্তরে যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, ‘মানুষ তার চতুর্দিকে অহরহ অজস্রÊ মৃত্যু দেখে, কিন্তু সে আপন মৃত্যুর কথা ভুলে থাকে।’ আমরাও প্রতিনিয়ত প্রজাতিমৃত্যু দেখছি, কিন্তু নিজ প্রজাতির মৃত্যুর কথা ভুলেও ভাবি না। প্রজাতির জীবৎকাল প্রকৃতির সূক্ষ্ম ভারসাম্যে স্থিত, হেরফের ঘটলেই বিপন্নতা কিংবা বিনাশ। মৌমাছির মতো নগণ্য একটি পতঙ্গ বিলুপ্ত হলেও মানুষ বিপন্ন হতে পারে। আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ এসব ঘটনার গুরুত্ব বুঝতে আমাদের দীর্ঘ সময় লেগেছে। শতবর্ষ আগে বিজ্ঞানীরা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তাপধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেছিলেন, কেউ কর্ণপাত করেনি। বায়ুমণ্ডলে অতিসামান্য মাত্রায় বিদ্যমান এই গ্যাস আজ কী তুলকালাম কাণ্ডই না ঘটিয়ে চলেছে। প্রকৃতির ভারসাম্য পাল্টে আমরা নিজেদের কতটা বিপন্ন করেছি, সে হিসাব কে মেলাবে!
পরিশেষ: মানুষের দম্ভ যতটা আকাশচুম্বীই হোক সে কোনো প্রজাতি উৎপাদন করতে পারে না, অথচ নিয়তই অজস্র প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটিয়ে চলেছে। প্রকৃতি পারে দুটিই। মানবজাতি ধ্বংস হলে সেটা হবে তার কৃতকর্মের ফল, প্রকৃতি তার পুনর্জনন ঘটাবে না। লিসিয়াস মানুষের নামকরণ করেছিলেন হোমো স্যাপিয়েন্স, অর্থাৎ জ্ঞানী জীব। কিন্তু সে যথার্থ জ্ঞানী হতে পারেনি। তার মধ্যে স্বার্থপরতা ও প্রতিযোগিতা প্রবৃত্তির মাত্রা অত্যধিক। ধর্ম ও সংস্কৃতির শত ধৌতনেও এই মলিনত্ব ঘোচেনি। পঁুজি হলো এইসব প্রবৃত্তির মূর্তরূপ। পুঁজির প্রকোপ প্রশমনে সাফল্য লাভের ওপরই মানুষের জ্ঞানী হওয়ার সম্ভাবনা নিহিত। বলা বাহুল্য, কাজটি সুকঠিন।
দ্বিজেন শর্মা: প্রকৃতিবিদ, লেখক।

পাট খাতে লুটপাট -এই অবহেলা ও অদক্ষতার জবাব কী?

দ্রুত শিল্পায়নের লক্ষ্যে ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে। মন্ত্রী-নেতাদের কণ্ঠেও পাট খাতের সোনালি দিন ফিরিয়ে আনার কথা উচ্চারিত হয় বেশ জোরেশোরে। কিন্তু সাড়ে ছয় বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে, অদক্ষতা, অব্যবস্থা ও দুর্নীতির কারণে গোটা পাট খাতই ডুবতে বসেছে।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০১১-১৩ সালে রাষ্ট্রীয় খাতের বন্ধ হয়ে যাওয়া পাঁচটি পাটকল চালু করে। তখন এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়েছিল; অন্তত তারা পূর্ববর্তী তত্ত্বাবধায়ক কিংবা বিএনপি সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বন্ধ করেনি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে ‘সকলই গরল ভেল’।
প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, এই খাতের লোকসান কয়েক গুণ বেড়েছে। বন্ধ কারখানা চালু করার সময় যে ৩৫ হাজার শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তার ২২ হাজারেরই কোনো কাজ নেই। অথচ তাঁদের পেছনে বছরে খরচ হচ্ছে ২৫০ কোটি টাকা। এই বাড়তি শ্রমিকদের কারা নিয়োগ দিয়েছিলেন, কেন দিয়েছিলেন, সেই প্রশ্নের জবাব চাই। এ ছাড়া পাট কেনার জন্য সময়মতো অর্থ ছাড় না করানোয় বছরে আরও ৭০ কোটি টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে। ফলে গত তিন বছরে এই খাতে সরকারকে লোকসান দিতে হয়েছে ৭৭৬ কোটি টাকা; যার মধ্যে ২০১৪-১৫ অর্থবছরেই ৪৫০ কোটি টাকা।
এই অপচয়, অব্যবস্থা ও লুটপাটের জবাব কী? এর জন্য দায়ী প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিরা কি বরাবরের মতো পার পেয়ে যাবেন? রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলো এভাবে চলতে পারে না। হয় রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো ঠিকঠাকমতো চালান, নাহয় বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিন।
পাট খাতের অনিয়ম, অব্যবস্থা ও দুর্নীতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হোক। প্রতিমন্ত্রীর ১০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনায় ভরসা রাখা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে যেটি প্রয়োজন তা হলো পাট খাতের লুটপাটের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায় এই শিল্পে রক্তক্ষরণ চলতেই থাকবে।

তুরস্কে আত্মঘাতী বোমায় নিহত ৩১

তুরস্কের সুরুক এলাকায় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে গতকাল সোমবার আত্মঘাতী বোমা হামলায় কমপক্ষে ৩১ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বিস্ফোরণে প্রায় ১০০ জন আহত হন। জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট-আইএসের জঙ্গিরা ওই হামলা চালিয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
এএফপির খবরে জানানো হয়, হামলার সময় সাংস্কৃতিক-কর্মীরা সীমান্তবর্তী সিরীয় শহর কোবানেরবাসিন্দাদের জন্য ত্রাণ সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, আত্মঘাতী গাড়ি বোমা হামলায় ওই সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে বিস্ফোরণ ঘটে। পরে আগুন ধরে যায়। সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ওই শিক্ষার্থীরা আইএস জঙ্গি হামলায় বিধ্বস্ত কোবানে শহর পুনর্বাসনে সিরিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। বিস্ফোরণে প্রায় ১০০ জন আহত হয়েছেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান দেশটির উত্তরাঞ্চলের সাইপ্রাস এলাকায় সফর করছেন। তিনি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। এটিকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বলে নিন্দা জানান এরদোয়ান।
তুরস্কের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে সোমবার আত্মঘাতী বোমা হামলায় আহত হয়েছেন এই দুজন। একে অন্যের হাত ধরে যন্ত্রণার দুঃসহ মুহূর্ত পার করার চেষ্টা করছেন তাঁরা।। ছবি: এএফপি

ফ্রাসোঁয়া ওলাঁদের আমন্ত্রণে মুহাম্মদ ইউনূস

এলিসি প্রাসাদে মুহাম্মদ ইউনূসকে শুভেচ্ছা
জানান ফ্রাসোঁয়া ওলাঁদ l ছবি: ইউনূস সেন্টার
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া ওলাঁদের আমন্ত্রণে গত সোমবার নৈশভোজে যোগ দিয়েছেন নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্যারিসে অনুষ্ঠিত সামিট ফর কনশানস ফর দ্য ক্লাইমেটে যোগ দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ বক্তাদের সম্মানে প্রেসিডেন্টের বাসভবন এলিসি প্রাসাদে ওই নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় ইউনূস সেন্টার থেকে প্রাপ্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ খবর জানানো হয়।
আগামী ৩০ নভেম্বর থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্যারিসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন। এর পাঁচ মাস আগে সামিট ফর কনশানস ফর দ্য ক্লাইমেট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সামিটে অধ্যাপক ইউনূস ‘হোয়াই ডু আই কেয়ার’-সংক্রান্ত এক আলোচনায় যোগ দেন। এই সামিটের স্লোগানও এটি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মূল কারণ জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ব্যক্তি পর্যায়ে কমানোর আহ্বানেই এই আলোচনার আয়োজন করা হয়। আলোচনায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ ৫০০ জন যোগ দেন।

‘চাপ দিয়ে তামিমের কাছে সেরাটা পাওয়া যাবে না’ by রানা আব্বাস

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে বসেই আজ
ছোট ভাই তামিমের খেলা দেখলেন নাফিস ইকবাল,
কোলে শিশুপুত্র নামির। ছবি: রানা আব্বাস।
‘আপনার সঙ্গে তামিম ইকবালের ব্যাটিং দেখতে চাই’—মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রস্তাবটা শুনে হাসি মুখেই রাজি নাফিস ইকবাল। তবে জানালেন, আগামীকাল (আজ বুধবার) সকালে নিশ্চিত করবেন, খেলাটা কোথায় দেখবেন-বাসায় নাকি স্টেডিয়ামে। সকালে নিশ্চিত করলেন, স্টেডিয়ামেই দেখবেন।
দ্বিতীয় দিন সকালে ব্যাট হাতে নেমেছেন তামিম। প্রেসিডেন্টস বক্সে বসে ভাইয়ের খেলা দেখেছেন নাফিস। চোখে চশমা, পরনে টি-শার্ট, জিনস। দেখা হতেই বললেন, ‘চলেন ক্যাপ্টেনস বক্সে বসে কথা বলি। ওখানে তামিমের সবচেয়ে বড় ভক্ত বসে আছে। বাড়িতে এলে তার সঙ্গেই ও বেশি সময় কাটায়।’ কৌতূহলী দৃষ্টি দেখে নিজেই খোলাসা করলেন, ‘ভক্তের নাম নামির ইকবাল, আমার ছেলে।’ অবশ্য ক্যাপ্টেনস বক্সে উপস্থিত ছিলেন তাদের কয়েকজন নিকটাত্মীয়ও। লন্ডন ও দুবাই থেকে ঈদের ছুটি কাটাতে চট্টগ্রামে এসেছেন তারা।
তামিম সবে ইনিংস শুরু করেছেন, নাফিসের মনোযোগ একবার মাঠে আরেকবার প্রশ্নে। নাফিস-তামিম-দুজনের টেস্ট অভিষেক একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে-নিউজিল্যান্ড। টেস্টে প্রথম সেঞ্চুরি পেতে নাফিসের চেয়ে বেশি সময় লেগেছে তামিমের। নাফিস প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেয়েছিল ১২ ইনিংস পর আর তামিম ২০ ইনিংস। নাফিসের আগমনী বার্তা ছিল অসাধারণ। তবে যাত্রাটা দীর্ঘ হওয়ার আগে থেমে গেছে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। স্বপ্নযাত্রাটা থেমে যাওয়ার পেছনে বছর আটেক আগের চোটকেই দায়ী করেন নাফিস, ‘নিজের কিছুটা দুর্ভাগ্য তো ছিলই। বাজে একটা চোটে এক-দেড় বছর ক্রিকেটই খেলতে পারিনি। ওটাই একটা বড় গ্যাপ তৈরি করে দিল।’
দুই ভাইয়ের ব্যাটিংয়ে মূল পার্থক্য ছিল কোনটি? নাফিস খানিকটা সময় নিলেন। বললেন, ‘দুজন দুই ধরনের। আমার বেশি মনোযোগ ছিল টেকনিক্যাল দিকে আর তামিমের আক্রমণে।’ তবে তামিম কেবল আক্রমণ করেন না, সময়ের প্রয়োজনে উইকেট কামড়ে পড়ে থাকতেও জানেন। গত বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৪৭৩ মিনিটে ৩৩২ বল খেলে করেছিলেন ১০৯ রান। গত বছর কেন, ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়ে আজও তামিম খেললেন ধীরস্থির এক ইনিংস। দিনের শুরুতে ডেল স্টেইনকে পরপর দুই চার মেরে আক্রমণাত্মক হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, সেই তামিম ইনিংসের তৃতীয় চারটা মারলেন ১১১ বল পর। ১২৯ বলে খেলা ৫৭ রানের ইনিংসে চার ওই তিনটিই। তামিমের ব্যাটিংয়ে চোখ রেখে নাফিস বললেন, ‘ওর সবচেয়ে বড় দিক টেম্পারামেন্ট। রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক-দুভাবেই খেলতে পারে। একজন বড় খেলোয়াড় হতে গেলে এ গুণটা থাকা খুব জরুরি।’
নাফিসের যখন থমকে দাঁড়াল আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার, তামিমে শুরু তখনই। নিজেকে ফিরে পেতে একজন নাফিসের প্রতিছোট ভাইয়ের কী কোনো পরামর্শ ছিল? বললেন, ‘হয়তো মনে হতে পারে এক পরিবারে তিনজন টেস্ট ক্রিকেটার; ক্রিকেট নিয়ে বুঝি অনেক কথা হয়। আসলে তা নয়। আমরা ক্রিকেট নিয়ে খুব কম কথা বলি। খুব সমস্যায় পড়লে আকরাম চাচার কাছে যাই। কিছু টিপস নেওয়া বা ব্যাটিং নিয়ে কিছু কথা হয়। তবে পারিবারিক আড্ডায় ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা একদমই কম হয়।’
তামিমের ভেতর অসম্পূর্ণ স্বপ্নটা কী দেখেন নাফিস? প্রশ্নটা শুনে কিছুটা থমকে যান। একদৃষ্টিতে দেখেন ২২ গজে ছোট ভাইয়ের ব্যাটিং। কল্প দৃষ্টিতে তামিমের অপরপ্রান্তে কি নিজেকে আবিষ্কার করছেন? দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন, ‘এখনো ঘরোয়া ক্রিকেট খেলছি। অনেকে বলেন, দুই ভাইকে ওপেনিংয়ে দেখতে চাই। কখনো কখনো ভালো লাগে শুনতে। আবার খারাপও লাগে এ চাওয়াটা পূরণ করতে না পারায়। বাংলাদেশ দল যেভাবে পারফর্ম করছে, সুযোগ পাওয়াটা কঠিনই। বর্তমান স্কোয়াডে থাকা খেলোয়াড়দের মধ্যে এখন সুস্থ এক প্রতিযোগিতা। আর আমার স্বপ্নটা পূরণ না হলেও চাইব তামিম যেন টেস্টে ১০ হাজার রান করে। ও যদি ঠিকমতো খেলে এবং মানুষ যদি চাপ না দেয়, তবে অসম্ভবও নয়।’
‘মানুষের চাপ’? বলা মাত্র নাফিস যেন জমে থাকা ক্ষোভই উগরে দিলেন মুহূর্তেই। চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি ছড়িয়ে বললেন, ‘দুটো টি-টোয়েন্টি আর ওয়ানডেতে ভালো না করার পর ওকে বাদ দিতে চারদিক থেকে যে আলোচনা-সমালোচনা, ভীষণ অবাক হয়েছি। কদিন আগেই না এই তামিমের কাছ থেকেই দারুণ কিছু ইনিংস পেল বাংলাদেশ? দেখেন যেকোনো কাজেই কাউকে চাপ দিয়ে সেরাটা বের করা যায় না। হয়তো চাপে পড়ে এক-দুইবার ক্লিক করতে পারে। তবে চাপ দিলে সে ভালো খেলবে, এ ধারণাটা একদমই ভুল। এটা যদি ক্রমাগত চলতে থাকে, বাংলাদেশ অনেক বড় প্রতিভা হারাবে। একটু খারাপ খেললেই ফেসবুকে তামিমকে নিয়ে নানা বাজে কমেন্ট, গালিগালাজ! ’ নাফিস একটু থামেন। তাঁর প্রশ্ন, ‘কেন আমরা একটু সহনশীল হতে পারি না? বলছি না তাকে সাপোর্ট করতে হবে। তাকে কেবল তার মতো থাকতে দিতে হবে। তার নিজের খেলাটা খেলতে দিতে হবে।’
অনেকে বলবেন, সামাজিক যোগাযোগের সাইট না দেখলেই তো হয়। নাফিস অবশ্য একমত নন এ ব্যাপারে। মাথা ব্যথার জন্য নিশ্চয় মাথা কেটে ফেলাটা সমীচীন নয়। নাফিস তাই বললেন, ‘সবাই এখন সোশ্যাল মিডিয়াতে সক্রিয়। না থেকেও পারা যায় না। শচীন টেন্ডুলকার থেকে শুরু করে সবাই কম-বেশি সক্রিয় এ মাধ্যমে। ধরুন, ফেসবুক ব্যবহার করলাম না। তবুও দেখা গেল কোনো আড্ডা-আলোচনায় কেউ বলল, “দেখেছিস কী লিখেছে এটা”। কেউ না কেউ মনে করিয়ে দেবেই।’
তামিমকে বাইরে থেকে দেখে বিচার না করার অনুরোধ নাফিসের, ‘কেউ তারকা হয়ে গেলে তার সব কিছুর একটা সংবাদমূল্য তৈরি হয়। তখন খুব সাবধানে চলতে হয়। দেখা গেল, আড্ডার ছলে কিছু বলল, ওটাই ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। বাইরে থেকে অনেকে তামিমকে রাশভারী মনে করলেও আদপে সে তা নয়।। বরং পরিবার, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সে অনেক হাসি-খুশি, ঠাট্টা-রসিকতায় মেতে থাকে। আড্ডা খুব ভালো জমাতে পারে। যথেষ্ট আবেগী। বাইরে থেকে এটা বোঝা যায় না। কেউ মনে মনে কাঁদে, কেউ প্রকাশ্যে। তামিম প্রথমটির দলে।’
হঠাৎ আলোচনা থেমে যায় ছোট্ট নামিরের উল্লাসে। দারুণ এক শটে তামিম বল পাঠিয়েছেন সীমানার কাছে। তবে বলটা বাউন্ডারি পার হয়নি। নামিরের আক্ষেপ, চাচা কেন ছক্কা মারছেন না! ছেলেকে কি ক্রিকেটার বানাবেন? মৃদু হাসলেন নাফিস, ‘ছেলের ভেতর যদি প্রতিভা থাকে, ক্রিকেটার হবে। বড় হচ্ছে, ভাবছি অনুশীলনে দেব। অবশ্য চাচার (তামিম) মতো এখনই ডাউন দ্য উইকেটে খেলার বিরাট ঝোঁক। আমাদের তো খেলার পরিবার। ক্রিকেটার হলে হতেও পারে।’
চাচার ব্যাট থেকে কিছুক্ষণ পরই এল ফিফটি-নামিরের উচ্ছ্বাস দেখে কে! নামিরের মতো উচ্ছ্বসিত গোটা জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম। তবে উচ্ছ্বাসটা পূর্ণতা পেল না ইনিংসটা ৫৭ রানে থামায়। সামনে নিশ্চয়ই আবারও বড় ইনিংস খেলে আনন্দের উপলক্ষ এনে দেবেন তামিম।

‘ম্যাচের ৬৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে’ by রানা আব্বাস

মাহমুদউল্লাহ । ছবি: শামসুল হক
সংবাদ সম্মেলনে আসার পথে বেশ নির্ভারই মনে হলো মাহমুদউল্লাহকে। মুখে মিষ্টি একটা হাসি। যদিও ব্যক্তিগত ইনিংসটার কথা মনে পড়লে একটু আফসোস হওয়ার কথা। তবুও দ্বিতীয় দিন শেষে চট্টগ্রাম টেস্টের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা বাংলাদেশের হাতে থাকায় মাহমুদউল্লাহর মুখে এমন হাসি থাকাটাই স্বাভাবিক। চট্টগ্রাম টেস্টের নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের হাতে থাকার কথা স্বীকার করলেন প্রোটিয়া বোলিং কোচ চার্লস ল্যাঙ্গারভেল্ট। বললেন, ‘লড়াইয়ে এগিয়ে বাংলাদেশই।’ মাহমুদউল্লাহ অবশ্য একেবারে অঙ্ক কষেই জানিয়ে দিলেন টেস্ট ম্যাচের অবস্থা। তাঁর হিসাবে ম্যাচের ৬৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশেরই হাতে।
মাহমুদউল্লাহ বাংলাদেশকে এগিয়ে রাখছেন কিন্তু এর সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছেন কিছু শর্তও, ‘সুযোগ একটা এসেছে। এটা কাজে আগাতে হবে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ৬৫ শতাংশ আমাদেরই হাতে। কিন্তু কালকের সকালটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’
৫৫ রানে দুই উইকেট পড়ে যাওয়ার পর কিছুটা বিপাকেই পড়েছিল বাংলাদেশ। তৃতীয় উইকেটে তামিম ইকবাল-মাহমুদউল্লাহর ৮৯ রানের জুটির কল্যাণে ভালোভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশের ইনিংস। তবে জুটিটা আরও বড় না হওয়ার আফসোস মাহমুদউল্লাহর, ‘টেস্টে ওরা বিশ্বের এক নাম্বার দল। ওদের বোলিং খুবই ভালো। জানতাম, রান করাটা এত সহজ হবে না আমাদের জন্য। আমাদের একটু সচেতন থেকেই ব্যাটিং করতে হবে। বাজে বলটার জন্য অপেক্ষা করাটাই ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। এভাবেই ব্যাটিং করছিলাম। জুটিটা আরও একটু বড় হলে আমাদের দলের জন্যই ভালো হতো।’
এরপরেও সব ঠিকঠাকই চলছিল। বিকেল চারটার দিকে হঠাৎ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। খানিকক্ষণ বৃষ্টি-বিরতির পর আবারও বল মাঠে গড়াল। তবে হলো মাত্র একটি বলই। আবারও বৃষ্টির জয়! দ্বিতীয় দিনের খেলা থেমে গেল ওখানেই। মাহমুদউল্লাহর আফসোসটা এখানে। মাত্র পাঁচটি বল কাটিয়ে দিতে পারলেই আগামীকাল নামতে পারতেন সেঞ্চুরির প্রত্যাশায়। ব্যক্তিগত ইনিংসটা বড় না হলেও মাহমুদউল্লার আশা, ‘বড় স্কোরই গড়বে বাংলাদেশ।’

খামেনির মন্তব্য খুবই বিরক্তিকর: কেরি

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক বদলাবে না—ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির এমন মন্তব্যকে ‘খুবই বিরক্তিকর ও অস্বস্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় আল অ্যারাবিয়া টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কেরি এ কথা বলেন। গতকাল মঙ্গলবার কেরির সাক্ষাৎকারের একাংশ প্রচার করে টেলিভিশন চ্যানেলটি। খবর রয়টার্সের।
তেহরানে গত শনিবার ঈদ উপলক্ষে সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে খামেনি বলেন, ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তির ফলে তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক কিংবা ইরানের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আঞ্চলিক কিংবা আন্তর্জাতিক এমনকি দ্বিপক্ষীয় কোনো বিষয় নিয়ে ইরান আলোচনা করবে না এবং আঞ্চলিক মিত্রদের মধ্যে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকার এবং ফিলিস্তিনে হামাসের প্রতি ইরানের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
খামেনির মন্তব্যের প্রেক্ষাপটে জন কেরি বলেন, ‘এই পর্যায়ে এসে তাঁর পরিচিতি ছাড়া, একে (খামেনির বক্তব্য) কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় আমি জানি না। এটি তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার।’ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কিন্তু আমি জানি, মাঝেমধ্যে প্রকাশ্যে করা অনেক মন্তব্য এবং প্রকৃত বিষয় ভিন্নভাবে ডালপালা ছড়ায়। যদি এই হয় নীতি, তাহলে তা খুবই বিরক্তিকর, খুবই অস্বস্তিকর।’
ইরানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের যেকোনো সিদ্ধান্তে খামেনির কথাই শেষ কথা। তেহরানের বিতর্কিত পারমাণবিক প্রকল্প নিয়ে বিশ্বশক্তির সঙ্গে ইরানের আলোচনা এবং চুক্তি সমর্থন কর
কেরি বলেন, আঞ্চলিক বিষয়ে ইরানের হস্তক্ষেপ মোকাবিলায় আরব মিত্রদের সামর্থ্য আছে বলেই মনে করে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ গতকাল নিজ দেশের পার্লামেন্টে চুক্তিটির পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, এটি একটি ‘ভারসাম্যপূর্ণ’ চুক্তি। চুক্তিটি সম্পন্ন করতে সমঝোতায় পৌঁছার প্রয়োজন ছিল। চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার ফলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই তেহরানের ওপর থেকে জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলোর অবরোধ তুলে নেওয়া হবে।